Friday, September 6, 2019

কার পাল্লা ভারী? by সালমান তারেক শাকিল

রওশন, এরশাদ, কাদের
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবিত অবস্থায়ই জাতীয় পার্টি (জাপা)-কে ভাগ করে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছেন তার বিশ্বস্ত কয়েকজন রাজনৈতিক সহচর। এই বিভক্তির সর্বশেষ সংস্করণটি দৃশ্যপটে এনেছেন স্বয়ং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ। রওশনপন্থী কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তাকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। এরপর এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রওশনকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করেন। তাকে চেয়ারম্যান ঘোষণার পেছনে যারা দোষী, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এই হুঁশিয়ারিতেও টলছেন না রওশনপন্থীরা। পরন্তু আগামী ৮ সেপ্টেম্বর সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক ডাকা হয়েছে। বলা হচ্ছে, ওই বৈঠক থেকেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন রওশন এরশাদ।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জিএম কাদেরের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জাপার এমপিরা। ইতোমধ্যে কয়েকজন দৃশ্যত দুজনের পাশে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ কেউ বজায় রাখছেন নিরাপদ দূরত্ব। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বয়ং মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। বৃহস্পতিবার সারাদিনে তিনি দৃশ্যপটে নেই অথচ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সড়কের একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

জাপার উভয় অংশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের সংগঠন ও এমপিদের মধ্যে জনপ্রিয় জিএম কাদের। বিরোধীদলীয় নেতা ও রংপুর-৩ আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে বেশিরভাগ এমপির সমর্থন চেয়ারম্যানের দিকে। তারা হলেন, কাজী ফিরোজ রশীদ, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, নাজমা আকতার, শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল, আহসান আদেলুর রহমান, মসিউর রহমান রাঙ্গা, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাসুদা রশিদ চৌধুরী, লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী, নুরুল ইসলাম তালুকদার, সালমা ইসলাম, পনির উদ্দিন আহমেদ। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদেরের পাশে ছিলেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, গোলাম কিবরিয়া টিপু এমপি, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি, সুনীল শুভরায়, লে. জে. মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী এমপি, মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, কাজী মামুনুর রশিদ, আলমগীর সিকদার লোটন, এমরান হোসেন মিয়া, নাজমা আক্তার এমপি, উপদেষ্টা মেজর (অব.) আশরাফউদ দৌলা, মাহমুদুর রহমান মাহমুদ, ভাইস চেয়ারম্যান সরদার শাহজাহান, আহসান আদেলুর রহমান এমপি, মোস্তাকুর রহমান, মস্তফা আল মাহমুদ, নুরুল ইসলাম তালুকদার এমপি, যুগ্ম-মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় প্রমুখ।

আগের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রওশন এরশাদের সঙ্গে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ছাড়াও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু, মজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, এসএম ফয়সল চিশতী, মীর আবদুস সবুর আসুদ, খালেদ আখতার, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, ভাইস চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন খোকা ও নাসিম ওসমান প্রমুখ। এছাড়া, রওশনপন্থী এমপিদের মধ্যে ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফখরুল ইমাম, মুজিবুল হক চুন্নু, নাসিম ওসমান প্রমুখ।

জিএম কাদেরপন্থী কাজী ফিরোজ রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এরশাদের জাপার পক্ষে। জিএম কাদেরকে তিনি জীবদ্দশায় চেয়ারম্যান মনোনীত করেছেন। তিনি এমপিদের অভিমত নিয়েই বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। খোদ এরশাদ আমাকে অসিয়ত করেছেন জিএম কাদেরের সঙ্গে থাকতে। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ তৃতীয় একটি গোষ্ঠীর ইঙ্গিতে জাপাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। এটা শত্রুদের কাজ। জাপার সারাদেশের নেতাকর্মীরা জিএম কাদেরের সঙ্গে আছেন।’

পাল্টা মন্তব্য রওশনপন্থী এমপি ফখরুল ইমামের। তার ভাষ্য, ‘গঠনতন্ত্র মোতাবেক তো জিএম কাদের কো-চেয়ারম্যান। পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি প্রেসিডিয়ামের সঙ্গে কোনও বৈঠক না করে, আলোচনা না করে বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে চিঠি দিয়েছেন, এটা অন্যায় হয়েছে।’

উভয় অংশের বাইরে আছেন, জাপার এমন নেতারা বলছেন, রওশন এরশাদের সঙ্গে জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব ৯০-এর দশকের শুরুতেই। এটা এরশাদের জীবদ্দশাতেই একাধিকবার দৃশ্যমান হয়েছে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেও রওশন ও জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে ছিল। এরপর ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে জাতীয় পার্টির কর্মী-সম্মেলনে এরশাদ তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিলে ফের রওশন বিরোধিতা করেন। পরে রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন এরশাদ। কিন্তু গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে কাদেরকে বেছে নেন। এই বছরের জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে গুরুতর অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন এরশাদ। কিন্তু গত ২২ মার্চ পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে জিএম কাদেরকে সরিয়ে দেন। পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারা অনুযায়ী ওই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে চূড়ান্তভাবে গত ৪ মে প্রায় মধ্যরাতে সাংবাদিকদের ডেকে এরশাদ জানান, তার ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এরপর ১৪ জুলাই এরশাদ মারা যান। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে রওশনপন্থীরা কোনও বিরোধিতা না করলেও আজই প্রথম জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে গেলেন রওশন।

একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাপা রংপুরকেন্দ্রিক রাজনীতিতেই এখন পর্যন্ত সক্রিয়। সারাদেশে তেমন সাংগঠনিক শক্তি না থাকলেও রংপুর বিভাগে এরশাদের জনপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত। এক্ষেত্রে রংপুর থেকেই দলের নেতৃত্ব পরিচালিত হবে। নেতাকর্মীদের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর এ কারণে জিএম কাদের স্বভাবত এগিয়ে থাকলেও সমস্যায় পড়েছেন বেশি তিনিই। রাজনৈতিকভাবে রওশন এরশাদ বা আনিসুল ইসলাম মাহমুদরা এগিয়ে থাকলেও সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান অনেকটাই কম। যদিও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে রওশনপন্থীদের দিকে পাল্লা ঝুঁকে থাকার কথা আলোচনায় থাকলেও তা কতটা বাস্তব, আরও পরে স্পষ্ট হবে। তবে, রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন জাপার একাধিক নেতা।

জাপার প্রেসিডিয়ামের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা দাবি করেন, জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ দুই অংশের চেয়ারম্যান হিসেবে এখন পর্যন্ত থাকলেও চেয়ারম্যান হতে আগ্রহীদের মধ্যে আছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (রওশনপন্থী), মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী (জিএম কাদেরপন্থী)। মহাসচিব হিসেবে মসিউর রহমান রাঙ্গা থাকলেও সরকারের সমর্থন আসলে কোন দিকে যায়, সেটিও নজরে আছে তার। মহাসচিব হওয়ার দৌড়েও রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু আছেন। এই নেতার দাবি, সরকারের একটি প্রভাবশালী সংস্থা জাপা-সংকটের পেছনে আছে। ফলে, কে প্রভাবশালী বা কে সামনে এগুবে, তা নির্ভর করবে ওই সংস্থার ওপর। এছাড়া দলের মিডিয়া উইং, কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও চেয়ারম্যান কার্যালয় জিএম কাদের অনুসারীদের দখলে। এ কারণে দৃশ্যত জিএম কাদের এগিয়ে আছেন।

জাপার একাধিক নেতা জানান, জাপার উভয় অংশই এখন সরকারের দিকে ঝুঁকে আছে। জিএম কাদেরও চান সরকারের সম্মতিতে বিরোধী পক্ষ গড়ে তুলতে। সম্প্রতি ছোট ছোট কয়েকটি দলের নেতা সাক্ষাৎ করেছেন তার নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট করতে। যদিও এসব আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।

আর জিএম কাদের মনে করছেন, সংসদীয় রাজনীতিতে সরকারের সম্মতির বাইরে কার্যকর বিরোধী দল হওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘মূলত দুটো রাজনৈতিক কারণে বিকল্প বিরোধী জোট করার পক্ষে তার কাছে মত আসছে। একটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোট আছে। জোটের শরিক দলগুলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই রাজনীতি করতে আগ্রহী। ফলে, যেকোনও দল চাইলেও সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধী জোট থাকলেও দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। এ কারণেই ছোট ছোট দলগুলো জাতীয় পার্টিতে ভিড়তে চায়।’

রওশন এরশাদ দশম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার আসনে ছিলেন। একটি সূত্র বলছে, একাদশ সংসদেও তাকে দেখতে চাইছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি পক্ষ। তবে রওশনপন্থীরা অবশ্য এখনও এ নিয়ে কিছু বলতে নারাজ। ইতোমধ্যে একজন নেতা জানান, খুব সম্ভবত সরকারের পক্ষ থেকে উভয়পক্ষকেই সমাধানে যেতে বলা হবে। অন্যথায় চলতি অবস্থাতেই কিছুদিন কার্যক্রম চলবে।

চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক এমপি মুহাম্মদ নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রওশন এরশাদ আমাদের স্যারের স্ত্রী, দলে তার অবদান অনস্বীকার্য। আবার ভদ্রলোক হিসেবে ইতোমধ্যে জিএম কাদের সমাদৃত। তার অবদানও অনেক। আমরা চাইছি ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় পার্টিতে সমাধান আসতে। একটি কার্যকর বিরোধী দল গড়ে তুলতে ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই।’

এদিকে, ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠনের পর দফায় দফায় ভাঙনের মুখে পড়েছে জাপা। এরশাদের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগীরা দল ছেড়ে যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। আবার কোনও কোনও নেতা জাতীয় পার্টি নামেই করেছেন দল। এই নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজী জাফর আহমেদ, নাজিউর রহমান মঞ্জু ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। সর্বশেষ রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান করে জাপায় আবার বিভক্তি শুরু করলেন দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন মজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, এস এম ফয়সল চিশতী ও সেলিম ওসমান প্রমুখ।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে পাঁচটি জাতীয় পার্টি রয়েছে। মূল দল জাতীয় পার্টি (নিবন্ধন নম্বর ০১২)। এর নেতৃত্বে আছেন জিএম কাদের। মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। তবে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নতুন চেয়ারম্যানের স্থলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম রয়েছে। নেই মহাসচিব হিসেবে কারও নাম। জাপা ছাড়া কয়েকটি দলের মহাসচিব পরিবর্তন  হলেও সেখানে আপডেট নেই।

নিবন্ধিত জাপার মধ্যে বাকি তিনটি হচ্ছে—আন্দালিভ রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (নিবন্ধন নম্বর ০১৮) ও প্রফেসর ডা. এম. এ. মুকিত (চেয়ারম্যান), এ এন এম সিরাজুল ইসলামের (ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব) নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (নিবন্ধন নম্বর ২৮) ও জাতীয় পার্টি-জেপি (নিবন্ধন নম্বর ০০২)। দলটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে আছে। দলটির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। অনিবন্ধিত অবস্থায় আছে জাতীয় পার্টি (মোস্তফা জামাল হায়দার)। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক এই দলটি।

বিভক্তির মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির কার্যকারিতা এখন আর কতটুকু বাকি রইলো, এমন প্রশ্ন ছিল এরশাদের সাবেক রাজনৈতিক সহযোগী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের প্রতি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘আমি এরশাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছি।’ বিষয়টি নিয়ে তিনি আর কোনও কথা বলতে চান না বলেও জানান।
একই মঞ্চে এইচএম এরশাদ, রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের
>>>ছবি: সাজ্জাদ হোসেন।

কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য: মেয়ে সংক্রান্ত ঘটনার জেরে খুন হয় মহসিন by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

