Saturday, August 17, 2013

মিসরে পশ্চিমা দ্বৈতনীতি স্পষ্ট by গিডিওন রাশম্যান

মিসরের রাস্তায় রক্তপাতের ঘটনা দেশটির জন্য একটি বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এটি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি হতাশাজনক উভয়সংকটও সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত কেউ জানে না নিহতের সংখ্যা কত। তবে একটি ব্রিটিশ টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান, একজন ১৭ বছর বয়সের মেয়েসহ অনেকেই নির্বিচার হামলার শিকার হওয়ায় ধারণা করা যায় মৃতের সংখ্যাটি অনেক বড়ই হবে। তাৎক্ষণিকভাবে এটি একটি ট্রাজেডি হলেও এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, কায়রো হত্যাকাণ্ড সামরিক বাহিনী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে যে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা ধ্বংস করে দিয়েছে। ধ্বংস করে দিয়েছে একটি গণতান্ত্রিক মিসর প্রতিষ্ঠার সব আশা, অন্তত নিকট-ভবিষ্যতে। ২০১১ সালের শুরুতে হোসনি মোবারক উৎখাত হওয়ার পর যে দূরকল্প প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল, তা এখন শেষ হয়ে গেছে। মিসরে কোনো এক পর্যায়ে হয়তো নির্বাচনও হবে। তবে সেনাবাহিনী তাতে আবারও মুসলিম ব্রাদারহুডকে জয়ী হতে দেয়ার ঝুঁকি নেবে, এটা অচিন্তনীয়। তাদের বিরুদ্ধে তো সেনাবাহিনী যুদ্ধই ঘোষণা করেছে। অনেক মিসরীয় বিশ্লেষক যুক্তি দিয়ে থাকেন, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি যখন নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, তখনকার চেয়ে ব্রাদারহুডের জনপ্রিয়তা এখন অনেক কম। তবে সেনাবাহিনী তা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে পরীক্ষা করার ঝুঁকি নেবে, এটা খুবই অসম্ভব মনে হয়।
মিসরে নিকট ভবিষ্যতে যদি কোনো নির্বাচন হয়, সেটা হবে একটি ধোঁকাবাজি। গণগ্রেফতার ও সেন্সরশিপের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর দমনপীড়ন চালানো হবে। এ মাসের প্রথমদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু একটি উদারপন্থী ক্যুয়ের ধারণা সব সময়ই বিভ্রান্তিমূলক।
তবে একটি নতুন অবয়বের মোবারক সরকারকে ফিরিয়ে আনাও খুবই কঠিন হবে। এটাকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ করার জন্য গত দু’বছরে অনেক কিছু করা হয়েছে। মোবারকের আমলে ব্রাদারহুডকে ভালোভাবেই প্রকৃত ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা গেলেও তারা মিসরীয় সমাজের অংশই ছিল। তারা বস্তি এলাকাগুলোয় সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সংগঠিত হয়েছে।
ভবিষ্যতে তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড মেনে নেয়া হবে এমন সম্ভাবনা কম। একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করা এবং রাস্তায় গণহত্যা চালানোর পর ইসলামপন্থীরা সামরিক শাসনের সঙ্গে সমঝোতা করবে বলেও মনে হয় না। বরং তাদের ওপর আরও দমনপীড়ন চালানো হলে সহিংস জিহাদিবাদের পুনরুত্থানের আশংকাই বেশি। মিসরের উদারপন্থীরা, যারা মূল তাহরির আন্দোলনের জন্য খ্যাত, তারা জানে না ফিরে আসার পথ কী।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও হয়ে পড়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাদের এই উভয়সংকট দেখা দিয়েছে নীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবে। পশ্চিমা নীতি হল গণতন্ত্রকে সমর্থন এবং সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। আর একটি ইসলামপন্থী সরকারের ওপর দমননীতি চালানোর প্রতি নীরব সমর্থন করার মাঝেই পশ্চিমা স্বার্থ নিহিত।
কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়েও বেশি জটিল। দমননীতির কারণে যদি আল কায়দা ও ইসলামপন্থী হুমকি ফিরে আসে, তাহলে তা কোনোভাবেই পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করবে না। একটি সহিংস, গণতন্ত্রবিরোধী অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যে এমনকি গোটা বিশ্বেই যে কোনো পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
মিসরে যা ঘটছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি তীব্র ভাষায় তার নিন্দা না জানায়, তাহলে তারা কিভাবে সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধে আল আসাদ সরকারের প্রতি নিন্দা প্রকাশ অব্যাহত রাখবে? এটা ঠিক, এখানে সংখ্যা বা মাত্রার একটি প্রশ্ন আছে। সিরিয়ায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। অন্যদিকে মিসরে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা সম্ভবত শ’য়ের ঘরে। তবে সহিংস দমননীতির প্রকৃতি একই রকম বলেই মনে হয়।
মিসরের সামরিক সরকারের প্রতি সমর্থন বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রত্যাহারে ব্যর্থতাও মধ্যপ্রাচ্যে উভয়সংকট সৃষ্টি করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি মিসরের ঘটনাবলী সহ্য করে নেয়, তাহলে তারা রাশিয়া ও চীনে তুলনামূলক কম দমনপীড়নের নিন্দা জানাতে পেরেছিল কিভাবে?
অবশ্য মিসরের সামরিক সরকারের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্ক ছিন্ন করলেও তারা উভয়সংকটে পড়বে। মিসরের অর্থনীতি টলটলায়মান এবং দেশটি মারাত্মক গৃহবিবাদ, এমনকি গৃহযুদ্ধের সুস্পষ্ট ঝুঁকিতে রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি এখন সামরিক সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে কি তারা প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রে সিরিয়ার মতোই ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে না? যদি তাই হয়, তাহলে বাইরের প্রভাবের শূন্যস্থানটি পূরণ করবে কে বা কী? সৌদি আরব, কাতার নাকি আল কায়দা?
এসব প্রশ্নের কোনো সহজ-সরল উত্তর নেই। কারণ পশ্চিমা রাজধানীগুলো থেকে যা শোনা গেছে এবং কায়রোয় যেসব ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে সেগুলো বিভ্রান্তিমূলক।
ব্রিটেনের ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকা থেকে অনূদিত
গিডিওন রাশম্যান : ফিনান্সিয়াল টাইমসের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক
মিসরের রাস্তায় রক্তপাতের ঘটনা দেশটির জন্য একটি বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এটি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি হতাশাজনক উভয়সংকটও সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত কেউ জানে না নিহতের সংখ্যা কত। তবে একটি ব্রিটিশ টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান, একজন ১৭ বছর বয়সের মেয়েসহ অনেকেই নির্বিচার হামলার শিকার হওয়ায় ধারণা করা যায় মৃতের সংখ্যাটি অনেক বড়ই হবে।
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
তাৎক্ষণিকভাবে এটি একটি ট্রাজেডি হলেও এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, কায়রো হত্যাকাণ্ড সামরিক বাহিনী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে যে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা ধ্বংস করে দিয়েছে। ধ্বংস করে দিয়েছে একটি গণতান্ত্রিক মিসর প্রতিষ্ঠার সব আশা, অন্তত নিকট-ভবিষ্যতে। ২০১১ সালের শুরুতে হোসনি মোবারক উৎখাত হওয়ার পর যে দূরকল্প প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল, তা এখন শেষ হয়ে গেছে।মিসরে কোনো এক পর্যায়ে হয়তো নির্বাচনও হবে। তবে সেনাবাহিনী তাতে আবারও মুসলিম ব্রাদারহুডকে জয়ী হতে দেয়ার ঝুঁকি নেবে, এটা অচিন্তনীয়। তাদের বিরুদ্ধে তো সেনাবাহিনী যুদ্ধই ঘোষণা করেছে। অনেক মিসরীয় বিশ্লেষক যুক্তি দিয়ে থাকেন, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি যখন নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, তখনকার চেয়ে ব্রাদারহুডের জনপ্রিয়তা এখন অনেক কম। তবে সেনাবাহিনী তা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে পরীক্ষা করার ঝুঁকি নেবে, এটা খুবই অসম্ভব মনে হয়।মিসরে নিকট ভবিষ্যতে যদি কোনো নির্বাচন হয়, সেটা হবে একটি ধোঁকাবাজি। গণগ্রেফতার ও সেন্সরশিপের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর দমনপীড়ন চালানো হবে। এ মাসের প্রথমদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু একটি উদারপন্থী ক্যুয়ের ধারণা সব সময়ই বিভ্রান্তিমূলক।তবে একটি নতুন অবয়বের মোবারক সরকারকে ফিরিয়ে আনাও খুবই কঠিন হবে। এটাকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ করার জন্য গত দু’বছরে অনেক কিছু করা হয়েছে। মোবারকের আমলে ব্রাদারহুডকে ভালোভাবেই প্রকৃত ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা গেলেও তারা মিসরীয় সমাজের অংশই ছিল। তারা বস্তি এলাকাগুলোয় সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সংগঠিত হয়েছে।ভবিষ্যতে তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড মেনে নেয়া হবে এমন সম্ভাবনা কম। একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করা এবং রাস্তায় গণহত্যা চালানোর পর ইসলামপন্থীরা সামরিক শাসনের সঙ্গে সমঝোতা করবে বলেও মনে হয় না। বরং তাদের ওপর আরও দমনপীড়ন চালানো হলে সহিংস জিহাদিবাদের পুনরুত্থানের আশংকাই বেশি। মিসরের উদারপন্থীরা, যারা মূল তাহরির আন্দোলনের জন্য খ্যাত, তারা জানে না ফিরে আসার পথ কী।