Wednesday, June 17, 2015

প্রগতিশীল ছাত্রজোটের মিছিলে ছাত্রলীগের হামলা, আহত ২০

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন
করা সহ বিভিন্ন দাবিতে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে
প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করলে
ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠিপেটা করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ
করে দেয়। ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের মিছিলে ছাত্রলীগের হামলায় আহত  হয়েছেন ২০ জন। আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলেজ ক্যাম্পাসে পুলিশের উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার পর ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, নগরের শহীদ মিনারে সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে স্মারকলিপি নিয়ে কলেজ অধ্যক্ষের কাছে যাচ্ছিলেন তাঁরা। সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্রলীগের ভর্তি-বাণিজ্য বন্ধ, শিক্ষার মান ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত এবং কলেজ ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে এই স্মারকলিপি দিতে যাচ্ছিলেন তাঁরা। মিছিলটি কলেজ ক্যাম্পাস গেটের সামনে গেলে ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালান এবং এলোপাতাড়ি মারধর করে তাঁদের তাড়িয়ে দেন। কলেজের মূল ফটক তালা বন্ধ করে ভেতরে এবং বাইরে অবস্থান নেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। পুলিশের উপস্থিতিতে এই হামলা চালানো হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তফা। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের কর্মীরা ক্যাম্পাসে জামায়াত-শিবিরের হরতালবিরোধী মিছিল করছিলেন। একই সময় প্রগতিশীল ছাত্রজোট স্মারকলিপি দিতে গেলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতা-কর্মীরা মাদকাসক্ত ও বহিরাগত। তাই সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁদের প্রতিরোধ করেছেন ।

৭০ শতাংশ অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে -সেমিনারে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের তথ্য

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেছেন, সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে যত অভিযোগ এসেছে তার ৭০ শতাংশই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে অর্ধেকই নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘এটা একটা ভয়াবহ দিক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যদি মনে করে থাকেন, এমন ভয়াবহ অপরাধ করেও তাঁরা পার পেয়ে যাবেন—তাহলে সেটা হবে চরম ভুল ভাবনা।’
গতকাল মঙ্গলবার ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে মিজানুর রহমান এসব কথা বলেন। রাজধানীর ফার্মগেটে ডেইলি স্টার সেন্টারে এক সেমিনারের আয়োজন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আসা সব অভিযোগ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সন্ত্রাসীতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছেন, মানবাধিকার কমিশন এমনটি দেখতে চায় না।’
এই সেমিনারে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আমন্ত্রণ জানিয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের কেউ এখানে আসেননি। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সাদা পোশাকে কাউকে আটক করা যাবে না। কোনো কর্মকর্তা আসামি ধরতে গেলে নিজের পরিচয়পত্র দেখাবেন। আসামিকে ধরার সময় কমপক্ষে দুজন প্রতিবেশীকে সাক্ষী রাখবেন। এরপর ওই আসামিকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে তাঁর পরিবারকে তথ্য দিতে হবে।’
এ বিধানগুলো দেশের প্রচলিত আইনেই আছে। তারপরও এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ দিকনির্দেশনা দাবি করেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘১৫ দিন আগে আটক করে আদালতের নেওয়ার সময় তারিখ চেঞ্জ করে বলবেন গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমনটি হলে ওই আসামির জীবন থেকে চলে যাওয়া বাকি ১৪ দিনের জবাব দিতে হবে রাষ্ট্রকে।’
হেফাজতে মৃত্যু বন্ধে করণীয় প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন, ‘হেফাজতে মৃত্যু হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ছবিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে হবে। এ ধরনের বিধান করলে দুদিনের মধ্যে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল আলীম। তাতে বলা হয়, হেফাজতে নির্যাতন বা মৃত্যু যাতে না হয় তার জন্য দেশে একটি ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন-২০১৩’ রয়েছে। এই আইনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে কারও মৃত্যু হলে দোষী ব্যক্তি বা কর্মকর্তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অথচ বেশির ভাগ মানুষ এই আইন সম্পর্কে জানেন না।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য অ্যারোমা দত্ত, রাউল ওয়ালেনবার্গ ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস সুইডেনের ভিজিটিং প্রফেসর লিয়াল সুঙ্গাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন পিএইচডি গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, এনজিও কর্মকর্তা ও আইনজীবী।

যেভাবে হবে রিজার্ভ ডের ব্যবহার

এবারের ওয়ানডেতেও হানা দেবে না তো বৃষ্টি? ফাইল ছবি
গত বছর ঠিক এই সময়েই হয়েছিল বাংলাদেশ-ভারত ওয়ানডে সিরিজ। তিন ম্যাচের প্রত্যেকটিতেই হানা দিয়েছিল বৃষ্টি। হানা দিতে পারে এবারও। বাংলাদেশের জন্য প্র​তিটি ওয়ানডে এখন র‍্যা​ঙ্কিং বিবেচনায় সোনার চেয়ে দামি বলেই এবার রাখা হয়েছে প্রত্যেকটি ম্যাচের ‘রিজার্ভ ডে’। কিন্তু কীভাবে এই রিজার্ভ ডে ব্যবহার করা হবে, এ নিয়ে একটু ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে।
বিসিবি সূত্র জানিয়েছে, যথাসম্ভব চেষ্টা করা হবে ম্যাচটিকে যেন নির্ধারিত দিনেই শেষ করা যায়। যেন রিজার্ভ ডেতে টেনে নিয়ে যেতে না হয়। একদিনেই ম্যাচ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ বলতে তিনটা উপায়—
১. অতিরিক্ত ৬০ মিনিটের ব্যবহার
প্রতিটি ম্যাচেই হাতে অতিরিক্ত ৬০ মিনিট রাখা হয়। যদি বৃষ্টির কারণে খেলা শুরু হতে বা শেষ হতে কিছু সময় বিঘ্ন ঘটে, হাতে থাকা ওই সময়টা ব্যবহার করা হয়। ধরুন, সূচি অনুযায়ী খেলা শুরু হওয়ার কথা তিনটায়। তখনই শুরু বৃষ্টি। শেষ হলো চারটায়। যদি আর বৃষ্টি না আসে সর্বক্ষেত্রে পুরো ৫০ ওভারই খেলা হবে। কারণ, তখন ওই নষ্ট হওয়া এক ঘণ্টা ব্যবহার হবে হাতে থাকা সময় থেকে। ওদিকে খেলা শেষ হওয়ার কথা ১০টা ৪৫ মিনিটে। সর্বক্ষেত্রে শেষ হবে ১১টা ৪৫ মিনিটে।
২. ওভার কর্তন
হাতে থাকা অতিরিক্ত ৬০ মিনিটও যদি শেষ হয়ে যায় এবং এ সময়ের বেশ পরে খেলা শুরু হয় সর্বক্ষেত্রে ওভার কর্তন হবে। বৃষ্টির কারণে কত সময় নষ্ট হলো, তার ওপর নির্ভর করবে ওভার কর্তনের বিষয়টি। নিশ্চয় মনে আছে, গত বছর জুনে ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডে নেমে এসেছিল ৪১ ওভারে। কাটা হয়েছিল ৯ ওভার।
৩. ডি-এল পদ্ধতি
ডি-এল পদ্ধতি নিশ্চয় জানা। এটি ব্যবহার হয় দ্বিতীয় ইনিংসে। যেমন-গত জুনে বাংলাদেশ করেছিল ২৭২ রান। ডি-এল পদ্ধতিতে ভারতের নতুন লক্ষ্য ঠিক করা হয় ২৬ ওভারে ১৫০। যেটি তারা অনায়াসে টপকেও যায়।
এখন এ তিনটি পদ্ধতি ব্যবহারের পরও যদি নির্দিষ্ট দিনে শেষ না করা যায়, ম্যাচ চলে যাবে রিজার্ভ ডেতে।
এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। রিজার্ভ ডেতে খেলা হবে কীভাবে? আগের দিন যেখানে শেষ হয়েছিল, সেখান থেকেই শুরু? নাকি শুরু হবে একেবারে প্রথম থেকে? বিসিবি জানিয়েছে, নতুন করে আবার ম্যাচ শুরুর সুযোগ নেই। আগের দিন যেখানে শেষ হয়েছিল, ঠিক ওখান থেকেই শুরু হবে ম্যাচ। আর রিজার্ভ ডেতেও ম্যাচ শেষ না হলে সেটি হবে পরিত্যক্ত।
এই পরিত্যক্ত ম্যাচের মাশুল গুনতে হবে বাংলাদেশকে। এই সিরিজটা ২-১-এ হারলেও বাংলাদেশ উঠে যাবে সাতে। কিন্তু ২-০ ব্যবধানে হারলে বাংলাদেশ নেমে যাবে নয়ে। আর ২-১ কিংবা ৩-০তে সিরিজ জিততে পারলে তো কথাই নেই!

জিয়া হত্যাকাণ্ড- যেসব প্রশ্নের উত্তর কখনো মিলবে না by জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

