Sunday, March 27, 2016

সাত বছরে আত্মসাৎ ৩০ হাজার কোটি টাকা by জাহাঙ্গীর শাহ

গত সাত বছরে ঘটেছে ছয়টি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। এসব কেলেঙ্কারিতে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ অর্থ দিয়েই অনায়াসে একটি পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত।
বড় এসব আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে সর্বস্বান্ত করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের একটি অংশ ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছে, নিজেরাও লাভবান হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছাড় দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
একটি কেলেঙ্কারিরও বিচার হয়নি। সাজা পাননি অভিযুক্তদের কেউ। প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। বছরের পর বছর মামলা চলছে। অভিযুক্তদের কেউ জেলে আছেন, কেউ চিকিৎসার নামে হাসপাতালে আরাম-আয়েশে আছেন। অনেকে জামিন পেয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান—দুজনেই মনে করেন, মূলত সুশাসনের অভাব থেকেই একের পর আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। আর ব্যবস্থা না নেওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, হল-মার্ক থেকে শুরু করে বেসিক ব্যাংক বা বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত লোকজন জড়িত ছিলেন বলেই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরের বছর দেশে দ্বিতীয়বারের মতো শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ঘটে। এ ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের হিসাবে ওই কেলেঙ্কারিতে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এরপর ২০১২ সালের সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারিতে অর্থ আত্মসাৎ করা হয় ১১০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে আত্মসাৎ করা হয় আরও প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বহুস্তরবিশিষ্ট বিপণন কোম্পানি ডেসটিনির অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আত্মসাতের পরিমাণ ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকা।
এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের কারও সাজা হয়নি। হল-মার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ জেলে থাকলেও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম জামিনে আছেন। ডেসটিনির সভাপতি রফিকুল আমীন আটক হলেও অসুস্থতার অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে আছেন। আর বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। মামলায় নাম পর্যন্ত নেই।
দেশে সবশেষ আর্থিক কেলেঙ্কারি হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে থাকা রিজার্ভ চুরি। ৫ ফেব্রুয়ারি চুরি করা হয় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ বা হ্যাক করে এই রিজার্ভ চুরির ঘটনা এখনো বিশ্বজুড়ে অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও সবচেয়ে বেশি তোলপাড় হয়েছে রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়েই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির কারণেই এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে অনেক বেশি। ফলে এর দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দুই ডেপুটি গভর্নরকে।
সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ আর্থিক এসব জালিয়াতি কমাতে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, যারা অপরাধী, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে বরখাস্ত, বদলি নয়; অপরাধের দায়ের শাস্তি দিতে হবে। এ ছাড়া সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সঠিক জায়গায় বসাতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ রয়েছে। আর সবশেষ হচ্ছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত অবস্থান নিতে হবে, এ প্রতিষ্ঠানটিকে মূল ব্যাংকিংয়ের দিকে নজর দিতে হবে। তিনি মনে করেন, ব্যাংক খাত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া উচিত।
বড় বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারির পেছনে সরকারের প্রভাবশালীরা জড়িত থাকেন—এর অন্যতম উদাহরণ হলো হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারির এই ঘটনায় টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন ওই ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই। ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদের কয়েকজন সদস্যও তা জানতেন। হল-মার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পরিচালনা পর্ষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা সাইমুম সরওয়ারের নাম বলেছিলেন। আবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিন বা চার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি বড় কিছু নয়। সোনালী ব্যাংক পর্ষদ পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থমন্ত্রী এটিকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ার-বহির্ভূত কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আবার বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির জন্য ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। তবে এই তালিকায় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নাম রাখেনি দুদক। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, অপ্রতুল জামানতের বিপরীতে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণ দেওয়ার জন্য চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকেই দায়ী করা হয়েছিল। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই অর্থমন্ত্রী নিজেই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ব্যাংকটিতে (বেসিক ব্যাংক) হরিলুট হয়েছে। আর এর পেছনে ছিলেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু।’ এর আগে ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বেসিক ব্যাংক ও হল-মার্ক সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘জালিয়াতদের ধরতে বাধা নিজের দলের লোক।’
কেন ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি, এ প্রশ্ন করা হয়েছিল অর্থমন্ত্রীকে। ১৮ মার্চ প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার সব আলাপ করা যায় না। তবে ব্যবস্থা ঠিকই নেওয়া হবে।’
এসব বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের যোগসাজশ রয়েছে। আবার ওই পর্ষদের সদস্যরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিংবা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। তাই অনিয়মের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। তিনি মনে করেন, এভাবেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। এ সংস্কৃতি দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেয়, আবার অন্যকে দুর্নীতি করতে উৎসাহ জোগায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আরও কিছু কেলেঙ্কারি ঘটলেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কম। যেমন, রূপালী ব্যাংক থেকে বেনিটেক্স লিমিটেড, মাদার টেক্সটাইল মিলস ও মাদারীপুর স্পিনিং মিলস নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এর ৮০১ কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার অগ্রণী ব্যাংক থেকে বহুতল ভবন নির্মাণে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ৩শ কোটি টাকা ঋণ নেয় মুন গ্রুপ। আর সবশেষ লাইসেন্স পাওয়া ফারমার্স ব্যাংকও অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৪শ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে।
দেশে অন্য সরকারের আমলেও আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ছিল। এর আগে গত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক কেলেঙ্কারি ছিল সবচেয়ে আলোচিত। এ ঘটনায় ব্যাংকটির মালিকপক্ষ ওরিয়ন গ্রুপ বেনামে ৫৯৬ কোটি টাকা তুলে নিলে ব্যাংকটি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পরে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপি সরকারের সময়েই চট্টগ্রামের অখ্যাত ব্যবসায়ী কে এম নুরন্নবী পাঁচটি ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ করেন ৬৯৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া গত আওয়ামী লীগ সরকারের (১৯৯৬-২০০১) সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হয়েছে শেয়ারবাজারে। সেই কেলেঙ্কারির মামলা এখনো বিচারাধীন।
এ ধরনের অপরাধে শাস্তির নজির নেই বাংলাদেশে। কিন্তু অন্য দেশে নজিরবিহীন শাস্তি দেওয়ার নজির রয়েছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাসদাকের সাবেক চেয়ারম্যান বার্নার্ড মেডফের শেয়ারবাজারে আর্থিক কেলেঙ্কারির কথা ফাঁস হয়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৯ সালের জুন মাসে বিচারে ৭১ বয়সী এ ব্যবসায়ীকে ১৫০ বছর জেল দেওয়ার পাশাপাশি ১৭০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়।

শুধু জামায়াতে ইসলামির কর্মকাণ্ড দিয়েই বৈচিত্রময় আবিশ্ব ইসলামপন্থার বিচার সম্ভব? by আ-আল মামুন

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত মইদুল ইসলামের গবেষণাগ্রন্থ ‘লিমিট্স অব ইসলামিজম : জামায়ত -ই-ইসলামি ইন কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ ’ অ্যাকাডেমিক পরিসরে ও পণ্ডিতসমাজে নিশ্চিত ভাবেই বিশেষ আগ্রহ জন্ম দেবে৷ প্রথমত এ কারণে যে , নয়া উদারবাদের চাপ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে ইসলামপন্থা , বিশেষত যেটাকে মইদুল ‘জামায়াতে ইসলামপন্থা ’ আখ্যায়িত করেছেন , কোনও বিকল্প দর্শন হাজির করতে ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে কি না , নাকি ইসলামপন্থা অন্তর্গত ভাবেই অসঙ্গতিতে ভরা তিনি সেই উত্তর খুঁজেছেন৷ এ কারণেও যে , ইসলামপন্থা নিয়ে গবেষণা ও আলোচনার বেশির ভাগটাই পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ৷ ভারত ও বাংলাদেশে ইসলামপন্থার মতাদর্শ ও চর্চা নিয়ে গুরুত্ববহ কোনও কাজই হয়নি৷ যদিও বিশ্বের মুসলমান জনগোষ্ঠীর ২০ ভাগ বাস করেন এই দু’টি দেশে৷ এই সব বিবেচনায় , মইদুল ইসলামের গবেষণাগ্রন্থটি বিশেষ অভাব পূরণ করেছে ; এবং বলতেই হবে এ কাজের মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক পরিসরে ইসলামপন্থা নিয়ে গবেষণারত অগ্রসর চিন্তকদের মাঝে স্থান করে নিয়েছেন৷
তবে বাংলাদেশে কেবল পণ্ডিতমহলে নয় , রাজনীতি -সক্রিয় সর্ব মহলেই আগ্রহ ও আলোচনা চোখে পড়ছে৷ এমন এক সময়ে বইটি প্রকাশিত হয়েছে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নানা অছিলায় নানা রূপে হাজির হচ্ছে , জনপরিসর ভরে উঠেছে রাজনৈতিক পন্থা ও পদ্ধতির দ্বন্দ্বে৷ জামায়েতে ইসলামি নামের রাজনৈতিক দলটিও বর্তমানে সঙ্কটময় রূপান্তরের কাল অতিক্রম করছে৷ বাংলাদেশ আন্দোলনের বিরোধিতাকারী এবং মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী এই দলটি স্বাধীনতা -উত্তর বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে কেবল পুনঃপ্রতিষ্ঠিতই হয়নি , তৃতীয় বৃহত্ রাজনৈতিক দল হয়ে উঠেছে , অর্থনৈতিক ভাবে প্রবল হয়েছে , এমনকী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতারও শরিক হয়েছে৷ আর , ইদানীং যুদ্ধাপরাধের দায়ে গোলাম আজমসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা দণ্ড পেয়েছেন , আরও অনেকের বিচার চলছে ; রাজনৈতিক দল হিসেবেও সংগঠনটির বৈধতা আদালতে বিচারাধীন৷ অর্থাত্, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এক টান টান উত্তেজনাকর সময়ে বইটি প্রকাশিত হয়েছে৷
ফলত , মইদুল কী বলতে চেয়েছেন তা নিয়ে অনেকেই জিজ্ঞাসু হয়ে আছেন৷ তিনি গ্রন্থের শুরুতেই ইসলামপন্থা ও এর উত্থানের ইতিহাস , নয়া উদারবাদ , জাতি -রাষ্ট্র , রাজনৈতিক মতাদর্শ ইত্যাদি ধারণা নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে নিয়েছেন৷ এও পরিষ্কার করে নিয়েছেন যে , বিশ্বাসের জগত ও রাজনীতির জগতকে আলাদা করার সনাতন অভ্যাস থেকে অনেক গবেষকের মতো তিনিও সরে এসেছেন৷ ইতোপূর্বে ধারণা করা হত , মতাদর্শ সেকুলার ব্যাপারস্যাপার এবং সেহেতু ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রাইভেট পরিসরে ঠেলে দাও৷ মইদুল বলছেন , মতাদর্শ নিয়ে সাম্প্রতিক ধ্যানধারণা অনুযায়ী একটা সর্বাত্মক ভুবনদৃষ্টির কারণে ইসলামপন্থাকে অবশ্যই আধুনিক রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে গণ্য করতে হবে৷ ব্যাপারটাকে তিনি এই ভাবে হাজির করেছেন , অ্যারিস্টটল আমাদের শিখিয়েছেন , ‘মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী৷ ’ এই বিবেচনাতেই মানুষের সমবায়ে গঠিত ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বস্ত্তত রাজনৈতিক৷
কিন্ত্ত ইসলামপন্থী কে? ইসলাম ধর্মের সকল মানুষই কি ? ইসলামপন্থী বা ইসলামিস্ট বলে মইদুল তাঁদেরকেই চিহ্নিত করেছেন যাঁরা মনে করেন ইসলাম পৃথিবীর তাবত্ মানুষের জন্যই একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং দাবি করেন যে , এটি এমনই এক রাজনৈতিক মতাদর্শ যার উদ্দেশ্য শরিয়তভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম৷ অর্থাত্ ইসলামপন্থীদের কাছে ইসলাম কেবল ধর্ম নয় , রাজনৈতিক মতাদর্শ৷ ইসলামপন্থীদের তিনটি ভাগে মইদুল ভাগ করেন : মডারেট ইসলামিস্ট , মেইনস্ট্রিম ইসলামিস্ট এবং এক্সট্রিমিস্ট ইসলামিস্ট৷ এ বিবেচনায় , জামায়েত ইসলামিকে মডারেট ইসলামিস্ট দল হিসেবে চিহ্নিত করা যায় , যেমন করা যায় মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে৷ মাহমুদ মাদানির সঙ্গে একমত হয়ে তিনি বলেন , ইসলামপন্থীর জন্ম ঔপনিবেশিক আধুনিকতার অন্তরে এবং পশ্চিমের সাপেক্ষে৷ ইসলামপন্থাকে মুসলমান সমাজগুলোতে ইউরো -আমেরিকান আধুনিকতা চর্চার ফলশ্রীতিতে তৈরি অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখা যায়৷ পশ্চিমি আধুনিকতা ও পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে ইসলামপন্থীরা ‘ইসলামি আধুনিকতা ’ বা ‘ইসলামি রাষ্ট্র ’র কথা বলেন, অথচ সে আধুনিকতা বা রাষ্ট্রকল্প পশ্চিমের কাছে ধার -করা ধারণা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব হয়ে ওঠে না৷
পাবলিক পরিসরে ধর্মের রাজনৈতিক উপস্থিতি নিয়ে মইদুলের কোনও আপত্তি , সেহেতু, নেই৷ তিনি বরং রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে ইসলামপন্থা , বিশেষত জামায়াতে ইসলামপন্থার কড়িবর্গা মাপজোক করে দেখেছেন৷ আর , এই বিচারের জন্য তিনি উদারনৈতিকতার পথে ক্রমাগত হাঁটতে থাকা সাম্প্রতিক ভারত ও বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামির মতাদর্শ ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করেছেন৷ দেশে দেশে ‘ইসলামি রাষ্ট্র ’ কায়েমের ইউটোপিয়া নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোর অন্যতম তত্ত্বগুরু আবুল আলা মওদুদির নেতৃত্বে ১৯৪৭ -এর পূর্ববর্তী ব্রিটিশ -ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক দলটি ত্রিখণ্ড মহাভারতে নিজেও ত্রিধাবিভক্ত হয়েছে৷ মইদুল দেখতে পাচ্ছেন , ভারত ও বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামির চলন -বলন আলাদা , বলা চলে বিপরীতমুখী৷ ভারতে জামায়াতে ইসলামি নিম্নবর্গীয় চরিত্রের হলেও বাংলাদেশে তারা ক্ষমতাচক্রেরই অংশীদার , ভারতে নয়া উদারপন্থার বিরোধী হলেও বাংলাদেশে সহচর এমনকী বলা চলে নয়া উদারবাদের সুবিধাভোগী৷ ভারতে সেকুলার জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থীরা জামায়াতে ইসলামির মিত্রপক্ষ , অন্য দিকে বাংলাদেশে সেকুলার জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থীরা তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ৷ মইদুল দাবি করেন , এইসব বৈপরীত্য মূলত জামায়াতের মতাদর্শিক অসঙ্গতিরই প্রতিফলন৷
ভারতে মুসলমানদের অবস্থান সমাজের সবচেয়ে নিচুতলায় , দলিত ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাতারে৷ নয়া উদারবাদী পদক্ষেপগুলোর কারণে মুসলমানদের অবস্থা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকছে৷ ফলে , জামায়াত বামপন্থী ও দলিত বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে৷ কেবল মুসলমান নয় , দলিত নিম্নবর্গীয় মানুষদেরও স্বার্থে৷ তাদের অবস্থান ক্ষমতাগোষ্ঠীর বিপক্ষে৷ এমনকী , জামায়াতের ২৫০০০ বা তারও বেশি সদস্য ভিন্ন ধর্মের মানুষ৷ ফলে , জামায়াতের ‘ইসলামি উম্মাহ ’ ধারণা , যেখানে অমুসলিমরা বাদ পড়ে যায় এবং ভারতের বঞ্চিত সকল জনগণের হয়ে তাদের রাজনীতি বৈপরীত্যময় অবস্থানে গিয়ে পৌঁছায়৷ আবার , সংখ্যালঘু ‘অপর ’ হিসেবে মুসলমানদের বিশেষ স্বার্থ রক্ষা করতে জামায়াত ‘হিন্দুত্ববাদ ’কেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে শনাক্ত করতে বাধ্য হয়৷ অন্য দিকে তারা যে পাশ্চাত্যবিরোধী সেই পাশ্চাত্য থেকে আসা সেকুলারপন্থাকেই নিজেদের পথ হিসেবে গ্রহণ করে নেয় , সেকুলার ও বামপন্থী দলগুলো তাদের মিত্র হয়ে ওঠে৷ এমনকী ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রধান গন্তব্য ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ নামের কল্পরাজ্য তৈরির বাসনাও ত্যাগ করতে হয়৷
অন্য দিকে, সংখ্যাগুরু মুসলমানের বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামির কাছে ‘ইসলামি রাষ্ট্র ’ কায়েম করা এক প্রবল মতাদর্শিক প্রবচন৷ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের মতোই জামায়াত বাংলাদেশে শরিয়তভিত্তিক ‘খাঁটি ’ ‘ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা’ কায়েম করতে চায়৷ অনুসারীদের কাছে পুঁজিবাদের বিপরীতে এই স্বপ্ন বিলি করে৷ অথচ , পুঁজিবাদের এই পর্যায়ের নয়া উদারবাদী প্রকল্পকেই তারা বাংলাদেশে এগিয়ে নিয়ে চলেছে৷ আর এ কারণেই নয়া উদারপন্থা সমর্থক প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামি লিগ ও বিএনপি ’র সীমা ছাড়িয়ে তারা এগোতে পারে না , কোনও বিকল্প রাজনৈতিক পন্থাও জনগণের সামনে হাজির করতে পারে না৷ নির্বাচনে তাদের জনসমর্থন ৩ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খায়৷ বাংলাদেশে জনস্বার্থ পরিপন্থী নয়া উদারবাদী পদক্ষেপগুলোর বিরুদ্ধে জামায়াত সোচ্চার হয় না , বরং সুবিধা ভোগ করে৷ কিন্ত্ত নয়া উদারবাদ উপজাত সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশ যেমন নাস্তিকতা , যৌনতা ইত্যাদি নিয়ে মাঠ গরম করে রাখে , নীতিপুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়৷ মইদুল এ সব বৈপরীত্যকেও তুলে ধরে দাবি করেছেন , এর উত্স নিহিত আছে মূলত দলটির মতাদর্শিক অসঙ্গতির মধ্যে৷
সর্বোপরি জামায়াতে ইসলামি এবং এরকম ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো দাবি করে যে , সকল ‘মনুষ্য -তৈরি মতাদর্শ’ এবং ধর্ম ব্যর্থ হবে ; কারণ সেগুলো মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর (অসাম্য ও অবিচার ) কোনও সমাধান দিতে পারে না, কিন্ত্ত ‘মুক্তিদায়ী মতাদর্শ’ হিসেবে ইসলাম সকল সমাধান দিতে পারে৷ মওদুদি বলতেন ইসলামপন্থা সমাজতন্ত্রও নয় পুঁজিবাদও নয় বরং মধ্যপন্থা৷ কিন্ত্ত মইদুল দেখতে পান , ‘মধ্যপন্থা ’ বলে তিনি এবং অন্যান্য তাত্ত্বিকরা যে ইসলামি রাষ্ট্রকল্প খাড়া করেছেন তা বস্ত্তত পুঁজিবাদেরই অধীন , যাকে বড়োজোর কল্যাণমূলক ‘নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ ’ আখ্যা দেওয়া চলে৷ মার্কেট হবে নিয়ন্ত্রিত , কিন্ত্ত কিছুতেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধ নয়৷ ব্যক্তিমালিকানা ও মজুরি শ্রম সমান ভাবেই সচল থাকবে৷ সুদের বিরুদ্ধে কথা বললেও লভ্যাংশ নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই জামায়াতের৷ কিন্ত্ত মার্কস আমাদের দেখিয়ে গেছেন , সুদ ও লভ্যাংশ দুইই উদ্বৃত্ত তৈরি করে --- যা পুুঁজিবাদের প্রাণভোমরা৷ উপরন্ত্ত নিরঙ্কুশ আধিপত্যবাদী সেই রাষ্ট্রে নারী , বিধর্মী এবং অন্যান্য অপরদের অবস্থান আবশ্যিক ভাবেই দ্বিতীয় কাতারে৷ এও এক গুরুতর অসঙ্গতি বটে৷
জামায়াতে ইসলামির মতাদর্শগত সীমাবদ্ধতা , বাংলাদেশ ও ভারতে দলটির রাজনৈতিক শত্রু ও মিত্রপক্ষ নির্ধারণের বৈপরীত্য এবং বিশেষত ভারতে নয়া উদারবাদের বিরোধিতা অথচ বাংলাদেশে সহচরী ভূমিকা মইদুল যথার্থই শনাক্ত করতে পেরেছেন৷ তবে , জামায়াতে ইসলামির মতাদর্শ ও কর্মকাণ্ড বিচার করেই বিশ্বব্যাপী বৈচিত্রময় ইসলামপন্থী রাজনীতির সীমানা দেগে দেওয়া যায় কি ? বইটির শিরোনামের প্রথম অংশে সেই রকম প্রস্তাবনা থাকলেও আমরা উত্তর পাই কেবল জামায়াতে ইসলামি প্রসঙ্গে৷ তা ছাড়া , সীমানাভাঙা বর্তমানে কেবল ইসলামপন্থা না , সঙ্কটে আছে সর্বজনমান্যতা দাবিকারি সকল মতাদর্শই, এমনকী ‘রাজনীতি ’ বলে এত কাল আমরা যে ধারণাটি চিনতাম তাও৷ মইদুল ইসলাম বার বার ‘প্রগতিশীল ’ রাজনীতির কথা বলেছেন , যা বইটির শেষভাগে স্পষ্ট হয় : পশ্চিমের বিপরীতে প্রতিবাদী মতাদর্শ হিসেবে ইসলামপন্থাকে অনেকেই উদ্যাপন করেন৷ কিন্ত্ত এই বিপরীত ক্যাম্পের কোনও একটিকে আস্থা রাখার বদলে বরং আমাদের উচিত এমন এক সমালোচনাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক ডিসকোর্স গড়ে তোলা যা একইসঙ্গে প্রাচ্যবাদ , নয়াউদারবাদ , এবং সর্বোপরি ইসলামপন্থার আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে৷ কারণ , মুক্তিদায়ী আদর্শের কথা বললেও ইসলামপন্থা এমন এক রাজনৈতিক প্রকল্প খাড়া করে যা বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চলমান শোষণ -পীড়নকেই ভিন্ন নামে সচল রাখতে চায়৷
কিন্ত্ত সেই সমালোচনাত্মক ডিসকোর্স গড়ে ওঠার জন্য বোধ হয় আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে৷ বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলন , ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন কিংবা আরব বসন্ত বিচার করলে আমরা বলতে পারি , পুরাতন সকল রাজনৈতিক মতাদর্শই ‘এমটি সিগনিফায়ার ’ হয়ে উঠেছে , যেমন অর্থহীন হয়ে উঠেছে খোদ গণতন্ত্র ধারণা৷ আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি যার রাজনৈতিক ভাষা এখনও অঙ্কুরোদগমের অপেক্ষায়৷
লেখক বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকইসলামপন্থা কি দিতে পারে নয়া উদারবাদের বিকল্প রাজনৈতিক মতাদর্শ? উত্তরের খোঁজে একটি বই৷ পড়লেন আ -আল মামুনলিমিট্স অফ ইসলামিজম : জামায়ত -ই-ইসলামি ইন কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশমইদুল ইসলামকেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস৷ ৬২০ টাকাইসলামপন্থী বা ইসলামিস্ট বলে মইদুল ইসলাম তাঁদেরকেই চিহ্নিত করেছেন যাঁরা মনে করেন ইসলাম পৃথিবীর তাবত্ মানুষের জন্যই একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং দাবি করেন যে , এটি এমনই এক রাজনৈতিক মতাদর্শ যার উদ্দেশ্য শরিয়তভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম৷
সুত্রঃ এই সময়

সুশাসন নিয়ে আলোচনায় আসছেন মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি সারাহ

নাগরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি সারাহ সিওয়েলের ঢাকা  সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র সফরটির বিষয়ে মিডিয়া নোট দিয়েছেন। সেখানে তিনি জানান, গত ২৫শে মার্চ থেকে থাইল্যান্ড সফরে রয়েছেন সারাহ। ব্যাংকক থেকে সরাসরি বাংলাদেশে আসবেন তিনি। আগামী ৩১শে মার্চ পর্যন্ত এখানে থাকবেন ওবামা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রতিনিধি। ঢাকা সফরকালে সুশাসন এবং সহিংস-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। ঢাকায় সন্ত্রাসবাদ বিরোধী একটি জনবক্তৃতাও করবেন সারাহ। ‘আওয়ার শেয়ার স্ট্রাগল এগেইস্ট ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম’ শীর্ষক ওই বক্তৃতা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। উল্লেখ্য, সারাহ দুই বছরের বেশি সময় ধরে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে নাগরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের বিষয়টি দেখভাল করছেন। বাংলাদেশে এটা তার প্রথম সফর। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিসহ সার্বিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন ওই প্রতিনিধির ঢাকা সফরকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য মতে, মোট সাতটি ব্যুরো ও অফিস প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন আন্ডার সেক্রেটারী সারাহ সিওয়েল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ রয়েছে তার। দূতাবাসের তরফে সেই আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে জানিয়ে সরকারি এক কর্মকর্তা বলেন, দূতাবাস যেসব আপয়েনমেন্ট চেয়েছে তার বেশির ভাগই চূড়ান্ত হয়েছে।

পরমাণুকেন্দ্রের প্রহরীকে হত্যা করে প্রবেশ কার্ড চুরি

ব্রাসেলস হামলায় জড়িত চক্রকে পাকড়াও করতে বেলজিয়ামের পুলিশ এখনো সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই অভিযানের মধ্যেই দেশটির একটি পরমাণুকেন্দ্রের একজন নিরাপত্তাকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে থাকা ভেতরে ঢোকার স্বয়ংক্রিয় অনুমতিপত্রও (অ্যাকসেস ব্যাজ) নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জঙ্গিদের হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল বেলজিয়ামের পরমাণুকেন্দ্র—একটি ফরাসি পত্রিকা গত বৃহস্পতিবার এমন প্রতিবেদন করার পর এ ঘটনা ঘটল। শুক্রবার ব্রাসেলসের অদূরের শেয়ারবিক এলাকায় অভিযান চালানোর সময় এক সন্দেহভাজনকে পায়ে গুলি করে আহত অবস্থায় ধরেছে পুলিশ। তবে তার নাম ঠিকানা প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে ব্রাসেলস হামলার ভিডিও ফুটেজে যে তিন হামলাকারীর ছবি দেখা গিয়েছিল, তাদের তৃতীয়জনকেও শনাক্ত করা গেছে। বেলজিয়ামের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তৃতীয় ওই ব্যক্তির নাম ফয়সল শেফু। চলমান সাঁড়াশি অভিযানে বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত বেলজিয়ামে মোট নয়জনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্রাসেলসের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে শুক্রবার জার্মানি থেকে দুজন এবং ফ্রান্স থেকে একজনকে আটক করা হয়। বেলজিয়াম থেকে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত একটি পত্রিকা গতকাল শনিবার জানিয়েছে, দেশটির শারলেরোই এলাকায় অবস্থিত পরমাণুকেন্দ্রের একজন নিরাপত্তাকর্মীকে কে বা কারা গুলি করে হত্যা করে ফেলে গেছে। কেন্দ্রে ঢোকার জন্য ওই নিরাপত্তাকর্মী যে অ্যাকসেস ব্যাজ ব্যবহার করতেন, সেটি পাওয়া যাচ্ছে না। একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলেছে, নিরাপত্তার কথা ভেবে অ্যাকসেস ব্যাজের প্রবেশ কোড নম্বর তাৎক্ষণিকভাবে অচল করা হয়েছে। এ ঘটনার পেছনে জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পরমাণুকেন্দ্রে সন্ত্রাসীদের নজর রয়েছে বলে এর আগে যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, এ ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই পত্রিকাটি গত বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে বলেছিল, হামলাকারীরা প্রথমে পরমাণুকেন্দ্রকেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল। কিন্তু পরে চক্রের বেশ কয়েকজন ধরা পড়ে যাওয়ায় তারা দ্রুত মত বদলে ফেলে এবং বিমানবন্দর ও পাতালরেল স্টেশনে হামলা চালায়। এদিকে বেলজিয়ামের কৌঁসুলিরা গতকাল জানিয়েছেন, প্যারিস হামলার অন্যতম সন্দেহভাজন সালাহ আবদেসালাম ব্রাসেলস হামলা নিয়ে নিয়ে মুখ খুলছেন না। প্রথম দিকে আবদেসালাম জিজ্ঞাসাবাদকারীদের সহযোগিতা করলেও মঙ্গলবারের ব্রাসেলস হামলার পর তিনি তাঁর ‘চুপ থাকার অধিকার’ প্রয়োগ করছেন। এদিকে, ফের যাতে কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য ব্রাসেলস বিমানবন্দর আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ওবামার হুঁশিয়ারি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ব্রাসেলস হামলার দায় মুসলমানদের ওপর ঢালাওভাবে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তাহলে বিষয়টিকে সন্ত্রাসীরাই ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করবে। গতকাল শনিবার সাপ্তাহিক ভাষণে ওবামা বলেন, ‘সহিংস জঙ্গিবাদে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুসলমান-আমেরিকানরা আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই মুসলমান-আমেরিকানদের দোষারোপ করা এবং দেশের উন্নয়নে তাঁদের ব্যাপক অবদানকে ছোট করে দেখার যেকোনো চেষ্টা আমাদের প্রতিহত করতে হবে। এ ধরনের কাজ হবে আমাদের জাতীয় চরিত্র, মূল্যবোধ ও ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুসলমানদের দোষারোপ করা হলে তা সন্ত্রাসীদের পক্ষেই যাবে, যারা আমাদের একে অন্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়।’ বেলজিয়ামের সন্ত্রাসী হামলায় দুই মার্কিন নাগরিকসহ ৩১ জন নিহত হয়।

আসামে ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশকারী তাড়াব

নরেন্দ্র মোদি।
আসামে বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই রাজ্য থেকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ বিতাড়িত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শনিবার আসামে প্রথম দিনের মতো ভোট প্রচারে এসে মোদি এই ঘোষণা দেন। প্রচারণায় উন্নয়নের পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারী বিতাড়নকে মূল ইস্যু করেছেন নরেন্দ্র মোদি। টানা পনেরো বছর ধরে কংগ্রেস শাসিত রাজ্যের ‘অনুন্নয়নকে’ কটাক্ষ করে মোদির ঘোষণা—‘উন্নয়ন, দ্রুত উন্নয়ন আর সার্বিক উন্নয়ন’ই তাঁর লক্ষ্য। তাঁর ঘোষণা, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ-এর বিরুদ্ধে তাঁর কোনো ‘লড়াই’ নেই। ‘গরিবীর বিরুদ্ধে লড়াই’-এ শামিল হয়েছেন তিনি। গতকাল শনিবার দিল্লি থেকে উড়ে এসে একই দিনে চার-চারটি জনসভা ও একটি ‘মতবিনিময়’ সভা করে দিল্লি ফিরে যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ‘রাজ্যে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠা হলে বেআইনিভাবে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করা হবে।’ আজ রোববার ফের আসাম সফরে আসছেন মোদি। ১২৬ বিশিষ্ট আসাম বিধানসভায় ক্ষমতায় আসতে মরিয়া বিজেপি।
আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট করলেও একাই প্রার্থী দিয়েছে ৯১টি আসনে। ৪ এপ্রিল, সোমবার আসামের প্রথম দফায় ৬৫টি আসনে ভোট। দ্বিতীয় দফায় ঠিক পরের সোমবার, ১১ এপ্রিল ভোট। বিজেপি এবার আসামে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী করেছে ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলনের নেতা তথা মোদি মন্ত্রিসভার ক্রীড়ামন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালকে। উত্তর আসামের তিনসুকিয়ায় দাঁড়িয়ে মোদির প্রশ্ন, ‘সুখিয়া কোথায়, সবই তো দুঃখিয়া নজরে আসছে!’ তাঁর দাওয়াই, ‘গরিবের জন্য শিক্ষা, বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান আর বৃদ্ধদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করলেই আসামের ছবিটা পাল্টে যাবে।’ চা-বাগানে বিশাল ভোটব্যাংক মাথায় রেখে আপার আসামে প্রধানমন্ত্রী শোনালেন, ‘ছোটবেলায় আসামের চা বিক্রি করে ক্রেতাদের মুগ্ধ করতাম। এখানকার বাগানের চা খেয়ে ক্রেতারা মুগ্ধ হতেন!’ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ মাজুলিতে ভোট প্রচারে মোদি দুর্নীতি ইস্যুতে কংগ্রেসকে বিঁধতে কার্পণ্য করেননি। বললেন, ‘কংগ্রেস টাকা খায় বলে শুনেছি। কিন্তু জানা ছিল না, এমন সুন্দর দ্বীপকেও ওঁরা খেয়ে নিতে পারে!’

অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ রোধে উন্নত মানের চুলা by বিয়ন লোমবোর্গ

উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো তৃতীয়টি।
বাড়ির ভেতরে খোলা আগুনে রান্নার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা এক দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট ধূমপান করার সমপরিমাণ হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি ১০টি বাড়ির মধ্যে প্রায় ৯টি বাড়ি অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের শিকার। এসব বাড়িতে রান্নার জন্য কাঠ ও অন্যান্য জৈব জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। ঘরের ভেতরে খোলা আগুনে রান্নার ফলে ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের মতো মারাত্মক সব ব্যাধিতে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এ রকম অভ্যন্তরীণ দূষণ ১০-১৫ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী।
এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই বলা যায়, বাড়ির ভেতরের বায়ুদূষণ কমানোর বিষয়ে এখন আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার। এ ব্যাপারে আমাদের করা একটি গবেষণায় বাড়ির ভেতরে মারাত্মক বায়ুদূষণ হ্রাসের ব্যাপারে দুটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমত, মানুষ হয় একই জৈব জ্বালানি বারবার ব্যবহার করতে পারে। তবে তা করতে হবে আরও উন্নত মানের রান্নার চুলা ব্যবহার করে, যা অনেক কম ধোঁয়া নিঃসরণ করে অথবা তারা জৈব জ্বালানির পরিবর্তে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করতে পারে, যা অনেক বেশি পরিচ্ছন্নভাবে রান্নার কাজটি করে।
ঘরের ভেতরে বায়ুদূষণ রোধ করার সবচেয়ে সস্তা উপায় হলো উন্নত রান্নার চুলা তৈরিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করা। এই চুলায় সাধারণত একটি চিমনি থাকে, যা ঘরের ভেতরে ধোঁয়া উদ্গিরণ না করে বাইরে করে এবং তাপের অপচয় রোধ করে রান্নার হাঁড়িতে তাপ ছড়িয়ে দেয়। গতানুগতিক চুলা বা খোলা আগুনে রান্নার চেয়ে এই চুলায় রান্না করা বেশি আরামদায়ক এবং পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর। এ ধরনের একটি চিমনিসহ দ্বিমুখী চুলা তিন বছর স্থায়ী হয়। এই চুলা ব্যবহারে পরিবারপিছু বছরে খরচ হবে এক হাজার টাকা। এর উপকারিতা অনেক। যদি বাংলাদেশের তিন কোটি পরিবারের সবগুলোই গতানুগতিক চুলার পরিবর্তে উন্নত রান্নার চুলা ব্যবহার করে, তাহলে প্রতিবছর ৩৩ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। প্রতিটি মানুষ গড়ে আরও ২৮ বছর বেশি বেঁচে থাকবে, যার অর্থমূল্য প্রায় ৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রতিটি পরিবার অসুস্থতার কয়েকটি দিন কম যাপন করবে, যার অর্থমূল্য আরও ২৬০ টাকা।
এ ছাড়া প্রতিটি পরিবারে রান্নার সময়ও দৈনিক ১৫ মিনিট করে বাঁচবে, কারণ উন্নত রান্নার চুলাগুলো দ্রুত কাজ করে এবং যেহেতু এতে কম জ্বালানির প্রয়োজন হয়, তাই এটা প্রতিদিনের জ্বালানি সংগ্রহ করার সময়কে অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। সব মিলিয়ে এই সুবিধার অর্থমূল্য আরও ২০০০ টাকা। ঘরের ভেতরে বায়ুর মান উন্নয়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে আমরা আরও বিকল্প চিন্তা করতে পারি। তা হলো ব্যাপকভাবে এলপিজির ব্যবহার। এটি খুব পরিচ্ছন্নভাবে রান্নার কাজটি করে, প্রায় একটি বৈদ্যুতিক চুলার মতোই। এলপিজির ব্যবহার অনেক বেশি সুবিধা দেবে। এটা ৯১০০০ হাজার মানুষের জীবন বাঁচাবে, যার অর্থমূল্য প্রায় ২১ হাজার ৮০০ টাকা বা পরিবারপিছু ৭ হাজার ৩০০ টাকা। এটি পরিবারপিছু প্রায় ৭০০ টাকার অসুস্থতার খরচ কমাবে, রান্নার গতি বৃদ্ধি করবে প্রায় ৪০ মিনিট এবং জ্বালানি সংগ্রহের পুরো সময়টা বাঁচিয়ে দেবে, যার নিট অর্থমূল্য প্রায় ৫ হাজার ২০০ টাকা।
কিন্তু এলপিজির খরচটাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে বছরে খরচ পড়বে প্রায় ১০,০০০ টাকা, যার সঙ্গে যোগ হবে ২০০০ টাকার জ্বালানি খরচ। তবে সব মিলিয়ে আপনি প্রায় ১২,০০০ টাকা খরচ করে প্রায় ১৩ হাজার ২০০ টাকার সুফল পাবেন। তাই এলপিজি ব্যবহারের জন্য আপনার আর্থিক ক্ষতি হবে না।
তবে এ-ও ঠিক যে সবচেয়ে দামি বিকল্পই সেরা বিকল্প নয়। সস্তা বিকল্পও অনেক সময় বেশি উপকার করে। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যয়বহুল বিকল্পগুলো সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশের মতো আয় রয়েছে এমন অনেক দেশ রান্নার কাজে বেশি অর্থ খরচ করে এলপিজির মতো আধুনিক জ্বালানি ব্যবহার করছে।
কিন্তু উন্নত মানের চুলা চালু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক পরিবারকে নতুন উন্নত মানের চুলায় অভ্যস্ত করানোটা কঠিন। প্রতিটি পরিবার উন্নত চুলাতে অভ্যস্ত না হতে পারলে স্থানীয় বায়ুদূষণ বৃদ্ধির কারণে খুব কমই সুফল পাওয়া যাবে।
তাই বায়ুদূষণ কম হয় এমন রান্নার চুলা ব্যবহারের সুবিধা জানিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। তবেই এর সুবিধা সম্পর্কে সবাই জানতে পারবে। এ-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর উচিত হবে ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী চুলাগুলো তৈরি করা। এবং চুলা কেনার জন্য পরিবারগুলোকে একাধিক কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত, যা তাদের জন্য আরও সাশ্রয়ী হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: তাসনুভা বাশার
ড. বিয়ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

আবেদনের ২৮ বছর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে শুনানি হচ্ছে by মেহের সাত্তার

রাষ্ট্রধর্ম ইসালামের প্রশ্নে উত্তপ্ত পরিস্থিতি আবারো মাঠে হেফাজত
ইংরেজির অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। শুনতে পেলেন রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বাদ রাখার যে আবেদন তিনি করেছিলেন শেষ পর্যন্ত সেই আবেদনের শুনানি হবে রোববার। এটা তার কাছে একরকম বিস্ময়। এখন থেকে ২৮ বছর আগে এ আবেদন করেছিলেন তিনি। এতে যে ১৫ বন্ধু স্বাক্ষর করেছিলেন, এরই মধ্যে তার ১০ জন মারা গিয়েছেন। ১৯৮৮ সালে ধর্মনিরপেক্ষ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও তার বন্ধুরা সতর্ক করেছিলেন যে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হলে দেশ মৌলবাদের দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু তখন দেশের সামরিক শাসক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করার জন্য তৎপর ছিল। উদ্বেগ উপেক্ষা করে তারা ওই বছরই সংবিধান সংশোধন করে ইসলামকে সরকারিভাবে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেয়। তাই ওই আবেদনের কোন ব্যবস্থা হয় নি।
এ মাসে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছে যে, ওই আবেদনের শুনানি হবে। এমন সিদ্ধান্ত এসেছে এক মোক্ষম সময়ে, যখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে রক্ষার এবং জঙ্গিদের ধারাবাহিক হামলা বৃদ্ধিতে বেড়েছে উদ্বেগ।
পাকিস্তানের কাছ থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইসলামের ব্যবহার নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। এখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ওই আবেদন বাংলাদেশের জনঅনুভূতির জন্য একটি পরীক্ষা। আদালতে এ নিয়ে শুনানির তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে সরকারি কর্মকর্তারা ততই নার্ভাসনেস হওয়ার কথা স্বীকার করছেন। শুক্রবার জুমার নামাজের পর ইসলামিক গ্রুপগুলো শুনানি বাতিল করার দাবিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে। এ বিক্ষোভের আয়োজক ছিল হেফাজতে ইসলাম। এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি ফয়েজুল্লাহ বলেন, এই শুনানি শান্তির প্রতি আঘাত নিয়ে আসবে। এতে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আঘাত আসবে। এদেশের মুসলিমরা এর পক্ষে থাকতে পারেন না। তাদের চেতনা এমন ঘটনার পক্ষে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ধারণা বাংলাদেশের ইসলামপন্থি বয়স্ক নেতাদের মতো প্রত্যাখ্যান করেন মুফতি ফয়েজুল্লাহ। তিনি বলেন, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম থেকে বাদ দেয়ার যে আবেদন করা হয়েছে তা করেছেন নাস্তিকরা। তিনি আরও বলেন, মধ্যপন্থি বা উদার ইসলামের ধারণা আমি পছন্দ করি না। ইসলাম তো ইসলামই। এটা সেই পথ, যে পথ সব সময়ই ছিল। কেয়ামত পর্যন্ত তা অক্ষত থাকবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিকেল ২ (এ) তে বলা হয়েছে ইসলাম হলো রাষ্ট্রধর্ম। দেশের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মুসলিম। ৮ দশমিক ৫ ভাগ হিন্দু, ক্ষুদ্র অংশ বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসে তখন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ জাগ্রত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সংবিধানে তারা অনুচ্ছেদ ১২ পুনঃসংযোজন করেছে। তাতে ‘ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে’র কথা বলা হয়েছে, যেটা ছিল ১৯৭২ সালে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আবেদন পুনরুজ্জীবিত করতে আদালত নির্দেশ দেন ২০১১ সালে।
একটি সময় পর্যন্ত সক্রিয় না থাকার পর দেশের ভিতরকার জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলো পুনর্গঠিত হতে থাকে। এতে বাংলাদেশে সুন্নি মুসলিম কট্টরপন্থিদের নিয়ে গত বছর আতঙ্ক বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান এমন ৬ জন লেখক ও বোদ্ধাকে হত্যা করা হয় ২০১৫ সালে। নিহতদের বেশির ভাগকেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এর পরে কট্টরন্থিরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে। তারা হিন্দু ধর্মীয় পুরোহিত, ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হওয়া ব্যক্তি ও শিয়া মসজিদকে টার্গেট করতে থাকে। তখন থেকেই সামাজিক মিডিয়াগুলোতে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করতে থাকে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। বাংলাদেশে এ সংগঠনের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
ফরিদপুর জেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের এক কর্মী অলোক সেন বলেন, তার স্মরণকালের যেকোন সময়ের তুলনায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বেশি বিপন্ন মনে করছেন নিজেদের। তিনি বলেন, অনেক বছর ধরে আমি সক্রিয় কর্মী। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে অনেক প্রচারণায় অংশ নিয়েছি। কিন্তু কখনও আমার ওপর হামলা হয় নি। কিন্তু এখন আমি আর নিজেকে নিরাপদ বোধ করছি না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বয়স এখন ৭৯ বছর। তিনি বলেন, সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার সিদ্ধান্তের সম্পর্ক আছে। এতে সারাদেশের আবহাওয়া (পরিবেশ) পাল্টে গেছে। কেউ ইসলামের নামে কোন ঘটনা ঘটালে তাকে একরকম দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে এতে। অনেক বছর ধরে মানুষ ধর্মের নামে অনেক দূর সরে গিয়েছে। তা থেকেই গত বছরের হত্যাকা-গুলো ঘটেছে।
আদালতে শুনানির সময় যতই ঘনিয়ে আসছে এ সপ্তাহে ততই স্নায়ু দুর্বল হয়ে আসছে। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, রোববারের তিনি ওই আবেদনের শুনানিতে স্থাগিতাদেশ চাইবেন বলে পরিকল্পনা করছেন। কারণ হিসেবে দেখাবেন যে, পরিস্থিতি অত্যন্ত কলহপ্রবণ। কট্টরপন্থি সহিংসতার উত্থান ও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেয়ার মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে বলে তিনি দেখছেন না। তিনি বলেন, সব সময়ই বিশৃংখলা সৃষ্টি করার জন্য কিছু মানুষ থাকে।
(নয়া দিল্লি থেকে যৌথভাবে এ রিপোর্ট লিখেছেন ইলেন বেরি)
নিউ ইয়র্ক টাইমে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