Friday, January 31, 2025

ট্রাম্পের গাজা ‘সাফ’ করার মতলব সফল হবে না

প্রায় আট বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর  জামাতা জ্যারেড কুশনার তথাকথিত ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ (ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি) উন্মোচন করেছিলেন। ফিলিস্তিনিরা যথার্থভাবেই এটিকে ‘শতাব্দীর সেরা ডাকাতি’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। কথিত শান্তি প্রস্তাবটির মূল উদ্দেশ্য ছিল, পশ্চিম তীরে অবৈধভাবে গেড়ে বসা ইহুদিদের বসতিগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা।

চার বছর পর দেখা গেল, আসলে ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ ছিল কুশনারের নতুন তহবিলের জন্য সৌদি আরব থেকে পাওয়া দুই শ কোটি ডলারের বিনিয়োগ।

এখন ট্রাম্প গাজার ফিলিস্তিনিদের অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। তিনি আরব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন জায়গায় বাড়ি তৈরি করে, যেখানে তারা শান্তিতে বসবাস করতে পারে। ট্রাম্প প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করতে চাইছেন। এই সংখ্যা ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় ভিটেছাড়া হওয়া এবং এখন গাজায় বসবাসকারী শরণার্থীদের সংখ্যার কাছাকাছি।

আমি ট্রাম্পের ‘শান্তিতে বসবাসের’ ধারণার সঙ্গে একমত। তবে তাঁর প্রস্তাবকে একটু পরিবর্তন করা দরকার। ১৫ লাখ ফিলিস্তিনিকে অন্য কোথাও পাঠানোর বদলে ১৬ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের আসল বাড়িতে, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে তাঁদের জোরপূর্বক যেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেখানে ফেরত পাঠানো হোক। মিসর বা জর্ডানে নয়, বরং এখন যে জায়গাটিকে ইসরায়েল বলা হয়, সে জায়গাটিই তাদের আদি বাড়ি এবং সেখানেই তাদের ফিরে যেতে দেওয়া উচিত।

ট্রাম্প এখন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু আসলে তাঁর কথা বলা উচিত নেতানিয়াহুর সঙ্গে। গাজার পূর্ব-পশ্চিম দিকে তাকানোর বদলে তাঁকে দখলদার ইসরায়েলের দিকেই নজর দিতে হবে এবং নেতানিয়াহুকে বাধ্য করতে হবে, যাতে তিনি ফিলিস্তিনিদের তাদের আসল গ্রাম ও শহরে ফিরতে দেন (যেমনটি জাতিসংঘের প্রস্তাব ১৯৪-এ বলা হয়েছে)।

তথাকথিত ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ এবং এখনকার ‘গাজা পুরোপুরি সাফ করে ফেলা’র মতো প্রস্তাব আসলে একই ধারার। এটি আদতেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি গভীরভাবে বর্ণবাদী জায়নবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রকৃত অর্থে ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির সেই বর্ণবাদী নীতিরই পুনরাবৃত্তি, যার মূল লক্ষ্য হলো ‘নদী থেকে সাগর পর্যন্ত’ (পূর্ব দিকের জর্ডান নদী থেকে পশ্চিমের ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড—যার মধ্যে এখনকার ইসরায়েল, পশ্চিম তীর এবং গাজা অন্তর্ভুক্ত) একটি ইহুদি জাতিবাদী রাষ্ট্র কায়েম করা। এটি ন্যায়বিচারের এমন এক ভয়ংকর বিপরীত রূপ, যেখানে নির্যাতিতরা আরও বেশি শাস্তি পায় আর দখলদার আরও শক্তিশালী ও পুরস্কৃত হয়।

ট্রাম্পের এই বর্ণবাদী প্রস্তাবের সবচেয়ে স্পষ্ট ও তীব্র জবাব এসেছে সেই লাখো ফিলিস্তিনির কাছ থেকে যারা প্রচণ্ড কষ্ট করে ঠান্ডার মধ্যে উত্তর গাজায় নিজেদের ঘরে ফেরা শুরু করেছে। ইসরায়েল তাদের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পরও তারা ফিরে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাদের এই দৃঢ় মনোবল ও সংকল্প দেখিয়ে দিচ্ছে, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার যেকোনো ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে তারা জীবন দিতে রাজি আছেন।

এই অবিচল প্রতিজ্ঞা প্রমাণ করে, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের মাতৃভূমির সম্পর্ক ভাঙার নয়। যতই ধ্বংস আর দুঃখ-দুর্দশা আসুক, তারা তাদের ভূমির প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছে। তাদের জন্য বাড়িঘর শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়। এটি তাদের পরিচয়, ইতিহাস ও ভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রতীক।

ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রস্তাব আসলে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বর্ণবাদী নীতিরই ধারাবাহিকতা। এটি ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং মিথ্যা সহানুভূতির আড়ালে দমন-পীড়ন ও উচ্ছেদকে আরও শক্তিশালী করে। সে কারণেই ট্রাম্পের প্রস্তাবকে প্রথম ইসরায়েলের কট্টরপন্থী বর্ণবাদী মন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ ও ইতামার বেন গভিরকে স্বাগত জানাতে দেখে আমরা মোটেও অবাক হইনি।

এই ইহুদিবাদী নেতাদের মতো ট্রাম্পও মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বই শান্তির পথে বাধা। এই দৃষ্টিভঙ্গি সেই নাৎসি মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে তারা ইউরোপীয় ইহুদিদের উপস্থিতিকে সমস্যা হিসেবে দেখত। কিন্তু ভয়াবহ হলোকাস্টের ঘটনা ঘটিয়েও সেই মতাদর্শ সফল হয়নি।

একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ড্রেসডেন, হামবুর্গ ও লন্ডনে ফেলা মোট বোমার চেয়ে বেশি বোমা ফেলে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের মুছে ফেলার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।

আসলে ভুক্তভোগীদের দোষারোপ করা মানে আসল অপরাধীকে আড়াল করা এবং দখলদারকে দায় এড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া। এই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি ইসরায়েলকে তার দমনমূলক নীতিগুলো অব্যাহত রাখতে সাহায্য করে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকৃত জবাবদিহি ও তদন্ত এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

১৫ মাসের গণহত্যামূলক যুদ্ধে গাজার ৬৬ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি নিহত বা আহত হয়েছে। এরপরও ফিলিস্তিনিদের মনোবল ভাঙেনি। এখন নতুনভাবে ‘নরম কৌশলে’ তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা আসলে ১৯৪৮ সালের নাকবার পুনরাবৃত্তি। তখন লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল, যাতে ইউরোপের নাৎসি নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা ইহুদিদের জন্য জায়গা তৈরি করা যায়।

যদি বাস্তবিকই স্থানান্তরের কোনো যৌক্তিকতা থাকে, তাহলে তা ইসরায়েলের নেতাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যেমন নেতানিয়াহু, স্মোতরিচ ও বেন গভির—যাঁদের পূর্বপুরুষেরা পোল্যান্ড, ইউক্রেন ও ইরাকের মতো জায়গায় বসবাস করতেন। ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ না করে বরং তাঁদের পূর্বপুরুষদের দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবা উচিত।

