Monday, November 25, 2013

অবৈতনিক বনাম বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা by মহিউদ্দিন আহমদ

খোন্দকার লুৎফুল খালেদ, ফারিয়া তিলাত লোবা ও তন্বী নওশীন
সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী অন্যতম আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব বহন করে, কারণ এসব দেশের অধিকাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাই শিশুর শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগের সঙ্গে অভিভাবকের আর্থিক সক্ষমতা সরাসরি জড়িত। দেশে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু থাকলেও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নানারকম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচের কারণে একই মানের প্রাথমিক শিক্ষায় রাষ্ট্রের সব শিশুর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
দরিদ্রতা ও জনসংখ্যার ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির হার এবং জেন্ডার সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য সফলতা থাকলেও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর উচ্চহারের কারণে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও ২০১৫ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের শিক্ষাবিষয়ক মাইলফলক ছুঁতে পারবে না বলে ধরে নেয়া যায়। বর্তমানে বহু প্রতীক্ষিত শিক্ষা আইন অনুমোদন ও কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলছে, কিন্তু বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এর কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। তাই বিরাজমান আইন ও নীতিমালাগুলো বিশ্লেষণ করে সেই ভিত্তিতে শিক্ষা আইনের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে এ আইন প্রকৃত অর্থেই শিক্ষা অধিকার নিশ্চিত করার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা : সরকার প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলক) আইন ১৯৯০-এর মাধ্যমে দেশের সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করেছে। এ আইন অনুযায়ী সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়ভার মূলত বাবা-মার অর্থাৎ সরকার সচেতনভাবেই প্রধান দায়িত্ব বাহকের ভূমিকা থেকে সরে এসে তার জবাবদিহিতার জায়গাটি অস্বচ্ছ করে রেখেছে। অথচ একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রধান ও একমাত্র কর্তৃপক্ষ হল সরকার এবং সংবিধানে বিধৃত আছে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, তাই সরকার কোনোভাবেই প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়ভার অন্য কোনো পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিতে বা দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারে না।
আবার ১৯৯০-এর আইনের ন্যূনতম অঙ্গীকার হচ্ছে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাথমিক শিক্ষায় কোনো ফি লাগবে না এবং ক্রমান্বয়ে সব স্তরে অবৈতনিক শিক্ষা চালু করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা হল, প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পেছনে এখনও পরিবারকে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। যদিও প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রাথমিক শিক্ষার পরিধিও। শিক্ষাব্যয়ের মধ্যে বিদ্যালয়ের বেতন খাতে কোনো ব্যয় না থাকলেও অর্থাৎ শিক্ষা অবৈতনিক হলেও এখনও তা বিনামূল্যের নয় দেখে দরিদ্র পরিবারগুলোতেই এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
আলোচনা অবৈতনিকে সীমাবদ্ধ : জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ রাষ্ট্রের শিক্ষার নীতিগত তাগিদ সম্পর্কে বলা হয়েছে সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ সৃষ্টি করার কথা। যেখানে প্রতি ৯ জনের মধ্যে ৩ জন অতি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং শতকরা ৭৬ ভাগ মানুষ দৈনিক ১৬০ টাকার নিচে জীবনব্যয় নির্বাহ করে, সে দেশে সব মানুষের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টি করা বলতে অবশ্যম্ভাবীভাবে বোঝায় বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ। শুধু তাই নয়, শিক্ষা বিনামূল্যে করার পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বাড়তি প্রণোদনা তৈরির দায়িত্বও রাষ্ট্রেরই। অথচ শিক্ষানীতিতেও এ ব্যাপারে আলোচনা শুধু অবৈতনিকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষানীতির প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অংশে বলা হয়েছে ... প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক এবং সকলের জন্য একই মানের। কিন্তু এর পরপরই বলা হয়েছে- কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বাধ্যতামূলক করা হবে। সব শিশুর জন্য একই মানের শিক্ষা কেবল একই ধারার শিক্ষা চালু করার মধ্য দিয়েই সম্ভব। কিন্তু দ্বিতীয় অংশে দেশে বর্তমানে প্রচলিত যে ভিন্ন ভিন্ন ধারা তাকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে এবং সমাধান হিসেবে কেবল কিছু মৌলিক বিষয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি করার কথা বলা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ধারার শিক্ষার প্রচলন হয়েছে অভিভাবকদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে- এই চাহিদার পার্থক্য প্রধানত অভিভাবকদের অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে হয়ে থাকে, কারণ একেকটি ধারার শিক্ষার খরচে বিপুল পার্থক্য বিদ্যমান। যে কারণে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের প্রধানত মাদ্রাসায় পড়তে দেখা যায় এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুদের ইংরেজি মিডিয়ামে- একটি ধারায় বিশেষভাবে পারলৌকিক ও ধার্মিক বিষয়াদির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় এবং অন্যটিতে ইংরেজি ভাষা এবং ইউরোপীয় ইতিহাস ও কৃষ্টি! বৈষম্য টিকিয়ে রাখার কী প্রয়াস! এমনিভাবে অর্থনৈতিক অবস্থার পার্থক্যের কারণে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থায় ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়া চালু রেখে বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য- রাষ্ট্রের সকল শিশুর জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টি করা তাকেই অস্বীকার করা হচ্ছে।
আবারও উপেক্ষিত : বরাবরের মতো ২০১৩ সালের প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনেও শিক্ষাকে অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হয়নি, যাতে করে প্রত্যেক শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করে সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। যদিও খসড়া আইনের ৪র্থ পৃষ্ঠার ৫(১) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা সব শিশুর জন্য অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে, তবে মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি বরাবরের মতো উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের সব শিশুর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দিক থেকে আইনগত দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি। আইনে কোথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই যে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা সবার জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক হবে এবং এ পর্যায়ের শিক্ষায় কোনো পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ খরচ থাকবে না।
একটি কার্যকর, মানসম্পন্ন ও সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিশদ, সময়োপযোগী শিক্ষানীতির পাশাপাশি এর পরিপূরক আইন, শিক্ষা খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য একটি টেকসই অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে। একটি সার্বিক কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে শিক্ষা খাতের চলমান এবং নতুন করে আবশ্যকীয় ব্যয়ের খাতগুলো চিহ্নিত করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ বিবেচনায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কাঠামো প্রস্তুত করতে হবে। সব স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে একটি ধারাবাহিক সচেতন নাগরিক প্রয়াসের মধ্য দিয়ে সব শিশুর জন্য শুধু অবৈতনিক নয়, বরং বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি শিক্ষা আইনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে- এটাই সবার প্রত্যাশা।

নিউইয়র্কে ইউনিসেফ-এর সদর দফতরে গৃহদাসী আদুরী, নিলুফা এবং রিতাদের কথা by মহিউদ্দিন আহমদ

‘ইউনিসেফ’- জাতিসংঘের ‘আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল- বাংলাদেশের বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে নির্যাতিত শিশু গৃহদাসীদের রক্ষায় আর কি কি ব্যবস্থা নিতে পারে, আমার সাম্প্রতিক নিউইয়র্ক সফরকালে তা আলোচনা করার জন্য ৩১ অক্টোবর এ সংস্থাটির সদর দফতরে গিয়েছিলাম। ড. সুসান বিসেল (ঝঁংধহ ইরংংবষষ চয.ফ) নামের এক ভদ্র মহিলার সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ইউনিসেফে তিনি শিশু রক্ষা বিভাগের প্রধান (চিফ, চাইল্ড প্রোটেকশন)। ড. সুসান বিসেলের বয়স ৫০-এর মতো হবে, দেখতে মমতাময়ী এক মায়ের মতোই। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৯- এ ৬ বছর তিনি বাংলাদেশে ঢাকার ‘ইউনিসেফ’ অফিসে কাজ করেছেন। এখনও একটু একটু বাংলা বলতে পারেন, ড. হামিদা হোসেন, সুলতানা কামাল, মরহুম সালমা সোবহান এদের নাম এখনও তার মনে আছে। এদের সঙ্গে তিনি ঢাকায় অবস্থানকালে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশকে তিনি এখনও গভীরভাবে ভালোবাসেন; এ ভালোবাসার প্রকাশে তিনি তার মেয়ের নাম জেসমীন রেখেছেন। তার অফিসে তিনি বাংলাদেশের কয়েকটি ছবিও টাঙিয়ে রেখেছেন।
ড. সুসান বিসেলের এই ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে আমার কাজটি সহজতর হল। বাংলাদেশের শিশুদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত আছেন। দুনিয়ার আরও কতগুলো দেশে শিশুদের ওপর কেমন নির্যাতন নিষ্ঠুরতা চলছে এবং তার মোকাবেলায় তারা কী করছেন তারও একটু বর্ণনা দিলেন তিনি আমাকে। আমাদের দেশে অনেক পরিবারে গৃহকর্মী ছাড়া চলে না, শিশুদের বাবা-মায়েরা বাধ্য হয়েই শিশুগুলোকে শুধু বাঁচিয়ে রাখতে, কখনও কখনও শুধু খাওয়া-পরার বিনিময়ে তাদের শিশু ছেলেমেয়েগুলোকে এমন নিষ্ঠুর পরিবার ও পরিবেশে রেখে যেতে বাধ্য হন- আমাদের আলোচনায় তা-ও এলো। আমাদের দেশে এখনও ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে, এই পরিবারগুলোর শিশু সদস্যদের রুজি-রোজগারে অনেক পরিবারের খাওয়া-পরা চলে, অনেক পরিবারে এই ছোট শিশুগুলোর গতরের ছোট ছোট আয়ও প্রবল ভূমিকা রাখে।
জনসচেতনতার সৃষ্টি, পরিবারের কর্তা-কর্ত্রীদের শিশু গৃহদাসীদের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতা থেকে বিরত রাখতে পারে, এ বিষয়ে আমরা একমত হলাম। এই জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ঢাকার ‘ইউনিসেফ’ অফিস কিছু কাজ করছে, যেমন শুভেচ্ছা দূত নিয়োগ। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ‘সেলিব্রিটি’দের জাতিসংঘ এবং ইউনিসেফ তাদের আদর্শ, উদ্দেশ্য প্রচারে ‘গুডউইল এম্বাসেডর’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকে। তারা নিয়মিত কোনো বেতন-ভাতা পায় না; তবে চাইলে বছরে এক মার্কিন ডলার প্রতীক সম্মানী নিতে পারেন।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের আদর্শ, উদ্দেশ্য প্রচারে মাস কয়েক আগে সিনেমা অভিনেত্রী মৌসুমী, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে এমন শুভেচ্ছা দূত হিসেবে ইউনিসেফ নিয়োগ দিয়েছে। এ তিনজনই বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সেলিব্রিটিদের মধ্যে আছেন, সুতরাং যোগ্যতম তিন বাংলাদেশীকেই বাংলাদেশের ‘ইউনিসেফ’ কাজে লাগাতে চেয়েছে। তবে এ তিন সেলিব্রিটি দৃশ্যমান কী কাজ গত তিন-চার মাসে করেছেন, তা নিয়ে আমার ‘সিরিয়াস’ প্রশ্ন আছে, এ প্রশ্নটি আমি করেছি আমার নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে, গত ৩ অক্টোবর এই দৈনিক যুগান্তরে ‘শিশু গৃহদাসী আদুরী ও নিলুফাদের ঠিকানা ঢাকা মহানগরের ডাস্টবিন’ শিরোনামে লেখায়। আমার এ লেখায় আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম, ঢাকা মহানগরের পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ শিশু আদুরীকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যেতে পারলেন, কিন্তু এই তিন শুভেচ্ছা দূতের একজনও তা পারলেন না কেন? বেনজীর আহমেদ মৃত ভেবে ডাস্টবিনে রেখে আসা আদুরীর জন্য কিছু ফলমূলও নিয়ে গিয়ে একটি অনুসরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করলেন, কিন্তু এই উদাহরণটি মৌসুমী, জুয়েল আইচ বা সাকিব আল হাসানদের চোখে পড়ল না কেন? নাকি তারা টিভি দেখা, পত্রপত্রিকা পড়া ছেড়ে দিয়েছেন।
শিশু নির্যাতনের এমন কোনো ঘটনার পরপরই আমাদের ‘সেলিব্রিটি’দের কেউ শিশু ‘ভিকটিম’টি দেখতে বা ঘটনাস্থলে গেলে, মিডিয়াতে তারা একটু ‘একটিভ’ হলে, খবরটি আরও গুরুত্ব পায়, খবরটি আরও বড় হয় এবং তাতে মানুষের সচেতনতা আরও বাড়ে। এমন কিছু শুভেচ্ছা দূতদের তিনজনের কেউ আদুরীর ক্ষেত্রে করেননি। করেননি অতি সম্প্রতি মাত্র গত সপ্তাহে গত ১৮ নভেম্বর ঢাকার পূর্ব শেওড়াপাড়ায় মৃত গৃহদাসী রিতার ক্ষেত্রেও। সুসান বিসেল শিশু আদুরীর ওপর গত ৩ অক্টোবর যুগান্তরে প্রকাশিত আমার লেখাটির একটি কপি আগ্রহের সঙ্গে আমার কাছ থেকে নেন এবং বলেন যে, এ লেখাটি তিনি তাদের ঢাকা অফিসে পাঠিয়ে দেবেন। নিউইয়র্কে থাকতেই আমাদের বাংলাদেশের কোনো একটি টিভি চ্যানেলে আমাদের এই তিন শুভেচ্ছা দূতের বাণী প্রচার হতে দেখেছি। এই বাণীতে তারা শিশুদের ওপর নিষ্ঠুরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু এখানে আমার দাবি- ঢাকার ‘ইউনিসেফ’কে এমন বিজ্ঞাপনচিত্র বেশি বেশি প্রচার করতে হবে; আর আমাদের শুভেচ্ছা দূতদেরও নির্যাতিত শিশুদের হাসপাতাল বা ঘটনাস্থলে দেখতে যেতে হবে। মিডিয়াকে আগে খবর দিয়ে এবং দরকার হলে একাধিকবার যেতে হবে; যেমন করেছেন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ।
দুই.
পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদের প্রশংসা আমি আগের লেখায় করেছি, এই লেখায়ও এখন করছি।
(আমার আগের লেখাটির কথা জানাতে বেনজীর আহমেদকে টেলিফোন করেছিলাম। তিনি আমার টেলিফোন ধরেননি। তার এক স্টাফ অফিসার নুরুন্নবীকে টেলিফোন করে মেসেজ রেখেছিলাম, কিন্তু তারপরও কোনো টেলিফোন পাইনি। বুঝলাম না, তার জন্য আমার প্রশংসা তার চোখে পড়েছে কিনা। এক বছর আগে চ্যানেল একাত্তর-এর সামিয়া জামানকে প্রশংসা জানাতে টেলিফোন করেছিলাম। তিনিও আমার টেলিফোন ধরেননি, ই-মেইলের জবাব দেননি। তখনও এক নির্যাতিত গৃহদাসীর ওপর তাদের প্রচারিত সংবাদচিত্রের প্রশংসা করতে চেয়েছিলাম)। পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ, কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর শিশু আদুরী এবং তার মাকে তিন সপ্তাহ আগে তার অফিসে ডেকে এনে আরও কিছু উপহার দিয়েছেন। তার পুলিশ বাহিনীর কোনো এক কর্মকর্তার আত্মীয় কানাডা থেকে আদুরীর জন্য ৭৬ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন, সেই টাকা আদুরীর মায়ের কাছে হস্তান্তর করেছেন; এ টাকা দিয়ে আদুরীর মা কয়েকটি রিকশা কিনে ভাড়ায় খাটাবেন। এতে তার একটি নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা হবে। এসব খবর নিউইয়র্কেই জেনেছি। টিভিতে দেখেছি।
জামায়াত-শিবিরের হামলায় গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। জামায়াত-শিবিরের এমন হামলা টিভিতে দেখছি, পত্রপত্রিকায় মর্মান্তিক সচিত্র খবরও পড়ছি। দিনরাত তারা ডিউটি করছেন, আইন মান্যকারী নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করে চলেছেন, তারপরও তারা নিন্দিত হচ্ছেন কোনো কোনো গণমাধ্যমে। গণমাধ্যমের লোকজন কোনো অন্যায় করে না, যেন ঘুষ খায় না, ব্ল্যাকমেইল করে না।
একদিকে এমন কঠোর কঠিন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব পালন অন্যদিকে শিশু আদুরীদের জন্য এমন দরদ, মমত্ববোধ। তারিফ অবশ্যই করতে হয়।
কিন্তু এমন মর্মস্পর্শী মায়া-মমত্বের বিপরীতে সেদিন গত ১৮ নভেম্বর এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী সোনিয়া আখতারকে শেওড়াপাড়ায় তার বাসা থেকে গৃহকর্মী রিতাকে ধাক্কা মেরে উপর তলা থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলেছে, এমন গুরুতর অভিযোগ গত কয়েকদিন ধরে চলছে। এই বাহিনীর নিষ্ঠুরতা অবশ্যই আমাদের পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি কলংক।
শেওড়াপাড়ার এ মহিলার শাস্তির দাবিতে ওখানকার স্থানীয় লোকজন যেমন জেগে উঠেছে তা আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। অভিযুক্ত মহিলাকে ওখানকার পুলিশ প্রোটেকশন দিচ্ছে, এমন অভিযোগে লোকজন রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও করেছে। একজন দৃশ্যত অভিযুক্ত মহিলার শাস্তির দাবিতে একজন পুলিশ সদস্যকে আহত করা কোনোভাবেই সমর্থন করি না। এমন জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ‘ইউনিসেফ’-এর বাংলাদেশী শুভেচ্ছা রাষ্ট্রদূত- মৌসুমী, জুয়েল আইচ এবং সাকিব আল হাসানদের কাছে প্রত্যাশিত। তাদের কোনো একজনও যদি সেদিন শেওড়াপাড়ায় যেতেন, লোকজনকে আইনি পথে প্রতিকার চাইতে, সংঘবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন লোকজন হয়তো সেদিন সহিংস হয়ে উঠত না।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি মর্মান্তিক দৃশ্যের কথা বলি, আদুরীর নির্যাতনকারী মহিলা নওরীন আখতার নদী এবং রিতাকে উপরের ছাদ থেকে ঠেলে নিচে ফেলে মেরে ফেলার অভিযোগে অভিযুক্ত মহিলা সোনিয়া আখতার, তাদের দু’জনকে যখন আদালত থেকে জেলে নেয়া হচ্ছে- দেখি তাদের দু’জনের কোলেই এক বছর বা তারও কম বয়সী শিশু!! তাদেরই শিশু। তারাও মা, বুকে তাদের শিশু সন্তানদের তারা আঁকড়ে ধরে আছে। শিশুগুলো কিছুই বুঝছে না, হয়তো ঘুমাচ্ছে। এখন এই নির্দোষ শিশুগুলোকেও তো মায়ের সঙ্গে জেলে থাকতে হবে। এ শিশুদের কিভাবে রক্ষা করা যায়, টিভিতে তাদের দেখার পর, এই চিন্তা-দুশ্চিন্তাও আমাকে তাড়া করে চলেছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, মা হয়েও এই মহিলাগুলো কিভাবে অন্য শিশুদের ওপর এমন নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারে।
তিন.
ড. সুসান বিসেলের অফিসে যাওয়ার পথে এখন একটি আমোদজনক (বা উদ্বেগজনক) অভিজ্ঞতার কথা। নিউইয়র্কের সেকেন্ড এভিনিউর খান্দানী এলাকায় অবস্থিত আমাদের স্থায়ী মিশনের পাশেই ‘ইউনিসেফ’-এর সদর দফতর। মাত্র দু’তিন মিনিটের হাঁটা পথ।
সুসান বিসেলের অফিসে সেদিন আমার সঙ্গে ছিলেন আমাদের স্থায়ী মিশনের ইকোনমিক মিনিস্টার বরুণ দেব মিত্র। এখানে এই দায়িত্বে আসার আগে তিনিই বাংলাদেশের সরকারের খাদ্য সচিব ছিলেন। বাংলাদেশে তার এত বড় সাম্রাজ্য ত্যাগ করে এখানে নিউইয়র্কে তার এই দায়িত্ব গ্রহণের কারণ বোধহয় তার স্ত্রী রাখী মিত্র। ভদ্রমহিলা ঢাকার ‘ইউনিসেফ’ অফিসে কাজ করতেন, এখন নিউইয়র্কের সদর দফতরে। স্ত্রী, প্রেমিকার টানে দুনিয়ার কত জায়গায় যুগে যুগে কত ত্যাগই না কত পুরুষ করেছেন। বরুণ মিত্রের স্ত্রীর জন্য ভালোবাসা সম্রাট শাজাহানের তাজমহল নির্মাণের মতো কিছু নয়, তবে ত্যাগ অবশ্যই।
আমরা দু’জন হাঁটতে হাঁটতে ইউনিসেফ সদর দফতরে পৌঁছলাম ঠিকই, কিন্তু হাঁটু সমান গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারছিলাম না। জাতিসংঘ থেকে আমাকে আমার ছবিসহ যে আইডি দেয়া হয়েছে, তা গ্রাউন্ড ফ্লোরের গেটের ওপর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখলে বা ছোঁয়া দিলেই হাঁটু সমান গেট আপনা-আপনি খুলে যাবে, তারপরই উপরের এক কামরায় সুুসান বিসেলের কামরায় যাব; তাই নিয়ম। জাতিসংঘের সদর দফতরে এমন করেই বারবার ঢুকেছি। নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি এত বেশি যে জাতিসংঘে ঢুকতে হলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই ঢুকতে হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ‘ইউনিসেফ’ সদর দফতরে ঢুকতে এই পদ্ধতি কাজ করছিল না।
পাশেই রিসেপশন, দু’তিন জওয়ান উপবিষ্ট, মনে হল পাকিস্তানি। তারাও চেষ্টা করল। তাতেও কাজ হচ্ছিল না। তারা কম্পিউটারে কী সব কয়েকবার টেপাটিপি করল। কিন্তু ‘নো সাকসেস’। তখন তারা প্রস্তাব করল, আমাদের ছবি তুলতে হবে, গেট দিয়ে ঢুকতে হলে এখন অন্য এক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তাই মেনে নিলাম। কাউন্টারে আগে ফিট করা ছোট্ট একটি ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়, তারপর কয়েক সেকেন্ডের ফরমালিটি। রিসেপশনের ওরা দুঃখ প্রকাশ করল গেটও খুলে গেল।
বললাম আমি, দুঃখ প্রকাশ করার কিছু নেই। আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন জার্মানির চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলকেও বোধ হয় একজন আমেরিকাবিরোধী হিসেবে সন্দেহ করে। তাই এঙ্গেলা মারকেলের টেলিফোনের কথাবার্তাও আড়িপেতে রেকর্ড করে আমেরিকানরা সম্প্রতি ধরা খেয়েছে, আর এখন মাফও চাইছে। আমরা অর্ডিনারি মরণশীল মানুষ কোন ছার!

ক্রিকেট ও নির্বাচনী খেলার টিকিট by মোঃ মাহমুদুর রহমান

আগামী বছর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে টি ২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০১৪ সালে। সম্ভবত জানুয়ারি মাসে নির্বাচন হবে। তারপর মার্চ মাসে শুরু হবে বিশ্বকাপ ক্রিকেট। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল তথা বিশ্ব ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই জড়িত। জাতীয় রাজনীতির চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণী খেলা হচ্ছে সংসদ নির্বাচন। আর ওয়ানডে ক্রিকেটের মিনি সংস্করণ টি ২০-তে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নির্ধারণের চূড়ান্ত খেলা হচ্ছে টি ২০ বিশ্বকাপ। এরই মধ্যে উভয় খেলার দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হয়েছে জোরেশোরে। ১৭ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। আইসিসি নিযুক্ত একটি ভারতীয় সংস্থার স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের দুটি ব্যাংকের ১০০টি শাখা থেকে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনের মাধ্যমে টিকিট কেনার সুযোগ রয়েছে। আপাতত টিকিটের বিপরীতে টাকা সংগ্রহ করে মানি রিসিপ্ট দেয়া হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে থাকলে আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে টিকিট বুকিং নেয়া হচ্ছে। পরে মূল টিকিট দেয়া হবে। এভাবে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে সিরিয়াল অনুসারে টিকিট সংগ্রহ করলে কোনো সমস্যা হতো না। ক্রীড়ামোদী বেশিরভাগ মানুষই টিকিট পেতে সক্ষম হতেন। অথচ দেখা গেল, একেকজন আগের দিন থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ লাইন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যাংকের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে বাধ্য হল। নির্ধারিত সময়ে যখন টিকিট বিক্রি শুরু হল তখন সিরিয়ালের প্রথম থেকে যারা টিকিট নিতে এলেন তাদের দেখে মনে হল তারা খেলার প্রকৃত দর্শক নয়। হয় তারা অন্যের জন্য টিকিট সংগ্রহ করছে অথবা পরে বেশি দামে কালোবাজারি করার জন্য টিকিট নিচ্ছে। কারণ তাদের বেশির ভাগেরই ধারণা নেই কোন স্টেডিয়ামে কোন খেলা হচ্ছে। কার সঙ্গে কে খেলবে। তবে একটা বিষয়ে টিকিট সংগ্রহকারী সবার আগ্রহ ছিল সমান। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের খেলার টিকিট। যারা কালোবাজারি বা অন্যের জন্য দিনমজুর হিসেবে দুই দিন থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে- তারা কোন তারিখে ভারত-পাকিস্তান খেলা তা না জানলেও টিকিট তাদের চাই-ই চাই।

বাংলাদেশ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রচার কাদের স্বার্থে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আমেরিকার প্রভাবশালী দৈনিক ‘দি নিউইয়র্ক টাইমস’ গত ২০ নভেম্বর (২০১৩) বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে চারদিকে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। নিবন্ধটির শিরোনাম ‘পলিটিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ লেখাটিতে যেভাবে হাসিনা সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্যাংশনস (অর্থনৈতিক) আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে, তাতে দেশটির অনেকে শংকিত হয়ে ভাবছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে আমেরিকা আবার তার একাত্তরের বিদেশনীতিতে ফিরে যাচ্ছে কিনা?
বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকার রিপাবলিকান নিক্সন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রকাশ্যে পাকিস্তানের হানাদারদের পক্ষাবলম্বন করেছিল এবং মার্কিন মদদে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বাংলাদেশে গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যায় উৎসাহিত হয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যাতে সফল না হয় সেজন্য আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরও পাঠাতে চেয়েছিল। এ সময় ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন (সাবেক) এবং পূর্ব ইউরোপীয় তখনকার সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না দাঁড়ালে বাংলাদেশ সহসা স্বাধীনতা অর্জন করত কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষা পেত কিনা সে সম্পর্কে সন্দেহ আছে। এ সময়ে ‘দি নিউইয়র্ক টাইমস’-এর ভূমিকা ছিল নিক্সন প্রশাসনের বাংলাদেশবিরোধী নীতির পক্ষে। তারপর দীর্ঘ চার দশকের বেশি কেটে গেছে। বাংলাদেশে আবার নতুন করে যে রাজনৈতিক পোলারাইজেশন ঘটেছে, তা গত শতকের সত্তরের দশকের অনুরূপ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির মধ্যে একটা বড় রাজনৈতিক পোলারাইজেশন ঘটেছে। একাত্তরে যে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তারা এখন আবার বিএনপির নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ। তারা ক্ষমতায় আসীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক সরকারকে যে কোনোভাবে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদে বদ্ধপরিকর। সেজন্য আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী জামায়াতের সহায়তায় দেশে নানা রকম ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তা আন্দোলন নয়, তা নিষ্ঠুর সন্ত্রাস।
এখন আমেরিকায় ডেমোক্র্যাট ওবামা প্রশাসন ক্ষমতায়। তারা নিক্সন আমলের কিসিঞ্জার-ডকট্রিন দ্বারা প্রভাবিত নয় বলেই অনেকের ধারণা। তাছাড়া আমেরিকা এখন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ওয়ার এগেইনস্ট টেরোরিজম বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। এই সন্ত্রাস ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী সন্ত্রাস। বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এই মৌলবাদী সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়ার জন্য আমেরিকা কর্তৃক সমালোচিত হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাস দমনে সাফল্য দেখানোর পর মার্কিন ডেমোক্র্যাট প্রশাসন কর্তৃক একাধিকবার প্রশংসিত হয়েছে।
এখন হঠাৎ সেই আমেরিকাই একটি বিশ্বময় পঠিত ও প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা বিএনপির নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ উগ্র মৌলবাদী শক্তির পাশে অবস্থান গ্রহণ করে ক্ষমতাসীন গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে কীভাবে অপপ্রচারে অংশ নেয় তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। এ জন্যই অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে কিসিঞ্জার ডকট্রিনের প্রেতাত্মা কি এখনও প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে এবং ওবামার ডেমোক্র্যাট প্রশাসনও কি বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের সত্তরের ব্যর্থ ও পরিত্যক্ত নীতিতে ফিরে যেতে চাইছে? গত ২০ নভেম্বর দি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধটি কি তারই আভাস বহন করছে?
দি নিউইয়র্ক টাইমসের ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট’ শীর্ষক নিবন্ধটি পাঠ করে বিস্মিত হয়ে ভাবতে হয়, বিশ্বের একটি বহুল প্রচারিত প্রথম শ্রেণীর ইংরেজি দৈনিকে তৃতীয় বিশ্বের কোনো তৃতীয় শ্রেণীর কাগজের মতো এত অসত্য ও দায়িত্বহীন কথা কী করে বলা হতে পারে? নিউইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য যদি সত্য ও সঠিক বলে মানতে হয় তাহলে মানতে হবে বর্তমান হাসিনা সরকার আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাবেক কোনো স্বৈরতন্ত্রের মতো একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার। বিরোধী দল, মানবাধিকার কর্মীদের এই সরকার নিষ্ঠুরভাবে দমন করছে। আদালত বিচার ব্যবস্থায় ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ডও বজায় রাখছে না।
পত্রিকাটির মতে, এই সংকটের জন্য শেখ হাসিনাই একমাত্র দায়ী। তিনি ক্ষমতায় ঝুলে থাকার জন্য সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধানটি মুছে ফেলেছেন। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও আসলে হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনের একটা হাতিয়ার। জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে বস্তুত তাদের রাস্তার আন্দোলনে নামতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে তারা রাস্তায় নেমেছে। সিরিজ অব হরতালে দেশটিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘর্ষে শত শত লোক মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং এসব অবস্থার প্রতিকার ও হাসিনা সরকারকে স্বৈরতন্ত্রের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্যাংশনসসহ বিভিন্ন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলে এই মার্কিন দৈনিকটি সুপারিশ করেছে।
এই ‘ইনফরমেশন এজের’ একটি আন্তর্জাতিক দৈনিক হয়ে মার্কিন এই পত্রিকাটি কী করে বাংলাদেশ সম্পর্কে এত অসত্য ও মনগড়া কথা ছড়াল, তা ভেবে বিস্মিত হই। যে ‘মরাল হাই গ্রাউন্ড’ মেনে আমেরিকার প্রশাসন ও মিডিয়া কথা বলে তার সঙ্গে এই প্রচারণার কোনো মিল আছে কি? এটা বাংলাদেশের বিএনপির হ্যান্ডবিলে যেসব কথা বলা হয় তার পুনরুক্তি মাত্র। প্রথম কথা, হাসিনা সরকার বিপুল ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার। বিএনপির মতো স্বৈরশাসন, অপশাসন ও নির্বাচন-জালিয়াতির কোনো রেকর্ড তার নেই। দেশকে সুশাসন দিতে তার অনেক ব্যর্থতা আছে, ভুলত্র“টি আছে। কিন্তু এই সরকার মূলত অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক। একে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বলা সত্যের ডাহা অপলাপ। দেশকে সুশাসন উপহার দিতে ব্যর্থ হওয়ার নজির মার্কিন প্রশাসনেরও রয়েছে।
হাসিনা সরকার জনগণকে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ যেসব নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন করে চলেছে। নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করা কি স্বৈরতান্ত্রিক কাজ? এক সময় সংবিধান পরিবর্তন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। এখন সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে আবার পুরনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়েছে। তাও সংসদে বিতর্ক ও আলোচনার পর। বিএনপি এই বিতর্কে সংসদে আসেনি। সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে, তাও সুপ্রিমকোর্টের রায় মেনে। এখানে শেখ হাসিনা স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় কোথায় সংবিধান ছিঁড়ে-খুঁড়ে (ঝপৎধঢ়ঢ়বফ) ফেললেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তো কংগ্রেসে বা সিনেটে বাধা পেলেও নিজের ডিসক্রেশনারি ক্ষমতার জোরে অনেক বিল পাস করেন। তা কি সংবিধান লংঘন? শেখ হাসিনা তো তাও করেননি।
নিউইয়র্ক টাইমস কোথায় পেল বাংলাদেশের আদালতগুলো বিচার ব্যবস্থায় নিুতম নিয়মকানুন ও মান বজায় না রেখে অভিযুক্তদের দণ্ড দেন? তাহলে একটি বড় ধরনের দুর্নীতির মামলায় তারেক রহমানের সহযোগী দণ্ডিত হন এবং তারেক রহমান কী করে খালাস পান? আমেরিকায় যেখানে রাশিয়ার কাছে আণবিক গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে (সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়) বিখ্যাত বিজ্ঞানী রোজেনবার্গ দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, বিশ্ববাসীর প্রাণ ভিক্ষাদানের আবেদনে পর্যন্ত কর্ণপাত করা হয়নি, সেখানে বাংলাদেশে ’৭১-এর বর্বর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে শুধু মানবতা বোধ থেকে বয়সের বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, তা কি দেশটির বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা, মান ও সুবিবেচনার পরিচয় বহন করে না?
আমেরিকা তার স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও কোলাবরেটরদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। অনেককে বিনা বিচারে হত্যা করেছে। সেই দেশটির একটি পত্রিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং ঘাতক ও দালালদের বিচার সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না বলে মায়াকান্না জুড়েছে এবং এই ঘাতক ও দালালদের হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (চড়ষরঃরপধষ ঙঢ়ঢ়ড়হবহঃং) হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের আপামর মানুষের দাবি। এটা হাসিনা সরকারের নির্বাচনী কমিটমেন্ট। এ কমিটমেন্ট থেকে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার সরে আসে কী করে? তাছাড়া ২০০৯ সালে গঠিত বিশেষ আদালত যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও দণ্ড দিয়েছেন তারা ৪০ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক ও দালাল হিসেবে সর্বত্র পরিচিত। হঠাৎ দি নিউইয়র্ক টাইমস আবিষ্কার করল, এই দণ্ডিত ও বিচারাধীন ব্যক্তিরা আসলে যুদ্ধাপরাধী নয়, তারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং আওয়ামী লীগ সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য এই বিচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এত বড় মিথ্যাচার দি নিউইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকা কীভাবে করে এবং কী উদ্দেশ্যে? তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নাৎসি ঘাতক হিটলার, মুসোলিনী কি যুদ্ধাপরাধী ছিল না? ছিল কেবল চার্চিল ও রুজভেল্টের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ? এবং এই প্রতিপক্ষকে দমনের জন্যই কি তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে?
নিউইয়র্ক টাইমসের অদ্ভুত যুক্তি, জামায়াতের মতো সন্ত্রাসী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে রাস্তায় আন্দোলন সৃষ্টি করার জন্য ঠেলে দেয়া হয়েছে। জামায়াতকে শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেয়া নয়, দলটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি সারা দেশের। আওয়ামী লীগ সরকার এই দেশব্যাপী দাবির মুখেও জমায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। দলটির সন্ত্রাসী চরিত্রের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাতিল করে দিয়েছে। এটা যদি অন্যায় হয়, তাহলে আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশে মহাযুদ্ধের ৬৮ বছর পরও নাৎসি পার্টি নিষিদ্ধ কেন?
আমেরিকায় ঢুকতে হলে ভিসা পেতে যে ফরম পূরণ করতে হয় তাতে লেখা আছে আপনি নাৎসি পার্টির সমর্থক হলে অথবা ওই পার্টির সঙ্গে অতীতে কোনো যোগাযোগ থাকলে আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি পাবেন না। তাহলে বাংলাদেশের নব্য নাৎসিদের প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের এত অনুকম্পা কেন? জার্মানির নাৎসি পার্টি এবং ইতালির ফ্যাসিস্ট পার্টি যেমন সঠিক অর্থে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, তেমনি বাংলাদেশের জামায়াতও কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। এটি দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসী দল। কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই এ ধরনের সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি দেয়া হয় না।
বিএনপি এই সন্ত্রাসীদের সাহায্যে বাংলাদেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে এটা কি বাস্তব সত্য? আর রাজনৈতিক দল-উপদলগুলোর সংঘর্ষে মানুষ মারা যাচ্ছে, এটাও নিউইয়র্ক টাইমসের আবিষ্কার। বাংলাদেশে জনসমর্থনপুষ্ট কোনো গণআন্দোলন সৃষ্টি করতে না পারায় জামায়াতের সশস্ত্র ক্যাডারদের সহায়তায় বিএনপি রাজপথে আকস্মিক হামলা চালিয়ে গাড়ি-বাড়ি পুড়িয়ে, ঘুমন্ত বাসযাত্রী হত্যা করে দেশে ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তার বাইরে তারা কিছু করেনি। তাও পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে।
অন্যদিকে জামায়াত-শিবির ও তাদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের অতর্কিত হামলায় গাড়িতে অগ্নিসংযোগের দরুন অধিকাংশ মৃত্যু ঘটেছে। এমনকি জামায়াতের ক্যাডারদের হামলায় নিহত পুলিশের সংখ্যাও কম নয়। এগুলোকে মার্কিন পত্রিকাটি রাজনৈতিক দল-উপদলের সংঘর্ষে নিহত বলে চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার যে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করেছে, তাদের একজন আদালত কর্তৃক ‘হঠাৎ সম্পাদক’ হিসেবে বর্ণিত এবং তার মিথ্যা প্রচার সাংবাদিকতার সব মানকে অতিক্রম করেছিল। আর মানবাধিকার দলটি ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে পুলিশ অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে বলে নিহতদের যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে দেখা গেছে এই নামে কেউ নেই। সবটাই দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণা। আমেরিকায় মার্কিন স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের বানানো অভিযোগে হাওয়ার্ড ফাস্ট, চার্লি চ্যাপলিনের মতো বিখ্যাত মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন। সেই দেশের একটি কাগজ বাংলাদেশে মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক দলনের নামে মায়াকান্না জুড়েছে, তা আর বিচিত্র কী?
উন্নয়নশীল বিশ্বের যেসব দেশে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে, সেসব দেশে গণতন্ত্রের বিকাশে বাধাদানে এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার কাজে অপপ্রচারে দি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার কোনো জুড়ি নেই। একটি উদাহরণ দিই। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক ও গণবিরোধী মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে প্রদেশে নতুন সরকার গঠন করে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে এই গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ আমেরিকা তার স্বার্থের অনুকূল মনে করেনি। ফলে শুরু হয় হক সাহেবের বিরুদ্ধে চক্রান্ত।
ফজলুল হক বয়োবৃদ্ধ ছিলেন। তিনি তার এক পুরনো রোগের চিকিৎসার জন্য এ সময় কলকাতায় যান। সেখানে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। যে কলকাতায় বসে ছয় বছর তিনি অবিভক্ত বাংলার সরকার পরিচালনা করেছেন, দেশভাগের পর সেই কলকাতায় এসে বিপুল সংবর্ধনা পেয়ে তিনি অভিভূত হন এবং সংবর্ধনার জবাবে বলেন, ‘আমি দেশের রাজনৈতিক বিভাজনে কোনো গুরুত্ব দেই না।’ হক সাহেবের এই সংবর্ধনার সময় দি নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক ক্যালাহান তার কাগজে রিপোর্ট পাঠান- হক সাহেব কলকাতায় বলেছেন, ‘আমি দেশ ভাগ মানি না।’
মার্কিন পত্রিকার রিপোর্টার কর্তৃক ফজলুল হকের মুখে পুরে দেয়া এই বক্তব্য ঢাকায় ও করাচিতে মুসলিম লীগপন্থী কাগজগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হয়। ফজলুল হক ঢাকায় ফিরে এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ক্যালাহান সাহেবের এই রিপোর্টকে ভিত্তি করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হক মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে এবং মুখ্যমন্ত্রী হক সাহেবকে গৃহবন্দি করে। তাকে বলা হয়, ‘হিন্দুর দালাল, ভারতের চর’। আজ থেকে ৫৯ বছর আগেও এটাই ছিল দি নিউইয়র্ক টাইমসের সৎ সাংবাদিকতার নমুনা।
৫৯ বছর পর দি নিউইয়র্ক টাইমস একই সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে এবং দেশটির সাম্প্রদায়িক ও উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসী শিবিরের সমর্থক সেজেছে। হাসিনা সরকারকে শায়েস্তা করার জন্য আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্যাংশনস আরোপেরও সুপারিশ করেছে। এই স্যাংশনস আমেরিকা সাধারণত আরোপ করে তার শত্র“ দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও কি তাহলে এখন আমেরিকার শত্র“ দেশ? দি নিউইয়র্ক টাইমস এ স্যাংশনস আরোপের জন্য যতই উস্কানি দিক, ওবামা প্রশাসন তাতে কান দেবে অথবা সুপারিশটিকে গুরুত্ব দেবে তা মনে হয় না। সত্তরের দশকের ব্যর্থ বিদেশনীতিতে আমেরিকা ফিরে যেতে চাইবে তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ এখনও ঘটেনি।

সাম্প্রদায়িকতার রিংমাস্টারগণ

বেড়া ভাঙা, পায়রাগুলো ভীত হলেও যায়নি এখনো
সাঁথিয়ার ঘটনায় গুন্ডা-বদমাশদের নাম যতটা আসে ততটা আসে না তাদের রিংমাস্টারদের নাম। হিন্দু সমাজের ঘরবাড়িতে যারা হামলে পড়েছিল, নিঃসন্দেহে তারা সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব। কিন্তু তারা একা ছিল না। তাদের পায়ের ছাপ ধরে এগোলে যে ‘উৎকৃষ্টদের’ নামনিশানা পাওয়া যায়, তাঁরা আমাদের নেতা-অভিভাবক-প্রশাসক।
এঁদের ছাড়া ওই নিকৃষ্টরা বড়জোর লুম্পেন-চাঁদাবাজি করে দিন কাটাত, হিন্দু পাড়া তছনছ করার ‘হিরো’ হতে পারত না। রামু, সাঁথিয়া, বরিশালের ‘সাম্প্রদায়িক’ তাণ্ডবের কাহিনিতে আক্রমণকারী ‘মুসলমান’। আক্রান্ত কখনো বৌদ্ধ কখনো হিন্দু। এ জন্যই একে সাম্প্রদায়িকতা বলা হচ্ছে। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের হদিস নিলে দেখা যায় এক সর্বদলীয় সাম্প্রদায়িক ঐক্য, যার হেফাজতকারীরা বর্তমান সরকারের। ধর্মনিরপেক্ষ আর ধর্মবাদীরা একজোট করতে পারে কোনো বড় ষড়যন্ত্র অথবা অর্থ-সম্পত্তির লোভে। এখন তাই বলবার উপায় নেই কে অসাম্প্রদায়িক আর কে সাম্প্রদায়িক! প্রশ্ন হচ্ছে, এই হামলাগুলো কি ধর্মীয় কারণে ঘটছে? নাকি ঘটছে টাকা-ক্ষমতা-জমি বা ভোটের মতো বাস্তব স্বার্থের হাতছানিতে? ধর্মবিশ্বাসী পরকালের জন্য পুণ্য অর্জনে আগ্রহী, সাম্প্রদায়িকতাবাদীর লোভ ইহলোকের ক্ষমতা ও সম্পত্তি প্রতি
সাম্প্রদায়িকতার হিরোরা তাই খুব কমই ধর্মনিষ্ঠ হয়। এমনকি হামলার সামনের সারিতে যে বীরপুঙ্গবদের দেখি, বাস্তবে তারা তালপাতার সেপাই। যাকে মনে হচ্ছে মূল খলনায়ক, সে আরেক দিক থেকে হয়তো বিপর্যয়ের বার্তাবাহক। কীভাবে তুচ্ছ ঘটনা ও রটনা মহামারি ঘটাতে পারে, রামু ও সাঁথিয়া তা চোখে আঙুল দিয়েই দেখাল। কিন্তু তত্ত্বকথা আর ইতিহাস থেকে মুখ তুলে আমরা তা দেখতে কি রাজি? নির্বাচনী রাজনীতির ফাঁদ: ফেসবুক পেজে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননায় উত্তেজিত মুসলিম জনতা হিন্দু ব্যবসায়ী বাবলু সাহার দোকান ও হিন্দু পাড়ায় আগ্রাসন চালায়; এটা বাইরের সত্য। ফেসবুকের সেই রটনা রটবার আরও আগে ঘটনার শুরু। বাবলু সাহার মেয়ের বিয়ে হয় কয়েক মাস আগে। তখন তাঁর কাছে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে স্থানীয় চাঁদাবাজ ফজলু মিয়া। ইনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী টুকু সাহেবের চ্যালা মিঠু প্রভৃতির মদদপুষ্ট। চাঁদা তাঁরা পান, তবে পরিমাণে কম। ব্যবসায়ীদের সব জায়গাতেই চাঁদা দিতে হয়, বনগ্রাম তার বাইরে নয়। ফজলু মিয়ার চাঁদার গ্রুপ সর্বদলীয়। এরা বাকি চাঁদার জন্য বাবলু সাহাকে বিপদে ফেলার ফন্দি করে। বনগ্রামের হিন্দু সমাজের বিপদ আসছিল আরেক দিক থেকে। ১ নভেম্বর সাঁথিয়ায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর স্বদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী আবু সাইয়িদকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। গত নির্বাচনে শেখ হাসিনার অনুরোধে জনপ্রিয় সাইয়িদকে টুকুর কাছে আসন ছেড়ে দিতে হয়। আসন্ন নির্বাচনের লক্ষ্যে আবু সাইয়িদ নিজের প্রভাব বিস্তারে তৎপর ছিলেন।
সংবর্ধনা সভা তারই অংশ। সেখানে হিন্দু পাড়া থেকে প্রায় ৩০০ মানুষ যান। প্রতিমন্ত্রী টুকুও সে সময় এলাকাতেই ছিলেন। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থক পরাজিত প্রার্থী সেলিম ও উপজেলা চেয়ারম্যানেরও ক্ষোভ ছিল হিন্দুদের প্রতি। তাঁদের বিশ্বাস, হিন্দু পাড়ার ভোট তাঁদের বিপক্ষে। নির্বাচনী রাজনীতি এভাবে আগেভাগেই বনগ্রামের নিরীহ অধিবাসীদের ঝুঁকিতে রেখেছিল। পরিকল্পনার আলামত: ঘটনার দিন ২ নভেম্বর। এর কিছু আগে বনগ্রামের দুই পাশের দুই গ্রামে দুটি বৈঠক হয়। বউলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বৈঠকে নেতৃত্ব দেন সোহেল ও ফজলু। আর কুমিরগাড়ি পদ্মবিলে ছিলেন সেলিম মেম্বার। ঘটনার দিন বনগ্রাম বাজারে বিএনপিপন্থী সোহেলের দোকানে ১০-১২ জন জড়ো হয়। পরিকল্পনামাফিক তারা বেছে নেয় হাটের দিন, যখন ভিড়ের মধ্যে কেউ কাউকে চিনবে না। আশপাশের গ্রামের লোকজনের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল সেখানে। অন্যদিকে হিন্দু পাড়ার পুরুষেরাও সবাই হাটে-কাজে বাইরে ছিল। হাট-বাজার সমাজ-বহির্ভূত এলাকা। এসব জায়গায় অজস্র মানুষকে সহজেই উত্তেজিত করা যায়। সোহেলের দোকান থেকেই একদল যায় ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার প্রচারপত্র বিলির কাজে। একই সময় ছাত্রলীগের কাউসার হাবিব সুইট, ছাত্রশিবিরের জাকির মোটর সাইকেলে করে বাবলু সাহাকে তুলে আনতে যায়।
সোহেলের দোকানেই তিনি বন্দী থাকেন। এর মধ্যে তাঁর দোকানের ক্যাশবাক্স লুট হয়, দাবি করা হয় আরও টাকা। তিনি দিতে ব্যর্থ হলেই শুরু হয় সর্বদলীয় সাম্প্রদায়িক জিগির। এই পটভূমিতে সর্বদলীয় লোকজন উত্তেজিত জনতাকে সঙ্গে নিয়ে লাঠিসোঁটাসহ হিন্দু পাড়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। যারা টাকা নিয়েছে তাদের সবাই হামলায় ছিল না, আবার যারা হামলায় জড়িত তাদের সবাই চাঁদাবাজির ঘটনাটা জানে না। এই গল্পে লীগ, দল, জামায়াতের পরিচয় তাদের আচরণ থেকে বোঝা সম্ভব নয়। তাই আলাদা করে কুশীলবদের পরিচয় জানতে হবে। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ: ঘটনার ১০ মিনিটের মধ্যে স্থানীয় পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী টুকুকে সাহায্য চেয়ে ফোন করে বিফল হন। এর ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দেন পরে। বিপর্যস্ত গ্রামবাসীদের শাসান, ‘কই, কোনো বাবুই (আবু সাইয়িদ) তো তোদের বাঁচাতে পারলো না’। হামলার চার দিন পর, বনগ্রাম বাজারে সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ সমাবেশ হয়। সরকারি আয়োজনে বিশেষ অতিথি থাকেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় জেলা প্রশাসক। বক্তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং হিন্দু সমাজকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। অথচ সেই সভাতেই মিঠুর মতো দাঙ্গাবাজরা উপস্থিত ছিল।
টুকুর উপস্থিতিতেই মিঠুসহ তিনজনের নামে সুপারিশ করা হয়। তাতে বলা হয়, হিন্দু পাড়ায় আক্রমণের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। মিঠুর কাছের লোক ব্যবসায়ী কার্তিক সাহা সেই দরখাস্তে সই করেন, বাবলু সাহাকেও সই করতে বাধ্য করেন। ব্যবসার স্বার্থে কার্তিক সাহাকে ফজলু, মিঠু, পেনসু প্রভৃতি লীগাশ্রিত মাস্তানদের হাতে রাখতে হয়। বিনিময়ে তিনিও তাঁদের চাঁদা দেন। যে দলটিকে তাঁরা ভোট দেন বলে সকলে জানে, সেই দল পেছনে ছুরি মারলে, এলাকার মন্ত্রী হামলাকারীদের বগলে নিয়ে চলাফেরা করলে অসহায়ত্ব সীমা ছাড়তে বাধ্য। আক্রান্তরা জলে কুমির ডাঙায় বাঘ অবস্থায় পড়েন। সুতরাং বিএনপিবিরোধী ভোটব্যাংক হিসেবে হিন্দুদের চিহ্নিত থাকা এবং আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের জাঁতাকলের মাঝখানে পড়ার সুযোগে সর্বদলীয় লুম্পেনরা একটি ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ সাজিয়ে ফেলল। এরা ফেউ, আসল বাঘ হলো ভূমিগ্রাসীরা। এ দেশের অর্থনীতিতে আদিম লুটপাটের জয়জয়কার। এর প্রধান লক্ষ্য হলো জমি। হিন্দু বা আদিবাসী জমি যেখানে সবচেয়ে অরক্ষিত; সেখানে জমি দখলের ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ঠেকানোটাই জরুরি। অর্পিত সম্পত্তি আইনের সকল ধারা বাতিল করে প্রয়োজনে ‘মাইনরিটি কমিশন’ গঠন করতে হবে। বুদ্ধিজীবীদের সেমিনার আর দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে আত্মতৃপ্তির সুযোগ আছে। কিন্তু বাস্তব প্রতিরোধ, বিচার বিভাগীয় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি কমিশন ছাড়া এ অসুখের কোনো ওষুধ নেই। মুসলিম প্রতিবেশী ও জাতীয় সমাজ: নিতাই (ছদ্মনাম) পেশায় নরসুন্দর।
বৃদ্ধা বিষ্ণুপ্রিয়া বৈষ্ণব। সরকার ফার্মেসির যুবক ও তাদের বাড়ির বাসিন্দাসহ এ রকম অনেকেই সেদিন আশ্রয় পেয়েছিলেন প্রতিবেশী মুসলমানদের বাড়িতে। বাবলু সাহার গুদাম যারা বাঁচান তারাও মুসলমান। নিতাইয়ের বাড়ির মেয়েরা আশ্রয় নিয়েছিল প্রতিবেশী জয়নাল মুহুরির বাড়িতে। প্রায় সব হিন্দু পরিবারের মেয়েদের এটাই আত্মরক্ষার গল্প সেদিনের। মুহুরি ভদ্রলোকটির চেহারায় পরহেজগার; অথচ তাঁর মতো মুসলিমদের সামনেই তাঁকে বুক চিতিয়ে বলতে হয়েছিল, ‘বাড়িতে ঢুকতে হলে আমাকে মেরে ঢুকতে হবে’। বিষ্ণুপ্রিয়া বলছিলেন, ‘স্বাধীনতার পর কখনো এ রকম হয়নি’। কিন্তু এখন তাঁর ঘুমের মধ্যেও ভয় ঢুকে পড়ে। হামলার হোতারা সর্বদলীয় এবং সমাজ-বহির্ভূত। দু-একজন ছাড়া হামলাকারীরা ছিল অপরিচিত। কিন্তু তাদের পেছনে তো সাধারণ মুসলমানরাও অনেকে ছিল। আবার রুখে দাঁড়াবার সারিতেও ছিল মুসলমান পরিচয়েরই মানুষ। বনগ্রামের হিন্দু-মুসলমানের যে মিলিত সমাজটা এখনো বেঁচে আছে; সেটাই দেশের আত্মা। সেই আত্মাটাই যেন বাজারের এক দিনমজুরের মুখ দিয়ে কথা বলে উঠল। তিনি চান না, কেউ ভয়ে থাকুক বা দেশ ছেড়ে চলে যাক। তাঁর ভাষায়, ‘হিন্দু মুসলমান একসাথে না থা’লে দ্যাশে শান্তি থাহে না’। গণবিরোধী রাজনীতি ও দুর্বৃত্তদের গ্রাস থেকে সেই সমাজকে আমরা বাঁচাতে পারব কি না, আজকের চ্যালেঞ্জ সেটাই।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

মিসরের জনগণ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র চায় না

কামাল গাবালা
কামাল গাবালার জন্ম মিসরের রাজধানী কায়রোর অদূরে, ১৯৫৩ সালে। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর ১৯৭৭ সালে সরকারের প্রেস ও প্রকাশনা বিভাগের চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৮০ সালে সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন দৈনিক আল-আহরাম পত্রিকায়। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি কুয়েতে দৈনিক আল-আমবা পত্রিকায় কাজ করেন। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি জাপানের টোকিওতে আল-আহরাম-এর ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে আল-আহরাম-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। প্রথম আলোর দেড় দশক পূর্তি উপলক্ষে তিনি সম্প্রতি ঢাকায় এলে তাঁর এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম
প্রথম আলো : মিসরে আপনারা ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরশাসন হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেন। প্রথমবারের মতো একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো। কিন্তু এমন কী ঘটল যে আজ সেই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কারারুদ্ধ এবং বিচারের মুুখোমুখি? কামাল গাবালা : এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে অনেক কথা বলতে হয়। কিন্তু সে অবকাশ তো এখানে নেই। সংক্ষেপে কিছু বলতে গেলেও শুরু করতে হয় ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে, যখন মিসরীয় বিপ্লবের সূচনা ঘটে। সেই সময় আমাদের সবার মনে আশা জেগেছিল যে কয়েক দশক অপেক্ষার পর আমরা অবশেষে একটা গণতান্ত্রিক, বেসামরিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চলেছি।
প্রথম আলো : সেটার সূচনা তো ঘটেছিল, অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে আপনারা প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন করেছিলেন...
কামাল গাবালা : কিন্তু এসবের মধ্য দিয়ে মিসরে গণতন্ত্রের সূচনা ঘটেনি। মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে মিসরে একটা বেসামরিক, ধর্মভিত্তিক স্বৈরশাসন চালু হয়েছিল এবং ক্রমেই তা আরও বেশি স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠছিল।
প্রথম আলো : মিসরের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুডকেই নির্বাচিত করে দেশের শাসনভার তাদের দিয়েছিল...
কামাল গাবালা : মুসলিম ব্রাদারহুড নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল, এটা সত্য। কিন্তু বোঝা প্রয়োজন, কেন ও কীভাবে সেটা ঘটেছিল। প্রথমত, মিসরের জনগণ এর আগে কখনো মুসলিম ব্রাদারহুডকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখার সুযোগ পায়নি। নির্বাচনের আগে অনেক মিসরীয় মনে করেছিল, ব্রাদারহুডের লোকজন ভালো, তারা গরিব-অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। যুগ যুগ ধরে তারা শাসকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে আসছে, তারা কঠোর সংগ্রাম করে আসছে। এবার যখন আমরা নিজেদের সরকার নির্বাচিত করার সুযোগ পেয়েছি, তখন ব্রাদারহুডকেই ভোট দিয়ে দেখা যাক। তাদের একটা সুযোগ দেওয়া হোক। দ্বিতীয়ত, উদারপন্থী ও বাম রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ নয়, সুসংগঠিতও নয়। কিন্তু ব্রাদারহুড ও অন্য ইসলামপন্থী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ এবং খুবই সংগঠিত। তৃতীয়ত, মিসরের অধিকাংশ মানুষ গরিব, তাদের ভোট কেনা যায়। সরাসরি টাকাপয়সা দিয়েও কেনা যায়, আবার নানা রকম সাহায্য-সহযোগিতার বিনিময়েও কেনা যায়। এসব ফ্যাক্টর মিলিতভাবে কাজ করেছে নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিজয়ের পেছনে।
প্রথম আলো : কিন্তু বছর না পেরোতেই সেই ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হলো কেন?
কামাল গাবালা : কারণ, মিসরীয় জনগণ ক্ষমতার বাইরে মুসলিম ব্রাদারহুডের যে চেহারা দেখেছিল, ক্ষমতাসীন ব্রাদারহুডের চেহারা তার থেকে ভীষণভাবে অন্য রকম। জনগণ চেয়েছিল একটা আধুনিক, অগ্রমুখী, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু ব্রাদারহুড মিসরকে একটা ধর্মভিত্তিক, পশ্চাৎমুখী, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট মুরসি বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমসহ রাষ্ট্র ও সরকারের সব স্তরে ব্যাপক রদবদল শুরু করেছিলেন। সব স্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে ভিন্নমতাবলম্বী লোকদের সরিয়ে ইসলামপন্থী লোকজনকে বসাচ্ছিলেন। তারা মৌলবাদী, মধ্যযুগীয় চিন্তার মানুষ। পেশাগত দক্ষতা-যোগ্যতার বালাই ছিল না, ব্রাদারহুডের সমর্থক আর গোঁড়া ধর্মীয় চিন্তাভাবনার মানুষ হলেই হলো। নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসছিল; অনেক চাকরিজীবী নারী চাকরি হারিয়েছেন। পর্যটনশিল্পে ধস নেমেছে।
প্রথম আলো : কোনো ক্ষেত্রেই কি মুরসি সরকারের কোনো সাফল্য ছিল না?
কামাল গাবালা : অর্থনৈতিক অবস্থা আগের থেকে আরও খারাপ হয়েছে; নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়েছে। আশা করা হয়েছিল, নতুন নির্বাচিত সরকার এসে অন্তত রাজধানীর যানজট দূর করতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটাবে। কিন্তু সেটা ঘটেনি; বরং কায়রোর যানজট আরও বেড়েছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে শহর। বিদ্যুৎ-ঘাটতি আরও বেড়েছে। ব্রাদারহুড নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার কোনোটাই পূরণ করতে পারেনি। তাই নির্বাচনের পর মাস ছয়েক না পেরোতেই জনগণের মোহভঙ্গ ঘটে। আরও একটা বড় ভুল করেছিলেন মুরসি। তিনি একটা প্রেসিডেনশিয়াল ডিক্লারেশন জারি করেন, যেখানে বলা হয়, প্রত্যেক মিসরীয়কে অবশ্যই প্রেসিডেন্ট মুরসিকে মেনে চলতে হবে, তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা, তাঁর কোনো বিরোধিতা করা চলবে না। তিনি নিজেকে অনেকটা সৃষ্টিকর্তার জায়গায় স্থাপন করেন। মিসরের জনগণ এটাকে খারাপভাবে নিয়েছে।
প্রথম আলো : কিন্তু জনগণের মোহভঙ্গ কি এতই ব্যাপক ছিল যে জনগণ আর মুরসি সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছিল না? নাকি সামরিক বাহিনী সুযোগ নিয়েছে?
কামাল গাবালা : বাইরে থেকে মুসলিম ব্রাদারহুডকে যতটা জনপ্রিয় বলে মনে হয়, আসলে তারা ততটা জনপ্রিয় নয়। ব্রাদারহুড ও অন্য ইসলামপন্থী দলগুলোর মোট সমর্থন ২০ শতাংশেরও কম। কিন্তু নির্বাচনে তাদের সাফল্যের কারণ, তারা অন্য সব রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত। জামাত ইসলামিয়া, সালাফি গোষ্ঠীসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পরে আমরা দেখলাম, তারা দেশকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছিল। মিসরীয় বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা এটা ছিল না যে মিসর ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাষ্ট্র হবে।
প্রথম আলো : কিন্তু যদি গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, তাহলে ব্রাদারহুডের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করার জন্য পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করা কি উচিত ছিল না?
কামাল গাবালা : কিন্তু মুরসি সরকার নিজেই তো আর গণতন্ত্র মানছিল না। তারা নিজেদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য, এমনকি চিরকাল ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার দুরভিসন্ধি নিয়ে যা কিছু করার—সব করছিল। তারা নিজেদের মতো করে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, যাতে মিসরীয় রাষ্ট্রের পরিচয় হয় একটা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে। শুধু তা-ই নয়, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড স্বপ্ন দেখে, সারা পৃথিবীতে তারা একটা ইসলামি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, বলা যায় একধরনের ইসলামি সাম্রাজ্য, যেটা পরিচালিত হবে মিসর থেকে। সারা পৃথিবীতে তাদের সমর্থক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী আছে। এমনকি বাংলাদেশেও আছে জামায়াতে ইসলামী। পৃথিবীর যেখানেই উগ্রপন্থী ইসলামি সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের যোগাযোগ আছে। ব্রাদারহুড অতিপ্রাচীন একটা সংগঠন; ১৯২৮ সালে এর জন্ম। পৃথিবীজুড়ে এর অনেক শাখা আছে। একটা হচ্ছে জামাত ইসলামিয়া বা জামায়াতে ইসলামী, আরও আছে আল-কায়েদা ও তালেবান। আল-কায়েদার নেপথ্যের নায়ক জাওয়াহিরি একজন মিসরীয়, ওসামা বিন লাদেন মিসরীয় না হলেও মুসলিম ব্রাদারহুডের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছেন সারা জীবন। সুতরাং, মুসলিম ব্রাডারহুডের স্বপ্ন শুধু মিসরকে নিয়েই নয়, সারা পৃথিবীকে নিয়ে। তারা মিসরের ক্ষমতায় গিয়ে পৃথিবীজুড়ে উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে নতুন করে সংগঠিত করছিল, তাদের অর্থকড়ি জোগান দিচ্ছিল।
প্রথম আলো : কিন্তু তারা তো নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় গিয়েছিল। আপনারা কেন পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন না?
কামাল গাবালা : আমাদের পরবর্তী নির্বাচনের জন্য আরও চার বছর অপেক্ষা করার উপায় ছিল না। কারণ, প্রতিটি দিন অতিবাহিত হচ্ছিল আর মিসর তার সেক্যুলার আইডেনটিটি একটু একটু করে হারাচ্ছিল। যেসব সাধারণ নাগরিক ব্রাদারহুডকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল, তারাও এটা চাচ্ছিল না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয়, ব্রাদারহুডকে আর এগোতে দেওয়া চলবে না, এক্ষুনি এসব থামাতে হবে। সে জন্যই আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, মুরসি সরকারের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ জানাতে কায়রোর রাস্তায় নেমে এসেছিল।
প্রথম আলো : তার মানে, ব্রাদারহুডের মৌলবাদী সরকারের থেকে সামরিক স্বৈরতন্ত্রই শ্রেয় বলে মিসরের মানুষ মনে করছে?
কামাল গাবালা : না। একদম না। আমরা এই কথা বলছি উচ্চ স্বরে: আমরা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র যেমন চাই না, তেমনি সামরিক রাষ্ট্রও চাই না।
প্রথম আলো : কিন্তু সামরিক বাহিনী তো আবার ক্ষমতা নিয়েছে; মিসরের জনগণ কি সেটা মেনে নিয়েছে?
কামাল গাবালা : মিসর এখন সামরিক রাষ্ট্র নয়। আমরা এই ব্যবস্থা মেনে নিচ্ছি না। আপনি জানেন, গত জুন মাসের ৩০ তারিখে কী ঘটেছিল? দেড় কোটি থেকে তিন কোটি মিসরীয় নাগরিক সারা মিসরের বিভিন্ন অঞ্চলে রাস্তায় নেমে এসেছিল মুরসি সরকারের পদত্যাগের দাবিতে। মুরসিকে বিদায় জানিয়ে জনগণ একটি আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছিল। কিন্তু মুরসি পদত্যাগ করতে রাজি হচ্ছিলেন না; উল্টা বরং প্রতিবাদী জনতাকে হত্যা করতে লাগলেন। প্রচুর মানুষের প্রাণহানি হলো। আর যেহেতু মুসলিম ব্রাদারহুড ও তার শরিক উগ্র ইসলামপন্থী দলগুলো বেশ সংগঠিত, তারাও চড়াও হতে লাগল বিক্ষোভকারীদের ওপর। এভাবে গোটা দেশের পরিস্থিতি ভীষণ সহিংস হয়ে উঠল। তখন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া রক্তপাত বন্ধ করার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তার মানে এই না যে সামরিক বাহিনীকে মিসরের জনগণ ডেকে এনে আবার ক্ষমতায় বসিয়েছে। না, সেটা আর কখনোই হবে না...
প্রথম আলো : কিন্তু সামরিক বাহিনী কত দিন থাকবে? মিসরের ভবিষ্যৎ কী?
কামাল গাবালা : ৫০ সদস্যের একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে; তারা শিগগিরই সংবিধান প্রণয়ন করবে। তারপর পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে মিসরে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হবে, সামরিক বাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে।
প্রথম আলো : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
কামাল গাবালা : ধন্যবাদ।

উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা জরুরি

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সরকারের সমন্বয় করার জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়টি। এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৩৮টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ৭৮টি। এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখভাল করার দায়িত্ব মঞ্জুরি কমিশনের। এর সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। উচ্চশিক্ষার যে ধারণা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর যে আস্থা রেখে মঞ্জুরি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা এখন নেই। আইনের সীমাবদ্ধতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার মঞ্জুরি কমিশনের নেই। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায়, ১৯৬৪ সালের ছাত্রদের ২২ দফায়, ১৯৬৯ সালের ছাত্রদের ১১ দফায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। সেই স্বায়ত্তশাসন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞানের সুস্থ বিকাশের লক্ষ্যে। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর রাজনীতির ভূত এবং শিক্ষিত স্বার্থান্বেষীদের কালো ছায়া ভর করেছে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য কর্তৃত্বশীল অভিভাবকস্থানীয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা কমিশন খুবই জরুরি।
বর্তমান সরকার উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৬ আগস্টের প্রথম আলোর সূত্রে জানা যায়, জনপ্রশাসন এবং অর্থ মন্ত্রণালয় চায় না তাদের কর্তৃত্ব হ্রাস পায় এমন উচ্চশিক্ষা কমিশন গড়ে উঠুক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী উল্লিখিত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করলে উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা সম্ভব হবে না। আইনের খসড়ায় প্রায় ৩০টি উপধারায় কার্যপরিধি নির্ধারিত হয়েছে। সেখানে অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠনসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা উল্লেখ রয়েছে। অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানক্রম যেমন জানা যাবে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবেও তুলনা করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা নির্ণয় করা যাবে। তবে কয়েকটি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা কমিশনের ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। যেমন, নিয়োগ ক্ষমতা। সংবিধানের ১৩৭ ধারা অনুযায়ী, ‘আইনের দ্বারা বাংলাদেশের জন্য এক বা একাধিক কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান করা যাইবে এবং একজন সভাপতিকে ও আইনের দ্বারা যেরূপ নির্ধারিত হইবে, সেইরূপ অন্যান্য সদস্যকে লইয়া প্রত্যেক কমিশন গঠিত হইবে।’ বর্তমানে বাংলাদেশ কর্মকমিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের জন্য আলাদা কর্মকমিশন গঠন করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে পদোন্নতি, পদায়নসহ অনেক দায়িত্ব এই কর্মকমিশনের থাকতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদার ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষা কমিশন যাতে এই কর্মকমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করার ক্ষমতা লাভ করতে পারে, তা আইনে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। অথবা উচ্চশিক্ষা কমিশনে নিয়োগ সেল গঠন করে নিয়োগ-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যেতে পারে। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন সময়ে কদর্য বাস্তবতার সৃষ্টি হচ্ছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ কিংবা অর্থ লেনদেনে নিয়োগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। শুধু নিয়োগ ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাতে না রাখলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০-৯০ শতাংশ সমস্যা দূর হবে। সে জন্য নতুন কর্মকমিশন করতে হবে, অথবা উচ্চশিক্ষা কমিশনে ন্যস্ত করতে হবে নিয়োগসংক্রান্ত সব দায়িত্ব। যেহেতু আইনের খসড়ায় উচ্চশিক্ষা কমিশনের একটি নিজস্ব সচিবালয়ের কথা উল্লেখ আছে, তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবালয়ের মাধ্যম বাদ দিয়ে উচ্চশিক্ষা কমিশন সচিবালয়কে সেই দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যার দ্বারা কমিশন সরাসরি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। 
উচ্চশিক্ষা কমিশনে বর্তমানে বাধা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ’ (৬ আগস্ট, প্রথম আলো)। উচ্চশিক্ষা কমিশন আইনের খসড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ-পদোন্নতি-পদোন্নয়নবিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব বিধি অনুযায়ী সেই নীতিমালা প্রয়োগ করবে। শুধু এতটুকু না করে এর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব কমিশনের গ্রহণ করার ক্ষমতা আইনে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ছিল। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক রকম পদোন্নতি নীতিমালা। এসব নীতিমালার কারণে পদায়ন, পদোন্নতিকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক প্রশাসনের তল্পিবাহক হওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাঁরাই উপাচার্যের দুর্নীতির সেফ গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের পদ্ধতি সংশোধন করে ডেমোনেস্ট্রেশন ক্লাস বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা কমিশনের প্রত্যক্ষ তদারকিতে বাংলাদেশে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। প্রশ্নপত্র থেকে শুরু করে উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ সব কাজ করবে এবং সনদ প্রদান করবে মূল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রেষণে শিক্ষকদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর ক্ষমতা উচ্চশিক্ষা কমিশনের থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের স্বল্পতা থাকে।
সে ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা কমিশন যোগ্য ও দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক সেমিস্টারের জন্য প্রেষণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে পারবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ন্ত্রণে উচ্চশিক্ষা কমিশনকে যথাযথ ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই বললেই চলে। উচ্চশিক্ষা কমিশন করে তার ক্ষমতা বাড়িয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ক্ষমতা কমানো প্রয়োজন। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি অভিন্ন আইনের আওতায় আনার জন্য উচ্চশিক্ষা কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংসদে প্রস্তাব পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা থাকা জরুরি। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের নির্দেশনা নেই, সেগুলোতে উপাচার্য নিয়োগের প্রস্তাব পাঠানোর ক্ষমতা উচ্চশিক্ষা কমিশনের থাকতে হবে। অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা কমিশন ছাড়া উচ্চশিক্ষার প্রসার বাংলাদেশে প্রায় অসম্ভব। এ জন্যই উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন পাস হওয়া জরুরি। লেখকেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা।

অতীত ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের নাম এফ কেনেডি

তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা; কে বলে আজ তুমি নাই; তুমি আছ মন বলে তাই ... গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যেন জন ফ্রিটজেরাল্ড কেনেডি (মে ২৯, ১৯২৭-নভেম্বর ২২, ১৯৬৩) ডাকনাম জ্যাককে এভাবেই স্মরণ করল। হাজার হাজার মার্কিনির অশ্র“সিক্ত চোখ আর স্মৃতিকাতর কণ্ঠে যেন সে কথাটিই বিড়বিড় করে উচ্চারিত হচ্ছিল, অমাদের অতীত ভবিষ্যৎ, আর অস্তিত্বের নাম কেনেডি। জন এফ কেনেডি তো আর দশজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো নয়, তিনি অনেকের কাছেই অনুকরণীয় আদর্শ।
মৃত্যুর এতগুলো বছর পরেও ৫০তম বার্ষিকীতে লাখ লাখ মার্কিনি যে এমনভাবে তাদের জ্যাককে স্মরণ করবে তা যেন ভাগ্য বিধাতার অশেষ কৃপা। শুক্রবার ন্যাশনাল মেমোরিয়ালে মার্কিনিদের নীরবে অশ্র“বিসর্জন আর ক্ষণে ক্ষণে আকাশপানে তাকিয়ে জ্যাকের জন্য শুভকামনা জন এফ কেনেডিকে এক অনন্য উচ্চতায় স্থান করে দিল। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে এক মোটরশোভাযাত্রায় নিহত হন ৪৬ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট। তার মৃত্যুর ৫০তম বার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, তার স্ত্রী মিশেল ওবামা, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, তার স্ত্রী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনসহ অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বহু প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এসেছেন, আবার চলেও গেছেন। খুব কমসংখ্যক প্রেসিডেন্টকেই মানুষ মনে রেখেছে। মনে রাখা প্রেসিডেন্টদের তালিকায় বেশ ওপরের দিকেই ঠাঁই করে নিয়েছেন ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই, বানানো হয়েছে চলচ্চিত্র। এর পরও যেন তাকে নিয়ে জানার তৃষ্ণা মানুষের শেষ হয় না। বেঁচে থাকতে যতটা জনপ্রিয় ছিলেন মৃত্যুর পরও ততটাই শ্রদ্ধার আসনে আসীন তিনি। কেমন ছিলেন জন এফ কেনেডি?
তাকে নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর কতটুকু সত্য আর কতটুকু কাল্পনিক, এ নিয়ে শনিবার বিবিসি অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কেনেডির গুণমুগ্ধদের কাছে তিনি ছিলেন অনেক গুণের অধিকারী। ক্যারিশম্যাটিক নেতা বলতে যা বোঝায়, তা-ই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচিয়েছেন। বর্ণবাদে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রকে এক সুতোয় গাঁথতে তিনি কাজ করেছেন। ওয়াটারগেট কেলেংকারির হোতা রিচার্ড নিক্সনকে তিনি ১৯৬০ সালের নির্বাচনে পরাজিত করে মার্কিনিদের দুঃস্বপ্নের ইতি টেনেছিলেন। এমন একজন রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যুর ক্ষত তার গুণমুগ্ধরা এখনও শুকাতে পারেননি। জন এফ কেনেডির সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন বিল ক্লিনটন। ১৯৯২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় ক্লিনটন ছবিটি ব্যবহার করেন। কেনেডির জীবনী নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদক জিল আব্রামসন বলেন, কেনেডিকে নিয়ে যত বই আছে, কোনোটাই তার সেরা জীবনী নয়। এখনও তার জীবনের অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে।