Friday, February 22, 2019

মিসর চায় ২ সন্তান বা তার কম, হাঙ্গেরি চায় ৪ বা তারও বেশি!

জনসংখ্যা নিয়ে সম্প্রতি দুই দেশে দেখা গেছে দুই চিত্র। ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরি চাইছে জনসংখ্যা বাড়াতে। আর মধ্যপ্রাচ্য ঘেঁসে থাকা আফ্রিকার দেশ মিসর চাচ্ছে জনসংখ্যা কমাতে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য হাঙ্গেরি ঘোষণা করেছে আর্থিক প্রণোদনা। অন্যদিকে জনসংখ্যা হ্রাসে মিসর কমিয়ে দিচ্ছে আর্থিক সহায়তা! অবশ্য দুই দেশেই সফলতা নিয়ে আশাবাদ কম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাঙ্গেরি যে ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তা বেশি সন্তান জন্মদানে প্রত্যক্ষভাবে উৎসাহিত করতে পারবে না। উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে জাপানের প্রসঙ্গ। অন্যদিকে মিসরে জন্ম হার হ্রাসের সরকারি উদ্যোগকে শ্লথ করে দিচ্ছে অশিক্ষা, ঐতিহ্যগত রীতি, দারিদ্র্য ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা। জন্ম নিয়ন্ত্রণের পক্ষে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়াও তেমন কাজে আসছে না।
মিসরের জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে। জনসংখ্যা প্রতি বছর ২৬ লাখ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি মন্তব্য করেছেন, মিসরের সবচাইতে বড় দুইটি ঝুঁকির একটি হচ্ছে জঙ্গিবাদ, অপরটি হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। মিসর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে দুইটির বেশি শিশু না নেওয়ার নীতি বাস্তবায়নের জন্য। এ লক্ষ্যে দেশটি জাতিসংঘের দেওয়া অর্থের পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নেও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ ও সচেতনতা তৈরি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। যদিও এসব কর্মসূচিতে সচেতনতা তৈরীর জন্য যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদেরই কেউ কেউ তিনটি সন্তান নেওয়ার ইচ্ছের কথা জানিয়েছেন!
নিম্ন জন্মহার এবং নাগরিকদের অন্যান্য দেশে থিতু হওয়ার প্রবণতার কারণে এক প্রজন্মের মধ্যেই হাঙ্গেরির জনসংখ্যা ১০ লাখ কমে গেছে। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ৯৮ লাখ। এতে ধীরে ধীরে দেখা দিতে শুরু করেছে শ্রম সরবরাহে ঘাটতি। কিন্তু দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর ওরবান অভিবাসীদের গ্রহণ করে শ্রমবাজারের এই সংকট নিরসনের ঘোরতর বিরোধী। তিনি চান, দেশের জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি। গত সপ্তাহে ওরবান ঘোষণা করেছেন, বেশি সদস্যের পরিবারগুলোর জন্য দেওয়া হবে ভর্তুকি, কর রেয়াত, বিশেষ অনুদান ও গাড়ি। বেশি সন্তান নিয়ে একটি পরিবার পেতে পারে সর্বোচ্চ এক লাখ ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত। চারটি বা তারও বেশি শিশুর আছে এমন পরিবারগুলোই পাবে সবচাইতে বেশি পরিমাণ আর্থিক আনুকূল্য।
ওরবানের ভাষ্য, ‘ইউরোপে দিন দিন শিশু জন্মের হার কমে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশের জন্য এর সমাধান হচ্ছে অভিবাসীদের নিয়ে আসা। কিন্তু আমাদের দরকার হাঙ্গেরীয় শিশু। অভিবাসীদের ডেকে নিয়ে আসার মানে হচ্ছে আত্মসমর্পণ করা।’
সাধারণত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রত্যেক নারীকে দুই দশমিক একটি শিশুর জন্ম দিতে হয়। হাঙ্গেরিতে এ সংখ্যা বর্তমানে এক দশমিক পাঁচ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওরবানের ঘোষণা করা আর্থিক প্রণোদনার সূত্রে জন্মহার বৃদ্ধি পেয়ে বড়জোর এক দশমিক সাতে উপনীত হতে পারে, এর বেশি নয়। ‘সেন্ট্রাল স্ট্যাটিসটিকস অফিসের’ গবেষক বালাজ কাপিটানি মন্তব্য করেছেন, ‘আর্থিক প্রণোদনা যখন প্রত্যক্ষ হয় তখন তা জন্মহার বৃদ্ধিতে ভালো ভূমিকা রাখে। কিন্তু এখানে ব্যবস্থাটি জটিল এবং শর্তসাপেক্ষ। দ্রুত জন্মহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দিতে পারবে না।’
এ বিষয়ে সামনে আনা হয়েছে জাপানের প্রসঙ্গ। বিশ্বের মধ্যে জাপানে জনসংখ্যা হ্রাসের হার সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে ‘বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ’ এক সমীক্ষায় দেখেছে, বেশি শিশু জন্ম দেওয়ার প্রণোদনা হিসেবে সরকার যেসব সুবিধার কথা ঘোষণা করেছিল, নাগরিকরা সেগুলো প্রায় উপেক্ষা করে গেছে। রাশিয়া এবং সিঙ্গাপুরেও জন্মহার বৃদ্ধির এমন প্রচেষ্টা সফলতা পায়নি।
ভিক্তর ওরবানের ঘোষণা উচ্ছ্বাসের বদলে হাঙ্গেরির কর্মহীন ও দরিদ্রদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। কারণ তাদের ক্ষেত্রে কর রেয়াত সুবিধা প্রাসঙ্গিক কোনও বিষয় নয়। লিজা রুডম্যান ভ্যাঙ্ক নামের একজন নার্স  মন্তব্য করেছেন, ‘সরকারি পরিকল্পনা অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে কোনও কাজেরই না। দাদি-নানির বড় সহায়তা বা বেবিসিটার ছাড়া চারটি শিশু লালন-পালন করা অসম্ভব ব্যাপার।’
এদিকে মিসরে ভিন্ন চিত্র। সেখানে নেসমা ঘানিম নামের এক মিশরীয় নারী সঙ্গে কথা হয়েছে রয়টার্সের। ঘানিমের তিন কন্যা সন্তান রয়েছে। তারপরও তিনি আরেকটি সন্তান গ্রহণ করতে চান। তার ভাষ্য, ‘এবার যদি একটি পুত্র সন্তান হয় তাহলে সে বংশের বাতি হতে পারবে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে সাহায্য করতে পারবে। বোনদের দেখভাল করতে পারবে।’ মিসর সরকার চাইছে মন মানসিকতার পরিবর্তন। এ উদ্দেশ্যে তারা ‘দুইটি সন্তানই যথেষ্ট’ নীতি ঘোষণা করেছে।
১৯৭৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তায় সেখানে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি চালু ছিল। তখন নারী প্রতি শিশু জন্ম হার পাঁচ দশমিক ছয় থেকে কমে তিন দশমিক শূন্য হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জন্ম হার বৃদ্ধি পেয়ে তিন দশমিক পাঁচে উন্নীত হয়।
বর্তমানে যে দুই সন্তান নীতি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে মিসর তার জন্য দেশটির নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ করেছে প্রায় ৪৩ লাখ ডলার। জাতিসংঘ দিচ্ছে প্রায় এক কোটি ডলার। সেই সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সহায়তা। কর্মসূচির আওতায় যেমন দেওয়া হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী, তেমনি আয়োজন করা হচ্ছে সচেতনতামূলক সভার। নারীদেরকে জানানো হচ্ছে, জন্ম নিয়ন্ত্রণ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় জন্মনিয়ন্ত্রণকে বৈধ ঘোষণা করলেও মিসরের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এর সঙ্গে একমত নয়।
তাছাড়া ঐতিহ্যগত রীতিনীতির প্রভাবও রয়ে গেছে। গিজার একটি গ্রামে কর্মরত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির স্বেচ্ছাসেবক আসমা মোহাম্মদ এখনও বিয়ে করেনি, তার নেই কোনও সন্তান। কিন্তু তিনি বলেছেন, তার তিনটি সন্তান নেওয়ার ইচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম আমি তিনটি সন্তান নেব!’
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য মিসর সরকার দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দিচ্ছে সন্তান সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এতে তৈরি হয়েছে অসন্তুষ্টি। নিমা মাহমুদ নামের একজন নারী মন্তব্য করেছেন, ‘কাউকে কোনও কিছু দিয়ে সেটা কেড়ে নেওয়া ঠিক না। যাদের ইতোমধ্যেই তিনটি সন্তান আছে তাদের আর্থিক সহায়তা না কমিয়ে, দুইটি সন্তানের বেশি জন্ম দিলে আর্থিক সহায়তা হ্রাসের নীতি নববিবাহিতদের ওপর কার্যকর করতে পারত সরকার।’ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ‘দুইটি সন্তানই যথেষ্ট’ নীতি ঘোষণা যথেষ্ট নয় শিশুর জন্ম হার হ্রাসের জন্য। বরং পরিবার পরিকল্পনার বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যসূচিতেও যুক্ত করা দরকার।

উইঘুর ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ পরিদর্শনে বাংলাদেশকে চীনের আমন্ত্রণ

উইঘুরদের ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ পরিদর্শনে বিদেশি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন। আমন্ত্রণ পাওয়া দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। তবে বাংলাদেশ শিনজং পরিদর্শনের আমন্ত্রণ পাওয়া নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, চীনের জন্য সামনের দুইটি উপলক্ষে সমালোচনা আটকে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। এদের একটি হচ্ছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সভা যা আগামী সোমবার (২৫ ফেব্রুয়ারিতে) জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর অন্যটি হচ্ছে আগামী এপ্রিলে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সম্মেলন, যেখানে মুসলিমপ্রধান অনেকগুলো দেশের অংশগ্রহণ করার কথা।
চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ, দেশটি উইঘুর, কাজাখ, উজবেক ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে আটক করে রেখেছে। চীনের ভাষ্য, তাদেরকে আটক করে রাখা হয়নি। বরং ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে দিয়ে চীনা সংস্কৃতিতে ‘অন্তর্ভুক্তকরণের’ প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে। চীনা সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্তকরণ বলতে মূলত অপরাপর চীনা গোষ্ঠীগুলোকে হান জনগোষ্ঠীর ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক, রাজনীতি এবং ভাষা গ্রহণে বাধ্য করছে চীন। আর সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণের জন্য খোলা হয়েছে কেন্দ্র। মানবাধিকার কর্মীরা এসব ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে’ ‘বন্দিশিবির’ আখ্যায়িত করেছেন।
গত ডিসেম্বর মাস থেকে বিদেশি কূটনীতিকদের অন্তত তিনটি দলকে শিনজং পরিদর্শনে নিয়ে গেছে চীন। এ মাসে বিদেশি কূটনীতিকদের আরেকটি দলের উইঘুর ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে’ যাওয়ার কথা। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৬ ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, মিসর, কম্বোডিয়া, রাশিয়া, সেনেগাল ও বেলারুশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের পরিদর্শন শেষ হয়েছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি।
ছয়টি কূটনৈতিক সূত্র ডাক্তার নিশ্চিত করেছে, এ মাসে ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো’ পরিদর্শনের জন্য চীন আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলাদেশ, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, মরক্কো, লেবানন, মিসর, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, লাওস, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, জর্জিয়া, হাঙ্গেরি এবং গ্রিসের কূটনীতিকদের।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, হাঙ্গেরি, মরক্কো, মিসর, আলজেরিয়া, সৌদি আরব ও গ্রিস কোনও জবাব দেয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর ও তুর্কমেনিস্তান কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কম্বোডিয়ার কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন, তারা এ ধরনের কোনও সফরের বিষয়ে অবগত নন। লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমন্ত্রণ পেলেও তারা এই পরিদর্শন কর্মসূচিতে অংশ নেবে না। আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা স্বীকার করে জর্জিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের প্রতিনিধি পরিদর্শনে যাবেন না।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঠানো এক প্রশ্নের জবাবে নিশ্চিত করেছে, তারা শিনজং পরিদর্শনের জন্য বিদেশি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, ‘আমরা মনে করি এ ধরনের সফর শিনজং সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়া এবং জ্ঞানকে বৃদ্ধি করবে। শিনজং একটি মুক্ত এলাকা এবং যে কেউ মুক্তমনে খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে সেখানে কত ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কূটনৈতিক সূত্র রয়টার্সকে বলেছে উইঘুরদের ‘বন্দিশিবিরে’ রাখার প্রেক্ষিতে সমালোচনা এবং জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের যুগপৎ নিন্দায় বেইজিংয়ের কূটনীতিকরা নড়েচড়ে বসেছেন। গত জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় শিনজংয়ের উইঘুরদের বিষয়ে সবচাইতে বেশি সমালোচনামুখর ছিল সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। গত ৯ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক মন্তব্য করেছে, ‘বন্দিশিবিরগুলো মানবতার জন্য অত্যন্ত বড় লজ্জার বিষয়।’
এই পরিদর্শন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের আগামী সভা ও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডের’ আগামী সম্মেলনে উইঘুরদের ‘বন্দিশিবিরে’ রাখা নিয়ে সম্ভাব্য সমালোচনার ঝুঁকি কমাতে চায় চীন।

