Sunday, November 17, 2013

জরুরি অবস্থা ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের অবস্থান by ইকতেদার আহমেদ

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় একটি দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা দেয়া থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত হয়ে থাকে। জরুরি অবস্থা মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও আমাদের সংবিধানে উভয়ের সহাবস্থান রয়েছে। সংবিধানের নবম-ক ভাগের ১৪১ক, ১৪১খ ও ১৪১গ- এ তিনটি অনুচ্ছেদ জরুরি বিধানাবলী সংক্রান্ত। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নকালে জরুরি বিধানাবলী সংক্রান্ত নবম-ক ভাগ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সংবিধান দ্বিতীয় সংশোধন আইন ১৯৭৩ দ্বারা নবম-ক ভাগ এতে সন্নিবেশিত হয়। জরুরি অবস্থা ঘোষণা-পরবর্তী দেশের নাগরিকরা কতিপয় মৌলিক অধিকার ভোগ করা থেকে বঞ্চিত হন। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেয়, জরুরি অবস্থা গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে জানা প্রয়োজন জরুরি অবস্থা কখন ও কে ঘোষণা করতে পারেন, এর কার্যকরতা কতদিন, ঘোষণাটি কার্যকর থাকাকালীন কোন কোন মৌলিক অধিকার স্থগিত থাকে, ঘোষণাটির কার্যকরতাকালে কোন বিষয়ে আইন প্রণয়ন বারিত নয়, জরুরি অবস্থার ব্যাপ্তি দেশব্যাপী হয় নাকি এর যে কোনো অংশব্যাপী হয়, জরুরি অবস্থা ঘোষণার আদেশ সংসদে উপস্থাপনের আবশ্যকতা আছে কি-না এবং কার্যকর থাকার জন্য কোন অবস্থায় সংসদের অনুমোদন আবশ্যক। উপরোক্ত বিষয়গুলো অনুধাবন করতে হলে অনুচ্ছেদ নং ১৪১ক, ১৪১খ ও ১৪১গ-এর বিধানাবলী বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
অনুচ্ছেদ নং ১৪১ক-এ বলা হয়েছে- ১. রাষ্ট্রপতির নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এমন জরুরি অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে, যাতে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের দ্বারা বাংলাদেশ বা এর যে কোনো অংশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপদের সম্মুখীন, তাহলে তিনি অনধিক ১২০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন; তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ ঘোষণার বৈধতার জন্য ঘোষণার পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষর প্রয়োজন হবে। ২. জরুরি অবস্থা ঘোষণা (ক) পরবর্তী কোনো ঘোষণা দ্বারা প্রত্যাহার করা যাবে; (খ) সংসদে উপস্থাপিত হবে; (গ) ১২০ দিন সময়ের অবসানে কার্যকর থাকবে না; তবে শর্ত থাকে যে, যদি সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় অনুরূপ কোনো ঘোষণা জারি করা হয় কিংবা এ দফার (গ) উপদফায় বর্ণিত ১২০ দিনের মধ্যে সংসদ ভেঙে যায়, তাহলে তা পুনর্গঠিত হওয়ার পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে ঘোষণাটি অনুমোদন করে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত ৩০ দিনের অবসানে অথবা ১২০ দিন সময়ের অবসানে, যা আগে ঘটে, অনুরূপ ঘোষণা কার্যকর থাকবে না। ৩. যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের বিপদ আসন্ন বলে রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে প্রকৃত যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তিনি অনুরূপ যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের জন্য বাংলাদেশ বা এর যে কোনো অংশের নিরাপত্তা বিপন্ন বলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন।
অনুচ্ছেদ নং ১৪১খ-তে বলা হয়েছে- এ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে অন্তর্ভুক্ত বিধানাবলীর কারণে রাষ্ট্র যে আইন প্রণয়ন করতে ও নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম নন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা কার্যকরতাকালে এ সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪২নং অনুচ্ছেদগুলোর কোনো কিছুই সেরূপ আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কিত রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করবে না; তবে অনুরূপভাবে প্রণীত কোনো আইনের কর্তৃত্বে যা করা হয়েছে বা করা হয় নাই, তা ব্যতীত অনুরূপ আইন যে পরিমাণে কর্তৃত্বহীন, জরুরি অবস্থার ঘোষণা অকার্যকর হওয়ার অব্যবহিত পরে তা সে পরিমাণে অকার্যকর হবে।
অনুচ্ছেদ নং ১৪১গ-তে বলা হয়েছে- ১. জরুরি অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতাকালে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা ঘোষণা করতে পারবেন যে, আদেশে উল্লিখিত এবং সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অন্তর্গত মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎকরণের জন্য আদালতে মামলা রুজু করবার অধিকার এবং আদেশে অনুরূপভাবে উল্লিখিত কোনো অধিকার বলবৎকরণের জন্য কোনো আদালতে বিবেচনাধীন সকল মামলা জরুরি অবস্থা ঘোষণা কার্যকরতাকালে কিংবা উক্ত আদেশের দ্বারা নির্ধারিত স্বল্পতর কালের জন্য স্থগিত থাকবে। ২. সমগ্র বাংলাদেশ বা এর যে কোনো অংশে এ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত আদেশ প্রযোজ্য হতে পারবে। ৩. এ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত প্রত্যেক আদেশ যথাসম্ভব শীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হবে।
উপরোক্ত তিনটি অনুচ্ছেদের বিধানাবলী অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, প্রধানমন্ত্রীর পূর্বানুমোদন ছাড়া রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন এবং নির্ধারিত ১২০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর সংসদের অনুমোদন ছাড়া জরুরি অবস্থার কার্যকরতা থাকে না। তাছাড়া জরুরি অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতাকালে সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪২নং অনুচ্ছেদগুলোর সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে রাষ্ট্রক্ষমতাপ্রাপ্ত, যা জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার-পরবর্তী অকার্যকর হয়ে যায়। অধিকন্তু জরুরি অবস্থার কার্যকরতাকালে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংবিধানের তৃতীয় ভাগে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎকরণের জন্য আদালতে মামলা রুজু করার অধিকার স্থগিত করতে পারেন।
সাধারণ অর্থে আমরা বুঝি, সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী যে কোনো প্রার্থীর ভোটারদের সামনে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করার জন্য নিজ সংগঠনের পক্ষ থেকে সভা-সমাবেশ ও শোভাযাত্রার আয়োজন এবং সেই সভা-সমাবেশ ও শোভাযাত্রায় বক্তব্য প্রদানের আবশ্যকতা রয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেয়, জরুরি অবস্থার বিধিনিষেধের কারণে উপরোক্ত কার্যক্রম স্থগিত থাকলে একজন প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার সুযোগ কোথায়? অনুরূপভাবে উপরোক্ত বিধিনিষেধ থাকাবস্থায় একজন সক্রিয় ভোটারের পক্ষে ও নিজ পছন্দের প্রার্থীর পক্ষাবলম্বনে প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণসহ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ কি সম্ভব?
সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে সংবিধানে বর্তমানে যে বিধান আছে তা হল, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ ভেঙে যাওয়া বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭২(৩)-এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভেঙে না দিয়ে থাকলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৫ বছর অতিবাহিত হলে সংসদ ভেঙে যাবে। এ দফাটিতে শর্তাংশ জুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত থাকবার কালে সংসদের আইনের দ্বারা অনুরূপ মেয়াদ এককালে অনধিক এক বছর বৃদ্ধি করা যাবে, তবে যুদ্ধ সমাপ্ত হলে বর্ধিত মেয়াদ কোনোক্রমে ৬ মাসের অধিক হবে না।
অনুচ্ছেদ নং ৭২(৪) এ বলা হয়েছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর এবং সংসদের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে রাষ্ট্রপতির নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রজাতন্ত্র যে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে সে যুদ্ধাবস্থার বিদ্যমানতার জন্য সংসদ পুনর্বহাল করা প্রয়োজন, তাহলে যে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি তা আহ্বান করবেন। জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়ে সংবিধানে যে শর্তারোপ করা হয়েছে তা হল, যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে বাংলাদেশ বা এর যে কোনো অংশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপদের সম্মুখীন হলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা যাবে।
সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে সংবিধানে যে শর্তারোপ করা হয়েছে তা হল, সংসদের ৫ বছরের মেয়াদ অবসানের বিধান সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত থাকবার কারণে সংসদের আইনের দ্বারা অনুরূপ মেয়াদ এককালে সর্বোচ্চ এক বছর বৃদ্ধি করা যাবে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ১৪১ক-এর দফা (১) এর শর্তসমূহ এবং অনুচ্ছেদ নং ৭২-এর দফা (৩) এর শর্তাংশ অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণের কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং সংসদের ৫ বছরের মেয়াদ অবসানের বিধান সত্ত্বেও এককালে অনধিক এক বছর মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ আছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা বারিত না হলেও সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ অজুহাত হিসেবে বিবেচনার অবকাশ নেই।
অভ্যন্তরীণ গোলযোগ যুদ্ধ কি-না এ বিষয়ে আইনজ্ঞদের অভিমত, প্রজাতন্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত অর্থ বাংলাদেশ অপর কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত এবং তা কোনোভাবেই অভ্যন্তরীণ গোলযোগকে আকৃষ্ট করে না। অভ্যন্তরীণ গোলযোগের শাব্দিক অর্থ পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরস্থ হাঙ্গামা, হট্টগোল, বিশৃংখলা, গোলমাল, হৈচৈ প্রভৃতি অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সমার্থক এবং এর কোনোটিই যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণের সমার্থক নয়। তাই অভ্যন্তরীণ গোলযোগ জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে বিবেচ্য হলেও সংসদের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী এর মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ যে বিবেচ্য নয় সে বিষয়ে কোনো সংশয় আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। অনেকের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে, সংসদের নির্ধারিত ৫ বছর মেয়াদ পূর্তির অব্যবহিত আগে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে আপনাআপনিভাবে সংসদের মেয়াদ বেড়ে যাবে। কিন্তু তাদের এ ধারণা যে অমূলক তা সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭২(৩) ও ১৪১ক-এর বিধানাবলী হতে স্পষ্ট।
উল্লেখ্য, সংবিধানের বর্তমান অবস্থায় সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী তার উত্তরাধিকার কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকায় সংসদ পুনর্বহালের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কার্য সম্পাদন করতে হবে।
সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এককালে অনধিক একবছর উল্লেখ থাকায় দুই বা দু’য়ের অধিকবারে একবছর করে বৃদ্ধি বারিত নয়। এ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। ভোটাধিকার গণতন্ত্রের চিন্তা-চেতনার চালিকাশক্তি এবং যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪২ নং অনুচ্ছেদে বিবৃত মৌলিক অধিকারের চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করার স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তা-বিবেক ও বাক্ স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতা, সম্পত্তি ভোগের স্বাধীনতা দ্বারা সমর্থনপুষ্ট। জরুরি অবস্থা বহাল থাকাকালীন উপরোক্ত স্বাধীনতা ভোগের অধিকার স্থগিত থাকায় নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ সময়ে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান কোনোভাবেই জরুরি অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ক্ষেত্রে সংবিধানের অপব্যাখ্যার অবলম্বনে জরুরি অবস্থাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধির যে কোনো ধরনের প্রয়াস আইনের সমর্থনের অনুপস্থিতিতে ফলদায়ক নয়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বড় শক্তির হস্তক্ষেপ কাম্য নয় by মইনুল হোসেন

