Sunday, July 5, 2015

ঢাকার পত্রিকার ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে ভারতে হুলস্থুল

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ওয়ানডে সিরিজে ভারতের পরাজয় নিয়ে ব্যঙ্গ করে তৈরি একটি গ্রাফিক্স ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও ক্রিকেট-মহলে হুলস্থুল ফেলে দিয়েছে। ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোর একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গ্রাফিক্সের নিন্দায় সরব হয়েছে ভারতের প্রায় সব প্রথম সারির চ্যানেল ও খবরের কাগজ। কেউ বলছে, ব্যঙ্গচিত্রটি শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং এটি ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতি চূড়ান্ত অসম্মান। দুই দেশের ক্রিকেট রেষারেষিকে ঘিরে বিজ্ঞাপনী যুদ্ধ অবশ্য চলছে সেই বিশ্বকাপের সময় থেকেই। কিন্তু তা এত তাড়াতাড়ি এতটা তলানিতে এসে ঠেকবে, তা প্রায় অভাবনীয় ছিল। গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে বিশ্বকাপের সময় ‘মওকা মওকা’ সিরিজের বিজ্ঞাপনগুলো ঘিরেই ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তদের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছিল। স্টার স্পোর্টসের বানানো মওকা মওকা-র জবাবে বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছিলো অনেক পাল্টা ভিডিও। এরপর জুনে ভারতের বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশকে ‘ক্রিকেটের বাচ্চা’ বলে কটাক্ষ কিংবা তার পাল্টা হিসেবে মোটা বাঁশের ডান্ডা দিয়ে ‘ব্যাম্বু ইজ অন’ সিরিজের বিজ্ঞাপন নিয়েও জলঘোলা কম হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি প্রথম আলোর সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন রুচি ও শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করে ভারতীয় অনেক সংবাদমাধ্যম। যে গ্রাফিক্স নিয়ে এই তোলপাড়, সেটিতে দেখা যাচ্ছে বোলার মুস্তাফিজ কাটারে ঘায়েল ভারতীয় ক্রিকেটাররা অর্ধেক মাথা কামিয়ে বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের হাতে পোস্টার ‘আমরা ব্যবহার করেছি, আপনারাও করুন’। মুস্তাফিজের যে স্লোয়ার ডেলিভারি বা কাটারে ধয়াশায়ী হয়েছিলেন বিরাট কোহলি বা এম এস ধোনিরা, সেটাকেই দ্বৈত অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে। কিন্তু ভারতের নানা চ্যানেলে ক্রিকেট পন্ডিতরা মন্তব্য করেছেন, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হারার রাগ থেকেই বাংলাদেশ এমন গ্রাফিক্স তৈরি করেছে। তবে ক্রিকেট-ভাষ্যকার গৌতম ভট্টাচার্যর মতে, এখানে যদি রুচিহীনতা থেকেও থাকে, তাহলে তার শেকড় আসলে অনেক গভীরে। তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “শুধু ক্রিকেটকে এখানে দায়ী করা ঠিক হবে না। ফারাক্কা বা তিস্তার জল থেকে শুরু করে কূটনীতির অনেক বিষয়েই বাংলাদেশে একটা ধারণা আছে যে ভারত তাদের সঙ্গে বড় দাদার মতো আচরণ করে থাকে। এখন ক্রিকেটটাই সে দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিফায়িং স্পোর্ট, তাই ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেই সেই মনোভাবের প্রতিফলন বেরিয়ে এসেছে।” যে দৈনিকে এই গ্রাফিক্সটি প্রকাশিত হয়, সেই প্রথম আলো অবশ্য মনে করছে তাদের ব্যঙ্গ সাময়িকী রস-আলোতে প্রকাশিত এই গ্রাফিক্সের রসিকতার দিকটি বা হালকা দিকটি দেখতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ব্যর্থ হচ্ছে। প্রথম আলোর ক্রীড়া সম্পাদক উৎপল শুভ্র বলছেন, “আমার মনে হয় ভারতে অনেকেই এটার ভুল ব্যাখ্যা করছেন। এই ব্যঙ্গ-সাময়িকীতে আমরা দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের ক্রিকেটার – প্রায় সবাইকে নিয়েই হাসিঠাট্টা করে থাকি। এখানেও স্রেফ রসিকতাও করাই হয়েছে।” তার এই বক্তব্যের সঙ্গে আবার অনেকটাই একমত ভারতের অ্যাডভার্টাইজিং জগতের দিকপাল প্রহ্লাদ কক্কর। অ্যাড-গুরু কক্করের স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই গ্রাফিক্সটা বেশ মজার এবং তাতে সৃষ্টিশীলতারও ছাপ আছে। কক্করের যুক্তি, “এটা যদি ভারতীয় ক্রিকেটারদের বদলে অন্য কাউকে নিয়ে, ধরা যাক অস্ট্রেলিয়ানদের নিয়ে বানানো হতো, তাহলে কিন্তু ভারতের এটা উপভোগ করায় কোনো অসুবিধা থাকত না। কিংবা পাকিস্তানিদের নিয়ে বানানো হলে ভারতীয়রা তো বোধহয় আরো বেশি খুশি হতো!” তবে ভারতে জাতীয় ক্রিকেটাররা যে প্রায় ডেমি-গড বা দেবতার মতো সম্মান পান, সেখানে তাদের নিয়ে হাসাহাসি করাটাও বোধহয় অপরাধের পর্যায়ে পড়ে – এবং প্রথম আলোর গ্রাফিক্সটিকে ভারত এখন সেই অপরাধেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।- বিবিসি।

আবু হোরায়রা মানে বিড়ালের বাবা, আবু বকর মানে ছাগলের বাবাঃ আব্দুল গাফফার চৌধুরী

এবার ধর্ম নিয়ে কথা বললেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। বললেন, আল্লাহর ৯৯ গুণবাচক নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিলো। এগুলো ইসলাম ‘এডপ্ট‘ করে, পরে বাংলা ভাষাও এডপ্ট করে। এগুলো এখন আরবি শব্দ। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন আবু হুরায়রা নামের অর্থ হচ্ছে বিড়ালের বাবা, আবু বকর নামের অর্থ হচ্ছে ছাগলের বাবা। এভাবে আমরা অনেকে নাম রাখি। তিনি বলেন, সাত শ' বছর ধরে আমরা ‘নামাজ’, ‘খোদা হাফেজ’ শব্দ বলেছি। এখন ‘সালাত’, ‘আল্লাহ হাফেজ’ শব্দে পরিণত হয়েছে। এগুলো ওহাবিদের সৃষ্টি। তিনি নিজে কিছুদিন মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন দাবি করে বলেন, এখন যে ইসলাম ধর্ম চলছে তা বাড়াবাড়ির ইসলাম। রসুলুল্লাহর (সা:) সময় মেয়েরা কাবা ও রওজা শরিফের মধ্যে প্রবেশ করতে পারতো। এখন পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে আব্দুল গাফ্ফার বলেন, আমেরিকানরা তালেবান সৃষ্টি করে এখন বিপদে পড়েছে। আর বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী দ্বীনে মোহাম্মদী নয়, তারা হচ্ছে দ্বীনে মওদুদী। হিজাব এবং বোরখা হচ্ছে মওদুদীর শেষ মতবাদ। আর জামায়াতে ইসলামী এক সময় কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রির পয়সায় চলতো। আমেরিকার পতনের সাথে সাথে এদেরও পতন হবে। শুধু শুধু সাদ্দাম ও গাদ্দাফিকে হত্যা করা হলো ইসরাইলকে নিরাপদ করার জন্য।
তিনি বলেন, আল্লাহর রহমত বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান থেকে আলাদা না হতো বাংলাদেশেও আজ তালেবান হামলা হতো। রক্তের গঙ্গা বয়ে যেতো।
সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লতিফ সিদ্দিকী এখানে (নিউ ইয়র্ক) কী বলে গেছে, এর জন্য আজও বাংলাদেশে বিক্ষোভ হচ্ছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসঙ্ঘ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত’ শীর্ষক লেকচার সিরিজে একমাত্র বক্তা হিসাবে এসব কথা বলেন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আব্দুল মোমেন।
আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেন, হিন্দুদের মধ্যে যেমন গোরামি আছে, ইসলাম ধর্মেও মধ্যেও গোরামি আছে। ইসলাম ধর্মে আছে, বিধর্মীকে কতল করো। তাহলে তো রসুলুল্লাহ (সা:) মক্কা জয়ের পর একটি কাফেরকেও হত্যা করেননি। তিনি বলেন, অমুকে রসুলুল্লাহ (সা:)-এর বিষয়ে ব্লগে লিখেছে বলে তাকে কতল করতে হবে।
আমি বেঁচে থাকবো কি না জানি না, তবে আজকে একটা কথা বলতে পারি আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে দুটি রাষ্ট্র বিলুপ্তি হবে। কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি এ দুটি রাষ্ট্র হচ্ছে পাকিস্তান ও ইসরাইল। একটি দেশ দক্ষিণ এশিয়াকে অশান্ত করে রেখেছে, আরেকটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যকে অশান্তির মধ্যে রেখেছে। আমেরিকার পতনের সাথে সাথেই এদের পতন হবে। সৌদি আরবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর নাম সৌদি আরব হবে কেন। তারা রসূলের (সা:) অনুসারী হলে এর নাম হবে মোহাম্মদিয়া। কাবা শরিফের দরজাগুলোর নাম বাদশাহদের নামে দেয়া হয়েছে। কোনো সাহবিদের নামে নয়।
বোরখা এবং হিজাব সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল গাফ্ফার বলেন, এটা হচ্ছে ওয়াহাবিদের সর্বশেষ মতবাদ। বাংলাদেশে ধর্মীয় উন্মাদনা ও আচার-আচরণ প্রসঙ্গে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে একটা সময় ইরানের ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রভাব ছিল। সম্প্রতিকালে সৌদি আরবের আচার-আচরণ বইছে। আগে খোদা হাফেজ বলতাম, এখন বলা হয় আল্লাহ হাফেজ। নারীদের উৎসাহিত করা হয় হিজাব পরতে। হিজাব একটি আরব সংস্কৃতির পোশাক, বাঙালির নয়। বাংলাদেশে নারীদের শাড়ি-টিপ পরা - এগুলোর সবই হিন্দুত্ব উল্লেখ করে আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেন, একবার প্রেসক্লাবের সামনে কিছু নারী ভারতীয় পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাদের সবার পরনে ছিল ভারতীয় শাড়ি। তিনি বাংলাদেশে বিয়েতে হিন্দুত্বের প্রভাব প্রসঙ্গে বলেন, বিয়েতে সাত পকে বাঁধা ছাড়া সবই আমরা করে থাকি। বর্ষবরণ থেকে শুরু করে সর্বত্রই মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, গঙ্গার পানিতে আমরা ওজু করতে পারবো না, অথচ গঙ্গার পানির হিস্যা চাচ্ছি। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এরশাদ আগে আটরশি পীরের কাছে যেতেন। এখন সবাই মাজারে যান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর আর কিছু থাকে না। মেজর জিয়া একটি বাণী পাঠ করলেই স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে যেতে পারেন না। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ঘৃণা করেন উল্লেখ করে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মেজর জিয়ার সঙ্গে এক মাস থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। জিয়া কখনো যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করেননি। তিনি শুধু পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুল ঠিক করতেন আর খবর নিতেন কোনো রাষ্ট্রদূত আসছে কি না। আমি ওই সময় থেকেই জিয়াকে ঘৃণা করি। এছাড়া পরে তার জেড ফোর্সই ভেঙে দেয়া হলো।
মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার প্রসার না ঘটলে জামায়াতসহ ইসলামী মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অসম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে বলে আশংকা করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দোষ-ত্রুটি আছে। তারপরও বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। দুর্নীতি রোধ করতে পারলে এবং শিক্ষা ও অর্থনীতিতে আরো উন্নয়ন ঘটালে দেশ একটি ঈর্ষণীয় গন্তব্যে পৌছতে পারবে। তিনি বলেন, যত দিন আমাদের ভাষা থাকবে, রবীন্দ্রনাথ থাকবে, বঙ্গবন্ধু থাকবে ততদিন বাংলাদেশকে তালেবান ধ্বংস করতে পারবে না। আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, মৌলবাদী রাষ্ট্র আমরা চাই না, আমরা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই। বাংলাদেশে একবার স্বৈরাচার আইয়ুব এসে বলেছিলেন বাঙালিরা হচ্ছে দাসের জাতি, বুটের তলায় পৃষ্ঠ জাতি।
তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিকল্প নেতা সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে বলেন, শেখ হাসিনার পর এই দলের নেতৃত্বে কে দেবেন এটা নির্ধারণ করা হয়নি। এটি নির্ধারণ না হলে বিরোধীরা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় চলে যেতে পারে। বর্তমান বিরোধী দলকে প্রয়োজনে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিএনপি সংসদ বর্জন করার কারণে এ বিরোধী দল তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সুস্থ বিরোধী দল তৈরি কঠিন বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন করা যায়। একজন মুসলমান তার ধর্ম পরিবর্তন করে খ্রিস্টান হতে পারেন। কিন্তু জাতীয়তা পরিবর্তন করা যায় না। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বক্তব্যের শুরুতে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, এর ব্যবহার, হাজার বছর আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষা বর্জনের ইতিকথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক ভাষার শব্দ এসে মিশে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। কাজী নজরুল ইসলাম তার অনেক কবিতায় আরবি ও ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এজন্য তাকে সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও নজরুলের সমালোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ চলিত বাংলার চেয়ে সাধু বাংলার প্রতি সমর্থন করেছিলেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের মুখের কথাই আজ বাংলা ভাষার সম্ভার। এই ভাষা বাংলাদেশ থেকে কখনও হারিয়ে যাবে না।
অনুষ্ঠানে আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননা স্মারক ও গ্রন্থ প্রদান করা হয়।

