Showing posts with label আনিসুল হক. Show all posts
Showing posts with label আনিসুল হক. Show all posts

Sunday, November 23, 2025

এ ভূমিকম্প হুঁশিয়ারি সংকেত, বড় বিপদ তো সামনে by আনিসুল হক

আগারগাঁও সিসমিক সেন্টার থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে মাধবদীতে ছিল ২১ নভেম্বর ২০২৫-এর ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। মাইলে হিসাব করলে দাঁড়াবে ৮ মাইল।

রিখটার স্কেলে ৫.৭ বলছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিসের সিসমিক অবজারভেটরি ও রিসার্চ সেন্টার। আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৫।

একটা ধাক্কা দিয়ে, একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ভূমিকম্প আমাদের সতর্ক করে দিল। ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শত শত আহত প্রধানত পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে, কেউ–বা ভবন থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে।

অনেক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে, বেশ কিছু ভবন হেলে পড়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন জ্বলেছে, মাঠের মাটি দুভাগ হয়ে গেছে, ঘরের জিনিসপত্র তাক থেকে পড়ে গেছে।

আরেকটু বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে কী হবে?

বাংলাদেশের সেরা কাঠামো-প্রকৌশলী শামীমুজ্জামান বসুনিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫। তিনি বলেছিলেন: ‘ভূমিকম্প হলে আমাদের যা হবে…যারা বেঁচে যাবে, তারাও থাকতে পারবে না।

এখানে বীভৎস অবস্থা হবে। আগুন, পানি এবং পয়ঃপ্রণালির যে সিস্টেম আমাদের, এগুলোর যে অবস্থা, এগুলোকে সরাতেও পারবা না। এগুলোর গন্ধে কেউ থাকতে পারবে না।

আগুন তো আছেই। প্লাস এগুলোর যে অবস্থা, তুমি ক্লিয়ারই করতে পারবা না।
ভূমিকম্প এক্সপার্ট যেটা বলে, আমিও বিএসএর আর্থকোয়েক সোসাইটির মেম্বার, সেখানে ওরা দেখেছে যে ভূমিকম্প কত বছর পরপর একটা রিপিটেশন হয়।

যে ফল্টগুলো আছে, সেগুলো মুভ করছে। প্রতিটি আলাদা মুভ করে। কোনোটা একই ডিরেকশনে মুভ করে, কোনোটা উল্টো দিকে করছে।

এটার মধ্যে দুই জয়েন্টগুলো, যেগুলো আছে, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে ডিফিকাল্ট জায়গা। ডাউকি ফল্ট আমাদের সিলেটের ওপর দিয়ে আছে, এটাও একটা।

ভূমিকম্প ডেইলি হচ্ছে। ভূমিকম্পের ইতিহাস দেখলে মনে হয় যে ডেইলি ২ মাত্রা বা ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে। এগুলো আমরা ধরি না।

ফলে একটা ভূমিকম্প যদি হয়, আমি জানি না কী হবে। এখানে বড় বড় এক্সপার্ট, ওনারা যারা পড়াশোনা করেন, তাঁরা বলেন, দেড় লাখ বিল্ডিং এখানে ভালনারেবল।

আমি বলব, ‘একসেপ্ট ফিউ বিল্ডিংস অল বিল্ডিংস আর ভালনারেবল। ইদানীং আমাদের ডিজাইনাররা ভেরি স্ট্রং ডিজাইন করছে। এগুলো ছাড়া অল বিল্ডিংস আর ভালনারেবল।’

অর্থাৎ তিনি বলছেন, ‘অল্প কিছু ভবন ছাড়া বাংলাদেশের সব স্থাপনাই ভূমিকম্পের সামনে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।’

২.

৫.৭ থেকে যদি ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, মহাপ্রলয় হবে ঢাকায়। এবং দেশের অনেক জায়গায়।

ভূমিকম্পে ভবন ধসে তো মানুষ মারা যাবেই, প্রধান বিপদ আসবে আগুন থেকে। সারা শহরের এখানে ওখানে আগুন জ্বলে উঠবে।

এখন মনে করুন, ২০ অক্টোবর ২০২৫ ঢাকার বিমানবন্দরের কার্গো গুদামে আগুন লেগেছিল। এই আগুন নেভাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে।

অথচ এই ধরনের কেপিআই এলাকায় আগুন লাগলে অ্যালার্ম বেজে ওঠার কথা স্বয়ংক্রিয়ভাবে, সিসিটিভিতে ধোঁয়া দেখে শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানির ধারা বর্ষিত হওয়ার কথা এবং ঘটনাস্থলেই ফায়ার ব্রিগেড থাকার কথা।

সেই সংরক্ষিত এলাকার আগুন আমরা সামলাতে পারি না। এখন কল্পনা করুন, সারা শহরে ৫০০টা ভবন ভেঙে গেছে, রাস্তাঘাটে বিদ্যুতের খুঁটি ভাঙা ইট কংক্রিট পড়ে রাস্তাকে অচল করে রেখেছে, এর মধ্যে ২৫টা জায়গায় একসঙ্গে আগুন জ্বলে উঠেছে, তখন কী হবে?

৩.

২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল বঙ্গবাজারের আগুনের পর একটা লেখা লিখেছিলাম। সেটা এখন আবার তুলে ধরি—

সিদ্দিকবাজারে একটা ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে, সম্ভবত গ্যাস থেকে। ৭ মার্চ ২০২৩। সে সময়ও আমরা বুঝতে পারি, দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি, সরঞ্জাম, রসদ, যন্ত্রপাতি কত অপর্যাপ্ত।

মাত্র একটা ভবনে দুর্ঘটনা ঘটলে তা থেকে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে আমরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। একই অসহায়ত্ব আমরা বোধ করেছিলাম কিছুদিন আগে, যখন সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় একটা ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে।

এ থেকে যে দুশ্চিন্তা মনে হানা দেয়, তা হলো, একটা জায়গায় আগুন লাগলে, একটা ভবনে বিস্ফোরণ হলে আমরা সামলাতে পারি না।

উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে বুঝতে পারি, আমাদের সীমাবদ্ধতা কত সীমাহীন। সে ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ, আল্লাহ না করুন, যদি এ ঢাকা শহরে কখনো আঘাত হানে, আমরা কী করব?

আমরা জানি, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের শঙ্কার মুখে আছে। গত ৪ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত ইফতেখার মাহমুদের প্রতিবেদন, ‘দেশের ১৩টি এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ভূগর্ভস্থ ফাটল বা চ্যুতি থাকার কারণে ওই কম্পন হতে পারে। সবচেয়ে তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা ও সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা।

‘সব এলাকাই ঢাকা থেকে কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার দূরে; কিন্তু সেখানে সাত থেকে আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা ঢাকায় বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।’

আমরা যে একটা বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে আছি, দেশি-বিদেশি একাধিক গবেষণায় তা উঠে এসেছে।

বলা হচ্ছে, বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকার বহু ভবন শুধু বিধ্বস্ত হবে, তা-ই নয়, আসল ক্ষতিটা হবে আগুন থেকে।

আমাদের ভবনে ভবনে গ্যাসের লাইন, মুহূর্তে পুরো শহর জ্বলে উঠবে। এখন হরর মুভির মতো দৃশ্য কল্পনা করুন।

একটা রানা প্লাজা ধসের সময় আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেও কত সামান্যই করতে পেরেছিলাম, একটা সিদ্দিকবাজারের সময় আমরা কতটা অসহায় বোধ করেছিলাম, এক বঙ্গবাজারের আগুন নেভাতে আমাদের কতটা বেগ পেতে হয়েছিল।

এখন যদি একসঙ্গে ১ হাজার রানা প্লাজা ভেঙে পড়ে, একসঙ্গে যদি ১০০ বঙ্গবাজার জ্বলে ওঠে, একসঙ্গে যদি ৫০০ সিদ্দিকবাজার বিস্ফোরিত হয়, এ শহরের হবেটা কী!

আপনারা ভাবছেন, আমি কেন বলছি যে এতগুলো ভবন একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি আসলে কমিয়ে বলছি।

বিবিসি বাংলার ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এর খবরটা পড়ুন—‘২০০৯ সালে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে বলা হয়, ঢাকায় সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলে, শহরের ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়বে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তৈরি হবে সাত কোটি টন কনক্রিটের স্তূপ।...এ ছাড়া উদ্ধারকাজের সহায়তার জন্য ২০১৯ সালে ২২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে আরও যন্ত্রপাতি বাংলাদেশ হাতে পাবে। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, ‘ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল।’

এখন বুঝুন, বাস্তবতাটা! এক সিদ্দিকবাজার, এক সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা, এক বঙ্গবাজারের বিপর্যয় আমরা সামলাতে পারি না।

বঙ্গবাজারে আগুন নেভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিসের লোকদের জন্য প্রধান বাধা হয়ে উঠেছিল মানুষের ভিড়। মানুষের ভিড়ে গাড়িগুলো চলতে পারছিল না, কর্মীরা কাজ করতে পারছিলেন না।

কোথায় আমাদের ২২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি! ২০১৭ সালের চ্যানেল আই অনলাইন খবর থেকে জানা যায়, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ‘ভূমিকম্প আমি প্রস্তুত’ শিরোনামে প্রচারণার লোগো উন্মোচন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল।

সে সময় ৬০ কোটি টাকার তাঁবু, ২৫০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনাসহ ভূমিকম্প মোকাবিলায় সরকারের কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।

তাঁবুগুলো কই? তা দিয়ে কী হচ্ছে?

আমরা আমাদের শহরটিকে পরিকল্পনার মধ্যে আনব না, আমরা আমাদের জলাশয়গুলো ভরাট করব, ডিএপি মানব না, ভবন বানানোর সময় মাটি নিরীক্ষা করব না, ভূমিকম্প ও দুর্যোগসহনীয় ভবন বানাব না, জরুরি নির্গমন পথ রাখব না, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলার পথ রাখব না, গলিগুলো বানিয়ে রাখব অপ্রবেশ্য, আগুন নেভানোর যন্ত্র রাখব না, নিরাপত্তা নির্দেশিকা মানব না; আমাদের রাস্তায় একটাও ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকবে না, আমরা ফায়ার ড্রিল করব না, আমরা ঘনবসতির এলাকায় বিস্ফোরক রাখব, রাসায়নিক রাখব; আমাদের মার্কেটগুলোকে আমরা একেকটা বিপজ্জনক ফাঁদ বানিয়ে রাখব; আমরা কোনো নিয়মকানুন মানব না; আমাদের কারখানাগুলো কেউ পরিদর্শন করবেন না, ভবনগুলো কেউ নজরদারিতে রাখবেন না এবং আশা করব, দুর্যোগ এলে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা আমাদের রক্ষা করবেন এবং ভবন ভেঙে গেলে আমরা ৬০ কোটি টাকার তাঁবুতে থাকব!

আসলে আমরা একটা সার্বিক নিয়মহীনতার মধ্যে পড়ে গেছি। আমাদের অর্থগৃধ্নুতা সব নিয়মকানুন তছনছ করে ফেলেছে। লোভের লেলিহান শিখাই পুড়িয়ে ফেলছে সব প্রতিষ্ঠান, নিয়ম, নির্দেশিকা, ম্যানুয়াল, প্রটোকল, আইনকানুন, সুশাসন বলতে যা বোঝায়, তা থেকে আমরা সহস্র যোজন দূরে।

একটা করে দুর্ঘটনা ঘটবে, তারপর আমরা বলব, এই ভবনের অনুমতি ছিল না, এই বাসের ফিটনেস ছিল না, এই এলাকায় রাসায়নিক রাখার কথা নয়, এই বাজার আগেই বিপজ্জনক বলে ঘোষিত ছিল। এখন যেমন আমরা বলছি, ঢাকায় পুকুর, হ্রদ, জলাশয়গুলো গেল কোথায়?

আমরা একটা মহাবিপর্যয়ের লাল সংকেতের মুখে আছি। এখন প্রকৃত আশাবাদীর পক্ষে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই নেই।

অরুন্ধতী রায় ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ শেষ করেছেন এভাবে, ‘একটা গুবরে পোকা চিৎ হয়ে আকাশের দিকে পা উঁচু করে আছে। আকাশটা যদি ভেঙে পড়ে, সে পাগুলো দিয়ে ঠেকাবে।’

বনানীর আগুনের সময় একটা ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। দমকলের ফুটো পাইপ পলিথিনে পেঁচিয়ে হাত দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করছে একটি শিশু।

পরে শিশুটিকে পুরস্কার দেওয়া হয়। এবারও এমন একটি ছবি দেখলাম। জানি না ছবিটা কার তোলা, এবারের নাকি আগেরবারের।

এই গুবরে পোকাটা আকাশের ভেঙে পড়া ঠেকাতে পারবে না। তবু সে চেষ্টা করছে। বঙ্গবাজারে লুটপাট করা, দমকল অফিসে হামলা করা, রাস্তায় ভিড় করে বাধা তৈরি করা জনতার বিপরীতে এই শিশুই আমাদের আশা জোগায়।

যে যেখানে আছি, সেখান থেকেই নৈরাজ্যের স্রোতের বিপরীতে নিয়মকানুন, আইনের শাসন, সুশাসন, নিরাপত্তা বিধান ও পদক্ষেপ নেওয়ার কাজটা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে। যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবু আমাদের চেষ্টা ছাড়া যাবে না।

* আনিসুল হক, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও সাহিত্যিক

ভূমিকম্পের কারণে বাইরে বেরিয়ে উঁচু ভবনের দিকে তাকিয়ে আছে উৎসুক জনতা। রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা।
ভূমিকম্পের কারণে বাইরে বেরিয়ে উঁচু ভবনের দিকে তাকিয়ে আছে উৎসুক জনতা। রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা। ছবি: দীপু মালাকার

Friday, February 7, 2025

গুড্ডুবুড়াদের বাড়িতে আর চোর আসে না by আনিসুল হক

অলংকরণ: নাইমুর রহমান
গুড্ডুবুড়াকে কি তোমরা চেন?
ও একটা ছোট্ট ছেলে। ও কিছুতেই খেতে চায় না। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করলে কী হয়? বুদ্ধি কমে যায়, গায়ের জোর কমে যায়।
ওর বোকামির কাণ্ড শুনলে তোমরা হাসতে হাসতে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
এমনিতে কিছু খায় না। একদিন দেখা গেল, ও বসে বসে টি-ব্যাগ চিবোচ্ছে। পানে চা-পাতার ব্যাগ।
ওর মা বলল, ওই তুই কী খাস? তোর মুখে কী?
আমি? চা খাই।
দেখি দেখি মুখ খোল।
মা ওর মুখ খোলালেন। দেখা গেল, মুখের মধ্যে টি-ব্যাগ ঢুকিয়ে সে বেশ করে চিবোচ্ছে?
তুই এটা খাচ্ছিস কেন?
আমি চা খাচ্ছি।
চা খাচ্ছিস কেন?
আমি বড় হয়ে গেছি।
বড় হলেই চা খেতে হবে?
হুম।
তা চা যদি খাবি, কাপে করে ভালোভাবে বানানো চা খা। এটা খাচ্ছিস কেন?
সেটা কি আর গুড্ডুবুড়া মাকে বলবে? একদিন তাদের টেবিলে দুই কাপ চা বানিয়ে রাখা হয়েছে, মেহমান এসেছেন বাড়িতে, তাদেরকে দেওয়া হবে।
গুড্ডুবুড়া এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, মা রান্নাঘরে। বাবা মেহমানদের সামনে। এই সুযোগ। সে চায়ের কাপে মুখ দিল। অমনি তার মুখ গেল পুড়ে। বাবা গো মা গো...কিন্তু সেই কথা তো সে মাকে বলতে পারে না।

গুড্ডুবুড়াকে একদিন দেখা গেল, মশামাছি মারার স্প্রে নিয়ে ছুটছে। কেন?
পিঁপড়া উঠেছে চিনির বয়ামে।
সে বয়ামের মধ্যে মশা মারা ওষুধ স্প্রে করতে লাগল।
মা বললেন, গুড্ডুবুড়া কী করিস?
পিঁপড়া মারি মা।
সর্বনাশ। এতো বিষ। এই চিনি খেলে আমরা তো সবাই মারা যাব।

ওদের বাড়িতে মুরগি ডিম দিল। তারপর সেই মুরগি বাচ্চা ফোটাল। ৮টা বাচ্চা।
একদিন খুব গরম পড়েছে। গুড্ডুবুড়া ঘেমে একাকার। বিকাল তিনটার মতো বাজে। স্কুল থেকে ফিরে এসে সে দুপুরের খাবার খেয়ে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিল। মা দিব্যি ঘুমাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ চলে গেছে। ফ্যান বন্ধ।
গুড্ডুবুড়া বিছানা ছাড়ল। উফ। কী গরম। সে গেল বারান্দায়। গিয়ে দেখে, মুরগিটা ঝিমোচ্ছে। মুরগির বাচ্চাগুলো পানি খাওয়ার জন্য বাটিতে ঠোঁট নামিয়েছে।
আহা, গরমে কষ্ট পাচ্ছ। বলে গুড্ডুবুড়া একটা মুরগির বাচ্চা ধরে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজে রেখে দিল। আরও নেবে বলে আসতেই মা মুরগি ওর হাতে দিল ঠোকর। ও ভয়ে পালিয়ে এল।
মুরগির বাচ্চাটা মারা গেল ফ্রিজে। তাই নিয়ে গুড্ডুবুড়ার কী কান্না। সে তো ভালো করতে চেয়েছিল। খারাপ হয়ে গেল যে।
আরেকদিন তার মা শিং মাছ কিনে এনে জিয়ল রেখেছেন। দুটো মাছ মরে গেছে। তাদেরকে রাখা হয়েছে ফ্রিজে।
গুড্ডুবুড়া ভাবল, সর্বনাশ। মাছ কেন ফ্রিজে রেখেছে। মাছ তো মারা যাবে। সে মাছ নিয়ে গিয়ে পানিভরা পাতিলে ভাসিয়ে দিল।
মাছ পচে পুরো বাড়িতে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
তখন সে আবার হাত ডোবাল শিং মাছের হাঁড়িতে। শিং মাছের কাঁটায় ভীষণ বিষ।
গুড্ডুবুড়ার হাতে শিং মাছের কাঁটা ফুটেছে। ব্যথায় সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
আর তো পারা যায় না। গুড্ডুবুড়াকে ওর বাবা-মা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন।
বললেন, ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলের সমস্যাটা কী?
ডাক্তার সাহেব সব দেখেশুনে বললেন, গুড্ডুবুড়ার সব ঠিক আছে। শুধু বুদ্ধিটা খুলছে না। বুদ্ধি খুলছে না, কারণ সে কিছু খায় না। ওকে ভাত খেতে হবে, রুটি খেতে হবে, মাছ খেতে হবে, মাংস খেতে হবে, দুধ খেতে হবে, ডিম খেতে হবে, শাক খেতে হবে, সবজি খেতে হবে, ফল খেতে হবে, মূল খেতে হবে।
গুড্ডুবুড়া ঠিকঠাক খাওয়া শুরু করল।
তখন ওর মাথায় বুদ্ধি এসে গেল। এখন গুড্ডুবুড়ার জোরও বেশি, সারাক্ষণ খেলাধুলা করে। পড়াশোনা করতেও ওর ভালো লাগে।
এখন ও ক্লাসে ফার্স্ট হয়।

