Showing posts with label প্রণব বল. Show all posts
Showing posts with label প্রণব বল. Show all posts

Monday, October 14, 2019

ওদের কিছু নেই by প্রণব বল

প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০১৯: *বড় বড় মেশিন আছে, চলার শক্তি নেই। *মণ্ড তৈরির কারখানা আছে, চালু নেই। *রক্ষণাবেক্ষণ নেই। *উৎপাদন নেই।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ কর্ণফুলী পেপার মিলটির (কেপিএম) অবস্থা অনেকটা কবি অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের ‘ছন্নছাড়া’ কবিতার কয়েকটি লাইনের মতো। কবিতাটিতে কবি ছন্নছাড়া বেকার যুবকদের বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘ওরা বিরাট এক নৈরাজ্যের এক নেই রাজ্যের বাসিন্দে। ওদের কিছু নেই।’
কেপিএমের তেমনি বড় বড় মেশিন আছে। কিন্তু চলার শক্তি নেই। মণ্ড তৈরির কারখানা আছে, চালু নেই। রক্ষণাবেক্ষণ নেই, কাঁচামাল নেই, দক্ষ শ্রমিক নেই, ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় নেই, আয় নেই, রোজগার নেই, মূলধন নেই, সর্বোপরি উৎপাদন নেই।
দিনের পর দিন লোকসান গুনতে থাকা কেপিএমের পরিচালনা সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) দেওয়ার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি কাগজকল করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। সৌদি আরবের আল ফানা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়।
রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা এলাকায় ১৯৫৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত কাগজকল কেপিএম প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন এ প্রতিষ্ঠানটি এখন রুগ্ণ থেকে রুগ্ণতর হচ্ছে। এরই মধ্যে শ্রমিক কমেছে ৮০ শতাংশ।
সিআইসির পরিচালক (উৎপাদন ও গবেষণা) শাহীন কামাল বলেন, কারখানাটি অনেক পুরোনো। লোকসান হচ্ছেই। তবে লোকসান অনেক কমেছে। এটির ব্যবস্থাপনার জন্য পিপিপির আওতায় সম্প্রতি সৌদি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ সই হয়েছে। সমঝোতার আওতায় নতুন কাগজকল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মরণদশা
প্রায় ৩০ বছর ধরে কেপিএমের কোনো সংস্কার (ওভারহোলিং) হয়নি। ফলে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুই বছর আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মণ্ড তৈরির কারখানা বা প্লাপ সেকশন। মণ্ড তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১০ কোটি টাকার কাঁচামাল নষ্ট হওয়ার পথে। বর্তমানে আমদানি করা মণ্ডের ওপর নির্ভর করে সীমিত আকারে উৎপাদন করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দিনে ৩০ টন পর্যন্ত কাগজ উৎপাদন হয় মাত্র।
গত ১ জুন রাঙামাটির তখনকার সাংসদ ঊষাতন তালুকদার শিল্পমন্ত্রী বরাবর কারখানাটির দৈন্যদশা তুলে ধরে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। কেপিএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম এম আবদুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, কাঁচামাল–সংকট, দক্ষ জনবল–সংকট, তারল্য–সংকট রয়েছে মিলে। বর্তমানে বন্ধ রয়েছে ২ নম্বর মেশিনটি। এটি মেরামতের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ৩ নম্বর মেশিনটিও আংশিক চালু।
উৎপাদন কমছে, লোকসান বাড়ছে
প্রতিষ্ঠাকালীন এই কারখানার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার টন। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ১৮২ টন কাগজ। একই সময়ে লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা লোকসান দেয় কেপিএম। ওই বছর উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৫৮১ টন। সর্বশেষ ২০০৮-০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৬৩৮ কোটি টাকা লাভ করেছিল। তখন উৎপাদন ছিল ২৯ হাজার ৭৩ টন। বর্তমানে লোকসান কমে প্রায় ২০ কোটি টাকার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় কেপিএমে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী ছিলেন। এখন স্থায়ী–অস্থায়ী মিলে লোকবল ১ হাজারের মতো।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক সংসদীয় কমিটি গত অক্টোবরে কারখানাটি পরিদর্শন করে। তখন কমিটির কাছে এমডি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাতে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে মিলের কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণ এবং রিপ্লেসমেন্টের মাধ্যমে চার থেকে পাঁচ বছর উৎপাদন সচল রাখার প্রস্তাব করা হয়। সে জন্য ৫২ কোটি টাকা দরকার হবে বলে মিল কর্তৃপক্ষ সংসদীয় কমিটিকে জানায়।
এ ছাড়া মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে পিপিপির মাধ্যমে ১০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইন্টিগ্রেটেড মণ্ড পেপার মিল স্থাপন করার কথা বলা হয়। তার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানানো হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দিনে ৩০০ টন উৎপাদন সক্ষম আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন ইন্টিগ্রেটেড মণ্ড পেপার মিল স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সৌদি প্রতিষ্ঠান আল ফানার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়।
এদুই বছর ধরে যেসব শ্রমিক অবসরে কিংবা অন্যত্র বদলি হয়েছেন, তাঁরা তাঁদের পাওনা পুরোপুরি বুঝে পাননি।
দেনায় জর্জরিত
বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা দেনায় রয়েছে কেপিএম। এর মধ্যে সরকারি ঋণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া রয়েছে শ্রমিকের গ্র্যাচুইটি, বকেয়া মজুরি, ডিবেঞ্চার ঋণ, বিভিন্ন পণ্য এবং রাসায়নিক সরবরাহকারীদের দেনা অন্যতম। কেপিএমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির মোট দেনা ৭৪৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। বিসিআইসির পরিচালক মোহাম্মদ শাহীন কামাল বলেন, দেনা আগের চেয়ে কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে নতুন মজুরি কমিশনের কারণে লোকসান আবার বাড়তে পারে। কারণ শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাবে।
সরেজমিন
সম্প্রতি কেপিএম ঘুরে দেখা যায়, কারখানার যন্ত্রপাতি সব জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে একটি ইউনিটে চলছে উৎপাদন কাজ। মণ্ড ইউনিটে দেখা যায় বাঁশের চিপস পড়ে রয়েছে। এই ইউনিটটির স্থানে স্থানে শেওলা জমে গেছে। সরেজমিন পরিদর্শনকালে নুরুল আলম নামের এক শ্রমিক বলেন, কারখানার যন্ত্রপাতি পুরোনো হওয়ায় প্রতিদিন তা চালু করা যায় না। ফলে ২৪ ঘণ্টাও উৎপাদন চলে না।
দিনের পর দিন লোকসান গুনতে থাকা কর্ণফুলী পেপার মিলের (কেপিএম) অবস্থা এখন এমনই জরাজীর্ণ। এখানে বড় বড় যন্ত্রপাতি থাকলেও তা চালু নেই। মণ্ড তৈরির কারখানা আছে, চালু নেই। রক্ষণাবেক্ষণ নেই, কাঁচামাল নেই, দক্ষ শ্রমিক নেই। ছবি: সৌরভ দাশ

Monday, September 2, 2019

মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতু এখনো ভরসা by প্রণব বল

কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট রেলসেতুটি নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয় ১৯১৪ সালে। সে সময় ব্রিটিশরা  বার্মায় সৈন্য আনা-নেওয়ার কাজে এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৩০ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৭১-এ সেতুটির উত্তর ও পশ্চিম পাশে ঘাঁটি করে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিবাহিনী। ৯০ বছর বয়সী মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুটির এখন মরণদশা। তবু ঝুঁকি ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে দিনে প্রায় ১ লাখ লোক এই সেতু ব্যবহার করে যাচ্ছে।

একমুখী কালুরঘাট সেতুর স্থানে নতুন করে একটি দ্বিমুখী সড়ক ও রেলসেতু নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়রা। সর্বশেষ গত মাসে অনশন করেন বোয়ালখালীর মুক্তিযোদ্ধারা। ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন সেতুর বিষয়ে সুরাহা না হলে সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দেন স্থানীয় সাংসদ মইন উদ্দীন খান বাদল। সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আবদুল মোমিন বলেন, ‘রেলসেতু হলে আমাদের কোনো লাভ হবে না।’

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পূর্ব পটিয়া, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া, শহরের চান্দগাঁও ও মোহরা এলাকার প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। কালুরঘাট সেতুর পশ্চিম পাশ (শহর এলাকা) থেকে বোয়ালখালী সদর গোমদন্ডির দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। কিন্তু ১০ মিনিটের এই পথ যেতে এখন সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। সেতুতে ওঠার জন্য সব সময় দুদিকে গাড়ির দীর্ঘ সারি থাকে।

মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় রেলওয়ে সেতুটিকে ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এরপর ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একদল গবেষকও এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দেয়। সেতুর পূর্বপাশে দুটি সাইনবোর্ড দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। একটিতে লেখা ‘১০ টনের অধিক মালামাল পরিবহন নিষেধ।’ অপরটিতে লেখা, ‘এই সেতুর ওপর দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল নিষেধ। আদেশ অমান্যকারীকে ফৌজদারিতে সোপর্দ করা হবে।’

এসব বিধিনিষেধ কিছুই মানা হচ্ছে না। ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন পারাপার করে তেমনি অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ট্রাকও চলছে। সেতুর মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে গেলে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়।

গত সোমবার দুপুর পৌনে ১২টার ঘটনা। পশ্চিম পাশ (শহরের দিক) থেকে গাড়ি সেতুতে উঠে গেছে। সেতুর মাঝামাঝি গিয়ে একটি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ে। সেতুর ওপর বাস, ট্রাক, টেম্পো, অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ঠাঁইয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে দোহাজারীগামী ট্রেন এসে সেতুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