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও হয়ে পড়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাদের এই উভয়সংকট দেখা দিয়েছে নীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবে। পশ্চিমা নীতি হল গণতন্ত্রকে সমর্থন এবং সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। আর একটি ইসলামপন্থী সরকারের ওপর দমননীতি চালানোর প্রতি নীরব সমর্থন করার মাঝেই পশ্চিমা স্বার্থ নিহিত।কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়েও বেশি জটিল। দমননীতির কারণে যদি আল কায়দা ও ইসলামপন্থী হুমকি ফিরে আসে, তাহলে তা কোনোভাবেই পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করবে না। একটি সহিংস, গণতন্ত্রবিরোধী অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যে এমনকি গোটা বিশ্বেই যে কোনো পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে।মিসরে যা ঘটছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি তীব্র ভাষায় তার নিন্দা না জানায়, তাহলে তারা কিভাবে সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধে আল আসাদ সরকারের প্রতি নিন্দা প্রকাশ অব্যাহত রাখবে? এটা ঠিক, এখানে সংখ্যা বা মাত্রার একটি প্রশ্ন আছে। সিরিয়ায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। অন্যদিকে মিসরে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা সম্ভবত শ’য়ের ঘরে। তবে সহিংস দমননীতির প্রকৃতি একই রকম বলেই মনে হয়।মিসরের সামরিক সরকারের প্রতি সমর্থন বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রত্যাহারে ব্যর্থতাও মধ্যপ্রাচ্যে উভয়সংকট সৃষ্টি করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি মিসরের ঘটনাবলী সহ্য করে নেয়, তাহলে তারা রাশিয়া ও চীনে তুলনামূলক কম দমনপীড়নের নিন্দা জানাতে পেরেছিল কিভাবে?অবশ্য মিসরের সামরিক সরকারের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্ক ছিন্ন করলেও তারা উভয়সংকটে পড়বে। মিসরের অর্থনীতি টলটলায়মান এবং দেশটি মারাত্মক গৃহবিবাদ, এমনকি গৃহযুদ্ধের সুস্পষ্ট ঝুঁকিতে রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি এখন সামরিক সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে কি তারা প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রে সিরিয়ার মতোই ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে না? যদি তাই হয়, তাহলে বাইরের প্রভাবের শূন্যস্থানটি পূরণ করবে কে বা কী? সৌদি আরব, কাতার নাকি আল কায়দা?এসব প্রশ্নের কোনো সহজ-সরল উত্তর নেই। কারণ পশ্চিমা রাজধানীগুলো থেকে যা শোনা গেছে এবং কায়রোয় যেসব ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে সেগুলো বিভ্রান্তিমূলক।ব্রিটেনের ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকা থেকে অনূদিতগিডিওন রাশম্যান : ফিনান্সিয়াল টাইমসের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক - See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2013/08/17/21123#sthash.udV6XHtC.dpuf
মিসরের রাস্তায় রক্তপাতের ঘটনা দেশটির জন্য একটি বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এটি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি হতাশাজনক উভয়সংকটও সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত কেউ জানে না নিহতের সংখ্যা কত। তবে একটি ব্রিটিশ টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান, একজন ১৭ বছর বয়সের মেয়েসহ অনেকেই নির্বিচার হামলার শিকার হওয়ায় ধারণা করা যায় মৃতের সংখ্যাটি অনেক বড়ই হবে।
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
তাৎক্ষণিকভাবে এটি একটি ট্রাজেডি হলেও এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, কায়রো হত্যাকাণ্ড সামরিক বাহিনী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে যে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা ধ্বংস করে দিয়েছে। ধ্বংস করে দিয়েছে একটি গণতান্ত্রিক মিসর প্রতিষ্ঠার সব আশা, অন্তত নিকট-ভবিষ্যতে। ২০১১ সালের শুরুতে হোসনি মোবারক উৎখাত হওয়ার পর যে দূরকল্প প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল, তা এখন শেষ হয়ে গেছে।মিসরে কোনো এক পর্যায়ে হয়তো নির্বাচনও হবে। তবে সেনাবাহিনী তাতে আবারও মুসলিম ব্রাদারহুডকে জয়ী হতে দেয়ার ঝুঁকি নেবে, এটা অচিন্তনীয়। তাদের বিরুদ্ধে তো সেনাবাহিনী যুদ্ধই ঘোষণা করেছে। অনেক মিসরীয় বিশ্লেষক যুক্তি দিয়ে থাকেন, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি যখন নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, তখনকার চেয়ে ব্রাদারহুডের জনপ্রিয়তা এখন অনেক কম। তবে সেনাবাহিনী তা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে পরীক্ষা করার ঝুঁকি নেবে, এটা খুবই অসম্ভব মনে হয়।মিসরে নিকট ভবিষ্যতে যদি কোনো নির্বাচন হয়, সেটা হবে একটি ধোঁকাবাজি। গণগ্রেফতার ও সেন্সরশিপের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর দমনপীড়ন চালানো হবে। এ মাসের প্রথমদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু একটি উদারপন্থী ক্যুয়ের ধারণা সব সময়ই বিভ্রান্তিমূলক।তবে একটি নতুন অবয়বের মোবারক সরকারকে ফিরিয়ে আনাও খুবই কঠিন হবে। এটাকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ করার জন্য গত দু’বছরে অনেক কিছু করা হয়েছে। মোবারকের আমলে ব্রাদারহুডকে ভালোভাবেই প্রকৃত ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা গেলেও তারা মিসরীয় সমাজের অংশই ছিল। তারা বস্তি এলাকাগুলোয় সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সংগঠিত হয়েছে।ভবিষ্যতে তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড মেনে নেয়া হবে এমন সম্ভাবনা কম। একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করা এবং রাস্তায় গণহত্যা চালানোর পর ইসলামপন্থীরা সামরিক শাসনের সঙ্গে সমঝোতা করবে বলেও মনে হয় না। বরং তাদের ওপর আরও দমনপীড়ন চালানো হলে সহিংস জিহাদিবাদের পুনরুত্থানের আশংকাই বেশি। মিসরের উদারপন্থীরা, যারা মূল তাহরির আন্দোলনের জন্য খ্যাত, তারা জানে না ফিরে আসার পথ কী।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও হয়ে পড়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাদের এই উভয়সংকট দেখা দিয়েছে নীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবে। পশ্চিমা নীতি হল গণতন্ত্রকে সমর্থন এবং সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। আর একটি ইসলামপন্থী সরকারের ওপর দমননীতি চালানোর প্রতি নীরব সমর্থন করার মাঝেই পশ্চিমা স্বার্থ নিহিত।কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়েও বেশি জটিল। দমননীতির কারণে যদি আল কায়দা ও ইসলামপন্থী হুমকি ফিরে আসে, তাহলে তা কোনোভাবেই পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করবে না। একটি সহিংস, গণতন্ত্রবিরোধী অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যে এমনকি গোটা বিশ্বেই যে কোনো পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে।মিসরে যা ঘটছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি তীব্র ভাষায় তার নিন্দা না জানায়, তাহলে তারা কিভাবে সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধে আল আসাদ সরকারের প্রতি নিন্দা প্রকাশ অব্যাহত রাখবে? এটা ঠিক, এখানে সংখ্যা বা মাত্রার একটি প্রশ্ন আছে। সিরিয়ায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। অন্যদিকে মিসরে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা সম্ভবত শ’য়ের ঘরে। তবে সহিংস দমননীতির প্রকৃতি একই রকম বলেই মনে হয়।মিসরের সামরিক সরকারের প্রতি সমর্থন বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রত্যাহারে ব্যর্থতাও মধ্যপ্রাচ্যে উভয়সংকট সৃষ্টি করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি মিসরের ঘটনাবলী সহ্য করে নেয়, তাহলে তারা রাশিয়া ও চীনে তুলনামূলক কম দমনপীড়নের নিন্দা জানাতে পেরেছিল কিভাবে?অবশ্য মিসরের সামরিক সরকারের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্ক ছিন্ন করলেও তারা উভয়সংকটে পড়বে। মিসরের অর্থনীতি টলটলায়মান এবং দেশটি মারাত্মক গৃহবিবাদ, এমনকি গৃহযুদ্ধের সুস্পষ্ট ঝুঁকিতে রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি এখন সামরিক সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে কি তারা প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রে সিরিয়ার মতোই ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে না? যদি তাই হয়, তাহলে বাইরের প্রভাবের শূন্যস্থানটি পূরণ করবে কে বা কী? সৌদি আরব, কাতার নাকি আল কায়দা?এসব প্রশ্নের কোনো সহজ-সরল উত্তর নেই। কারণ পশ্চিমা রাজধানীগুলো থেকে যা শোনা গেছে এবং কায়রোয় যেসব ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে সেগুলো বিভ্রান্তিমূলক।ব্রিটেনের ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকা থেকে অনূদিতগিডিওন রাশম্যান : ফিনান্সিয়াল টাইমসের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক - See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2013/08/17/21123#sthash.udV6XHtC.dpuf

