Tuesday, March 11, 2025

নরকে পরিণত হয়েছে মনিপুর by লিমা সুলতানা

ভারতের মণিপুরে চলমান জাতিগত সংঘাত। কুকি ও মেতেই গোষ্ঠীর চলমান সংঘাতে নরকে পরিণত হয়েছে মণিপুর। এতে ব্যাপক মানুষকে সেখান থেকে উৎখাত করা হয়েছে। এছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকশ। তাদের মধ্যে বিরোধ এতই বেড়েছে যে, দুই আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে কেউই তাদের নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গিয়ে নিজেদের কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। সবসময় এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ভুলবশত এক গোষ্ঠীর মানুষ অন্য গোষ্ঠীর সীমানায় প্রবেশ করা নিয়ে ২২ মাসে মণিপুরে কয়েকটি সংঘাত হয়েছে। এদিকে কিছুদিন ধরে দেশ ভাগের আভাস দিয়ে আসছে মণিপুর। যেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় বাফার জোনের দাবি তোলা হয়। সম্প্রতি মণিপুর জুড়ে ফ্রি মুভমেন্টের ডাক দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। যা ৮ই মার্চ থেকে শুরু হয়। এটিকে দেশভাগের আভাসের পরিকল্পনা পাল্টে দেয়ার চেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়। অমিত শাহের ডাকার ফ্রি মুভমেন্টে সরকারের পক্ষ থেকে বাস সরবরাহ করা হয়। ওই সব বাস কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাহারায় পাহাড় ও উপত্যকার মধ্য দিয়ে চলে যায়। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয়নি। ফ্রি মুভমেন্টের প্রথম দিনেই এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এতেই পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা বোঝা যায়। ওই হত্যার মাধ্যমে চার মাসে প্রথমবারের মতো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে নড়ে চড়ে বসে মণিপুরের জনগণ। তারা বুঝতে পারে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরকেই নিতে হবে। উল্লেখ্য, এনইচ-২ ও এনএইচ-৩৭ নামের হাইওয়ে দুটিকে মণিপুরের লাইফলাইন বলা হয়ে থাকে। ওই হাইওয়ে দুটি দিয়ে পাহাড় ও উপত্যকায় কর্মী ও পণ্য সরবরাহ করা হয়। এরই মধ্যে আলাদা প্রশাসনের দাবি তোলে কুকি গোষ্ঠী। তাদের দাবি আদায়ের আন্দোলনের অংশ হিসেবে ওই  দুটি হাইওয়ে দিয়ে পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে কুকিরা। এতে করে সৃষ্টি হয় খাদ্য সংকট, মুদ্রাস্ফীতি। ব্যাঘাত ঘটে ব্যবসায়। অনুরূপভাবে মেইতেই গ্রুপও পাহাড়ে যাওয়ার পথে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর ওপর হামলা চালায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মণিপুুরে দুই গ্রুপের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশে ৮ই মার্চের কর্মসূচির পরিকল্পনা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ই¤ফল থেকে চুরাচান্দপুরে একটি বাস সফলভাবে যাত্রা করে। তবে ব্যাপক সংখ্যক আন্দোলনকারীর বাধার সম্মুখীন হয় কাংপোকপি জেলার মধ্য দিয়ে যাওয়া আরেকটি বাস। ফলে এটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে মণিপুরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে এখনো অনেক দেরি।

এদিকে ইম্ফলের পশ্চিমের জেলার মারাক অঞ্চল থেকে নিষিদ্ধ কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির দুই জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া নিষিদ্ধ গোষ্ঠী পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কাছ থেকে দুই বালিকাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদেরকে কাকচিং জেলার কাকচিং বাজার থেকে উদ্ধার করা হয়। একই দিনে পুলিশ কাকচিং বাজার থেকে পিএলএ’র দুই ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলো মোইরামথেম রোমেন সিং (২৩) ও নংমাইথেম মহেন্দ্রো সিং (৫৪)। ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ গোষ্ঠী কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির দুই জঙ্গী গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে চারটি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। 

mzamin

৫০০ যাত্রীসহ পাকিস্তানে ট্রেন হাইজ্যাক, সামরিক অভিযান চালালে হত্যার হুমকি

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কাচ্চি’তে ম্যাচ শহরের আবে গাম এলাকায় জাফর এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটিকে  হাইজ্যাক করা হয়েছে। এতে জিম্মি করা হয়েছে প্রায় ৫০০ যাত্রী ও আরোহীকে। ভারতের টাইমস নাউ খবরে জানায়, ছয়জন সামরিক কর্মীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। কিন্তু পাকিস্তানি মিডিয়ায় নিহতের তথ্য এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ট্রেনটি গুদালার এবং পিরু কোনেরি এলাকার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় মঙ্গলবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। বিএলএ সতর্ক করে দিয়েছে যে তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক অভিযান হলে সমস্ত জিম্মিকে হত্যা করা হবে। তারা পুরো ট্রেনটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

এক বিবৃতিতে বিএলএ জানিয়েছে-  তাদের যোদ্ধারা মাশকাফ, ধাদার, বোলানে পূর্বপরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করেছে। দলটি জানিয়েছে - ‘আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা রেলপথ উড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে জাফর এক্সপ্রেস থামতে বাধ্য হয়েছে। যোদ্ধারা দ্রুত ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং সমস্ত যাত্রীকে জিম্মি করে’। কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে  বিএলএ ঘোষণা করে,  ‘যদি সামরিক  বাহিনী কোনও  অভিযানের চেষ্টা করে, তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ-  শত শত জিম্মিকে হত্যা করা হবে এবং এই রক্তপাতের দায় সম্পূর্ণরূপে সামরিক বাহিনীর উপরন বর্তাবে।’ বিএলএ জানিয়েছে যে-  তাদের বিশেষায়িত ইউনিট- মাজিদ ব্রিগেড, এসটিওএস এবং ফতেহ স্কোয়াড- এই আক্রমণটি চালিয়েছে এবং যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। টাইমস নাউ জানায়, হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএলএ জানিয়েছে, ‘এখনও পর্যন্ত ছয়জন সামরিক কর্মী নিহত হয়েছেন এবং শত শত যাত্রী বিএলএ’র হেফাজতে রয়েছেন।’

বেলুচ লিবারেশন আর্মির মুখপাত্র জিয়ান্দ বেলুচ পুনর্ব্যক্ত করেন, এই অভিযানের দায় তাদের দল সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করছে। ওদিকে এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বলছে, ম্যাচ-এর কাছে আব গাম এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। সেখানে সশস্ত্র অবস্থায় প্রায় ৬জন ব্যক্তি ট্রেনে ফাঁকা গুলি করেছে।  ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে গেছেন উদ্ধারকর্মী ও নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। হামলাকারীদের শনাক্ত করার অভিযান চলছে। রেল কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এর চালক গুরুত্বর জখম হলেও তিনি শঙ্কামুক্ত। তাদেরকে সহযোগিতা করতে একটি ইমার্জেন্সি ট্রেন পাঠানো হয়েছে। হামলার পর কর্তৃপক্ষ পেশোয়ার-কোয়েটা জাফর এক্সপ্রেস পূর্ব সতর্কতা হিসেবে বন্ধ রেখেছে। শিবি হাসপাতালে ঘোষণা করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। অর্থাৎ স্টাফদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। রেলওয়ে কন্ট্রোলার মুহাম্মদ কাশিফ বলেন, এই ট্রেনে ছিল ৯টি কোচ। আরোহীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। ৮ নম্বর টানেলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা এপা ড়ফশপাভধ করে। ট্রেনের যাত্রী ও স্টাফদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা চলছে।

mzamin

গাজায় ইসরায়েলের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের প্রভাব কী হতে পারে

ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, তারা গাজা উপত্যকায় বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এতে গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এটিকে জানুয়ারিতে সম্মত যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো সংশোধনে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে চাপ দিতে ইসরায়েলের আরেকটি চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের মেয়াদ বাড়াতে এবং আরও বন্দীকে মুক্তি দিতে হামাসকে চাপ দিতে মার্চ মাসের শুরুর দিকে গাজায় মানবিক সহায়তা সরবরাহের ওপর অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েল। দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি এড়াতে তারা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি হলে গাজায় যুদ্ধের স্থায়ী অবসান হতে পারে।

মানবিক সহায়তা সংস্থা, মানবাধিকার সংস্থা, ইসরায়েলের কিছু মিত্রদেশসহ বিভিন্ন দেশ এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে।

ইসরায়েলের ঘোষণাটি আসলে কী ছিল

ইসরায়েল বলেছে, তারা গাজায় যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে, তার পুরোটাই বন্ধ করে দেবে।

গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ইসরায়েলি জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেন, তিনি ‘তাৎক্ষণিকভাবে গাজা উপত্যকার বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন’।

দোহায় আরেকটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনার আগের দিন কোহেন বলেছিলেন, ‘কথা তো যথেষ্ট হলো, এখন পদক্ষেপ নেওয়ার সময়!’

তবে ইসরায়েলি গণমাধ্যম বলছে, ঘোষণাটিকে যতটা নাটকীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এটি সম্ভবত অতটা নয়।

তার মানে কি গাজা অন্ধকার হবে না

এমনিতেই গাজা অন্ধকারের মধ্যে আছে। টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের হামলাকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

গত নভেম্বরে গাজার মধ্যাঞ্চলীয় দেইর এল বালাহর কাছে একটি লবণাক্ত পানির পরিশোধনকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করা হয়েছিল। পরিশোধনাগারটি থেকে প্রায় ছয় লাখ মানুষের পানির ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এসব মানুষের বেশির ভাগই গাজার মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বাস্তুচ্যুত বেসামরিক নাগরিক।

এখন শোধনাগারটিকে সঞ্চিত বিদ্যুৎ, জেনারেটর এবং ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস না হওয়া সৌরপ্যানেলের অবশিষ্টাংশের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে।

ইসরায়েল কি শুধু বিদ্যুৎ ও ত্রাণ সরবরাহই বন্ধ করছে

না। জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তগুলো সংশোধন করার চেষ্টায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকাজুড়ে বিমান হামলা শুরু করেছে। গণমাধ্যমকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা গাজায় নতুন করে লড়াই শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতির সময় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের নিয়ে দৈনিকই তথ্য প্রকাশ করছে।

রাফায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে চাইছে ইসরায়েল। সেখানে শুক্রবার থেকে ইসরায়েলি ট্যাংক ও ড্রোন দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা করা হয়েছে। এতে কমপক্ষে তিনজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

হামাস কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে

গত রোববার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে হামাস ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘সস্তা ব্ল্যাকমেলের’ অভিযোগ এনেছে।

হামাস বলেছে, ‘দখলদার বাহিনী খাবার, ওষুধ ও পানি থেকে বঞ্চিত করার পর গাজায় বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই।’

হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ইজ্জত আল-রিশেক এ পদক্ষেপকে ‘গাজার জনগণ এবং তাদের প্রতিরোধকে চাপের মুখে ফেলার একটি মরিয়া চেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

ইসরায়েলকে কে বা কারা সমর্থন দিচ্ছে

দেশটি যুক্তরাষ্ট্র।

ইসরায়েল বলছে, হামাসকে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য গাজায় বর্তমান অবরোধ দেওয়া হয়েছে। উইটকফ যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের মেয়াদ বাড়ানো এবং গাজা থেকে কয়েকজন ইসরায়েলি বন্দীকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

এ পরিকল্পনায় উইটকফের ভূমিকা কী হবে, তা তিনি এখনো নিশ্চিত করেননি।

তবে গতকাল সোমবার দোহায় আলোচনার আগে সাংবাদিকদের উইটকফ বলেছেন, যৌথভাবে হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়াসহ ইসরায়েলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রাখবে মার্কিন প্রশাসন।

একই সময়ে হামাসের কাছে জিম্মি পাঁচ মার্কিন নাগরিককে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সংগঠনটির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই পাঁচ বন্দীর মধ্যে এখন মাত্র একজন জীবিত আছেন।

এ অবরোধে কারা ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে না

বলা চলে, যুক্তরাষ্ট্র বাদে প্রায় কেউ–ই ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে না।

মিসর ও কাতার—দুটি দেশই যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে। গাজা উপত্যকায় খাবার, ওষুধ ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় চলতি মাসে ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে সৌদি আরব ও জর্ডান।

গত বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য বলেছে, ‘মানবিক সহায়তা কখনোই যুদ্ধবিরতিনির্ভর হওয়া উচিত নয় অথবা এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’

গাজায় সহায়তা বন্ধ করা নিয়ে ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলোও নতুন করে অবরোধ আরোপের নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কাতারে চলমান আলোচনার ওপর এর প্রভাব কী

এটা এখন দেখার বিষয়।

হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা মার্কিন দূত অ্যাডাম বোহলারসহ অন্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ‘নমনীয় আচরণ’ করেছে। বোহলার মার্কিন জিম্মিদের নিয়ে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছেন এবং যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের ব্যাপারে ঐকমত্য হওয়ার আশা করছেন।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের মতো করে একই ধরনের দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১০ জন জীবিত ইসরায়েলি বন্দীকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধবিরতির বর্তমান পর্যায় ৬০ দিনের জন্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আলচনার অংশ হিসেবে হামাস দাবিগুলো বিবেচনা করছে।

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজা
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গাজায় রমজানেও ফেরে না সুদিন by শেখ নিয়ামত উল্লাহ

মুয়াজ্জিনের সুমধুর কণ্ঠে আজানের ধ্বনি আর ভেসে আসে না। মসজিদগুলোই নেই। বোমার আঘাতে সবকিছু মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। ফজরের আজান শুনে এখন আর রোজা শুরু করতে পারেন না ইসরা আবু কামার। মাগরিবের আজান কানে আসার পর মুখে তুলতে পারেন না ইফতার।

ইসরার বাড়ি ফিলিস্তিনের গাজায়। পবিত্র রমজানের বহু স্মৃতি তাঁর মনের গভীরে জমা। সেসব স্মৃতি এখন কাঁদায় তাঁকে, যেমনটা কাতর করে তোলে উপত্যকার সব মানুষকে। গত বছরের মতো এবারও রমজান তাঁদের জন্য উৎসবের আমেজ নিয়ে আসেনি। আসবেই–বা কীভাবে? ১৫ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের নির্মম হামলা গাজাবাসীর জীবন থেকে সব খুশি কেড়ে নিয়েছে।

তবে গত রমজানের তুলনায় এবার গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দা কিছুটা হলেও স্বস্তিতে রয়েছেন। দেড় মাস হলো যুদ্ধবিরতি চলছে। মুহুর্মুহু বোমার শব্দ এখন আর ভেসে আসে না। তাই তো প্রথম রমজানে একসঙ্গে ইফতার করেছেন রাফার একটি এলাকার বাসিন্দারা। রাস্তার ওপর বিশাল সেই জমায়েতে যোগ দিয়েছিলেন মধ্যবয়স্ক নারী ফাতিমা আবু হেলাল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর একটিই চাওয়া, ‘আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, সবকিছু আগের মতো করে দিন।’

আগের দিনে গাজায় একসঙ্গে ইফতার করাটা আনন্দের বিষয় ছিল। রোজা ছিল উপত্যকার মানুষের জন্য উৎসব, আয়োজন, মানুষে মানুষে মিলে যাওয়ার এক উপলক্ষ। সন্ধ্যা হলেই ঘরবাড়ি ও সড়কগুলো আলোকিত হতো লন্ঠন আর রংবেরঙের বাতিতে। প্রতিবেশীদের নিয়ে আয়োজন করা হতো হরেক পদের ইফতারির। রাত গড়িয়ে গেলেও রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কমত না। পরিবার–পরিজন নিয়ে তারাবিহর নামাজ আদায় করতে যেতেন মুরব্বিরা। টেলিভিশনে চলত রমজানের অনুষ্ঠান। রাস্তায় রাস্তায় শিশুরা খেলাধুলা করত। ধর্মীয় গান গেয়ে মাতিয়ে রাখত পাড়া।

এবার সেই শিশুদের অনেকেই নেই। বহু মানুষ হারিয়েছেন বাবা–মা, ভাই–বোন, কোলের সন্তান। ইসরায়েলের হামলা এখন পর্যন্ত গাজায় ৪৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ কেড়েছে। হারিয়ে যাওয়া কাছের মানুষগুলোর কথা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফেরে নগরীর বাসিন্দা ইসরা আবু কামারের কাছে। তিনি বলেন, ‘এবারের রমজানে আমার ভালোবাসার মানুষগুলো আর নেই। আমার এক ফুফা ছিলেন। প্রতি রমজানে ইফতারে নিমন্ত্রণ করতেন। তাঁকে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। বান্ধবী শাইমা, লিনা আর রোয়ার সঙ্গে প্রতিদিন মসজিদে দেখা হতো। তারাও শহীদ হয়েছে।’

