Showing posts with label সময়চিত্র. Show all posts
Showing posts with label সময়চিত্র. Show all posts

Sunday, April 3, 2011

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক by আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের গণপরিষদের বিতর্ক প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। ১৯৭২ সালের গণপরিষদের কার্যক্রমের ওপর প্রকাশিত এই বইটি পড়লে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আইনপ্রণেতাদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা আরও বাড়বে আমাদের। সেটি শুধু তাঁদের অনেকের পাণ্ডিত্যের জন্য নয়, তাঁদের বিনয়, সৌজন্যবোধ এবং সর্বোপরি ভিন্নমত প্রকাশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জন্য। বঙ্গবন্ধু, চার জাতীয় নেতাসহ তাঁদের অনেকে পরলোকগমন করেছেন; বেঁচে আছেন ড. কামাল হোসেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাজেদা চৌধুরীসহ অল্প কয়েকজন।
১৯৭২ সালে গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনের আলোচনার পরই গৃহীত হয় আমাদের আদি সংবিধান। পরিষদে সবচেয়ে সরব ছিলেন বিরোধী দলের সদস্য ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিন সপ্তাহব্যাপী বিতর্কে তিনি অর্থনৈতিক অধিকারগুলো গুরুত্বহীন করে রাখা, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা, ৭০ অনুচ্ছেদের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এমনকি শেষে ১৫ ডিসেম্বর সংবিধানে স্বাক্ষর প্রদান করা থেকেও বিরত থাকেন। প্রায় ৪০ বছর পর তিনিই আজ সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটির কো-চেয়ারম্যাান। ৪০ বছর আগে তিনি খসড়া সংবিধানে যেসব পরিবর্তনের কথা বলতেন, তার অনেক কিছুর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাম্প্রতিককালে আমরা সচেতন হয়েছি। তিনি এই কমিটির নেতৃত্বে আছেন বলে আমরা আশাবাদী হতে পারি যে সংবিধানে ভবিষ্যতে যে পরিবর্তনগুলো আসবে, তা হবে জনস্বার্থমূলক এবং সুশাসনের উপযোগী। তবে এ ক্ষেত্রে কমিটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত সংস্কার। আগের অধিকাংশ সংবিধান সংশোধন হয়েছিল ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে। এবারও তা হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ।

২.
গণপরিষদ বিতর্ক নিয়ে এ লেখা শুরু হয়েছিল। শুনলে কেউ কেউ অবাক হতে পারেন, ৩৯ বছর আগে সেখানে আলোচিত হয়েছিল কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) সরকার প্রসঙ্গও। তখনকার তরুণ আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, কেয়ারটেকার সরকার আসলে পৃথিবীর বহু দেশেই রয়েছে। মেয়াদ শেষে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর মন্ত্রিসভা নতুন নির্বাচনের আগে কেয়ারটেকার সরকার হিসেবেই কাজ করে। ড. কামাল তখনই ব্যাখ্যা করেছেন, সেই কেয়ারটেকার সরকারের মূল দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করা, দৈনন্দিন কাজের বাইরে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে না।
ড. কামালের এই ব্যাখ্যা এখনো প্রাসঙ্গিক। ১৯৯৬ সালে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম বিরল এক কেয়ারটেকার সরকার। দলীয় সরকার সংসদ নির্বাচন চলাকালে তত্ত্বাবধায়কসুলভ নিরপেক্ষতা বজায় রাখে না, বরং বিভিন্নভাবে কারচুপি করে তারা অসৎভাবে নির্বাচিত হতে চায়। তৎকালীন বিএনপি আমলে অতি বিতর্কিত মাগুরা উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা আবারও প্রমাণিত হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের দায়িত্ব তাই আমরা অর্পণ করি নির্দলীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। বিরোধী দলগুলোর তীব্র দাবির মুখে বিএনপি নিজেই এই সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা-সম্পর্কিত সংশোধনী সংসদে পাস করেছিল।
১৯৯৯ সালে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত বলে এই সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্রবিরোধী—মূলত এ অভিযোগে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয় হাইকোর্টে (এম সালিম উল্লাহ্ বনাম বাংলাদেশ)। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট রায় দেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বৈধ, এটি প্রতিষ্ঠিত হয় সংবিধানের যে ত্রয়োদশ সংশোধনীবলে, তা সংবিধানবিরোধী নয়। ১৯৭২ সালে ড. কামালের ব্যাখ্যার ছায়া আমরা দেখতে পাই এই রায়ের একটি অংশে। সেখানে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আগে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হতো, সেটিও এক ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারই ছিল, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর সেই দলীয় সরকারও অনির্বাচিত হয়ে পড়ত এক অর্থে।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ সমর্থনযোগ্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হলে আগামী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নতুন সংসদের নির্বাচন হবে। অথচ সংসদ সদস্যপদ চলে যাওয়ার কারণে তিনি এবং তাঁর মন্ত্রিসভা তখন আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবেন না। অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে পারলে অনির্বাচিত নির্দলীয় ব্যক্তিরা তা হতে পারবেন না কেন? হাইকোর্টে শুনানির সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, রাষ্ট্রপক্ষে বিএনপি সরকারের নিয়োজিত অ্যাটর্নি জেনারেল এবং তখনকার অ্যামিকাস কিউরিরাও (আদালত নিয়োজিত বিশিষ্ট আইনজীবীরা) তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে মতামত দেন।
এই রায়ের বিরুদ্ধে এখন আপিল বিভাগে শুনানি চলছে। এখনকার অ্যামিকাস কিউরিরাও এই সরকারের বৈধতা রয়েছে বলে বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অব্যাহত রাখতে বলছেন। হাইকোর্টের রায় তাই আপিল বিভাগে উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে এই সরকারব্যবস্থা উন্নতকরণের নির্দেশনা আসতে পারে সেখানে। সেটি হতে হবে সংসদে। আর এ জন্য প্রয়োজন সংবিধান সংশোধনী কমিটির সদিচ্ছা এবং সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা।

৩.
