Thursday, August 4, 2016

ট্রাম্পের দলে হাঙ্গামা

আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রিপাবলিকান দলে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করেছে। দলের আলোচিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে হতাশা বাড়ছে সিনিয়র নেতাদের। নির্বাচনের মাত্র তিন মাস বাকি থাকতেই ট্রাম্পের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। রিপাবলিকান দাতা এবং তহবিল সংগ্রাহক মেগ হুইটম্যান জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দেবেন। এ ছাড়া রিপাবলিকান দলের প্রথম কোনো কংগ্রেসম্যান হিসেবে রিচার্ড হান্না প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি হিলারিকে সমর্থন করছেন। দলের আরেক সিনিয়র নেতা জন হালপার হায়েস বিবিসিকে বলেছেন, ট্রাম্প ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য আচরণ ও বেফাঁস মন্তব্যে দিশেহারা রিপাবলিকান পার্টি। হাল ছেড়ে দিচ্ছে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটিও। কমিটির প্রধান রিন্স প্রাইবাস ডোনাল্ডের দিকে যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন, তিনিও হাত গুটিতে দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। সর্বশেষ ট্রাম্প নিজ দলের প্রভাবশালী দুই নেতা স্পিকার পল রায়ান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইনের পুনর্নির্বাচনে কোনো সহযোগিতা করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
হাউস স্পিকার পল রায়ান আর সিনেটর জন ম্যাককেইন নভেম্বরে পুনর্নির্বাচনে দাঁড়াবেন। রিপাবলিকান দলের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার পল মানাফোর্ট বলেছেন, তিনি এখন রীতিমতো হতাশ। ফিলিপাইনের ইমেলদা মার্কোস, অ্যাঙ্গোলার জোনাস সাভিম্বি, ইউক্রেনের ভিক্টর ইনাকোভিচের মতো বাঘা বাঘা ডিক্টেটরদের সামলে অভ্যস্ত এই ম্যানাফোর্ট। অথচ তিনিই বন্ধুদের কাছে বলেছেন, ট্রাম্পকে কোনো পথেই সামলাতে পারছেন না। ম্যানাফোর্টের বন্ধু ও মিত্র বলে পরিচিত এমন অনেকেই তাকে উদ্ধৃত করে বলছেন, তিনি ‘হতাশ’। এর প্রধান কারণ ট্রাম্প আসলে কারও কোনো পরামর্শের ধার ধরছেন না। এমনকি শুনতেও চান না। বরং নিজের মতো করে টুইটার আর ফেসবুকে এটা সেটা লিখে সমালোচনার ঝড়ের মুখে পড়ছেন। গোপন সূত্রে সিএনএন জানিয়েছে, ম্যানাফোর্ট বলেছেন, ‘আমরা শুধু শুধু সময় অপচয় করছি।’ সব মিলিয়ে রিপাবলিকানের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এখন প্রকাশ্যে ট্রাম্পের পক্ষে নেই। তবে দলে প্রতিষ্ঠিত নেতাদের জোট বেঁধে বিরোধিতাও দেখা যাচ্ছে না। এদিকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অযোগ্য উল্লেখ করে রিপাবলিকান নেতাদের তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করতে আহ্বান জানিয়েছেন।
তার এ আহ্বানকে ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করছেন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতিহাসবিদ ডাগলস ব্রিংকলি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নিকট অতীতে এমন ঘটনা একবারই ঘটেছিল। সম্প্রতি ট্রাম্প এক নির্বাচনী সভায় বলেছেন, ‘নির্বাচন-পদ্ধতিটা এমনিতেই গোলমেলে। আগামী নির্বাচনে কারচুপি করে তাকে হারানো হতে পারে।’ এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির নারী মুখপাত্র লিন্ডসে ওয়াল্টার বলে দিয়েছেন, এর ব্যাখ্যা ট্রাম্পের ক্যাম্পেইনই ভালো দিতে পারবে। তবে ট্রাম্পের অভিযোগ আমলে নিচ্ছেন না মার্কিন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। পিউ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ডেভিড বেকার বলেছেন, গত দু’দশকের নির্বাচন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নির্বাচন পরিচালনা কাজে নিয়োজিত লোকজন সর্বোচ্চ সততা ও পেশাদারি নিয়ে কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত মুসলিম সেনাসদস্য ক্যাপ্টেন হুমায়ুন খানের আত্মত্যাগকে উপহাস করে রিপাবলিকান-ডেমোক্রেটিক উভয় শিবির থেকে তোপের মুখে আছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের নানা বিতর্কিত বক্তব্য এবং গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে আলোচনার প্রভাব জাতীয় জনমত জরিপে পড়েছে। সিএনএন পরিচালিত সবশেষ জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি জনসমর্থনে এগিয়ে আছেন হিলারি।

ইরানকে ৪০ কোটি ডলার মুক্তিপণ ওবামা প্রশাসনের!