আমাদের দেশপ্রেম, আমাদের শাসন করার যোগ্যতা, আমাদের সততা- সব কিছু নিয়েই সংশয়-এটাই আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের কথা। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে শাসক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়ী হওয়ার যে সম্ভাবনা নেই, সেটা দেশের ভেতর ও বাইরের সব জনমত জরিপে পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সেই পরাজয় স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত নয়। আমাদের দলীয় রাজনীতিতে নির্বাচনে জয়লাভ করার ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনায় সততা কিংবা সুশাসনের ভালো গুণাবলী কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। ক্ষমতায় এসে সুশাসনের নজির স্থাপন করে আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি কোনো দলই নির্বাচনে বিজয় অর্জন করতে পারেনি। তাই জনগণের জনপ্রিয় ইচ্ছার বিরুদ্ধে একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন করে বিজয়ী হওয়ার আস্থা আওয়ামী লীগ কোথা থেকে পাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহলের অন্ত নেই। এই অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী পরিকল্পনার পেছনে অবশ্যই বাইরের বড় দাদাদের হাত থাকার ব্যাপারে সন্দেহ বাড়ছে। সরকারি প্রশাসনের সমর্থন আদায়ের জন্য সব রকম সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন আইন সংশোধন করে তাদের দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে না। জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ দেয়া হয়নি দলটিকে।
এটা স্পষ্ট যে, ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ সামনে এগিয়ে যাবেই, কোনো বাধার তোয়াক্কা দলটি করবে না। একদলীয় নির্বাচনের পরিকল্পনা যারা করছেন, তাদের জন্য ব্যাপক জনমত বিরুদ্ধে থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ তারা নির্বাচন করছেন নিজেরাই ক্ষমতাসীন থেকে। নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে না হলে যে একতরফা নির্বাচনী ‘বিজয়’ হবে, যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না, সরকারকে নির্বাচনে বিজয়ী করার কারিগররা এ দিকটা বিবেচনায় নিতেও প্রস্তুত নন।
এ ধরনের নির্বাচন যে কোথাও বৈধতা পাবে না, এটা তারা উপলব্ধি করতে পারছে না, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এতটা বেপরোয়া, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দেশের ভেতরে যেমন সরকার নিরন্তর জনগণের বিরোধিতার সম্মুখীন হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিপাকে পড়বে। তারপরও সরকার শান্তিপূর্ণ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব করে তুলছে।
নিকটতম প্রতিবেশিতা ও ঘনিষ্ঠতার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আওয়ামী লীগ যে জনমতের তোয়াক্কা করছে না, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছে না, বিশেষ করে যখন দেশকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আবর্তে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তখন ধারণা করা শুরু হয়েছে বাইরের কোনো শক্তি আওয়ামী লীগকে সাহায্য করতে উদগ্রীব।
কয়েক দিন আগে যারা ইটিভি টেলিভিশন চ্যানেলে টকশো দেখেছেন, তারা ঠিকই ধারণা করতে পেরেছেন যে সন্দেহের তীর ভারতের দিকেই রয়েছে এবং ভারতের বলেই আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে এই দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছে। সেদিনের টকশোর আলোচনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন অধ্যাপক শ্রোতাদের বিশ্বাস করানোর জন্য জোরালো বক্তব্য দিলেন যে, ভারত প্রবলভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং আওয়ামী লীগ যা কিছু করছে তা ভারতের নির্দেশেই করছে। অধ্যাপক এতদূর পর্যন্ত বললেন যে, প্রধানমন্ত্রী নিজের ইচ্ছায় পদত্যাগ করতেও পারেন না। সেই সিদ্ধান্তের জন্য ভারতের মনোভাবের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
শুধু যে আলোচ্য প্রফেসর সাহেবই ভারতের ব্যাপারে এ ধরনের মন্তব্য করেছেন তা নয়। কোনো কোনো কলামিস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব সম্পর্কেও দুশ্চিন্তা ব্যক্ত করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা রয়েছে এর সপক্ষে যে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক ইকনোমিস্টের লেখার উদাহরণ হাজির করেও বলতে পারেন। ভারতের ‘র’ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কী ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে, তার বিশদ বিবরণ কিছুদিন আগে সাপ্তাহিক পত্রিকাটি ছেপেছিল।
ভারতের একজন কলামিস্ট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপ করার পরামর্শ দিতেও আপত্তিকর মনে করেননি।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা কতটা নিবিড়ভাবে এখানে ও অন্যত্র বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অবলোকন করছেন, আমি এ লেখায় সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। বাংলাদেশে যা-কিছু ভুল-ভ্রান্তি করা হচ্ছে তার সব কিছুর জন্য আমি ভারতকে দোষারোপ করতে প্রস্তুত নই।
আমি আনন্দিত যে বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস তার অবস্থান পরিষ্কার ব্যাখ্যা করে দিয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের সহায়তা করেছে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে আমরা যাতে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারি সেটাই ভারত কামনা করে। অন্যান্য বন্ধু দেশের কাছ থেকেও প্রয়োজনে আমরা অনুরূপ সাহায্য-সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। আমাদের বিদেশী বন্ধুরা যদি কোনো পক্ষাবলম্বন না করেন, আমাদের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে আমাদের রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা অনুভব করেন, তবে আমি তার মধ্যে দোষের কিছু দেখি না। তবে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছাই যাতে সর্বাধিক গুরুত্ব পায়, সেটা সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
গত ১১ নভেম্বর সোমবার ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদপত্রে রিপোর্ট বেরিয়েছে, ‘বাংলাদেশে বিদ্যমান বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসন করাই সর্বোত্তম উপায়।’ মুখপাত্র আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবেন। ভারত বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সমর্থন করে।’
ইতিমধ্যে এক অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে গেছে। শেখ হাসিনা আলেম-ওলামাদের এক সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না, তিনি শান্তি চান, জনগণের নিরাপত্তা চান। হরতাল চলাকালে সহিংস ঘটনায় জীবনহানির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি এ বক্তব্য দেন।
এখন সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখতে চান তিনি কতটা আন্তরিকভাবে এ কথা বলেছেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি থেকে যথেষ্ট ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে তারা হরতাল করবে না। বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তার নিজের ঘোষণা অনুসারে পদত্যাগ করলে বর্তমান সংকট কেটে যাবে, সমঝোতা সম্ভব হবে।
পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া আরও পরিষ্কারভাবে জোর দিয়ে বলেছেন, যে মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন সেই মুহূর্তে হরতাল প্রত্যাহার করা হবে। একশ্রেণীর পত্রিকায় এসেছে, দু’জন রাজনৈতিক নেতা- বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও মেজর (অব.) মান্নান সোমবার রাতে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তাদের এ কথা তিনি জোর দিয়ে বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার কথা রেখে পদত্যাগ করলে বিরোধী দল সহিংস রাজনীতি পরিহার করতে বাধ্য হবে। সমঝোতা ও রাজনীতির শান্তিপূর্ণ যাত্রা শুরু হওয়ার পথে বড় ধরনের বাধা থাকবে না। শান্তির জন্যই তো প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার কথা বলেছেন। ধ্বংসের রাজনীতি থেকে দেশকে রক্ষার রাজনৈতিক দায়িত্ব রাজনীতিকদের পালন করতে হবে।
এখন জাতি দুই নেত্রীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে এটা দেখার জন্য যে, কে বেশি আন্তরিক জনজীবনের শান্তি ও নিরাপত্তার ব্যাপারে, কে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় এবং কে তার অঙ্গীকার রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীকে প্রমাণ করতে হবে, তার অভিযাত্রা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য নয়।
ইসলামী জঙ্গিবাদের ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না। পশ্চিমী দুনিয়ায় পর্যন্ত বাংলাদেশের পরিচিতি মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ হিসেবে। মালয়েশিয়ার তুলনায় আমরা অধিকতর মধ্যপন্থী। আমাদের দেশে মৌলবাদ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের এখানকার রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতা লালন করে চলেছে প্রধান দুটি দল- যার কোনোটিই ইসলামী দল নয়।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

আমাকে এখন পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম সংবাদটি জানাতে হবে by মোকাম্মেল হোসেন