হাইকোর্টে এবং এখনো আপিল বিভাগে শুনানিকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কারা থাকবেন, তা নিয়ে নানা সুপারিশ করা হচ্ছে। হাইকোর্টে এই সরকারব্যবস্থা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের সরকারি দায়িত্বে নিয়োগ নিষিদ্ধকরণসংক্রান্ত সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছিল। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বিচারপতিদের নিয়োগ না করে অন্যদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন বা রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা সাপেক্ষে নির্বাচনকালে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকও বিচারকদের বাদ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এখন আপিল বিভাগেও কয়েকজন বিশিষ্ট আইনজীবী অনুরূপ পরামর্শ দিচ্ছেন।
সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধানটি অপব্যবহার করার জন্য সরকার তার পছন্দসই কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করে থাকে বলে একটি ধারণা বিভিন্ন মহলে রয়েছে। দুজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি হিসেবেও তুলনামূলক জুনিয়র একজনকে ভবিষ্যতে নিয়োগ দেওয়া হলে বর্তমান প্রধান বিচারপতি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে (সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন—এ ধরনের একটি হিসাব সরকারি মহল থেকে করা হচ্ছে বলে কিছু মহল থেকে ইতিমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি বিভিন্নভাবে নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন, এ অভিযোগে তাঁকে আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না—এ ঘোষণাও কেউ কেউ ইতিমধ্যে দিয়েছেন।
তাত্ত্বিকভাবে দেখলে এটি ঠিক যে বর্তমান ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে সরকারি দল আরও জোরালোভাবে চেষ্টা করবে তাদের আস্থাভাজন বিচারকদের বিভিন্ন সময়ে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করতে। এতে অবাধ নির্বাচনের সম্ভাবনা বিঘ্নিত হয়, একই সঙ্গে রাষ্ট্র বঞ্চিত হয় স্বাধীনচেতা ও যোগ্যতম ব্যক্তিদের প্রধান বিচারপতি পদে পাওয়া থেকে।
তবে তাত্ত্বিকতার বাইরে বাস্তবতাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প আসলে আমাদের আছে কি? নির্বাচনের সময় জাতীয় সরকার গঠিত হলে শেখ হাসিনা তাঁর প্রধান হবেন, এটি বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো মেনে নেবে কি? অন্য কোনো ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নিতেও মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হবে কি? এই অনিশ্চয়তা আগামী নির্বাচনের জন্য সৃষ্টি করলে তা গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে না কি?
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে বর্তমান বিধান পরিবর্তন করতে হলে সংসদের দলগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট মতৈক্যের ভিত্তিতে তা করতে হবে। সেটি সম্ভব না হলে মন্দের ভালো হিসেবে বর্তমান বিধান অব্যাহত রাখা সঠিক হবে।

৪.
