Monday, December 1, 2025
পানির নীচে শ্রীলঙ্কা, মৃত প্রায় ২০০
আল জাজিরার এক খবরে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৩ জন। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (ডিএমসি) জানিয়েছে, রাজধানী কলম্বোর বেশ কিছু অংশে পানি বেড়েই চলেছে। এখনও নিখোঁজ আছেন ২২০ জন। রোববার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর জানায়, নিখোঁজদের মধ্যে নৌবাহিনীর পাঁচ সদস্যও রয়েছেন। ডিএমসি জানিয়েছে, চরম আবহাওয়ার কারণে দেশজুড়ে প্রায় ১৫ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ রাষ্ট্রীয় সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।
আল জাজিরার প্রতিনিধি মিনেল ফার্নান্ডো জানান, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। তিনি বলেন, কিছু মহল্লা পুরোপুরিই কাদা-পানিতে চাপা পড়েছে। আর প্রতিটি ঘটনা নতুন হতাশা নিয়ে আসছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বেশ কয়েকটি এলাকা এখনো হালনাগাদ তথ্য দিতে পারেনি। অবিরাম বৃষ্টিতে নতুন করে রোপণ করা ধানক্ষেতও ডুবে গেছে বলে জানান তিনি।
ডিএমসি জানায়, কলম্বোর উত্তরাংশেও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, কারণ কেলানি নদীর পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, ঘূর্ণিঝড় সরে গেলেও উজানে ভারী বর্ষণে নদীর তীরবর্তী নিচু অঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে শনিবার জরুরি অবস্থা জারি করে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানান। সাড়া দিয়ে প্রথমেই ভারত ত্রাণসামগ্রী ও উদ্ধার অভিযানের জন্য দুটি হেলিকপ্টার পাঠায়। জাপান জরুরি সহায়তার প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য একটি দল পাঠানোর ঘোষণা দেয়। যদিও অনেক এলাকায় বৃষ্টি কমেছে, কিন্তু মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বহু সড়ক এখনো অগম্য অবস্থায় রয়েছে।
ডিএমসি-এর হালনাগাদ তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড়-বন্যায় ২০ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ। বিভিন্নভাবে সহায়তার প্রয়োজনীয় তালিকায় রয়েছেন ৮ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মিলে উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের লাইন ধসে পড়া এবং পানি শোধনাগার প্লাবিত হওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারনেট যোগাযোগও ভেঙে পড়েছে নানা স্থানে। ২০১৭ সালের পর এবারই এমন ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন হলো শ্রীলঙ্কা। তখনকার বন্যা ও ভূমিধসে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। শতাব্দীর শুরু থেকে সবচেয়ে বড় বন্যা দেখা যায় ২০০৩ সালের জুনে। তখন প্রাণহানি হয়েছিল ২৫৪ জনের।

Tuesday, September 30, 2025
নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা: এরপর দক্ষিণ এশিয়ায় কোথায় আগুন জ্বলবে!
তিন ভিন্ন প্রেক্ষাপট, এক অভিন্ন দৃশ্য
শ্রীলঙ্কা (২০২২): অর্থনৈতিক ধস, ঋণ খেলাপি, জ্বালানি ও খাদ্য ঘাটতি, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। জন্ম নিল ‘আরাগালায়া’ (সংগ্রাম) আন্দোলন। যুবকরা ‘গোটা গো ভিলেজ’ বানালো কলম্বো প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের সামনে। জুলাইতে প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ (২০২৪): বৈষম্যমূলক চাকরির কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পুলিশি দমনপীড়নে শত শত নিহত হন। পরে আন্দোলন রূপ নেয় শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান দাবিতে। আগস্টে হাসিনা পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে ভারতে পালান।
নেপাল (২০২৫): সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ, তীব্র বৈষম্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ৭০ জনের বেশি। পার্লামেন্ট ও মিডিয়া হাউসেও আগুন জ্বলে ওঠে। অবশেষে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী ওলি।
সাধারণ সূত্র: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে জেন জেড
মানবাধিকার সংস্থার মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, এই দেশগুলোতে যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মূল কারণ একই- অমীমাংসিত বৈষম্য, দুর্নীতি, প্রবীণ রাজনীতিকদের প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন শাসন। জেন জেড তাদের জীবনে দুটি বড় মন্দা দেখেছে- ২০০৮-০৯ সময়ে এবং কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধস। এ প্রজন্ম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের শাসন করেছেন দাদা-দাদীর বয়সী নেতারা। তার মধ্যে নেপালে ওলি (৭৩), বাংলাদেশে হাসিনা (৭৬), শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে (৭৪)। তরুণদের নৈতিক ক্ষোভ প্রবল হয়েছে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্যমূলক বিলাসিতার প্রদর্শনী এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের জীবনযাত্রা দেখে।
ডিজিটাল প্রজন্মের শক্তি
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রুমেলা সেন বলেন, রাগান্বিত দৃশ্যের বাইরে দেখলে বোঝা যায়, এই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা হলো ‘গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’ ডিজিটাল দক্ষতার কারণে তারা অনায়াসে অনলাইনে সংগঠন, প্রচার ও প্রতিবাদের নতুন কৌশল তৈরি করছে। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করলে বা প্ল্যাটফর্ম ব্লক করলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। তিনি বলেন, এ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে যেতে দেখছে। তাদের ক্ষোভ একেবারেই সত্যিকারের।
একে অপরের কাছ থেকে শিক্ষা
রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী জীবন শর্মা বলেন, নেপালি তরুণরা শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের আন্দোলন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এসব বিদ্রোহ আলাদা নয়, বরং গভীর হতাশা থেকে জন্ম নেয়া। স্ট্যানিল্যান্ডও বলেন, এরা একে অপরকে দেখছে, শিখছে এবং অনুপ্রাণিত হচ্ছে।
অবশেষে প্রশ্ন রয়ে যায়-এরপর কোথায় আগুন জ্বলবে?

