Tuesday, October 8, 2019

অবশেষে মুঘলে আজম এলেন by শামীমুল হক

অবশেষে এলেন মুঘলে আজম। না! ঘোড়া কিংবা পালকিতে চড়ে নয়। এমনকি বজরায় চড়েও আসেননি তিনি। এসেছেন কড়া পাহারায়। গাড়িতে চড়ে। তবে তার এ আসা রাজদরবারে নয়, বন্দিশালায়। কিন্তু কদিন দেরি করে আসলেন তিনি। প্রায় দুই সপ্তাহজুড়েই প্রজারা অপেক্ষায় মুঘলে আজমের জন্য।
গোটা রাজ্যেই আলোচনা চলছিল মুঘলে আজম রাজবন্দি! প্রজাদের আলোচনা রোববার সত্যি প্রমাণিত হলো। রাজবন্দি হয়ে এলেন তিনি প্রকাশ্যে। ক্যাসিনো মুঘল সম্রাট আগেকার দিনের মুঘল, রাজা, বাদশাহ, নবাবদের মতোই রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। মুঘল কিংবা নবাব, রাজা কিংবা  বাদশাদের আমল বিলুপ্ত হয়েছে বহু আগেই। কিন্তু সেই আমলকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন ক্যাসিনো মুঘল সম্রাট। ফেনীর ইসমাইল একসময় সম্রাট হয়ে যাওয়ার কাহিনী আরব্য রজনীকেও হার মানিয়েছে। সেই যুগের মুঘল, নবাবদের মতোই দিন যাপন করেছে এ যুগের মুঘলে আজম সম্রাট। রাজা, বাদশাহ, মুঘল, নবাবরা বৈধভাবে খাজনা আদায় করতেন বছরের একটা সময়।
কিন্তু এ যুগের মুঘলে আজম সম্রাট খাজনা পেতেন প্রতি রাতে। এক, দুই টাকা নয়। লাখে লাখে। কাকরাইলের যে ভবনে তার অফিস সেখানেই সম্রাট বসাতেন দরবার। রাজ দরবারের আদলে সেই দরবারে হাজির হতো বিভিন্ন সেক্টরের লোকজন। সম্রাটকে খাজনা দিয়ে ফিরতেন বাড়ি। সন্ধ্যার পর এ ভবনেই ভিড় জমাতো তার জগতের উজির নাজির আর পাইক পেয়াদারা। সম্রাট এ ভবনে তার দরবার বানানোর পরই ভয়ে ভবনের অন্যরা একে একে ভবন ছেড়ে চলে যান। শূন্য এ ভবন দখল করে নেন সম্রাট। তার প্রতিদিনের খাজনা কেউ না পৌঁছালে নেমে আসত খড়গ। ডেকে এনে এ ভবনের টর্চার সেলে চালানো হতো নির্যাতন। এভাবেই ফেনীর ইসমাইল হোসেন হয়ে উঠেন সম্রাট। আর নিজেকে ভাবতে থাকেন মুঘলে আজম। গোটা রাজধানীজুড়ে তার পোস্টার, ব্যানার থাকত সারা বছরই। যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হয়ে তার জীবনই পাল্টে যায়। চাঁদাবাজি তার মূল পেশা। আর মূল নেশা ছিল জুয়া। বস্তায় টাকা নিয়ে তিনি দেশের বাইরে চলে যেতেন ক্যাসিনো খেলতে। অবাক বিস্ময়। অসীম ক্ষমতাধর একজন রক্ত মাংসের মানুষ হয়েও ইসমাইল নামের পাশে যোগ হয় সম্রাট। গডফাদার। এই নামটির প্রতি জন্মে প্রজাদের আতঙ্ক। ভয়। নির্মম নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে উঠেন সম্রাট। ১৯৬৯ সালে ইতালিয়ান মাফিয়া পরিবার নিয়ে উপন্যাস লেখেন মারিয়ো পুজো। বিখ্যাত লেখক তিনি। সে সময় তিনি দ্য গডফাদার উপন্যাসে তুলে ধরেন, গডফাদার কর্লিয়নি পরিবারের কাহিনী।
ডন ভিটো কর্লিয়নি গডফাদার নামে পরিচিত। তার মাধ্যমেই কর্লিয়নি পরিবারের উত্থান। গডফাদার কিংবা ডন বলতে তিনিই। কর্লিয়নি পরিবারের আরো এক জন সদস্য আছেন, যিনি কর্লিয়নি পরিবারের দুর্দিনে সাহায্যের দূত হিসেবে আর্বিভুত হয়েছিলেন। তিনি ডন মাইকেল। মাফিয়া একটি আলাদা জগত। ওই উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন, যতই এর ভিতরে প্রবেশ করা হয়, ততই বিস্মিত আর শিহরিত হতে হয় এর ভয়ানক রূপ দেখে। এ উপন্যাসে শেষ পরিণতি দেখানো হয়, প্রতিপক্ষের গুলিতে গডফাদারের যবনিকা। বাংলাদেশে এমন ভয়ানক গডফাদার কালচার চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু নির্মমতার দিক দিয়ে এরশাদ শিকদার এগিয়ে। মুঘলে আজম সম্রাট ক্ষমতার বলয়ে থেকে সম্রাট হওয়ায় মানুষ মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছিল।
কিন্তু এখন বন্দি হওয়ায় অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছে। নিজের সম্রাজ্য রক্ষা করতে গিয়ে হেন কাজ নেই করেন না এসব সম্রাটরা। হেরেমখানা থেকে শুরু করে সবকিছুই তাদের হাতের নাগালে। মদ, সুরা সবই তাদের সঙ্গী। ইশারায় মেলে নারী সঙ্গ। ক্যাসিনোকাণ্ড একটি বিষয় স্পষ্ট করে গেছে। আগেকার সম্রাটরা তাদের প্রজাদের কল্যাণে কাজ করতেন দিন রাত। বিশাল সম্রাজ্য রক্ষা করতে চৌকশ ও বিশ্বস্থ সেনাপতি ছিল। তাইতো সেই সব সম্রাটরা আজো গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে ইতিহাস হয়ে আছেন। আর এখনকার সম্রাটরা প্রতিটি পাড়া মহল্লা, ব্যবসা, বাণিজ্যকে সেক্টরে ভাগ করে। সেখানে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় খাজনা। যা প্রতিরাতে পৌঁছে দিতে হয় সম্রাটদের দরবারে। এ টাকা দিয়ে তারা করেন ফূর্তি। কিন্তু এসব সম্রাটদের পরিণতি হয় ভয়াবহ। কারো কারো ভাগ্যে ঘটে করুণ পরিণতি। কেউ কেউ প্রতিপক্ষের গুলিতে প্রাণ হারায়। কেউ কেউ গুম হয়ে যায়। চোখের সামনে এসব দেখেও কেউ শিক্ষা নেয়না। তাইতো বলা হয়, ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো- ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

অস্ত্র ও মাদক আইনে দুই মামলা: সম্রাটের উজির নাজির কারা? by রুদ্র মিজান ও মোহাম্মদ ওমর ফারুক

ঢাকার অপরাধ সাম্রাজ্যের ডন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের অবৈধ টাকার উৎস এবং এই টাকার ভাগ কারা নিয়েছেন তা তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার অবৈধ আয়ে যারা ভাগ বসিয়েছেন, মাসোহারা নিয়েছেন তারা আছেন এখন আতঙ্কে। ইতোমধ্যে তার আস্তানা থেকে একটি নথির সন্ধান পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ওই নথিতে অনেক রাঘব-বোয়ালের নাম রয়েছে। প্রতিমাসে কাকে কত টাকা দিতেন সেই হিসাবও আছে নথিতে। সম্রাটের অন্যতম সহযোগী খালেদ মাহমুদ ভুইয়াও ওইসব রাঘববোয়ালদের নিয়মিত অর্থ দিয়ে আসছিলেন। প্রতি রাতেই কোটি কোটি টাকা জমা হতো সম্রাটের দরবারে। সন্ধ্যা হলেই কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনের চতুর্থ তলায় হাজির হতেন তার অপরাধ সম্রাজ্যের হোতারা।
বস্তায় ভরে নিয়ে যেতেন টাকা। প্রতিদিনই এসব টাকা ভাগ বাটোয়ারা হতো। ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্য, কোরবানির পশুর হাট, সিটি করপোরেশন মাকের্টে অবৈধ দোকান এরকম বিভিন্ন উৎস থেকেই কমিশন পেতেন অপরাধ সাম্রাজ্যের মুকুটহীন এই সম্রাট। টাকা পেতেন আবার একটি পক্ষকে টাকা দিতেনও তিনি।
টাকা নিতে অনেকেই ধর্না দিতেন সম্রাটের দরবারে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি রয়েছেন। তবে কোনো কোনো ব্যক্তিকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠানো হতো প্রতি মাসের শেষের দিকে। টাকা পাঠাতে দেরি হলে তারা নিজেরাই যোগাযোগ করতেন। প্রথম সারির কয়েক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে টাকা পাঠানো হতো বিভিন্ন সেক্টরে। এমনকি দেশের বাইরে অবস্থান করা নেতা ও সন্ত্রাসীদেরও টাকা পাঠাতেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজির টাকা সঙ্গী, অনুসারীদের মধ্যেই বিলিয়ে দিতেন তিনি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। গ্রেপ্তারের পর গতকাল রমনা থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করেছে র‌্যাব।
তার আগে রোববার ভোরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন যুবলীগের এই নেতা। গ্রেপ্তারের পর থেকেই একপর্যায়ে অনুশোচনায় ভোগেন তিনি। কান্নাও করেছেন একাধিকবার। নিজের অপরাধের জন্য তার সঙ্গীদের দায়ী করেছেন। এমনকি দলের অনেক সিনিয়র নেতাদেরও দায়ী করেছেন সম্রাট। সম্রাট দাবি করেছেন, তার হাত থেকে টাকার ভাগ নিয়েছেন অনেকেই। এমনকি দলীয় সভা-সমাবেশে বিপুল টাকা ব্যয় করতেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, ‘পোলাপান’ সংগ্রহ করতে টাকা লাগে। তাদের হাত খরচ দিতে হয়। তাদের পরিবারের প্রয়োজনেও টাকা দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে টাকা দিতেন তিনি। আবার কর্মীদের মধ্য থেকেই অনেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা নিয়ে হাজির হতো তার কাছে। অবৈধ নানা ব্যবসা, দোকান, ফুটপাত দখল থেকে টাকা আসতো। বড় অঙ্কের টাকা আসতো ক্যাসিনো ও মাদক থেকে। সম্রাটের অনুসারীদের অনেকেই সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, এমনকি তার এই সিন্ডিকেটে সংসদ সদস্যও রয়েছেন।
তার এই অবৈধ টাকার লেনদেনের হিসাব রাখতেন যুবলীগের দক্ষিণের এক নেতা। তবে টাকা লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। কয়েক মাস আগে থেকে টাকার লেনদেন নিয়েই সম্রাটের সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টি হয় খালেদের। সম্রাটের অবৈধ আয়ের একটা বিরাট উৎস নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকা দক্ষিণের নয় নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজী এ কে এম মমিনুল হক সাঈদসহ আরো কয়েকজন কমিশনার। সূত্রমতে, সম্রাট স্বীকার করেছেন তার রয়েছে বিশাল ক্যাডার বাহিনী। মূলত তার ‘পোলাপানরা’ই বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে। অনেকক্ষেত্রেই দলের সভা-সমাবেশের অজুহাতে সংগ্রহ করা হতো। এছাড়া মতিঝিল, পল্টন, কমলাপুর, ফকিরাপুল, কাকরাইল এলাকায় কেউ ভবন নির্মাণ করতে গেলেই সম্রাটকে দিতো হতো মোটা অঙ্কের টাকা। ঢাকার বিভিন্নস্থানে ভবন, ফ্ল্যাট দখল করছে তার বাহিনী।
সম্রাটের অনুসারীদের নামে অভিযোগ করার সাহস পেতো না কেউ। র‌্যাবের কাছে সম্রাট জানিয়েছেন, তাকে অনেকেই ভয় পেতো। তিনি কখনও ভাবতে পারেননি তাকে এভাবে গ্রেপ্তার করা হবে। ঝামেলা এড়াতে নিজের দলের প্রভাবশালী নেতা থেকে শুরু করে উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত চাঁদা দিতেন তিনি। সরকার পরিবর্তন হলে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা ছিলো তার। বিদেশে কয়েক নেতাকে বড় অঙ্কের টাকা পাঠাতেন সম্রাট। সূত্রেমতে, মমিনুল হক সাঈদ ও এনামুল হক আরমানকে নিয়ে প্রায়ই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া যেতেন তিনি। সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনোতে খেলতেন সম্রাট। তবে তিনি কোথায় টাকা রাখতেন এ বিষয়ে বিস্তারীত তথ্য পায়নি র‌্যাব। ধারণা করা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়াতে টাকা পাঠাতেন সম্রাট।
অন্তত ১০টি ক্যাসিনোর পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিলো সম্রাটের হাতেই। ক্যাশিয়ার হিসেবে একেক ক্লাব থেকে একেকজন টাকা তুলতো। মতিঝিল ক্লাব পাড়া থেকে প্রতিদিন উঠতো ৩০-৩৫ লাখ টাকা। ক্যাশিয়ার ছিল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও নয় নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। অন্যান্য ক্যাসিনোর ক্যাশিয়ার ছিলো, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়া, বহিস্কৃত সহ-সভাপতি আরমানসহ আরো কয়েকজন।
পল্টনের জামান প্রীতম টাওয়ার থেকে প্রতিদিন আয় হতো ১০ লাখ টাকা। মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ ভবন নিয়ন্ত্রণ করত খালেদ ভূঁইয়া। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের সঙ্গে রয়েছে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ওই কমিটিতে বেশ প্রভাব ছিলো সম্রাটের। মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের বর্তমান এক শীর্ষ নেতা এবং আগের কমিটির এক শীর্ষ নেতা মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত।
অপরাধ সাম্রাজ্যের এই মুকুটহীন সম্রাট ও তার সহযোগী যুবলীগ নেতা আরমানকে রোববার ভোরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তারের পর সম্রাটকে নিয়ে কাকরাইলে তার অফিসে অভিযান চালানো হয়। এসময় ক্যাঙ্গারুর চামড়া সংরক্ষণের দায়ের তাকে ছয় মাসের কারাদন্ড দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত। একইভাবে গ্রেপ্তারের সময় মাদকসেবনরত অবস্থায় থাকা আরমানকেও ছয় মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়। ওই দিনই তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল রমনা থানায় অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, দায়েরকৃত মামলায় সম্রাটের রিমান্ড চাওয়া হবে। সম্রাটের অবৈধ অর্থের উৎস, ক্যাসিনোর টাকা কোথায় যেতো, দেশের বাইরের অর্থপাচার হতো কি-না তা খোঁজা হবে। বিদেশে অর্থপাচারের ব্যাপারে কিছু তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

