Friday, August 16, 2024

তাসরিফের পোস্ট নিয়ে যা বললেন আব্দুল্লাহ আল ইমরান

নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার তাসরিফ খান। এরপর একই বিষয়ে আরও ভয়াবহ তথ্য জানিয়েছেন তার টিম সদস্য ও সোশ্যাল মিডিয়া এক্সপার্ট আব্দুল্লাহ আল ইমরান। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আব্দুল্লাহ আল ইমরান লেখেন, গতকাল Tasrif Khan ভাইয়ের পোস্ট দেখেছি। আমি পোস্ট দেওয়ার আগে থেকেই জানি ওনার সঙ্গে ঘটা ওই ভয়াবহ ঘটনার কথা। এমনকি তাসরিফ ভাই আন্দোলনে যখন সশরীরে অংশগ্রহণ করেন তখন তার পেইজের অ্যাডমিন আমাকে রেখে নিজে রিমুভ হয়ে যান, যাতে ওনাকে ধরে ফেললেও, ওনাকে দিয়ে প্রাক্তন সরকারি দোষরেরা কোনো পোস্ট দেওয়াতে না পারে!

এসব আড়ালের গল্প! আমি বলতাম না, তবে অনেকেই উনাকেও ট্রল করেছেন, এগুলো দেখে বিরক্ত হয়ে জাস্ট এটুকু বললাম। একইভাবে পুরো আন্দোলনজুড়ে আমার টিম কাজ করে গেছে অনলাইন-অফলাইন দুভাবে! অনলাইনে আইটি সাপোর্ট, অফলাইনে ফাইন্যান্সিয়ালি হেল্প এবং মাঠে নেমে আন্দোলন- সব-ই করেছে। আপনারা দেখেছেন।

এর বাইরেও যেটা করেছে সেটা হচ্ছে ‘প্রতিশ্রুতি’ রক্ষা। আমরা বলেছিলাম, এমন কারো কাজ করব না যারা স্টুডেন্টদের বিপক্ষে কাজ করছে। প্রাক্তন সরকারি বহু পেইজ, অ্যাকাউন্ট চলে যাওয়া পুনরুদ্ধারের জন্য আসলেও আমরা কাজগুলো করিনি।

আবার প্রতিবাদ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে পোস্ট করায় ‘এক আইনপ্রয়োগকারী গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান’ থেকে ফোনকল-ও আসে, পোস্ট ডিলেটের জন্য। আসল ঘটনাটা একটু বলি-

ঘটনা-১: আমি আন্দোলন শুরুর দিকে আফ্রিদির পেইজে অ্যাডমিন হই ওর পেইজের ইস্যু সলভের জন্য। আন্দোলন শুরুর পর হুট করে ওর পেইজের অ্যাডমিন থেকে আমার আইডি রিমুভ করে এবং কিছুক্ষণ পরই সে পেইজ আনপাবলিশড করে ফেলে!!

একটু পর ইন্সটাগ্রামে পোস্ট দেয়, তার পেইজ এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাক, কেউ পারলে হেল্প করেন! আমি তখন-ই নাটকের কাহিনি ধরে ফেলি! আমাকে কয়েকজন মেসেজ দিয়ে ওর ইন্সটাগ্রামের স্টোরি দেখালে সবাইকেই বলি এটা নাটক! আমি একটু আগেও অ্যাডমিন ছিলাম!

ঘটনা-২: এর দুইদিন পর মেবি হাউন আংকেলের টুনটুনির ভিডিও ভাইরাল হয়। রাতের বেলায় আফ্রিদির কল আসে আমার কাছে। ফোন দিয়ে বলে হাউন আংকেলের ওই ভিডিও ফেসবুকের সব জায়গা থেকে রিমুভ করতে হবে যত টাকাই লাগুক। আমি বললাম ১০ মিনিট পর কল দেন, টিমের সঙ্গে কথা বলি। আমি প্রথমে থতমত খেয়ে গেছি, এই ছেলে কি বলে এই সময় এটা ভেবে!! যাই হোক, ১০ মিনিট পর কল দিলে তা আমিসহ আমার টিম মেম্বার সবাই শুনে এপাশ থেকে এবং আমি বলে দেই আমার টিম রিমুভ করতে পারবে না।

ঘটনা-৩: এর-ও এক/দুই দিন পর আমি খবর পাই ২৩ জন ইনফ্লুয়েন্সার নিয়ে আফ্রিদি, শেখ তন্ময় অ্যান্ড আরও অনেকে একটা ইনফ্লুয়েন্সার ক্যাম্পেইন করার মিটিং করবে। পরেরদিন বিস্তারিত শুনি যে মিটিংয়ে কি কি হয়েছে এবং কে ওই ক্যাম্পেইন লিড দিয়েছে। এমনকি যারা যারা ক্যাম্পেইনে আসেনি তাদের পরবর্তীতে দেখে নিবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। এগুলো শুনে আমি প্রচণ্ড বিরক্ত হয় এবং একটা পোস্ট দেই ইনফ্লুয়েন্সার আর ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে!!

ব্যাস পোস্টটা একটু ভাইরাল হতেই আমাকে আফ্রিদি কয়েকবার কল দেয়, আমি ধরতে পারিনি পরে দেখি একটি সংস্থা থেকে ফোন আসে। ‘আমাকে ঠাণ্ডা মাথায় বলা হয়, যেন পোস্ট ডিলেট করি। আমি বললাম, আমি পোস্টে কারো নাম বলিনি এই সেই, উনি বল্লো যেটাই হোক, উনি আমাকে ফোর্স করছেন না তবে আমি যেন পোস্টটা ডিলেট করি। আর অনেকেই তো পোস্ট করতেছে আমাকেই কেন ফোন দিল, নিশ্চয়ই অনেক জায়গায় আমার ব্যাপারটা মনিটরিং করা হচ্ছে। আরও বললো, উনি আফ্রিদিকে বলে দিবে যাতে পরবর্তীতে আমার সঙ্গে ঝামেলা না করে।’

সো, এতোকিছু সহ্য করতে হইসে আমাদের তবুও মানুষ ওদের মায়াকান্নায় সব ভুলে যাবে! আফ্রিদি তাও চুনোপুঁটি, সোলায়মান শকুন তো বিগ ফিশ! তাশরিফ ভাইকে ভয় দেখিয়ে ডাকাসহ ক্যাম্পেইনের বিরাট অংশ ম্যানেজ করেছে সে। যদি ওরা টিকে যেত হয়তো এই পোস্ট করা লাগত না আমার, আয়নাঘরের এক কোণায় পড়ে থাকতাম। এদের মাফ করে দিয়েন না এটাই অনুরোধ। সবাইকে মাফ করা যায়, বেইমানদের না।

সেই রাতে তাসরিফের সঙ্গে যা ঘটেছিল

সম্প্রতি নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার তাসরিফ খান। বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) নিজের ফেসবুক পেজে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তাসরিফ খান শুরুতে লেখেন, কিছু নির্মম ইতিহাস টাইমলাইনে থাকুক। তার স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

শুরুতে তাসরিফ খান লিখেন, ‘২৩ জুলাই রাত রাত ১টার কথা বলছি। একজন সিনিয়র ইনফ্লুয়েন্সার কল দিয়ে বললো, ‘তাসরিফ, তোর বাসার নিচে নাম, চা খাইতে আসতেছি, গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে।’ ৫ জুলাই থেকে ছাত্রদের পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট করা, কবিতা লিখতে থাকা এবং ‘রাজার রাজ্যে সবাই গোলাম’ গানটা ফেসবুকে চলতে থাকায় সরকারি গুন্ডা বাহিনীর থ্রেটে আমি তখন বাসার বাইরে অবস্থান করছিলাম। ওই সিনিয়র ইনফ্লুয়েন্সারের কথায় বিশ্বাস করে আমি তখন বাসার সামনে আসি উনার সঙ্গে দেখা করতে। গাড়ি থেকে ৬-৭ জনের মতো নেমে আসে। ইনফ্লুয়েন্সার সাহেব আমাকে একটু সাইডে নিয়ে আস্তে করে বুঝিয়ে বলে, ‘সঙ্গে যারা আছে তারা একটা এজেন্সির লোক এবং আইন প্রয়োগ সংস্থার বাহিনীর কয়েকজনও আছে এখানে।’ আমি তখন উনার কাছে জানতে চাই যে, উনারা কেন এসেছেন, কী চাচ্ছেন মূলত!

উনি তখন বুঝিয়ে বলেন, ‘সরকারি একটা কাজ আছে, এই সরকার আরও ৭-৮ বছর ক্ষমতায় থাকব। আমরা ঠিকমতো বাঁচতে চাইলে সরকারের পক্ষে কাজ করতে হইবো, এর বাইরে কোনো রাস্তা নেই।’ এ কথা বলে উনি আবার আমাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যান। সেই ৬-৭ জনের মধ্য থেকে একজন আমাকে বলে, ‘তাসরিফ, তোমাকে আমরা চিনি। আমরা তোমাকে একটা স্ক্রিপ্ট দিতেছি, ছোট্ট একটা ভিডিও করতে হবে। এ ভিডিওটা আমাদের কালকের মধ্যে লাগবে। পরশু সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এই ভিডিওটা দেখবে এবং তারপর তুমি আপলোড করবা।’

সেই ইনফ্লুরেন্সার তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাকে বলে, ‘দেখ তাসরিফ, পিএমের চোখে পড়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ, ভিডিওটা ভালো করে কর, সরকার যতদিন আছে সুবিধা পাবি।’ কথা শেষ করার আগেই উনি পকেট থেকে এক লাখ টাকার তিনটা বান্ডেল, মোট তিন লাখ টাকা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘এটা সামান্য ছোট একটা গিফট! টাকা যত চাস, তত দেওয়া হবে, ভিডিওটা সুন্দর কইরা কর।’

ঠিক এ সময় আমার ফোনে আমার ব্যান্ডের ড্রামার শান্তর নাম্বার থেকে একটা কল আসে। ফোন রিসিভ করতেই শান্ত আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘তাসরিফ! পাঁচ ছয়জন পুলিশ এবং সিভিল ড্রেসের কয়েকজন মিলিয়ে আমাকে রোল দিয়া সারা শরীরে মারছে!’ শান্তর কথা শুনে আমার হাত-পা একরকম কাঁপতে থাকে। আমি বোঝার চেষ্টা করি, এই মাইর খাওয়াটা কি আমাকে এদিকে রাজি করানোর জন্য ভয় দেখানো? নাকি শুধু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? শান্তর লাইন কেটে যায়।

আমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয় দেওয়া তাদের বলি, ‘ভাই, এইমাত্র কয়েকজন মিলে আমার ভাই, আমার ব্র্যান্ডের ড্রামার শান্তকে প্রচুর মারছে!’ ওরা জাস্ট আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘আরেহ! দেশের যে অবস্থা, এটা এখন কিছু করা যাবে না। ওরে বলো বাসায় চলে যাইতে।’

আমার তখন মাথায় আসে, এখন যদি আমি ওদের টাকা ফেরাই দেই অথবা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাই, তবে তারা আমাকে চাইলেই গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে ভিডিও করে জোরপূর্বক আপলোড করাতে পারে। আমি তাই মাথা ঠাণ্ডা করে ওদের বলি ঠিক আছে আমি দেখতেছি কি করতে পারি, কালকের মধ্যে জানাচ্ছি। ওরা আমাকে তখনো একরকম থ্রেট দিয়ে বলে, ‘ভাই জানাচ্ছির সুযোগ নাই! সিচুয়েশন তো বুঝেনই। ভিডিও কালকেই লাগবে।’ সঙ্গে ওই ইনফ্লুয়েন্সারও আমাকে বলে, ‘তাসরিফ, ভিডিওটা তো পিএম দেখবে সো বুইঝা শুইনা সুন্দর কইরা করিস।’

ওদের সঙ্গে কথা শেষ করে আমি বাসায় ফেরত যাই। বাসায় সবাইকে সব সিচুয়েশন জানিয়ে আমি আমার ম্যানেজার আয়মান সাবিতকে ফোন দিয়ে বলি, ‘আয়মান, আমি বাসা ছেড়ে দিচ্ছি, এই এই ঘটনা ঘটছে। আমি তোকে নাম্বার দিচ্ছি, তুই ওই এজেন্সিকে আমার বাসা থেকে তিন লাখ টাকা নিয়ে ওদের দিয়ে দিবি কালকেই। আমি আপাতত বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কারণ আমি বাসায় থাকলে ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যাবে।’

ওই সময় আমার মনের অবস্থা আমি জানি। আমার বাসার অবস্থা, ডায়াবেটিসের রোগী আমার আম্মুর অবস্থা, আব্বুর টেনশন, গুম হয়ে যাওয়ার চিন্তা এবং দেশের সঙ্গে বেইমানি করতে ওরা আমাকে বাধ্য করতে চাচ্ছে, সবকিছুই আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সঙ্গে বারবার আমার কানে বাজছে শান্তর ওই কান্না ভরা আর্তনাদ।

কষ্টের ব্যাপার কি জানেন? এ ঘটনার ঘণ্টাখানেক আগে শান্ত আমাকে ফোন দিয়ে বলছিল, ‘খান, আমার বাসায় আম্মা নাই। এদিকে কারফিউ চলছে, দুপুরবেলা খাওয়া হয় নাই, একটা দোকানও খোলা নাই- আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগছে, কি করব?’ আমি শান্তকে বলছিলাম, ‘এক বড় ভাই ফোন দিছে, আমার বাসার সামনে যাওয়া লাগতেছে, তো তুমি আমার বাসায় চইলা আসো, দুই ভাই একসাথে খাব।’ ছেলেটা চাইছিল আমার বাসায় এসে ভাত খাইতে অথচ তাকে রাস্তায় বেধড়কভাবে মাইর খাইতে হইল। মার খাওয়ার পরে ফোনকলে ও আমাকে এটাও বলছিল যে, ‘খান! সবাই আমারে একসাথে রোল দিয়ে মারতেছিল আর একজন বন্দুক তাক করে চিল্লায়ে বলছিল, চুপচাপ মাইর খা অমুকের পোলা নাইলে গুলি কইরা মাইরা ফালামু, লাশ খুঁজে পাইব না তোর পরিবার!’