পুরোনো দিনগুলো আবার ফিরে পাওয়া এখন গাজাবাসীর কাছে স্বপ্নের মতো। খাবারই তো ঠিকমতো মিলছে না তাঁদের। যুদ্ধবিরতির শুরুর দিকে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল ইসরায়েল। তাই বাজার কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। কয়েক দিন হলো আবার সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে কমছে মজুত, হু হু করে বাড়ছে দাম। গাজা নগরীর আবু ইস্কান্দার বাজারের বিক্রেতা হাসান আবু রামির হিসাবে, সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার আগে যে টমেটের দাম ছিল ৪০০ টাকা, তা এখন বেড়ে হয়েছে ৭৩০ টাকা। আর এক কেজি রান্নার গ্যাসের দাম ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার টাকা।

পেট চালাতে শেষ সঞ্চয়টাও খরচ করে ফেলেছেন গাজার অনেক বাসিন্দা। এত দাম দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সদাই কেনা তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উপত্যকার সাধারণ মানুষ এবার যা পাচ্ছেন, তা দিয়েই সাহ্‌রি–ইফতার সারছেন। এর মধ্যে রয়েছে ভাত, রুটি, মোলোখিয়া (একধরনের স্যুপ) বা সবজি। একটু সচ্ছল কারও কপালে জুটছে মাংস, রুটি ও পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি খাবার মুসাখান। রোজার মাসে ত্রাণের লাইনও দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এক থালা রান্না খাবারের জন্য শিশু থেকে বৃদ্ধ—কাড়াকাড়ি করছেন সবাই।

পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক উসকানিতে। গত বুধবারও তিনি বলেছেন, গাজায় বন্দী বাকি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া না হলে ‘নরকের পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। যুদ্ধবিরতি দ্বিতীয় ধাপে যেতেও গড়িমসি করছে ইসরায়েল সরকার। ফলে গাজায় আবার হামলা শুরুর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যার অর্থ আবারও শুরু হতে পারে মৃত্যু–রক্তপাত।

এত আশঙ্কার মধ্যেও আশা ছাড়তে নারাজ ইসরা আবু কামার। তাঁদের ঘরবাড়ি, মসজিদ ভেঙেছে, তবে বিশ্বাসটা অটুট। ভাঙা বাড়ি ও তাঁবুর মধ্যেই তারাবিহর নামাজ আদায় করছেন। নামাজ শেষে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে জানাচ্ছেন সব চাওয়া–পাওয়ার কথা। মনের প্রশান্তির জন্য তিলাওয়াত করছেন পবিত্র কোরআন। এই দুর্দশার মধ্যেও ইসরা বেঁচে থাকতে চান তাঁর মা–বাবার জন্য, সবাইকে নিয়ে করতে চান ঈদ, ঠিক যেন ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতার মতো—‘জীবনকে ভালোবাসি। কারণ, আমি মরে গেলে মায়ের কান্না আমার সহ্য হবে না।’

* তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউ আরব 

বেলা পড়ে এসেছে। কিছু সময় বাদে ইফতার। তারই প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফিলিস্তিনি এক নারী। পাশে খেলা করছে শিশুসন্তানেরা। এবারের পবিত্র রমজানে তাঁদের ঠাঁই হয়েছে বুরেজি শরর্ণার্থীশিবিরের একটি তাঁবুতে। গত বুধবার মধ্য গাজায়
বেলা পড়ে এসেছে। কিছু সময় বাদে ইফতার। তারই প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফিলিস্তিনি এক নারী। পাশে খেলা করছে শিশুসন্তানেরা। এবারের পবিত্র রমজানে তাঁদের ঠাঁই হয়েছে বুরেজি শরর্ণার্থীশিবিরের একটি তাঁবুতে। গত বুধবার মধ্য গাজায়। ছবি: এএফপি

পেন্টাগনের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ধাতব পরিশোধন স্থাপনা নির্মাণ করতে চান ট্রাম্প

সিনিয়র দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ ধাতবের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পেন্টাগনের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ধাতব পরিশোধন স্থাপনা নির্মাণ করতে চান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে এই খাতের নিয়ন্ত্রণ থেকে চীনকে দূরে সরিয়ে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তিনি। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়,  গত সপ্তাহের বুধবার মার্কিন কংগ্রেসের অধিবেশনে ভাষণ দেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি ধাতব উৎপাদনে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। ওই ভাষণের পর ট্রাম্প যে নির্বাহী আদেশে সই করবেন সেখানে এ বিষটিকে অন্যতম হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্রগুলো জানিয়েছে, আদেশের অংশ হিসেবে পেন্টাগন অন্যান্য ফেডারেল সংস্থার সঙ্গে কাজ করে ঘাঁটিগুলোতে পরিশোধন স্থাপনা নির্মাণ করবে। সামরিক ঘাঁটিগুলোকে পরিশোধনাগার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা জাতীয় নিরাপত্তায় ধাতব পদার্থের ওপর ট্রাম্পের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে। বর্তমানে ফাইটার জেট, সাবমেরিন (ডুব জাহাজ), বুলেট সহ অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেইজিংয়ের পরিশোধিত ধাতবের ওপর নির্ভর করতে হয়।

একটি সূত্র জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ধাতব সম্পদের জার নামকরণের পরিকল্পনাও করছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রেসিডেন্টরা ওয়াশিংটনের অন্যান্য ক্ষেত্রের ওপর নজর দিতে যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সে পথেই হাঁটতে চাইছেন তিনি। তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে এই পরিকল্পনা এখনও আলোচনাধীন। ট্রাম্প নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করার আগে এ বিষয়ে পরিবর্তন আসতে পারে। ট্রাম্পের প্রশাসনের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত একাধিক ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা মনে করছেন যে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি অথবা অন্য যেকোনো কারণে গুরুত্বপূর্ণ ধাতব রপ্তানি সংকুচিত করতে পারে চীন।

যদিও এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তাতে সাড়া দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল। রয়টার্স বলছে, বর্তমানে পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণে থাকা জমির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) একর। তবে পরিশোধন প্রক্রিয়ার জন্য জমি ব্যবহৃত হলে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে মাঝে মাঝে বিরোধ তৈরি করতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন জমি কেনার প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যান্য ফেডারেল বিভাগের জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি এড়িয়ে চলতে হবে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী ৫০টি ধাতব পদার্থের মধ্যে ৩০টির উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে চীন। মূলত চীনের এই একক আধিপত্য ঠেকাতেই ট্রাম্প এই পরিকল্পনা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সূত্রগুলো। তবে পেন্টাগনের সামরিক ঘাঁটিতে পরিশোধন সুবিধা বাস্তবায়নে কীভাবে কাজ করা হবে তা স্পষ্ট নয়। কেননা পেন্টাগনের ঘাঁটিগুলো মার্কিন ক্লিয়ার এয়ার এবং ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্টের অধীনে রয়েছে। অতীতে এই নিয়মে প্রক্রিয়াকরণের প্রকল্পগুলোর ব্যক্তিগত উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে।  

mzamin

বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকায় শৈশব যেভাবে কেটেছিল ইলন মাস্কের

লাল ইটের তৈরি প্রিটোরিয়া বয়েজ হাই স্কুলের মনোরম ভবনটি ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম ইংরেজি বেসরকারি বিদ্যালয়। ইলন মাস্ক যিনি এখন মার্কিন রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন, তিনি ১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার এই স্কুলে সবুজ, গাছপালা ভরা ক্যাম্পাসে একজন ছাত্র হিসেবে তার স্কুল জীবন কাটিয়েছিলেন। স্কুলের কাছেই ওয়াটারক্লুফে তার বাবার বিশাল বাড়িটি ছিল বেগুনি জ্যাকারান্ডা ফুলের ছায়ায় আবৃত। বর্ণবাদ প্রবেশ করার সাথে সাথে দক্ষিণ আফ্রিকায় মাথাচাড়া দেয় প্রবল বিদ্রোহ। ১৯৮৪ সালে দেশজুড়ে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। ১৯৮৬ সালের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন শ্বেতাঙ্গ ছিটমহলগুলিতে জীবন ছিল সমৃদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ। প্রিটোরিয়া বয়েজ-এ মাস্কের চেয়ে এক বছরের সিনিয়র জোনাথন স্টুয়ার্ট বলছেন, ‘যদিও পুরো দেশটিতে আগুন জ্বলছিল এবং অস্থিরতা বিরাজ করছিলো, আমরা আমাদের ছোট শহরতলিতে খুব নিরাপদে ছিলাম। স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলাম।’

প্রিটোরিয়া বয়েজ হাই স্কুলেই শৈশব কেটেছে লেবার রাজনীতিবিদ পিটার হেইন, বুকার পুরস্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক ড্যামন গ্যালগুট এবং প্যারালিম্পিয়ান অস্কার পিস্টোরিয়াসের মতো ব্যক্তিত্বদের।

১৯৭১ সালে প্রিটোরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী মাস্ক গত মাসে তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ তার জন্মস্থান দক্ষিণ আফ্রিকার ‘বর্ণবাদী আইনের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। ‘শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানরা তাদের নিজ দেশে তাদের বর্ণের জন্য নির্যাতিত হচ্ছে’ এই বিবৃতিতে সম্মতি জানিয়েছিলেন মাস্ক। যিনি এখন ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘সরকারি দক্ষতা বিভাগ(ডজ)' -এর  প্রধানের পদে আসীন।

শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানরা বেআইনি জমি বাজেয়াপ্তর লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। অন্যায়ভাবে জাতিগত বৈষম্যর শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি এই অভিযোগ তুলে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প। এই আদেশে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য তহবিল বন্ধ করার কথা বলা আছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা তার এইচআইভি/এইডস বাজেটের ১৭% পায়। ১৯৮৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে তার মাতৃভূমি কানাডায় চলে যান মাস্ক। তারপর পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্পকে এই আদেশ জারি করতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে মাস্কের সরাসরি ভূমিকা কতটা ছিল তা স্পষ্ট নয় ।

ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট পদের প্রথম মেয়াদ থেকেই শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের উপর কথিত নির্যাতনের বিষয়ে আগ্রহী। আফ্রিকানদের একটি অধিকার গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মিথ্যা দাবি করে যে সরকারের সহযোগিতায় শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের তাদের জমির জন্য হত্যা করা হচ্ছে। ট্রাম্প ফক্স নিউজে গ্রুপের একজন নেতার সাক্ষাৎকার দেখে তার সমর্থনে টুইট করেন। ট্রাম্প অন্যান্য স্বার্থ দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে গাজা যুদ্ধের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলার সমালোচনাকারী মার্কিন দলগুলি। বিষয়টি তিনি তার নির্বাহী আদেশে উল্লেখ করেছেন। মাস্ক এখন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন, তাই এটা ধরে নেয়া যেতে পারে যে তিনি তার মতামত প্রেসিডেন্টের কাছে প্রকাশ করেছেন। কারণ বিষয়টি দক্ষিণ আফ্রিকায় তার ব্যবসায়িক স্বার্থের সাথেও জড়িত।

মাস্ক দাবি করেছেন যে, দক্ষিণ আফ্রিকার জনসংখ্যার মাত্র ৭% শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু, যারা এখনও ৭০% এরও বেশি কৃষি জমির মালিক। তাই সেখানে ভূমি সংস্কার আইন বর্ণবাদী মনোভাবের প্রকাশ এবং চুরির শামিল। তিনি দাবি করেছেন যে, শ্বেতাঙ্গ কৃষকরা গণহত্যার শিকার; গবেষণায় দেখা গেছে যে অপরাধগুলি আর্থিকভাবে প্ররোচনা দেয়া হয়েছে। মাস্কের আক্রমণ এমন এক সময়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের সাথে আইনি বিবাদে লিপ্ত। কারণ তিনি সেদেশে তার স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটি এমন একটি আইনের বিরোধিতা করছেন যেখানে টেলিকম সেক্টরের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দক্ষিণ আফ্রিকার অংশের ৩০% ইকুইটি কৃষ্ণাঙ্গ মালিকানাধীন ব্যবসাগুলিকে প্রদান করতে হবে।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি করবে যাতে মাস্ককে কৃষ্ণাঙ্গ ক্ষমতায়ন আইন থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায়। এক্স-এর প্রেস টিম এবং মাস্কের আইনজীবী এ সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনও উত্তর দেননি। গত মাসে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে নাৎসি স্যালুটের মতো অঙ্গভঙ্গি দেখানো থেকে শুরু করে জার্মানির অল্টারনেটিভ ফার ডয়চল্যান্ডের মতো অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিকে আলিঙ্গন করা-বর্ণবাদী শাসনের আবহে মাস্কের বেড়ে ওঠার বছরগুলি আজকে তার এই অবস্থানের জন্য কতটা দায়ী এগুলো তারই প্রমাণ। মাস্কের পরিবারের মতো শ্বেতাঙ্গ, ইংরেজিভাষী দক্ষিণ আফ্রিকানরা বর্ণবাদের  শ্রেণিবিন্যাস থেকে উপকৃত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা শাসক আফ্রিকানদের থেকে আলাদা জীবনযাপন করত।

দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম দুই বছর মাস্ক জোহানেসবার্গের উত্তরাঞ্চলীয় শহরতলিতে অবস্থিত সাদা ব্রায়ানস্টন উচ্চ বিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত, এটি একটি  ইংরেজি-ভাষার রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়। ব্রায়ানস্টন হাই স্কুলেও খেলাধুলার চল ছিল। অনেকটা সেইসময়ের আমেরিকান সমাজের মতো। বলছেন, মাস্কের স্কুল জীবনের বন্ধু লেসলি বার্নস। ১৯৮৫ সালে স্কুলের দাবা দলের সদস্য মাস্ককে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। তাকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, এতটাই মারধর করা হয়েছিল যে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে মুখ খুলতে চায়নি।

মাস্কের সাথে কম্পিউটার বিজ্ঞানের ক্লাস করা গিডিয়ন ফুরি জানাচ্ছেন, মাস্কের বাবা তাকে এবং তার ভাই কিম্বালকে প্রিটোরিয়া বয়েজে স্থানান্তরিত করেছিলেন, যেখানে তাকে খুব পছন্দ করা হত। ফুরির মতে, ‘মাস্ক  খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিল। সে নিজেকে কোনোদিনই আলাদা করে রাখতো না। তার একদল বন্ধু ছিল।’

দক্ষিণ আফ্রিকার গণমাধ্যমগুলিতে কঠোর সরকারি সেন্সরশিপ ছিল। সংবাদপত্রগুলিতে সেন্সর করা অংশগুলি কালো করে ছাপা হত, বিশেষ করে শহরতলিতে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং গণগ্রেপ্তারের প্রতিবেদন। বিপরীতে, প্রিটোরিয়ার ফি-প্রদানকারী ছেলেরা সেই সময়ের তুলনায় অনেক উদার ছিল। ১৯৮১ সালে এটিই প্রথম সরকারি স্কুল যেখানে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্র ভর্তি করা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ম্যালকম আর্মস্ট্রং দক্ষিণ আফ্রিকার ‘মাতৃভূমি’ থেকে কূটনীতিকদের ছেলেদের স্কুলে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।  

স্কুলে মাস্কের দুই বছরের জুনিয়র প্যাট্রিক কনরয় বলেন, ‘আর্মস্ট্রং প্রায়শই আমাদের স্কুল সমাবেশে বক্তব্য রাখতেন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বের উপর জোর দিতেন।’

মাস্ক পূর্বে নিজেকে ‘রক্ষণশীল নন’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং ২০০৮ সালে বারাক ওবামার বিজয়ের পর থেকে প্রতিটি প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, যতক্ষণ না তিনি ডানপন্থী হয়ে ওঠেন। কিন্তু মাস্ক স্পষ্টতই গণতন্ত্র এবং এর সমর্থনকারী নেতাদের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে এসেছেন। ১৯৩০-এর দশকে, তার দাদা কানাডায় ফ্যাসিবাদী  গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা অভিজাত টেকনোক্র্যাটদের দ্বারা সরকারের পক্ষে প্রচারণা চালাত। এরপর তিনি বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যান কারণ বর্ণবাদী ব্যবস্থা তার কাছে আকর্ষণীয় ছিল।

