Monday, May 30, 2011

প্রাচ্যের ছহি খাবনামা by পল লুন্ডি

ভারত সম্পর্কে প্রাচীন গ্রিসের প্রত্যক্ষ জ্ঞানগম্যি কিছু ছিল না। মাঝখানে বিরাট পারস্য সাম্রাজ্য। এই পারস্যের ছাঁকনি দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে প্রাচ্যকে জেনেছে গ্রিস। প্রাচ্য সম্পর্কে ইউরোপের সেকালের ‘এক্সোটিক কল্পনা’ নিয়ে লিখেছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ পল লুন্ডি। অনুবাদ করেছেন তৈমুর রেজা। --- ভারত প্রসঙ্গে হেরোডেটাস সবার আগে সোনার কথা বলেছেন। হেরোডেটাস জানাচ্ছেন, সম্রাট দারিয়ুস যে ১৯টি করদরাজ্য থেকে নিয়মিত রাজস্ব পেতেন তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ আসত ভারত থেকে: ‘ভারতবর্ষ আমাদের জানা পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন

সম্প্রতি বরিশাল ব্রজমোহন সরকারি কলেজে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। কোনো ক্লাস বা পরীক্ষা পেছানো নয়, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষ ও শিক্ষকমণ্ডলীকে অবরোধ করে রাখেন। পরে অধ্যক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে তাঁরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। কোনো দাবিদাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের অবরোধ বা এ ধরনের আন্দোলনকে আমরা সমর্থন করি না। তবে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি যে যৌক্তিক, তা-ও অস্বীকার করা যাবে না। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশসহ শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত দাবিদাওয়া কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করতে পারেন শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। সব উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া আবশ্যক।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংসদের জন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় কোনো কোনো ছাত্রসংগঠন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অন্যায্য দাবি আদায় করে, এমনকি কথিত ছাত্রনেতারা চাঁদাবাজি ও ভর্তি-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এই অবস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর জন্য কল্যাণকর নয়।
শিক্ষামন্ত্রী একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দিয়েছেন, পাবলিক পরীক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নেও সচেষ্ট রয়েছেন। এখন তিনি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন আশা করি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সুস্থ ছাত্ররাজনীতির চর্চায় এর বিকল্প নেই।
ছাত্র সংসদগুলোর নিয়মিত নির্বাচন হলে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে কমে যাবে। ক্ষমতাশ্রয়ী ছাত্রসংগঠন কর্তৃপক্ষের ওপর খবরদারি করতে পারবে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলবেন, তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরবেন। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাঁরা পরিচালনা করছেন, তাঁদের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দূরত্বও কমবে।
সামরিক শাসনামলে ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন হতে পারলে গণতান্ত্রিক আমলে কেন হবে না? শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ আন্দোলনের আগেই অনুরূপ ঘোষণা দেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সরকারের আস্থার সংকট by কুলদীপ নায়ার

ভারতে মনমোহন সিং সরকারকে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রলেপ জুগিয়েছিল বামপন্থীরা। কিন্তু তাদের সমর্থন প্রত্যাহারের পর মনমোহন সরকার আর আগের মতো আস্থায় থাকেনি। ইউপিএ জোটের প্রথম পর্যায়ে ধনীদের স্বার্থে অর্থনৈতিক সংস্কার করা সত্ত্বেও বলা যায়, সরকারের নানা নীতি ছিল মোটা দাগে উদারপন্থী। দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে ইউপিএ সরকারকে একদিকে বামপন্থীদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে না, অন্যদিকে কংগ্রেস পার্টির অপশাসনের প্রতিকারও খুঁজতে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সরকারের অবস্থা কাহিল। আর সরকারের সাফল্যের দাবি তো বারবার বাজতে থাকা গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো।
ইউপিএ জোটের শীর্ষদল কংগ্রেসের আশা-ভরসা হয়ে ওঠা রাহুল গান্ধী নিজেই নিজের ক্ষতি সাধন করেছেন। কখনোই তিনি ঝানু রাজনীতিক ছিলেন না, তবে কথা বলতেন কম। নির্বাচনে কংগ্রেস তাঁর থেকে ফায়দা পেতে হলে নিজেকে নতুন মোড়কে অথবা নবশক্তিযোগে হাজির করতে হবে তাঁকে। এত দিনে তাঁর বুঝতে পারা উচিত, জনসমক্ষে কথা বলতে হবে কীভাবে আর কেমন হতে হবে আচরণ।
ইউপিএর সাড়ে সাত বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বাজেভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার আগে তিনি ছিলেন পেছনের সারিতে। সোনিয়া গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পদে বসেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি নিজের জায়গা গড়ে নিতে সক্ষম হন। ইউপিএ জোট যখন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হয়, তখন মনমোহনের বিরাট এক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। লোকসভায় কংগ্রেসকে বৃহত্তম দল হয়ে ওঠার পেছনে তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের হাওয়া ছিল তুঙ্গে। মনমোহনের শাসনের ফলে সবচেয়ে সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত তাঁর প্রতি সমর্থন দিয়েছিল। কংগ্রেস যদিও তখনো সোনিয়া গান্ধীর একান্ত জায়গা, তবু তিনি দলের কাছ থেকেও সম্মান পেলেন তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাঁর পরিপক্বতার কারণে।
এরপর ভাগ্য আর প্রসন্ন থাকল না মনমোহন সিংয়ের। সরকারের আলমারি থেকে বেরোতে থাকল একের পর এক কেলেঙ্কারি। সরকারি কোষাগার কোটি কোটি টাকা বঞ্চিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হতে থাকল। তিনি মোর্চাধর্মে অবিচল থেকে ডিএমকের মতো কলুষিত দলের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করায় তাঁর ও তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হলো।
সন্দেহজনক নানা অপকর্ম আড়াল করা কিংবা অন্যায় ঢাকার চেষ্টার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও জড়িত থাকার কথা শুনে জনগণ ধাক্কা খেয়েছে। মনমোহনের নিজের সুনাম নষ্ট করেছে টু-জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি। তাঁর টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এ রাজার সংশ্লিষ্টতার কথা মনমোহন জানতেন। কিন্তু বিরোধীদের চাপ এবং সংসদে তাঁকে সদয় হতে বাধ্য করার আগ পর্যন্ত রাজার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। রাজা এখন জেলে। সরকারের সরাসরি অধীন সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) সবুজ বাতি পাওয়ার পরই সক্রিয় হয়। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘোড়া ছুটে যাওয়ার পর আস্তাবল বন্ধ করার মতো ব্যাপার এটি।
মনমোহন সিংয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার পেছনে আরেকটি কেলেঙ্কারি কম দায়ী নয়, সেটা কমনওয়েলথ গেমসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুরেশ কালমাদির ব্যাপক দুর্নীতি। কালমাদি কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে আর তাতে উদ্যমের ঘাটতি ছিল। কালমাদি তখন কিছুদিনের জন্য সার্বক্ষণিক টিভি চ্যানেলগুলোর আলোচনার মজাদার বিষয় হয়ে থাকেন। তাঁর বিরুদ্ধে মনমোহন যদি দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে হয়তো প্রধানমন্ত্রীর মান কিছুটা বাঁচত।
এখনো কেউ মনমোহন সিংয়ের ব্যক্তিগত নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তবে তিনি গুচ্ছ লোকের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাদের গা থেকে দুর্নীতির পচা গন্ধ বেরোয়—এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। তার ওপর মূল্যস্ফীতি বাড়ছে তো বাড়ছেই। কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমানো যায়, সে ব্যাপারে সরকার কোনো দিশা পাচ্ছে না বলে মনে হয়। খাদ্যপণ্যের ১৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি অন্যায়। অথচ কর্তৃপক্ষের কোনো নড়াচড়া নেই। পরিস্থিতি অত্যন্ত অন্ধকার। পরিবর্তনের সম্ভাবনাও নেই।
ক্ষমতায় থাকার প্রথম পাঁচ বছর অতিক্রম করার পর মনমোহন সিং নিজেকে ১০ নম্বরের মধ্যে ৬ নম্বর দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেই নম্বর কমিয়ে ৬ থেকে ৩-এ নামিয়ে আনবেন। অল্পের জন্য তাঁর দল আঞ্চলিক নির্বাচনে জিতছে। কিন্তু এ থেকে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না।
ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে কংগ্রেস দল ও মনমোহন সরকারকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম যথার্থই বলেছেন, ‘আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়।’ তবে শুধু এ দিয়ে কাজ হবে না। মনমোহন সিং সরকারকে নতুন করে জয় করতে হবে মানুষের আস্থা এবং তৈরি করতে হবে এমন পরিস্থিতি, যেখানে সাধারণ মানুষ ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আঁচ পেতে পারে। এখন পর্যন্ত ধনীরাই লাভের ফসল তুলে নিয়েছেন। প্রথমবারের মতো এ কথা স্বীকার করার সাহস দেখাতে পেরেছেন রতন টাটা।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান হবে সবার ওপরে by মহিউদ্দিন আহমদ

বছর দুই আগে একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা পড়েছিলাম পত্রিকায়—একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভার পর অতিথিদের খাবারের উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করছেন নিজ পরিবারের জন্য। এটা পড়ে আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা কেঁদেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যত দিন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা অভুক্ত থাকবে, তত দিন আমি বঙ্গভবনে যাব না।’ তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন কি না জানি না।
আমি সেই খবরটি পড়ে আহত হয়েছি, অবাক হইনি। গত চার দশক ধরে আমরা দেখছি একই চালচিত্র। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার যে সিঁড়িগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেটা মাড়িয়ে অনেকেই ক্ষমতা আর বিত্তের চূড়ায় উঠে গেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিরাট অংশ পড়ে আছে পাদপ্রদীপের নিচে, অন্ধকারে।
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে আমার কাছে কোনো সার্টিফিকেট নেই। এর প্রয়োজন কখনো অনুভব করিনি। দেশ এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধায় ছেয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, একটা প্রমাণপত্র থাকলে মন্দ হতো না।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সহসভাপতি শামসুল কাউনাইন আমার স্কুলজীবনের সতীর্থ। কাউন্সিলের পুনর্বাসন ও কল্যাণ মহাসচিব মনিরুল হক ও আমি একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। তাঁদের কাছে আমার ইচ্ছার কথা জানাতেই তাঁরা আমাকে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার একটি লম্বা ফিরিস্তি দিলেন। আমি বললাম, ‘মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যদি প্রমাণের জন্য আমাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে তোমাদের কাজটা কী?’ দুই দিন পর তাঁরা আমাকে জানালেন, একটা কর্মসূচি উপলক্ষে তাঁরা এক দিনের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাবেন, আমি যেন তাঁদের সহযাত্রী হই। আমি সানন্দে রাজি হলাম।
১৯ মে ভোরে রওনা হয়ে পৌঁছালাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে। সংসদের জেলাপ্রধান হারুনুর রশীদ আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। জেলা পরিষদ মিলনায়তনে দেখা হলো মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হক সরকার ও আখতার হোসেন সায়িদের সঙ্গে। জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অপেক্ষা করছিলেন সংসদের জেলা উপপ্রধান রতন মিয়া। মিলনায়তন কানায় কানায় ভরা। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সমবেত হয়েছেন। সবাই প্রবীণ। শরীর ভেঙে গেছে, চোখ কোটরাগত। অনেকের হাতে লাঠি। কেউ বা অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছেন। যে তরুণেরা একদা রাইফেল হাতে শত্রুনিধনে ছোটাছুটি করেছেন, আজ তাঁরা অবসন্ন এবং অনেকটাই অপাঙেক্তয়। তাঁদেরই নাকি বলা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান! মলিন বেশভূষায় দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। আমার রবীন্দ্রনাথকেই মনে পড়ল:
ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির
মূক সবে, ম্লান মুখে লেখা
শত শতাব্দীর বেদনার করুণ কাহিনী।
স্কন্ধে চাপে যত ভার
বহিচলে মন্দ গতি যতক্ষণ
থাকে প্রাণ তার।
রিকশাচালকের সামাজিক মর্যাদা নেই। এই বয়সে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করবেন, এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। এই উপলব্ধি থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাদের পুনর্বাসনের একটি উদ্যোগ নিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা রিকশাচালককে দুটো করে রিকশা দেওয়া হবে, যা ভাড়া দিয়ে তাঁরা সংসার চালাবেন। ব্যাপারটি আমার কাছে খুব একটা সুখকর মনে হলো না। আরেকজনকে দিয়ে এই ‘অমর্যাদাকর’ কাজটি করিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর মর্যাদা বজায় রাখবেন, এটা কেমন সমাধান হলো? পুনর্বাসনের আর কোনো লাগসই উপায় আছে কি না, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তা ভেবে দেখতে পারে।
আমার পাশেই বসা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। বয়সের ভারে নত, চোখে ছানি পড়েছে। মোট চারজন মুক্তিযোদ্ধাকে দুটি করে আটটি নতুন রিকশা দেওয়া হলো। মনিরুল হক দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য তাঁদের চিন্তাভাবনার কথা বললেন। বললেন, এখন আড়াই হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয় প্রতি মাসে। এটা বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচ হাজার করা হবে। শামসুল কাউনাইনের সঙ্গে আলাপচারিতায় সংসদের যাত্রারম্ভের সময়কার মহাসচিব, আমার আরেক সতীর্থ, আবদুল আজীজ বীর প্রতীকের প্রসঙ্গ উঠল। আমরা স্মৃতিতাড়িত হলাম। আজীজ ওই সময় অমানুষিক পরিশ্রম করেছিল সংসদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
আমি চার দশক আগে ফিরে গেলাম। ফ্ল্যাশব্যাকে দৃশ্যমান হলো সবুজ জমিন, কাঁধে গামছা, হাতে কালো কারবাইন, নগ্নপদে জমির আল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা কজন—ভাদুগড়ের আলী আকবর, নাটঘরের লিয়াকত আলী, চাপুরের ফয়েজ, ধনাশীর ওয়ালীউল্লাহ, কোনাউরের মোখলেস, কালঘরার রফিক, নিলখির রেণু, নবীনগরের আলম, ধরাভাঙ্গার লতিফ। লতিফ ছিলেন আমাদের দলনেতা। পরে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন। সম্প্রতি প্রয়াত। আলম ও ওয়ালীউল্লাহ আর নেই। আলী আকবরের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলো। অন্যরা কে কেমন আছে জানি না।
মনিরুল হক যখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি শোনাচ্ছেন, আমি ভাবলাম, জাতি কি এই দু-চার-পাঁচ হাজার টাকা মাসিক ভাতা দিয়ে তাঁদের ত্যাগের প্রতিদান দেবে? একজন উঁচু পদের সরকারি কর্মকর্তা যে হারে অবসর ভাতা পান, জাতির একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান কোন যুক্তিতে তার চেয়ে কম পাবেন?
আমি মনে করি না, নানান রকম ইহজাগতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাঁদের ত্যাগের প্রতিদান দেওয়া সম্ভব। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি বিবেকের তাড়নায়, বেতন-ভাতার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। দেশের সব নাগরিকের দেখভাল করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দেশে একটি মানুষও অনাহারে থাকবে না, সবার মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, তাদের সন্তানেরা স্কুলে যাবে, অসুখ-বিসুখে চিকিৎসাসেবা পাবে, এটাই তো রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। তা না হলে রাষ্ট্রের প্রয়োজন কী? কিন্তু যদি সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে অগ্রাধিকার নির্ণয়ের। এই অগ্রাধিকার বিবেচনায় সাংসদেরা বিনা শুল্কে গাড়ি পাবেন, শিল্পপতিরা ট্যাক্স হলিডে পাবেন, নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা হবে?
অনেক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেখা যায়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিয়ে হুইলচেয়ারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। তারপর রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সামনে দিয়ে হেঁটে যান, দু-একবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। এ ছবি টেলিভিশনের পর্দায় দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। আমার প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোর সামনের সারিটি কেন তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য বরাদ্দ থাকবে না?
মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের জন্য চার দশক আগে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল। অনেক লাভজনক প্রতিষ্ঠান এই ট্রাস্টের আওতায় আনা হয়েছিল, যাতে করে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া যায়। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চুরি-চামারির কারণে প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছে। যারা এর জন্য দায়ী, তাদের কি বিচার হয়েছে?
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মায়াকান্না কম হয়নি। তাঁরা তো ভিক্ষা চান না? তাঁরা চান একটি সুন্দর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আমরা যদি একটি ‘অর্ডার অব প্রিসিডেন্স’ দিয়ে সমাজে কৌলীন্যপ্রথা চালু রাখি, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের কেন সবার ওপরে রাখা হবে না? আমরা মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনার কথা বলি, তার প্রাথমিক শর্তই হলো মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করা। বাগাড়ম্বর দিয়ে এই চেতনার বাস্তবায়ন হবে না।
নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে রকম ভয়াবহ রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে, তা থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদও মুক্ত নয়। গুটি কয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া এই বিভাজনের দগদগে ঘা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজদেহের সর্বত্র। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তার মর্যাদা অনেকটাই হারিয়েছে এই রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির জন্য। এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
প্রয়োজনমতো টাকা আর যোগাযোগ থাকলে এ দেশে সহজেই এমপি হওয়া যায়, মন্ত্রী হওয়া যায়, রাজনৈতিক দলের মালিক হওয়া যায়; কিন্তু চাইলেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় না। এ সুযোগ ইতিহাস আমাদের একবারই দিয়েছিল। যাঁরা সেদিন দেশ ও মানুষের মর্যাদা ও মুক্তির লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের অবহেলা করে, চরিত্র হনন করে বা অনুকম্পা দেখিয়ে এই জাতি কখনোই বড় হতে পারবে না।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক, গবেষক।
mohi2005@gmail.com

ব্রিটিশ লেখকের আপিল খারিজ

সিঙ্গাপুরে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে লেখা একটি বইয়ের ব্রিটিশ লেখক অ্যালান শ্যাড্রেকের (৭৬) ছয় সপ্তাহের কারাদণ্ডের আদেশের বিরুদ্ধে করা আপিলের আবেদন খারিজ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।
বিচারব্যবস্থাকে অবমাননা করার দায়ে শ্যাড্রেককে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শ্যাড্রেকের ওয়ান্স এ জলি হ্যাংম্যান: সিঙ্গাপুর জাস্টিস ইন দ্য ডক বইয়ে বলা হয়, সিঙ্গাপুরে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার অভাব রয়েছে। গত নভেম্বরে হাইকোর্টের এক রায়ে শ্যাড্রেককে ছয় সপ্তাহের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গে ১০২ বিধায়কের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নবনির্বাচিত ২৯৪ বিধায়কের মধ্যে ১০২ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে নয়জন মন্ত্রীও আছেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচনের সময় মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার কলকাতায় সংবাদ সম্মেলনে ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচের কর্মকর্তা বিপ্লব হালিম ওই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, তৃণমূলের ১৮৪ বিধায়কের মধ্যে ৬৯ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া কংগ্রেসের ৪২ বিধায়কের মধ্যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে এবং সিপিএমের ৪০ বিধায়কের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের নবনিযুক্ত ৪৩ মন্ত্রীর মধ্যে নয়জন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাঁরা সবাই তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক। তাঁরা হলেন আইন ও বিচারমন্ত্রী মলয় ঘটক; পৌর ও নগর উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম; বিদ্যালয় শিক্ষামন্ত্রী রবীন্দ্র ভট্টাচার্য; জনস্বাস্থ্য ও কারিগরিবিষয়ক মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি; দমকল, বেসামরিক প্রতিরক্ষা ও বিপর্যয় মোকাবিলাবিষয়ক মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ খান; আবাসনমন্ত্রী শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি; ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্র; স্বনির্ভর ও স্বনিযুক্তিয়বিষয়ক মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাত এবং জনশিক্ষা ও গ্রন্থাগারমন্ত্রী আ. করিম চৌধুরী।

মিসৌরিতে এখনো দুই শতাধিক লোক নিখোঁজ

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের জপলিন শহরে টর্নেডো আঘাত হানার চার দিন পরও কমপক্ষে ২৩২ জন বাসিন্দা নিখোঁজ রয়েছে। মিসৌরির সরকারি দপ্তর থেকে গত বৃহস্পতিবার নিখোঁজ ব্যক্তিদের এ তালিকা প্রকাশ করা হয়। গত রোববার শহরটিতে টর্নেডো আঘাত হানলে অন্তত ১২৫ জন নিহত ও ৭৫০ জন আহত হয়। আগামী রোববার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জপলিনে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

রাতকো ম্লাদিচকে হেগে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু

স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যার ঘটনার কথিত মূল হোতা সন্দেভাজন বসনীয়-সার্ব যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচকে হেগে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে হেগে পাঠানো হবে তাঁকে। সেখানে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
বসনিয়ায় ১৯৯২-৯৫ সালে গৃহযদ্ধ চলাকালে স্রেব্রেনিৎসা শহরে ঠান্ডামাথায় কয়েক হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে স্রেব্রেনিৎসার এ গণহত্যাই ছিল সবচেয়ে জঘন্য হত্যাকাণ্ড। স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যা ও ৪৩ মাস সারায়েভো শহর অবরোধ করে রাখার অপরাধে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বসনীয়-সার্ব সেনাপ্রধান ম্লাদিচকে অভিযুক্ত করেন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালত। কিন্তু প্রায় ১৬ বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার সার্বিয়ার একটি গ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ফের অস্ত্রবিরতির আহ্বান লিবিয়ার

লিবিয়ায় চারটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার পাঠানোর অনুমতি দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। লিবিয়ায় অ্যাপাচি হেলিকপ্টার পাঠানো হলে যুদ্ধকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবারও অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে লিবিয়া। চলমান সংকট নিরসনে রাশিয়াকে মধ্যস্থতা করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স।
গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফিবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার জন্য চারটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার দেওয়ার অনুমতি দেন। হেলিকপ্টারগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই ন্যাটো বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবে। সেগুলো এখন ভূমধ্যসাগর এলাকায় মোতায়েন রয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল ক্রিস প্যারি বলেন, লিবিয়ায় অ্যাপাচি হেলিকপ্টার পাঠানো হলে চলমান যুদ্ধ আরও উসকে যেতে পারে। তবে গাদ্দাফি বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার কাজে ব্যবহার না করে বেসামরিক নাগরিক রক্ষায় হেলিকপ্টারগুলো ব্যবহার করা হলে এ ধরনের আশঙ্কা থাকবে না।
লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাগদাদি আল-মুহাম্মাদি বলেন, চলমান লড়াই বন্ধে তাঁর দেশ জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নকে অস্ত্রবিরতির সময় ও তারিখ ঠিক করার আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় এক সম্মেলনে গত বৃহস্পতিবার আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতারা লিবিয়ায় নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) বিমান হামলা বন্ধ করে রাজনৈতিকভাবে চলমান সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
কিন্তু লিবিয়া সরকারের পক্ষ থেকে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব দিলেও তা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে আগে থেকেই তা প্রত্যাখ্যান করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো বলে আসছে, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গাদ্দাফি বাহিনীর হামলা বন্ধ করা না হলে তাদের হামলাও চলবে।
এএফপির একজন প্রতিবেদক বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতেও লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির কম্পাউন্ড থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। এসব বিস্ফোরণে রাজধানী কেঁপে উঠেছে। রাজধানীর আকাশে জঙ্গি বিমান উড়তে দেখা গেছে।
ন্যাটোর বিমান থেকে গাদ্দাফির বাব আল-আজিজিয়া ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়। লিবিয়া কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, গত সোম ও মঙ্গলবার রাতে ন্যাটোর হামলায় অন্তত তিনজন নিহত ও দেড়শতাধিক লোক আহত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী ত্রিপোলিতে সাংবাদিকদের বলেন, এর আগেও অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনো পক্ষ তা মেনে চলেনি। এবার সরকার চায়, উভয় পক্ষই অস্ত্রবিরতি মেনে চলবে। বিশেষ করে ন্যাটো হামলা বন্ধ করবে।
তবে গাদ্দাফি পদত্যাগ করবেন না বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাদ্দাফি সব লিবিয়াবাসীর অন্তরে রয়েছেন। তিনি গেলে লিবিয়ার নাগরিকেরাও যাবেন।

গাদ্দাফিকে উৎখাত করতে পশ্চিমারা অনড়: ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাত করার ব্যাপারে অনড় রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স লিবিয়ার লড়াই দ্রুত শেষ করার বিষয়ে অভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। গতকাল শুক্রবার ফ্রান্সে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির সঙ্গে বৈঠক করার পর ওবামা এ কথা বলেন।
গতকালের ওই বৈঠকে শিল্পোন্নত আট দেশের নেতাদের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে গণতন্ত্র বিকশিত করার লক্ষ্যে কোটি কোটি ডলার খরচ করার ব্যাপারে একমত হওয়ার কথা।
সারকোজির সঙ্গে বৈঠক করার পর ওবামা বলেন, তাঁরা লিবিয়া প্রসঙ্গে একান্তে আলাপ করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে গাদ্দাফিকে অবশ্যই ক্ষমতা ছাড়তে হবে। তিনি বলেন, লিবিয়ার লড়াই যত দ্রুত শেষ করা যায়, সে লক্ষ্যে তাঁরা একজোট হয়ে কাজ করছেন।
এদিকে রাশিয়ার কোমারসান্ত পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গাদ্দাফিকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভকে অনুরোধ করেছেন ওবামা। খবরে বলা হয়, ওবামা মেদভেদেভকে গাদ্দাফির কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেছেন যে গাদ্দাফি যদি প্রাণে বাঁচতে চান, তাহলে তিনি যেন লিবিয়া ছেড়ে চলে যান। তবে রাশিয়ার একটি কূটনৈতিক সূত্র এএফপিকে বলেছে, ওবামার এ আহ্বানকে রাশিয়া ‘অবাস্তব’ বলে মনে করছে। ওই সূত্র বলেছে, এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হলে গাদ্দাফি তা মেনে নেবেন, এমন কথা তারা বিশ্বাস করে না।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি গাদ্দাফিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, গাদ্দাফি যদি এখনই সরে যান, তাহলে তাঁর সামনে ‘সব ধরনের বিকল্প পথ’ খোলা থাকবে। তিনি বলেন, ‘তিনি এখনই সরে দাঁড়ালে বিমানের টিকিটে তাঁর (গাদ্দাফির) নামের পাশে কী লেখা হবে, বা তাঁর জন্য বিমানের কোন শ্রেণীর টিকেট কাটা হবে, তা আমরা ঠিক করব ।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কথিত ‘আরব জাগরণ’ প্রবণ উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে উন্নত বিশ্বকে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ এলাকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যুক্তরাজ্য ১১ কোটি পাউন্ড দিতে যাচ্ছে। গতকালের জি-৮ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিশ্ব নেতাদের একমত হওয়ার কথা।

গ্রন্ডোনার দাবি নাকচ অস্ট্রেলিয়ার

ভালোই ঝামেলা বাঁধিয়ে দিয়েছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৯৩ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের এক ম্যাচে পুরো আর্জেন্টিনা দল ড্রাগ নিয়েছিল—এই মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় চলছেই। সর্বশেষ হুলিও গ্রন্ডোনা পাল্টা তোপ দেগেছেন, ডোপ টেস্ট করা হয়নি ম্যারাডোনার স্বার্থেই। কারণ, ১৯৯১ সালে ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিল ম্যারাডোনা। গ্রন্ডোনার আশঙ্কা ছিল, আবারও না ডোপ টেস্ট করা হলে ধরা পড়েন দলের মূল ভরসা। এ কারণেই নাকি অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল সংস্থার (এএসএফ) সঙ্গে সমঝোতা করেই ওই ম্যাচে ডোপ টেস্ট করা হয়নি।
গ্রন্ডোনার এই যুক্তির ভিত্তি দুর্বল। ওই ম্যাচে না করা হলেও এর আগের কয়েকটি ম্যাচে তো ঠিকই ডোপ টেস্ট দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। তখন তো সমস্যা হয়নি। সে যা-ই হোক, দু-দলের সমঝোতার ভিত্তিতে ডোপ টেস্ট করা হবে না—এ কেমন নিয়ম!
তবে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার প্রধানের দাবি অস্বীকার করা হয়েছে। সে সময় এএসএফের প্রধান ছিলেন ইয়ান হোমস। তিনি রীতিমতো দিব্যি কেটে বলছেন, ‘আমি আপনাকে একদম নিশ্চিত করেই বলছি, এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আমার কাছে, সংস্থার কাছে কিংবা কোচিং স্টাফদের কাউকে দেওয়া হয়নি। দেওয়া হলে তারা সরাসরি আমাদের কাছে এসেই বলত। আর এ ধরনের প্রস্তাবে আমরা রাজিও হতাম না। আমার ছেলের জীবন নিয়ে শপথ করে বলছি, এ ধরনের কোনো কিছুতেই আমরা জড়াতাম না। যেকোনো পর্যায়ের ফুটবলেই এমন কিছু করা অন্যায়।

রুবচিচের ২৭-এ ডেনিশ খেলোয়াড়

পাকিস্তানের বিপক্ষে দুটি ম্যাচের জন্য ২৭ জনের প্রাথমিক দলে তিনটি চমক দিয়েছেন রবার্ট রুবচিচ। জামাল ভুঁইয়া নামের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডেনমার্কের খেলোয়াড় আছেন বড় চমক হয়ে। জাতীয় দল থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া ডিফেন্ডার রজনী ও মিডফিল্ডার মতিউর মুন্নার ক্যাম্পে ডাক পাওয়াও একটা চমক।
তবে জাতীয় দলের ক্রোয়েশিয়ান কোচ বিবেচনায় রাখেননি শেখ জামালের স্ট্রাইকার এনামুল ও ডিফেন্ডার ওয়ালি ফয়সালকে। চলমান বাংলাদেশ লিগে শেখ জামালের নিয়মিত চার বিদেশি খেলানোর ‘বলি’-ই হলেন তাঁরা। একই কারণে ভুক্তভোগী হতে পারতেন এমিলি, তবে এই স্ট্রাইকারকে ডেকেছেন কোচ। ওয়ালিকে রক্ষণে আর অপরিহার্য ভাবছেন না। রুবচিচের দলে একেবারেই নতুন মুখ ফরাশগঞ্জ স্ট্রাইকার সোহেল রানা।
বলাই বাহুল্য, জামাল ভুঁইয়াও নতুন মুখ। কোপেনহেগেনের দ্বিতীয় বিভাগের দল (অনূর্ধ্ব-২৩) হেলেরাপ আইকে-তে খেলেন। ডেনিশ পাসপোর্টধারী এই তরুণ বাংলাদেশের পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। পাসপোর্ট পেলে বাংলাদেশে আসবেন এবং পছন্দ হলে তবেই তাঁকে দলে রাখা হবে। টিকবেন কি না প্রশ্ন আছে। এর আগে ইংল্যান্ড থেকেও কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এসেছিলেন বাংলাদেশ দলে খেলতে। কিন্তু কোচের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়ে একদিন পরই ফিরতি বিমান ধরেছেন।
সর্বশেষ মিয়ানমার সফরে অসুস্থতার কারণে যেতে না পারা গোলরক্ষক আমিনুল ফিরেছেন। ফিরছেন ২০০৯ সালে সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ কাপে খেলা রজনীও। ডাক পাওয়ার খবর পেয়ে বললেন, ‘কোচ যখন ডেকেছেন। আমি যাব।’ মতিউর মুন্নাও কোচের ডাকে সাড়া দেবেন বলে জানা গেছে। এতে খুশি রুবচিচ। কেননা, পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রাক-বাছাইয়ে ২৯ জুন (ঢাকায়) ও ৩ জুলাই ফিরতি ম্যাচ উতরে যাওয়ার জন্য কোচের যে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় দরকার।
২৭ খেলোয়াড়: গোলরক্ষক— আমিনুল, বিপ্লব, মামুন, নেহাল। ডিফেন্ডার—রজনী, আরিফুল, মামুন মিয়া, উত্তম, ইউসুফ আলী, রেজাউল, লিংকন, ইয়ামিন মুন্না, নাসির। মাঝমাঠ—মামুনুল, রাজু, জাহিদ, মতিউর মুন্না, শাকিল, কমল, মারুফ, মিশু। আক্রমণভাগ—এমিলি, মিঠুন, শাখাওয়াত রনি, ইউসুফ, সোহেল রানা, জামাল ভুঁইয়া।

জুনিয়র অ্যাথলেটিকস আরও বিবর্ণ

তীয় জুনিয়র অ্যাথলেটিকসে অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৮ বিভাগে খেলা হতো এত দিন। কিন্তু দীর্ঘ রীতি ভাঙল এবার। কাল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ২৭তম জাতীয় জুনিয়রে অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগই নেই! তাই বেশ কিছু ইভেন্ট কমে গেছে। ৪০০ শিক্ষানবিশ অ্যাথলেট এসেছে বলা হলেও সংখ্যাটা তার চেয়ে কম। আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য আশা করা তো বাড়াবাড়ি।
ছেঁড়া ট্র্যাক মেরামত হয়নি। এসএ গেমসের সময় আনা ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড অকেজোই পড়ে আছে! স্টেডিয়ামে ভেতরে-বাইরে পৃষ্ঠপোষকবিহীন প্রতিযোগিতার কোনো পোস্টার নেই। দায়সারা আয়োজন!
অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম কখনো অজুহাত দিলেন, কখনো দায়সারা উত্তর দিয়ে প্রসঙ্গ এড়ালেন। ব্যর্থতা স্বীকার করতে তাঁর আপত্তি, ‘মাঝেমধ্যে দুই-একটা টুর্নামেন্টে এমন হয়ে যায়...! আমরা স্পনসর খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। সে জন্য অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগ বাদ দিয়েছি। তা ছাড়া গরমের কারণে এবার একটু সমস্যা হয়েছে।’ ৮০ লাখ টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট করছে টিটি ফেডারেশন। আর অ্যাথলেটিকস একটা স্পনসর জোগাড় করতে পারল না! অ্যাথলেটিকস-সংশ্লিষ্ট অনেকে ফেডারেশনের অযোগ্যতাকেই দায়ী করলেন।
এমন মিট থেকে আর কী আশা করা যায়! দুই দিনের প্রতিযোগিতার প্রথম দিনের নয়টি ইভেন্টে তাই কোনো রেকর্ড নেই। অজপাড়াগাঁয়ের অনেক ছেলেমেয়েকে এনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা খেলার নিয়ম-কানুনই জানে না! অনেক কিশোর-কিশোরী খালি পায়ে দৌড়াল। নতুন প্রতিভাও সেভাবে চোখ কাড়ল না।
ছেলেদের বিভাগে দ্রুততম মানব কুড়িগ্রামের আরিফুল ইসলামের (অরেঞ্জ) মধ্যে খানিকটা সম্ভাবনার আলো অবশ্য দেখলেন অনেকে। মেয়েদের বিভাগের দ্রুততম মানবী গতবার দুটি সোনাজয়ী বিকেএসপির মেয়ে পাপিয়া রানী সরকার। ২০০৮ সালেও একবার দ্রুততম মানবী হয়েছিলেন পাপিয়া। হাইজাম্প ও ট্রিপল জাম্পে দুটি সোনা জিতেছেন খুলনার ছেলে আরমান গাজী। এ ছাড়া সোনাজয়ীরা হলেন—মেয়েদের শটপুটে ময়মনসিংহের মোরসালিন ও হাইজাম্পে বিকেএসপির প্লাবনী হক এবং ছেলেদের ৮০০ মিটারে যশোরের মিলন ও জ্যাভলিন থ্রোতে পাবনার রাশিদুল।

নিজেকে মেলে ধরার প্রত্যাশায় রুনি

গত বছর বিশ্বকাপ ফুটবলে ওয়েইন রুনির কথা মনে পড়ে? নিজের নামের ধারে কাছেও ছিল না তাঁর পারফরম্যান্স। ইংল্যান্ডের জার্সি আর জার্সির পেছনে লেখে তাঁর নামটিই ছিল মাঠে তাঁর উপস্থিতির একমাত্র পরিচায়ক। এলোমেলো দৌড়াদৌড়ি, বার দুয়েক গোলপোস্টে ব্যর্থ প্রচেষ্টা, রেফারির সঙ্গে বচসা—এই ছিল ওয়েইন রুনির বিশ্বকাপ। অথচ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসির সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছিল এই ইংলিশ তারকার নাম।
বিশ্বকাপে মেসির মুখোমুখি হতে হয়নি রুনির। আজ এক বছর বাদে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে সেই রুনিই মেসির সঙ্গে মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামনে দাঁড়িয়ে। তবে এই এক বছরেই দুজনের মধ্যে ফারাকটা অনেক বড় হয়েছে। মেসি আজ সর্বজনবিদিত সেরা তারকা। আর রুনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ওয়েম্বলিতে ভালো খেলে নিজের নাম ফুটবল বিশ্বের সামনের কাতারে আবার প্রতিষ্ঠিত করতে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইডের অধিনায়ক ও ইংলিশ ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্দের মতে, রুনি আজ ঝলসে উঠবেই। ‘যখনই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জন্য রুনির প্রয়োজন হয়, রুনি তখন নিজেকে মেলে ধরে, এবং বেশ ভালোভাবেই মেলে ধরে। ওর প্রতি আমাদের সবার অগাধ আস্থা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বড় তারকারা বড় ম্যাচে ভালো খেলে। কিছুদিন আগেই সিটির বিপক্ষে সে দুর্দান্ত এক গোল করেছিল। আশা করছি, ওয়েম্বলিতেও সকলে রুনির সেরাটাই দেখবে।’
‘রুনি কী ধরনের খেলোয়াড় সকলেই তা জানে। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে তাঁর কিছু প্রমাণ করার নেই।’ ফার্ডিনান্দের সাফ কথা ।
এদিকে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ওয়েইন রুনির খেলায় পরিপক্বতার ছাপ দেখতে পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রুনি ২০০৯ সালের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্ব এবং অভিজ্ঞ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দলে এমন কিছু খেলোয়াড় রয়েছে, যাঁরা বড় মঞ্চে ভালো খেলে। ওয়েম্বলির ফাইনাল তেমনই একটি মঞ্চ। রুনি এঁদের মধ্যে অন্যতম।’
রুনির প্রতি প্রত্যাশাটা সবারই অনেক উঁচুতে। ফার্গুসন জানিয়ে দিয়েছেন রুনি আজ প্রথম একাদশেই খেলছেন।
রুনি প্রত্যাশার প্রতিদান দিতে পারবেন কি না—এটাই এখন দেখার বিষয় !

বার্সা ইতিহাস-সেরা দল: লিনেকার

সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকারের আরেক পরিচয়, তিনি একসময় বার্সেলোনার খেলোয়াড় ছিলেন। আজ রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও তিনি এগিয়ে রাখতে চান তাঁর সাবেক ক্লাবকে। কারণ আর কিছুই নয়, লিনেকার নিশ্চিত, মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তা-পুয়োলদের বার্সেলোনা কেবল এ মৌসুমেরই নয়, ফুটবল ইতিহাসেরও সেরা দল।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সাবেক এই ইংলিশ গ্রেট বলেন, ‘ওয়েম্বলিতে বার্সেলোনার না জেতার কোনো কারণ নেই। কারণ, তারা সবদিক দিয়েই সেরা দল। আমার মনে হয়, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ভাগ্য যদি আজ সুপ্রসন্ন হয়, তাহলে তারা জিতলেও জিততে পারে।’
‘একটা সেরা দলেরও বাজে দিন আসতে পারে। হতে পারে, আজকের দিনটিই বার্সেলোনার জন্য বাজে দিন। সে ক্ষেত্রেই কেবল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড নিজেদের জয়ী হিসেবে দেখতে পারে।’
লিনেকার মনে করেন, ‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যে ব্যাপারটির জন্য নিজেদের নির্ভার মনে করতে পারে, তা হলো—ওয়েম্বলিতে নিজ দেশের মাটিতে খেলা। তবে এটা ঠিক বার্সেলোনার যেসব প্রতিভা রয়েছে, তাদের কাছে মাঠ কোনো বিষয় নয়, তারা যেকোনো জায়গাতেই জ্বলে উঠতে পারে। দলটি যে ইতিহাসের সেরা।’
‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও বার্সেলোনার মধ্যে যদি ১০টি খেলা অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে নয়বারই বার্সা জিতবে। এ হিসাব নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।’ লিনেকারের অভিমত।
তবে যেহেতু বড় ম্যাচ তাই আজকের ম্যাচ নিয়ে এতটা নিশ্চিত হতে চাননি লিনেকার। তিনি বলেন, ‘বার্সা সন্দেহাতীতভাবেই সেরা দল। তবে আমি মনে করি, সময়ই বলে দেবে ওয়েম্বলিতে আজ কে জিতবে।’
তিনি বার্সেলোনাকে আবারও ইতিহাসের সেরা দল হিসেবে অভিহিত করে বলেন, বার্সেলোনা খুবই আকর্ষণীয় দল। এ দলটি অবশ্যই ইতিহাসের সেরা। বার্সেলোনা ফুটবলকে সত্যিই অন্য স্তরে নিয়ে গেছে।’

জাভির শ্রদ্ধা ম্যানচেস্টারের প্রতি

বার্সেলোনা মিডফিল্ডার জাভির রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা। তিনি বলেছেন, ‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একটি মেধাবী দল। তারা সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের লড়াইয়ে দারুণ মেধার স্বাক্ষর রেখেছে।’
‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দুর্দান্ত একটি দল। তারা মাঠের পারফরম্যান্সে নিজেদের অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়েছে। তারা অনেক সাফল্য পেয়েছে। অনেক গৌরব তাদের ঘরে তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা দলটি মারাত্মক ধারাবাহিক ও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সমাবেশ ঘটেছে এই দলটিতে।’ জাভির মন্তব্য।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পল স্কলস, রায়ান গিগসকে ইউরোপের দুই সেরা অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে বর্ণনা করেছন জাভি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের প্রতিও শ্রদ্ধা ও সম্মান ঝরেছে তাঁর কণ্ঠে।
‘স্কলস, গিগস ও ফার্গুসন গত এক দশকে নিজেদের মেধার সবটা ঢেলে দিয়েছেন এই ক্লাবটির কল্যাণে।’ ম্যানচেস্টারের এই ত্রয়ী সম্পর্কে জাভির অভিমত।
জাভি বলেন, ‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের খেলোয়াড়েরা কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভার ওপর নির্ভর করেই খেলে না। স্যার ফার্গুসন এসব প্রতিভাবনকে একসূত্রে গাঁথতে পেরেছেন।’
জাভি তাঁর নিজের দল বার্সেলোনাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘এই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দলটি গোল করতে যেমন দক্ষ, গোল দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সেটাকে ধরে রাখতেও সমান সিদ্ধহস্ত।’ তিনি বলেন, ‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একবার গোল করে ফেললে আমাদের জন্য খুবই মুশকিল হবে।’
জাভি নিজেও ক্যারিয়ারের শুরুতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলার স্বপ্ন দেখতেন বলে জানিয়েছেন। তবে এ মুহূর্তে বার্সেলোনাতে খেলে তিনি অনেক বেশি তৃপ্ত।

‘বার্সেলোনাকে হারানোর কৌশল জানে ফার্গি’

চ্যাম্পিয়নস লিগের আজকের ফাইনালে বার্সেলোনা ফেবারিট—এ বিশ্বাস প্রায় সব ফুটবলপ্রেমীরই। তবে লিভারপুল ম্যানেজার কেনি ডালগ্লিশ মনে করেন, বার্সেলোনা ফেবারিট হলেও এ দলটিকে হারানোর ক্ষমতা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রয়েছে। ‘রেড ডেভিল’ কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন হয়তো বার্সেলোনাকে হারানোর বিশেষ কোনো কৌশল ঠিক করে রেখেছেন। তিনি মাঠেই এর প্রমাণ দেবেন।
ডালগ্লিশ বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই শনিবার রাতে ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠেয় চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল দারুণ উপভোগ্য হবে। দুই দলের কাছেই এই ফাইনালের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ম্যাচে অবশ্য সবাই বার্সেলোনাকে অবিসংবাদিত ফেবারিটের আসনে বসিয়ে রেখেছে।’
‘বার্সেলোনা এ মুহূর্তে দারুণ খেলছে। তাদের থামাতে হলে কিছু কৌশল দরকার। আমি নিশ্চিত ফার্গি এ নিয়ে নিশ্চয়ই আলাদাভাবে ভেবেছে। এবং বার্সেলোনাকে হারানোর কিছু কৌশলও তিনি ঠিক করে রেখেছেন।’ ডালগ্লিশের অভিমত।
আজ রাতের ফাইনাল যথেষ্ট ‘মরণপণ’ হবে বলেই ধারণা ডালগ্লিশের। তিনি বলেছেন, ‘এটা ঠিক, ওয়েম্বলিতে আজ সবাই ক্লোজ ম্যাচই দেখবে। তবে ম্যাচটি আসলে কী রকম হবে, সে বিষয়ে এখনই অভিমত দেওয়া উচিত নয়। কারণ, খেলাটি মারামারিরও হতে পারে, আবার হতে পারে দৃষ্টিনন্দনও।’
বার্সেলোনার শক্তি অবশ্যই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি। তবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারেন, জাভি ও ইনিয়েস্তা—এ দুই বিশ্বকাপ জয়ী স্প্যানিশও।
তবে মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তার শ্রেষ্ঠত্ব শিকার করে নিলেও তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ওয়েইন রুনি ও হাভিয়ের হার্নান্দেজের নাম স্মরণ করতে ভোলেননি। তিনি বলেছেন, ‘যখন কোনো দলে ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে মনোনীত তিনজন খেলোয়াড় থাকে, তখন আপনি সেই দলটিকে শ্রেষ্ঠ বলতে বাধ্য।’
‘তবে মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তার সঙ্গে রুনি কিন্তু দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম। হার্নান্দেজকেও ভুলে যাবেন না। ছেলেটি এবার দারুণ একটি ইংলিশ মৌসুম কাটিয়েছে।’ বলেছেন ডালগ্লিশ।