Wednesday, February 18, 2026
নোয়াখালীতে তালা ভেঙে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা, দিলেন স্লোগান
জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি নোয়াখালী শহরের টাউন হল মোড়ে অবস্থিত। কার্যালয় খোলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশের একটি দল। এ সময় সন্দেহভাজন পাঁচজনকে আটক করা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয়ের সামনে বেশ কিছু পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কার্যালয়ের পাশে পুলিশের একটি গাড়িতে আটক পাঁচজনকে রাখা হয়েছে। আশপাশের দোকানিসহ কিছু উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় করেছেন।
তালা ভেঙে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ঢোকা এবং স্লোগান দেওয়ার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, ‘নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়’ লেখা একটি ব্যানার হাতে নিয়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে বয়স্ক এক ব্যক্তিকেও দেখা গেছে। ব্যানারটি টাঙিয়ে দিয়ে সবাই সটকে পড়েন।
জানতে চাইলে সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ভোরে দলীয় কার্যালয়ের তালা ভেঙেছেন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। জড়িত বাকি ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য অভিযান চলছে।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার জেরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা এই ভাঙচুর চালান। এ সময় কার্যালয়টিতে আগুনও দেওয়া হয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে কার্যালয়টির প্রধান ফটকে তালা ঝোলানো ছিল।
![]() |
| ব্যানার হাতে নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের স্লোগান। আজ সকালে নোয়াখালীর মাইজদীর টাউন হল মোড়ে অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া |
Monday, April 28, 2025
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের ভাইকে কোপাল কিশোর গ্যাং সদস্যরা
হামলায় শাহরিয়ার হাসান গুরুতর আহত হয়। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাত আটটার দিকে আহত শাহরিয়ারকে নিয়ে নোয়াখালী থেকে অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। শাহরিয়ার শহরের হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র।
এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ রাত পৌনে দশটার দিকে জেলা শহর মাইজদীতে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বিক্ষোভ-সমাবেশে শহীদ রিজভীর ভাই শাহরিয়ারের ওপর হামলার ঘটনার জন্য আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের লালিত কিশোর গ্যাংকে দায়ী করা হয় এবং হামলাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
শাহরিয়ারের মা ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, তাঁর ছেলে শাহরিয়ার স্থানীয় হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। গত দুই দিন আগে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে বাইরের কয়েকজন তরুণের ঝগড়া হয়। বিষয়টি তাঁকে (মা) এবং স্কুলের শিক্ষকদের জানায় শাহরিয়ার। পরে বিষয়টি সে মীমাংসা করে দেয়। এ জন্য বহিরাগত তরুণেরা তার বন্ধুদের মারতে পারেনি। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয় শাহরিয়ারের ওপর। আজ বিকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে ওই তরুণেরা শাহরিয়ারের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে।
শাহরিয়ারের বাবা জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, হামলাকারীরা প্রথম দুটি মোটরসাইকেলে করে আসে। এরপর আরও কয়েকজন এসে তাঁর ছেলেকে ঘিরে ধরে ব্যাগের ভেতর থেকে ধারালো অস্ত্র বের করে কোপাতে থাকে। এতে তাঁর ছেলে মারাত্মকভাবে আহত হয়। পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) রাজীব আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শাহরিয়ার হাসান নামের এক কিশোরকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ড থেকে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক আরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের কিশোর গ্যাং শহীদ রিজভীর ছোট ভাই শাহরিয়ারকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে। তারা তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। ঘটনার প্রতিবাদে তাঁরা আজ রাতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। এ ছাড়া হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আগামীকাল সোমবার সকালে হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করা হবে।
সুধারাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, শাহরিয়ারের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। বড় ভাই–ছোট ভাই মধ্যকার বিরোধের জের ধরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ওই হামলা চালিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
![]() |
| কিশোরগ্যাং সদস্যদের হামলায় আহত স্কুলছাত্র শাহরিয়ার হাসানকে হাসপাতালে আনা হয়। গতকাল রাতে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে। ছবি: প্রথম আলো। |
Saturday, October 5, 2024
ধরাছোঁয়ার বাইরে একরামপুত্র সাবাব by মারুফ কিবরিয়া
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৯শে জুন মহাখালী ফ্লাইওভারে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর সময় সেলিম নামের এক চালক ঘটনাস্থলে মারা যান। সেই ঘটনায় কাফরুল থানায় মামলা হয়। কিন্তু মামলায় রহস্যজনকভাবে সাবাবকে আসামি করেনি পুলিশ। সম্প্রতি অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে আদালতে। কাফরুল থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এই মামলা তদন্তকালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। একরামুল করিম চৌধুরীর সঙ্গে আরেক প্রভাবশালী সাবেক এমপি হাজী সেলিম পরিবারের আত্মীয়তা। এ ছাড়া একরাম চৌধুরীও প্রভাব বিস্তার করেছেন। সবমিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় সাবাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ ছিল না।
ওই ঘটনার পর গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়, রাজধানীর মহাখালী উড়ালসড়কে গাড়িচাপা দিয়ে এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় দায়ী গাড়িটিকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-১৩-৭৬৫৫। আর বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিতে (বিআরটিএ) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাড়িটির মালিক কামরুন্নাহার শিউলি। তিনি নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর স্ত্রী ও নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার চেয়ারম্যান। তবে ওই দুর্ঘটনার পর গাড়িটি দ্রুত এসে সংসদ ভবনের উল্টো দিকের ন্যাম ফ্ল্যাটে যখন ঢোকে, তখন সেটিকে অনুসরণ করেন এক মোটরসাইকেল আরোহী ও আরেকজন প্রাইভেটকার আরোহী। তারা জানিয়েছেন, গাড়িটি ওই ভবনে ঢোকার পর একজন তরুণ গাড়ি থেকে নামেন। ভবনটির আনসার ও প্রহরীরা জানিয়েছেন, ওই তরুণের নাম সাবাব চৌধুরী। তিনি কামরুন্নাহার শিউলি ও সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। গাড়িটি সাবাবই চালাচ্ছিলেন।
বাবার ক্ষমতার জোরে সুবর্ণচরের জনপ্রতিনিধি সাবাব তার বাবা একরামুল করিম চৌধুরীর ক্ষমতার জোরেই নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। অভিযোগ রয়েছে, সেই ভোটেও কারচুপির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হারানো হয়েছে। এ ছাড়া গত মে মাসে হয়ে যাওয়া উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে ছেলেকে ভোট না দিলে এলাকায় উন্নয়ন বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন একরামুল করিম চৌধুরী। পরে জোর করে সেই নির্বাচনে জয়ী হয়েই পরাজিত প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠে সাবাবের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি নোয়াখালীতে সরজমিন ঘুরে জানা যায়, একরামপুত্র সাবাব বিদেশে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু দেশে বাবা একরাম ও মা শিউলির সঙ্গে অপরাজনীতিতে নাম লেখান। বাবা-মায়ের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নিজেও বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালীতে একরাম পরিবারের নামে যেসব চাঁদা উঠতো তার বেশির ভাগই পাচার করা হয় বিদেশে। ভিয়েতনামে একরামের নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠান দেখভাল করেন তারই ছেলে সাবাব চৌধুরী। বাবার অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত টাকা ভিয়েতনামে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন তিনি। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সাবাবের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

Sunday, September 22, 2024
এখনো অধরা নোয়াখালীর আওয়ামী লীগ নেতারা
সেনবাগ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৩টি মামলার মধ্যে একটি করা হয়েছে ২০১৮ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সেনবাগ উপজেলা বিএনপি’র কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে। বিএনপি’র কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক মো. ইলিয়াছ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় নোয়াখালী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম, তার ছেলে সাইফুল ইসলাম দিপুসহ ৩০ জনের নামোল্লেখ করে ৪৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ২৩শে জানুয়ারি উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের শ্রীপদ্দি গ্রামের বিএনপিকর্মী মিজানুর রহমানের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়। মামলায় মোরশেদ আলমসহ ৩৪ জনের নামোল্লেখ করে আরও ৪৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। উপজেলার ছমির মুন্সীরহাট বাজারের ব্যবসায়ী ও বিএনপিকর্মী ইউছুফ আলীর দোকানে গত ৩রা আগস্ট হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আরেকটি মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমসহ ৩৮ জনের নামোল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৬৫ জনকে। শনিবার মামলার বিষয়টি সেনবাগ থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ৩ মামলার কোনো আসামিকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা যায়নি।

Wednesday, August 21, 2024
কাদের মির্জার যত অনিয়ম দুর্নীতি by মারুফ কিবরিয়া
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নিজ নির্বাচনী উপজেলা এটি। কাদের মির্জা তারই আপন ছোট ভাই। ১৫ বছর তিনি এখানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন সবই ছিল তার কাছে তুচ্ছ। স্থানীয়রা দাবি করেন, ওবায়দুল কাদের এলাকায় খুব একটা যাতায়াত না করলেও ভাইয়ের মন্ত্রিত্ব ও দলীয় সর্বোচ্চ পদ থাকায় বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন কাদের মির্জা।
সরজমিন জানা গেছে, বসুরহাটের সাবেক এই পৌর মেয়র ও তার পরিবারের লোকজনের কাছে পুরো কোম্পানীগঞ্জবাসীই ছিলেন জিম্মি। কেউ তার বিরুদ্ধে কিছুই বলতে পারতেন না। চাঁদাবাজি, ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী মত দমন, নিয়োগ বাণিজ্য- কী করেননি তিনি? অত্যাচার চালিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপরও।
কাদের মির্জার যত অনিয়ম, দুর্নীতি: কোম্পানীগঞ্জের টেন্ডারবাজি, দখল, চাঁদাবাজি, মন্ত্রী কোটার টিআর, কাবিখা, সরকারি অফিস-আদালত সবই কাদের মির্জার নিয়ন্ত্রণে চলতো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত মির্জার ইশারা ছাড়া কিছুই হতো না। স্থানীয় প্রশাসনও কখনো মির্জার ইচ্ছার বাইরে যাননি। বসুরহাট বড় মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদের ইমাম কে হবেন তাও ঠিক করতেন কাদের মির্জা। বড় ভাই ওবায়দুল কাদেরের প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশের সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের সকল অফিস থেকে চাঁদা আদায় করতেন তিনি। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয় দেখাতো ফেসবুক লাইভে এসে সব বলে দেয়ার। নিজের দলের নেতাকর্মী, সমর্থকদের থেকেও বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদা আদায় করতেন। আওয়ামী লীগ সমর্থক চরকাঁকড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খালের পাশে হওয়ায় খালের ওপর কালভার্ট করায় কয়েক ধাপে ৩ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন কাদের মির্জা। বসুরহাট বাজারের প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যবসায়ীর থেকে তিনি বিভিন্ন দিবসসহ দল চালানোর কথা বলে বছরে ৫ কোটি টাকার উপরে চাঁদা আদায় করতেন। তার এসব চাঁদা সংগ্রহ করতেন বসুরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা করিমুল হক সাথী। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বসুরহাট বাজারের বেশ কয়েকটি স্থান থেকে টোল আদায় করতেন কাদের মির্জা। মির্জার নির্দেশে বছরে প্রায় ২ কোটি টাকার টোল আদায় করতেন তার অনুসারী শ্রমিক লীগ নেতা ওয়াসিম। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে বসুরহাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মতিন লিটন মানবজমিনকে বলেন, একজন স্বৈরাচার ছিলেন মির্জা কাদের। মানুষকে অত্যাচার নির্যাতন করেছেন ক্ষমতায় থাকাকালীন। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে চাঁদা আদায় করতেন। টাকা না দিলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। ব্যবসা বন্ধের হুমকি দিতেন। তবে ৫ই আগস্ট ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর কোম্পানীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে রয়েছেন বলেও জানান লিটন।
মির্জার টর্চার সেল: কাদের মির্জা শুধু মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন না, ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষকে কখনো কখনো নিয়ে যেতেন পৌরসভার তিনতলায়। সেখানে তিনি গড়ে তুলেন একটি আধুনিক টর্চার সেল। ওই টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় ৫০ জন ব্যবসায়ী, শতাধিক আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। টর্চার সেলে ছিল অস্ত্র ভাণ্ডার। এ ছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়েও ছিল একটি টর্চার সেল। সোমবার সরজমিন দেখা যায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি ভেঙে দেয়া হয়েছে। ৫ই আগস্ট কাদের মির্জা এলাকা থেকে পালিয়ে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা অগ্নিসংযোগ করে।
ভূমি দখলের সর্দার মির্জা কাদের: উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের মুছাপুর ক্লোজারে কাদের মির্জা ৬০০ একর খাস জায়গা দখল করেন। এরপর ভুয়া ভূমিহীন সাজিয়ে ৪ কোটি টাকার ভিটি বিক্রি করেন। ক্লোজার সংলগ্ন নদী থেকে গত ৩ বছর অবাধে বালু উত্তোলন শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় ২০ কোটি টাকার বালু উত্তোলন করেন কাদের মির্জা। তার এই অবৈধ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন মুছাপুরের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আইয়ুব আলী ওরফে টাকলা আলী। বসুরহাট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর বাবুলের বসুরহাট বাজারের রূপালী চত্বর সংলগ্ন বহুতল ভবন কৌশলে দখল করে নেন কাদের মির্জা। উপজেলা ভূমি অফিসের খাস জায়গা দখল করে বাবার নামে মোশারেফ হোসেন ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণ করেন।
কাদের মির্জার হেলমেট বাহিনী: কাদের মির্জার ছিল সশস্ত্র হেলমেট বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল শতাধিক। কোম্পানীগঞ্জের মানুষ ছিল তাদের কাছে জিম্মি। এ বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরনবী চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খিজির হায়াত খান, উপজেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান রিপনসহ প্রায় ২ শতাধিক মানুষ। যুবদল নেতা রাজন ও ফয়সালের বাড়িতে হামলা চালায় এ বাহিনীর সদস্যরা। হেলমেট বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল কাদের মির্জার ছেলে তাশিক মির্জা কাদের, আর্থিক ও প্রশাসনিক শেল্টারে ছিল মির্জা ও তার স্ত্রী বকুল। হেলমেট বাহিনীর সেকেন্ড কমান্ড ছিল বসুরহাট পৌরসভার কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা রাসেল, হামিদ ওরফে কালা হামিদ, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মারুফ, সাধারণ সম্পাদক তন্ময়, বসুরহাট পৌরসভা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জিসান, কেচ্ছা রাসেল, বাংলা বাজারের পিচ্ছি মাসুদ ওরফে ডাকাত মাসুদ, রাস্তার মাথার শিপন, বসুরহাট পৌরসভার কর্মচারী পিচ্ছি স্বপন, শুঁটকি কামাল, মাছ সবুজ, ঠোঁট কাটা শিবু, পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হোনারি বাড়ির ছায়েদ ও মাছ ব্যবসায় শামীম। এ বাহিনীর সকল সদস্য ছিল আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রধারী। তারা সব সময় কোমরে অস্ত্র নিয়ে চলতে। ২০২২ সালের ১৩ই মে বসুরহাট পৌরসভার করালিয়া এলাকায় মিজানুরের অনুসারীদের ওপর প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে আনোয়ার হোসেনের ধাওয়া করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ছাড়া ২০২১ সালের ২১শে নভেম্বর রাতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খানের বাড়িতে সশস্ত্র হামলাকালে অস্ত্র হাতে আনোয়ার হোসেনকে গুলি করার দৃশ্য সিসিটিভির ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ১৩ই মে’র ভাইরাল ভিডিওতে কেচ্ছা রাসেলের সঙ্গে ছিলেন আরেক অস্ত্রধারী সহিদ উল্যাহ। পিচ্ছি মাসুদের বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ থানায় খুন, ডাকাতি, মাদক, পুলিশের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২১টি মামলা রয়েছে।
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদল মানবজমিনকে বলেন, কাদের মির্জা ছিলেন একজন মাফিয়া ডন। তার শাসনামল ছিল বিভীষিকাময়। এলাকায় কোনো স্বাধীনতা ছিল না। উপজেলা আওয়ামী লীগের এমন কোনো নেতাকর্মী নেই যে, কাদের মির্জার হাতে নির্যাতিত হননি। আমি অনেকবার মারধরের শিকার হয়েছি।
মির্জার দোসর কামাল কোম্পানী অঢেল সম্পদের মালিক: কামাল কোম্পানী কবিরহাটের ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবার ও মির্জার ঘনিষ্ঠ অনুসারী হওয়ার সুবাধে গত ১৩ বছরে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। মির্জার ঘনিষ্ঠ অনুসারী চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাকের যোগসাজশে কোম্পানীগঞ্জের চরএলাহী ইউনিয়নের দক্ষিণ চরএলাহীর তিন মৌজার ১২ একর খাস জায়গা ও সরকারি খালসহ নামমাত্র মূল্যে দখল করে নেন কামাল কোম্পানী। এরপর চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের এক মৎস্য ব্যবসায়ীর কাছে ৭ কোটি টাকা জামানত নিয়ে ভাড়া দেয়। ১২০০ একর জায়গার ভাড়া বছর একর প্রতি ৫০ হাজার টাকা। গত জুলাই মাসে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াখালী সুবর্ণচরে প্রায় ৭০০ একর খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠে ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামাল কোম্পানী ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে তারা উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চরলক্ষ্মী, উড়িরচর ও চরনোমান মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ওই জমির ফসল নষ্ট করে অর্ধশতাধিক পুকুর খননকাজ চালাচ্ছেন। গত ১০ বছরে নোয়াখালী এলজিআরডি’র অধীনে নোয়াখালীর কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ সহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ২ শতাধিক সড়ক নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি করে কামাল কোম্পানীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তার গত ১ বছরের কাজ পরিদর্শন করে দেখে যার সত্যতা মিলবে। নিজের ইউনিয়নে প্রতি বছর মেলার নামে নগ্ন নৃত্যের আসর, জুয়া ও অসামাজিক কার্যকলাপ চালান।
মির্জার অবৈধ অস্ত্রের যোগানদাতা আইয়ুব আলী চেয়ারম্যান: ২১ মামলার আসামি পিচ্ছি মাসুদ মুছাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রক ছিল আইয়ুব আলী। কাদের মির্জার হাতে পিচ্ছি মাসুদকে তুলে দেন আলী। এই পিচ্ছি মাসুদ ও আলীর হাত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য আসতো মির্জার হেলমেট বাহিনীর হাতে। মুছাপুরের চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাধে মির্জার নির্দেশে মুছাপুর ক্লোজারের ৬০০ একর খাস জায়গা দখল করে আইয়ুব আলী। আলী গত ৪ বছরে মুছাপুর ক্লোজার সংলগ্ন নদী থেকে অন্তত ২০ কোটি টাকার অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে। মির্জার হাত মাথায় থাকায় স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন তাদের কিছুই করতে পারেনি। উল্টো ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ জায়গা দখল ও বালু উত্তোলন বন্ধ করতে গেলে মির্জার নির্দেশে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী জাহাঙ্গীর ও তার ভাই হামলা চালায়।
পুলিশ পেটানোর অভিযোগ মির্জাপুত্রের বিরুদ্ধে: করোনাকালীন সময়ে পুলিশ চেকপোস্টে কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশ কনস্টেবল হুমায়ুনকে মারধর করেন কাদের মির্জার ছেলে তাশিক মির্জা। মির্জার বাড়ির সামনের সড়কে এই মারধরের ঘটনা ঘটে। তৎকালীন কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন মো. আরিফুল ইসলাম। পরে তিনি তৎকালীন এসপি’র নির্দেশে ঘটনা ধামাচাপা দেন। নির্যাতনের শিকার পুলিশ কনস্টেবল হুমায়ুন বর্তমানে নোয়াখালীর একটি থানায় কর্মরত আছেন। একাধিক সূত্র দাবি করে, হুমায়ুন বর্তমানে কবিরহাট থানায় কর্মরত আছেন।
মির্জার ছেলের যত অপকর্ম: কোম্পানীগঞ্জের কিশোর গ্যাংয়ের লিডার ছিল মির্জার ছেলে তাশিক মির্জা। বিএনপি-জামায়াত পরিবারের অনেক ছেলেকে ছাত্রলীগে প্রতিষ্ঠিত করেন তাশিক। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের থেকে চাঁদাবাজি করতেন তিনি। ২০১৮ পরবর্তী কোম্পানীগঞ্জে বেপরোয়া মাদক সিন্ডিকেট ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছিল তাশিক মির্জার হাতে। কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষের সময় বাবার আগ্নেয়াস্ত্র ভাণ্ডার ছিল তার হাতে। চলতি বছরে উপজেলা নির্বাচনের দিন তার গাড়ি করে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সকাল ৮টার মধ্যে উপজেলার ভোট কেন্দ্র দখল করেন। তাদের প্রার্থী গোলাম শরীফ চৌধুরী পিপুলের থেকে নেন এক কোটি টাকা। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে সোনাপুর টু বসুরহাট সড়ক প্রশস্তকরণ কাজে ঠিকাদার ছিদ্দিক উল্যাহ ভুট্টুর থেকে ৬ কোটি টাকা কমিশন নেন তাশিক মির্জা ও কাদের মির্জা। মুছাপুরের খাস জায়গা, বালু উত্তোলন, চর এলাহী ইউনিয়নের খাস জায়গা বিক্রির ভাগ কমিশন পেতেন তাশিক মির্জা।
কাদের মির্জা পত্নীর যত অনিয়ম: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কবিরহাটের বাটইয়া ইউনিয়নের আমেরিকা প্রবাসী বিএনপি’র নেতা ওমর ফারুকের বাসভবনে বকুল মির্জার নির্দেশে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। হামলার নেতৃত্ব দেয় তার বোনের ছেলে হিমেল। এ ঘটনায় কবিরহাট থানায় মামলা করতে গিয়ে মামলা করতে পারেননি ড. ফারুক। হিমেলের সন্ত্রাসী বাহিনী ভাঙচুর করে সাউন্ড সিস্টেম সহ অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। পরে কৌশলে ঢাকা থেকে আমেরিকা চলে যান ফারুক। স্থানীয়দের অভিযোগ মতে, মির্জা ফেরাউন হলে তার স্ত্রী লেডি ফেরাউন। উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বকুল মির্জা।
কাদের পরিবারের আরেক ত্রাস শাহাদাত: কাদের মির্জার ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন। তিনিও এক নীরব কিলার। ২০২৩ সালের জুলাই মাসের ঘটনা। অনুমোদনহীন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে বাধা দেয়ায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে মারধর ও তার মাথা ন্যাড়া করে দেয় সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন ও তার অনুসারী যুবলীগ নেতা শিপন। দুই দফায় ওই প্রকৌশলীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়। কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন নির্বাহী প্রধানের থেকে আদায় করতেন কোটি টাকার কমিশন। চরএলাহী ইউনিয়নে নয়ছয় করে খাস জায়গা দখল করেন ১৮৫ একর। যার বাজার মূল্য রয়েছে কোটি টাকার উপরে। শাহাদাতের এক সময় সুনির্দিষ্ট কোনো পেশা ছিল না। ভাই মন্ত্রী হওয়ার পর তার ভাগ্য সহজে ঘুরে যায়। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় ভাইয়ের পরিচয়ে বিভিন্ন দপ্তরে, প্রতিষ্ঠানে দালালি, চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্য। এতেই বনে যান হাজার কোটি টাকার মালিক।
সদরেও কাদের মির্জার সিন্ডিকেট: নোয়াখালী সদর হাসপাতালের ১২ কোটি টাকার এমএসআর টেন্ডার (পথ্য মালামাল, ওষুধ ক্রয়) শিডিউল নিয়ন্ত্রণ করে কোনো সাধারণ ঠিকাদারকে শিডিউল নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়নি কাদের মির্জার একটি সিন্ডিকেট। এর নেপথ্যে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হেলাল উদ্দিন, আরএমও ডা. আজীম, কেরানী মাসুদ, প্রধান সহকারী সুরুজ নিয়মবহির্ভূতভাবে ফাহিম টেইলার্সের মালিক শাহজাহান শাহীনকে কাজ পাইয়ে দেন। এই কাজ বাগিয়ে নিতে নোয়াখালী-৪ আসনের এমপিপুত্র সাবাব চৌধুরীকে নগদ দশ লাখ ও চেকের মাধ্যমে নব্বই লাখ টাকা দেয়া হয়। এই সিন্ডিকেটের আরেক অন্যতম দোসর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম শাসমুদ্দিন জেহান ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবদুল মোমিন বিএসসি। গত ১০ বছরে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এই সিন্ডিকেট থেকে কমিশন পেতেন একরামুল করিম, কাদের মির্জা ও ওবায়দুল কাদের।
কাদের মির্জার সাংবাদিক নির্যাতনের কাহিনী: ২০১৯ সালে স্থানীয় সাংবাদিক এইচ এম মান্নান মুন্নার ছোট ভাইকে জোর করে মুজিব কলেজ থেকে চাকরিচ্যুত করে। হেলমেট বাহিনীর সংবাদ প্রকাশের জের ধরে দৈনিক মানবজমিনের কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি নাজিম উদ্দিন খোকনের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতন শেষে তাকে মাদক দিয়ে থানায় সোপর্দ করে। দৈনিক আমার সংবাদের প্রতিনিধি আরমানকে বেধড়ক মারধর করে মির্জার হেলমেট বাহিনী। স্থানীয় সাংবাদিক সুভাষের বসতঘরে হামলা করে হেলমেট বাহিনী। মির্জার নির্দেশে সুভাষকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিনিধি জাফর উল্যাহ পলাশকে লাঞ্ছিত করে মির্জা। দৈনিক নয়াদিগন্ত প্রতিনিধি রাসেদকে প্রেস ক্লাবে কার্ড খেলার সময় আটকে ফেসবুকে লাইভে নিয়ে হেনস্তা করে। দৈনিক সকালের সময় প্রতিনিধি আমির হোসেনকে হেনস্তা করতে তার সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দেয়।
মির্জার দুর্নীতি-অনিয়মে সমর্থন ছিল সেতুমন্ত্রী কাদেরের: একাধিক সূত্রে জানা যায় সাবেক সেতুমন্ত্রীর প্রচ্ছন্ন সমর্থনে কাদের মির্জা বেপরোয়া হয়ে উঠে। মন্ত্রী কোটার টিআর, কাবিখা ও অন্যান্য বরাদ্দ নামমাত্র পেতো দলীয় লোকজন। মন্ত্রীর বরাদ্দে ৮৫ ভাগ মির্জা আত্মসাৎ করতেন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, উপজেলার উন্নয়নকাজে দশ শতাংশ কমিশন, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা, চাঁদাবাজির কথা জানতেন ওবায়দুল কাদের। সাবেক সেতুমন্ত্রী কাদের নিজেও অনেক বড় বড় কাজ থেকে ভাইদের কোটি কোটি টাকা কমিশন নিয়ে দিয়েছেন এটি তার নিজ উপজেলার মানুষের কাছে ওপেন সিক্রেট।
মির্জার ৫ই আগস্ট: শেখ হাসিনা সরকার পতনের খবরের সঙ্গে সঙ্গে মির্জা তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার একটু পরই তার বাড়িতে হামলা হয়। তখন তারা বাড়ির পাশের এক মেম্বারের ঘরে আশ্রয় নেন। এর একদিন পর সেখান থেকে বৃষ্টির মধ্যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গাঢাকা দেয়। তবে তাদের বর্তমান অবস্থান অজানা। জনশ্রুতি রয়েছে, হামলাকারীরা ওই দিন মির্জার ঘর থেকে ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ৪০০ ভরি সোনা ও তার ছোট ভাই শাহাদাতের ঘর থেকে ১০ কোটি টাকা লুট করে নেয়। হামলার সময় শাহাদাতের স্ত্রী পুকুরে ২ ঘণ্টা লুকিয়ে থাকে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, কাদের মির্জার বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ করার সাহস পেতেন না। প্রশাসনও তার কাছে জিম্মি ছিলেন। অনেকটা স্বেচ্ছাচারিতার মনোভাব ছিল তার। তিনি আরও বলেন, কাদের মির্জার শাস্তি হওয়া উচিত।
Monday, August 19, 2024
সরজমিন নোয়াখালী: এক একরামেই হাজার কোটি টাকা পাচার by মারুফ কিবরিয়া
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৬ বছরে একরামুল করিম চৌধুরীর ইশারায় সব অপকর্ম চলতো এই শহরে। কোনো ভিন্নমতের জায়গা ছিল না। বরং বিরোধী মত দমন করে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেন সাবেক এই এমপি। পাশাপাশি নিজের অবস্থান পোক্ত করতে পরিবারের সদস্যদেরও জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে বসান। এ ছাড়া তাদের একাধিক ব্যক্তিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধি বানিয়েছেন অনেকটা গায়ের জোরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেই কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন একরাম। নোয়াখালীতে যত সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার সবকটির ঠিকাদার ছিলেন তার নেতৃত্বে। যেসব কাজের টেন্ডার হতো সেখান থেকে কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ কমিশন দিতে হতো সাবেক এই এমপিকে। এই কমিশনের পরিমাণ ১০ শতাংশ অবধি গিয়ে ঠেকতো কাজের ধরনভেদে। কিছু ক্ষেত্রে বেশিও নিয়েছেন একরাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, এলজিইডি ও পিডব্লিউডি, ডিসি অফিস, বিএডিসির টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে একটি নিজস্ব বাহিনী তৈরি করেছেন। সেই বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ পিন্টু ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান জাবেদ। পিন্টু জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া সড়ক ও জনপথের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলা লিটন। এ ছাড়াও এখানে দায়িত্ব পালন করেন আবু তাহের ও জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক মোজাম্মেল হক মানিক নামের আরও দুই আওয়ামী লীগ নেতা। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের জন্য আগের মতো অস্ত্রবাজি বা গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে হুমকি-ধমকির প্রয়োজন না হলেও ই-টেন্ডারের এই যুগে অফিস ম্যানেজ করে কারসাজির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারদের ননরেসপনসিভ দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিতে কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করেন জাবেদ। এই অপকৌশলের বাইরে কিছু ঠিকাদার শিডিউল কিনলেও তাদের ফোনে ড্রপ করতে নিষেধ করা হয়। যেকোনো কাজ দেয়ার বিনিময়ে দলীয় ফান্ডের কথা বলে ঠিকাদারের কাছ থেকে নেয়া হয় ৬ পার্সেন্ট টাকা। আর নিজেদের নামে কাজ বের করে বিক্রি করলে জাবেদ ও পিন্টু নেন আরও ১০ পার্সেন্ট। মোট ১৬ পার্সেন্ট কমিশনের এই টাকার একটি বড় অংশ চলে যায় এমপি একরামুল করিমের কাছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য সাবেক এই এমপি নোয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজীম প্রধান, সহকারী সুরুজ, জহির মোল্লাদের দিয়ে ওষুধ, হাসপাতাল সরঞ্জামাদি বাইরে বিক্রি করাতেন। সে সঙ্গে হাসপাতালের যত কেনাকাটা হতো তাও তাদের দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাতেন। এ ছাড়া হাসপাতালের এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্যও করাতেন সাবেক এমপি একরামুল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেন্ডারবাজির অন্যতম হোতা জাবেদ মামা বাহিনীর প্রধান হিসেবেও পরিচিত। তার বাহিনীতে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। মামা বাহিনী নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন জাবেদের কথিত ভাগ্নে রকি। টেন্ডারবাজির পাশাপাশি শহরে চলাচলকারী ১৩ হাজার সিএনজি থেকে নোয়াখালী সদরের বিভিন্ন স্থান থেকে মামা বাহিনী চাঁদা আদায় করতো। যদিও বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী জেলা সদরে দুই হাজার সিএনজির রেজিস্ট্রেশন দিতে পারবে। কিন্তু সেখানে জাবেদ পিন্টু ও মানিকরা ক্ষমতা প্রয়োগ করে ১৩ হাজার রেজিস্ট্রেশন দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। অতিরিক্ত ১১ হাজার সিএনজি মালিকের কাছ থেকে ৬০ হাজার করে রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ আদায় হয়েছে। সিএনজির নিবন্ধন ও সড়কের চাঁদা থেকে মাসে শতকোটি টাকা আয় হতো। যার একটি ভাগ চলে যেত এমপি একরামের কাছে।
নিয়োগ বাণিজ্য: সাবেক এই এমপির আয়ের আরেকটি বড় উৎস ছিল নিয়োগ বাণিজ্য। জেলা উপজেলায় যত সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হয়েছে সেখান থেকে কমিশন দিতে হয়েছে। চাকরি না পেয়েও অনেককে টাকা দিতে হয়েছে। জানা যায়, পুলিশের নিয়োগে একরাম তার বাহিনীর মাধ্যমে কমিশন নিয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা। গত ১৩ বছরে যতবার নিয়োগ হয়েছে ততবারই এই বাবদ কমিশন তাকে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগের বাবদও তিন লাখ টাকা করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতিতে নিমজ্জিত একরামের পরিবারও: একরামের ভাগ্নে কবিরহাট পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক রায়হান। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসে গত পনেরো বছরে তিনি কবিরহাট পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সুযোগে গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। তার স্ত্রী ব্যবহার করেন প্রায় কোটি টাকা দামের গাড়ি। এই রায়হান কবিরহাট থানা হামলা মামলার এক নম্বর আসামি। স্থানীয়রা জানান, ২০১৪ সালের ৬ই মার্চ গভীর রাতে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতাকে আটকে রাখার খবর পেয়ে মদ্যপ অবস্থায় কবিরহাট থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় মেয়র রায়হানের নেতৃত্বে। পরে ওবায়দুল কাদের ও একরামুলের প্রভাবে তিনি বেঁচে যান। কবিরহাট পৌরসভা যেখানে অনিয়মই, নিয়ম। রায়হান গত ১৩ বছরে বাজার ইজারা, টোল আদায়, সিএনজি স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখেন তার অনুসারীদের দিয়ে। অল্প দরে বাজার ইজারা দেখিয়ে নিজে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা। একাধিক সূত্র জানায়, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় তিন বছরের বেতন বকেয়া রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক সন্ধ্যায় তার আয়োজনে বসতো মদের আসর। গত ১৩ বছর আঁকড়ে ছিলেন কবিরহাট প্রেস ক্লাবের সভাপতি পদও। কবিরহাট উপজেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে ১০ পার্সেন্ট করে কমিশন আদায় করতেন। অপরদিকে, অন্যায় অনিয়মে পিছিয়ে ছিলেন না মেয়রের আপন ছোট ভাই কবিরহাট পৌরসভা আওয়ামী লীগের সদস্য মামুনুল হক মামুন। চলতি বছরের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে একজন সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। মামুন তার ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে করতেন তদবির। অনেক অসহায় মানুষের থেকে সে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের অর্থ। কিন্তু অনেকের কাজ না হলেও তিনি আর টাকা ফেরত দেননি। অসহায় মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারেনি। মেয়র পরিবারের দখলে রয়েছে কবিরহাট বাজারের অনেক খাস জায়গা।
শিউলী একরাম: একরামুলের স্ত্রী ও কবিরহাট উপজেলা পরিষদের টানা তিনবারের চেয়ারম্যান। স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে লুটে নিয়েছেন টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ। তার সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের বিষয়টি কবিরহাট উপজেলায় ওপেন-সিক্রেট। এজন্য মাঝে মাঝে স্বামীকেও পাত্তা দিতেন না শিউলী। নিজের টাকায় জেলা শহর মাইজদীর বালুর মাঠ এলাকায় গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন।
সাবাবের বিতর্কিত নানা কাহিনী: বাবার অঢেল সম্পদের কারণে শুরু থেকে বেপরোয়া ছিলেন সাবাব। নানা কারণে দেশব্যাপী খলনায়ক হিসবে তার একটি পরিচিতি দাঁড়ায়। ২০১৮ সালের জুন মাসে রাজধানীর মহাখালীতে সাবাবের গাড়ির ধাক্কায় সেলিম ভূঁইয়া নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। পরে ৩০ লাখ টাকায় এ ঘটনা সমঝোতার অভিযোগ উঠে নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে কবিরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় মায়ের প্রতিপক্ষ প্রার্থী আলাবক্স তাহের টিটুর অনুসারীদের ওপর গুলি চালানো হয় সাবাবের নেতৃত্বে। এতে টিটুর ৫ অনুসারী গুলিবিদ্ধ হন। সাবাব ২০২৪ সালে সূবর্ণচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাৎক্ষণিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম অভিযোগ করেন, বাবার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ফলাফল বানচাল করে সে আমার জয়কে ছিনিয়ে নেয়। ওই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে তিনি লিখিত অভিযোগ করেন।
একরাম এখন কোথায়?
নোয়াখালীর ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী স্ত্রী ছেলেসহ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ৪ এমপি লাপাত্তা। কিন্তু ৫ই আগস্ট দুপুর থেকে এমপি একরামুল নোয়াখালীর কবিহাটের নিজ বাড়িতে ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিএনপি নেতা জানান, নোয়াখালী জেলা বিএনপি’র সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি ও একরামুলের বাড়ি পাশাপাশি এলাকায়। বিএনপি নেতা হায়দার বিএসসির যোগসাজশে একরামুল করিম চৌধুরী ও তার ভাগ্নে কবিরহাট পৌরসভার মেয়র রায়হান নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়র রায়হানের স্ত্রীর ব্যবহৃত গাড়িটিও হায়দার বিএসসির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি গাড়িটি সরিয়ে ফেলেন। তারা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও।
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা বিএনপি’র সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি দাবি করেন, বিষয়টি পুরোপুরি মিথ্যা। বিএনপি’র অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে মামলা হয়েছে এবং জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে।
এসব বিষয়ে জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আবদুর রহমান বলেন, গত ১৬ বছরে এমপি থাকা অবস্থায় একরামুল কবির পুরো নোয়াখালীবাসীকে জিম্মি করেন। আমাদের বিএনপি’র কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে তিনি তার নিজস্ব বাহিনী দিয়ে আগলে রেখেছেন। অনিয়ম দুর্নীতির মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ অর্থ আয় করেছেন।
হলফনামায় একরামের যত সম্পদ: হলফনামায় তার এমন সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকার। ১০ বছরের ব্যবধানে তার সম্পদের পরিমাণ ফুলেফেঁপে উঠলেও কমেছে তার ব্যাংক ঋণের পরিমাণ। ২০১৮ সালের হলফনামায় তার ব্যাংক ঋণ ৪ কোটি ১০ লাখ ৭ হাজার ৫৩৯ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। আর ২০০৮ সালে তার হলফনামায় ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৮৫ লাখ ৩৯ হাজার ৭২০ টাকা। এ ছাড়া ২০১৮ সালে দেয়া হলফনামা অনুযায়ী একরামুলের অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, একরামুল করিম চৌধুরী নিজ নামে দেখিয়েছেন ১ কোটি ৩০ লাখ ৫৬ হাজার ২৮০ টাকার কৃষি জমি, ১১ লাখ ২৯ হাজার টাকার অকৃষি জমি, ২৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৫ টাকা মূল্যের ভবন, বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট এবং ১১ হাজার টাকার শেয়ার।
অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে একরামুল করিম চৌধুরীর ব্যাংকে জমা রয়েছে ২ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮৮ টাকা এবং সঞ্চয়পত্র রয়েছে ৮৩ লাখ ১৪ হাজার টাকার। এ ছাড়া ১ কোটি ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ২০২ টাকা মূল্যের গাড়ি, ৯৩ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের স্বর্ণ, ৩ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র এবং ৩ কোটি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৮ টাকা ব্যবসায় পুঁজি রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়।
হলফনামায় একরাম ও তার পরিবারের সম্পদের পরিমাণ কম হলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তার বেশির ভাগ সম্পদই ভিয়েতনামে। দেশ থেকে পাচার করে সেখানে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েন তিনি।
যেভাবে উত্থান একরামের: নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৪ আসন থেকে দলের মনোনয়ন পেয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে দ্রুত নিজ বলয় গড়ে তুলেন। স্থানীয়রা জানান, ’৭৩-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নৌকার প্রার্থী আবদুুল মালেক উকিলের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নেন একরামুলের বাবা ইদ্রিস মিয়া। বাবার পক্ষে নৌকার বিরুদ্ধে ভোট করা একরামুল স্বরূপে ফেরেন ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তিনি নোয়াখালী-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে নোয়াখালী-৫ আসনে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে সেখানে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। কিন্তু বিএনপি’র শক্তিশালী প্রার্থী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের কাছে তাদের ভরাডুবি হয়। তখন হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে একরামুল করিম চৌধুরীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে অন্তত এক ডজন মামলা করেন ওবায়দুল কাদেরের অনুসারীরা।
Friday, August 2, 2024
গুলি কেড়ে নিলো কাইয়ুমের পরিবারের স্বপ্ন
কাজ শেখার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলে আর কাজ শেখা হলো না। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের পাশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় গুলিতে ঝাঁঝরা হয় তার শরীর। এরপর গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সড়কের পাশ থেকে কাইয়ুমকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন কয়েকজন পথচারী। পরে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর স্বজনেরা খবর পেয়ে ওখান থেকে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসেন ।
গত শুক্রবার সকাল ৯টায় তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। এলাকাবাসী ও ঘটনাস্থলে লোকজন জানান, একই ঘটনায় গুলিতে কাইয়ুম ছাড়াও আরও দু’জন নিহত হয়েছেন। তাদের কারও লাশেরই ময়নাতদন্ত করা হয়নি। স্বজনেরা এসব লাশ বাড়িতে নিয়ে গেছেন। বেগমগঞ্জ নরোত্তমপুরে কাইয়ুমের গ্রামের বাড়িতে ঢুকতেই ভেতর থেকে ভেসে আসছিল স্বজনদের আহাজারি। সন্তানের জন্য বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন মা বিবি খোদেজা। কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের কেন আমার ছেলেকে হত্যা করা হলো। কার কাছে আমি বিচার চাইবো কে আমার বিচার করবে। মায়ের কান্নার আহাজারিতে পাশে থাকা লোকগুলো কান্নাকাটি করছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনদের সান্ত্বনা তাকে এতটুকুও শান্ত করতে পারছিল না। বিলাপ করতে করতে বারবার তিনি বলছিলেন, ‘আমার বুকের মানিকের কী অপরাধ ছিল। সে তো কোনো দল করতো না। তাকে কেন এভাবে গুলি করে মারা হলো। আমি এর বিচার চাই।’ বিবি খোদেজা বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে কাইয়ুমকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে রাত ন’টার দিকে এক ব্যক্তি ফোন ধরে হাসপাতালে যেতে বলেন। চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে কাইয়ুম ছিল সেজো। আদরের সন্তানের কথা বলতে গিয়ে খোদেজা বলেন, ‘আমার ছেলের বুকে গুলি করা হয়েছে। মুখ, গলাসহ বুক গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। ডান হাতের কনুই, বাঁ হাঁটু ও বুকের বাঁ পাশে গুলি করা হয়েছে। গুলি করে ছেলেকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয়েছে। কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের? কারা আমার বুকের মানিকেরে এভাবে মারলো? আমি কী নিয়ে থাকবো?’ কাইয়ুমের বাবা আলাউদ্দিন বলেন, টাকা- পয়সার অভাবে ছেলেকে বেশি পড়াশোনা করাতে পারি নাই। আর ‘পড়ালেখার প্রতি কিছুটা অনাগ্রহ ছিল কাইয়ুমের। ছেলেটার বয়স কম হলেও অনেক লম্বা হয়ে গেছে। তাই সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ছয় মাস আগে তাকে যাত্রাবাড়ীতে একটি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিজ ও এসি মেরামতের কাজ শিখতে পাঠাই। অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। ছেলে কাজ শিখবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। খুব কাছে থেকে ইচ্ছা করে তাকে গুলি করা হয়েছে। তার তো কোনো অপরাধ ছিল না।’ আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না কী কারণে আমার ছেলেটাকে গুলি করে হত্যা করলো আমি এটার বিচার চাই। কাইয়ুমের বড় ভাই শুভ আহমেদ তুহিন বলেন, ঢাকায় কাইয়ুম যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো, সেখানে কথা বলে জেনেছেন, তার ভাই বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে কাজ শেষ করে ম্যানেজারের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে নাশতা করতে বের হয়েছিল। এমন সময় ২ পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। পরে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের পাশের একটি রাস্তায় দৌড়ে পালানোর সময় পুলিশ কাইয়ুমকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়। ভাই হারার বেদনা কত যে কষ্টের তা আপনাকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমি আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই এ বলে ভাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। চৌমুহনী সরকারি এসএ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস মঞ্জুরুল আজিম সুমন বলেন, এ ন্যক্কারজনক হত্যা কারও জন্য কাম্য নয়। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করেন।
Wednesday, November 6, 2019
নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের যত দর্শনীয় স্থান by জুনাইদ আল হাবিব
![]() |
| নিঝুম দ্বীপ |
| নিঝুম দ্বীপ |
নোয়াখালীর সর্বদক্ষিণের দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় বঙ্গোপসাগর ও মেঘনার মোহনায় জেগে উঠেছে একটি দ্বীপ। চারটি প্রধান দ্বীপ আর কয়েকটি চরের সমষ্টি নিয়ে গঠিত এটি। এর নামই নিঝুম দ্বীপ। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়। কেওড়ার বন, বন্য হরিণ আর প্রকৃতি অনিন্দ্যসুন্দর হওয়ায় নিঝুম দ্বীপ অনায়াসে সবার মন কেড়ে নেয়।
| মুছাপুর ক্লোজার |
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ থানার মুছাপুর গ্রামে অবস্থিত মুছাপুর ক্লোজার ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য মনমাতানো একটি জায়গা। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা ও ফেনী নদীর পাশে অবস্থিত এটি। সমুদ্র সৈকতের অপরূপ প্রকৃতিতে চোখ ফেরালে দেখা মেলে পাখির ঝাঁক, বন্যপ্রাণীসহ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। মুছাপুর ক্লোজার ও মুছাপুর ফরেষ্ট বাগান দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে একজন শহীদ মো. রুহুল আমিন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির সন্তান। তাঁর গ্রামে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই এটি স্থাপন করা হয়। এতে একটি সুপরিসর ও সুসজ্জিত পাঠ-কক্ষ ছাড়াও আছে অভ্যর্থনা কক্ষ। তত্ত্ববধায়ক ও লাইব্রেরিয়ানের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ।
| বজরা শাহী মসজিদ |
নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে অবস্থিত বজরা শাহী মসজিদ। দিল্লির শাহী জামে মসজিদের অনুকরণে নির্মিত হয়েছিল এটি। জনশ্রুতি আছে, দিল্লির সম্রাট বাহাদুর শাহ বেগমগঞ্জের বজরা অঞ্চলের জমিদারি দান করেছিলেন দুই সহোদর আমান উল্যা ও ছানা উল্যাকে। তারা একটি দীঘি খনন ও মসজিদ নির্মাণের জন্য ১০০ একর জমির বন্দোবস্ত দেন। বজরা শাহী মসজিদের সম্মুখভাগেই সেই দীঘি। মার্বেল পাথরের তৈরি মসজিদটির প্রধান ফটকের দুই পাশে আছে দুটি দেয়ালঘড়ি।
গান্ধী আশ্রম নোয়াখালীর একটি দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। জেলা সদর মাইজদী কোর্ট থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে সোনাইমুড়ি উপজেলার জয়াগ বাজার সংলগ্ন সড়কের পাশেই এর অবস্থান। তৎকালীন জমিদার ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে এটি স্থাপিত হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৪৬ সালের শেষভাগে সারা ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। তখন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব নোয়াখালীতে পড়ে। সেই থেকে ইতিহাসে গান্ধী আশ্রমের গুরুত্ব অনেক।
সোনাপুরে লুর্দের রানীর গির্জা, নোয়াখালীর উপকূলে নতুন জেগে ওঠা চরে বন বিভাগের সৃজনকৃত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, মাইজদী শহরে অবস্থিত নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ, নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মাইজদী বড় দীঘি, কমলা রানীর দীঘি ভ্রমণপ্রেমীদের ভালোলাগার জায়গা।
দালাল বাজার জমিদার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের অন্যতম ও ঐতিহাসিক স্থান। জেলা সদরের পশ্চিম-লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজারে এর অবস্থান। জমিদার রাজা লক্ষ্মী নারায়ণের বাড়িটির স্থাপত্যশৈলীতে প্রাচীন যুগের নিপুণতার ছোঁয়া রয়েছে। এটি দেখতে প্রতিনিয়ত জ্ঞানপিপাসুদের আসতে দেখা যায়। বাড়িটি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের যেন শেষ নেই। তবে সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন এর জৌলুসে ভাটা পড়েছে। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, জঙ্গল তৈরি হওয়ায় বিবর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে বাড়িটি।
জেলা সদরের পশ্চিম-লক্ষ্মীপুর গ্রামের কামাল খোলা বাজারের আধা কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত হরেন্দ্র বাবুর বাড়িটি। প্রাচীন জমিদার বাড়ি হিসেবে এর পরিচিতি আছে। এটিই কামান খোলা জমিদার বাড়ি। দুইশ’ বছরের পুরনো বাড়িটির সামনে একটি দ্বিতল ঠাকুরঘর। সুরক্ষিত প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে গেলে চোখে পড়বে রাজপ্রাসাদ। এমন সুন্দর বাড়ি দেখতে প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীদের ভিড় জমে।
জনশ্রুতি আছে, ৩০ বছরের আগে জিনেরা রাতের আঁধারে মসজিদটি নির্মাণ করেছে। মসজিদটি তৈরিতে টাকার যোগান দিয়েছে তারাই! এরপর কয়েক বছর ইবাদতও করেছে জিনেরা! গভীর রাতে তাদের জিকিরের আওয়াজ ভেসে আসতো। এর নাম মসজিদ-ই-আবদুল্লাহ। ১৮৮৮ সালে রায়পুর শহরের দেনায়েতপুর এলাকায় ৫৭ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদটি। এর দৈর্ঘ্য ১১০ ফুট ও প্রস্থ ৭০ ফুট। এতে রয়েছে তিনটি গম্বুজ ও চারটি মিনার।
জেলার সর্বদক্ষিণের জনপদ রামগতির দক্ষিণ-পূর্বে তেগাছিয়া বাজার পেরিয়ে মেঘনার কূলেই স্লুইস গেট। এখানে রয়েছে বেশ প্রশস্ত বিশাল ঝাউবন। সূর্যাস্তে মেঘনাতীর একদিকে যেমন অনিন্দ্যসুন্দর, তেমনই সারি সারি ঝাউগাছের মাঝে বিকেলের সূর্যের উঁকি মন ছুঁয়ে যায়। তবে এতদিন এখানকার তেমন পরিচিতি ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুসংখ্যক তরুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে তেগাছিয়াকে তুলে ধরায় ভ্রমণপ্রেমীদের আকর্ষণ করেছে।
| নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরের দর্শনীয় কয়েকটি স্থান |
নদী রক্ষা বাঁধ থেকে দর্শনীয় স্থানটির শুরু। এখানে মেঘনাতীরে বিকেলবেলায় পশ্চিম থেকে হেলে পড়া সূর্যাস্তের চিকচিক আলো আর নদীর বুকে জোয়ার-ভাটার ঢেউ খেলা জলের নিবিড় সখ্য নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। নদী রক্ষা বাঁধ আঁকা-বাঁকা হওয়াতে পূর্ব দিক থেকে সূর্যাস্তের দারুণ দৃশ্যের মাঝে হারিয়ে যান অনেকে। এটি জেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম একটি। বিভিন্ন উৎসবে এখানে হাজার হাজার পর্যটকের হৃদয়ের জানালা খুলে দেয় এমন দৃশ্য।
জেলার কমলনগর উপজেলার মতিরহাট বাজার। বলতে গেলে মেঘনার কোলেই জেগে আছে মতিরহাট। বাজারের উত্তর-দক্ষিণ প্রান্তে মেঘনার জলের সঙ্গে মিশে থাকা তীরকে অনেকে ‘মিনি কক্সবাজার’ বলে। এখানে বিকেলবেলার সূর্যরশ্মির সঙ্গে জোয়ার-ভাটার দৃশ্য বেশ ঝলমলে। এখানকার দৃশ্যটা অন্য স্থানগুলোর তুলনায় একটু ব্যতিক্রম। এছাড়া মাত্র পাঁচ মিনিটের নদী পেরিয়ে পা রাখা যায় দ্বীপ রমণীমোহনের চর শামছুদ্দিনে। বিকেলবেলায় সেখানে বেশ চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে।
আলেকজান্ডার নদীতীরের মতোই এর গল্প। নদী ভাঙন থেকে কমলনগরকে রক্ষার জন্য এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর এই স্থানও পর্যটকদের প্রিয় হয়ে উঠেছে। পর্যটন কেন্দ্রটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য। তাই গোধূলিতে এখানে তরুণ-তরুণীদের আড্ডা জমে ওঠে।
Sunday, April 21, 2019
সুবর্ণচরে কেন এত ধর্ষণ? by জিয়া চৌধুরী

গত কয়েক বছরে ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সুবর্ণচর এলাকা থেকে ফৌজদারী মামলাও দায়ের হচ্ছে তুলনামূলক বেশি। এক সময়ের শান্ত-নিরিবিলি জনপদ কেন হঠাৎ করে অস্থির হয়ে উঠলো? গত দুই দিন ধরে সুবর্ণচরের কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় নেপথ্যে কাহিনী।
স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের দাপটে কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন গ্রামের মানুষজন। নির্যাতন, হয়রানি ও লুটপাটের শিকার হয়েও মুখ খুলছেন না অনেকে। স্থানীয়দের নিজেদের নিয়মে করা শালিস ও বিচারেই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে বেশিরভাগ মানুষকে। থানা-পুলিশ ও আদালতে যাওয়ার ব্যাপারেও ভীতি আছে নির্যাতন-হয়রানির শিকার পরিবারগুলোতে।
গত বুধবার সুবর্ণচরের চর জুবলী ইউনিয়নের অন্তত বিশটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এমন তথ্য। গত ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন রাতে এক নারীকে তার স্বামী ও ছয় সন্তানের সামনে গণধর্ষণ করে স্থানীয় কয়েকজন। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করলেও বাকি পাঁচ অভিযুক্ত আসামি হানিফ, চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন, মিন্টু ও সোহেলকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। স্থানীয় চর জব্বার থানা পুলিশ ও ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের সহায়তায় আসামিরা অধরা বলে অভিযোগ ধর্ষণের শিকার নারীর পরিবারের।
পাঁচ আসামির মধ্যে হানিফ স্থানীয় চার নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও গ্রেপ্তার রুহুল আমিনের আত্মীয়। তার দোকানে বসেই এমন সংঘদ্ধ অপরাধের চক্রান্ত হয় বলে ভাষ্য আশেপাশের মানুষদের। এছাড়া আরেক আসামি চৌধুরী বিভিন্ন সময়ে বনদস্যু ও জলদস্যু ছিল এমন কয়েকজনকে নিয়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব ক্যাডার গ্রুপ চৌধুরী বাহিনী। মামলার বাকি তিন আসামি মোশাররফ হোসেন, মিন্টু ও সোহেল চৌধুরী এই বিশেষ বাহিনীতে কাজ করে বলে জানান নির্যাতনের শিকার ওই নারী। মোটরসাইকেল ও দেশীয় নানা অস্ত্র দিয়ে মহড়া দেয় এই বাহিনী। তাদের দাপটে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকতে হয় স্থানীয় মানুষদের। আর ৩০শে ডিসেম্বর গণধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ও সাবেক ইউপি সদস্য রুহুল আমিন এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও মানবজমিনকে জানান অন্তত দশটি পরিবারের সদস্যরা।
গণধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার থাকলেও জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো তার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবে বলেও স্থানীয়দের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে রুহুল আমিনের পরিবার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা। নিজেদের ভিটেমাটিতে থাকতে এখন ভয় পাচ্ছেন অনেকে। গণধর্ষণের শিকার ওই নারী ও স্বামী গতকাল চট্টগ্রাম থেকে মুঠোফোনে মানবজমিনকে জানান, মামলার পর থেকে আমাদের নানা রকমের হুমকি দেয়া হচ্ছে। মামলায় শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না বলেও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
রুহুল আমিন জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো দেখে নেবে বলে হুমকি দিয়েছে তার পরিবারের সদস্যরা। নির্যাতনের শিকার নারীর বাড়ির আশেপাশের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, হেন কোন অপকর্ম নেই রুহুল আমিন ও তার নিয়ন্ত্রণে থাকা চৌধুরী বাহিনীর সদস্যরা করে না। রুহুল আমিন মাঝি নামে স্থানীয় একজন জানান, এই বাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতে হয় আমাদের। আমি নিজেও কয়েকবার তাদের নির্যাতন-হয়রানির শিকার হয়েছি। এখন কথা বলতেও ভয় পাই।
স্থানীয় একজন নারী জানান ৩০ ডিসেম্বর গণর্ধষণের ঘটনার পরদিনও ইসমাইল নামে এক যুবককে বেদম নির্যাতন করে রুহুল আমিন ও তার বাহিনীর সদস্যরা। ইসমাইলকে উদোম করে রুহুল আমিনের আত্মীয় ও মামলার আসামি হানিফের দোকানে নিয়ে প্রকাশ্যে বেঁধে রাখা হয়। ইসমাইলকে মারধরের পর স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও তারা এ বিষয়ে কারো কাছে মুখ খোলেনি। ধর্ষণের শিকার নারী ওই যুবককে হাসপাতালে দেখেছেন বলেও মানবজমিনকে জানান।
স্থানীয় এনজিও কর্মী মুন্নি জানান, ৩০শে ডিসেম্বরের গণধর্ষণ শুধু নয় রুহুল আমিনের হাতে এমন অন্তত আরো অর্ধশত নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। তবে অনেকেই ভয়ে মুখ খুলছে না। নিজে নির্যাতিত হলেও অনেকে কখনো থানা-পুলিশের দ্বারস্থ হয়নি। স্থানীয় নারীরা রুহুল আমিনের কুনজরের শিকার হলে তাদের বিশাল বাগানবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হতো বলেও জানান মুন্নি। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ২০১০ সালের দিকেও এমন ছিলো না রুহুল আমিন। এর আগে কোর্ট মোহরার ও ব্রিকফিল্ডে কাজ করলেও ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে চর জুবলী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার দাপট বেড়ে যায়। চর জুবলীতে শুরু হয় রুহুল আমিনের রাজত্ব। মানুষের জমি দখল, শালিসের নামে টাকা নেয়া, সকালে বিয়ে বিকালে ডিভোর্সের আদেশ, গাছ কেটে নেয়া, জমির ফসল জোর করে কেড়ে নেয়ার মতো নানা অপকর্ম করতো তার সাঙ্গপাঙ্গরা। এলাকায় রুহুল আমিনই ছিলো বিচারক। তার আদেশই ছিলো শিরোধার্য। অনেক পরিবারের জমিজমার মীমাংসা করে দেবে বলে তাদের থেকে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।
এসব ভুক্তভোগী পরিবার এখন ধীরে ধীরে এসব বিষয় সামনে আনতে শুরু করেছে। ২০১৭ সালে এরকম এক সালিসে ছোট্ট একটি বাছুর চুরির অভিযোগে স্থানীয় চারজনের দশ লাখ টাকা জরিমানা করে রুহুল আমিন। ঘটনার সময় ওমানে থাকলেও ফাঁসানো হয় নূরনবী নামে এক প্রবাসীকে। জহির, রাশেদ ও মনি ঘটনায় জড়িত না থাকলেও দিতে হয় জরিমানা। চার জনে মিলে সেই সালিশে প্রায় ৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা জরিমানা দেন। যার সিংহভাগই নিজের পকেটে ভরে নেন রুহুল আমিন। নানা সময় রুহুলের অপকর্মের প্রতিবাদ করলে মুন্নি নামে ওই এনজিওকর্মীকে মাদকের মামলায় ফাঁসানোরও হুমকি দেয় সে। জাতীয় নির্বাচনের পর মুন্নিকে জবাই করে হত্যার হুমকি দেয় বলেও মানবজমিনকে অভিযোগ করেন এই নারী। এছাড়া নির্বাচনের পর ১১টি পরিবারকে দেখে নেয়ার জন্য পরিকল্পনাও করা হয় বলে অভিযোগ করেন ষাটোর্ধ্ব মীনা বেগম। স্বামী ও ছেলে সন্তান না থাকায় চার মেয়েকে নিয়ে প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকতে হয় তাকে।
তিনি বলেন, ‘কোনখানে যাওনের জায়গা নাই। থাকলে কবেই চইল্যা যাইতাম। মাঝে মাঝে মনে লয় আমরা মনে হয় রোহিঙ্গা, বার্মার মতো এখানে আমাদের নির্যাতন করা হচ্ছে।’ প্রায় আট বছর ধরে চর জুবলী ইউনিয়নে থাকছেন বাবুল চৌধুরী নামের একজন। ৩০শে ডিসেম্বর গণধর্ষণের ঘটনার পর প্রথম ওই নারীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তিনি। মানবজমিনকে বলেন, সুবর্ণচর ও চর জুবলী ইউনিয়নজুড়েই প্রতিহিংসার রাজনীতি। এখানে শিক্ষার হারও কম।
বেশিরভাগ পুরুষ বছরের প্রায় ছয় মাস কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ইট ভাটায় কাজ করে। আর যারা সুবর্ণচরে থাকে তারাও শ্রমিক না হয় কৃষিকাজ করে। পুরুষরা ছয় মাস বাড়িতে না থাকার সুযোগ নেয় রুহুল আমিন ও তার চৌধুরী বাহিনীর সদস্যরা। দুর্বল শ্রেণির এসব মানুষকে দিন দিন শুষে খাচ্ছে এখানকার চক্রটি। আমরা মাঝে মাঝে কেউ প্রতিবাদ করলেও ভয়ে পিছিয়ে যাই। সন্ত্রাসীদের কাছে আধুনিক অস্ত্র না থাকলেও লাঠিসোটা, কিরিচ ও বল্লমের ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকতে হয়। কারও উপর নির্যাতন করলেও অন্য কেউ এগিয়ে আসে না। কেউ ভয়ে ঘর থেকে বের হয় না। কোন পরিবারই চায় না তার নিজের ক্ষতি হোক। কিন্তু দিনশেষে প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে হয়রানি-নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।
চর জব্বর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মো. মানিক রতন বলেন, এখানকার প্রতিনিধিরা একেবারে নিম্ন পর্যায় থেকে উঠে আসেন। রাজনীতিতে কোন ভালো মানুষের জায়গা নেই। শ্রমিকরা এখন মানুষের বিচার আচার করছেন। ব্রিকফিল্ডে কাজ করেন সাদ্দাম হোসেন, এমডি বেলাল হোসেন, কবির ও ইসমাইল। তারাও অভিযোগ করেন বাড়িতে না থাকায় তাদের পরিবার ও স্বজনদের নানা সময়ে হয়রানি নির্যাতন করেছে চক্রটি।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণচর শিক্ষার্থী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জামশেদ উদ্দিন বলেন, এখানকার বাসিন্দা হিসেবে আমাদের জন্য এটা অন্তত দুঃখের। তবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নব্য রাজনীতিবিদদের দাপটে সুবর্ণচর আবারো অশান্ত হয়ে উঠছে। জামশেদ উদ্দিনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও চর জুবলী ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য সিদ্দিক উল্ল্যাহ বলেন, আমরাও এক সময় রাজনীতি করেছি। অথচ আমার একখান ঘরও নাই। অথচ রুহুল আমিন এক মেয়াদে ইউপি সদস্য হয়েই কোটিপতি বনে গেছে। এসব মানুষের নির্যাতন আর হয়রানি আর কামানো টাকা। আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ছাড়া আমগো আর কিছুই করনের নাই।
রুহুল আমিনের কথিত বাগানবাড়িতে গিয়ে সাবেক ইউপি সদস্য সিদ্দিক উল্লাহর কথার সত্যতা পাওয়া যায়। স্থানীয় চির খালের পাড়ে কয়েক একর জায়গায় বিশাল বাড়ি, সামনে পুকুর। খালের ওপরে সরকারি তহবিলের টাকায় বানানো হয়েছে বিশাল সেতু। বাড়ির সামনে দিয়ে চওড়া রাস্তা ও ভেতরের দালান গাজীপুরের বিভিন্ন বাগানবাড়ির কথাই মনে করিয়ে দেয়। পথে দেখা হওয়া একজন বাসিন্দা বলেন, ক্ষমতার দাপটে কাউকে পরোয়া করতো না রুহুল আমিন। তার দীর্ঘশ্বাস বলে দেয় বাগানবাড়িকে ঘিরে আছে সুবর্ণচর ও চরজুবলীর হাজারো মানুষের দুঃখ।
Wednesday, April 17, 2019
গণধর্ষণের মামলা করে জীবন শঙ্কায় বাদী by জিয়া চৌধুরী

এজন্য তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ কাউকে দিয়ে মামলাটির তদন্ত করারও দাবি উঠেছে।
এদিকে, সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় নির্বাচনের ঠিক দুই দিন পরে সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয় বলে দাবি করেছেন তার স্বামী ও মামলার বাদী মো. শাহাজাহান। ঘটনার পরদিন মামলা দায়েরের পর থেকে বাদী, তার পরিবারের সদস্য ও মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্য না দিতে ও মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকি ও চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ধর্ষণের শিকার নারীর কন্যাকেও ঘটনার পর নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এসিডে ঝলসে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। মামলার কয়েকজন স্বাক্ষী, ঘটনার শিকার নারীর স্বজন ও স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। জীবনের নিরাপত্তায় ধর্ষণের শিকার নারীর স্বামী মো. শাহাজাহান বাদী হয়ে চর জব্বর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছেন।
মামলার আসামিদের স্বজন ও পরিবারের সদস্য ছালা উদ্দিন, আলা উদ্দিন, আবদুল খালেক, আবদুল মতলব, কামাল উদ্দিন, নেছার উদ্দিন, আরিফ, ইলিয়াছ, মিরাজ, মেহরাজ, রেখা বেগম, রোজিনা বেগম ও জামাল উদ্দিনসহ আরো বেশ কয়েকজন মামলা তুলে নিতে বাদীর পরিবারকে ও সাক্ষীদের চাপ দিচ্ছেন। এসব বিষয়ে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল ওয়াদুদ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাক্ষী ও বাদীর পরিবারের সাথে কথা বলেন। মামলা তুলে নেয়ার হুমকির বিষয়ে সত্যতা পেয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। মো. আবদুল ওয়াদুদ গতকাল মঙ্গলবার রাতে মানবজমিনকে বলেন, সাক্ষীসহ কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি। তারা সবসময় বাড়িতে থাকেন। বাদীর পরিবারে মেয়েও রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়ে আমি থানাকে বলেছি। এদিকে, চর জব্বর থানার পুলিশ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা আট আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের থেকে কোন ধরনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় না করায় ক্ষোভ জানিয়েছেন বাদী।
একই সঙ্গে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ১৩ জনের মধ্যে আট জন আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও বাকি অজ্ঞাত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারে পুলিশ কোন তৎপরতা দেখাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মানবজমিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মামলার দুই ও চার নম্বর আসামি যথাক্রমে আবুল বাশার ও ইউছুপ মাঝি এই ধর্ষণের ঘটনার আগেও অন্তত আটটি ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে, যেগুলোর বিচার চলমান রয়েছে। নোয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালত সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছর ধরে তাদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে চর জব্বর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ। আগের মামলাগুলোর এখনো কোন সুরাহা না হওয়ায় আতঙ্কে আছেন ওইসব মামলার বাদী ও সাক্ষীরাও।
সবশেষ চতুর্থ ধাপে গত ৩১শে মার্চ সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জেরে মো. শাহাজাহানের স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে বাগ্যা এলাকায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। তবে ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত আসামি আবুল কালাম বেচু ওরফে বেচু মাঝির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও তার মোবাইল ফোনের লোকেশন নিয়ে ধাঁধায় পড়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ধর্ষণের শিকার নারী, তার স্বামী ও মামলার বাদী এবং ভিকটিমের পরিবার বেচু মাঝির যে মুঠোফোন নম্বর দিয়েছেন ঘটনার সময় সেই মুঠোফোন নম্বরের লোকেশন ঘটনাস্থলে ছিলো না। এমনকি আসামি বেচু মাঝির নামে নিবন্ধন করা সিমটির অবস্থান ধর্ষণের সময় চর জব্বর ইউনিয়নের বাগ্যা এলাকার ঘটনাস্থলে ছিল না বলে মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে পুলিশের একাধিক সূত্র। তবে ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত বেচু মাঝির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে পুলিশকে প্রমাণ করতে কাঠখড় পোহাতে হবে বলে সূত্রে জানা গেছে।
জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ধর্ষণের এক ঘণ্টা আগেও বাগ্যা এলাকায় রুহুল আমিনের প্রজেক্টের আশেপাশে বেচু মাঝির ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করা গেছে। কিন্তু ধর্ষণের সময় ও তারপর বেচু মাঝির মুঠোফোনের লোকেশন পাওয়া যায় পাশের জেলা লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায়। ওই কর্মকর্তা জানান, ধর্ষণের পরে নিজেকে ঘটনায় নির্দোষ প্রমাণ করতে এমন ফাঁদ পাতা হয়ে থাকতে পারে। টেলিভিশনের ক্রাইম পেট্রোল ও অপরাধবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো থেকে প্রধান অভিযুক্ত এমন পরিকল্পনা করতে পারে। তিনি জানান, ঘটনার আগে একটি মোটরসাইকেলে করে ধর্ষণের শিকার নারীকে ফলো করতে থাকে কয়েকজন আসামি। এ সময় বেচু মাঝির মুঠোফোন মোটরসাইকেলে করে লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। নইলে ধর্ষণের আগে বেচু মাঝির মুঠোফোন থেকে তার নামে নিবন্ধিত সিম অন্য সিম লাগিয়ে আসল নম্বরটি লক্ষ্মীপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। মামলার বিচার থেকে নিরাপদে থাকতে বেচু মাঝি এমন কৌশল করতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। তার এমন কৌশল মামলার বিচারে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা জানিয়েছে কয়েকজন। তবে আদালত সূত্র ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছে, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেচু মিয়ার সংশ্লিষ্টা থাকলেই তাকে সাজা দিতে সমস্যা হবার কথা নয়। তবে, মামলার আরো দুই আসামি আবুল বাশার ও ইউছুপ মাঝির বিরুদ্ধে আরো অন্তত আটটি নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপহরণের মামলার খোঁজ মিলেছে মানবজমিনের অনুসন্ধানে। ২০১৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৬০৩ নম্বর মামলা, ৬৮৭ নম্বর মামলা, ২০১৪ সালে জিআর ২৪১ নম্বর মামলা, ২০১৫ সালের ৬৫ নম্বর, ২০১৮ সালে ১৮৭ নম্বর মামলাসহ আরো কয়েকটি মামলায় অন্যতম আসামি করা হয় এই দুইজনকে। একই সঙ্গে ২০১৭ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি মামলায় সুবিচার চেয়ে পুলিশ সদর দফতরের ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ও নোয়াখালীর পুলিশ সুপার বরাবরও আবেদন করেন ভিকটিম একটি পরিবার। তবে এসবের কোন কিছুই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। তার আগে ২০১৫ সালে জেলা শিশু ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা একটি প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ তুলে ধরেন। যেটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের কাছেও পাঠান ওই কর্মকর্তা। এদিকে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মো. ইব্রাহিম খলিল গতকাল রাতে মানবজমিনকে জানান, বাদীর পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে জিডির বিষয়টি আমি নিজেই তদন্ত করছি। তবে এখনো কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাইনি। তবে বাদীর অভিযোগকে আমি পুরোপুরি ভিত্তিহীনও বলছি না। আমরা সচেষ্ট আছি। সব সময় টহল পুলিশ বাদীর পরিবারের নিরাপত্তায় কাজ করছে। আসামিদের এখনো জবানবন্দি নেয়া হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা রিমান্ডে নিয়ে তাদের থেকে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা কোন তথ্য দিচ্ছে না। আর অজ্ঞাত আরো ৫ আসামিকে এখনো পুলিশ শনাক্ত করতে পারেনি বলেও মানবজমনিকে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা।
Monday, January 14, 2019
সুবর্ণচরে ধর্ষণ: বাদির সঙ্গে মিলছে না কমিশনের বক্তব্য

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে চার সন্তানের জননীকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের সত্যতা খুঁজে পেলেও মানবাধিকার কমিশন বলছে পূর্ব শত্রুতার জেরে ওই ঘটনা ঘটেছে৷ কিন্তু কমিশনের প্রতিবেদনের সাথে মিলছে না নির্যাতিতার বক্তব্য৷
মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটি বলছে, এ ঘটনায় তারা কোনো রাজনৈতিক কারণ খুঁজে পায়নি৷
ঘটনার শিকার নারী এবং মামলার বাদি তাঁর স্বামীর বরাত দিয়ে তদন্ত কমিটি বলছে, তাঁরাই তাঁদের পূর্ব শত্রুতার জেরের কথা বলেছেন৷ ভোট দেয়ার ঘটনা বা রাজনৈতিক কারণ এর পেছনে নেই৷
স্বামী-স্ত্রীর জবানবন্দির কথা উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়া বা ভোট দেওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বা আসামিরা আওয়ামী লীগের কর্মী হওয়া বা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীর মাধ্যমে ওই নারীকে মারপিট ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না৷''
কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁদের বরাত দিয়ে ‘পুর্ব শত্রুতার' বিষয় উল্লেখ করা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ধর্ষণের শিকার নারী ও তাঁর স্বামী৷ তারা দু'জনই ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘ধানের শীষে ভোট দেয়ার কারণেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের নির্দেশে ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটানো হয়৷ আমরা তদন্ত কমিটির কাছেও একই কথা বলেছি৷ পূর্ব শত্রুতার কোনো কথা বলিনি৷''
গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর গভীর রাতে এই ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটে৷ বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হলে ব্যাপক তোলপাড় হয়৷ ৩১ ডিসেম্বর এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়৷ পুলিশ এখন পর্যন্ত সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য রহুল আমিনসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে৷ এর মধ্যে পাঁচ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন৷
এর আগেও ডয়চে ভেলের কাছে ‘ধানের শীষে ভোট দেয়ার কারণেই' ধর্ষনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন ওই নারী এবং তার স্বামী৷ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর রবিবার রাতে আবার কথা হয় তাঁদের সঙ্গে৷ ওই নারী এখনো নোয়াখালী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন৷
স্বামীর মোবাইল ফোনে ডয়চে ভেলের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তাঁর৷ তিনি আবারও পুরো ঘটনা তুলে ধরেন, ‘‘আমি দুপুর ২টার দিকে ভোট দিতে গিয়েছি৷ জসিম ভাই নৌকায় ভোট দিতে বলেন৷ কিন্তু আমি ধানে ভোট দিতাম৷ এরপর আমাকে সবার সামনেই ভোট দিতে বলে৷ কিন্তু আমি তা না করে গোপন কক্ষে গিয়ে ধানে ভোট দিই৷ এরপর জসিম, জুয়েলসহ আরো কয়েকজন গিয়ে বলে রাতে খবর আছে৷ ওই সময় রহুল আমিন ছিল কিনা আমি দেখিনি৷ তবে এরা সবাই রুহুল আমিন বাহিনীর৷''
তিনি বলেন, ‘‘রাতে রহুল আমিনের অর্ডারেই আমার ওপর নির্যাতন করা হয়৷ তাঁরা আমাকে ধর্ষণ করে৷ তাঁর নির্দেশেই হয়েছে৷''
তদন্ত কমিটির কাছে পূর্ব শত্রুতার কথা বলেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘অনেকেই এসেছেন, আমার বক্তব্য নিয়েছেন৷ কারা তদন্ত কমিটি, তা আমি জানিনা৷ তবে সবার কাছেই আপনাকে যা বলেছি সেই একই কথা বলেছি৷ পূর্ব শত্রুতার কথা বলিনি৷ পূর্ব শত্রুতার কারণে নয়, ধানের শীষে ভোট দেয়ার কারণেই রুহুল আমিনের নির্দেশে আমার ওপর নির্যাতন হয়৷''
পূর্ব শত্রুতা কখনো ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘চার বছর আগে ছিল৷ তা তখনই মিটমাট হয়ে যায়৷ আর পূর্ব শত্রুতার কারণে নির্যাতন করলে, কিছু হলে তো চার বছর আগেই হত৷''
৩০ ডিসেম্বর পাংখারবাজার ১৪ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষে ভোট দেয়ায় ওই নারীকে হুমকি দেয়া হয়৷ আর রাতেই বাড়িতে ঢুকে ধর্ষণ এবং নির্যাতন করে দুর্বৃত্তরা৷
ধর্ষণের শিকার নারীর স্বামী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমিতো আর ভোট দেয়ার সময় ছিলাম না৷ ওই সময় যা হয়েছিল তা আমি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে শুনেছি৷ সে আমাকে বলেছে ধানের শীষে ভোট দেয়ায় তাঁকে হুমকি দেয়া হয়৷ আর রাতে তো আমাকে বেঁধে, আমার সামনেই ধর্ষণ করা হয়৷ আমি তদন্ত কমিটির কাছেও একই কথা বলেছি৷ পূর্ব শত্রুতার কোনো কথা বলিনি৷''
তাহলে মামলার এজাহারে কেন ধানের শীষে ভোট দেয়ার কারণ বলা হয়নি, পূর্ব শত্রুতার কথা কেন বলেছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমি মৌখিকভাবে পুরো ঘটনা বলেছি৷ পুলিশ এজাহার লিখেছে৷ এজাহার লিখে আমাকে পড়েও শোনায়নি৷ শুধু আমাকে বলেছে সই কর৷ তারা আমার কথা এজাহারে না লিখে তাদের মতো এজাহার বনিয়েছে৷''
তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘‘আমি রহুল আমিনসহ ১২ জনের নাম বলেছি অভিযুক্ত হিসেবে৷ কিন্তু পুলিশ রহুল আমিনসহ ৩ জনের নাম বাদ দিয়ে ৯ জনকে এজাহারে আসামি করে৷'' অবশ্য চাপের মুখে পুলিশ পরে আওয়ামী লীগ নেতা রহুল আমিনকে সন্দেহজনক আসামি হিসেবে আটক করে৷
এর জবাবে সুবর্ণচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাদি সঠিক কথা বলছেন না৷ আর এজাহার না দেখে তাঁর অভিযোগ সম্পর্কে আমি এখন কিছু বলতে পারবো না৷ মামলাটি এখন ডিবি তদন্ত করছে৷''
এদিকে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটি পূর্ব শত্রুতার জেরের কথা বললেও কী সেই পূর্ব শত্রুতা তা উল্লেখ করেনি প্রতিবেদেন৷ ধর্ষণের শিকার নারী ও তার স্বামীর এই বক্তব্যসহ এইসব বিষয় তুলে ধরে কমিটির আহ্বায়ক আল মাহমুদ ফায়জুল কবীরের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা প্রতিবেদন দিয়েছি, এখন কমিশন মূল্যায়ন করবে৷ এ নিয়ে কমিশন চেয়ারম্যান বলতে পারবেন৷''
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘তদন্ত কমিটিই ভালো বলতে পারবে৷ এ নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাইনা৷''
তবে তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ওই নারীকে দলবদ্ধভাবে নির্যাতন এবং ধর্ষণ করা হয়েছে এটা প্রমাণিত৷ এখন সরকারের কাছে দাবি, বিচার নিশ্চিত করা৷ তদন্ত কমিটি বলেছে পূর্ব শত্রুতার জেরে এই ঘটনা ঘটেছে৷ ওরা মনে হয় সেটা পরিস্কার করতে পারেনি৷ এটা ওরাই ভালো বলতে পারবে৷ আমার কথা হল অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে৷''
সূত্রঃ DW
Thursday, January 10, 2019
সুবর্ণচরে গণধর্ষণ: সোহেল ও জসিমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

এলাকার ভূমিহীন বিবি মরিয়ম (৫০) জানায়, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় রুহুল আমিনের প্রধান সহযোগী আবদুর রব, সুবর্ণচর উপজেলার এক কর্মী সিজার ও সেলিম আমাকে হুমকি দিয়েছে এলাকা ছেড়ে চলে না গেলে আমাকেও ঐ নির্যাতিতার মতো করবে। তারা এলাকায় এ বলে হুমকি দিচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে রুহুল আমিনকে বের করে তারপর সবাইকে এলাকা ছাড়া করবে। ভূমিহীন বিধবা মরিয়ম জানান, আবদুর রব হুমকি দিয়ে বলেছে মুখ খুললে আমার ৩ মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে এবং সরকার থেকে পাওয়া বাড়ি ও জমি দখল করবে। তিনি জানান, রুহুল আমিন মেম্বার, আবদুল খালেক, রুবেল, মনির ২০১৮ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর তার মেয়ে ইয়াসনুর বেগম (১৮) কে তার স্বামীর বাড়িতে নির্যাতন করে হত্যা করে। হত্যার পরদিন থেকে ৪-৫ বার চরজব্বর থানায় গেলেও ওসি মামলা না নিয়ে উল্টো ধমক দিয়ে থানা থেকে বের করে দিয়েছে।
পরে উপায় না দেখে ১৮-৯-২০১৮ নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোহাম্মদ শামছুউদ্দিন খালেদের আদালতে মামলা করলে আদালত অভিযোগটি এফ.আই.আর হিসেবে প্রতিপালন প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন।
এ আদেশ পাওয়ার পরও থানা পুলিশ অনেক ঘোরাঘুরির পর ১৪-১০-১৮ইং মামলা রেকর্ড করতে বাধ্য হন। তারপরও চরজব্বর থানা পুলিশের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও রুহুল আমিন বাহিনীকে রহস্যজনক কারণে গ্রেপ্তার করেনি। এলাকার আমেনা খাতুন (২৫) জানায়, রুহুল আমিন এ চরের যে মহিলার দিকে চোখ দিয়েছে তাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। তার ভয়ে কেউ মুখ খোলেনি।
কেউ থানা পর্যন্ত গেলে পুলিশের ধমক খেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। এভাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো ৮-১০ জন মহিলার সঙ্গে এ প্রতিনিধির কথা হয়েছে। রুহুল আমিন তাদের স্বামীদের ডেকে নিয়ে তার ক্লাব ঘরে আটকে রাখতো এবং তাদের বাড়ি গিয়ে দলবল নিয়ে মহিলাদের নির্যাতন করতো। যারা নির্যাতনে রাজি হতো না তাদের স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে ২০-২৫ হাজার টাকা দিতে হতো রুহুল আমিনকে। এ বছর সে ভূমিহীনদের জমি দখল করে একটি ব্রিকফিল্ড চালু করে। হাসপাতালের একজন ডাক্তার জানায়, পাশবিক নির্যাতনের শিকার গৃহবধূকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা পিজি হাসপাতালে দ্রুত নেয়া দরকার। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলি ইউনিয়নের মধ্য বাগ্যা গ্রামে ভোটের রাতে গণধর্ষণের শিকার নির্যাতিত গৃহবধূকে সকল ধরনের আইনি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে নোয়াখালী আইন সহায়তা কমিটি ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।
গতকাল দুপুরে নোয়াখালী প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র দাস লিখিত বক্তব্যে বলেন, নির্যাতিত গৃহবধূকে সকল আইনি সহায়তা দেয়া হবে। সর্বোচ্চ আইনি সহায়তার মাধ্যমে ওই গৃহবধূর পাশে দাঁড়ানো হবে যাতে ধর্ষকরা কোনোভাবে যেন আইনের ফাঁকে বের হতে না পারে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের আইনজীবীদের নিয়ে আইনি সহায়তা কমিটি করা হয়েছে। আমরা সবসময় নির্যাতিত নারীদের পাশে আছি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলা আহ্বায়ক ও সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) কাজী মানছুরুল হক খসরু, আইনি সহায়তা কমিটি নোয়াখালীর সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সহিদ উল্যা বাবু, সদস্য অ্যাডভোকেট রিপন চক্রবর্তী প্রমুখ।
Wednesday, January 9, 2019
সুবর্ণচরে গণধর্ষণ: নির্যাতিতার ডিএনএ টেস্টের অনুমতি

সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক জানান, সুবর্ণচরে পৈশাচিকতার দায় নিতে হবে রুহুল আমিনকে। জঘন্যতম এ ঘটনায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এমপি একরামুল করিম চৌধুরী এ বিষয়ে জিরো টলারেন্সে রয়েছেন।
তার চিকিৎসাসহ নিরাপত্তা দেয়ার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বর ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে সুবর্ণচরের চরবাগ্যায় গণধর্ষণের দ্রুত চার্জশিট দাখিল করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন নোয়াখালীতে ১১১ জন আইনজীবী।
রিমান্ডে ৭ আসামিকে ডিবি অফিসে আনার ৪৫ ঘণ্টা পরও মুখ খোলেনি। তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ডিএনএ টেস্ট করে প্রোফাইল সংরক্ষণ করার জন্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নবনিতা গুহ এর আদালত আদেশ দিয়েছেন। এ ঘটনায় দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দাখিল করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য নোয়াখালী আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফাজ উদ্দিন, সাবেক সভাপতি বি.ইউ.এম কামরুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম, সাবেক সহসভাপতি কাজী মির হোসেন, এনায়েত উল্যাসহ ১১১ জন আইনজীবী যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। নোয়াখালী সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাছের মাহমুদ জনির তত্ত্বাবধানে ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের কখনও মুখোমুখি কখনও এককভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে সূত্র জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তদন্তের কার্যাবলীর ব্যাপারে তদারকি ও দিকনির্দেশনা দিতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ফারুখ আহমেদ সোমবার সন্ধ্যায় পুনরায় নোয়াখালী আসেন এবং জেলার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি রিমান্ডে থাকা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেন বলে ডিআইজি সোমবার রাত ৮টায় সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, সরকারের উচ্চ মহল ও নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে সব সময় খোঁজ খবর রাখছেন এবং অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। ডিআইজি আরো জানান, যত দ্রুততম সময়ে সম্ভব এ চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে এবং এ মামলাটি যেন দ্রুত বিচার আইনে বিচার হয় পুলিশের পক্ষ থেকে এ চেষ্টা করা হবে।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. খলিলুর রহমান জানান, চার সদস্যের মেডিকেল টিম মঙ্গলবার দুপুরে রোগীকে দেখেছেন, রোগীর সঙ্গে কথা বলেছেন। পরীক্ষা নিরীক্ষার কাগজপত্র ও রিপোর্ট পর্যালোচনা করেছে এবং আরো কয়েকটি নতুন পরীক্ষা করানোর জন্য বলেছেন। এসব পরীক্ষার কিছু কিছু জেনারেল হাসপাতালে করা যাবে আর কিছু পরীক্ষা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল সড়কের অত্যাধুনিক প্রাইম হাসপাতালে করতে হবে। সব রিপোর্ট পাওয়ার পর মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে নির্যাতিতাকে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করতে হবে কিনা।
Tuesday, January 8, 2019
সেদিনের বীভৎসতায় এখনো আঁতকে ওঠেন নির্যাতিতা

আদালত সূত্র জানায়, ধর্ষিতার পোস্ট ট্রমাটি স্টেচ ডিজ অর্ডার (পি.টি.এস.ডি) হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নবনীতা গুহ হাসপাতালের কেবিনে গিয়ে ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ধর্ষিতা জানান, কোর্টের হাকিমকে মহিলা পেয়ে আমি ধানের শীষে ভোট দেয়ায় আমার ওপর কী অত্যাচার করেছে সব কথা বলেছি, যারা আমাকে ধর্ষণ করেছে তাদের সবার নাম বলেছি।
সেই দিনের বীভৎসতার কথা, যা এখনো মনে হলে আঁতকে উঠি। সুবর্ণচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ.ন.ম খায়রুল আলম সেলিম বলেন, রুহুল আমিন বিএনপি থেকে ভোটের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। গণধর্ষিতার চিকিৎসার ব্যয়ভারসহ সকল দায়-দায়িত্ব নিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি ও এমপি একরামুল করিম চৌধুরী। তিনি মাইজদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আবদুল মমিন বিএসসিকে হাসপাতালে পাঠিয়ে ভিকটিমের সঙ্গে দেখা করে দায়িত্ব নেয়ার কথা জানান।
চরাঞ্চল ঘুরে জানা গেছে, ভোটের রাতে গণধর্ষণের ঘটনায় এই আলোচিত ওসি মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাবেক মেম্বার রুহুল আমিন এবং ধানের শীষে ভোট দেয়ার তথ্য-উপাত্ত বাদ দিয়ে গণধর্ষণ মামলা রেকর্ড করে। এ নিয়ে স্থানীয় জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ চলছে। সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্য ব্যাগ্যা গ্রামে গৃহবধূ গণধর্ষণের ওই রাত থেকে পলাতক ছিল মামলায় এজাহারভুক্ত ৭ নং আসামি আবুল (৪০)। এর মধ্যে মাঝে মাঝে স্ত্রী ছেমনা খাতুনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করতো আবুল। ঘটনাটি নিয়ে যখন চারদিকে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় তখন পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়।
এরপর ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। তখন ছেমনা তার স্বামী আবুলকে সেই সব বিষয়ে অবগত করেন এবং নিজ থেকে এসে পুলিশে ধরা দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আবুল তাতে কর্ণপাত করেনি। গত ২/৩ দিন ধরে ছেমনা স্বামীকে বলেন- স্বেচ্ছায় পুলিশে ধরা না দিলে তার ফাঁসি হয়ে যাবে। এর সূত্র ধরে, রোববার বিকালে ছেমনা তার স্বামী আবুলকে দেখা করার জন্য আটকপালিয়া বাজারে আসতে বলে। স্ত্রীর কথামতো বিকাল ৫টার দিকে ওই বাজারে আসে আবুল। এসময় ছেমনা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় কৌশলে আবুলকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
চরজব্বার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ইব্রাহিম খলিল জানান, আবুলের স্ত্রীর সহযোগিতায় আটকপালিয়া বাজার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে এই মামলার এজাহারভুক্ত ৭নং আসামি। সুবর্ণচরে গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার আরো ২ ধর্ষক। অভিযুক্ত আরো দুই আসামি নোয়াখালীর সেনবাগে গ্রেপ্তার মামলা গোয়েন্দা পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্য ব্যাগ্যা গ্রামে ৩০শে ডিসেম্বর ধানের শীষ মার্কায় ভোট দেয়ার ঘটনায় স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রেখে ৪ সন্তানের জননী গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত আরো দুই আসামি মুরাদ (৩০), ইব্রাহিম খলিল প্রকাশ বেচু (৪০)কে সেনবাগ থেকে গ্রেপ্তার করেছে নোয়াখালী গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রোববার ৬ই জানুয়ারি সন্ধ্যার সময় নোয়াখালী গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি’র) ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেনের নেতৃত্বে সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্স গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের নুরুল আমিনের (এম.পি.ডি) ব্রিকফিল্ডে অভিযান চালিয়ে সুবর্ণচরের মধ্যব্যাগ্যা গ্রামের মো. রফিকের ছেলে মুরাদ তাকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে গত ৩রা জানুয়ারি অপর এক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত অপর আসামি ইব্রাহিম খলিল প্রকাশ বেচু, একই উপজেলার আরিফের ব্রিকফিল্ড থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই নিয়ে শনিবার রাত থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ আলাদা অভিযান চালিয়ে ধর্ষণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করলো। এ পর্যন্ত সর্বমোট ১০ জন গ্রেপ্তার হলো। গ্রেপ্তার হওয়া অপর দুইজন হচ্ছে মধ্যব্যাগ্যা গ্রামের টোকাইয়ের ছেলে সালাউদ্দিন ও একই গ্রামের সেরু মিয়ার ছেলে আবুল। এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত ৭ জনের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেছেন- নোয়াখালীতে গণধর্ষণের ঘটনাকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এবং সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ গুরুত্বের কারণেই কিন্তু ৪৮ ঘণ্টার অ্যাকশন নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ১০ আসামিকে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী সকল আসামি ধরা পড়বে এবং আইনানুগভাবেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সোমবার সকালে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুবর্ণচর উপজেলার মধ্যব্যাগ্যা গ্রামে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূর খোঁজখবর নেন বিভাগীয় কমিশনার।
এসময় তিনি ভিকটিমকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা এবং আইনি সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দেন। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। এসময় বিভাগীয় কমিশনার আরো বলেন, গণধর্ষণের সঙ্গে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না। এই বিষয়টি কতটা রাজনৈতিক অথবা কতটা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তা খতিয়ে দেখতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আজকেও সময় টেলিভিশন চ্যানেলে দেখেছি, পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই এ ঘটনাটি ঘটেছে। ৩০ তারিখের নির্বাচনের সঙ্গে এটাকে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ধর্ষিতার চিকিৎসা এবং তার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ভিকটিম নিজেই বলেছেন আগের চেয়ে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এসময় জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস, পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী ড. মাহে আলম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ কামাল হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুর রউফ মণ্ডল, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. খলিল উল্যাহ, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুল ইসলাম সরদার, স্বাচিপ নোয়াখালীর সভাপতি ডা. ফজলে এলাহী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার পাঙ্খার বাজার উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নারীদের নিরাপত্তা দাবি ও গণধর্ষণের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে উপজেলা ভূমিহীন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন উন্নয়ন সংস্থা নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবির।
উপজেলা ভূমিহীন সংগঠনের সভাপতি ছেরাজুল হক খোকনের সভাপতিত্বে ও পাঙ্খারবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাতেমা আক্তারের সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, মানবাধিকার আইনজীবী সমিতির নির্বাহী সদস্য এড. সালমা আলী, ভূমিহীন নেতা শাহানা আক্তার, ইব্রাহিম খলিল ও নুর উদ্দিন, পাঙ্খারবাজার জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আক্তার হোসেন বাবুল, ভূমিহীন অঞ্চল কমিটির সমন্বয়ক খোদেজা বেগম, গণধর্ষণের শিকার পারুল বেগমের ওয়ার্ডের পুরুষ মেম্বার খলিল উল্যাহ, মহিলা মেম্বার আমেনা বেগম, ভুক্তভোগী অর্থসম্পদ ও সতীত্বহরণকারী ২৫ জন নারী মিনা, রহিমা, আয়েশা, মনোয়ারা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। প্রধান অতিথি সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী-ধর্ষকদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান। সমাবেশে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো নারী-পুরুষ সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেকে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা গণধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি করেন। একই সঙ্গে স্বাধীন দেশে নারীদের নিরাপত্তার দাবি করেন। নিজেরা করি এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক খুশি কবির ডিসি, এসপি’র সঙ্গে সন্ধ্যায় দেখা করে গণধর্ষিতাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর অনুরোধ করেন। এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের সভাপতি ও জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া’র শাইখুল হাদিস মাওলানা মামুনুল হক গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে যুব মসলিসের নেতাকর্মীদের নিয়ে হাসপাতালে যান। এসময় তিনি ভিকটিমের সুচিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করে প্রকৃত আসামিদের দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে নরপিশাচদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
Sunday, January 6, 2019
সুবর্ণচরে নির্যাতিতার পাশে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা by শাহনেওয়াজ বাবলু ও নাসির উদ্দিন বাদল

ধর্ষিত নারীকে সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মির্জা ফখরুল।
বিএনপি মহাসচিবকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন ওই নারীর অটোচালক স্বামীও। এ সময়ে তার পাশে থাকা ওই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানসহ অন্য নেতারাও ছিলেন অশ্রুসজল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকীও ওই নারীকে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন। গত ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর রাতে নিজের বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন বাগ্যা গ্রামের এই নারী। স্বামী সন্তানকে বেঁধে রেখে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার সহযোগীরা দল বেঁধে তাকে ধর্ষণ করা হয়।
এদিকে নির্যাতিতা নারীকে দেখে এসে বিকালে নোয়াখালী জেলা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত এক মতবিনিময়সভায় নেতারা বক্তব্য রাখেন। এ সময় মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে এখানে তরুণদের মাঝে যে ক্ষোভ দেখলাম, যে উচ্ছ্বাস দেখলাম এই ক্ষোভকে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। এরা (সরকার) চোরাবালির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এখন আমাদের প্রয়োজন শুধু ঐক্য, ঐক্য, ঐক্য। জনগণের ঐক্যের মধ্য দিয়ে আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একাত্তর সালের ২৫শে ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ২০১৮ সালে ৩০শে ডিসেম্বর এই বাংলাদেশে একটি সরকার তার সমস্ত প্রশাসনকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ওপর ঠিক একই কায়দায় হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং আমাদের যে অধিকার সেই অধিকার তারা কেড়ে নিলো। আমরা বাধা দিতে পারিনি।
কেন ভোটের দিন জনগন জেগে ওঠেনি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘যে কথা আমরা বার বার বলেছি, বার বার বিভিন্ন জায়গায় ছুটে গিয়ে বলেছি- জেগে উঠুন, আপনাদের অধিকার রক্ষা করুন। আমরা মরার আগেই মরে যাচ্ছি? কেন মরে যাচ্ছি? কেন উঠে দাঁড়াচ্ছি না। এটা আমার দেশ, এই মাটি আমার। আমি এর মালিক, জনগণ এদেশের মালিক। যারা চাকরি করবে, সমস্ত সুখ ভোগ করবে, জনগণের পয়সায় তারা সরকার চালাবে তারা আমাদের খাবে, আমাদের পরবে আর আমাদের ওপরে গুলি চালাবে?’ নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ক্ষোভ হয় না? রাগ হয় না,? উত্তেজনা হয় না? রুখে দাঁড়াতে পারি না আমরা?
সেই রুখে দাঁড়াতে হবে। এই একটা সুযোগ আমরা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আন্দোলন তৈরি করে আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে। কিন্তু আমরা পারিনি। তাই বলে কি সব শেষ হয়ে গেছে। হয়নি। কিছুই শেষ হয়নি। আমরা আবার রুখে দাঁড়াবো, আমরা আবার উঠে দাঁড়াবো শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে আমার যে বোনকে ধর্ষণ করা হয়েছে এর প্রতিশোধ নেবো, আমার যে ভাইয়ের ঘর পোড়ানো হয়েছে তার প্রতিশোধ আমরা নেবো। শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে সকলে উঠে দাঁড়ান বিজয় হবো ইনশাআল্লাহ।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি করে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই তার মিটিংয়ে বলেছেন যে, দানবীয় আচরণ করবেন না, দানবে পরিণত হবেন না।
আপনি তো দানব হয়ে গেছেন। আমি বলি না, এসকে সিনহা সাহেব (সাবেক প্রধান বিচারপতি) বলেছেন একটা দানব তৈরি হয়েছে। সেই দানব থেকে মুক্তি পেতে হবে, পাথর বুক থেকে সরাতে হবে। আমাদের স্বাধীনতার আলো নিয়ে আসতে হবে, আমাদেরকে মুক্তির সংগ্রামে যেতে হবে।
জেলা আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে মতবিনিময় সভায় এর আগে জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, প্রশ্ন এসেছে ভোট। ভোট তো হয় নাই। ভোটের তারিখ ছিলো ৩০শে ডিসেম্বরে। ২৯ তারিখে ব্যালট শেষ। আমি ১৯৫৪ সালে ভোট দিতে গেছি, সেই থেকে এই পর্যন্ত সব ভোট দেখেছি, ভোটে অংশগ্রহণ করেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভোটের ইতিহাস আমি পড়েছি এই ধরনের কলঙ্কিত উলঙ্গ ভোট ডাকাতি নয়, মহাডাকাতি। এরকম ভোট কোথাও হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এটা ঘৃণা করার ভাষা নেই।
সারা বাংলাদেশ সুবর্ণচর হয়ে যাবে। মা-বোন-মেয়ে নিয়ে মান ইজ্জতের সঙ্গে বেঁচে থাকবেন কিভাবে? এদের খপ্পরে আক্রমণে সুবর্ণচরের এক মহিলার শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে, তার শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে। আমার সেই বোনকে আমরা দেখতে এসেছি। একাত্তরে যেভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, এদের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ালে মান ইজ্জত নিয়ে কেউ বাঁচতে পারবে না। এদের রুখতে হবে, এই জালেমদের রুখতে হবে। একাদশ নির্বাচনের সংসদ সদস্যদের শপখ গ্রহণ অবৈধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, উনি (শেখ হাসিনা) তড়িঘড়ি করে শপথ নিয়েছেন। আপনি তো ভোটে জিতেন নাই। আপনার শপথ নেয়া বেআইনি। এই সংসদ (দশম) এর মেয়াদ আছে ২৮শে জানুয়ারি পর্যন্ত। সেই সংসদ বাতিল করেছে এটা আমি কোনো পত্রিকায় দেখি নাই।
বাংলাদেশে ২৮শে জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদ সদস্য হলো ৬শ’। আপনি শপথ নিলেন কিভাবে। ওই সংসদ বাতিল না করে কিভাবে শপথ নিলেন আপনারা। এই শপথ বেআইনি ও অবৈধ। আপনি শপথ সংবিধানবিরোধী ও নীতি নৈতিকতা বিরোধী। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন করবে বলে জানান রব। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বলেন, ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচন হয়নি, প্রহসন হয়েছে। আজকে আইন নেই, বিচার নাই, প্রশাসন নেই, পুলিশ নাই। সব দলীয় হয়ে গেছে। এদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে হলে প্রথম নিজেকে তৈরি করতে হবে।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নির্যাতিতা নারীকে দেখতে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও জেএসডি সভাপতি আ.স.ম. আবদুর রব, বিএনপির আবদুল আওয়াল মিন্টু, সৈয়দা আশরাফ পাপিয়া, মো. শাহজাহান, বরকতউল্লাহ্ বুলু, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, জয়নুল আবদিন ফারুক, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, শামীমা বরকত লাকীসহ বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ। এ সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমার বোন নোয়াখালীতে ধর্ষিতা হয়েছেন তিনি ৪ সন্তানের মা। আমরা ধিক্কার জানাচ্ছি, তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং জনগণের কাছে এর বিচার দিচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো।
Sunday, October 21, 2018
পাষণ্ড পিতা!

কয়েকদিন আগে ঘটনা টের পেয়ে ভিকটিম তার মাকে বিষয়টি জানায়। এর সূত্র ধরে গত কয়েকদিন আগে শহীদ আসার আগে তারা রাতের খাওয়া শেষ করে শুয়ে যেত এবং আমেনা মেয়েকে পাহারা দিতো। একপর্যায়ে গত দু’দিন আগে শহীদ তার মেয়ের রুমে গিয়ে ঘুমের মধ্যে ভিকটিমকে ধর্ষণ করার সময় তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে আমেনা।
পরে বিষয়টি কাউকে বললে তাদের মা-মেয়েকে হত্যা করার হুমকি দেয় শহীদ। কিন্তু এরমধ্যে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়ে গেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ভিকটিমের। পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে গতকাল শনিবার বিকেলে ভিকটিম বাদী হয়ে সেনবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার সূত্রধরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ছিলোনীয়া বাজারে অভিযান চালিয়ে শহীদ উল্যাকে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, শহীদ উল্যা একজন মাদক সেবি ও জুয়াড়ি। এর আগেও সে মাদক ও জুয়া খেলার অপরাধে একাধিকবার পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল। সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে মানবজমিনকে জানান, প্রাথমিকভাবে মেয়েকে ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেছে গ্রেপ্তারকৃত শহীদ উল্যা।
গ্রেপ্তারকৃত শহীদ উল্যাকে আজ রবিবার দুপুরে কারাগারে প্রেরণ ও ভিকটিমকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2002)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...