শান্ত এই কথাটা বলতে বলতে কাঁদতেছিল যে, ‘আমাকে ছাত্র বইলা বইলা ওরা মারছে আর বারবার বলতেছিল যে, এই অমুকের পোলা ছাত্র! ওরে মার!’ ওই রাতে আমি বাসা থেকে পালিয়ে যাই।

আমি জানি কয়েকটা পোস্ট, কবিতা লেখা আর ‘রাজার রাজ্যে সবাই গোলাম’-এর মতো কিছু গান করা ছাড়া দেশের জন্য তেমন কিছুই করতে পারি নাই। আমি জানি, আমি আবু সাঈদের মতো পথে গিয়ে বুক পেতে দিতে পারিনি। হয়তোবা এতটুকু সাহস আমার তখন হয়নি নাই। তবে, আল্লাহ জানেন আর আমি জানি, আমি টাকার কাছে বিক্রি হয় নাই আর দেশের সাথে বেইমানি করি নাই।

এই পোস্ট, পোস্টে শান্তর ছবিগুলা এবং ওদের নির্মমতার কথাগুলো আমি লিখে পোস্ট করছি এই কারণে, যেন ভবিষ্যতে কখনো এই স্বৈরাচারের প্রতি আমার ঘৃণা এতটুকু পরিমাণও কমে না যায়।

ভারতে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ-হত্যার প্রতিবাদে শাটডাউন কর্মসূচির ঘোষণা চিকিৎসকদের

মানবজমিনঃ পূর্ব ভারতে এক চিকিৎসককে ভয়াবহভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তীব্র আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ঘটনার পর থেকে সড়কে বিক্ষোভ করছে চিকিৎসা পেশাজীবীরা। তারা দেশব্যাপী কর্মবিরতির আহ্বান জানাচ্ছে। গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের একটি হাসপাতালে ৩১ বছর বয়সী এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর নারকীয়ভাবে হত্যা করা হয়। এরপর থেকেই উত্তাল হয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা ভারত। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। এতে বলা হয়, ভয়াবহ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন গোটা ভারতের চিকিৎসকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ভারতের চিকিৎসকদের বৃহৎ সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিকেল এসোশিয়েশন (আইএমএ) দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত জরুরি পরিষেবা ব্যতীত সকল প্রকার মেডিকেল পরিষেবা না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধর্মঘটের সম্মুখীন হয়েছে ভারত।

মেডিক্যালের অভ্যন্তরে নারী চিকিৎসকদের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। চিকিৎসকদের চলমান এই বিক্ষোভের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। শুক্রবার তারা চিকিৎসকদের সাথে রাস্তায় আন্দোলনে শরীক হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া এই বিক্ষোভে বলিউড তারকা, অভিনেত্রী সহ দেশের বিভিন্ন শ্রম-পেশাজীবী মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তারা ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতার কারণেই নারীদের প্রতি এমন সহিংস আচরণ করার সুযোগ পাচ্ছে অপরাধীরা বলে দাবি করেছে চিকিৎসক সমাজ। তারা রাজ্য সরকারের ব্যর্থতাকেও দায়ী করছে। ২০১২ সালে দিল্লিতে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের পরে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে কঠোর সাজার ব্যবস্থা করে সরকার। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন।

এ সপ্তাহের শুরুতে এক নারী চিকিৎসককে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় পশ্চিমবঙ্গের আরজি কর মেডিকেলে। গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে নিহত চিকিৎসক দিবাগত রাত দুইটায় নৈশভোজ সেরে জরুরি বিভাগের চারতলায় একটি সম্মেলনকক্ষে বিশ্রাম নিতে যান। পরে গত শুক্রবার সকালে সেখানে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে দেখা গেছে ওই চিকিৎসকের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে শ্বাসরোধ করার প্রশাণও পাওয়া গেছে। শরীরে পাওয়া গেছে রক্তক্ষরণের চিহ্ন। মূলত এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেই উত্তাল হয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা ভারত।

অন্তর্বর্তী সরকারে যুক্ত হতে যাওয়া চার উপদেষ্টা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

বিবিসি বাংলাঃ এক সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্ত হচ্ছেন আরো কয়েকজন উপদেষ্টা।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিলো।

গত আটই অগাস্ট প্রধান উপদেষ্টাসহ মোট ১৭ জন উপদেষ্টা শপথ গ্রহণ করেছিলেন।

উপদেষ্টা পরিষদে নতুন যে চার জন যুক্ত হওয়ার হওয়ার কথা জানা যাচ্ছে তারা শপথ নিলে মোট সদস্য সংখ্যা হবে ২১ জন।

শুক্রবার বিকালে বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন উপদেষ্টাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথবাক্য পড়াবেন।

উপদেষ্টা হিসেবে আজ শপথ নিতে যাচ্ছেন— ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, আলী ইমাম মজুমদার, ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ একজন সুপরিচিত বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ। ১৯৪৮ সালের পহেলা জুলাই নোয়াখালী জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করেছেন। পরে ১৯৬৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।

তারপরের বছর তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএসসি (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। সে বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।

এরপর তিনি আরও উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ইংল্যান্ড যান। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল, এই সময়ের মাঝে তিনি ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

তার শিক্ষাজীবনের মতো কর্মজীবনও বেশ বর্ণাঢ্য। ড. মাহমুদ ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টার, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (ইউএন-সিডিপি) সদস্য।

সেইসাথে, তিনি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অব ইকোনমিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসএএনইআই) চেয়ারম্যান। নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তিনি পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দীর্ঘ সময় এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন।

আলী ইমাম মজুমদার

আলী ইমাম মজুমদারের জন্ম ১৯৫০ সালে। ৭৪ বছর বয়সী সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মি. মজুমদার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

সেখান থেকে তাকে এখন উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করার কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে।

২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বরে অবসরের আগ পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

সে সময় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মুখ্য সচিবেরও দায়িত্বও তিনি পালন করেন। তার আগে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন।

১৯৭৭ সালে প্রশাসন ক্যাডারের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া আলী ইমাম মজুমদার পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) বিভিন্ন প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবেও তিনি কাজ করছেন।

আলী ইমাম মজুমদার চাকরি জীবনে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সহকারী কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ উপজেলা ও জেলায় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।

কুমিল্লার সন্তান মি. মজুমদার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন।

ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান

ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও একজন সুপরিচিত অর্থনীতিবিদ। তিনি ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ওয়েবসাইট থেকে এমনটাই জানা যায়।

তার আগে ১৯৯৮ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড-এর (ইডকল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ড. এম ফওজুল খান ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যাট বোস্টন, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পার্ট-টাইম ও ফুলটাইম ফ্যাকাল্টি হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন।

তিনি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, ইউএনডিপি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একজন শীর্ষ পরামর্শক।

তার বাড়ি সন্দ্বীপের হরিশপুর গ্রামে। বর্তমানে তিনি ইউনাইটেড পাওয়ারের পরিচালনা পরিষদে ইনডিপেন্ডেন্ট পরিচালক হিসাবে আছেন।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী

মুন্সিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা ৭১ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমান বিজিবি) মহাপরিচালক ছিলেন।

এরপর ২০০৬ সালের জুন থেকে ২০০৭ সালের জুন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি ও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনের ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর যে কর্মকর্তারা সক্রিয় ছিলেন তাদের মধ্যে মি. চৌধুরীও ছিলেন বলে জানা যায়।

২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনাবাহিনীর গঠিত তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেন তিনি। তখন তিনি কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) ছিলেন।

ওই বছরই তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। ২০১০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কমিশন করেন। একজন গানার হিসেবে কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কমান্ডিং টু আর্টিলারি ব্রিগেডসসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে: সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন by ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির

রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিষয় আপাতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে— দেশে সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন পদ্ধতি সঠিক আছে; তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সঠিক নয় এবং এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে প্রয়োজন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। উল্লেখ্য যে, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে গণ-আন্দোলনের মুখে সামরিক সরকার পদত্যাগ করলে, নির্বাচন পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই নির্বাচনকালীন তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় নির্বাচন শেষে আওয়ামীলীগ সরকার বাতিল করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা এখনও চালু রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করার উদ্দেশ্য ছিল সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেনি। কারণ এই সরকার ব্যবস্থায় গত কয়েক দশক ধরে যে দু’জন ব্যক্তি ঘুরেফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা উৎসারিত হয়েছে পরিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকে। তাঁদের হাতেই মূলত সরকার প্রধান, দলীয় প্রধান ও রাষ্ট্র প্রধানের ক্ষমতা ন্যস্ত থেকেছে বা আছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী হয়েও তাঁরা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের রাষ্ট্রপতির মতো শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন বা হন। অধিকন্তু, প্রধানমন্ত্রীর এই কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা বিদ্যমান থাকায় পরোক্ষভাবে জাতীয় সংসদকেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুগত থাকতে হয়েছে বা হয়। অন্যদিকে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রচলনের উদ্দেশ্য ছিল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করা। কিন্তু ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে অনুষ্ঠিত সমস্ত জাতীয় নির্বাচন সমাপনের পর, পরাজিত রাজনৈতিক দলগুলো সর্বদা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তা সত্ত্বেও বিরোধী দলগুলো নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পুনঃ:প্রবর্তনের রাজনৈতিক প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা পুনঃ:প্রবর্তনের মাধ্যমে হয়ত আপাতভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল হবে। কিন্তু এর মাধ্যমে আদতে টেকসই রাজনৈতিক সমাধান ঘটবে না। কারণ, এই ব্যবস্থাটির মাধ্যমে মূলত: “সব অথবা কিছুই নয়” ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। এর প্রধান কারণ হলো নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ ও প্রতিষ্ঠান সচল থাকে। তাছাড়া সাধারণ ভোটারদের নির্বাচনী আচরণকে অর্থ, অস্ত্র ও ক্ষমতা দ্বারা বিভ্রান্ত করার মতো ব্যবস্থাগুলো সচল থাকে। অধিকন্তু নির্বাচন প্রকৌশলের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সচল থাকে। এভাবে নির্বাচনী আচরণ ও নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মতো যে ব্যবস্থাগুলো বিদ্যমান রয়েছে, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে কেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত স্তরবিন্যস্ত অনেকগুলো স্বার্থান্বেষী মহল। নির্বাচনকালীন সময়ে এই স্তরবিন্যস্ত স্বার্থান্বেষী মহলকে যারা কাজে লাগাতে পারে, তাঁদেরকেই মূলত: রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, এই স্তরবিন্যস্ত স্বার্থান্বেষী মহলকে নির্বাচনে কাজে লাগাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার মতো অর্থ-বিত্ত সাধারণ রাজনৈতিক নেতাদের থাকে না। যে কারণে রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে সফলতা নিশ্চিত করতে বিত্তশালী প্রার্থীদেরকে মনোনয়ন দিয়ে থাকে।

উপরোল্লিখিত কারণে বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোতে আদর্শশুন্য বিত্তশালীদের প্রাধান্য বিস্তৃত হয়েছে। রাজনীতি থেকে ক্রমশ রাজনৈতিক আদর্শের বিদায় হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সমাজতন্ত্র, ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী রাজনৈতিক নেতাগণও বিভিন্ন সময় আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী ইত্যাদি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে যোগ দিয়েছেন। এই প্র্রক্রিয়া কয়েক দশক ধরে চলতে থাকায়, দেশে বিত্তশালীদের প্রাধান্যে দ্বি-দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। যে কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ সম্পন্ন, বিবিধ পেশা সম্পন্ন এবং আঞ্চলিকতাবোধ সম্পন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতিতে তথা আইন সভায় বা সরকারে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ নি:শেষ হয়ে গেছে। অথচ সরকার ব্যবস্থায় মতাদর্শ, ধর্ম, বিত্ত ও শ্রেণি ইত্যাদি নির্বিশেষে দেশের সমস্ত জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে, সমাজে তাদের প্রান্তিকীকরণ ঘটে। রাজনীতি বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী সমাজে শক্তিশালী কোনও গোষ্ঠীর রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণ ঘটতে থাকলে, তা পরিণামে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশ পায় অথবা রাজনীতিতে বিদেশি বা দেশী অপশক্তি ও স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বস্তুত: বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে একাধিকবার এরূপ গণঅভ্যুত্থান বা ষড়যন্ত্র সংঘটনের নজির রয়েছে এবং এখনও এরূপ ঝুঁকি বিদ্যমান রয়েছে। অথচ, বিত্তশালীদের প্রাধান্যে প্রতিষ্ঠিত দ্বি-দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এরূপ গণঅভ্যুত্থান বা ষড়যন্ত্র সংঘটনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দেশে রাজনৈতিক মহাসংকট সৃষ্টি করতে পারে।

দেশের উক্ত সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মহাসংকটকে এড়াতে হলে, সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন পদ্ধতি— এই উভয়রেই সংস্কার করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত এই সরকার ব্যবস্থা হবে রাষ্ট্রপতি শাসিত আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থা। নিম্নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ প্রতিনিধি নির্বাচনের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১) রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি: বর্তমানে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও, এ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর পদটি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রধানের মতো কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। সেজন্য প্রত্যক্ষ গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান চালু করা প্রয়োজন। তবে এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যবস্থাও গতানুগতিক পদ্ধতির বদলে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আদলে ২ ধাপ বিশিষ্ট নির্বাচন পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন, যেখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতার কিছু শর্ত থাকবে। এই শর্ত হলো— যে সব রাজনৈতিক দলের এককভাবে বা একাধিক দলের সম্মিলিতভাবে জাতীয় নির্বাচনে ২০ ভাগ ভোট প্রাপ্তির পূর্ব ইতিহাস রয়েছে, কেবলমাত্র সে সব রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে। কোনও নির্দিষ্ট প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনের জন্য সর্বমোট প্রদত্ত ভোটের কমপক্ষে শতকরা ৩০ ভাগ ভোট পেতে হবে। তবে কোনও প্রার্থী এককভাবে যদি শতকরা ৩০ ভাগ ভোট না পান, তা্হলে ১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট প্রাপ্ত প্রথম দু’জন প্রার্থীর প্রার্থীতায় দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ থাকবে। এই দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পাবেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন।

২) সংসদীয় প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতি: বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিত্তশালী নিয়ন্ত্রিত দ্বি-দলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এক নির্বাচনী অঞ্চল এক প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতি (প্রথম পদ্ধতি) এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন পদ্ধতি (দ্বিতীয় পদ্ধতি)— এই দ্বিবিধ নির্বাচন পদ্ধতির সমন্বয়ে মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতির প্রচলন করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে জাপানে এই মিশ্র পদ্ধতির জাতীয় সংসদ নির্বাচন চালুর ফলে সব মতাদর্শের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে।। প্রস্তাবিত এই মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতির প্রথম পদ্ধতি এবং দ্বিতীয় পদ্ধতিতে যথাক্রমে ৩০০জন করে মোট ৬০০ জন জাতীয় সংসদ প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ থাকবে। প্রথম প্রকার নির্বাচন পদ্ধতিতে মূলত: একটি নির্বাচনী অঞ্চলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা দল নিরপেক্ষ প্রার্থীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকবে, যেখানে সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্ত প্রার্থী নির্দিষ্ট নির্বাচনী অঞ্চল থেকে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হবেন। প্রথম প্রকার নির্বাচন পদ্ধতি মূলত: বিদ্যমান নির্বাচন পদ্ধতিরই অনুরকণ বিশেষ, তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন প্রবর্তন করা হলে, তা গতানুগতিক নির্বাচন পদ্ধতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় প্রকার নির্বাচন পদ্ধতিতে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনের পূর্বেই প্রার্থীদের অনুক্রমিক তালিকা প্রকাশ করবে এবং নির্বাচন শেষে, ৩০০টি নির্বাচনী অঞ্চলে মোট প্রাপ্ত ভোটের হিস্যা অনুসারে অনুক্রমিক তালিকা থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধি প্রেরণের সুযোগ পাবে। এই মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতিতে বড় ও প্রান্তিক উভয় প্রকার রাজনৈতিক দলেরই জাতীয় সংসদে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা অনুসারে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। নিম্নে বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হলো:

প্রথমত: মিশ্র পদ্ধতিতে বিগত (২০০১ ও ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ) কয়েকটি নির্বাচনে ভোটের হিস্যা অনুসারে বড় রাজনৈতিক দলের আসন প্রাপ্যতার হিসাব দেওয়া হলো। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামীলীগ (৪০.১৩% ভোট, ৬২টি আসন) ও বিএনপি (৪০.৯৭% ভোট, ১৯৩টি আসন) প্রায় সমান হারে ভোট পেয়েও, বিদ্যমান পদ্ধতির কারণে প্রাপ্ত ভোটের হিস্যা অনুযায়ী দল দু’টির আনুপাতিক হারে আসন প্রাপ্তি ঘটেনি। কিন্তু মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা দাঁড়াতো যথাক্রমে সর্বমোট ৬২+১২০=১৮২টি ও ১৯৩+১২৩=৩১৬টি। অন্যদিকে ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ (৪৮.৪০% ভোট, ২৩০ আসন) এর তুলনায় বিএনপি (৩২.৫০% ভোট, ৩০ আসন) উল্লেখযোগ্য হারে ভোট লাভ করেও, বিএনপি খুব অল্প সংখ্যক আসন (৩০টি) লাভ করেছিলো। কিন্তু মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত আওয়ামীলীগ ও বিএনপির জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা দাঁড়াতো যথাক্রমে সর্বমোট ২৩০+১৪৫=৩৭৫টি ও ৩০+৯৭=১২৭টি। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, প্রস্তাবিত মিশ্র পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক দলসমূহের যৌক্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

দ্বিতীয়ত: মিশ্র পদ্ধতিতে বিগত (১৯৭৩ ও ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ) কয়েকটি নির্বাচনে ভোটের হিস্যা অনুসারে কয়েকটি প্রান্তিক রাজনৈতিক দলের আসন প্রাপ্যতার হিসাব দেওয়া হলো। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রচলিত পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন উল্লেখযোগ্য দল ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টি- মোজাফফর (৮.৩২%), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (৬.৫২%), ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টি-ভাসানী (৫.৩২%) দেশব্যাপী যথেষ্ট সংখ্যক ভোট লাভ করে, একমাত্র জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ১টি আসন ছাড়া আর কোনো দল কোনও আসন লাভ করেনি। অথচ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন পদ্ধতি (দ্বিতীয় পদ্ধতি) চালু থাকলে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে আসন প্রাপ্য ছিল যথাক্রমে ২৫টি, ২০টি ও ১৬টি। অনুরূপভাবে, ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জাকের পার্টি (১.২২%), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-রব (০.৭৯%), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-ইনু (০.৫০%), বাংলাদেশ জনতা দল (০.৩৫%) ও ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ অব বাংলাদেশ (০.৩২%) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি আসনও লাভ করেনি। অথচ প্রস্তাবিত আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, হিস্যা অনুসারে এই দলগুলো জাতীয় সংসদে যথাক্রমে ৭টি, ৩টি, ১টি, ১টি ও ১টি আসন লাভ করতো। উপস্থাপিত পরিসংখ্যান থেকে লক্ষণীয় যে, কোনও রাজনৈতিক দল প্রথম পদ্ধতিতে দেশের কোনও একটি সংসদীয় আসনে জয় লাভ না করেও, মিশ্র পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধি প্রেরণের সুযোগ পাবে।

সবশেষে বলা যায় যে, উক্ত উপায়ে দেশে সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করা হলে দেশে স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। একদিকে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভ করবেন বিধায়, তাঁর মাধ্যমে পরিচালিত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া গতিশীল হবে, যা কার্যত দেশের সার্বিক উন্নয়নে সহায়ক হবে। তাছাড়া এই উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি দেশে স্থিতিশীল সরকারের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে। অন্যদিকে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন পদ্ধতিতে বিভিন্ন মতাদর্শ, পেশা ও শ্রেণি নির্বিশেষে উল্লেখযোগ্য সব রাজনৈতিক দলের জাতীয় সংসদে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে বিধায় রাজনৈতিক পরিক্রমায় ক্রমান্বয়ে জাতীয় সংসদে প্রান্তিক অথচ আদর্শবাদী দলগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ফলশ্রুতিতে দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উত্তরোত্তর গতিশীল হবে।

উপরে বর্ণিত উপায়ে সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার করা হলেও, দেশে পারিবারিক উত্তরাধিকার ভিত্তিক নেতৃত্বের বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে এবং বিত্তশালী প্রাধান্যে প্রতিষ্ঠিত দ্বি-দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান হবে। ফলশ্রুতিতে, রাজনৈতিক অঙ্গনে মৃতপ্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবন ঘটবে এবং সমাজতন্ত্র, ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি নানাবিধ রাজনৈতিক দর্শনের চর্চা বৃদ্ধি পাবে। আদর্শবাদী রাজনৈতিক দলসমূহের পুনরুজ্জীবন দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক আবহ বয়ে আনবে। ফলশ্রুতিতে দেশ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষা পাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত জনপ্রতিনিধিত্বশীল টেকসই গণপ্রজাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা কায়েম হবে। তবে এর জন্য সংবিধানের ৬৫(২) ও (৩) নং অনুচ্ছেদ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর সংশোধনী আনয়নের প্রয়োজন হবে।

ডক্টর এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; অনুবন্ধ অধ্যাপক, সুলতান ইদ্রিস বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়; ভূতপূর্ব অনুবন্ধ অধ্যাপক, টোকিও বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়; ভূতপূর্ব গবেষণা ফেলো, জাপান রাষ্ট্রভাষা ইনস্টিটিউট

বিএনপির সমর্থককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করল আ.লীগের নেতাকর্মীরা

কুমিল্লার দেবিদ্বারে বিএনপির এক সমর্থককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সাইচাপাড়া বাজারে আ.লীগ-বিএনপির সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে। এর পর থেকে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় দুপক্ষের আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। এর মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় ছিদ্দিকুর রহমানকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ছিদ্দিকুর রহমান (৪৫) সাইচাপাড়া গাবুদ্ধি বাড়ির মৃত আ. কুদ্দুস মিয়ার ছেলে। সে পেশায় একজন অটো রিকশাচালক। ছিদ্দিক বিএনপির সমর্থক বলে দাবি করেন পরিবারের লোকজন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন, মামুন ভুঁইয়া ও মো. আয়েজ মিয়া বলেন, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর এলাকার ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ আনন্দ মিছিল বের করেন। আনন্দ মিছিলের এক পর্যায়ে সাইচাপাড়া বাজারে স্থানীয় ইউপি সদস্য আমির হোসেনের ব্যক্তিগত অফিস থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদের ছবি ভাঙচুর করেন। ছবি ভাঙচুরের জেরে দুই দিন পর গাবুদ্ধি বাড়ির সামাউল নামে এক ছাত্রকে এলোপাতাড়ি মারধর করে আমির মেম্বারের ছেলে জুয়েল ও তার লোকজন।

পরে সামাউলের লোকজন দেবিদ্বার থানায় আমির মেম্বার ও তার ছেলের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের খবর পেয়ে আমিরের লোকজন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনা মীমাংসার জন্য স্থানীয় ময়নাল হাজারীর মধ্যস্থতায় শুক্রবার সকাল ৮টায় সাইচাপাড়া বাজারে দুই পক্ষকে সালিশ বৈঠকে ডাকেন।

বাজারের সালিশ বৈঠকে গাবুদ্ধি বাড়ির চারজন মুরুব্বি উপস্থিত হলে আমির মেম্বার তার ২০-৩০ জন লোক নিয়ে ওই সালিশ বৈঠকে উপস্থিত হয়ে গাবুদ্ধি বাড়ি থেকে আসা চার সালিশদারকে বেদম মারধর করেন। সালিশে মারধরের খবর পেয়ে গাবুদ্ধি বাড়ির ৪৫-৫০ জন বাজারে জড়ো হন।

পরে আমির মেম্বার ও লোকজনদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আমিরের লোকজন প্রকাশ্যে ছিদ্দিকুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় দুই পক্ষের ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতরা দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত আমির হোসেন মেম্বার বলেন, ঘটনার সময় আমি এলাকায় ছিলাম না। এখন শত্রুতা করে সবাই আমার নাম বললে আমি কী করব। আমি বর্তমানে ব্রাহ্মণপাড়ায় আছি।

দেবিদ্বার থানার ওসি মো. নয়ন মিয়া বলেন, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আনন্দ মিছিল থেকে আ.লীগ সমর্থিত স্থানীয় আমির মেম্বারের অফিস ভাঙচুরের ঘটনার জেরে শুক্রবার (১৬ আগস্ট) সকাল ৭টার দিকে একটি সালিশ বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ছিদ্দিক নামে বিএনপির এক সমর্থক নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টিম রয়েছে।

সাজা ছাড়াই ২৪ বছর কারাগারে হেলাল

নয়া দিগন্তঃ দুই যুগ অর্থাৎ ২৪ বছর পর কারামুক্ত হয়েছেন ইমামুল হাসান হেলাল। বৃহস্পতিবার রাতে ১০টার দিকে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার-৪ থেকে জামিনে মুক্ত হন তিনি। কোনো মামলায় সাজা ছাড়াই দীর্ঘ সময় তাকে কারাগারেই থাকতে হয়েছে। ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে গ্রেফতার করেছিল। সেই থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন। তার বড় ভাই ওয়াহিদুল হাসান দিপু বলেন, সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করে আমরা আমার ভাইকে বুকে পেয়েছি। আল্লাহর কাছে লাখ শুকরিয়া আদায় করছি।

তিনি জানান, ইমামুল হাসান হেলাল ছিল ছাত্রদলের মোহাম্মদপুর থানার সাধারণ সম্পাদক, মহানগরের যুগ্ম সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক। বিএনপি ঘোষিত সকল কর্মসূচি হেলালের নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর এলাকায় সম্পন্ন হতো। তোফায়েল আহমেদ জোসেফসহ আওয়ামী লীগের অনেকেই তা সহ্য করতে পারেনি। কোনোভাবে আটকাতে না পেলে ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নির্দেশে হেলালকে মিথ্যা-ভিত্তিহীন মামলায় গ্রেফতার করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গ্রেফতার হওয়া হেলাল যখন কারাগারে ওই অবস্থায় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ঘোষণা করে পুলিশ। ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বরের ওই তালিকায় হেলালের নামও ছিল।

বড় ভাই দিপু বলেন, আওয়ামী লীগের পর চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে বিএনপির-ই কয়েকজন নেতার ষড়যন্ত্রে হেলালের কারামুক্তি আটকে যায় এবং তাকে সন্ত্রাসী তালিকায় নাম উঠায়। ধারাবাহিকভাবে ওয়ান ইলেভেন এবং আওয়ামী লীগ কৌশল করে ক্ষমতা দখল করে। এরমধ্যে হেলালের বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে, সবগুলো মামলায় আদালত তাকে খালাস দেয়। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকা এবং জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে দুই-তিনটি মামলায় জামিন না চেয়ে হেলাল কারাগারকেই নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নেয়।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে গেলে তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা ছিল, সেই সব মামলায় জামিন দেয়। শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসা এবং কিছু মানুষের ষড়যন্ত্রে আমার ভাইয়ের নামের আগে সন্ত্রাসী লাগানো হয়েছে। এই করে আমার ভাইকে ২৪টি বছর আমাদের থেকে দূরে রাখা গেছে।

কাঁচামরিচের ঝাঁজে পুড়ছে বাজার, মাছ-মাংস-সবজির দাম স্থিতিশীল

রাজধানীর বাজারে আবারও বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি কাঁচামরিচে ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। কিছুটা সহনীয় হয়েছে সবজির বাজার, তবে মাছ, মুরগি ও ডিম বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।

শুক্রবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর পাইকারি সবজি বাজার শ্যামবাজার, নয়াবাজার, রায়সাহেব বাজার, বাবুবাজার, কারওয়ানবাজার, হাতিরপুল বাজার ও নিউমার্কেট কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক হয়েছে। এর আগে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পর সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতিতে এক মাস ধরে জিনিসপত্রের দাম বেশ ওঠানামা করছিল। এখন অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে দাম অনেকটা স্থিতিশীল পর্যায়ে এসেছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছিল ২২০ থেকে ২৪০ টাকায়। তবে শুক্রবার সে দাম ২৬০-৩০০ টাকা। তবে বাজারগুলোতে স্থিতিশীল আছে মাছ, মুরগি ও ডিমের বাজার।

নয়াবাজারের সবজি ব্যবসায়ী তোফাজ্জেল হোসেন কালবেলাকে বলেন, ছাত্র আন্দোলন, কারফিউ ও সরকার পতনের অস্থিরতার মধ্যে এক মাস ধরে বাজার ছিল অস্থিতিশীল। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক, তাই অধিকাংশ সবজির দাম স্থিতিশীল। কিন্তু হঠাৎ করে আজ বাজারে বেড়ে গেছে কাঁচামরিচের দাম। এর কারণ চাহিদার তুলনায় জোগান কম।

রায়সাহেব বাজারে আসা মানিক বণিক বলেন, এখন তুলনামূলক বাজার স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। কিন্তু সবজি, মাছ-মাংসের দাম আরও কম হওয়া উচিত। তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ একটু শান্তিতে বাচঁতে পারত।

এদিন ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেগুন প্রতি কেজি মানভেদে ৬০ থেকে ৭০, ঢেঁড়শ, চিচিঙ্গা, পটল, ধুন্দল, পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। পাকা টমেটোর কেজি প্রকারভেদে ১৬০ থেকে ১৮০ এবং গাজরের কেজি ২০০ টাকা। লেবুর হালি ১৫ থেকে ৩০ টাকা, ধনে পাতার কেজি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, কলার হালি ৪০ টাকা, মিষ্টিকুমড়ার কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা।

বয়লার মুরগির প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ডিম ডজনপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এসব বাজারে গরুর মাংসের কেজিপ্রতি ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা, মাথার মাংস ৪৫০ টাকা, ছাগলের মাংসের কেজিপ্রতি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেড় কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকায়, আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম কমে প্রতি কেজি পাঙাশ সাইজভেদে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় এবং তেলাপিয়া মাছ প্রতি কেজি ২২০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের মাছ ব্যবসায়ী মো. বাবুল হোসেন বলেন মাছের দাম তুলনামূলক কমেছে। গত এক মাস ধরে বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে রাজধানীতে বেড়েছিল মাছের দাম। কিন্তু বাজার এখন স্বাভাবিক। হাতিরপুল বাজারে বাজার করতে আসা কর্মজীবী নারী মালিহা বেগম বলেন, গত এক মাসের চেয়ে আজকের বাজারে সবজি, মাছ-মাংসের দাম কিছুটা কমেছে। তবে আজ মরিচের দাম বেড়েছে। সবজি ও মাছের দাম সহনশীল হলেও আগের মতো উচ্চ দরেই বিক্রি হচ্ছে চাল, আলু ও পেঁয়াজ।

চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে মিনিকেট ৭২ টাকা, আটাশ চাল ৫৮ টাকা, মোটা চাল ৫২ টাকা, লাল বোরোধানের চাল ৯০ টাকা, সুগন্ধী চিনিগুড়া পোলাওর চাল ১৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ ও আলু। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ এখন ১১০-১২০ টাকা ও আলু ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ছাত্র আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা জানাল জাতিসংঘ

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন, সরকারের ভূমিকা ও আন্দোলন দমন প্রচেষ্টায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নৃশংসতা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভের সময় ঘটা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ওভারভিউ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

সংস্থাটি বলছে, প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক, গুম, নির্যাতন ও অসদাচরণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে কঠোর বিধিনিষেধের মতো গুরুতর অভিযোগ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৬ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত গণমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, সরকার পতনের পর ৫ থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে বিক্ষোভের নতুন ধাক্কায় ২৫০ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংস্থাটি আরও বলছে, আন্দোলনে সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশু নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আহত হয়েছে হাজারো মানুষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে প্রথমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। পরে জুলাইয়ে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে।

মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের করা এই প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এ বিষয়ে উদ্বেগের প্রাথমিক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। গত জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

তবে এসব তথ্যের বিস্তারিত বিবরণ দেয়নি ওএইচসিএইচআর। ওএইচসিএইচআর বলছে, ওই সময়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকা এবং যোগাযোগে বিধিনিষেধের কারণে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়নি।

জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিতের জন্য এ সুপারিশ।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও এসব সুপারিশ করা হবে বলে জানায় ওএইচসিএইচআর। ওএইচসিএইচআর বলছে, মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তন মাথায় রেখে এ সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সহিংসতায় এক হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে: সাখাওয়াত হোসেন -নর্থইস্ট নিউজ এক্সক্লুসিভ

ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ চলাকালে সারা বাংলাদেশে এবং বিশেষ করে ঢাকায় যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছিল তাতে এক হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। ড. মুহাম্মদ  ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম সাখাওয়াত হোসেন নর্থইস্ট নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছেন। ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেবার পর থেকে সাখাওয়াত হোসেন ইতিমধ্যেই সহিংসতার বিষয়ে নিবিড় তদন্ত শুরু করেছেন।

ফোনে ৪৫ মিনিটের একটি সাক্ষাৎকারে ৭৬ বছর বয়সী হোসেন নর্থইস্ট নিউজকে বলেন,  ‘ঢাকার কিছু জায়গায়  এবং অন্যান্য জেলায় জনতার ওপর যাদের বেশিরভাগই ছাত্র এবং যুবক ছিল তৎকালীন শেখ হাসিনার পুলিশ বাহিনী গুলি চালায় অথবা প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে হামলা করে।’

ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ১৫ আগস্ট নর্থইস্ট নিউজের সাথে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং জেলা পর্যায়ের নেতাদের উপর প্রথম মনোনিবেশ করেছে, যারা ভারত এবং অন্যান্য দেশে পালিয়ে গেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।’

শীর্ষ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ের নেতাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে তারা বিশেষত তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আলী আরাফাত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদকে খুঁজে বের করতে বেশি আগ্রহী। একটি সূত্র জানিয়েছে , ‘আগে ধারণা করা হয়েছিল হাছানকে সেনাবাহিনী আটক করেছে। তাকে এখনো পাওয়া যায়নি। সে কোথাও লুকিয়ে আছে আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আওয়ামী লীগের শাসনামলের অর্ধেক নেতাকে খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি পালিয়ে যান। হোসেন বলছেন, ‘একজন ‘মেগালোম্যানিয়াক’ হিসাবে হাসিনা একটি অত্যাচারী রাজত্বের সভাপতিত্ব করে গেছেন এবং মানুষের  জীবন নিয়ে তিনি বিশেষ মাথা ঘামাতেন না।

তার মন্ত্রিপরিষদের কিছু মন্ত্রী যেমন আসাদুজ্জামান খান কামাল (স্বরাষ্ট্র), আনিসুল হক (আইন) এবং ওবায়দুল কাদের (আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) এবং বেশ কিছু সিনিয়র পুলিশ অফিসার  এই  হত্যা যন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল’। কামাল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২,০০০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন এই তথ্য প্রকাশ করে হোসেন জানিয়েছেন যে, তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আওয়ামী লীগ দ্বারা সংঘটিত ব্যাপক দুর্নীতির তদন্ত দ্রুত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। হোসেন বলেছিলেন,  ‘বাংলাদেশের বুকে ঘটে যাওয়া খুন, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনার ব্যাপক তদন্ত শুরু হবে ১৪ আগস্ট থেকে। এই তদন্তগুলো হবে ১৯৪৫-পরবর্তী জার্মানির নুরেমবার্গ ট্রায়ালের আদলে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি বিপুলসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। সে কথা উল্লেখ করে হোসেন বলেন, ‘তাদের শান্ত করতে আমার পাঁচ ঘণ্টা একটানা আলোচনা চালাতে  হয়েছে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম হাসিনার শাসনামলে কাদের হত্যা করা হয়েছে এবং  কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড চলেছে। অফিসারদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা আজ অনুশোচনায় ভুগছেন এবং আমার পা ছুঁয়ে ক্ষমা চেয়েছেন।’

হোসেনের অধীনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্ম এবং প্রতীক পরিবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছে। হোসেন বলেন, ‘এই প্রস্তাবের জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে, আশা করি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তা চলে আসবে।’

ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ঠিক করবে পুলিশ বাহিনীকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে। উপদেষ্টা হোসেনের মতে  ‘কাজটি কঠিন হবে। বেশ কিছু অফিসারকে  চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কর্মকর্তারা মাদক ব্যবসায় লিপ্ত এবং বদলি-পোস্টিং র‌্যাকেট চালিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করত। তদন্ত শেষ হলে তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।’

ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ‘অদৃশ্য ষড়যন্ত্রকারী এবং শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত’। একথা উল্লেখ করে হোসেন বলেন, ‘ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের কাছে তার বার্তা হলো- আপনি কি ঢাকায় বন্ধুত্বপূর্ণ না শত্রু সরকার চান? কারণ যে দেশ পরাশক্তি হতে চায়, তাকে বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আমরা কেউ টুকরে টুকরে গ্যাং নই’।

তালেবান শাসনের তিন বছর, কেমন আছে আফগানিস্তান

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এদিন দ্বিতীয়বারের মতো কাবুলের ক্ষমতায় বসে তালেবান। বিদ্রোহী থেকে শাসকে পরিণত হয়ে নিজেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামিক শাসন শুরু করে তারা। এখন পর্যন্ত তারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। তাই নিজেদের বৈধতার দাবি জোরদার করতে সব ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তালেবান।

বিশ্বের কোনো দেশ এখন পর্যন্ত তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও তারা চীন ও রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করেছে। এমনকি তাদের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন বৈঠকেও অংশ নিয়েছেন। চাপ সত্ত্বেও জাতিসংঘের এসব বৈঠকে কোনো নারী বা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রাখেনি তালেবান।

দেশের ভেতরে তালেবান শাসনের প্রতি এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। বিদেশি কোনো শক্তিকে এখন পর্যন্ত দেশটির অভ্যন্তরের কোনো পক্ষকে সমর্থন করারও তেমন কোনো আগ্রহ চোখে পড়েনি। কারণ, ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বিশ্বের পুরো মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। এ ছাড়া একসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তালেবানকে যেমনটি হুমকি মনে করা হতো, এখন তেমনটি মনে করা হয় না। কিন্তু আফগানিস্তান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে।

সংস্কৃতির যুদ্ধ ও পুরস্কার

তালেবানের শাসনব্যবস্থায় নেতৃত্বের কাঠামো পিরামিড আকৃতির। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এই পিরামিডের শীর্ষে থাকেন। পিরামিডের এক পাশে থাকে মসজিদ ও ধর্মীয় নেতারা। অন্য পাশে রাজধানী কাবুলকেন্দ্রিক প্রশাসন। এ প্রশাসন ধর্মীয় নেতাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদল ও বিদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের অনাবাসিক বিশেষজ্ঞ জাবিদ আহমদ বলেন, ‘(তালেবানের শাসনব্যবস্থায়) ভিন্ন ভিন্ন রকমের চরমপন্থা রয়েছে। কট্টরপন্থী ও রাজনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত নেতাদের সমন্বয়ে তালেবান সরকার গঠিত। সরকারের এই বৈশিষ্ট্য তাঁদের সংস্কৃতির যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।’

তালেবানের বর্তমান সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। নিয়ম অনুযায়ী, তালেবানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার অবসর নেওয়া বা পদত্যাগ করার কোনো নিয়ম নেই। আমৃত্যু তিনি এ পদে থাকেন। তাই আখুন্দজাদার জীবদ্দশায় তালেবানের সবচেয়ে বিতর্কিত নীতিগুলোর পরিবর্তনের তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই।

ক্রাইসিস গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের কর্মকর্তা ইব্রাহিম বাহিস বলেন, ‘তালেবানরা ঐক্যবদ্ধ। তাই আরও অনেক বছর তারা একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকবে। তারা একটি গোষ্ঠী হিসেবে শাসন করে, একটি গোষ্ঠী হিসেবে যুদ্ধ করে।’

এসব কিছুর কারণে তালেবান নেতাদের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি করা গেলে তাদের মধ্যে ফাটল ধরানো যেতে পারে বলে মনে করেন বাহিস।

প্রশাসনে ঐক্য ও শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রণক্ষেত্র থেকে ঝানু তালেবান নেতাদের প্রশাসনে নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁদের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

যেসব নেতা পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অনেককে নানাভাবে পুরস্কৃত করতে হয়েছে বলে মনে করেন জাবিদ আহমদ। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য সবাইকে কমবেশি পুরস্কৃত করা হয়েছে। অনেককে প্রাদেশিক সরকারে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অনেককে তৃতীয় বা চতুর্থ বিয়ের অনুমতি দিতে হয়েছে। কাউকে নতুন একটি ট্রাক দেওয়া হয়েছে। কাউকে দেওয়া হয়েছে শুল্কের ভাগ কিংবা বেদখল কোনো বাড়ির চাবি।’
দেশ যেভাবে চলছে

তালেবানের বর্তমান প্রশাসনকে ‘আফগানিস্তানের আধুনিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকার’ বলে মনে করেন ক্রাইসিস গ্রুপের বাহিস। এই বিশেষজ্ঞের মতে, ‘তারা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রামপর্যায়ে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।’

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জাবিদ আহমদের মতে, আফগানিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারাই দেশটিকে সচল রেখেছেন। তাঁদের প্রশাসনের দাপ্তরিক কাজ পরিচালনার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু তালেবানের বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দপ্তর পরিচালনার কোনো আনুষ্ঠানিক জ্ঞান নেই। তাঁদের সব যোগ্যতা ঐশ্বরিক।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্সের লীনা রিকিলা তামাং মনে করেন, তালেবানের দেশ পরিচালনার বৈধতা জনগণের কাছ থেকে পাওয়া নয়। তারা নিজেদের মতো ধর্ম ও সংস্কৃতির ব্যাখ্যা দিয়েই দেশ পরিচালনা করেছে।
আশা ধরে রাখতে হবে

আফগানিস্তানের অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। ২০২৩ সালেও দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে বিদেশি সহায়তা থেকে।

গত তিন বছরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার মাধ্যমে আফগানিস্তানে অন্তত ৩৮০ লাখ ডলার সহায়তা দিয়েছে জাতিসংঘ। এ সময়ে দেশটিতে এককভাবে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশটিতে মার্কিন সহায়তা এসেছে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু এসব সহায়তার একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় খাতের পরিবর্তে অন্য দিকে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজস্ব সংগ্রহের জন্য তালেবান নানা ধরনের কর নির্ধারণ করেছে। ২০২৩ সালে তারা প্রায় ২৯৬ কোটি ডলার রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। কিন্তু ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিটি চাঙা করতে তাদের আরও অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন। অথচ তালেবানের হাতে তা করার তেমন কোনো পথ নেই।

আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা ছাপাতে পারে না। তাদের বিদেশে মুদ্রা নোট ছাপাতে হয়। দেশটিতে সুদের লেনদেনও নিষিদ্ধ। তাই ব্যাংকগুলো অর্থ ধার দেওয়া বন্ধ রেখেছে। আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত না হওয়া তালেবান সরকার বিদেশ থেকে ঋণসহায়তাও পাচ্ছে না। দেশটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনও বন্ধ।

এর বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিবেশী পাকিস্তান থেকে ফিরতে থাকা নিজ দেশের শরণার্থী নাগরিকের ঢল তালেবানের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তালেবান নারীশিক্ষা প্রায় নিষিদ্ধ করেছে। সব ধরনের চাকরি থেকে নারীদের বরখাস্ত করেছে। এসব কিছুও দেশটির অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা।

বাহিস মনে করেন, এত সব চাপ, অভাব ও চ্যালেঞ্জ তালেবান সরকার বেশি দিন সহ্য করতে পারবে না। জনগণ একদিন জেগে উঠবে। সেই পর্যন্ত সবাইকে আশা ধরে রাখতে হবে।
কূটনীতি

তালেবান সরকারকে এখনো বিশ্বের কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু চীন ও রাশিয়ার মতো দেশটির বড় প্রতিবেশীরা মনে করে, একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তান তাদের জন্য মঙ্গলজনক।

কিন্তু বিদেশে তালেবানের জব্দ অর্থ ও সম্পদ ফেরত পেতে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন খুব দরকার। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিলে অন্য পশ্চিমা দেশগুলোও তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে।

আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তালেবানের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন করছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কাতার। আর আমিরাতের উড়োজাহাজ সংস্থার সহায়তাও তালেবানের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তাব্যবস্থা

অসংখ্য পাহারাচৌকি, সাঁজোয়া যান ও হাজার হাজার যোদ্ধা নিয়ে তালেবান নিজেদের নিরাপত্তা একধরনের নিশ্চিত করেছে। কিন্তু দেশটি নারী ও সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপদ নয়। আত্মঘাতী বোমা হামলা ও ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলায় দেশটিতে প্রায় সময় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

আফগানিস্তানের সক্রিয় ইসলামিক স্টেট (আইএস) কাবুলের দাশত-ই-বারছির শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর প্রায় সময় বোমা হামলা চালায়। আদর্শগত মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও আইএসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না তালেবান। এখন পর্যন্ত কোনো সন্ত্রাসী হামলার বিচার করতে পারেনি তারা।

আফগানিস্তানের নারীরা প্রায় দুই দশক স্বাধীনতা ভোগ করার পর এখন আবার অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। নারীদের পোশাক, কর্ম ও ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপ করেছে তালেবান সরকার।

গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে অনেক গণমাধ্যম তৈরি হয়েছিল। তালেবান আসার পর অধিকাংশ গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মূলধারার কিছু গণমাধ্যম এখনো কোনোভাবে কাজ করছে।

যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের লেকচারার বলেন, ‘আফগানিস্তানের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো তালেবানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, তারা কার নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছে?’

লোহার খাঁচায় আসামি রাখা ‘অমানবিক’ by আসাদুজ্জামান

গ্রেপ্তারের পর কাউকে আদালতে তোলা হলে নেওয়া হয় এজলাস কক্ষের এক পাশে থাকা একটি লোহার খাঁচার মধ্যে। আবার কোনো মামলার আসামি হয়ে কেউ হাজিরা দিতে গেলে তাঁকেও ঢুকতে হয় ওই খাঁচার মধ্যে। তবে ওই ব্যক্তি আসলেই দোষী নাকি নির্দোষ, তখনো তা প্রমাণিত হয়নি। এই বিষয় সামনে এনে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞরা বলছেন, এজলাস কক্ষে এভাবে আসামিকে লোহার খাঁচার মধ্যে ঢোকানো অমানবিক ও সংবিধান–পরিপন্থী। এই ব্যবস্থা আর থাকা উচিত নয়।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না প্রথম আলোকে বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রের আদালতে লোহার খাঁচা থাকতে পারে না। আগে কখনো লোহার খাঁচা ছিল না। কয়েক বছর ধরে লোহার খাঁচা বসানো হয়েছে। অবিলম্বে আদালত থেকে লোহার খাঁচা তুলে নেওয়ার দাবি জানান এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

আদালতে লোহার খাঁচায় আসামি রাখাকে সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী মনে করেন সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ। এ বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারের মুখোমুখি কোনো আসামির সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থী কোনো আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়। একজন আসামিকে লোহার খাঁচায় ঢোকানো কিংবা ঢুকতে বাধ্য করা অমানবিক। এটি সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।’

সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার–সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদের (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস–আইসিসিপিআর) ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি দেওয়া যাবে না। আইসিসিপিআরের অনুচ্ছেদ ১৪(২) অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধের জন্য অভিযুক্ত প্রত্যেকের আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণের আগপর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার থাকবে।    

বিচারিক আদালতের এজলাস কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা অপসারণের নির্দেশনা চেয়ে ১০ আইনজীবী গত ২৩ জানুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেন। দেশের কোন কোন আদালতের ভেতরে (অধস্তন আদালতের এজলাস কক্ষ) লোহার খাঁচা রয়েছে, তা জানতে চান হাইকোর্ট।

রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে দেশের কোন কোন বিচারিক আদালতে লোহার খাঁচা রয়েছে, সেই তথ্য জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তাঁর জানামতে, লোহার খাঁচা থাকার তথ্য হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসও আদালতের এই লোহার খাঁচা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছিল। ওই সব মামলায় হাজিরা দিতে তাঁকে বহুবার আদালতে যেতে হয়েছে। গত ১২ জুন পুরান ঢাকার একটি আদালতে হাজিরা দেওয়ার পর আদালত চত্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘আজকে আমরা অনেকক্ষণ খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে ছিলাম। বলা হয়েছিল, আপনি থাকেন। কিন্তু আমরা সারাক্ষণ লোহার খাঁচার মধ্যে ছিলাম। আমি আগেও প্রশ্ন তুলেছি, এটা ন্যায্য হলো কি না? আমি যত দূর জানি, যত দিন আসামি অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছে, তত দিন তিনি নিরপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবেন।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূস আরও বলেছিলেন, ‘একজন নিরপরাধ নাগরিককে লোহার খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে শুনানির সময়, এটা আমার কাছে অত্যন্ত অপমানজনক। এটা গর্হিত কাজ। এটা কারও ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য না হয়। একটা পর্যালোচনা হোক। একটা সভ্য দেশে কেন একজন নাগরিককে পশুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে শুনানির সময়, যেখানে একজন নাগরিক দোষী সাব্যস্ত হননি। অনেক আইনজ্ঞ আছেন, বিচারপক্ষের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা পর্যালোচনা করে দেখবেন, এটা রাখার দরকার আছে কি নেই। সারা সভ্য দুনিয়ায় যেভাবে হচ্ছে, সেভাবে হবে। আমরা সভ্য দেশের তালিকায় থাকতে পারি। লোহার খাঁচা মানবতার প্রতি অপমান। কেন পশুর মতো একজন মানুষকে খাঁচার ভেতর ভরে রাখবে? এটা সরিয়ে ফেলা উচিত।’
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে গত বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। তখনো তাঁদেরকে এজলাস কক্ষে থাকা লোহার খাঁচার ভেতর ঢোকানো হয়েছিল।

কী করা উচিত

সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবী জানিয়েছেন, একটা সময় পৃথিবীর অনেক দেশেই ফৌজদারি মামলার আসামিদের আদালতকক্ষের লোহার খাঁচায় রাখা হতো। তবে আইসিসিপিআরের চেতনার পরিপন্থী হওয়ায় অনেক দেশই লোহার খাঁচায় আসামি রাখার পদ্ধতিতে থেকে সরে এসেছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ কিংবা আমেরিকার ফৌজদারি আদালতে লোহার খাঁচায় আসামি রাখা হয় না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি আদালতগুলোয় আসামি রাখা হতো কাঠের তৈরি কাঠগড়ায়। সংবিধান অনুযায়ী, বিচারের মুখোমুখি কোনো আসামির সঙ্গে নিষ্ঠুর কিংবা অমানবিক আচরণ করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কোনো আসামিকে লোহার খাঁচায় রাখা অমানবিক বিষয়।

লোহার খাঁচায় আসামি রাখার পদ্ধতি তুলে দিয়ে আগের মতো কাঠগড়ায় তাঁদের রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। সদ্য অবসরে যাওয়া জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ সাইফুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আদালতের ভেতর লোহার খাঁচা নেই। অবিলম্বে আদালত থেকে লোহার খাঁচা তুলে নেওয়ার মত দেন তিনি।

লোহার খাঁচা রাখার আগে যেভাবে আসামিদের কাঠগড়ায় রাখা হতো কিংবা আসামিরা যেভাবে এজলাস কক্ষে অবস্থান করতেন, সেটি পুনরায় চালু করা উচিত বলে মনে করেন সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ।

সংকটের অন্যতম স্থপতি by সাজেদুল হক

কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক। কথা বলেন সুন্দর। চলাফেরা স্মার্ট।  কিন্তু অভিযোগের আঙ্গুল তার দিকে। বলা হয়, গত এক দশকে বাংলাদেশে যে সংকট তার অন্যতম প্রধান স্থপতি প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তার একটি রায়ের কারণেই ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। অবশ্য এর

পুরস্কারও পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ছিলেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে। আগস্ট ঝড়ে সে পদ অবশ্য হারিয়েছেন। পদত্যাগ করেছেন তিনি। তবে খায়রুল হককে নিয়ে আলোচনা থামছে না। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পর রায় পরিবর্তন শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার শুনানি চলছে। বিভক্ত বাংলাদেশি সমাজের শীর্ষ সব আইনজীবী একটি প্রশ্নে একমত পোষণ করলেন। এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা বহাল রাখার পরামর্শ দিলেন তারা। এমনকি শুনানির সময় প্রয়াত সিনিয়র আইনজীবী টিএইচ খান চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। বললেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে দেশে বিপর্যয় তৈরি হবে, গৃহযুদ্ধ লেগে যাবে। কিন্তু তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল তাতে রা করলেন না। বিভক্ত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেল। যেখানে তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখলেন। তবে এখানেই থেমে থাকলেন না খায়রুল হক। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় প্রকাশ্যে আদালতে ঘোষিত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট দুই মেয়াদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পথ খোলা রেখেছিল। কিন্তু প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ১৬ মাস পর যে রায় প্রকাশ করলেন সেখানে তিনি এ অংশটি রাখেননি। আপিল বিভাগের দুই জন বিচারপতি এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দৃশ্যত আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তই অনুসরণ করেছিলেন খায়রুল হক।
বিচারপতি খায়রুল হকের এ রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে এক আলোচনা সভায় এ নিয়ে কথা বলেন তিনি। যদিও বিচারপতি খায়রুল হকের নাম মুখে নেননি। বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেছিলেন, আমি মনে করি না অবসরের পর রায়  লেখা বেআইনি। পদ্ধতিগত কারণে আপিল বিভাগের রায়ে দেরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে সেটা  যৌক্তিক সময়, যেমন এক মাসের মধ্যে হতে পারে। কিছুতেই এক-দেড় বছর হতে পারে না। আর অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদেশের অংশ কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। সেটা করতে  গেলে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন ও শুনানি হতে হবে। কিন্তু তা না করেই যদি রাতের অন্ধকারে, এক-দেড় বছর পর রায় পরিবর্তন করে ফেলেন, তাহলে  সেটা  ফৌজদারি অপরাধ।

মাহমুদুল আমীন চৌধুরীর এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। গতকাল তিনি মানবজমিনকে বলেন, রায়ে এ ধরনের পরিবর্তন ফৌজদারি অপরাধ।  অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির এ প্রসঙ্গে বলেন, বিচারকদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের মূল হলো আস্থা ও বিশ্বাস। ঘোষিত রায় পরিবর্তন করা ফৌজদারি অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ। এটা দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একইসঙ্গে এটি বিচারকদের আচরণবিধিরও লঙ্ঘন।

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেয়া হয়। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর প্রথম নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। সেসময় সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি হয় এবং সম্পদ বিনষ্ট হয়। একতরফা নির্বাচনের পরও আওয়ামী লীগ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ নিয়েছিল। তবে সে নির্বাচন রাতের ভোট নামে পরিচিতি পায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনও বিরোধী দলগুলো বর্জন করে।

ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায় ছাড়াও একাধিক রায়, বক্তব্য, বিবৃতিতে বিচারপতি খায়রুল হকের রাজনৈতিক মতাদর্শ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে যা কখনো দেখা যায়নি। প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পরও অবশ্য তাকে পুরস্কৃত করা হয়। তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বানানো হয়। সেখানেও তিনি পুরোদমে সরকারের প্রতি আনুগত্য বহাল রাখেন।

মাহবুব তালুকদারের বইয়ে খায়রুল হক সম্পর্কে যা বলা হয়েছে: প্রয়াত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার ‘নির্বাচননামা: নির্বাচন কমিশনে আমার দিনগুলো’ বইতে বিচারপতি খায়রুল হক সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি লিখেন, বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনীতির স্থপতি একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি- সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। আমি তাকে অরাজনৈতিক ব্যক্তি বললেও মূলত তিনি পর্দার অন্তরাল থেকে দলীয় রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে দাবার চাল দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির আসনে থেকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যে ঘটনাটি ঘটান, তার নাম সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়। এই রায়ের ফলে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেয়া হয়। তিনি আরও লিখেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বিচার বিভাগ। গণতান্ত্রিক  দেশে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে অনেক যৌক্তিকতা প্রদর্শন করা যেতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থার স্থলাভিষিক্ত করার জন্য যে নতুন আইনি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল, বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে তা অনুপস্থিত।

’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ৭১ পাঠ by রফিকুজ্জামান রুমান

অভূতপূর্ব এক অভ্যুত্থানের আলোয় উদ্ভাসিত বাংলাদেশ। মাত্র আড়াই সপ্তাহে ছাত্র-জনতার উদ্বেলিত উৎসাহে রক্ত-কালি দিয়ে ঢাকা এবং সারা দেশের রাজপথে যে ইতিহাস লেখা হলো, তা বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল। অপ্রতিরোধ্য, ‘আনচ্যালেন্‌জড’, আমৃত্যু ক্ষমতা ধরে রাখার প্রায়-প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা- সব কেমন অসহায় আত্মসমর্পণ করে ফেললো গণজাগরণের সম্মিলিত শক্তির কাছে!

এই গণজাগরণ এবং তার অনিবার্য ফলাফল বাংলাদেশের ইতিহাসই শুধু পাল্টায়নি; পাল্টে দিয়েছে আমাদের কথা বলার ধরন, চিন্তা করার চ্যানেল, প্রকাশের প্রক্রিয়া, কর্মপরিধি এবং সর্বোপরি জীবনযাপনের পদ্ধতি। এটি দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়, ২০২৪-এর ৫ই আগস্টে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ এমনকি ৪ঠা আগস্টের বাংলাদেশ থেকেও ভিন্ন। এ এক নতুন বাংলাদেশ। কোটা সংস্কারের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো নতুন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রজ্জ্বলিত প্রত্যয়ে। এবং তাই এখনো রাজপথ ছাড়েনি ক্লান্তি-অবসাদ-আত্মতৃপ্তির নাগালের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরা। বিজয় উদ্‌যাপনের চাইতে বিজয়কে ধরে রাখা এবং তাকে অর্থবহ করার দিক থেকে তাদের মনোযোগ সরানো যায়নি। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ হয়েছে যৌক্তিক কারণেই। তারা পুলিশের অনুপস্থিতিতে ট্র্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার জন্য দিনের পর দিন সকাল-সন্ধ্যা রাস্তায় কাটিয়ে দিচ্ছে।

শহরের দেয়ালে দেয়ালে, সড়ক-বিভাজকের গায়ে আল্পনা আঁকছে যার মধ্যদিয়ে ফুটে উঠছে অনিবার্য বিপ্লবের অপরাজেয় ইশতেহার। পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতার’ অচল ন্যারেটিভের বিপরীতে তারা হাজির করছে সম্প্রীতি সমাবেশ। হাতের রং-তুলি ফেলে তারা ছুটে যায় সুপ্রিম কোর্টের বারান্দায় ‘ফুল-কোর্টের’ ষড়যন্ত্র ঠেকাতে। উপদেষ্টার অযাচিত কথার জবাব দিতে শহীদ মিনারে তারা উপস্থিত হয়ে যায় বাঁধভাঙ্গা স্রোতের গতিতে। গণহত্যার ঘৃণীত অপরাধীর শাস্তির দাবিতে উত্তাল গণজোয়ার শাহবাগ থেকে ছুটে যায় ধানমণ্ডি ৩২-এ। এই বাংলাদেশ কে কবে দেখেছে!