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ সুনির্দিষ্ট করার প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে সংসদীয় কমিটি। এটি সঠিক চিন্তা এবং এতে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ অনুসারে কাজ করার বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রপতির ওপর আরোপ করার প্রস্তাবটিও সবাই ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে বলে কেউ কেউ আপত্তি করছেন। রাষ্ট্রপতির ওপর তখন প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টামণ্ডলীর পরামর্শ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করলে এ বিতর্কও অনেকাংশে দূর হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনীর ক্ষেত্রে জটিল দিকগুলো হচ্ছে এই সরকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি নির্ধারণ। সংবিধানে আছে, এই সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান-সম্পর্কিত বিষয় বাদে কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অতীতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিতে হয়েছিল। আবার বিধানটির অস্পষ্টতার কারণে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত আইনগুলোও সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছিল।
আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে অতীতে তত্ত্বাবধায়ক আমলগুলোতে আমরা এমন অনেক ভালো আইনও পেয়েছি, যা নির্বাচনী আইনকে সমৃদ্ধ করেছে, বিভিন্ন কমিশন (যেমন—মানবাধিকার ও তথ্য কমিশন) প্রতিষ্ঠা করেছে এবং স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করতে চেয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যাবলি বেশি সীমাবদ্ধ করে দিলে এমন সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হব। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জরুরি অবস্থা জারি করার ক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মহাবিপর্যয়কালীন (যেমন—যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগ) আমরা গভীর সংকটে পড়ব।

৫.
মূল কথা হচ্ছে, আমাদের গভীর চিন্তাভাবনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী করতে হবে। শুধু গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে আমরা ভুল করব। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা ও প্রাণঘাতী সংঘাতের কারণে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন তখন প্রলম্বিত হয়েছিল শুদ্ধ ভোটার তালিকা প্রণয়নে বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি প্রথমেই আওয়ামী লীগের শর্তহীন সমর্থনের কারণে। কাজেই অন্যকে দোষ না দিয়ে এই দুটি দল যদি আত্মসমালোচনামূলকভাবে সংস্কার ভাবনায় মন দেয়, তাহলেই শ্রেয়তর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমরা পেতে পারি ভবিষ্যতে।
সংসদে সব দলকে তাই খোলা মনে আলোচনা করতে হবে, সব অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাখতে হবে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগুলো মাথায় রাখতে হবে। পর্যাপ্ত আলোচনা সংসদে করতে হবে, প্রয়োজনে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করতে হবে এবং অবশ্যই মতৈক্যের ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিরন্তর প্রচেষ্টায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে (এবং নির্বাচন কমিশনকে) আরও নিরপেক্ষ ও কার্যকর করার চিন্তা আমাদের সততার সঙ্গে করতে হবে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Saturday, March 13, 2010

অনেক কিছু বলতে মানা by আসিফ নজরুল

সাবধানে কথা বলো! দরজা দিয়ে বের হতে হতে স্ত্রীর উদ্বিগ্ন গলা শুনি। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবি, সাবধানেই বলা উচিত। যারা প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছে, তাদের দুরবস্থা জানি। যারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নজরদারিতে আছে, তাদের ভোগান্তি জানি। তবুও কেন চড়া গলায় বলে ফেলি এত কিছু!