মহসিন (১৪)। মোহাম্মদপুর চাইল্ড হেভেন স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। বুধবার সন্ধ্যায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হয় এই কিশোর। জানা যায়, মঙ্গলবার বিকালে মহসিন ও তার বন্ধু রুবেল তাদের এক মেয়ে বন্ধুকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানে আড্ডা দিচ্ছিল। এ সময় কাটাশুরের কয়েকজন কিশোর-তরুণ এসে আপত্তিকর  মন্তব্য করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এর জের ধরেই কয়েকজন কিশোর ও তরুণ চান মিয়া হাউজিংয়ের বেড়িবাধের পাশে পাইওনিয়ার হাউজিং এর গলিতে এসে মহসিনের ওপর হামলা চালায়। গুরতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
এসময় আহত হয় আরো তিনজন। আহতরা হলেন, সাব্বির (১৭), রাকিব (১৭) ও রুবেল (২৩)। প্রত্যক্ষদর্শীর জানান, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে চান মিয়া হাউজিং এলাকার ২ নম্বর সড়কে মহসিন, রুবেলসহ কয়েকজন কিশোর মুঠোফোনে ছবি দেখছিল। একপর্যায়ে তাদের সমবয়সী একদল কিশোর এসে চাপাতি নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এঘটনার সময় মিজানুর রহমান নামে একজন পালিয়ে যায়। বাকিরা মহসিনকে বাচাতে গিয়ে আহত হন। পরে তারা শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যান। এই ঘটনায় আসিফ ও রকি নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
প্রদক্ষদর্শী রিকশা চালক আলমগীর হোসেন বলেন , যখন ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যায় তখন সে বেশ আহত হয়েছিল। চারদিক রক্তে ভরে গিয়েছিলো। আর যারা মেরেছে তারা দিকবেদিক দৌড়ে চলে গেছে। তিনি বলেন ,আমাদের এলাকার ছেলেরা কর্মজীবী এদের আড্ডা দেয়ার সময় নাই। বাহিরের কিছু ছেলে- পেলে এসে আড্ডা দিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এলাকাবাসী বলছে ,মহসিন ও রুবেলের সঙ্গে হামলাকারীরা চলাফেরা করত। মহসিন তার মায়ের সঙ্গে চান মিয়া হাউজিংয়ে থাকত। ছোটবেলায় তার বাবা মারা গেছেন। তার মা লায়লী বেগম মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন।
বেড়িবাধ এলাকার চা দোকানদার রিয়াদ মিয়া জানান, তারা একসাথেই চলাফেরা করতো। চা, সিগারেট খেতো। তবে মহসিন সবার থেকে একটু ভালো ছিলো। বাকিরা নিরীহ মানুষদের হুমকি ধমকি দিতো। দোকানে বাকি খেয়ে টাকা দিতো না। এই গ্রুপটাই বখাটে ছিলো। তাদের দুই তিনটা বাইক ছিলো। ওরা এলাকায় আসলে সবাই টের পেতো।
এদিকে পুলিশ সূত্র বলছে, কিশোর গ্যাং এর দু’গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পূর্ব শত্রুতার জের ও  প্রেম সংক্রান্ত জেরেই তাকে হত্যা করা হয়। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে, মোহাম্মদপুরে রকি ও রবিন গ্রুপ নামে দুটি কিশোর গ্যাং মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। সমপ্রতি এক মেয়েক নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এলাকায় এ নিয়ে বেশ কয়েকবার বৈঠকও হয়। বুধবার রাতে তেমনই একটি সমঝোতা বৈঠক চলছিল। এ সময় রবিন গ্রুপের এক কিশোর উত্তেজিত হয়ে ওঠে। দুই গ্রুপের মধ্যে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। এ সময় মহাসিনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। দুটি কিশোর গ?্যাংয়ের সদস?্যরা অনেক দিন ধরেই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা, মেয়েদের উত্যক্ত করে আসছিল। এলাকার অলি-গলিতে দিন-রাত আড্ডায় মেতে থাকে তারা। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। তারা প্রত্যেকেই মাদকে আসক্ত।
সরেজমিনে মোহাম্মদপুরের চানমিয়া হাউজিং এলাকায় গিয়েও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই গ্রুপের কিশোর’রা সবসময়ই আড্ডা দিতো এলাকায় । বিশেষ করে স্কুল ছুটির পর বিকেল থেকে রাত এগারোটা বারোটা পর্যন্ত চলতো এই আড্ডা। অনেক সময় দোকানে বাকি খেয়ে টাকা দিতো না, মানুষকে কথায় কথায় হুমকি দিতো। এই এলাকার বাসিন্দা আলী রেজা বলেন , তাদের যন্ত্রনায় মানুষ অসহ্য হয়ে গেছে।
এদিকে এ ঘটনায় গতকাল সকালে নিহত মহসিনের বড় ভাই বাদী হয়ে ১৩ জনকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
মহসিনের মা লায়লী বেগম বলেন, আমার ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। ঘটনার দিন বিকাল সাড়ে চারটায় বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর শুনি এই ঘটনা। আমি এর বিচার চাই। আমার ছেলে কোনো অপরাধ করলে আমার কাছে বা পুলিশের কাছে বিচার দিতে পারতো। আমার ছেলেটারে এভাবে মেরে ফেল্লো?
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণেশ গোপাল বিশ্বাস জানান, মহসিন খুনে জড়িতরা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। আধিপত্য বিস্তার ও একটি মেয়েকে কেন্দ্র করে এই খুনের ঘটনা ঘটে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক ভূমিকম্পেও স্বমহিমায় গণতন্ত্র by সাজেদুল হক

গণতন্ত্রের শরীরটা ভালো নেই। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদী নেতাদের উত্থান। এমনকি এই প্রশ্নও উঠেছে যে, গণতন্ত্র কি মারা যাচ্ছে? প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড রাঞ্জিম্যান ‘কীভাবে গণতন্ত্রের বিনাশ হবে’ শীর্ষক বইতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তার জবাব চমকপ্রদ। রাঞ্জিম্যানের ভাষ্য- গণতন্ত্র মারা যাচ্ছে না, কিন্তু এটি অনিশ্চিত মধ্যবয়সের সংকটে পড়েছে। তার মতে, বেশিরভাগ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং হতাশার শুরু ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট থেকে। তারই জের ধরে রাজনীতিতে যেসব ভূমিকম্প হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ডনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া এবং বৃটেনের ব্রেক্সিট গণভোট। ঘটনার পাঁচ বছর আগেও কেউ ভাবতে পারেনি, এগুলো ঘটতে পারে।
এখন সবার মধ্যেই এই অনুভূতি কাজ করছে যে, আমরা এমন কিছুর ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, যা আসলে আমরা বুঝতে পারছি না। কেউ কোন আগাম ধারণ করতে পারছে না। এটাই কি শেষ? সবাই জানতে চায়, এরপর কি হতে যাচ্ছে? র‌্যাঞ্জিমানের এই বয়ানের বাইরেও গণতন্ত্রের নামে হরেক কিসিমের শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে দেশে দেশে।
ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে বিলাতের রাজনীতিতে যে ঝড় শুরু হয়েছিল তা আজও থামেনি। এরই মধ্যে দুই জন প্রধানমন্ত্রী এই ঝড় সামলাতে না পেরে বিদায় নিয়েছেন।
বরিস জনসনের আসনও নড়বড়ে। ‘মাদার অব পার্লামেন্টস’ এ মিনিটে মিনিটে পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। এতো সব সংকট আর নাটকীয়তার মধ্যেও গণতন্ত্র তার স্বমহিমায় হাজির হয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এক পার্লামেন্ট এটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে, একটি পার্লামেন্ট কী করতে পারে আর কী পারেনা! পার্লামেন্টের ক্ষমতার কাছে প্রধানমন্ত্রী যেন অসহায়! বরিস জনসন একের পর এক পরাজয় বরণ করছেন পার্লামেন্টে। নিজ দলের একটি অংশও ভোট দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে। মুসলিম নারীদের বোরকা নিয়ে মন্তব্য করে পার্লামেন্টে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে।
একের পর এক ভোটে পরাজিত হয়ে বরিস জনসনের কণ্ঠে হতাশা। তিনি বলেছেন, সরকারের আনা একের পর এক প্রস্তাব যদি পার্লামেন্ট পাস না করে তাহলে সরকার পরিচালনা করা পুরোপুরি অসম্ভব। বুধবার রাতে বিরোধী দল ও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের বিদ্রোহী এমপিরা ‘নো-ডিল ব্রেক্সিট’ বা চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট বন্ধের প্রস্তাব উত্থাপন করেন পার্লামেন্টে। এ বিল পাস করেছে পার্লামেন্ট। ব্রেক্সিট প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা কি হবে তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এই বিলে। এই বিলে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি সমঝোতা করে পার্লামেন্টে ফল নিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে তাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ফিরে যেতে হবে। তাদেরকে অনুরোধ জানাতে হবে, ব্রেক্সিটের সময়সীমা ২০২০ সালের ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এই অনুরোধ জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যে চিঠি পাঠাবেন তার ভাষা কী হবে তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এই বিলে। এর মধ্য দিয়ে বুধবার রাতে প্রথম দফা পরাজয়বরণ করেন জনসন। বিলটি পাস হওয়ার পর বরিস জনসন আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব আনেন।
এই প্রস্তাবটি পাস হতে প্রয়োজন হয় দুই-তৃতীয়াংশ এমপি’র সমর্থন। কিন্তু তার প্রস্তাব এই পরিমাণ সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়। ফলে তার ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। এ অবস্থায় পাস হওয়া ‘নো-ডিল ব্রেক্সিট’ বা চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট আটকে দিয়ে পার্লামেন্ট যে বিল পাস করেছে তাকে এক অর্থে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আত্মসমর্পণ বলে বর্ণনা করেছেন বরিস জনসন। ওই বিল পাসের পর তিনি আগামী ১৫ই অক্টোবর নির্বাচনের প্রস্তাব আনেন। কিন্তু বৃটেনে এখন যে ‘ফিক্সড টার্ম পার্লামেন্ট অ্যাক্ট’ রয়েছে তাতে বলা আছে যে, একটি পার্লামেন্ট যে মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবে সেই মেয়াদ পর্যন্ত থাকবে। যদি আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হয় তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন লাগবে। কিন্তু আগাম নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি দ্বিতীয় দফায় পরাজিত হন বুধবার রাতে।
বিবিসি লিখেছে, আগাম নির্বাচনের প্রস্তাব রেখে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে এটা নজিরবিহীন যে, সরকার নির্বাচন দিতে চাইছে আর বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করছে। তবে বিরোধী দল লেবার পার্টি বলছে, তারা আগাম নির্বাচনের বিরোধী নয়। গত দুই বছর যাবৎ লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন আগাম নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এই মূহুর্তে লেবার পার্টির অগ্রাধিকার হচ্ছে ‘নো ডিল ব্রেক্সিট’ বন্ধ করা। ‘নো ডিল ব্রেক্সিট’ আটকে দিয়ে হাউজ অব কমন্সে যে বিল পাস হয়েছে সেটি এখন হাউজ অব লর্ডসে যাবে। এরপর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সম্মতির জন্য তা পাঠানো হবে। এই সবগুলো ধাপ পার হবার যখন পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, ‘নো ডিল ব্রেক্সিট’ আর হচ্ছে না, তখন নির্বাচনের ব্যাপারে বিরোধী দল লেবার পার্টির কোনো আপত্তি নেই।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মনোভাব নিয়ে সংশয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ন্যায়বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের একটি গ্রামে রোহিঙ্গা নির্যাতনের সময় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা ৪০০ মানুষকে হত্যা করেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের দায়ে জড়িত সেনা সদস্যদের সামরিক আদালতে বিচার করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। কিন্তু তাদের এমন উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিধা প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক এই সংগঠন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
সোমবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে ঘোষণা দিয়েছে তাতে তাদের মনোভাবের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। তারা দু’বছর আগে চালানো ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’-এর সময় নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু তাদের নৃশংসতা থেকে জীবন বাঁচাতে কমপক্ষে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিদের হামলার জবাব দেয়া হয়েছে- এমন কথা ব্যবহার করে সেনাবাহিনী রাখাইনে নৃশংসতা চালানোর পক্ষে সাফাই গাইছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সপ্তাহান্তে ঘোষণা দিয়েছে, তারা নৃশংসতার জবাবে তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে যে, রাখাইনের ওই গ্রামে তাদের নির্দেশ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় নি। তবে কোন তারিখে বা কি ধরনের অপরাধ সেখানে ঘটানো হয়েছিল তার বিস্তারিত জানায়নি তারা। তবে তারা বলেছে, সামরিক আইনের অধীনে গুটাবাইন গ্রামে সংঘটিত ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিচার করা হবে সামরিক আদালতে।
গত বছর জানুয়ারিতে বার্তা সংস্থা এপি রিপোর্ট করে যে, তাদের হাতে তথ্যপ্রমাণ এসেছে। তাতে এমন ইঙ্গিত দেয় যে, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা ওই গ্রামে গণহত্যা চালিয়েছে। গ্রামটি গুদার পাইন নামেও পরিচিত। নিহতদের মৃতদেহ কমপক্ষে ৫টি গণকবরে চাপা দেয়া হয় সেখানে। তবে এ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা সামরিক আদালতে বিচারের যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে এই গ্রামের গণহত্যা অন্তর্ভুক্ত কিনা তাও অজানা। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতি নিধন অথবা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে বহু মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ২০১৬ সাল থেকে রাখাইনে বড় রকমের নির্যাতনের তথ্য প্রামাণ্য আকারে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, গ্রামে গ্রামে অগ্নিসংযোগ। এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বিচার করার কথা বলা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হাতেগোনা দু’চারজন সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটাই তাদের দিক থেকে অনেক বড় কিছু। তারা এটা করছে আমরা যখন হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ সহ নৃশংসতার বিষয়ে কথা বলছি। তাদের এসব নির্যাতনে তাদেরই লোকজন ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এভাবে কিছু নিম্নস্তরের সেনা সদস্যকে বলির পাঁঠা বানানোর মাধ্যমে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের এমন সামরিক আদালতে বিচার মনে হচ্ছে আরেকটি গেম। তিনি এক ই-মেইলে আহ্বান জানান, এমন বিচার করতে হলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের বিরুদ্ধে করতে হবে, যারা শাস্তির মুখোমুখি হবেন। ফিল রবার্টসন আরো বলেন, আপনি বলতে পারেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই বিচারের বিষয়ে সিরিয়াস নয়। কারণ, তারা পুরো অপারেশন রিভিউ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। রুদ্ধদ্বার ব্যবস্থায় তারা সামরিক আদালতের বিচারকে আড়াল করছে। ফলে জনগণ ও মিডিয়ার চোখ ফাঁকি দেয়া হবে এর মাধ্যমে। তাই তাদের এমন কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মনোভাবের পরিবর্তন হবে এমনটা ভেবে কারো বোকা হওয়া উচিত নয়। এখনো ওই সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অধিকার লঙ্ঘন করেনি। জঘন্য অপরাধে আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা থেকে তারা নিজেদের মুক্ত রাখার চেষ্টা করে।