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের যে কোনো পরিকল্পনা (প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে) চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন। এটি ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নীতিগুলোকে আরও শক্তিশালী করে। এটি ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিরুদ্ধে যায়।

তবে ট্রাম্পের প্রস্তাবে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ, তার প্রশাসনের অনেকে প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের ডানপন্থী এজেন্ডার সঙ্গে একমত। আসলে তাঁদের অনেকের কাছে ইহুদিবাদী স্বার্থ রক্ষা করা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্পকে বুঝতেই হবে, ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’র মতো যেকোনো অন্যায় পরিকল্পনা ঘৃণার চক্রকে আরও গভীর করে এবং অনন্ত সংঘাতের বীজ রুয়ে দেয়। তাঁকে বুঝতে হবে, গাজার মানুষের প্রয়োজন ন্যায়বিচার, অবমাননা নয়। তাঁদের প্রাপ্য হলো মর্যাদা, জাতিগত উচ্ছেদ নয়।

*জামাল কানজ ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক ও বিশ্লেষক

*মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বসতিতে ফিরছেন
যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বসতিতে ফিরছেন। ছবি: রয়টার্স

ছাত্ররা দল গঠন করবে: ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে অধ্যাপক ইউনূস

ছাত্ররা দল গঠন করবে। এ লক্ষ্যে তারা দেশজুড়ে লোকজনকে সংগঠিত করছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে এ কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোস সফর করেন প্রধান উপদেষ্টা। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রধান বৈদেশিক বিষয়ক ভাষ্যকার গিডেয়েন রাখমানের উপস্থাপনায় একটি পডকাস্টে কথা বলেন তিনি। ‘রাখমান রিভিউ’ নামের ওই পডকাস্ট অনুষ্ঠানে কথোপকথন লিখিত আকারে আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়েছে।

পডকাস্টে বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, তিনি নির্বাচনের সম্ভাব্য যে দুটি সময়ের কথা বলেছেন, তা ভালো সময়। কারণ, তিনি জাতীয় ঐক্য ধরে রাখছেন। তিনি এটা থেকে বিচ্যুত হতে চান না।

এ প্রসঙ্গে আলোচনায় অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘একটি সম্ভাবনা হলো, ছাত্ররা নিজেরাই একটি দল গঠন করবে। শুরুতে যখন তারা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করছে, তখন আমি তিনজন ছাত্রকে আমার উপদেষ্টা পরিষদে নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, যদি তারা দেশকে “প্রাণ” দিতে পারে, তাহলে তারা উপদেষ্টা পরিষদে বসতে পারে এবং প্রাণ দেওয়ার জন্য কী করছে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা ভালো কাজ করছে।’

এখন ছাত্ররা বলছে, কেন নিজস্ব দল গঠন করা হচ্ছে না, তাঁরা একটা সুযোগ নেবে– একথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তারা বলছে, তাঁদের (ছাত্রদের) কোনো সুযোগ নেই, এমনকি সংসদে তাঁদের একটিও আসন থাকবে না। কেন? কারণ, কেউ তাঁদেরকে চেনে না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘আমি তাদের বললাম, পুরো জাতি তাদেরকে চেনে। তারা যা করতে চায়, সে বিষয়ে তাদেরকে একটা সুযোগ দিই। সুতরাং, তারা এটা করবে।’

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে হয়তো তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এটাও একটা বিপদ। কারণ, রাজনীতি শুরু করলে সব ধরনের রাজনীতিবিদ তাদের সঙ্গে মিশে যাবে। তাই আমরা জানি না তারা আমাদের দেশে যে রাজনীতি, তা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে কি না। এ ধরনের সুযোগ আছে, যা আমাদের নিতে হবে। তবে ছাত্ররা প্রস্তুত। তারা প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশজুড়ে লোকজনকে সংগঠিত করছে।’

পডকাস্টে উপস্থাপক এ পর্যায়ে প্রশ্নে বলেন, ভারতীয়রা যেসব বিষয় বলছেন, তার একটি বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তারা বলছে, বাংলাদেশের অবস্থা খুবই নাজুক। অধ্যাপক ইউনূস হয়তো না–ও ঠিক থাকতে পারেন। কিন্তু সেখানে ইসলামিস্টরা রয়েছে, যারা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

তখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরা এমন লক্ষণ দেখি না। অন্তত আমি এখন কোনো লক্ষণ দেখি না। তরুণেরা সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের খারাপ কোনো কিছুর সঙ্গে সংস্পর্শ নেই বা নিজেদের রাজনৈতিক আখের গোছানোর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নেই। তারা এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল গঠন করছে বা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এটা দরকার। কারণ, রক্ত দিয়ে তারা যেগুলো অর্জন করেছে, সেগুলো তাদেরকে রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় সেগুলো সেই সব ব্যক্তি নিয়ে যাবে, যারা বিগত প্রশাসন ও অন্যান্যের মতো সব কিছুর পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ খুঁজছে। এটাই বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ। সুতরাং তারা এটা রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তাই আমি বলব, ছাত্রদের স্বচ্ছ অভিপ্রায় থাকবে।’

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ফাইল ছবি

ওয়াশিংটনের আকাশে বিমান-হেলিকপ্টার ভয়াবহ সংঘর্ষ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির রোনাল্ড রিগ্যান জাতীয় বিমানবন্দরের কাছে মাঝ আকাশে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের সঙ্গে দেশটির একটি সামরিক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে দ্বিখণ্ডিত ওই  বিমান এবং হেলিকপ্টারটি বিমানবন্দরের পাশের পোটোম্যাক নদীতে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিবিসি’র মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে নিশ্চিত করেছে পুলিশ কর্মকর্তা। তারা জানিয়েছে, কোনো জীবিত মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, বিমানে ৬০ জন যাত্রী ছিলেন এবং দুইজন পাইলট ও দুইজন ক্রু সদস্য। এ ছাড়া সামরিক হেলিকপ্টারে ছিলেন তিনজন সেনা। দেশটির ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বুধবার বলেছে, হোয়াইট হাউস থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পিএসএ এয়ারলাইন্স বোম্বারডিয়ার সিআরজে-৭০০ যাত্রীবাহী জেটের সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হয়। ইতিমধ্যে এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রিগ্যান বিমানবন্দরের কোলঘেঁষা পোটোম্যাক নদীতে উদ্ধারকাজ পরিচালনায় একাধিক উদ্ধারকারী সংস্থা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এই দুর্ঘটনার পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আপাতত সকল উড্ডয়ন এবং অবতরণ বন্ধ রেখেছে।

বিবিসি’র লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে বিমান দুই ভাগ হয়েছে। অন্যদিকে হেলিকপ্টারের উপরের অংশ নিচে পড়েছে। দুর্ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ঈশ্বর তাদের আত্মাকে শান্তি দিন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘ভয়াবহ’ ওই বিমান দুর্ঘটনা সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার খবর পেয়েই জরুরিভিত্তিতে কাজ করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, তিনি দুর্ঘটনার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। দুর্ঘটনার কবলে পড়া যাত্রীদের জন্য প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে দেশটির নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, পেন্টাগন সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, পুলিশ ও ফায়ার ডিপার্টমেন্টের কর্মীরা তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। সিএনএন বলছে, উদ্ধার অভিযান চালাতে মার্কিন কোস্ট গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে।  

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, সংঘর্ষের পর মোমবাতির ঝলকানির মতো কিছু একটা আকাশে দেখেছিলেন তিনি। বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেয়া ওই প্রত্যক্ষদর্শীর নাম অ্যারি শুলম্যান। জর্জ ওয়াশিংটন পার্কওয়ে ধরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। রিগ্যান বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে গেছে এই রাস্তা। গাড়ি চালিয়ে  সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই বিমানের ওঠানামা দেখেন তিনি।

শুলম্যান বলেন, দেখে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। বিমানটি  ঠিকমতো নেমে আসছিল, কোনো ত্রুটি ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই পেছনে ফিরে হতবাক হয়ে যান তিনি। শুলম্যান বলেন, আমি পেছনে ফিরে দেখি কিছুই আর ঠিকঠাক নেই। বিমানটি দেখে মনে হচ্ছিল সেটি ডানদিকে বেঁকে যাচ্ছে। সম্ভবত ৯০ ডিগ্রি। আমি বিমানের নিচের অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম। বাইরে খুবই অন্ধকার ছিল। তাই  বিমানের নিচের অংশ ভালোমতো দেখতে পাওয়ার কথা না। তিনি আরও বলেন- বিমানটির নিচের অংশে উজ্জ্বল হলুদ আলো দেখা যাচ্ছিল। নিচ থেকে স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে আসছিল।

বিমান দুর্ঘটনায় ষড়যন্ত্র দেখছেন ট্রাম্প

মাঝ আকাশে যাত্রীবাহী বিমানের সঙ্গে সেনা হেলিকপ্টারের ধাক্কা, ওয়াশিংটনে  ভয়ঙ্কর এই দুর্ঘটনা ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে সর্বত্র। আর সেই আবহে মুখ খুললেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের অনতিদূরে, পোটোম্যাক নদীতে দু’টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছে বিমানটি। উল্টো হয়ে নদীতে পড়েছে সেনার কপ্টারটিও। বিমানে ৬৪ জন এবং কপ্টারে চার যাত্রী ছিলেন এমন তথ্য এসেছে। সেই নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘একেবারে সঠিক পথে এগোচ্ছিল বিমানটি। বিমানবন্দরে নামার রাস্তা ধরেই এগোচ্ছিল। অনেকটা সময় ধরে সটান বিমানটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল হেলিকপ্টারটিই। রাতের আকাশ পরিষ্কার ছিল। জ্বলজ্বল করছিল বিমানের আলো। হেলিকপ্টারটি উপরে উঠে গেল না কেন, নীচেই বা নেমে গেল না কেন? বিমানটিকে দেখতে পাচ্ছে কি না জানতে চেয়ে কেন কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে হেলিকপ্টারটিকে নির্দেশ দেয়া হলো না’? সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথে এমন লিখেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজ থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে এমন ঘটনায় ষড়যন্ত্রের শঙ্কা মার্কিন প্রেসিডেন্টের। তার কথায়, ‘খুব খারাপ অবস্থা। দেখে মনে হচ্ছে এটা আটকানো যেত। ঠিক হয়নি’। সেনার কন্ট্রোল টাওয়ারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প।

৬৪ জন যাত্রী নিয়ে ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগান বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ে চপারে ধাক্কা খায় আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ৫৩৪২ বিমান। চপারের সঙ্গে বিমানটিও পোটোম্যাক নদীতে ভেঙে পড়েছে। উল্টো দিক থেকে সেনার চপারটি একই উচ্চতায় চলে এসেছিল বলেই এই দুর্ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। আমেরিকার সেনাবাহিনীর তরফে জানানো হয়েছে, চপারে পাইলট-সহ তিন জন ছিলেন। তাদের প্রশিক্ষণ চলছিল। এ পর্যন্ত ১৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে নিশ্চিত করেছে পুলিশ কর্মকর্তা। বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
সূত্র : এনডিটিভি

mzamin


মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানো যুবককে গুলি করে হত্যা সুইডেনে

সুইডেনে মুসলিমদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানো যুবক সালওয়ান মোমিকা’কে (৩৮) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থে আগুন দিয়ে সহিংস প্রতিবাদ বিক্ষোভে উস্কানি দিয়েছিল সে। তার কর্মকাণ্ডে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ইরাকের সঙ্গে সুইডেনের কূটনৈতিক সম্পর্কে দেখা দেয় উত্তেজনা। এক পর্যায়ে বাগদাদ থেকে বহিষ্কার করা হয় সুইডেনের রাষ্ট্রদূতকে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও বার্তা সংস্থা এএফপি। এতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যায় স্টকহোমের সোদারটালজে’তে একটি এপার্টমেন্টে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ২০২৩ সালে স্কটহোম সেন্ট্রাল মসজিদের বাইরে মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থে অগ্নিসংযোগ করে মোমিকা। এর ফলে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা।

পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, তাকে হত্যার পর বুধবার রাতভর অভিযান চালিয়ে সন্দেহজনকভাবে ৫ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। উল্লেখ্য, সালওয়ান মোমিকা একজন ইরাকি। সে বসবাস করে সুইডেনে। তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে চারটি ঘটনায় একটি জাতিগত গ্রুপের বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেয়। এ কারণে অন্য একজনের সঙ্গে অভিযুক্ত হয় সে। এই ঘটনার রায় দেয়ার কথা আজ বৃহস্পতিবার। কিন্তু স্টকহোম ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট বলেছে, দুই আসামীর মধ্যে একজন নিহত হওয়ার ফলে রায় ঘোষণা স্থগিত করা হয়েছে। বিবিসি লিখেছে, সালওয়ান মোমিকা ইসলামবিরোধী ধারাবাহিক প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে। এতে বহু মুসলিমের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। দেখা দিয়েছে বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিক্ষোভ। বাগদাদে সুইডিশ দূতাবাসে দু’বার প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরাকের সঙ্গে সুইডেনের কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ফলে বাগদাদ থেকে বহিষ্কার করা হয় সুইডিশ রাষ্ট্রদূতকে।

এখানে উল্লেখ্য, যে প্রতিবাদ বিক্ষোভে সালওয়ান মোমিকা মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থে অগ্নিসংযোগ করেছে, তার অনুমতি দিয়েছিল সুইডিশ সরকার। তাদের দাবি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক আইন অনুযায়ী এই অনুমতি দেয়া হয়েছিল। পরে তারা কোনো ধর্মীয় পুস্তক পোড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিবাদবিক্ষোভের বিষয়ে আইন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

mzamin

নতুন বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক উত্তরণে সংকট

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণে উভয় সংকট। নির্বাচনকে সামনে রেখে এখানে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিশ্রুত সংস্কারের জন্য। ক্ষমতা ছেড়ে পালানো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। তারা এখনো আওয়ামী লীগপন্থি অবস্থানে। ফলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষমতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় থাকা অন্যদের মধ্যে সংকট দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণে যে সংকট চলছে তার প্রেক্ষিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর করণীয় কি হতে পারে তা জোরালোভাবে তুলে ধরে গতকাল ৭ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রাসেলসভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। এটি একটি নিরপেক্ষ সংগঠন। কাজ করে যুদ্ধ প্রতিরোধ নিয়ে। আইসিজি’র রিপোর্টের শিরোনাম- বাংলাদেশ: দ্য ডিলেমাস অব এ ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন।

এতে বলা হয়েছে, সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছে। তারা বলেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে হবে এই নির্বাচন। এই সরকারের নেতৃত্বে আছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার নেতৃত্বাধীন সরকার এবং এর সমর্থকরা আশা করেন, এই নির্বাচন শুধুই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্বাচন হবে না। একই সঙ্গে ১৫ বছর ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী এবং নিষ্পেষণকারী শাসনের পরে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের উদয় হবে। শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ দলীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় যন্ত্র।  সংবিধান, নির্বাচনী ব্যবস্থা, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কারের সুযোগ করে দিয়েছে এর মধ্যদিয়ে। হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যে একচেটিয়া সমর্থন পেয়েছিল, তা আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে। ড. ইউনূস এখন সুদৃঢ় ফলাফল দেয়ার চাপ মোকাবিলা করছেন। অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ফাটল মেরামতের জন্যই শুধু তার সরকার চেষ্টা করছে না। একই সঙ্গে দিনের পর দিন ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনগণের সমালোচনাও মোকাবিলা করছে। আগামী বছর এই চ্যালেঞ্জ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ, বিরোধী দলগুলো, ছাত্রনেতারা, ইসলামপন্থি গ্রুপগুলো এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ নির্বাচনে সুবিধা নিতে চাইছে। বিশাল প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। এর কারণ, শেখ হাসিনার  রেজিমের শেষ পর্যন্ত তাদের দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছে। সেটা স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় বাধা হয়ে উঠেছে। উপরন্তু কমপক্ষে ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ব্যবস্থাপনা ও যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের সঙ্গে অস্থিতিশীল সীমান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বোঝা হয়ে আছে। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ইউরোপকে বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে বাংলাদেশ। তা হলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারকে সমর্থন করা। এটা এ অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব। বাংলাদেশকে সমর্থন করতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো কি কি সহযোগিতা করতে পারে তার কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে- বাংলাদেশে উচ্চ পর্যায়ের সফর করতে হবে। ড. ইউনূসের সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে  জোরালো সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। এটা করতে হবে এ জন্য যে, তাতে দেশের ভেতরে ইউনূস প্রশাসনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং  যেসব শক্তি তাকে খর্ব করার চেষ্টা করছে তাদের শক্তি দুর্বল হবে। একই সঙ্গে একটি নতুন পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্টের বিষয়ে অব্যাহতভাবে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সমর্থন দেয়া উচিত। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন সহযোগিতা করতে পারে। এর মধ্যে আছে মূল প্রতিষ্ঠাগুলোকে শক্তিশালী করা, সুশাসনকে উন্নত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখা। নির্বাচন মনিটরিং করতে একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী মিশন পাঠানো উচিত হবে। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে অধিক পরিমাণ আর্থিক সমর্থন দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইউরোপ তার প্রভাব ব্যবহার করে জাতীয় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করায় অবদান রাখতে পারে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। এ জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য অধিক আকর্ষণীয় পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করতে পারে ইউরোপ- যেটা হতে পারে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি অগ্রাধিকার। তৈরি পোশাক খাত থেকে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে আরও অনেক উদ্যোগে সহায়তা করা যেতে পারে। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিবর্গ এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন সব সম্পদ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। একই সঙ্গে ২০২৯ সালের পরেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক সুযোগ বিস্তৃত করতে ঢাকার সঙ্গে অব্যাহতভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশে সংস্কারে আরও বেশি সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে উত্তেজনাকে সীমিত করার কাজ করা উচিত। এক্ষেত্রে ২০২৫ সালে পরিকল্পিত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তা করা যেতে পারে। ভালো সম্পর্কের জন্য পরস্পরের মধ্যে অনাস্থা ও সম্পর্ক পরিবর্তনে নিজের প্রভাব ব্যবহার করা উচিত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদেরকে আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশ- উভয়কে মানবিক সহযোগিতা হিসেবে অর্থের যোগান দেয়া উচিত। এটা করা উচিত এমন এক সময়ে, যখন রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের কনফারেন্স হওয়ার কথা- তাতে সমর্থন দেয়া উচিত। এর জন্য ঢাকা এরই মধ্যে তদবির করেছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সীমান্ত জুড়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারকে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করা উচিত।

ওই রিপোর্টে ক্রাইসিস গ্রুপ আরও লিখেছে, আগস্টের শুরুতে লাখো বিক্ষোভকারী পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবনের খুব কাছে চলে যাওয়ায় তিনি বাংলাদেশ থেকে পালিয়েছেন। মোটামুটি এক মাস আগে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারি চাকরিক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থাকে সামনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন, বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের আন্দোলনকে নৃশংসতা ব্যবহার করে দমন করার চেষ্টা করেছেন হাসিনা। তার শাসন নিয়ে ভয়াবহ অসন্তোষের মধ্যে এই প্রতিবাদ বিক্ষোভ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার করণে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। তার পতন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু তাতে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। কারণ, দেশটিতে আছে বিভক্তি, অনেক সময় রাজনৈতিক সহিংসতা হয়।  সেনাবাহিনী, ছাত্র নেতৃত্ব এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রফেসর ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। এতে আছেন ছাত্র, নাগরিক সমাজের ব্যক্তিত্ব, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তা। অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশে এবং বিদেশে ড. ইউনূসের কমান্ডকে দেখা হয় অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে। তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পান। মূল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তিনি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু একসময় হাসিনার উৎখাতে ড. ইউনূসের প্রশাসনের প্রতি ব্যাপক সমর্থন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ‘হানিমুন’ শেষ। শুধু সংস্কার করার জন্য নয়, একই সঙ্গে দিন দিন সুশাসন উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চাপে সরকার। নতুন জাতীয় নির্বাচন এখন একটি বার্নিং ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র পক্ষ থেকে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার জন্য ক্রমবর্ধমান চাপে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার। এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সংবিধান অনুযায়ী গণতন্ত্রে ফেরার কথা বাংলাদেশের। ১৬ই ডিসেম্বর ড. ইউনূস বলেছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। এর অর্থ তার প্রশাসন দুই বছরের কিছু কম সময় ক্ষমতায় থাকবে। পুরোপুরি না হলেও অনেক সমালোচক এই ঘোষণায় নীরব হয়ে গেছেন। কিন্তু নির্বাচন, যদি তা দূরেও হয়, তবু তা নিয়ে বিএনপি, অন্য রাজনৈতিক দলগুলো এবং ছাত্রনেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্রনেতারা এখন একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা করছেন। ওই তারিখের বাইরেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনপরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ইস্যু এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি সংস্কার এজেন্ডার অংশ হিসেবে ড. ইউনূস কমপক্ষে এক ডজন কমিশন গঠন করেছেন। তাদের কাজ সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার। এর মধ্যে চারটি কমিশন মধ্য জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রফেসর ইউনূস আরেকটি কমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলো ও সামাজিক শক্তির সঙ্গে সংলাপ করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য এই প্রক্রিয়ার সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, হাসিনার আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে অনুপস্থিত। তাদের নেতারা নির্বাসনে। দেশে থাকা তাদের নেতাকর্মীরা আত্মগোপন করে আছেন। ফলে দেশে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি এখন বিএনপি। অতীতে যখন, বিশেষ করে ২০০০-এর দশকের শুরুতে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তারাও শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের মতো একইরকম একনায়কতন্ত্রের প্রবণতা প্রদর্শন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও তার সমর্থকদের কাছে এটা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। মনে করা হচ্ছে সংস্কারের ফলে দেশকে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।

জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক সংস্কারের যে গভীর আকাঙ্ক্ষা তা ড. ইউনূসকে সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনায় অন্তর্বর্তী সরকার অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।  হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তার অর্থনীতিতে অব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে আছে আর্থিক খাতে ভয়াবহ দুর্নীতি ও তার ঘনিষ্ঠদের লুটপাট। এর ফলে কমপক্ষে ১০টি ব্যাংক ‘টেকনিক্যালি ঋণখেলাপি’ হয়েছে। ড. ইউনূস দায়িত্ব নেয়ার সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ক্রমহ্রাসমান। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি শতকরা কমপক্ষে ১৫ ভাগে উঠে যায়। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পলিসি তৈরি এবং আস্থা পুনরুদ্ধারে মন্ত্রীদের নিয়োগকে দেখা হয়- অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ হিসেবে। তারপরও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তার ফলে এখনো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত।  একরোখা মুদ্রাস্ফীতি থেকে বাংলাদেশিরা অব্যাহতভাবে দুর্ভোগে। এ সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্পতার ফলে বিদ্যুৎ কর্তনে অবদান রেখেছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফ আশা করছে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। মুদ্রাস্ফীতি অর্ধেকে নেমে আসবে।

এই রিপোর্টে ভুয়া তথ্য এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তেজনার বিষয় তুলে ধরা হয়। এক্ষেত্রে ভারত ও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গ তোলা হয়। এতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে উৎখাতের ফলে ইসলামপন্থি দলগুলো প্রভাব বিস্তার করছে। এসব অভিযোগ এসেছে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভারত থেকে, যারা আওয়ামী লীগকে এবং হাসিনাকে দীর্ঘ সময় ধরে সমর্থন দিয়ে এসেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে তাদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে সমালোচকরা বলছেন, তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের মতোই টালমাটাল পরিস্থিতিতে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। তবে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে হিন্দুদের ওপর বিক্ষিপ্ত হামলা হয়েছে। এ সময়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করেনি। যারা হামলায় ভিকটিম হয়েছেন তারা ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক। কিন্তু তা নিয়ে ভারতে অনেকে, মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগ মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক একটি গ্রুপ ২০২৪ সালে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ১২৭টি ঘটনা ডকুমেন্ট হিসেবে ধারণ করেছে। ২০২১ সালের তুলনায় তা অনেক কম।  একইভাবে অভিযোগ আছে, ইসলামপন্থিরা বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্যে ছিল এবং তারা এখন সরকারকে বিভ্রান্ত করতে বড় রকমের প্রভাব রাখছে। বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের মিডিয়া এবং রাজনীতিকরা মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। এমন সব ঘটনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির সমর্থন বাংলাদেশিদের কাছে গভীরভাবে অপছন্দের। একই সঙ্গে যখনই এমন ধারণা জন্মেছে যে, ড. ইউনূসের সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছে ভারত এবং আওয়ামী লীগকে ফেরাতে চেষ্টা করছে, তখন বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বাড়ছে। নির্বাসনে শেখ হাসিনাকে ভারত শুধু আশ্রয় দিয়েছে এমন নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশিদের ভারতীয় ভিসা পাওয়াকে কঠিন করে তুলেছে। সর্বোপরি ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ধর্মীয় অধিকার নিয়ে ঢাকাকে নিয়ে তারা নিয়মিতভাবে সমালোচনা করছে। ওদিকে পাওনা পরিশোধ না করায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যাপক বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। উত্তেজনার সঙ্গে যোগ হয়েছে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ নিয়ে বিরোধ। আঞ্চলিক সুপারপাওয়ারকে মোকাবিলা করা ঢাকার জন্য কঠিন। কিন্তু তারা দেশের ভেতরে জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করতে পারে না। সেপ্টেম্বরে পূজাকে সামনে রেখে ইলিশ রপ্তানি স্থগিতের অস্থায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তারপর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ বাতিল করে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে বাংলাদেশি হত্যার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এই বিষয়টি হাসিনার সরকার উপেক্ষা করে এসেছে।

এর প্রেক্ষিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কী করতে পারে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয় রিপোর্টে। এতে বলা হয়, হাসিনার পতনের ফলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন রূপ দেয়ার, অধিক অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিতামূলক করার এক বিরল সুযোগ এসেছে। এসব সংস্কারের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে যতটা সম্ভব, সমর্থন দেয়া উচিত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের। অন্তর্বর্তী সরকারে সংস্কারকে সমর্থন দেয়ার ফলে বাংলাদেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভাবমূর্তি। ইউরোপিয়ান কিছু কূটনীতিক প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ রেজিমের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন- এখন উচিত হবে দেশের রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে তাদের বিস্তৃত যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। এর মধ্যে আছে ছাত্র নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থি গ্রুপগুলো। কারণ, তারা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ বিষয়ে ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার ও বাংলাদেশ-বিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিয়ান বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তী সরকারের মধুচন্দ্রিমা এখন পুরোপুরি শেষ। রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ সংস্কার নিয়ে দরকষাকষি করায় এবং নির্বাচনী সুবিধার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠায় এই বছর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বাড়তে পারে। জিনিসপত্রের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কারণেও অন্তর্র্বর্তী সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যবস্থাপনার উত্তরাধিকার হিসেবে তারা পেয়েছে। আর অর্থনীতিকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চলমান প্রচেষ্টার সুফল বাংলাদেশের জনগণের বাস্তবে  পেতে আরও সময় লাগবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে এখনো টানাপড়েন রয়েছে আর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এরপরও আগামী বছর বাংলাদেশের সামনে দেশটির জাতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং এটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক করার একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। এই লক্ষ্যে সংস্কার কমিশনগুলো কয়েকশ’ প্রস্তাব সংবলিত প্রতিবেদন জমা দিতে শুরু করেছে। এদিকে নির্বাচনী রাজনীতিতে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। সংস্কার প্রক্রিয়ার সমর্থনে এবং অন্তর্র্বর্তী সরকার যাতে বাংলাদেশকে একটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয় তা নিশ্চিতে কথাবার্তার মাধ্যমে, কারিগরি ও আর্থিকভাবে বিদেশি অংশীদারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে ইইউ’র সামনে গণতান্ত্রিক উত্তরণকে সমর্থন দেয়ার এবং অত্যন্ত ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের একটি অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ এক বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কোন্নয়নের সুযোগ এনে দিয়েছে বাংলাদেশ।”

