Monday, May 18, 2020

একজন সেনাপুত্রের গল্প: ‘আমি জানলাম, আমার বোন আসলে আমার মা’

শৈশবটা আনন্দেই কাটিয়েছিলেন এলবার্ট গিলমোর। এরপর কৈশোর শেষে সময়ের আবর্তে যুবকে পরিণত হলেন। এসব প্রায় ৬০ বছর আগের কথা। তখন ১৯৬৫ সাল। গিলমোর ২১ বছরে পা দিয়েছেন। বিয়ে করতে চান। সেজন্য জন্ম সনদ দরকার তার। মায়ের কাছে জন্ম সনদ চাইলেন। কিন্তু তার মা জন্ম সনদ দিতে ইতস্তত করছিলেন। জন্ম সনদটায় লুকিয়ে ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় গোপন কথা। সনদের যেখানে তার মায়ের নাম থাকার কথা সেখানে তার বড় বোনের নাম লেখা। বাবার নামের জায়গাটা ফাঁকা। অবাক বিস্ময় আর অবিশ্বাস নিয়ে গিলমোর জানতে পারলেন, তার বড় বোন আসলে তার বোন নন, তার মা। 
সেদিনকার ঘটনা আর অনুভূতি আজও স্পষ্ট মনে আছে এলবার্টের। ভুলেননি। ভোলার কথাও নয়। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ব্যাপারটা খুবই অপ্রীতিকর ছিল। কিন্তু মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সেদিনের ওই আবিষ্কার তার ২১ বছরের জীবন উলটপালট করে দিয়েছিল। তিনি জানতে পারলেন, এতদিন ধরে যাদের নিজের বাবা-মা ভেবেছেন তিনি তারা আসলে নানা-নানী।
এলবার্ট তার জন্মদাত্রী মা রুবি গিলমোরের কাছে পুরো সত্যটা জানতে চাইলেন। রুবি তাকে বলেন, তার বাবার নাম এলবার্ট কার্লো। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও সেনা ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গিলমোরের জন্মভূমি নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে মোতায়েন করা হয় তাকে। রুবির বয়স তখন ১৭। লন্ডনবেরির এংলিংটনে তার বাড়ির কাছেই এলবার্টের ঘাঁটি ছিল। সেখানেই দুজনের দেখা হয়। উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছর আগে, ১৯৪৪ সালে এলবার্ট চলে যান। অপারেশন নেপচুনের জন্য ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে মোতায়েন করা হয় তাকে। ওই বছরের নভেম্বরেই এক শিশুর জন্ম দেন রুবি। প্রিয়তমের নামেই শিশুর নামকরণ করেন। রুবির ধারণা, নরম্যান্ডিতে দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যু হয় এলবার্টের।
মায়ের কাছ থেকে নিজের পরিচয় সম্পর্কে সত্য জানার পর এলবার্ট পুরো বিষয়টা নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাননি। নানা-নানী ও মায়ের প্রতি সম্মানবোধ থেকে সব মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি করেন। এ বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে খুব একটা আলোচনা করেননি আর। কিন্তু ৩৫ বছর পর, নব্বইয়ের দশকে তার মেয়ে ক্যারেন কুক নিজের বাবার এই অভূতপূর্ব ঘটনা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
বেশ অল্প বয়স থেকেই ক্যারেন জানতো যে তার দাদা একজন আমেরিকান সেনা ছিলেন। এলবার্ট কার্লোর একটি ঠিকানা জানতেন রুবি। যুদ্ধের সময় রুবিকে একটি সিগারেটের প্যাকেটে ওই ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন তিনি। ৫০ বছর পর ওই ঠিকানা ব্যবহার করে এলবার্টের এক ফুফুর সন্ধান খুঁজে বের করেন ক্যারেন। ক্যারেন জানান, আমি আমার বাবাকে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হিসেবে তার আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছিলাম। আমি জানতাম তার মধ্যে ওই আমেরিকান আত্মীয়দের জন্য সবসময় একটা টান কাজ করে।
ক্যারেনের অনুসন্ধানে বিস্ফোরক এক তথ্য বের হয়ে আসে। ক্যারেন জানতে পারেন, তার ২০ বছর আগে মারা গেছেন, ৫০ বছর আগে নয়। এলবার্ট যখন প্রথম তার বাবার পরিচয় সম্পর্কে জেনেছিলেন, তখন তার বাবা বেঁচে ছিল। যুদ্ধ শেষে ফের বিয়ে করেছিলেন কার্লো। দুই পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। এলবার্টকে তার বাবার একটি ছবি পাঠান তার ফুফু। বিস্মিত চোখে বাবার সঙ্গে নিজের চেহারার মিল আবিষ্কার করেছিলেন এলবার্ট। পরবর্তীতে আমেরিকায় ভ্রমণ করেন তিনি। সে স্মৃতিচারণ করে বলেন, সব অবাস্তব লাগছিল। আমার মধ্যে আমি আমার বাবার ছায়া দেখতে পারছিলাম। আমাকে কিছুই ব্যাখ্যা করতে হয়নি, কিছুই প্রমাণ করতে হয়নি। সবাই জানতো আমি কে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের চেয়ে আমেরিকাকে বেশি আপন মনে হয়েছিল আমার।
আমেরিকায় নিজের বাবার কবর পরিদর্শন করেন এলবার্ট। এ নিয়ে তিনি বলেন, সমাধির প্রস্থরখ-টি তুষারে ঢাকা পড়ে গেছিল। আমি সেগুলো সরিয়ে তার নাম দেখেছিলাম। মনে হয়েছিল ভেতর থেকে বিশাল একটা বোঝে যেন নাই হয়ে গেছে। সেখান থেকে চলে আসার সময় জীবনকে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছিল। আর কোনো অপেক্ষা নয়। নিজের পরিচয় নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ নয়।
আমেরিকা থেকে ফিরে বাবার একটি ছবি মাকে দেখান এলবার্ট। ছবি দেখেই রুবির চোখ দিয়ে অশ্রু বেয়ে পড়ে। এলবার্ট বলেন, তিনি খুব কষ্ট নিয়ে কেঁদেছিলেন। তার জন্য ব্যাপারটা খুব কঠিন ছিল। বাবা ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিল। তিনি রুবিকে বলেন, যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরতে পারেননি কার্লো। তাকে সরাসরি আফ্রিকায় মোতায়েন করা হয়। কিন্তু তিনি আজীবন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের যুদ্ধের সময়কার পয়সা নিজের কাছে রেখেছিলেন।

তুতেনখামেনের রহস্য উদঘাটন!

মিসরের মমিকে ঘিরে রহস্যের ঘনঘটা কম নেই। বিখ্যাত হলিউডি ছবি হোক বা জমজমাট গল্পকাহিনি— সারা পৃথিবী জুড়েই এর আবেদন আজও একই রকম। মমিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রহস্য আর বিতর্ক যে তুতেনখামেন নামের এক বালক রাজার মমিকে ঘিরে, তা নিয়েই সত্যিই সন্দেহের অবকাশ নেই। দীর্ঘ সময় পরে এই মমিকে রাখা হয়েছিল দর্শকের চোখের আড়ালে। এবার তাকে প্রকাশ্যে আনা হলো।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘লাইভসায়েন্স’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, বেশ কয়েক বছর ধরেই বন্ধ ছিল তুতেনখামেনের সমাধিস্থল। এবার তা আবার খুলে দেয়া হলো সমাধিক্ষেত্রটি।
সমাধিক্ষেত্রটিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। কেবল তাই নয়, তুতেনখামেনের সমাধিটিরও স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। জানা যাচ্ছে, সমাধি সামান্য কাত হলেও অঘটন ঘটতে পারে, এই আশঙ্কায় নাকি অত্যন্ত সাবধানে তাকে সরানো হয়েছে। সেই সঙ্গে মন্ত্রও পড়া হয়েছে। ১২ জন ব্যক্তি নাগাড়ে মন্ত্র পড়ে গিয়েছেন, সরানোর সময়ে।
তবে কোনো অঘটন ঘটেনি। সমাধিতে যাতে ঠিকভাবে বাতাস ঢুকতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তিন হাজার বছরের পুরনো সমাধিক্ষেত্র যাতে আরো বহু বছর ধরে একই রকম থাকতে পারে সে জন্য মিসরের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে সকলেই সচেতন।
অবশেষে খুলে দেয়া হয়েছে দরজা। সাধারণ পর্যটকরা আবার চাক্ষুষ করতে পারবেন তুতেনখামেনকে। রহস্যময় ফারাও নতুন করে ভাবাবেন সকলকে। চিরকালীন এক রহস্যে মোড়া সময় আবার যেন জীবন্ত হয়ে উঠবে।
২০৬ বছর পর সন্ধান নেপোলিয়নের বিপুল গুপ্তধনের
সম্রাট নেপোলিয়নের সোনা। ২০৬ বছর যার সন্ধানে হন্যে হয়ে খুঁজছেন বহু মানুষ। প্রায় ৮০ টনের সেই বিপুল স্বর্ণ ভাণ্ডারের হদিস কি মিলল অবশেষে? রাশিয়ার এক বিজ্ঞানী সম্প্রতি সেই দাবিই করলেন। ভায়াচেসলাভ রিজকোভ দাবি করেন, সন্ধান পাওয়া গেছে সেই সোনার। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, স্মোলেনস্ক এলাকার সেমলেভো বা নেপোলিয়ান লেকে সোনা রয়েছে। বহু ইতিহাসবিদের দাবি এমনই। রিজকোভের দাবি, সেমলেভো নয়, সম্রাট আসলে এই জায়গা থেকে ৪০ মাইল দূরে লুকিয়েছিলেন এই সোনা। আসল এই সোনা রয়েছে লেক বোলশায়ায়। নেপোয়িলনই রাজা আলেকজান্ডার প্রথম-এর দৃষ্টি ঘোরাতে লেক সেমলেভোর কাছে পাঠিয়েছিলেন। আসলে নাকি ১৮১২ সাল থেকে মস্কোর কাছের এই অঞ্চলেই রয়েছে সোনা। নেপোলিয়ানের ঘনিষ্ঠরাই এই কাজে তাকে সাহায্য করেন বলেও দাবি রিজকোভের। বেলারুশ সীমান্তের কাছেই সেই সোনা লুকিয়ে রাখা রয়েছে।
রুডনিয়ার কাছে মস্কো থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে বোলশায়া রুতাভেচ লেকে এই সোনা ও গুপ্তধন ফেলে দেয়া হয় বলেও দাবি করেছেন ইতিহাসবিদ। বেশ কিছু সোনা গলিয়ে বার তৈরি করেও জলে ফেলে দেয়া হয়েছিল আলেকজান্ডার প্রথমকে ধোঁকা দিতে। ইতিহাসবিদদের বহু দিনের দাবি, ৪০০টি ওয়াগন ভর্তি সোনা নেপোলিয়নের ৫০০ জন ঘোড়সওয়ার ও ২৫০ জন এলিট ওল্ড গার্ডের প্রহরায় ছিল। নেপোলিয়ন নিজে এই গুপ্তধন ও সোনার সমাধিস্থ হওয়া দেখতে গিয়েছিলেন, জানান রিজকোভ। ডিসেম্বরের ঠাণ্ডায় ওয়াগন ভর্তি সোনার সবটাই ফেলে দেয়া হয়েছিল জলাশয়ে। ১৯৮০ সালে এই লেকের পানিতেই প্রচুর পরিমাণে রুপা মিলেছিল। ওয়াল্টার স্কট তার দ্য লাইফ অব নেপোলিয়ন বোনাপার্টে উল্লেখ করেছেন এই সোনার কথা।
এই বিপুল পরিমাণ সোনা নিয়ে উৎসাহ আরো বেড়েছে এর পর থেকেই। তবে এখন পর্যন্ত সেমলেভো লেক থেকে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হলেও কোনো দিনই সোনাদানা উদ্ধার হয়নি। ৬০ ও ৭০ এর দশকে রাশিয়া এই সোনা উদ্ধারের চেষ্টা করেছে অসংখ্যবার কিন্তু সফল হয়নি। বহু বছর ধরে এই এলাকায় সোনার সন্ধান করছেন ভøালাদিমির পোরিভেইভ নামে এক ইতিহাসবিদ। তিনি বলছেন, রিজকোভের দাবি ভিত্তিহীন। পোরিভায়েভ বলেন, ডিসেম্বরের মাঝে বরফ জমা লেকে কেন সোনা রাখা হবে এর কোনো যুক্তি নেই। তবে প্রাচীন আমলের সোনার সন্ধানে লেকগুলো নিয়ে উৎসাহ বেড়েই চলেছে ২০০ বছর ধরে। ইন্টারনেট।
চির রহস্যে ঢাকা তুতেনখামেনের মমি - ছবি : শাটারস্টক

‘আমরা সঙ্কটে’: বন উজাড়ের কড়া মূল্য দিতে হচ্ছে আফগানিস্তানকে by আগনিজকা পিকুলিকা-উইলজেউস্কা

কাবুলে জ্বালানি কাঠ বিক্রির দোকান
লাস্ট আপডেট- ১০ জুলাই ২০১৯: ভোট ছয়টার সময় স্ট্যান্ডে পৌঁছায় কাবুলের ৬০ বছর বয়সী কাঠ ব্যবসায়ী আসেফ। কঠোর পরিশ্রম আর কড়া রোদে চামড়া কুচকে গেছে তার। চার সদস্যের পরিবারের ভারণপোষণের জন্য বিগত ১৮ বছর ধরে সপ্তাহে সাত দিন, দিনে ১৩ ঘন্টা করে কাজ করে আসছে সে।
মওসুমের উপর ভিত্তি করে এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ পর পর এক ট্রাক করে কাঠ কেনে আসেফ। এরপর সেগুলোকে ছোট ছোট টুকরা করে স্থানীয় কাঠের বাজারে বিক্রি করে।
কোন শিক্ষা না থাকায় তার আর কোন বিকল্প নেই।
এ বছর ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে তার।
আসেফ আল জাজিরাকে বললেন, “আমাদের বিক্রি কমে গেছে। একটা কারণ হলো বসন্ত। তবে আসল কারণ হলো যারা রুটি তৈরির জন্য আগে কাঠ ব্যবহার করতো, তারা এখন গ্যাসের ব্যবহার শুরু করেছে, কারণ গ্যাস অনেক পরিস্কার। মানুষ এখন গ্যাসের দিকে ঝুঁকছে”।
কাছের একটা বাড়িতে একদল তরুণ ছোট একটা গ্যাস কেটল জ্বালিয়ে মাদুরে বসে শিশা টানছে। রাশিয়ান সাহিত্যের ২৮ বছর বয়সী ছাত্র আলীশাহ আরমান এবং তার সঙ্গীরা তাদের ঘরগুলোকে গরম রাখতে, বিশেষ করে শীতের সময় আসেফের কাছ থেকে কাঠ কিনে থাকেন।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে আলীশাহ বললেন, “এক কেজি গ্যাসের দাম ৬০ আফগানি (৭৪ সেন্ট)। সাত কেজি কাঠ ব্যবহার করে ২৪ ঘন্টা ঘর গরম রাখতে পারি আমরা। আর এক কেজি গ্যাস দিয়ে ঘর গরম রাখা যায় দুই থেকে তিন ঘন্টা”।
“গ্যাস ব্যয়বহুল হওয়ায় আমরা প্রায়ই কাঠ ব্যবহার করি। আমরা জানি এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। এই মুহূর্তে… ঘর ততটা গরম রাখার দরকার নেই, তাই অল্প পরিমাণে গ্যাস ব্যবহার করছি আমরা। গ্যাস বিক্রেতাদের সরকার যদি ভর্তুকি দেয়, তাহলে আমরা খুবই খুশি হবো”।
কিন্তু পরিস্কার জ্বালানির জন্য সরকারের সহায়তার ব্যাপারটি সুদূরের স্বপ্ন মাত্র।
দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানে জ্বালানির উৎস হিসেবে কাঠ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বহু বছর ধরে এর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। বন উজার হওয়ার পাশাপাশি দুষণের কারণে বছর অন্তত ৩০০০ মানুষ মারা যাচ্ছে।
কাঠ দেশটির মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে একটি। বিগত কয়েক দশকে, এটার দুষ্প্রাপ্যতা ক্রমেই বাড়ছে। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় মুজাহিদিন যোদ্ধারা দেশের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে আশ্রয় নিতো। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা সময় বনাঞ্চলে বোমা ফেলতে শুরু করে।
বহু বছরের যুদ্ধ ও লড়াইয়ের কারণে বনাঞ্চলের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বহু বন ধ্বংস হয়ে গেছে। আর যুদ্ধে লড়াইরত আফগান কর্তৃপক্ষ কখনই বনায়ানকে অগ্রাধিকারের দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ পায়নি।
এদিকে, ২০১৩ সাল নাগাদ আফগানিস্তানের অন্তত অর্ধেক বনাঞ্চল উজার হয়ে গেছে।
কাঠের ব্যবসা লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে।
বিক্রির জন্য কাঠ চেলাই করছে এক আফগান
পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে স্থানীয় অধিবাসী ও সশস্ত্র গ্রুপগুলো অবৈধভাবে কাঠ কাটছে আর এরপর সেগুলোকে প্রতিবেশী পাকিস্তানে বিক্রি করছে।
দারিদ্র, আয়ের বিকল্প উৎসের অভাব, এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের ব্যাপারে সচেতনতার অভাবের কারণে অবৈধ ব্যবসা বেড়ে গেছে।
পুনর্বনায়ন প্রকল্প
পাকতিয়া ও পাকতিকা প্রদেশে সরকার ৮.২ মিলিয়ন পাইন গাছ লাগিয়েছে এবং স্থানীয় প্রবীণদের সাথে নিয়ে তারা সাধারণ মানুষদের শিক্ষিত করার চেষ্টা করছে। জনসাধারণকে বন থেকে সুবিধা নেয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যেমন, কাঠ না কেটে, সেগুলোর ফল ফলাদি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
কিন্তু বন উজারের সমস্যাটি আফগানিস্তানের অনেকগুলো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটি মাত্র সমস্যা। তাদের অন্য বড় সমস্যাগুলো হলো খরা ও বন্যা, যেটা পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে আরও ভয়াবহ হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে পানির সঙ্কট ও দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অব্যবস্থাপনা।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশানের (এফএও) প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাজেন্দ্র আরিয়াল। তিনি আল জাজিরাকে বললেন, “এই সবগুলো সমস্যাই একটা আরেকটার সাথে জড়িত। পরিবেশ বিপর্যয় এবং জমির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে জমিগুলো উষর হয়ে যাচ্ছে। আর অব্যাহত সঙ্ঘাতের কারণে বহু উন্নয়ন সংস্থা এখানে কাজ করতে পারছে না, যার মধ্যে জাতিসংঘও রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য কোন প্রকল্প নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তারা যেতে পারছে না, কারণ সেখানে নিরাপত্তা সঙ্কট খুবই মারাত্মক”।
জ্বালানি সাশ্রয়ী হিটিং ও রান্নার প্রযুক্তি সরবরাহের জন্য সহায়তা দিচ্ছে এফএও। এর মধ্যে রয়েছে তান্দুর – যেটাতে কম কাঠ লাগে, এবং সৌর-চালিত চুলা। স্থানীয়রা যাতে তাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে, সে জন্য এগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সাথে পেস্তা বাদামের বন তৈরির জন্য কাজ করছেন তারা, যেটা উচ্চমূল্যের শস্য। পাশাপাশি বায়োগ্যাস ডাইজেস্টার স্থাপন করছেন তারা, যেটা দিয়ে পশুর মলকে রান্নার গ্যাসে রূপান্তরিত করা যায়।
আরিয়াল বলেন, “আমরা সমন্বিত চিন্তা থেকে প্রকল্পগুলো ডিজাইন করছি। শুধুমাত্র সেচের জন্য, শুধু তৃণভূমি বিস্তার, খাদ্যের মজুদ বাড়ানো বা শুধু বিপর্যয় মোকাবেলার ব্যাপারে কোন প্রকল্প আমরা নিচ্ছি না। বরং আমরা এই সবগুলোর বিষয় বিবেচনা করে এমন প্রকল্প ডিজাইন করছি যেটা একাধিক প্রয়োজন পূরণ করবে”।
অস্বাভাবিক হলেও আফগানিস্তানের বনসম্পদ রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন দিয়েছে তালেবানরা। যদিও এমনটাও শোনা গেছে যে, এই গ্রুপটি অবৈধ কাঠের ব্যবসার মাধ্যমে মুনাফা লুটছে।
২০১৭ সালে তালেবানরা ঘোষণা দেয়া যে, বৃক্ষরোপণ একটা ইসলামি বাধ্যবাধকতা এবং আফগানিস্তানের জনগণের প্রতি তারা জোর আহ্বান জানান যাতে তারা একটি বা একাধিক ফলের গাছ বা অন্যান্য গাছ লাগান, যাতে জমির সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সৃষ্টি থেকে উপকার পাওয়া যায়।
কিন্তু আফগানিস্তানের বনসম্পদ রক্ষায় আফগান সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টাও যথেষ্ট বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না।
পরিবেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুসাইনি বলেন, “এক দশকেও জালালাবাদ ও অন্যান্য এলাকাতে আমরা সুন্দর বন পাবো না। স্থানীয় অধিবাসীরা প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে ফেলছে, যাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুটি নিয়ে কোন সচেতনতা নেই”।
“পরিবেশ বিপর্যয় আফগানিস্তানকে বদলে দিয়েছে এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান খুবই সামান্য। তারা শুধু জানে যে, তারা গাছ কেটে পাকিস্তানের কাছে বিক্রি করতে পারবে। কারণ স্থানীয় মানুষ গাছ লাগানোর জন্য সময় দিতে রাজি নয়। আমরা একটা সঙ্কটে আছি”।
কাবুলের পুর-ই-সুরখ এলাকায় কাঠের দোকানে বসে আছেন বিক্রেতা আসেফ