রবার্ট মুগাবে আর নেই

জিম্বাবুয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। শুক্রবার সকালে সিঙ্গাপুরের এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। জিম্বাবুয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগওয়া তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। এ খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।
আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বীর ছিলেন মুগাবে। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে জিম্বাবুয়ে শাসন করেন তিনি। তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৭ সালের নভেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। জিম্বাবুয়ে স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮০ সালে প্রথম নির্বাচনে জয় লাভ করে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন মুগাবে।
১৯৮৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বিলুপ্ত ঘোষণা করে দেশের প্রেসিডেন্ট হন। তার দীর্ঘ শাসনামলে দুর্নীতি,  স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও অদক্ষতার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
মুগাবে ১৯২৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রোডেশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে রোডেশিয়ার তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করায় এক দশকেরও বেশি সময় কারাবাস করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে কারাগারে থাকাকালীন সময়েই জিম্বাবুয়ের আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন তিনি।
শুক্রবার দেয়া এক বিবৃতিতে জিম্বাবুয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুগাবেকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি স্বাধীনতার একজন আইকন ও একজন প্যান-আফ্রিকান ছিলেন। যিনি তার জনগণের ক্ষমতায়ন ও বন্ধনমুক্তির জন্য কাজ করেছেন। আমাদের জাতি ও মহাদেশের ইতিহাসে তার অবদান কখনো ভুলবার নয়। তার আত্মার শ্বাশ্বত শান্তি কামনা করছি। উল্লেখ্য, মুগাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নানগাগওয়া।
গত শতকে জিম্বাবুয়ে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি পান মুগাবে। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর ধীরে ধীরে তার বিরুেেদ্ধ ওঠে নানা অভিযোগ। জীবনের শেষ বছরগুলোয় আর্থিক টানাপোড়ন, সহিংস ভীতি প্রদর্শন, দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থতার জন্য সুনাম হারান তিনি। নিজের প্রধান সহচর নানগাগওয়াকে রেখে স্ত্রী গ্রেসবকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিলেন মুগাবে।
মুগাবের মৃত্যু জিম্বাবুয়ের জন্য নতুন এক অধ্যায়ের শুরু। বৃটিশ শাসন থেকে জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা লাভের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত মুগাবেই দেশটির একমাত্র শাসক ছিলেন। জিম্বাবুয়ের নাগরিকদের পুরো একটা প্রজন্ম তাকে ছাড়া অন্যকোনো শাসকের মুখ দেখেনি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাকে জাতির পিতার সম্মান দেয়া হয় ও সরকার থেকে ভাতার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। এতে তার অনেক বিরোধীরা ক্ষুব্ধ হন। তবে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মুগাবেও বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ দিয়ে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। সেখানে জানান, নিজ দল জানু-এফ পার্টির বদলে বিরোধীদল মুভমেন্ট ফর ডেমোক্র্যাটিক চেঞ্জ’র প্রতি সমর্থন জানাবেন তিনি। যদিও এর আগে বহুদিন দলটিকে দমিয়ে রেখেছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত আফ্রিকায় তার গুটিকয়েক বন্ধু ছিল। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব সম্মান খুইয়ে বসেন সাবেক এই আফ্রিকান বীর। বৃটিশ সরকার কর্তৃক তাকে দেয়া ‘নাইট’ সম্মাননা কেড়ে নেয়া হয়। ক্ষমতা প্রাপ্তির শুরুর দিককার মুগাবে অবশ্য একেবারেই ভিন্ন ছিলেন। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর যে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই করেছিলেন, সে শ্বেতাঙ্গদের ওপর কোনো নির্যাতন না চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি তার শাসনামলের শুরুর দিকে তরতর করে বেড়ে ওঠে। শিক্ষার উন্নয়নের দিকে জোর দেয়ুয়া হয়। তার শাসনামলের শুরুর দিককার ওইসব উন্নয়ন আফ্রিকার অহংকার হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠে গর্হিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। আশির দশকে মাতাবেলেল্যান্ড প্রদেশে ২০ হাজার মানুষের জাতিগত নিধনের অভিযোগ ওঠে তার সরকারের বিরুদ্ধে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জশুয়া নকোমোকে পরাস্ত করতে একাধিক স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এসব অভিযোগ অগ্রাহ্য করে যায়।
পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের দিকে ফের বিরোধীদের উত্থান ঘটে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বাণিজ্যিক সংগঠনগুলো মিলে মুভমেন্ট ফর ডেমোক্র্যাটিক চেঞ্জ- দল গঠন করে। মুগাবে ওই সময় নির্বাচনে কারচুপি করে জয়ী হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভূমি সংস্কারের নতুন কর্মসূচি চালু করেন তিনি। ওই কর্মসূচিত আওতায় শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের জোরপূর্বকভাবে চাষাবাদ করা থেকে বিরত রাখা হয়। অনেককে উৎখাত করে দেয়া হয়। তাদের জায়গায় দলীয় সমর্থক ও কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের কৃষিকাজের সুযোগ দেয়া হয়। যদিও চাষাবাদে শ্বেতাঙ্গরা গড়পড়তায় বেশি দক্ষ ছিল। মুগাবের এই পদক্ষেপে অর্থনৈতিক মন্দার পথ সৃষ্টি করে দেয়। দেশটিকে বিদেশী খাদ্য ও ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে হয়। ভেঙে পড়তে থাকে এক সময়কার উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সহিংস হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিবেশও। অধিকারকর্মীদের নির্যাতন করা হয়, কারাদণ্ড দেয়া হয়, এমনকি হত্যাও করা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগ দিয়ে দুই শতাধিক মানুষ সহিংসতায় মারা যায়।
মুগাবের বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব জিম্বাবুয়ের রাজনৈতিক বিষয়ক প্রয়াত অধ্যাপক জন মাকুম্বে বলেছিলেন, তাকে ভিলেন হিসেবে মনে রাখা হবে। ক্ষমতায় থেকে, নির্যাতন চালিয়ে, নিজের মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমিয়ে রেখে তিনি নিজের সুনাম ধ্বংস করেছেন। রবার্ট মুগাবের মধ্যে মন্দ শাসন, নৃশংসতা ও স্বার্থপরতার বীজ সবসময়ই বপন করা ছিল। তার শাসন ছিল এমন- একমাত্র আমিই গুরুত্বপূর্ণ।

কাশ্মীরে ব্ল্যাকআউট বন্ধে অ্যামনেস্টির ক্যামেপইন

কাশ্মীরে মাসব্যাপী ‘ব্ল্যাকআউট’ বন্ধে ‘আর্জেন্ট ক্যাম্পেইন’ শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এই প্রচারণার হ্যাসট্যাগ #লেটকাশ্মীরস্পিক। কাশ্মীরে কি পরিস্থিতি মানুষের সে বিষয়টিও তুলে ধরেছে তারা। বলা হয়েছে, কাশ্মীরে ভয়াবহভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা সেখানকার জনমানুষের নাগরিক অধিকারের বিরুদ্ধে এক নিষ্ঠুর অত্যাচার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারত চ্যাপ্টার থেকে এ বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ৫ই সেপ্টেম্বর তারা ওই প্রচারণা শুরু করেছে। এতে কাশ্মীরের অচলাবস্থার জন্য মানুষকে কীভাবে মূল্য দিতে হচ্ছে তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারত চ্যাপ্টারের প্রধান আকার প্যাটেল বলেছেন, ওই অচলাবস্থা এখন এক মাস হয়েছে।
ভারত সরকারের এই অচলাবস্থা আর দীর্ঘায়িত হতে পারে না। কারণ, এতে কাশ্মীরের মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের আবেগ ও মানসিক অবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা একইসঙ্গে দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ও জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। অচলাবস্থার কারণে কাশ্মীরি পরিবারগুলোর সদস্যরা আলাদা হয়ে পড়ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ক্যামেপইন থেকে গত এক মাস ধরে চলা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে কাশ্মীরিদের মুক্তির আহ্বান জানানো হয়েছে। ভারত সরকার কর্তৃক কাশ্মীরের স্বশাসনের অধিকার কেড়ে নেয়ার পর সেখানে টেলিফোন সেবা বন্ধ রয়েছে। জম্মু অঞ্চল যখন অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে তখনো কাশ্মীরের বেশিরভাগ এলাকাই বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। এ নিয়ে আকার প্যাটেল বলেন, একটি এলাকার নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর মত প্রকাশ ও চলাচলের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার অর্থ হচ্ছে তাদেরকে অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নেয়া। তথাকথিত নয়া কাশ্মীর কখনোই কাশ্মীরিদের ছাড়া নির্মাণ সম্ভব নয়। গত এক মাস যাবৎ ভারত সরকার বলে আসছে কাশ্মীরে সব স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে এখনো অনেক কিছু শোনার বাকি। ২রা সেপ্টেম্বর ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুবরামানায়াম জয়শংকর বলেন, কাশ্মীরের সন্ত্রাসীদেরকে তাদের নেতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতেই সেখানে ইন্টারনেট, টেলিফোন সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। আলাদা করে শুধু সন্ত্রাসীদের জন্য এই সেবা বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া সম্ভব নয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ বিষয়ে অবহিত আছে বলে জানিয়েছে। নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগ থাকলেও বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর সবাইকে অবরুদ্ধ করে রাখা ভারতীয় সংবিধানের বিরোধী।
কাশ্মীর থেকে পাওয়া গণগ্রেপ্তার, বেসামরিক নাগরিকদের নির্যাতন, রাবার বুলেট, পেলেট গান ও টিয়ারগ্যাসের বাছবিচারহীন
ব্যবহারের নিন্দা জানায় অ্যামনেস্টি। একে এই অঞ্চলের সব থেকে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সংস্থাটি। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সেখানকার মানুষজন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। আতঙ্কে বেশিরভাগ মানুষ ঘর থেকে বেরুচ্ছে না।

জাতীয় পার্টির দ্বন্দ্বকে যেভাবে দেখছে সরকার by মাহবুব হাসান

জাতীয় পার্টিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা মনে করছেন- জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার পদ এবং রংপুর-৩ আসনের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে যে মতভিন্নতা তৈরি হয়েছে সেটাকে এখনও ভাঙন বলা যায় না। দুই অংশের নেতারা আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করতে পারবেন। জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবেই জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। আর যদি দুটি আলাদা অংশ হয়ে যায়, তাহলে দলটি দুর্বল হয়ে পড়বে।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টি এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার অবর্তমানে দলে নতুন করে ভাঙন হলে বিরোধী দল হিসেবে অবস্থানও দুর্বল হয়ে যাবে। কেননা ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টি সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছিল। কিন্তু দুটি অংশ হয়ে গেলে দুই অংশেই সিনিয়র নেতা ও সংসদ সদস্যরা অবস্থান নেবেন। ফলে দলটির ঐক্য নষ্ট হবে।

