Showing posts with label ফখরুল ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label ফখরুল ইসলাম. Show all posts

Wednesday, October 30, 2019

কুঁড়ার তেলের বিদেশযাত্রা by ফখরুল ইসলাম

*১০ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২টি কারখানা গড়ে উঠেছে।
*বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তেল।
*দাম সয়াবিন তেলের চেয়ে কিছুটা বেশি।
*২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে রপ্তানি হয় কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল।
*দেশে বছরে উৎপাদিত হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন তেল।
*সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়।

দেশে তো জনপ্রিয় হচ্ছেই, ধানের কুঁড়ার তেল (রাইস ব্র্যান অয়েল) এখন বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হচ্ছে বগুড়া থেকে। বর্তমানে এই তেল প্রধানত রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। তবে শ্রীলঙ্কা, জাপান, চীন—এসব দেশেও রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে।
স্বাধীনতার পর এবং আশির দশকেও দেশে প্রধান ভোজ্যতেল ছিল সরিষার তেল। তবে নব্বইয়ের দশক থেকেই অপরিশোধিত পাম তেল ও সয়াবিন তেলের আমদানি বাড়তে থাকে। দেশে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাও। আর ভোজ্যতেল হিসেবে ঘরে ঘরে জায়গা করে নেয় পাম তেল ও সয়াবিন তেল। কেউ কেউ অবশ্য সূর্যমুখী বা জলপাই তেলও (অলিভ অয়েল) রান্নায় ব্যবহার করেন।
একসময় বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসে অন্য ভোজ্যতেলের তুলনায় ধানের কুঁড়ার তেলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক মাত্রা কম। ধানের তুষ ছাড়ানোর পর চালের গায়ে বাদামি যে অংশ থাকে, সেখান থেকে এই তেল নিষ্কাশন করা হয়।
গত ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধানের কুঁড়ার তেলের ১২টি কারখানা গড়ে ওঠে। পাবনার ঈশ্বরদীতে ২০১১ সালে রশিদ অয়েল মিলস লিমিটেড ‘হোয়াইট গোল্ড ব্র্যান্ড’ নামে ধানের কুঁড়ার তেল উৎপাদন শুরু করে। প্রায় একই সময়ে গড়ে ওঠে ময়মনসিংহে ‘স্পন্দন’ ব্র্যান্ডের আরেকটি কারখানা।
তবে উৎপাদনের মাঠে ভালোভাবে আছে এখন বগুড়ার মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও তামিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। মজুমদার গ্রুপের তেলের ব্র্যান্ড ‘স্বর্ণা’। মজুমদার গ্রুপের কারখানায় প্রতিদিন তেল উৎপাদন হয় ৯০ থেকে ১০০ টন। এ ছাড়া রংপুরের গ্রিন অ্যান্ড পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজও কিছু তেল উৎপাদন করে।
মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রপ্তানি করছি মূলত ভারতে। তবে বিশ্বব্যাপীই এই তেলের চাহিদা রয়েছে এবং বছর বছর চাহিদা বাড়ছে।’
কুঁড়ার তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন ২৫০–৩০০ টন এই তেল উৎপাদিত হয়। বছরে হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন। সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়। ধান থেকে চাল তৈরি করলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কুঁড়া পাওয়া যায়।
তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিদিনের কুঁড়ার চাহিদা ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টন। দেশের চালকল থেকে বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি কুঁড়া উৎপাদিত হয়। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের মধ্যে কুঁড়ার তেলের অবদান সোয়া দুই থেকে আড়াই শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা ১৪ লাখ টন।
তবে অন্যদের কাছ থেকে পরিশোধন করিয়ে নিয়েও এই তেল বাজারজাত করছে কয়েকটি বড় কোম্পানি। যেমন এসিআই। এসিআইয়ের রাইস ব্র্যান তেলের নাম ‘নিউট্রিলাইফ’। বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের ব্র্যান্ড ‘ফরচুন’। ‘নেচুরা’ নামের একটি ব্র্যান্ডও বাজারে রয়েছে।
এসিআই কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের বিজনেস ডিরেক্টর অনুপ কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এই পণ্যটির বিক্রির পরিমাণ যেহেতু বাড়ছে, অনুমান করা যায় যে সারা দেশে রাইস ব্র্যান তেল জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে, তবে নানা কারণে রপ্তানি বাজার এখনো অত বড় হতে পারছে না।’
জনপ্রিয়তার কারণ জানতে চাইলে অনুপ কুমার বলেন, ডাক্তাররাই বলছেন এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অরাইজানল রয়েছে এবং এই তেল মানুষের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। অরাইজানল ইনসুলিন প্রতিরোধে সহায়তা করে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ধারণা বোতলে তেলের রংটা একটু হালকা হলে ভালো হয়। কিন্তু তা করতে গেলে তেল থেকে উপকারিতা কম পাওয়া যেতে পারে।
কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, বোতলজাত এক লিটার কুঁড়ার তেলের দাম পাম ও সয়াবিন তেলের দামের চেয়ে একটু বেশি। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম যেখানে ১০০ টাকার মতো, কুঁড়ার তেলের দাম সেখানে ১১৫ থেকে ১৩০ টাকা।
কুঁড়ার তেল উৎপাদনকারীরা বলছেন, এই তেল যেমন স্বাস্থ্যসম্মত, তেমনি সাশ্রয়ী। এক লিটার সয়াবিন তেলে যে খাবার রান্না করা যায়, তা পৌনে এক লিটার কুঁড়ার তেলেই করা সম্ভব। এদিকে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থার (বিসিএসআইআর) এক গবেষণাও বলছে, ভোজ্যতেলে যেসব খাদ্যগুণ থাকা উচিত, জলপাই তেলের পর সবচেয়ে বেশি তা কুঁড়ার তেলে রয়েছে।
মজুমদার গ্রুপের চিত্ত মজুমদার বলেন, ‘বড় সমস্যা কুঁড়ার সরবরাহ। যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, সেই পরিমাণ কুঁড়া সব সময় পাওয়া যায় না। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এ কারণেই। তবে সম্ভাবনা বিশাল। পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে দরকার নগদ সহায়তা। ভারতে আমরা রপ্তানি করি ঠিকই, কিন্তু ভারতই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী।’

Monday, August 19, 2019

ইউরেশিয়ার ৫ দেশ বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাব্য বাজার by ফখরুল ইসলাম

রপ্তানি বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের চোখ এবার ইউরেশিয়ার দিকে। তারই অংশ হিসেবে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক কমিশনের (ইইসি) সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে গত ৩১ মে ইইসির সদর দপ্তরে এ চুক্তি সই হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং ইইসির মন্ত্রী পদমর্যাদার সদস্য তাতিয়ানা ভলোভিয়া।
পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশ রাশিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, আর্মেনিয়া ও কিরগিজস্তানের সমন্বয়ে গঠিত ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন (ইইইউ)। এই ইইইউ ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আদলে গড়া এই ইইইউর সদস্যদেশগুলো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ।
তবে বর্তমানে তারা কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটসের সদস্য। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১-৯৩ সময়ে যে ১১টি দেশ হয়, এগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটস (সিআইএস)। ইইইউভুক্ত পাঁচটি দেশ একই সঙ্গে সিআইএসভুক্ত দেশও।
ইইইউর কার্যক্রম পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষই হচ্ছে ইইসি। ইইইউর আওতায় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে কাস্টমস সীমান্ত নেই। ফলে বাধাহীনভাবে শুল্ক-কর পরিশোধ ছাড়াই এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য যাতায়াত করতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইইইউর সব সদস্যদেশ একই শুল্ক হার এবং অভিন্ন বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করে থাকে।
জানা গেছে, ইইইউর আওতায় মোট ২ কোটি বর্গকিলোমিটার এলাকার এই পাঁচ দেশে ১৮ কোটি ২৭ লাখ মানুষ বসবাস করে। এ অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২৭ হাজার মার্কিন ডলার। বিশ্বের চাষযোগ্য জমির ১৪ শতাংশ এ এলাকার অন্তর্ভুক্ত। গম, তুলা ও ভুট্টা যেমন এ অঞ্চলে ব্যাপক উৎপাদিত হয়; ইউরিয়া সার, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল ও রাসায়নিক পণ্য এ অঞ্চলের আর্থিক ভিত্তির অন্যতম উৎস।
ইইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, ওষুধ, আলু ও সবজি রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ায় তৈরি পোশাক, পাট, হিমায়িত চিংড়ি, আলু ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি হলেও বাজার অনুযায়ী পরিমাণ খুব বেশি নয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশ পণ্যের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা চেয়ে আসছে বহু বছর। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি না থাকায় এবং রাশিয়া ইইইউর আওতায় গঠিত কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় এককভাবে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা দিতে পারছে না। ইইসির সঙ্গে এবারের চুক্তি শুধু রাশিয়া নয়, ইইইউর সব সদস্যদেশেই বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে এবং বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক হিসেবে কাজ করবে। কারণ সহযোগিতা স্মারকের আওতায় শিগগিরই একটি কার্যদল গঠিত হবে, যার মূল কাজ হবে বাংলাদেশ ও ইইইউর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চিহ্নিত ১৯টি খাতের উন্নয়নে কাজ করা।
গত বছরের অক্টোবরে রাশিয়া বলেছিল, ইইইউভুক্ত দেশগুলোতে শুল্কমুক্তভাবে পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের উচিত হবে ইইসিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ সে আবেদন এখনো করেনি বলে জানা গেছে। যদিও এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশকে এখনো ইইইউভুক্ত দেশগুলো শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। তবে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিপণ্যে দেয় না। কমিশন অনুমোদন করলে তৈরি পোশাক, চামড়া, সিরামিক ইত্যাদি পণ্যের বড় বাজার হবে ইইইউভুক্ত দেশগুলো।
জানা গেছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হওয়ার বড় সুযোগ থাকলেও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাংক যোগাযোগই নেই বাংলাদেশের। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে সুষ্ঠু ব্যাংক লেনদেন জরুরি, যা বর্তমানে নেই। ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা রাশিয়াসহ সিআইএসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করতে অনেকটা নিরুৎসাহিত বোধ করেন। ব্যাংক লেনদেন চালু হলে তৃতীয় দেশ অর্থাৎ তুরস্ক, পোল্যান্ডের মতো দেশের ওপর আর নির্ভর করতে হবে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশের ৮৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগেরবারের চেয়ে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আর একই সময়ে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের আমদানি হয়েছে ৭৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগেরবারের চেয়ে দশমিক ৬ শতাংশ কম। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উজবেকিস্তানে রপ্তানি হয় প্রায় ৩ কোটি ডলার, ইউক্রেনে ২ কোটি ১৪ লাখ ডলার, আর্মেনিয়ায় ২৮ লাখ ৯২ হাজার ডলার ও বেলারুশে ২৭ লাখ ৪৮ হাজার ডলার মূল্যের পণ্য। এ ছাড়া মালদোভায় ২৩ লাখ ৫৬ হাজার, আজারবাইজানে ৭ লাখ ১৭ হাজার, তাজিকিস্তানে ৭ লাখ, কাজাখস্তানে ৬ লাখ, কিরগিজস্তানে ৩ লাখ এবং তুর্কমেনিস্তানে ২ লাখ ডলার দামের পণ্য রপ্তানি করা হয়।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিআইএসভুক্ত দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে উচ্চ শুল্ক। শুল্কায়নের জটিলতাও আছে। তার চেয়েও বড় কথা দেশগুলোর সঙ্গে আধুনিক ব্যাংক যোগাযোগ নেই বাংলাদেশের। আবার বাণিজ্য করতে হয় তৃতীয় দেশের মাধ্যমে এবং মান্ধাতার আমলের টেলিগ্রাফিক লেনদেন (টিটি) পদ্ধতিতে।
এ ছাড়া ব্যাংক যোগাযোগের বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি হয়েও আবার পিছিয়ে গেছে উভয় দেশ। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছিল যে বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংক ও রাশিয়ার স্পুতনিক ব্যাংক—উভয় দেশের ব্যাংক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে এবং উভয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মিলে ঠিক করবে ব্যাংক যোগাযোগ কীভাবে হবে। সে ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি নেই।
কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটসের বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মো. হাবীব উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ-রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখন ১৫০ কোটি ডলারের মতো। অথচ কিছু পদক্ষেপ নিলে আগামী তিন বছরের মধ্যেই এ বাণিজ্য ১ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।’

Monday, March 25, 2019

বড় বাজার লাতিন আমেরিকা by ফখরুল ইসলাম

• গত অর্থবছরে মারকোসারের সদস্যভুক্ত চার দেশে রপ্তানি হয় প্রায় ২১ কোটি ডলারের পণ্য।
• আমদানি হয়েছে ২৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য।
• রপ্তানির ৮৫ শতাংশই হয় ব্রাজিলে।

বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাব্য বড় রপ্তানি গন্তব্যস্থল হিসেবে অনুচ্চারিত এক মহাদেশের নাম লাতিন আমেরিকা। সংগত কারণেই এ তালিকায় মহাদেশটির নাম কারও মুখে আসে না। কারণ, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি হয় সামান্যই। উল্লেখ করার মতো যে দেশে রপ্তানি কিছুটা হয়, তার নাম হচ্ছে ব্রাজিল। যদিও ব্রাজিলে রপ্তানির তুলনায় দেশটি থেকে বাংলাদেশের আমদানি আট গুণ বেশি।
অথচ লাতিন আমেরিকার প্রায় সব দেশই হতে পারে বাংলাদেশি পণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বড় বাজার। বিশেষজ্ঞ ও রপ্তানিকারকেরা বলছেন, লাতিন আমেরিকাকে বড় বাজার বা রপ্তানি গন্তব্যস্থল করতে গেলে কয়েকটি পক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। পক্ষগুলো হচ্ছে রপ্তানিকারক; বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশি মিশন; লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সরকার এবং ওই সব দেশের আমদানিকারকেরা।
একটি উদ্যোগ অবশ্য শুরু করেছেন ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. জুলফিকার রহমান। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক চিঠি দিয়ে জানান যে মারকোসারের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পেয়েছেন। মারকোসারের সঙ্গে এফটিএর আলোচনা শুরু করতে তিনি আগ্রহপত্র পাঠানোর অনুরোধ করেন।
মারকোসার হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার এক বাণিজ্য জোট, যে জোটের গুরুত্বপূর্ণ চার সদস্য আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ জোটে বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, গায়ানা, পেরু ও সুরিনাম হচ্ছে সহযোগী সদস্য।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য ওই চিঠি পাওয়ার পর থেকে সজাগ হয়েছে এবং ট্যারিফ কমিশনকে দিয়ে একটি সমীক্ষাও করিয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে ব্যবসায়ী নেতাসহ আন্তমন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠকও করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠকে উপস্থিত প্রায় সবারই একই মত। আর সেটা হচ্ছে, রপ্তানি পণ্যে বহুমুখিতা যেমন দরকার, আবার রপ্তানি পণ্যের নতুন বাজারও খোঁজা দরকার। এই সময়ে সম্ভাব্য বড় বাজার হতে পারে দক্ষিণ আমেরিকা এবং আপাতত পছন্দের দেশ হতে পারে মারকোসারের গুরুত্বপূর্ণ চার সদস্য।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, মারকোসারের চার দেশের জনসংখ্যা ৩০ কোটি, গড় মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারের বেশি এবং মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এফটিএ করা গেলে উভয় পক্ষেরই বাণিজ্য বাড়বে, তবে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে এফটিএর ব্যাপারটিই তো দ্বিপক্ষীয়। আমরা যেমন সুবিধা নিতে চাইব, অপর পক্ষকেও সুবিধা দিতে হবে। সুতরাং দর-কষাকষি করার সময় খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের প্রধান পণ্য যেন ওই পক্ষের নেতিবাচক তালিকায় না ঢুকে পড়ে।’
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘এখনকার এফটিএ আলোচনায় বাণিজ্যের সঙ্গে বিনিয়োগের বিষয়ও আসে। মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ আলোচনার অগ্রগতি হলে আশা করি বিনিয়োগ আলোচনাও বাদ পড়বে না।’
মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ করার ব্যাপারে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, মারকোসারের একটি বিশাল বাণিজ্য অঞ্চল এবং এই অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা অনুযায়ী রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। কম হওয়ারও কারণ আছে। দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্য ঢুকতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা আছে। উচ্চ শুল্কের কারণে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি এখন বন্ধ। পাট রপ্তানিও বন্ধের পথে। তবে এফটিএ করে শুল্ক কমানো গেলে বা শূন্য করা গেলে দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার অনেক বড় হবে।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ মারকোসারের সদস্য চার দেশে ২০ কোটি ৮০ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ব্রাজিলেই রপ্তানি হয় ৮৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। একই সময়ে দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ ২৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বাংলাদেশ আমদানি করে চিনি, ভোজ্যতেল, ভুট্টা, গম ও পশুখাদ্য ইত্যাদি। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওষুধ, তামাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং তৈরি পোশাক। এফটিএ হলে উভয় পক্ষের বাণিজ্য বাড়বে ২০ গুণ।
জানা গেছে, বাংলাদেশে এ দেশগুলোর বিনিয়োগের তথ্য ট্যারিফ কমিশন বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়—কেউই জোগাড় করতে পারেনি। তবে উচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ হয়েও তাদের দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে কোনো শুল্কমুক্ত বা কোটামুক্ত সুবিধা পাওয়া যায় না। দেশগুলোর সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক কোনো বাণিজ্য চুক্তিও নেই বাংলাদেশের। মারকোসারের দেশগুলো তৈরি পোশাক, জুতা, মাছ ইত্যাদি পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘মারকোসারের সদস্যরা বিশেষ করে ব্রাজিল আমাদের পণ্য রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। সব খরচ মিলিয়ে ব্যয় ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ হওয়া খুবই দরকার। কারণ, ব্রাজিল, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে মিলিয়ে বাজারটা আসলেই অনেক বড়।
শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় লাতিন আমেরিকার মধ্যে চিলিতে রপ্তানি বাড়ছে জানিয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে পোশাকশিল্প মালিক টিপু মুনশি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা এ আশা করতেই পারি যে দক্ষিণ আমেরিকাও হবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম বড় রপ্তানি গন্তব্যস্থল।’
মারকোসারের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন রয়েছে, সেসব দেশের রাষ্ট্রদূত ও কমার্শিয়াল কাউন্সিলররা দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে কী করেছেন এবং ভবিষ্যতে কী করবেন—এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন মোহাম্মদ হাতেম।
এ বিষয়ে অবশ্য বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে যোগাযোগ করলে বাণিজ্যসচিব মো. মফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ করতে আমরা আগ্রহী। ঢাকায় ব্রাজিল দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। একটি দলকে মারকোসারের সদস্যদেশগুলোতে পাঠানোর চিন্তা চলছে।’

Thursday, May 3, 2018

যোগ্য বলেই তারেক রহমানকে নেতা নির্বাচিত করেছি: ফখরুল

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারেক রহমান যোগ্য বলেই আমরা তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছি। এ নিয়ে অন্যদের বলার কিছু নেই। গতকাল বুুধবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু স্মৃতি সংসদ আয়োজিত এক স্মরণ সভায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের নেতা আমরা নির্বাচিত করেছি। তাতে আপনাদের (প্রধানমন্ত্রী) বলার কিছু নেই। আমাদের পার্টির কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্টি চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানই দায়িত্ব নিবেন। এটা আমাদের গঠনতন্ত্রে আছে। তারেক রহমান কোন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত? যে মামলায় তিনি খালাস পেয়েছিলেন। আর তাকে খালাস দেয়ার অপরাধে সেই বিচারককে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। আর আপনারা সমস্ত সাজাপ্রাপ্তদের নিয়ে মন্ত্রিত্বে বসিয়ে রেখেছেন। বুধবার বিকালে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন- বিএনপি এত বড় রাজনৈতিক দল। এত বড় জনপ্রিয় দল, সেই দলে কি এমন একজন নেতা নেই, যে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে নেতা করতে হবে? তার এ বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মির্জা আলমগীর বলেন, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বৃটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন প্রধানমন্ত্রী কেন এই ভয়গুলো আমাদের দেখান। এভাবে আপনারা আলোচনা করে তারেক রহমানকে দেশে ফেরাতে পারবেন না। কারণ তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। বৃটিশ সরকার কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিদের ফেরত দেন না যদি তিনি নিজে না আসতে চান। তারেক রহমানের যখন দেশে ফিরে আসতে ইচ্ছা হবে তখন উনি দেশে ফিরে আসবেন। সেদিন আপনারা দেখবেন- তার জনপ্রিয়তা কত এবং মানুষ তাকে কত ভালোবাসে। সেদিন দেখবেন কোটি কোটি মানুষ তাকে বরণ করার জন্য বিমানবন্দরে যাবে।
সামপ্রতিক সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, যুক্তরাজ্য গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মহা বিপদে পড়েছেন, সেখানে তিনি সুবিধা করতে পারেননি। গোটা বৃটেনে বাংলাদেশের মানুষ তাকে ধিক্কার জানিয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রধানমন্ত্রী ধ্বংস করেছেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কি করেছেন। চুক্তি করেছেন। এই চুক্তির ৬ মাস হলেও একটি রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে পারেননি এবং পারবেনও না। কারণ মেরুদণ্ডবিহীন এই সরকার মিয়ানমারকে নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব বা কথা বলেনি।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি সাইদ হাসান মিন্টুর সভাপতিত্বে সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুু, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন, নির্বাহী কমিটির সদস্য নাসিমা আক্তার কল্পনা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

Friday, March 18, 2016

অর্থ চুরির ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত -সাক্ষাৎকারে : অর্থমন্ত্রী by সোহরাব হাসান ও ফখরুল ইসলাম

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অবশ্যই জড়িত। তাঁদের যোগসাজশ ছাড়া এ কাণ্ড হতে পারত না। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথমআলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে উঠে আসে সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের পদত্যাগের পটভূমি, ব্যাংক ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা ও অনিয়মের চিত্র। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাবহাসানফখরুলইসলাম
প্রথম আলো: রিজার্ভ চুরির ঘটনা জানার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। ডেপুটি গভর্নরদেরও সরিয়ে দিলেন। খুব ত্বরিত ব্যবস্থা নিলেন বলে মনে হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী: হ্যাঁ। কিন্তু আমি খুব অবাক হয়েছি। আতিউর রহমান সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তিনি একটুও লজ্জিত হননি।
প্রথম আলো: সংবাদ সম্মেলন করেছেন, না ব্যাখ্যা দিয়েছেন?
অর্থমন্ত্রী: ব্যাখ্যা না, সংবাদ সম্মেলনই করেছেন। বাড়িতে করেছেন এবং দুই দফা। একবার পদত্যাগের আগে, আরেকবার পদত্যাগের পর। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলেছেন। দুজন ডেপুটি গভর্নরের চাকরি গেছে তাঁর কারণে। বোঝাতে চাইলেন যে তিনি একা দায়ী নন। দুজনের বাইরে আরও কয়েকজনের চাকরি খাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তা আর হয়নি, হবেও না।
প্রথম আলো: নতুন গভর্নর তো নিয়োগ দিলেন। টাকা উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
অর্থমন্ত্রী: টাকা আসলে উদ্ধার হবে কি না, আমি নিশ্চিত না। কিছু টাকা পাওয়া গেছে বরং শ্রীলঙ্কার কল্যাণে।
প্রথম আলো: চুরির ঘটনা জানার পর আতিউর রহমান কী করেছিলেন বলে আপনি শুনেছেন?
অর্থমন্ত্রী: কী বলব। তিনি সংকটটির গভীরতাই বুঝতে পারেননি। আমার মনে হয়, তিনি চিন্তাই করতে পারেননি যে এটা একটা বড় ঘটনা। খবর পেয়েও তিনি দেশের বাইরে বাইরে ঘুরেছেন।
প্রথম আলো: দিল্লির বৈঠকে তো আপনারও যাওয়ার কথা ছিল।
অর্থমন্ত্রী: এটা মূলত অরুণ জেটলির (ভারতের অর্থমন্ত্রী) দাওয়াত ছিল। আমাকেও দাওয়াত দিয়েছিলেন তিনি। যাব চিন্তা করেও পরে যাইনি।
প্রথম আলো: আতিউর রহমানের সাফল্যও তো কিছু কম নয়...
অর্থমন্ত্রী: কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তাঁর অবদান প্রায় শূন্য (অলমোস্ট জিরো)। তিনি খালি পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন আর লোকজনকে অনুরোধ করেছেন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য তাঁকে সুযোগ দিতে ও দাওয়াত দিতে। এখন বেরোচ্ছে এগুলো।
প্রথম আলো: গ্রিন ব্যাংকিং, কৃষকদের জন্য ১০ টাকার হিসাব খোলার সুযোগ ইত্যাদি তো সাফল্যই।
অর্থমন্ত্রী: এগুলো স্লোগান। তিনি খালি পিআরের (জনসংযোগ) কাজ করেছেন। এসব নিয়ে বাজারে অনেক কথাও আছে।
প্রথম আলো: আতিউর রহমান বলার চেষ্টা করেছেন যে বেসিক ব্যাংক, হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছিলেন।
অর্থমন্ত্রী: না, না। এগুলো ইতিমধ্যে বহুল আলোচিত বিষয়। বেসিক ব্যাংক পুরোনো বিষয়। বেসিক ব্যাংকের ওপর প্রথম নিরীক্ষা প্রতিবেদনটা ভালো ছিল। তারপর তো বাংলাদেশ ব্যাংকই সব ধামাচাপা দিয়ে দিল।
প্রথম আলো: আপনি কিন্তু বলেছিলেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, পরে আর নেননি।
অর্থমন্ত্রী: হ্যাঁ, বলেছিলাম। ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখনো হয়নি। যাই হোক। রাজনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার সব আলাপ করা যায় না। তবে ব্যবস্থা ঠিকই নেওয়া হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টা ঠিকভাবে দেখভাল করতে পারেনি। যখন আদালতে যাবে, আদালত ঠিকই সব জানতে চাইবে এবং তখন ওই লোকটার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হবে।
প্রথম আলো: আর হল-মার্ক?
অর্থমন্ত্রী: হল-মার্ক বিষয়ে মামলা আছে। আমার মনে হয়, আমাদের উকিলরা বিষয়টিতে খুব একটা মনোযোগী নন।
প্রথম আলো: ব্যাংক-ব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য কী করছেন?
অর্থমন্ত্রী: কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাপক সংস্কার দরকার। এর ব্যবস্থাপনা অদক্ষ। গভর্নরের কথা যদি বলি, তিনি জনসংযোগেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিচতলায় যে লেনদেন হয়, তার মুনাফার কোনো হিসাব থাকে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের লোকেরা ভাগ করে নিয়ে যান। আতিউর কোনো দিন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেননি।
প্রথম আলো: ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে যেখানে হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, সেখানে ৪-৫ হাজার টাকা তো তেমন কিছুই না।
অর্থমন্ত্রী: দৈনিক যাচ্ছে! বাংলাদেশ ব্যাংক হবে নির্জন জায়গা। আগে তাই দেখেছি। অথচ এখন তা বিরাট বাজার। নিচতলায় বিরাট কামরায় সরাসরি বাণিজ্যিক কার্যক্রম হচ্ছে; যা আগে করত সোনালী ব্যাংক।
প্রথম আলো: এ ব্যাপারে আতিউর রহমানকে কিছু বলেছেন কখনো?
অর্থমন্ত্রী: বহুবার বলেছি যে, তুমি ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দাও। কিছু বললেই তিনি বলতেন, আমি এটা করেছি, ওটা করেছি। দুই দিন আগেও তিনি বলেছেন, প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের কৃতিত্ব তাঁর। রিজার্ভের কৃতিত্ব মূলত প্রবাসী শ্রমিকদের।
প্রথম আলো: বেশি রিজার্ভকেও তো অনেকে তেমন গুরুত্ব সহকারে দেখেন না।
অর্থমন্ত্রী: না, টাকা থাকলে ভালো হয়। তবে এ থেকে বিনিয়োগ করা গেলে আরও ভালো হতো। সেটা আমরা করতে পারিনি এখনো।
প্রথম আলো: রিজার্ভ ভালো বলেই কি আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার সাহস পেলাম?
অর্থমন্ত্রী: না। রিজার্ভের সঙ্গে পদ্মা সেতুর কোনো সম্পর্ক নেই। রিজার্ভ ভালো থাকলে প্রবাসীদের মনে আস্থা থাকে যে দেশে টাকা আছে। নইলে তাঁরা অন্য দেশেও টাকা হস্তান্তরের পথ বেছে নিতে পারেন।
প্রথম আলো: রিজার্ভ চুরির ঘটনা কি দেশে টাকা পাঠাতে প্রবাসীদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে?
অর্থমন্ত্রী: সে রকম কিছু হবে না বলে আমার বিশ্বাস। তাঁরা ঠিকই বুঝবেন যে একটু অব্যবস্থাপনা হয়েছে, ধরাও হয়েছে।
প্রথম আলো: রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটেছে ছুটির দিন শুক্রবারে, তাই পদক্ষেপ নিতে দেরি হয়েছে—আতিউর রহমানের এমন ব্যাখ্যাকে কীভাবে দেখবেন?
অর্থমন্ত্রী: সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা। শুক্রবারেও লোক থাকবে না কেন? ফোন ধরা ও তথ্য দেওয়ার জন্য ছুটির দিনেও লোক থাকা উচিত।
প্রথম আলো: আপনার কি মনে হয়, এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ রয়েছে?
অর্থমন্ত্রী: অবশ্যই। শতভাগ জড়িত। স্থানীয়দের ছাড়া এটা হতেই পারে না। ছয়জন লোকের হাতের ছাপ ও বায়োমেট্রিকস ফেডারেল রিজার্ভে আছে। নিয়ম হলো, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়—এভাবে ষষ্ঠ ব্যক্তি পর্যন্ত নির্দিষ্ট প্লেটে হাত রাখার পর লেনদেনের আদেশ কার্যকর হবে।
প্রথম আলো: ঘটনার প্রায় এক মাসেও সরকারের শীর্ষ মহলে না জানানোর কারণ হিসেবে আতিউর রহমান নিজে বিভ্রান্ত (পাজল্ড) হয়ে পড়েছিলেন বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী: এটাও ভুল। আমার নিয়োগ করা গভর্নর, অথচ তিনি সব সময়ই বলে এসেছেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি পদত্যাগপত্রও তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছেন। এটা তিনি পারেন না। তাঁর পদত্যাগপত্রটিও হয়নি। আমাদের দেশে তো ওইভাবে নিয়মকানুন মানা হয় না, অন্য দেশ হলে তো আমার অনুমতি ছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখাই করতে পারতেন না।
প্রথম আলো: এটা কি ‘চেইন অব কমান্ড’ সমস্যা?
*আতিউর পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন
*কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তাঁর অবদান প্রায় শূন্য।
*রিজার্ভের কৃতিত্ব তাঁর নয়, প্রবাসী শ্রমিকদের। ​তিনি কেবল জনসংযোগের কাজ করেছেন
*অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত নয়