সুশাসন ও নির্বাচন by মইনুল হোসেন

জামায়াতের দু’দিনব্যাপী হরতালে যখন সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিসহ জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত, তখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন ছাড়াই ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার ব্যাপারে জনগণকে বোঝানোর ব্যাপারে খুবই উদগ্রীব। আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই বিরোধী দলকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, নির্বাচন হোক বা না হোক, তারাই ক্ষমতায় থাকবে। কিছু লোকের কাছে ক্ষমতার আকাক্সক্ষা খুবই লোভনীয় এবং স্বাভাবিকও বটে। গত মঙ্গলবার তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন না হলেও ক্ষমতায় থাকার প্রত্যয় দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করা হয়েছে। বহুদিন থেকেই বিরোধী দলকে তারা আরও ভয় দেখাচ্ছে যে, সরকারের শর্ত অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা দেয়া হলে তৃতীয় শক্তি এর সুযোগ নেবে এবং পরবর্তী দশ বছরেও আর নির্বাচন হবে না। নতুন হুমকি অনুযায়ী তাদের বক্তব্য দাঁড়ায়, নির্বাচন ছাড়া তাদের ক্ষমতায় থেকে যাওয়া অসাংবিধানিক হবে না। নির্বাচন না হলেও এ ধরনের সরকার নির্বাচিত সরকার হিসেবেই বিবেচিত হবে। তার অর্থ হল, পেছনের দরজা দিয়ে কোনো অনির্বাচিত ও অসাংবিধানিক তৃতীয় শক্তির ক্ষমতা দখলের কোনো ‘ভয়’ থাকবে না। আওয়ামী লীগ এটা সামনের দরজা দিয়েই করবে। কাজেই বিরোধী দলের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই যে, তাদের হতাশ করে তৃতীয় কোনো শক্তি ক্ষমতা নিয়ে নেবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এটা বলছে না যে, ১০ বছর পরও আদৌ নির্বাচন হবে কিনা। নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে, প্রচলিত রাজনীতিতে নির্বাচন জনগণের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন বয়ে আনে না। বিদ্যমান ধারার রাজনীতিতে নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক- হরতাল, নৈরাজ্য, গুম, গুপ্তহত্যা ও লুটতরাজ বন্ধ হবে না। বর্তমানে রাজনীতি ও সরকার পর্দার আড়ালে থেকে অরাজনৈতিক ও অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে।
এখন ভোটের ব্যাপারে জনগণের খুব বেশি চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন থাকার কোনো কারণ নেই। কারণ, বর্তমান রাজনৈতিক প্রথায় জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু সৎ ও উত্তম কাউকে বেছে নিতে পারে না। ফলে জনগণের বিবেচনায় জনস্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে নির্বাচন কোনো চূড়ান্ত ফয়সালা নয়। তবে ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগের নির্ধারিত পথ গণতন্ত্রের প্রত্যাশাকেই ধূলিসাৎ করবে মাত্র।
পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং তারাও রাজনীতিবিদদের মতোই দুর্নীতিগ্রস্ত। সুতরাং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তেমন কার্যকারিতা নেই। একটি যোগ্য সরকার পরিচালনা করা ভিন্ন জিনিস। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করতে হলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে।
ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে সন্ত্রাস নৈরাজ্যের রাজনীতি পরিহার করার জন্য রাজনীতিবিদদের প্রতি আবারও অনুরোধ জানিয়েছেন। যদিও ব্যবসায়ী নেতারা তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভয়াবহ বিদ্যুৎ স্বল্পতা/সংকট এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু চেম্বার নেতারা একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির/অগ্রগতির একটি ইতিবাচক দিক চিহ্নিত করে বোঝাতে চেয়েছেন, এটা সরকারের জন্য মারাÍক সংকট নয়। ফলে তাদের সতর্কবাণী সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে না। এভাবে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ উন্নতকরণে সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারে উপযোগী ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার হিসাব সব সময় সুখবর হয় না। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি সবল-সচল না থাকে এবং বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশে যদি না থাকে তাতে সরকারের কৃতিত্ব প্রমাণ হয় না। অর্থ পাচারের সুযোগ পুঁজি পাচারের পথ অবারিত করে দিয়েছে- যতটা অতীতে ছিল না। বৈশ্বিক উদ্যোগ এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে দেশের অর্থনীতি এখনও মুখ থুবড়ে পড়েনি সত্য, কিন্তু অর্থনীতির শূন্যগর্ভতা সরকার কর্তৃক স্থাপিত বড় বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে আড়াল করা যাবে না। জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে নিজ নিজ কাজ করতে না পারলে কোনো ভালো কীর্তিই চূড়ান্ত পর্যায়ে ভালো কিছু বলে বিবেচিত হয় না। এটা দৃশ্যমান যে, ব্যর্থ রাজনীতি ও ব্যর্থ অর্থনীতি দেশে এক বিস্ফোরণোউন্মুখ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অনেকেই লক্ষ্য করছেন যে, দেশ দ্রুত এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা সবার নিরাপত্তায়ই বিঘœ ঘটাবে। এতে বিদেশী বন্ধুরা উদ্বিগ্ন হলেও আমাদের সুশীল সমাজ মোটেই বিচলিত নন। এই সংকট নিরসনে দেশপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ জরুরি।
আওয়ামী লীগ তাদের স্বপ্ন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারলে আপত্তি নেই, কিন্তু সর্বাগ্রে জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। শুধু একটি সরকারের ক্ষমতায় থাকার জন্য নয়, বরং জনগণের মঙ্গল ও উপযুক্ত শাসনের জন্যই শাসনতন্ত্র। দেশ কিন্তু সুশাসন বঞ্চিত।
স্বৈরশাসকরাও ক্ষমতায় থাকার জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন অনুভব করে। তারা জানে, দেশ নির্বাচনের জন্য নিরাপদ না হলে কিছুর জন্যই নিরাপদ নয়। গণতান্ত্রিক শাসন খুব সহজ নয়, কিন্তু স্বৈরশাসন আরও কঠিন ও বিপজ্জনক।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