তীব্র গরমে অতিষ্ঠ যাত্রীদের কয়েকজন গেটকিপার নূর হোসেনের সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। কেন ভারী ট্রাক সেতুতে উঠতে দিল এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি। এক যাত্রী বলেন, ‘ন ফাইল্লে ছঁরি ছাড়ি দে। তোরে হনে হইয়ে ওভারলোড ট্রেরাক তুলিবারল্লে। (কে বলেছে অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ট্রাক তুলবার জন্য। না পারলে চাকরি ছেড়ে দে।)’

এভাবে আধঘণ্টা পর ট্রাকটি সচল করলে গাড়ি চলাচল পুনরায় শুরু হয়। এবার সেতুর ওপরের গাড়ি পার হওয়ার পর ট্রেন ছোটে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আধঘণ্টার অচলাবস্থার প্রভাব তখন সেতুর দুপাশে। এক পাশের গাড়ি শেষ হতেই আধঘণ্টা সময় পার।

৭৩ গর্ত

সরেজমিনে দেখা যায়, রেল সেতুটির স্থানে স্থানে ছোট–বড় গর্ত। কোথাও হাড়গোড় উঠে গেছে। পশ্চিম থেকে পূর্ব পাশ পর্যন্ত গুনে ৭১টি গর্ত পাওয়া যায়। গর্তে ট্রাক পড়লে ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠে পুরো সেতু।

সেতুতে ক্ষত এত ভয়াবহ যে গর্তের ভেতর থেকে নদীর পানি দেখা যায়। আর রেলিংয়ের নিচের কাঠ ভেঙে গেছে অন্তত ১০ স্থানে।

সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে পার হচ্ছিলেন পশ্চিম পাশের দোকানি বোয়ালখালীর বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘ও ভাই ফরান আতত লইয়ারে চলির দে। হঁত্তে ভাঙি ফরে আল্লা জানে।’

নাজুক অবস্থার কথা স্বীকার করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন বলেন, ‘সেতুটির বয়স হয়েছে। ট্রেন চলাচলে সমস্যা নেই। যত সমস্যা বড় গাড়িতে। আমরা ১০ টন বেঁধে দিয়েছি। কিন্তু ৩০ থেকে ৪০ টন নিয়ে গাড়ি চলছে।’

এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত দুবার করে যাওয়া–আসা করে। এ ছাড়া দোহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেল পরিবহন করে অপর একটি মালবাহী ট্রেন। তবে ফার্নেস তেলের ওজনে সমস্যা হয় না বলে দাবি প্রধান প্রকৌশলীর।

জোড়াতালিতে চলছে

এ সেতু বারবার সংস্কার-মেরামত করে জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ২০০৪ সালের ১৩ আগস্ট ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতুতে বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়। এ সময় ১১ মাস সেতুর ওপর যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। গত বছর জাহাজের ধাক্কায় একটি স্প্যান সরে যায়। ওই সময় দুদিন বন্ধ রেখে তা ৫০ লাখ টাকায় মেরামত করা হয়। এর আগে একাধিক দফায় সেতুর সংস্কার করা হয়।

প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন বলেন, ‘লোহার সেতু ৬০ বছরে বেশি ব্যবহার করা ঠিক নয়। তারপরও আমরা এখনো ব্যবহার করছি। এখন মেরামতের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন একটি দ্বিমুখী রেল সেতুর জন্য সমীক্ষা চলছে।’

সেতুর গুরুত্ব

বোয়ালখালী ও পটিয়ার তিন ইউনিয়নের প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এ ছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটের গাড়িও এই সেতু দিয়ে বিভিন্ন সময় চলাচল করে। সেতুর পূর্ব পাড়ে বোয়ালখালী অংশে প্রায় ৫০টি কলকারখানা রয়েছে। সেতু নড়বড়ে হওয়ায় এসব কারখানা পণ্য পরিবহন করতে পারে না। তারা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু (শাহ আমানত সেতু) ব্যবহার করে। এতে খরচ বাড়ে।

স্থানীয় সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বলেন, এখন রেল সেতু করার কথা হচ্ছে, যেটিতে সড়ক সংযোগ নেই। এটা হলে জনগণের উপকার হবে না।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট সেতুতে তীব্র যানজট। একমুখী এ সেতুতে যানজটের এ ভোগান্তি নিত্যদিনের। সেতুর পশ্চিম পাশের প্রান্তে, গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টায়। ছবি: সৌরভ দাশ

Monday, August 24, 2015

এনকেফালাইটিস ভাইরাস ঝুঁকিতে উপকূলের শিশুরা by প্রণব বল

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকার এক থেকে পাঁচ বছরের শিশুরা এনকেফালাইটিস ভাইরাস ঝুঁকিতে রয়েছে। গত চার বছরে এ ভাইরাস সংক্রমণের শিকার শিশুদের অর্ধেকের বেশি মারা গেছে। বেঁচে যাওয়া শিশুদেরও বড় একটি অংশ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছে বলে এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। গবেষণায় যুক্ত চিকিৎসকেরা এটিকে মহামারি পর্যায়ের রোগ বলে উল্লেখ করেছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ জার্নাল অব চাইল্ড হেলথে গত বছর প্রকাশ করা হয়। চট্টগ্রামের ছয়জন চিকিৎসক এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের পাঁচজন এবং চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসটিসি) রোগতত্ত্ব বিভাগের একজন চিকিৎসক রয়েছেন।
গবেষণায় যুক্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, এনকেফালাইটিস ভাইরাস সংক্রমণের শিশুদের প্রতি দুজনের একজন মারা যাচ্ছে। তবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না উপকূলীয় এলাকায় ঠিক কী কারণে শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ভাইরাস সংক্রমণের শিকার হলে শিশুদের জ্বর ও খিঁচুনি হয়। মাঝে মাঝে তারা অচেতন হয়ে পড়ে। কোনো শিশুর এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা এ রোগ থেকে সুস্থ হলেও তাদের মধ্যে কিছু স্থায়ী সমস্যা দেখা দেয়। কানে কম শোনা, চোখে কম দেখাসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জানুয়ারি, এপ্রিল এবং অক্টোবর মাসে শিশুদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। ২০০৯ এবং ২০১০ সালে এনকেফালাইটিস ভাইরাস সংক্রমণের শিকার ৬৬৬টি শিশু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৪২১টি গ্রামের ও ১৪৪টি শহরের। ২০০৯ সালে ভর্তি হওয়া ৩১২টি শিশুর মধ্যে ৪৬ শতাংশ এবং ২০১০ সালে ভর্তি হওয়া ৩৫৪টি শিশুর মধ্যে ৫৬ শতাংশই মারা যায়। চিকিৎসকেরা জানান, গত বছর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনকেফালাইটিস ভাইরাস সংক্রমণের শিকার হওয়া ৮৪টি শিশু মারা গেছে।
গবেষণায় যুক্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১২ মাস থেকে ৬০ মাস বয়সী শিশুরা এনকেফালাইটিস ভাইরাসে বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের বেশির ভাগই আসছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া, চকরিয়া ও কক্সবাজার থেকে। তিনি জানান, এ ভাইরাসের টিকা বাজারে পাওয়া যায়। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে টিকা দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, সরকার চাইলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কোনো উপজেলায় বিনা মূল্যে এনকেফালাইটিস ভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে পারে।
গবেষণায় যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম, সহযোগী অধ্যাপক সনৎ কুমার বড়ুয়া এবং ইউএসটিসির রোগতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল।

Sunday, July 26, 2015

পাহাড়ধস ঠেকাতে নেই স্থায়ী উদ্যোগ- ৯ বছরে ১৯২ জন নিহত by প্রণব বল

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার আমিন কলোনি
এলাকার টাংকির পাহাড়ের পাদদেশ থেকে গতকাল
ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করা হয় l ছবি: প্রথম আলো
প্রতিবছর বর্ষা এলেই পাহাড়ধস রোধে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাসহ উচ্ছেদের মতো অস্থায়ী কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু উপেক্ষিত থেকে যায় পাহাড়ধস রোধে বিভিন্ন সময় দেওয়া মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশমালা। স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রতিবছর পাহাড়ধসে নিহতের ঘটনা ঠেকানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ শনিবার চট্টগ্রামে পাহাড় ও দেয়ালধসে ছয়জন নিহত হয়। সবচেয়ে বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। সেবার এক দিনে নগরের বিভিন্ন স্থানে ১২৭ জন নিহত হয়েছিল। সেই থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৯২।
চট্টগ্রাম শহরে যেসব পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রয়েছে, তার বেশির ভাগের মালিকানা সরকারের। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়ও আছে। সরকারি পাহাড় দখল করে অথবা ইজারা নিয়ে ঘর তৈরি করে ভাড়া দেয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
২০০৭ সালে পাহাড়ধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড়ে নিহতের ঘটনা ঠেকাতে ৩৬ দফা সুপারিশ দিয়েছিল। একই ঘটনার পর প্রকৌশলগত প্রতিরোধ কমিটি আরেকটি প্রতিবেদন দেয়। এতেও দুর্ঘটনা এড়াতে ৩০ দফা সুপারিশ দিয়েছিল। দুটি সুপারিশমালা ছিল প্রায় অভিন্ন।
এসবের মধ্যে পাহাড় দখলমুক্ত করে বনায়ন করা, ঝুঁকিতে বসবাসকারী মানুষদের পুনর্বাসন, পাহাড় ইজারাদান এবং দখল বন্ধ করা অন্যতম। কিন্তু এসব সুপারিশ গত আট বছরে আলোর মুখ দেখেনি। ফলে দিন দিন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দার সংখ্যা বেড়েছে।
ধস রোধে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ না থাকার কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘পাহাড়ধস রোধে অনেক ব্যবস্থা নিয়েছি। কিন্তু শনিবার হঠাৎ করে অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধসে পড়ে। আর আমরা তাদের একদিক থেকে উচ্ছেদ করলে অন্যদিকে গিয়ে বসবাস শুরু করে।’ তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে বসবাস ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের ক্ষমতা অনেক সীমিত। পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু আইন রয়েছে। কিন্তু তাদের জনবল নেই। তবে মামলা করলে এগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রয়োজন।
বর্তমানে চট্টগ্রামে ৩০টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে লোকজন বসবাস করছে বলে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে স্বল্প ও অধিক ঝুঁকিতে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। ২০০৭ সালের ঘটনার পর জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিডিএ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সদস্যদের নিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসন এই কমিটির তদারক করে।
প্রতিবছর বর্ষা এলে উচ্ছেদ চালানো হয়। এবারও ১১টি পাহাড়ের ৬৬৬টি পরিবারকে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ কার্যক্রম চলে। কিন্তু বৃষ্টি একটু কমলে তারা আবার পাহাড়ের ঝুঁকিতে গিয়ে বসবাস শুরু করে। ফলে শনিবারের আকস্মিক অতিবৃষ্টিতে নগরের লালখান বাজার ও বায়েজিদ এলাকায় পাহাড় ও দেয়ালধসের ঘটনা ঘটে।
জানতে চাইলে সচেতন নাগরিক কমিটি চট্টগ্রামের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার জানান, পাহাড়ে বসতি ঠেকাতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেই। প্রতিবছর এখানে বসতি বাড়ছে। এ কারণে দুর্ঘটনাও ঘটছে।
তালিকার বাইরের পাহাড়ে ধস: শনিবার বায়েজিদ থানাধীন আমিন কলোনিতে টাংকি পাহাড় ধসে তিনজন নিহত হয়। এই পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকায় নেই। এ বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘আমরা কত দিকে আর তাদের পাহারা দেব। একদিকে বন্ধ করলে অন্যদিকে গিয়ে বসতি গড়ে তোলে। কোনোভাবে মানুষকে বোঝানো যায় না। ভয়ও নেই তাদের।’
সরেজমিনে বায়েজিদ এলাকায় দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে, খাঁজে ছোট ছোট টিনের ঘর। বাবুল নামের এক বাসিন্দা জানান, ‘আমাদের এখানে আগে কখনো পাহাড়ধস হয়নি। এগুলো অনেক নিরাপদ।’
বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বল্প ভাড়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে পাহাড়ে বসতি গড়ে তোলে লোকজন। এক শ্রেণির দখলদার পাহাড় দখল করে গরিব লোকদের ভাড়া দেয়। কম ভাড়ার কারণে তারা সরতে চায় না।
বারবার উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত: ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ ওই ঘটনার পর প্রতিবছর ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের বিষয়ে নানা সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখে না। ২০১২ সালের ২ জুলাই পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির দশম সভায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ এক সপ্তাহের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে অগ্রগতি ছিল বেশ কম।
এরপর ২০১৩ সালে ৬ জুন পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির একাদশ সভায় নতুন করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়। সেটাও আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৪ সালে পুনরায় উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তা-ও পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি।
থেমে নেই দুর্ঘটনা: পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০০৭ সালে। সে সময় নিহত হয় ১২৭ জন। এ ছাড়া গত বছর বায়েজিদ এলাকায় ১ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১২ সালে ২৮ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১০ সালে ৩ জন ও ২০০৮ সালে ১৪ জন নিহত হয়। ২০০৯ সালে ৩ জন আহত হয়। ২০০৭ সালের আগেও পাহাড়ধসে একাধিক নিহতের ঘটনা ঘটেছে।

Friday, July 24, 2015

চট্টগ্রাম মেডিকেলে শিশু চুরি, খালি হাতে বাড়ি ফিরলেন মা by প্রণব বল

হাসপাতাল ছাড়ার সময় জেসমিন আক্তার।
গতকাল দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলো
হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে বেশিক্ষণ সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। তাই দ্রুত ওয়ার্ড থেকে বের হওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছেন স্বামী। কিন্তু জেসমিন আক্তার নিরুত্তর। তাঁর দুচোখ টলমল করছে। ছেলেকে ছাড়া তিনি কীভাবে বাড়ি যাবেন। আশা ছিল, হাসপাতাল ছাড়ার আগে কেউ এসে সুখবর দেবে, চুরি হওয়া তাঁর বুকের মানিককে পাওয়া গেছে।
চিকিৎসকের ছাড়পত্র পাওয়ার পর গতকাল বুধবার সকালেই জেসমিন আক্তারের সব জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখেন স্বামী শফিউল আলম। কিন্তু হাসপাতাল ছাড়তে ছাড়তে তাঁদের দুপুর হয়ে যায়। এ কয় দিন চিকিৎসা ঠিকমতো চললেও নাওয়া-খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন জেসমিন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখ ফুলে গেছে। অটোরিকশায় ওঠার আগে শুধু বললেন, ‘কেবল ছেলের কথা কথা মনে পড়ে। আমার...’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ২ জুলাই জেসমিন আক্তার দ্বিতীয় ছেলের জন্ম দেন। অস্ত্রোপচারের স্থানে সংক্রমণ হওয়ায় প্রসবোত্তর ওয়ার্ডে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। ১৫ জুলাই এই ওয়ার্ড থেকেই তাঁর শিশুপুত্র চুরি হয়।
শফিউল-জেসমিন দম্পতির বড় ছেলে সৈকত ইসলামের বয়স আড়াই বছর। সেও মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে ছিল। সেদিন সৈকত খেলতে খেলতে ওয়ার্ডের বাইরে চলে যায়। তাকে খুঁজতে তিনি ওয়ার্ডের বাইরে বের হন। তাঁর সঙ্গে থাকা মা ফাতেমা বেগম তখন শৌচাগারে ছিলেন। বড় ছেলেকে খুঁজে বের করে ওয়ার্ডে নিজের শয্যায় এসে দেখেন নবজাতক নেই।
জেসমিন জানান, ‘আমার ছেলে তার ভাইয়ের নাম মান্না রাখবে বলেছিল। বাড়ি গিয়ে অনুষ্ঠান করে নাম রাখার কথা। কিন্তু...’
জেসমিনের স্বামী শফিউল আলম ভাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। প্রায় তিন সপ্তাহ হাসপাতালেই কাটিয়েছেন তিনি। শফিউল জানান, চিকিৎসা বাবদ তাঁর ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিছু টাকা ধার করেছেন। সবাই আশ্বাস দিয়েছে, বাচ্চা ফিরে পাবেন তিনি। এখন খালি হাতে রাউজানের গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন।
শিশু চুরি হওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে হাসপাতালেরই এক নিরাপত্তারক্ষী (বেসরকারি) ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে র্যা ব। শিশুটির বাবার করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রত্নেশ্বর মজুমদার জানান, শিশু উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার রিমান্ড শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
বাড়ি ফেরার আগে পুলিশ ও চমেক প্রশাসন জেসমিনদের নাম ঠিকানা লিখে রেখেছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গনি তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে শফিউলকে সান্ত্বনা দিয়েছেন।
খোন্দকার শহিদুল গনি প্রথম আলোকে জানান, এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত আরও ১০০ আনসার সদস্য চাওয়া হয়েছে।

Tuesday, July 14, 2015

স্বপ্ন নিয়ে ‘লাকি ভেন্যু’তে মাশরাফিরা by প্রণব বল

রাস্তার দুপাশে উৎসুক জনতা। তাঁদের সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। বাংলাদেশের বাস এর মাঝে কঠোর নিরাপত্তায় চলল। হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল মানুষজন। কেউ কেউ প্রিয় তারকাদের হাত নেড়ে স্বাগত জানালেন। বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রাও গ্রহণ করলেন এই শুভকামনা।
এভাবেই আজ সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম পৌঁছেছে বাংলাদেশ। সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকাও। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছে দুদল। এর পর তাদের নিয়ে আসা হয় হোটেলে। এবার প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের নবনির্মিত পাঁচ তারকা হোটেল র‌্যাডিসন ব্লু বাংলাদেশ দলের ঠিকানা।
হোটেলে ঢোকার মুখেও ছিল উৎসুক মানুষের জটলা। বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে হোটেলে ওঠার সময় প্রিয় ক্রিকেটারদের নাম ধরে ডাকাডাকিও করেছে সমর্থকেরা। দ্বিতীয় ম্যাচের দাপুটে জয় আশাবাদী করে তুলেছে অনেককেই। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার আগে এই ভালোবাসা মাশরাফিদের বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে নিশ্চয়ই।
জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বুধবার সিরিজের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুদল। ‘ফাইনাল’ হয়ে ওঠা এই ম্যাচের টিকিট যেন সোনার হরিণ। টিকিটের জন্য হাহাকার। আগামী পরশু জিতলে পাকিস্তান, ভারতের পর আরও একটি বড় দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়। সেটিও টানা। এমন সোনালি অর্জনের হাতছানি যখন সামনে, তার সাক্ষী কে না হতে চায়!
চট্টগ্রাম বাংলাদেশকে স্বপ্নও দেখাচ্ছে। এই ভেন্যু বাংলাদেশের জন্য খুবই সৌভাগ্যের। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ১৫টি ওয়ানডে খেলে নয়টিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে আছে ২০১১ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্মরণীয় সেই জয়ও। এ মাঠে সর্বশেষ সাত ম্যাচের ছয়টিতেই জিতেছে বাংলাদেশ।
তবে এখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে একমাত্র ম্যাচে বাংলাদেশ হেরে গিয়েছিল ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে। কিন্তু ওই বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশ এক নয়। এবার চট্টগ্রাম নিশ্চয়ই হতাশ করতে চাইবে না মাশরাফিদের।
গত ম্যাচের দুই নায়ক নাসির ও সৌম্য। ছবি: চট্টগ্রামে থেকে সৌরভ দাশ

Saturday, July 4, 2015

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই ছাত্র কলেজে ভর্তি হতে পারবে না? by প্রণব বল

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই ছাত্রের কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য এবার প্রতিবন্ধী কোটা না থাকায় আবেদন করার সময়ই তারা বিভ্রান্তিতে পড়ে। পরে শিক্ষা কোটায় আবেদন করে। দুজনের একজন চট্টগ্রাম কলেজে, অন্যজন হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজ শিক্ষা কোটায় ভর্তির জন্য বিবেচিত হয়। কিন্তু কোটার শর্ত পূরণ না করায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের ভর্তি করাচ্ছে না।
দুই ছাত্রের মধ্যে একজন বিশ্বজিৎ বসাক বান্দরবান সুয়ালেক উচ্চবিদ্যালয় আর আল আমিন চট্টগ্রাম নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে। দুজনই মানবিক বিভাগের ছাত্র। বিশ্বজিতের জিপিএ ৪.২৮ আর আল আমিনের ৩.৮৯।
ভর্তি-প্রক্রিয়ায় এবার জেলা কোটা, শিক্ষা কোটা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকলেও প্রতিবন্ধী কোটা ছিল না। কোন কোটায় আবেদন করবে, তা বুঝতে না পেরে শিক্ষা কোটায় আবেদন করে দুজন।
ভর্তির এই অনিশ্চয়তা নিয়ে দুই ছাত্রের অভিভাবকেরাও উদ্বিগ্ন। বিশ্বজিতের মা সীমা বসাক বলেন, ‘কষ্ট করে ছেলে পড়ালেখা করল। এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে ছেলে এসএসসি পাস করার পর অনেক খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন ভর্তি হতে পারছে না। আমার ছেলের শিক্ষাজীবন কি এখানে থেমে যাবে?’
শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষা কোটাটি কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সন্তানদের জন্য। এই দুই ছাত্রের কেউ ওই কোটায় পড়ে না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কলেজের মানবিক বিভাগের ভর্তি কমিটির আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘সে (বিশ্বজিৎ) আবেদনের সময় ভুল করেছে। তারা শিক্ষা কোটায় ভর্তির জন্য আবেদন করেছে। প্রতিবন্ধী কোটা নেই। এখন তাদের বিষয়ে আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব? আমাদের এ ক্ষেত্রে কিছু করার নেই।’
এ বিষয়ে বিশ্বজিৎ বসাক জানায়, প্রতিবার প্রতিবন্ধী কোটা থাকলেও এবার ভর্তিতে কোটা ছিল না। তাই সে শিক্ষা কোটায় আবেদন করে। এই কোটায় তার নাম এলেও ভর্তি হতে দিচ্ছে না কলেজ।
নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচটি পছন্দের কলেজের নাম দিয়ে আবেদন করে হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজে ভর্তির জন্য বিবেচিত হয় আল আমিন। কিন্তু ১ জুলাই ভর্তি হতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কেন সে সাধারণ (জেনারেল) কোটায় আবেদন করেনি, তা জানতে চাওয়া হয়।
আল আমিন বলে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই পাস করতে হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের। এখন সে কী করবে বুঝতে পারছে না।
এ বিষয়ে হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ কুতুব উদ্দিন বলেন, শিক্ষা কোটায় আবেদন করায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করাতে পারছে না। তবে বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় তাকে চট্টগ্রাম বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগী দুই ছাত্র জানায়, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে এবার চার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। তারাও শিক্ষা কোটায় আবেদন করেছিল।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কলেজ উপপরিদর্শক মো. হালিম প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তির নীতিমালায় প্রতিবন্ধীদের জন্য এবার কোনো কোটা রাখা হয়নি। তবে সব কলেজকে তাদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাধারণ কোটায় আবেদন করতে হবে। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইলে তাদের ভর্তি করাতে পারে। এতে বোর্ডের কোনো আপত্তি থাকবে না। এ ছাড়া এই দুজনকে খালি আসনে আবেদনের মাধ্যমে ভর্তির চেষ্টা করতে পারবে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই শিক্ষার্থীরা শ্রুতলেখকের মাধ্যমে পরীক্ষা দেয়। তারা মুখে বলবে আর শ্রুতলেখক তা লিখবে। চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের সুযোগ রয়েছে। এরপর শিক্ষার্থীরা অন্য বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সামাদ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী কোটা না থাকায় ভর্তির আবেদনে হয়তো ভুল হয়েছে। কিন্তু সিটি কলেজ আমাদের চারজনকে ভর্তি করিয়েছে। চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজ ভর্তি করাচ্ছে না। এখন কি তাহলে তাদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে?’

Monday, June 22, 2015

কর্ণফুলীতে তেল ছড়ানো ঠেকাতে বসেছে ‘বুম’ by প্রণব বল

চট্টগ্রামের হারগেজি খালে ছড়িয়ে পড়া তেল নিজস্ব পদ্ধতিতে
সংগ্রহ করছেন স্থানীয় লোকজন। গত শুক্রবার রেলসেতু
ভেঙে তেলবাহী একটি ট্রেনের তিনটি ওয়াগন খালে পড়ে
গেলে ওই তেল ছড়িয়ে পড়ে। তেল পৌঁছে গেছে কর্ণফুলী
নদীতেও। গতকাল দুপুর ১২টায় তোলা ছবি l প্রথম আলো
দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় তেলবাহী ট্রেনের ওয়াগন থেকে ফার্নেস তেল খাল ও নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে। গত তিন দিনে তিনটি ওয়াগন থেকে প্রায় ৭০ হাজার লিটার তেল ছড়িয়ে পড়েছে। এই তেল খালের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে মিশছে।
খাল থেকে নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে খাল ও নদীর সংযোগস্থলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গতকাল রোববার বিকেল ‘বুম’ (তেল না ছড়ানোর পদ্ধতি) বসিয়েছে। এর কারণে খালে থাকা তেল জোয়ার-ভাটার সময় নদীর পানিতে মিশতে পারবে না।
খালের পানির নমুনা পরীক্ষায় দূষণের প্রমাণ পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইসুল আলম মণ্ডল। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের জানান, পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি রয়েছে। ক্ষতির মাত্রা দ্রুত যাতে কমানো যায়, সে জন্য খাল ও নদী থেকে তেল অপসারণের চেষ্টা চলছে।
তেল অপসারণে কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘পানি থেকে তেল অপসারণ দুরূহ কাজ। সেই প্রযুক্তি এখনো আমাদের এখানে সেভাবে নেই। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি তেল অপসারণ করতে।’
গত শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার সীমান্তে শাইরাপুল এলাকায় হারগেজি খালের (বোয়ালখালী খাল) সেতু পার হওয়ার সময় সেটি ভেঙে খালে পড়ে যায় তেলবাহী ট্রেন। দুর্ঘটনায় দুটি ওয়াগন খালে পড়ে যায়। আরেকটি ওয়াগন অর্ধেক ডুবে যায়। প্রতিটি ওয়াগনে ২৫ হাজার লিটার তেল ছিল। এ ছাড়া ট্রেনের ইঞ্জিন খালের পাশে কাত হয়ে পড়ে যায়। লাইনচ্যুত হয় আরও একটি ওয়াগন। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা তেল ডিপো থেকে ফার্নেস অয়েল নিয়ে ট্রেনটি চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী যাচ্ছিল। দোহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য আটটি ওয়াগনে করে তেল নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
রেল মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন, রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁদের উপস্থিতিতে খাল থেকে তেল অপসারণের জন্য ফোম আনা হয়। এ ছাড়া খালের দুই পাশের তেলযুক্ত ঘাস কেটে ফেলার জন্য শ্রমিক নিয়োগ করা হয়।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন জানান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে খাল থেকে সংগ্রহ করা প্রতি লিটার তেল ৬০ টাকা দরে কিনবে। দুপুরে তিনি দুর্ঘটাস্থল এলাকায় যান এবং তেল অপসারণে স্থানীয় লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তবে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোজাম্মেল হক দাবি করেন, বেশির ভাগ তেল ঘাস ও গাছপালায় লেগে আছে। অল্প তেল পানিতে মিশেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. জাফর আলমও গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হারগেজি খালে জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে। যে কারণে বেশির ভাগ তেল নদীতে মিশে গেছে।
দূষিত পানি: দুর্ঘটনার পর শনিবার হারগেজি খাল ও কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে যুক্ত খালের মুখ থেকে তেলমিশ্রিত পানির নমুনা সংগ্রহ করেন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের কর্মকর্তারা। নাম না প্রকাশের শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, খালের মুখসহ পাঁচটি স্থানের নমুনা পরীক্ষায় সর্বনিম্ন দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ১ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম (আদর্শ মান ৫ মিলিগ্রাম)। পাঁচটি নমুনার চারটিতেই অক্সিজেন স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম পাওয়া গেছে।
উদ্ধারকাজ: রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এখন রেললাইন মেরামতের কাজ চলছে। এরপর তিনটি ওয়াগন তোলা হবে। এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন জানান, লাইন সচল করতে আরও সাত দিন লাগতে পারে।

হাজার দীঘি ভরাট চলছেই- কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছেন না ভরাটকারীরা by প্রণব বল

টিনের বেড়া দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে হালিশহরের
রামপুরের হাজার দীঘি। এটি আশপাশের মানুষের
পানির একমাত্র ভরসা l সৌরভ দাশ
নগরের হালিশহরের রামপুরে হাজার দীঘি ভরাট বন্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন উচ্চ আদালত। কিন্তু কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছেন না ভরাটকারীরা। স্থাপনা নির্মাণের জন্য দীঘি ভরাট চলছেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীঘির দুই পাশ থেকে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। মাঝখানে কিছু অংশ পানি রেখে বাঁশ ও টিন দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। বেড়া পর্যন্ত দুই পাশ এখন মাটিতে ভরাট করা হয়ে গেছে। এক পাশে একটি টিনশেড ঘরও বানানো হয়েছে। ওই ঘরে ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা থাকেন। মাঝখানে থাকা সামান্য পানিতে স্থানীয় লোকজন গোসল করছেন।
মো. রফিক নামে এক ব্যক্তি গোসল করছিলেন দীঘিতে। তিনি বলেন, ‘মাস খানেকের বেশি সময় ধরে দীঘি ভরাট করা হচ্ছে। এই দীঘির পানি স্থানীয় লোকজন গোসল ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করেন। এখানে ওয়াসার পানি আসে না। দীঘিই আমাদের ভরসা।’
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই মাস ধরে প্রায় দুই একরের এই দীঘির ভরাটকাজ চলছে। এখন দক্ষিণ পাশের দীঘি ভরাট করা হচ্ছে স্থাপনা নির্মাণের জন্য। বছর খানেক আগে উত্তর দিকের দীঘির কিছু অংশ ভরাট করা হয়েছিল। দীঘি ভরাটের আগে পাম্প দিয়ে কিছু পানি সেচ করে ফেলা হয়। এরপর ট্রাকভর্তি বালু ও মাটি এনে ফেলা হয় দীঘিতে। রাতের বেলায় এই মাটি ফেলা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দীঘি ভরাট বন্ধ করতে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও নগর পুলিশ বরাবরে আবেদন জানানো হয়েছে। পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে জলাশয় ভরাটের সত্যতাও পেয়েছে। তবু এটি ভরাট বন্ধ হয়নি।
হালিশহর থানার পরিদর্শক মো. সাইফুদ্দিন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘মাঝখানে একবার সেখানে ভরাটকাজ করার সময় আমরা কয়েকজনকে আটক করেছিলাম। এরপর কিছুদিন বন্ধ ছিল। এখন যদি আবার দীঘি ভরাট করে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, ‘আমরা হাজার দীঘি ভরাটের সত্যতা পেয়েছি। তাদের প্রথমে নোটিশ দিয়েছি। পরে এ ব্যাপারে পরিবেশ আদালতে একটি মামলাও হয়েছে। তারপরও যদি কাজ চলে, আমরা আরও কী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায় দেখব।’
এদিকে দীঘির ভরাট বন্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করা হলে আদালত ৭ জুন নিষেধাজ্ঞা দেন। বেলা চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বেলার রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ শুনানি শেষে ঐতিহ্যবাহী হাজার দীঘি ভরাট বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভরাট অংশ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে এনে তা সংরক্ষণের নির্দেশনাসহ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রুল জারি করেছেন।
দীঘি-সংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, মধ্য রামপুরের আবদুল হাকিম মিয়া ওয়াক্ফ এস্টেটের মালিকানাধীন এই দীঘিটি। ওয়াক্ফ এস্টেটের বর্তমান মোতয়াল্লি রফিক মিয়া। একই এস্টেটের অধীনে পাশাপাশি দুটি দীঘি। আগে দুটি মিলে একটি ছিল। ২৫-৩০ বছর আগে মাঝখানে বাঁধ দিয়ে দুটি দীঘিকে ভাগ করা হয়। দুটিই হাজার দীঘি নামে পরিচিত।
স্থানীয় লোকজন জানান, জহিরুল ইসলাম, মো. ইলিয়াছ ও মো. হোসেনসহ কয়েকজন এই দীঘি ভরাটের কাজ তদারকি করছেন। তাঁদের মধ্যে ইলিয়াছ রফিক মিয়ার ভাতিজা। ভরাটের জন্য কোনো দপ্তর থেকে অনুমতিও নেওয়া হয়নি।
জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রথম দিকে ভরাটকাজের সঙ্গে ছিলাম। এখন ইলিয়াছ এসব দেখাশোনা করছেন। ভরাট করে ওখানে ভবন করা হবে বলে শুনেছি।’
অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মো. ইলিয়াছ বলেন, ‘দীঘি ভরাটের সঙ্গে সেভাবে আমি জড়িত নই। তবে আপনি দীঘির ওখানে এসে আমাকে ফোন দেন তারপর সামনাসামনি কথা বলব।’
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে রফিক মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

Sunday, June 21, 2015

চট্টগ্রামে তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনা- কর্ণফুলী নদীতে তেল ছড়াচ্ছে by প্রণব বল

বোয়ালখালীতে সেতু ভেঙে খালে পড়ে যায় তেলবাহী ট্রেন। এতে
ট্রেনের তিনটি ওয়াগন থেকে ৭০ হাজার লিটারের বেশি তেল
কর্ণফুলীর পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল তোলা ছবি l প্রথম আলো
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী রেলসেতু ভেঙে খালে পড়ে যাওয়া ট্রেনের তিনটি ওয়াগন থেকে কর্ণফুলী নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এই খালে জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে কর্ণফুলী নদীর দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। ছড়িয়ে পড়া তেলের দূষণে খালসহ আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
তেল ছড়িয়ে পড়ায় নদীর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হবে বলে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সস অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. শাহাদত হোসেন। তিনি জানান, নদীর পানির অক্সিজেন কমে গিয়ে ছোট মাছ মরে যাবে। এর পর বালুকণার সঙ্গে তেল মিশে নদীর নিচের অংশ দূষিত করবে। এতে পানির নিচে বসবাসকারী জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়বে। এ ছাড়া যে এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়বে সেখানে মাছের আবাস নষ্ট হবে। এতে জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গতকাল শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. মকবুল হোসেনসহ প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তাঁরা খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করেন। মো. মকবুল হোসেন জানান, ৭০ হাজার লিটারের বেশি তেল খাল-বিল, পুকুর ও কর্ণফুলী নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আশপাশের ২০ কিলোমিটার এলাকায় এই তেল ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দূষণ কমাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তবে রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, রশি ও খড় দিয়ে তেল অপসারণ করার চেষ্টা করছেন রেলের কর্মীরা। তিনি জানান, প্রতিটি ওয়াগনে ২৫ হাজার লিটার তেল ছিল। দুর্ঘটনাকবলিত তিনটি ওয়াগন থেকে বেশির ভাগ তেল বের হয়ে গেছে।
গত শুক্রবার দুপুরে বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার সীমান্তে শাইরাপুল এলাকায় হারগেজি খালের (বোয়ালখালী খাল) সেতু পার হওয়ার সময় সেটি ভেঙে খালে পড়ে যায় তেলবাহী ট্রেন। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা তেল ডিপো থেকে ফার্নেস অয়েল নিয়ে ট্রেনটি চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী যাচ্ছিল। দোহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য আটটি ওয়াগনে করে তেল নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। দুর্ঘটনায় দুটি ওয়াগন খালে পড়ে যায়। আরেকটি ওয়াগন অর্ধেক ডুবে যায়। এ ছাড়া ট্রেনের ইঞ্জিন খালের পাশে কাত হয়ে পড়ে যায় এবং আরও একটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়।
সরেজমিনে গতকাল দুপুরে দুর্ঘটনাস্থলে দেখা যায়, খালের পানিতে কালচে তেল ভেসে আছে। দুই পাড়ের গাছের গোড়া ও সবজিখেতে কালো তেল লেগে রয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে ১০ কিলোমিটার ঘুরে খালের মিলিটারি পুল এলাকা দিয়ে তেল নদীতে মিশছে।
কর্ণফুলী নদীর মাঝি আবু জাকের জানান, শুক্রবার রাতেই নদীতে তেল ভাসতে দেখা যায়। কালুরঘাট সেতুর নিচে নদীতে গতকাল দুপুরেও তেল ভাসতে দেখেছেন তিনি।
হারগেজি খাল এলাকার বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন জানান, ট্রেন দুর্ঘটনার পর জোয়ারের সঙ্গে তেল করলডাঙ্গা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। আবার ভাটার সঙ্গে তা গিয়ে মিশছে কর্ণফুলী নদীতে। জোয়ারের সঙ্গে পুকুরেও ছড়িয়ে পড়েছে তেল।
গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বাদল। তিনি খাল থেকে তেল অপসারণের জন্য রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
দোহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের মহাব্যবস্থাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়াও গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে তেল ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
উদ্ধারকাজ: দুর্ঘটনার পর চারটি ওয়াগনকে রিলিফ ট্রেনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লাইনচ্যুত একটি ওয়াগন থেকে পাইপের মাধ্যমে তেল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রেলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মফিজুর রহমান জানান, উদ্ধারকাজ শেষ করতে অনেক সময় লাগবে। দুই দিনের মধ্যে ইঞ্জিনটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। রেললাইন সচল করতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগবে।

Friday, June 12, 2015

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ‘নিরুপায়’ শিশুরা by প্রণব বল

চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরের একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় কাজ
করছে এক​ শিশু। গতকাল সকালে তোলা ছবি l প্রথম আলো
১৩ বছরের শচীন কাজ করে চট্টগ্রাম নগরের মোমিন রোডের একটি গাড়ি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানে। বাবার আয়রোজগার কম, তাই ষষ্ঠ শ্রেণির পরই পড়াশোনার পাট চুকাতে হয়েছে তাকে। একই দোকানে কাজ করে তার সমবয়সী রিপন। পরিবারের অভাবের তাড়নায় এই বয়সে কাজ করছে সে।
মোমিন রোডের ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. আলমগীর বলেন, ‘শচীনকে আমার এখানে আনার পর তার অভিভাবকদের বলেছিলাম, তাকে লেখাপড়া করাতে। কিন্তু তার অভিভাবক বলল, ঠিকমতো খেতে পায় না। কাজ করা ছাড়া উপায় নেই।’
শচীন ও রিপনের মতো হাজারো শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। সরকারি হিসেবে চট্টগ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১০ হাজার। কিন্তু বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। শ্রম আইন অনুযায়ী, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা নিষেধ। এ ছাড়া শিশুদের দিয়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের শ্রম একেবারেই নিষিদ্ধ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক শিশু শ্রমিকের আয়ে চলে তাদের পরিবার। অভাবের তাড়নায় নিরুপায় হয়ে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। অন্যদিকে সস্তা শ্রমের কারণে শিশুদেরও কাজে নিয়োগের প্রবণতা আছে। এসব কারণে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সরকারি হিসাবে, চট্টগ্রামে ১০ হাজার শিশু শ্রমিক আছে। এরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত।
‘বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন’ নামের একটি প্রকল্প ছিল শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সম্প্রতি প্রকল্পটি শেষ হয়ে গেছে। ওই প্রকল্পের প্রোগ্রাম সুপারভাইজার ছিলেন মো. ইয়াসির আরাফাত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে ১০ হাজার শিশু শ্রমিক জড়িত।’
বিভিন্ন সূত্র জানায়, শিশু শ্রমিকেরা জাহাজভাঙাশিল্প, ঝালাই কারখানা, পুরান লোহালক্কড়ের দোকানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত। এসব কাজে নিয়োজিত বেশির ভাগ শিশুই দৈনিক ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন, অপরাজেয় বাংলাদেশ ও ব্রাইট বাংলাদেশ নামে তিনটি সংস্থার ‘শিশুশ্রম হ্রাসকরণ’ নামের একটি প্রকল্প আছে। ওই প্রকল্পের অধীনে নগরের চারটি ওয়ার্ডে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
অপরাজেয় বাংলাদেশের প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে কাজ করছি। আমাদের অভিজ্ঞতায় বলে নগরে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা ৪০ হাজারের কম নয়। আমরা শিশুশ্রম বিষয়ে শিশুদের অভিভাবক ও মালিকপক্ষকে সচেতন করে যাচ্ছি। তবে বাস্তবতা হলো, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে নিরুপায়।’
ইউসেপ বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন প্রায় ৩৫ বছর ধরে চট্টগ্রামে শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তারা শিশুদের কাজের ফাঁকে লেখাপড়া ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছে।
ইউসেপ বাংলাদেশের সহকারী প্রোগ্রাম কর্মকর্তা দেবাশীষ সেন বলেন, ‘আমাদের ১০টি জেনারেল স্কুল ও দুটি টেকনিক্যাল স্কুলে ১০ হাজারের বেশি শিশু আছে। তারা কাজের ফাঁকে পালা করে এখানে পড়ছে।’ তিনি বলেন, শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কাজে আসছে। দেবাশীষ সেনের মতে, চট্টগ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজার।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়তলী থানাসংলগ্ন পুরোনো জাহাজের সরঞ্জাম বিক্রির দোকানগুলোতে অন্তত ৫০টি শিশু কাজ করছে। শিশুদের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে টানা আট-নয় ঘণ্টা কাজ করতে হয়।
রঙ্গাজীব নামের একটি শিশু বলল, ‘আমার বাবা অসুস্থ। মা বাসাবাড়িতে কাজ করে। তাতে চলে না। তাই এখানে কাজ করছি।’

Saturday, February 7, 2015

এক খামারেই দুধ বায়োগ্যাস, জৈব সার by প্রণব বল ও আবদুর রাজ্জাক

(ছবি:-১ পটিয়ার উত্তর চরলক্ষ্যা এলাকার একটি খামারে গরু পরিচর্যা করছেন কর্মীরা l ছবি: সৌরভ দাশ ছবি:-২ পটিয়ার পাঁচ শতাধিক দুধের খামারের মধ্যে অন্তত ৩৫০টিতে বায়োগ্যাস প্রকল্প করা হয়েছে। সেই গ্যাসে রান্না চলছে চরলক্ষ্যা এলাকার একটি বাড়িতে l ছবি: প্রথম আলো) শুরুটা হয়েছিল চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার চরফরিদ গ্রামের আবু তাহেরের হাত ধরে। অস্ট্রেলিয়ান (জার্সি) জাতের দুটি গাভি দিয়ে দুধের খামার শুরু করেছিলেন তিনি। সেই খামার ধীরে ধীরে বড় হয়েছে, গাভি বেড়েছে, বেড়েছে দুধের উৎপাদনও। তা দেখে আশপাশের অনেকেই দুধের খামার শুরু করলেন। এখন খামার থেকে দুধ পাওয়ার পাশাপাশি বায়োগ্যাস প্রকল্প করে গ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন করা হচ্ছে। অর্থাৎ একটি খামার মানে একের ভেতরে তিন!
পটিয়ায় এখন পাঁচ শতাধিক দুধের খামারের মধ্যে অন্তত সাড়ে তিন শ খামারে বায়োগ্যাস প্রকল্প আছে। এসব খামার অনেক গ্রামের জীবনচিত্র পাল্টে দিয়েছে। শিক্ষিত যুবকেরাও এখন এমন খামার করতে এগিয়ে আসছেন। ফলে দিনে দিনে বাড়ছে খামারের সংখ্যা। কিছু সমস্যা থাকলেও খামার করে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প এখন পটিয়ার ঘরে ঘরে।
খামারের শুরু: ১৯৯১ সালের দিকে দুধের খামারের যাত্রা শুরু হয় পশ্চিম পটিয়া থেকে। যাঁর হাত ধরে শুরু, চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের চরফরিদ গ্রামের সেই আবু তাহের জানালেন, তাঁর বাবা ছিলেন আদর্শ কৃষক। জমি চাষ ও দুধের জন্য তিনি ১৯৬৫-৬৬ সালের দিকেই ২০ থেকে ৩০টি দেশি গরু পালতেন। এইচএসসি পাস করে ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে আবু তাহের নিজেও কৃষিকাজ শুরু করেন। তাহের বলেন, ‘১৯৭৮ সালে নিজেদের গরুর চিকিৎসার জন্য একদিন চট্টগ্রাম পশুসম্পদ অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে ডাক্তার ঘোষ নামের একজন চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনিই বিদেশি গাভি দিয়ে দুধের খামার করতে উৎসাহ দিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই চট্টগ্রাম শেরশাহ কলোনির একটি খামার থেকে দুটি অস্ট্রেলিয়ান (জার্সি) জাতের গাভি কিনে খামার শুরু করি। সঙ্গে বাবার এতগুলো গরু পালনের অনুপ্রেরণা তো ছিলই।’ বললেন, ‘খামার করে আমি সফল হয়েছি। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে পড়ালেখা করাচ্ছি।’
তাহেরের এই সাফল্য দেখেই মূলত দুধের খামার করার দিকে ঝুঁকে পড়েন অনেকে। পশ্চিম পটিয়ার চরলক্ষ্যা, চর পাথরঘাটা, বড় উঠান, শিকলবাহা এলাকায় খামারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
এল বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট: অনেকের মতোই লাভের কথা ভেবে দুধের খামার করেন জুলধা গ্রামের হাজি মো. ইব্রাহিম। বায়োগ্যাস প্রকল্প এল তাঁর হাত ধরেই। সেই গল্প শোনালেন তিনি, ‘২০০৫ সালের দিকে টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদনে গরুর গোবর ও নানা ধরনের বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস প্রকল্প তৈরি করা দেখেছিলাম। সেটা দেখেই আমারও এমন প্রকল্প করার কথা মাথায় আসে। তখন খামারের পাশাপাশি প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করে বায়োগ্যাস প্রকল্প করি।’ হাজি ইব্রাহিম জানালেন, প্রথমে নিজের রান্নার কাজে এই গ্যাস ব্যবহার করতেন। পরে আশপাশের ২০টি পরিবারে গ্যাসের সংযোগ দেন। তা থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। এ ছাড়া প্রকল্পে ব্যবহার করা গোবর থেকে যে জৈব সার হয়, তা বিক্রি করে মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি আয় হয়।
সফলদের কয়েকজন: চরলক্ষ্যা এলাকার যুবক মো. বেলাল এইচএসসি পাস করে ২০০৭ সালে লেগে যান খামার ব্যবসায়। চারটি গাভি কিনে শুরু করেছিলেন। এখন সব মিলিয়ে তাঁর গরুর সংখ্যা এক শর কাছাকাছি। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ লিটার দুধ হয় বেলাল ডেইরি ফার্ম নামের খামারে। প্রতিদিন দুই বেলা দুধ সংগ্রহ করে নিয়ে যান গোয়ালারা।
দেড় বছর আগে খামারের গোবর ব্যবহার করে বেলাল গড়ে তোলেন বায়োগ্যাস প্রকল্প। সম্প্রতি একদিন বেলালের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, সেই বায়োগ্যাসে বেলালের ঘরে জ্বলছে বাতি, চলছে চুলা। গ্যাস উৎপাদন শেষে ওই প্রকল্পের গোবর জৈব সার হিসেবে বিক্রি করেন তিনি।
আরেকজন সফল খামারি নাজিম উদ্দিন হায়দার। জানালেন, ‘২০০৫ সালে ৪৫ হাজার টাকায় অস্ট্রেলিয়ান জাতের একটি গাভি কিনেছিলাম। সেই গাভি থেকে তখন ১৫ লিটার দুধ পেতাম। পর্যায়ক্রমে গাভির সংখ্যা বেড়ে ৫০টি পর্যন্ত হয়। ২০১১ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খামার করেছি। এখন শতাধিক অস্ট্রেলিয়ান গাভি আছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ লিটার দুধ পাই।’ সবচেয়ে বড় বায়োগ্যাস প্রকল্পটি করছেন নাজিম উদ্দিনই। ওই প্রকল্প থেকে ১০০ পরিবার জ্বালানি গ্যাস পাবে।
শিক্ষিত তরুণেরাও এগিয়ে এসেছেন এ রকম খামার গড়তে। আট বছর আগে শিকলবাহার মো. ফোরকান কয়েকটি গরু নিয়ে শুরু করেন খামার। খামারের কাজ করতে করতেই স্নাতক পাস করেন। পাস করার পর আরও পুরোদমে ব্যবসায় নেমে পড়েন। তার এখন ১৫টি গাভি রয়েছে। পাশাপাশি একটি ভেটেরিনারি ওষুধের দোকানও গড়ে তুলেছেন তিনি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে তাঁর কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্রের আয়। ফোরকান বলেন, ‘আমি খামারের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্র গড়ে তুলেছি। এই কেন্দ্রের আয় আমার বড় অবলম্বন।’
কিছু সমস্যা: উৎপাদিত দুধের বেশির ভাগই যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে। এর বাইরে পাঁচ হাজার লিটারের মতো যায় পটিয়ায় মিল্ক ভিটার দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রে। প্রতি লিটার দুধ ঘনত্বের তারতম্য অনুযায়ী ৪৬ থেকে ৫১ টাকায় বিক্রি হয়। তবে ঘণত্ব কম হলেও ওই দুধ লিটারপ্রতি ৩৫ টাকার বেশি বিক্রি হয়।
গ্রীষ্মকালে সমস্যায় পড়েন খামারিরা। ফলের মৌসুম হওয়ায় ওই সময় মিষ্টির চাহিদা কমে যায়। মিষ্টির দোকানগুলো ওই সময় দুধ কম কেনে। দুধের দাম পড়ে যায়। খামারিদের দাবি, ওই এলাকায় আরও কয়েকটি দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র করা হলে এ সমস্যার মুখে পড়তে হবে না তাঁদের। আরেকটি সমস্যা হলো, পর্যাপ্ত পশু চিকিৎসক নেই। তাই গরু রোগাক্রান্ত হলে ভোগান্তিতে পড়েন খামারিরা। চিকিৎসাসেবার অভাবে গরু মারাও যায়।
তাঁদের কথা: পটিয়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রাজীব চক্রবর্ত্তী চিকিৎসক সংকটের কথা স্বীকার করলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের হিসাবে চার শতাধিক খামার আছে। এসব খামারে দৈনিক গড়ে ৬০ হাজার লিটার দুধ হয়। ছোট খামারগুলো হয়তো আমাদের হিসাবে নেই।’ দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ফরহাদুল আলম বলেন, ‘আমরা খামারিদের দুধ নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবাও দিয়ে আসছি।’
পশ্চিম পটিয়া কর্ণফুলী ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘শুরুতে দু-একজন দেশের বাইরের গরু দিয়ে ঘরোয়াভাবে খামার করে। এখন প্রতিদিনই বাড়ছে খামারির সংখ্যা। পাঁচ শর বেশি খামার এখন রয়েছে। আশার কথা, শিক্ষিত যুবকেরা এখন এই খামারের দিকে ঝুঁকছে।’

