Thursday, January 28, 2010

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগ ডে-২০১০

দুই-তিন মাস ধরে ছাত্রছাত্রীদের চোখে ঘুম নেই। খাওয়া-দাওয়ারও ঠিক নেই। ঠিক নেই ক্লাসের সময়েরও। শুধু মিটিং আর আলোচনা—কীভাবে আরও বেশি জমজমাট করা যায়, অন্য সব বছর থেকে বেশি মজা করা যায়, এবারের র‌্যাগ ডে-২০১০। বিশ্ববিদ্যালয়ের-২০০৬ ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা তাই ভীষণ ব্যস্ত। র‌্যাগ ডের আগের এক সপ্তাহ তো তাঁদের কেটেছে উত্তেজনায়। মেয়েদের কী কম চিন্তা! সবার এক রঙের শাড়ি, তার সঙ্গে সব কিছু মিল করে কত কী যে কিনতে হবে! কত মজাই না করবেন তাঁরা বন্ধুদের সঙ্গে। দেখতে দেখতে কেমন করে চার-চারটি বছর পার করে দিলেন তাঁরা, ভাবতেই অবাক লাগে! এসব বন্ধুকে ফেলে রেখে চলে যেতে হবে কর্মজীবনে। চিরচেনা এই ক্যাম্পাস কী তাঁদের মনে রাখবে? শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাই তো র‌্যাগ ডে উদ্যাপনের মাধ্যমে স্মরণীয় করে রাখতে চান মুহূর্তগুলো।
জানুয়ারির ১৫ ও ১৬ তারিখ ছিল র‌্যাগ ডের অনুষ্ঠান। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যেন সেজেছিল উত্সবের আনন্দে। পাঁচ দিন আগে থেকেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে-কানাচে আলো জ্বল জ্বল করছে। আর জানাচ্ছে-০৬ ব্যাচের আনন্দ মুহূর্তকে। র‌্যাগ ডের আগের রাত থেকেই ছাত্রছাত্রীরা মেতে উঠেছিলেন আমোদে। রাতে আলোকসজ্জা দেখার জন্য বেরিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার আগুন জ্বালিয়ে করেছেন নৈশভোজ। দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কটকা মনুমেন্ট থেকে ভেসে আসছে কয়েকজনের মিলিত কণ্ঠ—‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই...।’
রাত তখন নয়টা। অপরাজিতা হলের শেষ বর্ষের ছাত্রীদের মনে হলের গেট বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন সংশয় দেখা যায় না। তাঁরাও মেতে উঠেছেন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়।
১৫ জানুয়ারি। খুলনা শহরবাসী তাকিয়ে আছে তাঁদের দিকে—অদ্ভুত সাজে বড় বড় রং-বেরঙের প্লাকার্ড, মুখোশ নিয়ে সাতটি ট্রাক আর তিনটি বাস চলেছে শহরের ভেতর দিয়ে। চলেছে হই-হই শব্দে। শোভাযাত্রায় লাল, বাসন্তী, কমলা, সবুজ রঙের আটপৌরে শাড়ি পরেছেন ছাত্রীরা। তারাও কম যান না, বাসের মধ্য থেকে হাত বের করে শহরবাসীকে অভিবাদন জানাতে ব্যস্ত তাঁরাও। শোভাযাত্রা শেষ হলো দুপুর ১২টার দিকে। ক্যাম্পাসে এসে গাড়ি থেকে নামতেই কোত্থেকে একদল ছাত্র ছুটে এসে আবিরে রাঙিয়ে দিলেন সবাইকে। শুরু হয়ে গেল রঙের খেলা—কে কার গায়ে কত রং দিতে পারেন! কিছুক্ষণ পর চেহারাই বদলে গেল সবার। গোলাপি, নীল রং মেখে বোঝাই যাচ্ছে না, কে সিলভি আর কে সৌরভ।
কিছুক্ষণ পর যে যাঁর মতো চলে যান, কারণ বিকেলে আবারও ক্যাম্পাসে আসতে হবে—সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। রাত ১০টা পর্যন্ত চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
১৬ জানুয়ারি, বেলা ১১টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি উপাচার্য প্রফেসর ড. সাইফুদ্দিন শাহ ৪৮৮ জন গ্র্যাজুয়েটের হাতে তুলে দিলেন ক্রেস্ট। প্রধান অতিথির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয় আনুষ্ঠানিকতা ।
সন্ধ্যায় মেতে ওঠে আরেকবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। ব্যান্ড গ্রুপ Warfej-এর মেটাল মিউজিক আর গানের দোলায় মাতোয়ারা হলো বিশ্ববিদ্যালয়। ‘রক্তিম আকাশ স্তব্ধ সেখানে ফিরবে না আর জানিয়ে গেলে...।’ নাচে আর গানে মাতাল হলো কনসার্ট।
দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া র‌্যাগ ডের এই বিশাল আয়োজন দুই দিনেই শেষ হয়। কিন্তু ‘স্বপ্নের দূত’ (Emissary of Envisions) দের নিয়ে যায় সুদূরের দিকে। স্বপ্নোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হাতছানি দিয়ে ডাকে তাঁদের। সাঙ্গ হলো ছাত্রজীবনের এই চিরচেনা পরিবেশ।