এই প্রজন্ম যেমন ’২৪-এর গণজাগরণ তৈরি করেছে, সমান্তরালভাবে এই গণজাগরণ জেনারেশন-জেডকে তথা পুরো বাংলাদেশকে অনেক মিথ থেকে বের হওয়ার উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছে। গণমানুষের সম্মিলিত শক্তির কাছে কোনো স্বৈরশাসক যে অপরাজেয় নয়, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে এই গণজাগরণ। ক’দিন আগেও “শেখ হাসিনা পালায় না” বলে যে আস্ফালন উচ্চারিত হয়েছে গণভবনের ইথারে, ৫ই আগস্ট ৪৫ মিনিটের প্রস্তুতিতে সমস্ত অহংকারের কাগুজে নৌকাকে গণভবনের লেকে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। অহংকার, আস্ফালন আর ঔদ্ধত্যের যে অবর্ণনীয় পতন, তার এক অবিশ্বাস্য চিত্রনাট্য প্রদর্শিত হয়েছে সেদিনের পড়ন্ত দুপুরে গণভবনে আগত জনতার মুক্তির উৎসবের মধ্যদিয়ে। আগের দিনও সংসদের করিডোরে দাঁড়িয়ে  যে মোহাম্মদ এ আরাফাত হুংকার ছুড়েছিলেন ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে, যার মুখের প্রতিটি কথায়, দেহের প্রতিটি ভঙ্গিতে অনিয়ন্ত্রিত অহংকারের অনুবাদ, সেই আরাফাত আজ পলাতক! পালাতে গিয়ে বিমানবন্দরে ধরা পড়া জুনাইদ আহমেদ পলকের কী অসহায় আত্মসমর্পণ! যে ক্ষমতা এমন অসহায় করে দেয়, সে কি আদৌ ক্ষমতা? পরম প্রতাপশালী সালমান এফ রহমানের সদরঘাটের নৌকায় ধরা পড়ার যে চিত্র, তা কি কখনো আপনার কল্পনায়ও ছিল? আনিসুল হক- পরিপাটি ভদ্রচেহারার মানুষ। ক্ষমতার মোহ আর বিসর্জিত বিবেক এমন নর্দমায় নামিয়েছে যেখান থেকে নৌকাও তাকে উদ্ধার করতে পারলো না! বুধবার আদালতে তাদের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। যে আনিসুল হকদের মুখের কথা-ই আইন, হাতের ইশারা-ই রায়, তারা একজন আইনজীবীও পেলেন না তাদের পক্ষে শুনানি করার জন্য! কী পরিমাণ ঘৃণা আর ক্ষোভের বৃত্তে বন্দি ছিল তাদের ক্ষমতা-কাঠামো! এই দুই প্রতাপশালীর লুঙ্গি পরা, হাতে রশি বাঁধা ছবি অনেক মিথ ভেঙে দিয়েছে।

জনগণের ভালোবাসা আর সমর্থনের অভাবকে অন্য কোনোকিছু দিয়েই প্রতিস্থাপন করা যায় না। সাময়িক সময়ের জন্য তাদেরকে চেপে রাখা যায়; এই সময় যত দীর্ঘ হয়, তাদের মাঝে ঘনীভূত হওয়া ক্ষোভ ক্ষমতালোভীদের পরাজয়কে তত মর্মান্তিক করে।

সবচেয়ে বড় যে মিথ এই আন্দোলনে বেশি খোলাসা হয়েছে, তা হলো ‘তৈরি করা সত্য’ আর ‘ক্ষমতার বয়ানে নির্মিত ন্যারেটিভ’ বিনা প্রশ্নে ছেড়ে দেয়া যায় না। ‘সত্য’ আর ‘তৈরি করা সত্য’র মধ্যে বিরাজমান যোজন যোজন দূরত্ব এই প্রথম এই প্রজন্ম চিহ্নিত করতে পেরেছে। মূলত এই আন্দোলনে এই উপলব্ধিই মূল চালিকাশক্তি। তারা ক্ষমতার বলয় থেকে আগত প্রত্যেকটি ‘তৈরি করা সত্য’কে চ্যালেঞ্জ করেছে। চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করা বাস্তবতার বাটখারায় মেপে দেখেছে ক্ষমতা-কাঠামো থেকে দাঁড় করানো মিথ্যা ন্যারেটিভ। এবং শেষ পর্যন্ত তারা দেখতে পেয়েছে- এই দেশের গোটা শাসনব্যবস্থাই মিথ্যার উপর দাঁড়ানো। তাই সেটি আর কোটা সংস্কারের ছোট্ট পরিসরে থাকেনি; আন্দোলন তখন অভীষ্ট হয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের উপলক্ষে।

কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৫/১৬ই জুলাই শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে যে ঐতিহাসিক ভুল করেছেন, দু’দিন পরেই তিনি সেটি অস্বীকার করলেন! সমস্ত মিডিয়ার সামনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে এভাবে সত্যকে অস্বীকার করা শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভাবায়। সেই রাতেই তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরপরে আন্দোলন যত তীব্র হয়, ক্ষমতা-ভবন থেকে একে একে বের হতে থাকে বাস্তবতা-বিবর্জিত সমস্ত বয়ান। দুর্দান্ত প্রতাপশালী মন্ত্রীরা, পুলিশের কর্মকর্তারা, ডিবি’র হারুনরা এমন ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে থাকে রাজপথের চিত্র যার সম্পূর্ণ বিপরীত। একটা পর্যায়ে আদালতের রায়ে যখন কোটা সংস্কার হলো, তার আগেই সারা দেশ শিক্ষার্থী-জনতার রক্তে প্লাবিত হওয়ায় বিচারের দাবিই হয়ে উঠলো মুখ্য। তখনই আন্দোলনকে দমন করার জন্য ছয় সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে বন্দি করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, তারাই নিরাপত্তা চেয়েছিল। তাই তাদেরকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়া হয়েছে। এরপরে চাপের মুখে সমন্বয়কারীদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হলো। ডিবি প্রধান হারুন জানালেন, আন্দোলন বাতিলের ঘোষণা সমন্বয়কারীরা নিজেদের থেকেই দিয়েছে। কোনো চাপ ছিল না। পরবর্তীতে মুক্ত হয়ে সমন্বয়কারীরা জানালেন, তারা নিরাপত্তা হেফাজত চাননি। আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা জোর করে পড়ানো হয়েছে। তার মানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ডিবি হারুন- দু’জনেই মিথ্যা কথা বলেছেন। ছাত্র-জনতার জাগ্রত বিবেক, চোখের সামনের রক্তাক্ত রাজপথ, শহীদদের আত্মনিবেদনের উজ্জ্বল উদাহরণের সামনে এই মিথ্যা টেকেনি।
আইসিটি’র পলক নজিরবিহীনভাবে সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ বিষয়ে যে কারণ দেখিয়েছিলেন, তাও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। মোহাম্মদ এ আরাফাত দেশি-বিদেশি মিডিয়ার কাছে যা বলেছেন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভেরিফিকেশন সেগুলোকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল এদেশের রাজপথ। সেখানে যা কিছু ঘটছে, সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে তা মিলছে না। তারা যা কিছু দেখছে, অধিকাংশ মিডিয়ায় তা দেখানো হচ্ছে না। তৈরি হয়ে গেল ফ্যাক্ট এবং ফিকশন ডিসকোর্স। ২০২৪ সালে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা যদি এভাবে ক্ষমতার হাতুড়ি দিয়ে বিকৃত করার চেষ্টা করা যায়, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের আবরণে তৈরি ন্যারেটিভের কতোটুকু ফ্যাক্ট আর কতোটুকু ফিকশন- সেই প্রশ্ন এখন জেনারেশন-জেড এর চোখে-মুখে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করার রেসিপির মধ্যে কতো চিমটি ফ্যাক্ট আর কতো চিমটি ফিকশন- নতুন করে এই প্রশ্নের অনুসন্ধানকে অপরিহার্য করে তুলেছে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান।

৫৩ বছর আগের ইতিহাস, মনে করবার কারণ নেই, কোরআন-হাদিসের মতো অকাট্য, প্রশ্নহীন। বিশেষ করে বিগত টানা ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনে ইতিহাসের যে রাজনৈতিক বিকৃতি সাধিত হয়েছে, তার বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান জরুরি। এই প্রজন্ম, যারা অভাবনীয় একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, তাদের এই দিকে মনোযোগী হতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে। ফ্যাক্ট ও ফিকশনকে আলাদা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দলীয় ডেফিনেশন ছুড়ে ফেলে মানবিক বাংলাদেশের পথে হাঁটতে হবে। নাটকে, সিনেমায়, সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের যে খণ্ডিত, বিকৃত, একপেশে বয়ান হাজির করা হয়েছে, তার কতোটুকু মিথ আর কল্পনা তা খুঁজে বের করতে হবে।

’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান যদি ব্যর্থ হতো, বুক চিতিয়ে জীবন বিলিয়ে দেয়ার অকুতোভয় মহান শহীদ আবু সাঈদকে ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে কীভাবে চিত্রায়িত করা হতো? সন্ত্রাসী? রাষ্ট্রদ্রোহী? জঙ্গি? আওয়ামী লীগ এই বাংলাদেশে যে পরিমাণ ঘৃণার জন্ম দিয়েছে, যেভাবে বিভেদের রাজনীতি করেছে, তাদের নির্মিত ইতিহাস যে সত্যি নয়, এই অভ্যুত্থান সেই বার্তাই দিয়ে গেল।
লেখক: শিক্ষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

হাসিনার ওপর চাপ দেওয়া বন্ধ করতে আমেরিকার কাছে আগেই তদবির করেছিল ভারত -দা ওয়াশিংটন পোস্টের নিবন্ধ

ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত করার এক বছর আগে, ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর চাপ দেওয়া বন্ধ করার জন্য মার্কিন সমকক্ষদের কাছে তদবির করেছিল। মার্কিন ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের একটি সূত্র এখবর জানিয়েছে। মার্কিন কূটনীতিকরা গত জানুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচনের আগে ৭৬ বছর বয়সী হাসিনাকে তার হাজার হাজার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমালোচকদের কারাগারে পাঠানোর জন্য প্রকাশ্যে হেনস্থা করেছিলেন। বাইডেন প্রশাসন বিচারবহির্ভূত অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত হাসিনার নেতৃত্বাধীন একটি বাংলাদেশী পুলিশ ইউনিটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং গণতন্ত্রকে ক্ষুন্ন করা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বাংলাদেশিদের উপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের হুমকি দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও একের পর এক বৈঠকে ভারতীয় আধিকারিকরা দাবি করেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী দিনে হয়তো তার গণতন্ত্রপন্থী অবস্থানের সুর নরম করবে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের যুক্তি ছিল, যদি বিরোধীদের একটি উন্মুক্ত নির্বাচনে ক্ষমতা লাভের অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে বাংলাদেশ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলির প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হবে।

ভারত সরকারের একজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন - 'আপনি গণতন্ত্রের কথা মাথায় রেখে চিন্তাভাবনা করছেন ,  কিন্তু আমাদের জন্য সমস্যাগুলি অনেক অনেক বেশি গুরুতর এবং অস্তিত্বের। মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে অনেক কথোপকথন হয়েছিল যেখানে আমরা বলেছিলাম,  এটি আমাদের জন্য একটি মূল উদ্বেগের বিষয়।  আপনি আমাদের ততক্ষণ পর্যন্ত কৌশলগত অংশীদার হিসাবে বিবেচনা করতে পারেন না, যতক্ষণ না আমরা কোনো কৌশলগত বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাই।' শেষ পর্যন্ত, বাইডেন প্রশাসন তার সমালোচনার সুরকে অনেকটাই নরম করে এবং হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি স্থগিত করে। কিন্তু বিষয়টি বাংলাদেশের অনেককেই হতাশ করেছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে এটি একটি গণনামূলক সিদ্ধান্ত যার সাথে ভারতীয় চাপের খুব একটা সম্পর্ক নেই। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং মার্কিন আলোচনার অনেক বিবরণ আগে রিপোর্ট করা হয়নি।

পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীরা সেনাবাহিনীর কারফিউ আদেশ অমান্য করে হাসিনার সরকারী বাসভবনের দিকে মিছিল করে হাসিনাকে ভারতে পালাতে বাধ্য করে। নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটন উভয়ের নীতিনির্ধারকরা মুখোমুখি হতে বাধ্য হন এই প্রসঙ্গে যে - তারা বাংলাদেশের সাথে অপব্যবহার করেছেন কিনা।বিষয়টির কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্তা জানিয়েছেন - 'বাংলাদেশ নিয়ে সর্বদা একটি ভারসাম্যমূলক অবস্থান বজায় রাখতে হয়। কারণ এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানের পরিস্থিতি জটিল। সেখানে  হয়তো আমাদের অংশীদারদের সাথে এমনভাবে কাজ করতে হয় যা আমেরিকান জনগণের প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।'

জানুয়ারির নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে, বাংলাদেশকে কীভাবে পরিচালনা করা যায় তা নিয়ে মার্কিন সরকারের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। তৎকালীন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এবং দূতাবাসের অন্যান্য কর্মকর্তা সহ মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কেউ কেউ হাসিনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন, বিশেষ করে যেহেতু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন  গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নিয়ে মার্কিন বিদেশী নীতির  প্রচারণা চালিয়েছিলেন। যদিও হাস, (অবসর নিয়েছেন) মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন  যে হাসিনাকে আরও চাপে ফেললে  হাস সহ মার্কিন কূটনীতিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা ভারতের বিরোধিতা করার  নেতিবাচক দিকটি বিবেচনা করেছিলেন।  ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের   সাথে দেখা করার সময়ে হাসিনার উপর  চাপ কমিয়ে আনার বিষয়ে আবেদন করেছিলেন। এমনকি প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন গত নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে আসার সময়েও বিষয়টি নিয়ে দরবার করা হয়। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালও ওয়াশিংটন সফরের সময় ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন - '“বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি সর্বদাই ছিল আমাদের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ - এবং আমরা অনেক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সেগুলি সম্পর্কে কথা বলেছি - তবে এটা বাস্তব ঘটনা যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ছিল এবং সেখানে অনেকগুলি বিষয়ে আমাদের ও  অন্যান্য দেশের  স্বার্থ জড়িয়ে ছিল। আমাদের সেখানকার প্রশাসনের সাথে সম্পৃক্ত থাকার জন্য একটি গঠনমূলক উপায় খুঁজে বের করার  দরকার ছিল  যেমন আমরা সব জায়গায় করি। সুতরাং আমাদের নীতিটি ছিল এই দুটি জিনিসের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। '

বাংলাদেশের নাটকীয় উন্নয়নের সাথে সাথে শেখ হাসিনা কর্তৃত্ববাদী শাসকে রূপান্তরিত হয়েছেন, তাঁর  ওপরেই বাজি রেখে চলেছে ভারত।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়: যেখানে বাইডেন প্রশাসন চীনকে মোকাবেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসাবে ভারতকে দেখে, সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অধীনে ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট প্রতিবেশী দেশগুলি হস্তক্ষেপকারী , আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসাবে ক্রমবর্ধমানভাবে দেখছে।জানুয়ারিতে, হাসিনা তার অনেক প্রতিপক্ষকে জেলে বা আত্মগোপনে রেখে একতরফা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দাবি করার পর, ভারতীয় কর্মকর্তারা নির্বাচনী ফলাফলকে সমর্থন করেন। বাংলাদেশের বিরোধী শিবির ভারতীয় পণ্য বয়কটের আহ্বান তোলে। গত বছর, ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দেশ মালদ্বীপে, মোহাম্মদ মুইজু "ইন্ডিয়া আউট" প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। শ্রীলঙ্কায়, এই বছর ভারত-বিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে যখন মোদি প্রচারের মাঝে  দাবি করেছিলেন যে তার বিরোধীরা ভারতের ন্যায্য অঞ্চল শ্রীলঙ্কাকে সস্তায় দিয়ে দিয়েছে।

জন ড্যানিলোভিজ, একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক যিনি ঢাকায় ডেপুটি চিফ অব মিশনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, বলছেন -  "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবংকোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করেছে। সম্ভবত বাংলাদেশের চেয়ে এটি আর কোথাও স্পষ্ট ছিল না। তবে ঝুঁকিটি  ১৯৭৯ সালে ইরানের পরিস্থিতির  মতো। যদি আপনাকে কর্তৃত্ববাদী শাসকের  সাথে যোগসাজশ  রাখতে হয় , তাহলে  যখন সেই শাসকের পতন হবে আপনাকে খেলা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। '(ইসলামিক  বিপ্লবের সময় ইরানের কর্তৃত্ববাদী  শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিল।)ড্যানিলোভিজ যোগ করেছেন, "নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনকে এখন কিছুটা নম্রতা দেখাতে হবে।  স্বীকার করতে হবে যে তারা বাংলাদেশি জনগণ এবং তাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন না করে ভুল করেছে।" স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা বলেছেন - মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতীয় লবিং দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার  তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ব্লিঙ্কেন সহিংসতা কমাতে এবং একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনকে উত্সাহিত করার প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা নিজে এবং বিরোধীদলীয় নেতা উভয়েই বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ সহিংসতা হ্রাস করতে সাহায্য করেছিল। নির্বাচনের পরে, (যা অবাধ বা সুষ্ঠু ছিল না) কেউ কেউ বাংলাদেশিদের উপর আরও বিধিনিষেধ আরোপ না করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছিলেন, এর পেছনে ভারতীয় প্রভাবকে দায়ী করেছিলেন ।"

হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর,  ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কৌশল পরিবর্তন করেছেন এবং  বাংলাদেশে  যে কেউ ক্ষমতায় আসবে তার সাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। গত সপ্তাহে, মোদি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ব্যাংকার মুহাম্মদ ইউনূসকে  তার "শুভেচ্ছা" পাঠিয়েছেন, যিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছেন। যদিও হাসিনাকে সমর্থন করার জন্য ভারতের সমালোচনা করেছিলেন ইউনূস।দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে  অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইউনূসকে সমর্থন করেছে, মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে বাংলাদেশের জনগণই বাংলাদেশী সরকারের ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও, ভারত একই সাথে অন্যান্য পশ্চিমা সরকারগুলিকে বিরোধী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্ষমতায় ফিরে আসার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিল।ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের বিরোধীদের নিয়ে  তাদের অস্বস্তির কারণ আছে। ২০০০-এর মাঝামাঝি সময়ে হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শাসনামলে, ইসলামিক  জঙ্গিরা উত্তর-পূর্ব ভারতে আক্রমণ করার জন্য অস্ত্র পাচার করেছিল এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের সহায়তায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। ভারতীয় ও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, বিএনপি শাসনের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে ভারত কেন হাসিনাকে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রাখার ব্যাপারে এতটা অনড় ছিল।

সাম্প্রতিক দিনগুলিতে, ভারতীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে জামায়াত-ই-ইসলামি  ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। ভারতীয় মিডিয়া হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর হামলার ঘটনা  রিপোর্ট করে চলেছে। বিএনপি নেতারা, যারা শীঘ্রই নির্বাচন হলে জয়ী হতে পারে, তারা  সম্পর্ক সংশোধন করতে  সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করেছেন। আশ্বস্ত করেছেন যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত  এবং বাংলাদেশের হিন্দুরা নিরাপদ থাকবে,  যদি ভারত হাসিনাকে সমর্থন করা বন্ধ করে। বিএনপির সিনিয়র নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তাদের বলার চেষ্টা করেছি,  আপনার সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখবেন না। “ভারতের উদ্বেগ যাই হোক না কেন আমরা তা প্রশমিত করার চেষ্টা করেছি। অতীতকে বহন করা উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই বোকামি হবে।”

ভারত যখন হঠাৎ তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজনকে হারানোর ভয়ে  ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন ভারতীয় পররাষ্ট্র নীতির বৃত্ত এবং মিডিয়া এই জল্পনা নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যে ওয়াশিংটন হাসিনাকে অপসারণের পরিকল্পনা করেছিল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সেই মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে  ঠাণ্ডা সম্পর্ক রেখে চলছিলেন । যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা কঠোরভাবে সেই দাবি অস্বীকার করেছেন।নয়াদিল্লির অন্যরা বলছেন যে এতদিন ধরে একজন কর্তৃত্ববাদী শাসককে  সমর্থন করার জন্য ভারতকে দায়ী করা হয়েছিল। একজন প্রাক্তন সিনিয়র ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন যে, 'তাত্ত্বিকভাবে, হাসিনাকে সমর্থন করা অর্থপূর্ণ, কিন্তু নয়াদিল্লি বাস্তব  পরিস্থিতি বুঝতে পারেনি। ঢাকা থেকে আসা প্রত্যেকেই একই প্রতিক্রিয়া জানাতো যে বাংলাদেশের মাটিতে  ভারত বিরোধী অনুভূতি একটি নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবুও আমরা মনে করতাম দেশের  প্রশাসনিক এবং সামরিক বৃত্তের  উপর তাঁর ( হাসিনা ) সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম সরকারকে অস্থিতিশীল করার বারবার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তাই তিনি আবারও দেশ পরিচালনা করবেন।আসল কথা হল, পুরো বাসায় আগুন লাগানোর জন্য শুধু একটা স্ফুলিঙ্গের প্রয়োজন ছিল। '


গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী যেমন বাংলাদেশ চাই by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের মোড়ে সংঘটিত জুলাই-আগস্ট গণহত্যার প্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক ও অনন্য গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিয়ে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটা এইজন্য অনন্য যে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের রূপ লাভ করেছিল, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে- বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রবর্তন করা। বিগত দেড় যুগ ধরে আইন এবং সংবিধানকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র ক্রমাগত ব্যক্তিগত এবং দুর্বৃত্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছে। বিগতকাল পর্বে সংবিধান ছিল সরকার বা দলের অধীন। সংবিধানের বিধি-বিধান, নির্দেশনা, প্রশাসনিক আইন সবকিছুকে অস্বীকার করে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এটা যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি রাষ্ট্র, এটা যে একটি  প্রজাতন্ত্র তার কোনো চিহ্ন বহন করতে দেখা যায়নি। সমস্ত জনগণের রাজনৈতিক ও মানবিক অধিকার বলতে কিছুই ছিল না। নির্বাচনবিহীন ক্ষমতা দখলের বন্দোবস্ত ও তৈরিকৃত কালাকানুনে জনগণকে ক্রীতদাসে পরিণত করে। সরকার অন্যায়-অবিচারের প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে। এমনকি বিরোধী দলের জনসমাবেশে সশস্ত্র রাষ্ট্রশক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ করে। পুলিশের গুলিতে প্রায়শই শ্রমিক-জনতা নিহত হয়। সরকারের অত্যাচার আর নির্যাতনে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে যায়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্র যে সবার এই দর্শনটুকু গ্রহণ করার নৈতিকশক্তি ছিল না। রাষ্ট্রের সবাই যে ‘নাগরিক’- এই শাশ্বত সত্যকে আওয়ামী লীগ গ্রহণ করতে পারেনি। রাষ্ট্র সম্পর্কে উচ্চতর ধারণা আওয়ামী লীগের একেবারেই নেই। ফলে নাগরিক হত্যা হলেই তাকে বিএনপি-জামায়াত হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যার বৈধতা নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতো। রাষ্ট্রের নাগরিককে নাগরিক না দেখে তার রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতো। সুতরাং শত্রুকে বল প্রয়োগ করে হত্যা করা বা গ্রেপ্তার করা কিংবা নির্যাতন করে প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করা সরকার কর্তব্য মনে করতো। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের নন্দিত নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা। একদলীয় বাকশালের ক্ষতচিহ্ন মুছে দেয়ার প্রশ্নে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের আন্দোলনই ছিল শেখ হাসিনার একমাত্র বিকল্প।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, কোনোক্রমে দলীয় সরকারের অধীনে নয়, এই নৈতিক অবস্থান এবং আন্দোলন-সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায় সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। একটা সময়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়।

কিন্তু পরবর্তীতে শেখ হাসিনা উপলব্ধি করলো যে, কোনো অবাধ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করতে পারবে না, বিএনপি এবং  অন্যান্য শক্তি নির্বাচন করলে তার ........ভরাডুবি নিশ্চিত।
সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করার উদ্যোগে যুক্ত করে বিচারপতি খায়রুল হককে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা তৃষ্ণার  কারণে জনগণকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং রাষ্ট্র আর জনগণের মধ্যে যে সামাজিক চুক্তি তা অস্বীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করে। নাগরিকদের উপর শুধুমাত্র দমন-পীড়ন ও হিংস্রতা বা বর্বরতা প্রয়োগ করাকেই জরুরি কর্তব্য মনে করে। সংবিধানকে হাতের খেলনায় পরিণত করে ফেলে। বিচার বিভাগ দলীয় অঙ্গসংগঠনের রূপ লাভ করে। নির্বাহী বিভাগের চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি  এবং বিরোধী মত-পথের আন্দোলন স্তব্ধ করার বেআইনি পদক্ষেপকে বিচার বিভাগ বাধাগ্রস্ত করেনি বরং বিরোধী দলের নিরপরাধ নেতাকর্মীদের দণ্ড প্রদান করেছে, রিমান্ড মনজুর করেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ব্যবহার করে ব্যাপক সম্পদের মালিকানা অর্জন করে স্বৈরাচারী সরকার ও সহযোগীগণ। ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে দাস বা ক্রীতদাসে পরিণত করে। জনগণকে না দিতে পেরেছে খাবার, না দিতে পেরেছে অধিকার।

স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গত ১৫ বছর ধরে অব্যাহত লড়াই-সংগ্রামের এই পর্যায়ে এসে যুক্ত হয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। এটা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা। স্বৈরাচারী আর স্বেচ্ছাচারী শাসনের ঘৃণ্য, নিকৃষ্ট ও নিষ্পেষণের মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের দাবিতে রাজপথ দখল করে। ছাত্ররা বুকের তাজা রক্ত উপহার দিয়ে রাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তিকে প্রতিরোধ করে। আবার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সমগ্র জনগণকে গণবিদ্রোহে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং গণবিস্ফোরণ, গণঅভ্যুত্থান ও গণ-বিদ্রোহের মূলশক্তি বা কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্রসমাজের অবস্থান নিশ্চিত হয়। ছাত্র, নারী শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনী-সহ সর্বস্তরের জনতার এক বিপ্লবী শক্তি আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বাংলাদেশের সমস্ত ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। হয় মৃত্যু, নয় মুক্তি- এই প্রতিশ্রুতিকে গ্রহণ করে দু’হাত পেতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করায় অত্যাচারের দুর্গ ধীরে-ধীরে ভাঙতে শুরু করে। ছাত্রদের এই অপরিসীম আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের চেতনা সমগ্র জাতিকে আলোকিত করায় প্রশাসন বিচলিত হয়ে পড়ে, দেশপ্রেমিক ‘সেনাবাহিনী’ ছাত্র-জনতার ওপর বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকায় গণঅভ্যুত্থান দ্রুত চূড়ান্তরূপ লাভ করে। দেশের সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর এখনো ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়নি, এখনো নিপীড়নকারী রাষ্ট্র ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য অপসারিত হয়নি কিন্তু এই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করেছে। যেহেতু এটি গণঅভ্যুত্থান, কোনোক্রমেই বিপ্লব নয়, সেহেতু সমাজ রূপান্তরের প্রশ্নটি হবে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন। সুতরাং সমাজতন্ত্রে প্রবর্তন বা বৈপ্লবিক ধারায় কমিউন রাষ্ট্রের প্রবর্তনও নয় বরং আমাদের আশু কর্তব্য হবে ঔপনিবেশিক নিপীড়নকারী শাসন ব্যবস্থার অবসানে প্রয়োজনীয় আইন ও শাসন কাঠামোর সংস্কার করা। বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে আকাঙ্ক্ষা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে, সে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে হাজির করতে হবে। ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতা বা উন্মত্ততা থেকে নিজেদের মুক্ত করা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্নে খুব জরুরি কাজ। সমস্ত জনগণের মালিকানা, অধিকার, গণতন্ত্র অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। সংবিধান ও ক্ষমতা কাঠামোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধন, পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন বা সংস্কার করতে হবে তা চিহ্নিত করতে হবে। গণবিরোধী আইন ও বিধি-বিধান বাতিল করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার অসঙ্গতি দূর করতে হবে। এই অসঙ্গতি দ্রুত দূর করার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের দমনাত্মক ভূমিকার অবসান ঘটানো। গণঅভ্যুত্থানকারী শক্তি যেহেতু বঞ্চনা, বৈষম্য, নিপীড়নের অবসান ঘটাতে চায়, সেহেতু গণমানুষের বিরোধী শক্তিগুলোকেও পর্যুদস্ত করতে হবে।

প্রথমত, ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ থেকে অপসারণ করা, অন্যায়-অবিচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ হবে যারা রক্তপাত ঘটিয়েছে, গণহত্যা সংঘটিত করেছে এবং যারা ফ্যাসিবাদ কায়েমে ভূমিকা রেখেছে বা ইন্ধন যুগিয়েছে, তাদের ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে রেখে আইনের আওতায় আনা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবসায়িক সংগঠন, পেশাজীবী-সামাজিক সংগঠনসমূহের নেতৃত্ব থেকে ফ্যাসিবাদের উত্তরাধিকারদের ক্রমাগতভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজটি হবে, যে পরাক্রমশীল অচিন্তনীয় গণবিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার অবসানে ন্যূনতম একটি রূপরেখা হাজির করা। গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে এগুলোকে  বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিবেচনা করে একটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে, ফ্যাসিবাদের বিকল্প রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। মনন, চিন্তা এবং সংস্কৃতি স্তরেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

গণতান্ত্রিক সমাজ রূপান্তরে গণঅভ্যুত্থানের যারা নিয়ামক শক্তি তাদের ভূমিকা কী হবে? এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটটির গুরুত্ব, উপযোগিতা বা প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানে প্রাথমিক বিজয় লাভ করতে কতজন আত্মদান করেছে, কতজন অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছে এবং কতজন আহত অবস্থায় মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থানে আছে তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে জীবন-যৌবনকে তুচ্ছ করে যারা আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করতে হবে।

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এমন বাংলাদেশ চাই- যেখানে চাবুক থাকবে না, চাবুক মারার মানুষও থাকবে না। প্রভু থাকবে না, কৃতদাসও থাকবে না। কেউ গৃহহীন থাকবে না, কারও রাজপ্রাসাদও থাকবে না। নিরস্ত্র মানুষকে সশস্ত্র শক্তি হত্যা করবে না, অধিকারকে বল প্রয়োগে স্তব্ধও করবে না। সকল মানুষকে নিরাপত্তা দেবে, মৃত্যুর ত্রাস  সৃষ্টি করবে না। রাষ্ট্রের উপর জনগণের মালিকানা স্বীকার করবে কিন্তু উপেক্ষা করবে না। মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা দেবে, বিনষ্ট করবে না। ন্যায়বিচারকে নিশ্চিত করবে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে না। রাষ্ট্র মিথ্যা উৎপাদনের কারখানা হবে না, রাষ্ট্র খুন করে লাশের উপর দাঁড়িয়ে শোকসভাও করবে না। অপরাধীকে ফুলের তোড়া দেবে আর নিরপরাধীকে হত্যা করবে রাষ্ট্রের এমন বৈশিষ্ট্য হতে পারবে না। মোদ্দাকথা এমন বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হবে যেখানে প্রতিটি নাগরিক সুযোগ পাবে স্বাধীনভাবে নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতার বিকাশ ঘটাবার। বেঁচে থাকার অধিকার যেন রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেড়ে না নিতে পারে। আমরা আর আবু সাঈদ, মুগ্ধ, রিয়া বা ফাইয়াজদেরকে হারাতে চাই না। নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যার বাংলাদেশ চাই না।  
বাংলাদেশকে নিয়ে আবার আমরা স্বপ্ন রচনা করতে চাই, দুঃস্বপ্ন দেখতে চাই না।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
faraiæees@gmail.com

বাংলাদেশে ‘অশুভ শক্তি’ মোকাবিলায় সোচ্চার হাসিনা- বিরোধী শক্তি :এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদন

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যেন পুনরায় বাংলাদেশ অস্থিতিশীল না হয় সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশের সর্বস্তরের জনতা। বুধবার গভীর রাতে ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকায় এক অন্যরকম দৃশ্য ফুটে উঠেছে। সেখানে শত শত শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়। জুলাই বিপ্লবে হতাহতদের সম্মান জানাতে তারা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের আশপাশের সড়কে মোমবাতি জ্বালিয়ে অবস্থান নিয়েছে। ৫ই আগস্ট দেশের ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ। প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীরা নীরবতার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া চার শতাধিক নিহতদের স্মরণ করে। মোমবাতির আলোর ঝলকানিতে একটি বিষণ্ন পরিবেশ তৈরি হয়। যদিও বুধবার রাতের এই স্মরণ অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের আয়োজিত একটি কর্মসূচি, কিন্তু এই কর্মসূচির পেছনে গভীর এক রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

১৫ই আগস্ট ‘অ্যান্টি-হাসিনা বাংলাদেশিস অন এলার্ট ফর ‘এভিল র‌্যামন্যান্টস’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এশিয়াভিত্তিক গণমাধ্যম এশিয়া টাইমস। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যেন পুনরায়  স্বৈরশক্তির উত্থান না ঘটে সে বিষয়ে গভীর মনোযোগী রয়েছে দেশটির তরুণ শিক্ষার্থীরা। আবু হামজা তারেক নামের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেছেন, এটি ফ্যাসিবাদী শাসনের অবশিষ্ট অংশের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

আওয়ামী লীগের লজ্জাজনক পতনের পরে এখনো দলটি দেশে নৈরাজ্যকর এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে ওই শিক্ষার্থী।

গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বার্তায় বলা হচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকারকে উচ্ছেদ করতে ১৫ই আগস্ট থেকে ‘প্রতিবিপ্লবের’ চেষ্টা হতে পারে। এই বার্তা ছড়ানোর মধ্যেই হঠাৎ আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে সমর্থকদের সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানায়। বিশেষ করে তারা ১৫ই আগস্টকে শোক দিবস হিসেবে পালন করার নামে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে সচেষ্ট বলে মনে করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু দিবসকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে হাসিনা সরকার এবং তার দল। হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তার মায়ের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আসছেন। তিনি সেখানে দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়নি। কেননা, এটা গণমুখী একটি দল। হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর জয় তার এক বার্তায় আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে আত্মার মাগফেরাতের জন্য ধানমণ্ডিতে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। মূলত ওয়াজেদ তার বার্তায় আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের ঢাকায় জড়ো হওয়ার ইঙ্গত দিয়েছেন বলে ধারণা ছাত্র-জনতার। যদি আওয়ামী লীগ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে পারে তাহলে হাসিনার পতনের পর এটাই হবে তার দলের প্রথম বড় কোনো সমাবেশ। তবে ছাত্র-জনতা এই সমাবেশকে নিছক কোনো শোক সমাবেশ হিসেবে মনে করছে না, তারা এই সমাবেশের আহ্বানকে দেশে  নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে।

গত কয়েকদিন বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশের একাধিক সমাবেশের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৫ই আগস্ট নিয়ে উদ্বেগ প্রকট হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সমাবেশগুলো করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ। শাহবাগে টানা দুইদিন সমাবেশের ফলে তীব্র ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ জনগণ। রাস্তায় সৃষ্টি হয় যানজট। হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সংখ্যালঘুর বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এতে বেশ কয়েকজন আওয়ামীপন্থি সংখ্যালঘুর হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নাবিলা ইদ্রিস সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবিকে সমর্থন করে বলেছেন, তিনি উদ্বিগ্ন; কারণ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার যে কথা বলা হচ্ছে তা রাজনৈতিক লেন্সের পরিবর্তে সাম্প্রদায়িকতার উস্কানি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কিছু ভারতীয় গণমাধ্যম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে অতিরঞ্জিত করেছে এবং মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। যেমন তারা বলেছে যে, বাংলাদেশে কয়েক ডজন হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টাই বলে মনে করেন নাবিলা ইদ্রিস। তিনি বলেছেন, আমি দৃঢ়ভাবে সন্দেহ করি যে, আওয়ামী লীগের কর্মী ও নেতারা তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে সংখ্যালঘুদের ব্যানারে সমাবেশ করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে।

‘৭ বছর আমাকে বোবা করে রাখা হয়েছিল’ -কনকচাঁপা

গত সরকারের সময় দেশের অনেক গুণী শিল্পীকে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার, শিল্পকলা একাডেমিসহ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে কালো তালিকায় রাখা হয়েছিল। ভিন্নমতের অনেক শিল্পী বঞ্চিত হয়েছেন বছরের পর বছর। সে তালিকায় ছিলেন মনির খান, কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন, আসিফ আকবর, সোহেল মেহেদীসহ অনেকে। এরমধ্যে কনকচাঁপা ৭ বছর ধরে ছিলেন কালো তালিকাভুক্ত। এ সময়ে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হতো না তাকে। এক সময় যে ছিলেন প্লে-ব্যাকের সম্রাজ্ঞী, সেই কনকচাঁপার গানের সংখ্যাও কমতে থাকে ধীরে ধীরে। এদিকে ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের। এই আন্দোলনের শুরুতেই কনকচাঁপা ছিলেন শিক্ষার্থীদের পক্ষে। একটা সময় বিএনপি’র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। এ কারণেই হয়তো বিগত সরকারের আমলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি গত ৭ বছর বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হয়েছি। তবে আমি হাসিমুখে সব সয়েছি। নিজেকে সবসময় ভালো রাখার চেষ্টা করেছি। এই সময়ে রান্নাবান্না, পরিবারের আনন্দে ডুবে থাকার চেষ্টা করেছি। অনেক সমস্যা হলেও অভিযোগ করিনি। এ শিল্পী বলেন, আমাকে ৭ বছর যেভাবে বোবা করে রাখা হয়েছে তা বর্ণনাতীত। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কোনো কিছু লিখতে

পারতাম না। শুধু তাই নয়, আমি গান গাইতে পারিনি। একজন শিল্পী যদি গান গাইতে না পারেন তবে বোবা হয়ে যাওয়াই ভালো। তিন দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ার কনকচাঁপার। চলচ্চিত্রে তার গানের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। নিগৃহীত হওয়ার ব্যাপারে এ শিল্পী বলেন, গত ৭ বছরে আমার কোনো গান বেতার কিংবা বিটিভিতে প্রচার হয়নি। শিল্পকলা একাডেমিতে ডাকা হয়নি। নতুন শিল্পীদেরও গাইতে দেয়া হয়নি আমার গান। আর সরকারি অনুষ্ঠানে তো আমি ব্ল্যাক লিস্টেডই ছিলাম। এদিকে গত সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়া প্রসঙ্গে এ শিল্পী বলেন, সবার এমন অবস্থা হয়েছিল গত সরকারের আমলে যে কেউ কথা বলার সাহস পায়নি। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দেখিয়ে দিয়েছে তারা অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করতে পারে না। আমি তাদের স্যালুট জানাই। আর অন্তর্বর্তী সরকার যেন সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারে তার জন্য আমাদের সবার সহযোগিতা করা উচিত। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটা সুন্দর দেশ আমরা গড়বো।

ঝামেলা করলে আওয়ামী লীগের পরিণতি শুভ হবে না -নয়াপল্টনে অবস্থান কর্মসূচিতে ফখরুল

ছাত্র-জনতার উপর গুলি চালিয়ে গণহত্যাকারী এবং খুনি হাসিনাসহ তার দোসরদের বিচারের দাবিতে ঢাকাসহ সারাদেশে অবস্থান কর্মসূচি করেছে বিএনপি। সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রদলের অবস্থান কর্মসূচি করে। একই সময়ে বৃহস্পতিবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ১নং গেইটে অবস্থান করে ঢাকায় মহানগর দক্ষিণ বিএনপি। এই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু। বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টন দলের কার্যালয়ের সামনে কেন্দ্রীয় বিএনপির উদ্যোগে অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আবারো ‘ঝামেলা’ করলে আওয়ামী লীগের পরিণতি শুভ হবে না। সুতরাং এখনো সময় আছে আপনারা আর ঝামেলা কইরেন না। কারণ ঝামেলা করলে আপনারা টিকতে পারবেন না।
এছাড়া বিকালে নিউমার্কেট, ধানমণ্ডি, ও হাজারীবাগ থানা বিএনপির নেতাকর্মীরা অবস্থান কর্মসূচি করেছেন। এই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১০ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শেখ রবিউল আলম। কর্মসূচি শেষে শান্তির পদযাত্রা বের করেন নেতাকর্মীরা। পদযাত্রাটি সাইন্সল্যাব থেকে শুরু হয়ে কলাবাগান,পান্থপথ মোড়, ধানমণ্ডি ৩২  ও ২৭ হয়ে শংকর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়।
কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ইতিহাস বড় নির্মম, আল্লাহ‘তালার বিচার বড় নির্মম. ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার (শেখ হাসিনার) মুখ দিয়ে প্রতিশোধে জিজ্ঞাসা স্পষ্ট হয়েছিলো। আল্লাহর কি হুকুম দেখেন, সেই তাকেই পালিয়ে যেতে হলো, আবার সেই জায়গায় সেখানে তার গোঁড়া পোতা আছে। আমি সেজন্য আওয়ামী লীগারদেরকে বলছি যে, এখনো সময় আছে আপনারা আর ঝামেলা কইরেন না। কারণ ঝামেলা করলে আপনারা টিকতে পারবেন না।

তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট তো চেষ্টা করেছিলেন যে, আপনারা যাবেন, ৩২নং এ গিয়ে ফুল দেবেন। কারো তো আপত্তি ছিলো না। কিন্তু ছাত্ররা তা হতে দেননি, হতে দেননি কেনো, এই মানুষটাকে কেউ দেখতে চায় না। খুনি হাসিনার চেহারা কেউ আর দেখতে চায় না। এক হাসিনা সারা বাংলাদেশে যত আওয়ামী লীগার ছিলো তারা ক্ষুদে হাসিনা তৈরি হয়েছে, সারাদেশে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তারা।
ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে সৃদৃঢ় করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব।
ফখরুল বলেন, আজকের সমাবেশের ব্যানারে লেখা আছে, এই যে গণহত্যা, হাসিনা যে খুনি ও তার দোসরদের আমরা বিচার চাই। বিচার আল্লাহ‘তালা করছে, আরও করবে। আমরা বিচার চাই এই সরকার কাছে, যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যাদের ওপরে জনগণ আস্থা দিয়েছে, একটু স্বস্তি ফিরিয়ে এনে নির্বাচন দেবে, একটা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন দেবে- সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের ভোট দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার গঠন করবে। আমরা সেটাই চাই।
তিনি বলেন, আমরা চাই, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন হোক। আমরা যৌক্তিক সময়ও দিতে চাই। একটা কথা আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, গণতন্ত্র গণতন্ত্র সেটার কোনো বিকল্প নাই। এই গণতন্ত্রের জন্য আমরা লড়াই করছি। আমরা লড়াই করেছি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমীগর বলেন, নতুন নতুন কৌশল ওরা আবিষ্কার করে। এখন নতুন একটা ধুঁয়া তুলেছে সেই ষড়যন্ত্রকারীরা। সেটা কি? সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। আমাদের ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) খুব সুন্দর করে বলেছেন যে, বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু নাই, বাংলাদেশের সবাই বাংলাদেশী নাগরিক, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আমরা সবাই মিলে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, দেশ স্বাধীন করেছি। সেই সূত্রে যারা আজকে হিন্দু সম্প্রদায়কে তারা আলাদা করে দেখতে চায়, আমরা তাদের সঙ্গে একমত নই। তারা সবাই এক নাগরিক।
তিনি বলেন, আমি পরিষ্কারর করে বলতে চাই, ভালোয় ভালোয় এসব ঝামেল ষড়যন্ত্র না করে আপনারা আত্মসমর্পণ করেন। যারা এখনো বাইরে আছে, এদিক-ওদিক করছেন। জানেন তো ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। আমাদের নেতা-কর্মীদের কোর্টে এভাবে নেয়া হয়েছিলো এবং তারেক রহমান সাহেবকে ওইভাবে হেলমেট পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। এদের বিচার করতে হবে। এদের বিচার করতে হবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিরোধী আইনে। অর্থাৎ যে অপরাধ করেছেন, যে ক্রাইম করেছেন, গণহত্যা করেছেন, অত্যাচার করেছে, নির্যাতন করেছে তার বিচার আন্তর্জাতিক আইনে হতে হবে।
ফখরুল বলেণ, এই সরকারকে আমরা সাহায্য করব। এটা ছাত্র-জনতার সরকার, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল আমরা তাদেরকে সহযোগিতা দেবো যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা গণতন্ত্রের পক্ষে থাকবে, গণতান্ত্রিকভাবে তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।
মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে ও বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, মহানগর দক্ষিণের রফিকুল আলম মজনু, স্বেচ্ছাসেবক দলের এসএম জিলানী, যুব দলের নুরুল ইসলাম নয়ন, কৃষক দলের শহীদুল ইসলাম বাবুল, সাবেক ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রশীদ হাবিব, ফজলুর রহমান খোকন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।