প্রসঙ্গত, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তার ভাই ও দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। কিন্তু তার পদের ব্যাপারে বিরোধিতা করে আসছিলেন অন্য কো-চেয়ারম্যান এবং এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ। সংকট আরও ঘনীভূত হয় জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার আসন নিয়ে। বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) দলের ১৫ জন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর নিয়ে নিজেকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন জি এম কাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় পার্টির আরেকটি অংশের কয়েকজন নেতা বুধবারই রওশন এরশাদের বাসায় বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার একইস্থানে বৈঠক শেষে রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। পাশাপাশি রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান দাবি করে নির্বাচন কমিশনেও একটি চিঠি পাঠানো হয়।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় পার্টির এই ভাঙন নিয়ে নীরব থাকবেন তারা। এটা জাপার অভ্যন্তরীণ বিষয়। কোনও অংশেরই পক্ষ না নিয়ে তারা এর সমাধান আশা করছেন। সংসদে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টিকে আশা করছেন তারা।

সূত্রের দাবি, শেষ পর্যন্ত দুই অংশ মিলে যাবে। দুটি অংশেই সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। দলটির সিনিয়র নেতারাও দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়েছেন। তারা দলকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবেন। কেননা এখন নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না থাকলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে দলটি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘জাতীয় পার্টি সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। তাদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা না করে ঐক্যবদ্ধ থাকাটাই সমীচীন হবে। তাহলে সংসদে একটি দল হিসেবে যেমন ভূমিকা পালন করতে পারবে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একটি সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় পার্টিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটাকে এখনও ভাঙন বলা যায় না। এর আগে দলটিতে রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা এবং জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান করে একটি সমাধানের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এখনও সেভাবেই দলটি উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করতে পারে।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় পার্টি আবার ভেঙে যাক সেটা তারা চান না। সরকার দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সে যাত্রায় জাতীয় পার্টির সমর্থন চায়। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আগামীতেও জাতীয় পার্টিকেই প্রত্যাশা করেন তারা। সে কারণে জাতীয় পার্টির দুই অংশের মধ্যে সমাঝোতা চায় সরকার।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। তারা দল ভাঙা-গড়া চায় না। জাতীয় পার্টির ঐক্য চায়। দলটির নেতাদের মধ্যে যে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে সেটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘দলটিতে চেয়ারম্যন ও বিরোধী দলীয় নেতার পদ নিয়ে যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে দুই পক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে সমাঝোতা হবে বলে আমার বিশ্বাস।’

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ‘নৌকাবাইচ’

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা ও ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমান বলেছেন,  নৌকাবাইচ বাঙালির জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাজার বছরের গ্রামবাংলার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ধারাবাহিক ভাবে সুস্থ বিনোদন হিসেবে চলে আসছে। তাই এই নৌকা বাইচকে ধরে রাখতে হবে। হারাতে দেয়া যাবে না।
গতকাল বিকালে  ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার খানেপুর, আলালপুর ও শৈল্ল্যা গ্রামবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।   নৌকাবাইচ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল আজিজ ব্যাপারীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি বলেন, দোহার নবাবগঞ্জে অনেক নদী রয়েছে। যার বেশির ভাগই বিলীনের পথে। এসব নদীর তালিকা তৈরি করে শিগগিরই খনন করা হবে। তিনি বলেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে বাংলার হাজার বছরের অনেক ঐতিহ্যই আজ বিলীনের পথে।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এভাবে হারিয়ে যেতে দেয়া ঠিক হবে না। তাই আমাদের যেকোনো মূল্যে বাংলার সকল ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে। ইছামতি ও পদ্মা নদীর সংযোগস্থল কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধ এলাকায় জলকপাট নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। পাল্টে যাবে ইছামতি নদীর চেহারা, ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দোহার উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আলমগীর হোসেন, নবাবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ ঝিলু, পিএমও তোফাজ্জল হোসেন, নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম সালাহউদ্দীন মনজু, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পনিরুজ্জামান তরুণ, নবাবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন, দোহার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান খোকন, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায়   বিষয়ক সম্পাদক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া কিসমত,  ব্যবসায়ী এম.এ বারী বাবুল মোল্লা, মো. কামাল হোসেন, ইউপি চেয়ারম্যান রিপন মোল্লা, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাড. নান্নু মিয়া ও মোশারফ হোসেন মোল্লা প্রমুখ।
এসময় নৌকাবাইচ দেখতে ইছামতি নদীর দুই পাড়ে ছিল উপচে পড়া দর্শক। নদীর দু’পাড়ে শিশু, নারী, পুরুষসহ উপস্থিত প্রায় অর্ধ-লক্ষাধিক মানুষ। ইঞ্জিনচালিত ও পানসি নৌকা নিয়ে নদীতেও ছিল মানুষের সরব উপস্থিতি। দর্শকের টান টান উত্তেজনার মধ্যেই বাইচের নৌকার মাঝিরা হাঁক দিলেন হেঁইয়ো-রে হেঁইয়ো। দর্শকদের হর্ষধ্বনি আর হাততালি বাড়তি উৎসাহ দিলো মাঝি-মাল্লাদের। নৌকাবাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে বসে হরেক রকমের দোকান। দর্শকদের আনন্দ দিতে বিভিন্ন নৌকা বর্ণিল সাজে সাজানো হয়। নৌকাগুলোতে এ অঞ্চলের সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়।

এরশাদের জাতীয় পার্টি এখন কার? ভাঙন, রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা একাংশের by লুৎফর রহমান

পর পর পাঁচবার ভেঙেছে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। তারপরও শেষ পর্যন্ত নিজেই দলের মূল অংশকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন এরশাদ। তার মৃত্যুর পর ফের ভাঙনের মুখে দলটি। নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ভাঙ্গন এখন স্পষ্ট। পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলের নেতার পদ ঘিরে বিভক্ত নেতাকর্র্মীরা। জীবনের অন্তিম মুহুর্তে ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছিলেন এরশাদ। তখনই এ নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল দলে। পার্টি চেয়ারম্যানের এ সিদ্ধান্ত দলের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি।
তবে বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেনি কেউ। এরশাদের মৃত্যুর পর অনেকটা নাটকীয়ভাবেই পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নাম ঘোষণা করা হয়। স্বামীর মৃত্যুতে পার্টির সিনিয়র কো চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ আড়ালে। প্রতিক্রিয়া আসে তার অনুসারি নেতাদের তরফে। বিষয়টি তারা মেনে নেবেন না এমনটি বোঝানোর চেষ্টা করেন। পার্টি চেয়ারম্যানের পদের পাশাপাশি আলোচনা ছিল জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতার পদটি নিয়ে। পার্টি প্রধানের সঙ্গে এরশাদ নিজেই এ পদে ছিলেন। সম্প্রতি পার্টির নেতাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করে বিরোধী নেতার আসনে বসতে স্পিকার বরাবর চিঠি পাঠান জিএম কাদের। এ চিঠির পরই নড়েচড়ে বসেন রওশন এরশাদপন্থি নেতারা। মঙ্গলবার জিএম কাদেরের পক্ষে চিঠি দেয়ার পর দিন রওশন এরশাদের গুলশানের বাসায় বৈঠক করেন তার অনুসারী নেতারা। বিকালে কাদেরকে বিরোধী নেতা না করতে স্পিকার বরারব পাল্টা চিঠি পাঠান রওশন। জানানো হয় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে আসছেন রওশন। স্বামীর মৃত্যুর পর গতকালই প্রথম গণমাধ্যমের সামনে এলেন বিরোধী দলের উপনেতা। তাকে পাশে রেখে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি রওশন এরশাদকে পার্টির চেয়ারম্যান এবং মশিউর রহমান রাঙাকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে ছয় মাসের মধ্যে কাউন্সিল করার কথা জানান। এসময় পার্টির বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এ ঘোষণার ঘণ্টা খানেক পরে দলের বনানীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদের সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রওশন এরশাদকে তিনি মায়ের মতো সম্মান করেন। তিনি সেই সম্মান রাখবেন। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও রওশন নিজে চেয়ারম্যান হওয়ার ঘোষণা দেননি। কাদের দাবি করেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ি তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। যারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমন ঘোলাটে পরিস্থিতিতে দিকভ্রান্ত অবস্থায় আছেন নেতাকর্মীরা। এমন অবস্থায় এরশাদের শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনের নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে। এ আসনে কে দলের প্রার্থী হবেন প্রার্থী করতে এ নিয়ে চরম বিরোধ রয়েছে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টিতে। এরশাদপূত্র সাদকে এ আসনে পার্টির পক্ষ থেকে অবস্থান নিয়েছেন রওশন এরশাদপন্থি নেতারা। যদিও এর ঘোরতর বিরোধী স্থানীয় জাতীয় পার্টির একটি বড় অংশ। রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন পার্টির প্রার্থী হিসেবে তারা কোনভাবেই সাদকে মেনে নেবেন না। এমন অবস্থায় দল থেকে কাকে প্রার্থী দেয়া হবে এটি এখনও নিশ্চিত নয়। নেতাকর্মীরা বলছেন পার্টি চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের একজনকে মনোনয়ন দিলে রওশনপন্থিরাও অন্য একজনকে প্রার্থী করতে পারেন। এতে এ আসনটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে জাপার। উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানে আপাতত পার্টির হাতে কোন দাওয়াই দেখছেন না নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, একমাত্র সরকারের দৃশ্যমান বা অদৃশ্য হস্থক্ষেপ ছাড়া সমস্যার সমাধান মিলছে না। জাপার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার পক্ষের অদৃশ্য ইঙ্গিত পেয়েই রওশনপন্থিরা মাঠে নেমেছেন। আর এটি অনুমান করেই প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন সদস্য রওশনের পক্ষে সরব হয়েছে। আগে তাদেরকে মাঝামাঝি থাকতে দেখা গেছে। পার্টি চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন অবস্থান শক্ত করতে পারলে বিরোধী দলের নেতার পদেও আসীন হতে পারেন উপনেতা রওশন।

চলমান পরিস্থিতিতে দলের একটি বড় অংশ পর্যবেক্ষকের ভুমিকা নিয়েছেন। তারা সবকিছু দেখেই নিজেদের অবস্থান ঠিক করবেন। ক্রমে ক্ষয়ে যাওয়া জাতীয় পার্টি এখন ঘোরতর বিপদে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। পার্টি চেয়ারম্যান এবং বিরোধী নেতার ইস্যু আপাতত ভাগাভাগি হওয়ার মতো কোন পরিস্থিতি নেই। দুই পক্ষের নেতারাই চাইছেন দুই পদই তাদের দখলে রাখতে। এ অবস্থায় ইস্যু দুটি কোন উপায়ে নিষ্পত্তি করা হলেও এটি যে জাপাকে আরেকভার ভিক্তক্তি রেখায় টুকরো করে দেবে এ নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে দ্বিমত নেই। আর এটি হলে নতুন করে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে সাবেক শাসক এরশাদের হাতে গড়া দলটি। ১৯৮৫ সালের শেষ দিকে এরশাদ তার আগের গড়া জনদল, বিএনপির একাংশ, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি এবং মুসলিম লীগের সমন্বয়ে গঠন করেন জাতীয় ফ্রন্ট। একপর্যায়ে কাজী জাফর স্বেচ্ছায় ইউপিপি ভেঙে দিয়ে এরশাদের দলে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালের ১লা জানুয়ারি সরকার নিয়ন্ত্রিত দল জাতীয় পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে উঠা জাতীয় পার্টি প্রথম ভাঙনের মুখে পড়ে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের সময় জাতীয় পার্টি প্রথমে তাদের সমর্থন দিলেও পরে চারদলীয় জোটে চলে যায়। সে সময়ের যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ‘জাতীয় পার্টি’ নতুন দল গঠনের ঘোষণা দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে আরেক দফা ভাঙন ধরে। নাজিউর রহমান মঞ্জু জাতীয় পার্টি নামে আরেকটি দল গঠন করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এখন মঞ্জু পুত্র আন্দালিব রহমান পার্থ এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