ওদের বাড়িতে কোনো পাহারাদার নেই। ওরা একটা চারতলা বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকে।
গরমের দিন। জানালা না খুলে ঘুমোনো যায় না।
কিন্তু জানালা খুলে ঘুমালে প্রায়ই ওদের বাড়িতে চোর আসে। জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয়। হাতের কাছে যা পায় নিয়ে যায়। একবার তো ওর দাদিমার কানে হাত দিয়ে কানের দুল পর্যন্ত খুলে নিয়ে গিয়েছিল।
কী করা যায়।
চোরটাকে তো ধরতে হবে।
গুড্ডুবুড়া একটা ইঁদুর ধরা কল জানালার কাছে টেবিলের ওপরে রেখে দিল। বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে এখানে যা থাকে, চোরটা প্রায়ই তাতে হাত দেয়। একবার তো মায়ের ইমিটেশনের গয়নার বাটিটা নিয়ে প্রত্যেকটা গয়না চোরটা কামড়ে কামড়ে দেখে পরখ করেছিল। তারপর সব রেখে গিয়েছিল।
রাতের বেলা ফল ফলল মারাত্মক। জানালায় চোর এসে যেই-না হাত দিয়েছে, অমনি ইঁদুরের কল তার হাত ধরল কামড়ে। চোরটা ওরে বাবা, ওরে মা বলে চিৎকার করছে। কিন্তু পালাতে পারছে না। হাত আর জানালার শিক গলে বেরোতে পারছে না। চোরটা হাত টানতেই আরও ব্যথা লাগছে।
ততক্ষণে বাড়ির সবাই জেগে উঠেছে। চিৎকার চেঁচামেচিতে রাস্তার পাহারাদারেরা ছুটে এল। ৯৯৯-এ কল করল গুড্ডুবুড়া।
অমনি পুলিশও ছুটে এল তাদের বাড়িতে।
চোরটাকে জানালাতেই পাওয়া গেল।
পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল।
এরপর থেকে গুড্ডুবুড়াদের বাড়িতে আর চোর আসে না।

Wednesday, December 15, 2021

গল্প- আঁধারে আলোর যাত্রী by আনিসুল হক

সাইকেল চালাচ্ছেন তাজউদ্দীন। নবাবপুর রোডে একটা ঘোড়াগাড়ির পেছনে পড়েছেন তিনি। ঘোড়াগাড়িটাকে ক্রস করতে পারছেন না।

বিপরীত দিক থেকেও গাড়িঘোড়া আসছে। রিকশা আসছে।

বসন্তকাল। সন্ধ্যার পরে দখিনা বাতাস বইতে শুরু করেছে। এই সময় সাইকেল চালাতে বড় ভালো লাগে ৩২ বছর বয়সী তাজউদ্দীনের।

তার গায়ে একটা হাফহাতা সুতির শার্ট। পরনে প্যান্ট। পায়ে স্যান্ডেল।

চোখে চশমা।

তিনি যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ অফিসে। পার্টির সেক্রেটারি মুজিব ভাই তাকে জরুরি তলব করেছেন।

তাজউদ্দীন ঘোড়াগাড়িটাকে ওভারটেক করতে পারলেন। ডানহাতে সাইকেলের বেল বাজালেন, ক্রিং ক্রিং।

পার্টি অফিসের সামনে গিয়ে সাইকেল রাখলেন।

তালা দিলেন সাইকেলে।

তারপর ভেতরে ঢুকলেন।

মুজিব ভাই বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আছে কর্মীরা। তিনি আবার মন্ত্রীও। এমনিতেই ভীষণ জনপ্রিয় মানুষ। তার ওপর পার্টির সেক্রেটারি হিসেবে সারাদেশে সব নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর নিত্য যোগাযোগ। সবার নাম জানেন। ব্যক্তিগত বিষয়ের খোঁজখবরও নেন।

তাঁকে দেখেই তিনি বললেন, তাজউদ্দীন আসছো। আসো।

তারপর নিজেই উঠলেন। বললেন, তোমার সঙ্গে আলাদা কথা বলতে হবে। এইদিকে আসো।

তিনি তাঁকে একটু আড়ালে নিয়ে গেলেন।

তারপর বললেন, তুমি তো জানো মওলানা সাহেব পদত্যাগপত্র দিয়েছেন?

জি জানি। খবরের কাগজে পড়েছি।

হ্যাঁ। আমরাও খবরের কাগজেই পড়েছি। পদত্যাগপত্র তো খবরের কাগজে দেবার জিনিস নয়। এটা পাঠাতে হবে পার্টির সেক্রেটারির কাছে। সেক্রেটারি কমিটিতে তুলবে। তাই না?

জি।

তাঁর পদত্যাগপত্র আমরা গ্রহণ করি নাই। তুমি তো জানো, তিনি প্রায়ই পদত্যাগের কথা বলেন; কিন্তু আসলে তিনি বলেছেন, জীবনেও তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়বেন না। জানো তো!

জি তিনি বলেছেন এ-কথা।

অলি আহাদকে তুমিও পছন্দ করো। আমিও পছন্দ করি। পররাষ্ট্রনীতি নিয়া লিডারের সঙ্গে তোমারও মতভেদ আছে আমারও আছে। তাই বলে এই কারণে তো পার্টি ভাঙা যায় না। আমরা আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। পার্টি সিদ্ধান্ত নিলে সবাই সেটা মানতে বাধ্য। আমরা ঠিক করেছি, যারা মন্ত্রী থাকবে, তারা আর পার্টিতে থাকবে না। যারা পার্টিতে থাকবে, তারা মন্ত্রী থাকবে না। আমি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করব। বুঝলা?

কিন্তু অলি আহাদ এটা কী করল? সে মওলানা সাহেবের পদত্যাগপত্র কেন সংবাদের জহুর হোসেন চৌধুরীর কাছে পৌঁছাইয়া দিলো? কাজটা কি সে ঠিক করেছে?

জি না।

তো এখন তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। তোমাকে মওলানা সাহেব বিশেষভাবে স্নেহ করেন। তুমি বললে তিনি না করতে পারবেন না। যাওয়ার সময় এক ঝুড়ি ফল নিয়ে যাবে।

জি কোথায় যাবো? তিনি তো আত্মগোপন করে আছেন।

হ্যাঁ। তিনি লুকায়া আছেন। তবে তাঁর অবস্থান জানা গেছে। তিনি আছেন সিরাজগঞ্জ মহকুমার সোহাগপুর গ্রামের কাছে। যমুনা নদীতে। নৌকায় আছেন। তুমি তাঁর কাছে যাবা। আমি চিঠি দিয়ে দিচ্ছি। তাঁকে বলবা, সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁকে দাওয়াত করেছেন। এই পেস্ননে ধরেই নিয়ে আসতে পারলে সবচেয়ে ভালো। তাঁকে এখান থেকে একবারে করাচি পাঠায়া দেব।

তাজউদ্দীন আহমদ ঠান্ডা মাথার মানুষ। নিজে প্রগতিশীল।  বামপন্থার দিকেও তাঁর খানিকটা ঝোঁক আছে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তিনিও সমর্থন করেন। কিন্তু এ-মুহূর্তে তিনি আওয়ামী লীগে থাকা এবং শেখ মুজিবের প্রতি আস্থা রাখাই কর্তব্য বলে স্থির করে নিয়েছেন।

১৯৫৭ সাল। ওই সময় দেশে বিমানবন্দর কমই ছিল। তখন সি-পেস্নন ছিল তাই প্রচলিত, এবং নিয়মিত। নদীর বুকে উড়োজাহাজ নেমে যেতে পারত।

তাজউদ্দীন আহমদ উত্তেজিত। সি-পেস্ননে চড়া হবে।

তিনি শেখ মুজিবের কথামতো সঙ্গে নিয়েছেন আম, জাম আর লিচু। লিচু ভালো পাওয়া গেছে। তবে আম যা পাওয়া গেছে, তা টক হবে। খেতে টক হলেও বাইরে দেখতে উজ্জ্বল হলুদ। এক ঝুড়ি ফল আর শেখ মুজিবের চিঠি নিয়ে তাজউদ্দীন তেজগাঁ এয়ারপোর্টে ছোট্ট  সাদা রঙের পেস্ননে উঠে বসলেন।

মুজিব ভাই সবকিছুর ব্যবস্থা করেই রেখেছিলেন।

ভাসানী তাজউদ্দীনকে দেখে বললেন, আইসো। এক নৌকা থাইকা আরেক নৌকায় উঠতে পারো তো মিয়া, নাকি?

তাজউদ্দীনের হাতে ফলের ঝুড়ি। সেটা তিনি আগে তাঁর  বোট থেকে ভাসানীর নৌকার পাটাতনে রাখলেন। তারপর নিজে বোটের পাটাতনে দাঁড়িয়ে এক পা বাড়িয়ে দিলেন ভাসানীর নৌকার পাটাতনে।

তাজুউদ্দীনও গ্রামেরই ছেলে। যদিও ছোটবেলায় নদীতে নদীতে সাঁতার কাটা তাঁর হয়ে ওঠেনি; কিন্তু তিনি ভালোই সাঁতার জানেন।

কে পাঠাইছে তোমারে? মজিবরে?

জি।

ক্যান পাঠাইছে?

আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।

কেন?

দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সেজন্য আপনি পদত্যাগ করে বসেছেন। তাতে দেশের ক্ষতি হবে। জনগণের ক্ষতি হবে। আপনি দলে থাকুন। তাহলে দলকে ঠিকপথে রাখতে পারবেন। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। এই দলকে ঠিকপথে রাখতে পারলে দেশের ভালো।

আওয়ামী লীগ ঠিকপথে নাই। সোহরাওয়ার্দী ঠিকপথে আওয়ামী লীগরে রাখতে দিবো না। ক্ষমতা মানুষরে অন্ধ বানায়া ফেলে। সোহরাওয়ার্দী অন্ধ হইয়া গেছে।

আপনাকে সোহরাওয়ার্দী সাহেব করাচিতে দাওয়াত দিয়েছেন। আপনি করাচি যান। তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলে যদি মনে হয় পদত্যাগপত্র উইথড্র করবেন না। করবেন না। আর যদি মনে হয় করবেন, তাহলে করবেন।

তাজউদ্দীন, তুমি দুপুরে কী খাইছো? ভাত খাও। জববার, সাহেবরে ভাত দাও।

ভাত খাবো না। আপনার জন্য মুজিব ভাই ফল পাঠিয়েছেন।

মজিবররে বইলো সে য্যানো গোস্বা না করে। আলাদা দল করা ছাড়া আমার আর উপায় নাই। অলি আহাদ কী বলে?

অলি আহাদ বলে, আমরা কেন দল ছাড়ব। আমরা দলে থাকব। যারা নীতি বিসর্জন দিয়েছে তাদের বহিষ্কার করব।

ও আর সেটা কেমন করে করবে। ওকেই তো বহিষ্কার করেছে আওয়ামী লীগ।

আপনি থাকলে সেটা নাও হতে পারতো।

আমি তো নারায়ণগঞ্জে জনসভা আহবান করছিলাম।

সেইটা তো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদক্ষেপ হলো না।

তুমি কী করতে বলো?

আমি বলি, আপনি আমার সঙ্গে ঢাকা চলেন। আপনি এখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলে তো পরিস্থিতি পালটাবে না। আপনাকে বাস্তবতার মোকাবেলা বাস্তবতা দিয়ে করতে হবে।

ভাসানী বললেন, দাও দেখি। দুইটা লিচু দাও। আম তো মনে হইতাছে টক।

জি টক। আপনি কী করে বুঝলেন।

বয়স হইছে না। বয়স দিয়া বুঝলাম। অসময়ের আম। চেহারা ভালো। মিষ্টি আম কখনো রঙিন হয় না। তোমার আম টকটকা হলুদ। এই অসময়ের সুন্দর আম কোনো কামের হওনের কথা না। তাজউদ্দীন, তুমি আমার প্রিয় মানুষ। তোমারে বলি। আমি ঢাকা যামু না। পরিস্থিতি তোমরা যত সহজ ভাবতাছো তত সহজ না। অনেক জটিল। ইত্তেফাকে আমাকে ইন্ডিয়ার চর বলতাছে। ইন্ডিয়ার কবি-লেখকদের আনা হইছে, এইটাকে খারাপ চোখে দেখা হইতাছে। মানুষ যে এত বড় মিথ্যা কথা রটাইতে পারে, শুইনা মনটা খুব দইমা গেছে। আমি ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা আছিলাম। ইয়ার মোহাম্মদ আছিল প্রিন্টার পাবলিশার। অহন সেই ইত্তেফাক আমার বিরুদ্ধে এইসব লেখতাছে। সেই মানিক মিয়া।

আপনি কী করবেন তাইলে?

দেখি। নয়া দল করতে হইব। সারা পাকিস্তানের প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক ফোর্সরে একত্রিত কইরা একটা বড় পস্ন্যাটফরম বানাইতে চাই। তুমি কী করবা?

আমি আওয়ামী লীগেই থেকে যাব। কারণ, পার্টি ফোরামে আপনার পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে কেউ তো আপনার পক্ষে দাঁড়ায় নাই। গণতন্ত্র হলে মেজরিটির মত মেনে নিতে হবে। আর…

আর?

আর মুজিব ভাইরে আমি না করতে পারব না।

একটা মাছরাঙা পাখি ঝোঁ মেরে একটা মাছ তুলে নিয়ে আবার আকাশে উড়ে গেল।

যমুনার বক্ষে কী অপরূপ শোভা খেলা করছে। নদীজল কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। একটু একটু বাতাস বইছে। ছোট ছোট ঢেউয়ে দূরে কতগুলো ডিঙি নৌকা দোল খাচ্ছে। আকাশ মেঘমুক্ত। রোদেলা চারপাশ। দূরে চরে গরু চরছে। এই চরের মধ্যে গরুগুলো কোত্থেকে এলো? তাজউদ্দীন ভাবতে থাকেন।

মাঝি ভাত বেড়েছে।

তাজউদ্দীন বললেন, ভাত খাবো না। আমাকে ঢাকায় ফিরে যেতে হবে।

না। খাও। আমি তো আর যাইতাছি না। তাড়াহুড়া কইরা লাভ কী। আমি গেলে না করাচির পেস্নন রেডি করতে হইতো!

তাজউদ্দীন নৌকায় বসে ভাত খাচ্ছেন। এক হাতে থালা ধরে আরেক হাতে খেতে হচ্ছে। মাছের ঝোল রাঁধা হয়েছে। আইড় মাছ।

আইড় মাছ তাজউদ্দীনের পছন্দের মাছ নয়; কিন্তু রান্নায় এত স্বাদ হয়েছে যে, তাজউদ্দীন বুভুক্ষুর মতো খেতে লাগলেন। খেতে গিয়ে হলুদ ঝোল পড়ল তার সাদা শার্টে। তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

ভাসানী খৈনি ডলছেন। খৈনি টানতে টানতে তিনি বললেন, জামাটা খুইলা নদীর পানিতে ধুইয়া নেও। তারপর তোমার ওই পেস্ননে যাইতে যাইতে গায়েই শার্ট শুকাইয়া যাইব।

তাজউদ্দীন মওলানা সাহেবের এই কথা শুনলেন না। মওলানার সব কথা যে শোনা যাবে না, এটা তিনি ভালো করেই বোঝেন।

তাজউদ্দীনের খাওয়া হয়ে গেছে। নদীর জলে তিনি হাত ধুলেন। এবার ফিরতে হবে।

বিদায়ের পালা। তাজউদ্দীনের মনে হলো, এই বিদায় একটা বড় বিদায়ের সূচনা মাত্র। তিনি যখনই এই ছইয়ে-ঢাকা নৌকা ছেড়ে তার বোটে উঠবেন, তখনই তিনি একটা যুগ থেকে বেরিয়ে যাবেন। আওয়ামী লীগের ভাসানী যুগ।

অবশ্য ভাসানী যে খুব স্থিরমতি মানুষ তাও নন। ঠিকভাবে আদরযত্ন করলে তিনি তাঁর মত পালটাতেও পারেন।

তাজউদ্দীনের মনে পড়ে গেল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের দিনগুলো। মওলানা ভাসানী হাতিতে চড়ে তাঁর হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করতে গিয়েছিলেন। বনের মধ্যে কারা যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। হাতি অস্থির হয়ে উঠেছিল। তাঁরা দুজন, ভাসানী আর তাজউদ্দীন, হাতির পিঠ থেকে পড়েও গিয়েছিলেন।

তাজউদ্দীনের বোটের সেইলরম্যানও ভাত খেয়ে নিলেন। তার খাওয়া হলে তাজউদ্দীন ভাসানীর সঙ্গে মোলাকাত সেরে বোটে উঠলেন।

তাজউদ্দীনের চোখ কি খানিকটা ভিজে উঠল?

না। তিনি আবেগপ্রবণ মানুষ নন। তাঁর চোখের জল তিনি কাউকে দেখাবেন না। মওলানা সাহেবের ফতুয়া থেকে খৈনির গন্ধ ভেসে আসছে। আশ্চর্য যে, তাজউদ্দীনের তা জীবনে প্রথমবারের মতো ভালো লাগল।

রেণু বললেন, তাইলে অলি আহাদ ভাইরে বহিষ্কার কইরে দিতেই হইলো?

তাঁর কোলে পানের বাটা। তিনি পান সাজাচ্ছেন।

মুজিব বললেন, হ্যাঁ। তাই তো।

অলি আহাদ ভাই কিন্তু মানুষটা ভালোই ছিল। কিন্তু একটু রগচটা টাইপের।

হ্যাঁ। বেশি থিয়োরিটিক্যাল। আবার একগুঁয়ে। এই রকম মানুষ দিয়া পলিটিক্স চলে না।

মওলানা সাহেবও পার্টি ছাড়লেন?

তুমি তো তাঁরে চিনোই। তাঁর কথার কোনো ঠিকঠিকানা আছে। সারাটা ক্ষণ তিনি আমাদের সরকারের সমালোচনা করেন। মতলবটা বুঝতে পারছ? ইস্কান্দার মির্জা করাচ্ছে এইসব।

তুমি কেমনে জানলা?

লিডারের কাছ থেকে জানলাম। কাগমারী সম্মেলনে লিডার দিছেন ৫০ হাজার। আবার ইস্কান্দার মির্জা দিছেন ২৫ হাজার। মওলানা সাহেব সবই নিয়েছেন।

এখন কী করবা?

দেখি, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ তো আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়েছেন। আমরা তো দলে নিয়ম করছি, একই লোক পার্টি আর সরকারে থাকতে পারবে না। আতাউর রহমান সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ কেউ থাকতে পারবে না। তাঁরা পার্টির পদ ছেড়ে দিয়েছেন।

তাহলে তুমি কী করবা?

তাই তো ভাবতেছি।

ভাবাভাবির কিছু নাই। অবশ্যই তুমি মন্ত্রীর পদ ছাড়বা। পার্টিই তোমার আসল। পার্টির এই অবস্থায় তোমারেই হাল ধরতে হইব। একটা পানের খিলি মুখে পুরে রেণু বললেন।

তাহলে এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।

দিবো।

কোথায় বাড়ি নেবো?

তাই তো।

শোনো। আমি চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হচ্ছি। সেগুনবাগিচায় ওদের চেয়ারম্যানের জন্য বাড়ি আছে।

তাইলে তো আর কোনো চিমত্মাই নাই। তুমি অবশ্যই মন্ত্রিত্ব ছাড়বা।

একটা টিকটিকি টিকটিক করে ডেকে উঠলো। দেয়ালে বকের গ্রীবার মতো বাঁকা ইলেকট্রিক বাতি ঝুলছে। তারই কাছে একটা টিকটিকি। লাইট ঘিরে উড়ছে নাম-না-জানা পোকা।

বড় বিছানার একপাশে জামাল ঘুমুচ্ছে। তার নিচে একটা লাল রঙের অয়েল পেপার পাতা। ঘরে ভেজা কাঁথার সোঁদা গন্ধ।

কবে ছাড়তেছো মন্ত্রিত্ব? বললেন রেণু।

মুজিব বললেন, লিডার আমাকে চীনে পাঠাচ্ছেন। যে-পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এত কথা, সেটা আসলে লিডার ঠিকঠাকই পরিচালনা করতে চান। কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে তিনি ভালো সম্পর্ক রাখতে চান। আমি চীনে যাব। মন্ত্রী হিসেবে গেলে আমাদের লাভ বেশি। শিল্প আর বাণিজ্য ক্ষেত্রে চীনের সহায়তা আমাদের দরকার হবে। আমি গেলে বাংলার লাভ।

তাইলে এক কাজ করো। আগে পদত্যাগপত্র জমা দাও। প্রধানমন্ত্রী সেইটা গ্রহণ করে বলে দিক যে, তুমি চীন থেকে আসার পরে এটা কার্যকর করা হবে।

ভালো বলেছো তো।

না, কী ভালো বলবো। আমি গিন্নি মানুষ। পলিটিক্সের আমি কী বুঝি।

তোমার একটা সিক্সথ সেন্স কাজ করে। অনেক কিছু তুমি ভালো আঁচ করতে পারো। আর সবচেয়ে বড় কথা নিজের স্বার্থ পরিবারের স্বার্থ তুমি দেখো না। তুমি দেখো কিসে মানুষের ভালো হবে। কিসে আমার ভালো হবে।

আমি সেইটাই দেখি। আমি জানি, তুমি মানুষের ভালো চাও। আওয়ামী লীগের ভালো চাও। তাতেই তোমার সুখ। তোমার সুখের জন্যই আমিও পার্টির ভালো চাই। দেশের মানুষের ভালো চাই।

জামাল নড়ে ওঠে। মনে হয় হিসু করবে। বিছানা ভেজানোর আগেই তাকে তুলে ফেলা ভালো।

রেণু জামালকে কোলে নিলেন। তাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে গেলেন কোলে করেই।

মুজিবের হাতে একটা ইত্তেফাক। তিনি মুসাফিরের কলাম পড়তে লাগলেন।

হঠাৎ করে তিনি বিড়বিড় করে উঠলেন, পারলাম না। মওলানা সাহেবকে রাখতে পারলাম না। আমি তো চেষ্টা করেছিলাম। আমি তো তাঁর কাছে বারবার করে ছুটে গিয়েছিলাম। আমি তো তাঁর কাছে ফতুল্লাহর নৌকায় গিয়ে দেখা করেছি। কথা বলেছি। আমি তাঁকে মিনতি করে অনুরোধ করেছি যেন তিনি আওয়ামী লীগ না ছাড়েন।

মুজিবের কেন যেন শামসুল হক সাহেবের কথা মনে পড়ল। আহা, বেচারির মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। শামসুল হক সাহেব ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ভাসানী ছিলেন প্রথম সভাপতি। শামসুল হক সাহেব এখন অসুস্থ। জালিম মুসলিম লীগ সরকারের কারাগারের নির্যাতন তিনি সহ্য করতে পারেননি। এই মুহূর্তে তিনি লাহোরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন। আল্লাহ, তুমি শামসুল হক সাহেবকে সুস্থতা দান করো।

রেণু বাথরুম থেকে বেরুলেন জামালকে কাঁধে তুলে নিয়ে। তিনি জামালের পিঠে আসেত্ম আসেত্ম চাপড় দিচ্ছেন।

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো

খাট নাই পালং নাই চোখ পেতে বসো…

ঘুমপাড়ানিয়া গানের একটা মাদকতা আছে। মুজিবও আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন।

জামালকে আবার শুইয়ে দিলেন রেণু।

তারপর বসলেন।

হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো ঘরজুড়ে। চরাচরজুড়ে।

রেণু বললেন, অলি আহাদ ভাই এই রকম করতে পারলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে?

মুজিব দাঁড়ালেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে পড়তে লাগলেন :

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।

এবার তিনি বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডের বারান্দায়। বাগানে কী একটা ফুল ফুটেছে। গন্ধরাজ নাকি। গন্ধরাজ ফুলে নাকি সাপ আসে!  ভারি মিষ্টি একটা গন্ধ এসে তাঁর মনটাকে আরো উতলা করে দিচ্ছে। কতদিনের সম্পর্ক তাঁদের দুজনের – মওলানা ভাসানীর আর মুজিবের! কী হলো মওলানা সাহেবের! কে তাঁকে এরকম উচাটন করল? ইস্কান্দার মির্জা? নাকি গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা? চীন? রাশিয়া? ভারত? নাকি পুরোটাই মওলানার নীতিনিষ্ঠতার ব্যাপার? নাকি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব?

নাকি তিনি চান যে, অলি আহাদ হোক সাধারণ সম্পাদক?

মুজিব রবীন্দ্রনাথ থেকে আবৃত্তি করতে লাগলেন :

মনেরে আজ কহ যে,

ভালো মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

কেউ বা তোমায় ভালোবাসে

কেউ বা বাসতে পারে না যে,

কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা

সিকি পয়সা ধারে না যে,

কতকটা যে স্বভাব তাদের

কতকটা বা তোমারও ভাই,

কতকটা এ-ভবের গতিকত

সবার তরে নহে সবাই।

তোমায় কতক ফাঁকি দেবে

তুমিও কতক দেবে ফাঁকি,

তোমার ভোগে কতক পড়বে

পরের ভোগে থাকবে বাকি,

মান্ধাতারই আমল থেকে

চলে আসছে এমনি রকম

তোমারি কি এমন ভাগ্য

বাঁচিয়ে যাবে সকল জখম!

মনেরে আজ কহ যে,

ভালো-মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

Tuesday, June 15, 2021

গল্প- ফণির পরে by আনিসুল হক

ক্যা   বারে কুটি যাচ্ছু! রমেন মাস্টার বলে জয়নালকে। রমেন মাস্টারের বগলে ছাতা, তার হাঁটার গতি দ্রুত। তার মাথায় টাক, টাকের ওপরে নীল আকাশের নীল, গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘ প্রতিফলিত হচ্ছে। জয়নাল গেরস্তি কাম করে, খেতি কাম করে; মানে সে একজন কৃষক; তার পরনে চেককাটা তমন্দ, গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি, তার চোখেমুখে রাজ্যের মেঘের ছায়া! অন্ধকার।

রমেন মাস্টার আবারো বলে, ক্যা বারে জয়নাল, কুটি যাচ্ছু!

ভেঁওত যাই বারে, কাইল সানঝের বেল বাতাস হলো না! তারপর তো বৃষ্টি।

মোর ভেঁও তো দেখা হলো না, কালকা আইতের বেলা মুই আর ঘুমাবার পারোম না। খালি ভাপর লাগে। ধানের ভেঁওটার না জানি কী অবস্থা!

রমেন মাস্টার তার পাশে দাঁড়ায়, গ্রামের কাঁচা রাস্তা বৃষ্টিতে ভিজে কাদাময়  হয়ে গেছে, হাঁটাও মুশকিল; বাটার খুব ভালো জুতা কাদায় গেঁথে যাচ্ছে। চারটা হাঁস রাস্তা দিয়ে প্যাঁক প্যাঁক করে হেঁটে যায়। বৃষ্টি হওয়ায় হাঁসগুলোর মনে বোধহয় বেশ ফুর্তি। একটা ছাগল গা ঝাড়ে। গা থেকে পানির ছিটা পিচকারির মতো ফুলঝুড়ি ঝরায়।

রমেন মাস্টার কাদায় ডেবে যাওয়া তার ডান পায়ের জুতাটা উদ্ধারের জন্য কসরত করতে করতে বলে, বাহে, ফণি হলো না? ওই যে ঘূর্ণিঝড়। ভগবানের আশীর্বাদে ফণি বাংলাদেশের ওপর দিয়া বয়া যায় নাই; কিন্তু বৃষ্টি তো হামার এলাকাতেও হলো। কী করব্যা! ওপরওয়ালাক তবু থ্যাংক ইউ বলা লাগে, ক্ষতি তো আরো বেশ হবার পাইরত! কী কও?

হ বারে। ওকনাই সান্তববনা। ক্ষতি তো আরো বেশিও হবার পারত।

বৃষ্টি ঝরল। ধরো যা গরম পড়ছিল, গরম তো কমল।

জয়নাল বলে, তা কমল। মাস্টর, তুমি কুটি যাচ্ছু?

মাস্টারের আর কাম কী! ছাত্র পড়াবার যাই বারে।

যাও। পড়াও। তোমার ছাত্র হামার ব্যাটার ফল বারাবি নাকি  বেষদবার, কথা কি ঠিক?

হ বারে। তাই তো শুনবার পাচ্ছি।

মাস্টর, হামার ব্যাটার জন্য আশীর্বাদ করো।

তাক ফির কওয়া লাগবি? আশীর্বাদই তো করিচ্ছি। সারাক্ষণ আশীর্বাদই করিচ্ছি।

জয়নালের বড় ব্যাটা জাহাঙ্গীর আলম। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল।  রেজাল্ট হবে বৃহস্পতিবার। জয়নালের দুই ছেলে। জাহাঙ্গীর, আলমগীর। আলমগীর ক্লাস সিক্সে উঠেছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। বড়টার মাথা আরো ভালো। ক্লাস এইটের পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছিল। জাহাঙ্গীর ম্যাট্রিকে যে কেমন করে, আল্ল­vহ জানে। ছেলেটার ব্রেন ভালো। মাস্টারেরা বলে। জয়নাল বাপ হয়ে ছেলের পড়াশোনার খবর নিতে পারে না। নিজে তো লেখাপড়া  বেশিদূর করতে পারে নাই। হাইস্কুলে গিয়েছিল কিছুদিন। শেষ তো করেনি। বাপ ডেকে ডেকে হালে লাগিয়ে দিত। জয়নালেরও হাল বাইতে ভালো লাগত। নিজেকে মরদ মরদ লাগত।

রমেন মাস্টার চলে যায় তার জুতায় আর কাদায় মচমচ শব্দ তুলে। খালি পায়ে জয়নাল হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। তার মনটা কেমন কেমন  যেন করছে। বাজে-পোড়া পাকুড়গাছের ভিটায় তার দেড় বিঘা জমিতে  সে বোরো ধান লাগিয়েছে। চৈত্র মাসের শেষেই ধানে শীষ এসেছে, এখন ধান পুষ্টু। চার-পাঁচ দিন সময় দিলেই ধান পেকে সোনালি হয়ে যাবে। খুব ভালো ফলন হবে এবার। জয়নাল মনে মনে ভেবেছিল। কৃষিকাজে লাভ নাই। ফসল ভালো ফললে, ফলন ভালো হলে বাজার পড়ে যায়। আর বাজার ভালো থাকলে ফলন ভালো থাকে না। এখন তো কিষানের মজুরি বেশি। তাও কিষান পাওয়া যায় না। কাটামারির সময় কিষানদের পোয়াবারো। জামাই-আদর করা লাগে কিষানদের। গ্রামে  কেউ থাকতে চায় না। সব গাজীপুর নরসিংদী চলে যায় গার্মেন্টসের কাজে। চট্টগ্রাম না কি কোথায় যায় জাহাজভাঙার কাজে। ঢাকা সিলেট চলে যায় রাজমিস্ত্রির কাজে। গ্রামেগঞ্জে পড়ে থেকে কৃষিকাজ করবে  কে? এদিকে পানির পাম্পে তেল লাগে। সেচের জন্য খরচ লাগে। সার আছে, কীটনাশক আছে। খরচের খাতের কি শুমার আছে বারে!

জয়নাল ভিটার দিকে হাঁটে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে এই সকালে। কাল সারাটা দিন ছিল খোসা ছাড়া লিচুর মতো মেঘে মেঘে ছাওয়া। রেডিও-টেলিভিশনে বারবার করে বলছিল, ঘূর্ণিঝড় ফণি আসছে। এটা নাকি ভয়ংকরতম ঘূর্ণিঝড়। বাজারে বিকালবেলা আলুপুরি খেতে খেতে জয়নালও শুনছিল অন্যদের মতামত : এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে উড়িষ্যায়। বাংলাদেশে আসতে আসতে দুর্বল হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশেও ঢুকবে খুলনা সাতক্ষীরা দিয়ে। চলে যাবে ফরিদপুর ঢাকা হয়ে মেঘালয় আসাম। তাদের এলাকায় ক্ষতি হবে না।

তা কাল রাতে যখন একটু বাতাস হলো, বৃষ্টি শুরু হলো, জয়নাল, তার দুই ছেলে জাহাঙ্গীর আর আলমগীর আর ছেলেদের মা মিলে তখন তারা টেলিভিশন দেখছিল। ভারতীয় বাংলা চ্যানেলে তখন একটা সিরিয়াল হচ্ছিল। বিদ্যুৎ চলে গেল, ঘর হয়ে গেল অন্ধকার, টেলিভিশন  ঘোলা! বাইরে হঠাৎ জোরে বাজ পড়ল, আলমগীর ভয়ে জড়িয়ে ধরল তার মাকে! জাহাঙ্গীর বলল, আলোর গতি শব্দের চায়া বেশি। এ আলমগীর, তুই বাজের আওয়াজকে ভয় পাচ্ছু কিসক, বিজলির আলোক ভয় পা।

তখনি তাদের টিনের চালে বৃষ্টি শুরু হলো।

জাহাঙ্গীর বলল, বাজান, ফণি আস্যা পড়ল।

জয়নাল বলল, হামাঘেরে এলাকাত নাকি আসপি না!

জাহাঙ্গীর বলল, আসপি না মানে ঝড়তুফান হবি না। কিন্তু বৃষ্টি  তো শুরু হয়াই গেল।

জাহাঙ্গীরের মা বলল, হারিকেনটা জ্বলাই। ম্যাচ কুটি থুছি চুলার পাড়তই তো থাকে।

জয়নাল বলল, পাকঘরত যায়া আমি আনা দিচ্ছি, তুমি যায়ো না।  তোমার শরীলডা তো জ্বরজ্বর।

জাহাঙ্গীর বলল, হামি যাচ্ছি। তোমরা নক করা বস্যা থাকো।

১৬‌ বছরের ছেলেটা চট করে ছাতাটা নিয়ে দরজার বাইরে গিয়ে ছাতাটা মেলে দৌড় ধরল রান্নাঘরের দিকে। দিয়াশলাইয়ের বাক্স আনতে। ওদের মা হারিকেন জ্বালাবেন। কারেন্ট তো আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকে। হারিকেন তাই লাগেই। কেরোসিনের খরচও লাগে।

জয়নাল সকাল সকাল বেরিয়েছে ক্ষেত দেখতে। ফণি চলে গেছে। সকালের আকাশ পরিষ্কার। নীল আকাশে সাদার ছিট, আকাশটাকে সুন্দর দেখাচ্ছে, মেঘগুলোকে মনে হচ্ছে একঝাঁক হাঁস, আকাশের নীলে সাঁতার কাটছে।

দুই পাশে ক্ষেতের দিকে তাকায় সে। ক্ষেত তো সব ঠিকই আছে। এই পাশে ধান, পাট, যারা যা করেছে, বৃষ্টির পানিতে ভেজা; কিন্তু ধানগাছগুলো মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে আছে। তার নিজের ক্ষেত এখন ঠিক থাকলে হয়।

শিমুলগাছের মোড়টা পার হলো সে। সাইকেল মেকানিক শিবুর দোকান। তিনটা রিকশাভ্যান সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের এই কাঁচা রাস্তার মোড় পর্যন্ত এখনো ব্যাটারির টমটম আসে নাই। রিকশাভ্যানগুলো এইখান থেকে যাত্রা শুরু করে পাকা রাস্তায় যায়। আরো দূরে যাওয়া তখন তাদের পক্ষে সহজ হয়। এখন এই কাদা রাস্তাটুকু পার হতে রিকশাভ্যানগুলোর কষ্টই হবে।

পাকুড়গাছটা বাজে পুড়ল। তার ডালপালা শুকিয়ে গেল। তবু গাছটায় কেউ হাত দেয়নি। এই গাছে তেনারা থাকতেন বলে গ্রামে প্রচলিত আছে। বাজ মানে আগুন। তেনারাও তো আগুনের তৈয়ারি।  তেনারা তো আর গাছ ছেড়ে চলে যাননি। কেউ যদি পাকুড়গাছের ডালে হাত দেয় খড়ি করবে বলে, তাহলে তার হাত তো পুড়ে যাবেই, বংশ নির্বংশ হতে পারে।

পাকুড়গাছের তলাটা পার হওয়ার সময় কলেমা পড়ে নিল জয়নাল।

তারপর উঁচু জমিটা পেরিয়ে নিচে তার ধানক্ষেতের দিকে চোখ পড়ল জয়নালের।

সে স্থির হয়ে গেল। ওই পাশে তিনশো-চারশো হাত চওড়া একটা জায়গা জুড়ে যত ক্ষেত আছে, সব শুয়ে পড়েছে। বাতাসের একটা ঝাপ্টা এই জায়গা দিয়ে বয়ে চলে গেছে সম্ভবত। তার নিজের ধানক্ষেতের সব ধান নুয়ে আছে। আশেপাশে সামনে আরো আরো  ক্ষেতের একই অবস্থা। পুবের দিকের জমিতে খয়বার চাচা করলা করেছিলেন, জাংলা ছেড়ে মাটিতে পড়ে আছে সব করলার ডালপালা, ওইদিকে হামেদ মিয়ার কলাক্ষেতেও দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষয়ক্ষতি।

আহা রে, আর পাঁচটা দিন সময় পেলেই ধান পেকে যেত। কাটামারির ফুর্তি লাগত। মামুর কিষান নিয়োগ দিত জয়নাল। ভাই ভাসেত্ম ভাগ্নে যতজন কামলা কিষান আছে, সবাইকে সে আলু লাউ গরুর মাংসের ঘণ্ট দিয়ে দুপুরে ভাত খাওয়াত। সবাই মিলে লেগে পড়ত ধান কাটতে। কিন্তু পাঁচটা দিন সময় দিলো না ফণি। বাতাসটা কিনা তার ক্ষেতের ওপর দিয়েই বয়ে গেল।

এই ধান করার জন্য সে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে দশ হাজার টাকা  লোন নিয়েছে। ধানকাটা সেরে ধানের দাম কিছুটা উঠলে সে বিক্রি করে দিত ধান। ঋণ শোধ করত। ছেলে তার কলেজে যাবে। মোকামতলা কলেজে। তার জন্য একটা সাইকেল লাগবে। সাইকেলের টাকাও  সে জোগাড় করে ফেলতে পারবে। কলা করেছে কালীতলার ভিটায়।  রোজার মাসে কলার চাহিদা বাড়বে …

জয়নালের চোখের কোণে পানি জমে, আকাশ পরিষ্কার, নীল আরো নীল হয়ে উঠছে। আলোয় আলোয় ভরে উঠছে পুরা পাথার। শুধু তার  চোখের কোণে পানি জমছে। সে কি কাঁদবে। এই সকালবেলা নিজের  ক্ষেতের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো দেড় বিঘার জমির শীষে ভরা ধানের জমিকে মাটিতে শুয়ে পড়তে নুয়ে পড়তে দেখে সে যদি কাঁদে, লোকে কি কিছু মনে করবে? কে দেখবে? দেখলেই বা কী!। মনে করলেই বা কী! জয়নালের নিজ হাতে চাষ করা জমিতে, নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে বড় করা ধান নুয়ে পড়েছে, হেলে পড়েছে, মাটির সঙ্গে মিশে আছে, তার অবশ্যই কাঁদা উচিত।

জয়নাল এগিয়ে যায়। মাটিতে বসে। ধানের একটা গোছা হাতে তুলে নেয়। ভেজা ধানের গা থেকে পানি ঝরে। তার হাত ভিজে যায়। মাটিতে পানি জমে আছে। একটা ঢোঁড়া সাপ হলুদ লেজ নাড়তে নাড়তে চলে যায় দূরে, তাকে দেখে, সসম্ভ্রমে। তিনটা চড়ুইপাখি ধানের ক্ষেতের ওপর দিয়ে ঝগড়া করতে করতে পাক খেয়ে ওড়ে।

জয়নাল উবু হয়ে তার ক্ষেতের ধানে হাত বুলায়। ধানের ছড়াগুলোকে হাতে তোলে। ধানগাছগুলোকে সান্তবনা দেয়। বলে, এই  তোরা কি খুব ব্যথা পেয়েছিস?

কী করবে এখন জয়নাল?

জয়নাল দাঁড়ায়। তার পায়ের নিচে পানি। গোড়ালি ডুবে গেছে পানিতে। লুঙ্গিটা তুলে সে হাঁটুর ওপরে ভাঁজ করে বাঁধে। ঘাড়ের গামছা  সে কোমরে বাঁধে। তারপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে তার পুরা ক্ষেতের দিকে। পুরাটা ক্ষেতে সবুজ ধান কালো ধান আধাপাকা ধান মাটির সঙ্গে মিশে শুয়ে আছে।

হঠাৎ সে দেখতে পায়, কতগুলো পিঁপড়া তার ডান পা বেয়ে ওপরে উঠছে। একটা ধানগাছে বাসা বানিয়েছিল পিঁপড়াগুলো। তাকে পেয়ে তারা তার পা বেয়ে উঠছে। ছোট ছোট লাল পিঁপড়া। এখন সে কী করবে? এই পিঁপড়া তাকে কামড়াতে আরম্ভ করলে যন্ত্রণার আর অবধি রইবে না। আর যদি সে পা সরিয়ে নেয় পিঁপড়াগুলান বাঁচবে না তো।

এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত। পিঁপড়াগুলানকে তার পা বেয়ে উঠতে দেওয়া উচিত। নাকি ঝেড়ে ফেলে দেওয়া উচিত?

সামনে কর্তব্য আছে। আজকালের মধ্যেই ধান কেটে ফেলতে হবে। যে-অবস্থায় আছে সে-অবস্থাতেই। ভালো চাল হবে না। কিন্তু হবে। ভালো দাম পাওয়া যাবে না। কিন্তু পুরাটা তো আর লোকসান হবে না। এখনই ব্যবস্থা করতে হবে। কিষান ডাকতে হবে।

জয়নাল পিঁপড়ার কথা ভুলে যায়।

তারপর সে কর্তব্যের টানে ঘরের দিকে ফিরতে থাকে। কোমরে বাঁধা কাপড়ের ফিতায় তার মোবাইল ফোনের থলে থেকে সে ফোনটা  বের করে। ফোনের নম্বর চেক করে সে ফোন দেয় জামালকে। ক্যা বারে জামাল, ক্যাংকা আছু। হ্যালো, শোনেক, হামার ধানের ভেঁও তো মাটির সাথে মিশা গেছে। ধান পাকতে আরো চার-পাঁচ দিন টাইম দেওয়া লাগত; কিন্তু উপায় তো নাই। কাটাই লাগবি। তুমি পাঁচটা কিষান আন্যা দেও বারে।

বলতে বলতেই পাকুড়তলা পেরিয়ে সামাদের দোকানের পাশে টিউবওয়েলের পাশে এসে সে দাঁড়ায়।

ব্যাগের মধ্যে মোবাইল ফোনটা ভরে সে চাপকলের হাতলে চাপ  দেয়। গলগল করে পানি বেরোতে থাকলে সে তার পা এগিয়ে দেয়।

পায়ে অনেক পিঁপড়া। টিউবওয়েলের পানির স্রোতধারায় পিঁপড়াগুলো ভেসে যেতে থাকে। পিঁপড়াগুলোকে বাঁচানোর কথা জয়নাল ভুলেই গিয়েছিল। খালি যে আকাশের দেওয়া খামখেয়ালি করে, কাউকে বাঁচায়, কাউকে মারে তা নয়, দেখা গেল, জয়নাল নিজেও খামখেয়ালি করে। একটু আগে তার মনে হয়েছিল সে পিঁপড়াগুলোকে বাঁচতে সাহায্য করবে; কিন্তু নিজের ক্ষেতের ধান কাটার ব্যবস্থা করতে গিয়ে সে তার গায়ে আশ্রয় নেওয়া পিঁপড়াগুলোর কথা বেমালুম ভুলে  গেছে।

এখন পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ার আগে তিন-চারটা পিঁপড়া তাকে কামড় বসিয়ে দেয়। তখন তার হুঁশ হয় যে পিঁপড়াগুলোকে বাঁচাতে চেয়েছিল।

কিন্তু এর মধ্যে সে পিঁপড়াগুলোকে টিউবওয়েলের পানির ধারায় ভাসিয়ে দিয়েছে।

দুই দিন পরে ধান কেটে কিষানেরা তার উঠানে পালা করে। কাঁচা ধানের ভেজা গন্ধে উঠান ম-ম করে। ধান মাড়াই করতে হবে।

জাহাঙ্গীরের মা গরুর চাড়িতে মাড় দিতে দিতে ধানের পালাটাকে  দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জয়নাল পরের দিন দুই কিষানকে কামলা খাটানোর জন্য বলবে বলে মোবাইল ফোনে তাদের নাম সার্চ দেয়।

আঙিনায় মুরগি চরছে। একটা নেড়ি কুত্তা শুয়ে আছে আমগাছের ছায়ায়। দূরে একটা গরুর পিঠে দুইটা পাখি পোকা খাচ্ছে। গরুটা আরামে গলা বাড়িয়ে শরীর এলিয়ে দেয়।

হিন্দি গানের সুরে জয়নালের মোবাইল ফোনের রিংগার বাজে।  ফোন করেছে জাহাঙ্গীর। তার ছেলে।

হ্যালো, বাপ, কও বারে।

বাপজান, হামি জিপিএ ফাইভ পাছি।

জাহাঙ্গীর লাফিয়ে ওঠে, ও জাহাঙ্গীরের মাও, শুনছ বারে, তোমার ব্যাটা তো জিপিএ ফাইভ পাছে।

জাহাঙ্গীরের মায়ের হাতে তখন একটা আরএফএলের লাল বালতি। সে সেটা নামিয়ে রেখে ছুটে আসে, কেটা ফোন করিছে?

জাহাঙ্গীর। লাও। কথা কও …

হ্যালো, জাহাঙ্গীর …

মাও। হামি জিপিএ ফাইভ পাছি মাও। আমি আসিচ্ছি, বাপজানক কও, হামাক কিন্তু সাইকেল কিন্যা দেওয়াই লাগপে …

দিবে তো। তোর বাপ টাকা জোগাড় করিচ্ছে বাপ। আয় … বাড়িত আয় …

জয়নাল ধানের পালাটার দিকে তাকায়। আর পাঁচটা দিন পরে যদি ফণিটা আঘাত হানত, তাহলে কয়েক হাজার টাকা বেশি পাওয়া  যেত এই ধান থেকে। আল্ল­vহর মনে যে কী আছে। ফণি আঘাত হানল খুলনা, সাতক্ষীরায়, আর ধানক্ষেত শুয়ে পড়ল তার। কতদূরে থাকে তারা সমুদ্র থেকে।

জাহাঙ্গীরের বাপ, তুমি চিন্তা করিচ্ছ কী? সাইকেলের ট্যাকা হামি  তোমাক দেমো। হামার সমিতিত হামার টাকা জমা থাকিচ্ছে তো। ওঠো। ব্যাটার ফল ভালো হছে, হাসো তো।

চামেলি বলে। জয়নালের বউ। জাহাঙ্গীর আলমগীরের মা।

আলমগীর কোত্থেকে আসে। নীল শার্ট পরা, হাফপ্যান্ট। বলে, মা, হামি পড়বার বসিচ্ছি। ভাইজান ফল ভালো করিছে, হামাকো তো করা লাগবি, না?

চামেলি হাসে। ক্যা বারে আলমগীর, এক বেলা পড়লি ফল ভালো হবি?

আলমগীর বলে, ইস, হামার ফল কী খারাপ? হামিও তো জিপিএ ফাইভ পাছি। পিএসসিত। পাই নাই? কও।

একটা মোরগ অসময়ে ডেকে ওঠে, ক কক কক। কুক কুরু কু।

চামেলি দুধ জ্বাল দেয়। জাহাঙ্গীর এলে দুই ভাইকে একসঙ্গে দুধভাত খেতে দেবে সে।

তার ছেলেরা দুধভাতে বড় হচ্ছে, এটা ভাবতেই তার চোখে পানি চলে আসে।

গ্রামীণ ব্যাংকের লোক তখনই এসে তাদের উঠানে দাঁড়ায়, চামেলি  বেগম আছেন নাকি! এই সপ্তার কিস্তিটা …

Sunday, March 15, 2020

গল্প- এই পথে আলো জ্বেলে by আনিসুল হক

শেখ মুজিব আবদুল মোমিনকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন! আহা, কতদিন পর, ১৭ মাস পর, তাঁর নিঃসঙ্গতা ঘুচল! কারাগারে তিনি এখন একজন সঙ্গী পাবেন, যার সঙ্গে তিনি সুখ-দুঃখের কথা বলতে পারবেন। তার কক্ষে আরেকজনকে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন। রাতের বেলা যখন বাইরে থেকে দরজায় তালা পড়ে, একা থাকলে তখন পৃথিবীর সমস্ত নির্জনতা এসে ভর করে নিজের ওপরে। এই অনুভূতি যে জেলখানায় কখনো থাকে নাই, তাকে বোঝানো সম্ভব নয়। রাতের বেলা তোমার শরীর খারাপ হতে পারে, কোনো বিপদ-আপদ হতে পারে, কিন্তু সেই কথা কাউকে জানানোর কোনো উপায় নাই। শুধু বাইরে প্রহরীর বুটের শব্দ মাঝেমধ্যে ভেসে আসে। তখন একটা টিকটিকিকেও আপন বলে মনে হয়!

রোজ রাতে তিনি অনেকক্ষণ বই পড়েন। রেণু তাকে কতগুলো বাঁধাই করা খাতা দিয়ে গেছে, সেখানে রোজনামচা লেখেন। মোমিন আসার পর সুবিধা হয়েছে, নিজে বই পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গেলে মোমিন বই পড়ে শোনায়। মুজিবও আওয়াজ করে বই পড়তে পছন্দ করেন।

মুজিব গুনগুন করে গান করেন। রবীন্দ্রসংগীত – ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ কিংবা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

শীত পড়েছে ১৯৬৮-এর জানুয়ারিতে। জেলখানায় গরমের চেয়ে শীতকাল ভালো। সেদিন সন্ধ্যার পর দুইজনে গল্প করে খাওয়া-দাওয়া সেরে খানিকক্ষণ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত দেশের খবর নিয়ে আলোচনা করলেন।

খবরের কাগজে বেরিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারত-সমর্থিত চক্রামেত্ম জড়িত থাকার অভিযোগে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং রাজনীতির সঙ্গে সংশিস্নষ্ট ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ ভারতীয় কূটনীতিক মিস্টার ওঝার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন। এরা আগরতলায় গিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিশ্র আর মেজর মেননের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ভারতের কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র এবং অর্থ সংগ্রহই এর উদ্দেশ্য।

ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দুই সিএসপি অফিসার ফজলুর রহমান এবং রুহুল কুদ্দুসকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মুজিব বললেন, ফজলু আর কুদ্দুসকেও ফাঁসিয়ে দিলো। আমার দুই বিশ্বস্ত আমলা! এদেরকে আমার দরকার! ফজলুর রহমানের সঙ্গে দেখা হয়েছে জেলের মধ্যে ঈদের দিন। বলল, আপনাকে জড়াবার খুব চেষ্টা চলছে। রেণুও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে বলল, তোমাকে জড়াবার খুব চেষ্টা করতেছে। জানি না খোদা কী করে। আলস্নাহর উপর নির্ভর করো।

মোমিন বললেন, কাউকেই বাইরে রাখবে না। নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে চেনেন নাকি মুজিবভাই?

মুজিব বললেন, চিনি। রোমান্টিক বিপস্নবী। বহুদিন থেকেই তার মাথার মধ্যে সশস্ত্র বিপস্নবের চিমন্তা। আমি করাচি গেলাম ১৯৬৪ সালে। তার বাড়িতে দাওয়াত করে খাওয়াল। তখন তার পোস্টিং করাচিতে। তার ড্রিগ রোডের বাসায় গেছি। তার একটা অবাস্তব স্বপ্ন আছে। পূর্ববাংলার সব সৈন্য একযোগে বিদ্রোহ করবে। দেখো, এইসব নিয়া আমি অনেক ভাবছি। জনগণকে সঙ্গে না নিলে কোনো বিদ্রোহ সফল হয় না। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়া মানে সমস্ত সম্ভাবনা শেষ করে ফেলা। সিপাহি বিদ্রোহ কেন সফল হয় নাই! সব ফাঁসিতে ঝুলবে। জনগণ চায়া চায়া দেখবে। ব্রিটিশ আমলে যেমন দেখছে। সিরাজউদ্দৌলার পতন যেমন দেখছে। আমি যখন ছয় দফা পেশ করতে লাহোর যাই, সে গাফ্ফার চৌধুরীকে তার আগে আমার কাছে পাঠাইছিল। সাংবাদিক গাফ্ফার চৌধুরী তার বার্তা নিয়া আমার ৩২ নম্বরের কাছে আসছিল। বলে যে, মুজিবভাই, কমান্ডার মোয়াজ্জেম তো আপনাকে যেতে মানা করে। আপনি যদি এখন যান, সেখানে কোনো বিপস্নবী দাবি জানান, আইয়ুব খান সতর্ক হয়ে যাবে। আমি মোয়াজ্জেমের নাম শুনেই গাফ্ফারকে থামতে বললাম। আমি তো জানি সে কী করতে চায়। ইদানীং সে চট্টগ্রামের মানিক চৌধুরীর সাথে মেলামেশা শুরু করছে, তাও আমার জানা।

শোনো, দেশ স্বাধীন করতে হলে প্রথমে লাগবে সংগঠন। আমি আওয়ামী লীগকে সেই লক্ষ্যে গড়ে তুলতেছি। এরপর লাগবে জনগণের ঐক্য। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জনগণ ঐকবদ্ধ হচ্ছে। ছয় দফা তারা রক্ত দিয়ে গ্রহণ করেছে। গণতান্ত্রিক ফ্রেমের মধ্যে ছয় দফা দিছি। এটা কাজ করতে শুরু করলে এক দফা সময়ের ব্যাপার মাত্র। মোয়াজ্জেমদের এই সব পরিকল্পনা সামরিক। সামরিক যুদ্ধ তো এটা নয়। এটা জনগণের সংগ্রাম। শোনো, আমার মনে হয় এই সময় আমাদের জেলে থাকাটা শাপে বর হলো। তা না হলে এইসব রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আমাকেও ফাঁসাত। আইয়ুব খান আর মোনেম খানের একমাত্র লক্ষ্য আমাকে খতম করা।

মোমিন বললেন, আর আপনাকে খতমের উদ্দেশ্য হলো বাঙালিকে চিরদিনের জন্য শেষ করে দেওয়া।

মুজিব বললেন, তবে এইবার আমাকে জড়াতে পারবে না। ঘটনা যখন ঘটতেছে, তখন তো আমি জেলে। এত বড় মিথ্যা কথা বলে তারা বিপদে পড়তে চাবে না। তাই না।

শীতটা বেশ ভালোই জাঁকিয়ে পড়েছে। আলো নিভিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে দুজনেই শুয়ে পড়লেন। শেখ মুজিবের ঘুম আসছে না।

ফজলুর রহমান সিএসপি তো বললই আপনাকে জড়াবার চেষ্টা হচ্ছে। চট্টগ্রামের একজন কর্মী ঈদের জামাতশেষে মুজিবকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, ২১ দিন কাস্টোডিতে রেখেছিল। মেরে পা ভেঙে দিয়েছে। শুধু আপনার নাম বলার জন্য এত মেরেছে যে আর সহ্য করতে পারি নাই। যা লিখেছে, তাতেই সই করে দিয়ে এসেছি। মরো মরো অবস্থায় তাকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে পাঠিয়েছিল। এখন আবার জেলে দিয়েছে।

আরেকজন এসে সালাম দিয়েছিল। মুজিব তাকে বলেছেন, আপনাকে তো চিনলাম না।

তিনি বললেন, আমার নাম কামালউদ্দিন। আগে নৌবাহিনীতে ছিলাম। পুলিশ হাজতে নিয়ে আমাকে মেরে পুরা বডি পচায়া দিছে। সোজাভাবে শুইতে পারি না। পায়খানার দ্বার দিয়া কী যেন ঢুকায়া দিত, যন্ত্রণায় অস্থির হইতাম। এই দেখেন জ্বলন্ত সিগারেট দিয়া আমার শরীরের কত জায়গা পুড়ায়া দিছে। আপনার নাম লেখায়া নিছে। যদিও বলছি, আপনার সাথে আমার কোনোদিনও পরিচয় ছিল না। কী করব স্যার, মাইরের চোটে মিথ্যা বলছি। তবে হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস করছি।

(ব্যাঙ্গমা বলে, কামালউদ্দিন কোর্টের কাছে এইসব কইছেনও।

ব্যাঙ্গমি বলে, সেই জবানবন্দি কাগজে ছাপাও হয়েছে। মুজিবের চোখে তা পড়ছেও।

ড. কামাল আর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম কামালউদ্দিনের পক্ষে হাইকোর্টে নির্যাতনের মামলা করছিলেন)এ

রেণুকে মুজিব বলেছিলেন, দেশরক্ষা আইনে জেলে রেখেছে, ১১টা মামলা করেছে, কয়েকটাতে সাজা হয়েছে, এরপরও এদের ঝাল পড়ল না। ছয় দফার এতই ঝাল! সামনে বসেছিলেন আইবি অফিসার আর এসবি অফিসার। তাই বেশি কথা আর রেণুকে তিনি বলতে পারেননি।

তাঁর শরীরটাও বেশ খারাপ। ওজন কমে যাচ্ছে দ্রম্নত। তিনি হাসপাতালের অধীনে আছেন। এখনো তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। হাসপাতালের খাবার বরাদ্দ হচ্ছে তার নামে। যদিও হাসপাতালের বেডে তার জায়গা হয় নাই।

কখন যে মুজিব ঘুমিয়ে পড়েছেন জানেনও না।

খটখট খটখট। মোমিন সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। জানালার কাছে কারা যেন শব্দ করছে।

তিনি ঘুমজড়িত কণ্ঠে বললেন, কে?

শেখ সাহেবকে একটু উঠতে বলেন।

কে?

আমি ডেপুটি জেলর তোজাম্মেল।

এত রাত্রে কেন আসছেন? মুজিব জিগ্যেস করলেন।

দরজা খুলে ভিতরে এসে বলছি।

ডিউটি জমাদার দরজা খুলে দিলেন।

তোজাম্মেল ভেতরে প্রবেশ করে শেখ মুজিবকে বললেন, আপনার রিলিজের অর্ডার আসছে। আপনি মুক্ত। এখনই আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে।

শেখ মুজিব বললেন, হতেই পারে না।

তোজাম্মেল হোসেন বললেন, সত্যিই আপনাকে মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। কাপড়চোপড় নিয়া চলেন।

মুজিব বললেন, আমার তো অনেক মামলা। বহু মামলাতে আমি জামিন নিই নাই। চট্টগ্রাম থেকে আছে কাস্টোডি ওয়ারেন্ট, যশোর সিলেট নোয়াখালি পাবনা থেকে আছে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট। ছাড়বেন কী করে? বেআইনি হবে।

তোজাম্মেল ভাঙা গলায় বললেন, সরকার চাইলে আপনাকে মুক্ত করা সম্ভব। আপনি চলেন।

মুজিব বললেন, আপনি আমার রিলিজ অর্ডার আনেন। কাগজ না দেখে আমি বাইর হবো না।

তোজাম্মেল সাহেব কাগজ আনতে গেলেন।

মোমিন সাহেবকে মুজিব বললেন, কী বুঝতেছেন?

মোমিন সাহেব বললেন, হয় আপনাকে অন্য জেলে ট্রান্সফার করবে, তা না হলে কোনো খারাপ ষড়যন্ত্র আছে। ভাবি যা আশংকা করতেছিলেন, তাই বোধহয় হতে যাচ্ছে।

ডেপুটি জেলার তোজাম্মেল সাহেব কাগজ নিয়ে এলেন। মুজিব চোখে চশমাটা দিয়ে ভালো করে পড়লেন। দেশরক্ষা আইন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে।

মোমিন সাহেব বললেন, সত্যি তো মুক্তি দিচ্ছে।

শেখ মুজিব বললেন, দেখেন, বিছানা কাপড় যারা বাঁধছে, কারো মুখে হাসি নাই। সবাই গম্ভীর।

আবদুল মোমিন বললেন, আর তা ছাড়া সাজা হওয়া কয়েদির মুক্তির ফরমান কই?

শেখ মুজিব বললেন, আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমি জানি না। বোধহয় আর কোনোদিনও দেখা হবে না। আপনি রেণুকে বলবেন, আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে। এই খবরটা পৌঁছায়া দিবেন। আর আমি তো চললাম। আপনারা আছেন। দেশের জন্য দেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালায়া যাবেন। খোদা আপনাদের সহায় হবে।

তিনি মোমিনকে জড়িয়ে ধরলেন, মোমিনের কাঁধে মাথা রাখলেন, তারপর তার কানে স্পষ্ট নিচু স্বরে বললেন, বাংলাদেশ রইল। এই দেশকে আপনারা স্বাধীনতার পথে আগায়া নিয়া যাবেন। আমার সারাজীবনের একটাই স্বপ্ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমি থাকব না, কিন্তু এই দেশ থাকবে, আমাদের ছেলেমেয়েরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বড় হবে। মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

মুজিবের দুচোখ দিয়ে দু-ফোঁটা অশ্রম্ন নির্গত হলো। সেই অশ্রম্ন সিক্ত করল আবদুল মোমিনের কাঁধের জামা।

আবদুল মোমিন হু-হু করে কাঁদছেন। কান্নার প্রবল বেগে যেন তিনি ভেসে যাবেন।

শেখ মুজিব একজন একজন করে মেট, জমাদার, বাবুর্চি, ফালতু সবার কাছে গেলেন। বললেন, চললাম। তোমরা আমার জন্য দোয়া করিও। জানি না আমার ভাগ্যে কী আছে। কোনো ভুলত্রম্নটি অপরাধ যদি করে থাকি, মাফ করে দিও।

তারা সবাই কাঁদতে লাগল।

তিনি জেলগেটে পৌঁছালেন।

এসে দেখেন, রীতিমতো যুদ্ধ যুদ্ধ সাজ। হেডলাইট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামরিক কনভয়।

খাকি পোশাক পরে হাতে অস্ত্র মাথায় হেলমেট পরে সামরিক কায়দায় দাঁড়িয়ে আছে সৈন্যদল।

মুজিব ডেপুটি জেলারের রুমে গিয়ে বসলেন। একজন মিলিটারি অফিসার এগিয়ে এলো, বলল, শেখসাহেব, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো।

মুজিব বললেন, নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। সেটা দেখালে বাধিত হবো।

অফিসার একজন সাদা পোশাকপরা কর্মচারীকে বললেন, পড়ে শোনাও।

তিনি পড়তে লাগলেন, ‘আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স আইন অনুসারে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো।’

মুজিব বললেন, ঠিক আছে কোথায় যেতে হবে চলেন।

অফিসার বলল, আপনার জিনিসপাতি নিয়ে চিমন্তা করবেন না। আপনি যেখানে থাকবেন সেখানে ঠিকঠাক পৌঁছে যাবে।

লোহার গেট খুলে দেওয়া হলো। মুজিবের জন্য জেলের ছোট গেট খুললে হয় না। তিনি মাথা নিচু করে বের হন না। তার জন্য শব্দ করে বড় গেটটাই খুলতে হলো। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল লোহার বড় ফটক খোলার শব্দে।

পুরো জেলখানা যেন মিলিটারি জওয়ানরা ঘিরে রেখেছে। সামনে মিলিটারি গাড়ি।

মুজিব বললেন, এক মিনিট।

তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। বাংলার ধূলিমাটি তিনি স্পর্শ করলেন পরম মমতায়। বিড়বিড় করতে লাগলেন, আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি…

তারপর একমুঠো মাটি তিনি তুলে নিয়ে নিজের রুমালে বাঁধলেন। সেটা রেখে দিলেন পকেটে।

সামনে একটা গাড়ি। মেজর পদের একজন বললেন, আপনি গাড়িতে উঠুন।

তিনি গাড়ির পেছনের সিটে বসলেন। তার দুই পাশে দুজন সশস্ত্র সৈনিক বসল। সামনের সিটে মেজর আর ড্রাইভার। হেডলাইটের আলো ফেলে গাড়ি নড়তে লাগল। সামনে-পেছনে মিলিটারি গাড়ির এসকর্ট।

দুই সৈনিকের গা থেকে বোঁটকা গন্ধ আসছে। মুজিব বিরক্ত হতে যাবেন, তার আগেই গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের শীতের বাতাস এসে তার মনকে প্রফুলস্ন করে ফেলল। আহ্, কতদিন পরে তিনি খোলা আকাশের নিচে চলেছেন। কতদিন পরে তিনি দেখছেন নাজিমউদ্দীন রোড। এই সেই ঢাকা শহর। এই সেই চেনা পথঘাট। তিনি পাইপ ধরালেন। গাড়ি এলো রমনা এলাকায়। শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমউদ্দীনের কবর দেখতে পেলেন। তিনি সালাম জানালেন নেতাদের। বললেন, একবারও কি তোমাদের মনে পড়ে না হতভাগা দেশবাসীর কথা!

শাহবাগ হোটেল পার হয়ে গাড়ি চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে। মুজিব বুঝে ফেললেন, তারা চলেছেন কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের দিকে। তিনি বাংলার মাটি স্পর্শ করে বললেন, মা গো, তোমাকে আমি ভালোবাসি। মৃত্যুর পরে তোমার মাটিতে যেন স্থান হয় মা।

তাঁর বৃদ্ধ মা-বাবার কথা মনে পড়ল। তাঁর আববার বয়স ৮৪, মায়ের বয়স ৭৫। এই বৃদ্ধ বয়সে যদি তাঁরা শোনেন, তাঁদের ছেলেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে অজানার উদ্দেশে, এই আঘাত তাঁরা সইবেন কেমন করে!

একটা ঘরের সামনে এসে গাড়ি থামল। সেখানেও সশস্ত্র সৈনিকদের সতর্ক প্রহরা। তিনি বুঝলেন, তিনি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে এসে গেছেন …

(বিভিন্ন বইয়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে)

Wednesday, October 16, 2019

ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত : -আনিসুল হক

দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত বলে মনে করেন বুয়েটের সাবেক কৃতী শিক্ষার্থী ও লেখক আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, পেশীশক্তি নির্ভর বর্তমান ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্ররা যুক্ত হয় পার্থিব লাভ ও অল্প বয়সে অধিক টাকার মালিক হওয়ার মানসে। ছাত্ররাজনীতির এমন হালের পেছনে শিক্ষাঙ্গনে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার দৈন্যতা বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।
আনিসুল হক বলেন, ‘৯০ সাল পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতিতে একটা আদর্শ ছিল। এরপর থেকেই ছাত্ররাজনীতির মূল চালিকা শক্তি হয়ে গেলো পেশীশক্তি। এর কারণটা হলো লোভ, পার্থিব লাভ, অতি অল্প বয়সে অধিক টাকার মালিক হওয়ার মানসিকতা।অতীতের সফল আন্দোলনগুলোতে আমরা দেখেছি, যারা আন্দোলন করতেন তারা জমিদারের ছেলে হয়েও খদ্দের পড়তেন, এক কাপড়ে জীবন পার করে দিতেন। তাদের মধ্যে আদর্শ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি যেসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্ররাজনীতি আছে সেখানে নির্মমতা জায়গা করে নিচ্ছে।  যেসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নেই সেখানে র‌্যাগিং এর নামে নানা ধরণের নির্যাতন হচ্ছে।
যেটি আগে আমাদের দেশে ছিল না। এ ধরণের ঘটনা ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিল।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে এখন যা দেখা যাচ্ছে এর পেছনে শুধু রাজনীতি যুক্ত না, সামাজিকতাও যুক্ত। আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া শিখাচ্ছি। তাদের ভাষা শেখানোর জন্য একটা কাঠামোয় ছেড়ে দিচ্ছি। মাল্টিপল চয়েজ কোয়েশ্চন শিখাচ্ছি, কিন্তু সাহিত্য পড়াচ্ছি না। আগে আমরা সাহিত্য পড়ে ইংরেজি শিখেছি। সাহিত্য মানুষের হৃদয়কে কোমল করে। সাহিত্য পড়ে ঝরা পালকের জন্যও কষ্ট লাগে। উপন্যাস গল্প পড়ে চরিত্রগুলোর জন্য চোখে পানি আসে। তিনি বলেন, বইমেলায় গিয়ে দেখা যায়, ক্যারিয়ার ভিত্তিক বই বেশি বিক্রি হচ্ছে। এটা হওয়ার কথা না। শিক্ষার্থীরা ফিকশন পড়বে, গল্প-উপন্যাস পড়বে। এগুলো মানুষের হৃদয়কে সংবেদশীল করে। জনপ্রিয় এ লেখক বলেন, মানুষ কিভাবে মানুষকে আঘাত করে সেটা আমি ভাবতে পারি না। আর বুয়েটের একটি হলের শিক্ষার্থীকে একই হলের অন্যরা পিটিয়ে মেরে ফেলল, কেউ এগিয়ে আসছে না এটা আমার কাছে অকল্পনীয় লেগেছে। আমি মনে করি, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত, বাংলাদেশ কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশ ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর হয়ে যাচ্ছে। আমরা সুবর্ণজয়ন্তি পালন করতে যাচ্ছি। আমরা যখন পরাধীন ছিলাম তখন ছাত্র রাজনীতির দরকার ছিল, তখন বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ গঠন করেছিলেন। এমনকি সামরিক সরকারের সময়ও ছিল। এখন আর নেই।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা তিনটি বড় আন্দোলন দেখেছি। এর মধ্যে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন, শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন এবং সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলো ছাত্ররাজনীতির বাইরে হয়েছে। সুতরাং ছাত্র রাজনীতি না থাকলে দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ হবে না যারা এটা বলতে চান তারা ভুল করছেন।
তিনি বলেন, এখন আর রাজনৈতিক দলের মিছিলে লোক পাওয়া যায় না। এর কারণ প্রধানত মানুষ বুঝে গেছে যে, রাজনৈতিক দলকে রক্ত দিয়ে আমি যদি ক্ষমতায় আনি, ক্ষমতায় আসার পর সে আর আমার জন্য কাজ করে না। এছাড়া এখন প্রতিটি মানুষের একটি করে মোবাইল ফোন হয়েছে। সবার ছেলে মেয়ে এখন স্কুল কলেজে যাচ্ছে। তারা স্বপ্ন দেখে সন্তানটি ভবিষ্যতে সফল হবে। তাই আমি বলছি, দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে তথাকথিত ছাত্ররাজনীতির সংগঠনের আর বাস্তব প্রয়োজন নেই। এখন যারা ছাত্ররাজনীতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে তারা ক্ষমতাকে পাহারা দেয়ার কাজ করছে। তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি। বিশেষ করে বুয়েটের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এর পাশাপাশি, স্কুলে, কলেজে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতি চর্চার একটি বিপ্লব শুরু করতে হবে। এগুলোর মাধ্যমে চিন্তার বিকাশ ঘটবে। সারা পৃথিবীতে, উন্নত দেশগুলোতে ছাত্র সংসদগুলো যেভাবে চলে আমাদের দেশেও সেভাবে চলুক, প্রচুর ক্লাব হোক, বিতর্ক, বক্তৃতা এগুলো যতো হবে ততো ভাল।
বুয়েটে নিজের শিক্ষা জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমরা যখন ভর্তি হই তখন প্রথম পরিচিতি সভায় বলা হয়েছিল, তোমরা ক্রিম অব দ্য ক্রিম। মানে মেধাবীদের মধ্য থেকে বাছাই করে অধিকতর মেধাবীদের নিয়ে এসেছি। আমাদের ক্লাশে জানতে চাওয়া হয়েছিল কারা কারা স্ট্যান্ড করেছে। তখন পুরো ক্লাস দাঁড়িয়ে গেলো। সবাই স্ট্যান্ড করা। চার-পাঁচ বছর পড়ার পর যখন আমাদের সমাপনী উৎসব করা হয় তখন একটা স্মরণিকা বের করা হয়। একটা জরিপে প্রশ্ন করা হয়, তুমি যদি কর্মক্ষেত্রে সুযোগ পাও, ঘুষ খাবে কি? ৯০ ভাগ ছাত্র উত্তর দেয় ঘুষ খাবো। আমি কিন্তু কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। দেশের সবচাইতে মেধাবীদের এনে পাঁচ বছর পড়িয়ে কী নৈতিক শিক্ষা দিলেন? এর মানে বুয়েটের কারিকুলামের মধ্যে একটা গভীর অসুখ আছে। বুয়েটে কিন্তু ডান পন্থা প্রবল। এখানে পড়াশোনা করে কি করতে হবে জগৎ সংসারের জন্য তা বুঝতে পারে না শিক্ষার্থীরা। এজন্য একই সঙ্গে তারা ঘুষও খেতে চায় আবার পারলৌকিক মুক্তিও চায়। আমি মনে করি আমাদের কারিকুলাম সিস্টেমে সমস্যা আছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে সমস্যা আছে। আমাদের নৈতিক মান এবং মূল্যবোধের সমস্যা আছে। আরেকটি সমস্যা হলো, এখানে যে কয়জন পড়ে তার মধ্যে ৯০ ভাগই বিদেশে চলে যায়। আমরা কিন্তু বিদেশে কর্মী পাঠানোর একটি ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছি। এই অবস্থায় আবরারের মৃত্যু আমাদেরকে জাগ্রত করুক। অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের সার্বিক কারিকুলাম বদলাতে হবে, সিস্টেম বদলাতে হবে। শূন্যতা পূরণে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। 
সূত্র: ভয়েস অফ আমেরিকা

Thursday, June 27, 2019

পশ্চিমবঙ্গের কেউ নেই বিশ্বকাপে! by আনিসুল হক

‘ক্রিকেটের বিশ্বযুদ্ধে এক বাংলার আলোর ঝলক, অন্য বাংলা অন্ধকারে।’ লিখেছে আনন্দবাজার পত্রিকা। বাংলাদেশের ১১ বাঙালি যখন বিশ্বকাপের আসর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন পশ্চিমবঙ্গের একজনও কেন নেই ভারতীয় একাদশে! সৌরভ গাঙ্গুলীর বিদায়ের পর কেন একজনও নেই পশ্চিম বাংলার, যাঁকে অন্তত জাতীয় দলের জন্য ভাবা যেতে পারত! কেন এমন হচ্ছে, আনন্দবাজার পত্রিকায় কৃশানু মজুমদার তা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন। ওই লেখায় কবি জয় গোস্বামীর উক্তি, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জেদ, তারুণ্য, তেজ, সাহস, সবটাই অবাক করে। এপার বাংলায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সেটা দেখা যায় না।’
কৃশানু বলছেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, হারুক বা জিতুক, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা মাঠে অন্য এক খিদে অনুভব করেন। অসম্ভবকে সম্ভব করার এক প্রবল তাগিদ বারবার ফুটে বেরোতে দেখা যাচ্ছে সাকিব, মাশরাফি, তামিম, মুশফিকদের। সেই মানসিক তেজ কি এপার বাংলার খেলোয়াড়দের মধ্যে কম?’ সাহিত্যিক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী বলছেন, ‘(ভারতের) বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের চেহারা বিভিন্ন। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে কর্মক্ষমতার বিভিন্নতা দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ তেমনটা নয়। সেখানকার তরুণদের ভিন্ন চেহারার ও তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মক্ষম প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়তে হয় না।’
কথাটার অন্য একটা মানে আছে। বাঙালিরা শারীরিকভাবে ছোটখাটো, কম বলশালী। যোদ্ধা জাতি হিসেবে বাঙালির কোনো ঐতিহাসিক সুনাম নেই।
সে কারণে ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা পিছিয়ে পড়ছে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালিরাও তো ভাতই খায়। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা যখন অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ান, তখন উচ্চতা ও স্বাস্থ্যের তারতম্য খুবই চোখে পড়ে। কিন্তু খেলা কেবল লম্বা-চওড়া মানুষদের ব্যাপার নয়। তা যদি হতো, মেসি কিংবা ম্যারাডোনা ফুটবলে পৃথিবীসেরা হতেন না, শচীন টেন্ডুলকার হতেন না বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান। অনুশীলন, প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা, দূরদর্শিতা, অবকাঠামোর সঙ্গে প্রতিভা যোগ হলে যেকোনো বিষয়েই ভালো করা যায়। আর জয়ের জন্য লাগে জিগীষা! জয় করার প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা।
ক্রিকেট কেবল শারীরিক খেলা নয়, মনেরও খেলা। বোলার আর ব্যাটসম্যান দ্বৈরথ হতে থাকে, কে কার ওপরে চড়াও হতে পারে। ফিল্ডিংয়ে লাগে অতন্দ্র মনঃসংযোগ। বাঙালির কাছে এসব ব্যাপারে বেশি প্রত্যাশা করা বোধ হয় বাড়াবাড়ি হবে। আমরা সবাই কবিতা লিখি, কারণ তাতে পরিশ্রম কম হয়, আমাদের উপন্যাস হয় ৬০ পৃষ্ঠার। আমাদের ধৈর্য কম।
তবু মাশরাফি বাহিনী লড়ে যাচ্ছে। হারাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। অতীতে বিশ্বকাপে হারিয়েছে পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, ভারত, নিউজিল্যান্ডের মতো দলকে। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে পশ্চিম বাংলার সাবেক অধিনায়ক লক্ষ্মীর উক্তি, ‘বাংলাদেশ একটা দেশ। পশ্চিমবঙ্গ একটা রাজ্য। এভাবে তো তুলনা হয় না।’
আসলে বাংলাদেশ যে ভালো করছে, তার কারণ নবীন এবং তারুণ্যপ্রধান এই দেশটা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জয়ের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে আছে। তা যেমন ক্রিকেটে, যেমন মেয়েদের ফুটবলে, তেমনি অর্থনীতিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে। ক্রিকেটের বিশ্বদরবারে যে ১১ বাঙালি দাপট দেখাচ্ছেন, তার কারণ যুদ্ধজয়ী একটা স্বাধীন দেশের নাছোড় বিজয়-আকাঙ্ক্ষা।
এই বিজয়-আকাঙ্ক্ষার তীব্র স্রোতকে যদি ঠিক চ্যানেলে প্রবাহিত করা যায়, তা আমাদের দেবে আলো, দেবে শক্তি। দেশনায়কদের কাছে আমাদের সেইটাই চাওয়া।
আর খেলার অধিনায়কের কাছে চাওয়া, হারার আগে হারবেন না। শেষ বল পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে। খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু নামতে হবে জয়ের জন্য। বিজয় মহান, কিন্তু বিজয়ের জন্য সংগ্রাম মহত্তর।

Wednesday, March 6, 2019

প্রতিবাদ তো করে যেতেই হবে: সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী রায় by আনিসুল হক

ছবিমেলার আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছেন অরুন্ধতী রায়। খ্যাতিমান এই লেখক ও সাম্রাজ্যবাদের কঠোর সমালোচক মুখোমুখি হয়েছেন প্রথম আলোর।
‘আমি বরিশালে যেতে চাই। আমার বাবার বাড়ি বরিশাল। কতক্ষণ লাগে যেতে?’
অরুন্ধতী রায় খুবই আগ্রহভরে জানতে চাইলেন।
অরুন্ধতী রায়। বুকার পুরস্কারজয়ী ভারতীয় লেখক। দ্য গড অব স্মল থিংস–এর পাণ্ডুলিপি পড়ে তাঁর প্রকাশক তাঁকে অগ্রিম দিয়েছিলেন পাঁচ লাখ পাউন্ড। তারপর সবই ইতিহাস।
অরুন্ধতী রায় ৩ মার্চ ২০১৯ এসেছেন ঢাকায়। ৪ মার্চ সকাল সকাল আমরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হাজির ধানমন্ডির এক বাড়িতে। দিনটা ছিল মেঘে ঢাকা। অরুন্ধতীকে মনে করিয়ে দিলাম, আপনার দ্য গড অব স্মল থিংস–এর শুরুর বর্ণনার মতো সোমবার ঢাকার দিনটা ভেজা আর শেওলাময়।
যে অরুন্ধতী রায় স্বাধীনভাবে কথা বলে এক দিনের জন্য জেল খেটেছেন, কিন্তু মাথা নত করেননি; যিনি আমেরিকার যুদ্ধনীতি, ভারতের কাশ্মীর-দলিত-গোরক্ষা-আদিবাসী সব জ্বলন্ত ইস্যুতে সবচেয়ে প্রজ্বলন্ত কণ্ঠস্বর, তাঁর সঙ্গে আলাপটা কেমন জমবে, একটা দুর্ভাবনা ছিল। কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি, চোখে বুদ্ধির ঝিলিক, কণ্ঠস্বরে আন্তরিকতার মাধুর্য, এক নিমেষেই অরুন্ধতী আমাকে আর সহকর্মী তৌহিদা শিরোপাকে আপন করে নিলেন।
অরুন্ধতী ঢাকায় এসেছেন ছবিমেলার আমন্ত্রণে। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে তিনি কথাও বলবেন নিবন্ধিত দর্শকদের সামনে। আলোকচিত্রী শহিদুল আলম অরুন্ধতীর দিল্লির বাড়িতে গিয়ে তাঁকে ঢাকা আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলেন। তারপর অল্প দিনের মধ্যেই শহিদুল আলমকে কারাগারে নেওয়া হয়। অরুন্ধতী তাঁর মুক্তি চেয়ে তাঁকেই একটা খোলা চিঠি লেখেন। তাতে তিনি বলেন, ‘আসলে এই চিঠি আমি শুধু তোমাকে লিখছি না, লিখছি আরও প্রিয়জনকে, সুধা, সুরেন্দ্র, রাজু এমনি অনেককে, কারণ শয়ে শয়ে এমন নামের মানুষ কারান্তরালে।’ ওই চিঠির শেষে অরুন্ধতী লিখেছিলেন শহিদুল আলমকে, ‘শিগগিরই ঢাকায় তোমার সঙ্গে দেখা হবে।’
অরুন্ধতী যেতে চান বরিশালে। তাঁর বাবার গ্রামের নাম তিনি মনে করতে পারেন লাকোতিয়া। গুগল করে বুঝলাম, লাকুটিয়া। বরিশাল থেকে আট কিলোমিটার দূরে। তাঁর বাবা রাজীব রায়, মেঘালয়ের শিলংয়ে চা-বাগানের ম্যানেজার ছিলেন। আর মা ছিলেন সিরিয়ান বংশোদ্ভূত মালয়ালি খ্রিষ্টান। অরুন্ধতীর বয়স যখন দুই, তখন থেকেই বাবা–মা আলাদা হয়ে যান। শিশু অরুন্ধতী আর তার বড় ভাইকে নিয়ে মা ফিরে যান কেরালায়। নিজে একটা স্কুল চালাতেন মা। বাবার সঙ্গে এরপর বহু বছর অরুন্ধতীর দেখা হয়নি। যে বাবার সঙ্গে বহু বছর দেখাও হয় না, সেই বাবার আদিবাড়ির খোঁজে বরিশাল যেতে খুব সাধ হয় অরুন্ধতীর।
অরুন্ধতী ১৬ বছর বয়সে দিল্লি আসেন। স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। রুমমেট ছিল উড়িষ্যার। তার সঙ্গে কথা হতো ছবি এঁকে এঁকে। কারণ কেউ কারো ভাষা বোঝেন না। তারপর তিনি সিনেমা করেছেন, সিনেমার পরিচালককে বিয়ে করেছিলেন। স্থপতির জীবন নিয়ে যে সিনেমা তারা করেছিলেন, তা জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিল। বহু বছর পর ভারতে বুদ্ধিজীবীদের ওপরে আক্রমণ হতে শুরু করলে প্রতিবাদে সেই জাতীয় পুরস্কার বর্জনও করেছিলেন সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার জেতা অরুন্ধতী।
অরুন্ধতীকে বলি, ‘আপনি দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস শেষ করেছেন, একটা গুবরে পোকার গল্প দিয়ে, ওই পোকাটা গোবরে চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে পা তুলে ধরে থাকে। যদি আকাশ ভেঙে পড়ে, সে তার পা দিয়ে ঠেকাবে। এখন পাকিস্তানে ইমরান, ভারতে গুজরাত কি লালা, আমেরিকায় ট্রাম্প। নিজেকে তো গুবরে পোকার চেয়েও অসহায় লাগে। আমরা তো কিছুই ঠেকাতে পারব না।’
অরুন্ধতী হার মানতে চান না। তিনি বলেন, ‘না, তবু পোকা পা তুলে ধরেই থাকবে। ওদের কাজ ওরা করে যাচ্ছে। আমাদের কাজ আমরা করে যাব। আমাদের প্রতিবাদ করে যেতে হবে। পৃথিবী বদলাবে। তাকে বদলাতেই হবে।’
তাঁকে বলি, ‘মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস–এর মতো তীব্র আগুনে তাতানো বই লেখার পরেও আপনি দেশে থাকতে পারছেন। এটা তো ভালো ব্যাপার।’
তিনি বলেন, ‘আপনাকে জানতে হবে কখন আপনি এগোবেন, কখন পেছাবেন। কখন সরে যাবেন। আগুন নিয়ে কাজ করলে আগুনের আঁচ তো লাগবেই। তবে আমাদের রক্ষা করে ক্ষমতাবানদের উদারতা নয়। আমাদের রক্ষা করে আমাদের কাজ। আমাদের শিল্প। শহিদুলের কাজ। শহিদুলের আলোকচিত্র। এসবই আমাদের রক্ষাকবচ দেয়।’
তিনি পুঁজিবাদ, প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, করপোরেটের নামে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ঘোর বিরোধী। ৯ জন ভারতীয়র কাছে যা সম্পদ আছে, তার পরিমাণ ৫০ কোটি ভারতীয়র সম্পদের সমান। এটা তিনি মানতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের ন্যূনতম চাওয়া হলো মানসম্পন্ন জীবনযাপনের উপযুক্ত মজুরি, সবার শিক্ষার অধিকার, সবার খাদ্যের অধিকার আছে—এই রকম একটা কল্যাণ রাষ্ট্র।’
‘ভারত-পাকিস্তান রণডঙ্কা নিয়ে কিছু কি বলবেন?’ তিনি বলেন, ‘আমি হাফিংটন পোস্ট–এ লিখেছি। আর কিছু বলতে চাই না।’
ওই রচনায় তিনি বলেছেন, ‘যখন পুলওয়ামাতে হামলা হলো, এটা মোদির জন্য সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল; কারণ সামনে নির্বাচন। এই সুযোগটা মোদি কাজে লাগাবেন। নির্বাচনে তিনি হারছিলেন। আমরা এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছিলাম। সেটাই সত্য হচ্ছে।’
অরুন্ধতীকে বলি, ‘অরুন্ধতী, আমরা প্রতিবাদ করতে পারি, কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারব না। এই লড়াইয়ে আমাদের বিজয় আসবে না।’
অরুন্ধতী তা মানতে নারাজ। যদিও তিনি অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে চান না। তিনি মনে করেন, তিনি লেখক, লেখাই তাঁর কাজ। এবং আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিজের কাজের ভেতর দিয়ে যদি প্রতিবাদ করতে থাকি, মানুষের জয় হবেই। অরুন্ধতী তা মনে করেন।
আর মনে করেন, সব সময় একটা প্রতিবাদী ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করারও দরকার নেই। সংগীত, শরীরচর্চা, শিল্প, খাদ্য—সবকিছুই তো একটা মানুষের জীবনে থাকবে। সেসব নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তৌহিদা শিরোপার কলমে তা প্রকাশিত হবে আগামীকালের অধুনায়। আর তাঁর দুই উপন্যাসের গঠনশৈলী ইত্যাদি নিয়ে যা কথা হয়েছে, তার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করা হবে ভবিষ্যতে অন্য আলোর পাতায়।
অরুন্ধতী যেতে চান বরিশালের লাকুটিয়া গ্রামে। বরিশাল থেকে আট কিলোমিটার দূরে। গ্রামটা সুন্দর, পুরোনো জমিদার বাড়ি আছে। আমারও যেতে ইচ্ছা করে। অরুন্ধতী যদি যান, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন, সেই কথা পাকা করে আমরা বিদায় নিই। তাঁর মধুর সাহচর্যের আবেশ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে বহুক্ষণ।

Friday, March 18, 2016

যম যে রাস্তা চিনে গেল! by আনিসুল হক

বাবা মারা গেছেন, ক্ষতি নেই, কিন্তু যম যে রাস্তা চিনে গেল! এই দেশে প্রচলিত পুরোনো কৌতুক! বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা অপহারকেরা নিয়ে গেছে ফিলিপাইনে, শ্রীলঙ্কায়, ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে ঢুকে অথবা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, তাতে ওই ৮০০ কোটি টাকাই কেবল ক্ষতি নয়, মূল সমস্যা হলো, এখানকার ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে ঢোকা যে সহজ, তা সবাই জেনে গেছে বা হ্যাকাররা রাস্তা চিনে গেছে।
এরপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে দরকারে-অদরকারে, কখনোবা নিছক তামাশা করার জন্য, বাংলাদেশ হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। তারা বাংলাদেশের নাম জেনে গেছে, জেনে গেছে যে বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠুনকো।
হ্যাকাররা হ্যাকিং করতে পারে চারটা কারণে: এক. নিতান্তই মজা করার জন্য। খেলা হিসেবে। তাদের কে বলবে, ওহে বালকবৃন্দ, তোমাদের জন্য যা তামাশা, আমাদের জন্য তা জীবনমরণ সমস্যা। তোমাদের কাছে যা এক ডলার, আমাদের বহু পরিবারের তা এক দিনের আয়।
দুই. নামের জন্য। হ্যাকিং করে অনেকেই খ্যাতিমান হয়।
তিন. লাভের জন্য। যেমন, আমাদের টাকা নাকি চলে গেছে জুয়ার আসরে। ভালোই!
চার. শত্রুতা সাধনের জন্য। কোনো একজন, কোনো একদল মানুষ, কোনো একটা দেশ তো আমাদের ক্ষতি চাইতেই পারে।
কাজেই সদ্য পিতৃহারা ওই সন্তানের মতোই আমি রোদন করব, ৮০০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে, বড় ক্ষতি সেটা নয়, বড় ক্ষতি হলো হ্যাকাররা রাস্তা চিনে গেছে।
নইলে আমাদের তো কয়েক হাজার কোটি টাকা হল-মার্কওয়ালারা নিয়ে গেছে, তখন আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই নয়। শেয়ার মার্কেট থেকে চুরি হয়েছে হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ খবর, ছয় বছরে তিতাস গ্যাস লিমিটেড থেকে নয়ছয় হয়েছে ৩ হাজার ১৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ভাইরে, আমি নিতান্তই ছা-পোষা লেখক, আমার অবস্থা সেই দুই বৃদ্ধার মতো, যাঁরা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন, ‘বল তো, এই সেতু বানাতে কত টাকা খরচ হয়েছে?’ একজন বললেন, ‘এক হাজার টাকা।’ আরেকজন বললেন, ‘তুই একটা ফকিরনি, কম করে হলেও দশ হাজার টাকা।’ কত টাকায় হাজার কোটি টাকা হয়, আমি কল্পনাও করতে পারি না।
কিন্তু আমি চিন্তিত আমাদের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে।
হ্যাকাররা আমার ই-মেইলে একটা মেইল পাঠাতে পারে। হয়তো আমার এক বন্ধুর নামে এল সেটা। বলল, তোমার বইয়ের একটা রিভিউ ছাপা হয়েছে। এই নাও, এই অ্যাটাচমেন্টটা খোলো। বা এই সাইটে গেলেই পাওয়া যাবে। আমি অ্যাটাচমেন্টটা বা সাইটটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমার কম্পিউটারে বা মোবাইল ফোনে স্পাইওয়্যার ঢুকে যেতে পারে। এরপর আমি কী করি, কী লিখি, কী দেখি, সব আরেকজনের কাছে চলে যাবে। এমনকি আমার কম্পিউটারের ক্যামেরা বন্ধ থাকলেও সে সেটা চালু করে নিয়ে আমাকে দেখতে পাবে। হে প্রভু, আমাকে রক্ষা করো।
চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। ৮০০ কোটি টাকার বিনিময়েও যদি আমরা বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার দিকে মন দিতে পারি, তাহলে কাজের কাজ হবে। ব্লেইম গেইমের চেয়েও সেটা বেশি জরুরি
সত্যি কথা বলতে কি, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে বছর ছয়েক আগে দালাই লামার কম্পিউটারে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কম্পিউটারে এই ধরনের স্পাইওয়্যার ঢুকে গিয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে ঢুকেছিল কি না, সরকার আমাদের জানায়নি। আমরা জানি না।
এই দেশের অনেক দায়িত্বশীল কর্তার কম্পিউটারজ্ঞান কেমন? এই বিষয়ে যে কৌতুকটা জানি, তা আগে বলে নিই। কর্মচারী তাঁর কর্মকর্তাকে বললেন, স্যার, আমার বেতন তো ১০ হাজার টাকা। পে স্লিপে এসেছে ১ লাখ। আমি ৯০ হাজার টাকা ফেরত দিতে এসেছি।
‘না, না, আপনার টাকা নেওয়া হবে না। পে স্লিপ বানিয়েছে কম্পিউটার। কম্পিউটার কখনো ভুল করতে পারে না। যান।’
আপনারা ভাবছেন, দূর, তাও কি হয়?
তাহলে আমি আমার সেই অভিজ্ঞতাটা আরেকবার বলি। দুই যুগ আগের কথা। আমি বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিতে গিয়েছি ঢাকার একটা স্কুলে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রেই সঠিক উত্তরে পেনসিল দিয়ে গোল্লা দিতে হয়, এটা পরে কম্পিউটারে পরীক্ষা করানো হয়। তো ওই উত্তরপত্রে পরীক্ষার্থীর স্বাক্ষরের একটা ঘর আছে। আমি তাতে বাংলায় স্বাক্ষর দিলাম, কারণ আমার স্বাক্ষর বাংলাতেই। একজন স্কুলশিক্ষক পরীক্ষক এসে আমাকে বললেন, নাম স্বাক্ষর ইংরেজিতে করতে হবে।
আমি বললাম, আমার সই তো বাংলা। ইংরেজি দেব কী করে।
তিনি বললেন, ইংরেজিতেই দিতে হবে, কারণ এই উত্তরপত্র দেখবে কম্পিউটার। আর কম্পিউটার বাংলা পড়তে পারে না।
আমি বললাম, প্রথম কথা কম্পিউটার বাংলা-ইংরেজি কিছুই পড়তে পারে না, আমরা রোল নম্বরটাও গোল্লা পূরণ করে লিখে দিয়েছি, সে সেটাই পড়বে। দুই নম্বর কথা, স্বাক্ষরের বাংলা-ইংরেজি কোনো কিছুই ব্যাপার না, বিদেশেও আমি এই সাইনই দিয়েছি।
তিনি বললেন, আপনার খাতা আমি জমা নেব না।
আমি বললাম, আপনাকে নিতেই হবে।
তিনি তখন পুলিশ ডেকে আনলেন, হলে একজন সন্ত্রাসী ঢুকে পড়েছে। যে পরিদর্শকের কথা শুনছে না।
আমার মনে হয়, দুই যুগ পরেও বহু বিভাগে বহু জায়গায় এই ধরনের কর্তাই নিয়োজিত আছেন, যাঁরা কম্পিউটার স্টার্ট দিতেও জানেন না।
আমার আশঙ্কা, হ্যাকিং করে বিমান ভুল পথে নেওয়া সম্ভব, সম্ভব ট্রেন আটকে দেওয়া, সবগুলো ব্যাংক লন্ডভন্ড করে দেওয়া, রাস্তার ট্রাফিক সংকেত উল্টাপাল্টা করে দেওয়া, আণবিক বোমার সুইচ টিপে দেওয়া। কাজেই সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। ৮০০ কোটি টাকার বিনিময়েও যদি আমরা বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার দিকে মন দিতে পারি, তাহলে কাজের কাজ হবে। ব্লেইম গেইমের চেয়েও সেটা বেশি জরুরি।
তা না হলে আমাদের ঘরে ঘরে ক্যামেরা চালু করে দেবে হ্যাকাররা, সব তথ্য নিয়ে যাবে, নিয়ে যাবে সব টাকাকড়ি। বিপন্ন করে তুলবে আমাদের দেশ ও রাষ্ট্রকে।
তখন এই গান গেয়ে কোনো লাভ হবে কি—খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, ধরতে পারলে ‘লোহার বেড়ি’ দিতাম পাখির পায়!
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Saturday, February 13, 2016

জয়ের আনন্দে বারবার কাঁদতে চাই by আনিসুল হক

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত বিজয়স্তম্ভে উঠেছেন।
গলায় সোনার মেডেল। চোখে দেশপ্রেমের কান্না
মাদারীপুরের মেয়ে। বাবা খিলগাঁওয়ে মুদির দোকান চালান। আর্থিক প্রতিকূলতায় একসময় বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া। মামা বক্সিং কোচ শাহাদাত কাজী জোর করেই ভাগনিকে ভারোত্তোলন অনুশীলন করাতে শুরু করেন। এর আগে কমনওয়েলথ ভারোত্তোলনে রুপা জেতেন, আফ্রো-এশিয়ায় রুপা, আরও দুটো ব্রোঞ্জ আছে তাঁর থলেতে। গুয়াহাটিতে এসএ গেমসে গিয়েছিলেন কনুইতে ব্যথা নিয়ে। আগের রাতেও বেশ ব্যথা করছিল। এই অবস্থায় নামলেন তিনি প্রতিযোগিতায়। ভারতকে হারিয়ে এই তরুণী জিতে নিলেন সোনা। বাংলাদেশের প্রথম সোনা এবারের এসএ গেমসে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাবিয়া আক্তার সীমান্ত বিজয়স্তম্ভে উঠেছেন। গলায় সোনার মেডেল। সামনে জাতীয় পতাকা। তিনি অভিবাদন জানাচ্ছেন। এমন সময় বেজে উঠল সেই সুর—আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। তিনি হুহু করে কাঁদতে লাগলেন। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল ইন্টারনেটে। বাংলাদেশের মানুষ, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, যিনিই এই ভিডিও দেখেছেন, তিনিই চোখ মুছেছেন।
কোত্থেকে আসে এত আবেগ? আমার সোনার বাংলা শুনলেই কেন চোখ ছলছল করে? কী শোভা কী ছায়া গো, কী স্নেহ কী মায়া গো!
এত মায়া কোত্থেকে আসে?
বাংলাদেশের একদল নারী-সাংবাদিক একবার আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন সাংবাদিকতার কর্মশালায় অংশ নিতে। সেখানে একটা অনুষ্ঠানে তাঁদের বলা হলো গান গাইতে। সবাই কোন গানটা জানেন? অবশ্যই আমাদের জাতীয় সংগীত। তাঁরা গাইতে আরম্ভ করলেন। আর শুরু করে দিলেন কান্না। আমেরিকানরা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কাঁদছ কেন?
‘কারণ, আমরা আমাদের জাতীয় সংগীত গাইছি।’
‘জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় কাঁদতে হবে কেন? আমরাও তো গাই। আমরা তো কাঁদি না।’
এটা আমেরিকানরা বুঝবে না, কেন আমরা, বাংলাদেশের মানুষ, বিদেশের মাটিতে জাতীয় সংগীত শুনলে কাঁদি। এই দেশটা আমাদের স্বপ্ন দিয়ে তৈরি, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।
আমাদের মেয়েরা আমাদের সোনা এনে দিচ্ছেন এসএ গেমসে। কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন তাঁরা। কতই না প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁদের আজকের এই জয়। আমাদের বাংলাদেশও অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন জয়ের পথে, জয়ের রথে, এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকেই।
২.
আইআরআইয়ের সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। আওয়ামী লীগের সমর্থন বাড়ছে। দেশের অর্থনীতি ঠিক পথে এগোচ্ছে বলে বেশির ভাগ মানুষের ধারণা। বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, দেশ ঠিকপথে এগোচ্ছে, মানুষের নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বা মোটামুটি ভালো। ৪৫ শতাংশ মনে করেন, গণতন্ত্রের চেয়েও বেশি দরকার অর্থনৈতিক উন্নতি। তবে বেশির ভাগ মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থা হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনকেই বেশি পছন্দ করেন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একই প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হয়েছিল, দেশের মানুষ অসন্তুষ্ট দুর্নীতি নিয়ে। তাঁদের প্রধান দুশ্চিন্তা এমনকি রাজনৈতিক হানাহানির চেয়েও বেশি দুর্নীতি নিয়ে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় পরিচালিত জরিপে বলা হয়েছিল, ৪৩ শতাংশ মানুষ চায় দ্রুত নতুন নির্বাচন, আর ৪০ শতাংশ মানুষ চায় এই সংসদ পুরো মেয়াদ শেষ করুক। আর নভেম্বরে দ্রুত নির্বাচন চাওয়া মানুষের সংখ্যাটা ছিল ৩৬ শতাংশ।
সবটা মিলিয়ে সরকারের নিজের ব্যাপারে আস্থাবান হওয়ার যথেষ্ট উপকরণ আছে আইআরআইয়ের জরিপে।
পাশাপাশি গত বছরের শেষে কিংবা নতুন বছরের প্রাক্কালে আরও কিছু জরিপের ফল প্রকাশিত হয়েছে। একটা হলো, টিআইবির জরিপ। এ জরিপে আবারও বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে, যা লজ্জার এবং হতাশার। দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। এ প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘দুর্নীতির ব্যাপারটা আমরা টাচ করতে পারিনি।’
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, সেসবও বেশ উদ্বেগজনক। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি মানবাধিকার-বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে সেই প্রতিবেদনে যা বলা হয়, তাতে নতুন কথা কেউ আশাও করেননি। ওই প্রতিবেদনে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি দপ্তরগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটকে রাখা, দুর্বল বিচারিক ক্ষমতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাহীনতা এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা। এ ছাড়া তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মীদের কাজের পরিবেশের কথা উঠে আসে। অনলাইনে ও গণমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কমে আসার কথাও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে।
সবশেষ খবর হলো, মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশে বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়াতে পারে। এটা বলার জন্য অবশ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের দরকার পড়ে না। যেকোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক যেকোনো দেশের জন্য সাধারণভাবে এ কথা সব সময়ই বলবেন যে মানুষকে তার মত প্রকাশ করতে দাও, বিরোধীদের পরিসর দাও নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিরোধিতা করার, তা না হলে তাদের ক্ষোভ জমতে থাকবে, তা একসময় বিস্ফোরিত হবে, কিংবা তা প্রকাশের জন্য চোরাগোপ্তা পথ খুঁজবে। এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আলী রীয়াজ ইলিনয় থেকে অনেকবার কলাম লিখেছেন; প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পুস্তক প্রকাশ করেছেন।
আমরা সবাই চাই বাংলাদেশের জয়। বাংলাদেশের মেয়ে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত যখন সোনা জয় করে জাতীয় সংগীতের আবহে লাল-সবুজ পতাকাকে অভিবাদন জানাতে গিয়ে কাঁদতে থাকেন, তখন আমরা জানি, আমরা এই দেশকে কত ভালোবাসি, আর এই দেশের জন্য জয় ছিনিয়ে আনতে আমরা কতটাই না মরিয়া। বাংলাদেশ নিজের শক্তিতে পদ্মা সেতু বানাতে যাচ্ছে, সেটাও আমাদের মাথা উঁচু করেছে, গৌরবে আমাদের বুকের ছাতি ফুলে উঠেছে। আমেরিকান সংস্থা আইআরআইয়ের জরিপে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ার খবরে কেউ কেউ মন খারাপ করতে পারেন; বিএনপি তো বলেই দিয়েছে, এই জরিপ ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু সাধারণভাবে এটা গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়। জাতীয় সংসদে মাননীয় সাংসদেরা আইআরআইকে ধন্যবাদও দিয়েছেন। আইআরআইয়ের জরিপেই আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং তিনি তাঁর দলের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেছিলেন, এতে তাঁর খুশি হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তিনি যা কিছু অর্জন করতে পেরেছেন, তার পেছনে আছে তাঁর দল। এখন আমরা আইআরআইয়ের জরিপটি যদি গ্রহণ করি, আমাদের আত্মবিশ্বাস যদি বাড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক অন্যান্য সংস্থার জরিপগুলোকে রাবিশ বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আশার কথা, টিআইবির জরিপের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতই রাবিশ কথাটা উচ্চারণ না করে বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন। মানবাধিকার, আইনের শাসন, দুর্নীতি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে যে হতাশার কথা প্রতিবেদনগুলোয় ফুটে ওঠে, সেসব আমলে নেওয়া জরুরি।
আমরা সবাই জানি, দুই বছর আগের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। তার আগে তারাই ছিল প্রধান বিরোধী দল এবং তারও আগে তারা ছিল সরকারি দল। কাজেই এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। সরকারের জন্য পরম স্বস্তির ও উৎসাহের ব্যাপার হবে, মানুষ সরকারের ওপর আস্থাশীল রয়েছে, দেশ ঠিক পথে এগোচ্ছে বলেই বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন। এখন এখানেই সরকারের সামনে বড় সুযোগ, করণীয় ক্ষেত্রটি বড়ই স্পষ্ট। নির্বাচন গণতন্ত্রের একটা উপাদান, হয়তো খুব বড় উপাদান, কিন্তু একমাত্র উপাদান নয়। নির্বাচিত সরকারও দুঃসহ যাতনার কারণ হতে পারে, একনায়কতান্ত্রিক আচরণ করতে পারে। গণতন্ত্রের মিটারে পারদের ওঠানামা মাপা যায় বাক্স্বাধীনতা আর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কতখানি আছে, তা দেখে। মানুষ নির্ভয়ে মনের কথা বলতে পারে কি না, সেখান থেকে। সবচেয়ে বড় লিটমাস টেস্ট হলো, বিরোধী মতের মানুষ যদি একজনও হন, তিনি কেমন আছেন, সেটা দেখা। আর মানবাধিকার রক্ষা করা হচ্ছে কি হচ্ছে না। মানবাধিকার মানে ব্যক্তির অধিকার। বিনা বিচারে একজন মানুষও শাস্তি পেতে পারে না, আটক থাকতে পারে না। বিচারের পরে আইনানুগ শাস্তি হলে কারও তো আপত্তি থাকবেই না, বরং মানুষ সেটাই চায়। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনই তো সরকারের কাজ। কিন্তু অস্ত্রের বলে, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেন কেউ কাউকে তুলে নিয়ে না যায়, মানুষ যেন গুম না হয়। খালি চোখে সাম্প্রতিক কালে এই বিষয়ে কিছু উন্নতি অবশ্য দেখা যাচ্ছে। আর বিরোধী দল ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরোধিতা ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে, অসন্তোষ প্রকাশের অসংকোচ সাহস যেন তারা দেখাতে পারে।
আমি এখনো মনে করি, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে রেখেছে এই দেশের স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। বাধা আছে, পরোক্ষ এবং কখনো কখনো প্রত্যক্ষ। তারপরেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের চিত্ত স্বাধীন, তাদের শির উন্নত। সম্প্রতি ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে কয়েকজন মাননীয় সাংসদ জাতীয় সংসদে যে বিরূপ সমালোচনা করেছেন, তাঁর গ্রেপ্তার, শাস্তি ও কাগজ বন্ধের যে দাবি জানিয়েছেন, সেটা একটা দেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি ক্ষমতাসীনদের একাংশের অসহিষ্ণু মনোভাবেরই প্রকাশ মাত্র। সাত বছর আগে যে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য তাঁরা পত্রিকাটির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, সেই প্রতিবেদনগুলো তাঁদের পাশে বসা কোনো কোনো নেতারই জবানবন্দি, এটা মনে রাখলে তাঁরা ভালো করবেন।
আমি মনে করি, বাংলাদেশ মানে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত, সোনাজয়ী তরুণী। বাংলাদেশ মানে সাঁতারে সোনাজয়ী মাহফুজা। একেকজন মাবিয়া, মাহফুজা এগিয়ে যাচ্ছেন মানে বাংলাদেশই এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের বিজয়ের পেছনে সরকারের অবদান আছে, আমাদের নেতৃত্বের কৃতিত্ব আছে। তাই তো মানুষ আস্থাশীল। সেই আস্থা আরও বাড়বে, দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে যদি আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারি, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারি, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারি এবং বিরোধী দলকে পরিসর দিতে পারি। বাংলাদেশের উজ্জ্বলতম ভাবমূর্তি নিয়ে জয়ের স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আমরা মারিয়ার মতোই আনন্দাশ্রু চোখে গাইতে চাই—আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Monday, February 8, 2016

কৌতুকটৌতুক by আনিসুল হক

আজকে একটা নির্ভেজাল কৌতুক বলি।
একজন প্রকৌশলী আর একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার ট্রেনে ভ্রমণ করছেন পাশাপাশি আসনে বসে।
অনেক দূরের পথ। দীর্ঘ সময় লাগবে। কম্পিউটার প্রোগ্রামার বললেন, আসুন, সময় কাটানোর জন্য একটা মজার খেলা খেলি।
প্রকৌশলী বললেন, প্রকৌশলীরা মজার খেলা কী, তা জানে না।
প্রোগ্রামার বললেন, খুব সোজা। আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করব। আপনি যদি উত্তর পারেন, আমি আপনাকে দেব ১০ ডলার। আর আপনি যদি উত্তর না পারেন, আপনি আমাকে দেবেন ১০ ডলার। একই ভাবে আমাকে প্রশ্ন করবেন আপনি। আমি পারলে আপনি আমাকে দেবেন ১০ ডলার, না পারলে আমি আপনাকে দেব ১০ ডলার।
প্রকৌশলী হাই তুলে বললেন, ভাই, আমি ক্লান্ত, একটু ঘুমিয়ে নিই।
প্রোগ্রামার বললেন, আচ্ছা, আপনি দেবেন ১০ ডলার, কিন্তু আমি দেব ১০০ ডলার।
প্রকৌশলী বললেন, আচ্ছা।
প্রোগ্রামারের প্রথম প্রশ্ন: বলুন তো পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কত?
প্রকৌশলী বললেন, জি না। জানি না। তিনি পকেট থেকে ১০ ডলার বের করে প্রোগ্রামারের হাতে দিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, এবার আপনি বলুন, কোন প্রাণী তিনটা পা নিয়ে পাহাড়ে ওঠে আর চারটা পা নিয়ে পাহাড় থেকে নামে।
প্রোগ্রামার বললেন, ঠিক আছে। আমি গুগল করে বলছি। তিনি গুগল করলেন। বন্ধুদের ই-মেইল করলেন। এই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই।
তিনি তখন ১০০ ডলার বের করে প্রকৌশলীর হাতে দিয়ে বললেন, এবার আপনি বলুন তো এই প্রশ্নের উত্তর কী? কোন প্রাণী তিন পা নিয়ে পাহাড়ে ওঠে, চার পা নিয়ে নামে।
প্রকৌশলী পকেটে হাত দিয়ে ১০ ডলার বের করে প্রোগ্রামারের হাতে দিয়ে দিলেন।
প্রকৌশলী আর ডাক্তারের বাহাসের কৌতুকটা পুরোনো।
দুজন ডাক্তার আর দুজন ইঞ্জিনিয়ার ট্রেনে উঠেছেন।
প্রকৌশলীরা জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ডাক্তার ভাইয়েরা, আপনারা কটা টিকিট কেটেছেন।
ডাক্তাররা বললেন, দুইটা। আপনারা?
একটা।
চেকার এলে কী করবেন?
দেখেন কী করি।
যখন চেকার এল, তখন দুই প্রকৌশলী গিয়ে এক বাথরুমে ঢুকল। চেকার বাথরুমের দরজায় টোকা দিলে তাঁরা একটা টিকিট বের করে দিলেন। চেকার টিকিট পরখ করে চলে গেল।
ডাক্তার দুজন অবাক।
ফেরার সময় আবার প্রকৌশলী দুজন জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তার দুজনকে, আপনারা কটা টিকিট করেছেন?
ডাক্তাররা বলল, একটা। আপনারা?
আমরা করি নাই।
কী করবেন চেকার এলে?
দেখেন না কী করি।
চেকার আসছে। ডাক্তার দুজন গিয়ে বাথরুমে ঢুকল। ইঞ্জিনিয়ার সেই দরজায় গিয়ে নক করল। ডাক্তাররা টিকিট বের করে দিল। সেই টিকিট নিয়ে দুই ইঞ্জিনিয়ার আরেকটা বাথরুমে ঢুকে গেল।
কৌতুক দুইটাই হাসির। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বাণী প্রকৌশলীদের জন্য ভালো নয়। কারণ, এর মাধ্যমে আমরা এই বার্তা পাই যে প্রকৌশলীরা চালাক, কিন্তু সেই চালাকি তাঁরা ফাঁকি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেন। একজন প্রকৌশলী হিসেবে আমি এই কৌতুক দুইটারই প্রতিবাদ জানাই। বিশেষ করে দ্বিতীয়টার। আমরা প্রকৌশলীরা সব সময় টিকিট কেটেই ট্রেনে উঠি। টিকিট ছাড়া ট্রেনে ওঠার অপবাদ আমাদের কেউ দিতে পারবে না।
বিভিন্ন পেশাজীবীর বাহাস নিয়ে অনেক কৌতুক প্রচলিত আছে।
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদদের মধ্যে কথার প্রতিযোগিতা হচ্ছে।
কোন পেশা সবার আগে পৃথিবীতে এসেছে।
ডাক্তার বললেন, অবশ্যই ডাক্তারি পেশা। প্রথম মানুষ এল পৃথিবীতে, তাদের সন্তান জন্ম নিল, শুরু হয়ে গেল ডাক্তারি।
ইঞ্জিনিয়ার বললেন, না, না। তারও আগে মহাবিশ্ব ছিল লন্ডভন্ড। সৃষ্টিকর্তা সেসবকে সুশৃঙ্খল করলেন। সেটা অবশ্যই একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ। কাজেই প্রকৌশলবিদ্যাই পৃথিবীর আদিতম বিদ্যা।
পাত্রী চাই, পাত্রী চাই, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্য পাত্রী চাই। মাসিক আয় দুই লাখ টাকা। ঢাকায় বাড়ি আছে এমন পাত্রী চাই। বাড়ির ফটোসমেত যোগাযোগ করুন রাজনীতিবিদ তখন মিটিমিটি হাসছেন।
বাকি দুজন বললেন, কী ব্যাপার, আপনি হাসেন কেন?
রাজনীতিবিদ বললেন, ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা মহাবিশ্বকে সুশৃঙ্খল করল বটে, কিন্তু মহাবিশ্বটাকে বিশৃঙ্খল করলটা কে?
এসবই কৌতুক। কৌতুক বলা শেষ। এবার বলি একটা টৌতুক। শুনতে পেলাম, আমাদের ঢাকা শহরের একটা ফ্লাইওভার বানানো যখন প্রায় শেষ, তখন টের পাওয়া গেছে, এগুলো আসলে যেসব গাড়ি রাস্তার ডান দিক দিয়ে যায়, সেসবের জন্য ডিজাইন করা। আমাদের দেশে এবং বিলাতে ড্রাইভাররা বসেন গাড়ির ডান পাশে। আমেরিকায় ড্রাইভাররা বসেন গাড়ির বাঁ দিকে। আমরা রাস্তার বাঁ দিকে চলি। আমেরিকানরা রাস্তার ডান দিকে চলে। এই জন্য ব্রিটিশরা বলে থাকে, আমেরিকার সবকিছু উল্টো। তারা রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলে, তেলকে বলে গ্যাস আর ফুটবল খেলে হাত দিয়ে।
তো আমরা চলি ব্রিটিশ নিয়মে, ফ্লাইওভার নাকি বানিয়ে ফেলেছি আমেরিকান নিয়মে, এখন নাকি অনেকটা কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে। ভেঙে আবার বানাতে হবে। এটার সত্য-মিথ্যা জানি না। যদি সত্য হয়, বোঝাই যাচ্ছে ডিজাইনাররা আমেরিকান কোনো কপি বুক থেকে ডিজাইনটা নিয়ে ঢাকার রাস্তায় হুবহু বসিয়ে দিয়েছেন।
আমরা এ ধরনের ঘটনা ডাক্তারির ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে সংবাদপত্রে কখনো কখনো পড়েছি। যেমন, ডান পায়ে সমস্যা, ডাক্তার সাহেব ভুলে বাঁ পা কেটে ফেলেছেন। কৌতুক আছে, রোগী বলছে, ডাক্তার সাহেব গতবার যে দাঁত তুলেছিলেন, খুব ব্যথা পেয়েছিলাম, এবার যে সহজেই উঠে গেল, ব্যাপার কী! ডাক্তার বললেন, ইয়ে মানে, ভুলে দাঁত ভেবে আমি আপনার আলজিব তুলে ফেলেছি।
কৌতুকের কোনো আগা-মাথা নেই, আলজিব তুললে মানুষ কথা বলবে কী করে?
সম্প্রতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রকৌশলীদের নিয়ে একটা বক্তৃতা দিয়েছেন। তাতে তিনি আফসোস করেছেন, দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররা প্রকৌশলী হয়, তা সত্ত্বেও দেশের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে প্রকৌশলীদের অংশ নেওয়ার সুযোগ খুব কম। বিষয়টা অবশ্যই চিন্তা করার মতোই। মেধাবীরা দেশের উন্নয়নে ও নীতিনির্ধারণে আরও বেশি করে অংশ নিক, সেটা সবাই চাইব। যেমন চাইব, মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসুন। এবং মর্যাদা পান। সম্মান পান।
আমরা ছোটবেলায় কবিতা পড়েছিলাম, ‘বাদশাহ আলমগীর—/ কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।’ সেই শাহজাদা তার শিক্ষকের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছিল, তা দেখে বাদশা রেগে যান এবং বলেন, আমি খুব দুঃখ পেয়েছি, আপনার ছাত্র কেন শুধু পানি ঢেলে দেবে। কেন সে নিজ হাতে আপনার পা প্রক্ষালন করে দেয়নি।
সেই দিল্লিও নেই। সেই আলমগীরও নেই। কিন্তু সেই শিক্ষকও কি আছেন? আমাদের মূল্যবোধের ব্যাপক বদল ঘটেছে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে—পাত্রী চাই, পাত্রী চাই, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্য পাত্রী চাই। মাসিক আয় দুই লাখ টাকা।
তাহলে আর এই বিজ্ঞাপনকে আমরা কেন দোষ দেব? পাত্রী চাই। ঢাকায় বাড়ি আছে এমন পাত্রী চাই। বাড়ির ফটোসমেত যোগাযোগ করুন।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Sunday, January 17, 2016

দশজনের মধ্যে নয়জনই!! by আনিসুল হক

জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম কথা কিন্তু নাগরিকদের নিরাপত্তা। আবার নিরাপত্তা হলো নিরাপত্তার বোধ। বাংলাদেশে নাগরিকেরা নিজেদের অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার চেয়েও বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন, বিদেশি গবেষণা সংস্থার সেই রিপোর্ট ধরে এই কলামে একটা লেখা লিখেছিলাম।
তখনই প্রশ্নটা উঠল। পুলিশের কাছে গেলে প্রতিবিধান পাওয়া যাবে কি না, রাস্তায় রাতে চলতে ভয় লাগে কি না, আপনার বাড়িতে গত এক বছরে কোনো চুরিচামারি হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর যা পাওয়া গেছে, তা থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষেরা অনেক উন্নত দেশের মানুষের চেয়ে নিজেদের নিরাপদ ভাবছেন বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ কি তঁাদের নিজেদের ঘরে নিরাপদ? আরও একটু নির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশের নারীরা কি তাঁদের নিজেদের ঘরে নিরাপদ? আরও একটু নির্দিষ্ট করে বলা যায়, বাংলাদেশের একজন স্ত্রী কি তাঁর স্বামীর কাছে নিরাপদ?
এই বিষয়ে ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনের ফল ভয়াবহ। বাংলাদেশে প্রতি দশটা পরিবারের মধ্যে নয়টাতেই নারীরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার। সব প্রশ্নের উত্তর নাকি হ্যাঁ বা না দিয়ে হয় না। যেমন? এই উদাহরণটা তখন দেওয়া হয়, ‘আপনি কি আগের মতো বউ পেটান?’
এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি কী বলবেন? যদি বলেন, ‘না’, তার মানেটা দাঁড়াবে, আপনি আগে বউ পেটাতেন, এখন আর আগের মতো পেটান না। হয় পেটানো ছেড়ে দিয়েছেন, নয়তো পেটানোর পদ্ধতিটা বদলেছেন। আর যদি বলেন ‘হ্যাঁ’, তাহলে তো কথাই নেই। আগেও স্ত্রীকে মারতেন, এখনো মেরে চলেছেন। কিন্তু পরিসংখ্যান যা বলছে, তাতে এই প্রশ্নটা বাংলাদেশিদের বেলায় বড়ই প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের নারীরা ঘরেই নির্যাতিত হন—এবং যে হারে হন, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক, তা ভয়াবহ, তা লজ্জাজনক। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশে নিযুক্ত নয়টি দেশের রাষ্ট্রদূত, যাঁদের সবাই নারী, এই বিষয়ে একটা প্রচারণা শুরু করেছিলেন।
পারিবারিক নির্যাতনের এই হিসাবে মানসিক নিপীড়ন অন্তর্ভুক্ত আছে। কাজেই এই প্রশ্ন খুব উঠবে যে শারীরিক নির্যাতন আসলে শতকরা কত ভাগ হয়? এই প্রশ্নের উত্তরেও আপনার মাথা হেঁট হয়ে আসবে, তিনজন বিবাহিত নারীর দুজনই স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন, শারীরিকভাবে। এর মধ্যে চড়-থাপড় আছে; কোনো না কোনো হাতিয়ার দিয়ে আঘাত আছে; কিল, ঘুষি, লাথি আছে; পোড়ানো আছে; অ্যাসিড ছোড়াও আছে। এঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারীকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে, অনেকেই স্বামীর ভয়ে ডাক্তারের কাছে যাননি, কেউবা যাননি সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে।
তিনজনের মধ্যে দুজন বউ পেটান? আর ‘হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে’—সেটা তো আছেই। সবটা মিলিয়ে দশজনের নয়জনই বউ পেটান, হাতে বা ঠোঁটে। এই আমার বাংলাদেশ। পরিসংখ্যানটা চমকে দেওয়ার মতো, ঘাবড়ে দেওয়ার মতো, আঁতকে ওঠার মতো, লজ্জায় অধোবদন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নানা ধরনের কাপড়চোপড়—শার্ট-প্যান্ট, পাঞ্জাবি-পায়জামা, লুঙ্গি-গেঞ্জি, কোট-টাই পরে আমরা পথেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি কতজন স্ত্রী-নিপীড়ক। কোনো বাসের মধ্যে যদি ৪০ জন পুরুষ যাত্রী বসে থাকেন, তাঁদের ৩৬ জন বউ পেটান; কোনো অফিসে যদি ১০০ জন পুরুষ সহকর্মী থাকেন, তাঁদের ৮৭ জন স্ত্রী নিপীড়ন করেন!
পরিসংখ্যানটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, না না, এটা হতেই পারে না। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, তিনজনে দুজন একেবারে শারীরিকভাবেই নির্যাতন করেন! এবং এই লজ্জাজনক ব্যাপারটা নিয়ে আমরা কোনো কথাও বলি না। শেষে আমাদের এই নীরবতা ভাঙতে এগিয়ে এসেছেন এই দেশে কর্মরত বাইরের দেশের নয়জন নারী রাষ্ট্রদূত! তবু আমাদের নীরবতা ভাঙল বলে তো মনে হয় না! আসলে বায়ুসমুদ্রে ডুবে থাকলে যেমন বোঝা যায় না চারদিকে বায়ু আছে, তেমনি নারী নির্যাতন–সমুদ্রে ডুবে থেকে আমরা বুঝছি না যে আমরা নারী নির্যাতন করে আসছি!
সেই যে প্রচলিত কথাটা—আপনি কি এখনো আগের মতো বউ পেটান?—কথাটার মধ্যেই কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে। এক. বউ আপনি ঠিকই পেটান, আগে আর পরে, আগের মতো কিংবা এখন নতুন রকমে। দুই. বউ পেটানো কথাটার মধ্যেই একটা বস্তুবাচকতার ইঙ্গিত আছে। আপনি কি ঢোল পেটান কথাটা যেমন, তেমনি রকম আপনি কি বউ পেটান? হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নাটকে একটা প্রবাদ ব্যবহার করেছিলেন, বউ আর ঢোল বাড়ির ওপরে রাখতে হয়! আমরা হয়তো এই প্রবাদটা বিশ্বাসই করি। প্রবাদ তো সমাজের বহুদিনের আচার-আচরণ থেকেই উদ্ভূত হয়!
রবীন্দ্রনাথের গল্পের কথাও তো আসবে। ‘শাস্তি’ গল্পে পাই—
‘ক্ষুধিত দুখিরাম আর কালবিলম্ব না করিয়া বলিল, “ভাত দে।”
বড় বউ বারুদের বস্তা স্ফুলিঙ্গ পাতের মতো এক মুহূর্তেই তীব্র কণ্ঠস্বর আকাশ-পরিমাণ করিয়া বলিয়া উঠিল, “ভাত কোথায় যে ভাত দিব। তুই কি চাল দিয়া গিয়াছিলি। আমি কি নিজে রোজগার করিয়া আনিব।”
সারা দিনের শ্রান্ত ও লাঞ্ছনার পর অন্নহীন নিরানন্দ অন্ধকার ঘরে প্রজ্বলিত ক্ষুধানলে, গৃহিণীর রুক্ষ বচন, বিশেষত শেষ কথাটার গোপন কুৎসিত শ্লেষ দুখিরামের হঠাৎ কেমন একেবারেই অসহ্য হইয়া উঠিল। ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্রের ন্যায় গম্ভীর গর্জনে বলিয়া উঠিল, “কী বললি!” বলিয়া মুহূর্তের মধ্যে দা লইয়া কিছু না ভাবিয়া একেবারে স্ত্রীর মাথায় বসাইয়া দিল। রাধা তাহার ছোটো জায়ের কোলের কাছে পড়িয়া গেল এবং মৃত্যু হইতে মুহূর্ত বিলম্ব হইল না।’
সবটা মিলিয়ে দশজনে নয়জনই বউ পেটান, হাতে বা ঠোঁটে। পরিসংখ্যানটা চমকে দেওয়ার মতো, ঘাবড়ে দেওয়ার মতো, আঁতকে ওঠার মতো, লজ্জায় অধোবদন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
দুখিরাম খুন করল বউকে। দুখিরামকে বাঁচাতে এগিয়ে এল তার ভাই ছিদাম। কীভাবে? নিজের বউকে শিখিয়ে দিল, পুলিশ এলে বলবি, সে দা নিয়ে তোকে মারতে এসেছিল, নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে তুই তাকে খুন করেছিস। তা-ই হলো শেষ পর্যন্ত। বউকে খুন করল দুখিরাম আর শাস্তি পেল ছিদামের বউ।
এটা আমাদের সমাজে বহুদিন ধরে ঘটে আসছে বলেই তো রবীন্দ্রনাথ এই গল্প লিখতে পেরেছেন। আমরা আমাদের প্যান্টের আড়ালে লেজটা লুকিয়ে রাখব কী করে? যতই নখ কাটি না, আমাদের নখর বেরিয়ে পড়বেই। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ধারাবাহিক নাটক ৬৯-এ ফজলুর রহমান বাবু একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তাঁর স্ত্রী জয়া আহসান, এই অধ্যাপক বউকে পেটান না, কিন্তু হাতে একটা ছুরি রাখেন। না, বউকে মারার জন্য নয়, নিজের হাত কাটার জন্য। বউকে সন্দেহ করেন, কিছু হলেই ছুরি বের করে বলেন, কাটলাম কিন্তু নিজের হাত। ওই নাটকটা প্রচারের পরে পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কাজ করেন, এমন বিশেষজ্ঞরা আমাকে বলেছিলেন, এটা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের একটা ধরন, ওই যে মানসিক অত্যাচার—এটা তার মধ্যে পড়ে।
এখন এই লজ্জা থেকে আমরা মুক্তি পাব কী করে? ব্যাপারটা কেবল লজ্জার নয়, বাস্তবেও নানাভাবে ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতার অর্থনৈতিক কুফল মারাত্মক, যার মধ্যে আছে স্বাস্থ্য-চিকিৎসার খরচ, আয় হ্রাস, উৎপাদন হ্রাস, পরবর্তী প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া।
বাংলাদেশ তো মানব উন্নয়ন সূচকে অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো করছে। আমাদের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। আমরা মায়ের স্বাস্থ্য শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উন্নতি ঘটাতে পেরেছি। আমাদের মেয়েরা কাজ করছেন, মাঠে-ঘাটে, সংসারে, অফিসে-আদালতে, বিমানে-ট্রেনে। তারপরেও কেন কমছে না পারিবারিক নির্যাতন? দেখা যাচ্ছে, এই সমস্যা যেমন গরিব ঘরে আছে, তেমনি আছে ধনীর ঘরে, অশিক্ষিতের ঘরে যেমন আছে, তেমনি আছে শিক্ষিতের ঘরে।
তবুও আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। সচেতনতা সৃষ্টি থেকে শুরু করে বিচার আর সাজা—নানাভাবে কাজ করে আমরা এই ক্ষেত্রেও অগ্রগতি ঘটাতে পারব বলে আমাদের বিশ্বাস। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারী, আমাদের দুজন বিরোধী নেতা নারী, আমাদের স্পিকার নারী। আমাদের মেয়েরা গ্রামগঞ্জে বেরিয়ে আসছেন ঘর থেকে, তাঁরা লেখাপড়া করছেন, তাঁরা কাজকর্ম করছেন।
আবারও আমি দেব রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার সাদেকার উদাহরণ। তিনি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন বেগম রোকেয়া নারী সমিতি। সেই সমিতি গ্রামের মেয়েদের হাতের কাজ শেখায়, তঁারা পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেন, হাঁস-মুরগি-গরুর চাষ করেন—সমিতি এখন বেশ ঋদ্ধ। তাঁদের গ্রামের প্রতিটা ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়, সবার বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি আছে, আছে স্যানিটারি ল্যাট্রিন। ওই গ্রামে কোনো বাল্যবিবাহ হয় না। পুরো গ্রামের প্রতিটা পরিবার এখন পাল্টে গেছে। আমি পুরুষদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মেয়েরা এত কিছু করছেন, আপনারা বাধা দেন না? তাঁরা বলেছেন, কেন দেব? এতে তো আমাদেরই উন্নতি হচ্ছে। (সাদেকা খাতুনের একটা চিঠি এসেছে দুই দিন আগে, তাঁদের সমিতি গ্রামের বাড়ি বাড়ি কম্বল দিতে চায়। কিছু কম্বল কি আমরা পাঠাতে পারি!)
আমি মনে করি, সচেতনতা সৃষ্টি করলে কাজ হবে। আমরা যদি একটা আওয়াজ তুলতে পারি, আমরা যদি নীরবতা ভঙ্গ করতে পারি, আমরা যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা দেখতে পারি এবং প্রতিজ্ঞা করি—আগের মতো আর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স করব না—হয়তো খানিকটা কাজ দেবে।
আমরা কি সেই প্রতিজ্ঞাটা করব? আজই। এখনই?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।