Tuesday, April 1, 2025
কলম্বোর দিন-রাত by জাকারিয়া মণ্ডল
রাজধানী শহরে ঢুকতে ঢুকতে দুপুর গড়িয়ে গেল। পার্লামেন্ট ভবনকে ডানে রেখে আর একটু এগিয়ে বাঁয়ে কলম্বো বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনাল। বিপরীতে শহরের ভেতর খানিক এগিয়ে ওল্ড ডাচ্ হসপিটাল।
টালি ছাওয়া দোচালা কাঠামোর নিচে সারিবদ্ধ ঘর। কোনোটা ফ্যাশন, কোনোটা সুভ্যেনির, কোনোটা বা খাবারের দোকান। এমন চারটি ঘরের বাহু পুরো স্থাপনাটাকে আয়তক্ষেত্রের রূপ দিয়েছে। ভেতর দিক টানা বারান্দার বেড়ে খোলা উঠোন। পাশ দিয়ে সারিবদ্ধ বাঁধানো টেবিল চেয়ার।
সিলন কারি ক্লাবে মুরগি ও মাছের কারি, পাঁপড় ভাজি, মিশ্র সবজি, বেগুনের টক ঝোল আর ঘন ডালে উদরপূর্তি নেহায়েত মন্দ হলো না। রেস্তরাঁটার অনতিদূরেই বিখ্যাত কাঁকড়া মন্ত্রণালয়। মানে ‘মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাব’। শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত দুই ক্রিকেটার কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে মিলে রেস্তরাঁটা জমিয়েছেন বেশ। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের সেরা ৫০ এশীয় রেস্তরাঁর তালিকায় এটা ২৯ নম্বরে ছিল। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে এখানে ভূরিভোজ সারতে এসেছিলেন কোহলি ও তার দল। কিন্তু খাবারের ছবি পোস্ট করে পড়েছিলেন ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তোপের মুখে। যদিও যতই তোপ দাগা হোক, যে দেশেরই ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কায় খেলতে আসুক না কেন, কাঁকড়া মন্ত্রণালয়ে খেতে আসা ঠেকানো যায় না।
দুপুর গড়িয়েছে বলে কাঁকড়া মন্ত্রণালয়ে এখন ভিড় নেই। তবে বিকাল থেকে সরগরম হয়ে উঠবে রেস্তরাঁটা। সেইসঙ্গে ভোজ আর কেনাকাটার উৎসবে জমে উঠবে এই ওল্ড ডাচ্ হসপিটাল চত্বর। মূলত ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হসপিটাল ছিল এখানে। সতেরো শতকের মাঝামাঝিতে। পরবর্তীতে ইতিহাসের আরও অনেকগুলো যুগ পাড়ি দিলেও ডাচ্ হসপিটাল নামেই এখনো পরিচিত এই ভবন ও চত্বরটা।
যদিও এখন আর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল ঘিরে থাকা ডাচ্ দুর্গের চিহ্নও খুঁজে নেয়া ভার। সামনের দিকটায় রাস্তার ওপাশে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া টাওয়ার। মাথা উঁচু করে আকাশ ছুঁতে চাইছে। কলম্বোর তিন রাতের ঠিকানা হোটেল রামাদায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ৪টা বেজে গেল। শ্রীলঙ্কার প্রখ্যাত রত্ন ব্যবসায়ী তারিক আলীওয়াফা এসেছেন হোটেল লবিতে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন সভাপতি ও এই ট্যুরের লিডার আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলের পূর্ব পরিচিত তিনি। তার শ্বশুর শ্রীলঙ্কান পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। গাড়িতে করে বেয়ারফুটের সামনে নামিয়ে দিলেন।
বারবারা সানসোনি নামে এক শিল্পী ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বেয়ারফুট প্রতিষ্ঠা করেন। এখন এটি পরিচালনা করছেন তারই উত্তরসূরি ডমিনিক। বড়ই অমায়িক মানুষ। সঙ্গে করে ঘুরিয়ে দেখালেন সবকিছু। রঙ আর নকশার রাজ্য চোখ ধাঁধিয়ে দিল। কাপড়ে কাপড়ে বৈচিত্র্যের সমাহার। রকমারি কারুপণ্য। চা ও ভেষজ। বইয়ের গ্যালারি। সবখানে চারু আর কারুশিল্পের অভূতপূর্ব সমন্বয়।
মূল ভবনের একপাশে আর্ট গ্যালারি। পেছনের উঠোন জুড়ে ক্যাফে। খোলা চত্বরে বহু দেশের মানুষের আড্ডা।
এরইমধ্যে গোধূলি নেমেছে কলম্বোর আকাশে। সেই আলোয় মূল সড়কের পাশে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে রিফর্মড ডাচ্ চার্চের শ্বেতভবন। যানজটহীন সড়কে সাই সাই ছুটে চলেছে গাড়ি। রাস্তার ওপাশে একটা তামিল মন্দির। প্রবেশপথের ওপরে কয়েকতলা গোপুরামে দেবদেবীর মেলা। এ জাতীয় মন্দিরের প্রবেশপথের ওপরে বিভিন্ন দেবদেবী খচিত যে বহুতল কাঠামোটা থাকে, তারই তামিল নাম গোপুরাম। এই গোপুরামের মাথায় সাঁঝবাতি জ¦লে উঠলো হুট করে। এরইমধ্যে সূর্যটা ডুবে গেছে ভারত মহাসাগরের বুকে। কলম্বোর রাস্তা আলোকিত ল্যাম্প পোস্টের আলোয়। সুপারশপ ম্যাজেস্টিক সিটিতে উপচে পড়া ভিড়। রাত ৮টার আগেই বন্ধ হয়ে গেল কলম্বো শহরের দোকানপাট।
হোটেল রামাদার সুইমিং পুল ঘিরে সবুজ বাগান। ফাঁকে ফাঁকে টেবিল-চেয়ার। ডিনারের পর মাঝরাত অবধি চললো অলস আড্ডা। ঘুমিয়ে যাওয়া শহরের কাছেই কোথাও নাইট পার্টি চলছে। ড্রামের বিট আর হৈ-হুল্লোড় শোনা গেল রাতভর।
সকালে হোটেল রুমের জানালা থেকেই মহাসাগরের শান্ত জলরাশি চোখে পড়লো। প্রাতরাশের পর শুরু হলো লোটাস টাওয়ার অভিযান। সুউচ্চ সবুজ দণ্ডের মাথায় গোলাপি পদ্মটা যেন আকাশের গায়ে বসে আছে। শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতিতে পদ্ম হলো বিশুদ্ধতা ও উন্নয়নের প্রতীক। তাই পদ্মের আদলেই এই টাওয়ার। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ এই টাওয়ারের উচ্চতা ১১৬৮ ফুট। আছে রেস্তরাঁ, অডিটোরিয়াম, টেলিকমিউনিকেশন জাদুঘর, পরিদর্শন গ্যালারি।
উন্নয়ন কাজ চলমান বলে এখন লোটাস টাওয়ারে প্রবেশ নিষেধ। তবে এয়ারফোর্সের তত্ত্বাবধানে পরিদর্শনের বিশেষ অনুমতি মিলেছে। অতিকায় দ্রুতগামীর লিফটে পরিদর্শন প্ল্যাটফরমে পৌঁছাতে সময় লাগলো না। তত্ত্বাবধায়কদের বিশেষ অনুমতি ও সহযোগিতায় মই বেয়ে ছাদের ফোকর গলে উপরের খোলা চত্বরেও ওঠা গেল। তারপর আরও খাড়া মই বেয়ে একেবারে শীর্ষে ওঠার সুযোগও করে দিলেন তারা।
টাওয়ারের চূড়া থেকে নিচের মানুষগুলোকে মনে হলো লিলিপুট। গোড়াতেই বেইরা লেক। সরু ক্যানাল হয়ে পশ্চিমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। মহাসাগরের ওপরে জমে থাকা কুয়াশায় খুব বেশি দূর দৃষ্টি চলে না। এপাশে কুয়াশামাখা শহর। ছবির মতো সুন্দর। স্কুল, খেলার মাঠ। ছুটে চলা গাড়ি আর ট্রেনকে মনে হচ্ছে খেলনা। মার্চের শুরুতে কলম্বো শহরের অসাধারণ টপ ভিউ ধরা দিল চোখের সামনে।
মধ্যাহ্নভোজের পর বিটুবি সেশন শুরু হলো হোটেল রামাদায়। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস এসোসিয়েশন (টোয়াব) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কান ট্যুর অপারেটরদের বিজনেস বৈঠক। তারপর সবার হাতে সুভ্যেনির তুলে দিলেন শ্রীলঙ্কার পর্যটন সচিব।
বিকালে হোটেল থেকে বেরুতেই হাজির তারিক আলী। তার ড্যাজলজিম অ্যান্ড জুয়েলারি শপটা বেয়ারফুটের কাছেই। লম্বাটে দোকানটায় বিদ্যুতের আলো ছাপিয়ে রত্নের ঝিলিক। নানা রঙের দ্যুতি। রুবি, নীলকান্তমণি। নীল একটা রত্ন দেখিয়ে জানালেন, ওটার দাম ৩৫ হাজার ডলার। বিভিন্ন দেশ থেকে রত্নপ্রেমীরা ছুটে আসেন তার দোকানে। আর তিনি রত্ন সংগ্রহ করেন রত্নপুরা থেকে। যার অবস্থান কলম্বো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বদিকে।
রত্নপুরা মানে রত্ননগরী বা রত্নের শহর। ওখানকার নদীর কাদাবালি চালনিতে নিয়ে চাললে একসময় রত্ন পাওয়া যেতো। এখন নিচু ধানের জমিতে ৩৩ ফুট থেকে ১৬০ ফুট পর্যন্ত গভীরে বেশ কিছু রত্নের খনি। এসব খনির কারণেই পৃথিবীর কোথাও রত্নদ্বীপ, কোথাওবা রত্নের ভাণ্ডার নামে শ্রীলঙ্কা পরিচিতি। এ নিয়ে আছে ঢের গল্প, কিংবদন্তি। শ্রীলঙ্কা থেকে রত্ন সংগ্রহের ইতিহাসও শত সহস্র বছরের প্রাচীন। অতি রূপবতী বিলকিসকে বিয়ে করার পর বাদশাহ সোলায়মান দু’টি জাহাজ পাঠান রত্নের দেশ শ্রীলঙ্কায়। জাহাজভর্তি রত্ন এনে নববধূকে খুশি করবেন বলে। এদেশে এখনো ভুরি ভুরি ব্লু শেফায়ার বা নীলা পাথর পাওয়া যায়। নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে প্রদর্শিত ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ নামে অতি মূল্যবান রত্নটি আসলে এই শ্রীলঙ্কারই রত্ন। বৃটিশ রাজমুকুটে শোভিত ৪০০ ক্যারেটের নীলা পাথরটিও এই শ্রীলঙ্কার। এটাই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে কমলা ও গোলাপি মিশ্রিত পদ্মরাগ মণি মেলে। আরও আছে রুবি। চীনা পর্যটক ফা হিয়েন এদেশে মানুষের হাতের মতো লম্বা ও বিঘত খানেক চওড়া রুবি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে মুরগির ডিমের সমান রুবি দিয়ে হাতির মাথা সাজানো হতো বলে লিখে গেছেন। এখানকার রুবির প্রেমে পড়েছিলেন মার্কোপেলোর মতো পর্যটকও। আরও আছে ক্যাটস আই, টোপাজ, আরও যে কতো রত্ন!
শ্রীলঙ্কার রত্ন ব্যবসায়ে মুসলমানদের আধিপত্য রয়েছে বলে গর্বিত তারিক আলী। ১১ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যার শ্রীলঙ্কায় রত্নপুরার মুসলমান জনসংখ্যা ৩৩ শতাংশের বেশি, আর রাজধানী কলম্বোতে প্রায় ৪২ শতাংশ। সন্ধ্যায় ড্যাজল থেকে বেরিয়ে কয়েক মিনিটেই ফের বেয়ারফুট। খোলা ক্যাফেতে গাছের নিচে আড্ডা জমে জয়ন্তির সঙ্গে। জয়ন্তি কুরু-উতুমপালা। শ্রীলঙ্কার প্রথম এভারেস্টজয়ী। পুরুষ-নারী বৈষম্য করে না পর্বত। হয় তাকে জয় করো, নয়ত পরাজিত থাকো। এ আপ্তবাক্যকে মূল সূত্র ধরেই শ্রীলঙ্কার প্রথম এভারেস্টজয়ী হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম পোক্ত করে নিয়েছেন জয়ন্তি। নারী হিসেবে তো বটেই, প্রথম শ্রীলঙ্কান হিসেবেই এই অনন্য গৌরব অর্জন করে নিয়েছেন তিনি। যে গৌরবে এ দেশের পুরুষরাও তার থেকে পিছিয়ে।
জয়ন্তির সঙ্গে কথায় কথায় সন্ধ্যা গড়ায়। কলম্বোতে আর একটা রাত গভীর হয়। তারপর সকাল। দুই আলোকচিত্রী আবির আবদুল্লাহ ও আজিম খান রনি ছুটে যান ফটোগ্রাফিক এসোসিয়েশনে। সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে একটা ফটো প্রেজেন্টেশন দেবেন তারা। পাটের কাপড় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন ছুটলেন তার ব্যবসার কাজে। এসোসিয়েশন সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ও শাকিল বিন মুশতাকসহ তিনজনের দল ছুটলো সিলন টুডে অফিসে।
শ্রীলঙ্কার অন্যতম ডেইলি নিউজপেপার সিলন টুডের অফিসটা ছিমছাম, পরিপাটি। প্রথমে সাংবাদিক সঞ্জু, তারপর জেনারেল ম্যানেজার-এডভারটাইজিং সঞ্জিব ওটেউয়ি, সবশেষে ফিচার এডিটর খুবই আন্তরিক সবাই।
পত্রিকা অফিস থেকে বেরিয়ে পেরেরা হুসেইন পাবলিশিং হাউজ। বিখ্যাত লেখক আমেনা হুসেইন আগে থেকেই আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলকে চিনতেন। তার অফিসে জমে উঠলো আড্ডা। স্বামী সাম পেরেরার সঙ্গে মিলে প্রকাশনা সংস্থাটাকে জমিয়ে তুলেছেন তিনি।
মনোযোগ দিয়ে সুনেলা জয়াবর্ধনের ‘লাইন অব লঙ্কা: মিথ অ্যান্ড মেমোরিজ অব অ্যান আইল্যান্ড’ গ্রন্থটির পৃষ্ঠা উল্টাতে দেখে সেটা উপহারই দিয়ে বসলেন আমেনা হোসেন। এ ছাড়া আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলকে দিলেন মাইকেল রোহান সূরিয়া রচিত ‘মোটর সাইক্লিং এডভেঞ্চারস ইন শ্রীলঙ্কা’ গ্রন্থটি। আর নিজের অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ ‘ইবনে বতুতা ইন শ্রীলঙ্কা’ গ্রন্থটি তিনি দিলেন শাকিল বিন মুশতাককে। যে পথ ধরে ইবনে বতুতা শ্রীলঙ্কা ঘুরে বেড়িয়েছেন, সে পথ ধরে নিজেও ঘুরেছেন আমেনা হোসেন। সেই অভিজ্ঞতাই তিনি প্রকাশ করেছেন গ্রন্থটিতে। তার কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতে দুপুর।
ফুডকোর্টে মধ্যাহ্নভোজ সারতে নিয়ে গেলেন তারিক আলী। বাংলাদেশের ফুডকোর্টের মতোই গিজগিজে ভিড়। খাবারের পর কলম্বোর পুরনো শহর ও স্থাপনা ঘুরিয়ে দেখালেন তারিক আলী। তারপর বিদায় নিলেন। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে ডিনারের দাওয়াত। হাইকমিশনার তারেক মো. আরিফুর রহমানের সঙ্গে জমে উঠলো শ্রীলঙ্কা সফরের শেষ আড্ডা।
শ্রীলঙ্কান ট্যুরিজম থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে বলে অকপটে মত প্রকাশ করলেন বাংলাদেশ হাইকমিশনার। নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি মেলে তিনি বললেন, শ্রীলঙ্কান ট্যুরিজমের অতিথিসেবা অনেক নিখুঁত। অবকাঠামো থেকে শুরু করে ভাষা, ট্যুর প্ল্যান সবকিছুতেই তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের উন্নতির ধারা এখনো অব্যাহত। আমরা তাদের কাছে অনেক কিছুই শিখতে পারি।
ভারত মহাসাগরের পাড়ে কলম্বোর অবস্থান শ্রীলঙ্কার পশ্চিম উপকূলে। কালানী নদীর মোহনায়। অতীতে এ শহরের নাম ছিল কালান তোতা, যার অর্থ কালানী নদীর ফেরিঘাট। আরব বণিকরা যার নাম দেয় কালাম্বু। ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে পতুর্গিজরা এ শহর দখলের পর ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামে নাম রাখে কলম্বো। ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এ শহরের দখল নেয় ওলন্দাজরা। ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজরা হয় এ শহরের নিয়ন্ত্রক। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে বৃট্রিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়া শ্রীলঙ্কার কলম্বো এখন প্রধান সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক রাজধানী।
ঐতিহাসিক এ শহরে এখন মাঝরাত। ট্যুরিস্ট বাস ছুটে চলেছে ৩৫ কিলোমিটার দূরের বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের দিকে। Í
লেখক: নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা
(সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০২৫)