পরে এ অংশটিতেও ভাঙন ধরে। মন্ত্রিত্ব নিয়ে ঝামেলার একপর্যায়ে এম এ মতিন আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এক এগারোর সময়ও জাতীয় পার্টি দুটি অংশে বিভক্ত হয়েছিল, পরে অবশ্য এ দুটি অংশই এরশাদের নেতৃত্বে এক হয়ে যায়। সর্বশেষ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে। ২০১৩ সালের ২০শে ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে দলের বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন জাতীয় পার্টির ঘোষণা দেন কাজী জাফর আহমেদ। এ নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল এবং একই সঙ্গে সরকারে অবস্থান নেয়। জাপা চেয়ারম্যান এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়। বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পালন করেন রওশন এরশাদ। ওই নির্বাচনের আগেও দলে বিভক্তি স্পষ্ট ছিল। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে থাকায় পরে অবশ্য সেই বিভক্তি মিটে যায়। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগে টানাপড়েন দেখা দিলেও এরশাদের হস্থক্ষেপে পরিস্থিতি উতরে যায় জাপা। তবে এবার আগের বারের মতো বিরোধী আসনের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগ পায়নি জাতীয় পার্টি। এক তরফা সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসে। এরপর থেকেই আগের বার মন্ত্রী ছিলেন এমন নেতারা দলের নেতৃত্ব দিয়ে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেন। আগের বারের মন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙাকে দলের মহাসচিব করায় তার বিরোধী একটি পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠে। তবে চেয়ারম্যান পদ দিয়ে নেতাকর্মীরা দুই ভাগে অবস্থান নিলেও মশিউর রহমান রাঙাকে দুই পক্ষই মহাসচিবের দায়িত্বে বহাল রেখেছেন।

রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা: গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, রওশন এরশাদ পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কাউন্সিল করে গণতান্ত্রিক উপায়ে স্থায়ী চেয়ারম্যান ঠিক করব। এরশাদের ভাই জিএম কাদের জাতীয় পার্টির ‘গঠনতন্ত্র ভেঙে’ চেয়ারম্যান হয়েছেন অভিযোগ করে আনিসুল ইসলাম বলেন, জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের সম্মান দেবেন রওশন এরশাদ। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে রওশন এরশাদ বলেন, পার্টি এখন উদ্বিগ্ন আছে। পার্টিতে কী হচ্ছে? জাপা অতীতেও ভাগ হয়েছে, এবারও কি সেটি হচ্ছে নাকি? হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এত কষ্ট করে পার্টি গড়ে তুলেছেন, এখন সেই পার্টিটা ভালোভাবে চলুক, মান অভিমান ভুলে যারা চলে গেছে, তারা ফিরে আসুক। আমি চাই পার্টির সবাই মিলেমিশে জনগণের সেবা করব। রওশন এরশাদের সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু, মজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, এসএম ফয়সল চিশতী, মীর আবদুস সবুর আসুদ, খালেদ আখতার, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, ভাইস চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন খোকা ও নাসিম ওসমান উপস্থিত ছিলেন।

শৃঙ্খলা নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: এদিকে সংবাদ সম্মেলন করে পার্টি চেয়ারম্যান ঘোষণার দিকে ইঙ্গিত করে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যারা পার্টির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, রওশন এরশাদ আমার মায়ের মত। তিনি নিজ মুখে তো আর বলেন নাই যে তিনি চেয়ারম্যান। তাকে সম্মান করি। আশা করি, তিনি এমন কিছু করবেন না, যাতে তার সম্মান নষ্ট হয়। দল ভাঙনের মুখে পড়েনি দাবি করে কাদের বলেন, যে কোনো লোক যে কোনো জায়গায় বলে দিল, তিনি রাজা। রাজার তো রাজত্ব থাকতে হবে, প্রজা থাকতে হবে। তিনি বলেন, প্রেসিডিয়ামের সদস্যদের অধিকাংশের সমর্থন নিয়েই তাকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে এবং দলীয় এমপিদের অধিকাংশের সমর্থন নিয়েই সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সালমা ইসলাম, এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাফা, রানা মোহাম্মদ সোহেল উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, অসুস্থ থাকা অবস্থায় এরশাদ গত এপ্রিলে ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। গত ১৪ই জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার মৃত্যুর চার দিনের মাথায় এক সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়।

সমৃদ্ধির কর্মকাণ্ড যেন সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ নষ্ট না করে : -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে যেন সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ বিঘ্নিত না হয় সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এ জন্য ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সুনীল চিন্তাও করতে  হবে। প্রধানমন্ত্রী সামুদ্রিক জীববৈচিত্র সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, প্রতিটি বিনিয়োগ এবং প্রতিটি পদক্ষেপই মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদকে রক্ষায় নিতে হবে। কারণ দীর্ঘ মেয়াদে এ অঞ্চলের জন্য এটি অপরিহার্য। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে তৃতীয় আইওআরএ সমুদ্র অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘টেকসই সমুদ্র অর্থনীতির প্রসার-ভারত মহাসাগরের সর্বোত্তম সুযোগের ব্যবহার’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী ওই আঞ্চলিক সম্মেলনে আইওআরএ’র ২২ সদস্য রাষ্ট্র এবং ৯ ডায়ালগ পার্টনারের (কান্ট্রি) মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে সমুদ্রের তলদেশের অনাবিস্কৃত সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে এই অঞ্চলে একটি অভিন্ন টেকসই সমুদ্র অর্থনৈতিক বেষ্টনী গড়ে তোলার আহবান জানান।  বলেন, একীভূত টেকসই সমুদ্র অর্থনীতির সর্বোচ্চ সুফল পেতে অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের কোন বিকল্প নেই। সাগর-মহাসাগর গ্রিন-হাউজ গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সৃষ্টি হওয়া ৯০ শতাংশ অতিরিক্ত উষ্ণতা শোষণ করে নেয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের অতি দ্রুত সাড়া দিতে হবে। মহাসাগরে যে কোনো অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আমাদের সচেষ্ট থাকতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, লক্ষ্য অর্জনে সমুদ্র ও মহাসাগরের জন্য একটি সুসংহত, লাভজনক এবং সামগ্রিক প্রতিরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সামুদ্রিক জীবন সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি ও উপায়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে জানিয়ে শেখ হাসিনা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং অন্যান্য অপরাধ দমনেও কার্যকর আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন। তার সরকার বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও বিকাশের লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী ‘কর্ম পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করেছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মাছের উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। চলতি বছরের ১লা অক্টোবর বাংলাদেশ দুই বছরের জন্য আইওআরএ’র সহ-সভাপতি এবং ২০২১ সালের ১ লা অক্টোবর থেকে (পরবর্তী দুই বছরের জন্য) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী চ্যালেঞ্জিং ওই দায়িত্ব পালনে সকল সদস্যের সহযোগিতা কামনা করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভারত মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশন- আইওআরএ’র যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ঢাকা সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইওআরএ জোট মেরিটাইম সুরক্ষা ও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহায়তা, মৎস্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহায়তা, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সর্বোপরি সমুদ্র অর্থনীতির সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। তথাপি, নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আমরা কিছু ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে আছি। তিনি বলেন, আপনারা ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, সমুদ্র শাসন, সম্পদ উন্মোচন ও আহরণের টেকসই পদ্ধতি, নৌ-পরিবহন, পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় অনুষ্ঠিত আইওআরএ লিডার্স সামিটে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে আমরা আইওআরএ’র নেতৃত্বে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়নে কাজ করার এবং সমুদ্রযান চলাচলের স্বাধীনতায় সম্মান দেখানোর অঙ্গীকার করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র সম্পদের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম ‘সমুদ্র অঞ্চলের সীমা নির্ধারণ, সমুদ্র সীমানায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য ‘দি টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স এন্ড মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট-১৯৭৪ প্রণয়ন করেন। এই আইনটি জাতিসংঘ কতৃক ঘোষণার আট বছর পূর্বেই বাংলাদেশে কার্যকর করা হয়। যখন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এ সম্পর্কে ততটা ধারণাই ছিল না। সরকার প্রধান বলেন, সমুদ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শিল্পগুলো যেমন- পণ্য পরিবহন, মৎস্য শিল্প, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সমুদ্র বন্দর, পর্যটন, মেরিন জেনেটিক রিসোর্সেস, মেরিন বায়োটেকনোলজি ইত্যাদি বর্তমানে বিশ্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অবদান রাখছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ ও তেল পরিবহণের ৬০ শতাংশ এই সাগর-মহাসাগর দিয়েই হচ্ছে। বিগত ১৫ বছরে সমুদ্র বাণিজ্যের পরিমাণ ৬ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপ্রিয় হলেও সত্য যে মানুষ-সৃষ্ট নানা কারণে আমাদের সাগর আজ ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, পরিবেশ দূষণ, তেল নিঃসরণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণ, শব্দ দূষণ এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তন এসবের অন্যতম কারণ। এর ফলে সাগর ও মহাসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জীববৈচিত্রই কেবল হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে না, বেশিরভাগ আইওআরএ সদস্য রাষ্ট্র সুনামি ও সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎকে বিপদগ্রস্ত করে তুলছে এবং মানব জাতিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আশা করেন- ওই সম্মেলনের সমাপনীতে ‘ঢাকা ঘোষণা’ হিসেবে যা গ্রহণ করা হবে সেটি ভবিষ্যতে আমাদের সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আইওআরএ’র চেয়ারপার্সন দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবেশ, বন এবং মৎস্য সম্পদ বিষয়ক উপমন্ত্রী মাখোৎসো মেডেলিন সতিও, আইওআরএ মহাসচিব ড. নমভুভো এন. নকউই, আন্তর্জাতিক সী-বেড অথোরিটির মহাসচিব মাইকেল ডব্লিউ লজ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষায়িত সমুদ্র সম্পর্কিত ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অবঃ) খোরশেদ আলম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, উচ্চ পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ যেন বিঘ্নিত না হয়: আইওআরএ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে যেন সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ বিঘ্নিত না হয় সেদিকে নজর দিয়ে সমুদ্র সংরক্ষণমূলক নীতি-নির্ধারণ ও সে অনুযায়ী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে।’

বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শাহবাগে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে সুনীল অর্থনীতি নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ভারত মহাসাগর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় ২১ রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোশিয়েশন (আইওআরএ)-এর মন্ত্রী পর্যায়ের তৃতীয় সম্মেলন বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হল। ২২ সদস্য রাষ্ট্র এবং ৯টি ডায়ালগ পার্টনারসহ মোট ৩১ দেশের মন্ত্রী-উপমন্ত্রী, সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ের শতাধিক প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সকল সম্ভাবনার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে টেকসই সমুদ্র অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুনীল সমুদ্র সম্পদ ব্যবহার করে আমরা দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি। একীভূত টেকসই সুনীল অর্থনীতির সর্বোচ্চ সুফল পেতে অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নাই। তাই আপনাদের প্রতি আহ্বান, সম্মেলনে আমরা যেন সম্মিলিতভাবে সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারি। তবে খেয়াল রাখতে হবে সমুদ্র সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে যেন সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়।’

২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ বিলিয়ন মানুষের জীবনধারণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই সুনীল অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পালন করতে পারবে বলেও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

তিনি আরও বলেন, বঙ্গোপসাগরে মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, আহরণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য আমাদের সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। আমরা বছরে ছয় মাস মা ইলিশ ও মাছের পোনা ধরা এবং সমুদ্রের নির্দিষ্ট অঞ্চলে ৬৫ দিন সকল প্রকার মৎস্য সম্পদ আহরণ আমরা নিষিদ্ধ করেছি। মৎস্য আহরণের এই নিষেধাজ্ঞা আরোপে আমাদের জন্য বিশেষ সুফল বয়ে এনেছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো মৎস্য উৎপাদনের নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে। ২০২১ বাস্তবায়নের শেষ প্রান্তে সামনের দিনগুলোতে আমরা উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য রুপকল্প ২০৪১ প্রণয়ন করেছি এবং জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষতি মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ নামে একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলেও বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, আইওআরএ মেরিটাইম নিরাপত্তা সুরক্ষা, বাণিজ্য বিনিয়োগ সহায়তা ও মৎস্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহায়তা, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং স্বল্প পরিসরে অর্থনীতির সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। তবে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। আমি আশা করি, আইওআরএ সদস্যদের মধ্যে যে কর্মতৎপরতা ও উদ্যোগ সৃষ্টি হয়েছে তা নিকট ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ হবে।’ 