অর্থমন্ত্রী: বটেই। তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেননি, আমি নিয়োগ দিয়েছি। আমার কাছেই পদত্যাগপত্র দিতে হবে।
প্রথম আলো: সাত বছরে আতিউর কি আপনার পরামর্শ নিয়েছেন?
অর্থমন্ত্রী: নেননি, তবে আমিই পরামর্শ দিয়েছি। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একটা ঝামেলা থাকে। এটা ভারতসহ সব দেশেই হয়। আর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া সবাই মুদ্রানীতি প্রণয়নে হস্তক্ষেপ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা আছে। সে অনুযায়ী কাজও করেছে সব সময়। মুদ্রানীতি নিয়ে আতিউর যা করেছেন, আমি বরাবরই গ্রহণ করেছি।
প্রথম আলো: এ ক্ষেত্রে কি তাঁকে ক্রেডিট দেবেন?
অর্থমন্ত্রী: ওয়েল। দেব। তবে আমিও একটু বলে নিই। নিজের কথা নিজের বলা উচিত না। বাজেট ব্যবস্থাপনায় গত সাত বছরে আমি যা করেছি, এ ব্যাপারে এই মুহূর্তে আমার চেয়ে বিশেষজ্ঞ দ্বিতীয় ব্যক্তি পৃথিবীতে নেই।
প্রথম আলো: আপনার কথার সূত্র ধরে যদি বলি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান প্রধান কাজ করা থেকে আতিউর অন্য কাজে বেশি মনোযোগী ছিলেন। এতে তো আপনার দায়ও চলে আসে। আপনার নিয়োগ করা গভর্নর...
অর্থমন্ত্রী: যত দূর জানি, আতিউর আর্থিকভাবে সৎ ব্যক্তি। তবে প্রায়ই অভিযোগ করতেন, তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। খামোখা! এত বছরে বাংলাদেশ ব্যাংককে মাত্র তিন-চারটা নির্দেশনা দিয়েছি। একবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিলে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, শেয়ারবাজারে ওভার এক্সপোজার আরও কয়েক বছরের জন্য থাকবে। কিন্তু আতিউর ব্যাংক কোম্পানি আইনে সময়সীমা বেঁধে দিলেন এক বছর। আশ্চর্য কাণ্ড!
প্রথম আলো: ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য প্রাক্-বাজেট আলোচনা তো শুরু করেছেন...
অর্থমন্ত্রী: হ্যাঁ। গতবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছি। কারণ, এনবিআরের চেয়ারম্যান কোনো কাজ-কাম করেন না।
প্রথম আলো: এখনকার চেয়ারম্যান?
অর্থমন্ত্রী: হ্যাঁ। কিছুই করেন না তিনি। খালি বক্তৃতা দেন। তাঁরও পুরো আচরণ হচ্ছে জনসংযোগ করা। করুক, আপত্তি নেই। কিন্তু নিজের কাজটা তো করতে হবে। এক বছর হয়ে গেছে, অথচ এনবিআরের চেয়ারম্যান জানেনই না যে এনবিআর কীভাবে চলে।
প্রথম আলো: বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া টাকাও যে খরচ হয় না...
অর্থমন্ত্রী: পয়সা আছে, কিন্তু খরচ করতে পারছে না—এটাও একটা সমস্যা। অন্য সব মন্ত্রণালয়ের দোষ রয়েছে এতে।
প্রথম আলো: কারণ কী, অদক্ষতা?
অর্থমন্ত্রী: আমার মনে হয়, গত সাত বছরের অর্জন সবাইকে অলস করে তুলেছে। মনোভাবটা এ রকম—আমরা তো ভালোই করছি। অর্থাৎ, মরিয়া ভাবটা আর নেই।
প্রথম আলো: অনেকে বলেন, দেশের বড় বড় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির পেছনে দুর্নীতি একটা উদ্দেশ্য। আপনি কী মনে করেন?
অর্থমন্ত্রী: প্রথমত, এগুলোর জন্য অভিজ্ঞতা না থাকায় আমরা যথাযথ অনুমানটি (এস্টিমেট) করতে পারি না। সাধারণভাবে অনুমোদন দিয়ে দিই। দ্বিতীয়ত, আমাদের চরিত্রটা দুষ্ট। বড় প্রকল্প মানেই আমরা বড় দাও মারতে চাই।
প্রথম আলো: প্রতিরোধ করা যায় কীভাবে?
অর্থমন্ত্রী: ডিজিটাইজেশন। মুশকিল হচ্ছে, অনেকেরই ডিজিটাইজেশনের প্রতি বিরোধিতা আছে।
প্রথম আলো: রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়টি নিয়ে সরকারকে যতটা সোচ্চার হতে দেখা গেছে, ব্যাংক খাত থেকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অতটা সোচ্চার হতে দেখা যায়নি, কেন?
অর্থমন্ত্রী: আসলে অন্য লুটপাট ধরার বিষয়ে কোনো নির্দেশক (ইনডিকেটর) নেই, যার মাধ্যমে তথ্য পেতে পারি।
প্রথম আলো: রিজার্ভ চুরির ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তাঁদের মধ্যে নির্দোষ কেউ আছেন কি না...
অর্থমন্ত্রী: একমাত্র আসলাম আলম নির্দোষ। ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হলো। সামান্য শাস্তি, কিন্তু বদনাম তো হলো। আমি আগের দিনই আসলামকে ডেকেছিলাম। বলেছি, তোমার ওপর খড়্গ আছে। কিন্তু তোমার কোনো দোষ নেই।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজকর্মে সংস্কার আনার কথা বলছিলেন। কে আনবে সংস্কার?
অর্থমন্ত্রী: নতুন গভর্নরকে ইতিমধ্যে বলেছি, তিনি যাতে একটু সময় নিয়ে হলেও একটা পর্যালোচনা করেন। এরপর উদ্যোগ নেব।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ ব্যাংকের নিচতলার কাজগুলো কি আগের মতো সোনালী ব্যাংককে দিয়ে দেওয়া উচিত?
অর্থমন্ত্রী: আমি জানি না। তবে ফরাসউদ্দিন তদন্ত কমিটি এ ব্যাপারেও সুপারিশ করবে বলে আমি আশা করি।
প্রথম আলো: এনবিআরের চেয়ারম্যান কাজকর্ম করছেন না, এ দায় কি আপনারও নয়? আপনারই তো সংস্থা এনবিআর।
অর্থমন্ত্রী: তিনি এত বক্তৃতা দেন যে তাঁকে আসলে তথ্যসচিব বানিয়ে দেওয়া উচিত। সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর একান্ত সচিব ছিলেন তো, তাঁরই প্রভাব পড়েছে এনবিআর চেয়ারম্যানের ওপর। আর আমার দায়ের কথা কী বলব। তাঁর সঙ্গে আছেন শক্তিশালী আমলা। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, তাঁকে নিয়ে কাজ করা মুশকিল। তিনি রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।
প্রথম আলো: নতুন গভর্নর সম্পর্কে কিছু বলুন।
অর্থমন্ত্রী: ভালো। তিনি আমার অর্থসচিব ছিলেন। আমি তাঁকে জানি। শিগগির কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালানোও তিনি শিখে ফেলবেন।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
অর্থমন্ত্রী: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

Thursday, December 3, 2015

ছয় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৫ হাজার কোটি টাকা by ফখরুল ইসলাম

রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এখন ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। তিন মাস আগের তুলনায় এ ঘাটতি কিছুটা কমেছে। গত জুনে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ৪৬৫ কোটি টাকা ঘাটতি কমেছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা, বেসিক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের এ উন্নতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের চার বিষয়ে কিছুটা উন্নতির খবরও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলো হচ্ছে সংরক্ষিত মূলধন, মূলধন পর্যাপ্ততার হার, ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন এবং মোট ঋণসুবিধার তুলনায় উদ্যোক্তা মূলধনের অনুপাত (লিভারেজ রেশিও)।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন প্রান্তিকের তুলনায় সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চারটি বিষয়ে উন্নতি করেছে দেশের ব্যাংক খাত। একটি বিষয়ে আবার খারাপও করেছে। যেমন একই সময়ে ব্যাংক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে গতকাল মঙ্গলবার এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকে যা ছিল ৬৮ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। এই সময়ে ব্যাংক খাতে সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। সামগ্রিক মূলধন ঘাটতি প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৪৩ কোটি টাকা কম, আগে যা আরও বেশি ছিল।
একই সময়ে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা গত জুনে ছিল ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। তিন মাসে এ হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। অবশ্য গত মার্চে সিআরএআরের হার ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ ছিল। আর লিভারেজ রেশিও সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা জুনে ছিল ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।
যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর লিভারেজ রেশিও থাকার নিয়ম রয়েছে কমপক্ষে ৩ শতাংশ। সে হিসাবে দুটি হারই বেশি আছে। ব্যাংকাররা মনে করছেন, এই হারের উন্নতি দেশের ব্যাংক খাতের জন্য স্বস্তিদায়ক।
যোগাযোগ করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতের নেতিবাচক বিষয়গুলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। সেপ্টেম্বরভিত্তিক প্রতিবেদনটি সেটাই নির্দেশ করছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি আরও কমবে।’
সিআরএআর সংরক্ষণে দেশের ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৭টি সক্ষমতা দেখালেও নয়টি ব্যাংক পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সিআরএআর সংরক্ষণে নয়টি ব্যাংকের কোনো উন্নতি হয়নি। অর্থাৎ আগের তিন মাসেও এগুলোর অবস্থা একই রকম ছিল। ব্যাংকগুলো হচ্ছে সোনালী, জনতা, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (বিসিবি), আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক।
আর লিভারেজ রেশিও সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে ছয় ব্যাংক। এগুলো হচ্ছে সোনালী, রূপালী, বেসিক, বিকেবি, রাকাব ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে, ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সে হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে তা সংরক্ষণ করতে হবে ১০ শতাংশের অতিরিক্ত আরও দশমিক ৬২ শতাংশ হারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকে তা ছিল ৬ লাখ ৬৪ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদউদ্দিন বলেন, ‘প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে আমাদের বাড়তি টাকার দরকার। বেসরকারি ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সহজে টাকা পেলেও আমরা পাই না।’ অর্থ মন্ত্রণালয়ে টাকার জন্য আবেদন করা আছে বলে জানান তিনি।