যুক্তরাষ্ট্র গত জানুয়ারি মাসে অতি গোপনে ইরানে বিমানে করে ৪০ কোটি ডলার পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। ইরানে জিম্মি চার আমেরিকানের মুক্তির আগে এ অর্থ পাঠানো হয়। সমালোচকরা বলছেন, মুক্তিপণ হিসেবে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ অর্থ দিয়েছে। তবে ওবামা প্রশাসন তা অস্বীকার করেছে। মঙ্গলবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ওবামা প্রশাসন বলছে, ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লবের আগের একটি অস্ত্র চুক্তি নিয়ে সমঝোতা বাবদ ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭০ কোটি ডলার দেয়ার কথা ছিল। ৪০ কোটি ডলার সেই অর্থের অংশ। ইরানে জিম্মি চার আমেরিকানের মুক্তির জন্য ওই অর্থ দেয়ার কথা অস্বীকার করে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জন কিরবি বলেন, আমরা স্পষ্ট করেই বলেছি যে চার আমেরিকানের দেশে ফেরার আলোচনার সঙ্গে (অস্ত্র চুক্তি নিয়ে) সমঝোতার আলোচনার কোনো সম্পর্ক ছিল না। দুটি আলোচনা শুধু পৃথকই ছিল না, আলোচনাকারীও ছিল ভিন্ন। তিনি বলেন, ইরানের বিপ্লবোত্তর অস্ত্র চুক্তি নিয়ে হেগে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছিল এবং এতে বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। ওয়াল স্ট্রিট জানায়, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই অর্থ কেনা হয় এবং কাঠের বাক্সে ভরে ইউরো, সুইস ফ্রাঁ এবং অন্যান্য মুদ্রা বেনামি একটি কার্গো বিমানে তেহরান পাঠানো হয়। ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লবের আগে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইলিনয়েসের সিনেটর মার্ক কির্ক বলেছেন, ইরানকে দেয়া ৪০ কোটি ডলার ছিল মুক্তিপণ। অপহরণকারীদের মুক্তিপণ দিয়ে আমেরিকানদের উদ্ধার করায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে বলে মত দেন কির্ক।
পরমাণু কর্মসূচি ফের শুরু করার হুমকি গত বছর ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর সই হওয়া পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়ন করতে আমেরিকা অব্যাহতভাবে অবহেলা করলে তার দেশ পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি আবারও চালু করতে পারে বলে জানিয়েছেন ইরান সংসদ পরিচালক বোর্ডের মুখপাত্র বেহরুজ নেমাতি। মঙ্গলবার ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা পার্সটুডেকে তিনি বলেন, পরমাণু সমঝোতা বা জেসিপিওএ’র প্রতিশ্রুতি পালন করতে আমেরিকা ব্যর্থ হলে তা হবে সমঝোতাবিরোধী কর্মকাণ্ড। তিনি বলেন, জেসিপিওএ একটি ব্যাপক ভিত্তিক সমঝোতা। আমেরিকা যদি এটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন না করে তাহলে আমরাও অনুরূপ ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেন যে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন। তবে তাদের কর্মকাণ্ডে সেটি সমর্থন করে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। ইরানের এই আইনপ্রণেতা বলেন, জেসিপিওএ বাস্তবায়নের সময় প্রায় ছয় মাস অতিক্রম করলেও ইরানের সঙ্গে ছোট ব্যাংকগুলোর সীমিত লেনদেন ব্যতীত বড় বড় ব্যাংকগুলো পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত রয়েছে। নেমাতি বলেন, ইরান আশা করে যে, ছয় জাতিগোষ্ঠীর দেশগুলো পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়ন করবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি সোমবার বলেছেন, ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে তার দেশের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা প্রমাণ করে যে শত্র“দের বিশ্বাস করা যায় না। তিনি বলেন, পরমাণু চুক্তির ফলে ইরানের সাধারণ জনগণের কোনো লাভ হয়নি।

ডিএনডি এখন মরণ বাঁধ

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরার ডিএনডি বাঁধের ভেতরের মানুষ বছরজুড়েই নানা ভোগান্তির মধ্যে বসবাস করে আসছে। ১৯৬৫ সালের আগে এ এলাকায় শুকনো মৌসুমে থাকত সবুজ ফসলের মাঠ, আর বর্ষায় থাকত কানায় কানায় পূর্ণ পানি। পাকিস্তান আমলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে মাতুয়াইল, মুসলিম নগর, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থানাসহ ৫৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বন্যামুক্ত এলাকা গড়তে প্রতিষ্ঠা করা হয় ডিএনডি বাঁধ। ডিএনডি প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এ এলাকার মানুষ যাতে খালের পানি সেচের মাধ্যমে ইরি ধানসহ যাবতীয় ফসল নির্বিঘ্নে ফলাতে পারে। এলাকাটি ঢাকা শহরের অতি সন্নিকটে বন্যামুক্ত বিধায় ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠতে শুরু করে বসতবাড়ি। বর্তমানে ফসলের ক্ষেত বিলীন হয়ে এখানে বহুতল অট্টালিকার সমাহার। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা, ঘরবাড়ি সবই যেন জলাশয়ে পরিণত হয়। ডিএনডি যেন এখন মরণ বাঁধ।
ডিএনডি বাঁধ এলাকায় অসহায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন বাসিন্দারা। অন্যদিকে কয়েক দশকের পুরনো পাম্প দিয়ে উপরোক্ত এলাকাগুলো সারাদিন সেচ করেও জলাবদ্ধতা কমানো যাচ্ছে না। জানা গেছে, ১৯৬৮ সালের যন্ত্রাংশ দিয়ে এখনও সেচ কার্যক্রম চলে। ডিএনডি বাঁধ এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য চারটি পাম্প রয়েছে, যা দিয়ে সেকেন্ডে ১৫ কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা যাচ্ছে; কিন্তু প্রতি সেকেন্ডে ৭৮ কিউসেক পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন। পাউবো ঢাকা মহানগর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাইদ জানিয়েছেন, পাম্পের ক্ষমতা কমে গেছে। দ্রুত নতুন ৪টি পাম্প স্থাপন জরুরি। পাশাপাশি বাঁধ এলাকার ৯৪ কিলোমিটার খাল সংস্কার ও দখলমুক্ত করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। তিনি জানান, ২০১০ সালে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়। সেই প্রতিবেদনে ২৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পাম্প স্থাপন, খাল সংস্কার ও দক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো উঠে আসে। প্রকল্পটি ২০১১ সালে একনেকে অনুমোদন পেলেও টাকার অভাবে কাজ শুরু করা যায়নি। পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (পাম্প হাউজ) জীবন কুমার সাহা জানান, বহুদিনের পুরনো পাম্পগুলো আর সর্বোচ্চ ৩ বছর চালানো সম্ভব। এখনই প্রস্তুতি না নিলে ডিএনডি এলাকাসহ ঢাকার একটি বড় অংশে বর্ষা মৌসুমে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে। ডিএনডি পাম্প হাউসে একযুগ ধরে কর্মরত প্রকৌশলী লিয়াকত আলী খান বলেন, ‘আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, দুই বছরের মধ্যে বাঁধ এলাকার পানি নিষ্কাশনের সব উৎস অকেজো হয়ে যাবে। এখান থেকে কোনো পানিই নিষ্কাশন হবে না। বিকল্প ব্যবস্থা করতে না পারলে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাবে। কিছু করতে হলে এখনই শুরু করতে হবে। কারণ একটি পাম্প বসাতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই বছর।’
ডিএনডি বাঁধের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বছরের পর বছর ফাইল বন্দি। ডিএনডি বাঁধ সূত্রমতে, ডিএনডির বর্তমান মোট আয়তন ৩২ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৫ সালে সেচ প্রকল্প ছিল ৫ হাজার ৬৪ হেক্টর। অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে ২৩৩ দশমিক ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয় ডিএনডি প্রকল্পের অবস্থান। ১৯৬৫ সালে শুরু করে ১৯৬৮ সালে ডিএনডি প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছিল। বাঁধের ভেতরে কংস নদ নামে একটি বড় ও প্রশস্ত খাল ছিল। এছাড়া ছিল পাগলার খাল ও মালখালী খালের মতো ৯টি খাল। ১৯৯২ সালে জাপানি সাহায্য সংস্থা জাইকা সমীক্ষা চালিয়ে ডিএনডিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমান পাম্প হাউজের মতো ৫টি নতুন পাম্প হাউজ স্থাপন ছাড়াও একাধিক প্রস্তাব রাখে। ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্তৃপক্ষ এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে নামলেও পাঁচটি পাম্প অদ্যাবধি নির্মাণ করা হয়নি। ডিএনডি এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে ২৩৮ কোটি ৩৮ লাখ ১৬ হাজার টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিএনডির জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের জন্য আইনের মাধ্যমে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে, যা ড্রেনেজ ইম্প্রুভমেন্ট অব ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা প্রজেক্ট নামে পরিচিত। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ডিএনডির অভ্যন্তরে অল্প বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান সম্ভব হতো বলে মনে করা হয়।
সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে মাতুয়াইল দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ২০ লাখেরও বেশি মানুষ ডিএনডি বাঁধের ভেতরে জলাবদ্ধতায় আটকে গেছে। গত ২৭ জুলাই যমুনা টিভিসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিস্তারিতভাবে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্প্রচারিত হয়েছে। পানি জমে থাকার কারণে প্রতিবছর পাকা করার পরও ভালো ভালো রাস্তা ভেঙে গিয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। ডিএনডি বাঁধের ভেতরের কারখানার বর্জ্য পানি বিভিন্ন খাল, বিশেষ করে পাগলার খাল দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ পাম্প মেশিন দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে মিশে নদীর পানিও ব্যবহারের অনুপযোগী করে ফেলে। প্রতিবছর বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা ডিএনডি বাঁধের ভেতর বন্যা সৃষ্টি হয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার অপূরণীয় ক্ষতি হয়। বর্ষাকালে এলাকার শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারে না। মেরামতকৃত এবং নতুন পাকা রাস্তা ভেঙে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ১৯৯৮ সালে ডিএনডি বাঁধের ভেতর ভয়াবহ বন্যার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতুয়াইলসহ ডেমরা এলাকার বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। পাশে ছিলেন মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও ডেমরা থানার স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ হাবিবুর রহমান মোল্লা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও ত্রাণ বিতরণ করেছেন। আমরা ডিএনডি বাঁধের ভেতর এই ভয়াবহ বন্যার কবল থেকে বাঁচতে চাই। ডিএনডি বাঁধের ভেতরে বসবাসকারী মানুষ এখন বিপদগ্রস্ত। তাদের এলাকায় বসবাসসহ সন্তানদের লেখাপড়া অনেকটাই হুমকির মুখে। এলাকার ২০ লাখ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর মুখপানে তাকিয়ে আছে।
মো. সিদ্দিকুর রহমান ও এমএ ছিদ্দিক মিয়া : যথাক্রমে আহ্বায়ক ও সদস্য, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম

আরব বসন্ত ব্যাকফায়ার করেছে এখন দরকার নতুন এক মধ্যপ্রাচ্য

আমাদের রাজনীতিক তো বটেই, লেখক-বুদ্ধিজীবীদেরও কেউ কেউ একদম ঘোর গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধাটির চেয়েও অনাধুনিক, রক্ষণশীল। এরা রটেন পটেটোর চেয়ে অধিক কিছু নন, তবু কেন জানি থাকছেন সব তরকারিতেই। যেমন ধরুন, সেই কবে চন্দ্রগুপ্তের আমলে মার্কসীয় দর্শনের দীক্ষা নিয়েছিলেন (তখন তো মার্কসের জন্মই হয়নি বলে কেউ আবার ব্যাকরণগত ভুল ধরবেন না যেন), এর মাঝখানে কত কিছু ঘটল- সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙল, পূর্ব ইউরোপ তছনছ হয়ে গেল, চীনের লোকজন লু শ্যুন বাদ দিয়ে শেক্সপিয়র ধরল, পশ্চিমবঙ্গবাসীও মার্কসীর দর্শনের মোহ ত্যাগ করল, আরও কত কী! কিন্তু এদের ওই এক কথা, মার্কসবাদই আলটিমেট নলেজ। এদেরকে যদি বলি, ফসিল তো থাকবে জাদুঘরে, রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কেন, এরা উত্তর দেন- দু’চারটি বেলুন ওড়া দেখে কি বলা যায় মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ভুল? এদের একজনকে বলেছি, বেলুন তো সবই উড়ে গেল, বাকি থেকেছে ক্যাস্ট্রোর বেলুনটি, ওটাও তো দ্রুতবেগে উপরে উড়ে চলেছে। এরা শেষ কথা বলেন- যা-ই বলেন, রিসাইক্লিংয়ে আবার ফিরে আসবে মার্কসবাদ। এরপর তো বলতেই হয়, ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি ঘটায় বটে, তবে প্রথমবার যা ট্রাজেডি, দ্বিতীয়বার সেটা প্রহসন হয়ে পড়ে।
আপত্তি ছিল না, যদি এসব কথিত মার্কসবাদী মতবাদটিকে যুগোপযোগী করার প্রয়াস নিতেন। টমাস পিকেটি যা করে চলেছেন। ৪৭ বছর বয়সী এই ফরাসি অর্থনীতিবিদকে দুনিয়াজুড়ে এখন বলা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর কার্ল মার্কস। বিশেষত ইউরোপের সম্পদ বৈষম্যকে তিনি নতুন দৃষ্টিতে দেখছেন। আমাদের বামপন্থীরা হয়তো পিকেটির নামও শোনেননি। ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে মার্কস যে চেয়ারটায় বসে পড়াশোনা করতেন, সেটাতে বসে দেখেছি কেমন লাগে; গা শিউরে উঠেছিল। কিন্তু এই আমিই লন্ডনে তার কবরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত জোড় করে বলেছিলাম- তোমার কল্পিত সমাজে আমি নিজস্ব নিয়মে বিকশিত হতে পারব না বলে তোমাকে ত্যাগ করেছি মার্কস। দুঃখিত, তুমি কিছু মনে করো না। আমাদের বামপন্থীরা সেই যে মার্কস-লেনিন-মাও জে দংকে পীর ধরেছেন, এখনও আচ্ছন্ন হয়ে আছেন সেই পীরতন্ত্রে।
আমাদের কথিত ডেমোক্রেট অথবা লিবারেল ডেমোক্রেটরাও কি কম অনাধুনিক! আওয়ামী লীগের কথাই ধরি। পৃথিবী অথবা এই দেশ যে কোথায় চলে গেছে, তাদের হুঁশ নেই। তাই কথায় কথায় গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের উদাহরণ টেনে আনেন তারা। অতীতের কোন্ ঘটনাকে শুধুই ইতিহাস হিসেবে দেখতে হবে আর কোনটাকে মেলাতে হবে বর্তমানের সঙ্গে, এই জ্ঞান তাদের নেই। তারা তাই বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা তুলে সেই ইতিহাসকে গ্লোরিফাই করে ক্রেডিট নিতে চান, কিন্তু জানেন না বর্তমান বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে দৃশ্য দেখি আমরা, মোটামুটি সহনীয় হলেও তার ভিত্তিটা দিনদিন দুর্বল হচ্ছে। কবে যে উপরি কাঠামোটা ধুপ করে পড়ে যায়! হ্যাঁ এই বাংলাদেশেই বাবা-মা এখন সন্তানের নাম এমন বাংলায় রাখতে চান না, যাতে গন্ধ শুঁকে হিন্দুত্ব খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। হ্যাঁ এখানেই, বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক স্বপ্নালোকিত এই বাংলাদেশেই এমন অনেক পরিবার আছে, যেখানে সন্তানের প্রতি নির্দেশ থাকে স্কুলে তার পানির বোতলটি যেন কোনো হিন্দু সহপাঠী না ছোঁয়। এই বাংলাদেশকে ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট আর ছয় দফা দিয়ে সামলানো যাবে? অথবা আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ছেঁটে যে মহা কাণ্ডটি ঘটানো হয়েছিল এককালে, তার কি কোনোই উপযোগিতা আছে বর্তমানকালে?
আর বিএনপি? পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তাকিয়ে তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই দেখতে পান বলে অনেক কষ্টে ভাসানীকে বিকল্প দাঁড় করিয়ে নিরর্থক অতীত চর্চা করেন। কখনও কখনও ভাসানীতে না কুলোলে তারা সিরাজউদ্দৌলা পার হয়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি পর্যন্ত ছুটে যান। তাদের দরকার মুসলমান বীর, তিনি যত দূর ইতিহাসেরই হোন। বাংলাদেশ এখন যেভাবে দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে, এ ধরনের ইতিহাস চর্চা দিয়ে তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যাবে?
২. বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ নিয়ে লিখতে গিয়ে এত কথা বললাম এজন্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মতো বিশ্বনেতৃত্বকেও এখন অনাধুনিক বলা যায়। তারা বুঝতেই পারছেন না একটি নতুন ধরনের world order বা বিশ্ব-শৃংখলাই কেবল পারে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ দমন করতে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র কেন নতুন world order-এর ব্যাপারে আগ্রহী নয়, তা যে আমরা বুঝি না, তা নয়। আমাদের বুঝটা নিখাদ যে, আপাতদৃষ্টিতে জঙ্গিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় এজেন্ডা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা এমন কোনো সমীকরণে যাবেন না, যা তাদের অস্ত্র ব্যবসাসহ নানাবিধ সম্প্রসারণবাদী স্বার্থের প্রতিকূলে থাকে। বরং জঙ্গিবাদ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিটা অনেকটা জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মতোই। নিষিদ্ধ করো না, জিইয়ে রাখো। মারোয়ারি ব্যবসা-বুদ্ধি আর কাকে বলে! দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিটাও অনাধুনিক। ওরা আমাদের ডাকে ‘তৃতীয় বিশ্ব’। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল কিংবা স্বল্পোন্নত অভিধা আমরা মেনে নিয়েছি; কারণ বাস্তবতা অস্বীকার করবে কে? কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব কেন? মূল বিশ্ব বলে কিছু আছে নাকি? গ্রামের একজন গতরখাটা মানুষকে আমরা দরিদ্র বলি, কিন্তু তাকে কি কোনোভাবেই সাব-হিউম্যান বলা যায়? নাকি ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো মিলিয়েই তৈরি করেছি আমরা মানবজাতি? আসলে এই সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাক, তাতে পশ্চিমা সরকারগুলোর কিছু যায়-আসে না, তারা পুরনো ধারণা থেকে সরে আসবেন না। মলমূত্র ছাড়া তারা কিছুই ত্যাগ করতে জানেন না।
আজকের যে জঙ্গিবাদ, তা পরাশক্তিদের অতীত ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরই খেসারত। অবশ্য ভুল না বলে স্বার্থবাদী সিদ্ধান্ত বলাই ভালো। বলা বাহুল্য, পরবর্তীকালে ওইসব সিদ্ধান্তের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, সেগুলোর মীমাংসা না করে সিরিয়ায় এয়ার স্ট্রাইক বা অন্য কোনো উপায়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাবে না। প্রথমত, প্রথম মহাযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তির ভেতর যেমন লুকিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শর্ত, তেমনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীনই তখনকার দুই পরাশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র তখনও পরাশক্তি হয়ে ওঠেনি) ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যকার সাইকস-পিকট চুক্তি (এই চুক্তিতে ব্রিটেনের পক্ষে মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের পক্ষে ফ্রাঁসোয়া জর্জেজ পিকট স্বাক্ষর করেছিলেন) সূত্রপাত ঘটিয়েছিল আজকের জঙ্গিবাদের। এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে ব্রিটিশ, সিরিয়া ও লেবাননকে ফরাসি এবং ইস্তান্বুলকে জারের রুশ শাসনে নিয়ে আসা হয়। এই বিভাজন মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীবিরোধী মনোভাবেরই জন্ম দেয় না শুধু, তাদের আশা-আকাক্সক্ষাও মারাত্মকভাবে আহত করে। দ্বিতীয় ভুলটি সংঘটিত হয় ইরাককে কেন্দ্র করে। ইরাক আক্রমণের আগেই পশ্চিমা মিডিয়া ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, সাদ্দামকে পরাস্ত করে সেখানে মার্কিন উপস্থিতি ঘটালে ইরাক শিয়া, সুন্নি ও কুর্দিপ্রধান তিন ভূখণ্ডে বিভাজিত হয়ে পড়বে। বাস্তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তা ঘটেছেও। ইরাক আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র যত বড় ভুল করেছে, সাদ্দামকে পরাস্ত করার পর তার সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত করার ভুলটি তার চেয়ে কম কিছু নয়। এত বড় এক বাহিনী, যাদের রয়েছে সামরিক প্রশিক্ষণ ও দৈহিক সামর্থ্য, বিপরীতে নেই কোনো কাজ- তারা তাহলে কী করবে? বলা যায়, আইএসের ভিত্তিই রচনা করেছে সাদ্দামের বিলুপ্ত সেনাবাহিনীর সদস্যদের একাংশ। এক কথায় বললে, ঔপনিবেশিক শাসনেরও কিছু পজিটিভ সিস্টেম থাকতে হয়; কিন্তু ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন জোট কোনো সিস্টেমেরই ধার ধারেনি। মালেকীকে তারাই বসিয়েছে, আবার শিয়া-ডমিনেটেড এই সরকারের সঙ্গে শিয়াপ্রধান ইরানের ন্যাচারাল সখ্য যাতে গড়ে উঠতে না পারে, সেজন্য এই সরকারকে সাইজে রাখতে সুন্নিদের উসকেও দেয়া হয়েছে। সোজা কথা, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শিয়া-সুন্নির যে প্রকট দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থে সেটার বিশ্রী ব্যবহার করেছে।