অসামান্য বালিশ ও ক্যাসিনো কেস by কাজী জেসিন

কাজী জেসিন
পুরোটাই লুটপাটের টাকায় জুয়াখেলা। ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো চলে আসছে বছর বছর ধরে। সাধারণ মানুষ কেউ কিছুই জানে না। কিন্তু, কিছু মানুষ না জানলে তো ক্যাসিনো ক্লাবগুলো তার গ্রাহক পেতো না, কোটি কোটি টাকা আয় হতো না, মজুদ হতো না ভরি ভরি সোনা। ক্যাসিনো থেকে সর্বস্ব হারিয়ে কেঁদে বের হয়ে যাওয়া মানুষের চোখের জল আশেপাশের মানুষ দেখেছে। তবু রাষ্ট্রের নজরে আসেনি। রাষ্ট্রতো অন্ধ না। রাষ্ট্রের চোখ আছে।
যে রাষ্ট্র ডিজিটাল তার তো চোখ, নাক, কান আরও সুতীক্ষ্ণ। যখন তখন সে রাষ্ট্র নামের কারিগর যার-তার ফোনে আড়ি পাততে পারে,  যখন খুশি যে কারো সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়তে পারে। ডিজিটাল রাষ্ট্র বলে কথা। কিন্তু এই রাষ্ট্র গত দশ-বারো বছরে কোথায় কিভাবে ক্যাসিনো চলেছে তা দেখতে পায়নি। তাহলে এখন দেখতে পেলো যে! কী অদ্ভুত!
সাধারণ মানুষ বিগত বছরগুলোতে দেখে এসেছে কিভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার বাণিজ্য নিজেদের আয়ত্তে নিতে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে কখনও কখনও হানাহানি, মারামারি এমন কি খুন পর্যন্ত করেছে। যুবলীগ, ছাত্রলীগের টেন্ডার নিয়ে একের পর এক সংঘর্ষ, হত্যা বাংলাদেশের মানুষের সামনে একটা অতি পরিচিত চিত্র। সরকারি দল ও তার অঙ্গ সংগঠন সংবিধান লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতির মহাউল্লাস চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ইউনাইটেড নেশানস কনভেনশান এগেইন্সট করাপশান (টঘঈঅঈ) এর অনুসমর্থনকারী দেশ। দূর্নীতি নির্মূলের জন্য ’ফৌজদারী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রতিকার ছাড়া ও দুর্নীতির ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে’ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এই কনভেনশানে। শুধু তাই নয় আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে ও জনগনের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতিতে বার বার উল্লেখ করেছে দুর্নীতি নির্মূলের কথা, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে এক অস্বাভাবিক দুর্নীতির খেলা, যেখানে সরকারি কাজের টেন্ডারে বালিশের মূল্য ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার নয় শত সাতান্ন টাকা, তিরিশটি বিছানার চাদর আনতে ট্রাক ভাড়া তিরিশ হাজার টাকা। কী অসামান্য বালিশ! কী অসামান্য চাদর! শুধু বালিশের মূল্যই নয়, আমরা দেখেছি সড়ক নির্মাণেও অনান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যয় কয়েকগুণ। উন্নত দেশগুলোতে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে গড় ব্যয় হচ্ছে ৩১ কোটি টাকা। বাংলাদেশে ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৭৩ কিলোমিটার রেলপথের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৩ কোটি টাকা। চট্রগ্রামের দোহাজারি থেকে বান্দরবনের ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটার ব্যয় ১৩৯ কোটি টাকারও বেশি। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সিঙ্গেল লাইনের রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারে গড় ব্যয় ১২ কোটি টাকা। চীনে সিঙ্গেল রেলপথ নির্মাণে গড় কিলোমিটার ব্যয় ১২ কোটি ৫০ লাখ ও ২০০ কিলোমিটার গতিবেগের রেলপথ নির্মাণে গড় ব্যয়৭৫ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাপত্রের তথ্যমতে, উন্নয়নশীল দেশে সড়ক নির্মাণের খরচ বাড়ার কারণের মধ্যে রয়েছে বাজার থেকে সড়কের দূরত্ব, দরপত্রের প্রতিযোগিতা না হওয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, সংঘাত ও উচ্চমাত্রার দুর্নীতি। দুর্নীতির মহোৎসব বাংলাদেশে নতুন কিছু না। বর্তমান সরকার দুর্নীতি রোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মূলত উলটা, দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছে।
যে দেশে ৪৭.১% মানুষ দারিদ্রসীমা এবং ২৪.৬% মানুষ চরম দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে, যে দেশে এখনও মানুষ খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভোগে সেই দেশে সরকারদলের একজন মাঝারি সারির নেতার ঘরে পাওয়া যায় প্রায় দুই কোটি টাকা, পৌনে দুইশত কোটি টাকার এফডিআর। তিনি শুধু ক্ষমতা দেখিয়ে টেন্ডার সন্ত্রাসের মধ্য দিয়েই অর্থ উপার্জন করেন নি, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় প্রশাসনের নাকের ডগায় চালিয়ে এসেছেন ক্যাসিনো বাণিজ্য। এর আগে অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে যুবলীগের আরেক নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে আটক করা হয়। নানান তালবাহানার পর অবশেষে গত রোববার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে বলে বলা হচ্ছে ক্যাসিনো সম্রাটখ্যাত সদ্য বহিষ্কৃত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সহসভাপতি আরমানকে। প্রশাসন কি হঠাৎ করেই ক্যাসিনো আবিষ্কার করেছে? নিশ্চয়ই তা নয়। বছরের পর বছর ধরে যেখানে ক্লাবগুলোতে চলছে ক্যাসিনো, যেখানে মানুষ খেলতে যাচ্ছে, বহু মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরছে, যেখানে এই দৃশ্য আশপাশের সাধারণ মানুষ সকলেই দেখছে, প্রশাসনের চোখে পড়েনি একথা একেবারেই ভিত্তিহীন। ক্যাসিনো খেলতে যে সরঞ্জাম লাগে তা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে। কাস্টমস এর নাকের ডগা দিয়ে এই সব অবৈধ খেলার সরঞ্জাম কি করে দেশে ঢুকলো এর জবাব কে দেবে? আজ বা্‌ংলাদেশ যে দুর্নীতির দুষ্টচক্রে ঢুকে পড়েছে সেখান থেকে দেশকে, দেশের মানুষকে উদ্ধার করতে হলে এর মূলে যেতে হবে।
বিভিন্ন সময় সরকারদলের ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নানাবিধ ফৌজদারী অপরাধে জড়ালে ও সরকার শুধু ক্ষোভ প্রকাশ আর বিব্রতই বোধ করেছে। দু্‌’একটা ঘটনা ছাড়া মানুষ চাঁদাবাজ, টেন্ডারসন্ত্রাস, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের বিচার হতে দেখেনি। দরপত্র ছিনিয়ে নিয়ে ঠিকাদারকে মারধরের ঘটনায় সাধারণ মানুষ হয়ত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয় কিন্তু আর অবাক হয় না। ছাত্রলীগ, যুবলীগের টেন্ডারসন্ত্রাস থেকে রক্ষা পায়নি এমন কি সাধারণ মানুষও। মনে পড়ে রাব্বির কথা। ২০১৩সালের ১৯ জানুয়ারি আধিপত্য বিস্তার, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি নিয়ে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের দুই গ্রপের গোলাগুলিতে পাশের গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের ১০ বছরের শিশু রাব্বি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এমনকি নিজদলের নেতাকর্মীদের হীন স্বার্থে খুনের ঘটনা বারবার জাতীয় দৈনিকগুলোর খবর হয়েছে। আইনের শাসন জারি থাকলে,  প্রশাসন তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে,  বলাবাহুল্য সরকারি দলের কোনো নেতাকর্মী, ছাত্রলীগ, যুবলীগের গায়ে সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজের তকমা লাগতো না।
কিন্তু প্রশাসনকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হলে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হয়। বর্তমান সরকার পরপর দুটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, সাধারণ মানুষকে তাদের সাংবিধানিক ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ক্ষমতায় আছে। কোনো দল যখন মানুষের ভোটের উপর আস্থা রাখতে না পারে, তখন ক্ষমতায় আসার জন্য তাকে নির্ভর করতে হয় প্রশাসনের অনৈতিক, অসাংবিধানিক সহযোগিতা, পেশীশক্তি এবং জাল ভোটের উপর। জালভোটের মধ্য দিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকার সাধরণত: আটকে যায় অনাকাঙ্খিত সব নির্ভরতার জালে। তখন সেই সরকার জনগনকে তুষ্ট না করে তুষ্ট করতে বাধ্য হয় নানারকম পেশীশক্তিকে। আইনের শাসনহীনতার এক অশুভ দুষ্টজালে আটকে যায় সরকার। বাংলাদেশ সরকার এমন উদাহরণ থেকে ব্যতিক্রম নয়। সুষ্টু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগনের পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেই রুল অব ল প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না তবু একটি নির্বাচিত সরকারই নিয়মতান্ত্রিক শাসনের প্রথম শর্ত। সুতরাং দুর্নীতি নির্মূল করতে হলে, জনগনের কাছেই সরকারকে ফিরতেই হবে। জনগনের ভোটে নির্বাচিত একটি শক্তিমান স্বনির্ভর সরকারই পারবে দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করতে।
একের পর এক দুর্নীতির কালিমা সরকারকে এমনভাবে কালিমাময় করেছে, প্রশাসন যখন ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো অভিযান চালাচ্ছে তখন, সারাদেশে গুঞ্জন চলছে কেন হঠাৎ এই অভিযান। প্রশাসন দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজ শাসক দলের ভিতরেই অভিযান চালাবে এটা যেন অবিশ্বাস্য, অথচ অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, এটাই জনমানুষের সবসময় কাম্য। সরকার সবসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সজাগ থাকবে, একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করবে এটাইতো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ। অথচ সোশ্যাল নেটওর্য়াক খুললেই দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নানান জল্পনা-কল্পনা। এই নিয়ে বিবিসি রিপোর্ট করেছে,’শেখ হাসিনা কেন হঠাৎ ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে’ সজাগ হলেন। উল্লেখ্য ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে’ শব্দযুগলকে এই রিপোর্টে কোড করা হয়েছে অর্থাৎ এই অভিযানকে বিবিসি হয়তো এখনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান বলতে নারাজ। কারণ কী হতে পারে এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিবিসি আমাদের জানাচ্ছে এই অভিযানের পেছনে দল এবং সরকারকে রক্ষার কোন চেষ্টা থাকতে পারে। ‘অপরাধে জড়িতদের সতর্ক করা হয়েছিলো ’উল্লেখ করে বিবিসি জানাচ্ছে, ”শেখ হাসিনা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে পরিস্থিতি যাচাই করে অভিযান চালানোসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’’
অর্থাৎ সরকার একরকম বাধ্য হয়ে একটানা তৃতীয় মেয়াদে এসে কতিপয় দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাও আবার ব্যাবস্থা গ্রহনের আগে অপরাধীদের সর্তক করা হয়েছিলো। সরকার যে এই অভিযানেও কতোটা ইতস্তত তা অনুমান করা যায় ক্যাসিনো সম্রাটখ্যাত সম্রাটকে গ্রেফতারে টালবাহানা দেখে। শুধুমাত্র এই ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান নয়, সরকারকে তার ভাবমূতি উজ্জ্বল করতে চাইলে রাষ্ট্রের বিভিন্নস্তরে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি, অপকর্ম রোধ করতে হবে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাছে ফিরে গিয়ে মানুষকে তার হারিয়ে যাওয়া ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। জনমানুষের অধিকার সমুন্নত রাখার মধ্য দিয়েই শুধুমাত্র একটি সরকার জনপ্রিয় থাকতে পারে। কোনো চাপের মুখে নয় সরকার সংবিধান মেনে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করুক, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করুক, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করুক, এটাই সাধারণ মানুষের কাম্য। ক্লাবে ক্যাসিনো চলেছে, বাংলাদেশের আপামর সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে যেন কোন ক্যাসিনো না চলে, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন যখন এতদিন পর দেখতে পেলো অসাংবিধানিকভাবে চলে আসা এই ক্যাসিনো বাণিজ্য, তখন এই চোখ খোলা থাকুক, সকল অপরাধই রাষ্ট্রের চোখে ধরা পড়ুক। কারণ, অন্ধ হলেই বন্ধ হবে না প্রলয়।
>>>লেখক: সাংবাাদিক, উপস্থাপক

বুয়েট ভিসি, অনেক প্রশ্ন by রোকনুজ্জামান পিয়াস

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আরবার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের দেড় দিন পার হয়েছে। কয়েক দফা জানাজা শেষে লাশ দাফনও হয়ে গেছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম এখনও পর্যন্ত ঘটনাস্থলে আসেননি। আবরারের দাফনেও অংশ নেননি। দেখা তো দূরের কথা, কথা বলেননি আবরারের অভিভাবক, স্বজন বা সহপাঠিদের সঙ্গে। তাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না।
যদিও শুরুতে বলা হয়েছিলো তিনি অসুস্থ। তাই তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি।
কিন্তু সময় গড়িয়েছে, আর হত্যার লোমহর্ষক সব কাহিনী বেরিয়ে এসেছে, পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর গন্ডি পেরিয়ে আবরার রাষ্ট্র হয়ে গেছে। দলমত নির্বিশেষে ফুঁসে ওঠেছে সারাদশের ছাত্রসমাজ। দেশ ছাড়িয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমজুড়ে আবরার বন্দনা আর ভালোবাসায় শোকাভিভূত, ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদ মুখর মানুষ। ঘৃণার বিষবাষ্প ছুঁড়ে দিয়েছে খুনীদের প্রতি। অথচ তখনও নিবর ভিসি সাইফুল ইসলাম।
স্বয়ং ছাত্রলীগ খুনের ঘটনায় জড়িত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, বহিস্কার করেছে, শাস্তি চেয়েছে, কিন্তু সাড়া মেলেনি ভিসির। তখনও চুপ, নির্লিপ্ত তিনি। প্রয়োজন মনে করেননি ঘটনাস্থলে যাওয়ার, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার, আবরারের অভিভাবক-স্বজনদের সান্তনা দেয়ার। ফোন করে খোঁজ-খবর নেয়ার সাধারণ সৌজন্যবোধটুকুও নেই তার। ধরেননি ফোনও।
এক মায়ের সন্তান আবরার এখন লক্ষ মায়ের। আবরারের পিতার চোখের পানি গড়িয়েছে লক্ষ পিতার চোখ হয়ে। আবরার এখন আর এক পরিবারের নেই। অসংখ্য পরিবার তার, সারাদেশের ছাত্রসমাজ তার সহপাঠি, ভাই, বন্ধু। অথচ যার অভিভাবকত্বে উচ্চশিক্ষার এই বিদদ্যাপীঠে পা রেখেছিলেন আবরার, সেই ভিসির টিকিটিও পায়নি ছাত্ররা।
প্রশ্ন ওঠেছে তাহলে তিনি কোথায় আছেন? আর কেনই বা তার এই নির্লিপ্ততা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, একজন ভিসি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। শিক্ষার্থীরা বিপদে-আপদে তার কাছেই যাবেন। তিনিও ছুটে আসবেন তাদের দুঃসময়ে। সমাধান দিতে না পারেন, অন্তত: সান্তনার বাণী শুনাবেন, সহানুভূতি জানিয়ে ছাত্রদের পাশে থাকবেন, ব্যথিত হবেন। কিন্তু তিনি যেনো একেবারে অজ্ঞাত কোন স্থানে চলে গেছেন।

গতকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে ভিসিকে আশা করছিলেন। তার মুখ থেকে বিচারের আশ্বাস শুনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেটি আর চাওয়া নেই, হয়ে গেছে পূর্ণাঙ্গ দাবি। ঘটনাস্থলে না আসার জবাবদিহিতা। কিন্তু এরপরও আসেননি ভিসি সাইফুল।
এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন আজ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে। আর এসেই তোপের মুখে পড়েন শিক্ষার্থীদের। প্রশ্নবানে জর্জরিত হন। ভিসিকে না পেয়ে শিক্ষার্থীরা সকল রাগ-ক্ষোভ উগরে দেন তার ওপর। শিক্ষার্থীরা জানতে চান, আপনি কোথায় ছিলেন? হলে পুলিশ আসলো কি করে? ইত্যাদি। এর সঠিক জবাব তিনি দিতে পারেননি। এরপরই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগের আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীদের জেরার মুখে ভিসি কোথায় আছেন তা জানেন না বলে জবাব দেন।
ভিসিকে ফোন দেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক। কয়েকবার ফোনে বিজি পান। এরপর তার (ভিসি) ফোন বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা ভুয়া ভুয়া বলে আওয়াজ তোলেন।
তবে মিজুনুর রহমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্র রাজনীতি থাকার প্রয়োজন নেই। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আশ্বাসও দেন তিনি।
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। আন্দোলনকারীরা ভিসিকে স্বশরীরে হাজির হয়ে জবাবদিহি করার জন্য বিকাল ৫টা পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছেন।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন বুয়েট ভিসি। এ কারণে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে যাননি, তবে যাবেন। আজ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক ইস্যুতে ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
শিক্ষকরা দাবি করেছেন, ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম সুস্থ্য রয়েছেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চলমান ক্যাম্পাস পরিস্থিতি নিয়ে তার বাসায় আলোচনাও হয়েছে। সেখানে শিক্ষকরা ক্যাম্পাসের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান। বলেন, ভিসি স্যার সুস্থ্য, তবে তিনি আন্দোলন কিভাবে সামাল দেবেন সে ব্যাপারে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্ধে রয়েছেন।

মায়ের মন: এ লাশ আমি বহন করতে পারবো না by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

মা’র কাছে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপহার ছিলেন আবরার ফাহাদ। তাকে হারিয়ে পাগলিনী মা রোকেয়া খাতুন। মুহুর্মূহু মুর্ছা যাচ্ছেন তিনি। তাকে সান্তনা দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন সবাই। কে কাকে সান্তনা দেবেন, সবাই অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আত্মীয়-স্বজন, গ্রামবাসী, এলাকার মানুষ, জানা না জানা অসংখ্য মানুষ। সবার হৃদয়ে আবেগ উথলে উঠছে। তার প্রকাশ ঘটছে কান্নায়।
এ এক বীভৎস দৃশ্য বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের অন্যতম বিদ্যাপীঠ বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের গ্রামের বাড়িতে। জন্ম নেয়ার পর তাকে যত মানুষ দেখতে এসেছিলেন, তার চেয়ে শতগুন মানুষ ভিড় করেছেন। রোকেয়া খাতুন চেতনা ফিরে পেতেই আহাজারি করছেন। আছড়ে পড়ছেন। চিৎকার করছেন। বিমর্ষ হচ্ছেন। তিনি কাঁদছেন কেন! তার সন্তান ঘরে ফিরেছে। আনন্দ করার কথা তার। এটা ওটা হাজির করার কথা সন্তানের জন্য। অথচ তিনি শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। সোমবার তার সন্তান ঘরে ফিরেছে কাঠে তৈরি কফিনে। নির্বাক। এমন ছেলেকে তো তিনি একদিন আগে বিদায় দেন নি। তার ছেলে তো মা বলে বাড়ির বাইরে থেকে ডাক দেয় নি। কেন? তার এ প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছে। শুধু আছে চারদিকে কান্নার আওয়াজ। বুকফাটা আর্তনাদ। এমন পরিবেশের জন্য, সন্তানের এই পরিণতির জন্য কি তিনি জীবনভর স্বপ্ন দেখেছেন! সব পিতামাতার মতো তিনি সন্তানকে বড় করেছেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্ন ঘরে ফিরেছে লাশ হয়ে। তিনি তাকে কোথায় রাখবেন!
কুষ্টিয়ার পিটিআই রোডে আবরার ফাহাদের বাড়িতে মা রোকেয়া খাতুনের এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য। চেতনা ফিরতেই তিনি চিৎকার করছেন, আমার সন্তানকে জীবিত ফিরিয়ে দাও। আত্মীয়রা তাকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সবার একই অবস্থা। আবরার ফাহাদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তাকে রোববার দিবাগত রাতে ফেসবুকে একটি পোস্টের কারণে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে। কিন্তু তাতে কি মা রোকেয়ার মন শান্ত হবে! তিনি কি তার উজ্বল আলোয় আলোকিত এই সন্তান আর ফিরে পাবেন! যে স্বপ্নের দুনিয়া তাকে নিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন, সেখানে এখন শুধুই দুঃস্বপ্ন। চিৎকার করে বলছেন, আমাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করো না। এই লাশ আমি বহন করতে পারবো না।
রোকেয়া খাতুন একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা। দু’ছেলের গর্বিত মা। বলেন, আমার ছেলে আমার কাছে আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। দুটি ছেলেকে বড় করতে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নি আমাকে। আবরার সব সময়ই ক্লাসে প্রথম হতো। নিজে নিজেই বিড়বিড় করে এসব বলছেন তিনি। তিনি বলছেন, আমার সন্তানকে কোথায় এবং কিভাবে পাবো। চেয়ারে বসে এসব বলতে বলতে তিনি বেশ কয়েকবার মুর্ছা যান।
তার ছোট ছেলে সাব্বির ফাহাদ ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। স্বামী বরকত উল্লাহ ব্র্যাকের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা। সোমবার সকালে অকস্মাৎ আত্মীয়-স্বজনরা তার বাড়িতে আসতে থাকেন। একদিনে কেন এত আত্মীয়-স্বজন তার বাড়িতে যাচ্ছেন তা তিনি তখনও বুঝতে পারেন নি। জানেন না তার প্রাণের ধন আবরার ফাহাদ আর নেই। আর কোনোদিন তাকে মা বলে ডাকবে না। আত্মীয়রা তাকে এ খবর জানাতেই যেন প্রলয় শুরু হয়।
আবরারের সঙ্গে রোকেয়া সর্বশেষ ফোনে রোববার বিকাল ৫ টায় কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সে আমাকে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে পৌঁছেছে। তারপর রাত ৯টার পরে তিনি অনেকবার তাকে ফোন করেছেন। কিন্তু সেই ফোন আর রিসিভ করতে পারেন নি আবরার। রোকেয়া বলেন, সোমবার ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করতে উঠে পড়ি। দেখি আবরারের বাবা কাঁদছেন। জানতে চাইলাম, কাঁদছো কেন। তিনি বললেন, ছেলের হল থেকে কেউ একজন ফোন করেছিল এবং বলেছে, কিছু সমস্যা হয়েছে। তাই তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা যেতে হবে।
আবরার তার ছোটভাইকে সঙ্গে নিয়ে ২৪ শে সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার বাড়ি যান। অক্টোবরের ২০ তারিখ পর্যন্ত মা-বাবার সঙ্গে সেখানে অবস্থান করার পরিকল্পনা ছিল। এক আত্মীয় বলেন, কিন্তু একাডেমিক চাপ থাকায় রোববার সকালে আবরার ঢাকা চলে আসেন। শৈশব থেকেই তিনি ধার্মিক ছিলেন। তবে কখনোই ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আবরারের এক আঙ্কেল মিজানুর রহমান বলেছেন, তাদের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের সমর্থক। কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের বাড়ির পাশেই তাদের বাড়ি।
সন্তান হত্যার বিচার চান কিনা এ প্রশ্নে কিছুটা সময় নীরব রইলেন মা রোকেয়া। তারপর তিনি কান্না থামালেন। জানতে চাইলেন, কে তাকে ন্যায়বিচার দেবে। আমি চাই আমার ছেলেকে জীবিত ফিরিয়ে দাও। আমার ন্যায়বিচার দরকার নেই।

আবরারের স্বজন-সহপাঠীদের কান্না by মরিয়ম চম্পা

সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। মেধাবী ছাত্র আবরারের মৃত্যুতে যেন প্রকৃতিও কাঁদছে। ঢাকা মেডিকেলের মর্গের সামনে পানি জমেছে। বৃষ্টিতে ভিজে বন্ধুর নিথর দেহের জন্য মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন বেশ কয়েকজন। তাদের কেউ ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী কেউ বুয়েট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মর্গের সামনে আবরারের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। মামাতো ভাই জহিরুল ইসলাম প্রিয় ভাইটিকে হারিয়ে যেন বাকরুদ্ধ।
কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন। আবরারের মৃতদেহ নিয়ে আসা পুলিশ সদস্যদের চোখেও যেন একরাশ প্রশ্ন? নিষ্পাপ মুখটিকে কারা, কি কারণে হত্যা করলো। এসময় দুঃখ প্রকাশ করেন সিআইডি’র ক্রাইম সিনের এক সদস্য। বলেন, ছেলেটির মা-বাবা কতো বড়ই না একটি সম্পদ হারালেন। সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বন্ধুদের একটিই কথা, তার সঙ্গে এমনতো হওয়ার কথা ছিল না। আবরারের মামাতো ভাই মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আমি সকাল সোয়া ৫টার দিকে ফজরের নামাজ পড়তে উঠেছি। তখন মামা (আবরারের বাবা) আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল থেকে ফোন দিয়েছে। ফাহাদ (আবরার) এখন জরুরি বিভাগে আছে। হাসপাতাল থেকে বলেছে আত্মীয় স্বজন কাউকে যেতে। ওর মামা-কাকাদের কাউকে ফোনে পাচ্ছি না। তুমি একটু হাসপাতালে যাও’। মামার কাছ থেকে নাম্বারটা নিয়ে ফোন দিলে আমাকে জরুরি বিভাগে যেতে বলে। হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের ভর্তি তালিকা পরীক্ষা করে আবরারের নাম পাইনি। ইতোমধ্যে পুলিশের একটি গাড়ি এসে থামলে পায়ের আঙ্গুল দেখেই চিনতে পারি যে ও আমার মামাতো ভাই। পরবর্তীতে ওর গায়ের চাদরটি উল্টে দেখি ওর হাতে, পায়ে মারের চিহ্ন।
আবরার কখনো কোনো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না। ওর পিঠে, পায়ে এবং হাতে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন দেখেছি। ও এতো ভালো ছেলে ছিল যে কখনো কারো সঙ্গে উচু স্বরে কথা বলেনি। সে ছোট বেলা থেকে শান্ত স্বভাবের। এবং মেধাবী। কুষ্টিয়া জেলা স্কুল থেকে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে নটরডেম কলেজে ভর্তি হয়েছিল। সেখান থেকে সে ঢাকা মেডিকেলে চান্স পায়। কিন্তু মেডিকেলে পড়তে চায়নি। কারণ তার ইচ্ছা ছিল বুয়েটে পড়ার। পরবর্তীতে সে বুয়েটে ভর্তি হয়। তার হলের সহপাঠি এবং রুমমেটরা জানিয়েছে, রাতে তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। এবং পরবর্তীতে হলের কোনো একটি রুমে তাকে বেদম পিটানো হয়েছে। তাকে কেনো মারা হয়েছে সেটা আমরা বলতে পারবো না। আবরারের বন্ধুর বাবা শ্যামল হক জোয়ার্দার বলেন, আমার ছেলে আর আবরারের ছোট ভাই একসঙ্গে ঢাকা কলেজে পড়ে। এবং তারা দুজন একই রুমে থাকে। আবরার ওদের বড় ভাইয়ের মতো দায়িত্ব পালন করতো। সকাল (সোমবার) পৌনে ৭টায় আমি হাঁটতে বেরিয়েছি। এ সময় ছেলে ফোন দিয়ে বলে, ‘আব্বু, ভাইয়া (আবরার) মারা গেছে। ফেসবুকে দেখে আমি আবরারের ছোট ভাইকে ফোন দিয়েছি। তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে’। তখন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। সে ছিল অত্যন্ত ভদ্র ছেলে। সে কিভাবে মারা গেলো। ওর তো কোনো শত্রু থাকার কথা না।
বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং আবরারের ক্লাসমেট বলেন, আমি আহসানউল্লাহ হলে থাকি। আবরার থাকতো শেরেবাংলা হলে। পুজার ছুটি শেষে কুষ্টিয়া থেকে গত রোববার বিকাল ৫টায় সে হলে পৌঁছায়। রাতে তাকে শেরেবাংলা হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী ডেকে নিয়ে যায়। ওকে অনেক মেরেছে তারা। ভোর রাত ৪টায় আমি খবর পাই শেরেবাংলা হল থেকে একটি ছেলেকে মেরে ফেলে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে খোঁজ করে দেখি যে সে ফাহাদ আবরার। এটা যে কেনো হলো। এবং তাকে কেনো এভাবে মারা হলো এটা অনুসন্ধান করা দরকার। ওর সঙ্গে এমনটা হওয়ার কথা না। ও সারাদিন পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কারো সঙ্গে টাইমপাস বা ঘোরাঘুরিতে নেই। আমরা একই ডিপার্টমেন্টে পড়ি। কিভাবে এবং কেনো এমন হলো জানি না। আবরারের বন্ধু ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী বলেন, আমরা একসঙ্গে নটরডেমে পড়েছি। পরবর্তীতে আবরার বুয়েটে চান্স পেয়ে যায় আমি ঢামেকে। ও ছিল অনেক বেশি স্টাডিয়াস (পড়ুয়া)। আমাদের সঙ্গে আড্ডা কম দিত। কিন্তু এমন না যে সে অসামাজিক। যে কোনো দরকারে ওকে পাশে পাওয়া যেত। আমাদের বিভাগ থেকে নটরডেমে ওর রেজাল্ট প্রথম বা দ্বিতীয়তে থাকতো। সে ধর্ম কর্ম এবং নামাজ রোজার বিষয়ে একটু সিরিয়াস ছিল। তবে ধর্ম নিয়ে বাস্তবিক জীবনে বা ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায়নি কখনো। যতদুর জানি ওদের হলে এই ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কিন্তু সেগুলো লাইমলাইটে আসতে দেয়া হয় না। সামান্য কারণে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়া। দাঁত ফেলে দেয়া। অমানবিকভাবে মারধর করা। এটা মূলত হলের ছাত্রদের দ্বারাই সংঘটিত হয়ে থাকে।
মাওলানা ভাসানী হলের সাবেক এক শিক্ষার্থী এবং ছাত্রনেতা বলেন, হলের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। অতি উৎসাহি কিছু ছাত্র আছে যারা লাইমলাইটে বা আলোচনায় আসতে চায়। এবং পদ পজিশন পেতে এটা করে থাকে। ছোট ছোট পদ যেমন সহ-সম্পাদক ইত্যাদি পদ পেতে এবং প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারির নজরে আসার জন্য এগুলো করে। এখানে হয়তো তাদের ইনটেনশন ছিল আবরারকে পিটানো। আবরারের বন্ধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, ওর মতো ছেলে হয় না। ওর সঙ্গে কারোর বিরোধ নেই। দ্বন্দ্ব ছিল না। আমরা একই স্কুলে সহপাঠি ছিলাম। সে সবসময় পড়া লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। ওকে এভাবে মেরে ফেলা হলো কেনো জানিনা। ওর হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার চাই।
আরেক বন্ধু আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের বেশিরভাগ বন্ধুরাই এখন পুজার ছুটিতে কুষ্টিয়াতে আছে। আবরার গতকাল (সোমবার) বিকাল ৫টায় কুষ্টিয়া থেকে ছুটি কাটিয়ে ক্যাম্পাসে আসে। চলতি মাসের ২০ তারিখ তার পরীক্ষা। ওর সঙ্গে বুয়েটের কারো কোনো দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানা নেই। এমনকি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেনি এমন কোনো কথা। তাছাড়া হলে ওর কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। কারণ আবরার এই টাইপের ছেলে না। ও এতোটাই রুটিন মেনে চলতো যে প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করতো। পড়ালেখার পাশাপাশি সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রোজা নিয়মিত করতো। আমরা ওকে আড্ডা দিতে ডাকলে বলতো পড়া আছে। কারো আগে পিছে নেই সে। বন্ধু হিসেবে আমরা মজা করি। হাঁসি-ঠাট্টা করি। সে এসবের ধারে কাছে নেই। বর্তমান যুগের ছেলে হলেও সে ছিল অতি নম্র এবং ভদ্র। এদিকে, বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যুর কারণ বলতে গিয়ে নৃশংস নির্যাতনের বর্ণনা ওঠে এসেছে চিকিৎসকের জবানিতে। আবরারের ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান বলেন, আঘাতগুলো দেখে মনে হয়েছে ভোঁতা কোনো কিছু দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়েছে। এটি বাঁশও হতে পারে বা ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প। তার শরীরে হাতে, পায়ে এবং পিঠে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