Friday, October 30, 2015

ইনক্রিমেন্ট দিয়ে ক্ষতি পোষাতে চায় সরকার by ফখরুল ইসলাম

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর প্রশাসনের সঙ্গে ২৬ ক্যাডারের দূরত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ক্ষোভ থামছে না। প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি থেমে থেমে কর্মসূচি পালন করছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা শনিবার নতুন কর্মসূচি দেওয়ার আভাস দিয়ে রেখেছেন।
এই পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এখন সতর্কতার সঙ্গে গোটা বিষয়টি দেখভাল করছেন। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর চাওয়া হচ্ছে, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট এমনভাবে করতে হবে, যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মনে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিলের ক্ষোভ আর না থাকে। এ ছাড়া ১০ বছর একই পদে থাকার পর সরকারি কর্মচারীরা যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর ধাপে যেতে পারেন, তা-ও চান অর্থমন্ত্রী।
তবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা বাতিলের ক্ষতি পোষাতে চাইলেও বাস্তবে তা সম্ভব নয় বলে মনে করছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন। এরই মধ্যে প্রশাসন ক্যাডার বেশি সুবিধা পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে অন্যান্য ক্যাডারের পক্ষ থেকে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বিদ্যমান সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিলের জন্য ফরাসউদ্দিন কমিশন প্রথম সুপারিশ করে। যদিও কমিশনের প্রতিবেদনে এই বাতিলের সঙ্গে বেতনকাঠামোর ধাপ ২০ থেকে ১৬-তে নামিয়ে আনার সুপারিশ ছিল। একটি বাস্তবায়ন করে আরেকটি না করায় অসংগতি তৈরি হয়েছে বলে কমিশন মনে করে।
এরই মধ্যে আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কেবল প্রশাসন ক্যাডারের ৩০৬ জন কর্মকর্তাকে সিলেকশন গ্রেড দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এ নিয়েও দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্যবিদায়ী সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞার নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি এবং পরে মন্ত্রিসভা কমিটিও সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিলের পক্ষে মত দেয়। তবে সরকারি চাকরিজীবীরা তা মানতে চাইছেন না। আর এই সুবিধা বাদ পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, বেতন বাড়লেও তাঁদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি তৃতীয় গ্রেডে আটকে থাকছে।
সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল হলে বেতন-ভাতায় তুলনামূলক ঠকবেন—এ কথা জানিয়ে কর্মচারীরা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। অর্থমন্ত্রীও দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেন তাঁদের। যুক্তরাষ্ট্র ও পেরু থেকে ২৫ দিন পর ১৭ অক্টোবর দেশে ফেরেন অর্থমন্ত্রী। এর আগেই বিষয়টির ওপর নতুন কিছু পর্যবেক্ষণ দেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরেই কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২২ অক্টোবর অর্থ বিভাগ বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার (ভেটিং) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়। ২৬ অক্টোবর কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিষয়টি অর্থমন্ত্রীকে জানানো হলে তিনি ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে ফেরত আনার নির্দেশ দেন।
এদিকে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের সঙ্গে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টকে মিলিয়ে দেখার বিপক্ষে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী ঐক্য পরিষদ। বেতনবৈষম্য দূরীকরণ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীকে এক লিখিত আবেদনে সংগঠনটি জানায়, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের অজুহাতে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব অযৌক্তিক। উল্লেখ, প্রতিবছর ৫ শতাংশ করে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে নতুন বেতনকাঠামোতে।
অর্থমন্ত্রীকে কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল হলে প্রতিটি ধাপে সরকারি কর্মচারীরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অঙ্ক কষে তার একটি হিসাব দিয়েছেন। হিসাবের মধ্যে ২০তম ধাপকে উদাহরণ হিসেবে বেছে নিলে দেখা যায়, প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, পদোন্নতি ছাড়াই ২০৩০ সালে ২০তম ধাপের মূল বেতন হবে ১৭ হাজার ১৫১ টাকা। আর টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বহাল থাকলে ২০৩০ সালে ২০তম ধাপের মূল বেতন হবে ১৮ হাজার ৭১০ টাকা।
কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের মহাসচিব মো. রুহুল আমিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাকরিতে পদোন্নতি সাংবিধানিক অধিকার। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধিও তাই। এর সঙ্গে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা অঙ্ক কষে এবং যুক্তি দিয়ে আমাদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরলেও কেউই তা বুঝতে চাইছেন না।’
ইনক্রিমেন্ট দিয়ে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিলের ক্ষতি পোষানোর উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রুহুল আমিন বলেন, ‘এটাও যে ভুল উদ্যোগ, অর্থ মন্ত্রণালয়কে তা-ও আমরা জানিয়েছি।’
সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত যখন প্রায় চূড়ান্ত, কর্মচারীরা যখন তা বহালের দাবিতে আন্দোলন করছেন—গত ৩ আগস্ট তখন ঘটে নতুন ঘটনা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই দিন শুধু প্রশাসন ক্যাডারের ৩০৬ জন কর্মকর্তাকে সিলেকশন গ্রেড দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। গত ২ জুলাই থেকে তা কার্যকর করা হয়। একই ব্যাচের অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অবশ্য একই সুবিধা দেওয়া হয়নি।
এই সময়ে এসে কেন এমন বৈষম্যমূলক কাজ করা হলো—জানতে চাইলে অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবার জন্য একই সুবিধাই তো হওয়ার কথা।’ বিষয়টি তিনি খোঁজ নেবেন বলে জানান।
শুধু একটি ব্যাচের ও একটি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সিলেকশন গ্রেড দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরাসরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে, তাই আগের বেতনকাঠামোর ধারাবাহিকতায় নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার আগে তাঁদের সিলেকশন গ্রেড আমরা দিয়েছি। দেওয়ার আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতও নিয়েছি।’ অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সিলেকশন গ্রেড দেওয়ার ক্ষমতা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেই বলেও জানান তিনি।
নভেম্বর মাসে নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থসচিব প্রথম আলোকে বলেন, কাজ শেষ হয়নি। কবে প্রজ্ঞাপন হবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে তিনি বলেন, যখনই প্রজ্ঞাপন জারি হোক, তা কার্যকর হবে গত ১ জুলাই থেকেই।

Friday, October 9, 2015

গুনে গুনে ঘুষ খান তিনি by ফখরুল ইসলাম

টাকা গুনে নিচ্ছেন মো. শহিদুল হকl
ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি, প্রথম আলো
চেয়ারটা কাঠের। চেয়ারের পেছনে গোলাপি তোয়ালে। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ, মুঠোফোন ও ফাইলের স্তূপ। বৈদ্যুতিক পাখা চলছে। নিচে সবুজ কার্পেট বিছানো সুসজ্জিত কক্ষ। কক্ষটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত সংস্থা প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিসিআইই), ঢাকার নিয়ন্ত্রক মো. শহিদুল হকের।
সরকারি এই কক্ষে বসেই ঘুষের কারবার চালাচ্ছেন শহিদুল হক। পাঁচটি ভিডিওচিত্রে ঘুষ গ্রহণের এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, শহিদুল হক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দর-কষাকষি করছেন, গুনে গুনে টাকা বুঝে নিচ্ছেন। হাসতে হাসতে সেই টাকা আবার নিজের প্যান্টের পকেটে পুরছেন। শহিদুল হকের এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে করা গোপন ভিডিওচিত্রসহ সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কিছু ব্যবসায়ী। অভিযোগ আমলে নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বিদেশ থেকে কোনো পণ্য আমদানি করতে গেলে সিসিআইই থেকে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) নিতে হয়। বিদেশে কোনো কিছু রপ্তানি করতে গেলেও এই দপ্তর থেকে নিতে হয় রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি)। এই দুই সনদের ক্ষেত্রেই ঘুষের ঘটনা বেশি ঘটছে বলে জানা গেছে। কাগজপত্র ঠিক থাকুক আর না-ই থাকুক, ঘুষ ছাড়া তাঁর কাছ থেকে কেউ কোনো সনদই নিতে পারেন না বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানান, পুরো ঘুষ-বাণিজ্যেরই নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিসিআইইর ঢাকা কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রক শহিদুল হক। যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত চলছে। এর আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।
আমদানি-রপ্তানির পরিমাণের ভিত্তিতে আইআরসি ও ইআরসির মাশুল (ফি) নির্ধারণ করে দেওয়া আছে, সনদের জন্য নগদ টাকা লেনদেনের সুযোগ নেই। আর ভিডিওগুলোতে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে শহিদুল হক নগদ টাকা নিচ্ছেন। বাণিজ্যসচিবকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধ উঠে এলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেওয়া হবে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, গত ঈদুল আজহার আগে বাণিজ্যসচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয় সভায় উপস্থিত সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত সবাই শহিদুল হকের ঘুষ গ্রহণের ভিডিওচিত্র দেখেছেন। কর্মকর্তারা খোলামেলা ঘুষ গ্রহণের ঘটনায় যতটুকু বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হয়েছেন এই ভিডিও করা কীভাবে সম্ভব হলো তা নিয়ে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেন সচিব।
জানতে চাইলে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সদর আলী বিশ্বাস গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি তদন্তের কাজ শুরু করেছেন এবং আশা করছেন দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিবেদন শেষ করতে পারবেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১১ অক্টোবর সিসিআইই কার্যালয় পরিদর্শন করবেন সদর আলী।
রাজধানীর মতিঝিলের জনতা ব্যাংক ভবনের পেছনে সিসিআইইর প্রধান কার্যালয়। সারা দেশে ১৫টি শাখা রয়েছে সংস্থাটির। ঢাকা ও চট্টগ্রামে রয়েছেন একজন করে নিয়ন্ত্রক এবং রাজশাহী ও খুলনায় রয়েছেন একজন করে যুগ্ম নিয়ন্ত্রক। এর বাইরে বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, সিলেট, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁয় রয়েছেন একজন করে সহকারী নিয়ন্ত্রক। তাঁরাই যে যাঁর কার্যালয়ের প্রধান ব্যক্তি।
এর মধ্যে প্রধান কার্যালয় যে ভবনে, ঢাকা কার্যালয়ও একই ভবনে। এ বিষয়টিও ঘুষ-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন।
এদিকে সংস্থাটির প্রধান ব্যক্তি হিসেবে যেসব ফাইলে সই করার কথা প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক মজিবুর রহমানের, সেগুলোতেও সই করছেন ঢাকা কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রক শহিদুল হক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ঢাকা কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রক এ কাজ করলেও প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক কিছু বলছেন না।
এর রহস্য কী, জানতে চাইলে প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক মজিবুর রহমান বলেন, তাঁর সই শহিদুল হক করছেন ঠিক, তবে ব্যাপারটি নিয়ে তিনি বাণিজ্যসচিবের সঙ্গে মৌখিক আলাপ করে সম্মতি নিয়েছেন।
শহিদুল হক ঘুষ গ্রহণ করে থাকলে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তিনি কীভাবে দায় এড়াবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মজিবুর রহমান বলেন, ‘এটা ঠিক, আমি দায় এড়াতে পারি না। তবে আমি নিজে ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই।’
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে সিসিআইই থেকে একই দিনে এমনকি দুই ঘণ্টার মধ্যে আইআরসি ও ইআরসি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কাগজগুলো হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স, চেম্বার বা স্বীকৃত বাণিজ্য সংগঠনের বৈধ সদস্যতা সনদ, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), ব্যাংক প্রত্যয়নপত্র এবং লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) থেকে অনুমোদিত সংঘস্মারক ও সংঘবিধি এবং সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন।
গত মঙ্গলবার সিআইআইই কার্যালয়ে গিয়ে জানতে চাইলে শহিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, নিজের দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ও বাইরের দালালেরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে পারেন, আগেও দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর কিছু হয়নি এবং হবেও না বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ‘আপনি নগদ টাকা গুনে গুনে নিচ্ছেন এবং এক টাকাও কম নেবেন না বলে জানাচ্ছেন, এ ব্যাপারে মন্তব্য করুন।’ এ কথা শুনেই তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। বলেন, ‘দপ্তরটা অনেক অগোছালো ছিল। অনেক চেষ্টা করে শৃঙ্খলার মধ্যে এনেছি। আর আমার এখানে তো কেউ ঢুকতেই পারে না। এই যে দেখুন, দুপুর ১২টা বাজে। একটা লোককে আসতে দেখেছেন?’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আছেন বলেও জানান তিনি।
শহিদুল হক ১৯৮৫ সালে বিসিএস বাণিজ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকরি শুরু করেন। সিসিআইইর আগে তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে (ইপিবি) গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কারণে চাকরিজীবনে একাধিকবার তাৎক্ষণিক বদলি (স্ট্যান্ড রিলিজড) হন শহিদুল হক।

Saturday, October 3, 2015

দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা এখন পৌনে দুই লাখ by ফখরুল ইসলাম

দেশের ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮১ জন মানুষ এখন ঋণখেলাপি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এ তথ্য দিয়েছেন।
সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোট খেলাপির মধ্যে ৫০ হাজার টাকার খেলাপি যেমন রয়েছেন, রয়েছেন ১০ হাজার থেকে তারও বেশি টাকা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণখেলাপিও। তবে কার কাছে, কোন ব্যাংকের, কত টাকা খেলাপি রয়েছে সংসদে এই দফায় অর্থমন্ত্রী সেই তথ্য আর দেননি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত জুন পর্যন্ত হিসাবমতে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৩৭ হাজার কোটি টাকা রাইট-অফ বা অবলোপন করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশের পৌনে দুই কোটি ঋণখেলাপির হাতে আটকা আছে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই আর আদায় হবে না।
বছরের পর বছর আদায় করতে না পেরে ব্যাংকগুলো একপর্যায়ে ব্যাংকের স্থিতিপত্র বা ব্যালান্সশিট থেকে কিছু খেলাপি ঋণের (মন্দ বা কুঋণ) হিসাব বাদ দিয়ে দেয়। একেই বলা হয় ঋণ অবলোপন। খেলাপি ঋণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০০২ সালে এই ঋণ অবলোপন পদ্ধতি চালু হয়েছিল।
ঋণখেলাপিদের নিয়ে গবেষণা করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পৌনে দুই লাখ ঋণখেলাপির মোট তথ্য দিয়ে অর্থমন্ত্রী বিষয়টিকে জলো করে ফেলেছেন। এর মধ্যে রাঘববোয়াল খেলাপি আড়াই হাজারের বেশি হবে না। আগেরবার বড় খেলাপি ছিল দুই হাজার ১১৭ জন।’
অর্থনীতির এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘এভাবে গড়ে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেশি দেখানোর পরিবর্তে বরং এক কোটি টাকার বেশি ঋণের খেলাপিদের তালিকা করা উচিত। তাহলেই মানুষের পক্ষে বোঝা সহজ হবে যে কার কাছে কত টাকা আটকে আছে।’
অর্থমন্ত্রী অবশ্য সংসদকে জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের বার্ষিক পারফরম্যান্স চুক্তি (এপিসি) রয়েছে এবং প্রতি মাসেই তা তদারকি হয়। অর্থঋণ আদালতসহ অন্যান্য বিচারাধীন মামলা তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে বিশেষ সেল রয়েছে। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তার তদারকি হয় এই সেল থেকে। এর বাইরেও রয়েছে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে খেলাপি অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা—অর্থমন্ত্রী এসব কথাও জানিয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ে নতুন করে বিকল্প পদ্ধতি চালুর চিন্তাভাবনা চলছে। ইতিমধ্যে একটি ধারণাপত্রও তৈরি করা হয়েছে। মতামত চেয়ে ধারণাপত্রটি শিগগির বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হবে।’ খেলাপি ঋণ আদায় করে দিলে আদায় করা অর্থের একটি অংশ কমিশন পাবে, এমন তৃতীয় কোনো পক্ষকে সরকারের অনুমতি নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানান সচিব।
এর আগে গত জুনে অর্থমন্ত্রী সংসদকে মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের একটি হিসাব দিয়েছিলেন। সে সময় পর্যন্ত তা ছিল ৫৪ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংকের খেলাপিই ২২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। আর ৩৯টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ২২ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলো এক বছরে ৩৭ হাজার ২৫২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে।
অবলোপন পদ্ধতি চালু তো আছেই, বর্তমান সরকার ঋণ গ্রহণকারীদের দিয়েছে আরও নতুন সুযোগ। যেমন ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণকারীদের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে ঋণ পুনর্গঠনের এই সুযোগ খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে পারবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই সুযোগের সাফল্যের কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না বলে জানান অধ্যাপক মইনুল ইসলাম।

Wednesday, August 12, 2015

নতুন নতুন সংকটে গ্রামীণ ব্যাংক by ফখরুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর শাহ

গ্রামীণ ব্যাংক
গ্রামীণ ব্যাংকে সংকট বাড়ছেই। দিন যাচ্ছে, আর পুরোনো সংকটের সঙ্গে ব্যাংকটিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন সংকট, যা তৈরি করছে সরকার নিজেই।
নোবেল বিজয়ী এ প্রতিষ্ঠানে ১০ মাস ধরে পর্ষদ সভা হয় না। চেয়ারম্যান নিয়েও আছে বিভ্রান্তি। চার বছর ধরে এ ব্যাংকে নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেই। এমডি নিয়োগ দেওয়ার জন্য পর্ষদও নেই।
পর্ষদের নির্বাচিত সদস্যদের মেয়াদ ছয় মাস আগে শেষ হলেও নির্বাচন করা যাচ্ছে না। ব্যাংকটিকে নিজের কবজায় নিতে সরকার আইনকানুন বদলালেও বাস্তবায়ন করতে পারছে না কিছুই। একেকবার একেক পদক্ষেপ নিয়ে তা থেকে আবার সরে আসছে। ১০ মাস ধরে সরকার একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজই খুঁজে পাচ্ছে না, যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন করে দেওয়ার জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান হতে রাজি আছেন।
এত সব সংকট কীভাবে কাটবে এবং নির্বাচনই বা হবে কবে—জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন করে দেবে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজের নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন।’ মাসের পর মাস চেষ্টা করা হলেও কোনো জেলা জজ তো রাজি হচ্ছেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তাই নাকি? জানি না তো!’
এত সব সংকটের মধ্যেও গত এপ্রিলে পুরোনো সদস্যদের নিয়ে পর্ষদ সভা ডেকেছিলেন ব্যাংকটির সরকারের নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যান (যিনি পদত্যাগ করলেও সরকার তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেনি) খন্দকার মোজাম্মেল হক। পর্ষদের নয়জন নারী সদস্যসহ সব সদস্যকে সভায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানান তিনি। এ খবর অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছালে সভা অনুষ্ঠানের আগের সপ্তাহে চিঠি দিয়ে বাতিল করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, যেহেতু পর্ষদ সদস্য বা নির্বাচিত পরিচালকদের মেয়াদ তিন বছর পার হয়ে গেছে, তাই পর্ষদ সভা অনুষ্ঠানের কোনো কার্যকারিতা নেই। এরপরই সভাটি বাতিল করেন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান।
এ অবস্থায় আরেকটি সংকটে পড়তে যাচ্ছে ব্যাংকটি। আগামী অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এস এম মহিউদ্দিন নিয়মিত অবসরে যাচ্ছেন। তার আগে ভারপ্রাপ্ত এমডি নিয়োগ দিতে হবে। আর এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে ব্যাংকের পর্ষদকে।
২০১১ সালের ১১ মে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এমডির পদ থেকে সরে যান। চার বছরের বেশি সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত এমডি দিয়েই চলছে গ্রামীণ ব্যাংক।
এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান খন্দকার মোজাম্মেল হক কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে ভারপ্রাপ্ত এমডি এ এস এম মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে পর্ষদ সভা আহ্বান করা হলেও তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে বাতিল করার কথা জানান।
পুরোনো সংকটগুলোও কাটছে না গ্রামীণ ব্যাংকের। পর্ষদের নির্বাচিত সদস্য বা পরিচালকদের মেয়াদ শেষ হয়েছে পাঁচ মাস আগে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁরা তিন বছর মেয়াদ শেষ করেন। কিন্তু নতুন পরিচালক নির্বাচন করতে গেলে যে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, সেটাই গঠন করতে পারছে না সরকার।
যোগাযোগ করলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের উদ্যোগগুলোতে একের পর এক সমস্যাই বেড়েছে। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত।
মেয়াদ নিয়ে দুই রকম কথা: পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচিত সদস্য বা পরিচালকদের মেয়াদ নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক আইন এবং গ্রামীণ ব্যাংক (পরিচালক নির্বাচন) বিধিমালার মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থানও রয়েছে।
অধ্যাদেশের আওতায় ১৯৮৪ সালে গঠিত হয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক। অধ্যাদেশের ১১(২) ধারা অনুযায়ী, একজন পর্ষদ সদস্যের মেয়াদকাল হবে তিন বছর এবং পরবর্তী সদস্য নির্বাচিত না হওয়ায় তিনি কাজ চালিয়ে যাবেন।
কিন্তু ২০১৩ সালে সামরিক সরকারের আমলের প্রণীত দেশের সব অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে গিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক আইনও প্রণয়ন করা হয়। সেখানে কিছু পরিবর্তনও আনা হয়। আইনের ১১(১) ধারায় বলা হয়েছে, সদস্যদের মেয়াদকাল হবে তিন বছর। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় সদস্যদের মেয়াদকাল শেষ হবে, তা নিয়ে কিছু বলা হয়নি। ২০১৪ সালের ৬ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ ব্যাংক (পরিচালক নির্বাচন) বিধিমালা জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিধিমালার ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, পরিচালক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান নির্বাচিত পরিচালকদের পদ শূন্য হবে। এর মানে হলো, যত দিন তফসিল ঘোষণা না হবে, তত দিন আগের পরিচালকেরা বহাল থাকবেন।
সুতরাং সর্বশেষ পর্ষদ সদস্যদের তিন বছরের মেয়াদ শেষ হলেও আইনমতে তাঁরা সদস্য নন, কিন্তু বিধিমতে সদস্য আছেন।wwww
গ্রামীণ ব্যাংকের পর্ষদ সদস্যদের পদ বহাল রাখা নিয়ে গত এপ্রিল মাসে একটি রিট করেন পর্ষদ সদস্য তাহসিনা খাতুন। সেই রিটের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তাহসিনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু নতুন পর্ষদ সদস্য নির্বাচিত হয়নি, তাই এখনো আমরাই সদস্য আছি।’
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত এমডি এ এস এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকে সব সময় নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন হয়েছে। এত দিন নতুন পর্ষদ সদস্য নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পুরোনোরাই সদস্য থাকতেন।’
গ্রামীণ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পর্ষদের নয়জন নারী সদস্যের কাছে এখনো প্রতি মাসের হিসাবসহ যাবতীয় তথ্যের প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
জেলা জজ খুঁজে পাচ্ছে না: গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচনের জন্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ গত ১০ মাসেও খুঁজে পায়নি সরকার। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্বাচন করার দায়িত্ব দিয়ে বিধিমালা জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এ দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানায়। ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে পরিচালক নির্বাচন করার সময়সীমা শেষ হয়ে যায়। এরপর সেই দায়িত্ব জেলা জজকে দিয়ে আবারও বিধিমালা সংশোধন করা হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে বিধিমালাটি সংশোধন করলেও তা ৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়।
সংশোধনীতে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচনের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ। প্রজ্ঞাপনটিতে এবার কিছুটা কৌশল অবলম্বন করা হয়। বলা হয়, নির্বাচন হবে ‘বিধিমালার অধীন কমিশন গঠনের এক বছরের মধ্যে।’ অর্থাৎ, কমিশন গঠন করার আগ পর্যন্ত নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা নেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার পর্যন্ত সরকার নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারেনি। কারণ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হতে কোনো অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজই রাজি হচ্ছেন না।
আবার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজকে সরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় না আইন মন্ত্রণালয় করবে, তা স্পষ্ট বলা নেই। এ ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অবশ্য জানান, ‘আমরাই নিয়োগ করব।’ কোনো অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজই তো রাজি হচ্ছেন না, তাহলে কী দাঁড়াবে—এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
সরকার গঠিত গ্রামীণ ব্যাংক-সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সদস্য আজমালুল হোসেন কিউসি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিচালক নির্বাচন করতে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরার দরকার ছিল না। আমাদের নির্বাচন কমিশনকে দিয়েই এ নির্বাচন করা সম্ভব। গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের প্রতিবেদনে এ রকম একটি সুপারিশও আমরা করেছিলাম।’
পরিচালক নির্বাচন করে দিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন—এ প্রসঙ্গে মির্জ্জা আজিজ বলেন, ‘আমার মনে হয় সরকার এ ব্যাপারে সিরিয়াস নয়। আর একান্তই কাউকে না পাওয়া গেলে আবার আইন সংশোধন করতে হবে। এভাবে তো চলতে পারে না।’
এত বিপত্তির পরও গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কার্যক্রম ভালো চলছে, ভালো মুনাফাও হচ্ছে, কীভাবে—আবারও জানতে চাইলে মির্জ্জা আজিজ বলেন, ‘এ জন্য ড. ইউনূসকে কৃতিত্ব দিতে হয়। তিনি এমন পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠানটি নুয়ে তো পড়ছেই না, উল্টো মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে আছে।’
নির্বাচিতদের ছাড়াই কোরাম: গত ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সদস্যদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ওই মাসেই অর্থ মন্ত্রণালয় তিনজন মনোনীত সদস্য নিয়োগ দেয়। তাঁরা হলেন চেয়ারম্যান খন্দকার মোজাম্মেল হক, তৎকালীন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সুরাইয়া বেগম এবং আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি শাহ এ সারোয়ার। তাঁরাও এ পর্যন্ত কোনো সভা করতে পারেননি।
নির্বাচিত পরিচালকদের ছাড়াই কোরাম পূর্ণ করতে ২০১৩ সালের গ্রামীণ ব্যাংক আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইনের ১৭(৩) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত পরিচালকদের পদ শূন্য হলে পরিচালক নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত চেয়ারম্যান ও সরকার মনোনীত অপর দুজন সদস্য উপস্থিত থাকলেই সভার কোরাম হবে।
এর মানে হলো, সরকার চাইলে নির্বাচিত পরিচালক ছাড়াই গ্রামীণ ব্যাংকের পর্ষদ চালাতে পারবে। যেকোনো সিদ্ধান্তও পর্ষদ নিতে পারবে।

Thursday, July 2, 2015

বাংলাদেশই বেশি লাভবান হবে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : তোফায়েল আহমেদ by আব্দুল কাইয়ুম ও ফখরুল ইসলাম