সাবধানে থাকার আসল উপায় হচ্ছে, কথা-ই না বলা। মাঝেমধ্যে তা-ই করি। পঞ্চম সংশোধনী মামলার লিভ টু আপিল খারিজ হওয়ার দিন ফোন আসে কিছু চ্যানেল থেকে। এই লিভ খারিজ হওয়ার কোনো কারণ আমি বুঝতে পারি না। হাইকোর্টের বিচারক কেন চতুর্থ সংশোধনীর পক্ষে কিছুটা হলেও সাফাই গাইলেন রায়ে, তাও বুঝতে অক্ষম আমি। আরও নানা অসংগতিপূর্ণ (কিন্তু সামরিক শাসনের বিরোধিতা, অসাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রশংসনীয়) এ রায়কে বাইবেলের মর্যাদা দিয়ে লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে চারদিকে। অথচ আমার মনে নানা প্রশ্ন। এত প্রশ্ন প্রকাশ্যে করে টিকে থাকা যাবে না দেশে। সব চ্যানেলকে যাব না বলে দিয়ে বসে থাকি বাসায়। দেখি, অন্যরা কী বলেন।
অন্যরা বলেন। কিন্তু আমার মনের প্রশ্ন অনেকাংশে নেই সেখানে। হয়তো সবাই সাবধানী হয়ে গেছেন আজকাল। হয়তো এ দেশে সত্যিই অনেক কিছু বলতে মানা। কিছু বিষয়ে আদালত অবমাননার খড়্গ আছে, কিছু বিষয়ে মানহানি মামলা খাওয়ার ভয় আছে। এগুলো সব দেশে আছে, বাংলাদেশে আছে আরও বেশি। কিছু বিষয়ে টেলিফোনে হুমকি শোনার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে ও কলম্বিয়ার মতো দেশে এমন হুমকি থাকবেই। কিন্তু গণতন্ত্রের দেশ বাংলাদেশেও তা আছে—আছে ভয়ংকরভাবে।
বাংলাদেশে আরও আছে অতি ‘প্রগতিশীল’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ নাগরিক সমাজের আক্রমণ। পশ্চাত্পদ বা সাম্প্রদায়িক শক্তি ভয়ংকর একপেশে ও নির্মম। কখনো কখনো শারীরিকভাবে আক্রমণ বা জীবনের ওপর হামলাকে উত্সাহিত করে বসে এরা। এরা এক আমলে সোচ্চার থাকে, আরেক আমলের অনাচার নীরব থেকে সমর্থন করে।
প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাত্পদ গোষ্ঠী অযৌক্তিক বা অসহিষ্ণু হবে, কিংবা অন্যদের প্রতি আক্রমণাত্মক হবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু বেদনাদায়ক হচ্ছে, অতি প্রগতিশীলদের আচরণ। এরা বাকস্বাধীনতার কথা বলে, মুক্তচিন্তার কথা বলে, অন্য পক্ষদের ঝেড়ে বিষ নামিয়ে ফেলে। কিন্তু এদের কোনো সমালোচনা করলে, এমনকি এদের মতো ভাষায় কথা না বললেই বিপদ। হয় তাদের মতো ভাষায় কথা বলতে হবে, না হয় প্রতিক্রিয়াশীল বা পশ্চাত্পদ হিসেবে চিহ্নিত হতে হবে। মাঝামাঝি কিছু নেই।
এই অতি প্রগতিশীলেরাও বিশেষ সময়ে, বিশেষ কারও পক্ষে সোচ্চার থাকেন, অন্য সময় নিশ্চুপ। পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এরা আদিবাসী নামে অভিহিত করে, তাদের অধিকার রক্ষায় দিনরাত সোচ্চার থাকে। থাকাই উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙালি কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে, বাঙালির গ্রাম পুড়লে এরা নীরব থাকে। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকে, কিন্তু ভারত বা ইসরাইলে সংখ্যালঘুরা চরম বর্বরতার শিকার হলে সে প্রসঙ্গে নীরব থাকে। এরা বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে যুদ্ধাপরাধের বিচার আর সুশাসনের আন্দোলনে দেশ গরম করে ফেলে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এদের সুর নরম হয়, সুশাসনের রূপকল্প বাক্সবন্দী হয়ে যায়।
এদের ভাষায় কথা বললে টিক্কা খানের শপথ পরিচালনাকারী বিচারক, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় বিভিন্ন বাহিনীর সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তি কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজার সাতখুন মাফ হয়ে যায়। অন্য ভাষায় কথা বললে, সেক্টর কমান্ডার বা বীর উত্তম পর্যন্ত হয়ে যান রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী।
এদের চটালে জীবন শেষ। সুশীল আর কুশীলদের সম্মিলিত আক্রমণে জান শেষ হয়ে যাবে তখন।

২.
এ দেশে কী বলা যাবে, কী যাবে না, তা নির্ধারিত হয় অন্যদের সিদ্ধান্তে। রাষ্ট্র নয়, নাগরিকই এখানে প্রতিপক্ষ অন্য নাগরিকের। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দিই। একজন বড় সম্পাদক ফোন করতেন মাঝেমধ্যে। অন্তত একটি লেখা দিতেই হবে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘যা খুশি লিখেন, যা আপনার ইচ্ছা হয়।’
