Friday, December 29, 2017

কিশোরী আহেদ তামিমি প্রতিরোধের প্রতীক by মর্তুজা নুর

ঘটনাটির সূত্রপাত হয়েছিল গত ৮ ডিসেম্বর। সেদিন ছিল শুক্রবার। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার প্রতিবাদে জুমার নামাজের পর জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের বাইরে এবং গাজা উপত্যকায় বিক্ষোভে অংশ নেন হাজার হাজার মুসল্লি। বিক্ষোভে ইসরায়েলি বাহিনী বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ইসরায়েলি বাহিনীর কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেটের জবাবে পাল্টা পাথর নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীরা। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ বিক্ষোভ ঠেকাতে পশ্চিমতীরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে ইসরায়েল। কিন্তু রাস্তায় টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ চালাতে থাকে বিপুলসংখ্যক মানুষ।
এ সময় ১৬ বছরের ফিলিস্তিনি কিশোরী আহেদ তামিমি ও তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বিক্ষোভের সময় তামিমির পরিবারের এক সদস্যকে মাথায় গুলি করে ইসরায়েলি সেনারা। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে কিশোরী তামিমি।
এ ঘটনার একপর্যায়ে সে একজন দখলদার ইসরায়েলি সেনাকে চড় দেয়। এ দৃশ্য মোবাইল ফোনের ক্যামেরার মাধ্যমে ভিডিও করে সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে তা ভাইরাল হয়ে যায়।
পরে ইসরায়েলি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তামিমি ও তার ২১ বছরের চাচাতো বোনকে অপহরণ করে। তাদের খবর নিতে গেলে তামিমির মাকেও আটক করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি জেরুজালেম ইস্যুতে ইসরায়েলি সেনার গালে চড় মেরে আলোচনায় উঠে আসা ১৬ বছরের ফিলিস্তিন কিশোরী আহেদ আত তামিমিকে নিয়ে তোলপাড় চলছে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে ব্রিটিশ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত তামিমির চর্চা এখনো বহাল তবিয়তে। তামিমির গ্রেপ্তারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। গ্রেপ্তারকৃত এই ফিলিস্তিন কিশোরী আহেদ তামিমির নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান ব্রিটিশ এমপিরাও।
১৬ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কিশোরী আহেদ তামিমি তার এক আত্মীয়ের মাথায় রাবার বুলেটের আঘাতের পর ইসরায়েলি বাহিনী তাদের বাড়ি তছনছ করছিল। ওই সময় তামিমি ইসরায়েলি সেনাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। তামিমি চিৎকার করে সেনাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে। তখন ইসরায়েলি সেনারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। পুরো ঘটনাটি মোবাইলে ধারণ করা হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় সেই সেনারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় থাকে, খবরটি প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের শিরোনাম হলে সেনাদের নীরবতার এই চিত্র ইসরায়েলিদের কাছে অপমানকর বলে বিবেচিত হয়।
ইসরায়েলে সেনারা দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানায়, আহেদ তামিমিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়, ডিসেম্বরের ১৯ তারিখের শুরুতে তাকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আটকাবস্থায় থাকা তামিমিকে দেখতে গেলে তার মাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনার পর তামিমি বীর হিসেবে অভিহিত হচ্ছে। তার ছবি নিয়েও কার্টুন এবং আরবি ও ইংরেজি ভাষায় স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও তৈরি হয়েছে। জর্ডানের প্রিন্স আলি বিন হুসেইন পর্যন্ত এই ফিলিস্তিনি কিশোরীর প্রশংসা করে টুইটারে ছবি প্রকাশ করেছেন।
এর মধ্যে তামিমির মুক্তির দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি নেতা জেরেমি করবিন। সামাজিক মাধ্যমে মুক্তির দাবিতে শুরু হয়েছে দুটি হ্যাশট্যাগ।
জেরুজালেম নিয়ে মার্কিন সিদ্ধান্তের বিষয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের জরুরি বৈঠকের মন্তব্যে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া তিনটি ছবিকে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে তামিমির ঝড় তোলা সেই প্রতিবাদের ছবি।
ঘটনার সূত্রপাত ইসরায়েলি সেনার গালে চড় মারা থেকে হলেও তামিমি কিন্তু অনেক আগে থেকেই তার আন্দোলন শুরু করেছিল। ২০১৪ সালে ইসরায়েল সৈন্যরা তার ভাইকে গ্রেপ্তার করার পর সে বেশ স্পর্ধা দেখিয়েছিল।
এ কারণে তখনকার তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানের প্রেসিডেন্ট) রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তামিমির সাহসিকতার অনেক প্রশংসা করেছিলেন। আর তুরস্কের ইস্তাম্বুল বাসাখেইর নগরী তাকে ‘হানজালা কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার দিয়েছিল।
তামিমির গ্রামের নাম নাবিহ সালেহ। সেখানে ইসরায়েলি অথরিটির অধীনে চলে গেছে। হালামিশ সেটেলাদের (ইহুদি সেটেলার) ইসরায়েলি অথরিটি তাদের গ্রামের অনেকাংশ জমি দিয়ে দিয়েছে। ইহুদিদের বাড়িঘর বানিয়ে দিয়েছে সেখানে। প্রায় জন্মের পর থেকেই আহাদ দেখছে, তাদের অস্তিত্ব হাতের নাগাল থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে।
তামিমির মামা আইডিএফের গুলিতে শহীদ হন। তার মা বিগত বছরগুলোতে তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেনাদের গুলিতে জখমও হয়েছেন একবার। তার বাবা দুবার গ্রেফতার হয়েছেন, ১৮ মাস ছিলেন শত্রুদের জেলে।
এখান থেকেই মূলত তামিমির সংগ্রামী চেতনার জন্ম। সে আজ কোনো কিছুতেই ভয় পায় না। বর্তমানে ফিলিস্তিন তরুণীদের কাছে তামিমি ‘ইয়ং ফিমেল লিডার অব টিনএজার’ নামে পরিচিত হয়ে উঠছে। ইসরায়েলি কাপুরুষদের সঙ্গে অকুতোভয়ে লড়ে যাওয়া হিরোর নাম তামিমি। তাকে ডাকা হচ্ছে ‘ফেস অব দ্য রেসিসটেন্স’।
সূত্র : মেমো, দ্য নেশন, বাংলা ট্রিবিউন, আওয়ার ইসলাম।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আয়কারী ভারত, পঞ্চম বাংলাদেশ

সারাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আয়কারী দেশ ভারত। এ ক্ষেত্রে চীনকে পিছনে ফেলেছে তারা। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। ২০১৫ সালে অর্জিত রেমিটেন্সের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে ভারতের অনলাইন দ্য স্টেটসম্যান। এতে বলা হয়েছে, দেশের বাইরে কাজ করতে যাওয়া ভারতীয়রা ২০১৫ সালে মোট প্রায় ৬৮০০ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উপার্জন ১৫০০ কোটি ডলার।
বিশ্ব ব্যাংকের অভিবাসন ও রেমিটেন্স বিষয়ক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বেশি রেমিটেন্স আয়ের ক্ষেত্রে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইন, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এতে বলা হয়েছে, অন্য সব দেশের অভিবাসীদের তুলনায় ভারতীয়রা সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন তাদের দেশে। এর পরেই অর্থাৎ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। তাদের অর্জিত রেমিটেন্সের পরিমাণ হলো প্রায় ৬৪০০ কোটি ডলার। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিলিপাইন। বাংলাদেশের উপরে রয়েছে পাকিস্তান। সেখানে একই সময়ে অর্জিত রেমিটেন্সের পরিমাণ প্রায় ১৯০০ কোটি ডলার। এ দেশটিতে বিশেষ করে পবিত্র রমজানের সময় বেশি সংখ্যক নাগরিক অর্থ পাঠান। তারা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, এতিমখানায় অর্থ দান করেন। এমন অর্থের পরিমাণ বিপুল। তা থেকে বড় অংকের রেমিটেন্স আসে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স একটি বড় ফ্যাক্টর। বছরের পর বছর তা বাড়ছে। কারণ, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশী শ্রমিক বিদেশে বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাচ্ছেন। তাদের সংখ্যাও বাড়ছে। তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে আছে ভিয়েতনাম। সেখানকার রেমিটেন্সের পরিমাণ বাড়ছে আস্তে আস্তে। ২০১৫ সালে ভিয়েতনাম অর্জন করেছে প্রায় ১৩০০ কোটি ডলার। এরপরেই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। সেদেশটির শ্রমিকরা অদক্ষ বলে বিবেচনা করা হয়। তাই তাদের বেতন কম। এ খাত থেকে তাই রেমিটেন্সও কম আসে। ২০১৫ সালে অর্জিত হয়েছে প্রায় ১০০০ কোটি ডলার। একই সময়ে শ্রীলংকা অর্জন করেছে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। নেপালের রেমিটেন্স প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় সাড়ে ৬ শত কোটি ডলার। থাইল্যান্ডের প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। জাপানের প্রায় সাড়ে চারশত কোটি ডলার। মিয়ানমারের প্রায় সাড়ে তিনশত কোটি ডলার। মালয়েশিয়ার প্রায় দেড়শত কোটি ডলার। স্টেটসম্যান আরো লিখেছে, এশিয়ার দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। কারণ, ওই এলাকা দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য। বিশ্বব্যাপী ২০ কোটিরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক তাদের দেশের বাইরে গিয়ে অবস্থান করছেন এবং কাজ করছেন। তাদের পাঠানো রেমিটেন্স অর্থনীতির বড় ফ্যাক্টর।

বছরজুড়ে আলোচনায় গুম, অপহরণ by রোকনুজ্জামান পিয়াস

নিখোঁজ, গুম, অপহরণ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক কেউই বাদ যাননি গুম তালিকা থেকে। ভিকটিমরা নিখোঁজ- গুম নাকি অপহরণের শিকার এ নিয়েও চলেছে বিতর্ক। তালিকায় স্থান পাওয়া কেউ ফিরে এসেছেন নীরবে, কারও ফেরা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। তবে না ফেরার তালিকাটাই দীর্ঘ। এদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়েও সন্তুষ্ট নন গুম বা অপহরণ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার।
বিদায়ী বছরে কোনো মাসে একজন আবার কোন মাসে একাধিক ব্যক্তি গুম, অপহরণের শিকার হয়েছেন। এদের কাউকে তুলে নেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে, কেউ হঠাৎ করেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন স্বজনদের কাছ থেকে। এসব নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, রাজনীতির বিরোধীপক্ষ মাঝেমাঝে সরব হলেও আদতে তার তেমন প্রভাব পড়েনি। একটি ঘটনা ভুলতে বসার আগেই ঘটেছে আরেকটি ঘটনা। তবে বছরের শেষের দিকে এসে এসব অপহরণ বা গুমের ঘটনা বেশি ঘটেছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএমবিএস) তথ্যমতে, ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ২০৯টি। এর মধ্যে ১৬৭ জন পুরুষ, ৩১ জন নারী এবং ১১ জন শিশু অপহরণের শিকার হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এই সময়ে নিখোঁজ হয়েছে ১১৬ জন নারী-পুরুষ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেয়া তথ্যমতে, গত ১০ বছরে এ ধরনের ৫৪৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন যার মধ্যে ৩৯৫ জনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নিখোঁজ হয়েছেন ৫০ জন, যাদের ৩৮ জনের খোঁজ মেলেনি। তবে নিখোঁজ কিংবা অপহরণের শিকার কারও জন্যই কোনো ধরনের মুক্তিপণ চাওয়া হয়নি। এদিকে সরকারের বিরোধী পক্ষ বিএনপির অভিযোগ বর্তমান সরকারের আমলে তাদের ৭৪৭ জন নেতাকর্মী অপহৃত হয়েছেন। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম খান আলমগীর দাবি করেছেন, এর মধ্যে সরাসরি ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে খুন’ হয়েছেন ৫২০ জন, ১৫৭ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বিপুল সংখ্যক এই গুম-অপহরণের মধ্যে কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ পেয়েছে। যাদের কেউ কেউ ফিরেও এসেছেন।
চলতি বছরের ৩রা জুলাই ভোর সাড়ে ৫টায় নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ফরহাদ মজহার। নিখোঁজের পর তাকে অপহরণের অভিযোগ করে তার পরিবার। তবে সেদিন সন্ধ্যায় ফরহাদ মজহারকে খুলনার হানিফ পরিবহনের একটি বাস থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের পর শুরু হয় নানা বিতর্ক। দীর্ঘ ১০ দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ জানায়, ফরহাদ মজহার স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছিলেন। এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক এ ঘটনাকে ‘নাটক’, ‘মিথ্যাচার’, ‘সাজানো গল্প’ বলে উল্লেখ করেন। আইজিপি দাবি করেন ‘ফরহাদ মজহার স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছেন, সরকারকে বিব্রত করার জন্য। আর ‘মিথ্যা নাটক’ সাজানোর দায়ে সমপ্রতি ফরহাদ মজহার দম্পতির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মামলার অনুমতি দিয়েছেন ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত। আদালতের সিদ্ধান্ত দেখে রহস্যজনক অপহরণ ঘটনার পাঁচ মাস পর অবশেষে ৯ই ডিসেম্বর মুখ খোলেন ফরহাদ মজহার। নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি নাটক করিনি, আমাকে যা বলা হয়েছে, তাই করেছি।
২২শে আগস্ট মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় বনানী ওভারপাসের নিচে একটি মাইক্রোবাসে থাকা বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী সৈয়দ সাদাত আহমেদ ও তার ছেলের পথরোধ করে অন্য আরেকটি মাইক্রোবাস। এরপর সেই মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন নেমে সাদাতকে  জোর করে নামিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়। মাইক্রোবাসের একজন এসে সাদাতের গাড়ির চালকের আসনে বসেন। দু’টি গাড়ি কুড়িল বিশ্বরোডের তিন শ’ ফুট রাস্তা দিয়ে পূর্বাচলে গিয়ে থামে। সাদাতের গাড়িতে ওই সময়ও তার ছেলে মেহেদি ও কেয়ারটেকার ছিলেন। পরে পূর্বাচলে সাদাতের গাড়ি থেকে ওই ব্যক্তি নেমে যান। সাদাত ১৫ মিনিট পর ফিরে আসবেন বলে তার ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন। তবে তখন থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন তার স্ত্রী। মামলা করা হলেও গত চার মাসে কেউ ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করেনি। খোঁজও মেলেনি। গত ২৩শে আগস্ট থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় আইএফআইসি ব্যাংকের কর্পোরেট কমিউনিকেশন ও ব্রান্ডিং বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম আহমেদের। তার পরিচিতজনরা বলেছেন, শামীম আইএফআইসি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে থেকে ‘খানাবাসমতি’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে খাওয়ার উদ্দেশে বের হন। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। এ ঘটনার পরদিন পল্টন মডেল থানায় জিডি করেন তার স্ত্রী শিল্পী আহমেদ। তবে হঠাৎ করেই সাতদিন পর ৩০শে আগস্ট অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফেরেন শামীম। অন্যদের মতো তিনিও নিখোঁজের বিষয়ে সাংবাদিক কিংবা পুলিশকে কিছুই বলেননি।
গত ২৬শে আগস্ট সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে খেতে ধানমন্ডির স্টার কাবাবে গিয়েছিলেন কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ (২০)। খাওয়া শেষে আর বাসায় ফেরেননি। এখনও নিখোঁজই রয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ছুটি কাটাতে ঢাকায় এসেছিলেন। এ ঘটনায় তার বাবা জামালউদ্দিন আহমেদ ধানমন্ডি থানায় একটি জিডি করেন। সিসিটিভির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, স্টার কাবাব থেকে চার বন্ধু বের হয়ে যান। এরপর দুই বন্ধু একদিকে এবং ইশরাক ও আরেক বন্ধু আরেক দিকে চলে যান। এরপর ইশরাকের সঙ্গের বন্ধু তাকে রেখে অন্যদিকে চলে যান। তখন থেকে ইশরাক নিখোঁজ।
ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায়কে গত ২৭শে আগস্ট বিকালে গুলশানের ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয়। এ সময় তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক সঙ্গে ছিলেন। চালক বিষয়টি তার পরিবারের সদস্যদের অবহিত করেন। পরে গুলশান থানায় একটি জিডি করেন তার ভাগ্নে কল্লোল হাজরা। তবে আকস্মিকভাবে কোনো পুলিশি সহায়তা ছাড়া অপহরণের ৭৯ দিনের মাথায় অজ্ঞাত স্থান থেকে বাড়ি ফেরেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বললেও একটি খোলা চিঠি পাঠান গণমাধ্যমে। এতে তিনি উল্লেখ করেন, তার অনুপস্থিতিতে তার অফিস থেকে জরুরি নথিপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও অপহরণ করার পর তার সব সম্পত্তি লিখে দেয়ার জন্য নানাভাবে চাপ দেয়া হয়। তবে তিনি কোথায় ছিলেন এবং কীভাবে ফিরেছেন এ বিষয়টি এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।
২০১৭ সালের ২৭শে আগস্ট ২০ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এমএম আমিনুর রহমান নিখোঁজ হন। এদিন রাজধানীর নয়াপল্টন থেকে সাভারের আমিনবাজার পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের পাশে তার নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর বাড়ি ফেরেননি তিনি। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পায়নি স্বজনরা। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিলো। এ ঘটনায় পল্টন থানায় সাধারণ ডায়েরি করে তার পরিবার। চার মাস নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২২শে ডিসেম্বর গুলশান থেকে তকে গ্রেপ্তার করা হয়। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের ওপর হামলা চেষ্টার অভিযোগে গুলশান থানায় দায়ের হওয়া নাশকতার একটি পুরোনো মামলায় ঢাকা মহানগর আমিনুর রহমানকে গ্রেপ্তার দেখায়। তবে এতদিন কোথায়, কিভাবে ছিলেন তিনি তা রহস্যই থেকে গেছে।
গত ১০ই অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে হঠাৎ নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গিয়েছিলেন পূর্ব-পশ্চিমবিডিডটকম এর সিনিয়র রিপোর্টার উৎপল দাস। নিখোঁজের দিন দুপুরে সর্বশেষ মায়ের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কথা হয়। এরপর থেকেই মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি জিডি করেন উৎপলের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস। গত ১৯শে ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভুলতা এলাকায় তাকে পাওয়া যায়। প্রথমে তিনি বলেছিলেন, ঘুরতে গিয়েছিলেন, পরে স্বীকার করেন তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার কাছ থেকেও স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত ৭ই নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাস নিয়ে রাজধানীর আইডিবি ভবনে একটি মিটিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য রওনা হয়েছিলেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার। কিন্তু মিটিংয়ে আর উপস্থিত হতে পারেননি। সেই থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। কিন্তু গত ২১শে ডিসেম্বর রাত ১টার দিকে রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর জে-ব্লকের ১২/৩ সড়কের বাসা ২৫নং নিজের বাসায় ফিরে আসেন এই শিক্ষক। তার বক্তব্যও রহস্যাবৃত।
এ মাসের ৪ঠা ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে কাতার ও ভিয়েতনামে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান তার বেলজিয়াম ফেরত মেয়েকে আনতে এয়ারপোর্র্টের উদ্দেশ্যে বের হন। তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর মারুফ জামান বাসার ল্যান্ডফোনে জানান, তিনজন লোক তার ল্যাপটপ নিতে আসবে। কথামতো তারা বাসায় এসে নিয়ে যায়। কিন্তু তার খোঁজ আর পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানায়, তার কাছে থাকা মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে সর্বশেষ লোকেশন ছিলো বিমানবন্দরে কাছেই কাওলা নামক স্থানে। পরদিন রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকা থেকে তার গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা সোহেল বলেন, গুম-অপহরণের ফলে জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। বেশির ভাগ ঘটনায় অভিযোগের তীর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে যায়। অনেক সময় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তির বিরোধের জের ধরেও এমন ঘটনা ঘটে। এতে সরকারও বিপাকে পড়ে। উভয় ক্ষেত্রেই সরকারকে সচেতনভাবে দায়িত্ব নেয়া উচিত।