গণমাধ্যম ও মানবাধিকার by ফরহাদ মজহার

আদিলুর রহমান খান শুভ্রকে প্রথমে অপহরণ করা হয়েছিল, তার বাসার সামনে থেকে। আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও গুমের যে রেকর্ড বর্তমান সরকারের রয়েছে তা বিবেচনা করে এই অপহরণকে দেশে ও বিদেশে মানবাধিকার কর্মীরা সহজভাবে নেয়নি। তার পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। সরকার তাকে হাজির করেছে বাধ্য হয়ে। কারণ তাকে অপহরণের খবর দেশে-বিদেশে বেশ দ্রুততার সঙ্গেই জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। উৎকণ্ঠা ও উদ্বিগ্নতা ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। কেন তাকে কোনো আগাম অভিযোগ ছাড়া গ্রেফতার করা হল তার কোনো ব্যাখ্যা সরকার দিতে পারেনি। গ্রেফতারের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, আদিলুরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। প্রশ্ন উঠল, যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তাকে কেন ফৌজদারি কার্যপ্রণালীর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হল? সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে হল না কেন? এর কোনো উত্তর সরকার পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। ফৌজদারি কার্যপ্রণালীর ৫৪ ও ১৬৭ ধারা নিয়ে তর্ক অনেক দিনের। পুলিশ এর অপব্যবহার করে। পুলিশের অপব্যবহার রোধ করার বিরুদ্ধে আগে আদালতে মামলাও হয়েছে। আদালত ৭ এপ্রিল ২০০৩ পরিষ্কার রায়ও দিয়েছে। ফৌজদারি পুলিশি ক্ষমতা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৫-এর সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ছয় মাসের মধ্যে এই বিধানগুলো এবং একই সঙ্গে পুলিশ অ্যাক্ট, পেনাল কোড এবং এভিডেন্স অ্যাক্ট ইত্যাদির সংস্কার বা পরিবর্তনেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ছয় মাস অনেক আগেই গত হয়েছে। ইতিমধ্যে জোট সরকার গত হয়েছে এবং এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের পর ডিজিটাল সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একজন মানবাধিকার কর্মীকে এই সরকারের আমলে অনায়াসে পুলিশ অপহরণ করল আগে, তারপর বলল ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরপর দেশ-বিদেশের চাপে বলা হল, পুলিশ সন্দেহ করছে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বিধান লংঘন করেছেন। এটা সন্দেহ। তার মানে তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এখনও এই লেখা যখন লিখছি তখন তোলা হয়নি। যা কিছু অভিযোগ সরকার বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমেই চাউর করছে। পুলিশ সন্দেহের জোরেই আদিলুরের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে। আদালত ১০ দিন কমিয়ে ৫ দিন করেছে। কিন্তু উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাকে যা জিজ্ঞাসাবাদ করার কারাগার ফটকে করতে বলেছেন। এর আগে হাইকোর্টে পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে নালিশ করবার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন পুলিশের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার থাকলে সেটা কারাগার ফটকে করতে হবে। থানায় নিয়ে গিয়ে অভিযুক্তকে নির্যাতন করে তার কাছ থেকে তথ্য আদায় করা যাবে না। আদিলুর কিছুটা রেহাই পেয়েছেন।
আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযোগ হচ্ছে তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন। ভুলটা কোথায়? সেটা সংখ্যায়। সরকার দাবি করছে, ৫ ও ৬ মে’র শাপলা চত্বরে হেফাজত কর্মীদের তাড়িয়ে দিতে গিয়ে যে গুলিগোলা, টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার হয়েছে তাতে একজনও হতাহত হয়নি। ‘অধিকার’ সেক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা সেদিন শহীদ হয়েছে, তাদের অনেকের তথ্য ‘অধিকার’ বিভিন্ন জেলায় জেলায় সরেজমিন গিয়ে অনুসন্ধান করে জানিয়েছে ৬১ জনের নাম-ঠিকানা তারা জোগাড় করতে পেরেছে। তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এটাই চূড়ান্ত নয়। এই তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি কোনো কানকথা বা শোনা কথার ভিত্তিতে নির্ণয় করা হয়নি। এর সঠিকতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন এবং দলমত নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে ‘অধিকার’ সবসময় সতর্ক পদ্ধতি অবলম্বন করে। তথ্যের যাচাই-বাছাইও করা হয় অতিশয় সতর্কতার সঙ্গে। এই প্রথম ‘অধিকার’ কোনো মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করছে তা নয়। প্রতি মাসেই মাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় এবং বছর শেষে বাৎসরিক প্রতিবেদনও ‘অধিকার’ প্রকাশ করে আসছে। এ সংগঠনটির কৃতিত্ব, সাফল্য এবং বিপুল গ্রহণযোগ্যতা সঠিক তথ্য হাজির করার নৈতিক দৃঢ়তার মধ্যে নিহিত। অতি অল্প সময়ের মধ্যে মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে ‘অধিকার’-এর আন্তর্জাতিক খ্যাতি তথ্যের সঠিকতার জন্যই। এতদিন ‘অধিকার’ কোনো ভুল তথ্য দিল না, শুধু মে মাসের হত্যাযজ্ঞের মৃতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য দেবে, এটা অবিশ্বাস্যই মনে হয়। কিন্তু তারপরও দেখছি মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের গোড়ার প্রশ্ন বাদ দিয়ে ৫ ও ৬ তারিখে শহীদের সংখ্যা নিয়ে তর্কটাকেই নানাভাবে প্রধান করে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশে অতিশয় নিম্ন পর্যায়ের দলবাজিতা এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয়ই এর কারণ, এটা স্পষ্ট। এটাও লক্ষ্য করছি, যারা একজন মানবাধিকার কর্মীকে এভাবে হেনস্থা ও পুলিশি নির্যাতনের নিন্দা করছেন, তারাও শহীদের সংখ্যা নিয়ে বেশ কাতর। তারা বলছেন, সংখ্যা এত হবে না। পঞ্চাশ-টঞ্চাশ বা কাছাকাছি কিছু হতে পারে। সরকারের অভিযোগ সঠিক হলেও, তারা বলছেন, আদিলুর রহমান খানকে এভাবে গ্রেফতার করা ঠিক হয়নি। এর জন্য আওয়ামী লীগের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তারা। বেশ কৌতুককরই মনে হল। একজন মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংস্থার প্রধানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কাজটা খারাপই হয়েছে। এ সত্য ও বাস্তবতা তারা অস্বীকার করতে পারছেন না। কিন্তু তাদের আশংকা, এর সুযোগ নিতে পারে বিএনপি। তারা আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এই অন্যায় গ্রেফতারের ইস্যু কাজে লাগাতে পারে। যারা এভাবে দেখছেন, বোঝা যায় তারা আওয়ামীপন্থী এবং ঘোর বিএনপিবিরোধী। তদুপরি যে কোনোভাবে ইসলামপন্থীদের বিরোধিতা করা তারা তাদের ধর্মজ্ঞান করেন। তবে সেটা একটা ভদ্রলোকি বা সুশীল মতাদর্শের মোড়কে ঢেকে রাখেন। কিন্তু মোড়ক ফেটে ভেতরটা বেরিয়ে আসে। তারপরও বলব, এটা মন্দের ভালো। বিশেষত যদি মনে রাখি যে প্রধানমন্ত্রীর লাল রঙ মেখে শুয়ে থাকা ও পুলিশের গুতা খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার কাহিনীটা বিশ্বাস করে এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে কম নয়। চেতনা ও বিবেক নিম্ন শ্রেণীর দলবাজিতা ও ক্ষমতার কাছে বন্ধক দেয়া নতুন কিছু নয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে লন্ডনে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি কামাল আহমেদের লেখা, ‘বিচারের আগে দোষী একজন আদিলুর’ (১৬ অগাস্ট ২০১৩) পড়ে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছি। কামাল আহমেদ বছরওয়ারি অধিকারের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন। তার লেখায় স্পষ্ট যে, মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে অধিকার কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করে না। প্রতিটি সরকারের অধীনেই মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং অধিকার তা যথাসাধ্য সঠিকভাবে পেশ করার চেষ্টা করেছে। এমনকি আদিলুর যখন জোট সরকারের আমলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন, তখন জোট সরকারের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ও তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করেছে ‘অধিকার’। কামাল আহমেদের লেখার গুরুত্ব হচ্ছে তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। লিখেছেন, ‘জাতিসংঘের বর্ণনায় একজন মানবাধিকাররক্ষীকে (হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার) আদালতের বিচারের আগেই দোষী সাব্যস্ত করায় একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি লজ্জিত এবং আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ তিনি যে গণমাধ্যমগুলো সম্পর্কে ইঙ্গিত করছেন, তাদের নাম নেয়ার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশের সচেতন পাঠকদের কাছে তারা পরিচিত।
এটা অস্বীকার করার জো নাই যে, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভূমিকা ন্যক্কারজনক। অথচ মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা শক্তিশালী না হলে শুধু মানবাধিকার সংস্থার সাহসী ভূমিকা দিয়ে নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা অসম্ভব। এই পরিপ্রেক্ষিতে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের লেখা পড়ছিলাম। তার লেখার শিরোনাম হচ্ছে 'Something that should seriously worry the PM' (প্রধানমন্ত্রীর কিছু গুরুতর বিষয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত’, দেখুন, ১৬ অগাস্ট ২০১৬)। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেন আদিলুর রহমান খানের পক্ষে দাঁড়াল, মাহফুজ আনাম যেন তার জন্যই কাতর হয়ে পড়েছেন। এর ফলে সরকার ও রাষ্ট্রের বদনাম হয়েছে। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক কাতারে দাঁড়িয়ে আজ শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এ এক বিব্রতকর পরিস্থিতি। বলেছেন, এটা বাংলাদেশের প্রাপ্য নয় (Bangladesh does not deserve) । কিন্তু জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা কানাডা কেউই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি, বরং শেখ হাসিনার অত্যাচার, নির্যাতন ও দমননীতির বিরোধিতা করছে। একজন মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করা মারাত্মক ঘটনা, মাহফুজ যা মেনে নিতে পারছেন না। হিউমেন রাইটস ওয়াচের ব্রাড এডাম বলেছেন, এটা অনেকটা মেরুদণ্ডে হিমপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার, এতই ভীতিকর। বাংলাদেশে মানবাধিকার এবং সাধারণভাবে নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন কী পরিমাণ নাজুক হয়ে পড়েছে তার কোনো স্বীকৃতি মাহফুজ আনামের লেখায় পেলাম না। তিনি সরকারের মতোই বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে সেই কথাই বলেছেন। তার লেখায় সরকারের প্রতি পক্ষপাত স্পষ্ট।
৫ ও ৬ তারিখে হেফাজতের সমাবেশ ও হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্রে ডেইলি স্টারের ভূমিকা ছিল সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে একান্তই সরকারের পক্ষে সাফাই ও ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ ছাপানো ও প্রচার। মাহফুজ দাবি করেছেন, তারা সতর্কভাবে সেদিন কতজন মারা গিয়েছে তা নিরীক্ষণ করেছেন এবং তিনি ‘অধিকার’-এর সংখ্যার সঙ্গে একমত নন। সেটা হতেই পারে। তাহলে কতজন সেদিন মারা গিয়েছে সেই সংখ্যা উল্লেখ করলে বোঝা যেত তার আপত্তি ঠিক কোথায়। কিন্তু তার লেখায় কোনো সংখ্যা তিনি উল্লেখ করেননি, তার পত্রিকার সতর্ক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সেদিন কয়জন মারা গিয়েছিল। যেটা বিস্ময়কর সেটা হল মাহফুজ আনাম বলতে চাইছেন, আদিলুর রহমানের সমস্যা হচ্ছে অধিকারের রিপোর্ট ও আদিলুর রহমান খানকে সরকারের হ্যান্ডলিংয়ের সমস্যা। কী রকম? সেই হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে সরকারের অযোগ্যতা বা চরম অক্ষমতাই প্রকাশিত হয়েছে (The handling of the Odhikar report and the subsequent arrest of its secretary Adilur Rahman, are examples of incompetence at their devastating worst that has today brought the government to disrepute and the country to worldwide embarrassment.) ফলে কিভাবে জাতিসংঘ ও বিদেশীদের না খেপিয়ে আদিলুরকে শায়েস্তা করা যেত তিনি তার একটা ফিরিস্তি দিয়েছেন বা পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। গণবিরোধী ও মানবাধিকার বিরোধী একটি সরকার কিভাবে একজন মানবাধিকার কর্মীকে শায়েস্তা করবে, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তার লেখায় সেই পরামর্শ দিয়েছেন। এই হচ্ছে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদকের অবস্থান।
মাহফুজ আনামের এই রাজনীতির আমি বিরোধিতা করি। সামাজিক ক্ষেত্রে তাকে বন্ধু গণ্য করি বলে এই রাজনীতির বিপদ সম্পর্কে তাকে সতর্ক করার জন্যই কথাগুলো তুলেছি। বাংলাদেশ দলীয় ও রাজনৈতিক-মতাদর্শিকভাবে একটি বিভক্ত দেশ। এ ক্ষেত্রে যদি আমরা উদারনৈতিক মূল্যবোধেও বিশ্বাস করি তাহলে মানবাধিকারের ন্যূনতম নীতিগত ক্ষেত্রগুলো যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। সেটা ইনক্লুসিভ বা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে হতে হবে, এক্সক্লুসিভ নয়, অর্থাৎ ইসলামপন্থীদের মানবাধিকার থাকবে না, কেবল আওয়ামী লীগ ও সেকুলারদের থাকবে, তা হবে না। যদি তা করি তাহলে সমাজকে আমরা আরও গভীর বিভাজনের দিকে ঠেলে দেব। যার ফল হবে মারাত্মক। যদি ইসলামপন্থাকে উদারনৈতিক রাজনীতি দেশের জন্য মঙ্গলজনক মনে না করে, তবে তার বিরুদ্ধে মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম চালাক। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চলতে পারে না। তারপর কয়জন নিহত হয়েছে মৃত মানুষগুলো নিয়ে সংখ্যার রাজনীতি খুবই ন্যক্কারজনক ব্যাপার। যে কোনো নাগরিক, তার ধর্ম বা মতাদর্শ যাই হোক, রাষ্ট্র ও সরকার তার নাগরিক ও মানবিক অধিকার লংঘন করতে পারে না। বাংলাদেশকে যদি এই জায়গায় আমরা নিতে না পারি, তাহলে সেটা মস্ত বড় বিপদের কারণ হয়ে দেখা দেবে।
‘অধিকার’ সরকারকে তথ্য দেবে না কখনোই বলেনি। সুস্পষ্টভাবে যাদের কাছ থেকে ‘অধিকার’ তথ্য সংগ্রহ করেছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। আর যেখানে খোদ সরকার মানবাধিকার লংঘন ও গণহত্যার দায়ে মানবাধিকার কর্মীদের কাছে অভিযুক্ত সেক্ষেত্রে স্বাধীন একটি তদন্ত কমিশন গঠিত না হলে সরকারকে তথ্য দিতে বলার অর্থ মানবাধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া।
যেখানে অধিকারের সম্পাদক তার নিজেদের মানবাধিকার রক্ষা করতে পারেননি, সেখানে যারা ৫ ও ৬ তারিখে হত্যার সাক্ষী হয়েছে বা তথ্য দিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? কামাল আহমেদ গণমাধ্যমের ভূমিকায় যথার্থই লজ্জিত ও দুঃখিত হয়েছেন।

আমজাদ : এক সহযোদ্ধার স্মৃতি by ফকীর আবদুর রাজ্জাক

গত ১ জুলাই অনেকটা কাউকে জানান না দিয়েই আমাদের অকৃত্রিম সহযোদ্ধা বন্ধু খোন্দকার আমজাদ আলী চিরবিদায় নিয়েছেন আমাদের মাঝ থেকে। আমজাদ ছিলেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর ভালোবাসায় সিক্ত একজন মানুষ। ’৭১-এ যেহেতু কোনো কিছুর পরোয়া না করে সবে পাওয়া চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীনতার ডাকে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেহেতু আমরা যারা তার মতো একই পথের পথিক ছিলাম তারাও সর্বক্ষণ তাকে কাছে পেয়েছি একান্ত বিশ্বস্ত মুক্তিকামী সাহসী মানুষ হিসেবে।
’৬৯-এর ছাত্র গণআন্দোলনে গোটা বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রকম্পিত হতে থাকে। ওই সময় দু’দিনের জন্য পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবে যোগ দিতে ঢাকায় এসে আমজাদের মেসে উঠি। তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র হিসেবে আমজাদ তার বন্ধুদের নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। ছাত্র আন্দোলনে চাকরি সত্ত্বেও দিনরাত মিছিল-মিটিং করত। আমজাদ জগন্নাথ কলেজের প্রখ্যাত ছাত্রনেতা, ছাত্রলীগের বিশিষ্ট নেতা রাজিউদ্দিন আহমদ রাজু, সাইফুদ্দিন আহমদ প্রমুখের সংস্পর্শে থেকে ছাত্রলীগের তৎকালীন রাজনীতিতে বিরাট অবদান রেখেছিল। আন্দোলনের চরম মুহূর্তে পাকিস্তানের তথাকথিত লৌহমানব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসেন জনতার মাঝে। আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। ধারাবাহিকতায় আসে ৭ মার্চ। দু’দিন আগেই আমি আবার ঢাকায় আসি। আমজাদ ও তার বন্ধুদের নিয়ে ৭ মার্চের জনসভায় যোগ দিই। সভা শেষে আমজাদের মাথায় এলো, কত লোক হয়েছিল তার হিসাব বের করতে হবে। সে আমাদের নিয়ে গোটা রেসকোর্স মাঠের (পরবর্তী সময়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দৈর্ঘ্য-প্রস্থ হেঁটে একটা অংক বের করল। এক পা থেকে অন্য পা পর্যন্ত যদি একটি লোক বসে তাহলে দৈর্ঘ্য-প্রস্থের হিসাবে কাগজ-কলমের দ্বারা আমজাদ আনুমানিক হিসাব বের করল- সাত লাখের কিছু বেশি।
’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের সময় আমজাদ অফিসে ছুটি নিয়ে বাড়িতে এলো। ততদিনে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে রাজশাহীর পাঠ চুকিয়ে রাজবাড়ী, পরে গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছি। শেষ পর্যন্ত অনেক ঘটনার পর আমাদের বালিয়াকান্দি ও বোয়ালমারীর একাংশ আসনে বঙ্গবন্ধু মনোনয়ন দিলেন গৌরচন্দ্র বালাকে। অগত্যা তাকে নিয়েই আমরা মাঠে নেমে পড়লাম। আমজাদ ও অন্য সমমনা বন্ধুদের নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়াতে শুরু করলাম। সে সময় দেখেছি আমজাদের কী দারুণ মনোবল। আমরা যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনকার একটি ঘটনা উল্লেখ না করলে আমজাদকে সঠিক মূল্যায়নে খানিকটা ঘাটতি থেকে যাবে। আমার বড় ভাই ড. ফকীর আবদুর রশীদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসের ছাত্র। একদিন বাড়ি এসে আমজাদ, সৈয়দ মঞ্জুরুল হক, পিয়ারা মিয়া ও কমরউদ্দিনকে ডেকে বললেন, নবাব বাড়ির গহিন জঙ্গলের কোথাও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরুষ মীর মশাররফ হোসেনের কবর রয়েছে, যা খুঁজে বের করা উচিত। একদিন আমরা সবাইকে নিয়ে ভাইয়ের নেতৃত্বে নবাব বাড়ির ধ্বংসস্তূপ ও জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। সাপ ও শূকরের আস্তানা ছিল ওই জঙ্গলে। অবশেষে দু’দিন ধরে খোঁজাখুঁজির পর মীরের কবরস্থান নতুন করে আমরা আবিষ্কার করলাম। সেই খবর ও ছবি ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হল। ঘটনাটি ’৬২ সালের।
এরপর নানা ঘটনার পর একদিন এলো সেই চরম মুহূর্ত ’৭১-এর মার্চ মাস। ২৫ মার্চ পাকবাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করল। আমজাদ পরদিনই ঢাকা থেকে নৌকা ও হাঁটাপথে মুন্সীগঞ্জ-মানিকগঞ্জ হয়ে বাড়ি ফিরে এলো। এতদিনে আমি মানিকগঞ্জ কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে রাজবাড়ীর প্রতিরোধ আন্দোলনে ভূমিকা পালন করে শেষ পর্যন্ত গ্রামের বাড়িতে এসে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে আমজাদ ঢাকা থেকে বাড়ি চলে আসায় আমাদের শক্তি আরও বেড়ে গেল। আমাদের গ্রাম ও আশপাশের গ্রামে যাদের বন্দুক ছিল তা সংগ্রহ করে নিয়ে প্রতিদিন রাতে আমরা বহরপুর-রামদিয়া-সোনাপুরসহ হিন্দুপ্রধান এলাকায় ব্যাপক পাহারা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলাম। আমজাদ ছিল সর্বক্ষণ সঙ্গী। এপ্রিলের ’৭১-এর মাঝামাঝিতে গোয়ালন্দঘাটের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে শেষ পর্যন্ত পাকবাহিনী ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর তথা দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। অবশেষে পরিস্থিতি এমন আকার ধারণ করল যে আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিলাম, ভারত চলে যাব। আমজাদ, বাবলু গোস্বামী ও আমি একদিন বাড়ি ছেড়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিলাম। সম্পূর্ণ হেঁটে কয়েকদিন ধরে এপ্রিলের শেষের দিকে আমরা কৃষ্ণনগর হয়ে কলকাতায় গিয়ে পৌঁছলাম।
আমজাদ আগে থেকেই সুনীল কুমার দাসের ঠিকানাটা নিয়ে এসেছিল। সুনীলদা আমাদের পাশের গ্রামের ছেলে। এমএ পাস করার পর চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দেশত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান। আমজাদ ও আমার ঘনিষ্ঠজন। ক’দিন তার বাসায় থাকার পর কলকাতায় একটি শিখ মুসাফিরখানায় প্রায় দুই সপ্তাহ খেয়ে-থেকে মুজিবনগর সরকারের হদিস খুঁজতে লাগলাম। কিছু খোঁজখবর পেলেও আমজাদ বেশি খুশি হতে পারল না। হতাশা তাকে চরমভাবে পেয়ে বসল। তার একই কথা- পাকবাহিনীর মতো শক্তিধরদের পরাজিত করার মতো কোনো আয়োজনই আমাদের নেই। মুজিবনগর সরকার তো গুছিয়েই উঠতে পারেনি, যুদ্ধ করবে কবে? বোধহয় মাস দুয়েক হতাশা বুকে নিয়ে ঘুরেফিরে অবশেষে আমজাদ আমাকে রেখেই দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। তাকে আর নিবৃত্ত করতে পারলাম না। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমজাদ যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুক, বাঙালির স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় গিয়ে জেনেছি চাকরি সূত্রে ঢাকায় থেকেও আমজাদ ও তার কয়েক সহকর্মী সাধ্যমতো মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছে।
স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দেয়ার কাজ শেষ করে প্রথমে আমজাদের কাছে একদিন থেকে শেখ ফজলুল হক মনির সঙ্গে দেখা করে সাংবাদিকতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। তিনি রাজি হলেন এবং একদিন আরামবাগে তার বাসার চাবি আমার হাতে দিয়ে বললেন, বউ-ছেলে নিয়ে এসে ওই বাসাতে থাক। ২১ ফেব্র“য়ারি ’৭২ বাংলার বাণী প্রথম প্রকাশ পেল। কিছুদিন যেতেই একদিন আমজাদ তার দেশে রেখে আসা স্ত্রী, যে আমারই ধর্মবোন, রওশন আরা বেগম বাচ্চুকে নিয়ে বাসায় এসে উঠল। ওরা মাসাধিককাল আমাদের এখানে ছিল। এরপর আমজাদ তার বড় ভাইয়ের কাছে কিছুদিন থেকে মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের একটি পরিত্যক্ত বাড়ির প্রজেশন কিনে বাস করতে থাকল। তারপর সেই বাড়িই একসময় সরকারের কাছ থেকে কিনে স্থায়ীভাবে তার বসবাস। আমরাও একসময় স্ত্রীর সরকারি চাকরির সুবাদে ওই জাকির হোসেন রোডেই একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে থেকেছি প্রায় ৩২ বছর। ফলে আমজাদের থেকে আমাকে বেশিদিন আলাদা থাকতে হয়নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওই জাকির হোসেন রোডেই ছিল আমজাদ। 
আমজাদের চলে যাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। আমি ও আমরা কতিপয় এমন এক অভিভাবকসম পরম বন্ধুকে হারিয়েছি, যা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। দেশ ও সমাজ হারিয়েছে সত্যিকার দেশপ্রেমিক এক মুক্তিকামী মানুষকে।
ফকীর আবদুর রাজ্জাক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত by তারেক শামসুর রেহমান

নির্বাচন কমিশন একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২-এর ব্যাপক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ৪১টি সংশোধনী প্রস্তাব এনে আইন মন্ত্রণালয়ে একটি নোট পাঠিয়েছে। যদিও আইন মন্ত্রণালয় এখন অবধি সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করেনি, কিন্তু ইসির এ প্রস্তাব ইতিমধ্যেই রাজনীতির ময়দানে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ছাড়াও মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ইসির এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। যে অভিযোগটি উঠেছে তা হচ্ছে, ইসি সরকারের পক্ষে কাজ করছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসব অভিযোগের কোনো জবাব দেননি। তবে বলছেন, কমিশন ইতিমধ্যে এসবের জবাব দিয়েছে। প্রয়োজনে কমিশন আরও ব্যাখ্যা দেবে। দেশ যখন একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি, জাতি যখন এখনও স্পষ্ট নয় কোন পদ্ধতির সরকারের আওতায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তখন নির্বাচন কমিশন এ ধরনের কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত না নিলেই পারত। নির্বাচন কমিশন কি আদৌ চিন্তা করেনি যে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি করবে? ইসির দায়িত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সব দলের অংশগ্রহণের ব্যাপারটি নিশ্চিত করা। কিন্তু এ ধরনের একটি অযৌক্তিক সংশোধনী শুধু নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণকেই অনিশ্চিত করবে না, বরং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। বস্তুত কমিশন ইতিমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জটিলতা আরও বাড়বে।
নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে থাকে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২-এ সংশোধনী আনা প্রয়োজন, তারা সেটা করতে পারে। এতে আপত্তি থাকার কথা নয়। সময়ের পরিক্রমায় কিছু কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত, যারা মূল ‘অ্যাক্টর’, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তাদের যদি সম্মতি না থাকে, তাহলে ওই সব সংশোধনী আনার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। বর্তমান ইসি যেসব সংশোধনী আনল, তাতে মূল ‘অ্যাক্টর’দের সম্মতি না থাকায় সেসব সংশোধনী অর্থহীন হয়ে পড়ল। কমিশন দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারল না। বরং রাজনৈতিক সংকটে নতুন একটি মাত্রা যোগ করল। কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হল।
প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন যেসব সংস্কারের প্রস্তাব করেছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল কতটুকু? তারা মোট ৪১টি সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে, যার বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ইসি যেসব সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকায় বাড়ানো, নির্বাচনবিধি ভঙ্গ করলে শাস্তি কমানো, স্বতন্ত্র সদস্যদের জন্য শতকরা ১ ভাগ ভোটারের পূর্ব-স্বাক্ষর গ্রহণ প্রযোজ্য না করা, দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থী পদ বাতিলের ব্যাপারে দলীয় প্রধানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, নির্বাচন কমিশনারের প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রহিত করা ইত্যাদি। ইসি আরপিও’র ৯১ ধারা বাতিলের যে প্রস্তাব করেছে, তা শুধু বিতর্ককে উসকেই দেবে না, কমিশন যে সরকারের মুখাপেক্ষী- এ অভিযোগকে আরও জোরালো করবে।
আরপিওর ৯১ই(২) ধারায় আছে, আচরণবিধি ভঙ্গের অপরাধে কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হলে এবং সেখানে অন্য একজন প্রার্থী থাকলে ওই আসনের নির্বাচন বন্ধ থাকবে। পরবর্তী সময়ে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ওই ধারায়। বর্তমান কমিশন ওই ধারায় সংশোধনী আনার প্রস্তাব করেছে। তারা প্রস্তাব করেছে, কোনো প্রার্থীর প্রার্থী পদ বাতিল হলে, ওই আসনে অন্য একজন প্রার্থী থাকলে, তাকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হবে। এর অর্থ কী? যে কোনো প্রক্রিয়ায় যদি বিএনপি তথা ১৮ দলীয় প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়, তাহলে সরকারদলীয় সদস্যকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা সহজ হবে। এখন ইসির সংশোধনী প্রস্তাবটি বিতর্কিত হওয়ায় ইসি পুরো ৯১ ধারাই বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাহলে তো প্রশ্ন থেকেই যায়, ইসি কার স্বার্থে এ ধরনের একটি প্রস্তাব এনেছিল? দল নিবন্ধন কিংবা স্বতন্ত্র সদস্যদের ব্যাপারে আরপিওতে যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তাও বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সুতরাং ইসির কর্মকাণ্ড যে বিতর্কের সৃষ্টি করবে, এটা বলাই বাহুল্য।
নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র কয়েক মাস। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান নিয়েছে। ঠিক এমন একটি সময় নির্বাচন কমিশনের আরপিও সংস্কারের উদ্যোগ ‘রাজনীতির আগুনে’ ঘি ঢেলে দেয়ার শামিল। তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। এ মুহূর্তে এর আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। এর চেয়ে নির্বাচন কমিশনের আরও অনেক কাজ বাকি। কমিশন সেসব ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে ভালো করত। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই একটা কথা বলা হয়- তা হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা। আমাদের মন্ত্রীরা এ ধরনের কথা বলতে ভালোবাসেন। আমাদের সংবিধানে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কি আদৌ স্বাধীন? বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা কি সম্ভব? এক কথায় এর জবাব হচ্ছে, ‘না’। যে কমিশন নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই বিতর্কিত হয়ে যায়, সেই কমিশন দিয়ে কোনোমতেই নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করা যায় না। তত্ত্বগতভাবে নির্বাচন কমিশন যদি সরকারের প্রভাবের বাইরে থেকে নিজের ক্ষমতাবলে একক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট কী? নির্বাচন কমিশন কাগজে-কলমে স্বাধীন। নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্বাহী কর্তৃপক্ষের প্রভাব এখনও বহাল। বলা হয়, ভারতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন পরিচালনা করে। কথাটার পেছনে সত্যতা আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন কমিশন সব ক্ষমতা ভোগ করে। নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কোনো ক্ষমতা থাকে না। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকেন বটে, কিন্তু তার কোনো ক্ষমতা থাকে না। ওই তিন মাস মূল ক্ষমতা থাকে নির্বাচন কমিশনের হাতে। তারা কর্মকর্তাদের বদলি, পদায়নসহ বিধিভঙ্গের অভিযোগে মন্ত্র্রীদের, সাবেক মন্ত্রীদের গ্রেফতারের নির্দেশ পর্যন্ত দিতে পারেন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমাদের নির্বাচন কমিশনের পার্থক্য একটাই- আমাদের কমিশন, কমিশনের সদস্যরা অনেকটা ‘সরকারি চাকরি’ করেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর দলীয় আনুগত্যের কারণে তারা কমিশনে আসেন পাঁচ বছরের জন্য এবং যাদের দ্বারা তারা নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাদের স্বার্থ রক্ষা করেন। ইদানীং একটা প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করেছি, তা হচ্ছে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবসরের পর কমিশনে নিয়োগ পান। এসব সামরিক কর্মকর্তার রাজনীতি, রাজনীতির গতিধারা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পান। তারা সামরিক বাহিনীতে থাকাকালীন সব সময়ই ‘কমান্ড’ মানতেন। মানতে বাধ্য থাকতেন। এখন কমিশনে এসেও তারা সেই ‘কমান্ড’ই মেনে চলছেন। তাদের পক্ষে নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয়া অসম্ভব। তাদের ‘মাইন্ড সেটআপে’র কারণে তারা কমান্ডের বাইরে যেতে পারেন না। অতিরিক্ত সচিব (অবসর) পদমর্যাদায় কিংবা জেলা জজ পদমর্যাদায় যারা থাকেন, তারাও সরকারি প্রভাবের বাইরে যেতে পারেন না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কমিশনকে দিয়ে তাই নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
আমরা বারবার বলেছি, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব। তবে সেখানে ‘কিন্তু’ এবং ‘যদি’ আছে। প্রথমত, প্রতিটি জেলায় যে নির্বাচন কমিশনের অফিস ও কর্মকর্তারা আছেন, তারা সরকারি কর্মকর্তা। সরকারের আদেশ মানতে তারা বাধ্য। এখানে পিএসসির মাধ্যমে এবং সরাসরি ইসির তত্ত্বাবধানে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। তাদের নিয়োগকর্তা হবে কমিশন। তাদের বদলি, বেতন-ভাতা, নিয়োগ ইত্যাদি সবকিছু করবে কমিশন। সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো প্রভাব তাদের ওপর থাকবে না। তারা কোনো সরকারি কর্মকর্তার (যেমন জেলা প্রশাসক) নির্দেশ মানতে বাধ্য নন। তারা শুধু নির্বাচন কমিশনের আদেশ গ্রহণ করবেন এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন। এখন যদিও পিএসসি তাদের রিক্রুট করেছে, কিন্তু নির্বাহী কর্তৃপক্ষের প্রভাব তাদের ওপর রয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন আর্থিকভাবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল হতে পারবে না। বাজেটে প্রথম থেকেই তাদের বরাদ্দ থাকবে। বাজেট বরাদ্দ থাকলে তারা টাকার জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী হবে না। না হলে এই আর্থিক নির্ভরতাকে সরকার নিজের কাজে ব্যবহার করে। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক পদ হলেও কারা কারা এর প্রধান হবেন বা সদস্য হবেন, তার কোনো নীতিমালা নেই। এবার সার্চ কমিটির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সদস্যদের নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। এক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে একটা নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। না হলে বারবার একই ঘটনা ঘটতে থাকবে- সরকার তার সমর্থকদের এই কমিশনে নিয়োগ দেবে এবং নিয়োগপ্রাপ্তরা সরকারের স্বার্থ রক্ষা করবে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, সমাজের প্রতিটি সেক্টরে ‘রাজনীতিকরণ’ হয়েছে। শিক্ষকতা, পেশাজীবী, প্রশাসন সব জায়গায়ই রাজনীতি। নিয়োগগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক আদর্শকে মাথায় রেখে। ফলে নিয়োগপ্রাপ্তরা ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের ‘আদেশ’ অনুসরণ করবেন, তাদের ‘খুশি’ করার জন্য ‘পদক্ষেপ’ নেবেন, এটাই স্বাভাবিক। মহাজোট সরকারের আমলে প্রশাসনে রাজনীতিকরণের বিষয়টি এত বেশি ঘটেছে যে, অতীতের সব রেকর্ড তারা ভঙ্গ করেছেন। প্রশাসন ক্যাডারে পদোন্নতি, পুলিশ বিভাগে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের ঘটনা এত বেশি ঘটেছে যে, প্রশাসনের ওপর আস্থা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। মূলধারায় আমরা কিভাবে ফিরে আসব, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। একটা দেশের প্রশাসন যদি ঠিক না থাকে, তাহলে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আজ নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করল, কমিশন সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি কমিশন হিসেবে কাজ করতে পারছে না। কমিশন একটি ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে’র মতোই আচরণ করছে। তাদের এই ‘আচরণ’ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারবে না।
নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ব্যাপারে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে, এটা ঠিক আছে। কিন্তু কমিশনের বড় কাজ হচ্ছে বড় দলগুলোর আস্থা অর্জন করা। শুধু সরকারি দলের আস্থা অর্জন করলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, বড় দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে কমিশন যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের এই প্রস্তুতি মূল্যহীন। আরপিওতে সংশোধনী যদি আনতে হয়, তাহলে তা বড় দলগুলোর সম্মতি নিয়েই আনতে হবে। এককভাবে সংশোধনীর উদ্যোগ বিতর্কের মাত্রা বাড়াবেই মাত্র। সিইসি বলেছেন, তিনি একটি ব্যাখ্যা দেবেন। কিন্তু ব্যাখ্যার চেয়েও বড় প্রয়োজন বড় দলগুলোর মতামতকে গ্রহণযোগ্যতায় নেয়া। আরপিওর ব্যাপারে বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি যে মতামত দিয়েছে, নির্বাচন কমিশন তা গ্রহণযোগ্যতায় নিতে পারে এবং সেই মতো কাজ করতে পারে। তাহলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রতিফলন ঘটবে। না হলে যে কোনো উদ্যোগ হয়তো সরকারি দলকে খুশি করবে, কিন্তু বিরোধী দলের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।
এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাচন কমিশন। তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা নির্বাচন কমিশন কতটুকু পূরণ করে, সেটাই দেখার বিষয়।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর

মোহাম্মদ মুরসি
 কেন ও কীভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট মুরসি?
ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মুরসি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পাশাপাশি মিসরের অনেকেই মনে করছিলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধানে তিনি তেমন কিছুই করেননি। মুরসির ইসলামপন্থী সমর্থক ও তাঁদের বিরোধী বামপন্থী, উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধ এতটাই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যে মিসর কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। গত ৩০ জুন ছিল প্রেসিডেন্ট হিসেবে মুরসির দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বর্ষপূর্তি। মুরসির পদত্যাগের দাবিতে গড়ে ওঠা তামারোদ (বিদ্রোহ) আন্দোলন ওই দিন দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিলে লাখ লাখ লোক রাস্তায় নামেন। সেনাবাহিনী মুরসিকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ৩ জুলাই মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। গঠিত হয় অন্তর্বর্তীসরকার।
 সেনা হস্তক্ষেপের পর থেকে কী ঘটেছে?
সেনা হস্তক্ষেপের পর
মুরসিকে ক্ষমতায় পুনর্বহালের দাবিতে প্রায় প্রতিদিন বিক্ষোভ করতে থাকেন তাঁর সমর্থকেরা। বিক্ষোভের একটি কেন্দ্রছিল কায়রোর প্রেসিডেন্ট গার্ড সদর দপ্তর এলাকা। অনেকের ধারণা মুরসিকে প্রেসিডেন্ট গার্ড সদর দপ্তরেই বন্দি রাখা হয়েছে। সেখানে ৮ জুলাই পুলিশের গুলিতে অন্তত ৫১ জন মুরসি-সমর্থক নিহত হন। এ ছাড়া রাব্বা আল-আদাবিয়া মসজিদের বাইরে মুরসি-সমর্থকদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী ২৭ জুলাই গুলি চালালে নিহত হন আরও অন্তত ৭০ জন।
 ১৪ আগস্ট ঠিক কী ঘটেছিল?
নিরাপত্তা বাহিনী কায়রোর রাব্বা আল-আদাবিয়া মসজিদের বাইরে ও নাহদা চত্বর থেকে মুরসি-সমর্থকদের সরিয়ে দিতে ১৪ আগস্ট সকালে অভিযান শুরু করে। সেদিনের অভিযানে পাঁচ শ জনের বেশি নিহত হয়। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও এ সময়প্রাণহারায়।
 এরপর কী হতে পারে?
সেনাপ্রধান সিসি বলেছেন, নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আদলি মানসুর দায়িত্বে থাকবেন। মানসুর মুরসি সরকারের প্রণীত সংবিধান পুনর্বিবেচনা এবং ২০১৪ সালের শুরুর দিকে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। সিসি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ কী হবে বা সেখানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি। বিবিসি।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে

মিসরের রাজপথে শুধু দেশটির নবীন গণতন্ত্র লুটিয়ে পড়েনি, অগুনতি মানুষের চোখে পুরোনো মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের মিসরনীতিও ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। মিসর সংকটে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। বস্তুত এ মুহূর্তে কায়রোর ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব তলানিতে। সাম্প্রতিক সময়ে মিসরে মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা একের পর এক ব্যর্থ হয়েছে। সেনাবাহিনী মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তাঁকে সেনা কর্তৃপক্ষ ও বিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আপসরফার পরামর্শ দিয়েছিল ওয়াশিংটন। এতে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। এর আগে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত না করতে দেশটির সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তা আমলে নেয়নি সেনাবাহিনী। মুরসির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পদক্ষেপকে সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থান বলে স্বীকৃতি দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, একদিকে যেমন মিসরের জেনারেলদের ও মুরসিবিরোধী লাখো মানুষকে ক্ষুব্ধ করতে চায়নি ওয়াশিংটন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনকানুনের বিষয়টিও বড় বিবেচ্য ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস স্টাডিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট টমাস ক্যারোথার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিসরের সঙ্গে তাঁদের যৌথ সামরিক মহড়া বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এতেও খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না ওয়াশিংটন। কারণ, সৌদি আরব মিসরকে প্রতিবছর এক হাজার কোটি ডলার সহায়তা দেয়। অ্যাট দ্য পয়েন্ট অব এ গান গ্রন্থের লেখক ডেভিড রিয়েফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মিসরের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে মাত্র, নিন্দা করেনি। কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রুস রাদারফোর্ড বলেছেন, মুরসি-বিরোধীরাও যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র মনে করে না। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকার সময় মুরসিকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে ওয়াশিংটন। কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, মুরসিকে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পরও মিসরকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্টতই সেনা কর্তৃপক্ষকে সমর্থন জুগিয়ে চলেছে দেশটি।

সংঘাত জাপটে ধরেছে মিসরকে

কায়রোর রামসেস স্কয়ারে গতকাল নিরাপত্তা বাহিনীর
সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত একজনকে সরিয়ে নেন
মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকেরা ষ ছবি: এএফপি
মিসরে দুই দিন আগেই ঘটে গেছে কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী ঘটনা। সরকারি হিসাবে প্রাণহানি হয়েছে প্রায় ৭০০ মানুষের। এর পরও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে পুনর্বহালের দাবিতে মরিয়া দলের কর্মী-সমর্থকেরা। গতকাল শুক্রবারও জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে রাজপথে নামেন মুরসির দল মুসলিম ব্রাদারহুডের হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক। পুলিশও জবাব দেয় কাঁদানে গ্যাস ও বুলেটে। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় কায়রো।সরকারি কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সারা দেশে নিহত হন ৬০ জন। তবে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরা তাদের প্রতিনিধির বরাত দিয়ে জানায়, শুধু কায়রোর রামসেস স্কয়ারেই গতকালনিহত হয়েছেন ৯৫ জন। সারা দেশে নিহত হয়েছে আরও অনেক মানুষ। সংঘাত জাপটে ধরেছে মিসরকে। গতকাল জুমার নামাজের পর রাজধানী কায়রোর কেন্দ্রস্থলে রামসেস স্কয়ারে মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন মুরসির দলের কর্মী-সমর্থকেরা। তবে সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্থানে সড়ক বন্ধ করে দেয়। ‘জীবন বাঁচাতে’ তাঁদের ওপর গুলি চালাতে আগের দিন পুলিশকে ক্ষমতা দেয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া মুরসিপন্থীদের প্রতিহত করতে বিরোধী ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট ও তামারুদকে রাজপথে নামার আহ্বান জানায় কর্তৃপক্ষ। জরুরি অবস্থার মধ্যেও রাজপথে এগোতে থাকেন ব্রাদারহুডের মরিয়া কর্মীরা। রামসেস স্কয়ারে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও বুলেট ছোড়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এরপর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে পুরো কায়রোতে। রাজধানীর বাইরে আলেকজান্দ্রিয়াসহ অন্যান্য শহরেও গতকাল বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কায়রো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির এক সাংবাদিক জানান, সেখানকার একটি মসজিদে তিনি ১৯টি মৃতদেহ দেখেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অপর একটি মসজিদে আছে ২০টির বেশি লাশ। রাজধানীর দক্ষিণে ফাইয়ুম শহরে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। সুয়েজ খালের পাশের শহর ইসমাইলিয়াতে নিহত হন আরও পাঁচজন। নিরাপত্তা পরিষদের আহ্বান: সংঘাত থেকে বিরত থাকতে মিসরের অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। পরিষদের সদস্য ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া গত বৃহস্পতিবার রাতে এক বৈঠক থেকে ওই আহ্বান জানায়। দেশে দেশে বিক্ষোভ: মিসরে বিক্ষোভকারীদের ওপর কর্তৃপক্ষের চরম পদক্ষেপ ও শত শত প্রাণহানির ঘটনায় গতকাল বিক্ষোভ হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে জুমার নামের পর বিক্ষোভ মিছিল করে মানুষ। এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্স।

ক্ষ্যাপা সিকান্দারের কাণ্ড

ক্ষ্যাপা সিকান্দারের কাণ্ড
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের ব্যস্ত সড়ক জিন্নাহ অ্যাভিনিউ। বৃহস্পতিবার বিকেল। স্ত্রী ও এক শিশুছেলেকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন এক ব্যক্তি। হাতে দুটি মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র। মুহূর্তে এলোপাতাড়ি ফাঁকা গুলি ছুড়তে শুরু করলেন তিনি। অ্যাকশন চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে সত্যি সত্যি ঘটেছেএই রুদ্ধশ্বাস ঘটনা। মোহাম্মদ সিকান্দার নামে খ্যাপাটে ওই লোককে শেষ পর্যন্ত পাকড়াও করে পুলিশ। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনি ও তাঁর স্ত্রী গুরুতর আহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকটি মোড়ে সিগন্যাল অমান্য করার পর জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ে তাঁকে আটকায় ট্রাফিক পুলিশ। এর পরই তিনি কালাশনিকভ রাইফেল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে সিকান্দার মুঠোফোনে কথা বলেন টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে। জানাতে থাকেন একটার পর একটা দাবি। এর মধ্যে ছিল সরকারের পদত্যাগ, দেশে শরিয়াহ আইন চালু এবং দুবাইতে বন্দী থাকা তাঁর ছেলের মুক্তি। পাঁচ ঘণ্টা ধরে এই অবস্থা চলার পর সিকান্দারকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। একপর্যায়ে সুবিধামতো অবস্থা পেয়ে পুলিশ গুলি চালায়। চিকিৎসার পর আশঙ্কামুক্ত সিকান্দার ও তাঁর স্ত্রী। দুজনের বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে মামলা হয়েছে।যদিও পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্তে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এএফপি।

এনএসএ হাজারবার আইন লঙ্ঘন করেছে

এডওয়ার্ড স্নোডেন
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) গত দুই বছরে কয়েক হাজারবার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘন করেছে। শুধু তা-ই নয়, সংস্থাটি হাজারবার নিজের আইনি সীমাও লঙ্ঘন করেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত এসব নথি থেকে জানা যায়, বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করেই এনএসএ মার্কিন নাগরিকদের ওপর গোপন নজরদারি চালায়। নজরদারিবিষয়ক মার্কিন গোপন আদালত এই তৎপরতাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২০১২ সালের মে মাস থেকে তার আগের ১২ মাসে এনএসএ অবৈধভাবে নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের ঘটনা ঘটিয়েছে দুই হাজার ৭৭৬ বার। তবে এটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে মোট কতজন নাগরিক অবৈধ এই নজরদারির শিকার হয়েছেন। ‘তাঁরা আমার পরিস্থিতি জানেন না’: এদিকে এডওয়ার্ড স্নোডেন বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, তাঁর বাবা লন স্নোডেন এবং বাবার আইনজীবী ব্রুস ফিন এবং ফিনস অ্যাসোসিয়েটস তাঁর (স্নোডেন) আইনি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেন না। তিনি বলেন, ‘তাঁরা কেউ আমার আইনি পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং ভবিষ্যতে এই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।’ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, লন স্নোডেনের আইনজীবীর দল তাঁর ছেলে স্নোডেনের উপদেষ্টা উইকিলিকস ও ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান-এর সাংবাদিক গ্লেন গ্রিনওয়াল্ডের ওপর আস্থা রাখে না। এরপরই ওই বিবৃতি দিলেন স্নোডেন।
অ্যাসাঞ্জের অস্বীকার: গোপনীয়তাবিরোধী ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, রাশিয়ায় স্নোডেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে যে খবর বেরিয়েছে তা সঠিক নয়। গতকাল শুক্রবার অস্ট্রেলিয়ার ফেয়ারফ্যাক্স মিডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অ্যাসাঞ্জ বলেন, ‘৫৪ দিন ধরে আমাদের একজন প্রতিনিধি সব সময় স্নোডেনের সঙ্গে আছেন। এই সময়ের মধ্যে রুশ কর্তৃপক্ষ বা রাশিয়ার কোনো গোয়েন্দা সংস্থা স্নোডেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।’ বিবিসি, সিএনএন ও এএফপি।