তোফায়েল আহমেদ
চারদেশীয় মোটরযান চুক্তির পর আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো মুখোমুখি হয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুমফখরুল ইসলাম
প্রথম আলো : আগেরবার যখন মন্ত্রী ছিলেন, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর চুক্তি করেও কিন্তু সফল হতে পারেননি। এখন করলেন চারদেশীয় চুক্তি। এবারও কি আগের মতো সমস্যা হতে পারে?
তোফায়েল আহমেদ: আসলে ১৯৯৬ সালে আমি যখন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন নেপালের বাণিজ্যমন্ত্রী ও আমি মিলে পঞ্চগড়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর উদ্বোধন করেছিলাম। পরে সেটা কার্যকর হয়নি। কারণ, ভারতের সঙ্গে তখন সংযুক্তির (কানেকটিভিটি) চুক্তি ছিল না। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে সেই সমস্যার নিরসন হয়েছে। এখন সেই সমস্যা নেই।
প্রথম আলো : ওই সময় নেপালের ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা না থাকায় পণ্য পাঠানো সমস্যা।
তোফায়েল আহমেদ: না। আসল কথা, তখন ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল না। কিন্তু এবার যে চুক্তি হয়েছে, তাতে ভারত, নেপাল ও ভুটানে সরাসরি পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যাবে। শুধু তা-ই নয়, এখান থেকে যাত্রীরাও তিন দেশে যাওয়া-আসা করতে পারবেন।
প্রথম আলো : আমাদের পণ্য যাবে, ওদের পণ্য আসবে, নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে না?
তোফায়েল আহমেদ: এখন তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। আমাদের অংশে যেমন নিরাপত্তার সমস্যা নেই, তাদের অংশেও নেই। তবে এটা ঠিক, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
প্রথম আলো : ব্যাপারটা কি এমন যে আমাদের রাস্তার উন্নয়ন আমরা করব, আর তারা করবে তাদেরটা?
তোফায়েল আহমেদ: ঠিক তা-ই।
প্রথম আলো : আগে বলা হতো নেপাল ও ভুটানের পণ্য মংলা বন্দর দিয়ে আসবে?
তোফায়েল আহমেদ : আমাদের দুইটা বন্দর। তিন দেশই এ দুই বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তাদের থেকে আমরা রাজস্ব পাব। সিঙ্গাপুরের উন্নতি ও লাভবান হওয়ার কারণ হচ্ছে দেশটির বন্দর বিশ্বের সবাই ব্যবহার করতে পারে। শ্রীলঙ্কাও অন্যদেরও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে লাভবান হচ্ছে। বন্দর শুধু আটকে রাখলে হবে না। তাই বন্দরেরও আমরা আধুনিকায়ন করছি।
প্রথম আলো : আগে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, নেপাল-ভুটানের জন্য মংলা ব্যবহৃত হলে পশ্চিম বাংলার বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
তোফায়েল আহমেদ : না, তা হবে না। যেমন পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছি ভারতের কাছ থেকে। চারদেশীয় চুক্তি যদি কাজে লাগাতে পারি, আমরা লাভবান হব।
প্রথম আলো : চুক্তির ফলে লাভবান বেশি হবে কারা?
তোফায়েল আহমেদ : বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে। আজকে বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের যুগে সংযুক্তি ছাড়া কোনো দেশেরই ব্যবসা-বাণিজ্য সফলতা লাভ করে না। এখন আমাদের চার দেশের মধ্যে সংযুক্তি হয়ে গেল। তারপর আমরা জোর দেব বিসিআইএমের ওপর। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার—এই চার দেশের অর্থনৈতিক করিডর থেকেও আমরা সাংঘাতিক লাভবান হব। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনাও চলছে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক, এডিবি (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) বিনিয়োগ করবে।
প্রথম আলো : অনেকের সন্দেহ যে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে আমরা আসলেই লাভবান হব কি না?
তোফায়েল আহমেদ : যারা এ দেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি করে, তারাই এসব কথা বলে। তাদের দল বা গোষ্ঠীবিশেষের জন্মই হয়েছে ভারতবিরোধিতা ও মৌলবাদিতার ওপর ভিত্তি করে। এগুলো আসলে স্রেফ ভারতবিরোধিতা।
নরেন্দ্র মোদির সফর দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ৪১ বছরেও যে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন হয়নি, সম্প্রতি ভারত তা সর্বসম্মতভাবে করেছে। তারপর আছে সমুদ্রসীমা। সমুদ্রসীমা নিয়ে মামলা করতে আমরা ইতস্তত করিনি। ভুটান ও নেপালে আমরা সরাসরি যেতে পারতাম না। আজ সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যারা বিরোধিতা করে, তারা কেন গঙ্গার পানি আনতে পারল না? শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা আনতে পারল না?
প্রথম আলো : ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি তো অনেক বেশি।
তোফায়েল আহমেদ : বাণিজ্য ঘাটতি সব সময় যে ক্ষতি করে, তা নয়। চীনের সঙ্গে আমাদের ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য; চীন যদিও বলে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি আছে, পাশাপাশি চীনে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।
আবার ভিন্ন চিত্রটিও দেখুন। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা ৫৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করি, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে করি ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউ কিন্তু সে তুলনায় আমাদের কাছে রপ্তানি কম করে। এই বাণিজ্য ঘাটতির জন্য কি তারা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? প্রায়ই বক্তৃতা দেওয়া হয়, বাণিজ্য ঘাটতি, বাণিজ্য ঘাটতি। আমি চাই, এটা নিয়ে প্রথম আলো লিখুক।
প্রথম আলো : কিন্তু আমাদের রপ্তানি যদি ভারত বা চীনে আরও বাড়ানো যেত ভালো হতো না?
তোফায়েল আহমেদ : তা হতো। কিন্তু আমরা চীন-ভারতের কাছ থেকে পণ্য এনে নিজেরা লাভবান হই। ভারত যদি তুলা, সুতা বা পেঁয়াজ-রসুন ইত্যাদি নিত্যপণ্য আমাদের কাছে বিক্রি না করে, আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। ভারত যদি এখন মনে করে তারা বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? বাংলাদেশ। আর ভারতে রপ্তানি করতে না পারার যে প্রশ্নটি এসেছে, সে বিষয়ে বলব, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক বড়। তাদের পণ্যের দাম কম। সেখানে আমাদের পণ্য রপ্তানি করে তেমন সুবিধা করা সহজ নয়।
প্রথম আলো : তাহলে তো যেখানে রপ্তানি করলে সুবিধা হবে, সেখানেই যাওয়া উচিত।
তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ। সে জন্যই তো আমরা বিদ্যমান বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকা, ব্রাজিল, চিলিতে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) হয়েছে।
প্রথম আলো : ট্রানজিটের শর্তের মধ্যে কি মাশুলের (ফি) হার নির্ধারণের বিষয়ে কিছু বলা আছে?
তোফায়েল আহমেদ : বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ঠিক করা হবে। প্রতিটি দেশের মাশুল-হারের নিজস্ব হিসাব আছে, সেভাবে দিতে হবে। যেমন ইইউতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য যায়। তারা কীভাবে দেয়? এগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে শুল্ক দিতে হবে।
প্রথম আলো : এর আগে প্রয়াত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমতউল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিটির একটা সুপারিশ এসেছিল। বলা হয়েছিল, যেহেতু ট্রানজিট দেওয়া হলে ভারতের পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে ৮০ শতাংশ, তাই এর একটা অংশ বাংলাদেশের পাওয়া উচিত।
তোফায়েল আহমেদ : আমরা বিভিন্নভাবে লাভবান হব। যেমন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত ২০০ কোটি ডলার সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে।
প্রথম আলো : ভারী ট্রাক আসা-যাওয়া করবে, কয়েক দিনের মধ্যে মেরামত করতে হবে। তখন?
তোফায়েল আহমেদ : এটা ঠিক না যে ভারী ট্রাকের কারণে রাস্তা ভেঙে যাবে। আমাদের প্রাণ গ্রুপ ত্রিপুরায় শিল্প করেছে। পূর্ব ভারতের প্রতিটি রাজ্যে প্রাণ পণ্য রপ্তানি করে। ওই রাজ্যগুলোতে আমাদের পণ্য ভারতের পণ্যের চেয়েও বেশি যাবে।
প্রথম আলো : কিন্তু ভারত ট্রানজিট পেলে পূর্ব ভারতে প্রাণ বাজার হারাবে কি না?
তোফায়েল আহমেদ : না, মোটেই না। কারণ, আমরা যত সহজে ও কম ব্যয়ে পূর্ব ভারতে পণ্য পাঠাতে পারব, দিল্লি বা ভারতের অন্য রাজ্য সেই সুবিধা পাবে না।
প্রথম আলো : তিস্তার পানি পেলাম না, অথচ ট্রানজিট দিয়ে দিলাম?
তোফায়েল আহমেদ : তিস্তার পানিও পাব আমরা। শুধু সময়ের ব্যাপার। প্রতিটি দেশেরই রাজনীতি আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুবার ঢাকা সফর করেন। পশ্চিম বাংলা চায় ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর বিষয়টা সমাধান করতে। এটা হলো বাস্তব কথা।
প্রথম আলো : ভারতকে দুইটা বিদ্যুৎকেন্দ্র আমরা দিয়ে দিলাম দরপত্র আহ্বান ছাড়াই। এই সময়ে এসে এমন দায়মুক্তি দেওয়ার দরকার ছিল?
তোফায়েল আহমেদ : দেখুন, বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের দরকার। এখন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লোক বিদ্যুৎ পায়। আমরা সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে চাই। কুইক রেন্টাল পাওয়ার যখন চালু করেছি, সমালোচকের কোনো অভাব ছিল না। তখন ছিল ঘরে ঘরে অন্ধকার। আর এখন আলোকিত বাংলাদেশ। কীভাবে হয়েছে?
সমালোচনা করবেন তখন, যদি দেখবেন বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছি। রামপালে আমরা কি এমন কোনো প্রকল্প করব, যা আমাদের স্বার্থের বিরোধী? আমরা কি দেশকে ভালোবাসি না? সবকিছু বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই করা হচ্ছে।
প্রথম আলো : আপনি উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বে ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সেই সময়ের স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
তোফায়েল আহমেদ : বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দেশ স্বাধীন করার। সে জন্য তিনি অনেক জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। ফাঁসির কাষ্ঠে পর্যন্ত গিয়েছেন। তাঁর সেই স্বপ্ন এখন ধীরে ধীরে পূরণ হতে চলেছে। আমরা সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হব এবং ২০৪১ সালের মধ্যে হব উন্নত দেশ।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
তোফায়েল আহমেদ : ধন্যবাদ।

Friday, June 19, 2015

প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ হওয়া অবাস্তব নয় -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: বিনায়ক সেন by ফখরুল ইসলাম