২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় অনুষ্ঠিত আইওআরএ শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেছিলেন জানিয়ে বলেন, ওই বৈঠকে আইওআরএ’র নেতৃত্বে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সুনীল অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করা এবং সমুদ্র যান চলাচলের স্বাধীনতায় সম্মান দেখানোর অঙ্গীকার করেছিল। বাংলাদেশ আগামী ১ অক্টোবর ২০২১ পরবর্তী দুই বছরের জন্য সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবে বলে জানান এবং এই গুরুদায়িত্ব পালনে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে গত বছর অনুষ্ঠিত আইওআরএ এর উচ্চ পর্যায়ের বার্ষিক বৈঠকে আন্তর্জাতিক এই সংস্থার ২০১৯-২১ বর্ষের জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ২০২১-২৩ বর্ষের জন্য চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। সংস্থাটির সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করতে ৫ হাজার ৭৫০ ডলারের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ঢাকা। এবারই প্রথমবারের মতো আইওআরএ-এর মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ হচ্ছে ঢাকা।

২০২১ সাল থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা থাকছে না

আগামী ২০২১ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা থাকছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শ্রেণীতে পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল হোসেন গতকাল সচিবালয়ে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবসকে সামনে রেখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। বলেন, ২০২১ সালে নতুন পাঠ্যসূচিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে। তার আগে ২০২০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে একশ স্কুলে এ ব্যবস্থা চালু হবে। সামেটিভ পরীক্ষা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত রাখব না, ফরমেটিভ পরীক্ষা রাখব। অর্থাৎ রাউন্ড দ্য ইয়ার তারা পরীক্ষা দেবে।
২০২১ সালে নতুন কারিকুলামের পুরো বাস্তবায়ন হবে জানিয়ে সচিব বলেন, গতাণুগতিক প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক এবং বার্ষিক পরীক্ষা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত থাকবে না। সারা বছরেই ক্লাসে মূল্যায়ন করা হবে।
শুধু পড়াশোনা নয়, শিক্ষার্থীর আচার-আচরণ সবগুলো বিষয় মূল্যায়ন করে গ্রেড দেয়া হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হবে কিনা জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ফাইল চালাচালি চলছে।
দেশের ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয় না, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সরকারি প্রাথমিকে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু করা হয় ২০১৪ সালে। প্রাক-প্রাথমিকের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের প্রাথমিক সমাপনীতে অংশ নেয়। দেশের শিক্ষাবিদরা পঞ্চম শ্রেণির পিএসসি পরীক্ষাও তুলে দেয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন, তবে তাতে সরকার সাড়া দিচ্ছে না।

রৌওশনারা যুক্তরাজ্যের রামসগেইট শহরের প্রথম বাংলাদেশী মেয়র by আব্দুর রাজ্জাক

যুক্তরাজ্যের রামসগেইট শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন মানিকগঞ্জের মেয়ে রৌওশনারা রহমান। তিনি ওই শহরের এশীয় বংশোদ্ভূত প্রথম মেয়র। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা-বাবার সাথে যুক্তরাজ্যে যান রৌওশনারা রহমান (দুলন)। তবে শেকড়ের টানে প্রতি বছরই দেশে আসেন তিনি। নিজ গ্রামে তার প্রতিষ্ঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে; যার মাধ্যমে এলাকার মানুষকে তিনি নানাভাবে সহায়তা করেন।
দেশের ঐতিহ্য তুলে ধরতে রৌওশনারা রহমান প্রায় এক যুগ আগে একটি রিকশা নিয়ে গিয়েছিলেন লন্ডনে। সে সময় বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলেছিল, যা বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও প্রচারিত হয়। রৌওশনারার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা কাশিমপুর (কাঁঠালবাগান) গ্রামে। তার বাবার নাম প্রকৌশলী রজ্জব আলী খান। দুই মাস আগে তিনি মারা গেছেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে রৌওশনারা সবার বড়।
সিংগাইর উপজেলার ইরতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়েছিলেন রৌওশনারা। স্থানীয় তালেবপুর উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মা-বাবার সাথে যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
রাজনীতির পাশাপাশি রামসগেইট শহরে রৌওশনারার রেস্টুরেন্ট ব্যবসা রয়েছে। স্বামী রেজাউর রহমান জামানও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রৌওশনারার শ্বশুরবাড়ি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলায়।
রৌওশনারার বাবা ছিলেন বুয়েটের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ১৯৬৭ সালে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান তিনি। এলাকায় একজন দানশীল ব্যক্তি হিসেবে তার পরিচয় ছিল। তিনি নিজের জমিতে এলাকাবাসীর জন্য মসজিদ, ঈদগাঁ মাঠ, রাস্তা এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি নির্মাণ করেন। সব সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বাবার মতো রৌওশনারাও এলাকার অসহায় মানুষের পাশে থাকেন সবসময়। যুক্তরাজ্যের রামসগেট শহরের নামে নিজ গ্রামে রামস-বাংলা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সুদূর প্রবাসে থেকেও যার মাধ্যমে তিনি এলাকার মানুষকে নানাভাবে সহায়তা করেন। বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ান।
রামস-বাংলা মহিলা উন্নয়ন সংস্থার ম্যানেজার ও রৌওশানার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মোতালেব হোসেন জানান, সংস্থার মাধ্যমে তিনি প্রতি বছর বন্যার সময় ত্রাণ, শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ, ফি মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত খরচে এলাকার অনেক মানুষের চোখের অপারেশন করিয়েছেন রৌওশনারা রহমান। মোতালেব হোসেন জানান, রৌওশনারা রহমানের পেশা ব্যবসা। রামসগেট শহরে ‘তন্দরি’ নামে একটি রেস্তোরাঁর মালিক তিনি। যুক্তরাজ্যে সক্রিয় রাজনীতি ও ব্যবসায় ব্যস্ত থাকলেও রৌওশনারা প্রতি বছরই দেশে আসেন। সময় কাটান নিজ গ্রামে। তার মানবিক কাজের কারণে এলাকার সবাই তাকে অনেক ভালোবাসেন। তিনি আরো জানান, ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির এমপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন রৌওশনারা রহমান। অল্প ভোটের ব্যবধানে সে সময় পরাজিত হন তিনি। এর আগে লেবারপার্টি থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। গত ১৪ মে বিপুল ভোটে যুক্তরাজ্যের রামসগেইটের মেয়র নির্বাচিত হন রৌওশনারা।
রৌওশনারার এই সাফল্যে খুশি তার জন্মস্থান মানিকগঞ্জের সিংগাইরের মানুষ। স্থানীয় তালেবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: রমজান আলী জানান, আমাদের এলাকার মেয়ে রৌওশনারা যুক্তরাজ্যের রামসগেইট শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এ জন্য আমরা খুবই গর্বিত। এলাকার সব মানুষ খুবই উচ্ছ্বসিত। রৌওশনারা রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, দীর্ঘ দিন ধরে কমিউনিটির মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। লেবার পার্টি আমার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিল। এ জন্যই আমাকে মনোনয়ন দেয়। শহরের মেয়র নির্বাচিত হতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। এটা খুবই সম্মানের। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে ভবিষ্যতে মানুষের জন্য আরো কাজ করে যেতে চাই।
তিনি আরো বলেন, নিজের শেকড়ের সাথে সম্পর্ক রাখা প্রত্যেকটি মানুষের জন্য খুবই জরুরি। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমি সবসময় আমার দেশ এবং জন্মস্থানকে মনে করি। এ জন্যই সুযোগ পেলেই দেশে ফিরে আসি। গ্রামের অসহায় মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে আমারও ভালো লাগে। রৌওশনারা জানান, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের সম্পর্কে আরো যেন উন্নয়ন করা যায় সে জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করবেন।

কাশ্মীর: সেনা অভিযানের মধ্যে নির্যাতনের অভিযোগ, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি সমর্থন অনেকের by সামির হাশমি