mzamin

জন্মনিবন্ধনে ভোগান্তির শেষ নেই by আফজাল হোসেন ও মোহাম্মদ রায়হান

আবুল হাসান। পেশায় একজন শিক্ষক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। মঙ্গলবার ভাগ্নের জন্য জন্মসনদ করতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ সিটির অঞ্চল-৩ এর অফিসে। সেখান থেকে আঞ্চলিক অফিস, নগর ভবন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘুরেছেন। শেষে খিলগাঁওয়ে অবস্থিত অঞ্চল-২ এর কার্যালয় থেকে জন্মসনদ হাতে পান। জন্মনিবন্ধন করতে হয়রানির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবুল হাসান বলেন, কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন কার্যালয়ে জন্মসনদ করার জন্য ঘুরেছি। সিটি করপোরেশনের ভিতরে আবেদন করা যায় না, বাহির থেকে করা লাগে। অথচ এই কাজগুলো তাদেরই। অনলাইনে আবেদন করে দিতে বললে তারা নানা টালবাহানা করে। পরে দোকান থেকে আবেদন করি। আঞ্চলিক কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিতে গেলেও ঝামেলায় পড়ি। এই ভবন থেকে অন্য ভবনে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, অঞ্চল-৩ থেকে নগর ভবনের ১৫ তলায় যেতে বললে সেখানে যাই। কিন্তু সেখানে জন্মনিবন্ধের কোনো কার্যক্রম নেই। সরকারের অন্য একটি দপ্তর খোলা হয়েছে। লিগামেন্ট ইঞ্জুরি নিয়ে আবার ১৫ তলা থেকে আবার ৮ তলায় যাই। আবেদনে ভুল থাকায় আবেদনটির সুরাহা হয়নি। পরে ভুল সংশোধনের জন্য সেখান থেকে আবার অঞ্চল-২ এ আসতে হয়। অনলাইন সংশোধনের পর তা অনুমোদনের জন্য আবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেতে বলা হয়। তিনি বলেন, এতসব হয়রানি কোনোভাবেই আমাদের কাম্য নয়। কত মানুষের ভোগান্তি। কারও বাবা মারা গেছে, কেউ জন্মনিবন্ধন বানাচ্ছে। প্রত্যেক জায়গায় ভোগান্তির শিকার মানুষ।

শুধু হাসান নন, জন্মনিবন্ধন পেতে এভাবে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। সরজমিন ঢাকা সিটির বিভিন্ন জোন ঘুরে এমন দুর্ভোগের চিত্র চোখে পড়ে।

জন্মনিবন্ধন সনদ নিতে গুলশানের ৩৯ নং ওয়ার্ড নূরের চালা থেকে এসেছেন হাসিব ও সাজ্জাদ। দু’জন শিক্ষার্থী। একজনের পিতা-মাতার জন্মস্থান ঢাকার বাহিরে কিন্তু তিনি নিজে ঢাকায় জন্ম নেয়া। অন্যজনের মাতার জন্মস্থান ঢাকায় বাবার জন্মস্থান ঢাকার বাহিরে। সাজ্জাদ ও হাসিব বলেন, দেখেন নিয়ম অনুযায়ী  আমাদের জন্মসনদটা হয়ে যাওয়ার কথা, এখন তারা অযথাই হয়রানি করাচ্ছে। এই জন্মসনদ ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারছি না। তারা সরাসরি বলে দিয়েছে এখানে হবেই না। আমরা অনলাইনে আবেদন করেই আসছি, কথা ছিল এখানে জমা দিলেই হয়ে যাবে। তারা বললো জন্মস্থান যে জায়গায় দেয়া সেখানেই করতে হবে। এখন আমরা জন্মনিবন্ধন ছাড়া কিছুই করতে পারছি না। তারা যদি চায় এক হাজার টাকা দেন তবুও করতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৩ এর কার্যালয়ের নিবন্ধক সহকারী আব্দুল মান্নান জানান,  জন্মস্থান এখানে (উত্তর সিটি) হলে, জন্মস্থান এখানে বা স্থায়ী ঠিকানা এখানে হলে আমি সনদের ব্যবস্থা করতে পারি। সেবাগ্রাহীতারা বাহির থেকে অনলাইনে আবেদন করে কাগজপত্রসহ এখানে এলে আমরা করে দেই। এখানে কোনো হয়রানি নাই। কাগজপত্র দিয়ে গেলে আমি ডেট দিয়ে দেই। ১৫ দিন সময় লাগে হয়তো। জন্মনিবন্ধন কার্ড রেডি হলে মেসেজ যায়। মেসেজ গেলেই একদিন পর এসে নিয়ে যেতে পারে।

