Saturday, April 2, 2011

সন্দেহভাজন মূল পরিকল্পনাকারী পাতেক গ্রেপ্তার

২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে বোমা হামলা ঘটনার সন্দেভাজন মূল পরিকল্পনাকারী ওমর পাতেককে পাকিস্তানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই হামলায় আল-কায়েদা ও তার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সহযোগীরা জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ওমর পাতেককে গ্রেপ্তারে তথ্য দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ‘ছোট ওমর’ নামে পরিচিত জাভানিজ-আরব বংশোদ্ভূত ওমর পাতেক ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপে রয়েছেন। পাকিস্তানে ওমর পাতেক গ্রেপ্তার হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, আল-কায়েদাসহ দেশটির অন্য জঙ্গি সংগঠন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গিদের সঙ্গে তাঁর যোগসাজশ রয়েছে। ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ায়ও পাতেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এসব দেশে তিনি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মিন্দানাওকে তিনি লুকিয়ে থাকার নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নেন।

সিরিয়াজুড়ে আজ বিক্ষোভ

সিরিয়ায় আজ শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দেশজুড়ে বিক্ষোভের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর ভাষণে দেশটি থেকে কয়েক দশকের জরুরি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার ফেসবুকে এই বিক্ষাভের আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশবাসী আশা করেছিল, জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রসিডেন্ট আসাদ জরুরি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তিনি তা দিতে ব্যর্থ হন। গতকাল বৃহস্পতিবার ফেসবুকে ‘সিরিয়া বিপ্লব ২০১১’ নামের একটি অজ্ঞাত গ্রুপের দেওয়া এই বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের দিন শুক্রবার। তারা সব বাড়িঘর এবং উপাসনালয় থেকে প্রত্যেক নাগরিককে দেশের স্বাধীনতার জন্য দেশটির সব চত্বরে জড় হওয়ার আহ্বান জানায়।
গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ওই গ্রুপ মূল চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গত মঙ্গলবার সিরিয়ার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে। ওই দিনই সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রেসিডেন্ট আসাদ। আশা করা হচ্ছিল, তিনি জরুরি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবেন।
জরুরি আইন বিলুপ্তিতে কমিটি: সিরিয়া দেশটি থেকে জরুরি আইন বিলুপ্তির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করছে। গতকাল রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানার খবরে এ কথা বলা হয়।
রয়টার্সের সাংবাদিক নিখোঁজ: সিরিয়ায় রয়টার্সের দুই সাংবাদিক নিখোঁজ হয়েছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সংবাদদাতা সুলেইমান আল-খালিদিকে সিরিয়া কর্তৃপক্ষ গত মঙ্গলবার দামেস্ক থেকে আটক করে। এদিকে ফটোগ্রাফার খালেদ আল-হারিরির সঙ্গে তাঁর সহকর্মীরা গত সোমবার থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারছেন না

অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন পাকিস্তানের ইসলামপন্থী নেতা রেহমান

পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল জামায়েত উলেমা-ই-ইসলামের (জেইউআই) প্রধান মাওলানা ফজলুর রেহমান আবারও অল্পের জন্য গুপ্তহত্যার হাত থেকে বেঁচে গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী তাঁর মোটর শোভাযাত্রায় হামলা চালায়। এতে আটজন নিহত ও আহত হয়েছেন ২৯ জন। ওই হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান রেহমান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রেহমানের মোটর শোভাযাত্রাটি খাইবার-পাখতুনখাওয়া প্রদেশের চরসাদা শহরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই শহরের দারুল উলুম ইসলামিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত সমাবেশে রেহমানের ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

চীন তার সদ্য প্রকাশিত একটি জাতীয় প্রতিরক্ষাবিষয়ক শ্বেতপত্রে বলেছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এর ফলে ওই অঞ্চল ‘নিয়তপরিবর্তনশীল’ হয়ে উঠছে। এতে আরও বলা হয়েছে, সেখানে চীনবিরোধী বিদেশি সামরিক তৎপরতার উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ শ্বেতপত্র প্রকাশ করে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়ে চীন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সে দেশের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর হালনাগাদ অবস্থা শ্বেতপত্রে তুলে ধরা হয়। আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা পরিস্থিতির ওপর এতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শ্বেতপত্রের নথিতে বলা হয়, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের নকশা নিয়তপরিবর্তিত হচ্ছে। এ এলাকায় শক্তিধর দেশগুলো নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট কৌশল বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সেখানে আন্তর্জাতিক সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা ভয়ানক পর্যায়ে রয়েছে।
নথিতে ‘শক্তিপ্রদর্শনকারী’ দেশগুলোর মধ্য থেকে আলাদাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ওয়াশিংটন দিন দিন এখানকার আঞ্চলিক বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাত্রা বাড়িয়ে যাচ্ছে। বেইজিং বলেছে, বিদেশি শক্তিগুলো চীনের শক্তিবৃদ্ধি নিয়ে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সন্দিগ্ধ। সন্দেহ থেকেই তারা ‘মারমুখী’ মনোভাব নিয়ে এ অঞ্চলে হস্তক্ষেপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রিসহ অন্য কয়েকটি সামরিক ইস্যুতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কে চিড় ধরে। চলতি বছরের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিন তাও যুক্তরাষ্ট্র সফর করায় সে সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললেও বিভিন্ন বিষয়ে এখনো দুই দেশের মতবিরোধ রয়ে গেছে।
বেইজিংয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করার সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কর্নেল জেং ইয়ানসেং সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা স্বীকার করছি আমাদের সামরিক খাত বিভিন্ন সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।’
কর্নেল জেং ইয়ানসেং বলেন, তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেওয়াই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কের অবনতির মূল কারণ। স্বশাসিত দ্বীপ রাষ্ট্র তাইওয়ানকে চীন তাঁর নিজ ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে।
চীনের আপত্তি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভালো না যাওয়ার এটাই প্রধান কারণ বলে ইয়ানসেং জানান।

ভারতের জনসংখ্যা এখন ১২১ কোটি

ভারতের জনসংখ্যা এখন ১২১ কোটি দুই লাখ। দেশটির ১৫তম জাতীয় আদমশুমারি-২০১১-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং সেন্সাস কমিশনার সি চন্দ্রমৌলি রাজধানী দিল্লিতে এই প্রতিবেদন পেশ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ বছরে দেশটির জনসংখ্যা বেড়েছে ১৮ কোটি। বৃদ্ধির হার ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০০১ সালের আদমশুমারিতে এ হার ছিল ২১ দশমিক ১৫ শতাংশ। বর্তমান জনসংখ্যার মধ্যে ৬২ কোটি ৩৭ লাখ পুরুষ এবং ৫৮ কোটি ৬৫ লাখ নারী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা উত্তর প্রদেশ রাজ্যে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মহারাষ্ট্র। জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি দিল্লির উত্তর-পূর্বের জেলাগুলোতে। সেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ৩৭ হাজার ৩৪৬ জন। আর সবচেয়ে কম অরুণাচল প্রদেশের দিবাং উপত্যকায়। সেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে একজন করে বাস করে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্মিলিত জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।

গুয়াতেমালার মাদক সম্রাট হুয়ান লোপেজ গ্রেপ্তার

গুয়াতেমালার পলাতক আসামি মাদকসম্রাট হুয়ান অরতিজ লোপেজ ধরা পড়েছেন। মার্কিন ও গুয়াতেমালার গোয়েন্দারা যৌথ চেষ্টায় গত বুধবার তাঁকে আটক করে।
গুয়াতেমালার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার্লোস মেনোকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, কুইতজালতেনাগো শহরের একটি বাড়ি থেকে দুজন সঙ্গীসহ এ মাদকসম্রাটকে আটক করা হয়। লোপেজকে আটক করতে সেনা ও পুলিশ বাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। তাঁর বিরুদ্ধে গুয়াতেমালা ও মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ফ্লোরিডায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। এ গ্রেপ্তারকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে সরকার।
আটকের পর হুয়ান অরতিজকে গুয়াতেমালার আদালতে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিচারের জন্য অরতিজকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।

এক শ কোটি ডলার সম্পদের মালিক ছিলেন এলিজাবেথ টেলর

হলিউডের কিংবদন্তি তারকা এলিজাবেথ টেলর তাঁর মৃত্যুকালে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদ রেখে গেছেন। দি ইনডিপেনডেন্ট-এর অনলাইন ভার্সন থেকে গত বুধবার এ তথ্য জানা গেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বের শীর্ষ ১৪ জন ধনী মহিলার তালিকায় ঠাঁই পেলেন।
কিংবদন্তি এলিজাবেথ শুধু যে চলচ্চিত্রে অভিনয় সূত্রেই এ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা নয়। তিনি বিশ্বের প্রথম কোনো তারকা, যিনি নামীদামি পণ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়েছেন। সম্পদের তালিকায় তাঁর অলংকারের বিশাল ভান্ডারও রয়েছে। এসব অলংকারের মূল্যই রয়েছে ২৭ কোটি মার্কিন ডলার। এই অভিনেত্রী মূল্যবান রত্নখচিত দৃষ্টিনন্দন অলংকারের জন্যও আলোচিত ছিলেন। তিনিই হলিউডের প্রথম কোনো নায়িকা, যাঁকে অভিনয়ের জন্য ১০ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। তাঁকে ক্লিওপেট্রা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ওই সময় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়া হয়।
তা ছাড়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনি আরেক অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে প্রসাধনসামগ্রীর প্রতিষ্ঠান ‘এলিজাবেথ আরডেন’ গড়ে তোলেন। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি বিখ্যাত সুগন্ধি ‘হোয়াইট ডায়মন্ড’-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর নিযুক্ত হন।
এলিজাবেথ টেলর গত সপ্তাহে ৭৯ বছর বয়সে মারা যান।

বড় মুক্তার নিলাম এবার দুবাইয়ে

বিশ্বের অন্যতম বড় একটি মুক্তাকে নিলামে তোলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিলাম প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টি’স এ আয়োজন করছে। নিলাম হবে আগামী ২০ এপ্রিল দুবাইয়ে। এ নিলামকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে মুক্তারাজি, হীরা, রত্ন ও সোনার অলংকারাদির পসরা সাজানো হয়েছে। চলছে এ সবের প্রদর্শনী।
ক্রিস্টি’স ২০০৬ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে হীরা, মুক্তা ও রত্নসামগ্রীসহ মূল্যবান অলংকারের নিলামের আয়োজন করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির সূত্রে জানা গেছে, গত বছর এ অঞ্চলে পাঁচ কোটি ১০ লাখ ডলারের অলংকার বিক্রি হয়েছে। একই বছর সারা বিশ্বে তাঁদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটি ডলার।
ক্রিস্টি’স-এর মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল জেহা বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে ২০০৯ সালে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মুক্তাসহ অন্যান্য অলংকারসামগ্রী বিক্রিতে কিছু ভাটা পড়ে। তবে পরের বছর আবার চাকা ঘুরতে থাকে।