ভারতের সংবিধান থেকে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার ব্যবস্থা বাতিল করার পর ভারত শাসিত কাশ্মীরের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মারধর এবং নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে অনেকদিন আগে থেকেই।
সেখানাকার একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলেছে বিবিসি। গ্রামবাসীরা অভিযোগ করে যে তাদেরকে তার ও লাঠি দিয়ে মারা হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে।
অনেক গ্রামের বাসিন্দারাই বিবিসিকে ক্ষতচিহ্ন দেখান, কিন্তু কর্তৃপক্ষের সাথে সেসব অভিযোগ সম্পর্কে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভারতের সেনাবাহিনী এসব অভিযোগকে 'ভিত্তিহীন ও প্রমাণসাপেক্ষ নয়' বলে দাবি করেছে।
অগাস্টের ৫ তারিখ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কাশ্মীরকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে কাশ্মীর।
কাশ্মীর অঞ্চলকে ধারণা করা হয় এমন একটি এলাকা হিসেবে যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সামরিক সদস্যদের অবস্থান রয়েছে, তার ওপর বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর সেখানে আরো অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ভারত সরকার।
কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, অ্যক্টিভিস্টসহ প্রায় তিন হাজার মানুষকে আটকও করা হয়েছে।
অনেককেই রাজ্যের বাইরের কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব পদক্ষেপ শুধুই রাজ্যটির জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে।
একজন ভুক্তভোগীর পায়ে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন, ভারতীয় সেনাদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি
গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের সেনাবাহিনী কাশ্মীরে সশস্ত্র জঙ্গিবাদ দমনে লড়াই করে যাচ্ছে। ভারতের অভিযোগ, ঐ অঞ্চলের জঙ্গিদের সহায়তা করে পাকিস্তান - যেই অভিযোগ কাশ্মীরের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করা পাকিস্তান সবসময়ই অস্বীকার করেছে।
অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ করার সিদ্ধান্তকে ভারতের বিভিন্ন অংশের মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী'র এই 'সাহসী' সিদ্ধান্তকে ভারতের গণমাধ্যমও সাধুবাদ জানিয়েছে।
সতর্কতা: নিচের বর্ণনা অনেক পাঠকের কাছে অস্বস্তির কারণ মনে হতে পারে
আমি দক্ষিণ কাশ্মীরের অন্তত ৬টি গ্রামে ঘুরেছি, যেগুলো গত কয়েকবছরে ভারত বিরোধী সশস্ত্র জঙ্গিবাদের উত্থানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। সেসব গ্রামের সবগুলোতর বাসিন্দাদের কাছ থেকেই নির্যাতনের একই ধরণের বক্তব্য জানতে পারি।
সেসব এলাকার ডাক্তার এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি, তবে গ্রামবাসীরা আমাকে তাদের শরীরের ক্ষত দেখিয়ে দাবি করেছেন যে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা।
একটি গ্রামের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন যে ভারতের সংসদে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের ঘোষণা আসার সাথে সাথে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালায় সেনাবাহিনী।
একটি গ্রামের দু'জন বাসিন্দা, যারা সম্পর্কে দুই ভাই, বলেন ঐদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়ি থেকে জোর করে বের করে নিয়ে গিয়ে আরো কয়েকজন গ্রামবাসীর সাথে একসাথে দাঁড় করায়। অন্যান্যদের মত ঐ দুই ভাইও নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চায়নি।
"তারা আমাদের ব্যাপক মারধর করে। আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি: আমরা কী করেছি? কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি, কিছু বলেওনি, তারা আমাদের মারতেই থাকে," বলেন দুই ভাইয়ের একজন।
একজন গ্রামবাসীর পিঠে নির্যাতনের ফলে হওয়া ক্ষতচিহ্ন
"আমার শরীরের প্রতিটি অংশে তারা আঘাত করে। তারা আমাদের লাথি দেয়, লাঠি ও তার দিয়ে মারে, বৈদ্যুতিক শকও দেয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে যখন আমরা অজ্ঞান হয়ে যাই তখন বৈদ্যুতিক শক দিয়ে আমাদের জ্ঞান ফিরিয়ে আনে।"
"লাঠি দিয়ে মারার সময় আমরা যখন চিৎকার করছিলাম, তখন আমাদের মুখ বন্ধ করার জন্য মুখে কাদা ভরে দেয়।"
"আমরা তাদের বারবার বলতে থাকি যে আমরা নির্দোষ। তাদের জিজ্ঞাসা করি কেন আমাদের নির্যাতন করছে। কিন্তু তারা এসব কোনো কথাই শোনেনি।"
"নির্যাতনের একপর্যায়ে তাদের বলি যে আমাদের মেরো না, এর চেয়ে গুলি করো। একপর্যায়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুনয় করি যেন আমাদের উঠিয়ে নেয়।"
গ্রামের আরেকজন তরুণ জানান, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে কে কে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে তাদের নাম বলতে সেনা সদস্যরা তাকে বারবার চাপ দিতে থাকে।
এই তরুণ ও কিশোররা বিগত কয়েকবছর ধরে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের প্রতিমূর্তি হিসেবে অনেকটাই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
ঐ তরুণটি সেনা সদস্যদের বলেন যে, তিনি তাদের নাম জানেন না। তারপর সেনা সদস্যরা তার চশমা, জুতা ও কাপড় খুলতে নির্দেশ দেয়।
"আমার গায়ের কাপড় খোলার পর তারা আমাকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়, প্রায় দু'ঘন্টা যাবত। যখনই অজ্ঞান হয়ে যেতাম, তারা বৈদ্যুতিক শক দিতো আমার জ্ঞান ফেরানোর জন্য।"
"তারা যদি আবারো আমার সাথে এরকম করে, তাহলে আমি যে কোনোভাবে এর প্রতিরোধ করবো। প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেবো।"
কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন কেড়ে নেয়ার পর সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে শ্রীনগরের সৌরা এলাকায়
তরুণটি বলে, সৈন্যরা তাকে সতর্ক করে দেয় যে গ্রামের কেউ যদি কোনো ধরণের বিক্ষোভে অংশ নেয় তাহলে তাদের পরিণতিও একই হবে।
গ্রামের মানুষ মনে করে সেনা সদস্যরা এরকম নির্যাতন করেছে যেন গ্রামবাসীরা কোনো ধরণের বিক্ষোভে অংশ নিতে ভয় পায়।
বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা 'অভিযোগ অনুযায়ী কোনো নাগরিকের সাথে জবরদস্তি করেনি' তারা।
"এধরণের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। এই অভিযোগগুলো শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা থেকে উদ্ধৃত," এরকম দাবি করেন সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল আমান আনন্দ।
বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হলেও 'সেনাবাহিনীর নেয়া পদক্ষেপের কারণে নিহত বা আহত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি' বলে মন্তব্য করেন কর্নেল আনন্দ।
আমরা বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখতে পাই যে সেখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের প্রতি সহানুভূতিশীল।
নিরাপত্তারক্সীদের দিকে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুঁড়ে মারলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে
গ্রামবাসীদের ভাষায়, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা 'মুক্তিযোদ্ধা'।
কাশ্মীরের এই অঞ্চলের একটি জেলাতেই ফেব্রুয়ারিতে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়। এই অঞ্চলেই ২০১৬ সালে জনপ্রিয় কাশ্মীরী জঙ্গি নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হয়, যার পর কাশ্মীরী তরুণদের অনেকেই ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেয়।
কাশ্মীরের ঐ অঞ্চলে একটি সেনা ক্যাম্প রয়েছে এবং সেখানকার সেনা সদস্যরা নিয়মিত ভিত্তিতে জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদদের খোঁজে ঐ গ্রামগুলোতে তল্লাশি অভিযান চালায়।
তবে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রায়ই সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বন্দ্বের ভুক্তভোগী হতে হয় তাদেরকে।
একটি গ্রামের একজন তরুণ জানায়, জঙ্গিদের খবর জোগাড় করে না দিলে তার নামে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করা হবে বলে তাকে হুমকি দিয়েছিল সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এই কাজে অস্বীকৃতি জানালে তাকে এমন নির্যাতন করা হয় যে দু'সপ্তাহ পরেও সে সোজা হয়ে বিছানায় শুতে পারছে না।
"এরকম অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবো আমি। তারা আমাদের এমনভাবে মারে যেন আমরা মানুষ না, পশু।"
নির্যাতনের শিকার আরেকজন বলেন অন্তত ১৫-১৬ জন সেনা সদস্য তাকে মাটিতে ফেলে রড, লাঠি, তার দিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে।
"আমার জ্ঞান প্রায় ছিলই না। তারা আমার দাড়ি ধরে এত জোরে টানে যে আমার মনে হচ্ছিল যে আমার দাঁত উপড়ে আসবে।"
আগে থেকেই বিপুল পরিমাণ সেনা সদস্যের অবস্থান থাকা কাশ্মীরে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত সেনা
পরে জ্ঞান ফিরলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে একজন সৈন্য তার দাড়ি পুড়িয়ে দিতে চাইলেও আরেকজন সৈন্য বাধা দেয়ায় শেষপর্যন্ত তার দাড়ি পুড়ানো হয় নি।
আরেকটি গ্রামে সংবাদদাতা সামির হাশমি এক তরুণের দেখা পান যার ভাই দু'বছর আগে ভারত শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা হিজবুল মুজাহিদিন গোষ্ঠীতে যোগ দেয়।
তরুণটি জানায়, একটি ক্যাম্পে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং সেখান থেকে সে পায়ে ফ্র্যাকচার নিয়ে বের হয়।
"আমার হাত পা বেঁধে উপুর করে ঝুলায় তারা। এরপর দুই ঘন্টার বেশি সময় ধরে আমাকে মারতে থাকে।"
কিন্তু সেনাবাহিনী কোনো ধরণের অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিবিসিকে দেয়া বিবৃতিতে সেনাবাহিনী মন্তব্য করে যে তারা 'পেশাদার একটি সংস্থা যারা মানবাধিকারের বিষয়টি বোঝে এবং সম্মান করে' এবং তারা 'অভিযোগগুলো দ্রুততার সাথে তদন্ত করছে।'
বিবৃতিতে তারা বলে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গত পাঁচ বছরে আনা ৩৭টি অভিযোগের ২০টিই 'ভিত্তিহীন' হিসেবে পেয়েছে তারা। ঐ অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৫টির তদন্ত হচ্ছে এবং 'শুধুমাত্র ৩টি অভিযোগ তদন্ত করার যোগ্য' বলে মন্তব্য করেছে তারা।
ঐ বিবৃতিতে আরো জানানো হয় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
বিবিসি'র আমির পীরজাদা জানান শুরুতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও ধীরে ধীরে তা উত্তপ্ত রুপ নেয়
তবে গত তিন দশকে কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শতাধিক অভিযোগের সংকলন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দু'টি কাশ্মীরী মানবাধিকার সংস্থা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্তের উদ্দেশ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করার আহ্বান জানিয়েছে। ঐ অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে ৪৯ পাতার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা।
জাতিসংঘের ঐ প্রতিবেদনটিও প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতের কর্তৃপক্ষ।

কাশ্মীরে আসলে কী হচ্ছে?

  • কাশ্মীর একটি হিমালয় অঞ্চল যেটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই দাবি করে, তবে কোনো দেশই ঐ অঞ্চল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে না। কাশ্মীর ইস্যুতে দুই দেশ একাধিকবার যুদ্ধ করেছে, এবং বেশ কয়েকবার সীমিত পরিসরে দ্বন্দ্বেও জড়িয়েছে।
  • অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের আগ পর্যন্ত কাশ্মীরের ভারত নিয়ন্ত্রিত অংশে (জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য) আংশিক স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল।
  • ৫ই অগাস্ট ভারত সরকার অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তার ক্ষমতাসীন বিজেপি'র যুক্তি ছিল ভারতের অন্যান্য এলাকার মতই শাসন ব্যবস্থা থাকা উচিত কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও।
  • তারপর থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। সেখানে হওয়া কিছু কিছু বিক্ষোভ সহিংস রুপও নিয়েছে। পাকিস্তান এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং সঙ্কট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
ভারত শাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর থেকেই বিক্ষোভ চলছে সেখানে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জটিলতা by ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

পূর্ণ প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বে¡ও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি না হওয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে। গত ২২ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় মিয়ানমার যেতে রাজি হননি। রোহিঙ্গাদের বহনের জন্য পাঁচটি বাস ও তিনটি ট্রাক প্রস্তুত রাখা হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্প, কেরণতলী ট্রানজিট ক্যাম্প ও নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পসহ সব ধরনের প্রস্তুতিও নেয়া হয়। যাতায়াতের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকেও সতর্ক রাখা হয়। মিয়ানমার সরকারের দেয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী, এক হাজার ৩৭টি পরিবারের মোট তিন হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেয়ার তালিকাটি দেয়া হয়। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি না হলে কোনো শরণার্থীকে জোরজবরদস্তি করে পাঠানোর বিধান নেই।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। ওই বছরের ৬ জুন নেপিডোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসঙ্ঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারো নির্যাতনের মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।

রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে কেন আগ্রহী নয় এর কারণগুলো খতিয়ে দেখতে হবে।
  • (ক) রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের আশ্বাসের ওপর আস্থা ও ভরসা রাখতে পারছেন না।
  • (খ) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার ভাষ্য মতে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রচুর ক্যাম্প ও ডরমিটরি তৈরি করা হয়েছে। উইঘুর মুসলমানদেরকে যেভাবে চীনের ক্যাম্পে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তেমনি রোহিঙ্গাদেরকেও রাখা হতে পারে, এমন একটা আশঙ্কা কাজ করছে। বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে রাখাইনের ক্যাম্পে যেতে তারা আগ্রহী নন।
  • (গ) বাংলাদেশে বিনাশ্রমে ফ্রি থাকা, খাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকায় অনেকে আরাকানে ফিরে যেতে আগ্রহী নয়। এখান থেকে অন্যান্য দেশে চলে যাওয়ার একটা পথ তৈরি হতে পারে, এমন একটা প্রত্যাশা অনেকের আছে।
  • (ঘ) চীন বাংলাদেশকে জানিয়ে দিয়েছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করা সমীচীন নয়। এ বিষয়টি রোহিঙ্গাদের ভাবিয়ে তুলেছে। নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। বাস্তুভিটা, শিক্ষা, চারণভূমি, ফসলি জমি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকার ফিরে পাওয়া নাগরিকত্বের ওপর নির্ভরশীল।
  • (ঙ) কোনো কোনো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) রোহিঙ্গাদের ফিরে না যাওয়ার জন্য ক্যাম্পে ক্যাম্পে প্রচারণা চালাচ্ছে। এর কারণ ও যৌক্তিকতা খুঁজতে হবে। এর নেপথ্যে কি খ্রিষ্টধর্ম প্রচার না শরণার্থী বাণিজ্য অথবা মানবপাচার তদন্ত করে বের করতে হবে।
টেকনাফ উপজেলার শালবাগান ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান বজলুল ইসলাম রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে উপস্থিত সাংবাদিকদের যে কথা বলেন, তাতে রোহিঙ্গাদের ফিরে না যাওয়ার ব্যাখ্যা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নাগরিকত্বসহ দাবি করা পাঁচটি শর্ত না মানলে কিছুতেই মিয়ানমার ফিরে যাবো না। আগে রাখাইনে বন্দী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে মুক্তি দেয়ার দাবি জানাই। কারণ, রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা রাখাইনে ফিরতে চাই, তবে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো রাখাইনে সৃষ্টি হয়নি। মিয়ানমার সরকার এখনো মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করছে। এ অবস্থায় রাখাইনে যাওয়া মানে পুনরায় বিপদ ডেকে আনা। তাই আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় মিয়ানমার সরকারকে চাপে ফেলে আমাদের অধিকার ও শর্তগুলো আদায় করা হোক। তাহলে আমরা মিয়ানমার ফিরব।’

২২ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের যে কথা বলেছেন তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এটাকে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হাইলাইট করা প্রয়োজন। ‘রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্টি এবং এই সঙ্কটের সমাধান তাদের কাছেই। আমরা জোর করে কাউকে পাঠাব না। আমরা স্বেচ্ছায় নিরাপদ প্রত্যাবাসন চাই। রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূলে আস্থার অভাব রয়েছে। এ জন্য আমরা সর্বশেষ চতুর্থ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে প্রস্তাব করেছিলাম, আস্থা তৈরির জন্য কক্সবাজারের একাধিক শিবিরে যেসব রোহিঙ্গা মাঝি বা নেতারা রয়েছেন, তাদের রাখাইন নিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হোক, যেন রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার যে অভাব আছে তা দূর হয়।’