নায়ক রাজ রাজ্জাকের মৃত্যু (!) অনলাইন বিড়ম্বনা by জুয়েল রাজ

আপডেটঃ ০৩ জুলাই, ২০১৫ গত তিনদিন আগে সকাল থেকে ফেসবুক জুড়ে নায়ক রাজ রাজ্জাকের মৃত্যু সংবাদ। এর মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন অনলাইনের লিঙ্কও শেয়ার দিয়েছেন নায়ক রাজ রাজ্জকের মৃত্যু সংবাদের। অনেকে ইন্নালিল্লহে ওয়া ইন্নাইলাইহে রাজিউন লিখে নানা রকম অনুভূতি প্রকাশ করে স্ট্যাটাস লিখেছেন। এর পর অবিশ্বাসের আর কোন অবকাশ থাকেনি নায়ক রাজ রাজ্জাকের মৃত্যু নিয়ে। একজন জীবিত মানুষ মৃত হয়ে গেলেন সবার কাছে। বাধ্য হয়ে বিকালে রাজ্জাকের পরিবার সংবাদ সম্মেলন করে সবাইকে বলেছেন তিনি জীবিত আছেন শঙ্কামুক্ত আছেন।
প্রযুক্তির যুগে মানুষ বহুলাংশে ইন্টারনেটের উপর নীর্ভরশীল। অনেকেই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এবং ঘুম থেকে জেগে দুচোখ খুলেই হাত বাড়ান নিত্যসঙ্গী স্মার্ট ফোনের দিকে। তারপর শুরু হয় দিন। প্রয়োজনীয় প্রায় সব তথ্য উপাত্ত এখন গুগল থেকে পেয়ে যাচ্ছেন। ইউটিউব তো লজিং মাষ্টারের মতো অবস্থা। হেন বিষয় নেই সেখানে আপনি পাবেন না।
প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই সময়ে  অনলাইন পোর্টালের জয়জয়কার চারদিকে আর এর পরিমান বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী। ইতিমধ্যে ফেইস বুকে নানা রকম উস্কানীর কারণে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে।
লাইক নিয়ে বহু অনাকাংকিত ঘটনার আমাদের চারপাশে ঘটে চলছে।পাঠক মাত্রই আশা করি এই ঘটনার সাথে পরিচিত। অনলাইন যেমন অনেক বন্ধুর জন্ম দিয়েছে তেমনি বহু বন্ধুকে ও শত্রু বানিয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা হচ্ছে নিউজ পোর্টালগুলোর ব্যাঙের ছাতার মতো নিউজ পোর্টালকে ব্যাক্তিগত ব্লগ বানিয়ে ফেলেছেন। পোর্টালে অশ্লীল বিভিন্ন মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করে লেখা থাকে ভিডিওসহ। ইউটিউব থেকে নানারকম প্রাপ্তবয়ষ্ক ছবির অংশ বিশেষ জুড়ে দেয়া হচ্ছে। আকর্ষনীয় শিরোনাম দেখে  সাধারণ পাঠকও কৌতুহল মেটাতে ক্লিক করছেন সে সব সংবাদে। অনেকেই হচ্ছেন বিব্রত।
অনলাইন সংবাদ পত্রে মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করে  রাজনীতিবিদ, নায়ক নায়িকা সহ সমাজের নানা পেশায় জড়িতদের চরিত্র হননের এক ভয়ংকর অস্ত্র এইসব নিউজ পোর্টাল। এলক্সা র‍্যাংকিয়ের প্রতিযোগীতায় বেশী পরিমানে ক্লিক এর আশায় এই সমস্ত ভূয়া সংবাদ পরিবেশন করছে।
অনলাইন পোর্টালগূলো দেখলে মনে হবে দেশের সব ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,ধর্মীয় স্কলার সহ পেশাজীবিরা পেশা বাদ দিয়ে সাংবাদিকতায় যোগ দিয়ে দিয়েছেন। কিভাবে মোটা হবেন, চিকনা হবেন, ধর্মীয় রীতি মেনে স্ত্রী সহবাস করবেন  দাঁত , চুল, সুন্দর ত্বক, প্রেমিকা কে খুশি করা, পরকীয়ার কারণ, পুরুষ কে বশ করা এই সমস্থ অদ্ভুত শিরোনামের সংবাদ।কিছু কিছু অনলাইনের সিস্টেম আবার এমন অটো শেয়ার হয়ে যায়। অনেকে না বুঝে ক্লিক করে সেই বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হন। অনলাইন আমাদের সমাজের জন্য এখনো নতুন একটা ধারণা। অনেকই এর নিয়ম নীতি এখনো রপ্ত করতে পারেন নি। তাই শুরু হয় বিব্রতকর  অবস্থা কাটাতে দৌড়াদৌড়ি করেন অনেকেই। নিজের অনেক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও আছে এই ব্যাপারে। সিনিয়র অনেক এসেছেন নিজের ফেইসবুক ঠিকঠাক করে নিতে।
সম্প্রতি সময়ে লন্ডনে ভূয়া কিছু বাংলা নিউজ পোর্টাল একই ধরনের কাজ করছে। তবে তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পুর্ন রাজনৈতিক। ভুল ঠিকানায় ভুল নাম ধাম দিয়ে চালানো হচ্ছে এসব পোর্টাল। অভিযোগ আছে বিলেতের বেশ কয়েকজন তরুণ সাংবাদিক  নেপথ্যে থেকে এসব রাজনৈতিক নিউজ পোর্টালগুলো পরিচালনা করেন। রাজনৈতিক নেতাদের  আজ্ঞাবহ হয়ে নিজের চেহারা আড়াল রেখে এই কাজটা করে থাকেন। কেউ কেউ বিভিন্ন আন্ডার গ্রাউন্ড টিভিও নাকি চালাচ্ছেন লন্ডনে। এবং সেটা সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য। অনেক নেতাই নাকি টাকা দিয়ে এডমিন বানিয়ে নিজের পেইজ ও ফেইসবুক একাউন্ট চালিয়ে যাচ্ছেন। অনলাইন অনেকের আবার রুটিরুজির ও ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
লন্ডনেও সেই প্রবণতা এখন  চোখে পড়ার মতো। লন্ডনের কিছু নিউজ পোর্টাল  স্থানীয় নেতাদের নামে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে ব্যাক্তিগত ভাবে হেয় করার চেষ্ঠা করছেন। খোঁজ খবর নিয়ে দেখা যায় তাঁদের অনলাইনে দেয়া নাম ঠিকানা সব ভুয়া। সচেতন মানুষ যারা তাঁরা হয়তো বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু মোবাইল ফোন  বিপ্লবের কারণে ফেইসবুক, হোয়াটস আপ, সহ নানারকম যোগাযোগ মাধ্যম  পৌঁছে গেছে এখন রান্নাঘর থেকে ফসলের মাঠে। যাদের কাছে এই নিউজ পোর্টালোটি  সংবাদপত্র। তাঁর কাছে এর প্রতিটা অক্ষর সত্য।
ব্যাক্তিগত  কোন্দল এর কারনে অনেককে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন থেকে   থেকে বহিষ্কার বলে সংবাদ অনলাইনে প্রচার  করে হেয় করার চেষ্ঠা করা হয়েছে।বিগত কিছুদিন আগে লন্ডনের এমন একটি ঘটনার জন্য বাংলাদেশ প্রেস নামে বাংলাদেশের একটি অনলাইন পোর্টালোকে আইনি নোটিশ দেয়ার পরে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা ও ঘটেছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলে  সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা চাই। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই না, তবে গণমাধ্যমকে নীতিমালায় চলতে হবে।
কিন্তু ভূয়া অনলাইন পোর্টালের ক্ষেত্রে নীতিমালা নির্ধারন করবে কে?
সাংবাদিকতার নামে এই সমস্ত মিথ্যাচার সাংবাদিকদের নামে  মিথ্যা কে সত্য বানানোর নামে, মানুষের মনে যে ভুল ধারণা এর থেকে সাংবাদিকদেরই বের হয়ে আসতে হবে।