জনমত জরিপে কংগ্রেস তৃণমূল জোট এগিয়ে

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিভিন্ন সংস্থা এবং গণমাধ্যমের করা জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট।
গত বুধবার কলকাতার বাংলা টিভি চ্যানেল মহুয়া বাংলার এক জনমত জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ নির্বাচনে তৃণমূল জোট ১৯১টি আসন পেতে পারে। তবে এই জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিততে পারবে না। এককভাবে তৃণমূল পেতে পারে ১৫৬টি আসন। এ ছাড়া কংগ্রেস ৩৩টি, এসইউসিআই দুটি ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা পেতে পারে তিনটি আসন। আর বামফ্রন্ট পেতে পারে ৯৬টি আসন। এর মধ্যে সিপিএম ৭২, ফরোয়ার্ড ব্লক ১২, আরএসপি নয়টি এবং সিপিআই তিনটি আসন পেতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পছন্দের শীর্ষে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পক্ষে রায় দিয়েছেন ৫০ শতাংশ ভোটার। আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পক্ষে রায় দিয়েছেন ৪১ শতাংশ ভোটার। ৩৬ হাজার ৪০০ ভোটার এ জনমত জরিপে অংশ নেন।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার করা এক সমীক্ষায়ও এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট। ওই সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, কংগ্রেস-তৃণমূল জোট ১৮০ থেকে ২০০টি আসন পেতে পারে।
আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে ছয় পর্বে শুরু হচ্ছে এই নির্বাচন।

আরও এলাকা থেকে লোক সরিয়ে নিতে চাপ বাড়ছে

জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় চার হাজার গুণ বেড়ে গেছে এবং ক্রমাগত তা আরও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ওই কেন্দ্রের আশপাশের আরও বেশি এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপের মুখে আছে সরকার।
১১ মার্চের ভূমিকম্প ও সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফুকুশিমা কেন্দ্র থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার পর কেন্দ্রের চারপাশের ২০ কিলোমিটার এলাকার প্রায় ৭০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ওই ২০ কিলোমিটারের বাইরে প্রায় ১০ কিলোটারের মধ্য বসবাসকারী আরও এক লাখ ৩৬ হাজার মানুষকে সরে যেতে বা ঘরের মধ্যে থাকতে বলা হয়। কিন্তু পানি, বাতাস ও মাটিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকায় আরও বেশি এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে জাপানের পরমাণু নিরাপত্তা সংস্থা এবং জাতিসংঘের পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।
আইএইএ জানিয়েছে, তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা যতটা বাড়লে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন হয়, ফুকুশিমা কেন্দ্র থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের ইতাতা গ্রামে তেজস্ক্রিয়তা সেই মাত্রাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।
আইএইএর উপমহাপরিচালক ডেনিস ফ্লোরি বলেন, ‘জাপানের প্রতি আমাদের পরামর্শ, তারা যেন সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে এবং তারা যে ঝুঁকির পরিমাণ কম করে দেখাচ্ছে, ইতিমধ্যে তা বোঝাও গেছে।’
তবে অপসারণ এলাকা আরও বাড়ানোর ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেননি জাপান সরকারের মুখপাত্র মন্ত্রিপরিষদের মুখ্য সচিব ইয়োকিয়ে এদানো। ইতাতা গ্রামের তেজস্ক্রিয়তার বিষয়ে আইএইএ যে তথ্য দিয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তেজস্ক্রিয়তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে, এ মুহূর্তে এমনটা ভাবার মতো কোনো কারণ নেই।’
জাপানের পরমাণু নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, ফুকুশিমা কেন্দ্রের পাশে সাগরের পানিতে তেজস্ক্রিয়তা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এর থেকে ধরেই নেওয়া যায় যে ওই কেন্দ্র থেকে অব্যাহতভাবে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ছে।
আবারও ভূমিকম্প: এদিকে ভূমিকম্প ও সুনামি-বিধ্বস্ত জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে গতকাল বিকেলে আবার ভূমিকম্প হয়েছে। স্থানীয় সময় বিকেল চারটা ১৫ মিনিটে আঘাত হানা ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ২। উৎপত্তিস্থল ছিল টোকিও থেকে ৪১৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

তিনটি জাহাজ নির্মাণশিল্প এলাকা গড়ে তোলা হবে: শিল্পমন্ত্রী

দেশে আগামী দুই মাসের মধ্যে জাহাজ নির্মাণশিল্প নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এ ছাড়া জাহাজ নির্মাণের জন্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর এবং বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জে নদীর তীরে গড়ে তোলা হবে তিনটি শিল্প এলাকা।
শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া গতকাল চট্টগ্রামে জার্মানির গ্রোনা শিপিং কোম্পানির কাছে স্থানীয় ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের আরও দুটি সমুদ্রগামী জাহাজ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, জাহাজশিল্পের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সমন্বয় সংস্থাও গঠন করা হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল জহির উদ্দিন আহমেদ, ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত হোলগার মিখাইল, কালের কণ্ঠর সম্পাদক আবেদ খান, চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম, জাহাজ দুটির মালিক গ্রোনা শিপিং কোম্পানির প্রতিনিধি মার্কু ভেডর, প্রকল্প পরিকল্পনা সমন্বয়কারী ইস্ট উইন্ড জার্মানির লারস ব্রেনেকি, জার্মানশিয়র লয়েডের প্রিন্সিপাল সার্ভেয়ার চৌধুরী ফখরুজ জামান এবং মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন ও পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, জার্মানির কোম্পানিটির কাছে প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা মূল্যের মোট ১২টি জাহাজ রপ্তানির চুক্তি করেছিল ওয়েস্টার্ন মেরিন। সেই অনুযায়ী ‘ইএমএস লেক’ ও ‘ইএমএস ডলার্ট’ নামের এই দুটি জাহাজ হস্তান্তর করা হয়। এর আগে গত ২৬ নভেম্বর একই মূল্যের আরও দুটি জাহাজ রপ্তানি করেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানটি।

সমাধানের পথ খুঁজতে হবে ভারত ও পাকিস্তানকেই

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, পারস্পরিক মতবিরোধ নিয়ে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে উঠতে অবশ্যই ভারত ও পাকিস্তানকে এগিয়ে আসতে হবে। দুই দেশের মধ্যে যা নিয়েই মতভেদ থাকুক না কেন, তা নিষ্পত্তির জন্য উভয় দেশকে সমাধানের উপায় খুঁজতে হবে। গত বুধবার রাতে ভারতের মোহালিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির সম্মানে আয়োজিত এক ভোজসভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। এ সময় গিলানিও মনমোহনের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।
বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সেমিফাইনালে অংশ নেওয়া ভারত ও পাকিস্তানের খেলা শেষ হওয়ার পর গিলানির সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করা হয়। পরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের মনমোহন বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে যে বিভেদই থাকুক না কেন, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার উপায় আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।’ তিনি বলেন, ক্রিকেটের মতো একটি ‘সুন্দর খেলা’ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এক জায়গায় আনার ক্ষেত্রে ‘একত্রীকরণের অনুঘটক’ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
মনমোহন বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকতে চায়, মোহালি থেকে এমন বার্তা সবার কাছে পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, সব ধরনের সমস্যা নিয়ে তাঁর সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছে। এ সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী গিলানি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সব ধরনের সমস্যা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করার ‘সামর্থ্য ও সক্ষমতা’ ভারত ও পাকিস্তানের রয়েছে।
মনমোহন বলেন, গিলানি তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ভারত সফরে আসায় তিনি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি জানান, গিলানির সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বহু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁরা দুজনেই দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।
এর আগে ভোজসভায় মনমোহন বলেন, জাতির বর্তমান সমস্যা সমাধানের স্বার্থে দুই দেশকেই পুরোনো বিবাদ ভুলে এগিয়ে আসতে হবে।

উপহার না পাওয়ায় পূবালী ব্যাংকের এজিএম ভণ্ডুল

সাধারণ শেয়ারধারীদের হট্টগোলে ভণ্ডুল হয়ে গেছে পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি খাতের এ ব্যাংকের গতকাল বৃহস্পতিবার ২৮তম এজিএম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এজিএম শুরু হওয়ার আগেই কিছু সংখ্যক বিনিয়োগকারী উপহার না পেয়ে গণ্ডগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বেলা একটার দিকে জরুরি বৈঠক করে এজিএম স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এজিএমের নতুন সময় ও স্থান পরে জানানো হবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে বেলা ১১টায় এজিএম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেক শেয়ারধারী সেখানে উপস্থিত হয়ে ফোলিও নম্বর দিয়ে এজিএমে অংশগ্রহণের জন্য অনুমোদনপত্র সংগ্রহ করেন। এ সময় শেয়ারধারীদের অনেকেই কোনো উপহার না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ব্যাংকের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা এজিএমে উপহার দেওয়ার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নিষেধাজ্ঞার কথা বললে শেয়ারধারীরা বাগিবতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁরা এজিএমের স্থলে ভাঙচুর শুরু করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এজিএমে উপস্থিত একজন শেয়ারধারী বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় সব কোম্পানিই এজিএমে সাধারণ শেয়ারধারীদের জন্য কিছু না কিছু উপহারের ব্যবস্থা করে। এ কারণেই হয়তো তাঁরা পূবালী ব্যাংকের এজিএমে উপহারের প্রত্যাশা করেছিলেন। এসইসির নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ভালোমতো প্রচার করা হলে এ সমস্যা হতো না।
উল্লেখ্য, পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গত ৩ মার্চ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৫ শতাংশ নগদ ও ৩৫ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করে।

অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরলে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেবে



অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দেশে ফেরার পর পুঁজিবাজারে কারসাজি তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। বর্তমানে প্রতিবেদন তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে।
কমিটির চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আজকের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে তদন্তকাজ সম্পন্ন হবে। তবে অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া যাচ্ছে না। আগামী ৬ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী দেশে ফেরার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি দেশে ফিরলে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
তদন্ত প্রতিবেদনে কী কী বিষয় উঠে এসেছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এ ব্যাপারে এখন বলা যাবে না। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর অর্থমন্ত্রী হয়তো এ ব্যাপারে কথা বলবেন। অন্যথায় প্রতিবেদন পেশ করার পর এ ব্যাপারে কথা বলা যাবে।
তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান আরও বলেন, তদন্তের ব্যাপারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকে যতটা আশা করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি সহযোগিতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) পক্ষ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
তদন্তকাজে কমিটির সদস্যদের সহযোগিতার ব্যাপারে খোন্দকার ইব্রাহিম বলেন, তাঁরা খুবই আন্তরিক ছিলেন। সবাই যথাযথভাবে সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়া প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তাতে কমিটির কারও মতবিরোধ নেই বলে জানান তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার হবে বলেও জানান ইব্রাহিম খালেদ।
উল্লেখ্য, পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ধসের কারণ অনুসন্ধানে গত ২৬ জানুয়ারি কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদকে চেয়ারম্যান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে দুই মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই সময়সীমা অনুযায়ী ২৭ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও পরে ৩১ মার্চের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

ভোজ্যতেল ও চিনির দাম আরও কমবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