গত বছর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ইতোমধ্যে আট হাজার ৩২ জনের একটি তালিকা মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লে. জেনারেল কিয়াও সোয়ের হাতে হস্তান্তর করা হয়। তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সময়ক্ষেপণের কৌশল অবলম্বন করে। ইতোমধ্যে আরাকানে অব্যাহত নির্যাতন ও অস্থির পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশে আসা অব্যাহত রয়েছে। এপারে আসার জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি থানার শূন্য রেখায় (নো-ম্যান্স ল্যান্ডে) অপেক্ষায় আছে আরো সাত হাজার রোহিঙ্গা।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯০ শতাংশ রোহিঙ্গা পৈতৃক বাস্তুভিটা হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে আরাকানে মাত্র ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৯ হাজার ৩৮ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা এসেছে চার লাখ। ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছে আরো সাত লাখ। সব মিলিয়ে মোট ১১ লাখ কক্সবাজারের পাঁচ হাজার একর বনভূমিতে ১২টি অস্থায়ী ক্যাম্পে এক লাখ ৬৫ হাজার ঝুপড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। দেশের আলেম সমাজও ত্রাণ বিতরণ ও অন্যান্য মানবিক সেবা কার্যক্রমে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে আছে, যারা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চাইবে তাদেরই মিয়ানমারে ফেরত পাাঠানো হবে। কিন্তু আশ্রয়শিবির ঘুরে আসা সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, কোনো রোহিঙ্গা অরক্ষিত ও অনিশ্চিত অবস্থায় স্বদেশের বধ্যভূমিতে ফিরে যেতে আগ্রহী নয়। তাদের অবস্থান পরিষ্কার। ২০১২ সালের চুক্তির আওতায় যারা ফিরে গেছে তারা এখনো আশ্রয়শিবিরে দিনাতিপাত করছে; নিজ ভিটায় ফিরতে পারেনি। প্রত্যাবাসনের আগে নি¤œলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন-

ক) রোহিঙ্গাদের নিজ ভিটায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। খ) নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া। গ) জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। ঘ) ভিটেবাড়ি, গবাদি পশু, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ফসলাদি যেগুলো পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে- তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। ঙ) কসোভোর মতো জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে আরাকানকে নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করা।
চ) হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং দোষীদের মানবতাবিরোধী অপরাধে শাস্তির বিধান করা।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ ক্যাম্প থেকে নিয়ে আরাকানের আশ্রয় ক্যাম্পে রাখা সমাধান নয়। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সাথে জাতিসঙ্ঘ শরণার্থী সংস্থাকে যুক্ত করা।
মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর কূটনৈতিক প্রয়াস অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে আরাকানের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রতিটি কবরে রয়েছে ২৫০টি লাশ। এ পর্যন্ত সাংবাদিক ও জাতিসঙ্ঘসহ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আরাকানে ঢুকতে দেয়া হয়নি। প্রবেশাধিকার দিলে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিলে জাতি নিধনযজ্ঞের নৃশংস ও ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠবে।

আরাকানের মুসলমানদের ইতিহাস বড় করুণ ও বেদনায় ভরা। বছরের পর বছর ধরে মিয়ানমার সরকার আরাকানে বসবাসকারী ১৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সে দেশের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। ইতোমধ্যে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। রয়েছে অবশিষ্টদের দেশ থেকে তাড়ানোর পরিকল্পনা। রোহিঙ্গাদের দমন-নিপীড়ন ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে আগের সামরিক জান্তা ও বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণের মধ্যে কোনো শ্রেণিগত পার্থক্য নেই। উভয় সরকার সংখ্যালঘুদের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে আসছে।

শত শত বছর ধরে আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানেরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের কোনো ভোটাধিকার নেই, সরকারি চাকরি নেই, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ নেই, শিশুদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার অনুমতি নেই। বেসরকারিভাবে পরিচালিত মাদরাসাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। মসজিদগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ফলে পুরো জনগোষ্ঠী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। মুসলমানদের চলাফেরায়ও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। মংডু, আকিয়াব, বুচিডং, তমরু ও সিতওয়ে প্রভৃতি এলাকার মুসলমান নিজ নিজ এলাকায় বন্দী। নানা অজুহাতে ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, অপহরণ, গুম, ধর্ষণ শারীরিক নিবর্তন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তুভিটা হারিয়ে এক লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আরাকানের আইডিপি ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চির নীরবতা ও অসহযোগিতা রোহিঙ্গাদের আরো হতাশ করেছে।

রাখাইন জনগোষ্ঠীর নির্মম নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের রক্ষায় আরাকানে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে বহুজাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা জরুরি। এ দাবিতে মুসলিম দেশগুলোকে সোচ্চার হতে হবে। ওআইসির মূলত কোনো ক্ষমতা নেই, কার্যকর উদ্যোগও নেই। একমাত্র তুরস্ক ও মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের নির্মূল অভিযান বন্ধ করতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে তুরস্ক সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ সরকারেরও উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের প্রতিবেশী।

মিয়ানমারের সাথে রয়েছে বাংলাদেশের ১৯৩ কিলোমিটার সীমান্ত। ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী-শিশু সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আর্থ-সামাজিক, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত কারণে শরণার্থীদের পাইকারি হারে গ্রহণের সুযোগ বাংলাদেশের নেই। এটা সমস্যার সমাধান নয়। মিয়ানমার সরকার সব সময় বলে আসছে, রোহিঙ্গারা বর্মি নয়, বাঙালি। অতএব, তাদের সীমান্তের এপারে ঠেলে দিতে পারলেই তারা বাঁচে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ আরাকানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা প্রদান করতে মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।

এ কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, শান্তি ও সমঝোতাপূর্ণ পন্থায় যদি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হয় তাহলে হয়তো সহিংস পন্থায় সমাধানের পথ খুঁজতে অনেকেই বিশেষ করে সংক্ষুব্ধ গোষ্ঠী এগিয়ে আসতে পারে। তখন পরিস্থিতি আরো কঠিন ও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার নজির রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ আগে থেকেই সক্রিয়। কাচিন ও কাইন স্টেটে আরাকান আর্মি, শান স্টেটে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, চিন স্টেটে জুমি রিভলিউশনারি অর্মি ও কারেন স্টেটে ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির তৎপরতা মিয়ানমার সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তি ও সমঝোতাপূর্ণ স্থায়ী সমাধান চাই। ওহভষীঁ ড়ৎ চঁংযনধপশ স্থায়ী সমাধানের পদ্ধতি নয়।

>>>লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গনি এম.ই.এস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বাংলাদেশ by এম এ খালেক

চলতি অর্থ বছরে (২০১৯-২০) বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় হ্রাস পেলেও বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে। তারা বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক এবং গতিশীল ধারায় প্রবহমান রয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের মর্যাদা লাভ করবে। বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অতি সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের সম্পূরক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। এডিবি বলেছে, সদ্যসমাপ্ত অর্থ বছরে (২০১৮-১৯) প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এই উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে মূলত শিল্প ও সেবা খাতই মূল ভূমিকা পালন করেছে। এই দুটি খাতের গতিশীলতার কারণেই সার্বিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের বছর বাংলাদেশ ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। সদ্যবিদায়ি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অতিক্রম করে যাবে বলে সরকারিভাবে সাময়িক প্রাক্কলন করা হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। উল্লেখ্য, উন্নয়ন সহযোগীরা সাধারণত অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করে থাকে। ফলে সরকারি হিসাবের সঙ্গে তাদের দেয়া পরিসংখ্যানের প্রায় ১ শতাংশ ব্যবধান থাকে। এডিবি প্রথমবারের মতো ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করল।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান দেশ চীনের অর্থনৈতিক অবস্থাও এই মুহূর্তে খুব একটা ভালো নয়। বছরের শুরুতেই চীনের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। চলতি পঞ্জিকা বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের প্রান্তিকে চেয়ে দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ২৯ বছরে এটাই চীনের সর্বনিম্ন জিডিপি প্রবৃদ্ধি। কয়েক দশক ধরে চীন উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছিল। তারা মুক্ত বাজার অর্থনীতি অনুসরণ করলেও মার্কিনি ধাঁচের মুক্তবাজার অর্থনীতি তারা গ্রহণ করেনি। বরং তারা মুক্ত বাজার অর্থনীতিকে নিজেদের দেশের উপযোগী করে বাস্তবায়ন করেছে। অনেকের মনেই বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে এটা ভেবে যে, চীনের মতো জনবহুল একটি দেশ কীভাবে এত উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, চীনের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে তাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিশেষ ভাবে কাজ করেছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধা সঠিকভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারা। একটি দেশের যখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সূচনা হয় তখন সেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছর স্থায়ী হয়। বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান বেশ কয়েক দশক আগে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা অতিক্রম করে এসেছে। জাপানে এখন বৃদ্ধ বা প্রবীণ লোকের সংখ্যা বেশি। তারা ক্রমশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর এক আদেশে চীনকে দেয়া শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা বাতিল করেন। চীনা পণ্যের ওপর বর্ধিত হারে শুল্কারোপ করা হয়। পালটা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও মার্কিন পণ্যের ওপর ব্যাপক হারে শুল্কারোপ করে। ফলে দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চীনা অর্থনীতির ওপর। চীনের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে এ বাণিজ্যযুদ্ধ কাজ করছে বলে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন। যেসব মার্কিন কোম্পানি চীনে বিনিয়োগ করেছিল তারা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীনের প্রবৃদ্ধির এ শ্লথ গতি আগামীতেও অব্যাহত থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এটাই চেয়েছিল। চীন বাণিজ্য যুদ্ধে চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করুক—এটাই যুক্তরাষ্ট্রের কাম্য। চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে শুধু যে এই দুটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই বাণিজ্য যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেটাই হচ্ছে মূল আশঙ্কার কারণ। উল্লেখ্য, ১৯২৯-১৯৩৩ সময়কালে সৃষ্ট বাণিজ্যযুদ্ধের সময় ২০ হাজার পণ্যের ওপর ব্যাপক মাত্রায় শুল্কারোপ করা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অবস্থা কী? বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করে চলেছে। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অনেক দেশের জন্যই ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা। বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের বয়স এখন ১৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।

জনসংখ্যা এমনই এক অর্থনৈতিক উপকরণ যা একই সঙ্গে ‘সম্পদ’ এবং ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ করে তোলা যায় তাহলে জনসংখ্যা হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কারণ যে কোনো উন্নয়ন কাজের জন্যই দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত লোকবল প্রয়োজন। আবার জনসংখ্যা যদি অপ্রশিক্ষিত হয় এবং অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠে, তবে তা হবে সবচেয়ে বড় একটি রাষ্ট্রীয় দায়। বাংলাদেশের জন্য সংখ্যাকে এখনো আমরা জনসম্পদে পরিণত করতে পারিনি। বাংলাদেশের ১ কোটিরও বেশি শ্রমিক বিদেশে কর্মসংস্থান করছে। তারা বছরে প্রচুর পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রেরণ করছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১ হাজার ৬৪২ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স প্রেরণ করেছে। এটা এ যাবত্কালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ যদি প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ পেশাজীবীদের বিদেশে প্রেরণ করতে পারত তাহলে বিদ্যমান প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমেই কয়েক গুণ বেশি রেমিট্যান্স আহরণ করা যেত। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতি বছর যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করছে তার একটি বড় অংশই আবার বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি এক্সপার্টদের বেতন-ভাতা পরিশোধে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন কলকারখানায় যেসব বিদেশি এক্সাপার্ট কাজ করছেন তাদের পেছনে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। আমরা যদি দক্ষ জনশক্তির জোগান দিতে পারতাম তাহলে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশেই থেকে যেত। চলতি অর্থবছর থেকে কারিগরি শিক্ষার ওপর ব্যাপকভাবে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এ ছাড়া আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূরীকরণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেসব তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে চান তাদের স্টার্ট আপের জন্য ১০০ কেটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার জন্য বাজেটে গবেষণার জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চাকরিজীবী নয়, উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে কৃষি ও পল্লি ঋণ নামে এক বিশেষ ধরনের ঋণকার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে—পল্লি এলাকায় কৃষিনির্ভর ছোটো ছোটো শিল্প গড়ে তোলা। কিন্তু পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিশেষ ঋণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে তেমন একটা অবদান রাখতে পারছে না। অনেকেই এ ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে প্রবাহিত করছেন।

বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে সত্য, কিন্তু এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি কতটা মানসম্পন্ন, টেকসই এবং উত্পাদনশীল খাত থেকে আসছে তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ১২ বছরে আমাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় দ্বিগুণ করতে হবে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ১ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার। উচ্চ আয়ের দেশ হতে হলে এই মাথাপিছু জাতীয় আয়কে অন্তত পক্ষে ৩ হাজার ৯৯৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে হবে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১০ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু শুধু রেকর্ড মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেই চলবে না। সেই প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবাই পাচ্ছে কি না তা ভেবে দেখতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির অভাব এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টিত না হওয়ায় দারিদ্র্য বিমোচনের হার কমছে।

>>>লেখক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক