Monday, April 26, 2010

পরাধীন পাঁজরে মুক্তির স্বপ্ন by সিদরাতুল সিনড্রেলা

১৯৭১ সাল। স্বামী যেন কোথায় গেছে। চারদিকে শুধু গোলাগুলির আওয়াজ। তার সঙ্গে ভেসে আসছে কিছু মানুষের হূদয়-নিংড়ানো কান্না। ভয় পেয়ে গেছে স্ত্রী। না জানি স্বামী কোথায় গেছে, কেমন আছে? ভয়ে, অস্থিরতায় এক বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে স্বামীর খোঁজে। না, ফিরে পায়নি সে তার স্বামীকে। বরং পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে হারিয়েছে প্রিয় সন্তান আর নিজের জীবন। ঝালকাঠির এ গৃহবধূর স্বামী হলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। এমনই যন্ত্রণাদায়ক অনেক কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কষ্টগুলো মুছে যায়নি আবুল হোসেনের জীবন থেকে।
ঝালকাঠি জেলার তিফইতনগরে তাঁর বাড়ি ছিল একসময়। সত্ ভাই আর মায়েদের জ্বালায় গ্রাম ছেড়েছেন সেই ছোটবেলায়। ছাড়া বলতে কি, যেন ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত আগুনে পড়া।
বাবা সৈয়দ আজিজউদ্দীন আহেমদ করেছিলেন তিনটি বিয়ে। তাঁর বড় স্ত্রী দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে মারা গেলে বিয়ে করে আনেন সৈয়দ আবুল হোসেনের মাকে। ‘মায়ের লগেও বাবার বেশি দিন টিকে নাই। ওই যে সত্ ভাইরা আমারে মারত। মা সইতে পারত না। তখন বাবার লগে ঝগড়া করত। তাই আরেকজনরে বিয়া কইরা আনলেন’ বলছিলেন আবুল হোসেন।
‘আমার জীবনে আমি যত কষ্ট করছি, তা শুনলে কেউ চউক্ষে পানি ধইরা রাখতে পারে না। সত্ ভাইরা আমাকে বাক্সে ভরে রাখত। চৌকির নিচে রেখে ঘরে তালা মেরে দিত। আরও অনেক কষ্ট দিত।’ নিজের কষ্টের কথাগুলো বলে যেন হালকা হতে চাইছিলেন আবুল হোসেন।
যখন আবুল হোসেনের বয়স এক বছর, তখন তাঁর এক মামা তাঁকে ৮০ টাকায় কোনো এক লোকের কাছে বিক্রি করে দেন। সেই লোকের কোনো সন্তান ছিল না। কিছু দিন পর তাঁর নিজের বাচ্চা হলে মর্যাদা কমে যায় আবুল হোসেনের। আবার বিক্রি হন তিনি পাঁচ-ছয় বছর বয়সে। আবার পুরোনো নাটকের পুনরাবৃত্তি। না, আর সুস্থ-সুন্দর জীবন যাপন করা হয়নি তাঁর। খুলনায় চলে গেছেন সেই ‘বিক্রীত জীবন থেকে’ ১৪ বছর বয়সে। রিকশা চালিয়েছেন, আরও কিছু কাজ করে কষ্টে জীবন পার করেছেন। এমনও দিন গেছে, যখন খাবার জোটেনি কারও কাছ থেকে, ভাতের মাড় চেয়ে নিয়ে খেয়ে দিন পার করেছেন। দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তখন তাঁর বয়স ২৮ বছর। ঘরে স্ত্রী আর সন্তান। ঘরের টান তাঁর কাছে দেশের টানের থেকে বড় হয়নি। গিয়েছিলেন যুদ্ধে। ৯ নম্বর সেক্টরে করেছেন যুদ্ধ। কিন্তু হারিয়ে ফেলেছেন স্ত্রী ও সন্তানকে। ‘মুক্তিযুদ্ধে কত ভয়ের কাজ করসি। গল্লামারি ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছি, অস্ত্র সংগ্রহ করেছি, পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছি। বেশি কষ্ট পাইছি যখন আমাগো সাথের মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান মারা গেছে। আমারও মাথার ওপর দিয়ে গুলি গেছে। চামড়া ছিঁড়ে গেছে। অল্পের জন্য বাঁইচা গেছি।’ ভাই বা সন্তানতুল্য সহযোদ্ধাকে হারানোর কষ্টটা যেন এখনো ভুলতে পারেননি আবুল হোসেন।
স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে যেন পাগলপ্রায় হয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘদিন ছিলেন একা। পরে জীবনের তাগিদেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় আবার। এখন সেই স্ত্রী আর চার সন্তান নিয়ে ঢাকাতেই আছেন তিনি। প্রতিদিন এক হাজার টাকার ফল এনে যা লাভ হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো সত্যিই কষ্টকর। উপরন্তু বয়সও তো হলো আবুল হোসেনের, তাই রোগগুলো যেন জোঁকের মতো ধরেছে। তবু টাকা কোথায় যে চিকিৎসা হবে? ‘তাও তো বড় মাইয়া গার্মেন্টসে কাজ করে বইলা কিছু টাকা পাওন যায়।’ বড় মেয়ে মাহমুদা গার্মেন্টসে কাজ করে বলে মাস শেষে এক হাজার ৬০০ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে তো বাসা ভাড়াও হয় না। তার ওপর ছোট দুই মেয়ে ফিরোজা, রাজিয়া ও ছেলে নজরুলের পড়ার খরচ তো আছেই।
বাবাকে তো মনেই পড়ে না তাঁর। মা মারা গেছেন ১০ বছর হলো। গ্রামে আছে কেবল কয়েকজন অত্যাচারী সত্ ভাই আর তাদের ছেলেমেয়েরা। তাই গ্রামে যাওয়া বলতে কেবল এক বা দুই বছর পর পর, শ্বশুরবাড়ি যাওয়া। স্বাধীনতার দুই বছর পর আবুল হোসেন এসেছিলেন ঢাকায়, তখন থেকেই এই পান্থপথ এলাকায়। বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন তিনি। এখন রাস্তার পাশেই বসেন মৌসুমি ফল নিয়ে। সকাল আটটায় এসে বাড়ি ফিরেন রাত ১১টায়। এত ধকল আর এই শরীরে সয় না। এক দিন টানা কাজ করলে পরের দুই দিন অসুস্থ থাকেন। তাই তাঁর কাজে একটু সহযোগিতা করার জন্য প্রতিদিন রান্না শেষ করে খাবার নিয়ে এসে আবুল হোসেনকে খাইয়ে কিছুক্ষণ দোকানে বসেন স্ত্রী তহমিনা বেগম। ততক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নেন আবুল হোসেন, পরে আবার শুরু করেন কাজ। গ্রামের স্মৃতি তাঁর কষ্টদায়ক হলেও তিনি বলেন, ‘কিছু টাকা হইলে গ্রামে ছোট একটা বাড়ি বানামু। তারপর বউ-মাইয়া-পোলা লইয়া সুখে থাকমু।’
বুকের ওপরে তাঁর স্বাধীন দেশের মুক্তিযোদ্ধার ব্যাজ আর বুকের ভেতরে পরাধীনতার শেকল। সেই পরাধীন পাঁজরে বাসা বেঁধেছে হাঁপানি, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক, কিডনির রোগ। ‘আশা দেয় সকলে। কেউ কিছু করে না। ওই বলে যে তোমাগো লাইগা কিছু করমু, আর যায় গা। পরে আর দেহিও না তাদের।’ মিথ্যে আশ্বাস পেতে পেতে বিরক্ত আবুল হোসেন। চিন্তার বলিরেখা আবুল হোসেনের অভিব্যক্তিতে। অসুখের জন্য এর আগে ১০ হাজার টাকা ধার করেছিলেন। সেটাই শোধ করা হয়নি। কীভাবে কী করবেন তিনি? ‘যদি একটা ভ্যানগাড়ি কিনতে পারতাম, তবে ঘুরে ঘুরে ব্যবসাটা ভালো হইত।’ কে জানে, কবে তাঁর সে আশা পূরণ হবে? কেউ জানেন কি, স্বাধীন দেশে এই মানুষগুলোর পরাধীনতার শেকল ছিঁড়বে কবে?

দুই সুপ্রিম কোর্টের রায় ও পাঁচ শিক্ষাবিদের বিবৃতি by মিজানুর রহমান খান

পাঁচজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ‘ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ ছিন্ন করা প্রয়োজন’ বলে মত দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আসলে তাঁরা অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের বিলোপেরও সুপারিশ করেছেন। কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জামাল নজরুল ইসলাম ও আনিসুজ্জামানের এই আহ্বান সময়োপযোগী, যদিও এই শিক্ষাবিদদের বিবৃতি পড়ে মনে হয় না যে ক্যাম্পাস রাজনীতিবিষয়ক সমস্যা নিয়ে তাঁদের মুখ্য উদ্বেগ ছিল। তবে এখন এমন একটি সময়, যখন প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাহী বিভাগ ক্যাম্পাসে বাইরের কারও হয়ে তৎপরতা চালানোকে নিরুৎসাহিত করছেন। এই দুটি প্রতিবেশী দেশই পোড় খাওয়া। তারা ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ করেছে। আবার চালু করেছে। বিরাট সংস্কার ও শর্ত সাপেক্ষে আবার অনুমতিও দিচ্ছে। আমরাই কেবল ব্যতিক্রম। কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে আমরা নেই। কোনো ধরনের লাগাম টানার মধ্যে আমরা নেই।
ভারতের উত্তর প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে লক্ষ্নৌ বিশ্ববিদ্যালয়, একসময় আমাদের সরকারি খাতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো করুণ অবস্থায় পতিত হয়েছিল। ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসীরা অধ্যাপককে পর্যন্ত পিটিয়ে হত্যা করেছে। ওই অধ্যাপক একটি ছাত্র সংসদের নির্বাচন পেছাতে সুপারিশ করেছিলেন। সে অবস্থা উতরাতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাদের সাহায্য করে। আদালতের আদেশে গঠিত হয় একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার জেমস মাইকেল লিংদোর নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের কমিটি ছয় দফা সুপারিশ দেয়। এর বহু উপদফা আছে। প্রতিটি সুপারিশ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেন। কেন্দ্রীয় সরকার তা মেনে নিয়েছে।
আমাদের শিক্ষাবিদেরা কার্যত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট-সমর্থিত একটি সুপারিশের প্রতিধ্বনি তুলেছেন। ওই সুপারিশ বলেছে, ‘রাজনৈতিক দল থেকে ছাত্র নির্বাচন ও ছাত্র প্রতিনিধিত্ব বিযুক্ত করতে হবে।’ ওই বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান লিংদো গত বছর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘রাজনৈতিক দল থেকে ছাত্রসংগঠনের বিযুক্তিকরণই ছিল তাঁদের প্রধান আকর্ষণ।’ এটা একটা নীতিগত অবস্থান। শুধু ছাত্রলীগ থেকে শেখ হাসিনা নন, ছাত্রদল থেকে বেগম খালেদা জিয়া নন, অন্য সব দলকেও এটা মানতে হবে। ছাত্ররাজনীতি পরগাছা থেকে সম্ভব নয়। দলগুলো বাধার প্রাচীর দাঁড় করিয়েছে। এ জন্য ছাত্ররাজনীতির অঙ্কুরোদ্গম সম্ভব হচ্ছে না। বহুদিন ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছে না। এটা যাতে ছাত্রদের শর্তে ও সুবিধায় না হয়, সে বিষয়ে দুই বড় দলের বড় নেতাদের স্বার্থ অভিন্ন। তবে মনে হয়, দলের সঙ্গে সংগঠনগুলোর বিযুক্তি ছাড়া নির্বাচন না হওয়াই ভালো। কারণ ওই সংসদ নির্বাচন ছাত্রদের কাজে আসবে না। ছাত্ররাজনীতির গৌরব পুনরুদ্ধারের সুযোগ মিলবে না, বরং ওই নির্বাচন মূল দলগুলোর মানমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠবে। মাগুরা ও ভোলার উপনির্বাচনের মতো উত্তাপ তৈরি হবে।
ছাত্ররাজনীতি উঠে আসতে হবে ছাত্রদের ভেতর থেকে। সেই রাজনীতির স্বার্থে ছাত্রসংগঠন গড়তে হবে। তখন ওই লিংদো কমিটির সুপারিশ কাজে দেবে। এর কয়েকটি এখানে বলি।
এক. ছাত্র সংসদ কীভাবে চলবে তার বিধিবিধান করে দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নির্বাচনকালে বাইরের কেউই ক্যাম্পাস-তৎপরতায় অংশ নেবে না। দুই. নির্বাচনী প্রচারাভিযান সাকল্যে ১০ দিনে করতে হবে। তিন. প্রতিটি শিক্ষাবর্ষ শুরুর ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন শেষ করতে হবে। সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বর্ণিত ‘আদু ভাই’ প্রার্থী ঠেকাতে ওষুধ আছে। স্নাতক পর্যায়ের নিচের প্রার্থীদের বয়স হবে ১৭ থেকে ২২ বছর। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পঁচিশের নিচে ও গবেষণার ছাত্র হলে তাঁর বয়স থাকবে ২৮-এর নিচে। ৭৫ ভাগ ক্লাসে উপস্থিতি লাগবে। চার. অতীত ফৌজদারি রেকর্ড থাকলে নির্বাচন করা যাবে না। পাঁচ. নির্বাচনী ব্যয় হবে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার রুপি। ফল ঘোষণার দুই সপ্তাহের মধ্যে নিরীক্ষিত হিসাব জমা দিতে হবে। ছয়. প্রার্থীরা ছাত্রদের স্বেচ্ছামূলক চাঁদা ছাড়া বাইরের উেস পাওয়া টাকা খরচ করতে পারবেন না। সাত. নির্বাচনী প্রচারণায় লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে না। আট. নির্বাচনের পর দেয়াল সাফসুতরো করার দায় সব প্রার্থীকে যৌথভাবে নিতে হবে। নয়. বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি গ্রিভান্সেস রিড্রেসাল সেল বা দুঃখ-দুর্দশা প্রশমন কমিটি গঠন করবে। এটা অনেকটা ট্রাইব্যুনালের মতো কাজ করবে। এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ছাত্র তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান/বিভাগ প্রধানের কাছে আপিল করতে পারবেন। তবে আইনশৃঙ্খলাজনিত কোনো গুরুতর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনধিক ১২ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশকে জানাবে। দশ. ভারতীয় দণ্ডবিধিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানসংক্রান্ত যেসব ধারা আছে, সেসব ছাত্রদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। এগারো. বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্রনেতৃত্বের পরিবর্তন ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ ও কর্মশিবিরের আয়োজন করবে।
পাকিস্তানে জিয়াউল হক প্রজ্ঞাপন জারি করে ১৯৮৪ সালে ছাত্রসংগঠনের তৎপরতা নিষিদ্ধ করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানে ব্যাপক সমালোচনা ও নিন্দা ছিল। পিপিপি ও মুসলিম লিগের নেতারাও সরব ছিলেন। অন্যতম যুক্তি ছিল, এটা হলো আইয়ুব খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। মেঠো বক্তৃতায় এর বড় কদর ছিল। থাকাটাই স্বাভাবিক।
পাকিস্তানে ২০০৮ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ৬১.২ ভাগ ছাত্র ছাত্ররাজনীতির পক্ষে নয়। ৭২.৩ ভাগ মনে করে, ছাত্রসংগঠনের উচিত নয় রাজনৈতিক দলের লেজুড় হওয়া। ২৮.১ ভাগ অবশ্য মনে করে মূল দলের ছাত্র-অঙ্গসংগঠন থাকা উচিত। ২৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০৯ জন ছাত্রের মতামত নেওয়া হয় ওই জরিপে। রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে থাকার বিরুদ্ধে প্রথম রায় কিন্তু পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের। ১৯৯৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক অন্তর্বর্তী আদেশে ছাত্রসংগঠনের তৎপরতা নিষিদ্ধ করেছিলেন। আবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টই পরে বলেছেন, ক্যাম্পাসে সংগঠন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা অসাংবিধানিক। এর আগে ১৯৯২ সালের ১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী প্রত্যেক অভিভাবক তাঁদের ছেলেমেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় মুচলেকা দিতেন। তাঁরা বলতেন, তাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের ‘রাজনীতিতে জড়াতে আশকারা’ দেবেন না। ১৮ বছর পর এর একটা পুনরাবৃত্তি দেখলাম। আসিফ জারদারির সরকার এবার ক্ষমতায় এসে ছাত্রসংগঠন করার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই বছরও যায়নি। ক্যাম্পাসে ছাত্র খুনের ঘটনায় পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছিল। ২০ দিন পর পুনরায় খোলার সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর একটি নির্দেশনা জারি করেন। প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে নতুন করে হলফনামা দিতে হবে। এর সারকথা হলো, তাঁরা ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নেবেন না (ডন, ১০ এপ্রিল)।
ছাত্ররাজনীতিবিষয়ক পাকিস্তানি গবেষক ইকবাল হায়দার বাট তাঁর ১৭৮ পৃষ্ঠার এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘ছাত্রসংগঠনগুলো নিষেধাজ্ঞা প্রতিহত করেছিল। কিন্তু শিক্ষাবিদেরা ব্যাপকভাবে সুপ্রিম কোর্টকে সমর্থন জানান। তাঁরা যুক্তি দেন, ছাত্রদের সাংগঠনিক তৎপরতার পরিণাম ভালো হয় না। ক্যাম্পাসে তা পড়াশোনার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটায়। সহিংসতার বিস্তার ঘটায়। আরও একটি নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল। পাকিস্তানের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা একটি টেলিকনফারেন্স করলেন। তাঁরা এতে ছাত্রসংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। উপাচার্যরা অবশ্য ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধরনের সোসাইটি ও সমিতির বিকাশ সমর্থন করেন। এমনকি কতিপয় বিশিষ্ট সাবেক ছাত্রনেতা জাতীয় রাজনৈতিক দল থেকে ছাত্রসংগঠনের পৃথক্করণে এখন একমত হতে পারছেন।’
পাকিস্তান ও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশের গন্তব্য এর থেকে আলাদা হওয়ার যুক্তি ও কারণ দেখি না। ছাত্ররা অবশ্যই রাজনীতি করবে। কিন্তু তার মতো করে। কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়। ছাত্রসংগঠন কথিত ‘লেজুড়’ থেকেও প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। সত্য। কিন্তু আমরা কি ওষুধ বদলাতে পারি না?
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী এক দৃষ্টান্ত। তিনি ভারতের ইতিহাসের প্রথম দলিত মুখ্যমন্ত্রী। চতুর্থবারের মতো এ পদে আছেন। জনপ্রিয় বিষয়ে অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে তিনি ভয় পান না। নিউজ উইকের শীর্ষ সাফল্য অর্জনকারী নারীর তালিকায় উঠে এসেছে তাঁর নাম। জন্মদিনে বিপুল টাকার মালায় ভূষিত হয়ে তিনি বিতর্কিত হন। আবার তিনিই অমিতাভ বচ্চনের বিরুদ্ধে ভূমি অনিয়মের দায়ে মামলা চালু করেন। গণতন্ত্র গেল গেল জিগির উপেক্ষা করে তিনি ক্যাম্পাসের ইউনিয়ন নির্বাচন নিষিদ্ধ করেন। ২০০৭ সালে তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সূচনায় উল্লিখিত লিংদো কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় উত্তর প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সেই শিক্ষাবর্ষে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতে পারেনি। প্রার্থীর আকাল পড়েছিল। কারণ রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট ‘আদু ভাইরা’ নির্বাচনে সব অযোগ্য হন। ২০০৭ সালের অক্টোবরে মায়াবতী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইউনিয়ন নির্বাচন শুধু যে ক্যাম্পাসের পরিবেশ দূষিত করছে তা নয়, প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষতি করছে। সাধারণ মানুষের জন্য দুঃখ-দুর্দশা ডেকে আনছে।’ মায়াবতী অবশ্য পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ আসার পর ২০০৮ সালের মার্চে ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। উত্তর প্রদেশের ছাত্র-সহিংসতার প্রেক্ষাপটেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০৫ সালে লিংদো কমিটি গঠনে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে অন্তত ১২ জন ছাত্র ক্যাম্পাসে নিহত হয়েছিল। ২০০৩ সালে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদব নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছিলেন। আর তারপরই ক্যাম্পাসে ব্যাপক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লিংদো কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। আদালতের ভূমিকার সমালোচনাও আছে। কিন্তু ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অব্যাহতভাবে লিংদো কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন তদারকি করছেন। ২০০৮ সালে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত করেন সুপ্রিম কোর্ট। যেটা দেখার বিষয় এবং আমাদের জন্য শিক্ষণীয়, তা হলো সরকারের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল গোপাল সুব্রামনিয়াম ওই নির্বাচন স্থগিত করার আবেদন করেন। তাঁর যুক্তি: ছাত্ররা লিংদো কমিটির সুপারিশ তামিল না করেই নির্বাচন করছে। আরও একটি ঘটনা বলি। কংগ্রেসের অঙ্গসংগঠন হলো ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া। তারা গেছে আদালতে। নালিশ করেছে লিংদো কমিটি তাদের মতামত নেয়নি। সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ বিস্ময় ও ক্ষোভ ঝরান। বলেন, ‘তোমরা কি পড়তে এসেছো, নাকি রাজনীতি করতে এসেছো? তোমাদের অগ্রাধিকার কী? অধ্যয়ন, না দলীয় বিষয়? তোমাদের বাবা-মা তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছেন। রাজনীতির জন্য নয়।’ (দ্য হিন্দু, ২৯ অক্টোবর, ২০০৭)
আমি একজন ব্যারিস্টার বন্ধুকে জানি। তিনি একদিন বললেন, তিনি জনস্বার্থে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রসংগঠনের নামে যা চলছে, তা চলতে পারে না। সরকার বা সংসদ কিছু করবে না। এখন যদি শেষ ভরসা আদালত মুখ তুলে তাকান। আমি তাঁকে রিট করার কিছু মসলাপাতির জোগান দেই। তারপর অনেক দিন নীরবতা। সম্প্রতি তিনি জানালেন, এ কাজে নামতে তাঁকে সবাই মানা করেছেন। ভয় দেখাচ্ছেন। সাবধান করছেন।
গতকাল আমি ওই বিবৃতি নিয়ে তিনজন শিক্ষাবিদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি। আমি আসলে বোঝার চেষ্টা করি যে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ভারত ও পাকিস্তানের মতো একটি অবস্থানে যেতে পারেন কি না। সামাজিক সংবেদনশীলতার মাত্রাটা কী। এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, ‘যারা এখন অন্যায় করছে তাদের শাস্তিটা সবচেয়ে জরুরি।’ তালুকদার মনিরুজ্জামান বলেন, ওই বিবৃতি পড়ে তিনি খুবই খুশি হয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ক্ষমতাসীন দলের উচিত নয় তাদের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক বজায় রাখা। তিনি ব্যক্তিগতভাবে তেমন দৃষ্টিকোণ থেকেই বিষয়টিকে দেখছেন।
আমরা খুব স্পষ্ট করে বলি, ক্যাম্পাসে যে মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে, তা থেকে পরিত্রাণ চাইলে ভারত ও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের পথেই যেতে হবে। আমরা দল থেকে ছাত্ররাজনীতির পৃথক্করণ চাই।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অপেক্ষা by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল বেঙ্গল কনফারেন্সে কলকাতার এক খ্যাতিমান কবি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতে এখন অনেকটা উপেক্ষিত। বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে যতটা তোড়জোড় চলে, তার কিছুই কলকাতায় হতে দেখা যায় না। ওই কবির খেদোক্তির খানিকটা যে সত্যতা রয়েছে, তা আমরা বাংলাদেশের মানুষ অনুমান করতে পারি।
এ কথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি নেই। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া শিক্ষার্থীর পাঠ্যক্রম তৈরি হয় না, তাঁর গান-কবিতা ছাড়া অনুষ্ঠান থাকে অসম্পূর্ণ, তাঁর গান-কবিতা ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামে গতি আসে না। বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ—সব জায়গায়ই শক্তি আর উদ্যমের উৎস রবীন্দ্রনাথ।
সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হওয়ার পর এ কারণে বারবার পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িকতার কবি, পাক-বাংলার মানুষের তামুদ্দুনিক জীবন নষ্ট হচ্ছে রবীন্দ্রচর্চার মাধ্যমে—একশ্রেণীর লেখক-বুদ্ধিজীবী ও তাঁদের মুখপাত্র এবং কিছু সংবাদপত্র এই বলে রবীন্দ্রনাথকে দেশে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তৎকালীন সরকার সুপরিকল্পিতভাবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়। বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ প্রায় নিষিদ্ধ হন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী জনগণ; বিশেষ করে রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, প্রতিবাদ জানায়। একসময় পাকিস্তানি যুগের অবসান হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্র অর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণাদাতা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মোৎসব পালিত হবে আগামী বছরের ২৫ বৈশাখ। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যুক্তভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ উৎসব উদ্যাপন করবে; যা বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য অবশ্যই আশাব্যঞ্জক আনন্দের সংবাদ।
কবি রবীন্দ্রনাথের কাছে তো আমরা অনেকভাবে ঋণী। আমরা তাঁর কাছ থেকে নিয়েছি অনেক, দিয়েছি কতটা? সেভাবে হিসাব করলে দেখা যাবে, অকাতরে আমরা শুধু নিয়েই গেছি, তাঁর একটি গান দেশের জাতীয় সংগীত করা হয়েছে—এই যা। অথচ বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ বহুল পঠিত ও বহুল অনুশীলিত কবি সন্দেহ নেই।
প্রতিবছর সাড়ম্বরে দেশজুড়ে কবির জন্মোৎসব ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। বেতার-টিভির সর্বজনীন আকর্ষণ রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে যথার্থ অর্থে সম্মাননা জানিয়ে দেশে উচ্চতর কোনো বিদ্যাপীঠ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। অথচ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেই দাবি জানিয়ে আসছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ববঙ্গের অন্যতম জমিদারি ছিল পাবনা (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) জেলার শাহজাদপুরে। ১২৯৭ থেকে ১৩০৪ বঙ্গাব্দে ইউসুফ শাহী পরগনার শাহজাদপুরের জমিদারিতে রবীন্দ্রনাথ বহুবার এসেছেন। রচনা করেছেন অসাধারণ কিছু গান, কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, স্বজনদের জন্য বেশ কিছু তথ্যনিষ্ঠ চিঠি; যা তাঁর সাহিত্যকে ভিন্ন এক মর্যাদা দান করেছে। কবির স্মৃতিধন্য এই শাহজাদপুরেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হলো এখানকার চমৎকার যোগাযোগব্যবস্থা। ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক দিয়ে দু-আড়াই ঘণ্টায় ঢাকায় যাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বঙ্গবন্ধু সেতুতে যেতে সময় লাগে মাত্র ৩০ মিনিট। নৌবন্দরসহ বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় শাহজাদপুরের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুরূপ পরিবেশ রয়েছে।
সাংস্কৃতিক বিভাগগুলোর (সংগীত, নাটক, ফোকলোর, চারুকলা, সাহিত্য, দর্শন, নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি) প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে শাহজাদপুরেই ওই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক দিনের। ‘টেগর পিস্ ইউনিভার্সিটি’ নামে প্রায় দুই দশক আগে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য খ্যাতনামা লোকতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মযহারুল ইসলাম। নানা কারণে অধ্যাপক ইসলাম তাঁর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাপক মযহারুল ইসলামের অনুজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল খালেক অগ্রজের নেওয়া সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন নতুন করে শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী মহোদয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা শাহজাদপুরের সুধী সমাবেশে আশ্বাসও দিয়েছেন বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয় শাহজাদপুরেই হবে। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব জাতীয় সংসদ হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আগামী বছরের ২৫ বৈশাখ কবিগুরুর সার্ধশত জন্মোৎসবে কবির স্মরণে ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত স্মারক রেলব্যবস্থা চালু করবে। উভয় বাংলার রবীন্দ্রপ্রেমীদের কাছে অবশ্যই এ এক আশাব্যঞ্জক সংবাদ। বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমাদেরও প্রত্যাশা, ওই দিন বাংলাদেশে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে আমাদের সরকারও কবির অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে। অপরিশোধ্য ঋণের খানিকটা অন্তত পরিশোধ করা যাবে। অনেকের ধারণা, বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে তিনি নিজেই যে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতেন সন্দেহ নেই। তাঁর সুযোগ্য তনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে কবির স্মৃতির প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাবশত বাবার আরাধ্য কাজটি সম্পন্ন করবেন। আমাদের সবারই স্মরণে আছে, ১৯৬৯ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বারবার উল্লেখ করেছেন বাঙালির ভবিষ্যৎ সংগ্রামের সঙ্গে কবিগুরুর ভূমিকার কথা। পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে বজ্রকঠোর ঘোষণা দিয়েছিলেন বেতার-টিভিতে রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিতে।
সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখা এবং বাঙালিয়ানা সংরক্ষণের স্বার্থে সরকারি সব প্রক্রিয়া শেষ করে দেশবাসী আশা করে, ১৪১৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে বাবার সার্থক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রিয় কবির স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি বড় জাতীয় দায়িত্ব সম্পাদন করবেন। শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ী ও মযহারুল ইসলাম ফোকলোর ইনস্টিটিউটই হতে পারে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর অবকাঠামো। একটি বছর শুধু অপেক্ষায় কাটুক।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক। অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

অপরাধী আর কেউ নয়, আমি by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

বড় জালিম নিজে, সবচেয়ে অপরাধী। মাছের পেটে আশ্রয় নেওয়ার পর ইউনুস নবী যে দোয়া পাঠ করেছিলেন, তা স্মরণ করতে পারি। ‘আমার চেয়ে জালিম পৃথিবীতে আর কেউ নয়।’ যে অন্যায় করে চলি তার হিসাব তো একদিন হবেই। এ অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী প্রতিদিন আল্লাহর কাছে, মানুষের কাছে, সবার কাছে।
ব্রিটিশ যখন মোগলদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়, সে লড়াইয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল লাখো মানুষ, নারীরা বিসর্জন দিয়েছেন সম্মান। সে কথা আর কে মনে রেখেছে? শত সমরাঙ্গনের ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যেখানে ব্রিটিশরা নিষ্ঠুর বর্বরতায় স্বাধীনতাকামীদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়েছে। বালাকোটের যুদ্ধে আমাদের সমরাঙ্গন সিলেটে প্রাণ দিয়েছেন আমার নিজ আত্মীয়। তাঁর নাম ইব্রাহিম আলী তোশনা [১৮৭২—১৯৩৩]। প্রাণ দিয়েছেন: মৌলবী আবদুল সালাম (বায়মপুর), মুহাম্মদ মুসা মিয়া (দুর্লভপুর), আবদুুল আজিজ (বাউরভাগ), হাজি আজিজুর রহমান (সরদারিপাড়া), ইয়াসিন মিয়া (চট্টগ্রাম)। কানাইঘাটে এই শাহাদতের কথা সবাই ভুলে যেতে পারে, কিন্তু আমি আমার মৃত্যুদিন পর্যন্ত এই শাহাদতকে স্মরণ করব।
শহীদদের ভুলে গেলে স্বাধীনতা হয় নিরর্থক। ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে লাখো মানুষের শাহাদত দেশের লোক আজ ভুলে গেছে। ওরা ভারতীয়দের নির্বাসন দিয়েছে, অন্ধকূপ হত্যায় অংশ নিয়েছে। নির্যাতিত ছিল হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে। তাদের ক্ষমতা, সম্পদ ও ধর্মাচরণের ওপর নেমে আসে অত্যাচারীর খড়্গকৃপাণ। জালিয়ানওয়ালাবাগের কথাও ভুলতে বসেছি। রবীন্দ্রনাথ ‘নাইট’ উপাধি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
ভারত স্বাধীন হলে ভারতের স্বাধীনতা দিবসে লর্ড মাউন্ট ব্যাটন প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে শপথ নেন। এত যে মানবতার বিপর্যয় হলো উপমহাদেশে, তার জন্য দায়ী কে? ব্রিটিশরা সহজেই নিষ্কৃতি পেয়ে গেল। যারা দেড় শ বছর আমাদের ওপর জুলুম করেছে, তাদের সঙ্গে ডিনার খাই, তাদের দেওয়া উপাধি গ্রহণ করি। রাজনীতিতে নেই চিরকালীন শত্রুতা।
‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান, আসি অলক্ষে দাঁড়ায়েছে তারা দিবে কোন বলি দান।’ যাঁরা জীবন দিয়েছিলেন সেদিন, তাঁদের কথা মনে রেখেছেন তাঁরাই, যাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ক্ষুদিরাম, বিনয় বাদল দীনেশ, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও এর সঙ্গে জড়িত হাজার ব্যক্তি নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। স্বাধীনতাকামীদের পেছনে ছিল গোয়েন্দা ও পুলিশ, এঁদের জীবনকে করেছিল যারা দুর্বিষহ। এসব ভারতীয় সহচরের বিচারের কথা কেউ বলেননি। যাঁরা আগের অফিসার ছিলেন, পরে বড় পোস্ট অধিকার করেছেন ভারত ও পাকিস্তানে।
১৪-১৫ আগস্ট, ১৯৪৭। উপমহাদেশে ক্ষমতা বদল হলো আপাত রক্তপাতবিহীন। দেড় শ বছরে যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, ভারতবাসীকে যারা ভূলুণ্ঠিত করেছিল, তারাই কমনওয়েলথের নতুন বন্ধু। কেউ ভেবে দেখেছেন, যাঁরা ভারতীয়দের অন্যায়ভাবে সেদিন অত্যাচারে অংশ নিয়েছিলেন, সেই সব সামরিক-অসামরিক রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তি কি কোনোভাবে কারও কাছে কৈফিয়ত দিয়েছেন? তাঁদের আইসিএস অফিসাররাও আমাদের ‘খানবাহাদুর’, ‘রায়বাহাদুর’রা প্রমোশন পেয়ে মন্ত্রী হয়েছেন। সহজেই ভুলে যাই কে ছিল শত্রু, কে ছিল মিত্র। এটাই জগতের নিয়ম!
১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাস বাঙালিদের ওপর যে নির্মম অত্যাচার হয়েছে, তার কথাও যেন মনে হয় সুদূর অতীত। যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাঁরাই জানেন কত মর্মান্তিক এই স্মৃতি। ১৪ অথবা ১৬ ডিসেম্বর শহীদদের ছেলেমেয়েরা ও আত্মীয়স্বজন যখন টেলিভিশনের সামনে এসে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন অনুভূতি হয় প্রখর। যাঁদের গেছে তাঁরাই শুধু জানেন, তাঁরাই শুধু বোঝেন এই গণহত্যার মর্ম। সময় সব ভুলিয়ে দেয়। এর জন্য যারা প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, তারা নিষ্কৃতি পেল কত অনায়াসে। ভারত, পাকিস্তান ও তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে যখন বিচার না করার কথা বলে, তখনো ‘বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে’। যারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল, তারা ওই সুবিধাপ্রাপ্তদের দলে। এর হয়তো কারণও ছিল। তা হলো, যারা বুলেটের স্টিম রোলার চালিয়েছিল, তারাই যখন দেশে ফিরে গেল, তখন এদের বিচার করার যৌক্তিক ভিত্তি বঙ্গবন্ধুর কাছে ছিল না। তাঁর ওপর চাপ ছিল সর্বাধিক। আমেরিকার, পাকিস্তানের, সৌদি আরবের, ভারতের ও তাঁর পূর্বতন রাজনৈতিক সহযোগীদের। ক্ষমাপ্রাপ্তরা পরবর্তী সরকারগুলোতে পুনর্বাসিত, যা ছিল অগ্রহণযোগ্য ও অভাবিত। ক্ষমা করা আর প্রধানমন্ত্রীত্বে বসানো, দুটোর মধ্যে অনেক তফাত।
ভারতে ১৫ থেকে ২০ কোটি মুসলমান, এদের তো দল থাকবেই। বাংলাদেশেও আছে ১৩ কোটি মুসলমান। এদেরও আলাদা দল থাকতেই পারে। যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে এই বিরোধ কেয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং লস্কর-তস্করের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বলে, বারুদ চাপা দিয়ে রাখা যায় না। ইসলামি দলগুলোর সংখ্যা বেশ কয়েকটি, এদের মধ্যে মিল নেই, কারও সঙ্গে কারও বনে না। পীড়ন হলেই নতুন শক্তিতে জেগে উঠবে তারা। সে শক্তি সামলানো কঠিন হবে। সালমান রুশদি নবীর বিরুদ্ধে লিখলে সারা দেশ গর্জে ওঠে, অথচ নবীর জন্য তারা তেমন কিছুই করে না। অভিজ্ঞানটির সঙ্গে সবার পরিচয় আছে—এটা বাস্তবতা।
দেশটিতে ৯০ ভাগ মুসলমান। গ্রামে বাস করে তারা এবং পরিপূর্ণভাবে সমর্পিত আল্লাহ এবং রাসুলে। স্বাধীনতার সুফল তাদের কাছে পৌঁছেছে বলে মনে হয় না। যাঁরা সরকারে আজ আছেন অথবা কাল, তাঁরা ভোটের সময় ইসলামি লেবাস পরে ভোট চাইতে যান। কাজ ফুরোলে অন্য রূপ। ভোটাররা এই চালাকি অনুভব করেন। যুদ্ধকালে যাঁরা পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন, তাঁরা মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকলে তার বিচার সবাই কামনা করেন। যারা অপরাধ করেছে, তাদের অপরাধ ক্ষমা করা হবে না—এটাই জনগণের রায় বলে মনে হয়। এ নিয়ে খানিকটা সংশয় যে নেই, তাও নয়।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পালিত হবে ২০২১ সালে। স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান, ভারত, মস্কো, চীনপন্থীদের রাজনীতি। কারও বা অঘোষিত রাজনীতি, ইসলামের পরাজয়। ‘ইসলামি’ না ‘সেক্যুলার’, তা বলবে দেশের জনগণ। কিছুসংখ্যক ভ্রান্ত ‘মুজাহিদ’ একসঙ্গে কয়েকটি পটকা ফুটিয়ে দেশে ইসলামি শাসন আনতে চায়, যা সফলতার মুখ দেখবে না। যত দিন দেশের মানুষ ইসলামের মূল দৃষ্টিভঙ্গিতে সমর্পিত হবে না, তত দিন এটি হওয়ার নয়। ইরান অপেক্ষা করেছে ২৫০০ বছর।
যদি বলি আমি নিজে অপরাধী, কেউ কিছু বলবে না। যে মুহূর্তে বলব সবাই অপরাধী, তাহলে ভ্রূকুঞ্চন। উত্তমকুমার অভিনীত থানা থেকে বলছি চলচ্চিত্রের প্রতিটি চরিত্রের কথা স্মরণ করা যেতে পারে, যেখানে এক মহিলার করুণ মৃত্যুর পর দেখা গেল তার মৃত্যুর জন্য সংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলোর সম্পৃক্ততা। দেশ ভাগ হলো, লাখ লাখ লোক শহীদ হলো, লাখ লাখ লোক নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নতুন ঘরে এসে আশ্রয় নিল। কে দায়ী? শুধু ব্রিটিশ? আমাদের রাজনীতি, আমাদের পরমত অসহিষ্ণুতা, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, সম্পত্তি দখলের অভীপ্সা, এগুলোর কোনোটাই দায়ী নয়?
১৯৭১ সালেও লাখ লাখ লোক শহীদ হলো, ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেল কোটি লোক। দেশটি হলো সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত। উঠে দাঁড়াতে পারেনি। একে ওকে দোষ দিয়ে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় আছে কি? আমি নিজে কতটুকু দায়ী, তার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে আমরা অনেকেই থাকব না। সব দোষ কয়েকজনের ওপর না চাপিয়ে বরং ভালো হয়, প্রকৃত অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি দিয়ে সত্যের পতাকার উড্ডয়ন, মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের উদ্বোধন।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সংগীতব্যক্তিত্ব।
mabbasi@dhaka.net

রাজনীতিতে অকারণ উত্তাপ -বিরোধীদের সইতে হবে, কর্মীদের সামলাতে হবে

সরকারি দল মার দেবে, বিরোধী দল মার খাবে—বাংলাদেশে এটাই যেন হয়ে উঠেছে রাজনীতির প্রধান সূত্র। সরকার বদলায় কিন্তু রাজনীতির এই ধারা যেন কিছুতেই বদলায় না। এই দাপট প্রতিষ্ঠায় সরকারদলীয় কর্মী ও পুলিশের ভূমিকা যেন সহযোদ্ধার। গত এক সপ্তাহে ঢাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় বিএনপির প্রায় কোনো কর্মসূচিই অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। সর্বশেষ ঘটনার সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে গত শনিবারের প্রথম আলোয়। ঢাকার পল্লবীর এই ঘটনায় হামলা করেছে যুবলীগ আর বিএনপির ৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ফলে রাজনীতিতে সংঘাত-উত্তেজনা ফিরে এসেছে, জনগণ হয়ে পড়েছে এই সংঘাতের অনিচ্ছুক দর্শক।
ছাত্রলীগের হামলা থেকে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির মতো নাগরিক সংগঠনের গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট মেটানোর দাবির পদযাত্রাও রেহাই পায়নি। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা কলেজের সামনে এ রকম একটি পদযাত্রায় হামলা করে মাইক-ব্যানার কেড়ে নেয় ছাত্রলীগ পরিচয়ধারী একদল সন্ত্রাসী। বিএনপির কর্মসূচিও একই ধরনের হামলার শিকার হচ্ছে। রাজনৈতিক কি অরাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ কি তাহলে থাকবে না?
গণতন্ত্রে বিরোধী দল থাকবে, থাকবে তাদের তৎপরতাও। কারণে কি অকারণে তারা প্রতিবাদী হবে এবং সরকারও তা শুনে বা না-শুনে নিজের কাজ করে যাবে—এটাই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু বিরোধী দল সড়কে বা ময়দানে নামামাত্রই শুরু হয়ে যায় চর দখলের কায়দায় লাঠালাঠি-মারামারি। পল্লবীর ঘটনায় সিটি করপোরেশনের দুজন কাউন্সিলরসহ বিএনপির ৭৮ জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষায়, তাঁদের অপরাধ হলো রাস্তায় শান্তি ভঙ্গ করা। অথচ তাঁরা সবাই গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁদের দলীয় কার্যালয় থেকে। আর যেখানে রাস্তায় সংঘাতে জড়িয়ে শান্তি ভঙ্গ করেছে দুটি পক্ষ, সেখানে এক পক্ষকে গ্রেপ্তার আর আরেক পক্ষকে প্রশ্রয় দেওয়ায় পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ ওঠে।
একদিকে অব্যাহত সন্ত্রাস ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের রক্তপাত, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়ার যে চর্চা ছাত্রলীগ-যুবলীগ করে যাচ্ছে, তাতে প্রশ্ন ওঠে, সরকারদলীয় ছাত্র-যুব সংগঠন কি আধিপত্য কায়েম রাখার হাতিয়ার? জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো ভূমিকা কি তাদের থাকতে নেই? নিঃসন্দেহে এসব ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, এমন অসহিষ্ণুতার জ্বরে তপ্ত হলে রাজনীতিতে সংঘাতই বাড়বে। বিরোধী দলেরও উচিত, প্রতিবাদকে শান্তির গণ্ডির মধ্যে রাখা; সরকারকে প্ররোচিত করা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের কাজ নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার -সরকারকে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে

বর্তমান সরকারের ১৫ মাসে বাংলাদেশ থেকে চাকরি নিয়ে সৌদি আরবে গেছেন ১৬ থেকে ১৭ হাজার শ্রমিক। কিন্তু একই সময়ে দেশটি থেকে ফিরে এসেছেন ৩১ হাজারের বেশি। অর্থাৎ সৌদি আরবে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি গত ১৫ মাসে লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে।
এ তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক; কারণ সৌদি আরবই বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। সে বাজার সংকুচিত হলে ব্যাপক বেকারত্বের এই দেশে বেকার-সমস্যা প্রকট হতে বাধ্য, বিদেশি মুদ্রা উপার্জনেরও একটি বড় খাত ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রথম আলোয় বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, শুধু সৌদি আরব নয়, কুয়েত, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—মধ্যপ্রাচ্যের এই চারটি দেশেও বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
কারণ কী? প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি কেন হঠাৎ করে কমে যাচ্ছে, তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসগুলোতে চিঠি পাঠিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সেসব চিঠির উত্তরে কী জানানো হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে সমস্যাটির নানা রকম কারণের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। যেমন: এক. কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে খুন, ধর্ষণসহ নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, বিশেষত সৌদি আরবে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের অপরাধবৃত্তির উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। দুই. বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্পর্কে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নানা রকম নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে একটি মহল, যার বিপরীতে ওই সব দেশের বাংলাদেশি মিশনগুলো বা বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক কিছু করতে পারছে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরব সফরের পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি—এমনটিও বলা হচ্ছে। সৌদি আরবের বিষয়টি গুরুতর বলে মনে হচ্ছে। দেশটি বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই, অর্থাৎ ২০০৯ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশের শ্রমিক নেওয়া ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে; কিন্তু একই সময় তারা নেপাল ও ভারত থেকে শ্রমিক নিচ্ছে আগের হারেই। বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজের অনুমতিপত্র বা আকামা পরিবর্তন করতেও তারা দিচ্ছে না। এখন বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে বিষয়টি নিয়ে সৌদি আরবের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করা যে কী কী কারণে সে দেশে আমাদের শ্রমবাজারে এই নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও আমাদের জনশক্তি রপ্তানি হ্রাসের কারণগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখে সেগুলোর নিরসনের লক্ষ্যেও তৎপর হতে হবে। কূটনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর সক্রিয়তা, জনসংযোগ, জনশক্তি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে লোকবল বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে। বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজারের সংকোচন কোনোভাবেই নগণ্য বিষয় নয়; বরং এটি সরকারের বাড়তি মনোযোগ দাবি করে।

আফগানিস্তানে ক্রসফায়ারে পড়ে চার ছাত্র নিহত

আফগানিস্তানে ক্রসফায়ারে পড়ে গত শুক্রবার চার ছাত্র নিহত হয়েছে। বিদেশি সেনা ও জঙ্গিদের মধ্যে গোলাগুলির সময় এ ঘটনা ঘটে। সে দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল শনিবার এ কথা জানায়। খবর এএফপির।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ওই দিন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টায় এ ঘটনা ঘটে। গুরবুজ জেলায় মোতায়েন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা বাহিনী (আইএসএএফ) ও জঙ্গিদের মধ্যে গোলাগুলির সময় ক্রসফায়ারে পড়ে ওই চার ছাত্র নিহত হয়।
নিহত ছাত্রদের আত্মীয় আমির সালিহান বলেন, যে চার ছাত্র নিহত হয়েছে তারা সবাই পরস্পরের আত্মীয়।

পাকিস্তানের গণমাধ্যমকে তালেবানের হুঁশিয়ারি

পাকিস্তানভিত্তিক তালেবান গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) অভিযোগ করেছে, সে দেশের গণমাধ্যম সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষে সংবাদ পরিবেশন করে। কোনো ঘটনাকে তালেবানের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয় না। এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব বন্ধ করতে পাকিস্তানের গণমাধ্যমকে ‘শেষবারের মতো’ হুঁশিয়ারি দিয়েছে তালেবান।

লন্ডনে বাংলা টিভির উপস্থাপক সন্ত্রাসী হামলার শিকার

লন্ডনে স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলা টিভির উপস্থাপক ঊর্মি মাযহার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন। সন্ত্রাসীরা তাঁর বাঁ পা ভেঙে দিয়েছে। গত বুধবার রাতে লন্ডনের ব্লাক হিথ এলকায় তাঁর নিজ বাসভবনে এ হামলা চালানো হয়।
ঊর্মি মাযহারের স্বামী আবরার আহমেদ জানান, গত মঙ্গলবার রাতে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক তাঁদের বাড়ি গিয়ে ঊর্মি মাযহারের সঙ্গে দেখা করতে চায়। তিনি ওই যুবককে টেলিফোনে ঊর্মি মাযহারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর অজ্ঞাত পরিচয় ওই যুবক চলে যায়। এর পরদিন রাত সাড়ে আটটার দিকে এক শ্বেতাঙ্গ যুবকসহ ওই কৃষ্ণাঙ্গ যুবক বাড়ির দরজা ভেঙে ঢুকে পিটিয়ে ঊর্মির বাঁ পা ভেঙে দেয় এবং মাথায় কাচের প্লেট দিয়ে আঘাত করে তাঁকে আহত করে। আহত ঊর্মি মাযহারকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে বিমান উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এক যাত্রীর

যুক্তরাষ্ট্রে গত শুক্রবার অভ্যন্তরীণ একটি ফ্লাইটের এক যাত্রী বিমানের ভেতর পানি ছিটিয়ে দেন ও তা উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। ক্রু ও কয়েকজন যাত্রী মিলে তাঁকে কাবু করার পর বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে। তবে পাইলট বিমানটির গতিপথ বদলে আগেই অন্যত্র অবতরণ করেছিলেন।
লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে টাম্পাগামী বিমানটির যাত্রী স্ট্যানলি ডোয়াইন শেফিল্ড প্রথম শ্রেণীর একটি কেবিনে পানি ছিটিয়ে দেন, একটি কেবিনের দরজা খোলার চেষ্টা করেন এবং বিমানটি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। কর্মকর্তারা এ কথা জানিয়েছেন।
বিমানের ক্রু সদস্য ও যাত্রীরা মিলে কাবু করার পর শেফিল্ডকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এ কথা জানায়।
এ ঘটনায় ডেল্টা বিমান সংস্থার ফ্লাইটটি গতিপথ পরিবর্তন করে নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কিতে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর বিমানটি আলবুকার্কি থেকে টাম্পায় নিরাপদে অবতরণ করে। এ ঘটনায় কেউ আহত হননি।

আফগানিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নভেম্বরে শুরু

আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব ও শাসনক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আগামী নভেম্বর মাস থেকে শুরু হবে। এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিনে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠকের শেষ দিনে গত শুক্রবার এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অভিযানের প্রায় নয় বছরের মাথায় এসে ক্ষমতা আফগানদের হাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করছে ন্যাটো। এদিকে নতুন করে তৎপর হওয়া তালেবান ও আল-কায়েদা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন বিদেশি সেনারা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে ন্যাটো মহাসচিব আন্দ্রেস ফগ রাসমুসেন বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছি।’ আফগান রাজধানী কাবুলের নিরাপত্তার দায়িত্ব ইতিমধ্যে আফগানদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
রাসমুসেন আরও বলেন, ‘আগামী নভেম্বর থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আজ থেকে আমরা একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করব।’ আগামী জুলাই মাসে কাবুলে একটি সম্মেলনে আফগান সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্মতি দেবে বলে তিনি আশা করছেন।
আফগানিস্তানের ন্যাটোর শীর্ষ বেসামরিক প্রতিনিধি মার্ক সেডুইল জানান, তিনি আশা করছেন, তুলনামূলক স্থিতিশীল প্রদেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে স্থানীয় আফগান নেতারা প্রস্তুত আছেন। এখন ন্যাটো পরিকল্পনাকারীরা যাচাই করে দেখছেন কোথায় কোথায় নিরাপত্তার দায়িত্ব ও সরকারি সেবা দেওয়ার মতো সামর্থ্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আছে।
তিনি আরও জানান, ন্যাটো সেনাদের সম্মুখভাগ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে এবং তারা শুধু স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতা দেবে। এভাবে একপর্যায়ে সেনাদের আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্তভাবে প্রত্যাহার করা হবে।

ইউরোপে মার্কিন পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরমাণু স্থাপনা রাখা না-রাখা নিয়ে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন বলছে, সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোকে রাশিয়া-ভীতি থেকে রক্ষা করার জন্যই তাদের এই পদক্ষেপ এবং এ ব্যাপারে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জার্মানির ক্ষমতাসীন সরকার গত নভেম্বরে দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রের স্থাপনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জার্মানি, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গ ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের পরমাণু কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে একটি বিতর্কের ডাক দেয়।
এদিকে এস্তোনিয়ায় রাজধানী তাল্লিনে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরমাস প্যায়েটের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সাবেক সোভিয়েক রাষ্ট্রগুলোকে পরমাণু স্থাপনা-সংক্রান্ত ব্যাপারে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু স্থাপনা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থারই অংশ। হিলারি বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলছি এস্তোনিয়াসহ আমাদের অন্যান্য মিত্রদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা রক্ষা করতে আমরা সচেষ্ট। আমরা কখনোই আমাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসব না।’
ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে এই বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী র্যাডোস্লো শিকোরিস্কি বলেছেন, ইউরোপে অনেক কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার একটি সমঝোতামূলক চুক্তি হওয়া দরকার।
তবে ন্যাটোর মহাসচিব আন্ড্রেস ফগ রাসমুসেন বলেছেন, ‘ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র রাখা না রাখা নিয়ে অবশ্যই বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক স্থাপনা ইউরোপে থাকুক। আমি বিশ্বাস করি, ইউরোপে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রের স্থাপনা থাকাটা খুবই জরুরি।’
ন্যাটোর মহাসচিব রাসমুসেন জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন। ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে কোনো ধরনের চুক্তি না হওয়ার সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে তারা এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে এই জোট পরমাণু অস্ত্রের ব্যাপারে তাদের বর্তমান অবস্থান নির্ধারণ করেছে। তবে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুইডো ওয়েস্টারওয়েল বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরমাণু কার্যক্রম হ্রাস করার যে নীতি গ্রহণ করেছে, আগের তুলনায় তা সন্তোষজনক।

মধ্যপ্রাচ্য-সংকট নিরসনে ওবামার হস্তক্ষেপ কামনা আব্বাসের

মধ্যপ্রাচ্য-সংকট নিরসনে ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, অস্থায়ী সীমানা নির্ধারণ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে না।
পশ্চিম তীরের রামাল্লায় গতকাল শনিবার তাঁর ফাতাহ পার্টির সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে আব্বাস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও আপনার প্রশাসন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাস করেন। তাই মধ্যপ্রাচ্য-সংকট নিরসনের পথ খুঁজে বের করা আপনাদের দায়িত্ব। এই সমস্যা সমাধানে আপনাদেরই উদ্যোগী হতে হবে।’
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত জর্জ মিশেল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে জানান, ওবামা চান শিগগিরই দুই পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্য-সংকটের নিরসন হোক।
ইসরায়েলের গণমাধ্যমে সম্প্রতি বলা হয়েছে, সাময়িকভাবে সীমানা নির্ধারণ করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিতে পারে ইসরায়েল। তবে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট।

ভারত পঞ্চম প্রজন্মের বিমান তৈরি করছে

বিমানবাহিনীতে পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক বিমান যোগ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ভারত। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তারা এ বিমান তৈরি করবে। এ বিষয়ে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তিও হয়েছে। ২০১৮ সাল নাগাদ নতুন এ যুদ্ধবিমান ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরে যোগ হবে।
ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান পি ভি নায়েক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ পঞ্চম প্রজন্মের এই যুদ্ধবিমান ভবিষ্যতে আকাশযুদ্ধে ভারতের সামর্থ্যকে অনেক এগিয়ে রাখবে।