Friday, October 11, 2019

ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের নেপথ্য কারণ: পর্ব-দুই

বিভিন্ন ইস্যুতে আবুধাবি ও রিয়াদের মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ্যে আসায় বিশেষ করে ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার কিংবা সেনা সংখ্যা হ্রাসের বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘোষণা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

ইয়েমেন থেকে আমিরাতের সেনা সংখ্যা কমিয়ে আনার এ ঘোষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হচ্ছে এতে করে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরব কার্যত একা হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ধ্বংস বা পতন অনিবার্য। ২০১৫ সালে ১০টি দেশকে সঙ্গে নিয়ে এ জোট গঠন করা হলেও এ জোটের মূল শক্তি হচ্ছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু আমিরাত সরকার ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করায় সামরিক জোটের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমিরাতের পিছু হটার অর্থ হচ্ছে ইয়েমেন যুদ্ধে ওই জোটের পরাজয়। এর ফলে সৌদি আরব শুধু যে একা হয়ে পড়বে তাই নয় এ ধারণাও করা হচ্ছে, আনসারুল্লাহকে ধ্বংসের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে তারা ইয়েমেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে যাতে "আরব ভিয়েতনাম"-এর এই চোরাবালি থেকে উদ্ধার পেতে পারে রিয়াদ।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার কিংবা সেনা সংখ্যা কমিয়ে আনার ঘোষণা দিলেও গত চার বছরে দেশটি ইয়েমেনে তাদের অনুগত যে মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছে এখন তাদেরকে ব্যবহার করবে আবুধাবি। "আল-নোখবে আল শাবওয়ানিয়ে", "আল-হেজাম আল-আমানি" ও "আবুল আল-আব্বাস ব্রিগেড" আমিরাত সরকারের সমর্থনপুষ্ট তিনটি মিলিশিয়া বাহিনী যারা ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তার করে আছে। ইয়েমেনের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে কাতারের আল জাজিরা নিউজ চ্যানেল জানিয়েছে, "উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুগত অন্তর্বর্তী পরিষদের শত শত সদস্যকে ইয়েমেনের বাইরে স্থানান্তর করা হয়েছে।" লেবাননের আল-মিয়াদিন টিভি চ্যানেলও জানিয়েছে, "আমিরাত সরকার তাদের অনুগত বাহিনীর ৫০০ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য দক্ষিণ ইয়েমেনের এডেন বন্দর থেকে রাজধানী আবুধাবিতে স্থানান্তর করেছে।"

আমিরাতের সমর্থনে ২০১৭ সালে অন্তর্বর্তী পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। ইয়েমেনের পদত্যাগী সরকারে প্রধানমন্ত্রী আব্দুল হাদির বরখাস্তকৃত গভর্নর ইদ্রিস আয যাবিদিকে ওই পরিষদের প্রধান করা হয়।

বর্তমানে দক্ষিণ ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে আমিরাত সমর্থিত এই পরিষদের নিয়ন্ত্রণে। ইয়েমেন থেকে আমিরাতের সেনা সংখ্যা কমিয়ে আনার ঘোষণাকে যদিও ওই যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে ইয়েমেন থেকে আমিরাত পুরোপুরি সরে গেছে। আমিরাত ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার বা সেনা সংখ্যা কমিয়ে আনলেও সেখানে তাদের অনুগত মিলিশিয়া বাহিনী তৎপরতা চালাবে। এ অবস্থায় ইয়েমেনের পদত্যাগী সরকারের প্রধানমন্ত্রী মানসুর হাদির অনুগত সৌদিপন্থী মিলিশিয়া বাহিনীর সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে যা কিনা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে তীব্র ভাঙনের আলামত। বলা হচ্ছে, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ বাহিনী যদি দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয় তাহলে একদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্রতর হবে অন্যদিকে রিয়াদ ও আবুধাবির অনুগত মিলিশিয়া বাহিনীর মধ্যেও লড়াই ছড়িয়ে পড়বে যা সৌদি আরবের জন্য শুভকর হবে না।

ইয়েমেনবিরোধী যুদ্ধের ভবিষ্যত এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অবস্থানকে কয়েকটি দিক থেকে মূল্যায়ন করা যায়। প্রথমত, ইয়েমেন ইস্যুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে শারজা, দুবাই ও রাআস আল খেইমে অঙ্গরাজ্যগুলো ইয়েমেন যুদ্ধের তীব্র বিরোধী এবং তারা যুদ্ধ বন্ধের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ এ যুদ্ধের ফলে আমিরাত ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ ছাড়া, উগ্র যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দ্বারা পরিচালিত সৌদি আরব বর্তমানে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে তীব্র সংকট ও চাপের মুখে রয়েছে। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত চায় না ইয়েমেন বিরোধী সামরিক জোটের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত সৌদি আরবের সঙ্গে শামিল হতে। বলা যায়, রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরাসরি এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে।

ইয়েমেনবিরোধী যুদ্ধের ভবিষ্যত এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অবস্থানকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দ্বিতীয় যে বিষয়টি সবার নজর কেড়েছে তা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে বাদ দিয়ে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

কোনো কোনো খবরে বলা হচ্ছে, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারে কয়েকটি চ্যানেলের গোপন যোগাযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে অপ্রকাশ্য কিছু গোপন সমঝোতা হয়েছে বলেও জানা গেছে। এ অবস্থায় আনসারুল্লাহ ও আমিরাত সরকারের মধ্যে যে সমঝোতাই হোক না কেন সেটা ইয়েমেনবিরোধী সামরিক জোটের জন্য বিরাট ব্যর্থতা। কারণ এর ফলে একদিকে সৌদি আরব প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়বে এবং অন্যদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য রিয়াদ ও আবুধাবির অনুগত মিলিশিয়া বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হতে পারে।

ইয়েমেনবিরোধী যুদ্ধের ভবিষ্যত এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অবস্থানকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তৃতীয় যে বিষয়টি পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে তা হচ্ছে, তাদের মতে, ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহারে আমিরাতের সিদ্ধান্ত রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার উত্তেজনাকে বাড়িয়ে তুলবে। এ অবস্থায় সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধের ব্যাপারে তাদের অবস্থানের বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে। এ মুহূর্তে আমিরাত যেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে স্বাভাবিকভাবেই সে এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টার করবে সৌদি আরব। এরইমধ্যে তারা কয়েকটি সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। এ অবস্থায় ইয়েমেনে আমিরাত ও সৌদি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চতুর্থ বিষয়টি হচ্ছে, ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে আমিরাতের সরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সৌদি আরব একা হয়ে পড়বে এবং ইয়েমেনের সেনা ও আনসারুল্লাহ যোদ্ধাদের মোকাবেলায় তাদের পরাজয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

শর্ত ভঙ্গ করেও তিনি বহাল by লুৎফর রহমান

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে তার সার্বক্ষণিক থাকার কথা ক্যাম্পাসে। কিন্তু তিনি থাকেন বাইরে, নিজের পছন্দের বাসায়। ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আড়াই বছরে তিনি বিদেশ সফর করেছেন অন্তত ২২ বার। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চালিকা শক্তি শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা নিতে শুধু দৌড় ঝাঁপই নয় আদালতে পর্যন্ত যেতে হয়। সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলেও ভিসি কার্যালয়ে আসেন দুপুরে। এসব অভিযোগ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের ভিসি ড. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তার অদক্ষতা  ও ব্যর্থতায় মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন, ভিসির স্বেচ্ছাচারিতার জন্য ভেঙে পড়েছে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা।
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলাও এখন প্রশ্নের মুখে। আবরার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বুয়েট নিয়ে সারা বিশ্বে যে বার্তা পৌঁছে গেছে তার পরিণতি আরও দীর্ঘ দিন ভোগ করতে হবে। আর এর পুরো দায় ভিসি ড. সাইফুল ইসলামের। রোবরাত রাতে বুয়েটের শের ই বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। রাত আটটা থেকে দুইটা পর্যন্ত চলে তার ওপর নির্যাতন। ঘটনাটি অবহিত করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। অনেকে বলছেন, ভিসিও নিশ্চয়ই অবগত হয়েছিলেন।
রাত দুইটায় আবরারের নিথর দেহ বাইরে ফেলে রাখে খুনিরা। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। চিকিৎসক এসে জানিয়ে ছিলেন নির্মম পিটুনির শিকার আবরার আর বেঁচে নেই। তারা ভিসিকে ফোনে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ড. সাইফুল সন্তানতুল্য ছাত্রটির জন্য ঘটনাস্থলে আসার গরজ অনুভব করেননি। বরং তিনি ফোনেই কর্মকর্তাদের সমাধান বাতলে দেন। বলেন, এটি পুলিশ কেস। পুলিশই ব্যবস্থা নেবে। হ্যাঁ, পুলিশ কেস বলেই হয়তো আবরারকে যখন পিটানো হচ্ছিল তখন পুলিশ হলের গেটে বসে অপেক্ষা করছিল। তারা কার নির্দেশ এবং কি পরিস্থিতির অপেক্ষায় ছিল এটির জবাব ভিসির কাছ থেকেই চাইছেন আন্দোলনকারীরা। সেদিন রাত পেরিয়ে সকাল হলেও ঘুম ভাঙেনি ভিসি সাইফুল ইসলামের। ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখটির জানাজায় যখন সারিবদ্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তখনও গরহাজির তিনি। নানা সূত্র থেকে বলা হলো তিনি অসুস্থ তাই বাইরে আসতে পারছেন না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মুখেও এমনটি শোনা গেল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জনসমক্ষে ওই দিনই দাবি করেন ভিসি অসুস্থ নন। আবরার হত্যাকাণ্ডের রেশ সুপার সনিক গতিতে ছড়িয়ে পড়ে দেশময়, পুরো বিশ্বে। একজন বিনয়ী, মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন নিষ্ঠুর মৃত্যুতে নাড়া দিয়েছে প্রতিটি হৃদয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘটনার দিন সকাল থেকেই ঘটনার খোঁজ খবর নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। ভিসির রহস্যময় নিরবতায় তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘটনার প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর ভিসি ক্যাম্পাসে প্রকাশ হন। শিক্ষার্থীদের সামনে এসে তিনি নিজেই জানান, অসুস্থ ছিলেন না বরং মন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেই তিনি এই সময় কাটিয়েছেন। মুখে না বললেও এ কারণেই যে তিনি ক্যাম্পাসে আসতে পারেননি এটিই তিনি ইঙ্গিত করেন। ভিসি আসলেন না তাতে কি। আবরার যে ততক্ষণে ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়। ক্ষোভ আর প্রতিবাদের উত্তাল দেশ। এই ক্ষোভের বাতাস যে অনেকটা তার দিকেই ধেয়ে আসছে এটিও টের পেলেন ভিসি।
তাই বুধবার তড়িঘড়ি করে তিনি রওনা দিলেন কুষ্টিয়া। আবরারের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাত করতে। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দিলেন না রায়ডাঙ্গা গ্রামের মানুষ। প্রতিবাদে সোচ্চার মানুষের বাধায় ঢাকায় ফিরতে বাধ্য হন ভিসি। কিন্তু তার এই আগমনে লঙ্কাকাণ্ড ঘটায় পুলিশ। লাঠিচার্জে আহত হন আবরারের ভাই ফায়াজ, তার এক আত্মীয়সহ কয়েকজন। এতো ঘটনার রেশ ধরেই বুয়েট ভিসির পদত্যাগ দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শিক্ষার্থীদের কারও কারও মুখে উঠে এমন দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দাঁড়িয়ে এমন দাবি তুলেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। কিন্তু যিনি নীতি আর নিয়মের ধার ধারেন না তার কাছে এমন দাবি হয়তো নিছকই দাবি। তাই অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি কোন অন্যায় করেননি। তাই পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না। ভিসি এমন দাবি করলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ অবশ্য পুরো পরিস্থিতির দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই দিয়েছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বুয়েটে এমন পরিস্থিতি এক দিনে আসেনি। আগে যদি কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিত, তাহলে আজকের পরিস্থিতি দেখতে হতো না।
এদিকে গত ১৩ই জুলাই শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বেশির ভাগ ফাইল সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এক থেকে দুই বছর পড়ে থাকে। প্রশাসন স্থবির। প্রভাষক নিয়োগ দিতে সেমিস্টার শেষ হয়ে যায়। ভিসি নিয়মিতভাবে দুপুর সাড়ে ১২টার পর অফিসে আসেন। একাডেমিক কাউন্সিলের সভা হয় না। সাড়ে তিন বছরে মাত্র ১৪টি সিন্ডিকেট সভা হয়েছে। তাঁর প্রশাসনিক অদক্ষতায় সাড়ে ২৪ কোটি টাকার তহবিল  ফেরত যায়। তাঁরই অন্যায্য সিদ্ধান্তে ২১ জন শিক্ষক ও ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পেনশন আটকে যায়। হাইকোর্ট, আপিল বিভাগে ও রিভিউতে হেরে যাওয়ার পরও তিনি সহজে রায় মেনে নিতে চাননি। ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সমিতির সভার রেজুলেশনেও এমন অনেক বিষয় তুলে ধরা হয়। শিক্ষকদের দাবি ভিসি আড়াই বছরে অন্তত ২২ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।
বুয়েট এ্যালামনাই’র দাবি একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদেরকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাকে ওই অনুষ্ঠানে অতিথি করা হলেও তিনি জাননি। বুয়েট এ্যলামনাই’র বর্তমান সভাপতি প্রখ্যাত স্থপতি ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি এ ঘটনার বিষয়ে চরম বিরক্তি ও খেদ প্রকাশ করেন তার ঘনিষ্টজনদের কাছে। বুধবার বুয়েট ক্যাম্পাসে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা ও বুয়েট এ্যালামনাই’র সদস্য আবুল হায়াত ভিসির বিষয়ে নিজের ক্ষোভের কথা জানান। বুয়েটের শের ই বাংলা হলের সাবেক এই ছাত্র বলেন, আমরা যখন বুয়েটে পড়েছি তখনকার পরিবেশ এমন ছিলো না। আমরা যখন আন্দোলন করতাম তখন ভিসি এসে আমাদের সামনে বসে থাকতেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসতেন। কারণ তিনি আমাদেরকে নিজের সন্তানের মত মনে করতেন। আর আজকের ভিসি। আমার সন্তান মারা যাওয়ার খবর শুনে আমি যাবো না সেখানে?  ভিসির সন্তান নয় ছাত্ররা। এর চেয়ে অবাক করার ঘটনাতো আর কিছু হতে পারে না। তিনি বলেন, আমরা ভিসিকে আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য একটি চিঠি দিয়ে দেড় মাস অপেক্ষা করেছি। এবং তিনি বিশেষ অতিথি হয়ে আসবেন বলে কথা দিয়েও আসেননি। এমন একটা ভিসিকে আমরা কী বলতে পারি? তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান। আমাদের চোখের সামনে এখনো ড. রশিদ, ড. নাসের, শাহজাহান এইসব ব্যক্তিত্ব রয়েছে। তিনি এও বলেন, প্রশাসনকে আগে ধুয়ে-মুছে সাফ করতে হবে। হারপিক বা এর চেয়েও কড়া কিছু থাকলে তাদেরকে পরিষ্কার করতে হবে।

আবরার হত্যা: আদালতে ইফতির সেই জবানবন্দি

আবরার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সমাজসেবা বিষয়ক উপসম্পাদক ইফতি মোশাররফ ওরফে সকাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেই জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর বর্ণনা। ইফতি আদালতকে বলেছেন, আবরার ফাহাদকে ক্রিকেটের স্টাম্প আর প্লাস্টিকের মোটা দড়ি (স্কিপিং রোপ) দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন তিনি। তাকে মাটি থেকে তুলে আবারও পেটাতে থাকেন তারা। ঘণ্টা কয়েক পর বমি করতে শুরু করেন আবরার। তিনবার বমি করার পর নিস্তেজ হয়ে যান। খবর প্রথম আলোর।
পত্রিকাটির প্রতিবদেনে বলা হয়, এই ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন ইফতি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মহানগর হাকিম খন্দকার ইয়াসির আহসান চৌধুরীর কাছে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
জিজ্ঞাসাবাদে ইফতি বলেছেন, ৪ঠা অক্টোবর বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে একটি নির্দেশনা দেন। এতে বলা হয়, আবরার শিবির করে, তাকে ধরতে হবে। এরপর মেসেঞ্জার গ্রুপে সাড়া দেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা। আবরার তখন বাড়িতে থাকায় তিনি ইফতিকে বলেন, ‘ওকে বাড়ি থেকে ফিরতে দেন।’
ইফতি আদালতে বলেন, ৬ই অক্টোবর রাত আটটার কিছু পর আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসা হয়। আবরারের দুটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপও সঙ্গে আনা হয়। তার রুমমেট বুয়েট ছাত্রলীগের উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ একটি মোবাইল ফোন এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর আরেকটি মোবাইল ফোন চেক করেন। একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মুনতাসির আল জেমি আবরারের কাছ থেকে তার ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড নিয়ে খুলে চেক করেন।
জবানবন্দিতে ইফতি জানিয়েছেন, আবরারের ডিভাইসগুলো তারা যখন চেক করছিলেন, তখন মেহেদী হাসান এবং বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মো. মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়ন (নেভাল আর্কিটেকচার মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র) কক্ষে আসেন। মেহেদী তাদের বুয়েটে কারা কারা শিবির করে তা আবরারের কাছ থেকে বের করার জন্য নির্দেশ দেন। এ সময় মেহেদী বেশ কয়েকটি চড় মারেন আবরারকে।
ইফতি আদালতকে বলেন, ওই কক্ষে তখন ক্রিকেটের কোনো স্টাম্প ছিল না। বাইরে থেকে তখন কেউ একজন স্টাম্প নিয়ে আসেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সামসুল আরেফিন ওরফে রাফাত স্টাম্প এনে তার হাতে দেন। আবরারের কাছ থেকে কথা বের করার জন্য স্টাম্প দিয়ে চার-পাঁচটি আঘাত করেন ইফতি। এতে স্টাম্পটি ভেঙে যায়। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র) স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু, পা, পায়ের তালু ও বাহুতে মারতে থাকেন। এতে আবরার উল্টাপাল্টা কিছু নাম বলতে শুরু করেন। তখন মেফতাহুল আবরারকে চড় মারেন এবং স্টাম্প দিয়ে হাঁটুতে বাড়ি দেন। এ সময় মেহেদী মুঠোফোনে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ইফতি আদালতকে বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ক্যান্টিনে খেতে যান। মিনিট বিশেক পর ফিরে এসে দেখেন, আবরার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি মেঝেতে শুয়ে আছেন। তিনি তখন আবরারকে ধমক দিয়ে উঠে দাঁড় করান। কয়েকটি চড় মারেন। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মুজাহিদুর রহমান তখন কক্ষে থাকা স্কিপিং রোপ দিয়ে আবরারকে মারেন। ইফতি আবার স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু ও পায়ে আঘাত করেন। তাবাখখারুল তখন চড়-থাপ্পড় মারেন।
ইফতি ঘটনার বর্ণনা দেয়ার এই পর্যায়ে বলেন, রাত ১১টার দিকে অনিক সরকার আবার কক্ষে আসেন। হঠাৎ অনিক স্টাম্প দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে এলোপাতাড়ি শতাধিক আঘাত করেন। অনিক খুবই অনিয়ন্ত্রিতভাবে আবরারকে মারতে থাকেন। তার মারা দেখে সবাই ভয় পেয়ে যান। আনুমানিক রাত ১২টার পর অনিক আবরারকে মারা থামিয়ে কক্ষের বাইরে যান।
ইফতি বলেছেন, তখন আবরার অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন। তিনি জানান, তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তখন আবরারের মাথার নিচে দুটি বালিশ দেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পরই আবরার বমি করেন। মুঠোফোনে বিষয়টি অনিককে জানানো হলে তিনি আবরারকে গোসল করিয়ে হাতে-পায়ে মলম লাগিয়ে দিতে বলেন। এ সময় আবরার দ্বিতীয়বার বমি করেন। তখন আবরারের কক্ষ থেকে তার কাপড়চোপড় নিয়ে আসা হয়। তখন মেহেদী আবরারকে দেখে বলেন, ‘ও নাটক করছে’।
ইফতি বলেন, এরপর আবরারকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে শুইয়ে দেয়া হয়। এ সময় অমিত খুদে বার্তা পাঠালে তিনি সবকিছু জানতে চান এবং আবরারকে আরও মেরে আরও তথ্য বের করতে বলেন। আবরারের অবস্থা খুব খারাপ জানালে অমিত তাকে হল থেকে বের করে দিতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পর মেহেদী ও অনিক ২০০৫ নম্বর কক্ষে আসেন। আবরারকে দেখে তারা বলেন, ‘ও ঠিক আছে।’ এরপর তারা চলে যান।
ইফতি বলেন, এ সময় আবরার আবার বমি করেন। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেয়ার জন্য নিচে নামাতে বলেন। ১৭ ব্যাচের ছেলেরা আবরারকে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হলে তোশকসহ আবরারকে ধরে দোতলা ও নিচতলার সিঁড়িতে নামিয়ে রাখেন। তখন আবরার বলছিলেন যে, তার খুব খারাপ লাগছে। সাধারণ সম্পাদক রাসেল তখন নিচে নেমে হলের প্রধান ফটকে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় মুনতাসির দৌঁড়ে এসে বলেন, আবরারের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ইফতি তাকে মালিশ করতে বলেন। ইসমাইল ও মনির তখন অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দেন। অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হওয়ায় তামিম বাইক নিয়ে বুয়েট মেডিকেলের চিকিৎসক নিয়ে আসেন। চিকিৎসক আসার পরপরই অ্যাম্বুলেন্স আসে। চিকিৎসক সিঁড়িতে আবরারকে দেখে বলেন, ‘ও মারা গেছে।’ পরে ইফতি একটি কক্ষে গিয়ে শুয়ে থাকেন। সেখান থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে গতকাল বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহাকে সবুজবাগ থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শামসুল আরেফিন ওরফে রাফাত ও ওয়াটার রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মিজানুর রহমানকে গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বুয়েট প্রশাসন সতর্ক থাকলে আবরার হত্যাকাণ্ড ঘটতো না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বুয়েট প্রশাসন আরেকটু সতর্ক থাকলে আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটতো না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আজ দুপুরে তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত প্রধান ফটক উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন না ডাক দিলে পুলিশ ভেতরে ঢোকে না জানিয়ে তিনি বলেন, এ জায়গাটিতে বুয়েট কর্তৃপক্ষের আরেকটু সতর্ক থাকার দরকার ছিল। আরেকটু সতর্ক থাকলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা নাও ঘটতে পারতো। ভবিষ্যতে প্রশাসন ছাত্রদের প্রতি আরও নজর দেবে, দায়িত্ববান হবে বলে মনে করি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ড যারা সংঘটিত করেছিল এদের প্রায় সবাইকে আমরা ধরে  ফেলেছি। এ পর্যন্ত ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১ জন ১৬৪ করেছে (স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন)। আমি আগেও বলেছি আজও বলছি, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এ মামলার চার্জশিট দেয়া হবে, আশা করছি তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলা তদন্ত সম্পন্ন করবে।

তিনি বলেন, সাথে সাথে আমি আহ্বান রাখবো, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড, এ ধরনের মেধাবী ছাত্র যারা কি না আমাদের ভবিষ্যত, যে প্রজন্মকে নিয়ে আমরা অহংকার করি, এ ধরনের ঘটনায় যাতে তারা হারিয়ে না যায়।
যারা এ কাজটি করেছেন, এর মতো খারাপ কাজ, এর মতো গর্হিত কাজ এর আগে আর ঘটেনি বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও অনেক ঘটনাই ঘটেছে, আমরা সানি হত্যাও  দেখেছি। কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডটি সবার হৃদয়ে দাগ কেটেছে। আমি আশা করবো, আমাদের ছাত্র সমাজ এ ধরনের ঘটনা আর দেখবে না। যাতে না ঘটে সেজন্য তারাও সজাগ থাকবে।

আবরার হত্যার পেছনে মূল কারণ কী জানতে চাইলে বলেন, এ খুনের পেছনে কারণটা কী এটা আমাদের দেখতে হচ্ছে। যারা ধরা পড়ছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তদন্ত চলছে, এর  পেছনে মোটিভটা কী জানার চেষ্টা চলছে। এমনি এমনি একজন আরেকজনকে হত্যা করবে এটা  যেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে, আরও কিছু উদ্দেশ্য আছে। এর সবই আমরা খতিয়ে দেখছি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করতে এসেছে, তারা সবাই  মেধাবী। এ ধরনের মেধাবীরাই এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। তার ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো কারণ রয়েছে। সে কারণগুলো উদঘাটন করে নিখুঁত ও তথ্যসমৃদ্ধ চার্জশিট দিতে চাই।

উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েকটি চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্যের সূত্র ধরে শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ৬ই অক্টোবর রাতে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেন।

মেসেঞ্জারে কথোপকথন: ‘মাইর বেশি হয়ে গেছে, মরে যাচ্ছে’

ছাত্রলীগের হাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে মারধরের পরিকল্পনা হয় একটি ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে। ওই গ্রুপের কথোপকথনের মাধ্যমে জানা যায় তাকে কিভাবে ধরে আনা হবে, মারপিট করা হবে, এরপর হল থেকে বের করে দেয়া হবে। এজন্য আবরারের রুমমেট মিজানের সঙ্গে আলাপ করার কথাও বলা হয়েছে। আর সেই কথোপথনের সূত্র ধরেই অমিত, মিজানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন গত শনিবার দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিটে গ্রুপে লেখে, আবরারকে মেরে বের করে দিতে হবে। সে ‘শিবির’ করে। মনিরুজ্জামান নামে একজন মেহেদীর কথায় সাড়া দেয়। পরে মেহেদী মনিরুজ্জামানকে বলে, আবরারের রুমমেট মিজানের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য।
এজন্য মেহেদী তাকে দু’দিন সময় দেয়ার কথা বলে। পরে  রোববার রাতে আবরারকে ধরে আনা হয়।
মেসেঞ্জারে অন্য আরেকটি ব্যক্তিগত কথোকথন পাওয়া গেছে, যা ছিল অমিত সাহা ও ইফতি মোশাররফ সকালের মধ্যে। এতে অমিত সাহা লিখেছেন, আবরার ফাহাদ রে ধরছিলি তোরা। ইফতি জবাবে লেখেন, হ। পুনরায় অমিত প্রশ্ন করেন ‘বের করছস?’ জবাবে ইফতি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘কী? হল থেকে নাকি স্বীকারোক্তি?’ এবার অমিত লিখেন, ‘স্বীকার করলে তে বের করা উচিত।’
এরপর ইফতি জবাবে বলেন, ‘মরে যাচ্ছে; মাইর বেশি হয়ে গেছে’ জবাবে অমিত সাহা লিখেন, ‘ওওও. বাট তাকে তো লিগ্যাললি বের করা যায়’ এরপর একটি ইমোজি সেন্ড করেন ইফতি। পরবর্তীতে এই দু’জনের আর কোনো কথোপকথন পাওয়া যায়নি।
ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে কথোপকথনের প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। আমরা হত্যা সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছি। কথোপকথনের বিষয়টিও যাচাই-বাছাই চলছে।

বুয়েটে শিক্ষার্থী নির্যাতনের সংস্কৃতি: প্রশাসনের ব্যর্থতা কতটা? by শাহনাজ পারভীন

বুয়েটে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য সময়সীমা ছিল বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।
কিন্তু প্রশাসন এখনো পর্যন্ত এসব দাবির বিষয়ে কোন জবাব না দেয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে এদিনও মুহুর্মুহু স্লোগান শোনা গেছে।
যে শিক্ষার্থীরা চারদিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর তাদের অনেকেরই, বিশেষ করে ছেলেদের হলে নিয়মিত একটি অভিজ্ঞতা হল র‍্যাগিং।
মৌখিক ভাবে হেনস্থা থেকে শুরু করে, বিব্রতকর পরিস্থিতির মতো ঘটনা দিয়ে অনেকের ক্যাম্পাস জীবন শুরু হয়েছে। সেই খবর এখন ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে।
ভিন্নমত প্রকাশ করার জন্য বা কোন সাধারণ বিবাদের ঘটনা নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের হাতে মারধরের ঘটনাও নিয়মিত ব্যাপার ছিল।

নির্যাতনের শিকার এক শিক্ষার্থীর বয়ান

এরকম একটি ঘটনার বর্ণনা করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী।
তিনি বলছেন, "ধর্মকে যারা কটাক্ষ করে তাদের বিরুদ্ধে আমি ফেসবুকে একটি পোষ্ট দিয়েছিলাম। এটার জেরে আমাকে রাতের বেলা রুমে ডেকে নেয়া হয়েছিলো। তারা আমাকে জেরা করে। আমার ল্যাপটপ, ফোন, ইমেইল, আমার ব্রাউজার হিস্টরি, আমার ফেসবুকের কর্মকাণ্ড সবকিছু তার চেক করে। চেক করে কোন কিছুই পায়না।"
তিনি বলছেন, অন্য আরও কিছু বিষয়ে ফেসবুক পোষ্টের জের ধরে তাকে সেই রাতে পেটানো হয়েছিলো।
তার বর্ণনা দিয়ে এই শিক্ষার্থী বলছিলেন, "তারা আমাকে সারা রাত ধরে পেটায়, নির্যাতন করে। এখনো আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। এই ঘটনাটা হয়ত এতদিন পরে আর তীব্র থাকবে না। কিন্তু আমি এখনো থ্রেট ফিল করি।"

প্রশাসনের ব্যর্থতা কতটা?

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, এমন ঘটনা প্রতিহত করা পুরোটাই প্রশাসনের দায়ভার।
কিন্তু তারা তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ করে একজন শিক্ষার্থী বলছেন, "আমাদের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢোকানো মানে আমাদের পরিবার আমাদের তাদের হাতে ছেড়ে দিলো। আমি আশা করবো যে আমার প্রশাসন আমার কোন বিপদ হলে এগিয়ে আসবে।"
"আমি রাত দুইটায় ফোন দেই বা রাত চারটায় কল দেই এবং সঠিক ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? প্রশাসন বলল আমাদের থেকে ছাত্রলীগের ক্ষমতা বেশি। তারা এত উচ্চ পর্যায়ে থেকে যদি ভয় পায় তাহলে আমরা কেন ভয় পাবো না?"
আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছে নির্যাতন ও র‍্যাগিং-এর সংস্কৃতির কথা।
প্রশাসনিকভাবে বিচারের অভাবকে একটি বড় কারণ বলছেন অনেক শিক্ষার্থী। বুয়েটের সিএসই বিভাগের একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে একটি সার্ভার গড়ে তোলে বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
এতে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা নিজের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে পারেন।
বুধবার পর্যন্ত সেখানে ১০৬টি অভিযোগ এসেছে, যার অনেকগুলোই জমা পড়েছে আবরার ফাহাদ নিহত হবার পর। কিভাবে বহুদিন ধরে এমন ঘটনা বুয়েটের মতো ক্যাম্পাসে চলে আসছে?
বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলছেন, শিক্ষার্থীরা ভয়ে বেশিরভাগ সময় অভিযোগ নিয়ে আসেন না। তবে এক্ষেত্রে প্রশাসনের এক ধরনের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করছেন অধ্যাপক রহমান।
তিনি বলছেন, "নতুন যারা আসে তাদের উপরেই এই র‍্যাগিং-এর নামে শারীরিক নির্যাতনটা বেশি হয়। আর এটা করে তাদের ইমিডিয়েট উপরের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। নতুন শিক্ষার্থীরা তখন যে একজন প্রভোস্টের কাছে অভিযোগ করবে বা আমার কাছে অভিযোগ করবে সেই রকম পরিবেশ হয়ত আমরা তাদেরকে তৈরি করে দিতে পারিনি। এক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে আমাদের শিক্ষক ও আমাদের প্রশাসনিক যে কাঠামো রয়েছে সেটার ব্যর্থতা কিছুটাতো আছেই। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।"

নির্যাতনের সংস্কৃতির আরেক দিক

আবরার হত্যাকাণ্ডের আগে আর একটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলেছিল। সেটি হল আহসানউল্লাহ হলে মেরে এক শিক্ষার্থীর কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়ার ঘটনা।
অধ্যাপক রহমান বলছেন, এই ঘটনার পর তিনি হলে প্রভোস্টদের নিয়মিত টহলের অনুরোধ করেছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে কাউন্সেলিং-এ বসেছিলেন।
তিনি বলছেন সেসময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বিশেষ মানসিকতা তিনি দেখতে পেয়েছেন।
তিনি বলছেন, "যে ছেলেটি এখন র‍্যাগিং দিচ্ছে সে তার ইমিডিয়েট আগের ব্যাচ থেকে এরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে চাপা একটা ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকে যে কবে নতুন স্টুডেন্ট পাবো। তাদেরকে যতক্ষণ না সে একইভাবে হেনস্থা করতে পারছে, ততক্ষণ তার মধ্যের ক্ষোভটা যাচ্ছে না।"

ছাত্রনেতাদের দৌরাত্ম্য ও সরকারের ভূমিকা

এটি হয়ত সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে এখন প্রচুর ঘটনার জন্য সরকারী দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের বিপক্ষে অভিযোগ উঠছে।
আবরার হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার বেশ কিছু নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
যাদের ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে তখন অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন।
এক অর্থে তারা একটি বিকল্প প্রশাসন চালাচ্ছে বলে মনে হয়। হলে সিট বরাদ্দ থেকে শুরু করে বড় উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি পর্যন্ত তাদের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে।
আহসানুল্লাহ হলের প্রভোস্ট এবং পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এম. শাহজাহান মণ্ডল বলছেন শিক্ষকরাও অনেক সময় এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে আপোষ করেন।
তিনি বলছেন, "যারা পলিটিক্স করছে তারা হয়ত খুব তাড়াতাড়ি ক্যারিয়ারে উন্নতি চায়। বিশেষ করে আর্থিক দিক দিয়ে। আর একটা বিষয় হল যখন যে সরকারি দলে থাকে, যারা স্ট্রং পলিটিক্স করে তাদের তারা প্রমোট করে। অনেক শিক্ষকও তরুণ বয়সেই রাজনীতিতে ঢুকে যাচ্ছে।"
"আমরা যারা শিক্ষক অনেক সময় আমরা শিক্ষকের দায়িত্বের কথা ভুলে যাই। অ্যাম্বিশনের কারণে অনেক সময় আমরা আপস করি।"
বিভিন্ন হলে ছাত্রদের সুযোগ সুবিধা দেখভালের জন্য দায়িত্বরত শিক্ষকদের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর না নেয়া এবং তাদের প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব একটি কারণ হিসেবে এখন চিহ্নিত হচ্ছে।
একই সাথে ছাত্র সংগঠনের কাছে তারা এক অর্থে অসহায়ও বোধ করেন বলে মনে করছেন অধ্যাপক মণ্ডল।
তিনি বলছেন, "সরকারের একটা শক্ত সমর্থন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন পাচ্ছে। যেটা সবসময় থাকলে আমরা ছাত্র নেতাদের কাছে আমাদের ভয়েস আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারি। সরকার এখন তার ছাত্র সংগঠনের ব্যাপারে যে কঠোর ভূমিকা নিয়েছে সেটি আরও আগে হলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।"
আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষকে

বিদেশিদের প্রতিক্রিয়ায় নাখোশ ঢাকা

ফেসবুকে মন্তব্যের জেরে ছাত্রলীগ কর্মীদের নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারানো বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ঘটনার ‘বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত’ এবং ‘অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ চেয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়ায় নাখোশ ঢাকা। এটি একান্তই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া দেখানো রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ তথা জাতিসংঘের প্রতিনিধির প্রতি ‘বিরক্তি’ প্রকাশ করেছেন সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের কাছে সরকারের ‘পাল্টা প্রতিক্রিয়া’ ব্যক্ত করা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে। সূত্র মতে, এ নিয়ে বৃটিশ হাই কমিশনারের সঙ্গে সেগুনবাগিচার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকে ঢাকার ‘নাখোশ হওয়ার’ বার্তাটি স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে বৈঠকটি কোথায় হয়েছে? এবং কোন কর্মকর্তা রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কথা বলেছেন? সে স্থান ও অফিসার সম্পর্কে তাৎক্ষণিক নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে সরকারের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে আবরার হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন। মন্ত্রী এ সময় কূটনীতিকদের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন রাখেন।
বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোন স্কুলে যখন গোলাগুলি হয়, তখন কি আপনারা (কূটনীতিকরা) প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন? যখন পাকিস্তানের শিয়া মসজিদ পুড়িয়ে দেয়া হয়, তখন কি  প্রতিক্রিয়া জানান? অতীতে যখন বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তখন কি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন? মন্ত্রী বলেন, ‘এখন যারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাদের বলবো, কূটনৈতিক শিষ্টাচার যাতে রক্ষিত হয়, সেভাবে আপনারা বক্তব্য রাখুন। এভাবে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে বক্তব্য রাখা সমীচীন নয়।’ উল্লেখ্য, শনিবার ঢাকাস্থ বৃটিশ হাই কমিশনের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে প্রচারিত এক পেস্টে ‘বুয়েট’কে হ্যাশট্যাগ করে বৃটেনের তরফে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছিল।
বার্তাটি এখনও বহাল রয়েছে। সেখানে লেখাটি এ রকম- ‘#বুয়েট-এ ঘটে যাওয়া ঘটনায় আমরা বিস্মিত ও মর্মাহত। যুক্তরাজ্য বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রসঙ্গে নিঃশর্তভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।’ একই দিনে ঢাকাস্থ জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর দপ্তর থেকে প্রচারিত বার্তা এবং কূটনৈতিক সংবাদদাতা সমিতির (ডিকাব) সঙ্গে আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পোর মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রায় অভিন্ন ভাষায় জাতিসংঘের তরফে ওই হত্যাকান্ডের নিন্দা জানানো হয়। বলা হয়- মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। এর চর্চার জন্য কাউকে হয়রানি, নির্যাতন ও হত্যা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। আবরারের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে সরকারের তাৎক্ষণিক অ্যাকশনের প্রশংসা করে এ ঘটনার ‘স্বাধীন তদন্তের’ আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়- স্বাধীন তদন্তই ‘সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় বিচার’ ও ঘটনার ‘পুনরাবৃত্তি রোধে’ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক সহিংসতা বেড়ে গেছে। এতে অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু ওই সব ঘটনায় দায়ীদের দৃশ্যত ‘দায়মুক্তি’ দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো বুয়েটের ঘটনাকে ‘ভয়ানক’ উল্লেখ করে ডিকাব টক-এ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই সন্তানের জননী হিসাবে এ ঘটনা আমাকে ব্যথিত করেছে, আমি আতঙ্কিতও।’ এদিকে ঢাকাস্থ জার্মান দূতাবাসের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়েছে- জার্মান সরকার নিজ দেশে এবং বিশ্বব্যাপী মুক্তভাবে মত প্রকাশের অধিকারের প্রতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জার্মানী কখনও এই নীতিগুলির কোনও লঙ্ঘনকে ‘শাস্তিবিহীন’ অবস্থায় রাখে না, বরং সব সময় সেই মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখে।

অমিতসহ আরো ৩ জন গ্রেপ্তার

অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহাকে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডে শুরু থেকেই তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রকাশ পায় গণমাধ্যমে। এমনকি মামলার আসামি থেকে অমিত সাহাকে বাদ দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন নিহত আবরারের ছোট ভাই ফাইয়াজ। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় বুয়েট ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক অমিত সাহাসহ গতকাল আরও তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হচ্ছে, আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান মিজান ও হোসেন মোহাম্মদ তোহা। রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় অমিত সাহাকে। এ নিয়ে আবরার হত্যা মামলায় ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অমিত বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী।
ঘটনার রাতে ওই রুমে নিয়েই আবরারকে পেটানো হয়। অমিত সাহা আবরার হত্যা মামলার এজাহার বহির্ভূত আসামি। আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান মিজানকে দুপুরে শেরেবাংলা হল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিজান ওয়াটার রিসোর্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী।
এদিকে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন আবরার হত্যাকান্ডে অমিত সাহার পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। বলেন, ঘটনাস্থলে না থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করার সুযোগ আছে। তথ্য প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষন ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আমাদের মনে হয়েছে অমিত সাহা হয়তো ঘটনাস্থলে ছিল না তবে তার দায়দায়িত্ব রয়েছে। সেজন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সে এজাহার বহির্ভূত আসামি ছিল। তদন্ত করতে গিয়ে যাদের যাদের সম্পৃক্ত পাওয়া যাবে তাদেরকেই গ্রেপ্তার করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনা জানার পরপরই পুলিশ তৎপরতা শুরু করে। নিহত আবরারের বাবা ঘটনার পরদিন বিকাল বেলা  ১৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। কিন্তু এজাহার দায়েরের আগেই যখন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিলেন তখনই গোয়েন্দা পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছিলো। তাদের আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। পাশাপাশি এজাহার দায়েরের পরে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এজাহারনামীয় রয়েছেন তিনজন ও এজাহারের বাইরে তিনজন। তিনি বলেন, আবরার হত্যার ঘটনায় পুলিশ তার সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে আসামিরা কে কোন দলের, কার কোন পদ-পদবি বা তার সমাজিক অবস্থান কি সেটি বিবেচনা করা হচ্ছে না। তদন্তের ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরণের প্রভাব বিস্তার না করে সেজন্য ডিবির একটি চৌকষ টিম কাজ করছে। ঘটনার তদন্ত ডিবি দক্ষিণ করলেও ডিবির অন্যান্য টিম, পুলিশ ক্রাইম ডিভিশন শুরু থেকেই কাজ করছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য তদন্ত সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে করা হবে।

ঘটনার দিন টর্চার রুমে কি হয়েছিলো ও ঘটনার সঙ্গে কতজন জড়িত ছিল সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, এসব বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা যখন পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারবে তখন বলা যাবে। কারণ পাঁচ দিনের রিমান্ড শুরু হয়েছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমরা চেষ্টা করছি ঘটনার সঠিক একটি বর্ণনা নেবার। কারণ আমাদের কাছে ঘটনাস্থলে যে আবরারকে মারধর করা হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো ভিডিও ফুটেজ নাই। শুধু নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো সেই ভিডিও আছে। তাই এই ঘটনার সঙ্গে এমন কেউ থাকতে পারে যে হয়তো সেখানে আসেও নাই কিন্তু মারামারিতে অংশগ্রহণ করেছে। আবার এমনও হতে পারে আশে পাশের রুমে ছিল ঘটনা শুনে ওই রুমে গেছে। যার হয়তো এই ঘটনায় কোনো ভূমিকাই নাই। তদন্ত ছাড়া এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব না। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত জানা যাবে না। তবে আসামিদের মধ্যে অনেকেই স্বেচ্ছায় তাদের দ্বায় স্বীকার করছেন। ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরছেন। তাদের দেয়া তথ্য আমরা যাচাই-বাছাই করছি।

শুধুমাত্র নির্যাতন নাকি হত্যা করার জন্য আবরারকে ডেকে নেয়া হয়েছিলো এবং ঘটনার মোটিভটা কিরকম ছিল সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদেরও ফোকাসটা ওই জায়গায়। আমরাও জানার চেষ্টা করছি মোটিভটা আসলে কি ছিল। তাকে কি হত্যা করার উদ্দেশ্যই তারা নিয়ে গিয়েছিলো নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল। আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি তবে পরবর্তী তদন্তে যদি না মিলে সেজন্য এখনি সেটি বলা যাচ্ছে না। শিবির পরিচয়ে আবরারকে মারধর করা হয়েছিলো কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটিও একটি কারণ বলে আমরা জেনেছি। তবে এটিই একমাত্র কারণ হিসাবে আমরা ধরে নিচ্ছি না আরও অনেক কারণ আছে।

আবরার গুরুতর অসুস্থ জেনে পুলিশের একটি টহল টিম বুয়েটে গিয়েছিলো। কিন্তু তাদেরকে নাকি ঢুকতে দেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে পুলিশের পেশাদারিত্বে কোনো ঘাটতি ছিল কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কেউ অসুস্থ বা কাউকে গুরুতর আহত করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। একটা গণ্ডগোল হচ্ছে এমন খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়েছিলো। অনেক্ষণ অপেক্ষাও করেছে। কিন্তু তাদেরকে বলা হয়েছে ভেতরে কোনো সমস্যা নেই। যদি ওই সময় ঘটনা ঘটেছে এর সত্যতা পাওয়া যেত তবে টহল পুলিশ নয় উর্ধ্বতন সবাই সেখানে যেত। এক্ষত্রে আমরা হলে প্রবেশের রেওয়াজও মানতাম না।

সিসিটিভির ফুটেজে একজন ডাক্তার, ছাত্র কল্যাণ পরিচালক ও প্রভোস্টকে আবরারের লাশের পাশে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে তাদের বিষয়ে মনিরুল বলেন, ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে কথাও হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসাবে আমরা তাদের সঙ্গে আরও কথা বলবো। তাদেরকে সাক্ষী করবো।

আবরার হত্যাকান্ডে আমরা শুধু সাক্ষীর মৌখিক স্টেটমেন্টের ভিত্তিতে তদন্ত কাজ করছি না। এখানে আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের কাছ থেকে আমরা তথ্য পাচ্ছি। তথ্য প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে আমরা তথ্য সংগ্রহ করবো। এছাড়া পারিপাশ্বিক তথ্য ও আলামতের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত কাজ করবো যেগুলো মৌখিক সাক্ষীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সহসা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন না হাসিনা: -দ্য টেলিগ্রাফের রিপোর্ট by দেবদীপ পুরোহিত

সম্প্রতি নয়া দিল্লি সফরে ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া নিয়ে দেশের ভিতর যে সমালোচনা আছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলে বুধবার নিজের সুনামের সঙ্গে বাজি ধরলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকাকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে পশ্চিমা প্রতিবেশী ভারত- এমন অভিযোগকারী একজন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার পর যে ভারত-বিরোধিতা জ্বলে উঠেছে তা প্রশমনের চেষ্টা করেছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ় কন্ঠে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে শেখ হাসিনা সমঝোতা করবে- এটা  অসম্ভব। গত সপ্তাহে ভারত সফরকালে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি একথা বলেন। তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির অগ্রগতির বিষয়ে বাংলাদেশের বড় প্রত্যাশা নিয়ে গত ৩রা অক্টোবর দিল্লি পৌঁছেছিলেন শেখ হাসিনা। এই চুক্তিটি ২০১১ সাল থেকে রয়েছে মুলতবি অবস্থায়। এর কারণ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা। কিন্তু এবারও বহুল প্রত্যাশিত সেই চুক্তি ঢাকার কাছে ধরা দিল না।
এতে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে।
ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বার্থ বিলিয়ে দেয়া এবং বিক্রি করে দেয়ার জন্য রাজনৈতিক কিছু সমালোচক অভিযুক্ত করছেন হাসিনাকে। এসব রাজনীতিক সম্পাদিত ৭টি চুক্তির মধ্যে দুটি চুক্তিকে দেখছেন নয়া দিল্লির স্বার্থের পক্ষে। এর মধ্যে একটিতে ত্রিপুরার মানুষের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে ফেনি নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারে ভারতকে অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। অন্য চুক্তিতে ভারতের পণ্য আনা-নেয়ার জন্য চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারে ভারতকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। দেশ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। এতে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ত্রিপুরাকে প্রাকৃতিক গ্যাস দিতেও রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। এটা হলো বাংলাদেশের একটি বিরল প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রকৃতপক্ষে এই চুক্তিটি হলো ভারতের কাছে এলপিজি রপ্তানি সংক্রান্ত।
বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে কি পেল বাংলাদেশ তা নিয়ে যখন দেশে উচ্চ নিনাদে বিতর্ক তখন অভিজাত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ ফেসবুকে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে পোস্ট দিয়েছিলেন। ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, এই হত্যাকারীরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের সদস্য।
বাংলাদেশের একজন সিনিয়র সংবাদ উপস্থাপক বলেছেন, ফাহাদকে কিভাবে নির্যাতন করে শেষ পর্যন্ত হত্যা করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন সেই ভিডিও যখনই ভাইরাল হয়ে যায়, তখন ভারত ঢাকাকে পাল্টে দিচ্ছে এমন দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে।
শেখ হাসিনাকে সব সময়ই ভারতপন্থি হিসেবে অভিযুক্ত করে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো। এর ফলে মাঝে মধ্যেই লাভবান হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে গঠিত জোট। যদিও বেশির ভাগ বাংলাদেশী ভারত সফর করতে ভালবাসেন, দেখেন বলিউডের সিনেমা, বাংলা সিরিয়াল, তা সত্ত্বেও ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট দেশের জনগণের বড় একটি অংশের গভীরে প্রোথিত।
ফাহাদের হত্যা নিয়ে দেশজুড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এই হত্যাকা- ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টকে আরো প্রবল করেছে এবং নিজের দলের ছাত্র সংগঠনের ওপর শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জোরালো প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে।
বুধবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কিছু কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন এটা আগেই অনুমান করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে তিনি ওই সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে প্রথম প্রশ্নটি জোরালো মেজাজে ছিল: ভারতের সঙ্গে চুক্তি কি ঢাকার স্বার্থে হয়েছে?
জবাবে শেখ হাসিনা ব্যাখ্যা করেছেন, এলপিজি বাংলাদেশের মূল উৎপাদ নয়। এটা হলো অশোধিত তেলের একটি বাই-প্রডাক্ট। এই অশোধিত তেল বাংলাদেশে আমদানি করা হয় এবং পরে তা শোধন করা হয়। আমরা ত্রিপুরার কাছে যে গ্যাস বিক্রি করবো তা অন্যান্য রপ্তানিপণ্যের মতো হবে। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু থাকা উচিত নয়।
তার সরকার প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করতে রাজি হয়েছেন এমন অভিযোগ থেকে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন। এরপরই এসেছে ফেনি নদী থেকে ভারতকে পানি প্রত্যাহারে একমত হওয়ার বিষয়। এর জবাবে তিনি বলেছেন, আমরা তাদেরকে খাবার পানি দিচ্ছি। তা মাত্র ১.৮২ কিউসেক। কেউ যদি খাবার পানি চান তাহলে তাকে কি আমরা বলতে পারি- না। পানি দেবো না। এর মধ্য দিয়ে তিনি তার সমালোচকদের জবাব দিয়েছেন।
ফেনি নদীর স্ট্রাকচার বিষয়ে অবহিত এমন সূত্রগুলো বলেছেন, ১.৮২ কিউসেক পানি (প্রতি সেকেন্ডে ৫১.৫৪ লিটার পানির সমতুল্য) প্রত্যাহার করলে তাতে বাংলাদেশের ভাটিতে প্রভাব পড়বে না বললেই চলে।
এই ব্যাখ্যা শেখ হাসিনার সমালোচকদের সবার মুখ বন্ধ করতে যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে সচেতন শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতি, ধরলা ও দুধকুমারের মতো আন্তঃসীমান্তবর্তী নদীগুলোর অন্তর্বর্তী পানি চুক্তির একটি খসড়া প্রস্তুত করছে দুই দেশ। সহসাই এর সমাধান মিলবে। আমরা তিস্তা নিয়েও আলোচনা করেছি।
এর পরের প্রশ্নটি ছিল ফাহাদের মৃত্যু নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেছেন, সন্দেহভাজনদের বিচারে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হবে না। তার ভাষায়, যখন কেউ একজন অপরাধ সংঘটিত করে তখন তার রাজনৈতিক পরিচয়ের তোয়াক্কা করি না আমি। আমার কাছে একজন ক্রিমিনাল একজন ক্রিমিনালই। তাদেরকে আমরা ক্রিমিনাল হিসেবেই দেখি।
পুলিশ এরই মধ্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ১৩ জন শিক্ষার্থীকে এই হত্যায় জড়িত থাকার কারণে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন এরই মধ্যে বহিষ্কার করেছে ১১ জনকে। যখন ঢাকায় এমন সব প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তখন সেখানকার কিছু সূত্র বলেছেন, দোষীদের অভিযুক্ত করার পরেই শুধু তারা আশ্বস্ত হবেন।
গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা পরাজয়ের অধীনে এখনও স্মার্ট। তবে সহসাই বা অবিলম্বে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন না হাসিনা। ঢাকায় একটি সূত্র বলেছেন, এখানকার সমস্যা হলো জনগণের মনোভাব। দু’একটি বিষয়ে প্রশ্ন করার কারণে একজন ছাত্রকে হত্যা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। নিজের সুনাম ধরে রেখে দুটি সমস্যা মোকাবিলায় শেখ হাসিনা তার উত্তম হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন।

১০ দফায় অনড় শিক্ষার্থীরা, ফের আল্টিমেটাম

আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দশ দফা দাবি মেনে নিতে ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামকে আজ দুপুর ২টা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ভিসি সশরীরে এসে দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল চতুর্থ দিনের আন্দোলন শেষে এ ঘোষণা দেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এর আগে ভিসি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলেও গণমাধ্যমের উপস্থিতিবিহীন কোনো আলোচনায় বসতে রাজি হননি আন্দোলনকারীরা। এদিকে, বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নয়, বরং সংগঠনভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি স্পষ্ট করেছেন শিক্ষার্থীরা। আর নিজেরা কোনো দলীয় রাজনীতি না করার ঘোষণা দিয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবি দিয়েছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। অন্যদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় গতকালও বিক্ষোভ ও গণপদযাত্রা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের করা ৭টি চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে তা বাতিল করার হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি বলেন, আবরারের রক্ত ঝরানো অসম চুক্তি আমরা বাস্তবায়ন হতে দেবো না। আবরারের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌন মিছিল করেছে ছাত্রলীগ।
ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে স্বতন্ত্র জোট। গতকাল চতুর্থ দিনের মতো আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ দশ দফা দাবিতে বুয়েট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এরপর সেখান থেকে তারা বিক্ষোভ মিছিল করে পুনরায় শহীদ মিনারে এসে অবস্থান নেন। এসময় ‘শিক্ষা-সন্ত্রাস, এক সঙ্গে চলে না’, ‘খুনিদের ঠিকানা, এই বুয়েটে হবে না’, ‘এক আবরার কবরে, লক্ষ আবরার বাহিরে’, ‘বহিষ্কার বহিষ্কার, খুনিদের বহিষ্কার’, ‘যাবো না, যাবো না, ফাঁসি ছাড়া যাবো না’ ইত্যাদি স্লোগানে তারা আবরার হত্যার বিচার দাবি করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন বিক্ষুব্ধরা। এসময় তারা বলেন, হল প্রশাসনের যে ব্যবস্থাগুলো নেয়া উচিত ছিল, তা নেয়া হয়নি। এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়াও গ্রহণ করেনি। কাজেই এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১৪ই অক্টোবর বুয়েটে যে ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে এ পর্যন্ত বুয়েটে যত শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন হয়েছে তার বিচার করতে হবে। গতকাল বাদ আসর বুয়েট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ফাহাদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল করেছে শিক্ষার্থীরা। এর আগে দুপুরে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বুয়েটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী অন্তরা মাধুরী বলেন, ভিসি স্যারকে আমরা মানববন্ধনের মাধ্যমে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। তার সঙ্গে আমরা যদি কোনো দুর্ব্যবহার করে থাকি, তার কাছে আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ভিসির প্রতি আহ্বান জানিয়ে অন্তরা বলেন, ‘স্যার, আপনি আসুন, আমরা শুধু কথা বলবো। আপনার প্রতি আমাদের কোনো রাগ নেই।’ অন্তরা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের বিষয়গুলোর স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এগুলো নিয়ে কথা বলেছেন।
উনি আমাদের সবার অভিভাবক, ওনার জন্যই ব্যাপারগুলো এত দ্রুত সুষ্ঠুভাবে হয়ে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি, এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যই সম্ভব হয়েছে।’ বুয়েটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শীর্ষ সংশপ্তক বলেন, আমাদের আন্দোলন ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে নয়। আমরাও স্বীকার করে নেই যে, আমাদের দেশের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু আজকে বুয়েটে যে নষ্ট ছাত্ররাজনীতি হয়েছে, যার জন্য আমরা আসলে বেঁচে থাকতে পারছি না, যার জন্য হলে ও ক্যাম্পাসে প্রতিটি শিক্ষার্থী ত্রাসের মধ্যে থাকে, আমাদের আন্দোলন তার বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ তিনি এ বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমাদের আন্দোলনটি আসলে রাজনীতির বিরুদ্ধে নয়, বরং শুধু বুয়েট ক্যাম্পাসে সংগঠনভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে। শীর্ষ বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবির বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এবং এ বিষয়ে মিডিয়ার সামনে কথা বলেছেন। তিনি এও বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে এটি বন্ধ করে দিতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কোনো প্রভাব থাকবে না। এর জন্য প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সৎসাহস ও সদিচ্ছা। আশা করবো, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমাদের প্রশাসন ও ভিসি এ বিষয়ে পিছিয়ে থাকবেন না। ভিসি স্যার আসবেন, আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন এবং আমাদের দাবিগুলো মেনে নেবেন।
শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে শনাক্তকারী খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে শনাক্ত করা সবাইকে ১১ই অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল পাঁচটার মধ্যে আজীবন বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে, মামলা চলাকালে সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের সব ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। এ মর্মে অফিশিয়াল নোটিশ ১১ তারিখ পাঁচটার মধ্যে প্রদান করতে হবে; আবরার হত্যায় দায়ের করা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করতে বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুয়েট প্রশাসনকে সক্রিয় থেকে সব প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত ছাত্রদের আপডেট করতে হবে, অবিলম্বে চার্জশিটের কপিসহ অফিশিয়াল নোটিশ দিতে হবে, বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েট হলে হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে রাখা হয়েছে।
জুনিয়র মোস্ট ব্যাচকে সব সময় ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক জোর করে রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেকোনো সময় যেকোনো হল থেকে সাধারণ ছাত্রদের জোরপূর্বক হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলে হলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের এমন কর্মকাণ্ডে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ। তাই আগামী ৭ দিনের মধ্যে (১৫ই অক্টোবর) বুয়েটে সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি এবং ৩৮ ঘণ্টা পরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন এবং কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। তাকে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে আগামীকাল বেলা দুইটার মধ্যে জবাবদিহি করতে হবে; আবাসিক হলগুলোতে র‍্যাগের নামে ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত সবার ছাত্রত্ব প্রশাসনকে বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল ১১ই অক্টোবর, ২০১৯ তারিখ বিকাল পাঁচটার মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে, পূর্বের এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ এবং পরবর্তী সময়ে ঘটা যেকোনো ঘটনা প্রকাশের জন্য একটা কমন প্ল্যাটফরম, কোনো সাইট বা ফর্ম থাকতে হবে এবং নিয়মিত প্রকাশিত ঘটনা রিভিউ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্ল্যাটফরম হিসেবে বুয়েটের বিআইআইএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হবে এবং ১১ই অক্টোবর, ২০১৯ তারিখ বিকাল পাঁচটার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করতে হবে। পরবর্তী ১ তারিখের মধ্যে কার্যক্রম পূর্ণরূপে শুরু করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সব হলের প্রত্যেক ফ্লোরে উইংয়ের দু’পাশে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে; রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হওয়ায় শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ই অক্টোবর, ২০১৯ তারিখ বিকাল পাঁচটার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।
ভিসির পদত্যাগসহ শিক্ষক সমিতির ৭ দফা: এদিকে, অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততার অভিযোগে বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। ভিসি পদত্যাগ না করলে সরকার যেন তাকে সরিয়ে দেন সে আহ্বানও জানায় শিক্ষক সমিতি। গতকাল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ, ছাত্র রাজনীতি বন্ধে প্রশাসনের সহায়তাসহ সাতটি দাবি করেছে সংগঠনটি। বুধবার শিক্ষক সমিতির এক জরুরি সভায় এই সাত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সাত দফা দাবি উত্থাপন করে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ বলেন, বুয়েট শিক্ষক সমিতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছে। শিক্ষকদের সাত দফা হলো- আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকলকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, আবরারের পরিবারকে মামলা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে, আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কার করতে হবে, আবাসিক হলগুলো হতে সকল অবৈধ রুম দখলকারীদের বিতাড়িত করে হলের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অতীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর সংঘটিত বিভিন্ন নির্যাতন এবং র‌্যাগিংয়ের তথ্যসমূহ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনলাইনে সংগ্রহ করে দোষীদের শনাক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক সংগঠন ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বুয়েটের শিক্ষকগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক দল ভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতি থেকে বিরত থাকবেন। ইতিপূর্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নির্লিপ্ততা, নিষ্ক্রিয়তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসিপ্লিনারি আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আবাসিক হলসমূহে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভিসির ধারাবাহিকভাবে অবহেলা ও ব্যর্থতার কারণে ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ এবং ভিসি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাকে অবিলম্বে দায়িত্ব হতে অপসারণের জন্যে বুয়েট শিক্ষক সমিতি সরকারের নিকট জোর দাবি জানায়।
ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দেব না: এদিকে আবরার হত্যার বিচার দাবি, জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল অসম চুক্তি বাতিল ও সারা দেশে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংহতি সমাবেশ ও গণপদযাত্রা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে এই পদযাত্রা শুরু হয়। পদযাত্রায় অংশ নেন ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, যখনই কোনো ঘটনায় ছাত্র সমাজ ফুঁসে উঠে, তখনই সরকার তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়, যাতে আন্দোলন ব্যাপক না হয়। এসব লোকদেখানো ব্যবস্থা। এসব দেখিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি মায়ের মতো হয়ে বিচার করবেন, এগুলো কথার ফুলঝুরি। ছাত্ররা রাজপথে থাকলে প্রশাসনের টনক নড়ে। ছাত্ররা রাজপথ ছেড়ে দিলে তারা আবার আগের মতো হয়ে যাবে। ভিপি নুর বলেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ক্যাম্পাসে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাস ও গুণ্ডামি বন্ধ করতে হবে। তিনি আবরারের রক্ত ঝরানো অসম চুক্তি আমরা বাস্তবায়ন হতে দেব না উল্লেখ করে বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে। গণপদযাত্রাটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
ছাত্রলীগের শোক র‌্যালি: আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে গতকাল দুপুর ১২টায় ঢাবি ক্যাম্পাসে শোক র‌্যালির আয়োজন করে ছাত্রলীগ। র‌্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে মল চত্বর, স্মৃতি চিরন্তন চত্বর, টিএসসি হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সেখানে আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, আবরারের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে সেদিকে কড়া নজর দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। তিনি আরো বলেন, ব্যক্তির দায় কখনো সংগঠনের উপর পরা উচিত না। কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে যদি কোনো খারাপ কাজ করি, তাহলে সে দায় কিন্তু সংগঠন নেবে না। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি আদর্শিক সংগঠন। এখানে কোনো অপরাধীর জায়গা নেই। ব্যক্তিগতভাবে কেউ অন্যায় করে থাকলে তার দায় তাকেই নিতে হবে।
আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের নিন্দা: এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বুধবার প্রভোস্ট কমিটির এক সভা থেকে এ দাবি করা হয়। এ ছাড়া, আবরার ফাহাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়। এদিকে সভায় আরো কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেগুলো হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বা হলগুলোতে কোনো মাদকসেবী, মাদককারবারী, মাদকাসক্ত ও সন্ত্রাসী অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা থাকলে, তা অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে অবহিত করতে শিক্ষার্থীদের এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পরীক্ষা সমাপ্ত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে হল ত্যাগ করতে হবে এবং কোনো ক্রমেই হলে অবস্থান করতে পারবে না বলে সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হল প্রশাসন ১ম বর্ষে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তিতে শূন্য আসনে সিট বরাদ্দ করবে এবং কোনো শিক্ষার্থী হল প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া হলে উঠতে ও অবস্থান করতে পারবে না। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হলের যে সকল কক্ষে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান করে, সেখানে বাংক বেড স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সময়সীমা ইতিমধ্যে রাত ৯টা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সময়সীমা আরো বৃদ্ধি এবং বিভাগীয় সেমিনার লাইব্রেরির সময়সীমাও বৃদ্ধি করার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

সর জমিন যা ঘটেছিল আবরারের গ্রামে: চাপা আতঙ্ক চারপাশে by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

রোববার রাতে বুয়েটের শেরে বাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবরার ফাহাদকে। রাতে বিষয়টি অবহিত হয়েও ঘটনাস্থলে যাননি বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি ড. সাইফুল ইসলাম। পরের দিন ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত আবরারের জানাজায়ও যাননি তিনি। এ নিয়ে চারপাশে সমালোচনা ওঠায় বুধবার আবরারের কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ভিসি। তার আগমনী বার্তা পৌঁছে যায় স্থানীয় প্রশাসনে। স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরও বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়। তাই ভিসি সেখানে পৌঁছার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য সেখানে উপস্থিত হন। দলীয় নেতাকর্মীদেরও ভিড় বাড়ে।
আবরারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর রহস্যময় আড়ালে থাকা ভিসি সাইফুল ইসলামের রায়ডাঙ্গা গ্রামে যাওয়াকে ভালভাবে দেখেননি সেখানকার ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। তারা ভিসিকে আবরারের বাড়িতে যাওয়ার পথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। ভিসির সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ান স্থানীয় নারী, পুুরুষ, যুবকরা। প্রতিবাদী এসব মানুষকে নিবৃত্ত করতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে। বুধবারের এ ঘটনার পর এখন নতুন করে চাপা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে এলাকায়। সেদিন যা ঘটেছিল তা নিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে। ভিসির গাড়ি বহরে যারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা এখন আর সামনে আসতে চান না। আতঙ্কের ছাপ দেখা গেছে আবরারের পরিবারের সদস্যদের মাঝেও।
হত্যাকাণ্ডের শিকার আবরার ফাহাদের ভাই ফায়াজের অভিযোগ, বুধবার তাকে এবং তার স্বজনদের মারধর করে পুলিশ। এমনকি আবরারের জানাজা দুই মিনিটের মধ্যে শেষ করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল বলেও দাবি করেন ফায়াজ। তার অভিযোগের সূত্র ধরে গতকাল কুষ্টিয়ার কুমালখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, চাপা আতঙ্কের ছাপ। গ্রামবাসী প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশের আচরণ নিয়ে। তারা বলছেন, পুলিশের কাজ সবাইকে নিরাপত্তা দেয়া। কিন্তু তারা উল্টো এসে এই পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন করেছে।
স্থানীয়রা জানান, বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ফাহাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এসময় তার দাদা আবুল কাশেম বিশ্বাস ভিসিকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পরে কবর জিয়ারত শেষে পরিবারকে সমবেদনা জানাতে ফাহাদের বাড়িতে যাওয়ার সময় গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে পড়েন তিনি। এলাকার বিক্ষুব্ধ শত শত নারী-পুরুষ ভিসিকে বাধা দেন। একসময় পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর ধস্তাধস্তি হয়। এতে আঘাত পান আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ, তার ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী তমা। এদিকে এলাকাবাসীর প্রতিরোধে ও বাধার মুখে পড়ে ভিসি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া প্রহরায় রায়ডাঙ্গা গ্রাম ত্যাগ করেন। তবে ফাহাদের বাবা বরকতউল্লাহ এই প্রতিবেদক’কে বলেন, ভিসি স্যার চাইলে আমার বাসায় আসতে পারতেন। পুরো রাস্তা খালি ছিলো। ভিসি থাকতেই আমাদের উপজেলার চেয়ারম্যান আমাদের বাড়িতে এসেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশি তদারকি ছিলো। এ কারণেই মনে হয় তিনি আসেননি। পুলিশের এমনটা করা ঠিক হয়নি। আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ বলেন, এখানকার দায়িত্বে থাকা এডিশনাল এসপি (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) মোস্তাফিজুর রহমান আমার বুকে কনুই দিয়ে আঘাত করেন এবং মঙ্গলবারও যখন আমার ভাইয়ের জানাজা হয় তখন তিনি বলেছিলেন দুই মিনিটের মধ্যে জানাজা শেষ করতে হবে। কিভাবে তিনি এটা বলেন? আমার ভাবিকে বেধড়ক পুলিশ দিয়ে মারা হয়েছে। এটা কোন ধরনের পুলিশ?
ফাহাদের বাবা বলেন, আমি নিজের কানে শুনেনি। পরে জানাজায় আসা অনেকের কাছেই এই কথা শুনেছি। পুলিশ নাকি বলেছে দুই মিনিটের মধ্যে জানাযা শেষ করতে হবে।
ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ভিসি এখানে আসাতে অনাকাঙ্খিত অনেক কিছু ঘটেছে। আমার ছোট ছেলে যখন ভিসির সাথে কথা বলতে যায়,তখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা তার গায়ে হাত তুলে। এই বেদনা আমি আর সইতে পারছি না।
বুধবারের ঘটনাটির প্রতক্ষদর্শী কলেজ শিক্ষার্থী একই গ্রামের শাহরিয়ার মাতুল বলেন, আমি এখানে ছিলাম। কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে বলতে শুনেছি এখানে সব ভিডিও হচ্ছে। যাদেরকে ভিডিওর মধ্যে দেখা যাবে তাদেরকে জামায়াত শিবির বলে চালিয়ে দিবো। এখনো সময় আছে সরে যান। কিভাবে একজন পুলিশ সদস্য এই কথা বলতে পারে। আমরা তা দেখে অবাক হয়েছি। এটা খুবই দুঃখজনক। প্রদক্ষদর্শী রিকশা চালক সালাউদ্দিন বলেন, আমাদের মধ্যে এই ছেলেটার জন্য একটা আফসোস তৈরি হয়েছে। শুধুমাত্র এই আফসোস থেকে ভিসির কাছে জানতে চেয়েছিলাম। এটা আমাদের অপরাধ? পুলিশ এটা কোনোদিনই করতে পারে না।
আরেকজন প্রতক্ষ্যদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন , ওই দিন যদি সাংবাদিকরা এখানে না থাকতো, তাহলে আমাদের ওপর গণহারে অত্যাচার চলতো। একটা মানুষকে মেরে ফেললো, তার ওপর আবার পুলিশ এসে গ্রামবাসীর উপর অত্যাচার শুরু করলো। এই দেশ থেকে কি বিচার ওঠে গেছে? এদিকে বুধবার সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন প্রতিবাদ সমাবেশ করতে এলে আইশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ সামাবেশ করতে বাধা দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের সামনে ফাহাদের বন্ধুদের কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠে। স্থানীয় ছাত্রলীগ তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেয়। সেখানে পুলিশ থাকলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাত এসব বিষয় অস্বীকার করে মানবজমিনকে বলেন, এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এসব ঘটনা আমার সামনে ঘটেনি। আগে পরে কি হয়েছে আমি জানি না। আমাদের কাজ ছিলো জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, অতিরক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম), উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ভিসি স্যারের নিরপত্তার জন্য ওই স্থানে যাওয়া। এরপরও এমন একটা অভিযোগ কেন উঠলো আমার সেটা বোধগোম্য নয়।
এলাকায় চাপা আতঙ্ক: আমার ছোট ছেলে আবরার ফায়েজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নামে বেনামে ফেসবুক আইডি খুলে মিথ্যা স্ট্যাটাস দিচ্ছে। তার আইডিতে নানাজন হুমকি ধমকি দিয়ে ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে। বুধবার রাতে ফায়াজের বন্ধু ফোন দিয়ে আমাকে বলছে ফায়েজকে যেনো বাইরে না পাঠাই। তাকে অনেকে নজরদারি করছে, যেকোনো সময় ক্ষতি করতে পারে। বুধবার তাকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরাও মারধর করলো। আমি এই নিরাপত্তা চাইবো কার কাছে’ বলছিলেন ছাত্রলীগের নির্যাতনে নিহত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন। গতকাল কুষ্টিয়ার কুমালখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গায় ফাহাদের গ্রামে গেলে এই প্রতিবেদকে তিনি এই কথা বলেন। এদিকে আবরারের ভাই ফায়েজ বলেন, ঢাকায় যে রকম ভাইয়ের হত্যার প্রতিবাদের জন্য সমর্থন পাচ্ছি, কুষ্টিয়ায় অদৃশ্য কারণে কোনো ধরনের সমর্থন পাচ্ছি না এভাবে। কিভাবে আগাবো বুঝতে পারছি না। তাছাড়া আমার নামে যে কয়েকটি আইডিতে নানানজন স্ট্যাটাস দিচ্ছে এগুলো আবার বিভিন্ন অনলাইনে নিউজ করছে।
বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলেও এক ধরনের চাপা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তার পরিবারের সদস্যরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবরার ফাহাদের এক স্বজন বলেন, বুধবার রাতে আবরারের বাবা বরকতউল্লাহকে কেউ একজন হুমকি দিয়ে বলেছে, এক ছেলেকে হারিয়েছন। আরেক ছেলেকে হারানোর চেষ্টা করবেন না। বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে বলেই ফোন রেখে দেন। তবে বরকতউল্লাহ এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আঁতকে উঠেন। চোখেমুখে ছিলো আতঙ্কের ছাপ। যদিও বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এই ধরনের কোনো চাপ আমার ওপর নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছে বিচার করে দিবেন। সেহেতু আমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারি।
কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কে পাশে স্থানীয় এমপির বাড়ির পেছনেই আবরারের বাড়িটি। সেখানেও গিয়েও কথা হয় কয়েকজনের সাথে। গতকাল ভোরে বাড়ির পাশের মসজিদে ফজর নাম পড়ে বেরোচ্ছিলেন কয়েকজন মুসল্লি। তাদের কাছে আবরারের পরিবার সর্ম্পকে জানতে চাইলে এক মুসল্লি বলেন, আবরারের পরিবারটি খুবই শান্তশিষ্ট। এখানে প্রায় সাত বছর ধরে আছেন তারা। আমরা যতটুকু জানি, খুবই ভদ্র পরিবার।
কুষ্টিয়া শহরের পাশের বাসায় থাকা আবরারের বাবার বন্ধু আলী আকবর বলেন, তাদের পরিবারটি খুবই নিরীহ পরিবার।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি প্রতিরোধ শক্তির বিস্ময়কর উত্থান: পর্ব-এক

ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ শক্তি
আমেরিকা এবং তাদের মিত্র সৌদি আরব ও দখলদার ইসরাইলের শত্রুতামূলক নীতির কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। এর মোকাবেলায় এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ইসলামি প্রতিরোধ শক্তি। শত ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরোধ শক্তিগুলোর অবস্থান কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং তারা কি ধরণর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে সেটাই এখন প্রধান প্রশ্ন।

গত প্রায় নয় বছরে পশ্চিম এশিয়ায় তিনটি দেশে বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটেছে। সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্র, ইরাকের বিরুদ্ধে দায়েশকে লেলিয়ে দেয়া এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এসব যুদ্ধে ওই তিনটি দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই দেশগুলোতে এতোবড় সংকট চাপিয়ে দেয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে তারা অশুভ শক্তির সঙ্গে আপোষের বিরোধী এবং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগঠনগুলো ও ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ সংগঠন আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারা এ অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষের আশা-ভরসার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় গড়ে ওঠা প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে নির্মূল কিংবা দুর্বল করার জন্য গত নয় বছরে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ইরাক ও সিরিয়াকে দুর্বল করার জন্য উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল।

২০১১ সালের পর দখলদার ইসরাইল ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চারটি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অন্যদিকে ইসরাইলের বন্ধু রাষ্ট্র সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বাহিনী ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়ে আসছে। সৌদি আরব ও তার মিত্রদের প্রধান লক্ষ্য ইয়েমেনের জনপ্রিয় আনসারুল্লাহ সংগঠনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা। কিন্তু এতোসব ষড়যন্ত্র, রক্তপাত ও হামলা সত্বেও এ অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তিগুলো দুর্বলতো হয়নি বরং আগের চেয়ে আরো জোরদার হয়েছে। এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই প্রথমত, বিশাল অঞ্চল জুড়ে প্রতিরোধ শক্তি প্রভাব বিস্তার করে আছে। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এরা দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে যেকোনো আপোষের বিরোধী এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোতে আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোর হস্তক্ষেপ মেনে নিতে রাজি নয়।

দ্বিতীয়ত, ইসরাইল ও আমেরিকার আধিপত্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ শক্তিগুলো পশ্চিম এশিয়ায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছ। ইরানের পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক গবেষক মাসুদ আসাদুল্লাহি এ ব্যাপারে বলেছেন, "বর্তমানে একমাত্র প্রতিরোধ শক্তিগুলোই এ অঞ্চলে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও শক্তিমত্তা ধরে রেখেছে। প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর প্রতি সরকারগুলোর সমর্থন রয়েছে এবং এ ঐক্য লেবানন, ইরাক ও সিরিয়াকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। অন্যদিকে যারা প্রতিরোধ শক্তিকে দুর্বল করতে চেয়েছিল তারাই দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। এ দেশগুলোতে শত্রুরা যে জায়গা করে নিয়েছিল তাও হাত ছাড়া হয়ে গেছে। তাই বলা যায়, প্রতিরোধ শক্তিগুলো যদি এগিয়ে না আসত তাহলে আজ আমরা পশ্চিম এশিয়ার ভিন্ন চিত্র দেখতে পেতাম।"

পশ্চিম এশিয়ায় ইসরাইল-মার্কিন বিরোধী প্রতিরোধ শক্তির আত্মপ্রকাশের তৃতীয় প্রভাব হচ্ছে, আমেরিকা, ইসরাইল ও সৌদি জোট  এবং তাদের সামরিক শক্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলোসহ কয়েকটি আরব দেশের সর্বাত্মক সমর্থন পেয়েও দায়েশ সন্ত্রাসীরা পরাজিত হয়েছে এবং ইরাক ও সিরিয়ার সরকার ও প্রতিরোধ যোদ্ধারা বিজয়ী হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন যুদ্ধেও কোনো সাফল্য পায়নি। বরং বর্তমানে আনসারুল্লাহ সংগঠন ও তাদের মিত্রদের ছাড়া ইয়েমেনকে কল্পনা করা যায় না।

২০১৪ সালে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ৩৩ দিনের যুদ্ধে, ২০১৮ সালে চার দিনের যুদ্ধে ও ২০১৯ সালে দুই দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা আয়রন ডোম ফিলিস্তিনিদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতোসব ব্যর্থতার পর আমেরিকা ও সৌদি আরব এখন প্রতিরোধ শক্তির বিরুদ্ধে  অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদে লিপ্ত হয়েছে। তারা ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তাদেরকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

পশ্চিম এশিয়ায় ইসরাইল-মার্কিন বিরোধী প্রতিরোধ শক্তির আত্মপ্রকাশের চতুর্থ প্রভাব হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বহু বিশ্লেষক মনে করেন, আমেরিকা ও তার মিত্ররা প্রতিরোধ শক্তির মোকাবেলায় তাদের দুর্বলতা ঢাকার জন্য দায়েশের মতো বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম দেয়। কিন্তু এতেও তাদের লাভ হয়নি বরং প্রতিরোধ শক্তির ছায়া তলে এ অঞ্চলের মুক্তিকামী জাতিগুলো আরো ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আমেরিকা ও তার মিত্রদের সহায়তায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ শক্তিগুলো মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। পশ্চিম এশিয়ায় ইসরাইল-মার্কিন বিরোধী প্রতিরোধ শক্তির আত্মপ্রকাশের পঞ্চম প্রভাব হচ্ছে, গত নয় বছরের ঘটনাবলীতে প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিরোধ শক্তিগুলো যুদ্ধ ও মৃত্যুকে ভয় পায় না বরং তারা শত্রুর মোকাবেলা করাকে জিহাদ এবং মৃত্যুবরণকে শাহাদাতের মর্যাদা লাভের সুযোগ বলে মনে করে। এ কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের চাইতেও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দৃঢ় মনোবল ও ঈমানি শক্তিকে শত্রুরা বেশী ভয় পায়।

নাসরুল্লাহর নেতৃত্বে লেবাননের হিজবুল্লাহ সংগঠন পশ্চিম এশিয়ায় প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। ইসরাইলের গণমাধ্যমগুলো নাসরুল্লাহর কথিত অসুস্থতাসহ নানান মিথ্যা খবর প্রচার করে এ সংগঠনের সদস্যদেরকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহ মহাসচিবের বিচক্ষণতার কারণে মিথ্যা প্রচার চালিয়েও তারা এ সংগঠনকে দুর্বল করতে পারেনি। হিজবুল্লাহর শক্ত অবস্থানের কারণে এবং তারা ৩৩ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের অপরাজেয় থাকার কাহিনীকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে সক্ষম হওয়ায় ২০০৬ সালের পর থেকে ইসরাইল আর লেবাননের জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি। ২০১১ সালের পর দায়েশ সন্ত্রাসীরা সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তার করার পর লেবাননের জন্যও ওরা হুমকি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহ ও সিরিয়া দায়েশ সন্ত্রাসীদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। ইরানের বিশেষজ্ঞ হোসেন অজারলু বলেছেন, হিজবুল্লাহর শক্তিশালী উপস্থিতির কারণে অন্য প্রতিরোধ সংগঠনগুলা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। হিজবুল্লাহ ইসরাইলের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তাদের টানেলগুলো ও সামরিক কৌশল ইসরাইলের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

এদিকে, দায়েশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ও সিরিয়া সরকারের সাফল্যের কারণে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশ, আমেরিকা ও ব্রিটেন হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী অভিহিত করে তাদেরকে নিষেধাজ্ঞা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি অর্জন ছাড়াও লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সরকারেও এ সংগঠনের বিরাট প্রভাব রয়ছে। ২০১৮ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে এ সংগঠনটি বহু সংখ্যক আসন লাভে সক্ষম হয়।  এ বিষয়টিও ইসরাইলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রিশা হত্যা: ওবায়দুলের ফাঁসির রায়

রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশা (১৪) হত্যা মামলার একমাত্র আসামি ওবায়দুলকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ওবায়দুলকে  ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। গতকাল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে ওবায়দুলকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর বিচারক ৩ টা ৪ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন। রায় পড়া শেষ হয় ৩ টা ৪৫ মিনিটে। মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ইমরুল কায়েস বলেন, ঘটনাটি একটি অসম প্রেম বলে মনে হয়েছে। ভালোবাসা যেন সহিংসহতায় রূপ নিতে না পারে সে জন্য আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়াই শ্রেয়।
আদালতের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী মো. শোয়েব ও বাদী পক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ।
এদিকে, রায় ঘোষণার পর সুরাইয়া আক্তার রিশার মা তানিয়া বেগম দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান। এ সময় তিনি আদালত চত্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, রায়ে আমি খুশি। ফাঁসির রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। আমার মতো যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। রায় শোনার জন্য এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন ও গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান আরেফুর রহমান টিটু। তারাও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তা দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান। এ সময় আদালতে আরো উপস্থিত ছিল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরাও।
২০১৬ সালের ১৪ই নভেম্বর ওবায়দুলকে একমাত্র আসামি করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলী হোসেন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এরপর ২০১৭ সালের ১৭ই এপ্রিল ঢাকা মহানগর অষ্টম অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবুল কাশেম আসামি ওবায়দুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলায় ২৬ সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ২১ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।
নথি থেকে জানা যায়, ঘটনার পাঁচ-ছয় মাস আগে রিশা ও তার মা তানিয়া ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটে বৈশাখী টেইলার্সে কাপড় সেলাই করাতে যান। এ সময় তার মা ওই দোকানের রসিদের রিসিভ কপিতে ফোন নম্বর দিয়ে আসেন। ওই টেইলার্সের কর্মচারী ওবায়দুল রিসিভ কপি থেকে ফোন নম্বর নিয়ে রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বিরক্ত করতো। রিশার মা এ বিষয়ে ওবায়দুলকে সতর্ক করেন। ২০১৬ সালের ২৪শে আগস্ট রিশা ও তার বন্ধু মুনতারিফ রহমান রাফি পরীক্ষা শেষে কাকরাইল ওভারব্রিজ পার হওয়ার সময় রিশাকে ফের প্রেমের প্রস্তাব দেয়। রিশা তা প্রত্যাখ্যান করলে ওবায়দুল তাকে ছুরিকাঘাত করে। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় রিশাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। ২৮ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রিশা। এ ঘটনায় ২৪শে আগস্ট রিশার মা তানিয়া হোসেন বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি মামলা করেন।

এমন হত্যাকাণ্ড দেশ পরাধীন থাকাকালেও ঘটেনি: -ড. কামাল হোসেন

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, দেশ আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, সরকার ভিন্নমত সহ্য করছে না। ভিন্নমতের কারণে যেভাবে একটি মেধাবী ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। এমন হত্যাকাণ্ড পরাধীন আমলেও ঘটেনি। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে গণফোরাম আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন এসব কথা বলেন তিনি। আবরার হত্যার বিচারের দাবি ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, এ রকম ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা জানোয়ারের থেকেও নিকৃষ্ট। যে ছাত্র রাজনীতি ছেলেদের পশুতে পরিণত করেছে, তা থেকে দেশের শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং দেশের বর্তমান যে সংকটময় পরিস্থিতি, তা থেকে দেশকে মুক্ত করে কার্যকর গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সকলকে ঝাঁপিয়ে পড়ারও আহ্‌বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, যে কোন মানুষের ভিন্নমত থাকতেই পারে, তাই বলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে? এ কোন দেশ, কোন সমাজে বাস করছি আমরা? রুগ্ন ও অসুস্থ রাজনীতির কারণে দেশে এক সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণের মালিকানা জোরপূর্বক ছিনতাই করে ক্ষমতা দখলের কারণে আজ গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যেতে বসেছে। সুশাসন ও জবাবদিহিতা নেই। ভিন্নমত দমন, মিথ্যা মামলা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সভা-সমাবেশ করতে বাধা নিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। নিবর্তনমূলক আইন করে সরকার জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করেছে। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে এমন বর্বরতা বন্ধ করতে হবে।
ড. কামাল বলেন, আবরার হত্যার তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি করতে হবে। যেখানে সাবেক বিচারপতি, সাবেক সচিব, সাবেক আইজিপিসহ অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা থাকবেন, যারা গভীর থেকে তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ও আসল ঘটনা বের করে আনতে পারবেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, দলের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, দলের নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ, মুকাব্বির খান এমপি, মেসবাহ উদ্দীন আহমদ, আমীন আমহদ আনসারী, মোশতাক আহমেদ প্রমুখ।

২০১৮ ও ২০১৯ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন অস্ট্রিয়ান সাহিত্যিক পিটার হান্ডকে। এ ছাড়া একইসঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ীদের নামও। এটি জিতেছেন পোল্যান্ডের সাহিত্যিক ওলগা টোকারজুক। গত বছর তিনি ম্যান বুকার পুরস্কারও জিতেছিলেন। দুটি পুরস্কারই তিনি তার লেখা ফ্লাইটস বইটির জন্য পেয়েছেন। গত বছর যৌন কেলেঙ্কারির কারণে সাহিত্যে নোবেল দেয়ার প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়। তাই এ বছর একইসঙ্গে দুই বছরের নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করেছে নোবেল কমিটি।
বৃহসপতিবার রয়েল সুইডিশ একাডেমি নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন। তারা সপষ্ট করে জানান, উভয় নোবেলজয়ীই পুরস্কারের পূর্ণ অর্থ পাবেন।
আগামী ১০ই ডিসেম্বর দুইজনের হাতে তুলে দেয়া হবে নোবেল জয়ের ৯০ লাখ ক্রোনার। নোবেলজয়ী পোলিশ লেখক ওলগা টোকারজুকের জন্ম ১৯৬২ সালে। বাণিজ্যিকভাবে নিজের প্রজন্মের সবচেয়ে সফল লেখক হিসেবে পরিচিত তিনি। এর আগে ১৪ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। এরমধ্যে টনি মরিসন একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। এদিকে, ২০১৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হান্ডকের জন্ম ১৯৪২ সালে। উপন্যাস, নাটক লেখার পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে এই নোবেল জয়ীর। এর আগে পরপর তিনদিনে ঘোষণা করা হয় যথাক্রমে চিকিৎসা, পদার্থ এবং রসায়নে নোবেলপ্রাপ্তদের নাম। এতে চিকিৎসায় নোবেল পান উইলিয়াম জি কেইলিন জুনিয়র, স্যার পিটার জে র‌্যাটক্লিফ এবং গ্রেগ এল স্যামেনজা। আর পদার্থে নোবেল পান জেমস পিবলেস, মিশেল মেয়র এবং দিদিয়ের কোয়েলজ। রসায়নে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা হলেন- জন গুডেনাফ, স্ট্যানলি হোয়াইটিংহাম এবং আকিরা ইয়োসিনো। শুক্রবার শান্তি ও ১৪ই অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা হবে।

রোবট নেবে চাকরি, রোবটই দেবে চাকরি

২০৩০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে শিল্প খাতের দুই কোটি কর্মসংস্থান চলে যাবে রোবটের হাতে। এই খাতে চাকরি হারানো মানুষগুলো সেবা খাতে জায়গা খুঁজে পেতেও প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবেন। কারণ, সেবা খাতেও অটোমেশনের কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৬ জুন বুধবার বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
অবশ্য অটোমেশনের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও চাকরির ক্ষেত্র বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি। সংস্থাটি মনে করছে, যে আয়–বৈষম্যের সৃষ্টি হবে, তা প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
গবেষণায় বলা হচ্ছে, একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট ১ দশমিক ৬টি কর্মসংস্থান নিয়ে নেবে। তা ছাড়া যেসব অঞ্চলের কর্মীরা বেশি অদক্ষ, তাঁদের ওপর প্রভাব পড়বে বেশি।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের এই গবেষকেরা বলছেন, যেসব অঞ্চলে কর্মীরা বেশি অদক্ষ, এ কারণে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে ও বেকারত্ব বাড়ছে, তাঁদের রোবটের কাছে চাকরি হারানোর আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। শিল্প খাতে যাঁরা চাকরি হারাবেন, তাঁরা যোগাযোগ, অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনাসহ নানা ধরনের প্রশাসনিক কাজ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে অটোমেশনের কারণে তাও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। রোবটের কাছে দক্ষ অঞ্চলের মানুষের চেয়ে অদক্ষ অঞ্চলের মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা দুই গুণ বেশি। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পাবে, যা এখনই অনেক বেশি।
অনেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রোবট ও অটোমেশনের কারণে সব ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হারাবে মানুষ—এমন অশনিসংকেত দেওয়া হয়। তবে এই প্রতিবেদন সেভাবে বিষয়টিকে বলা হয়নি। বরং রোবটের কারণে অর্থনৈতিক প্রভাবের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছে তারা। গবেষকেরা বলছেন, অটোমেশনের কারণে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, যার ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। অর্থাৎ, যে পরিমাণ চাকরি হারানোর ভয় থাকছে, সেই পরিমাণ নতুন চাকরি সৃষ্টির উপায়ও থাকছে। এখন বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো সমাজের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না করে নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা। এ ক্ষেত্রে চাকরির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকির বিষয়ে সরকারকে নজর রাখতে হবে।
২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে শিল্প খাতে প্রায় ১৭ লাখ কর্মসংস্থান রোবটের হাতে চলে গেছে। যার মধ্যে ইউরোপে ৪ লাখ, যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ ৬০ হাজার, চীনে সাড়ে পাঁচ লাখ। গবেষণা সংস্থাটি মনে করছে, সবচেয়ে বেশি অটোমেশন হবে চীনে। ২০৩০ সাল নাগাদ এ অঞ্চলে ১ কোটি ৪০ লাখ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট কাজ করবে।

পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন নওগাঁর চাষিরা

উত্তরাঞ্চলের জেলা নওগাঁ ধান ও আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। একসময় এ জেলায় পাট চাষ হতো ব্যাপক। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন এ জেলার কৃষকেরা।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পাট চাষে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কৃষকেরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। এ কারণে তাঁরা পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁ জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি। সেই জায়গায় চাষ হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এ বছর পাট চাষে কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। জেলার ১১ উপজেলার মধ্যে তিনটি উপজেলায় (নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার) চলতি বছর কোনো পাটের আবাদ হয়নি। প্রতি হেক্টর জমিতে ১১ দশমিক ৪২ বেল হিসেবে চলতি মৌসুমে ৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ২৩৩ বেল। ২০১৮ সালে নওগাঁয় পাটের আবাদ হয়েছিল ৬ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদিত হয়েছিল ৮০ হাজার ১৪০ বেল পাট। ২০১৭ সালে জেলার পাটের আবাদ হয়েছিল ৮ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে। পাট উৎপাদিত হয়েছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৭০০ বেল।
জেলায় সবচেয়ে বেশি পাটের আবাদ হয়ে মান্দা উপজেলায়। গত বছরের তুলনায় এ বছর মান্দায় পাটের আবাদ কমেছে। চলতি মৌসুমে পাটের চাষ হয়েছে ১ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে। যেখানে গত বছর চাষ হয়েছিল ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে।
মান্দা উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের কৃষক সুলতান আহমেদ বলেন, গত বছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করে তাঁকে লোকসান গুনতে হয়েছে। তাই এ বছর তিনি পাট চাষ করেননি। তিনি আরও বলেন, পাট চাষে অনেক শ্রম দিতে হয়। উৎপাদন খরচও বেশি। এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে বীজ বপন থেকে শুরু করে পাটের আঁশ ছড়িয়ে শুকানো পর্যন্ত ১৪-১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এক বিঘা জমিতে ভালো ফলন হলে ১০ মণ পাট হয়। এই হিসাবে এক মণ পাটের দাম ২ হাজার টাকার বেশি হওয়া দরকার। কিন্তু গত বছর পাটের দাম ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত।
নওগাঁ সদর উপজেলার বাচাড়ীগ্রামের কৃষক খবির উদ্দিন বলেন, ‘পাট চাষের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সে তুলনায় পাটের দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পাট চাষে তেমন আগ্রহ নেই। তারপরেও আমরা চাষি মানুষ। চাষ করতে হয়। এ বছর ৪০ শতক জমিতে পাটের আবাদ করেছি। দাম ভালো পেলে আগামী বছর আরও বেশি পাটের আবাদ করব। আর লোকসান হলে বিকল্প চিন্তা করতে হবে।’
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনোজিৎ কুমার মল্লিক বলেন, কৃষকদের পাট চাষে আগ্রহ হারানোর পেছনে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া অন্যতম কারণ। এ ছাড়া আরও অনেক কারণ রয়েছে; যেমন এ বছর পাটের বীজ বপণের সময় মে মাসে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ফলে নিচু জমিগুলোতে পানি জমে যাওয়ায় অনেক কৃষক বীজ বপণ করতে পারেননি। তা ছাড়া নওগাঁতে পাট জাগ দেওয়ার জায়গার ভীষণ সংকট। এসব কারনে পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষিরা।

দানবের জন্ম by ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ছাত্রলীগের ছেলেরা আবরার ফাহাদকে মেরে ফেলেছে (তাকে কীভাবে মেরেছে প্রথমে আমি সেটাও লিখেছিলাম কিন্তু মৃত্যুর এই প্রক্রিয়াটি এত ভয়ঙ্কর এবং এত অবমাননাকর যে বাক্যটির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো আবরারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমি প্রক্রিয়াটি না লিখি। দেশ-বিদেশের সবাই এটা জেনে গেছে, আমার নতুন করে জানানোর কিছু নেই)। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমাকে আমার অনেক ছাত্রছাত্রীর মৃত্যু দেখতে হয়েছে, তরুণ ছাত্রছাত্রীর মৃত্যু বেশিরভাগ সময়েই অস্বাভাবিক মৃত্যু-দুর্ঘটনায়, পানিতে ডুবে কিংবা আত্মহত্যা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একজনকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলার একটি ঘটনা ছিল কিন্তু আমার মনে হয় আবরারের হত্যাকাণ্ডটি তার থেকেও ভয়ানক। তার কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারীরা পালিয়ে গিয়েছিল, সম্ভবত এখনও পালিয়েই আছে। কিন্তু আবরারের হত্যাকারী ছাত্রলীগের ছেলেরা পালিয়ে যায়নি।
হত্যাকাণ্ড শেষ করে তারা খেতে গিয়েছে, খেলা দেখেছে, মৃতদেহটি প্রকাশ্যে ফেলে রেখেছে। অপরাধীরা শাস্তির ভয়ে পালিয়ে যায়, আবরারের হত্যাকারীরা নিজেদের অপরাধী মনে করে না। সরকারের সমালোচনা করার জন্য তারা একজন ছাত্রকে “শিবির সমর্থক” হিসেবে “যথোপযুক্ত” শাস্তি দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলটি তাদের জন্য অনেক নিরাপদ জায়গা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তাদের দেখে-শুনে রাখে, তাদের নিরাপত্তা দেয়। কেউ যেন মনে না করে এটি শুধুমাত্র বুয়েটের চিত্র, এটি আসলে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র, কোথাও বেশি কোথাও কম।
হত্যাকাণ্ডের পর আরও একটি নাটক দেখেছি, সেটি হচ্ছে ছাত্রলীগের নিজেদের একটি তদন্ত। একটি হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় অপরাধ, সরকার তার তদন্ত করে বিচার করবে, শাস্তি দেবে, সেখানে অন্যরা কেন নাক গলাবে? আত্মবিশ্লেষণ করতে চায় করুক কিন্তু সেটি কেন গণমাধ্যমের মাঝে আমাদের জানতে হবে? শুধু তা-ই নয়, আমরা সবাই বুঝতে পারি একজন সন্তানের হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবা-মায়ের মনের অবস্থা কী থাকে। সেই সময় খুঁজে খুঁজে অপরাধীদের বের করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার মতো মনের অবস্থা থাকে না। আবরারের বাবা-মা তো তার সন্তানকে বুয়েটের শিক্ষকদের হাতে, প্রশাসনের হাতে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার জন্য তুলে দিয়ে এসেছিলেন। লাশ হয়ে যাওয়া জন্য দিয়ে আসেননি। এ রকম একটি ঘটনার পর কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের ব্যর্থতার দায়টুকু নিয়ে নিজেরা মামলা করার দায়িত্বটুকু নেয় না? বাবা মা আপনজনকে এই অর্থহীন নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি দেয় না?
আমি ঠিক জানি না আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা জানেন কিনা এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রলীগের ওপর কতটুকু ক্ষুব্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতো আমার কোনো রকম হেনস্তা সহ্য করতে হয় না কিন্তু তারপরও আমি যেকোনো সময় চোখ বন্ধ করে তাদের বিশাল অপকর্মের লিস্ট তুলে ধরতে পারব। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভ ঘৃণার পর্যায়ে চলে গেছে এবং দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের যে কয়টি আন্দোলন হয়েছে তার সবই আসলে ছাত্রলীগের প্রতি ভয়ঙ্কর ক্ষোভের এক ধরনের প্রতিক্রিয়া। কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের সভাপতি সিলেট এসেছিল, ঘটনাক্রমে আমিও সেদিন রাস্তায় এবং তখন একসাথে আমি যত মোটরসাইকেল দেখেছি, জীবনে আর কখনও একসাথে এত মোটরসাইকেল দেখিনি। এরা সবাই ছিল ছাত্রলীগের কর্মী।
আমার প্রশ্নটি ছিল খুবই সহজ। একজন ছাত্র এখনও লেখাপড়া শেষ করেনি, তাদের আয় উপার্জন থাকার কথা না, তাহলে তারা কেমন করে এত মোটরসাইকেল কিনতে পারে? ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড যদি শুধুমাত্র মোটরসাইকেল কেনার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতো আমরা হয়তো সহ্য করতে পারতাম। কিন্তু যখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররা অবলীলায় তাদের একজন সহপাঠীকে নির্মম অত্যাচার করে মেরে ফেলে, কারণ তাদের বুকের ভেতর আত্মবিশ্বাস আছে তাদের কিছুই হবে না, সেটা কারও পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না। খুব স্বাভাবিকভাবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রী বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে, এর আগে প্রত্যেকবার যখন এ রকম হয়েছে একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এবারও কি সেটা করার চেষ্টা করবে? তাদের এখনও কি সেই মনের জোর আছে?
খবরের কাগজে দেখলাম, বুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় কুষ্টিয়ায় আবরারের বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছেন। তার অনেক সাহস- আমাদের এত সাহস নেই, আবরারের বাবা-মায়ের চোখের দিকে আমরা তাকাতে পারব না।কেমন করে পারব? যে দেশে একজন ছাত্র নিজ দেশকে ভালোবেসে নিজের মনের কথাটি প্রকাশ করার জন্য সহপাঠীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে মারা যায়, কেউ তাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসে না, সেই দেশের একজন মানুষ হয়ে আমরা কেমন করে মুখ দেখাব?
এই দেশে আমরা আর কতদিন এভাবে দানবের জন্ম দিতে থাকব?

ঢাকায় ৩০ শতাংশ রিকশাচালকই জন্ডিসে আক্রান্ত – গবেষণা

রিকশায় চড়েন না – এমন মানুষ খুব কমই আছে ঢাকা শহরে। কিন্তু আপনি জানেন কি – ঠিক কী পরিমাণ রিকশা ঢাকা শহরে চলে আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট আছে কত মানুষের জীবিকা? কিংবা তাদের মাসিক আয়ই বা কত?
এসব বিষয় নিয়ে প্রথমবারের মত বিস্তর পরিসরে গবেষণা করেছে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার রাইটস বা বিলস নামে একটি শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠান।
ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রিকশা চলছে বলে তাদের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। এই রিকশাগুলো সাধারণত বিভিন্ন সংস্থার অধীনে নিবন্ধন পেয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ বিবিসিকে জানান, “অনেক সময় একই রেজিস্ট্রেশন একাধিক রিকশা দেখা যায়। মানে একই নম্বরে অনেকগুলো রিকশা। যার কারণে রেজিস্ট্রেশন দেখে রিকশার প্রকৃত সংখ্যা বের করা খুব কঠিন।”
তবে ইউনিয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি, গ্যারেজ মালিক, সিটি কর্পোরেশন সবার সাথে কথা বলে ধারণা করা হয় যে, ঢাকা ও এর আশেপাশে প্রায় ১১ লাখ রিকশা চলছে।
ঢাকার রিকশার ওপর নির্ভরশীল ‘২৭ লাখ জীবিকা’
ঢাকার এসব রিকশার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২৭ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে বলে গবেষণায় জানা যায়।
কেননা একটি রিকশা সাধারণত দুই শিফটে চালানো হয়। একজন হয়তো সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চালান, আরেকজন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত।
সেক্ষেত্রে রিকশার সংখ্যা যদি ১১ লাখ ধরা হয় তাহলে রিকশা চালকের সংখ্যাই দাঁড়ায় ২২ লাখে।
সেইসঙ্গে, রিকশা মেরামত, রিকশার যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, গ্যারেজ ব্যবসায়ী সব মিলিয়ে আরও কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এই রিকশার সাথে যুক্ত।
কেমন আয় করেন রিকশা চালকরা?
ঢাকার অন্যান্য শ্রমিকের তুলনায় রিকশা চালকের আয় ভাল বলে মনে করেন বিলসের পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ।
জরিপ দেখা গেছে যে, একজন শ্রমিক যদি প্রতিদিন রিকশা চালান তাহলে মাসে ২৪ হাজার থেকে সর্বনিম্ন ১৩ হাজার ৩৮২ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
রংপুর থেকে আসা মোহাম্মদ লিটন মিয়া প্রায় ১০ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন।
সপ্তাহে ছয় দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে তার দৈনিক আয় হয় ৫০০-৭০০ টাকা। এই হিসেবে তার মাসিক আয় দাঁড়ায় গড়ে ১৮,০০০ টাকা।
এই আয়ের পুরোটাই নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। যেদিন তাদের কোন কাজ থাকেনা, সেদিন রোজগারও নেই।
১০ বছর আগে যেখানে আয় ছিল এর অর্ধেক কিংবা তারও কম, অর্থাৎ দিনে প্রায় ২৫০-৩৫০ টাকা।
এদিকে গবেষণায় উঠে এসেছে যে রিকশাচালকদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ রিকশাচালক অন্য কোন পেশার সুযোগ পেলেও রিকশা চালানো ছাড়তে চান না।
‘ঢাকার ৯৪ শতাংশ রিকশা চালকই অসুস্থ’
আয় রোজগার আগের চাইতে বাড়লেও জীবনমানের কোন উন্নতি হয়নি।
বিশেষ করে তাদের বিশ্রাম, খাবার দাবার, বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেটের সংকটে ভুগতে হয় প্রকটভাবে।
এছাড়া একজন রিকশা চালকের পক্ষে প্রতিদিন রিকশা চালানোও সম্ভব হয় না।
কেননা এই কাজটি খুবই শ্রমসাধ্য এবং রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে তাদের রিকশা চালাতে হয়। যার একটা বড় ধরণের প্রভাব তাদের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে, বলে জানান মিজ. মাহমুদ।
বিলসের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার ৯৪% রিকশা চালকই অসুস্থ থাকেন। বিশেষ করে জ্বর-কাশি, ঠাণ্ডা, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা লেগেই থাকে।
সেইসঙ্গে ৩০ শতাংশ জন্ডিসে আক্রান্ত বলে ওই জরিপে উঠে এসেছে।
তার কারণ তাদের জন্য রাস্তাঘাটে সুপেয় পানির কোন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া টয়লেটের সংকটের ভুগতে হয়।
রিকশা চালক রিপন মিয়া জানান, তাদের বেশিরভাগ সময় ড্রেনে বা গাছপালার আড়ালে টয়লেটের কাজ সারতে হয়।
এছাড়া যে কয়টা মোবাইল টয়লেট বা পাবলিক টয়লেট রয়েছে, সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ৫ থেকে ১০ টাকা গুনতে হয় বলে তিনি জানান।
বেশিরভাগ রিকশাওয়ালা তাদের দিনের খাওয়া সারেন বিভিন্ন টংয়ের দোকানে রুটি, কেক ও চা খেয়ে। যেন তারা ভাত খাওয়ার পয়সা সাশ্রয় করতে পারেন।
এখন রাস্তাঘাটে যদি তাদের কথা ভেবে সস্তায় পুষ্টিকর খাবার বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হতো, তাহলে তাদের হয়তো এতোটা ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো না বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে এই রিকশা চালকরা বড় ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন বলে জানান কোহিনূর মাহমুদ।
এছাড়া রিকশার আকৃতি ও প্রকৃতি আমাদের দেশের গড়-পড়তা যে শ্রমিকরা আছেন তাদের জন্য আদর্শ নয় বলে তিনি মনে করেন।
মিজ. মাহমুদ বলেন, “যেই চালক লম্বা তাকে রিকশাটা নুয়ে চালাতে হয়। যিনি খাটো, তাদের দাঁড়িয়ে চালাতে হয়। আবার যারা শারীরিক প্রতিবন্ধী, তারাও রিকশা চালান। কিন্তু রিকশাটা তাদের অনুযায়ী আরামদায়ক করে হয় না। যার কারণে তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন। এই বিষয়গুলো সবসময় এড়িয়ে যাওয়া হয়।”
এতে করে অনেক শ্রমিকের গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা থেকে শুরু করে তাদের কাজ করার ক্ষমতা আগের চাইতে কমে যায় বলে গবেষণায় উঠে আসে।
অর্থাৎ বেশিরভাগ শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে পারে না বলে জানান মিজ. মাহমুদ।