বিএনপির ময়নাতদন্ত by কাফি কামাল

ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব। মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার স্বীকৃতি মিলেছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেই। তবে তার ক্ষমতা আরোহণ বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। যদিও ব্যক্তিগত সততার জন্য তিনি ছিলেন প্রশংসিত। ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৮। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির। জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যু এ দলের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়লেও খালেদা জিয়ার হাত ধরে এগিয়ে যায় বিএনপি। একটি পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তারেক রহমানও। চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া দল বিএনপি এখন এক অনিবার্য ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন বিপর্যয় দলটি অতীতে কখনোই মোকাবিলা করেনি। সামনে কী আছে তা জানেন না বিএনপির কেউই। এমনকি রাজনৈতিক পণ্ডিতরাও। দলটির জন্য এ এক অনিশ্চিত ঘোর অমানিশার সময়। কেন এ বিপর্যয়? বিএনপির শেষ গন্তব্যই বা কোথায়। এমন সব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেছেন আমাদের রাজনৈতিক সংবাদদাতা
কাফি কামাল। তার লেখা ধারাবাহিক  প্রতিবেদনের আজ ছাপা হলো প্রথম পর্ব-
স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম পাঁচ বছর বাংলাদেশের জাতীয় জীবন ছিল চাওয়া-পাওয়ার এক জটিল হিসাব-নিকাশের পর্ব। আওয়ামী লীগ তার হিরন্ময় ঐতিহ্য বাঁচাতে চায়নি, ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে খুন হলেন, আওয়ামী লীগ হঠাৎ ছিটকে পড়লো। উত্তরণ ঘটলো নতুন এক রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির। এই দুই অবস্থার অন্তর্বর্তীকালে স্বাভাবিক গণতন্ত্র নিভে গিয়েছিল, এসেছিল তাঞ্জানিয়ার জুলিয়াস নায়ারের কর্তৃত্বপরায়ণ মডেলের সরকার ব্যবস্থা -বাকশাল।
তাজউদ্দীন আহমেদ ও ড. কামাল হোসেনের মতো বঙ্গবন্ধুর অনেক ঘনিষ্ঠজন হতবিহ্বল আর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের ভাষায়, স্বাধীনতার শত্রুরা হয়েছিল উল্লসিত। একজন ত্রস্ত বিচলিত কামাল হোসেন লন্ডনে দেশান্তরী হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে সাহস করে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমি আপনার মৃত্যুসনদে (বাকশালে সমর্থন) সই দিতে পারি না।’ ’৭৫-এর বিয়োগান্তক পটপরিবর্তন পরবর্তী তিন মাস ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অস্থির-অনিশ্চয়তাময় এক ঘোর অমানিশা। নির্মোহ জীবনদৃষ্টির অধিকারী জিয়াউর রহমান অন্য অনেকের মতোই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে চলে যান অনেকটাই পেছনের কাতারে। কিন্তু তাঁর অবদান ও যোগ্যতার স্বীকৃতি তিনি বঙ্গবন্ধুর হাতেই পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু জিয়াকে বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত করেন। জিয়াকে সেনাবাহিনী প্রধান করতে না পারার ক্ষতিও মুজিব পুষিয়ে দিতে বিশেষভাবে উদ্যোগী হন। তার প্রমাণ হলো যা উপমহাদেশে কখনও ছিল না, জিয়াকে সম্মানিত করতেই মুজিব সৃষ্টি করেছিলেন সেনা উপপ্রধানের পদ। সুতরাং মুজিব পরবর্তী বাংলাদেশেই কেবল জিয়া পাদপ্রদীপে এসেছিলেন তা ঠিক নয়। তিনি তাঁর বিশেষত্বের স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধুর হাতেই পেয়েছিলেন। জিয়াকে জার্মানিতে রাষ্ট্রদূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেখ মুজিব তা জিয়ার অনুরোধেই বাতিল করেছিলেন। সুতরাং মুজিব-জিয়া সম্পর্কে কোন চিড় নেই। সম্প্রতি জিয়ার জন্মদিনের আলোচনায় অধ্যাপক বি. চৌধুরী বেগম খালেদা জিয়ার সামনেই বলেন, শহীদ জিয়া কখনও মুজিবের সমালোচনা করেননি। আর আজ বিএনপি নেতারা কি করেন।
আজ যারা মুক্তিযোদ্ধা জিয়াকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তারা আসলে প্রকারান্তরে শেখ মুজিবের প্রজ্ঞাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। জিয়া মুক্তিযুদ্ধে কি করেছেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে কি করেছেন, তার সবটাই ঘটেছে ১৯৭২ সালে মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগে। সুতরাং মুজিবের জিয়া মূল্যায়নের তারিখ ও ঘটনাবলী বিবেচনায় নিলে জাতীয় রাজনীতিতে তিক্ততা কিছুটা হলেও দূর হতে পারে। অবশ্য জিয়া কি প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে এলেন, সেটা বিচার্য। অনেকের মতে জিয়া যদি কোন কারণে ক্ষমতায় না গিয়ে আওয়ামী লীগকে দ্রুত ক্ষমতায় বসাতে সক্ষম হতেন, বিএনপি গঠন না করতেন, তাহলে জিয়া আওয়ামী লীগের অনেক বেশি প্রিয়ভাজন হতেন। কিন্তু কোটি টাকা দামের প্রশ্ন হলো, জিয়ার হাতে যখন ক্ষমতা এসেছিল তখন আওয়ামী লীগ সরকারিভাবে লুপ্ত ছিল। আর বাকশাল পুনরুজ্জীবন যে সম্ভব ছিল না, তার প্রমাণ হলো আওয়ামী লীগ নিজেই কখনও আর বাকশাল হতে চায়নি।
মাৎস্যন্যায় যুগের অবসান ঘটিয়ে অষ্টম শতকে দেশবাসী বঙ্গের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন একজন সাধারণ গোপালকে। হতাশায় বিপর্যস্ত মানুষ সিপাহী-জনতার বিপ্লবের নামে নতুন প্রত্যয়ের প্রকাশ ঘটিয়ে নিজেদের নেতা নির্বাচন করেন জিয়াউর রহমানকে। ঘটনা পরম্পরায় তিনি হয়ে উঠেন এক অনিবার্য চরিত্র। বাংলাদেশের সিপাহি-জনতা সেদিন ঘোর অমানিশায় কারাবন্দি সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের মধ্যেই দেখেছিলেন আলোকবর্তিকা। ষড়যন্ত্রকারীদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে সিপাহি-জনতা জিয়াকে আসীন করেন সেনাপ্রধানের দায়িত্বে। এটা লক্ষণীয় যে, আগস্ট অভ্যুত্থানের কুশলীবদের সঙ্গে জিয়ার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনও ভাল ছিল বলে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং মোশতাক আহমেদ ও ফারুক-রশীদ সর্বদা জিয়ার প্রতি কমবেশি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কোন চেষ্টা তার জীবদ্দশায় দেখা যায়নি। অবশ্য তিনি জাতি গঠনের জন্য সব মত ও পথের দল ও গোষ্ঠীকে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তাকে অনুভব করেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। ’৭৫-এর ১০ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট সায়েম সরকার গঠিত হলে সেনাপ্রধানের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র, শিল্প, বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্য, পাট, শিক্ষা, বিজ্ঞান, কারিগরি গবেষণা, আণবিক শক্তি, অর্থ, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে সেদিনটিই ছিল মূলত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে প্রকাশ করতে থাকেন তার দূরদর্শী রাজনৈতিক ভাবনা। ’৭৬ সালের ১লা এপ্রিল খুলনা, ৬ই এপ্রিল কুমিল্লা স্টেডিয়াম ও ২৪শে এপ্রিল সিলেট স্টেডিয়ামের জনসভায় তিনি বলেন, ‘পার্টিতে পার্টিতে, গ্রুপে গ্রুপে অতীতের সকল পার্থক্য ভুলে দেশের প্রগতির জন্য ‘বাংলাদেশী’ রূপে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। যে কোন মূল্যে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হবে।’
অধ্যাপক বি. চৌধুরী মনে করেন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে কোন সংঘাত নেই। জিয়া একে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাননি। এ বিষয়ে তারা পুস্তিকা করেছিলেন যা তারা বিলিয়েছেন। সাধারণত জাতীয়তাবাদ হয় নৃ ও ভাষানির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশে একাধিক জাতিগোষ্ঠী বাস করে, আবার পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আবাস্থলের কারণেও রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্ভর একটা জাতীয়তাবাদের দরকার পড়েছিল। ভারতীয় বাঙালির স্বাধীনতা আর বাংলাদেশী বাঙালির স্বাধীনতা এক নয়। ওপারের বাঙালির রাষ্ট্র নেই। এপারের বাঙালির রাষ্ট্র আছে।  তাই তিনি নৃ, ভাষা ও ধর্মের ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি ভূখণ্ডকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন একটি নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের জন্য জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রয়োজন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মে দিবসের শ্রমিক সমাবেশের বক্তব্যে জিয়া তার জাতীয়তাবাদের দর্শন স্পষ্ট করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চত্য যেমনি, তেমনি ইসলামি বিশ্ব আবার চীনের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনেন। মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের মনোযোগ তিনি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন। বিদেশে শ্রমবাজার সৃষ্টিতে যার বিরাট প্রভাব পড়েছিল। সার্ক এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে মধ্যস্থতার একটা উদ্যোগ নিয়ে তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন, সেটা সফল না হলেও বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করেছিল। দেশে শ্রমিক ও মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে বৈঠক করে দেশের মানুষকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন। ’৭৭-এর ২১শে এপ্রিল ‘ভগ্নস্বাস্থ্যের’ কারণে প্রেসিডেন্ট সায়েম দায়িত্ব ছেড়ে জিয়াউর রহমানকেই মনোনীত করেন নতুন কর্ণধার। ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’ এ চিন্তা থেকে তিনি একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি সাত্তারকে আহ্বায়ক করে ’৭৮-এর ২২শে ফেব্রুয়ারি গঠন করেন জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্রী দল (জাগদল)। মে মাসে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ন্যাপ (ভাসানী), ইউপিপি, মুসলিম লীগ, লেবার পার্টি ও তফশিলি জাতীয় ফেডারেশনের সমন্বয়ে জাগদল রূপান্তরিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’-এ। সে বছরই আনুষ্ঠানিক নির্বাচনে জেনারেল ওসমানীকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় বিএনপি গঠনের এ প্রাকপ্রস্তুতি পর্ব। ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৮। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির আনুষ্ঠানিক জন্মদিন। জাগদলের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র রমনা পার্কের খোলা চত্বরে ১৯ দফার ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ নামে প্রেসিডেন্ট জিয়া নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন। এর রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। জিয়াউর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম কলেবর ছিল ৭৬। যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৬ জনে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কতটুকু সফল ও সমপ্রসারিত হয়েছে বিএনপি? ২০০৬ সালের শেষ দিকে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকে বিএনপিকে অব্যাহতভাবে একটি প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। অনেকে বলছেন, এর আগে তারেক রহমান বগুড়ায় যে মডেলে দল গোছানো শুরু করেছিলেন এবং পরে যদিও তা পরিত্যাগ করেছিলেন, তাকেই আবার চাঙ্গা করা যায় কি না। তারেক রহমান গোপন ব্যালটে ভোটাভুটির মাধ্যমে গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭৪-এর ২৮শে ডিসেম্বর, জনগণের যেসব মৌলিক অধিকার স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে তা দ্রুত ফিরিয়ে দিতে সচেষ্ট হন। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া গণমাধ্যম মুক্ত করেন, বিধিনিষেধ রহিত করেন, বিচারালয়ের স্বাধীনতা বিশেষ করে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের একটি নোটিশ দিয়ে বরখাস্ত করার মতো বিধান বাতিল করেন। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শের বিধান প্রবর্তন করেন, যা সংবিধানে আজও টিকে আছে, যে বিধানের কারণে জাতি মাসদার হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায় পেয়েছে।
জিয়া মুজিব সরকারের অনুসৃত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নীতি বজায় রাখেন। দুই পরাশক্তির মধ্যে পাশ্চত্যের দিকে ঝোঁকটা একটু বেশি রেখেও সোভিয়েত ব্লককে একেবারে দূরে ঠেলে দেননি। জিয়াউর রহমানের আমলেই ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা গঙ্গার পানি বণ্টনে ৫ বছর মেয়াদি একটি স্থায়ী চুক্তি করা সম্ভব হয়। নদী বিশেষজ্ঞরা একমত যে, ফারাক্কা পয়েন্টে ন্যূনতম পানিপ্রবাহের ব্যাপারে যেভাবে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করা হয়েছিল, সেটা ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে রাখা সম্ভব হয়নি। সমুদ্রসীমা ও তালপট্টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে যৌথ আলোচনা আগে থেকেই চলছিল। অফশোর ব্লক মার্কিন তেল কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার পরে ভারত বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল শেখ মুজিব বেঁচে থাকতেই। জিয়ার আমলে তালপট্টি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলেও বাস্তবে শক্তি প্রয়োগ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। যৌথ জরিপের মাধ্যমে তালপট্টি সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে ও সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব হয়েছিল। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তরেখা নির্ধারণ ও শরণার্থী সমস্যা আলোচনার উদ্যোগ, জাপানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে টপকে দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ, ওআইসির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আল কুদস কমিটি, জোটনিরপেক্ষ ব্যুরো ও ওআইসি কাঠামোর মধ্যে যুদ্ধরত ইরান ও ইরাকের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শান্তি কমিটির একক প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ফলে তার সময়ে বহিঃসম্পদ প্রবাহ বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৭৭২ মিলিয়ন ডলার। জিয়াউর রহমানই দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সমন্বয়ে সার্কের গোড়াপত্তন করেন, সম্প্রতি ঢাকায় এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
রাজনীতিতে এসে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী দর্শনের ভিত্তিতে জন্ম দেন বিএনপির। তিনি মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হন, বিএনপি একটি উদার ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল। ফলে মানুষ দলে দলে বিএনপিতে যোগ দেয়। স্বল্প সময়েই বিএনপি পরিণত হয় একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে। তখনকার সময়ে গণমাধ্যমের উপস্থিতিও ছিল সীমিত। টেলিভিশন বলতে ছিল শুধু বিটিভি। পত্রিকা ছিল মাত্র কয়েকটি। তার পরও জিয়াউর রহমানের একক প্রচেষ্টায় জাতীয়তাবাদী ও মধ্যপন্থি রাজনীতির উন্মেষ ঘটেছিল দেশজুড়ে। কারণ সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। বিএনপি বাংলাদেশের বাস্তবতায় ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হাঁটেনি তেমনি ধর্মীয় চরমপন্থাকেও সমর্থন করেনি। লক্ষণীয় হলো, জিয়া রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার দিকে যাননি, যা এরশাদ করেছেন। রাষ্ট্রপরিচালনায় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের প্রতিফলনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সামাজিক ন্যায়বিচার সমৃদ্ধ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার নির্দেশনা রয়েছে বিএনপির গঠনতন্ত্রে। ফলে বিএনপির দলীয় কর্মসূচি কিংবা রাষ্ট্রপরিচালনা সবখানেই দেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্মবিশ্বাস ইসলামী অনুশাসনের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। আবার জিয়া ও তাঁর অনুসারীরা কখনও শরিয়া আইন চালুর চিন্তাও করেননি। আশির দশকে বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল জাতীয়তাবাদী ও মধ্যমপন্থি রাজনীতি। কিন্তু ’৯০-এর দশকের পরের প্রজন্ম অর্থাৎ আজকে যাদের বয়স বিশ থেকে পঁচিশ-তাদের মধ্যে বিকাশ ঘটেনি জাতীয়তাবাদী ও মধ্যপন্থি রাজনীতির।
আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরির পাশাপাশি দলটি দীর্ঘ সময় পরিচালনা করেছে রাষ্ট্রক্ষমতা। তিন যুগের রাজনৈতিক ইতিহাসে চারবার (স্বল্পকালীন ষষ্ঠ সংসদসহ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে বিএনপি। প্রথমবার প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং পরের তিনবার তারই সহধর্মিণী বিএনপির বর্তমান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছে দুইবার। উন্নয়নের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল বিএনপি। আর বাংলাদেশ যখন স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই নিহত হন জিয়া। বাংলাদেশ নিপতিত হয় এক দীর্ঘমেয়াদি স্বৈরশাসনের কবলে। এরশাদের পতনের পর ’৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি চমক সৃষ্টি করে বিজয়ী হয়। কারণ মিডিয়া এবং প্রায় সকল বিশ্লেষকরা ধরেই নিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন।
বিএনপি সরকার সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি ফুলবাড়ি কয়লাখনি, কানসাট ও শনির আখড়ার বিদ্যুৎ-পানির আন্দোলন। এ সময় দেশব্যাপী জঙ্গি সন্ত্রাসের উত্থান, একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণ, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ জন শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই পর্বে বিএনপির বড় সীমাবদ্ধতা ছিল নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে তথাকথিত ইসলামী সন্ত্রাসবাদের প্রতি সৃষ্ট ভয়ানক সংবেদনশীলতা বুঝতে না পারা।
২০০৪ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের সুবাদে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটির বিরাট নেতিবাচক প্রচার পায়। যদিও বিএনপি সরকারই চিহ্নিত জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করেছিল। কিন্তু রাজশাহীতে বিএনপির কিছু নেতা বাংলাভাইকে গণসংবর্ধনা দিয়েছিল, ঢাকার রাস্তায় বাংলা হবে আফগান স্লোগান উঠেছিল। আরও তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল যে, জঙ্গি নেতাদের কারও কারও সঙ্গে জামায়াত ইসলামীর পুরনো সম্পর্ক ছিল। জামায়াত নেতারা এ কথাও বলেছিলেন, এসব মিডিয়ার সৃষ্টি। বিএনপি বুঝতে পারেনি যে, এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত ও সন্দিগ্ধ করেছিল। তবে সাফল্য হিসেবে দলটি দাবি করতে পারে, নকলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, পরিবেশ দূষণ হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিটেন্স বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। আমদানি, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবাসী-আয়, খেলাপি ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, সরকারি ব্যয় অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ভাল ছিল। তার পরও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে দুর্ভোগ এনেছে মূল্যস্ফীতি। বিএনপির গত শাসনামলে তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল নেতিবাচক প্রচার-অপপ্রচারের দিকে মনোযোগ না দেয়া। কাজ পেতে হলে বিশেষ বিশেষ স্থানে কমিশন দিতে হয়, এটাই প্রচার হয়েছিল সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। সেটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মন্ত্রী-এমপি ও ব্যবসায়ী মিলে হঠাৎ ধনী কিছু প্রভাবশালী মানুষ। ফলে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রসহ নানাভাবে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিপর্যয় এবং নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে দলটি। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা রটনা ঘটনা, একটা কিছু হয়েই থাকতে পারে। তবে যতটা পারা যায় রাজনীতিবিদদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু নেতিবাচক প্রচারণার ব্যাপারে দলটির অমনোযোগের কারণে সম্ভবত সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ কর্ণধার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চলা তারেক রহমানকে। শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি তাকে বাধ্য করা হয় দেশত্যাগে। ওয়ান-ইলেভেনের সে সূত্র ধরে এখনও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করছে বিএনপি। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে নানা ক্রান্তিকাল বিএনপি পার করে এসেছে। কিন্তু সব মিলিয়ে বর্তমানে বিএনপি একটি অনিবার্য ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে সে লড়াই হয়ে উঠেছে কঠিন থেকে কঠিনতর।

আজ মন্ত্রিসভায় উঠছে পে-স্কেল : সরকারের ২০ লাখ জনবল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে

পে-কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা বাদ দিয়ে আজ সোমবার নতুন পে-স্কেল (বেতন কাঠামো) অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উঠছে। আর সর্বক্ষেত্রে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি না করে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা রহিত করলে গোটা প্রশাসনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। কারণ এতে সরকারের প্রায় ২০ লাখ জনবল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মন্ত্রিসভার কাছে অর্থবিভাগের পাঠানো এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবকণ্ঠকে বলেন, সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের জন্য উঠছে। তবে এটি নিয়মিত আলোচ্য সূচিতে নয়, বিধির মধ্যে এটি থাকছে। পে-স্কেলে প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধির একটি সুযোগ রাখা হয়েছে। এ কারণে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা রহিত করা হয়েছে। এর ফলে কত সংখ্যক জনবল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার একটি তুলনামূলক চিত্র তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ। এ মূল্যায়ন রিপোটর্টি মন্ত্রিসভাকে অবহিত করতে পাঠানো হয়েছে।
মোট কর্মরত জনবলের ভিত্তিতে বৃহৎ ৬টি মন্ত্রণালয়ের জনবলের একটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব মন্ত্রণালয় হচ্ছে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ও জনপ্রশাসন। এ ছকে দেখা যায়, জিওবি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোট জনবলের সংখ্যা ২১ লাখ ৪ হাজার। মোট জনবলের ৮৬ দশমিক ৭ ভাগই ওই ৬টি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। এই ৬টি মন্ত্রণালয়ের আওতায় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণীর জনবলের সংখ্যা ১৩ লাখ ৭৮ হাজার, যা জনবলের ৬৫ দশমিক ৪১ ভাগ। আর প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৩ জন।
সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত অধিকাংশ প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা যথাসময়ে বা প্রায় কাছাকাছি সময়ে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ কিছু থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর জনবলের পদোন্নতির সুযোগ নেই।
পে-কমিশন সুপারিশের আলোকে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা রহিত করা হলে জনবলের ভিত্তিতে ৬টি বৃহৎ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর জনবলের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় : এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর জনবলের অধিকাংশই বিশেষ করে ৩য় শ্রেণীর জনবল সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত, যা সরকারের মোট জনবলের ৯ ভাগ। তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত সিপাহী, নৌ-সেনা ও বিমান সেনা হিসেবে চাকরিতে প্রবেশ করার পর অধিকাংশই দীর্ঘদিন এমনকি সমস্ত চাকরিকাল একই পদে কর্মরত থাকেন। ফলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা রহিত করা হলে এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত জনবলের মধ্যে প্রায় ৯৫ ভাগ জনবল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ২য়, ৩য়, ও ৪র্থ শ্রেণীর জনবলের অধিকাংশই বিশেষ করে ২য় ও ৩য় শ্রেণীর জনবল পুলিশ বাহিনী, আনসার, ভিডিপি, বিজিবির সৈনিক, কারারক্ষী, ফায়ার সার্ভিসের ফায়ারম্যান চাকরিতে প্রবেশ করার পর দীর্ঘদিন বা প্রায় একই পদে কর্মরত থাকেন। ফলে সিলেকশন গ্রেড বা টাইম স্কেল সুবিধা রহিত করা হলে, এ মন্ত্রণালয়ের ৯৪ ভাগ জনবল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যা সরকারের মোট জনবলের প্রায় ২৪ ভাগ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষ মন্ত্রণালয় : এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ৩য় শ্রেণীর জনবলের প্রায় সবাই সহকারী শিক্ষক। এসব শিক্ষকগণ সমগ্র চাকরিজীবনে কোনো পদোন্নতি পান না। সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা রহিত করা হলে মোট জনবলের ১৬ ভাগ আথিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় : এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ২য় শ্রেণীর জনবলের অধিকাংশই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিগত দিনে এসব শিক্ষক ৩য় শ্রেণীভুক্ত থাকলেও বর্তমান সরকারের পূর্বের মেয়াদে তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা প্রদান করা হয়। কিন্তু এসব শিক্ষকগণ সমগ্র চাকরিজীবনে কোনো পদোন্নতি পান না। পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি না করেই সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা রহিত করলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
স্বাস্থ্য ও পবিরার কল্যাণ মন্ত্রণালয় : একইভাবে এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ৩য় শ্রেণীর জনবলের অধিকাংশই স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী। এসব পদের কর্মকর্তারা সমগ্র চাকরিজীবনে কোনো পদোন্নতি পান না। পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি না করে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় : এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ৪র্থ শ্রেণীর জনবলের অধিকাংশই ড্রাইভার। এ পদে কর্মরতরা সমগ্র চাকরিজীবনে কোনো পদোন্নতি পান না। পদোন্নতির কোনো সুযোগ সৃষ্টি না করে টাইম স্কেল সুবিধা বাদ দেয়ায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
প্রতিবেদনে সার্বিক বিবেচনায় বলা হয়, সব মন্ত্রণালয়/বিভাগের মধ্যে কেবলমাত্র ওপরে ৬টি মন্ত্রণালয়ে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধাভোগীর সংখ্যা মোট জনবলের প্রায় ৬৫ শতাংশ। পে-কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। যদিও গঠিত পে-কমিশনের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতির সুবিধা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান চাকরি বিধি ও নিয়োগ বিধির আলোকে পদোন্নতি প্রদানের সুযোগ খুবই সীমিত। যদিও কেবলমাত্র বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের পদ না থাকা সত্ত্বেও সুপার নিউমারি পদ সৃষ্টিপূর্বক পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। অন্যান্য চাকরি ক্ষেত্রে এরূপ নজির নেই। সার্বিক চাকরিতে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি না করেই প্রদত্ত সুবিধা বাদ দেয়া হলে তা কর্মরত জনবলের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

আল-নুসরার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র by রবার্ট ফিস্ক

আল নুসরা ফ্রন্টের যোদ্ধা
না, ‘মধ্যপন্থী’ জাবহাত-আল-নুসরার বিদ্রোহীদের কথা উল্লেখ করার জন্য আজ কোনো দুঃখ নেই। এরাও গলাকাটা ও খুনি বাহিনী, এখন তারা আইএস-বিরোধী অবস্থান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রণয় প্রার্থনা করছে।
আপনাদের মনে থাকতে পারে, এই দলের নেতা কাতারের আল–জাজিরা টিভিকে বলেছিলেন, আল–কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁর যোদ্ধারা আইএস ও বাশার আল আসাদ উভয়েরই বিরোধিতা করবে। এমনকি তারা সিরিয়ার খ্রিষ্টান ও আলাওয়িদদের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রবণতা সম্পর্কে যারা জানে তারা বলবে, এর কোনো মানে নেই। তারা আরও বলবে, ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদী’দের ঘাড়েই দোষটা বর্তায়। কারণ, তারা এমন কথা বলছে যে যুক্তরাষ্ট্র এসব মানুষের কাছে নতুন নতুন অস্ত্র পাঠাচ্ছে। না, যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত সন্ত্রাসী তালিকায় যারা আছে, তাদের সঙ্গে সে কখনো কোনো সম্পর্কে যাবে না। আর কাতার তো কখনো এই খুনিদের মধ্যপন্থী তকমা দেবে না, তাই না?
এবার ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদীদের দিকে আরেকবার নজর দেওয়া যাক। ফরাসি পত্রিকা লে মঁদ ডিপ্লোমাতিক এই মাসে ‘আপনি কি ষড়যন্ত্রের কথা বললেন?’ শিরোনামে অনেকগুলো নিবন্ধ ছেপেছে। খুব বেদনার সঙ্গে তারা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, কতগুলো ফলস ফ্ল্যাগ অভিযানের (একাধিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছদ্ম অভিযান) খবর সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। মাকদেনের ঘটনার কথাই বলা যেতে পারে। যেমন ১৯৩১ সালে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের ওপর চীনের আক্রমণ উল্টো চীনের ওপর জাপানের আক্রমণ বলে প্রতীয়মান হয়, যেখান থেকে জাপান চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়। তারপর সেখানে জাপানের আগ্রাসন-বিষয়ক রেপ অব নানকিং-এর মতো বইও লেখা হয়েছে।
তারপর আমরা দেখলাম, রাইখস্ট্যাগে আগুন লাগল। এই কাজটা সম্ভবত নাৎসিরা করেছিল, কমিউনিস্টরা নয়। তারপর দেখা গেল সিআইএ ও এমআই ৫-এর ষড়যন্ত্র সফল হলো, যার মাধ্যমে তারা ইরানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে উৎখাত করে। অনুমান করা হয়, সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কমিউনিস্টরাই বোমা পুঁতে রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে ইসরায়েল কায়রোর মার্কিন ও ব্রিটিশ ভবনে হামলা চালায়, আর তার দোষ চাপানো হয় মিসরীয় জাতীয়তাবাদীদের ওপর। তারপর দেখলাম ১৯৬৪ সালের টনকিন কাণ্ড, তখন যুক্তরাষ্ট্র গায়েবি অভিযোগ করে, উত্তর ভিয়েতনাম মার্কিন যুদ্ধ জাহাজে হামলা চালিয়েছে। সেখান থেকে এক বাস্তব যুদ্ধের শুরু হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধ। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এমন ষড়যন্ত্রের আরও নিদর্শন দেখা যায়, গুয়েতেমালা, ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, নিকারাগুয়া, কিউবা ও আরও অনেক দেশে।
যারা বিশ্বাস করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও তাঁর সহযোগীরা ৯/১১-এর হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, উপরোক্ত ফরাসি জার্নালে তাঁদের পক্ষপাতহীনভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। ব্যাপারটা যেন এমন, যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে কোনো কিছু করতে গিয়ে সব গুলিয়ে ফেলেছেন, তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস করতে পারেন। আর পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আরব বিশ্বের আচ্ছন্নতা, যার আড়ালে তারা নিজেদের দায়-দায়িত্ব লুকাতে চান।
ঠিক সেভাবেই একজন ইসরায়েলি নারী কর্মকর্তা আরব নেতাদের শয্যাসঙ্গী হয়ে তাঁদের ইসরায়েলপন্থী রাজনীতি সমর্থন করতে প্রলুব্ধ করেছেন—এই মিথ্যা খবর ছাপানোর পর মিসরের পত্রিকা আল মাসরি আল ইয়ৌম পরবর্তীকালে ক্ষমাও চেয়েছিল। কিন্তু ইন্টারনেটের সৌজন্যে এই মিথ্যার পুনরুৎপাদন চলছেই।
আরবদের বলা হয়েছে, পশ্চিমা বিশ্ব ষড়যন্ত্র করে ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বিপ্লবের জোয়ার তৈরি করেছিল, যাতে সেখানে অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বাশারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর মোবারকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাও করেছে মার্কিনরা। প্রথমটির লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের শক্তিশালী প্রতিবেশীর সাহচর্য থেকে দূরে রাখা, আর দ্বিতীয়টির লক্ষ্য ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডকে ক্ষমতায় আনা এবং ‘মিসরের মহত্ত্ব খর্ব করা’। মিসরের রাজনৈতিক কর্মীরা সেনাবাহিনীর নৃশংসতার বিরোধিতা করলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তারা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে টাকা খেয়ে তাদের স্বার্থের বাড়বাড়ন্ত করছে। এমনকি ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল-প্রেসিডেন্ট আল সিসিও তা বিশ্বাস করেন। আলজেরিয়ার মানুষ এখনো দাবি করে, সেখানকার সব রাজনৈতিক আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ফরাসি দিউক্সিয়েম ব্যুরো (১৯৪০ সালের পর থেকে যাদের অস্তিত্ব আর নেই)।
তাই আমিও এতে যোগ দিচ্ছি। আমার মনে হয়, ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার সাধারণ কোনো পাঠক এই বোকামির কথা শুনে ইংরেজি ভাষার বাগ্রীতির এক মহান দৃষ্টান্তের দ্বারস্থ হবেন: হোয়াট আ লোড অব ওল্ড কবলার্স! (বাজে কথা) কিন্তু অপেক্ষা করুন।
কিছুদিন আগে সিরিয়ায় থাকার সময় আমি কয়েকবার শুনেছি, ইরানিরা আসাদের জামানাকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিলেও অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যাপারে তারা খুবই কৃপণ। দামেস্কের এক সূত্র আমাকে জানিয়েছে, তারা সিরিয়ার সেনাবাহিনীর জন্য কোনো খরচ করলে তার নিশ্চয়তা হিসেবে রিয়েল এস্টেট দাবি করে। জানি না এটা সত্য কি না। তবে জাতিসংঘের বিশেষ দূত স্তাফান দে মিস্তুরা হিসাব দিয়েছেন, ইরান সিরিয়ার বর্তমান জামানাকে রক্ষায় প্রতিবছর চার বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এর মধ্যে ইরানের সেনা কর্মকর্তা, হিজবুল্লাহ ও সিরিয়ার হয়ে লড়াই করা ইরাকি শিয়াদের খরচ ধরা হয়নি। তবে ‘ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসের’ এক ভদ্রলোক এই হিসাব খারিজ করে বলেছেন, এই খরচের পরিমাণ বছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।
আর এর সব টাকাই নাকি আসে এমন এক দেশ থেকে, যার অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেঙে পড়েছে? এটা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই যে ইরান যদি এখনো পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় বা সমমনাদের দেওয়ার মতো এত টাকা তার থাকে, তাহলে সে আল-নুসরা, আইএস ও মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো গুপ্ত ইসলামপন্থীদের চেয়ে ইসরায়েল ও সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় হুমকি। আর এভাবেই কাতারের জনগণ এখন আল-নুসরা থেকে আল কায়েদার খুনিদের দূর করার প্রচারণায় আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিচ্ছে। হ্যাঁ, ষড়যন্ত্রতত্ত্বই বটে।
আবারও ভাবুন। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালেদ আল আতিয়াহ গত মাসে বলেছেন, ‘আমরা পরিষ্কারভাবেই যেকোনো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আইএস ছাড়া সবাই আসাদকে উৎখাতের চেষ্টা করছে।’ মধ্যপন্থীরা নুসরা ফ্রন্টকে বলতে পারে না, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে কাজ করব না। তোমাদের পরিস্থিতি বুঝতে হবে, বাস্তববাদী হতে হবে।’
অন্য কথায়, আল-নুসরার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে আসাদ সরকারকে উৎখাত করা। ফলে তারা মধ্যপন্থীদের কাতারেই পড়ে, তাদের মতো সামরিক সহায়তাও পেতে পারে। যদি মধ্যপন্থীরা আল-নুসরাকে বলতে না পারে, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে কাজ করব না’, তাহলে মার্কিনরা করবে কীভাবে?
ফরাসি সরকারের কাছে পেশকৃত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আইসিসের বিরুদ্ধে বিমান হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। তারা আল-নুসরার অধিকৃত বিপজ্জনক স্থান ত্যাগ করেছে। গত মাসে যখন হাজার হাজার আইএস সেনা মূলত দিনের আলোয় পালমিরা আক্রমণ করে, তখন একটিও মার্কিন বিমান সিরিয়ার আকাশে দেখা যায়নি। আর এসবই ঘটেছে যখন মার্কিন সেনারা আইএসের বিরুদ্ধে পরিচালিত আক্রমণ শেষে ফিরছিল। তাদের বিমানে তখনো বোমা ছিল, কারণ তারা লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায়নি।
সিরিয়ায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে’ কেন্দ্র করে যে সতর্কসংকেত আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, তা বোঝার জন্য আপনাকে প্রতিবেদক হতে হবে না। কারণ, কিছু কিছু সন্ত্রাসী শিগগিরই আমাদের সন্ত্রাসী হতে যাচ্ছে, যত দিন তারা একই সঙ্গে আরও ভয়ংকর সন্ত্রাসী ও আসাদের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়ে। তাদের দরকার হচ্ছে আরও টাকা ও অস্ত্র। আমি বাজি ধরতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের বদৌলতে তারা সেটা পেয়ে যাবে। শুধু ষড়যন্ত্র শব্দটা উল্লেখ করলাম না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; যুক্তরাজ্যের দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

সিদ্ধান্ত দিতে প্রস্তুত গ্রিস

গ্রিসের এথেন্সে গণভোট হচ্ছে আজ রোববার। ভোট
দেওয়ার পর বের হয়ে আসছেন এক বৃদ্ধা। অর্থনৈতিক
সংকট থেকে রেহাই পেতে ঋণদাতাদের কঠোর শর্তসংবলিত
পুনরুদ্ধার প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে কি না—সে বিষয়ে
এই গণভোট চলছে। ছবি: রয়টার্স
গ্রিসে আজ রোববার গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে রেহাই পেতে ঋণদাতাদের কঠোর শর্তসংবলিত পুনরুদ্ধার প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে কি না—সে বিষয়ে এই গণভোটে সিদ্ধান্ত দেবেন দেশটির লাখো ভোটার।
বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে। সন্ধ্যানাগাদ প্রাথমিক ফলাফল পাওয়া যেতে পারে।
গণভোটের ফলাফল নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা আছে। ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ পক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। গত শুক্রবারের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সমর্থন ৪৪ শতাংশ। ‘না’ ভোটের পক্ষে সমর্থন আছে ৪৩ শতাংশের।
সরকারের পক্ষ থেকে গ্রিসের ভোটারদের ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদের আহ্বান, ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার। তারা সতর্ক করে বলেছে, ‘না’ জিতলে ইউরোজোন থেকে গ্রিসকে বের হয়ে যেতে হতে পারে।
তবে গ্রিসের অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস গতকাল শনিবার বলেন, গ্রিসকে ইউরোজোন থেকে বের করে দেওয়ার কোনো আইনগত অবস্থান ইইউর নেই। ঋণদাতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গ্রিসের সঙ্গে যা হচ্ছে তা সন্ত্রাসবাদ।
গ্রিকরা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে ঋণদাতারা জরুরি তারল্য সহায়তার (ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি অ্যাসিস্ট্যান্স বা ইএলএ) সীমা সামান্য একটু বাড়াতে পারে। এর ফলে ব্যাংকগুলো যথেষ্ট আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে না পেলেও আমানতকারীদের দৈনিক অর্থ উত্তোলনের সীমা এখনকার ৬০ ইউরো থেকে সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে। বিদেশে অর্থ পাঠানোর ওপর যে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে তা-ও একটু শিথিল হতে পারে। এতে কয়েক দিন ধরে গ্রিক অর্থনীতি যে সম্পূর্ণ অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে তার কিছু উন্নতিও ঘটতে পারে।
গ্রিসে ব্যাংক বন্ধসহ সরকারি কড়াকড়িতে খাদ্যের পাশাপাশি ওষুধের ঘাটতি এবং পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে এই গণভোট হচ্ছে। ব্যাংকগুলো চলার মতো অর্থ থাকবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
ঋণদাতাদের কঠোর শর্ত মেনে নিতে নারাজ গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস গত সপ্তাহে ৫ জুলাইয়ের গণভোটের ঘোষণা দেন। বিক্রয়কর বাড়ানো, পেনশনে কাটছাঁট কৃচ্ছ্রসাধনের একগুচ্ছ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে আসছিল সিপ্রাস সরকার। এরই মধ্যে গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ ১৫০ কোটি ইউরো ফেরতের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে গ্রিস।

জামায়াত–বিএনপির অনুরোধ রাখেনি সৌদি সরকার by মিজানুর রহমান খান

উইকিলিকসে সৌদি গোপন নথি
যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে জামায়াতের তদবির। রাজনীতিতে মধ্যস্থতা চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া
যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে জামায়াতে ইসলামী ‘একাধিকবার’ সৌদি আরবের হস্তক্ষেপ আশা করেছিল। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনৈতিক সংকট মেটাতে সৌদি সরকারের মধ্যস্থতা চেয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব তাতে কোনো সাড়া দেয়নি।
উইকিলিকসে সদ্য প্রকাশিত সৌদি কূটনৈতিক বার্তার মধ্যে বাংলাদেশ-বিষয়ক কয়েকটির ভাষান্তর করে সৌদি আরবের এ তথ্য পাওয়া গেছে যে, মরহুম বাদশাহ আবদুল্লাহ হিজরি সন ১৯/১২/ ১৪৩২ তারিখে (ইংরেজি ১৫ নভেম্বর ২০১১) ৬১৬৪৬ নম্বর ফরমান দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি শেখ হাসিনা ওয়াজেদ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের আশঙ্কায় সৌদি রাজকীয় খরচে আরাফাত রহমানের চিকিৎসার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার অনুরোধেও সাড়া দেয়নি সৌদি আরব।
এ বিষয়ে ঢাকার সৌদি দূতাবাসের মতামত চেয়েও পাওয়া যায়নি। জানতে চাওয়া হলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বিস্ময় প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য।’ খালেদা জিয়া কখনো মধ্যস্থতা চাননি বলেও দাবি করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ রকম কিছু হলে আমি জানতাম। এটা হতেই পারে না। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সৌদি রাজপরিবারের আত্মার আত্মীয়তা ছিল এবং তার ধারাবাহিকতা আজও অটুট রয়েছে।’ তিনি ২০০৫ সালে সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে মক্কায় রাজকীয় প্রাসাদে খালেদা জিয়া-আবদুল্লাহর অন্তরঙ্গ বৈঠকে হাজির থাকার স্মৃতিচারণা করেন। উইকিলিকস প্রকাশিত সৌদি তারবার্তার সত্যতা নিয়েও তিনি সন্দেহ ব্যক্ত করেন। যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি না জেনে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয় বলে জানিয়েছে।
তবে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি মনোভাব সম্পর্কে তাঁরা যেটা জানতেন, সেটাই বাদশাহর ওই সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে সৌদি আরবের তরফ থেকে সরকারকে কখনো কিছুই বলা হয়নি বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। তাঁর কথায়, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সৌদি সরকারের বিদ্যমান সম্পর্ক চমৎকার এবং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি ইয়েমেন সংকটে পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াতে পারেনি, আমরা তাঁদের অনুরোধে দ্রুত সাড়া দিয়েছি। এতে তাঁরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট।’
সৌদিতে বাংলাদেশের হয়ে দায়িত্ব পালন করা আরেকজন সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে অনারব দেশগুলোতে সৌদিরা সাধারণভাবে যে নীতি অনুসরণ করে, সেটাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেল।
ঢাকার সৌদি দূতাবাসের প্রেরিত বার্তার বরাত দিয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের মে-জুন মাসের দিকে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহকে মূলত রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতা করার অনুরোধ জানিয়ে খালেদা জিয়ার দেওয়া একটি চিঠির বিষয়ে তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু এটা লক্ষণীয় যে এই প্রসঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাদশাহকে অবহিত করতে গিয়ে খালেদা জিয়ার আগে জামায়াতের তরফে যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে যে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, তাও নতুন করে বাদশাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর উভয় প্রসঙ্গে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে সৌদি বাদশাহ যে এক বছর আগেই একটি বাদশাহি ফরমান জারি করেছিলেন, তাও ওই পত্রটিতে উল্লেখ করা হয়।
ঢাকার তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ বিন নাসের আল-বুসাইরি ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ২০১২ সালের আগস্টে সৌদি রাজপরিবারের আমন্ত্রণে রিয়াদ সফরকালে খালেদা জিয়া তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ প্যাডে বাদশাহর কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর লেখা ২০১২ সালের মে-জুন মাসের ওই বার্তায় (স্মারক নম্বর ৭/২, নথি নং ৪/১ তাং ১৪৩৩ সনের রজব মাস) ৬১৬৪৬ নম্বর বাদশাহি ফরমানের কথা উল্লেখ করা হয়, যাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ওই বার্তায় বাদশাহ আবদুল্লাহকে বলা হয়, ‘আপনাকে আরও জানাচ্ছি যে ঢাকাস্থ সৌদি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির নেত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আপনার উদ্দেশে প্রেরিত একটি পত্র পেয়েছেন, যেখানে সৌদি আরবে আপনার ক্ষমতা আরোহণের সপ্তম বছর পূর্তিতে আপনাকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সংলাপ আয়োজনে মধ্যস্থতা করার জন্য তিনি আপনাকে অনুরোধ করেছেন।’
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বার্তায় আরও লেখেন ‘[ঢাকার] সৌদি দূতাবাস আরও জানিয়েছে যে, সরকার ও বিরোধী দলের বিবাদের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক বিরোধিতাকারীকে [নেতা-কর্মী] কারাগারে বন্দী করা হয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ, যাঁরা একাধিকবার তাঁদের সাহায্য করার জন্য এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে যে বিচারকাজ চলবে, তা বন্ধ করার জন্য সৌদি সরকারের মধ্যস্থতা কামনা করেছিলেন। তাঁর [বেগম জিয়া] চিঠিটি এমন সময় এল, যখন বাংলাদেশের সংকট নিরসনে সৌদি সরকারের মধ্যস্থতার ব্যাপারে বিরোধীদের ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।’
উল্লেখ্য, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় বছর ঢাকায় ড. বুসাইরি সৌদি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। উইকিলিকসে প্রাপ্ত তারবার্তাগুলো তাঁর সময়েই ঢাকা থেকে প্রেরিত হয়েছে। সৌদি রাজপরিবার এবং ঢাকা-রিয়াদ সম্পর্কের বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘সৌদি আরব কখনো যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ সরকারকে আকারে-ইঙ্গিতেও কিছু বলেনি। অবশ্য বাংলাদেশ সরকারই নিজ থেকে তাদের এই বিচারের বিষয়ে সব সময় অবহিত করে এসেছে।’
ওই কূটনীতিক আরও উল্লেখ করেন, তবে তাদের দেশের সরকারনিয়ন্ত্রিত দৈনিক সৌদি গেজেট পত্রিকায় সময়ে সময়ে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিবন্ধ ছাপা হয়েছে, তাও সম্পাদকীয় নয়, উপসম্পাদকীয় হিসেবে বেরিয়েছে। আর তাতে আগে ঢাকার সৌদি দূতাবাসে কনসাল হিসেবে কাজ করেছিলেন, এমন এক ভদ্রলোক নিয়মিত লিখেছেন। তবে তাতে কখনো বিচার বন্ধের কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক মান যাতে বজায় থাকে।
ইসলামাবাদ থেকে: ওদিকে, পাকিস্তানের সৌদি দূতাবাস রিয়াদে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া দপ্তরে এক ‘গোপনীয়’ তারবার্তায় [নম্বর ১০/৭/৩ তাং ৭/৩/১৪৩৩ হিজরি, ইংরেজি ৩০ জানুয়ারি ২০১২] জানায়, ‘মাননীয় রাষ্ট্রদূত বিশেষ উৎস হতে জানতে পেরেছেন যে, বাংলাদেশের কারাগারে অন্তরীণ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের যদি ১৯৭১ সালের (পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়ার বছর) যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার করা হয়, তাহলে এটা পাকিস্তান, বিশেষ করে তার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে উসকানি হিসেবে কাজ করবে। এই সূত্র আরও জানাচ্ছে যে, সর্বশেষ ৯০ বছর বয়সী অধ্যাপক গোলাম আযমকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়ার যুদ্ধে গুপ্তহত্যায় (ইকতিয়াল) অংশগ্রহণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
‘পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত কিছু সামরিক কর্মকর্তা মনে করেন, এই উসকানি [যুদ্ধাপরাধের বিচার] দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ভারত। তারা আন্তর্জাতিক বিচারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে জড়াতে চাইছে। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য...’
উল্লেখ্য, এই বার্তাটির এরপরের অংশ পাওয়া যায়নি। তবে এতে এ-সংক্রান্ত একটি পূর্ববর্তী বার্তার (নম্বর ২১০/৯২/২১/১৮৮ তাং ১৮/৩/১৪৩১, ইংরেজি ৪ মার্চ ২০১০) বরাত দেওয়া আছে, যা ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে পাকিস্তানি মনোভাব সৌদি আরবের আগ্রহের বিষয় ছিল। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের বিচার বন্ধে হস্তক্ষেপ করতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল।
আরাফাতের চিকিৎসা: তৎকালীন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদ আল ফয়সাল (বর্তমান বাদশাহ সালমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা) প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহর বিশেষ সচিবকে ২০১২ সালের মার্চে বলেন, ‘সৌদি সরকার বাংলাদেশের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে রিয়াদস্থ বাদশাহ ফয়সাল বিশেষায়িত হাসপাতালে সৌদি আতিথেয়তার খরচে চিকিৎসার জন্য একটি অনুরোধপত্র পেয়েছেন।’ আরাফাত রহমান আর্থিক দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত উল্লেখ করে তাঁকে জানানো হয় যে আপাতত তিনি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন আছেন। বার্তায় এরপর লেখা হয়েছে ‘খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, তাঁর রোগের চিকিৎসা সৌদি আরবে যেমন আছে, তেমনি থাইল্যান্ডেও রয়েছে। এমতাবস্থায় এ বিষয়টি এড়ানো উত্তম হবে। কেননা, এতে করে শেখ হাসিনা ওয়াজেদের সরকার এবং সৌদি সরকারের মধ্যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হবে।’
বিএনপির নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মীর নাছির প্রথম আলোকে বলেন, সাবেক রাষ্ট্রদূত আল বুসাইরির সঙ্গে তিনি সৌদি আরবে তারেক রহমানের চিকিৎসা বিষয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি যথেষ্ট ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিলেন। তবে আরাফাতের বিষয়টি তাঁর জানা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। অথচ প্রাপ্ত তারবার্তায় দেখা যায়, আল বুসাইরি আরাফাতের চিকিৎসায় খালেদা জিয়ার অনুরোধ রক্ষায় বর্তমান সরকারের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় তাঁর সরকারের কাছে নেতিবাচক মতামত ব্যক্ত করেছিলেন।
উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া নথি সূত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের বিষয়ে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে সাধারণভাবে যে ধারণা প্রচলিত, তার সঙ্গে বাস্তবতার যে পার্থক্য, সেটাই এবারে উন্মোচিত হলো। গত এক দশকে সৌদি আরবে কয়েকবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। সুতরাং সেখানে আবেগ রহিত বাস্তবানুগ ও পরিপক্ব পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন ঘটবে, সেটাই স্বাভাবিক। এখন বরং আমাদেরই উচিত হবে আবেগমুক্ত হওয়া।’

গ্রিসের আলোচিত গণভোট আজ: খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি, অনেক কমেছে পর্যটক