জিয়াউর রহমান
দুঃস্বপ্নের স্মৃতিচারণা কখনোই সুখকর ব্যাপার নয়। তারপরও প্রতিবছর এই সময়ে আমার মন ১৯৮১ সালের ৩০ মের সেই আতঙ্কজনক সকালে চলে যায়, স্থান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস। সেই সকালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আততায়ীর হাতে নিহত হন। শতাব্দীর প্রাচীন ভবনটির অংশবিশেষ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তিনজন নিরীহ মানুষও নিহত হয়। স্থানীয় সেনানিবাস থেকে আসা একদল উর্দিধারী মানুষ এদের সবাইকে হত্যা করেছিল। আমি যখন ভোরবেলা ঘটনাস্থলে পৌঁছাই, তখন সেখানে ভুতুড়ে নীরবতা বিরাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, ঘণ্টা খানেক আগেই সেখানে রীতিমতো যুদ্ধ হয়েছে। সার্কিট হাউসের বারান্দা এবং ওপরের ব্যালকনির একটি অংশ ভাঙা অবস্থায় পড়ে ছিল। দুজন উর্দিধারী মানুষের নিথর দেহ সিঁড়িতে পড়ে ছিল—একটি ছিল পুলিশের, আরেকটি ছিল সেনাসদস্যের দেহ। কিন্তু সবচেয়ে বিপর্যয়কর ও মর্ম বিদীর্ণ করা ব্যাপার ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বুলেটবিদ্ধ দেহ। যে স্যুটে তিনি ছিলেন, তার খানিক দূরেই পড়ে ছিল তাঁর নিথর দেহটি। সেই দৃশ্যটি আমাকে বহুকাল তাড়িয়ে বেরিয়েছে, এমনকি এখনো তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য ছিল। দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটির ডাকে যেখানে পুরো সেনাবাহিনী মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে প্রস্তুত ছিল, সেই রাষ্ট্রপতি কিনা তাঁর নিজের এক লোকের হাতে এভাবে খুন হলেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে খুন করার এই অভিযান সম্ভবত এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। এ কথা বলছি কারণ, সেদিন আমি ভোররাত তিনটার দিকে সম্ভবত প্রথম গুলির শব্দ শুনেছিলাম। আমার বাংলো থেকে সার্কিট হাউসের দূরত্ব ছিল মাত্র এক মাইলের মতো। পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে এক ঘণ্টা পর আমাকে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতিকে খুন করা হয়েছে। আমি সার্কিট হাউসে পৌঁছার এক ঘণ্টা আগেই খুনিরা সেই স্থান ত্যাগ করেছিল। অভিযানটি খুব সুপরিকল্পিত ছিল, তার লক্ষ্যও ছিল একটি। কিন্তু পরবর্তীকালে যে খবর বেরোয়, তা ছিল আরও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও দুর্বোধ্য।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে খুব অল্পসংখ্যক মানুষের এক প্রতিনিধিদল ছিল, তাঁদের সবাই রাতে সার্কিট হাউসেই ছিলেন। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছাড়া এই দলে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, উপদেষ্টা ড. আমিনা রহমান ও আরও একজন প্রতিমন্ত্রী। খুনিরা সেখানে ঢোকার পর তাঁরা নাকি খাটের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমরা সার্কিট হাউসে পৌঁছার পর তাঁরা একে একে বের হয়ে আসেন, বিহ্বল চিত্তে তাঁরা ভয়ে কাঁপছিলেন। সেখানে যে লোকটা সবচেয়ে শান্ত ছিলেন, তাঁর সামরিক ইউনিফর্মও ছিল একদম পরিপাটি, লে. কর্নেল মাহফুজ, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব। আমাদের দেখে বেরিয়ে আসার সময় তিনি বেতার ফোনে কথা বলছিলেন। তিনি খুব শান্ত গলায় আমাদের জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ হেলিকপ্টারে রওনা হয়েছেন। তাঁর মেজাজের প্রশান্তি দেখে মনে হচ্ছিল না যে সেখানে কোনো বিপর্যয় ঘটেছে। তাঁর ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে আছে; একদল বিপথগামী ঘাতকের হাতে রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন।
যে মানুষদের জিয়াউর রহমান নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের হাতেই যে তিনি খুন হবেন, সেটা দুর্ঘটনা নয়। আবার একদল ক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তের কারণে তিনি খুন হয়েছেন, ব্যাপারটা তেমনও নয়। কয়েক বছর ধরে তাঁকে খুন করার এই পরিকল্পনা হয়েছে। দেশ ও আমাদের মতো দলের বাইরের মানুষদের জন্য এটা খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, খুনের প্রকৃত সত্য কখনোই বেরোবে না, অথচ কুশীলবেরা এটা নিয়ে কুশলতার সঙ্গে কত না নাটক করবেন। এর সঙ্গে আরও কিছু যোগ করতে হবে। এই খুনের পর আরও অনেক অস্বাভাবিক ও পরিণাম-অজানা ঘটনা ঘটেছে, এগুলো দেখে আমরা হতবুদ্ধি হয়ে গেছি; যার রেশ এখনো আছে।
সেদিন সকালে লে. কর্নেল মাহফুজের রহস্যময় আচরণের পাশাপাশি প্রথম লক্ষণীয় ব্যাপার ছিল সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে সেনা অনুপস্থিতি। মাহফুজ দাবি করেন, সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘটনার তিন ঘণ্টা পর পর্যন্ত রেডিও বা অন্য কোনো মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা আসেনি। আমাদের তরফ থেকে সকালের দিকে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ফোনে ঘটনাটি জানাই। এরপর চট্টগ্রামের সঙ্গে বাইরের টেলিযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত তা বহাল থাকে। হেলিকপ্টার আসেনি, ঢাকা থেকেও কেউ আসেনি।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার খুনের প্রথম ঘোষণাটি আসে চট্টগ্রাম বেতার থেকে, একজন অজ্ঞাত সেনা কর্মকর্তা এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের সরকারকে হটিয়ে ‘বিপ্লবী কাউন্সিল’ ক্ষমতা দখল করেছে। ছয় ঘণ্টা পার হওয়ার আগে সরকারের তরফ থেকেও অভিযোগ খণ্ডন করা হয়নি। তখন উপরাষ্ট্রপতি এক রেডিও ভাষণে তথাকথিত অভ্যুত্থানের নিন্দা জানান, আর এসব কিছুর দায় চাপান চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের কাঁধে। আর এই তথাকথিত অভ্যুত্থানই বা চট্টগ্রামে কীভাবে ব্যর্থ হলো? এক ডজন সেনা চট্টগ্রাম টেলিফোন ভবন এবং আরেক দল টিভি ও রেডিও ভবন দখল করে নেয়। একজন সেনাও শহরে প্যারেড করেনি, আবার ‘বিদ্রোহী সেনাদল’ যানবাহন চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা করেনি। দেশে কী ঘটেছে, তা নিয়ে পুরো শহরে আতঙ্ক বিরাজ করছিল, পুরো শহরই তখন দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।
এর পরবর্তী অপরিণামদর্শী ঘটনা ছিল মেজর জেনারেল মঞ্জুরের আচরণ, বিদ্রোহের অনুমিত নেতা। তিনি আমাকে (জেলা প্রশাসক) ও বিভাগীয় কমিশনারকে সেনানিবাসে ডেকে নিয়ে নিজেকে তথাকথিত বিপ্লবী কাউন্সিলের মুখপাত্র হিসেবে পেশ করেন। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, এই বিপ্লবী কাউন্সিলে কে কে আছেন, তখন তিনি সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর কথা শুনে মনে হচ্ছিল তিনি মুখস্থ স্ক্রিপ্ট অনুসারে কথা বলছেন (সরকারকে একদম ধুয়ে দিয়ে তিনি ঢাকার সঙ্গে অসহযোগিতার কথা বলেছিলেন, যতক্ষণ না সরকার বিপ্লবী কাউন্সিলের দাবি মেনে না নেয়)। মঞ্জুর সাধারণত শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন, তাঁর কথায় কর্তৃত্ব ছিল। কিন্তু পরবর্তী দিন সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁর সুর ভিন্ন শোনাল। নরম মনে হচ্ছিল তাঁকে, তাঁর আচরণ ছিল নিয়ন্ত্রিত। মঞ্জুরের মধ্যে কে ভর করেছিল?
একই দিন (৩১ মে) মেজর জেনারেল মঞ্জুর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শলাপরামর্শের জন্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেন্দ্রে যান, তিনি ঢাকার সঙ্গে বিরামহীনভাবে কথা চালাতে থাকেন। আমরা এটাও জানি না, ও-প্রান্তে কে ছিলেন। তবে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, তিনি লে. জেনারেল শওকতের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু আমার সূত্র আমাকে জানিয়েছে, সেই বৈঠকে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের পরবর্তীকালে জিয়ার খুনের সঙ্গে জড়ানো হয়েছিল, এমনকি তাঁদের অনেকেই মঞ্জুরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যও দিয়েছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা বক্রাঘাত মনে হয় এ কারণে যে সেনানিবাসে মঞ্জুরের সঙ্গে আমাদের বৈঠকে শতাধিক কর্মকর্তা ছিলেন, যাঁরা তাঁর সঙ্গে বৈঠকের জন্য আমাদের আগেই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে কেউ বলেননি কে কাকে সমর্থন করছেন।
দুঃখজনকভাবে জিয়া হত্যার তিন সপ্তাহ পর বিচারকের খাসকামরায় অনুষ্ঠিত কোর্ট মার্শালে বিদ্রোহের কথিত নেতার ভাষ্য পাওয়া যায়নি, এই বিচারে ১৩ জন কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। আমরা কখনোই প্রকৃত ঘটনা জানব না। এই খুনের পরিকল্পনা
কারা করেছিলেন, তাঁদের চিনতে পারব না। সত্য চিরকালই রহস্যাবৃত হয়ে থাকবে। আক্ষেপের ব্যাপার হচ্ছে, এটা নজির হিসেবে থেকে যাবে, আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকেও তা তাড়িয়ে বেড়াবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: ১৯৭৮-৮১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ছিলেন। অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড দ্য আফটারম্যাথ (ইউপিএল, ২০০৯) গ্রন্থের লেখক।

বাংলাদেশকে ‘শুল্ক ও কোটামুক্ত’ বাণিজ্য সুবিধা দেয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নকে উৎসাহিত করতে এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে  শুল্ক ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা দেয়া। কারণ, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ পোশাক শ্রমিকই নারী। তারা নারীদের ক্ষমতায়নে অগ্রবর্তী ভূমিকা রাখছেন। আর তা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ট্র্যান্স প্যাসিফিক অংশীদারিত্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিষয়ক প্রস্তাবনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন ওয়াশিংটনে অবস্থিত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড শেরম্যান ও টম ম্যারিনোর সঙ্গে পৃথক সাক্ষাতে মিলিত হন। গত ১৫ই জুন শেরম্যান ও ১৬ই জুন ম্যারিনোর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন জিয়াউদ্দিন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রকাশিত এক প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য দেয়া হয়েছে। ইউএস হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপ-কমিটির জ্যেষ্ঠতম সদস্য ব্র্যাড শেরম্যান। রেগুলেটরি রিফর্ম অ্যান্ড কমার্শিয়াল অ্যান্ড অ্যান্টিট্রাস্ট ল বিষয়ক উপ-কমিটির সভাপতি টম ম্যারিনো। বৈঠকে জিয়াউদ্দিন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরেন মার্কিন দুই কংগ্রেস সদস্যের কাছে। তিনি বলেন, লীস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি (এলডিসি) বা সবচেয়ে স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ কোন সুবিধা পায় না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্প বা আরএমজি খাতে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান বাজারের একটি যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক উচ্চ রপ্তানিতে শুল্ক দিতে হচ্ছে। অথচ, এলডিসি’র আওতায় থাকা বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রকে কোন বাণিজ্য শুল্ক দিতে হয় না। দেশগুলো জিরো ট্যারিফের আওতাভুক্ত। জিয়াউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ তৈরি পোশাক শ্রমিকই নারী। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীদের ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চারিত করছে এ বিপুল সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে  শুল্ক ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা দেয়া। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে প্রেরণা যোগাতে এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তা করা।

কাগজটি চেয়ে নেন মোদি

অনিশ্চয়তা ছিল। বৈঠক নিয়ে আলোচনাও ছিল বিস্তর। সাক্ষাৎ না বৈঠক এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। তবে গত ৭ই জুন শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকই করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ওই বৈঠকের দুটি পর্ব ছিল। প্রথম পর্বে বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে তার দলের নেতারাও ছিলেন। আর দ্বিতীয় পর্বে একান্তে বৈঠক করেন নরেন্দ্র মোদি এবং বেগম খালেদা জিয়া। বৈঠকে ঠিক কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা নিয়ে এখনও নানা আলোচনা চলছে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত করেছে সূত্র। যেসব পয়েন্টে কথা বলবেন তা একটি কাগজে লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। আলোচনার শেষদিকে নরেন্দ্র মোদি নিজেই কাগজটি চেয়ে নেন খালেদা জিয়ার কাছ থেকে। বৈঠকে বিএনপি নেতারা বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র নেই দাবি করে এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। এসময় নরেন্দ্র মোদি গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন থাকার কথা জানান। তবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করেন তিনি। নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপির অবস্থান নরেন্দ্র মোদির জানা আছে বলেও বৈঠকে তার পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়। বৈঠকে জামায়াত প্রশ্নে সরাসরি কোন আলোচনা হয়নি বলে সূত্রের দাবি।
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক নিয়ে এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কৌতূহল রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফও একাধিকবার দাবি করেছেন ওই বৈঠকের বিষয়বস্তু প্রকাশের জন্য। ভারতের দ্যা সানডে গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারেও ওই বৈঠক নিয়ে কথা বলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার কাছে সাংবাদিক সৌরভ স্যানাল জানতে চেয়েছিলেন, বেগম জিয়া, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ কেমন হলো? জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, বৈঠক অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে। মোদিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ ছিল চমৎকার। আমি অবশ্যই বলবো, খুবই আন্তরিক পরিবেশে বৈঠক হয়েছে। এতে আমি খুবই সন্তুষ্ট। খালেদা জিয়ার কাছে ভারতীয় এই সাংবাদিক জানতে চান, আপনাদের আলোচনায় মূল কি কি ইস্যু ছিল? জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, যেমনটি আমি বলেছি, বৈঠক হয়েছে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে এবং ফলপ্রসূ। আপনারা দেখেছেন বৈঠকটি ছিল ওয়ান-টু-ওয়ান। আমরা যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছি বাস্তবেই সবটা বলতে পারছি না। তবে এটা বলতে পারি যে, অবশ্যই বৈঠক হয়েছে সন্তোষজনক।

বাংলাদেশ পাকিস্তানও হিন্দু রাষ্ট্র: আরএসএস প্রধান

শুধু ভারত নয়, পুরো ভারতীয় উপমহাদেশই হলো হিন্দু রাষ্ট্র। অন্তত এমনটিই বিশ্বাস করেন ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভগবৎ। শুক্রবার ভারতের লক্ষৌর মাথুরার সংঘ প্রশিক্ষণ শিবিরে বক্তৃতাকালে মোহন ভগবৎ বলেন, ভারত, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তান হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্রের অংশ। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। এ খবর দিয়েছে ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়া টুডে। এমন হিন্দুত্ববাদী বাগাড়ম্বরপূর্ন বক্তৃতা আগেও দিয়েছেন শাসক দল বিজেপির ঘনিষ্ঠ এ কট্টর সংগঠনটির প্রধান। তার ভাষায়, ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র। এটি নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। আমাদের উচিত এ বিশ্বাসে অটল থাকা। আমরা অন্য অনেক কিছুতে পরিবর্তিত হতে পারি। কিন্তু ভারত যে একটি হিন্দু রাষ্ট্র - এ বিশ্বাসকে কোনো মূল্যেই দূরে ঠেলে দেয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, কিছু মানুষ নিজেদের হিন্দু বলে দাবি করে। কেউ বলে, তারা ভারতীয়। কিন্তু আরও কিছু মানুষ আছে, যারা নিজেদের আর্য বলে দাবি করে। আবার অনেকেই বলে, তারা মূর্তি পূজায় বিশ্বাস করে না। অর্থাৎ অনেকে অনেকভাবে নিজেদের পরিচয় দেয়। কিন্তু ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে এসব কোনো প্রতিবন্ধক নয়।
এক পর্যায়ে মোহন ভগবৎ বলেন, যারা ভারতীয় উপ-মহাদেশে বসবাস করে, তারা হিন্দু রাষ্ট্রের অন্তর্গত। তাদের হয়তো ভিন্ন নাগরিকত্ব থাকতে পারে। কিন্তু তাদের জাতীয়তা হলো হিন্দু। নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে তিনি ইতিহাস থেকেও কিছু কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, আরবরা ‘সা’ কে ‘হা’ বলে উচ্চারণ করতো। তাই আমাদের দেশে সিন্ধু নদ থাকায়, তারা আমাদের হিন্দু বলে ডাকতো। এ অঞ্চল থেকেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান পৃথক হয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে হয়েছে বাংলাদেশ। তাই ভিন্ন ভিন্ন এলাকার মানুষের নাগরিকত্ব পাল্টে গেছে। কিন্তু কেউই নিজেদের বাড়িঘর বা দেশ ছেড়ে যায়নি। তাই তাদের সবারই জাতীয়তা এক।
আরএসএস প্রধানের দাবি, কিছু মানুষ মূর্খ, তাই তারা নিজেদের মুসলিম বা খৃষ্টান বলে পরিচয় দেয়। তার মতে, এ অঞ্চলের প্রাচীন নাম হিন্দুস্তান। তাই এখানে যারা বসবাস করে, তারা সবাই হিন্দু। ভগবৎ প্রশিক্ষণার্থী কর্মীদের আরএসএস-এর আদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, পরিস্থিতি স¤পূর্ন আমাদের অনুকূলে। এখনই সময়। আরএসএস-এর প্রত্যেক শাখার উচিৎ নিজেদের ভিত প্রসারিত করার জন্য কাজ করা। যদি আরও উচু ভবন গড়তে চাই, আমাদের আরও মজবুত ভিত তৈরি করতে হবে। একই অবস্থা আমাদের সংঘ পরিবারেরও। আমাদের তাই নিজেদের মজবুত ভিত তৈরি করতে হবে।

