Tuesday, March 9, 2010

অতিথিসেবার অনন্য নজির by আরিফুল ইসলাম

উত্তরটা জেমি সিডন্সের হাসিতেই লুকিয়ে ছিল। আগামী ১৫ মে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসে টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কোচকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এর আগে লর্ডসেই বাংলাদেশকে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলানো হলে কেমন হতো! ‘তাহলে তো দারুণ হতো!’—মুখে এ কথা বলেছেন, কিন্তু এর পরই যে হাসিটা দিলেন, তার অর্থ হতে পারে, ‘ইংলিশদের কি এতই বোকা পেয়েছ!’
প্রথম টেস্ট খেলার জন্য বাংলাদেশ দল চট্টগ্রাম এসেছে পরশু রাতে, আর ইংল্যান্ড এখানে আছে নয় দিন ধরেই। তাতে খুব একটা সমস্যা নেই। কিন্তু যে মাঠে দুই দিন পরই টেস্ট, সেই মাঠেই প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ ক্রিকেট ইতিহাসে কোনো সফরকারী দল এর আগে পেয়েছে কি না, অনেক ঘেঁটেও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেল না। প্রশ্ন হতে পারে, প্র্যাকটিস ম্যাচের উইকেটেই তো আর টেস্ট হবে না, তাহলে আর সমস্যা কী? যৌক্তিক প্রশ্ন, তবে পুরোনো সেই প্রবাদটা ভুলে গেলেও চলবে না, ‘একটা ভাত টিপলেই পুরো হাঁড়ির ভাতের অবস্থা বোঝা যায়!’
উইকেট সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে, এর চেয়েও বড় ব্যাপার আরেকটা। ক্রিকেট যতটা মাঠের খেলা, ঠিক ততটাই মনস্তাত্ত্বিক। শুধু উইকেট নয়, মাঠ, মাঠের পরিবেশ, ড্রেসিংরুম—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক নিউজিল্যান্ড সফরে এটা নিয়ে খুব ভালো একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান, ‘শুধু মাঠ বা উইকেট নয়, হোটেল থেকে মাঠে আসা-যাওয়ার রাস্তা, রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য, ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি সবকিছুই একজন ক্রিকেটারের মনোজগতে ছাপ ফেলে। হুট করেই একটা নতুন জায়গায় যাওয়া আর কদিন থেকে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য।’ সাকিবের কথার প্রেক্ষাপট অবশ্য ছিল ভিন্ন, নিউজিল্যান্ডে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ তো বাংলাদেশ পায়ইনি, উল্টো অন্য এক গোলার্ধে পা দিয়েই তড়িঘড়ি করে আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নেমে পড়তে হয়েছে। এর স্পষ্ট ছাপ দেখা গেছে পারফরম্যান্সেও, শুরুর জঘন্য পারফরম্যান্স অনেক ভালো হয়েছে যতই সময় গড়িয়েছে।
নিউজিল্যান্ডে এমন আতিথেয়তা পেয়ে দেশে এসে সাকিব যখন শুনলেন আমাদের অতিথি ইংল্যান্ডের জন্য এমন আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে, একা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডে গেলে কি লর্ডসে আমাদের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে দেবে!’ কাল জেমি সিডন্স কোনো রাখঢাক না রেখেই বললেন ‘অবশ্যই এটা ওদের জন্য বড় একটা অ্যাডভানটেজ, অবশ্যই। কোনো সন্দেহ নেই ওরা অনেক লাভবান হবে।’ ওয়ানডে দলে ছিলেন না, টেস্টের আগে একই ভেন্যুতে প্রস্তুতির সুযোগ পেয়ে বিস্ময় লুকাননি ইংলিশ ব্যাটসম্যান, ‘সপ্তাহখানেক এই মাঠে অনুশীলন করছি, ম্যাচ খেলেছি, দলের জন্য এটা দারুণ একটা ব্যাপার। আমাদের প্রস্তুতিটা দুর্দান্ত হয়েছে, এমন সুযোগ সব সময় হয় না।’
সিডন্স অবশ্য পরে শিষ্যদের সাহস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এই বলে, ‘ওরা একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে, আমার ছেলেরা এখানে সারা জীবন ধরেই খেলছে, দেখা যাক।’ কিন্তু একদল সারা জীবন ধরেই খেলে, আরেক দল সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে এসে খাবি খাবে, এটাই তো দেশের মাটিতে খেলার সুবিধা। অবশ্য ক্রিকেট কর্তারা যদি বাংলাদেশের সুবিধার চেয়ে ‘বাঙালি অতিথিপরায়ণ জাতি’ এটা প্রমাণ করাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তাহলে ভিন্ন কথা!

হতবাক তাঁর স্বজনেরা by মোস্তফা মনজু

জাতীয় দলের মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান রকিবুল হাসানের সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণায় তাঁর বৃদ্ধ বাবা নূর উদ্দিন (৮২) হতবাক হয়ে পড়েছেন। রকিবুলের নিজ জেলা জামালপুর শহরের দেওয়ানপাড়ায় তাঁর বাসায় কাল রাতে ছিল এক ধরনের ‘শোকাচ্ছন্ন’ পরিবেশ। তাঁর স্বজনদের মুখে যেন কোনো ভাষাই ছিল না। শহরের মোড়ে মোড়ে এ নিয়ে শোনা গেল বিস্তর আলোচনা। রকিবুলের এই সিদ্ধান্তে সবাই বিস্মিত, হতবাক। মোবাইল ফোনে রকিবুলকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সবার মাঝেই ‘কী হলো কী হলো’ ছটফটানি লক্ষ করা গেছে। তবে তাঁর নিকটাত্মীয় ও বন্ধুরা কেউই জানেন না রকিবুল কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন।
রাত সাড়ে নয়টায় তাঁদের বাসায় রকিবুলের বাবা-মা, ভাইবোন ও অন্যরা রিমোট টিপে টিপে টিভি চ্যানেলগুলোতে রকিবুলের অকাল অবসরের খবরটা দেখছিলেন। তাঁর বৃদ্ধ বাবা নূর উদ্দিন ক্রিকেট অতটা বোঝেন না। কিন্তু ছেলে রকিবুল যে ভালো খেলেন, এ আনন্দ নিয়েই তিনি সময় কাটান। টিভিতে ছেলের খেলা দেখে খুবই আনন্দ পান। কিন্তু রকিবুল আর ক্রিকেট খেলবে না—কাল রাতে এ কথা শোনার পর তিনি অনেকটা ভেঙে পড়েছেন। বড় ছেলে শফিকের কাছে জানতে চাইলেন, কী হয়েছে রকিবুলের। ‘আমার ছেলে নয়নের (রকিবুলের ডাক নাম) সারা দেশশুদ্ধা নামডাক আছে। সেদিন টিভিতে দেখলাম, ১০০ রান করার পর কী রকম কালা মিচমিচা চেহারা হইছে। অর যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আপনেরা দেখবেন’—রকিবুলের বাবা এ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলছিলেন আর ফ্যাল ফ্যাল করে টিভি চ্যানেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
২০০৮ সালের এই মার্চেই (৯ মার্চ) চট্টগ্রামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু। একই বছরের নভেম্বরে সেঞ্চুরিয়নে ওই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেই টেস্ট অভিষেক। জাতীয় দলে ঢোকার পরই ঢাকার মিরপুরে বাসা নেন জাতীয় লিগে এ পর্যন্ত একমাত্র তিন শ রানের ইনিংসের মালিক এই তরুণ ক্রিকেটার। জামালপুর থেকে নিয়ে যান মা-বাবা ও এক বোনকে। বাবা এ মুহূর্তে জামালপুরে থাকলেও মা ও বোন রয়েছেন ঢাকাতেই।
চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে রকিবুল সবার ছোট। বড় ভাই শফিকুল ইসলামের হাত ধরে জামালপুরের মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে তাঁর ক্রিকেট-যাত্রা শুরু। এই ভাই-ই বড় মানসিক আশ্রয়। তাঁকেই সবকিছু জানান। শফিকুলের কাছ থেকে জানা যায়, সর্বশেষ কাল দুপুরের দিকে রকিবুল তাঁকে মোবাইল ফোনে জানান, তিনি আর ক্রিকেট খেলবেন না। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসছেন। এর পর থেকেই তাঁর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। শফিকুল বললেন, ‘রকিবুল খুব বিচক্ষণ। পরিবারের এবং কারও সঙ্গেই ও খারাপ ব্যবহার করে না। কেউ তাঁর সঙ্গে ব্যবহার একটু খারাপ করলে মানিয়ে নেয়। কিন্তু হঠাত্ করে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত যে কেন নিল আমার মাথায় ধরছে না। ওর সঙ্গে কথা না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলতে পারছি না।’

নোবেলজয়ী নারীরা by শায়লা রুখসানা

বিশ্বজুড়ে আজ উদ্যাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শতবর্ষ। বিশ্বের সর্বাধিক সম্মানজনক পুরস্কার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন অনেক নারী। নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের দুই বছর পরই এই সম্মানজনক পুরস্কার পান একজন নারী। তিনি মাদাম কুরি। এখন পর্যন্ত সব বিভাগে ৪১ জন নারী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে সাহিত্যে পেয়েছেন ১২ জন নারী।
এঁরা হলেন সুইডেনের সেলমা লগারলোফ, ইতালির গ্রাজিয়া ডেলেড্ডা, নরওয়ের সিগরিড আন্ডসেট, যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল এস বাক, চিলির গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, জার্মানির নেলি স্যাক্স, আফ্রিকান-আমেরিকান নাদিন গর্ডিমার, যুক্তরাষ্ট্রের টনি মরিসন, পোল্যান্ডের বিসলোবা সিমবোর্স্কা, অস্ট্রিয়ার আলফ্রেড জেলিনেক, ব্রিটিশ ডরিস লেসিং ও জার্মানির হেরটা মুয়েলার।
এঁদের মধ্যে চারজনের জীবন ও কর্ম নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করা হলো।
সেলমা লগারলোফ: ১৯০৯ সালে সাহিত্যে প্রথমবারের মতো নোবেল জয় করেন কোনো নারী। তিনি হলেন সুইডেনের সেলমা লগারলোফ। ১৮৫৮ সালে জন্ম নেওয়া সুইডিশ এই লেখিকা সেই সময়েও লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। শিশুদের জন্য লেখা তাঁর দ্য ওয়ান্ডারফুল অ্যাডভেঞ্চারস অব নিলস বইয়ের জন্য অনেক বেশি বিখ্যাত। তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে স্কুলে পড়িয়েছেন। সেখান থেকেই তাঁর গল্প বলার স্বচ্ছন্দ অভ্যাসটি গড়ে ওঠে বলে মনে করা হয়। স্কুলে শিক্ষকতার সময়ই প্রথম উপন্যাস লেখেন। এরপর লেখালেখিবিষয়ক এক প্রতিযোগিতায় তাঁর বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদটি জমা দিলে পুরো বইটি লেখার প্রস্তাব পান। ভাবাই যায় না, বইয়ের একটি অনুচ্ছেদ থেকে পুরো বই লেখার প্রেরণা! বইটির জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ায় এ ঘটনাটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যয় করতে তিনি তাঁর নোবেল পদক এবং স্বর্ণপদক ফিনল্যান্ড সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেন। ৮১ বছর বয়সে ১৯৪০ সালে মারা যান সেলমা লগারলোফ।
পার্ল এস বাক: চীনের কৃষকদের জীবনের আখ্যান নিয়ে এবং নিজের আত্মজীবনীমূলক রচনার জন্য ১৯৩৮ সালে নোবেল জয় করেন পার্ল এস বাক। ১৮৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় জন্ম। তিন মাস বয়সের সময় পার্ল এস বাকের পরিবার চলে যায় চীনে। সেখানেই একটানা ১৪ বছর কাটান তিনি। জিনজিয়াং প্রদেশে বড় হন পার্ল।
প্রথম উপন্যাস ইস্ট উইন্ড-ওয়স্ট উইন্ড। ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য গুড আর্থ প্রকাশিত হয়। এ বইটি প্রকাশের পর টানা দুই বছর সর্বোচ্চ বিক্রির বইয়ের রেকর্ড ধরে রাখে। পুলিত্জার পুরস্কারও পেয়ে যান এ বইয়ের জন্য। প্রথম মার্কিন নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস, কবিতা যেমন লিখেছেন, তেমনি চীনা সাহিত্যের প্রচুর অনুবাদ করেছেন।
পরে তিনি স্থায়ীভাবে ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে লেখালেখির পাশাপাশি তিনি মানবাধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করেন। বিশেষ করে নারীদের অধিকার রক্ষায় তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। পার্ল এস বাক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কয়েক হাজার শিশুর জীবনযাপনের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রিন হিলস ফার্ম এখন ঐতিহাসিক স্থানের তালিকার একটি। ১৯৭৩ সালে ৮১ বছর পূর্ণ করার ঠিক দুই মাস আগে তিনি মারা যান।
ডরিস লেসিং: ইরানে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ নাগরিক ডরিস লেসিং সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ২০০৭ সালে। তাঁর বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। আর মা সেবিকা। ডরিস লেসিং বিচিত্র সব পেশায় জড়িত ছিলেন। স্কুলিং শেষ করার পর তিনি একজন নান হিসেবে জীবন শুরু করেন। এরপর টেলিফোন অপারেটর, অফিস সহকারী এবং স্টেনোগ্রাফারের কাজও করেন। এরই মধ্যে শুরু করেন সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার। এ সময় প্রকাশিত হয় তাঁর কিছু ছোটগল্প। অতঃপর লেখালেখিতেই নিজেকে সঁপে দেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে পরমাণু অস্ত্ররোধী আন্দোলনে অংশ নেন।
দ্য গ্রাস ইজ সিঙ্গিং নামের প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত দ্য গোল্ডেন নোটবুক তাঁর জন্য সত্যিকারের সাফল্য নিয়ে আসে।
হেরটা মুয়েলার: সর্বশেষ ২০০৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পান জার্মান লেখক হেরটা মুয়েলার। হেরটা মুয়েলার ছোটগল্প দিয়ে লেখকজীবনের শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে রুমানিয়ায় জন্ম। জার্মান ও রুমানিয়ান সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। একটি কারখানায় অনুবাদকের কাজ করতেন। গোয়েন্দা পুলিশের সোর্স হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে অনুবাদকের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর তাঁকে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেও অপদস্থ হতে হয়। তবু থেমে যাননি তিনি। মুয়েলার তাঁর লেখায় রুমানিয়ার স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার বলে রুমানিয়ার সমালোচকেরা তাঁর প্রতি বিরূপ।

শ্রমিক নারীদের সংগ্রামই তুলে ধরতে হবে -আন্তর্জাতিক নারী দিবস by ফরিদা আখতার

আমরা অনেক নারী সংগঠন যখন আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণার শত বছর পূর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন একটি কথা বারবার আসছিল। সে কথাটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শত বছর পালন করতে গিয়ে কি আমরা অনেক কিছু অর্জিত হয়েছে বলে ‘উদ্যাপন’ করব, নাকি এখনো আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক ও শ্রমজীবী যে নারীরা আছেন, তাঁদের প্রতিদিনের সংগ্রামের কথাটি আর একবার মনে করিয়ে দেব? ডিসেম্বর মাস থেকে এমন একটি নীরব বিতর্ক চলছিল। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কাছে গাজীপুরে সোয়েটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে যে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেল, তাতে বিতর্কের আর কোনো অবকাশ নেই। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ শিকাগো শহরে পোশাক কারখানার নারীশ্রমিকেরা তাঁদের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। এই আন্দোলনকে বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিক নারীদের সংগ্রাম ও আন্দোলনের প্রয়োজনে সে দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করার জন্য নারীনেত্রী ক্লারা জেিকন যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ১৯১০ সালে তা কার্যকর হয়েছে ঠিকই কিন্তু আজ ১০০ বছর পর আমরা যেন সেই তিমিরেই রয়ে গেছি। অর্জন দূরে থাকুক, এ শ্রমিকেরা এখন প্রতিদিন কারখানায় যায় সুস্থ অবস্থায়, ফিরবে কীভাবে তা তারা জানে না। লাশ হওয়ার আশঙ্কা সবার ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে। এখন ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে গিয়ে শুধু মজুরির বৈষম্য, কাজের ঘণ্টা ও কাজের সুস্থ পরিবেশ নিয়ে কথা বলা মনে হয় অনেক সহজ বিষয়। প্রাণে বাঁচার নিশ্চয়তা এ শ্রমিকদের যেখানে নেই, সেখানে মজুরি তো খুব বড় কথা নয়।
আমরা এ ঘটনাগুলোকে হত্যাকাণ্ডই বলি, কারণ কারখানার কাঠামোর মধ্যেই আছে মৃত্যুর ফাঁদ। আগুন লাগতেই পারে, কিন্তু প্রাণ বাঁচানোর জন্য বের হতে পারবে না, কারণ গেট বন্ধ থাকে। তালা লাগানো থাকে। গেট কেন বন্ধ থাকে? মনে করা হয়, শ্রমিকেরা এ ধরনের দুর্ঘটনার সময়ও বের হতে গিয়ে কাপড় চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। গরিব শ্রমিকেরা জীবিকার জন্য কাজ করতে আসে, তারা চায়, করখানা টিকে থাকুক। দু-একটি কাপড় নিয়ে তাদের পেট তো ভরবে না। তাহলে কেন এমন মনে করা হয়? গরিব বলেই কি? তাহলে এ আচরণ কি বৈষম্যমূলক নয়? শুধু তাই নয়, দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তড়িঘড়ি করে আত্মীয়দের কাছে লাশ হস্তান্তর করা, দাফন করা এবং তদন্ত কমিটি ও লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা যেন আগুনের লেলিহান শিখার চেয়েও বেশি দগ্ধ করে। শ্রমিকেরাও জানে, লাখ টাকা পাচ্ছে শুনে অন্য সবাই আশ্বস্ত হয়ে যায়। লাখ টাকা একসঙ্গে পাওয়া কম ভাগ্যের কথা নয়। আগুন লেগে এ ধরনের গরিব পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যু যদি এক লাখ টাকা এনে দিতে পারে, তাহলে তার প্রতি খুব একটা সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে যে লেলিহান শিখা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের ড্রইং রুম ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা তাদের আশ্বস্ত করে। বাহ! টাকা তো পেয়েই যাচ্ছে। কিন্তু গার্মেন্টস শ্রমিকেরা খুব বোঝে এবং তাদের কাছে তাদের ভাইবোন বা সহকর্মীর জীবনের দাম এক লাখ টাকা ঠিক করলেই তারা মোটেও শান্তি পায় না। প্রথম আলোর (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) সাংবাদিক গাজীপুর থেকে এসে লিখেছেন, তেমনি এক শ্রমিকের কথা। ‘এক লাখ টাকা দাম দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো আমার মায়ের। বোনের লাশের দামও এক লাখ। আর লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য আরও ১৫ হাজার করে। গরিব গার্মেন্টসে কাজ করে আমার মা আর বোন এখন অনেক বড় লোক হয়ে গেছে।’ মৃত জরিনা বেগমের ছেলে ২০ বছর বয়সী জুয়েল এই বলে বিলাপ করছিলেন সেদিন। এ বিলাপ এক নির্মম প্রহসনকেই তুলে ধরেছে। আমরা এর আগে আরও অনেক আগুন লাগার ঘটনা দেখেছি, দেখেছি সাভারের বাইপাইল ভবন ধসে পড়ার ঘটনা। গত দুই দশকে ১৬৮টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে, মারা গেছে ৩০০ জন। ক্ষতিপূরণের ঘোষণা ততবারই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কতজন আজ পর্যন্ত এই ঘোষিত টাকা পেয়েছে? পেলেও তা কোনো সময়ই পূর্ণ অঙ্ক ছিল না। তাই একজন উন্নয়নকর্মী এক লাখ টাকার কথা শুনেই বিড়বিড় করে বলে বসেছিলেন, বুঝেছি, ২৫ হাজার টাকা। অর্থাত্ যদি শেষ পর্যন্ত দেয়, তাহলে সেটা হবে চার ভাগের এক ভাগ। অন্যদিকে আজ পর্যন্ত তদন্ত কমিটি যতই প্রতিবেদন দিক না কেন, দায়ীদের শাস্তি পেতে আমরা দেখিনি। পত্রপত্রিকায় তাঁদের বিরুদ্ধে লেখালেখি ছাড়া আর কোনোভাবে তাঁরা দায়বদ্ধতায় পড়েন না। ফলে সামাজিকভাবে তাঁদের কোনো লজ্জা বা বিব্রত হওয়ার ব্যাপার থাকে না। তাঁরা রাতে মনে হয় শান্তিতেই ঘুমান!
দৈনিক ইত্তেফাক-এর একটি শিরোনাম ছিল, (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) ‘গেট আটকে রেখে আর কত দিন শ্রমিক মারা হবে?’ এটাও ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি গাজীপুর থেকে ঘুরে লিখেছেন। অর্থাত্ যাঁরা সরেজমিনে সেখানে দেখে এসেছেন, তাঁদের কাছে এই মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো নয়। ফ্যাক্টরি নির্মাণে ত্রুটি, অগ্নিনির্বাপণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং জরুরি দরজা বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ রাখার কারণেই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। আমি নিজেও আমার দুই সহকর্মীসহ ২৭ ফেব্রুয়ারি গরিব অ্যান্ড গরিব কারখানায় গিয়েছিলাম। আমরা কারখানার ভেতর ঢুকতে পারিনি। মালিকপক্ষ বাইরের কাউকে ঢুকতে দিতে চান না। সামনে অনেক পুলিশ, যেন একটা রণক্ষেত্র। বোঝা যায় না যে এখানে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে কোনো উত্কণ্ঠা আছে, বরং মালিককে রক্ষা করাই যেন প্রধান কাজ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুলিশ দিয়ে মালিককেই সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু যে শ্রমিক মারা গেল, তাদের পক্ষে কেউ দেখতেও আসতে পারবে না। লোহার বড় গেটটি দেখেছি। এ গেট যদি সিকিউরিটি খুলে না দেয়, তাহলে শ্রমিকেরা কিছুতেই সেটা খুলে বের হতে পারবে না। গেটের ধরনও বলে দেয়, শ্রমিকের নিজের ইচ্ছায় বা প্রয়োজনে বের হওয়ার জন্য গেট বানানো হয়নি, বরং বানানো হয়েছে মালিকের কাপড় রক্ষার জন্য। হায়রে অভাগা দেশ!
যায়যায়দিন পত্রিকায় (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) প্রতিবেদনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য আছে। প্রতিবেদনে দমকলের সাবেক মহাপরিচালকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সোয়েটার ফ্যাক্টরিগুলোতে অ্যাক্রেলিক কেমিক্যাল উপাদান থাকে প্রচুর পরিমাণ, এগুলো পুড়লে মারাত্মক টক্সিক (বিষাক্ত) ধোঁয়া উত্পন্ন হয়। কারখানাগুলোতে তাপ ও ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ থাকে না। এ কারখানায়ও তা-ই হয়েছে। বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছিল ভবনটি। এ কারণে বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির হিটলারের গ্যাস চেম্বারের কথা শুনে আঁতকে উঠি, কিন্তু এখনো আমাদের সোয়েটার কারখানায় বিষাক্ত গ্যাস শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে, তা দেখে ও শুনে আঁতকে উঠছি না কেন?
সম্মিলিত নারীসমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং কারখানার দোষী মালিকদের শাস্তি দাবি করেছে। তবে সব নারী সংগঠনের ঐক্যবদ্ধভাবে গার্মেন্টস ও সোয়েটার কারখানায় দুর্ঘটনার বিষয়টি আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তুলে ধরা দরকার। শ্রমিক নারীদের সংগ্রামই আমাদের তুলে ধরতে হবে।
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী; উন্নয়নকর্মী।

গণমাধ্যমের শক্তি ভাষার প্রাণ by সৌমিত্র শেখর

এফএম রেডিওর ভাষা নিয়ে সমপ্রতি তথ্যসচিবের একটি বক্তব্য বেশ আলোচিত হচ্ছে। কেউ তাঁর বক্তব্য সমর্থন করছেন, কেউ বা বলছেন সরকারি খবরদারি। যাঁরা খবরদারি বলছেন, তাঁদের কেউ অবশ্য তথ্যসচিবের বক্তব্য সংবাদপত্রের পাতা থেকে উদ্ধার না করে টেলিভিশনের প্রচারটাই গুরুত্ব দিচ্ছেন। কোনো টেলিভিশনে নাকি তথ্যসচিবের বক্তব্যকে ‘কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি’ বলে প্রচার করা হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পত্রিকান্তরে ছাপা হয়েছে: ‘তথ্য মন্ত্রণালয়ে বেসরকারি মালিকানাধীন এফএম বেতার কেন্দ্র ও টিভি চ্যানেলগুলোর মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তথ্যসচিব কামাল আ. নাসের চৌধুরী বৈঠক করেন। তথ্যসচিব উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বেসরকারি রেডিওতে বাংলা ভাষাকে ইংরেজি-করণের চেষ্টা চলছে। বাংলা ভাষাকে বিকৃত ও জগাখিচুড়ি করে ফেলায় বাংলার মূল রূপ হারিয়ে যাচ্ছে। এটি অবমাননাকর ও দুর্ভাগ্যজনক।’ এই সংবাদের প্রথমে অবশ্য বলা হয়েছে: ‘বেসরকারি মালিকানাধীন এফএম বেতার কেন্দ্র ও টিভি চ্যানেলগুলোতে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধ করে শুদ্ধ উচ্চারণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়।’ এই তাগিদকেই বোধ করি টেলিভিশন প্রচার করে বলেছে ‘কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি’। আর এই প্রচার শুনে অনেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটাই গণমাধ্যমের শক্তি; এই শক্তি দিয়ে যে-কাউকে জাদু করে ফেলতে পারে গণমাধ্যম।
কিছু এফএম রেডিওর ভাষিক প্রয়োগ বা ঢাকা শহরের তরুণ প্রজন্মের ভাষায় সেই ভাষারীতির প্রাদুর্ভাব নিয়ে সমপ্রতি সুধীমহলে যে বিতর্কটি হচ্ছে, একে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ আছে। সেই এফএম রেডিওর বেতারসারথি (আরজে) যাঁরা, তাঁদের উচ্চারণে বাংলা ভাষায় অনুমোদিত ধ্বনিসমূহের অনেকগুলোই লোপ বা বিকৃতির শিকার। কিছু নাটক বা অনুদানপুষ্ট চলচ্চিত্রেও সেই ভাষারূপ ব্যবহার হওয়ার কারণে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বিকাশপথে তা কুপ্রভাব ফেলছে। মিডিয়ার যে শক্তি, সেই শক্তি বাংলা ভাষার প্রগতিমুখী অগ্রগতির পক্ষে কাজে না লাগিয়ে এর ব্যবহার হচ্ছে উল্টোপথে। এ জন্য আতঙ্কের কারণ আছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ও যদি এ কারণেই উদ্বেগ প্রকাশ করে, তবে সেই উদ্বেগকে স্বাভাবিক বলতে হবে।
এ ভাষাকে ‘খিচুড়ি ভাষা’ না বলে ‘বিকট ভাষা’ বলাই শ্রেয়। খিচুড়ি বা বিকট যে নামেই বলি না কেন, এই ভাষারীতি নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করলেই অনেকে আঞ্চলিক ভাষার দোহাই দেন। তাঁরা উদাহরণ আনেন নীল-দর্পণ, পদ্মানদীর মাঝি, হাতহদাই, আগুনপাখি, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় ইত্যাদি নাটক ও উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষারীতি প্রয়োগের। কেউ কেউ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণে ‘দাবায়া’ শব্দ-প্রয়োগ বা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত চরমপত্রের ভাষার প্রসঙ্গও উল্লেখ হিসেবে সামনে আনেন। এটা আসলে বিকট ভাষাকে আড়াল করার একটা কৌশল মাত্র। আঞ্চলিক ভাষা নয়, আজ বিপত্তি ও আপত্তি বিকট ভাষা নিয়ে। এফএম রেডিও বা অনুদানপুষ্ট নাটকে আজকাল যে ভাষার ব্যবহার হচ্ছে, একে কি আঞ্চলিক ভাষা বলা যাবে? নাকি এটা বাংলা ভাষাকে অন্তঃসারশূন্য করে একটি কৃত্রিম ভাষারীতি তৈরির অপচেষ্টা? বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রধান শত্রু টেলিভিশনের হিন্দি বা ইংরেজি চ্যানেলগুলো—এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা এই ভাষারীতিকে সামনে নিয়ে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি প্রচার বা বিকাশ করবেন কীভাবে?
একসময় সংস্কৃতানুসারে বাংলা লেখা ও বলার যে চেষ্টা, পরে আরবি-ফারসি শব্দ মিশ্রণ করে বাংলা লেখার প্রবণতা, পাকিস্তান আমলে উর্দুর প্রভাবসমেত আরবি বর্ণে বাংলা লেখার মানসিকতা ইত্যাদির সঙ্গে বর্তমানে বিকট ভাষারীতিকে জনপ্রিয় করার চেষ্টাকে কোনোভাবেই আলাদা করা যায় না। এ সবই হয়েছিল এবং হচ্ছে বাংলার স্বাভাবিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করার জন্য। আঞ্চলিক ভাষার প্রাণপ্রবাহের কথা আমরা কে না জানি? রবীন্দ্র-ছোটগল্পেই শুধু নয়, জীবনানন্দের বহু কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ মুক্তার মতো দ্যুতি ছড়ায়, নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। কিন্তু সেগুলো শিল্পীর লেখনীতে প্রযুক্ত হয়েছে। তাই এসব ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষার বদল কাম্য নয়। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের মতো এ যুগেও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ অনেক লেখক আছেন, যাঁরা আঞ্চলিক ভাষার স্নিগ্ধতাকে সঞ্চারিত করেছেন প্রমিত ভাষার ধারায়। অন্যান্য ভাষার মতোই বাংলারও প্রমিত রূপ আছে এবং এটিকে অব্যাহত রাখতে হলে এর চর্চা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব সম্পদ আছে; বাংলারও। বাংলা ভাষার ‘সহোদর’ শব্দটির কোনো ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই। বাংলায় অর্থ ভিন্ন হলেও ‘অকৃতজ্ঞ’ ও ‘কৃতঘ্ন’ শব্দ দুটোর জন্য পৃথক ইংরেজি শব্দ পাওয়া যায় না। বাঙালিদের আত্মজনবাচক শব্দসমূহ (যেমন: খালা/মাসি, ফুফু/পিসি, চাচি/কাকি বা চাচা/কাকা-জেঠা ইত্যাদি) নির্দিষ্ট সম্পর্কজ্ঞাপক হলেও এগুলোর প্রতিটির জন্য যথাযথ কোনো ইংরেজি প্রতিশব্দ মেলে না। তাই বাংলা ভাষার প্রাণসম্পদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। কিন্তু এফএম রেডিও বা অনুদানপুষ্ট কিছু নাটকের সামপ্রতিক ভাষিক প্রবণতায় দেখা যায় এ রকম: ‘হাই আন্টি, নাও আপনার জন্য এ কাপ অব সং প্লে করছি।’ এ রকম বাংলা ভাষা ইদানীং শুনছি। ‘সো আমরাও ইন্সপায়ার্ড হই এসব আরজের স্পিস-স্টাইল নিয়ে টক করতে।’ অথচ মিডিয়ার এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলা ভাষার কত উন্নতিই না করা যেত! ‘ক্লাসিক’ শব্দের পরিভাষা হিসেবে ‘ধ্রুপদ’ শুনতে ও মানতে আজ তো খারাপ লাগে না। যখন এ ধরনের পরিভাষা তৈরি হয়েছে, সেদিন মিডিয়া এত শক্তিশালী ছিল না। আজ মিডিয়ার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরিভাষা জনপ্রিয় করা অনেক সহজ। ‘আরজে’র বদলে আমরা যদি ‘বেতারসরথি’ বলি, খুব কি শ্রুতিকটু লাগে? সব বেতারকেন্দ্র থেকে একযোগে বলুক—এক মাসের মধ্যে আরজের বদলে বেতারসারথি সারা দেশে চালু হয়ে যাবে।
বেসরকারি মালিকানাধীন এফএম বেতারকেন্দ্র ও টিভি চ্যানেলগুলোর মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও তাঁদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তথ্যসচিবের বৈঠক ও উদ্বেগ প্রকাশকে খবরদারি না বলে অনুযোগ প্রকাশ বলা ভালো। যে দেশ ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সোপান তৈরি করেছে, সেই দেশের সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় ভাষা ও সংস্কৃতি-বিকৃতির প্রশ্নে উদ্বিগ্ন হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতাই সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিবেচনা নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বাংলা বানানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছু সুপারিশসহ অনুরোধ করেছিলেন। এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছিলেন শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও। ওই প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিয়েছিল বলেই বাংলা ভাষায় একটি বানানরীতি পাওয়া গেছে। একটি বানানরীতি থাকার পরও বাঙালির বাংলা লেখার যে অবস্থা, যদি ধরে নিই, বাংলা বানানরীতি শুরু থেকেই ছিল না—কী হতো তাহলে? বানানের বিশৃঙ্খলা কোন পর্যায়ে পৌঁছত! অর্থাত্ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও দেখভালের প্রয়োজন আছে। তথ্যসচিব যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, এ উদ্বেগ প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ অথবা ‘বাংলা একাডেমী’র প্রকাশ করার কথা ছিল। তারা করেনি, তথ্যসচিব করলেন—এতে তো ক্ষতি কিছু নেই। মিডিয়া-বিপ্লবের এই যুগে এখন প্রয়োজন মিডিয়ার শক্তি ব্যবহার করে বাঙালির সংস্কৃতি ও ভাষার প্রাণসম্পদ বৃদ্ধি করা।
ড. সৌমিত্র শেখর: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নারী লেখক, নর লেখক -আন্তর্জাতিক নারী দিবস by শামীম আজাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পর এলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আর আমি এখনো ঢাকায়। আমি এখনো ঘোরে। কী করে একটি অখণ্ড ফেব্রুয়ারি মাস পেলাম! প্রতিদিন ঢাকার ধুলোয় ধরাশায়ী অবস্থায় বাংলা একাডেমী বইমেলায় ঢুকেছি, তবু মনে হয়েছে এ আমাদের এক আশ্চর্য মোকাম। উড়ছে ধুলো, ঘুরছে পাঠক, লেখক, চিত্রক, চিত্রধারক, প্রকাশক, পাওনাদার, প্রতারক। বক্তৃতা হচ্ছে সেখানে! শ্রোতার আসনে অর্ধেক পুলিশ আর অর্ধেক মানুষ। বাংলাবাজার থেকে জ্যাম আর ঘামে বিরক্ত হয়ে আসছেন প্রকাশক। কিন্তু নজরুল মঞ্চে টিভি ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের সামনে তারা হাসছেন। মজুরদের মাথায় করে আসছে তিনতলা বইয়ের দালান। মেলায় চিত্রগ্রাহকদের কাঁধে ঘুরছে আধাডজন টিভি ক্যামেরা। ঘাড় ফেরালেই সাংবাদিক। যাঁরা মেলায় আসেননি বা এসেছেন, তাঁদের জন্য কেবলই সন্দেশ চাই-সংবাদ চাই। মাথার ক্ষুধা এমনই এক গনগনে তাওয়া, সাংবাদিকদের এ মেলা থেকেই পরের মেলার বিষয় তুলে নিতে হবে ক্যামেরা, মোবাইলে অথবা নোটবুকে টুকে টুকে।
বাংলা একাডেমীর বইমেলায় হাত বাড়ালেই কবি-লেখক-প্রাবন্ধিক। তাঁরা নর কিংবা নারী। কেউ কেউ নতুন হলেও নন খুব একটা আনাড়ি। এমন সুযোগ যখন, তখন নারী দিবসের জন্য সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও হাতে ‘অতএব ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার’-এর মতোই নারীধরা হয়ে প্রশ্ন করে বেড়াচ্ছেন। নারী লেখক কম কেন? নারীদের লেখা পুরুষ লেখকদের তুলনায় মানুষ কম পড়ছে কি? কেন? নারী কবিদের নাম করতে গেলে মাত্র কয়েকজন কেন পাওয়া যায়? বলা বাহুল্য, শেষ প্রশ্নটির টোপে গেঁথে গেলাম।
আমি তখন লিটলম্যাগ কর্নারে লেখকদের বসার জন্য আল্পনা আঁকা যুগল আমগাছের গোড়ায় বসে পড়েছি। আমি বসার পর সেই সাংবাদিক ভগ্নী-ভ্রাতারাও বসলেন। তখন হঠাত্ করেই আমার একটি তুলনা মাথায় এল। তা গতবারের অলিম্পিক গেমের কথা। লম্বা একটা দৌড় হচ্ছে। সব দেশের প্রতিনিধি এসে দাঁড়িয়েছেন। সেসব প্রতিনিধির সবাই পুরুষ। সংকেত বাজার পর সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। কালো, হলুদ, সাদা, গোলাপি, বাদামি রঙের সব দৌড়বিদ জীবন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টিভি পর্দায় সে দৌড়ের সঙ্গে উড়ছে আমাদের চোখ। কিন্তু দৌড় শুরু হওয়ার পরপরই কিছু দেশের প্রতিনিধি বরাবরের মতোই ভীষণ পেছনে পড়ে গেল। কারণটা কী? এরা তো নারী নয়। তাহলে? দর্শকদের একজন বললেন, সমান পুরুষ হলেও কি এদের অলিম্পিকে খেলার তেমন অভিজ্ঞতা আছে? আরেক জন বললেন, এদের বেশিরভাগই জাতিগতভাবে বেশ দরিদ্র, তাই ছোটবেলা থেকে তেমন পুষ্টিকর খাওয়া হয়নি। একে তো এদের বলহীন দেহ, তার ওপরে এসব দেশে নেই সর্বশেষ প্রযুক্তি, তথ্য ও বিজ্ঞান। বেড়ে ওঠাটা সমান মাপের হয়নি, এমনকি অনুশীলন-কালেও। একজন বললেন, বাংলাদেশের কথা ভাবো, আমরা ভালো খাবার দূরে থাকুক, ভালো ওষুধও তো পাই না। আর এরা প্রাকটিস করবে কী, সংসারের চাপে অন্য কাজ করেই কুল পায় না। এরা অনেকেই হয়তো পার্টটাইমার। ওই পিছিয়ে পড়া পুরুষদের স্থানেই আমাদের দেশের নারী। সমপর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা ও অভিজ্ঞতার ব্যবস্থা করে একবার, কোনো একবারও কি তা যাচাই করা হয়েছে?
এ গল্প বলার পর আমাদের আড্ডা বেশ জমে উঠল। তবে শারীরিকভাবে তারা বলশালী এটা মানি। বুদ্ধিতে নয়, কল্পনায় নয়। লেখক তো তাঁর অভিজ্ঞতাই লেখেন। যেকোনো অভিজ্ঞতা যা কিনা তাঁরা সর্বতোভাবে গবেষণা করেছেন, তাই লেখেন নারী লেখক ও পুরুষ লেখক উভয়েই। কিন্তু তা লেখার জন্য সার্বিক যোগ্যতা অর্জন করার সুযোগ নারী কবি বা লেখকের চেয়ে পুরুষের বেশি।
একবার বইমেলায় যদি লেখকের নাম ঢেকে কেবলমাত্র শিরোনাম দিয়ে তা বিক্রি করা হতো, তাহলে একটা মজা হতো নির্ঘাত। যে যে লেখকের নামে তিনি নারী বা পুরুষ বোঝা যায় না, বিষয়বস্তুতেও যদি থাকে না ‘মেয়েদের বিষয়’—এমন নব্য নারী লেখক যে বস্তুগুণে আদৃত হয়েছেন, তার প্রমাণ আছে এন্তার। আর নারী নামে যাঁরা খ্যাত হয়েছেন, ব্যতিক্রম ছাড়া সবাই হয় সমান মাপের পুরুষ লেখকদের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন, নয়তো কারও (বাবা, বন্ধু, স্বামী) হাতে ধরেই তবে এসেছেন। তবে নারী লেখক যে কম, তাতে আমার কোনো দ্বিমত নেই। যাঁরা আগে মাঠে নামবেন, তাঁরা তো আগে যাবেনই। এ ক্ষেত্রে পুত্রদের নামানো হয় আগে। যে পরিবারে দুজনই কন্যা, তাদের অবস্থানের পরিসংখ্যান নিয়েছি?
আড্ডা আরও জমে উঠল এবং এসে গেল আশির দশকের গোড়ার কথা। আমি তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করতাম। টিমের মধ্যে একমাত্র নিয়মিত নারী সাংবাদিক। লিখি মধ্যবিত্তের জীবনযাপন, নারী নির্যাতন, খাদ্যাভ্যাস, দেশি ফ্যাশন, ঈদের বাজার, ও বড়জোর দেশের শিক্ষালয়গুলোর ব্যবস্থা, কিংবা ঢাকার বিনোদন এসব নিয়ে। আর এসব গতানুগতিক বিষয়ে কাব্য এনে, রোদে রোদে টাঙ্গাইল, রাজশাহী ঘুরে দেশের জাতীয় চরিত্রে দেশি পোশাক আনার জন্য প্রাণান্ত। আর তখনই কি না আমার পুরুষ সহকর্মীরা ধমাধম পোর্ট আনোয়ারা অথবা যুদ্ধাপরাধীরা কে কোথায় আছে অথবা বিমানের কারচুপি লিখে হিরো। শাহাদত চৌধুরী আমাকে তেমন কোনো রিপোর্ট করতে দিতে পেরেছেন কি? আমি তো আর পারব না ক্রিমিনাল শিবিরে ঢুকে এক টেবিলে চা সিগারেট খেয়ে তাঁর কথা বের করতে। অথবা কাজ সেরে রাত দুটো-তিনটায় মতিঝিল থেকে একা রিকশায় ফিরতে। মানলাম, এ আমাদের সমাজ-ব্যবস্থা।
সে সময় সত্তরের শেষার্ধ থেকে আশির পুরোটা দশক আমি যেভাবে যে বিষয় দেখেছি ও লিখেছি, তখন ঢাকার কোনো পুরুষ সহকর্মী হয়তো তা করেননি। কারণ তাদের তো আর ছোটবেলা থেকে নারী অথবা গৃহজীবনের সেসব অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়নি। তাই তাঁরা কই মাছের কোরমা কিংবা আরেক জন কিশোরীর কষ্ট জানবেন কী করে? এমনকি আজ অবধি বাংলাদেশি খুব নগণ্য সংখ্যক পুরুষই আছেন, যাঁরা তাঁর স্ত্রীর প্রসবকালে সামনে থেকে সে কষ্টটুকু অন্তত চাক্ষুষ করেছেন। তাহলে এসব সুবিধাবঞ্চিত পুরুষেরা কি করছে? এসব বিষয়ে পিছিয়ে আছে। তাহলে এ ব্যাপারে তাদের পশ্চাত্পদতা নিয়ে কে তাঁদের বকছে! নাকি এ বিষয়গুলো কেবল নারী জাতির বিষয়। একটা প্রচলিত ইংরেজি কথা আছে, ‘যাকে সমালোচনা করছ, তার জুতোয় নিজের পা গলিয়ে দেখ তো দেখি হাঁটতে পার কি না?’ হয় প্রচণ্ড ব্যথা পাবে, পায়ে তোমার ফোস্কা হবে, কোমরে হবে ব্যথা। সে কি আর যা-তা কথা। ‘পুরুষের জন্য সে জুতো মানানসইও তো হতে হবে।’
হাসতে হাসতেই তাই বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন-এর কথা বলি। সেখানে সুস্পষ্ট দেখা যায়, নারীকে অবরুদ্ধ রাখলে তার শক্তি ক্ষয় হয় না, ক্ষয় হয় দেশের। লেখককে নারী বলে খুঁজে পেতে বের করলে নিজেদের অসম্পূর্ণতাই আরও সম্পন্ন হয়ে ওঠে।
শামীম আজাদ: কবি, লেখক ও সাংবাদিক
shetuli@yahoo.com

রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্রby আয়েশা সিদ্দিকা

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানি সম্প্রতি দুজন লেফটেন্যান্ট জেনারেলের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। রাষ্ট্রের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পত্রিকা থেকে যে যৎসামান্য জানা গেছে তা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষমতা সত্যিই জেনারেল কায়ানির আছে। এটিকে কার্যপ্রণালিগত ক্ষুদ্র বিষয় হিসেবে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
জেনারেল কায়ানির এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকাঠামোর প্রকৃত চরিত্রের প্রতীকী রূপ। মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কোনো অনুমোদন না নেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান সেনাপ্রধান সেনাবাহিনীকে আরও একবার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় আসীন করলেন। তিনি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যেটি অনুসরণ করতে বেসামরিক প্রশাসনের অনেকেও প্রলুব্ধ হবেন।
প্রধানমন্ত্রী এতে কোনো আপত্তি জানিয়েছেন বলে মনে হয়নি। অনতিবিলম্বে তাঁকে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রকে পুনর্গঠিত করতে হবে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংস্থাপন বিভাগের কাজের আর কোনো প্রয়োজন না থাকায় এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে গুটিয়ে নিতে হবে। বিভাগের প্রধানেরাই যদি এসব কাজ করতে পারেন, তাহলে এ দুই প্রতিষ্ঠানের আমলাদের রাখার কী দরকার?
রাষ্ট্রের ভেতর আমলাতন্ত্র যেভাবে কাজ করে সেদিক থেকে দেখলে জেনারেল কায়ানিকে একটি বিভাগের প্রধান হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। কেউ হয়তো যুক্তি দেখাতে পারেন, প্রতিরক্ষাসচিবই আসলে বিভাগটির প্রধান। কিন্তু যুক্তি চ্যালেঞ্জের মুখে। স্পষ্টত, জেনারেল নিজেই সর্বেসর্বা।
বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করার জায়গায় ‘বিভাগের প্রধান’ প্রত্যয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মোশাররফের শাসনামলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিভাগের প্রধানেরা অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি দিতে পারবেন। ছুটি অনুমোদনের জন্য একজনের পর আরেকজনের কাছে ছোটাছুটির যন্ত্রণা লাঘব করার উদ্দেশ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে পদোন্নতি বা মেয়াদ বাড়ানোসহ অন্য সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি কর্তৃত্বে এই ক্ষমতা অর্পণ কোনো হস্তক্ষেপ ঘটায়নি।
উচ্চতম থেকে নিম্নতম পর্যায় পর্যন্ত ক্রমবিভক্ত কর্তৃত্বের ভিত্তিতে সংগঠিত কোনো বিভাগের একজন কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর অর্থ তার নিম্নপদের সবাই পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হবে। এর অর্থ হলো, আমলাতন্ত্রের প্রতিটি স্তরের কিছু কিছু কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠাতে হবে, যা রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি বোঝা। রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের দায় যেহেতু সরকারের ওপর পড়ে, তাই রাষ্ট্রই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ। সুতরাং জেনারেল কায়ানি যদি চান কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ চালিয়ে যাক, তবে তাঁকে আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন চাইতে হবে।
এই মত কেউ কেউ অপছন্দ করতে পারেন; তাঁরা রাজনৈতিক সরকারগুলোর দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলতে পারেন। তাঁরা হয়তো বলবেন, যেখানে এত বিপুল পরিমাণে খারাপ ঘটনা ঘটছে, সেখানে কেন মাত্র দুজনের মেয়াদ বাড়ানোর প্রসঙ্গ নিয়ে লাগলেন? এই আলোচনাটা কিন্তু কেবল কত অর্থ নষ্ট হলো তা নিয়ে নয়; বরং রাষ্ট্রকে শাসন করার নীতির প্রসঙ্গ এটি। আরও জরুরি প্রশ্নটি হলো, ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্রের’ বিষয়টিকে নিরুৎসাহিত করার জন্যই এই আলোচনা।
প্রতিরক্ষা বিষয়ে ১৯৭০-এর দশকে প্রণীত প্রথম ও একমাত্র শ্বেতপত্রটি সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যে প্রধান সাধারণ ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল। প্রথম প্রতিরক্ষাসচিব সামরিক সদস্য বা আমলা। সশস্ত্র বাহিনীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় এটি ছিল সরকারের প্রধান প্রতিষ্ঠান। তখন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির (জেসিএসসি) আঙ্গিকে একটি মধ্যবর্তী জায়গা তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু ১৯৭৭ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানই বাড়তে পারেনি। ক্ষমতায় বসা সামরিক বাহিনীর চাপ সহ্য করে জিসিএসসি আসলে উঠে দাঁড়াতে পারেনি। পরে মোশাররফের সময়ে, পালাক্রমে চেয়ারম্যান নিয়োগ সংক্রান্ত জেসিএসসির অন্যতম মূলনীতিটি পাল্টে দিয়ে সেনাবাহিনী এই প্রতিষ্ঠানটিকে মেরে ফেলেছে। এমনকি নওয়াজ শরিফও এই অপকর্মে ভূমিকা রেখেছিলেন, যখন নৌবাহিনীপ্রধানের পালা তখন মোশাররফকে তিনি এটির চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন সেনাপ্রধান। কর্মকর্তাদের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বর্তমান সেনাপ্রধান তাঁর স্বাধীনতা ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করলেন। এ অঞ্চলের ইতিহাসে দেখা গেছে, শাসনব্যবস্থার নীতি পাল্টে ফেলতে চাইলে এর জন্য বিরাট মূল্য দিতে হয়। ১৯৬০-এর দশকে ভারতবাসী এর ফলে অনেক ভুগেছে। সশস্ত্র বাহিনীতে প্রশ্নসাপেক্ষে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জড়িয়ে পড়েছিল তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। যে জন্য চীনের বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।
জেনারেল কায়ানি হয়তো সরকারের কাছে এই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সেনাবাহিনীর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা তাঁর আওতায় পড়ে এবং তিনি চান না সামরিক বাহিনীর হূদয়ের কাছের বিষয়াবলি নিয়ে রাজনীতিবিদেরা সিদ্ধান্ত নিক। অবশ্য আফগানিস্তান অভিযানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ঠিক লোককে ঠিক জায়গায় বসানো নিয়ে রাজধানীসহ অন্য শহরগুলোয় যে রাজনীতি চলে এটি তার অংশ। জেনারেল কায়ানি তাঁর আমেরিকান বন্ধুদের ভাবজগতে জায়গা করে নেওয়ায় ওয়াশিংটনে এখন অনেকে তাঁর মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষপাতী। এটা যদি কাজে না দেয়, তাহলে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দের ব্যক্তিরাই যাতে সামনের সারিতে থাকেন সে বিবেচনায় তিনি তাঁদের জায়গা করে দেবেন।
ওবামা প্রশাসনের কেউ কেউ এখনো বেসামরিক সরকারের চেয়ে সামরিক কর্তাদের ওপর ভরসা করেন। সামরিক বাহিনীর ভেতর তাঁদের পছন্দ কিছু কর্মকর্তা, বিশেষভাবে তাঁদের পছন্দ আইএসআইপ্রধান জেনারেল পাশা। ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’কে জায়গা করে দিতে ইতিমধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামো বদলে দেওয়া হয়েছে।
ডন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব।
আয়েশা সিদ্দিকা: পাকিস্তানি কলামিস্ট; কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

নারীমুক্তির আইনি কিছু উপায় -আন্তর্জাতিক নারী দিবস by মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। শুধু তা-ই নয়, দিবসটি আজ শত বছরের পূর্ণবয়স্ক। কিন্তু সেটা অঙ্কের হিসাব, বাস্তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো কোথাও জ্ঞাতসারে কিংবা কোথাও অজ্ঞাতসারে আজও সমাজে খুঁটা গেড়ে আছে। বর্তমান সময়ে মানুষ-উত্পাদনের যন্ত্র হিসেবে নারীদের কাজ কমেছে যেহেতু একালে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে। সন্তানের জন্ম দেওয়া ও তার লালন-পালনের কাজে একজন নারীকে তাঁর বিবাহিত জীবনের পুরোটা ব্যয় করা এখন অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক। তাহলে এটা ভাবতে কিংবা ধরে নিতে কঠিন না হয়ে সহজ হচ্ছে না কেন যে নারী কিংবা পুরুষ উভয়েই ব্যক্তিমানুষ, তাদের প্রত্যেকের রয়েছে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা লাভের অধিকার, সঠিক বলতে শুধু অধিকারই নয়, স্বাধীনতাও। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে উচ্চারিত হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ এ বাক্যটি উচ্চারণ করার সময়ে এই দিবসে আশা করব, অতঃপর উচ্চারিত হবে জনগণ, যার অর্ধেক নারী আর অর্ধেক পুরুষ।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, শিরোনাম পড়ে নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে আপনার ধারণা হয়েছে এ লেখাটির পরিসর একটি বিষয়ে নির্দিষ্ট। আবার এখান থেকে পড়তে শুরু করার আগে জানিয়ে দিচ্ছি, লেখাটির বিষয় অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে নির্দিষ্ট রাখতে চাই ১৯৬৯ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অর্ডিন্যান্সের কয়েকটি ধারার সংশোধন বিষয়ে। এই সঙ্গে আশা করব, জাতীয় সংসদের সদস্যরা সেইমতো অর্ডিন্যান্সটি সংশোধন করবেন এবং আমার সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নারীমুক্তির আইনি কিছু উপায় কি না, সেটা বিবেচনার ভার পাঠক-পাঠিকাদের ওপর দিলাম।
উপরিউক্ত অর্ডিন্যান্সের ৭ ধারার বঙ্গানুবাদ এই: ‘তালাক-৭ (১) কোনো ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে ইচ্ছে করলে যেকোনোভাবে তালাক উচ্চারণ করার পর পরই এরূপ কাজ করেছেন জানিয়ে চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দেবেন এবং তার একটি অনুলিপি স্ত্রীকে সরবরাহ করবেন। (২) কেউ উপধারা (১)-এর শর্ত লঙ্ঘন করলে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে বিনাশ্রম কারাদণ্ড, যার মেয়াদ হতে পারে এক বছর পর্যন্ত কিংবা অর্থদণ্ড যা হতে পারে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কিংবা উভয়বিধ দণ্ড। (৩) উপধারা (৫)-এ বর্ণিত সাপেক্ষে কোনো তালাক স্পষ্টভাবে কিংবা অন্যভাবে প্রত্যাহার করা না হলে, তা কার্যকর হবে না যদি না উপধারা (১) অনুযায়ী চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পাঠানোর পর ৯০ দিন অতিক্রান্ত হয়। (৪) উপধারা (১) অনুযায়ী নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে একটি সালিস পরিষদ গঠন করবেন এবং সেই সালিস পরিষদ সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। (৫) যদি তালাক উচ্চারণের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকেন, তাহলে তালাক ওই সময় পর্যন্ত কার্যকর হবে না যদি উপধারা (৩)-এ উল্লিখিত মেয়াদ কিংবা গর্ভকালীন সময় (যেটা পরে হয়) শেষ না হয়। (৬) এই ধারা অনুযায়ী তালাক দ্বারা বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এমন একজন স্ত্রীর তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে হিল্লা বিয়ে ছাড়াই একই স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহ হতে কোনো বাধা থাকবে না। যদি না এরূপ বিবাহবিচ্ছেদ তৃতীয়বারের মতো কার্যকর হয়।’
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, (৪) উপধারাটি লক্ষ করুন। সালিস পরিষদের কার্যপরিধি ও ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। চেয়ারম্যানের একমাত্র কাজটি হচ্ছে উভয় পক্ষকে তাদের পক্ষে সালিস পরিষদে একজন করে প্রতিনিধির নাম দেওয়ার জন্য নোটিশ প্রেরণ করা এবং সালিস পরিষদের একমাত্র কাজ হচ্ছে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা। একজন দুর্বিনীত স্বামী যদি সালিস পরিষদে তাঁর প্রতিনিধি না দেন এবং সেটাই স্বাভাবিক, তাহলে (৩) উপধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পাঠানোর ৯০ দিন পরে তালাক আপনা-আপনি কার্যকর হয়ে যাবে। অর্ডিন্যান্সটির (২) ধারার (খ) উপধারায় সালিস পরিষদের চেয়ারম্যান কোন এলাকায় কে হবেন তা বলা আছে। কিন্তু (ক) উপধারায় সালিস পরিষদ গঠনের যে নিয়ম আছে অর্থাত্ চেয়ারম্যান। স্বামীর পক্ষে একজন প্রতিনিধি ও স্ত্রীর পক্ষে একজন প্রতিনিধি নিয়ে সেটা গঠন করা হবে, সেটা নিম্নরূপ সংশোধন করার জন্য আমি প্রস্তাব রাখছি:
‘২ (ক) ৭ ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী দেওয়া নোটিশের নিষ্পত্তির জন্য চেয়ারম্যান নোটিশ প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে দুজন মহিলা ও দুজন পুরুষ সদস্যের মনোনয়ন দেবেন এবং পাঁচ সদস্যর একটি সালিস পরিষদ গঠিত হবে। তবে শর্ত থাকে ২ (খ) ধারায় উল্লিখিত চেয়ারম্যানরা সালিস পরিষদের সদস্য মনোনীত করার উদ্দেশ্যে তাঁদের স্ব-স্ব এলাকায় উপযুক্ত আস্থাবান অন্যূন ১৫ জন সমসংখ্যক মহিলা ও পুরুষের তালিকা প্রস্তুত রাখবেন। আরও শর্ত থাকে যে শুনানির প্রথম তারিখে পক্ষগণের মধ্যে কেউ মনোনীত এক কিংবা একাধিক কোনো সদস্যের মনোনয়নে আপত্তি করলে চেয়ারম্যান অন্য সদস্য কিংবা সদস্যদের মনোনয়ন দেবেন।’
উপরিউক্ত অর্ডিন্যান্সের (৩) ও (৪) ধারা দুটি বাতিল হবে এবং ৭ উপধারা হিসেবে যোগ হবে এই বিষয়গুলো: ‘৭ (১) সালিস পরিষদ সমঝোতার ভিত্তিতে তালাক অকার্যকর করতে ব্যর্থ হলে নিম্নলিখিত রোয়েদাদ দেবেন: (ক) দেনমোহরের পরিমাণ (যদি বকেয়া থাকে); (খ) ইদ্দতকালীন ভরণপোষণের জন্য অর্থের পরিমাণ (যদি ইতিপূর্বে না দেওয়া হয়); (গ) বিবাহকালীন স্বামীর নামে কিংবা স্ত্রীর নামে কিংবা উভয়ের নামে অর্জিত (কিন্তু দান কিংবা হেবামূলে প্রাপ্ত নয়) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির তুলাংশ বণ্টন; (ঘ) প্রাপ্ত অংশ দ্বারা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ পর্যাপ্ত না হলে পুনর্বিবাহ না করা পর্যন্ত তা পূরণের জন্য স্বামীর দেয় মাসিক কিংবা বাত্সরিক অর্থের পরিমাণ; এবং (ঙ) নাবালক সন্তান কিংবা সন্তানদের অভিভাবকত্ব সাব্যস্ত ও মাতা যদি অভিভাবক সাব্যস্ত হন তবে সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য পিতা কর্তৃক দেয় মাসিক কিংবা বাত্সরিক অর্থের পরিমাণ। (২) রোয়েদাদে প্রদত্ত অর্থের কিংবা সম্পত্তির মূল্যের পরিমাণ যা হোক না কেন, রোয়েদাদটি ওই এলাকার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের ডিক্রি গণ্যে সেই সহকারী জজ আদালত কর্তৃক দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশের অন্তর্ভুক্ত নিয়মগুলোর মাধ্যমে রোয়েদাদটি কার্যকর করা যাবে।’
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, কোনো স্ত্রী তাঁর স্বামীকে তালাক দিতে চাইলে তাঁকে কী করতে হবে। এই অর্ডিন্যান্সের ৮ ধারায় বলা আছে, স্ত্রীকে সে ক্ষেত্রে উপরিউক্ত ৭ ধারা অনুযায়ী নোটিশ দিতে হবে। এই অর্ডিন্যান্সের সবচেয়ে অবমাননাকর ও লজ্জাদায়ক ধারাটি হচ্ছে ৬ ধারা। সেটা হচ্ছে সালিস পরিষদের অনুমতি সাপেক্ষে একাধিক বিয়ে করা যাবে। অথচ সত্য কথাটি হচ্ছে, ইসলাম বহু বিবাহ সমর্থন করে না। অজ্ঞানতার যুগে বাধাহীন নারীকে বিয়ে করার পরিবর্তে সর্বাধিক স্ত্রী গ্রহণের সংখ্যা চার সীমিত করা হয় এই শর্তে যে স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম-আচরণ ও সুবিচার করতে হবে (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩)। এ আয়াতটি নাজিল হয় ওহুদ যুদ্ধের পরে। এই যুদ্ধে অনেক মুসলমান শহীদ হওয়ায় এতিম ও বিধবাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অতঃপর সূরা আন-নিসার ১২৯ আয়াতে বলা হয়: ‘এবং তোমরা যতই আগ্রহ করো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে কখনোই পারবে না।’
সহিহ আল-বুখারির সপ্তম খণ্ডে ১৫৭ নম্বর হাদিসটি এই: ‘আল-মিসওয়ার বিন মাখরামা বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সা.) -কে মিম্বর থেকে বলতে শুনেছি, ‘বনি হাসিম বিন আল-মুখিরা আমাকে অনুরোধ করেছেন যে আমি যেন তাদের কন্যার সঙ্গে আলি বিন তালিবের বিবাহে অনুমতি দিই। কিন্তু আমি অনুমতি দিইনি এবং অনুমতি দেব না যতক্ষণ না আলি আমার কন্যা ফাতিমাকে তালাক দেয়। কারণ, ফাতিমা আমার দেহের টুকরা এবং আমি ঘৃণা করি যা সে ঘৃণা করে আর যা তাকে ব্যথা দেয়, তা আমাকেও ব্যথা দেয়।’
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে সূরা আল-আহজাবের ৫২ নম্বর এই আয়াতটি নাজিল হয়: ‘অতঃপর তোমার (অর্থাত্ আল্লাহর রাসুল) জন্য কোনো নারী বৈধ নয় এবং তোমার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণও বৈধ নয়।’ সুতরাং স্ত্রীদের প্রতি সম-আচরণ করতে হবে এই শর্তটি পালন দুঃসাধ্য বিধায় ইসলাম এক বিয়েকে নির্দেশ দেয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর জামাতাকে আরেকটি বিয়ে করার প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করেছিলেন ওই একই কারণে যে হজরত আলি (রা.) দুই স্ত্রীর প্রতি সম-আচরণ করতে পারবেন না। তিউনিসিয়া ১৯৫৭ সালে আইন করে একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। উপরিউক্ত অর্ডিন্যান্সের ৬ ধারাটি অবশ্যই বিলুপ্ত করে তত্স্থলে একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ করে একটি ধারা যোগ করতে হবে।
মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট।

দুর্নীতি ও দলীয়করণ সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে -ন্যাশনাল সার্ভিস

কুড়িগ্রামে গত শনিবার চারজন তরুণের হাতে নিয়োগপত্র হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল সার্ভিসের কার্যক্রম শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় কর্মসূচিটি অভিনব। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথম ন্যাশনাল সার্ভিস চালুর অঙ্গীকার ঘোষিত হলে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এতে বলা হয়েছিল, প্রতিটি পরিবারে একজনকে ন্যাশনাল সার্ভিসের আওতায় চাকরি দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে দেশ যেমন তাঁদের সেবা পাবে, তেমনি তাঁদেরও কর্মসংস্থান হবে।
২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে ন্যাশনাল সার্ভিসের কথা উল্লেখ করা হলেও কীভাবে এর বাস্তবায়ন হবে, তা পরিষ্কার ছিল না। পরবর্তী সময়ে দলীয়ভাবে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হলে এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কিছুটা বিতর্কও সৃষ্টি হয়। অতীতে কোনো সরকার শিক্ষিত বেকার তরুণদের এ ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার কর্মসূচি নেয়নি। সে ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অবশ্যই কৃতিত্ব দাবি করতে পারে।
প্রথম পর্যায়ে কর্মসূচিটি চালু হচ্ছে কুড়িগ্রাম ও বরগুনা জেলায়। পরবর্তী ধাপে সারা দেশে এ কার্যক্রম চলবে, সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কর্মসূচি উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, কুড়িগ্রাম জেলার নয় উপজেলায় ৫৩০ জন দুই বছরের জন্য ন্যাশনাল সার্ভিসের আওতায় থাকবেন। ইতিমধ্যে নয় হাজার ৯৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে বরগুনা জেলায়ও সমসংখ্যক তরুণ-তরুণী কাজের সুবিধা পাবেন। এ সময় কাজ করলে দৈনিক ২০০ টাকা ও কাজ না থাকলে দৈনিক ১০০ টাকা ভাতা পাবেন নিয়োগপ্রাপ্তরা। টাকার অঙ্কে এ অর্থ বেশি না হলেও একজন তরুণ বা তরুণীর স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে, নিজের প্রতি তাঁদের আস্থা ফিরে আসবে। অন্যদিকে এ দুই বছরের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ তাঁকে গড়ে তুলবে দক্ষ ও যোগ্য কর্মশক্তি হিসেবে। সেদিক থেকে এ ধরনের কর্মসূচি কেবল প্রয়োজনীয় নয়, অপরিহার্যও।
তবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত। অতীতে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের কারণে জনগণ এ ধরনের কর্মসূচির সুফল পায়নি। অনিয়ম-অব্যবস্থায় পুরো প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার নজিরও কম নয়। ন্যাশনাল সার্ভিসের ক্ষেত্রে সে রকম কিছু হবে না বলেই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

‘ভারতীয়দের ওপর হামলা বরদাশত করা হবে না’

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ার রাজ্য সরকারের প্রধান জন ব্রামবি বলেছেন, ভারতীয়দের ওপর কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা বরদাশত করা হবে না। গত বৃহস্পতিবার মেলবোর্নে তিন বছরের ভারতীয় শিশু গুরশান সিং চান্নার মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পর গতকাল রোববার তিনি এ কথা বলেন।
গুরশানের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে গ্রেপ্তার এবং আরেকজনকে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ। শিশু গুরশানের লাশ উদ্ধারের স্থানের পাশে দেখা একটি গাড়ির সন্ধান করছে পুলিশ। খবর এএফপি ও জি নিউজের।
গতকাল একটি বার্তা সংস্থার কাছে দেওয়া সাক্ষাত্কারে জন ব্রামবি বলেন, ‘ভিক্টোরিয়াবাসী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কারণ আমাদের রাজ্য অভিবাসন ও পুরো বিশ্বের সংস্কৃতি দিয়ে তৈরি হয়েছে। কিন্তু অল্প কিছু নির্বোধ সাম্প্রদায়িক লোক রয়েছে।’
ভারতীয়রা সহিংসতার শিকার হচ্ছে উল্লেখ করে ব্রামবি বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সংখ্যা যতই কম হোক না কেন, তা বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, যখন ভারতীয় একটি পরিবার তাদের ছেলে বা মেয়েকে অন্য দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সেই দেশের প্রতি বিশ্বাস রেখেই সেই সিদ্ধান্ত নেয়। ভিক্টোরিয়া বা অস্ট্রেলিয়ায় কোনো সাম্প্রদায়িক সমাজ নেই।
পুলিশ জানিয়েছে, গুরশান সিংয়ের লাশ পাওয়ার স্থানের পাশে একটি সবুজ রঙের ভিআর বা হোল্ডেন কোম্পানির ভিটি হোল্ডেন কমোডর গাড়ি দেখা গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, গোয়েন্দারা এখন গাড়িটির প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন।
গুরশানের মা হারপ্রিত কউর চান্না ও বাবা হারজিত্ সিং চান্না শনিবার তাঁদের ভারত যাওয়ার বিমান টিকিট বাতিল করেছেন। তাঁরা চান পাঞ্জাবের নিজ শহরে সন্তানের শেষকৃত্য করতে। তবে ময়নাতদন্তে গুরশানের মৃত্যুর ঠিক কারণ জানা না যাওয়ায় আরও কিছু পরীক্ষা করছে কর্তৃপক্ষ। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলেও আরও দু-তিন দিন পর গুরশানের লাশ ফেরত পাবে তার পরিবার। সূত্র জানিয়েছে, সব ধরনের তদন্ত শেষ না করা পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করতে পারবেন না তাঁরা।
গুরশানের মৃত্যুতে তার পরিবারকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছে ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ভিক্টোরিয়ার (এফআইএভি) কমিউনিটি নেতারা ও ভারতীয় দূতাবাস। গুরশানের লাশ দেশে পাঠাতে এফআইএভি ও ভারতীয় দূতাবাস ছয় থেকে সাত হাজার মার্কিন ডলার দিতে রাজি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ গতকাল জানিয়েছে, গুরশানের মৃত্যুর ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। মেলবোর্নের সিনিয়র কনস্টেবল মার্টি বেভারিজ বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ জানিয়েছে, গুরশানের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ধীলন গুরুসেওয়াক (২৩) নামের একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই ব্যক্তি গুরশানদের বাসায় থাকতেন।
অস্ট্রেলিয়ায় গত বছরের মে মাস থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাসহ ভারতীয়দের ওপর ১০০-এর বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত জানুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের পাঞ্জাবের নিতিন সিং নামের এক ভারতীয়কে হত্যা করা হয়।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস -নারী উন্নয়ন হোক অন্যতম জাতীয় অগ্রাধিকার

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শতবর্ষ পূর্তিতে এবার বৈশ্বিক স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সমান অধিকার, সমান সুযোগ: সকলের অগ্রগতি’। শতবর্ষ আগে দিবসটি পালন শুরু হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, সমাজতন্ত্রীদের দ্বারা। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শিবিরে এ দিবসকে ঘিরে নানামুখী কর্মসূচির আয়োজন চলেছে। কিন্তু দিনে দিনে এটি সারা বিশ্বের সব নারীর দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং বিশ্বব্যাপী নারীর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ একটি আনুষ্ঠানিকতার স্মারক হয়ে ওঠে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর গুরুত্বের সঙ্গে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের নারীর বাস্তবতা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের থেকে ভিন্ন। এখানে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী; কিন্তু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক—কোনো ক্ষেত্রেই তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগ পর্যাপ্ত নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েশিশুর ভর্তির হার ছেলেশিশুর সমান হয়েছে, কিন্তু মাধ্যমিক থেকে উচ্চতর পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমশ কমতে থাকে। আবার উচ্চশিক্ষায় নারীদের ভালো ফলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়েনি। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত অবস্থানেও নারীর অবস্থা পুরুষের সমান নয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে বটে, কিন্তু এখনো তাঁরা পুরুষের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। আবার অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘটেনি রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। পরিবার থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো অনেকটা পিছিয়ে। সম্পত্তির মালিকানার ক্ষেত্রেও নারীরা অসমতার শিকার। নিরাপত্তার প্রশ্নে নারীর অবস্থা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি নাজুক। খুন, ধর্ষণ, এসিড-সন্ত্রাসসহ যেকোনো ধরনের অন্যায়-অপরাধের শিকার হলে নারীর ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়া অপেক্ষাকৃত কঠিন। সামাজিকভাবে নানা পশ্চাত্পদ ধারণা ও কুসংস্কার নাগরিক হিসেবে নারীর সমমর্যাদার অন্যতম অন্তরায়। প্রান্তিক বা তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষুধা, দারিদ্র্য বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রেও নারীর অবস্থা অপেক্ষাকৃত বেশি নাজুক।
নারীসমাজের এই অসম অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এই দেশে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে নানা উদ্যোগ চলে আসছে অনেক বছর ধরে। অবস্থার অগ্রগতিও হচ্ছে, তবে বেশ ধীরে এবং বিক্ষিপ্তভাবে। অগ্রগতি আরও বেগবান করতে হলে কয়েকটি উদ্যোগ সম্পন্ন করতে হবে। নারী উন্নয়ন নীতিমালার যে খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে, তা পাস করে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা দরকার। আওয়ামী লীগ সরকার এর আগের মেয়াদে ১৯৯৭ সালে যে নীতিমালা তৈরি করেছিল, পরবর্তী সরকার এসে সেখানে গোপনে নানা পরিবর্তন করেছিল। খবর বেরিয়েছে, সেই দলিলটির অধিকাংশ বিষয় নতুন নীতিমালার খসড়ায় নেওয়া হয়েছে। এটি সঠিক উদ্যোগ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রয়েছে: সেটি হচ্ছে সিডও বা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ বাস্তবায়ন। নারীকে সম্পত্তির সমান অধিকার দেওয়ার লক্ষ্যেও প্রয়োজনীয় আইনি বিধান করা প্রয়োজন। নীতিমালা ও আইন-বিধানের ক্ষেত্রে এসব বুনিয়াদি কাজ সম্পন্ন হলে নারীসমাজের অগ্রগতির পথ আগের চেয়ে অনেক সুগম হবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শতবর্ষ পূর্তির সুবাদে আমরা এই বিষয়গুলোকে জাতীয় অগ্রাধিকারের অন্তর্ভুক্ত দেখতে চাই, এবং এসবের আশু বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রত্যাশা করি।

অপহূত ব্রিটিশ বালকের বাবাকে গিলানির আশ্বাস

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি তাঁর দেশে অপহূত পাঁচ বছর বয়সী ব্রিটিশ বালক সাহিল সাঈদকে উদ্ধারের প্রচেষ্টা জোরদার করতে পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। গিলানি ওই বালকের পরিবারে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি গত শনিবার সাহিল সাঈদের বাবাকে ফোন করে তাঁকে তাঁর পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
অপহরণকারীরা রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ঝিলাম শহরে সাহিলকে তার নানিবাড়ি থেকে অপহরণ করে। তারা ওই সময় নগদ অর্থ ও গয়না লুট করে। এখন তারা এক লাখ ২০ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, গিলানি শনিবার অপহূত বালকের বাবা রাজা নাক্কাশ সাঈদকে ফোন করেন এবং তাঁর ছেলেকে উদ্ধারে তাঁর সরকারের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা রাজা মোহাম্মদ তাহির বলেন, পুলিশ এ বিষয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে এবং শিগগিরই ওই পরিবারকে তারা একটা ভালো খবর দিতে পারবে।

ভারতের সামরিকীকরণ বড় হুমকি: পাকিস্তান

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া উচ্চপ্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ভারতের উদ্বেগ নাকচ করে পাকিস্তান বলেছে, তাদের সামরিক নীতি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক। গতকাল রোববার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল বাসিত এ কথা বলেন। পাশাপাশি তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ‘ব্যাপক সামরিকীকরণের’ অভিযোগ তুলে একে এ অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি হিসেবেও উল্লেখ করেন।
বাসিতকে উদ্ধৃত করে পাকিস্তানভিত্তিক পত্রিকা দ্য নিউজ বলেছে, ‘ভারতের ব্যাপক সামরিক শক্তি অর্জন ও সামরিক নীতি এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সব সময়ই নিজস্ব সামরিক নীতিতে নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের সামরিক নীতি মূলত আত্মরক্ষামূলক।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের দায় চীনের একার নয়: জিয়েচি

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং জিয়েচি বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর দায় চীনের একার নয়।
গতকাল রোববার চীনের পার্লামেন্টের বার্ষিক অধিবেশনের পাশাপাশি এক সংবাদ সম্মেলনে ইয়াং জিয়েচি এ কথা বলেন।
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তিব্বত ও তাইওয়ানের বিষয়ে চীনের যে আগ্রহ, তাকে যুক্তরাষ্ট্রের অবশ্যই শ্রদ্ধা করা উচিত। আমি মনে করি, চীনের বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে।’
এ বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ আরোপ, বাণিজ্য বিরোধ, তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি এবং তিব্বতের নির্বাসিত নেতা দালাই লামার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বৈঠক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বাগিবতণ্ডায় লিপ্ত ছিল। আর এ কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে।
ইয়াং বলেন, চীন সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। নিজের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে অটল থাকার মানে কট্টর পন্থা অবলম্বন নয়।

পৃথক রাজ্যের দাবি থেকে সরে যাচ্ছে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা

পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য যে গড়া যাবে না, তা এখন কিছুটা হলেও বুঝতে পারছেন পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে আন্দোলনরত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতারা। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের তেমন সমর্থন এখনো তাঁরা পাননি। তার পরও এই মোর্চা পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি জেলা দার্জিলিংকে আন্দোলনে আন্দোলনে অশান্ত করে রেখেছে।
বন্ধ হরতালে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে দার্জিলিং। এ আন্দোলনের জেরে পাহাড়ে পর্যটকসংখ্যা কমেছে। বেকারত্ব বেড়েছে। জনমুক্তি নেতারা বিভিন্ন দলের কাছে গিয়ে ধরনা দিয়েও পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবির প্রতি সমর্থন আদায় করতে পারেননি। ফলে এখন জনমুক্তি নেতারাই চাইছেন, পৃথক রাজ্য না চেয়ে বরং অন্তর্বর্তীকালের জন্য দার্জিলিং, শিলিগুড়ি এবং ডুয়ার্সকে নিয়ে পৃথক একটি স্বশাসিত অঞ্চল গড়তে। যদিও আশির দশকে এই দার্জিলিংকে ভেঙে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের প্রথম দাবি তুলেছিলেন গোর্খাল্যান্ড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (জিএনএলএফ) নেতা সুভাষ ঘিষিং। সে সময় রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকার কেউই সুভাষ ঘিষিংয়ের পৃথক রাজ্য গড়ার আন্দোলনে সমর্থন জানায়নি। অগত্যা সুভাষকে প্রধান করে গড়ে তোলা হয়েছিল দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ।
এরপর সুভাষ ঘিষিংয়ের জিএনএলএফ থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন সাবেক জিএনএলএফ নেতা বিমল গুরুং। ২০০৭ সালের ৭ অক্টোবর তিনি গড়েন জনমুক্তি মোর্চা। এর পরেই বিমল গুরুং এক ধাপ এগিয়ে এসে ঘোষণা দেন, পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবি থেকে তাঁরা এক পাও সরবেন না। আন্দোলন চলবে।
জনমুক্তি মোর্চার নেতারা এবার বিকল্প পথে চলার গোপন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা এখন চাইছেন দার্জিলিং, শিলিগুড়ি ও ডুয়ার্স নিয়ে পৃথক স্বশাসিত একটি পর্ষদ গড়তে। আর এই লক্ষ্যে তাঁরা গোর্খাল্যান্ডের নামও বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বলা হয়েছে, এই স্বশাসিত পর্ষদের নাম হবে ‘গোর্খা আদিবাসী পরিষদ’। তবে তাঁদের পৃথক রাজ্যের আন্দোলনও চলবে।
একই সঙ্গে জনমুক্তি মোর্চা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্য এ কথাও বলছে, আগামী বছরের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনের পরই তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব মোর্চার নেতারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠিয়েছেন। মোর্চার নেতা বিমল গুরুং দার্জিলিংয়ে প্রকাশ্য জনসভা করে আগামী ১৫ মার্চ এ সংক্রান্ত প্রকাশ্য ঘোষণা দেবেন। আর ১৮ মার্চ এই নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক বসছে নয়াদিল্লিতে। এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্র, রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি ও জনমুক্তি মোর্চার নেতারা।a

ভারত হাফিজ সাঈদের গ্রেপ্তার দাবি করে

পাকিস্তানের জামাত-উদ-দাওয়া প্রধান ও জঙ্গিনেতা হাফিজ মোহাম্মদ সাঈদের গ্রেপ্তার দাবি করেনি ভারত। এমনকি গত মাসে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে যে আলোচনা হয় সেখানেও বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ কুরেশি গত শনিবার এ দাবি করেছেন। খবর জিনিউজ অনলাইনের।
ভারত হাফিজ সাঈদের গ্রেপ্তার চেয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নিজের শহর মুলতানে কুরেশি আরও বলেন, আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে তারা সে ধরনের কোনো দাবি করেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল বাসিত এর আগে গত বৃহস্পতিবার বলেন, লস্কর-ই-তাইয়েবার প্রতিষ্ঠাতা সাঈদকে ভারত তাদের হাতে তুলে দিতে বলেনি। ভারত মনে করে থাকে, ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে চালানো জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন সাঈদ।
সম্প্রতি দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের (মোস্ট ওয়ান্টেড) একটি তালিকা প্রকাশ করে সরকার। সন্ত্রাসীদের ওই তালিকায় এমন ২০ জনের নাম এসেছে, যারা মুম্বাইয়ে ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিল। তবে ওই তালিকায় জঙ্গিনেতা হাফিজ সাঈদের নাম আসেনি।

ফিলিপাইনে ৭ জঙ্গি নিহত

ফিলিপাইনের নৌ সেনারা গতকাল রোববার ভোরে দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত দ্বীপে জঙ্গিদের গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে সাত জঙ্গিকে হত্যা করেছে।
বন্দরনগরী জাম্বোয়াঙ্গায় অবস্থানরত সন্ত্রাস-বিরোধী যৌথ বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুস্তিকো গুয়েরিরো গতকাল জানান, লামিনুসা দ্বীপে সুলু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আজ (গতকাল) ভোরে ওই অভিযান চালানো হয়। ওই সময় এক সেনাও সামান্য আহত হয়েছে। আবু বেনহুর নামে পরিচিত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওই অভিযান চালানো হয়। বেনহুর আবু সায়াফ গোষ্ঠীর সদস্য এবং তাদের সঙ্গে জেমাহ ইসলামিয়া গোষ্ঠীর সক্রিয় যোগাযোগ রয়েছে। আবু সায়াফ গোষ্ঠীর ৪০০ জঙ্গি রয়েছে। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুলু গোষ্ঠী ও নিকটবর্তী অন্য দ্বীপগুলোতে অবস্থান করে থাকে। দেশটিতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাগুলোর জন্য এ গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিতে আবার সুদিন ফিরছে

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের সুদিন ফিরে আসছে। সেই সঙ্গে সুদিন ফিরছে বৈশ্বিক মন্দার ফলে চাকরিচ্যুত অনেকেরও। ভারতের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পৃথ্বী সেন চাকরি করতেন ফ্ল্যাগশিপ আউটসোর্সিং ইন্ডাস্ট্রিতে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশ্বমন্দার প্রভাব পড়ায় তাঁকে চাকরিটি হারাতে হয়। এতে হতাশ হয়ে পড়েন পৃথ্বী। তবে সম্প্রতি তাঁর বেকারত্ব ঘুচে গেছে। তিনি সম্প্রতি ভারতের তথ্যপ্রযুক্তির কেন্দ্রস্থল বেঙ্গালুরুর একটি আউটসোর্সিং কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন।
চাকরি পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ২৬ বছর বয়সী পৃথ্বী সেন বলেন, ‘আমার বেকারত্বের দিনগুলো ছিল খুব কষ্টের।’
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস কোম্পানিজের (নাসকম) একটি সূত্র জানিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আগামী অর্থবছরে প্রায় ৭০ শতাংশ জনবল নিয়োগ করা হবে।
ভারতের তিনটি বড় আউটসোর্সিং কোম্পানি হলো: টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস (টিসিএস), ইনফোসিস ও উইপ্রো। আগামী অর্থবছরে এ তিনটি প্রতিষ্ঠানই অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পেশাদারদের ইউনিয়নের প্রধান পৃথ্বী লিক্কাদ বলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে সুদিন ফিরে এসেছে। পেশাদারদের এ ট্রেড ইউনিয়নটি অনেক বিদেশি শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করে।
ভারতের সফটওয়্যার রপ্তানিকারকেরা আগামী অর্থবছরে ২০১১ সালের মার্চের মধ্যে পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি ডলার উপার্জন করবেন বলে প্রত্যাশা করছেন। বড় কোম্পানিগুলো সফটওয়্যারের নতুন ফরমায়েশ সংগ্রহ করতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে প্রচারণা শুরু করেছে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র আর কে আকাশ বলেন, এখন চাকরির বাজার অনেক ভালো।
ভারতের সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভের ফলে দেশটির অর্থনীতির বিকাশ ও এর আধুনিকায়ন সম্ভব হয়েছিল। তবে বিশ্বজুড়ে মন্দা দেখা দেওয়ায় সেসব কোম্পানি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেকেই তাঁদের বিভিন্ন প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছেন।
তবে এ খাতে সুদিন ফিরে আসায় এখন তাঁরা আবার আশায় বুক বেঁধেছেন।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তির চাকরির বাজারে এখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ২৩ লাখের বেশি মানুষ জড়িত। এ খাতটিই এখন সে দেশের অন্যতম চাকরিদাতা ও অর্থনৈতিক জোগানদাতা খাত হিসেবে পরিচিত।
ভারতের এ সাফল্য দেখে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের কোম্পানিগুলোও এ খাতে ভারত থেকে জনশক্তি নিচ্ছে। নাসকমের প্রেসিডেন্ট সোম মিত্তাল বলেন, ‘আমরা আশা করছি, চলতি অর্থবছরে আমরা দেড় লাখের বেশি জনশক্তি রপ্তানি করতে পারব।’

নারী পরিচালিত বিমান

আন্তর্জাতিক নারী বর্ষকে সামনে রেখে আজ ৮ মার্চ ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই থেকে সম্পূর্ণ নারীদের দ্বারা পরিচালিত একটি বিমান পাড়ি দেবে যুক্তরাষ্ট্রের জে এফ কেনেডি বিমানবন্দরের উদ্দেশে। ওই বিমানের শুধু পাইলটই নারী থাকছেন না, উড্ডয়নের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য কর্মীও থাকছেন নারী।
এই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাশনাল এভিয়েশন কোম্পানি ইন্ডিয়া লিমিটেড (নাসিল)। নারীদের দ্বারা পরিচালিত এই বিমানটি মুম্বাই থেকে টানা ১৪ ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে পৌঁছাবে যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে নাসিলের ১৩৬ জন নারী পাইলট রয়েছেন। তাঁরা নিয়মিত আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চালিয়ে থাকেন।
ফ্লাইটের নেতৃত্বে থাকবেন ক্যাপ্টেন রেশমি মিরান্ডা ও ক্যাপ্টেন সুনিতা নারুলা। তাঁরা একটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ বিমান উড়িয়েনিয়েযাবেন।
এছাড়া আরও কয়েকটি নারী-ক্রু পরিচালিত ফ্লাইট মুম্বাই থেকে রওনা দেবে। এগুলোর মধ্যেরয়েছেআইসি-৬৮৬, আইসি-১০৫ ও আইসি-১২৯ নম্বরের ফ্লাইট।

অনশন শুরু করেছেন ফনসেকা

টেলিফোন-সুবিধা না দেওয়ায় নৌবাহিনীর একটি বন্দিশিবিরে আটক শ্রীলঙ্কার সাবেক সেনাপ্রধান ও পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী শরত্ ফনসেকা অনশন শুরু করেছেন। গতকাল রোববার তাঁর স্ত্রী আনোমা ফনসেকা এ খবর জানান।
গত জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাহিন্দা রাজাপক্ষের কাছে পরাজিত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলার অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পর ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ফনসেকার স্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত তাঁদের দুই মেয়ের সঙ্গে এত দিন যে মোবাইল ফোনে কথা বলতেন, সেটির সংযোগ হঠাত্ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় অনশনের সিদ্ধান্ত নেন জেনারেল ফনসেকা।
প্রধান সামরিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল প্রাসাদ সামারাসিংহে বলেন, এত দিন তাঁকে কেবল সৌজন্য দেখানো হয়েছে। এটি তাঁর প্রাপ্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা এ ধরনের সুবিধা যেকোনো সময় বন্ধ করে দিতে পারি। তাঁকে ফোন দিতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’
দেশে তিন দশকের গৃহযুদ্ধের অবসানে ভূমিকা রেখেছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেলশরত্ ফনসেকা। কিন্তু যুদ্ধের পরপরই প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের সঙ্গে তাঁর মন-কষাকষি শুরু হয়। এর পরই সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি

ইসরায়েলে মিশেল-এহুদ বারাক বৈঠক

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দূত জর্জ মিশেল গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা আবার শুরুর ব্যাপারে বৈঠক করেছেন। এদিকে পূর্ব জেরুজালেমের একটি আরব বসতিতে ইহুদি বসতি স্থাপনের প্রতিবাদে শনিবার প্রায় তিন হাজার ইসরায়েলি বিক্ষোভ মিছিল করে। জেরুজালেমে ইহুদি বসতি স্থাপনের প্রতিবাদে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ মিছিল ছিল এটি।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাকের তেল আবিবের বাসভবনে তাঁর সঙ্গে জর্জ মিশেলের বৈঠক হয়।
দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে তাঁরা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার আলোচনা আবার শুরু করা নিয়ে কথা বলেন। বিবৃতিতে এর বেশি কিছু জানানো হয়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে আলোচনার জন্য জর্জ মিশেল গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্যে যান। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী সপ্তাহে ওই অঞ্চল সফর করতে পারেন।
এর আগে গত বুধবার মিসরের কায়রোতে আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা পুনরায় শুরু করার ব্যাপারে সমর্থন দিতে একমত হন।
পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ এলাকার বিক্ষোভ মিছিলে শান্তিকর্মী ও বামপন্থীরা ছিলেন। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা লাল পতাকায় ‘হিব্রুতে শান্তি’ কথাটি লেখা ছিল। সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন তাঁরা। বিপুল সংখ্যক পুলিশ মিছিল ঘিরে রাখে। এর আগে পুলিশ মিছিল-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে আপিল আবেদনের পর সমাবেশের অনুমোদন পাওয়া যায়। ওই মিছিলে কয়েকজন ফিলিস্তিনিও অংশ নেন।
কয়েক দিন আগে ইসরায়েলি দাঙ্গা পুলিশ ও ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার সংঘর্ষের উত্তেজনার মধ্যে ওই বিক্ষোভ হলো।

মাওবাদীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনায় মধ্যস্থতায় রাজি অরুন্ধতী

ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, মাওবাদী গেরিলাদের সঙ্গে সে দেশের সরকার শান্তি আলোচনার জন্য রাজি হলে সে ক্ষেত্রে তিনি ‘নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক’-এর ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত রয়েছেন। মাওবাদী গেরিলাদের শান্তি আলোচনার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন। মাওবাদীদের সামরিক শাখার নেতা কোতেশ্বর রাও (কিষেনজি) বার্তা সংস্থা বিবিসিকে অজ্ঞাত স্থান থেকে এ কথা জানান।
কিষেনজি বলেন, শান্তি আলোচনায় সরকার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অরুন্ধতী রায় অথবা বি ডি শর্মার মতো বুদ্ধিজীবী বা মানবাধিকারকর্মীকে আমন্ত্রণ জানালে তাঁরা সহিংসতার পথ ছেড়ে দেবেন।
অরুন্ধতী রায় যেকোনো আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে অস্বীকৃতি জানালেও বিবিসি হিন্দি রেডিওকে বলেন, নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে আলোচনায় অংশ নিতে তিনি রাজি আছেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন লেখক। আমি জানি যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর গুণাবলি আমার নেই।’ তিনি আরও জানান, মাওবাদীদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না তিনি। কিন্তু তিনি তাঁদের আলোচনার প্রস্তাবকে সর্মথন করেন।
বুকার পুরস্কার বিজয়ী এই লেখক বলেন, মাওবাদীরা আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের এ প্রস্তাব মেনে নেওয়া উচিত।
ভারতে মাওবাদীদের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে সরকারি বাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম চলে আসছে। এতে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মাওবাদীরা বলছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বার্থে তারা সংগ্রাম করছে। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের জন্য মাওবাদীরাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হুমকি।

৯/১১ হামলা নিয়ে মিথ্যাচার হয়েছে: আহমাদিনেজাদ

ইরানের কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (৯/১১) যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা নিয়ে বড় ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে আফগানিস্তানে আক্রমণ চালাতে এই মিথ্যাকে ব্যবহার করা হয়েছে। গত শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এ কথা প্রচার করে।
শনিবার তেহরানে গোয়েন্দা দপ্তরের কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘ওই হামলাটি একটি জটিল গোয়েন্দা-কারসাজি ছিল।’ এর আগেও টুইন টাওয়ারে হামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। এবার পুরো ঘটনাকে ‘বড় মিথ্যা’ হিসেবে অভিহিত করলেন তিনি।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া ও সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগনে যাত্রীবাহী বিমান নিয়ে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ওই হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের একটি বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে টুইন টাওয়ার এলাকা পরিদর্শন করতে চাইলে আহমাদিনেজাদকে অনুমতি দেয়নি মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
এদিকে গতকাল ইরানের বার্তা সংস্থা মেহর জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ আজ সোমবার আফগানিস্তান সফর করবেন। সেখানে তিনি আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে দেখা করবেন।
অবরোধ লঙ্ঘনকারীদের অর্থ সরবরাহ: ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ লঙ্ঘনকারী ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোটি কোটি ডলার দিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। গত শনিবার প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়। পত্রিকাটি জানিয়েছে, অবরোধ লঙ্ঘন করে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে, এমন মার্কিন ও বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের শুধু তেল ও গ্যাস খাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, এমন কেম্পানিগুলোকে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। সরকারি পর্যালোচনা প্রতিবেদন ও ব্যবসায়িক নথিপত্র থেকে এই হিসাব পাওয়ার কথা জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। ওবামা ও তাঁর পূর্বসূরি জর্জ বুশের প্রশাসন এ ব্যাপারে মিশ্র আচরণ করেছে উল্লেখ করে পত্রিকাটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ নীতি অবলম্বনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরস্কৃত করেছে দুটি সরকারই।
জ্বালানি খাত ছাড়া ইরানে গাড়ি নির্মাণ ও সরবরাহ খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোও আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছে। ইরানের গ্যাস খাতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে স্থল ও সমুদ্রে এক কোটি ৪০ লাখ একর এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের অনুমতি পেয়েছে। অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে ক্যানসার গবেষণা ও কৃষি নিয়ে কাজ করছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও মার্কিন সরকারের কাছ থেকে বিপুল অনুদান ও ঋণ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বেশির ভাগ ব্যবসা পরিচালনার ব্যাপারে মার্কিন কোম্পানির ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে।
চীনের বিরোধিতা: পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করার ব্যাপারে বিরোধিতা করেছে চীন। গতকাল রোববার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং জাইচি বলেন, ‘পরমাণু কর্মসূচি থেকে ইরানকে সরিয়ে আনতে অবরোধ বা চাপ কার্যকর পন্থা নয়। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এখন কিছুটা সংকটজনক পরিস্থিতি চলছে, কিন্তু আমরা মনে করি কূটনৈতিক উপায়ে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ এখনো খোলা আছে।’ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত-বর্ধনশীল অর্থনীতি চীনের অশোধিত তেলের তৃতীয় বৃহত্তম উত্স তেহরান।
ক্ষেপণাস্ত্র উত্পাদন: ইরান গতকাল রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন স্বল্প পাল্লার ‘ক্রুজ মিসাইল’ উত্পাদনের জন্য নতুন ‘প্রোডাকশন লাইন’ চালু করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ কথা জানানো হয়। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আহমাদ ভাহিদির বরাত দিয়ে টেলিভিশনে জানানো হয়, নাসর-১ নামের ক্ষেপণাস্ত্রটি এক হাজার টন ওজনের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারবে। স্থলভাগ থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যাবে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ডুবোজাহাজ ও হেলিকপ্টার থেকে ছোড়ার উপযোগী করেও তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান ইরানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

মর্টার ও বোমা হামলার মধ্যে ভোট হলো ইরাকে

বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মর্টার আর বোমা হামলার মধ্যেই গতকাল রোববার ইরাকে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয়েছে। সকাল সাতটায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল পাঁচটায় শেষ হয়। ভোট গ্রহণের সময় মর্টার ও বোমার বিস্ফোরণে ২৪ জন নিহত হয়েছে। ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অভিযানের পর এটি দ্বিতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন।
স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান, সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোর সামনে ভোটাররা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। রাজধানী বাগদাদে যথেষ্ট ভোটারের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। তবে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পর বাগদাদে ১০টি মর্টার ও চারটি বোমা হামলা চালানো হয়। উত্তর বাগদাদে একটি রকেট হামলায় ১২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় ১০ জন। আরেকটি ভবনে বোমা হামলায় আরও চারজন নিহত হয়েছে। বাগদাদে আরও একটি মর্টার ও বোমা হামলায় মারা গেছে আটজন। এতে আহত হয় ৪০ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, চারটি মর্টার সুরক্ষিত ‘গ্রিন জোনে’ আঘাত হেনেছে। ওই এলাকায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দপ্তর অবস্থিত।
এ ছাড়া ফাল্লুজা, বাকুবা, সামারাসহ বেশ কয়েকটি শহরে মর্টার ও বোমা হামলা চালানো হয়। বেশির ভাগ হামলা হয়েছে ভোট কেন্দ্রগুলোর কাছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, বাকুবার একটি কেন্দ্রে পাঁচটি রকেট বিস্ফোরিত হয়। এসব হামলায় আরও ৩০ জন আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পার্লামেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইরাকজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও এসব হামলা চালানো হয়। শুধু বাগদাদেই দুই লাখ পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে ওমর আল মোখতার ভোট কেন্দ্রের প্রথম ভোট প্রদানকারী ৫৭ বছর বয়সী আবু আদেল জানান, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা কর্তব্য। প্রত্যেক ইরাকিরই উচিত ভোট দেওয়া।’ সুন্নি অধ্যুসিত ফাল্লুজার একটি ভোট কেন্দ্রে ভোট প্রদান শেষে খালেদ আবদুল্লাহ নামের একজন ভোটার বলেন, ‘আমার আজকের ভোটটি আল-কায়েদার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ।’ সুন্নিরা ২০০৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনটি বয়কট করলেও এবার ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মালিকি সকালে বাগদাদের গ্রিন জোনে একটি ভোট কেন্দ্রে ভোট দেন। তিনি জানান, ভোটারদের ভয় দেখাতে এসব হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু ইরাকিরা চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পায় না। এই মর্টার ও বোমা তাদের মনোবল নষ্ট করতে পারবে না।
ইরাকের কুর্দিরাও এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তবে তাদের উপস্থিতি ততটা সরব ছিল না। নির্বাচনে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশির ভাগ আসনে জয় লাভের সম্ভাবনা রয়েছে প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে) ও কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (কেডিপি)। এ ছাড়া গোরান দলের কর্মীরা জানিয়েছেন, তাঁরা ২৩ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার আশা করছেন। কুর্দি অধ্যুষিত সুলাইমানিয়াহ শহরের ভোটার সাদান ওমর মোহাম্মদ জানালেন, তিনি পিইউকের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এদিকে তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শিয়া নেতা মুক্তাদা আল সদর দেশকে বিদেশি সেনাদের দখলদারি থেকে মুক্ত করার জন্য ইরাকিদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরাকের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৩২৫টি আসনের বিপরীতে ছয় হাজার ২০০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটার সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ। এককভাবে সরকার গঠনের জন্য কোনো একটি দলকে কমপক্ষে ১৬৩টি আসন পেতে হবে। আগামী ১৮ মার্চ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইরাকের গণতন্ত্র জোরদার হবে এবং এ অঞ্চলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইরাক হবে আলোর দিশারী। এ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারও নির্বিঘ্নে করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।

মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই প্যানেলের মধ্যে

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) কার্যনির্বাহী পরিষদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। ২১ সদস্যবিশিষ্ট কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচনে এবার ৫২ জন প্রার্থী হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার মূলত দুটি প্যানেলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। ‘নবধারা’ নামের প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান কমিটির ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি ও আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সাংসদ নসরুল হামিদ। ‘জাগরণ’ নামের প্যানেলটির নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সহসভাপতি মোকাররম হুসাইন খান। ইতিমধ্যে প্যানেলের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
নবধারা প্যানেলের প্রার্থীরা হলেন হামিদ রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিহ্যাবের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য নসরুল হামিদ, ইনডেক্স ডেভেলপমেন্টের আবদুর রহিম খান, বিডিডিএলের সাঈদ নজরুল, মেগা বিল্ডার্সের মুরাদ ইকবাল চৌধুরী, লতিফ রিয়েল এস্টেটের আকতার বিশ্বাস, এলিয়েন প্রপার্টিজের মিজানুর রহমান দেওয়ান, র্যামস ডেভেলপমেন্টের মো. মহসিন মিয়া, ইউনিয়ন ডেভেলপমেন্টের মো. জাহিদ হাসান, জাপান গার্ডেন সিটির মো. ওয়াহিদুজ্জামান, দালান কোঠার মেজর (অব.) জামশেদ হাসান, কিংডম বিল্ডার্সের মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ, ট্রপিক্যাল হোমসের রবিউল হক, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের এম সাইফুল ইসলাম, প্রাসাদ নির্মাণের আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ, ভারটেক্স বিল্ডার্সের সৈয়দ জুনায়েদ আনোয়ার, রয়েল এস্টেটের এম আনিসুজ্জামান রানা, নগর হোমসের আবদুর রহমান, বিশ্বাস বিল্ডার্সের শহিদুর রহমান, স্ট্যান্ডার্ড কনস্ট্রাকশনের মো. রবিউল হাসনাত, এভিনিউ বিল্ডার্সের এম এ ওহাব এবং নবো উদ্যোগের আবুল খায়ের সেলিম।
জাগরণ প্যানেলের প্রার্থীরা হলেন ক্যাপিটাল্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাররম হোসেন খান, আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সাংসদ ও এনা প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এনামুল হক, অ্যাডভান্স ডেভেলপমেন্ট টেকনোলজিসের এস এম আনোয়ার হোসেন, সাউথ ব্রিজ হাউজিংয়ের আনিসুর রহমান খান, মেট্রো মেকারসের এ এফ এম জাহাঙ্গীর, সূচনা ডেভেলপমেন্টের আখিল আকতার চৌধুরী, মোমেন রিয়েল এস্টেটের স্থপতি রিয়াদ মোমেন, এস এ খালেক প্রপার্টিজের সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, মেট্রো হোমসের মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, হাইপেরিয়ান বিল্ডার্সের মো. শামসুল আলম, ইউনিক লিভিংয়ের মো. শামসুজ্জোহা চৌধুরী, নন্দনকানন হাউজিংয়ের শাহেদ মাহমুদ, গ্র্যান্ড প্রপার্টিজের তৈয়বুর রহমান, কমপ্রিহেনসিভ হোল্ডিংয়ের মো. জিল্লুল করিম, জেটস ডেভেলপমেন্টের মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিকস ওয়ার্কস ডেভেলপমেন্টের লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, স্প্রিং ফিল্ড ডেভেলপমেন্টের শাহ মমরেজ চৌধুরী, অ্যাডভান্স হোমসের তাওহীদা সুলতানা এবং এমবিকে বিল্ডার্সের মো. সাঈদুল ইসলাম বাদল।
এ ছাড়া তামান্না রিয়েল এস্টেটের তুহিন হাসনাত কফিল, সিটি টেকনোলজির হাফিজুল আলম, ফেয়ার বিল্ডার্সের এস এম জাহিদুর রহমান, ভ্যালেন্টাইন কনস্ট্রাকশনের সফিক রহমান, রুটস প্রপার্টিজের মো. মিজানুর রহমান, এবং এলিগেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের মো. আশিকুল হক মিলে ‘পরিবর্তন’ নামে আরেকটি প্যানেল গঠন করেছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হলেন দারুল ইসলাম হাউজিংয়ের মো. খায়রুল আলম, আরবিল ডেভেলপমেন্টের মো. আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, ইমপেরিয়াল ডেভেলপমেন্টের আসাদুর রাহমান জোয়ারদার ও নর্দান ফাউন্ডেশনের মোহাম্মদ আখতার হাবিব ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রিহ্যাবে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হচ্ছে। আর বর্তমান কমিটি প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্বভার গ্রহণ করে। গতবার নবধারা প্যানেলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয়েছিল। আর গতবারের বিজিত ‘গ্রিন’ প্যানেল এবার জাগরণ নামে নতুন প্যানেল করেছে।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রিহ্যাবের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিবেচনায় উঠে আসবে দলীয় পরিচয়।
জানা গেছে, নবধারা প্যানেল মূলত আওয়ামী ঘরানার ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ব্যবসায়ীদের নিয়ে গঠিত।
অন্যদিকে জাগরণ প্যানেলে একজন আওয়ামী লীগের সাংসদ ছাড়াও কয়েকজন আওয়ামী-সমর্থিত ব্যবসায়ী থাকলেও অন্তত দুজন প্রার্থী জামায়াতের নেতা বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির সাবেক সাংসদের ছেলে ও বিএনপি-সমর্থিত ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি।
রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে মাত্র নয়জন সদস্য নিয়ে রিহ্যাবের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এর সদস্য ৬৩৭ জন। তবে এবারের নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা ৫৮৮ জন।
রিহ্যাবের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যরা হলেন মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খান চৌধুরী, এ কে ফজলুল হক, আরশি হায়দার, তৌফিক এম সেরাজ, সৈয়দ ফজলে বারী, পিন্টু খান, এম এস আলম, নসরুল হামিদ এবং ব্রিগেডিয়ার (অব.) এ এইচ এম আবদুল মোমেন।
এবারের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিক এম সেরাজ।

ড্রয়ের চিন্তা নিয়েও এগোচ্ছে রাজশাহী

মিরপুর জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় লিগের ফাইনাল কাল দ্বিতীয় দিনে কিছু দর্শক দেখেছিল। কিন্তু গোটা পঞ্চাশেক দর্শকের বেশির ভাগই আবার লাঞ্চের পরপর চলে গেল। যাওয়ার সময় অনেককেই বলতে শোনা গেল—দূর, দূর! এটা কোনো ব্যাটিং? এ খেলা দেখার চেয়ে না দেখাই ভালো।
আগের দিনের ৫ উইকেটে ২০৮ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন শুরু করা রাজশাহী অলআউট হয়েছে ৩৭২ রানে। পরশু ৯০ ওভার খেলেছিল, কাল অলআউট হওয়ার আগে খেলেছে আরও ৭৯ ওভার। এতে ২.০৭ গড়ে উঠেছে ১৬৪ রান। এই শ্লথ ব্যাটিং কি পরিকল্পিত? রাজশাহীর অধিনায়ক খালেদ মাসুদের উত্তর, ‘ম্যাচ ড্র করলেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হব। এমনিতে ম্যাচের ফল হলে আগের পাওয়া পয়েন্ট হিসেব হবে না। আর যদি ড্র হয় তাহলে আগের পয়েন্ট যোগ হবে। আর আমরা ওদের চেয়ে ৫ পয়েন্ট বেশি (রাজশাহী ৮৯, চট্টগ্রাম ৮৪) নিয়ে ফাইনালে এসেছি।’
দর্শকদের তৃপ্তি দেওয়ার চেয়ে শিরোপাটাই আসল বলে হয়তো উইকেট কামড়ে পড়ে থাকতে চেয়েছে রাজশাহী। আগের দিন অপরাজিত থাকা দুই ব্যাটসম্যান মাসুদ (৫৫) ও আনিসুর (৫২) হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। আট নম্বরে নেমে ধীমান ঘোষও (৬৬*) অনুসরণ করেছেন জ্যেষ্ঠ সতীর্থদের। তবে আনিসুর ছাড়া বাকি দুজনের ব্যাটিং ছিল কচ্ছপ গতির। মাসুদ ৬টি চারের মাধ্যমে ৫৫ রান করেছেন ২২০ বলে। ধীমানের অপরাজিত ৬৬ রান এসেছে ১৮৯ বলে। আনিসুর ৫২ করেছেন ৯৫ বলে।
ধীর ব্যাটিং করেও ওভাবে আগের পয়েন্টের কল্যাণে কি শিরোপা জেতা হবে রাজশাহীর? ম্যাচটি যে পাঁচ দিনের। কাল গেল কেবল দ্বিতীয় দিন। আর দ্বিতীয় দিনের শেষে কোনো উইকেট না হারিয়েই চট্টগ্রাম ৯ ওভারে করেছে ২১ রান। গাজী সালাউদ্দিন ১১ ও মাহবুবুল করিম ৬ রান নিয়ে উইকেটে আছেন।
রাজশাহী অবশ্য শেষ দিকে দ্রুত উইকেট না হারালে শ্লথ ব্যাটিংয়ের পরও এর চেয়ে বড় স্কোর করতে পারত। মাসুদ-আনিসুরের ৭৭ রানের ষষ্ঠ উইকেট জুটির পর সপ্তম উইকেটে ধীমানকে নিয়েও ওই একই রানের জুটি গড়ে দলকে ৩৩৩ রানে নিয়ে যান মাসুদ। তিনি আউট হয়ে গেলে ধীমানকে আর কেউ ভালো সঙ্গ দিতে পারেননি। ৩৯ রানে পড়েছে শেষ ৩ উইকেট।