Saturday, February 22, 2025
শ্রীলঙ্কায় হাতিদের প্রথম ‘অনাথ আশ্রমের’ সুবর্ণজয়ন্তীতে ফলের বড় ভোজ
‘অনাথ আশ্রম’টির নাম পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজ। পর্যটকদের কাছে এটি অন্যতম একটি আকর্ষণের জায়গা। গত রোববার এ আশ্রম প্রাঙ্গণ কলা, তরমুজ ও শসায় ভরে গিয়েছিল।
প্রতিদিন এ আশ্রমের হাতিগুলোকে নদীতে নিয়ে গোসল করানো হয়। রোববারও এদের গোসলের জন্য নদীতে নেওয়া হয়। আশ্রমে থাকা চার প্রজন্মের হাতি নিকটবর্তী মহা ওয়া নদীতে গোসল করে। সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনে আমন্ত্রিত কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পর্যটককে দুধভাত ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পরিবেশন করা হয়।
আশ্রমটির প্রধান কিউরেটর সঞ্জয়া রত্নানায়েকে বলেন, ‘১৯৮৪ সালে এ অনাথ আশ্রমে প্রথম হস্তীশাবকের জন্ম হয়। তখন থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭৬টি হাতির জন্ম হয়েছে।’ তিনি এ উদ্যোগকে একটি সফল প্রজনন কর্মসূচি বলেও উল্লেখ করেন।
সঞ্জয়া রত্নানায়েকে আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের এখানে চার প্রজন্মের হাতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ১৮ মাস ও বড়টির বয়স ৭০ বছর।’
২০২১ সালের আগস্টে আশ্রমটিতে প্রথমবারের মতো যমজ হস্তীশাবক জন্ম নেয়। এশীয় হাতির ক্ষেত্রে যমজ শাবক জন্মানোর ঘটনা বিরল। দুটো হস্তীশাবকই ভালো আছে।
১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাতির ‘অনাথ আশ্রম’টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর দুই বছর আগে থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বেনটোটার একটি ছোট সেবাকেন্দ্রে পাঁচটি অনাথ হাতিকে লালন–পালন করা হচ্ছিল।
রত্নানায়েকে বলেন, ‘১৯৭৫ সালে পিন্নাওয়ালায় একটি নারকেলবাগানে আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই প্রাণীরা বিচরণের জন্য আরও বেশি জায়গা ও ভালো পরিবেশে পায়। আশপাশের এলাকায় তখন প্রচুর খাবারও পাওয়া যেত।’
হাতিদের ক্ষুধা মেটাতে এ আশ্রমে ১৪ হাজার ৫০০ কেজি নারকেল, পাম ও অন্যান্য গাছের পাতার প্রয়োজন হয়।
শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) পূর্বে আশ্রমটির অবস্থান। সেখানকার কর্তৃপক্ষ হস্তীশাবকদের জন্য টন টন ফল ও দুধও কিনে রাখে। বিদেশি ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের কাছে হস্তীশাবকগুলো খুব পছন্দের।
এ আশ্রম শ্রীলঙ্কার রাজস্ব আয়েরও অন্যতম বড় উৎস। সেখান থেকে প্রতিবছর প্রবেশ ফি হিসেবে লাখ লাখ ডলার আয় হয়। দর্শনার্থীরা দূর থেকে হাতিদের দেখতে পারেন, কাছেও আসতে পারেন। স্নানের সময় হাতিদের গা ঘষতে সাহায্য করতে পারেন তাঁরা।
সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আশ্রমে উপস্থিত হয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মাহুত কে জি সুমানাবন্দ। এএফপিকে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার সময় এ আশ্রমে পানি ও বিদ্যুতের অভাব ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
হাতি লালন–পালনকারী হিসেবে তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন সুমানাবন্দ। ৬০ জনের বেশি মাহুতকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। এখনো বিভিন্ন মন্দির ও অন্যান্য জায়গার হাতি লালন–পালনকারীরা তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে থাকেন।
২০ বছর আগে শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষ দেশের দক্ষিণে আরেকটি হাতির আশ্রম খোলেন। সেখানে অনাথ, পরিত্যক্ত বা আহত হাতিদের যত্ন নেওয়া হয় এবং পরে এদের বনে ফেরত পাঠানো হয়।
পিন্নাওয়ালা আশ্রমটিকে অনেকে সফল এক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। এরপরও শ্রীলঙ্কায় বন্য প্রাণীদের ঐতিহ্যবাহী অভয়ারণ্যগুলোর সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে।
পরিবেশ উপমন্ত্রী আন্তন জয়াকোড়ি রোববার এএফপিকে বলেন, ২০২৩ সালে এমন সংঘাতে ৪৫০টি হাতি মারা যায়। এ ছাড়া ১৫০ জন নিহত হন। আগের বছর ৪৩৩টি হাতি ও ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
শ্রীলঙ্কায় হাতি হত্যা বা হাতির ক্ষতি করা ফৌজদারি অপরাধ বলে বিবেচিত। দেশটিতে আনুমানিক সাত হাজার বন্য হাতি রয়েছে এবং সেখানে হাতিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে হাতির গুরুত্ব থাকা এর একটি কারণ বলে মনে করা হয়।
তবে হাতি হত্যা থামছেই না। হাতি ফসলের খেত নষ্ট করে দেওয়ায় কৃষকেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। উপমন্ত্রী আন্তন জয়াকোড়ির দৃঢ় বিশ্বাস, নতুন সরকার গ্রামে হাতিদের প্রবেশ বন্ধ করে সমস্যাটি মোকাবিলা করতে পারবে।
আন্তন জয়াকোড়ি এএফপিকে বলেন, বন্য হাতিদের গ্রামে প্রবেশ করা কঠিন করে তুলতে তাঁরা বৈদ্যুতিক বেড়া, পরিখাসহ একাধিক বেষ্টনি তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
![]() |
| পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজ নামের আশ্রমটিতে হাতিকে ফল খাওয়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: এএফপি |
Monday, February 3, 2025
গাড়ি আমদানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল শ্রীলঙ্কানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
উল্লেখ্য, জাপান ও ভারতসহ অনেক দেশের মতো কার ও ট্রাক প্রস্তুতের কোনো রকম বড় কারখানা নেই শ্রীলঙ্কায়। সবরকম গাড়ি তারা আমদানি করে। এখন চীনা গাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় ব্যবহৃত গাড়ির দাম অনেক বেড়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আগে যে দাম ছিল, এখন কিছু মডেলের ব্যবহৃত গাড়ির দাম দুই থেকে তিনগুণ। গায়ানা ইন্ডিকা’র মতো মানুষদের জন্য এই বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রভাব অনেক কঠিন। কারণ, তারা বিয়েতে গাড়ি সবরাহ করতেন। গায়ানা ইন্ডিকা একজন পার্টটাইম ক্যাবচালক। তিনি বলেন, আমি একটি নতুন গাড়ি কিনতে চাই যাতে আমার কাজ করতে পারি। আমার প্রাইভেট ক্যাব ভাড়া দেয়ার কাজটা শুরু করতে পারি। একটি গাড়ি ছাড়া, চলাচল করা ছাড়া আমিতো রাজস্ব হারাচ্ছি। ক্যান্ডি শহরের একজন সফ্টওয়্যারের পেশায় যুক্ত শশীকুমার বলেন, দেশে গণপরিবহন নাজুক। এক্ষেত্রে একটি গাড়ি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আমাদের ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই, দেশের অন্য স্থানগুলোতে সফর করার জন্য একটি গাড়ি অত্যাবশ্যক। হয়তো সরকারকে গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, না হয় তাদেরকে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগের বছরে শ্রীলঙ্কা প্রায় ১৪০ কোটি ডলারের যানবাহন আমদানি করেছিল। এ বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা যানবাহন আমদানির জন্য একশ’ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু এই অর্থ ছাড় দেয়া হবে আস্তে আস্তে। ভেহিক্যাল ইমপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব শ্রীলঙ্কার আরোশা রড্রিগো বলেন, কমপক্ষে চার দশক ধরে গাড়ির ডিলারশিপ পরিচালনা করেন তিনি ও তার পরিবার। নিষেধাজ্ঞার আগে
মাসে প্রায় ১০০ যানবাহন আমদানি করেছে তার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ার পর তারা একটি গাড়িও আমদানি করতে সক্ষম হননি। তিনি বলেন, যদি এই নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করা হয়, যদি যাত্রীবাহী গাড়ি এবং অন্য যানবাহন আমদানি অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে বহু মানুষ এগুলো কিনতে সমর্থ হবেন না। কারণ, ট্যাক্স বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রীলঙ্কান মুদ্রা দুর্বল হয়েছে। সরকার আমদানি করা গাড়ির ওপর এক্সসাইজ ডিউটি বা শুল্ক নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে। ইঞ্জিনের আকারের ওপর নির্ভর করে নতুন এবং সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়িতে এই শুল্ক হার যথাক্রমে শতকরা ২০০ ভাগ এবং ৩০০ ভাগ। অর্থাৎ যদি ধরা হয় একটি নতুন গাড়ির দাম ১০০ ডলার। কিন্তু তাতে শতকরা ২০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করায় মূল্য দাঁড়াবে ৩০০ ডলার। এখানেই শেষ নয়। এক্সসাইজ ডিউটির শীর্ষে আছে শতকরা ১৮ ভাগ ভ্যাট। বিদেশ থেকে আনা যেকোনো গাড়ির জন্য এই ভ্যাট প্রযোজ্য। বিশ্বের বড় সব মুদ্রার, যেমন ডলার, বিপরীতে শ্রীলঙ্কার রুপি মারাত্মক দুর্বল। এর ফলে আমদানি করা গাড়ির দামে বড় রকম প্রভাব ফেলবে। এর ফলে আর যশোদার মতো স্কুল শিক্ষকদের মতো মানুষদের গাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়বে। যশোদা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা একটি গাড়ি কেনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু যদি ট্যাক্স এবং মূল্য হিসাব করি, তাহলে একটি গড় মাপের গাড়ির মূল্য ২৫ লাখ রুপি থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৫০ লাখ রুপি হয়েছে। এটা আমাদের জন্য কোনো সুযোগ এনে দেয়নি।

Saturday, January 11, 2025
ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করায় শ্রীলঙ্কার এক সন্ন্যাসীর জেল
২০১৮ সালে, নিখোঁজ কার্টুনিস্টের স্ত্রীকে ভয় দেখানো এবং আদালত অবমাননার অভিযোগে জ্ঞানাসরাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু মাত্র নয় মাস পরেই তাকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনা। ২০২২ সালে দেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে চলা বিক্ষোভের পর তার প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ওই সন্ন্যাসী আবারো ক্ষমতাচ্যুত এবং বিচারের মুখোমুখি হন।

Saturday, November 16, 2024
শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিরাট জয় পেলো অনুরার বামপন্থি জোট
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে এনপিপি জোট বেশ ভালো অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে তা আগাম অনুমান করেছিলেন বিশ্লেষকরা। তবে তাদের সংশয় ছিল এনপিপি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কিনা। তবে সে সংশয়ও দূর করলেন অনুরা। বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়। পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা ২২৫। এর মধ্যে ১৯৬ আসনে সরাসরি ভোট হয়। বাকি ২৯টি জাতীয়ভিত্তিক আসন। এগুলো রাজনৈতিক দলগুলো পাবে ১৯৬ আসনে প্রাপ্ত ভোটের হিস্যা অনুযায়ী। এনপিপি জোটের নেতৃত্বে রয়েছে অনুরা কুমারা দিশানায়েকের জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) পার্টি। বৃহস্পতিবার ভোট দেয়ার পর সাংবাদিকদের ৫৫ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কার এই নেতা বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন এই নির্বাচন শ্রীলঙ্কার জন্য গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। জনগণ তাদেরকেই ম্যান্ডেট দেবে বলেও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
বিরোধীদের জোট নেতা সজিথ প্রেমাদাসাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত করেন দিশানায়েকে। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের সীমাহীন দুর্নীতির ফলে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দ্বীপরাষ্ট্রটি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে দেশটির জনগণ। যার তোপে ২০২২ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যান রাজাপাকসে। এর প্রায় দুই বছর পর সেপ্টেম্বরে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এতে জয়ী হন বামপন্থি রাজনীতিক অনুরা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। ১৪ই নভেম্বর আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করলো তার জোট এনপিপি। চীনপন্থি সমাজতান্ত্রিক নেতা হিসেবে পরিচিত অনুরা কুমারা দিশানায়েকে।

Sunday, October 6, 2024
শ্রীলঙ্কার চীনপন্থি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জয়শঙ্করের যে আলোচনা হলো
২১শে সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকট ও গণরোষে সরকারের পতনের পর এটাই প্রথম নির্বাচন সেখানে। এতে চীনপন্থি অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার এক পক্ষের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীলঙ্কা সফরে গেলেন। দিশানায়েকের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মধ্যে বিরোধী দলীয় একজন এমপি হিসেবে এ বছর ফেব্রুয়ারিতে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। সেখানে প্রথমবার জয়শঙ্করের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। আর শুক্রবার দ্বিতীয় দফা তাদের বৈঠক হলো। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাতের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি।
বৈঠকের পর প্রেসিডেন্সিয়াল মিডিয়া ডিভিশন থেকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শ্রীলংকার অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, পর্যটন, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সেবা এবং ডেইরি শিল্পে ভারতের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ড. জয়শঙ্কর। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা দেবে ভারতের বিশাল বাজার। এ সময় প্রায় ৪০০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে প্রশঙ্কা করেন প্রেসিডেন্ট দিশানায়েকে। তার সঙ্গে বৈঠকের পর জয়শঙ্কর ভারত সমর্থিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচালন, জ্বালানি ও এলএনজি সরবরাহ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌর বিদ্যুতায়ন, সরকারি অবকাঠামোকে ডিজিটাল করা, স্বাস্থ্য ও ডেইরি প্রকল্পের কথা জোর দিয়ে তুলে ধরেন জয়শঙ্কর।
কিন্তু কোনো পক্ষই শ্রীলঙ্কার নর্দার্ন প্রদেশে বিতর্কিত আদানি পাওয়ার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেনি। স্থানীয় জনতা ও পরিবেশবাদীদের ঘোর বিরোধিতায় আদালতের রায়ে এই প্রকল্পটি বর্তমানে বাধাগ্রস্ত।

Tuesday, September 24, 2024
কে এই অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে!
অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের জন্ম ১৯৬৮ সালে গালেওয়েলাতে ২৪শে নভেম্বর। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হন। সরকারি স্কুলে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানে আছে তার ডিগ্রি। ১৯৮৭ সালে যখন ইন্দো-শ্রীলঙ্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় প্রায় সে সময়ে তিনি ছাত্র হিসেবে প্রথম রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত জনতা বিমুক্ত পেরামুনা (জেভিপি) মার্কসবাদী রাজনৈতিক দলটি শ্রীলঙ্কা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। এই দলের সঙ্গে পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে দিশানায়েকের। গ্রামীণ নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ থেকে এই বিদ্রোহের প্রচারণা শুরু হয়। এর ফলে রাজনৈতিক বিরোধী এবং নাগরিক উভয়ের বিরুদ্ধে তল্লাশি, হত্যা ও হামলা শুরু হয়। এতে হাজারো মানুষ প্রাণ হারান। ১৯৯৭ সালে জেভিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন দিশানায়েকে। ২০০৮ সালে এ দলের নেতা নির্বাচিত হন তিনি। তখন থেকেই তিনি তার দলের কথিত ‘সন্ত্রাসের সময়ের’ বিষয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। ২০১৪ সালে বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওই সশস্ত্র লড়াইয়ে ব্যাপক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটা উচিত ছিল না। আমাদের হাতে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার জন্য এখনো আমরা হতাশ। হতাশা প্রকাশ করি। এর জন্য আমরা সবসময় গভীর বেদনা ও শোক প্রকাশ করি। উল্লেখ্য, দিশানায়েকে বর্তমানে এনপিপি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এতে তার দল জেভিপি’র আছে মাত্র তিনটি আসন। এবার নির্বাচনী প্রচারণার সময় দিশানায়েকে শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসের আরেকটি সহিংসতাকে সামনে আনেন। তাহলো ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে বোমা হামলা। ওই বছর ২১শে এপ্রিল রাজধানী কলম্বোতে কতোগুলো চার্চে এবং আন্তর্জাতিক হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কমপক্ষে ২৯০ জন নিহত হন। আহত হন কয়েক শত মানুষ। এটা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা ছিল। কীভাবে এই হামলা হয়েছিল এবং নিরাপত্তার ব্যর্থতা নিয়ে তদন্তের জবাব ৫ বছর পরেও মেলেনি। তদন্তে বাধা দেয়ার জন্য অনেকে সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসের সরকারকে দায়ী করেছেন। সম্প্রতি বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দিশানায়েকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, নির্বাচিত হলে এই তদন্ত তিনি করাবেন। কর্তৃপক্ষ এটা করানো এড়িয়ে গেছে। কারণ, এতে তাদের নিজেদের দায় প্রকাশিত হয়ে পড়ার ভীতি ছিল তাদের মধ্যে। তিনি আরও বলেন, শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অভিজাতদের কাছ থেকে এটা ছিল অন্যতম অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিকরা দুর্নীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেরাই দুর্নীতিতে যুক্ত হয়েছেন। শ্রীলঙ্কাকে ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ঋণের বোঝা আরও বেড়ে পরিাস্থিতির অবনতি হয়েছে। যারা আইনকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারাই আইন ভেঙেছেন। এ জন্যই এ দেশের মানুষ ভিন্ন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। আমরাই সেই দল, যারা এসব সেবা দিতে পারবো।
শনিবার শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এর আগেই শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে উঠে আসেন দিশানায়েকে। দেশ জুড়ে তীব্র অসন্তোষ থাকার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেকে পরিবর্তনের জন্য একজন প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়ার কারণে ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসে সহ তার সরকারের কর্মকর্তারা। এর আগে বছরের পর বছর ট্যাক্সনীতি, দুর্বল রপ্তানি, পলিসিগত বড় ভুলের সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি মিলিত হয়ে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শুকিয়ে ফেলে। সরকারি ঋণের পরিমাণ কমপক্ষে ৮৩০০ কোটি ডলারের বেশি হয়। মুদ্রাস্ফীতি শতকরা ৭০ ভাগের উপরে উঠে যায়। এর জন্য রাজাপাকসে ও তার সরকারকে দায়ী করা হয়। যদিও তার উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করেন, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনেন। শক্তিশালী করেন শ্রীলঙ্কান রুপি। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট ও তার প্রেক্ষিতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাতে দেশে ভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবি উঠতে থাকে। সেই দাবি পূরণে এগিয়ে আসেন দিশানায়েকে। তিনি বার বার বলেন, ক্ষমতায় এসে পার্লামেন্ট ভেঙে দেবেন। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, নির্বাচিত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে তিনি এটা করতে চান। দিশানায়েকে যেসব নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বৃহত্তর কল্যাণমূলক স্কিম এবং ট্যাক্স কমানো।

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে যত চ্যালেঞ্জ
ঋণে জর্জরিত দ্বীপরাষ্ট্রটির নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য কাজটি সহজ হবে না। সরকার পরিচালনায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে তাঁকে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে টেনে তুলতে হলে অনূঢ়া যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের চরম সংকট দেখা দেয়। এতে কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ে দেশটির অর্থনীতি। এর পর থেকে কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সেই সংকট কিছুটা কাটলেও সংকট থেকে উত্তরণে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে নতুন প্রেসিডেন্টকে।
রিজার্ভ–সংকটে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। অবশ্য চলতি বছর তা কমে দশমিক ৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। কিন্তু ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতির আকার কমেছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। গত বছর সেই হার অবশ্য কমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোই হবে অনূঢ়া কুমারার প্রধান চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ফেরাতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে দেশটির দুই কোটির বেশি দরিদ্র্য মানুষের জীবনমানের উন্নতি হবে আরেকটি চ্যালেঞ্জ।
বৈদেশিক ঋণের বোঝা
গত বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ২৯০ কোটি ডলারের ঋণ পায় শ্রীলঙ্কা। এই ঋণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেমন বেড়েছে, তেমনি মুদ্রার মান কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা গেছে। এদিকে ঋণ পুনর্গঠন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত জুনে চীনসহ অন্য ঋণদাতা দেশগুলোর সঙ্গে এক হাজার কোটি ডলারের ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে চুক্তি করেছে কলম্বো। এ ছাড়া গত সপ্তাহে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক বন্ড পুনর্গঠন নিয়েও একটি খসড়া চুক্তি হয়েছে। আইএমএফের দেওয়া শর্ত পূরণ করতে হলে ঋণ পুনর্গঠন করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক ঋণের যে বিশাল বোঝা, তা কমানোর দায়িত্ব থাকবে নতুন প্রেসিডেন্টের।
জনগণের ওপর করের বোঝা
আইএমএফের ঋণের কারণে কর বাড়ানোসহ নানা পদক্ষেপের কারণে দেশটির অনেক মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। এই করের বোঝা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনূঢ়া। কিন্তু তাঁর জন্য কাজটা হবে খুব কঠিন। কেননা, শ্রীলঙ্কার ২২৫ সদস্যের পার্লামেন্টে মাত্র তিনটি আসন আছে অনূঢ়ার দলের। এই পার্লামেন্টের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে হবে তাঁকে।
অনূঢ়া কুমারা অবশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শপথ নেওয়ার দেড় মাসের মধ্যে পার্লামেন্টে বিলুপ্ত করে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেবেন। নতুন পার্লামেন্টের ওপর নির্ভর করবে তাঁর সরকার নীতি প্রণয়নে কতটা সফল হবে।
অনূঢ়া কুমারা জানিয়েছেন, ঋণ ও এর শর্ত পুনরায় বিবেচনার জন্য আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। পাশাপাশি কর কমানোর বিষয়টি নিয়েও কথা বলবেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খাদ্যসামগ্রীর মতো কিছু বিষয়ে মূল্য সংযোজন কর কমাবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
চাকরি ও জনকল্যাণ
ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোকে আরও লাভজনক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনূঢ়া কুমারা। জানিয়েছেন, শিক্ষা খাতে নতুন করে ২০ হাজার চাকরির ব্যবস্থা করবেন। পাশাপাশি পর্যটনের মতো দেশটির অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোতে আরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। একই সঙ্গে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন সরকারি সেবার আওতা ও পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
অর্থায়নে ভুল পদক্ষেপ, লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের সংকটের কারণে অনূঢ়া কুমারা শিগগিরই এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না বলে মত অর্থনীতিবিদদের।
ভূরাজনীতি
শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভূরাজনীতি। বিশেষ করে ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপে থাকতে হবে তাঁকে। কারণ, শ্রীলঙ্কাকে সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া দেশ দুটি হলো ভারত ও চীন। এ ছাড়া ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির ওপর দুই দেশই প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তাই প্রতিবেশী এই দুই দেশের সঙ্গেই ভারসাম্যের নীতিতে চলতে হবে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টকে।
শ্রীলঙ্কার যে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে, তার বেশির ভাগই জাপান, ভারত ও চীনের দেওয়া। অনূঢ়া কুমারা অবশ্য জানিয়েছেন, এসব দেশের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক অব্যাহত রেখে প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক মিত্রতার সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চান তিনি।
![]() |
| শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজ সোমবার শপথ নিয়েছেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকেছবি: এপি |
Monday, September 23, 2024
শ্রীলঙ্কায় বাজিমাত চীনপন্থি দিশানায়েকের
নির্বাচনে অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে পেয়েছেন মোট ৫৬ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৫ ভোট (শতকরা ৪২.৩১ ভাগ)। সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছেন ৪৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩৫ ভোট (শতকরা ৩২.৭৬ ভাগ)। অন্যদিকে রনিল বিক্রমাসিংহে পেয়েছেন ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬৭ ভোট (শতকরা ১৭.২৭ ভাগ)। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু ও শ্রীলঙ্কার ডেইলি মিরর। অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে মার্কসবাদী ও চীনপন্থি। অন্যদিকে সাজিথ প্রেমাদাসা ভারতপন্থি। তার প্রতি ভারতের সমর্থন আছে বলে গত সপ্তাহে দ্য ডিপ্লোম্যাটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শ্রীলঙ্কায় দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ভারত এ অঞ্চলে আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক চিরবৈরী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মসৃণ নয়। মালদ্বীপে চীনপন্থি মোহাম্মদ মুইজু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এখন শ্রীলঙ্কায়ও চীনপন্থি দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। ফলে এতে ভারতের কপালে আরও একটি চিন্তার রেখা যোগ হবে। শ্রীলঙ্কার নির্বাচনে একটি চমৎকার ব্যবস্থা চালু আছে। তাহলো প্রথম রাউন্ডের ভোটে যদি কোনো প্রার্থী শতকরা ৫০ ভাগ ভোট পেতে ব্যর্থ হন তাহলে দ্বিতীয় দফায় ভোট গণনা করা হয়। ২১শে সেপ্টেম্বর ভোটাররা সরাসরি ভোট দিয়েছেন। সেই ভোটের হিসাবে কোনো প্রার্থীই বিজয় নিশ্চিত করতে পারেননি। ওই ভোটের সময়ই ভোটারদেরকে একটি বিকল্প দেয়া হয়। তাতে তিনজন প্রার্থীকে ভোট দিতে বলা হয়। যদি প্রথম রাউন্ড ব্যর্থ হয়, তাহলে এই তিনজন প্রার্থীর মধ্য থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দু’জনের মধ্যে ভোট নতুন করে গণনা করা হয়। এটাই দ্বিতীয় দফার ভোট গণনা। এই গণনায় যিনি বেশি ভোট পান, তিনিই হন প্রেসিডেন্ট। এই হিসাবে অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। এরই মধ্যে দিশানায়েকের দলের পলিটব্যুরো সদস্য বিমল রত্নানায়েকে বলেছেন, শ্রীলঙ্কা আইএমএফের সঙ্গে যে ২৯০ কোটি ডলার বেইলআউট চুক্তি করেছে তা অজনপ্রিয়। তবু অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে এবং তার দল পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট সেই চুক্তি বাতিল করবে না। পক্ষান্তরে তারা এটা নিয়ে সমঝোতা করবে। তিনি বলেন, আমাদের পরিকল্পনা হলো আইএমএফের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং কিছু শর্তের সংশোধন সামনে আনা।

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট বামপন্থী অনূঢ়া
অনূঢ়া কুমারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষে পরিবারের টানা দেড় দশকের বেশি সময়ের একক আধিপত্যের অবসান ঘটল। ১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতার পর থেকে শ্রীলঙ্কা শাসন করেছে দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বা তাদের জোট বা তাদেরই কোনো অংশ। এর মধ্যে একটি রাজাপক্ষে পরিবারের নেতৃত্বাধীন দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি)। দলটি থেকে একাধিকবার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগের আগে সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট ছিলেন তাঁর ছোট ভাই গোতাবায়া রাজাপক্ষে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে ৪২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দল সঙ্গী জন বালাওয়াগার (এসজেবি) নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছেন ৩২ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। মাত্র ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট রণিল বিক্রমাসিংহে।
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয় গতকাল। আজ প্রথম দফা ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, একজন প্রার্থীও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। এরপর দ্বিতীয় দফায় ভোট গণনা করে রাতে নির্বাচন কমিশন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোটের নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকেকে বিজয়ী ঘোষণা করে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা আসার পর এনপিপি জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামীকাল সোমবার সকালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ে তাঁর শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানটি হবে অনাড়ম্বর।
খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধসহ নিত্যপণ্যের তীব্র সংকটের প্রতিবাদে ২০২২ সালে সড়কে নামেন শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ। প্রবল জন–অসন্তোষের মুখে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ গণ–আন্দোলনে রূপ নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ হাজারো মানুষ ঢুকে পড়েন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের বাসভবনে। গোতাবায়া দেশ ছেড়ে পালান। এরপর রণিল বিক্রমাসিংহকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে দেশটির সংসদ।
কে এই দিশানায়েকে
জনতা বিমুক্তি পেরামুনার (জেভিপি) প্রধান অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে এবারের নির্বাচনে এনপিপি জোটের প্রার্থী ছিলেন। এই জোট এর আগে কখনো শ্রীলঙ্কার বিরোধী দলও ছিল না। দেশটির ২২৫ সদস্যের পার্লামেন্টে এই জোটের আসন ছিল মাত্র তিনটি।
গণবিক্ষোভের মুখে গোতাবায়া রাজাপক্ষে দেশ ছেড়ে পালানোর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জেভিপির জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। সেই গণবিক্ষোভে সক্রিয়া ভূমিকা ছিল দলটির। আন্দোলনের পর জেভিপি বৃহত্তর পরিবর্তনের ডাক দেয়। সামাজিক ন্যায়বিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলটির অনড় অবস্থান নাগরিকদের আকৃষ্ট করেছে। দলের সঙ্গে বেড়েছে অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের ব্যক্তিগত আবেদন।
গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে মার্ক্সবাদে অনুপ্রাণিত দুটি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল জেভিপি। রাষ্ট্র এর প্রতিশোধ-পাল্টা প্রতিশোধ নিতে দেরি করেনি। গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, অপহরণ ও গণহত্যায় দলসংশ্লিষ্ট কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ নিহত হর। এর মধ্যে দলের প্রতিষ্ঠাতা রোহানা উইজেবিরাসহ বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ নেতাও ছিলেন।
অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর দিশানায়েকে দলের পলিটব্যুরো সদস্য হন। দল সহিংসতার পথ ত্যাগ করে। বিশ্লেষকদের মতে, দিশানায়েকে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে এক বৃহত্তর জোট গড়ে তুলতে পেরেছেন। এটাই তাঁকে জয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
অর্থনীতি সামলানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বিক্ষোভের মুখে গোতাবায়া রাজাপক্ষে পালানোর পর রণিল বিক্রমাসিংহেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে দেশটির পার্লামেন্ট। এরপর দুই বছরের বেশি সময়ে তাঁর নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সংকট থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় দেউলিয়া হওয়া শ্রীলঙ্কা। কিন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণের শর্ত অনুযায়ী কর বাড়ানোসহ নানা পদক্ষেপ নেয় সরকার। এর চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে উত্তরণের আশায় অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকেকে ভোট দিয়েছেন মানুষ। এখন তাঁর বড় কাজ হবে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে টেনে তোলা। ফলে নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো। এখন দিশানায়েকে দেশটির মানুষকে কতটা দিশা দেখাতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।
| প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার খবরে হাত নেড়ে কর্মী–সমর্থকদের অভিবাদনের জবাব দিচ্ছেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। আজ রোববার রাতে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয়। ছবি: এএফপি |
Sunday, September 22, 2024
গণঅভ্যুত্থানের পর শ্রীলঙ্কায় প্রথম নির্বাচন: কে হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট
এই নির্বাচনে মোট ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত চারজন। তারা হলেন- রনিল বিক্রমাসিংহে, অনুরা কুমারা দিশানায়েকে, সাজিথ প্রেমাদাসা এবং নামাল রাজাপাকসে। এর মধ্যে রনিল বিক্রমাসিংহে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এর আগে দু’বার পরাজিত হয়েছেন। অনুরা দিশানায়েকে বামপন্থি ন্যাশনাল পিপলস পার্টি জোটের প্রার্থী। তিনি দুর্নীতি বিরোধী কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সুশাসনের। তাকে খুব বেশি চীনপন্থি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে সাজিথ প্রেমাদাসা বিরোধী দল সামাগি জানা বালাওয়েগ্যা পার্টির নেতা। তার পিতা শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তাকে ১৯৯৩ সালে হত্যা করা হয়। অন্য প্রার্থী নামাল রাজাপাকসে হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসের ছেলে। মাহিন্দ রাজাপাকসের ক্ষমতার সময়ে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে সরকার নিজেদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এর পুরো দায় দিয়ে মাহিন্দা রাজাপাকসের বিরুদ্ধে ভয়াবহ আন্দোলন শুরু হয়। তাতে গণঅভ্যুত্থানের ফলে তিনি প্রেসিডেন্ট ও তার ভাই গোটাবাইয়া রাজাপাকসে পালিয়ে যান। শুরু হয় শ্রীলঙ্কায় সংস্কার কার্যক্রম।
শ্রীলঙ্কার ভোটাররা তিন প্রার্থীকে র্যাংকিং করে একজন প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন। যদি একজন প্রার্থী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যান, তাহলে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। যদি কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান তাহলে দ্বিতীয় দফায় ভোট গণনা শুরু হবে। এ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় কোনো নির্বাচনের ফলই দ্বিতীয় দফা গণনায় যায়নি। কারণ, প্রথম দফায়ই একজন প্রার্থী পরিষ্কারভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তবে এ বছর ব্যতিক্রম হতে পারে বলে মনে করেন আইসিজি’র কিনান। তিনি বলেন, জনমত জরিপ এবং প্রাথমিক প্রচারণা এটাই বলে যে, প্রথমবারের মতো এবারই কোনো প্রার্থী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হতে ব্যর্থ হবেন বলে মনে হচ্ছে। তাই যেকোনো আপত্তি, বিরোধ সামনে এলে সে বিষয়টি মোকাবিলা করার জন্য প্রার্থী, দলীয় নেতাকর্মী ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

Thursday, September 19, 2024
শ্রীলংকার নির্বাচনে যে কারণে ভারত জড়িত হয়েছে -ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন
তিনি আরো লিখেছেন, গত দেড় দশক ধরে চীনকে বহিঃশক্তি হিসেবে দেখে আসছে ভারত। তাদেরকে নিয়ে ভারতের উদ্বেগ সবচেয়ে। এ কারণে শ্রীলংকার রাজনীতিবিদদের সমর্থনে উদ্বুদ্ধ হয়েছে ভারত। যে বা যারা চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের সমালোচনা করছেন বা বিরোধিতা করছেন, তাদেরকেই সমর্থন দিচ্ছে ভারত। কলম্বোর রাজনৈতিক বলয়ে এটা সর্বজনবিদিত যে, ২০১০ এবং ২০১৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শ্রীলংকার সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) শরত ফনসেকা এবং শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে সমর্থন দিয়েছিল ভারত। ওই সময় ভারত এই দু’জনকে সমর্থন দেয়ার জন্য বেছে নেয়। কারণ, তারা এক দশক ধরে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা মাহিন্দ রাজাপাকসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাই এবারের নির্বাচনে ফ্রন্টরানারদের মধ্যে যেসব প্রার্থী বেশি মাত্রায় চীনবিরোধী দাদেরকে ভারত সমর্থন দেবে- এটা নিরাপদভাবেই বলা যায়। ২১শে সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের (এনপিপি) অনুরা কুমারা দিশানায়েকে, স্বতন্ত্রপ্রার্থী প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে, সামাগি জন বালেওয়েগ্যা (এসজেবি) পার্টির বিরোধী দলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা এবং শ্রীলংকা পোদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি) দলের নামাল রাজাপাকসে। তাদের মধ্যে দিশানায়েকে এবং প্রেমাদাসা হলেন ফ্রন্টরানার। ২২শে সেপ্টেম্বর যখন নির্বাচনের ফল ঘোষণা হতে পারে, তখন শ্রীলংকার নবম প্রেসিডেন্ট হতে পারেন তাদের একজন। এর মধ্যে দিশানায়েকে’কে পছন্দ করে চীন। তার এনপিপি দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধ্য-বাম রাজনৈতিক ধারায়। তাদের সঙ্গে আছে জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি)। তারাই মূলত এনপিপির মূল চালিকাশক্তি। ১৯৬০-এর দশকের শ্রীলঙ্কা কমিউনিস্ট পার্টির চীনপন্থি একটি অংশ হলো এর ভিত্তি। এ বছর শুরুর দিকে দিশানায়েকে ভারত সফর করেন। তা নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার পান তনি। তবে ভারত বিরোধী অবস্থান তিনি বা তার দল পরিবর্তন করেনি। যদিও এনপিপি ভারতবিরোধী কোনো দল নয়, তবে জাতীয় সম্পদ বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে দেয়ার কঠোর বিরোধিতা করে তারা। এ জন্য তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছেই। শ্রীলংকার বন্দর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিমানবন্দরগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোতে ভারতের আদানি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ায় তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এনপিপি। ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এই আদানির নিবিড় সম্পর্ক।
আদানি গ্রুপের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে সরকার চুক্তি করেছে। এমন অভিযোগ তুলে কয়েকদিন আগে আদানির সঙ্গে বিতর্কিত বিদ্যুৎ বা জ্বালানি চুক্তি বাতিল করে দেয়ার হুমকি দেন দিশানায়েকে। টিভির এক টকশোতে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেন, মান্নারে অবস্থিত উইন্ডফার্ম থেকে আদানিরা যেটুকু নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন করবে তার প্রতিটি ইউনিট কিনতে রাজি হয়েছে শ্রীলঙ্কা। তবে বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে তা কেনার চুক্তি হয়েছে। অনুরা দিশানায়েকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সংযুক্তিকে তিনি সমর্থন করেন। কিন্তু তিনি ওইসব চুক্তির বিরোধিতা করেন- যা শ্রীলংকার অর্থনীতি এবং ব্যবসার প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে দেবে। তিনি একই সঙ্গে শ্রীলংকার জলসীমা থেকে ভারতীয় জেলেদের সরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রেমাদাসা ও তার সহযোগীরা ভারতের প্রতি খুব বেশি অনুগত। তার এসজেবি হলো ডানপন্থি ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি)-এর একটি অংশ। তারা চীনের ব্যাপারে অধিকমাত্রায় সন্দিহান। ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল ইউএনপির। ১৯৬০-এর দশকে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের সময়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনকে আগ্রাসী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার জন্য শ্রীলংকার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল তারা। চীনের প্রতি এখনও সন্দিহান এসজেপির বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্ব। চীন যে ঋণফাঁদ কূটনীতি অবলম্বন করছে তার সমালোচনাও করেছে এসজেপি। সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে রাজি হয়েছেন প্রেমাদাসা। এই সংশোধনী বাস্তবায়নের জন্য শ্রীলংকার প্রতি অব্যাহতভাবে দাবি জানিয়ে আসছে ভারত। ইলানকাই তামিল আরাসু কাদচি (আইটিএকে) দলেরও সমর্থন আছে প্রেমাদাসার ওপর। আইটিএকে হলো এমন একটি রাজনৈতিক দল, যাদের ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। জল্পনা আছে যে, প্রেমাদাসাকে সমর্থন দিতে তামিল দলগুলোর ওপর প্রভাব আছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের। তিনি কয়েক সপ্তাহ আগে শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। এ সময় কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের (সিএসসি) এবং সিএসসি সচিবালয়েল প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগের জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে।
বাংলাদেশে মিত্র হারানোর পর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বন্ধুর সংখ্যা একেবারে কমে গেছে। এর জবাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালদ্বীপ এবং শ্রীলংকার সঙ্গে সম্পর্ককে মেরামত এবং শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে ভারত। শ্রীলংকায় একটি বন্ধুপ্রতীম প্রশাসন ভারতের জন্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলংকায় চীনের প্রভাবকে মোকাবিলার মানসিকতা চালিত হয়েছে সেখানে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভারতের জড়িত হওয়ার বিষয়। একদিকে প্রেমাদাসা ভারতপন্থি অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে অধিক পরিমাণ চীনপন্থি অবস্থান নিয়েছেন দিশানায়েকে। এই নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে শ্রীলংকার পররাষ্ট্রনীতির গতিবিধি। তাই ভূরাজনৈতিক কারণে প্রেমাদাসাকে সমর্থন করছে ভারত।

Sunday, September 15, 2024
৩৮ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী শ্রীলঙ্কায়, চমক দেখাবেন অনুরা দিশানায়েকে!
অনুরা দিশানায়েকের বয়স ৫৫ বছর। তিনি দেশটির সরকারে নেই। তিনি যে রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দেন তার নাম ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি)। এমনকি তারা মৌলিক অর্থে বিরোধী দলও নয়। শ্রীলঙ্কার ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে তাদের আছে মাত্র তিনটি আসন। তারপরও তারা সেখানে চতুর্থ বৃহৎ শক্তি। তার দলকে মাঝে মধ্যেই দেখা গেছে ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ চীনের খুব ঘনিষ্ঠ। কিন্তু কয়েক মাস ধরে অনুরা দিশানায়েকে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে ভিন্ন এক রকম কর্তৃত্ব উপভোগ করছেন। এর ফলে তিনি উদীয়মান একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। এমনকি আঞ্চলিক সুপারপাওয়ার ভারতও তাকে এমন স্বীকৃতি দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এসব কারণে শ্রীলঙ্কায় আগামী ২১শে সেপ্টেম্বর শনিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শীর্ষ প্রার্থীদের মধ্যে বিস্ময়করভাবে উঠে এসেছেন দিশানায়েকে। কোনো কোনো জনমত জরিপে বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট পদে ৩৮ জন প্রার্থীর ভিড়ের মধ্যেও তিনি ফ্রন্টরানার হয়ে উঠতে পারেন।
উল্লিখিত হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভিড়ে তিনি নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তার নিজের দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি)। এই দলটিকে কখনোই জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কাছাকাছি দেখা যায়নি এর আগে। তার নেতৃত্বাধীন মার্কসিস্টদের দু’বারের বিদ্রোহে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করলেও এখন সেই রাষ্ট্রকে শাসন করতে চাইছেন দিশানায়েকে। এই দলটি এবং তাদের নেতৃত্বে এনপিপি জোটের জন্য সুযোগ উন্মুক্ত হয়ে যায় ২০২২ সালে। ওই সময় দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়েছিল। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। তখনকার প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসের পদত্যাগ দাবিতে দেখা দেয় ভয়াবহ এক গণঅভ্যুত্থান। সিংহলি ভাষায় এর নাম ‘আরগ্যালয়’ বা সংগ্রাম। ওই আন্দোলনে প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেন। তার ভাই ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসেও পদত্যাগে বাধ্য হন। এক পর্যায়ে তারা জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
এই আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দল নেতৃত্ব দেয়ার আনুষ্ঠানিক দাবি করেনি। কিন্তু জেভিপি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারা প্রতিদিন প্রতিবাদ বিক্ষোভ আয়োজন করে। কলম্বোর গ্যালে ফেসে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান নেয়। আয়োজন করে সাধারণ ধর্মঘটের। রাজাপাকসে ভাইদের পদত্যাগ ও পালিয়ে যাওয়ায় দেশে ক্ষমতায় শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এটাই দেশে ব্যাপক পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভয়াবহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিবর্তনের দাবি জোরালো করার পথ তৈরি হয়ে যায় দিশানায়েকে ও জেভিপি’র জন্য। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে থাকা এই দলটি বিশ্বাসযোগ্য ও বড় একটি রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে। দিশানায়েকের ব্যক্তিগত আপিল তার দলের মধ্যেও প্রতিধ্বনি তোলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক গামিনি ভিয়ান্যগোদা তার সম্পর্কে বলেছেন, সার্বিক ব্যবস্থা পরিবর্তনে তার উদ্যোগকে সততা হিসেবে দেখেছি। যখন তিনি বলেন- দুর্নীতির দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন, তখন আমি তার এই কথাকে বিশ্বাস করি। তিনি সেটা করতে পারুন বা না পারুন সেটা অন্য বিষয়। কিন্তু এই নিখুঁত মানসিকতা আমি অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার মধ্যে দেখিনি।
অনুরা দিশানায়েকের জন্ম শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ১৭৭ কিলোমিটার দূরের অনুরাধাপুরা জেলার থাম্বতেগামা গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। ইউনিভার্সিটি অব কেলানিয়্যা থেকে তিনি বিজ্ঞানে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি জেভিপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। ২০০০ সালে প্রথমবার তিনি পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে জেভিপি দলের নেতা হিসেবে নিয়োগ করা হয় দিশানায়েক’কে। তখন থেকে তিনি দলকে তার সহিংস অতীত থেকে ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ১৯৭১ সালে এবং ১৯৮০’র দশকে এই দলটি মার্কসবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদ্রোহে ব্যর্থ হয়। ১৯৮৮-১৯৮৯ সালে জেভিপি সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। তারা তখনকার দুই প্রেসিডেন্ট জেআর জয়াবর্ধনে এবং আর প্রেমাদাসার শাসনকে সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে উৎখাতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এটাকে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত সময়ের অন্যতম একটি অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। ওই সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড হয়। রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয় মানুষ। অনানুষ্ঠানিক কারফিউ দেয়া হয়। স্যাবোটাজ করা হয়। জেভিপি ধর্মঘট আহ্বান করে। জেভিপি যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে তার মধ্যে ছিলেন বুদ্ধিজীবী, আর্টিস্ট, ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তা এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। এর জবাবে রাষ্ট্র নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নেয়। তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, অপহরণ এবং গণহত্যা চালিয়ে তাদেরকে দমন করে। সরকারি দমনপীড়নে নিহত হন কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে আছেন জেভিপি’র প্রতিষ্ঠাতা রোহানা বীজেউইরা সহ সিনিয়র কর্মকর্তারা। বিদ্রোহে ব্যর্থ হওয়ার পর জেভিপি’র পলিটব্যুরোতে নিয়োগ করা হয় অনুরা দিশানায়েককে। ওই সময় দলটি সহিংসতা ত্যাগ করে। তারা নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসে। ২০১৪ সালের মে মাসে বিবিসিতে একটি সাক্ষাৎকারে দিশানায়েক দলের অতীত অপরাধের জন্য ক্ষমা চান। শ্রীলঙ্কার প্রথমদিকে ব্যাপকভাবে সহিংসতার জন্য এটাই প্রথম এবং এটাই জেভিপি’র সর্বশেষ ক্ষমা প্রার্থনা।
তিনি ক্ষমা চাওয়ার কারণে শ্রীলঙ্কার বাম ঘরানার কিছু নেতা এবং নিজ দলের কিছু নেতা সমালোচনা করেন দিশানায়েকের। তারপর থেকে তিনি অতীত নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে সতর্ক হয়েছেন। অনেকবার তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। তবে আর কখনোই তিনি ক্ষমা চাননি।
এখনো অতীত জেভিপি এবং দেশকে তাড়া করে ফেরে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে ১৯৮০’র দশকে জেভিপি’র বিদ্রোহের সময় প্রেমাদাসা সরকারের একজন সিনিয়র মন্ত্রী ছিলেন। সেই সরকারের দমনপীড়নে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে এখনো তাকে অভিযোগ শুনতে হয়। অন্যদিকে শ্রীলঙ্গার প্রবীণদের অনেকেই জেভিপি’র সন্ত্রাসী অতীত ভুলে যাননি।

Saturday, July 24, 2021
শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম্: দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জাতি-রাষ্ট্র’-এর সংকট

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই আসন্ন উত্থান-পতনের অনিবার্যতায় কাজ করছে তার বিবিধ জাতীয়তাবাদের বৈরিতা। আলতাফ পারভেজের ‘শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম্ : দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিরাষ্ট্রের সংকট’ সেই জাতীয়তাবাদী টানাপোড়েনের একটি বড় কেস স্টাডি। এখানে মূলত শ্রীলঙ্কার তামিল জাতীয়তাবাদের পূর্বাপর আলোচিত হলেও তা ঘটেছে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে জাতীয়তাবাদী দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক পটভূমিতে। লেখক ‘এথনো-পলিটিক্স’ বলে একটি নতুন ধারণা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মূল সংকটটি বুঝবার ওপর জোর দিচ্ছেন। ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী’ শীর্ষক সাড়া জাগানো গ্রন্থের পর এবার এই লেখক অনুসন্ধানী আলো ফেলেছেন নৃতাত্ত্বিক রাজনীতির উপর।
আমরা জানি, উপনিবেশিক শক্তি প্রায় ৭০ বছর আগে ভারত, পাকিস্তান, বর্মা, শ্রীলঙ্কাকে একই সময় ‘স্বাধীনতা’ দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেক্যুলার ‘জাতি-রাষ্ট্র’ গঠনের সুপারিশ ও চ্যালেঞ্জও দিয়ে গিয়েছিল। সেই চ্যালেঞ্জের পরিণতি এই হয়েছে যে, আরকান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব, আসাম, কাশ্মীর, বালুচিস্থান, মধেস, জাফনাসহ অনেক জনপদ আজও জ্বলছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জাতি-রাষ্ট্র’ – এর মডেল কিভাবে এবং কেন ব্যর্থ হলো এবং তার সম্ভাব্য পরিণতি কি তারই গভীর অনুসন্ধান এই গ্রন্থ। লেখক কেবল যে, সিংহলি ও তামিলদের সংঘাতের ঐতিহাসিক পূর্বাপর নিয়ে তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছেন তাই নয়, একই সঙ্গে ২৬ বছর স্থায়ী ঐ সংঘাতে ভারতের প্রায় তিন দশক পুরানো সর্বগ্রাসী হস্তক্ষেপেরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে অনুসন্ধানের উপসংহার হলো, এথনো পলিটিক্সে বহির্দেশীয় হস্তক্ষেপ সেই সংকটকে আরও জটিল ও বিপথগামী করে। লেখক এই বার্তা হাজির করেছেন পাকিস্তান, বর্মা, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ সকলের জন্য।
জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগকে ব্যবহার করে শুরু হলেও এথনো-পলিটিক্স কীভাবে অস্ত্র ব্যবসা, সামরিক আমলাতন্ত্র, ন্যায়বিচারহীন মানবিক বিপর্যয় এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পুষ্টি সাধন করে চলে তারও বিস্তর তথ্য দিচ্ছে এই গ্রন্থ। তামিল ইলম্- এর সংগ্রামে ভারতের ভূমিকা ছাড়াও শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উদীয়মান বিবাদের পর্যালোচনাও রয়েছে অনুসন্ধানে। আগামীতে দক্ষিণ এশিয়া নৃতাত্ত্বিক ঘৃণাকে উপজীব্য করে কীভাবে ভূ-রাজনীতির উত্তপ্ত কড়াই হতে চলেছে তার ইশারা-ইঙ্গিত গ্রন্থটির বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে। রয়েছে জাতীয়তাবাদী ঘৃণা-বিদ্বেষ থেকে নিষ্কৃতির মৃদু পথনির্দেশও। তবে লেখক বলেছেন, জাতি-রাষ্ট্র’র টানাপোড়েন থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আপাত মুক্তি নেই এবং ঐরূপ রাষ্ট্র কায়েম সম্ভবও নয়। অর্থাৎ পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র ধারণার মৃত্যু ঘটেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ থেকে বের হয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে একক পলিটিক্যাল কমিউনিটি হওয়ার তাগিদ রয়েছে লেখকের ভাবনায়। তবে মূল আলোচনায় লেখক নৈর্ব্যক্তিক।
৩৩৫ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে সাতটি অধ্যায়জুড়ে মূলত ৪-৫টি বিষয় আলোচিত হয়েছে। এগুলো হলো শ্রীলঙ্কায় সিংহলি বনাম তামিল বিবাদের ঐতিহাসিক আর্থ-সামাজিক বিবরণ, তামিল জাতীয়তাবাদের উত্থানের ভূ-রাজনৈতিক পটভূমি হিসেবে বিশেষভাবে তামিল নাড়ু, দিল্লি ও অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা এবং সিংহলি শাসক এলিটদের কাছ থেকে ‘হোমল্যান্ড’ আদায়ে এলটিটিই ও প্রভাকরণের ভূমিকা। যদিও এলটিটিই’র সঙ্গে শ্রীলঙ্কার শাসকদের যুদ্ধ চলেছে ২৬ বছর, তবে এই গ্রন্থের শুরু আরও পূর্বে এবং শেষও হয়েছে অতিসাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় শ্রীলঙ্কাচর্চা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই এ গ্রন্থকে বলা যায় বাংলা ভাষায় শ্রীলঙ্কা বিষয়ক প্রথম গবেষণা গ্রন্থ। কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো লেখক শুরুতে দেখিয়েছেন, কীভাবে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে বাংলাদেশ বার বার আলোচিত এবং দেশটির ইতিহাসে বাংলাদেশ কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই গ্রন্থ বাংলা ভাষায় দক্ষিণ এশিয়ায় এথনো-পলিটিক্স-এর আলোচনার পরিসর বাড়াবে। বাংলাদেশেও যে আলোচনা জরুরি।
এটা এইরূপ সিরিজের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে দাবি করা হয়েছে প্রকাশকের তরফ থেকে।
শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম্: দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জাতি-রাষ্ট্র’-এর সংকট আলতাফ পারভেজ
ঐতিহ্য, ২০১৭ পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৩৫ মূল্য : ৭২০ টাকা
>>সেলিম সারোয়ার
Sunday, May 9, 2021
প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স অ্যাট এমজিকে: শ্রীলঙ্কার ছু-মন্তরের চমক

শ্রীলঙ্কায় ইংরেজি চর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ট্রাস্ট তহবিলের আওতায় এই পুরস্কার দেয়া হয়। তবে অন্য কেউ নয়, পুরস্কার কেবল শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের জন্যই নির্ধারিত। আর এটি প্রবর্তন করেছিলেন শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণকারী কানাডিয়ান উপন্যাসিক মাইকেল অনদাতজি। দি ইংলিশ পেশেন্ট লেখার জন্য যৌথভাবে বুকার প্রাইজ জয়ের টাকা দিয়ে তিনি এই পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রতিবছরই বেশ কিছু উপন্যাস, ছোট গল্প ও কবিতা জমা হয় এই পুরস্কারের জন্য। শ্রীলঙ্কায় প্রতি বছরই অনেক অনেক দারুণ সৃষ্টিশীল লেখালেখি হয়। তবে প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স বিরল ধরনের সৃষ্টি। স্থানীয় পরিভাষাই লেখক ইংরেজিতে ব্যবহার করে নতুনত্ব এনেছেন।
শ্রীলঙ্কা নামে বর্তমানে পরিচিত দেশটি ১৫০৫ সালে পর্তুগিজদের উপনিবেশে পরিণত হয়। তারপর একসময় তা হয়ে যায় ডাচদের উপনিবেশে। এরপর তা হাত ঘুরে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখনই ইংরেজি দেশটিতে শেকড় গাড়তে থাকে। ইংরেজিই হয়ে পড়ে দেশটির প্রধান ভাষা। তবে ইংরেজি শিক্ষিতরাই শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বিদেশী শিক্ষিতদের হাতেই থাকে দেশের নিয়ন্ত্রণ। তবে বিতর্কিত সিংহলি অনলি অ্যাক্ট পাস হওয়ার পর ইংরেজি শিক্ষা কেবল উচ্চশ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
ফলে যারা ইংরেজিতে লেখালেখি করেন, তাদের ইংরেজিতে উচ্চ শ্রেণির বিষয়গুলোই সামনে আসে। শ্রীলঙ্কার আসল লোকজন বাইরেই থেকে যান। একেবারে অল্প কিছু লোকের মধ্যেই থাকে তাদের বিচরণ। দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগও থাকে খুবই ক্ষীণ।
মেদাওয়াত্তাগেদেরা পেশায় শিক্ষাবিদ। তিনি একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা শেখানোর কাজ করেন। প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স তার প্রথম উপনাস। এছাড়া দুটি ছোট গল্প সঙ্কলনও আছে তার। এ দুটির নাম হলো ক্যান ইউ হেয়ার মে রানি এবং উইন্ডো ক্লিনার্স সোল। শ্রীলঙ্কার ইংরেজি ভাষাভাষিদের ছোট্ট দুনিয়ায় তিনি তা দিয়েই পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।
তবে তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানে কিন্তু ইংরেজিই প্রধান ভাষা ছিল না। তবে সাবলীলভাবেই সেটি করায়ত্ত করে নিয়েছেন।
শ্রীলঙ্কায় দ্বিতীয় মার্কস আন্দোলন ঘটেছিল ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে। তখন তিনি কিশোর। আর ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনা নিয়ই তার প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী দৃশ্যপটকে নিয়ে লিখলেও তিনি পর্যটন, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, জেভিপি আন্দোলনসহ অন্যান্য বিষয়ও সামনে নিয়ে এসেছেন।
শ্রীলঙ্কার রূপকথার ওপর এই লেখকের বেশ ভালো জ্ঞান রয়েছে। তিনি তার উপন্যাসে সেটিই বেশ ভালো মতোই ব্যবহার করেছেন। ফলে বাস্তবতা আর মিথ বেশ ভালোভাবেই মিশে গেছে তার লেখায়। পাঠকদের কাছেও তা উপভোগ্য হয়েছে। বিশ্বাস, অবিশ্বাস, অশুভ আত্মা, আস্তিক, নাস্তিক ইত্যাদি নানা দোলাচলে এগিয়েছে কাহিনী। রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামনে চলে এসেছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার কুখ্যাত ভ্যাট অপহরণ, সম্পাদকদের খুনের মতো ঘটনাও এতে ঠাঁই পেয়েছে। অতিপ্রাকৃত ঘটনা যখন নিরেট বাস্তবতার সাথে স্থান পায় এবং এই মেশানোর কাজে যদি দক্ষতার ছোঁয়া থাকে, তবে তা অনন্য হয়ে ওঠতে বাধ্য।
সিংহলি ভাষায় মহাগানিকান্দা দিয়ে কল্পকথার পর্বতকে বোঝানা হয়, যার অর্থ হলো বিপুলাকায় নারী। একেই সংক্ষেপে বলা হয় এমজিকে। তার গল্পে ওই নারীই উচ্ছেদের শিকার হয়ে ক্যাসিয়া প্যালেসে স্থান পান। এই পর্যায়ে অক্ষম বালকের ঈশ্বর হিসেবে উপাসনা, নাস্তিকের আগমন, শববাহক ইত্যাদি অনেক চরিত্র ভিড় করতে থাকে।
গল্পের প্রয়োজনেই তিন চাকার অটো চালক, ব্যবসায়ী ইত্যাদি নানা চরিত্র তাদের হাসি-কান্না নিয়ে সামনে হাজির হয়। তারা সবাই এমজিকের ভূমিতে অবৈধভাবে বাস করতে থাকে। এখানেও নানা চরিত্র নানা আবেদন নিয়ে সামনে আসে। নানা পেশায় থাকলেও তাদের ঠিকানা এই পর্বতকে ঘিরে থাকা এলাকা। ঈশ্বর-বালক বালিশে এমজিকেকে লুকিয়ে রাখে। এটি খুঁজে পেতে চলে নানা চেষ্টা। কত ধরনের চরিত্রই না এর সন্ধানে থাকে। একেক জনের অবস্থানও হয় একেক রকমের। একপর্যায়ে তো এমজিকের নিয়ন্ত্রণও চলে যায় অন্যদের হাতে। এমনকি এক বিদেশীর হাতেও পড়ে যায় সে।
তিনি তার চরিত্রগুলোর নামকরণও করেছেন অদ্ভূত ভাবে। এই যেমন প্লাস্টিক স্মাইল। এই নারীর হৃদপিণ্ডটি সত্যিকারের, কিন্তু তার হাসিটা কৃত্রিম। আবার যে ছেলেটাকে তার প্রতিবেশীরা ঈশ্বর মনে করে তার চাচির নাম তন্দুরি নন্দা। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। আবার নন্দার বৈরী সুজাতা মনিয়ো মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছেন। একটি পশ ক্লাবের স্টুয়ার্ডের নাম ভিক্টোরিয়া মালি। টয়োটা নন্দা হলো পার্কিং অ্যাটেনডেন্ট।
পাঠকদেরকে ক্যাসিয়া প্যালেসে ঈশ্বর বালকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। তার পরিচয় এতই ব্যাপক হয়ে পড়ে যে এমজিকের অধিবাসীরা তাকে পূজাও করতে থাকে।
শ্রীলঙ্কার অধিবাসী নন, এমন লোকদের জন্য এই গল্পে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো বুঝতে একটু কঠিনই হবে। তারপর আবার এগুলোই যখন ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে, তখন পাঠকদের কাছে তা আরো দুর্বোধ্য ঠেকতে পারে। তারপরও মনে রাখতে হবে, এটি দ্বীপ রাষ্ট্রটির সেরা একটি উপন্যাস। যদি পরিভাষা আর শব্দের হেঁয়ালি আয়ত্বে আনা যায়, তবে বইটি খুবই উপভোগ্য মনে হবে। মনে রাখার মতো বই এটি। পাঠ করার পর পরিশ্রম স্বার্থকই মনে হবে। লেখকের মুন্সিয়ানায় বেশ পরিতৃপ্তিই পাওয়া যাবে।
![]() |
| ‘প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স’ উপন্যাসের জন্য লাল মেদাওয়াত্তাগেদেরা হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হচ্ছে |
Friday, January 29, 2021
জাফনার মরমি অতীত ও বিখ্যাত হিন্দু সন্ন্যাসী যোগস্বামীর আশ্রম: ফিরে দেখা by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা



Thursday, August 20, 2020
শ্রীলংকার টি মিউজিয়াম, ঐতিহ্য বেঁচে আছে যেখানে by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

যাদুঘরের দেয়ালে এক-দেড়শ বছর আগের ছবি ঝুলছে। কিভাবে বন বাদার কেটে চা চাষের জমি তৈরি হলো, মাটির রাস্তা যেগুলো দিয়ে গরুর গাড়িতে চা নিয়ে যাওয়া হতো কলম্বো বা গালে বন্দরে। রেললাইন তৈরির আগে ওই মাটির রাস্তাতেই চা পরিবহন করতে হতো।
সেই শুরুর দিকের ব্রিটিশদের তৎপরতাও জীবন্ত উঠে উঠেছে যাদুঘরে। যেমন স্কটিস ভদ্রলোক জেমস টেইলর। চা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার নেশা ছিল তার। বলা যায় তার কারণেই শ্রীলংকায় চা চাষের শুরু। ১৮৬০-এর দশক পর্যন্ত সিলনে ব্রিটিশ চাষীদের প্রধান কৃষিপণ্য ছিল কফি। দারুণ মুনাফা হতো কফি চাষে। কিন্তু ১৮৬৯ সালে ভয়াবহ পাতার রোগ ছড়িয়ে পড়ে, পুরো তছনছ হয়ে যায় কফি শিল্প।
বলা যায় টেইলরের একক প্রচেষ্টাতেই কফির শূন্য জায়গা দখল করে চা। ভারত থেকে চা গাছ এনেছিলেন টেইলর। সেগুলো নিয়ে তার আগ্রহের অন্ত ছিল না। আদতে এই গাছগুলো আনা হয়েছিল চীন থেকে। এরপর কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনে উষ্ণ ও আদ্র ভারতীয় আবহাওয়ায় প্রথম লাগানো হয় গাছগুলো। এরপর আসামেও লাগানো হয় গাছগুলো এবং শেষ পর্যন্ত শ্রীলংকার ক্যান্ডি পাহাড়ে শেষ ঠিকানা হয় এগুলোর। আজকের যে টি মিউজিয়াম, এর কাছেই লুলেকোন্দেরা ইস্টেটে ১৯ একর জায়গা জুড়ে প্রথম চা বাগান গড়ে তুলেছিলেন টেইলর। টেইলরের ব্যাপারটা অনন্য ছিল সত্যিই কারণ শুধু বিপুল পরিমাণ চা চাষের দিকেই তার আগ্রহ ছিল না, চা প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রেই সবার সেরা হতে চেয়েছিলেন তিনি।
টি মিউজিয়াম এই সব আবিষ্কারের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে বিশেষ করে টেইলর যে সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছিলেন। অতিকায় বা মাঝারি আকারের এই সব যন্ত্রপাতির মধ্যের চা রোলিং মেশিনও রয়েছে একটি, চা পাতা গুড়া করার জন্য যেটি উদ্ভাবন করেছিলেন টেইলর। বাকি যন্ত্রপাতিগুলো চা চাষ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহার করা হতো।

টি মিউজিয়ামে দর্শনার্থীরা টেইলর, তার যন্ত্রপাতি এবং শ্রীলংকার চা চাষের ইতিহাসের সাথে সাথে চা শিল্পের আরও সব বড় বড় ব্যক্তিদের অতীতটাও জীবন্ত দেখতে পাবেন। প্রচুর তথ্যের সাথে এখানে লিফলেট, পোস্টার এমনকি ভিডিও-ও রয়েছে। মিউজিয়ামের মধ্যেই তৈরি রেস্তোরাঁয় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে এই সব ভিডিও দেখতে পারবেন আপনি।
চা ‘টেস্ট’ করার সুক্ষ্ম ব্যাপারটার সাথেও পরিচিত হতে পারবেন দর্শনার্থীরা। শ্রীলংকার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন আবহাওয়ায় চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করা চা দেয়া হবে আপনার সামনে। ছোট দেশ হলেও শ্রীলংকায় বিচিত্র স্বাদের চায়ের দেখা মিলবে। পাহাড়ি এলাকার কত উচ্চতায় চা উৎপাদিত হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে স্বাদও বদলে যায় চায়ের। আবার ক্যান্ডিতে যে চা তৈরি হচ্ছে, সেটা নুয়ারা এলিয়ান্দের মতো শীতল উঁচু এলাকায় খেতে একরকম লাগবে, আবার নিচু গালে বা মাতারা এলাকায় তার স্বাদ হবে ভিন্ন। বাতাসে জলীয় বাস্পের তারতম্যের কারণে বদলে যায় এই স্বাদ।
সব মিলিয়ে চারটি তলা জুড়ে ছড়ানো যাদুঘরটি। নিচ তলা আর তৃতীয় তলায় রয়েছে পুরনো যন্ত্রপাতিগুলো। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে লাইব্রেরি। চা নিয়ে যাবতীয় তথ্য রয়েছে এখানে। সাথে রয়েছে অডিটোরিয়াম আর অডিও ভিডিওর কালেকশান। চতুর্থ তলায় রয়েছে কেনাবেচার দোকান। শ্রীলংকার সবচেয়ে ভাল চা’টা এখান থেকে কিনতে পারবেন আপনি। চা সম্পর্কিত বই পুস্তক, পোস্টার, অডিও ভিডিও-ও পাবেন এখানকার দোকানগুলোতে।
যাদুঘরের চতুর্থ তলার সাথেই রয়েছে চমৎকার চা ক্যাফে। চা তো খেতে পারবেনই, এখানে রয়েছে আরও চমৎকার আকর্ষণ। টেলিস্কোপ বসানো রয়েছে এই ক্যাফেতে, যেগুলো দিয়ে অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন হুনাসগিরিয়া, নাকলস রেঞ্জ এবং মাতালে রেঞ্জের পাহাড়গুলোতে ঘনিষ্ঠ নজর বুলাতে পারবেন আপনি। সন্দেহ নেই টেলিস্কোপে দেখার পর ওই জায়গাগুলোতে যেতে ইচ্ছে করবে আপনার। আরও যদি চায়ের স্বাদ নিতে চান আপনি, যাদুঘরের চারদিকে ঘিরে বহু রকমের চা পাবেন আপনি।
যাদুঘরে এবং এর চারপাশে আসলে কি আছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারণা দেয়ার জন্য যাদুঘরের পক্ষ থেকে গাইডের ব্যবস্থাও রয়েছে। যাদুঘরের স্টাফরা আপনাকে বুঝিয়ে দেবে কোন মেশিন দিয়ে কি করা হতো। চায়ের কি স্বাস্থ্যগুণ, সেগুলো নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট তথ্য ও লিফলেট। এই যাদুঘরে একবার ঘুরে গেলে নিশ্চিত চায়ের ভক্ত হয়ে যাবেন আপনি। শুধু এর স্বাদের কারণে নয়, বরং এর স্বাস্থ্যগুণের কারণে বিশেষ করে ক্যান্সার প্রতিরোধে এর ভূমিকার কারণে।
এই্ প্রতিবেদনটি শ্রীলংকার চা ও এর ঐতিহ্য নিয়ে সাউথ এশিয়ান মনিটরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের অংশ।

Monday, August 3, 2020
চা-চিত্র: লঙ্কা চায়ের মানবীয় ভূগোল by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
শ্রীলংকা চায়ের গল্প আসলে মানুষেরই গল্প। এর আনসাঙ হিরোরা হলো শ্রীলংকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাগান-কর্মীরা। এসব নারী-পুরুষকে ১৮৩০-১৮৮০ সময়কালে তালাইমানারের নর্থ ওয়েস্টারমসি বন্দরে জাহাজযোগে আনা হয়েছিল। সেখান থেকে তারা ঘন জঙ্গল দিয়ে পায়ে হেঁটে সদ্য বন কেটে ক্যান্ডি, নওয়ারা ইলিয়া ও তালাওয়াকেলের মতো স্থানে তৈরি করা বাগানে পৌঁছেছিল। অনেক শ্রমিক পথেই মারা পড়েছিল। অন্যরা প্রাণ হারিয়েছিল ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ রোগে।
বর্তমানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সব বাগান-কর্মীকে শ্রীলংকার নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা দ্বীপদেশটির বহুমুখী সামাজিক আবরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
![]() |
| সংগ্রহ করা চায়ের পাতা জমা দিচ্ছে শ্রমিকরা |
চা-বাগান ১৯৯০-এর দশক থেকে পুরোপুরি স্থানীয় মালিকানায় চলে এলেও বাগানের সাথে জড়িত দাস-শ্রমিকদের উপনিবেশ সম্পৃক্ততা এখনো রয়ে গেছে। আবার চা তোলার কাজ প্রায় পুরোপুরি নারীদের হাতে থাকায় এটি নারীদের সংগ্রামের কাহিনীও।
স্বাদে ও গন্ধে শ্রীলংকার চা অতুলনীয়। এ চা ভারতীয় ও কেনিয়ান চায়ের সাথে পাল্লা দেয়। অবশ্য বর্তমানে শ্রমিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় শ্রীলংকার চায়ের সেই সুনাম হুমকির মুখে পড়েছে।
তাদের না-বলা কাহিনী ভাসে চাপের কাপে
চল্লিশ বছরের রানি। ক্ষিপ্র পায়ে চা-বাগান দিয়ে হাঁটছেন। দূর থেকে মনে হবে, তিনি সবুজ কার্পেটের উপর দিয়ে চলছেন। সকালের রোদে চা-পাতা ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই পাতাই তার জীবিকা ছিল। কেবল তার নয়, তার পূর্বপুরুষদেরও রুটি-রুজির উৎস ছিল এই চা পাতা। এখন অবশ্য আয়া হিসেবে কাজ করেন।
বয়স যখন ছিল ১৮, তখন থেকেই তিনি চা-বাগানে কাজ করেন। কোনো রকমে নাম লিখতে পারেন তিনি। আসলে তাদের পড়াশোনা করার মতো কোনো ব্যবস্থাও তার শৈশবে ছিল না। ফলে পড়াশোনা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন ব্যাপারেও পরিণত হয়েছিল।
তবে নিজে পড়াশোনা করতে না পারলেও তিনি তার সন্তানদের পড়াচ্ছেন। তিনি চান তার সন্তানরা যেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হন। এখন অবশ্য তার আয় বাড়ায় তিনি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে পারছেন। তার সময়ে তেমনটি করা সম্ভব ছিল না।
তবে তা কেবল তার একার আয় দিয়ে হচ্ছে না। তার স্বামী কাজ করেন কলম্বোতে একটি দোকান সহকারী হিসেবে। এতেই তার পক্ষে অনেক কাজ সহজ হয়ে গিয়েছে।
![]() |
| নতুন একটি সড়কে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন রানি |
তিনি জানান, আয়ার কাজে তিনি মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা আয় করেন। পরিশ্রমও খুব নয়। চা-শ্রমিক হিসেবেও তার আয় প্রায় একই ছিল। তবে তা ছিল অনেক বেশি পরিশ্রমের। তখন তাকে পোকামাকড়ের কামড় খেতে হতো, জোঁক ধরত, ঠাণ্ডায় ভুগতে হতো। ছুটিছাটাও তেমন পাওয়া যেত না। তাছাড়া থাকতে হতো ঘিঞ্চি মেসে। মালিকদের সাথে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কও সবসময় মধুর থাকে না।
দুনিয়া যে ছোট নয়, সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি চা-বাগান থেকে সরে গেছেন। তার মেয়ে পড়াশোনা করছে কাছের একটি চার্চে। ইংরেজিতেই হয় পড়াশোনা। এ নিয়ে তার গর্বও কম নয়।
এই রানিই বলে দিচ্ছে, চা-শ্রমিকদের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা চা শিল্পে নিয়োজিত থাকলেও পরবর্তী প্রজন্ম সম্ভবত এই পেশায় থাকবে না। তাহলে চা-শিল্পের কী হবে? শ্রমিক না থাকলেও তো চা-বাগানও থাকবে না। এ নিয়ে চা-শ্রমিকরা কী ভাবছে?
রানিই জানালেন, চা-পাতা কে তুলবে, তা আমার কাজ নয়। আমাদের সবার দিন-রাতের ভাবনা হলো, আমাদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করা। বাগানে বন্দি থাকার নিয়তি আমরা মেনে নিতে পারি না। তারা আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না, আমরা কেন তাদের দিকে তাকাব।
তার প্রকাশভঙ্গি ও স্বরই বলে দিচ্ছে, তারা এখন নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ভাবছেন।
চা-বাগানটির কাছাকাছি থাকা ছোট একটি গির্জায় দুই তরুণ নানকে দেখা গেল। তারাও এখন পড়াশোনার কথাই ভাবছে। তাদের মাথায় ভর করে আছে বিজ্ঞান, গণিত আর ইংরেজি।
সবুজ দিগন্ত
তবে চা বাগানের মালিকদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। ক্যান্ডি জেলার গালাসার একটি চা-বাগানের কথাই ধরা যাক। সেখানকার বেশির ভাগ শ্রমিকের বয়স ৫০ বছরের বেশি। নতুন শ্রমিক পাওয়া কঠিন। এমনকি স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাগানে কাজ করবে এমন কাউকেও পাওয়া যায় না।
বাগান-মালিক জানান, ১০ বছর পর চা তুলবে কে? তবে তিনি যতটা হতাশ, তার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী তার মেয়ে ততটা নন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করলে ব্যাপক পরিবর্তন আনবেন বলে পরিকল্পনা করছেন। তিনি একদিকে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। তাছাড়া শ্রমিকদের জুতার মতো সামগ্রীও দেওয়ার কথা ভাবছেন। ফলে কম শ্রমিকেও বেশি উৎপাদন হবে।
কিন্তু তাতে তো খরচ বেড়ে যাবে অনেক। এখনই দামের কারণে চা-শিল্প বেশ সঙ্কটে পড়েছে। দাম আরো বেড়ে গেলে বাজার পাওয়া কঠিন হবে বৈকি।
তবে তারা পরিবর্তন আনুন বা না আনুন, শ্রীলংকার চা-শিল্পে ইতোমধ্যেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগে গেছে। অবশ্য তা হচ্ছে ধীরে ধীরে।

চা-বাগানেও একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। বাগানের আকার ও মালিকানায় নতুনত্ব আসছে। অনেক চা-শ্রমিক পর্যন্ত এখন যৌথভাবে বাগান কিনছে। অবশ্য এসবের আয়তন বেশ ছোট। এমন একটি উদাহরণ হলো ৩৫ বছরের রাতনাভেলি। তিনি পূর্বসুরীদের থেকে পাওয়া তার বিশাল বাগানের একটি অংশ বেশ কম দামে শ্রমিদের কাছে বিক্রি করেছেন। তারা এখন যৌথভাবে এটি পরিচালনা করছে। নিজের জমিতে কাজ করতে হওয়ায় এসব শ্রমিক পারিশ্রমিক নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামান না।
ছোট চা-বাগান মালিক-শ্রমিকদের বিষয়টি তদারকির জন্য গড়ে ওঠেছে টি স্মল হোল্ডার্স অথোরিটি। এসব বাগান যাতে লাভজনক হয়, তা-ই দেখা এই সংগঠনের অন্যতম দায়িত্ব। রাতনাভেলি একসময় শিক্ষকতা করতেন কাছের একটি স্কুলে। এখন তিনি চা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, যে ফসলটিকে একসময় দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করা হতো, তা এখন মুক্তির বার্তা বয়ে আনছে।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