মাস্কের স্কুলের কিছু সহপাঠী অনুমান করেছিলেন যে দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পর্কে তার বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণবাদের অবসান এবং ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট  হওয়ার ‘অলৌকিক ঘটনা’ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। তারপর থেকে, ম্যান্ডেলার এএনসি দলের নেতৃত্বাধীন সরকারগুলি বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও তাদের কৃষ্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নীতিগুলি কৃষ্ণাঙ্গ মালিকানাধীন কোম্পানিগুলিকে কর ছাড় এবং রাষ্ট্রীয় চুক্তি প্রদান করে, তবুও কৃষ্ণাঙ্গদের বেকার হওয়ার সম্ভাবনা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকাও বিশ্বের সর্বোচ্চ হত্যার হারের দেশগুলির মধ্যে একটি। শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ অস্বাভাবিক নয়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে, প্রিটোরিয়ায় মার্কিন দূতাবাসের বাইরে শত শত লোক জড়ো হয়েছিল ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ’ এবং ‘দক্ষিণ আফ্রিকাকে আবার মহান করুন’ স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড বহন করে।

কেপ টাউনের তার প্রশস্ত বাড়ি থেকে একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে এরোল মাস্ক বলেন, তার ছেলে ইলনের শৈশব সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান, সময়টা ভালো ছিল। কারণ আমাদের কোনও সমস্যা ছিল না। কৃষ্ণাঙ্গ এবং শ্বেতাঙ্গ উভয়ই একে অপরের সাথে খুব ভালোভাবে মিলে মিশে থাকতো। এটাই বাস্তবতা। অবশ্য মানুষ এটা শুনতে চায় না, কিন্তু এটাই সত্য।

মাস্ক এবং তার দুই ছোট ভাইবোন, কিম্বাল এবং টোস্কার  তাদের বাবার সাথে সম্পর্ক খুব একটা গভীর নয়। কিম্বাল মাস্কের জীবনীকার ওয়াল্টার আইজ্যাকসনকে বলেছিলেন যে, তাদের বাবা দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে তাদের উপর চিৎকার করতেন, তাদের অকেজো বলে বকাঝকা করতেন। তাদের মা, এরোল মাস্কের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন। যদিও এইসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। আইজ্যাকসনের মতে, ২০১৭ সালে যখন তার ৩০ বছর বয়সী সৎমেয়ে জানা বেজুইডেনহাউটের সাথে এরোলের একটি সন্তান হয়, তখন ভাইয়েরা তাদের বাবার থেকে দূরে সরে যান।  

এরোলের কথায় , ‘২০১৬ সালে কেপটাউনে আমার ৭০তম এবং মাস্কের ৪৫তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক পার্টিতে আমি যখন ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিলাম, তখন আমার ছেলে আমার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলো। বাইডেন আসার পর আমেরিকার পরিস্থিতি বদলে গেল এবং ইলন বুঝতে পারলো যে তারা আমেরিকা ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। এখন আমার ছেলের সাথে আমি প্রতিদিন বার্তা আদান-প্রদান করি। অবশ্যই, সে সবসময় উত্তর দিতে সক্ষম হয় না, তাই তার পিএ আমাকে উত্তর দেয়।’

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

mzamin

আমরা ইসরায়েলের কোনো দালাল নই : মার্কিন দূত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিম্মিবিষয়ক দূত অ্যাডাম বোহলার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্র, আমরা ইসরায়েলের কোনো দালাল নই। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলোচনার বিষয়ে ইসরায়েল সমালোচনা করায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

রোববার (৯ মার্চ) মার্কিন ও ইসরায়েলি একাধিক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বোহলার এ বিষয়ে কথা বলেন। খবর রয়টার্স।

এর আগে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বোহলারের হামাসের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বোহলার বলেন, তিনি ইসরায়েলের ক্ষোভ বুঝতে পারেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও কৌশলগতবিষয়কমন্ত্রী রন ডারমারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বোহলার বলেন, আমি রনের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তার উদ্বেগের প্রতি আমরা সহানুভূতিশীল। তবে হামাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেখুন, তাদের মাথায় শিং গজায়নি। তারা আসলে আমাদের মতোই মানুষ, বেশ ভালো লোক।’

রন ডারমারের প্রতিক্রিয়াকে ইঙ্গিত করে বোহলার বলেন, ‘সে আমাকে চেনে না এবং এখানে (হামাসের সঙ্গে আলোচনায়) বড় ধরনের ঝুঁকি আছে। তিনি এমন এক দেশে থাকেন, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলে, তা অন্য অনেক মানুষের ক্ষতি বা উপকার করতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাই, আমি ইসরায়েলের অস্বস্তি ও উদ্বেগের কারণ বুঝতে পারি। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, আমরা যুক্তরাষ্ট্র। আমরা ইসরায়েলের কোনো দালাল নই। আমাদের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। আমরা পারস্পরিক যোগাযোগ করেছি এবং নির্দিষ্ট কিছু সীমারেখার মধ্যে থেকেই কাজ করছি।’

অপরদিকে বোহলারের বক্তব্য ইসরায়েলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। টাইমস অব ইসরায়েলকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তারা বলেন, ‘আমরা অবাক হয়েছি যখন বোহলার বললেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের দালাল নয়।’

বর্তমানে কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় চলমান পরোক্ষ আলোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র হামাসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো গাজায় এখনো আটক থাকা মার্কিন নাগরিকদের মুক্ত করা।

বোহলার বলেন, ‘আমরা দুই সপ্তাহ শুধু বসে থাকার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এখন বাস্তব সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কিছু অগ্রগতি হতে পারে এবং জিম্মিদের বাড়ি ফিরতে দেখা যেতে পারে।’

ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল-১২ বোহলারের কাছে জানতে চায়, ‘বাস্তবতা বিবেচনায় হামাস শেষ পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যতে আর কোনো ভূমিকা রাখবে—এমনটা কী সম্ভব?’

উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি এটি সম্ভব।’

বোহলারের এই মন্তব্য ও যুক্তরাষ্ট্রের হামাসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনার মুখেও যুক্তরাষ্ট্র জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে সরাসরি যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

হামাসের হাতে ইসরায়েলি জিম্মিদের নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করছেন মার্কিন জিম্মিবিষয়ক দূত অ্যাডাম বোহলার। ছবি : সংগৃহীত
হামাসের হাতে ইসরায়েলি জিম্মিদের নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করছেন মার্কিন জিম্মিবিষয়ক দূত অ্যাডাম বোহলার। ছবি : সংগৃহীত



দ্রুত বিচার ও সংস্কারের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি নাহিদের

সরকারকে দ্রুত বিচার ও সংস্কারের রোডম্যাপ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

সোমবার (১০ মার্চ) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শহীদ পরিবার এবং আহতদের নিয়ে এনসিপির ইফতার মাহফিলে এ দাবি জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারকে বলব দ্রুত বিচার ও সংস্কারের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। কতদিনের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় আমরা দৃশ্যমান বিচার কার্যক্রম দেখতে পারব এবং দৃশ্যমান সংস্কার আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব, সেটার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অবিলম্বে ঘোষণা করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। তাকে আমরা আমন্ত্রণ-আহ্বান জানিয়ে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করেছিলাম, অন্যান্য উপদেষ্টাবৃন্দ রয়েছেন, সেনাপ্রধান রয়েছেন। তারা প্রত্যেকে কিন্তু কমিটমেন্ট দিয়েছিলেন মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং বিচারের দায়িত্ব তারা নিচ্ছেন। ফলে এই কমিটমেন্ট থেকে কিন্তু তারা দূরে সরে যেতে পারবেন না, জনগণের সামনে কিন্তু দাঁড়াতে হবে। ফলে আমরা কিন্তু ‘কড়ায় গণ্ডায়’ জবাবদিহিতা নেবো আমাদের বিচার কতটুকু আদায় হলো, সংস্কার কতটুকু আদায় হলো।

নির্বাচনের বিষয় উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের বলা হচ্ছে, আমরা নাকি নির্বাচন পেছানোর রাজনীতি করছি। খুব পরিষ্কারভাবে পাল্টা আপনাদের বলতে চাই, আপনারা বিচার ও সংস্কার পেছানোর রাজনীতি করবেন না। বিচার ও সংস্কারের প্রতি ঐক্যমত পোষণ করুন, নির্বাচন আমরা আপনাদের করে দিতে সহায়তা করব।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি নির্বাচনের জন্য এত তাড়াহুড়ো করে, ভোট চাইতে গেলে কিন্তু সেই জবাবদিহিতা তাদের দিতে হবে। আমরা বলব, বাংলাদেশে যে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমরা সেই ঐক্যমত্য ধরে রাখতে চাই।

নাহিদ বলেন, আমরা নির্বাচনের বিরুদ্ধে না, বরং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব বলেই নিজেরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছি। কিন্তু আমরা বলছি বিচার সংস্কার এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে বলেছি গণপরিষদ নির্বাচন, কারণ এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সংবিধান অকার্যকর ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা আপনাদের কাতারে নেমে এসেছি। আমরা নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছি। কারণ আমরা মনে করি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা সে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য আমরা কারো ওপর নির্ভর করতে চাই না, আমরা নিজেরাই মাঠে নেমে দাবি বাস্তবায়ন করতে চাই। শহীদ পরিবার এবং আহতসহ আমাদের সবার এই মুহূর্তে জরুরি দাবি- আমরা সবাই বিচার এবং সংস্কারের কথা বলছি। পাঁচ আগস্ট পরবর্তী এই নতুন বাংলাদেশে যে সরকার গঠিত হয়েছে এবং সামনে যারা রাজনীতি করতে চাচ্ছে- সবার ন্যায্যতা হচ্ছে শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধারা। ফলে তাদের মনের আকাঙ্ক্ষা আমাদের বুঝতে হবে।

নাহিদ বলেন, শহীদ পরিবার শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের খুনিদের আসামি করে শত শত মামলা করেছে। যদি এর বিচার ছাড়া আরেকটি সরকার চলে আসে তাহলে কী নিশ্চয়তা আছে, আওয়ামী লীগকে আবার এই বাংলাদেশে পুনর্বাসিত করা হবে না? অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোকে এবং সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে আওয়ামী লীগের ফয়সালা কী হবে।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি পাঁচ আগস্ট বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট রাজনীতির আর কোনো জায়গা হবে না, হবে না, হবে না।

দ্রুতই রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়ে নাহিদ বলেন, আমরা সম্মিলিতভাবে বিচার সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচন আদায়ে খুব দ্রুতই আবার রাজপথে নামব। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে একটি নতুন সংবিধান জাতিকে উপহার দিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। 

নাহিদ ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত
নাহিদ ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত

সিরিয়ায় সাধারণ মানুষ হত্যার ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসছে by মোস্তফা সালেম

সিরিয়ার নতুন সরকারের অনুগত সশস্ত্র ব্যক্তিরাই আলাউইত সম্প্রদায়ের সদস্যদের মাঠে-ময়দানে হত্যা করেছে। এই নির্মমতার কারণ হিসেবে দেশকে ‘পরিশুদ্ধ করার’ লক্ষ্যের কথা বলেছেন তাঁরা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও ভিডিও থেকে এমনটি জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও ভিডিওচিত্রে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদ সরকারের অনুগতদের ওপর নিপীড়নের রোমহর্ষ দৃশ্য ফুটে উঠেছে। এটা কার্যত ‘সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডে’ রূপ নিয়েছে।

সশস্ত্র বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে বাশার আল-আসাদ গত বছরের ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। আলাউইতদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দুটি প্রদেশে এই সহিংসতা হচ্ছে। এ বিষয়ে সিরিয়ার নতুন সরকারের বক্তব্য হলো, সাবেক সরকারের প্রতি অনুগত কিছু বিদ্রোহী এখনো রয়ে গেছে। তাদের শুরু করা বিদ্রোহ দমন করতে অস্ত্রধারীরা সেখানে ব্যবস্থা নিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের (এসএনএইচআর) তথ্যমতে, সহিংসতায় অন্তত ৬৪২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ রয়েছেন, যাঁদের অনেকে তরুণ ও যুবক। সরকারি বাহিনীগুলো ‘মাঠে-ঘাটে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড’ চালানোয় তাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন।

এসওএইচআরের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাতাকিয়া ও তারতুসে তিন দিনে আলাউইত সম্প্রদায়ের অন্তত ৭৪৫ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। সংঘাতে বাশারপন্থী যোদ্ধা নিহত হয়েছেন ১৪৮ জন। নতুন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন প্রায় ১২৫ জন।

সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা রোববার সহিংসতার জন্য আগের সরকারের বাহিনীর মধ্যে এখনো যাঁরা বাশারের অনুগত রয়ে গেছেন, তাঁদের দায়ী করেছেন। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

আল-শারা বলেছেন, ‘এখনো আসাদ বাহিনীর যারা টিকে আছে, তাদেরকে আমরা সহ্য করব না। তাদের সামনে কেবল একটি পথ খোলা আছে, তা হলো অবিলম্বে আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করা।’

একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন আল-শারা। সাম্প্রতিক সহিংসতাকে তিনি ‘অনুমেয় চ্যালেঞ্জ’ বলে বর্ণনা করেছেন। সহিংসতার ঘটনা খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন এবং আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছে তাঁর দপ্তর।

‘তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল’

যে দুটি প্রদেশে হামলা হয়েছে, তার একটি লাতাকিয়া। এটি সিরিয়ার প্রধান বন্দরনগরী। এই শহরের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছিল। যেন এটা তাদের কাছে একধরনের বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।...সমগ্র সিরিয়ায় তারা আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল।’

এই বাসিন্দা ৩০ বছর ধরে লাতাকিয়ায় বসবাস করছিলেন। গত শনিবার তিনি শহরটি ছেড়ে পালিয়ে যান। তিনি সিএনএনকে বলেন, শুক্রবার (৭ মার্চ) ভোরে তাঁরা রাস্তায় মানুষের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।

লাতাকিয়া শহরের আরেক বাসিন্দা বশির বলেন, ‘যাঁরা হত্যাকাণ্ড থেকে প্রাণে বেঁচে যান, তাঁরা পালাচ্ছিলেন। আমার ৭০ বছর বয়সী চাচা এবং তাঁর ৬০ বছর বয়সী স্ত্রীকে নিজেদের বাসায় ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। আমার চাচা ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক।’ নিহত এই দুই ব্যক্তিও আলাউইত সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের তারতুস প্রদেশের বানিয়াস শহরের বাসিন্দা।

‘আমি নিজের ও দুই সন্তানের জীবন নিয়ে ভয়ে আছি,’ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বশির।

আলাউইত অধ্যুষিত বিভিন্ন শহরে নতুন সরকারের বাহিনীর ওপর বাশারপন্থীরা হামলা চালাচ্ছে, এমন খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সরকার অনুগত সশস্ত্র ব্যক্তিরা দলে দলে লাতাকিয়া ও তারতুস প্রদেশের দিকে যাত্রা শুরু করেন।

৩৫ বছর বয়সী রাশা সাদেক জাতিগতভাবে আলাউইত। তিন সন্তানের এই জননী সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের হোমস প্রদেশে বাস করেন। রোববার তাঁর ভাইয়ের ব্যবসায়িক অংশীদার তাঁকে ফোন করে জানান, নতুন সরকারের সমর্থক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা তাঁর মা ও দুই ভাইকে হত্যা করেছে। নিহতরা তারতুস প্রদেশের বানিয়াস শহরে থাকতেন।

হোমস প্রদেশের ওই নারী বলেন, ‘আমি সার্বক্ষণিক আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম। তাঁরা গোলাগুলির শব্দ শোনার কথা জানিয়েছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, তাঁর পরিবারের সদস্যরা ধর্মীয় স্লোগান শোনার কথাও জানিয়েছিলেন। তাঁর পরিবার বাশারপন্থী ছিল না, ছিল সাধারণ মানুষ।

বাশার আল–আসাদের পরিবারও আলাউইত সম্প্রদায়ের। বাশারপন্থী যোদ্ধারাও আলাউইত সম্প্রদায়ের সদস্য। এটি শিয়াধর্মাবলম্বীদের একটি শাখা। সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলেই এই সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ বাস করেন। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের অধিকাংশের সঙ্গে বাশার পরিবারের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।