আগের দিন টিভিতে দেখেছি, বিএনপি আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবরের দুর্ভোগ। পুলিশের সাহায্য নিয়ে বিধ্বস্ত শরীরে হাঁফাতে হাঁফাতে চলছেন তিনি আদালতে। আদালত তবুও বারবার রিমান্ডে দিয়ে চলেছেন তাঁকে। বাবরের যা অবস্থা, তাঁর আর টেকার কথা নয় বেশি দিন। আমি সম্পাদককে বলি, বাবরের রিমান্ড নিয়ে লিখব। আঁতকে ওঠেন তিনি— এটা লিখবেন! লোকজন কী ভাববে? বোঝানোর চেষ্টা করি তাঁকে। বাবর অপরাধী হলে তাঁর অবশ্যই সমুচিত শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু প্রায় মুমূর্ষু একজন মানুষকে এতবার রিমান্ডে নেওয়া সংবিধানের লঙ্ঘন। তা ছাড়া রিমান্ডের বিষয়ে হাইকোর্টের যে নির্দেশনা আছে, সেটা পালন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখাও আদালতের কর্তব্য। তিনি আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু অন্যরা কী ভাববে এ নিয়ে বিব্রত তিনি। ‘অন্যদের’ চটানোর সাহস নেই তাঁর। আমাকে আর লিখতে অনুরোধ করাও বন্ধ করে দেন এরপর। সেই পত্রিকায় আমার আর লেখা হয়নি।
অতএব, এ ধরনের পত্রিকায় বাবরের বিষয়ে বলতে মানা। অতি প্রগতিশীলেরা রুষ্ট হন—এ রকম আরও কিছু বিষয়ে লিখতে মানা। বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে সত্যিকারের ইতিহাস চর্চা মানা। শেখ হাসিনার মামলা কেন প্রত্যাহার হলো, সজীব ওয়াজেদ জয় কেন ক্ষমতাবান—এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে মানা। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইনটির আরও সংস্কার প্রয়োজন—এটি লিখতে মানা। ভারতীয় সীমান্তে বাংলাদেশিদের নির্বিচারে মেরেই চলেছে, তা বলতে মানা।
মানা আছে অন্য পক্ষেও। মনে আছে, টিভিতে একবার বলেছিলাম, ‘তারেক রহমানকে দেখে শহীদ জিয়ার সন্তান মনে হয় না, মনে হয়, মামুনের বন্ধু।’ বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত একজন সাংবাদিক ফোন করে জানান, বিএনপির লোকজন দারুণ খেপেছেন এতে। এসব কী বলি আমি! মনে মনে আরেকটা লিস্ট করি। তারেক রহমান বিএনপির এবং দেশের কী কী ক্ষতি করেছেন, তা কোথাও কোথাও বলতে মানা। খালেদা জিয়া কীভাবে জিয়ার রাজনীতি, আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব থেকে বিচ্যুত্ হয়েছেন, তা লিখতে মানা। বিএনপির আমলে কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন, তা নিয়ে অনুসন্ধান করা মানা, জামায়াতের বর্বরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানা। বিএনপি এখন ক্ষমতায় নেই। এখন হয়তো আপাতত বলা বা লেখা যাবে অ-বিএনপি পত্রিকা বা টিভিতে। কিন্তু ক্ষমতায় এলেই এসব লেখালেখির মাসুল দিতে হবে। জেলখানায় পচতে হবে কিংবা দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।
মানা মানে যে সরাসরি মানা, সব সময় তা নয়। তবে এসব নিয়ে লিখলে বা বললে নানা রকম বিপদ হতে পারে। সবচেয়ে বড় ভয়, ভুল বোঝাবুঝির শিকার হওয়ার। আওয়ামী লীগের স্তাবক না হলে বিএনপি কিংবা রাজাকারের লেবেল দিয়ে দেওয়া হবে এক পক্ষ থেকে। বিএনপির স্তাবক না হলে ভারতের দালাল বলে গালি দেবে অন্য পক্ষ।
অতি প্রগতিশীল বা অতি প্রতিক্রিয়াশীলদের থেকে রক্ষা নেই। মাঝামাঝি কিছুতে বিশ্বাস নেই তাদের।
৩.
এই হানাহানিতে নানাভাবে উত্সাহ জোগায় গণমাধ্যমও। একদল পত্রিকা ‘অগ্রসর চিন্তার’। কিন্তু অন্য কিছু যারা বলে, তাদের সম্ভবত পছন্দ করে না এরাও। নিজেদের প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগবিরোধী লেখক-শিক্ষাবিদদের তারা উল্লেখ করে ‘বিএনপি-জামায়াতপন্থী’ হিসেবে, বিএনপিবিরোধীদের উল্লেখ করে ‘বিশিষ্ট’ বুদ্ধিজীবী বা লেখক হিসেবে। এই বিশিষ্টরা আওয়ামী লীগের এ আমলেও বিভিন্ন ব্যাংক, করপোরেশন বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পেয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। তবু তাঁরা নিরপেক্ষ বা বিশিষ্ট, আর বাকিরা ‘বিএনপিপন্থী’। এদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ বিশেষণ ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি’, সাদা দলের পরিচয় ‘বিএনপি-জামায়াত ঘরানার শিক্ষক’।
অন্যদিকে বিএনপির সমর্থক কিছু পত্রিকায় ঠিক উল্টো চিত্র। সেখানে বিএনপিবিরোধী কাউকে ঘাদানি, নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা মামুলি বিষয় মাত্র। তাদের সাংবাদিকতায় ঘাদানি মানে আওয়ামী লীগ, নাস্তিক মানে আওয়ামী লীগ, মুরতাদ মানেও আওয়ামী লীগ। বিএনপির পক্ষে কথা বলা মানে স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলা, অন্যকিছু বলা মানে ভারতের দালালি করা।
পিছিয়ে নেই আমাদের চ্যানেলগুলোও। যেকোনো সংবাদ প্রচারে নিজেদের দর্শনের বিশেষজ্ঞ খুঁজে পেতে এদের তুলনা নেই। তাদের দুয়ার বন্ধ অন্যদের জন্য—যা তারা বলতে চায় না, তা অন্যদের বলার সুযোগও দিতে চায় না।

৪.
এ দেশে বলতে মানা এমন বহু কিছু। কিন্তু সাধারণ মানুষ শুনতে চায় সব। দ্রব্যমূল্য বা দুর্নীতি আওয়ামী লীগের আমলে বাড়লে এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কষ্ট পাওয়া থেকে বিরত থাকে না। বিএনপি আমলে দাম বাড়লে বিসমিল্লাহ বললে এদের কষ্ট দূর হয় না। বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমানের হত্যার বিচার হলে এরা নিজেদের পরিজনদের হত্যার কষ্ট ভুলে যায় না। নদীতে পানি কম থাকলে ভারতের স্বার্থ ভেবে খুশি থাকে না, বিএনপি ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানকে ভাই ভাবা শুরু করে না। সবার চলাচল থামিয়ে দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি রাস্তায় চললে, কোন দলের তিনি—এটা ভেবে শাপ-শাপান্ত করা থেকে বিরত থাকে না।
মুশকিল হচ্ছে, ‘বলতে মানা’ কথা বলার সুযোগ নেই তাদের। মিডিয়ায় কথা বলি আমরা শিক্ষিত আর সম্পদশালীরা। জনগণের রায় কী, তাও অবলীলায় সার্টিফাই করি আমরা। জরিপ, গবেষণা আর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে জনগণ কারা কারা, তাও নির্ধারণ করি আমরাই।
ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। কিন্তু বলতে মানা কথাগুলো সবারই বলা উচিত ছিল। সেটি হয়নি বলেই এত দুর্ভোগ বাংলাদেশের।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Monday, February 1, 2010

আন্দোলনের হুমকি by আসিফ নজরুল

বিভিন্ন কারণে দাতা দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কিছু শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় আছে আমাদের অনেকের। অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এমন একজন ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর একটি গবেষণার জন্য আলোচনায় বসেন আমার সঙ্গে। আলোচনার একপর্যায়ে অনিবার্যভাবে আসে দেশের রাজনীতির কথা। নির্বাচনে অভাবিত পরাজয় ঘটেছে বিএনপির। এই ফলাফল কি মেনে নেবে তারা? না মেনে নেওয়ার মতো শক্তি কি আছে তাদের? তিনি খুব আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জানালেন, বিএনপি ফলাফল মেনে নেবে। আরও বললেন, দুই বছর অন্তত কোনো বড় ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি দেবে না বিএনপি, হরতালও করবে না। প্রসঙ্গক্রমে আরও জানালেন, দুই বছর তারেক রহমানও ফিরবেন না বাংলাদেশে।
বিএনপির এখনকার আন্দোলনের হুমকি শুনে সেসব পুরোনো কথা মনে পড়ে। টিপাইমুখ ইস্যু ছিল, ছিল করিডর, দ্রব্যমূল্য এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টার মতো ইস্যু। হাতে আছে ভারতের কাছে ‘দেশকে বেচে দেওয়ার’ গুরুতর অভিযোগও। বেগম খালেদা জিয়া কঠোর ভাষায় আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছেন। কিন্তু আমার সংশয় তবু যায় না। নির্বাচনের দুই বছরের মধ্যে আন্দোলন করা হবে না—এ ধরনের কোনো অলিখিত ‘মুচলেকা’ আছে নাকি কোথাও? না হলে টিপাইমুখ নিয়ে যখন উত্তাল ছিল সিলেট, তখনো অন্তত সিলেটে আধাবেলা হরতাল ডাকা হলো না কেন! এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করার উদাহরণ কি আছে নিকট ইতিহাসে? নেই। তাহলে হয়তো দাতা বন্ধুর কথাই ঠিক। তাদের চেয়ে বেশি জানার সুযোগ নেই আমাদের অনেকের। আবছাভাবে আমরা শুধু জানি বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা শুধু জনগণ নয়, দাতাদেশ ও প্রতিষ্ঠান, সেনাবাহিনী এবং বড় ব্যবসায়ী—অন্তত এই তিনটি শ্রেণী বাংলাদেশে কে কখন ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারণে বিরাট ভূমিকা রাখে। উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমেরও। তবে প্রথমোক্ত শ্রেণীর তুলনায় এদের ভূমিকা অনেক খোলামেলা ও প্রকাশ্য।
তুলনামূলকভাবে অপ্রকাশ্য যে তিনটি শ্রেণীর কথা বললাম, এদের ভেতরে ঐক্য আর বোঝাপড়া থাকে অধিকাংশ সময়। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাবলিতে যত বেশি এই বোঝাপড়া থাকে, জনগণের ভূমিকা তত গৌণ হয়ে ওঠে। আবার জনগণ ও জনমতকে প্রকৃত অর্থে সংগঠিত করা গেলে অন্তরালের শক্তিরাও সুযোগমতো অবস্থান বদলে জনগণের ভাষায় কথা বলতে থাকে। ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা দেখেছি তা। কিছুটা দেখেছি ১/১১-এর দ্বিতীয় বছরেও।
দুই বছরের কোনো সমঝোতা যদি থাকে, তাহলে বড় ধরনের আন্দোলন কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে বিএনপিকে তাই বিশাল জনসমর্থন গড়ে তুলতে হবে দেশে। সেটি এতই বিশাল এবং সুশক্ত হতে হবে যাতে রাজনীতির অন্য নিয়ন্ত্রকেরা আন্দোলনের যৌক্তিকতায় সম্মত হন। প্রশ্ন হচ্ছে, আন্দোলনের পক্ষে এত বড় জনসমর্থন পাওয়ার মতো কোনো ঘটনা কি ঘটেছে দেশে? সেই সমর্থন গড়ে তোলার মতো সাংগঠনিক শক্তি ও প্রস্তুতি কি আছে বিএনপির?

২.
সরকারের প্রতি জনগণ বিক্ষুব্ধ হয় মূলত দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দ্রব্যমূল্য, গণতন্ত্রহীনতা ও দেশবিরোধী কোনো কাজের জন্য। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের দু-একজন উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তবে তা যথেষ্ট জোরালো ও ব্যাপকভাবে নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে নানাভাবে স্থবির ও শক্তিহীন করার চেষ্টা রয়েছে। দলের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা টেন্ডার ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছেন এমন অভিযোগও ছাপা হয়েছে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে। কিন্তু বাংলাদেশের অতীত সরকারগুলোর তুলনায় তা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। আওয়ামী লীগ সরকার বরং মাত্রা ছাড়ানো বাড়াবাড়ি করেছে প্রশাসন দলীয়করণে। তবে সাধারণ জনগণ প্রত্যক্ষভাবে এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। সরকারকে বিতাড়িত করতে এ কারণে রাস্তায়ও নেমে আসেন না।
আওয়ামী লীগ সরকার তুলনামূলক সাফল্য দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার ক্ষেত্রে। এ সময়ে স্বভাবজাত অপরাধীদের দৌরাত্ম্য, খুন-খারাবি ও বড় অপরাধ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রথম আমলে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা যেভাবে নিজেরাই প্রকাশ্যে গডফাদারের ভূমিকায় নেমেছিলেন এবং যে কারণে জনগণ ও গণমাধ্যম বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল তেমন ঘটনা ঘটেনি এখনো দেশে। বরং গডফাদারদের অনেককে নির্বাচনে মনোনয়ন না দিয়ে এমনকি দলের নেতৃত্ব থেকে বাতিল করে শেখ হাসিনা প্রশংসিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সম্ভাবনাময় সন্ত্রাসীদের জন্য একটি সতর্কবাণী হিসেবেও তা কাজ করেছে। যুবলীগ ও ছাত্রলীগ এ থেকে কতটুকু শিক্ষা নিয়েছে সেই প্রশ্ন অবশ্য বাড়ছে দিনে দিনে।
আওয়ামী লীগের প্রতি কিছু মানুষের ইতিমধ্যে রুষ্ট হয়ে ওঠার কথা দ্রব্যমূল্যোর কারণে। কত টাকায় চাল খাওয়ানো হবে, দ্রব্যমূল্য কতটা সহনীয় থাকবে—এ ধরনের কিছু প্রতিশ্রুতি আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচন চলাকালীন সময়ে দিয়েছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না সরকারের খুব একটা চেষ্টা আছে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, চাঁদাবাজি দমন, টিসিবি ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ বিশেষজ্ঞরা দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার সুসমন্বিতভাবে দ্রব্যমূল্য কমানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে এমন কিছু শোনা যায়নি।
এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের কিছু ব্যর্থতা আছে ঠিকই, তবে তা ব্যাপক জনগণকে বিক্ষুব্ধ করার পর্যায়ে যায়নি। আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে গণতন্ত্র চর্চার পথেও অর্থবহ কোনো প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলেননি। মাঝেমধ্যে টকশো, সংবাদপত্র এবং বাগ্স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের কিছু আত্মঘাতী উদ্যোগের কথা শোনা যায়। কিন্তু সরকার শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো পদক্ষেপ বাস্তবে নেয়নি এখনো। এ সময়ে আমার দেশ পত্রিকার একজন প্রতিবেদককে শারীরিকভাবে হামলা করার মতো কিছু নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে, তবে তা এখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের গলা টিপে ধরলে কী ভয়ংকর পরিস্থিতি হয় তা দেখার দুর্ভাগ্য আমাদের হয়েছে অতীতে। সরকার ঠিক সে ধরনের কিছু এখনো করেনি। বিরোধী দল এসব নিয়ে তাদের অভিযোগ করেছে, কিন্তু তা খুব আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে নয়, তেমন জোরালো ভাবেও নয়।
৩.