মধ্য এথেন্সের একটি সংবাদপত্রের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে
শিরোনাম দেখছেন কয়েকজন রাজধানীবাসী। প্রায় সব পত্রিকার
প্রথম পাতায় ‘না’ ও ‘হ্যাঁ’ লেখা শিরোনাম l ছবি: এএফপি
অর্থনৈতিক সংকট থেকে রেহাই পেতে ঋণদাতাদের কঠোর শর্তসংবলিত পুনরুদ্ধার প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে কি না —এ নিয়ে আজ রোববার গ্রিসে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ব্যাংক বন্ধসহ সরকারি কড়াকড়িতে খাদ্যের পাশাপশি ওষুধের ঘাটতি এবং পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই ভোট হচ্ছে। সপ্তাহান্তে ব্যাংকগুলো চলার মতো অর্থ থাকবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। খবর গার্ডিয়ান ও বিবিসির।
গ্রিসের ব্যাংকগুলো বলছে, তাদের হাতে এখন এক শ কোটি ইউরো আছে। অর্থাৎ, এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মাথাপিছু অর্থের পরিমাণ ৯০ ইউরো। গণভোটের রায় যা-ই হোক না কেন, এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো জরুরি ভিত্তিতে আগামী সোমবার ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) সহযোগিতা চায়।
‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত শুক্রবারের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সমর্থন ৪৪ শতাংশ। না ভোটের পক্ষে সমর্থন আছে ৪৩ শতাংশের। সমাবেশের মতো নির্বাচনের ২৪ ঘণ্টা আগে থেকে জরিপও নিষিদ্ধ।
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস কার্যত তাঁর রাজনৈতিক জীবন রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। শুক্রবার রাতে বিশাল এক সমাবেশে সিপ্রাস, ‘প্রতারণার সঙ্গে বিজয়ী হতে’ ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানান। মাত্র পাঁচ মাস আগে ক্ষমতাসীন বামপন্থী সিপ্রাসের জোট সরকার এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।
কেবল না-এর পক্ষেই নয়, হ্যাঁ-এর পক্ষেও বড় কয়েকটি সমাবেশ হয়েছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, হ্যাঁ-এর চেয়ে না-এর পক্ষের সমাবেশে লোক সমাগম অনেক বেশি হয়েছে।
হ্যাঁ-এর পক্ষের সমাবেশে বলা হয়েছে, না পক্ষ জেতার অর্থ হলো ইউরোজোন থেকে বের হয়ে যেতে হবে গ্রিসকে। এ কথা প্রত্যাখ্যান করে সিপ্রাস বলেন, ‘ওদের আমরা ইউরোপ ধ্বংস করতে দেব না।’
খাদ্য আর ওষুধের সংকট: গণভোট নিয়ে তীব্র এই উত্তেজনার মধ্যে খাদ্য আর ওষুধের সংকটে পড়েছে গ্রিস। আটা ও চিনির মত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জোগানও কমে গেছে। ওষুধের দোকানি মেরি পাপাদোপুলো বলেন, ‘ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সমস্যার একটা সমাধান না হলে ঘাটতি আরও বাড়বে।’
এথেন্সের শহরতলি পাইরুয়াসের ফল ও সবজির দোকানি এলনি কাসামাকি বলেন, ‘সবাই ব্যাংক থেকে তোলা ২০ ইউরোর নোট নিয়ে আসছে। ভাংতির সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমার হাতে কিছু ছোট নোট ছিল তাই খুচরা ফেরত দিতে পেরেছিলাম। এখন সব শেষ।’
ব্যবসায়ীদের সংগঠন ন্যাশনাল কনফেডারেশন অব হেলেনিক কমার্সের প্রধান ভাসিলিস করকিদিস বলেন, ‘আমদানি, রপ্তানি, কারখানা, পরিবহন—সব স্থবির হয়ে গেছে।’
গ্রিসের পর্যটন ব্যবসায়ীদের সংগঠন গ্রিক টুরিজম কনফেডারেশন (এসইটিই) বলেছে, গত কয়েক দিন পর্যটকদের বুকিং ৪০ শতাংশ কমে গেছে। প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লোক তাদের বুকিং বাতিল করছে। গ্রিসের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পর্যটনশিল্প।

চেঙ্গিস খানের নাতির জাহাজ জাপানে!

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে জাপান জয় করতে আসা এক নৌবহরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছে জাপানের প্রত্নতত্ত্ববিদরা। মঙ্গোলিয়ার শাসক চেঙ্গিস খানের নাতি কুবলাই খানই নাকি ওই জাহাজ বহর পাঠিয়েছিলেন। এমনটাই ধারণা জাপানি বিশেষজ্ঞদের। জাপানের দক্ষিণে কায়ুশু দ্বীপের পূর্ব উপকূলে মাতসুয়ারা নগরের কাছের সৈকতে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৫ ফিট গভীরে পাওয়া গেছে জাহাজের ভাঙা অংশ। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে চীনাদের ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী পোর্সিলিনের তৈজসপত্র পাওয়া গেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, কুবলাই খান ১২৭৪ ও ১২৮১ সালে জাপান জয়ের উদ্দেশ্যে রণতরী পাঠান।
ওই রণতরীগুলোয় ১ লাখ ৪০ হাজার সৈন্যসামন্ত ছিল ধারণা করেন তারা। দু’বারই সামুদ্রিক ঝড় টাইফুনের কবলে পড়ে ধ্বংস হয় ৪ হাজার নৌকাসহ জাহাজ বহর। তবে জাপানিদের বিশ্বাস ‘কামিকাযি’ বা পবিত্র বায়ুই জাপানকে শত্র“র আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে। মাতসুয়ারা শহরের সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান আতসুইয়ুকি নাকাতা বলেন, ‘আমরা এই জাহাজের ধ্বংসাবশেষে যে ধরনের তৈজস পেয়েছি সে সব ৭৩০ বছর আগে মঙ্গোলিয়ানরা ব্যবহার করত। জাহাজ নির্মাণের কৌশলও মঙ্গোলিয়ানদের মতোই। এর আগে ২০১১ সালে আরও একটি মঙ্গোলিয়ান জাহাজের ভাঙা অংশ পাওয়া যায়। সেবার কিছু মুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল।’ টেলিগ্রাফ।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ৫.৪৬০ কোটি টাকা ঘুষ!

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ৭০ কোটি ডলার (৫.৪৬০ কোটি টাকা) ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঋণে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ানএমডিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, ব্যাংক ও সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এসব অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়েছে। মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে তার কার্যালয় থেকে এ ঘটনাকে রাজনৈতিক স্যাবোটাজ চেষ্টার অংশ বলে দাবি করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নাজিবের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ৫ দফায় ৭০ কোটি ডলার জমা হয়েছে। এর মধ্যে দুই দফায় সবচেয়ে বড় অংকের লেনদেন হয়েছে। ২০১৩ সালের মার্চে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে প্রথম দফায় ৬২ কোটি এবং দ্বিতীয় দফায় ৬ কোটি ১০ লাখ ডলার জমা করা হয়েছে। এসব অর্থ ঋণভারে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ানএমডিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, ব্যাংক ও সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যম হয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।

প্রথম চ্যালেঞ্জে জিতে খুশি দ. আফ্রিকা

প্রস্তুতি ম্যাচ জিতে দারুণ খুশি দক্ষিণ আফ্রিকা। কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে ভালো খেলার চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হয়ে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে প্রোটিয়াদের। কাল বিসিবি একাদশকে ১০ উইকেটে হারিয়েছে তারা। বিসিবি একাদশের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার পেসাররা তো ভালো করেছেন, স্পিনাররাও কম যাননি। তিন ওভার বোলিং করে দুই উইকেট নেয়া অ্যারোন ফাঙ্গিসো জানালেন, ‘অবশ্যই এ জয়টা আমাদের জন্য ভালো। এতে আমাদের জন্য সফর সহজ হবে না, কিন্তু এই জয়ে সবাই খুশি। কারণ গরমের মধ্যে মানিয়ে নেয়ার জন্য সবাই কষ্ট করেছে এবং ক্রিকেটাররা ভালো পারফর্ম করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জয় চেয়েছিলাম এবং সেটা পেয়েছি। অনুশীলনের জন্য আমরা আরও একটি দিন সময় পাব। এখানে কেউ এক মাসের জন্য এসেছে আবার কেউ এক সপ্তাহ পর চলে যাবে। এটা ভালো কন্ডিশন, প্রোটিয়াদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও।’
ফতুল্লার উইকেটে স্পিনারদের জন্য বড়তি কিছু ছিল না। তারপরও বিসিবি একাদশকে ৯৯ রানে অলআউট করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ফাঙ্গিসো বলেন, ‘এই উইকেটে বোলিং করা অনেক কঠিন ছিল, কারণ স্পিনারদের জন্য কোনো টার্ন ছিল না।’ এই স্পিনার মনে করেন, ‘বাংলাদেশে আসলে মনে করতে হবে স্পিনাররা সুবিধা পাবে। উইকেটে টার্ন থাকবে, এটাই কল্পনা করতে পারেন।’ এদিকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ না খেলা লেগ-স্পিনার এডিয়ে লেইকে নিয়ে এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ২৮ বছর বয়সী বোলারের অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশন দেখে ব্যাটসম্যানরা ভড়কে যেতে পারেন। শুরুতে যেমন তার বল বুঝতে না পেরে বোল্ড হন মোসাদ্দেক হোসেন। নতুন এই স্পিনার সম্পর্কে ফাঙ্গিসো বলেন, ‘লেই ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করেছে। দলে আমার ও তার ভূমিকা আলাদা। সে মানসম্মত বোলার। সে সিপিএল (ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লীগ) থেকে এখানে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার টি ২০ টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি লেই। সে যোগ্যতা দিয়েই দলে এসেছে।’

অপূর্ব রোজা এবং মিরর দ্য গেইম

ঈদ মানেই তারকা শিল্পীদের ব্যস্ততা। ছোট-বড় সবাই কমবেশি নাটকের অভিনয় নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটান। ঈদের নাটক নিয়ে তেমনই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা অপূর্ব। এবার সঙ্গে নিয়েছেন রোজা পারমিতা দে নামে নতুন এক শিল্পীকে। গৌতম কৈরির পরিচালনায় পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক নাটক ‘দ্য মিরর গেইম’-এ এই দুই শিল্পী জুটিবেঁধে অভিনয় করেছেন। রোজা বেড়ে উঠেছেন এবং পড়াশোনা করছেন কলকাতায়। ওখানকার বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার পাশাপাশি তিনি রাজচক্রবর্তীর নির্দেশনায় ‘কাঠমুন্ডু’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন।
বাংলাদেশে এটাই তার প্রথম নাটক। পরিচালক জানান, ‘দ্য মিমর গেইম মূলত রোমান্টিক থ্রিলারধর্মী নাটক। গল্পের প্রয়োজনে দেখানো হয়, রোজা পারমিতা কলকাতা থেকে আসা একটি মেয়ে। একটি পুরাকীর্তির সন্ধানে সে বাংলাদেশে এসেছে। এ নিয়েই মূলত গল্প এগিয়ে যায়।’ নাটকে কাজ করা প্রসঙ্গে রোজা পারমিতা দে বলেন, ‘ভীষণ ভালোলাগছে গৌতম দা এবং অপূর্ব দাদার সঙ্গে কাজ করে। পুরো ইউনিটই খুব গুছানো এবং এখানে এত চমৎকার কাজ হয় আমার জানা ছিল না। অনেক চমৎকার একটি কাজ হচ্ছে।’ অপূর্ব বলেন, ‘রোজা মূলত আমাদেরই মেয়ে। বেড়ে উঠেছে কলকাতায়। খুব বিনয়ী একজন শিল্পী।’ নাটকটি ঈদে একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে।

ঋণদাতারা যা করছে তা হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ -আজকের গণভোটের প্রাক্কালে গ্রিসের অর্থমন্ত্রী

মধ্য এথেন্সের একটি সংবাদপত্রের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে
শিরোনাম দেখছেন কয়েকজন রাজধানীবাসী। প্রায় সব
পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘না’ ও ‘হ্যাঁ’ লেখা শিরোনাম
অর্থনৈতিক সংকট থেকে রেহাই পেতে ঋণদাতাদের কঠোর শর্তসংবলিত পুনরুদ্ধার প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে কি না—এ নিয়ে আজ রোববার গ্রিসে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ব্যাংক বন্ধসহ সরকারি কড়াকড়িতে খাদ্যের পাশাপাশি ওষুধের ঘাটতি এবং পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই ভোট হচ্ছে। ব্যাংকগুলো চলার মতো অর্থ থাকবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস গতকাল ঋণদাতাদের সমালোচনা করে বলেন, গ্রিসের সঙ্গে যা হচ্ছে তা সন্ত্রাসবাদ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ঋণদাতাদের ত্রয়ী চায় ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতুক, কারণ তারা এতে গ্রিক জনগণকে অপমান করতে পারবে। খবর গার্ডিয়ান ও বিবিসির।
গ্রিসের ব্যাংকগুলো বলছে, তাদের হাতে এখন এক শ কোটি ইউরো আছে। অর্থাৎ, এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মাথাপিছু অর্থের পরিমাণ ৯০ ইউরো।
গণভোটের ফলাফল কী হবে তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত শুক্রবারের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সমর্থন ৪৪ শতাংশ। না ভোটের পক্ষে সমর্থন আছে ৪৩ শতাংশের।
ঋণদাতাদের কঠোর শর্ত মেনে নিতে নারাজ গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস গত সপ্তাহে ৫ জুলাইয়ের গণভোটের ঘোষণা দেন। বিক্রয়কর বাড়ানো, পেনশনে কাটছাঁট কৃচ্ছ্রসাধনের একগুচ্ছ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে আসছিল সিপ্রাস সরকার। এরই মধ্যে গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ ১৫০ কোটি ইউরো ফেরতের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
হ্যাঁ ও না এর তফাত: গ্রিকরা হ্যাঁ ভোট দিলে ঋণদাতারা জরুরি তারল্য সহায়তার (ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি অ্যাসিস্ট্যান্স বা ইএলএ) সীমা সামান্য একটু বাড়াতে পারে। এর ফলে ব্যাংকগুলো যথেষ্ট আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে না পেলেও আমানতকারীদের দৈনিক অর্থ উত্তোলনের সীমা এখনকার ৬০ ইউরো থেকে সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে। বিদেশে অর্থ পাঠানোর ওপর যে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে তা-ও একটু শিথিল হতে পারে। এতে কয়েক দিন ধরে গ্রিক অর্থনীতি যে সম্পূর্ণ অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে তার কিছু উন্নতিও ঘটতে পারে
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস কার্যত তাঁর রাজনৈতিক জীবন রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। শুক্রবার রাতে বিশাল এক সমাবেশে সিপ্রাস, ‘প্রতারণার সঙ্গে বিজয়ী হতে’ না-এর পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানান। শুধু না-এর পক্ষেই নয়, হ্যাঁ-এর পক্ষেও বড় কয়েকটি সমাবেশ হয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, হ্যাঁ-এর চেয়ে না-এর পক্ষের সমাবেশে লোক সমাগম অনেক বেশি হয়েছে। গ্রিসজুড়ে এমন ১০টি বড় সমাবেশ হয়েছে। হ্যাঁ-এর পক্ষের সমাবেশে বলা হয়েছে, না-এর পক্ষ জেতার অর্থ হলো ইউরোজোন থেকে বের হয়ে যেতে হবে গ্রিসকে। এ কথা প্রত্যাখ্যান করে সিপ্রাস বলেন, ‘ওদের আমরা ইউরোপ ধ্বংস করতে দেব না।’

বলতে গেলে আমি লুকিয়ে বাস করছি -অনন্য আজাদ

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত। কোন আইন নেই। বিচার নেই। আর সরকার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়ায় না। মনে হচ্ছে যেন তারাও ব্লগার হত্যাকারীদের সঙ্গে চক্রান্তে লিপ্ত। দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদের ছেলে অনন্য আজাদ (২৫)। প্রাণনাশের হুমকির মুখে বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তার সঙ্গে আলাপ করেছেন ডিপ্লোম্যাটের সঞ্জয় কুমার। এখানে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: দেশ কেন ছাড়ছেন?
অনন্য আজাদ: আমি দেশ ছাড়ছি, কারণ আমার জীবন হুমকির মুখে। স্বাভাবিক থাকাটা আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। আমি মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখি। যুদ্ধাপরাধী আর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লেখি। আমি তাদের বিরুদ্ধে লেখি যারা সমাজকে ভুল পথে চালিত করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। ফলে, মানুষ মনে করে আমার লেখা তাদের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণে তারা আমাকে হত্যা করতে চায়। কয়েক মাস ধরে আমি বলতে গেলে প্রায় লুকিয়ে বাস করছি; আমার চাকরি ছেড়েছি, লেখালেখি কমিয়ে এনেছি, আমার ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেছি। আমার জন্য জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে গেছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে থাকলে আপনি হত্যার শিকার হতে পারেন সেজন্য নিশ্চয়ই আপনি ভীত?
অনন্য আজাদ: বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত। যারা অযৌক্তিকতার বিরুদ্ধে লেখে বা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলে তাদের কারও জন্য কোন নিরাপত্তা নেই। মৌলবাদীরা ইতিমধ্যে নয়জন ব্লগারকে হত্যা করেছে, যারা মুক্তচিন্তার জন্য লড়াই করছিল। ইসলামী চরমপন্থার বিরুদ্ধে লেখার কারণে অনেক লেখক, ব্লগারের নাম মৌলবাদী শক্তিগুলোর হিট-লিস্টে রয়েছে। এসব ব্লগারের জীবন রক্ষার্থে সরকার কোন কিছুই করছে না। ব্লগাররা সার্বক্ষণিক আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন। আর তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর কোন প্রচেষ্টাই নেই।
প্রশ্ন: সরকার আপনাকে বা অন্য ব্লগারদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়- এমনটা কেন মনে করছেন?
অনন্য আজাদ: কোন আইন নেই। কোন বিচার নেই। আর সরকার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়ায় না। মনে হচ্ছে যেন হত্যাকারীদের সঙ্গে তারাও চক্রান্তে লিপ্ত। লেখক আর ব্লগারদের প্রতি প্রকাশ্য হুমকি থাকা সত্ত্বেও সরকার মৌলবাদী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। দেশের ভেতরের অবস্থা ভাল না। হয়তো মৌলবাদী শক্তি আর সরকার একসঙ্গে কাজ করছে। এ কারণেই পুলিশ এ যুক্তি মেনে নিচ্ছে যে ব্লগাররা নাস্তিক আর তাদের টার্গেট করা উচিত। ধর্ম বা রাজনীতি নিয়ে স্বতন্ত্র ধারণা থাকার কারণে কেন একজন হত্যার শিকার হবে? এটা ভাল রাজনীতির লক্ষণ নয়। আমি মনে করি দিন দিন এ দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। আর দেশের মৌলিক নীতিগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য হস্তক্ষেপ করার জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
প্রশ্ন: ব্লগারদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক হামলার জন্য আপনি কাকে দায়ী করেন?
অনন্য আজাদ: এটা সত্যি, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন করে পাকিস্তান। আর আমাদের দেশে আমরা যুদ্ধাপরাধী আর তাদের স্বাধীনতাবিরোধী মতাদর্শের বিরুদ্ধে। কাজেই, ব্লগারদের ওপর হামলা আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলোর জন্য সমর্থনের মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশের একটি পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি সব সময়ই রয়েছে, যা তালেবান আর একই ধরনের জঙ্গি শক্তির উৎপত্তিস্থল।
প্রশ্ন: কট্টরপন্থিদের অভিযোগ, আপনি ইসলাম ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে লেখেন?
অনন্য আজাদ: এটা সত্যি নয়। এটা একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত্র। ব্লগারদের নাস্তিক আর ইসলামবিরোধী বলা হয়। দেখুন, আমাদের একমাত্র এজেন্ডা হলো, পড়াশোনা করা, লেখা এবং সমাজে মৌলবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যারা কিনা ৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আমরা ওই শক্তিগুলোর সমালোচনা করি যারা নিজস্ব রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে। যারা ইসলামের নামে হত্যা করে আমরা তাদের নিন্দা জানাই। এমন লেখাগুলোতে তাদের মুখোশ খুলে দেয়, ফলে আমরা স্বাভাবিক টার্গেটে পরিণত হই। বাংলাদেশ প্রধানত একটি মুসলিম দেশ। আর মৌলবাদীরা আমাদের নাস্তিক বা ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতি উসকে দেয়ার চেষ্টা করে। এভাবে তারা ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের হত্যার যথার্থতা নিরূপণ করছে। বাংলাদেশী সমাজ নিজেদের প্রথমে বাঙালি ও পরে মুসলিম হিসেবে চিহ্নিত করে। আর বাংলাদেশী এ সমাজে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দেয়ার একটি গভীরে প্রোথিত ষড়যন্ত্র রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার পরিবার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে?
অনন্য আজাদ: তারা অনেক বেশি সহযোগিতামূলক। অস্পষ্ট, গোপন এসব শক্তির বিরুদ্ধে আমার সংগ্রামে আমার পরিবার আমার পাশে আছে। তারা ভীত, কিন্তু যে আদর্শের জন্য আমাদের অবস্থান তাতে তাদের বিশ্বাস রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার পিতা, হুমায়ুন আজাদ মৌলবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার জীবন হারিয়েছিলেন?
অনন্য আজাদ: তিনি দেশের জন্য বিরাট এক অবদান রেখেছেন। নিজের জীবন দিয়ে তিনি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা আর যৌক্তিকতার শিখা প্রজ্বলিত রেখেছেন। তিনি শুধু আমার জন্যই অনুপ্রেরণা নন, বরং তিনি তাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা যারা বাংলাদেশকে প্রগতিশীল একটি সমাজ হিসেবে দেখতে চায়।
প্রশ্ন: সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কী আপনি সমর্থন পান?
অনন্য আজাদ: নতুন প্রজন্ম ধর্মকে সম্মান করে। কিন্তু তারা ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত। তারা জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দ করে না, যারা ধর্মের নামে সব কিছু করতে পারে। নতুন প্রজন্ম ধর্মনিরপেক্ষতা পছন্দ করে। কিন্তু তারা উগ্রপন্থি শক্তিদের দ্বারা নাস্তিক আখ্যায়িত হতে চান না, যা নিশ্চিত এক মৃত্যুকে নিমন্ত্রণ দেয়। মানুষ ভীত।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন কেন?
অনন্য আজাদ: পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের পৃথক হওয়ার পুরো ভিত্তিই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম কারণ এটা ইসলামপন্থি দেশ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের গঠনও আজ পরিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের দেশ সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ নয়। ইসলাম এখন আমাদের রাষ্ট্রধর্ম। এটা ভাল নয়। আমাদের জীবনধারা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত। স্বার্থের কারণে ধর্ম ব্যবহৃত হলে তা নিয়ে সমালোচনা করার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
প্রশ্ন: এখন আপনার পরিকল্পনা কী?
অনন্য আজাদ: এটা আমি এখন আপনাকে বলতে পারবো না। আমি যদি আমার পরিকল্পনা প্রকশ করি, তাহলে সেটা আমার জন্য সমস্যার সৃষ্টি করবে। কিন্তু যেটা নিশ্চিত তা হলো আমি লেখা বন্ধ করতে পারবো না। আমি আমার পরবর্তী বই প্রকাশ করবো। আমি ধর্মনিরপেক্ষতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তাধারার একজন শক্ত সমর্থক। আর আমি এসব ইস্যুতে লেখা অব্যাহত রাখবো।

কানেক্টিভিটি ধাঁধার পাঠোদ্ধার by এস.এন.এম আবদি

তিন সার্কভুক্ত দেশ- বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সড়ক কানেক্টিভিটি (সংযোগ) চুক্তি করে উল্লসিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। এ চুক্তি সমপাদিত হয়েছে সীমান্ত অতিক্রম করে অবাধে পরস্পরের গাড়ি, বাস ও কার যাতায়াতের জন্য, যাতে করে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ ও বাণিজ্যে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। কিন্তু নয়াদিল্লি এটি খুব ভাল করেই জানে, বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) মোটরযান চুক্তি কোনভাবেই পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে ইসলামাবাদের সাড়া পাওয়ার আশা ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু নয়। পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি ভারতের জন্য অত্যন্ত সুখকর একটি বিষয় হতো। বিবিআইএন মোটরযান চুক্তির বাস্তবায়ন এখনও ‘বহুদূরের স্বপ্ন’। এমনটিই বলেছে একটি নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক পত্রিকা। সেখানে বলা হয়েছে, বেশ কিছু স্ববিরোধী বিষয় সপষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে নিজের আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে অবাধ সড়ক যোগাযোগ চায় ভারত। এর মধ্যে আফগানিস্তানও রয়েছে। কিন্তু দেশটির সঙ্গে ভারতের কোন সীমান্ত নেই। অপরদিকে সিকিম হয়ে চীনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে ভারতের আপত্তি রয়েছে। সিকিমের সঙ্গে তিব্বতের সীমান্ত রয়েছে। আবার উত্তরপূর্বাঞ্চল দিয়েও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে আগ্রহী নয় ভারত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের। মিয়ানমারের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং-এর। চীনের প্রস্তাবিত নিউ সিল্ক রোডে ভারতের তীব্র অনাগ্রহও জানা কথা। কিন্তু যেটা তেমন জানা কথা নয়, তা হলো, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার মহাসড়কের ভিত দুর্বল করার ব্যাপারে ভারত ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। চীনের কুনমিং থেকে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত ওই মহাসড়ক হবে মিয়ানমারের মান্দালয়, বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রাম এবং ভারতের আসামের সিলচরের মধ্য দিয়ে। চার দেশের মধ্যে পর্যটন ও বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য এটি সুপারিশও করেছে অনেকে। কথায় আছে, এক মানুষের মাংস আরেকজনের জন্য বিষ। তাই যেটা এক দেশের জন্য ভাল হয়, আরেক দেশের জন্য সেটাই খারাপ হতে পারে। যে বিষয় এক দেশের জন্য অনেক সুখকর, আরেক দেশের জন্য সেটা খুবই অপ্রীতিকর একটি বিষয়। অন্য কথায়, নীতি নয়, জাতীয় স্বার্থই সর্বাগ্রে আসে। তিন পারমাণবিক শক্তিসমপন্ন দেশ ভারত, পাকিস্তান ও চীনের একসঙ্গে বসে আপসে নিজেদের মধ্যকার সংযোগ ইস্যুগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। পরসপরকে হটানোর নীতি থেকে সরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত বিশ্বের অন্যতম পরিবর্তনশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ এ অঞ্চলটির প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য।
সিকিম হয়ে তিব্বতের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের বিরোধী ভারত। এ ছাড়া ভারত নিরাপত্তাগত কারণ তুলে ধরে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের বিরোধিতা করছে। কিন্তু বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতাও বিবেচনা করা উচিত। সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ সালে, ভারতে প্রায় ৫১০৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে চীন। অপরদিকে ভারত থেকে চীন আমদানি করেছে ১২৮৩ কোটি ডলারের পণ্য। ভারতের ভয়, সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলে এ ঘাটটি আরও বড় হতে পারে।
ভাল কথা। ভারত চায় না, তার বাজার চীনা পণ্যে সয়লাব হয়ে উঠুক। কিন্তু যদি বিবিআইএন চুক্তি কার্যকর হয়, তাহলে কি ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালে নিজেদের পণ্যের বন্যা বইয়ে দেবে না? নিরাপত্তাগত দিক যদি বিবেচনা করা হয়, পাকিস্তান চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে নিয়ে উদ্বিগ্ন, ঠিক যেমন ভারত চীনকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই ভারতের কার, বাস ও ট্রাকের বহরের জন্য নিজের দরজা খুলে দেবার বেলায় পাকিস্তান সতর্ক। সত্যিকার অর্থে, আমি মনে করি না, নিজেদের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে সংযোগ স্থাপনে ভারতকে অনুমতি দেবে পাকিস্তান। বিশেষ করে যখন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পররাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সরতাজ আজিজ ভারতের বিরুদ্ধে ‘আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে হামলা’র অভিযোগ উত্থাপন অব্যাহত রেখেছেন।
অপরদিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ সমপ্রসারণের ভয়াবহ অভিযোগ আনে ভারত। এমন পরিবেশে, সংযোগের বিষয়টি কেবলমাত্র বিদ্যমান পরিস্থিতির জিম্মিতে পরিণত হতে বাধ্য। ভূ-রাজনৈতিক কারণে আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব হ্রাস পেতে চলেছে। আফগান প্রেসিডেন্ট আফগান গনি ভারতের সঙ্গে একটি অস্ত্র চুক্তি বাতিল করেছেন। তিনি বরং পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন বেশি। এছাড়াও, মনে হচ্ছে পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টিলিজেন্স (আইএসআই) ও আফগান ন্যাশনাল ডিরেক্টরেট ব্যাপক ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
উপ-আঞ্চলিকতা উদযাপন করা খুবই ভাল। আঞ্চলিক সংগঠন সার্কের বিরুদ্ধে গিয়ে বিবিআইএন চুক্তি উপ-আঞ্চলিকতারই প্রতিনিধিত্ব করে। উদযাপন সাজানো হচ্ছে ‘সার্ক মাইনাস ওয়ান’ প্রতিষ্ঠার কৌশলের মাধ্যমে। এমনভাবে কৌশল করা হচ্ছে, যাতে করে পাকিস্তান ত্যাগ করতে বাকি সার্কভুক্ত দেশগুলোকে এক করা যায়। এ প্রচেষ্টার পক্ষের অনেকে আবার পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযোগ বিষয়ে সুসমপর্ক স্থাপনের বিরুদ্ধে। তাদের বিশ্বাস, এর ফলে ভারতে সন্ত্রাসীদের প্রবেশ বেড়ে যেতে পারে।
প্রার্থনার মতো কূটনীতিও অলৌকিক কিছুর জন্ম দিতে পারে। ভারত, পাকিস্তান ও সার্কের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র চীনের কাছে ঝুঁকি নেয়ার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। যদি তারা বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য পরসপরের জন্য সীমান্ত খুলে দিতে চায়, তাহলে তাদেরকে অবশ্যই এক টেবিলে বসতে হবে। ভয় দূর করতে হবে। পরসপরকে দিতে হবে ভাল আচরণের লৌহের ন্যায় প্রতিশ্রুতি।
(লেখক: এস.এন.এম আবদি ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। এ লেখাটি আরব নিউজে প্রকাশিত তার নিবন্ধের অনুবাদ)

ঘুষ দিন, সেবা নিন by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)। ৭০ বছরের পুরনো এই হাসপাতালটিতে রোগীরা সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়তই দালালদের দৌরাত্ম্যের শিকার হচ্ছেন। রোগীরা তাদের কাছে জিম্মি। দালালদের কাছে টাকাই মুখ্য, রোগী নয়। এমনকি মুমূর্ষু রোগীও তাদের অর্থের কাছে পাত্তা পায় না। যে কোন রোগীই তাদের কাছে ডাল-ভাত। তাই হাসপাতালে রোগীদের অর্থের বিনিময়ে অনেক সেবাই নিতে হয়। টাকা দিলে সিট, না দিলে ফ্লোর। শয্যাপ্রতি ১০০ থেকে ৩০০ টাকা দিতে হয় রোগীকে। অন্যথায় সিট বা শয্যা পাওয়া খুবই ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সদ্যোজাত শিশুর খোঁজখবর নিতে ৫০ থেকে ৩০০ টাকাসহ বিভিন্ন দামে তাদের কাছ থেকে সুযোগ কিনতে হয় বলে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
তারা অভিযোগ করেন, জরুরি বিভাগ দিয়ে রোগী কোনো ওয়ার্ডে নিতে হলেই দালাল চক্রের লোককে  ট্রলি ব্যবহারে জন্য ১০০ থেকে ৩০০ টাকা দিতে হয়। রোগীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিতে হয় রোগীকে। দ্রুত রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা। দ্রুত এক্স-রে রিপোর্ট পেতে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। নবজাতক রিলিজ নেয়ার সময় ১০০ থেকে এক হাজার টাকা। সিরিয়াল ভেঙে এমআরআই করাতে ৫০ থেকে এক হাজার টাকা। ক্যাথেটার পরাতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। ইকো করাতে ১০০০ টাকা। ব্যান্ডেজের সেলাই কাটতেও দিতে হয় টাকা। অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা ও গেট পাসের জন্য দালালদের ঘুষ দিতে হয় ৫০ টাকা করে ।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, জরুরি বিভাগে বহিরাগত মোসলেম, লাইলী, জীবন নেছা এবং আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষের সিরাজের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। রোগীরা  টাকা না দিলে এসব কর্মচারী রোগীদের চরম হয়রানি করেন। এদের টাকা দিলেই দ্রুত সেবা মিলে। অন্যথায় যতই মুমূর্মু রোগী হোক না কেন, তাদের কাছে পাত্তা নেই। সূত্র  আরও জানায়, হাসপাতালে কিছু বহিরাগত (প্রাইভেট) আয়াও রয়েছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তারা প্রভাবশালীদের ইশারায় চলে। এরাই হাসপাতাল নষ্টের মূলহোতা। বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তারা।
এদিকে হাসপাতালের ডাক্তাররা নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত হন না বলে অভিযোগ করেন রোগীরা। তারা রোগীদের উন্নত চিকিৎসার কথা বলে নিজেদের চেম্বারে বা ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়া মেডিসিন প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা থাকলেও তারা সবসময়ই ডাক্তারদের কক্ষে প্রবেশ করতে পারেন বলেও তারা অভিযোগ করা হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেয়া, সময় মতো নার্স এবং ওয়ার্ড বয়দের ডেকে না পাওয়াসহ রোগীদের সঙ্গে নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের খারাপ ব্যবহারের অভিযোগও উঠে আসে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ঘুরাফেরা করতে দেখা গেছে। তারা দ্রুতই রোগীর পরীক্ষার-নিরীক্ষার কাগজপত্রগুলো হাত করে নেয়। আর রোগীর স্বজনকে বলতে বা পরামর্শ দিতে দেখা যায়, এখানে (হাসপাতালে) পরীক্ষার করালে অনেক সময় লাগবে। আপনরা বাইরে থেকে এই পরীক্ষাগুলো দ্রুত করালে অনেক সুবিধা পাবেন।
আমরা (ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা) দ্রুতই আপনার পরীক্ষার-নিরীক্ষার ফলাফল হাতে পৌঁছে দিবো। এতে গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো তাদের কথায় বিশ্বাস করে ফাঁদে পড়েন। দালালরা হাসপাতালের প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে হাসপাতালের বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
কেইস স্টাডি: গত মাসে হাসপাতালের ১০০ ওয়ার্ডের বয় স্বপন এক রোগীকে জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে আনতে ট্রলি ব্যবহার বাবত ৩০০ টাকা দাবি করেন। কিন্তু রোগীর স্বজনরা বলেন, ভাই আমরা গরিব। তাই ১০০ টাকা দিলাম। টাকা কম দেখে স্বপন ক্রোধের সঙ্গে বলতে থাকেন মাত্র ১০০ টাকা! ওই সময়ে ঘটনা স্থলে উপস্থিত হাসাপাতালের আরেক কর্মচারী স্বপনকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘ওর (রোগীর) বাবার কাছে তুই টাকা রেখেছিল যে ৩০০ টাকা দিবি করছিস।’
গত বছর আগস্ট মাসে আব্বাস নামের এক রোগী বরিশাল শেরে-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে ঢামেকে আসেন। ওই রোগী জিবিএস মুমূর্মু ছিলেন। রোগীর বোন সাঈদা আক্তার অভিযোগ করেন, জরুরি বিভাগ থেকে তার ভাইকে নতুন ভবনের ছয় তলায় ৬০১ ওয়ার্ডে রেফার করেন ডাক্তাররা। প্রথমে ওই ভবনের গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা শুরু করেন। আর বলতে থাকেন, সিট খালী নেই। ফ্লোরেই থাকতে হবে। কোনো রোগী চলে গেলে বা ফাঁকা হলে সিটে পাবেন। অল্প কিছুক্ষণ পর ওই ওয়ার্ডের এক নার্স এসে বললেন, আপনারা ওয়ার্ড বয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ওয়ার্ড বয়দের সঙ্গে কথা বললে, তারা জানান ৪০০ টাকা দিলে এখনই সিট বা শয্যা ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে। পরে ওই রোগীর সঙ্গে আসা তার মামা সবুজ দরকষাকষি করে ৩০০ টাকা দিয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফ্লোর থেকে সিটে তুলেন রোগীকে। তবে, অল্প কয়েকদিনের মধ্যে ওই রোগী মারা যান বলে তার মামা উল্লেখ করেন।
ঠাণ্ডাজনিত কারণে চলতি বছরের ৪ঠা জুন ঢামেকের বর্হিবিভাগে ডাক্তার দেখাতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা সুমি আক্তার। সুমি আক্তারের স্বামী জিয়াউদ্দিন বাবুল অভিয়োগ করে বলেন, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক তার স্ত্রীকে তিন ধরনের ওষুধ লিখেছেন ব্যবস্থাপত্রে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৪টি গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেটের মধ্যে মাত্র ৪টি দিয়েছে। আর বাকি দুই ধরনের এন্টিবায়োটিক ১৪টি ও ১০টি ট্যাবলেটের একটিও দেয়নি। তিনি জানান, এই ওষুধগুলোর প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম ৫০ টাকা। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, হাসপাতাল থেকে এতো ওষুধ কোথায় যায়? হাসপাতাল থেকে পাবলিকের ওষুধ সবই কি চুরি হয় ? তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ যাবো কোথায় ?
জুন মাসের শেষ সপ্তাহে ৩১৩ ওয়ার্ডের রোগী আবদুর রব শেখের ইকো টেস্ট করার নির্দেশ দেন ডাক্তার। সেই মোতাবেক রোগীর আত্মীয় হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় এই টেস্ট করাতে যান। রোগীর স্ত্রী অভিযোগ করেন, হাসপাতালের দালালরা রোগীর এই টেস্ট করাতে তার কাছে ১০০০ টাকা দাবি করে। দালালরা বলেছে, এই টাকা দিলে দ্রুত পাঁচ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষা হবে। তিনি তাদেরকে (দালালদের) বলেছেন, ভাই আমরা গরিব, টাকা দিতে পারবো না। এই রোগী ২রা জুলাই রিলিজ নিয়ে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর চলে গেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের (স্বাস্থ্য বুলেটিন) ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে নারী, পুরুষ ও শিশু মিলে ২৬১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বহির্বিভাগ দিয়ে ৩ হাজার ৩৫৩ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। গড়ে মারা গেছেন ২৪ জন। হাসপাতাল সূত্র জানা গেছে, জরুরি বিভাগ দিয়ে এক হাজার থেকে ১২শ’ রোগী চিকিৎসা নিয়ে ফেরা যান। হাসপাতালে নিয়মিত ৩ হাজার ৪শ’ থেকে ৩ হাজার ৫শ’ রোগী থাকছেন।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি ঢামেককে ২৬০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। যদিও হাসপাতালের শয্যা উন্নীত হয়েছে কিন্তু জনবল বাড়েনি। পুরনো কাঠামো অনুযায়ী জনবল আছে ৩ হাজার ২১১টি। তবে ৭৮২টি পদ শূন্য রয়েছে। ডাক্তারের সংখ্যা ৫২৫ জন। জানা গেছে, হাসপাতালে ১৩২৯ নার্সের মধ্যে কর্মরত আছেন ৮৭৯ জন। তৃতীয় শ্রেণীর ৩৪৪টি পদের মধ্যে খালি আছে ১৩০টি এবং চতুর্থ শ্রেণীর ১০১৩ পদের মধ্যে ২০০টি পদ শূন্য রয়েছে।
সুযোগ-সুবিধা: হাসপাতালে ৭০টি ওয়ার্ড রয়েছে। বিভাগ আছে ৩০টি। প্রতি বছর হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত ৬২৩টি ওষুধের আইটেম কেনার কথা থাকলেও দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কেনা হয় । এ হাসপাতালে রোগীকে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা দামের ওষুধ দেয়া হয় বলে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সিরিয়াস ইনফেকশনের জন্য এন্টিবায়োটিক ম্যারোপেনা ১ এমজি দেয়া হয়। সিটি এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাম, ইআরসিপি, এনড্রোসকপি,  ইকো, ডায়ালাইসিসসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখানে করা হয়। তবে, যেসব টেস্ট সব সময় প্রয়োজন হয় না সেগুলো এই হাসপাতালে করা হয় না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, আইসিইউ থেকে ২০টি এবং সিসিইউতে ২৪টি শয্যা রয়েছে। বার্ন ইউনিটে নিওরোসার্জারি, মাক্রো সার্জারি অর্থোপেডিকে অপারেশন করা হয় এই হাসপাতালে। এনজিও প্লাসটি করা এই হাসপাতালে। ২৪ ঘণ্টা এম্বুলেন্স সুবিধা দেয়া হয়। চারবেলা রোগীকে খাবার সরবরাহ করা হয়। রুটিন অনুযায়ী সকালের নাস্তায় দেয়া হয় পাউরুটি, ডিম, কলা ও জেলি; দুপুরে ভাত, মাছ, সবজি, মাংস; বিকালে চা, বিস্কুট এবং রাতে ভাত, মাংস ও সবজি দেয়া হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. খাজা আবদুল গফুর মানবজমিনকে জানান, ভর্তিযোগ্য সব রোগীকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোগীরা প্রায় সব ধরনের সুবিধাই ভোগ করছে হাসপাতালে। তারা হাসপাতাল থেকে গড়ে ৯০ শতাংশ ওষুধ পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ ডাক্তার একজন রোগীকে ১০টি ওষুধ দেয়ার নির্দেশ দিলে রোগী কমপক্ষে ৯টি ওষুধ পান বলে তিনি দাবি করেন। কখনও ১০টি ওষুধও পেয়ে থাকেন। আমরা ১৯৭৪ সালের লোকবল দিয়ে কাজ করছি। প্রতিদিন হাসপাতালে ৪ হাজারের ওপরে রোগীর সমাগম হয়। ওই লোকবল দিয়ে হাসপাতালের কাজ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান হাসপাতালে দালাল ও ঘুষ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে তার দপ্তরে বলেন, ‘সমস্যা আছে। সমাধানের চেষ্টাও চলছে। সচেতন আছি। পদক্ষেপ নিয়েছি। আশা করি উত্তরণ করা সম্ভব হবে।’
ইতিহাস: ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি ১৯৪৬ সালে স্থাপিত হয়। ছাত্র সংখ্যা ১,৫৫০ জন। আয়তন ২৫ একর। এটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ৫ বছর মেয়াদি এমবিবিএস কোর্সে প্রতি বছর  ১৮০ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের পাশে রয়েছে শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখলের প্রায় একশ’ বছর পর ১৮৫৩ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতায় মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠারও একশ’ বছরে এ অঞ্চলে কোন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত হয়নি। মধ্যবর্তী এ দীর্ঘ সময়ে কিছু মেডিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিটফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুল (যা বর্তমানে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ), ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও সিলেট মেডিক্যাল স্কুল। তবে, পূর্ববঙ্গে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে নিতে চলে আসে ১৯৩৯ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার বছরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল তদানীন্তন বৃটিশ সরকারের কাছে ঢাকায় একটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব পেশ করে। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে হারিয়ে যাওয়া প্রস্তাবটি ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে আলোর মুখ দেখে। বৃটিশ সরকার উপমহাদেশের ঢাকা, করাচি ও মাদ্রাজে (বর্তমানে চেন্নাই) তিনটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উপলক্ষে ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মেজর ডব্লিউ জে ভারজিন এবং অত্র অঞ্চলের প্রথিতযশা নাগরিকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাদের প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করেই ১০ই জুলাই ১৯৪৬ তারিখে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চালু হয়। ওই বর্ষেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
শুরুতেই ডব্লিউ জে ভারজিনের ওপরেই ন্যস্ত হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পরিচালনার গুরুদায়িত্ব। শুরুতে এনাটমি ও ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্ট না থাকায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলে ক্লাস করতে হতো। একমাস পর এনাটমি বিভাগের অধ্যাপক পশুপতি বসু এবং ফিজিওলজি বিভাগে অধ্যাপক হীরালাল সাহা শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর হাসপাতালে ২২ নং ওয়ার্ডে ক্লাস শুরু হয়। ১৯৫৫ সালে কলেজ ভবন স্থাপনের পর সেই অভাব পূরণ হয়।
প্রথম থেকে একই কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকলেও ১৯৭৫ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে কলেজ ও হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ পৃথকীকরণ করা হয়। কলেজের দায়িত্বভার অর্পিত হয় অধ্যক্ষের ওপর এবং হাসপাতাল পরিচালনার ভার পরিচালকের ওপর।
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলন রেখেছে অনন্য অবদান। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ডাক্তাররা এরশাদ সরকার ঘোষিত গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে বিএমএর ব্যানারে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।