গুলশান কার্যালয়ে ঠাণ্ডা লড়াই

ঠাণ্ডা লড়াই চলছে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে। এ লড়াইয়ে একপক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও অপরপক্ষে প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চেয়ারপারসন কার্যালয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও প্রভাব বলয় তৈরি নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই সেখানে দায়িত্বরত কয়েকজন নেতা ও কর্মকর্তার মধ্যে চলছে টানাপড়েন। চলতি বছরের শুরুতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের সময় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর প্রতিবন্ধকতার কারণে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন খালেদা জিয়া। সে সময় দীর্ঘ তিন মাস চেয়ারপারসনের সঙ্গে কার্যালয়ে অবস্থান করেন তার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল। তখন তাদের মধ্যে কিছু বিষয়ে দ্বিমত হলে পুরনো ঠাণ্ডা লড়াই নতুন মাত্রা পায়। সেখানে দায়িত্বরত প্রভাবশালী কয়েকজনের সঙ্গে মিডিয়া উইংয়ের দ্বন্দ্ব উঠে চরমে। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর বাসভবনে ফিরে যান। এরপর থেকে কার্যালয়ে যাতায়াত কিছুদিন কমিয়ে দেন তিনি। খালেদা জিয়া বাসভবনে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন কার্যালয়ে যাননি মারুফ কামাল খান। গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ প্রায় বন্ধ থাকে। জানতে চাইলে, গুলশান কার্যালয় থেকে বলা হয়, প্রেস সচিব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সম্প্রতি খালেদা জিয়া আবারও প্রায়দিনই কার্যালয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু চেয়ারপারসন কার্যালয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন মারুফ কামাল খান। মাঝে-মধ্যে তিনি কার্যালয়ে হাজিরা দিলেও তাকে আগের মতো সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না। গণমাধ্যম কর্মীরাও প্রয়োজনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারটি প্রায় বন্ধ থাকছে। সম্প্রতি তিনি জানান, মামলায় হুলিয়া থাকার কারণে তিনি আপাতত বিচ্ছিন্ন আছেন। কিন্তু যে মামলার আসামির তালিকায় তার নাম রয়েছে একই মামলায় আসামি শিমুল বিশ্বাসসহ প্রেস উইংয়ে দায়িত্বরত দুই কর্মকর্তা। মারুফ কামাল খান বিচ্ছিন্ন থাকলেও তারা প্রত্যেকেই নিয়মিত চেয়ারপারসন কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কার্যালয়ের একপক্ষের সঙ্গে ঠাণ্ডা লড়াইয়ে জড়িয়ে ও শীর্ষ নেতৃত্বের নাখোশ মনোভাবের কারণে সেখানে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছেন সোহেল। সূত্রগুলো জানায়, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অংশ হিসেবে গুলশান কার্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমানকে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সরিয়ে দেয়া হয়। সেখানে ডেকে নেয়া হয় আরেক সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীনকে। কয়েকদিন পরেই শামীমকে ফের গুলশান কার্যালয়ে ফিরিয়ে নেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তাকে ঘিরে এ অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়েও। তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে গুলশান কার্যালয়ের গুটিকয়েক কর্মকর্তার ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্তে চরম বেকায়দায় পড়ে বিএনপি। চলতি বছরের শুরুতে তিন মাসের আন্দোলনে ওইসব প্রভাবশালী কর্মকর্তাই ছিলেন আন্দোলনের হর্তাকর্তা। প্রথমদিকে টেলিফোনে কথা বলা শুরু করলেও সুকৌশলে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন ওই প্রভাবশালী মহল। কার্যালয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে যাতে নেতা-কর্মীরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে না পারেন। চেয়ারপারসনকে একনজর দেখা বা দু’একটি কথা শেয়ার করার জন্য গুলশান কার্যালয়ে এসে আক্ষেপ করে ফিরে যেতে হয় তৃণমূলসহ জেলা নেতাদের। কিন্তু কার্যালয়ের ওইসব প্রভাবশালী কর্মকর্তার পাশাপাশি কিছু সিএসএফ সদস্যের দুর্ব্যবহারের কারণে মনে কষ্ট নিয়ে তাদের ফিরে যেতে হয়। সিনিয়র নেতাদেরও বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের অভিযোগ গুলশান কার্যালয়ের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের কারণে তৃণমূল বিএনপির আসল চিত্রও জানতে পারছেন না খালেদা জিয়া। কমিটি গঠন ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিতে পারছেন না সঠিক সিদ্ধান্ত। ওইসব কর্মকর্তার সঙ্গে যারা সমঝে চলেন গুলশান কার্যালয়ে তারাই পান বেশি কদর। দলের দুঃসময়ে কিংবা আন্দোলনে না থাকলেও তারাই সাক্ষাৎ পান খালেদা জিয়ার। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন এখন সরকার ও বিরোধী দলে নেই। তিনি এখন সংসদের বাইরে বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে গণমাধ্যমের সঙ্গে যে ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার কথা তার প্রেস সচিব তেমনটি নন। গণমাধ্যমের প্রভাবশালীদের সঙ্গে যেমন তার যোগাযোগ কম, তেমনি মাঠপর্যায়ের গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গেও দূরত্ব গড়ে উঠেছে তার। এছাড়া সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসকে নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে খোলামেলা কথা বলেছেন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন। তিনি সেখানে বলেছেন, যে শ্রমিক সংগঠনে আওয়ামী লীগ সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান সভাপতি সেই সংগঠনে শিমুল বিশ্বাস কি করে যুগ্ম সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন।

স্মরণ- আমাদের সঙ্গেই আছেন সরদার স্যার by শান্তনু মজুমদার

সরদার ফজলুল করিম
আজ মনীষী সরদার ফজলুল করিমের প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী। বিকেলে বাংলা একাডেমি আয়োজিত প্রয়াণবার্ষিকীর আলোচনা সভায়, ধারণা করি, আমাদের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের অনেকে হাজির থাকবেন। তাঁর চিন্তার পথের সহযাত্রীরা, তাঁর সান্নিধ্যধন্য মানুষেরাও যাবেন নিশ্চয়। বাংলা একাডেমির আয়োজন, আয়োজনটি ঘিরে কাছের মানুষদের খানিক ব্যস্ততা, আয়োজনের খবর জানতে পারলে হাজির হবেনই এমন মানুষকে খবর দেওয়া—সবই হয়েছে। কিন্তু তবু আমার একবারও মনে হয় না যে তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে আমরা সরদার স্যারের একেবারে শেষের দিকের, সম্ভবত শেষ ব্যাচের ছাত্র। ’৯০ সালে প্রথম বর্ষে যখন তাঁর ছাত্র হই, তখন জানতাম না যে এই ছাত্রত্ব আর কোনো দিন শেষ হবে না। পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তার ক্লাসে আড়াই হাজার বছরের পুরোনো এক প্রশ্ন সামনে রেখে সত্যিকার অর্থেই আমাদের অনেকের মগজ ধোলাই করে দেন তিনি। মারাত্মক সেই প্রশ্ন—ন্যায় কী? এই প্রশ্ন উত্থাপনকারী হলেন গ্রিসের নগর–রাষ্ট্রগুলোর অধঃপতনে আকুল চিন্তাবিদ প্লেটো। কয়েক বছর পরে, শিক্ষকতায় যুক্ত হওয়ার পরে, স্যারের সঙ্গে বেশি বেশি মেশা শুরুর অনেক পরে, বুঝতে শুরু করি যে প্লেটোর উত্থাপিত প্রশ্নটির উত্তর অনুসন্ধানই স্যারের সারা জীবনের ব্রত। এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষের মানুষ অ্যাথেন্সবাসী প্লেটোর পক্ষে সারা জীবন সাফাই গেয়েছেন বাংলার সরদার। অথচ নিজে কোনো দিন কোনো অর্থেই এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে নেই।
ন্যায় কী? কীভাবে ন্যায় কায়েম হয়? ন্যায় কায়েমের সূত্র কী? ন্যায়কে ভিত্তি ধরে মানুষ কেমন করে মানুষ হয়ে উঠবে? তাঁর মনে হয়েছে, এসব জটিলতার সমাধান আছে সমাজতন্ত্র হয়ে সাম্যবাদে। এ জন্য অবশ্য সরদার স্যারের কোনো তাড়া নেই। তিনি মনে করেন, মানুষের সমাজ গঠিত হতে হাজার বছরও লেগে যেতে পারে; কিন্তু তাতে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। স্যারের কথা হচ্ছে, ব্যক্তি হিসেবে সরদার ফজলুল করিম মানুষটি থাকবেন না, কিন্তু মনুষ্য প্রজাতি থেকে যাবে। মানুষের মানুষ হওয়ার সংগ্রামে শরিক হওয়ার গৌরব তাঁকে নির্ভীক করেছে। নির্ভীকতা বলতে সরদার সর্বদা চেঁচানো, ভূতগ্রস্তের মতো বাক্-প্রলাপ, বিপ্লবের সোল এজেন্সি নিয়ে নেওয়া বোঝেন না। তাঁর নির্ভীকতা সৌম্য ও প্রশান্ত। স্কলারশিপে বিদেশে যাওয়া কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চেয়ে নেতারা মনে করলেন যে তাঁকে সাংগঠনিক কাজে বেশি দরকার। সরদার বিনা আক্ষেপে স্কলারশিপ ছাড়েন, মাস্টারি ছেড়ে দেন; পার্টির কাজ করতে থাকেন। মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার কাজ করতে গিয়ে জেল খাটেন ১১ বছর। তাতে কী! এ নিয়ে সরদারের কোনো আক্ষেপ আগে-পরে কখনো দেখা যায় না।
একসময় রাজনীতি থেকে সরে এসে নিবেদিত হন নিবিষ্ট জ্ঞানসাধনায় আর সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি পর্যবেক্ষণে। সরদার বাঙালিকে বাংলায় পরিচয় করিয়ে দিলেন প্লেটোর রিপাবলিক ও সক্রেটিস-বিষয়ক রচনাবলির সঙ্গে। তিনি অনুবাদ করলেন অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, রুশোর সোশ্যাল কনট্র্যাক্ট, এঙ্গেলসের অ্যান্টি-ডুরিং-এর মতো যুগান্তকারী গ্রন্থ। অনুবাদগুলোর প্রতিটির ভূমিকায় সরদার নিজেকে উন্মোচন করেন স্বমহিমায়। জ্ঞানচর্চায় প্রাচ্যের জন্য পশ্চিমকে হারাম ঘোষণার নির্বুদ্ধিতা সরদারকে কখনো ভর করেনি। তাই সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল তাঁর কাছে এলিয়েন নন; কাছের মানুষ। রুশো তাঁর প্রাণের সখা। মার্ক্স-এঙ্গেলস তাঁর জীবনদেবতা।
অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের সংগ্রাম, ‘অবুঝ’ এক পুত্রসন্তানের জন্য উৎকণ্ঠা সব সময় ঘিরে ধরে থাকলেও সরদার ফজলুল করিম তাঁর পর্যবেক্ষণগুলো নিয়ে লিখতেই থাকেন, বলতেই থাকেন। আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি নিয়ে লেখাতে-বলাতে তিনি মানুষের অপার সম্ভাবনার কথা শোনাতেই থাকেন, ভীরুদের সাহস দিতেই থাকেন। এ যুগের তরুণেরা হতাশায় আতঙ্কিত হন। তিনি সতর্ক করেন, ‘ব্যক্তির হতাশা থেকে হতাশার মহামারি হয়।’ ‘হতাশার নিবাস কোথায়?’ তীব্রভাবে জানতে চান সরদার। ইতিহাস–বিস্মৃতি আর ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যান সরদার স্যার। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থা জিন্দা থাকার বিপদ ও কারণ বোঝাতে থাকেন তিনি। এই বিপদ থেকে পার পাওয়া যে সহজ কর্ম নয়, পারলে তা গণতান্ত্রিক শক্তিকে গুলে খাওয়াতে চান সরদার ফজলুল করিম।
স্বাধীনতার পরে দীর্ঘদিনের ব্যবধানে আবার শিক্ষক হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; পদ ও পদোন্নতির চিন্তা মাথার বাইরে রেখে। ক্লাসরুমে সরদারে আবিষ্ট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনুমেয়ভাবেই অনেক। কিন্তু সরদারে আকৃষ্ট অন্যান্য বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অগুনতি। কেন সবাই পাতলা শরীর, হাফ হাতা জামা পরা, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরা, লাঠি হাতে লোকটির কাছে ফিরে ফিরে আসে? তিনি প্রজ্ঞাবান, জাতীয়ভাবে পরিচিত এক শীর্ষ বুদ্ধিজীবী। তিনি প্রগতিশীল, তিনি সৎ। আরও অনেক বিশেষণ সরদার ফজলুল করিমের নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু আমার বিবেচনায়, সত্যিকার অর্থেই অহম বিসর্জন দিয়ে চলতে পারার গুণের কারণেই অসংখ্য মানুষের মনে পৌঁছে গিয়েছেন তিনি; মগজে আটকে না থেকে।
এটা ঠিক যে সরদার স্যার আর লিখবেন না; বলবেন না। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিগুলো আছে, সেগুলো তাঁর অনুসারীদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও, জীবন ও কর্মের নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে নিত্যদিন আমাদের সঙ্গেই থাকবেন সরদার স্যার।
শান্তনু মজুমদার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

ময়লা-আবর্জনায় ভরা মহাসড়ক

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কড্ডা এলাকায়
ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কে এভাবেই ময়লা ফেলে
রাখা হয়েছে। ছবিটি সম্প্রতি তোলা l প্রথম আলো
ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আবর্জনা ফেলে রাখছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। এতে অনেক সময়ই রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। চলাচলের সময় যানজট ও দুর্গন্ধে নাকাল হচ্ছে মানুষ। শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে তুরাগ নদ ও স্থানীয় খাল-বিলে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় সিটি করপোরেশনের কর্মীরা আবর্জনা ফেলছেন। এর মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সদর উপজেলার মালেকের বাড়ি, ছয়দানা, টঙ্গী বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকাসহ বেশ কিছু স্থানে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। একই উপজেলার কড্ডা ও বাইমাইল এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আবর্জনা ফেলতে ফেলতে অর্ধেক অংশ আবর্জনার দখলে চলে গেছে। দুটি মহাসড়কের সংযোগস্থল চান্দনা চৌরাস্তার জাগ্রত চৌরঙ্গী ভাস্কর্যের নিচে প্রকাশ্যে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।
নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ওপরেই সিটি করপোরেশনের আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। যার কারণে মহাসড়কে যানজট লেগে থাকে। এ ছাড়া আছে প্রকট দুর্গন্ধও। নাক চেপে বাসিন্দাদের চলাফেরা করতে হয়। তা ছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের কড্ডা এলাকায় মহাসড়কের দুই পাশে আবর্জনা ফেলায় সেখানেও বেশির ভাগ সময় যানজট লেগে থাকে। বৃহস্পতিবার সকালে ওই এলাকার দুই পাশে তিন কিলোমিটার এলাকায় থেমে থেমে যানজট লেগে ছিল। যানজটে আটকে থাকা বাসযাত্রী রহিম সরকার বলেন, ‘এখানে এলে মনে হয় না আমরা কোনো সভ্য দেশে বসবাস করি।’
কড্ডা এলাকার বাসিন্দা নাছির হোসেন জানান, প্রতিদিন সিটি করপোরেশনের কমপক্ষে ৫০টি ট্রাক বিভিন্ন স্থান থেকে ময়লা-আবর্জনা নিয়ে এসে মহাসড়কের ওপর ফেলে চলে যায়। সড়কটি যখন একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, সেই সময় ময়লা সরিয়ে নেওয়া হয়।
সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কবীর আল আসাদ বলেন, কোথাও জায়গা না থাকায় মহাসড়কের পাশে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বলেন, গাজীপুরে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ মেট্রিক টন আবর্জনা সৃষ্টি হয়। এখন আম-কাঁঠালের সময় তা আরও বেড়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরমের জন্য শ্রমিকও কিছু কম আছে। যে কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে রাস্তা থেকে একটু দূরে সাময়িকভাবে সড়ক ও জনপথের জায়গা পাওয়া গেছে, সেখানে আবর্জনা ফেলার জন্য কাজ চলছে।
এদিকে গাজীপুরের অনেক শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য সরাসরি তুরাগ নদে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় খাল ও বিলেও ফেলা হচ্ছে। গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কারখানাগুলোর মধ্যে ইটিপি স্থাপনযোগ্য শিল্প ইউনিট রয়েছে ৩৫৭টি। গত তিন মাসে ইটিপি স্থাপিত হয়েছে পাঁচটিতে। এ পর্যন্ত ইটিপি স্থাপিত হয়েছে ২৮৪টি শিল্পকারখানায়। ইটিপি সচল আছে এমন কারখানার সংখ্যা ২১৮টি। আর ইটিপি স্থাপনের প্রক্রিয়াধীন আছে ৩৭টি কারখানায়। এ ছাড়া পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৮৭টি কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে ১১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
পরিবেশ অধিদপ্তর গাজীপুরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, ‘অনেক কারখানাই পরিবেশ দূষণ করছে। আমাদের অভিযানও অব্যাহত আছে।’

সাংসদপুত্রকে বাঁচানোর চেষ্টা- আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করুন

গভীর রাতে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে যে ব্যক্তি দুজন দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষকে হত্যা করেছেন বলে অভিযুক্ত, তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আইন প্রয়োগে স্পষ্টতই গড়িমসি লক্ষ করা যাচ্ছে। তিনি ক্ষমতাসীন দলের এক সাংসদের ছেলে বলে তাঁকে রক্ষা করার অপচেষ্টা চলতে পারে না। তাঁর যথাযথ বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গত ১৩ এপ্রিল রাত পৌনে দুইটায় রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের রাস্তায় যানজটে আটকা পড়ে বখতিয়ার আলম রনি নামের ওই ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে নিজের গাড়ির জানালা খুলে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছিলেন বলে নিজেই পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন তাঁর গাড়ির চালক ইমরান ফকিরও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে একই কথা বলেন। কিন্তু বখতিয়ার আলম রনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শনিবার তাঁকে আদালতে নেওয়া হলো, অথচ শুনানির সময় জবানবন্দির জন্য তাঁকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হলো না। এর আগে তিনি অসুস্থতার ভান করে কালক্ষেপণ করেছেন এবং হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাঁর কোনো রোগ পাওয়া যায়নি বলে ডিবি পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এই পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিবিসি বাংলাকে বললেন, ‘ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে এবং কীভাবে ঘটিয়েছে, তা নিয়ে আমরা এখনো স্পষ্ট ধারণা পাইনি।’ মন্ত্রীর এই বক্তব্য এ মামলায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করে। আসামিকে আদালতে বিচারকের সামনে হাজির না করা, তাঁর অসুস্থতা প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর আইনজীবী যখন তাঁর চিকিৎসার আবেদন করলেন, তখন পুলিশের বিরোধিতা না করাসহ মামলাটি পরিচালনার সামগ্রিক দিক লক্ষ করে প্রতীয়মান হয় যে তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরাই তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বাদীপক্ষ দরিদ্র ও দুর্বল, তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেই সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে মামলা লড়ে হত্যাকারীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ব্লু-আইশের ভয়াল থাবা

দেখতে অনেকটা ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো। তবে রং ভিন্ন। নীল অথবা সবুজ রংয়ের ‘ব্লু-আইশ’ নামের নতুন মাদকের ভয়াল থাবা বিস্তার করেছে ঢাকায়। অভিজাত এলাকায় উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা বেশি আসক্ত হচ্ছে এতে। ইয়াবার চেয়েও এ মাদকের ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ মাদক সেবনের ফলে কিডনি দুর্বলতা, যৌন ক্ষমতা হ্রাসসহ শরীরের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।
সূত্র জানায়, ব্লু-আইশ মূলত থাইল্যান্ডে তৈরি হয়ে থাকে। ইন্দোনেশিয়ায়ও তৈরি হয়। তবে বেশি পরিমাণের নয়। পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, ওই ট্যাবলেট চোরাইভাবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করে থাকে। চোরাকারবারিরা কৌশলে তাদের লাগেজে বা বৈধ ওষুধের প্যাকেটে ওই ট্যাবলেট নিয়ে আসে। তবে এখন শাহজালাল আন্তর্জান্তিক বিমানবন্দরে নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় চোরাকারবারিরা এটি মিয়ানমার থেকে এনে বান্দরবান ও কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। যারা ইয়াবা ট্যাবলেট পাচার করে ঢাকায় নিয়ে আসতো তারাই ওই ট্যাবলেট পাচার করে নিয়ে আসে। পরে তারা রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোর বার ও হোটেলগুলোতে সরবরাহ করে থাকে। সরবরাহ বাড়ায় দামও কমেছে এ মাদকের। ফেব্রুয়ারি মাসে গুলশান এলাকার একটি বারে অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা এক তরুণের পকেট থেকে কয়েকটি ব্লু-আইশ ট্যাবলেট উদ্ধার করে। তখন থেকে ওই অভিজাত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করেন ডিবি পুলিশের সদস্যরা। রাজধানীর কয়েকটি নাইট ক্লাবের কর্মচারীরাও এই নতুন মাদকের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তবে যেসব উচ্চবিত্ত ছেলে ও মেয়েদের কাছে আগে ইয়াবা ট্যাবলেট জনপ্রিয় ছিল তারা এখন ব্লু-আইশে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের পশ্চিম বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (মাদক উদ্ধার, দমন ও প্রতিরোধ) মাহমুদ নাসের জনি জানান, আগে ব্লু আইশের অতটা প্রচলন ছিল না। উচ্চবিত্ত পরিবারের উঠতি তরুণ ও তরুণীরা এই ট্যাবলেট সেবন করে থাকে। বেশি সেবন করছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ও তরুণীরা। যেসব বার ও প্রতিষ্ঠান ওইগুলো বিক্রয় করে থাকে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এবং কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
ঢাকা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী কমিশনার মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, আইশ পিল নামে এক ধরনের মাদক ছিল। এটি হেরোইনের মতো সেবন করে মাদক সেবীরা। তবে ঢাকায় ব্লু-আইশের ক্রয় ও বিক্রয় কম হয়ে থাকে।
যোগাযোগ করা হলে মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)’র সভাপতি অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী জানান,‘ ইয়াবা ট্যাবলেটের চাইতে ভয়ঙ্কর ব্লু-আইশ। এটি প্রচণ্ড নেশার আসক্তি বাড়িয়ে দেয়। হার্ট অ্যাটার্ক, লিভারের ক্ষতি ও রক্তচাপের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে সেবনকারী আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।  তিনি আরও বলেন, যেসব ছাত্রছাত্রী ওই ট্যাবলেট সেবন করবে তার স্মৃতি শক্তি কমে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে পারবে না। এতে তার শিক্ষাজীবন ধ্বংস অনিবার্য। দেশ ও জাতির স্বার্থে সকল প্রকারের মাদককে দমন করার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলার প্রতি আহ্বান জানান।

চা-শ্রমিকদের জীবন! by মোহন রবিদাস

বাংলাদেশের চা-শ্রমিকেরা বহুকাল ধরে নিরক্ষরতা, নিপীড়ন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে আসছে। দেশের মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। তারা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, খালি পায়ে, জোঁক, মশা, সাপসহ বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড় খেয়ে মাত্র ৬৯ টাকার বিনিময়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করে, কোনো কথা বলে না।
দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় চা-শ্রমিকেরা সব দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে নিরক্ষরতা। দেশে বাজেটের একটা বিরাট অংশ যেখানে ব্যয় হচ্ছে শিক্ষা খাতে, সেখানে চা-বাগানের শিক্ষার হার অতি নগণ্য। দেশের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে যেমন কোটা-সুবিধা রয়েছে, চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য তেমন কিছু নেই।
চা-বাগানগুলোতে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খুবই নাজুক। অভিজ্ঞ বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী না থাকায় চা-বাগানগুলোতে মাতৃমৃত্যুর হার খুব বেশি। ১৯৬২ সালের টি প্ল্যান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স এবং ১৯৭৭ সালের প্ল্যান্টেশন রুলসে চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা মালিকের দায়িত্ব থাকলেও তা প্রতিপালনের ব্যবস্থা নেই। চা-শ্রমিকেরা ৮ বাই ১১ ফুট মাপের একটি ঘরে অন্তত তিনটি প্রজন্ম বাস করে।
জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাই প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। এখানে কোনো জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করা চলবে না। চা-বাগানে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, কারিগরি বিদ্যালয়, কলেজ প্রতিষ্ঠা ও চা-বাগানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তির প্রচলন করা উচিত। চা-বাগান এলাকায় পর্যাপ্ত সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে চা-শ্রমিকদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মানুষ মনে করলে এসব অবশ্যই করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

যৌন সহিংসতা, ‘ভারতকন্যা’র আয়নায় by কুর্‌রাতুল–আইন–তাহমিনা

দিল্লির গণধর্ষণের এক ঘটনাকে ঘিরে বিবিসির সহপ্রযোজনায় তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং ভারতে সেটা নিষিদ্ধ হওয়া, এসব নিয়ে লিখছি। মনে হচ্ছে, ঢাকায় পয়লা বৈশাখে গণ যৌন হয়রানি, মাইক্রোবাসে আদিবাসী মেয়েটির ধর্ষণের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাগুলোর কথাই লিখে চলেছি। অনেকগুলো প্রশ্ন, ক্রোধ আর বিষাদ বুদ্ধিকে আউলে দিচ্ছে।
১...
লন্ডননিবাসী চলচ্চিত্রকার লেসলি আডউইনের ইন্ডিয়া’স ডটার দিল্লির ‘নির্ভয়া’ গণধর্ষণ ও হত্যার পুরো বিভীষিকা মাথার মধ্যে ভরে দেয়। আরও অনেক অনেক ঘটনার ছায়া উঠে আসে। বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে।
তথ্যচিত্রটিতে ওই ঘটনার দায়ে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া এক আসামির খোলামেলা সাক্ষাত্কার রয়েছে। মার্চের গোড়ায় ছবির প্রচারপর্বে সেটা প্রকাশিত হলে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার টনকটি নড়ে ওঠে। তবে দিল্লির হাকিমের নিষেধাজ্ঞা ভিনদেশে ছবিটার বৈধ সম্প্রচার তো বটেই, এমনকি ভারতেও এটার ‘অবৈধ’ দেখা ঠেকাতে পারেনি। ছবিটা প্রথম দেখায় বিবিসি যুক্তরাজ্যে, ৪ মার্চ। তারপর ইউটিউবসহ ভিডিও ভাগাভাগির সাইটগুলোতে কর্তৃপক্ষের নিবারণী তত্পরতার সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলতে খেলতে এ তথ্যচিত্র ছড়িয়ে পড়ে।
আডউইন ঘটনাটি ধরে ধর্ষণের কারণ ও মানসিকতার খোঁজ করেছেন। ঘটনাটির প্রতিবাদে বিস্ফোরিত জনবিক্ষোভের গতিপথে তিনি আশার দিশা খুঁজেছেন। কিছু অতিসরলীকরণ সত্ত্বেও ছবিটা সত্যকে দেখায়।
এ তথ্যচিত্রের পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ও বাক্-স্বাধীনতার প্রশ্ন সেটাকে গুলিয়ে তুলেছে। তর্ক-বিতর্কগুলো মূল বিষয়ের জটিলতাকেই দেখায়। বিষাদ গভীর হয়। বিষাদ, ‘নির্ভয়া’দের জন্য। বিষাদ, জগেজাড়া বাস্তবতা নিয়ে।
২...
দক্ষিণ দিল্লিতে ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যারাতে এক পুরুষবন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরতে বাসে উঠেছিলেন ফিজিওথেরাপির ইন্টার্ন মেয়েটি। বাসে ছিলেন চালক ও তাঁর ভাই-বন্ধু-সহকারী মিলে মোট ছয়জন, একজন তখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক। চলন্ত বাসে বন্ধুটিকে গণমার মেরে তাঁরা মেয়েটিকে ক্ষতবিক্ষত করে ধর্ষণ করেন। হাত আর লৌহদণ্ড দিয়ে মেয়েটির অন্ত্র টেনে বের করেন। তারপর দুজনকেই রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেন। ১৩ দিনের মাথায় সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে মেয়েটি মারা যান।
ঘটনার পরপরই দিল্লিতে জনবিক্ষোভ শুরু হয়, চলে মাসাধিককাল। ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য শহরেও। সরকার বাধ্য হয় যৌন নিপীড়ন-সংক্রন্ত আইন খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিতে। চার মাসের মধ্যে আইন কঠোর হয়।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ছয়জন দ্রুত গ্রেপ্তার হন। বছর ঘোরার আগেই নিম্ন আদালত ঘটনাটিকে বিরলের মধ্যে বিরলতম বলে বাসচালক মুকেশ সিংসহ চারজনকে ফাঁসির দণ্ড দেন। দিল্লির হাইকোর্ট রায়টি বহাল রাখেন। এখন সর্বোচ্চ আদালতে এঁদের আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে। মুকেশের ভাইটি আগেই জেলের ভেতরে কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, আত্মহত্যা করেছিলেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেটিকে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ড তিন বছরের জন্য সংশোধনকেন্দ্রে পাঠান। ডিসেম্বরে সে বেরিয়ে আসবে।
আডউইনের ছবির অনেকটা জুড়ে আছে দিল্লির তিহার জেলে বাসচালক মুকেশের সাক্ষাত্কার। তিনি চেনা সাফাই গেয়েছেন, ‘তালি বাজাতে দুহাত লাগে। শরিফ মেয়ে হলে রাত নয়টায় ঘুরে বেড়াত না। ধর্ষণের জন্য ছেলের চেয়ে মেয়ে বেশি দায়ী।’
মুকেশ বলেছেন, ছেলেমেয়ে সমান নয়; নারীর স্থান ঘরে। অথচ নারীরা রাতেবেরাতে স্বল্প বসনে ডিসকো-বারে ঘুরছে, ‘গলত’ কাজ করছে। শতেকে ২০ জন হয়তো ভালো।
আলাদা সাক্ষাত্কারে জেহাদি জোশে একই বোল তুলেছেন আসামিপক্ষের দুই উকিল। গা গুলিয়ে বমি পায়।
উকিল এম এল শর্মা বলেছেন, ‘মেয়ে ঠিক ফুলের মতো—দেখতে সুন্দর, ভারি কোমল, সুখকর একটা বিষয়। অন্যদিকে, পুরুষ হচ্ছে ঠিক কাঁটার মতো। বলবান, শক্তপোক্ত। ফুলের চাই সুরক্ষা। নর্দমায় ফেললে ফুল নষ্ট হবে, মন্দিরে রাখলে পূজিত হবে।’
উকিলজুটি রায় দিয়েছেন, ‘আমাদের সমাজে সন্ধ্যার পর মেয়েদের ঘরের বাইরে বেরোনোর অনুমতি নেই, বিশেষত বেগানা পুরুষের সঙ্গে। শর্মাজি বলেছেন, মেয়েকে রাস্তায় খাদ্যের মতো ফেলে রাখতে নেই। মেয়েরা হীরার চেয়েও দামি —‘যদি তুমি তোমার হীরা রাস্তায় ফেলে রাখো, অতি অবশ্যই সেটা কুকুরে (?!) নিয়ে নেবে।’
শর্মাজির আরেক রায়, আমাদের সংস্কৃতিতে ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব অচল—‘মেয়ে মানেই ছেলের চোখে যৌনচিন্তা জাগাবে। আমাদের হচ্ছে সেরা সংস্কৃতি। আমাদের সংস্কৃতিতে নারীর কোনো স্থান নেই।’
এসব কথা কি নতুন বা বিরল? এই বাংলাদেশে হেফাজতের বৃদ্ধ আমির বলেছিলেন, মেয়েছেলেরা তেঁতুলের মতো, পুরুষের জিবে পানি আনবেই। ঢাকায় পুলিশের বড় কর্তা সেদিন যৌনহয়রানিকে বললেন ছেলেদের ‘দুষ্টামি’।
ঢাকাতেই ১৯৯৯ সালে ইংরেজি নববর্ষের রাতে রাজপথে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন যে মেয়েটি, তখনকার সরকারদলীয় সাংসদ জয়নাল হাজারী তাঁর সাজা চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অত রাতে রাস্তায় বেরিয়ে মেয়েটিই দোষ করেছেন। সম্প্রতি মাইক্রোবাসে আদিবাসী মেয়েটির গণধর্ষণের শিকার হওযার ঘটনায় তিনি স্বেচ্ছায় গাড়িতে উঠেছিলেন কি না, তা আলোচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন মাধ্যম ভাইস নিউজে এক তথ্যচিত্রে দেখি, ছাতকের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, মেয়েরা পর্দা করলে ধর্ষণ ঘটে না।
ইন্টারনেট ঘাঁটলে মাথা ঝিমঝিম করে। লক্ষ্মণরেখা টেনে, যৌন সহিংসতার জন্য নারীকেই দায়ী করে, সহিংসতাকে অস্বীকার করে, পুরুষোচিত লঘু স্খলন বলে বাণী দিয়েছেন বড় বড় লোকেরা। দেশে দেশে।
২০১২ সালে কলকাতায় সুজেট জর্ডনের গণধর্ষণের পর অশ্লীল কটাক্ষ করেছিলেন ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রী, অধুনা জেলবাসী মদন মিত্র। সুজেটকে যৌনকর্মী বলেছিলেন তৃণমূলেরই সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ঘটনাটা সাজানো। (১৯ জুন ২০১৩, এনডিটিভি)
পাশ্চাত্যে ‘ডেট রেপ’ বা ছেলেবন্ধুর হাতে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে নাক-সিঁটকানি ব্যাপক। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক কংগ্রেস সদস্য রিপাবলিকান টড আকিন টিভি সাক্ষাত্কারে গর্ভপাতবিরোধিতার যুক্তি হিসেবে বলেছিলেন, ধর্ষণ বৈধ হলে নারীর শরীর গর্ভধারণ ঠেকিয়ে দেয়। (১৯ আগস্ট ২০১২, নিউ ইয়র্ক টাইমস)
‘বৈধ ধর্ষণ’, ‘নারী ধর্ষণযোগ্য’ অথবা ‘ধর্ষণযোগ্য নারী’, এমনকি শিশু?
ইনডিয়া’স ডটার নিয়ে বিতর্কের সূচনাকালে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডশায়ারে সংঘবদ্ধ সহিংস শিশু যৌন শোষণের ব্যাপকতার ওপর আলো ফেলে। দেখা যায়, পুলিশ ও সমাজসেবা কর্মীরা ভেবেছেন, ১১ বছরের মেয়েও নিজের ইচ্ছায় ধর্ষিত হয়েছে। এই শিশুদের ‘বেয়াড়া’ ও ‘অকালপক্ব’ ধরে নিয়ে তাঁরা তাদের দুষেছেন, নির্যাতনের কথা বিশ্বাস করেননি। (৩ মার্চ, বিবিসি ও গার্ডিয়ান)
গত বছর যুক্তরাজ্যের রদারহ্যাম শহরে এমন প্রবণতার ওপর একই ধারার তথ্য দিয়েছিল একটি তদন্ত প্রতিবেদন (২৬ আগস্ট ২০১৪, বিবিসি ও গার্ডিয়ান)। সমস্যাটি আরও বিস্তৃত ও জটিল, তবে ঘটনাগুলো ১৫-১৬ বছর ধরে চলার পেছনে রক্ষা কর্মকর্তাদের মনোভাবকে বড় কারণ বলা হয়েছে।
৩...
বাংলাদেশে আজও সমাজপতিদের সালিসে ধর্ষণের শিকার নারীকে ‘জেনা’র দায়ে দোর্রা মারা হয়। ধর্ষকের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক খোঁজা হয়। ২০১১ সালে শরীয়তপুরের কিশোরী হেনার হত্যা এভাবেই ঘটেছিল। ঘটে আত্মহত্যা।
এ.পি. সিং ইনডিয়া’স ডটার-এ আবির্ভূত দ্বিতীয় উকিল। ছবিটায় মক্কেলদের ফাঁসির রায় ঘোষণার পরপর টিভিকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাত্কারের ক্লিপ দেখি। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তাঁর মেয়ে বা বোন বিয়ের আগে কোনো সম্পর্কে জড়ালে অথবা চাল-চরিত্র খারাপ করলে তিনি পুরো পরিবারের সামনে তাকে পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়ার সাহস রাখেন। ছবিতে সাক্ষাত্কারে জোর গলায় তিনি বলেন, আজও এটাই তাঁর ‘স্ট্যান্ড’।
মুকেশ বলেছেন, ‘নির্ভয়া’র ক্ষেত্রে ধর্ষণ মুখ্য ছিল না। ‘অ্যাক্সিডেন্টাল’ যা ঘটেছে, সেটা সবক শেখানোর অধিকারে করা হয়েছে। ছেলেতে মেয়েতে ‘এত রাতে’ ঘুরবে কেন? উদ্দেশ্য ছিল, ‘ওর সাথে গলত কাজ করব, কাপড় খুলে দেব’, ওরা লজ্জায় কাউকে বলবে না। ‘আকল মিলেগি’—শিক্ষা হবে।
মুকেশের মতে, মেয়েটির উচিত ছিল চুপচাপ নিজেকে ধর্ষিত হতে দেওয়া। তা হলে মরতে হতো না। (ইংরেজি প্রবাদটি মনে পড়ে যায়—ধর্ষণ যদি ঠেকাতে না পারো, তবে বরং উপভোগই কর।)
মুকেশ বলছেন, তাঁদের ফাঁসি মেয়েদের বিপদ বাড়াবে। এখন কেউ ধর্ষণ করলে মেয়েটিকে সোজা মেরে ফেলবে। ‘আগে যারা রেপ করত, বলত ছেড়ে দেই, কাউকে বলব না।’ এই ভয় দেখানোর মধ্যে কিন্তু তাঁর নিজের ভয়টাই ফুটে ওঠে। সামাজিক লজ্জা ভেঙে ধর্ষণের কথা প্রকাশ পেলে ধর্ষকের শাস্তির ভয়।
৪...
ভারতের সরকার মুকেশের সাক্ষাত্কার দেখেই ছবিটা ঠেকাতে উঠেপড়ে লাগে। পুলিশের তুরন্ত ফরিয়াদের ভিত্তিতে দিল্লির এক হাকিমি আদালত সাক্ষাত্কারটির সব রকম প্রকাশ নিষেধ করেন জনরোষ ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের আশঙ্কার যুক্তিতে। পুলিশ আরও বলেছিল, মুুকেশের বক্তব্য নারীর জন্য অবমাননাকর, এটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।
ছবিটা নারী দিবসে ভারতের এনডিটিভিতে দেখানোর কথা ছিল। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রাইভেট চ্যানেলগুলোকে আইনের ভয় দেখিয়ে ‘পরামর্শ’ পাঠায়। তাতে আরও বলা হয়, সাক্ষাত্কারটি নারীর প্রতি সহিংসতাকে উসকে দেবে। তা ছাড়া, দণ্ডিতদের আপিল বিচারাধীন থাকায় এর প্রচার আইনি প্রক্রিয়াকে বাধা দেবে।
সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও মেয়েটির মর্যাদাহানি এবং বিচারাধীন বিষয়ের যুক্তি দিয়েছেন। ছবিটার বিরুদ্ধে একই ধারার যুক্তি দেখিয়েছিল ভারতের নারীবাদী চিন্তক-আন্দোলনকর্মীদের একাংশ। তর্কবিতর্কে জোরালো পাল্টা যুক্তিও কিন্তু উঠে এসেছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নিষেধাজ্ঞার আদত কারণ জাত্যভিমান—আঁঁতে ঘা লাগা। সংসদীয় মন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু লোকসভায় বলেছিলেন, এ ছবি ভারতের মানহানি করার একটা চক্রান্ত (৪ মার্চ, পিটিআই)। আর বিজেপির মুখপাত্র লোকসভাসদস্য মীনাক্ষী লেখী রাজ্যসভায় বলেছিলেন, এটা পর্যটনের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলবে (৪ মার্চ, এনডিটিভি)!
৫...
লজ্জা, দায় এড়ানো ও ভয় নানা রূপ ধরে। জবাবদিহি চাইলে ক্ষমতা ক্ষিপ্ত হয়।
পুলিশের ভয় ছিল, ছবিটা দেখালে ‘নির্ভয়া’র ঘটনা-পরবর্তী জনবিক্ষোভের পুনরাবৃত্তি হতে পারে (৪ মার্চ, দ্য হিন্দু)। ছবিতে ২০১২ সালের ওই বিক্ষোভ দমনে পুলিশের লাঠিপেটা করা, জলকামান দাগা সহিংসতার ফুটেজ দেখি।
অদম্য ওই জনবিক্ষোভ হয়ে উঠেছিল মেয়েদের মুক্ত জীবন, নিরাপত্তা ও সম-অধিকারের দাবি। পুঞ্জীভূত ওই বিক্ষোভের চাপই কর্তৃপক্ষকে শেষতক পথে আসতে বাধ্য করেছিল।
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের দিনাজপুরে শিশু গৃহকর্মী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছিল পুলিশের তিন সদস্য। পুলিশ পরে ইয়াসমিনকে যৌনকর্মী বলেছিল। গণবিক্ষোভে গুলি চালিয়ে মানুষ মেরেছিল। দেশজোড়া প্রতিবাদের চাপেই ধর্ষণকারীদের বিচার ও ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়।
ফিজিওথেরাপির ছাত্রী ‘নির্ভয়া’র ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের সাভারে পোশাকশ্রমিক রাহেলা আখতারের গণধর্ষণ ও হত্যার কথা। রাহেলার ধর্ষকেরা কুপিয়ে তাঁর ঘাড়ের পেছনটা (স্পাইনাল কর্ড) বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন জঙ্গলে ফেলে রেখে যায়। দুদিন পর ফিরে এসে রাহেলাকে জীবিত দেখতে পেয়ে তাঁরা অ্যাসিড ঢেলে চলে যায়। রাহেলাকে পাওয়া যায় পরদিন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় এক মাস যুঝে তিনি মারা যান। ঘটনাটির প্রতিবাদী বিক্ষোভ ছিল বিক্ষিপ্ত, স্বল্পায়ু। প্রায় পাঁচ বছর পর মাত্র একজন আসামির ফাঁসির দণ্ড হয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাঁকে আজও ধরেনি।
কোন ঘটনা কেন সমাজের নারী-পুরুষকে ব্যাপক বিক্ষোভে টেনে আনে, সেই প্রশ্ন মনে আসে।
৬...
ইনডিয়া’স ডটার-এ তিহার জেলে মুকেশের তিন সহযোগীকেও দেখি। চারজনই দেখতে গড়পড়তা সাধারণ মানুষ।
মুকেশ নিজেকে নির্দোষ বলে নিপাট মুখে নৃশংসতার বিবরণ দেন। তিনি বলেন, তাঁরা সেদিন ‘মৌজ-মস্তি’ করতে বেরিয়েছিলেন। তিনি ভাই-বন্ধুদের বেপরোয়া গায়ের জোরের কথা বলেন। বলেন, তাঁর ভাই আগেও ধর্ষণ করেছেন; অনেকেই করে, পারও পেয়ে যায়।
ছবিটায় তাঁদের বস্তির পরিবেশ, পরিবারের দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতা আর নাবালক ছেলেটির প্রসঙ্গে পথশিশুর জীবন দেখানো হয়েছে। সেখানে মারধর, নারীর প্রতি সহিংসতা ও অবজ্ঞার ব্যাপ্তির কথা বলা হয়েছে। এটা আর্থসামাজিক বৈষম্যের বিষবৃক্ষকে অবয়ব দিয়েছে, অপরাধের পটভূমির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকে আলো ফেলেছে।
তবে ভুললে চলবে না, কেবল দারিদ্র্যই ধর্ষকের জন্ম দেয় না। অনেক ধর্ষক বিত্তবান, ক্ষমতাধর। সমস্যাটা একা ভারতেরও নয়।
জাতিসংঘের হিসাবে পৃথিবীতে পাঁচজনে একজন নারী জীবনকালে কখনো না কখনো ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার শিকার হবে। যুক্তরাষ্ট্রে দুটি জরিপে ছয় থেকে পাঁচজনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন (এনআইজে, ১৯৯৮; সিডিসি, ২০১০)। জরিপ বলছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ২০ জনে একজন নারী ১৫ বছর বয়স থেকে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন (এফআরএ, ২০১৪)।
জরিপগুলো স্বামী বা নিকটসঙ্গীর হাতে ধর্ষণের ব্যাপকতার কথাও বলে। বাংলাদেশে ১৫ পেরোনো নারীদের জীবনকালে ২৩ জনে একজন অন্য পুরুষের হাতে এবং বিবাহিতদের তিনজনে একজন স্বামীর হাতে এমন সহিংসতার শিকার হয়েছেন (বিবিএস, ২০১১)।
সব পুরুষ ধর্ষণ করে না। এমন প্রতিটি অপরাধের জটিল পটভূমি থাকে। তবে এ কথা স্বীকৃত যে, ধর্ষণ তথা সহিংসতার আকর নারীকে পুরুষের চেয়ে কমদামি, তুচ্ছ বলে ভাবার মধ্যে। নারীকে ভোগ করা, সবরকমে নিয়ন্ত্রণে রাখাকে পৌরুষ বলে ভাবার মধ্যে।
প্রকাশ্য বা সুপ্ত এ মানসিকতা দুনিয়াজুড়েই ব্যাপ্ত। কতজনের মধ্যে? এ প্রশ্ন প্রত্যেক পুরুষ-নারীর নিজেকেই করার।
মুকেশ এবং উকিল জুটির বক্তব্য অনেককে লজ্জা দিয়েছে। কিন্তু সেগুলোর নগ্ন প্রকাশের পরই শুধু দিল্লির উকিলসমাজ শর্মাজি ও সিংজিকে জবাবদিহির মুখোমুখি করেছে।
‘নির্ভয়া’র মা বলেছিলেন, ‘কোনো ক্রাইম হলে সোজা মেয়ের ওপর আক্রমণ হয় যে ওর বাইরে যাওয়া ঠিক নয়; এত দেরি পর্যন্ত ঘোরাফেরা ঠিক নয়; এই কাপড় পরা ঠিক নয়। এই দোষ যদি ছেলের ওপর আরোপ করা যায় যে, সে কেন এমন করে—ওর এমন করা ঠিক নয়...।’
ধর্ষণের বিচার কমই মেলে। বিচার ও শাস্তির জন্য প্রতিবাদ-বিক্ষোভ খুব জরুরি। কিন্তু আসল যুদ্ধটা মানুষের মনের অচলায়তনের সঙ্গে। লজ্জাকর মানসিকতাকে ধামাচাপা দেওয়া নয়, স্বীকার করাটা তাই প্রথম কাজ।
৭...
‘নির্ভয়া’র বাবা-মা তথ্যচিত্রটির আন্তর্জাতিক সংস্করণে মেয়ের নাম প্রকাশ করেছেন। ছবির নামপাতায় ভাসে—ইনডিয়া’স ডটার, জ্যোতি সিংয়ের কাহিনি।
জ্যোতি সিং আশা ও বদ্রীনাথ সিংয়ের কন্যা। কাহিনির শুরুতে মা বলেন, মেয়ের জন্মে তাঁদের ঘরে খুশি এসেছিল। বিমানবন্দরে শ্রমিকের কাজ করা বাবা বলেন, মেয়ের চিকিত্সক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি জমি বেচেছিলেন।
গল্পের পরিণতিতে থমধরা সন্ধ্যায় নদীতীরে কার চিতা জ্বলে। মায়ের হাত ছোট্ট ভেলায় প্রদীপ জ্বালে। ভেলায় হলুদ গাঁদাফুল আর সাদা চন্দ্রমল্লিকার মালা। ভেলা ভেসে যায়।
বাবার গলা ভেসে আসে, ‘যেতে যেতে ও এমন এক মশাল জ্বেলে গেছে, যাতে একটি দেশ শুধু নয়, পুরো বিশ্ব প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ও এক প্রশ্নচিহ্নও রেখে গেছে—নারীর মানে কী? সমাজে আজ নারীকে কী চোখে দেখা হয়?’ মা আবছা গলায় মেয়ের শেষ মুহূর্তের কথা বলেন...।
ঘটনার পর ঘটনা ঘটছেই। মানুষ হওয়ার জন্য মানুষকে আরও কত পথ হাঁটতে হবে?।
কুর্‌রাতুল–আইন–তাহমিনা: সাংবাদিক

নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা দরকার- পুলিশ যখন অভিযুক্ত

পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত নিজেরাই করে আসছে এবং তারা তা বজায় রাখতে চায়। পুলিশের বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুটি কমিটি করলে পুলিশের এই মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিজেরাই তদন্ত করলে যে খুব কাজে দেয় না, তা পুলিশের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডে পরিষ্কার। নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে পুলিশ এ ক্ষেত্রে তাদের ভাবমূর্তি খুব উন্নত করতে পেরেছে, এমনটি বলা যাবে না। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন কতটুকু আইনসম্মত ও তা কতটুকু কাজে দেবে, সেটাও বড় প্রশ্ন।
সাধারণভাবে বোঝা যায় যে নিজেদের বিচার নিজেরা করতে গেলে সেখানে ছাড় দেওয়া, পক্ষপাতিত্ব বা বাঁচানোর চেষ্টা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপারে পুলিশ সব ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করেছে ও ব্যবস্থা নিয়েছে, এমন ভাবমূর্তি দুঃখজনকভাবে পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে পারেনি। বাইরের কোনো কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তাই দীর্ঘদিনের। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, তার মাধ্যমে তা আদৌ পূরণ হবে বলে মনে হয় না।
বর্তমান আইন অনুযায়ী পুলিশের যেকোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের। আইন পরিবর্তন না করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তের উদ্যোগ অকার্যকর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে তদন্তের উদ্যোগ রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কাই বেশি, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পৃথক ও নিরপেক্ষ একটি কমিটির মাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনো অভিযোগের তদন্তের উদ্যোগ নেওয়াই বাঞ্ছনীয়। এতে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত যেমন নিশ্চিত করা যাবে, তেমনি পুলিশ বাহিনীর ম্রিয়মাণ ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করা সম্ভব।
আমরা মনে করি, বিষয়টি মন্ত্রণালয় বা পুলিশ—এই গণ্ডির মধ্যে বিবেচনা না করে আরও বড় পরিসরে বিবেচনা করা উচিত।

মুজাহিদের ফাঁসি বহাল

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে তাকে দেয়া ট্রাইব্যুনালের সাজা বহাল রেখে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল এ রায় দেয়। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। রায়ের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী আজ সকাল ৬টা থেকে আগামীকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছে।
এই প্রথম যুদ্ধাপরাধের কোন মামলায় আপিল বিভাগের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে রায় দিলো। এর আগে তিনটি মামলার রায়ই ঘোষণা করা হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে। গতকাল রায় ঘোষণার পরপরই আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমি মনে করি এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ ছিল না। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেলেই রিভিউ আবেদন দায়ের করা হবে। অন্যদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ রায়ে বাংলাদেশের সবাই খুশি হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, রায় কার্যকরের জন্য এখন রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। রায়ের কপি পাওয়ার পর আসামিপক্ষ ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন দায়ের করতে পারবে। রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তির পর রায় বহাল থাকলে আসামিকে প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য যৌক্তিক সময় দেয়া হবে। ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি নিষ্পত্তির পরই রায় কার্যকর হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল অবশ্য বলেছেন, রায়ের কপি পাওয়ার পরপরই রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। আসামি রিভিউ আবেদন দায়ের করলে ওই কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাবে।
২০১৩ সালের ১৭ই জুলাই মুজাহিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই বছর ১১ই আগস্ট ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন তিনি। গত ২৯শে এপ্রিল থেকে আপিলের শুনানি শুরু হয়। নয় কার্যদিবসে শুনানি শেষ হয়। আসামিপক্ষে এসএম শাহজাহান ছাড়াও সিনিয়র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন শুনানি করেন। তাদের সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মুহাম্মদ মুনির। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মামলায় দেখা যায়, প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম অভিযোগে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণের পর হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। একই রায় এসেছিল সপ্তম অভিযোগে, ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সমপ্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায়। আপিল বিভাগের রায়ে প্রথম অভিযোগের ক্ষেত্রে আসামির আপিল মঞ্জুর করে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। সপ্তম অভিযোগে তার সাজা কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে মুজাহিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ৩০শে আগস্ট রাত ৮টায় পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি মুজাহিদ, ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে তারা আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে দেখে তাদের গালাগাল করেন। একপর্যায়ে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন যে, প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। মুজাহিদ অন্যদের সহায়তায় আটকদের একজনকে ছাড়া অন্য বন্দিদের অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করেন এবং তাদের লাশ গুম করেন। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। আপিল বিভাগের রায়ে সেই সাজাই বহাল আছে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে তৃতীয় অভিযোগে ফরিদপুর শহরের খাবাসপুরের রণজিৎ নাথকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় মুজাহিদকে। আপিল বিভাগও ওই সাজা বহাল রেখেছে। দ্বিতীয় অভিযোগে ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে হিন্দু গ্রামে গণহত্যা এবং চতুর্থ অভিযোগে আলফাডাঙ্গার আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও তাতে মুজাহিদের সংশ্লিষ্টতা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে খালাস দিয়েছিল।
এখন পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লার। আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় ভোগ করছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। মৃত্যুর কারণে আপিল পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় গোলাম আযম ও আবদুল আলিমের মামলায়।
হিটলারের সঙ্গে এদের তফাৎ নেই: অ্যাটর্নি জেনারেল
আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেছেন, মুজাহিদের ফাঁসির রায় এসেছে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে। এই রায়ে বাংলাদেশের সবাই খুশি হবে। বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে যে ক্ষতি করেছে, তা এক শতাব্দীতেও পূরণ হওয়ার নয়। হিটলারের যে হিংস্রতা আর এদের হিংস্রতার কোন তফাৎ আমি দেখি না। নিজ কার্যালয়ে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, এক শতাব্দীতে এরকম বুদ্ধিজীবী তৈরি হবে না। তবে এটুকু সান্ত্বনা বিচার পাওয়া গেলো। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আজ আমি শর্ট অর্ডার চাইনি। আগেরবার চেয়েছিলাম, দেয়া হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ চাইনি। আশা করছি শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ রায় পেয়ে যাবো।
আমরা ন্যায় বিচার পাইনি: মুজাহিদের ছেলে
আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বলেছেন, রায়ের কপি পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই রিভিউ আবেদন দায়ের করা হবে। এদিকে, আপিল বিভাগের দেয়া রায়ে ন্যায় বিচার পাননি বলে জানিয়েছেন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, যেহেতু ট্রাইব্যুনালে আমরা ন্যায়বিচার পাইনি, সেহেতু ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলাম। কিন্তু এখানেও ন্যায় বিচার পাইনি। আমরা সংক্ষুব্ধ। এখন আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব। তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যার যে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে, সেখানে কাকে হত্যা করা হয়েছে তা অভিযোগে নেই। কোন ভিকটিম পরিবারের সদস্য এসে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়নি। এ অভিযোগে কিভাবে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলো তা আমার কাছে মিসট্রেরিয়াস।
আপিলেও ন্যায়বিচার পাইনি: মুজাহিদ পুত্র
আপিল বিভাগের দেয়া রায়ে ন্যায় বিচার পাননি বলে অভিযোগ করেছেন আলী আহসান মুজাহিদের পুত্র আলী আহমেদ মাবরুর। ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেয়া রায়ের প্রতিক্রিয়ার মুজাহিদ পুত্র বলেন, যেহেতু  ট্রাইব্যুনালে আমরা ন্যায়বিচার পাইনি, সেহেতু ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম  কোর্টে আপিল করেছিলাম। কিন্তু এখানেও ন্যায়বিচার পাইনি। আমরা সংক্ষুব্ধ। এখন আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবো। তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যার যে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে, সেখানে কাকে হত্যা করা হয়েছে তা অভিযোগে নেই। কোন ভিকটিম পরিবারের সদস্য এসে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেননি। এ অভিযোগে কিভাবে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলো তা আমার কাছে মিসট্রেরিয়াস (রহস্যময়)। এদিকে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড বহালের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা মহানগরীর রমনা জামায়াত কর্মীরা মগবাজার চৌরাস্তায় বিক্ষোভ করে। মহানগরীর মজলিসে শূরা সদস্য আ.জ.ম কামাল উদ্দিন ও ড. আহসান হাবিবের নেতৃত্বে বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন- রমনা থানা জামায়াতের সেক্রেটারি জিল্লুর রহমান, বনানী সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম, জামায়াত নেতা ইউসুফ আলী, আতাউর রহমান সরকার, শিবির নেতা জামিল মাহমুদ, আশরাফ উদ্দিন প্রমুখ।
জামায়াতের হরতাল আজ
আজ সকাল ৬টা থেকে আগামীকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত টানা ২৪ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ আপিল বিভাগে বহাল রাখার ঘটনায় হরতালের ডাক দেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ। এক বিবৃতিতে মকবুল আহমাদ দাবি করেন, ‘সরকার জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে বিচারের নামে প্রহসনের আয়োজন করছে। সরকারি ষড়যন্ত্রের শিকার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তার আপসহীন নেতৃত্বে দিশাহারা হয়ে সরকার তাকে হত্যার উদ্দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করে। আপিল বিভাগের এ রায়ে মুজাহিদ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। দেশের জনগণ এ রায়ে হতাশ।’ জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর বলেন, ‘সরকারের দায়ের করা মামলাটি সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফরিদপুর জেলসহ বাংলাদেশের কোন থানায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত কোন অপরাধের জন্য মামলা হয়েছে- এমন কোন তথ্য তিনি পাননি। মামলার আইও এটাও স্বীকার করেছেন, মুজাহিদ আল বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল শামস বা এ ধরনের কোন সহযোগী বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন- এমন কোন তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। এরপরও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে সরকারের সাজানো মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। তিনি জুলুমের শিকার হয়েছেন।’ মকবুল আহমাদ বলেন, ‘আলী আহসান মুজাহিদ এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করবেন। রিভিউ আবেদনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে তিনি খালাস পাবেন বলে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মিল-অমিল

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গতকাল জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া  এক বিবৃতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য বৈঠক প্রশ্নে গত ৫ই জুন সাংবাদিক সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু তাতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি বরং নতুন করে তা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
যমুনা টেলিভিশনের কূটনৈতিক প্রতিবেদক মাহফুজ মিশু প্রশ্নটি করেছিলেন। তার প্রশ্নের দুটি অংশ ছিল। অডিও টেপ (যেটি আমাদের হাতে রয়েছে) থেকে নেয়া ভাষ্যে দেখা যায়, তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, আমার জানার বিষয় হচ্ছে বাইলেটারাল টকস-এ দুই প্রধানমন্ত্রীর, বাংলাদেশের এক নম্বর এজেন্ডা কি? আমরা কোন বিষয়ে সবচেয়ে জোরালো অবস্থানে থাকবো? এবং দ্বিতীয় হচ্ছে- একটা গুঞ্জন মাননীয় মন্ত্রী, সেটা হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক এখনও নির্ধারিত না। সেটি হওয়ার কোন সম্ভাবনা আপনারা দেখছেন কিনা?
দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাব আগে দেন মন্ত্রী। বলেন, “এটাতো আমার মনে হয় না এখানে এটার কোন সুযোগ আছে।”
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের এজেন্ডা কি থাকছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, “কানেকটিভিটি, আমাদের প্রধান উপজীব্য। এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আদান-প্রদান কিভাবে বাড়ানো যায় সেটাই হবে প্রধান প্রতিপাদ্য।”
গতকাল সংসদে মন্ত্রী বলেন, “উত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘এই প্রশ্নের অলোচনার’ এখানে কোন সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না।”
উল্লেখ্য যে, মন্ত্রী গতকাল তার বিবৃতিতে প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে “বিএনপিপন্থি” বলে চিহ্নিত করেন। অথচ ওই সাংবাদিক নিজকে বিএনপিপন্থি বা কোন পন্থি হিসেবে পরিচয় দেন না। তিনি পেশাদার সাংবাদিক। উপরন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে কোন বিএনপিপন্থি সাংবাদিকের প্রবেশাধিকারে বাধা-নিষেধও ছিল না।
ওই সাংবাদিক সম্মেলনের পরে এ বিষয়ে অনেক ঘটনা ঘটে। তাঁর ওই মন্তব্য নিউজ রুমগুলোতে স্বাভাবিক চমক সৃষ্টি করেছিল। তাই বিভিন্ন চ্যানেল ও অনলাইনের স্ক্রলে তাঁর ওই মন্তব্য ফলাও করে প্রচারিত হয়। ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকাতেও ছাপা হয়। কিন্তু  পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগ বা সরকারের তরফে এর তাৎক্ষণিক কোন প্রতিবাদ হয়নি। কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।  অথচ এ রকম একটি ‘মিথ্যা’ খবরের কূটনৈতিক তাৎপর্য ছিল অসাধারণ। এর প্রতিবাদ করা হয় ৯ই জুন ইত্তেফাকে রিপোর্ট ছাপা হওয়ার পরে।
যুগান্তর পত্রিকা ও যমুনা টেলিভিশন একই মিডিয়া হাউসের পত্রিকা। এর একজন সাংবাদিককে ‘বিএনপিপন্থি’ এবং অপরজনকে মন্ত্রী তাঁর দেয়া বক্তব্যের স্বপক্ষে নিরপেক্ষ সাংবাদিক হিসেবে হাজির করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বিবৃতিতে যমুনার “বিএনপিপন্থি” সাংবাদিকের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি। আবার তিনিই বিবৃতিতে বলেন, যুগান্তরের সাংবাদিক জনাব মাসুদ করিম মোহনা টিভিতে বলেছেন, আমি ছিলাম ওই ব্রিফিংয়ে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে, “এই প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনার কোন সুযোগ নেই।”
ইত্তেফাকের রিপোর্টমতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রী তার ওই মন্তব্যের জন্য সমালোচিত হন। এরপরই তিনি প্রতিবাদ করেন।
অথচ ঢাকায় তার ওই মন্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় কিংবা কাকতালীয়ভাবে হোক বা না হোক, দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জয়শঙ্কর ৫ই জুনেই নিশ্চিত করেন যে, মোদি-খালেদা বৈঠকটি হচ্ছে। এই ঘটনা দৃশ্যত বাংলাদেশ সরকার বা আওয়ামী লীগের মর্যাদা বাড়ায়নি। তাছাড়া ৫ই জুনের বরাতে যেসব খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল তা ছিল কূটনৈতিকভাবে ভুল। কারণ বিদেশী মেহমান কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বা করবেন না, সে বিষয়ে স্বাগতিক দেশের আগ বাড়িয়ে কোন মন্তব্য সাজে না। সুতরাং ভুলভাবে খবরটি প্রচারিত হয়ে থাকলেও তা ছিল যথেষ্ট স্পর্শকাতর, সে কারণে গতকাল বা তার আগে ৯ই জুন যা বলা হয়েছে তা বলা উচিত ছিল ৫ বা ৬ই জুনেই।
লক্ষণীয় যে, সানডে গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকার প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সংসদে বিবৃতি দিলেন। কিন্তু তিনি ওই পত্রিকার সাংবাদিকের নিজস্ব বক্তব্যকে খণ্ডন করেননি।
তিনি বাংলাদেশী সাংবাদিককে আক্রমণ করলেন। ভারতীয় সাংবাদিককে নয়।
বেগম খালেদা জিয়ার জবানিতে নয়, সানডে গার্ডিয়ানের সাংবাদিক সৌরভ স্যানাল নিজের জবানিতে তার লেখার সূচনাতেই সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে প্রথম বাক্যেই লিখেছেন, “উইল শি অর ওয়ান্ট শি, দ্যাট ওয়াজ দ্য কোয়েশ্চেন।” প্রধানমন্ত্রী মোদি তার  প্রথম শুরুর আগেই বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে মোদির বৈঠকের সামান্যই সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বিবৃতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্কর কোন অনিশ্চিত ভাষায় নয়, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, মোদি-খালেদা বৈঠকটি হবেই।

