Tuesday, December 30, 2014

শিক্ষিকা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা সহ্য করা হবে না -প্রধানমন্ত্রী

নোয়াখালীতে নারী স্কুলশিক্ষকের হত্যাকাণ্ড এবং ঢাকায় অপর এক নারী শিক্ষক অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, তাঁর সরকার এ ধরনের ঘটনা আর সহ্য করবে না। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী আজ মঙ্গলবার সকালে গণভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। প্রাথমিক স্কুল সার্টিফিকেট (পিএসসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী একই অনুষ্ঠান থেকে সারা দেশে পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচিরও উদ্বোধন করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের এ ধরনের অপরাধের নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই। নোয়াখালীতে স্কুলশিক্ষকের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপি-জামায়াতই দায়ী।’ তিনি এ ধরনের অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে বিএনপি-জামায়াতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আর সহ্য করব না এবং এ ধরনের অপরাধ বন্ধে প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নোয়াখালী ও ঢাকায় যারা এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করেছে, তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা কখনোই চাই না কেউ এ ধরনের অপরাধ করুক, আমরা অবশ্যই অপরাধীদেরকে খুঁজে বের করব এবং এ ধরনের জঘন্য অপরাধ বন্ধে অপরাধীদের বিচার করব ইনশাআল্লাহ।’ তিনি বলেন, দেশের জনগণ যে মুহূর্তে শান্তিতে বসবাস করছে, ঠিক সে সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। তিনি বলেন, ‘সোমবার বিএনপি-জামায়াতের হরতাল ডাকার কী যৌক্তিকতা থাকতে পারে, আমার জানা নেই।’ তিনি হরতাল আহ্বানকারী বিএনপি-জামায়াতের উদ্দেশে বলেন, ‘তারা একজন স্কুল শিক্ষককে হত্যা করে এবং অপর একজন স্কুলশিক্ষককে পুড়িয়ে কী পেয়েছে? তারা একজন স্কুলশিক্ষকের জীবন কেড়ে নেওয়া ছাড়া এবং অপর একজনকে আগুনে পোড়ানো ছাড়া আর কিছু তো পায়নি। গত সোমবারের হরতাল থেকে তারা আর কিছুই পায়নি। তাহলে কেন এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানো হলো? মানুষ মারা এবং পোড়ানোই যদি তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এটি হবে খুবই দুঃখজনক। তারা কেন একজন স্কুলশিক্ষকের ওপর হামলা চালাবে?’
পরে প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ সালের শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনা তসলিম করবীর হাতে এক সেট বই তুলে দিয়ে বই বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রথমবারের মতো মাল্টিমিডিয়া গ্রন্থের বিতরণ ও উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি শেখ হাসিনা সব শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী মিডিয়া ভার্সনে পূর্ণাঙ্গ অডিও ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া গ্রন্থের একটি পূর্ণাঙ্গ টেক্স উদ্বোধন করেন। শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব কাজী আখতার হোসেন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আবদুস সোবহান সিকদার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

দলীয় পদ হারালেন এইচটি ইমাম পুত্র

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের পুত্র ও সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম  অবশেষে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ হারালেন। ইতিমধ্যেই তাকে বাদ দিয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৪ই নভেম্বর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে তরুণ রাজনৈতিক তানভীর ইমাম বিনাভোটে উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হয়েছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. কেএম হোসেন আলী হাসান মঙ্গলবার বিকালে বলেন, উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তানভীর ইমাম সাধারণ সম্পাদক ও মীর শহিদুল ইসলাম পুন্নুকে সভাপতি মনোনীত হন। এরপর দলের অভ্যন্তরে মনোনীত কমিটি নিয়ে কোন্দল দেখা দেয়। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্দেশে সম্মেলনের মনোনীত কমিটি বাতিল করে ২৮শে ডিসেম্বর নতুন আহবায়ক কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ কমিটিতে সাবেক সভাপতি মীর শহিদুল ইসলাম পুন্নুকে আহবায়ক ও সাবেক সাংসদ গাজী শফিকুল ইসলাম শফিকে ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৪ জন যুগ্ম আহবায়ক মনোনীত করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, ৫ই জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের কিছু দিন আগে রাজনীতিতে তানভীর ইমামের আবির্ভাব ঘটে। এরপর থেকেই স্থানীয় সাংসদ ও উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী শফিকুল ইসলাম শফি’র সাথে তার দুরত্ব তৈরী হতে থাকে। সাংসদ নির্বাচন এগিয়ে এলে সংকট আরো ঘনীভূত হতে থাকে। একপর্যায়ে গাজী শফিকে টোপকিয়ে তানভীর ইমাম বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও বিনাভোটে সাংসদ মনোনীত হন। এ অবস্থায় সাবেক ও বর্তমান সাংসদের মধ্যে দুরত্ব আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন শফি। এ পরিস্থিতিতে দলের সাধারন সম্পাদক হওয়ার জন্য সাংসদ তানভীর ইমাম মরিয়া হয়ে উঠেন। এ অবস্থায় ২৮ আগস্ট উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের বর্ধিত সভায় সাবেক সাংসদ ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলামকে দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনে তাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেটির চুড়ান্ত ফয়সালার আগেই ১৪ নভেম্বর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সন্মেলনের মধ্যদিয়ে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় তানভীর ইমাম সাধারন সম্পাদক এবং প্রায় ১০ বছর পর অনুষ্ঠিত এ সন্মেলনে সভাপতি পদে আর কোন প্রার্থী না থাকায় মীর শহিদুল ইসলাম পুন্নু আবারও সভাপতি মনোনীত হয়েছিলেন।

মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ভয়াবহ বন্যায় নিহত ২৪

মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে বন্যায় নিহত হয়েছে ২৪ জন। এক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় মালয়েশিয়ায় নিহত হয়েছে অন্তত ১০ জন। সীমান্তের ঠিক ওপাশে অবস্থিত থাইল্যান্ডে ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে শুরু হওয়া বন্যায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১৪ জন। বন্যার ফলে বাস্তচ্যুত হয়েছে ২ লাখেরও বেশি মানুষ। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। মালয়েশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায়ই বন্যা হয়। তবে এ বছর এর তীব্রতা একটু বেশিই ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে ঝড়ের তীব্রতা আরও মারাত্মক হবে, পূর্বাভাস দেয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। মালয়েশিয়ায় বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ প্রদেশ কেলান্টানে নিহত হয়েছে ৫ জন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ৮০ হাজার মানুষ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এ সপ্তাহে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কিছু অঞ্চল সফর করেছেন। কেলান্টানে পানির উচ্চতা কিছুটা কমে আসলেও, এখনও বিপদজনক মাত্রায় রয়েছে। এর আগে মালয়েশিয়ান সরকার বলেছে, কেলান্টান ও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অব্যাহত বৃষ্টিপাত আরও এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

এটিএম আজহারের ফাঁসি

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আজ বেলা সাড়ে ১২টায় এর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে সকালে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় আনা হয়। সোয়া ১১টার দিকে রায় পড়া শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল ও এর আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দোয়েল চত্বর থেকে ট্রাইব্যুনালের দিকের সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বাইরে প্রস্তুত রাখা হয়েছে পুলিশের সাঁজোয়া যান। ট্রাইব্যুনালে প্রবেশের সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে।

দিনাজপুরে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৫

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে এক মহিলাসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২ যাত্রী। আহতদের বীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের  মধ্যে ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আজ সকাল পৌনে ৯টায় বীরগগঞ্জ উপজেলার ঢেপা নদী সেতু সংলগ্ন নিজপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। নিহতরা হলেন- মো. কুরবান আলী (৪৫), শামিমা আকতার (৩০) ও লায়লা বেগম (১৯)। তাৎক্ষণিক বাকিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যাত্রীবাহী বাসটি দিনাজপুর থেকে পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে একটি মোটরসাইকেলকে পাশ কাটতে গিয়ে ঘন কুয়াশার কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলে বাসের এক শ্রমিকসহ দু’জন নিহত হয়। আহত হয় কমপক্ষে ১৩ জন। আহতদের স্থানীয় বীরগঞ্জ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে আরও একজনের মৃত্যু হয়।
তবে বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে. এম. শওকত হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ৩ জন নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। এ রিপোর্ট খেলা পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

সাগরের তলদেশে থাকতে পারে নিখোঁজ এয়ার এশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার নিখোঁজ বিমানটি সাগরের তলদেশে থাকতে পারে। দেশটির অনুসন্ধান ও উদ্ধারবিষয়ক সংস্থার প্রধান বামবাং সোইলিসটিও এ কথা বলেছেন। তবে রোববার এয়ার এশিয়ার এয়ারবাস এ-৩২০-২০০ ইন্দোনেশিয়ার সুরাবাইয়া থেকে ১৬২ আরোহী নিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর কেটে গেছে পুরো দুদিন। কিন্তু গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিমানটি ও এর আরোহীদের ভাগ্যে কি ঘটেছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কেউ কিছুই বলতে পারে নি। ধারণা করা হচ্ছে, আরোহীদের সবাই মারা গেছেন। অনেকে এ ঘটনাটিকে মালয়েশিয়ার এমএইচ ৩৭০ ফ্লাইটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলেও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট এ বিষয়ে একমত নন। তিনি মনে করেন এমএইচ ৩৭০ এর মতো এটা কোন রহস্য নয়। এ বিমানটি খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে। ওদিকে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আজ থেকে বর্ধিত এলাকায় শুরু হচ্ছে এ অভিযান। বিমানটি সুরাবায়া থেকে উড্ডয়নের ৪২ মিনিট পরেই এর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটি যাচ্ছিল সিঙ্গাপুর। সর্বশেষ বিমানটিকে দেখা গিয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার বেলিতুং ও বোর্নিওর পোনতিয়ানাক দ্বীপের মধ্যবর্তী এলাকার আকাশে। ওদিকে এই ফ্লাইটের বেশির ভাগ আরোহীই ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। ফলে পুরো দেশ যেন শোকে স্তব্ধ। আরোহীদের স্বজনরা শোকে কাতর। উদ্ধার অভিযানে বিভিন্ন দেশের ৩০টি জাহাজ ও বিমান অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় পদ্ধতিতে চলছে অভিযান। এতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এখনও উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় এয়ার এশিয়া কোম্পানি এখনই কোন ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত অস্ট্রেলিয়ান বিমান পি-৩ সি অরিয়ন পাংকালান বুন থেকে ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে পানিতে ভাসমান কিছু দেখতে পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো এয়ার এশিয়ার কিউজেড ৮৫০১ ফ্লাইটের ধ্বংসাবশেষ। তবে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। তারা এখন নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন আসলে ওই ভাসমান বস্তু কিসের। ওদিকে উদ্ধার অভিযানে ‘আন্ডার ওয়াটার লোকেটর বিকন’ (ইউএলবি) নামে গভীর পানিতে উদ্ধার অভিযানে একটি ডাটা রেকর্ডার পাঠানো হচ্ছে। এটি পানির নিচে ডুবে প্রতি এক সেকেন্ডে ৩৭.৫ কিলোহার্টজের সিগন্যাল পাঠাবে। ওই সিগন্যাল পরীক্ষা করে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হতে চাইছে, পানির নিচে আসলে বিমানটির কোন ব্ল্যাকবক্স আছে কিনা। ওদিকে প্রিয়জন হারানো স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। তারা শুধু জানতে চাইছেন বিমানটির কি হয়েছে? এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কাল্লা। সেখানে আত্মীয়-স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা। গতকালের মতো অভিযান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন বামবাং সোইলিসটি। তিনি বলেন, আজ আবার অভিযান শুরু হবে। উদ্ধার অভিযানের আওতায় আনা হবে পশ্চিম কালিমানতান এলাকা। গতকাল আবহাওয়া ভাল থাকলেও উদ্ধার অভিযানে লিপ্ত হেলিকপ্টারগুলো কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারে নি। তবে একটি এলাকায় দেখা গেছে তেল ভাসতে। তবে তারা নিশ্চিত নন তা বিমান ধস থেকে সৃষ্ট কিনা। সেখানেও তারা আজ অভিযান চালাবেন। ওদিকে এয়ার এশিয়ার কর্মকর্তা টনি ফার্নান্দেজ বলেছেন, এই অভিজ্ঞতা তার জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ। তারা এর আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন এয়ার এশিয়ার বিমান কখনও হারিয়ে যাবে না। কিন্তু তা মিথ্যা প্রমাণ হওয়ায় ক্ষমা চেয়েছে এয়ার এশিয়া। তাদের ওই ঘোষণা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। বলা হয়, মালয়েশিয়ার এমএইচ ৩৭০ বিমান নিখোঁজ হওয়ার পরে তারা এই ঘোষণা দিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায় উন্নতি। তবে এয়ার এশিয়া বলেছে, তারা মালয়েশিয়ার বিমান নিখোঁজ হওয়ার আগে ওই ঘোষণা দিয়েছিল একটি ম্যাগাজিনে। টনি ফার্নান্দেজ বলেছেন, প্রিয়জন হারানো স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। টুইটার বার্তায় তাদেরকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেছেন, ওই ফ্লাইটের ক্রু ও যাত্রীদের স্বজনদের জন্য আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দেশটির বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বলেছে, উদ্ধার অভিযানে দুটি বিশেষজ্ঞ দল ও গভীর পানিতে ডিটেক্ট করতে পারে এমন লোকেটর দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সিঙ্গাপুর। সে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে ইন্দোনেশিয়া। এরপরই সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত হয়েছে সিঙ্গাপুরের উদ্ধারকারী দল। তারাই বিমানটির ব্ল্যাকবক্স উদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন।

