Showing posts with label চারু শিল্প. Show all posts
Showing posts with label চারু শিল্প. Show all posts

Wednesday, June 10, 2026

ক্যানভাসে সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করা এক ইরানি শিল্পী by আশরাফুর রহমান

যখন পুরো শহরজুড়ে সাইরেনের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হয় এবং সংবাদমাধ্যমের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বারুদের গন্ধ, তখন প্রতিটি বিবেকবান মানুষ নিজের মতো করে অস্ত্র তুলে নেয়। কেউ কাঁধে তুলে নেন রাইফেল, কেউ আবার তাক করেন ক্যামেরার লেন্স।

আর বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের এই আগ্রাসী রূপের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন এক শিল্পী, যার অস্ত্র কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নয়—তার অস্ত্র হলো নিখুঁত কিছু রেখা, রং এবং বিশ্বরাজনীতিকে কাঁপিয়ে দেওয়া অত্যন্ত অর্থপূর্ণ ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গচিত্র।

ইরানের প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট সাইয়্যেদ মাসুদ শোজায়ি তাবাতাবায়ি ‘৪০ দিনের যুদ্ধ’ শুরুর প্রথম ভোরেই একটি নীরব প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যে প্রতিজ্ঞার ভিত্তি ছিল শিল্প ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।
তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যতদিন এই সংঘাতের আগুন জ্বলবে, ততদিন তিনি প্রতিদিন অন্তত একটি করে ক্যারিকেচার (ব্যঙ্গচিত্র) তৈরি করবেন। এই ছবিগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের পেছনের আসল সত্য, পশ্চিমা মিডিয়ার একপেশে প্রচারণার জবাব এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের এক সৎ ও আপসহীন দলিল হিসেবে কাজ করবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ছোট ফ্রেমে বন্দি থাকা সেই উত্তাল দিনগুলোর গল্পই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করা থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মকে দিনরাত কার্টুন আঁকার প্রশিক্ষণ দেওয়া—সবই জড়িয়ে আছে এই শিল্পীর লড়াকু জীবনের সাথে।
এটি এমন এক স্রষ্টার দুনিয়ায় ঘুরে আসার গল্প, যিনি বিশ্বাস করেন যে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সত্যকে টেনে বের করতে হলে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপকে কখনো কখনো তীরের মতো তীক্ষ্ণ ও ধারালো হতে হয়।

ক্যানভাসের নীরব বৈপ্লবিক ঝড়
ডিজিটাল স্ক্রিনের ওপর দিয়ে স্টাইলাস (ডিজিটাল কলম) আলতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবকিছু শুরু হয় একটিমাত্র কালো বিন্দু দিয়ে। সেই বিন্দুটি ধীরে ধীরে প্রাণ পেয়ে রেখায় রূপ নেয় এবং ফুটিয়ে তোলে একটি চেনা মুখের অবয়ব। ভেতরের চরিত্র আর উপাদানগুলো সব যার যার জায়গায় ঠিকঠাক বসে যায়; মনে হয় যেন ক্যানভাসে এখনই রঙ আর ব্যঙ্গের একটা বিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে। এই দৃশ্যের পরিচালক পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের কোনো জোরালো আওয়াজ বা প্রোপাগান্ডা নয়, বরং একজন শিল্পীর মন, যিনি তার কর্মশালার নীরবতার মাঝেই একটা বৈপ্লবিক ঝড় তুলে দিচ্ছেন।

হঠাৎ করেই রেখাগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায় এবং স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ভাঙা শিংওয়ালা একটি ষাঁড়। এটি কোনো ফ্যান্টাসি দৃশ্য নয়, এটি বর্তমান ভূরাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ও চাক্ষুষ রূপ। এই ৪০ দিনের মিডিয়া যুদ্ধের আসল চেহারা কী ছিল, তা যদি কেউ জানতে চায়, তবে তাকে এই শিল্পীর প্রতিদিনের কার্টুনগুলো দেখানোই যথেষ্ট। ইতিহাস যেন তাকে এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সাক্ষী হতে এবং তা স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার জন্যই নির্বাচন করেছে। বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধের পরিধি সাধারণ খবরের চেনা ফ্রেমে তুলে ধরা যায় না; এই লড়াইকে দেখতে হবে তার কার্টুনের অতিরঞ্জিত রেখা, তেতো ব্যঙ্গ আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সাহসী রঙের মধ্য দিয়ে।

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের আগুন জ্বলে ওঠার প্রথম দিন থেকেই এই পরিশ্রমী ও সচেতন কার্টুনিস্ট হাত গুটিয়ে বসে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কেবল একজন দর্শক বা সংবাদের নিস্পৃহ ভোক্তা হয়ে থাকতে চাননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞার মুহূর্তটি তুলে ধরে বলেন: ‘যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতেই আমি একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম: যদি আল্লাহ চান এবং কোনো বাধা না আসে, তবে আমি এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন অন্তত একটি করে ব্যঙ্গচিত্র তৈরি ও প্রকাশ করব। আল্লাহর রহমতে, আজ পর্যন্ত আমি প্রায় প্রতিদিনই এটি করতে পেরেছি, এমনকি কোনো কোনো দিন একাধিক ছবিও এঁকেছি। এখন পর্যন্ত এই কাজের সংখ্যা ৮০টি ছাড়িয়ে গেছে।’

তবে এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, যেখানে খবরের গতি আলোর চেয়েও দ্রুত, সেখানে প্রতিটি ঘটনার সাথে তাল মিলিয়ে চলা মোটেও সহজ কাজ নয়। তিনি বলেন, ‘এত এত ঘটনা আর একের পর এক সংবাদের জোয়ারে কখনো কখনো সত্যিই কিছুটা পিছিয়ে পড়তে হয়। খবরের গতি অত্যন্ত তীব্র, তবে আমি চেষ্টা করি প্রতিদিনের এই পরিবর্তনের অন্তত একটি ভিজ্যুয়াল বর্ণনা তুলে ধরতে।’

ছবি দিয়ে সত্য উন্মোচন
কার্টুনের দুনিয়ায় রেখাগুলো কেবল মানুষকে হাসানোর জন্য আঁকা হয় না। কখনো কখনো একটি সাধারণ খসড়া ছবিও একটি বিশ্বসাম্রাজ্যের মিডিয়া একাধিপত্যকে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। শোজায়ি তাবাতাবায়ি তার এই কার্টুনগুলোকে ‘মুখোশ উন্মোচনের ভাষা’ হিসেবে দেখেন। পর্দার আড়ালে কী ঘটছে তা প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তায় তিনি বিশ্বাস করেন: ‘আমাদের কাজ হলো এটা দেখানো যে বাস্তবে কী ধরনের অপরাধ ঘটছে, এর পেছনে কারা রয়েছে এবং সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক খবরের আড়ালে কোন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।’

যখন তার কার্টুনের নিয়মিত চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, তখন দুটি নাম সবচেয়ে বেশি সামনে আসে: ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি এই দুজনকে ‘আগ্রাসী ও যুদ্ধবাজ নীতির প্রতীক’ মনে করেন। তাবাতাবায়ি বলেন, ‘আজ নেতানিয়াহুকে কার্যত একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চেনে সবাই। অন্যদিকে ট্রাম্পও একজন জটিল ব্যক্তিত্ব—যার বিরুদ্ধে অসংখ্য আইনি মামলা রয়েছে। এই চরিত্রগুলো ব্যঙ্গচিত্রের জন্য খুবই উপযোগী, কারণ তারা একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে পরিচিত, অন্যদিকে তেমনি একবিংশ শতাব্দীর কুৎসিত রাজনৈতিক আচরণের প্রতীক।’

ভাঙা শিংয়ের ষাঁড় এবং ‘মেড ইন চায়না’ পতাকা
একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে পৃথিবীকে দেখে, এই শিল্পী দেখেন তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। নিজের সাম্প্রতিক একটি বহুল প্রচারিত (ভাইরাল) কাজের কথা উল্লেখ করে শোজায়ি তাবাতাবায়ি বলেন: ‘আমি একটি ছবি এঁকেছিলাম যেখানে ট্রাম্পকে একটি আহত ষাঁড় হিসেবে দেখানো হয়েছে—যার একটি শিং ভাঙা এবং ব্যান্ডেজ করা। ষাঁড়ের শরীরের দাগগুলোকে আমি পৃথিবীর মানচিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি। সাধারণত বলা হয় গরুর প্রতিটি অংশই উপকারী, কিন্তু এখানে এটিকে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ও পরাজিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই কাজটি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার শিল্পীদের কাছ থেকে প্রচুর সাড়া পায়।’

ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তার ব্যঙ্গাত্মক রূপটি মাঝেমধ্যে বেশ নিষ্ঠুর ও রূপক হয়ে ওঠে। আরেকটি কাজে তিনি উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সামনে মার্কিন নেতৃত্বকে ক্ষুদ্র ও অসহায় হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন: “এক সময় তারা চীনের সাথে হুমকির ভাষায় কথা বলত, কিন্তু আজ তারা এমন এক অবস্থানে আছে যেখানে তাকে অন্যের কাছে এক ধরনের মরিয়া ভাব নিয়ে যেতে হয়। ছবিতে দেখা যায়, ট্রাম্পের হাতে একটি বিশাল চীনা পতাকার সামনে আমেরিকার একটি ছোট্ট পতাকা রয়েছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যঙ্গাত্মক বিষয় হলো, ট্রাম্পের হাতের ওই ছোট্ট পতাকাটিতেও লেখা ‘মেড ইন চায়না’!”

ব্রাজিল থেকে তেহরান: বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেটওয়ার্ক
শোজায়ি তাবাতাবায়ির এই ব্যঙ্গচিত্রগুলোর বার্তা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকেনি। তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত, যারা কার্টুনকে কেবল বিনোদন হিসেবে নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখেন।

বিদেশি কার্টুনিস্টদের সাথে তার সুগভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি ব্রাজিলের একজন শিল্পীকে নিয়ে একটি চমৎকার স্মৃতি চারণ করেন: “ব্রাজিলের একজন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ছিলেন যিনি আমাদের একটি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বিচারক হিসেবে ইরানে এসেছিলেন। তিনি তেহরানের ১০ লাখ মানুষের সেই বিশাল সমাবেশে অংশ নেন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সেই গণজাগরণ খুব কাছ থেকে দেখেন। পরে তিনি ব্রাজিলে ইরানি সংস্কৃতির একজন প্রকৃত দূত হয়ে ওঠেন! তিনি বলতেন, ‘যারা নিপীড়কদের হয়ে কাজ করে, তাদের আমরা কার্টুনিস্ট বলেই গণ্য করি না; যার বাস্তবতার সঠিক বোধ ও পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই, সে পেশাদার কার্টুনিস্টদের দলের মধ্যেই পড়ে না’।”

শোজায়ি এবং তার সমমনা বন্ধুদের কাছে ভার্চুয়াল জগৎ—বিশেষ করে ফেসবুক—একটি ‘নরম যুদ্ধ’ বা ‘সফট ওয়ার’ রুমে পরিণত হয়েছে। যখন বিশ্বখ্যাত কোনো ব্যক্তিত্ব এই ছবিগুলো শেয়ার করেন, তখন সেটি হাজার হাজার বার ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি মনস্তাত্ত্বিক দলিল হয়ে ওঠে।

ক্যানভাসে অশ্রু: মিনাবের শহীদদের গল্প
সব ব্যঙ্গচিত্র মানুষকে হাসানোর জন্য নয়; কখনো কখনো এটি এমন এক আয়না হিসেবে কাজ করে যা সত্যকে প্রতিফলিত করে বুকের ভেতর এক গভীর বেদনা তৈরি করে। বেসামরিক ভুক্তভোগী ও শিশুদের নিয়ে তৈরি করা ছবির প্রসঙ্গে আসতেই শোজায়ি তাবাতাবায়ির কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদের এই নিষ্ঠুর আগ্রাসনের চিত্রকর নিজেও এর মানসিক আঘাত থেকে রেহাই পাননি। অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন:
“মিনাবের শহীদদের জন্য আমি যে ছবিটি এঁকেছিলাম, তা গভীর ভালোবাসা আর তীব্র বেদনা থেকে তৈরি হয়েছিল। কাজটা করার সময় আমি সত্যিই কাঁদছিলাম। আপনি যখন এমন শিশুদের ছবি আঁকেন যারা যুদ্ধের শিকার হয়েছে, অথচ একই সাথে ছবিতে তাদের মর্যাদা ও নির্দোষ ভাবটা ফুটিয়ে তোলেন, তখন সেই কাজটা আর কেবল কার্টুন থাকে না; তা একটি আবেগঘন দলিলে পরিণত হয়। আমি বিশ্বাস করি, কোনো কাজ যখন হৃদয় থেকে আসে, তখন তা অন্যের হৃদয়েও জায়গা করে নেয়।”

কোমে মধ্যরাতের ক্লাস: পেন্সিল ও কাগজের এক নতুন বাহিনী
তবে এই লড়াই কেবল একজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের পবিত্র কোম শহরে শোজায়ি তাবাতাবায়ি রাত প্রায় দেড়টা পর্যন্ত জেগে তরুণ প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যারা আগামী দিনে এই দেশের ও সময়ের সত্যগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। সেখানে এক দারুণ সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে; শিশু, কিশোর ও তরুণরা এসে তাদের চারপাশের বেদনা ভাগ করে নেয় এবং এই গভীর কথোপকথন থেকেই নতুন নতুন কার্টুনের আইডিয়া জন্ম হয়।

গর্বের সঙ্গে তিনি বলেন, “আমার কিছু শিক্ষার্থী এখন এত ভালো কাজ করছে যে আমি তাদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিই। আজকের যুগে যখন রাজনীতিবিদরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ঝকঝকে প্রচারণার ওপর নির্ভর করছেন, তখন ব্যঙ্গচিত্র কোনো সীমান্ত না মেনেই মানুষের মনে পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই।”

এ প্রসঙ্গে শোজায়ি তাবাতাবায়ি বলেন, “আমি এই দিনগুলোতে আমার সব শক্তি ব্যয় করছি, যেন প্রতিদিন অন্তত একটি কাজ তৈরি হয়, যা একই সঙ্গে গল্প, সচেতনতা এবং শিক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। আশা করি, এই কার্টুনগুলো সত্য তুলে ধরতে এবং শোকাহত মানুষের হৃদয়ে সামান্য হলেও সান্ত্বনা দিতে পারবে।”

যতদিন অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থাকবে, ততদিন এই শিল্পীদের ক্যানভাসে আঁকা রেখাগুলো কখনো বিশ্রাম পাবে না। তারা তাদের তুলি ও কলমকে তীক্ষ্ণ করেছেন যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস কেবল অস্ত্রধারী বিজয়ীদের মুখ থেকেই না শোনে, বরং সত্যের আসল রূপটি দেখতে পায়।

ক্যানভাসে সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করা এক ইরানি শিল্পী
সাইয়্যেদ মাসুদ শোজায়ি তাবাতাবায়ির ব্যঙ্গচিত্র ‘বৈশ্বিক সংকট: একটি গরু, হাজার সমস্যা!