মনেরে আজ কহ যে... by আনিসুল হক

আমাদের একজন বন্ধু মারা গেছে। সে আমার মেয়েরই বয়সী। বলতে পারতাম, আমার কন্যাস্থানীয় একজন মারা গেছে। কিন্তু আমার মেয়েও তো আমার বন্ধুও। তাই ওই কিশোরীর মৃত্যু আমার মধ্যে একজন বন্ধুকে হারানোর বেদনাই জাগিয়ে তুলেছে।
প্রথম কথা হলো, এই মৃত্যুটা অপ্রয়োজনীয়। এই মৃত্যু মোটেও অনিবার্য বা অপরিহার্য ছিল না।
ক্লাস নাইনে পড়া নাসফিয়া আপন পিংকির অকাল প্রস্থানের কথাই আমি বলছি। আমাদের এই বন্ধুটি আর আমাদের মধ্যে নেই। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৪। সে ক্লাস নাইনে পড়ত। সে ছিল ভালো ছাত্রী। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সে পাঠ্যপুস্তক গ্রহণ করেছিল। তার ছবি কাগজে ছাপা হয়েছিল। ক্লাসের দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল মেয়েটি।
এই মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। সে আর আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে নেই। তার নাকি শখ ছিল সে এমবিএ পড়বে। নতুন ক্লাসে যাওয়ার জন্য তার স্কুলের পোশাক পড়ে আছে দরজির দোকানে। শুধু পিংকি নেই। শ্যামলী আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের একটা প্রাণবন্ত ছাত্রীর এই অকারণ চলে যাওয়ার বেদনা সত্যি আমাদের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।
আমাদের দুঃখ কোনো সান্ত্বনা মানে না। কারণ পিংকি আত্মহত্যা করেছে। যাওয়ার আগে সে একটা চিরকুট লিখে রেখে গেছে। চিরকুটটা সে লিখেছে তার দাদির উদ্দেশে। তাতে সে বলেছে, তার মৃত্যুর জন্য পরিবার দায়ী নয়। সে যা বলছে তার ভাবার্থ এই যে দুষ্টুমি করতে গিয়ে তার হাতকাটা গেছে। সে জন্য সে ব্যান্ডেজ কিনতে গিয়েছিল ওষুধের দোকানে। সেখানে মুরাদ নামের এক ছেলে এই ঘটনা নিয়ে হাসাহাসি করেছে আর তাকে চড় মেরেছে। তার জন্য যাতে পরিবারের মানসম্মান না যায়, সে জন্য সে ফাঁসি নিয়েছে।
খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে, মুরাদ বখাটে ছেলে। পিংকির অভিভাবক ও চাচা তেমনটাই বলছেন যে পিংকির চলার পথে মুরাদ তাকে উত্ত্যক্ত করত। সে তাকে চড় মারায় পিংকি আত্মহত্যা করেছে। আর মুরাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পিংকির সঙ্গে তার প্রেম ছিল, পিংকি আবেগের বশে তার হাত কেটেছে, সেটা দেখে আবেগের বশে মুরাদ পিংকিকে চড় মেরেছে, তারই পরিণতিতে পিংকির এই আত্মহত্যা।
১৯ জানুয়ারি ২০১০ ঢাকার শ্যামলী এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনায় মামলা হয়েছে, মুরাদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তদন্ত চলছে। মুরাদ বখাটে নাকি পিংকির প্রেমিক, পিংকির প্রেম করার বয়স হয়েছিল কি না, মুরাদ প্রেমিক হলেই তাকে মারতে পারে কি না, পিংকির এই অকাল প্রয়াণের পেছনে মুরাদের দায় কতটুকু—এসব তদন্ত ও বিচারে বেরিয়ে আসবে। সেই তদন্ত সুষ্ঠুভাবে হোক, নিরপেক্ষভাবে হোক, আমরা যাকে বলি ‘গণমাধ্যমের বিচার’ বা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’, অর্থাত্ বিচার হওয়ার আগেই একজনকে দায়ী করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো, সেটাও করতে চাই না।
আমরা যেটা বলতে চাই, আমার বন্ধুদের, আমার মেয়ে আর তার বন্ধুদের, আমার বোনদের, আমার ভাইবোন-সন্তানদের, এসো বেঁচে থাকি। আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমাধানের পথ বেরোনোর আগেই একটা নতুন সমস্যা তৈরি করা।
আমরা জানি, আমাদের সমাজটা পুরুষশাসিত। এই সমাজে মেয়েদের চলাফেরা করা কঠিন। কথাবার্তা বলা কঠিন। স্বাধীন পেশা বেছে নেওয়া কঠিন। তাই বলে আমরা তো লড়াই করার আগেই হেরে যেতে পারি না। অনেক কঠিন সময় আসবে, সুসময়ও আসবে। মানুষের জীবনে চড়াই-উতরাই থাকেই। আজকে যদি মনে হয়, আমি খুবই দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, নিশ্চিত থাকতে পারো, কালকে অনেক সুন্দর সময় আসবে, যখন আমরা প্রাণভরে হাসতে পারব; যখন কেবল নিজের জীবনটা তো সুন্দর মনে হবেই, মনে হবে, আমার জন্য চারপাশের মানুষের জীবনও সুন্দর হয়ে উঠছে।
পিংকির চিরকুটটায় আসি। ও লিখেছে, ‘আমার জন্য যাতে তোমাদের মানসম্মান না যায় তার জন্য আমি ফাঁসি দিলাম।’ ও চেয়েছিল অন্যের দুঃখ লাঘব করতে, পরিবারের অন্যদের মানসম্মান রক্ষা করতে, কিন্তু ওর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কি সেটা সে পারল? স্বজনদের দুঃখ-কষ্ট কি কমল?
আমরা জানি, এ বয়সের ছেলেমেয়েদের আবেগ বড় তীব্র থাকে। রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন, ‘তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই।...স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো আধো কথা ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি, এবং কথামাত্রই প্রগল্ভতা মাত্র।...সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না; এ জন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে। অথচ এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিত্ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এ সময়ে যদি সে কোনো সহূদয় ব্যক্তির নিকট হইতে স্নেহ বা সখ্য লাভ করিতে পারে, তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত হইয়া থাকে। কিন্তু তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ সাহস করে না, কারণ সেটা সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে।’
তারা বড় হচ্ছে, অথচ কেউ তাদের বড় ভাবে না; তাদেরও হূদয়সংক্রান্ত জটিলতা হতে পারে, সেটাকে কেউ খুব গুরুত্ব দেয় না, বরং কঠোর ভাষায় ও পদ্ধতিতে এ ব্যাপারগুলো গুঁড়িয়ে দিতে চায় সবাই। এসব সমস্যা বড়দের কাছে হয় হাস্যকর, নয়তো খুবই আপত্তিকর, কিন্তু ওটা যে ওই বয়সীদের জন্য একটা বাস্তবতা আর সমস্যা, সেটা কেউ বুঝতে চায় না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, স্নেহ দেওয়া হলে লোকে তাকে বলে প্রশ্রয় দেওয়া।
আজ তাই আমাদের অভিভাবকদের বলব, লোকের কথা বা প্রচলিত সংস্কারের বশবর্তী না হয়ে আপনার কিশোর-তরুণ ছেলে বা মেয়েটিকে, ভাই বা বোনটিকে, ভাগ্নে বা ভাগ্নিকে আপনি একটু প্রশ্রয় দিন। শিক্ষকদের বলব, অভিভাবকদের বলব, আপনি আপনার এই কিশোর-তরুণটির বন্ধু হোন। শুধু এটা কোরো না, ওটা কোরো না; বাবা-মায়ের মুখে কালি মেখো না, না বলে তার প্রকৃত বন্ধু হয়ে তার সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনুন। তার মনের ব্যথা ভাগ করে নিন। দুঃখ ভাগ করে নিলে কমে, আনন্দ ভাগ করে নিলে বাড়ে।
আর আছে আমাদের পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা। আমরা কারও নিরাপত্তা দিতে পারি না, নারীদের তো নয়ই, কিশোরী-তরুণদেরও নয়। কত কত আত্মহত্যার কথা মনে পড়ে। সেই যে খুলনার খালিশপুর এলাকায় রুমি আত্মহত্যা করল এক বৈশাখী দুপুরে, সে তো বাড়ি পর্যন্ত এসে বখাটেরা উপদ্রব করেছিল বলে, গাইবান্ধায় বখাটেদের ধাওয়া খেয়ে পানিতে পড়ে মারা গেল ছোট্ট মেয়ে তৃষা, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী সিমি মারা গেল পাড়ার সামাজিক শৃঙ্খলারক্ষক বখাটেদের খোঁটা সইতে না পেরে, তার অপরাধ ছিল সে কেন নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার বাসায় ফিরতে বেশি রাত করে। এসব মৃত্যুর কথা যতবার মনে পড়ে, ততবার আমরা মন খারাপ করি, আমাদের সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করি। এই অসুন্দর, সাম্যহীন সমাজটাকে আরেকটু সুন্দর, আরেকটু মানবিক, আরেকটু নারীবান্ধব করার সংগ্রামে আমরা শামিল হই, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হোক সে ব্যাপারে সোচ্চার থাকি। কিন্তু তবুও বলি, বারবার বলি, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। আমাদের যে সংগ্রাম বখাটেদের বিরুদ্ধে, অসুন্দরের বিরুদ্ধে, এই মৃত্যু সেই লড়াইয়ে আমাদের জয়লাভ করতে সাহায্য করে না। আমাদের হারিয়ে দেয়। আমার বন্ধুদের বলি, আমার বোনদের বলি, আমার মেয়েদের বলি, আমাদের অসংখ্য কিশোর-তরুণ ভাইবোন-বন্ধুকে বলি, মরবে কেন? বাঁচো। প্রতিবাদ করো। রুখে দাঁড়াও। কথা বলো। তোমার কথা, তোমার বেদনা কারও সঙ্গে ভাগ করে নাও। মনে রাখবে, তোমরা একা নও। কেউ না কেউ এই পৃথিবীতে আছে, যে তোমার এই বেদনা বুঝতে পারবে।
প্রেম হবে, প্রেম ভেঙেও যাবে; প্রেম হবে না, প্রত্যাখ্যানের বেদনা সইতে হবে; জীবনটাকে তুচ্ছ মনে হবে, চারপাশের লোকেরা ভীষণ কঠিন করে তুলবে আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ, পরীক্ষার ফল খারাপ হতে পারে, সবাই যখন ভালো ফল করে হাসছে, নাচছে, ছবি তুলছে, তখন আমি আশানুরূপ ফল নাও করতে পারি, মা-বাবার মনে প্রত্যাশাভঙ্গের বেদনাও জাগাতে পারি, কিংবা চলার পথে খুব বড় কোনো ভুল করে পরিবারের মানসম্মানের কথা ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হতে পারি, কিন্তু এসবের কোনোটাই কোনো অচিকিত্স্য সমস্যা নয়। সব সমস্যাই কেটে যাবে। ভালো ফল করার একটা প্রচণ্ড চাপ আমাদের চারপাশে আছে, আমাদের স্কুল-কলেজ, প্রতিষ্ঠান, বাবা, মা, শিক্ষক—সবাই মিলে এ রকম একটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আমরা তৈরি করেছি যে সবাইকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কম্পিউটারবিদ, সিএ হতে হবে। ব্যাপার মোটেও তা নয়। জীবনের সফলতার সঙ্গে পরীক্ষার ফলের সম্পর্ক খুব কম, পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করা ভালো, কিন্তু পরীক্ষার ফল ভালো করেও জীবনের পরীক্ষায় ভালো করেনি এমন মানুষের সংখ্যাও প্রচুর। তেমনি তেমন ভালো ফল না করেও জীবন-জগত্-সভ্যতাকে আলোকিত করেছে, এমন উদাহরণও আছে ভূরি ভূরি। রবীন্দ্রনাথের ফল ভালো ছিল না, আইনস্টাইনেরও না। বিল গেটস তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করেননি।
আর মৃত্যুর কথা ভাবার দরকারই নেই। জীবন খুবই সুন্দর। বাবা, মা, ভাইবোন, বন্ধু—সবাই আমাদের কী প্রচণ্ডভাবে ভালোই না বাসেন! আমার জীবন আমি যা খুশি করব, কথাটা তা নয়। এই জীবন কেবল আমার নয়, আমার দেশের আলো-বাতাস-অন্ন এই দেহে মিশে আছে, মা-বাবার রক্ত আছে, অজস্র বন্ধু-সুহূদ-শিক্ষকের একটু একটু অবদান আছে আমার বেড়ে ওঠায়। সবার মধ্যে সুন্দরভাবে আমাকে বেঁচে থাকতে হবে, প্রতিকূলতা এলে সবাই মিলেই সেটা জয় করতে হবে।
সবাই মিলে জয় করার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরেকটু বন্ধুভাবাপন্ন হতে হবে। চাকরিবাকরি, ব্যবসা, আধুনিকতা, প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে আমরা আমাদের জীবনকেও বড় যান্ত্রিক করে তুলছি। আমাদের সময় করতে হবে পাখির গান শোনার, রংধনু দেখে মুগ্ধ হওয়ার, বৃষ্টিদিনে কদম ফুল কিনে বাড়ি ফেরার, সন্তানের সঙ্গে গল্প করার, তাদের সময় দেওয়ার। আর তাদের ওপর প্রত্যাশার জোয়াল চাপিয়ে না দিয়ে তার আত্মবিশ্বাসটা জাগ্রত করার।
একটা উদাহরণ দিই। হঠাত্ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থী, বেশির ভাগই ছাত্রী, আত্মহত্যা করল। এখন ওই প্রতিষ্ঠানে পরামর্শকেন্দ্র খোলা হয়েছে, ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রে ও মেয়েদের হলে। আত্মহত্যার ঘটনা কমে এসেছে।
রবীন্দ্রনাথের বোঝাপড়া কবিতাটা দিয়ে শেষ করি:
মনেরে আজ কহ যে,
ভালোমন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে।
কেউ বা তোমায় ভালোবাসে
কেউ বা বাসতে পারে না যে,
কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা
সিকি পয়সা ধারে না যে ......
......তোমার মাপে হয়নি সবাই।
তুমিও হওনি সবার মাপে,
তুমি মর কারো ঠেলায়
কেউ বা মরে তোমার চাপে—
তবু ভেবে দেখতে গেলে
এমনি কিসের টানাটানি?
তেমন করে হাত বাড়ালে
সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি।
আকাশ তবু সুনীল থাকে
মধুর ঠেকে ভোরের আলো,
মরণ এলে হঠাত্ দেখি
মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো।
যাহার লাগি চক্ষু বুজে
বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর
তাহারে বাদ দিয়েও দেখি
বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর।
কাজেই, মরণ এলে তাকে হটিয়ে দিয়ে বাঁচতে হবে; বাঁচলে দেখা যাবে, মরার চেয়ে বাঁচা ঢের ঢের ভালো। জীবন মূল্যবান, সেটার মূল্য আমাদের ধরে রাখতে হবে; জীবন সুন্দর, বেঁচে থাকাটাও এক অপূর্ব সুন্দর ব্যাপার। অসুন্দর এসে জীবনকে কালিমালিপ্ত করতে চাইলে আমরা লড়াই করব, হেরে বসে থাকব না।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক।

ছিনতাই উপদ্রব

ছিনতাই-রাহাজানি-ডাকাতি বাংলাদেশে এক চিরন্তন ব্যাপার হলেও কখনো তা বিপদ হয়ে আসে, কখনো আবার উপদ্রবে পরিণত হয়। বর্তমানে অতীতের তুলনায় মাস্তানি-সন্ত্রাস ইত্যাদি কিছুটা নিম্নমাত্রায় থাকলেও জনগণের জানমালের ওপর হামলা নিয়মিত উপদ্রব হিসেবে রয়ে গেছে। পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর কারণে হয়তো ‘মলম পার্টি’ থেকে বিপদ কিছুটা কমেছে, কিন্তু অপরাধীরা তো আর বসে থাকার নয়, নতুন নতুন কৌশলে তারা তাদের কাজ চালিয়েই যাচ্ছে।
গত সোমবারের প্রথম আলোয় ছিনতাই-রাহাজানির কয়েকটি সংবাদের মধ্যে সামনে এসেছে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে বাসযাত্রীদের প্রায় জিম্মি করে ডাকাতি এবং প্রকাশ্যে রিকশাযাত্রীকে ছিনতাইয়ের ঘটনা। এ রকম অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে, এবং রয়ে যাচ্ছে প্রতিকারহীন। বন্যার পানি যেমন ধীরগতিতে বাড়তে বাড়তে একসময় দুই কূল উপচায়, হত্যা-রাহাজানি-সন্ত্রাসের মাত্রা তেমন করেই বাড়ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম তো বটেই, জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলের অবস্থাও কম উদ্বেগজনক নয়। এ ধরনের অপরাধ কচুরিপানার বিস্তারের মতো দ্রুতই ছড়িয়ে যেতে পারে, যদি তা ঠেকিয়ে রাখা না হয়। অতএব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের টনকটি ভালো করেই নড়া দরকার।
কারও মনে হতে পারে, ‘এ রকম দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতেই পারে।’ পুলিশ কর্তৃপক্ষ হয়তো বলবে, ‘আমরা তো আর বসে নেই।’ তারা হয়তো দণ্ডায়মান, কিন্তু সাধারণ মানুষকে ঘরে-বাইরে নিরাপদ রাখার মতো পরিস্থিতি বজায় রাখার পুলিশি নজরদারি ও তত্পরতা আলগা হওয়ার সুযোগ নেই। এ কথা ঠিক, এক পুলিশ কর্মকর্তার ত্বরিত তত্পরতার কারণে ঢাকায় বাস ডাকাতির অপরাধীরা হাতে-নাতে ধরা পড়েছে; কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ আসে ঘটনার পর এবং তাদের হস্ত সব সময় অপরাধীর চুল স্পর্শ করতে সক্ষম হয় না। এ কথাও সত্য যে পুলিশের একার পক্ষে সব ধরনের অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। নিয়মিতভাবে যারা অপরাধকর্মের সঙ্গে যুক্ত, তালিকা তৈরির মাধ্যমে তাদের নিরস্ত করে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ কাজ পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষে অসম্ভব হওয়ার কথা নয়।
সংঘবদ্ধ অপরাধই জননিরাপত্তার প্রধান হুমকি। আশার কথা যে তা বর্তমানে প্রশমিত রয়েছে। তাহলেও অজস্র খুচরো অপরাধ জনজীবনকে সন্ত্রস্ত করার সুযোগ পাচ্ছে এবং এটা সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুতর গলদ হিসেবেই গণ্য হবে। ১৫ কোটি মানুষের দেশে অল্প মানুষই হয়তো অপরাধের শিকার হয়। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য-উত্পাদনে বাধা সৃষ্টি এমনকি সামাজিক পরিমণ্ডলে ভীতি ছড়াতে তা যথেষ্ট। এসব ঘটনা আইনের শাসনে মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। নিরাপত্তার আস্থা সৃষ্টি সভ্য সমাজ ও গণতন্ত্রের আবশ্যকীয় শর্ত।