ভৈরবে মাথা উদ্ধারের ঘটনায় সুমনা ও নজরুল রিমান্ডে

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে পরিবহন ব্যবসায়ী নবী হোসেন হত্যাকা‌ণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া সুমনা বেগম ও নজরুল ইসলামের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত-২–এ হাজির করে তাঁদের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। বিচারক হামিদুল ইসলাম শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কায়েস আকন্দ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমনা ও নজরুল হত্যাকা‌ণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এখন জানা দরকার, কতজন লোক নিয়ে লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের বিশ্বাস, লম্বা সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে বাকি লোকজনের নাম ও পরিচয় পাওয়া যাবে এবং খুনের প্রকৃত রহস্য বের হয়ে আসবে।
গত রোববার ভোরে পৌর শহরের চিজণ্ডবের দক্ষিণপাড়া মহল্লার শহীদ জিয়া তোরণ এলাকার একটি আস্তাকুঁড় থেকে নবীর মাথা ও পরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সড়কসেতু এলাকা থেকে হাত ও পা উদ্ধার করা হয়। গত বৃহস্পতিবার পৌর শহরের মালাগুদাম এলাকা থেকে হাত-পা-মাথাবিহীন একটি খণ্ডিত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভৈরব শহর থেকে রাসেল মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে গত রোববার ভোরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বিজেশ্বর এলাকা থেকে নজরুল ইসলাম (৩৮) ও সুমনা বেগম (৩০) নামে নবীর আরও দুই পূর্বপরিচিত ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ খুন হওয়া ব্যবসায়ীর মাথা ও হাত-পা উদ্ধার করে।
সহকারী পুলিশ সুপার (বাজিতপুর সার্কেল) মৃত্যুঞ্জয় দে ও ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বদরুল আলম তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন নজরুল ও সুমনা। নজরুল ও সুমনার ভাষ্য অনুযায়ী সহকারী পুলিশ সুপার জানান, দুজনেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা। দুজনের মধ্যে একসময় প্রেম ছিল।
পরে সুমনার অন্যত্র বিয়ে হয়। এরপর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে সুমনা তাঁর একটি কন্যাসন্তান নিয়ে ভৈরবে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। এর মধ্যে নবীর সঙ্গে সুমনার প্রেম হয়। তবে কিছুদিন ধরে নজরুল ও সুমনার মধ্যে আবার সম্পর্কের উন্নতি হয়। নবী তাঁদের সম্পর্কে বাধা দেওয়ায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সুমনার বাসায় ২৩ ডিসেম্বর তাঁকে হত্যার পর লাশ কয়েক টুকরা করে বিভিন্ন স্থানে সেগুলো ফেলা হয়।
নবীর স্ত্রী বিলকিস বেগম বলেন, সুমনা নামের নবীর দূর সম্পর্কের এক বোন আছে বলে তিনি জানেন। তবে তাঁদের দুজনের মধ্যে আর কোনো সম্পর্কের কথা তাঁর জানা নেই।
সুমনা যে বাসায় থাকতেন, সেই বাড়ির মালিক রওশন আরা বেগম বলেন, সুমনা চার বছর ওই বাসায় থাকতেন। স্বামী পরিচয়ে নবী প্রায়ই এখানে আসতেন। ভাড়া ও সংসার খরচ তিনিই দিতেন। তবে ইদানীং নবী আর ঠিকমতো সংসারের খরচ দিচ্ছেন না বলে জানিয়ে গত বুধবার বাসা ছেড়ে চলে যান সুমনা।

ট্রেন-কাভার্ড ভ্যান সংঘর্ষ, নিহত ৬

কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে স্টেশনমুখী একটি ট্রেনের সঙ্গে কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ৬ জন। নিহতরা হলেন- নাঈম ইসলাম (১৬), মজিবুর রহমান (৬০), আলমগীর হোসেন (৪৫), অজ্ঞাত আরও ৩ জন। এরমধ্যে দু’জন পুরুষ, একজন মহিলা। এছাড়া, আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশত ট্রেনযাত্রী। এর মধ্যে গুরুতর আহত ১৪ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। ঘটনা তদন্তে রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাজমুল হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ট্রেনযাত্রীরা জানান, গতকাল দুপুরে
নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি লোকাল ট্রেন কমলাপুর রেল স্টেশনে যাচ্ছিল। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ট্রেনটি স্টেশনের পাশের কনটেইনার ডিপোতে ঢুকে পড়ে। এসময় ডিপোর পশ্চিম পাশের এসএম কার্গো সার্ভিসেস লিমিটেডের একটি কাভার্ড ভ্যান (ঢাকা মেট্রো ট-১১-৮৮৫৪) ঘোরানোর জন্য রেললাইনের ওপর তুলে দেয়। এতে ট্রেনের ইঞ্জিনের পরের বগিতে সজোরে ধাক্কা লাগে। কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশ ট্রেনের বগির ওপর উঠে যায়। কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশসহ ট্রেনের ওই কামরাটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একদিকে হেলে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার করে। এসময় ট্রেনের বগির ভেতর থেকেই একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া, কাভার্ড ভ্যানের ইঞ্জিনের অংশ থেকে চালকের সহযোগীর লাশ উদ্ধার করা হয়। চালকের ওই সহযোগীই কাভার্ড ভ্যানটি চালাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পরপরই কামরার ভেতরে আটকেপড়া যাত্রীরা চিৎকার করতে থাকে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ ট্রেনের অন্য কামরার যাত্রীরা তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। ট্রেনের জানালা ও দরজা দিয়ে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করে আনা হয়। হরতাল থাকায় ট্রেনটি যাত্রীতে ঠাসা ছিল। আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারের পর গুরুতর আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আরও চার জন নিহত হন। ট্রেন-কাভার্ড ভ্যান সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে ছুটে যান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, রেল পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলামসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থলে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, কাভার্ড ভ্যানটির চালক হয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, নয়তো তার গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাসুদ নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি ডিপোর ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি ট্রেন আসছিল। অপরদিকে পশ্চিম পাশের কাভার্ড ভ্যানটি পূর্বদিকে যাচ্ছিল। কাভার্ড ভ্যানটি ট্রেন লাইনের উপরে চলে আসলে ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এ সময় কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশ এবং ট্রেনের ইঞ্জিনের  পেছনের বগিটি আঘাতে হেলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী শিশু আল আমিন জানায়, গেণ্ডারিয়া থেকে ট্রেনে উঠেছিল সে। কমলাপুর আসার সঙ্গে সঙ্গে একটা ট্রাক ট্রেনের উপরে চলে আসে। কাশেম নামে ট্রেনের ইঞ্জিনের পেছনের বগির ছাদে থাকা এক যাত্রী বলেন, ট্রেনটি যখন স্টেশনের আগে কনটেইনার ডিপোতে ঢোকে, কাভার্ড ভ্যানটি তখন পশ্চিম থকে পূর্বের দিকে যাচ্ছিল। গতিও খুব বেশি ছিল না। কিন্তু ট্রেন দেখেও চালক না থামিয়ে এগিয়ে গেলে প্রথমে ইঞ্জিনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং কাভার্ড ভ্যানটি ঘুরে গিয়ে ইঞ্জিনের পেছনের বগিতে সজোরে আঘাত করে। ওই অবস্থায় লরিটি প্রায় ২০ গজ ছেঁচড়ে নিয়ে ট্রেনটি থেমে যায়। ডিপোর ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মিজান নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ট্রেন আসতে দেখে ডিপোর আনসার সদস্যরা কাভার্ড ভ্যান চালককে থামার সঙ্কেত দিয়েছিলেন। কিন্তু চালক না থামিয়ে ট্রেন লাইন পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এরপর চোখের পলকে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। তিনি বলেন, ইঞ্জিনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর লরিটি ছিটকে এসে ধাক্কা দিলে পেছনের বগিটি কাত হয়ে লাইনে পড়ে যায়। ওই অবস্থায় ট্রেন আরো এগিয়ে যাওয়ায় কাভার্ড ভ্যানের চেসিস পুরো ভেঙেচুরে যায় এবং ট্রেনের বগির একপাশ ভেঙে দুমড়ে যায়।
আইসিডি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরো আইসিডির মাঝ বরাবর দিয়ে রেল লাইন। পূর্ব ও পশ্চিম পাশে মালামাল লোড করার জন্য কাভার্ড ভ্যানগুলো অবস্থান করে। কখনো পূর্ব পাশে আবার কখনো পশ্চিম পাশে মালামাল লোড করা হয়। দুই পাশে লোহার গেট থাকার কথা থাকলেও কোন পাশেই পুরো লোহার গেট ছিল না। দুই পাশেই  অল্প একটু লোহার গেট ছিল। লোহার গেট না থাকার কারণে কাভার্ড ভ্যানটি রেল লাইনের উপরে ওঠে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এছাড়া, কাভার্ড ভ্যানটি চালক না চালিয়ে তার সহযোগী চালাচ্ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আনসার বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে গেটটি নেই। গেটটি থাকলে হয়তো আজ এ ঘটনা ঘটতো না। কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি আবদুল মজিদ জানান, ঘটনাস্থলেই দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে পাঠানোর পর আরো চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় রেলওয়ের সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন মণ্ডল বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
এদিকে হাসপাতাল সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পর দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৫  জনকে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে চারজনকে মৃত ঘোষণা করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা। দুর্ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে নিহতদের সবার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যালে আরো এগারো জন ভর্তি আছেন। তারা হলেন- বাবুল হোসেন (৪৩), নাসির হোসেন (৩০),  গোলাম মোস্তফা (২৫), বিল্লাহ (২৭), অজ্ঞাত পুরুষ (৪০), দিলদার (৪০), জাবেদ আলী (৪০), মিজানুর রহমান (৩০), হারুনুর রশীদ হারুন (৪০), সাবের হোসেন (৩৫), সুমন (৩৫)। আহতদের মধ্যে নাসির, গোলাম  মোস্তফা, অজ্ঞাত পুরুষসহ তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) পাঠানো হয়েছে। আহত সুমন জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় থাকেন। পেশায় বাসের হেলপার। ডিউটি করার জন্য তিনি নারায়ণগঞ্জের ওই লোকাল ট্রেনে করে ঢাকায় আসছিলেন। ওই ট্রেনের ইঞ্জিনের তৃতীয় বগির দরজার সামনে তিনি বসা ছিলেন। কমলাপুর রেলস্টেশন কাছাকাছি হওয়ায় ট্রেনের গতি কম ছিল। ট্রেনটি যখন কনটেইনার ডিপো পার হচ্ছিল এসময় একটি কনটেইনারবাহী কাভার্ড ভ্যান ট্রেনের দ্বিতীয় বগিকে ধাক্কা দেয়। এতে ওই বগির অধিকাংশ যাত্রীসহ আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীরা আহত হন। আমি আতঙ্কে ট্রেনের দরজা দিয়ে লাফ দেয়ায় কোমরে এবং বাম পায়ে আঘাত পাই। আহত গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি দুর্ঘটনাকবলিত দ্বিতীয় বগিতে ছিলেন। বগিতে তিলধারণের ঠাঁই ছিল না। অনেকে ঝুলেও ছিলেন। ওই বগির কম বেশি সবাই আহত হয়েছেন। ওই ট্রেনের যাত্রী রেলওয়ের কর্মচারী ওয়েম্যান এনামুল হক জানান, তিনি ওই ট্রেনের পেছনে বসা ছিলেন। ট্রেনটির গতি কম হওয়ায় বগিটি হেলে যায়। অনেক যাত্রী আতঙ্কে লাফিয়ে পড়েন। নিহত নাঈম ইসলামের খালু আব্দুর রশিদ জানান, নাঈমের পিতার নাম ইউনুস আলী। তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার খোদাবকশকাটি এলাকায়। সে স্থানীয় নেসারিয়াবাদ এলাকার একটি আলিয়া মাদরাসার নবম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি আরো বলেন, গত ১০ দিন আগে নাঈম গ্রামের বাড়ি থেকে তাদের বাড়ি ঢাকার কমলাপুরে আসে। সে আমাদের বাড়িতেই ছিল। নিহত মজিবুরের স্ত্রী সকিনা বেগম জানান, তার স্বামী মিরপুরের শেয়ালবাড়ির ৭ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। ব্যানারের কাঠির ব্যবসা করতেন। তিনি বলেন, গতকাল ভোর সাড়ে ৫টায় তিনি নারায়ণগঞ্জে মাল সরবরাহ করতে যান। পরে সেখান থেকে ট্রেনে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান। তাদের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। মজিবুরের পিতার নাম আবদুল হক। তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং এলাকায়। এদিকে দুর্ঘটনার পর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল পাঁচটার দিকে উদ্ধারকাজ শেষ হলে এ রুটে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

২ দিনের হরতাল ডেকেছে জামায়াত

দলের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদ-ের আদেশের পর দুই দিনের হরতাল ডেকেছে জামায়াত। আজহারকে ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যার সরকারি ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে এ হরতাল ডাকা হয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে জামায়াত। এতে বলা হয়েছে, আগামীকাল ভোর ছয়টা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত হরতাল চলবে। একইভাবে পরের দিন ভোর ছয়টা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত হরতাল থাকবে। এ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ী, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ী হরতালের আওতামুক্ত থাকবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ  এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে জামায়াত নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে। সরকারের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের শিকার জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল জনাব এটিএম আজহারুল ইসলাম। সরকার মিথ্যা, বায়বীয় ও কাল্পনিক অভিযোগে জনাব এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে নিজেদের দলীয় লোকদের দ্বারা আদালতে মিথ্যা স্বাক্ষ্য প্রদান করে। আদালত সরকারের দায়ের করা মিথ্যা মামলায়, সাজানো সাক্ষীর ভিত্তিতে আজ তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের যে রায় ঘোষণা করেছেন তা একটি ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। এ রায়ে জনাব এটিএম আজহারুল ইসলাম ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে আপীল করবেন। উচ্চ আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করলে তিনি খালাস পাবেন বলে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি।
সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য বিচারের নামে যে প্রহসনের আয়োজন করেছে, দেশে-বিদেশে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। সরকারের মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যে প্রতীয়মান হয় যে, আদালতের বিচার কার্যক্রম সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের প্রতিবাদ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচী সরকারী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে। আর সরকারের যে কোন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। সরকার ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত বিচার কার্যক্রমকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকার বিচারের নামে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার জন্য যে ষড়যন্ত্র করছে তা জনগণ নিরবে মেনে নিতে পারে না।

‘ভোঁতা তলোয়ার দিয়ে সরকার হটাতে চাইছে বিএনপি’

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির হরতাল এখন ভোঁতা তলোয়ার। ধারালো বিহীন ভোঁতা তলোয়ার দিয়ে সরকার হটাতে চাইছে বিএনপি। হরতাল ডেকে বিএনপি নেতাকর্মীরাই মাঠে থাকেন না। বিএনপি নেতাকর্মীরা এসি রুমে বসে হরতাল ডেকে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করছে। ভোঁতা তলোয়ারের মত এই হরতাল ডেকে বিএনপি লাভবান হতে পারবে না। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া চৌরাস্তায় পদ্মা সেতুর এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনকালে সেতু মন্ত্রী এ সব কথা বলেন। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন- পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প, সেতু বিভাগ, সড়ক ও জনপথের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

‘মৃত’ শিশু জীবিত হয়ে এখন ইনকিউবিটরে

বাংলাদেশের জয়পুরহাটের একটি ক্লিনিকে প্রসবের পর একটি নবজাতক শিশুকে মৃত ঘোষণা করা হলেও পরে দাফনের সময় তাকে জীবিত আবিষ্কার করার ঘটনা ঘটেছে। রোববারের সে ঘটনার পর সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রথমে জেলা শহরের হাসপাতালে নেয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শিশুটি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে। পরে বগুড়ায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়ে। সময়ের আগেই জন্ম হওয়ায় শিশুটিকে এখন সেখানের একটি ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে। শিশুটির বাবা মুনিরুল ইসলাম আজ মঙ্গলবার বিবিসি বাংলার সকালে অধিবেশনে দেয়া এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন বিস্তারিত। তিনি জানান, তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা ওঠার পর রাত দুটার দিকে জয়পুরহাটের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। ক্লিনিকে রাতে  নেয়ার পর তার স্ত্রীকে দোতলায় নিয়ে গেলো এবং দু মিনিটও হয়নি  ডেলেভারী হয়ে গেলো। আতঙ্কে উপরে উঠিনি। তারা (চিকিৎসক) বললো মরা বাচ্চা। শুনে মাথা খারাপ হয়ে গেলো। ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলো। যেই মাইক্রোবাসে এসেছিলাম সেটায় করেই আবার বাড়ি রওনা হলাম। তিনি বলেন, বাবা-মা-শ্বশুর তো দেখবে। তারা দেখে বললো বাচ্চা তো নড়তেছে। পরে মোটর সাইকেলে করে সকাল ৬টার দিকে জয়পুরহাট নিয়ে গেলাম। কিন্তু ডাক্তার পেলাম না। তিনি আরও বলেন, নয়টার দিকে বাচ্চাটিকে নিয়ে তিনি সদর হাসপাতালে যান এবং সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে বেলা ১২টার দিকে ডাক্তার বললো বগুড়ার হাসপাতালে নিয়ে  যেতে। এখন বাচ্চা কেমন আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন সাত মাসের বাচ্চা তো। ইনকিউবিটরে আছে। ডাক্তাররা বলছেন আল্লাহ চাইলে ভালো হবে। জয়পুরহাটের ক্লিনিকে বাচ্চাটিকে কে মৃত ঘোষণা করলো বা পরে বাচ্চাটি জীবিত নিশ্চিত হওয়ার পর ওই ক্লিনিকের কারও সঙ্গে কথা বলেছেন কি-না জানতে চাইলে ইসলাম বলেন, আমরা তো বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত। তাই ওদিকে নজর দেয়ার সুযোগ পাইনি।

এয়ার এশিয়ার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ ও ৪০ মৃতদেহ উদ্ধার

নিখোঁজ এয়ার এশিয়া ফ্লাইট অনুসন্ধান অভিযানে কমপক্ষে ৪০ টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে বিবিসি। এছাড়া জাভা সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় বিমানের সম্ভাব্য ধংসাবশেষ শনাক্ত করা গেছে। তবে ওই ধ্বংসাবশেষ প্রকৃতপক্ষে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বিমানটির কিনা তা এখনও নিশ্চিত করা যায় নি। এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট কিইজেড ৮৫০১ রবিবার ১৬২ আরোহী নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জুয়ান্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়ে যায়। এ খবর আসার পরপরই শুরু হয় ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা। উদ্ধার অভিযানের তৃতীয় দিনে উদ্ধারকর্মীরা কমপক্ষে ৪০ টি মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হলেন।

ইংরেজি নববর্ষ, অনুমতি ছাড়া ক্লাবে অনুষ্ঠান নয়

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ হওয়ায় জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আজহারকে আদালত ফাঁসির নির্দেশ দেওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রায়কে স্বাগত জানাই। রায়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছ বলে তিনি জানান। সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, উপপ্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

জাভা সাগর থেকে ৪০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার

(টিভিতে জাভা সাগরে এক লাশ ভাসার দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনেরা। ছবিটি জুয়ান্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত ক্রাইসিস সেন্টার থেকে তোলা। ছবি: রয়টার্স) জাভা সাগর থেকে ৪০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করেছে ইন্দোনেশিয়ার নিখোঁজ বিমানের সন্ধানে তল্লাশি চালানো উদ্ধারকারী দল। আর এ সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর মুখপাত্র মারাহান সিমোরাংকির। ধারণা করা হচ্ছে, মরদেহগুলো নিখোঁজ বিমানের যাত্রীদের। আজ মঙ্গলবার এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ইন্দোনেশিয়ার অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা সংস্থার প্রধান বামবাং সোয়েলিসতিয়ো জাকার্তায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে বোর্নিও দ্বীপের কালিমানতা প্রদেশের পাংকালান বান শহরের ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজ থেকে উদ্ধারকর্মীরা সাগরতলে বিমানের আদলে একটি ছায়ার মতো জিনিস দেখতে পান। এ ছাড়া একটি বস্তু ভাসতে দেখেন। তাঁরা ধারণা করেন ভাসমান ওই বস্তুটি একটি মৃতদেহ। এর পরপরই উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সবাই সেই এলাকায় অনুসন্ধানে বেশি মনোযোগ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাগরে ভাসমান বস্তুর সেই ফুটেজ দেখানো হয়। ফুটেজ টেলিভিশনে দেখে সুরাবায়া শহরে বিমানের নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনেরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় একজন অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
গত রোববার ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়া শহর থেকে ১৬২ জন আরোহী নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল এয়ার এশিয়া ইন্দোনেশিয়ার ফ্লাইট কিউজেড ৮৫০১। ওই দিন ভোর ৬টা ২০ মিনিটে যাত্রাপথের প্রায় মাঝামাঝি গিয়ে নিখোঁজ হয় এটি। ওড়ার ঘণ্টা খানেক পর এয়ারবাস কোম্পানির এ৩২০-২০০ উড়োজাহাজটির সঙ্গে বিমান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে এটি থেকে কোনো বিপদসংকেত আসেনি।
এয়ার এশিয়ার অতিরিক্ত প্রধান নির্বাহী টনি ফারন্যানদেস এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সুরবায়াতে যাওয়ার পথে তিনি তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘বিমানে থাকা যাত্রীদের পরিবারের জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।’

শহিদুল আইজিপি, বেনজীর র‌্যাবের ডিজি

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) শহিদুল হককে আইজিপি, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদকে র‌্যাবের ডিজি এবং হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া সিআইডি’র এডিশনাল আইজি মোখলেছুর রহমানকে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন পুলিশ ধান, র‌্যাব প্রধান ও ডিএমপি প্রধানের বাড়ি বৃহত্তর ফরিদপুরে। শহীদুলের বাড়ি শরীয়তপুরে, বেনজীরের বাড়ি গোপালগঞ্জে এবং আসাদুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ কল্যাণে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শহীদুল হক ১৯৮৪ সালের বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৬ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে আসা এই পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালনের পর ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে এসেছিলেন তিনি। সর্বশেষ অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। র‌্যাবের নতুন মহাপরিচালক বেনজীরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তিনি পড়াশোনা করেছেন ইংরেজিতে। বর্তমানে পিএইচডি করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৮৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয়া বেনজীর সন্ত্রাস দমন বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে বসনিয়া ও কসোভোতে কাজ করে এসেছেন তিনি।

‘রায়ে জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে’

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ হওয়ায় জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আজহারকে আদালত ফাঁসির নির্দেশ দেওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রায়কে স্বাগত জানাই। রায়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছ বলে তিনি জানান। সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, উপপ্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

‘মৃত’ শিশু জীবিত হয়ে এখন ইনকিউবিটরে

বাংলাদেশের জয়পুরহাটের একটি ক্লিনিকে প্রসবের পর একটি নবজাতক শিশুকে মৃত ঘোষণা করা হলেও পরে দাফনের সময় তাকে জীবিত আবিষ্কার করার ঘটনা ঘটেছে। রোববারের সে ঘটনার পর সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রথমে জেলা শহরের হাসপাতালে নেয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শিশুটি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে। পরে বগুড়ায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়ে। সময়ের আগেই জন্ম হওয়ায় শিশুটিকে এখন সেখানের একটি ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে। শিশুটির বাবা মুনিরুল ইসলাম আজ মঙ্গলবার বিবিসি বাংলার সকালে অধিবেশনে দেয়া এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন বিস্তারিত। তিনি জানান, তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা ওঠার পর রাত দুটার দিকে জয়পুরহাটের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। ক্লিনিকে রাতে  নেয়ার পর তার স্ত্রীকে দোতলায় নিয়ে গেলো এবং দু মিনিটও হয়নি  ডেলেভারী হয়ে গেলো। আতঙ্কে উপরে উঠিনি। তারা (চিকিৎসক) বললো মরা বাচ্চা। শুনে মাথা খারাপ হয়ে গেলো। ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলো। যেই মাইক্রোবাসে এসেছিলাম সেটায় করেই আবার বাড়ি রওনা হলাম। তিনি বলেন, বাবা-মা-শ্বশুর তো দেখবে। তারা দেখে বললো বাচ্চা তো নড়তেছে। পরে মোটর সাইকেলে করে সকাল ৬টার দিকে জয়পুরহাট নিয়ে গেলাম। কিন্তু ডাক্তার পেলাম না। তিনি আরও বলেন, নয়টার দিকে বাচ্চাটিকে নিয়ে তিনি সদর হাসপাতালে যান এবং সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে বেলা ১২টার দিকে ডাক্তার বললো বগুড়ার হাসপাতালে নিয়ে  যেতে। এখন বাচ্চা কেমন আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন সাত মাসের বাচ্চা তো। ইনকিউবিটরে আছে। ডাক্তাররা বলছেন আল্লাহ চাইলে ভালো হবে। জয়পুরহাটের ক্লিনিকে বাচ্চাটিকে কে মৃত ঘোষণা করলো বা পরে বাচ্চাটি জীবিত নিশ্চিত হওয়ার পর ওই ক্লিনিকের কারও সঙ্গে কথা বলেছেন কি-না জানতে চাইলে ইসলাম বলেন, আমরা তো বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত। তাই ওদিকে নজর দেয়ার সুযোগ পাইনি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

শিবিরের সভাপতি জব্বার, সেক্রেটারী আতিকুর

২০১৫ সেশনের জন্য বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল জব্বার এবং সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মো. আতিকুর রহমান। আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় ছাত্রশিবির। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজ সকাল ১০ টায় রাজধানীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় সভাপতির নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত পরিষদের অধিবেশনে নব নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সভাপতির নাম ঘোষণা করেন সহকারী নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ। এরপর সাংগঠনিক নিয়ম মেনে তিনি নতুন সভাপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এর আগে গত ২৭শে ডিসেম্বর থেকে ২৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে সারাদেশে এক যোগে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার এর আগে চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিন ও চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, অফিস সম্পাদক, ২০১২-১৩ সেশনে সেক্রেটারী জেনারেল ও ২০১৪ সেশনে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। নব মনোনীত সেক্রেটারি জেনারেল আতিকুর রহমান এর আগে ঢাকা মহানগরী উত্তর সভাপতি, কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, অফিস সম্পাদক এবং ২০১৪ সেশনে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণত প্রতি বছর ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা এবং শপথ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের ফলে গত চার বছরের মতো এবার সদস্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা ও সেক্রেটারি জেনারেল মনোনয়ন কার্যকরী পরিষদের অধিবেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়।

শিবিরের সভাপতি জব্বার, সেক্রেটারী আতিকুর

২০১৫ সেশনের জন্য বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল জব্বার এবং সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মো. আতিকুর রহমান। আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় ছাত্রশিবির। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজ সকাল ১০ টায় রাজধানীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় সভাপতির নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত পরিষদের অধিবেশনে নব নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সভাপতির নাম ঘোষণা করেন সহকারী নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ। এরপর সাংগঠনিক নিয়ম মেনে তিনি নতুন সভাপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এর আগে গত ২৭শে ডিসেম্বর থেকে ২৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে সারাদেশে এক যোগে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার এর আগে চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিন ও চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, অফিস সম্পাদক, ২০১২-১৩ সেশনে সেক্রেটারী জেনারেল ও ২০১৪ সেশনে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। নব মনোনীত সেক্রেটারি জেনারেল আতিকুর রহমান এর আগে ঢাকা মহানগরী উত্তর সভাপতি, কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, অফিস সম্পাদক এবং ২০১৪ সেশনে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণত প্রতি বছর ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা এবং শপথ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের ফলে গত চার বছরের মতো এবার সদস্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা ও সেক্রেটারি জেনারেল মনোনয়ন কার্যকরী পরিষদের অধিবেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়।

মেয়র আরিফ কারাগারে

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় আত্মসমর্পণের পর সিলেট সিটি করপোরেশন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। আজ সকাল সোয়া ৯টায় হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন তিনি। এরপর বিচারক তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে গত ২৮শে ডিসেম্বর একই মামলায় এ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন হবিগঞ্জের পৌর মেয়র জিকে গউছ। বিচারক রোকেয়া আক্তার জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠান। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার  বৈদ্যেরবাজারে জনসভা শেষে বের হওয়ার পথে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন।

স্বৈরশাসন বেশিদিন টেকে না by শিমুল বিশ্বাস

বাংলাদেশে এখন চলছে একদলীয় স্বৈরশাসন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত তবুও এটাকে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার বলা যেত; কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন একদলীয় অবৈধ নির্বাচনের পর এটাকে অবৈধ একদলীয় স্বৈরশাসন ছাড়া আর কিছুই বলা যাচ্ছে না। একটি অনির্বাচিত অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় চেপে বসলে দেশের জনগণকে যেসব সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় সেগুলো মোকাবেলা করতে করতে মানুষ এখন সরকারকে এতটাই অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, শাহজাহানপুরে শিশু জিহাদের মৃত্যুর কঠিন বাস্তবতাকেও অনেকেই রেশমা নাটকের মতো সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির সাজানো নাটক মনে করেছিল। জনগণ এই সরকারকে ভোট দেয়নি, জনগণ তাদের সমর্থন করে না, জনগণ তাদের ক্ষমতায়ও দেখতে চায় না। কিন্তু তারপরও এই সরকার জোরপূর্বক অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে আছে।
সরকারের এই টিকে থাকাটা এখন শুধু আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসরদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে। তারা গত ছয় বছরে যত খুন, গুম, দুর্নীতি, অত্যাচার করেছে, তাতে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর গণরোষ থেকে তাদের বাঁচার কোনো উপায় তারা নিজেরাই দেখতে পারছে না। ঠিক বাঘের পিঠে চেপে বসার মতো, জোর করে বসে না থেকে কোনো উপায় নেই, কারণ পিঠ থেকে নামলেই বাঘের হাতে নিশ্চিত মৃত্যু।
তারপরও সাধারণ মানুষ আশা করেন বিএনপি এবং অন্য বিরোধী দলগুলো আন্দোলন করে এই সরকারের পতন ঘটাবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনকে সম্মান করে রাষ্ট্র ক্ষমতা ত্যাগ করাটা একটি গণতান্ত্রিক আচরণ। আগেই বলেছি যেহেতু এই সরকার মোটেও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, তাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন এরা যে কোনো উপায়ে দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতিহত করবেই। এটাই অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী একনায়কদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি এই ভূখণ্ডেও অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী একনায়কের পতন হয়েছে গণআন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে, দাবিও আদায় করা হয়েছে গণআন্দোলনের মাধ্যমেই।
রাজনৈতিক নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন আর গণআন্দোলনে বিস্তর তফাৎ। রাজনৈতিক আন্দোলন হয় রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারিত পন্থায় রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে। আর গণআন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান হয় গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সাধারণ জনগণের নেতৃত্বে। রাজনৈতিক নেতারা পরে সেই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন, সেটাও ওই গণমানুষের চাপেই।
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যে আন্দোলন, সেটার সূত্রপাত কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার মাধ্যমে হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে মতামত দিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতারা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে ভাষা মতিনের নেতৃত্বে ওই দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়, বাকিটা ইতিহাস।
স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যখন চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হয়, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তখন জেলে। ঊনসত্তরের সেই উত্তাল গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বও দিয়েছিল ছাত্র-জনতা, এককথায় গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের চাপেই রাজনৈতিক নেতারা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। আইয়ুব খানের পতন হয়েছিল।
একই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। সেই সময় শীর্ষ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা না দিয়ে পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আর বাকি নেতারা গিয়েছিলেন আত্মগোপনে। গণমানুষকে নিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সেনাবাহিনী-ইপিআর-পুলিশ ও সর্বস্তরের সাধারণ জনতা। গণমানুষের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরুর কারণেই মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় ‘গণযুদ্ধ’। শহীদ জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে গণযোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই রাজনৈতিক নেতারা চাপে পড়ে এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আবার যদি ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের কথা চিন্তা করা যায়, সেখানেও একই ঘটনা ঘটেছে। এরশাদের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা এবং সমর্থন না থাকলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের নির্বাচন করে ’৮৬ সালে সে একটা বৈধতা নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু জনগণের বৈধতা সেটা ছিল না। বিএনপিসহ অন্যান্য সমমনা রাজনৈতিক দল আগাগোড়াই এরশাদবিরোধী আন্দোলন করে গেলেও ’৮৩ থেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন করে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই ’৯০ সালে ডা. মিলন হত্যার পর এরশাদবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ার পর অন্যান্য রাজনৈতিক দল আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে এগিয়ে আসে। বর্তমান স্বৈরাচারের মতো এরশাদেরও কৌশল ছিল রাজনৈতিক দলের নেতাদের হত্যা, দমন, নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বাগে রেখে আন্দোলনমুক্ত থাকা। যে কারণে গণআন্দোলনেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।
এই অবৈধ সরকারের বিদায়ের জন্যও গণঅভ্যুত্থানমুখী গণআন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা সবাই জানি একটি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির বর্ষীয়ান ও সিনিয়র নেতারা ভদ্র প্রকৃতির। তবে অনেককেই সমালোচনা করতে শোনা যায়, হয়তো জেল-জুলুমের ভয়ে বা সহায়-সম্পত্তি হারানোর দুশ্চিন্তায় নেতারা কঠোর আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে দ্বিধা করছেন। অবশ্য স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার যেভাবে পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাব ব্যবহার করে সামান্য মৌন মিছিলেও বডিলাইনে গুলি করে মানুষ খুন করে, সারা দেশে প্রায় দশ লাখ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে পাইকারি হারে মামলা দিয়ে, একদিকে পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে অন্যদিকে আদালতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে লক্ষাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী জেলে পাঠিয়ে নির্যাতন করছে, তাতে রাজনৈতিক নেতাদের ভীত হওয়াটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়।
তবে এ কথা সত্য, রাজনৈতিক দলের আন্দোলনকারীরাই এই সরকারের প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল করে দিয়েছে। গত বছর এই সময় যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছিল, তখনও এরা ১৪৪ ধারা জারি করেনি। কিন্তু এখন তারা বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করে সরকারবিরোধী গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন ঠেকাতে বাধ্য হচ্ছে। এর সহজ-সরল অর্থ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ লীগের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে এখন আর সরকারবিরোধীদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন মোকাবেলা করা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকার এখন ১৪৪ ধারার আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে- ১৯৫২, ৬২, ৬৯, ৭১ এবং ৯০ সালেও আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল এবং সেই প্রতিটি আন্দোলনের শেষ সাফল্য কিন্তু এসেছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই। ব্রিটিশদের ১৪৪ ধারা, আইয়ুব খানের ১৪৪ ধারা, ইয়াহিয়ার ১৪৪ ধারা, এরশাদের ১৪৪ ধারা আর হাসিনার ১৪৪ ধারার মধ্যে কোনো পার্থক্যই নেই। তাই আন্দোলনে সফল হতে হলে এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করারও কোনো বিকল্প নেই। দেশের নিরংকুশ মানুষ এখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন দেখতে চায় এবং বিএনপিকে আন্দোলনের অগ্রভাগে দেখতে চায়। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যে পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, আন্দোলন সেই পর্যায়ে না দেখে ব্যাপক সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে জনগণের পাশাপাশি সাধারণ কর্মী ও সমর্থকরা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সময়ের দাবিতে অতীতে বারবার সাধারণ কর্মী ও সমর্থকরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছে এবং স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। এবারের আন্দোলনও গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে বাধ্য। অতীতের চেনা পথে সরকারের আন্দোলন দমনের চেষ্টা অব্যাহত থাকলে সময়ের প্রয়োজনে নতুন পথেই এবারের আন্দোলনে সাফল্য আসবেই বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
যারা এই ক্রান্তিকালে সরকারবিরোধী দুর্বার আন্দোলন না করার কারণে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের তীব্র সমালোচনা করছেন এবং বিরূপ মন্তব্য করছেন, তারাও এখন গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে এগিয়ে আসতে পারেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এগিয়ে আসতে পারেন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতাদের সামনে অতীতের দৃষ্টান্ত নতুন করে তুলে ধরতে। ’৫২ থেকে ’৯০ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের আলোতে জাতির বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা এই অবৈধ স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারকে সরানোর কাণ্ডারি হিসেবে পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে। আন্দোলনের পথেই সব দ্বিধা, সংশয়, সন্দেহ, অবিশ্বাস পরাজিত হবে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই গণতন্ত্রের সংগ্রামে জাতি আবার বিজয়ী হবে ইনশাআল্লাহ।
শিমুল বিশ্বাস : বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী

২ দিনের হরতাল ডেকেছে জামায়াত

দলের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদ-ের আদেশের পর দুই দিনের হরতাল ডেকেছে জামায়াত। আজহারকে ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যার সরকারি ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে এ হরতাল ডাকা হয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে জামায়াত। এতে বলা হয়েছে, আগামীকাল ভোর ছয়টা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত হরতাল চলবে। একইভাবে পরের দিন ভোর ছয়টা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত হরতাল থাকবে। এ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ী, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ী হরতালের আওতামুক্ত থাকবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ  এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে জামায়াত নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে। সরকারের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের শিকার জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল জনাব এটিএম আজহারুল ইসলাম। সরকার মিথ্যা, বায়বীয় ও কাল্পনিক অভিযোগে জনাব এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে নিজেদের দলীয় লোকদের দ্বারা আদালতে মিথ্যা স্বাক্ষ্য প্রদান করে। আদালত সরকারের দায়ের করা মিথ্যা মামলায়, সাজানো সাক্ষীর ভিত্তিতে আজ তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের যে রায় ঘোষণা করেছেন তা একটি ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। এ রায়ে জনাব এটিএম আজহারুল ইসলাম ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে আপীল করবেন। উচ্চ আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করলে তিনি খালাস পাবেন বলে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য বিচারের নামে যে প্রহসনের আয়োজন করেছে, দেশে-বিদেশে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। সরকারের মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যে প্রতীয়মান হয় যে, আদালতের বিচার কার্যক্রম সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের প্রতিবাদ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচী সরকারী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে। আর সরকারের যে কোন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। সরকার ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত বিচার কার্যক্রমকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকার বিচারের নামে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার জন্য যে ষড়যন্ত্র করছে তা জনগণ নিরবে মেনে নিতে পারে না।

জিহাদ ট্রাজেডি by ড. মাহবুব উল্লাহ্

অপঘাতে মৃত্যু যেন এ দেশের মানুষের নিয়তি হয়ে গেছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন বাংলাদেশ সৃষ্টির অব্যবহিত পর লিখেছিলেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি হয়নি। স্বাভাবিক মৃত্যুর পাশাপাশি অস্বাভাবিক মৃত্যুও বেড়ে চলেছে। এরকম মৃত্যু হয় কখনও ক্রসফায়ারে, কখনও গুম হওয়ার মধ্য দিয়ে, কখনও পুলিশি হেফাজতে, কখনও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়, কখনও লঞ্চডুবিতে, আবার কখনও রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্বৃত্তপনায়। দেশে আইনের শাসন থাকলে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু একেবারে নিশ্চিহ্ন না হয়ে গেলেও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসত। আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু সুশাসন পাইনি। পাইনি মানবাধিকার তো দূরের কথা, তিনটি স্বাভাবিক অধিকার। এই স্বাভাবিক অধিকারগুলো হল- আইন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা থেকে বেঁচে থাকার অধিকার, বৈধ পন্থায় অর্জিত সহায়-সম্পদ রক্ষার অধিকার এবং স্বাধীন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এ অধিকারগুলোকেই সংক্ষেপে লাইফ, লিবার্টি অ্যান্ড প্রোপার্টি বলে চিহ্নিত করেছিলেন পাশ্চাত্যের এক দার্শনিক।
এগুলো শুধু পাশ্চাত্য দর্শনের কথাই নয়, এগুলো আমাদের ধর্মীয় বিধিবিধানেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব অধিকার না থাকলে মনুষ্যত্বে ও পশুত্বে কোনো পার্থক্য থাকে না। দাস সমাজে মানুষকে ভারবাহী পশুর মতোই গণ্য করা হতো। আফসোস, আজও আমরা দাস যুগের বর্বরতা থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এ জন্যই কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? এজন্যই কি শতপ্রাণ বলিদান করেছিল? ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলতেন, কোনো শাসক স্বেচ্ছায় মানুষকে অধিকার দেয় না, অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল আত্মত্যাগের। ব্রিটিশ শাসনের অন্তিমলগ্নে ভারতব্যাপী বিক্ষুব্ধ মানুষের অশান্ত উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন শুনে কবি কিশোর সুকান্ত লিখেছিলেন, অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি / জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি / অবাক পৃথিবী অবাক যে বারবার / দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার। সুকান্তের এই কবিতা বঙ্গদেশে বহু কণ্ঠে আবৃত্ত হয়েছে। কবিতাটি গান হিসেবেও পরিবেশিত হয়েছে। ইংরেজ গেল, পাকিস্তানিরাও গেল, এখন তো আমরাই আমাদের দেশ চালাই। কিন্তু অবাক হওয়ার পালা শেষ হল না। একে কী বলব? এটা কি আমাদের জাতীয় দুর্ভাগ্য! রবিঠাকুর লিখেছিলেন, হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাহাদের তুমি করিয়াছো অপমান / অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। আমরা উত্তরোত্তর অপমানের শিকার হচ্ছি। কিন্তু যারা আমাদের অপমান করছে তারা অপমানিতদের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে এমনটি ঘটতে কদাচই দেখা যায়। অন্যায়, অপমান, দুরাচার, নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতন আমাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে পড়েছে। আমরা প্রতিবাদে কুণ্ঠিত। আমাদের শোধ-বোধও নেই। নির্বাক, নিরুত্তর থাকাতেই আমরা নিরাপদ বোধ করি। আমরা যে এসব বুঝি না তা নয়। কিন্তু আমাদের উপলব্ধির চেতনা থেকেও আত্মসংরক্ষণের চেতনা অনেক বেশি প্রখর। আমরা এখন বিশ্রী রকমের স্বার্থপর হয়ে গেছি। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা- এটাই আমাদের টিকে থাকার কৌশলে পরিণত হয়েছে। তা না হলে অজস্র অন্যায় ও অবিচারের মধ্যেও আমরা কীভাবে কিছু হয়নি, কিছু ঘটেনি এমন ভাব করতে পারি। আমরা সবাই যেন আধমরা হয়ে গেছি। কিন্তু এ আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচানোর জন্য তরুণরা কই? আমার এই অনুভূতির সঙ্গে অনেকেই হয়তো একমত হবেন না। তারা বলবেন, খণ্ড বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ তো হচ্ছে। যেমনটি হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। এ সপ্তাহে হল শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে। এ ধরনের প্রতিবাদ প্রদীপের দপ করে জ্বলে ওঠার পর নিভে যাওয়ার সঙ্গেই তুলনীয়। তাই এসব থেকে স্থায়ী ফল আসে না। সমগ্র দেশবাসী এক প্রাণ একাট্টা হয়ে যদি প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠত, তাহলে কিছু ফল পাওয়া যেত। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। অনেকেই বলবেন, এরকম বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ থেকে বৃহত্তর প্রতিবাদের জন্ম হবে। জনগণের পুঞ্জীভূত ক্রোধ, হতাশা এবং বেপরোয়া মনোভাব হয়তো একদিন একটি বড় বিক্ষোভের জন্ম দেবে। কিন্তু এরকম কিছু ঘটা সম্ভব নাও হতে পারে। ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়। ফিলিপাইনের মার্কোস, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, চিলির পিনোশে, স্পেন ও পর্তুগালের ফ্রাংকো ও সালাজারের শাসন মানুষ চোখ বুজে বহু বছর সহ্য করেছে। মনে হয়, রাতের অন্ধকার মাত্র নেমেছে। প্রভাতি সূর্যের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এমন হতাশা প্রকাশ ছাড়া কি-ই বা করার আছে! তারুণ্যে দুঃসাহসী প্রতিবাদী ছিলাম। পাকিস্তানি শাসনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আমার কণ্ঠ থেকে আগুন ঝরত। স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি (২২ ফেব্র“য়ারি ১৯৭০) উত্থাপন করার অপরাধে সামরিক আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে আমার বিচার হয়েছিল। সামরিক আদালত আমাকে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৫ বেত্রদণ্ডের সাজা দিয়েছিল। কোর্ট দারোগা এ শাস্তির কথা শুনে আমাকে ক্ষমা ভিক্ষার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি ঘৃণা ভরে সেই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, আপনি কি বোঝেন বেত্রদণ্ডের পরিণতি কী? আমি বলেছিলাম, পরিণতি সম্পর্কে আমার জানা আছে। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পর ময়মনসিংহের কমরেড কাজী আবদুল বারীকে বেত্রদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এর ফলে তিনি চিরজীবনের জন্য শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। কারোর কারোর ক্ষেত্রে পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়। যেমন কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া কিংবা পঙ্গু হয়ে যাওয়া। পাকিস্তানে জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে শত শত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বেত্রদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। এসব বেত্রদণ্ড দেয়া হতো খোলা মাঠে। জনসমক্ষে। মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
আমি আমার নিজের কথা বলছিলাম। জীবনের অনেকগুলো বছর পার হয়ে এসে মনে হয় আমার সত্তারও পরিবর্তন হয়েছে। আমি আর ষাটের দশকের মতো প্রতিবাদী নই। বয়স, রোগ-শোক ও পারিবারিক দুর্যোগে হতাশা আমাকে ঘিরে ধরেছে। আরও হতাশ হই এ কথা ভেবে, সব পরিবর্তনই শুভ নয়। কোনো কোনো পরিবর্তনের মধ্যে অনেক অশুভ লুকিয়ে থাকে। তাই আশা করব আগামীর পরিবর্তন যেন নতুন ধরনের অশুভের জন্ম না দেয়। এটুকু আশা নিয়ে শত হতাশার মধ্যেও বেঁচে থাকতে চাই।
গত শুক্রবার দুপুরের খাবার খেয়ে শিশু জিহাদ মায়ের কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। মাও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর জিহাদ ঘুম থেকে জেগে উঠে তার খেলার সাথীদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে বাইরে বেরিয়ে যায়। সেখানে ছোটাছুটি করতে গিয়ে সে একপর্যায়ে একটি পরিত্যক্ত ঢাকনাবিহীন গভীর নলকূপের মধ্যে পড়ে যায়। নলকূপটির ব্যাস ছিল ১৭ ইঞ্চি। নলকূপটি ছিল ৩০০ ফুট গভীর। অর্থাৎ ৩০০ ফুট গভীরেই সে পড়ে গিয়েছিল। ওই সময় তার মানসিক অবস্থা কী দাঁড়িয়েছিল তা বর্ণনাতীত। তার খেলার সাথীরা খবর দিল সে নলকূপের মধ্যে পড়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে স্থানীয়রা নলকূপের গভীরে রশি ঢুকিয়ে জিহাদকে উদ্ধারের চেষ্টা করে। কিন্তু অত লম্বা রশি না থাকায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। প্রায় আধঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ৩টি দল ঘটনাস্থলে এসে নলকূপ থেকে জিহাদকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ওয়াসা ও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। রাত ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা শিশুটির কান্নার আওয়াজও শুনেছে। তাদের ডাকে সাড়াও দিয়েছে। রাত ১১টার দিকে বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে আসে। প্রায় একই সময়ে ওয়াসার একটি দল ঘটনাস্থলে এসে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে। ওয়াসা এবং বুয়েট ও প্রতিনিধি দলের পরামর্শের পর লোহার তিনটি পাইপ একত্র করে ক্যাচার তৈরি করে পাইপের ভেতরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই ক্যাচারের মুখে ওয়াসার জন্য সদ্য আমদানি করা শক্তিশালী বোর হোল ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সদ্য আমদানি করা ক্যামেরাটি প্রস্তুত করতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় হয় বিশেষজ্ঞদের। ওই সময় ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হয়, অত্যাধুনিক ওই ক্যামেরাটি দুই হাজার বর্গফুট পর্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে ছবি এবং শব্দ পাঠাতে সক্ষম। সর্বশেষ রাত ১টায় ক্যামেরাসহ বিশেষভাবে তৈরি ক্যাচার পাইপের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। রাত পৌনে তিনটার দিকে ক্যামেরার ছবি মনিটরে ভেসে ওঠে। এতে একটি পুরনো স্যান্ডেল, কিছু মরা তেলাপোকা ও টিকটিকি আর একটি রশির ছবি ভেসে ওঠে। তবে পানির পাইপটির গভীরতা প্রায় ৭০০ ফুট বলা হলেও ক্যামেরাসহ ক্যাচারটি পাইপের ভেতরে ২৮০ ফুট পর্যন্ত গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। এর নিচেই ছিল ময়লা আবর্জনার স্তূপ। প্রায় আধঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পর ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ তদারকিতে থাকা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রাত সোয়া তিনটার দিকে সাংবাদিকদের জানান, পাইপের ভেতর শুধু জীবিত নয়, মৃত কোনো মানুষের অস্তিত্ব মেলেনি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হচ্ছে কি-না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাইপের ভেতর থাকা ময়লা তুলে ফেলার পর আমরা আরেকবার দেখব। তবে আমরা নিশ্চিত, পাইপের ভেতর কোনো মানুষ নেই। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর চলে যাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ওই ময়লা-আবর্জনা তুলে আনার পর আরেক দফা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। মূলত তখন থেকেই উদ্ধার অভিযানে শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। শনিবার সকাল থেকে ফায়ার সার্ভিস ও ওয়াসার সমন্বয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। টানা কয়েক ঘণ্টা অভিযানের পর দুপুর আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আহাম্মদ আলী ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন। এর পরই শুরু হয় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্ধার অভিযান। অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণার ১৫ মিনিটের মধ্যেই তারা শিশু জিহাদকে পাইপের ভেতর থেকে অচেতন অবস্থায় বের করে আনেন। জিহাদকে উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের হাতেই তুলে দেন স্বেচ্ছাসেবীরা। শিশুটিকে উদ্ধারে খাঁচার মতো নিজস্ব বিশেষ ধরনের জাল বা ক্যাচার ব্যবহার করেন বলে স্বেচ্ছাসেবীরা জানান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জিহাদকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হল, শিশুটি উদ্ধারের আগ পর্যন্ত শাহজাহানপুর থানা জিহাদের বাবাকে বারো ঘণ্টা আটকে রাখে। এমনকি কোথায় জিহাদকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে জানাতে তাকে উল্টো ভয়ভীতিও দেখানো হয়। র‌্যাবের হাতে তুলে দেয়ারও ভয় দেখানো হয়। জিহাদের বাবার এ অবর্ণনীয় দুরবস্থা দেখে মনে হয় তার সন্তান দুর্ঘটনায় পড়ে যাওয়াতে তিনি বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের একটি প্রবণতা হচ্ছে সবকিছুর মধ্যেই ষড়যন্ত্র ও নাশকতার গন্ধ খুঁজে পাওয়া। ইচ্ছাকৃত নয় এমন দুর্ঘটনার জন্যও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করা হয়। দেশের ১৬ কোটি উদ্বিগ্ন মানুষের জন্য স্বস্তির বিষয় হল শেষ পর্যন্ত জনউদ্যোগেই মৃত জিহাদকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। উন্মোচিত হয়েছে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কুটিল চেষ্টা। নিশ্চয়ই ঊর্ধ্বতন কোনো মহল থেকে স্থানীয় পুলিশকে এ আচরণ করতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল। পুরো আচরণটি নার্ভাসনেসেরই বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনাদের ওপর নির্দেশ ছিল, Shoot at any moving particle অর্থাৎ নড়ছে-চড়ছে এমন কোনো ধূলিকণার ওপরও গুলি চালাতে হবে। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি শুনলেও তার ওপর গুলি চালাতে হবে। মার্কিনিরা ভিয়েতনামেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল। ভিয়েতনামের জঙ্গলে ভিয়েতকংরা (ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধা) বন-জঙ্গলের মধ্যে কোথাও জড়ো হলে সেখানকার বাতাসে কার্বন-ডাইন-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে সেই জায়গাটি চিহ্নিত করার জন্য স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো। সে রকম আভাস পেলে সেখানে মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হতো। এতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বনভূমির বিপুল ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ভিয়েতকংদের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। এ ধরনের মানসিকতা যে নার্ভাসনেস থেকে সৃষ্টি হয়, তার মূলে রয়েছে ক্ষমতায় টিকে থাকার ব্যাপারে আস্থার অভাব। সরকার কি সেই আস্থা শূন্যতায় ভুগছে? এর কারণ কি ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন?
যাই হোক, শিশু জিহাদের ট্রাজেডি থেকে আমরা যা শিখলাম তার সারকথা হল, শাহজাহানপুরের ঢাকনাবিহীন নলকূপের মতো অজস্র মৃত্যুফাঁদ সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। এসব মৃত্যুফাঁদ তৈরি হয়েছে উন্নয়ন কাজের নামে। এসব মৃত্যুফাঁদ থেকে দুর্ঘটনা রোধে কোনো প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। এটা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতা। এর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। দাবি করতে পারে দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীদের কঠোর শাস্তির। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা সত্য ধামাচাপা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সত্য সত্যই। সত্য আপন গৌরবে উদ্ভাসিত হয়। কোনো রকম অস্বীকৃতি সত্যকে চাপা দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। ভারতের এক সময়কার রেলমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী একটি রেল দুর্ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। অথচ রেল দুর্ঘটনার জন্য তিনি কোনোক্রমেই সরাসরি দায়ী ছিলেন না। আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল যদি লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন, তাহলে সেটা কি তার দলের জন্য ভালো হবে না? জনাব কামাল ভেবে দেখবেন।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

ভিন্নমত দমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী by মো. আবুসালেহ সেকেন্দার

ডিসেম্বর-মার্চ এলেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গদগদ করি। যদিও প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী, তা বোঝার চেষ্টা করি না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভেতরে ধারণ করতে চাইলে ধান্ধাবাজি করা যাবে না সে বিষয়টি অবশ্য জানি! তাই বাইরেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হতে চাই! এমন চেতনাধারীর সংখ্যাই এখন বেশি এটা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। আর এ কথিত চেতনাধারীরা তাদের স্বার্থবিরোধী সত্য কথা বললে যাকে-তাকে রাজাকার আখ্যা দিতে উঠেপড়ে লেগে যায়। কিন্তু এরা জানে না, সব শুদ্ধ মতের মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য।
সত্য প্রকাশকারীদের পাকিস্তানিদের মতো দেশবিরোধী, ইসলামবিরোধী আখ্যা দেয়াটা আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হতে পারে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মনে হয়, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দূরে ঠেলে দিয়ে পাকিস্তানি চেতনায় ফিরে যাচ্ছি। তাই ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে পাকিস্তানিদের কৌশল অবলম্বন করে যাকে-তাকে স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার অথবা ইসলাম ধর্মবিরোধী, নাস্তিক ইত্যাদি বলছি।
দুই. ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের স্বার্থবিরোধী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করেছিল, তাদের হয় ভারতের চর নয়তো নাস্তিক উপাধি দিয়ে দেশ ছাড়ার সব বন্দোবস্ত করেছিল। যারা জম্মভূমির মায়ায় এদেশ ছেড়ে যেতে চায়নি, তাদের ওপর নেমে এসেছিল জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়ন। আর এক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীরা ছিল তাদের চোখের বালি। বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার ও দাবি-দাওয়াকে সমর্থন করলেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ইয়াহিয়া গংদের দৃষ্টিতে বুদ্ধিজীবীদের হতে হয়েছিল ধর্মদ্রোহী অথবা ভারতের দালাল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী আল-বদর, আল-শামস, রাজাকাররা বাঙালি নিধনকে বৈধতা দিতেও এ তত্ত্ব ব্যবহার করেছিল। তারা প্রচার করেছিল, ইসলাম ধর্মকে রক্ষা ও ভারতের দালালকে প্রতিহত করতেই তাদের এ অভিযান। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংগ্রাম পত্রিকার পাতায় পাতায় তৎকালীন বদর বাহিনী নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিষয়টি স্পষ্ট।
তিন. শুধু একাত্তরে অথবা পাকিস্তানি সামরিক শাসনামলে নয়, প্রতিটি যুগে বা দেশে সত্য কথা বলা, মজলুমদের পক্ষে অবস্থান নেয়া মানুষদের শাসকগোষ্ঠী নানা মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে হয় দেশ ছাড়া, নয়তো হত্যা করেছে। নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে। সে কারণেই হয়তো বিশ্বকবি বলেছেন : সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম। সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, যেসব ক্ষণজন্মা মনীষী বিশ্বকবির মতো সত্যকে ভালোবেসেছেন, তারা সবাই পদে পদে হয়েছেন লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অপমানিত। শাসকগোষ্ঠী তাদের ওপর চালিয়েছে নির্যাতন-নিপীড়নের স্টিম রোলার। বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও সত্য বলার কারণে পেয়েছিলেন ধর্মদ্রোহী উপাধি। বাইবেলে আছে : পৃথিবী স্থির, অনড়, সৌরজগতের কেন্দ্র। তিনি বলেছিলেন : পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তার এ কথা শুনে ধর্মযাকরা ক্ষেপে গেল। ১৬৩৩ সালে অসুস্থ, বৃদ্ধ বিজ্ঞানীকে করা হল বিচারের মুখোমুখি। আদালত থেকে তার ধ্যান-ধারণাকে ভ্রান্ত ও ধর্মবিরোধী আখ্যায়িত করে পরিত্যাগের কঠোর নির্দেশ দেয়া হল। পাশাপাশি দণ্ডাদেশের কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য তাকে সিয়েনায় একঘরে জীবনযাপন করতে হয়েছিল দীর্ঘদিন। খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিস্টকেও সত্য কথনের কারণে ক্রুসবিদ্ধ করে হত্যা করেছিল ইহুদিরা।
চার. আরবে জাহেলিয়া যুগে বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) জন্মেছিলেন সত্যের আলোকবর্তিকা হয়ে। তিনি প্রচার করেছিলেন মহান আল্লাহ প্রেরিত সত্য ধর্ম ইসলাম। আরবদের কাছে আল-আমিন বা বিশ্বাসী হয়ে ওঠা মহানবী (সা.) যখনই মহান আল্লাহর সত্য বাণী প্রচার শুরু করলেন, আরবদের প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে কথা বললেন, তখনই তিনি আরবদের কাছে হয়ে উঠলেন ধর্মদ্রোহী। নানা নির্যাতন-নিপীড়ন নেমে এল মহানবী (সা.) ও তার অনুসারীদের ওপর। আরবরা মহানবীকে (সা.) শুধু রক্তাক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাঁকে বলা হল নাস্তিক। শত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও প্রলোভনেও যখন মহানবীকে (সা.) ইসলাম প্রচার থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি, তখন মক্কার কোরাইশ দলপতিরা হজরত মোহাম্মদের (সা.) মতাদর্শ প্রতিহত করতে সামাজিক সভা আহ্বান করে তাঁকে নাস্তিক বলে অভিহিত করে। মোহাম্মদ আকরম খাঁর ভাষায় : বর্তমান সভায় সেইজন্য সামাজিক শাসনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রতিজ্ঞাপত্রে লিখিত হয়, হাশেম ও মোত্তালেব গোত্রের সহায়তার ফলেই মোহাম্মদের স্পর্ধা এতদূর বেড়ে যাচ্ছে। অতএব তাদের এবং মোহাম্মদ ও তার দলের সাহাবিদের (নাস্তিক বা লা-মজহাবি) একদম বয়কট করতে হবে (মোস্তফা-চরিত্র, কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ১৯৫)।
তাই প্রশ্ন জাগে, স্বাধীন বাংলাদেশে একশ্রেণীর ধর্ম ব্যবসায়ী বাছবিচার না করে বিরুদ্ধ মতের হলেই যাকে-তাকে নাস্তিক বলে কি সেই জাহেলিয়া যুগের আরবদের মতোই আচরণ করছে না? আর যাকে-তাকে রাজাকার বলাও কি পাকিস্তানিদের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়?
পাঁচ. ভিন্নমতাবলম্বীদের মতকে যুক্তি নয়, অস্ত্রের মাধ্যমে মোকাবেলা করার পাকিস্তানি মানসিকতা স্বাধীন বাংলাদেশেও দেখা যায়। সামরিক শাসনামলে ভিন্ন মত বা পথের মানুষ হওয়ার কারণে গোপনে বহু সামরিক-বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা না হলেও নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। হামলা-মামলার বহু ঘটনা ঘটেছে। সত্য বলায় বারবার বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো মহীয়সী নারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলেও যে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে, তা বলা যাচ্ছে না। কেউ আওয়ামী লীগ বা সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ইত্যাদি বলে দমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু মতের পার্থক্য থাকার কারণে অনেককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে শহীদ মিনারে। অথচ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিন্নমত সহজে গ্রহণ না করার ফলই আজকের শহীদ মিনার, স্বাধীন বাংলাদেশ। আজ আমরা সেই স্বাধীন বাংলাদেশেই ভিন্নমতকে যুক্তির মাধ্যমে নয়, শক্তির মাধ্যমে প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে আমরা চিন্তাচেতনায় কি সেই পাকিস্তানের দিকেই ফেরত যাচ্ছি?
আমরা ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সব মতের সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে একমত নাও হতে পারি। তবে এই মতভিন্নতার কারণে যারা তাদের শহীদ মিনারে নিষিদ্ধ করছে অথবা রাজাকার বলছে তাদেরও সমর্থক নই। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের ভাষায় বলতে চাই : আমি তোমার মত মানি না, কিন্তু তুমি যাতে অবাধে বলতে পার, তার জন্য আমি নিজের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। এটা শুধু ভলতেয়ারের কথা নয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনাও বটে।
ছয়. সরকারের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে কথা বললেই সেটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়ে যায় না। রাষ্ট্র ও সরকার আলাদা দুটি সত্তা। ১৯৪৭ থেকে ৭১ (যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে বাদে) দেশপ্রেমিক রাজনীতিকরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শিক্ষক, সাংবাদিক তথা বুদ্ধিজীবীরা সত্য কথা বলেছিলেন। এই রুখে দাঁড়ানোর কারণ ছিল গণতন্ত্রহীনতা। আজ দেশ যদি আবার সেই গণতন্ত্রহীনতার পথে হাঁটে, আর কেউ গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেন, তবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্র“ নন, বরং প্রকৃত বন্ধু।
আজ যারা দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে কথা বলছেন, তাদের রাজাকার বলে গালি দেয়া, শহীদ মিনারে নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করে, তাকে প্রতিহত করা যেতেই পারে। আর সেই ষড়যন্ত্রকারী যে শুধু বিরোধী দলেই থাকবে এমনটি ভাবার কারণ নেই। সরকারি দলে থেকেও কেউ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করতে পারে। এমন উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে আছে ভূরি ভূরি। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্বাসীদের উচিত হবে কাউকে রাজাকার বলার আগে তার অবস্থানকে বা বক্তব্যকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা। কেউ সত্য বললে তা মেনে নেয়া। বিশ্বকবির ভাষায়: ভালো মন্দ যাহাই আসকু/সত্যেরে লও সহজে।
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সঙ্গে দক্ষতার সামঞ্জস্য থাকতে হবে by ধীরাজ কুমার নাথ

অষ্টম বেতন ও চাকরি কমিশন প্রায় এক বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে গত ২১ ডিসেম্বর সরকারের কাছে তাদের সুপারিশ পেশ করেছে। ইতিপূর্বে ৭ বার পে-কমিশন গঠিত হয়েছিল ১৯৭৩, ১৯৭৬, ১৯৮৫, ১৯৯০, ১৯৯৭, ২০০৫ ও ২০০৯ সালে। তার মধ্যে ১৯৮৫ সালে বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল। তবে এবার ২০১৪ সালের সুপারিশে, যা ২০১৫ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হতে পারে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা দ্বিগুণ বা তারও বেশি করার সুপারিশ করা হয়েছে। সপ্তম পে-কমিশন সচিবদের বেতন ৪০ হাজার টাকা সুপারিশ করেছিল, সেখানে বর্তমানে ৮০ হাজার টাকা সুপারিশ করা হয়েছে এবং সিনিয়র সচিবরা পাবেন ৮৮ হাজার টাকা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্যসচিব পাবেন ৪৫ হাজারের পরিবর্তে ১ লাখ টাকা অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি। এটি একটি উদারভিত্তিক সুপারিশ, যার ফলে সরকারি নিজস্ব কোষাগারের ওপর সরাসরি চাপ বাড়বে প্রায় ৬৪ শতাংশ। তবে সরকার কর্তৃক ২০১২ সালে প্রদত্ত ২০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা বর্তমান বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হবে। একজন বিসিএস কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশের শুরুতে পাবেন প্রায় ২৫ হাজার টাকা। অবশ্য কমিশন ২০টি স্কেলের পরিবর্তে ১৬টি গ্রেডের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া পিতা-মাতাকে পরিবারের সদস্য বিবেচনা করে আগের ৪ সদ্যসের স্থলে ৬ সদস্য করে পরিবারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২০০ টাকা করার প্রস্তারের অর্থ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ধার্য করা হয়েছে ১ অনুপাত ৯ দশমিক ৭৬ (১:৯.৭৬) অর্থাৎ নিুপদস্থ কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১ : ৮ করার দাবি পূরণ হয়নি।
বেতন-ভাতা সম্পর্কিত সুপারিশ ছাড়াও এ কমিশনের অন্য কিছু সুপারিশ লক্ষণীয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, প্রেষণসহ সব রকমের ভাতা বাতিল এবং ডেপুটেশন না রাখা। তবে বাড়ি ভাড়া ভাতা যৌক্তিক করতে চার ধরনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হচ্ছে, এমপিওভুক্ত স্কুলগুলো তাদের ছাত্রদের বেতন থেকে যে রাজস্ব পায় তার একটি অংশ সরকারের রাজস্ব খাতে জমা দেয়া। এ ছাড়াও পেনশনের হার শতকার ৯০ ভাগে উন্নীত করা এবং ২০ বছরে স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা যায়। বর্তমান সরকারি কল্যাণ ফান্ডকে পুনর্গঠিত করে বীমা ব্যবস্থাপনা, পেনশন ফান্ড ব্যবস্থাপনা এবং কল্যাণ ফান্ড ব্যবস্থাপনা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়াও স্থায়ী বেতন ও চাকরি কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
লক্ষণীয়, সরকার সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখে শিক্ষা খাতে, কিন্তু শিক্ষার মান কি বেড়েছে? দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ক’দিন আগে অভিমত প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের কর্মকাণ্ড। অবশ্যই দুটি খাতে নিয়োজিত সরকারি চাকরিজীবীরা এজন্য বহুলাংশে দায়ী। জাতির দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সবচেয়ে সম্মানিত পদে অধিষ্টিত ব্যক্তিরাই দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানে অবস্থান করেন। অনেকে সুশাসন নিয়ে বই লিখেছেন, দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে সুনাম অর্জন করেছেন এবং একই সঙ্গে সব ধরনের দুর্নীতিতে ‘সুনাম’ অর্জন করছেন। বিচিত্র এই দেশ!
শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রীদের মান-সম্মান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য খাতে রোগীদের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হচ্ছে। রোগীরা দেশের বাইরে চিকিৎসা নেয়ায় প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন শুধু চিকিৎসার লক্ষ্যে ভারতযাত্রীদের জন্য ভিসা সেন্টার খুলছে। এমনটি ভাবা যায়!
সাম্প্রতিক কিছু খবর দেশবাসীকে নিদারুণভাবে হতাশ করেছে। শুধু শিক্ষক ও চিকিৎসদের কথা বললে ভুল হবে। প্রশাসনে নিয়োজিত কিছু উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা মানসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে জাল মুক্তিযোদ্ধা সাটিফিকেট নিয়ে নৈতিকতাকে বিসর্জনের নির্দশন স্থাপন করেছেন এবং অনেকে সুকৌশলে জনগণকে প্রতারিত করছেন। চরম অবক্ষয় দৃশ্যমান হচ্ছে জনবল নিয়োগে, সরকারি কেনাকাটায় এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আচরণে।
আমার বক্তব্য বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিরুদ্ধে নয়। আমার অভিমত হচ্ছে, বেতন দ্বিগুণ করার সঙ্গে সঙ্গে চারিত্রিক গুণাবলীর উন্নতি হবে কি-না এবং তার কোনো সুপারিশ এই কমিশন করেছে কি-না? খুশি হতে পারতাম যদি দেখা যেত এ কমিশন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তির সুপারিশ করেছে। প্রতারণা করে জাল সার্টিফিকেট গ্রহণকারী উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তি প্রদানের সুপারিশ করার প্রয়োজন ছিল। এবারের কমিশন হচ্ছে পে অ্যান্ড সার্ভিসেস কমিশন; তাই সরকারি কর্মচারীদের আচরণ বিধিমালায় কঠোর ও বৈপ্লবিক কিছু সুপারিশ করার প্রয়োজন ছিল। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক, প্রভু নয়- এমন মানসিকতার উন্মেষ ঘটাতে না পারলে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না। সরকারি কর্মচারীরা প্রকাশ্যে কোনো দলের হয়ে কথা বলবেন, রাজনৈতিক দলের সভায় উপস্থিত হয়ে স্লোগান দেবেন, শেয়ার মার্কেটে গিয়ে বিচরণ করবেন- এমনটি কি চলতেই থাকবে? সরকারি কর্মচারীদের আচরণ বিধিমালার পরিবর্তন প্রয়োজন। তাছাড়া বর্তমানে প্রচলিত সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫-এর আওতায় শাস্তি প্রদান করা কঠিন। তাই প্রয়োজন ডিজিটাল পদ্ধতি উদ্ভাবন করে সুপারিশ করা যাতে শাস্তি প্রদান কঠোর, অথচ সহজ ও দ্রুত হয়। বেতন-ভাতা বাড়বে কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, শুদ্ধাচরণের জন্য কোনো সুপারিশ থাকবে না, এমনটি ঠিক নয়।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ১৩ লাখ। তাদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দিতে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়বে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য বাড়বে বলে অনেকে আশংকা প্রকাশ করলেও সরকারিভাবে তা স্বীকার করা হচ্ছে না। কিন্তু এই যে গত পে-কমিশনের তুলনায় ৫ বছরে বেতন দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে গত ৫ বছরে দ্রব্যমূল্যও ৫ গুণ বেড়েছে। তাহলে সরকারের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অথবা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি কি ভুল?
২০০৩ সালে আমি যখন সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করি, তখন সচিবদের সর্বোচ্চ বেতন ছিল ১৫ হাজার টাকা এবং সে হিসাবেই পেনশন পেয়েছি। এই ১২
বছরে কি তা ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে? এই হিসাবটা সঠিকভাবে করা হয়েছে কি-না সন্দেহ আছে। বাড়ি ভাড়া ও জমির দাম
ছাড়া অনেক কিছুরই মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে বলে ধরা যায়। তারপরও বলতে হয়, বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব সমর্থনযোগ্য। কারণ, সরকারি কর্মচারীদের ধার-দেনা করতে হবে কেন?
তবে একটি কথা ভুললে চলবে না, তা হচ্ছে- সরকারি কর্মচারীদের জীবনধারা হতে হবে সুুনিয়ন্ত্রিত ও কঠোর আত্মসংযমী (Strictly self-disciplined life maintaining austerity)। শিক্ষকদের হতে হবে আর্দশ চরিত্রের অধিকারী এবং চিকিসৎকদের
হতে হবে সেবার প্রতিভূ। এগুলো নীতিবাক্যমূলক কথা; কিন্তু জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মূল বার্তা এটিই।
একজন প্রশিক্ষকের কথা মনে আছে, যিনি ষাটের দশকে সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের নীতিশাস্ত্র ও নৈতিকতা নিয়ে বক্তৃতা দিতেন। তিনি বারবার বলতেন, দুর্বত্তায়নের সুযোগের অবাধ দুয়ার তোমাদের জন্য উন্মুক্ত; কিন্তু তোমাদের কর্মজীবন প্রতিদিন প্রতিপদে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার পরীক্ষা। একজন ম্যাজিস্ট্রেট মিথ্যা কথা বলতে পারেন না, একজন সরকারি কর্মকর্তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারেন না। তার জীবন পদ্ধতি হবে পরিচ্ছন্ন। তাই সরকারি পদে নিয়োগের প্রাক্কালে নির্ভেজাল প্রতিযোগিতার
মাধ্যমেই মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ করলে এমন একটি প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা থাকবে বেশি।
সম্ভবত এমন একটি সুস্থ ভাবনা থেকেই পে-কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। তাই দেশবাসীর প্রত্যাশা, তাদের কর প্রদান সার্থক হোক, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। সুন্দর একটি প্রশাসনিক পরিবেশ দৃশ্যমান করতে হলে সরকারি কর্মকর্তাদের বৃহত্তর প্রাপ্তির লক্ষ্যে ক্ষুদ্রস্বার্থ বির্সজন দিতে হবে। দক্ষতার ও জবাবদিহিতার স্বাক্ষর রাখতে হবে প্রতিটি কর্মকাণ্ডে।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব

আজীবন সংগ্রামী অজয় রায় by জয়ন্তী রায়

অজয় রায়, জন্ম ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। পৈতৃক বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী থানার বনগ্রাম। ১৯৩৭ সালে বারানসির স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন অজয় রায়। ১৯৪৩ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে বারানসি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইএসসিতে ভর্তি হন। ১৯৪৫ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করে বারানসি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। এরই মধ্যে ১৯৪৪ সালে বাবা প্রমথনাথ রায় মারা যান। তার ১ বছরের ব্যবধানে মা কল্যাণী রায়ও মারা যান। বাবা-মার মৃত্যুর পর ছোট ভাইবোনদের নিয়ে বারানসি থেকে কিশোরগঞ্জের বনগ্রামে ফিরে আসেন অজয় রায়। গ্রামে আসার কারণে তার লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। ছোট ভাইবোনরা বনগ্রামের স্কুলেই ভর্তি হয়। ছয় মাস অপেক্ষার পর তিনি মুন্সীগঞ্জ কলেজে বিকম শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৪৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে বিকম পাস করেন।
অজয় রায় যখন স্কুলের ছাত্র তখন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বারানসিতে যে স্কুলে পড়তেন সেখানে ছিল কমিউনিস্টদের প্রভাব। যখন ক্লাস সেভেনে পড়েন সহজাতভাবেই সেদিকে আকৃষ্ট হয়ে ছাত্র ফেডারেশন ও তার মারফত বারানসির কমিউনিস্ট নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি ছিল নিষিদ্ধ। বারানসির কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বাঙালি এবং বারানসিতে অজয় রায়রা যে পাড়ায় থাকতেন তার অধিবাসীরাও। সেই সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লাগে না।
১৯৪৩ সালে বাংলায় দেখা দেয় মন্বন্তর। কমিউনিস্টরা তাদের সব শক্তি নিয়ে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী প্রতিরোধের কাজ সংগঠিত করতে উদ্যোগী হন। বারানসিতেও কমিউনিস্টরা ত্রাণ সংগ্রহে সক্রিয় হন। অজয় রায় এ সময় সেই কাজের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।
১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত নিলে এর স্লোগানের ভিত্তিতে একটি ছাত্র সম্মেলন করতে গিয়ে তিনি প্রথম গ্রেফতার হন। সেটা ছিল ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাস। তখন মাত্র বিকম পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। ১ বছর জেল খেটে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্যগত কারণে মুক্তি পান। মুক্তি পেয়ে সংগঠনের কাজের জন্য বাড়ি বা কলকাতায় না গিয়ে মুন্সীগঞ্জে চাঁপাতলী স্কুলে প্রধান শিক্ষকের কাজে যোগ দেন। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যাপক দেশত্যাগের কারণে ছাত্র সংখ্যা কমে যাওয়ায় স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় তিনি কাছেই রামপাল হাইস্কুলে শিক্ষকতার কাজ নেন। সে অবস্থাতেই ১৯৫০-এর সেপ্টেম্বরে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এবার ১৯৫৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আটক থাকতে হয়। ১৯৫৪ সালে জানুয়ারিতে মুক্তি দিয়ে ময়মনসিংহ মিউনিসিপ্যাল এলাকায় তাকে অন্তরীণ করা হয়। সেখানে তিনি যুক্ত হন ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সঙ্গে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে ময়মনসিংহে যখন কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য অফিস খোলা হয়, তখন তার দায়িত্ব নেন তিনি। নির্বাচনের আগে আবারও গ্রেফতার করা হয় তাকে।
১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠিত হওয়ার পর তিনি পার্টির সিদ্ধান্তক্রমেই ন্যাপের সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় ন্যাপের ব্যাপারে পাকিস্তানে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে ময়মনসিংহে জনমত সংগঠনে বিশেষভাবে উদ্যোগী হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সাময়িক শাসন জারি করলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপন অবস্থায় তিনি ময়মনসিংহে পার্টি সংগঠন গুছিয়ে তুলতে উদ্যোগী ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ময়মনসিংহ শহরের মহাখালী স্কুলে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ময়মনসিংহ শহর যখন পাক হানাদার বাহিনীর দখলে চলে যায় তখন তিনি মূলত কিশোরগঞ্জকে ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন। জুলাইয়ের শেষভাগে প্রথমে আগরতলা ও পরে কলকাতা হয়ে তিনি মেঘালয়ে বারেংগাপাড়ায় ময়মনসিংহ জেলার ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে স্থাপিত ক্যাম্পে যোগ দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের বাকি সময়টা ওই ক্যাম্পকে ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
স্বাধীনতার পর ৭২-এর জানুয়ারিতে তিনি ময়মনসিংহে ফিরে আসেন এবং আবারও জেলা কমিউনিস্ট পার্টি ও চলমান আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেন। এ সময়ে তার উদ্যোগেই ময়মনসিংহে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের শাখা গড়ে ওঠে এবং তাকে স্থানীয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। পার্টির সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও উপরোক্ত দায়িত্বগুলো ১৯৯২ সালে পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করা পর্যন্ত তার ওপরই ন্যস্ত ছিল।
অজয় রায় দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ১৮ বছর জেলে কাটিয়েছেন এবং স্বাধীনতার আগে ও পরে ৫ বছরের কিছু বেশি সময় কাটিয়েছেন আত্মগোপনে।
জয়ন্তী রায় : অজয় রায়ের সহধর্মিণী

পিএসসিতে ৯৭.৯২% ও জেএসসিতে ৯০.৪১% পাস

সারা দেশে একযোগে আজ সকালে প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট (পিএসসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ৯৭.৯২ শতাংশ ও ইবতেদায়ীতে ৯৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। এর মধ্যে প্রাথমিকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৪১১ জন। আর ইবতেদায়ীতে ৬ হাজার ৫৪১ জন। ওদিকে অষ্টম  শ্রেণীর জেএসসি ও  জেডিসি পরীক্ষায় এবার পাস করেছে ৯০.৪১ শতাংশ শিক্ষর্থী। এর মধ্যে আটটি সাধারণ বোর্ডের অধীনে জেএসসিতে ৮৯.৮৫ শতাংশ এবং মাদরাসা বোর্ডের অধীনে জেডিসিতে ৯৩.৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। জেএসসি-জেডিসি মিলিয়ে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ২৩৫ জন। আজ সকালে গণভবনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে পরীক্ষার ফলের অনুলিপি তুলে দেন। বেলা সাড়ে ১১টায় সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জেএসসি ও  জেডিসি পরীক্ষার ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন শিক্ষামন্ত্রী। পরে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা  বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে ফল জানতে পারবে। এছাড়া মোবাইল থেকে এসএমএস করেও ফল জানা যাবে। ফলাফল শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে(www.educationboardresults.gov.bd) জেএসসি- জেডিসি এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর(www.dpe.gov.bd)  ও  টেলিটক মোবাইলের ওয়েবসাইটে(http://dpe.teletalk.com.bd) পাওয়া যাবে। এছাড়াও মোবাইলে এসএমএস করে ফল পাবেন শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক সমাপনীর জন্য যে কোন মোবাইল ফোন থেকে DPE লিখে স্পেস দিয়ে থানা/উপজেলার কোড নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে  রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০১৪ লিখে ১৬২২২ নম্বরে এসএমএস পাঠিয়েও ফল জানা যাবে। ইবতেদায়ীর ফল পেতে EBT লিখে স্পেস দিয়ে থানা/উপজেলার কোড নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে রোল নম্বর লিখে  স্পেস দিয়ে ২০১৪ লিখে ১৬২২২ নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। জেএসসি-জেডিসির জন্য যে কোন মোবাইল থেকে JSC/JDC লিখে  স্পেস দিয়ে নিজ বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর লিখে স্পেস দিয়ে  রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০১৪ লিখতে এসএমএস করলে ফিরতি এসএমএসে ফল জানিয়ে দেয়া হবে।

মুসলিম হতে চেয়েছিলেন চার্চিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যুক্তরাজ্যের সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও সাহিত্যে নোবেলজয়ী উইনস্টন চার্চিল খ্রিস্টানত্ব ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন বলে এক গবেষণায় ওঠে এসেছে। চার্চিলের লেখা ১৯০৭ সালের একটি চিঠির সূত্র ধরে এমনটা মনে করছে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। ওই চিঠিটি লিখেছিলেন চার্চিলের ভাইয়ের স্ত্রী গোয়েনডোলিন বারটি। তাতে তিনি ইসলামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়া থেকে বিরত থাকতে চার্চিলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। গবেষক ওয়ারেন ডকটার তার উইনস্টন চার্চিল অ্যান্ড দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ড বইতে বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বইটি বাজারে আসছে। সানডে টেলিগ্রাফে বারটির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, তিনি চার্চিলকে জোর দিয়ে বলছেন, প্লিজ, ইসলামে ধর্মান্তরিত হবেন না; আমি আপনার প্রাচ্যপ্রীতি এবং পাশা-সদৃশ মুগ্ধতা লক্ষ্য করছি।

দুই দুর্ঘটনা এক রকম নয়

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গত নয়মাসে মধ্য আকাশ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে দুটি বিমান- এমএইচ ৩৭০ ও কিউজেড ৮৫০১। দুটি বিমানই উড্ডয়নের এক ঘণ্টার মধ্যে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। তারপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সামনে শুধু প্রশ্ন আর সমুদ্রের সীমাহীন পানি। মেলেনি কোনো ধ্বংসাবশেষ বা কোনো প্রশ্নের উত্তর। আপাতদৃষ্টিতে দুটি দুর্ঘটনা একই রকম মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন অনেক ফারাক আছে এই দুই বিমান হারানোর ঘটনায়। চক্রান্তের সম্ভাবনা : ৮ মার্চ কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংগামী এমএইচ ৩৭০ ফ্লাইটের রেডিও ট্রান্সমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। হারানোর আগেই পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। নিয়ন্ত্রণের সব মাধ্যম অকার্যকর করে বিমানটি রহস্যজনক রুটে মোড় নিয়েছিল। এটা কোনো ছিনতাইকারী বা সন্ত্রাসীর কবলে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কিউজেড ৮৫০১ বিমানটি স্বাভাবিক গতিতে প্রত্যাশিত রুটেই যাচ্ছিল। এখানে পাইলট নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে আপডেট জানাচ্ছিলেন। খারাপ আবহাওয়া ও মেঘের কথা বলেছিলেন। এমনটি জানালেন, বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ পিটার গোয়েলজ।
রুটের অবস্থান : এমএইচ ৩৭০ বিমান যেখান থেকে হারিয়ে গেছে বা বিধ্বস্ত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেটি অত্যন্ত দুর্গম। ভারত মহাসাগরের ওই জায়গায় পানির গভীরতা অনেক এবং তা রহস্যময়। সে কারণে ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর। অন্যদিকে এয়ার এশিয়ার বিমানটি হারিয়ে যাওয়ার স্থান ভ্রমণযোগ্য। পানির গভীরতাও খুব বেশি নয়। তাই এখানে ধ্বংস হলে খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। পূর্বশিক্ষা :আগের বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার পর নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও সংশয় দেখা দিয়েছিল। সরকার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রদত্ত তথ্যে গরমিল ছিল। একেক সময় একেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল। যথাসময়ে অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়নি।
কিন্তু এক্ষেত্রে আগের একটি অভিজ্ঞতা সামনে ছিল। বিমান চলাচলে অধিক সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছিল। নিখোঁজের পর প্রাপ্ত তথ্যে সবাই প্রায় একই সুরে কথা বলছে এবং হারানোর পরপরই অনুসন্ধান জাহাজ পাঠানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে ১০ মাস লাগবে না : এমএইচ ৩৭০ বিমানের মতো এই বিমানের অনুসন্ধানে ১০ মাস সময় লাগবে না। দু-একদিনের মধ্যেই একটা নিশ্চিত ফল পাওয়ার আশা করছেন সাবেক বিমান প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্টিভেন ওয়ালেস। তিনি বলেন, এখানকার পানির গভীরতা ১৫০ ফুট। কিন্তু ভারত মহাসাগরের ১০-২০ হাজার ফুট।

আফগানিস্তানে ন্যাটো হেরেছে

ন্যাটোর আফগান যুদ্ধ শেষ। ওবামার ঘোষণার পরদিন সোমবার এক বিবৃতিতে তালেবানরা আফগানিস্তানে ন্যাটো পরাজিত হয়েছে বলে দাবি করেছে। তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধকে ‘বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার আগুন’ মন্তব্য করে বলেছে এটি দেশকে ‘রক্তের সে াতে’ ভাসিয়ে দিয়ে গেছে। তালেবানের হামলার ভয়ে আড়ম্বরপূর্ণ কোনো বিদায় অনুষ্ঠানেরও সাহস করেনি ন্যাটো।
ইংরেজি ভাষায় দেয়া তালেবানের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই পদক্ষেপকে আমরা তাদের পরাজয় ও হতাশার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছি। এই ভারসাম্যহীন যুদ্ধে আমেরিকা, তাদের আগ্রাসী দোসর... এবং সব উদ্ধত আন্তর্জাতিক সংস্থার সুস্পষ্ট পরাজয় ঘটেছে।’ ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল তালেবানরা। এদিকে আফগানিস্তানে ১৩ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। রোববার এক বিবৃতিতে ওবামা বলেন, ‘আমেরিকার ইতিহাসে দীর্ঘতম যুদ্ধের দায়িত্বশীল সমাপ্তি হল।’
হাওয়াই দ্বীপে অবকাশযাপন অবস্থায় ওবামা এ বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তিনি আফগান যুদ্ধের মিত্রদের প্রশংসা করে বলেছেন, মিত্র জোটের সেনাদের প্রচেষ্টায় আল কায়দা নেতৃত্বের মূল অংশ ভেঙে দেয়া সম্ভব হয়েছে, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা এবং অনেক সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। ১৩ বছরের এ যুদ্ধে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ২,২০০ মার্কিন সেনা। রয়টার্স।
ওবামা বলেন, যুদ্ধের এই ১৩ বছরে মার্কিন জাতি ও সেনাবাহিনীর জন্য বিরাট পারীক্ষা হয়ে গেছে। তিনি জানান, তার ক্ষমতা গ্রহণের সময় ইরাক ও আফগানিস্তানে ১,৮০,০০০ সেনা মোতায়েন ছিল; এখন তা কমিয়ে ১৫ হাজারেরও নিচে আনা হয়েছে। শতকরা ৯০ ভাগ সেনাকে দেশে ফেরত নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ১৩ বছরের আফগান যুদ্ধে ৩,৫০০ বিদেশী সেনা মারা গেছে এবং আমেরিকার খরচ হয়েছে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের বেশি অর্থ। যুদ্ধের ফলে আফগানিস্তানের প্রায় ১০০০০ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে আফগান যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও দেশটিতে ১৩,৫০০ ন্যাটো সেনা অবস্থান করবে যার মধ্যে থাকবে ১১,০০০ মার্কিন সেনা। এএফপি।
এদিকে আফগান যুদ্ধ শেষের ঘোষণা দেয়া হলেও সেখানে তালেবানরা এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং দিন দিন শক্তি অর্জন করছে। চলতি ২০১৪ সালেই তালেবান হামলায় আফগান ও বিদেশী সেনার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। সেক্ষেত্রে ২০০১ সালে তালেবান নির্মূলের নামে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিদেশী বাহিনীর যে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল তাতে তালেবানকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।

আরিফুলের আত্মসমর্পণ

সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী হবিগঞ্জের আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি তিনি। আজ মঙ্গলবার হবিগঞ্জের আমলি আদালত-১-এ হাজির হন আরিফুল। পরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। এ বিষয়ে শুনানি চলছে। সকালে আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আরিফুল দাবি করেন, ‘আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হওয়াই আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আজ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।’
একই মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জি কে গউছ ২৮ ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণের পর আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। গত ২১ ডিসেম্বর কিবরিয়া হত্যা মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আদালত। এরপর এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জি কে গউছসহ ১১ জন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম রশিদ আহমদ মিলন সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। গত ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জ আমলি আদালত-১-এ কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের তৃতীয় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। এতে হারিছ চৌধুরী, আরিফুল হক, জিকে গউছ, হাফেজ মো. ইয়াহিয়া, আবু বকর করিম, দেলোয়ার হোসেন, শেখ ফরিদ, আবদুল জলিলসহ নয়জনকে নতুন করে এবং আগের ২৬ জনসহ মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এ হত্যা মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নান, জি কে গউছসহ ২২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। পলাতক রয়েছেন মাওলানা তাজ উদ্দিনসহ ১৩ জন। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যেরবাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক জনসভায় গ্রেনেড হামলায় শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ চারজন নিহত হন। আহত হন ৭০ জন। পরদিন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক) ও সাংসদ আবদুল মজিদ খান হবিগঞ্জ সদর থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন।

হাঙরের মুখ থেকে যেভাবে বাঁচল ম্যাট

চোখের সামনেই বন্ধু জে মাসকাটের পায়ে কামড় দিল হাঙর। এবার এটা ফিরল অপর কিশোর ম্যাট পুলেলার দিকে। একটুও দেরি না করে স্পিয়ার-গান থেকে বর্শা ছুড়ে দিল সে। বর্শাটা গিয়ে বিঁধল হাঙরের গলায়। বেশ বড় শ্বেত হাঙর এটা। বর্শা নিয়েই পালিয়ে গেল। এতে ম্যাট প্রাণে বাঁচলেও জীবন গেল তার বন্ধু জের। এএফপির খবরে জানানো হয়, আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে গলায় বর্শা বেঁধা ওই খুনে হাঙরটাকে ঘায়েল করতে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে, চেনিস সৈকতের সাগরজলে। গতকাল সোমবার দ্য ওয়েস্ট অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানানো হয়, ম্যাট ও জে (১৭) মাছ ধরার সময় ওই হাঙরের মুখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ম্যাট পুলেলা জানায়, হাঙরটি প্রথমে আঘাত করে। পরে বন্ধু জের পায়ে কামড় দেয়। পরে বর্শার আঘাতে ভেগে যায়। হাঙরটি ১৩ থেকে ১৬ ফুট লম্বা হবে বলে ধারণা ম্যাটের। নিজের অভিজ্ঞতাকে ভয়ংকর বলে উল্লেখ করে ম্যাট পুলেলা বলে, এ রকম বীভৎস্য ঘটনা আগে কেউ দেখেনি। অস্ট্রেলিয়ার মৎস্য বিভাগ জানায়, চেনিস সৈকতটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাঙরটি ধরার জন্য নৌকাগুলোকে তৈরি রাখা হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখা হয়েছে। মৎস্য বিভাগের মুখপাত্র রিক ফ্লেচার অস্ট্রেলিয়ার ব্রডকাস্টিং কো অপারেশনকে জানান, আহত হাঙরটি শিকারে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। এর আগে গত অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের দক্ষিণ উপকূলে দুটি শ্বেত হাঙরের হামলায় এক তরুণ আহত হন। তিনি একজন সার্ফার ছিলেন। সাগরের বিভিন্ন ধরনের খেলা জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় হাঙরের হামলার ঘটনা বেড়েছে।