Monday, January 5, 2026

বান্দরবানে চিত্র প্রদর্শনী: পাল্লায় উঠেছে প্রাণ-প্রকৃতি, শিল্পীর তুলিতে বিপন্ন পাহাড় by বুদ্ধজ্যোতি চাকমা

প্রকাশ ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ ঝিরি-ঝরনার পাথর ও জীবন্ত ব্যাঙ দাঁড়িপাল্লায় ঝুলছে। বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। প্রাণ-প্রকৃতি যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ের নিসর্গ ও পাহাড়ি মানুষের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে আঁকা এই ছবির সামনে দর্শকেরা মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ান। শিল্পী খিং সাই মং মারমার আঁকা ছবিটি যেন পাহাড়ের প্রাণ-প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস।

বান্দরবান জেলা শহরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে (কেএসআই) খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনীর শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার। চার দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী শুরু হয় ১৯ ডিসেম্বর। ‘রোয়া-দ্ব’ নামের এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর জলরং ও তেলরঙে আঁকা ২৭টি ছবি।

শিল্পী খিং সাই মং মারমা প্রতিটি ছবিতে বান্দরবানের প্রাকৃতিক ও জাতিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়া যেমন রয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে হারানো সময়ের চালচিত্র। আদিবাসী ঐতিহ্যের শিকড়সন্ধানী শিল্পীর মনোভাবে পরিচয় মেলে প্রদর্শনীর নামকরণেও। ‘রোয়া-দ্ব’ নামে আয়োজিত এই প্রদর্শনী বান্দরবানের অতীতের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। মারমা ভাষায় ‘রোয়া-দ্ব’ বলতে বান্দরবানকে বোঝায়। আরও পরিষ্কার করে বললে, ‘রোয়া-দ্ব’ হলো বোমাং সার্কেলের কেন্দ্রীয় গ্রাম বা রাজধানী।

শিল্পীর বেশ কয়েকটি ছবির শিরোনাম ‘অস্তিত্ব’। এই সিরিজের একটি ছবিতে দেখা যায়, কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, কুকুরের পাশ ঘেঁষে বসে থাকা কয়েকটি পাহাড়ি শিশু শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উড়ন্ত পালকের দিকে। ছবিটি দর্শককে আচ্ছন্ন করে। আক্রান্ত করে। পাহাড়ের বাস্তবতা ও তার অনিশ্চয়তার দিকে টেনে নিয়ে যায়।

‘পাথর’ শিরোনামে একটি ছবিতে দেখা যায়, ঝিরি-ঝরনার পাথর দাঁড়িপাল্লায় তোলা হয়েছে, তার নিচে একটি কাঁকড়া। কোটি বছর ধরে বালুকণা জমে সৃষ্ট পাথর বিক্রি হচ্ছে, অপর দিকে এই পাথর যার আবাস, সেই কাঁকড়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠছে।

শিল্পী খিং সাই মং মারমার ছবিতে হাইপাররিয়েলিজম অর্থাৎ অতিবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটেছে। ফটোগ্রাফির নিখুঁত ডিটেইল পাওয়া যায় তাঁর ছবিতে। একই সঙ্গে পরিপার্শ্বকে বদলে দেওয়া নতুন বাস্তবতাও আবিষ্কার করে দর্শক।

প্রকৃতিঘনিষ্ঠ ১১টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে খিং সাইয়ের ছবিতে। শিল্পী খিং সাই মং বলেন, তাঁর শৈল্পিক পথচলায় পাহাড়ের ভূমি, ভূমিপুত্র ও তাদের জীবনযাত্রা ভীষণভাবে প্রভাব ফেলেছে। ছবিগুলো সেই গভীর অনুভূতির প্রতিফলন। খিং সাইয়ের এটি প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী। ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেক এই ছাত্র এর আগে দলগতভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৫টি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন।

চিত্র প্রদর্শনীতে সহযোগিতা করেছেন সেনাবাহিনীর বান্দরবান ৬৯ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান। সমাপনী অনুষ্ঠানে এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান বলেন, শিল্পী খিং সাই মং মারমার এই প্রদর্শনী দেখে আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন। তাঁর ছবি ভবিষ্যতে পাহাড়কে আলোকিত করবে।

শিল্পী খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনীতে ছবি দেখছেন এক দর্শক। গত শুক্রবার বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে
শিল্পী খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনীতে ছবি দেখছেন এক দর্শক। গত শুক্রবার বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে। ছবি- মং হাই সিং মারমা

Wednesday, July 30, 2025

চারুশিল্প- রশীদ আমিনের রং-রাগ by শামসেত তাবরেজী

এখন শ্রাবণ মাস। শিল্পী রশীদ আমিন এই শ্রাবণের সাক্ষীস্বরূপ গানের গলা না ভেঁজে রঙের সুর তুলেছেন নানা মাত্রার কাগজের ওপর—জলরঙে ও ছাপচিত্র মাধ্যমে। তাঁর চিত্ররাগের নামও হয়েছে ‘মেঘমল্লার’। রশীদ আমিনের এই ভীমসেন জোসি বাজছে ৩ আগস্ট থেকে, চলবে ১৬ আগস্ট, প্রতিদিন ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে। কিন্তু এই রাগ কানে না শুনে চোখ দিয়ে শুনতে হবে। শ্রাবণ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে শ্রবণের প্রসঙ্গ। এখন শ্রুতি ও নজরের সম্মিলনে যে লাবণ্যসুন্দর বাংলার বর্ষা তিনি এঁকেছেন, একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে আমিনের জলরঙে আঁকা বর্ষার মেঘ ঠিক কবি কালিদাসের মতো ব্যস্ত ডাকপিয়ন নয়। বরং শ্রাবণমেঘ জলভারানত গম্ভীর গর্ভিণীর মতো। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় প্রায় সন্নিকটে, চোখেমুখে তারই এক রাহস্যিকতা খেলে বেড়াচ্ছে আর মোটা তুলিতে ধোঁয়া ছড়িয়ে যাওয়া রং বা পীতাভ পানির সুর চোখ ছাপিয়ে শ্রুতি পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

সাধারণত আমরা যখন গ্যালারিতে ছবি দেখি, আমাদের চোখের ডগায় মগজ বেঁধে নিতে হয়, কিছুটা বুদ্ধি খরচের ক্লেশ হয়, যদিও তার স্বাদ আরেক মাত্রার। আমিনের ‘মেঘমল্লার’ শিরোনামের এই সিরিজের ছবিগুলোতে বুদ্ধি-ব্যায়াম না করে শুধু নজরভ্রমণ করেই বর্ষাযাত্রার আনন্দ উপভোগ করা যায়। তবে মেঘমল্লার রাগের মিড়, ঘাটগুলো মনের অজানায় চালান করে দেওয়ার জন্য একটু দাঁড়িয়ে থাকার দাবি রাখে। ছবিগুলো যেমন শান্ত, তেমনি দর্শকও যদি শান্ত হয়ে ছবিগুলো দেখেন, তা আরও বেশি উপভোগ্য হবে।

আমি যতবার ছবিগুলো দেখেছি, ততবারই তীব্র এক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি। জলরঙের ছবিগুলোর উৎসভূমি আমিনের জীবনেরই অংশ—টাঙ্গাইলে তাঁর বাড়িটি। এ বাড়ির সঙ্গে সংগত কারণে আমার পরিচয় রয়েছে। ঘন বাঁশবন, ভেতর দিয়ে নানা মাত্রার জ্যামিতি করা বোঝা যায়, বোঝা যায় না এমতো ফাঁকফোকর, অথচ পটভূমির অধিকাংশ জায়গাজুড়েই ঘনবদ্ধ পীতাভ সবুজ, কখনো আবার হঠাৎ হলুদ লাগা নরম আলো, নীল ঢেউয়ের সহজ গতির উচ্ছ্বাস।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, আর্দ্রতাঘন জমিনের সারল্যকে সহজ রেখা দিয়ে বিভেদরঞ্জিত করেছেন আমিন। ছবির জমিনের ওপর মূল রেখাগুলোর বেশির ভাগ রেখাই এঁকেছেন উল্লম্ব। এতে বর্ষার প্রকৃতি আরও গাঢ় হয়ে ধরা পড়েছে। যখন আমরা দেখি এই উল্লম্বতা ভেঙে ছবিকে ছন্দ দিতে এবং দৃশ্যব্যঞ্জনাময় করার তাগিদে মোটা তুলিতে দৈগন্তিক রেখা টেনে ছবির জ্যামিতিকে সুবিন্যস্ত করেছেন, তখন আনন্দ আরও বিশেষ হয়ে ওঠে। বৃষ্টিসিক্ত বাংলার এই প্রকৃতিরূপ দেখার সৌভাগ্য হলো অনেক দিন পর।

প্রিন্ট মাধ্যমটি মনে হয় এই আর্দ্রতাস্বভাবকে খুব গ্রাহ্য করে না, কিন্তু শিল্পীর দক্ষতায় সবুজের সঙ্গে মিল খাওয়া অন্যান্য রং বা রঙের স্তরপরম্পরার এই ছবিগুলোও বর্ষাকে ধারণ করে রোমান্টিকতায়, যদিও তা অত পেলব নয়, বরং দার্ঢ্য, যেন বেশ কয়েক দিন বিরামহীন বৃষ্টির পর সামান্য সময়ের বিরতি পেয়েছে। জলরঙের ছবিগুলো ঠিক যে কথা বলতে চায়, প্রিন্টগুলো ঠিক তা-ই বলে না। ফলে, আমরা বর্ষার বৈচিত্র্য বা দ্বন্দ্বও খানিকটা ছুঁয়ে ফেলতে পারি। এই দ্বন্দ্ব ঠিক বিরোধ নয়, বরং সহোদরার মতো, দুই বোনের চেহারা নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে আলাদা। এখন এই বিষয়টা নির্ভর করবে গ্যালারিতে একাধিক মাধ্যমের ছবিগুলো কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হবে বা হয়েছে, তার ওপর।

আমিন তাঁর ছবিতে বহুবিচিত্র রং ব্যবহার করেননি। গাঢ় বঙ্গীয় সবুজ, কদম-আভাষিত হলুদ, নরম রোদের কমলা, স্মৃতিকাতর নীল—মোটামুটি এই তাঁর রংবাহার। সেসব রং প্রযুক্ত হয়েছে খুব যে নিপুণ ড্রয়িংয়ে, তা নয়, আমার বিবেচনায় বর্ষার শুদ্ধ মূর্ততাকে তিনি হাজির করেননি ইচ্ছা করেই। বরং রোমান্টিক থরথরতা, বিনয়ী অপটুতা বরং ছবিগুলোকে এবং বর্ষাকে অধিকতর প্রকাশসম্ভব করে তুলেছেন এক বিরল বিমূর্ত শর্তে। দরকার শুধু দর্শকের চিদ্‌মুহূর্তের জন্য ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য সময় দেওয়া। অনেকটা আলোকচিত্রী কার্তিয়ার ব্রেসঁ যেমন বলেন ‘নির্ধারক মুহূর্ত’, তার জন্য অপেক্ষা করা। কেননা, নিবিড় সময়-বিরতিই রতিসংক্রমণের মুহূর্তটি এনে দেয়, যেহেতু আমিনের ছবি শুধু দেখার নয়, শোনারও। যেন ভীমসেন জোসির কম্বুকণ্ঠে মেঘমল্লারের সুর: গরজে ঘটা ঘন কারে রি...।
‘মেঘমল্লার ১’,শিল্পী: রশীদ আমিন

Friday, April 18, 2025

চারুশিল্পীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ: ছাত্রলীগ নেতার স্ট্যাটাস-‘মিশন কমপ্লিট’, গ্রেপ্তার ৮

আলোচনায় সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের গ্রামের বাড়ি গড়পাড়া এলাকা। পহেলা বৈশাখে ফ্যাসিবাদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার মুখাবয়ব বানানোর কারিগরের তকমা লেপে দেয়া চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ির পাশেই জাহিদ মালেকের বাড়ি। হাসিনার মুখাকৃতি তৈরির ক্ষোভ থেকেই দুর্বৃত্ত নামধারীরা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে চিত্রশিল্পীর বাড়িতে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতাসহ আওয়ামী লীগের ৮ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রলীগের এক নেতার ফেসবুক আইডি থেকে দেয়া  রহস্যজনক স্ট্যাটাস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজতে মাঠে নেমেছে পুলিশ। স্ট্যাটাসের ধরন ছিল “মিশন কমপ্লিট’’। পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, আটককৃতদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা খান মোহাম্মদ রাফি ওরফে সিজন অগ্নিসংযোগের রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাসটি দিয়েছে। আটক সিজনের কাছ থেকে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে পুলিশ মনে করছেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- সদর উপজেলা ছাত্রলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক আল আমিন ওরফে তমাল (২২), সদর উপজেলার ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনউদ্দিন আহাম্মদ পিয়াস (২২), ছাত্রলীগ নেতা মীর মারুফ (২১), ছাত্রলীগ নেতা আমিনুর রহমান (২৪), গড়পাড়া ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেন (৫৪), মোশারফ হোসেন, সঞ্জিব ঘোষ। বৃহস্পতিবার বিকালে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আসামিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

সরজমিন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের গ্রামের বাড়ি গড়পাড়া এলাকার ঘোষের বাজার ঘুরে দেখা গেল চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িটিকে ঘিরে নানান কৌতূহল। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার বাড়ির আশপাশে এমন ঘটনায় রহস্যের দানা বেঁধেছে। তবে এলাকার মানুষজন নানা কারণে কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িটি শুধু  সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বাড়ির পাশেই নয়, একই সঙ্গে  সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জাহিদ মালেকের আপন ফুপাতো ভাই ইসরাফিল হোসেন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং গড়পাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অর্থাৎ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত আফসার উদ্দিন সরকার, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সিফাত কোরাইশী সুমনের বাড়িও একই এলাকায়।  আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জাহিদ মালেকের বাড়ি গড়পাড়া থেকেই জেলার রাজনীতি সহ সবকিছুরই কলকাঠি নাড়ানো হতো বলে জানান এলাকাবাসী। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী সহ তার আস্থাভাজন ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ সবাই গাঢাকা দিয়েছেন।  

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে আগুনে ক্ষত চিত্রশিল্পীর বাড়ি পরিদর্শনে যান মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ডক্টর মনোয়ার হোসেন মোল্লা। এ সময় তিনি ঘুরে দেখেন। এরপর মুখোমুখি হন সাংবাদিকদের সঙ্গে। ক্ষতিগ্রস্ত চিত্রশিল্পীর ঘর তৈরি করে দেয়ার দায়িত্ব নেন। বলেন, বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের ঘর পুনঃনির্মাণ করে দেয়া হবে। তাছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। এই তদন্ত কমিটিকে ৩ কর্মদিবসের মধ্যে  প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাপ করা।

কবে নাগাদ ঘর তৈরি করে দেয়া হবে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত শেষেই  ঘর তৈরি করে দেয়া হবে। তদন্ত কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। এর পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম) মোস্তাফিজুর রহমান ও মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোসাম্মৎ ইয়াসমিন খাতুন। তারাও ঘুরে ঘুরে দেখেন আগুনে ক্ষতের চিত্র।

এ সময় পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ও তার পরিবারের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। ঘটনাটি ঘটার পর থেকেই আমাদের আইনগত কার্যক্রমের পাশাপাশি  গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই ঘটনায় মামলায় এ পর্যন্ত আমরা ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছি।  গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সরাসরি তারা স্বীকার না করলেও তাদের কথাবার্তায় কিছু কিছু সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। অচিরেই বের করতে পারবো অগ্নিকাণ্ডের আসল রহস্য।