প্রস্তাবিত বাজেট, দেশের অর্থনীতি, ব্যাংক খাত, দুর্নীতি, সুশাসন, রাজস্ব সংগ্রহসহ ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সমতামুখী প্রবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করছেন তিনি। বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের এই সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জার্নাল ও বইপত্রে ৫০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে: সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফখরুল ইসলাম
প্রথম আলো : প্রস্তাবিত বাজেট কেমন হলো?
বিনায়ক সেন : বাজেট নিয়ে আশির দশকে, এমনকি ষাটের দশকেও সমালোচনা থাকত। এখন তা ছিদ্রান্বেষী নিন্দা ও লাগামছাড়া স্তাবকতা—এ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, যেখানে যতটুকু ভালো হয়েছে, তা বলা উচিত। আর মন্দ হলে মন্দ বলতে হবে। একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, শক্তিশালী দিককেও দুর্বলতম বলা হচ্ছে। এই প্রবণতা আমার কাছে পরিহার্য। যেমন ধরুন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ধরাটা খুবই বাস্তবোচিত হয়েছে। প্রথমত, প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে একটি স্বাভাবিক বছর পেলে ৭ শতাংশ অর্জন করা অবাস্তব নয়। দ্বিতীয়ত, ঘাটতি বাজেট ১৫ বছর ধরেই ৪-৫ শতাংশের মধ্যে থাকছে। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতিও ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে আশা করা যায় দেশে ভালো ফলন ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার কারণে।
প্রথম আলো : তিনটি কারণকে বিবেচনায় নিয়েই আপনার এত বড় আশাবাদ? সার্বিকভাবে দেশের মৌলিক বাজেট–শৃঙ্খলা কি ঠিক আছে?
বিনায়ক সেন : আমি বলব সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট–শৃঙ্খলা একরকম ঠিকই আছে। এখন যদি দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে পারল না, তখন ব্যয়ের কাঠামো কাটছাঁট করতে হবে। আর এই কাটছাঁটের পরও যদি বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকে, প্রবৃদ্ধির হার যদি ৭ শতাংশ অর্জন করা যায়, মূল্যস্ফীতি যদি ৬ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে, তাহলে আমি এটাকে সময়োচিত ও বাস্তবোচিত বাজেটই বলব। এটা বলার পরই আমি মূল কথাটি বলতে চাইছি।
প্রথম আলো : সেটা কী?
বিনায়ক সেন : মূল কথাটা হচ্ছে আমরা এখনো আলোচনাটা সাধারণ মানের প্রবৃদ্ধির মধ্যেই আটকে রাখছি। সমতামুখী প্রবৃদ্ধি বা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলছি না। সমতামুখী প্রবৃদ্ধির তিনটি মাত্রা রয়েছে। একটা হচ্ছে প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্বশীলতা। প্রবৃদ্ধিকে ওঠা–নামা থেকে রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধিকে অংশগ্রহণমূলক হতে হবে, অর্থাৎ এতে সমাজের সবার ও দেশের সব অঞ্চলের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। তৃতীয়ত হচ্ছে আয়বৈষম্যহীন প্রবৃদ্ধি। অর্থাৎ যত দিন যাচ্ছে, তত আমরা অধিক বৈষম্যমূলক সমাজ থেকে অপেক্ষাকৃত কম বৈষম্যমূলক সমাজে পরিণত হতে পারছি কি না। ২০১০ সালের আয়-ব্যয় জরিপ বলছে, আয়বৈষম্যের সূচক বেশ উঁচু পর্যায়ে চলে গেছে।
প্রথম আলো : সমতামুখী প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমরা কতটুকু কী করতে পারছি?
বিনায়ক সেন : প্রথমটি মোটামুটি অর্জিত হয়েছে। প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্বশীলতা অর্জনে ধারাবাহিকতা রয়েছে আমাদের। অনেকেই একে ৬ শতাংশের ফাঁদ বলছেন, কিন্তু আমি ‘ফাঁদ’ বলতে রাজি নই। একনাগাড়ে প্রায় এক দশক ধরে ৬ শতাংশ হার অর্জনের দেশ খুব বেশি নেই। এক দশকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক সংকটও তৈরি হয়েছে। সবকিছুর পরও স্থায়িত্বশীলতার নিক্তিতে আমাদের অর্জন বেশ ভালোই বলা যায়।
প্রথম আলো : বাকি দুটির অবস্থা তাহলে ভালো নয়?
বিনায়ক সেন : না, সেটা না। যেমন অংশগ্রহণমূলক দিক থেকে আমি বলব আংশিক সাফল্য এসেছে। দুই দশক আগেও শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ১৫ শতাংশ। এখন ৩৩-৩৪ শতাংশ। এটা ৬০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে প্রবৃদ্ধি যেমন ত্বরান্বিত হবে, আয়ও বাড়বে। আবার যুবশক্তির মধ্যে পোশাক ও কৃষি খাতের অদক্ষ-আধা দক্ষ শ্রমিক এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান যথেষ্ট। কিন্তু স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ থেকে সাফল্য পাইনি। কারণ, আমাদের উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার সব কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে চালিত। এবারের বাজেট বক্তব্যে অবশ্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে বণ্টনবৈষম্য দূর করার ইঙ্গিত রয়েছে। স্থানীয় সরকারের অর্থায়নে একটা আলাদা কৌশলপত্র হওয়ার কথা। সেটা যদি সত্যি হয়, এবার থেকেই যেন বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ স্থানীয় সরকারের জন্য রাখা হয়। ভারতের কেরালায় যা আছে এক-তৃতীয়াংশ।
প্রথম আলো : সে হিসাবে বাজেটের মোট আকার থেকে স্থানীয় সরকারের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিচ্ছেন?
বিনায়ক সেন : হ্যাঁ। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের জন্য থাকতে পারে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা থাকতে পারে নগরাঞ্চলের জন্য। এতে লাভ যেটা হবে, প্রতিবছর বাজেট বাস্তবায়ন করতে না পারার যে সমালোচনা আছে, সেটা দূর হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) যতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে না, ততটুকু বরাদ্দ দিলেও একটা কাজ হবে। আর তাতে দরিদ্র অঞ্চল, বিশেষ করে হাওর, লবণাক্তপ্রবণ, বন ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষও সমানভাবে উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে।
প্রথম আলো : বৈষম্যহীন প্রবৃদ্ধি নিয়ে কিছু বললেন না?
বিনায়ক সেন : বাজেট বক্তব্যে এটি প্রায় অনুপস্থিত। দারিদ্র্য দূরীকরণের কথা বলা হলেও আয়বৈষম্য ও সম্পদবৈষম্য দূরীকরণ নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। আয়বৈষম্য ও ভোগবৈষম্যের তুলনায় বেশি হারে বাড়ছে সম্পদবৈষম্য। সম্পদবৈষম্যকে যদি আঘাত করতে হয়, তাহলে সম্পদের ওপর আয়কর সারচার্জ সংগ্রহের বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করতে হবে। বড় দুর্বলতা হলো সম্পদের মূল্যায়ন যথাযথভাবে হচ্ছে না। ভিত্তি ধরা হচ্ছে সম্পদ ক্রয়মূল্যকে, ন্যায্য বাজারমূল্যকে নয়। ফলে মাত্র ১০ হাজার লোক এই আয়কর সারচার্জ দিচ্ছেন। বাংলাদেশে দুই কোটি টাকার ওপরে সম্পদের মালিক মাত্র ১০ হাজার লোক—এটা অবিশ্বাস্য।
প্রথম আলো : সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন থেকে সরকার কীভাবে লাভবান হতে পারে?
বিনায়ক সেন : এতে রাজস্ব আয় বাড়বে, যা বৈষম্যহীন প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। উদাহরণস্বরূপ যদি বলি কয়েক বছরে দেশে মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও ধনিক শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে। বিশেষ করে নগরাঞ্চলে। তাঁদের কাছ থেকে আয়কর সারচার্জ এবং/অথবা প্রত্যক্ষ সম্পদ-করের মাধ্যমে (যা এখনো বাজেটে নেই) অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা বেশি আয় করা সম্ভব। তবে দুই বছর ধরেই একটি ভালো দিক লক্ষ করছি। এখন প্রত্যক্ষ বা আয়করকে রাজস্ব সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ সমতামুখী প্রবৃদ্ধি অর্জনেরই উদ্যোগ। পোশাকশিল্পসহ প্রতিষ্ঠিত রপ্তানি খাতগুলো থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর ১ শতাংশ হারে কর বসানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা প্রবৃদ্ধিকে সমতামুখী করবে। আর শিশু-শিল্প হলে কর-রেয়াত দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যারা ভালো প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, তাদের থেকে কিছুটা আয়কর আদায় করা জরুরি।
প্রথম আলো : কিন্তু মানুষের প্রথম চাওয়া হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন ও যানজট নিরসন। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
বিনায়ক সেন : প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে—আমাদের এখন সে ধরনের অবকাঠামো দরকার। আবার প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেয়ে বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাটাও বড় কথা। মানুষ নগরমুখী হচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে তা মোট জনগোষ্ঠীর ৪৫ শতাংশ হয়ে যাবে। তাদের সমস্যার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। আগে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ছিল কৃষি অর্থনীতি ও রপ্তানি, এখন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে হবে নগর অর্থনীতি ও রপ্তানি। ফলে নগরে ও নগরবাসীর জন্য এখন বেশি হারে বিনিয়োগ করতে হবে। যানজট নগরবাসীর কর্মজীবনের বড় একটা সময় খেয়ে ফেলছে। বাজেটে যানজট নিরসনে বা নগর অর্থনীতি উন্নয়নে তেমন কোনো কৌশলগত নির্দেশনা নেই। ঢাকার বাইরে শহরগুলোর অবকাঠামোগত পরিবেশ আরও খারাপ, অথচ শহরেই কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি করে জড়ো হচ্ছে। আর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) পদ্ধতির একটা উদ্যোগ সরকার নিলেও এর কোনো ফল দেখা যায়নি। পিপিপিতে ৪৩টি প্রকল্প নিয়ে অর্থমন্ত্রী আর জানালেন না কোনটির কী হাল? বিদ্যুৎ যেমন জাতীয় তাগিদ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, অবকাঠামো খাতেরও একই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
প্রথম আলো : তাহলেই কি সমতামুখী প্রবৃদ্ধি আসবে?
বিনায়ক সেন : না। সমতামুখী প্রবৃদ্ধির জন্য আরও দরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ভালো বরাদ্দ। শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলেছেন, প্রয়োজনের ধারে-কাছেই তিনি যেতে পারেননি। স্বাস্থ্য খাতেরও একই অবস্থা। এ দুই খাতে বরাদ্দের অপ্রতুলতায় বিস্মিত না হয়ে পারি না। পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকেরা মাসে ৩০০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে রাজি থাকলেও তাঁদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা পলিসি চালু করা যায়নি।
শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিও রয়েছে। যেমন মাদ্রাসাশিক্ষা থেকে সবচেয়ে কম ফল (রিটার্ন) পাওয়া যায়। অথচ মাদ্রাসাশিক্ষা-ব্যবস্থায় যদি কারিগরি শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা যায়, ভালো ফল পাওয়া যাবে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষায় আমাদের বুয়েট ভালো, ঢাকা মেডিকেল কলেজও (ডিএমসি) ভালো। দরকার ছিল বুয়েটের মতো আরও পাঁচটা ‘বুয়েট’ করা, ডিএমসির মতো পাঁচটা ‘ডিএমসি’ করা। ভারতে যেমন করে প্রথম সারির বেশ কিছু আইআইএম, আইআইটি ও মেডিকেল কলেজ আছে। সেদিকে আমরা গুরুত্বই দিচ্ছি না। মোটের ওপর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আগামী ১০ বছরে প্রধান গুরুত্ব দিতে হবে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিকার্ডো হাউসম্যান সম্প্রতি হিসাব করে বলেছেন, শ্রমশক্তির মান গড়ে তিন বছর স্কুলশিক্ষা থেকে আট বছর স্কুলশিক্ষার মানে উত্তীর্ণ করতে পারলে জিডিপির আকার শুধু এ কারণেই দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।
প্রথম আলো : আমাদের আর্থিক খাত কি ঠিকভাবে চলছে? দুর্নীতি কী করে কমবে, সুশাসনের কী হলো?
বিনায়ক সেন : খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। কর-রেয়াত এবং ব্যাংকঋণ—এ দুই বিকল্পের ক্ষেত্রে একজন শিল্পপতি যদি দেখেন ব্যাংকঋণ ফেরত দিতে হচ্ছে না, তখন কর-প্রণোদনা কাজ করবে না। কর-প্রণোদনার নীতি আর্থিক-প্রণোদনার নীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আর্থিক খাতে এখনো শৃঙ্খলার অভাব। উচ্চ খেলাপি ঋণের হার থেকে আমরা বের হতে পারছি না। উচিত হবে সোনালী ব্যাংককে হাতে রেখে বাকিগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া। কেননা, সরকারি খাতেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ বেশি। অন্যদিকে এটাও খেয়াল রাখতে হবে, বেসরকারীকরণের পর তা যেন গুটি কয়েক মুখচেনা শিল্প-ব্যাংক পরিবারের কাছে চলে না যায়।
দুর্নীতি হ্রাস বা সুশাসন চালু সরকার চাইলে অনেকখানিই পারবে। বলছি না যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু খাতভিত্তিক সুশাসন তো আমরা চাইতেই পারি; অন্তত কয়েকটি খাতে। আর দুর্নীতির মাধ্যমে যারা টাকা কামাচ্ছে, তাদেরও ধরা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর যৌথভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারীদের (টিআইএন) যাবতীয় তথ্য মিলিয়ে নজরদারি করলে অবৈধ উপায়ে টাকা কামানো, কর ফাঁকি দেওয়া ও খেলাপি হওয়া—এসব রোধ করা অনেকখানিই সম্ভব।
প্রথম আলো : করদাতার সংখ্যা সরকার তেমন বাড়াতে পারছে না। কোনো পরামর্শ?
বিনায়ক সেন : ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে। আরও চার কোটি মানুষ আছে দারিদ্র্যঝুঁকিতে। বাকি থাকল আট কোটি মানুষ, তথা ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবার (পরিবারপ্রতি পাঁচজন হিসাবে)। পরিবারে যদি একজন আয় করেন, তাহলেও আয়করের আওতায় আসতে পারেন ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যক্তি। এর মধ্যে শহরবাসী ৫০ লাখ। অথচ বর্তমানে আয়কর দেন কেবল ১০ লাখ লোক। শুধু নগরমুখী করেও প্রায় পাঁচ গুণ আয়করদাতা বাড়ানো সম্ভব। তাই বলব যে উপজেলা পর্যায়ে কর অফিস সম্প্রসারিত না করে শহর পর্যায়ে এর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হোক।
প্রথম আলো : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কীভাবে দেখছেন?
বিনায়ক সেন : নদী আমাদের প্রাণ, ট্রানজিট তাঁদের প্রাণ। কৌশলগত স্বার্থের দিক থেকে আমরা তাঁদের পানির বিনিময়ে ট্রানজিট দিতে পারি।
প্রথম আলো : আপনাকে বাজেট প্রণয়নের দায়িত্ব দিলে কোন খাতে অগ্রাধিকার দিতেন?
বিনায়ক সেন : অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। অবশ্যই সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে। অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বের কথা যদি বলি, দেখুন, এক যমুনা সেতুর কারণে আশির দশকের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশ থেকে আমরা ২০০০ সালের পর ৫-এর ওপরে উঠেছি। পদ্মা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন হলে নিশ্চয়ই ৭-এর ওপরে ওঠা সহজ হবে। আর নীল (সমুদ্র) অর্থনীতি চাঙা করতে পারলে তো কথাই নেই।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
বিনায়ক সেন : ধন্যবাদ।