Thursday, February 5, 2015

সীতাকুণ্ডে পেট্রলবোমায় তিনজন দগ্ধ- ‘বুকের মানিকরে পোড়ায় দিছে’ by প্রণব বল

(সীতাকুণ্ডে গত মঙ্গলবার রাতে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় ঝলসে গেছে আনোয়ারুল ইসলামের শরীর। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তাঁকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন মা রেহানা আক্তার l ছবি: প্রথম আলো) গত মঙ্গলবার রাত পৌনে আটটা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলার শেখপাড়া এলাকা। একটি পিকআপ লক্ষ্য করে পর পর তিনটি পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তেই ঝলসে যান চালক আনোয়ারুল ইসলামসহ (২০), বিক্রয়কর্মী ঝন্টু পাল (২৪) ও জিল্লুর রহমান (২২)। তাঁদের তিনজনের বাড়ি মিরসরাইয়ের বড় দারোগাহাট এলাকায়। বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। পাশাপাশি শয্যায় ঠাঁই হয়েছে আনোয়ার, ঝন্টু ও জিল্লুরের।
আনোয়ারের মা রেহেনা আক্তার ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পাশে থাকা স্বজনকে জড়িয়ে ধরে বলছেন, ‘আমার বুকের মানিকরে পোড়ায় দিছে তারা।’ টানাটানির সংসারে এই ছেলেই যে তাঁর বড় ভরসা। দুর্বৃত্তের ছোড়া বোমায় হঠাৎ ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে তাঁর জীবনে। যে হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরতেন আনোয়ার, সে হাত-ই যে পুড়ে গেছে।
কথা হয় রেহেনা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী অন্ধ। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আনোয়ার বড়। তার আয়ে আমাদের ঘর চলে। জমিজমা নেই। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেল।’
আনোয়ারের শরীরের ৯ ভাগ পুড়ে গেছে। ঝন্টু পালের ৩০ ভাগ ও জিল্লুরের ১২ ভাগ। ঝন্টুর হাত, মুখ, বুক পুড়ে গেছে। জিল্লুরেরও দুই হাত, বুক ও মুখ ঝলসে গেছে।
ঝন্টুর বড় ভাই বিপ্লব পাল ভাইয়ের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন। বিপ্লব লেখাপড়া করেন। ছোট ভাই ঝন্টুর আয়ে তাঁদের সংসার চলে। ঝন্টুর এমন অবস্থার কথা গতকাল বিকেল পর্যন্ত তাঁর মা কল্পনা পালকে জানানো হয়নি। বিপ্লব বলেন, ‘মা প্রেশারের রোগী। তাঁকে ভাইয়ের এই খবর জানানো হয়নি। এখন আমাদের সংসার কীভাবে চলবে জানি না। হয়তো আমাকে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হবে।’
জিল্লুরের মা মঞ্জুরা খাতুন ছেলে দগ্ধ হওয়ার খবর শুনে অচেতন হয়ে পড়েন। হাসপাতালে দেখতে ছুটে আসতে চাইলেও স্বজনেরা তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে হাসপাতালে যেতে দেননি। জিল্লুরের খালাতো ভাই বাহার উদ্দিন জানান, দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট জিল্লুর। বড় ভাই কৃষিকাজ করেন। সংসারের দায়িত্ব জিল্লুরের কাঁধে। চার বোনের মধ্যে তিন বোনের বিয়ে হয়েছে। এখন এই পরিবারটি কীভাবে চলবে...।
বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক মো. এস খালেদ জানান, তিনজনের মধ্যে ঝন্টুর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পেট্রলবোমা হামলা হওয়া পিকআপের পেছনে ছিলেন একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী বিক্রয়কর্মী রবিউল হাসান। ভাগ্য সহায় হওয়ায় তিনি রক্ষা পেয়েছেন। হাসপাতালে এখন তিন সহকর্মীর শুশ্রূষা করছেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রবিউল বলেন, ‘মিরসরাইয়ের বড় দারোগাহাট থেকে পণ্য নিয়ে আমরা সীতাকুণ্ড যাচ্ছিলাম। পন্থিছিলা আসার পর গাড়ির বাঁ দিক থেকে পর পর তিনটি পেট্রলবোমা মারা হয়। বাঁ দিকে ছিলেন ঝন্টুদা। তিনজনই দগ্ধ হন। আমি পেছন থেকে নেমে পড়ি। একটু পর আগুনে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়।’

Sunday, January 18, 2015

টাকা কীভাবে শোধ দেবেন ফজলুর?- চট্টগ্রামে পেট্রলবোমায় দগ্ধ রিকশাচালক by প্রণব বল

ডিসেম্বর মাসে ছয় হাজার টাকা ধার করেছিলেন ফজলুর রহমান। তাঁর মেয়ে রুমি আক্তার এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষার ফি জমা দিতে এই টাকা ধার করতে হয়েছে তাঁকে। মেয়েকে নিয়ে বড় স্বপ্ন তাঁর। সংসার খরচ তো আছেই, ধার করা টাকা ফেরত দেওয়ার দুশ্চিন্তাও এক মাস ধরে পোড়াচ্ছে ফজলুর রহমানকে। পঞ্চাশ পেরোনো জীর্ণ শরীর নিয়ে তাই রাতেও রিকশা নিয়ে বের হতে হয় তাঁকে। হাড়ভাঙা খাটুনির পর গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এরপর আবারও রিকশা নিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু ঘরে ফেরার আগেই অন্ধকার ফুঁড়ে ছুটে আসা পেট্রলবোমায় ফজলুর রহমানের জীবন এখন সংকটাপন্ন। টানা অবরোধের মধ্যে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রামের কর্নেলহাট সিডিএ-১ নম্বর এলাকায় রিকশা চালানো অবস্থায় পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে গতকাল শনিবার কথা হয় ফজলুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একদিন রিকশা না চালালে আমার সংসার চলে না। তার ওপর ওই ঋণ। এখন কী হবে? আমার তো সব শেষ।’ নগরের বিশ্বকলোনি এলাকায় ছেলে আমিনুর রহমানকে নিয়ে থাকেন ফজলুর রহমান। আমিনও রিকশা চালান। তাঁদের বাড়ি নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায়। সাত মাস আগে ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি কর্নেলহাট থেকে দুই যাত্রী নিয়ে বিশ্বকলোনি যাচ্ছিলাম। সিডিএ-১ এলাকায় আসার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার পাশের অন্ধকার থেকে একজন পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। এসে পড়ে আমার হাতের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত ও লুঙ্গিতে আগুন লেগে যায়। দুই যাত্রী লাফ দিয়ে বেঁচে যান।’
আগুনে দুই হাত, কোমরসহ দুই পা দগ্ধ হয়েছে ফজলুর রহমানের। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক মিশমা ইসলাম জানিয়েছেন, ‘ফজলুর রহমানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। রোগী কথা বলছে, এটা দেখে ভালো মনে হতে পারে। কিন্তু ৩৫ শতাংশ পোড়া রোগীর অবস্থা যেকোনো মুহূর্তে খারাপ হয়ে যেতে পারে।’
বাবার চিকিৎসা, সংসার খরচ, বোনের পরীক্ষা— কীভাবে একা সব সামাল দেবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না আমিনুর রহমান। তিনি জানান, নওগাঁয় মায়ের সঙ্গে তাঁর বোন থাকে। মুঠোফোনে তাঁদের খবর জানিয়েছেন। সবাই কাঁদছে। তিনি বলেন, ‘আমার বোন এসএসসি পরীক্ষা দেবে, এ নিয়ে বেশি ভাবতেন বাবা। এখন সব শেষ হয়ে গেল।’
দগ্ধ ট্রাকচালক: প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের অন্য একটি শয্যায় কাতরাচ্ছেন ট্রাকচালক তাজুল ইসলাম। তাঁর তিন সন্তান। ১০ জানুয়ারি কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম আসার পথে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন। বুক, মুখ, হাতসহ তাঁর শরীরের ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁর অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানান চিকিৎসকেরা। তাজুল বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের ওপর কেন হামলা হয়?’

Sunday, September 21, 2014

সরকারি জমি দখল করে ‘জমিদার’ ক্ষমতাসীনেরা by প্রণব বল

ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় জেগে ওঠা চর দখল করে বস্তি-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বকশিরহাট ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি মো. আকতার হোসেন। পাশাপাশি বিরোধী দল বিএনপি, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীরা এই দখলপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।

দখল সুসংহত রাখতে গঠন করা হয়েছে ‘ভেড়ামার্কেট শ্রমজীবী সমবায় কল্যাণ সমিতি’ নামে একটি সংগঠন। সমিতির সভাপতি আকতার হোসেন। সমিতির নেতাদের প্রত্যেকের পাঁচ থেকে ৫০টি পর্যন্ত কক্ষ রয়েছে। এঁরা ‘জমিদার’ নামে পরিচিত।
আকতার হোসেনের নামে সবচেয়ে বেশি ৬০টি কক্ষ রয়েছে। তিনি কসাই আকতার নামে পরিচিত। সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাত্তার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কর্মী। বকশিরহাট ইউনিট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উত্তম নাগেরও বেশ কিছু ঘর রয়েছে।
সমিতির সভাপতি এবং ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি আকতার হোসেন দাবি করেন, ‘এখানে গরিব লোকজন থাকেন। যাঁরা জমি দখল করেছেন, তাঁদের কেউ ব্যবসায়ী, কেউ রাজনীতিক কেউবা বড় চাকুরে। এগুলো ব্রিটিশ আমলে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ ছিল। একসময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে চর জেগে উঠলে এগুলো সরকারি খাস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। আমরা চর ভরাট করে ১৫-২০ বছর ধরে বসবাস করছি। এগুলো নিয়ে মামলাও চলছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আকতার, সাত্তার, উত্তম নাগ ছাড়াও দখলদারদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপি নেতা আকতার কামাল, ড্রেজার মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর মেম্বার, ফরিদ চেয়ারম্যান, আজিম সওদাগর, ইছহাক সওদাগর, ইয়াহিয়া খান, শুক্কুর আলী, এরশাদ আলী, আলী আব্বাস তালুকদার, জোস মোহাম্মদ, ইয়াছিন প্রমুখ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চাক্তাই এবং রাজাখালী খালের পাশে জেগে ওঠা চরের কর্ণফুলী নদীর কিনারের অংশে সীমানাদেয়াল। দেয়াল থেকে নদীর কিনারার অংশের মালিক চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বাকি ১০০ একরের বেশি জায়গা সরকারি খাস জমি। এই জমির তদারকিতে রয়েছে জেলা প্রশাসন। ওই জমিতে গড়ে উঠেছে বস্তি। বস্তির মাঝামাঝি ভেড়ামার্কেট শ্রমজীবী সমবায় কল্যাণ সমিতির একটি সাইনবোর্ড এবং কার্যালয়। বস্তিতে কাঁচা, সেমিপাকা এবং পাকা ঘর মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে রয়েছে বিদ্যুৎ-সংযোগ। সবার জন্য রয়েছে সাধারণ শৌচাগার। প্রতিটি কক্ষ থেকে মাসে এক থেকে দেড় হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। বস্তির বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, তিনি সাত-আট বছর ধরে এই বস্তিতে আছেন। তাঁর কক্ষের ভাড়া নেওয়া হয় দেড় হাজার টাকা।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘শত শত একর জমিতে বস্তি গড়ে উঠেছে। এর পেছনে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী অনেকে থাকতে পারেন। যাঁরাই জড়িত থাকুন, আমরা বস্তি উচ্ছেদ করব। বস্তি উচ্ছেদ করে জায়গা খালি রাখা যাবে না। খালি রাখলে আবার দখল হবে। সেখানে কী করা যায়, সেই পরিকল্পনা করেই দ্রুত উচ্ছেদ করা হবে।’
মেরিনার্স ড্রাইভ সড়কের কাজ ব্যাহত: বস্তির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেরিনার্স ড্রাইভ সড়ক। সড়কটি কর্ণফুলী তৃতীয় সেতুর সঙ্গে মিলিত হওয়ার কথা। বস্তির কারণে সড়কের নির্মাণকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তবে সম্প্রতি বস্তির কয়েকটি ঘর উচ্ছেদ করে সড়ক সম্প্রসারণ কাজ করা হয়।
এরই মধ্যে সড়কের দুই পাশে ভাসমান দোকান বসানোর হিড়িক পড়েছে। বস্তির লোকজন এসব দোকান বসাচ্ছে। সড়কটি চালু হলে এসব দোকানের কদর বাড়বে। ইলিয়াছ নামে বস্তির একজন বাসিন্দা একটি দোকান দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সড়কটি চালু হলে এসব দোকানে ব্যবসা ভালো হবে। এই আশায় একটি ভাসমান দোকান করেছি। কাউকে টাকা দিতে হয়নি।’
সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘করপোরেশনের আওতাধীন মেরিনার্স সড়ক নির্মাণের জন্য কিছু ঘর আমরা ভেঙে দিয়েছি। আমরা সড়কের জন্য ৬০ ফুট জায়গা নিয়েছি। কিন্তু এর দুই পাশে এখনো অবৈধ বস্তি রয়েছে। সড়কের দুই পাশের জায়গাও দখল হচ্ছে।’

Thursday, June 27, 2013

চাহিদার ৪০ শতাংশ সরবরাহ পানির জন্য গরিবের হাহাকার by প্রণব বল

‘তিন দিন ধরে পানি আসে না। প্রতিদিন কলস লাইনে বসাই। পরে নিরাশ হয়ে নিয়ে আসি। অনেক দূর থেকে প্রতি কলস দুই টাকা করে পানি এনে কোনো রকমে জরুরি কাজগুলো সারছি এখন।’

Wednesday, June 26, 2013

চট্টগ্রামে দরপত্রের নিয়ন্ত্রক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ by একরামুল হক ও প্রণব বল

চট্টগ্রামে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়নকাজের বেশির ভাগ দরপত্রই নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা। এদের অনেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত।

Sunday, June 23, 2013

বাজল তামিমের বিয়ের সানাই by প্রণব বল

বৃষ্টির ঝাপটা তখন কমে এসেছে। ঝরছে ঝিরি ঝিরি ঝরনার মতো। ত্রিপল ঢাকা টেনিস কমপ্লেক্স উদ্যানে অপেক্ষমাণ হাজারো নর-নারী। অপেক্ষা নাকি প্রতীক্ষা! ইতিহাসের সাক্ষী বলে কথা। ক্লান্তিহীন এই প্রতীক্ষা তামিম ইকবাল দম্পতির জন্য।

Thursday, June 20, 2013

খুঁড়িয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা by প্রণব বল

১৭ জুন তিন বছর পার হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের। সিটি মেয়র মোহাম্মদ মন্জুর আলম দায়িত্ব নেন এক মাস পর ২০ জুলাই। এ তিন বছরে নাগরিক সেবার মান কি বেড়েছে, নাকি আগের অবস্থান থেকে সূচক নিম্নগামী?

Sunday, February 3, 2013

ভেন্যু এম এ আজিজ- আশা এখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের by প্রণব বল

শহরের মানুষের যেন কোনো কাজকর্ম নেই। সবাই ছুটছে। গন্তব্য এক। সব পথ যেন মিশে গেছে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। এত দর্শক! গেল শুক্রবারের দৃশ্য। দর্শক-উপস্থিতিতে ওইদিন সব দিনকে ছাপিয়ে যায়। বেলা যত গড়িয়েছে, তত স্টেডিয়ামের আশপাশে বেড়েছে ভেতরে ঢুকতে না পারা মানুষের সংখ্যা।