ঘটনার আগে চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্রের থানায় জিডি প্রসঙ্গে এসপি বলেন, তখন থেকেই তার ওপর পুলিশি নিরাপত্তা রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি প্রথম থেকেই অব্যাহত আছে। কিন্তু বাড়িকেন্দ্রিক যে নিরাপত্তার কথা উঠছে তিনি সেভাবে আমাদের কাছে ডিমান্ড করেননি বলে সেটা করা হয়নি। তবে চিত্রশিল্পীর  নিজের ফিজিক্যাল নিরাপত্তা আমরা দিয়ে যাচ্ছি প্রথম থেকেই।

ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি ক্রাইম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করবো ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার। পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি সহায়তা পরিবারটিকে দেয়া হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।

এদিকে চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষ বলেন, আমি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কারও কখনো ক্ষতির কারণ হইনি। না কোনো দল, না কোনো মত- না কোনো ধর্মীয় বিষয়। আমি সব সময়ই দল-মত এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

আমি সব সময় বলেছি- এবারের পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রাতে আমি একটি বাঘের প্রতিকৃতি তৈরি করছি হলুদ রংয়ের। সেটা দেশবাসী দেখেছেন। এটা তৈরি করতে গিয়ে খেয়ে না খেয়ে অনেক সময় ব্যয় করেছি। তার মধ্যেই এ ধরনের একটি ঘটনার মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে।  এ ঘটনা আমার চেয়ে আমার পরিবারের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়ে গেল। এই ট্রমাটা কীভাবে কাটিয়ে উঠবো জানি না। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের কাছে একটাই প্রত্যাশা- সাধারণ মানুষ যারা একটু শান্তিপ্রিয় তারা যেন শান্তিতেই থাকতে পারে।  প্রশাসনের কাছে নিজের এবং  পরিবারের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান এই চিত্রশিল্পী।

mzamin

Monday, April 14, 2025

আঁকতে যাই পাখি, হয়ে যায় মাছ

কাল পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। বর্ষবরণকে সামনে রেখে ‘স্বপ্ন নিয়ে’র পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই এমন এক শিল্পীর কথা, যাঁর তুলির টানে টানে ফুটে উঠত বাংলার নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য। তিনি পটুয়া কামরুল হাসান (২ ডিসেম্বর ১৯২১-২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮)। কীভাবে তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল শিল্পসত্ত্বা? ‘আপন কথা’ নিবন্ধে সে কথা নিজেই লিখে গেছেন তিনি। ১৯৮৬ সালে লেখাটি ছাপা হয়েছিল মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সুন্দরম পত্রিকায় (সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৩৯৩)। পড়ুন নির্বাচিত অংশ।

আব্বা, মা, এবং আমরা দুটি ভাই—এই নিয়ে আমাদের সংসার। এক ছুটির দিন, সকলেই বাড়িতে, আমি বোধ হয় একটু দুষ্টমি করছিলাম। তাই আমাকে শান্ত করবার জন্যে আব্বা আমাকে আদর করে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে বড় ভাইয়ের স্লেট পেনসিল সামনে ধরে বললেন, ‘আয় তোকে একটা মজার খেলা শেখাই।’ বড় ভাইয়ের স্লেটের ওপর আমার ছোট্ট ডান হাতের পাতা উপুড় করে বসিয়ে পাঁচ আঙুলের চারপাশে পেনসিলের দাগ বসিয়ে হাতের পাতাটি স্লেট থেকে ওপরে তুলে ধরতেই চোখে পড়ল স্লেটের ওপরে আমার ছোট হাতের পাঁচটি আঙুলের সুন্দর একখানি ছবি। নিজেই আমার হাতটা পেতে দিয়ে শিশু ভাষায় জানালাম আবার আমার হাত এঁকে দিতে। আগের ছবিটি মুছে দিয়ে আব্বা আমার হাত আবার আঁকলেন—এইভাবে বারবার আঁকা চলতে থাকল। অবসর এবং ভাইয়ার স্লেট পেনসিল হাতের নাগালে পেলেই আব্বার কাছে নিয়ে উপস্থিত হতাম। তিনিও বুঝতেন এবং স্লেটের পিঠে আমার হাতের ছবি ভেসে উঠতে থাকত বারংবার। এটা আমার নিত্যদিনের খেলা হয়ে দাঁড়াল। শেষে একদিন দেখা গেল আমি নিজেই নিজের হাত বসিয়ে আঁকছি স্লেটের ওপরে। এইভাবে খেলা করতে করতে বয়স কিছুটা বেড়ে গেল। তখন কথাও বলতে পারি। এদিকে ভাইয়ার স্লেটে নিজেই নিজের হাত আঁকা আমার নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু আঁকাতেই শেষ নয়, তা নিয়ে আব্বাকে দেখাই, অন্য সব আত্মীয়স্বজন—মামা-চাচাদেরও দেখাই। বাহবা নিই।

এভাবেই খেলার ছলে কখন আমার মনের কোণে ছবি আঁকার একটি লতাগুল্ম অঙ্কুরিত হয়েছিল, বলতে পারি না। তারপর বয়স একটু বাড়তেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় এসে গেল। আব্বা বড় ভাইকে যে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন, সেই মডেল এম-ই স্কুলে আমাকেও ভর্তি করিয়ে দিলেন। ইনফ্যান্ট টু-তে। কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুল। সাধারণ পড়াশোনার সঙ্গে ড্রইং আর মডেলিং ক্লাসের চমৎকার আয়োজন ছিল। আমি যেন এক নতুন আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে লাগলাম মনের আনন্দে। ছবি আর ছবি। আজ দেখতে পাচ্ছি আমার সেই শিশুকালটাকে। নতুন দৃষ্টি মেলে। মাত্র ডিম ফেটে বের হয়েছি, চোখ ফুটেছে কিন্তু ডানা ভালো করে মেলতে পারি না, তাই উড়তে গিয়ে বারবার পড়ে যাই। হ্যাঁ, ছবি আঁকতে যাই পাখির, হয়ে যায় মাছ। এমনিভাবে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ছবির আকাশে সেই যে উড়তে আরম্ভ করেছিলাম সে ওড়ার এখনো বিরাম নাই।

সেই বয়ঃসন্ধির কাল থেকে কানে আসতে লাগল যে ছবি আঁকলে আর্টিস্ট হওয়া যায় এবং আর্টিস্ট হলে খুব নাম হয়। লোকে আঙুল দেখিয়ে বলে ওই লোকটা খব বড় আর্টিস্ট। পয়সাও নাকি উপায় করা যায়। তবে ওটা বড়লোকদের পেশা, আর্টিস্ট হতে হলে বেশ পয়সাকড়ি খরচ করতে হয়। আবার এ-ও কানে এল যে আর্টিস্টরা খেয়ালি হয়, খাবার পয়সা জোটে না তাদের। তবুও ছবিই আঁকব, আর্টিস্ট হতেই হবে। সেই বয়সেই অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, সাধারণ পড়াশোনা আর করব না। তখনকার দিনে কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে পড়তে হলে ম্যাট্রিক না পাস করলেও চলত। এ সংবাদটিও সংগ্রহ করে ফেলেছিলাম। কলকাতা শহরে থাকতাম বলেই এসব খবরাখবর জোগাড় করা সম্ভব হয়েছিল। তা ছাড়া মনটা আমার সেই বয়সেই যেন শিল্পের রসে জারিত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মাইনর স্কুল শেষ করে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে ক্যালকাটা মাদ্রাসায় ঢুকতে হয়েছিল। মাদ্রাসার সঙ্গেই ছিল ইংরেজির মাধ্যমে সাধারণ বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা। সেখানে গিয়ে ড্রইং ক্লাস পেয়েছিলাম এবং আজিজার রহমান নামে একজন তরুণ ড্রইং টিচার। তাঁর কাছ থেকেও উৎসাহ এবং উসকানি দুটোই পেয়েছিলাম। যার ফলে সপ্তম শ্রেণি অতিক্রম করে আর অষ্টম শ্রেণিতে যেতে পারিনি বা যেতে চাইনি বলা যায়।

অতএব ১৯৩৮ সালের জুন মাসে কলকাতার চৌরঙ্গীতে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে গিয়ে টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে এলাম। ফলাফল প্রথম বিভাগেই ছিল। যে ধর্মপ্রাণ পিতা শিশুকালে খেলার ছলে বড় ভাইয়ের স্লেটে আমার হাত আঁকা শিখিয়েছিলেন, সেই নিরীহ মানুষটিকে বাধ্য করেছিলাম আমাকে নিয়ে আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তখন এইটাই নিয়ম ছিল। আব্বা বিরোধিতাও করেননি, আবার উষ্ণতার উত্তাপ দিয়ে সমর্থনও করেননি।

১৯৩৮ সালের জুলাই মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকার অনুশীলন আরম্ভ হয়ে গেল। প্রথম দিকে মনে মনে নিজেকে বিরাট কী ভাবতাম এবং সেইভাবেই চলাফেরা করতাম। রেমব্রান্ট, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল—সব নখের ডগায়। তারপর যত দিন যেতে লাগল, ততই ঘোর কাটতে লাগল। পাঁচ বছরের মধ্যেই কামরুল নামে নতুন এক শিশু হিসেবেই যেন আবার জন্ম নিলাম। এবং সেই থেকে নিউটনের মতোই সমুদ্রতীরের নুড়িপাথর সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আজ অবধি সেই পাথর স্পর্শ করা তো দূরের কথা, তার আলোর ছটা এখনো দৃষ্টিগোচর হলো না। তবুও হাল ছাড়িনি। ছাড়বই বা কোন সাহসে, পেটে তো আর বিদ্যা নেই। আমার পিতা প্রায়ই আমার ছবি আঁকাকে সমর্থন করার জন্যে যুক্তি দিয়ে বলতেন, ‘ছবি আঁকাও তো হুনুরে কাজ, পেট চলেই যাবে ওর।’ সত্যিই, পেট তো চলেই যাচ্ছে। তাহলে কি পেট চালাবার জন্যে ছবি আঁকছি? এ প্রশ্নের উত্তর কি দেব? না, ছবি আঁকবার জন্যেই ছবি আঁকতে আরম্ভ করেছিলাম বটে, পরে সময় যত যেতে লাগল, ততই মনে নানান প্রশ্নের তাগিদ অনুভব করতে লাগলাম। নিজের ভালো লাগা সেই সঙ্গে অন্যদেরও ভালো লাগানো। এটাতেও যেন প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেলাম না। বয়স বাড়ার সাথে কিছু কিছু রাজনৈতিক চিন্তার আঘাত পড়ল মনের দরজায়। তার মধ্যে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। সে মানুষ সর্ব সমাজের, বিশেষ করে শোষিত সাধারণ শ্রেণির, নিচের তলার মানুষের আর্তনাদ যেন অধিকতর। কিন্তু শিল্পকলা তো শুনেছি চিত্তবিনোদনের জন্যে! হ্যাঁ তার মধ্যে দিয়েই নতুন বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। আমার ছবির মধ্য দিয়ে ওই কাজটি করতে হবে।

পটুয়া কামরুল হাসানের তুলির টানে টানে ফুটে উঠত বাংলার নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য
পটুয়া কামরুল হাসানের তুলির টানে টানে ফুটে উঠত বাংলার নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য। ছবি: সংগৃহীত

Friday, July 15, 2022

বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ by রবিউল হুসাইন

মাজহারুল ইসলাম
বাংলাদেশের যে স্থপতি সর্বপ্রথম এ দেশে আধুনিক স্থাপত্যের সূচনা করেন তাঁর প্রখর সৃষ্টিশীল মেধা ও দূরদৃষ্টি নিয়ে, তিনি হলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। তিনি এ দেশের স্থাপত্য পেশাচর্চার পথিকৃৎ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিম দিকে, বর্তমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগার এবং চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউটের এ দুটি ভবনই এ দেশের আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের প্রথম উদাহরণ; এবং এ দুটি বিশিষ্ট স্থাপত্যকর্মের স্থপতি হচ্ছেন মাজহারুল ইসলাম। তখন তিনি সরকারি চাকরি করতেন। সরকারের অধীনেই ১৯৫৫ সালে নির্মিত এ ভবন দুটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলে অবাকই হতে হয়। পরিসরের বিভাজন, উপযোগিতার সঙ্গে উপকরণের সমন্বয় সাধন এবং সর্বোপরি চারপাশে বিরাজমান নৈসর্গের সঙ্গে মেলবন্ধনে এ কাজ দুটি এ দেশের স্থাপত্য জগতের দৃষ্টান্তমূলক মাইলফলক। হয়তো পৃথিবীখ্যাত স্থপতিগুরু লে কর্বুজিয়ের, আলভার আলটুর পরোক্ষ প্রভাব এ কাজে দেখা যেতে পারে, তথাপিও বর্তমান স্থাপত্যশিল্পের যে অবস্থা, সেদিক দিয়ে বিচার করলে ওগুলোর মান উন্নত তো বটেই, বরং দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তা একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হিসেবে বিরাজ করছে।
স্থাপত্যশিল্পের বেশ কয়েকটি বিষয়ে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়ে থাকে, যেমন: তিনি এ দেশের প্রথম আধুনিক স্থপতি ও প্রথম স্থাপত্য পেশাচর্চার পথিকৃৎ তো বটেই, তিনি এ দেশের সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি এবং স্থাপত্য প্রতিযোগিতার বিচারক। তিনি স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রথম সভাপতি। তিনি এ দেশের স্থাপত্যশিক্ষা, বিশেষ করে চর্চার জন্য নবীন স্থপতিদের সম্মুখে পৃথিবীর বিখ্যাত স্থপতিদের কাজের দৃষ্টান্ত রাখার জন্য তাঁদের দ্বারা ভবন নির্মাণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছিলেন। এই নীরব, আত্মপ্রচারবিমুখ, নিরঙ্কুশ স্থাপত্যশিল্পীর জন্ম ১৯২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ১৯৪২ সালে বিএসসি পাস করে প্রথমে তিনি শিবপুরের রয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে পুরকৌশলে ১৯৪৬ সালে স্নাতক হন। এরপর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কনস্ট্রাকশন, বিল্ডিং অ্যান্ড ইরিগেশন বিভাগে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এই বিভাগে কর্মরত অবস্থায় স্থাপত্য পেশায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ১৯৫২ সালে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে জুনিয়র সহস্থপতি হিসেবে পুনরায় সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর ১৯৫৭ সালে লন্ডনের এ এন্ড এ স্কুল থেকে ট্রপিক্যাল স্থাপত্য বিষয় সম্বন্ধে ডিপ্লোমা নিয়ে আসেন। এরই মধ্যে দেশে তাঁর সেই দুটি পথিকৃৎ ভবন নির্মিত হয়েছে। সে সময় যেহেতু দেশে কোনো উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত স্থপতি ছিল না, সেহেতু সরকার বিদেশি স্থপতিদের নিযুক্ত করেছিল বিভিন্ন সরকারি ভবনের নকশা করার জন্য। কিন্তু তাঁদের কাজের মান নিম্নস্তরের হতো এবং তাতে আধুনিক স্থাপত্যের কোনো গুণাবলি থাকত না। এই বৈরী পরিবেশে স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে একা সংগ্রাম করতে করতে এগোতে হয়েছে এবং ওই দুটি ভবন থেকেই সে সময়ের বিদেশি স্থাপত্যের প্রভাব এখানে অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে অচিরেই তিনি এ প্রভাব কাটিয়ে নিজস্ব স্থাপত্য ধারা প্রয়োগ করে বিশিষ্টতা লাভ করেন; এবং এ দেশের কৃষ্টি, সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্য ভাবধারা-সংবলিত নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা ও উপকরণের সার্থক সমন্বয় করতে সফলকাম হন। তিনিই এ দেশে ঐতিহ্যবাহী ইটকে লাইনবন্দী, সরাসরি, উন্মুক্ত পলেস্তারাহীন করে পুরোনো রীতিকে নবতররূপে উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া স্থাপত্যে শিল্পকর্ম, যেমন: বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের দেয়ালে দেয়ালচিত্র সংযোজন করার প্রস্তাব এ দেশে তিনিই প্রথম বাস্তবায়ন করতে পরামর্শ দেন, যার ফলে আমরা নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমানের দুটি কাজ সেখানে দেখতে পাই এবং এই শিল্পকর্মে স্থাপত্যশিল্পের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পের সার্থক যোগাযোগের প্রথম প্রয়াস বলে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সম্পন্ন করা সরকারের বহু স্থাপত্যকর্মের মধ্যে উপরিউল্লিখিত দুটি প্রকল্প ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলো সরকারি লাল ফিতার কারণে কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। এবং এই কারণে ১৯৫৮ সালে তিনি চাকরি থেকে ছাড়পত্র নিতে আবেদন করেন, কিন্তু সেই পত্র তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার জন্য সরকারি বৃত্তি নিয়ে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং ১৯৬১ সালে ফিরে এসে আবার সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ড. কুদরত-ই-খুদার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৬২ সালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি (বিসিএসআইআর) প্রকল্প প্রণয়ন করেন। তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠীর একতরফা অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভের কারণে এদেশে তখন তেমন উল্লেখযোগ্য নির্মাণকার্য চলছিল না। এই অবস্থায় স্থপতি মাজহারুল ইসলাম প্রায় এককভাবে সরকারি স্থাপত্য নির্দেশনামা প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করেন কিন্তু সরকারিভাবে তা অনুমোদিত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে আবার বিরোধ বাধে এবং ১৯৬৭ সালে তিনি সরকারি স্থপতির পদ থেকে সম্পূর্ণরূপে পদত্যাগ করেন। পরে এ সময়ই প্রখ্যাত প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে মিলে বাস্তুকলাবিদ নামে একটি স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান গঠিত করে স্থাপত্য চর্চা শুরু করেন। এই বাস্তুকলাবিদই এদেশের প্রথম স্থপতি পরিচালিত পেশাভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান। কিছুদিনের মধ্যে স্থপতি ইসলামের পরিচালনায় এই প্রতিষ্ঠানটি তদানীন্তন সমগ্র পাকিস্তানে উন্নত স্থাপত্য শিল্পকর্মচর্চার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এদেশে স্থাপত্যচর্চ ও পেশাকে একটি সম্মানজনক শৈল্পিক পেশা হিসেবে তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্য, রুচি, দেশপ্রেম, কাজের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা, পরিপূর্ণ সততা, শৃঙ্খলা, নান্দনিক বিন্যাস ইত্যাদিসহকারে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ইতিমধ্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য অনুষদে প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্য শিক্ষা শুরু হয়েছে এবং সবে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত অনেক নবীন স্থপতি হাতে-কলমে কাজ শেখার জন্য স্থপতি ইসলামের বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ স্বনামধন্য স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠার পর অনুপম স্থাপত্যগুণ সংবলিত বহু ভবনের নকশা করেন তিনি। তখন ১৯৬৪-৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিভাগের উত্তরে নিপা ভবন, ১৯৫৫ সালে মতিঝিলে কৃষি ভবন, ১৯৬৫-৬৮ সালে জীবনবীমা ভবন (টাওয়ার বাদে), ১৯৬৬ সালে মিরপুরের রোড রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রকল্পের ভবনসমূহ এবং অসংখ্য বসবাস গৃহের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। স্থপতি ইসলাম ও তাঁর বন্ধু বিখ্যাত আমেরিকার স্থপতি টাইগারম্যানের যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশের পাঁচটি শহর যথা বরিশাল, পাবনা, রংপুর, সিলেট ও বগুড়াতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রকল্পের ভবনসমূহের নকশা করেন। তিনি ১৯৬৪-৬৮ সালে নতুন প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬৯-৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প দুটির মহাপরিকল্পনা ও বিভিন্ন নকশা প্রণয়ন করেন যা তাঁর স্থাপত্য জীবনের অন্যতম প্রধান উল্লেখযোগ্য কীর্তি বলে বিবেচিত। যদিও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগরের কাজ থেকে তাঁকে অজ্ঞাত কারণে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া যৌথভাবে স্থপতি আলমগীর ও ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পের আবাসিক ভবনের নকশাও স্থপতি ইসলাম প্রণয়ন করেন যা বাংলাদেশ আমলে বাস্তবায়ন হয়।
এখন ভাবলে অবাক লাগে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যে স্থপতি এত ব্যস্তভাবে কাজ করে গেছেন, এ সময় তাঁর হাতে কোনো কাজ নেই। প্রশ্ন জাগে, এর কারণ কী? তৃতীয় বিশ্বের সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবীরা বাস্তব জীবনে একটু সফল হলেই তাঁরা এই অভাগা দেশের অবহেলিত জনগণের মৌলিক চাহিদার দাবিতে খুব সংগত কারণেই বিবেকের তাড়নায় সোচ্চার হন, যা আবার শাসকগোষ্ঠীর পছন্দ নয় এবং এই শাসকগোষ্ঠী আবার জনগণের পছন্দ নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই জনগণ-সমর্থিত শিল্পী-স্থপতিরা সরকারের কাজ পান না এবং এভাবে তাঁরা নিজেদের পেশাচর্চার ক্ষতি করেন। অন্যান্য উন্নত দেশে এ ধরনের স্থপতিদের কোনো দৈনিক দায়বদ্ধতা থাকে না। উপরন্তু তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন জাতীয় বুর্জোয়ারা। তাই তাঁদের কোনো অসুবিধা হয় না। সরকারের পাশাপাশি আরও একটি বেসরকারি জনগণ সমর্থিত ধারা বয়ে যায় যার প্রচলন হওয়া আমাদের দেশে অচিন্তনীয় এবং অসম্ভব, যেহেতু এরাও শাসক সমর্থক, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মাজহারুল ইসলামের মতো স্থপতিরা কর্মহীন থাকেন, যা আমাদেরদেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।
স্থাপত্যকর্ম ছাড়াও স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের উপযুক্ত স্থাপত্য শিক্ষার সঠিক প্রসার ও শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্থাপত্য পরিবেশ নির্মাণে এবং স্থাপত্য পেশার সুষ্ঠু আন্দোলন গঠনে সচেষ্ট হন। স্থাপত্য শিক্ষাকে একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ত করার জন্য স্থপতি ইসলামের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সাহায্যক্রমে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের আমন্ত্রণে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শক্তিশালী দল ঢাকায় উচ্চমানের স্থাপত্য শিক্ষার প্রচলনের সম্ভাবনা যাচাই করতে আসেন। কিন্তু তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬৬ থেকে ’৬৮ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন, একাডেমিক ভবন ও কিছু আবাসিক ভবন নকশা করার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত আমেরিকান আধুনিক স্থপতি, তাঁর শিক্ষক এবং তৎকালীন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদের প্রধান পল রুডলফকে মনোনীত করা হয়। এই ভবনগুলো আমাদের দেশের আধুনিক স্থাপত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের লাথিয়াগলিতে গভর্নর্স কনফারেন্স গৃহীত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় রাজধানী নির্মাণের যে প্রস্তাব আনা হয় তার বাস্তবায়নে ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় পূর্তমন্ত্রী মরহুম ফজলুল কাদেরচৌধুরী ইসলামাবাদে নিয়ে গিয়ে স্থপতি ইসলামকে সরাসরি ওই দ্বিতীয় রাজধানীর পরিকল্পনা ও নকশা করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজে না করে মন্ত্রীকে তিনি কোনো পৃথিবীখ্যাত স্থপতি দ্বারা পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে অনুরোধ জানান। মন্ত্রী সম্মতি প্রকাশ করেন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানের শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি লুই কান দ্বারা সম্পন্ন হয় যা বিংশ শতাব্দীতে নির্মিত স্থাপত্যগুণ-সংবলিত বিশটি শ্রেষ্ঠ ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বলে স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের আধুনিক স্থাপত্যে বিদেশি শ্রেষ্ঠ স্থপতিকৃত সৃষ্টকর্ম বাস্তবায়নে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন এই মনে করে যে তরুণ স্থপতিদের সম্মুখে ভবিষ্যতে এই ভবনগুলোর উন্নত উদাহরণ এবং চিরকালের জন্য তাদেরপ্রেরণা ও সুস্থ স্থাপত্যের মূল উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর এই প্রচেষ্টার পরোক্ষ অবদান আমাদের নবীন স্থপতিদের মধ্যে অপরিসীম। স্থাপত্য সংগঠক হিসেবেও তিনি তার স্থাপত্য ধারণায় শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যখন তদানীন্তন পাকিস্তানি স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন সে সময় ১৯৬৮ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো দেশের সব স্থপতি কর্তৃক একটি সেমিনার খুব সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।দেশে প্রকৌশলী, পরিকল্পক ও স্থপতিদের সুস্থ ও সঠিক পেশাচর্চার দিকনির্দেশনা ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো স্থাপত্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নামে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের জন্যও তিনি বহুদিন ধরে কাজ করেছেন এবং এই প্রস্তাবের গুরুত্ব স্থাপত্য জগতে অপরিসীম বলে বিবেচিত। যদি কোনো দিন কালক্রমে এটির বাস্তবায়ন হয় তবে তা স্থপতি ইসলামের স্বপ্ন ও দূরদৃষ্টির সার্থকতা প্রকাশ করবে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের একমাত্র আন্তুর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি ছাড়াও একজন স্থাপত্য বিচারকও। দেশি-বিদেশি বহু আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার তিনি অন্যতম বিচারক হিসেবেও তাঁর বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়েছেন। ১৯৮০-৮১ সালে সৌদি আরব সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান ভবন এবং আগাখান শীর্ষক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করেন। আমাদের দেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা-নির্বাচনেও তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। স্থপতি ইসলাম শুধু স্থপতি শিক্ষা, পেশা, সংগঠন এবং আন্দোলনে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি নবীন ও উৎসাহী স্থপতি এবং ছাত্রদের নিয়ে সব শিল্পমাধ্যমের সৃষ্টিশীল শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে ‘চেতনা’ নামে একটি পাঠচক্রও গঠন করার মূলে অবদান রেখেছেন। স্থাপত্য শিল্প ক্রমান্তর জটিল ও পরিবর্তনশীল। সামপ্রতিক স্থাপত্য বিশ্বে কী পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং পরিবর্তন ঘটছে; বিষয়, দর্শন ও উপকরণ নিয়ে নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য সম্বন্ধে জানা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে সম্যক ধারণালাভের উদ্দেশ্যেই এই পাঠচক্র। স্থপতি ইসলামের প্রেরণা, উৎসাহ ও নবীন স্থপতিদের অদম্য উদ্দীপনা, কার্যক্ষমতা ইতিমধ্যে সুধীমহলে ‘চেতনার’ কার্যক্রম বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের এই পথিকৃৎ স্থপতিকে যেমন কর্মবিহীন করে রাখা হয়েছে অথবা বলা যায় বর্তমানের অসুস্থ স্থাপত্য পেশা ও স্থপতি নির্বাচনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর অপারগতায় অপরাধী করে রাখা হয়েছে, এদেশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদক বা সামাজিক কোনো সম্মানেও তাঁকে ভূষিত করা হয়নি, কিন্তু যা ভাবতে অবাকই লাগে। দেশের বাইরে সমপ্রতি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের স্থাপত্য চেতনা বিকাশে অপরিসীম অবদান রাখার জন্য ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের পশ্চিমবঙ্গ শাখা কর্তৃক বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সম্মাননাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই সম্মান তাঁকে দেওয়া হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের মূলধারার সঙ্গে দেশজ বা আঞ্চলিক রীতির মেলবন্ধনে, স্থাপত্যশিল্পে উপযোগিতা ব্যবহারিকতার সঙ্গে উপাদানরীতি উপকরণ কৌশলের সার্থক সমন্বয় সাধনে তাঁর নিরলস সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার অপূর্ব অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। এই প্রথমবারের মতো অন্যান্য দেশের পৃথিবীখ্যাত স্থপতিদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো স্থপতি স্থাপত্য জগতের এ রকম একটি দুর্লভ ও আন্তর্জাতিক সম্মানে বিভূষিত হলেন। এই সম্মান স্থপতির জন্য তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মুখও সহস্র গুণ উজ্জ্বল করেছে।
বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ প্রবীণ স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের স্থাপত্য জগতের ইতিহাসে তাঁর নীরব, দৃঢ় ও নান্দনিক ঐতিহ্যময় অবদানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

Wednesday, March 23, 2022

দ্য ড্যান্সিং গার্ল! by শাঈখ আল মাহমুদ বনি

নৃত্যরতা মেয়েটি, বা দ্য ড্যান্সিং গার্ল – আমাদের ভারতবর্ষের পুরাকীর্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন। বইয়ে অনেক পড়েছি এই ভাস্কর্যের কথা, সামনাসামনি এই পাঁচ হাজার বছরের পুরনো নিদর্শন দেখে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।
সিন্ধু সভ্যতার শিল্পসৌকর্যের অনুপম এই নিদর্শনটির বয়স প্রায় পাঁচ হাজার বছর! (২০০০-২৭০০ খ্রিঃপূঃ)। জন ম্যাকে নামে একজন প্রথিতযশা পুরাতাত্ত্বিক ১৯২৬ সালে এই নিদর্শনটি আবিষ্কার করেন মোহেনজোদারো এলাকাতে, প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের পরে পাওয়া এক বাড়ির উনুনের কাছে।
এই ভাস্কর্যটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? একটু সময় নিয়ে তাকাই এই ভাস্কর্যের দিকে, দেখতে পাবো এর চমৎকার বৈশিষ্ট্যগুলো। দুই হাত ভরা বালা পরে সম্পূর্ণ নিরাবরণ একজন নারী খুবই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন কোমরে হাত দিয়ে। এই ভাস্কর্য থেকে সিন্ধু সভ্যতার নারীদের পরিধেয় অলঙ্কার প্রসঙ্গে কিছুটা ধারণা করা যায়। এই যে একহাত ভর্তি চুড়ি, এইরকম কিন্তু এখনো দেখা যায় রাজস্থানে, বাঞ্জারা নামের যাযাবর গোষ্ঠীর নারীদের মাঝে। দাঁড়ানোর ভঙ্গিমার মাঝে যে আত্মবিশ্বাস আছে, এ থেকে সেই সময়ের সামাজিক পরিমণ্ডলে নারীদের উঁচু অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায় কি? এর ইন্টারপ্রিটিশান নিয়ে একেক বিশেষজ্ঞ একেক মন্তব্য করেছেন। ধারণা করে নেয়া হলো, এই ভাস্কর্যের নারীটি পেশায় একজন নৃত্যশিল্পী, তার চারুময় ভঙ্গিমা দেখে এবং এ থেকেই এর নাম হয়ে গেল ড্যান্সিং গার্ল।
প্রত্নতাত্ত্বিক শিরিন রত্নাগর বলছেন,
  • *“তার ঘন দীর্ঘ চুল নান্দনিক ভঙ্গিমায় গুটিয়ে ঘাড়ের কাছে খোঁপার মতো নিবদ্ধ। মূর্তিটি নগ্ন, কিন্তু কামোদ্দীপক নয় বরং অত্যন্ত সারল্যমাখা।“
এই ভাস্কর্যটি সিন্ধু সভ্যতার মানুষজনের কারিগরি দক্ষতা নিয়েও একটি ধারণা দেয়। এটি ব্রোঞ্জে তৈরি। এই ভাস্কর্য থেকেই আমরা প্রথম জানতে পারি যে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীরা মেটাল কাস্টিং সম্পর্কে খুব ভালোমতোই ওয়াবকিবহাল ছিল। এ ভাস্কর্যটি বানানোর জন্যে প্রথমে একটি কাদামাটির নমুনা তৈরি করা হয়েছিল। এরপর সেই নমুনার গায়ে মোমের একটি পাতলা আস্তরণ দিয়ে দেয়া হলো। এরপর তার উপর কাদামাটির আরেকটি স্তর চাপিয়ে দেয়া হলো। এখন কাদামাটির দুইস্তরের মাঝামাঝি মোমের যে পাতলা স্তর আছে, সেখানে গলিত উত্তপ্ত ব্রোঞ্জকে ঢালা হলো। মোম সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে গেল এবং ব্রোঞ্জের একটি চমৎকার পাতলা আস্তরণের অসাধারণ ভাস্কর্য আমরা পেয়ে গেলাম।
প্রত্নতত্ত্ববিদ শিরিন রত্নাগর অবশ্য বলছেন,
*“এই ভাস্কর্যটি আদতে আরো বড় কোন ভাস্কর্যের অংশবিশেষ, যেটা তার হাতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, যেনবা সেখানে কোন খুঁটির মতো কিছু ধরে রাখার জায়গা ছিল।”
এই ভাস্কর্যটি আরো সাক্ষ্য বহন করে যে, সিন্ধু সভ্যতায় নৃত্যকলার কদর ছিল, বিনোদন ছিল তাদের জীবনধারার অংশ।
এর সমসাময়িক আরেকটি নিদর্শন পাওয়া গেছে মোহেনজোদারোতেই। আরেকটি মেয়ের ভাস্কর্য কিন্তু সে যেন এই ড্যান্সিং গার্লের সৌন্দর্যপ্রভার কাছে অনেকটাই ম্লান হয়ে আছে। সেটি এখন আছে পাকিস্তানের করাচির জাদুঘরে। মোহেনজোদারো এখন পড়েছে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে। পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে এই ড্যান্সিং গার্লকে নিয়ে বেশ বিবাদ আছে, পাকিস্তান দাবি করে যে এই ড্যান্সিং গার্ল এর উত্তরাধিকারী তারা। তাকে যেন এই অমূল্য নিদর্শন ফিরিয়ে দেয়া হোক। ২০১৬ সালে এই নিয়ে বেশ কোর্টকাচারিও হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ইতালির কাছে মোনালিসা যেমন, পাকিস্তানের কাছেও এই ড্যান্সিং গার্ল তেমনই।
পাঁচ হাজার বছরে আমাদের কি বিপুল পরিবর্তন! সিন্ধু সভ্যতার খুবই উন্নতমানের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল, পানির বিতরণ নিয়ে তারা রীতিমতো অবসেসড ছিল। জলপ্রকৌশলের আদিমতম কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে সেখানে। অথচ আমরা এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে মিরপুরকে পানির নীচ থেকে তুলতে পারি না। এই নৃত্যরতা রমণী যে নির্ভয়ে যে আত্মবিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সময়ে আমাদের আধুনিক শহরে কি কোন নারী এতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াতে পারে?
দ্যা ডান্সিং গার্ল

Wednesday, November 20, 2019

চোখগুলো বিমর্ষ কেন? by রাসেল মাহ্‌মুদ

‘ডিসটেন্ট স্ক্যাইস–১১’
লাস্ট আপডেট- ১১ মে ২০১৮: চিত্রকর্মগুলোতে দৃশ্যের আড়ালে দৃশ্য, ছবির অন্তরালে লুকানো আছে ভিন্ন গল্প। এখানে যেনবা আছে গোপন কোনো সংকেত। কথাগুলো বললাম মোহাম্মদ ইকবালের সাম্প্রতিক চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে। ‘সাইলেন্ট রিভেলেশন’ বা ‘নীরব বিপ্লব’ শিরোনামে তাঁর প্রদর্শনী দেখতে গ্যালারিতে ঢুকতেই প্রথমে দুটি প্রশ্ন করে মন। এক. ছবিতে এত চোখ কেন? দুই. চোখগুলো বিমর্ষ কেন? মানে দেয়ালের পর দেয়াল শুধু ভয়ার্ত, বিভ্রান্ত, বিস্মিত, বিষাদাক্রান্ত চোখ আর চোখ। কিন্তু কন্যাশিশুর চোখেই কেন বারবার চোখাচোখি হবে আমাদের? এই দৃষ্টি কেন এঁকে রেখেছেন শিল্পী?

শৈশবে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছিলেন ইকবাল। এই মধ্য জীবনেও সেই যুদ্ধ ঘুরেফিরে আসে তাঁর কাছে। আসে পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধের বিভীষিকাগুলোও। ‘যুদ্ধ’ নামের গোলকধাঁধা থেকে এখনো বের হতে পারেনি পৃথিবী। প্রতিদিন সেসব যুদ্ধে নতুন ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা বাড়ছে সিরিয়ায়, ফিলিস্তিনে, কঙ্গোতে বা ইরাকে। ইকবাল তেলরঙে এঁকে রেখেছেন যুদ্ধের সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ কন্যাশিশু এবং তাদের ওই ভয়ার্ত দৃষ্টিগুলো। এই কন্যাশিশুদের জন্য নিজস্ব বেদনার রঙে প্লাবিত হয় শিল্পীর ক্যানভাস! তবে মজা হলো, তাঁর ক্যানভাসের ভেতর থাকে আরেকটি গোপন ক্যানভাস। এটা যেন অনেকটা জাদুকরের বাক্সের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা আরেকটি বাক্স।

চিত্রকলা নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করতে গিয়ে ইকবালের অঙ্কনরীতিতে যুক্ত হয়েছে বৈচিত্র্য। রঙের জমিন হিসেবে এখন তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছে জাপানি কাগজ ওয়াশি, যা এ শিল্পীর ছবিকে করে তুলেছে আরও অভিনব।
জাপানের বয়স্ক নারীরা ক্যালিগ্রাফি করেন। তাঁদের দেখে এ শিল্পে তাঁরও আগ্রহ জন্মেছিল। সেটিও তাঁর ছবিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
গ্যালারিতে গেলেই ইকবালের ছবির সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি করা সম্ভব। সৌন্দর্যের গুণে তাঁর চিত্রকর্ম ক্রমেই নিকটবর্তী করে চিত্ররসিককে। আর যাঁরা নতুন করে পরিচিত হন তাঁর ছবির সঙ্গে, প্রকারান্তরে তাঁরা মিলিত হন এক অস্বস্তিকর সুন্দরের সঙ্গে। যাকে ছেড়ে আসা যায় না, মুখোমুখি দাঁড়ানোও যায় না। কেবলই দূরত্ব রেখে চেয়ে থাকতে হয়।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আঁকা ৫০টি ছবি নিয়ে প্রদর্শনীতে ‘এক্সপ্রেশন’, ‘কনভারসেশন’, ‘পিস ইন দ্য টাইম অব ডিসকুইট’, ‘আননোন ফেস’সহ বেশ কিছু সিরিজ ছবিতে আছে নানা রঙের অভিব্যক্তি, যা প্রভাব ফেলবে অনুভূতিপ্রবণ দর্শকের চোখ থেকে মনে।
‘সিভিলাইজেশন অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ ফর দ্য পিস টু’, শিল্পী: মোহাম্মদ ইকবাল

Tuesday, September 24, 2019

প্রকৃতিকে ভালোবেসেই শিল্পী হয়েছেন তিনি by হৃদয় সম্রাট

কারু তিতাস, একজন শিল্পী, একজন আঁকিয়ে। ৩০ বছর ধরে ক্যানভাসে রঙ দিয়ে সৃষ্টি করছেন প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানালেন কেমন করে বাংলার প্রতিটা ঋতু তাকে প্রভাবিত করেছে। সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা এই বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য সব সময় তাকে প্রলুব্ধ করেছে তুলির আঁচড়ে সেসব দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে।
চিত্রশিল্পী কারু তিতাস
ছবির পথে যাত্রা...
শুরুটা আসলে কীভাবে হয়েছিলো সেটা সঠিকভাবে বলতে পারবো না। আমাদের বাড়িতে সবসময় আঁকাআঁকির পরিবেশ ছিল। মা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আমাদের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। তবু একেবারে ছেলেবেলা থেকে ছবি আঁকা শুরু করিনি। একটি ঘটনার পর থেকে আমার ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল। তখন আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন পৃষ্ঠায় সুন্দর একটি ফুলের ছবি এঁকেছিলাম। তখন আমার মনে হলো যে, আমি কী সুন্দর একটা ফুল তৈরি করে ফেললাম! এরপর থেকেই শুরু হয় আমার নিত্য ছবি আঁকা। সেই থেকেই চলছে তুলির সঙ্গে বসবাস।
ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা...
আমাদের পরিবারটা একটি আগাগোড়া শিল্পী পরিবার। এখানে আমরা পেয়েছি অবাধ স্বাধীনতা, শিল্পী হওয়ার সুযোগ। এই বিষয়কে অনুপ্রেরণা বলবো কিনা, ঠিক বুঝতে পারছি না, কেননা আমার পরিবার কখনও আমাদের ওপরে কোনও কিছু চাপিয়ে দেয়নি। বলেনি যে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। আমরা আমাদের পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়েছি। যেমন আমার ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়াশোনা করার। আমি তাই করেছি। সবাই সাদরে গ্রহণ করেছে। আর একটি কথা না বললেই নয়, আসলে বাংলাদেশের প্রকৃতির বৈচিত্র্যই আমার ছবি আঁকার প্রেরণা। এই প্রকৃতিতে নেশা আছে।
চিত্রশিল্পী কারু তিতাস
ভালোবাসার নাম বাংলাদেশ...
অনুপ্রেরণা বা ভালোবাসার কথা যদি বলতে চাই তবে বলতে হয় বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্যের কথা। আমার মতো চিত্রশিল্পীদের জন্য এই দেশের কোনও বিকল্প হয় না। কেননা প্রতিনিয়ত এই দেশের ঋতু পরিবর্তন হয় যেমনটা অন্য কোনও দেশে হয় না। আর সবচেয়ে ভালো লাগে যে ২০ মাইল অন্তর অন্তর এই দেশের বাতাসের পরিবর্তন ঘটে। আর দেশের প্রকৃতিক পরিবেশতো অসাধারণ, একেকটি জায়গা একটি বিশেষত্ব নিয়ে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের ভাণ্ডার খুলেছে। আর এসব কারণে আমার ঘুরতে ভীষণ ভালো লাগে। তবে ঢাকা ছাড়া যেকোনও স্থানে ঘুরতে যেতে আমি আগ্রহী। যখনই সময় পাই তখনই ঘুরতে বের হয়ে যাই। একবার চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠেছিলাম, ট্রেনটি চলতে চলতে হঠাৎ এক স্টেশনে থেমে যায়। সেখানকার পরিবেশটা এতটাই নীরব আর সুন্দর ছিল যে, আমি ট্রেন থেকে নেমে যাই।
তরুণদের জন্য কিছু কথা...
ছবি আঁকা কাজটি করতে হয় ধৈর্য আর ভালোবাসা নিয়ে। আপনার মাথায় যদি সারাদিনের কর্মব্যস্ত দিকগুলো নিয়ে চিন্তা থাকে তবে আপনি কখনও ভালো ছবি আঁকতে পারবেন না। আর আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এখানে কোনও শর্টকাট ওয়ে নেই। কোনটা ছবি আর কোনটা ছবি না, তা সময়ই একদিন বলে দেবে। ঠিক যেমন একটি কবিতা সব ভেঙেচুরে কবিতা হয়ে ওঠে।
শপিং ব্যাগের উপর এঁকেছেন ছবি
চলছে অবিরাম আঁকাআঁকি
ছবি নিয়ে বাংলাদেশের মতো একটি জায়গায় কাজ করা খুবই কঠিন বিষয়। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আর ছবি তো একটি সময়োপযোগী ব্যাপার। সময় বলে দেবে কী হবে। এই মুহূর্তে শিল্পাঙ্গনে চলছে আমাদের ২৯ জন শিল্পীর বর্ষা বিষয়ক প্রদর্শনী। এখানে আমরা কাজ করেছি বর্ষণমুখর বাংলাকে নিয়ে। আমাদের প্রতিটি ছবিতেই বাংলাদেশের বর্ষাকালের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি ছবির মেঘ, বাতাসের ভাঁজ আর পরিবেশটার দিকে তাকালেই বর্ষার ছোঁয়া পাবেন শিল্পপ্রেমীরা। প্রদর্শনীটি চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
ক্যানভাস তুলি নিয়েই পথচলা...
ছবি ছাড়া আমি আমার দিন শুরু করতে পারি না। আর নির্দিষ্ট করে এক বিষয় ধরে বেশিদিন বসে থাকতে পারি না। যেমন আমি ফুলের ছবি আঁকছি, কিন্তু আমি বেশি দিন ফুল আঁকতে পারি না। আমাকে পরিবর্তন করতে হয় ছবি আঁকার বিষয় বা মাধ্যম। এখন যেমন কাজ করছি বিভিন্ন শপিং ব্যাগের উপর। ইচ্ছা আছে এই বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু কাজ করার। ২০২০ সালে ছবির একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনাও রয়েছে। ছবি নিয়েই জীবন শুরু, ছবি নিয়েই শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে চাই।
শপিং ব্যাগের উপর এঁকেছেন ছবি
>>ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

Wednesday, August 7, 2019

স্মৃতির চালচিত্র by ইব্রাহিম ফাত্তাহ

আমাদের জীবনের এমন কিছু কিছু সময় আছে, এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে যা ভুলে যাওয়ার নয়। শৈশব তেমনই এক অনন্য কাল। এরপর সময়ের সিঁড়ি বেয়ে বয়সের হাত ধরে যৌবন আসে, ভালো লাগা থেকে আসে ভালোবাসা। তারপর ঘরবাঁধা, সংসার, কোল আলো করে সন্তানের আগমন। মানবজীবনের নানা স্তর ধরে মানুষ হেঁটে যায় তার পরিণতির দিকে। নানা সময়ের ভালো লাগা বিষয় নিয়ে গ্যালারির ভেতর একেকটি গল্প বেঁধেছেন তরুণ এক ভাস্কর। বাঁধনহারা শৈশবের উচ্ছলতা, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, কাজ, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা, কখনো একাকিত্ব এসব নিয়ে চলমান জীবনের গল্প নির্মাণ করেছেন ভাস্কর ফারজানা ইসলাম মিল্কী। ‘জীবনের ছন্দ-২’ শিরোনামে তাঁর দ্বিতীয় একক ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে এ-গল্পের নানা চরিত্র ও পরিবেশ তুলে ধরেছেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, কুড়ি বছর আগে এই লা গ্যালারিতেই ফারজানা ইসলামের প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল।

প্রদর্শনী হলজুড়ে সাকল্যে ঊনত্রিশটি ভাস্কর্য স্থান পেয়েছিল। নানা উচ্চতার সাদা রং করা বাক্সের ওপরের জমিনে নানা কায়দায় ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বচ্ছ কাচের ওপর মডেলগুলো রাখায় স্থির জলের আবহ এসেছে। এতে অন্য এক মাত্রা তৈরি হয়েছে।

তরুণ এই ভাস্করের শিল্পীজীবনের সূচনা শৈশবে যশোর চারুপীঠ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ১৯৯৬ সালে। চারুকলার বার্ষিক প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, গ্যালারি টোন ও শিল্পাঙ্গন আয়োজিত প্রদর্শনীতে পুরস্কৃত হয়ে তিনি কলারসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অসংখ্য চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।

ভাস্কর ফারজানার আদর্শ বরেণ্য ভাস্কর নভেরা আহমেদ। নভেরার সৃজনধ্যানের প্রতি তাঁর অনুরাগ শিল্পীজীবনের সূচনা থেকে। চারুপীঠে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন ভাস্কর মাহাবুব জামাল শামিমকে। এরপর ঢাকার চারুকলায় ভর্তি হয়ে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন বরেণ্য ভাস্কর ও শিল্পী আবদুর রাজ্জাক, হামিদুজ্জামান খান, লালা রুখ সেলিম প্রমুখকে। এই কৃতী শিক্ষকদের কাছে শিখে নিজের মানস পুষ্ট হয়েছে তিনি।

ভাস্কর ফারজানা চারপাশের মানুষের বিচিত্র অবয়ব ও দেহকাঠামোর দিকে তাকান, নানা পরিবেশে তাদের কর্মকা-কে প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর শিক্ষক ভাস্কর লালা রুখ সেলিমের বয়ানে –  ‘ফারজানার ভাস্কর্যগুলো গল্প বলে মানুষ ও তার সম্পর্ক নিয়ে। তাঁর সৃজন উপস্থাপনাকে ঠিক নাটকীয় বলা যাবে না, বরং সেগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের অভিব্যক্তি বা গল্পের ভাবব্যঞ্জক বলাই যথার্থ। এসব বিষয়কে আমরা অবলোকন করি ও স্মৃতিতে ধারণ করি।’ এমনই এক সুন্দর মুহূর্ত ফুটে উঠেছে – তাঁর গড়া এক বালিকার চাকা চালানোর গতিশীল অভিব্যক্তিতে, নৃত্যরত শিল্পীদের গতিময় ছন্দে।

নিত্যকার জীবনপ্রবাহের সাধারণ কিছু ঘটনার চুম্বক সময়টাকে ভাস্কর্যে তুলে ধরেন ফারজানা। সৃজনের ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দের পদ্ধতি হচ্ছে মডেলিং। মডেলিংয়ের মাধ্যমে অবয়ব গড়েপিটে অভিব্যক্তি তুলে ধরেন তিনি। বিংশ শতকের আধুনিক ভাস্কর্যের অবয়বিক অভিব্যক্তি এই ভাস্করের খুব পছন্দের। তিনি পস্নাস্টিক বা অ্যালুমিনিয়ামকে গলিয়ে মানুষের নানারকম অবয়ব ও দেহকাঠামো গড়েন। এগুলোর শরীর, মাথা, হাত ও পা এসবের উপস্থাপনার ধরনেই নানারকম অভিব্যক্তি তৈরি হয়। আবার এসব ফিগরকে কেন্দ্র করে ভাস্কর এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যাতে ওই অভিব্যক্তি আরো যথার্থ হয়ে ওঠে।

প্রকৃতির প্রতীক হিসেবে তিনি গাছের অংশবিশেষ দেখান কিংবা মানুষ-নির্মিত বাড়ির কাঠামো, বেঞ্চ ও চেয়ারে তাঁর সৃজিত এক বা একাধিক মডেল স্থাপন করেন। যেমন প্রাচীন এক বাড়ির কাঠামোর সামনে এক নারীরূপী মডেলকে স্থাপন করে এই কাজটির শিরোনাম দিয়েছেন ‘অপেক্ষা’। আরাধ্য ও প্রবল আকাঙিক্ষতের জন্য এই অপেক্ষা। এ নিয়ে সাহিত্য ও সংগীতে অনেক কালজয়ী রচনা ও সংগীত আছে। এই নামে তাঁর আরেকটি ভাস্কর্যে আমরা দেখি এক বৃক্ষকাঠামোর সামনে দাঁড়ানো নারীর অবয়ব। তেমনি এক বেঞ্চে নানা অভিব্যক্তির তিনটি ফিগর নিয়ে যে গঠন তৈরি করেছেন ভাস্কর, তার নাম দিয়েছেন ‘আড্ডা’।

‘দম্পতি’ একটি প্রিয় বিষয় ফারজানার। একই শিরোনামে তিনি অনেক ভাস্কর্য গড়েছেন। এ শিরোনামের প্রথম কাজটিতে আমরা দেখি যেন উদ্যানের এক বেঞ্চে বসে থাকা অভিমানী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তার মান ভাঙানোর চেষ্টা করছেন স্বামী। এ নামের দ্বিতীয়টিতে গাছে বাঁধা দোলনায় বসা স্ত্রী। তাকে দোল দিতে স্বামী তার পেছনে দাঁড়ানো। ‘বন্ধু’ শিরোনামে লম্বা দুটি ফিগর গড়েছেন, যেন তারা এক হয়ে পথ চলছেন। ভেলায় চড়ে নদীপথ পাড়ি দিচ্ছেন তিনজন যাত্রী দুজন মাল্লা। এটি দেখে ছান্দসিক কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘দূরপাল্লা’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায়! এমনতর অনেক গল্প এই প্রদর্শনী জুড়ে। ৫ এপ্রিল শুরু হয়ে এ-প্রদর্শনী শেষ হয় গত ১৯ এপ্রিল শুক্রবার।

Saturday, August 3, 2019

৩৭ শ’ কোটি টাকা দিয়ে ‘ভুয়া’ চিত্রকর্ম কিনলেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স?

বিশ্বখ্যাত চিত্রকর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির একটি ‘ভুয়া’ চিত্রকর্মের পেছনে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার বা ৩৭০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স। বৃটেনের মিরর পত্রিকা এক প্রতিবেদনে এমনটা দাবি করেছে। খবরে বলা হয়, ২০১৭ সালের নভেম্বরে ‘দ্য সালভাতর মুন্দি’ শীর্ষক লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ওই কথিত চিত্রকর্ম বিক্রি হয়। তখন বলা হয়েছিল, ওই ইতালিয়ান চিত্রকরের জ্ঞাত ২০টি চিত্রকর্মের মধ্যে এটি একটি। প্রথমে ক্রেতার নাম গোপন থাকলেও পরে জানা যায় যে, এটি কিনেছিলেন প্রিন্স বদর বিন আবদুল্লাহ আল সৌদ। ধারণা করা হচ্ছিল, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষে ওই চিত্রকর্ম ক্রয় করেন স্বল্পপরিচিত প্রিন্স বদর।
এই চিত্রকর্ম নিয়ে একটি বইও লিখেছেন শিল্প ইতিহাসবিদ বেন লুইস। তিনি দাবি করেন, প্রথম দিকে ৩৭ কোটি ডলার দিয়ে ওই চিত্রকর্ম কিনতে চেয়েছিল সৌদ পরিবার। কিন্তু কাতারি রাজপরিবারের কেউ এটি বেশি দামে কিনতে চাইছে এমনটা অনুমান করে সৌদি যুবরাজ দাম বাড়িয়ে ৪০ কোটি ডলারের উন্নীত করেন। পরে জানা যায়, কাতারি রাজপরিবার নয়, বরং চীনা বিলিয়নিয়ার লিউ ইকিয়ানও ওই চিত্রকর্ম কেনার জন্য বেশি দাম হাঁকিয়েছিলেন। অবশেষে ৪৫ কোটি ডলার দিয়ে এটি কেনেন সৌদি যুবরাজ। তখনই এটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি চিত্রকর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০১১ সালে লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে ভিঞ্চির বিভিন্ন চিত্রকর্মের সঙ্গে এটিও প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু তখন থেকেই এই পেইন্টিং-এর মূল্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠা শুরু হয়। এই চিত্রকর্মে অতিরিক্ত ‘পেইন্টিং’ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরুদ্ধার করার অতিরিক্ত চেষ্টা চালানো হয়। ফলে এটি মূল চিত্রকর্মের চেয়ে অনেকাংশেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ কারণে এটি বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই চিত্রকর্ম নিলামে উঠার আগের কয়েক মাস এর উৎস নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দা ভিঞ্চির ‘প্রকৃত’ কোনো শিল্পকর্মে হাত দেওয়ার নেশায় ওই দুই ধনকুবের নেমে পড়েন প্রতিযোগিতায়। কিন্তু অনেক শিল্প ইতিহাসবেত্তা এখনও এই শিল্পকর্ম আদৌ দা ভিঞ্চির কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, এতে এমন কিছু জিনিস আছে যা দা ভিঞ্চির মতো শিল্পির সঙ্গে যায় না।
পরবর্তীতে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স এই শিল্পকর্ম দান করেন আবুধাবির ল্যুভর মিউজিয়ামে। কিন্তু প্রদর্শনের ঠিক ২ সপ্তাহ আগেই তা বাতিল করা হয়। তখনই গুঞ্জন ওঠে যে, এই বাতিল থেকে ইঙ্গিত মিলে যে, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছে এটি ভিঞ্চির নয়, বরং তার কোনো শিষ্যের আঁকা চিত্রকর্ম।
এতেই সব শেষ হয়নি। সম্প্রতি প্যারিসের বিশ্বখ্যাত মূল ল্যুভর মিউজিয়াম গোপনে একমত হয়েছে যে, এই পেইন্টিং-এর উৎস দা ভিঞ্চির ‘কর্মশালা’। অর্থাৎ, সরাসরি দা ভিঞ্চি নয়; হয়তো তারই শিষ্যদের মধ্যে কেউ এটি এঁকে থাকতে পারেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের সবচেয়ে দামি শিল্পকর্মটির দাম মারাত্মকভাবে কমে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফের নিলামে উঠানো হলে এর দাম ১৫ লাখ ডলার বা ১২ কোটি টাকার বেশি উঠবে না!
লুইস সম্প্রতি হে ফেস্টিভালে বলেছেন, ল্যুভরে আমার একাধিক সূত্র বলছেন যে, ল্যুভরের অনেক কিউরেটর বলছেন এটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নিজের আঁকা নয়। তাই ল্যুভরে এটি যদি প্রদর্শিত হয়, তাহলে এটি দা ভিঞ্চির ‘ওয়ার্কশপ’-এর চিত্রকর্ম হিসেবেই প্রদর্শিত হবে। সুতরাং, এই চিত্রকর্মের মালিক এটি প্রদর্শিত হতে দেবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, এতে এর দাম পড়ে যাবে বহুগুণ। অর্থাৎ এত সুন্দর একটি চিত্রকর্ম মানুষ দেখতে পাবে না। এটি যেন সৌদি আরবের সর্বশেষ রাজনৈতিক বন্দীতে পরিণত হয়েছে।

Friday, July 26, 2019

ফরাসি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ছবি নিয়ে ঢাকায় প্রদর্শনী

আলোকচিত্রী শিবলী সিরাজ এ বছরের মার্চে তিন সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সে বেড়িয়েছেন। একটি গাড়ি ভাড়া করে মহাসড়ক ও গ্রামাঞ্চলের পথেঘাটে ঘুরেছেন তিনি। ফ্রান্স জুড়ে এই ভ্রমণে অনেক মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি হয়েছে তার। সেগুলো নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে প্রদর্শনীর। এর শিরোনাম ‘ফ্রান্স, নৈসর্গিক ও অনন্ত: এক আলোকচিত্রীর অভিযাত্রা’।

আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে শিবলী সিরাজের একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হবে আজ ২৬ জুলাই। বিকেল সাড়ে ৫টায় এটি উদ্বোধন করবেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সম্মানিক সভাপতি রামেন্দু মজুমদার।

শিবলী সিরাজ জানান, উত্তরের বেলাভূমি থেকে দক্ষিণে সমুদ্র থেকে পাহাড়ে বিশাল প্রকৃতির ছবি তুলেছেন তিনি। পাহাড়ি ঝরনায় ছুটে চলা নুড়ির চঞ্চলতা ধরা পড়েছে তার ক্যামেরায়। তিনি বিশ্বাস করেন, মানবের অস্তিত্বের গহীনে প্রকৃতির বসবাস অত্যাবশ্যকীয়। এই মন্ত্রই অনুসরণ করেছে তার প্রদর্শনী।
শিবলী সিরাজের ক্যামেরায় ফরাসি নৈসর্গিক সৌন্দর্য
‘ফ্রান্স, নৈসর্গিক ও অনন্ত: এক আলোকচিত্রীর অভিযাত্রা’ শীর্ষক প্রদর্শনী চলবে ৮ আগস্ট পর্যন্ত। সোম থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা। শুক্র ও শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা ও বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা। এই আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত।
শিবলী সিরাজের ক্যামেরায় ফরাসি সৌন্দর্য

Wednesday, March 27, 2019

নীরব মোদির সংগৃহীত চিত্রকর্ম নিলামে

গত সপ্তাহে বৃটেনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতের ডায়মন্ড ব্যবসায়ী, বিলিয়নিয়ার নীরব মোদিকে। তার স্বর্ণালঙ্কার উঠেছে প্রিয়াংকা চোপড়া, নিক জোনাসের মতো তারকাদের হাতেও। দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়ােিতর অভিযোগে তাকে ফেরত চাইছে ভারত। অভিযোগ আছে, নীরব মোদি ২০০ কোটি ডলারের জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত। এরপর তিনি নিরুদ্দেশ ছিলেন। পরে তাকে বৃটেনে দেখা যায়। সেখানেই গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাকে। এই নীরব মোদির দখলে আছে ৬৮টি বিরল আর্ট বা অঙ্কনচিত্র।
এগুলো মুম্বইতে নিলামে উঠার কথা মঙ্গলবার। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এই নিলামের মাধ্যমে তারা ৪৪ লাখ থেকে ৭৩ লাখ ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
নীরব মোদির সংগ্রহে রয়েছে ভারতের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রাজা রবি বর্মা, ভাসুদেও এস গাইতোনদের মতো শিল্পীর আঁকা বিরল সব শিল্পকর্ম। নিলামকারীরা আশা করছেন, ভাসুদেব এস গাইতোনদের আঁকা ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত বিমূর্ত চিত্র হবে এই নিলামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এর মধ্যে ‘আনটাইটেলড’ শিরোনামের একটি চিত্রকর্ম ২০১৫ সালে মুম্বইয়ে ৪৪ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। এর ফলে ওই চিত্রকর্মটি ভারতের সবচেয়ে দামী চিত্রকর্মে পরিণত হয়। এ ছাড়া নিলামকারীরা মনে করছেন রাজা রবি বর্মার একটি চিত্রকর্মের দাম উঠে যেতে পারে ২৫ লাখ ডলার।
উল্লেখ্য, ভারতের রাষ্ট্র পরিচালিত দ্বিতীয় বৃহৎ ব্যাংক পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (পিএনবি) অভিযোগ করেছে যে, ২০০ কোটি ডলার জালিয়াতিচক্রে জড়িতদের অন্যতম নীরব মোদি। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি ২০১৮ সালের শুরুতে ভারত থেকে পালিয়ে যান। তারপর আয়কর বিভাগ তার বেশ কিছু সম্পত্তি জব্দ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল কিছু সম্পত্তি এবং ১৭০টি দামী অঙ্কনশিল্প।
কোনো অন্যায় তিনি করেন নি বলে এর আগে দাবি করেন নীরব মোদি। লন্ডন পুলিশ বলেছে, গত সপ্তাহের মঙ্গলবারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার জামিন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ২৯ শে মার্চ পর্যন্ত তাকে রিমান্ডে দেয়া হয়েছে।
কে এই নীরব মোদি?
ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম নীরব মোদি। ফরবিস ম্যাগাজিনের হিসাবে, তার সম্পদের পরিমাণ ১৭৫ কোটি ডলার। ডায়মন্ড ব্যবসা করে এমন একটি বংশে তার জন্ম। তবে নিজের ব্যবসা শুরু করে সে ২০১০ সালে। খুব দ্রুততার সঙ্গে তার এই ব্যবসার ব্রান্ড বিস্তার লাভ করে। শিগগিরই তিনি ভারতজুড়ে তার দোকান ছড়িয়ে দেন। এমন কি নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও হংকংয়েও তিনি ব্যবসা শুরু করেন। তার ডিজাইনের ডায়মন্ড পরেছেন ‘টাইটানিক’ নায়িকা কেট উইন্সলেট, রোজি হান্টিংটন-হোয়াইটলি ও নাওমি ওয়াটসের মতো নায়িকারা।

Wednesday, July 29, 2015

আমি শতভাগ শিল্পী

শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ
শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ। সত্তরের দশক থেকে সক্রিয় শিল্পচর্চার নানা মাধ্যমে। ৩১ জুলাই কালি-কলমে অাঁকা ৬০টি চিত্রকর্ম নিয়ে শিল্পকলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাঁর চতুর্থ একক প্রদর্শনী। ২০ জুলাই তাঁর জীবন ও শিল্পচর্চা নিয়ে কথা বলেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
শিল্পের সঙ্গে পাঁচ দশক
১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনের শুরু। ১০ বছরের শিক্ষক জীবনে শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে শিখিয়েছেন ড্রয়িং, ড্রাফটিং, ডিজাইন ও পেইন্টিং। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে শিল্পচর্চায় মন দেন। এই সময়ে বিভিন্ন অফিস ও রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জা, নাটকের মঞ্চসজ্জা, বাণিজ্যিক কোম্পানির লোগো ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রোডাক্ট ডিজাইন, বিজ্ঞাপন নির্মাণ ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হন। পাশাপাশি চলতে থাকে শিল্পচর্চা।
শিল্প চর্চার অনুপ্রেরণা
বাবা আবু মোহাম্মদ তৈয়বুল আলমের ছাপাখানা ছিল। আন্দরকিল্লায় কোহিনুর প্রেস নামের সেই ছাপাখানার ওপরেই থাকতেন আহমেদ নেওয়াজেরা। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি মেজো। ছাপাখানার নানা ধরনের ব্লক তৈরি হতে দেখতেন প্রতিদিন। কাঠের ওপর শিসা দিয়ে তৈরি ব্লকগুলো পরবর্তী জীবনে তাঁর শিল্পচর্চার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। স্কুলে পড়ার সময় প্রায় যেতেন আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ এলাকায়। মসজিদের সিঁড়িতে বসত এক মুচি। কাজের অবসরে সেই মুচি কাগজে ছবি আঁকতেন। নেওয়াজের শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা ছিল এই মানুষটিরও।
এ ছাড়া আন্দরকিল্লার পাশের এলাকা রহমতগঞ্জে ছিল নবীন মেলা নামের একটি ক্লাব। সেই ক্লাবের সদস্য হন স্কুলে পড়ার সময়ই। নবীন মেলার উদ্যোগে বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করার পাশাপাশি নাটকের মঞ্চসজ্জাও করেন।
যখন চারুকলার শিক্ষার্থী
১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজের যাত্রা শুরু হলে পরিবারের অমতে আহমেদ নেওয়াজ সেখানে ভর্তি হন। চারুকলার শিক্ষার্থী থাকার সময়ই সুব্রত বড়ুয়া, সাজিদুল আলম, মমতাজুল হক ও তপন চৌধুরীর সঙ্গে মিলে গঠন করেন ব্যান্ডদল সোলস। এ ছাড়া থিয়েটার ৭৩ নামের নাটকের দলের সঙ্গেও যুক্ত হন। অধুনালুপ্ত এই নাট্যদলটির একাংশ ভেঙে অরিন্দম নাট্যসম্প্রদায় গঠিত হয়েছিল। পরে অরিন্দমের হয়ে বেশ কিছু নাটকের মঞ্চসজ্জা করে খ্যাতি অর্জন করেন।
শিল্পের বিষয়-আশয়
ড্রয়িং, পেইন্টিং, ডিজাইন, ছাপচিত্রসহ নানা মাধ্যমে কাজ করেন নেওয়াজ। নেওয়াজের ভাষায় প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম অনুপ্রেরণা। যে কাজই করেন তা গুরুত্ব দিয়ে করার চেষ্টা করেন তিনি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে নিজেকে শতভাগ শিল্পীই মনে করেন।
সাক্ষাৎকার: আহমেদ মুনির

Tuesday, June 23, 2015

আসলেই অভিনব, অনুকরণীয়! by কাজী আরিফ আহমেদ

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় কর্নাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরুর প্রধান সড়কে কোত্থেকে একটা কুমির চলে এলো। ওই সড়কে চলাচলকারী যানবাহনে থাকা আরোহী এবং পথচারীদের চক্ষু চড়কগাছ। তারা ভেবে পাচ্ছেন না কিভাবে নদীর কুমির চলে এলো রাস্তায়। আশপাশে কোন নদীও তো নেই! সড়কের একটি বড় গর্তের পানিতে নিশ্চল রয়েছে কুমিরটি। জীবন্ত মনে হওয়া এ কুমিরটি আসলে এক দক্ষ শিল্পীর শিল্পকর্ম। স্থানীয় এক শিল্পী বাদল নাঞ্জুনদাস্বামী এটি তৈরি করেছেন। প্রধান সড়কে তৈরি হওয়া বিশাল গর্তের প্রতিবাদ জানাতেই তিনি শিল্পের আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর সে প্রতিবাদে তৎক্ষণাৎ কাজও হয়েছে। গর্তটি সারিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। শহরের উত্তরের একটি প্রধান সড়কে বহুদিন আগে বিশাল ওই গর্ত সৃষ্টি হলেও, কর্তৃপক্ষের কোন ভ্রƒক্ষেপ নেই। ওই শিল্পী পানিভর্তি ওই গর্তে কৃত্রিম কুমিরটিকে রেখে রঙের বিচিত্র খেলায় তার চারপাশে পুকুরের মতো একটা আবহ সৃষ্টি করেছেন। শিল্পী বাদল বলছিলেন, প্রত্যেকের নিজের মতো করে প্রকাশের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। এটাই আমার দুঃখ-দুর্দশা প্রকাশের মাধ্যম। যানবাহনে চড়ে বা আশপাশ দিয়ে যারা হেঁটে যাচ্ছিলেন, তারা ছবি তুলছিলেন বা ভিডিও করছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ আলোড়ন তুলেছে ছবি ও ভিডিওগুলো। এদিকে আজই ওই গর্ত ঢেকে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ প্রতিবাদ সত্যিই অভিনব, অনুকরণীয়।

Sunday, June 21, 2015

ফাতেমা রিয়াজের ছন্দময় প্রকৃতি by মুজিবুল হক

গাছের ডালপালা ও শিকড় দিয়ে ফাতেমা তৈরি করেন শিল্পকর্ম
মরা গাছের শিকড় বা শুকিয়ে যাওয়া কাণ্ডের মধ্যে মানুষ, সাপ বা পাখির অবয়ব দেখে চমকে উঠতে হয়। দেখার চোখ থাকলে কত কিছুই না ধরা পড়ে! ‘নেচার অব হারমনি’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে শৌখিন শিল্পী ফাতেমা রিয়াজ প্রকৃতির এসব অনুষঙ্গ হাজির করেছেন দর্শকদের সামনে। ১৪ জুন তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী শেষ হয় নগরের সার্সন রোডের হাটখোলা গ্যালারিতে। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক অলক রায়, অতিথি ছিলেন বাঁশিবাদক ওস্তাদ আজিজুর ইসলাম, আলোকচিত্র শিল্পী শোয়েব ফারুকী, মউদুদুল ইসলাম ও হাটখোলার পরিচালক ইউসুফ মুহাম্মদ। ইতালির রেনেসাঁ যুগের ভাস্কর মিকেলেঞ্জেলো এন্টোনিওনি বলেছিলেন, এক খণ্ড পাথরের ভেতরে ভাস্কর্য আগে থেকেই থাকে। শিল্পীর কাজ হলো সেটা দক্ষতার সঙ্গে বের করে আনা। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ফাতেমা মরা গাছের গুঁড়ি বা শেকড়ে যে অবয়ব ছিল তা দক্ষতার সঙ্গেই বের করে আনতে পেরেছেন। প্রদর্শনীতে মানুষ ও বিভিন্ন জীবজন্তুর অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী তাঁর ৩৫টি উপস্থাপনায়। ব্যবহার করেছেন বাঁশ, কাঠের টুকরো ও গাছের শেকড়।
প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ‘ড্যান্সিং বার্ড’ শিরোনামের একটি শিল্পকর্ম। এখানে দেখা যায় একটি পাখি খানিকটা গলা উঁচু করে নৃত্যরত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে গাছের ওপরে। গাছের শেকড়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দেখলে মনে পড়ে খালের ধারে গাছের ওপর বসে থাকা শিকারি বকের কথা।
তবে শিল্পের উপকরণ হিসেবে বৃক্ষ বা পাথরের ব্যবহার নতুন নয়। মৌলিকত্ব না থাকলেও ফাতেমার কাজ নিছকই ‘শো-পিস’ নয়। প্রকৃতিকে গভীরভাবে অনুধাবনের চেষ্টা আছে তাঁর মধ্যে। আছে আখ্যান আর নাটকীয়তা।
কী করে এমন ভিন্নধারার কাজ করার ইচ্ছে তৈরি হলো, জানতে চাইলে শিল্পী ফাতেমা রিয়াজ বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে পাহাড়, ঝরনা, জঙ্গল ও সাগরের ভেসে আসা গাছের গুঁড়ি ও শিকড় সংগ্রহ করেছি। এরপর সেসবের নিজস্বতা অক্ষুণ্ন রেখে শৈল্পিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’

Sunday, May 17, 2015

নগ্ন না হলে ফেল!

নগ্ন চিত্র আঁকছেন একজন শিল্পী।
ছবি: নিউজ ডট কমের সৌজন্যে
ফাইনাল পরীক্ষায় শিক্ষকের সামনে নগ্ন হতেই হবে; নইলে নির্ঘাত ফেল। আঁতকে ওঠার মতো খবর বটে! কিন্তু গত ১১ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়াগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় এই রেওয়াজ চালু রয়েছে। সেখানকার ভিজ্যুয়াল আর্টস বিষয়ের সমাপনী পরীক্ষায় বাধ্যতামূলকভাবেই নগ্ন হতে হয় সবাইকে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নগ্ন হন শিক্ষকও। তারপর শুরু হয় শরীরের নানা ভঙ্গির শিল্পসম্মত চিত্র আঁকার কাজ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ক্লাসের পাঠ নিচ্ছেন অধ্যাপক রিকার্ডো ডমিনগুয়েজ।
দ্য গার্ডিয়ান ও ডেইলি মেইলে প্রকাশিত প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই পরীক্ষায় শুধু নগ্ন হলেই হয় না। আধো আঁধারি ঘরে শিক্ষার্থীদের নগ্ন হয়ে ‘উত্তেজক’ অঙ্গভঙ্গি করতে হয়।
১১ বছর ধরে ভিজ্যুয়াল আর্টস বিষয়ের সমাপনী পরীক্ষায় নগ্নতার এই নিয়ম চলে এলেও হঠাৎ করেই আপত্তি জানিয়েছেন ওই ক্লাসেরই এক ছাত্রীর মা। কেজি টিভিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই ছাত্রীর মা জানান, ‘ক্লাসে পাস করতে হলে নগ্ন হতেই হবে, এটা একটা বিকৃত রুচির ব্যাপার। বিরক্তিকরও বটে। তা ছাড়া আমি তো আমার মেয়েকে নগ্ন হওয়ার জন্য ক্লাসে পাঠাই না। একটা আধো আঁধারি কক্ষে সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষকও নগ্ন হয়ে থাকবেন, ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন গা গুলিয়ে আসছে।’
নগ্ন চিত্র আঁকছেন একজন শিল্পী। ছবি: নিউজ ডট কমের সৌজন্যে।
তবে অধ্যাপক রিকার্ডো ডমিনগুয়েজ এই সিলেবাসকে কোনোভাবেই পরিবর্তন করতে নারাজ। কেজি টিভিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করতে হলে ছাত্রছাত্রীদের নগ্ন হতেই হবে। তিনি বলেন, ‘গত ১১ বছর ধরে এই সিলেবাস চলছে। এত দিন কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। তা ছাড়া শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা ওয়াকিবহাল থাকে যে, তাঁদের ক্লাস সমাপনী পরীক্ষায় নগ্ন হতেই হবে। তাঁরা শুরু থেকে নিজেদের সেভাবেই তৈরি করতে থাকে। শিল্পের জন্য নগ্ন হওয়াতে খারাপ কিছু নেই। তা ছাড়া এখানে কেউ একা নগ্ন হয় না। একটা মোম জ্বালানো ঘরে সবাই এক সঙ্গে নগ্ন হয়। তাই এখানে যৌনতারও কিছু নেই।’
সান ডিয়াগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় ভিজ্যুয়াল আর্টস বিভাগের শিক্ষক রিকার্ডো ডমিনগুয়েজ। ছবি: ডেইলি মেইলের সৌজন্যে।
ডমিনগুয়েজ আরও বলেন, কারও এই নগ্ন হওয়াতে আপত্তি থাকলে ভিজ্যুয়াল আর্টস বিষয়টি তাঁরা না নিয়ে অন্য কোনো বিষয় নিয়েই পড়লে পারেন। কারণ, ক্লাসের একেবারে শেষে শরীরের বিভিন্ন ধরনের গঠনের ছবি আঁকা হয়, যার জন্য ক্লাসে নগ্ন হতেই হবে।
তবে এ ব্যাপারে ভিজ্যুয়াল আর্টস বিভাগের চেয়ারম্যান জর্ডান ক্র্যানডাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি ডমিনগুয়েজকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শরীরের সব কাপড় খুলে নগ্ন হওয়াটা এই ক্লাসে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। নগ্নতার পাঠের নানা পদ্ধতি আছে। সেসব ভাবলেই হয়।