গত ডিসেম্বরে সুন্নি সশস্ত্র ইসলামপন্থীদের হাতে বাশার সরকারের পতনের আগে তাঁর পরিবার অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে সিরিয়া শাসন করেছে। নতুন শাসকেরা দেশটির রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক শৃঙ্খলা ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছে। নতুন শাসক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)। দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ও এইচটিএসের মূল নেতা আহমেদ আল-শারা আল-কায়েদার সাবেক সদস্য। ক্ষমতায় আসার পর তিনি রাজনৈতিক সমতা এবং জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময় সিরিয়ার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন পর্যন্ত নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সিরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ আলাউইত। বাশার সরকারের আমলে তাঁদের দাপট ছিল। ডিসেম্বরে বাশারের পতনের পর এই সম্প্রদায়ের অনেকে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন, তবে এখনো অনেকে তা করেননি।

বাশারপন্থীরা এইচটিএসের সদস্যদের ওপর গুপ্ত হামলা চালাচ্ছে এবং তাঁদের হত্যা করছে—এ খবর ছড়ানোর পর সরকারি বাহিনী পাল্টা হামলা শুরু করে। যে সশস্ত্র আক্রমণের মুখে বাশারের পতন ঘটে, সেই ঝটিকা হামলার নেতৃত্ব ছিল এই গোষ্ঠীর হাতে।

লাতাকিয়া শহরের বাসিন্দা বশির সিএনএনকে বলেন, ‘তারা [অস্ত্রধারীরা] যেসব গ্রামে হামলা চালিয়েছে, সেসব গ্রামের আসাদের অনুগতরা থাকত না। তারা এসব গ্রামে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে।’

সিরিয়ার সরকারি একটি সূত্র দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমকে বলেছে, ‘বিপুলসংখ্যক অসংগঠিত মানুষ’ ওই এলাকায় যাওয়ার পর সেখানে ‘ব্যক্তিগতভাবে আইন লঙ্ঘনের’ ঘটনা ঘটেছে।

সিরিয়া সরকার শনিবার সিএনএনকে বলেছে, বৃহস্পতিবার থেকে তাঁদের নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছে। বাশারপন্থীদের সঙ্গে সংঘাতের সময় ৩০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে হতাহতের সংখ্যা আলাদা করে নিশ্চিত করতে পারেনি সিএনএন।

‘পরিশুদ্ধির লড়াই’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি ভিডিওতে, ব্যাপক মাত্রার এই সহিংসতার আগে আগে গাড়ির বহর নিয়ে সশস্ত্র ব্যক্তিদের লাতাকিয়া ও তারতুসে যেতে দেখা যায়। সশস্ত্র ব্যক্তিদের বহরে থাকা এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আগেরটি ছিল স্বাধীনতার লড়াই। এখন চলছে সিরিয়াকে পরিশুদ্ধ করার লড়াই।’ তবে ভিডিওটি ঠিক কখন ধারণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘হেই আলাউইত, তোমাদের ও তোমাদের বাপদের হত্যা করার জন্য আমরা আসছি।’ রাতে ধারণা করা ওই ভিডিওতে এই ব্যক্তির উচ্চারণ মিসরীয় বলে মনে হয়েছে।

‘সবাই অস্ত্র নিয়ে বের হয়েছে। আমরা তোমাদেরকে সুন্নিদের [শক্তি] কেমন তা দেখিয়ে দেব।’ এই ভিডিও কোন জায়গায় ধারণা করা হয়েছে, তা নির্ধারণ করতে পারেনি সিএনএন। তবে ভিডিওটিতে বিপুলসংখ্যক গাড়ি দেখা গেছে।

বিপুলসংখ্যক এসব অস্ত্রধারী লাতাকিয়া ও তারতুসে যাওয়ার পরপরই ভয়াবহ সহিংসতার খবর আসতে শুরু করে। কিছু ভিডিওর স্থান নির্ধারণ করতে পেরেছে সিএনএন। এসব ভিডিও আল মুখতারেয়াহ গ্রামের। সেখানে মাটিতে শায়িত কয়েক ডজন মরদেহ ঘিরে লোকজনকে শোক করতে দেখা গেছে।

‘এরা সবাই আলাউইত শুয়োর’—একটি ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে এই কথা বলতে শোনা যায়। খোলা মাঠে দেখতে একটি মরদেহকে গুলি করার আগে তিনি এই উক্তি করেন। কোথায় বা কখন এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা স্পষ্ট নয়।

সিরিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো আরেকটি ভিডিওতে সামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে মোটরসাইকেলে চড়ে একটি ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ওই ঘরের এক বাসিন্দাকে হত্যা করার আগে তাঁকে ক্যামেরার দিকে তাকাতে বলেন ওই অস্ত্রধারী।

অস্ত্রধারী হাসতে হাসতে বলেন, ‘গাদ্দার, আমি তোকে ধরে ফেলেছি।’ ওই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে আবারও গুলি করার আগে অস্ত্রধারী বলেন, ‘এখনো তুই মরিসনি? তোর এখনো মৃত্যু হয়নি?’

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তি একটি ভবন থেকে এক জিম্মিকে বের হতে বলেন। নির্মমভাবে গুলি করে মারার আগে তাঁকে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করতে নির্দেশ দেন তিনি।

ওপরে উল্লেখ করা দুটি ভিডিওর কোনোটির সত্যতা সিএনএন যাচাই করতে পারেনি। কিন্তু গত কয়েক দিনে সিরিয়ায় যেসব ভিডিও বের হয়েছে, এই দুটি সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এসব ভিডিওতে ক্যামেরার সামনে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।

এসব হামলা সিরিয়ার বর্তমান সরকারের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এই শাসকগোষ্ঠী অতীতে জিহাদি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে নিজেদের তা থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করছে।

বশির বলেন, ‘তিন মাস আগ থেকে আজ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে, তা পাঁচ দশকে আসাদরা [বাশার আল-আসাদ ও তাঁর বাবা হাফিজ আল-আসাদ] যা করেছেন, তার সঙ্গে তুলনীয়। আসাদরা অপরাধী ছিলেন। এরাও (নতুন শাসকেরা) অপরাধী।’

মোস্তফা সালেম সিএনএনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন। এর আগে তিনি রয়টার্সের আঞ্চলিক ভিডিও সংবাদ প্রযোজক ছিলেন। প্রতিবেদনটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ তাসনিম আলম।

নিহত এক ব্যক্তিকে কবর দিচ্ছেন স্বজনেরা। সিরিয়ার উপকূলীয় লাতাকিয়া প্রদেশের জাবলেহ শহরে, ১০ মার্চ ২০২৫
নিহত এক ব্যক্তিকে কবর দিচ্ছেন স্বজনেরা। সিরিয়ার উপকূলীয় লাতাকিয়া প্রদেশের জাবলেহ শহরে, ১০ মার্চ ২০২৫ ছবি: এএফপি

শেখ হাসিনা গাজার মতো বিধ্বস্ত এক দেশ রেখে গেছেন: গার্ডিয়ানকে অধ্যাপক ইউনূস

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যখন গত আগস্টে বাংলাদেশে ফেরেন, তখন তাঁর চারপাশে বিষাদময় দৃশ্য। রাজপথে তখনো রক্তের দাগ লেগে ছিল। মর্গে রাখা ছিল এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী ও শিশুর মরদেহ, যাঁদের শরীরে ছিল পুলিশের ছোড়া বুলেটের আঘাত।

১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবে শেখ হাসিনা সবে তখন ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। তিনি একটি হেলিকপ্টারে করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তাঁর নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে উন্মুখ হয়ে থাকা সাধারণ মানুষ তাঁর বাসভবনে লুটপাট চালিয়েছেন।

দরিদ্রদের মাঝে ক্ষুদ্রঋণ প্রবর্তনের জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া ৮৪ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ ইউনূস অনেক আগেই তাঁর রাজনৈতিক বাসনা ত্যাগ করেছেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি হাসিনার দিক থেকে অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হাসিনা তাঁকে রাজনৈতিক হুমকি মনে করতেন এবং তাঁকে বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতেন না।

তবে শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীরা যখন তাঁকে (মুহাম্মদ ইউনূস) বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নেতৃত্ব দিতে বললেন, তিনি রাজি হলেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘যে ক্ষতি তিনি (হাসিনা) করে গেছেন, তা বিশাল। এটা আরেক গাজার মতো পুরোপুরি বিধ্বস্ত এক দেশে পরিণত হয়েছে। পার্থক্য যা হলো এখানে ভবন নয়, তিনি ধ্বংস করেছেন প্রতিষ্ঠান, নীতিমালা, মানুষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।’

হাসিনার শাসনামল ছিল স্বৈরশাসন, সহিংসতা ও দুর্নীতির অভিযোগে ভরা। জুলাই ও আগস্ট মাসে কয়েক সপ্তাহের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এর চূড়ান্ত পতন হয়। তাঁর দমনমূলক শাসন, পুলিশের সহিংস দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। জাতিসংঘের মতে, এসব কর্মকাণ্ড ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তিনি (হাসিনা) অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ইউনূসের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকে দেশের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তিনি (ইউনূস) দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে হাসিনার সুরক্ষাবলয় থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানো ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করেছেন। যেসব গোপন আটক কেন্দ্রে হাসিনার সমালোচকদের নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো খালি করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং হাসিনার বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ আনা হয়েছে, যেগুলো তিনি (হাসিনা) অস্বীকার করছেন।

ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এই বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে, বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যা হবে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এর পরে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।

তবে ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে এমন অনুভূতি হয় যে দেশটি এক গর্তের মধ্যে আছে। ইউনূস এখনো ব্যাপকভাবে সমাদৃত হলেও তাঁর শাসনকার্য চালানোর সক্ষমতা এবং প্রতিশ্রুত সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য ইউনূসের ওপর চাপ বাড়ছে, তাঁর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেসব শিক্ষার্থী বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরাও তাঁদের নিজস্ব দল গঠন করেছেন।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচন খুব শিগগির না-ও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এ সরকার কেবলই অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে আছে। এ মুহূর্তে দৈনন্দিন কাজের জন্য কাউকেই জবাবদিহি করা যাচ্ছে না এবং সংস্কার করার মতো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ম্যান্ডেট এবং সক্ষমতা তাদের নেই।’

আইনশৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে

শেখ হাসিনার শাসনামলে নানা কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ছে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগও আনা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু পুলিশ সদস্য নিজেদের কর্মস্থলে ফিরে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ঢাকার রাস্তাগুলোয় অপরাধী চক্রের তৎপরতা ব্যাপকহারে বেড়েছে এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। গত সোমবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের দাবি—ক্রমবর্ধমান অপরাধে লাগাম টানতে ব্যর্থতার জন্য উপদেষ্টাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে।

শেখ হাসিনার শাসনামলের চেয়ে বর্তমানে রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা কম, এমন কথা অস্বীকার করেছেন অধ্যাপক ইউনূস। তবে অন্যরা সতর্ক করেছেন যে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তাঁর সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রখ্যাত ছাত্রনেতা এবং নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান নাহিদ ইসলাম গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা অসম্ভব’ হবে।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং অধ্যাপক ইউনূসের ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গত সপ্তাহে একটি বক্তব্যে তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, দেশ ‘অরাজকতার’ মধ্যে রয়েছে এবং বিভাজনের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা চলমান থাকলে ‘এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’ অধ্যাপক ইউনূস বলে আসছেন, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাঁর ‘খুবই ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে এবং সেনাপ্রধানের দিক থেকে ‘কোনো চাপ’ নেই। অবশ্য কেউ কেউ জেনারেল ওয়াকার–উজ–জামানের বক্তব্যকে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বকে কঠোরভাবে তিরস্কার এবং এমনকি সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের সতর্কবার্তা হিসেবে মনে করছেন।

দেশের দুর্দশাকে শেখ হাসিনার শাসনের পরিণতি হিসেবে তুলে ধরতে দৃঢ়সংকল্প অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেছেন, ‘হাসিনার আমলে কোনো সরকার ছিল না, এটি ছিল ডাকাতদের একটি পরিবার। নেতার কাছ থেকে যেকোনো নির্দেশ এলে তা পালন করা হতো। কেউ সমস্যা সৃষ্টি করছে? আমরা তাদের গায়েব করে দেব। একটি নির্বাচন আয়োজন করতে চান? আমরা নিশ্চিত করব, আপনি সব আসনে জয় পাবেন। আপনি অর্থ চান? ব্যাংক থেকে নেওয়া লাখ লাখ ডলারের ঋণ রয়েছে, যা আপনাকে কোনো দিন পরিশোধ করতে হবে না।’

শেখ হাসিনার অধীনে যে মাত্রায় দুর্নীতি হয়েছে, তা দেশের ব্যাংকব্যবস্থাকে ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। শেখ হাসিনার আত্মীয়দের মধ্যে অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক রয়েছেন। তিনি যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি থেকে নির্বাচিত একজন পার্লামেন্ট সদস্য। বাংলাদেশে দুর্নীতির তদন্তে তাঁর নাম আসায় এবং শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাড়িতে বসবাসের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে তিনি যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘সিটি মিনিস্টার’–এর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি কোনো অনিয়মে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শেখ হাসিনার মিত্রদের সরিয়ে নেওয়া আনুমানিক ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার উদ্ধারের চেষ্টায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডের আর্থিক কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যক্রম চলছে। তবে সেই অর্থ শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে আনার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণে ব্যাংকগুলোকে মানুষের অর্থ লুট করতে পূর্ণ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।

অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কট্টর ইসলামি ডানপন্থীদের উত্থান নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনার আমলে জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামি দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং ইসলামপন্থী রাজনৈতিক নেতারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তারা এখন স্বাধীনভাবে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছেন এবং তাদের সমর্থনও বাড়তে দেখা গেছে। একই সময়ে নিষিদ্ধ ইসলামি সংগঠনগুলোও আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় ইসলামি কট্টরপন্থীদের বাধার মুখে কিশোরীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আর গত শুক্রবার খিলাফতের দাবিতে ঢাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের মিছিলে অংশ নেওয়া শত শত সদস্যকে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে পুলিশ।

ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার তৎপরতা

অধ্যাপক ইউনূসের ওপর সবচেয়ে বড় কিছু চাপ এসেছে বাংলাদেশের বাইরে থেকে। ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আর এখন তিনি প্রতিবেশী এই দেশটিতে পালিয়ে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি হয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালে এই সম্পর্ক উন্নয়নে খুব কম আগ্রহ দেখাচ্ছে ভারত। সম্প্রতি নয়াদিল্লি ঢাকার বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদকে স্বাভাবিকীকরণের’ অভিযোগ তুলেছে।

বিচারের জন্য শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে গত ডিসেম্বরে ভারতের কাছে তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ভারত সরকারের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ‘কোনো সাড়া’ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখনো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে, এমনকি যদি তিনি অনুপস্থিতও থাকেন।

অধ্যাপক ইউনূসের সমালোচনায় ক্রমে সোচ্চার হচ্ছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি তিনি অধ্যাপক ইউনূসকে ‘মবস্টার’ আখ্যা দিয়েছেন, যিনি বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসীদের’ মুক্তি দিচ্ছেন। অপর দিকে অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিচ্ছে তা সহ্য করা হবে, তবে ‘আমরা যা করেছি, তা বদলে দেওয়ার জন্য ভারতকে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে তাঁকে প্রচার চালিয়ে যেতে দেওয়াটা হবে বিপজ্জনক। এটা দেশকে অস্থিতিশীল করবে।’

ভারত সরকারই শুধু অধ্যাপক ইউনূসের একমাত্র সমস্যা নয়। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিরে আসাও তাঁর জন্য একটি খারাপ সংবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ছিল অধ্যাপক ইউনূসের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষকদের অন্যতম, সেটা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুভাবেই। তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনাটা ট্রাম্পের জন্য অগ্রাধিকার তালিকায় থাকার সম্ভাবনা কম।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ইউএসএইডের কার্যক্রম স্থগিত করায় একটি ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলারের (১০০ কোটি ডলার) চেয়ে বেশি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইউএসএইড। সম্প্রতি এক বক্তব্যে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশে ২৯ মিলিয়ন ডলার গেছে রাজনৈতিক পরিসর শক্তিশালী করতে এবং তাদের সহায়তা করতে, যাতে তারা ‘একজন কট্টর বাম কমিউনিস্টকে ভোট দিতে পারে’। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশে ট্রাম্পের শতকোটিপতি সমর্থক ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক চালুর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস। তাঁর আশপাশে থাকা সূত্র বলেছে, আগামী এপ্রিলে ইলন মাস্ক বাংলাদেশ সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

অধ্যাপক ইউনূস আশা করছেন যে ট্রাম্প বাংলাদেশকে একটি বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ‘বিনিয়োগের ভালো সুযোগ’ হিসেবে দেখতে পারেন। তিনি বলেছেন, ইলন মাস্কের ঢাকা সফরকালে তাঁর সামনে বিষয়টি তুলে ধরার কথা ভাবছেন তিনি। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘ট্রাম্প একজন ব্যবসাবান্ধব মানুষ। সুতরাং আমি তাঁকে বলছি, আসুন, আমাদের সঙ্গে চুক্তি করুন।’ অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, তিনি যদি চুক্তি না করেন, তাহলে বাংলাদেশ হয়তো কিছুটা সমস্যাবোধ করবে, কিন্তু ‘এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না’।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে  সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ওই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ওই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট

সিলেটের পথে পথে টর্চার সেল by মিজানুর রহমান

এতটা নির্দয় ও নিষ্ঠুর কখনো ছিল না সিলেট। আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত জালালাবাদ অঞ্চলের সামাজিক এবং রাজনৈতিক সম্প্রীতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। পতিত আওয়ামী শাসনের শেষক’টি বছর ছিল ভয়ঙ্কর। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে সিলেটের রাজনীতি ‘বিষাক্ত’ রূপ নেয়। ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতার আসনে আমৃত্যু থাকবেন’- এমন ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে নেতাকর্মীদের মাঝে। সিলেটে গ্রুপিং-লবিং তথা রাজনৈতিক পোলারাইজেশন ঘটে তখনই।

রাজনৈতিক কর্মীদের বাইপাস করে নিজ নিজ বলয় শক্ত করতে ডেভিল বা খারাপ লোকদের কাছে টানতে শুরু করেন সিনিয়র গ্রুপ লিডাররা। বিষয়টি এমন ছিল- ‘যাই করো, তোমরা শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকো।’ ওই সময় হাইকমান্ড থেকে চাপিয়ে দেয়া অনেককে নেতা হিসেবে মানতে হয় সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিকদের। যদিও এ নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল ৫ই আগস্ট তাদের পতনের দিন পর্যন্ত। আরোপিত এবং মাঠের নেতাদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার সুযোগ কাজে লাগায় বিভিন্ন উপ-গ্রুপের আশ্রয়ে থাকা অপরাধী চক্র। তারা নেতাদের পেছনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ঠিক রেখে শেষ পর্যন্ত নিজেদের আখের গুছিয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, মানুষকে হয়রানি, বাড়িঘর নির্মাণে চাঁদাবাজি, চোরাকারবার, পরিবহন, ফুটপাথ থেকে চাঁদা আদায়, টেন্ডারবাজিসহ হেন কাজ নেই যা তারা করেনি। এতে কোথাও কেউ বাধ সাধলে লেগে যেত দ্বন্দ্ব। তাদের ধরে এনে টর্চার সেলে চলতো বর্বর নির্যাতন। সেই বর্বরতা থেকে নারীরাও রক্ষা পায়নি।
রিপোর্ট বলছে, প্রত্যেক গ্রুপেরই ছিল একাধিক টর্চার সেল। তারা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, কোনো কোনো টর্চার সেল ছিল ওপেন সিক্রেট। দিনের আলোতেই ভিন্নমত এবং তাদের অপরাধের পথে প্রতিবন্ধকদের ধরে এনে নৃশংস নির্যাতন করা হতো। গ্রুপিং রাজনীতির কারণে প্রত্যেক গ্রুপ লিডার ঘটনা-দুর্ঘটনার বিষয়ে অবহিত হতেন, কখনো কখনো আটকদের উদ্ধারে হস্তক্ষেপ করতেন। কিন্তু তারা তা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। ফলে পথে পথে ওপেন সিক্রেট এসব টর্চার সেলে দিনের পর দিন বহু মানুষ বর্বরতার চরম শিকার হয়েছেন।

মেজরটিলা টেক্সটাইল মিল এলাকার এক নারী প্রত্যক্ষদর্শীর (আঞ্চলিক ভাষায়) বয়ান ছিল  এমন “আমি এখনো রাতে ঘুমাইতে পারি না ভাই। ঘুমের ঘোরে ওউ পুয়াটার কান্না হুনি। পুয়াটায় বারবার চিৎকার করে কইছলো আমারে গুল্লি করি মারিলা, তবুও পিঠাইছনা। আধ-মরা করে পুয়াটারে ফার্মেসির বেঞ্চে শুয়াইলো কাফিরর বাচ্ছারা। আমি বেটি মানুষ, তবুও মনে হইছে হাসপাতাল নিয়া যাই’।

ভিকটিম ছেলেটা মেজরটিলা এলাকার বাইরের (বহিরাগত) ছিল এমন দাবি করে ওই গৃহবধূ জানান, তারা পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। কেবল ধরে এনে নির্যাতন নয়, স্থানীয়দেরও নানাভাবে ডিস্টার্ব করতো ওরা। ভয়ে কেউ কাউকে মুখ খুলতো না, উদ্ধার দূরে থাক। সাধারণরা তাদের পাশ দিয়ে যেতেও সাহস করতেন না। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া তথ্য মতে কেবল মেজরটিলা, শাহপরান এলাকা নয়, সিলেটে পথে পথে ছিল অন্তত অর্ধশত টর্চার সেল। এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হল ছিল একেকটি মিনি ক্যান্টনমেন্ট। অস্ত্র-গোলাবারুদ সবই মজুত থাকতো হলগুলোতে। সেখানে আয়নাঘরের অস্তিত্বও ছিল।  পরিত্যক্ত ঘর বা সিঁড়ির গোড়ায় থাকা রুমে ছাত্রদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করতো ছাত্রনেতা নামধারী ডেভিলরা। সিলেটের ক্যাম্পাসগুলোতে আটকে রেখে ধর্ষণ ও নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক এবং শারীরিক টর্চারের অনেক প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন।

রিপোর্ট বলছে, ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণকারী ছাত্রলীগের গ্রুপের সঙ্গে না থাকলে, গ্যাং লিডারদের সালাম না দিলে বা বিরোধী মতাবলম্বী হলেই তাদের  শাস্তি ছিল অবধারিত। বর্বর এসব নির্যাতনে অনেকে পরবর্তীতে মারা গেছেন। কেউ পঙ্গুত্ববরণ বা অসুস্থতা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। ৫ই আগস্টের পর সিলেটে টর্চার সেলগুলো থেকে লাঠি, হকিস্টিক, ক্রিকেট স্ট্যাম্প, চেইন, লোহার রড ছাড়াও ইলেকট্রিক শক দেয়ার মতো ভয়ঙ্কর নির্যাতন-সামগ্রী উদ্ধার করেছে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।

গ্রুপভিত্তিক টর্চার সেল, নিয়ন্ত্রকদের যত কীর্তি: সিলেটে আওয়ামী লীগের একটি বড় গ্রুপ হচ্ছে তেলিহাওর। যে গ্রুপের মূল নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান। তার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন দু’টি টর্চার সেলে চলতো নির্যাতনের স্টিম রোলার। নাসির গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুজেল তালুকদার ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তানভীর আহমদ ছিল ওই দুই সেলের নিয়ন্ত্রক। আখালিয়া বিডিআর স্কুলের পেছনে সুজেল ও তানভীরের দখল করা বাড়িতে ছিল একটি টর্চার সেলের অবস্থান। ওই সেলকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকাকে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে তারা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, খোদ হাসিনা আমলেই অস্ত্র, মাদকসহ গ্রেপ্তার হয় সুজেল-তানভীর।

নাসির গ্রুপের আরেকটি টর্চার সেল ছিল জেলা যুবলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি সেলিম উদ্দিনের এলাকা সাদাটিকরে। ওই সেল পরিচালনা করতো যুবলীগ নেতা আব্দুল হাই, অলিউর রহমান, দুলাল আহমদ ও জুয়েল খান। এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখতে গিয়ে সেলিম উদ্দিনের বাসার গলিতে নিয়ে অনেককে মারধর করা হতো।

সিলেটের নাম্বার ওয়ান ডেভিল খ্যাত রঞ্জিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল অন্তত ১০টি টর্চার সেল। টিলাগড়ের গোপালটিলাস্থ রঞ্জিতের বাসার গলিতে ছিল একটা সেল। এটি পরিচালনা করতো রঞ্জিতের নিকটাত্মীয়  ছাত্রলীগ নেতা রাজিব সরকার। গোপালটিলার বাসিন্দারা জানিয়েছেন- সন্ধ্যা হলে ভয়ে ওই গলি দিয়ে তারা যাতায়াত করতেন না। প্রায় সময় গলি থেকে তারা চিৎকার শুনতেন। এ সেলের নিয়ন্ত্রকদের তালিকায় রঞ্জিতের ভাগ্নে মিঠু তালুকদারের নামও রয়েছে।

মেজরটিলা ওয়ান ব্যাংকের বিল্ডিংয়ের পেছনের অংশ ছিল সিলেটের আলোচিত টর্চার সেল। এ সেলের নিয়ন্ত্রক ছিল রঞ্জিতের সেকেন্ড ইন কমান্ড ওই এলাকার অপরাধের মূল হোতা কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম। তার সঙ্গে ছিল জেলা যুবলীগের অর্থ সম্পাদক কামরুল ইসলাম, তার ভাই জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম ও ওয়ান ব্যাংক বিল্ডিংয়ের মালিক কাইয়ূম চৌধুরী। ওই টর্চার সেলে প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ জনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। বহুতল ওই বিল্ডিংয়েই ছিল আগ্নেয়াস্ত্রের গোডাউন। জমি কিনতে আসা প্রবাসী, পরিবহন শ্রমিক, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতন করা হতো ওই সেলে। মেজরটিলার সিদ্দিক প্লাজার নিয়ন্ত্রক ছিল কাউন্সিলর রুহেল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আমির আলী, যুবলীগ নেতা রুমন আহমদ, যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী ওরফে অস্ত্র আলী। মেজরটিলা বাজারের ব্যবসায়ী, টমটম চালক, সিএনজি চালক, ভাসমান হকারদের সেখানে এনে নির্যাতন করা হতো। শাহপরান হাসপাতালের পাশে ছিল জাহাঙ্গীরের ভাগ্নে ও আলোচিত ছাত্রলীগ ক্যাডার হাবিবুর রহমান পংকির টর্চার সেল। তার ভাই ছাত্রলীগ ক্যাডার মুজিবুর রহমান রুহিতের টর্চার সেল ছিএ খাদিম চৌমুহনা সংলগ্ন ছড়ার সঙ্গে যুক্ত একটি আন্ডারগ্রাউন্ডে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- ওই টর্চার সেলে চিনি বহনকারী ট্রাকের চালকদের মারধর করা হতো। স্থানীয়দের কেউ কেউ ওই সেলকে আয়নাঘরও বলতেন। ৫ই আগস্টে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ওই টর্চার সেল থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও ভারত থেকে আসা চোরাই পণ্য চা পাতা, চিনি, কসমেটিক্স উদ্ধার করেছে। শাহপরান মাজার গেটের ঠিক উল্টোদিকে প্রত্যাশা কমপ্লেক্স। এর পেছনে আরেকটি টর্চার সেল ছিল পংকি ও রুহিতের সহোদর মিজানুর রহমান রকির। শাহপরান বাজারের ব্যবসায়ী, এলাকার প্রবাসীরা চাঁদা না দিলে তাদের ওই টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। রাতে চলতো অসামাজিক কাজও। ৫ই আগস্টের পর গা ঢাকা দিয়েছিল দুর্ধর্ষ ওই ছাত্রলীগ ক্যাডার। শ্বাসরুদ্ধকর এক অবস্থা থেকে মোটামুটি মুক্তি পেয়েছিল শাহপরান এলাকা। কিন্তু ৬ মাসের ব্যবধানে তারা ফের আতঙ্কিত। রকি এখন ছাত্রদল পরিচয়ে প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছে জানিয়ে এক ব্যবসায়ী বলেন, স্থানীয় এক ছেলেকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের কারণে রকির সঙ্গে এলাকাবাসীর দ্বন্দ্ব হয়। পাশের মৎস্যজীবী দু’টি গ্রামের মানুষের ওপর নানাভাবে অত্যাচার করতো তারা। প্রায়ই মৎস্য ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে যেতো। এ নিয়ে বিচার সালিশ হয়েছে বহুবার, কিন্তু কাজ হয়নি। এক পর্যায়ে গোটা গ্রামবাসী রকি, পংকি, তার বাবা রাজা মিয়া এবং মামা কমিশনার জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আতঙ্কিত ওই ব্যবসায়ী মানবজমিন প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে বলেন, ৫ই আগস্টের আগে রকিরা ছিল আওয়ামী লীগ। এখন ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছে সে নাকি বিএনপি।রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, আমরা তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে চাই।

চিনি চোরাচালানে ভাগ বসাতে বিসিকে টর্চার সেল:
বিসিক শিল্প নগরী এলাকায় ছাত্রলীগ ক্যাডার আহমদ সাজন এবং সুরমা গেইটে হাসান আহমদ আরও দুটি টর্চার সেল গড়ে তুলে। সিলেট-তামাবিল রুটের চলাচলকারী চিনি চোরাচালানে ব্যবহৃত ট্রাকের চালকদের বন্দি রাখা হতো ওই দুটি টর্চার সেলে। প্রায় সময় চিনি লুট করে দু'টি সেলে রাখা হতো। ৫ই আগস্ট স্থানীয়রা হাসানের বাড়ি ও মোটরসাইকেলের দোকানে আগুন দেয়। সেই সঙ্গে তার টর্চার সেলও গুঁড়িয়ে দেয়। দাসপাড়ায় ডেভিল রঞ্জিত সরকারের ঘনিষ্ঠ সিনিয়র সাইফুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠান সাইফুল এন্টারপ্রাইজের পেছনকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতো। বর্তমানে সাইফুল পলাতক। এ ছাড়া এমসি কলেজে ছাত্রলীগ সভাপতি দেলোয়ার হোসেন রাহী, সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি রুহেল দুটি টর্চার সেল চালাতো। স্থানীয়  কামরুল ও সাবেক ছাত্রনেতা দেবাংশু দাস মিঠুর নেতৃত্বে এমসি কলেজ হোস্টেলে আরেকটি টর্চার সেল ছিল। ডেভিল রঞ্জিত সরকারের নিয়ন্ত্রিত ছাত্রলীগ ক্যাডাররা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আরও দুটি টর্চার সেল গড়ে তুলেছিল। ডেথ জোন খ্যাত টিলাগড়ের এক সময়ের অধিপতি মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ। হাসিনা সরকারের পতনের বহু আগে থেকেই তার গ্রুপের শক্তি কমতে থাকে। তারপরও নিভু নিভু আলোতে নিজের গ্রুপটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন পারিবারিকভাবে প্রভাবশালী কমিশনার আজাদ। তার গ্রুপের নেতাদেরও একটি টর্চার সেল ছিল।

বালুচরে মসজিদ সংলগ্ন চৌরাস্তায় সবচেয়ে বড় টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণ করতো আলোচিত কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপু। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে তার গ্রুপের অনুসারীরা ওই এলাকায় মহড়া দিতো।  সম্প্রসারিত সিটি হওয়ায় বালুচরে তখন অনেকে বাসাবাড়ি করছে। বিভিন্ন নামে তাদের চাঁদার জন্য বাধ্য করতো নিপু, রাজি না হলে ধরে এনে সেলে রেখে নির্যাতন করতো। দু'বছর আগে নিপু গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা আরিফ আহমদকে কুপিয়ে খুন করে। এ ঘটনায় নিপুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। এতে তার গ্রুপের ১০ ক্যাডারসহ তাকে জেলে যেতে হয়।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমানের কাছের লোক টিলাগড়ের আলোচিত হেরোইন সম্রাট কবির ওরফে হেরোইন কবিরের টর্চার সেল ছিল পূর্ব শাপলাবাগে। দেশ কাঁপানো জঙ্গি নেতা শায়খ আব্দুর রহমানের এক সময়ের আস্তানা পূর্ব শাপলাবাগ। সূর্যদীঘল বাড়ি খ্যাত সেই আস্তানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিশপ্ত সূর্যদীঘল বাড়ির পাশেই  হেরোইন কবিরের আস্তানা। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে প্রতিবাদী বা প্রতিপক্ষের লোকজনকে ধরে নিয়ে কবির তার সেলে রেখে নির্যাতন করতো। হাসিনা সরকারের প্রথমদিকে হেরোইন ও ইয়াবার অন্যতম প্রধান হাট ছিল পূর্ব শাপলাবাগ।

বাগবাড়ি থেকে রিকাবীবাজার বিধান গ্রুপের ৩ টর্চার সেল:
সিলেটের আলোচিত ক্যাডার ও নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বিধান কুমার সাহার নেতৃত্বে নগরীর বাগবাড়ির আখড়া মন্দির, মনিকা সিনেমা হলের সামনে এবং রিকাবীবাজার স্টেডিয়াম এলাকায় তিনটি টর্চার সেল ছিল। বাগবাড়ি আখড়া মন্দির সেলের নিয়ন্ত্রণ করতো বিধানের নিকট আত্মীয়  মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক বিদ্যুৎ ভূষণ দেব। সঙ্গে যুবলীগ নেতা বিপ্লব দাশ, শিবু দাশ, গোবিন্দ দাশ, সৌমিত্র সেন, টিপু দত্ত পুরকায়স্থসহ জেলার ছাত্রলীগের দুর্ধর্ষ ক্যাডাররা। ওই সেলের নানা কাহিনী এখন মানুষের মুখে মুখে। মদিনা মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকরা তাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রিকাবীবাজার ছিল তার অন্যতম টর্চার সেল। পুরাতন একটি ভবন দখলে নিয়ে সেখানে এটি গড়ে তোলা হয়। এ সেলের নিয়ন্ত্রক বিধানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী জেলা যুবলীগ সম্পাদক শামীম ওরফে সীমান্তিক শামীমের বন্ধু জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি হাসান আহমদ চৌধুরী, মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অরুন দেবনাথ সাগর, জেলা যুবলীগের সদস্য খালেদ আহমদ, সুহেল ওরফে বোঙ্গা সুহেল, মদন মোহন কলেজের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মিফতাহুল হোসেন লিমন। ওসমানী মেডিকেল এলাকায় মনিকা সিনেমা হলের সামনে একটি দোকানে টর্চার সেল চালাতো বিধান গ্রুপের নেতা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি  ছাত্রলীগ প্রেসিডেন্ট সাগর হোসাইন। সঙ্গে ছিল ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আলী আহমদ। পরবর্তীতে সাগর গ্রুপ বদলায়। সে নগরের আসাদ গ্রুপের নেতা হিসেবে ওই টর্চার সেলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। মহানগর

ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমএইচ ইলিয়াস দিনার দরগাহ গেইট এলাকায় একটি টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণ করতো। বিশেষ করে সিলেট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট থেকে আসা চোরাই চিনির ট্রাক চালকদের ওই সেলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। সিলেটের আলোচিত ক্যাডার পীযূষ ছিল ভয়ঙ্কর। প্রকাশ্য অস্ত্র হাতে সে একাধিকবার নগরীতে মহড়া দিয়ে আলোচনায় আসে। জল্লারপাড় ওয়াকওয়ে ও দাড়িয়াপাড়াস্থ পাঁচভাই রেস্টুরেন্টের গলিতে দু'টি টর্চার সেল ছিল তার। এ সেল দু'টি পরিচালনা করতো মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস অনিক, আকাশ সহ কয়েকজন দুর্ধর্ষ ক্যাডার। এ দুটি টর্চার সেল নিয়ে অতিষ্ঠ ছিলেন জিন্দাবাজারবাসী। দুটি টর্চার সেলের নানা ঘটনা বিভিন্ন সময় নগরে আলোচিত হয়েছে। এক সময় পীযূষ নগরের মাছুদিঘীরপাড়ের প্রবেশমুখের উল্টোপাশে জমি দখল করে টর্চার সেল গড়ে তুলে। ওই এলাকা থেকে পীযূষ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান জমিটির নিয়ন্ত্রণ নিলে পীযূষের বাহিনী আস্তানা পরিবর্তন করে।

পীরমহল্লার মূর্তিমান আতঙ্ক আফতাবের টর্চার সেল এবং...:
সিলেট মহানগরীর সুবিদবাজার এলাকার অপরাধ রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক কাউন্সিলর নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আপ্তাব হোসেন খানের। তার নেতৃত্বে তিনটি আলোচিত টর্চার সেল ছিল। জমি দখলে বাধা কিংবা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই ওইসব সেলে এনে টর্চার করা হতো নিরীহ লোকজনকে। এর মধ্যে আলোচিত টর্চার সেল ছিল আপ্তাবের পীরমহল্লা এলাকায় দখল করা একটি বাড়ি। প্রকাশ্য দিনদুপুরে ওই বাড়িতে নিয়ে লোকজনকে নির্যাতন করা হতো। এ নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ এয়ারপোর্ট থানায় দায়ের করা হলেও পুলিশের কোনো অ্যাকশন ছিল না।  পীর মহল্লার টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণে ছিল আপ্তাবের ভাই আমির হোসেন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম সুমন, অর্থ সম্পাদক শাহনূর আহমদ, ক্যাডার রুহিন, ফয়সল আহমদ, সায়মন্ড। আপ্তাবের অন্যতম সহযোগী কুখ্যাত ক্যাডার বাবুল হোসেন ওরফে পাঙ্গাশ নিয়ন্ত্রণ করতো বাদাম বাগিচার টর্চার সেল। ওই এলাকার কলোনির বাসিন্দা, ভাসমান হকার, রিকশা ও টমটম চালকরা চাঁদা না দিলে পাঙ্গাশ তার টর্চার সেলে ধরে এনে নির্যাতন করতো। বনখলাপাড়ার শেষ প্রান্তে ছিল আরেকটি টর্চার সেল।

ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রুবেল আহমদ ও মঞ্জুর আহমদ ওই সেলে লোকজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করতো। আম্বরখানা পয়েন্ট সংলগ্ন হোটেল হিমেলের ছাদে একটি টর্চার সেল ছিল। এ সেলের নিয়ন্ত্রক ছিল ছাত্রলীগ সম্পাদক রাহেল সিরাজ। ওই টর্চার সেলে এক ব্যবসায়ীকে মারধরের ঘটনায় সিরাজের সহযোগী সাদ্দাম গ্রেপ্তার হয়েছিল। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজের নিয়ন্ত্রণে ছিল বড়বাজার ও সাপ্লাই এলাকার আরও দুটি টর্চার সেল। বড়বাজার এলাকায় দু’বছর আগে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন বিএনপি নেতা আ ফ ম কামাল। জনশ্রুতি আছে; রাহেল সিরাজের সহযোগী সশস্ত্র ক্যাডাররা আ ফ ম কামালকে খুন করে। এ ঘটনায় সন্ত্রাসী রাজু সহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়। সাপ্লাই গলির মুখে রাহেল সিরাজের টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণ করতো গোয়াইনঘাট উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুফিয়ান আহমদ সহ কয়েকজন। রাহেলের ভাই রুমেল সিরাজ ও জৈন্তাপুরের আলমগীর হোসেনেরও ওই সেলে নিয়ন্ত্রণ ছিলো। 

mzamin

বানিয়াচংয়ে ৬ বছরের শিশু ধর্ষণ: সন্তানের বিবস্ত্রতা দেখে মারা গেলেন বাবা

হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ৬ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সন্তানের বিবস্ত্রতা দেখে মারা  গেছেন বাবা। ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার বিকালে বানিয়াচং সদরের ৪নং দক্ষিণ পশ্চিম ইউনিয়নের দক্ষিণ যাত্রাপাশা গ্রামে। এদিকে ঘটনার ১দিন পর সোমবার ধর্ষণের শিকার শিশুটির অসুস্থ পিতা দুপুর ১২টার দিকে নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর নানি  মোছা. মিনারা বেগম বাদী হয়ে বানিয়াচং থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।

এ ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে দক্ষিণ যাত্রাপাশা এলাকার বনমুথুরা গ্রামের সাজমান মিয়ার ছেলে নোফায়েল মিয়া এবং একই এলাকার ফরিদ মিয়ার ছেলে শামীম মিয়া নামে ২জনকে আটক করেছে। জানা যায়, গত রোববার বিকালে শিশুটিকে ১০টাকার একটি নোট হাতে দিয়ে তাকে টানা-হেঁচড়া করে পার্শ্ববর্তী বার্নিতলা ডালীগাছ নামক জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে দুই কিশোর। এ সময় শিশুটি  জোরে চিৎকার করতে লাগলে আশপাশের লোকজন এসে শিশুটিকে জঙ্গল থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে রেফার্ড করেন। বর্তমানে শিশুটি হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে  চিকিৎসাধীন আছে। এ বিষয়ে বানিয়াচং থানায় যোগাযোগ করা হলে বানিয়াচং থানার অফিসার ইনচার্জ গোলাম মোস্তফা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। বানিয়াচং থানায় একটি নিয়মিত ধর্ষনের মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোঃ আব্দুর রহিমকে। ধর্ষনের একদিন অতিবাহিত হতে না হতেই ধর্ষনের শিকার শিশুটির অসুস্থ পিতা দুলাল মিয়া নিজ বাড়িতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এ সংবাদে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকের ধারণা মেয়ের এ অবস্থা দেখে অসুস্থ পিতা দুলাল মিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। যার দরুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এদিকে দুলাল মিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন এর উপদেষ্টা ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন। পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার শিশুটির যাবতীয় চিকিৎসা ব্যয় এবং মামলা সংক্রান্ত সকল বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।

mzamin

জাতিসংঘে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুললো কাতার

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের মাথাব্যথার শেষ নেই। অথচ ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি, তাদের হাতে কী পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র আছে- সে বিষয়ে বিশ্ব মুখে কুলুপ এঁটেছে। যেমন গাজার নিরীহ মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়ে গাজাকে ‘নির্জন দ্বীপ’ বানিয়ে ফেললেও তাতে ইসরাইলিদেরই আত্মরক্ষার অধিকার দেখে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। এমনই এক পরিস্থিতির মুখে ইসরাইলের সব পারমাণবিক স্থাপনার বিষয়ে আঙ্গুল তুলেছে মুসলিম দেশ কাতার। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কড়া বার্তা দিয়েছে। বলেছে, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর অধীনে ইসরাইলের পারমাণবিক স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ইসরাইলকে যুক্ত হতে হবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক চুক্তিতে। ভিয়েনায় জাতিসংঘের অফিস ও ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে কাতারের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি জসিম ইয়াকুব আল হাম্মাদি দৃঢ়তার সঙ্গে তার বিবৃতিতে এসব দাবি তুলে ধরেছেন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দখলীকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের পরিস্থিতি এবং ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়ে ভিয়েনাতে আমলে নেয় আইএইএ বোর্ড অব গভর্নরস। সেখানে অধিবেশনে কাতারের অবস্থান তুলে ধরেন জসিম ইয়াকুব। তিনি বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, আইএইএ এবং ১৯৯৫ সালের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির রিভিউ কনফারেন্স-এর অধীনে নিজেদের প্রতিশ্রুতি সমুন্নত রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন। এসব পরিষদ বা সনদের অধীনে ইসরাইলকে আইএইএ’র নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলতে আহ্বান জানায়। তিনি আরও বলেন, এসব রেজ্যুলুশনের ইসরাইলকে এনপিটি’তে যুক্ত হতে আহ্বান জানায়।  

তিনি আরও বলেন, ইসরাইল ব্যতীত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এনপিটি’র অংশীদার। তারা সবাই আইএইএ’র নিরাপত্তা চুক্তি কার্যকরভাবে মেনে চলে। তিনি আরও বলেন, ইসরাইল তার আগ্রাসী নীতি অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে আছে শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনের বাস্তুচ্যুত করার আহ্বান। বিভিন্ন শহরে এবং পশ্চিমতীরে শরণার্থী শিবিরে তীব্র সামরিক অভিযান। গাজায় মানবিক সহায়তা আটকে দেয়া। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ। হাম্মাদি আরও বলেন, গত সপ্তাহে ২০২৪ সালের ১৯শে ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজ্যুলুশনের ভিত্তিতে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে কাতার। এতে জাতিসংঘ, অন্য আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বাধ্যবাধকতার বিষয়ে ইসরাইলের অবস্থান পরিষ্কার করে জানতে চাওয়া। 

গাজায় বিদ্যুৎ বন্ধ

গাজায় আটক জিম্মিদের মুক্তি দিতে হামাসকে ক্রমাগত চাপ দিতে শুরু করেছে ইসরাইল। এ লক্ষ্যে রোববার থেকে উপত্যকাটির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে দেশটি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ২০ লাখের বেশি জনসংখ্যার উপত্যকাটিতে ত্রাণ সহায়তা প্রবেশে বাধা দেয়ার এক সপ্তাহ পর বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিলেন ইসরাইলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন।
এক ভিডিও বিবৃতিতে কোহেন বলেন, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে এবং যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর থেকে গাজা থেকে হামাসকে হটাতে আমরা সকল উপায় অবলম্বন করবো। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্তটি মূলত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কেননা, বিদ্যুৎ না থাকলে মাটির গভীর থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ইসরাইলের সরকার বলছে, তারা পানি সরবরাহ বন্ধ করার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়নি।
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই গাজার অনেকাংশে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয় ইসরাইল। এরপর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জেনারেটর ও সৌর প্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসরাইল গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করায় আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে কাতারের দোহায় গিয়েছে ইসরাইলের একটি প্রতিনিধিদল। তেল আবিব চাচ্ছে হামাস যেন যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ বাড়ানোর জন্য সম্মত হয়। কিন্তু হামাস যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় আগ্রহী। আলোচনায় অবশিষ্ট জিম্মি এবং বন্দিদের মুক্তি, ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

mzamin

রেলের মাফিয়া by জুলকারনাইন সায়ের ও শরিফ রুবেল

শুরুটা ২০১১ সালে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই নেতার আশীর্বাদ নিয়ে রেলের নির্মাণ খাতে আবির্ভূূত হন এক টেন্ডার ডন। ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার ছোট কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে বাগিয়ে নেন একের পর এক হাজার কোটি টাকার কাজ। এখন পর্যন্ত  রেল খাতের অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছে অখ্যাত এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রকল্পের বরাদ্দের একটা বড় অংশ লুটপাট হয়েছে সিন্ডিকেট করে। আর এই অর্থের বিপুল পরিমাণ কমিশন চলে গেছে দেশ-বিদেশের সুবিধাভোগীদের হাতে। রেল প্রকল্পের টেন্ডার ডন খ্যাত সেই কোম্পানির নাম ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির জাল- জালিয়াতির মাধ্যমে রেলের নির্মাণ খাত নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত তথ্য মানবজমিনের হাতে এসেছে। নথিপত্র ঘেঁটে মিলেছে তাদের নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির চিত্র। সময়টা ২০০৯ সাল। খুঁড়িয়ে চলছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। ওই সময়ে মাত্র ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার ছোট ছোট নির্মাণকাজ করতো প্রতিষ্ঠানটি। তাও টেনেটুনে শেষ করতে হতো। ব্যাংক লোন নিয়ে চলতো প্রকল্পের কাজ। তখন ম্যাক্সের এককভাবে মাত্র ১৬.৭০ কোটি টাকার রেললাইন প্রকল্প নির্মাণের অভিজ্ঞতা ছিল। তাও কাজের মান ছিল নিম্নস্তরের। পরে আওয়ামী লীগের সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও মির্জা আজমের সহায়তায় রাতারাতি বদলে যায় ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এই দুই নেতার সহায়তায় দরপত্রে ১৫ নম্বরে থেকেও ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ২০৯ কোটি টাকার চিনকি আস্তানা থেকে আশুগঞ্জ রিনিউয়াল রেল প্রকল্পের কাজ পেয়ে যায়। ওই প্রকল্প পেতেও জালিয়াতি করে ম্যাক্স। মাত্র ১৬ কোটি টাকার একটি কাজের সঙ্গে আরও দুটি চলমান প্রকল্প ৫০ ও ৯৬ কোটি টাকার যোগ্যতা একসঙ্গে দেখিয়ে চিনকি প্রকল্পের দরপত্রে অংশগ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি। পরে মন্ত্রীর লিখিত সুপারিশে প্রকল্পটির কাজও পেয়ে যায়।

মূলত সেখান থেকেই ম্যাক্সের উত্থান শুরু। তারপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের নির্মাণ খাতের মাফিয়া খ্যাত দুই প্রভাবশালী নেতার সরাসরি হস্তক্ষেপে রেলের একের পর এক বড় বড় প্রকল্পের কাজ পেতে থাকে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এই দুই নেতার প্রভাব খাটিয়ে রেলের সব প্রকল্প একাই গিলে খেয়েছে  গ্রুপটি। শুধু রেল নয়, গত ১৫ বছরে উন্নয়ন খাতের অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকার কাজ করেছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। যা দেশের উন্নয়ন খাতের এক নজিরবিহীন ইতিহাস।

হাসিনা সরকার পতনের পরে এখনো রেল সিন্ডিকেট ধরে রেখেছে রেলের কালো বিড়াল খ্যাত ম্যাক্স গ্রুপ। চিনকি আস্তানার পরে কাশিয়ানি-গোপালগঞ্জ রেল প্রকল্পের একাধিক অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজ পায় ম্যাক্স। বর্তমানে রেলের চলমান আরও বড় দুটি প্রকল্পেও কাজ করছে এই গ্রুপটি। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০৯ কোটি টাকার চিনকি আস্তানা ক্ষয়প্রাপ্ত রেল প্রকল্প, ২০১১ সালে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার লাকসাম-চিনকি আস্তানা রেল প্রকল্প, ২০১৫ সালে ৬ হাজার কোটি টাকার আখাউড়া লাকসাম রেলপথ প্রকল্প, ২০১৬ সালে ১৮ হাজার কোটি টাকার দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পেলো ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। ৪ নম্বর গ্রেডের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হয়েও তারা কীভাবে রেলের এতবড় সব প্রকল্প বাগিয়ে নিলো? এত অল্প সময়ে কোন শক্তির জোরে যোগাযোগ খাতে মাফিয়া হলে উঠলো প্রতিষ্ঠানটি? কোন ক্ষমতার বলে একচেটিয়া আধিপত্য করতে পারলো ম্যাক্স। ১৬ কোটি টাকার কাজ পাওয়ার যোগ্য প্রতিষ্ঠান কীভাবে ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পেলো তা নিয়ে রেল খাতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তবে দরপত্রে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই নেতা জড়িত থাকায় ম্যাক্সের তেলেসমাতি কাণ্ড নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পাননি। মানবজমিন অনুসন্ধানে ম্যাক্স গ্রুপের জাল- জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও এর পেছনে কারা জড়িত তা বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মালিক ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর নিজেকে আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম ডোনার হিসেবে পরিচয় দিতেন। বিভিন্ন সময়ে হাসিনা সরকারের পক্ষে দেশের কথিত বিশিষ্ট নাগরিকদের দেয়া একাধিক বিবৃতিতেও গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর স্বাক্ষর করেছেন। সরকার পতনের পরে দুর্নীতির দায়ে জেলও খেটেছেন। এখনো দুর্নীতির মামলা চলমান আছে। বিগত সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া ঠিকাদারদের মধ্যে অন্যতম এই আলমগীর। রেলওয়ে ছাড়াও সমপ্রতি ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ পেয়েছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। ম্যাক্সের মালিক আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজমের বন্ধু। সেই সুবাধে মির্জা আজমের সহায়তায় রেলের সকল প্রকল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাতেন ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। দরপত্রে যোগ্যতার মাপকাঠিতে ১০ নম্বরে থেকেও রেলের একের পর এক প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন ম্যাক্স লিমিটেড। একপ্রকার প্রতিযোগিতাহীনভাবে রেলের ৯০ শতাংশ প্রকল্পের টেন্ডার পেয়েছে ম্যাক্স গ্রুপ। মূলত ৩০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়েই তিনি এই প্রকল্পের কাজ পেতেন বলে রেল সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন। এদিকে মির্জা আজমের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র মানবজমিনকে বলেছেন, গত ১৫ বছরে রেলের ৭০ হাজার কোটি টাকার কাজ একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন মির্জা আজম। শেখ রেহানা সিন্ডিকেটের প্রধান হয়ে কাজ করেছে মির্জা আজম। বড় অঙ্কের কমিশন নিয়েই এসব কাজ তাদের দেয়া হয়েছে। মির্জা আজম শুধুমাত্র মিডিয়া ছিল। কিন্তু পুরো টাকা চলে গেছে শেখ রেহানার কাছে। ম্যাক্সের মালিক আলমগীরের সঙ্গেও শেখ রেহানার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। তাই তিনি যে প্রকল্পের কাজ চেয়েছে তাই-ই পেয়েছে।
যেভাবে প্রতারণা করেছে ম্যাক্স: ঠিকাদারি বিশেষজ্ঞরা বলছেন আন্তর্জাতিক দরপত্রে জয়েন ভেঞ্চারের শর্ত মোতাবেক শুধু পার্টনার হিসেবে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে হলে ওই প্রকল্পের মোট মূল্যের অন্তত ২৬ শতাংশ মূল্যমানের কাজ করার অতীত অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। ম্যাক্সের ২ শতাংশ কাজ করারও অভিজ্ঞতা ছিল না। অনুসন্ধানেও একই তথ্য পাওয়া গেছে, কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র বিজ্ঞপ্তির শর্তানুযায়ী দরপত্র দাখিলের সময় ম্যাক্সের দেয়া অতীত অভিজ্ঞতার স্বপক্ষে যে আইনগত পরিচয় ও কাজের কথা (লাকসাম-চিনকি আস্তানা দ্বৈত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প) উল্লেখ করেছে, তা ছিল অস্পষ্ট ও জালিয়াতিতে পরিপূর্ণ। এজন্য তারা যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তাতে তারা বিদেশি লিড পার্টনার চায়না রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে মাক্স ওই কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ করে নিয়েছে। পরে ওই কাজের পুরো অভিজ্ঞতাকেই নিজের বলে দাবি করে চালিয়ে দিয়েছেন। যা রেল খাতের একটি ভয়ঙ্কর জালিয়াতি ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের একজন কর্মকর্তা বলেন, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের কাজটি মূল প্রকল্প দলিল ডিপিপি ও সংশোধিত প্রকল্প দলিলে আরডিপিপি মোতাবেক একটি একক কাজ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। যোগ্যতার মানদণ্ডে অতীত অভিজ্ঞতায় আর্থিক মূল্যমানের সীমারেখা বিবেচনায় ম্যাক্সকে ওই প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য এই একক কাজকে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান ও মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন। যেটা লট-১ ও লট-২ প্যাকেজ নামে পরিচিত। লট-২ প্যাকেজের কাজ ম্যাক্স লিমিটেড নিয়েছিল একটি চাইনিজ ঠিকাদারের সঙ্গে জয়েন্ট  ভেঞ্চার করে। বিষয়গুলো বোঝার জন্য এই লট-২ তে কাজের অতীত অভিজ্ঞতার কি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছিল সেটা দেখার জন্য অনুরোধ করেছেন এই ব্যক্তি।
রিকোয়ারমেন্টে যা বলা হয়েছে: এই প্রকল্পের দরপত্রে অংশগ্রহণের জন্য ঠিকাদারদের অতীত অভিজ্ঞতার স্বপক্ষে বিগত ১০ বছরের মধ্যে কমপক্ষে একটি কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার মূল্যমান ২৭০ মিলিয়ন ডলার। যা ২২৬৮ কোটি টাকা। এবং ট্র্যাক, ব্রিজ, ইমব্যাংকমেন্ট, স্টেশন বিল্ডিং, সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। যদি প্রতিষ্ঠানটি জয়েন্ট ভেঞ্চার করে তাহলে লিড পার্টনারের জন্য কাজের বৈশিষ্ট্য এবং মূল্যমানের ক্ষেত্রে পুরো অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এবং পার্টনারদের ক্ষেত্রেও ওইরূপ অভিজ্ঞতা ও বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে, তবে সেটা মূল্যমানের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ থাকলেই চলবে। অর্থাৎ ২২০৮ কোটি টাকার ২৫ শতাংশ যা ৫৬৭ কোটি টাকা। ম্যাক্স যে কাজের অভিজ্ঞতার সনদ দিয়েছে, সে কাজে ম্যাক্সের আইনগত অন্তর্ভুক্তির বিষয়টা কেমন ছিল? টিএসসি’র মতামতগুলো প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমানের মাধ্যমে টেকনিক্যাল বিড ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট এড়িয়ে গিয়ে কীভাবে প্রভিয়াসলি কমপ্লাইড স্টাটার্সকে কমপ্লাইড করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে সেই রিপোর্ট এডিবিতে গেলে পরবর্তীতে সেই জবাব হুবহু উল্লেখ করে প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান ম্যাক্সের জবাবকে বৈধতা দিয়ে সুপারিশসহ এডিবি’র কাছে পাঠিয়ে সর্বগ্রাসী দুর্নীতির ষোলকলা পূর্ণ করে। লাকসাম চিনকি আস্তানা দ্বৈত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ক্রয়চুক্তি সম্পাদিত হয় সিআরএম জয়েন্ট ভেঞ্চার এসোসিয়েশনের সঙ্গে। ম্যাক্স এখানে শুধু পার্টনার। কাজের সফল সমাপ্তিতে লিড পার্টনার চায়না রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্টকে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকল্প পরিচালক কর্তৃক অভিজ্ঞতার যে সনদ দেয়া হবে তাতে পার্টনার হিসেবে ম্যাক্সের নামও উল্লেখ থাকবে। ম্যাক্স এই অভিজ্ঞতার ক্রেডিনশিয়ালিটি পাবে জয়েন্ট ভেঞ্চার এসোসিয়েশন  করার সময় ওই এসোসিয়েশনে তার অন্তর্ভুক্তির পার্সেন্ট হিসেবে।

পদে পদে ম্যাক্সের জালিয়াতি: ২০১১ সালের ১৭ই অক্টোবর বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে সিআরএম জয়েন্ট ভেঞ্চার এসোসিয়েশনের চুক্তিপত্র সম্পাদিত হওয়ার মাত্র দেড় মাস পর ওই জয়েন্ট ভেঞ্চার এসোসিয়েশনে অঙ্গীভূত তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ স্বাক্ষরে প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে এই বলে পত্র দেয় যে তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চার এসোসিয়েশনে যে দু’টি চাইনিজ কোম্পানি আছে লিড পার্টনারের একটি চায়না রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট, আরেকটি পার্টনার চেঙ্গু রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। তারা অনিবার্য কারণবশত এই প্রকল্পের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, জনশক্তি, যন্ত্রপাতি ও অর্থ চীন থেকে দ্রুত আনতে পারবে না। তাই তাদের লোকাল পার্টনার ম্যাক্স এই প্রকল্পের ১০০ শতাংশ কাজ একাই সম্পন্ন করবে। কাজ শেষে ১০০ শতাংশ যোগ্যতার সনদ ম্যাক্সই পাবে। পরবর্তীতে জয়েন্ট ভেঞ্চার এসোসিয়েশনের পার্টনারদের মধ্যে সম্পাদিত বোঝাপড়ায় স্বত প্রণোদিতভাবে ক্ষমতাবান হয়ে সিআরএম জয়েন্ট ভেঞ্চারের পক্ষে ম্যাক্স ওই বছর ডিসেম্বরে প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর আরেকটি চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে ম্যাক্স দাবি করেন, তাদের দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে; যাতে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল এই পাঁচ মাস সময় তারা কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু এই সময়ে লিড পার্টনার দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠান দ্রুত তাদের সরঞ্জাম আনতে পারবে না। চুক্তির শর্ত অনুসারে চুক্তিকৃত কাজ সম্পাদন ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান সবাই যৌথভাবে ও পৃথকভাবে দায়বদ্ধ। তাই অংশীদারদের মধ্যে কেউ যদি তাদের অংশের কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তবে অপর অংশীদার তাদের ফেলে রাখা বাকি কাজ শেষ করবে। সেই শর্তানুসারে এটা ম্যাক্সের দায়িত্ব জয়েন্ট ভেঞ্চারের পক্ষে একাই সব কাজ শেষ করা। সিআরএম জয়েন্ট ভেঞ্চারের পক্ষে ম্যাক্স ইতিমধ্যেই ১০ শতাংশ পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিয়েছে। চাইনিজ দু’টি প্রতিষ্ঠান লিড পার্টনার চীনা রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট এবং পার্টনার চেঙ্গু রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন সম্মত আছে, যে ম্যাক্স তার নিজস্ব যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম দ্বারা ১০০ শতাংশ কাজ শেষ করবে। এটা নিয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। এ রকম একটা অনৈতিক, অযৌক্তিক, ক্রয় চুক্তি বহির্ভূত, ক্রয় আইন পরিপন্থি এবং সর্বোপরি একটা খোঁড়া প্রেক্ষাপট তৈরির পর ম্যাক্স বলেন এ অবস্থায় এত বড় একটা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংক থেকে তাদের বড় অঙ্কের লোন গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ব্যাংক বলছে, তারা ম্যাক্সকে লোন দেবে যদি ক্রয়কারী বাংলাদেশ রেলওয়ে ম্যাক্সকে ১০০ শতাংশ কাজ করার অনুমতি দেয়। পরে ওই প্রকল্পের পুরো কাজ একাই শেষের অনুমতি চান। ম্যাক্স দাবি করেন, কাজ শেষের পর বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে ম্যাক্সের নামে ১০০ শতাংশ প্রতিযোগিতা সনদ ইস্যু করতে হবে। এটাই হলো ম্যাক্সের সবচেয়ে বড় চাওয়া ও কৌশল। এর মাধ্যমে ১৬.৭ কোটি টাকার কাজে অভিজ্ঞ ঠিকাদার ম্যাক্স লিমিটেড ১৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প কাজ পাওয়ার যোগ্য হয়ে যায়। যেটা পরবর্তীতে ১৮ হাজার কোটি টাকায় কক্সবাজার প্রকল্পের কাজ পেতে সহায়তা করে। প্রশ্ন হলো দু’টি চীনা কোম্পানির সঙ্গে ম্যাক্স লিমিটেড জয়েন্ট ভেঞ্চারে লাকসাম চিনকি আস্তানা প্রকল্পের কাজ পাওয়ার পরই কেন এ রকম অবান্তর প্রস্তাবনা উপস্থাপন করলো যেখানে জয়েন্ট ভেঞ্চার দু’টি কোম্পানিকে বাদ দিয়ে ম্যাক্সকে দিয়ে কাজ করাবে এবং ম্যাক্সের নামে অভিজ্ঞতার সনদ জারি করাবে। এটা তাদের পূর্ব কৌশল ছিল। এই প্রস্তাবনা পুরো ক্রয় আইন, বিধি ও চুক্তির শর্তবহির্ভূত। কাজ পাওয়ার আগে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক আবশ্যিকভাবে লিড পার্টনার হিসেবে চীনা রেলওয়ের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়িত করেই চীনা রেলওয়ের সঙ্গে পার্টনারদের অন্তর্ভুক্তিতে গঠিত চীনা রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট, চেঙ্গু রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড ও ম্যাক্স লিমিটেড (সিআরএম) এই তিন জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে কাজ দেয়। ম্যাক্স লিমিটেড একটি প্রকল্পে জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে পরে নিজ নামে অভিজ্ঞতার সনদ পেতে পারে না। বিষয়টা আইনে সমর্থিত নয়। মূলত ১৬ কোটি টাকা কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ম্যাক্সকে ১৮০০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার যোগ্য করা না গেলে পরে কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের ১৮ হাজার কোটি টাকার কাজ দেয়া সম্ভব নয় বলেও এসব জালিয়াতি করা হয়।

