Showing posts with label চারদিক. Show all posts
Showing posts with label চারদিক. Show all posts

Wednesday, March 30, 2011

শুদ্ধ জাতীয় সংগীত নিয়ে কর্মশালা by গাজীউল হক

আজকাল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভুলভাবে, ভুল উচ্চারণে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। এ নিয়ে সব মহলেই হতাশার কথা শোনা যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কুমিল্লায় আয়োজন করা হয় এক কর্মশালার। কুমিল্লার সামাজিক সংগঠন অধিকার ফাউন্ডেশন ওই কর্মশালার আয়োজন করে। শুদ্ধ জাতীয় সংগীত পরিবেশন শিরোনামের কর্মশালাটি ২৪ মার্চ কুমিল্লা টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী আয়োজিত ওই কর্মশালায় কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অংশ নেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মহিলা শিক্ষক। বিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর আগে অ্যাসেম্বলিতে তাঁদের নেতৃত্বেই শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষকেরা যেন শুদ্ধ জাতীয় সংগীত পরিবেশন করতে পারেন, সে জন্যই ওই কর্মশালা—জানালেন আয়োজকেরা।
কর্মশালার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অধিকার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আলী আকবর মাসুম জানান, মার্চ মাস স্বাধীনতার মাস। এ মাসকে কেন্দ্র করে তথা স্বাধীনতার ৪০ বছর উপলক্ষে ওই কর্মশালা করা হয়। এতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেছে নেওয়া হয়। শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানেই শিক্ষার্থীদের অ, আ, ক, খ-সহ বর্ণমালা শেখানো হয়। জাতীয় সংগীতও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের রপ্ত করতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা এ সম্পর্কে অজ্ঞ। তাঁদের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত নিয়ে ধারণাও স্পষ্ট নয়। আর যাঁরা শেখাচ্ছেন, তাঁদেরও রয়েছে কিছু দুর্বলতা। আর যাঁরা পারেন, তাঁদের ওই পারাটাকে আরও বিকশিত করার জন্য ওই কর্মশালার আয়োজন। দিনব্যাপী ওই কর্মশালায় প্রশিক্ষক ছিলেন কুমিল্লার সংগীতাঙ্গনের প্রিয় মুখ অমল কুমার সিনহা, অভিজিৎ সিনহা মিঠু ও শিপ্রা সরকার। তাঁরা একে একে সব ভুল ধরিয়ে দেন। বাতলে দেন লাল-সবুজের পতাকার প্রিয় সংগীতের ভাবার্থ। সুর, তাল ও লয় নিয়ে কথা বলেন।
সকাল নয়টায় ওই কর্মশালা শুরু হয়। এতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একে একে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। পরিবেশনের পর প্রত্যেক শিক্ষকের ভুলত্রুটি সংশোধন করে পুনরায় জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। এরপর জাতীয় সংগীতের শুদ্ধ উচ্চারণ, জাতীয় পতাকার তথ্য পরিচিতি সম্পর্কে শিক্ষকদের ধারণা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে কথা বলেন সাপ্তাহিক অভিবাদন পত্রিকার সম্পাদক আবুল হাসানাত বাবুল। তিনি শিক্ষাঙ্গনে সঠিক মাপের পতাকা টানানো, শুদ্ধ জাতীয় সংগীত চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পতাকা ও সংগীতে তারুণ্যের উদ্দীপনা এবং চিরায়ত বাংলার রূপ রয়েছে। আমরা যেন কখনো একে অবমাননা না করি।’
কর্মশালায় গুলবাগিচা, বিষ্ণুপুর, মনোহরপুর, লতিফা নিরোদা সুন্দরী, গোবিন্দপুর, আড়াইওড়া, আড়াইওড়া পূর্ব, শাসনগাছা, চাঁদপুর, সৈয়দপুর, কমলাপুর, কালীরবাজার, ধনুয়াইশ, হাতীগাড়া, কৃষ্ণনগর, হারুন, রেয়াজউদ্দিন, কাঁটাবিল, বজ্রপুর, রত্নাবতী, উত্তর রসুলপুর, কোটেশ্বর, মুন্সীবাজার, চাঁদপুর, বালুতুপা, ঝাঁকুনিপাড়া, রঘুপুর, অরণ্যপুর ও কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষক অংশ নেন।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া কালীরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক স্নিগ্ধা রানী রায় বলেন, ‘কর্মশালায় অর্জিত জ্ঞান আমাদের প্রতিদিনকার কাজে লাগবে। এ ধরনের কর্মশালা একেবারেই ব্যতিক্রম। আমাদের মধ্যে যেসব ত্রুটি ছিল, তা কর্মশালার মাধ্যমে মুছে গেছে।’
বজ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফেরদৌসী আক্তার ও মনোহরপুর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেবেকা পারভীন বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কর্মশালায় প্রথম এসেছি। এখন শিক্ষার্থীদের আরও ভালো করে জাতীয় সংগীত শেখানো যাবে।’
বিকেলে কর্মশালার সমাপনী পর্ব। এ পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ। তিনি একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সহসভাপতি (ভিপি)। কুমিল্লা অজিত গুহ কলেজের দীর্ঘদিনের অধ্যক্ষ ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি, কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বললেন, ‘জাতীয় সংগীত নিয়ে এমন আয়োজন বিরল ঘটনা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে আমরা জাতীয় সংগীত শুনে বিস্মিত হই। হতবাক হই। তখন দুঃখ পাই, এ জন্যই কি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি? আশা করি, আমাদের সম্মানিত শিক্ষকেরা কোমলমতি শিশুদের শুদ্ধ জাতীয় সংগীত শেখাবেন। তবেই আমাদের স্বপ্ন সার্থক হবে।’
পরে কর্মশালার সনদ বিতরণ করা হয়। কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিক্ষকেরা দলীয়ভাবে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। সবশেষে একটি অঙ্গীকার হয়। ওই অঙ্গীকার পতাকার মান রাখার। ওই অঙ্গীকার একসঙ্গে শব্দ করে জাতীয় সংগীত গাওয়ার। এরপর বেলা পড়ে যায়। যেতে যেতে সবার কণ্ঠে আবারও বেজে ওঠে, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...’।

Wednesday, December 30, 2009

নয়ন-চয়নের নাও by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

হাঁটুপানি। অনেকে হেঁটেই পার হচ্ছেন। মেয়েরা এবং যাঁরা পায়ের জুতা খুলে পানিতে নামতে চাইছেন না, তাঁদের জন্য আছে নৌকা। নৌকার ওপর উঠে দাঁড়ালেই হাফপ্যান্ট পরা নয়ন, আর ফুল প্যান্ট পরা চয়ন—দুই ভাই পানিতে নেমে নৌকা টেনে ওপারে ভেড়াচ্ছে। একজন গলুইয়ের আগা ধরে টানছে, আরেকজন পিছে ঠেলছে। বড়জনের বয়স বড়জোর ১০ আর ছোটজনের ছয়-সাত। কাজ নেই। স্কুলেও যায় না। শুধু খেলেই বেড়ায়। পাড়ার এক মাতব্বর তাঁর পড়ে থাকা নৌকাখানা দিয়েছেন। তাই নিয়ে দুই ভাই সারা দিন এপার-ওপার করে। মালিককে কিছুই দিতে হয় না। তাই দুই টাকা পারানির পুরোটাই দুই ভাইয়ের।
রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের বুলনপুর এলাকার নিচে পদ্মা নদীর খেয়াঘাটের এই হাঁটুপানিতে দুই ভাইয়ের নৌকা নিয়ে সারা দিনের লুটোপুটি। হাতে ক্যামেরা দেখে ছোট ভাই চয়ন ফোকলা দাঁতে ফিক করে হেসে বলে, ‘আমাদের একটা ছবি তোলেন না!’ জানতে চাই, সারা দিনে কত হয় ওদের। নয়ন নৌকা টানতে টানতে বলে, ‘ওই...হয়।’ বলতে চায় না, মোট কত ওঠে। চয়ন বলে, ‘১০০ টাকার মতো হয়।’ ‘কী করিস এত টাকা?’
নৌকায় ঠেলা দিয়ে দম ছাড়তে ছাড়তে চয়ন বলে, ‘মা কিস্তির লাইগ্যা দৌড়ে বেড়ায়।’ বুঝতে পারি, কিস্তি মানে এনজিও থেকে নেওয়া কিস্তিতে পরিশোধ্য ঋণ। এই টাকা নিয়ে ওরা কি বাড়িঘর বানিয়েছে? ঘাটে নেমে নয়নকে শুধাই, ‘বাবা কী করে রে?’ ‘রিস্কা চালায়।’ ‘নাম কী?’ ‘মাসুম।’ ‘মা কী করে?’ ‘কিছু না।’
এ সময় নৌকা থেকে নামছিলেন বুলনপুরের কৃষক দেলোয়ার হোসেন। আঙুল তুলে দেখালেন, ওই যে ওদের মা রিনা বেগম। দেখি, বাঁধের ওপর থেকে চোখেমুখে উত্কণ্ঠা নিয়ে একজন নারী নেমে আসছেন। বয়স ২৮-৩০ বছর হবে। কাছে এসে নিজের থেকেই জানতে চাইলেন, তাঁর ছেলেদের কিছু হয়েছে কি না। তাঁদের সংসারের খবর নিতে চাইলে ভয় পান। তারপর আস্তে আস্তে বলতে থাকলেন, ছেলের বাবার সঙ্গে মাসখানেক আগে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ‘সে মাতাল। সারা দিন রিকশা চালিয়ে যা হয়, নিজেই হেরোইন খেয়ে শেষ করে দেয়। বলতে গেলেই বিপত্তি। বাড়িঘর নাই। এখানে বস্তিতে একাই বড় হয়েছে। যাওয়ার জায়গাও নাই।’ রিনা বেগমের গলায় বেশ বড় একটা আঁচড়ের দাগ দেখে মনে হলো, তিনি আত্মহত্যার জন্য গলায় দড়ি দিয়েছিলেন। কোনোভাবে হয়তো বেঁচে গেছেন। কিন্তু না, প্রসঙ্গ তুলতেই রিনা বেগমের মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি করে হাত দিয়ে দাগটা আড়াল করার চেষ্টা করেন। বললেন, ‘ওই শুইনেন না। স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার। নয়নের বাপের ঠেকেই একটু লেগেছিল।’ ‘কেন, আপনাদের না ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?’