রাস্তায় কোনো যানজট নেই। যানজট না থাকলে চলাফেরায় খুব আরাম। আরাম পাচ্ছি- পাশাপাশি টেনশনও হচ্ছে। শুনেছি, বিষের কঠিন জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করে তবেই দেবতারা অমৃত পেয়েছিলেন। হরতালের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া আরামের জন্যও চড়া মূল্য দেয়ার ভয় আছে। ডানে-বাঁয়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখে অগ্রসর হচ্ছি- একটা মিছিল আসতে দেখে রিকশাওয়ালাকে থামতে বললাম। রিকশা থামতে না থামতেই পরপর কয়েকটা ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। লোকজনের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হতেই রিকশা থেকে লাফ দিয়ে তাদের সঙ্গে শামিল হলাম। কিছুটা পথ পাড়ি দেয়ার পর সামনে একটা জটলা চোখে পড়ল। ওদিক থেকে আসা এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করলাম-
: ওইখানে কী হইছে ভাই!
-কুত্তার বাচ্চা।
লোকটার মুখের ভাষা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। তথ্য প্রদানে বাঙালির অসহযোগিতার বদনাম আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গালি-গালাজের নজিরও আছে। আমি এমন কোনো তথ্য জানতে চাইনি যার জন্য এ রকম জঘন্য একটা গালি শুনতে হবে। লোকটার নাক বরাবর নিশানা ঠিক করে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করতেই সে বলে উঠল-
: খন্দকের মধ্যে একটা কুত্তার বাচ্চা পইড়া গেছে। মানুষ গোল হইয়া তামাশা দেখবার লাগছে।
মানুষের মুখের কথা কখনও কখনও মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আরেকটু হলেই কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটত, ভেবে জিহ্বায় কামড় দিলাম। যাক, শেষ পর্যন্ত কোনো অঘটন ঘটেনি- এ জন্য আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া।
জটলার কাছে গিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতেই দেখলাম- ফুটপাতের উন্নয়ন কাজ চলছে। এর নিচে স্যুয়ারেজ লাইন বসানোর জন্য জায়গায় জায়গায় গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে। এ রকম একটা গর্তের মধ্যেই কুকুরছানাটা পড়ে গেছে। এক লোক লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে কুকুরছানাকে উপরে উঠানোর চেষ্টা করছিল। এ ব্যাপারে দু’একজন তাকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছিল। গর্তের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মনে হল- গর্তে কুকুরছানা নয়, বাংলাদেশ পড়ে আছে। কিছু লোক লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে উপরে তোলার চেষ্টা করছে। কিছু লোক নানারকম পরামর্শ দিচ্ছে। আর কিছু লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে!
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘুরে দাঁড়াতেই পাশে একটা বিলবোর্ড নজরে এলো। ফুটপাত উন্নয়নের রূপকার এক প্রতিমন্ত্রী নিজের ছবি-সংবলিত বিলবোর্ডে তার দ্বারা সম্পাদিত উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়েছেন। মন্ত্রী মহোদয় ডান হাতের বুড়া আঙুল থুঁতনির নিচে রেখে মিটিমিটি হাসছেন। হাতের তিন আঙুলে পাথর বসানো তিনটি আংটি শোভা পাচ্ছে। আঙুলের চাপে তার থুতনিতে বেশ কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে। এ মন্ত্রীকে আমি চিনি। পাঁচ বছর আগে মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোট ভিক্ষা করার সময় তার শরীর ছিল পাতাকাঠির মতো। এ পাঁচ বছর হাফমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি থুতনিতেই যদি আধা কেজি চর্বি জমিয়ে ফেলেন, তাহলে তার সারা শরীরে কতটুকু চর্বি জমেছে, তা বের করতে হলে খাতা-কলম নিয়ে বসতে হবে।
বোমা বিস্ফোরণের পর রাস্তায় পুলিশের আনাগোনা বাড়লেও খুব একটা ভরসা পাচ্ছি না। হরতালের সময় পিকেটারদের হাতে পুলিশের ছেঁচা খাওয়ার ছবি প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে। যারা নিজেদের রক্ষা করতে অক্ষম, তারা অন্যদের সুরক্ষা দেবে কীভাবে? সাবধানে পা ফেলছি- হঠাৎ দ্রুতগতির একটা সিএনজি অটোরিকশা পাক খেতে খেতে আমার সামনে উল্টে গেল। দৌড়ে সেটার কাছে গেলাম। আশপাশ থেকে আরও কয়েকজন ছুটে এলো। সবাই মিলে সেটাকে টেনে উঠালাম। ভেতর থেকে রক্তাক্ত চেহারা নিয়ে ড্রাইভার বের হয়ে এলেও পেছনে থাকা যাত্রীর কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। ড্রাইভারকে বললাম-
: আপনের প্যাসেঞ্জার তো মনে হয় জ্ঞান হারাইয়া ফেলছে, কী করবেন?
ড্রাইভার কোনো কথা না বলে হাতের তালু দিয়ে নাকের রক্ত মুছতে লাগল। তার উদ্দেশে পুনরায় বললাম-
: আপনার নিজেরও তো চিকিৎসা দরকার। দুইজন একসঙ্গে হাসপাতালে চইল্যা যান।
ড্রাইভার রাজি হল না। মাথা নেড়ে বলল-
: সামনেই আমার গ্যারেজ। গ্যারেজে গাড়ি জমা দিয়া আমি বাসায় চইল্যা যামু।
লোকটার স্বার্থপরতা দেখে খুবই কষ্ট পেলাম। রেগে গিয়ে বললাম-
: অ্যাক্সিডেন্ট আপনে ঘটাইছেন। এই ব্যাপারে অবশ্যই আপনের একটা দায়িত্ব আছে!
ড্রাইভার চোখ পিটপিট করে আমার দিকে তাকাল। চেহারায় অবাক ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল-
: আপনে এসব কী বলতেছেন! কেউ কি ইচ্ছা কইরা অ্যাক্সিডেন্ট করে?
: তাইলে কী কইরা করে?
-হরতালকারীরা যেভাবে চারপাশ থেইক্যা ঘিরা ধরছিল, জোরে টান না দিলে এতক্ষণে উনার শরীর পুইড়া কয়লা হইয়া যাইত!
: কয়লা যখন হয় নাই, তখন উনারে একটু হাসপাতালে পৌঁছাইয়া দেন। কোনো সমস্যা নাই, আপনের সঙ্গে আমিও যাব।
-ভাই, আমারে মাফ কইরা দেন।
পাশ দিয়ে একটা ভ্যান যাচ্ছিল। সেটাকে দাঁড় করালাম। অচেতন হয়ে পড়ে থাকা যাত্রী ভদ্রলোককে ধরাধরি করে ভ্যানের উপর শুইয়ে দিয়ে ভ্যানচালককে বললাম-
: ঢাকা মেডিকেলে চল।
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পার হচ্ছি- ভদ্রলোকের পকেটের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। তার কী পরিচয়- কোথায় যাচ্ছিল, কিছুই জানি না। মোবাইল ফোন একটা যোগসূত্র হতে পারে ভেবে তাড়াতাড়ি কল রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে এক নারীকণ্ঠ জানতে চাইল-
: রূপার আব্বু, তুমি কোথায়?
বোঝা গেল, রূপা নামে ভদ্রলোকের একটা মেয়ে আছে। আমার কানে যার কণ্ঠস্বর বাজছে, তিনি কি রূপার মা? ফোন করে স্বামীর খোঁজখবর নিচ্ছেন? কী উত্তর দেব বুঝতে পারছি না। এপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভদ্রমহিলার উদ্বিগ্ন স্বর ভেসে এলো-
: কী হইল! কথা বলতেছ না কেন? তুমি এখন কোথায়?
দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। ঠিক করলাম- আগে হাসপাতালে যাই। তারপর ওখান থেকে ভদ্রমহিলার নম্বরে কল ব্যাক করে সবকিছু জানালেই হবে। তার আগ পর্যন্ত হা-হু করে যেতে হবে। আমি আস্তে করে বললাম-
: রাস্তায়।
-এখনও রাস্তায়! অফিসে পৌঁছাইতে আর কতক্ষণ লাগবে?
ভদ্রলোক তাহলে অফিসে যাচ্ছিলেন? আমি আগের মতোই আস্তে করে বললাম-
: এই তো...
ভদ্রমহিলা এবার জানতে চাইলেন-
: কীসে কইরা যাইতেছ?
উত্তর দেয়ার আগে ভদ্রলোকের জ্ঞানহীন নিথর শরীরের ওপর চোখ রাখলাম। তারপর কোনোমতে উচ্চারণ করলাম-
: ভ্যানে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়ার পর চিকিৎসক এগিয়ে এলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
: পেশেন্ট আপনার কী হন?
-কেন?
: প্লিজ, আপনি মন শক্ত করুন।
-কেন?
: আই অ্যাম স্যরি টু ছে- হি হ্যাজ অলরেডি এক্সপায়ার্ড। এখানে আনার আগেই ওনার মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালে কেউ মারা গেলে নানা আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার থাকে। এলোমেলো পা ফেলে বাইরে চলে এলাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। আমি যার মৃত্যু ঘটনার সঙ্গী হয়ে রইলাম, তার জন্য এদেশে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হবে না। জাতিও তার কথা মনে রাখবে না। পকেট থেকে ভদ্রলোকের মোবাইল ফোন বের করতে গিয়ে আমার হাত কাঁপতে লাগল। একজন স্ত্রীর কাছে তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম সংবাদগুলোর একটি। আমাকে এখন পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম এ সংবাদটি জানাতে হবে। আমি শহীদ মিনারের সিঁড়ির ওপর বসে পড়লাম। আগের সেই নম্বরে কল ব্যাক করতেই একটা বাচ্চা মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল-
: হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। আপনি কে বলছেন!
-আমি তোমার এক আংকেল। তুমি কি রূপা?
: জি।
-রূপা তুমি কোন ক্লাসে পড়?
: ক্লাস থ্রি।
-তোমার আম্মু কোথায়?
: আম্মু তো ছাদে গেছে আচার রোদে দিতে। আপনি আমাকে বলুন।
ছোট্ট মেয়েটিকে আমি কীভাবে তার বাবার মৃত্যুসংবাদ দেব? কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, চারপাশের সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেছে।
ওপাশ থেকে রূপা হ্যালো হ্যালো করছে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও কোনো কথা বলতে পারছি না। চোখের পানিতে আমার বুক ভেসে যাচ্ছে...
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