ফেসবুকে যা লিখেছিলেন আবরার
একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। যাতে ছিল সাম্প্রতিক একটি ইস্যুতে ব্যক্তিগত বক্তব্য। ওই পোস্টের জের ধরেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদের ওপর নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের পিটুনিতে নির্মমভাবে নিহত হন আবরার। গতকাল দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় ছিল আবরারের সেই স্ট্যাটাস।
আবরারের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-
১. ৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো।
বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মোংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।
৩. কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

বিদেশী মিডিয়ায় ফাহাদ হত্যাকাণ্ড: ভারতের সঙ্গে পানি-চুক্তির সমালোচনা করায় বুয়েটছাত্র হত্যা, বিক্ষোভ

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পানি-চুক্তির সমালোচনা করার দায়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে আবরার ফাহাদকে (২১)। তিনি অভিজাত বাংলাদেশ  প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র। তার হত্যার প্রতিবাদে সোমবার ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বড় বড় সড়কে অবরোধ করা হয়েছে। ঢাকায় ও রাজশাহীতে এই হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন কয়েকটি বিশ্বদ্যিালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। এতে যোগ দেন কিছু শিক্ষকও। বিক্ষোভ থেকে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে স্লোগান দেয়া হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিহত কৃতী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে এসব কথা লিখেছে বিদেশী বিভিন্ন মিডিয়া।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে উদ্ধৃত করে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, ঢাকায় পুলিশের উপ কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বলেছেন, ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ জন্য ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতাকর্মীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ফাহাদের মৃতদেহ পাওয়া যায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমেটরিতে। সেখানকার অন্য আবাসিক ছাত্রদের উদ্ধৃত করে মিডিয়া বলেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্যরা ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তাকে প্রহার করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিকুল ইসলাম বিটু এনটিভি’কে বলেছেন, একটি ইসলামপন্থি দলের যুব শাখার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

তবে এ ঘটনার কয়েক ঘন্টা আগে ফাহাদ তার ফেসবুক একাউন্টে একটি পোস্ট দেন। তা তাড়াতাড়ি ভাইরাল হয়ে যায়। ওই পোস্টে তিনি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। ওই চুক্তিতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকার ফেনি নদী থেকে ভারতকে পানি নিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গত বছর সরকার বিরোধী একটি ছাত্র আন্দোলনকে নির্মূল করে দিতে ছাত্রলীগের সদস্যরা হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও চাঁদাবাজি করেছেন বলে অভিযোগ আছে। এ অভিযোগে দুর্নাম কুড়িয়েছে তারা। গত বছর প্রচন্ড জোরে চলমান একটি বাসের নিচে পড়ে দু’শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ওই ছাত্র আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের কাছে অর্থ দাবি করার অভিযোগে গত মাসে বহিষ্কার করা হয়েছে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে।

ওদিকে অনলাইন আল জাজিরা লিখেছে, ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে সোমবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে বিক্ষোভ করেছেন। শনিবার ঢাকা ও নয়া দিল্লি বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ফেনি নদী থেকে ভারতকে ১.৮২ কিউসেক (প্রতি ঘন্টায় ১,৮৫,৫৩২ লিটার) পানি নিতে অনুমোদন দিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর সমালোচনা করে আবরার একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। এ জন্য তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এতে আরো বলা হয়, কয়েক দশক ধরে নদীর পানি বন্টন নিয়ে চুক্তি করতে এক রকম সংগ্রাম করছে ঢাকা ও নয়া দিল্লি। গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে একটি বিতর্কিত চুক্তিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন দেখা হয় এমন একটি চুক্তি হিসেবে, যা থেকে সুবিধা পায় ভারত। আবরারের এক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ফেসবুকের পোস্টের কারণে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। এ এক উন্মাদনা। ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করেছে। আমরা এর বিচার চাই।

ফাহাদের পিতা ৫৭ বছর বয়সী বরকত উল্লাহ। তিনি সন্তান হারানোর বেদনায় মুষড়ে পড়ছেন। তবুও বলছেন, আমরা ছেলে নিরপরাধ। সে তার জোরালো মতামত ব্যক্ত করেছে এবং এর জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে। ফাহাদের কাজিন আবু তালহা রাসেল (৩১) বলেন, পরিষ্কার প্রমাণ রয়েছে যে, কারা ফাহাদকে হত্যা করেছে। শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্ররা এবং তার বেশ কয়েকজন সহপাঠী আল জাজিরার কাছে ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করে তাদের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। আল জাজিরা আরো লিখেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা ময়না তদন্ত রিপোর্টে বলেছেন, শরীরের ভিতরে রক্তক্ষরণ ও অতিরিক্ত ব্যথায় মারা গেছেন ফাহাদ। তাকে ভয়াবহ প্রহার করা হয়েছে থেঁতলানো কোনো কিছু দিয়ে। সেটা হতে পারে ক্রিকেট স্ট্যাম্প অথবা বাঁশের লাঠি।

এ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে রাজশাহীতে। সেখানে বড় বড় সড়কগুলো অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষকরাও যোগ দেন বলে মনে করা হয়। এ ঘটনায় বেশ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্রকে আটক করা হয়েছে। তাদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত এবং এই হত্যার সঙ্গে জড়িত। এর আগে ঢাকা মেট্রোপলিটল পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেছেন, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজের ওপর ভিত্তি করে চিহ্নিত করার পর তারা ওইসব শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়েছেন। তবে কি কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার মোটিভ এখনও জানায় নি পুলিশ। ওদিকে এই হত্যা নিয়ে জনগণের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।

আল জাজিরা আরো লিখেছে, ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রশিবির হলো বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রয়েছে সম্পর্ক। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহকারী সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু স্বীকার করেছেন, ফাহাদ ছাত্রশিবিরের কর্মী এমন সন্দেহে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাকে তার কক্ষ থেকে তুলে নিয়ে যান। ওদিকে বুয়েটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাশুক এলাহি সাংবাদিকদের বলেছেন, ঘটনার রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের শিক্ষার্থীরা তাকে ডেকে নেয়। তার ভাষায়, আমি হলে গেলাম। দেখলাম সিঁড়ির কাছে পড়ে আছে একটি মানুষের দেহ। ততক্ষণে সে মারা গেছে। তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের দায়ী পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের হাত রক্তে রঞ্জিত। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমরা এক মৃত্যু উপত্যকায় বসবাস করছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীও। তিনি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সহিংসতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। গত মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানিকে বরখাস্ত করেছেন তাদের পদ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, ছাত্রশিবিরে যুক্ত থাকার অভিযোগে অথবা সরকার বিরোধী পোস্ট ফেসবুকে দেয়ার কারণে একজন সহপাঠী ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের অধিকার ছাত্রলীগকে কে দিয়েছে? তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ছাত্রলীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাদের প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।

ওদিকে প্রায় একই রকম কথা লিখেছে ভারতের অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এতেও বলা হয়, বুয়েট শিক্ষার্থী ফাহাদ হত্যার ব্যাপক প্রতিবাদ করেছেন বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে যোগ দিয়েছেন শিক্ষকরা পর্যন্ত।

চীনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৭ চুক্তি: মার্কিন মিডিয়ার খবর

চীনের প্রভাব বিস্তারকে কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সঙ্গে ৭টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত। ৫ই অক্টোবরে এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে ভারত তার ঘরের পেছনে চীনের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা জোরালো করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের  চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দরকে ভারতের অধিকতর ব্যবহারের উপযোগী করে চুক্তি। এই দুটি বন্দরে ভারতকে প্রবেশাধিকার দেয়ার অর্থই হলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরা সরাসরি বঙ্গোপসাগর দিয়ে ভারত মহাসাগরে কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। এই ত্রিপুরা রাজ্য তিন দিক দিয়ে বাংলাদেশের সীমানা ঘিরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ইপোক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে  এ কথা বলা হয়েছে। এর শিরোনাম ‘ইন্ডিয়া সাইনস সেভেন ডিলস উইথ বাংলাদেশ টু ফেন্ড অফ চাইনিজ ইনফ্লুয়েন্স’।
এতে সাংবাদিক ফ্রাঙ্ক ফ্যাং লিখেছেন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতে গত ৫ই অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, উত্তরপূর্ব ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের সরাসরি সুবিধা পাবে ত্রিপুরা। এতে এই রাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্যের অপরিসীম উন্নতি হবে। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ওই সাতটি চুক্তির মধ্যে রয়েছে একটি সমঝোতা স্মারকও। তার অধীনে বাংলাদেশের উপকূলে নজরদারি ব্যবস্থা জোরালো করবে ভারত। তারা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ২০টি রাডার সিস্টেম বসাবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উপকূলে এবং ভারতের উপকূলে নজরদারি বৃদ্ধি করবে। একই রকম নজরদারি ব্যবস্থা ভারত মালদ্বীপ, মৌরিতিয়াস, সিসিলি, শ্রীলঙ্কাসহ আরো দেশে স্থাপন করেছে। ভারতের ইকোনমিক টাইমসের মতে, সমুদ্রপথে সন্ত্রাসী হুমকি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিতে যথেষ্ট ব্যবহার উপযোগী হবে এই রাডার সিস্টেম। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, অন্য চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুব সম্পর্ক বিষয়ক ইউনিভার্সিটি অব হায়দরাবাদ ও ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার মধ্যে সহযোগিতা, ভারতে পানীয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের পানি দেয়ার চুক্তি।
এই অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। ২০১৭ সালে দোকালামে চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টির পর কয়েক ডজন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন ভারত মহাসাগরে মোতায়েন করে চীন। তবে বাংলাদেশে বেইজিংয়ের পা রাখা নিয়ে বিশেষ করে উদ্বিগ্ন ভারত। বাংলাদেশের কাছে চীনের সামরিক হার্ডওয়্যার বিক্রি নিয়ে তাদের উদ্বেগ বেশি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ২০ কোটি ৩০ লাখ ডলারে দুটি সাবমেরিন কেনে। তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারত। এ নিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এডমিরাল অরুণ প্রকাশ বলেন, ওই সাবমেরিন হলো এক ধরনের প্ররোচনামূলক কর্মকাণ্ড। তিনি আরো বলেন, এই সাবমেরিন বিক্রি হলো ভারতের ‘ক্লায়েন্ট’ দেশকে কৌশলগতভাবে বেঁধে ফেলা। গত মাসে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে কক্সবাজারে প্রথম সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে বেইজিং। এখানে অবস্থান করবে চীনের ওই দুটি সাবমেরিন। চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিটিআই এটি নির্মাণ করবে বলে বলা হয়। বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, এতে খরচ পড়বে ১২০ কোটি ডলার।
এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিনিয়র কর্মকর্তা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ফারুক খান একটি মিডিয়াকে বলেছেন, ওই ঘাঁটি নির্মাণ করবে চীন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেবে। তবে তিনি নিশ্চয়তা দেন যে, চীনের সামরিক সাবমেরিন ওই ঘাঁটিতে আসবে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে চীন। বিশেষ করে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চীনের পররাষ্ট্র বিষয়ক উদ্যোগ ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড প্রকল্প। এর মধ্য দিয়ে বেইজিং বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে বিশ্বজুড়ে অর্থায়ন করছে। এর উদ্দেশ্য ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করা। চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার মতে, বাংলাদেশ ও চীন বেশ কয়েকটি ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যার অর্থমূল্য ২১৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে রয়েছে, একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ বিষয়ক প্রকল্প। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে শীর্ষ বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে যায় চীন। এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০৩ কোটি ডলার।
সম্প্রতি মিয়ানমারের সঙ্গেও সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে ভারত। এই মিয়ানমারের সঙ্গেও রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এই সহযোগিতা বৃদ্ধির কারণ হলো সেখানেও চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের পাল্টা জবাব দেয়া। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কিলো-ক্লাস ডিজেল-ইলেকট্রিক একটি সাবমেরিন হস্তান্তরের জন্য মিয়ানমারের নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি করেছে ভারত।

আবরার হত্যা: বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি কি বন্ধ হওয়া উচিত?