আওয়ামী লীগ সরকার সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে ‘ভারতপ্রীতির’ কারণে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর এই সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে। তার সরকার ভারতকে ইতিমধ্যে কিছু বিষয় ‘ডেলিভার’ করেছে (যেমন উলফা নেতাদের সমর্পণ), কিছু বিষয়ে তুলনামূলকভাবে ভারতের জন্য বেশি লাভজনক চুক্তি করেছে (যেমন সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন), কিছু বিষয়ে ভারতকে আনুকূল্য দেওয়ার সুশক্ত অঙ্গীকার করেছে (যেমন বন্দর ব্যবহার, নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ লাভে সমর্থন)। কিন্তু বিনিময়ে বাংলাদেশ যা পেয়েছে তা মূলত ভবিষ্যতে কিছু পাওয়ার প্রতিশ্রুতি, আশ্বাস ও আশাবাদ।
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি এমনকি লিখিত চুক্তি পালনের ক্ষেত্রে ভারতের ট্র্যাক-রেকর্ড অবশ্য আশাপ্রদ নয়। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিসহ বেশ কিছু উদাহরণ দেওয়া যায় এ ক্ষেত্রে। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানও তাঁর সাম্প্রতিক লেখায় ভারতের কয়েকটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথা বলেছেন। তিনি আশাবাদী মানুষ বলে তারপরও আমাদের ‘মনের বাঘ’ থেকে বেরিয়ে এসে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সম্ভাবনাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার জন্য বলেছেন। কিন্তু সব মানুষ সমভাবে আশাবাদী ধরনের নয়। বিশেষ করে ফারাক্কা ব্যারাজের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ভারত সম্পর্কে অবিশ্বাস ও আশঙ্কায় ভোগা অযৌক্তিকও বলা যাবে না।
এই অবিশ্বাস দূর করানোর ক্ষমতা রয়েছে মূলত ভারতেরই। বাণিজ্যবৈষম্য কমানো, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধ, কানেকটিভিটি সুবিধা সমভাবে বণ্টন, সমুদ্রসীমানা ন্যায়ভাবে নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে ভারত প্রকৃত বন্ধুসুলভ পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত ভারতবিরোধী মনোভাব বহু মানুষের মধ্যে থাকা স্বাভাবিক। এ পরিস্থিতিতে একতরফাভাবে বাংলাদেশের মাটি ও বন্দর ভারতকে উন্মুক্ত করে দিলে জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভের সঞ্চার হবে তা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব।
তবে এই ভবিষ্যত্ খুব নিকটে নয়। ভারতকে যা যা দেওয়ার অঙ্গীকার আছে যৌথ ইশতেহারে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রায় বছর দুয়েক সময় লাগবে আওয়ামী লীগ সরকারের। আমার ধারণা, এই হিসাব যথেষ্টভাবেই বিবেচনায় রয়েছে বিএনপির। সরকারবিরোধী আন্দোলনে এখনই তাই ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা নয় দলটির। কাউন্সিল অনুষ্ঠান এবং ফখরুল ইসলাম আলমগীর বা রিজভী আহমেদের মতো ব্যক্তিদের ক্ষমতাবান করার পর বিএনপি কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে অবশ্যই। কিন্তু অতীতে এই দলটির আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা রাখত যে ছাত্রদল, তার নেতৃত্ব নির্বাচনে চরম ভুল করে ছাত্রদলের কতটা শক্তি ক্ষয় করা হয়েছে তার কিছু আলামত এখনি দেখা যাচ্ছে।

৪.
সরকারের ব্যর্থতা উন্মোচনের জন্য রাজপথের চেয়ে শ্রেয়তর ফোরাম হচ্ছে সংসদ। অতীতে কোনো বিরোধী দল সংসদের শক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। বাস্তবতাকে বিবেচনা করে বিএনপিকে সেই চেষ্টাই করতে হবে। মাঠপর্যায়ে শক্তি সংহত করার পাশাপাশি সংসদে গেলে বিএনপির অন্তত কোনো ক্ষতি নেই।
নতুন প্রজন্ম এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। এদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হলে বিএনপি যে ভবিষ্যতে শ্রেয়তর সরকার হবে তা গবেষণালব্ধ বক্তব্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ভারতের সঙ্গে চুক্তিসহ সব বিষয়ে নিজের চিন্তা ও পরিকল্পনা সংসদ ও বাইরে তুলে ধরতে হবে। তা না হলে আন্দোলনের সাফল্যের জন্য বিএনপিকে সরকারের বিশাল কোনো ব্যর্থতার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমার ধারণা, কারও ব্যর্থতা বা অযোগ্যতার জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা শ্রেয়তর।
আসিফ নজরুল: আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।