Thursday, July 2, 2026

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে ধস, ইরান আলোচনা মূলত আবাসন ব্যবসায়ীদের হাতে by যশ পল

আল জাজিরার মতামতঃ পেশাদার কূটনীতির অবক্ষয় ও অনভিজ্ঞ নেতৃত্বের এক সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঐতিহ্যগতভাবে একটি দেশের কূটনৈতিক দল গঠিত হয় নিরপেক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে দেশের কল্যাণ। তবে ইরানের সাথে চলমান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল শান্তি আলোচনায় মার্কিন দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং দু’জন ব্যক্তি জ্যারেড কুশনার ও স্টিভেন উইটকফ। তাদের মূল পরিচয় তারা আবাসন খাতের ব্যবসায়ী এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির সাথে যুক্ত। ট্রাম্পের জামাতা হওয়ার সুবাদে কুশনারের এই অঙ্গনে প্রবেশ। অন্যদিকে উইটকফের প্রধান যোগ্যতা হিসেবে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন তার ৭০টিরও বেশি বহুতল ভবন নির্মাণের অভিজ্ঞতা।

স্বার্থের সংঘাত ও বিদেশি বিনিয়োগের মারপ্যাঁচ: যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী সরকারি পদে থাকাকালীন কোনো বিদেশি রাষ্ট্র থেকে আর্থিক সুবিধা বা ‘পারিতোষিক’ নেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ কুশনারের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাফিনিটি পার্টনার্স’-এর ৫০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের সিংহভাগই এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারি তহবিল থেকে। এমনকি যুদ্ধের চরম মুহূর্তেও তিনি উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আরও তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। কুশনারের পারিবারিক ইতিহাসও এখানে প্রাসঙ্গিক। তার বাবা চার্লস কুশনার ২০০৫ সালে একটি ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর ২০২০ সালে ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমা পান। ২০২৫ সালে ফ্রান্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন।

অন্যদিকে, উইটকফের ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত একটি কোম্পানি বড় অঙ্কের শেয়ার কিনেছে, যা ট্রাম্পের শপথ নেয়ার ঠিক চার দিন আগে চূড়ান্ত হয়। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার চেয়ে তাদের নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এই দেশগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

ইসরাইল তোষণ ও গাজা নিয়ে ‘ব্যবসায়িক’ পরিকল্পনা: ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই দুইজনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত ইসরাইলের প্রতি কুশনারের পক্ষপাত অত্যন্ত স্পষ্ট। তার পরিবার ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী সংস্থা এবং দেশটির সামরিক বাহিনীকে বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছে। গাজা উপত্যকাকে কুশনার ও উইটকফ কেবল একটি ‘বিনিয়োগের সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর তৈরি করা ‘মাস্টার প্ল্যান ফর গাজা’ অনুযায়ী, গাজাকে একটি সস্তা শ্রমিকের ক্যাম্প বা কারখানার শহর বানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেখানে ফিলিস্তিনিরা নির্দিষ্ট জোনের বাইরে যাতায়াত করতে পারবে না।

এছাড়া আগামী ১০ বছরের মধ্যে গাজার মনোরম উপকূলের ৭০ ভাগকে বিলাসবহুল হোটেল বানিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার নীলনকশা রয়েছে তাদের।
অস্থায়ী চুক্তি ও বিপর্যয়ের আশঙ্কা: পেশাদার কূটনীতিকরা বছরের পর বছর ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক চুক্তি করেন (যেমন ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তি)। কিন্তু কুশনার এবং উইটকফের এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি নিয়ে কোনো গভীর জ্ঞান নেই। ট্রাম্পের যেকোনো উপায়ে একটি চুক্তি করার তাড়াহুড়ো এবং এই দুই মধ্যস্থতাকারীর অনভিজ্ঞতার কারণে হয়তো দ্রুত একটি সাময়িক সমঝোতা বা চুক্তি হয়ে যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন স্বার্থ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা উপেক্ষিত হওয়ায়, এই ধরনের চুক্তিগুলো টেকসই হবে না এবং ভবিষ্যতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মতোই আরও বড় রাজনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে ধস, ইরান আলোচনা মূলত আবাসন ব্যবসায়ীদের হাতে

আল-আকসা মসজিদে ইহুদি সেটেলারদের ‘তাণ্ডব’

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে ফের ‘তাণ্ডব’ চালিয়েছে ইহুদি সেটেলাররা। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার লাইভ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলি পুলিশের তত্ত্বাবধানে ইহুদিরা আল-আকসায় জোরপূর্বক প্রবেশ করেছে। ফিলিস্তিনের সরকারি ওয়াফা নিউজ এজেন্সি বলেছে, ইহুদি সেটেলাররা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছে এবং তালমুদীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেছে।

জেরুজালেম গভর্নরেটের বরাতে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, বুধবার কয়েক ডজন ইহুদি বসতি স্থাপনকারী কম্পাউন্ডের প্রাঙ্গণে উস্কানিমূলক পদযাত্রা ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করেছে।
আল-আকসা মসজিদ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে ইহুদিরা এই এলাকাটিকে টেম্পল মাউন্ট বলে। তাদের দাবি, এটি দুটি প্রাচীন ইহুদি টেম্পলের স্থান ছিল।

আল-আকসা মসজিদে ইহুদি সেটেলারদের ‘তাণ্ডব’

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মাধ্যমে শিশুর যে ক্ষতি করেন বড়রা by হুমায়রা মাহজাবিন

ছোট একটি বাক্য একজন মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। লাঠি বা পাথর মানুষের হাড় ভেঙে ফেলতে পারে; কিন্তু কথা দিয়ে মানুষের মনোবল ভেঙে ফেলা সম্ভব। আর কারও আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়া শারীরিক আঘাতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন (ইমোশনাল অ্যাবিউজ) শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায় ব্যাঘাত ঘটায়।

সাধারণত একজন ব্যক্তি আরেকজনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা থেকে ইমোশনাল অ্যাবিউজ করে। অনেক পরিবারে বড়দের দ্বারা এমন আচরণের শিকার হয় শিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন শারীরিক নির্যাতনের মতোই ভয়াবহ। ছোটবেলার এসব মানসিক নির্যাতন শিশুর বিকাশে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের প্রভাবই ফেলতে পারে।

শাসন যখন মানসিক নির্যাতন

সন্তান বড় করতে গিয়ে মা–বাবারা অনেক ধরনের নিয়ম বেঁধে দেন। অনেক অভিভাবক মনে করেন, এতে শিশুদের ভালো হবে। কঠোর ভালোবাসা এসব বেঁধে দেওয়া নিয়মের অন্যতম। কিন্তু এ পদ্ধতিটি শিশুদের ভালো তো করেই না, বরং তার মধ্যে হীনম্মন্যতা, ভয় এবং নিজের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করে। অনেক সময় দেখা যায়, মা–বাবা তাঁদের সন্তানকে নিয়মিত কারও সঙ্গে তুলনা করছেন। সন্তানকে অযোগ্য কিংবা কিছুই পারে না বলে বারবার তিরস্কার করলে শিশুটির মধ্যে একধরনের বিশ্বাস গড়ে ওঠে যে আসলেই সে কিছু পারে না, তাকে দিয়ে কিছুই হবে না। নিজের শক্তি আবিষ্কারের বদলে সারাক্ষণ সে হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো অনেক অভিভাবক এ ধরনের নির্যাতনকে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য মনে করেন। নিজের অস্বাভাবিক আচরণকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে অনেকে শিশুর সামনে ব্যাখ্যা হাজির করেন। অভিভাবকেরা আবার যখন ‘আমি তোমার ভালোর জন্যই করছি’ বলে নিজের কাজকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, সেটা শিশুর ওপর চাপ তৈরি করে। আবেগজনিত নির্যাতন একটি শিশুকে তার সুস্থ ও স্বাভাবিক ব্যবহার পাওয়া থেকে বঞ্চিত করে।

মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের দীর্ঘ প্রভাব

মানুষ স্বভাবতই নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে মনে রাখে বেশি। শৈশবে পাওয়া মৌখিক আঘাতে বড়বেলায়ও ভুগতে পারে শিশু। দীর্ঘদিন ধরে একই কথা শোনার ফলে শিশুদের মনে কথাগুলো পাকাপাকিভাবে গেঁথে যায়। একটি এমআরআই পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মা–বাবার অবমাননাকর বা নির্যাতনমূলক কথাবার্তা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশপ্রক্রিয়াই বদলে দিতে পারে। তারা এই নেতিবাচক কথাগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং ভুলভাবে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল রপ্ত করে। ফলে নিজের অজান্তেই তারা অন্যদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন প্রয়োগ করে। যারা শৈশবে মানসিক বা আবেগজনিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাঁরা উদ্বেগ, হতাশা, আত্মসম্মানের ঘাটতিতে ভোগেন। একই সঙ্গে এমন মানুষেরা স্বাস্থ্যকর ও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে দ্বিধায় ভোগেন।

সূত্র: ফিজিওলজি টুডে

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-19%2Fw0ibaxuq%2FKabir-Hossain2.JPG?rect=280%2C0%2C3266%2C2177&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শিশুর মানসিক বিকাশে বাধা হতে পারে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন। মডেল: ভুবন ও বর্ণ। ছবি: কবির হোসেন

বিপ্লব অস্বীকার করলে ক্ষমতার ন্যায্যতা থাকবে না by মাহমুদুর রহমান

আজ পহেলা জুলাই। ঠিক দুবছর আগে এই দিনে আমাদের লড়াকু ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল; যার পরিণতিতে মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট শাসককে দেশ থেকে পালিয়ে দিল্লিতে তার প্রভুর চরণে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

আমি তখন ইস্তান্বুলে নির্বাসিত জীবনযাপন করছি। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি ভেবেছিলাম আগের কোটা আন্দোলনের চেয়ে বেশি কিছু প্রাপ্তি এবারও ঘটবে না। কিন্তু অতিদ্রুত কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংকীর্ণ বয়ান বৃহত্তর বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষার দিকে ধাবিত হলে আশান্বিত হয়ে উঠলাম।

আন্দোলনকারীদের এক অংশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের প্রথমে অবৈধ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও পুলিশের আইজির পদত্যাগ, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং পর্যায়ক্রমে সরকার পতনের এক দফা দাবির পরামর্শ দিয়েছিলাম। যেহেতু আমি দেশের বাইরে ছিলাম, কাজেই মাঠের প্রকৃত উত্তাল চিত্র আমার জানা ছিল না।

এ প্রজন্মের অসীম সাহসিকতার মাত্রাও দূরে থেকে উপলব্ধি করতে পারিনি। আন্দোলনের গতি আমার ধারণাকে ছাড়িয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তখন চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করা আবু সাঈদের অবিস্মরণীয় শাহাদতের দৃশ্যে আমার মনে হয়েছিল এবার আর সম্ভবত শেখ হাসিনার শেষরক্ষা হবে না।

জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে তুরস্কের প্রখ্যাত মিডিয়া ‘ইয়েনি শাফাক’-এর স্টুডিওতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে আমার একটি একক বক্তৃতা ছিল। সেখানে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলাম, শুধু ভারতের সমর্থনের জোরে জনবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনার সরকার আর বেশিদিন টিকতে পারবে না। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ আপনাদের সবারই জানা।

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে তরুণ বিপ্লবীদের প্রতি অগাধ স্নেহ আর অপরিসীম শ্রদ্ধার যুগপৎ অনুভূতি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আমার প্রত্যাশা ছিল বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে অন্যসব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে পাব। আমি রাজনীতিবিদ নই বলেই হয়তো বোকার মতো একেবারেই অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেশে ফিরে মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। দেখলাম, ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।

ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তারা পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধানে ব্যস্ত। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার জরুরি দাবিটিও আমাকে উত্থাপন করতে হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের প্রায় সমাপ্তি পর্যন্ত দুই দফার বন্দিজীবনে যাদের দিনের পর দিন জেলখানায় এক পাতে খেতে দেখেছিলাম, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েই তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদ্গার করছেন। ১৫ বছর যারা একই ধরনের মজলুম ছিলেন, তারা একে অন্যকে যথাক্রমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী এবং রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী বলে গালমন্দ করছেন।

প্রসঙ্গক্রমে পুরোনো কথা বলছি। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী এবং বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনরত আমি এবং তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিলে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের এক ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই উদ্যোগে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন এবং নিজে চীন মৈত্রী হলে মেলার উদ্বোধন করেছিলেন।

সেই সূত্র ধরেই বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের অফিসেই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। এরপর তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের অনেক ঘটনাই আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমার মনে পড়ছে না তিনি ‘রাজাকার মন্ত্রীর’ অধীনে প্রতিমন্ত্রিত্ব নিয়ে কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। চলমান সংসদেও তিনি নিজামীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু যখন সেই আলমগীর ভাইকে বাংলাদেশে মৌলবাদের কথিত উত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে একেবারে আওয়ামী বয়ানে বক্তব্য দিতে শুনি, তখন বড়ই আশ্চর্য হই। মুদ্রার অপর পিঠের কাহিনিও আছে।

আমার প্রায় পাঁচ বছরের জেল জীবনের অধিকাংশ সময় কাশিমপুর দুই নম্বর জেলে কেটেছে। সেই দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুস সালাম পিন্টু, রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মী একই জেলে বন্দি ছিলাম। জামায়াত নেতাদের মধ্যে মীর কাসেম আলী তিনতলায় আমার পাশের সেলে প্রায় দুবছর ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর ওই একই সেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার থেকেছেন। বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানও ওই সেলে বন্দি ছিলেন। জামায়াতের বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যন্ত প্রায় এক বছর একই বিল্ডিংয়ের দোতলার সেলে থাকতেন।

তিনি আমাকে বুড়ো বয়সে পবিত্র কোরআন শরিফ পড়তে শিখিয়েছিলেন। আর একজনের কথা না বললেই নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন আমাদের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় আরেক প্রান্তের সেলে থাকতেন। মামুনের সেলেই আমরা জামাতে নামাজ পড়তাম। মীর কাসেম আলী নামাজে ইমামতি করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমাদের নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

মামুনের সেলের সামনের বারান্দায় আমাদের তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সপ্তাহে এক দিন আমরা বাসা থেকে খাওয়া পেতাম। এছাড়া জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। একজন কারারক্ষী আমাদের টাকায় বাজার করে আনতেন। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এসব কিছু দেখাশোনা করতেন। জেলে রান্না করা এবং সবার বাসা থেকে আনা সাপ্তাহিক খাবার আমরা ভাগ করে খেতাম। তখন কিন্তু কোনো জামায়াত নেতাকে বলতে শুনিনি যে, আমরা কোনো চাঁদাবাজের বাসা থেকে আনা অথবা তার টাকায় কেনা খাবার গ্রহণ করব না। রাজাকার ও চাঁদাবাজরা যে একে অন্যের দৃষ্টিতে অস্পৃশ্যÑসেটি আজকের ক্ষমতাবান নেতাদের বোধ হয় ফ্যাসিস্ট আমলে কারাগারে স্মরণে ছিল না।

রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একে অন্যকে গালাগাল করবেন; আবার বিপদে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই গালাগালি ছেড়ে গলাগলি করবেনÑএতে আমাদের মতো আমজনতার কিছু যায়-আসে না। বরং এদের কাজকারবারে আমরা বেশ আমোদ অনুভব করি। কিন্তু তারা এত তাড়াতাড়ি যেভাবে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের রাস্তা নির্মাণ করছেন, সেটি বিপজ্জনক। ভাই, ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভালো কথা।

কিন্তু আপনাদের কর্মকাণ্ডে যদি কোনোভাবে জুলাই বিপ্লব নিয়ে বৈধতার সংকট তৈরি হয়, তাহলে আপনারা তো বিপদে পড়বেনই, সেই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকারও আবার হুমকির মুখে পড়বে। ৩৬ জুলাই না ঘটলে আজকের সরকারি কিংবা বিরোধী দল কোনোটাই সৃষ্টি হতো না। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, আপনাদের বিভাজনের সুযোগে এদেশের চিহ্নিত ভারতপন্থিরা আবার ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে? দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার হুমকি দেওয়ারও সাহস পাচ্ছে!

এদিকে সুশীলরা ফতোয়া দিচ্ছেন, স্বাধীনতার পর থেকে সব সন্ত্রাসের হোতা আওয়ামী লীগকে আর ‘সন্ত্রাসী’ বলা যাবে না। অথচ ব্যক্তিসন্ত্রাস থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জনগণের ওপর যাবতীয় নির্যাতনের পন্থা আওয়ামী কারখানা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল যেমন আওয়ামী ‘প্রডাক্ট’ ছিল, একইভাবে এ শতাব্দীতে আওয়ামী ঘরানা থেকেই ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ জন্ম নিয়েছে। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী দিয়ে যে গুমের জন্ম দিয়ে গিয়েছিলেন, তাকেই শেখ হাসিনা ডিজিএফআই এবং র‍্যাবকে ব্যবহার করে আরো ব্যাপক ও নির্মমভাবে প্রয়োগ করেছেন।

‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামী বয়ান তৈরির জন্য দুর্নীতির কথিত সূচককে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে সব আমলেই দুর্নীতি হয়েছে। ড. ইউনূসের আমলও দুর্নীতিমুক্ত ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট জমানায় দুর্নীতি যে মাত্রায় উঠেছিল, তার সঙ্গে এ যাবৎ অন্য কোনো আমলের তুলনা হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ সে সময় ভয়ানক সব দুর্নীতি দেখেও না দেখার ভান করেছে।

একের পর এক ব্যাংক দখল হয়েছে এবং আমানতকারীদের লাখো-কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে; অথচ সুশীলরা নীরব থেকেছেন। তারা নাকি যুক্তি দিতেন, শেখ হাসিনা খারাপ হতে পারেন; তবে দেশের অন্য যেকোনো নেতার তুলনায় তিনি মন্দের ভালো। ফ্যাসিস্ট আমলে তারেক রহমান সম্পর্কে তারা কী বলতেন, সেটি লিখে বোধ হয় আজ আর কোনো লাভ নেই। ক্ষমতা প্রাপ্তির আনন্দে বিএনপি নেতারা সেগুলো শুনতে আগ্রহী নন। শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আপনাদের নতুন বন্ধুরাই ২০০১ থেকে টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশের ললাটে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রের তিলক পরিয়ে দেওয়ার অনুঘটক ছিলেন। দুদিন আগে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুর্নীতির অনুসন্ধান দুদক দিয়ে করানোর জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন।

অথচ আজ পর্যন্ত বিএনপির কোনো মন্ত্রীর মুখে আওয়ামী আমলের দুর্নীতির অনুসন্ধানের কথা শুনিনি। বরং শেখ পরিবার, অলিগার্ক ও আওয়ামী নেতাদের বিরুদ্ধে ড. ইউনূস আমলের সব অনুসন্ধান এখন দুদকে বাক্সবন্দি হয়ে আছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, সুশীলদের মতো বিএনপির শীর্ষ নেতারাও বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা অন্যদের, এমনকি তাদের চেয়েও ভালো ছিলেন? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কদিন আগেই বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মহানুভবতার সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম জাতিকে ভুলে যেতে বলেছেন।

সব মজলুম তার মতো এতটা মহৎ নাও হতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দেখেও মনে হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের ‘মন্দের ভালো’ এবং ‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামীপন্থি সুশীল সমাজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অধিকতর আগ্রহী। যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী কোন রাজনীতিচর্চা করবেন কিংবা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, সেসব একান্তই তার বিবেচনা। আমাদের মতো আদার ব্যাপারীর সেই জাহাজের খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামে যৎকিঞ্চিৎ ভূমিকার কারণে হয়তো আজকের বিশেষ দিনে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা বলার অধিকার দাবি করতে পারি।

৩৬ জুলাইকে আমি প্রথমাবধি বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখায় ‘বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছি। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আমার অন্যতম নালিশ ছিল যে, তিনি বিপ্লবী সরকার গড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার সুশীল সমর্থকরা জুলাইকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বাংলাদেশের মিডিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী ভারতপন্থি বাম তাত্ত্বিকরাও জুলাইকে ভয়ানক অপছন্দ করেন। কারণ, তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এটি একটি ইসলামপন্থি অভ্যুত্থান ছিল।

মব সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামপন্থা জুড়ে দিয়ে এরা হাসিনার পতনের বিপক্ষে দেশ-বিদেশে বয়ান উৎপাদনের চেষ্টা করে চলেছেন। যে চিহ্নিত গোষ্ঠী একসময় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ আবিষ্কার করে হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করত, তারাই ড. ইউনূসের আমলে মৌলবাদ ও উগ্রবাদের উত্থান খুঁজে পেয়েছিল। এখন আবার নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। জুলাইকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারি দল বিএনপি বেশ সমস্যায় পড়ে যায়। কারণ, তারা বিপ্লবের প্রধান উপকারভোগী। হাসিনার পতনের পর দলে ‘গুপ্ত জামায়াতের’ বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব ‘গুপ্ত আওয়ামীদের’ জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। এ কারণেই গত প্রায় দেড় বছরে বিএনপি নেতাদের বয়ানের মধ্যে উপরোক্ত বাম ও আওয়ামীকরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তারাও নাকি বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান দেখছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের পর বিএনপির আবেগাপ্লুত প্রভাবশালী নেতারা মিডিয়ায় যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, সেখান থেকে তারা গত দুবছরে অনেকটাই সরে এসেছেন। নিজেদের সেসব বক্তব্য আবার শুনলে পার্থক্যটা তারা নিশ্চয়ই ধরতে পারবেন। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আপত্তিকে সরকারে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি একেবারে অযৌক্তিক মনে করি না।

কাজেই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ অপ্রত্যাশিত নয়। তবে সনদ বাস্তবায়নের ভয়ে খোদ জুলাই বিপ্লবকে ছোট করে দেখার মনোভাব সরকারি দলের নেতাদের আপন স্বার্থেই পরিত্যাগ করা উচিত। বিএনপির জুলাই নিয়ে বয়ান আওয়ামী প্রোপাগান্ডা ও ভারতপন্থি বাম ঘরানার তাত্ত্বিক বয়ানের সঙ্গে মিলে গেলে শেখ হাসিনার পতনের প্রক্রিয়াই যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়— সেটি আশা করি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব উপলব্ধি করবেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন কি করেননি— এ বিতর্ক যারা তোলেন, তাদের উদ্দেশ্য সরকার বুঝতে না পারলে আখেরে তারাই পস্তাবেন। এক-এগারো থেকে কোনো শিক্ষা বিএনপি নিয়েছে কি না—সেটিও আমার জানা নেই।

মোট কথা, ৩৬ জুলাই ঘটিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতাপ্রাপ্তির যে সুযোগ আমাদের তরুণরা সৃষ্টি করেছে, তাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কেউ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে আর কেউ যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াই করতে গিয়ে জুলাইয়ের মর্যাদাহানি করে উভয় গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ও জনগণের জন্য বিপদ তৈরি করছে। ইতিহাস আপনাদের এই সুযোগসন্ধানী স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করবে না।

বিপ্লব অস্বীকার করলে ক্ষমতার ন্যায্যতা থাকবে না
মাহমুদুর রহমান

শিশুর ভালো ঘুমের জন্য যেসব অভ্যাস করাবেন by রাফিয়া আলম

শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য ভালো ঘুমের বিকল্প নেই। কোনো কাজ শিশু কতটা মনোযোগ দিয়ে করতে পারবে, নির্ভর করবে শিশুর ঘুমের ওপর। সুস্থ থাকতে শিশুকে যেমন ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা শেখানো হয়, তেমনি তাদের নিদ্রা স্বাস্থ্যবিধিও অভ্যাস করানো উচিত। একেই বলে স্লিপ হাইজিন। এই নিদ্রা স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নিই চলুন।

সময় হোক নির্দিষ্ট

রোজ একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। তবে বিষয়টা যেন এমন না হয় যে শিশুকে জোর করে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়ে অভিভাবক রাত জেগে মুঠোফোন স্ক্রল করছেন। ছুটির দিনে দেরি করে ওঠার অভ্যাসটিও শিশুর জন্য ভালো নয়। তাতে বায়োলজিক্যাল ক্লক বা দেহঘড়ির সময় এলোমেলো হয়ে যায়। তাই ছুটির আগের দিনও রাত করে বাইরে ঘোরাঘুরি কিংবা রাত জেগে সিনেমা দেখা বা গল্প করা ভালো চর্চা নয়। তাতে সেদিন ঘুমাতে দেরি হবে, পরদিন ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হবে। এলোমেলো হবে দেহঘড়ির সময়। 

ঘুমের আয়োজন

  • বিছানায় পড়ালেখা, গেম খেলা, খাওয়া দাওয়া বা অন্য কোনো কাজ করা যাবে না। বিছানা কেবল ঘুমেরই জন্য ব্যবহার করতে হবে। তাহলে বিছানায় গেলে মস্তিষ্ক বুঝতে পারবে, এখন ঘুমের সময়।

  • ঘুমের আগে ছোট শিশুকে গল্প বা ছড়া বলা যেতে পারে। একটু বড় হলে ঘুমের আগে নিজেও বই পড়তে পারে শিশু। তবে উত্তেজনাপূর্ণ কোনো কিছুই ঘুমের আগে ভালো নয়। হোক তা গল্প, হোক তা বই। ঘুমের আগের সময়ে এমন বই বেছে নেওয়া উচিত নয়, যা গভীর চিন্তার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়।

  • অন্ধকার ঘরে শিশু ভয় পেতে পারে। এ সমস্যা এড়াতে ঘুমের সময় ঘরে মৃদু আলোর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

  • ঘুমের আগে শিশুকে উষ্ণ পানিতে গোসল করানো যেতে পারে। তাঁকে প্রার্থনা করতে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। যোগব্যায়াম, শ্বাসের ব্যায়াম, শিথিলায়নের অভ্যাস করা যেতে পারে। শোনানো যেতে পারে আয়েশি কোনো অডিও।

  • ঘুমের আগমুহূর্তে যা করতে নেই

  • ঘুমের অন্তত এক-দুই ঘণ্টা আগেই পড়ালেখা শেষ করে ফেলতে হবে। রাতে পড়া শেষ না হলে ভোরে উঠে পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

  • ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে ইলেকট্রনিক বা স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের পাট চুকিয়ে ফেলতে হবে।

  • খেলাধুলা বা শারীরিক শ্রম হয়, এমন কাজ ঘুমের অন্তত চার ঘণ্টা আগেই সেরে নিতে হবে। 

    খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ

    • ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দু-তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে। রাতের খাবারটা হতে হবে হালকা, সহজপাচ্য। রাতে ভারী খাবার, মসলাদার খাবার, মিষ্টি খাবার, চিপস প্রভৃতি খাওয়া উচিত নয়।

    • ঘুমের এক ঘণ্টা আগে দুধ, খেজুর বা কলা খাওয়া যেতে পারে। তাহলে রাতে হঠাৎ খিদে পাবে না। তবে এ সময় বাড়তি কোনো স্বাদ বা ঘ্রাণের দুধ (ফ্লেভারড মিল্ক) না খাওয়াই ভালো।

    • বেলা দুইটার পর চকোলেট বা চকোলেট মেশানো খাবার না খাওয়াই ভালো। কারণ, চকোলেটে ক্যাফেইন থাকে, যা ঘুমের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটু বড় হওয়ার পর চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস হলে তখনো খেয়াল রাখতে হবে, বেলা দুইটার পর যেন এসব পানীয় খাওয়া না হয়।

    স্লিপ হাইজিন মেনে না চলায় শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে
    স্লিপ হাইজিন মেনে না চলায় শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। মডেল: পদ্মহেম পাবন। ছবি: কবির হোসেন


ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংস করছে ইসরাইল

একটি নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে পরিচালিত গণহত্যা (রিপ্রোডাক্টটিভ জেনোসাইড) চালিয়ে আসছে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, নারী ও শিশু হত্যা এবং বসবাসের পরিবেশকে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে যে এর ফলে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিচ্ছে। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।

প্যালেস্টিনিয়ান ফেমিনিস্ট কালেকটিভ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে এই কর্মকাণ্ড আরও তীব্রতর হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনধারা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে অসম্ভব করে তোলা।

এর আগে গত সপ্তাহে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল বিষয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থাও এক প্রতিবেদনে জানায়, গাজায় অভিযানের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে ইসরাইলি বাহিনী।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নানা ধরনের নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্নাইপার ও ড্রোনের নির্ভুল গুলি, আটক অবস্থায় নির্যাতন, প্রজনন-সম্পর্কিত সহিংসতা এবং স্কুল ও হাসপাতাল ধ্বংস।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ২১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও প্রায় ৫ হাজার ১৬০ শিশু চাপা পড়েছে। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ১৫ হাজার শিশু তাদের মাকে হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংস করছে ইসরাইল
ছবি: সংগৃহীত।

বৈঠকে না বসে ইরান বলল, আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত

দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা কখন হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা হয়নি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখল ইরান। ইরানি সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা স্মারক মেনে না-চলে, তেহরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তিনি জানান, ওয়াশিংটন যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোবে না।

এক সাক্ষাৎকারে বাকের কালিবাফের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে। পারস্য উপসাগরে মার্কিন হামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই জবাব দেব।’ তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা শুধু একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছোনো নয়। বরং এই আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সমঝোতার ১৪ দফা শর্তের কথা।

কালিবাফের কথায়, ‘আমরা এমওইউ স্বাক্ষর করেছি। এই সমঝোতা স্মারকের ১৩ অনুচ্ছেদ পূরণের জন্য আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে। এটিই ছিল সমঝোতা স্মারকের অন্যতম বড় সাফল্য।’ কী রয়েছে ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে? এতে বলা হয়েছে, সমঝোতার শর্তগুলো মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গঠিত একটি দল। যদিও সেই দল কীভাবে কাজ করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ইরানের স্পিকারের মতে, ওই দল গঠনের কাজ বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে আলোচনা চলছে।

এমওইউ স্বাক্ষরের পর তেল রফতানির ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কালিবাফ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী থেকে অবরোধ উঠে যাওয়ার পর থেকে ইরান চার কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল রফতানি করেছে।’ তিনি জানান, হরমুজের ওপর ইরান এবং ওমানের কর্তৃত্ব রয়েছে। ওই নৌপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে কালিবাফ বলেন, ‘বিনামূল্যে হরমুজ দিয়ে ৬০ দিন যাতায়াত করতে পারবে পণ্যবাহী জাহাজগুলো। ইরান কোনো অবস্থাতেই হরমুজের ওপর তার অধিকার ছেড়ে দেবে না। এটা আমদের আঞ্চলিক জলসীমা।’

কাতারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক নিয়ে বিভ্রান্তি তুঙ্গে। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, কাতারে দ্বিতীয় দফার বৈঠক হবে। মঙ্গলবার সেই বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। সোমবার হোয়াইট হাউসের তরফে জানানো হয়, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার কাতারে যাচ্ছেন। ঘটনাচক্রে, প্রায় একই সময়ে কাতারে প্রতিনিধিদল পাঠায় ইরানও। তবে তেহরান জানায়, কাতারে প্রতিনিধিদল যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠক হবে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই সে দেশের সংবাদসংস্থা ফার্স নিউজকে বলেন, ‘মার্কিন প্রতিনিধিদের কাতারে যাওয়ার সঙ্গে আমাদের প্রতিনিধিদলের সেখানে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।’

গত ১৭ জুন যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার পর উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়। তবে পরে দফায় দফায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান হামলা-পাল্টাহামলা চালায়। আপাতত আবার তারা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। তবে দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করছে। চলছে বাগ্‌যুদ্ধও। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশই পরখ করে নিতে চাইছে বিপক্ষের ক্ষমতা। ছোটখাটো হামলার ঘটনা ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান, কেউই অদূর ভবিষ্যতে পুরোদমে যুদ্ধে নামতে চাইবে না।

বৈঠকে না বসে ইরান বলল, আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত

ভারতে নতুন করে ভাঙা হলো আরো তিন মসজিদ

ভারতের গুজরাট রাজ্যের কুচ জেলায় আগাম নোটিশ ছাড়াই তিনটি মসজিদ ও কয়েকটি মাজারসহ মোট ৩০টি স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের এ অভিযানের পর ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ দেশটির মুসলমানদের সর্ববৃহৎ সামাজিক সংগঠন জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুস্তান গ্যাজেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ অভিযানে মোট ৩০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১১টি ধর্মীয় স্থাপনা, ১৭টি বাণিজ্যিক ভবন এবং দুটি আবাসিক স্থাপনা।

তুর্কি গণমাধ্যম টিআরটি ওর্য়াল্ড প্রকাশিত এক ভিডিওতেও মসজিদ ভেঙে ফেলার বিষয়টি দেখা যায়।

ঘটনার পর জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধি দল কুচ জেলা পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন জমিয়তের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা হাকিমুদ্দিন কাসেমী।

তিনি অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই মসজিদগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তারা সন্তোষজনক কোনো জবাব পাননি।

ভেঙে ফেলা স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক জুনা কান্দলা মসজিদ। মসজিদের খাদেম জানান, হঠাৎ করেই সেখানে অভিযান চালিয়ে স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের আটক করার হুমকি দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সাল থেকেই জুনা কান্দলা মসজিদটি ওয়াকফ হিসেবে নিবন্ধিত ছিল। এর নান্দনিক নির্মাণশৈলীর কারণে এটি এলাকায় পরিচিত একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হতো।

মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সামার বলেন, উচ্ছেদের সময় তারা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার এবং মসজিদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের সেখানে যেতে দেয়নি। বরং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ভারতে নতুন করে ভাঙা হলো আরো তিন মসজিদ