দুপুর ১২টা।  রেগে গিয়ে চিৎকার করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয় ৫ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন মানিক নগর মিয়াজান লেনের বাসিন্দা শরীফ। জন্মনিবন্ধনে তার বাবার নাম সংশোধন করার জন্য ১০ দিন ধরে এই কার্যালয়ে ঘুরছেন কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। একদিন গেলে বলে হোল্ডিং ট্যাক্স এর ফটোকপি লাগবে, আরেকদিন বলে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন এভাবে দিনের পর দিন কাগজপত্র নিয়ে ঘুরছেন এই আঞ্চলিক অফিসে। বৃহসপতিবার এই অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তা তার আবেদনটি গ্রহণ করেননি, তারা বলছেন নতুন করে জন্মনিবন্ধন আবেদন করতে। তাই রাগে অভিমানে চিৎকার করে বের হয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন- আমার আবেদন যদি গ্রহণ না করে তাহলে আমাকে কেন এতদিন ধরে বিভিন্ন কার্যালয়ে ঘুরালো। আমি তো বাবার নাম সংশোধন করার জন্য আবেদন করেছি তাহলে আমার আবেদন গ্রহণ করবে না কেন। এইখানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ফাজলামি করা হচ্ছে আর কিছুই না। আমার সব কিছুই ঠিক আছে শুধু বাবার নাম এর শেষে আলম বসবে এইটার জন্য আমার এই জন্মনিবন্ধন বাদ দিয়ে নতুন করে জন্মনিবন্ধন করতে হবে এইটা ফাজলামো ছাড়া আর কিছুই না। শুধু তিনি নন, শরীফ ছাড়া এমন অনেক বাসিন্দা জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। সরজমিন ঢাকা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয় গিয়ে দেখা মিলেছে এইসব দৃশ্যের। সরকার ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করায় নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়পত্র করার জন্য জন্মনিবন্ধন সংশোধন সহ নতুন করে জন্মনিবন্ধন করতে এসে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া প্রতিটি স্কুলে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্কুলে ভর্তির সময় শিশুদের জন্মসনদ চাওয়া হয় স্কুল থেকে। সময়মতো জন্মনিবন্ধন পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে অভিভাবকদের। উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ছোটখাট সংশোধনের জন্য তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানোর কারণে সময় অপচয়, প্রয়োজনীয় কাজে জন্মনিবন্ধন জমা দেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পিতামাতার জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে নামের মিল নেই জাতীয় পরিচয়পত্রের। এক্ষেত্রে শিশুর জন্মনিবন্ধন করতে প্রথম ধাপে সংশোধন করতে হয় পিতামাতার নাম। ভোগান্তিটা এখান থেকেই শুরু। অন্যদিকে শিশুর পিতা প্রবাসে থাকায় পাসপোর্টের নামের সঙ্গে অনেকের মিলছে না জন্মনিবন্ধনের নাম। এতে অভিভাবকদের আরেক ধাপ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া জন্মনিবন্ধন সংশোধনসহ নতুন জন্মনিবন্ধন করার জন্য আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা নাগরিকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন।
বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ক্লান্ত চেহারায় হেঁটে যাচ্ছিলেন যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা হৃদয়। তিনি বলেন, আজকে ৫ দিন ধরে এই অফিসে ঘুরছি এনআইডি কার্ড করার জন্য জন্মনিবন্ধন করতে এসেছিলাম এখানে। একবার স্কুল সার্টিফিকেট লাগবে আবার তাদের কাছে গেলে বলে হোল্ডিং ট্যাক্স এর ফটোকপি লাগবে। সর্বশেষ বলছে আমার বাবা-মা’র জন্মনিবন্ধনের অনলাইন কপি লাগবে নাহলে হবে না। আজকে বাবা-মা’র জন্মনিবন্ধন নিয়ে এসেছি এখন বলছে- ডিসি অফিসে গিয়ে আবেদন কনফার্ম করে এই অফিসে আসতে। আমাদের সাধারণ মানুষকে নিয়ে তারা খেলছেন আর কিছুই না। আমার অফিস আছে অফিসে কয়দিন ছুটি নেয়া যায় দুইদিনের কাজ আজকে দশদিন লেগে যাচ্ছে।

সরকার নতুন করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করছে এখনো এনআইডি কার্ড করেনি মানিক নগর এলাকার বাসিন্দা সাদেক হোসেনের। এনআইডি কার্ড করার জন্য জন্মনিবন্ধন লাগবে। তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছি জন্মনিবন্ধন করার জন্য আসার পর সবকিছু কাগজপত্র জমা দিয়েছি। চারদিন ধরে এইখানে ঘুরছি একদিন এক কাগজ চায় তারা। আজকে সব কাগজ জমা দিয়েছি এখন বলছে ডিসি অফিসে যেতে হবে ওইখানে সার্ভার থেকে আবেদন নিশ্চিত করে এখানে পাঠাতে হবে। এক কর্মকর্তা  আমাকে অফার দিয়েছে যদি তাকে ৫০০ টাকা দেই তাহলে অফিসে যেতে হবে না উনারা এখান থেকে সব করে দেবেন। হয়রানি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে ৫০০ টাকা দিয়ে এসেছি।

সত্তুর বছরের বৃদ্ধা হালিমা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছেন এই অফিসের ১০৯ নম্বর রুমের সামনে। অফিস আর দোকান ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। তার মেয়ের জন্মনিবন্ধন সংশোধন করার জন্য এসেছিলেন এই কার্যালয়ে। আবেদনপত্র নিয়ে যাওয়ার পর দায়িত্বরত কর্মকর্তা এক একবার এক এক কাগজ চাচ্ছেন। একবার চাচ্ছেন বিদ্যুৎ বিলের ফটোকপি, একবার চাচ্ছেন পানির বিলের ফটোকপি দুই ঘণ্টা এই অফিস আর দোকানে আসা যাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে  গেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন আমি বৃদ্ধ মানুষ এই বয়সে কী এত হাঁটাহাঁটি  করতে পারি উনারা একবারে বলে না কি কি লাগবে। সবকিছু দেয়ার পর এখন বলছে আসল জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি লাগবে একবারে বলে দিলেই তো হতো এই বয়সে এত বার কি দৌড়াদৌড়ি করা যায়।    

ন্যাশনাল কলেজের শিক্ষার্থী তারেক এসেছেন জন্মনিবন্ধন সংশোধন করার জন্য। তিনি বলেন, আজকে তিনবার পর্যন্ত এই আঞ্চলিক কার্যালয় আর ফটোকপির দোকানে আসা-যাওয়া করছি। উনারা একেকবার একেক কাগজপত্রের জন্য পাঠায়। এখানে আসার পর আমাকে বললো যে, বিদ্যুৎ বিলের ফটোকপি লাগবে আর গ্যাস বিলের ফটোকপি লাগবে, কিন্তু আমি বিদ্যুৎ বিল এবং গ্যাস বিলের ফটোকপি  আনার পরে বলছে হোল্ডিং ট্যাক্সের ফটোকপি লাগবে। সবকিছু জমা দেয়ার পর এখন বলছে- হলফনামা লাগবে। 

mzamin

অন্য দলের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন ছাত্ররা

দল গঠনের প্রক্রিয়া অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ঘোষিত হতে পারে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল। শুরুতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবেন তারা। ইতিমধ্যে সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফরম জাতীয় নাগরিক কমিটি। নতুন দল ঘোষণার আগে ছাত্ররা যোগাযোগ রক্ষা করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও। উদ্দেশ্য- তাদেরকে নতুন দলে ভেড়ানো। এ ছাড়াও বিভিন্ন দলের নেতারা নিজ থেকেও যোগাযোগ করছেন ছাত্রদের সঙ্গে। ছাত্রদের যোগাযোগ হচ্ছে সুশীল সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গেও।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিষয় সামনে এনেছেন ছাত্ররা। উদ্দেশ্য- পুরনো বন্দোবস্তকে বিদায় দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা। তারুণ্য নির্ভর দল গঠন করে সব মত-পথের মানুষকে ঠাঁই দিতে চায় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। নেতাদের দাবি- মধ্য পন্থার এ নতুন রাজনৈতিক দল হবে গণমানুষের দল। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত।

দল ঘোষণাকে সামনে রেখে পর্যায়ক্রমে পদত্যাগ করবেন সরকারে থাকা ছাত্রদের তিন প্রতিনিধি। যাদের একজন নতুন দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে পারেন। জানা গেছে, ফেব্রুয়ারির মধ্যেই পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন সরকারের আইসিটি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা নাহিদ ইসলাম। যিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নম্বর সমন্বয়ক ছিলেন। শোনা যাচ্ছে, নাহিদকে সামনে রেখে দল ঘোষণা হতে পারে। নাহিদের পর উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করবেন আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। যিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। নাহিদের পদত্যাগের পরের ধাপে আসিফ পদত্যাগ করতে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে। আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে অথবা অক্টোবরের শেষে পদত্যাগ করতে পারেন। তবে পদত্যাগ ইস্যুতে গতকাল নাহিদ ইসলাম বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। যদি হয় তাহলে আমরা নিজেরাই বলবো। রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণের পরিস্থিতি হলে, আমরা সরকার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেটা আনুষ্ঠানিকভাবেই বলবো।

এদিকে, নিজেদের নতুন দলে পরিচিত একজন রাজনৈতিক মুখকে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। সে লক্ষ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে। এ তালিকায় রয়েছে বিএনপিসহ অন্যান্য ছোট দলের নেতারা। যেখানে বিএনপি’র হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। এ ছাড়াও দলটির তরুণ কয়েকজন নেতাকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চলমান রয়েছে। বিএনপি ছাড়াও দলটির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে নতুন দলে যোগ দেয়ার। এ ছাড়াও বিএনপি’র সঙ্গে জোটে থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা ব্যক্তিও রয়েছেন এ তালিকায়। তবে এদের কেউই দলে যোগদানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানাননি। কেউ কেউ নিজেদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন। সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন কয়েকজন। এ ছাড়াও সুশীল সমাজের কয়েকজন ব্যক্তিকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছেন ছাত্ররা।

ছাত্রদের নতুন দলের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নাম চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে আগামী সপ্তাহে অনলাইন ও অফলাইনে গণমানুষের মত নেয়া হবে। মানুষের দেয়া নাম ও নিজেদের প্রস্তাবনা থেকে দলের নাম চূড়ান্ত করা হবে। এক্ষেত্রে নতুন দলের নামেও জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রতিফলন রাখতে চান ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। এ ছাড়া গঠনতন্ত্রের বিষয়টিও শেষ দিকে রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে এটি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রেও জুলাই-আগস্টের স্প্রিট রাখতে চান তারা। আজ জনমত তৈরির লক্ষ্যে দেশব্যাপী বিভিন্ন সভা করছেন তারা। আনুষ্ঠানিকভাবে দলের ঘোষণা দেয়ার আগে রংপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করারও পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে, দল গঠনের আগে দেশব্যাপী নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই একাধিক উপজেলা কমিটি গঠন করে দল গোছানোর চেষ্টায় রয়েছেন তারা। কমিটিগুলো নিজ নিজ এলাকায় দল গঠনের বিষয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর লক্ষ্যে করা হচ্ছে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ।

দল গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনেকটা ক্লোজডোর আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নাগরিক কমিটির অভ্যন্তরীণ সভাগুলোতে আলোচনা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে ক্লোজডোর আলোচনায়। উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কাজ করছেন। এ ছাড়াও উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, মুখপাত্র সামান্তা শারমিনও রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। অন্যদিকে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠন সারজিস আলম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ, সদস্য সচিব আরিফ সোহেল ও মুখ্য সংগঠন আব্দুল হান্নান মাসউদ রয়েছেন। এদিকে ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক ব্যক্তির একটি গোপন বৈঠক নিয়ে আলোচনা রয়েছে নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অভ্যন্তরে। সূত্রের দাবি, জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ঢাকার পার্শ্ববর্তী একটি রিসোর্টে এ বৈঠক হয়। যেখানে সাত ছাত্রনেতা ছাড়াও উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তবে এ ধরনের কোনো বৈঠকের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা কিছু প্রকাশ করেননি।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, আমরা দল গঠনের আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গেই যোগাযোগ করছি। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোও রয়েছে। বিষয়টা এমন না যে তাদেরকে দলে ভেড়াতে এ উদ্যোগ। তিনি বলেন, আমাদের নতুন দলে সব জাতি, ধর্ম, বর্ণের অংশগ্রহণ থাকবে। মধ্যপন্থার দল হবে। নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতারাই নেতৃত্বে থাকবে। আর দলের নামের ক্ষেত্রে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের যেন প্রতিফলন ঘটে এমন একটি নামই আমরা চূড়ান্ত করবো।

ছাত্ররা নতুন দল গঠন করবে, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে ড. ইউনূস: এদিকে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন ছাত্ররা দল গঠন করবে। এ লক্ষ্যে তারা দেশ জুড়ে লোকজনকে সংগঠিত করছে। একটি সম্ভাবনা হলো, ছাত্ররা নিজেরাই একটি দল গঠন করবে। শুরুতে যখন তারা উপদেষ্টা পরিষদ সভা গঠন করছে, তখন আমি তিনজন ছাত্রকে আমার উপদেষ্টা পরিষদে নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, যদি তারা দেশকে “জীবন” দিতে পারে, তাহলে তারা উপদেষ্টা পরিষদে বসতে পারে এবং জীবন দেয়ার জন্য কী করছে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা ভালো কাজ করছে। এখন ছাত্ররা বলছে, কেন আপনি আপনার-আমাদের নিজস্ব দল গঠন করেন না, আমরা একটা সুযোগ নেবো। তারা বলেছে, আপনার কোনো সুযোগ নেই, এমনকি সংসদে আপনার একটি আসনও থাকবে না। কেন? কারণ, কেউ আপনাকে চেনে না। আমি তাদের বললাম, পুরো জাতি তাদেরকে চেনে। তারা যা করতে চায়, সে বিষয়ে তাদেরকে একটা সুযোগ দিই। সুতরাং, তারা এটা করবে। তিনি বলেন, এটা দরকার। কারণ, রক্ত দিয়ে তারা যেগুলো অর্জন করেছে, সেগুলো তাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় সেগুলো সেই সব ব্যক্তি নিয়ে যাবে, যারা বিগত প্রশাসন ও অন্যান্যের মতো সব কিছুর পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ খুঁজছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে হয়তো তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এটাও একটা বিপদ। কারণ, রাজনীতি শুরু করলে সব ধরনের রাজনীতিবিদ তাদের সঙ্গে মিশে যাবে। তাই আমরা জানি না তারা আমাদের দেশে যে রাজনীতি, তা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে কি না। এ ধরনের সুযোগ আছে, যা আমাদের নিতে হবে। তবে ছাত্ররা প্রস্তুত। তারা প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশ জুড়ে লোকজনকে সংগঠিত করছে। তিনি বলেন, তরুণরা সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের খারাপ কোনো কিছুর সংস্পর্শে নেই বা নিজেদের রাজনৈতিক আখের গোছানোর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নেই। তারা এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল গঠন করছে বা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এটাই বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ। সুতরাং তারা এটা রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তাই আমি বলবো, ছাত্রদের স্বচ্ছ অভিপ্রায় থাকবে।

mzamin