যেভাবে অভিজ্ঞতা সনদ নেয় ম্যাক্স: ম্যাক্স বলেছে, চীনা রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ও চেঙ্গু রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড তাদের রিসোর্সেস এদেশে আনতে পারবে না। নির্মাণকাজের মূল কম্পনেন্ট সরবরাহ করেছে লিড পার্টনার চীনা রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট। বাংলাদেশ রেলওয়ে প্যাডে এই সার্টিফিকেট দিয়েছে ওই প্রকল্পের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকল্প পরিচালক নিজে। যৌথ কাজের লিড পার্টনার চীনা রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কারিগরি নির্দেশ মোতাবেক সময়মতো সরঞ্জাম সরবরাহ সম্পন্ন করেছে। তাহলে ম্যাক্স যে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটা মিথ্যা ছিল। চীনা কোম্পানি দু’টি নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়ে শুধু ম্যাক্সের অনুকূলে অভিজ্ঞতার সনদ দেয়ার মিথ্যা কথা বলেছিল। কিন্তু তারাই রেলপথ নির্মাণের মূল উপাদান রেল সরবরাহ করেছিল। যার পরিমাণ ছিল ৭ হাজার টন। প্রশ্ন উঠে যে কীভাবে লিড পার্টনার চীনা রেলওয়ে মেটারিয়াল ইম্পটেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ও পার্টনার চেঙ্গু রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড ওই প্রকল্পের কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকেও নিজেদেরকে সম্পৃক্তহীন ঘোষণা দিয়ে ১০০ শতাংশ অভিজ্ঞতার সনদ ম্যাক্সকে দেয়ার শর্তকে সমর্থন করলো। এবং সেই শর্তকে প্রকল্পের পিডি ও ডিজি অনুমোদন দিল। এতে প্রমাণিত হলো কক্সবাজার প্রকল্পের সুযোগ পাওয়ার জন্য ম্যাক্স যাতে ওই প্রকল্প কাজের টেন্ডারে অংশ নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে পারে সেজন্যই এগুলো করা হয়েছিল। পরিষ্কারভাবে লাকসাম চিনকি আস্তানা দ্বৈত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল চীনা কোম্পানি দু’টি। এবং তারা চুক্তি সম্পাদন করেছিল এবং যৌথভাবে কাজ শেষ করেছিল। অভিজ্ঞতার সনদ জারি হওয়ার কথা ছিল এই তিন কোম্পানির নামে। কোনো অবস্থায় ম্যাক্সের নামে নয়। ম্যাক্সকে সার্টিফিকেট দেয়ার সময় চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও পিডি শব্দগত ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছিল। তার তথ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।

এ ছাড়া ২০১১ থেকে ২০১৬ সালে হওয়া ক্রয় চুক্তিতে কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তৎকালীন মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন, সাগর কৃষ্ণ চক্রবর্তী, নাজনীনা আরা কেয়া, লিয়াকত আলী খান, মফিজুর রহমান ও আবুল কালাম চৌধুরী। অনিয়মের বিষয়ে জানতে চেয়ে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কী অভিযোগ তা জানতে চান। বিস্তারিত জানানোর পরে লিখিত আকারে বক্তব্য দেবেন বলে এই প্রতিবেদককে জানান ম্যাক্সের মিডিয়া বিভাগের কর্মকর্তা ইব্রাহিম খালিদ পলাশ। পরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ম্যাক্সের কেউ আর সাড়া দেননি।

সম্পাদকীয় নোট: এই রিপোর্ট না ছাপার জন্য নানামুখী তদবির হয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে মানবজমিন সম্পূর্ণ স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতি অনুুসরণ করে। এই নীতি অনুসরণ করেই রিপোর্টটি প্রকাশ করা হলো।

mzamin

হাসিনার শাসনামলে ‘স্মরণীয়’ ক্ষতির পর টুকরো বাংলাদেশকে জুড়তে চাইছেন ইউনূস

মুহাম্মদ ইউনূস যখন গত বছর আগস্টে বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন তাকে  অভ্যর্থনা জানানো হয় এক অন্ধকারাচ্ছন্ন দৃশ্যপটে। শহরের রাস্তাগুলোতে রক্তের দাগ তখনো শুকায়নি। পুলিশের গুলিতে নিহত ১ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী এবং শিশুদের মৃতদেহ মর্গে স্তূপাকৃত করে রাখা হয়েছিল। ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী  শাসনের পর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লবে সবেমাত্র পতন ঘটেছে শেখ হাসিনার। তার নৃশংসতার প্রতিশোধ নিতে তার বাসভবনে ঢুকে  ভাঙচুর চালিয়েছিলেন দেশের সাধারণ মানুষ, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে  হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ৮৪ বছরের  ইউনূস- একজন অর্থনীতিবিদ যিনি দরিদ্রদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের সুযোগ করে দিয়ে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন।

তিনি দীর্ঘদিন আগেই তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। কারণ  হাসিনার দ্বারা বহু বছর ধরে অবমাননা ও নিপীড়নের সম্মুখীন হয়েছেন ইউনূস। যার জেরে তাকে তার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয়েছে  বিদেশে। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনকারীরা তাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিতে বললে তিনি রাজি হয়ে যান। দায়িত্ব নেয়ার সময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. ইউনূস গার্ডিয়ানকে বলেন- ‘তিনি (হাসিনা) যা ক্ষতি করে গেছেন তা  স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত দেশে পরিণত হয়েছে  ঠিক গাজার মতো। শুধু তফাৎ একটাই গাজার মতো এখানে ভবনগুলো ভেঙে পড়েনি ঠিকই। কিন্তু পুরো প্রতিষ্ঠান, নীতি, মানুষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সবই আজ বিধ্বস্ত।’

হাসিনার শাসনামলে অত্যাচার, সহিংসতা ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ছিল। যা জুলাই এবং আগস্টে রক্তাক্ত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত আকার নেয়। হাসিনার  দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে  ১৪০০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছিল। জাতিসংঘের মতে, পুলিশের এই সহিংস দমন-পীড়ন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ  হিসেবে গণ্য হতে পারে। যদিও হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ইউনূসের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন দেশের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা  হয়েছিল। ইউনূস দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের (যারা হাসিনার সুরক্ষার অধীনে নেই)  বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে, গোপন আটক কেন্দ্রগুলো যেখানে হাসিনার সমালোচকদের নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছিল সেগুলো খালি করা হয়েছে, একাধিক মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং হাসিনার বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে, যা তিনি এতদিন অস্বীকার করে গেছেন।

ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এই বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে যেকোনো সময়, বাংলাদেশে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যার পরে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এমন অনুভূতি হয় যে, দেশটি এখনো একটি খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও ইউনূসকে  ব্যাপকভাবে সম্মান করা হয়, তবুও তার শাসন ক্ষমতা এবং প্রতিশ্রুত সংস্কারের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং নির্বাচন করাতে  ইউনূসের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে বিএনপি। বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররাও আজ তাদের নিজস্ব দল গঠন করেছে। বিএনপি’র প্রবীণ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এই সরকার শুধুমাত্র অন্তর্বর্তীকালীন  হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এই মুহূর্তে কেউই দৈনন্দিন ভিত্তিতে জবাবদিহি করার অবস্থানে নেই। সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ম্যান্ডেট এবং সংহতি কিছুই নেই।’
আইনশৃঙ্খলার অবনতি: হাসিনার আমলে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জনরোষ এবং ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি পুলিশ তাদের পদে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক। যার জেরে  নিরাপত্তা পরিস্থিতির  দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ঢাকার রাস্তায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কার্যকলাপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সংখ্যালঘু সমপ্রদায়গুলো হয়রানির শিকার হচ্ছে। সোমবার বিক্ষোভকারীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর কুশপুত্তলিকা দাহ করে। ক্রমবর্ধমান অপরাধ দমনে তার ব্যর্থতাকে দায়ী করে পদ থেকে অপসারণের দাবি জানায়। হাসিনার শাসনামলের তুলনায় রাস্তাঘাট এখন কম নিরাপদ ছিল- এমন কোনো অভিযোগ  ইউনূস অস্বীকার করেছেন।  

তবে অন্যরা সতর্ক করেছেন যে, দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নতুন জাতীয় নাগরিক দলের প্রধান বিশিষ্ট ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম গার্ডিয়ানকে বলেছেন, “বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা অসম্ভব”। গত সপ্তাহে এক জোরালো বক্তৃতায়, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, যিনি হাসিনার প্রস্থান এবং ইউনূসের প্রত্যাবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি বলেছেন  যে- দেশটি  অরাজকতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যদি অস্থিরতায় ইন্ধন যোগানো   অব্যাহত থাকে, তাহলে এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
ইউনূস বলেন যে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার “খুব ভালো সম্পর্ক” রয়েছে এবং সেনাপ্রধানের কাছ থেকে চাপ আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে, কেউ কেউ জেনারেলের কথাকে ইউনূসের নেতৃত্বের প্রতি তিরস্কার, এমনকি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার সতর্কীকরণ হিসেবেও দেখছেন। ড. ইউনূস দেশের দুর্দশাগুলোকে হাসিনার শাসনের পরিণতি হিসেবে উপস্থাপন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বলেছেন- ‘হাসিনার শাসনামলে  কোনো  সরকার ছিল না, এটি ছিল দস্যুদের একটি পরিবার। বস কোনো আদেশ করলে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হতো। যেমন-কেউ সমস্যা তৈরি করছে? আমরা তাদের অদৃশ্য করে দেবো। নির্বাচন করতে চান? আমরা নিশ্চিত করবো যে, আপনি (হাসিনা) সব আসনে যাতে জয়ী হন। আপনি টাকা চান? ব্যাংক থেকে এক মিলিয়ন ডলার ঋণ পাবেন, যা আপনাকে কখনো ফেরত দিতে হবে না।”

হাসিনার আমলে যে মাত্রার দুর্নীতি হয়েছিল, তাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বরূপ সবার সামনে এসে গেছে এবং দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হাসিনার আত্মীয়দের মধ্যে তার ভাগ্নি, যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিকও রয়েছেন। হাসিনার শাসনামলের সঙ্গে জড়িত সম্পদের বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার পর এবং বাংলাদেশে দুর্নীতির তদন্তে নাম আসার পর সিদ্দিক ট্রেজারি থেকে পদত্যাগ করেন। যদিও তিনি সমস্ত অন্যায়ের কথা অস্বীকার করেছেন। হাসিনার মিত্রদের দ্বারা দেশের ব্যাংক থেকে নেয়া ১৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইজারল্যান্ডের আর্থিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলিত অভিযান চলছে। কিন্তু শিগগিরই সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণ। ইউনূস বলেন, ‘সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণে ব্যাংকগুলোকে জনগণের টাকা লুট করার পূর্ণ অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তারা তাদের কর্মকর্তাদের বন্দুক দিয়ে পাঠাতো সবকিছুতে স্বাক্ষর করানোর জন্য।’

সামপ্রতিক মাসগুলোতে কট্টর ইসলামিক  ধর্মীয় ডানপন্থিদের উত্থান ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেয়ার জন্যও ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। হাসিনার শাসনামলে, জামায়াতে ইসলামীর মতো  দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং ইসলামপন্থি রাজনৈতিক নেতারা ব্যাপক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তারা এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং তাদের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে নিষিদ্ধ ইসলামপন্থি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোও আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় কট্টরপন্থি ইসলামী গোষ্ঠীগুলোর হস্তক্ষেপের পরে কিশোরী মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের শত শত সদস্য যখন ইসলামী খেলাফতের দাবিতে ঢাকায় মিছিল করছিল, তখন পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ভারত সরকারই ইউনূসের সামনে একমাত্র সমস্যা নয়: ইউনূসের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ বাংলাদেশের বাইরে থেকে এসেছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন, হাসিনা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করেছিলেন এবং এখন দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতির কারণে তিনি প্রতিবেশী দেশটিতে লুকিয়ে আছেন। ড. ইউনূস যখন দায়িত্বে আছেন, তখন ভারত বাংলাদেশের সংস্কারে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। নয়াদিল্লির তরফে সমপ্রতি বাংলাদেশকে বার্তা দেয়া হয়েছে, তারা যেন সন্ত্রাসবাদকে ‘জলভাত’ করে না দেখে। ডিসেম্বরে, হাসিনাকে বাংলাদেশে বিচারের মুখোমুখি করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ভারত থেকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ইউনূস নিশ্চিত করেছেন যে, ভারত সরকারের কাছ থেকে “কোনো সাড়া” পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন যে, হাসিনাকে এখনো মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি করা হবে, এমনকি তার অনুপস্থিতিতেও। ইউনূসের সমালোচনায় সরব হয়ে হাসিনা ক্রমশ সোচ্চার হয়ে উঠছেন। সমপ্রতি তিনি ইউনূসকে একজন “দুর্বৃত্ত” বলে অভিহিত করেছেন যিনি নাকি দেশে “সন্ত্রাসীদের” ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ড. ইউনূস বলেন, ‘ভারত তাকে আতিথ্য দিয়েছে তা সহ্য করা হলেও, নিজের প্রচারণা চালিয়ে যাবার জন্য ভারতকে একটি প্ল্যাটফরম হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া বিপজ্জনক। এটি দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে।”

ভারত সরকারই ইউনূসের সামনে একমাত্র সমস্যা নয়। ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনও খারাপ খবর। বাইডেন প্রশাসন ইউনূসের রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে অন্যতম বড় সমর্থক ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে  অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সামপ্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়া মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাকে (ইউএসএইড) ট্রাম্প ধ্বংস করে দিয়েছেন, যা  বাংলাদেশের কাছে একটি বড় ধাক্কা। এক ভাষণে ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে শক্তিশালী করার জন্য বরাদ্দকৃত লাখ লাখ মার্কিন ডলার  একজন “উগ্র বামপন্থি  কমিউনিস্ট”কে নির্বাচিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে আনার প্রয়াসে ইউনূস সমপ্রতি ট্রাম্পের কোটিপতি সমর্থক ইলন মাস্ককে তার স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে আনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ড. ইউনূসের আশপাশের সূত্র জানিয়েছে যে, এপ্রিল মাসে মাস্কের বাংলাদেশে সফরের সম্ভাবনা ছিল। ইউনূস আশা প্রকাশ করেন যে, ট্রাম্প বাংলাদেশকে একটি  ভালো বিনিয়োগের ক্ষেত্র এবং বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে দেখতে পারেন। তিনি মাস্কের  সফরের সময় বিষয়টি  তুলে ধরার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। ইউনূসের কথায়-ট্রাম্প একজন ভালো ডিল মেকার, তাই আমি তাকে বলতে চাই-আসুন, আমাদের সঙ্গে চুক্তি করুন। তিনি যদি তা না করেন, তাহলে বাংলাদেশ কিছুটা কষ্ট পাবে। কিন্তু এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেমে থাকবে না।’
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

mzamin

বিচার-সংস্কার নিয়ে কড়ায় গণ্ডায় জবাবদিহিতা নেব: নাহিদ

বিচার ও সংস্কার কতটুকু হলো আমরা তা কড়ায় গণ্ডায় জবাবদিহিতা নেয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আমন্ত্রণ-আহ্বান জানিয়ে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করেছিলাম। অন্যান্য উপদেষ্টাবৃন্দ রয়েছেন, সেনাপ্রধান রয়েছেন। তারা প্রত্যেকে কিন্তু কমিটমেন্ট দিয়েছিলেন মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং বিচারের দায়িত্ব তারা নিচ্ছেন। ফলে এই কমিটমেন্ট থেকে কিন্তু তারা দূরে সরে যেতে পারবেন না। জনগণের সামনে কিন্তু দাঁড়াতে হবে। ফলে আমরা কিন্তু ‘কড়ায় গণ্ডায়’ জবাবদিহিতা নেব আমাদের বিচার কতটুকু আদায় হলো। সংস্কার কতটুকু আদায় হলো।

সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহতদের নিয়ে এক ইফতার মাহফিলে তিনি  এসব কথা বলেন। এনসিপি এ ইফতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারকে বলব দ্রুত বিচার ও সংস্কারের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। কতদিনের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় আমরা দৃশ্যমান বিচার কার্যক্রম দেখতে পারব এবং দৃশ্যমান সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারব, সেটার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অবিলম্বে ঘোষণা করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের বলা হচ্ছে, আমরা নাকি নির্বাচন পেছানোর রাজনীতি করছি। খুব পরিষ্কারভাবে পাল্টা আপনাদের বলতে চাই, আপনারা বিচার ও সংস্কার পেছানোর রাজনীতি করবেন না। বিচার ও সংস্কারের প্রতি ঐকমত্য পোষণ করুন, নির্বাচন আমরা আপনাদের করে দিতে সহায়তা করব।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি নির্বাচনের জন্যে এত তাড়াহুড়ো করে, ভোট চাইতে গেলে কিন্তু সেই জবাবদিহিতা তাদের দিতে হবে। আমরা বলব, বাংলাদেশে যে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমরা সেই ঐক্যমত্য ধরে রাখতে চাই। আমরা কেউ নির্বাচনের বিরুদ্ধে নয়। বরং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব বলেই নিজেরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছি। কিন্তু আমরা বলছি বিচার সংস্কার এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে বলেছি গণপরিষদ নির্বাচন কারণ এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সংবিধান অকার্যকর ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।

mzamin