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে একটি ছাত্র সংগঠনের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি উঠেছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে।
বুয়েটের ইলেক্ট্রনিক এন্ড ইলেট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী যিনি নিজেকে রাহাত নামে পরিচয় দিতে চান, তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত।
"আমাদের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির নামে যা চলছে তা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। এসব অত্যাচারগুলা বন্ধ হতে হলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত" বলেন রাহাত।
তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এমন দাবি মানতে চাইছেন না ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা। তারা বলছেন, ছাত্র রাজনীতি নয় বরং ছাত্র রাজনীতির নামে যে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি শুরু হয়েছে তা বন্ধ হওয়া উচিত।
ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি উঠেছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে
ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনিক দখলদারিত্ব বেড়ে যাবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ।
তিনি বলেন, "আমরা কোন ভাবেই মনে করি না ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত এবং আমরা এই দাবির বিরুদ্ধে"।
"শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে যে রাজনীতি বা প্রক্রিয়া সেটা বন্ধ হওয়া উচিত। এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করা দরকার বা কথা বলা দরকার" বলেন মি. আহমেদ।
ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন তুলে দেয়া উচিত।
কারণ তারা ছাত্র রাজনীতির কোন নিয়ম বা ব্যাকরণ অনুসরণ করছে না বলে মনে করেন ডাকসুর সাবেক জিএস ড. মোস্তাক হোসাইন।
তিনি বলেন, "অপরাজনীতিকে দমন করতে হলে সুস্থ্য ধারার ছাত্র রাজনীতি প্রয়োজন। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে সেটা হবে না। অপরাধী ছাত্র সংগঠন বন্ধ হোক। এগুলো ক্যাম্পাসে থাকা উচিত না"।
"রাজনৈতিক দলের শাখা হিসেবে শুধু শিক্ষাঙ্গনে নয় বরং ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবি-কোথাও হওয়া উচিত নয়। এই দাবি তারা তুললে গোটা দেশবাসীর সমর্থন তারা পাবে" তিনি বলেন।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় ছাত্র রাজনীতির অনেক অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে স্কুলের শিক্ষার্থীরা, পরে তা সব পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে
তবে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে যতগুলো বড় আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোটা বিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ২০০৬ সালে শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান বিরোধী আন্দোলন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন।
এসব আন্দোলনের কোনটাই রাজনৈতিক দলের সহযোগি ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগে হয়নি।
বরং অনেক আন্দোলন যেমন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারীদের উপর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি দরকার। তবে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহৃত হওয়াটা ছাত্র রাজনীতির জন্য খারাপ বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা।
তিনি বলেন "ছাত্রদের নিজেদের যে চাওয়া পাওয়া রয়েছে তার পক্ষে অর্থ্যাৎ তাদের নিজেদের যা নিয়ে রাজনীতি করার কথা সে সুযোগ তাদের থাকতে হবে।"
"কিন্তু সরকারি দলের যে দলগত রাজনীতি সেটা বন্ধ করা জরুরী"।
"এটার চেয়েও যেটা বেশি জরুরী সেটা হল, শিক্ষকদের যে দলীয় রাজনীতি সেটাও ক্ষতিকর। এই শিক্ষক রাজনীতি টিকে থাকলে তা ছাত্র রাজনীতিকে নিজেদের টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে" বলেন তিনি।
দলীয় রাজনীতির ছত্রছায়া বন্ধ করা গেলে গেস্টরুম কালচার, গণরুম ও র‍্যাগিংয়ের নামে ভয়ংকর নিপীড়ণ বন্ধ করা সম্ভব বলেও জানান সামিনা লুৎফা।

যেভাবে হত্যা করা হয় আবরারকে by পিয়াস সরকার

অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা। অসীম মহাকাশের অন্তে। আবরার ফাহাদের ফেসবুক বায়োতে লেখা এই কথা। তার বায়োর মতোই মহাকাশের অন্তে হারিয়ে গেছেন তিনি। নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে। আবরার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিপল-ই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। শেরে বাংলা হলের এই শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আববাররের ফেসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাসের কারণেই ক্ষুব্ধ হয় ছাত্রলীগের কর্মীরা হত্যা করে বলে সহপাঠীদের অভিযোগ।
রোববার বিকালে আবরার তার এক বন্ধুর সঙ্গে পলাশীতে গিয়েছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই বন্ধু বলেন আমরা সেখানে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তখনই জানান স্ট্যাটাসের কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বড় ভাইয়েরা। সেদিন তারা ৬টার দিকে হলে ফেরেন। তার বন্ধু থাকেন ১০১০ নম্বর রুমে। আর আবরার থাকতেন ১০১১ নম্বর রুমে। আবরারের বন্ধু বলেন, সাড়ে ৭ টার দিকে অংক করছিলো আবরার। সেই অংকের খাতায় দেখা যায় একটি অংকের স্টেজ ৩ সমাধান করবার সময়েই ডাক পড়ে। ফাহাদ সমাধান না করে দুটি শুণ্য লিখে উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপ সম্পাদক অমিত সাহাসহ ৩ জন তাদের রুমে নিয়ে যায় ২০১১ নম্বর রুমে। ঠিক তার ওপরের রুমে। এরপর তাকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। এরপর সেখানে কিহয় তা জানা না গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু তার ঘনিষ্টজনদের বলেন, তার ফেসবুক ও ম্যাসেঞ্জার ঘেটে দেখা যায় সে বিভিন্ন শিবিরের পেইজে লাইক দেয়া ও সেই সঙ্গে শিবিরের বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। এরপর শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় বড় ভাইদের ডেকে আনি। এরপর আমি সেখান থেকে চলে আসি। পরে রাতে শুনি আবরার মারা গেছে। রাত ১০ টার দিকে সেই রুম থেকে ১ জন এসে আবরারের জন্য কাপড় নিয়ে যায়। তিনি বলেন, তখন ধারণা করি রক্তাক্ত করা হয়েছে আবরারকে। এরপর ওপরে যাই। ওপরে থেকে মার ও চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ২০১১ নম্বর রুমে চলছিলো নির্যাতন আর ২০১০ নম্বর রুমের একজন জানান, তিনিও চিৎকারের শব্দ শুনেছেন। কিন্তু চিৎকারের শব্দ শোনার পরেও কেন এগিয়ে গেলেন না। এর জবাবে বলেন, বড় ভাইয়েরা প্রায়শই এভাবে নিয়ে গিয়ে মারধোর করেন। এটা নতুন কিছু না। ফাহাদের বন্ধু রাত ২টার দিকে চিৎকারের শব্দ শুনে বের হন। বের হয়ে দেখেন তোশকের মধ্যে শোয়ানো আবরার। ব্যাথায় কাতরাচ্ছিলেন। বলছিলো, আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। এদিকে ঘটনার পর সোমবার সকালে উদ্ধার করা সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দেখা যায়, তিনজন ধরে নিয়ে আসছে আবরারকে। তার পিছনে আসছেন বেশ কজন। তারা তাকে নিয়ে দুই সিঁড়ির মাঝখানে নিয়ে রাখে। আবরারের বন্ধু বলেন, নির্যাতনকারী ৩ জন সেখানে উপস্থিত ছিলো। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। ফাহাদের অন্তিম মুহুর্তে ছিলাম আমি। নির্যাতনকারীরাই ডাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার। আমরা এম্বুলেন্স ডাকি। এম্বুলেন্সের স্ট্রেচার রেডি করার সময়ে আসেন ডাক্তার। ডাক্তার বলেন, ফাহাদ আর নেই। সেময় তার শরীরে ছিলো মারের চিহ্ন। তিনি আরো বলেন, ফাহাদ আমার কলেজ ফ্রেন্ড। এরপর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই হলে পাশাপাশি রুমে থাকি। তার মৃত্যু হলেও মেনে নিতে পারতাম না। আর এতো পরিকল্পিত হত্যা। আবরার কিছুদিন আগে কয়েক বন্ধু মিলে গিয়েছিলেন তাবলীগে। তার দেয়া ৩০শে সেপ্টেম্বর এক স্ট্যাটাসের কারণেও হুমকির মুখে পড়েছিলেন। সেই স্ট্যাটাসটি ছিলো ‘কে বলে হিন্দুস্থান আমাদের কোন প্রতিদান দেয়না। এইযে ৫০০ টন ইলিশ পাওয়া মাত্র ফারাক্কা খুলে দিছে। এখন আমরা মনের সুখে পানি খাবো আর বেশি বেশি ইলিশ পালবো। ইনশাল্লাহ আগামী বছর এক্কেবারে ১০০১ টন ইলিশ পাঠাবো।’
যে রুমে নির্যাতন করা হয় সেই রুমে গিয়ে দেখা যায় অমিত সাহার টেবিলের ওপরে কয়েকটি মদের বোতল। আর পড়ার টেবিলের বিভিন্ন দেব দেবীর ছবি। আর উপ-দপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদের পড়ার টেবিলের ওপর আল্লাহু লেখা ফলক। আর অসংখ্য সিগারেটের শেষাংশ।

ফেসবুকে যা লিখেছিলেন আবরার
একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। যাতে ছিল সাম্প্রতিক একটি ইস্যুতে ব্যক্তিগত বক্তব্য। ওই পোস্টের জের ধরেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদের ওপর নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের পিটুনিতে নির্মমভাবে নিহত হন আবরার। গতকাল দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় ছিল আবরারের সেই স্ট্যাটাস।
আবরারের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-
১. ৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো।
বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মোংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।
৩. কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারকে নির্মম, নিষ্ঠুর কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করেছে বুয়েট ছাত্রলীগের কতিপয় নেতাকর্মী by মুনির হোসেন

এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫। একই সঙ্গে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন মেডিকেল ও বুয়েটে। প্রকৌশলী হওয়ার  স্বপ্ন থাকায় তিনি বেছে নেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে। মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি শিক্ষার্থী নামের কুলাঙ্গাররা। নির্মম, নিষ্ঠুর কায়দায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বুয়েট ছাত্রলীগের কতিপয় নেতাকর্মী। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অন্তত নয় জনকে আটক করা হয়েছে। মামলা দায়ের করা হয়েছে ১৯ জনের বিরুদ্ধে। বুয়েটের শের-ই বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরারকে হত্যা করা হয় একই হলের ২০১১নম্বর কক্ষে।
এ ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আবরারের সহপাঠিদের দাবি সাম্প্রতিক একটি ইস্যুতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় বুয়েট ছাত্রলীগের নেতারা আবরারকে ডেকে নিয়ে পিঠিয়ে হত্যা করে। আবরার ফাহাদ ইলিক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ট্রিপল-ই) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায়। হত্যার পর হত্যাকারীরা আবরারের নিথর দেহ দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতে ফেলে যায়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকায় আটক ছাত্রলীগ নেতারা হলেন, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি মোস্তাকিম ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, উপ-দপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, উপ-সমাজ কল্যাণ সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা, গ্রন্থ ও গবেষণা সম্পাদক ইশতিয়াক মুন্সি, সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু।

এদিকে, আবরার হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল অবস্থা বিরাজ করছে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ ঘটনার প্রতিবাদ ও হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। বিক্ষোভ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও। আর আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রলীগ। রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখার সময়ও শিক্ষার্থীরা শের-ই বাংলা হল প্রাধ্যক্ষের কক্ষের সামনে বিক্ষোভ করছিলেন। রাতে আবরারের বাবা বরকতুল্লাহ ১৯জনকে আসামী করে চকবাজার থানায় ছেলে হত্যার মামলা করেন। এর আগে সন্ধ্যায় ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী ফাহাদ হত্যার ঘটনায় মোট নয়জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সিসিটিভির ফুটেজ দেখে জড়িত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে বিকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজ দেখে ছয়জনকে সনাক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, রোববার রাত ৮টার দিকে উপ আইন বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহার নেতৃত্বে তিন ছাত্রলীগ নেতা আবরারকে ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয়। এরপর সেখানে তাকে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে ওই কক্ষে আরো কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে ডেকে এনে আবরারকে মারধর করা হয়। মারধর করতে করতে তার থেকে বিভিন্ন জবানবন্দী আদায় করার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ নেতারা। একজন স্ট্যাম্প ও লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করে। এক পর্যায়ে রাত ৩টার দিকে আবরার অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতে ফেলে যায় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এরপর সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবরারের নিথর দেহ দেখে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসক ও হল প্রশাসনকে খবর দেন। চিকিৎসক এসে আবরারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। এরপর হল প্রশাসন সকাল ৬টার দিকে আবরারের নিথর দেহ প্রথমে হল ক্যান্টিনে নিয়ে আসেন। এরপর সেখান থেকে সাড়ে ৬টা দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বুয়েটের চিকিৎসক ডা. মাসুক এলাহী জানান, রাত তিনটার দিকে হলের শিক্ষার্থীরা আমাকে ফোন দেয়। আমি হলে গিয়ে সিঁড়ির পাশে ছেলেটিকে পড়ে থাকতে দেখি। ততক্ষণে ছেলেটি মারা গেছে। তার সারা শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। আবরারকে মারধরের সময় ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন শাখা ছাত্রলীগের একজন গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ঘনিষ্টজনকে জানান, আবরারকে শিবির সন্দেহে রাত আটটার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়। সেখানে আমরা তার মোবাইলে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার চেক করি। ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেইজে তার লাইক দেয়ার প্রমাণ পাই। সে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাই। আবরারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বুয়েট ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজতবা রাফিদ, উপ সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ আইন সম্পাদক অমিত সাহা। পরবর্তীতে প্রমাণ পাওয়ার পরে চতুর্থ বর্ষের ভাইদের খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার সেখানে আসেন। একপর্যায়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে আসি। এরপর হয়তো ওরা মারধর করে থাকতে পারে। পরে রাত তিনটার দিকে শুনি আবরার মারা গেছে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ফাহাদের একজন রুমমেট ঘটনার বিষয়ে বলেন, টিউশনি শেষে রুমে রাত নয়টার দিকে আসি। তখন আবরার রুমে ছিলো না। অন্য রুমমেটদের কাছ থেকে জানতে পারি তাকে ছাত্রলীগের ভাইয়েরা ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে গেছে। পরে রাত আড়াইটার দিকে হলের একজন এসে আবরার আমাদের রুমমেট কিনা জানতে চান। আমি হ্যাঁ বললে সিঁড়ি রুমের দিকে যাওয়ার জন্য বলেন। পরে সিঁড়ি রুমের দিকে গিয়ে দেখি তোশকের ওপরে আবরার পড়ে আছে। পরে ডাক্তার এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর শের-ই বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ বলেন, ডাক্তারের ফোন পেয়ে হলে আসি। এসে ছেলেটির লাশ পড়ে আছে দেখতে পাই। ডাক্তার জানান, ছেলেটি আর নেই। পরে তাকে পুলিশের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, পুলিশ ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে সব ধরণের সহায়তা করা হবে। এদিকে দুপুরে আবরারকে যে কক্ষে হত্যা করা হয় সে কক্ষ (২০১১) থেকে দু’টি লাঠি, চারটি স্ট্যাম্প, একটি চাপাতিসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। একটি স্ট্যাম্পে শুকনা রক্তের দাগ রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। পুলিশের ক্রাইম সিন ইউনিট, মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও চকবাজার থানা পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। এছাড়াও কক্ষটি থেকে পুলিশ তিনটি খালি মদের বোতল, একটি অর্ধেক ভরা মদের বোতল (পানি নাকি মদ নিশ্চিত নয়)। দুপুরে শের-ই বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষটি পরিদর্শন করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়। এসময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, আবরারকে পিটিয়ে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। ঘটনাটি তদন্তে ডিবি, থানা পুলিশ কাজ করছে। যারা জড়িত তারা অবশ্যই আইনের আওতায় আসবে। তিনি বলেন, আমরা আলামত সংগ্রহ করেছি। সেগুলো পর্যালোচনা করছি। যারা জড়িত তাদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী তদন্তে চলে আসবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, তদন্তে রাজনীতিক প্রভাব পড়বে না। এদিকে ঘটনার পরপরই গাঢাকা দিয়েছেন ২০১১ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থীরা। এ কক্ষের শিক্ষার্থীরাই আবারারকে ডেকে এনে হত্যা করে। তারা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা, উপ-দপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুজতাবা রাফিদ, সমাজসেবা বিষয়ক উপ-সম্পাদক ও বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ইফতি মোশারফ। ওই কক্ষের আরেক শিক্ষার্থী বর্তমানে দুর্গাপূজার ছুটিতে বাড়িতে অবস্থান করছেন। মারুফ ইসলাম নামে আবরারের এক সহপাঠী বলেন, ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দেয়ায় তার ওপর ক্ষুব্ধ হয় ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা। তার বিরুদ্ধে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু সে আমার সাথে এর আগে তিনদিনের তাবলীগে গিয়েছিল। 

লাঠির আঘাতে আবরারের মৃত্যু:
এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে এক সংবাদ সম্মেলন করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. মো. সোহেল মাহমুদ। তিনি বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ফাহাদের হাতে, পায়ে ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। আঘাতের ধরণ দেখে মনে হয়েছে, ভোঁতা কোনো জিনিস যেমন, বাঁশ বা স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। তবে তার মাথায় কোনো আঘাত নেই। কপালে ছোট একটি কাটা চিহ্ন রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তার শরীরে বিশেষ কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। হাতে, পায়ে ও পিঠে আঘাতের স্থানে রক্তক্ষরণ ও পেইনেই তার মৃত্যু হয়েছে।

মারধরের সঙ্গে জড়িতরা সবাই ছাত্রলীগের পোস্টেড: বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি
এদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় জড়িতরা ছাত্রলীগের পোস্টেড বলে স্বীকার করেছেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামিউশ সানি। গতকাল দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের একথা বলেন। জড়িতদের সবাইর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, রাতে খবর পাওয়ার পরই আমি সেখানে (ঘটনাস্থল) যাই। কয়েকজন তাকে ওই রুমে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে মারধর করা হয়েছে বলে শুনেছি। যারা মারধরে জড়িত তারা সবাই ছাত্রলীগের পোস্টেড নেতা। তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন একটি ঘটনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা জড়িত থাকতে পারে- এমন ভাবাও কষ্টের। এটা খুবই ন্যাক্কারজনক। সানি বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখানে ছাত্রলীগের ছেলে হিসেবে নয়, অপরাধী যে-ই হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছাত্রলীগের তদন্ত কমিটি
এদিকে আবরার হত্যার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রলীগ। গতকাল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য সাক্ষারিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তদন্ত কমিটিকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ছাত্রলীগের তদন্ত কমিটির দুই সদস্য হলেন- সহসভাপতি ইয়াজ আল রিয়াদ ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক আসিফ তালুকদার।

বিক্ষোভে উত্তাল ঢাবি-বুয়েট
এদিকে, আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। গতকাল সকাল থেকে দফায় দফায় বিক্ষোভ অব্যাহত রাখছে শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা আবরারের হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেন। সকাল থেকে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করে। এসময় তারা কয়েক দফায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চায়। কিন্তু প্রশাসন এতে অস্বীকৃতি জানায়। দুপুরে হল প্রাধ্যক্ষের কার্যালয় ঘেরাও করে শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা সিসিটিভি ফুটেজ না দেখানো পর্যন্ত প্রাধ্যক্ষের কার্যালয় ছাড়বে না বলে ঘোষণা দেয়। বুয়েট শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসও প্রদক্ষিণ করেন। দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও প্রদক্ষিণ করে। তবে ঢাবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল আসতে দেখে শের-ই বাংলা হলের সবকটি ফটক বন্ধ করে দেয় হলটির কিছু শিক্ষার্থী। এসময় বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলে এ বিক্ষোভ। বিক্ষোভ থেকে ‘বিজেপির দালালরা ; হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই; আবরার হত্যার ফাঁসি চাই’, ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হুঁশিয়ার সাবধান,’ ‘হলে হলে দখলদারিত্ব; বন্ধ কর, করতে হবে’, ‘বুয়েট তোমার ভয় নেই, আমরা আছি লাখো ভাই’, ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘হলে হলে সন্ত্রাস রুখে দাড়াও ছাত্র সমাজ’, ‘শিক্ষা, ছাত্রলীগ, একসাথে চলে না’, ‘সন্ত্রাসীদের কালো হাত, ছাত্রলীগের কালো হাত, ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দেয় শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভে কয়েকজন শিক্ষকও উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিলটি বুয়েটে ক্যাম্পাসও প্রদক্ষিণ করে। বিক্ষোভকারীরা বলেন, আবরার হত্যার পেছনে ছাত্রলীগের অতিমাত্রায় ভারতপ্রেম প্রেরণা জুগিয়েছে। দেশপ্রেমিক আবরারের ভারতবিদ্বেষী স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে তাকে খুন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর। প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশনসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতারা। এদিকে, ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভ শেষে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘আজকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি হচ্ছে? প্রত্যেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলদাস প্রশাসনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়ার্ত পরিবেশ কায়েম করা হয়েছে। যেখানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের ভয়ে অন্যরা কথা বলতে ভয় পাচ্ছে, একটা প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছে।’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোকে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের সহযোগী দাবি করে ডাকসুুর ভিপি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দলকানা প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের এই অপকর্মের অন্যতম সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। যেই কারণে আপনারা দেখেছেন এই বুয়েটে কিছুদিন আগে যখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছিল তখন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে তখনকার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে ওই ছেলেকে বেদম প্রহার করেছিলেন, পরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আমরা একটা কথা বলতে চাই, কোনো শিক্ষার্থী যদি অন্যায় অপরাধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন রয়েছে তাদের হাতে তুলে দেবেন তারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু ছাত্রলীগকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের গায়ে আঘাত করার অধিকারটা কে দিল?’ এদিকে বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এসময় বক্তারা বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যায় জড়িত সকলকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করতে হবে। এসময় সকল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল বলেন, বুয়েটের মত একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করার মাধ্যমে ছাত্রলীগ নিজেদেরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে আবারও প্রমাণ করছে। আবু বক্কর হত্যাকাণ্ড এবং বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচারের নামে যে প্রহসন হয়ছে তেমনি এই বিচার নিয়ে যদি এরকম প্রহসন করার চেষ্টা করা হয় তাহলে ছাত্রদল রাজপথে নেমে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে এর জাবাব দিবে।

ফেসবুকে যা লিখেছিলেন আবরার
একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। যাতে ছিল সাম্প্রতিক একটি ইস্যুতে ব্যক্তিগত বক্তব্য। ওই পোস্টের জের ধরেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদের ওপর নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের পিটুনিতে নির্মমভাবে নিহত হন আবরার। গতকাল দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় ছিল আবরারের সেই স্ট্যাটাস।
আবরারের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-
১. ৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো।
বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মোংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।
৩. কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন ৩ বিজ্ঞানী

ঘোষণা করা হয়েছে এ বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ীদের নাম। মানবদেহের কোষগুলো কীভাবে শরীরে অক্সিজেনের প্রাপ্যতার সঙ্গে খাপ খায় তা নিয়ে গবেষণার জন্য তাদেরকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। এতে যৌথভাবে জয়ী হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম ক্যালিন, গ্রেগ সেমেনজা এবং বৃটিশ বিজ্ঞানী পিটার র‌্যাটক্লিফ। তাদের ওই গবেষণা পরবর্তিতে আনেমিয়া ও ক্যান্সারের চিকিৎসায় সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে।
সোমবার সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জয়ীদের নাম ঘোষণা করে নোবেল কমিটি। এসময় সুইডেনের কারোলিনস্কা ইন্সটিটিউট এক বিবৃতিতে বলে, নতুন এই আবিষ্কার হচ্ছে জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ন খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়া যা এ বছরের নোবেলজয়ীরা প্রকাশ করেছেন। পুরস্কার বাবদ তারা যে অর্থ পাবেন তার পরিমাণ ৯ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা বা ৯ লাখ ১৩ হাজার ডলার। অক্সিজেন সেন্সিং ব্যাপক সংখ্যক রোগের জন্য দায়ি।
তাই এ আবিষ্কার ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করবে নতুন ধরণের ঔষধ বাজারে আনতে যা অক্সিজেন সেন্সিং কার্যক্রমকে বাঁধা দেবে।
প্রতি বছরই সবার আগে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল দেয়া হয়। মহান উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী ১৯০১ সাল থেকে প্রতি বছর বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারা, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। এটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবথেকে সম্মানজনক পুরস্কার বলা হয়। গত বছর মার্কিন বিজ্ঞানী জেমস অ্যালিসন ও জাপানিজ বিজ্ঞানী তাসুকু হোঞ্জো যৌথভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন।

তারেকের স্মৃতি হাতড়ে ফেরেন নুরুন নাহার by মরিয়ম চম্পা

দীর্ঘ ৮ বছর। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চাপা কান্নায়। শূন্য হৃদয়ে শুধু হাহাকার। ছেলে তারেক মাসুদ নেই। তারপরও অপেক্ষা তার মা নুরুন নাহারের। সারাক্ষণ ছেলের স্মৃতি হাতড়ে ফেরেন। তারেকের স্মৃতিবিজড়িত স্টুডিও, বইপত্র, আর ঘরের নানা আসবাবপত্রের মাঝে পান ছেলের গন্ধ। কখনো কখনো হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। কখনো নীরবে চোখের জল ফেলেন। এভাবেই পেরুচ্ছে দিন। তারেক মাসুদের কথা জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে নুরুন নাহার বলেন, সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকে নিয়ে গেলো না? তারেককে কেন এতো জলদি নিয়ে গেলো?
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ। মাটির ময়নার প্রিকুয়েল কাগজের ফুল সিনেমার কাজ চলছিল তখন। তারেক মাসুদের মনিপুরিপাড়ার বাসায় মা নুরুন নাহার মাসুদ এখনো খুঁজে ফেরেন তার নারী ছেড়া ধন তারেক মাসুদকে।
তিনি বলেন, আমার হিরার টুকরো ছেলের মতো দেখিনা কাউকে। অনেক খুঁজি কিন্তু পাইনা। ওযে কি রত্ন ছিল সেটা আমি জানি। ওর হাটা-চলা, কথা-বার্তা কারো মাঝে খুঁজে পাইনা। ওকে হারিয়ে কোনোরকম বেঁচে আছি। তারেকের রেখে যাওয়া সব স্মৃতিতে বিশেষ করে ওর পাওয়া বিভিন্ন পুরষ্কার, বই ইত্যাদিতে ধুলো-ময়লা জমে গেছে। অথচ এগুলো সবই ছিল তার কষ্টার্জিত। এগুলোর অবহেলা দেখতে আমার খুব খারাপ লাগে। কষ্ট লাগে। বেঁচে থাকাবস্থায় যদি দেখে যেতাম এগুলো সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা করা হয়েছে তাহলে আমি শান্তি পেতাম।
নুরুন নাহার বলেন, আমারতো বয়স কম হয়নি। ওর আগেই আমার যাওয়া উচিৎ ছিল। তারেক চলে যাওয়ার ৮ বছরের মধ্যে ৬ থেকে ৭ বছর আমার কোনো সেন্স ছিল না। মানুষ দেখেছে আমি ভালো আছি। কথা বলছি। কিন্তু গত দুই বছর ধরে আমার একটু একটু করে মনে হচ্ছে চারপাশে আমার তারেকের স্মৃতিগুলো নষ্ট হচ্ছে। কোথায় তার ব্যবহৃত পাপোশটা নষ্ট হচ্ছে। কোথায় তার হাতের ছোয়া জিনিসগুলো নষ্ট হচ্ছে। এগুলো নিয়েই আমার কষ্ট এখন। তারেকের নামে একটি জাদুঘর ও লাইব্রেরী তৈরি করা, তারেকের সমাধির সঠিক সংরক্ষণ এগুলোই আমার চাওয়া। দেশ বিদেশের মানুষ দেখতে এসে অযত্ন অবহেলা দেখে আফসোস করে।
তিনি বলেন, আমার ছেলে আমার বুকে থাকতো। ও কেনো এতো বড় হতে গেলো। ও এতো বড় এবং বিখ্যাত না হয়ে সাধারণ তারেক হয়ে বেঁচে থাকতো। তারেকের মৃত্যুর পাঁচদিন আগে ওর বাবা মারা যায়। তখন তারেক বলেছিল, আমার মায়ের কাছে কেউ যদি না থাকে আমি থাকবো। ঠিক তার পাঁচদিন পরে তারেক মারা যায়। মৃত্যুর আগে চারদিন আমার কাছে ছিল। তখন রমজান মাস। মিশুক মনির আমেরিকা থেকে আসার পর কাগজের ফুল সিনেমার বিষয়ে কথা বলতে ফোন দিলে ও চলে যায়। তার পরেই সব শেষ হয়ে যায়।
তারেক যেদিন চলে গেছে সেদিনই আমি চলে যেতে পারতাম। কিজন্য তারেক আমাকে রেখে গেছে সেটাও আমি বুঝি। তার কষ্টের স্মৃতিগুলো নিয়ে থাকতে এবং দেখার জন্য আমাকে তারেক রেখে গেছে। ও প্রায়ই বলতো, ‘আমি বেশি দিন থাকবো না। ক্যাথরিন তুমি আমার কাজগুলো সমাধান করো’।
ক্যাথরিন ছেলে নিষাদকে নিয়ে এখন আমেরিকায় আছে। গত বছর আগস্টে তারেকের মৃত্যুদিবসের আগে ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। এ বছর হয়তো তারেকের মৃত্যুবার্ষিকীতে ওরা দেশে আসবে। এখন নিষাদের বয়স ৯ বছর। গত এপ্রিলে তার জন্মদিন ছিল। জন্মদিনের সময় ওদের সঙ্গে শেষবার আমার কথা হয়েছে। ক্যাথরিন বললো, ‘আম্মা তুমি কেমন আছো। ভিডিও কল করলে নিষাদকে দেখতে পাবে’। নিষাদ বাংলা বোঝে কিন্তু বলেনা। নিষাদকে তার বাবার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারনা দিতে মা ক্যাথরিন একটি বই তৈরি করেছে। যেখানে ইংরেজিতে তারেকের জীবনের আদ্যপান্ত লিখে দিয়েছে মা ক্যাথরিন।
খুব সকালে উঠে নামাজ শেষে তারেকের জন্য দোয়া করি। ওর সকল ছবিগুলো নেড়েচেড়ে দেখি। এইতো আমার সারাদিনের রুটিন। আমি মনে করি আমার তারেক মারা যায়নি। তারেক মাঝে মাঝে আমাকে দেখা দিয়ে বলতো, আম্মা ফোন ধরো। আম্মা বসো। ও বেঁচে থাকাবস্থায় সবসময় একথাটি বলতো, আম্মা আসো। বসো। কারণে অকারণে তারেক আমাকে ডাকতো। কোনো কারণ ছাড়াই ডাকতো। চিৎকার করে ডাকতো।
এতো স্মৃতি আমি কিভাবে ভুলবো। ও যে এভাবে হঠাৎ করে হারিয়ে যাবে এটা আমি কখনো ভাবিনি। ও সবসময় আমাকে নিয়ে চিন্তা করতো। সবাইকে বলতো আমার মা’কে দেখো। আমাকে ওর সাথে ঢাকায় থাকতে বলতো। এখনতো থাকছি। কিন্তু তখন থাকিনি। নিষাদের হাতে একটি তিল রয়েছে। ঠিক একই জায়গায় তারেকের হাতেও তিল ছিল।
তারেক যখন আমেরিকায় থাকতো তখন আমার সাথে প্রতি সপ্তাহে ভিডিও কথা এবং দেখা হতো। বলতো আম্মা তোমাকে দেখা যায়না। তোমার পাশে বড় একটি লাইট নাও। এমন একটি বটগাছ এভাবে চলে যাবে আমি মেনে নিতে পারছিনা। যতোদিন থাকবো ততোদিনই তারেকের কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে তার স্মৃতিগুলো আমি একজায়গায় একত্রে দেখতে চাই। তার স্মৃতিতে একটি জাদুঘর ও লাইব্রেরী হোক। বিশ্বরোড থেকে বাড়ি যাওয়ার রাস্তায় একটি মসজিদ হোক। আমার এই দাবি। সে কোনো বাড়িঘর করেনি। মনিপুরিপাড়ার এই ভাড়াবাড়িতেই থাকতো সে। তার যাবতীয় কাজ করতো এখানেই। ৫ ভাই তিন বোনের মধ্যে তারেক ছিলো মেজো। বড় মেয়ে প্রয়াত আসমার পরেই তারেকের জন্ম।
তারেক মাসুদের ছোট ভাই সাঈদ মাসুদ বলেন, সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ হঠাৎ এরকম একটি দুর্ঘটনায় মারা যাবেন এটা এখনো আমরা মানতে পারছিনা। কোনো কোনো মানুষের জন্ম হয় একটি পুরো পরিবারকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারেক ভাই আমাদের পরিবারের জন্য তেমনই একজন মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যুতে আমাদের পরিবারের মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। ছোট বাচ্চাদের সাথে এবং পরিবারের বাবা-মা ও ভাই বোনদের সাথে তার আচরণ ছিল অন্যরকম। তার শূণ্যতা কখনো পূরণ হবার নয়।

সিজারিয়ানে কাবু দেশ, ঝুঁকিতে মা-শিশু by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শিশু জন্মের হার দিন দিন বাড়ছেই। সিজারিয়ানে কাবু গোটা দেশ। এতে ঝুঁকিতে থাকে মা ও শিশু। আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন সম্প্রতি এক গবেষণায় বলেছে, গত দুই বছরে বাংলাদেশে অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান অপারেশনে সন্তান জন্মদান বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৫১ ভাগ। এর ফলে রোগীরা বছরে খরচ করছেন ৪৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে সিজারিয়ান অপারেশনে জন্ম হয় মোট শিশুর শতকরা ৮০ ভাগ।  এর কারণ মেডিকেল খাতে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য বিবেকবর্জিত চর্চা। সিজারিয়ান অপারেশনের এই ধারাকে বিশাল বৃদ্ধি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সংস্থাটি। ২০১৮ সালে সিজারিয়ান অপারেশন করানো হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার নারীর।
এর মধ্যে শতকরা ৭৭ ভাগ অপারেশন করানো হয়েছে একেবারে খালি খালি। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭০ হাজার। পক্ষান্তরে প্রায় ৩ লাখ নারীকে প্রতি বছর সিজারিয়ান অপারেশন করানো একেবারে বাধ্যতামূলক। তারা এই সুবিধা নিতে পারেন না।
২০০৪ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সিজারিয়ান অপারেশস শতকরা ৪ ভাগ থেকে ৩১ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে সেভ দ্য চিলড্রেন এই খাতকে উন্নততর নিয়ন্ত্রণ, ডাক্তারদের ওপর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স আরোপের আহ্বান জানিয়েছে। এ বিষয়ে সংস্থাটির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ইশতিয়াক মান্নান বলেছেন, এই অপারেশন খুব বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অধিক থেকে অধিক হারে ধনী মায়েরা অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ভিড় করছেন। তাদের বিশ্বাস, এই অপারেশন তাদের জন্য অধিক স্বস্তির হবে। অথবা হতে পারে, তাদেরকে ভুল বুঝিয়েছেন কোনো চিকিৎসক। পক্ষান্তরে দরিদ্র অনেক নারী, যাদের একান্তই এই অপারেশন দরকার তারা এই সুবিধা পাচ্ছেন না। বিষয়টি বিস্ময়কর। ড. মান্নান বলেন, স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানের চেয়ে সংশ্লিষ্টরা অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়াকে বেছে নেন আর্থিক সুবিধার জন্য। যদি এক্ষেত্রে কোনো ভুল অথবা ত্রুটিপূর্ণ পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে তার জন্য তাদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় না। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন মা ও শিশু উভয়কেই প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। এতে সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অঙ্গহানী, রক্ত জমাট বাঁধা সহ নানা রকম ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এ ছাড়া মায়ের অপারেশন পরবর্তী সুস্থ হতেও সময় লাগে বেশি। স্বাভাবিক সন্তান জন্ম দেয়ার সুবিধাটি এর মাধ্যমে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশে স্বীকৃত ধাত্রীর সংকট। সারাদেশে মাত্র ২৫০০ এমন ধাত্রী আছেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্যখাত থেকে এখাতে ২২ হাজার ধাত্রী প্রয়োজন বলে পর্যালোচনায় বলা হয়েছে। কিন্তু যা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক দশমাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, সিজারিয়ান সেকশন এখন দেশের বেশির ভাগ প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকের বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ প্রবণতা রোধ তো করা যাচ্ছেই না, বরং দিন দিন প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কোনো প্রসূতি পেলেই প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর এক শ্রেণীর চিকিৎসক থেকে শুরু করে সবাই বিভিন্ন অজুহাতে রোগীকে নরমাল ডেলিভারির ব্যাপারে কৌশলে মানসিকভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। এমনকি সিজার না হলে মা কিংবা নবজাতকের ক্ষতি হওয়ার ভয়ও দেখানো হয় অনেক ক্ষেত্রে। নিরুপায় হয়ে প্রসূতি ও তার স্বজনরা নিরাপদ মাতৃত্ব ও সুস্থ সন্তানের স্বার্থে হাসপাতালের প্রত্যাশায় সায় দেয়। আর সিজারিয়ানের মাধ্যমে প্রসব পদ্ধতিতে রাজি হলেই শুরু হয় টাকা হাতানোর হিসাব কষাকষি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাভাবিক প্রসবের খরচ সর্বোচ্চ তিন হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা এবং অস্ত্রোপচারে খরচ সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এর বাইরে কেবিন ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ তো আছেই। সরকারি জেলা হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবের সময় রোগীর পক্ষকে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার ওষুধ কিনলেই চলে, আর অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে কিনতে হয় কমপক্ষে তিন হাজার টাকার ওষুধ। দেশে অনেক নারীর নিজ ও পরিবারের সদস্যেদের ইচ্ছায়, কেউবা চিকিৎসকের কথায় বিশ্বাস করে বা প্ররোচণায় পড়ে সিজারিয়ানের মাধ্যমে শিশু প্রসব করছেন। সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু জন্ম বাড়ছে। এতে শীর্ষে রয়েছেন শিক্ষিত ধনী শ্রেণীর যুবতীরা। ২০১৭ সালের ১০ই আগস্ট সিজারিয়ান (অস্ত্রোপচার) মাধ্যমে শিশু খাদিজার জন্ম হয় মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। আত্মীয়-স্বজনের ইচ্ছা ছিল স্বাভাবিক প্রসবের। কিন্তু চিকিৎসক ও ক্লিনিকের দালালদের প্ররোচনায় মা সালমা শেষ পর্যন্ত সিরাজর করতে বাধ্য হলেন। এটি তার প্রথম সন্তান। তার স্বামী থাকেন সৌদিতে। শিশুটির মামা আলাপকালে জানান, তাদের ইচ্ছা ছিল বোনের বাচ্চা যেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়। কিন্তু তা হলো না চিকিৎসক ও ক্লিনিকের কর্মচরাীদের কারণে। সিজার করতে গিয়ে সবমিলে এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে তাদের।
‘মাতৃমৃত্যু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা জরিপ ২০১০’ চিত্রে দেখা যায়, ২০০৯ দেশে চার লাখের বেশি শিশু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল। ২০০১ সালের তুলনায় এই সংখ্যা পাঁচ থেকে ৬ গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রসবের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার দরকার হয়। মায়ের অপুষ্টি ও গর্ভকালীন সমস্যার কারণে প্রসবে জটিলতা দেখা দেয়। মা ও নবজাতকের প্রাণ ও স্বাস্থ্যরক্ষায় অস্ত্রোপচার করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সিজারিয়ানে শিশু জন্ম বাড়ছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস)-২০১৪-এর তথ্য মতে, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে মাধ্যমে  শিশু  জন্মের বাড়ার গতি ২০০৪ সালে ছিল ৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ছিল ৯ শতাংশ, ২০১১ সালে ছিল ১৫ শতাংশ আর ২০১৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশ। এতে ৮ শতাংশ অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে শিক্ষিত ও ধনিক শ্রেণীর মধ্যে অস্ত্রোপচারের হার বেশি। দরিদ্র পরিবারে ৭ শতাংশ সিজারিয়ান করান। সরকারি হাসপাতালে ৩৪ শতাংশ, ৮০ শতাংশ লাভজনক প্রাইভেট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে, ২৪ শতাংশ এনজিও প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমের শিশু জন্ম দিচ্ছেন। ২০১৭ সালের ২রা মার্চ জাতীয় সংসদে লিখিত প্রশ্নের জবাবে সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, দেশে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে তুলনামূলকভাবে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার অনেক বেশি।
এ প্রসঙ্গে ঢামেক হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ফেরদোসৗ ইসলাম বলেন, সিজারিয়ানের মাধ্যমে শিশু জন্ম প্রসবের প্রবণতা বাড়ছে। এটা শিক্ষিত নারীদের মধ্যে বেশি। তার হাসপাতালে বছরে যত শিশু জন্ম হয়, তামধ্যে ৫০ শতাংশই হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। মায়েরা ব্যথা সহ্য করতে চান না। নতুনদের মধ্যে প্রবণতা বেশি। চিকিৎসকরাও অনেক সময়ে ঝুঁকি নিতে চান না।

নিজস্ব ত্রয়ী অর্জনের চেষ্টা করছে পাকিস্তান, পারমাণবিক অস্ত্রও ভারতের চেয়ে বেশি by শাফকাত আলী

পাকিস্তানের ১৫০ থেকে ১৬০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের রয়েছে ১৩০ থেকে ১৪০টি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্স ইন্সটিটিউট (সিপরি) প্রকাশিত ২০১৯ সালের রিপোর্টে এ কথা বলা হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়, এক দিক দিয়ে দুই দেশই সমান কারণ তাদের উভয়েরই পরস্পরের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণে ক্ষতি ও জীবন ধ্বংসের ক্ষমতা রয়েছে।
পাকিস্তানের হাতে যে দূরপাল্লার শাহিন-৩ ক্ষেপনাস্ত্র রয়েছে তা ভারতের সর্বপূর্বের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও আঘাত হানতে পারে। অন্যদিকে চীনের আঘাত হানার উপযুক্ত ক্ষেপনাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ভারত।
গত বছর ভারত তার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন আইএনএস অরিহন্ত অভিযানে নামায়। এর মাধ্যমে দেশটি ত্রয়ী অর্জন করে। অর্থাৎ জল, স্থল ও আকাশ – সব প্লাটফর্ম থেকে পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা অর্জন করে।
নিজস্ব ত্রয়ী অর্জনের জন্য পাকিস্তানও সাগর থেকে উৎক্ষেপনযোগ্য ক্রুজ মিসাইল তৈরির চেষ্টা করছে।
চীন, ভারত ও পাকিস্তান তিন দেশই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সিপ্রি গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি-জেনারেল জানা এলিয়াসন বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার হলো ২০১৮ সালের পর পারমাণবিক ওয়ারহেড সংখ্যা সার্বিকভাবে কমলেও পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিটি দেশই তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়নের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
২০১৯ সালের শুরুতে নয়টি দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল, ও কোরিয়ার হাতে প্রায় ১৩,৮৬৫টি পারমাণবিক অস্ত্র ছিলো। এর আগের বছর সিপ্রির হিসেবে এই অস্ত্র সংখ্যা ছিলো ১৪,৪৬৫।
১৩,৮৬৫টি অস্ত্রের মধ্যে ৩,৭৫০টির মতো মোতায়েন করে রাখা হয়েছে এবং ২,০০০ ওয়ারহেড রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়।
পারমাণবিক অস্ত্র সংখ্যা কমার পেছনে কারণ রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই দেশের কাছে বিশ্বের ৯০% পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। ২০১০ সালের চুক্তি বাস্তায়ন করতে গিয়ে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংখ্যা কমাচ্ছে।
২০১৮ সালে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে যে তারা নতুন স্টার্ট চুক্তির অস্ত্রহ্রাস সীমা অর্জন করেছে।

