Showing posts with label বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি. Show all posts
Showing posts with label বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি. Show all posts

Tuesday, October 6, 2026

একটি সূত্রই বদলে দিয়েছিল স্টিভ জবসের পুরো কর্মজীবন, কী সেটা by কাজী আকাশ

২৮ বছর আগের কথা। মার্কিন প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবসায়ী স্টিভ জবস তখন ডুবন্ত কোম্পানি অ্যাপলকে একদম নতুনভাবে সাজাতে শুরু করলেন। সে সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে একটা অসাধারণ শিক্ষার কথা সম্প্রতি শেয়ার করেছেন কানাডীয় ব্যবসায়ী ও টিভি ব্যক্তিত্ব কেভিন ও’লিয়ারি। তিনি বলেছেন, ‘জবসের কাছ থেকে শেখা সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা সময় ব্যবস্থাপনা বা লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে নয়। এটা আরও গভীর ব্যাপার। জবস জানতেন, কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। কীভাবে অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সরিয়ে নিজের কাজটা করতে হয়। এই একটি ধারণাই তাঁর পুরো কর্মজীবন বদলে দিয়েছে।’ স্টিভ জবসের সেই সূত্রের নাম ‘সিগন্যাল ও নয়েজ’।

সিগন্যাল ও নয়েজ কী

কেভিন ও’লিয়ারি খুব সহজভাবে বিষয়টা ব্যাখ্যা করেছেন। সিগন্যাল হলো সেই ৩-৫টি কাজ, যেগুলো আগামী ১৮ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই করতে হবে। এসব এমন কাজ, যা না করলেই নয়। এসবই আপনাকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেবে। আর নয়েজ হলো বাকি সবকিছু। যেমন অপ্রয়োজনীয় মিটিং, সময় নষ্ট করে ই–মেইল করা কিংবা নানান ধরনের বিভ্রান্তি।

জবস তাঁর জীবনে এই নিয়ম খুব ভালোভাবে মেনেছেন। তিনি ৮০: ২০ অনুযায়ী কাজ করতেন। জবস চাইতেন, তাঁর সময় আর শক্তির ৮০ শতাংশ যাবে সিগন্যালে। আর নয়েজে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। কিন্তু সাধারণ মানুষ কী করে? তারা ৫০ শতাংশ সময় সিগন্যালে আর ৫০ শতাংশ নয়েজে দেয়। কেউ কেউ তো আরও খারাপ অবস্থায় থাকে। বেশির ভাগ সময় মিটিং ও মেইল চালাচালি করে ভাবে, গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে না কেন!

ও’লিয়ারির মতে, সফল উদ্যোক্তা এবং অন্যদের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। বিজয়ীরা হয়তো সব সময় সবচেয়ে বুদ্ধিমান বা ভদ্র মানুষ হন না, কিন্তু তাঁরা সিগন্যাল চিনতে ভুল করেন না।

নির্মমতার শক্তি

জবস কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতেন একদম নির্মমভাবে। তাঁর কাছে যা কিছু লক্ষ্যের জন্য অপ্রয়োজনীয়, তা-ই নয়েজ। এর মধ্যে পড়ে আরাম, সামাজিক ভদ্রতা, প্রশংসা, এমনকি আবেগও।

কেভিন ও’লিয়ারি বলেন, ‘জবস ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করতেন, যখন সেটা কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াত। কোনো আলাপ যদি প্রোডাক্ট তৈরি নিয়ে না হতো, তাহলে তাঁর কাছে সেই আলাপের কোনো দাম ছিল না। কেউ যদি যথেষ্ট দ্রুত কাজ না করত, তাকে ছাঁটাই করা হতো। জবস এটা কঠোর হওয়ার জন্য করতেন না, লক্ষ্য অর্জনের জন্য করতেন। তিনি মনে করতেন, দ্রুত কাজ না করাটা মাঝারি মানের নয়েজ। এটাও নয়েজকে প্রশ্রয় দেওয়া।’

এই কঠোরতা জবসকে অনেকের কাছে অসহ্য করে তুলেছিল। কিন্তু এটাই তাঁকে সফল করেছে। তাঁর এই অবিচল মনোযোগ চারপাশের মানুষকে বাধ্য করত নিজেদের সেরাটা দিতে, নয়তো সরে যেতে হতো।

আবেগের নিয়ন্ত্রণও কাজের অংশ

বেশির ভাগ মানুষ ভাবে, উৎপাদনশীলতা মানে শুধু কাজ আর সময়ের ব্যাপার। কিন্তু জবস বুঝেছিলেন, আপনার মানসিক অবস্থাও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। ও’লিয়ারি বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলেছেন। তিনি বলছেন, কোনো খবর চরম বিপর্যয়ের হোক বা চরম আনন্দের—কোনোটিই যেন আপনাকে পথভ্রষ্ট না করে।

কেন? কারণ, আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তখন সেটা নয়েজে পরিণত হয়। খারাপ খবরের আতঙ্ক হোক বা জয়ের উদ্‌যাপন, আসল বিপদটা একই—আপনি সিগন্যাল থেকে দূরে সরে যাবেন।

জবস নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যেন যেকোনো পরিস্থিতিতে তিনি স্থির থাকতে পারেন। তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত দুটি প্রশ্ন—এখনো কী কাজ বাকি এবং সিগন্যাল বা মূল লক্ষ্য কী? পরিস্থিতি যা-ই হোক, কাজ শেষ করাই হলো মূল কথা। ও’লিয়ারির মতে, এই আবেগীয় শৃঙ্খলাই সফল নেতাদের অন্যদের থেকে আলাদা করে।

স্টিভ জবস ও ইলন মাস্ক: আলাদা মানুষ, একই শক্তি

স্টিভ জবস ও ইলন মাস্কের ইনটেন্স বা কাজের প্রতি গভীর মনোযোগের ব্যাপারটা প্রায় একই। তবে শুধু গভীর মনোযোগ তাঁদের সফল করেনি, আসল ব্যাপার হলো, তাঁরা কোন বিষয়ে মনোযোগী।

ও’লিয়ারির মতে, দুজনের মধ্যে একটি জায়গায় মিল আছে। তাঁরা মূল লক্ষ্যের ওপর শতভাগ মনোযোগ দেন। জবস কখনো মানুষের মনোযোগ বা অ্যাটেনশন খোঁজেননি, তিনি খুঁজেছেন ফলাফল। অন্যদিকে মাস্ককে মানুষ পছন্দ করল কি না, তা না ভেবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পেছনে ছুটেছেন।

ও’লিয়ারি উল্লেখ করেছেন, এই তীব্র মনোযোগের কারণে এই নেতাদের সঙ্গে কাজ করা বা তাঁদের আশপাশে থাকাটা কঠিন হতে পারে। কিন্তু এ কারণেই তাঁরা সফল। এই একই কারণে তাঁরা এমন সব জিনিস তৈরি করেন, যা নিয়ে অন্যরা শুধু আলোচনাই করে যায়। তাঁরা কখনো নয়েজ বা অগুরুত্বপূর্ণ কাজে ফোকাস করেননি।

আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত

আপনি যদি না জানেন আপনার সিগন্যাল বা মূল লক্ষ্য কী, তাহলে সারা দিন কেটে যাবে নয়েজের পেছনে ছুটতে ছুটতে। নিজের লক্ষ্য ঠিক করতে না পারলে সারা দিন মিটিং, মেসেজ আর ছোটখাটো সিদ্ধান্তের ভিড়ে আপনি হারিয়ে যাবেন। শুনতে সহজ মনে হলেও কাজটা করা মোটেও সহজ নয়। এ কারণেই বেশির ভাগ মানুষ বিষয়টি এড়িয়ে যায়। আর যারা এড়িয়ে যায় না, তারাই কাজ শেষ করে, এগিয়ে যায় এবং নেতৃত্ব দেয়।

তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কী কী? কোন পাঁচটি কাজ আগামী ১৮ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই করতে হবে? একই সঙ্গে এটাও ভাবুন, কোন কোন বিষয় আপনাকে এই পাঁচটি কাজ করতে বিভ্রান্ত করছে। সেসব ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিন।

মোদ্দাকথা হলো, আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ আর অগুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। এ কাজটা করতে পারলেই বাকিটা সহজ হয়ে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ কাজটা গুরুত্বসহকারে করুন, তবে অন্যটা কাছে ঘেঁষতে দেবেন না। তাহলে আপনিও হবেন সফল।

সূত্র: মিডিয়াম 

স্টিভ জবস কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতেন একদম নির্মমভাবে
স্টিভ জবস কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতেন একদম নির্মমভাবে। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

Friday, September 4, 2026

মহাকাশে ছায়াযুদ্ধ: যেভাবে সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে এবার মহাকাশের কক্ষপথে দানা বাঁধছে এক নতুন লড়াই। একে অপরের স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ শনাক্ত করা, অনুসরণ করা, এমনকি অচল বা ধ্বংস করার সক্ষমতা অর্জনে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মহাকাশ যুদ্ধের এই নেপথ্য প্রস্তুতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশে বেইজিংয়ের তৎপরতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। গত জুনে চীন একটি গোপন চালকবিহীন মহাকাশযান থেকে কক্ষপথে একটি ছোট স্যাটেলাইট অবমুক্ত করে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘লিওল্যাবস’ জানায়, ওই ছোট স্যাটেলাইটটি অন্য একটি চীনা স্যাটেলাইটকে প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মূল যানে ফিরে আসে।

গবেষকরা বলছেন, চীন এমন ‘হান্টার’ বা শিকারি স্যাটেলাইট তৈরি করছে যা প্রতিপক্ষের মহাকাশযানকে অনুসরণ করতে এবং প্রয়োজনে সেটিকে ধরে ফেলতে বা জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের প্রধান জেনারেল চান্স সাল্টজম্যান সতর্ক করে বলেছেন, চীনের এই স্থল ও মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র তৈরির গতি অত্যন্ত দ্রুত এবং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘ব্যাপক হুমকি’।

পরাশক্তিদের গোপন প্রযুক্তির লড়াই

পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। চীনের মতো ওয়াশিংটনেরও রয়েছে ছোট শাটল আকৃতির গোপন চালকবিহীন মহাকাশযান। আধুনিক যুদ্ধে স্যাটেলাইট এখন স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্য সব যুদ্ধেই যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য এবং নেভিগেশনের জন্য স্যাটেলাইট অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, স্যাটেলাইটগুলোকে সক্রিয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে। লেজার দিয়ে সেন্সর অচল করা, জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা কিংবা সরাসরি অন্য স্যাটেলাইট দখল করে নেওয়া, সবই এখন ভবিষ্যতের মহাকাশ যুদ্ধের অংশ। মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এভারেট ডলম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সক্ষমতা কোনোভাবে ব্যাহত হলে পৃথিবীতে দেশটির বিশাল সামরিক শক্তি পঙ্গু হয়ে পড়বে।

একাট্টা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা

মহাকাশে চীনের আধিপত্য রুখতে মিত্রদের নিয়ে জোট বাঁধছে ওয়াশিংটন। গত বছর সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মহাকাশে তাদের প্রথম যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। কলোরাডোর একটি ঘাঁটি থেকে পরিচালিত এই অভিযানে একটি মার্কিন স্যাটেলাইটকে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি ব্রিটিশ স্যাটেলাইটের খুব কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

মজার বিষয় হলো, সেই সময় তাদের নিচ দিয়েই অতিক্রম করছিল চীনের ‘শিয়ান-১২-০১’ স্যাটেলাইট। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ছিল বেইজিংয়ের প্রতি একটি ‘কৌশলগত বার্তা’। এর মাধ্যমে মিত্রদেশগুলো তাদের সক্ষমতা ও ঐক্যের জানান দিয়েছে, যাতে চীন তাদের মহাকাশ সম্পদে হস্তক্ষেপ করার সাহস না পায়।

ব্যস্ত কক্ষপথ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথ ক্রমেই জনাকীর্ণ হয়ে উঠছে। একদিকে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-এর ১১ হাজার স্টারলিংক স্যাটেলাইট, অন্যদিকে চীনের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে মহাকাশ এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতেও মহাকাশভিত্তিক ইন্টারসেপ্টর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিজ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মহাকাশ এখন ভূ-রাজনীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নতুন ময়দান। যেখানে গোপন অভিযান আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাল্টাপাল্টি প্রদর্শনীতে ভবিষ্যতের ‘স্টার ওয়ার্স’ বা মহাকাশ যুদ্ধের সলতে পাকানো হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

মহাকাশ নজরদারিতে মার্কিন বাহিনী। ছবি: রয়টার্স
মহাকাশ নজরদারিতে মার্কিন বাহিনী। ছবি: রয়টার্স

Wednesday, August 12, 2026

বিশ্বে হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯৭ ভাগ চীনের দখলে

চীনের অত্যাধুনিক শিল্পোন্নয়ন সোমবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এর মাধ্যমে হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তিতে চীনের পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক নেতৃত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং দেশটির তথাকথিত ‘নিউ নিউ থ্রি’ কৌশলগত খাতÑ রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উদ্ভাবনী চিকিৎসা- আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বের মোট হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯৭ শতাংশেরও বেশি এসেছে চীনা নির্মাতাদের কাছ থেকে।

একই দিনে চীনা রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি রোবোটিক্স সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য শেয়ার সাবস্ক্রিপশন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি হিউম্যানয়েড রোবট খাতের প্রথম এ-শেয়ার তালিকাভুক্ত কোম্পানি হতে যাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গ্লোবাল টাইমস।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ প্রায় ১৯১০০ ইউনিটে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭২ শতাংশ বেশি। এ সময় বাজারে নেতৃত্বেরও পরিবর্তন হয়েছে। চীনা রোবোটিক্স কোম্পানি এজিবট ইউনিট্রিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ স্মার্ট অ্যানালিটিক্স গ্লোবাল (এসএজি) গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের হিউম্যানয়েড রোবটের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি চীন থেকে এসেছে।

২০২৫ সালে বার্ষিক ৫৫০০ ইউনিট সরবরাহ করে বিশ্বের শীর্ষ হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা হওয়া ইউনিট্রি রোবোটিক্স সোমবার তাদের আইপিওর শেয়ারপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করেছে ১৫০.৮ ইউয়ান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক আইপিও মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬.১ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহ করতে পারে। এতে কোম্পানিটির আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬১ বিলিয়ন ইউয়ান। ইউনিট্রি জানিয়েছে, অনলাইন সাবস্ক্রিপশনে চূড়ান্ত শেয়ার পাওয়ার সম্ভাব্য হার হবে মাত্র ০.০১৮১ শতাংশ।
হিউম্যানয়েড রোবোটিক্সে এই অগ্রগতি চীনের দ্রুত বিকাশমান ‘নিউ নিউ থ্রি’ শিল্পের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এসব খাত চীনের উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদনব্যবস্থা উন্নয়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল স্তম্ভ হিসেবে উঠে আসছে।

বিশ্বে হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯৭ ভাগ চীনের দখলে

Saturday, August 1, 2026

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের বিস্ময়কর উত্থান, আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিন ধরে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর প্রাধান্য থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ধারাবাহিক অগ্রগতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত লিথোগ্রাফি মেশিনের উৎপাদন এবং চিপ নির্মাণে সাফল্য সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, চীন প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের বিভিন্ন লিথোগ্রাফি কোম্পানির প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছে।

এদিকে, চীনের গবেষকরা দাবি করেছেন, তারা নিজস্ব এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট (ইইউভি) লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি উন্নয়নেরও দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। তদের এ দাবি সফল হলে এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ডিইউভি ও ইইউভি প্রযুক্তি

বর্তমানে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিইউভি প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষ প্রকৌশল কৌশলের মাধ্যমে ৭ ন্যানোমিটার পর্যন্ত চিপ তৈরি সম্ভব হলেও, ২, ৩ ও ৫ ন্যানোমিটারের অত্যাধুনিক প্রসেসর তৈরির জন্য ইইউভি প্রযুক্তি প্রায় অপরিহার্য।

এই উন্নত প্রযুক্তির বাণিজ্যিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান এএসএমএল-এর কার্যত একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। তাদের তৈরি ইইউভি মেশিন বিশ্বের সবচেয়ে জটিল শিল্পযন্ত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিষেধাজ্ঞার পরো থামেনি চীন

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলেও চীনের কাছে উন্নত চিপ, চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং সফটওয়্যার রপ্তানিতে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে হুয়াওয়ে ও সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের (এসএমআইসি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত বিদেশি প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার হারায়।

তবে এসব নিষেধাজ্ঞার পর চীন সেমিকন্ডাক্টর খাতকে জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। গবেষণা, উৎপাদন, যন্ত্রপাতি, উপকরণ এবং জনবল তৈরিতে দেশটি কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

হুয়াওয়ের ৭ ন্যানোমিটার চিপ ছিল বড় বার্তা

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডোর চীন সফরের সময় হুয়াওয়ে তাদের ‘মেট ৬০ প্রো’ স্মার্টফোন উন্মোচন করে। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফোনটিতে ব্যবহৃত ৭ ন্যানোমিটার প্রসেসরটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসএমআইসি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল এমন একটি সাফল্য, যা অনেকের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের পক্ষে এমন চিপ তৈরি করা সম্ভব হবে না বলেই ধারণা করা হয়েছিল।

পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে বেইজিং

চীনের লক্ষ্য শুধু একটি বা দুটি সফল চিপ কোম্পানি তৈরি করা নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। চিপ ডিজাইন, উৎপাদন যন্ত্রপাতি, উপকরণ, মেমোরি চিপ এবং ফ্যাব্রিকেশন সব খাতেই সমান্তরালভাবে বিনিয়োগ করছে দেশটি।

এরই মধ্যে চ্যাংজিন মেমরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি) দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বড় ডিআরএএম মেমোরি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ইয়াংজি মেমরি টেকনোলজিস (ওয়াইএমটিসি) উন্নত এনএএনডি ফ্ল্যাশ মেমোরি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।

পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

চীন যদি ভবিষ্যতে নিজস্ব লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, তবে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে এএসএমএল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস, ল্যাম রিসার্চ এবং কেএলএ-এর মতো চিপ উৎপাদন সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স-এর মতো মেমোরি চিপ নির্মাতারাও চীনের অগ্রগতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে বৈশ্বিক চিপ শিল্প

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দুটি পৃথক প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেমে বিভক্ত হতে পারে একটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে, অন্যটি চীনকে কেন্দ্র করে। তবে এখনও উন্নত চিপ ডিজাইনে যুক্তরাষ্ট্র, অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের টিএমএসসি এবং ইইউভি প্রযুক্তিতে এএসএমএল বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে শীর্ষে পৌঁছায়নি। তবে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদে থামিয়ে রাখা কঠিন। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের পাশাপাশি এখন চীনের উত্থানও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের বিস্ময়কর উত্থান, আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

Sunday, July 12, 2026

রাতের তাপমাত্রা ব্যবহার করে তৈরি হবে বিদ্যুৎ by জাহিদ হোসাইন খান

রাতের আকাশ মানেই তারার ঝলক। রাত মানেই যেন পৃথিবীর বিশ্রাম। পরিষ্কার রাতে পৃথিবী নিঃশব্দে দিনের বেলা গ্রহণ করা সূর্যের তাপ মহাকাশে নির্গত করে। যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা পৃথিবীর স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে স্থিতিশীল শক্তি প্রবাহ তৈরি করার পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন। তাদের তৈরি করা একটি ছোট আউটডোর ইঞ্জিন রাতের আকাশকে একটি ঠান্ডা জলাধার হিসেবে ব্যবহার করে। যন্ত্রটি সারারাত ধরে উষ্ণ ও শীতল অংশের মধ্যে তাপমাত্রার একটি শক্তিশালী পার্থক্য বজায় রাখতে পারে। সেখান থেকে একটি ছোট পাখা চালানোর মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়।

এই যুগান্তকারী কাজের নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের বিজ্ঞানী জেরেমি ম্যান্ডে। সায়েন্স অ্যাডভান্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণভাবে রাতে বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের একটি স্বচ্ছ ব্যান্ড বরাবর তাপ মহাকাশে লিক হতে থাকে। এই ব্যান্ডটিকে প্রায়শই বায়ুমণ্ডলীয় জানালা বলা হয়। সেখানে বাতাস সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে। বিজ্ঞানীদের তৈরি যন্ত্রের নিচের প্লেটটি মাটির উষ্ণতাকে অনুসরণ করে।

যন্ত্রটিতে কয়েকটি প্লেট আছে। উষ্ণ ও শীতল প্লেটের মধ্যে প্রায় ১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা মাইনাস ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটি স্থির তাপমাত্রার পার্থক্য দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকলে ইঞ্জিনটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় একবার ঘোরে। এতে উন্নত উপাদান ব্যবহার করে প্রতি বর্গমিটারে বেশ কয়েক ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, যন্ত্রটি সরাসরি একটি পাখা ঘোরাতে পারে। এ ছাড়া একটি ছোট মোটর যুক্ত করে পরিমিত বৈদ্যুতিক প্রবাহও তৈরি করতে পারে যন্ত্রটি। বিজ্ঞানী ম্যান্ডে বলেন, এই ইঞ্জিন খুব কার্যকর হয় যখন শুধু তাপমাত্রার পার্থক্য থাকে। যদি আপনি এটিকে কোন টেবিলের ওপর রাখেন, তবে এটি নিজে থেকে কোনো শক্তি উৎপাদন করবে না।

এই প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্টার্লিং ইঞ্জিন নামের একটি যন্ত্র। এটি বাহ্যিক তাপ ইঞ্জিন, যা আবদ্ধ গ্যাস ব্যবহার করে তাপমাত্রার পার্থক্যকে গতিতে রূপান্তরিত করে। দুটি পিস্টন ও একটি তাপ সঞ্চয়কারী রিজেনারেটর ব্যবহার করে উষ্ণ ও শীতল অঞ্চলের মধ্যে গ্যাস আদান-প্রদান করা হয় যন্ত্রটিতে। এর ফলে গ্যাস প্রসারিত হয়, তারপর সংকুচিত হয়। তখন ফ্লাইহুইল নামের বিশেষ চাকা ঘুরিয়ে শক্তি উৎপাদিত হয়। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি গ্রিনহাউস বা ভবনে রাতের বেলা স্থিতিশীল বায়ু চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পূরণে ব্যবহার করতে আগ্রহী।

সূত্র: আর্থ

রাতের আকাশ
রাতের আকাশ। ছবি: আর্থ ডটকম

Saturday, June 6, 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ‘বিশ্বের প্রথম’ টিকা তৈরি হতে যাচ্ছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ‘নতুন’ ধরনের একটি টিকা তৈরি হতে যাচ্ছে। এটি অনেক ধরনের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেবে এবং মহামারি প্রতিরোধ করবে বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই প্রথম কোনো টিকার মূল উপাদানগুলো পুরোপুরি এআই দিয়ে নকশা করা হয়েছে। এরই মধ্যে মানুষের ওপর এটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগও করা হয়েছে।

টিকাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা সব ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে। এর মধ্যে করোনার সব ধরনের পাশাপাশি পশুপাখির শরীরে থাকা সেসব ভাইরাসও রয়েছে, যা মানুষের মধ্যে ভবিষ্যতে মহামারি ছড়াতে পারে।

গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে কেমব্রিজের গবেষক দলটি এআইয়ের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলার জন্য আলাদা টিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে।

যেভাবে কাজ করে

টিকা মূলত আমাদের শরীরকে রোগজীবাণু চিনতে শেখায়। এর ফলে শরীর সহজে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, তবে কিছু ভাইরাস দ্রুত তাদের রূপ বদলাতে পারে। একে মিউটেশন বা রূপান্তর বলা হয়। রূপ বদলানোর কারণে আগে টিকা দেওয়া থাকলেও তা দ্রুত কার্যকারিতা হারায়। এ কারণে করোনা ও শীতকালীন ফ্লুর টিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হয়।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় ভাইরাসের চেয়ে পিছিয়ে থাকি। আমাদের লক্ষ্য হলো ভাইরাসের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকা।’ তাঁরা এতটাই এগিয়ে থাকতে চান, যেন নতুন কোনো মহামারি আসার আগেই তা ঠেকানো যায়। সাধারণত প্রচলিত ভাইরাসের ধরন দেখে টিকা তৈরি করা হয়, কিন্তু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন।

তাঁরা নজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে সংগ্রহ করা বিভিন্ন করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড বা বংশগতির সংকেত সংগ্রহ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে।

এরপর এআই একটি ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ তৈরি করে। এই অ্যান্টিজেন বা প্রোটিন মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করে, যা সংশ্লিষ্ট সব ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। ভাইরাস রূপ বদলালেও এই টিকা কাজ করবে। এমনকি পশু থেকে মানুষের শরীরে নতুন কোনো ভাইরাস ছড়ালেও এটি সুরক্ষা দেবে।

টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অ্যান্টিজেন। কারণ, এটি দেখেই আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শত্রু বা ভাইরাসকে আক্রমণ করতে শেখে।

অধ্যাপক হিনি বলেন, এই প্রথম এআইয়ের নকশা করা কোনো অ্যান্টিজেন মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা হলো। এই প্রযুক্তি সবাইকে চমকে দিচ্ছে। মানবজাতির কল্যাণে এটি দারুণ কাজ করবে।

কেমব্রিজের এই অধ্যাপক বিবিসি নিউজকে বলেন, ‘এই টিকার লক্ষ্য শুধু আজকের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যতের মহামারি থেকে আমাদের বাঁচানো। মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এটি এক বড় পরিবর্তন।’

মানুষের ওপর পরীক্ষা

টিকাটি নিরাপদ কি না, তা ট্রায়াল বা পরীক্ষা করে দেখতে ৩৯ জনের ওপর প্রথম পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এরপর প্রায় ২০০ জনের ওপর দ্বিতীয় আরেকটি পরীক্ষা চালানো হবে। এর মাধ্যমে এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করছে, তা বোঝা যাবে।

গবেষণাপত্রটি চিকিৎসাবিজ্ঞান–বিষয়ক নির্ভরযোগ্য সাময়িকী জার্নাল অব ইনফেকশনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব এখনো ‘মাঝারি’ মাত্রার, তবে গবেষকেরা এটি নিয়ে বেশ আশাবাদী।

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ফস্ট এই ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, এআইয়ের এই নকশার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ নেই। এটি সত্যিই দারুণ বিষয়। ভাইরাস যখন দ্রুত রূপ বদলায়, তখন মহামারির টিকা তৈরিতে এই প্রযুক্তি অনেক ভালো কাজ করে।

কেমব্রিজের দলটি এখন সর্বজনীন ফ্লুর টিকার জন্য প্রাণীদের ওপর গবেষণা চালাচ্ছে। এই টিকা সফল হলে প্রতিবছর নতুন টিকা নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া তাঁরা এইচফাইভএনওয়ান বার্ড ফ্লুর টিকা নিয়েও কাজ করছেন।

পাশাপাশি গবেষক দলটি ভাইরাল হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী জ্বরের টিকা তৈরির চেষ্টা করছে, যার একটি রূপ হলো ইবোলা। আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে বর্তমানে এই জ্বরের যে বিশেষ ধরনটি ছড়িয়েছে, সেটার কোনো টিকা এখনো নেই।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক অধ্যাপক অ্যান্ডি পোলার্ড এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। এআই দিয়ে তৈরি এই টিকা সম্পর্কে তিনি বিবিসি নিউজকে বলেন, প্রাণীদের ওপর গবেষণায় এই প্রযুক্তির ভালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি চমৎকার একটি খবর।

তবে পোলার্ড মনে করেন, ‘মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ল্যাবরেটরির ইঁদুরের চেয়ে আলাদা। বছরের পর বছর নানা সংক্রমণের মধ্য দিয়ে আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হয়। তাই মানুষের ওপর ট্রায়ালে কী ঘটে, সেটাই হবে আসল পরীক্ষা।’

পোলার্ড আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টিকা গবেষণার দৃশ্যপট বদলে দেবে। এর মাধ্যমে দ্রুত টিকা তৈরি করা যাবে এবং অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিচার্সের বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক মারিয়ান নাইট বলেন, এআইয়ের নকশা করা এই ট্রায়ালের সাফল্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।

যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড ভ্যালেন্স বলেন, ‘এটি ব্রিটিশ বিজ্ঞানের আরেকটি সাফল্যের গল্প। নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনে আমরা কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করতে পারি, এটি তার বড় উদাহরণ। মানুষের ওপর প্রথম ট্রায়ালে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এই কাজ বিশ্বজুড়ে দ্রুত টিকা পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।’ -বিবিসি

মহামারি ঠেকাতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
মহামারি ঠেকাতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Tuesday, May 19, 2026

২০০ বছর ধরে প্রভাবশালী দেশগুলো আকাশপথে কীভাবে নজরদারি চালাচ্ছে by ফাহমিদা আক্তার

সম্প্রতি বেলজিয়ামের একটি বিমানঘাঁটি এলাকায় কয়েকটি সন্দেহজনক ড্রোন শনাক্ত হয়। ২ নভেম্বর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, বেলজিয়ামের ‘সামরিক যুদ্ধবিমানের ওপর নজরদারি করতে’ ড্রোনগুলো সেখানে পাঠিয়েছে কেউ। এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো একে অপরের ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় মত্ত। আর তা করতে গিয়ে দেশগুলো অনেক সময় একে অপরের কর্মকাণ্ডের দিকে গোপনে নজর রাখে। এসব নজরদারির ঘটনা যখন সামনে আসে তখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা। একসঙ্গে বিস্তৃত এলাকাকে নজরদারির আওতায় রাখতে অনেক বছর আগে থেকেই আকাশপথকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে আকাশপথে নজরদারির মাধ্যমগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

২০২৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় শনাক্ত হয় একটি চীনা বেলুন। প্রায় ২০০ ফুট উঁচুতে ভেসে ছিল সেটি। এর নিচে ঝুলে ছিল অন্তত ৩০ ফুট চওড়া একটি ফ্রেম। দক্ষিণ ক্যারোলাইনা উপকূলে এফ-২২ যুদ্ধবিমানের সাহায্যে বেলুনটি ভূপাতিত করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় বেশ হইচই শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্র তখন অভিযোগ করেছিল, এটি চীনের নজরদারি বেলুন। এর সঙ্গে নজরদারির সামগ্রী যুক্ত ছিল বলে দাবি করে তারা। তবে চীন দাবি করে, এটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী বেলুন ছিল এবং বেসামরিক গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রবল বাতাসের কারণে বেলুনটি পথভ্রষ্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছিল।

বেলুন হলো আকাশপথে নজরদারির প্রাচীনতম মাধ্যমগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনারা যুক্তরাষ্ট্রে অগ্নিসংযোগকারী বোমা ফেলার জন্য এ ধরনের বেলুন ব্যবহার করতেন। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালেও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাপকভাবে বেলুনের ব্যবহার করেছিল। তবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ সময়ে এসেও ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে নজরদারির কাজে বেলুনের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।

এক দেশ আরেক দেশের ওপর নজরদারি চালাতে আজকাল নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ঠিকই, তবে এ ক্ষেত্রে ওপর থেকে (আকাশ থেকে) নজরদারিকে সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচনা করা হয়।

আকাশ থেকে নজরদারির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের ইমেরিটাস কিউরেটর টম ডি ক্রাউচ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শত্রুরেখার পেছনের অংশে কী আছে, তা যতটা বেশি সম্ভব নজরে রাখার জন্য উঁচুতে উঠে পর্যবেক্ষণ করাটাই সব সময় কার্যকর।

২০০ বছরের বেশি সময় ধরে আকাশপথে বিভিন্ন মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক দেশ আরেক দেশের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত বেলুন থেকে শুরু করে ঘুড়ি, ক্যামেরাবাহী কবুতর, গোয়েন্দা উড়োজাহাজ, ড্রোন, স্যাটেলাইটসহ নানা মাধ্যমের ব্যবহার দেখা গেছে।

গোয়েন্দা বেলুন

১৭৯০-এর দশকের শুরুর দিকে ফরাসিরা যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি চালাতে সর্বপ্রথম গোয়েন্দা বেলুনের ব্যবহার শুরু করেন। বেলুনগুলো হাইড্রোজেন গ্যাসে ভরা থাকত। এগুলো যে শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় গিয়ে ওড়াউড়ি করত, এমন নয়। এগুলোকে নিজেদের সীমান্ত এলাকায় একধরনের তারের সাহায্যে আটকে রাখা হতো।

বেলুনের সঙ্গে যুক্ত ঝুড়িতে দুজন সেনা বসতে পারতেন। তাঁদের একজন দুরবিন দিয়ে শত্রুপক্ষের অবস্থান দেখতেন। আর অন্যজন পতাকা ব্যবহার করে ভূমিতে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে সংকেত পাঠাতেন।

ইতিহাসবিদ এবং ইন্টারন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়ামের কিউরেটর অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড বলেন, আকাশ পরিষ্কার থাকলে ওই ধরনের বেলুনে চড়ে ৫০ মাইল দূর পর্যন্ত দেখা যেত।

যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ চলার সময় উদ্ভাবক থ্যাডেউস লোও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সামনে একটি গোয়েন্দা বেলুন প্রদর্শন করেন। লিংকন তখন ওই বেলুনের কার্যকারিতা দেখে মুগ্ধ হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন আর্মি গোয়েন্দা বেলুনের ব্যবহার শুরু করে। সবচেয়ে বড় বেলুনটির নাম ছিল ইনট্রেপিড। এটিতে একজন টেলিগ্রাফ অপারেটরসহ পাঁচজন বসতে পারতেন।

ঘুড়ি ব্যবহার করে আকাশ থেকে ছবি তোলা

১৮৮০-এর দশকে ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ ডগলাস আর্চিবল্ড বড় ক্যানভাস ঘুড়ি দিয়ে বাতাসের গতিবেগ পরিমাপ করতেন। তিনি ঘুড়িতে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখতেন আর দূর থেকে একটি কেব্‌লের সাহায্যে ক্যামেরার শাটারটি চালাতেন।

আর্চিবল্ডের তোলা ছবিগুলো ওই সময় বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। ছবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সেনা করপোরাল উইলিয়াম এড্ডির নজরে আসে। ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন যুদ্ধ চলাকালে এড্ডি নিজেই ঘুড়িতে ক্যামেরা লাগিয়ে শত্রুর অবস্থানের ছবি তুলেছিলেন।

গৃহযুদ্ধের সময় সাধারণ ফটোগ্রাফি চালু ছিল ঠিকই, তবে এড্ডির ঘুড়ি দিয়ে তোলা ছবিকেই সামরিক উড়োজাহাজ থেকে তোলা প্রথম নজরদারির ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

ক্যামেরা বহনকারী কবুতর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কবুতর যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। কবুতরগুলো আটকে পড়া নাবিকদের সাহায্য চেয়ে পাঠানো বার্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিত। গুপ্তচরদের পাঠানো সাংকেতিক বার্তাগুলোও যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দিত। কবুতরের মাধ্যমে আকাশ থেকে ছবি তোলারও চেষ্টা করা হতো।

১৯০৭ সালে জার্মান ফার্মাসিস্ট জুলিয়াস নিউব্রোনার কবুতরের গায়ে লাগিয়ে ব্যবহার উপযোগী একটি ক্যামেরা উদ্ভাবন করেন এবং এটির পেটেন্ট পান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনারা এভাবে কবুতর দিয়ে ছবি তোলা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদ হ্যামন্ড বলেন, তাঁরা আসলেই কবুতরের সঙ্গে ক্যামেরা বেঁধে ফ্রান্সের পরিখাগুলোতে পাঠাতেন; কিন্তু ছবি অস্পষ্ট হতো এবং বোঝা কঠিন হতো।

সিআইএও হালকা ওজনের কবুতরের ক্যামেরার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিল। তবে কবুতরগুলো নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।

প্রথম নজরদারি উড়োজাহাজ এবং কোডাক ক্যামেরা

সর্বপ্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে উড়োজাহাজের ব্যবহার শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। তবে শুরুতে এগুলোকে যুদ্ধবিমান বা বোমারু বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হতো না। তখন উড়োজাহাজের কাজ ছিল কেবল নজরদারি চালানো। দুই আসনের উড়োজাহাজে একজন পাইলট এবং একজন পর্যবেক্ষক থাকতেন। ওই পর্যবেক্ষক দুরবিন ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতেন।

এরপর উড়োজাহাজে ক্যামেরা বসানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোডাক কোম্পানি এ ধরনের ক্যামেরা তৈরি করে। কোডাকের রচেস্টার সদর দপ্তরে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু ছিল। সেখানে সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারির জন্য সহায়ক ছবি তোলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ নজরদারি বিমানগুলোতে অস্থায়ী ডার্করুম বসানো হয়। সেখানে যথাযথ সময়ে ছবিগুলো প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ করা যেত। স্নায়ুযুদ্ধের সময় রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি স্থলভাগে গুপ্তচরবৃত্তি প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল। তাই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা তখন আকাশের দিকে মনোযোগ দিয়েছিল।

প্রথম গোয়েন্দা স্যাটেলাইট

যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যে শুধু কার আগে কে চাঁদে পৌঁছাবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করত, তা নয়। কে প্রথম কক্ষপথে গোয়েন্দা স্যাটেলাইট পাঠাবে, তা নিয়েও প্রতিযোগিতায় মেতেছিল তারা।

১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ডিসকোভারার নামের একটি কর্মসূচি চালু করে। আদতে এটি ছিল প্রজেক্ট করোনা নামের একটি গোপন গোয়েন্দা কর্মসূচি। এর মধ্য দিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হতো।

১৯৬০ সালে প্রথমবারের মতো গোয়েন্দা স্যাটেলাইটগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নে নজরদারির ছবি পাঠানো শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে হেক্সাগন কেএইচ-৯ নামের স্যাটেলাইটের ব্যবহার শুরু হয়। এ স্যাটেলাইট ১০০ মাইল উঁচু থেকে ২ ফুট আকারের ছোট বস্তুরও ছবি নিতে পারত।

সিআইএর ড্রাগনফ্লাই ড্রোন

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর জাদুঘরে থাকা সবচেয়ে আলোচিত যন্ত্রগুলোর একটি হলো ইনসেক্টোথোপটার। এটি একধরনের গোপন শোনার যন্ত্র, যা দেখতে একদমই ফড়িংয়ের মতো ছিল। সে জন্য এটিকে ড্রাগনফ্লাই ড্রোন বলা হতো। সিআইএ ১৯৭০-এর দশকে এটি তৈরি করে।

ইনসেক্টোথোপটারের স্বচ্ছ ডানায় ছোট একটি গ্যাসোলিন ইঞ্জিন লাগানো ছিল। ৬০ সেকেন্ডে দুটি ফুটবল মাঠের দূরত্ব অতিক্রম করার সক্ষমতা ছিল এটির।

ইনসেক্টোথোপটার এমনভাবে তৈরি হয়েছিল, যেন একজন অপারেটর লেজার বিম ব্যবহার করে এটির ওড়াউড়িকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং মাইক্রোফোনে ধারণ করা অডিও শুনতে পাওয়া যায়। তবে ইনসেক্টোথোপটার যন্ত্রটিকে কার্যকরভাবে চালানো যায়নি। কারণ, বাতাসের গতি ঘণ্টায় পাঁচ মাইলের বেশি হলেই এটি ভেঙে যেত।

প্রথম চালকবিহীন উড়োজাহাজ বা ড্রোন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ এরিয়াল টার্গেট নামের একটি রেডিও–কন্ট্রোলড উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়। ওই সময় ব্রিটিশ সেনাদের আকাশে নিশানা করার প্রশিক্ষণ দিতে এ ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী চালকবিহীন এ উড়োজাহাজের নাম দেন কুইন বি। এটি ছিল পুনর্ব্যবহারযোগ্য। যুদ্ধবিমানের চালকেরা এটিকে নিশানা করার মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ চালাতেন। ব্রিটিশ উড়োজাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডি হাভিল্যান্ড এই কুইন বি উড়োজাহাজ তৈরি করেছিল।

উড়োজাহাজটির রাডার ও এলিভেটর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোম্পানিটি একটি রেডিও-নিয়ন্ত্রিত সার্ভো ব্যবহার করেছিল। ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, এই মৌমাছি থিমযুক্ত চালকবিহীন বিমান থেকেই ‘ড্রোন’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নজরদারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে সর্বপ্রথম ভিয়েতনাম যুদ্ধে জেটচালিত নজরদারি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এটির নাম ছিল একিউএম-৩৪ রায়ান ফায়ারবি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৩৪ হাজারের বেশি নজরদারি মিশনে এ ড্রোন ব্যবহার করা হয়। রাডারকে ফাঁকি দিয়ে চলাচলের উপযোগী করে এটির রং করা হয়েছিল। এটি যেমন শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করত, পাশাপাশি শত্রুপক্ষের সীমানায় প্রচারপত্র ছড়াতেও এটিকে ব্যবহার করা হতো।

এ তো গেল পুরোনো ধাঁচের সব নজরদারি মাধ্যমের কথা। তবে প্রযুক্তিতে পুরোনো হলেও এগুলো নতুনরূপে এখনো ফিরে আসছে এবং এগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে পরীক্ষা–নিরীক্ষা চলছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ফিল্ড মার্শাল জোহানেস আরভিন রোমেল একবার বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে স্থলযুদ্ধের শুরুটা আকাশ থেকেই হবে। এর মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়ে যাবে, কোন পক্ষ অভিযান পরিচালনায় ও কৌশলগতভাবে দুর্বল হবে এবং যুদ্ধ চলাকালে বারবার সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য হবে।’

রোমেলের এ কথাটি আজকের দিনে আগের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রগুলো এখনো অন্য দেশে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য স্যাটেলাইট, ড্রোনসহ নানা অত্যাধুনিক মাধ্যম ব্যবহার করছে। হয়তো এটি যুদ্ধবিমানের মুখোমুখি লড়াইয়ের বিষয় নয়। তবু এটি আকাশে আধিপত্য বজায় রাখার এক লড়াই হিসেবে থেকে গেছে। নজরদারির মাধ্যমগুলোতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিও যুক্ত করা হচ্ছে।

এখন কথা হলো, আকাশপথে অন্য দেশের ওপর নজরদারির বিষয়টি কতটা হুমকির। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশকারী ওয়েবসাইট মডার্ন ডিপ্লোমেসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, নজরদারি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য হুমকি তৈরি করে, নাগরিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে। প্রতিপক্ষের সামরিক ও নাগরিক স্থাপনা তাদের অনুমতি ছাড়া পর্যবেক্ষণ করাটা নৈতিকভাবে অনুচিত।

একইভাবে নজরদারি তথ্যের ভুল বিশ্লেষণের কারণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভুল–বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া নজরদারি তথ্যের অপব্যবহার বা ডিভাইস হ্যাক হলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে স্পর্শকাতর তথ্য চলে যেতে পারে। এতে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ ধরনের নজরদারির কাজগুলো নিয়মিত নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের উচিত যুদ্ধবিধি এবং মানবাধিকার আইন মেনে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা।

সূত্র: হিস্ট্রি ডট কম, এনপিআর, বিবিসি, রয়টার্স

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-10%2Fam535c8z%2FThumn-04.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Sunday, May 17, 2026

এআই নিয়ে কেন বিশ্বজুড়ে এত আলোচনা, কেনই–বা এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা by মো. মিন্টু হোসেন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত। মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, এআই বাজারের আকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ৩৪৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৩ সালে এআই বাজার ছিল মাত্র ১৫০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

শিল্প খাতে এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ইতিমধ্যে চোখে পড়ছে। আইবিএমের ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ৪২ শতাংশ বড় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রমে এআই যুক্ত করেছে, আর অতিরিক্ত ৪০ শতাংশ সংস্থা এই প্রযুক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনায় করছে।

এই প্রযুক্তি গ্রহণের ঢেউ এখন জেনারেটিভ এআইয়ের ক্ষেত্রেও প্রবাহিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, জেনারেটিভ এআই হলো একধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা কোনো নির্দেশ মেনে জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করে পাঠ্য, ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য ডেটা তৈরি করতে সক্ষম। বর্তমানে ৩৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের অংশ হিসেবে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট কর্মীর ৪৯ শতাংশের প্রায় অর্ধেক কাজেই কোনো না কোনোভাবে এআই জড়িত থাকবে, যা কর্মপরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন আমূল বদলে দেবে।

২০৩০ সালে এআইয়ের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস

এই দশকের শেষে এআইয়ের সক্ষমতা কোথায় পৌঁছাবে? প্রযুক্তিবিদদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু যুগান্তকারী উন্নয়নের মধ্য দিয়ে যাবে, যা বর্তমান ব্যবস্থার পরিধিকে ছাড়িয়ে যাবে। শুধু বিদ্যমান এআইকে আরও কার্যকর করা নয়—এই অগ্রগতি শিল্প খাতজুড়ে এক মৌলিক পরিবর্তন আনবে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং শতগুণ দ্রুত কর্মক্ষমতা অর্জন করবে

কোয়ান্টাম এআই হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক শক্তিশালী সমন্বয়। এই প্রযুক্তিতথ্য প্রক্রিয়াকরণের এমন গতি এনে দেয়, যা আজকের সর্বাধুনিক কম্পিউটারগুলোকেও প্রাচীন মনে হয়।

এর মূল রহস্য হলো কোয়ান্টাম বিট বা কিউবিট, যা একই সময়ে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে—এটিকে বলা হয় সুপারপজিশন। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিছু গণনা প্রচলিত সিস্টেমের তুলনায় বহু গুণ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে।

প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, কোয়ান্টাম এআইয়ের মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ গুণ বেশি পারফরম্যান্স অর্জন সম্ভব। ইতিমধ্যে মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও আইবিএমের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অ্যাজ–এ সার্ভিস হিসেবে এটি চালু করেছে।

কোয়ান্টাম এআই প্রযুক্তি ওষুধ উদ্ভাবন, বাজার বিশ্লেষণ আরও গভীরভাবে করে ঝুঁকি মূল্যায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়ানোসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

কোয়ান্টাম সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ের কোয়ান্টাম ট্রান্সফরমার কাজ করলেও চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো সিস্টেমের সক্ষমতা অর্জনে কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের শত শত কিউবিট ব্যবহার করে নতুন কোড তৈরি করতে হবে।

বৃহৎ ভাষা মডেলের বিকল্প হবে ছোট এআই মডেল

বৃহৎ ভাষা মডেল বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) নিয়ে যত আকর্ষণই থাকুক না কেন, এখন শিল্প খাতে এক বিপরীত ধারা দেখা যাচ্ছে। আইবিএম, গুগল, মাইক্রোসফট এবং ওপেনএআই—সবাই সম্প্রতি এমন কিছু ছোট ভাষা মডেল (স্মল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এসএলএম) প্রকাশ করেছে, যেগুলো মাত্র কয়েক বিলিয়ন প্যারামিটারে চলে, বৃহৎ মডেলগুলোর তুলনায় অনেক ছোট আকারে।

এসব ক্ষুদ্র মডেল নির্দিষ্ট ও সীমিত কাজের ক্ষেত্রেই অসাধারণ ফল দেখাচ্ছে—যেমন কথোপকথন সংক্ষেপ করা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে হেলথকেয়ার চ্যাটবট হিসেবে কাজ করা কিংবা স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। এগুলো ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনে সরাসরি চলতে পারে, বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয় না। ফলে খরচ কমে, পরিবেশের ওপর প্রভাবও হ্রাস পায় এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আরও সুরক্ষিত থাকে।

গবেষকেরা এই ছোট মডেলগুলোকে আরও কার্যকর করতে নলেজ ডিস্টিলেশন ও প্রুনিংয়ের মতো কৌশল ব্যবহার করছেন। নলেজ ডিস্টিলেশনে বড় মডেল থেকে শেখা তথ্য ছোট মডেলে স্থানান্তর করা হয়, আর প্রুনিং প্রক্রিয়ায় নিউরাল নেটওয়ার্কের অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া হয়। ফলে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী এই ছোট মডেলগুলো সহজেই কাস্টমাইজ করা যায়।

মাল্টিমোডাল এআই টেক্সট ও ছবির সীমা পেরিয়ে যাবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ কেবল লেখা বা টেক্সট বোঝাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে মাল্টিমোডাল এআই সিস্টেম একসঙ্গে টেক্সট, ছবি, অডিও, ভিডিও ও ডকুমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে, যা প্রধান ধারার প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এগুলোর শক্তি কোথায়? বর্তমান এআই সাধারণত একধরনের তথ্য নিয়ে কাজ করে, কিন্তু মাল্টিমোডাল সিস্টেম একাধিক তথ্যধারা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে—মানুষের যোগাযোগের ধরনকে অনেক বেশি বাস্তবভাবে অনুকরণ করে।

এক শিল্পবিশেষজ্ঞের ভাষায়, ‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে মাল্টিমোডাল যোগাযোগকারী, তাই এআই-ও এখন টেক্সটভিত্তিক সীমিত যোগাযোগ থেকে জটিল, বহুমাত্রিক যোগাযোগের দিকে এগোচ্ছে।’ এই পদ্ধতির ফলে এআই এখন দৃশ্য, শব্দ ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য মিলিয়ে আরও প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবসম্মত দ্বিমুখী কথোপকথন চালাতে পারবে, যা সত্যিকার অর্থে ‘মানুষসদৃশ’ যোগাযোগের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে।

শিল্পে আধিপত্য বিস্তার করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। বিশেষত স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন শিল্প ও আর্থিক খাত—এই তিন ক্ষেত্রের পরিবর্তন হবে সবচেয়ে গভীর ও বিস্তৃত।

২০২৮ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ রোগ নির্ণয়প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হবে। বর্তমানে ভুল রোগনির্ণয়ের কারণে প্রায় ১০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু ও ১৭ শতাংশ জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্যসেবা খাত দ্রুত এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করছে।

চিকিৎসায় রোগনির্ণয়ে এআইয়ের বৈশ্বিক বাজার ২০২৩ সালের ১৩০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৮ সালে ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ২৩ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রথম দিকে এআই চিকিৎসকদের সহায়ক সরঞ্জাম হিসেবেই কাজ করবে, প্রতিস্থাপক নয়। তবে সময়ের সঙ্গে চিকিৎসক-এআই সহযোগিতা আরও নির্ভুলতা আনবে এবং শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় এআইয়ের প্রতি আস্থা তৈরি হবে।

উৎপাদন শিল্পে প্রভাব রাখবে

বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে এআই প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক জিডিপির তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে উৎপাদন খাত একাই পাবে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত মূল্য।

যেসব প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই এআইয়ে বিনিয়োগ করবে, তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, আগে এআই ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানগুলো দশকের শেষে তাদের নগদ প্রবাহ দ্বিগুণ করতে পারে এবং বার্ষিক গড় ৬ শতাংশ অতিরিক্ত বৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শিল্পপ্রয়োগ ছাড়াও এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে এআই কীভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কাঠামো বদলে দেবে। নতুন গবেষণা বলছে, এতে যেমন বিশাল বদল আসবে, তেমনি নতুন সুযোগও তৈরি হবে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআই বৈশ্বিকভাবে ৪০ শতাংশের বেশি চাকরিকে প্রভাবিত করতে পারে, যাকে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন ‘ডিসরাপশন থ্রেশহোল্ড’। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০৩০ সালের মধ্যে মোট কর্মঘণ্টার ৩০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় হতে পারে, বিশেষ করে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে। এতে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ মানুষকে সম্পূর্ণ নতুন পেশায় যেতে হতে পারে। এই প্রভাব অবশ্য সবার জন্য সমান নয়।

নারীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে—তাঁদের ৩৬ শতাংশ এমন পেশায়, যেখানে জেনারেটিভ এআই কাজের সময় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৫ শতাংশ। কম আয়ের কর্মীরা (যাঁদের বার্ষিক আয় ৩৮ হাজার ২০০ ডলারের নিচে) সর্বোচ্চ আয়কারীদের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি হারে পেশা পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

নতুন পেশার উত্থান ঘটবে

যদিও কর্মক্ষেত্রে চাকরি হারানো নিয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে। তবে বাস্তবে এআই তৈরি করছে একদম নতুন পেশার দিগন্ত। ২০৩০ সালের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতভিত্তিক চাকরির চাহিদা ২৩ শতাংশ বাড়বে, আর এআই ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞদের চাহিদা ২০২৭ সাল পর্যন্ত ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

বেশি চাহিদা বাড়বে ডেটা অ্যানালিস্ট ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বিশেষজ্ঞ (৩০-৩৫ শতাংশ), স্বাস্থ্যসেবা টেকনিশিয়ান ও পেশাজীবী (প্রায় ৩৫ লাখ ও ২০ লাখ নতুন চাকরি), এআই ট্রেইনার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার ও প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারের।

কর্মী প্রশিক্ষণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ৪২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআইভিত্তিক প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেবে, আর ৩৬ শতাংশ সংস্থা বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে—এআইয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য।

লড়াই এশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্রের

বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের চিত্রে অঞ্চলভেদে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ও বিনিয়োগের ধারা দেখা যাচ্ছে, যা ২০৩০ সাল পর্যন্ত এআইয়ের গতিপথ নির্ধারণ করবে। প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকারের প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন অঞ্চলে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব ও কৌশল গড়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০১৮ সালে চীনকে পেছনে ফেলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

এই নেতৃত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বেসরকারি বিনিয়োগে, যেখানে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭২০ কোটি ডলার, আর চীনে ছিল ৭৮০ কোটি ডলার। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্র ৬১টি গুরুত্বপূর্ণ মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি করেছে, যা চীনের ১৫টির তুলনায় অনেক বেশি।

তবু চীন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগামী। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটি ৪৪ হাজারের বেশি এআই পেটেন্ট অনুমোদন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ হাজারের প্রায় তিন গুণ।

বৃহত্তর আঞ্চলিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হার অর্জন করবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কে কী বলছেন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা নতুন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, এই ভবিষ্যৎ এখনো বহু দূরে, আবার কারও কাছে তা যেন একেবারে দোরগোড়ায়। এআইয়ের সবচেয়ে পরিচিত নাম ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান সম্প্রতি বলেছেন, মানুষ এআইয়ের সঙ্গে ক্রমেই বেশি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলছে এবং এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে।

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং বলেন, ‘আমরা এখনো এআই বিপ্লবের শুরুতেই আছি।’ তাঁর মতে, এআই মানুষের কাজের ধরন পাল্টে দেবে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং নতুন নতুন ধারণা অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

মেটার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের মতে, সুপারইন্টেলিজেন্স এখন নাগালের মধ্যে বা দোরগোড়ায়। তাঁর ভাষায়, ‘এআই আমাদের বিদ্যমান প্রতিটি ব্যবস্থাকে উন্নত করবে এবং এমন সবকিছু তৈরি করবে, যা আজ কল্পনাতেও নেই।’

অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তিনি মনে করেন, এটি এমন এক যুগ নিয়ে আসবে, যেখানে মানুষ কম কাজ করবে, আর রোবট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ভার বহন করবে।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোডেই মনে করেন, হোয়াইট-কলার বা অফিসভিত্তিক চাকরিজীবীদের এখন থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এআই আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই প্রায় অর্ধেক এন্ট্রি-লেভেল চাকরি প্রতিস্থাপন করতে পারে এবং ১০-২০ শতাংশ বেকারত্ব তৈরি হতে পারে।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ভিন্নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বোঝা যায়, এটি একদিকে বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, কোয়ার্টজ ম্যাগাজিন, নেটগুরু, টেকনোলজি ম্যাগাজিন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। ছবি রয়টার্স

Monday, May 11, 2026

ধানের দানার চেয়ে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট উদ্ভাবন by আহসান হাবীব

নিউরো প্রযুক্তির অগ্রগতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন একদল গবেষক। ধানের দানার চেয়ে ছোট একটি মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। এটি মস্তিষ্কের ভেতরের বৈদ্যুতিক সংকেত পর্যবেক্ষণ ও তারহীন তথ্য পাঠাতে সক্ষম। মাইক্রোস্কেল অপটোইলেকট্রনিক টেথারলেস ইলেকট্রোড বা মোট নামের এই যন্ত্র আকারে ক্ষুদ্র। এর কার্যক্ষমতা ও নির্ভুলতা ভবিষ্যতের স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা বলে বিবেচিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী অ্যালিওশা মলনার বলেন, ‘আমাদের জানামতে, এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ছোট স্নায়ু ইমপ্ল্যান্ট। এটি মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ মাপতে ও তথ্য তারহীন প্রেরণ করতে পারে। মানবচুলের প্রস্থের প্রায় সমান বা মাত্র ৩০০ মাইক্রোমিটার লম্বা ও ৭০ মাইক্রোমিটার চওড়া এই ইমপ্ল্যান্ট। এটি ইনফ্রারেড আলোর মাধ্যমে স্নায়ুসংকেত কোডে রূপান্তর করে। পরে সেই সংকেত মস্তিষ্কের টিস্যু ও হাড় ভেদ করে নির্দিষ্ট রিসিভারে পৌঁছায়।

বিজ্ঞানী মলনার ২০০১ সালে এই ধারণা প্রথম উপস্থাপন করেন। প্রায় দুই দশকের গবেষণা ও পরীক্ষার পর সেটি বাস্তব রূপ পেল। অ্যালুমিনিয়াম গ্যালিয়াম আর্সেনাইড নামের সেমিকন্ডাক্টর উপাদান দিয়ে তৈরি এই ডায়োডভিত্তিক যন্ত্রটি একই সঙ্গে আলো ব্যবহার করে শক্তি আহরণ ও তথ্য প্রেরণ করতে পারে।

গবেষকেরা জানান, ইমপ্ল্যান্টে ব্যবহৃত প্রযুক্তি আধুনিক মাইক্রোচিপের নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। অপটিক্যাল এনকোডার ও লো নয়েজ অ্যামপ্লিফায়ারের মাধ্যমে এটি সংকেতকে আরও পরিষ্কারভাবে প্রেরণ করতে পারে। ডেটা পাঠাতে ব্যবহৃত হয়েছে পালস পজিশন মড্যুলেশন। বিজ্ঞানী মলনার বলেন, এই ইমপ্ল্যান্ট অত্যন্ত অল্প বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই নির্ভুলভাবে তথ্য পাঠাতে পারে।

গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে যন্ত্রটি ল্যাবরেটরিতে প্রস্তুত সেল কালচারে পরীক্ষা করা হয়েছে। ইঁদুরের মস্তিষ্কের ব্যারেল কর্টেক্সে প্রতিস্থাপন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ইমপ্ল্যান্টটি এক বছরের বেশি সময় ধরে ইঁদুরের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ও স্নায়ুসংযোগের ধরন স্থিতিশীলভাবে ধারণ (রেকর্ড) করেছে। বিজ্ঞানী মলনার আরও বলেন, ‘প্রচলিত ইলেকট্রোড ও ফাইবার অনেক সময় মস্তিষ্কে জ্বালা বা প্রদাহ সৃষ্টি করে। টিস্যু ক্রমাগত নড়াচড়া করে বলে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমরা এমন এক ইমপ্ল্যান্ট তৈরি করতে চেয়েছি, যা বেশ ক্ষুদ্র হলেও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন না ঘটিয়ে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে। অন্যান্য সংবেদনশীল অঙ্গে, যেমন মেরুদণ্ডে এটি ব্যবহারের সুযোগ আছে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

ধানের দানার চেয়ে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা
ধানের দানার চেয়ে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

Monday, April 6, 2026

চীন কি যুদ্ধের জন্য রোবট সৈন্য তৈরি করছে, আসলে কী

মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবটরা হাতে অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, চীনের সামরিক বাহিনী রোবট সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওর পোস্টে লেখা হয়েছে, চীন আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক পরিষেবার প্রস্তুতির জন্য রোবটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। চীনের রোবট ‘ইউনিট্রি’–এর (ইউশু) সরাসরি গুলি চালানোর পরীক্ষাটি দেখে মনে হচ্ছে, যেন এটি এআই দিয়ে তৈরি। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ভবিষ্যতে যুদ্ধের জন্য হয়তো আর মানুষের প্রয়োজন হবে না।

    🚨 ⚡️ BREAKING NEWS
    China officially begins training robots in preparation for military service.
    The live-fire testing of the Chinese robot "Unitree" (Yushu) looks as if it were generated by AI.
    This is fascinating; in the future, wars may no longer require humans. 🫠 pic.twitter.com/aCzRZ7QI9R
    — RussiaNews 🇷🇺 (@mog_russEN) February 18, 2026

তবে ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এআই গ্রোক–এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে।

গ্রোকের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ‘না, এ ভিডিওটি এআই জেনারেটেড বা বানোয়াট বলে মনে হচ্ছে। ২০২৬ সালে চীনের সামরিক বাহিনীর লাইভ ফায়ার পরীক্ষায় ইউনিট্রি হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের যাচাই করা কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।’

গ্রোকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউনিট্রি রোবটের আসল প্রদর্শনীগুলো মূলত সাধারণ কাজের জন্য ছিল, যেমন বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। অতীতের সামরিক পরীক্ষাগুলোয় চার পায়ের রোবট ব্যবহার করা হয়েছিল, মানুষের মতো রোবট সৈন্য নয়।
অনলাইনে এ ধরনের দাবি এবারই প্রথম নয়।

এর আগেও ভাইরাল হওয়া পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) কাছাকাছি এলাকায় টহলের জন্য এআই–চালিত রোবট মোতায়েন করেছে।
চীন আলাদাভাবে ঘোষণা দিয়েছে, তারা প্রধান প্রধান সীমান্ত পারাপার এলাকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সহায়তার মতো অ–সামরিক কাজের জন্য হিউম্যানয়েড রোবটের পরীক্ষা চালাচ্ছে। শেনজেনভিত্তিক ইউবিটেক রোবোটিকস একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় ভিয়েতনাম সীমান্তে হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের চুক্তি সই করেছে।

এই পরীক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে ‘ওয়াকার এস২’, যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উন্মোচন করা উন্নত মানের হিউম্যানয়েড রোবট। এটিকে বিশ্বের প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যে রোবট নিজেই নিজের ব্যাটারি পরিবর্তন করতে পারে।

এর ফলে এই রোবট দীর্ঘ সময় ধরে নিজে থেকেই কাজ করতে সক্ষম, যা লজিস্টিক, কাস্টমস ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক বৈশিষ্ট্য।

হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে চিনের বিশেষ চেষ্টা

সর্বশেষ ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন চীন হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির চেষ্টা আরও জোরদার করছে। চীনের কোম্পানি ইউনিট্রি রোবোটিকস সম্প্রতি একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মানুষের সঙ্গে হিউম্যানয়েড রোবটদের মার্শাল আর্ট প্রদর্শন করে দেখিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ‘ম্যাজিকল্যাব’ একই অনুষ্ঠানে রোবটদের নাচের প্রদর্শন করেছে। আবার ‘নোয়েটিক্স রোবোটিকস’ অবিকল মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড প্রদর্শন করেছে। বেইজিংভিত্তিক ‘গ্যালবট’ এমন রোবট দেখিয়েছে, যেগুলো আখরোট ভাঙা, সসেজ বানানো ও কাপড় ভাঁজ করার মতো দৈনন্দিন কাজ করতে সক্ষম।

সিএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান শ্রম খরচ ও কমতে থাকা কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যেও বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চীন রোবোটিকস খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের তথ্যমতে, চীন বিশ্বের বৃহত্তম ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট বাজার হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী যত রোবট বসানো হয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি হয়েছে চীনে।

অবশ্য বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবট মূলত বিনোদন ও প্রদর্শনীতে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে চীন সরকারের বিপুল ভর্তুকিতে কয়েক ডজন কোম্পানি এগুলোকে বর্তমানে কারখানা, লজিস্টিক সেন্টার ও গবেষণাগারে পরীক্ষা করছে।

ছবিটি এক্সে দেওয়া ভিডিও থেকে নেওয়া
ছবিটি এক্সে দেওয়া ভিডিও থেকে নেওয়া

Thursday, December 11, 2025

চীনের ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্রের’ ভবিষ্যৎ কী by লুদোভিক সুবরাঁ

চীনে এখন আরেকটি বড় রূপান্তর চলছে। বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন দ্রুত একটি ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছে। এর অর্থনীতি দিন দিন কার্বনমুক্ত জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এই নতুন মডেলে অনেক সম্ভাবনা আছে। তবে বড় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

কার্বনমুক্ত প্রযুক্তির উৎপাদনে চীন এখন বিশ্বের একক নেতা। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও ব্যাটারির যন্ত্রপাতি উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। শুধু সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক উৎপাদনের ৮০ শতাংশের বেশি চীনেই হয়। এ বিশাল উৎপাদনের কারণে খরচ অনেক কমে গেছে। যেমন গত ১০ বছরে সৌর প্যানেলের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।

চীন বিরল মৃত্তিকা খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’-এর দখলও অনেকটা নিজের হাতে নিয়েছে। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু টারবাইন ও এআই সেন্সর তৈরিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের রেয়ার আর্থ মজুতের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং উৎপাদন ও পরিশোধনের প্রায় ৭০ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে, বিশেষ করে এআই খাতে চীনের বিনিয়োগও বড় ফল দিচ্ছে। এখন বিশ্বের মোট এআই গবেষকদের অর্ধেকের বেশি চীনে কাজ করেন। বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত এআই পেটেন্টের প্রায় ৭০ শতাংশ চীনের। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার উদ্ভাবন সূচকেও চীন এখন শীর্ষ দশে। এই সবকিছু মিলিয়ে ওপর নির্ভরশীল।

কাঁচামাল, উচ্চ প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন, নতুন শিল্প ও জ্বালানিব্যবস্থার নকশা এবং অর্থায়ন—সবকিছুতেই চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি রেয়ার আর্থ চায় বা কোনো উন্নয়নশীল দেশের যদি পরিষ্কার জ্বালানি অবকাঠামো দরকার হয়, তাকেও চীনের দিকে তাকাতে হচ্ছে। কিন্তু এখানেই একটি বড় ঝুঁকি আছে। চীন যতই শক্তিশালী রপ্তানিকারক হোক, তবু তার অর্থনীতি এখনো বাইরের চাহিদার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অথচ চীন সেই নির্ভরতা কমাতে চাইছে। বিশ্বে যখন সুরক্ষাবাদ বাড়ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সরবরাহব্যবস্থা চীন থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তখন এ নির্ভরতা চীনের জন্য দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যাগত সংকট। চীনের শ্রমক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জন্মহার কমে গেছে প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে। ফলে শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আয় ও ভোগ কম বাড়তে পারে। এতে ভোগনির্ভর অর্থনীতিতে যাওয়ার যে পরিকল্পনা, তা বাধাগ্রস্ত হবে। আবাসন খাতও বড় সমস্যা তৈরি করছে।

এ অবস্থায় চীন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা একটি উদ্ভাবনী, কম কার্বননির্ভর শিল্প অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করেছে। এ অর্থনীতি বিশ্বকে নেট জিরো এবং এআই বিপ্লবের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্র’ টেকসই করতে হলে চীনকে তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি আনতে হবে।

প্রথমত, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। শুধু আরও রোবট বা কারখানা দিয়ে নয়; বরং উদ্ভাবন, দক্ষতা বৃদ্ধি, ভালো ব্যবস্থাপনা এবং সেবা খাত উন্নয়নের মাধ্যমে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপির তুলনায় গবেষণায় ১০ শতাংশ বেশি ব্যয় করলে উৎপাদনশীলতা ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় চাহিদা বাড়াতে হবে। মানুষের আয় ও সম্পদ বাড়াতে হবে। ভোক্তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেবা খাত, যেমন প্রবীণদের যত্ন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি শিল্প ও আবাসন খাত থেকে শ্রমিক সরিয়ে ভোক্তানির্ভর খাতে আনতে হবে।

তৃতীয়ত, বাইরের নির্ভরতা সামলাতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। আত্মনির্ভরশীলতা জরুরি। তবে পাশাপাশি কৌশলগত অংশীদার, স্থিতিশীল বাণিজ্য সম্পর্ক ও স্বচ্ছ সহযোগিতার কাঠামোও দরকার।

* লুদোভিক সুবরাঁ, জার্মানিভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আলিয়াঞ্জের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা (সিআইও) ও প্রধান অর্থনীতিবিদ
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

চীনের অর্থনীতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে
চীনের অর্থনীতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এএফপি

Saturday, November 8, 2025

ইলন মাস্ক মঞ্চে নাচলেন, সঙ্গী হলো রোবট

বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক গতকাল বৃহস্পতিবার কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা চলাকালে রোবটের সঙ্গে নেচেছেন। এক ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা ইলন মাস্কের জন্য প্রায় এক লাখ কোটি ডলারে বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করার পর তিনি নেচে নেচে উদ্‌যাপন করেন।

টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা গতকাল টেক্সাসের অস্টিনে বার্ষিক সাধারণ সভায় অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ইলন মাস্কের জন্য একটি বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করেন। এ বেতন প্যাকেজের আওতায় আগামী এক দশকে ধাপে ধাপে তাঁকে শেয়ার আকারে প্রায় এক লাখ কোটি ডলার অর্থ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নতুন বেতন প্যাকেজ অনুমোদনের পর মুহূর্তের মধ্যেই মাস্ক মঞ্চে উঠে আসেন। সেখানে উপস্থিত থাকা মানুষেরা তখন উল্লাসে মেতে ওঠেন। মাস্ক মঞ্চে নাচতে শুরু করেন। তখন মঞ্চে থাকা রোবটও তাঁর নাচের ভঙ্গি অনুকরণ করে নাচতে থাকে।

মাস্ক দর্শকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডারদের অন্য সভাগুলো একঘেয়ে, কিন্তু আমাদের সভাগুলো দারুণ। দেখুন না, এটা কত চমৎকার।’

এরপর মাস্ক ঘোষণা করেন যে টেসলা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তিনি বলেছেন, এ নতুন যুগ শুধু গাড়িতে নয়, রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতেও শুরু হচ্ছে। তিনি তখন ইশারায় পাশে থাকা মানবসদৃশ রোবটকে দেখান।

গতকাল টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা প্রায় ১ লাখ কোটি ডলারের বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করেন। এটিকে মাস্কের জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মাস্কের টেসলাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যকে সমর্থন জানিয়েছেন।

কিছু বড় বিনিয়োগকারীর বিরোধিতার পরও গতকাল বেতন প্যাকেজের প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়েছে। তবে টেসলা কর্তৃপক্ষের ধারণা, প্রস্তাবটি অনুমোদন না পেলে মাস্ক হয়তো কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদত্যাগ করতেন।

টেসলা কর্তৃপক্ষ ও নতুন বেতন প্যাকেজ অনুমোদনকারী বিনিয়োগকারীরা বলেছেন, প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের এই বেতন প্যাকেজ দীর্ঘ মেয়াদে শেয়ারহোল্ডারদের জন্যই লাভজনক। কারণ, মাস্ককে বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে টেসলার জন্য নির্ধারিত কিছু যুগান্তকারী লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।

মাস্ককে আগামী ১০ বছরের জন্য যে লক্ষ্যগুলো বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—২ কোটি গাড়ি সরবরাহ করা, ১০ লাখ রোবোট্যাক্সি চালু করা, ১০ লাখ রোবট বিক্রি করা।

মাস্ককে পুরো বেতন প্যাকেজ পেতে হলে, টেসলার বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পেতে হবে। প্রথমে কোম্পানির বর্তমান বাজারমূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারকে ২ লাখ কোটি ডলারে উন্নীত করতে হবে। এর পরে বাজারমূল্যের পরিমাণ ৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে হবে।

নতুন পরিকল্পনার আওতায়, মাস্ক টেসলার শেয়ার হিসেবে ১০ বছরের মধ্যে ৮৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার আয় করতে পারেন। আদতে মাস্ককে ১ লাখ কোটি ডলার দেওয়া হতে পারে, তবে তাঁকে কিছু অর্থ টেসলাকে ফেরত দিতে হবে। এ জন্য তা ৮৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ধরা হয়েছে।

মঞ্চে রোবটের সঙ্গে নাচছেন ইলন মাস্ক
মঞ্চে রোবটের সঙ্গে নাচছেন ইলন মাস্ক। ছবি: এসএমএক্স নামের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া ভিডিওর স্ক্রিনশট

Monday, August 25, 2025

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিশু কাইরান কাজী মাস্কের স্পেসএক্স ছেড়ে এবার কোন চ্যালেঞ্জ নিতে যাচ্ছে

টাইমস অব ইন্ডিয়াঃ মাত্র ১৪ বছর বয়সে ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের স্টারলিংক প্রকল্পে যোগ দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোর কাইরান কাজী। দুই বছর সেখানে কাজ করার পর এবার স্টারলিংক ছেড়ে সে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটাডেল সিকিউরিটিজে কোয়ান্ট ডেভেলপার হিসেবে নিজের দক্ষতা দেখাতে চলেছে।

কাইরান কাজীর বয়স এখন ১৬ বছর। ১৪ বছর বয়সে সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করার পর সে স্পেসএক্সে যোগ দিয়েছিল। কাইরান বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী প্রকৌশলীদের একজন।

এই কিশোর প্রকৌশলী এবার কোয়ান্টিটেটিভ ফাইন্যান্সে তার অনন্য প্রতিভা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা দেখাতে চলেছেন। পেশা জগতে বয়সভিত্তিক পক্ষপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠাই হচ্ছে তার উদ্দেশ্য।

কাইরান কাজীর অসাধারণ যাত্রা শুরু হয় মাত্র ১৪ বছর বয়সে সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে। সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ১৭০ বছরের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ স্নাতক হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এটি তার ব্যতিক্রমী বুদ্ধিমত্তা, একাগ্রতা ও চাপের মধ্যে সফল হওয়ার ক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

কাইরান কাজীর শৈশব

কাইরান কাজীর বাবা মুস্তাহিদ কাজী কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং মা জুলিয়া কাজী ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করা একজন আর্থিক পেশাজীবী। অর্থাৎ কাইরানের জন্ম এমন একটি পরিবারে, যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আর্থিক কৌশল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

এ ছাড়া একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন হিসেবে বেড়ে ওঠার কারণে কাইরান কাজী সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষাগত প্রত্যাশার একটি অনন্য মিশ্রণের সঙ্গে শৈশবেই পরিচিত হয়।

এসবের প্রভাবে ছোটবেলা থেকেই গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠে ছোট্ট কাইরান, যা তার অসাধারণ অর্জনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

কাইরান কাজীর শিক্ষাজীবন অন্য সব শিশুর মতো ছিল না। সে তার সহপাঠীদের চেয়ে অনেক আগে কলেজে লেখাপড়া শুরু করে এবং মাত্র ১১ বছর বয়সে লাস পোসিটাস কলেজ থেকে গণিতে অ্যাসোসিয়েট অব সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করে।

২০২৩ সালে সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করে ইতিহাস সৃষ্টি করে কাইরান কাজী। প্রতিষ্ঠানটির ১৭০ বছরের ইতিহাসে সে–ই হচ্ছে সর্বকনিষ্ঠ স্নাতক।

শুধু শিক্ষাগত অর্জনের ক্ষেত্রেই নয়; বরং সেখানে সে নেতৃত্বের গুণাবলিও প্রদর্শন করেছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সে অ্যাসোসিয়েটেড স্টুডেন্ট গভর্নমেন্টের সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। সে ক্যাম্পাসে নানা উদ্যোগে অংশ নিয়েছে এবং ছাত্র–নেতৃত্বাধীন প্রকল্পগুলোর প্রচার করেছে।

স্পেসএক্সে যোগদান ও বিদায়

মাত্র ১৪ বছর বয়সে সাহসী এক পদক্ষেপ নেয় কাইরান কাজী। একজন প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেয় মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের স্টারলিংকে।

স্টারলিংক প্রকল্পে তার কাজের মধ্যে ছিল জটিল প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে সংস্থাটির বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের লক্ষ্য পূরণে অবদান রাখা।

স্পেসএক্সে কাইরান কাজীর ভূমিকা তাকে প্রযুক্তি খাতে অন্যতম কম বয়সী প্রকৌশলী রূপে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও স্বীকৃতি এনে দিয়েছে এবং দেখিয়েছে যে বয়স কম হলেও উদ্ভাবনের সর্বোচ্চ স্তরের কাজ করার কতটা ক্ষমতা সে রাখে।

২০২৫ সালে কাইরান কাজী তার মনোযোগ মহাকাশ প্রকৌশল থেকে আর্থিক প্রযুক্তি খাতে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে নিউইয়র্ক নগরভিত্তিক একটি শীর্ষ কোয়ান্টিটেটিভ ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান সিটাডেল সিকিউরিটিজে কোয়ান্ট ডেভেলপার হিসেবে যোগ দেয়।

এখানে সে প্রকৌশল ও পরিমাণগত সমস্যা সমাধানের সংযোগস্থলে কাজ করবে এবং ট্রেডার এবং প্রকৌশলীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে বৈশ্বিক ট্রেডিং ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কাজ করবে।

বয়সভিত্তিক পক্ষপাত মোকাবিলা এবং বড় অর্জনের পথে কাইরান কাজীর যাত্রা

অসাধারণ দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কাইরান কাজীকে বয়সের কারণে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রখ্যাত ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ‘ভোগ’–এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কাইরান বলেছিল, সে পুরোনো ধ্যানধারণার প্রাপ্তবয়স্কতাবাদ এবং এ ধরনের নিয়োগ সংস্থা থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তারা প্রতিভার চেয়ে বয়সকে বেশি গুরুত্ব দিত।

কাইরানের জীবনবৃত্তান্তে তার নানা অর্জনের কথা লেখা থাকত। এর পরও অনেক নিয়োগকর্তা তার বয়সকে তার যোগ্যতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন।

কাইরান কাজীর পেশাগত খাতে যাত্রা একটি বিস্তৃত সমস্যা তুলে ধরেছে। সেটা হলো, বয়স বা অভিজ্ঞতার প্রচলিত প্রত্যাশার চেয়ে দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া কতটা জরুরি।

কাইরান কাজী শুধু একজন প্রতিভাবান শিশু নয়, সে একজন পথপ্রদর্শকও। সে দেখিয়েছে, ছোটবেলা থেকেই অভিজ্ঞতা, কৌতূহল ও দৃঢ়সংকল্পের মাধ্যমে কী কী অর্জন করা যেতে পারে।

১৪ বছর বয়সে কলেজ থেকে স্নাতক পাস করা থেকে শুরু করে স্পেসএক্সে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এবং এখন সিটাডেল সিকিউরিটিজে কোয়ান্টিটেটিভ ফাইন্যান্সে পদার্পণ করা—তার যাত্রা বিশ্বজুড়ে কমবয়সী উদ্ভাবকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

কাইরান কাজী প্রমাণ করেছে, প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের সংমিশ্রণ কীভাবে প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে তরুণ পেশাজীবীদের জন্য সম্ভাবনার ধারণা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-23%2Fkd0mnt8z%2FKairan-Quazi.avif?rect=0%2C0%2C404%2C269&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাইরান কাজী। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

Monday, June 2, 2025

সমুদ্রের তলদেশে ১ লাখ ৪০ হাজার বছরের বেশি পুরোনো শহরের খোঁজ

ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার বছরের বেশি পুরোনো শহর খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। জাভা ও মাদুরা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী মাদুরা প্রণালিতে পলি ও বালুর স্তরের নিচে থাকা এই শহরে মানুষের প্রাচীন পূর্বপুরুষ হোমো ইরেক্টাসের খুলিও পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, সুন্দাল্যান্ড নামের একটি প্রাগৈতিহাসিক ভূমির অংশ ছিল শহরটি। একসময় এই এলাকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমভূমির অংশ ছিল। আর তাই শহরটির আশপাশে মানুষের খুলির হাড়ের পাশাপাশি কোমোডো ড্রাগন, মহিষ, হরিণ, হাতিসহ ৩৬ প্রজাতির প্রায় ৬ হাজার প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। কিছু প্রাণীর জীবাশ্মে কাটা চিহ্ন রয়েছে, যা আদি মানুষের উন্নত শিকার কৌশলের প্রমাণ। নতুন এ আবিষ্কার প্রাচীন মানবজীবন ও হারিয়ে যাওয়া সুন্দাল্যান্ড সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানার সুযোগ করে দিয়েছে।

সমুদ্রের তলদেশে থাকা শহরটির বিষয়ে নেদারল্যান্ডসের লিডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক হ্যারল্ড বার্গুইস বলেন, সেই সময় এই অঞ্চলে হোমিনিন জনসংখ্যার বসবাস ছিল। ১ লাখ ৪০ হাজার বছর ধরে পলির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি খুলি মানুষের প্রাচীন পূর্বপুরুষ হোমো ইরেক্টাসের সময়কার বলে নিশ্চিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আদি মানবজীবন সম্পর্কে জানা যাবে।

শহরটিতে দুটি হোমো ইরেক্টাস খুলির টুকরার মধ্যে একটি ফ্রন্টাল ও একটি প্যারিটাল হাড় রয়েছে। হাতির মতো বৃহৎ তৃণভোজী স্তন্যপায়ী এক প্রাণীর বিলুপ্ত প্রজাতির জীবাশ্মও শহরটিতে খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণীটি লম্বায় ১৩ ফুট হলেও ওজন ছিল ১০ টনেরও বেশি।

সূত্র: ডেইলি মেইল

সমুদ্রের পলি ও বালুর স্তরের নিচে পুরোনো এক শহর খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা
সমুদ্রের পলি ও বালুর স্তরের নিচে পুরোনো এক শহর খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ফাইল ছবি: পেক্সেলস

Monday, April 21, 2025

ফ্যাসিবাদের নতুন মুখ: প্রযুক্তি, ধর্ম ও ধ্বংসের জোট by নাওমি ক্লেইন ও এস্ট্রা টেইলর

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর দুনিয়াজুড়ে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা নতুন চেহারা নিচ্ছে। দক্ষিণপন্থী আদর্শের ধারক–বাহক এবং অতিধনীরা বিশ্বকে কীভাবে সাজাতে চান, তা নিয়ে লিখেছেন নাওমি ক্লেইন ও এস্ট্রা টেইলর ...

আজকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিতে ভবিষ্যতের এক অন্ধকার ও বিপর্যস্ত চিত্র উঠে আসছে। এই চিন্তার ওপর ভর করে গড়ে উঠছে এক বিশাল জোট। সেই জোটের মধ্যে আছে উগ্র ডানপন্থী আদর্শবাদী, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির মালিক আর দুনিয়াকে ধ্বংস করতে তৎপর পুঁজিবাদ। এরা জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি বা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মতো সংকট না সামলে বরং সংকটগুলোর মধ্যেই মুনাফা খোঁজে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনের প্রচারণার পেছনে ছিলেন পিটার থিয়েল ও ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেররা। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এ রকমের এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। তাঁদের যে রাজনৈতিক প্রকল্প, তা এখন আর সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করার ভানও করছে না। তাঁরা বরং পরিকল্পিতভাবে সেসব প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিচ্ছেন, যেগুলো জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে গঠিত হয়েছিল। এই ধনকুবেররা গড়ে তুলতে চান প্রযুক্তিনির্ভর এক কল্পনাবিলাসী দুনিয়া, যেখানে কর্তৃত্ববাদই একমাত্র নীতি।

* সিলিকন ভ্যালি থেকে আসছে নতুন নতুন তত্ত্ব। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা ছড়িয়ে দিচ্ছেন এমন তত্ত্ব, যেখানে বলা হচ্ছে যে পৃথিবীতে মানুষ আর টিকবে না। সেখানে রাজত্ব করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

* দুনিয়াজোড়া কর্তৃত্ববাদকে কেবল প্রতিহত করলেই হবে না। এমন এক ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাও সামনে আনতে হবে, যার জন্য লড়াই করা যায়। যে আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি হবে মানুষের মর্যাদা।


এই ‘শেষ সময়ের ফ্যাসিবাদের’ কিছু মূল চালিকা শক্তি আছে। সেগুলো হলো দুনিয়া যে ধ্বংস হবে, তা নিয়তিনির্ধারিত। আর তাঁরাই হচ্ছেন সেই ধ্বংসের মধ্য দিয়েও টিকে থাকার মতো শ্রেষ্ঠ মানুষ। জলবায়ু বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং গণতান্ত্রিক নিয়মের অবক্ষয়ের মুখে এঁরা পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন না। তাঁরা বরং ভাবছেন কীভাবে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবী থেকে নিজে রক্ষা পেয়ে ক্ষমতার একচেটিয়া দখল নেওয়া যায় অথবা কীভাবে এই ধ্বংসাবশেষের ওপর আধিপত্য বজায় রাখা যায়।

হামাস ইসরায়েলে মারাত্মক আক্রমণ চালালে পুরো বিশ্ব বিস্মিত হয়ে দেখল যে প্রবল প্রতাপশালী ইসরায়েলের প্রায় ১ হাজার নাগরিক নিহত হলো। তাদের অনেকেই ছিল সাধারণ নাগরিক। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এর পাল্টা জবাব দিতে কোনো দেরি হলো না। এরপরের মাসেই আক্রমণ করল ইসরায়েল।

সেই আক্রমণ ছিল পৈশাচিক ও নির্মম। গাজায় লাগাতার সামরিক আক্রমণে প্রাণ হারাল প্রায় ৩৩ হাজার নাগরিক। এদের মধ্যে ছিলেন হাজার হাজার শিশু ও নারী। সেই সংখ্যা এখনো বেড়েই চলেছে। সেখান থেকে যে ছবি আর খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে পুরো বিশ্ব শিউরে উঠছে।

গাজাতে এই মানবিক বিপর্যয়ে পৃথিবীর সব মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই সেদিকে গেছে। তবে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর এক মতাদর্শিক সংগ্রাম। এই সংগ্রাম যে কেবল মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজ করছে, এমন নয়। এই লড়াই চলছে আসলে দুনিয়াজুড়ে।

এসবের মধ্যে আমরা আসলে যা দেখছি, তাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে নাম দিয়ে তা হলো—‘ফ্যাসিবাদের শেষ সময়’। এ ছাড়া আর কোনোভাবে একে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর মধ্যে মিশে আছে কিছু বিষয়। একদিকে দুনিয়া কেমন করে শেষ হয়ে যাবে সেই বিষয়ে ধর্মীয় ধারণা। তার সঙ্গে এসে জুড়েছে অতিজাতীয়তাবাদী আর কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি। এসবের মধ্য দিয়ে দুনিয়াজুড়ে বিভিন্ন দেশের মৈত্রী নতুন আকার পাচ্ছে। আর ফাঁকতালে দুনিয়াজুড়ে বিপদে পড়েছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।

পুরোনো মৈত্রী নতুন আদলে

বেশ কয়েক দশকজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান, জায়নবাদী ও ইসরায়েলি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কট্টরপন্থী অংশ বিশ্বজুড়ে খুব অটুট এক বোঝাপড়ার মধ্যে ছিল। এটা খুব কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার যে এদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল খুব সুসংহত। জন হ্যাগির মতো ইভানজেলিক্যাল নেতা দাবি করেছিলেন যে হারিকেন ক্যাটারিনা ছিল ‘স্রষ্টার পাঠানো এক শাস্তি। অপরাধ কী?’

অপরাধ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সমস্যার দুই রাষ্ট্র সমাধান সমর্থন করা। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে সমর্থন করার কারণ ইহুদিদের নিরাপত্তা দেওয়া নয়। এই সমর্থন দিতে হবে, কারণ দুনিয়া শেষের যে লড়াই আর যিশুর দ্বিতীয় আগমনের জন্য ইহুদিদের জমায়েত হওয়াটা পূর্বশর্ত। তাই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে হবে, এই হলো জন হ্যাগির বিশ্বাস।

ওদিকে ইসরায়েলে জায়নবাদী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলো প্রতিনিধিত্ব করে ধর্মতত্ত্ব আর জাতীয়তাবাদের মিশ্রণের। এ রকম দুটি দল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কোয়ালিশনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই দলগুলো তাদের মতাদর্শিক অনুপ্রেরণা পায়, যার কাছ থেকে তাঁর নাম মেইর কাহানে। একসময় এই কাহানেকে ইসরায়েল রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করেছিল তাঁর অতি কট্টর খোলাখুলি বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। আর আজ কাহানের শিষ্যরা ইসরায়েলের নীতি নির্ধারণ করে।

কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো এই ‘ত্রাতাবাদী’ জোট যে কেবল প্রতীকী, এমন নয়। এই মৈত্রীর আছে সরাসরি আর হিংসাত্মক ফলাফল। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গেভির বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের স্বেচ্ছায় গাজা থেকে চলে যেতে উৎসাহিত করা। আবার ইসরায়েলের ডাক দেন ফিলিস্তিনের সব শহরকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার।

এই মন্ত্রীরা কিন্তু একটা ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথা বলছেন। তাঁরা ফিলিস্তিনের ওপর চালানো এই পৈশাচিক হামলাকে দেখেন স্রষ্টানির্ধারিত এক কাজ হিসেবে। এই হিসেবেই তাঁদের কাছে কোনো শিশু বা নারী হত্যা অপরাধ বলে মনে হয় না।

দুনিয়া ধ্বংসের প্রস্তুতি থেকে কোটিপতিদের গোপন বাংকার


২০১৭ সালে নিউইয়র্কার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে ধনীদের এক নতুন পরিকল্পনা। একে বলা হচ্ছে ‘ডুমসডে প্রিপারিং ফর দ্য সুপার রিচ।‘ অর্থাৎ সমাজে বড় ধস নামলে বেঁচে থাকার জন্য ধনীদের তৈরি বিশেষ পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ধনকুবের ও হেজ ফান্ড মালিকেরা তখন নিউজিল্যান্ড ও হাওয়াইয়ে বিলাসবহুল বাংকার তৈরি করছিলেন। সেখানে থাকছে ব্যক্তিগত বিমানঘাঁটি, গোপন পালানোর পথ, এমনকি ভূগর্ভস্থ নিরাপদ কক্ষ।

হাওয়াই দ্বীপ কাওআইতে তৈরি মার্ক জাকারবার্গের ‘ছোট্ট আশ্রয়স্থল’ বা পিটার থিয়েলের বিশাল নিউজিল্যান্ড এস্টেট। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা বা হুজুগ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এগুলো একধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। এই ধনীরা মনে করছেন যে সমাজের ধস অনিবার্য। ফলে পুরোনো পৃথিবী বসবাসের একেবারে অযোগ্য হয়ে যাবে। ফলে তারা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজেদের মতো করে ব্যবস্থা করে রাখছেন।

এই প্রবণতার সঙ্গে মিল রেখে সিলিকন ভ্যালি থেকে আসছে নতুন নতুন তত্ত্ব। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা ছড়িয়ে দিচ্ছেন এমন তত্ত্ব, যেখানে বলা হচ্ছে যে পৃথিবীতে মানুষ আর টিকবে না। সেখানে রাজত্ব করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একটু খোঁজ নিলেই বোঝা যায়, এগুলোর মধ্যে মিশে আছে ইউজেনিকস বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। এসবের মূল কথা হচ্ছে—কে বাঁচবে আর কে মরবে, তা ঠিক করবে বাজার; যার হাতে বাজারের মালিকানা, তারাই টিকে থাকবে। যারা বাজারে দুর্বল তারা অনিবার্যভাবেই টিকে থাকার যোগ্য নয়।

এগুলোর মধ্যে ‘লংটারমিজম’ নামে এক মতবাদ বলে যে ভবিষ্যতে এক ট্রিলিয়ন মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে। অথচ তারা বর্তমানের কোটি কোটি মানুষের দুঃখ-কষ্টকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। এই মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বিশ্বাস হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একদিন মানুষের চেয়ে উন্নত হবে। তখন প্রযুক্তিই হবে নতুন সভ্যতা; পৃথিবীতে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না।

ইলন মাস্ক তো একবার বলেই ফেলেছিলেন, ‘মানবজাতি হচ্ছে কেবল ডিজিটাল সুপারইন্টেলিজেন্সের জেনেটিক বুটলোডার।’ অর্থাৎ মানুষ হচ্ছে একধরনের অস্থায়ী যন্ত্র। এই মানুষকে অতিক্রম করে তৈরি হবে আরও উন্নত কিছু। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ ‘পরিত্যাজ্য’।
ধ্বংসই উদ্দেশ্য

এই আদর্শগুলো বা মতবাদগুলো কোনো সংকটের সমাধান দিতে রাজি নয়। তারা বরং সংকটকে সাদরে বরণ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন পরিবেশ আইন, জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিষ্ঠান বা তহবিল অবলীলায় বন্ধ করে দিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তারা পরিকল্পিত এক বিপর্যয় তৈরি করতে চাইছে। এই অরাজকতা যত বাড়বে, মানুষ তত নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্যক্তিগত প্রস্তুতি নেবে। সমাজ বা সামগ্রিক চিন্তা আর কারও মাথায় থাকবে না। তারা তখন কেবল প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়বে। একবার এই চক্র শুরু হলে এতে লাভ হয় ধনীদের।

স্পেনে একদল জলবায়ু অধিকারকর্মী প্রতিবাদ করে বলছেন, ‘তোমাদের ক্লাউড সিস্টেম টেকাতে গিয়ে আমাদের নদী শুকিয়ে যাচ্ছে।’ অর্থাৎ এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালাতে যে বিপুল ডেটা সেন্টার লাগছে, তা স্থানীয় পানি শেষ করে দিচ্ছে। এখানে ‘ক্লাউড’ বা ‘তথ্যমেঘ’ কেবল রূপক নয়, এটি একটি বাস্তব সত্যের প্রতীক।

শেষ সময়ের পুঁজিবাদ আসলে এই পৃথিবীকে ধ্বংস করে গড়ে তুলছে এক ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া। আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য বিদ্যুতের চাহিদা তিন গুণ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য বা পারমাণবিক জ্বালানি যথেষ্ট দ্রুত বাড়ছে না। ফলে এখনো মূল ভরসা জীবাশ্ম জ্বালানি।

গুগলের সাবেক সিইও এরিক শ্মিট স্বীকার করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের জন্য লাগবে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রকল্প, পানি ও বিরল খনিজ। তারা (প্রযুক্তনির্ভর ধনিক শ্রেণি) যেন পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ আগ্রহী নন। কারণ, তারা আর এই পৃথিবীকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে না। একে কাজে লাগিয়ে কেবল অল্প কয়েকজন টিকে থাকাই তাদের কৌশল।

তবে এই প্রযুক্তিনির্ভর অতিধনীরা চিন্তিত অন্য কিছু নিয়ে। আর তা হলো তাঁদের এসব পরিকল্পনার মধ্যে সরকারের হস্তক্ষেপ। তাঁদের ভয়, যদি সরকার কর চাপানো শুরু করে, যদি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, যদি তাঁদের এসব বেহিসাবি কাজ বন্ধ করতে বলা হয়, তখন কী হবে? তাদের কাছে আসল মহাপ্রলয় হলো জবাবদিহির ভয়।

সংকটের পর সংকট

সম্প্রতি কয়েকটি সংকট এই সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে আছে পরিবেশ। একে আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। তাপমাত্রা গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে হয়ে উঠেছে অসহনীয়। বাস্তুতন্ত্র পড়ছে ভেঙে। এসব সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া বা ঢেকে রাখার এখন আর কোনো উপায় নেই। আর আমাদের অতিধনীরা মুখে মুখে এসব বিশেষ গুরুত্ব না দিলেও তলেতলে তাঁরা নিজেদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন।

এই তো কিছুদিন আগে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেখা গেল যে আমাদের এই মানুষের পৃথিবী কত সহজে উলটপালট হয়ে যেতে পারে। দেখা গেল কেমন করে ভয়কে কাজে লাগিয়ে চমৎকার ব্যবসা করা যায়। সেই অতিমারি কেবল এক স্বাস্থ্যসংকট ছিল না। এটা ছিল নজরদারি, কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ আর মানুষের ওপর মানুষের আস্থা ধসিয়ে দেওয়ার নতুন পরীক্ষা।

এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামের আরেক বাস্তবতা। যন্ত্র কোনো একসময় মানুষকে ছাপিয়ে যাবে—এই ভয় আজ যেন বাস্তব হয়ে দেখা দিচ্ছে। যারা এই ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, সেই নতুন প্রযুক্তি অভিজাতেরাই এই ভয়কে বাস্তব করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো এক ভয়—পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়। রিচার্ড সেইমুর যেমন বলেন, ‘দুনিয়া ধ্বংস হবে কবে, তা আর বিষয় নয়, আমরা এক ধ্বংস হওয়া পৃথিবীতেই বাস করছি।’

এই ভয়াবহ ছুটে চলার শেষ কোথায়? এর জন্য তো দরকার দুনিয়াকে দেখার এক বিকল্প দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি কেবল রাজনৈতিক হলে হবে না। তাঁকে হতে হবে একই সঙ্গে নৈতিক ও আত্মিক। দুনিয়াজোড়া কর্তৃত্ববাদকে কেবল প্রতিহত করলেই হবে না। এমন এক ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাও সামনে আনতে হবে, যার জন্য লড়াই করা যায়। যে আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি হবে মানুষের মর্যাদা। যেখানে সব বিশ্বাসের মানুষ কেবল মানুষ হিসেবেই একে অপরকে শ্রদ্ধা করবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব বিশ্বাসের শিকড় হচ্ছে ন্যায্যতা।

এই প্রতিরোধের ইশারা পাওয়া যাচ্ছে ইতিমধ্যে। রাষ্ট্রের হিংস্রতাকে উপেক্ষা করে দুনিয়াজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, সিনাগগ আর চার্চে, অন্য অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষার কথা জানাচ্ছেন।

* নাওমি ক্লেইন লেখক ও অধিকারকর্মী

* এস্ট্রা টেইলর লেখক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

- গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ জাভেদ হুসেন

ফ্যাসিবাদের নতুন মুখ: প্রযুক্তি, ধর্ম ও ধ্বংসের জোট

Monday, February 24, 2025

সুপারবাগ সমস্যার সমাধান করে দিল এআই, সময় নিল মাত্র ৪৮ ঘণ্টা

নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি সুপারবাগ রহস্য সমাধান করেছে, যা দেখে রীতিমতো অবাক বিজ্ঞানীরা । বিবিসি জানিয়েছে, মাইক্রোবায়োলজিস্টরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জটিল সমস্যাটি বোঝার জন্য কাজ করছেন। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক জোসে পেনাডেস এবং তার দল বছরের পর বছর ধরে গবেষণা  করে আসছেন কেন সুপারবাগ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। সুপারবাগ হল এমন ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক যা একাধিক অ্যান্টিবায়োটিককে অতি সহজে হারিয়ে দিয়েছে। এই জীবাণুকে অতি সহজে শেষ করা কঠিন। যদি আপনি অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়টিক নিয়ে থাকেন তাহলে আপনার দেহে এই সুপারবাগের জন্ম নিজে থেকেই হয়ে যাবে। একে সহজে ওষুধ দিয়ে নষ্ট করা যায় না। এর ক্ষমতা এতটাই বেশি যে একে নিয়ে বহুদিন ধরেই চিন্তায় ছিলেন বিজ্ঞানীরা।

অধ্যাপক জোসে গুগলের এআই টুল 'কো-সায়েন্টিস্ট'-কে এই রহস্য সমাধানের দায়িত্ব দেন।  সকলকে অবাক করে দিয়েছে এআই টুলটি ।  দু দিনের মধ্যে এই সুপারবাগের ওষুধের ফর্মুলা বাতলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ।  সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অধ্যাপক জোসে পেনাডেসের  গবেষণাটি এখনও প্রকাশিত হয়নি, যার অর্থ হল এআই  পাবলিক ডোমেইন থেকে এটি অ্যাক্সেস করতে পারত না।  পেনাডেস ভাবতে শুরু করেন যে এআই কি কোনওভাবে তার সিস্টেম থেকে তথ্যটি সংগ্রহ করেছে। পেনাডেস এবং তার গবেষকদের দল কিছু সুপারবাগ, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া তৈরির দিকে নজর দিচ্ছিল। তাদের তত্ত্ব ছিল যে সুপারবাগগুলি  ভাইরাসের সাহায্যে  এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে স্থানান্তরিত হতে পারে। এই অনুমানটি গবেষণা দলের কাছেই  ছিল এবং কোথাও প্রকাশিত বা শেয়ার  করা হয়নি। কিন্তু গুগলের এআই টুল এই হাইপোথিসিসকেই মান্যতা দিয়েছে এবং সমাধান বাতলে দিয়েছে।

এবার বিজ্ঞানীরা এই সমস্যার সমাধান অতি সহজেই করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদি এটি দ্রুত তৈরি করা যায় তাহলে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেবে এই সুপারবাগ। এটি এমন একটি জীবাণু যাকে সহজে শেষ করা যায় না। অতি দ্রুত এটি দেহের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে দেহের নানা অংশকে ধ্বংস করতে শুরু করে সুপারবাগ।পেনাডেস বলেছেন যে এআই টুলটি কেবল তার গবেষণার প্রতিলিপি তৈরি করেনি বরং   প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।তিনি বলেন যে এআই কেবল সঠিক অনুমানই প্রদান করেনি বরং আরও চারটি অনুমানের পরামর্শ দিয়েছে, যার সবকটিই বৈধ।  

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

Thursday, January 23, 2025

পারকিনসন্সের চিকিৎসায় 'ব্রেনসেন্স' প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুগান্তকারী সাড়া

পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় ব্রেন ইমপ্লান্টের পদ্ধতিকে ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (DBS) বলা হয়। এটি একটি নিউরোসার্জিক্যাল পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ইলেক্ট্রোড ইমপ্লান্ট করা হয়। এই ইলেক্ট্রোডের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো হয়, যা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিবর্তন করে।

পারকিনসন্সে আক্রান্ত যুক্তরাজ্যের উত্তর-পূর্বের  লোকেরা ব্রেন ইমপ্লান্টের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বের মধ্যে প্রথম। সান্ডারল্যান্ডের কেভিন হিলের মতো রোগী, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত এইচজিভি ড্রাইভার  ২০১৭ সাল থেকে পারকিনসন্সে আক্রান্ত।  ইতিমধ্যেই তার মস্তিষ্কে ইমপ্লান্ট এবং বুকে একটি ছোট কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিচালিত ‘গভীর মস্তিষ্কের উদ্দীপনা’ প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হয়েছেন। ব্রেনসেন্স নামে পরিচিত এই প্রযুক্তিটি রোগীর লক্ষণগুলো পরিচালনা করতে বৈদ্যুতিক বার্তা প্রেরণ করে।

ব্রেনসেন্স প্রযুক্তিটি কেভিনের ইমপ্লান্টের উপর ভিত্তি করে কাজ করবে ।  রোগীকে তাদের প্রয়োজনীয়  পরিবর্তনের সাথে সাথে  সামঞ্জস্য করার জন্য আর হাসপাতালে ফিরে যেতে হবে না।

ক্রনিকেল লাইভ-এর  প্রতিবেদনে বলা হয়,  কেভিন জানাচ্ছেন- ইমপ্লান্টের আগে আমি শরীরে কম্পন অনুভব করতাম।  যা আমার ঘুমকে প্রভাবিত করেছিল এবং আমার কাঁধ, হাত ও পায়ে ভয়ানক ব্যথা হতো। এটি আমাকে মানসিকভাবেও প্রভাবিত করেছিল। আমি সত্যিই আত্মসচেতন হয়ে উঠেছিলাম এবং অন্য লোকদের সঙ্গে দেখা করতে চাইতাম না।

কেভিনের কথায়, ‘ আমি যে ওষুধ খাচ্ছিলাম  তা  কাজ করছিল না এবং আমাকে আমার চাকরিও ছেড়ে দিতে হয়েছিল। যখন আমাকে ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন রেফার করা হয়েছিল, তখন আমাকে বলা হয় এটি প্রভাব ফেলতে কিছুটা সময় নিতে পারে। কিন্তু ব্রেনসেন্স প্রযুক্তিটি  আমার শরীরে  দুর্দান্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। এটি আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে এবং আমার কাঁপুনি, ব্যথা ও  বেদনাকে সম্পূর্ণরূপে সারিয়ে দিয়েছে। আমি আমার জয়েন্টগুলোতে আরও নমনীয়তা দেখতে পেয়েছি এবং আমার ঘুমের সমস্যা অনেকটা কমেছে । আমি আবার জীবনকে উপভোগ করছি, স্নুকার খেলছি এবং বাইকে উঠছি।‘

কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন আকবর হোসেনের প্রযুক্তির প্রতি অনুরাগ নিউক্যাসল হাসপাতালকে এই অসাধ্য সাধন করতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, ‘পারকিনসন্স রোগের প্রতিটি ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আলাদা এবং অনন্য। রোগের অগ্রগতির সাথে সাথে লক্ষণগুলো পরিবর্তিত হয়, তবে সেগুলো একদিনের মধ্যেও পরিবর্তিত হতে পারে। নিউক্যাসল ছিল যুক্তরাজ্যের প্রথম হাসপাতাল যেখানে ব্রেনসেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে । এই সিস্টেমটি ব্যবহার করে  আমরা রোগীদের উন্নত জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি ।‘

ডাক্তার আকবর হোসেন  জানাচ্ছেন যে,  ব্রেনসেন্স প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয়তা ‘আশ্চর্যজনক’ ছিল।  ডিভাইস দ্বারা মস্তিষ্কে প্রদত্ত বৈদ্যুতিক আবেগগুলো রোগীদের  বুকে থাকা ডিভাইস থেকে  স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং সমন্বয় করা যায়। ব্যক্তির মধ্যে উৎপন্ন জৈবিক সংকেত ইমপ্লান্ট দ্বারা প্রদত্ত চিকিত্সা পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা দেখিয়েছে । এই পরিবর্তনগুলো মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যে ঘটতে পারে। যার অর্থ নতুন এই চিকিত্সা পদ্ধতি প্রতিটি ব্যক্তির সঠিক প্রয়োজনের জন্য সত্যিই প্রতিক্রিয়াশীল। আমি সত্যিই উত্তেজিত এবং গর্বিত যে, আমরা আমাদের রোগীদের এই পরিষেবা অফার করতে পেরেছি।'

ব্রেনসেন্স প্রযুক্তিটি তৈরি করেছে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিক। সেখানকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট আমাজা রেইটমেয়ার বলেছেন যে, ‘নতুন প্রযুক্তির অর্থ পারকিনসন্সের রোগীদের তাদের শারীরিক সমস্যা নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।' যুক্তরাজ্যে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মানুষ মানুষ পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত।

উল্লেখ্য যে, নিউরোসার্জন আকবর হোসেনের বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে। তিনি বিলেত প্রবাসী মাহতাব মিয়ার জামাতা। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. নাজিবার স্বামী।

mzamin

Saturday, January 11, 2025

ঘুমন্ত অবস্থায় এআই ব্যবহার করে ১০০০ চাকরিতে আবেদন

বিষয়বস্তু তৈরি এবং লেখার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনের পর থেকে, কার্যত প্রত্যেকেই যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তারা কোন না কোন উপায়ে এর কার্যকারিতা প্রত্যক্ষ করেছে। এআই সরঞ্জামগুলি এখন সাধারণ হয়ে উঠেছে, যা লোকদের জীবনবৃত্তান্ত, কভার লেটার, সমঝোতা স্মারক এবং চাকরির আবেদনে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন নথি তৈরি করতে সহায়তা করে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এই সব কাজ করে কিভাবে? একজন চাকরিপ্রার্থী যিনি ১০০০ টি পদের জন্য আবেদন করেছেন তাদের মধ্যে ৫০ টির জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছেন – তাও আবার যখন তিনি  ঘুমাচ্ছিলেন। ওই ব্যক্তি  তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে  বলেছেন  এআই বট ব্যবহার করে তার কাজের সন্ধানে ব্যাপকভাবে সুবিধা হয়েছে। তিনি যখন বিছানায় আরামে শুয়েছিলেন তখন এই  শ্রমসাধ্য কাজ সম্পন্ন করেছে এআই বট। এআই-কে প্রার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করার জন্য প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল, যার উপর ভিত্তি করে ওই ব্যক্তি  ঘুমানোর সাথে সাথে অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছে এটি। Reddit 'Get Employed' ফোরামে, ওই ব্যবহারকারী দাবি করেছেন যে তিনি একটি এআই বট তৈরি করেছেন যা "প্রার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে, চাকরির বিবরণ পরীক্ষা করে, প্রতিটি কাজের জন্য অনন্য সিভি এবং কভার লেটার তৈরি করে। নিয়োগকারীরা যে প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করেছে  তার উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছে। মাত্র এক মাসে, এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করে ৫০ টি ইন্টারভিউ সম্পন্ন করা গেছে। এআই বটটি রাতারাতি  প্রতিটি কাজের বিবরণের উপর ভিত্তি করে কাস্টমাইজড সিভি এবং কভার লেটার তৈরি করেছে। এই পদ্ধতিটি স্বয়ংক্রিয় স্ক্রীনিং সিস্টেমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্যভাবে কার্যকর। তবে সেইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে প্রায় এআই যদি নিখুঁত চাকরির আবেদন তৈরী করতে পারে  বাস্তব প্রতিভা কীভাবে সামনে আসবে ?  
mzamin

Tuesday, December 10, 2024

যে সাতটি অস্ত্র নিউক্লিয়ার অস্ত্র থেকেও ভয়ংকর by আরিফুল ইসলাম

নিউক্লিয়ার অস্ত্রকে এখনো সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হিসেবে ধরা হয়, তবে প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান চর্চার বিস্ময়কর অগ্রগতি এমন কিছু অস্ত্রের উদ্ভাবন করেছে যা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের বাইরে গিয়ে মানুষের জীবনধারা, সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই অস্ত্রগুলো শুধুমাত্র ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে না, বরং মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে এমন সাতটি অস্ত্র বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো যা নিউক্লিয়ার অস্ত্রের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।

১. জৈব ও জেনেটিক অস্ত্র: অদৃশ্য শত্রু
জৈব অস্ত্র মানুষের জন্য অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক শত্রু। এতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, বা অন্যান্য সংক্রামক জীবাণু ব্যবহৃত হয়, যা বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর রোগ এবং মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ক্রিস্পর কেস প্রযুক্তি এমন অস্ত্র তৈরির সুযোগ তৈরি করেছে যা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা অঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম। ডিএনএ লক্ষ করে এমন জীবাণু তৈরি সম্ভব যা প্রাকৃতিক মহামারীর চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত ও বিপজ্জনক। এটি এমন ভয়ঙ্কর যে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর জন্য প্রাণঘাতী হলেও উৎপাদনকারীদের জন্য ক্ষতিকর নয়। এছাড়াও এ অস্ত্র দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত এবং স্বাস্থ্যগত প্রভাব সৃষ্টির পাশাপাশি খাদ্য ও পানির সরবরাহ দূষিত করা সম্ভব।

২. সাইবার অস্ত্র: আধুনিক যুদ্ধের নীরব হাতিয়ার
যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর শুধু শারীরিক নয়, এটি ভার্চুয়াল জগতে বিস্তৃত হয়েছে। সাইবার হামলার মাধ্যমে একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অকার্যকর করা সম্ভব। এ অস্ত্রগুলোর সাহায্যে ব্যাংকিং সিস্টেম, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বা সামরিক ডেটা সম্পূর্ণ অচল করা সম্ভব। এছাড়া একটি মাত্র ভাইরাস কোনো দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থা অচল করে দিতে পারে।

৩. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-চালিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক প্রযুক্তি যা মেশিনকে মানবিক চিন্তাভাবনার চেয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে তোলে। এই প্রযুক্তি এখন অস্ত্র ব্যবস্থায় এক বিপ্লব এনে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। এটি এমন বিপদশংকুল অস্ত্র যা মানুষের সিদ্ধান্ত ছাড়াই অস্ত্র ব্যবহার করা যায়। লক্ষ্য নির্ধারণে ভুলের কারণে অসংখ্য নিরীহ মানুষের মৃত্যু হতে পারে মুহূর্তে। মানুষ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ হারালে বৃহৎ আকারের সংঘর্ষ সৃষ্টি হতে পারে আমাদের বিশ্বে।

৪. ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস (ইএমপি) অস্ত্র: একটি বোতামেই অচল পৃথিবী
ইএমপি অস্ত্রের মাধ্যমে পুরো একটি এলাকার সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস অচল করা যায়। এটি এমন একধরনের শক্তি, যা ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দিতে পারে। একটি শক্তিশালী ইএমপি বিস্ফোরণ কোনো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আধুনিক সভ্যতা যা মূলত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল, তা এক মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। এ ছাড়া এ অস্ত্রটি পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিস্তার করতে স্বক্ষম।

৫. কোয়ান্টাম কম্পিউটিং : এনক্রিপশন সিস্টেম ভেঙে ফেলার ওস্তাদ
কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রচলিত সুপার কম্পিউটারের তুলনায় লক্ষগুণ দ্রুত কাজ করতে পারে। এটি সামরিক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক প্রভাবও ফেলতে পারে। প্রচলিত এনক্রিপশন সিস্টেম ভেঙে ফেলা, যা রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করতে পারে। সুরক্ষিত ডেটাবেস হ্যাক করে সামরিক বা অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করা এক মুহূর্তের কাজ।

৬. ডিরেক্টেড এনার্জি অস্ত্র: নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস
ডিরেক্টেড এনার্জি উইপন বা লেজার অস্ত্র সরাসরি শক্তি নিঃসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। স্যাটেলাইট ধ্বংস করা। শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করার সাথে সাথে প্রচলিত অস্ত্রের চেয়ে অনেক কম খরচে বড় ধরনের ধ্বংস করতে পারে। এছাড়া দ্রুত আক্রমণ এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানাই এ অস্ত্রের মূল কাজ।

৭. অস্ত্রায়িত ন্যানোপ্রযুক্তি: ক্ষুদ্র কিন্তু মারাত্মক
ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে অণু বা পরমাণুর স্তরে ক্ষতিকর যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব। ন্যানোডিভাইস গোপনে মানবদেহে প্রবেশ করে সুনির্দিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধ্বংস করতে পারে। এটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা লক্ষ্যমাত্রাকে আক্রমণ করতে সক্ষম। ক্ষুদ্র ন্যানোড্রোন যা শত্রুর সেনাবাহিনীর উপর গোপনে আক্রমণ চালাতে পারে। রাসায়নিক বা বায়োলজিকাল অস্ত্রের চেয়ে এ অস্ত্র আরও সূক্ষ্ম এবং কার্যকর।

সব শেষে এটাই বলতে হচ্ছে যে, এই অস্ত্রগুলো শুধুমাত্র ধ্বংসাত্মক নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। নিউক্লিয়ার অস্ত্র একসময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে বিবেচিত হলেও এই নতুন অস্ত্রগুলো যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাই বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই অস্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত জরুরি। মানবজাতি কি প্রযুক্তির বিপ্লবকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাবে নাকি ধ্বংসের পথে হাঁটবে, তা নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর।

লেখা: প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক। কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।

mzamin


Friday, December 6, 2024

গাঁজা গাছ দিয়ে বাড়ি : পরিবেশ রক্ষায় নতুন যুগ

আপনি কী জানেন, গাঁজা গাছ দিয়েও বাড়ি তৈরি করা সম্ভব? জার্মানির প্রকৌশলী হেনরিক পাউলি গত কয়েক বছর ধরে বাড়ি তৈরির উপকরণ হিসেবে গাঁজা গাছ ব্যবহার করে আসছেন।

বৃহস্পতিবার (০৫) ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গাঁজা গাছ (যাকে জার্মান ভাষায় হেম্প বলা হয়) দিয়ে নির্মিত বাড়িগুলো পরিবেশবান্ধব এবং বেশ কিছু গুণসম্পন্ন।

হেনরিক পাউলি জানান, গাঁজা গাছের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা বাড়ি তৈরিতে এর ব্যবহারকে আরও কার্যকর করে তোলে। এই গাছ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং প্রায় সব জায়গায় জন্মায়, বিশেষ করে জার্মানির হেসেন রাজ্যে। গাঁজা গাছ অধিক পরিমাণে কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে, যা পরিবেশের জন্য উপকারী।

পাউলি বলেন, গাঁজা গাছের গুণাবলি অনেক। এটি দিয়ে তৈরি বাড়ি পরিবেশবান্ধব, ভালো ইনসুলেশন সরবরাহ করে, ঘর গরম রাখে এবং অগ্নি-নিরাপদ। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি স্যাঁতসেঁতে ভাব শোষণ করে এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম।

তবে, গাঁজা গাছ দিয়ে বাড়ি তৈরির এ ধারণাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো প্রচলিত বাড়ি নির্মাণ উপকরণের তুলনায় এর খরচ ১০-২০% বেশি। এ ছাড়া, জার্মানির অনেক মানুষ এখনো গাঁজা গাছকে মাদক হিসেবে দেখে থাকেন, যা এই উপকরণের ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

তবে পাউলি বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে আরও মানুষ গাঁজা গাছ ব্যবহার করে বাড়ি নির্মাণ করবেন এবং এতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উন্নয়ন হবে। গাঁজা গাছ অনেকভাবে কাজে লাগানো যায়, তিনি বলেন, যারা একে মাদক হিসেবে ব্যবহার করেন, তারা হয়তো অন্যভাবে এর উপকারিতা দেখতে পাবেন।

হেনরিকের আশা, ভবিষ্যতে নির্মাণশিল্পে গাঁজা গাছের ব্যবহার বাড়বে এবং এটি পরিবেশবান্ধব ঘর তৈরির একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

গাঁজা গাছ দিয়ে তৈরি বাড়ি। ছবি : সংগৃহীত
গাঁজা গাছ দিয়ে তৈরি বাড়ি। ছবি : সংগৃহীত