চুড়িহাট্টা মোড়ের যানজট কাল হয়ে এসেছিল ওদের জন্য by নুরুজ্জামান লাবু

দুই সন্তান রামিম ও শাহিরকে নিয়ে রিকশায় চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড় পার হচ্ছিলেন রাশিদুল ইসলাম মিঠু ও সোনিয়া আক্তার দম্পতি। চুড়িহাট্টার পাশেই রামিমের স্কুলবন্ধুর বোনের কান ফোঁড়ানোর দাওয়াত খেতে যাচ্ছিলেন তারা। রিকশাটি চুড়িহাট্টার মোড়ে যানজটে যখন আটকে ছিল, তখনই সিলিন্ডারে ভয়াবহ বিস্ফোরণটি হয়। মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা, সঙ্গে আগুনের লেলিহান শিখা। আগুনের ঝাটকা এসে লাগে সবার গায়ে। রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে রামিম কোনোমতে দৌড়ে কিছুটা দূরে সরে আসে। কিন্তু শাহিরসহ মিঠু-সোনিয়া দম্পতি সেই জট থেকে আর বের হয়ে আসতে পারেননি। সেখানেই করুণ মৃত্যু হয় তাদের। রামিমকে ভর্তি করা হয়েছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। শরীরের ছয় ভাগ ঝলসে গেছে তার।
মিঠু-সোনিয়া দম্পতির মতো আরও অনেকেরই করুণ মৃত্যু হয়েছে বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে, চুড়িহাট্টার মোড়ের সেই যানজটে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরাও জানিয়েছেন, সড়ক থেকে তারা অন্তত ১৪-১৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন। পোড়া যানবাহনের আশপাশে ও নিচে পড়েছিল এসব লাশ। ভোর থেকে লাশগুলো উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চকবাজারের চুড়িহাট্টার শাহী মসজিদের মোড়টিতে এমনিতেই ভিড় লেগে থাকে। রাস্তার দুইপাশে মার্কেট, দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ। রাস্তাটি সরু হওয়ায় কোনও রকমে ওভারটেক করতে পারে দুটি প্রাইভেটকার। বুধবার রাতে শহীদ মিনারে ‘ভিভিআইপি মুভমেন্ট’ থাকায় পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পেছনের সড়কে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। সে কারণে চুড়িহাট্টা সড়কে যানজট কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। আর সেটাই যেন কাল হলো যানজটে আটকে থাকা লোকজনের। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর মুহূর্তের আগুনে সড়কের জটে আটকে থাকা লোকজন পুড়ে মারা যায় অত্যন্ত অসহায় ও করুণভাবে।
কামরাঙ্গীরচরের ইসহাক বেপারী ছিলেন ভ্যানচালক। ভ্যানে মালামাল নিয়ে হয়তো কোথাও যাচ্ছিলেন তিনি। চুড়িহাট্টার মোড়ে যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় পুড়ে যায় মালামালসহ ভ্যানটি। আগুনের ছোবল থেকে রেহাই মেলেনি ইসহাকের। রাস্তায়ই পুড়ে মারা যান তিনিও। ইসহাক বেপারীর বোন হাসিনা বেগম জানান, কামরাঙ্গীরচরের মতবর বাজারে স্ত্রী চম্পা বেগম ও দুই সন্তান আলিফ (৫) ও আরাফাত (৩)-কে নিয়ে থাকতেন ইসহাক। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসহাকের স্ত্রী চম্পা বেগম জানান, সকালে যে গামছা নিয়ে ইসহাক বের হয়েছিলেন, সেই গামছা দেখেই তাকে শনাক্ত করেছেন তারা। চম্পা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। স্বামী ভ্যানচালক। তার আয় দিয়েই আমাদের সংসার চলতো। আমরা এখন কী করবো? আমরা দুই সন্তানের কী হবে?’ একথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সরেজমিন চুড়িহাট্টার ভয়াবহ আগুনের সেই জায়গাটি ঘুরে দেখা গেছে, সাইকেল, মোটরবাইকের পাশাপাশি একাধিক ঠেলাগাড়ি, রিকশা, ভ্যান পুড়ে অঙ্গার হয়ে পড়েছিল। কোনও কোনও স্থানে ভ্যান-ঠেলাগাড়িতে বহন করা বিভিন্ন পণ্যের কিছু কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাস্তায় পড়েছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এসব পরিষ্কার করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।
বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে কথা হয় রিনা বেগমের সঙ্গে। আরও কয়েকজন নারীসহ তিনি সড়কের পাশে বসে আছেন ভাবলেশহীন হয়ে। জানালেন, মজিবর হাওলাদার নামে তার এক স্বজন পুড়ে মারা গেছেন। মজিবর ঠেলাগাড়ি চালাতেন, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে টালিগাড়ি। বেশিরভাগ সময় প্লাস্টিকের ‘দানা’ আনা-নেওয়া করতেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে রিনা বেগম জানান, ঠেলাগাড়িতে মজিবরসহ চারজন ছিলেন। চুড়িহাট্টা মোড়ে যানজটে আটকে ছিল ঠেলাগাড়িটি। গাড়ির মালামাল ছিল তার ভাইয়ের ছেলে যে গোডাউনের ম্যানেজার, সেখানকার। এজন্য আগুন লাগার পর অন্যরা দৌড়ে প্রাণ বাঁচালেও মালামাল সরাতে গিয়ে আগুনের মধ্যে পড়ে মারা যান পাঁচ সন্তানের জনক মজিবর। রিনা বলেন, ‘আমরা পা আর গায়ের গেঞ্জি দেখে মজিবরকে শনাক্ত করেছি। লাশ নিয়ে গিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রহমতগঞ্জে দাফন করবো।’
চকবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন তিন বছরের ছেলে আরাফাতকে নিয়ে। সঙ্গে ছিল ছোট ভাই অপু রায়হানও। চুড়িহাট্টা সড়ক ধরে যানজট ঠেলে পাশের রহমতগঞ্জের ছাতা মসজিদ এলাকা দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন তারা। কিন্তু হঠাৎ সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর ভয়াবহ সেই আগুনে তিনজনই পুড়ে মারা যান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের পাশে বসে বিলাপ করছিলেন আলী ও অপুর বোন জরিনা বেগম। মাঝে মাঝে চিৎকার করে কাঁদছিলেন তিনি। তাকে সান্ত্বনা দেওয়া আলীর বন্ধু জুবায়ের জানালেন, ‘চাচা অপুর সঙ্গে বড় ছেলে আরাফাত বাবার দোকানে গিয়েছিল। একসঙ্গে বাসায় ফিরছিল তারা। কিন্তু আগুন একসঙ্গে কেড়ে নিলো তাদের।’ একথা বলেই তিনি নিজেও কান্নায় ভেঙে পড়েন। জুবায়ের জানান, আলীর স্ত্রী ইতি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী ও সন্তানের মৃত্যুর খবরে সেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর অপুর চার মাসের একটি সন্তান রয়েছে। পরিবার দুটি পুরোপুরি পথে বসে গেলো, সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়লো।’
বুধবার রাত ১০টা ২১ মিনিটে চা খেতে বের হয়েছিলেন জয়নাল আবেদীন বাবুল। আগুনের পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তার। ঢাকা মেডিক্যালের মর্গেও তার লাশ শনাক্ত করতে পারেননি স্বজনরা। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর চুড়িহাট্টা সড়কে তার ছবি নিয়ে আহাজারি করছিলেন বাবুলের মেয়ে নাসরিন আক্তার। নাসরিন জানান, কোনও এক বন্ধুর ফোন পেয়ে রাত ১০টা ২১ মিনিটে ২৬ নম্বর আজগর লেনের বাসা থেকে বের হন তার বাবা। হাজী বালুঘাটে যাওয়ার কথা ছিল তার। চুড়িহাট্টা সড়ক দিয়েই যেতে হয়। নাসরিন জানান, আগুনে তার বাবা পুড়ে মারা গেছেন কিনা নিশ্চিত হতে পারছেন না। লাশ দেখে শনাক্তও করতে পারেননি। রেডক্রসের কাছে বাবার নিখোঁজ থাকার বিষয়টি জানিয়েছেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের পরিদর্শক শরীফুল ইসলাম জানান, তারা রাস্তা থেকে অন্তত ১৪-১৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন। এছাড়া, হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে নিচতলার মার্কেটের করিডোর থেকে একসঙ্গে থাকা ২৪টি লাশ উদ্ধার করেছেন। হায়দার ফার্মেসি থেকেও ৫-৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যান্য দোকান থেকেও একাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

সেই সবুজ ট্রেনে চড়ে ভিয়েতনাম যাবেন কিম!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এ মাসের ২৭ তারিখে দ্বিতীয়বারের মতো মুখোমুখি হবেন। এবার উত্তেজনাপূর্ণ দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করছে ভিয়েতনাম। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন কীভাবে ভিয়েতনামে পৌঁছাবেন তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বের ক্ষমতাধর সরকার প্রধানরা বিশেষ বিমানে যাতায়াত করলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন যতটা সম্ভব আকাশপথ এড়িয়ে চলেন। পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্য ধরে রেখে তিনি প্রায় সব সফরেই বাহন হিসেবে রহস্যময় সবুজ ট্রেন ব্যবহার করেন। কি আছে ওই ট্রেনে? কড়া গোপনীয়তার কারণে সে তথ্য বিশ্ববাসীর কাছে অজানা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, আসন্ন ভিয়েতনাম সফরেও কিম জং উনের সঙ্গী হচ্ছে সেই সবুজ ট্রেন। এ খবরকে সত্য প্রমাণিত করে তিনি যদি ট্রেনে চড়ে ভিয়েতনামের উদ্দেশে যাত্রা করেন, তাহলে সময় লাগবে কমপক্ষে ২ দিন।
কেননা পিয়ংইয়ং থেকে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যায়ের দূরত্ব ৩ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। এক্ষেত্রে কিম জংকে ট্রানজিট হিসেবে চীনের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে হবে। উত্তর কোরিয়ার সরকার প্রধানের সফরসূচি ও বিস্তারিত তথ্যের বিষয়ে সব সময়ই কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। এ কারণে ডনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের প্রথম বৈঠক নিয়েও রহস্য তৈরি হয়েছিল। কৌশলগত কারণে তখন উত্তর কোরিয়ার নেতাকে বিমানে চড়ে সিঙ্গাপুর সফর করতে হয়। কিন্তু কোন বিমান তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাবে, তা সফর শুরুর কয়েক মিনিট আগেও প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে, আসন্ন ভিয়েতনাম সফর নিয়েও সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই কারো কাছে। তবে কিম জংয়ের সবুজ ট্রেনে চড়ে ভিয়েতনাম পৌঁছানোর সম্ভাবনা বেশি। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি গণমাধ্যম গোপন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, কিম জং উন সবুজ রংয়ের ট্রেনে চড়ে পিয়ংইয়ং থেকে যাত্রা শুরু করবেন। পরে ডানডং সীমান্ত অতিক্রম করে চীনের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে তিনি ভিয়েতনাম পৌঁছাবেন। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, কিম জং ভিয়েতনামের ডংডাং সীমান্তে ট্রেন ছেড়ে সড়কপথে কারে চড়ে হ্যানয় পৌঁছাবেন।
কিম জং উন রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য কেন ট্রেন ব্যবহার করেন সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে তার পিতা ও দাদা আকাশপথে সফর করতে ভয় পেতেন। এজন্য তারা সব সময় বিমানযাত্রা এড়িয়ে চলেছেন। তারা সব সফরেই সবুজ রংয়ের ট্রেনে চড়ে যেতেন। তবে কিম জং উনের মধ্যে তেমন ভয় নেই বলে মনে করা হয়। কেননা, সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য তিনি বিমানে চড়েছেন। উত্তর কোরিয়ার সরকার প্রধানের ব্যবহৃত এই ট্রেনে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ট্রেনে বসে যেমন রাষ্ট্রের দাপ্তরিক সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে, তেমনি বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুবিধা রয়েছে এতে।

বৃটেনে শামিমা, যুক্তরাষ্ট্রে মুথানার নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক

বৃটেনে শামিমা বেগম (১৯)। যুক্তরাষ্ট্রে হুদা মুথানা (২৪)। দু’জনেই জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসে যোগ দিয়েছেন। শামিমা ফিরতে চাইছেন বৃটেনে। মুথানা ফিরতে চাইছেন যুক্তরাষ্ট্রে। বৃটিশ সরকার এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে শামিমার নাগরিকত্ব বাতিলের। অন্যদিকে হুদা মুথানাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেবেন না প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার তিনি স্পষ্ট করে এ কথা বলে দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী মুথানা মার্কিন নাগরিক নন বলে তিনি জানিয়েছেন। একক কোনো ব্যক্তির অভিবাসন বিষয়ক ইস্যুতে তার বক্তব্য দেয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে তিনি প্রটোকল ভেঙেছেন বলে বলা হচ্ছে। ওদিকে মুথানা বলেছেন, তার ব্রেনওয়াশ করে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ম্যাসেজ। তাই ২০১৪ সালে পিতামাতার অজ্ঞাতে তিনি চলে যান সিরিয়ায়। এর অল্প পরেই তিনি নিজের ও অন্য তিনজন নারীর একটি ছবি পোস্ট করেন। তাতে দেখা যায় তাদের পশ্চিমা পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলছেন। এর মধ্যে একটি পাসপোর্ট যুক্তরাষ্ট্রের। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
এতে বলা হয়, মুথানার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। তার পিতা ইয়েমেনি। তিনি সাবেক একজন কূটনীতিক। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, সেখানে কেউ জন্মগ্রহণ করলেই সে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং পূর্ণাঙ্গ অধিকার পাবে। এখানে উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউরোপিয় দেশগুলোকে আইএসে যোগ দেয়া তাদের নিজেদের নাগরিকদের  ফিরিয়ে নিয়ে আইনের মুখোমুখি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনিই উল্টো সুরে কথা বলছেন। টুইটারে তিনি বলেছেন, এরই মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে নির্দেশনা দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি যেনো হুদা মুথানাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেন। ওদিকে মাইক পম্পেও নিজেও একটি কড়া বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হুদা মুথানা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। তাকে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন দেয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি যাওয়ার জন্য তার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ পাসপোর্ট নেই। পাসপোর্ট পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য কোনো ভিসাও নেই।
এএফপি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সবাইকে সাধারণত নাগরিকত্ব দেয়া হয়। বিশ্বাস করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় বড় হয়ে ওঠা মুথানা সিরিয়া সফর করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট ব্যবহার করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা পরে এক তদন্তে দেখিয়েছেন যে, মুথানা পাসপোর্ট পেতে পারেন না। তার নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয় আসতে পারে না। কারণ তিনি তো কখনো নাগরিক ছিলেনই না।
তবে এক্ষেত্রে একটি ফাঁকফোকর আছে। তাতে মার্কিন সরকাই সুবিধা পেতে পারে। তা হলো, মুথানার পিতা ছিলেন একজন ইয়েমেনি কূটনীতিক। কূটনীতিকদের সন্তানদের অটোমেটিক নাগরিকত্ব দেয়া হয় না যুক্তরাষ্ট্রে।
মুথানার আইনজীবী হাসান শিলবি দেখিয়েছেন মুথানার জন্ম সনদ। এ অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে নিউ জার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন মুথানা। তার জন্মের বেশ কয়েক মাস আগে তার পিতা কূটনৈতিক মর্যাদা হারিয়েছেন। টাম্পা’য় নিজের অফিসে বসে এএফপিকে হাসান শিলবি বলেন, মুথানা মার্কিন নাগরিক। তার বৈধ পাসপোর্ট ছিল। তিনি হয়তো আইন ভঙ্গ করেছেন। যদি তিনি তা করে থাকেন তাহলে তার মূল্য দিতে প্রস্তুত তিনি। মুথানা যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যেতে চান এবং যদি অভিযুক্ত হন তাহলে জেলে যেতে চান। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে মহান এক আইনি ব্যবস্থার মধ্যে আছি। তা আমাদেরকে মেনে চলতে হবে।
সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তাই এ সপ্তাহে তিনি তার ইউরোপিয় মিত্রদের তাড়না দিয়েছেন যেন, তারা সিরিয়ায় আটক শত শত আইএস জঙ্গিকে ফেরত নিয়ে যায়। 
মুথানা সিরিয়ায় যাওয়ার পর পর একে একে বিয়ে করেন তিন পুরুষকে। এখন আইএস ওই এলাকায় তাদের দখলদারিত্ব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে। এরই মধ্যে শামিমার মতোই তারও একটি পুত্র সন্তান হয়েছে। এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। বলেছেন, আমার কথায়, যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি, আমার পরিবার বা অন্য কাউকে তার জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

বৃটিশ রাজনীতিতে ব্রেক্সিট ঝড়

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য বৃটেনের হাতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় রয়েছে। কিন্তু এখনো এই বিচ্ছেদের প্রকৃতি ও বিচ্ছেদ পরবর্তী সম্পর্ক নিয়ে ইইউ’র সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি করতে পারেনি বৃটেন। উভয়পক্ষ একটি খসড়া চুক্তির ওপর ঐকমত্যে পৌঁছালেও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’ পার্লামেন্টের সমর্থন আদায় করতে পারেন নি। এখন তেরেসা মে’ ওই খসড়াতে সামান্য পরিবর্তন করে পার্লামেন্টের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ইইউ থেকে বৃটেনের চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিশ্চিতভাবেই এমন সংকটময় পরিবেশে ব্রেক্সিট ইস্যুতে বৃটিশ রাজনীতিবিদদের হাল ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। কিন্তু এ সপ্তাহে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ১১ এমপি ঠিক সে কাজটিই করেছেন। গত সোমবার বিরোধী লেবার পার্টির সাত সদস্য জানান, ইহুদি-বিদ্বেষ ও ব্রেক্সিট ইস্যুতে দলীয় প্রধান জেরেমি করবিনের কর্মকাণ্ডে তারা বিরক্ত।
তারা লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এখন থেকে তারা পার্লামেন্টে স্বতন্ত্র এমপিদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসবেন। তবে তারা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করবেন না। একটি স্বতন্ত্র গ্রুপ (ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপ) হিসেবে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাবেন। পরে তাদের এই গ্রুপে যোগ দেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির ৩ সদস্য। ব্রেক্সিট ইস্যুতে তারাও দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র কর্মকাণ্ডে বিরক্ত। তাদের এই পদত্যাগ বৃটিশ সরকারের সামনে বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কেননা, পদত্যাগকারী ৩ কনজারভেটিভ এমপি সবসময় ইইউ’র পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’ কঠোর বিচ্ছেদের পক্ষ নেয়া রাজনীতিবিদদের কড়া সমালোচনা করতেন। এই ৩ এমপি তেরেসা মে’র এই নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। এখন তারা কনজারভেটিভ পার্টি ছেড়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপে যোগ দিয়েছেন। এই গ্রুপের এমপিরা ব্রেক্সিট ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষের নীতিতেই অসন্তুষ্ট। তাই বৃটিশ পার্লামেন্টে গ্রুপটিকে ইইউপন্থি গ্রুপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রেক্সিট ইস্যু বৃটিশ রাজনৈতিক সমীকরণকে বেশ জটিল করে তুলেছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলই ইইউ’র সঙ্গে বিচ্ছেদের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ বিষয়ে তেরেসা  মে’র সরকার একটি খসড়া চুক্তির ওপর ইউরোপের ২৭ দেশের সঙ্গে একমত হয়েছেন। কিন্তু পার্লামেন্ট দফায় দফায় ওই খসড়া প্রত্যাখ্যান করেছে। এই চুক্তির ওপর ভোটাভুটিতে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’কে হাউস অব কমন্সের ইতিহাসে সবচেয়ে শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যক এমপি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র এই খসড়া চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। ২০১৬ সালের পরে ব্রেক্সিট ইস্যু বৃটিশ রাজনীতিকে আদর্শগতভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এখন বৃটেনে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে মানুষকে সেভাবে যাচাই করা হয় না। এখন মোটা দাগে বৃটিশদেরকে দুই ভাবে দেখা হয়।  ব্রেক্সিটপন্থি, আর ব্রেক্সিট বিরোধী। বৃটেনে এই মানদণ্ডে নাগরিকদের যাচাই করার প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নয়া বিভাজনের রাজনীতিতে মানুষ আরো কট্টরপন্থি হয়ে উঠছে। ব্রেক্সিটপন্থি ও  ব্রেক্সিটবিরোধীদের মধ্যে পরস্পরের ওপর অনাস্থাশীল হওয়ার মজ্জাগতভাবে প্রবণতা খুবই বেশি।
কিন্তু সমস্যা হলো, বৃটিশদের মধ্যে এই নয়া বিভাজনের ফলে বৃটেনে বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণে রাজনীতির ঐতিহ্য ভেঙে পড়বে না। যদিও প্রধান দুই দলের এমপিদের মধ্যেই দলত্যাগের প্রবণতা শুরু হয়েছে। যা হোক, ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে একজন কি ভোট দিয়েছে, সেটা যদি তার ভবিষ্যৎ ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বৃটিশ রাজনীতি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে। ২০১৭ সালের নির্বাচনে তেমনটিই ঘটেছে।
কনজারভেটিভ পার্টি ব্রেক্সিটপন্থি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর লেবার পার্টির ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে ইইউপন্থি বা ব্রেক্সিট বিরোধী হিসেবে। গণভোটের ফল ও ২০১৭ সালে নির্বাচনের ফলের মধ্যে বেশ সামঞ্জস্য দেখা গেছে। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রব ফোর্ডের মতে, ব্রেক্সিট কখনোই শুধুমাত্র ইইউ’র সঙ্গে বিচ্ছেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বলেন, এটা দ্বিতীয় আদর্শিক মানদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইইউ’র সঙ্গে সম্পর্কের ভালোমন্দ নির্ধারণ কখনোই ব্রেক্সিটের মূল বিষয় ছিল না। বরং এর মূল প্রশ্ন ছিল উন্নত ও বৈশ্বিক বৃটেন? নাকি পশ্চাৎপদ ও গতানুগতিক দেশ।
নতুন গঠিত ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপের সব সদস্যই উন্নত ও বৈশ্বিক বৃটেনের পক্ষে। যা হবে আধুনিক ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। বর্তমানে বৃটেনের প্রধান দুই দলই বলছে যে, তারা ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করবে। এখন পার্লামেন্টে একটি নতুন গ্রুপের আবির্ভাব হলো, যারা নিজেদের ইচ্ছা মতো কথা বলবে ও ভোট দেবে। এখন তারা  ব্রেক্সিটের প্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রস্তাব দিতে পারে, অথবা এই ইস্যুতে দ্বিতীয় গণভোটের আহ্বান জানাতে পারে। যদি তারা এমন পদক্ষেপ নেন, তাহলে এটা সরকার ও বিরোধী দল উভয়পক্ষকেই বিপদে ফেলবে।
কিন্তু আসলেই কি তারা এমন পদক্ষেপ নেবেন? সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি বাস্তবে এমন কিছু ঘটে, তাহলে দ্বিতীয় ব্রেক্সিট গণভোটের প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে। আর এতে সমর্থন দিতে পারে লেবার পার্টি। এমন পরিস্থিতিতে কনজারভেটিভ পার্টির ব্রেক্সিটপন্থিদের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কেননা, দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হলে বৃটিশ পার্লামেন্টের হিসাবনিকাশ পুরোপুরি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি ঘটনাপ্রবাহ বৃটেনকে নতুন একটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মাকে খুঁজছে অবুঝ সানিন

চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে মাকে খুঁজে পাচ্ছেন না আবুঝ শিশু সানিন। মামার কোলে চড়ে তাই মায়ের খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছে সে। পাঁচ বছরের শিশুটি ঠিক কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না, কী হয়েছে ! দুই রাত পার হয়েছে মা তার কাছে নেই। তার কাছে আজ পৃথিবী যেন এক শূন্য গহ্বর। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। তার মা তো সামান্য সময়ের জন্য বাড়ির নিচে গিয়েছিল। তারপর কোথায় গেল? সানিনের পাঁচ মাস বয়সী ছোট্ট বোনটার কান্নাও যে থামছে না কিছুতেই। কিন্তু তাদের মা তো ফিরে আসে না!
পুরান ঢাকার চকবাজারে গত বুধবার রাতে আগুনের ঘটনায় সানিনের মা বিবি হালিমা বেগম শিলা নিখোঁজ হন।
আজ মামার সঙ্গে সানিন এসেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শিলার লাশ সনাক্ত করার জন্য মেয়ে সানিনের ডিএনএ নমুনা নিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের স্থান থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরেই পরিবার নিয়ে থাকতেন শিলা। শিলার স্বামী মোহাম্মদ সুমন। তিনি চকবাজারেই ব্যাগের ব্যবসা করেন। বুধবার রাতের আগুন তাঁদের বাসা পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তবে দুর্ভাগ্যই শিলাকে আগুনের কাছে নিয়ে গেছে। শিলার বোনের স্বামী মো. বেলাল হোসেন জানান, ঘটনার দিন রাতে সানিন একটু অসুস্থ ছিল। তার বাবা সুমন ছিলেন কর্মস্থলে। তাই শিলা তাঁর এক বোন ও দুই শিশুসন্তানকে বাসায় রেখে নিচে গিয়েছিলেন ওষুধ কিনতে। সেই যে গেছেন, আর ফেরেননি শিলা।
স্বজনদের ধারণা, নিচে ওষুধ কিনতে গিয়ে শিলা হয়তো ভয়াবহ আগুনের শিকারে পরিণত হয়েছেন। আগুন হয়তো নিষ্পাপ সন্তানদের  কাছ থেকে তাকে কেড়ে নিয়েছে। শনাক্ত না হওয়া লাশের ভেতরে শিলার লাশ থাকতে পারে, এমনটা ভেবে ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছেন তাঁরা। শিলারা পাঁচ বোন তিন ভাই। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে শিলার গ্রামের বাড়ি।

গুম, প্রেম ও সাহসের গল্প by আসিফ নজরুল

রহমানকে জিজ্ঞেস করি, বকুলদের ওখানে গিয়েছিলি?
সে উত্তর দেয় না।
বকুল কেমন আছে রে দোস্ত?
সে কঠিন গলায় বলে: সেটা দিয়ে তোর কি দরকার?
মন খারাপ করে বসে থাকি। বড় বড় চোখ, খাড়া নাক, লাল ঠোঁটের সেই মায়াময় মেয়েটার মুখ ভেসে ওঠে বারবার। সে কি জানে কিছু আমার কথা? মনে হয় না। হয়তো ভুলেই গেছে আমাকে। মনে রাখার মতো কিছু তো নাই আসলে।
রহমান এক কাপ চা বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। বকুলের মায়ের অবস্থা খুব খারাপ।
আমি চমকে তাকাই তার দিকে। অপেক্ষা করি আরও কিছু বলুক সে। শেষে না থাকতে পেরে বলি: কী হয়েছে?
বশির ভাইকে কোপ দিয়েছিল এক দিন।
মানে! আনন্দ আর উত্তেজনায় বুক লাফিয়ে ওঠে আমার। তারপর?
কোপ লাগেনি ঠিকমতো। লাগলে হয়তো মারাই যেত।
যায়নি মারা!
রহমান ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকায়। মারা যাবে কেন। শকুনের দোয়ায় গরু মরে?
আমি বলি: কিছু হয়নি তার?
হইছে। দুইটা আঙুল কাটছে। টুকরা হয়া গেসে।
বলিস কি!
জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে। শিউর না লাগব কিনা!
সত্যি!
রহমান আমার উত্তেজনাকে পাত্তা দেয় না। বলে, বকুলের মা-কে মেন্টালে পাঠায় দিসে।
মেন্টালে?
হ্যাঁ, তো কি করবো? কোপ খাইবো নাকি আবার!
আহারে! আমার মন কেমন করে ওঠে। আর বকুলদের কী হলো?
কি হইব! রহমান অবাক হয়। তারা আছে।
মাকে ছাড়া কীভাবে আছে ওরা?
ভালো আছে! তোর চিন্তা করতে হইব না। রহমান বিরক্ত হয়। কেন যে বলতে গেলাম তোরে এত কথা।
আমি আর কাজে মন বসাতে পারি না।
উপরের অংশটা আমার নতুন উপন্যাস ‘উধাও’ থেকে নেয়া। পড়লে  মনে হতে পারে: এটা একটা প্রেমের উপন্যাস। কিন্তু প্রেমের উপন্যসের নাম উধাও হলো কেন? উধাও মানে কি আমি গুমের কথা বলতে চেয়েছি? গুমের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার আমার উপন্যাসে কিছু নেই এ’সম্পর্কে?
উধাও নিয়ে এসব জানতে চায় মানুষ আমার কাছে। আমার ফেসবুক ফ্যানপেজে বড় একটি প্রশ্ন উধাও-এর বিষয়বস্তু নিয়ে। আমি পাকা লেখকের মতো রহস্যটা গোপন রেখেছি। এরমধ্যে উধাও পাঠকের চোখে পড়েছে। বইমেলার মাত্র বারো দিনে এর প্রথম মুদ্রন শেষ হয়েছে। 
আমি এখনো বিষয়টা অস্পষ্ট রাখতে পারি। কিন্তু কেন যেন এখন জানাতে ইচ্ছে করছে যে, উধাও আসলে গুম হওয়ারও গল্প। গল্পও ঠিক না। সত্যি ঘটনা জেনেশুনে তা গল্পের আদলে বলা হয়েছে এর বড় একটি অংশে।
আমার উপন্যাসে গুম হওয়া মানুষটা ফিরে আসে। কিন্তু আরো যারা ফিরে না তাদের ইংগিত আছে সেখানে। আপনার হয়তো চিনেন তাদের।
কিন্তু উধাও-এর মূল বিষয়বস্তু গুম নয়। এটি মূলত ভালোবাসার গল্প। গুম থেকে ফিরে আসা ভীত-সন্ত্রস্ত একজন তরুন শুধু প্রেমের কারণে কিভাবে সাহসী হয়ে ওঠে, বা উঠতে চায় সেই গল্প। 
তবে কোন উপন্যাস প্রেমসর্বস্ব হতে হবে এটা আমি মানি না। প্রেমের উপন্যাসেও সমসাময়িক রাজনীতি আর মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা আনা যায়না। খুবই যায়। আমার কোন উপন্যাস তাই সমসাময়িকতা বা বাস্তবতা বর্জিত নয়।
পাঠককে ‘উধাও’ পড়ার আমন্ত্রন জানানোর আত্মবিশ্বাসটা পাই সেখান থেকে। উধাও বের করেছে প্রথমা, বইমেলায় পাবেন ৮ নং প্যাভিলিয়নে।

নরকে পূর্বঘোষিত মৃত্যুর চকবাজার by ফারুক ওয়াসিফ

চকবাজার ছিল বারোয়ারি মালপত্রের আড়ত। এখন তা বারোয়ারি মৃত্যুর নরক। গোটা পুরান ঢাকাই মৃত্যুফাঁদ। গোটা ঢাকাতেই এখন বসেছে গণমৃত্যুর চকবাজার। পুরান ঢাকার পুরান গর্ব, খাদ্যের বাহার, তার প্রাণবান রসিক মানুষ, তার টগবগ করা জীবন—সব আজ পুড়ে গেছে।
কেমনে সইব? কার কাছে বিচার দেব? আর কত, আর কত, আর কত হে খোদা? আর কত সইবে হে সর্বংসহা জাতি?
বাতাসে মানুষ পোড়ার গন্ধ
নরকেই যদি বাস, তবে আগুনে কেন ভয়? আমাদের কি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি? আমরা কি অভ্যস্ত হয়ে যাইনি? তাজরীন ফ্যাশনস পোড়ার পর গিয়েছিলাম। পোড়া মানুষের চিহ্ন, গলে যাওয়া অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন বাটি, মেশিন, পাখা, স্যান্ডেল দেখেছি। অজস্র আধপোড়া পরিচয়পত্র, ছবি নিয়ে এসেছিলাম। আমার টেবিলের ড্রয়ারে সেগুলো এখনো তালাবদ্ধ আছে। খুললেই পোড়া মাংসের ঘ্রাণ আসে। ঢাকার বাতাসে আজ মানুষ পোড়ার গন্ধ।
নন্দিত নরকে নরকবাসের প্রশিক্ষণ
সয়ে নিয়েছি তো! রানা প্লাজার নরকও তো দেখেছি। জীবনযন্ত্রণা সয়ে যাওয়া মানুষের বীভৎস মৃত্যুযন্ত্রণাও সয়ে যায়। চুপচাপ মরে যাব বলেই চুপচাপ থেকে যাই জীবনের পুরোটা সময়। মরলে তো সব কষ্টের শেষ।
অভ্যাস হয়ে যায়। নরকবাসের নিয়তি হলে, নিরুপায় হলে সয়ে যায়। খাঁচার মুরগিরা যেমন জবাই করতে নেওয়ার আগে পর্যন্ত কক কক করে, কামড়াকামড়ি করে, আমরাও তেমনই করে যাব। তারপর জীবনমৃত্যুর ম্যানেজারের বদখেয়ালে কিংবা ইচ্ছায় একসময় ভবলীলা সাঙ্গ হয়। নরকে এসব অভ্যাস রপ্ত করা জরুরি। সেটাই বাংলাদেশীয় টেকনিক। নরকবাসের ট্রেনিংটা লাগাতার রাখার জন্য ওপরতলার মহাজনদের তাই ধন্যবাদ জানাই।
ছয় বছর আগে এই পুরান ঢাকারই নিমতলীর কেমিক্যাল ডিপোতে আগুন লেগে শতাধিক মানুষের অঙ্গার হওয়ার পরও সত্যিকার প্রতিকার না করা হলো সেই ট্রেনিং। তাজরীনের মালিককে বিচারের নামে দিন গুজরান করার বন্দোবস্ত দেখে যাওয়া হলো সেই ট্রেনিং। রানা প্লাজার কেয়ামতের পরও কারখানাগুলোকে নিরাপদ না করা হলো ট্রেনিং। মহাজনেরা এভাবে আমাদের তৈরি করে আমাদেরই গণমৃত্যুর জন্য। আগুনে বা পানিতে, গাড়িতে বা বিমানে, ধসে বা পুড়িয়ে—সবভাবেই মরার জন্য আমাদের প্রস্তুত করা হয়েছে।
উন্নয়নে কী কাজ যদি জীবন না বাঁচে?
গত সপ্তাহেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বিভীষিকাময় আগুন লাগল। গত রাতে পুড়ল পুরান ঢাকার চকবাজার। শতের নিচে আমরা মরি না। বিশ্বের মধ্যে উন্নয়নের কৃতিত্বের মতো নিয়মিতভাবে শত বা হাজারে মরার শিরোপাটাও আমাদেরই হোক।
এটা আগুনের মাস। আরও আগুন লাগবে। আরও মানুষ পুড়ে কাবাব হবে এবং হচ্ছে—ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে। ঘিঞ্জি খুপরির মতো ঘরবাড়িতে যারা পয়-পরিজন নিয়ে তিলে তিলে সংসার সাজিয়েছিল যারা, তাদের অনেকে আবারও পুড়ে কয়লা হবে। জীবন যেমন নারকীয়, তেমন নারকীয় মৃত্যুই আমাদের জন্য বরাদ্দ।
আমাদের জন্য বরাদ্দ অসীম যানজটের রাস্তা, যা দিয়ে জীবন বাঁচানোর অ্যাম্বুলেন্স, দমকল কিংবা সাহায্যকারী মানুষ—কিছুই সময়মতো পৌঁছতে পারবে না। আমাদের জন্য রয়েছে সরু গলি, শুকানো পুকুর; তাই দমকলের আধুনিক গাড়ি কোনো কাজেই আসবে না। কেনাকাটায় আমরা বড়ই সেয়ানা। অপ্রয়োজনীয় জিনিস আর বাহিনীতে ভরপুর থাকবে রাষ্ট্রটা। সবচেয়ে দামিটা সবচেয়ে বেশি দামে কিনে আমরা সাজিয়ে রাখব খেলনার মতো। তারপর এক দুর্ভাগ্যের প্রহরে যখন ঢাকার ঘনবসতি পুড়ে যাবে, তখন গাড়িগুলো, যন্ত্রগুলো আমাদের ভেংচি কাটবে। আমরা বিরাট বিরাট ভবন আর সেতু বানাব, কিন্তু নিরাপদ ও সভ্য নগর বানাতে কিছু তো করবই না, যতভাবে এই নগরের প্রাণ, প্রকৃতি ও নিরাপত্তা নষ্ট করা যায়, তাতে মদদ দেব। জীবন চলে না এখানে, জীবন জিয়ে না এভাবে। মৃত্যুই এখানে সবচেয়ে সুলভ, গতিশীল ও নিশ্চিত। জীবন এখানে সবচেয়ে সস্তা।
নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিকেরা
আমরা এক নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিকের জীবন পেয়েছি। আমরা কত ভাগ্যবান, জীবনে যে স্বীকৃতি পাই না, মরার পর তা পাই। পাই শোকবার্তা, কভারেজ ও প্রতিশ্রুতির হাওয়াই মিঠাই।
এভাবে চলতে পারে না বলবেন? চলছে তো। ঢাকা মহানগর যে এক গণবিধ্বংসী মৃত্যুফাঁদ তা কে জানত না? যাঁরা বহুকাল থেকে করি করি করছেন, তাঁরা এবারও বলবেন এবার একটা কিছু করতেই হইবে। এই ‘একটা কিছু’ সাগর-রুনি হত্যাকারীদের কায়দায় সোনার হরিণের মতো পালিয়ে বেড়াবে। প্রতিবার মানুষের হুতাশন ঠান্ডা করতে চমৎকার সব বিবেকের জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। উদ্বেগ আর শোকে বাতাস ভারী হলেও লাশের লোবানের ঘ্রাণ চাপা পড়ে না। এই দেশে মানুষের চেয়ে মশা-মাছিরাই বেশি নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। ছয় বছর আগে নিমতলীর আগুনে ১১৭ জনেরও বেশি মানুষের গণমৃত্যুর পর লিখেছিলাম,
‘এমন মৃত্যু কি তাহলে আমাদের বোধোদয়ের টনিক? প্রতিটি বিপর্যয় কেবল পরের বিপর্যয়েরই পদধ্বনি। জীবনের মতো মৃত্যুও এখানে সুলভ, সহজ ও তুচ্ছ। আগুনে পুড়ে, নদীতে ডুবে, ভবন ধসে, বিষক্রিয়াসহ কত তুচ্ছ কারণেই না দফায় দফায় মানুষ মরে। মহিমাহীন এসব মৃত্যুতে কিছুই কি তবু বদলায়? বদলাবে? মৃত্যুর রাজত্বে জীবনের গান গাওয়ার অসম্ভব কসরতে আমরা জর্জরিত। তবু প্রতিদিনকার জীবনের পিছু ধাওয়া করতে করতে সম্ভাব্য সব বিপদের ভয়কে আমরা হজম করে ফেলি। ঢাকাবাসীর থেকে তাই সাহসী ও অদূরদর্শী আর কে আছে? কিন্তু “দিনে দিনে যত বাড়িয়াছে দেনা”, একদিন তার “শুধিতে হইবে ঋণ”…আগেকার যুগে ডুবন্ত জাহাজের ওজন কমাতে গরিব যাত্রী ও খালাসিদের সাগরে ফেলা হতো। সমস্যার ভারে ডুবতে থাকা ঢাকায় সবার আগে তেমনি খরচ হয়ে যায় ঝুঁকিতে থাকা স্বল্পবিত্ত মানুষেরা। বাকিরা মৃতের তালিকায় নিজেদের নাম না ওঠায় ভাবে, যাক আমি তো নিরাপদ! আমাদের শোকগুলো তাই মাছের মায়ের পুত্রশোকের মতো। বঙ্গজননীর তো ১৮ কোটি সন্তান। তার কটি বাঁচল আর কটি মরল তার হিসাব রেখে তাই কী লাভ?’ (ফারুক ওয়াসিফ, প্রথম আলো, মে, ২০১২)
সম্মিলিত বেকুবির শহীদ
রাষ্ট্র তো পাষাণ, তার মনন থাকতে নাই। পাথরে আঘাত করলেও প্রতিধ্বনি আসে, ফরিয়াদের কোনো জবাব আসে না। ওদিকে মৃত্যুর টালিখাতা হয়েছে সংবাদপত্র। আমাদের জাতীয় জীবন যেন এক লাইভ জানাজা। শোকে পাথর হলেও পাথরের মতো কঠিন সংকল্প জাগে না আমাদের। কপট আশ্বাস আর মিথ্যা আশায় বুঁদ হয়ে আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাই, সরকার যদি থাকবে তবে মানুষ বারবার অকাতরে মরবে কেন? যা নিয়মিতভাবে হয়, তা দুর্ঘটনা নয়, তার দায় শোকের বন্যায় হালকা হওয়ার নয়। কবির সেই কথাই এখানে চিরসত্য: ‘সুখেরও লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু,/ অনলে পুড়িয়া গেল।/ অমিয় সাগরে সিনান করিতে,/ সকলই গরলই ভেল।’
এটা নির্দয় এক ব্যবস্থার কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। কেউ টাকা বানাতে আর কেউ টাকা বাঁচাতে চালিয়ে যাচ্ছে এমন সর্বনাশা কারবার। কে কাকে দোষ দেব? সাধারণ মানুষও অধিকার নিয়ে যেমন অসচেতন, দায়িত্ব নিয়েও তেমন। যা করা উচিত আর যা করা হয়, তার মধ্যে ব্যবধান আকাশ-পাতাল—কোথাও নিয়মনীতির বালাই নেই। সমস্ত মনোযোগ যার যার নাকের ডগায় রাখতে গিয়ে সামনের অতল খাদটি কেউ দেখছি না। যেমন জনগণ, তেমন সরকারই তারা পায়। আমরা যেমন, আমাদের সরকার তেমন এবং আমাদের এই সাধের ঢাকা শহর আমাদের দায়িত্বহীন মানসিকতারই দর্পণ।
মানুষের তৈরি এই বাস্তবতারই শিকার নিমতলী বা চকবাজার বা রানা প্লাজা বা বেগুনবাড়ি বা…। আমরা আমাদেরই সম্মিলিত বেকুবির শহীদ।
জতুগৃহের দিনরাত্রি
জতুগৃহ নামে একটা বাস চলত একসময় ঢাকা শহরে। এখন আর দেখি না। সম্ভবত আগুনে পুড়ে গেছে। ঢাকা মহানগর নিজেই এখন পৌরাণিক জতুগৃহ। মহাভারতের কাহিনিতে পঞ্চপাণ্ডবের বনবাসে জতুগৃহ নামে এক ঘরে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেটা আসলে ছিল ফাঁদ। মেঝে থেকে চাল পর্যন্ত পুরোটা মোড়া ছিল দাহ্য বস্তু দিয়ে, যাতে ঘুমন্ত অবস্থায় সবাইকে নিমেষে পুড়িয়ে মারা যায়। পাণ্ডবকুলের পাঁচ ভাই সেই ষড়যন্ত্র বুঝে কয়েকজন আদিবাসীকে কৌশলে সেই ঘরে ঢুকিয়ে নিজেরা প্রাণে বাঁচেন। পুড়ে মরে সেই নিরীহ মানুষগুলো। ওরা জানত না জতুগৃহ বাঁচার আশ্রয় নয়, দহনের ফাঁদ। আজ উন্নতি আর সুখের স্বপ্নে ভিড় জমানো ঢাকাবাসীর সে রকম ফাঁদে পড়ার দশা হয়েছে।
মৃত্যুর সুশাসনে পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জি
ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেক্সেই ডি তকুইভিল বলেছিলেন, দীর্ঘদিন যন্ত্রণায় ভুগতে থাকা মানুষ বিকল্পের সন্ধান পাওয়া মাত্রই সমস্যাগুলোকে অসহনীয় মনে করতে থাকে এবং তাকে বদলানোর জন্য কোমর কষে নামে। আমাদের এখানে হয়েছে উল্টোটা, দীর্ঘদিন অসুবিধার মধ্যে থাকতে থাকতে, পরিবর্তনের আশা ধূলিসাৎ হতে দেখতে দেখতে আমরা এখন সব সওয়া মহাশয়ে পরিণত হয়েছি। আশার মৃত্যু হলে ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ জন্ম নেয়। সার্বিক সমস্যা থেকে মন সরিয়ে আমরা অনেকেই যেভাবে একা একা সুখে থাকার ইঁদুরদৌড়ে নেমেছি, তাতে পতনই বরং ত্বরান্বিত হচ্ছে। ওদিকে বড় সাহেবেরা তো ভালোই আছেন। বিদেশে সাহেবপাড়া, বেগমপাড়ার বাসিন্দারা তো শাদ্দাদের বেহেশতে নিরাপদই আছেন।
এখনো ভাবুন কী করবেন। যাঁরা বিদেশে পালাতে পারবেন না, তাঁরা কোন মলমে নরকযন্ত্রণা ভুলবেন, ভুলবেন নেতা–নেত্রীদের কোন কোন গা-জ্বালানো কথায়। জীবন নয়, মৃত্যুই এখানে নিশ্চিত ও সুদক্ষ। মৃত্যুর সুশাসনে আমাদের জীবন এক পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জি।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক
faruk.wasif@prothomalo.com

অর্থনৈতিক সফলতায় বাংলাদেশি রেসিপি by ড. কামাল মন্নু

নতুন সাউথ এশিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার হাউসের শিখা হিসেবে দ্রুত বেড়ে উঠছে বাংলাদেশ- এমনটাই মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুসঙ্গতি এবং প্রগতিশীল ব্যবসায় পরিবেশ বাংলাদেশকে অর্থনেতিক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দেশটি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের অন্যতম স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে ধরনের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করছে এই দেশটি তা শুধু রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যেখানে থাকে ঋণের ফাঁদ। এর পরিবর্তে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা হয়েছে। যা পরিচালিত হয় দেশে তৈরি পণ্য দিয়ে। এর ফলে দেশটি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান রপ্তানির পাওয়ার হাউস হিসেবে অবস্থান দৃঢ় করছে। ২০১৮ সালে এ দেশটি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করেছে ২৫৮ কোটি ডলার।
২০০৯ সালের চেয়ে যা ৭০ কোটি ডলার বেশি। আর বর্তমানে এ দেশটিতে এমন অনেক কিছু আছে যা দেখে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন।
এসব সফলতা গড়ে তোলা হয়েছে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে। ব্যবসার জন্য আকৃষ্ট করা হয়েছে প্রণোদনা প্যাকেজ। সুশাসনে কার্যকর একটি ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি চিত্তাকর্ষক। তা শুধু আঞ্চলিকতার বিচারেই নয়, বৈশ্বিক দিক থেকেও। এর জাতীয় প্রবৃদ্ধি গত এক দশকে শতকরা ৬ ভাগের বেশিতে পৌঁছেছে (গত তিন বছরে তা শতকরা ৭ ভাগ ছাড়িয়ে গেছে)। এ ছাড়া গত ৩০ বছরে এখানে কোনো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নেই।  মাথাপিছু আয় ১৭৫৪ ডলার, যা ২০০৯ সাল থেকে ৭২৫ ডলার বেশি। এর ফলে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে ২০১৭ সালে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। মুদ্রাস্ফীতি শতকরা প্রায় ৫ ভাগ। এ ছাড়া সরকার ২০৪১ সালে দেশটিকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করার যে আকাক্সক্ষা দেখাচ্ছে তা এখন বাস্তবতা।
পরবর্তী বা ‘নেক্সট ১১’ জাতি, যারা বিশ্ব অর্থনীতির শক্তি হবে, তাদের একটি সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে গোল্ডম্যান স্যাশে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সমতাভিত্তি প্রতিশ্রুতিতে জাতিসংঘের সহ¯্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সর্বোচ্চ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ হলো একটি সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক দেশ, যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সমর্থন রয়েছে। এখানে আছে কঠোর নিয়মনীতি। এই উপমহাদেশে সর্বনি¤œ বেতন, মজুরি সম্বলিত উচ্চ পর্যায়ের কর্মশক্তি আছে এখানে। দেশটির শতকরা প্রায় ৫৭ ভাগ মানুষ ২৫ বছর বয়সের নিচে। এর ফলে বর্তমান ব্যবসায় প্রয়োজনীয় যুবক ও মেধাবী কর্মশক্তি রয়েছে এখানে। বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ হলো অর্থনৈতিক জোন এবং রপ্তানি সংশ্লিষ্ট শিল্প এলাকা। সেখানে আছে পরিবহন, লজিস্টিক এবং অবকাঠামোগত সুবিধা, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশে বিদ্যুতের মূল্য এ অঞ্চলে খুব বেশি প্রতিযোগিতামূলক, প্রতি কিলোওয়াট আওয়ারের মূল্য ০.০৯ ডলার। অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ।
মজার বিষয় হলো, নতুন যেসব খাতে বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া হয়েছে তা প্রায় সব সেক্টরের জন্যই এখন উন্মুক্ত, শুধু আগ্নেয়াস্ত্র ও নিরাপত্তা বিষয়ক প্রিন্টিং বাদে। ১৬ কোটি মানুষ নিয়ে এবং দ্রুত মধ্যম শ্রেণির মানুষের বৃদ্ধি বলে দেয় এখানে রয়েছে একটি বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার। বিনিয়োগকারীরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের শতকরা ২০ ভাগ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণভাবে বিক্রি করতে অনুমোদিত। এ ছাড়া বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক যে অবস্থানে আছে তাতে সে আঞ্চলিক একটি মার্কেটের সুবিধা পায়। যেখানে রয়েছেন ৩০ লাখ যুবক এবং ব্রান্ড সচেতন ক্রেতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ করছে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা)। অর্থনৈতিক/রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ জোনের বাইরে সারা দেশে বিনিয়োগকারীদের রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স/ট্যারিফ সনদ প্রদান ও সব রকম সমর্থনমূলক সেবা দিয়ে যাওয়ার একটি ওয়ান-স্টপ বিনিয়োগ বিষয়ক এজেন্সির সেবা দিয়ে যাচ্ছে বিডা। এই বছর সব সহযোগী এজেন্সিকে এক ছাতার নিচে আনার জন্য একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিডা। এক্ষেত্রে ব্যবসায় প্রয়োজনীয় সব সেবা অনলাইনে দেয়ার চেষ্টা করা হবে।
এর ফলে ব্যবসা সফলতার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে আরো সহায়তা করবে বাংলাদেশকে। উপরে বর্ণিত এসবই হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সফলতায় অবদানের বর্ণনা। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এসব খাতে একটি ভালো মডেল।
(পাকিস্তানের অনলাইন দ্য নেশন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার সংক্ষেপিত অনুবাদ)

সরকারের ‘ঘুমে’ বাড়ছে কান্না by গোলাম মর্তুজা

দুটো বাঁকা হয়ে যাওয়া চাকা আর একটা কাঠামো দেখে বোঝা যায় এটা একটা পুড়ে যাওয়া রিকশা। তার ওপরে ভেজা সুতি কাপড় দিয়ে পুড়ে যাওয়া মানুষের দেহাবশেষ ঢেকে রেখেছেন স্থানীয়রা। একজন জানালেন, রিকশাটিতে এক দম্পতি ও একটি শিশু ছিল। তিনজনই রিকশার সঙ্গে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন।
চুড়িহাট্টার পুড়ে যাওয়া বাড়িটির সামনে ও পাশের সড়কটিতে এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ নিমতলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০১০ সালের ৩ জুনের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় রাসায়নিকের আগুনে জ্বলে উঠেছিল নিমতলী, যাতে প্রাণ হারান ১২৪ জন। মুহূর্তেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চারদিকে পড়ে ছিল লাশগুলো। ঘিঞ্জি অলিগলির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক ব্যবসা বা শিল্প কারখানা কতটা বিপজ্জনক, আট বছর আগে তা দেখেছে মানুষ। কিন্তু শিক্ষা হয়নি। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে শেষ পর্যন্ত কাজটি আর হয়নি।
সেই নিমতলীর পুনরাবৃত্তি যেন চুড়িহাট্টায়। রাস্তা জুড়ে ১৫/২০টি পুড়ে যাওয়া রিকশার কাঠামো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দুটি পিকআপ ভ্যান, দুটি প্রাইভেট কার, কয়েকটি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার কাঠামোও দেখা যায়। কোথাও কোথাও ধোঁয়া উঠছে। এগুলোর মধ্যেই মানব দেহের অবশিষ্টাংশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। স্থানীয়রা আগেই কয়েকটি দেহাবশেষ দেখে মসজিদ থেকে সুতি কাপড় ভিজিয়ে এনে ঢেকে দিয়েছেন।
এত মৃত্যু সবাইকে নির্বাক করে দিয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও বেঁচে থাকতে পেরে সৃষ্টিকর্তাকে বারে বারে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন বেঁচে যাওয়া মানুষেরা। রাত তখন শেষের পথে। তখন বিকট দুম দুম শব্দ করে বিস্ফোরণ ঘটছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানালেন, সুগন্ধির ক্যানিস্টারগুলো সশব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বাজছে পুলিশ আর ফায়ার কর্মীদের বাঁশি। ফায়ার ইঞ্জিনগুলোর ঘরঘর শব্দ চলছেই। সেসব ইঞ্জিনের পোড়া ডিজেল আর সদ্য পুড়ে যাওয়া জনপদের ধোঁয়ায় একাকার পুরো এলাকা।
চকবাজারের এই এলাকাটি মূলত প্রসাধনী ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল বেচা কেনার কেন্দ্র। এই এলাকায় প্রচুর নকল প্রসাধনী বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। সারা দেশ থেকেই ব্যবসায়ীরা এখানে পাইকারি দরে প্রসাধনী কিনতে আসেন।
চুড়িহাট্টা মসজিদের উল্টোদিকের বাড়িটির ভূগর্ভস্থ তলাসহ একতলা ও দোতলায় গড়ে তোলা হয়েছিল সুগন্ধির বিশাল মজুদ। ওই বাড়ির সামনে এসে মিলেছে চারটি সরু গলি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন লাগার সময় ওই গলির মোড়টি ছিল মানুষ, গাড়ি, মোটরসাইকেল আর রিকশা দিয়ে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। যানজটের কারণে থমকে ছিল সব। সুগন্ধির ক্যান ভর্তি বাড়ি থেকে আগুনটা রাস্তায় ছড়িয়েছে নাকি রাস্তার কোনো গাড়িতে লাগা আগুন ওই বাড়িকে গ্রাস করেছে তা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, একটি প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে দু’টি গাড়ির একটির সিলিন্ডার অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। আরেকটি গাড়ি হাইব্রিড (টয়োটা অ্যাকুয়া), যেটাতে কোনো সিলিন্ডার ছিল না।
চুড়িহাট্টা মসজিদ লাগোয়া গলিতে প্লাস্টিকের গুটির দোকানদার রেজাউল করিম তখন দুই কর্মচারীকে নিয়ে দিনের বেচা-কেনার হিসাব মেলাচ্ছিলেন। হঠাৎই বিকট বিস্ফোরণের শব্দে তাকিয়ে দেখেন থমকে থাকা রাস্তায় একটি গাড়িতে আগুন লেগে তা কয়েক ফুট শূন্যে উঠে গেছে। মুহূর্তেই আগুনের ঢেউ যেন গোটা রাস্তাটিকে গ্রাস করে। দুই কর্মচারীকে নিয়ে দৌড়ে বের হয়ে যান, দোকানের ঝাঁপ ফেলারও চিন্তা করেননি।
আবার ওই পথ ধরে তখন মোটরসাইকেলে যাওয়া ফারুক হোসেন বলেন, চার গলির ওই মোড়ের দুটি বড় রেস্তোরাঁ। সেগুলোর চুলার গরমে জায়গাটা এমনিতেই একটু গরম হয়ে থাকে। রাতে যাওয়ার সময় তিনি ওখানে রেস্তোরাঁর খাবারের গন্ধ ছাড়াও সুগন্ধির গন্ধ পান। ৫০ গজ এগোতেই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পান। পরে ঘুরে ওই বাড়িটি থেকে আগুন জ্বলতে দেখেন।
স্থানীয়রা বলছেন, আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যেই তা ঢেউয়ের মতো করে চারপাশের রাস্তায় থাকা মানুষ ও যানবাহনগুলোকে গ্রাস করেছে। আশপাশে অনেক ভাসমান ফল বিক্রেতা, পান-সিগারেট বিক্রেতাও ছিলেন। আগুনে এই লোকগুলোর অনেকেই রাস্তার ওপরেই জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন।
আগুন লাগার পরে পুড়ে যাওয়া এসব যানবাহনের কাঠামোগুলো রাস্তার ওপরই ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে ছিল। কোনো কোনোটির তলায় মানুষের দেহাবশেষ।
এখানে এমন কোনো বাড়ি নেই যার নিচতলায় দোকান বা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়নি। দোকানগুলোর মধ্যে প্রসাধনী ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্লাস্টিকের গুটির (চিপস) দোকান। স্থানীয়রা বলছেন, যে কয়টা বাড়িতে আগুন লেগেছে তার মধ্যে দু’টির নিচে গুটির দোকান ছিল। এগুলো দ্রুত জ্বলে আগুন বাড়িয়েছে।
এত ব্যস্ত ব্যবসায়িক এলাকা হলেও এখানে ঢোকার সড়কগুলো একেবারেই সরু। কোনো সড়কেই দু’টি গাড়ি পাশ কাটানোর জায়গা নেই। ফায়ার সার্ভিসের বড় পানিবাহী গাড়ি এখানে ঢুকতে না পারায় প্রচণ্ড সমস্যায় পড়তে হয়েছে। পাম্প দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের পুরোনো কারাগারের পুকুর থেকে পানি আনা হয়। যার কারণে পানির গতি ছিল কম। আর মানুষের পায়ের চাপে পাইপগুলো মাঝে মাঝেই পানিশূন্য হয়ে পড়ছিল। ফায়ার সার্ভিসের লোকদের মাইক নিয়ে বারবারই বলতে হচ্ছিল ‘পাইপগুলো পাড়াবেন না।’ এ ছাড়া চুড়িহাট্টা মসজিদ এবং আশপাশের কয়েকটি বাড়ির রিজার্ভ ট্যাংক থেকেও পানি সংগ্রহ করে ফায়ার সার্ভিস।
চুড়িহাট্টা মসজিদের অজু খানায় বসে কাঁদছিলেন আাবদুল আজিজ ও তাঁর মেয়ে। আজিজ জানান, তাঁর ১৮ বছরের ছেলে ইয়াসিন রনি এখানে ছিলেন। আগুন লাগার পর থেকে ইয়াসিনের ফোন বন্ধ, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মো. রায়হান খুঁজছেন তাঁর বোন সোনিয়া, দুলাভাই মিঠু ও দুই বছরের ভাগনে শাহীদকে। আগুন লাগার সময় ওই পরিবারটি এই রাস্তা দিয়ে রিকশায় করে যাচ্ছিলেন।
ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ছবি মোবাইলে বের করে কান্নায় ভেঙে পড়েন মাইনুল হোসেন। পুরে যাওয়া বাড়িটির উল্টো দিকে হায়দার মেডিকো বলে একটি ওষুধের দোকান চালাতেন আনোয়ার। ঘটনার সময় সেখানে আনোয়ারের তিন বন্ধু নাসির, হীরা ও আরেক আনোয়ার ছিলেন। এদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
রাত ৩টার পর থেকে ঘটনাস্থলে পাওয়া মৃতদেহগুলো একের পর এক ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি মো. ইউসুফসহ কয়েকজন লাশ উদ্ধারের কাজ করছিলেন। হাত দু’টো দেখিয়ে ইউসুফ বলেন, ‘দেখছেন লাশ তুলতে তুলতে কেমন হয়ে গেছে।’
সকাল আটটা নাগাদ ঢাকা মেডিকেলে জমা হয়ে গেছে ৬৫টি লাশ। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল চত্বরে জমা হয়েছেন হাজারো মানুষ। কিন্তু অঙ্গার হয়ে যাওয়া এ লাশ তাঁরা চিনবেন কী করে? লাশ দেখে অসহায় মানুষগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ারও কেউ নেই।

পাকিস্তান কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? by বকর আহমেদ

পাকিস্তানের ৭১ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সফলভাবে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা নিয়েছে গত বছর। দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান সামনে নিয়ে ইমরান খান সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। ইমরানের নতুন এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সরকারের মধ্যেও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে।
সরকার এখন অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই নয়, বরং অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই করাও নতুন সরকারের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়ানকভাবে কমে গেছে। রপ্তানি স্থবির হয়েছে এবং আমদানির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। উপরন্তু ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ধারদেনা করতে হচ্ছে। সরকারি খাতের উদ্যোগ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক লোকসানের কারণে মূলত এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির দাম পড়ছেই। মুদ্রানীতি ও সরকারি খাতের উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করায় চাহিদা কমে গেছে। ২০১৯ সালে মোট দেশজ উৎপাদন ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে বলা হচ্ছে। এই বছরে যে পরিমাণ দেনা শোধ করার কথা ছিল, সে লক্ষ্যও অর্জিত হবে না বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এই অবস্থায় ইমরানের নতুন সরকার আস্তে আস্তে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে আরেক দফায় ঋণ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকার বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদি অর্থ সহায়তা পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে বলে আপাতত মনে হচ্ছে। দিন দুই আগে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি চুক্তি হলো। সেই চুক্তি অনুযায়ী সৌদি আরব পাকিস্তানে দুই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এর আগে পাকিস্তান সরকার সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে চার শ কোটি ডলার নিয়েছে। চীনের কাছ থেকেও আড়াই শ কোটি ডলার পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছে। এই ধরনের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা পেলে হয়তো আইএমএফ পাকিস্তানের প্রত্যাশামতো না হলেও কিছু অর্থ নতুন করে দিতে পারে।
পুরোনো ঋণ শোধের কিস্তির অর্থ সরবরাহ অব্যাহত রেখে নতুন করে ঋণ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা মোটেও উদ্‌যাপন করার মতো বিষয় হতে পারে না। এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মডেল হতে পারে না। জনগণকে এই ধরনের অর্থনৈতিক মডেল উপহার দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য সুখকরও নয়। ইমরানের সরকার মাত্র ছয় মাস আগে ক্ষমতায় এসেছে। অন্যদিকে গত ছয় দশকে আইএমএফের কাছ থেকে ২১টি গুচ্ছ সহায়তা নিয়েছে পাকিস্তান। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে, পাকিস্তান হঠাৎ করে এই সংকটে পড়েনি। এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রনিক পর্যায়ের।
এই পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পাকিস্তানের নতুন সরকারকে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি মনে করি, চারটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলে পাকিস্তান এই সংকট থেকে বের হতে পারবে।
এক. সরকারি খাতে সবচেয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগ করতে হবে। যথাসম্ভব প্রণোদনা দিয়ে এসব কর্মীকে ধরে রাখতে হবে এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
দুই. প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পাকিস্তানকে সাহসী রূপরেখা নিয়ে এগোতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের পাঁচসালা উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সেই পরিকল্পনায় কৃষি ও কলকারখানার উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবতে হবে।
তিন. প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও টেকসই হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সরকারকে ‘আগামীকালের অর্থনীতি’র প্রতি জোর দিতে হবে। বাণিজ্যনীতিকে অভিজাতদের খপ্পর থেকে মুক্ত করে ভোক্তাবান্ধব করে তুলতে হবে। পানি ও জ্বালানির মতো সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
চার. সরকারকে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে। পাকিস্তানের ৬০ শতাংশ লোক ২৫ বছরের কম বয়সী। তাঁদের মধ্য থেকে বহু তরুণ উদ্যোক্তা উঠে আসছেন, তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।
এসব বিষয়ে নজর না দিলে পাকিস্তানকে আরও অনেক বড় সংকটের মুখে পড়তে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
বকর আহমেদ পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের যুগ্ম নির্বাহী পরিচালক

চারদিন পরই ছিল দু’জনের চূড়ান্ত পরীক্ষা

আগুন শুধু জ্বলে না, মাঝে মাঝে নিভিয়েও দেয়। এই যেমন, চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনে নিভে গেছে মানবসেবার ব্রত নিয়ে বেড়ে ওঠা দুই হবু চিকিৎসকের প্রাণ। গত বুধবার রাতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে দুই ডেন্টাল সার্জনের পরিবারের আশাও। বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিটের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন দুই বন্ধু ইমতিয়াজ ইমরোজ রাশু ও আশরাফুল হক। চার দিন পরই বসতেন বিডিএস কোর্সের চূড়ান্ত প্রফেশনাল পরীক্ষায়। বেঁচে থাকতে যেমন ছিলেন অন্তঃপ্রাণ বন্ধু, এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার শেষ সময়েও একে অন্যের পাশেই ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহ শনাক্ত করার পর জেলা প্রশাসনের নিবন্ধন খাতায় দু’জনের ক্রমিক নম্বর যথাক্রমে ১২ আর ১৩।
কেবল দু’জনের দেহে ছিল না প্রাণ।
সাদা ব্যাগে, কাঠের কফিনে বন্দি দু’জনের যেন এক নীরব সহাবস্থান। বাংলাদেশ ডেন্টাল কলেজের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ ইমরোজ রাশু ও আশরাফুল হকের পড়াশোনা-ঘোরাফেরা বলতে গেলে সবই একসঙ্গে। রাশু আর আশরাফ দু’জনকে এক নামে চিনতো ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা। পাবনার বেড়া উপজেলার সোনাপুর গ্রামের রাশু থাকতো মেডিকেল কলেজের রায়েরবাজার হোস্টেলে। মাত্র দু’মাস হলো চকবাজারের ক্লিনিকে যাওয়া-আসা। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে রাশু বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে চুড়িহাট্টা রোডের ক্লিনিকে আরেকজন ডেন্টাল সার্জনের সঙ্গে হাতে-কলমে শিখতেন খুঁটিনাটি।
বুধবার সন্ধ্যার দিকেই  চলে যান সেখানে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফরদাবাদের ছেলে আশরাফ অবশ্য পরিবারের সঙ্গে থাকতেন মালিবাগে। বুধবার রাতে হঠাৎ দাঁতে রক্তক্ষরণ হওয়ায় বন্ধু রাশুকে ফোন করেন তিনি। দ্রুত চকবাজারের ক্লিনিকে যাবার জন্য মুঠোফোনের অন্য প্রান্তে তাগাদা দেন রাশু। রাত আনুমানিক সাড়ে নয়টার দিকে ক্লিনিকে পৌঁছান আশরাফ। সেখানে বন্ধুর কাছেই দাঁতের স্কেলিং চিকিৎসা করতে থাকেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার ভোরে সেখান থেকে রাশু ও আশরাফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের এক সহপাঠী অর্ণব আবীর জানান, ক্লিনিকটির পেশেন্ট চেয়ারেই পাওয়া যায় আশরাফকে। তার মুখে পাওয়া গেছে স্কেলিং চিকিৎসার বিশেষ সাকার। আর গ্লাভস হাতে মেডিকেল টেবিলের কাছেই মিলেছে রাশুর দেহ। মূলত আগুন ছড়িয়ে পড়লে নিচতলায় থাকা মেডিকেল ও ফার্মেসির শাটার নামিয়ে ফেললে দোতলা থেকে নামতে পারেনি দুই বন্ধু। আগুনের ভয়ে শাটার নামিয়ে ফেললেও সেখানে অক্সিজেনের অভাব ও শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মারা যান দু’জন। ইমতিয়াজ ইমরোজ রাশু ও আশরাফুল হকের আরেক সহপাঠী ঐশ্বর্য সেনগুপ্ত বলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আমাদের ফাইনাল প্রফ. শুরু হবার কথা।
অথচ, আর চার দিন বাদেই দুই বন্ধুকে ছাড়াই আমাদের পরীক্ষার টেবিলে বসতে হবে, এ কথা চিন্তা করতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠছে। ক্যাম্পাস জীবনের স্মৃতি টেনে ঐশ্বর্য বলেন, পুরো ক্যাম্পাসে রাশু ও আশরাফ দু’জনকে এক নামে চিনতো সবাই। মেডিকেল ওয়ার্ডেও মাঝে মাঝে ওদের পড়তে দেখা যেত। দু’জনেরই মনপ্রাণ ছিল চিকিৎসাবিদ্যায়। কি করে আরো ভালো করে শেখা যায়। আশরাফরা ছয় ভাইয়ের সকলেই ছিলেন কোরানে হাফেজ। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন আদায় আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আশরাফ। তার উদ্যোগেই প্রায় ৫০৭ জন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফিরে পায় বলে জানান তার সহপাঠী অর্ণব আবীর। গতকাল সন্ধ্যায় দু’জনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে।
সেখানে বাদ মাগরিব জানাজায় অংশ নেন সহপাঠী, শিক্ষক ও ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থী। প্রিয় দুই শিক্ষার্থীর নিথর দেহের সামনে নির্বাক যেন পুরো ক্যাম্পাস। এই দুই চিকিৎসকের সঙ্গে আল-মদিনা মেডিকেল ও ডেন্টাল ক্লিনিকে প্রাণ গেছে মোট ছয়জনের। রোগী হিসেবে ক্লিনিকে যাওয়া কাজী এনামুল হক এদের মধ্যে একজন। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার রায়পুর গ্রামের কাজী মোতালেবের ছেলে এনামুল সিটি কলেজ থেকে বিবিএ করেছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে এমবিএ করার। তার ভাই কাজী আমির হোসেন জানান, এনামুল থাকতেন রাজধানীর মগবাজারের হাজী বালুর গেট এলাকার একটি ব্যাচেলর বাসায়। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতেন একটি বিমা কোম্পানিতে।
এনামুলের সঙ্গে একই বাসায় থাকতেন বন্ধু আবুজার হোসেন। তিনি মানবজমিনকে জানান, গত বুধবার সন্ধ্যায় জীবনবৃত্তান্তের খসড়া নিয়ে বাসা থেকে বের হন এনাম। বিমা কোম্পানিতে কাজ করলেও আরো ভালো চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলেন। সিভি বানাতে নিউ মার্কেট যাবার কথা ছিল তার। সেখান থেকে পরিচিত এক দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল তার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে ছেলে এনামুলের ছবি হাতে নিথর বাবা কাজী মোতালেব শুধু এক পলকেই চেয়ে ছিলেন। তখনো তার ছেলের মরদেহের হদিস মেলেনি। মাঝে শুধু একবারই বাবা মোতালেব বলে উঠেন, আমার পোলাডা যদি বাঁইচ্যা যাইতো!।

দুর্ঘটনা, না হত্যা? শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর by সাজেদুল হক

মৃত্যুর মিছিল চলছে। মারা যাচ্ছে মানুষ। বেরুচ্ছে একের পর এক লাশ। আমাদের চোখের সামনেই। আমরা কিছুই করতে পারছি না। ফায়ার সার্ভিস রাতভর চেষ্টা করেছে। লড়াই করেছে জীবনবাজি রেখে। এখন আগুন নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু যা হওয়ার তা হয়েই গেছে।
এ যেন সবারই জানা ছিল। দিনটি আসবে। কেবল কবে আসবে তা হয়তো আমরা জানতাম না। অপেক্ষা করেছি। একটি অক্ষম এবং বিস্মৃতিপরায়ন জাতির অপেক্ষা। ৯ বছর পর সেই রাত আবার ফিরে এলো। নিমতলি ট্রাজেডির পর কত কথা হলো। কত আওয়াজ। শোক, কান্না। নাজিম হিকমত লিখে গেছেন, বিংশ শতাব্দিতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর। কিন্তু আমাদের শোকের আয়ু আসলে আরো কম। আমরা সবকিছু মেনে নিতে এবং মানিয়ে নিতে শিখে গেছি।
নিমতলি থেকে চকবাজার। কত কাছে। নিমতলিতে শতাধিক প্রাণহানির পর এ দাবি জোরেশোরে ওঠেছিল যে রাসায়নিক গুদামঘরগুলো সরিয়ে নিতে। নানা ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। নিরাপদ ঢাকা। এ যেন রীতিমতো পরিহাস। আরেকটি কালোরাত এটা পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে যে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গুটিকয়েক লোকের সীমাহীন লোভের কাছে তুচ্ছ অগণিত মানুষের জীবন। এমনকি সময় আর সভ্যতাও বোধ হয় নতুন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে। সবকিছুই যেন এখন স্বাভাবিক। সকালেই ঢাকায় অনেক মানুষের চোখের ভাষার পড়ার চেষ্টা করলাম। গণপরিবহনে, রাস্তায় মানুষের চোখে-মুখে শোকের ছায়া খুব বেশি নয়। অথচ এই শহরে একরাতে এতগুলো মানুষ নাই হয়ে গেল। ‘আব্বা, এনামুল পুইরা মইর‌্যা গেছে’- এই এনামুল আমাদের যেকারও বাবা, ভাই হতে পারতো। আছিয়া বেগমের ভাইকে আমরা কেউই আর ফিরিয়ে দিতে পারবো না।
শোকের মিছিল যে নেই তা নয়। স্বজনহারাদের কান্নার বাইরেও বহু মানুষ শোকাতুর। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আলী রীয়াজ লিখেছেন, এত মৃত্যু! সহজেই নিবার্য ছিল এই সব প্রাণহানি। কিন্তু এই  লেলিহান শিখা কি কেবল আগুনের? এই লেলিহান আগুনের আলোয় কি আর কিছুই  দেখা যাচ্ছে না? ২০১০ সালের ৩রা জুন নিমতলির আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যুর পরে যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল তার কোন সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছিল আমরা জানি না, কিন্তু মনে পড়ে একদিন জাতীয় শোক দিবস পালনের কথা। এর বেশি আর কিছুই হয়েছে বলে মনে হয় না। ৬ই জুন ২০১০, ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, ‘কেবল শোক দিবস পালন নয়, সময় এসেছে আমাদের জাতীয় জবাবদিহি দিবস পালনের; কেননা জবাবদিহির অনুপস্থিতিই জাতিকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে’।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর রাজী লিখেছেন, একুশ মানে মাথা নত না করা? ঢাকার চকবাজারে এতগুলো মৃত্যুর জন্য কেউ কি দায়ী? কে বা কারা দায়ী? কে কে বা কারা দায়িত্ব পালন না করায় এমন বিপুল প্রাণহানি হলো? সম্পদহানি হলো? কে বা কারা এ দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করে, ক্ষমা চেয়ে, পদত্যাগ করবে? কাকে বা কাদের আমরা এই অপরাধ ও অযোগ্যতার জন্য বিচারের সম্মুখীন হতে এবং শাস্তি পেতে দেখবো? না কি  দেখবো নতুন কোনো নাটক মঞ্চস্থ হতে? ক্ষমাহীন ঘৃণা ছাড়া আমাদের অন্তরে তাদের জন্য আর কিছু কি অবশিষ্ট আছে, না কি থাকতে পারে?
শেষ কথা: এ এমন এক সময় যখন প্রার্থনা ছাড়া আমাদের আসলে খুব বেশি কিছু করার নেই। আসুন, নিহত আর তাদের স্বজনদের জন্য আমরা প্রার্থনা করি। শোকের আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এই হতভাগাদের কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।

রায় লিখুন বাংলায়, যাতে মানুষ বোঝে: প্রধানমন্ত্রী

আদালতের রায় লেখার সময় ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারেও জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে এক অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন,  আদালতের রায় লেখা হয় ইংরেজিতে। সেই রায়ে কি বলা হলো তা বুঝতে অনেক বিচারপ্রার্থীকে নির্ভর করতে হয় আইনজীবীর ওপর। তিনি (আইনজীবী) যা বোঝাবেন তাই সে বুঝবে, নিজে পড়ে জানার কোনো সুযোগ তার থাকে না। ফলে অনেক সময় তাকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় অথবা তাকে একটু অন্যভাবে ব্যবহারও করা হয়। শেখ হাসিনা বলেন, আমি বলব, আদালতের রায়টা যদি কেউ ইংরেজিতে লিখতে চান লিখতে পারেন। কিন্তু একটা শর্ত থাকবে, এটা বাংলা ভাষায় প্রচার করতে হবে, প্রকাশ করতে হবে এবং যিনি রায় পাবেন তিনি যেন পড়ে জানতে পারেন। আর ইংরেজিতে যে রায় লেখা হবে, তা যেন ‘একটু সহজ ইংরেজিতে’ লেখা হয়, সে বিষয়ে বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, যে ভাষা আমরা সবাই বুঝতে পারি, সেই ভাষায় লেখা উচিত। আর বাংলায় রায় লিখে সেটা ইংরেজিতে ট্রান্সলেশন করেও দিতে পারেন। মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি আমাদের যারা আদালতে আছেন, তারা যদি মাতৃভাষায় লেখার অভ্যাসটা করেন, সেটা অন্তত আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, তাদের খুব সুবিধা হবে রায়টা পড়ে বোঝার। বাংলা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, মাতৃভাষা জানাটা সবার জন্য অপরিহার্য। তবে বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজ।
আমাদের ভাষাগতভাবে যোগাযোগটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতেই সরকারের তরফ থেকে পৃথিবীর নয়টি ভাষা নিয়ে একটি অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। তার মাধ্যমে কিন্তু মানুষ অনেক ভাষা শিখতে পারে। ইংরেজি সারা বিশ্বে একটা মাধ্যম হয়ে গিয়েছে। কাজেই আমাদের দেশের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সেটা শিখতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা মাতৃভাষা, যে ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি সেই ভাষাটাও সবাই যাতে শেখে সেই ব্যবস্থাটাও করা একান্তভাবে প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অনুষ্ঠানে চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারের প্রতিও সমবেদনা জানান। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহীবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

চকবাজার ট্র্যাজেডি: নিহত অন্তত ৬৭, এ যেন কেয়ামত

হঠাৎ বিস্ফোরণ। বিকট শব্দ। বিধ্বংসী আগুন। লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে সড়ক, দোকান, রেস্টুরেন্টে। মাটি থেকে বহুতল ভবন। সর্বত্র শুধু আগুন আর আগুন। সড়কে থাকা গাড়ি ও হোটেলের গ্যাসের সিলিন্ডারে একের পর এক বিস্ফোরণ। তুলোর মতো উড়ছিল বডি স্প্রে, পারফিউম, লোশনের কৌটা।
বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ছিল মার্কেটের দেয়াল। এ যেন কেয়ামতের দৃশ্য। কেউ  কিছু বুঝে উঠার আগেই আগুনের লেলিহান শিখা ঘিরে ধরে চারপাশ। পালিয়েও বাঁচার উপায় নেই। যে যেখানে ছিলেন সেখানেই দগ্ধ হয়েছেন। পুরে অঙ্গার হয়েছে দেহ। মা-বাবা ছেলে, বাবা-ছেলে, ভাই ভাইকে জড়িয়ে তারা চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
পুরান ঢাকার চকবাজারে চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন অন্তত ৬৭জন। আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন নয়জন। সরকারি হিসেবে ১১ জনের নিখোঁজের তথ্য দেয়া হলেও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের হিসেবে এখনও ৬২ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিহতদের মধ্যে গতকাল রাত পর্যন্ত ৪০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন তাদের স্বজনরা। তাদের ৩৭ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যেসব লাশ শনাক্ত করা যায়নি তা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে বলে  জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সুহেল মাহমুদ।
অমর একুশে উদযাপনের দিনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনার নয় বছর পর একই এলাকায় এ ধরনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। নিমতলীর ঘটনায় দাহ্য পদার্থের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। চকবাজারেও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এদিকে ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন শোক প্রকাশ করে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন।
এ যেন কেয়ামতের দৃশ্য: কেমিক্যাল, গ্যাসের সিলিন্ডারে আগুন ক্রমেই বাড়ছিল। আগুনে পুড়ছিল মানুষ। ভস্ম হচ্ছিল দোকানের পণ্য, সড়কের যানবাহন। কিছু বুঝে উঠার আগেই আগুন ঝাঁপটে ধরেছে আশপাশের প্রায় সবাইকে। আগুনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পালাতে পারেনি পথচারীরাও। এমনকি আগুন থেকে রক্ষা পেতে পাশের মার্কেটে যারা আশ্রয় নিয়েছিলেন রক্ষা পাননি তারাও। আগুন তাদের জীবন কেড়ে নিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুসারে মনে হচ্ছিল পৃথিবী বুঝি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই জীবন্ত মানুষগুলো কয়লার মতো হয়ে গেলো। রাতভর চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। রাত শেষে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। একে একে উদ্ধার করা হয় ৬৭টি লাশ।
রাত তখন সাড়ে ১০টার বেশি। চুড়িহাট্টা, নন্দ কুমার দত্ত রোড ও হায়দার বক্স রোডের শাহী জামে মসজিদ সংলগ্ন মোড়ে তীব্র যানজট। গাড়ি চলছে না কিছুতেই। অনেকেই চালককে গাড়িতে রেখে নিজেরা হেঁটে গন্তব্যে যান। এরকম একটি প্রাইভেট কার মসজিদের সামনে মোড়ে যানজটে ছিল। পাশে ছিল আরো একটি প্রাইভেট কার, একটি পিকআপ, ১৫-১৬টি মোটরসাইকেলসহ, রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি। প্রত্যক্ষদর্শী পারভেজ স্টোরের আলমগীর হোসেন জানান, রাত তখন প্রায় সাড়ে ১০টা। তীব্র যানজট। হঠাৎ বিকট শব্দ। কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা। তাকিয়ে দেখি প্রাইভেট কারে আগুন। আগুন নিয়ে কারটি শূন্যে উড়ছিল। তারপর জীবন বাঁচাতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন তিনি।
একইভাবে ওই এলাকার ৫৫/১ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা প্রত্যক্ষদর্শী ইরফান হোসেন ইমন জানান, ঘটনার সময় বাসা থেকে বের হয়েছেন মাত্র। নন্দ কুমার দত্ত রোডের মুদি দোকানে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই পুরো মাটি কেঁপে ওঠে। শুনতে পান বিস্ফোরণের শব্দ, মানুষের চিৎকার, আর্তনাদ। ইমন বলেন, চেয়ে দেখলাম বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে একটি পিকআপ গাড়ি আগুন নিয়ে প্রায় ৪০ ফিট উপরে উঠে আমার সামনে পড়েছে। এর মধ্যেই ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণ হলো। বিস্ফোরণের শব্দ হচ্ছিল আর আগুনের তীব্রতা বাড়ছিল। মনে হচ্ছিল পুরো এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।  প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মুহূর্তের মধ্যেই শাহী মসজিদ মোড়ের রাস্তায় ও মার্কেট, রেস্টুরেন্টসহ পাঁচটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই রাস্তায় থাকা গাড়ি চালক, আরোহী ও পথচারীরা পুড়ে মারা যান। পথচারীদের অনেকে প্রাণ বাঁচাতে আব্দুল ওয়াহেদ ম্যানশনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মার্কেটের ভেতরের রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন তারা। অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ না থাকায় শাটার বন্ধ করে আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। পুরো আব্দুল ওয়াহেদ ম্যানশনে ছড়িয়ে যায় আগুন।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী আজিজুল ইসলাম জানান, ওই মার্কেটের ভেতরের রাস্তা থেকেই ২৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা আগুনের তাপে, গ্যাসে মারা গেছেন। রাস্তায় তখন পড়েছিল অন্তত ১৬ জনের লাশ। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন সেখানে পৌঁছান তখন অনেক নারী ও শিশু ছাদে উঠে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলেন। তাদের উদ্ধার করেছেন তারা। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে জীবিত তবে দগ্ধ, আহত অবস্থায় ৪১ জনকে উদ্ধার করেছেন তারা। রাজ্জাব ভবন, আব্দুল ওয়াহেদ ম্যানশন, রাজমহল ও আনাস রেস্টুরেন্ট, মদিনা ডেকোরেটার্স ও মদিনা ফার্মেসি থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সকালে বিমান বাহিনীর দুটি হেলিকপ্টার থেকে ঘটনাস্থলে পানি ছিটানো হয়। এ বিষয়ে এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ৩টা ৪৮ মিনিটে পানি নিয়ে দুটি হেলিকপ্টার ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে হেলিকপ্টার থেকে পানি ছিটানো হয়।
সকালে চুড়িহাট্টার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, এ যেন ভস্মীভূত জনপদ। রাস্তায় ময়লার স্তূপের মতো পুড়ে কয়লা হয়ে আছে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল। পুড়ে বাদামি হয়ে গেছে গাড়িগুলো। রাস্তাজুড়ে কেমিক্যালের বোতল, প্লাস্টিকের পণ্য। দেয়াল ভেঙে ধসে পড়া ক্রংক্রিটের টুকরো। আগুনে কালো হয়ে গেছে ভবনগুলো। ঘটনাস্থলের শাহী মসজিদ ছাড়া প্রায় পাঁচটি ভবনেরই একই অবস্থা। সকাল ১০টা পর্যন্ত এসব ভবনে ধোঁয়া উড়ছিলো। নিভো নিভো করে আগুন জ্বলছিল। তখনই উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি আগুন নেভানোর কাজ করছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। সঙ্গে ছিলেন রেড ক্রিসেন্ট, রোভার স্কাউট ও আরবান কমিউনিটির সদস্যরা। নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন পুলিশ সদস্যরা। এলাকাবাসী জানান, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়ার কারণ ছিল গ্যাস সিলিন্ডার ও কেমিক্যাল। রাজ্জাক ভবনের নিচতলায় ছিল সিলিন্ডারের দোকান। এছাড়াও দুটি রেস্টুরেন্টে ছিল ছয়টি সিলিন্ডার। আব্দুল ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় ছিল প্লাস্টিকের স্যান্ডেলের কারখানা। দ্বিতীয় তলায় ছিল গ্যাস, পারফিউম এর মজুত। সেখানে বডি স্প্রে তৈরি করা হতো।
আব্দুল ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টোদিকে মদিনা ফার্মেসিতেও এই আগুন ছড়িয়ে যায়। ওই ফার্মেসি থেকে ৩০ ফিট দুরে আল বাকার ডেইলি ফুডের ব্যবসায়ী ওয়াকিল আহমেদ জানান, আগুনের তাপ তার দোকান পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করছিল। এলাকার আশপাশের নারী-পুরুষ সবাই সারা রাত বাইরে ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে একে একে ৩৭টি ইউনিট। সরু রাস্তা আর তীব্র যানজটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো ওই এলাকায় পৌঁছতে বেগ পেতে হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চলছিল উদ্ধার তৎপরতা। রাতভর আগুন নেভানোর তৎপরতা চলে। ভোরে একে একে বেরিয়ে আসে মরদেহ। গতকাল বিকাল পর্যন্ত লাশের ৮১টি অঙ্গপ্রতঙ্গ উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্তব্যরত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল বলেন, তবে মাথা পাওয়া গেছে ৬৭টি। যে কারণে আমরা ধরে নিচ্ছি ৬৭টি লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক গুলজার বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে রাত ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরমধ্যে ৬৭টি লাশ উদ্ধার করেছে। সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ হুমায়ুন, এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন গণফোরাম সভাপতি ও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন।
ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, চুরিহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৬৭টি লাশ পাওয়া গেছে। তবে অনেক লাশই আগুণে বিকৃত হয়ে গেছে। যেসব লাশ দেখে সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না তা ডিএনএ পরীক্ষায় ম্যাচ করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান তিনি। ঢাকার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার সেলিম রেজা জানান, এ পর্যন্ত ৩৭টি লাশ সনাক্ত করা হয়েছে। আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে ২২টি লাশ তাদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য নিহতের স্বজনদের ২০ হাজার করে টাকা দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্বজনের আহাজারিতে ভারি মর্গের বাতাস: অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের পর ঢাকা মেডিকেলে একে একে নিয়ে আসা হয় আহতদের। ভোর রাতে মর্গে আসতে থাকে একের পর এক লাশ। লাশ সনাক্ত করতে এবং আহত স্বজনদের খুঁজতে সকাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করেন শ শ মানুষ। কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে সেখানকার বাতাস। সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বজনরা লাশ সনাক্ত করেন। রাত পর্যন্ত ৩৭ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাদের কয়েক জনের লাশ রাতেই আজিমপুরে দাফন করা হয়েছে।
তদন্তে দুই কমিটি : পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে শিল্প মন্ত্রণালয় ফায়ার সার্ভিস দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মফিজুল হককে প্রধান করে বৃহস্পতিবার উদ্ধার অভিযান শেষে ১২ সদস্যের একটি কমিটি করে মন্ত্রণালয়। যাদের পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তিন সদস্যের সমন্বিত একটি কমিটি করা হয়েছে। যারা চকবাজারের চুড়িহাট্টায় লাগা আগুনের প্রকৃত কারণ ও সূত্রপাত খুঁজে বের করবেন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা আবদুল জলিল বলেন, তদন্ত কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ ও প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে অগ্নি দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ করতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে বিসিকের পরিচালক (প্রকল্প) মো. আব্দুল মান্নানকে। কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, কল-কারখানা অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের একজন করে প্রতিনিধি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর, বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ এসিড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ পেইন্টস, ডাইজ অ্যান্ড কেমিক্যাল মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব কেমিক্যাল সায়েন্টিস্টের সাধারণ সম্পাদক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
এদিকে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ ঘটনাস্থলেই তার বাহিনীর কমিটি গঠনের কথা জানান। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (অপারেশন্স) দিলীপ কুমার ঘোষকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের এ কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (এডি) সালাহ উদ্দিন ও উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুল হালিমকে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড, নামফলকের ছড়াছড়ি

সব সাইনবোর্ড ও নামফলক বাংলায় লিখতে হবে। আদালতের এই আদেশটি পাঁচ বছরের পুরোনো। কিন্তু রাজধানীর যেকোনো সড়কে গেলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান-গুলোর সাইনবোর্ডে ইংরেজির দৌরাত্ম্য চোখে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়, বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল বা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানই হোক, নামই ইংরেজিতে (রোমান হরফ) রাখার প্রবণতা বেশি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাইনবোর্ড বাংলায় প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দিলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, নামফলকের ছড়াছড়ি। তবে সরকারি দপ্তরের সাইনবোর্ড বা নামফলক বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলায় রূপান্তর হয়েছে। এ ছাড়া যানবাহনের ডিজিটাল নম্বরপ্লেটগুলো বাংলায় সরবরাহ হওয়ার কারণে এ ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ অনেকটাই বাস্তবায়ন হয়েছে। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আদালত বিদেশি দূতাবাস ও প্রতিষ্ঠান বাদে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, দপ্তরগুলোর নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে নির্দেশ দেন।
পরে ২০১৪ সালের ২৯ মে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মাধ্যমে এটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়। তারপরও বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট আদালত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। যে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন, সেই রিটের আবেদনকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ অভিযোগ করেন, সরকারের গাফিলতির কারণে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকার বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তরিক না। সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় হলে এবং জনগণ সচেতন হলেই কেবল সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সচিব রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া বলেন, সাইনবোর্ডে ভিনদেশি ভাষার ব্যবহার দীর্ঘদিনের বাজে অভ্যাস। সিটি করপোরেশনের অভিযান চলমান প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন হতে হবে, বাংলা ভাষার প্রতি দরদ থাকতে হবে।
ইংরেজিতে সাইনবোর্ড টাঙানো বিভিন্ন ধরনের অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই জানেন না বাংলায় সাইনবোর্ড লেখা নিয়ে আদালতের আদেশের বিষয়ে। ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো ইংরেজিতে হওয়ায় ইংরেজিতেই সাইনবোর্ড তৈরি করেছেন বলেও কেউ কেউ দাবি করলেন। অথচ ব্যবসা সনদ (ট্রেড লাইসেন্স) নেওয়ার সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ডে বাংলা ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। ‘সাইনবোর্ড/ব্যানার বাংলায় লিখতে হবে’—এই কথাটি ব্যবসা সনদে আলাদাভাবে লেখা থাকে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সাইনবোর্ডে ভাষার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া থাকার পরও অনেকে সেটা অনুসরণ করেন না। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা থাকলেও সিটি করপোরেশন কখনোই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় না।
ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড বড় বড় ইংরেজি হরফে লেখা। শংকর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত একটি ভবনের বাইরের অংশে ১০টি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড টাঙানো। এর অধিকাংশই রেস্তোরাঁ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ইংরেজিতে লেখা। তবে দুটি প্রতিষ্ঠান ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ডের পাশে ছোট করে পৃথক ব্যানারে বাংলায় প্রতিষ্ঠানের নাম টাঙিয়েছে।
একই চিত্র দেখা যায়, বনানী ১১ নম্বর সড়কে। এই সড়কের প্রায় প্রতিটি ভবনেই আছে ব্র্যান্ডের পোশাক ও খাবারের দোকান। এই সড়কের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ইংরেজিতে লেখা। একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘বাংলার প্রতি অবজ্ঞা থেকে এটি করা হয়েছে, বিষয়টি এমন না। নামটি ইংরেজিতে তাই সাইনবোর্ড ইংরেজি হরফেই লেখা হয়েছে। আমাদের সচেতনতার অভাব আছে এটি সত্যি।’
জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এটি দুর্ভাগ্যের বিষয়। শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, সামাজিক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রও ইংরেজিতে করা হচ্ছে। এগুলো সরকারের বা আদালতের আদেশেই কেন বাংলায় লিখতে হবে? এটি নাগরিকদের দায়িত্ববোধ থেকেই করা উচিত।

এ যেন মৃত্যুপুরী! by আসাদুজ্জামান

চকবাজারের চুড়িহাট্টার মসজিদ গলিতে পাশাপাশি দুটি খাবার হোটেল। হোটেলের পাশে ওষুধের দোকান। এর সামনে রাসায়নিক দ্রব্যের গোডাউন। দোকানের সংখ্যা আনুমানিক ২৫টি। এর পাশে ডেকোরেটরের দোকান। বুধবার, রাত ১০টা ৩০ মিনিট। হঠাৎ বিকট আওয়াজ, মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাঁচটি ভবনে। এরপর আগুনে পুড়ে অঙ্গার রাস্তায় থাকা মোটরসাইকেল, পিকআপ, রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি। রাত ৩টার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ উদ্ধার শুরু। লাশ মেলে রাস্তায়, দোকানে দোকানে। ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় বডি স্প্রের কৌটা আর রাসায়নিক উপাদান।













ভারতে যুবরাজ সালমানঃ যুদ্ধ এড়াতে মোদির হাতে বিকল্প কী?

পুলওয়ামা হামলার পরে ভারত এখন ক্ষোভে উত্তাল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর চাপ বাড়ছে। জনগণ থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের দাবি, ‘পাকিস্তানকে যুদ্ধের মাধ্যমে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।’
তবে মোদি যুদ্ধে যাবেন না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর বড় কারণ, দুটি দেশেরই পরমাণু অস্ত্রের বিশাল মজুত রয়েছে। যুদ্ধ থেকে একটি ‘পারমাণবিক ভুল সিদ্ধান্ত’ এই অঞ্চলকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে, এটি সবাই জানে। ফলে যুদ্ধ ছাড়া পাকিস্তানকে সমুচিত জবাব দেওয়ার মোদির হাতে কী কী বিকল্প আছে, সেটি নিয়ে চলছে এখন বিচার–বিশ্লেষণ।
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক প্রায় তিন বছর ধরে জমে বরফ হয়ে আছে। অথচ মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের দুই বছর পর্যন্ত সম্পর্কে বরফ গলার আভাসই মিলেছিল। মোদি তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বছর গড়াতেই আকস্মিক সফরে গিয়েছিলেন লাহোরে। কিন্তু লাহোরে মোদি–নওয়াজের শান্তি আলোচনার দিন কয়েক পরই পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ছয় সেনাকে হত্যা করে জেইএম।
একে একে অনেক ঘটনার পর ২০১৬ সালের জুলাইয়ে দিল্লির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ে। পুলওয়ামায় হামলার পর ভারত এখন কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে চাচ্ছে।
ভারত ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানকে বাণিজ্যসুবিধা দিতে মোস্ট ফেভারড নেশন (এমএফএন) হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। পুলওয়ামায় হামলার পর সেটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে তারা। পাকিস্তানের পণ্যের ওপর আরোপ করেছে ২০০ শতাংশ শুল্ক। ক্রিকেট ভারত ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলে না। এতে পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।
১৯৬০ সালের সিন্ধুর পানি চুক্তি বাতিল করার দাবি উঠেছে ভারতে। এটি করলে অবশ্য চড়া মূল্য দিতে হবে ভারতকে। প্রতিবেশী চীন, নেপাল ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে। ওই চুক্তির আওতায় তারাও রয়েছে। ভারত পাকিস্তানকে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের কালো তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওই তালিকায় ইরান ও উত্তর কোরিয়া রয়েছে।
ভারতে যুবরাজ সালমান: ‘সন্ত্রাসবাদই ভারত-সৌদির বড় দুশ্চিন্তা’
পুলওয়ামা প্রসঙ্গ উচ্চারণ করলেন না, সন্ত্রাস প্রসঙ্গে পাকিস্তানের নামও নিলেন না। কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জানালেন, সন্ত্রাসবাদই ভারত ও সৌদি আরবের বড় দুশ্চিন্তা। এই দুশ্চিন্তা দূর করতে ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সৌদি আরব সহযোগিতা করবে। প্রয়োজনে তথ্যের আদান-প্রদানও করবে।
ভারত সফরে এসে বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ বিন সালমান এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীকে নিরাপদ করতে এই সহযোগিতা জরুরি। যেসব দেশ সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার করছে, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে।
ভারতে আসার আগে দুই দিনের সফরে সৌদি যুবরাজ পাকিস্তান গিয়েছিলেন। সেই সফরের ঠিক আগেই ঘটে যায় কাশ্মীরের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদী হামলা। মারা যান ৪৯ জন ভারতীয় আধা সামরিক নিরাপত্তারক্ষী। পাকিস্তানে ২০ বিলিয়ন ডলারের লগ্নির কথা ঘোষণা করে দেশে ফিরে সৌদি যুবরাজ গতকাল মঙ্গলবার রাতে ভারতে আসেন। এই সফরে তিনি পুলওয়ামা-কাণ্ড ও সন্ত্রাস প্রসঙ্গে পাকিস্তানের নাম নেন কি না, সেই আগ্রহ দানা বেঁধেছিল। সৌদি যুবরাজ দুটি ক্ষেত্রেই নীরব থাকলেন।
তবে সৌদি অতিথিকে পাশে রেখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পুলওয়ামা-কাণ্ডের অবতারণা করেন। বলেন, ‘পুলওয়ামায় নারকীয় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ এই বিপদের আরও একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। এর মোকাবিলায় আমরা দুই দেশই একমত। সন্ত্রাসবাদের চরিত্র যেমনই হোক, তাকে কোনোভাবেই মদদ দেওয়া উচিত নয়। যারা সন্ত্রাসীদের সমর্থক, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা দরকার। সন্ত্রাসীদের অবকাঠামো ধ্বংস করা ও তার সমর্থকদের শাস্তি দেওয়া অতি প্রয়োজনীয়, যাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাতে অস্ত্র তুলে না নেয়।’ মোদি আরও বলেন, ‘আমি খুশি, এই বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সৌদি আরব একমত।’
সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু দেশ পাকিস্তান। তবু ভারতে এসে সৌদি যুবরাজ বলেন, আরব দেশসমূহের ‘ডিএনএ’-তেই আছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। দ্বিপক্ষীয় এই সম্পর্ক কতটা গভীর ও আন্তরিক তা বোঝাতে গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রটোকল ভেঙে নরেন্দ্র মোদি দিল্লি বিমানবন্দরে যান মোহাম্মদ বিন সালমানকে স্বাগত জানাতে। ৩৩ বছর বয়সী অতিথিকে তিনি বুকে জড়িয়ে ধরেন।
অবশ্য পাকিস্তানে বসবাসকারী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদের নেতা মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জঙ্গি তালিকাভুক্ত করার প্রচেষ্টায় সৌদি সমর্থন ভারত আদায় করতে পারেনি। বরং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টির ‘রাজনীতিকরণ এড়ানোর’ প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ঘোষণার চেষ্টায় বারবার বাধা দিচ্ছে চীন। বিপক্ষে সৌদি আরবও। ভারত তবুও হাল ছাড়েনি। ফ্রান্স এই বিষয়ে জাতিসংঘে নতুন করে প্রস্তাব আনার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সেই উদ্যোগকে সমর্থন করছে।
এই সফরে ভারত ও সৌদি আরবের মধ্যে লগ্নি, পর্যটন, গৃহনির্মাণ ও তথ্য-সম্প্রচার ক্ষেত্রে পাঁচটি অনুচুক্তি ও বোঝাপড়া সই হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছে দুই দেশ। ভারত-সৌদি আরব দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ আগামী বছর ৩ হাজার কোটি ডলার ছুঁয়ে ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বহরের নিরিখে সৌদি আরব চতুর্থ বৃহৎ দেশ।