বেশ আহ্লাদ ভরা কণ্ঠে এবার রিনা বেগম বলেন, ‘তাও আসে। জোর করে ভাত খেয়ে যায়। না দিতে চাইলেই ঝামেলা করে। সংসারে কোনো খরচও দেয় না।’
কথা বলতে বলতে আমরা বাঁধের ওপরে উঠে আসি। বটগাছের পাশে খোলা জায়গায় একটা ভাতের হাঁড়ি থেকে মাড় গড়িয়ে পড়ছে। দৌড়ে গিয়ে রিনা বেগম হাঁড়ি সামলাতে লাগলেন। পাশেই তিন দিকে ইট দিয়ে ঘেরা ওপরে কয়খান টিনে ছাওয়া একটা ঘর। চৌকিতে একটা বিছানা। রিনা বেগম বললেন, ‘আমিনুল ব্যাপারির ঘর। পড়েই থাকে। আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নেয় না। এখানেই থাকি। বাসাবাড়িতে কাজ করি।’
সুযোগ বুঝে কথা তুললাম, ‘বিনা ভাড়ায় থাকেন, তো কিস্তির টাকা তুলে কী করেছেন?’ ‘মিথ্যা কথা বলব না,’ রিনা বেগম গরগর করে বলতে লাগলেন, ‘আমার একটা মেয়ে আছে। নাম টুকটুকি। ১৪ বছর বয়স। বিয়ে দিয়েছি।’
মনে হলো, এনজিও থেকে টাকা তুলে রিনা বেগম মেয়ের বিয়েতে খরচ করেছেন, কিন্তু বললেন অন্য কথা। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে তাঁর মেয়েটা ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজে গিয়েছিল। ওখান থেকে বান্ধবীদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে রাজবাড়ীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। এখন হাজতে আছে। ‘এখন আমি মা হয়ে জাবিন চাচ্ছি, ম্যাসটেট জাবিন দিচ্ছে না। মেয়েকে বের করার জন্য গ্রামীণ শক্তি এনজিও থেকে ছয় হাজার টাকা তুলেছিনু। সব খরচ হয়ে যাচ্ছে। মেয়েকে বের করতে পারছি না।’ বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে তাঁর। ‘মেয়ের ছবি আছে। দেখেন, আমার ছোট মেয়ে, কিচ্ছু বোঝে না।’ ঘরের ভেতর থেকে একটা ছবি বের করে আনলেন রিনা বেগম, কিন্তু ছবিটার অর্ধেক ছেঁড়া। জিজ্ঞেস করার আগেই রিনা বেগম বললেন, জামাই-মেয়ে একসঙ্গে ছবি তুলেছিল। সেদিন রাগ করে জামাই মাঝখান দিয়ে ছিঁড়ে আলাদা করে দিয়ে গেছে। রিনা বেগমকে হালকা করার জন্য বলি, ‘আপনার ভাত তো হয়ে গেছে, আজকেও নয়নের বাবা খেতে আসবে নাকি?’
এবার একগাল হেসে রিনা বেগম হাত তুলে বললেন, ‘ওই দেখেন, নয়নের বাপ নদীতে গোসল করছে। যাইয়ে শুধান খাবে নাকি।’ বলতে বলতে আবার রিনা বেগমের মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। আমাদের পাশেই নয়ন-চয়ন দাঁড়িয়ে ছিল। এই ফাঁকে দেখি, ওরা নৌকা টানতে টানতে আবার ওপারে চলে গেছে। মনে হলো, হায় রে পদ্মা নদী, নয়ন-চয়নের সংসারের মতোই তোমার অবস্থা!