Friday, April 26, 2019

আপনারা বিদায় হোন -আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা ত্রাণকর্মীসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মিয়ানমারে যেতে বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন। জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ তিন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে যৌথ বৈঠকের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘আমি তাদের বলেছি আপনাদের এখানে কাজ নাই, মিয়ানমারে যান। আমি বেশ শক্তভাবে বলেছি। আপনারা ওখানে বেশি জোর দেন, এখানে না। আমি জিজ্ঞাসা করেছি আপনারা কতবার মিয়ানমার গেছেন? সেখানে আপনাদের কত লোক কাজ করে? এখানে তো হাজারেরও বেশি লোক কাজ করে, ওখানে বেশি কাজ করেন, আপনারা এখান থেকে বিদায় হোন।’ মন্ত্রী কোন রকম রাখঢাক না করে একাধিকবার বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি আপনারা মিয়ানমার যান, এখানে আপনাদের কোন কাজ নেই। এখানে আমরা ঠিক আছি। যা যা করার তা করছি, করতেছি।
আপনারা মিয়ানমারকে কনভিন্স করেন।
যাতে তারা তাদের লোক নিয়ে যায় এবং ওখানে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করেন।’ বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে সফররত জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রধান (হাইকমিশনার) ফিলিপো গ্রাান্ডি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম মহাপরিচালক অ্যান্টনিও ভিটোরিনো এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান। মন্ত্রীর দপ্তর সংলগ্ন অতিথি কক্ষে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ বৈঠক শেষে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। ১৩ মিনিটের ওই ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। কোনো রকম যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে, সমাধান তাদেরই করতে হবে। তিনি বলেন, আপনি শক্ত অবস্থানের কথা বলছেন, আপনি কি যুদ্ধ করতে যাবেন? না, আমরা যুদ্ধ করবো না। আমাকে পাওয়ারফুলদের কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন, যদি আমরা চাই তাহলে তারা সেখানে কিছু একটা মহড়া করে দেখাবেন। এই ‘পাওয়ারফুল’ কে? ব্যক্তি না দেশ? জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, দেশ। ব্যক্তি না। আমরা খুব একটা পাত্তা দেইনি। তারা বলেছেন তোমরা চাইলে আমরা তোমাদের হয়ে ক্ষমতা দেখাতে পারি। আমরা বলেছি না। কারণ আমরা শান্তিপূর্ণভাবে এ সমস্যার সমাধান চাই। এ সময় মন্ত্রী বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি আশাবাদী, মিয়ানমার এর আগে লোক নিয়ে গেছে। এবারও নেবে। তারা নেবে না এটা কখনও বলেনি। মিয়ানমারের মন্ত্রী এখানে এসেছেন, তিনি বলেছেন তারা তাদের লোক নিতে চান। আমরা তার কথায় বিশ্বাস রাখছি। তবে তাদের বলেছি, কয়েক জন নয়, লোক দেখানোর জন্য নয়। কয়েক লাখ নিলে আপত্তি নাই।
লোক মরলে দায় আপনাদের, বাংলাদেশের না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন সাফ জানিয়ে দিলেন, সরকার জোর করে কাউকে ভাষানচরে পাঠাবে না। তবে ভাষানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করতে না পারলে এবং আসন্ন বর্ষায় কক্সবাজারে ভূমিধসে কোনো সমস্যা হলে তার দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বহন করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, আবহাওয়া অফিস বলছে, এবার বেশি বৃষ্টিপাত হবে। এতে পাহাড়ধস হলে মানুষ মারা যাবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় কেউ মারা গেলে বাংলাদেশের কোনো দায় থাকবে না। যারা বাঁধা দিচ্ছে, তারাই এ মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন। এ সময় মন্ত্রী আরও বলেন, ভাষানচরে রোহিঙ্গারা গেলে অর্থনৈতিকভাবে কাজ করার সুবিধা পাবে।
মাছ ধরতে পারবে, গরু পালন করতে পারবে। ভাসানচরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়িঘর, আশ্রয় কেন্দ্র এবং অন্যান্য সুবিধাদি তৈরি করেছে সরকার। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় সরকার প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গাকে আপাতত কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে ভাষানচরে পূনর্বাসন করতে চায়। কিন্তু জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দুনিয়া, যারা রোহিঙ্গা সংকটের সূচনা থেকে বাংলাদেশের পাশে আছে, তাদের এতে এখনও সায় নেই। এ অবস্থায় আগামী বর্ষায় কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে এবং সেখানে প্রাণহানীর ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন সরকার। সফররত জাতিসংঘের ৩ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যারা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এই মুহুর্তে ঢাকায় রয়েছে।
শুক্রবার তারা কক্সবাজার যাচ্ছেন। সেখানকার পরিস্থিতি সরজমিনে দেখবেন। বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ কমানোর বিষয়ে তারা মন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেছেন। সরকারের তরফেও এ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের দিনে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপিও দুর্ভোগ লাঘবে লাখো রোহিঙ্গাকে ভাষানচরে অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরে সরকারের আন্তরিক ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী গতকাল তার বৈঠকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের বলেছেন, রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে ঝামেলা তৈরি করছে। স্থানীয় জনগণ খুব আপসেট যে এরা দিনে দিনে ঝামেলার সৃষ্টি করছে। মন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের বলেছি ওদের সংখ্যা এত যে তারা আমাদের বন-জঙ্গল সব উজাড় করে দিচ্ছে।
চাপ বাড়ানোর আহ্বান মন্ত্রীর: রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের তিন সংস্থার প্রধানকে বলেন, এতবড় সংস্থার প্রধান আপনারা। আপনারা চাইলে বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করতে পারেন। মন্ত্রী বলেন, আমার ধারণা জনমত তৈরি করতে পারলে সবচেয়ে বড় অত্যাচারী শাসকেরও পতন হয়।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বরতা চালিয়েছে বর্মী বাহিনী তার বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সেখানে শান্তি পূণঃপ্রতিষ্ঠা বিশেষ করে সেখানে থাকা এবং ফিরতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের মাঝে আস্থা বাড়াতে বেসামরিক লোকজনকে দিয়ে সেফ জোন করার প্রস্তাব পূনরুল্লেখ করেন মন্ত্রী। বলেন, আমরা চাই সেখানে একটি জোন হোক। সেটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেসামরিক লোকজন তত্ত্ববধান করবে। এতে মিয়ানমারও থাকবে। আসিয়ান দেশগুলোও থাকতে পারে। প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছি দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। আমরা তাদের এটাও বলেছি আপনাদের যে বন্ধুপ্রতিম দেশ যেমন- জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ বাড়ানো যায়।
মিয়ানমারের বেশিরভাগ ব্যবসা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে, জাপান সেখানে বিনিয়োগ করেই চলেছে, ব্যাংকিং চালায় সিঙ্গাপুর। আপনারা সেখানে চাপ দেন যাতে করে তারা মিয়ানমারকে চাপ দেয় তাদের লোককে ফেরত নেয়ার জন্য। মন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের বলেছি রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান জরুরি। তা না হলে সেখানে যে যুবকরা আছে তারা উগ্রবাদের পকেটে পরিণত হতে পারে। আর এখানে উগ্রবাদের পকেট হলে এটা গোটা অঞ্চলের জন্য খারাপ হবে। মন্ত্রী বলেন, উগ্রপন্থার ঝুঁকিতে পড়লে মিয়ানমারের দুঃখ আছে। সেখানে চীনের উদ্দেশ্যও সেটা সফল হবে না, অর্থনৈতিক কোনও কাজ হবে না। রাখাইনে বর্মী বর্বরতার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সেখানে যেসব সহিংস গোষ্ঠির অস্তিত্ব রয়েছে মর্মে খবর প্রকাশিত হয় তাদের অস্ত্র ও রসদের যোগান কোত্থেকে আসে তা খুজে বের করার তাগিদও দেন মন্ত্রী। বলেন, আমি তাদের বলেছি, কারা সেখানে অস্ত্র সরবরাহ করছে? সেটি খুঁজে বের করুন। যদি তা করা যায় তাহলে দুনিয়া জানতে পারবে কে বা কারা তাদের মদদ দিচ্ছে? এ সময় মন্ত্রী গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বলেন, বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে এবং বিভিন্ন তথ্য আমরা পাই।
কিন্তু মিডিয়াতে কখনো আসে না অস্ত্র কোন দেশের তৈরি, কোন কোম্পানির তৈরি বুলেটে বা শ্রাপনেলে লোকটা মারা গেছে! মন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি মিডিয়া যদি ওই অস্ত্র কোম্পানির নাম প্রকাশ করে তাহলে অস্ত্র সরবরাহকারী ধরা পড়বে, সন্ত্রাসও কমে যাবে।’ এ সময় রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুলিংয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের তাগিদ অস্বীকার বা অগ্রাহ্য না করে মন্ত্রী বলেন, আমরা জানি ওখানে অনেক বাচ্চা আছে এবং তাদের স্কুলিং হওয়া উচিত। কিন্তু তাদের তো মিয়ানমার ভাষা শিখাতে হবে। তাদের মিয়ানমারের ইতিহাস জানা উচিত। আমাদের এখানে এ ধরনের কোনও ব্যবস্থা নাই। সুতরাং তাদের দ্রুত ফেরত যাওয়া উচিৎ। মিয়ানমারকে তা বুঝতে হবে এই শিশুরা তাদের দেশের ভবিষ্যত। এ সময় আইনস্টাইনও শরনার্থী ছিলেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ওই বাচ্ছাদের এবং তাদের পরিবারগুলোকে মিয়ানমারের ফেরত নিয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ‘গতি’ নিয়ে অসন্তোষ, হাল ছাড়ছে না বিশ্বসম্প্রদায়: এদিকে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে গতকাল বৈঠকের পরই প্রথম গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ঢাকা সফরকারী জাতিসংঘের ৩ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দপ্তরের বাইরে উপস্থিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপে তারা প্রায় অভিন্ন ভাষায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে উদারতা দেখিয়ে চলেছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গতি কমে আসায় বিশেষ করে রাখাইনে কাঙ্খিত পরিবেশ সৃষ্টি এখনও না হওয়ায় খানিক হতাশা প্রকাশ করেন তারা। তবে এ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়ের যোগাযোগ বাড়ানো এবং দেশটির ওপর ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টির তাগিদও অনুভব করেন ওই তিন কর্মকর্তা। তারা জানান, তারা সফরের চেষ্টায় রয়েছে। একজন বলেন, শিগগির তিনি সফর করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তবে ওই ৩ কর্মকর্তা যেটা বলার চেষ্টা করেন তা হল- সমস্যাটা পুরনো। প্রায় ৩ দশক ধরে রাখাইনে অস্থিরতা চলছে। রোহিঙ্গারা বঞ্চনার শিকার। তাদের নাগরিক অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি  জটিল আকার ধারণ করেছে। বর্বরতার মুখে ২০১৭ সালের আগষ্টের পর প্রায় ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। চুক্তি হয়েছে, সমাধানের আশ্বাসও মিলেছে। তবে মিয়ানমারের কূটকৌশলে এখন পর্যন্ত প্রাপ্তির খাতা কার্যত শূন্য। কিন্তু তাতেও সমাধান সূত্র খুজে পেতে বাংলাদেশের সঙ্গে থেকে অব্যাহত ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এর অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ সফরে এসেছেন জাতিসংঘের তিনটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা। সফরের আজ সমাপনী দিন।
এ দিনে কক্সবাজার যাচ্ছেন তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে তারা তাদের বাংলাদেশ সফর এবং আগামী পরিকল্পনা শেয়ার করেছেন। সাক্ষাৎ শেষে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থার প্রধান মার্ক লোকোক বলেন, বাংলাদেশ যে উদারতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা সংগঠনের উচিত এ দেশকে সমর্থন এবং আরও ঘনিষ্ঠভাবে পাশে থাকা। আইওএম মহাপরিচালক এন্তোনিও ভিটোরিনো বলেন, আমরা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান যেমন দেখতে চাই, তেমনি ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগও কম দেখতে চাই। এ লক্ষ্যেই আমাদের সমস্ত প্রয়াস। ইউএনএইচসিআর প্রধান হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি বাস্তবায়নে গতি কম। এছাড়া রাখাইনে এখনও সেনাবাহিনীর অভিযান চলমান থাকায় জটিলতা কমছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নিলেন জাহিদ: তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে: ফখরুল

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন জাহিদুর রহমান। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে বিজয়ী হন তিনি। নির্বাচনে বিএনপির ৬ জন নির্বাচিতের মধ্যে তিনি একজন। বৈরী পরিবেশ, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে রাখাসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফলাফলসহ ৩০শে ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল। সেই সঙ্গে যৌথ সিদ্ধান্ত নেয় সংসদে না যাওয়ার। কিন্তু প্রথম সেই সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে গণফোরাম মনোনীত দুইজন। বিএনপির নির্বাচিতদের কয়েকজনও সংসদে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছেন গণমাধ্যমে। রাজধানীতে একটি হোটেলে বসে নিজেরা চা-চক্র করেছেন।
তাদের গতিপ্রকৃতি দেখে সম্প্রতি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ডেকে সতর্ক করেছেন।
জরুরি বৈঠক করে সংসদে না যাওয়ার ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির জাতীয় নির্ধারক ফোরাম। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ সে পথে হাঁটলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সবকিছুকে পাশকাটিয়ে, জল্পনা-কল্পনার পর, নানা নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে বিএনপির প্রথম এমপি হিসেবে একাদশ সংসদে যোগ দিলেন জাহিদুর রহমান। নির্বাচনের পর সংসদীয় রীতি অনুযায়ী শপথ নেয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে গতকাল দুপুরে বেশ গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে নিজ দপ্তরে তাকে শপথ পড়ান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। জাহিদুর রহমান শপথ নেয়ার পর তাকে গণদুষমন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। শিগগিরই সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর। এদিকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিতরা বারবার বলেছেন তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে এলাকাবাসী। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চাপের বিষয়টি সত্য হলেও চাপের ক্ষেত্র ভিন্ন।
নির্বাচিতদের ওপর রয়েছে নানামুখী চাপ। তবে সেটা এলাকার লোকজনের নয়, অন্য কোনোখানের। টোপও রয়েছে তাদের সামনে। বিএনপির নির্বাচিতরা সে চাপ এবং লোভ সামলাতে পারছেন না। রাজনীতিতে জাতীয় বেঈমান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ভয়, দলে সাংগঠনিক শাস্তি ও এলাকায় নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও তারা হাঁটছেন সংসদের পথে। জাহিদুর ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছেন সংসদে, অন্যরাও হচ্ছেন সে পথের যাত্রী। এখন পর্যন্ত সংসদে না যাওয়ার ব্যাপারে একজনই কেবল পরিস্কার অবস্থানে রয়েছেন। আর তিনি হচ্ছেন বগুড়া-৬ আসনে বিজয়ী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্বাচিত অন্য চারজনও গুনছেন অপেক্ষার প্রহর। তারাও শপথের ব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর জাহিদুর রহমান গণমাধ্যমকে সে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘মহাসচিব ছাড়া দলের বাকি সদস্যরাও শপথ নিতে পারেন। দেখি তাঁরা আসেন কি না।’ শপথ নিলেও গতকাল সংসদ অধিবেশনে যোগ দেননি তিনি। বলেছেন, ‘অন্যরা এলে একসঙ্গে যোগ দেব।’ তার এমন বক্তব্যে অনেকটাই পরিস্কার অন্যরাও প্রস্তুত। বিএনপির নির্বাচিতদের মধ্যে মহাসচিব ছাড়া বাকি চারজনের সঙ্গে গতকাল মানবজমিনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাদের বক্তব্যেও পাওয়া গেছে সংসদে যাওয়ার সুর।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিজয়ী দলের যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদ বলেছেন- ‘দলের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছি, এখনও সময় আছে’। দল তো সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছে, তাহলে নতুন কি সিদ্ধান্ত সেটা জানতে চাইলে হারুনুর রশীদ পরে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। অন্যদিকে কয়েকবার চেষ্টা করেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিজয়ী আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ব্রাহ্মনবাড়িয়া-২ আসন থেকে বিজয়ী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা উকিল আবদুস সাত্তার বলেন- ‘দলের সিদ্ধান্তের জন্য তো অপেক্ষা করেছি, কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না। এলাকাবাসীর চাপও বাড়ছে।’ এলাকাবাসীর চাপে শেষপর্যন্ত সংসদে যাবেন কিনা জানতে চাইলে প্রবীণ এই নেতা বলেন- ‘হতে পারে, দোয়া করবেন।’ শপথ গ্রহনের ব্যাপারে বগুড়া-৪ আসন থেকে বিজয়ী মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘জনগনের চাপ আছে সংসদে যাওয়ার। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত আছে সংসদে না যাওয়ার। এখন দলের সিদ্ধান্তই মানতে হবে।’ জাহিদুর রহমানের শপথের পর প্রশ্ন উঠেছে- বিএনপি কি আদৌ বাকিদের শপথ গ্রহণ নেয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে?
জাহিদুরের পর কে?
সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী ৩০শে এপ্রিলের মধ্যে তাদের শপথ নিতে হবে। কারণ কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী নির্বাচনে বিজয়ী কোন সংসদ সদস্য ওই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে তার আসন শূন্য হবে। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন গত ৩০ জানুয়ারি শুরু হয়। সেই হিসেবে শপথ না নিলে ৩০ এপ্রিলের পর তাদের আসন শুন্য হবে। তবে এই সময়ের মধ্যে বিএনপি’র আরো দুই জন শপথ নিতে পারেন। তারা হলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল হক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের মো. হারুনুর রশীদ। শপথের বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে খোঁজ-খবর নেয়া হয়েছে। সংসদ সচিবালয় জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেই জাহিদুর রহমান শপথ নেয়ার বিষয়ে তার আগ্রহের কথা জানিয়ে স্পিকারের নিকট চিঠি লেখেন। এরপর শপথ গ্রহণের জন্য তাকে সংসদে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বেলা ১১টার আগে সংসদে এসে স্পিকারের দপ্তরে বসেন জাহিদুর রহমান। দুপুর ১২টায় তাকে শপথ পড়ান স্পিকার। শপথ নিয়ে নিয়মমাফিক সংসদ সচিবের কক্ষে গিয়ে স্বাক্ষর বইতে সই করেন। পরে সংসদের নিচতলায় সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচয়পত্র নেন। সেখান থেকে বেরিয়ে অপেক্ষারত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
জাহিদকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে: ফখরুল
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাহিদুর রহমান এমপি হিসেবে শপথ নেয়ায় তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইমলাম আলমগীর। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দলের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, শপথ গ্রহণ না করা। এই সিদ্ধান্তকে অমান্য করে যদি কেউ শপথ গ্রহণ করে থাকেন, তা নিঃসন্দেহে সাংগঠনিক অপরাধ। অবশ্যই এরকম ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুতই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা স্পষ্ট করেননি বিএনপি মহাসচিব।
তারা গণদুষমন, সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে: গয়েশ্বর
দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেয়ায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, জাহিদের শপথের বিষয়টি জাতীয় প্রেসক্লাবে বসে শুনলাম। এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং দল এটা দেখবে। নেত্রীকে কারাগারে রেখে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে শপথ নিচ্ছেন বা নেবেন, তারা গণদুশমন। জনগণই তাদের বিচার করবে। সাংগঠনিকভাবে যা ব্যবস্থা নেয়ার, তাই করা হবে। দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে বহিষ্কার করা হতে পারে। অথবা সরাসরি বহিষ্কারও করা হতে পারে। গণমাধ্যমবিরোধী কালো আইন বাতিল, সাংবাদিক হত্যার বিচার, বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়া এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক এসোসিয়েশন আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি একথা বলেন। অন্যদের ব্যাপারে গয়েশ্বর রায় বলেন, তাঁরা দল করেন।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তাঁরা দলীয় সিদ্ধান্ত মানবেন। একজন ব্যক্তি যদি দলের সিদ্ধান্ত না মানেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক যে নিয়ম আছে, তা কার্যকর করা হবে। আমরা এই শপথ গ্রহণে ক্লান্তও নই, ভীতও নই। গয়েশ্বর বলেন, আজকে সাংবাদিকরা একটা কথা জানতে চান, জাহিদ হোসেন দাবিদার তিনি পাস করেছেন। ধানের শীষ থেকে পাস করে তিনি আজ শপথ গ্রহণ করছেন। জনগণের সঙ্গে যিনি থাকতে পারেন না তিনি কোথায় শপথ নিলেন আর না নিলেন এটা বিবেচনার বিষয় না। ১৬ কোটি মানুষ ভোট দিতে পারেননি। যারা আওয়ামী লীগ করে তাদের ৫ শতাংশ লোকও ভোট দিতে পারেনি। একথা আমার না, আপনাদের সকলের কথা। গয়েশ্বর রায় বলেন, ৩০০ আসনের কেউ নির্বাচিত না। এই ৩০০ জনও যদি এক জায়গায় এসে চিৎকার করে বলে আমরা নির্বাচিত তাতেও তো নির্বাচিত হয় না। বরং জনগণ তাদের যে থুথু মারবে, সেই থুথুর ঢলে তারা ভেসে যাবে। সেইদিনই তারা বুঝতে পারবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার পরিণতি কি?
নেত্রীর মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারে দাবি তুলব সংসদে: জাহিদুর
শপথ গ্রহণ শেষে বিএনপি নেতা জাহিদুর রহমান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের জানান, জনগণের চাপে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই শপথ নিতে বাধ্য হয়েছেন। সংসদে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও এলাকাবাসী দাবি নিয়ে কথা বলতে চান। একই সঙ্গে এলাকার হাজার হাজার নিরপরাধ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাবেন। জাহিদুর বলেন, আমি সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে বলব- আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যা মামলা হয়েছে। আপনি এগুলো দেখেন। এগুলোর বাদী পুলিশ।
পুলিশ যা করেছে সব মিথ্যা মামলা করেছে। আপনার লোক কোন মামলা করেনি। গণতন্ত্রের স্বার্থে সেসব মামলা প্রত্যাহার করা হবে বলে আমি আশাকরি। জাহিদুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে মাঠে লড়াই করেছি। আমি এবার নিয়ে চতুর্থবার নির্বাচন করলাম। এই আসনটি আমাদের বিএনপির ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনটি আওয়ামী লীগের। এই প্রথম বিএনপি বিজয়ী হয়েছে। ধানের শীষের জন্মের পর আমিই প্রথম জিতলাম। তাই এলাকার ৯৫ শতাংশ মানুষ আমার শপথ নেয়ার পক্ষে। তিনি বলেন, আমার নেত্রী একজন বয়স্ক নারী, ৭৩ বছর বয়স। উনাকে যেন গণতন্ত্রের স্বার্থে মুক্ত করে দেয়া হয়, সংসদে এই আহ্বান জানাব। এটাই আমার এমপি হিসেবে প্রথম অঙ্গিকার।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই শপথ দলের সিদ্ধান্তের বাইরেই। আমি দীর্ঘদিন তো অপেক্ষা করলাম। যেহেতু এমপি নির্বাচিত হয়েছি, এলাকার মানুষের প্রচন্ড চাপ। গত ১৫ দিন ধরে ঢাকায় আছি। এলাকার মানুষের একটাই বক্তব্য, শপথ নিয়ে ফিরে আসেন। শপথ গ্রহণের আগে দলের কোনো পর্যায়ে কথা হয়েছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন- না, আগে বলেছি। দেখাও করেছি। কোনো প্রকারে সম্মতি দেয়নি। দল থেকে বহিষ্কার হবেন কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বিষয়ে দল যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। দল যদি মনে করে বহিষ্কার করবে, করতেই পারে। তবে বহিষ্কার করলেও কিন্তু আমি দলে আছি। আমি এই দলের একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী।
সেই ছাত্রজীবন থেকে দীর্ঘ ৩৮ বছর এই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কাজেই বিএনপি আমাকে বহিষ্কার করলেও আমি তো বিএনপি থেকে বহিষ্কার হবো না। আমি বিএনপি’র সঙ্গে আছি-থাকবো। জাহিদুর রহমান বলেন, এমনিতে আমার আর নির্বাচন করার ইচ্ছা নেই। আমি ক্লান্ত। ১৯৯১ সাল থেকেই তো নির্বাচন করে যাচ্ছি। চারবার সংসদ নির্বাচন ও একবার পৌর নির্বাচন। বাপের টাকায় রাজনীতি করি। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা আছে। মামলা চালানোর টাকা তো দল দেয় না। আমাদেরই দিতে হয়। শপথ নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জাহিদুর রহমান বলেন, আমি মনে করি শপথ নেয়া উচিত। কারণ আমাদের নেত্রী কারাগারে। তিনি অসুস্থ। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা চলছে, তারা জেলে আছে। বাইরে থেকে কিছুই হচ্ছে না। সুতরাং বাইরে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে ভেতরেই যাই, অন্তত চিৎকার করে কথা তো বলতে পারবো।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলেও পরিণতি স্পষ্ট নয় সংবিধানে: উল্লেখ্য, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তবে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সুলতান মনসুর, মোকাব্বির খান ও জাহিদুর রহমান দল থেকে পদত্যাগ করেননি। সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার সুযোগও তাদের নেই। তাই তাঁরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে যোগ দিলে এবং ওই অবস্থায় দল তাঁদের বহিষ্কার করলে পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। কিন্তু গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে হলে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থাকতে হবে।
শপথ নেয়ায় জাহিদকে আওয়ামী লীগের অভিনন্দন: এমপি হিসেবে শপথ নিয়ে জাহিদুর রহমান বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে তিরস্কৃত হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে অভিনন্দন পেয়েছেন। একাদশ সংসদে বিএনপির প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে জাহিদ গতকাল শপথ নেয়ার পর তাকে অভিনন্দন জানান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ। বিরোধী দলের এমপির শপথ নেয়ার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা বারবার বলে আসছি- ভোটারদের দায়বদ্ধতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আপনারা শপথ গ্রহণ করুন। জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে সংসদে আসার জন্য, সেই দায়বদ্ধতা থেকে শপথ নেয়া উচিত। আজকে বিএনপির এমপি জাহিদুর রহমান শপথ নিয়েছেন, তাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করি, বাকিরাও খুব শিগগিরই শপথ নেবেন।’

বিদেশ ফেরত তরুণদের ওপর নজরদারি: ৪৫ জনের তালিকা by দীন ইসলাম

ভিনদেশি পাসপোর্টধারি বিদেশ ফেরত বাংলাদেশিদের নজরদারীতে আনতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে এ নির্দেশনা দেশের সব বিমানবন্দর, স্থলবন্দরগুলোতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে  বাংলাদেশ থেকে নিখোঁজ হওয়া ৪৫ জনের তালিকা বন্দরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। সূত্রমতে, সরকারের তরফ থেকে এসব নির্দেশনা পৌঁছার পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষগুলো এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট ও শোলাকিয়া ঈদগাহে হামলায় বিদেশে পড়ুয়া বাংলাদেশের তরুণদের জড়িত থাকার ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই বিমানবন্দরগুলোতে বাংলাদেশি ছাত্র ও তরুণদের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়।
কারণ সরকারের সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে খবর রয়েছে, ইংরেজি মাধ্যমে পড়া এবং এরপর উচ্চ শিক্ষার্থে বাংলাদেশের তরুণরা কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পড়তে যাওয়ার পর সে দেশের নাগরিকত্ব পান। এরপর তাদের মধ্যে কেউ কেউ জঙ্গিবাদমূলক নানা কাজে জড়িয়ে পড়ে। তখন উন্নত দেশের পাসপোর্ট নিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন তারা পোর্ট এন্ট্রি ভিসা নিয়ে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে পড়তে গিয়ে ভিনদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ফিরছেন এমন ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
তাই ভিনদেশি পাসপোর্টে তরুণদের পোর্ট এন্ট্রি ভিসা দেয়ার সময় কর্মকর্তারা তার আদ্যোপান্ত যাচাই বাছাই করছেন। এরপর সন্তুষ্ট হলে তবেই ওই সব তরুণদের পোর্ট এন্ট্রি ভিসা দিচ্ছেন। তুরস্কসহ মধ্য প্রাচ্যের কয়েকটি দেশের বিমানবন্দর দিয়ে যেসব বাংলাদেশি তরুণরা যাতায়াত করছেন তাদের উপর নজরদারি করা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে তুরস্কগামীদের ওপর বাড়তি গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যারা তুরস্ক থেকে বাংলাদেশে আসছেন তাদের ওপরও গোয়েন্দারা নজর রাখছেন। ‘বাংলাদেশি জিহাদি গ্রুপ’ নামে একটি উগ্রপন্থী সংগঠনের অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম দেখার পরই এ নির্দেশনা দেয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক বাংলাদেশি তরুণ আফগানিস্তান, পাকিস্তানে গিয়ে উগ্রপন্থিদের হয়ে যুদ্ধ করেছেন।
এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দেশে ফেরত আসেন। অনেকে বিদেশে গিয়ে ধরা পড়েন। কেউ সেখানে নিহত হন। যারা ফিরেছেন তাদেরকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যারা এখনও ফেরেননি তাদের সংখ্যা ৪৫ জন। বাড়িতে না ফেরা তরুণদের তালিকা তৈরি করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও র‌্যাব। এরই মধ্যে কাউন্টার টেরোরিজম তাদের তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠিয়ে দিয়েছে। গত রোববার শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় এ পর্যন্ত ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ হামলায় শ্রীলঙ্কার স্থানীয়রা অংশ নেয় যাদের কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষিত এবং বিদেশে পড়াশোনা করেছে। ওই ঘটনার পর বাংলাদেশের গোয়েন্দারা নজরদারি তৎপরতা আরও বাড়িয়েছেন। সার্বিক বিষয়ে সতর্ক থাকতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

দেশেও সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা চলছে -প্রধানমন্ত্রী

শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলা চালানোর চেষ্টা চলছে মন্তব্য করে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী রুটে বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ সতর্ক বার্তা দেন। ভিডিও কনফারেন্সের অপরপ্রান্তে রাজশাহীতে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে গত রোববার ইস্টার সানডের দিনে শ্রীলঙ্কার রাজধানীর কয়েকটি গীর্জা  ও  হোটেলে একযোগে বোমা হামলার প্রসঙ্গ তোলেন। ওই হামলায় এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা সাড়ে তিনশ’ ছাড়িয়ে গেছে। নিহতদের মধ্যে শেখ হাসিনার ফুপাত ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিমের আট বছর বয়সী নাতি জায়ান চৌধুরীও রয়েছে। আহত হয়েছেন জায়ানের বাবা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে জঙ্গিবাদ শুধু বাংলাদেশে না, বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা। মাত্র কয়েকদিন আগেই শ্রীলঙ্কায় যে ঘটনা ঘটেছে সেখানেও আমরা বাংলাদেশের কয়েকজনকে হারিয়েছি।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্য অনেকগুলো শিশু সেখানে মারা যায়। সেখানে বাংলাদেশের শিশু জায়ানকে আমাদের হারাতে হয়েছে এই জঙ্গি সন্ত্রাসের কারণে, এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে। বাংলাদেশেও এই ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যথেষ্ট সর্তকতা অবলম্বন করে যাচ্ছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দেশবাসীকে আহ্বান জানাবো, এই ধরনের সন্ত্রাস জঙ্গিবাদের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত থাকবে, কে কোথায় এই ধরনের সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে সঙ্গে লিপ্ত সেটা শুধু আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা না, দেশবাসীকেও সতর্ক থাকতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে হবে।’
বনলতা উদ্বোধনের কারণ উল্লেখ করে রসিকতার ছলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা পবিত্র ঈদ এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে রাজশাহীর আমকে মাথায় রেখে বনলতা ট্রেনের উদ্বোধন করলাম।
ইসলামকে শান্তির ধর্ম উল্লেখ করে শেখ হাসিনা মসজিদে মসজিদে জুমার খুতবায় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রসবাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার আহ্বান জানান। এছাড়াও অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সব ধর্মের শিক্ষা গুরুদেরকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রেলের উন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সারাদেশে রেল নেটওয়ার্ক চালু করতে চাই। রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগটা আরও উন্নত করে দিতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শেষে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বাঁশি বাজিয়ে রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী রুটের বনলতা ট্রেনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
রেলের পশ্চিমাঞ্চল মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খোন্দকার শহিদুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, আগামী ২৭শে এপ্রিল থেকে বনলতা এক্সপ্রেস ঢাকা-রাজশাহী রুটে নিয়মিত চলাচল করবে। বনলতা এক্সপ্রেসের বগি নতুন হলেও ইঞ্জিন পুরাতন। ২০১৩ সালে ভারত থেকে আমদানি করা ইঞ্জিন দিয়ে চলাচল করবে ট্রেনটি। ঘণ্টায় ট্রেনটির সর্ব্বোচ্চ গতি থাকবে ৯০ থেকে ৯৫ কিলোমিটার।
পশ্চিমাঞ্চল রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বনলতা এক্সপ্রেসে থাকছে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা ১২টি নতুন বগি। এর মধ্যে শোভন চেয়ারের বগি ৭টি, যার আসন সংখ্যা ৬৬৪। এসি বগি ২টি, যার আসন সংখ্যা ১৬০। ১৬ আসনের একটি পাওয়ার কার। দুটি গার্ড বেরাকের আসন সংখ্যা ১০৮। সবমিলিয়ে আসন সংখ্যা ৯৪৮। তবে যাত্রীদের জন্য আসন সংখ্যা ৯২৮টি।
এছাড়া একটি খাবারের বগিও থাকছে। ট্রেনটিতে রয়েছে উড়োজাহাজের মতো বায়োটয়লেট। থাকছে রিক্লেনার চেয়ার, ওয়াইফাই সুবিধা। প্রতিটি বগিতে রয়েছে এলইডি ডিসপ্লে, যার মাধ্যমে  স্টেশন ও ভ্রমণের তথ্য প্রদর্শন করা হবে।
রাজশাহী থেকে ঢাকায় পৌঁছতে ট্রেনটির সময় লাগবে ৪ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। সপ্তাহের শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৭টায় ট্রেনটি রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। আবার দুপুর দেড়টায়  ট্রেনটি ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। বনলতা এক্সপ্রেস উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ইনস্টিটিউট ও স্থাপনার উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অপরপ্রান্তে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- সংসদ সদস্য ডা. মনসুর রহমান, সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার নুর-উর-রহমান, রাজশাহী  রেঞ্জের ডিআইজি একেএম হাফিজ আক্তার, পুলিশ কমিশনার হুমায়ন কবির, জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের, পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ, পশ্চিমাঞ্চল রেলের জিএম খোন্দকার শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

শ্রীলঙ্কায় হামলার আশঙ্কা, মসজিদ বা গির্জায় প্রার্থনা না করার আহ্বান

ইস্টার সানডে’তে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধ নিতে সহিংস হামলা হতে পারে এবং স্টেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেসের (এসআইএস) সতর্কতা রয়েছে, গাড়িবোমা হামলা হতে পারে শ্রীলঙ্কায়। এমন আশঙ্কায় শুক্রবারের নামাজ বা প্রার্থনা করতে মসজিদ বা গির্জায় না যেতে নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে।
এতে বলা হয়, শ্রীলঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তার নাগরিকদের উপাসনালয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। ধর্মীয় স্থানগুলোকে টার্গেট করে আরো হামলা হতে পারে কর্তৃপক্ষের এমন সতর্কতার পরে এ হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।
শুক্রবার সেনাবাহিনী বলেছে, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তল্লাশি অভিযান চালানোর জন্য দেশজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার সেনা সদস্য। এরই মধ্যে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কায় অনেক মুসলিম তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। বোমা হামলার হুমকি, অবরুদ্ধ হয়ে পড়া এবং নিরাপত্তার অভাবের কারণে এমনটা ঘটছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কায় মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সংগঠন অল সাইলন জমিয়তুল উলেমা মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে শুক্রবারের নামাজ বাসায় আদায় করতে। পারিবারিক ও সহায় সম্পদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে এমন আহ্বান জানানো হয়েছে।
ওদিকে পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত গির্জায় ধর্মীয় প্রার্থনা সভা না করতে যাজকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কার্ডিনাল ম্যালকম রঞ্জিত। তিনি বলেছেন, নিরাপত্তা হলো গুরুত্বপূর্ণ।
ওদিকে রোববারের হামলার তদন্ত করতে কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৬ জনকে আটক করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন সিরীয় এবং মিশরীয় নাগরিক। এরই মধ্যে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট। যদিও তারা দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি। যদি তাদের দাবি সত্যি হয় তাহলে ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে এটাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় হামলা। ওদিকে কর্তৃপক্ষ স্থানীয় দুটি সংগঠন ন্যাশনাল তাওহীদ জামায়াত ও জমিয়তুল মিল্লাত ইব্রাহিমের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগসূত্র থাকার তথ্য খুঁজেছে। সরকার মনে করছে তারাই শ্রীরঙ্কায় ওই হামলা চালিয়েছে।

গোয়েন্দা তৎপরতায় ত্রুটি থাকার কথা স্বীকার শ্রীলঙ্কার

ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় গোয়েন্দা তৎপরতার ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকার কথা স্বীকার করেছে শ্রীলঙ্কা। গত রোববার দেশটির তিনটি গির্জা, তিনটি হোটেল ও কয়েকটি এলাকায় বোমা হামলায় ৩৫৯ জন নিহত হন। আহত ৫০০ জনের বেশি।
বৃহস্পতিবার বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, এই মাসের শুরুতেই হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ভারতের একটি গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কাকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা–সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সেভাবে আলোচনা হয়নি। পার্লামেন্টেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দায় নিতে হবে। যদি গোয়েন্দা তথ্য সঠিক লোকজনের কাছে পৌঁছানো যেত, তাহলে এই হামলা এড়ানো যেত বা ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত।’
পার্লামেন্ট নেতা লক্ষ্মণ কিরিয়েলা বলেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য হামলা নিয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি। পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শীর্ষ কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে গোয়েন্দা তথ্য গোপন করেছিলেন। তথ্য হাতে ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা কর্মকর্তারা যথাযথ পদক্ষেপ নেননি।
পার্লামেন্ট নেতা লক্ষ্মণ কিরিয়েলা বলেন, ৪ এপ্রিল ভারতের সতর্কতার তথ্য এসে পৌঁছায়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী কেউই তা গ্রহণ করেননি।
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে বরখাস্ত করার পদক্ষেপ নিয়েছেন।
নয়জন হামলাকারীর মধ্যে আটজন শ্রীলঙ্কার নাগরিক বলে শনাক্ত হয়েছে। হামলায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) জড়িত কি না, তা নিয়ে তদন্ত করছে শ্রীলঙ্কার সরকার। প্রকাশিত হয়েছে যে হামলাকারীদের একজন যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেছেন।
হামলার পর গত মঙ্গলবার আইএস দায় স্বীকার করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে একজনের মুখ খোলা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি হাশিম। ভিডিওতে দেখা যায়, দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হাশিম। তাঁরা আইএসপ্রধান আবু বকর আল বাগদাদির অনুসারী। শ্রীলঙ্কার সরকারও ইতিমধ্যে তাঁকে হাশিম হিসেবেই অভিহিত করেছে। তবে তারা এই কথা সরাসরি বলেনি। ধারণা করা হচ্ছে, এই হাশিম দেশটির উগ্রপন্থী ইসলামি গোষ্ঠী ন্যাশনাল তৌহিদ জামায়াতের (এনটিজে) নেতা। তিনি এই হামলার প্রধান সন্দেহভাজন।
হাশিমের বোন মোহাম্মদ হাশিম মাদানিয়া বিবিসিকে জানান, গণমাধ্যম থেকে তিনি হাশিমের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেনেছেন। তিনি বলেন, ‘ভাবতেও পারছি না সে এমন কাজ করতে পারে। সে যা করেছে, আমি তার নিন্দা জানাই। আমি আর তাকে নিয়ে ভাবি না।’

ফরেন পলিসির বিশ্লেষণ: অতীত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে

শ্রীলঙ্কার চার্চে ও হোটেলে সন্ত্রাসী হামলায় ২৯০ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক শ মানুষ আহত হয়েছে। গত রোববার সকালে এই হামলার ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আটটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। নেগোম্ব, বাটিকুলা ও কোচচিকাডে এলাকায় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাজধানী কলম্বোর তিনটি বিলাসবহুল হোটেলও এর লক্ষ্য ছিল। এর আগে ২০১৮ সালের মার্চে বৌদ্ধরা দেশটির মসজিদ, মুসলমানদের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘরে হামলা চালায়।
মূলত দেশটির ১৫ লাখ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণগুলো একের পর এক ঘটে। কিন্তু দুটি বিস্ফোরণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল কম। ফলে হামলার শিকার এক দল অন্যদের সতর্ক করতে পারেনি। দেশটির প্রায় ২০০টি চার্চের মোর্চা ন্যাশনাল ক্রিশ্চিয়ান ইভানজেলিক্যাল অ্যালায়েন্স। তারা জানিয়েছে, গত বছর হুমকি ও সংঘর্ষের মতো প্রায় ৮৬টি ঘটনা ঘটেছে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে।
শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণ করেন, এমন মানুষদের লক্ষ্য করে কলম্বোর হোটেলে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলা ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ের হামলার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই হামলায়ও বিলাসবহুল হোটেল, ব্যস্ত রেলওয়ে স্টেশন ও ইহুদি প্রচারকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুসারে শুধু হতাহতের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য মুম্বাইয়ের হামলা চালানো হয়নি। বিদেশি পর্যটকেরাও এর লক্ষ্য ছিল, যাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হয়। পরে ভারত চিহ্নিত করেছিল, পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবা ওই হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু মুম্বাইয়ের ওই হামলার সঙ্গে রোববারের শ্রীলঙ্কার হামলার পার্থক্য আছে। শ্রীলঙ্কায় বেশ কয়েকটি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে আর ভারতের শুধু মুম্বাইয়ে হামলা চালানো হয়েছিল।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে শ্রীলঙ্কার। তবে এটি পরিষ্কার নয়, ইতিহাসের সেই পুনরাবৃত্তি ঘটল কি না। তামিলদের স্বাধীনতাকামীদের সশস্ত্র সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই) ১৯৭৬ সালে গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে তারা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এলটিটিইকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা দেয়। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয় এই গৃহযুদ্ধের শেষ ভাগে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা গত বছর আবারও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধদের ওই হামলার ফলে তা বৃদ্ধি পায়। এর আগে ২০১৬ সালে সরকার বলেছিল, ৩২ জন শ্রীলঙ্কান আইএসে যোগ দিয়েছে।

‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’র ঘোষণা দেবেন সাবেক শিবির সভাপতি মন্জু

‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা দেবেন জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মুজিবর রহমান মন্জু। শনিবার (২৭ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর একটি হোটেলে তিনি গণমাধ্যমের সামনে একটি ঘোষণাপত্র তুলে ধরবেন।
মজিবুর রহমান মন্জু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার এই উদ্যোগ ধর্মভিত্তিক নয়, এমনকি সুনির্দিষ্ট তত্ত্বের আদলে আদর্শভিত্তিকও নয়।
সম্ভাব্য ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ হচ্ছে একদল আশাবাদী মানুষের উদ্যোগ, ভাবনা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরার উদ্যোগ। যারা এই কাফেলায় শরিক হতে চান, তাদের সংগঠিত করার কাজ আজ (শনিবার, ২৭ এপ্রিল) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।’
তবে জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নামে উদ্যোগ শুরু হলেও রাজনৈতিক দলের নাম, লোগো-পরিচয় আরও পরে নির্ধারণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে সময়ের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক উদ্যোগের কথা জানান দেবেন মন্জু। নতুন এই উদ্যোগের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করবেন তিনি।
রাজনৈতিক উদ্যোগের বিষয়ে মজিবুর রহমান মন্জু বলেন, ‘কোনও নির্দিষ্ট তত্ত্বের আদলে আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের চিন্তা, মত ও পথের আমরা অনুসারী নই। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এগুলো অন্তর্গতভাবে সমালোচনা, ভিন্নমত ও বিরুদ্ধ চিন্তার প্রতি অসহিষ্ণু থাকে। প্রবণতার দিক থেকে তা সব সময় নিরঙ্কুশ, কর্তৃত্ববাদী এবং ভীতিকর একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত হয়। আমাদের রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য হবে সমষ্টির জন্য কল্যাণকর বিষয় নির্ধারণ।’
নতুন উদ্যোগ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ধর্মভিত্তিক হচ্ছে না, এমনটি জানিয়ে ছাত্রশিবিরের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, কিন্তু আমরা কোনও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করবো না।’
জামায়াতে ইসলামীতে বিভক্তির অভিযোগ এনে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বহিষ্কার করা হয় মজিবুর রহমান মন্জুকে। ওই দিনই লন্ডনে অবস্থানরত সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক স্বেচ্ছায় জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মন্জু দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা, মহানগর মজলিসে শুরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে তার অনুপস্থিতি থাকলেও জামায়াতের তাত্ত্বিক পর্যায়ে মন্জুর অবস্থান ছিল।
বহিষ্কারের দুইদিন আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াত আমিরের কাছে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সংস্কার চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছিলেন মন্জু।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ওই চিঠির একটি অংশে মন্জু দলের আমির মকবুল আহমাদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘আপনি জানেন ইতোপূর্বেও লিখিত ও মৌখিকভাবে আমি আপনাকে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ অনেক অনিয়ম প্রসঙ্গে অবহিত করেছি। বিশ্ব পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ইসলামিক স্কলারদের মতামতের আলোকে মৌলিক আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে কর্মকৌশলগত দিকে জামায়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আবেদন জানিয়েছি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রসঙ্গে জামায়াতের দ্বিমুখী নীতি ও অপরিচ্ছন্ন-ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থানের অবসান ঘটানোর পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছি। শুধু তা-ই নয়, জামায়াতের সিনিয়র নেতা শহীদ কামারুজ্জামান, শহীদ মীর কাসেম আলী এবং ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকসহ আরও অনেকে বহু আগেই কৌশলগত ও রাজনৈতিক সংস্কারের লিখিত দাবি জানিয়েছিলেন। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ফোরামে তারা নিয়মানুযায়ী একাধিকবার প্রস্তাবও পেশ করেছিলেন। কিন্তু তাদের সেই যুক্তিকে শুধু অগ্রাহ্যই করা হয়নি; বরং তাদের সংগঠনে বিতর্কিত ও কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মো. কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলী, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, সাইফুল আলম খান মিলন, আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহের, জসিম উদ্দিন সরকার, চট্টগ্রামের শাহজাহান চৌধুরী ও অধ্যাপক মফিজুর রহমানের মতো বহু সিনিয়র ও সম্ভাবনাময়, প্রাজ্ঞ দায়িত্বশীল এখানে বঞ্চনার শিকার। তাদের সমস্যাগুলো হলো, তারা কেউ হয়তো স্পষ্টবাদী, সংস্কারবাদী অথবা জনপ্রিয়। আমার কাছ থেকে এরকম তির্যক ও স্পর্শকাতর সমালোচনা শুনে আপনি বিরক্ত হয়েছিলেন। আমি তখন বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম- আপনি এই কাফেলার জিম্মাদার, অতএব আপনার কাছে নির্ভয়ে, নিঃশঙ্কচিত্তে মন খুলে কথা বলা আমার দায়িত্ব। আপনি তখন সন্তুষ্ট হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সংগঠনের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ অসাম্য এবং ভেদ-নীতি দূরীকরণে কোনও পদক্ষেপ নেননি। আমি পরিষ্কারভাবে বিশ্বাস করি, সংগঠনের বেশিরভাগ জনশক্তি নীতি ও কৌশলগত পরিবর্তন চায়। ৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী ট্যাগ থেকে তারা মুক্তি চায়। কিন্তু অধিকাংশ জনশক্তির চাওয়া এখানে উপেক্ষিত। আপনি যদি আমার এ মতামতকে যাচাই করতে চান তাহলে নিরপেক্ষভাবে কর্মীদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখতে পারেন।’
উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালে শিবিরের সাবেক সভাপতি আহমদ আবদুল কাদেরকে সংগঠন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই কমিটির সেক্রেটারি ফরীদ আহমদ রেজাকেও সরে যেতে হয়েছিল। আহমদ আবদুল কাদের এখন ২০ দলীয় জোটভুক্ত খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও ফরীদ আহমদ রেজা লন্ডনে বসবাস করছেন।

শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা আতঙ্কে

শ্রীলঙ্কায় গত রোববার গির্জা ও বিলাসবহুল হোটেলসহ আটটি স্থানে হামলার সময় ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন মোহামেদ হাসান। এখন তিনি হামলার ভয়ে আছেন। কারণ তিনি মুসলমান।
একটি প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করেন হাসান। রাজধানী কলম্বোর দেমাতাগোদা এলাকার জুমা মসজিদের পাশে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। ৪১ বছর বয়সী এই ব্যক্তিকে বাইরে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছে তাঁর পরিবার। হাসান বলেন, ‘তারা ভয় পাচ্ছে, যদি আমি বাইরে যাই তাহলে কি আর জীবিত ফিরতে পারব?’
রোববারের এই হামলায় এ পর্যন্ত ৩৫৯ জন মারা গেছে। আহত হয়েছে কয়েক শ মানুষ। এই হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এ ছাড়া ভয়ংকর এই হামলার জন্য সরকারও উগ্রপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। এরপর থেকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা।
এমন একজন মুসলিম নারী জরিনা বেগম (৬০)। তিনি বলেন, ওই হামলার পর থেকে এখনো তিনি ঠিকঠাক ঘুমাতে পারেননি। জরিনা আরও বলেন, ‘আমি জানি মানুষ মুসলমানদের ওপর ক্ষিপ্ত। যাঁরা ঘৃণা করেন, তাঁরা এখন আরও বেশি ঘৃণা করবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকছি। আমরা বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছি।’
শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যা ১০ শতাংশ মুসলমান এবং ৭ শতাংশ খ্রিষ্টান। দেশটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিরা বৌদ্ধ। আর দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো হিন্দু সম্প্রদায়। দেশটির ধর্মীয় এবং জাতিসত্তার মানুষদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। কট্টরপন্থী বৌদ্ধরা ২০১৩ সালে এবং ২০১৮ সালে মুসমানদের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছিল। যদিও রোববার এই হামলার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে জুমা মসজিদের ওই এলাকায় গিয়ে দেখে গেল, সেখানকার মুসলমানরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাঁরা আশা করছেন, এ রকম সংকটময় সময় পুলিশ তাঁদের রক্ষা করবে।
শ্রীলঙ্কার মুসলিম কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলমি আহমেদ বলেন, ‘আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। পুরো মুসলিম সম্প্রদায় এই হামলা চালায়নি।’
নিরাপত্তার বড় ঘাটতি ছিল
এদিকে শ্রীলঙ্কা সরকার গতকাল বুধবার স্বীকার করেছে, বড় ধরনের গোয়েন্দা সতর্কবার্তা থাকার পরও ওই ভয়ংকর হামলা ঠেকানোর ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি ছিল। যদিও সরকার ওই সতর্কবার্তাকে প্রশাসন আমলে নেয়নি। এই সতর্কবার্তা আমলে না নেওয়ার ফলে রোষের মুখে পড়েছে সরকার।
এদিকে জরুরি অবস্থা জারির পর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নতুন ক্ষমতাকে কাজে লাগাচ্ছে। ওই হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ গত মঙ্গলবার রাতেও ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই শ্রীলঙ্কার নাগরিক।
দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির পর থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া গতকালও বোম স্কোয়াড সন্দেহভাজন কয়েকটি স্থানে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
এর আগে গুরুত্বপূর্ণ চার্চে আত্মঘাতী বোমা হামলার ব্যাপারে সতর্কতা দিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কা পুলিশের প্রধান। ন্যাশনাল তৌহিদ জামায়াত হয়তো এই হামলা চালাতে পারে বলে সতর্কতায় উল্লেখ করা হয়েছিল। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন তিনি। সরকার বলেছে, এই তথ্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের জানানো হয়নি। এ প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজেওয়ার্দেনে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এটা তথ্য ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি। সরকারকে এই দায় নিতে হবে।’
এদিকে সরকারের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, আরও হামলার আশঙ্কা আছে। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলেছেন, ওই সন্দেহভাজন হামলাকারীরা পলাতক রয়েছেন। ফলে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ঘরে তৈরী আয়রন ফিল্টার

২০০২ সালে মাইজদিতে থাকাকালীন সময়ে প্রথমে যেই বাসায় থাকতাম সেখানকার কলের পানি ছিল লাল রঙের। কারণ বাড়িওয়ালা সরাসরি টিউবওয়েলের পানি পাম্প করে ছাদের ট্যাংকে ভরতেন। আর ট্যাংকে পানি পড়ার সময়ে পানিতে থাকা দ্রবীভূত আয়রন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে অদ্রবনীয় দানাদার আয়রনের কনায় পরিণত হয়ে যেত। তাই রূহ আফজা রঙের পানি আসতো। এই পানি দিয়ে গোসল করলে চুল আঠা আঠা হয়ে যেত, ভাত রান্না করলে মনে হত লাল চালের ভাত, তরকারী হত কুচকুচে কালো। তাই ঠিক করলাম একটা ফিল্টার বানিয়ে নেই।
এর আগে বুয়েটে রিসার্চ এসিস্টেন্ট হিসেবে চাকুরীর সময়ে প্রচুর ফিল্টার বানিয়ে বিলি করেছিলাম - এমনকি আমার মাস্টার্সের থিসিসও এই বিষয়ে। তাই দেরী না করে বাজার থেকে জিনিষপাতি কিনে একটা ফিল্টার বানিয়ে ফেললাম। ফিল্টারটাকে বাথরুমের কলের নিচে একটু উঁচু জায়গায় রাখলাম। ফলাফল দারুন। এই পানি দিয়ে গোসল, রান্না সবকিছুতেই পরিস্থিতি ভাল হল।
বাসাতে আমি আর আমার কলিগ রেজা ভাই দুজন থাকতাম। ফিল্টারের কার্য়কারীতা দেখে উনি ওনার বাড়ির জন্য ওরকম অন্তত দুইটা বানিয়ে নেবেন ঠিক করলেন। যথারীতি অফিসের প্লাম্বারকে লাগিয়ে দিলেন এই কাজে। অফিসে ওনার এই জিনিষ দেখে আর আমাদের মুখে শুনে অন্য কলিগরাও বললেন তাদেরও একই সমস্যা, এটা লাগবে। বেচারা প্লাম্বারকে সবার সমস্যাই সমাধান করতে হয়েছিলো। ঐ কলিগদের একজন (মোস্তফা ভাই) যেই ভবনে থাকতেন সেখানে ওনার প্রতিবেশীরাও একই জিনিষ বানিয়ে নিয়েছিলেন।