চালান প্রথা (ডেলিভারি অর্ডার—ডিও) বাতিল ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার কারণে দেশীয় বাজারে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম কমেছে বলে তথ্য দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান। কয়েক দিন পর এ দুই পণ্যের দাম আরও কমবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের ভাইস গভর্নর লি জিয়াংয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে বাণিজ্যমন্ত্রী এ কথা জানান।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে চিনির দর কমেছে ১০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এক মাস আগে এক কেজি চিনির দাম ছিল ৫৯ থেকে ৬০ টাকা। গতকালের দর ৫২ থেকে ৫৫ টাকা।
একইভাবে খোলা সয়াবিনের দর নেমে এসেছে লিটারপ্রতি ১০৩ থেকে ১০৬ টাকায়। এক মাস আগে ছিল ১০৫ থেকে ১০৮ টাকা। আর পামতেল এক মাস আগে ছিল ৯৩ থেকে ৯৬ টাকা। গতকালের দর ৯১ থেকে ৯৩ টাকা।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চীন তাদের দেশে চার হাজার ৭০০টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই এতে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়বে।
উল্লেখ্য, ২০০৯-১০ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ৩৮১ কোটি ৯২ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আর চীনে রপ্তানি হয়েছে ১৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের পণ্য।
চীনের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যেই এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়িত হলে চীনের কুনমিং প্রদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।’
গুঁড়ো দুধের দাম বাড়া প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভূমিকম্পের কারণে জাপানে তেজস্ক্রিয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গুঁড়ো দুধের দাম বড়েছে। এরই প্রভাব দেশীয় বাজারে পড়ে থাকতে পারে।
জাপান থেকে বাংলাদেশ গুঁড়ো দুধ আমদানি না করলেও কেন দাম বেড়ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চেরনোবিল দুর্ঘটনার সময়ও আমরা রাশিয়া থেকে গুঁড়ো দুধ আমদানি করতাম না। তখনো দাম বেড়েছিল।’
টিসিবির তথ্যমতে, এক মাস আগে এক কেজি ডানো ব্র্যান্ডের গুঁড়ো দুধের দাম ছিল ৪৭০ থেকে ৪৮০ টাকা। গত এক সপ্তাহে তা বেড়ে হয়েছে ৪৯০ থেকে ৫০০ টাকা। বাড়ার হার ৪ দশমিক ২১ শতাংশ। ডিপ্লোমা ব্র্যান্ডের গুঁড়ো দুধ এক মাস আগে ছিল কেজি ৪৮০ থেকে ৪৮৫ টাকা। গতকালের দর ৪৯০ থেকে ৫০০ টাকা।

বিশ্বকাপে আয় দেড় হাজার কোটি রুপি!

এবারের বিশ্বকাপ আইসিসির জন্য বাণিজ্যলক্ষ্মী হয়ে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ থেকে আইসিসির মোট আয় হবে ১ হাজার ৪৭৬ কোটি রুপি। আয়োজন বাবদ আইসিসির খরচ ৫৭১ কোটি রুপি। বিশাল অংশ লাভের খাতায় চলে যাচ্ছে। আইসিসি আরেকটি সুখবর শুনেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের ৪৫ কোটি রুপি কর মওকুফ করে দিচ্ছে। কাল এ-সংক্রান্ত একটি কমিটি এই মওকুফ অনুমোদন করেছে। ওই কমিটির সদস্য হিসেবে রাজ্য সরকারের কৃষিমন্ত্রী ও আইসিসির প্রেসিডেন্ট শারদ পাওয়ারও ছিলেন।

বৃষ্টিতে ড্রয়ের দিন জাতীয় লিগে

তিনটি ম্যাচই ড্র। ফতুল্লা, বিকেএসপি এবং চট্টগ্রাম—কাল শেষ হওয়া জাতীয় লিগের তিন ম্যাচের কোনোটিই ফলাফল দেখেনি।
ম্যাচগুলোর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আসলে আবহাওয়া। ফতুল্লা স্টেডিয়ামে তো চতুর্থ দিনে একটা বলও হলো না! বৃষ্টিতে মাঠ খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বেলা ২টা ১০ মিনিটে পরিত্যক্ত হয়ে যায় ঢাকা-রাজশাহী ম্যাচের চতুর্থ দিনের খেলা।
বিকেএসপিতে আগের দিন ৬ উইকেটে করা ৮০ রানের সঙ্গে কাল আর মাত্র ৪৬ রান যোগ করেই শেষ হয়ে গেছে সিলেটের দ্বিতীয় ইনিংস। আবদুল্লাহ আল মামুন ২৩ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন। জবাবে ১৬৬ রানের জয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নেমে দিন শেষে ৪ উইকেটে ৫৪ রান করেছে চট্টগ্রাম। আগের রাতের বৃষ্টিতে মাঠ ভেজা থাকায় এখানেও খেলা শুরু হয়েছে বেলা ১টার পর।
একই অবস্থা চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের ম্যাচেও। বেলা ১২টা ১০ মিনিটে খেলা শুরু হয়ে সাড়ে ৪টাতেই শেষ। বরিশালের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে আগের দিন ৩ উইকেটে করা ৯২ রানটাকে ততক্ষণে খুলনা নিয়ে গেছে ৭ উইকেটে ২৫৪-তে। অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন অপরাজিত ছিলেন ১০৬ রান করে।
আগামী ৩ এপ্রিল জাতীয় লিগের পরের রাউন্ডের ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা।

ফেবারিট প্রশ্নে সাবেকেরা বিভক্ত

ভারত-পাকিস্তান সেমিফাইনাল মহারণের উত্তেজনা থিতিয়ে গেছে। সবার কৌতূহল এখন মুম্বাইয়ের ফাইনাল নিয়ে। ভারত, নাকি শ্রীলঙ্কা—ইতিহাসের প্রথম অল এশিয়ান বিশ্বকাপ ফাইনালে কে ফেবারিট? বর্তমান ক্রিকেটাররা নীরব থাকলেও চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন সাবেকেরা। আলোচনায় মজেছেন ক্লাইভ লয়েড, অ্যালান বোর্ডার, কপিল দেব, ইমরান খান, অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অধিনায়কেরা।
স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে সাবেক কিংবদন্তিদের মধ্যে বিভাজন। কেউ ভারতকে এগিয়ে রাখছেন, তো কারও ভোট শ্রীলঙ্কার বাক্সে।
কপিল দেব ও অর্জুনা রানাতুঙ্গার ভোটটা স্বাভাবিকভাবেই নিজ নিজ দেশের পক্ষে। ১৯৭৫ ও ১৯৭৯—অধিনায়ক হিসেবে ইতিহাসের প্রথম দুটি বিশ্বকাপেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে শিরোপা জেতানো ক্লাইভ লয়েড এগিয়ে রাখছেন মহেন্দ্র সিং ধোনির দলকে। ইমরান খানের ভোট ভারতের পক্ষে। অ্যালান বোর্ডারের ফেবারিট কুমার সাঙ্গাকারার শ্রীলঙ্কা। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে দেশে ফিরেই রিকি পন্টিং ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছেন, সম্ভাবনায় ভারতই এগিয়ে। বিশ্বকাপ জেতা অধিনায়কদের মধ্যে বাদ কেবল স্টিভ ওয়াহর ফেবারিট কে সেটাই জানার বাকি।
ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর সেমিফাইনালে হারিয়েছে পাকিস্তানকে। দুটি ম্যাচই তাঁদের কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে। পাকিস্তানের ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান মনে করেন, ফাইনালে ভারতের চাপটা কম থাকবে, ‘ভারত তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পারফরম্যান্স হয়তো করতে পারেনি, তারা অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে এসেছে। কাজেই তারা পাকিস্তানের বিপক্ষে সেমিফাইনালের চেয়ে ফাইনালে কম চাপে থাকবে।’ অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮৭ বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক বোর্ডার মনে করেন, শুধু ফাইনালের দুই দলের মধ্যেই নয়, শ্রীলঙ্কা এবারের বিশ্বকাপেরই সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল।
ধোনির দলকেই এগিয়ে রাখা ভারতের ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কপিল দেব ফাইনাল যুদ্ধে নামার আগে দিয়েছেন কিছু টিপসও, ‘তাদের ম্যাচটা খেলতে হবে আবেগ সহকারে, কোনো চাপ ছাড়া। হ্যাঁ, চাপ অবশ্যই থাকবেই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো খেলাটা উপভোগ করা।’ সেমিফাইনালের ম্যান অব দ্য ম্যাচ টেন্ডুলকার সম্পর্কে কপিলের কথা, ‘শচীনের প্রমাণের কিছু নেই। আমরা ওর সম্পর্কে যা বলব, ও তার চেয়ে ১০০ গুণ বড়।’
শ্রীলঙ্কার ১৯৯৬ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা শ্রীলঙ্কাকে এগিয়ে রাখলেও ভারতীয় আরেকটি পত্রিকাকে বলেছেন, ‘সম্ভাবনা ৫০-৫০।’ তাঁর কথা, ‘দেশের রাষ্ট্রপতি যেখানে পরামর্শ দিয়েছেন, আমার সেখানে বলার কিছু নেই। ফাইনালে চাপ থাকবেই। ধোনি ও সাঙ্গাকারা সেটা অনুভব করবে। দুটি সেরা দল, দুটি ফেবারিট দল, দুটি এশিয়ার দল মুখোমুখি হবে। তাদের উচিত ১০০ ওভার ভালো খেলা।’
ভারত-পাকিস্তানের সেমিফাইনালের অভিজ্ঞতার আলোকে ভারতকে এগিয়ে রাখা ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি ক্লাইভ লয়েড বলেছেন, ‘ক্যাচগুলোই ম্যাচ জেতাবে।’
সাবেক বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কদের এই ফেবারিট-তত্ত্বের আলোচনায় যোগ দিয়েছেন ভারতীয় সাবেকেরাও। ভারতের সাবেক অধিনায়ক, সাবেক প্রধান নির্বাচক এবং ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য দিলীপ ভেংসরকার মনে করেন, ভারতের ২৮ বছরের অপেক্ষা ঘুচবে এবার, ‘যেভাবে তারা খেলে আসছে, ভারত অবশ্যই শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেবে। ভারতের পক্ষে আমার বাজি ৬০-৪০।’
ভারতের আরেক সাবেক প্রধান নির্বাচক চান্দু বোর্দে মনে করেন, স্বাগতিক সুবিধাটাই এগিয়ে রাখবে ভারতকে। সাবেক স্পিনার বাপু নাদকার্নি, সাবেক টেস্ট অধিনায়ক নরি কন্ট্রাক্টরদের ভোটও পাচ্ছেন ধোনির দল।

রাত পোহালেই ফাইনাল

ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড। ক্ষণগণনা চলছে, যা শেষ হবে আগামীকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় বেলা তিনটায়। ঠিক তখনই মঞ্চে দুই দল। ভারত-শ্রীলঙ্কা। শুরু হবে দ্বিতীয়বার বিশ্ব-শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় তোলার শেষ লড়াই। ক্রিকেট-বিশ্বকে মোহাবিষ্ট করার জন্য এর চেয়ে বড় উপলক্ষ আর কী হতে পারে!
প্রস্তুত মুম্বাই। শচীন টেন্ডুলকারের শহর ছাপিয়ে যার পরিচয় এখন বিশ্ব ক্রিকেটের সাময়িক রাজধানীর। সব পথ এসে মিলছে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। শ্রীলঙ্কা পরশু পৌঁছাল বলিউডের শহরে। ভারতীয় দল কাল। মঞ্চের দুই চরিত্রকে পেয়ে মুম্বাইও যেন বদলে গেছে। তার পরও ভারতের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পীসমাজের আগমন তো আছেই। কালকের ফাইনাল দেখার জন্য সবাই এখন মুম্বাইমুখী।
মুম্বাইয়ের অবস্থা এখন কী—সেটি বোধ হয় আর বলার দরকার নেই। ফাইনালের ৪৮ ঘণ্টা আগে ওয়াংখেড়ে দাঁড়িয়েই উত্তরসূরিদের প্রেরণা দিলেন অরবিন্দ ডি সিলভা। ১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক কথা বলছেন মুত্তিয়া মুরালিধরনের সঙ্গে। ১৬ বছর আগে শ্রীলঙ্কার সেই বিজয়ের আরেক সেনানী ছিলেন মুরালি নিজেও। কাল এই মাঠ থেকেই ক্রিকেটকে যখন মুরালি বিদায় জানাবেন, শ্রীলঙ্কানদের তো বটেই, আবেগ ছুঁয়ে যাবে সবাইকে। বিশ্বকাপের ফাইনালে শুধু রোমাঞ্চই থাকছে না। আবেগের স্রোতও ভেসে আসছে থেকে থেকে।
একটা ব্যাপার বেশ চমকপ্রদ। এবার বিশ্বকাপটা শেষমেশ যেন এশিয়া কাপেরই সংস্করণ! ঠিক যেন এশিয়া কাপের ফাইনাল হচ্ছে! ভারত-শ্রীলঙ্কার দুই দলই এশিয়ার প্রতিনিধি। বিশ্বকাপটা এশিয়ায় হচ্ছে—তখনই যেন নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার বদলে এবার ছড়ি ঘোরাবে এশিয়ার দলগুলোই। হলোও তা-ই। সেমিফাইনালে চার দলের তিনটিই এশিয়ার। নিউজিল্যান্ডের আরেকটি চৌকাঠ থেকে বিদায় নিশ্চিত করে দিল, ফাইনালটিও হবে অল এশিয়ান। আর এটাও তো নিশ্চিত, দেড় দশক পর শিরোপা থাকছে এশিয়াতেই।
এশিয়ার দেশগুলোর দাপট এবার এমনই ছিল যে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ফেবারিটেরও সেমিফাইনালের চৌকাঠে পা রাখার আগেই ধরেছে দেশের বিমান। বাংলাদেশকে বাদ দিলে এশিয়ার বাকি তিন দল ছিল স্বমহিমায়। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ কাদের গলায় বিজয়মালা পরায়, তার জন্য অপেক্ষাটা থাকুক।
তবে উৎসব শুরুর জন্য তো আর কেউ সময়-ঘণ্টা বেঁধে দেয় না। সেই উৎসব শুরু হয়ে গেছে। কান পেতে শুনুন, বিজয়ের ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে মুম্বাই, মোহালি, আহমেদাবাদ, কলকাতা থেকে...আসছে কলম্বো, ক্যান্ডি থেকেও।
নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানকে ভারত—দুটি সেমিফাইনালে নিজ নিজ দলের জয় দেশে দুই দেশের সমর্থকেরা রাস্তায় আতশবাজি পুড়িয়েছেন, রঙের উৎসবও চলেছে। সেই উৎসব চলবে কাল পুরো ম্যাচে। শেষ পর্যন্ত এক দলের উৎসব থেমে যাবে। অন্য দলের উৎসব চলতে থাকবে আরও কিছুদিন। সেই উৎসব অলক্ষে শামিল অন্যতম স্বাগতিক বাংলাদেশও। বাংলাদেশের ঘরে ঘরেও তো একটাই আলোচনা—বিশ্বকাপ। এখানেও চলছে অধীর অপেক্ষা।
তবে ব্যক্তি হিসেবে অপেক্ষাটা একজনের সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। নিজের শহরে বিশ্বকাপ হাতে তুলতে পারলে ক্যারিয়ারে আর কোনো অতৃপ্তি থাকবে না। একে তো ফাইনাল, তার ওপর এই ম্যাচে টেন্ডুলকার তাঁর শততম সেঞ্চুরি পেলে একেবারে সোনায় সোহাগা। এই ফাইনাল তাই শুধু শুধুই একটা ফাইনাল নয়। তার চেয়েও বেশি কিছু!
হ্যাঁ, তার চেয়ে বেশি। কিন্তু দুই দল অত কিছু ভাবতে রাজি নয়। পেশাদার দল হিসেবে নিজেদের মিশন শেষ করার আগেই উচ্ছ্বাসে গা ভাসাচ্ছে না। পরশু পাকিস্তানের বিপক্ষে মহাযুদ্ধ জেতার পরও ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি একেবারেই আবেগ প্রশ্রয় দেননি। এখনো যে শিরোপা জেতা বাকি রয়ে গেছে!
‘আমাদের চারপাশে অনেক কিছু ঘটছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের মনোযোগ যাতে সরে না যায়। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্বটা ভালোভাবে জানি। এবং সেদিকেই আমাদের মনোযোগ রাখতে হবে’—বলেছেন ধোনি।
সতীর্থদের যতই পেশাদারের শেকলে আবেগ বেঁধে রাখতে বলুন, সাধারণ্যের বয়েই গেছে তা মানতে। সেমিফাইনালে পাকিস্তানকে হারানোর পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এতই উচ্ছ্বসিত যে, ওতেই তাদের বিশ্বকাপ জেতা হয়ে গেছে বলে কোনো কোনো কাগজেও লেখা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কা অতটা উচ্ছ্বাসে হয়তো এখনো মাতেনি। ভারতকে ভারতের মাঠে হারিয়ে বিশ্বকাপ ঘরে তোলার মাহেন্দ্রক্ষণই অপেক্ষায় রেখেছে সে দেশের সংবাদমাধ্যমকে। কিন্তু আমজনতার তর আসলে আর সইছে না। বিশেষ করে উপমহাদেশের। শ্রীলঙ্কাকে সে অর্থে উপমহাদেশের অংশ বলা যায় না। তবে চেন্নাই থেকে পক প্রণালি পেরোলেই শ্রীলঙ্কা। সেদিক থেকে দ্বীপরাষ্ট্রটি উপমহাদেশের অংশও বটে।
যে যেভাবেই দেখুন, রাত পোহালেই ক্রিকেট-বিশ্ব গাইবে একটাই গান—‘জয় হোক বিশ্বকাপ ক্রিকেটের!’

নীরব বিদায়

শোয়েব আখতার যদি হতেন কোনো উপন্যাসের চরিত্র, শেষটা পড়ে চোখ জলে ভিজত। যদি হতেন সেলুলয়েডের ভ্যাগাবন্ড নায়ক, সেখানেও শেষ দৃশ্যে মিশে থাকত সহানুভূতি। শোয়েব এর কোনোটিই না হয়ে হলেন ক্রিকেটার, আবেগময় চরিত্র যেখানে বড়জোর করুণা পেতে পারে। ক্রিকেটে আবেগের স্থান মাঠ, স্কোর বোর্ড এমনকি ড্রেসিংরুমেরও বাইরে।
শোয়েব আখতার ক্রিকেটের নায়ক না খলনায়ক, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তাঁর ১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এতই বর্ণময় যে সেখান থেকে খারাপটুকু বাদ দিয়ে ভালোটুকু তুলে আনা কঠিন। আবার শুধু খারাপটুকু তুলে এনে ভালোটুকুও ফেলে রাখা যায় না। শোয়েব ছিলেন পিন্ডি এক্সপ্রেস। তারুণ্যের প্রতিচ্ছবি। বোলিং প্রান্তে তাঁকে দেখলে ভয়ে কুঁকড়ে যেতেন অনেক ব্যাটসম্যান। বল হাতে টগবগিয়ে ছুটে আসছেন...আগুনের গোলায় উড়িয়ে দিলেন স্টাম্প...পাখার মতো দুহাত প্রসারিত করে আকাশে ওড়ার ভঙ্গিতে উদ্যাপন—সোনালি দিনের শোয়েব যেন পাকিস্তান ক্রিকেটেরই ট্রেডমার্ক!
শেষবেলায় সেই শোয়েবই কত না অপাঙেক্তয়! ঝাঁকড়া চুল কমতে কমতে উঁকি দেয় উদীয়মান টাক। উইকেট পেলে পাখির মতো ওড়ার উদ্যাপন শেষ দিকে কমে এসেছিল। উড়তে দম লাগে। লম্বা রানআপ, তারপর আগের সেই বিধ্বংসী অ্যাকশনের খোলসে নির্বিষ ডেলিভারি—উড়বেন কী, শোয়েবের সব শক্তি তো ওখানেই শেষ! মাত্র ৩৫-এ গতিহীন পিন্ডি এক্সপ্রেস। মফস্বল শহরের রেলস্টেশনে অবহেলায় ফেলে রাখা জং ধরা একটা কম্পার্টমেন্ট যেন!
শোয়েবের পতন হঠাৎ করে নয়। একটু একটু করে নিজেকে শেষ করে দিয়ে নিজেই হয়ে গেছেন ‘ক্রিকেটের ব্যাডবয়’। বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ থেকে শুরু করে মাদক কেলেঙ্কারি, সতীর্থকে পেটানো, সর্বশেষ বিশ্বকাপের নিউজিল্যান্ড ম্যাচে দুবার রস টেলরের ক্যাচ ফেলায় উইকেটকিপার কামরান আকমলকে লক্ষ্য করে শূন্যে লাথি—নিজেকে আর শোধরাতে পারলেন না। এবার বিশ্বকাপেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সবচেয়ে বেশি জরিমানা গোনা খেলোয়াড়টি তিনি। শৃঙ্খলা ভাঙ্গার কারনেই বিশ্বকাপের শেষ দিকে দলে একা হয়ে পড়েছিলেন। বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনিও বেজে উঠল। বিশ্বকাপ চলার মাঝপথেই শোয়েব জানালেন, এই বিশ্বকাপের পরই তাঁর শেষ।
বিশ্বকাপের পর পর্যন্ত যেতে হয়নি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাল্লেকেলের ম্যাচটাই হয়ে গেল তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সাবেক ক্রিকেটারেরা জনমত গড়ে তুলেও বিশ্বকাপে আর কোনো ম্যাচ খেলাতে পারেননি শোয়েবকে। আর শেষ টেস্ট তো খেলে ফেলেছিলেন ২০০৭ সালের ডিসেম্বরেই, ভারতের বিপক্ষে বেঙ্গালুরুতে। ৪৬ টেস্টে ১৭৮ আর ১৬৩ ওয়ানডেতে ২৪৭ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করা আর যা-ই হোক, শুরুর সম্ভাবনার সঙ্গে মেলে না।
১৪ বছর আগে শোয়েবও নিশ্চয়ই ভাবেননি ক্যারিয়ারের শেষ দৃশ্যে ট্র্যাজেডির নায়ক হবেন, আগমনধ্বনি সারা বিশ্ব শুনলেও বিদায়টা হবে নীরবে। ১৯৯৭ সালে নিজ শহর রাওয়ালপিন্ডিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। কত না সম্ভাবনা, কত না রোমাঞ্চে ভরা ছিল সেই দিনগুলো! শোয়েবের আজও মনে পড়ে, ‘টেস্ট খেলার পোশাকটা যে দিন প্রথম পেলাম...আমার বুকে বিশাল একটা তারকাচিহ্ন, কখনো ভোলার নয় মূহূর্তটা। ওই পোশাক পরেই ঘুমাতে গেলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না, যখন ঘুম থেকে উঠব তখনো আমার গায়ে ওই পোশাকটাই থাকবে। তিন দিন ধরে একই পোশাক পরে ছিলাম।’
পাকিস্তানের জলপাই রঙের পোশাক আর কখনোই উঠবে না শোয়েবের গায়ে। বড়জোর মূল্যবান স্মৃতিস্মারক হতে পারে সেগুলো। কিন্তু পিন্ডি এক্সপ্রেসের বর্ণময় ক্যারিয়ার বিবর্ণ এই জার্সিগুলো ঠিক কতটা ধরে রাখতে পারবে? অবসর ঘোষণার সময় শোয়েব কিন্তু মেনেই নিয়েছেন, তাঁর একটা জনম শেষ হয়ে গেল এখানেই, ‘যেন আমার প্রথম মৃত্যু হলো আজ।’
শোয়েব বলেই প্রশ্নটা আসছে—মৃত্যু, নাকি ‘স্লো পয়জনিং’য়ে আত্মহত্যা!

ইমরান-মিয়াঁদাদ দুই দিকে

ইমরান খান সব সময়ই ব্যতিক্রম। অন্য সবাই যখন পাকিস্তান ভালোই করেছে বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে, ইমরান তখন সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের বাজে ফিল্ডিংয়ের। পাকিস্তানের সাবেক এই অধিনায়কের দলে অবশ্য আছেন সাবেক লেগ স্পিনার আবদুল কাদিরও।
পাকিস্তান যা করেছে, সেটাই যথেষ্ট—এই স্লোগানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আরেক সাবেক অধিনায়ক জাভেদ মিয়াঁদাদ, ‘এই দলটিকে সমর্থন দেওয়া আর প্রশংসা করা উচিত আমাদের।’ মিয়াঁদাদ কেন সবাইকে শহীদ আফ্রিদিদের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন? ‘এরা কোনো বিতর্কের জন্ম দেয়নি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেটও খেলেছে। সেমিফাইনালে যেতে পারাটাই বড় এক অর্জন।’
মিয়াঁদাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন পাকিস্তানের আরও দুই সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ ও ইনজামাম-উল হক। কয়েক বছর আগে ভারতের কাছে হেরে যাওয়ার পর পাকিস্তানের মানুষ ক্রিকেটারদের ওপর ছিল ক্ষুব্ধ, এবার যাতে সেই ঘটনা না ঘটে, আফ্রিদিরা যাতে দেশে ভালো অভ্যর্থনা পান; লতিফ সবাইকে জানিয়েছেন এই আহ্বান। ‘অন্য যেকোনো দলই স্পট ফিক্সিং নিয়ে বিতর্ক ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ঝামেলা নিয়ে চাপে পড়ে যেত। কিন্তু আমাদের ছেলেরা অনেক দৃঢ়তা দেখিয়েছে এবং শহীদ আফ্রিদি দলকে খুব ভালো নেতৃত্ব দিয়েছে’—বলেছেন লতিফ।
গত বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেওয়া দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ইনজামাম। দেশে ফেরার পর মানুষের রুদ্ররোষের শিকার হতে হয় তাঁকে এবং তাঁর সতীর্থদের। এর জ্বালাটা ভালো করেই বোঝেন ইনজামাম। ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না তিনি, ‘দল খুব ভালো লড়াই করেছে। টেন্ডুলকারের ক্যাচ মিস না করলে ফলটা অন্য রকমও হতে পারত।’
আরেক সাবেক অধিনায়ক মঈন খানের কথা, ‘দলের ওপর রাগ করার কিছু নেই। এই দলে দারুণ প্রতিভাবান কিছু খেলোয়াড় আছে, যারা পাকিস্তানের সুন্দর ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিতবাহী।’
সাবেক খেলোয়াড়দের মতো দেশের রাজনীতিবিদেরাও পাকিস্তান খেলোয়াড়দের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ তো প্রত্যেক খেলোয়াড়কে পাঁচ হাজার রুপি বেশি করে অর্থ পুরস্কার দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।
ইমরান অবশ্য এত প্রশংসার কিছু দেখেন না। পাকিস্তানের ফিল্ডিং দেখে বিস্মিত তিনি, ‘পাকিস্তান যা ফিল্ডিং করেছে, তা করে কোনো দলই জিততে পারে না। শচীন টেন্ডুলকারের মতো একজন ব্যাটসম্যানের ক্যাচ আপনি কিছুতেই চারবার ফেলতে পারেন না।’ পাকিস্তানের খেলোয়াড়েরা চাপের কাছে ভেঙে পড়েছে, বলেছেন পাকিস্তানকে ১৯৯২ বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক। ইমরানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন কাদির।
ভারতের কাছে এভাবে হেরে যাওয়ার সমালোচনা করেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমও। দ্য নিউজ-এর শিরোনাম ছিল ‘মোহালিতে মহাবিপর্যয়’। এই শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তানের বাজে ব্যাটিং ও ফিল্ডিংকে পুঁজি করে ফাইনালে চলে গেছে ভারত।’ ডন লিখেছে, ‘ক্যাচ ফেলা, বাজে শট এবং মিসবাহর “টেস্ট ইনিংস”ই পরাজয়ের কারণ।’
ইমরান-কাদির ফিল্ডিংয়ের সমালোচনা করেছেন শুধু পরশুর সেমিফাইনাল নিয়ে। অন্য সাবেকরা দলের পাশেই আছেন। তবে পাকিস্তান তো পাকিস্তানই! এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বলির পাঠা খোঁজা! আর এবার সেই ‘পাঁঠা’ সম্ভবত হতে চলেছেন কামরান আকমল। ব্যাট হাতে ভালো কিছু করতে পারেননি ওপেনিংয়ে নেমে। আর উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতেও মিস করেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘নির্বাচকদের যেমন সিদ্ধান্ত, তাতে মনে হয় কামরান আকমলের ক্যারিয়ার শেষ। তার ব্যাটিং-কিপিং কোনোটিতেই কেউ খুশি নয়।’

তাঁর মেয়ের চোখেও কান্না

বিশ্বকাপে এই নিয়ে পাঁচবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের মুখোমুখি। প্রতিবারই পরাজিত দলটির নাম পাকিস্তান। বিশ্বকাপে কিছুতেই ভারত-বাধা কাটিয়ে উঠতে পারছে না পাকিস্তান। ইমরানের পাকিস্তান পারেনি। ওয়াসিম, ওয়াকারের পর আফ্রিদির পাকিস্তানও ব্যর্থ হলো। ভারত এগিয়ে রইল ৫-০ ব্যবধানে।
পরশু ভারতের সাদামাটা বোলিংটাই ‘হঠাৎ অপ্রতিরোধ্য’ হয়ে উঠল পাকিস্তানের বিপক্ষে। অথচ একটা সময় মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি কলঙ্ক ঘোচাতে যাচ্ছে ওয়াহাব-মিসবাহরা। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ২৬০ রানের লক্ষ্যটাই মনে হলো এভারেস্ট।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল আফ্রিদিরা। কাঁদল নিজেরা, কাঁদাল গোটা পাকিস্তানকেও। দুপুরের রঙিন আয়োজন রাত গড়াতেই বিষাদে নীল। নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধ সবাই শোকে বিহ্বল। মিসবাহ-উল-হক আউট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। পাকিস্তান অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির বড় মেয়ে আকসাও যেমন পারল না চোখের পানি ধরে রাখতে। প্রিয় দল হেরে যাওয়ায় ভীষণ দুঃখ পেয়েছে আকসা, ‘আমরা হেরে যাওয়ায় আমি কষ্ট পেয়েছি, দুঃখ পেয়েছি। আমি এতই আবেগপ্রবণ ছিলাম যে ধরেই নিয়েছি আমরা ভারতকে হারাব।’
আর দশজনের মতো আফ্রিদির ছোট মেয়ে আনসার কাঠগড়ায়ও মিসবাহ। পাকিস্তানের ২৯ রানের পরাজয়ের জন্য এই মিডল-অর্ডারের ধীরস্থির ব্যাটিংই দায়ী—বলেছে আনসা, ‘মিসবাহ হঠাৎ করেই বুঝতে পারলেন যে তাঁর রান করা দরকার।’

হঠাৎ ডাক পেয়ে মুম্বাইয়ে ভাস

বলেছিলেন, মুম্বাইয়ে ফাইনালটা দেখেই বিদায় বলে দেবেন। কিন্তু এমনও হতে পারে মাঠে খেলারই সুযোগ পেয়ে গেলেন চামিন্ডা ভাস। আকস্মিকভাবে মুম্বাই থেকে শ্রীলঙ্কা দলের ডাক পেয়ে গেলেন ৩৭ বছর বয়সী এই বাঁহাতি পেসার। ভাস একাই নন, মুম্বাই যাত্রায় তাঁর সঙ্গী অফ স্পিনার সুরাজ রণদিভও। না, মূল দলে নয়, এই দুজনকে ডাকা হয়েছে বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে।
হ্যামস্ট্রিং ও কুঁচকির চোটে ভুগছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন, সঙ্গে যোগ হয়েছে হাঁটুর চোট। সেমিফাইনালে ফিল্ডিংয়ের সময় ঊরুতে চোট পেয়েছেন অলরাউন্ডার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। এই দুজনের বিকল্প হিসেবেই ভারতে উড়িয়ে আনা হচ্ছে ভাস ও রণদিভকে। শেষ পর্যন্ত যদি মুরালি-ম্যাথুসকে পাওয়া না যায়, তখনই দলে ঢোকার সুযোগ হবে ভাস-রণদিভের।
স্বপ্নের ফাইনালটা হয়তো কেউই মিস করতে চাইবেন না। কিন্তু যদি খেলতে না পারেন? ঝুঁকি এড়াতে তাই আগে থেকেই শ্রীলঙ্কা দলে ডেকে নেওয়া হলো ভাস ও ২৬ বছর বয়সী রণদিভকে। ভাস ম্যাথুসের বিকল্প, রণদিভ মুরালিধরনের। গতকালই এই দুজন মুম্বাইয়ে এসে যোগ দিয়েছেন দলের সঙ্গে।
এই বিশ্বকাপের ফাইনালে দলের সঙ্গে কোনোভাবে নিজের নাম দেখতে পারাটা অনেক বড় ব্যাপার ভাসের জন্য। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটকে উদয়ের পথে নিয়ে যেতে অনেকটাই মুরালিধরনের মতো অবদান চামিন্ডা ভাসের। টেস্টে ৩৫৫ ও ওয়ানডেতে ৪০০ উইকেটের মালিকের বড় স্বপ্ন ছিল উপমহাদেশের এই বিশ্বকাপটি খেলার। ২০০৯ সালের জুলাইতে টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিলেও এই আশাতেই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ওয়ানডে ক্যারিয়ার। কিন্তু তাঁরই সাবেক সতীর্থ অরবিন্দ ডি সিলভার নির্বাচক কমিটি ভাসের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি।
প্রায় ২০ মাস হয়ে গেল টেস্ট ছেড়েছেন। সর্বশেষ ওয়ানডেটি খেলেছেন তারও আগে, ২০০৮ সালের আগস্টে। কিন্তু নিজের দেশে বিশ্বকাপ-স্বপ্নটা পূরণ না হওয়ার কষ্টটা মনের কোণেই জমা রেখেছিলেন ভাস। কিন্তু সেদিন, ২৯ মার্চ সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে কুমার সাঙ্গাকারার দল ফাইনালে ওঠার পর আবেগাপ্লুত বলে দেন মুম্বাইয়ের ফাইনালের দিনই ‘বিদায়’ বলে দেবেন।
এটাই যদি সত্যি হয়, বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে ডাক পাওয়াটাও তাঁর জন্য সৌভাগ্যেরই বটে! মুরালির মতো রঙিন না হোক, মুরালির সঙ্গে থেকেই ক্রিকেটকে বিদায় বলতে পারবেন।
ভারতের বিপক্ষে ২০০৯ সালে ওয়ানডে অভিষিক্ত রণদিভ তাঁর সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছেন গত বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