Wednesday, April 15, 2015

তিন আঁচড়েই তার ছবি বিক্রি ১০ লাখ রুপিতে, ছবি বিক্রির অঙ্ক নিয়ে বিব্রত মমতা

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গর্ব করে বলতে পারেন, তিনটে আঁচড় দেব, ১০ লাখ রুপিতে বিক্রি হবে (ছবি)। কলকাতা পুরসভার নির্বাচনী প্রচারে তার ছবি বিক্রি নিয়ে ঘন ঘন বলতে হচ্ছে। কখনও ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে, কখনো আত্মরক্ষার তাগিদে। তিনি নিজেই বলেছেন, তার বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। প্রায় ৫৪ টি বই লিখে তিনি বছরে রয়্যালটি পান বেশ কয়েক লক্ষ রুপি। আর ছবি এঁকে তিনি কত পান তা নিয়েই  শুরু হয়েছে যত গোলমাল। অনেকদিন ধরেই তার ছবি বিক্রি নিয়ে নানা অঙ্ক শোনা গিয়েছে। সারদা কর্তা থেকে শিল্পপতিদের মোটা অঙ্কে মমতার ছবি কেনা নিয়ে সমালোচনার ঝড়ও উঠেছে বারে বারে। কিন্তু এতদিন মমতা সে সবে পাত্তা না দিলেও এবার তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন তার ছবি বিক্রির নানা অঙ্ক প্রচারিত হওয়ার ফলে। একসময় শোনা গিয়েছিল দু কোটি রুপিতেও নাকি তার ছবি বিক্রি হযেছে। তবে এটা যে অপপ্রচার সেটা জানিয়ে কলকাতায় সম্প্রতি এক জনসভায় মমতা নিজেই বলেন যে, তার ছবি বিক্রি হযেছে ১০ লক্ষ রুপিতে। এই ভাবেই আয় হয়েছে ২ কোটি রুপি। তবে মমতা নিজেকে কখনোই পেশাদার শিল্পী বলে মনে করেন না। তিনি শিল্প র্চ্চার কোন পাঠও নেন নি। তবে শিল্প শুভাপ্রসন্ন তাকে ছবি আঁকার কিছু টিপস দিয়েছেন। আর তিনিই সার্টিফিকেট দিয়েছেন যে মমতা একজন বড় দরের শিল্পী। তার পর থেকে মমতা কত যে ছবি ্ঁকেছেন তার সঠিক হিসেবে মমতা নিজেও জানেন না। অনেককেই বিলিয়েও দিয়েছে তার আঁকা ছবি। তবে তার ছবি বিক্রি থেকে সাড়ে ছয় কোটি রুপি আয়ের কথা দলের আয়ব্যায়ের হিসেবে দেখানোতেই গোল বেঁধেছে। বিক্রির অঙ্কের ধাঁধায় পড়ে মমতা কখনো বলছেন দু কোটি রুপি আয় হয়েছে তার ছবি বিক্রি থেকে। আর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে মত পাল্টে বলেছেন, তার ৩০০ ছবি বিক্রি হয়েছে নয় কোটি রুপিতে। ৬০০ ছবি বিলিয়েও দিযেছেন বলে জনসভায় জানিয়েছেন। তবে ছবি বিক্রির তিন রকম হিসেব নিয়েই রাজণীতি গরম হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা আক্রমন শানাচ্ছেন তার সততা নিয়ে। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গেও সভাপতি তো বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাবার কথাও সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন। তৃণমূল নেত্রীর আঁকা ছবির দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম-সহ বিরোধী দলগুলির নেতারা। পুরভোটের মুখে সে কথা মাথায় রেখেই এ দিন মমতা বলেছেন, ওরা বাজার জানে না। এক একটা ছবি ১৫ কোটি রুপিতে বিক্রি হতে পারে! তার পরেই বিরোধী এবং সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আমার ছবি হাজার, কোটি রুপিতে বিক্রি করব! তোমার কী? তোমার পিতা, পিতামহ, তোমার বউয়ের কী? তবে বিরোধীদের বক্তব্য, নিজের আঁকা ছবি বিক্রির টাকা নিয়ে আজ এক রকম, কাল এক রকম কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী প্রমাণ করছেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে চাপে আছেন। বিশেষ করে পুরভোটের আগে নাগরিক সমাজের সামনে এই প্রসঙ্গটি দলের সমস্যা বাড়াতে পারে। সেই বিড়ম্বনা এড়াতেই তৃণমূল নেত্রীকে মুখ খুলতে হচ্ছে। সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী অবশ্য এক আঁচড় দিয়ে তোলাবাজি হিসেবে অভিহিত করেছেন। আর কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর ছবি বিক্রি থেকে আয়ের অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে! শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, চিট ফান্ড থেকে তৃণমূল কয়েক হাজার কোটি টাকা পেয়েছে এবং তার পুরোটাই মুখ্যমন্ত্রী নিজের ছবি বিক্রির আয় বলে চালাচ্ছেন। বিজেপি বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্যও বলেন, তৃণমূল নেত্রীর ছবির দামের ওঠা-পড়া ভারতীয় শেয়ার বাজারের হর্ষদ মেটার যুগকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছে।

Friday, February 13, 2015

রঙের আঁচড়ে পথপ্রান্তরে বর্ণালি উচ্ছ্বাস by মানসুরা হোসাইন

ই সহযোগীর সঙ্গে শিল্পী রুহুল আমিন কাজল (মাঝখানে)
ছবি আঁকছেন শিল্পী রুহুল আমিন কাজল
শিল্পী রুহুল আমিন কাজলের করা ট্রাফিক আর্টের ছবি
ফিতার মতো চলে যাওয়া কোনো একফালি রাস্তা কিংবা কোনো উদোম চত্বর পেলে আর কি চাই তাঁর? মনের সুখে সেখানে আঁকতে বসে যান। এটাই তাঁর ছবি আঁকার ক্যানভাস। খেলার মাঠ বা কোনো বিদ্যালয়ের সামনের প্রাঙ্গণেও ছবি আঁকেন তিনি। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ নানা রঙের বাহারে বর্ণিল হয়ে ওঠে বিভিন্ন ছবি। আকাশ, নদী, মানুষ, ফুল, পাখি—কত কিছুই না আঁকেন তিনি। তাঁর তুলির আঁচড়ে নিষ্প্রাণ পথ আর চত্বরে ফোটে জীবনের গান।  এই মানুষটি হলেন রুহুল আমিন কাজল। বাংলাদেশ ছাড়াও এ পর্যন্ত ভারত, আরব আমিরাত, ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, মেক্সিকো, চেক প্রজাতন্ত্রসহ মোট ১৩টি দেশে ছবি এঁকেছেন। তিনি বলেন, এ শিল্পের নাম হচ্ছে ‘ট্রাফিক আর্ট’। বাংলা করেছেন—‘চলার পথে কলার কথা’।
সুইডেনে ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কাজও করেছেন সড়কচিত্রের শিল্পী রুহুল আমিন। এ কাজের পাশাপাশি পাথর খোদাই করা ভাস্কর্য, কাঠের ভাস্কর্য তৈরি, ম্যুরাল তৈরি এবং ছবি আঁকার কাজও চলছে। ট্রাফিক আর্টে এ শিল্পীকে প্রায় বেশির ভাগ সময় সহযোগিতা দেন প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশি উত্তম কর্মকার ও কলম্বিয়ার রুবেন মার্তিনেজ।
১৯৮৬ সাল থেকে সুইডেনপ্রবাসী রুহুল আমিন এখন বাংলাদেশে। কাল শনিবার রাজধানীর শাহবাগে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনের রাস্তায় ছবি আঁকবেন। প্রথমে রাস্তায় সাদা রং করা হবে। সেখানে উড়বে নারীর শাড়ির আঁচল। শাড়ির পাড়ও থাকবে। তারপর কালোসহ বিভিন্ন রং দিয়ে আঁকা হবে নানা বিষয়। এখানে নারীর অবয়বকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেদিন শাহবাগে সবাই আসবেন বিশ্বব্যাপী আন্দোলন ‘উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’ প্রচারণায় অংশ নিতে। ‘উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ আয়োজন। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই বিকেল তিনটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত চলবে নানান আয়োজন।
এ আন্দোলনে পুরুষের সম্পৃক্তকরণের অংশ হিসেবেই রুহুল আমিন ও তাঁর সঙ্গের সহযোদ্ধারা রাস্তায় ছবি আঁকবেন। ১৯৮৬ সালে ডেনমার্কে পাড়ি জমানোর আগে রুহুল আমিন বাংলাদেশে পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতিচ্ছবি নিয়ে ‘সোসাইটি’ নামে একটি ছবির প্রদর্শনী করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কথা হয় রুহুল আমিনের সঙ্গে। তিনি এ কে এ রা কাজল নামেও পরিচিত। তাঁর দাদার বাড়ি গফরগাঁও। ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় নানিবাড়িতে জন্ম তাঁর। সত্তরের দশকে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে সিরামিকে পড়াশোনা করেন তিনি। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস থেকে ড্রয়িং এবং পেইন্টিং বিষয়ে পড়াশোনা। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে চার মাসের গ্রাফিক প্রিন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ডেনমার্কের নাগরিক লিস রাসমুসেনকে বিয়ে করেন রুহুল আমিন। তারপর পাড়ি জমান ডেনমার্কে।
রুহুল আমিন বলেন, ‘এখন অনেকেই পাবলিক আর্টের সড়কচিত্রের মাধ্যমটি ব্যবহার করছেন। তবে বাংলাদেশি হিসেবে আমি যখন কাজটি শুরু করি, তখন সম্ভবত আর কেউ তা করেননি। এখন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সহজেই এ কাজের জন্য অনুমতি মেলে। বিভিন্ন সংগঠন কমিশনের বিনিময়ে কাজের অর্ডার দিচ্ছে। চারটা বড় কাজ করতে পারলে সারা বছরে আয় রোজগারের জন্য আর সেভাবে চিন্তা না করলেও চলে।’
কোনো জায়গার চিত্রকলা নষ্ট হয়ে গেলে, শিশুদের খেলার জায়গাকে আকর্ষণীয় করার জন্য, বড় কোনো উৎসব সামনে রেখে বা বিভিন্ন কারণেই ট্রাফিক আর্টের জন্য অনুরোধ পান রুহুল আমিন। তিনি বলেন, এ শিল্পকে রংধনু শিল্প বলা হয়। একদিকে যেমন প্রচুর রং ব্যবহার করা হয়, অন্যদিকে এ আর্টের স্থায়িত্ব কত দিন হবে, তা কেউ বলতে পারে না। দামি রং ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করতে হয়। ফলে খরচাপাতিও অনেক। যেসব সংগঠন অর্ডার দেয়, সেসব প্রতিষ্ঠানকে বাজেট জানিয়ে দেন রুহুল আমিন। রুহুল আমিন নিজের চিন্তাভাবনা থেকে স্বাধীনভাবে একটি থিমের বর্ডার আঁকেন। তারপর সেখানে শিশুসহ নানান বয়সী মানুষ রং দিয়ে সাজাতে থাকেন। তবে পুরো কাজটির নিয়ন্ত্রণ করতে হয় রুহুল আমিনকেই। তিনি বলেন, এ কাজে শিশুদের মধ্যে উৎসাহ বেশি। তারা নির্দিষ্ট জায়গায় আঁকতে পছন্দ করে না। ফলে তদারকি বেশি করতে হয়। তবে এ কাজটাকে তারা খুব উপভোগ করে। ফলে বেশ কয়েক বছর পরে দেখা হলেও তারা সেই অভিজ্ঞতার কথা জানায়। তত দিনে তারা অনেক বড় হয়ে গেছে।
ট্রাফিক আর্টের সুবিধা বর্ণনা করে রুহুল আমিন বলেন, ছবি আঁকার ক্যানভাসটা বিশাল। বদ্ধ জায়গায় কাজ করতে হয় না। বড় লাঠির মাথায় ব্রাশ লাগিয়ে স্বাধীনভাবে আঁকা যায়। চারপাশের অভিজ্ঞতায় গাছ, লতাপাতা, ফুল, পাখি, ময়ূর—কীই না থাকে সেখানে। এ ধরনের দৃশ্য দেখে মন প্রফুল্ল হয়। এক নারী বলেছেন, অফিসে বসে তিনি যখন নিচের দিকে তাকিয়ে রাস্তার দৃশ্য দেখেন, তখন তাঁর মন ভালো হয়ে যায়। এ চিত্রের মূল উদ্দেশ্যই সেখানে। ফলে এ ধরনের চিত্র শিল্প জগতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
রুহুল আমিন জানান, ২০০৮ সালে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জার্মানির বনে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রাঙ্গণে ট্রাফিক আর্টে প্রাধান্য পায় জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষ, পানি ইত্যাদি। অনেক জায়গায় এ শিল্পী ‘ড্যান্সিং পারফরম্যান্স’-এরও আয়োজন করেন। এটি হচ্ছে সড়কে একটি চিত্র থাকে। মানুষের শরীরেও তা আঁকা থাকে। মানুষগুলো নড়াচড়া করলে ছবিকে জীবন্ত মনে হয়।
রুহুল আমিনের স্ত্রী ১৯৭২ সাল থেকে নানাভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ দেশে এসেছিলেন যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে। তারপর ডেনমার্কের সহায়তায় বাংলাদেশি এনজিও পরিচালনাসহ নানাভাবে বাংলাদেশে নিয়মিত যাতায়াত। ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও অফিসের সভার ফাঁকে বা অন্য সময় যে আঁকিবুকি করেন, তা যথেষ্ট ভালো হয় বলেই মনে করেন রুহুল আমিন। ফলে স্ত্রীকে এসব নষ্ট না করে সংরক্ষণ করতে বলেছেন। এ ছাড়া যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে কাজের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বই বের করারও ইচ্ছা আছে। এই দম্পতির কোনো সন্তান নেই। রুহুল আমিনের বাবা আফাজ উদ্দিন ছিলেন টেলিগ্রাফ অফিসের প্রধান সুপারিনটেনডেন্ট। মা ছামিরুন নেছা। তাঁরা মারা গেছেন। তাঁরা ১৩ জন ভাইবোন।
নতুন কিছু করার চিন্তা সব সময়ই মাথায় ঘুরপাক খায় রুহুল আমিনের। গতানুগতিকতার বাইরের কাজ করাই তাঁর নেশা। তাই ৪০ ফুট কনটেইনারে করে বিমান ভাড়া দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বাঁশ নিয়ে যান ডেনমার্কে। সেখানে সেই বাঁশ দিয়ে নানান কাজ করেন। গত বছরের মার্চে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে ‘কনসপির‌্যাচুয়াল’ শিরোনামে ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এ প্রদর্শনীর মূল প্রতিপাদ্য ছিল বর্তমানের অত্যাধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার। এতে দেখানো হয়েছে, মানুষের সবার মাথা একই রকম, তা দেখতে রোবটের মতো।