Monday, April 27, 2015

কৃষি ব্যাংকের ওপর আমি খুবই অসন্তুষ্ট -সাক্ষাৎকার: অর্থমন্ত্রী by ফখরুল ইসলাম

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্বীকার করে নিলেন যে ব্যাংক খাতে কিছু দুর্বল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর এখন তিনি সবচেয়ে অসন্তুষ্ট কৃষি ব্যাংকের ওপর।
অর্থমন্ত্রী ২০ এপ্রিল ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগ্যান বিমানবন্দরে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি ব্যাংক খাত ছাড়াও আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের দর্শন, মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার এবং পরিকল্পনা কমিশনসহ অর্থনীতির সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ফখরুল ইসলাম
প্রথম আলো: ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনি কি আস্থাশীল?
আবুল মাল আবদুল মুহিত: না, না, না। ব্যাংক খাত নিয়ে আমি ততটা চিন্তিত না। দু-চারটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। সোনালী ব্যাংকে একটা লুট হয়েছে, জোচ্চুরি হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে সোনালী ব্যাংক ঠিকও হয়ে গেছে। বেসিক ব্যাংকটা একটা সমস্যায় পড়েছে। অবশ্য ব্যাংক খাতে কিছু দুর্বল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমনিতে অন্য কোনো ব্যাংকে তেমন একটা অসুবিধা নেই। হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাংক আছে। কৃষি ব্যাংক। আমার আমলেই এটা হয়েছে। আমি খুবই অসন্তুষ্ট এই ব্যাংকটার প্রতি। কৃষককে কৃষি ব্যাংক যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি দিয়েছে কৃষি-বাণিজ্যে। আমি এখন কৃষি ব্যাংককে ধরেছি। তদারক চলছে। বিগত পাঁচ বছরে তারা বাণিজ্য িক বিনিয়োগ এত বেশি করেছে যে এটা মানা যায় না। কৃষি ব্যাংককে অবশ্যই প্রধানত কৃষিঋণে যেতে হবে। তবে একটা ভালো খবর হলো, বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন কৃষিঋণ দিচ্ছে।
প্রথম আলো: বেসিক ব্যাংক যে এত বড় সমস্যায় পড়ল, এর নেপথ্যে যাঁরা ছিলেন বা রয়েছেন, তাঁদের কাউকেই কিন্তু শাস্তি দিতে পারলেন না।
আবুল মাল আবদুল মুহিত: না, না, কে বলেছে? এখনো শেষ হয়নি।
প্রথম আলো: হোতা তো ধরাছোঁয়ার বাইরেই।
আবুল মাল আবদুল মুহিত: না, না, শেষ হয়নি।
প্রথম আলো: এবার তাহলে বাজেট প্রসঙ্গে আসি। এমন একসময়ে আপনি আগামী অর্থবছরের বাজেট করতে যাচ্ছেন, যখন চলতি অর্থবছরে অন্তত তিন মাসের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন হয়েছে। তাতে অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ হয়েছে। এগুলো সামাল দিতে না পারায় আমরা কি পিছিয়ে পড়ছি না?
আবুল মাল আবদুল মুহিত: না, না, না। এগুলোর প্রভাব নগণ্য। খালেদা জিয়ার আন্দোলনের কারণে বলতে পারি ক্ষতি হয়েছে একটাই, আর সেটা হচ্ছে, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা কমে গেছে। অন্য কোনো দিক থেকে কোনো সমস্যা বা অসুবিধা হচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনব্যবস্থা তো ভালোভাবেই চলছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে আমাদের সময়ে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আমলে। এটাই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
প্রথম আলো: চলতি অর্থবছর শেষে কত হতে পারে প্রবৃদ্ধির হার?
আবুল মাল আবদুল মুহিত: আমরা তো আশা করেছিলাম ৭ দশমিক ১ শতাংশ অর্জিত হবে। এখন নিশ্চিত না যে এটা হতে পারবে কি না। কিন্তু ৭ শতাংশের কাছাকাছি হবে।
প্রথম আলো: ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কিন্তু এই হার ৮ শতাংশ হওয়ার কথা।
আবুল মাল আবদুল মুহিত: তা হওয়ার কথা। কিন্তু পরিকল্পনা করা হয় সব সময়ই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য। আর আগের পরিকল্পনার চেয়ে এখনকার পরিকল্পনার মধ্যে অনেক অনেক পার্থক্য। এখন বলা যায়, একধরনের অনুমান করা হয়। সেটা তারা ঠিকভাবেই করেছিল ৮ শতাংশ। যদি বিভিন্ন রকমের অসুবিধা না থাকত, সেটা হতেও পারত। তবে এটা ঠিক যে, আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা যখন চূড়ান্ত হবে, তখন লক্ষ্যমাত্রার হার সংশোধন করতে হবে। করা উচিত হবে। আর আগামী বাজেটের জন্য আমার ইচ্ছা হলো প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ওপরে রাখা। সত্যি সত্যিই কত রাখতে পারব, বলতে পারব না। বাজেট তো খুব কাছে, এ মুহূর্তে বলাটাও ঠিক হবে না। তবে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, এটা হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশের বেশি।
প্রথম আলো: যতই বলুন না কেন হরতাল-অবরোধে তেমন ক্ষতি হয়নি, আসলে তো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত আয় ও এনবিআর-বহির্ভূত আয় সংগ্রহে প্রভাবও পড়ছে।
আবুল মাল আবদুল মুহিত: আসলে চেষ্টা করলে হয়। উভয় ধরনের আয় সংগ্রহেই সরকারের চেষ্টা রয়েছে। আগেরবারও তেমন অসুবিধা হয়নি, এবারও হবে না বলে আশা করি। আমি যখন ২০০৯ সালে মন্ত্রী হলাম, তখনই আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাজেট নিয়ে গভীর কিছু করতে হবে। সরকারি বাজেটটা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ছিল সবচেয়ে কম। কম মানে জিডিপির অর্থে কম। এত কম ছিল যে এটা ছিল একধরনের অসম্মানের ব্যাপার। তাই প্রথম বছর থেকেই আমি ঠিক করেছি যে বাজেটের আকার বাড়াতে হবে। আর এ জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদের সঞ্চালন বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির জন্য এখন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ যা আছে, তার বাইরে বৈদেশিক বিনিয়োগের অংশ বড়জোর ২ শতাংশ হতে পারে। সুতরাং অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালনেই আমরা বেশি নজর দিচ্ছি। এনবিআরও এ ব্যাপারে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক।
প্রথম আলো: আমাদের উন্নয়ন বাজেটের আকার সমীহ করার মতো। স্বাধীনতার পর পর পরিকল্পনা কমিশন যতটা শক্তিশালী ছিল, বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ ছিলেন কমিশনের সদস্য, কিন্তু এখন এই দুরবস্থা কেন? সরকারই বা কেন পরিকল্পনা কমিশনকে গুরুত্বহীন করে রেখেছে?
আবুল মাল আবদুল মুহিত: কমিশন দুর্বল হয়ে গেছে। কারণ, কমিশন তার গুরুত্ব হারিয়েছে। আমরা এখন তিন বছর মেয়াদি বাজেট করি। কমিশন এখন শুধু অনুমান (ফোরকাস্ট) করে। পাঁচ বছর মেয়াদি করে, এক বছর মেয়াদি করে। এই যে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পরিকল্পনা, সেটাও তারা করেছে। যদিও আমার বিশ্বাস ও ধারণা, ২০১৯ সালের মধ্যেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়ে যাব। তবে সার্বিকভাবে যদি বলি পরিকল্পনা একটু উচ্চাভিলাষী হওয়াই ভালো। সে দিক থেকে আমাদের কমিশন ঠিক কাজই করছে।
প্রথম আলো: আগামী অর্থবছরের বাজেটের দর্শন কী? মোটাদাগে কী কী বিষয় বিবেচনায় রাখবেন?
আবুল মাল আবদুল মুহিত: এখনো বলার মতো সময় আসেনি। কাজ চলছে। বাজেট নিয়ে দর্শনের কথা কবে যেন বলেছিলাম। জ্বালানি ও যোগাযোগের পরিবর্তে আগামী বাজেটে বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি খাতে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বরাদ্দ খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হবে না। কারণ, যে প্রকল্প ও কর্মসূচিগুলো চলছে, সেগুলো তো চালু রাখতে হবে।
প্রথম আলো: বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের এবারের বসন্তকালীন বৈঠক সম্পর্কে কোনো মূল্যায়ন করবেন?
আবুল মাল আবদুল মুহিত: বসন্তকালীন বৈঠকে অনেক আলোচনাই হয়, এবারও হয়েছে। মোটামুটি ফলপ্রসূ। আইএমএফের সঙ্গে কোনো সমস্যা নেই। আর বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে মূলত ৫০ কোটি ডলার ডেভেলপমেন্ট পলিসি ক্রেডিট নিয়ে। আমি আশা করছি, এটা পাব। আর বিশ্বব্যাংকের অন্য কর্মসূচি তো চলছেই। পদ্মা সেতুর ওই ব্যাপারটার পর বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আর কোনো সমস্যা হয়েছে বলে মনে হয় না।
প্রথম আলো: এত ব্যস্ততার মধ্যেও সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আবুল মাল আবদুল মুহিত: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Friday, March 20, 2015

রপ্তানির চার গুণ চা আমদানি by ফখরুল ইসলাম

ষষ্ঠ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষাগুলোতে একসময় চা নিয়ে রচনা লিখতে বলা হতো। চা ছিল তখন দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। রপ্তানি করে আয় হতো প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। এখন আর সেই রচনা আসে না। কারণ, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকেই এখন বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চা আমদানি করতে হচ্ছে। অবশ্য এখনো কিছু চা রপ্তানি হয়। তবে আমদানি হয় এর প্রায় চার গুণ বেশি। চা-বাগানমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদ বলছে, ২০১৩ সালে ৬ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা পান করেছে এ দেশের মানুষ, যা ২০০৯ সালের তুলনায় এক কোটি কেজি বেশি। চা সংসদের অভিযোগ, সরকারের মনোযোগের বাইরে থাকা এই শিল্পটি ভুল নীতির কারণেই বিপদে পড়েছে। অন্যান্য চা উৎপাদনকারী দেশ আমদানি নিরুৎসাহিত করলেও বাংলাদেশ হেঁটেছে উল্টো পথে। ৮৪ শতাংশ শুল্ক হারে এ দেশে চা আমদানি করা যায়। অথচ ভারতে এ হার ১১০ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৩০ শতাংশ।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠক করে কোনো প্রতিকার পায়নি চা সংসদ। সংগঠনটি পরে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কাছে লিখিত আবেদন জানালে তিনি বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। চা সংসদ জানিয়েছে, নিম্নমানের চায়ে সয়লাব হচ্ছে দেশ এবং বিনা কারণে শিল্পটি মার খাচ্ছে।
বাণিজ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে জানান, চা আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো এবং বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার (বিএসটিআই) মাধ্যমে চায়ের মান নিয়ন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা আরোপের কথা ভাবা হচ্ছে। বিষয়টি কার্যকর করবে শিল্প মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের এ ব্যাপারে চিঠি পাঠানো হবে।
রপ্তানি কমছে ২৩ বছর ধরে: ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবেই চা রপ্তানি কমেছে। কমেছে রপ্তানি আয়ও। চা রপ্তানি করে ১৯৯০ সালে যেখানে আয় হয়েছিল ১৫৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকায়।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে ২ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা রপ্তানি হয়েছিল। ২০১৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫ লাখ ৪০ হাজার কেজিতে।
সে কারণেই নব্বইয়ের দশকে চা রপ্তানিকারক হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। এখন কোনো অবস্থানই নেই।
২০০৯ থেকে ২০১৪—এই পাঁচ বছরে চা রপ্তানি হয়েছে ৭৫ লাখ ৭০ হাজার কেজি। ২০০৯ সালে ৩১ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করে ৪৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০১০ সালে ৯ লাখ ১০ হাজার কেজি রপ্তানি থেকে ১৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ১৪ লাখ ৭০ হাজার কেজি রপ্তানি করে ২১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ১৫ লাখ কেজি থেকে ২২ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং ২০১৩ সালে ৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি রপ্তানি থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা আয় করে বাংলাদেশ।
চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এনায়েত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চা আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে একশ্রেণির আমদানিকারক সুযোগ নিয়েছেন। আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক হার অন্তত ভারতের সমান করা উচিত।’
রপ্তানির চার গুণ আমদানি: চা সংসদের তথ্যমতে, ২০০৯-২০১৩ পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৭৫ লাখ ৭০ হাজার কেজি চা রপ্তানি হয়। অন্যদিকে এই সময়ে দেশে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৯৩ হাজার কেজি চা আমদানিও হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪০ লাখ ১৩ হাজার, ২০১০ সালে ৪৯ লাখ ৮০ হাজার, ২০১১ সালে ১৯ লাখ ২০ হাজার, ২০১২ সালে ১ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার এবং ২০১৩ সালে ৬৯ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা আমদানি হয়।
চা সংসদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, ‘২০১০ সাল থেকে নিম্নমানের ও সস্তা দামের চা আমদানি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে চা উৎপাদকেরা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।’
এনবিআর ২০১১ সালে চা আমদানির ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করলে আমদানিতে কিছুটা ভাটা পড়ে। দুই বছর অব্যাহত থাকার পর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট পাসের আগে হঠাৎ করেই তা প্রত্যাহার করা হয়।
এ কারণেই নিম্নমানের চা আমদানি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন চা সংসদের সাবেক সভাপতি সাফওয়ান চৌধুরী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এতে শুধু নিম্নমানের চা-ই আমদানি হচ্ছে না, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও চলে যাচ্ছে বিদেশে।’
রাজস্ববঞ্চিত সরকার: চা বোর্ডের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার কেজি চা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৫০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু এতে উৎপাদক ও সরকারি কোষাগারের ক্ষতি হয়েছে ৬০৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
চা বোর্ডের সাবেক উপপরিচালক (বর্তমানে চা সংসদের সচিব) কাজী মোজাফফর আহাম্মদ তাঁর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধে বলেন, ২০১৩ সালে ৬ কোটি ৬২ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়। ২০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের আগে ২৭২ টাকা ৫৩ পয়সা দরে বিক্রি হয় ৬৬ লাখ কেজি চা। শুল্ক প্রত্যাহারের পর বিক্রি হয় ১৯১ টাকা ১২ পয়সা দরে ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা। প্রতি কেজিতে ৮১ টাকা ৪১ পয়সা কম হিসাবে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয় ৪৮৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
আর সরকারের রাজস্ব ক্ষতির হিসাবটি হচ্ছে—শুল্ক প্রত্যাহারের আগে রাজস্ব ১৩৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা হলেও প্রত্যাহারের পর হয় ৯০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ক্ষতি ৪৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আমদানির ফলে মূল্য কমে যাওয়ার কারণে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাবদ ক্ষতি হয় ৭২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। শুল্ক ও মূসক মিলিয়ে রাজস্ব ক্ষতি ১২১ কোটি ৩ লাখ টাকা। আর উৎপাদক ও রাজস্ব মিলিয়ে মোট ক্ষতি ৬০৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
সিলেটের মালনিছড়া চা-বাগানের মাধ্যমে ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশে চা চাষ শুরু হয়। তবে বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয় ১৮৫৭ সালে। বর্তমানে হেক্টরপ্রতি গড়ে উৎপাদিত হচ্ছে ১ হাজার ২৪৭ কেজি চা।
চা সংসদের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট ১ লাখ ১৫ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে এ, বি ও সি—এই তিন শ্রেণির ১৬৩টি চা-বাগান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯০টি চা-বাগান রয়েছে মৌলবীবাজার জেলায়। এ ছাড়া হবিগঞ্জ ও সিলেটে ২০টি করে, চট্টগ্রামে ২২টি, পঞ্চগড়ে নয়টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাঙামাটিতে একটি করে চা-বাগান রয়েছে।
চা সংসদ সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩৫টি দেশে বর্তমানে চা উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্ববাসী দিনে ৩০০ কোটি কাপ চা পান করছে।