বছরে ১৬ কোটি টাকার পণ্য নষ্ট by অরূপ রায়

রাজধানীর কাছেই সাভারের নামা বাজার। সেখানকার গুদাম
আর পাইকারি দোকানের পণ্য ইঁদুরের আহারে পরিণত
হওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে ব্যবসায়ীদের l ফাইল ছবি
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা নেই; বাঁশির সুরও নেই। তবে আছে ডাল, চাল, গমসহ নানা খাদ্যশস্য। আর তার টানেই ঝাঁকে ঝাঁকে কালো ইঁদুর আস্তানা গেড়েছে রাজধানীর কাছেই সাভারের নামা বাজারে। সেখানকার গুদাম আর পাইকারি দোকানের পণ্য কালো ইঁদুরের আহারে পরিণত হওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে ব্যবসায়ীদের। প্রতিবছর ইঁদুরের কারণে এই বাজারের ব্যবসায়ীদের ১৬ কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হচ্ছে।
ইঁদুরের কারণে সাভারের ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখতে এই প্রতিবেদক ওই বাজারের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩০টি প্রতিষ্ঠান থেকে এক মাস ধরে তথ্য সংগ্রহ করেন। জরিপের জন্য নির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে একটি ছক তৈরি করে ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করা হয়। তাঁদের পূরণ করা ওই ছক থেকে টাকার অঙ্কে ক্ষতির এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এই জরিপে দেখা গেছে, ইঁদুর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে ডাল ব্যবসায়ীদের।
বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বহু প্রাচীন এই বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নানামুখী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার ব্যবসায়ী। এসব ব্যবসায়ীর সবারই স্বার্থ কোনো না কোনোভাবে ইঁদুরের আক্রমণের শিকার হয়ে আসছেন।
সাভার বাজার ডাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও চৌধুরী ট্রেডার্সের মালিক আবদুল বারী চৌধুরী বলেন, ডালপট্টির ব্যবসায়ীরা ইঁদুরের আক্রমণের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর অন্তত ৫০ বস্তা ডাল ইঁদুরের পেটে যায় অথবা বিনষ্ট হয়; যার মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। এ ছাড়া খালি বস্তা কেটে ইঁদুর আরও প্রায় ১২ হাজার টাকা ক্ষতি করে বছরে। তিনি বলেন, সরকার শুধু কৃষিক্ষেত্রে ইঁদুর নিধনের অভিযান চালায়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এই ক্ষতির দিকে মনোযোগ নেই।
নামা বাজারের পত্তন ইংরেজ আমলে। তখন নদীর পাড়, উঁচু ভূমি—সব মিলিয়ে বাজারটি আশপাশের কৃষিনির্ভর এলাকাগুলোর প্রধান শস্য কেনাবেচার স্থানে পরিণত হয়। এখনো এটি সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের একাংশের খাদ্যশস্য কেনাবেচার গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
প্রথম আলোর জরিপে ৫০টি ডাল, ২০টি চাল, ২০টি পশুখাদ্য, ৫টি ওষুধ, ৫টি কাপড়ের, ২৩টি মুদি, ৫টি হোটেল এবং ২টি পাখিখাদ্যের পাইকারি দোকান ও গুদামের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে দেখা যায়, এসব দোকানে বছরে ৫৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের পণ্য ইঁদুরের পেটে যায় অথবা ইঁদুরের কারণে বিনষ্ট হয়। এই হিসাবে ইঁদুর প্রতিবছর বাজারটির পাঁচ হাজার ব্যবসায়ীর ১৬ কোটিও বেশি টাকার খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য খায় অথবা বিনষ্ট করে।
সাভার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রইস উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ইঁদুর নিশাচর ও সর্বভুক প্রাণী। তাই সব ফসলের মাঠ বা দোকান-গুদাম যেখানে তারা যা পায়, তা-ই খায়। এখন শুধু কৃষি খাতে ফসল নষ্টকারী ইঁদুর নিধনের কার্যক্রম নেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাভারের নামা বাজারে ইঁদুরের কারণে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণে খাদ্যশস্য ও পণ্য বিনষ্ট হওয়ার বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হবে; যাতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
১৩০টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির চিত্র: প্রতি কেজি ডালের গড় মূল্য ৪০ টাকা হিসাবে বছরে একটি ডালের দোকান বা গুদামে ৬৮ হাজার টাকার ডাল ইঁদুরের পেটে যায় অথবা বিনষ্ট হয়। এই হিসাব অনুযায়ী, ৫০টি দোকান বা গুদামে বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪ লাখ টাকায়। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে অন্তত সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার খালি বস্তা কেটে বিনষ্ট করে ইঁদুর।
সাভার বাজারে চালের দোকান রয়েছে ১২০টি। জরিপ চালানো হয় ২০টিতে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর এসব দোকানের প্রায় ১৫ হাজার কেজি চাল ইঁদুরের পেটে যায় অথবা বিনষ্ট হয়। ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের গড় মূল্য দুই হাজার টাকা হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ টাকা। আর বস্তা কাটার কারণে ক্ষতি ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
বাজারটিতে মুদি দোকানের সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে জরিপের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে ২৩টি দোকান। এসব দোকানে বছরে অন্তত ২ লাখ ৩০ হাজার টাকার পণ্য ইঁদুরের পেটে যায় অথবা বিনষ্ট হয় বলে হিসাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজারটিতে ৫০টি পশুখাদ্যের দোকানের মধ্যে ২০টিতে জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ইঁদুরের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা বছরে অন্তত ৪ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হন।
একইভাবে পাঁচটি ওষুধের দোকানের ক্ষতি অন্তত ৫০ হাজার টাকা। কাপড় কেটে ফেলায় বছরে একটি দোকানের ক্ষতি হয় অন্তত ১০ হাজার টাকার। সে অনুযায়ী পাঁচটি কাপড়ের দোকানের ক্ষতি ৫০ হাজার টাকা।
পাঁচটি হোটেলে বছরে ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায় ৭৫ হাজার টাকা। আর দুটি পাখিখাদ্যের দোকানের ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৫০ হাজার টাকা।
ডাল ব্যবসায়ীদের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি: জরিপের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, একটি ডালের দোকান বা গুদামে প্রতিবছর ১ হাজার ৭০০ কেজি ডাল ইঁদুরের পেটে যায় অথবা বিনষ্ট হয়। প্রতি কেজির গড় মূল্য ৪০ টাকা ধরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৮ হাজার টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী, ৫০টি দোকানে ৮৫ হাজার কেজি ডাল ইঁদুর খায় অথবা বিনষ্ট করে; যার মূল্য দাঁড়ায় ৩৪ লাখ টাকা।
একইভাবে একটি দোকানে বছরে ৯০৯টি বস্তা কেটে নষ্ট করে ইঁদুর। প্রতিটি বস্তার মূল্য ১২ টাকা হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯০৯ টাকা। এই হিসাবে ৫০টি দোকানে বস্তা কাটার কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয় ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪০০ টাকা।
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ব্যবসায়ীরা চান সরকারিভাবে এই বাজারে যেন ইঁদুর নিধন অভিযান চালানো হয়।

পাকুন্দিয়ার তিন গ্রামে আতঙ্ক by আশরাফুল ইসলাম

অজ্ঞান করে স্বর্ণালঙ্কারসহ মালামাল লুটের
সময় এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়ে দুই সদস্য
ভয়ংকর খেলায় পর্যুুদস্ত পাকুন্দিয়ার তিন গ্রামের মানুষ। দস্যুচক্রের হানায় তছনছ এসব গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবন। বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম খাবার গ্রহণেও গ্রামবাসীর মাঝে কাজ করছে চরম আতঙ্ক। অভিনব কায়দায় ঘরের রান্না করা খাবারে চেতনানাশক উপাদান মিশিয়ে দস্যুচক্র লুটে নিচ্ছে সর্বস্ব। অনেকের বিপন্ন হচ্ছে জীবন ও স্বাস্থ্য। উপজেলার খালিশাখালী, কাওয়ালীকান্দা ও ঠুটিরজঙ্গল এই তিন গ্রামে এভাবেই একের পর এক পরিবার খুঁইয়েছে নগদ টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। চেতনানাশক মিশিয়ে পরিবারের সব সদস্যকে অজ্ঞান করে গত দুই বছর ধরে প্রায় নিয়মিত ভাবেই ঘটছে এমন দস্যুতার ঘটনা। তারপরও থামছে না এ মরণখেলা। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত ধরা পড়েনি চক্রের হোতা বা কোন সহযোগী।
পারিবারিক প্রয়োজনে একখণ্ড জমি কেনার জন্য দীর্ঘদিন যাবৎ টাকা জমাচ্ছিলেন কাওয়ালীকান্দা গ্রামের কৃষক আবদুল হাই খান। এরপরও প্রয়োজনীয় টাকার সংস্থান করতে না পেরে জমি বন্ধক দিয়ে ২ লাখ টাকা জোগাড় করেন তিনি। নিরাপদ স্থান মনে করে সেই টাকা ঘরের টেবিলের বক্সে রেখে তালা দিয়ে দেন। এ ঘটনা গত ৩০শে মে সকালের। কিন্তু ওইদিন রাতেই ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। রাত ৮টার দিকে খাবার খাওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই একে একে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েন পরিবারের ৩ সদস্যের সবাই। রাত দেড়টার দিকে আবদুল হাই খানের ঘরে তালা ভাঙার শব্দে প্রতিবেশী এক স্বজনের ঘুম ভাঙলে তিনি ওই বাড়ির দরজায় ৪-৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির অবস্থান টের পান। এ সময় তার ডাকচিৎকারে অন্য প্রতিবেশীরাও এগিয়ে আসলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। তবে এর আগেই তারা লুটে নেয় টেবিলের বক্সে রাখা ২ লাখ টাকা। ঘরে তখনও বেহুঁশ বৃদ্ধ আবদুল হাই খান (৬৫), তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৫৬) ও ছেলে জিল্লুর রহমান (৩০)। তাদের চেতনাহীন অবস্থা বুঝতে পেরে প্রতিবেশীরা উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী হোসেনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে দু’দিন চিকিৎসার পর জ্ঞান ফিরে তাদের। কেবল আবদুল হাই খানের পরিবারই নয় স্থানীয় দস্যু চক্রের এমন ভয়ংকর উৎপাতে কাওয়ালীকান্দা গ্রাম ছাড়াও খালিশাখালী ও ঠুটিরজঙ্গল গ্রামেরও প্রায় প্রতিটি পরিবারই অতিষ্ঠ। একই কায়দায় কাওয়ালীকান্দা গ্রামের আতাহার মিয়ার পরিবারের ৬ সদস্য, সুরুজ মিয়ার পরিবারের ৩ সদস্য, মুসলেহ উদ্দিনের পরিবারের ৩ সদস্য, আবদুল খালেকের পরিবারের ৩ সদস্য, বোরহান মিয়ার পরিবারের ৩ সদস্যের সবাইকে ঘরের রান্না করা খাবারে চেতনানাশক উপাদান মিশিয়ে অজ্ঞানের পর সেসব পরিবারের মূল্যবান সামগ্রী ও নগদ টাকা লুটে নিয়েছে দস্যুচক্র। এছাড়া খালিশাখালী গ্রামের ৩ সদস্যের আবুবক্করের পরিবার, ৫ সদস্যের মজলু মিয়ার পরিবার, ৬ সদস্যের মানিক মিয়ার পরিবার, ৫ সদস্যের ফারুক মিয়ার পরিবার ও ৪ সদস্যের বকুলা আক্তারের পরিবার এবং ঠুটিরজঙ্গল গ্রামের ২ সদস্যের গফুর মিয়ার পরিবার, ৪ সদস্যের হাফিজ উদ্দিনের পরিবার, ৪ সদস্যের কামাল মিয়ার পরিবার ও ৪ সদস্যের আলামিনের পরিবার একই রকম লুটের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। কাওয়ালীকান্দা গ্রামের আবদুল হাই খান জানান, তাদের গ্রামের মৃত ফজলুর রহমানের ছেলে খোকন এই অজ্ঞান চক্রের হোতা। খোকনের সহযোগীরা গ্রামের মানুষের বাড়িতে রান্না করার সময় খাবারে চেতনানাশক ওষুধ মেশাতে কৌশলে ওত পেতে থাকে। সুযোগ বুঝে তারা যে বাড়ির খাবারে সে ওষুধ মেশাতে পারে, সে বাড়ির সর্বনাশ আর কেউ ঠেকাতে পারে না। এরকম ভাবে চক্রটি নিজগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে ভয়ংকর এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে অজ্ঞান চক্রের সদস্যদের দ্বারা পরিবারগুলো আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও অনেকের জীবন ও স্বাস্থ্য বিপন্ন হচ্ছে। আবদুল হাই খান আরও জানান, তার পরিবার আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরই তিনি প্রতিকার চেয়ে পাকুন্দিয়া থানায় অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। পরবর্তীতে পুলিশ সুপারের নিকট আবেদন করেও অদ্যাবধি কোন প্রতিকার পাননি বলে তিনি মন্তব্য করেন। এদিকে জেলা শহরের চরশোলাকিয়া এলাকায় দস্যুচক্রের কয়েক সদস্য বাসা ভাড়া নিয়ে একই কায়দায় দস্যুতা করে আসছিল। সোমবার রাতের খাবারে একই বাসার ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন দয়ালের পরিবারের রান্না করা খাবারে চেতনানাশক মিশালে তা খেয়ে পরিবারের চার সদস্যই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে কৌশলে দরজা খুলে স্বর্ণালঙ্কার ও ২টি মোবাইল সেট লুট করে পালানোর সময় রাত ৩টার দিকে স্থানীয়দের হাতে চক্রের লিজা (১৯) নামে এক নারী সদস্য ও হেলাল মিয়া (৪০) নামে এক সহযোগী ধরা পড়ে। তবে এ সময় কৌশলে চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য সোহেল পালিয়ে যায়। পরে তাদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
আটককৃতদের মধ্যে হেলাল মিয়া সদরের রঘুনন্দপুর গ্রামের মৃত হাফিজ উদ্দিনের ছেলে এবং লিজা উত্তর বৌলাই রাজকুন্তি গ্রামের সোহেলের স্ত্রী। এ ব্যাপারে থানায় দেলোয়ার হোসেন দয়াল বাদী হয়ে মামলা করেছেন বলে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মীর মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন।
এর আগে ১৪ই জুন রাতে কিশোরগঞ্জে নিজাম উদ্দিন (১৭) নামে এক চালককে অজ্ঞান করে তার অটোরিকশা ছিনতাই করে নিয়ে যায় অজ্ঞান চক্রের সদস্যরা। জেলা শহরের গাইটাল এলাকা থেকে শহরতলীর লতিবাবাদ এলাকায় যাওয়ার জন্য নিজামের অটোরিকশা ভাড়া করে অজ্ঞান চক্রের ৪/৫ সদস্য। পথে অটোচালক নিজামকে তাদের সঙ্গে থাকা কলা ও রুটি খাওয়ায়। কলা ও রুটি খেয়ে নিজাম লতিবাবাদ ইউপি সংলগ্ন এলাকায় অজ্ঞান হয়ে পড়লে তার অটোরিকশাটি ছিনতাই করে নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ চক্রটি। পরে রাস্তা থেকে অজ্ঞান অবস্থায় করিমগঞ্জ উপজেলার গাংগাইল গ্রামের বাসিন্দা নিজামকে পথচারীরা উদ্ধার করে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করে।
এ ব্যাপারে পাকুন্দিয়া থানার ওসি হাসান আল মামুন জানান, অজ্ঞান চক্রের হোতা হিসেবে খোকনকে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সে পলাতক রয়েছে। পুলিশ তাকে ধরতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।