সংকটে, অগ্রযাত্রায় ইউনেস্কো by কাজী ফারুক আহমেদ

গতকাল ছিল জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এদিনই জানা গেল, বাংলাদেশ এ সংস্থার নির্বাহী বোর্ডের সদস্য পুনঃনির্বাচিত হয়েছে। নতুন রূপে পুরনো সংকটের আবর্তে ৬৯ বছরে পা দিয়েছে এ সংস্থা। ইতিমধ্যে বকেয়া চাঁদা পরিশোধ না করায় ৮ নভেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এ বিশ্ব সংস্থার ভোটাধিকার হারিয়েছে। ২০১১ সালে ফিলিস্তিনকে ইউনেস্কোর পূর্ণ সদস্যপদ দেয়ার পর থেকে ওই দুটি দেশ চাঁদা বন্ধ করে দেয়। ইউনেস্কোর বিধান অনুযায়ী ৮ নভেম্বর সকালের মধ্যেই বকেয়া সব চাঁদা পরিশোধ করার কথা ছিল। না পারলে কেন পারছে না তা জানালেও চলত। কিন্তু দেশ দুটি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় তাদের ভোটাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর মোট বাজেটের ২২ শতাংশ পাওয়া যেত যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু তা না পাওয়ায় সংস্থাটির বাজেটে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চাকরি হারানোর আশংকা দেখা দিয়েছে ৩০০ লোকের। আর্থিক সংকট মোকাবেলায় মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এর মধ্যে সাড়ে ৭ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছেন। তবে তা দিয়ে পুরনো কর্মসূচিগুলো কতটুকু ভালোভাবে চালানো যাবে, জরুরি কর্মসূচি নেয়া যাবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১৬ নভেম্বর ইউনেস্কোর গঠনতন্ত্র স্বাক্ষরের দিন। ১৯৪৫ সালের এদিনে গঠনতন্ত্র লন্ডনে স্বাক্ষরিত হওয়ার পরের বছর ৪ নভেম্বর ২০টি দেশের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এর কার্যকারিতা শুরু হয়। বর্তমানে ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্র ১৯৫টি। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনেস্কোর গঠনতন্ত্র শুরু হয়েছে কবি, কূটনীতিক, মার্কিন কংগ্রেসের গ্রন্থাগারিক আর্চবল ম্যাকসেলের বিখ্যাত বাক্য দিয়ে : যেহেতু মানুষের মনেই যুদ্ধের সূত্রপাত, সেজন্য সেখানেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রচনা করতে হবে। ২১ ফ্রেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের কারণে ইউনেস্কো বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। একই সঙ্গে বিশ্বের ৬ হাজার ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষায় ভূমিকা পালনের জন্য ইউনেস্কোর নাম উচ্চারিত হয় বিশ্বব্যাপী।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ঐতিহ্য, প্রযুক্তি নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করে যাওয়া ইউনেস্কো বিশ্বব্যাপী শিক্ষকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। ১৯৬৬ সালে প্যারিসে ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিনিধিদের সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার, করণীয় ও মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশমালা গৃহীত হওয়া এর একটা বড় কারণ। তবে ১৪৫ অনুচ্ছেদবিশিষ্ট ওই সুপারিশমালা ছিল নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক, কারিগরি, বৃত্তিমূলক, চারুকলাসহ স্কুলে পাঠদানকারী শিক্ষকদের জন্য। মাধ্যমিক (উচ্চ)-পরবর্তী স্তরগুলোর সুস্পষ্ট উল্লেখ সেখানে ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ১৫-১৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর এক বিশেষ অধিবেশনে উচ্চতর স্তরে শিক্ষা দানকারী শিক্ষকদের মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণীত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের উভয় সুপারিশমালা যুগ্মভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা সনদ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বিশ্বব্যাপী সর্বস্তরের শিক্ষক ওই সনদের স্মারক দিবস হিসেবে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করবেন।
বাংলাদেশে ইউনেস্কো শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে আসছে। ২০০৮ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সক্ষমতা সম্প্রসারণ, ২০০৯ সালে একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা উন্নয়নসহ বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমে নানা কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। বাগেরহাটে ষাট গম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুরে পুরাকীর্তি সংরক্ষণ, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ঘিরে বিশেষ কার্যক্রম, শিক্ষাক্রমে ডিজিটাল উপাদান সংযোজনে ইউনেস্কোর ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ মুদ্রণ, প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন প্রণয়নে ইউনেস্কো সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সনদ হিসেবে পরিচিত ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের দুই সুপারিশমালার মধ্যে প্রথমটি ইউনেস্কোর ঢাকা অফিস থেকে বাংলায় অনুবাদ করে ২০০৮ সালে প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯৭ সালের সুপারিশটিও বাংলায় ছাপা হয়েছে এ বছর। ডেরেক ইলিয়াস বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রধান থাকাকালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে আমি এ প্রস্তাব রাখি। সম্প্রতি ইউনেস্কো ঢাকা অফিস মার্ক ব্রোর ছায়া শিক্ষা ব্যবস্থার মোকাবেলায় বইটির বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেছে। সমীর রঞ্জন নাথ অনূদিত বইটিতে উল্লেখ করা হয়, গৃহশিক্ষকতা সাধারণভাবে ন্যায়নীতিহীনভাবে সামাজিক অসমতা সৃষ্টি করেছে। আশা করা যায়, আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটও বিশ্ব সংস্থাটির দ্বিতীয় ক্যাটাগরি মর্যাদাভুক্ত হবে। তবে প্রায় দুবছর ধরে ইউনেস্কো ঢাকা অফিসে শীর্ষ কর্মকর্তার অনুপস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
বর্তমানে ইউনেস্কো অর্থ সংকটে পড়েছে এ কথা সত্য। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ না করা এর জন্য অনেকটা দায়ী। তবে লক্ষণীয়, অতীতে নীতিগত মতবিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে ইউনেস্কো থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে দেখা গেছে, সম্প্রতিকালে তা হয়নি। আশা করা যায়, ইরানের প্রতি ক্রমাগত নমনীয়তার মতো ইউনেস্কোর ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তন আসবে। কাক্সিক্ষত এ পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্বের সব শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ও শিক্ষানুরাগী মানুষ। এ পরিবর্তন যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল।
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান

স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের উত্থানের আশঙ্কা -ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ নিয়ে সেমিনারে মাইলাম

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান না হলে নির্বাচনের পর একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে। চলমান পরিস্থিতি বাংলাদেশকে রাজনীতি ও সুশাসনের জন্য খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে এক সেমিনারে এ অভিমত দেন। ওই একই সেমিনারে উইলসন সেন্টারের সিনিয়র পাবলিক পলিসি স্কলার আলী রীয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হওয়া আর রাজনৈতিক দলগুলোর একে অন্যের প্রতি আস্থা তৈরি না হওয়ার আগে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার চেয়ে ভালো কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টার গতকাল বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ‘খাদের কিনারে বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশ অন দ্য ব্রিঙ্ক) শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনার সঞ্চালনা করেন উইলসন সেন্টারের এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক রবার্ট হ্যাথাওয়ে।
সেমিনারের আলোচকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল সেমিনারের আলোচনার বিষয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন উইলিয়াম বি মাইলাম। ওই সফরের সময় রাজনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর যে ধারণা জন্মেছে, সেটি সেমিনারে তিনি তুলে ধরেন। অন্যদিকে বৃহৎ পরিসরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন আলী রীয়াজ।
সেমিনারে পররাষ্ট্র দপ্তরসহ মার্কিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণায় জড়িত বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার উইলিয়াম বি মাইলাম বলেন, সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। আগামী দিনের সম্ভাব্য একটি ছবি হতে পারে: আসন্ন মাসগুলোতে বাংলাদেশের নির্বাচনটি হবে ‘একটি দল ও অর্ধেক দলের সমন্বয়’। যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও কয়েকটি ছোট ছোট দল অংশ নিল। এর ফলে নির্বাচন শেষে একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে। সম্প্রতি ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য তিনটি পরিস্থিতির কথা তাঁর ভাবনায় এসেছে। তিনি বলেন, প্রথমত, সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন একেবারেই অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, প্রধান বিরোধী দলকে ছাড়াই একটি নির্বাচন। আর শেষ বিকল্পটি হতে পারে অতীতের পুনরাবৃত্তি অর্থাৎ বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এ রাষ্ট্রদূত সহিংসতা ও লোকজনের প্রাণহানির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যেহেতু ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালের মিল নেই, তাই বর্তমান সংকটের উত্তরণও ওই সময়ের মতো হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি ও সুশাসনের ‘খাদের কিনার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। গত পাঁচ বছরের জনমত জরিপের দৃষ্টান্ত টেনে মাইলাম বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি জনসমর্থন রয়েছে।
আলী রীয়াজ আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণ হিসেবে বলা হলেও এ পরিস্থিতি এক দিনে হয়নি। সংবিধানের ধারাবাহিক তিনটি সংশোধনী (ত্রয়োদশ, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ) এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দায়ী, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকশিত হতে দেয়নি। তাঁর মতে, পঞ্চদশ সংশোধনী হচ্ছে কফিনের শেষ পেরেক।
আলী রীয়াজ বলেন, একতরফাভাবে সংবিধানে এসব সংশোধনী আনা হয়েছে। এ ব্যাপারে জনগণের মতামতের তোয়াক্কা করা হয়নি। ফলে এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে জনগণ বাইরে থেকেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে সংশোধনী প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলো কেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করেনি, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণায় সুপ্রিম কোর্ট অনেক বেশি সময় নেওয়ায় সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, নির্বাচন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক জটিলতার নিরসন ঘটাবে না। তাই বাংলাদেশের নাগরিকদের পুরো সংবিধান সংস্কার করা উচিত। দেশ এখন এমন এক পরিস্থিতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ‘অপ্রীতিকর ও বিপর্যয়মূলক’—এর মধ্যে একটাকে বেছে নিতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া একটি বাজে নির্বাচন হবে বিপর্যয়মূলক।
উইলসন সেন্টারের এই গবেষক সেমিনারে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শুধু নির্বাচন নয়, নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। পাশাপাশি বিরোধী দল যাতে অন্যায়ভাবে নির্যাতনের শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে তাদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কাজ করতে হবে। হেরে যাওয়ার পর নির্যাতিত হতে হবে—এ আশঙ্কায় নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে একজনের উত্থানের বিনিময়ে অন্যের পতনের খেলায় পরিণত করেছে।
আলী রীয়াজ বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো সমাধান হতে পারে না। তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর একে অন্যের প্রতি আস্থা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এখন পর্যন্ত এর চেয়ে ভালো কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেমিনারে উপস্থিত ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাজনৈতিক কাউন্সেলর নাঈম উদ্দীন আহমেদ নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে মহাজোট সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
সেমিনারে উপস্থিত এক গবেষক মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ছিয়ানব্বইয়ের মতো হবে না। তাঁর প্রশ্ন, তবে কি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের উত্থানের সম্ভাবনা আছে?

বিএনপি-জামায়াতকে ঘন ঘন হরতাল দিয়ে সহিংসতার আশ্রয় নিতে হচ্ছে কেন? by বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর প্রধান দুই দলের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও শত্র“তামূলক রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হরতাল এখন জনগণের জীবনে এক অভিশাপের মতো নেমে এসেছে। এ অভিশপ্ত হরতালের কারণে জনগণের জীবনে কত রকম বিপদ ঘটছে, জনগণের জীবন কতভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে, তার বিবরণ দেয়ার প্রয়োজন এখানে নেই। এটা সবারই জানা। হরতাল আমাদের দেশের রাজনীতিতে আন্দোলনের এক পরিচিত কৌশল। এর ব্যবহার প্রাক-বাংলাদেশ বা পাকিস্তানি আমলে তেমন বেশি না হলেও আশির দশক থেকে হরতালের ব্যবহার নতুনভাবে শুরু হয়ে নব্বইয়ের দশক থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এরশাদের শাসন শেষ হওয়ার পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই আওয়ামী লীগ কর্তৃক বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সংসদ বর্জনসহ হরতালের ব্যবহার বেশ ঘন ঘন হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় হরতাল এখন যে বিরোধী দলের সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রায় একমাত্র কৌশলে পরিণত হয়েছে তা-ই নয়, এর চরিত্রেরও গুরুতর পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তন শাসক শ্রেণীর সংকট ঘনীভূত হতে থাকা এবং তাদের শ্রেণীগত অবস্থান ভেঙে পড়তে থাকার সঙ্গেই সম্পর্কিত। শাসক শ্রেণীর সংকট ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ইত্যাদি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও আছে। কিন্তু এ দেশগুলোতে বাংলাদেশের মতো এত বেশি হরতালের ব্যবহার দেখা যায় না। ভারত, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এবং নেপালে বন্ধ নামে পরিচিত হরতাল মাঝে মাঝে দেখা যায়। পাকিস্তানে হরতাল দেখাই যায় না। কিন্তু এসব দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন নেই বা কম আছে এমন নয়। শ্রেণীগত অবস্থানের চরম দুর্বলতা এবং দেউলিয়াপনার জন্যই বাংলাদেশে হরতালের ব্যবহার এখন অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক ছাড়িয়ে গেছে। শুধু এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে তা-ই নয়, হরতালের ধরন ও চরিত্রের মধ্যেও এমন পরিবর্তন এসেছে যাকে ভয়াবহ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন অর্থাৎ প্রায় ৬ মাস হরতাল দিয়েছিল। ২০০৬ সালে হরতালের সময় লগিবৈঠা ইত্যাদি নিয়ে তারা রাস্তায় নেমে তাণ্ডব করেছিল এবং প্রকাশ্য দিবালোকে পল্টন এলাকায় খুনখারাবি করেছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট এখন আওয়ামী লীগ জোট সরকারের বিরুদ্ধে হরতালের পর হরতাল দিচ্ছে এবং রাস্তায় এমনভাবে সহিংসতা করছে যার কোনো উদাহরণ এদেশে নেই। বস্তুতপক্ষে অন্য কোনো দেশেও এর কাছাকাছি কিছু নেই। কোনো দেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা এক অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার।
এখন হরতালের চরিত্রের মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে এগুলো কার বিরুদ্ধে এটা বোঝা মুশকিল। আগে হরতালের সময় ক্ষেত্রবিশেষে পিকেটিং হতো, কিন্তু এখন যেভাবে সহিংসতা দেখা যায় তার কোনো কিছুই তখন দেখা যেত না। এখনকার হরতালের দিকে তাকালে স্পষ্টই বোঝা যাবে যে, এগুলোর ঘোষিত উদ্দেশ্য সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা হলেও বস্তুত এর শিকার হচ্ছেন সাধারণ লোক।
বিএনপি-জামায়াতের দ্বারা পরিচালিত এ হরতালের সহিংসতা এখন শুধু হরতালের দিনগুলোতেই হচ্ছে না। এটা শুরু হচ্ছে হরতালের আগের দিন থেকেই। বাস, স্কুটার, প্রাইভেট গাড়ি, এমনকি রিকশার ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এগুলোতে ককটেল মেরে বা পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে শুধু জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে তা-ই নয়, নিরীহ যাত্রীদেরও হত্যা করা হচ্ছে। তারা প্রাণে মারা পড়ছেন, তাদের শরীর আগুনে ঝলসে গিয়ে তারা সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হচ্ছেন, তাদের পারিবারিক জীবন ধ্বংস হচ্ছে। একটানা হরতালের সময় কাজের অভাবে দিন আনা দিন খাওয়া লোকরা সপরিবারে উপোষ করছেন। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব রকম জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি হয়ে চোর, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ ছাড়া অন্য সবার জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে। সব কিছু ছাড়িয়ে সহিংসতাই হরতালের সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে জনজীবনের জন্য সব থেকে বিপজ্জনক ব্যাপার।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে হরতাল নয়, হরতালের সময় এ ধরনের বেপরোয়া সহিংসতার আশ্রয় বিএনপি-জামায়াত জোট কেন নিচ্ছে? এর ফলে জনজীবনে যে বিপর্যয় ঘটছে এ নিয়ে সাধারণভাবে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে, মানবাধিকার সংস্থা ইত্যাদিতে দেখা যাচ্ছে। নিহত-আহতদের ওপর রিপোর্ট সংবাদপত্র ও টিভিতে প্রচার হচ্ছে। বিদেশেও এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। কিন্তু এসবের কোনো কিছুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে কেন নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিএনপি-জামায়াত এভাবে হরতালের ডাক দিয়ে ব্যাপক আকারে সহিংসতা ও নৃশংসতা করছে? হরতাল তারা করতে পারে। একটানা হরতালও তারা করতে পারে। কিন্তু হরতালে এ সহিংস আচরণ কেন করতে হচ্ছে? হরতাল দিয়ে সাধারণ নিরীহ মানুষের ওপর কেন এভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে? লক্ষ্য করার বিষয় যে, হরতালের সময় এভাবে যে সহিংসতা হচ্ছে, যে নির্মম কাণ্ডকারখানা চলছে তার বিরুদ্ধে হরতাল দেনেওয়ালা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে, তাদের নেতৃত্বের থেকে একটি বাক্যও শোনা যাচ্ছে না! এর অর্থ কি এই নয় যে, হরতালের সময় এ সহিংসতায় তাদের সমর্থন আছে? শুধু তা-ই নয়, এটা বলা কি অতিরিক্ত বা অসঙ্গত হবে যে, ইচ্ছাকৃতভাবেই এই নৃশংসতা করা হচ্ছে? যেভাবে হরতালের সময়কার সহিংসতা ও নৃশংসতা সম্পর্কে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্ব নীরব থাকছে এবং তা বন্ধ করার কোনো চেষ্টাই করছে না, তার থেকে এই সিদ্ধান্ত কি অযৌক্তিক? তারা কি এজন্য এ ব্যাপারে নিশ্চুপ যে, রাস্তায় যারা হরতালের সময় সহিংস তাণ্ডব করছে, তাদের ওপর এই দুই দলের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? এর সপক্ষে যুক্তি খাড়া করার মতো কিছু নেই। সেটা থাকত যদি এই দুই দলের নেতৃত্ব এ সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলতেন, এটা বন্ধের জন্য নিজেদের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাতেন। সে রকম কিছুই হচ্ছে না। উপরন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই এ কাজ করছেন এবং রাস্তায় তাণ্ডবকারীদের হাতে অস্ত্রশস্ত্রের জোগান দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি ধনিক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলো সভা-সমিতির সময় টাকা-পয়সা দিয়ে লোক ভাড়া করে নিজেদের সভা-সমাবেশে জড়ো করে। এখন কি তাহলে এভাবে হরতালের সময় ভাড়া করা লোক দিয়ে রাস্তায় সন্ত্রাস করা হচ্ছে? যেভাবে এবং যেসব লক্ষ্যবস্তুর ওপর ককটেল ছোড়া হচ্ছে, গাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে, সাধারণ পথচারীর ওপর বোমা মারা হচ্ছে তার থেকে বোঝা যায়, যারা এ কাজ করছে তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মী নয়। তারা ভাড়া করা লোক। এই ভাড়া করা লোক দিয়েই এখন হরতাল ‘সফল’ করার চেষ্টা হচ্ছে!!
এখানে বলা দরকার যে, কোনো গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য, কোনো গণতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য হরতাল দিলে তাতে জনগণের সমর্থন থাকার কথা। জনগণের সমর্থন থাকলে হরতাল সফল করার জন্য রাস্তায় সহিংস তাণ্ডবের প্রয়োজন হয় না। সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে হরতাল ‘সফল’ করার জন্য জনগণকে বাধ্য করার প্রশ্ন ওঠে না। তারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালে অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে আসেন, অতীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে যেভাবে দেখা গেছে। এখন মূলত দেখা যাচ্ছে যে, জনগণের মধ্যে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে, তাদের চুরি, ঘুষখোরী, দুর্নীতি, শোষণ, নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যাপক ও গভীর ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে বিএনপির-জামায়াত জোট যেভাবে আন্দোলন করছে তার প্রতি জনগণের কোনো সমর্থন নেই। তারা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চান, কিন্তু এ ধরনের আন্দোলন তারা চান না। এটাই মূল কারণ যে জন্য হরতাল সফল করার লক্ষ্যে বিএনপি-জামায়াত জোটকে রাস্তায় সহিংসতার আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

নতুন রাজনীতি ছাড়া পরিবর্তন আসবে না

তারিক আলি
তারিক আলি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার। নিউ লেফট পত্রিকার সম্পাদকীয় কমিটির সদস্য। জন্ম ১৯৪৩ সালে, পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। বাল্যকালেই তিনি সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে জড়িত হন। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় চলে যান ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে। সেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। অক্সফোর্ডের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে বার্ট্রান্ড রাসেলের নেতৃত্বে গঠিত ভিয়েতনাম যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। ১৯৬৮ সালে লন্ডনের মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও মিছিলে নেতৃত্ব দেন। তারিক আলির গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, পাকিস্তান: মিলিটারি রুল অ্যান্ড পিপলস পাওয়ার, বুশ ইন ব্যাবিলন, স্ট্রিট ফাইটিং ইয়ারস, ক্ল্যাশ অব ফান্ডামেন্টালিজমস। তাঁর ইসলাম চতুষ্টয় সিরিজের প্রথম উপন্যাস শ্যাডোজ আন্ডার পমেগ্রানাটে ট্রি জার্মানিতে বেস্ট সেলার হয়। সম্প্রতি শেষ করেছেন রুশ বিপ্লবের ওপর নির্মিতব্যচলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ সফরে আসেন।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ
প্রথম আলো : বাংলাদেশে নির্বাচন ঘিরে যে ক্রান্তিকাল যাচ্ছে, তা রাজনীতি ও সমাজকে আদর্শিকভাবেও বিভক্ত করছে। এমন পরিস্থিতি মিসর ও পাকিস্তানেও দেখা গেছে। আপনি কীভাবে দেখছেন?
তারিক আলি: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে যতটা মিল, বাংলাদেশ ও মিসরের পরিস্থিতির মধ্যে মিল ততটা নয়। রাজনীতিতে মতাদর্শিক বিভাজন নিয়ে আমরা অনেক কথাই বলতে পারি। খোলাখুলিভাবে বললে, এসব দেশে যা দেখা যাচ্ছে তা মোটেই আদর্শিক বিভাজন নয়; বরং তা দুই গুচ্ছ রাজনীতিবিদের বিভাজন, যারা ক্ষমতায় আসতে বা থাকতে চায়। তাদের ক্ষমতাসীন হওয়া মানে তাদের সমর্থক, সহচর ও সাঙ্গপাঙ্গদের টাকা বানানোর সুযোগ তৈরি হওয়া। কেবল বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানেই নয়, বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্রের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রভাবশালীদের বিভিন্ন অংশকে পালা করে ধনার্জনের সুযোগ করে দেওয়া। সেটা এখানেও ঘটছে, পাকিস্তানেও পিপলস পার্টির জারদারির আমলে ঘটেছে। তারা নাকি সেক্যুলার, অথচ সেক্যুলার মূল্যবোধ রক্ষায় তারা কিছুই করেনি। তাদের একমাত্র যোগ্যতা হলো টাকা বানানো। গত নির্বাচনে যাদের হাতে তাদের পরাজয় ঘটেছে, সেই মুসলিম লীগ চালান ব্যবসায়ী শরিফ ভ্রাতারা। এঁরাও টাকা বানানোর ব্যাপারে সমান ওস্তাদ। আর এই বাস্তবতায় মানুষের জীবনের মানের অবনতি ঘটছে। এটাই আজকের দিনের রাজনীতির মৌলিক চিত্র। এটা এক ট্র্যাজেডি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতি না থাকায় পুঁজিবাদী গণতন্ত্র বিনা চ্যালেঞ্জে সবকিছু করে যাচ্ছে।
প্রথম আলো : এ অবস্থায় ধর্মাশ্রিত রাজনীতি বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে।
তারিক আলি : বিশ্বরাজনীতির যে পর্যায়ে আমরা বসবাস করছি, তাতে ধর্ম বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে ধর্মাশ্রিত রাজনীতিকেরা বলছে, আমরা গরিবদের পক্ষে কাজ করছি, অন্য পক্ষ বলছে আমরা সেক্যুলার। মানুষ যদি ক্ষুধার্ত থাকে, মানুষের যদি নিরাপত্তা না থাকে, তারা যদি মজুরি না পায়; তাহলে ধর্ম বা সেক্যুলারিজমে কিছুই যাবে আসবে না মানুষের। বাংলাদেশে নারী-পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি এত কম, বাংলাদেশ দ্রুত হারে বিশ্বের সোয়েটশপে পরিণত হচ্ছে।
প্রথম আলো : এ রকম অমানবিকতার মধ্যে একটি দেশ কীভাবে গণতান্ত্রিক হতে পারে?
তারিক আলি : এটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, গণতন্ত্র হয়ে ওঠার দাবিদার রাষ্ট্র। গণতন্ত্র আছে কি নেই, তা শাসকদের জন্য, এলিটদের জন্য সমস্যা নয়। কিন্তু জনগণের দুরবস্থা এ রকমই থাকলে তারা বলবে, এ গণতন্ত্র দিয়ে আমরা কী করব? তখন তাদের একটি অংশ ধর্মাশ্রিত রাজনীতির দিকে যাবে, এক অংশ রাজনীতিবিমুখ হবে। বাংলাদেশে সম্ভবত সেটাই হচ্ছে। অথচ আমরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে দেখতাম রাজনীতির পথপ্রদর্শক হিসেবে। সে সময় বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মান ছিল খুবই উঁচু, নারী-পুরুষের মধ্যে ভেদাভেদ কম ছিল। নারীরা অনেক মুক্তভাবে কথা বলত, চলাফেরা করত। সে সময়ের বাংলাদেশের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের তুলনা করলে গভীর বেদনা হয়। কিন্তু আমি এখানকার বন্ধুদের বলি, ভেবো না, তোমরা একাই এ অবস্থার শিকার নও, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো বাদে সারা পৃথিবীতেই এ রকম দুর্দশা চলছে। বাংলাদেশে যা দেখছি তা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসহ বৈশ্বিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। বাংলাদেশ যদি দমবন্ধকর দ্বিদলীয় ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে জনগণের জন্য কিছু করতে না পারে, তাহলে আশা নেই। আজকের রাজনীতি মানে হচ্ছে, পাঁচ বছর পর পর পালা করে টাকা বানানোর গণতন্ত্র।
প্রথম আলো : উপমহাদেশের সব রাষ্ট্রেই কমবেশি আশাভঙ্গের ব্যাপার দেখা যাচ্ছে।
তারিক আলি : বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার সমস্যা মিলবে না। বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ছোট দেশ। ধর্ম-সম্প্রদায়-জাতীয়তার বৈচিত্র্য এখানে কম। এখানকার সরকারগুলোর জন্য সম্ভব ছিল জনগণের সমস্যাগুলো মেটানো। এটা অসম্ভব কিছু ছিল না। এ দেশে প্রচুর বিত্ত সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি-আয় কোথায় যায়? আমাদের মতো দেশের জন্য চারটি মৌলিক ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা পূরণ করতেই হবে: সম্পূর্ণ অবৈতনিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা— প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত, বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা, জনগণের জন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা এবং গরিবের জন্য বিদ্যুৎ-খাদ্য-পানি ইত্যাদিতে ভর্তুকি। যে দেশ এগুলো করতে পারবে না, সেই দেশ পতিত হবে। অথচ আমরা কী দেখছি, সবখানেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। ধনীরা এই শিক্ষা নিতে পারে এবং গরিবেরা দেখে, তাদের জন্য রয়েছে ভাঙাচোরা এক ব্যবস্থা। এই ক্রোধ ও হতাশাও তাদের ধর্মীয় রাজনীতির দিকে ঠেলে নেয়। জাতীয়তাবাদ ও উন্নয়নের ব্যর্থতাও ধর্মাশ্রিত রাজনীতির প্রভাব বাড়বার কারণ।
প্রথম আলো : বাংলাদেশ একদিন বিশ্বে আশা সৃষ্টি করেছিল। এখন কি তা বলা যায়?