বস্তুত আরব বসন্ত ব্যাকফায়ার করার পর থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, সাইকস-পিকট চুক্তির পর দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যবাসীর মধ্যে যে ক্ষোভ ঘনীভূত হচ্ছিল, তার অন্যরকম প্রকাশ ঘটবে। তিউনিসিয়ায় শুরু হওয়া বসন্তের যে বাতাস ছড়িয়ে দেয়া হল লিবিয়া, মিসর ও সিরিয়া পর্যন্ত, সেই বাতাসে যদি মধ্যপ্রাচ্যবাসীর হৃদয় জুড়াতো, তাহলেও আইএসের জন্ম হতো না। কিন্তু কী হল? লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে সরানো হল বটে, প্রতিস্থাপিত দুর্বল সরকার কি রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে পারল? মিসরে এলো চরমপন্থার ব্রাদারহুড, সেটাকে সরিয়ে আবার সামরিক শাসক। অর্থাৎ সেখানেও রাজনৈতিক অস্থিরতা। সিরিয়ায় আসাদ টিকে গেলেন বটে; কিন্তু অস্থিরতা গেল কি? সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যবাসীর আকাঙ্ক্ষা, তারা পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত একটি স্থিতিশীল সমাজে বাস করবে, বঞ্চনাবোধ থেকে মুক্ত হবে। সেটা হল না। আরব বসন্তের আগ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য যে স্থিতিশীল ছিল, তার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। পানি ১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বাষ্প হয়। কিন্তু ৯৯ ডিগ্রি পর্যন্ত বোঝা যায় না যে, পানিটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বাষ্প হওয়া শুরু করবে। আসলে পানি তাপ কনজিউম করতে থাকে এবং নির্দিষ্ট তাপ পাওয়ার পরই হঠাৎ বাষ্পীয়ভবন শুরু হয়। পৃথিবীর প্রায় সব বিপ্লবী অথবা গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর বিরুদ্ধে খোমেনির বিপ্লবও তাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও ঘটেছে ২৪ বছরের শোষণজনিত বঞ্চনার কারণে, বঙ্গবন্ধু না থাকলে হয়তো সময়টা আরও দীর্ঘায়িত হতো। পশ্চিমা আধিপত্য ও স্ব স্ব দেশের স্বৈরতন্ত্র থেকে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। সেই ক্ষোভ সামাজিক বিজ্ঞান দ্বারা নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ করা মাত্রই মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয়েছিল দক্ষিণা হাওয়া। কিন্তু এই হাওয়ায় প্রাণ জুড়াল না, কারণ এতে মিশে গেল পশ্চিমা ঘূর্ণি বাতাস।
আরব বসন্ত ব্যাকফায়ার করার পর বিকল্প শক্তি দিয়ে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করার চিন্তা আসতেই পারে এবং তা এসেছে। আবার গোটা অঞ্চলটাই যেহেতু মুসলমানপ্রধান, তাই সেই শক্তি অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে ইসলাম ধর্ম থেকেই। এবার আর আল কায়দার মতো শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র নয়, সমগ্র আরব ভুবনকেই খেলাফত শাসনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, অতঃপর সম্ভব হলে গোটা বিশ্বকে। জন্ম হল আইএসের। প্রশ্ন উঠতেই পারে, আইএস যাদের হত্যা করছে, তারা তো সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট কিংবা তাদের আদর্শের চিহ্নিত শত্রু নয়। তাদের হত্যাকাণ্ড তো নির্বিচার। উত্তর হল, তারা একটা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শক্তি প্রদর্শনই তাদের উদ্দেশ্য। ডিফিকাল্ট অথবা বলা যায় আলটিমেট টার্গেটকে আক্রমণ করার শক্তি এখনও অর্জন করতে পারেনি বলে তাদের যেন কেউ দুর্বল ভাবতে না পারে, সেজন্য তারা ইজি টার্গেটেই আঘাত করে বলতে চাইছে- রিহার্সালের শক্তিটা বুঝে নাও, আসল শক্তি পরে দেখতে পাবে। এটা এক অদ্ভুত ব্যাপার, আটলান্টিকের ওপাড়ে রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য কোনো রাষ্ট্র সহজে দখলে নিতে পারবে না, অথচ রাষ্ট্রটি দুনিয়াজুড়ে বিছিয়ে রেখেছে সামরিক চাদর। নাবিকদের নাকি বন্দরে বন্দরে বউ থাকে, যুক্তরাষ্ট্রেরও যেখানে পানি, সেখানেই ফ্লিট। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের একটা প্রশ্ন করাই যেতে পারে, তাদের কাছে কোনটা বড়- সভ্যতার স্বাভাবিক বিকাশ, নাকি সভ্যতা কোথায় যাবে যাক, আমার মাতব্বরিটা ঠিক থাকতে হবে? ঠিক আছে, মাতব্বরি করতে দেয়া হলই না হয়, বিচারসভায় চোখ টেপাটেপি কেন? খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে ইসলামের ততো বিরোধ নেই, যতটা আছে ইহুদি ধর্মের সঙ্গে। তো মুসলমান ফিলিস্তিনিকে উপেক্ষার চোখে দেখে ইহুদি ইসরাইলির দিকে রোমান্টিক দৃষ্টি দেয়ার অর্থ কী? তার মানে যৌনাকাঙ্ক্ষার কাছে কখনও কখনও যেমন হার মানে ধর্মীয় চেতনা, নীতিবোধ; ব্যাপারটা তেমন কিছু?
হ্যাঁ জঙ্গিবাদ রুখতে হলে এক নতুন মধ্যপ্রাচ্য শুধু নয়, এক অন্যরকম পৃথিবীর খোঁজ করতে হবে। সেই বিশ্বব্যবস্থা গড়তে নেতৃত্ব নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকেই। এই প্রক্রিয়ায় থাকা চলবে না ডাবল-ডিলিং, কনটেইন করতে হবে সমগ্র পৃথিবীকে। গরিবের বউকে সত্যি সত্যিই ‘ভাবী’ ডাকতে হবে, কোনো কু-মতলবে নয়। আর তা না পারলে জঙ্গিরা একসময় এই সভ্যতা জ্বালিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হবে না, সেই আগুনে পুড়ে খাবে আলু। কীভাবে তেমন একটি পৃথিবী গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে কিছু কথা আমারও আছে। সেটা আরেকদিন হবে।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

কী পেল চট্টগ্রাম?

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) চট্টগ্রাম পর্ব শেষ হয়েছে অগোছালোভাবেই। কোটি টাকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ফ্লপ। চট্টগ্রামে ১৮ ম্যাচ হল প্রায় ফাঁকা গ্যালারির বিদ্রূপ সয়ে! আয়োজকদের মতে, এ লীগে চট্টগ্রামের পাওয়ার কিছু নেই। কারণ এটি জাতীয় ইভেন্টের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম সহযোগিতা করেছে মাত্র। চট্টগ্রাম পর্বের প্রথম রাউন্ডের ছয়টি ম্যাচের মধ্যে একটিতে জয় ছাড়া পাঁচ ম্যাচই ড্র হয়েছে। এ রাউন্ডে গোল হয়েছে মাত্র ১১টি। দ্বিতীয় রাউন্ডে গোল খরা কিছুট কাটলেও দর্শকখরা কাটেনি। এ রাউন্ডের ছয় ম্যাচে গোল হয়েছে ২২টি। তৃতীয় রাউন্ডে আবার ড্র এবং গোলখরা। এ রাউন্ডে ছয় ম্যাচের পাঁচটিতে গোল হয়েছে ছয়টি। এদিকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতিতে কোনোরকমে ম্যাচগুলো সুষ্ঠুভাবে শেষ করা গেলেও আয়োজন থেকে শুরু করে বাহ্যিক কার্যক্রমে ছিল হযবরল অবস্থা। অভিযোগ আছে, ঢাকার বাইরে বাফুফের দায়িত্ব পালন করবে চিটাগাং ডিস্ট্রিক টস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (সিডিএফএ)। কিন্তু চট্টগ্রামে সিডিএফএকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে রাখা হয় দেশের সবচেয়ে মর্যাদার এ পেশাদার লীগে। ফুটবল সংশ্লিষ্ট কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে সিডিএফএকে বাদ দিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে (সিজেকেএস) ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রাখা হলেও তাদেরও কোনো কাজ দেয়নি বাফুফে। অভিযোগ আছে, শুধু সিজেকেএস থেকে শাহাবুদ্দিন শামীমকে লোকাল অর্গানাইজিং কমিটির সেক্রেটারি করে বাফুফে।
চট্টগ্রামের প্রায় ম্যাচেই রেফারিং নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। রেফারিদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বেশ কয়েকটি ম্যাচে মাঠের উত্তেজনা গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিপিএল চট্টগ্রামে আয়োজনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (সিডিএফএ) সাধারণ সম্পাদক আ ম ম ওয়াহিদ দুলাল। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অঙ্গ সংগঠন সিডিএফএ হলেও রহস্যজনক কারণে আমাদের বাদ দিয়ে সিজেকেএসকে দিয়েই কাজ করিয়েছে বাফুফে বা বিপিএল আয়োজক কমিটি।’ বিপিএলকে ‘হাইজ্যাক’ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, সিডিএফএ বা চট্টগ্রামের ফুটবল সংগঠকদের কাজে লাগালে আয়োজন আরও সুন্দর হতে পারত। সিজেকেএস আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে স্বীকার করে সিজেকেএস’র নির্বাহী সদস্য এবং ফুটবল উপ-কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘বিপিএল বাফুফের আয়োজনেই হচ্ছে। এখানে সিজেকেএস’র কিছু পাওয়ার নেই। জাতীয় এই আয়োজনে দর্শক উৎসাহিত হয়ে সিজেকেএস’র লীগে মাঠে এলে সেটাই হতো চট্টগ্রামের পাওয়া।’ এই আয়োজনে দর্শক টানতে না পারার ব্যর্থতায় কি চট্টগ্রাম লাভবান হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আগেই বলেছি এটা বাফুফের আয়োজন। ব্যর্থতা ও সফলতা তাদের। তাদের আমরা সহযোগিতা করেছি মাত্র।’ ছোটখাটো ভুল ছাড়া বিপিএল চট্টগ্রাম পর্ব সফল হয়েছে দাবি করে লোকাল অর্গানাইজিং কমিটির সেক্রেটারি সৈয়দ শাহাবুদ্দিন শামীম বলেন, ‘লীগের মূল আয়োজক বাফুফে। সিজেকেএস নয়। আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি। ছোটখাটো ভুল থাকতেই পারে।’

পরিণীতি সমাচার

মিডিয়ার শুরুটা খুব একটা শুভকর ছিল না পরিনীতি চোপড়ার। বড় বোন প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মতো ক্যারিয়ারে সফলতার দেখা না পেলেও হতাশ হওয়ার পাত্রী তিনি নন। নিজের চেষ্টা, সে সঙ্গে হাসিমুখ আর মিষ্টি চেহারার পরিণীতি ইতিমধ্যেই রুপালি পর্দায় নিজের ভিত তৈরি করে নিয়েছেন। ‘লেডিস ভার্সেস রিকি বেহেল’ সিনেমায় রণবীর সিংয়ের বিপরীতে একটি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন এ অভিনেত্রী। পরবর্তিতে অভিনয় করেছেন অর্জুন কাপুর, সুশান্ত সিং রাজপুত এবং সিদ্ধার্থ মালহোত্রার সঙ্গে। লেডিস ভার্সেস রিকি বহেল, ইশকজাদে, শুদ্ধ দেশী রোমান্স যশরাজের সেই তিনটি ছবিই বক্স অফিসে দারুণ ব্যবসা করে। সব ছবিতেই দর্শক তাকে পেয়েছেন নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে। সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে নিজেকে মেলে ধরার জন্য কোনো কিছুতে কার্পণ্য করেননি এ বলিউড কন্যা। বলিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যশরাজ ফিল্মসের নিয়মিত নায়িকা এখন পরিণীতি। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে যথাযথ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন তার সক্ষমতা। তবে শুরুতে পুরোদমে কাজ করলেও মাঝে অনেকটা পর্দার আড়ালে ছিলেন এ অভিনেত্রী। কারণ হিসেবে জানান, নিজেকে প্রস্তুত করা বা পরপর তিনটি ছবি করে বেশ হাঁপিয়ে উঠেছেন তিনি। তাই অভিনয়ে খানিকটা বিরতির কথা বললেও বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য ছিল না।
২০১৪ তে সর্বশেষ ‘কিল দিল’-এর পারিণীতিকে শেষবারের মতো পর্দায় দেখা গেছে। ২০১৫ সালে একটি বারের জন্যও পর্দায় দেখা মিলেনি পরিণীতি চোপড়ার। বিরতির কারণ হিসেবে তিনি মনের মতো চিত্রনাট্যের অভাবকে দাবি করলেও সমালোচকরা বলেন, ভিন্ন কথা। তাদের ধারণা, ২০১৪ সালে পরিণীতির মুক্তিপ্রাপ্ত তিনটি ছবির মধ্যে ‘হাসি তো ফাঁসি’ ছাড়া বাকি দুটি ছবি দর্শক একেবারেই গ্রহণ করেনি। আর এ কারণে নির্মাতারাও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তবুও হাল ছাড়ার পাত্রি নন পরিণীতি। গেল বছরের শেষ দিকে শরীর থেকে বাড়তি মেদ ঝরিয়ে প্রায় ২৯ কেজি ওজন কমিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছেন একেবারে নতুন রূপে। ইদানীং শোনা যাচ্ছে ‘ধুম ফোর’-এও নায়িকা হিসেবে আসছেন এ অভিনেত্রী। তার নতুন রূপ দেখে অনেকেই আলোচনা করতে থাকেন, ভক্ত মহলের ধারণা ‘ধুম ফোর’-এর জন্যই তার এমন রূপ। বিরতির পর অবশ্য চলতি বছর আবারও অভিনয় শুরু করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! সেখানে খুব একটা সফলতার মুখ দেখেননি বলিউড কন্যা। সম্প্রতি আরও একটি সিনামার অভিনয়ের কথা চাউর হয়েছে। বলিউড সুপারস্টার সালমান খানের বিপরীতে ‘দাবাং-৩’ ছবিতেও নাকি দেখা যাবে তাকে। যদিও বিষয়টি এখনও গুঞ্জনের পর্যায়ে রয়েছে। কারণ এ ছবির মূল নায়িকা সেনাক্ষী সিনহা। তবুও যদি ভাগ্যে এমনটি জুটে যায় তবে সেটা হয়ে পরিণীতির জন্য পোয়াবারো। তবে ভাগ্য কতটা তার সহায় হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।