শোয়েব ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন

১৯৯৬: বাজে আচরণের কারণে সাহারা কাপের দল থেকে বাদ। এক বছরের জন্য পিছিয়ে গেল আন্তর্জাতিক ম্যাচে অভিষেক।
১৯৯৭: নভেম্বরে নিজ শহর রাওয়ালপিন্ডিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক।
১৯৯৮: ফেব্রুয়ারি—মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পাকিস্তানের প্রথম টেস্ট জয়ে অবদান রাখলেন প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে।
১৯৯৯: কলকাতায় শচীন টেন্ডুলকারকে করা সেই বিখ্যাত দুটি বল। এরপর বিশ্বকাপেও কেটেছে দারুণ। বছরের শেষে তাঁর বোলিং অ্যাকশনের জন্য নো বল ডাকেন আম্পায়াররা।
২০০০: বোলিং অ্যাকশন বৈধ ঘোষিত হলেও বিভিন্ন ইনজুরিতে প্রায় সারা বছরই মাঠের বাইরে ছিলেন।
২০০১: বোলিং অ্যাকশনের জন্য আবারও নো বল। তবে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা কোনো ক্রুটি খুঁজে পাননি তাঁর অ্যাকশনে।
২০০২: প্রথমবারের মতো স্পিডগানে ১০০ মাইল ওঠে শোয়েবের কল্যাণে। জিম্বাবুয়েতে দর্শককে বোতল ছুড়ে এক ম্যাচে নিষিদ্ধ। অভিযোগ ওঠে বল টেম্পারিংয়েরও।
২০০৩: বিশ্বকাপে খারাপ করায় দল থেকে বাদ। মে মাসে বল টেম্পারিংয়ের দায়ে নিষিদ্ধ। পল অ্যাডামসকে গালি দিয়ে আবারও নিষিদ্ধ। ১১ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে দেন ওয়েলিংটন টেস্টে।
২০০৪: অধিনায়ক ইনজামাম ইনজুরির ভান করার অভিযোগ করলেন আখতারের বিরুদ্ধে। পরে মেডিকেল বোর্ড নিশ্চিত করে ইনজুরিটা ভান ছিল না।
২০০৬: চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ডোপ পরীক্ষায় পজিটিভ হয়ে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ। অবশ্য পরে তুলে নেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা।
২০০৭: বিশ্বকাপের আগে কোচ বব উলমারের সঙ্গে বিরোধ। সুযোগ পেলেন না বিশ্বকাপে। আসিফের সঙ্গে মারামারি করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হতে দেশে ফেরত। ১৩ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ।
২০০৮: কেন্দ্রীয় চুক্তি নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ।
২০১০: প্রায় এক বছর পর দলে ফিরে আসেন শ্রীলঙ্কা সফরে।
২০১১: বিশ্বকাপে বাজে বোলিং, অবসরের ঘোষণা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে থাকছেন না আফ্রিদি

শিরোপা জয়ের স্বপ্নটা বাস্তবে রূপ না পেলেও বিশ্বকাপ যাত্রাটা খুব একটা খারাপ হয়নি পাকিস্তানের। অনেক বিতর্ক, বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে শহীদ আফ্রিদিরা যে সেমিফাইনাল পর্যন্ত আসতে পেরেছেন, এটাই অবাক করেছে অনেককে। অধিনায়ক হিসেবে ইতিমধ্যেই অনেক প্রশংসাও কুড়িয়েছেন আফ্রিদি। তবে এখন ক্রিকেট অঙ্গন থেকে কিছুটা দূরেই থাকতে চাচ্ছেন এই পাকিস্তানি অলরাউন্ডার। ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে অংশ নেবেন না বলে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে জানিয়েছেন আফ্রিদি।
পিসিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘শহীদ আফ্রিদি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে দলে থাকবেন না। কারণ, তিনি কিছুদিন বিশ্রাম চান।’ আফ্রিদি পিসিবি সভাপতির কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বলে ওই কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে।
গত বছর টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন আফ্রিদি। তবে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার জন্য তাঁর ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাওয়ার কথা ছিল। ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এ সফরে পাকিস্তান একটি টি-টোয়েন্টি, পাঁচটি ওয়ানডে ও দুটি টেস্ট খেলবে।

যা করেছেন, তাতেই গর্বিত আফ্রিদি

পাকিস্তানই কি তাহলে ফাইনালে উঠেছে!
শহীদ আফ্রিদিকে দেখে কেউ ভুল বুঝতেই পারত। ভারত-পাকিস্তান আর দশটা ম্যাচের মতো নয়। এখানে একটাই নিয়ম—জয়ী দল আমজনতার নয়নের মণি। পরাজিতরা খলনায়ক। অথচ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে ভারতের কাছে হারার পর আফ্রিদি কথায় কথায় রসিকতা করলেন। হাসলেন, হাসালেনও।
বিস্ময়কর। আবার একটুও বিস্ময়কর নয়। আফ্রিদি যে শুধু এই একটা ম্যাচ দেখছেন না। দেখছেন বৃহত্তর ছবিটা। যে ছবিটা বলবে, এই বিশ্বকাপে কেউ যা প্রত্যাশা করেনি, তা-ই করেছে পাকিস্তান।
বিতর্কে জর্জরিত মাটিতে মিশে যাওয়া একটা দলের আবার মাথা তুলে দাঁড়ানো তো এই বিশ্বকাপেরই সুন্দরতম গল্প। আফ্রিদি সেটিই মনে করিয়ে দিতে চাইলেন সবাইকে, ‘আমি আমার দল নিয়ে গর্বিত। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ক্রিকেট খেলতে হয়েছে আমাদের, গত নয়-দশটা মাস কী ভয়াবহই না গেছে! একটা ভাঙা দল আবার দল হয়ে উঠে যেভাবে খেলেছে, তাতে খুব খুশি।’
আফ্রিদি এটাও মনে করিয়ে দিতে পারতেন যে, তিনি যা চেয়েছিলেন, তা-ই পেয়েছেন। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দূরে থাক, ফাইনালের কথাও তো কখনো বলেননি। শেষ চারে থাকতে চাই বলেছিলেন, তাতেও অনেকে হেসেছে। আফ্রিদি তো তাঁর দল নিয়ে গর্ব করতেই পারেন।
একটু এদিক-ওদিক হলে ফাইনালও অসম্ভব কিছু ছিল না। ওয়ানডেতে ২৯ রানে জয়-পরাজয় এমন বড় কোনো ব্যবধান নয়। ম্যাচটার দিকে ফিরে তাকালে ব্যবধানটা মনে হবে আরও কম। যা খেলেছে, তা খেলেই পাকিস্তান এই ম্যাচটা জিততে পারত। যদি পাকিস্তানি ফিল্ডাররা ‘টেন্ডুলকারের ক্যাচ ধরাটা অন্যায়’ মনে না করতেন!
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে পরাজিত দলের কাউকে না কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটাও নিয়মের মধ্যে পড়ে। এখানে সবার পছন্দ বলে মনে হচ্ছে মিসবাহ-উল-হককে। ৭৬ বলে ৫৬ রান যা বলে, মিসবাহর ইনিংসটি অবশ্যই তার চেয়ে অনেক কম উজ্জ্বল। তবে শেষ দিকে ম্যাচটা যে ভারতের সঙ্গে তাঁর একার লড়াই হয়ে গেল, সেই দায় তো অন্য ব্যাটসম্যানদের। পাকিস্তানের গেমপ্ল্যান ছিল, ইউনুস বা মিসবাহর মধ্যে কেউ একজন একটা দিক ধরে রাখবেন। আস্কিং রেটের সঙ্গে বোঝাপড়ার করতে উমর আকমল, আবদুল রাজ্জাক ও শহীদ আফ্রিদি তো আছেই। ধরে রাখার কাজটা একটু বেশি আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার ভুল হয়তো করেছেন মিসবাহ। কিন্তু পাকিস্তান তো ম্যাচটা হেরেছে আরও আগে, টেন্ডুলকারকে বারবার নবজীবন দিয়ে।
প্রথম ‘লাইফ’টি পাওয়ার পর টেন্ডুলকার ৫৮ রান করেছেন। জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে দ্বিগুণ। তবে এটিও আসল তাৎপর্যটা বোঝাতে অসমর্থ। টেন্ডুলকার উইকেটে থাকা না-থাকার মূল্য শুধু তাঁর নিজের রানেই প্রতিফলন ফেলে না, ভারতীয় ড্রেসিংরুমের হাওয়াটাই বদলে দেয়। মহেন্দ্র সিং ধোনি সেটিই বুঝিয়ে বললেন সংবাদ সম্মেলনে, ‘শচীন থাকলে অন্য ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং করাটাও খুব সহজ হয়ে যায়। ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ ব্যাটিং করলে ১৫ ম্যাচ খেলেছে এমন ব্যাটসম্যানেরও ৫০ ম্যাচের অভিজ্ঞতা হয়ে যায়।’ এই ম্যাচের উইকেট যে মোহালির সেই চিরন্তন ৩০০-৩২০-এর উইকেট নয়, সেটি বুঝে ২৬০-৭০ রানের পরিবর্তিত লক্ষ্যও টেন্ডুলকারেরই ঠিক করে দেওয়া।
২০০৯ সালে পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় ছিল একটা রূপকথা। ৫০ ওভারের এই বিশ্বকাপেও আরেকটি রূপকথা প্রায় লেখাই হয়ে গিয়েছিল ভেবে মনে মনে নিশ্চয়ই আফ্রিদির আফসোস আছে। তবে মুখে তাঁর প্রকাশ নেই। যোগ্য অধিনায়কের মতো দলকে উল্টো ধন্যবাদ জানালেন। যাঁরা প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি, তাঁদের পিঠে রাখলেন সান্ত্বনার হাত। এই ম্যাচে এক নম্বরে অবশ্যই উমর গুল। এক সাংবাদিকের প্রশ্নে আফ্রিদির উত্তর হাসির রোল তুলল, ‘গুল আগের ম্যাচগুলোতে এত ভালো করেছে, এক দিন তো খারাপ যেতেই পারে। আপনার যায় না? ক্রিকেটের মতো ক্রিকেটের বাইরেও এটাই নিয়ম, সব দিন সমান যায় না।’
মাঠের মতো সংবাদ সম্মেলনের আফ্রিদিও যেন এক ঝলক তাজা বাতাস। বিরূপ প্রশ্নেও তিনি একই রকম সপ্রতিভ। তখনো সবকিছু সহজভাবে নেওয়ার আমুদে ভঙ্গি। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হারার পর কী হয়েছিল, এটা ভেবে শঙ্কিত কি না—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়ও যে কারণে হাসতে পারলেন। ‘আরে, আমি তো মনে করি, সবাই আমাদের আরও উৎসাহ দেবে। আত্মবিশ্বাস জোগাবে। ১৯৯৬-এর কথা বলছেন? ২০০৩-২০০৭ বিশ্বকাপের কথা বলুন না, আমাদের দল তখন অনেক ভালো ছিল। ওই দুবারের চেয়ে তো আমরা অনেক ভালো করেছি।’
টেন্ডুলকার এখানে শততম সেঞ্চুরি পেলেন না, শ্রীলঙ্কাও কি তাঁকে ঠেকাতে পারবে বলে মনে করেন? আফ্রিদির মুখে দুষ্টুমির হাসি, ‘পারলে পারবে, না পারলে নাই। আমি বলেছিলাম করতে দেব না, দিইনি।’ আগের দিনই যে এমন কিছু বলেননি বলে ভারতীয় মিডিয়াকে একহাত নিলেন, সেটি আফ্রিদিকে কে মনে করিয়ে দেবে? সবাই যে তখন তাঁর বলার ভঙ্গিতে হাসিতে মাতোয়ারা।

