Sunday, April 28, 2019

শ্রীলঙ্কা হামলার 'মূলহোতা' জাহরান হাশিম আসলে কে? by জাহিদুল ইসলাম জন

শ্রীলঙ্কার আত্মঘাতী সিরিজ বোমা হামলার সন্দেহভাজন মূলহোতা জাহরান হাশিম মোহাম্মদ। কাশিম মোহাম্মদ জাহরান নামেও পরিচিত সে। তাওহীদ জামাত নামে পরিচিত একটি স্থানীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা হাশিম। শ্রীলঙ্কা সরকারের সন্দেহ তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এনটিজে-ই রবিবারের সিরিজ হামলা চালিয়েছে। আইএস-এর পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, বাগদাদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে হাশিমের পরিকল্পনা মাফিক ওই হামলা হয়েছে।  এনটিজের হামলার সমন্বয় প্রক্রিয়া এবং সামরিক গ্রেডের বিস্ফোরক ব্যবহারের ধরণ দেখেও ধারণা করা হচ্ছে বিদেশি কোনও গ্রুপের সহায়তা পেয়েছে স্থানীয় ওই গ্রুপটি। শ্রীলঙ্কার মুসলিম কাউন্সিলের এক নেতার দাবি তিন বছর থেকেই হাশিমের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে আসছিলেন তিনি। তার সাথে দক্ষিণ ভারতের উগ্রবাদীদের সংশ্লিষ্টতাও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রবিবার (২১ এপ্রিল) খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ইস্টার সানডে উদযাপনকালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো ও তার আশপাশের তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলসহ আটটি স্থানে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছে ৫০০ জনেরও বেশি।
হামলার পর সরাসরি দায়ী না করা হলেও স্থানীয় উগ্রবাদী গ্রুপ এনটিজেকে সন্দেহের শীর্ষে রেখে তদন্ত শুরু করে শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দারা। এক পর্যায়ে ওই উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে সরাসরি দায়ী করে দাবি করা হয়, হাশিম হামলার মূলহোতা।  আইএস-এর ছবি সম্বলিত বিবৃতিতে হামলাকারী হিসেবে যে ৮ জনের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে একমাত্র হাশমিকেই দেখা গেছে মুখ খোলা অবস্থায়। আইএস-ও তাকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে হাজির করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হাশিম। অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ারও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। আইএসপন্থী সামাজিক যোগাযোগের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে হাজার হাজার অনুসারী যোগাড় করেছে সে। শ্রীলঙ্কার মুসলিম কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলমি আহমেদ দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, হাশিমের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড নিয়ে তিন বছর ধরে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে আসছিলেন তিনি। হাশমি তার কোরআন শিক্ষা ক্লাসে তরুণদের উগ্রবাদে আকৃষ্ট করছিলো বলে কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন তিনি। হিলমি দাবি করেন, ঘৃণাবাদী বক্তব্য সম্বলিত তার সবগুলো ইউটিউব ভিডিও ভারত থেকে আপলোড করা হয়েছে। চেন্নাই অথবা বেঙ্গালুরুতে তার ঘাঁটি রয়েছে।
ভারতের সিএনএন নিউজ ১৮ প্রথম এই হামলায় হাশিমের সম্পৃক্ততার খবর সামনে আনে। সংবাদমাধ্যমটির দাবি করে  কলম্বোর ভারতীয় হাইকমিশনে হামলা হতে পারে বলে লঙ্কান পুলিশকে এপ্রিলের শুরুতে সতর্ক করে দেয় ভারতীয় গোয়েন্দারা। আরেক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়, ছয় মাস আগে তামিল নাড়ু থেকেআটক এক আইএস ঘনিষ্ঠকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শ্রীলঙ্কায় হামলার তথ্য পায় তারা।
নিক্কি এশিয়ান রিভিউ-এর খবর অনুযায়ী, রবিবারের হামলার  কয়েক মাস আগে থেকে দক্ষিণ ভারত থেকে  সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছিলো হাশিমের কর্মকাণ্ড। 
ভারতীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে হাশিমের সম্পৃক্ততার বিষয়টি  নিবিড় তদন্তের আওতায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার দাবি, ওই সিরিজ বোমা হামলা নিয়ে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল তাদের কাছে। কলম্বোর হাতে তা পৌঁছে দেওয়া হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রত্যাবাসনে দেরি করছে মিয়ানমার

মিয়ানমার বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক। কক্সবাজার সৈকতের একটি হোটেলে গত শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক আন্তেনিও ভিতোরিনো।
এর আগে জাতিসংঘের তিন সংস্থার প্রধানদের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে। সকাল সাড়ে আটটার দিকে তারা কক্সবাজার থেকে সড়কপথে উখিয়ার বালুখালী শিবির পরিদর্শনে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তারা বালুখালী-২, কুতুপালং, মধুরছড়া, জুমশিয়া রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে। বেলা দেড়টার দিকে তারা কক্সবাজারে ফেরে।
শিবির পরিদর্শনের সময় দুই বছর আগে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল। এ সময় রোহিঙ্গারা বলে, তারা মিয়ানমারে ফিরতে চায়। তবে সে দেশে তাদের নিরাপদ বসবাসের নিশ্চয়তা ও নাগরিকত্ব দিতে হবে। বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি, আন্তোনিও ভিতোরিনো ও মার্ক লোকক। তাঁরা বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। আরাকান আর্মির সঙ্গে চলমান সংঘর্ষের কারণে মিয়ানমারের রাখাইনের পরিবেশ উত্তপ্ত। এই পরিবেশ রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কখন হবে সেটা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরও নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।
মার্ক লোকক বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য যে চুক্তি হয়েছে, সেই অনুযায়ী মিয়ানমার কাজ করছে না। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে। তবে আমরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছি যে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
আইওএমের মহাপরিচালক আন্তোনিও ভিতোরিনো বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিষয়টি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকারের ওপর নির্ভর করে। তবে বর্ষা মৌসুমসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই দ্বীপটি বাসযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কখন শুরু হচ্ছে—এই মুহূর্তে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ, রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলেন, সামনে বর্ষা মৌসুম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিধস থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ রাখতে হবে। এদিকে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার বিষয়টি রোহিঙ্গাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তবে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব মিয়ানমারের ওপর। জাতিসংঘ মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।

এবার আইএসের বাংলায় বার্তা: আলোচনায় জঙ্গি ‘হুমকি’

শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর দেশে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা হচ্ছে বলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সর্বশেষ আইএস এর একটি বাংলা বার্তা ভারত ও বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে এই বার্তাকে পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশে হামলার হুমকি হিসেবে দেখছে।
যদিও বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা বলছেন, ঝুঁকি থাকলেও এ ধরনের হামলার কোন শঙ্কা এই মুহূর্তে নেই। আর শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশে হামলার মতো সামর্থও কোন গোষ্ঠির নেই বলে মনে করছেন তারা। বাংলাদেশে কোন ধরনের শঙ্কা না থাকলেও ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে সতর্ক রয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অনেক জায়গায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা, বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও।
এদিকে, গোয়েন্দা ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, তুর্কি ভাষার ভিডিও গানগুলোকে (নাশিদ) বাংলা ও ইংরেজি ভাষার সাবটাইটেলসহ প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংগঠনটির কথিত অনুবাদ বিভাগ ‘আল-মুরসালাত’ এক টুইট পোস্টে বৃহস্পতিবার রাতে এমন ঘোষণা দেয়।
আইএসের পোস্টারটিতে বাংলায় লেখা হয়েছে, ‘শীঘ্রই আসছে ইনশাআল্লাহ....’। এছাড়া তাতে আল মুরসালাতের আরবি ক্যালিগ্রাফি করা লোগো এবং তার নিচে একটি স্লোগানও বাংলায় লেখা রয়েছে। এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এ সংক্রান্ত খবরে বলা হয়, পোস্টারটি বাংলাদেশে অথবা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে তারা এমন আশঙ্কার কথা জানায়। বাংলায় প্রকাশিত ওই পোস্টারটি আইএস’র প্রকাশিতব্য কোন ভিডিও’র হতে পারে বলেও সিটিটিসি’র কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে। ইউনিটটির একজন কর্মকর্তা জানান, শ্রীলঙ্কায় হামলার পর থেকে আরো সতর্ক অবস্থানে আছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সূত্র জানায়, শ্রীলঙ্কায় হামলার পর বাংলাদেশেও অ্যাক্টিভ যেসব জঙ্গি সংগঠন রয়েছে, তারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। জঙ্গিদের নিজেদের প্রপাগান্ডা চ্যানেলগুলোতে বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে। তবে তাদের নতুন করে হামলা চালানোর মতো শক্তি ও সামর্থ্য কোনোটাই নেই বলেও দাবি সিটিটিসি ইউনিট কর্মকর্তাদের। আরেকটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে যারা আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে ইরাক-সিরিয়াতে গিয়েছিল, সেই সব দেশ ফেরৎ কেউ দেশে থাকলে তাদের নজরদারিতে রাখা হবে। এরকম অন্তত ৪২ জনের নামের তালিকা বিভিন্ন ইমিগ্রেশনে দেয়া হলেও তারা নামে-বেনামে বা অবৈধ পথে দেশে প্রবেশ করতে পারে কিনা, সে বিষয়েও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, নিরপত্তা বিশ্লেষক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল রাতে মানবজমিনকে বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরটির সত্যতা কিংবা সে দেশের গোয়েন্দাদের কোন মেসেজ আছে কিনা সেটা ভাবনার বিষয়। তবে, কোন ধরনের তথ্যকেই উড়িয়ে দেয়া ঠিক নয়। শ্রীলঙ্কা মানে আমাদের একেবারে দোরগোড়ায় হামলার পর এক ধরনের ঝুঁকি বা আশঙ্কা তৈরি হতেও পারে। তবে সবক্ষেত্রেই যে হামলার ধরণ ও আবহ এক রকম হবে বিষয়টা তাও নয়। গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এমন বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে। তবে, আমি মনে করি গণমাধ্যমের খবর হোক আর অন্য কোন গোয়েন্দা সূত্রের খবর হোক আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের জোর প্রস্তুতি থাকতে হবে। শ্রীলংকার ঘটনায়ও যেটা দেখা গেছে সে দেশের গোয়েন্দাদের কাছে হামলার আগাম সতর্কতা ছিল। আমি মনে করি একেবারে কোন সম্ভাবনা না থাকলেও বাংলাদেশেও সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি নেয়া উচিত।
বাংলায় আইএসের বার্তা
মানবজমিন ডেস্ক: বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গে হামলার পরিকল্পনা করে থাকতে পারে জঙ্গি সংগঠন আইএস। আইএস টেলিগ্রামপন্থি চ্যানেলের একটি পোস্টারের ওপর ভিত্তি করে এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে বলে দাবি করছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো। পশ্চিমবঙ্গে এরই মধ্যে একটি পোস্টার বিতরণ করা হয়েছে। তাতে লেখা ‘শিগগিরই আসছি, ইনশাআল্লাহ’। গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে এমন পোস্টার বিলি করা হয়েছে এবং তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।
বৃহস্পতিবার রাতে ওই পোস্টার বিলি করা হয়। পোস্টারে আল মুরসালাত নামে একটি গ্রুপের লোগো আছে। তাই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পোস্টারটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। কারণ, মাত্র এক সপ্তাহ আগে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। আইএস এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। যদিও সেদেশের সরকার মনে করে এর জন্য দায়ী স্থানীয় ইসলামপন্থি সংগঠন ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াত।
টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, আইসিস সেন্ট্রালের সঙ্গে সম্পৃক্ত জামা’আতুল মুজাহিদীন (জেএমবি) নামের স্থানীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের মাধ্যমে আইএসের শক্তিশালী উপস্থিতি আছে বাংলাদেশে। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থান ও অন্য প্রতিবেশী রাজ্যে জেএমবি বেশ পরিচিত। তারা আত্মগোপন করে আছে। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার বাবুঘাট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জেএমবি অপারেটিভ আরিফুল ইসলামকে। বোধগয়া বিস্ফোরণে জড়িতদের মধ্যে সে অন্যতম। এর আগে আসামে একটি মডিউল গড়ে তুলেছিল জেএমবি। গ্রেপ্তার করা ওই অপারেটিভ প্রকাশ করেছে যে, লোয়ার আসাম বলে পরিচিত এলাকার চিরাংয়ে তাদের ছিল একটি প্রশিক্ষণ সেন্টার।
বর্ধমান রেলস্টেশন থেকে পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি মোহাম্মদ মুসিরুদ্দিন ওরফে মুসা নামে আইসিস-জেএমবি সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই। মুসা অনেক দিন তামিলনাড়ুর তিরুপুর জেলায় পালিয়ে ছিল। স্বীকার করেছে জেএমবি’র একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আমজাদ শেখের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। আমজাদ শেখকে ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার করা হয় খাগড়া বিস্ফোরণে। তিন বছর আগে স্থানীয় জেএমবি’র কয়েকজন স্লিপার সেল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগিয়েছিল। এতে সাধারণ তরুণদেরও জেএমবিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশের কথা মাথায় রেখেই কি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) বাংলায় লেখা একটি পোস্টার প্রচার করেছে। নাকি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা-সহ পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাঙালিপ্রধান রাজ্যগুলোতে বড় ধরনের হামলার কোনো ছক কষছে আইএস জঙ্গিরা? এ নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ দ্বিধার মধ্যে পড়েছিল। যদিও সবদিক খতিয়ে দেখার পর আপাতত তাদের ধারণা হয়েছে, বাংলাদেশের কথা মাথায় রেখেই এই  পোস্টার প্রচার করা হয়েছে। এই পোস্টারে লেখা, শিগগিরই আসছে, ইনশাআল্লাহ। উল্লেখ্য, শ্রীলঙ্কায় লাগাতার বিস্ফোরণের ঘটনার দায় নিয়েছে আইএস। এর ঠিক পরপরই এই বাংলা পোস্ট ভারতীয় গোয়েন্দাদের গভীর চিন্তায় ফেলে দেয় বলে সংবাদ মাধ্যম সূত্রের খবর। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা অবশ্য শ্রীলঙ্কার জঙ্গি হামলার পর জঙ্গিরা পালিয়ে যাতে ভারতে চলে না আসে সেজন্য সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
দেশের মধ্যেও আইএস জঙ্গি সন্দেহে অনেকের ওপরই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের খবর। তবে পশ্চিমবঙ্গ,  আসাম, ঝাড়খণ্ড ও ত্রিপুরায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের জেএমবি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। জেএমবি জঙ্গিদের আসা-যাওয়াও বেড়েছে এই অঞ্চলে। বেশ কয়েকজন জেএমবি জঙ্গি ধরাও পড়েছে। তবে গোয়েন্দাদের মতে, আইএস জঙ্গিদের সাংগঠনিক টার্গেটে এখনো মুখ্য জায়গায় রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে আইএস নিজেদের সংগঠনকে নতুন করে ঢেলে সাজার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও ভারতীয় গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। তাই ভারতীয় গোয়েন্দাদের ধারণা, বাংলায় লেখা এই পোস্টার সম্ভবত বাংলাদেশের প্রতি লক্ষ্য করেই প্রচার করা হয়েছে। তবে ভারতীয় গোয়েন্দারা আইএস তৎপরতার কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের জঙ্গিদের খোঁজে জোরদার নজরদারি চালাচ্ছে  বলে জানা গেছে।

‘শ্রীলঙ্কা হামলার প্রশিক্ষণ হয় ভারতে!’

শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মূলহোতা জাহরান হাশমি। সেনাবাহিনীর একটি শীর্ষ স্থানীয় সূত্র বলেছেন, সে দক্ষিণ ভারতে বেশ সময় কাটিয়েছে। গত রোববার সন্ত্রাসী হামলায় একজন নারী সহ অংশ নেয় ৯ আত্মঘাতী। তাদের বেশ কয়েকজন ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে, সম্ভবত সেটা তামিলনাড়ু হবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। এ খবর দিয়েছে ভারতের অনলাইন দ্য হিন্দু।
এতে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কার তদন্তকারীরা জাহরান হাশমিকে ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াতের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সে সুপরিকল্পিত ওই সিরিজ বোমা হামলায় নিহত হয়েছে। এ হামলার মূলহোতা সে বলে বিশ্বাস ওই সামরিক সূত্রের।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, গত রোববারের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াত। এর দু’দিন পরে এ হামলার দায় স্বীকার করে আইএস। এর পর পরই তারা আট বোমা হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করে। এর ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায় জাহরান হাশমিকে। ওই ছবিতে অন্য জিহাদিদের মুখ ছিল ঢাকা।
তবে শ্রীলঙ্কার তদন্তকারীরা একজন নারী সহ ৯ আত্মঘাতী হামলাকারীকে সনাক্ত করতে পেরেছে। ওই সূত্রটি বলেছেন, আমরা বিষয়টিকে আইএসের দিক থেকে যাচাই করে দেখছি। আমাদের সন্দেহ ওই যুবকদের কয়েকজনকে ভারতে, সম্ভবত তামিলনাড়ু রাজ্যে মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
তবে জাহরান হাশমি ভারতে সফর করেছে কিনা সে বিষয়ে ভারতীয় কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেন নি। সে যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুবকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল যোগাযোগ স্থাপন করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
একজন কর্মকর্তা বলেছেন, জাহরান হাশমির ফেসবুক পেজ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সাত সদস্যের একটি গ্রুপের নেতাকে দেখতে পায় হাশমির অনুসারী। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ভারত। এরপরই জাহরান হাশমির উগ্রবাদী ভিডিওর প্রথম ইঙ্গিত বেরিয়ে আসে। ওইসব যুবক ছিল আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ভারতে হত্যা পরিকল্পনা করেছিল এমন অভিযোগে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয় কয়েমবাটোরে।
৯ হামলাকারীকে শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ সনাক্ত করলেও তাদের নাম প্রকাশ করে নি। তবে শুক্রবার তারা এটা নিশ্চিত করেছে যে, সাংগ্রি-লা হোটেলে দু’জন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর মধ্যে হাশমি ছিল। তার বসবাস ছিল কাত্তানকুড়িতে। স্থানীয়রা বলেছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা নিয়ে স্থানীয় মৌলভীদের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধের পর দুই বছর আগে জাহরান ওই শহর ছেড়ে যায়। তারপর থেকে সে পলাতক ছিল।

এক বছরে ৪৩৩ শিশু ধর্ষণ, নির্যাতনে মৃত্যু ২৭১

২০১৮ সালে সারাদেশে ৪৩৩ টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ২২টি শিশু। যৌন নির্যাতনের ফলে মারা গেছে একজন। এছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল ৫৩টি শিশুর ওপর। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে মারা  গেছে ২৭১টি শিশু। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ১০০৬ জন। আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবে বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। সংস্থাটি এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
দেশে প্রকাশিত ছয়টি সংবাদপত্রে উল্লেখিত সংবাদ থেকে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর রাফিজা শাহীন বলেন, ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়া বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৭-১২ বছর। ১৩-১৮ বছর বয়সীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বেশি। বিশেষ করে পুরুষ শিক্ষকের হাতে এই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে। গতবছর এই সংখ্যা ছিল ১২৯ জন। এদের মধ্যে ১৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
গতবছরে শিশুদের বিষয়ে এক হাজার ৩৭টি ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। অন্যদিকে নেতিবাচক ঘটনায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ২৯৭৩টি, যেখানে ক্ষতিগ্রস্থ শিশুর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৮১১ জন।
রাফিজা শাহীন বলেন, আমাদের দেশে শিশুদের প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। আমাদের কাছে  যে পরিসংখ্যান আছে, সেটি আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। আমরা কেন শিশুদের জন্য নিরাপদ আবাস গড়তে পারছি না সেটি নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে। শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এখনই করণীয় নির্ণয় করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের শাহনাজ হুদা বলেন, ২০১১ সাল থেকে আমরা এই প্রতিবেদনগুলো সংগ্রহ করছি। শুরুতে আমাদের ধারণা ছিল এতে করে শিশুদের প্রতি সহিংসতা কমবে। কিন্তু হচ্ছে এর উল্টো। মূলত বিচারহীনতার জনই এমনটা হচ্ছে। শাস্তির দিকে মনোযোগ না দিয়ে, সংশোধনে মনোযোগ দেয়া জরুরি। নাহলে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে। সঙ্গে এসব ঘটনার বিচার এমনভাবে করতে হবে যেন আর কেউ শিশুদের প্রতি অপরাধ করতে উৎসাহিত না হয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব রনি চাকমা বলেন, যারা অপরাধী তাদের ওপরও একটি স্টাডি করা জরুরি। কেন তারা শিশুদের রেপ করবে? এমন চিন্তা মাথায় আসে কিভাবে সেটি খুঁজে বের করতে হবে আমাদেরকে। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। দ্রুততম সময়ে এটি বন্ধ করতে হবে।

ঢাকা আসছেন ৭ মার্কিন কর্মকর্তা: নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় by মিজানুর রহমান

নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় ঢাকা আসছেন মার্কিন ৭ কর্মকর্তা। আগামী ২রা মে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করবেন তারা। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেবেন।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ফোরাম রয়েছে। এটি খুবই স্ট্রাকচার্ড বা কাঠামোবদ্ধ ফোরাম। এর আওতায় ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর অল্টারনেটিভ ভেন্যুতে আলোচনা হয়ে আসছে। ওই ফোরামের সর্বশেষ বৈঠক ওয়াশিংটনে হয়েছিল ২০১৭ সালের অক্টোবরে। সেটি ছিল ষষ্ঠ নিরাপত্তা সংলাপ।
সঙ্গত কারণেই এবারের ভেন্যু ঢাকা।
আসন্ন ৭ম নিরাপত্তা সংলাপ প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ঢাকার কূটনীতিকরা মানবজমিনকে জানিয়েছেন, অতীদের ধারাবাহিকতায় এবারের সংলাপে আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রথা এবং অ-প্রথাগত নিরাপত্তাসহ সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ দমন, সামরিক সহযোগিতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাইবার সিকিউরিটি, মেরিটাইম সিকিউরিটি, জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। বিগত সংলাপের মূখ্য আলোচ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি ওয়াশিংটনের তরফে এবারের বৈঠকে তোলা হতে পারে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম বা আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস বিশেষতঃ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কারণ হিসাবে কর্মকর্তারা যে বিষয়টি সামনে আনছেন তা হল- শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক বর্বর হামলা। ওই হামলায় বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতাহত হয়েছেন।
সহিংস এমন ঘটনা ঠেকাতে দ্বিপক্ষীয় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা আরো ‘সুনির্দিষ্ট’করণের তাগিদ থাকবে উভয় পক্ষের। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা সতর্কতা (‘কে’ ক্যাটাগরিতে নাম ওঠার) জারির বিষয়টি কিংবা এ নিয়ে মার্কিনীদের উদ্বেগ নিরসনের কোন চেষ্টা ঢাকার তরফে থাকবে কি-না? জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের যে কোন দেশে মার্কিন মিশন এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি স্টেট ডিপার্টমেন্টের অগ্রাধিকার। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এটি মনিটর করা এবং এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটন নিয়মিতভাবে আলোচনা করে।
নিরাপত্তা সংলাপ কাঠামোবদ্ধ ফোরাম হওয়ায় অতীতে কখনও সতর্ক বার্তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। এবারের এজেন্ডায় তা নেই। তবে ওয়াশিংটন চাইলে ঢাকার তরফে অবশ্যই এ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হবে এবং বাংলাদেশ যে বিদেশীর জন্য নিরাপদ, সেটি দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরা হবে। যুদ্ধ বা সামরিক কারণে নয় কিন্তু বেসামরিক নিরাপত্তার জন্য জরুরি যে কোন অপারেশন পরিচালনায় যেমন দুর্যোাগ-দুর্বিপাকে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালানোর জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে লজিস্টিক সাপোর্ট এগ্রিমেন্ট চায় যুক্তরাষ্ট্র।
বেসামরিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ওই চুক্তির জন্য ওয়াশিংটন যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে তা কয়েক বছর ধরে নিরাপত্তা সংলাপে আলোচনা হয়ে আসছে। এবারের সংলাপেও এটি আসতে পারে। তাছাড়া রোহিঙ্গাসহ যে কোন মানব সৃষ্ট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ সহায়তায় অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নিরাপত্তা সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতি উভয় দেশের অঙ্গিকার নিরাপত্তা সংলাপে প্রতিফলিত হয়।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এবারের সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের পলিটিক্যাল অ্যান্ড মিলিটারি ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত উপ-সহকারী মন্ত্রী মাইকেল মিলার নেতৃত্ব দিবেন। তার সঙ্গে স্টেট ডিপার্টমেন্টের সংশ্লিষ্ট ব্যুরো ও বিভাগের ৬ জন প্রতিনিধি থাকবেন। ঢাকা থেকে যুক্ত হবেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার এবং তার টিমের অন্তত ৬ জন সদস্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকাস অনুবিভাগের মহাপরিচালক ফেরদৌসি শাহরিয়ার সংলাপে নেতৃত্ব দেবেন। স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে থাকছেন বলে জানা গেছে।

সরজমিন জুরাইন: এ যেন কারবালার ময়দান by শাহনেওয়াজ বাবলু

খাবার পানির জন্য হাহাকার। যেন কারবালার ময়দান। পানি থেকেও তা খাওয়ার অযোগ্য। দুর্গন্ধে বমি আসে। পানি ফুটিয়ে খেতেও ভয় জুরাইনবাসীর। এলাকাবাসী জানায়, ওয়াসার পানি মুখেই দেয়া যায় না। ফুটানোর পরেও থাকে অসহনীয় গন্ধ। পানি ফুটানোর পর ‘ফিটকিরি’ দিয়েও কাজ হয় না।
ফলে বাধ্য হয়েই বাইরে থেকে পানি কিনতে হচ্ছে।
সরজমিনে জুরাইন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এলাকাবাসীর উদ্যোগে বিভিন্ন মসজিদে ডিপটিউবওয়েল বসানো হয়েছে। এই পানি দিয়ে মসজিদের মুসল্লীরা ওজু করেন। আর এই টিউবওয়েল থেকে পাইপের মাধ্যমে জুরাইনের বিভিন্ন মোড়ে সংযোগ দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করে। বোতল প্রতি দুই টাকা করে মসজিদের ফান্ডে দেয়া হয়। আর এই পানি সংগ্রহের জন্য সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে থাকে মানুষের ভিড়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওয়াসা থেকে হয়তো ভালো পানি আসে।
কিন্তু যে পাইপ দিয়ে পানি আসে সেগুলোর একেবারেই বাজে অবস্থা। ৪০ বছর আগে যে ওয়াসার পাইপগুলো লাগানো হয়েছে এগুলো এখনো মেরামত হয়নি। অধিকাংশ জায়গায় পাইপগুলো ফেটে গেছে। ড্রেন এবং পাইপের আশে পাশে জমে থাকা ময়লা পানি ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে পানি ময়লা হচ্ছে। অনেক সময় মটর দিয়ে পানি টানলেও পাইপে পানি পাওয়া যায় না। এই সব বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বার বার অবহিত করা হলেও তারা এই বিষয়ে কোন কাজ করছেন না বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।  
ওই এলাকার বাসিন্দা কাজী আলমগীর কামাল বলেন, ওইদিন ওয়াসার এমডি বলেছেন, তারা সব সময় তাদের পানি রাখার রিজার্ভ ট্যাংকগুলো পরিষ্কার করে রাখে। কিন্তু ওনারা ওয়াসা থেকে শতভাগ পিওর পানিও সরবরাহ করে থাকলেও আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। কারণ আমরাতো ভালো পাানি পাচ্ছি না। এর একটাই কারণ, তাদের পানি সঞ্চালন পাইপগুলোতো ত্রুটিমুক্ত নয়। আর আমাদের জুরাইন এবং আশে পাশের এলাকায় প্রায় বাধ্য হয়েই মসজিদে ডিপকল বসানো হয়েছে। এই পানির জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছি। কিন্তু এর কোন প্রতিকার পাচ্ছি না। ৬০ বছর বয়সি ভ্যান চালক মোশারফ হোসেন বলেন, আমি এখানে ছোট বেলা থেকেই থাকি। গত কয়েক বছর ধরে পানিতে এতোটা দুর্গন্ধ যে মুখে নিতে পারি না। তাই এলাকার মানুষ উদ্যোগ নিয়ে প্রায় সব মসজিদে ডিপকল বসিয়েছে।
চাকুরীজীবী ছোটন দেবনাথ জানান, পানির সমস্যা নিয়ে কথা বলতে বলতে জীনটা শেষ করে দিচ্ছি। এই নিয়ে কতো আন্দোলন সংগ্রাম করছি। কিন্তু এর কোন প্রতিকার নেই। উল্টো আমাদের বিভিন্ন দিক থেকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এলাকার কোন জনপ্রতিনিধিই এই পানির সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছে না।
গৃহবধূ পারুল বেগম বলেন, বাসার পানিতে দুর্গন্ধ। খাওয়া যায় না। পানি ফুটানোর পরও গন্ধ থাকে। এ কারণে লাইনে দাঁড়িয়ে হলেও টিউবওয়েলের পানি নিয়ে যাই। কিন্তু অনেক সময় এতো ভিড় থাকে পানি নিতে দুই-তিন ঘন্টা লেগে যায়।
আরিফুর রহমান নামে এক বাসিন্দা বলেন, ওয়াসার বাড়ি বাড়ি সরবরাহ করা পানি দুর্গন্ধ ও লালচে রঙের। এ পানি দিয়ে গোসল করলেও চর্মরোগ হচ্ছে।
গৃহবধূ লাকি আক্তার জানান, গত কয়েক মাস ধরে ওয়াসার পানিতে মারাত্মক দুর্গন্ধ। সেই সঙ্গে পানিও ঘোলাটে। ময়লায় ভরা। অবস্থা এমন যে পানি ফুটিয়েও পান করা যাচ্ছে না। ফিটকিরি দিয়েও পানি পান করা যাচ্ছে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও জুরাইন এলাকার বাসিন্দা নুর হোসেন বলেন, ওয়াসার পানি খারাপ না। কিন্তু এই পানিগুলো যে পাইপ দিয়ে আসে ওই পাইপগুলো একেবারেই খারাপ। এই এলাকায় পানির সমস্যার জন্য ওয়াসার কিছু কর্মকর্তার খামখেয়ালি ও অবহেলা দায়ি। তবে পানির এই সমস্যা সমাধানে আমার এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সব ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় কারখানার মালিক জড়িত হামলায়: বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফেরার তাড়া

শ্রীলঙ্কায় একটি কারখানায় নিয়োজিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে দেশে ফেরার তাড়াহুড়ো সৃষ্টি হয়েছে। ওই কারখানাটির মালিক ইস্টার সানডে’তে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ইনশাদ ইব্রাহিম। রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে দেমাতোগোদায় মহাবোধী ওয়েলাম্পিতিয়ায় অবস্থিত ওই কোম্পানি। সেখানে নিয়োজিত বাংলাদেশি শ্রমিকরা সবাই এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কাস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে চলে গেছে বলে একজন কর্মী জানিয়েছেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে। ওই কর্মচারী বলেছেন, এই কোম্পানিতে প্রায় ৬০ জন স্টাফ। এর মধ্যে সিনিয়ররা বাদে বাকি সব শ্রমিক নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। অন্যরা   ইব্রাহিম পরিবারের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
এতে প্রকাশিত রিপোর্টটি এ রকম- রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে দামাতাগোদায় একটি তিনতলা বিশিষ্ট বাংলো। কপারের গন্ধযুক্ত কারখানা এটি। উপরে উজ্জ্বল নীল ছাদ। কারখানাটির ভিতরে পিনপতন নিস্তব্ধতা।
তদন্তকারীদের সন্দেহ ইস্টার সানডে হামলার সঙ্গে যোগসূত্র আছে এই কারখানার। এর মালিক শ্রীলঙ্কার মশলা রপ্তানিকারক, টাইকুন বা ধনকুবের বলে পরিচিত এম ওয়াই ইব্রাহিমের তিন ছেলের একজন ইনশাদ ইব্রাহিম। রোববার সন্ত্রাসী হামলাকারীদের অন্যতম সে।  এম ওয়াই ইব্রাহিম ভারত সহ বিভিন্ন দেশে মশলা রপ্তানি করে থাকে। আর পরিবারটি ব্যবসায়ী পরিবারে পরিণত হয়েছে। এর প্রধান তিনিই।
ইস্টার সানডে’তে যে ৯ জন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হামলা চালিয়েছিল বলে পুলিশ শনাক্ত করেছে তার মধ্যে রয়েছে এম ওয়াই ইব্রাহিমের দুই ছেলে ইনশাদ ও ইলহাম ইব্রাহিম। সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, ওই দুই ভাই প্রতিজন ১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত সি-৪ বিস্ফোরক বহন করেছিল। এম ওয়াই ইব্রাহিম বর্তমানে নিরাপত্তা হেফাজতে। হামলার বিষয়ে তিনি অথবা তার তৃতীয় ছেলে কিছু জানতেন কিনা তা এখন তদন্ত করছে পুলিশ।
প্রায় ৭ মাস আগে ইনশাদ ইব্রাহিম দেমাতোগোদায় তার ওই কারখানাটি স্থাপন করেছে। বিস্ফোরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলোর সঙ্গে তার স্থাপিত ওই কারখানার কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা। তা ছাড়া তার কারখানার কোনো কর্মী এতে জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে সেখানকার কিছু কর্মচারীকে আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তবে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় নি।
বৃহস্পতিবার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মহাবোধী ওয়েলাম্পিতিয়ায় ওই কারখানায় পৌঁছে। এটি কর্মজীবী মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ একটি এলাকা। সেখানে কর্মরত প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য কাগজপত্র প্রস্তুত করতে দেখা যায়।  একজন কর্মচারী ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, ওইসব শ্রমিক (বাংলাদেশি) তারা সবাই দূতাবাসে পৌঁছে গেছে। আমরা প্রায় ৬০ জন স্টাফ। কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য সিনিয়র স্টাফরা বাদে বাকি সবাইকে আনা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
তদন্তকারীরা বলছেন, চারতলা বিশিষ্ট ওই ভবনে বিপুল পরিমাণের বিনিয়োগ করার পর থেকে সেখানে তদন্ত হয়েছে। এর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার রেকর্ড পাওয়া গেছে। একজন তদন্তকারী বলেছেন, আমাদের কাছে এই মর্মে তথ্য আছে যে, বিস্ফোরণের কয়েক সপ্তাহ আগে ইনশাদ তার এই কোম্পানির মালিকানা হস্তান্তর করে কিছু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কাছে। কোথা থেকে অর্থ এসেছে, যে অর্থে অল্প সময়ের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে এই কারখানা, আমরা তা তদন্ত করছি।
এই কারখানা লাগোয়া একটি অফিস। এটি একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের অফিস। এই অফিসের কর্মকর্তা বলেছেন, এখনও তার বিশ্বাস হয় না সন্ত্রাসী হামলার নেপথ্যে ইনশাদ জড়িত থাকতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ইনশাদের এই বিশাল অবকাঠামো দাঁড় করানোর সময় আমার ভবনের বেশ ক্ষতি হয়েছিল। আমি যখন ইনশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামত করতে লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
ইনশাদের কারখানার কাছেই একটি বড় স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে একটি গোডাউন। এর মালিকও ইব্রাহিম পরিবার। এটি বন্ধ। এর ভিতরে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা বা শ্রমিক ভিতরে থাকার কোনো লক্ষণ নেই।
কলম্বোর অভিজাত ফ্লাওয়ার টেরেস রোডে ইব্রাহিম পরিবারের একজন আত্মীয় বলেছেন, পরিবারের বয়স্ক ও নারীদের অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে।
দেমাতোগোদা ফ্লাইওভারের কাছেই তিন তলাবিশিষ্ট বাংলোর পিছনে একটি সাদা বিএমডব্লিউ। ধুলোবালি পড়ে তা সাদা হয়ে আছে। একটি সংকীর্ণ সড়কে তা পার্ক করা। গাড়ি ও ওই স্থানটি ঘেরাও করে রেখেছে পুলিশ। এই গাড়ি ও ওই বাংলো সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে ইব্রাহিম পরিবার জড়িত থাকার প্রথম ক্লু।
রাজধানী কলম্বোর সিনামন গ্রান্ড হোটেলে হামলার পর তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে এই গাড়িটিই শনাক্ত করতে পারেন। এই গাড়িটি ব্যবহার করে হোটেলে টার্গেট করা হয়েছিল। আর বাংলোটিতে ছিলেন ৩০ বছর বয়সী ফাতিমা। তিনি ইলহাম ইব্রাহিমের স্ত্রী। পুলিশ যখন তার বাংলোতে উপস্থিত হয় তখন তিনি আত্মঘাতী হয়েছিলেন। 
একজন তদন্তকারী বলেছেন, ওই বাংলোতে বসবাস করতো হামলাকারী ভাইয়েরা। হামলার কয়েক মিনিট আগে হোটেলে তাদের গাড়ি শনাক্ত করার পর আমরা উপস্থিত হই ওই বাংলোতে। এ সময় ফাতিমা বোমার বিস্ফোরণ ঘটান। এতে আমাদের তিনজন সদস্য নিহত হয়েছেন। আমরা ভিতরে দেখতে পাই তৃতীয় তলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওই তদন্তকারী আরো বলেছেন, ইব্রাহিম পরিবারের ওই দুই ছেলের বয়স ৩০ এর কোটায়। তারা অকল্পনীয়ভাবে উগ্রপন্থি হয়েছে। তারা দু’জনেই পড়াশোনা করেছে দেশের অভিজাত প্রতিষ্ঠানে, বৃটেন ও অস্ট্রেলিয়ায়। আমরা আরো জানতে পেরেছি, তারা ব্যবসার জন্য মাঝে মাঝেই আফ্রিকা সফরে যেত।
সূত্রগুলো বলেছে, ইব্রাহিম পরিবারের ইশানা এক্সপোর্টস প্রাইভেট লিমিটেড প্রাথমিকভাবে ভিয়েতনাম থেকে মরিচ আমদানি করে তা বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতো। এম ওয়াই ইব্রাহিমের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে। তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এতটাই যে, দুই বছর আগে সরকার তাকে প্রেসিডেন্সিয়াল এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

দল এবং সম্পদ নিয়ে কেন শঙ্কিত এরশাদ

নিজের সব সম্পত্তি ট্রাস্টের নামে দলিল করে দেয়ার পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সম্পদ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় রাজনৈতিক মহলে। এ নিয়ে কৌতূহল রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝেও। এর আগে দলের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনে এরশাদের একের পর এক সিদ্ধান্তে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, আদৌ কি তিনি নিজেই এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন নাকি নেপথ্যে অন্যকিছু। দল আর সম্পত্তি নিয়ে এরশাদ এবার নিজেই যেন আস্থাহীনতায় পড়েছেন। তা নাহলে থানায় জিডি করতে যাবেন কেন?
নিজের দল জাতীয় পার্টি ও সম্পদ নিয়ে স্বাক্ষর জালিয়াতির শঙ্কায় বুধবার বনানী থানায় সাধারণ ডায়েরি(জিডি) করেন এরশাদ। তার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে কেউ কেউ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি সাধন করতে পারে এমন আশঙ্কায় তিনি এ জিডি করেন। এ জিডি ঘিরে এখন সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক অঙ্গণে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাক্ষর জাল করে সম্পদ হাতিয়ে নেয়া হতে পারে এমন অভিযোগে জিডিতে নিজের নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন এইচ এম এরশাদ।
গত বুধবার তার পক্ষে বিরোধীদলীয় নেতার একজন প্রটোকল অফিসার, একজন কনস্টেবল ও আনসার সদস্য এবং তার এক ব্যক্তিগত সহকারী বনানী থানায় জিডির আবেদন নিয়ে যান।
সাধারণ ডায়েরির লিখিত আবেদনে স্বাক্ষর করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নিজেই। জিডির আবেদনে কারা স্বাক্ষর জালিয়াতি করে দল, সম্পদ ও তার পরিবারের ক্ষতি করতে পারে এমন কারো নাম উল্লেখ করেননি বিরোধীদলীয় নেতা। তবে পার্টির কয়েকজন নেতাকর্মী তার ও পরিবারের ক্ষতি করতে পারে এমন আশঙ্কায় এরশাদ জিডি করেছেন বলে মানবজমিনকে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক ব্যক্তিগত সহকারী। জিডি করার সময় উপস্থিত থাকা একজন জানান, স্যারের (এরশাদের) হাতের সই এলোমেলো হয়ে গেছে। যেকোন লোক নকল করতে পারে। এজন্য জিডি করে রাখা হল। বুধবার জিডিটি গ্রহণ করে নথিভুক্ত করেন সেই সময় বনানী থানায় দায়িত্বে থাকা একজন ডিউটি অফিসার। পরে, ১৫০২ নম্বর জিডি হিসেবে থানার নথিতে তা অর্ন্তভূক্ত করা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও চলমান সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার শঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতায় করা জিডিটি যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখছে বনানী থানা পুলিশ। বনানী থানার একজন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব নিয়েই তার শঙ্কার বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শায়হান ওয়ালী উল্লাহকে এরই মধ্যে তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল বিকালে তিনি মানবজমিনকে বলেন, উনার (এরশাদ) স্বাক্ষর করা একটি জিডি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এখনই কিছু বলতে পারছি না। এদিকে জাতীয় পার্টি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ ডায়েরিতে সাবেক এ রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, তার বর্তমান ও অবর্তমানে স্বাক্ষর নকল করে পার্টির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দলের বিভিন্ন পদ পদবী বাগিয়ে নেয়া, ব্যাংক হিসাব জালিয়াতি ও পারিবারিক সম্পদ, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য হাতিয়ে নেয়া ও আত্মীয়-স্বজনদের জানমাল হুমকির মুখে রয়েছে। দলের নেতৃত্ব ও তার সম্পদের কারণে অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ জালিয়াতির আশ্রয় নিতে পারে বলে শঙ্কার কথা জানান এরশাদ। তবে তার শারীরিক অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন এমন অপরাধ করতে না পারে, সেজন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাও চেয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, উনার (এরশাদ) কাছ থেকে অনেকে স্বাক্ষর নিয়েছেন বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নিরাপত্তা হিসেবে এই জিডি করা হয়। এদিকে, বেশকিছু দিন ধরে অসুস্থ ৯০ বছর বয়সী সাবেক সামরিক শাসক এরশাদ সমপ্রতি একটি ট্রাস্ট গঠন করে সেখানে তার সব সম্পদ দলিল করে দিয়েছেন। পাঁচ সদস্যের ট্রাস্টে এরশাদ নিজে সদস্য হিসেবে থাকলেও স্ত্রী রওশন এরশাদ আর ভাই জিএম কাদেরকে ট্রাস্টি হিসেবে রাখেননি। ট্রাস্টি বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন- এরশাদের ছেলে এরিক এরশাদ, একান্ত সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর খালেদ আক্তার, চাচাতো ভাই মুকুল ও তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। সবশেষ গত ৭ই এপ্রিল এইচ এম এরশাদ তার সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ট্রাস্ট গঠন করে দেয়ার পর থেকেই তিনি কিছুটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও মনে করছেন অনেকে।
এরশাদের প্রটোকলে থাকা একজন বলেন, ট্রাস্টে অনেককে রাখা হয়নি। এজন্য কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হতেও পারেন। এছাড়া দলের ও কাছের অনেকে নানা সময়ে বিভিন্ন কাগজ স্বাক্ষর করে নিয়ে যাচ্ছেন। স্যার (এরশাদ) শঙ্কা করছেন এসবের মধ্যে তার অজান্তে অনেকে সম্পদ ও দলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে জালিয়াতি করতে পারে। স্যার জিডিতে উল্লেখ করেছেন, তার মৃত্যুর পর এসব জালিয়াতি করা কাগজপত্র অকার্যকর হবে। এছাড়া, কারো কোন দাবি থাকলে তা সরাসরি যোগাযোগ করার জন্য বলেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যে হলফনামা জমা দেন তাতে তিনি বার্ষিক এক কোটি আট লাখ টাকা আয়ের কথা জানান। সম্পদের বিবরণীতে তিনি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, অনির্ধারিত ব্যবসা, বিভিন্ন কোম্পানি থেকে বেতন, সম্মানীর কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও রাজধানীর গুলশান ও বনানীতে সর্বশেষ তিনি দুটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন যার মূল্য যথাক্রমে ৬ কোটি ২০ লাখ ও ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকে এরশাদের ঋণ রয়েছে ৫৬ লাখ টাকা।
তিনি নিজেও এই ব্যাংকের একজন পরিচালক। ব্যাংকটি থেকে তিনি বার্ষিক ৭৪ লাখ টাকা সম্মানি হিসেবে পান। বেশ কয়েক মাস ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ এরশাদকে সবশেষ বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় দেখা যায়নি। নির্বাচনের আগে অসুস্থ হয়ে ভর্তি হন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে(সিএমইচ)। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে। সেখান থেকে ফেরার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ভোট দিতে নিজের নির্বাচনী এলাকা রংপুরেও যাননি এরশাদ। নির্বাচনের পর গত ৬ই জানুয়ারি হুইল চেয়ারে চড়ে সংসদে যান এইচ এম এরশাদ, শপথ নেন আইনপ্রণেতা হিসেবে। এরপর ২০ জানুয়ারি আবারো চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান এরশাদ। তখন জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয়, রক্তে হিমোগ্লোবিন ও লিভারের সমস্যায় ভুগছেন তিনি। নতুন পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনের ২৬ দিনের মধ্যে মাত্র একদিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা।

কিম-পুতিন শীর্ষ বৈঠক: বন্ধুত্বের বাঁধনকে আরো শক্ত করার অঙ্গীকার

প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর নগরী ভ্লাদিভস্তকের কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের রাস্কি দ্বীপে দুই নেতার এই বৈঠক হয়। বৈঠকে কোরীয় উপদ্বীপ অঞ্চলে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার কথা আলোচনায় এনেছে রাশিয়া। কিন্তু কিম জং উনের দৃষ্টি অন্যদিকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে। তাই তিনি রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন এ বৈঠকে।
বিবিসি জানিয়েছে, দুই নেতা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং কিম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর রুশ সহায়তা চেয়েছেন। ভিয়েতনামের হ্যানয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
কিন্তু রুশ রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে উদ্বোধনী বক্তব্যে রুশ ও উত্তর কোরীয় নেতা দু’দেশের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন।
পুতিন বলেন, তিনি কোরিয়ান অঞ্চলে বিরাজমান উত্তেজনা প্রশমনের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে চান। তার ভাষায়, আমি আত্মবিশ্বাসী যে আপনার এই রাশিয়া সফরের ফলে কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে সমাধান করতে পারি, এবং চলমান প্রক্রিয়ায় রাশিয়া কীভাবে ইতিবাচক উপায়ে ভূমিকা রাখতে পারে তা ভালোভাবে অনুধাবনে আমাদের সাহায্য করবে।
এর আগে উত্তর কোরিয়ার নেতা বুধবার সীমান্ত অতিক্রম করার পর তাকে রাশিয়ার কর্মকর্তারা উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। এরপর তিনি ট্রেনে করে পৌঁছে যান ভ্লাদিভস্তক। খাসান সীমান্ত অতিক্রম করার পর তিনি রাশিয়ান টিভিকে বলেছেন, আমার দেশের জনগণের উষ্ণ অনুভূতি সঙ্গে নিয়ে এসেছি রাশিয়ায়। আমি এরই মধ্যে বলেছি, এই সফর সফল ও অর্থপূর্ণ হবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল মুখপাত্র দমিত্রি পেসকভ বলেছেন, উত্তর কোরিয়া নিয়ে ৬ জাতির আলোচনা বর্তমানে অচল অবস্থায় আছে। এটি দুই কোরিয়া, চীন, জাপান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে।
বৃহস্পতিবারের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার পতাকা দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া দেখাতে চাইছে যে, তার শক্তিধর মিত্র আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এ সময়ে তাদের পাশে বড় শক্তিধর কাউকে দেখানো উত্তর কোরিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হ্যানয়ের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য উত্তর কোরিয়া দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে। এ মাসের শুরুর দিকে তারা দাবি করেছে, পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে মাইক পম্পেওকে। উত্তর কোরিয়া তার কথাবার্তাকে ‘ননসেন্স’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বলেছে, তার পরিবর্তে অধিক সতর্ক এমন কাউকে আলোচনায় আনতে হবে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় মহাশক্তিধর কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন তার কমিউনিস্ট মিত্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে উত্তর কোরিয়ার। দেশটি তখন প্রধান মিত্র হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের অধীনে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং ২০১৪ সালে তিনি সোভিয়েত-যুগ পরবর্তী উত্তর কোরিয়ার অধিকাংশ ঋণ সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করতে শুরু করে।

সোনিয়াদের যন্ত্রণার জীবন, চাপা কান্না by শাহাবুল শাহীন

প্রতিমুহূর্তের যন্ত্রণা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কাটছে সোনিয়া বেগমের (২৪) জীবন। ঠিক ছয় বছর আগে ২৪ এপ্রিল সকালে রানা প্লাজার সাততলায় সবে সেলাই মেশিনের কাজ শুরু করেছিলেন সোনিয়া। হঠাৎ বিকট শব্দে অন্ধকার হয়ে যায় চারদিক। বের হতে পারছিলেন না, ডান পা চাপা পড়ে একটি পিলারের নিচে। এভাবেই তিন দিন থাকার পরে উদ্ধার পেলেও শেষ পর্যন্ত ডান পা কোমরের নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়। এরপর থেকেই শুরু চাপা কান্না আর যন্ত্রণার জীবন।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার ধস এ রকম হাজারো পরিবারের দুর্যোগের কারণ হয়ে আছে। সাভার বাসস্ট্যান্ডের আটতলা রানা প্লাজার ছয়টি তলাতেই ছিল পোশাক কারখানা। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সর্বশেষ হিসাবে ভবন ধসে প্রাণ গেছে ১ হাজার ১৩৮ জনের। আহত ১ হাজার ১৬৭ জন, যার মধ্যে ২৭ জন অঙ্গ হারিয়েছেন। নিখোঁজ আছেন ১৫৮ জন।
রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গাইবান্ধার। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্যমতে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে গাইবান্ধার ৪৯ জন। আর ১১ জন নিখোঁজ ও শতাধিক আহত হন।
অঙ্গ হারানো শ্রমিক সোনিয়া, লাভলী খাতুন, রিক্তা খাতুনদের জীবন কাটছে ধুঁকে ধুঁকে। তাঁদের কাছে আগের জীবনটা এখন স্বপ্নের মতো, অন্তত সেখানে প্রতিদিনের যন্ত্রণাগুলো ছিল না।
জেলার সাদুল্যাপুরের দক্ষিণ দামোদরপুরে কথা হয় সোনিয়ার সঙ্গে। অনেকটা কিশোর বয়সেই বিয়ে হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে স্বামীসহ রানা প্লাজার পোশাক কারখানায় কাজ নেন তিনি। চাকরির ২২ দিনের মাথায় ভবনটি ধসে পড়ে। স্বামী বাইরে থাকায় বেঁচে যান। ওই ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাওয়া ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার করে টাকা পাচ্ছেন। এই টাকাতেই চলছে সংসার ও চিকিৎসা। সোনিয়া বলেন, শীতকালটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয়। ব্যথা করে, জ্বালা–যন্ত্রণা হয়। এ যন্ত্রণা অবর্ণনীয়। তখন প্রায়ই যেতে হয় চিকিৎসকের কাছে।
আক্ষেপ করে সোনিয়া বলেন, ‘এক জীবনে যাদের কারণে এত কষ্ট পাইলাম, সেই লোকগুলোর এখনো শাস্তি হইতে দেখলাম না। এইটাও অনেক বড় কষ্ট।’
স্বামী মিজানুর আর সাড়ে তিন বছরের সন্তান নিয়ে তবু সোনিয়ার সংসারটা কোনোমতে চলছে। কিন্তু একই উপজেলার চকগোবিন্দপুরের রিক্তা খাতুন হাতও হারিয়েছেন, স্বামীও তাঁকে ছেড়ে গেছেন। এখন ক্ষতিপূরণের ১২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশে চলছে দুই সন্তান নিয়ে সংসার। আর কাটা হাতেও যন্ত্রণার শেষ নেই।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গার লাভলী খাতুন (৩৭) রানা প্লাজায় বাঁ পা হারিয়েছেন। এরপর থেকেই খুঁড়িয়ে চলছে জীবন। তিনি বলেন, ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ আর স্বামীর আয়ে সংসার চললেও যন্ত্রণাগুলো কমছে না। শীতকাল আসে খুবই কষ্ট নিয়ে। রানা প্লাজা ধসে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন লাভলীও।
সাদুল্যাপুরের নলডাঙ্গা গ্রামের বাঁ পা হারানো শিল্পী খাতুন জীবিকার তাগিদে আবারও ফিরেছেন সাভারে। তিনি কাজ করতে পারেন না, হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয়। মুঠোফোনে শিল্পী বলেন, ‘হুইলচেয়ারে চলতে–ফিরতে হয়। এখনো ক্ষত জায়গায় জ্বালাপোড়া করে। খুবই কষ্ট করে বেঁচে আছি ছেলেমেয়ে দুইটার জন্য।’ এখন ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ এবং স্বামীর ও গরু পালনের আয়ে চলছে সংসার।
নিখোঁজ–নিহতদের পরিবারগুলোর হতাশা
১১ বছরের কামরুল মিয়া এখন মায়ের কথা তেমন বলতেই পারে না। তার মা কামনা খাতুনের (২২) লাশটাও পাওয়া যায়নি। সাদুল্যাপুরের দামোদরপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাঙ্গামোড় গ্রামের সোনা মিয়ার স্ত্রী কামনা। একই গ্রামের আবদুল বারীর মেয়ে বীথি খাতুনেরও (২১) লাশ পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ ভাঙ্গামোড় গ্রামে কথা হয় সোনা মিয়া ও আবদুল বারীর সঙ্গে। তাঁরা জানান, কোনো ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি তাঁরা। আবদুল বারী বলেন, ‘ট্যাকা পাওয়া তো দূরের কতা। সরকার হামার ছোলটার খোঁজই দিব্যার পায় নাই।’
একই গ্রামের (ভাঙ্গামোড়) দিনমজুর ওয়াহেদ আলী রানা প্লাজা ধসের ১৬ দিন পরে ছেলে সবুজ মিয়ার (১৮) দেহাবশেষ পেয়েছিলেন। তাঁদের বাড়িতে কেউ গেলেই সবুজ মিয়ার মা মনজিলা বেগম এখনো ছেলেকে ফিরে চান। বাবা ওয়াহেদ আলী বলেন, প্রত্যেক নিহত শ্রমিকের পরিবারের সদস্যদের সরকার চাকরি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এখনো সে আশ্বাস পূরণ হয়নি। কষ্টে কাটছে তাঁদের দিন।
একই উপজেলার কিশমত হলদিয়া গ্রামের স্মৃতি রানীর (২৫) পরিবারের অবস্থাও করুণ। মা সন্ধ্যা রানী রীতিমতো খাবারের কষ্টে আছেন। তিনি বললেন, স্মৃতির টাকা দিয়ে সংসার চলত। তাঁর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এখন সংসারে চরম টানাটানি।
নিহত স্মৃতির বড় বোন মাধবী রানী বলেন, ‘আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের টাকার চেক দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, নিহত পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেল, চাকরি দূরের কথা, কেউ খোঁজও নেয়নি।’
গত সোমবার বিকেলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম ইদ্রিস আলী ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারগুলোর বিষয়ে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনার পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে হতাহতের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

এখন সব মরে গেছে, কোনো প্রতিবাদ নেই -এম হাফিজ উদ্দিন খান

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও দেশের সুশাসনের দিকে ইঙ্গিত করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেছেন, ‘দুঃখজনক, এর কোনো প্রতিবাদ নেই। আমরা কেউ মাঠে নামি নাই। বাঙালিরা এত প্রতিবাদী ছিল। বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তরে কত প্রতিবাদ করেছে এই বাঙালি। এখন সব মরে গেছে কেন, বুঝতে পারলাম না।’
শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক গোলটেবিল বৈঠকে হাফিজ উদ্দিন খান এসব কথা বলেন। দি ঢাকা ফোরাম নামের একটি সংগঠন ‘গণতন্ত্র ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, শুধু নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র হয় না। তবে গণতন্ত্রের শুরুটা হয় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে উন্নয়ন সুবিধা সবাই পাচ্ছে না। বাংলাদেশে এখন উন্নয়নের যে স্লোগান চলছে, ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলেও তা ছিল। কিন্তু সে উন্নয়ন সবাইকে আকৃষ্ট করতে পারেনি।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে এসেছে উল্লেখ করে সাবেক এই গভর্নর বলেন, এই খাতে ঋণ প্রবাহ কমে ১২ শতাংশ নেমে এসেছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এটি ১৬ শতাংশ ছিল। বড় বড় বিনিয়োগ করতে গিয়ে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অবহেলা করা হচ্ছে। তারা যথেষ্ট ব্যাংক ঋণ পায় না বললেই চলে। বড় বড় ঋণ পুঁজিপতিদের দখলে।
শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৯০-এর দশকে শেয়ারবাজারে যে কেলেঙ্কারি ঘটেছিল সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। রাষ্ট্র ও সরকার সেই শিক্ষা নেয়নি বলেই ২০১০ সালে কেলেঙ্কারি হয়। তার ধারাবাহিকতা এখনো আছে। কারা, কীভাবে এর সঙ্গে জড়িত, তা সরকার জানে। অথচ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, গণতন্ত্র সংকুচিত হলে পুঁজির অসম বিকাশ ঘটে। আর এই কারণেই এ সরকারের নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীরা। কারণ, পুঁজিই এখন ক্ষমতার উৎস, জনগণ নয়। এতে জনগণের স্বার্থ সেই অর্থে গুরুত্ব পায় না। যার ফলে জবাবদিহি নেই, সুশাসনও নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমান উন্নয়নের ধরনে জবাবদিহির অভাব ও স্বচ্ছতার অভাব আছে। সড়ক, রেলপথে বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। এসব প্রকল্পের ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। এর কারণ, যারা নীতিনির্ধারক তারাই এসব প্রকল্পের পেছনে আছেন। এসব প্রকল্প ব্যয়ের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, দোষী, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার তৎপর। কিন্তু জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার অতটা তৎপর নয়।
জনগণ প্রশাসনের কাছে অসহায় বলে মন্তব্য করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। সব অন্যায় অবিচারের কাছে আমরা ১৭ কোটি লোক অসহায় হয়ে আছি। দেশে সরকার থাকবে আর সুশাসন থাকবে না, এটা হতে পারে না। আমি আশ্চর্য হয়ে যাই এ রকম বিনা ভোটের একটা সরকার, লজ্জাও পায় না। ভোটাধিকার না থাকলে নাগরিকত্বও থাকে না।’
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘এই সরকার ডাকাত সরকার। ৩০ ডিসেম্বর ডাকাতি করে ভোট নিয়েছে। আবার বলছে, উন্নয়ন হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। যে জিডিপিতে সমতা নেই তাকে উন্নয়ন বলা যাবে না। এটা লুটেরাদের উন্নয়ন।’
বৈঠকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য দেন।

প্রেমে রাজি না হওয়ায় স্কুলছাত্রীকে কুপিয়ে জখম

প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্কুলছাত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়েছে জুয়েল আহমদ (২০) নামে এক বখাটে যুবক। আহত স্কুলছাত্রী মায়মুনা জান্নাত ছামিরা (১৪) কুলাউড়া উপজেলার আল-হেরা ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী। জানা যায়, গতকাল দুপুর আড়াইটায় উপজেলার মীরশংকর এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ঘটনাস্থল থেকে বখাটে জুয়েলকে আটক করে গণধোলাই দেয়। এ সময় পরিস্থিতি শান্ত করতে উপস্থিত হন স্থানীয় ভূকশিমইল ইউপির চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির। খবর পেয়ে কুলাউড়া থানার এস আই হারুন আল রশিদ ঘটনাস্থলে গিয়ে জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসেন।
এলাকাবাসী ও পরিবারের স্বজনরা ছামিরাকে গুরুতর আহত অবস্থায় কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে। সেখানে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত ডাক্তার আরএমও জাকির হোসেন তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। এ বিষয়ে আহত স্কুলছাত্রী ছামিরার মা সাহারা বেগম বাদী হয়ে জুয়েল আহমদকে আসামী করে কুলাউড়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ছামিরা স্কুলে যাওয়া আসার সময় প্রায়ই মীরশংকর গ্রামের বকুল মিয়ার ছেলে জুয়েল আহমদ তার গতিরোধ করত এবং প্রেমের প্রস্তাব দিতো।
সর্বশেষ গতকাল দুপুর আড়াইটায় ছামিরা ও তার ছোট বোন মনিরা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় মীরশংকর এলাকায় অপেক্ষমান জুয়েল তাকে প্রেম নিবেদন করে। এতে রাজি না হলে সে তার হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছামিরার মাথায়, হাতে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। বিগত ৩ বছর পূর্বেও স্থানীয় সপ্তগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ছামিরাকে একইভাবে উত্ত্যক্ত করতো জুয়েল। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আছমল, স্কুলের প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির, ম্যানেজিং কমিটির রাহিব উদ্দিন, শিক্ষক সফিক উদ্দিনসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে বিষয়টি অবহিত করলে তারা সপ্তগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে সালিশি বৈঠকে জুয়েলকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তখন জুয়েল মুচলেকা দিয়ে রেহাই পায়। এরপর মেয়েটির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তার বাবা-মা ওই স্কুল থেকে তাকে বদলি করে কুলাউড়া আল হেরা ক্যাডেট স্কুল এন্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করান।
আল-হেরা ক্যাডেট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাশুক বলেন, মেয়েটি অত্যন্ত সহজ সরল। পড়ালেখায় বেশ ভালো। বখাটে জুয়েলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। 
কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ ইয়ারদৌস হাসান বলেন, এ বিষয়ে থানায় মামলা হয়েছে। আসামি জুয়েল থানা হাজতে আটক রয়েছে। আজ রোববার মৌলভীবাজার জেল হাজতে প্রেরণ করা হবে।

কীর্তিমান এক সাংবাদিকের বিদায়

বাংলাদেশে পরিবেশ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও সময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর মাহফুজ উল্লাহ আর নেই। থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ আন্তর্জাতিক হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বেলা ১১টা ৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তার মেয়ে নুসরাত হুমায়রা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্টাটাসে মাহফুজউল্লাহ’র মৃত্যুবরণের সংবাদটি নিশ্চিত করেন। কিছুদিন ধরে হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি ও ফুসফুসের জটিলতায় ভুগছিলেন কীর্তিমান এই সাংবাদিক। ২রা এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। স্কয়ারে কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১১ই এপ্রিল তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ব্যাংককে নিয়ে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে ব্যাংককে একবার তার বাইপাস সার্জারিও হয়েছিল।
লেখক, সাংবাদিক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও পরিবেশবিদ মাহফুজউল্লাহ ১৯৫০ সালের ১০ই মার্চ নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।
তার পিতার নাম হাবিবুল্লাহ ও মায়ের নাম ফয়জুননিসা বেগম। ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত কমরেড মুজফফর আহমেদের দৌহিত্র। তার বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ।
তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে ঊনসত্তরের ১১ দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়েনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্ররাজনীতির কারণে আইয়ুুব খানের সামরিক শাসনামলে তাকে ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে পদার্থবিদ্যা ও ৭৪ সালে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনেই মাহফুজ উল্লাহ সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের একসময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার জন্মলগ্ন থেকেই এ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। মাঝে চীন গণপ্রজাতন্ত্রে বিশেষজ্ঞ হিসেবে, কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপদূতাবাসে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে কাজ করেছেন তিনি। উপস্থাপনা করেছেন রেডিও ও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান। সর্বশেষ তিনি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগে শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। সাম্প্রতিক দশকে বাংলাদেশে টেলিভিশন টকশোর সাহসী ও আলোচিত কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি।
মাহফুজউল্লাহ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন পরিবেশবিদ ছিলেন। তিনিই প্রথম পরিবেশ সাংবাদিকতা শুরু করেন বাংলাদেশে। তিনি সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার-এর আন্তর্জাতিক পরিচালনা পর্ষদের প্রথম বাংলাদেশী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।
বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় মাহফুজউল্লাহ লেখা বইয়ের সংখ্যা ৫০ এর অধিক। তার সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে- প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ: আ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি; যাদুর লাউ; যে কথা বলতে চাই; অভ্যুত্থানের ঊনসত্তর; পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ জান্তা ও জনতা; পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন: গৌরবের দিনলিপি (১৯৫২-৭১); উলফা অ্যান্ড দ্য ইনসারজেন্সি ইন আসাম; বেগম খালেদা জিয়া: হার লাইফ হার স্টোরি; স্বাধীনতার প্রথম দশকে বাংলাদেশ; মুক্তজীবন রুদ্ধপ্রাণ; পাঠকের চোখে জাসদ; স্বরূপ অন্বেষা; এ কী কেবলই প্রেম। এসবের বেশিরভাগই পৃথিবীর বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে সংগৃহীত আছে। উল্লেখ্য, গত ২১শে এপ্রিল তার মৃত্যুর খবরও ছড়িয়েছিল। কিন্তু তার মেয়ে নুসরাত তখন জানিয়েছিলেন, তার বাবা বেঁচে আছেন।
মাহফুজউল্লাহর মেয়ে নুসরাত হুমায়রা জানিয়েছেন, শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় ব্যাংকক থেকে তার বাবার লাশ দেশে আসবে। আজ জোহরের নামাজের পর ঢাকার গ্রীন রোডের জামে মসজিদে ও পরে জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্ত্বরে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। বড় ভাই প্রফেসর ড. মাহবুবউল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, মাহফুজউল্লাহর মরদেহ মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
এদিকে মাহফুজউল্লাহর মৃত্যুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক জানিয়েছেন। শোকবার্তায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন- ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মরহুম মাহফুজ উল্লাহর বলিষ্ঠ ও সাহসী ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। মানুষের বাক-ব্যক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর ধারালো লেখনি ও সাহসী উচ্চারণ দেশের মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছিল। তাঁর লেখনি ছিল সবসময়ই সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পক্ষে। তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও কর্তব্যবোধ ছিল সর্বজনস্বীকৃত এবং প্রশ্নাতীতভাবে গৃহীত। সাংবাদিকতা জগতে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হবার নয়। বিএনপি মহাসচিব শোকবার্তায় বলেন- ‘সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালনে বরাবরই তিনি ছিলেন নির্ভীক ও দ্বিধাহীন। অবৈধ সরকারের রক্তচক্ষুর কাছে তিনি কখনোই মাথানত করেননি। সরকারী ক্রোধের পরোয়া না করে গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর উচ্চারণ ছিল শাণিত ও সুস্পষ্ট। বর্তমান দুঃসময়ে তাঁর মতো একজন ঋজু ও দৃঢ়চেতা মানুষের বড়ই প্রয়োজন ছিল। দেশে ভয় ও শংকার বর্তমান পরিস্থিতিতে সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর মতো মানুষের অনুপস্থিতি গভীর শুন্যতার সৃষ্টি করবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিব তাদের শোকবার্তায় মরহুম মাহফুজউল্লাহর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা, তাঁর শোকাহত পরিবারবর্গ, আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়াও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন শোকপ্রকাশ করেন।