Friday, April 11, 2025

নিশ্চিত যুদ্ধের পথে হাঁটছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র! by পাপলু রহমান

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা চরম অবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরমাণু ইস্যুতে আলোচনায় বসতে চলেছে। কিন্তু ইরান এ আলোচনার প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে তারা পরোক্ষ সংলাপ চালিয়ে যেতে রাজি। এটি যেন এক যুদ্ধের ইঙ্গিত।

ইরান যেহেতু পরোক্ষ আলোচনায় যেতে চায়, এটি বলা য়ায় যে তারা যুদ্ধের পথে হাঁটতে চায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে এর জবাব দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত তারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি, ইরানের পরমাণু আলোচনার সম্ভাবনা ও ইরানের কঠোর অবস্থান নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রতিবেদন।

ইরানের শক্তি ও দৃঢ়তা

ইরান (প্রাচীন পারস্য) বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি। এ দেশের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। ইরানিরা শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের আক্রমণ সত্ত্বেও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করেছে। একাধিক মঙ্গোল, রোমান, তুর্কি, ব্রিটিশ ও আরব আক্রমণের পরেও ইরান কখনো পুরোপুরি পরাজিত হয়নি। সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ইরাক ইরানের বিরুদ্ধে আট বছর ধরে যুদ্ধ করেছিল, কিন্তু ইরান সে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, ইরান যে কোনো শক্তির মোকাবিলা করতে সক্ষম। তবে, এই শক্তি কোথায় নিহিত? এটি শুধু সামরিক শক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের সরকারের দৃঢ়তা এবং সুশৃঙ্খল নীতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ট্রাম্পের হুমকি : পরমাণু বোমা এবং যুদ্ধের শঙ্কা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চূড়ান্ত হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি পরমাণু চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে তারা এমন এক বোমা হামলার শিকার হবে যা তারা কখনো কল্পনা করেনি। ট্রাম্পের এমন কথা শুধু ইরান নয়, বিশ্বকে তোলপাড় করেছে। ট্রাম্পের কথায়, ইরান যদি চুক্তি না করে, তবে তাদের ওপর মারাত্মক হামলা হবে। এর মানে হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরমাণু প্রকল্পকে থামাতে ইরানকে ভয় দেখাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে তারা একটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে, ইরান কখনোই পরমাণু বোমা তৈরি করার কথা অস্বীকার করেনি। তারা দাবি করছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তির উদ্দেশ্যে এবং তাদের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা নেই। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, তাদের এ দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের মতে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে এবং এ কারণে ইরানকে পারমাণবিক শক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপে পড়তে হচ্ছে।

পরমাণু ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। মার্কিন প্রশাসন বারবার বলেছে, তারা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেবে না। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ অবস্থান নিয়েছে। কারণ, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে এটি গোটা অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং ইরানকে শান্তিপূর্ণভাবে পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনা করার জন্য চাপ দিচ্ছে।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও বড় কয়েকটি দেশ ইরানের সঙ্গে একটি পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) সই করেছিল। চুক্তিতে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচিকে সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং বিনিময়ে ইরানকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়। এরপর থেকে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়, যার ফলে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

ইরান ঘিরে উত্তেজনা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামিনি সম্প্রতি ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক এবং বাহরাইনকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি এই দেশগুলো মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তা করে, তাহলে তাদের জন্য গুরুতর পরিণতি অপেক্ষা করছে। এসব দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিলে কঠোর পদক্ষেপ নেবে ইরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে, আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে এ উত্তেজনা সারা পৃথিবীকে প্রভাবিত করতে পারে, কারণ বিশ্বের জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

পরমাণু আলোচনার সম্ভাবনা

এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নতুন করে পরমাণু আলোচনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান যদি পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসে, তাহলে তারা একটি ‘বড় চুক্তি’ করতে সক্ষম হবে। চুক্তি করতে ব্যর্থ হলে ইরানকে মহাবিপদে পড়তে হবে—ট্রাম্প এমন হুমকিও দিয়েছেন। তবে ইরান সরাসরি আলোচনার হুমকি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং পরোক্ষ আলোচনার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা চাপ ও হুমকি উপেক্ষা করেছে। তেহরান জানিয়েছে, ইরান কখনোই জোরজবরদস্তি মেনে নেবে না। তারা তৃতীয়পক্ষ, যেমন ওমানের মাধ্যমে আলোচনা চালাতে চায়।

ইরানের অবস্থান

ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ইরান জানিয়েছে, তারা যুদ্ধ চায় না এবং পারমাণবিক অস্ত্রও তৈরি করতে চায় না। তবে তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের সাথে সৎ মনোভাব নিয়ে আলোচনা করতে চায়, তবে আমরা সেই পথে যাব। কিন্তু যদি তারা আমাদের ওপর চাপ তৈরি করতে চায়, তাহলে কোনো সমঝোতা হবে না।’

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘কূটনীতি মানে আত্মসমর্পণ নয় এবং বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাপের মাধ্যমে সম্ভব নয়।’ এর মানে হলো, ইরান কোনোভাবেই হুমকির কাছে নত হতে রাজি নয়, বরং তারা নিজ স্বার্থ রক্ষা এবং বৈশ্বিক শান্তির জন্য সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তেহরান জানিয়েছে, তারা কেবল সম্মান ও নিরাপত্তা চায়, যুদ্ধ নয়।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোরও একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। যে কোনো একতরফা পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি আলোচনায় বসতে সক্ষম হয়, তবে তা বৈশ্বিক শান্তির জন্যই কল্যাণকর। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামিনি। ছবি : সংগৃহীত

গাজায় হামলা, নিহত কমপক্ষে ৩৫

গাজার আবাসিক ভবনে একাধিক হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ৩৫ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন ৮০ ফিলিস্তিনি। তারা বেঁচে আছেন কিনা তা নিশ্চিত নয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা। এতে বলা হয়, গাজার শুজাইয়া নামক একটি এলাকার বসতবাড়ি লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু বোমা বর্ষণ করেছে ইসরাইল। প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানিয়েছেন, ইসরাইলের বোমা হামলার শব্দ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল তারা গণহত্যা চালাচ্ছে। আহতদের বেশ কয়েকজনের জন্য রক্তদানের আহ্বান জানিয়েছে চিকিৎসকরা। তাদের অবস্থা গুরুতর। অন্যদিকে বালাতা শরণার্থী শিবিরেও বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইলের বাহিনী। এই শরণার্থী শিবিরটি পশ্চিম তীরের নেবলাস অঞ্চলের কাছে অবস্থিত। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, এ পর্যন্ত ইসরাইলের হামলায় নিহত হয়েছেন ৫০ হাজার ৮১০ ফিলিস্তিনি। আহতের সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৮৮ জন। এ ছাড়া বহু মানুষ ধ্বংস্তূপের নিচে চাপা পড়ায় তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
mzamin

সৌদিতে বিপুল গ্যাস ও তেলের খনির সন্ধান

সৌদিতে বিপুল গ্যাস ও তেলের খনির সন্ধান সন্ধান মিলেছে। দেশটির পূর্বাঞ্চল এবং এম্পটি কোয়ার্টার এলাকায় এসব খনির খোঁজ পাওয়া গেছে।

সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বুধবার (৯ এপ্রিল) সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমান এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, পূর্বাঞ্চল এবং এম্পটি কোয়ার্টার এলাকায় সৌদি আরামকো তেল ও গ্যাসের একাধিক নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। এসব আবিষ্কার দেশটির হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনার পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে এবং সৌদি আরবের বৈশ্বিক জ্বালানি নেতৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

পূর্বাঞ্চলের জাবু তেলের খনি জাবু-১ কূপ থেকে প্রতিদিন ৮০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করার সম্ভাবনা রয়েছে। আরেক খনি সায়াহিদের সায়াহিদ-২ কূপ থেকে ৬৩০ ব্যারেল তেল উত্তোলন সম্ভব। এছাড়া আইফান খনির আইফান-২ কূপ থেকে প্রতিদিন ২,৮৪০ ব্যারেল অপরিশোধিত এবং প্রায় ০.৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

অনুসন্থানে আরও বলা হয়েছে, বেরি ফিল্ডের বেরি-৯০৭ কূপ থেকে দৈনিক ৫২০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং দৈনিক ০.২ এমএমএসসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। এছাড়া মাজালিজ ফিল্ডের মাজালিজ-৬৪ কূপ থেকে দৈনিক ১,০১১ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং দৈনিক ০.৯২ এমএমএসসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব।

অন্যদিকে এম্পটি কোয়ার্টারের নুওয়াইর ফিল্ডের নুওয়াইর-১ কূপ থেকে দৈনিক ১,৮০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ০.৫৫ এমএমএসসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। দামদাহ ফিল্ডের একটি কূপ থেকে দৈনিক ২০০ ব্যারেল তেল ও অপর কূপ থেকে দৈনিক ১১৫ ব্যারেল তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া কুরকাস ফিল্ডের একটি কূপ থেকে দৈনিক ২১০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এরমধ্যে গিজলান ফিল্ডের একটি কূপ থেকে প্রতিদিন ৩২ এমএমএসসিএফ গ্যাস এবং ২,৫২৫ ব্যারেল কনডেনসেট উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আরাম ফিল্ড থেকে প্রতিদিন ২৪ এমএমএসসিএফ গ্যাস এবং ৩,০০০ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে। আর মিহওয়াজ ফিল্ডের প্রতিদিন ৩.৫ এমএমএসসিএফ এবং ৪৮৫ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে।

এছাড়া এম্পটি কোয়ার্টারের মারজুক ফিল্ডের দুটি কূপ থেকে প্রতিদিন ৯.৫ এমএমএসসিএফ এবং ১০ এমএমএসসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর বাইরে জুবাইলার একটি কূপ থেকে প্রতিদিন ১.৫ এমএমএসসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জ্বালানিমন্ত্রী আব্দুল আজিজ বলেন, এই আবিষ্কারগুলো কেবল সৌদি আরবের জ্বালানি খাতে নেতৃত্বকে দৃঢ় করছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

সৌদিতে আবিষ্কৃত হওয়া একটি খনি। ছবি : সংগৃহীত
সৌদিতে আবিষ্কৃত হওয়া একটি খনি। ছবি : সংগৃহীত



গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ১৯ ফিলিস্তিনি নিহত

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায়য় ইসরায়েলি  হামলায় আরও ১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এসব ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। এর মধ্যে গাজা নগরীতে নিহত হন ১১ জন। গতকাল বুধবার ইসরায়েলের হামলায় আরও ৪৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন। হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে।

গাজায় ১৫ মাসের বেশি সময় ধরে নির্বিচার হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গত ১৯ জানুয়ারি থেকে প্রথম যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির শর্ত ভেঙে গত ১৮ মার্চ থেকে আবারও গাজায় হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় গত ১৮ মার্চ থেকে ইসরায়েলের হামলায় ১ হাজার ৫২৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৮৩৪ জনা।

এদিকে আরও ৮০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তাঁরা সবাই গাজা উপত্যকার বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রগুলো বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে এই তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসের কিসুফিম ক্রসিংয়ে এসব বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়। ক্রসিংটি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, মুক্তি পাওয়া বন্দিদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ কারণে তাদের দের আল–বালাহ শহরের আল–আকসা মার্টারস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বন্দিদের মুক্তি দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাসপাতালটির কর্মীরা। কারণ এসব বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার আগে তাদের কোনো তথ্য জানানো হয়নি। সাধারণত ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা সম্পৃক্ত থাকে।

বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার পর তাদের স্বজনেরা হাসপাতালে ছুটি আসেন। সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হাসপাতালে গিয়ে দীর্ঘদিন পর বাবার সঙ্গে দেখা হয় ফারাহ নামের এক তরুণীর।

ফারাহ সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ভেবেছিলেন তাঁর বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে কোনো তথ্যই জানতে পারেননি। তিনি ইসরায়েলের কুখ্যাত সাদি তেইমান কারাগারে ছিলেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সশস্ত্র যোদ্ধারা ইসরায়েলে হামলা চালায়। ইসরায়েলের হিসাব অনুসারে এ হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে বন্দী করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। পাল্টা হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজা উপত্যকা অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, এসব হামলায় এরইমধ্যে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। হামলায় গাজা উপত্যকার বেশির ভাগ বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনে গণহত্যার প্রতিবাদে বিএনপির র‍্যালি: মুসলিম বিশ্বের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান

ফিলিস্তিনের গাজা ও রাফায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা ও গণহত্যার প্রতিবাদে এবং নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজধানীতে র‍্যালি করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর বিএনপি। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই কর্মসূচি।

র‍্যালি–পূর্ব সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ফিলিস্তিনে যা ঘটছে, তা শুধু তাদের ধ্বংস নয়, এটা বিশ্ব মুসলমানদের নিঃশেষ করার একটি ষড়যন্ত্র। মুসলিম বিশ্ব কার্যকরভাবে ঐক্যবদ্ধ হলে ইহুদিরা এতটা সাহস দেখাতে পারত না বলে অভিমত দেন তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিশ্বের কয়েকটি পরাশক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে বহু আগেই ফিলিস্তিনে গণহত্যা শুরু হয়েছে। আজ ফিলিস্তিনের মানুষ নিজেদের দেশেই পরবাসী। অথচ মুসলিম বিশ্বের মোড়লদের কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। তারা মুখ খুলছে না, অবস্থান নিচ্ছে না।’

গাজায় গণহত্যা বন্ধে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন চলছে, কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে এই নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং গণহত্যা বন্ধের জোর দাবি করছি।’

সালাহ উদ্দিন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ইসরায়েলকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বিরোধী দলের ওপর নিপীড়নের সঙ্গে ইসরায়েলের কাছ থেকে আড়িপাতার যন্ত্র কিনেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘স্বাধীনতা দিবসে জিয়াউর রহমান ইয়াসির আরাফাতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই থেকেই বিএনপি ফিলিস্তিনের জনগণের সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে। আজ গাজা যেন অবরুদ্ধ খাঁচা, যেখানে শিশু ও নারীদের ওপর বর্বরতা চালানো হচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রতিহত করতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ দরকার।’

ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটকারীদের বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেন বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, তারা ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করছে বলেই মনে করব। তাদের প্রতিহত করতে হবে, তবে কোনোভাবেই মারপিট নয়—পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘ফিলিস্তিনে যুগের পর যুগ ধরে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলছে। নারী-পুরুষ কেউ রেহাই পাচ্ছে না। এটা সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধ। দেশের সাধারণ মানুষ দল–মতনির্বিশেষে ফিলিস্তিনের পক্ষে, কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের থেকে তেমন কোনো অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। জাতিসংঘও নিষ্ক্রিয়—একটি ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে গেছে।’

র‍্যালি–পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু। সঞ্চালনায় ছিলেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দীন টুকু। আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক। উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

বিএনপির এই কর্মসূচি বিকেল চারটায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বেলা আড়াইটা থেকেই নয়াপল্টনে নেতা–কর্মীদের ভিড় বাড়তে থাকে। হাতে প্ল্যাকার্ড, ফিলিস্তিনের পতাকা ও কালো ব্যানার নিয়ে নেতা–কর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেন নয়াপল্টন এলাকা।

র‍্যালিটি নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে শান্তিনগর, মৌচাক, মগবাজার হয়ে বাংলামোটরে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে র‍্যালি শুরু হয়। সারা পথজুড়েই ছিল ব্যাপক জনসমাগম ও প্রতিবাদী স্লোগান। বিএনপির নেতা–কর্মীরা ‘ইসরায়েলি পণ্য বয়কট করো, দুনিয়ার মুসলিম এক হও লড়াই করো’, ‘ফিলিস্তিনে হামলা কেন, জাতিসংঘ জবাব চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

বিএনপির নেতারা জানান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে বার্তা দেওয়া হয়েছে—গণহত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশি জনগণ ফিলিস্তিনের পাশে আছে।

ইসরায়েলের হামলায় আহত এক শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মা। গাজা সিটি, ফিলিস্তিন, ১০ এপ্রিল
ইসরায়েলের হামলায় আহত এক শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মা। গাজা সিটি, ফিলিস্তিন, ১০ এপ্রিল। ছবি: রয়টার্স

আমাদের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ by হাসান ফেরদৌস

রাজনৈতিক ভাষার একটা কাজ হচ্ছে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করা। এ কাজ সবচেয়ে ভালো করতে সক্ষম দেশের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা জনপ্রিয়, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজার পক্ষ নিয়ে তেমন কোনো বুদ্ধিজীবী যখন কলম ধরেন, তা তিনি কবি, সাংবাদিক বা অভিনেতা যা–ই হোন, তাঁর কথা লোকে মন দিয়ে শোনে, সে কথায় আস্থা স্থাপন করে। তাঁদের ওকালতিতে শুধু মিথ্যা নয়, ঠান্ডা মাথার গুম-খুনও পার পেয়ে যায়।

কথাটা আমার নয়, জর্জ ওরওয়েলের। অ্যানিমেল ফার্ম নামের প্রহসনে তিনি ব্যাপারটা আমাদের হাতে-কলমে ধরিয়ে দিয়েছেন। অন্য আরেক স্মরণীয় গ্রন্থ ১৯৮৪-তেও বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে স্বৈরাচারকে আগলে রাখে, তার সবিস্তার বিবরণ দিয়েছেন তিনি। উভয় গ্রন্থেই মুখ্যত স্তালিনের সোভিয়েত আমলের কথা তিনি বলেছেন, কিন্তু তাঁর সে কথা পৃথিবীর যেকোনো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বেলাতেই প্রযোজ্য। এ অভিজ্ঞতা আমাদের বাংলাদেশেও।

শূকরপাল ও তাদের নেতাদের গল্প

অ্যানিমেল ফার্ম এক শূকরের খোঁয়াড় নিয়ে গল্প, যার বাসিন্দারা খোঁয়াড়মালিক মিস্টার জোন্সের নিষ্ঠুর ব্যবহারে অতিষ্ঠ। খামারের পুরোনো বাসিন্দা ওল্ড মেজর, সে প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ। অন্য শূকরদের ডেকে সে বোঝায়, তাদের বর্তমান হতদরিদ্র দশার কারণ মি. জোন্স। অবস্থা বদলাতে হলে এই লোকের কবজা থেকে মুক্ত হতে হবে। তার প্রেরণায় খামারের শূকরেরা এক সফল বিদ্রোহে মি. জোন্সকে তাড়িয়ে খোঁয়াড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় খোঁয়াড়ের দুই চতুর শূকর—স্নোবল ও নেপোলিয়ন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই এই দুজনের মধ্যে নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। অধিক চতুর নেপোলিয়ন তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্নোবলকে তাড়িয়ে দেয়।

খামারের অন্য সদস্যরা টিকে থাকার জন্য নেপোলিয়নের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। তার নেকনজর ও বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য তাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এ কাজে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে স্কুইলার নামের এক শূকর। তার দায়িত্ব ছিল খামারের নতুন নেতা নেপোলিয়নকে নিয়ে সত্য-মিথ্যা গল্প বানিয়ে অন্য শূকরদের প্রভাবিত করা।

১৯৮৪ গ্রন্থে ওরওয়েল যে মিনিস্ট্রি অব ট্রুথের কথা লেখেন, স্কুইলার হচ্ছে সে মিনিস্ট্রির সেরা খাদেম। তার নেতৃত্বে নতুন যে প্রচার-ভাষার জন্ম হয়, ওরওয়েল তাকেই নিউজস্পিক নাম দিয়েছিলেন। যে অনুগত বুদ্ধিজীবীদের কথা গোড়ায় বলেছি, স্কুইলার তাদেরই একজন।

বোঝা কঠিন নয়, এই রূপকের ওল্ড মেজর কার্ল মার্ক্স ও লেনিন, যাঁরা এক শোষণহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্নোবল সম্ভবত ট্রটস্কি ও অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতা, যাঁরা লেনিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন সোভিয়েত সমাজ গড়ার কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। আর নেপোলিয়ন অবশ্যই স্তালিন, যাঁর ক্ষমতার ক্ষুধার বলি হয়েছিলেন ট্রটস্কির মতো অসংখ্য স্বপ্নতাড়িত মানুষ। নেপোলিয়ন নিজে নিজেই ওরওয়েলের শূকর খামারের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসেনি। তাকে সেই কাজে সাহায্য করেছে স্কুইলারের মতো অসংখ্য সেবক। বস্তুত স্কুইলার সেসব লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি, যাঁরা নগদ পাওনার লোভে চোখ বুজে, কখনো কখনো চোখ খুলে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য বানিয়েছেন।

ওরওয়েল বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রশ্নে বারবার ফিরে গেছেন। আর তা মুখ্যত এই বেদনা থেকে যে বিশ শতকের প্রায় প্রতিটি বৃহৎ ট্র্যাজেডি, যেমন স্তালিনীয় একনায়কতন্ত্র ও হিটলারীয় নাৎসিবাদ—তার কোনোটাই সফল হতো না যদি বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে সক্ষম হতেন। তিনি এ বিষয়ে প্রবল সচেতন যে বিপ্লব বা ইতিবাচক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। আবার তাঁরাই বা তাঁদের কেউ কেউ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একনায়কের রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। উভয় ক্ষেত্রেই, অর্থাৎ বিপ্লবপূর্ব ও বিপ্লবোত্তর সময়ে স্বৈরাচারের পক্ষে ও বিপক্ষে তাদের হাতিয়ার কিন্তু একটাই—ভাষা।

ওরওয়েল তাঁর ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন। সব সময়েই একদল বুদ্ধিজীবী মুখ উঁচিয়ে থাকেন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হাত মেলাতে। আদর্শগতভাবে নৈকট্যের কারণে তাঁরা কোনো বাদবিচার ছাড়াই তাঁদের পছন্দের শাসকদের গুণকীর্তনে বিন্দুমাত্র অস্বস্তি অথবা বিবেকের তাড়না বোধ করেন না। প্রবল উষ্মা ও বিদ্রূপের সঙ্গে তিনি লিখেছেন, একমাত্র বুদ্ধিজীবীদের পক্ষেই সেসব গালগপ্প বলা বা বিশ্বাস করা সম্ভব। ‘নো অর্ডিনারি ম্যান কুড বি সাচ আ ফুল।’ অর্থাৎ কোনো সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এমন নির্বোধ হতে পারে না।

স্বৈরাচার তোষণকারী বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্লেষ ও বিদ্রূপ করেই ওরওয়েল অ্যানিমেল ফার্ম প্রহসনটি লিখেছিলেন, কিন্তু এর সঙ্গে গভীর বেদনা ও বঞ্চনার এক অলিখিত অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে। বামপন্থী ও প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি নিজে একসময় স্তালিনীয় বন্দনায় অংশ নিয়েছিলেন। একই চেতনাবোধ থেকে ১৯৩৬ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে নাম লিখিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধের সময়েই তিনি স্তালিনীয় স্বৈরাচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হন। এই যুদ্ধে ভিন্নমত পোষণের জন্য আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের অনেক সদস্যই মস্কোপন্থী স্প্যানিশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। মস্কো নির্দেশিত নীতি অনুসরণে অনাগ্রহী অনেক কমরেড হতাহত হন। ১৯৩৭ সালে সংঘটিত ব্যাটল অব বার্সেলোনা সেই রক্তাক্ত ও লজ্জাকর ইতিহাসের সাক্ষী। এ অভিজ্ঞতাই ওরওয়েলকে স্বৈরাচারের পক্ষে ও বিপক্ষে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা প্রশ্নে সচেতন করে তোলে।

আমাদের শূকরের খোঁয়াড়

গল্পটা আমাদের খুব পরিচিত। জুলাই-আগস্টের গণজাগরণে বিতাড়িত শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরে আমরা অসংখ্য স্কুইলারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। স্বৈরশাসকের সমর্থনে তাঁর বলা গল্পটাই এই স্কুইলাররা আমাদের নানাভাবে, নানা ভঙ্গিতে শুনিয়েছেন। আমরা সে গল্প শুনেছি এবং বহুলাংশে বিশ্বাসও করেছি। কিন্তু আমরা লিঙ্কনের মাধ্যমে তো এই কথাও জানি যে কিছু লোককে অনন্তকাল বোকা বানানো যায়, অনেক লোককে কিছুদিনের জন্য বোকা বানানো যায়। কিন্তু সব লোককে অনন্তকাল বোকা বানিয়ে রাখা যায় না।

যেমন যায়নি বাংলাদেশে। আগামী দিনের গবেষক ও ছাত্ররা যখন লিঙ্কনের কথার প্রমাণ খুঁজতে ইতিহাসের পাতা হাতড়াবেন, তাঁরা নির্ঘাত বাংলাদেশের উদাহরণটিকেও হিসাবে আনবেন।

হাসিনা সরকারের পতনের দিন দশেক আগে বাংলাদেশের নামজাদা কয়েকজন সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বিগত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন। এর দিন দু-এক আগে একদল প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক বিবৃতিতে ছাত্র আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। প্রায় একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক উপাচার্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আসেন।

এ ঘটনায় অভিনবত্ব কিছুই নেই। স্বৈরাচারের ১৫ বছর অথবা তারও আগে আমরা অনুগত বুদ্ধিজীবীদের দেখেছি, যাঁরা বরাবর কথা ও যুক্তি দিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন, কেন এই স্বৈরাচার আমাদের নিজের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে এ পরিস্থিতিতে বড় রকমের পরিবর্তন আসে। এটা এমন এক সময়ের কথা, যখন ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পাখির মতো নিহত হচ্ছে মানুষ। হেলিকপ্টার থেকে এলোপাথাড়ি ছোড়া হচ্ছে গুলি, মারা যাচ্ছে মায়ের কোলের শিশুকেও। এই অভাবিত হত্যাকাণ্ডে ভীত না হয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষ স্বৈরাচারের পতন দাবি করে বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দিয়েছেন।

স্বৈরাচারের শেষ সময়েও আমাদের এই সেরা বুদ্ধিজীবীরা জনতার দাবির যৌক্তিকতা ও তাঁদের প্রতিবাদের তীব্রতা টের পাননি। তাঁরা জনবিযুক্ত, এমন একটা অভিযোগ বরাবরই ছিল, কিন্তু তাঁরা যে জনতার পাশে দাঁড়ানোর বদলে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বন শ্রেয় ভাববেন, সে কথা ভাবা কঠিন। এই বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে স্বৈরাচারের হাতে সঁপে দিয়েছিলেন। অনুমান করি, তাঁরা হয়তো ধরে নিয়েছিলেন বিগত ১৫ বছরের মতো এবারও শক্তি প্রয়োগ করে স্বৈরাচারের পক্ষে ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হবে। হলো না, এর দিন কয়েকের মধ্যেই পতন ঘটে স্বৈরাচারী সরকারের।

জর্জ ওরওয়েল বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলাদেশের এই বুদ্ধিজীবীদের নিয়েই লিখতেন আরেক অ্যানিমেল ফার্ম। আমাদের এই শূকরের খোঁয়াড়ে কে হবেন স্নোবল, কে হবেন নেপোলিয়ন এবং কে বা কারা হবেন স্কুইলার, সে কথা অনুমান করা খুব কঠিন নয়। আমাদের বিবেক বলে যাঁদের ভেবেছি, যাঁদের কলমে রচিত হয়েছে বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের রূপরেখা ও বহিঃকাঠামো, সংকটের সময় তাঁদের জনতার মিছিলে পেলাম না। এর চেয়ে বড় পরিহাস, যাঁরা এ সরকারের সমর্থনে ‘সবকিছু করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেতু ভেঙে বানের জল প্রবেশ করতে না করতেই ভীতসন্ত্রস্ত সেই বুদ্ধিজীবীরা হয় দেশ ছেড়ে পালালেন, অথবা ইঁদুরের গর্তে লুকালেন। এই গল্প একই সঙ্গে বেদনার ও বঞ্চনার।

স্বৈরাচারের দোসর

স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদ—যে নামই তাকে দিই না কেন, বিগত সরকার বলতে বোঝাত দেশের সব ক্ষমতা এক ব্যক্তি ও তাঁর সহযোগী ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। এ ব্যবস্থাকে আমরা অলিগার্কিও বলতে পারি, যেমন আজকের রাশিয়ার পুতিন সরকার। নামমাত্র গণতান্ত্রিক হলেও এ এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে এক ব্যক্তিকে ঘিরে হাতে গোনা কয়েকজন ক্ষমতার প্রতিটি ক্ষেত্রের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তাদের মূল লক্ষ্য দেশের আর্থিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন, তাকে নিয়ে যা খুশি করার অধিকার কবজা করা। সে জন্য চাই আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ, তথ্যব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ, এমনকি মানুষের ভাবনাচিন্তার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা যত শক্তিধর ও বিত্তশালী হন না কেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে যে একনায়ক ও তাঁর সঙ্গে যে হাতে গোনা গোষ্ঠীপতি, তাঁদের একার পক্ষে এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অর্জন ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ সম্ভব নয়। এর জন্য চাই বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক, যাদের একটি বড় অংশ হলেন সেই সব মানুষ, যাঁদের আমরা সম্ভবত পরিহাসভরে বুদ্ধিজীবী বলে থাকি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন লেখক, সাংবাদিক, ও সংস্কৃতিকর্মী। তাঁদের কেউ কেউ যথার্থই প্রতিভাবান, কেউ কেউ হয়তো দেশের বাইরেও তাঁদের প্রতিভার স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন।

স্বৈরাচারের কাছে এমন লোকের মূল্য অন্য সব ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা পেটোয়া বাহিনীর চেয়ে অধিক মূল্যবান। কারণ, তাঁরা যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে বোঝাতে সক্ষম, কেন এই স্বৈরাচার শুধু বৈধ ও ন্যায্য নয়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কেন তা অপরিহার্য। গত ১৫ বছর আমাদের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ ঠিক এ কাজই করে গেছেন।

বুদ্ধিজীবীরা কেন জনগণের পাশে থাকার পরিবর্তে স্বৈরাচারের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়? বিশ শতকে রুশ বিপ্লবের পর আমরা দেখেছি, মায়াকোভস্কি বা এরেনবুর্গের মতো প্রথিতযশা লেখক, যাঁরা তাঁদের নিকট বন্ধুদের ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে ঢলে পড়তে দেখেছেন, প্রকাশ্যে তা নিয়ে কথা না বলে বিপ্লবের নির্মমতাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন।

আরেক বিখ্যাত লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি, লেনিন বেঁচে থাকতে ঢালাও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান, কিন্তু স্তালিনের ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই স্বৈরশাসককে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে গেছেন। মার্টিন হাইডেগারের মতো দার্শনিক, অথবা লেনি রেফিনিস্তালের মতো চিত্রপরিচালককে হিটলারের পক্ষে সাফাই গাইতে দেখেছি।

চীনা বিপ্লবের পর, বিশেষত তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর সীমাহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা জেনেও তা নিঃশব্দে মেনে নিয়েছেন বা প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে সাফাই গেছেন সে দেশের প্রধান কবি গুয়ো মরু ও বিখ্যাত লেখক মাও দুন। পাকিস্তান আমলে সামরিক স্বৈরাচারকে স্বাগত জানিয়েছেন আলতাফ হোসেনের মতো যশস্বী সাংবাদিক। একই চিত্র একাত্তরের গণহত্যার সময়।

বুদ্ধিজীবী কেন স্বৈরাচারের পক্ষে

নোয়াম চমস্কির কথায়, বুদ্ধিজীবীদের একটা কাজ হলো সত্যের পক্ষে থাকা। আমি অন্য আরেকটি কাজের কথা বলব, তা হলো দেশের মানুষের পক্ষে থাকা। অথচ সত্য প্রকাশের বদলে সে সত্য ঢাকতে অথবা ভিন্ন সত্য প্রকাশে এবং দেশের মানুষের পক্ষে থাকার বদলে ক্ষমতাধরদের পক্ষাবলম্বনে কোনো কোনো লেখক-বুদ্ধিজীবীর এমন আগ্রহ কেন?

আমরা এর তিনটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলতে পারি, বস্তুগত ফায়দা, ভীতি ও আদর্শগত আনুগত্য।

বস্তুগত ফায়দার ব্যাপারটা বোঝা সহজ। মোটা উৎকোচ, ভালো সরকারি পদ (যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অথবা বিদেশে রাষ্ট্রদূত), সস্তায় সরকারি জমি, অথবা নিদেনপক্ষে সরকারপ্রধানের সঙ্গে নিখরচায় বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ—এমন ফায়দা যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তো আমাদের জানাশোনা অনেকেই আছেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের অনেককে দেখেছি হাত কচলে চৌদ্দবার ‘মাননীয় নেত্রী’ বলে ঢোক গিলতে। অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে তাঁরাই আবার ভিন্নকথা বলেছেন। কিন্তু স্বৈরাচারের হাত থেকে একবার যাঁরা সুবিধা নিয়েছেন, তাঁদের পক্ষে মত ও পথ বদলানো কঠিন। বার্নাড শর একটি উক্তি কিছুটা ঘুরিয়ে বলতে পারি, একবার যে সতীত্ব হারিয়েছে, তার পক্ষে সতীত্ব ফিরে পাওয়া অসম্ভব।

ভীতির ব্যাপারটাও বোঝা কঠিন নয়। স্তালিনের সোভিয়েত রাশিয়া বা হিটলারের জার্মানিতে স্বৈরতন্ত্রের প্রতিবাদ করায় জীবন গেছে, এমন উদাহরণ অসংখ্য। নিকোলাই বুখারিন বা আইজাক বাবেলের মতো অসাধারণ লেখক ও চিন্তাবিদকে জান দিতে হয়েছে শুধু রাজনৈতিক মতান্তরের কারণে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কার্ল ভন ওসিয়েতজস্কিকে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কার্যত না–খেয়ে মরতে হয়েছে। পালাতে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতো দার্শনিক।

ফলে দৈহিক নিষ্পেষণের ভয়ে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সখ্য বা সমঝোতা অভাবিত নয়। একাত্তরে ঠিক এ কারণে প্রবল ঘৃণা সত্ত্বেও কেউ কেউ সামরিক অধিগ্রহণের পক্ষে কলাম লিখেছেন, অথবা রেডিও বা টিভির টক শোতে অংশ নিয়েছেন। জ্যঁ পল সার্ত্রের মতো দার্শনিক অবশ্য বলবেন, কঠিনতম সময়েও বুদ্ধিজীবীর বা সব নাগরিকের জন্যই ‘কলাবরেশন’ বা সোজা বাংলায় দালালি একমাত্র পথ নয়। ব্যক্তি জন্মগতভাবে স্বাধীন—‘ম্যান ইজ কনডেমন্ড টুবি ফ্রি’—সে মুক্ত হতে বাধ্য। সে কারণে যে সিদ্ধান্তই সে নেয়, তার দায়দায়িত্ব একা তার। মুক্ত মানব হিসেবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভেতর দিয়েই আমাদের মানবিকতা প্রকাশিত হয়, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণেই আমাদের ‘স্বাধীনতা’ নিহিত।

কোনো ব্যক্তি যখন স্বৈরতন্ত্রের হাতে নিজেকে সঁপে দেন, সেটিও মুক্ত মানুষ হিসাবে তাঁর স্বাধীনতারই প্রকাশ। কিন্তু তাঁকে দালাল হতেই হবে, এ কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিকল্প হিসেবে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের পথও তাঁর সামনে খোলা আছে। কেউ সে পথ বেছে নিতে গিয়ে জেলে যান, কেউ দেশত্যাগ করেন, কেউবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যেমন আত্মহত্যা করেছিলেন মায়াকোভস্কি। এ সবই ব্যক্তির ‘মুক্ত ইচ্ছার’ প্রকাশ।

বাংলাদেশের স্বৈরাচার সম্ভবত স্তালিন বা হিটলারের মতো নির্মম ও দক্ষ নন, কিন্তু নিষ্পেষণের অস্ত্র ও উপকরণ তাঁর হাতেও কম ছিল না। ‘আয়নাঘরের’ কথা আমরা জানি। হারুনের ডিবি অফিসের কথা জানি। গুম-খুনের উদাহরণও কম নয়। ভয়-ভীতি থেকে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বন করেন, এ কথা মানতে আমাদের কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। কিন্তু এমন উদাহরণও কম নয়, যেখানে শুধু ‘গুড লাইফ’, অর্থাৎ পকেটে কিছুটা বাড়তি পয়সা, মাসে দু-চারটে টিভি অনুষ্ঠান, নিদেনপক্ষে ঢাকা ক্লাবে অন্যের পয়সায় মদ্যপানের সুযোগ—এসব কারণেও কেউ কেউ দালালির পথ বেছে নেন।

বাকি থাকল আদর্শগত আনুগত্যের বিষয়টি। বিপ্লবে গভীরভাবে বিশ্বাস থেকে কেউ কেউ সজ্ঞানে স্বৈরাচারের সঙ্গে সহযোগিতার পথ বেছে নেন, এমন লোকের সংখ্যাও তো কম নয়। আমরা নিকোলাই বুখারিনের কথা জানি, তিনি রুশ বিপ্লবে গভীর আস্থাবান ছিলেন, এর সোনালি ভবিষ্যতে নিশ্চিত ছিলেন। বিদেশি চর হিসেবে মিথ্যা মামলার সম্মুখীন হয়েও সে বিপ্লব ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এই বিবেচনায় প্রকাশ্যে স্তালিনের বিরুদ্ধাচরণ করেননি।

অথবা আমরা আর্জেন্টিনার লেখক হুলিও করতাজারের কথা ভাবতে পারি। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আগে তিনিই আমাদের ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ উপহার দিয়েছেন। লাতিন আমেরিকার যে কয়জন লেখক-বুদ্ধিজীবীকে আমরা কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান সমর্থক বলে জানি, তিনি তাঁদের একজন। ফিদেল কাস্ত্রোর শাসনামলে তাঁর অনেক নিকট বন্ধু নিগৃহীত হয়েছেন, এমন প্রমাণ তাঁর হাতে থাকা সত্ত্বেও করতাজার সে বিপ্লবের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করেননি। ১৯৭১ সালে বিখ্যাত কিউবান লেখক হেবার্তো পাদিয়াকে বিপ্লববিরোধী কবিতা ও বক্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়।

পশ্চিমের অনেক লেখক, যাঁরা একসময় কিউবার বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, পাদিয়ার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তাঁদের অনেকে কাস্ত্রো প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করেন। কিন্তু করতাজার তাঁর অবস্থান বদলাননি। সে সময় তিনি বলেছিলেন, যত সন্দেহ ও উদ্বেগই থাকুক না কেন, আমি কিছুতেই কিউবার বিপ্লবের প্রতি আমার বিশ্বাস পরিবর্তন করব না। কোনো বিপ্লব সর্বশুদ্ধ নয়, কিন্তু শুদ্ধতার চেয়ে অনেক জরুরি সাম্রাজ্যবাদের প্রতিরোধ।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের আদর্শিক আনুগত্য

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ বরাবর জনতার পাশে থেকেছেন, সামরিক ও বেসামরিক দুঃশাসনের প্রতিবাদ করেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, যা আসলে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ, তার নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ। ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী নির্দেশের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে গণজাগরণ, তার নেতৃত্বেও বুদ্ধিজীবীশ্রেণি। এমনকি স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তাঁর প্রস্তাবিত বাকশালি রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন শামসুর রাহমান, আনিসুজ্জামান, আহমদ শরীফ, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান লেখক, বুদ্ধিজীবী। তাঁদের কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর নিকটজন ও আদর্শের অনুসারী, তা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রত্যাখ্যান করার নৈতিক বল তাঁদের ছিল। সে জন্য বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁদের উদ্দেশ্যে আমরা এখনো মাথা নোয়াই।

সেই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ, সম্ভবত বৃহদাংশ কেন গত দেড় যুগ শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন শুধু মেনেই নেননি, তাঁর প্রতি কথায় ও কাজে নানাভাবে সমর্থন জানিয়ে গেছেন?

অনুমান করি, নগদ লাভ ও ভীতি থেকেই অধিকাংশ সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবী স্বৈরাচারের ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে সেসব সুবিধাভোগীদের বাইরে এমন অনেক বুদ্ধিজীবী ছিলেন, যাঁরা শুদ্ধ আদর্শিক কারণেও হাসিনা সরকারের প্রতি অনুগত ছিলেন। তাঁদের অনেককেই আমরা চিনি। তাঁরা সেই সব মানুষ, যাঁরা এই সরকারের কাছ থেকে চিহ্নিত করা যায়, এমন কোনো সুবিধাভোগ করেছেন, তা বলা যাবে না। নগদ কোনো সুবিধাও পাননি। স্বল্পমূল্যে সরকারি জমিও পাননি। তাঁরা নির্বোধ নন।

হাসিনা সরকার যে খোলামেলাভাবে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত, এর একমাত্র লক্ষ্য পরিবারতন্ত্র ও তাঁর অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখা, এ কথা তাঁরা খুব ভালোভাবেই জানতেন। তা জানা সত্ত্বেও তাঁরা সচেতনভাবে বিগত সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসনকে সমর্থন দিয়ে গেছেন সম্ভবত এই বিশ্বাস থেকে যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা ও মৌলবাদ প্রতিরোধে হাসিনার কোনো বিকল্প নেই।

এই বুদ্ধিজীবীদের প্রতি করুণা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি আমার নেই। বিগত সরকারের হাতে মুক্তিযুদ্ধের সব মূল্যবোধ নিরন্তর ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, সে কথার তারাও সাক্ষী। এই সরকারের হাতে বাক্‌স্বাধীনতা হরণ হয়েছে, হরণ হয়েছে ভোটাধিকার।

বিচার বিভাগ থেকে পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভ অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। শুধু আদর্শিক ভিন্নতার জন্য কারাগারে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এর কোনোটাই গোপনে বা খুব চালাকির সঙ্গে করা হয়েছে, তা নয়। কোনো কিছুই গোপন নয়, কোনো কিছুই অপ্রকাশিত নয়। তারপরও বুদ্ধিজীবীরা যখন নিজেদের পছন্দের ‘আইডিওলজি’ রক্ষিত হবে, এই বিশ্বাস থেকে স্বৈরাচারের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাঁদের করুণা করা ছাড়া আর কী করতে পারি!

আনাক্সিওস

বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আমার প্রিয় নায়কদের একজন হলেন চেকোস্লোভাকিয়ার বিবেকী লেখক ভাসলাভ হাভেল। স্বৈরাচারের প্রতিবাদ করায় তাঁকে বারবার জেলে যেতে হয়েছে।

তিনি বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবী হলো এমন ব্যক্তি, যে পৃথিবীর সব দুর্ভোগের সাক্ষী, যে সব রকম আপসবিরোধী, যে সব গোপন চাপ ও চালবাজির বিপক্ষে, যে ক্ষমতাসীনদের ব্যাপারে সবার আগে সন্দেহ ও প্রতিবাদী কণ্ঠ উচ্চারণ করে, যে ক্ষমতাধরদের নিরন্তর মিথ্যাচারের সরব সাক্ষী।

সেই রকম একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন সক্রেটিস। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে, অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় সাড়ে আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের অত্যাচারী শাসকদের নির্দেশ মানার পরিবর্তে তিনি বিষের পানপাত্র তুলে নিয়েছিলেন। সমঝোতা বা পালাবার পরামর্শ তাঁকে অনেকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন সক্রেটিস। মৃত্যুর আগে তাঁর মন্তব্য ছিল, প্রশ্ন না করে আত্মসমর্পণের যে জীবন, তা অর্থহীন।
সক্রেটিস মহামতি, তাঁকে অনুসরণ করে এ কথা অনায়াসেই বলা যায়, আমাদের আপসবাদী বুদ্ধিজীবীরা যে জীবন যাপন করেছেন, তা অর্থহীন। সক্রেটিসের ভাষায় ‘আনাক্সিওস’।

* হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক

আমাদের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’

হাসিনার পতনে গ্রামেগঞ্জে প্রভাব ও আওয়ামী কর্মীদের ভাবনা কী by খান মো. রবিউল আলম

মাঠ ঘুরে এলাম ৯ থেকে ১০ দিন। রাজশাহী শহর, শহরসংলগ্ন উপকণ্ঠ এবং গ্রাম। সরেজমিন দেখলাম, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও কর্মীরা কেমন আছেন। তাঁদের সঙ্গে আলাপ হলো। নেতাদের দেখা পাইনি। কর্মী আর সমর্থকদের পেলাম। নেতারা বেশির ভাগ দেশছাড়া। অধিকাংশই ভারতে। পলাতক নেতারা কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলেন, খোঁজখবর নেন। কিন্তু তাঁরা কোথায় আছেন, কেমন আছেন, সেই সম্পর্কে কিছুই জানান না। শুধু কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নিজেদের ভেতর যোগাযোগ রক্ষা করেন। এ যোগাযোগ চলে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। শেখ হাসিনার শাসন নিয়ে তাঁদের ভেতর কোনো অনুশোচনা বা দুঃখবোধ চোখে পড়ল না; বরং তাঁর শাসনের পক্ষে তাঁরা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।

আওয়ামী লীগের একটি বড় অর্জন এই যুক্তিবোধহীন সমর্থকশ্রেণি তৈরি। তাঁরা শেখ হাসিনার কোনো সমালোচনা শুনতে পছন্দ করেন না বা সমালোচনা করতে চান না।

উপজেলা পর্যায়ের একজন নেতা বললেন, কথায় কথায় শেখ হাসিনার সমালোচনা করা ফ্যাসিস্ট বলাটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। এই নেতার অনুযোগ, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পার্থক্য হলো আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা সহজেই শেখ হাসিনার সমালোচনা করেন। কিন্তু বিএনপির সমর্থকেরা তারেক জিয়ার কোনো সমালোচনা করেন না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি আর জামায়াতের ভালো-মন্দ দিক, নির্বাচন এবং নির্বাচন হলে কে ক্ষমতায় আসবে, মাঠেঘাটে তা ঘিরে আলোচনা চলছে। সংস্কার নিয়ে কোনো আলোচনা কানে এল না।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট বৈষম্যহীন বাংলাদেশে বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষার অস্তিত্ব মাঠে খুঁজে পেলাম না। মাঠে যা পেলাম, তা হলো শেখ হাসিনা–পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন–আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষায় বিএনপির অবস্থান অগ্রগণ্য।

একটি পর্যবেক্ষণ হলো, গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা ঢাকার বাইরে নেওয়া সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনার সরকারের পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়াকে স্থানীয় জনগণ গণ–অভ্যুত্থানের মুখে একটি সরকারের পতন হিসেবেই দেখছে। গণ-অভ্যুত্থানের মর্মবাণী ঢাকার ফ্রেমে আটকে আছে। এটা মর্মান্তিক ব্যাপার। ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বা ‘নতুন বয়ান’ কিংবা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ’ বিনির্মাণের স্বপ্ন মাঠেঘাটে নেই।

স্থানীয় জনগণ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। সেই চেষ্টায় জনগণ বিএনপিকে আগামী দিনের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। গ্রামীণ রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে জনগণ বিশেষ কিছু ভাবছে না। কারণ, জনগণের রাজনৈতিক আচরণের অভ্যস্ততা কেবল ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জীবন-জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা মাড়িয়ে এর শিকড় অনেক গভীরে। জনগণের ক্ষমতাপ্রিয়তা বা ক্ষমতাসখ্যের তীব্র অনুভূতি প্রচলিত রাজনীতির একটি বিশেষ দিক, যার ভিত্তি হলো রাজনৈতিক দলকেন্দ্রিক এক বিশেষ সুবিধাবাদী ব্যবস্থা। মতাদর্শের চেয়ে অনেক বেশি অনুগামী ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গঠন ও ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে স্থানীয় জনগণের অভিমত হলো, তারা দল না করে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে থাকলেই ভালো হতো। দল গঠনের ব্যাপারে জনগণ তাদের তাড়াহুড়া দেখেছে। তাদের মন্তব্যে এনসিপি দল দ্রুত গঠিত হয়েছে। তারা নির্বাচন করতে চায় এবং ক্ষমতায় যেতে যায়। কিন্তু গ্রামের ভোট এনসিপির বাক্সে আনা সহজ হবে না। কারণ, গ্রামের মানুষের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংযুক্তি, তার বাইরে আনা কঠিন।

গ্রামীণ পরিসরে নাগরিক বোধ সেই অর্থে বিকশিত হয়নি। মানুষ আছে বড় আকারের দলা হয়ে। এই দলা বালুর দলার মতো ঠুনকো। সামান্য আঘাতে এলোমেলো হয়ে যায়। আমাদের চাওয়া ছিল এঁটেল মাটির দলা, যূথবদ্ধ সামাজিক বিন্যাস। কিন্তু সামাজিক ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। সম্পর্কগুলো ভীষণভাবে হালকা হয়ে উঠছে। পরিশীলিত রাজনৈতিক বোধ ও দায়িত্বশীলতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। এই দায় সবার। জনগণের ভেতর বিদ্যমান ক্লেদাক্ত রাজনীতি লকলকে জিব বের করছে। এর শেষ কোথায়!

সুইডিশ লেখক ও ইতিহাসবিদ জোহান্স নর্গবাগ বলেছেন, গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতিতে মানুষ সম্ভাবনা নয়, সুরক্ষা খুঁজে। তিনি ‘দ্য প্রোগ্রেস’ গ্রন্থে এই ধারণা তুলে ধরেন। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী যে কথোপজীবী শ্রেণি গড়ে উঠল, তারাও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সম্মেলনকক্ষের অনুরাগী। বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের সামাজিক কোনো রূপান্তর গ্রামীণ পরিসরে দেখা যাচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কেবল গুটিকয় শহরের সমষ্টি নয়। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গ্রামের মানুষদের যুক্ত করা না গেলে তা বিশেষ কোনো ফল আনবে না।

আরেকটি বিষয় হলো, শাসন যত ভালো হোক না কেন, তা যদি জনগণের মনে স্বস্তি তৈরি না করে, তবে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায় না। শেখ হাসিনার পতনের মূলে রয়েছে জন–অসন্তুষ্টি। উন্নয়ন একটু কম হলেও সমস্যা নেই। মানুষ স্বস্তি চায়। ৫ আগস্ট–পরবর্তী মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, হানাহানি, কলহ, ক্ষেত্রবিশেষে খুনোখুনির অভিযোগ উঠছে। মানুষ শেখ হাসিনাকে তাড়িয়েছে একটু স্বস্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আশায়। বাস্তবে জনপরিসরে নতুন করে অস্বস্তি বাড়ছে।

পরাজিত আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের ওপর সেই খড়্গ নামছে প্রতিনিয়ত। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ একবার পরাজিত হয়েছে। সেই অবধি আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন পরাজিত করার চেষ্টা হচ্ছে। একটি বড় জয়ের পর আর কোনো ছোট জয় থাকতে পারে না। যাঁরা অপরাধ করেছেন, তাঁদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যের বিচারের ভার নিজ হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।

বিজয়ীদের ঔদ্ধত্য বাড়ছে। উদ্ধত আচরণ জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। বিজয়ী কতটা উন্নত, তা বোঝা যায় বিজিতের প্রতি সে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে। বিজয়ের স্বাদ বিজিতদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া কাজের কথা হতে পারে না। বিজয় উদ্‌যাপনের চেয়ে তার মর্মকে বাস্তবে রূপ দেওয়া জরুরি কাজ। ভেঙে যাওয়া সম্পর্কগুলো, সমাজের গভীর ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলা দরকার। আন্তসম্পর্কের গভীর নেতিবাচক অভিঘাত নিয়ে কোনো সমাজ বেশিদূর এগোতে পারে না।

ফ্যাসিস্ট তাড়ানোর বহুমাত্রিক অভিঘাত পড়েছে সমাজের নানা স্তরে। গ্রামের একজন সাধারণ আওয়ামী লীগ সমর্থকও তা পদে পদে অনুভব করছেন। ক্ষমতাহীনতার তিক্ত স্বাদ এবং অসহায়ত্ব তাঁদের পেয়ে বসেছে। পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দুয়ারীবাজারের এক আওয়ামী লীগ সমর্থক জানান, অনেক মামলা তাঁর। এতে তাঁর সমস্যা নেই। সমস্যা হলো ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে। আর অর্থনীতি শেষ হয়ে গেলে মানুষের দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। অর্থনীতি ও রাজনীতি কীভাবে মিলেমিশে গেছে, তার চমৎকার ব্যাখ্যা দিলেন তিনি।

নিছক রাজনৈতিক সমর্থন ও দলীয় সম্পৃক্ততার কারণে কাউকে রাজনৈতিক, সামাজিক বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও হয়রানি করা যাবে না। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই চলছে। এতে সামাজিক সংহতি ও সহাবস্থানমূলক সম্পর্কে ব্যাপক ফাটল ধরেছে। ফ্যাসিস্ট তাড়ানোর মাইক্রো–ইমপ্যাক্ট কত গভীরে, তা বুঝতে মাঠে পাওয়া কয়েকটি ঘটনা নিচে তুলে ধরা হলো।

ব্যাংকঋণ নিয়ে মামলার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা জানান, তৎকালীন সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী তাঁকে ক্ষমতার শেষ দিকে উপজেলা কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দেন। তিনি তা নিতে চাননি। পদ পাওয়ার অল্প কিছুদিনের মাথায় শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা তাঁর নামে মামলার হুমকি দিতে থাকেন। মামলা থেকে বাঁচতে চাঁদা দেওয়ার জন্য চাপ দেন। মামলা-মোকদ্দমার ঝক্কি এড়াতে তিনি ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ঋণ নেন। নেতাদের চাঁদা দিয়ে তিনি মামলা থেকে রক্ষা পেয়েছেন। স্বল্প বেতনের চাকরিজীবী এই নেতা ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও সংসার চালাতে এখন হিমশিম খাচ্ছেন।

টুপি ও পাঞ্জাবি যখন মুক্তির দাওয়া

মাঠে দেখা হলো একজন পরিচিত আওয়ামী সমর্থকের সঙ্গে। বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার আলোকছত্র এলাকায়। তাঁর পোশাক-আশাকে ব্যাপক পরিবর্তন দেখলাম। তিনি টুপি ও পাঞ্জাবি পরেছেন, নিয়মিত নামাজ পড়ছেন। পোশাক পরিবর্তনের কারণ জিজ্ঞাসা করলে জানান, নিরাপত্তা , হুমকি ও মামলা থেকে বাঁচতে তিনি এই পরিবর্তন এনেছেন। তিনি আরও জানান, এতে তাঁর সমাজে মর্যাদা বেড়েছে। অনেকে সালাম দেন, সম্মান করেন।

গভীর নলকূপের অপারেটর পরিবর্তন

৫ আগস্টের পরপর তানোর-গোদাগাড়ী উপজেলা প্রায় সব গভীর নলকূপের অপারেটর পরিবর্তন করা হয়েছে। সেখানে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকেরা অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে তাঁদের নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। একটি গভীর নলকূপের অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পেতে এক লাখ টাকা উপরি গুনতে হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকার গভীর নলকূপ কেবল সেচের উৎস নয়, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বড় পাওয়ার হাউস। কারণ, এটি সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৃষক নতুন করে অপারেটরদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয় জনগণ নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করছেন। প্রচলিত রাজনীতির ঘেরাটোপের ভেতরই তাঁরা রয়েছেন। তার ভেতরেই তাঁরা যা খুঁজছেন, তা সুরক্ষা, সম্ভাবনা নয়। গ্রামের মানুষ পরিবর্তন আশা করে। কিন্তু সেটা কত দূর, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন।

* খান মো. রবিউল আলম যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক

হাসিনার পতনে গ্রামেগঞ্জে প্রভাব ও আওয়ামী কর্মীদের ভাবনা কী

হামাসকে সন্ত্রাসী তালিকা থেকে বাদ দেয়ার আবেদন

সন্ত্রাসীদের তালিকা থেকে নিজেদেরকে বাদ দেয়ার জন্য বৃটেনের কাছে আবেদন করেছে ফিলিস্তিনের যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস। এ বিষয়ে বৃটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের কাছে হামাসের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বুধবার আবেদন জমা দিয়েছেন হামাসের সিনিয়র কর্মকর্তা মুসা আলু মারজুক। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের রাজনৈতিক শাখার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আইনি বিষয়ক প্রধান মারজুক ওই আবেদনে জানিয়েছেন, হামাস হলো ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থি স্বাধীনতা ও প্রতিরোধ আন্দোলনের সংগঠন। তাদের উদ্দেশ্যই হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং জায়নবাদী প্রকল্পগুলোর মুখোমুখি হওয়া। এই আবেদনের পরিধি কমপক্ষে ১০০ পৃষ্ঠা। এতে মত নেয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের সাবেক এডহকভিত্তিক বিচারক জন দুগার্ড সহ কমপক্ষে ২০ জন বিশেষজ্ঞের। এতে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে, গাজায় গণহত্যা চালানো হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বৃটেনের এর বিরোধিতা করার বাধ্যবাধকতা আছে। তা তারা করছে না। এর মধ্য দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। হামাসের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। সমাবেশের অধিকার আছে। তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না বৃটেন। এটা বৈষম্যমূলক। এই আবেদনে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন বৃটেনের আইনের অধীনে যেভাবে হামাসের কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাস হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, একই কাজ তো করছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এবং বৃটিশ সেনাবাহিনী।

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে ফ্রান্স
ফিলিস্তিনিদের জন্য সুখবর দিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে তার দেশ। তার এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, বুধবার ফ্রান্স ৫ টেলিভিশন চ্যানেলকে ম্যাক্রন বলেছেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের সম্মেলনে চূড়ান্তভাবে তিনি তার দেশের অবস্থানের কথা পরিষ্কার করবেন। জুনে অনুষ্ঠেয় সৌদি আরবের ওই সম্মেলনের সহ-সভাপতি তার দেশ। ম্যাক্রন বলেন, আমাদেরকে অবশ্যই স্বীকৃতি দেয়ার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কয়েক মাসের মধ্যেই সেটা করবো আমরা। কাউকে খুশি করার জন্য আমি এটা করবো না। এটা করছি, এর একটিই কারণ। তা হলো ফিলিস্তিনিদের অধিকার আছে। ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন বার্তা সংস্থা এএফপি’কে বলেছেন, এই স্বীকৃতি হবে তার দেশের জন্য আর একটি সঠিক নির্দেশনা। ফিলিস্তিনি জনগণ এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য একটি রক্ষাকবচ। তবে ফ্রান্সের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার।

তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নিয়ে যেকোনো ‘একতরফা স্বীকৃতি’ হামাসকে উদ্বুদ্ধ করবে। এই ধরনের পদক্ষেপ কোনো শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা আনবে না এ অঞ্চলে। পক্ষান্তরে এই পদক্ষেপ এসব বিষয়কে আরও দূরে সরিয়ে দেবে। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৪৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে আর্মেনিয়া, স্লোভেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন, বাহামা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, জ্যামাইকা এবং বারবাডোজ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সমর্থন সত্ত্বেও কয়েকটি পশ্চিমা শক্তিধর দেশের কারণে সেই স্বীকৃতি আটকে আছে। এর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন ও জার্মানি। এবার ইমানুয়েল ম্যাক্রন বলেছেন, কতোগুলো দেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে তিনিও ইসরাইলকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করেন। যেসব দেশ ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে না তার মধ্যে আছে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন। ম্যাক্রন বলেছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে ইসরাইলের অধিকারের পক্ষে যারা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানকে পরিষ্কার করে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের সমাধানে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান ফ্রান্সের। ফ্রান্সের এই স্বীকৃতি দেয়ার ফলে ক্ষুব্ধ হবে ইসরাইল, এটা নিশ্চিত।  ওদিকে সম্প্রতি মিশর সফরে গিয়ে সেখানকার প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি এবং জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন। সেখানে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, গাজায় জায়নবাদীদের বসতি সম্প্রসারণ অথবা গাজার মানুষের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার দৃঢ়বিরোধী ফ্রান্স।

বেশির ভাগ আমেরিকানই ইসরাইলকে অপছন্দ করেন
সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিকেরই ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। গাজায় ইসরাইলের বর্বর হামলার ফলে এই বিদ্বেষ আরও জোরদার হয়েছে। এ খবর দিয়েছে মিডেল ইস্ট আই। এতে বলা হয়, সম্প্রতি পিউ রিসার্চ নামের একটি সংগঠন এ বিষয়ে একটি জরিপ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইসরাইলের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভব পোষণ করেন। ২০২২ সালের মার্চে করা জরিপে এ হার ছিল ৪২ শতাংশ। রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্রেটদের ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মতামত প্রকাশের পরিসংখ্যান বেশি। সর্বশেষ জরিপে ৬৯ শতাংশ ডেমোক্রেট ও ৩৭ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরাইলকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে ২০২২ সালে ২৭ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরাইলের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব রাখতেন। তবে গাজা যুদ্ধের পর থেকে রিপাবলিকানদের মধ্যে নেতিবাচক মতামত পোষণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ শতাংশ। এক্ষেত্রে ৫০ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব বেশি বেড়েছে বলে ওই জরিপে বলা হয়েছে। এ বয়সের প্রায় ৫০ শতাংশ রিপাবলিকান এবার ইসরাইলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ডেমোক্রেটদের মধ্যেও ইসরাইলকে নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেড়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় এবার ১৬ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান গ্রুপ ছাড়া বাকি সব ধরনের বয়স গ্রুপের মানুষ মনে করেন, গাজায় ইসরাইলের হামলা তাদের ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে মার্কিন ইহুদিদের সঙ্গে ইসরাইলের দূরত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ইসরাইল সরকার ও দেশটির সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ দূরত্ব আরও দ্রুত বেড়েছে।

mzamin

পররাষ্ট্রমন্ত্রী-সচিব আসছেন: পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মোড় by মিজানুর রহমান

৫৪ বছরে এই প্রথম এতটা নাটকীয় মোড় নিয়েছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক। প্রায় ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে যাওয়া সম্পর্কটি এখন কেবল ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সচল’ই নয়, বরং এতে দৃশ্যমান রূপান্তর ঘটতে চলেছে! সম্পর্কের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তি-চেষ্টার পাশাপাশি কিছু নতুনত্ব আনতে উভয়ের আগ্রহ রয়েছে- এমনটাই দাবি পেশাদার কূটনীতিকদের। তবে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, গবেষক এবং বিশ্লেষকরা বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেন। যা বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। সেগুনবাগিচা এটা নিশ্চিত করেছে যে, নতুন বাস্তবতায় পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে বোঝাপাড়া করতে চাইছে বাংলাদেশ। চলতি মাসে ঢাকায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের সফর হবে। প্রায় এক যুগ বিরতির পর ৬ষ্ঠ ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) বা রাজনৈতিক সংলাপ হবে দুই দেশের মধ্যে। ২০১০ সালে সর্বশেষ ইসলামাবাদে ৫ম এফওসি হয়েছিল। আসন্ন ঢাকা সংলাপে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে ডেইলি পাকিস্তান। তাদের রিপোর্ট মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমেনা বেলুচ এতে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করবেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দু’দেশের সম্পর্ক দৃঢ় করার প্রস্তাব। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি যৌথ কমিশন পুনর্বহালের বিষয়টি তুলতে পারে পাকিস্তান। এদিকে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চলতি মাসেই বাংলাদেশ সফর করছেন, এটা নিশ্চিত করেছে সেগুনবাগিচা। কিন্তু তার সফরের দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি বলে দাবি করেছেন সফর প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। পাকিস্তানি সংবাদ মাধ্যম অবশ্য সফরের সম্ভাব্য তারিখ তুলে ধরছে। তাদের রিপোর্ট মতে, আগামী ২২-২৪শে এপ্রিল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করবেন। তার এ সফরকে বাণিজ্য, কূটনীতিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে ইসলামাবাদ। ডেইলি পাকিস্তানের রিপোর্টের ফাইন্ডিংস হচ্ছে- ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশের ওপর থেকে ভারতের প্রভাব হ্রাস করে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি করে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে চাইছে। বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করতে চাইছে। যা বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্মরণ করা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরালো করতে পাকিস্তান আগ্রহী- এমন বার্তা দিয়ে গেছেন সদ্য ঢাকা সফরকারী পাকিস্তানের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি ঢাকায় দেশটির হাইকশিনার হিসেবে ক’বছর আগে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এবারে ভিন্ন  অ্যাসাইনমেন্টে আসা মিস্টার সিদ্দিকী পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উভয়পক্ষ দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে পরামর্শমূলক বৈঠক ও যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের সভা অনুষ্ঠানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠক ২০১০ সালে আর অর্থমন্ত্রী পর্যায়ের অর্থনৈতিক কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক হয় ২০০৫ সালে। ইমরান সিদ্দিকী এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের বিষয়েও আলোচনা করে গেছেন। তিনি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে লেখা ইসহাক দারের একটি চিঠিও পররাষ্ট্র সচিবের কাছে হস্তান্তর করেন। উভয়পক্ষ সার্ক, ওআইসি ও ডি-৮ কাঠামোর আওতায় আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। ২০১২ সালে পাকিস্তানের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানী খারের ঢাকা সফরের পর ইমরান সিদ্দিকী সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা যিনি ঢাকা সফর করেন।

শীতল সম্পর্কে উষ্ণতা আসে যেভাবে:
আগস্টে রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। এক মাসের মাথায় (সেপ্টেম্বরে) নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে দু’জনের মধ্যে বৈঠক হয়। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান শীতল সম্পর্ক অবসান হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল সেই মিটিং! এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মূল্যায়ন হচ্ছে- ‘গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক তলানিতে চলে যায়। অনেকের ধারণা, ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্কের কারণেই পাকিস্তানকে গুরুত্ব দেয়নি বাংলাদেশ। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আগামীতে যারা সরকারে আসবেন, তারাও পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখবেন- সেটি ধারণা করা যায়।’ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিষয়টি। এ বিষয়ে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, ক্ষতিপূরণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পদের ভাগাভাগি, আটকেপড়া বিহারিদের পুনর্বাসনসহ অমীমাংসিত অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। এগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন।’

সম্পর্ক উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ দৃশ্যমান: গত বছরের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের করাচি থেকে কন্টেইনারবাহী একটি জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে, যে সুযোগ আগে ছিল না। আওয়ামী শাসনামলে অবৈধ অস্ত্রসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্যের প্রবেশ বন্ধে পাকিস্তান থেকে আসা কন্টেইনারগুলো শতভাগ পরীক্ষার ব্যবস্থা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) এর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন মনে করেন- বিদায়ী সরকারের আমলে পাকিস্তান থেকে আসা কন্টেইনারগুলো শতভাগ পরীক্ষা করার যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা সঠিক ছিল না। গত ডিসেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশি ভিসা প্রাপ্তি সহজ করার নির্দেশ দেয়। আগে পাকিস্তানি নাগরিক এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত উন্নত দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনাপত্তিপত্র লাগতো। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, বাংলাদেশিদের জন্য পাকিস্তানের ভিসার চার্জ লাগবে না। ৮ মাসে দু’টি বৈশ্বিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের দেখা হয়েছে। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল এসএম কামরুল হাসান ইসলামাবাদ সফর করেন এবং সেখানে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় চেম্বার অব কমার্স ও ইন্ডাস্ট্রিজের (এফপিসিসিআই) একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেছে। এটা ছিল এক দশকে পাকিস্তানের কোনো উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের প্রথম ঢাকা সফর। প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের কর্মকর্তা ও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেছে। সফরকালে পাকিস্তান-বাংলাদেশ যৌথ ব্যবসায়িক কাউন্সিল গঠনের জন্য একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আহ্বান জানায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বছরে মাত্র ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে। জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রাক্কলন মতে, বাণিজ্য বিধি-নিষেধ পুরোপুরি দূর হলে এক বছরের মধ্যে দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব। তাদের রিপোর্ট মতে, চট্টগ্রাম ও করাচির মধ্যে মেরিটাইম রুটের সম্ভাবনা অবারিত। যা ৫২ বছর ধরে ব্যবহার হয়নি। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা যেতে পারে, যা ২০১৮ সালের পর থেকে বন্ধ।

’৭১-এর সংবেদনশীলতা এবং...
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়ে পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতা- বরাবরই দেশটির সঙ্গে সম্পর্কে সংবেদনশীল বিষয়। ইতিহাস বিবেচনায় এ নিয়ে আলোচনা, রাজনীতি কম হয়নি। তবে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে আওয়ামী আমলে, বিশেষত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রশ্নবিদ্ধ বিচারের প্রেক্ষাপটে। বর্তমান বাস্তবতায় কি বাংলাদেশের কূটনীতিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসবে? পাকিস্তানের তরফে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ কতোটা? সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশেরই বা লাভ কী? অথবা সমস্যার জায়গাগুলো কী? এ নিয়ে একাধিক বিশ্লেষণ রয়েছে বিবিসি বাংলার। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুমতাজ যেহরা বালোচ বিবিসির সঙ্গে আলাপে দাবি করেন বাংলাদেশের ব্যাপারে পাকিস্তান সবসময়ই শ্রদ্ধাশীল, ইতিবাচক ও গঠনমূলক অবস্থানকে আগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে কিছু সমস্যা হয়েছে, কিন্তু তা অতিক্রম করার ইচ্ছায় তাদের কোনো ঘাটতি ছিল না। বিবিসি’র রিপোর্টে সম্পর্কোন্নয়নে তাদের আগ্রহের বেশ কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেই রিপোর্টে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে উদ্ধৃত করা হয়। সেখানে মিস্টার হোসেন বলেন, গত ক’বছর ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল যাচ্ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত মুখ লেখক ফাহাম আবদুস সালাম মনে করেন গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের সরকার ভারতের চোখে পাকিস্তানকে দেখেছে এবং ১৯৭১ সালকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। অস্ট্রেলিয়া থেকে বিবিসি’র সঙ্গে কথা বলেন লেখক ফাহাম আবদুস সালাম। তার মতে, ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে অনেক পুরানো একটা সমপ্রীতির জায়গা ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে এসে সেটা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের পেছনে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমকে 'ঘৃণার সংস্কৃতি' প্রচারের জন্য দায়ী করেন মি. সালাম। হাসিনার পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘিরে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে উদ্বেগ দেখা গেছে। বাংলাদেশ পরবর্তী আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে পরিণত হবে কিনা? এমন আলোচনাও উঠেছে।

ক্ষমা প্রসঙ্গ: বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই একটি আলোচিত বিষয় ১৯৭১ সালের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা। এ নিয়ে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একাধিকবার কথা বললেও আনুষ্ঠানিকভাবে সেটা করা হয়নি। এখন কি সেই ক্ষমা চাওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয়া হবে? সে প্রসঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিস বালোচ মনে করেন ১৯৭১ সালের ‘বেদনাদায়ক’ ইতিহাস দুই দেশই বহন করে আসছে। তার দাবি এই সমস্যার সমাধান ১৯৭৪ সালে দুই দেশের নেতারা করে গেছেন। এ সংক্রান্ত চুক্তিও হয়েছে। ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পদ থেকে সরে যেতে হয়েছিল (২০শে ডিসেম্বর ১৯৭১)। তার বিদায়ের পর ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি ’৭০-এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানে জয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের জয় নিয়ে টানাপড়েনে ক্ষমতা হস্তান্তর স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালের তিক্ততা পেছনে ফেলে আন্তর্জাতিক মহলের চেষ্টায় '৭৪ সালে দুই দেশের নেতা-ই অপর দেশে সফর করেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪-এ পাকিস্তানের লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজিয়ে, তোপধ্বনি এবং গার্ড অব অনার দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। এর আগের দিন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। সে বছর জুন মাসে মি. ভুট্টো বাংলাদেশ সফর করেন। ঢাকায় মি. ভুট্টো বলেছিলেন, “যা হয়েছে তা নিয়ে অন্তর থেকে অনুতপ্ত হতে বা তওবা করতে দেরি হয়ে যায়নি। পাকিস্তানের মানুষ আপনাদের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানায়। তারা এবং পাকিস্তানের সরকার বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে স্বীকার করে এবং শ্রদ্ধা জানায়।” '৭৪-এর এপ্রিলের বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিবরণে রয়েছে যে, জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশের জনগণকে অনুরোধ করেছেন যেন তারা তাদের (পাকিস্তানকে) ক্ষমা করে দেন এবং অতীতের কথা ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে যান। শেখ মুজিবুর রহমানের তরফেও অতীত ভুলে নতুন সূচনা করার এবং “ক্ষমার নিদর্শন হিসেবে বিচার না চালানোর” সিদ্ধান্তের কথার উল্লেখ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি আর্কাইভ প্রতিবেদনে। দুই নেতার সে সময়কার দূরদর্শিতা সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন মিস বালোচ।

mzamin

ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করলো ভারত: আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে?

বাংলাদেশ থেকে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানিতে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে ভারত। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে নেপাল এবং ভুটানের ক্ষেত্রে এই সুবিধা চালু থাকবে। ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের কারণ হিসেবে দেশটির বিমানবন্দরে পণ্য জটের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভারতীয় গণমাধ্যম সম্প্রতি ‘সেভেন সিস্টার’ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য এবং ঢাকায় চলা বিনিয়োগ সম্মেলন এর বিষয় সামনে এনেছে। বাংলাদেশের খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য একটা ধাক্কা হবে। আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে। পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ভারতের সরকারি ওই সার্কুলারে বলা হয়েছে, স্থলবন্দর বা বিমানবন্দরগামী ভারতীয় স্থল কাস্টমস স্টেশন ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্যবাহী কার্গোকে পণ্য পরিবহন করতে দেয়া হবে না। সরকার এরই মধ্যে এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে। এর আগে বাংলাদেশকে দেয়া এই সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য ভারতের রপ্তানিকারকরা, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের রপ্তানিকারকরা সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিল। পিটিআই’র খবরে বলা হয়, ভারতের দেয়া এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার কারণে ভুটান, নেপাল এবং মিয়ানমারের মতো দেশে বাংলাদেশ মসৃণভাবে পণ্য রপ্তানি করতে পারতো। ২০২০ সালের জুনে বাংলাদেশকে এই সুবিধা দেয় ভারত। ৮ই এপ্রিল সেন্ট্রাল বোর্ড অব ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সেস অ্যান্ড কাস্টমসের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ২৯শে জুনের সার্কুলার বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সংশোধনী অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এরই মধ্যে যেসব পণ্যবাহী কার্গো ভারতে প্রবেশ করেছে তাদেরকে ওই সার্কুলারে দেয়া প্রক্রিয়ার অধীনে ভারতীয় অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যেতে দেয়া হবে। ভারতের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন ভারত ও বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের বিরুদ্ধে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আগের সার্কুলারের অধীনে ইন্ডিয়ান ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশনস (এলসিএস) হয়ে ভারতের স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের কার্গোকে অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এর অধীনে বাংলাদেশ থেকে তৃতীয় দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি হতো। বাণিজ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে তৈরি পোশাক, জুতা, জেমস ও অলঙ্কারের মতো ভারতীয় রপ্তানি খাতের সহায়ক হবে। বস্ত্রশিল্পে ভারতের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশন্সের (এফআইইও) মহাপরিচালক অজয় সাহাই বলেন, এখন আমাদের কার্গোর জন্য অধিক পরিমাণ সক্ষমতা পাবো।

অতীতে বাংলাদেশকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেয়ার কারণে এক্ষেত্রে স্থান সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন ভারতের রপ্তানিকারকরা। ওদিকে তৈরি পোশাকের রপ্তানিকারকদের সংগঠন এইপিসি বাংলাদেশকে দেয়া সুবিধা স্থগিত করার আহ্বান আগেই সরকারের কাছে জানিয়েছিল। কারণ, ওই সুবিধার মধ্য দিয়ে দিল্লি এয়ার কার্গো কমপ্লেক্সের মাধ্যমে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বিষয়ক কার্গোকে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। এইপিসি’র চেয়ারম্যান সুধীর সেখরি বলেন, প্রতিদিন দিল্লিতে লোড করা ২০ থেকে ৩০টি ট্রাক এসে পৌঁছে। এর ফলে কার্গোগুলোর মসৃণ চলাচল ধীরগতির হয়ে যায়। ফলে বিমান সংস্থাগুলো অনুচিত সুবিধা নিচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে বিমান ফ্রেইটের ভাড়া। রপ্তানি কার্গোগুলো হস্তান্তর ও প্রক্রিয়াকরণ বিলম্বিত হচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে মারাত্মক জট সৃষ্টি হয়।

থিংকট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্স ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, তৃতীয় কোনো দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরকারের ওই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি বিঘ্নিত হতে পারে। এর আগে বাংলাদেশকে যে ম্যাকানিজম বা সুবিধা দেয়া হয়েছিল তা ব্যবহার করে ভারতের ভেতর দিয়ে রুট ব্যবহার করতে পারতো। এতে ট্রানজিট সময় ও খরচ কম হতো। কিন্তু এখন সেই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি যৌক্তিকভাবে বিলম্বিত হতে পারে। খরচ বাড়তে পারে। অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের জন্য ট্রানজিট সুবিধা বিধিনিষেধে আটকে দেয়ার ফলে স্থলবেষ্টিত নেপাল ও ভুটান উদ্বেগ জানাতে পারে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন শ্রীবাস্তব। তিনি আরও বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, ভূমিবেষ্টিত দেশগুলো থেকে এবং সেখানে পণ্য সরবরাহের জন্য ট্রানজিট সুবিধার স্বাধীনতা অনুমোদিত। এর অর্থ হলো এই ট্রানজিটে কোনো বিধিনিষেধ থাকতে পারবে না। অপ্রয়োজনে বিলম্ব করা থেকে তা মুক্ত থাকতে হবে। উল্লেখ্য, জেনেভাভিত্তিক এই সংগঠনের সদস্য বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়েই।

ওদিকে বাংলাদেশের পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করার যে সিদ্ধান্ত ভারত নিয়েছে, তা নেপাল বা ভুটানগামী পণ্য চালানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতের স্থলসীমান্ত ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভুটান বা নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য হয়, তার ওপর ভারতের নতুন সিদ্ধান্তের কোনো প্রভাব পড়বে না বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য।

বুধবার সন্ধ্যায় বিষয়টি স্পষ্ট করে এই বিবৃতি দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশকে দেয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে উল্লেখযোগ্য পণ্যজট সৃষ্টি হচ্ছিল। এই কারণে আমাদের নিজস্ব রপ্তানিতে বিলম্ব, খরচ বৃদ্ধি এবং ব্যাকলগ তৈরি হচ্ছিল। ফলে, এই সুবিধা ৮ই এপ্রিল ২০২৫ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। স্পষ্ট করে বলা যায়, এই সিদ্ধান্ত ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে নেপাল বা ভুটানে পণ্য পরিবহনের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

উল্লেখ্য, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোকে ভূমিবেষ্টিত দেশগুলোর জন্য অবাধ ট্রানজিট সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়।১৯৯৪ সালে সংস্থাটির জারি করা জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (জিএটিটি)-এর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুসারে, সব সদস্যকে স্থলবেষ্টিত দেশগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সীমা দেয়া যাবে না। তাছাড়া এই পণ্য পরিবহনকে শুল্কের আওতায় ফেলা যাবে না।

ফলে ভারত যদি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে তা ডব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ওদিকে কোনোরকম আলাপ-আলোচনা ছাড়াই বাংলাদেশকে দেয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভারত বাতিল করার সিদ্ধান্ত হতবাক করেছে সংশ্লিষ্ট খাত গবেষকদের। এই সিদ্ধান্ত বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মানবজমিনকে বলেন, কোনোরকম আলাপ-আলোচনা ছাড়াই বাংলাদেশকে দেয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভারত বাতিল করার সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছি। বাংলাদেশের সরকারের উচিত এই বিষয়ে দ্রুতই ভারতের কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া। একইসঙ্গে অনুরোধ থাকবে যাতে এই সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখে। তবে প্রতিক্রিয়া হিসেবে যাতে বাংলাদেশ পাল্টা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন এই গবেষক। ভারতের সিদ্ধান্তে কী প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তুলনামূলকভাবে প্রভাব কম পড়বে। কিছুটা রপ্তানি প্রভাব পড়তে পারে। 

mzamin

কেন পিছুটান দিলেন ট্রাম্প!

অতিরিক্ত শুল্কনীতি ঘোষণা করে তার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে চেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার থেকে এই শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৮ ঘণ্টার মধ্যে চীনকে বাদ দিয়ে এই শুল্কনীতি তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন ট্রাম্প। কিন্তু কেন এত তাড়াহুড়ো  এবং সেখান থেকে তিনি দৃশ্যত পিছুটান দিলেন! এ নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ৯ই এপ্রিল থেকে এই শুল্কনীতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে একশ’ বছরের মধ্যে এটা ছিল সর্বোচ্চ শুল্ক। ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে বন্ডের বাজারে অশনিসংকেত দেখা দেয়। নতুন শুল্কনীতির প্রভাবে এক সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন শেয়ারবাজারের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১২ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। এরপরও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলতে থাকেন, তারা আত্মবিশ্বাসী। তাদের বিশ্বাস, ট্রাম্পের  বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন এবং কয়েক দশকের পুরোনো বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াকে বাতিল করে দেয়ার পরিকল্পনা বেশ ভালোভাবে কার্যকর হবে। হোয়াইট হাউসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন শেয়ারবাজার (ওয়াল স্ট্রিট) বুঝতে পারে না, একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিক প্রতিদিন কী চান- আর সাধারণ নাগরিকরা এখনো ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেন।

তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সংঘাত আরও উত্তপ্ত করে তুললেও অন্য দেশের ওপর নতুন শুল্ক স্থগিত করেন। এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে পুঁজিবাজারের সূচকে বড় ধরনের উত্থান ঘটে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে নেয়া শুল্কনীতি পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথে পোস্ট দেয়ার প্রায় ৯০ মিনিট পর ট্রাম্প বলেন, আমার মনে হয়, মানুষ এটিকে আর্থিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দিন হিসেবে আখ্যায়িত করছে। তার শুল্ক স্থগিতের সিদ্ধান্ত অনেককেই হতবাক করেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার বিকাল পর্যন্ত ট্রাম্প ও তার বাণিজ্য উপদেষ্টারা বহু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এবং বিদেশি নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও বিশ্ব জুড়ে ক্রমবর্ধমান মন্দার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এমন পরিস্থিতিতে কিছু করার জন্য তারা ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান। বুধবার বিকালে ট্রাম্প বলেন, কয়েক দিন ধরেই তিনি নিজের মত বদলানোর কথা ভাবছিলেন। তিনি বলেন, সম্ভবত সকালেই বেশ সকালেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা লিখে ফেলি। আমরা  কোনো আইনজীবীর দ্বারস্থ হইনি। আমরা এটি আমাদের হৃদয় থেকে লিখেছি।

মঙ্গলবার রাতে ফক্স নিউজে শন হ্যানিটির রাত ৯টার অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া একদল রিপাবলিকান সিনেটরের সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ফোনালাপ করেন ট্রাম্প। এ সময় কিছু সিনেটর ট্রাম্পের নতুন আরোপিত শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওই সন্ধ্যায় ট্রাম্প বন্ড বাজারেও নজর রাখছিলেন, যেখানে মানুষজন কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন। শন হ্যানিটির সাক্ষাৎকারের শেষে সিনেটর জন নিলি কেনেডি শুল্ক নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে উপস্থাপকের কাছে ১৫ সেকেন্ড সময় চান। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে কেনেডি বলেন, সময় চাওয়ার কারণ ছিল, সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম তাকে বলেছিলেন, ট্রাম্প অনুষ্ঠানটি দেখবেন। হ্যানিটির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে  কেনেডি ও গ্রাহাম ছাড়াও সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন, রিপাবলিকান সিনেটর টিম স্কট, সাউথ ক্যারোলাইনার কেটি বয়েড ব্রিট, আরকানসর টম কটন,  টেক্সাসের টেড ক্রুজ এবং ওকলাহোমার মার্কওয়েন মুলিন উপস্থিত ছিলেন। কিছু সিনেটর ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসা অন্য দেশের সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এসব সিনেটরের কয়েকজন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেন। গ্রাহাম বলেন, তিনি মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্পকে বলেন- কোনটা যথেষ্ট আর  কোনটা যথেষ্ট নয়, তা ঠিক করার দায়িত্ব আমি আপনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমি মনে করি, আপনি বুঝতে পারছেন, মানুষজন সত্যিকারের অগ্রগতি চাইছে।

mzamin


৫ কিলারের লোমহর্ষক বর্ণনা: মিস কিলিংয়ের শিকার আইনজীবী সুজন

মিস কিলিংয়ের শিকার হন তরুণ আইনজীবী সুজন মিয়া। ভুল টার্গেটে কিলিং মিশন সম্পন্ন করে কিলাররা। মুঠোফোনে পাঠানো ছবির সঙ্গে মিল ভেবে ভাড়াটে ঘাতকরা দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে কিলিং মিশন। ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ডকে মারতে গিয়ে তারা ভুলক্রমে খুন করে আইনজীবী সুজনকে। মৌলভীবাজার শহরে পৌরসভা এলাকায় ঘাতকদের ছুরিকাঘাতে আইনজীবী সুজন মিয়া চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনার ৫ দিনের মাথায় প্রেস বিফিংয়ে ৫ জনকে গ্রেপ্তার ও হত্যার নেপথ্যের রহস্য গণমাধ্যমকর্মীদের জানান পুলিশ সুপার। গতকাল দুপুরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কনফারেন্স হলে প্রেসবিফিংয়ে পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন ঘাতকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান এ পর্যন্ত আইনজীবী সুজন মিয়া হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার রাত প্রায় ১১টার দিকে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানাধীন মৌলভীবাজার পৌরসভার পশ্চিম পাশে মেম্বার রোডের ৪৪নং শাকির ভবনসংলগ্ন তালাবাহ হুমায়ুন হক ফ্রুট স্টোর দোকানের পাশে ফুটপাথের উপর আইনজীবী সুজন মিয়াকে অজ্ঞাতনামা কতিপয় ব্যক্তি ধারালো চাকু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। ওই ঘটনায় সুজনের ভাই এনামুল হক সুমনের এজাহারের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় মামলা হয়।

একটি বিশেষ টিম গঠন করে জেলার বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান, পার্শ্ববর্তী জেলাসহ তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হয়। অভিযান পরিচালনা করে বুধবার ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী নজির মিয়া মুজিব (২৫), পিতা-সামছুল হক, গ্রাম: বাসুদেবশ্রী (কালিশপুর), থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মো. আরিফ মিয়া (২৭), পিতা-মৃত সিজিল মিয়া, রঘুনন্ধনপুর, বাসা নং-৫২, থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার সদর। হোসাইন আহমদ সোহান (১৯), পিতা-আনসার মিয়া, গ্রাম: দিশালোক, ইটা সিংকাপন, থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার। লক্ষণ নাইডু (২৩), পিতা-মনা নাইডু, মাথিউরা চা বাগান, থানা-রাজনগর, জেলা-মৌলভীবাজার। আব্দুর রহিম (১৯), পিতা-মো. রফিকুল ইসলাম, গ্রাম: কাশিপুর পূর্বপাড়া, থানা-কেন্দুয়া, জেলা-নেত্রকোনা, বর্তমান ঠিকানা: মল্লিকসরাই (জসিম মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া), থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার। এদের আটক করা হয়। আসামি নজির মিয়া মুজিবের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করে জব্দ করা হয়। নজির মিয়া মুজিবকে আটক করার পর মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হয়।

সূত্রমতে, নজির মিয়া মুজিব তার পাশের বাড়ির অগ্রণী ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড মিসবাহের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতা ছিল। মুজিব চেয়েছিল মিসবাহকে একটা কঠিন জবাব দিতে। দুই বছর পূর্বে নজির মিয়া মুজিব শহরের চাঁদনীঘাট এলাকায় হোটেলে কাজ করাকালীন সময়ে দুধ ব্যবসায়ী লক্ষণের সঙ্গে পরিচয় হয়। লক্ষণের মাধ্যমে মিসবাহকে মারার জন্য টাকার বিনিময়ে কিলার ভাড়া করে মুজিব। মুজিব ভাড়াটিয়া ঘাতক লক্ষণসহ অন্যান্যের মোবাইলের মাধ্যমে মিছবাহের ছবি পাঠায়। ঘটনার দিন শহরের কাশিনাথ আলাউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের খেলার মাঠে চলা বাণিজ্যমেলায় ভাড়াটিয়া কিলাররা আইনজীবী সুজনকে দেখে মিসবাহ ভেবে মুজিবকে ফোন দেয়। তারা তাকে জানায়, যে লোকের ছবি পাঠিয়েছ সেই লোককে আমরা পেয়েছি। মুজিব ভাড়াটিয়া  কিলারদের ভিডিওকলের মাধ্যমে টার্গেট দেখিয়ে নিশ্চিত করতে বলে। খুনের শিকার সুজনকে কিলার আব্দুর রহিম ইমুতে ভিডিওকল দিয়ে মুজিবকে টার্গেট দেখায়। মিল থাকাতে তখন মুজিব তাদের মারতে বলে। তখন তারা সুজনের ওপর আঘাত চালায়। প্রেস বিফিংয়ে জানানো হয়, এই ৫ জন ছাড়াও ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করতে তৎপর রয়েছে পুলিশ। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা, ডিআইও মো. আবু হোসাইন, মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গাজী মো. মাহবুবুর রহমান, ডিবি’র ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবিরসহ জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা।

mzamin

১০ নেতার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে আইজিপি’র দপ্তরে আবেদন

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারির আবেদন জানিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) চিঠি পাঠানো হয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে ইন্টারপোলকে এই অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অন্যরা হলেন- সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ঢাকা সিটির সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী।

চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইন্টারপোলের মাধ্যমে ১০ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে আইজিপিকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। জুলাই-আগস্টে গণহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার পলাতক আসামি তারা।

তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেড়-দুই হাজারের বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। ২৫ হাজারের মতো ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন। সব ঘটনার জলজ্যান্ত প্রমাণ রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে আমরা সেটা প্রমাণ করতে সক্ষম হবো। ট্রাইব্যুনালে মামলার পরিসংখ্যান নিয়ে বলা হয়, মোট ৩৩৯টি অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বেসামরিক, সামরিক ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৪১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ জন বেসামরিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৬২ জন এবং ৯ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়েছেন। পরোয়ানা জারির পর ৫৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি ৮৭ জন আসামি পলাতক। এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২২টি মামলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, উত্তরায় অবস্থিত একটি গোপন বন্দিশালায় উদ্ধার করতে গিয়ে টাইমার সংযুক্ত শক্তিশালী বোমা দেখা যায়। গত ২৫শে জানুয়ারি ওই বন্দিশালার একটি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে তল্লাশি চালানোর সময় বালতির নিচে লুকিয়ে রাখা বোমাগুলো পাওয়া যায়। দেখতে পেয়ে আমি দ্রুত স্টপ বলে সতর্ক করি। এর ফলে আমরা রক্ষা পাই। ভেতরে পাওয়া এই বিস্ফোরকগুলো একসঙ্গে ফাটলে পুরো ভবন ধ্বংস হয়ে যেতো বলে জানিয়েছে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল। নিরাপত্তাজনিত কারণে ঘটনাটি তখন গোপন রাখা হয়। বোম ডিসপোজাল ইউনিট গিয়ে বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করে। বোমাগুলোর শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলে পুরো ভবন উড়ে যেতো। সেই গোপন ঘরে গুম ও নির্যাতনের শিকারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন রুমের ছদ্ম দেয়াল ভেঙে সেল, বাথরুম, টর্চার রুমের সন্ধান পাওয়া যায়। ঘটনাগুলো ধাপে ধাপে ডকুমেন্টেড করে রাখা হয়েছে। তাজুল বলেন, আমরা তখন ঘটনাটা জানায়নি। কারণ এতে তদন্ত বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই প্রধান উপদেষ্টা ওই গুম ঘর পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল। আমরা চাইনি এটা নিয়ে নিরাপত্তার অজুহাতে প্রধান উপদেষ্টার পরিদর্শনে যাতে কোনো ধরনের বাধা না আসে। আমরা মনে করেছি, গুম ঘরটি প্রধান উপদেষ্টার পরিদর্শন করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চারটি মামলা তদন্ত শেষ বা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো হলো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হওয়া মামলা, সাভারের আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলা, রাজধানীর চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা এবং রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা ব্যক্তির ওপর গুলির ঘটনায় হওয়া মামলাটি রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দাখিল করা হতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য এখন পর্যন্ত এক হাজার ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এক হাজারের বেশি ভিডিও পর্যালোচনা, যাচাই-বাছাই ও জিও লোকেশন কাজ করা হয়েছে। গুমবিষয়ক তদন্ত কার্যক্রমে ঢাকা শহরের তিনটি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়া জেলায় গুমের তিনটি কেন্দ্র পরিদর্শন ও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ১৫টি জেলায় তদন্ত পরিচালনার উদ্দেশ্যে একাধিকবার পরিদর্শন করা হয়েছে। তদন্তকাজে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়-মাদ্রাসা পর্যায়ে এ পর্যন্ত চারটি গণশুনানি গ্রহণ করা হয়েছে। তাতে আট শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন।

সভায় প্রসিকিউটর আব্দুস সোবহান তরফদার, মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, আবদুল্লাহ আল নোমান, সাইমুম রেজা তালুকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির অর্থ হলো- ওই ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও বিচার বিভাগ বিচারের মুখোমুখি করতে অথবা দণ্ড কার্যকর করার জন্য খুঁজছে। সদস্য দেশগুলো ইন্টারপোলের মাধ্যমে পলাতক আসামির সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে এবং সে দেশের সরকার তা খতিয়ে দেখে সন্তুষ্ট হলে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।

mzamin

‘আমি কষ্ট পাইনি তবে বিব্রত হয়েছি’ by সামন হোসেন

ঈদের ছুটির ঠিক আগের দিন কাজী রাজীব উদ্দীন আহমেদ চপলকে সাধারণ সম্পাদক করে আরচারি ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করেছিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। এরপর সার্চ কমিটির পদত্যাগের হুমকিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন এনে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক এই সংস্থা। ঈদের ছুটির মধ্যে কমিটি পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন দিয়ে নজির সৃষ্টি করে এনএসসি। এনএসসি’র দেওয়া অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক করা হয় তানভীর আহমেদকে। চপলকে করা হয় ১৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির এক নম্বর সদস্য। হঠাৎ কী এমন ঘটনা ঘটলো যে মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে চপলকে সরিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন দিতে হলো? এ নিয়ে মানবজমিনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশের আরচারি পথিকৃৎ কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল। তার অংশ বিশেষ মানবজমিনের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

আপনার কী মনে হয়? কেন মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে সরকারি ছুটির মধ্যে প্রজ্ঞাপন দিয়ে আপনাকে সরিয়ে দেয়া হলো?
চপল: এটা আসলে আমার চেয়ে আপনারা ভালো বলতে পারবেন। আমি আসলে কিছুই জানি না। আমি কারো কাছে আমাকে রাখার জন্য যেমন তদবির করিনি, তেমনি কেন বাদ দেয়া হয়েছে তাও জানতে চাইনি। আমি তো আরচারি সেবক। এখন উনারা যা ভালো মনে করেছেন তাই করেছেন। কে বা কারা বাইরে থেকে খেলছে, তা তো বলতো পারবো না। তবে আমি কাপুরুষ নই যে, সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বাদ দিয়েছে বলে ফেডারেশনেই আর থাকবো না। বড় পদে না থেকেও যে খেলাটি এগিয়ে নেওয়া যায় সেই চেষ্টা করে যাবো। সামনে দুটি প্রকল্প আছে। সেটা আগে এখন শেষ করতে হবে।

দায়িত্ব দেয়ার পর ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে সরিয়ে দেয়াতে আপনি কি কষ্ট পাননি?
চপল: সত্যি বলতে আমি একটুও কষ্ট পাইনি। তবে বিব্রত হয়েছি। 

আপনি বললেন কে বা কারা বাইরে থেকে খেলছে। তারা কারা? 
চপল: ক্রীড়াঙ্গনে আমার কোনো শত্রু নেই। যারা আছেন তারা সবাই আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। আমি কারো ওপর দায় চাপাতে চাই না।

কিন্তু সার্চ কমিটি তো সরাসরি আপনার বিরোধিতা করেছে। আপনাকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি দেয়ার পর পদত্যাগের হুমকি দিয়েছে-
চপল: দেখুন সরকার ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কারে তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। তারা হয়তো চিন্তা করেছে আমাকে দিয়ে আর হবে না। তাই আমাকে সরিয়ে দিয়েছে। এতে আমি বিন্দুমাত্র কষ্ট পাইনি। তাদের ওপরও আমার কোনো রাগ নেই। তারা সবাই আমার বন্ধু কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সর্ম্পক।
তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সর্ম্পক।

সুদীর্ঘ সময় আরচারির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার নেতৃত্বেই পরপর দুটি অলিম্পিকে দু’জন আরচার সরাসরি অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করেছে। ২০১৯ সালের এসএ গেমসে আরচারিতে দশটি সোনা জিতেছে বাংলাদেশ। আরচারি খেলাটিকে দেশের অন্যতম সেরা ফেডারেশনে পরিণত করেছেন। দীর্ঘ পথচলায় আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?
চপল: আমি একজন দেশপ্রেমিক সংগঠক। আমি দেশকে ভালোবেসে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি খেলাটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কতটুকু পেরেছি তার মূল্যায়ন আপনাদের মাধ্যমে দেশের জনগণ করবে। তবে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট না। কারণ কাজ করতে গিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। বারবার আমাকে টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। নানাভাগে খেলোয়াড়দের মাথাভারি করেছে একটা গ্রুপ। তাদের কারণেই রোমান সানার মতো খেলোয়াড় বিগড়ে গেছে। বার বার আমাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরেও আমি আমার চেষ্টা চালিয়ে গেছি।

অলিম্পিকে পরপর দু’বার কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। কী এমন হলো সবশেষ কমিটিতে আপনাকে রাখাই হলো না?
চপল : এখানে অনেক বড় গল্প আছে। তা আমি এখন বলতে চাই না। আমি কারো বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাই না। তবে এটুকু বলি,  অলিম্পিকে আমি যাদের খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম হয়তো তারা চায়নি আমি থাকি। তারা সেনা প্রধানের দোহাই দিয়ে আমাকে বাদ দিয়েছে। অথচ পরে সেনা প্রধান আমি কেন নাই সেটা জানতে চেয়েছেন।

শোনা যাচ্ছে আপনি অলিম্পিকের মহাসচিব পদে নির্বাচন করবেন। সার্চ কমিটির একজনের কথাও শোনা যাচ্ছে, এই পদে তিনিও আগ্রহী। গুঞ্জন আছে তিনি তার রাস্তা পরিষ্কার করতেই আপনাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে উপদেষ্টার দোহাই দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে-
চপল: আমার মনে হয় না আমাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রাখলে উপদেষ্টা কিছু বলতেন। যাইহোক এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমার নিজের কোন ইচ্ছে নেই অলিম্পিকের মহাসচিব হওয়ার। তবে পরিস্থিতির কথা বলা যায় না। সার্চ কমিটির কারো অলিম্পিকে নির্বাচন করার বিষয়ে আমি এখনো কিছুই জানি না। 

এটাতো অ্যাডহক কমিটি। সামনে নির্বাচন হবে ফেডারেশনে। আপনি কি ফেডারেশনে নির্বাচন করবেন?
চপল: সেটা আসলে সময়ই বলে দেবে। আমার বয়স হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছি। ক্রীড়ালেখক সমিতির সেরা সংগঠক হয়েছি। অনেক পেয়েছি আরচারি থেকে। কমিটিতে না থাকলেও আরচারির সংগঠক হিসেবে থাকতে চাই। কারণ আরচারি আমার রক্তে। 

এবার বলুন কমিটি কেমন হলো? এরা কি পারবে কমিটিকে ঠিক ঠাকমতো চালিয়ে নিতে?
চপল : খুবই ভালো কমিটি হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক তানভীর খুবই ভালো ছেলে। ও বিদেশে থাকতে কমিটি ঘোষণা হয়েছে। দেশে ফিরেই ও আমার সঙ্গে বাড়িতে এসে দেখা করেছে। আমি ওকে যুগ্ম সম্পাদক আলমগীরকে ফুল দিয়ে মিষ্টি খাইয়ে বরণ করেছি। এমনিতে আরচারি সঠিক পথেই আছে। সিটি গ্রুপের মতো একটি প্রতিষ্ঠান আরচারির সাথে আছে। এবার স্কয়ার সাঈদ সাহেব কমিটিতে আসছেন। ফান্ডে প্রায় নয় কোটি টাকা আছে। পাইপ লাইনে যথেষ্ট খেলোয়াড় আছে। সবকিছু মিলিয়ে আরচারি চালিয়ে নিতে নতুন কমিটির সমস্যা হওয়ার কথা না। 
mzamin

সাহায্যের দোকান খুলেছিলেন আন্দোলনের নেত্রী by সাজ্জাদ হোসেন

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে গত ১৯শে জুলাই সানারপাড় এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন বুলবুল শিকদার ও তার ছেলে রাকিবুল শিকদার। স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন বুলবুল ও তার ছেলে। বুলবুলের অবস্থার অবনতি হলে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) স্থানান্তর করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া আফরিন আশরাফ  বুলবুলকে এক পর্যায়ে প্রস্তাব দেন আন্দোলনে আহতদের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হবে- বিনিময়ে আফরিনকে কিছু টাকা দিতে হবে। এ ছাড়াও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে চাকরি দিয়ে দেয়াসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ৯০ হাজার টাকা নেন বুলবুলের কাছ থেকে। শুধু বুলবুল নন, আরও অনেকের কাছ থেকে এভাবে অর্থ নিয়েছেন আফরিন আশরাফ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আফরিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ছাত্রআন্দোলনে অংশ নেয়ার সুবাদে আফরিন নারায়ণগঞ্জে আহত ও শহীদদের পরিবারকে সাহায্য করার নামে রীতিমতো দোকান খুলে বসেছিলেন। একে একে অভিযোগ আসায় তার বিষয়ে অনুসন্ধান চালায় জুলাই শহীদ ফাউন্ডেশন। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাকে ডেকে এনে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আফরিনের এমন কর্মকাণ্ডের তথ্য পেয়ে ছাত্রআন্দোলন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও তাকে বহিষ্কার করেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন মানবজমিনকে জানান, আফরিন আশরাফ জাতীয় নাগরিক কমিটির সিদ্ধিরগঞ্জ শাখার সদস্য ছিলেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিতে তিনি ছিলেন না।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রতারণার লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জের জালকুঁড়িতে অফিস খুলেছিলেন আফরিন। এমনকি জেলা সিভিল সার্জন অফিসের আহত ও শহীদ পরিবারের তালিকাও সংগ্রহ করতেন। তালিকায় থাকা ফোন নাম্বারে যোগাযোগের জন্য একজন কলেজছাত্রকে নিয়োগ দিয়েছিলেন তার অফিসে। এ পর্যায়ে আফরিনের প্রতারণার বিষয়টি টের পেয়ে চাকরি থেকে সরে আসেন ওই শিক্ষার্থী।

গতকাল আফরিনকে আটকের তথ্য পেয়ে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাইন্ডেশনের অফিসে ভিড় করেন প্রতারণার শিকার অনেকে।  সেখানে কথা হয় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বুলবুলের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ১৯শে জুলাই তার ছেলে রাকিবুলকে মোটরসাইকেলে করে আনতে যান বুলবুল শিকদার। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া হলে ছেলেকে নিয়ে মাঝখানে পড়ে যায়। দ্রুত মোটরসাইকেল চালিয়ে স্থান ত্যাগ করার সময় দুর্ঘটনায় পড়েন বুলবুল। সাইনবোর্ড এলাকায় প্রো-অ্যাক্টিভ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেন। অবস্থার অবনতি হলে বুলবুলকে ভর্তি করা হয় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর)। কোনো একভাবে জুলাই আন্দোলনের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয় বুলবুল ও তার ছেলে রাকিবের। নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিস থেকে সেই তালিকা সংগ্রহ করে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ছাত্র প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে আফরিন ফোন করেন আহত বুলবুলকে। চিকিৎসার যাবতীর কাগজপত্র সত্যায়িত করার জন্য বুলবুলের কাছ থেকে নেয়া হয় ১০ হাজার টাকা।

আবার জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সহায়তার জন্য সরকারি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির সময় নেই জানিয়ে আফরিন বলেন, যদি বুলবুল ও রাকিবুলের নাম এমআইএস-এ অন্তর্ভুক্তির জন্য ১ লাখ টাকা দেয়া হয় তাহলে কাজ করে দিবেন। বুলবুলের পরিবার থেকে প্রথমে চেকে ৫০ হাজার টাকা নেন তিনি। পরে বুলবুল ও রাকিবুলকে সরকারি সহায়তার জন্য করা তালিকা এ-ক্যাটাগরিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং মাসিক ভাতা দেয়ার কথা বলে নেন আরও ৩০ হাজার টাকা।

ওদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ২১শে জুলাই সাইনবোর্ড এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আহসান কবির শরীফ। শরীফের বাবা জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে তার ছেলের সঙ্গে পুত্রবধূ হাফিজা আক্তার হ্যাপির ডিভোর্সের ভুয়া কাগজ জমা দেন। শহীদদের জন্য বরাদ্দ ৫ লাখ টাকা নেয়ার জন্য এ কাজ করেন তিনি। খবর পেয়ে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে অভিযোগ দিলে আটকে দেয়া হয় শহীদ শরীফের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা। এ তথ্য পেয়ে হ্যাপির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আফরিন। টাকা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে প্রথমে ২৫ হাজার টাকা নেন তিনি। পরে উভয় পরিবারের সমঝোতার ভিত্তিতে হ্যাপি জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে আড়াই লাখ টাকা পেলে সেখান থেকেও ২৫ হাজার টাকা নেন আফরিন।

৫ই আগস্ট দুপুরে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে আহত হন মো. বেলাল হোসেন। তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলায় হওয়ায় সেখান থেকে এমআইএস করান বেলাল। এ তথ্য জানতে পেরে বেলালকে নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিস থেকে আহতদের জন্য দেয়া ২০ হাজার টাকা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে ফোন দেন বেলালকে। পরে বেলালকে ডিসি অফিসে নিয়ে ২০ হাজার টাকার চেক দিয়ে সেখান থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন আফরিন।  কৌশলে আফরিনকে টাকা না দিয়ে বাসায় চলে আসে বেলাল। পরে বেলালকে ফোন দিয়ে আফরিন জানান যদি ১০ হাজার টাকা দেন তাহলে পরবর্তীতে ডিসি অফিস থেকে আহতদের জন্য দেয়া ৫০ হাজার টাকাও পাবেন। বেলালের ব্যক্তিগত ঋণ থাকায় এক পর্যায়ে আফরিনকে ৮ হাজার টাকা দিতে রাজি হন।

অঙ্কন দাস গত ১৭ই জুলাই রায়েরবাগে পুলিশের গুলিতে আহত হন। নারায়ণগঞ্জের খানপুরে চিকিৎসা নেয়া অঙ্কনকে ফোন করে ডিসি অফিস থেকে টাকা দেয়ার কথা বলে সব তথ্য চান আফরিন। পরে ডিসি অফিসে নিয়ে ২০ হাজার টাকার চেক দিয়ে জুলাই আন্দোলনে অন্য আহতদের সহায়তার জন্য ১০ হাজার টাকা দাবি করে আফরিন। অঙ্কন সেদিন টাকা না দিলেও পরবর্তীতে ডিসি অফিস থেকে আরও টাকা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ১০ হাজার টাকা নেয়া হয় অঙ্কন থেকে।

মানবজমিনকে অঙ্কন বলেন, আমি প্রায় ২ মাসের মতো বিছানায় পড়ে ছিলাম। আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। অনেক টাকা খরচ হয়েছে আমার চিকিৎসায়। কিন্তু আমাকে বিভিন্ন কথা বলে প্রতারণা করে যে ১০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে আমি এই টাকা ফেরত চাই।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের লিগ্যাল অফিসার এডভোকেট পায়েল মানবজমিনকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে প্রতারণার বিভিন্ন ঘটনা শনাক্ত করছি। আমরা ভুয়া আহতদের চিহ্নিত করে মামলা দেয়া, মুচলেকা নেয়া এবং টাকা ফেরত চেয়ে শোকজ নোটিশ দেয়াসহ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি। যেহেতু আফরিন আশরাফ জুলাই আন্দোলনের আহত এবং নিহত অনেক পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, আমরা তাকে কোনোভাবেই ছাড় দিবো না। প্রতারণার অভিযোগে রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করে আফরিনকে পুলিশে দিয়ে দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান ভেরিফিকেশন কর্মকর্তা মো. হারুন মানবজমিনকে বলেন, আমরা এসব প্রতারকদের ব্যাপারে আগের চেয়ে অধিক সতর্ক। কোনো প্রতারকই ছাড় পাবে না। কে ছাত্র প্রতিনিধি, কিংবা নেতা-নেত্রী আমরা এসব আমলে নেই না। এ ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র জুলাই আন্দোলনের আহত ও নিহতদের সহায়তা দেয়ার জন্য খোলা হয়েছে।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ মানবজমিনকে বলেন, এই ফাউন্ডেশনের টাকা বাংলাদেশের জনগণের টাকা। শহীদ ও আহতদের সহায়তার জন্য দেয়া এসব টাকা আমাদের কাছে আমানত হিসেবে দেয়া হয়। আমরা প্রকৃত আহত কিংবা শহীদ পরিবারকে দিয়ে থাকি। ফাউন্ডেশনের টাকা যেন কোনো ভুল মানুষের কাছে না যায় আমরা এ ব্যাপারে সতর্ক আছি। ইতিমধ্যে প্রতারণার অভিযোগে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

mzamin

ইরানের বিরুদ্ধে কী বি-২ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করবে যুক্তরাষ্ট্র!

মার্চে ভারত মহাসাগরে মার্কিন-বৃটিশ যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে আমেরিকান বি-২ বোমারু বিমান মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। পারমানবিক কর্মসূচী নিয়ে ইরানের সঙ্গে বিরোধের মধ্যেই ওই বোমারু বিমান মোতায়েন করে দেশটি। ওই বিমান মোতায়েন ইরানের জন্য সতর্কবার্তা ছিলো কিনা এ বিষয় জিজ্ঞাসা করা হলে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন- এটি ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়াগো গার্সিয়াতে ছয়টি বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়। ইয়েমেনে বোমা বর্ষণ ও ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই ওই বিমান মোতায়েন করা হয়। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে মাত্র ২০ টি বি-২ বিমান আছে। এই বিমান ৩০ হাজার পাউন্ডের জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর বহনে সক্ষম। জিবিইউ-৫৭ একটি পারমাণবিক অস্ত্র। মাটির অনেক গভীরে কোনো টার্গেটকে এই অস্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোকে টার্গেট করতে যুক্তরাষ্ট্র এই বোমা ব্যবহার করতে পারে।

এই বোমা মোতায়েনের মাধ্যমে ইরানকে সতর্কবার্তা দেয়া হচ্ছে কিনা প্রশ্ন করা হলে হেগসেথ বলেন, এটি একটি দুর্দান্ত সম্পদ। এর মাধ্যমে সকলের কাছেই একটি বার্তা যায়। পানামা সফরকালে সাংবাদিকদের এমন তথ্য দেন তিনি। আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান কোনো পারমানবিক বোমার অধিকারী হতে পারবে না। হেগসেথ বলেন, আমরা আশাবাদী ট্রাম্প শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিষয়টি নজরদারি করবেন। সোমবার ট্রাম্প এক আকস্মিক ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, শনিবার পারমানবিক কর্মসূচী বিষয়ে সরাসরি আলোচনায় বসবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান কঠিন বিপদের সম্মুখীন হবে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পের দাবির বিরোধিতা করেছে ইরান। দেশটির তরফ থেকে বলা হয়, পারমানবিক কর্মসূচী বিষয়ে ওমানে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হবে। বুধবার ইরানকে হুমকির বিষয়টি পুনরাবৃত্তি করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমি বেশি কিছু চাই না। তবে ইরান পারমানবিক অস্ত্রধারী দেশ হতে পারবে না। তবে ঠিক কবে সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।  

mzamin