ইনজুরির কবলে আশিস নেহরা

গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাজে বোলিং সত্ত্বেও সেমিফাইনালের মহারণে আশিস নেহরাকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্তটা অবাক করেছিল অনেককে। কিন্তু নির্বাচকদের একেবারেই হতাশ করেননি এ বাঁ-হাতি পেসার। পাকিস্তানের বিপক্ষে ‘হাই ভোল্টেজ’ ম্যাচটাতে ১০ ওভার বল করে মাত্র ৩৩ রানের বিনিময়ে তুলে নিয়েছেন দুটি উইকেট। পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক এ জয়ের পেছনে ভালো অবদান রেখে নেহরা জাগিয়ে তুলেছিলেন বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনাও। কিন্তু এখন তাঁর এ স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইনজুরি।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটাতে ডানহাতের আঙুলে চোট পাওয়ায় সংশয়ে পড়ে গেছে নেহরার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার স্বপ্ন। কাল মুম্বাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটাতেও হয়তো তিনজন পেসার নিয়ে মাঠে নামারই পরিকল্পনা করবেন ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। কিন্তু নেহরা যদি ইনজুরির কারণে খেলতে না পারেন, তাহলে হয়তো তাঁর জায়গায় দেখা যেতে পারে স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে।
সেমিফাইনালে আশিস নেহরাকে জায়গা দেওয়ার জন্য ধোনির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক কপিল দেব। গতকাল দিল্লিতে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ধোনি এখন পর্যন্ত অধিনায়ক হিসেবে খুবই ভালো করেছে। আমি তাকে শুভকামনা জানাই। ধোনিকে শুধু বিশ্বকাপ জেতা না-জেতা দিয়েই বিচার করা যাবে না। সে একজন জুয়াড়ি। সে অনেক ঝুঁকি নিতে পারে। পাকিস্তানের বিপক্ষে অশ্বিনের বদলে নেহরাকে নামানোর সিদ্ধান্তটাও অনেকটা জুয়া খেলার মতোই ছিল। কিন্তু ম্যাচ শেষে কিন্তু কেউ এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি। ধোনির সিদ্ধান্তের যথার্থতাই প্রমাণিত হয়েছে।’

নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা by আবুল মোমেন



নদী অববাহিকার এই দেশে নদী ও ভূমি দুটিই খুব জাগ্রত—নদীর খাতবদল আর ভূমির ভাঙা-গড়ার কথা কে না জানে। আমাদের রাজনীতিতেও এ অস্থিরতা ও পরিবর্তনশীলতার প্রতিফলনই ঘটে চলেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও এ অস্থিরতা কমেনি। পর পর দুটি নির্বাচনে এখনো একই দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। প্রতিবারই দেখছি সরকার গঠনের দুই বছরের মধ্যেই সমালোচকের কণ্ঠ বড় হয়ে উঠেছে।
অদলবদল অস্থিরতা যা-ই ঘটুক, মানুষের মনে কিন্তু নেতৃত্ব নিয়ে পূর্ণ সন্তুষ্টি নেই। বড় দল-ছোট দল সর্বত্র নেতৃত্বে যে স্থিতাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, তাকে অচলাবস্থাও বলা যায়। অর্থাৎ যে ক্ষেত্রে গতিশীলতা তথা পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল, সেখানে তার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায় না। দুই নেত্রীই নিজ নিজ দলের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। দলের অন্যদের অবস্থান ও ভূমিকা পালনের সুযোগ এবং কদর ও উত্থান সম্পূর্ণ নির্ভর করে নেত্রীর মূল্যায়নের ওপর। এভাবে দলীয় এবং সময় সময় সরকারের নেতৃত্ব একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে সংকুচিত, স্তিমিত হয়ে পড়ছে। হারাচ্ছে সৃজনশীলতা, বহুদর্শিতা ও কার্যকারিতা।
কথাটা আরেকটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
আমরা আমাদের কালে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি কর্মী থেকে দলীয় নেতা, আবার সে পর্যায় থেকে জাতীয় মহানায়ক হয়ে উঠতে। এমনকি সেখান থেকে একসময় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নেতা হয়ে ওঠেন। তাঁর বিকাশ ও ভূমিকা পর্যালোচনা করলে একজন বড় মাপের নেতার করণীয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট ধারণা ও লক্ষ্য ছিল। তিনি পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তাই এ দেশের অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সক্রিয় সংযোগ গড়ে ওঠে। তিনি বাঙালি অর্থনীতিবিদদের প্রণীত দুই অর্থনীতি তত্ত্বটি অনুধাবন করেন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষে তাঁদের ভূমিকাকে রাজনীতিতে ধারণ করেন। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, রেহমান সোবহান প্রমুখ তাঁর চিন্তাজগৎকে প্রভাবিত করেন এবং রাজনীতিতে তিনি তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়ে সাহিত্যিক আবুল ফজলকে চিঠি লেখেন তাঁর ‘শক্ত কেন্দ্র কী ও কেন’ প্রবন্ধটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে বিতরণের অনুমতি চেয়ে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু যোগ্য-দক্ষ মানুষদের চেনার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁদের অনেককেই অভিভাবকের মতো সম্মানের আসন দিয়েছেন; বড় কথা হলো, তাঁদের দেশসেবার যোগ্যতাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। একইভাবে তাঁরই নেতৃত্বে তাজউদ্দীন আহমদের মতো ধীমান দক্ষ নেতার বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। ষাটের দশকে, বিশেষত সত্তরের নির্বাচন থেকে একাত্তরের অসহযোগ এবং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস দল ও দেশের মূল নির্বাহী ব্যক্তি হিসেবে তাঁর অনন্য ভূমিকা এ দেশের মানুষ কখনো ভুলবে না। তাঁর এই বিকাশ সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধু তাঁকে চিনে যথাযথ স্থানে তুলে আনার ফলে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা দেখি ভিন্নমত ভিন্ন দল ছেড়ে অনেকেই আওয়ামী লীগে এসে যোগ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ঐক্যের এই বিস্তারকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। তখন সুবিধাবাদের জন্য দলে যোগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি, ঘটেছিল আদর্শের বিস্তারের কারণে।
আমরা জানি, আগরতলা মামলা থেকে বেরোনোর পরে পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বদলীয় যে বৈঠক হচ্ছিল, সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদের একটি দল তাঁকে তথ্য-উপাত্ত এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল। এভাবে দলের বাইরেও তাঁর সিনিয়র, সমবয়সী ও জুনিয়রদের দেশ ও দশের জন্য সেবা দেওয়ার সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন। দেশ গড়ার কাজটা সংকীর্ণভাবে আওয়ামী লীগ দলীয় ব্যাপার রাখেননি। আর আওয়ামী লীগেও তিনি সংকীর্ণভাবে নিজের পছন্দের মানুষদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েননি।
অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আনিসুর রহমান একবার ঘরোয়া বৈঠকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ট্র্যাজেডির সূত্রপাত হয়েছে মুজিব-তাজউদ্দীন দূরত্ব তৈরি হওয়ার মাধ্যমে।
আমি আগেও লিখেছি আজও বলব, বাংলাদেশের জন্য বাংলাদেশ হিসেবে ঘুরে দাঁড়িয়ে যথার্থ লক্ষ্যে বিকশিত হওয়ার এটাই যেন শেষ সুযোগ। এ কাজের দায় ইতিহাস তুলে দিয়েছে শেখ হাসিনার কাঁধে। একদিক থেকে এটাকে বলা যায় ইতিহাসের ন্যায় প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়—পিতার আরব্ধ কাজ কন্যার ওপর বর্তাল। কাজটা ঠিকই হয়েছে।
শেখ হাসিনা বারবার বলছেন, কাজটা কঠিন, এমনকি এও বলেছেন যে ছিয়ানব্বইয়ের পর এবার আরও কঠিন মনে হচ্ছে সরকার পরিচালনা। আমরাও বুঝি, দিনে দিনে এ কাজ কঠিন হয়ে পড়ছে। কীভাবে কঠিন হয়ে পড়ছে, সেটা বোঝা দরকার।
প্রথমেই বলব তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। তাঁর ওপর একাধিকবার হামলা হয়েছে, তাঁর জীবন অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে, সেটা আমরা জানি। ফলে তাঁকে নিতে হচ্ছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা-সতর্কতা। এতে করে জনপ্রিয় জননায়কের সঙ্গে কর্মী, সমর্থক, সমমনাদের নিয়মিত সহজ সংযোগের সুযোগ কমে যাচ্ছে। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। এ বাস্তবতা জনপ্রিয় নেতার অনুকূলে না এলেও এর কোনো প্রতিকার আমাদের জানা নেই।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো, পঁচাত্তরের পর থেকে সামরিক স্বৈরশাসকদের জবরদস্তিমূলক অপশাসনের ফলে রাজনীতি নানাভাবে দূষিত হয়েছে। অর্থ, ক্ষমতা, অস্ত্র—সবকিছুর অপব্যবহারের ধকল নিয়ে যে রাজনীতি দূষিত হয়েছে, তার কুশীলবেরা তো আর তা থেকে মুক্ত থাকেননি। তাই বলব, পরিস্থিতিটা অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর আমলের চেয়ে গুণগতভাবে ভিন্ন হয়ে পড়েছে। দলীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে তাঁকে বাছবিচার করতে হয়েছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে হচ্ছে কি না, সেটাই বিচার্য বিষয়।
তৃতীয় বিষয়টি হলো, স্বাধীনতার পর থেকে সমাজে সুবিধাবাদের চর্চা হয়েছে ব্যাপকভাবে। তদুপরি বিশ্বায়ন ও বাজার অর্থনীতির রমরমার ফলে বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিকদের মধ্যেও ব্যক্তিগত প্রাপ্তি, ভোগবিলাসের আকাঙ্ক্ষা বেড়ে সুবিধাবাদের প্রসার ঘটেছে। ফলে তাঁদের কাছ থেকে ষাটের দশকে যে স্পষ্ট, দৃঢ়, পরিচ্ছন্ন সহযোগিতা, পরামর্শ পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, এখন সম্ভবত সে বাস্তবতা আর নেই। এ কারণে রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি সর্বক্ষেত্রে লেনদেনের সংস্কৃতি জোরদার হয়ে পড়েছে। আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধ নিঃস্বার্থ সমর্থন পাওয়াও দুষ্কর আজ।
চতুর্থ একটি সমস্যাও সম্ভবত শেখ হাসিনার জন্য তৈরি ছিল। তাঁকে বিশেষ পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে আওয়ামী লীগের হাল ধরতে হয়েছে, দেশের রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা নিতে হয়েছে। অধিকাংশ দলীয় নেতা ছিলেন পিতৃবন্ধু, পিতার সহকর্মী, অনুসারী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর পূর্বসূরি। আওয়ামী সমর্থক বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রেও এ কথাই সত্য। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বাঙালির স্বভাব অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে অভিভাবক ও মুরব্বির ভূমিকা নিয়ে অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন, তাঁর বিশেষ একান্ত শুভানুধ্যায়ী হতে চেয়েছেন অনেকে, আর এভাবে তাঁকে আপন আপন বলয়ে রাখতে চেয়েছেন এঁরা। শেখ হাসিনাকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাস্তবতা অনুধাবন করতে হয়েছে। তাঁর জন্য এটা এক কঠিন এবং সময় সময় বিরক্তিকর অভিযাত্রা ছিল সন্দেহ নেই। আমার অনুমান ভুলও হতে পারে তবু বলি, পথ চলতে গিয়ে হিমশিম খেতে খেতে তাঁকে নিজের পথ নিজকে সৃষ্টি করে নিতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে মনে প্রশ্ন জাগে, এভাবে তিনি একটু বেশি একা হয়ে পড়লেন কি? একান্ত বিশ্বস্ত ও অনুগত একটি বৃত্তের মধ্যে স্বস্তি বোধ করতে শুরু করছেন না তো? আমি ঠিক জানি না।
তবে একটু যেন মনে হয় নেতৃত্ব ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে, কিছুটা দুর্বোধ্য হয়ে পড়ছে এবং অনেক সময় সিদ্ধান্তগুলো নানামুখী বিবেচনার পরিপক্বতার ছাপ বহন করছে না। প্রশ্ন ওঠে মনে, দেশের নানা ক্ষেত্রে যাঁরা অবদান রাখতে পারেন, তাঁদের কি ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকছে, নাকি সরকার বড্ড আমলানির্ভর বড্ড অনুগত নেতানির্ভর হয়ে পড়ছে? সরকার ও সরকারি বলয়ের অনেকের কথায় তোষামোদের ভাষা ও সুর শোনা যাচ্ছে। আবার খুব সহজেই যোগ্য, দক্ষ, মানী লোকেরা বিশেষ সংগত কারণ ছাড়াই সরকারের বিরাগভাজন হয়ে পড়ছেন। সরকার বা নেতৃত্ব কি ওভার রিঅ্যাকটিভ হয়ে পড়ছেন? অরাজনৈতিক কিংবা অন্য রাজনৈতিক ভাবনার মানুষজন কি কাজের সুযোগ পাচ্ছেন? প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী কি তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কারণে সুপার প্রধানমন্ত্রী ও সুপার নেত্রী হয়ে পড়ছেন?
এর পরিণতি হবে সরকারের কাজকর্মে মন্থরতা এবং দলের গতিহীনতা। রাজনৈতিক শক্তি, সদিচ্ছা এবং কার্যক্রমের বাহন ও মঞ্চের অকার্যকরতা কিংবা ঊনকার্যকরতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। তাতে কথার ফুলঝুরি বাড়বে, সহিষ্ণুতা কমবে, অনুদারতা বাড়বে এবং রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থির হয়ে পড়বে।
আমাদের দেশে বিরোধিতার রাজনীতি চর্চা এক অর্থে খুব সহজ। এর প্রকাশ ঘটে ভাঙচুর করা, অচল করে দেওয়া এবং ভাড়াটে লোক দিয়ে সমাবেশ করার মাধ্যমে। এ কাজ রিকশাচালক, পোশাককর্মী যেমন পারে তেমনি রাজনৈতিক কর্মীর জন্যও সহজ কাজ। এ কাজের কোনো রাজনৈতিক প্রভাব নেই, যেটুকু আছে তা নেতিবাচক।
আজকে এ কথাগুলো আলোচনার উদ্দেশ্য হলো মানুষ কেবল বিরোধিতার রাজনীতিতে উৎসাহী নয়, আর তারা এই অসহিষ্ণুতা ও নেতিবাচক রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। এ বিষয়ে তাদের মতামত সুস্পষ্ট। মানুষ চায় অর্থনৈতিক উন্নতি, মর্যাদাসম্পন্ন জীবন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ শান্তিপূর্ণ জীবন। এর জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ইতিহাস বিকৃতি রোধ, জঙ্গিবাদ দমনসহ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চার পক্ষে জোরালো জনমত তৈরি হয়েছিল এ নির্বাচনের সময়। বলা যায়, এ লক্ষ্যে দেশে জাতীয় ঐক্য ও জাগরণ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ অনেকটা ঊনসত্তরের পরে সৃষ্ট গণজাগরণ, গণজোয়ার ও জাতীয় ঐক্যের মতোই ঘটনা। সেদিন বঙ্গবন্ধু যথাযথ নেতৃত্বের মাধ্যমে সূচিত জাগরণ ও ঐক্যের ফসল জাতির জন্য তুলে আনতে পেরেছিলেন।
আমাদের উদ্বেগ হলো, বঙ্গবন্ধুকন্যা পুনরায় সৃষ্ট এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন কি না। তিনি তা পারলেই বঙ্গবন্ধুর আরব্ধ কাজ, অর্থাৎ পিতার সূচিত কাজ কন্যার হাতে সমাপ্ত হবে। জাতি সেদিকে প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। এ নিয়ে সবার মনে উদ্বেগ আছে। কারণ, এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে দেশের সর্বনাশ হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

মানবকল্যাণে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

সৃষ্টির সেরা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ তথা মানবজাতির জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণকে কেন্দ্র করেই জীবনঘনিষ্ঠ ধর্ম ইসলামের সবকিছু আবর্তিত। আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টির পর তাকে জ্ঞানের বদৌলতে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং মানুষের ভেতর থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। পৃথিবীতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ও জীবন পরিচালনার জন্য যেসব প্রয়োজনীয় বিষয়ে আধুনিক জ্ঞান থাকা দরকার, সেগুলো আয়ত্তের ব্যাপারে ইসলামে যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিশ্বমানবতার কল্যাণে সেসব জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা থেকে অতল সাগরের তলদেশ পর্যন্ত হোক না কেন, ইসলাম সর্বদাই সমাজজীবনে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মধারাকে উৎসাহিত করেছে ও বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা সৎ কর্মে পরস্পর প্রতিযোগিতা করো।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৪৮)
মানবজীবনে বিভিন্ন দিকদর্শন আছে, যেগুলো মানবসৃষ্ট জ্ঞান দ্বারা সমাধান করা সম্ভব নয়। মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বস্তুগত, জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক প্রভৃতি বিভিন্ন দিক রয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ বিভিন্ন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির দাপটে মাটির তৈরি মানুষ মহাকাশ থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশেও প্রবেশ করেছে। তাই মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পাশাপাশি যান্ত্রিক তথা প্রযুক্তিগত জ্ঞানার্জন একই সঙ্গে অত্যাবশ্যক। একবিংশ শতকে পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী করতে হলে এবং ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণীকে দুনিয়ার সব মানুষের কাছে সহজে প্রচার, প্রসার ও পৌঁছাতে হলে, এমনকি ইসলামের উত্তরণ দেখতে হলে মুসলমানদের বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তির জ্ঞান আয়ত্ত করতে হবে। বান্দার প্রতি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো তিনি তাকে বিদ্যা-বুদ্ধি শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না। পবিত্র কোরআন হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুউচ্চ মিনার, মানুষের জীবন চলার পাথেয়। জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম। তাই তো দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জনের জন্য তাগিদ দিয়ে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর বিদ্যা অর্জন ফরজ।’ (ইবনে মাজা)
তবে কেউ যদি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের জন্য অকল্যাণকর কোনো কাজ করে কিংবা জনগণের সঙ্গে ধোঁকা-প্রতারণা ও অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়, ইসলাম সে ক্ষেত্রে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। পবিত্র কোরআনে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে, ‘কেউ কোনো সৎ কাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে এবং কেউ কোনো অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬০) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা মন্দ কাজ করে তাদের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ এবং তাদের হীনতা আচ্ছন্ন করবে, আল্লাহ হতে তাদের রক্ষা করার কেউ নেই।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৭)
বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগের উন্নতি ও অগ্রগতিতে কম্পিউটার একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার। বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রচলনের ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যের ক্ষেত্রে এক বিরাট বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের জন্য কম্পিউটার একটি অত্যন্ত জরুরি এবং কার্যকর উপাদান। আধুনিক সমাজনীতিতে ব্যবহূত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কৃত প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার তথ্যপ্রযুক্তিকে গ্লোবাল ভিলেজ এবং ডিজিটাল বিশ্বে পরিণত করেছে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের অমূল্য দান। ধর্মপ্রাণ মানুষ এটা ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারে এবং আবার কেউ ধর্ম-কর্ম ভুলে খারাপ কাজেও ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু কম্পিউটারের তো কোনো দোষ নেই। কম্পিউটার মানুষের তৈরি মানুষের উপকারের একটি অন্যতম যন্ত্র। বর্তমানে কম্পিউটারের অবদান প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরাজমান। দেশের বেকারত্ব দূরীকরণসহ সব কাজের জন্য আজকাল কম্পিউটারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মক্তব বা মসজিদ চত্বরে যদি সুলভে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে সবাই অনেক লাভবান হবে।
আজকের পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন ধরনের নিত্যনতুন তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদান করে থাকে। শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষাবিষয়ক নানা তথ্য অনায়াসেই জানতে পারছে। সর্বোপরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে, যা সত্যিই জনকল্যাণকর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিজ্ঞানের এ বিস্ময়কর আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসার নামে চরম ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার বিশাল ফাঁদ পেতে বসেছে। আর দেশের অপরিণামদর্শী তরুণ ও বেকার যুবসমাজ সেই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের মহামূল্যবান সময় অযথা নষ্ট করছে। প্রতারক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল ও পর্নো ছবির সাইটগুলো তাদের সামনে লোভনীয় আকারে তুলে দিচ্ছে। নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে দেশের তরুণ যুবসমাজ। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম)
ইন্টারনেটসহ নানা ধরনের তথ্য ও প্রযুক্তির বহুমাত্রিক সুফলের পরিবর্তে আজকাল একশ্রেণীর ধোঁকাবাজ প্রতারকের কারণে দেশের মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না। তাই মানুষের দোরগোড়ায় ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার নানা কার্যক্রম ভেস্তে যাচ্ছে। এভাবেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ প্রতিনিয়ত ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এ ধরনের জঘন্যতম প্রতারণা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘কূট ষড়যন্ত্র তার উদ্যোক্তাদেরই পরিবেষ্টন করে।’ (সূরা আল-ফাতির, আয়াত: ৪৩) বিভিন্ন রকমের অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে সবাইকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা প্রকাশ্য হোক বা গোপন হোক, অশ্লীল আচরণের ধারেকাছেও যাবে না।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৫১) আর প্রতারক ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে নবী করিম (সা.) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘মিথ্যাবাদী প্রতারক ব্যবসায়ীরা হাশরের দিন বদকারদের দলে থাকবে।’ (তিরমিযি)
তাই ধর্মপ্রাণ জনগণের সার্বিক কল্যাণে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রকৃত সুফল পেতে হলে প্রয়োজন সবার ঐকান্তিক ও সামগ্রিক প্রচেষ্টা। এর জন্য প্রয়োজনে মানবকল্যাণে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট আইনকানুন ও নীতিমালা প্রণয়নের কার্যকর ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com