যেভাবে ডিজে সানির উত্থান by মরিয়ম চম্পা

একসময় কানে দুল, হাতে রাবার ব্যান্ড, চুড়ি পরতেন। অনেকটা ডিজে পার্টির ছেলেমেয়েদের স্টাইলে করতেন চলাফেরা। সে থেকে তিনি নিজেকে পরিচয় দিতে থাকেন ডিজে সানি হিসাবে। যদিও তার নাম মোহাম্মদ সানি। শুরুতে বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশের একটি দোকানে কাজ করতেন। কিছুদিন পর জিপিও ও মুক্তাঙ্গনের পাশে অবস্থিত পাবলিক টয়লেটের ভেতরে আস্তানা তৈরি করেন। গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি শুরু করেন। এক পর্যায়ে তার নামে কয়েকটি মামলা হয়।
মামলা হওয়ায় যেন তার কপাল খুলে যায়। এরপর থেকে তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এলাকায় সুপরিচিতি লাভ করেন। কারণ জেলখানায় বসে শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইন ইকবালের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। নাইন ইকবাল মির্জা খোকনের ক্যাডার বাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলো। যেটা ফাইভ স্টার গ্রুপ নামে পরিচিত। গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন শফিকুল ইসলাম ইকবাল ওরফে নাইন ইকবাল। নাইন ইকবাল কমলাপুরে একটি মেয়েকে ছয় টুকরো করে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। মতিঝিলে রাজউক ভবনের পেছনে জঙ্গি বাবু নামে একজনকে খুন করাসহ একাধিক খুনের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির পর পাঁচ তলা থেকে লাফ দেয়। এভাবেই একসময় তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পল্টনের এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ আলী ও নাইন ইকবাল একই তরিকার লোক। এদিকে ১৯৯৮ সালে জেলখানায় বসে নাইন ইকবালের সঙ্গে ডিজে সানির ভালো সম্পর্ক তৈরির মধ্যে দিয়ে ডিজে সানির কপাল খুলে যায়।
ওই আমলে নাইন ইকবাল ছিলেন কুখ্যাত সন্ত্রাসী। যদিও নাইন ইকবাল নিজেকে মোহাম্মদ আলীর শ্যালক হিসেবে সবার কাছে পরিচয় দেন। জেলখানা থেকে বেরিয়ে ইকবালের হাত ধরে অপরাধ জগতে পা রাখেন ডিজে সানি। এরপর ট্যুর-ট্রাভেলস কোম্পানি, আবাসিক হোটেল থেকে চাঁদা তোলাসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত হন। আবাসিক হোটেল থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা সংগ্রহ করতেন সানি। সেসময় যুবদল নেতাদের সঙ্গে ছিল তার ওঠাবসা। বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইকবাল গংরা জেলে যায়। পরবর্তীতে জেল থেকে বের হয়ে কাউন্সিলর সাঈদের সঙ্গে ইকবাল যুক্ত হয়। এসময় তারা দুজন মিলে একটি ত্রাস কমিটি তৈরি করে। যেখানে ডিজে সানি পল্টন, সেগুনবাগিচা এলাকায় চাঁদা সংগ্রহের দায়িত্ব পায়। যদিও তারা সবাই বর্তমান যুবলীগ নেতা সম্রাটের লোক। মূলত আরমান নামে আরেক নেতা কাম সন্ত্রাসীর পক্ষে কাজ করতেন ডিজে সানি। এছাড়াও ডিজে সানির একটি নিজস্ব শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। রাজধানীতে নতুন এবং বড় কোম্পানির অ্যাপার্টমেন্টের মালিকদের অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করাই এ বাহিনীর কাজ। পাশাপাশি পল্টনের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, রিক্রুটিং এজেন্সি ইত্যাদি থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমান চাঁদা তোলেন তারা। এছাড়া বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে তারা ফ্ল্যাট দাবি করেন। পরবর্তীতে ফ্ল্যাটগুলো বিক্রি করে দেন। কোনো উচ্চবৃত্ত পরিবারে ভাই বোনের মধ্যে ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্ব। খবর পেয়ে গায়ে পরে তারা বিচার করতে যান। বিচারের মীমাংসা হিসেবে দুই পক্ষের কাউকেই বাড়িতে প্রবেশ করতে দিতেন না তারা। মিডলম্যান হিসেবে লোক ঠিক করে তাকে দিয়ে বাসার ভাড়া উঠিয়ে বাসার মালিক পক্ষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি টাকা দিয়ে বাকিটা তারা নিয়ে যান। এছাড়া রাজধানীতে নাইন ইকবালের নিজস্ব একটি বড় ইয়াবার ডিলার আছে। সানি ওরফে ডিজে গ্রুপের সবচেয়ে বড় ব্যবসা হচ্ছে বিয়ার, মদ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সরবরাহ করা। ইকবালের কাছ থেকেই মূলত ইয়াবা সংগ্রহ   করে সেগুলো বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করতেন সানি। সন্ত্রাসী জগতে সানির বস হচ্ছে নাইন ইকবাল ওরফে শফিকুল ইসলাম ইকবাল। যুবলীগের নেতা আরমান পরবর্তীতে ডিজে সানিকে মৌখিক ভাবে যুবলীগে একটি পদ দেন। সানি যেটাকে পল্টন থানা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক দাবি করে পরিচয় দিতে থাকেন। ডিজে সানির গ্রামের বাড়ি নিয়ে রয়েছে দ্বিধা। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বলা হলেও অন্য সূত্র জানায় তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালি। দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে একসময় তার বাসা ছিল পল্টন। পরবর্তীতে গুলবাগে বাসা স্থানান্তর করেন। সম্প্রতি যুবলীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের ধরপাকড় শুরু হলে সে নাইন ইকবালের ছত্রছায়ায় আত্মগোপনে চলে যায়। এদিকে ইকবাল বর্তমানে কমিশনার সাঈদের অবৈধ বাণিজ্যের পাহারা দিচ্ছেন। বিজয় নগর পানির ট্যাঙ্কির পেছনের একটি ভবনে মাঝারি আকারের ক্যাসিনোর আসর বসাতেন সানি। এখানেই মূলত তার প্রকৃত আস্তানা ছিল। যেখানে সন্ধার পরই জুয়ার আসর বসতো। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য হতো তার জুয়ার আসরে। বর্তমানে সেখানে তালা ঝুলছে। যুবলীগ নেতা খালেদকে গ্রেফতারের পর দুই দিন সে প্রকাশ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন করেন। আরামবাগের একাধিক ক্যাসিনোতে ব্যারেব অভিযানের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায় নি। এদিকে নাইন ইকবাল অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পল্টনের একজন ব্যবসায়ী বলেন, গত সোমবারও ইকবালকে মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকায় ঘুরতে দেখেছি। তার নামে অসংখ্য খুনের মামলা থাকা সত্বেও পুলিশ কেনো ধরছে না বুঝতে পারছি না। শুদ্ধি অভিজানের ভেতরে সে কিভাবে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। যদিও কোথাও  এখন সে অবস্থান করছেন না। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, বড় ভাইদের আশির্বাদে সেগুন বাগিচা স্কুল এলাকার পুরোটাই ডিজে সানির দখলে। নাইন ইকবালই মূলত বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের যোগান দিয়ে তাকে এ সকল অবৈধ কাজে সহায়তা করেন। নাইন ইকবাল ও সানি অনেক মারাত্মক লোক। আমরা পল্টনে ব্যবসা করি প্রায় ৪০ বছর। ছোট খাটো ব্যবসা করলেও তাদের ম্যানেজ করেই আমাদের টিকে থাকতে হয়। তাদের মাসোহারা না দিলে যে কোনো সময় আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

রং ফর্সাকারী ক্রিম এড়িয়ে চলুন: যুক্তরাজ্যে সতর্কতা

যুক্তরাজ্যের ভোক্তাদেরকে রং ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহারে সতকর্তা জারি করে বলা হচ্ছে 'যেকোনো মূল্যে' এ ধরণ্যের পণ্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে।
লোকাল গভর্নমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এলজিএ) এই সতর্কবার্তায় বলা হচ্ছে, রং ফর্সাকারী ক্রিমে থাকা উপাদান ত্বকের উপরিভাগের একটি স্তরকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সম্প্রতি দেশটিতে বাণিজ্য মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের হাতে এ ধরণের কিছু পণ্য জব্দ হওয়ার পর এই হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
এতে বলা হয়, অনেক পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান হাইড্রোকুইনোন থাকে। এছাড়া অনেক ক্রিমে মার্কারি বা পারদ থাকার কথাও জানা গেছে।
এলজিএ বলছে, কিছু খুচরা ব্যবসায়ী, অনলাইন, বাজারের কিছু দোকানীসহ এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা এ ধরণের পণ্য বিক্রি করছে।
তারা সবসময় পণ্যের সঠিক মাত্রা উল্লেখ করেনা, যার কারণে ভোক্তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন।
এলজিএ'র মতে হাইড্রোকুইনোন এমন এক রাসায়নিক যা জৈবিক রং পরিবর্তনের এক ধরণের উপাদান বা 'পেইন্ট স্ট্রিপার'।
এই রাসায়নিক মানুষের ত্বকের একটি স্তরকে অপসারণ করে দিতে পারে।
এর ফলে ত্বকের ক্যান্সার, যকৃত এবং কিডনির মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। পারদ থেকেও একই ধরণের প্রাণঘাতী স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসকের অনুমোদন ছাড়া যুক্তরাজ্যে হাইড্রোকুইনোন, স্টেরিয়ড বা পারদ রয়েছে এমন ক্রিম তাদের মারাত্মক ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যেকোনো মূল্যে এড়িয়ে চলুন:
এলজিএ জানায়, সম্প্রতি এসব পণ্যের বেশ কয়েকটি চালান জব্দ করা হয়েছে। এগুলো হল-
•ডাগেনহ্যামে একটি দোকান থেকে ৩৬০ পণ্য জব্দ করা হয়, যেগুলোর বেশ কয়েকটির মধ্যে হাইড্রোকুইনোন ছিল। এগুলোতে উপাদানের সঠিক মাত্রা উল্লেখ করা হয়নি এবং এগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত মান নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়েছে।
•২০১৮ সালে এক অভিযান চালিয়ে সাউথওয়ার্ক কাউন্সিল ২৯০০ রং ফর্সাকারী পণ্য জব্দ করে, যেগুলোর বেশিরভাগই নাইজেরিয়া থেকে সরাসরি আমদানি করা হয়েছিল। এর জের ধরেই হয়তো যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো বিপজ্জনক রং ফর্সাকারী পণ্য বিক্রির দায়ে কারাদণ্ডের রায় আসতে যাচ্ছে।
•ক্যামেরুন থেকে আসার পর গ্যাটউইক বিমানবন্দর থেকে ২৫০ কেজি রং ফর্সাকারী পণ্য জব্দ করা হয়। এসব পণ্যের নমুনায় হাইড্রোকুইনোন পাওয়া গেছে।
কিন্তু এলজিএ বলছে, কাউন্সিল বাজেট কমে যাওয়ায়, বাণিজ্য মান নির্ধারণ কর্মকর্তারা এই সমস্যার বিষয়ে সর্বোচ্চ নজরদারি করতে পারছে না।
এলজিএ'র নিরাপদ ও শক্তিশালী কমিউনিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিমন ব্ল্যাকবার্ন বলেন, "নিষিদ্ধ পণ্যসমৃদ্ধ ত্বকের ক্রিম খুবই বিপজ্জনক এবং এগুলো স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, সারা জীবনের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে, তাই এগুলোকে যেকোনো মূল্যে এড়িয়ে চলা উচিত।"
"ভোক্তাদের সব সময় তাদের ক্রিমে কি উপাদান রয়েছে তা খতিয়ে দেখা উচিত। খুব কম দাম হলে আরো বেশি সচেতন হওয়া উচিত কারণ সেগুলো নকল এবং ক্ষতিকর হতে পারে। সেইসাথে হাইড্রোকুইনোন রয়েছে এমন পণ্য ব্যবহার না করা উচিত।"
"পণ্যে যদি কোন ধরণের উপাদানের উল্লেখ না থাকে তাহলে সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়।"
তিনি আরো বলেন, "যেসব অসাধু ব্যবসায়ী এসব নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি করে তাদের খুঁজে বের করতে কাজ করছে কাউন্সিল। এছাড়া এসব ব্যবসায়ীদের বিষয়ে তথ্য দিতে জনগণকে আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে করে টাউন হল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। যাতে করে মানুষ এ ধরণের পণ্য কেনা থেকে বিরত রাখা যায় যা তাদের চেহারায় স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে।"
ব্রিটিশ স্কিন ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র লিসা বিকারস্টাফে বলেন, বছরের পর বছর ধরে অবৈধ রং ফর্সাকারী ক্রিমের ইস্যুটি চলেই আসছে।
তিনি বলেন, "কাউন্টার কিংবা অনলাইনে অবৈধ উপায়ে এসব ক্রিম বিক্রির কারণেই এই সমস্যা বেড়ে চলেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া বেশ কঠিন।"
"এসব কসমেটিকসের উপাদান মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং ব্রিটিশ স্কিন ফাউন্ডেশন এগুলো ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দিয়ে থাকে।"
"নিজের ত্বকের রং নিয়ে কোন অভিযোগ থাকলে ব্যক্তিগত ত্বক বিশেষজ্ঞ বা জিপি'র সাথে যোগাযোগ করুন এবং তারাই আপনাকে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবেন," তিনি বলেন।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে রং ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহারে সতর্কতা আরোপ করা হয়েছে