Wednesday, July 11, 2018

উঠতি বয়সীদের নিয়ন্ত্রণে ঢাকার অপরাধ জগৎ by আল-আমিন

তরুণদের নিয়ন্ত্রণে এখন অপরাধ জগৎ। চুক্তিতে কিলিং মিশন বাস্তবায়ন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ছিনতাই সবই নিয়ন্ত্রণ করছে উঠতি বয়সী তরুণরা। রাজধানীতে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেছে তরুণদের নিয়ে গ্রুপ। আর এসব গ্রুপ এখন পাড়া-মহল্লার আতঙ্ক। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্র মতে, এলাকাভিত্তিক ৫ থেকে ৭ জন মিলে একটি করে গ্রুপ রয়েছে। এই গ্রুপের আবার একজন বড় ভাই আছে। যে ওই ৫ থেকে ৭ জনকে নিয়ন্ত্রণ করে। একেক গ্রুপ একেক নামে পরিচিত।
তারা এক এলাকা ছাড়া অন্য এলাকায় যেতে পারে না। মিরপুর পাইকপাড়ায় কানা সুমন, পল্লবী এলাকায় রতন, শাহআলী এলাকায় নীরব, রূপনগর এলাকায় বাইট্টা আজিজুল, রমনা এলাকায় ছোট শহিদুল, কলাবাগানে ছোট হাজী রহমত, ধানমন্ডি এলাকায় ল্যাংড়া রুবেল, ঝিগাতলা এলাকায় ডিসকো বাবু, আজিমপুর এলাকায় খুতি সালাউদ্দিন, কোতোয়ালি এলাকায় রাজা খবির, বংশাল এলাকায় লাল মোহাম্মদ, যাত্রাবাড়ী এলাকায় বাইক সেলিম, কদমতলী এলাকায় পিচ্চি রহিম, মতিঝিলে বড় আরিফ, খিলগাঁও এলাকায় বালি রফিক, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় কবীর ওরফে শাহেন শাহ, গুলশান এলাকায় ছোট মুক্তাকিন, উত্তরখান এলাকায় মালা শফিক গ্রুপ সক্রিয়।
এই গ্রুপের সদস্যদের চিহ্নিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ এলাকাভিত্তিক তালিকা সংগ্রহ করছে। এমনই একজন সবুজ। বয়স ১৮ বছর। মহাখালী এলাকায় একাধিক নাম রয়েছে তার। সংসারে অভাবের তাড়নায় বাসে হেলপারির মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার জীবন। এরই মধ্যে অন্ধকার জগতের এক মধ্য বয়সী লোকের সঙ্গে পরিচয়। এরপর থেকেই সবুজ অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। এদের কেউবা শীর্ষ সন্ত্রাসীর ছোট ভাই নাম ভাঙিয়ে নানা অপরাধ করছে। পুলিশের খাতায় তারা উঠতি বয়সী সন্ত্রাসী। এই চক্রটি দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নির্মাণাধীন বাড়ির মালিক, মার্কেটের দোকানিকে চিঠি পাঠিয়ে চাঁদা দাবি করে। তাদের হুমকির ভাষা হলো- চাঁদা  দে, নইলে জীবন দে? অনেকেই ঝামেলা এড়ানোর জন্য পুলিশকেও বিষয়টি জানাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন মানবজমিনকে জানান, ‘পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কেউ জেলে আছে কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এ অবস্থায় এলাকাভিত্তিক কিছু কিশোর-তরুণ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়াচ্ছে। এই চক্রটিকে দমন করার জন্য আমরা মাঠে কাজ করছি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম বিভাগের ডিসি মো. মোখলেসুর রহমান জানান, কিছু বখে যাওয়া তরুণ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরানুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, কিছুদিন আগে মিরপুর এলাকা থেকে র‌্যাব ৪ তরুণকে আটক করে। তারা উঠতি সন্ত্রাসী। চক্রের অন্য সদস্যদের ধরার চেষ্টা চালাচ্ছি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কম বয়সী এই উঠতি সন্ত্রাসীদের পুরো নাম-ঠিকানা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ। কমবয়সী এইসব উঠতি সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে নামে-বেনামে নানা অপরাধ করছে। বিশেষ করে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের তারা টার্গেট করে এগিয়ে চলে। চাঁদা না দিলে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। জায়গা-জমি কিনতে গেলেও নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিতে হচ্ছে তাদের। কেউ বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে তাদেরকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। অনেকেই এসব ঘটনায় থানায় জিডি বা মামলা দায়ের করছে। আবার কেউ ভয়ে মামলা করছে না।
সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে মিরপুর এলাকায় ৪ জন তরুণকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩। তারা এক ব্যবসায়ীর কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশের নাম ব্যবহার করে চাঁদা চেয়েছিল। এছাড়াও একজন শিশুকে অপহরণ করেছে। গ্রেপ্তারকৃত সুমন র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছে অর্থের লোভে এ জগতে পা বাড়িয়েছে সে। ৫ বছর আগে মিরপুর এলাকায় রতন ডন নামে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। এরপর থেকে সে নানারকম অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই চক্রের সদস্যরা বেশি সক্রিয় রয়েছে মিরপুর অঞ্চলে। তারা দিনের বেলায় বাসা থেকে তেমন একটা বের হয় না। রাতের অন্ধকার নেমে আসলেই তারা সক্রিয় হয়ে উঠে। নির্দিষ্ট আড্ডাস্থলে যায়। নানা পরিকল্পনা করে। পরে শুরু হয় আসল কাজ।

অসহায় নুরুর পরিবারের আহাজারি by মরিয়ম চম্পা

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরুর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। তার কিডনি ও ইউরিনে ইনফেকশনসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, চিকিৎসার খরচ   যোগাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নুরুর ভাবি মিতা বলেন, এই মুহূর্তে নিজেদের খুব অসহায় মনে হচ্ছে। গত সোমবার নুরুর লিভার ও কিডনির টেস্ট করানো হয়েছে। এছাড়া ডান হাতের কাঁধের অংশ থেকে হাড় সরে যাওয়ায় গলায় ব্যাগ দিয়ে হাত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বুধবার ওর মাথার সিটি স্ক্যান করানো হবে। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের হামলায় নুরু আহত হওয়ার পরপরই আমার শ্বশুরকে ফোন করে বলি বাবা নুরুর অবস্থা ভালো না। ওর চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে। আমার শ্বশুর একজন কৃষক। তার কোনো নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। তাই খবর পাওয়ার পরপরই তিনি এলাকায় এক ব্যক্তিকে গিয়ে বলেন, ভাই আমি জমি বিক্রি করবো আমার টাকা লাগবে।
তখন একটি কাগজে লিখিত দিয়ে তিনি অল্প কিছু টাকার ব্যবস্থা করে ঢাকায় আসেন। মিতা বলেন, কিডনির সমস্যাটা সারতে অনেক সময় লাগবে বলে ডাক্তার জানিয়েছেন। বর্তমানে নুরু একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। সেখানে দৈনিক ৭ হাজার টাকা বেড ভাড়া দিতে হয়। হাই পাওয়ারের মেডিসিনসহ আনুষঙ্গিক আরো খরচ রয়েছে। টানা এক সপ্তাহ ধরে বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবার।
তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নুরু মেজ। নুরুর গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা থানায়। নুরুর বয়স যখন আড়াই বছর তখন মা মারা যান। বাবা মো. ইদরিস হাওলাদার কৃষি কাজ করেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত এক সমাবেশে শুক্রবার নুরুর পিতা ইদরিস হাওলাদার বলেন, সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার ছেলে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। তাকে অমানবিকভাবে পেটানো হয়েছে। আজকে আমার ছেলেকে পিটিয়েছে, কালকে আপনার ছেলে, এরপর তার ছেলে- এভাবেই দেশটা চলবে। কেবল আমরা মরে যাবো, আর তারাই বেঁচে থাকবে। কথা বলার এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুর বাবা।
গত ৩০শে জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেয়ার সময় সকাল ১১টার দিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হককে বেধড়ক মারধর করা হয়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়নি বলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ রয়েছে। পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হলে সেখান থেকেও তাকে মধ্যরাতে বের করে দেয়া হয় বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তাকে হাসপাতাল বদল করতে হয়।
এদিকে গুরুতর আহত কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা তরিকুল ইসলাম তারেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় অ্যাম্বুলেন্সে রাজশাহী থেকে তাকে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তরিকুলের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। গত ২রা জুলাই বিকালে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সামনে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে পতাকা মিছিল বের করে। সেসময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনের নেতা ও রাবি শিক্ষার্থী তারেককে রামদা, হাতুড়ি, লোহার পাইপ ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে। এতে তরিকুলের ডান পা ও কোমরের হাড় ভেঙে যায়।

অবরোধ ভাঙার চেষ্টা: গাজার নৌকা ঠেকিয়ে দিয়েছে ইসরাইল

গাজা থেকে নৌকার বহর


ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে কয়েকজন রোগী নিয়ে সাইপ্রাসের দিকে যাওয়ার সময় ইহুদিবাদী ইসরাইলের যুদ্ধজাহাজ গাজার ওই নৌকার বহর আটকে দিয়েছে।
গতকাল (মঙ্গলবার) গাজা থেকে সাইপ্রাসের দিকে রোগীবাহী নৌকার বহর পাঠিয়ে ইসরাইলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ২০০৭ সালে ইসরাইল গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করে এবং এর ফলে গাজার মারাত্মক অসুস্থ লোকজন বাইরের দেশে চিকিৎসা নিতে পারছেন না।
ইসরাইলি বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, আটজন রোগী নিয়ে একটি নৌকা গাজা অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল কিন্তু তাদেরকে আটক করা হয়েছে এবং অবরোধ অব্যাহত রাখার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা চালু থাকবে। তল্লাশির পর নৌকাটিকে ইসরাইলি নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া, অসুস্থ রোগীদেরকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এর আগে, গতকাল সকালের দিকে গাজা উপকূল থেকে ১০ নটিক্যাল মাইল যাওয়ার পর একটি নৌকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বহরের অন্য নৌকাগুলোর বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। ইসরাইলি অবরোধের কারণে গাজা থেকে ছয় নটিক্যাল মাইলের বেশি ভেতরে কোনো নৌকা বা জাহাজকে যেতে দেয়া হয় না।
রোগীবাহী নৌকাকে এস্কর্ট দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন গাজার মানবাধিকার কর্মীরা

টার্নিং পয়েন্ট সিলেট বিএনপি-জামায়াত দূরত্বে নতুন মাত্রা by কাফি কামাল

২০ দলীয় জোটের প্রধান দুই শরিক দল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে নতুন করে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই দৃশ্যমান হচ্ছে দুই  দলের সম্পর্কের ফাটল। রাজনীতিতে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে বাড়ছে সেই ফাটলের পরিধি। সিলেট সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোরালো হয়েছে দুই দলের সম্পর্কের এ টানাপড়েন। সর্বশেষ সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী দেয়ার ব্যাপারে জামায়াত প্রকাশ করেছে তাদের অনড় অবস্থান।
দু’দফায় জোটের বৈঠক ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের দফায় দফায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পরও তারা মেয়র পদে নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করেনি। অন্যদিকে দুই দলের দূরত্বের বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে তিন সিটির নির্বাচনে জোটের সমন্বয় কমিটিতে জামায়াতকে জায়গা না দেয়ায়। জোটের একাধিক নেতা জানান, জামায়াত নেতারা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যতই জোটবদ্ধ রাজনীতি করুক না কেন, স্বতন্ত্র দল হিসেবে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের অধিকার রয়েছে জামায়াতের। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো যে তাদের অবস্থান শক্ত সেটা তারা প্রমাণ করতে চায় সিটি নির্বাচনে। এছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনের একটি প্রার্থী তালিকাও করছে জামায়াত। নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তালিকা বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে উপস্থাপন করা হবে। জামায়াতের সংশ্লিষ্ট সূত্র ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মহলে এমন বার্তাও দিয়ে রেখেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট অটুট থাকবে কিনা সেটাই এখন অনিশ্চিত।
দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বড় অংশটিই চাইছে জোট থেকে বেরিয়ে যাক জামায়াত। মুখে প্রকাশ না করলেও জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিএনপি কৌশলগত নীতি বা অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়লেও জোট নিয়ে জামায়াতের কৌশল ভিন্ন। তারা চাইছে, বিএনপিই তাদের জোট ভেঙে দিক। কৌশল-পাল্টা কৌশলের একটি সূক্ষ্ম সুতো জড়িয়ে রেখেছে দুই দলের সম্পর্ক। এদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই বড় জোটের বাইরে থাকা দলগুলো নিয়ে একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি।
রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রগতিশীল ও বামপন্থি দলগুলো বিএনপির সঙ্গে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। বিএনপির নেতাদের কারও কারও ধারণা, এসব ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য হলে জামায়াত জোটে গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। তাতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের আগের অবস্থান নষ্ট হবে। এ কারণে জামায়াত সিলেটে আলাদা নির্বাচন করে বিএনপিকে একটা ইঙ্গিত দিয়ে রাখছে। আবার জামায়াতের কারণে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে ওই দলগুলোরও আপত্তির কথা- চালু আছে। তাই বিএনপিও বৃহত্তর স্বার্থে আপাতত জামায়াতকে পেছনে রেখে জাতীয় ঐক্য গড়তে চাইছে।
১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির নেতৃত্বে জামায়াতসহ ৪ দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। জামায়াত ইস্যুতে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার অস্বস্তি বুকপকেটে রেখেই জোটগত পথযাত্রা শুরু করেছিল বিএনপি। জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়েছিল বিএনপি। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় গিয়ে জামায়াতকে সরকারের হিস্যা দিতে কার্পণ্য করেনি বিএনপি। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে দলের তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমসহ অনেক সিনিয়র নেতাকে হারিয়েছে দলটি।
দেশের যেসব এলাকায় জামায়াতকে আসন ছেড়েছিল সেখানে শরিক দলটির মনরক্ষায় নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও মেনে নিয়েছিল বিএনপি। এতে রাজনৈতিক আদর্শ ও অবস্থান সম্পর্কে দেশে-বিদেশে নানামুখী প্রোপাগান্ডার শিকার হয়েছে বিএনপি। একটি উদার গণতান্ত্রিক ও মধ্যপন্থি দল হয়েও জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে গালি হজম করতে হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে জামায়াত ছাড়তে বিএনপিকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে বারবার। ওয়ান ইলেভেনের রাজনৈতিক দুঃসময়ে বিএনপির চেয়ারপারসনসহ বেশিরভাগ নেতা যখন কারাগারে তখন মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়িয়েছেন জামায়াত নেতারা। জোট সরকারে অংশ হয়েও নানা জায়গায় তারা বলেছেন, বিএনপির দুর্নীতির দায়ভার কেন তারা নেবেন? ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আগ্রহী ছিলেন না।
কিন্তু জামায়াতের চাপের কারণে সে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান ও বিপুল জনসমর্থনের পরও সে নির্বাচনে বিএনপি ঘাড়ে চেপে বসে একটি ভূমিধস পরাজয়ের ভার। যা রাজনীতিতে বিএনপিকে ঠেলে দেয় খাদের কিনারে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পর আন্দোলন-সংগ্রামে দুই দলের দূরত্ব দৃশ্যমান হতে শুরু করে। বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে জোটের বন্ধনকে কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ করে ফেলে জামায়াত। নিজেদের প্রার্থীর ব্যাপারে একাট্টা হয়ে মাঠে নামলেও বিএনপির পাশে দাঁড়ায়নি তারা। এ সময় ভিতরে ভিতরে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ব্যাপারে নানা গুঞ্জনও ছড়ায় রাজনৈতিক মহলে।
জামায়াতের ডাকা হরতালের কারণে ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সে ঘটনায় বিএনপিকে দিতে হয়েছে চরম খেসারত। সে নির্বাচনের পর দীর্ঘ এক বছর দুই দলের নেতারা সৌজন্য বৈঠক পর্যন্ত করেননি। তারপর দুই দলের সম্পর্কের বিষয়টি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে মাসে-ছ’মাসে কাগজে-কলমে দুয়েকটি বৈঠক। ওদিকে বিএনপির বিরুদ্ধে এক সময় প্রচারণা ছিল দলটি জামায়াত-শিবির নির্ভর হয়ে পড়েছে আন্দোলন-সংগ্রামে।
কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে ২০১৫ সালে বিএনপি ঘোষিত টানা আন্দোলনে অংশগ্রহণ ছিল না শরিক দল জামায়াতের। পরবর্তী আড়াই বছর ধীরে চলো নীতিতে এগিয়েছে বিএনপির রাজনীতি। নিম্ন আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার হাজিরাকে কেন্দ্র করে ২০১৭ সালের শেষের কয়েক মাস থেকে চলতি বছরের ৮ই ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে পাঠানো পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহেই রাজধানীর মৎস্যভবন থেকে বকশীবাজার পর্যন্ত শোডাউন করেছে বিএনপি ও অঙ্গদলগুলোর নেতাকর্মীরা।
প্রতিটি হাজিরার দিনে সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও পুলিশের হামলা এবং অব্যাহত গ্রেপ্তারের মুখেও সে শোড়াউনে বেড়েছে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপস্থিতি। যা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে তৈরি করেছে নতুন আত্মবিশ্বাস। খালেদা জিয়া জোটের শীর্ষ নেত্রী হলেও জামায়াতকে দৃশ্যমান হতে দেখা যায়নি তার কারামুক্তির আন্দোলনে। জোটের বৈঠকে দলটি আন্দোলনে অংশ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও রক্ষা করেনি সে প্রতিশ্রুতি। অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় দলটির নেতারা জানান, এ বিষয়টিকে তারা বিএনপির দলীয় ইস্যু মনে করে। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, সন্দেহ-অবিশ্বাসের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ দুই দশক জোটগত পথযাত্রার পর এখন বিএনপিও ভাবছে নতুন করে। 
বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরাম সূত্র জানায়, জামায়াতের একটি অংশের কার্যক্রমের ওপর অনেক আগে থেকেই নজর রাখছে বিএনপি। তাদের কর্মকাণ্ডকে দেখা হচ্ছিল সন্দেহের চোখে। দলের হাইকমান্ডও বিষয়টি অবহিত। রাজনৈতিক নানা হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যাপারে কোনো কৈফিয়ত চায়নি বিএনপি। তবে বারবার আহ্বান ও অনুরোধ জানানোর পরও সিলেটে মেয়র পদে প্রার্থী প্রত্যাহার না করায় দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে বিএনপি। ২০ দলের শরিক দলগুলোও ক্ষুব্ধ হয়েছে এ ঘটনায়।
বিএনপি যখন বৃহত্তর ঐক্যের আহ্বান নিয়ে কাজ করছে তখন জামায়াতের এমন কর্মকাণ্ড ও অবস্থান উদ্দেশ্যমূলক এবং রহস্যজনক বলছেন তারা। তাদের ভাষ্য, এখানে দুইটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে জামায়াতের। প্রথমত, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মেয়র প্রার্থী দেয়া জামায়াতের একটি কৌশল হতে পারে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসন ভাগাভাগি প্রশ্নে দরকষাকষির সুযোগ নিতেই এমন কৌশল নিয়েছে তারা।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের সঙ্গে গোপন আঁতাত করছে দলটির একটি অংশ। দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। কিন্তু সেটার মূল উদ্দেশ্য অন্যখানে। বিএনপিকে দুর্বল করতেই জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছিল সরকার। রাজনীতিতে পরিবর্তিত কৌশলে তারা জামায়াতকে স্পেস দিলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। আর সেটা হলে বিএনপিকে বাদ দিয়ে বর্তমান সরকারের অধীনে জামায়াতের ওই অংশটি নির্বাচনে যেতে পারে বলেও শঙ্কা বিএনপির।
জামায়াতের এমন সন্দেহজনক গতিবিধি নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামসহ সিনিয়র নেতাদের বড় অংশটি মোটেই চিন্তিত নয়। তারা মনে করেন, জামায়াত যদি জোট ছেড়ে চলে যেতে চায়, তাহলে সেটিই হবে বিএনপির জন্য মঙ্গল। কারণ, এ দলটির কারণে বারবার বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারেনি বিএনপি।
জামায়াতের কারণে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েও সমর্থন দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক দল এবং সামাজিক শক্তি। জামায়াতের কারণেই প্রতিবেশী প্রভাবশালী দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারছে না বিএনপি। তৈরি হচ্ছে না আস্থার সম্পর্ক। তাই এ দলটি জোট ছেড়ে চলে যেতে চাইলে তাদের ধরে রাখতে চায় না বিএনপি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সামনের দিনে ভোটের রাজনীতিতে খুব বেশি পথ আগাতে চায় না বিএনপি। তাই এই দূরত্ব ঘোচাতে বিএনপি কোনো ছাড় দেবে না।
অন্যদিকে বিএনপির একটি অংশ মনে করে, জামায়াতের সঙ্গে এই মুহূর্তে সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত হবে না। তারা মনে করেন, বিএনপি জোট থেকে ইসলামী দলগুলোকে আলাদা করতে নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। জামায়াতকে জোট থেকে আলাদা করতে পারলে সরকার এ দলটিকেই আবার বিএনপির বিপক্ষে দাঁড় করাতে পারে। তাহলে কি সিলেট থেকেই শুরু হচ্ছে সে বিরোধিতা? সিলেটে দলীয় মেয়র প্রার্থী দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। জামায়াতের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, ‘কেন্দ্রের অনুমতি সাপেক্ষেই মেয়র পদে মনোনয়নপত্র নিয়েছি।’
অন্যদিকে ৪ঠা জুলাই জোটের বৈঠক শেষে একক প্রার্থীর ব্যাপারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা আলমগীর ও জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্যের সঙ্গে জামায়াতের বক্তব্য ছিল সাংঘর্ষিক। জামায়াত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রয়েছেন। এতে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই।’ বিষয়টি পরিষ্কার যে, বুঝে-শুনেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত। এ ব্যাপারে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, সরকার হয়তো জামায়াত নিয়ে খেলতে চাইছে।
তাদের আলাদাভাবে নির্বাচন করার প্রস্তাবও দিতে পারে। দলটির একাংশ এমন সমঝোতা করলেও তাদের নির্যাতিত তৃণমূল সেটা মেনে নেবে বলে মনে হয় না। কিন্তু বাস্তবতা বলছে অন্যকথা। বিএনপি ও জোটের একাধিক নেতা জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াত প্রকাশ্যে দলের কোনো কার্র্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। কিন্তু সিলেটে প্রকাশ্যে নিয়মিত নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী। গাড়িবহর নিয়ে শহরের সব জায়গায় নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন।
প্রতিদিন কর্মিসভা করে যাচ্ছেন। সেখানে কোনো ধরনের বাধা দিচ্ছে না পুলিশ। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনো মাঠে নামতে পারেনি। প্রতিনিয়ত তাদের বাসাবাড়িতে হানা দিচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে বরিশাল-রাজশাহীতেও দুই দলের মধ্যে চলছে টানাপড়েন। রাজশাহীতে মেয়র পদে প্রার্থী না দিলেও এখন পর্যন্ত বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেয়নি জামায়াত। সেখানে তারা শর্ত জুড়ে দিয়ে বলছে, জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থন দিলেই তারা বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে সমর্থন দেবে।

তারুণ্যের ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ by শুভ্র দেব

গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে। নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন সাধারণ   শিক্ষার্থীরা। একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এখন স্বাভাবিক চলাফেরায়ও ভয় পাচ্ছেন। এই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এক সময় সংহতি প্রকাশ করা প্রশাসন এখন উল্টো তাদের প্রতি বৈরী হয়ে উঠেছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবস্থান ও কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়ের কারণ বলে মনে করছেন তারা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, নতুন এই সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের টার্গেট করে। বিশ্ববিদ্যালয় বহিরাগত মুক্ত রাখা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লক্ষ্য নয়।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়ে দমিয়ে রাখার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একটি যৌক্তিক আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত কখনই কাম্য নয়। শতকরা ৯৫ভাগ শিক্ষার্থীর দাবির আন্দোলনকে ঢাবি কর্র্র্র্তৃপক্ষ সমর্থন না দিয়ে বরং এটি বন্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা এমন সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে করা হয়েছে বলে বিবেচনা করছে। রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত নয় এমন শিক্ষার্থীরা মনে করছে একটি যৌক্তিক আন্দোলন করতে গিয়ে এখন তাদের জঙ্গি বলা হচ্ছে। ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম রেজওয়ান বলেন, বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে কিন্তু কোনো তল্লাশি চৌকি নাই। শত শত বহিরাগত প্রবেশ করছে। যদি কোনো তল্লাশি চৌকি নাই থাকে- তবে কেন এই নিষেধাজ্ঞা। তবে, কী অন্য কোনো কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। যদি তাই হয় তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এটা কখনই কাম্য নয়। আমরা কোটা সংস্কারের পক্ষে।
এখানে কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা নেই। আর যদি থেকে থাকে তবে কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কী নিরাপত্তা দিচ্ছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আরেক শিক্ষার্থী মামুন বলেন, দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠে যখন আসি বাসা থেকে একটু পরপর খবর নেয়া হয় কেমন আছি। কতটুকু নিরাপত্তাহীনতায় আমরা ভুগি। কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতরে এসে শিক্ষার্থীদের হামলা করে। কোনোকালেই এটা হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি আজ এমন হয়েছে সব কিছু মেনে নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা আসবেই। অরক্ষিতভাবে এটা কখনই বন্ধ করা যাবে না। আর শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন করবে। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিলেই আর আন্দোলন হবে না। ব্যবসা অনুষদের আরেক শিক্ষার্থী নাফিস বলেন, এটা খুব স্বাভাবিক। সবাই বুঝে কেন এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে আমরাও।
কিন্তু এরকম একটা পরিস্থিতিতে কেন এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলো। অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে অন্য দিকে মোড় নিতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এমন ক্যাম্পাসে এটা কেউ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের নিয়ে ভিসি যে মন্তব্য করেছেন এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক। কারণ কোটা সংস্কারের পক্ষে বিপক্ষে যারাই আছে সবাই ভিসি স্যারের শিক্ষার্থী। আলাদা করে দেখার কোনো প্রয়োজন নাই। আর স্যারের এ ধরনের মন্তব্যে তিনি নিজেই সমালোচিত হচ্ছেন। যদি ডাকসু থাকতো তবে এই ভিসির প্রত্যাহার চাওয়া হতো।  এদিকে, বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা  সত্ত্বেও গতকাল ঢাবি এলাকায় সব ধরনের যানবাহন ও বহিরাগতদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। নানা শ্রেণি পেশার মানুষ টিএসসিতে ঘোরাফেরা করেছেন নানা কাজে। অন্যান্য দিনের মতো গতকালও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল করেছে। তবে, শাহবাগ থানা এলাকায় পুলিশের প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। জলকামান, সাজোয়াঁ যান, একাধিক পুলিশ ভ্যান সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। এমনকি টিএসসি এলাকায়ও পুলিশের দুটি ভ্যান দেখা যায়।

বৃটিশ রাজনীতিতে যেন ঘূর্ণিঝড়

ব্রেক্সিট ইস্যুতে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। এ ইস্যুতে একে একে তিনজন প্রভাবশালী মন্ত্রী পদত্যাগ করার পর তার ভাগ্য ঝুলছে। ফলে ব্রেক্সিট ইস্যুতে বৃটিশ রাজনীতিতে শুধু ঝড় বললে ভুল হয়, বলা যায় ঘূর্ণিঝড় বইছে। যারা সরকার থেকে পদত্যাগ করেছেন তারা আর কেউ নন ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী ডেভিড ডেভিস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন ও ব্রেক্সিট বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী স্টিভ বেকার। ওদিকে পরিবহন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অবৈতনিক পার্লামেন্টারিয়ান সহায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন ক্রিস গ্রিন। তিনিও তার এ পদ থেকে সরে গেছেন। এ অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন তেরেসা মে। তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। এমন খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ ও বিবিসি। রোববার আকস্মিক বা নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করেন ডেভিড ডেভিস। তখন বলা হয়, তাকে অনুসরণ করে আরো কয়েকজন মন্ত্রী বা এমপি পদত্যাগ করতে পারেন। এরপর পরই খবর আসে স্টিভ বেকারও পদত্যাগ করেছেন। তবে সোমবার দিনশেষে সবচেয়ে বড় আঘাতটি হানেন ওই এলোমেলো চুলের বরিস জনসন। তিনি লন্ডনের সাবেক মেয়র এবং বৃটেনের রাজনীতিতে এ সময়ে বেশ প্রভাবশালী নেতা। এতে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র ভাগ্য সরল দোলকের মতো দুলছে। যেকোনো সময় যেকোনো দশায় চলে যেতে পারে তা। বরিস জনসন পদত্যাগ করার আধা ঘণ্টারও একটু বেশি পরে তেরেসা মে এমপিদের মুখোমুখি হন। তাকে এমপিরা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তার পারফরমেন্সের পক্ষেই কথা বলেন। তিনি জানান দেন, গত সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনকে বের করে আনার বিষয়ে যে চুক্তি অনুমোদন করেছে সেটাই সর্বোত্তম অগ্রবর্তী অবস্থা। হাউজ অব কমন্সে তিনি অবিলম্বে নেতৃত্ব সংকটে বা নেতৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জে পড়তে পারেন এমন আশঙ্কা-উদ্বেগ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও তেরেসা মে নিজের দলের ব্যাকবেঞ্চার এমপিদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তার লড়াকু কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি তার এমপিদের বলেন, তাদের সমর্থন তার প্রয়োজন। তা নাহলে বিরোধী লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন ক্ষমতার দিকে হাত বাড়াবেন। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ক্ষমতা থেকে উৎখাতের যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই করবেন তেরেসা মে। সরকার ‘মেল্টডাউন’ বা গলে যাওয়ার মতো কথাও বলা হয়। এমন আশঙ্কাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তবে বরিস জনসন পদত্যাগ করায় যেন একটি ‘বোমা’ বিস্ফোরণ হয়েছে রাজনীতিতে। তার স্থানে বসানো হয়েছে জেরেমি হান্টকে। বিবিসি লিখেছে, বৃটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সংকট এখন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। না-আঁচড়ানো এলোমেলো সোনালি চুলের বরিস জনসন লন্ডনের সাবেক মেয়র, বৃটিশ রাজনীতির এক জনপ্রিয় এবং বর্ণাঢ্য চরিত্র। যার চটকদার কথা এবং বিচিত্র কর্মকাণ্ড প্রায় সময়ই সংবাদপত্রে খবর হয়। বৃটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগের প্রশ্নে যখন গণভোট হয়েছিল- তখন এই বরিস জনসনই ছিলেন ইইউ ত্যাগের সমর্থক শিবিরের প্রধান নেতা। ২০১৬ সালের ওই গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়ে। এর পর সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন, এবং তেরেসা মে নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়ে বরিস জনসনকে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেন। তেরেসা মে নতুন ব্রেক্সিট বিষয়ক পরিকল্পনা প্রকাশ করার পর থেকেই তার কনজারভেটিভ পার্টির এমপিদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বলা হয়, বরিস জনসন এবং তার অনুগামীরা ইইউ থেকে বৃটেনের প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের পক্ষে, যাতে ইউরোপ থেকে অবাধ অভিবাসন এবং বৃটেনের ওপর ব্রাসেলসের কর্তৃত্ব বন্ধ হয়। এদের বলা হয় ‘হার্ড বেক্সিট’ গ্রুপ। আর অন্য পক্ষকে বলা হয় ‘সফট ব্রেক্সিট’ পক্ষ- এরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার বিরোধী, তারা চান ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থেকে বৃটেন যে সুবিধাগুলো পায় সেগুলো অব্যাহত রাখতে- যাতে তাদের ভাষায় বৃটেনে কর্মসংস্থান এবং ইইউ-বৃটেন ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাই গণভোটের পর থেকেই বৃটেনে এ বিতর্ক চলছে যে বৃটেন ইউরোপ থেকে কতটুকু আলাদা হবে এবং কীভাবে তার বাস্তবায়ন হবে। বৃটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগ করবে ২০১৯ সালের ২৯শে মার্চ। এখন তেরেসা মে ব্রেক্সিটের যে পরিকল্পনা দিয়েছেন তার সমালোচনা করে কড়া ব্রেক্সিটপন্থিরা বলছেন, এতে ইউরোপকে খুব সহজে অনেক বেশি ছাড় দেয়া হয়েছে। এর পর প্রথম পদত্যাগ করেন ব্রেক্সিটমন্ত্রী ডেভিড ডেভিস। তার কথা, এ পরিকল্পনায় তিনি বিশ্বাস করেন না, তাই এর পক্ষ নিয়ে ব্রাসেলসের সঙ্গে ব্রেক্সিটের আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। এর কয়েক ঘণ্টা পরই পদত্যাগ করেন ব্রেক্সিটের পক্ষের মূল নেতা বরিস জনসন- যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েও তেরেসা মে’র ব্রেক্সিট পরিকল্পনার সমালোচনা করে চলেছিলেন, কিন্তু সরকার ছেড়ে যান নি। বিবিসির বিশ্লেষক লরা কুয়েন্সবার্গ বলছেন, বরিস জনসনের বিদায়ের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে এক অপ্রস্তুত এবং কঠিন অবস্থায় পড়ে গেছেন, এবং এটা এখন পূর্ণাঙ্গ সংকটে পরিণত হয়েছে। তিনি বলছেন, এর ফলে হয়তো কড়া ব্রেক্সিটপন্থি শিবির থেকে মিসেস মে’র নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তাকে এই বার্তা দেয়া হয়েছে যে, তিনি তার পরিকল্পনা ত্যাগ না করলে একের পর এক মন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। বিরোধীদল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, মি. জনসন এবং মি ডেভিস সরকারের ডুবন্ত জাহাজ থেকে নেমে গেছেন, এবং মিসেস মে তার দলে ঐক্য আছে বলে যে বিভ্রম তৈরি করে রেখেছিলেন- তা ভেঙে পড়েছে। এরকম সংকটের মধ্যে তেরেসা মে কীভাবে তার সরকারকে টিকিয়ে রাখেন এটাই এখন দেখার বিষয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন পরিস্থিতি কাম্য নয় by মনির হোসাইন

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও পরবর্তী দমনপীড়নের পরিবেশ নিয়ে শিক্ষাবিদরা বলেছেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিবেশ  কারো কাম্য নয়। শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও তাদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সে দায়িত্ব পালন না করে উল্টো শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়াটাও বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে বেমানান। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির উচিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে সহিংসতা মুক্ত করা। কিন্তু তিনি সেটি করেননি বা তার প্রশাসনও পারেনি। যারা হামলা করেছে তাদের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। অর্থাৎ হামলাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে, এটা কেমন ধরনের শাসন হলো তা আমার কাছে বোধোগম্য না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আজকে দেখা গেছে ভিসি কিছু ছাত্রকে দোষারোপ করছেন। যদি কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকার বিরোধীদের সম্পৃক্ততা থাকে সে বিষয়টি দেখবে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যদি ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের পক্ষ হয়ে ভিসি কথা বলবেন- সেটা তো আমাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত।’ তার মতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় আছে। প্রবীণ এ শিক্ষক বলেন, ‘আজ দেখা যাচ্ছে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যেমন হওয়া উচিত ঠিক তেমন নেই। অত্যন্ত অমানবিক দৃষ্টান্ত যে আহতরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এটা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও অমানবিক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র যদি গ্রেপ্তার হয়। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ভূমিকা থাকা উচিত। যে সে ছেলেটি দোষী না নির্দোষ। বা তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো। সে ভূমিকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নেয়নি।’ ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ঘোরাফেরা ও কার্যক্রম বন্ধে নেয়া সিদ্ধান্তের বিষয়ে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘সিদ্ধান্তটির উদ্দেশ্য মহৎ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে বহিরাগত মুক্ত রাখা। এটা আমরাও চাই। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তটা অবাস্তব। প্রশাসনের অনভিজ্ঞতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ খোলামেলা, এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় না, এটি বাংলাদেশ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। সুতরাং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ সবার আছে। যে কেউ আসতে পারে। কেউ যদি অসৎ উদ্দেশ্যে আসে, তখন তাকে কোনো আইনের আওতায় আনার মতো সক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বর্তমানে আছে বলে আমার মনে হয় না।
অধ্যাপক আনোয়ার বলেন, ‘এখানে অনবরত গাড়ি চলাচল করছে। এসব কে বন্ধ করবে। আর কে বহিরাগত আর কে বহিরাগত নয় সেটি নির্ধারণ করা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভব, এখানে কীভাবে সম্ভব। এটা আসলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিণত করতে হবে। রাজনীতি একটু কম করে পড়াশোনা এবং শিক্ষকতায় মনোযোগ দেয়া দরকার। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ ভালো হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি  ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, কোনো উৎকণ্ঠাই ভালো নয়। ছাত্র-শিক্ষকদের উৎকণ্ঠা তো আরো খারাপ। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুতরাং আমি আশা করবো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এ সমস্যার সমাধান হবে। ছাত্রছাত্রীরা উৎকণ্ঠা কাটিয়ে পড়ালেখায় আত্মনিবেশ করতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার দ্রুততার সঙ্গে কোটা নিয়ে গঠিত কমিটির রেজাল্টের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করলে সব ধরনের শঙ্কা কেটে যাবে। এটা যত দীর্ঘায়িত হবে তত সমস্যা দেখা দেবে।’ বহিরাগতদের ঘোরাফেরা ও কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভিসি ভবন ও তার পরিবার যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে, সে থেকে তিনি যদি শঙ্কিত থাকেন বা আস্থাহীনতার সংকটে থাকেন তবে তিনি এমন ধরনের ঘোষণা দিতে পারেন। প্রভোস্ট কমিটিও ভয়ে থেকে দিতে পারেন। তবে আমি মনে করি এটা চিরস্থায়ী সমাধান (পার্মানেন্ট সলিউশন) না। এটা যত দ্রুততার সঙ্গে তুলে নেয়া যায় ততই ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের ডেফিনেশন (সংজ্ঞা) দেয়াটা কঠিন। এটা প্রমাণ করবো কীভাবে যে, আমি বহিরাগত না। সুতরাং আমি মনে করি এটা দ্রুততার সঙ্গে অবসান হওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ভিসি ড. আখতারুজ্জামানের বক্তব্যের বিষয়ে বলেন, আমি মনে করি এটা একটি গুরুতর অভিযোগ। কারো কাছে যদি এমন তথ্য থাকে, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। আর যদি তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ থাকে তাহলে কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতি তাদের সঙ্গে সংহতি জানাতে গিয়েছে। যদি কেউ জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন তথ্য তাদের কাছে থাকে তাহলে তথ্য উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘তখন তারা সংহতি প্রকাশ করেছেন এখন তো এভাবে বলা যায় না। যদি তার কাছে তথ্য প্রমাণ থাকে। আমি মনে করি নিশ্চয় তার কাছে আছে। তাই তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিত।’
শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের আক্রমণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদের ওপর যারা আক্রমণ করেছে তারাও ছাত্র। সুতরাং ছাত্ররা ছাত্রদের ওপর আক্রমণ করলে এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া তাদেরই দায়িত্ব।’ অধ্যাপক আরেফিন বলেন, ‘প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে আশা করবো ইতিমধ্যে গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার নিরিখে বাস্তবায়ন যোগ্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করবেন।’ বহিরাগত মুক্ত করতে বর্তমান প্রশাসনের নেয়া পদক্ষেপের বিষয়ে সাবেক এ ভিসি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রতি মুহূর্তে এখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আসা-যাওয়া। এখন কীভাবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন সেটি তারা ভালো জানেন।’

বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও দিল্লি যাচ্ছেন খালেদার আইনজীবী

বাংলাদেশ সরকারের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও দিল্লিতে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বৃটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলের পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিল হচ্ছে না। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব তার শুক্রবারের নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল করে দিলেও তার একদিন আগেই তিনি দিল্লিতে অন্য কোনো জায়গায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মিলিত হবেন বলে বৃটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইল বিবিসিকে জানিয়েছেন। বাংলাদেশে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাটি কেন ‘সাজানো’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ’, সেটাই তার ওই সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা করার কথা। তবে লর্ড কার্লাইল যদি ভারতের মাটিকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক ক্যা¤েপইন চালান- ঢাকা সেটা আদৌ পছন্দ করবে না বলে ইতিমধ্যেই দিল্লিকে জানানো হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, লর্ড কার্লাইল দিল্লিতে আসছেন এ খবর জানাজানি হওয়ার পরই ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতের কাছে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। এমনকি, দু-তিনদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ভারত সফরে এসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর এবং রাম মাধবের মতো বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাতের সময় প্রসঙ্গটি উঠিয়েছেন। লর্ড কার্লাইলকে ভারতে এসে সংবাদ সম্মেলন করতে দেয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি স¤পর্কে ঢাকার পক্ষ থেকে যে যুক্তি দেয়া হয়েছে সেটি এরকম- লর্ড কার্লাইল খালেদা জিয়ার হয়ে মামলায় লড়তে আর্থিকভাবে চুক্তিবদ্ধ। ফলে দিল্লিতে তিনি যেসব কথা বলতে আসছেন সেগুলো একটা ‘পেইড রাজনৈতিক ক্যা¤েপনে’র অংশ- যার নিশানা হলো বাংলাদেশ সরকার। ঢাকার পক্ষ থেকে এমন কথাও বলা হয়েছে যে এখন বাংলাদেশ যেভাবে তাদের ভূখ-কে ভারতবিরোধী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত হতে দেয় না, সেভাবে ভারতেরও উচিত নয় দিল্লির মাটিকে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হতে দেয়া। বাংলাদেশের একটি শীর্ষ কূটনৈতিক সূত্র বিবিসি বাংলাকে এমনও বলেছেন,“লর্ড কার্লাইল ভারতে এসে তাজমহল বেড়াতে যান, ইন্ডিয়া গেটে হাওয়া খান- আমাদের কিছুই বলার নেই। কিন্তু দিল্লি সফরকে তিনি যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারে কাজে লাগান- তাও আবার পয়সা নিয়ে- সেটা মোটেই ভারত-বাংলাদেশ স¤পর্কে কোনো ভালো সংকেত দেবে না।”
লর্ড কার্লাইল চেয়েছিলেন ১৩ই জুলাই দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব বা এফসিসি-তে তিনি মিডিয়ার মুখোমুখি হবেন এবং সেভাবে ওই ক্লাবের মিলনায়তনটি প্রাথমিকভাবে বুকিংও করে রেখেছিলেন। কিন্তু ওই একই দিনে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতও ক্লাবে আসছেন, এই যুক্তিতে শেষ মুহূর্তে এফসিসি তার বুকিং বাতিল করে দিয়েছে। ফলে লর্ড কার্লাইল এখন দিল্লিতেই অন্য কোনো জায়গায় সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হচ্ছেনÑ আর তার দিনটাও একদিন এগিয়ে এনে ১২ই জুলাই বৃহ¯পতিবার করা হয়েছে। তবে গত রাতে তিনি বিবিসিকে হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়েছেন, তার দিল্লি সফর মোটেও বাতিল হচ্ছে না- এবং খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা নিয়ে তিনি কথা বলতে চান, সেটাও দিল্লিতে অবশ্যই বলবেন। কিন্তু বৃহ¯পতিবার কোথায়, কটার সময় তিনি মিডিয়ার মুখোমুখি হবেন- সেগুলো এখনও প্রকাশ করা হয়নি, যাতে এফসিসি-র মতো তারাও না শেষ মুহূর্তে কোনো কারণে বেঁকে বসে।
গত সোমবার লর্ড কার্লাইল বিবিসিকে বলেন, তার ভারতীয় ভিসা হয়ে গেছে। আসলে বৃটিশ নাগরিকরা এখন ভারতে যাওয়ার জন্য সফরের অনেক আগেই ই-ভিসা বা ইলেকট্রনিক ভিসার আবেদন করে রাখতে পারেন, আর সচরাচর তা মঞ্জুরও হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, লর্ড কার্লাইলের ভিসার অবেদনেও ভারতের সিলমোহর পড়ে গেছে অনেক আগেই। আর একজন প্রবীণ বৃটিশ লর্ড ও বিখ্যাত আইনজীবীর ভিসা বাতিলের যুক্তি খাড়া করাও ভারত সরকারের জন্য মুশকিল।
দিল্লির সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই কারণেই বাংলাদেশ সরকারের ¯পষ্ট আপত্তি সত্ত্বেও দিল্লি কিন্তু লর্ড কার্লাইলের ভারত সফর বাতিল করতে পারছে না। কিন্তু সরকারি মহলের প্রভাব খাটিয়ে দিল্লিতে তার কর্মসূচিতে বাধা তৈরি করার চেষ্টা একটা আছে, সেই ইঙ্গিত রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলিনি

সমালোচনার মুখে নিজের দেয়া বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। তার বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে ভুলভাবে এসেছে দাবি করে বলেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলেননি। গতকাল নিজের আগের বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের ঢাবি ভিসি বলেন, আমি বলেছি, আন্দোলনকারীদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড উগ্রপন্থি জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে যায়।
এদিকে আগের দিন বহিরাগত  প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পরের দিন গতকাল ভিসি আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হবে। দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। নিরাপত্তা চৌকিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করবে।’ তার মতে কোটা আন্দোলনের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন কিছু অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশের ফলে নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বহিরাগত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা শিগগিরই কিছু নিরাপত্তা চৌকি বসাবো। যাতে ভ্রাম্যমাণ মানুষ অন্য কোনো গোষ্ঠী এখানে এসে হঠাৎ করে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে। কেউ এসে হঠাৎ করে মাইক দিয়ে আওয়াজ তুলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবে-এটি আমরা বরদাশত করবো না।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বাজারঘাটের জায়গা নয়। এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জায়গা। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদানের এখানে সম্মিলন ঘটে।’ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় স্বাগত জানায়। যেহেতু এটি গণতন্ত্রের সূতিকাগার এখানে সকল প্রকার কর্মসূচি পালিত হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, কবিতা, গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। এসব কাজে এখানে সবাই আসবে। তবে স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটায় ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নষ্ট করে-এমন বহিরাগতদের এখানে অবস্থান আমাদের কাম্য হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়ি প্রবেশ করে। এটা বন্ধ করা হবে। আমরা সড়ক ব্যবস্থাপনা করবো। যেমন ফুলার রোডে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো রোধে সড়ক গতিরোধক বসিয়েছি।’ ভিসি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস তারা যেন নিরাপদ থাকে আমরা সেই চেষ্টা করবো। নিরাপত্তা চৌকি মানে ক্যান্টনমেন্ট না, পুলিশ পোস্ট না, এখানে আমাদের সিকিউরিটি গার্ড থাকবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকটি যাতে বসতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে।’
হামলাকারীদের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ: কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে গতকালও মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয় বাংলা বিভাগের উদ্যোগে। এসময় বাংলা বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী মাসুদ রানার ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। সমালোচনা করা হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনকে জঙ্গিবাদের কার্যক্রমের বহিঃপ্রকাশ বলে ভিসির দেয়া বক্তব্যেরও।
এসময় মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড বহন করে। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘গত ২রা জুলাই শহীদ মিনার এলাকায় কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের কর্মীরা। ওই ঘটনার সময় মাসুদ রানার ওপর অমানবিক হামলা চালানো হয়। কিন্তু হামলার পরও প্রক্টর বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চুপ ছিলেন। প্রক্টর গোলাম রব্বানী বলেছেন হামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।’ বিভাগটির তৃতীয় বর্ষের দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা দুঃখজনক। শিক্ষার্থীরা একটি যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি এবং দ্রুত এর সমাধান দাবি করছি।’ ফারজানা খেয়া নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘শহীদ মিনারের মতো জায়গায় একজন শিক্ষার্থীকে কুকুরের মতো মারা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর এমন হামলা মেনে নেয়া যায় না।

সর্বময় ক্ষমতা নিয়ে আবারো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান by অনিম আরাফাত

আবারো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। তবে এবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন পূর্বের চেয়ে আরো ক্ষমতাধর হয়ে। এখন থেকে দেশের পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া, জরুরি অবস্থা জারিসহ গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারবেন তিনি। সোমবার আঙ্কারার পার্লামেন্ট ভবনে দেশের প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে পর পর দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন এ দেশনায়ক। শপথ নেয়ার পর দেয়া এক ভাষণে এরদোগান আধুনিক তুরস্ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, জনগণের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করে যাবে তার নতুন সরকার।
মঙ্গলবার বর্ণাঢ্য আয়োজনে এরদোগানকে শপথ পড়ান পার্লামেন্টের স্পিকার। তার অভিষেক অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিসহ প্রায় ২২টি দেশের রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুরস্ক নতুন সংসদীয় ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করলো।
গত বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত এক গণভোটের মাধ্যমে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের ব্যাপক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। নতুন সরকার ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ওপর দেশ পরিচালনার সর্বময় কর্তৃত্ব অর্পণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট সংসদের অনুমতি ছাড়াই মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রধান বিচারপতিসহ নতুন সংযুক্ত হওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে যে কাউকে নিয়োগ এবং বরখাস্ত করতে পারবেন। এ ছাড়াও, তিনি যেকোনো মুহূর্তে আইন সভা ভেঙে দেয়া, নির্বাহী আদেশ জারি ও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন। নতুন এই পদ্ধতিতে দেশটিতে প্রধানমন্ত্রী পদ বিলুপ্ত করা হয়।
নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৬৪ বছর বয়স্ক এরদোগান দেশ পরিচালনার সর্বময় কর্তৃত্ব ভোগ করবেন। সোমবার তিনি একইসঙ্গে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামও ঘোষণা করেছেন। পূর্বের সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী মেহমেক সিমসেক নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল হুলসি আকার। নিজের জামাতা বেরাত আলবায়রাককে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন এরদোগান। এছাড়া, মেভলুত সাভুসলগুকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন সুলেমান সয়লু। আর সাবেক উপদেষ্টা ফুয়াত ওক্টায়কে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিয়েছেন।
এর আগে এরদোগান বলেছেন, নতুন মন্ত্রিসভায় তার দল একে পার্টি থেকে কেউ থাকছে না। সাবেক রাজনীতিবিদ ও আমলাদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের ইঙ্গিত দেন তিনি। ২৪শে জুন অনুষ্ঠিত হওয়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫২.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে আরো ৫ বছরের জন্য ক্ষমতা সংহত করেন এরদোগান। নির্বাচনে একে পার্টি ৪২.৫ শতাংশ ভোট পায়। কিন্তু তা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। পরবর্তীতে ১১.১ শতাংশ ভোট পাওয়া ন্যাশনাল মুভমেন্ট পার্টির সঙ্গে জোট গঠনের মাধ্যমে তারা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে।
একটানা ১৫ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে তুরস্কের ক্ষমতায় রয়েছেন এরদোগান। এর আগে ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট শাসিত নতুন সরকারব্যবস্থার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সোমবার এরদোগান বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি তুরস্কের শক্তিশালী ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক হবে। তিনি আরো বলেন, ‘নতুন শুরু হতে যাওয়া এ যুগে তুরস্ক গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, অর্থনীতি ও বড় বিনিয়োগসহ সকল ক্ষেত্রে উন্নত হবে’। তবে তুরস্কের পশ্চিমা মিত্ররাষ্ট্র, বিরোধী দল ও সমালোচকরা বলছেন, নতুন এ পদ্ধতি দেশটির গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলবে। তারা এই পদ্ধতিকে ‘এক ব্যক্তির শাসন’ বলে অভিহিত করেছেন।
প্রসঙ্গত, তুরস্কে সম্প্রতি ব্যাংক সুদহার ও মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিপরীতে কমে গেছে লিরার মান। ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে তাই নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেন এরদোগান। অর্থনীতিবিদ ও কলাম লেখক টানের বারকসয় বলেন, নতুন সরকারকে অবশ্যই সুদের হার কমানোর দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে যে সুদের হার চলছে তা দেশের মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের জন্য যথেষ্ট নয়। কীভাবে নতুন মন্ত্রিসভা এ সমস্যার সমাধান করে তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করে আছি’। যদিও রাষ্ট্রপতির অভিষেক পরবর্তী সময়ে তুরস্কের অর্থনীতি ধীরে ধীরে জেগে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু তা নির্ভর করছে নতুন সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় কতখানি পরিবর্তন আনতে পারবে তার উপরে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় এরদোগান দাবি করেছিলেন, যদি তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন তাহলে তুরস্কের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবেন। নতুন মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন নিজের জামাতা বেরাত আলবায়রাককে। এর আগে তুরস্কের জ্বালানি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
এরদোগানের নির্বাচনী প্রচারণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তুরস্কে চলমান জরুরি অবস্থার অবসান ঘটানো। ২০১৬ সালের জুলাইতে সেনাবাহিনীর সরকারবিরোধী ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর থেকে তুরস্কে জরুরি অবস্থা চলছে। ঐ ঘটনার পর সরকার এখন পর্যন্ত লাখো মানুষকে গ্রেপ্তার ও সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। এরমধ্যে, গত রোববার পুলিশ, সেনাবাহিনী, শিক্ষাবিদসহ একসঙ্গে প্রায় ১৮৫০০ জন চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আঙ্কারা জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনকে সমর্থন করার দায়ে তাদেরকে চাকরিচ্যুত এবং যেকোনো সরকারি চাকরির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ওই অভ্যুত্থানে প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছিল। যদিও স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা গুলেন এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে আসছেন। পাশাপাশি, চাকরিচ্যুত ও গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে আঙ্কারা যে দাবি করছে তাকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ভিন্নমতাবলন্বী নিপীড়নের অজুহাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।