তারিক আলি : ১৯৬৯-৭০ সালে যখন আমি ঢাকায় ছিলাম, তখন এখানে শক্তিশালী আশাবাদ দেখেছি। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জনসভায় আমিই প্রথম স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বলেছিলাম, ‘স্বায়ত্তশাসন তোমাদের কিছুই দেবে না, তোমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের দিকেই যাওয়া উচিত। নইলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তোমাদের ধ্বংস করে দেবে।’ এটাই আমি বলেছিলাম। সাংবাদিকেরা এতই নার্ভাস হয়েছিল শুনে, তারা আমার বক্তৃতার পুরোটা প্রকাশ করেনি। কিন্তু কথাটা শেখ মুজিবের কানে গিয়েছিল এবং তিনি সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় দেখা করতে বললেন। সেখানে তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি শুনেছি তুমি কী বলেছ। কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত, তুমি কি নিশ্চিত?’ আমি বললাম, ‘আমি নিশ্চিত। আমি পাকিস্তানি শাসকদের ভালো করে জানি। তারা তোমাদের ধ্বংস করবে। তোমাদের প্রস্তুত থাকা দরকার, সে জন্যই আমি এটা বলেছি। তারা স্বায়ত্তশাসন দেবে না, তারা ছয় দফা মানবে না। তোমাদের স্বাধীনতার দিকেই যাওয়া উচিত।’ কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে একদমই একমত হলেন না। যা হোক, সে সময়ের আলোড়ন, আন্দোলন, রাজনৈতিক সচেতনতার মাত্রা এত বিস্ময়কর ছিল, এত উঁচু মাপের ছিল! এমনকি যারা স্কুল-কলেজে যাননি তাঁদের কাছেও সবকিছু পরিষ্কার ছিল। তখন বাংলাদেশিরা ভিন্ন এক দেশের স্বপ্নে আকুল হয়ে উঠেছিল। আমাদেরও আশা ছিল, বাংলাদেশ মুক্তিকামী প্রগতিশীল রাষ্ট্র হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা হয়নি।
প্রথম আলো : কেন হয়নি? আপনার দৃষ্টিতে বিপত্তিটা কোথায় ঘটেছিল?
তারিক আলি : বলতেই হচ্ছে, এর কারণ সে সময়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের একের পর এক ভুল। তারা একদলীয় রাষ্ট্র গঠন করেছিল, কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু করেছিল। মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করেছিল, ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক করছিল। তাহলে অতীতের সঙ্গে আর পার্থক্য কী থাকল? তাই স্বাধীনতার পরের প্রথম চার-পাঁচ বছরের ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একসময় যখন স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস কমে এল, তখন মানুষ চাইছিল বাস্তব পরিবর্তন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু যা তারা চেয়েছিল, তা তারা পায়নি। মনে রাখতে হবে, যে রাজনীতিবিদেরা জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেন না, মানুষ তাঁদের জন্য আর জীবন দেয় না।
প্রথম আলো : পরিবর্তন এখন জনপ্রিয় শব্দ। বিশ্বে কি সত্যিই কোনো পরিবর্তন দেখতে পান, কিংবা তার সম্ভাবনা?
তারিক আলি : পৃথিবীতে এ মুহূর্তে একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডরে সত্যিকার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। শ্যাভেজ আমাকে বলেছিলেন, ‘সবকিছু ভেঙেচুরে নতুন রাষ্ট্র বানানো এখন কঠিন, কিন্তু আমরা তো তেলের টাকা দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারি। আমেরিকা যদি আমাকে মেরেও ফেলে, তবু আমি সেই কাজ করে যাব।’ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য দক্ষিণ আমেরিকার মডেল খুবই ভালো মডেল। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিবিদেরা জাতীয় মুক্তির উপায়ের কথা ভাবেন না, তাঁরা ভাবেন টাকা বানানোর কথা। আর টাকা বানানো আজকের নয়া উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই ব্যবস্থা দুনিয়াকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের দিকে দেখুন, গ্রিস, ইতালি, পর্তুগালেও সংকট চলছে। ইতালিতে তো দেশ চালানোর জন্য তারা একজন ব্যাংকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এসব ব্যাংকার আর তাদের সহযোগী রাজনীতিবিদেরাই তো দেশে দেশে লুণ্ঠন চালাচ্ছে। তৃতীয় দেশগুলোয় এই অবস্থার সুযোগ নিয়েই সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসে।
প্রথম আলো : নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখেন?
তারিক আলি : আজকের আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ বাংলাদেশকে নিছক একটা সস্তা শ্রমের দেশ করে রাখতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস তো সে রকম নয়। ভারত বলি বা যুক্তরাষ্ট্র বলি, তারা নিজেরাই অনেক সমস্যায় আছে। বাংলাদেশের যদি সে রকম রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকে, যারা জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারে, তাহলে কেউ আপনাদের চলার পথে বাধা হতে পারবে না। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। গণমুখী সরকারব্যবস্থাকে সহজেই কেউ উল্টিয়ে দিতে পারে না, যত বড় পরাশক্তিই তারা হোক। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের সমস্যা হলো, অভ্যন্তরীণভাবেই এই রাষ্ট্রগুলো এতই সমস্যায় আক্রান্ত যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষমতা তাদের নেই। আজকে এখানে ভারতবিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দানা বাঁধলে সেই রাজনীতি হবে দেউলিয়া রাজনীতি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে হবে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার না করেই জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতি গড়তে পারে, তাহলে আশা আছে।
প্রথম আলো : মওলানা ভাসানীকে কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁকে কী দৃষ্টিতে দেখেন?
তারিক আলি : ভাসানী পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সংকটটা বুঝতে পারেননি, যেটা আংশিকভাবে হলেও আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছিল। ভাসানীর এই ভুলের কারণেই আওয়ামী লীগ শূন্যতা পূরণ করে সামনে চলে এল। ভাসানী গণনেতা ছিলেন, রাষ্ট্রনেতা ছিলেন না। তিনি নীতির জায়গা থেকে ভাবতেন, কৌশল বুঝতেন না। তিনি আমাকে তাঁর রাজনৈতিক সচিব হতে বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম, আমি বাংলা জানি না, তাই এই কাজ আমি ভালো পারব না। কিন্তু আমি ভাবি, স্বাধীনতাসংগ্রাম যদি মুজিব ও ভাসানীর যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত হতো, তাহলে হয়তো ইতিহাস অন্য রকম হতো।
প্রথম আলো : আপনার তারুণ্যের সময়ের মতো এখন আবার বিশ্বজুড়ে গণ-আন্দোলনের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে কি?
তারিক আলি : গণ-আন্দোলন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু রাজনীতিটা স্পষ্ট হচ্ছে না। রাজনীতি ছাড়া বড় পরিবর্তন হয় না। রাজনীতিহীনতাই আরব জাগরণের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। ব্রাদারহুডের রাজনীতি ছিল, তাই তারা সামনে এসেছে। কিন্তু তারা জনগণকে হতাশ করায় তাদের সরিয়ে এসেছে সেনাবাহিনী। কিন্তু লাতিন আমেরিকার দিকে দেখুন, সেখানে সামাজিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে এবং তারা নেতৃত্ব তৈরি করেছে। নতুন সরকারগুলো সামাজিক আন্দোলনের চাহিদামাফিক কাজ করেছে। আরবের সঙ্গে এখানেই দক্ষিণ আমেরিকার পার্থক্য।
গণ-আন্দোলন সত্যিই সুন্দর, কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলনও এ কারণে পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।
প্রথম আলো : হে ফেস্টিভ্যাল নিয়ে বলেন। অনেকেই তো এর সমালোচনা করছে। কী বিবেচনায় আপনি এতে অংশ নিয়েছেন?
তারিক আলি: আমি সাধারণত কোথাও হে ফেস্টিভ্যালে বক্তৃতা করি না। কারণ, তারা বৈশ্বিক করপোরেট কালচারের অংশ। কিন্তু এবার আমি তাদের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছি। কারণ, আমি ঢাকায় আসতে চেয়েছি। স্বাধীনতার পর আমার আর তো আসা হয়নি। ফেস্টিভ্যালের উদ্যোক্তাদের কাছেও অভিযোগ করেছি, কেন এটা ঢাকা ফেস্টিভ্যাল হবে না? কেন হে ফেস্টিভ্যাল? এই করপোরেটাইজেশনের সমালোচনা করি।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
তারিক আলি :  আপনাকেও ধন্যবাদ।

পাকিস্তানে শান্তি কত দূর?

এ মাসের ২ তারিখ থেকে পাকিস্তানি তালেবানের সঙ্গে নওয়াজ শরিফের সরকারের শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিক তার আগের দিনই মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী সিআইএর ড্রোন হামলায় তালেবানের প্রধান নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদ চার সহযোগীসহ নিহত হলে সব ভেস্তে গেছে। তালেবান তার প্রধান নেতাকে হারিয়ে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছে এবং পাকিস্তানের সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। তারপর, গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলি খান পাকিস্তানের পার্লামেন্টে বললেন, তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা আপাতত হচ্ছে না। কারণ, মার্কিন বাহিনী ড্রোন হামলা চালিয়ে শান্তি প্রক্রিয়াকে ‘সাবোটাজ’ করেছে। প্রতিরক্ষা উৎপাদনবিষয়ক মন্ত্রী রানা তানভীর হুসাইন বলেছেন, আলোচনা এখন হবে না, কারণ তালেবান বেশ খেপে আছে। তারা ঠান্ডা হওয়ার পর আলোচনা প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করা হবে বলেও মন্তব্য করেছেন এই মন্ত্রী। পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত সংগঠনটি পাকিস্তানের কয়েকটি ইসলামপন্থী জঙ্গি ও জিহাদি গোষ্ঠীর এক মিলিত প্ল্যাটফর্ম বা মোর্চা। আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তেহরিক-ই-তালিবান, পাকিস্তান’ নামে তালিকাভুক্ত এই সংগঠনকে অনেক আগেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
কিন্তু তাতে সুফল ফলেনি, বরং তালেবানের সন্ত্রাসী তৎপরতার চাপ ও প্রভাব ক্রমশ এতটাই বেড়েছে যে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হয়েছে, তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসে কোনো একটা সমঝোতামূলক বন্দোবস্তে পৌঁছা যায় কি না। পাকিস্তানি তালেবানের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর; তারা পাকিস্তানের সংবিধান মানে না, গোটা পাকিস্তানে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। তাই তারা আপাতত চাইছে পাকিস্তানের সাতটি উপজাতীয় অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য নিরঙ্কুশ করতে। সরকারের প্রতি তাদের দাবি, উপজাতীয় অঞ্চলগুলো থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া তারা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছে। কিন্তু নওয়াজ শরিফ যদিও নির্বাচনের আগে তালেবানদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ড্রোন হামলা বন্ধ করবেন, কিন্তু বাস্তবে সেটা তাঁর পক্ষে করা সম্ভব নয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী তৎপরতার সবচেয়ে সফল অংশ হচ্ছে ড্রোন হামলা। তারা আফগানিস্তান থেকে আল-কায়েদাকে প্রায় পুরোটাই ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে ড্রোন হামলা চালিয়ে। পাকিস্তানেও তালেবান জঙ্গিদের ওপর ড্রোন হামলা চালানো তাদের নিয়মিত কাজ। ড্রোনের সাহায্যে তারা ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়ায়ও প্রচুরসংখ্যক ইসলামি জঙ্গিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে।
সুতরাং এই মোক্ষম অস্ত্র তারা ত্যাগ করবে এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পাকিস্তানে সিআইএর ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে জনমত অত্যন্ত প্রবল। সরকারও প্রতিটি ড্রোন হামলার পরে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন কেউ নেই, যাকে ড্রোন হামলার সমর্থনে প্রকাশ্যে কিছু বলতে শোনা গেছে। সরকার ও সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে চালকবিহীন বিমান থেকে মিসাইল ও গোলা নিক্ষেপ করে পাকিস্তানি নাগরিকদের হত্যা করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করছে। এটাই তাদের প্রধান আপত্তির বিষয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের জনসাধারণের একটা বড় অংশের আপত্তি হলো, ড্রোন হামলা চালিয়ে শুধু যে তালেবানসহ ইসলামপন্থী জঙ্গিদেরই হত্যা করা হচ্ছে তা তো নয়, একই সঙ্গে প্রচুরসংখ্যক বেসামরিক মানুষও নিহত হচ্ছে। এমন যদি হতো যে সিআইয়ে ড্রোন হামলা চালিয়ে শুধু জঙ্গিদেরই হত্যা করছে, তাহলে সাধারণ মানুষের তেমন আপত্তি ছিল না। দৈনিক ডন এমন কথাই লিখেছে: তালেবান প্রধান হাকিমুল্লাহ মেহসুদ নিহত হওয়ার পর সারা পাকিস্তানের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু ড্রোন হামলায় নিরীহ সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে প্রচুর।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের প্রশাসন দাবি করে যে ড্রোন হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের হতাহত হওয়ার ঘটনা যত বেশি বলে মনে করা হয়, আসলে ততটা নয়। পাকিস্তান সম্প্রতি বলেছে, ২০০৪ সাল থেকে এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পাকিস্তানে সিআইএর ড্রোন হামলায় মোট যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টের দেওয়া এক হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সিআইএ পাকিস্তানে ড্রোন হামলা চালিয়েছে মোট ৩৭৮ বার। এতে মোট নিহত হয়েছে তিন হাজার ৬৪৪ জন মানুষ। তাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ৯৪৮ জন, এর মধ্যে ২০০ জন শিশু। আহত প্রায় দেড় হাজার। মার্কিন প্রশাসন ড্রোন হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের সংখ্যার বিষয়ে একমত না হলেও স্বীকার করে যে জঙ্গিদের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে নারী-শিশুদেরও মৃত্যু হয়েছে। বারাক ওবামার ড্রোন কর্মসূচির বিরাট সাফল্যের বিপরীতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এটাই। কিন্তু তাই বলে, জনমতের চাপে, এমনকি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তীব্র সমালোচনার চাপে ওবামা ড্রোন কর্মসূচি ত্যাগ করবেন, এমন কোনো সম্ভাবনাই নেই। আফগানিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়ার মতো পাকিস্তানেও তালেবানসহ ইসলামি জঙ্গি গ্রুপগুলোর প্রধান মাথাব্যথা সিআইএর ড্রোন হামলা। সে দেশের সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা বন্ধ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ না করছে,
ততক্ষণ পাকিস্তানি তালেবান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হবে না। কিন্তু নওয়াজ শরিফের সরকার এ ক্ষেত্রে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদনবিষয়ক মন্ত্রী রানা তানভীর হুসাইন বলেছেন, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর এমন সামরিক প্রযুক্তি আছে, যা দিয়ে সিআইএর ড্রোনগুলোকে ভূপাতিত করা সম্ভব, কিন্তু তা করা সমীচীন হবে না। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করে দেশটির আকাশসীমা ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানি নাগরিকদের হত্যা করে চলেছে, অথচ তাদের এই বেআইনি, যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য তৎপরতা বন্ধ করতে পাকিস্তান একটা ড্রোনও গুলি করে কেন ভূপাতিত করেনি বা করছে না—এটা একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন। পাকিস্তানি তালেবানের কাছে হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আছে। সম্ভবত সে কারণেই তারা তাদের অনেক পুরোনো বন্ধু নওয়াজ শরিফের কথাও বিশ্বাস করে না। তালেবান জানে, দলনির্বিশেষে পাকিস্তানের সব সরকার এবং দেশটির সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কী নিদারুণভাবে নির্ভরশীল! তাদের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের অর্থ তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই মিটমাট করে ফেলা। কিন্তু তা কি হয়? এ মুহূর্তে তারা নিজেদের কর্তব্য স্থির করেছে, তাদের প্রধান নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদের হত্যার বদলা নেওয়া জরুরি। এখন পাকিস্তানের জনগণের দিনরাত্রি কাটছে সেই আতঙ্কে।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

বিএনপির নেতাদের রিমান্ড

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সাধারণভাবে রিমান্ডসর্বস্ব, যা মানবাধিকারের পরিপন্থী। এমনকি ২০০৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়ে রিমান্ড প্রদানে যেসব বাধানিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। হাইকোর্ট বলেছিলেন, অনধিক তিন দিনের বেশি রিমান্ড দেওয়া যাবে না। কিন্তু বিএনপির নেতাদের দুটি মামলায় প্রত্যেককে আট দিন করে রিমান্ড দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছিলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। সে জন্য কাচের দেয়ালবিশিষ্ট বিশেষ কক্ষ লাগবে। সেখানে আত্মীয় বা আইনজীবীর দৃষ্টিসীমায় জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু সেই কক্ষ তৈরি করা হয়নি। পরিহাস হচ্ছে, তৎকালীন বিএনপি সরকার ওই রায় মেনে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেনস্তা তারাও কম করেনি। হাইকোর্টের ওই রায় মানলে নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষা পেত। কিন্তু সেটা মেনে চলাকে তারা তাদের অপশাসনের পথে বাধা মনে করেছিল।
এখন নিজেরাই সেই ফাঁদে পড়েছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের রিমান্ড বলে বিএনপি এখন বড় গলায় শোর তুলেছে। তারা ক্ষমতায় এলেও পরিস্থিতির উন্নতি হবে, সেই ভরসা কম। আদালতকে উচ্চ আদালতের ওই নির্দেশনা এবারে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিএনপির আইনজীবীরা। তাতে প্রতিকার মেলেনি। এটা তাই আমাদের অবাক করেছে। কারণ, হাইকোর্টের রায়ের পরে কতগুলো অগ্রগতি ঘটেছে। নিম্ন আদালত যা অস্বীকার করতে পারেন না। প্রথমত, ২০০৩ সালের পরে বিচার বিভাগ পৃথক হয়েছে। সংবিধানমতে, হাইকোর্টের রায় নিম্ন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। যদিও ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগ সরকারের দায়ের করা লিভ পিটিশন মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু কোনো স্থগিতাদেশ দেননি। শুনানি বা নিষ্পত্তিও হয়নি। ২০১২ সালে আপিল বিভাগ এক রায়ে বলেছেন, যে ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে হাইকোর্টের কোনো রায়ের ওপর আপিল বিভাগ স্থগিতাদেশ দেবেন না, সে ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা থাকবে।
আমরা এদিকে আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের আশু প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ আশা করছি। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং তাঁকে হাজতে রেখে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করার মাধ্যমেই পুলিশ প্রধানত অপরাধ সংঘটন-সংক্রান্ত তথ্যাবলি পেয়ে থাকে। অথচ কোনো সভ্য দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এ ধরনের নির্ভরশীলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। আইনের রাজনৈতিক অপপ্রয়োগের কারণে গোটা পুলিশি ব্যবস্থার নীতি-নৈতিকতা যথেষ্ট নড়বড়ে হয়ে আছে। তথাকথিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি-নির্ভর একটি অনুসন্ধান ও তদন্তব্যবস্থা কার্যত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি ছাড়া কিছু নয়। বিএনপির পাঁচ নেতাকে হয়তো ডিবি অফিসের তথাকথিত হাজতখানায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এটা আদালত অবমাননার শামিল। আর জিজ্ঞাসাবাদে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা কেবল ওই রায়েরই নয়, সংবিধানেরও লঙ্ঘন। সংবিধান নির্দিষ্টভাবে কারও নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য আদায় এবং অভিযুক্তের সঙ্গে লাঞ্ছনাকর আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। রিমান্ডে এই দুটোই ঘটে বলে অভিযোগ আছে।