হরতালে রাজধানী ছিল আওয়ামী লীগের দখলে

বিএনপি জোটের ডাকা হরতালে সোমবার রাজধানীর রাজপথ ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দখলে। সকাল থেকেই বিভিন্ন ওয়ার্ড, থানা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে খণ্ড খণ্ড মিছিল-সমাবেশ করে হরতালবিরোধী অবস্থান নেয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, ছাত্রলীগ মহানগর দক্ষিণ, সম্মিলিত আওয়ামী সমর্থক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা হরতালবিরোধী মিছিল-সমাবেশ-মানববন্ধন করে। এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন সংসদীয় আসনে সরকারদলীয় এমপিদের নেতৃত্বে মিছিল সমাবেশ করার খবর পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে হরতালবিরোধী সমাবেশে বিএনপির হরতাল জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে জানিয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, বিএনপি আন্দোলনের মাঠে নেই। গণমাধ্যম বিএনপিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। হরতালে মানুষ সাড়া দেয়নি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের ভয়ে আজকাল অর্ধেক শেষ। আর (আওয়ামী লীগ) যদি নামি আমরা আপনার কি অবস্থা হইব, বুঝতে পারছেন?
সম্মিলিত আওয়ামী সমর্থক জোট এই সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশ শেষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে হরতালবিরোধী মিছিল বের করে।
সাংবাদিকদের অনুরোধ করে মায়া আরও বলেন, খালেদা জিয়া আর ফখরুল। এদের তিনটা প্রোগ্রামে আপনারা ক্যামেরা নিয়ে যাইয়েন না। তারপর যদি বিএনপির কোনো খোঁজখবর থাকে আপনারা আইসেন, যান আমি পদত্যাগ কইরা দিমু। বিএনপির উদ্দেশে খাদ্যমন্ত্রী ও মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, কোনো ধরনের অরাজকতা করা হলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, কেন্দ্রীয় সদস্য একেএম এনামুল হক শামীম, মহানগরের মুকুল চৌধুরী, ফয়েজ উদ্দিন মিয়া, স্বেচ্ছাবেক লীগের অ্যাডভোকেট মোল্লা আবু কাওছার, যুবলীগের হারুন-অর রশিদ, কৃষক লীগের অ্যাডভোকেট শামসুল হক রেজা প্রমুখ।
বিএনপির কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ বাধা দিচ্ছে না -নানক : হরতালের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপির কোনো কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ বাধা দিচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেন, তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তি করায় যারা হৃদয়ে আঘাত পেয়েছেন তারাই তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিচ্ছে। এ সময় তিনি বিএনপির ডাকা হরতাল প্রত্যাখ্যান করায় দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান। বিএনপি নেতা রিজভী আহমেদের এক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, তারা কিভাবে বাধা দেয় তা আমরা দেখতে চাই।
হরতাল সম্পর্কে তিনি বলেন, সোমবারের হরতাল জনগণের স্বার্থে ছিল না। খালেদা জিয়া তার মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে, যুদ্ধাপরাধীদের খুশি করতে এবং তার ছেলে তারেক রহমানের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য হরতাল দিয়েছে। এই দলটি কখনোই জনগণের সঙ্গে নেই।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, হাবিবুর রহমান সিরাজ, আবদুস সাত্তার, ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, মৃণাল কান্তি দাস, এনামুল হক শামীম, এসএম কামাল, সুজিত রায় নন্দী, আমিনুল ইসলাম আমিন প্রমুখ।
খালেদা দুষ্কৃতকারীদের নেত্রী -ড. হাছান মাহমুদ : হরতালবিরোধী সমাবেশে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা ডাকাত-ছিনতাইকারীদের চেয়ে ভয়ংকর। এরা (বিএনপি-জামায়াত) আর রাজনৈতিক কর্মী নয়, দুষ্কৃতকারী। আর খালেদা জিয়া দুষ্কৃতকারীদের নেত্রী।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের হরতালবিরোধী সমাবেশে তিনি আরও বলেন, এদের বিরুদ্ধে পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এদের যেখানেই পাবেন, গণধোলাই দেবেন। পেট্রল বোমা নিক্ষেপ কোনো রাজনৈতিক কর্মীর কাজ নয়।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, মহানগরের হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন, শিক্ষক নেতা শাজাহান আলম সাজু প্রমুখ।

ছাত্র বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার

১৩ বছর বয়সী এক মাদ্রাসা ছত্রকে বলৎকারের অভিযোগে সিরাজগঞ্জে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে স্থানীয় জনতা মারপিট করে পুলিশে সোর্পদ করেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুস সবুর (৩৮) শহরের মালসাপাড়া কবরস্থান আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম কওমী মাদ্রাসার বাংলা শিক্ষক ও কাজিপুর উপজেলার সোনামুখি ইউনিয়নের পরানপুর পশ্চিমপাড়ার মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে। সোমবার রাতে এ ঘটনার পর ওই ছাত্রের মা রাতেই থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে জানা যায়, শহরের ধানবান্ধি জেসি রোডের বাসিন্দা ওই ছেলেকে ৩ বছর আগে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার তত্বাবধানে পরিচালিত ওই মাদ্রাসায় হাফিজি পড়ার জন্য ভর্তি করা হয়। ১৭ই ডিসেম্বর রাতে শিক্ষক আব্দুস সবুর ওই ছাত্রকে চায়ের কাপ ধুয়ে দেয়ার কথা বলে তার রুমে ডেকে নিয়ে দরজা আটকে জোরপূর্বক বলৎকারের চেষ্টা করে। এসময় ছেলেটির চিৎকারে ওই শিক্ষক তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এরপর ওই ছাত্র বাড়িতে ফিরে গিয়ে কাউকে কিছু না বললেও আর মাদ্রাসায় ফিরে যায়নি। স্বজনরা মাদ্রাসায় ফিরে যেতে বললে গতকাল সোমবার সে পরিবারের কাছে শিক্ষকের বলৎকারের বিষয়টি জানায়। জানাজানি হওয়ার পর ছেলেটির স্বজন ও আশপাশের লোকজন রাতে মাদ্রাসায় গিয়ে ওই শিক্ষককে মারপিট করে। সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুল ইসলাম জানান, ওই শিক্ষককে আটক করে থানায় আনার পর ওই ছাত্র, তার মা ও মামাসহ স্বজনরা থানায় এসেছিল। উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ছাত্রের মায়ের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। রাতে ওই শিক্ষক থানা হেফাজতে ছিল। তাকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আসছে নতুন চমক

নতুন বছরের শুরুতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক দেখাতে যাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই বড় দুই দলের বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে দলটি। এর অংশ হিসেবে ২৯তম প্রতিষ্ঠাবাষির্কী উপলক্ষে ১ জানুয়ারি রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশে দশ লাখ লোকের জমায়েত করার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। এ মহাসমাবেশের নাম দেয়া হয়েছে ‘মিলিয়ন ম্যান শো’। মহাসমাবেশ থেকে ‘নতুন বার্তা’ দিতে চান দলের চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
নব্বইয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টির এটিই প্রথম মহাসমাবেশ। জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দলের সাংগঠনিক অবস্থা মজবুত করার পাশাপাশি জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে কাজ করে যাচ্ছে দলটি। বড় দুই দলের হানাহানি ও সংঘাতময় রাজনীতির বিকল্প শক্তি হিসেবে ‘শান্তির বারতা’ নিয়ে জাতীয় পার্টি আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এজন্য দলের পক্ষ থেকে স্লোগান তোলা হচ্ছে- ‘এরশাদ মানেই শান্তি উন্নয়ন ও অগ্রগতি।’ বলা হচ্ছে জাতীয় পার্টি মানে থ্রি-জি অর্থাৎ জাতীয় পার্টি, জাস্টিস (ন্যায়বিচার) এবং জব (কর্মসংস্থান)।
মহাসমাবেশের প্রস্তুতি সম্পর্কে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু সোমবার যুগান্তরকে বলেছেন, ১ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ হবে স্মরণকালের বড় সমাবেশ। এ সমাবেশের মাধ্যমে জাতীয় পার্টির শক্তি দেশবাসীসহ বিশ্ব সম্প্রদায়কে দেখাতে চাই। এছাড়া আগামী দিনের রাজপথ জাতীয় পার্টির দখলে রাখার পাশাপাশি রাজনীতির নিয়ামক শক্তি হতেই এই মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ মহাসমাবেশের ডাক দেয়া হলেও জাতীয় পার্টির মূল লক্ষ্য দলের সর্বোচ্চ শক্তি প্রদর্শন করা। এজন্য মহাসমাবেশ সফল করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ‘বিগ বাজেট’র এই মহাসমাবেশের আয়োজনের সার্বিক দিক মনিটরিং করছেন স্বয়ং দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং মহাসচিব সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু এমপি। জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু নিজেই সামনে থেকে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ করে এসেছেন জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু। দলের শীর্ষ নেতারা তার সঙ্গে ছিলেন।
ইতিমধ্যে সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। মহাসমাবেশের প্রচারণায় ইতিমধ্যে সারা দেশে পোস্টার সাঁটানো ও ব্যানার টানানো হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির সবক’টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ব্যাপকসংখ্যক নেতাকর্মী জমায়েত করতে কাজ করে যাচ্ছে। ঢাকা মহানগরী ছাড়াও নবাবগঞ্জ, দোহার, কেরানীগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। নবাবগঞ্জ-দোহার উপজেলা থেকে লাখ লাখ মানুষের সমাগম করতে কাজ করে যাচ্ছেন এ আসনের সংসদ সদস্য, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। সম্প্রতি তিনি জাতীয় মহিলা পার্টির সভানেত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। মহাসমাবেশে মহিলাদের বিশাল সমাবেশ করতে ইতিমধ্যে তিনি সর্বাত্মক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র আরও জানায়, রাজধানী ঘিরে মূলত বড় আয়োজন। এজন্য গত ৩ সপ্তাহ ধরে বিরামহীন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার নেতাকর্মীরা। সঙ্গে আছেন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে ইতিমধ্যে ঢাকা শহরে বিভিন্ন স্থানে শতাধিক বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে। এছাড়া এক হাজারেরও বেশি ফেস্টুন ও কয়েক লাখ পোস্টার লাগানো হয়েছে। বিশটির মতো তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে আরও কয়েক লাখ পোস্টার ও কয়েকশ’ বিলবোর্ড লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝখানে মোট তিনটি মঞ্চ নির্মাণ করা হবে। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে মঞ্চ নির্মাণের কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে শুরু করে একদিকে মৎস্য ভবন, প্রেস ক্লাব হয়ে পল্টন মোড়, অন্যদিকে শাহবাগ হয়ে বাটা সিগন্যাল পর্যন্ত লাগানো হচ্ছে ১৬০টি মাইক। জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে তিন ধরনের পোস্টার লাগানো হয়েছে প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে। পাশাপাশি থানা ও ওয়ার্ড কমিটির পক্ষ থেকেও আলাদা পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন লাগানো হয়েছে। মহাসমাবেশের প্রচারণার জন্য ঢাকা দক্ষিণের আহ্বায়ক সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি তার ব্যক্তিগত খরচে ১০টি বিলবোর্ড, ছোট-বড় ১২টি তোরণ, ৪৭ হাজার পোস্টার, ১০টি ফুটওভার ব্রিজে বড় বড় ব্যানার ও কয়েকশ’ ফেস্টুন লাগিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী সুজন দে।
এছাড়া প্রতিদিন পাড়া-মহল্লায় পথসভা, মিছিল ও ট্রাকে করে এরশাদের গান বাজিয়ে, হ্যান্ডমাইকিং চলছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার প্রচারণা। সোমবার শ্যামপুর, দোলাইরপাড়, মুরাদপুর, মতিঝিল, রমনা, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী, কাজলাতে মিছিল ও পথসভা হয়েছে। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন ব্যক্তিগতভাবে লক্ষাধিক পোস্টার লাগিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। ঢাকার নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার লাখ লাখ মানুষের মাঝে চলছে প্রচারণামূলক কার্যক্রম। বসে নেই মহানগর উত্তরের নেতাকর্মীরাও। তারাও ইতিমধ্যে লক্ষাধিক পোস্টার লাগানোসহ ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন উত্তরের সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ফয়সল চিশতী। দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ১ জানুয়ারির মহাসমাবেশ আয়োজনে বড় অংকের টাকা খরচ হচ্ছে। আয়োজনে কোনো কার্পণ্য করা হচ্ছে না। দলীয় নেতাকর্মীরাই স্বপ্রণোদিত হয়ে মহাসমাবেশের খরচ বহন করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, পার্টির এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় নেতারা এই মহাসমাবেশ সফল করতে মোটা অংকের টাকা দিচ্ছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি সমর্থিত ব্যবসায়ীরাও সহযোগিতা করছেন। সরকারের কাছ থেকে আমরা কোনো অর্থ নিচ্ছি না। মহাসমাবেশের দিন থেকে আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান আবারও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠবেন। এ লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই জোরদার করবে জাপা -বাবলু : জাতীয় পার্টির মহাসচিব সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু এমপি বলেছেন, দেশের মানুষ সন্ত্রাস, দলীয়করণ, টেন্ডারবাজি, দলবাজি, দুর্নীতি লুটপাট ও পরিবারতন্ত্রের কবল থেকে মুক্তি চায়। সুদৃঢ় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনীতির মুক্তির জন্য জাতীয় পার্টির লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ১ জানুয়ারির মহাসমাবেশ থেকে সেই লড়াই সংগ্রামের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বাবলু আরও বলেন, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি আগামীদিনের আন্দোলনে রাজপথ দখলে রাখতে চায়। একই সঙ্গে ক্ষমতার নিয়ামক শক্তি হিসেবে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে জাতীয় পার্টি।
সোমবার যাত্রাবাড়ীর নুর কমিনিউটি সেন্টারে জাতীয় ভ্যান শ্রমিক ও মালিক পার্টি আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। সংগঠনের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন মজুমদারের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা-৪ আসনের এমপি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সদস্য সচিব জহিরুল আলম রুবেল, শ্রমিক পার্টির সভাপতি শাহ আলম তালুকদার, যাত্রাবাড়ী থানার সভাপতি তুহিনুর রহমান নুরু হাজী, এমএ সোবহান ও আক্তার দেওয়ান।
আওয়ামী লীগ-বিএনপির কাছে গণতন্ত্র নিরাপদ নয় -
বাবলা : জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগরের (দক্ষিণ) সভাপতি ও ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপির কাছে গণতন্ত্র নিরাপদ নয়। এ দুটি দল গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় এসে গত দুই যুগ ধরে দেশে দলতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও ব্যক্তিতন্ত্র কায়েম করেছে। তারাই এদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করেছে। জনগণের সেবা করার ওয়াদা করে ক্ষমতায় এসে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে। এরা উভয়ে ক্ষমতায় এসে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা করে। দলের মহাসমাবেশ সফল করার জন্য সোমবার শ্যামপুর কদমতলী থানা জাতীয় পার্টি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের যৌথসভায় তিনি এ কথা বলেন। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন- কদমতলী থানা জাপার সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠাণ্ডু, শ্যামপুরের সভাপতি কাওসার আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম মোল্লা, জহিরুল ইসলাম সরকার, সুজন দে, মাইনুদ্দিন বাবু, জহিরুল ইসলাম জহির, মানিক হোসেন, আসাদ মিয়া প্রমুখ।