নাইজেরিয়ার সহিংসতা কবলিত শহরে কারফিউ আরও শিথিল

মধ্য নাইজেরিয়া কর্তৃপক্ষ গতকাল সোমবার জানিয়েছে, যশ শহরে জারি করা কারফিউ আরও শিথিল করা হয়েছে। মুসলিম-খ্রিষ্টান সহিংসতায় প্রায় ৫০০ লোক নিহত হওয়ার পর সেখানে কারফিউ করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, শহরে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল গালাডিমা শেকারি বলেন, যশ শহর ও আশপাশের জেলাগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসার প্রেক্ষাপটে কারফিউ আরও শিথিল করা হয়েছে। কারফিউ মেনে চলার জন্য যশ ও আশপাশের জেলাগুলোর আদিবাসীদের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মুসলিম-খ্রিষ্টান রক্তক্ষয়ী সহিংসতার কারণে গত মঙ্গলবার সেখানে কারফিউ জারি করা হয়। পরের দিন কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়।
রেডিও নাইজেরিয়ায় বলা হয়, যশ ও আশপাশের জেলাগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসার প্রেক্ষাপটে গত রোববার রাতে প্লাটেড রাজ্য সরকারের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে কারফিউ আরও পাঁচ ঘণ্টা শিথিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আমাদের সেই ওয়াহিদ ভাই by বিপ্লব বালা

সারা জীবন কত কাজ করে গেছেন ওয়াহিদ ভাই। যাকে বলে ‘জীবন ভরিয়া’ কত কত সব কাজ। তার জন্য কত রকম সব দল করতে হয়েছে। কত মানুষকে জোটাতে হয়েছে কাজে। মাথায় তাঁর খেলত যেন এক কাজের ঘোর। একবোঝা কাজ মাথায়। একা তো আর সে কাজ করার নয়। তার জন্য নানা স্বভাব-ঝোঁকের মানুষ চাই। একেক ধরনের মানুষ নিয়ে একেক কাজ করে চলা। যখন যা করণীয় মনে হয়েছে। পাকিস্তান তাঁর কাছে ছিল তো এক মামদো ভূত। মূর্তিমান কালাপাহাড়। এত যে সাধের দেশ, সমাজ—সব ভেঙেচুরে খান খান করেছিল তো সে। বিষিয়ে দিয়েছিল মানুষের মন। যা কিছু ছিল সহজ, স্বাভাবিক, সুন্দর, তা বিরূপ-কুরূপ করে তুলেছিল। তাই নিয়েই ছিল ওয়াহিদ ভাইয়ের জনমভর মাথাব্যথা। কদর্য কুিসত সেই বীভত্সতার হাত থেকে বাঁচানো মানুষকে। কুবুদ্ধি মানুষের সুবুদ্ধি ফেরানোর সুলুক সন্ধান করা। তারই জন্য কাজ, নানা কাজের আয়োজন আর মানুষ জোটানো। সাংবাদিক ছিলেন তো জীবিকার ফেরে। রাজনীতির কাজ তাঁর স্বভাবের স্বধর্ম ছিল না। মন ছিল শিল্প-সংস্কৃতির বিচিত্র দিকে। সাহিত্য, কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞান, খেলাধুলা। সবার ওপরে গান—বাংলা গান, রবীন্দ্রসংগীত। বুঝে নিয়েছিলেন, গানেই যে বাঙালির প্রাণভোমরা। তাকে জাগাতে, বাঁচাতে হলে চাই গান। নগরের যত আধমরা, সুরহারা মানুষজনে যদি ফিরে পেতে হয় প্রাণ, মন। তার স্বভাব, সত্তা। তবে সে কেবল সত্ রাজনীতির গণসংগীত হলেই চলবে না। তাতে যে কেবল খানিক ঝাঁকি লাগে আদর্শ-বুদ্ধির ওপরতলে। মনের ঠিক সাড়া জাগে না। তার জন্য বাংলা গানের আপন স্বভাব-সুর আর নিজের ভাব-ভাষা চাই। নাগরিক জীবনে দ্বিজেন্দ্র-অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত-নজরুল—বিশেষ করে রবীন্দ্রগানেই যে তার ভুবনজোড়া স্বদেশী আসনখানি। তবে ঘরের কোণে একা একা গাইলে চলবে না সে গান। হূদয় দুয়ার খুলে, বাইরে বেরোতে হবে। আর সবার সঙ্গে মিলে। খোলা আকাশের নিচে সুর মেলাতে হবে সুরে। ‘যুক্ত কর হে সবার সঙ্গে, মুক্ত কর হে বন্ধ।’ তাই তো নানা জায়গায় আসর করে ফেরা। পুরান ঢাকায় বাগানে, ছাদে, শিলাইদহ কুটিরে। খোলা মঞ্চে মঞ্চে। এভাবেই একদিন সব পথ মিলে যায় রমনায়। বটমূলে পহেলা বৈশাখের ভোরবেলায়। হারিয়ে-খুইয়ে বসা বিশ্ব প্রকৃতির যেন কোলের পরে, বুকের তলায়। স্থান-কালের যোগ বিনা যে সুর জাগে না মনের তানে। খোলা আকাশের তলে, আলো-হাওয়ায় সুরে সুরে ফিরে পায় নগরবাসী আপনায়। তারপরে কে রোধে সে জোয়ার—জীবন-মন-প্রাণ তরঙ্গ? এই আয়োজন সম্পন্ন করতে মিলতে হয়েছে তো কত কত মানুষে। গড়তে হয়েছে দল—ছায়ানট। পাকিস্তানি মারের সাগর পাড়ি দিতে। রবীন্দ্র-নিষেধাজ্ঞার জবাবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্গতি আর রাজনৈতিক দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রাণপণ করাও ছিল একই কাজের আরেক পিঠ। কিংবা চলচ্চিত্র সংসদের পত্তন। অথবা বাংলাদেশকালে রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ গঠন। আনন্দধ্বনি, কণ্ঠশীলন, গীতসূত্র, নালন্দা—এই সকল কাজের একজন বড় কাজি ছিলেন তিনি। আমাদের সেই ওয়াহিদ ভাই। গানে গানে বন্ধন কাটাতে দেশজুড়ে ফিরেছেন। অনাহূত, রবাহূত হয়েও জেলা শহরে, গ্রামে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে। সে তো এখন সবারই জানা সর্বশেষ এক অপরূপকথা।
এত এত সব কাজে সারা জীবনে, দেশজুড়ে কত মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে? শত শত, হাজার হাজার। আর কেবলই কি ছিল তা পরিচয়মাত্র? ছিল তো যাকে বলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। সোজা বাংলায় সবার সঙ্গেই ছিল ভাব-ভালোবাসা। আর এটাই বুঝি তাঁর সর্বসেরা কাজ, মাস্টারপিস। শহর আর নগর মানেই তো অচিন অজানা যত মানুষের বাস। একসঙ্গে তারা যত যা-ই করুক না কেন, কারও সঙ্গেই থাকে না কারও সম্পর্কের বালাই। তা সে রাজনীতি বা সংস্কৃতির যত যা রাজা-উজির মারাই হোক। সেসব যেন বাইরের কাজ। কাজ শেষ তো সব শেষ। তারপর আবার কিসের কী সম্পর্ক। যে যার কাজ ফুরালেই পাজি—চিন-পরিচয় থাকেই না আর।
রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু এই বন্ধন মোচন করেন। ঘুচিয়ে ফিরেছেন মানুষের সঙ্গে মানুষের এই সম্পর্কহীনতা। এই নিয়ে তো মুখে মুখে ফেরে মিথ—কত বছর পরে কোন গণ্ডগ্রামের বছিরুদ্দির কাছে জানতে চান বাড়ির সবার খবর নাম ধরে ধরে। গাছপালা-পুকুরঘাটও বাদ যায় না সেই তল্লাট থেকে। তাই তো তিনি বঙ্গবন্ধু। শিল্প-সংস্কৃতির আপনাতে আপনি মশগুল মানুষজনের সঙ্গে সেই কাজই করেন আমাদের ওয়াহিদ ভাই। আর তাতে তো কোনো ভেদ ছিল না। নাম-ডাক কি বয়সের। বাংলাদেশের নানা পেশার বিখ্যাত সব মানুষ থেকে শুরু করে অনামা-অনামী নানা বয়সী যত নারী-পুরুষ। সবার সঙ্গেই তাঁর কত রকম সব অম্লমধুর জান-পেহসান। কৃষ্ণ-কানাইয়ের দেশে সখা-সখীর এক মেলা না কি হাট বসিয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের গানেই বলতে হয়, ‘ওগো আমার প্রাণের ঠাকুর/তোমার প্রেম তোমারে এমন করে করেছে নিষ্ঠুর।’ প্রেমের যেন এক লীলাজীবনই যাপন করেছেন তিনি। রসিক গোরাচাঁদ হেন। এটাই ছিল তাঁর বুঝি সংস্কৃতির বড় কাজ। আত্মীয় সম্বন্ধ না পাতিয়ে বাঙালির নাকি কথা ফোটে না চেনা-অচেনা কারও সঙ্গেই। এই সম্পর্কবন্ধনই তার মর্ম-ধর্মের শানে-নযুল। যার সামনে হতবাক, মাথা নত করেছে বিশ্বজন একদা। জগত্সভায় তার শ্রেষ্ঠ আসন এই কারণেই নাকি ছিল একদিন। জানি না ওয়াহিদ ভাই ঠিক তাত্ত্বিক, নীতি-আদর্শ বিবেচনায় মাথায় তুলে নিয়েছিলেন কি না এই দেশাচার, মানবের সার এই ধর্ম। মনের মানুষ বা মানুষ-রতনের এই সন্ধান যে বাংলা-মনেরই আদি সাধন। অন্য এক ব্যক্তিগত পথে ওয়াহিদ ভাই এই কুবুদ্ধিধর নগরবাসেও তাকে ফলিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত আগুনতিজনের মনে কোথায় যেন জানে তাই একই অনুভব। ভাবের রসে যেমন ঘটে একই আস্বাদন। প্রাচ্য শিল্প-নন্দনের সেই তো চিরকালের গূঢ়তম অন্বিষ্ট।
কেবল তো শিল্পে নয়, দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবে ওয়াহিদ ভাই এমনই এক অসাধ্য সাধন করেছিলেন। অসম্ভব এই কৃত্যের ভুক্তভোগী আমরা আছি কতজনা দেশজুড়ে। আজ তাঁর মৃত্যুদিনে তাঁদের এক সতীর্থজনের কৃতার্থ এই প্রণতি—‘তোমায় নূতন করে পাবো বলে...’।

মন্দার কারণে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিয়ের হার কমছে

অর্থনৈতিক মন্দার কারণে গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় একদিকে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েছে, অন্যদিকে কমসংখ্যক লোক বিয়ে করছে। এতে দেশটিতে জন্মহার আরও হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ইতিমধ্যেই জন্মহার হ্রাস পেয়েছে। সোমবার কোরিয়ার পরিসংখ্যান বিভাগ জানিয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় বিয়ের ঘটনা ৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। গত বছর দেশটিতে দুই লাখ ৭৩ হাজার ৬০০টি বিয়ে হয়। অন্যদিকে, একই সময় আগের বছরের তুলনায় বিবাহবিচ্ছেদ ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৫ হাজার ৮০০। এতে আরও বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে শিশু জন্মহার ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ১৪ হাজার ১০০ জনে। কোরিয়ার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে বেশি বিবাহবিচ্ছেদ ও কম বিয়ে হচ্ছে।

নিরপরাধ মানুষ হত্যার পক্ষে অসার যুক্তির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে

হোয়াইট হাউস বলেছে, আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের সর্বশেষ অডিও টেপে শুধু নিরপরাধ মানুষকে ব্যাপক হারে হত্যার পক্ষে অসার যুক্তির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা ডেডিভ এক্সেলর্ড এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ওসামা বিন লাদেনের ওই অডিও টেপের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি হোয়াইট হাউস।
ওই অডিও টেপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে আরও হামলা চালানো হবে।
আল-জাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত অডিও টেপে আরও বলা হয়, ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রও শান্তিতে থাকতে পারবে না। টেপে দাবি করা হয়, বড়দিনে যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার পেছনে ছিল আল-কায়েদা।
ডেডিভ এক্সেলর্ড বলেন, তাত্ক্ষণিকভাবে ওই টেপের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, তবে এটা ধরে নেওয়া যায় যে অডিও টেপের বক্তা ওসামা বিন লাদেন। তাঁর বার্তায় নিরপরাধ মানুষকে ব্যাপকভাবে হত্যার পক্ষে অসার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, যা আগেও শোনা গেছে।
গত রোববার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেন, টেপটি বিশ্বাসযোগ্য কি না, সেটা কারোরই প্রমাণ করার সুযোগ নেই। বড়দিনে বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে বিন লাদেনের সংশ্লিষ্টতা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র এটা বিশ্বাস করে কি না— এ প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান হোয়াইট হাউসের এই মুখপাত্র।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অ্যান্ডি ডেভিড বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, এটা নতুন কিছু নয়। বিন লাদেন আগেও এ ধরনের কথা বলেছেন। সন্ত্রাসীরা সব সময় তাদের ঘৃণ্য কাজের বৈধতা দেওয়ার জন্য অযৌক্তিক অজুহাত খুঁজে বেড়ায়।

তালেবানের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের সময় এসেছে: মার্কিন জেনারেল

আফগানিস্তানে নিযুক্ত শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, আফগানিস্তানে যথেষ্ট যুদ্ধ হয়েছে। এখন সময় এসেছে তালেবানের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করার।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিনানশিয়াল টাইমস পত্রিকাকে জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টাল বলেন, আফগানিস্তানে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। এখন তিনি চান, এ সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান হোক। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে অতিরিক্ত ৩০ হাজার মার্কিন সেনা পাঠাতে বারাক ওবামার সিদ্ধান্তে তালেবানরা যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন তাদের শান্তি চুক্তিতে বাধ্য করা যায়। ভবিষ্যতে দেশ পুনর্গঠনে তালেবানরা সহায়তা করতে পারবে বলে তিনি জানান।
আফগানিস্তানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আগ মুহূর্তে ম্যাকক্রিস্টাল এসব কথা বলেন। চলতি সপ্তাহে লন্ডনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
জেনারেল ম্যাকক্রিস্টাল বলেন, ‘আমি আশা করব, লন্ডন সম্মেলন থেকে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি নিয়ে সবাই ফিরবে; যে প্রতিশ্রুতি আফগান জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে।’
আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সম্প্রতি জানান, তালেবানদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে তিনি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তালেবানের জন্য নগদ অর্থ এবং চাকরি দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, তিনি আশা করছেন, লন্ডন সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাঁর এ পরিকল্পনা সমর্থন করবে।
ম্যাকক্রিস্টাল বলেন, ‘একজন সেনা হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি হলো, লড়াই যথেষ্ট হয়েছে। আমি মনে করি, সব সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান অপরিহার্য এবং সেটাই সঠিক, তবে শান্তি স্থাপনের কথা বলা আমার কাজ নয়, সে দায়িত্বে যাঁরা আছেন, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তাঁদের সহযোগিতা করা আমার কর্তব্য।

হাইতির দুর্গতদের জন্য ব্রিটিশ বালক চার্লির ভালোবাসা

ব্রিটেনের সাত বছরের বালক চার্লি সিম্পসন। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হাইতির জনগণের দুরবস্থা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে সে চুপ করে বসে থাকতে পারেনি। নিজের ছোট্ট সাইকেলটি নিয়ে অর্থ সংগ্রহে বেরিয়ে পড়ে। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) জন্য মাত্র ৫০০ পাউন্ড সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হয়ে এক দিনেই ৫০ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করে ফেলে।
কয়েক দিন আগে চার্লি তার সাইকেল নিয়ে লন্ডনের স্থানীয় পার্কের আশপাশের আট কিলোমিটার এলাকায় অর্থ সংগ্রহ শুরু করে। আর তার এ প্রচেষ্টায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনলাইনে শত শত মানুষ ওই তহবিলে সহায়তা দিতে থাকে। সিম্পসন জানায়, ‘ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হাইতির অবস্থা আমি টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি। দৃশ্যগুলো অত্যন্ত মর্মান্তিক। শিশুদের অবস্থা আরও ভয়াবহ।’ সিম্পসনের মা লিওনোরা তহবিল সংগ্রহে ছেলেকে সাহায্য করেন। লিওনোরা জানান, হাইতির জনগণের সহায়তায় একটি আবেদন ফরম ইন্টারনেটে ছাড়া হয়। মূলত এর মাধ্যমেই এক দিনে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এ অর্থ ইউনিসেফকে দেওয়া হবে।
ইউনিসেফ হাইতিতে শিশুদের জন্য পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা ও তাদের রক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইউনিসেফ জানায়, একজনের এক দিনে ৫০ হাজার পাউন্ড তহবিল সংগ্রহ করার ঘটনা এটাই প্রথম। ইউনিসেফের মুখপাত্র মাইকেল নিউসাম বলেন, ‘একটি শিশুর এ ধরনের উদ্যোগ, এককথায় অসাধারণ ব্যাপার।’

শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ

আজ মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রায় চার দশকের গৃহযুদ্ধের অবসানের পর দেশটিতে এই প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে এবং সাবেক সেনাপ্রধান শরত্ ফনসেকার মধ্যে। নির্বাচনের আগে ফনসেকা অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাসীন দল ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং ভোট কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জেতার চেষ্টা করবে। তবে প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে আশ্বাস দিয়েছেন, নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে।
শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু তামিলদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ শেষ হয় গত বছরের মে মাসে। বিদ্রোহী লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম বা এলটিটিইর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে। আর অভিযানে নেতৃত্ব দেন সেনাপ্রধান ফনসেকা। নির্বাচনে এ দুজনের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাজাপক্ষে লড়ছেন ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্সের প্রার্থী হিসেবে। আর ফনসেকা ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি ও জনতা ভিমুক্তি পেরামুনাসহ কয়েকটি প্রধান বিরোধী দলের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে প্রার্থী আছেন আরও ২০ জন। আর ভোটার এক কোটি ৪০ লাখ। দেশজুড়ে ১১ হাজার ভোটকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে ভোট গ্রহণ। নিরাপত্তা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ।
গত রোববার ফনসেকারের এক সহযোগী দাবি করেন, ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় থাকার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করছে। তারা ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তবে এ ধরনের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে সরকার।
স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি গতকাল সোমবার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সরকার চায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এজন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুত থাকতে হবে।

বাগদাদে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলায় ৩৬ জন নিহত

ইরাকের রাজধানী বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে গতকাল সোমবার তিনটি আত্মঘাতীগাড়িবোমা হামলায়অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৭১ জন। বোমাগুলো বাগদাদের কয়েকটি হোটেলকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল।
বাগদাদে বিবিসির সংবাদদাতা জানান, মনে হচ্ছে সম্প্রতি উন্নতি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে এ বোমা হামলা চালানো হয়েছে।
বাগদাদের নিরাপত্তা মুখপাত্র মেজর জেনারেল কাশিম আল-মৌসাবি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, ‘হোটেল শেরাটনের কাছে প্রথমে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর ব্যাবিলন হোটেলে বিস্ফোরণ ঘটে। তৃতীয় বোমাটি কোথায় বিস্ফোরিত হয়েছে, তা খুঁজছি আমরা।’
মার্চ মাসে ইরাকে সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার পর থেকে দেশব্যাপী বোমা হামলা বেড়ে গেছে।

ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে দাবি করেছেন ব্রিটেনের শীর্ষ একজন জ্যোতির্বিদ। রয়াল সোসাইটি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রনোমার রয়ালের সভাপতি লর্ড রিস বলেছেন, ‘এ ধরনের কোনো কিছু আবিষ্কৃত হলে তা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস বদলে দেবে।’ গতকাল সোমবার লন্ডনে আয়োজিত ‘ভিনগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
লর্ড রিস বলেন, ‘ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেলে নিজেদের সম্পর্কে এবং বিশ্বজগত্ সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টে যাবে। প্রযুক্তি এখন অনেক উন্নত হয়েছে। আর এ কারণেই প্রথমবারের মতো পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে সত্যিকারের আশাবাদী হয়ে উঠতে পারি।’
বিজ্ঞানীরা ৫০ বছর ধরে ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানে মহাকাশ চষে বেড়াচ্ছেন উন্নত কোনো প্রাণীর বেতারসংকেত পাওয়ার প্রত্যাশায়। এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে সম্প্রতি যেসব নভোদূরবীক্ষণ যন্ত্র বসানো হয়েছে, সেগুলো বহুদূরের নক্ষত্রমণ্ডলেও পৃথিবীর মতো গ্রহ শনাক্ত করতে পারবে।
লর্ড রিস বলেন, ‘পৃথিবীর মতো গ্রহের কোনো ছবি পাওয়াও একটি বড় সাফল্য। পৃথিবীর বাইরে আমরা কোনো প্রাণের সন্ধান পেলে তা হবে ২১ শতকের অন্যতম বড় আবিষ্কার। আমার ধারণা, মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে এবং তাদের বুদ্ধিমত্তা হয়তো আমাদের কল্পনাসীমার বাইরে।

তহবিল সরবরাহের জন্যচাপের মুখে পড়ে ধনী দেশগুলো

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার সময়সীমা পূরণে গত রোববার চীনের নেতৃত্বে নয়াদিল্লিতে চার জাতির জলবায়ু বৈঠক হয়েছে। এতে বিশ্ব উষ্ণায়ন মোকাবিলার লড়াইয়ে তহবিল সরবরাহের জন্য নতুন করে ধনী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।
বৈঠকে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও চীনের পরিবেশমন্ত্রীরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ধনী দেশগুলোর তহবিল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয়ে জোর দেন।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিল নির্ধারণ করা নিয়েও তাঁরা আলোচনা করেন। ঝুঁকিপূর্ণ এই দেশগুলোর জন্য ২০১০ সালের মধ্যে ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে এক হাজার কোটি ডলার আদায়ে এই চার জাতি গ্রুপ কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
ডেনমার্কের কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ২০১০-১২ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তিন হাজার কোটি ডলারের জলবায়ু তহবিল এবং ২০২০ সাল নাগাদ ১০ হাজার কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নয়াদিল্লি বৈঠকে চার জাতি গ্রুপ বলেছে, এ বছর এক হাজার কোটি ডলার সরবরাহ হলে তা ধনী দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হবে।
এ ছাড়া জলবায়ু লড়াইয়ে স্বতন্ত্র কিছু তহবিলের ব্যবস্থা করা নিয়েও চার জাতি গ্রুপ আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। তবে এর কোনো পরিমাণ বা সময় উল্লেখ করেনি তারা।

৯/১১ হামলার পরিকল্পনার সময় লাদেন পঞ্চমবারের মতো বিয়ে করেন

৯/১১ হামলার আগের বছর। আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন তখন যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত। এরই মধ্যে তাঁর ইচ্ছে হলো পঞ্চমবারের মতো বিয়ে করবেন। মেয়ে যেমন-তেমন হলে চলবে না, জাতিতে হতে হবে ইয়েমেনি। এতে করে বাবার জন্মভূমি ইয়েমেনের সঙ্গে লাদেনের সম্পর্ক জোরদার হবে। এ ছাড়া কনেকে ধার্মিক, অনুগত, উদার, শান্ত ও নম্র হতে হবে। আর হতে হবে যথেষ্ট অল্পবয়সী। অন্য স্ত্রীদের ঈর্ষা করবে, এমন হিংসুটে স্বভাবের হলে চলবে না। সাধারণত একাধিক স্ত্রী থাকলে স্ত্রীদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে। লাদেন চাননি, তাঁর নতুন স্ত্রী তেমনটা করুক।
কোথায় পাওয়া যাবে এমন মেয়ে। লাদেন দ্বারস্থ হলেন তাঁর সহযোগীদের। দায়িত্ব নিলেন ইয়েমেনেরই এক সহযোগী, নাম শেখ রাশেদ ইসমাইল। ইয়েমেনে নিজের শহর ইবে এমনই একটি মেয়েকে চিনতেন ইসমাইল। মেয়েটির নাম আমাল আল-শাদাহ। বয়স ১৮। বাবা সরকারি কর্মকর্তা। ইসমাইলের মনে হলো ৪৩ বছর বয়সী লাদেনের জন্য আমালই হবে উপযুক্ত পাত্রী।
ইসমাইল জানান, বয়স অল্প হলেও আমাল যথেষ্ট ধার্মিক। বাবার বয়সী কাউকে বিয়ে করতেও তাঁর আপত্তি ছিল না। এ ছাড়া তিনি মনে করতেন, অনুগত ও কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী হতে পারলে তাঁর জন্য বেহেশতের দ্বার খোলা।
ঠিকঠাকমতো বিয়ে হয়ে গেল। অন্তঃসত্ত্বা হলেন আমাল। লাদেন তাঁকে রেখে দিলেন আফগানিস্তানের কান্দাহারে। তিনি চাইতেন, সেখানেই আমালের সন্তানের জন্ম হোক। ৯/১১ হামলার কয়েক দিনের মধ্যে আমাল একটি কন্যাশিশুর মা হলেন।

৯০ জন আরোহীনিয়ে ভূমধ্যসাগরে ইথিওপিয়ার বিমান বিধ্বস্ত

ইথিওপিয়ার একটি বিমান ৯০ জন আরোহী নিয়ে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের পাশে ভূমধ্যসাগরে বিধ্বস্ত হয়েছে। স্থানীয় সময় রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে বৈরুতে রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওড়ার কিছুক্ষণ পর বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৩৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তাত্ক্ষণিকভাবে দুর্ঘটনার কারণ জানা যায়নি। দুর্ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তারা জানিয়েছে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা হতে পারে। গত রোববার থেকে বৈরুতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। খবর এএফপি, এপি, জি নিউজ ও রয়টার্স অনলাইনের।
লেবাননের গণপূর্ত ও পরিবহনমন্ত্রী গাজী আরিদি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের জানান, বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের ইথিওপিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৪০৯-এর বিমানটি ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় যাওয়ার উদ্দেশে রোববার রাত আড়াইটার দিকে বৈরুতের রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। এর কিছুক্ষণ পর বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে তা বৈরুতের ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে উপকূলীয় এলাকা নামেহ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরে বিধ্বস্ত হয়।
জানা গেছে, বিমানটি ওড়ার পরপরই ঝোড়ো হাওয়া ও প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আরিদি জানান, নিঃসন্দেহে আবহাওয়া খুব খারাপ ছিল।
বৈরুত থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত নামেহ গ্রামের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি গ্রামটির ওপর একটি আগুনের গোলা পড়তে দেখেন।
বিমানটিতে ৮৩ জন যাত্রী ও সাতজন ক্রু ছিলেন। পরিবহনমন্ত্রী গাজী আরিদি জানান, যাত্রীদের মধ্যে লেবাননের ৫৪ জন, ইথিওপিয়ার ২২ জন এবং ইরাক, ফ্রান্স ও সিরিয়ার একজন করে যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া ব্রিটিশ, কানাডীয় ও রাশিয়ার বংশোদ্ভূত লেবাননের আরও তিন দ্বৈত নাগরিক ছিলেন। এর মধ্যে কয়েকজন শিশু যাত্রী ছিল।
ফরাসি দূতাবাস বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, দ্বৈত ওই নাগরিকদের মধ্যে লেবাননে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত ডেনিস পিয়েতঁর স্ত্রী মার্লা সানচেজ পিয়েতঁও ছিলেন।
ইথিওপিয়ার হাজার হাজার নাগরিক লেবাননে গৃহকর্মীর কাজ করেন। এ জন্য ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস নিয়মিত আদ্দিস আবাবা ও বৈরুতে ফ্লাইট পরিচালনা করে।
উদ্ধার তত্পরতা: দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে হেলিকপ্টার ও নৌজাহাজ পাঠানো হয়। পরিবহনমন্ত্রী আরিদি জানান, লেবাননের সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী এবং লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। তিনি জানান, ‘উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য আমরা দেশের ভেতরে ও বাইরে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনুসন্ধানকারীরা ৩৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে।
লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের মুখপাত্র কর্নেল ডিয়েগো ফুলকো বলেন, উপকূলীয় টাস্কফোর্সের দুটি জাহাজ ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। আরেকটি পথে রয়েছে। জাতিসংঘের দুটি হেলিকপ্টারও সেখানে রয়েছে।
এ ছাড়া সাইপ্রাস পুলিশের একটি হেলিকপ্টার এবং সাইপ্রাসে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারও সেখানে আছে।
নাশকতার সম্ভাবনা নাকচ: বিমান দুর্ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ বা নাশকতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিচেল স্লেইম্যান। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত বিমান দুর্ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ বা নাশকতার কোনো প্রমাণ পাইনি।’ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটা খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। হতাহতদের খুঁজতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।’ বিমানটির আরোহীদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার নির্ধারিত সূচি বাতিল করে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেন।
তদন্ত কমিটি: বিমান দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পরিবহনমন্ত্রী আরিদি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। আদ্দিস আবাবায় দ্য ইথিওপিয়ান নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সংঘর্ষের কারণ অনুসন্ধানে বৈরুতে একটি দল পাঠিয়েছে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস।
শোকার্ত স্বজনদের ভিড়: দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গতকাল সোমবার সকালে বিমানটির যাত্রীদের স্বজনেরা রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জড়ো হয়। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থান করা স্বজনদের কয়েকজনকে চিত্কার করে কাঁদতে দেখা গেছে। কয়েকজন কিছুক্ষণ পর পর মূর্ছা যাচ্ছিল। রেডক্রসের স্বেচ্ছাসেবকেরা সামাল দিচ্ছিলেন তাদের। বিমানটির এক যাত্রীর স্ত্রী বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমি জানি তারা তাকে খুঁজে পাবে না।’
বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানটি ১৯৯৮ সাল থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। মোটামুটিসংখ্যক যাত্রী ধারণক্ষমতার এই বিমান বিশ্বের সবচেয়ে ব্যবহূত আধুনিক বিমানগুলোর অন্যতম। বিমানটি একসঙ্গে ১৮৯ জন যাত্রী বহন করতে পারে।

নতুন ১০ টাকার নোট আসছে বাজারে

নতুন ১০ টাকার নোট বাজারে আসছে। ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢাকার মতিঝিল অফিস থেকে এ নোট ইস্যু করা হবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য অফিস থেকে ইস্যু করা হবে নোটটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল সোমবার এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গভর্নর ড. আতিউর রহমানের স্বাক্ষরিত এ নোটের সম্মুখভাগে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ও জাতীয় পাখি দোয়েলের প্রতিকৃতি থাকবে। আর পশ্চাত্পৃষ্ঠে থাকবে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জাতীয় সংসদ ভবনের প্রতিকৃতি। নোটটির পরিমাপ হচ্ছে ১২৩ মি.মি.x৬০ মি.মি.।
নতুন মুদ্রণের এ নোটের পাশাপাশি বর্তমানে প্রচলিত ১০ টাকা মূল্যমানের অন্যান্য নোটও বৈধ ব্যাংক নোট হিসেবে চালু থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয় যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিসংবলিত নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে প্রচলনের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ঈশ্বরদীর মোকামে মণপ্রতি চালের দাম কমেছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা

উত্তরবঙ্গে মোটা চালের বড় মোকাম ঈশ্বরদীতে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। গত দুই দিনের ব্যবধানে এ মোকামে বস্তাপ্রতি চালের দাম কমেছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে ব্যবসায়ীরা জানান, এ মোকামে চালের বেচাকেনা স্থবির হয়ে পড়েছে। বাইরের ব্যাপারি বা ব্যবসায়ীরা আসছেন না। ঢাকার পাইকারি বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় ঈশ্বরদীতেও এর প্রভাব পড়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সপ্তাহে ঈশ্বরদীর জয়নগর মোকামে মিনিকেট চাল বিক্রি হয় প্রতি বস্তা (৮৪ কেজি) ৩১০০ টাকা। গতকাল সোমবার সেই চাল বিক্রি হয় ৩০০০ টাকা দরে। একইভাবে প্রতিমণ গুটি স্বর্ণা ২১০০ টাকা থেকে ২১৫০ টাকায়, বিআর-২৯ চাল ২৭০০ টাকা থেকে ২৬০০ টাকায় এবং বিআর-১০ চাল ২৬০০ টাকা থেকে কমে ২৫০০ টাকায় এসেছে।
জয়নগর মোকামের ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, দু-তিন দিন ধরে এখানে চালের বেচাকেনা কমে গেছে। তাঁর ধারণা, রাজধানী ঢাকার পাইকারি বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় ঈশ্বরদীর মোকামেও কমেছে।
আরেক ব্যবসায়ী সাদেক আলী জানান, এ মোকামে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চালের অর্ডার কমে যাওয়ায় দাম কমে গেছে। তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গত দুই দিন বাইরের কোনো চাল ব্যবসায়ী যোগাযোগ করেননি বলে তিনি জানান।
স্থানীয় চাল ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় টিআর, কাবিখা, ওএমএসসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় চালের দাম কমতে শুরু করেছে।

ঢাকা শেয়ারবাজারে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন



ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৫০৩ কোটি টাকার শেয়ার, যা গত রোববারের রেকর্ড লেনদেনের চেয়ে ৫১ কোটি টাকা বেশি।
এদিন স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ সূচক ১৫৫ পয়েন্ট বা তিন শতাংশ বেশি বেড়ে পাঁচ হাজার ৩১২ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৮০ পয়েন্ট বেড়েছে কেবল গ্রামীণফোনের মূল্যবৃদ্ধির কারণে।
গতকাল গ্রামীণফোনের প্রতিটি শেয়ার আগের দিনের চেয়ে ২২ টাকা ৯০ পয়সা বা নয় শতাংশ বেড়ে ২৭৫ টাকায় সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে। কোম্পানিটির তালিকাভুক্তির পর এটিই ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর বৃদ্ধি।
এ দর বাড়ার কারণ জানতে এসইসির নির্দেশে ডিএসইর দেওয়া চিঠির জবাবে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কাছে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, যার কারণে শেয়ারের দাম বাড়তে পারে।
বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রচুর নতুন টাকাও ঢুকছে। এর বড় অংশ এসেছে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের যে সুযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে। মূলত এসব বিনিয়োগই বাজারকে অতিমূল্যায়িত করে তুলছে।’
অস্বাভাবিক লেনদেনের তদন্ত: এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিযোগাযোগ খাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি গ্রামীণফোন লিমিটেডের শেয়ারের সাম্প্রতিক লেনদেনকে অস্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে এর কারণ তদন্তে মাঠে নেমেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।
গতকাল সোমবার এসইসির তদন্ত দল ছয়টি ব্রোকারেজ হাউস থেকে গ্রামীণফোনের লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করেছে।
একই সঙ্গে সংস্থাটি ডিএসইকেও চিঠি দিয়ে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এতে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মতামতসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ নির্দেশের পরপরই গ্রামীণফোনের শেয়ারের লেনদেন বেশি হয়েছে এমন প্রায় ৩৫টি ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেন খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসই। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ১৮টি ব্রোকারেজ হাউসে চিঠি পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
চিঠিতে আগামী তিন দিনের মধ্যে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে গ্রামীণফোনের শেয়ার লেনদেনের শীর্ষ ২০ গ্রাহকের (১ থেকে ২৫ জানুয়ারির লেনদেনের তথ্যসহ) বিভিন্ন ধরনের তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এসইসির সদস্য মনসুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রামীণফোনের শেয়ারের লেনদেন এসইসির কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এ কারণেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ডিএসইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা নিজেরাও খতিয়ে দেখছি, এ লেনদেনের পেছনে সন্দেহজনক কিছু রয়েছে কি না।’
এসইসি ও ডিএসইর প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জানা গেছে, কয়েকজন প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী সংঘবদ্ধ হয়ে কৃত্রিমভাবে গ্রামীণফোনের দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। আর হঠাত্ করেই এভাবে দাম বাড়তে দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটি কেনার ব্যাপারে প্ররোচিত হয়েছে।
মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠক: বিকেলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে পুঁজিবাজারে ঋণ জোগানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমিতি মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠক করেছে। বৈঠক শেষে সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্যের কারণে বাজারে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় প্রয়োজন নতুন শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো। এ জন্য এসইসি, ডিএসই, সিএসই ও সরকার সবাইকে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ঋণ প্রদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো গ্রাহক ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে ঋণ নিতে গেলে তাকে সতর্ক করবে। এর বাইরেও কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে ঋণ প্রদান থেকে বিরত থাকতে পারবে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, আজ থেকে তাঁরা গ্রামীণফোনের শেয়ার কেনার জন্য ঋণসুবিধা দেবেন না।
এদিকে আজ মঙ্গলবার ডিএসই বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ৫৫টি ব্রোকারেজ হাউসের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যাদের চিঠি পাঠানো হয়েছে: লঙ্কা বাংলা সিকিউরিটিজ, উইফেং সিকিউরিটিজ, আল-আরাফাহ ব্যাংক, আইডিএলসি, পিএফআই সিকিউরিটিজ, বিএলআই সিকিউরিটিজ, আইসিবি, আইআইডিএফসি, প্রাইলিঙ্ক সিকিউরিটিজ, এনসিসি ব্যাংক, ই সিকিউরিটিজ, মাল্টি সিকিউরিটিজ, এবি ফাউন্ডেশন, এসইএস, আইএফআইসি, সিএমএসএল, গ্রিনডেল্টা ও কান্ট্রি স্টক লিমিটেড।
মিউচুয়াল ফান্ড: মিউচুয়াল ফান্ড-সংক্রান্ত মামলার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এসইসি আপিল না করার সিদ্ধান্তে গতকাল বেশির ভাগ মিউচুয়াল ফান্ড বিক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। বাজারে ক্রেতারা বেশি দাম দিয়ে কেনার জন্য দর হাঁকলেও শেষ পর্যন্ত অনেকেই আর কিনতে পারেনি।