Sunday, February 9, 2025

ইসরাইলি তিন জিম্মিকে মুক্তি দিলো হামাস

যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী শনিবার ইসরাইলের তিন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। এর বিনিময়ে ইসরাইলের কারাগার থেকে ১৮৩ জন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ জন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে হামাস।

তাদের মধ্যে শনিবার মুক্তি পাওয়া ইসরাইলি জিম্মিরা হলেন- ৫২ বছর বয়সী এলি শারাবি, ৫৬ বছর বয়সী ওহাদ বেন আমি এবং ৩৪ বছর বয়সী ওর লেভি। এখন পর্যন্ত যেসকল জিম্মিদের মুক্তি দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে এই তিন জনের স্বাস্থ্যর অবনতি হয়েছে বলে তাদের পরিবার জানিয়েছে। ওহাদ বেন আমির শাশুড়ি বলেছেন, তাকে হাড্ডিসার দেখাচ্ছে। বিষয়টা পীড়াদায়ক।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, বন্দিদের ভঙ্গুর অবস্থায় দেখাটা সত্যিই দুঃখজনক এবং আমরা এটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। বন্দি বিনিময় প্রক্রিয়ায় হামাসকে আবারও শক্তি প্রদর্শন করতে দেখা যায়। গাজার কেন্দ্রে কয়েক ডজন সশস্ত্র যোদ্ধার উপস্থিতিতে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) গাড়িতে তোলা হয় এবং সেখান থেকে তারা ইসরাইলি কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে যায়।

বন্দি বিনিময়ের অংশ হিসেবে ১৮৩ জন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরাইল। তাদের মধ্যে অনেকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত থাকার দায়ে দণ্ডিত ছিলেন। এ ছাড়া গাজা যুদ্ধ চলাকালীন আটক ১১১ জনকেও মুক্তি দেওয়া হয়। অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় মুক্তি পাওয়া ৪২ বন্দিকে বহনকারী একটি বাস পৌঁছালে স্থানীয় জনতা উল্লাসের সঙ্গে তাদের স্বাগত জানায়। মুক্তিপ্রাপ্ত এসব ফিলিস্তিনিদের শারীরিক অবস্থাও খারাপ ছিল। অনেকেই ইসরাইলের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। তাদেরকে ক্রমাগত লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

mzamin

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে মিত্র দেশগুলোর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত মিত্র দেশগুলোর জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজা উপত্যকাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্তসহ তার কিছু বৈদেশিক নীতির কারণে মিত্র দেশগুলো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে মিত্র দেশগুলোর।

গাজা ইস্যু

ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে গাজাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছেন। পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের নীতির বিপরীত। 'দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান' থেকে সরে এসে ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এতে ফিলিস্তিনিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর নেতারা স্পষ্টভাবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।

মিত্রদের প্রতিক্রিয়া

গাজা দখলের সিদ্ধান্তে ইউরোপ, জাতিসংঘ ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য মিত্র দেশগুলো ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের উদ্বেগ, এ পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়া বিপদে পড়বে এবং গাজার যুদ্ধবিরতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। জাতিসংঘ ট্রাম্পকে জাতিগত নিধনের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো, যেমন ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন করবে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাজ্য ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও, তারা ট্রাম্পের কিছু পদক্ষেপের প্রতি সমালোচনা করেছে। ইউরোপীয় নেতারা সাফ জানিয়েছেন, তারা গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের পরিকল্পনা সমর্থন করেন না।

ভূরাজনৈতিক সংকট

এ সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো চিন্তিত যে, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে ক্রমাগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে এবং বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রতি আস্থার অভাব সৃষ্টি হবে। তারা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়া

ট্রাম্পের প্রশাসন কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র একঘরে হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে তার মন্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন,কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে না পারলে রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। তথ্য: সিএনএন, বিবিসি

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত



জায়মা রহমানকে নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে by রাজকুমার নন্দী

যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিনিধিত্ব করেন তার একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জায়মা জারনাজ রহমান। এর ফলে রাজনীতিতে তার সহসাই অভিষেক হতে যাচ্ছে কি না, রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। তবে দল ও জায়মা রহমানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ঘোষণা না দেওয়ায় ‘একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ঘটনা’ তার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া বলে মনে করেন না অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও জায়মা রহমানকে এর আগে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো প্রোগ্রামে দেখা যায়নি। অবশ্য ব্যারিস্টার জায়মার যোগ্যতা ও কার্যক্রম দলের জন্য উপকারী কিংবা দলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো হলে ভবিষ্যতে তার বিএনপির রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ও দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটা দোষের কিছু নয়। কারণ, ভারতীয় উপমহাদেশে পারিবারিক রাজনীতির ঐতিহ্য রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সবার নজর এখন জায়মা রহমানের দিকে।

মার্কিন কংগ্রেসের আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে গত ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠান হয়। যেখানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জায়মা জারনাজ রহমান অংশগ্রহণ করেন। জায়মা রহমান লন্ডন থেকে এবং মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান।

ভারতীয় উপমহাদেশে পারিবারিক রাজনীতির ঐতিহ্য রয়েছে। সে হিসেবে জিয়া পরিবারও ব্যতিক্রম নয়। জিয়াউর রহমানের পর এ পরিবার থেকে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান এসেছেন। এখন আলোচনা হচ্ছে জায়মা রহমানকে নিয়ে; বিশেষ করে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর থেকে আরও ডালপালা মেলেছে সেই আলোচনা। ফলে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের এ সদস্যের শিগগির রাজনীতিতে অভিষেক হতে যাচ্ছে কি না—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা।

রাজনীতি সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ স্রেফ একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও তাতে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বিশ্বনেতারা অংশগ্রহণ করে থাকেন। স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সেখানে উপস্থিত থাকেন। সুতরাং বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে এমন একটি অনুষ্ঠানে জায়মা রহমানের অংশগ্রহণ করা নিশ্চয়ই তাৎপর্যপূর্ণ। এমন প্রেক্ষাপটে ধারণা করা যায়, রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগে রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে ধাতস্থ করার জন্য ঐতিহ্যবাহী এই প্রাতরাশ অনুষ্ঠানে তাকে পাঠানো হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির প্রাথমিক সিঁড়িতে পা রেখেছেন তিনি।

তবে জায়মা রহমানের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি এখনো কৌতূহলের পর্যায়েই রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, বিষয়টা এখনো কৌতূহল পর্যায়েই আছে। কারণ, জায়মা রহমানের রাজনীতিতে আসা নিয়ে বিএনপি এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি কিংবা জায়মা রহমান নিজেও বলেননি তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন। তবে জায়মা রহমানের যোগ্যতা-কার্যক্রম যদি দলের জন্য উপকারী হয়, দলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে অবস্থায় জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে ভবিষ্যতে তার দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার, দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আছে। এটা দোষের কিছু না। কারণ, ভারতীয় উপমহাদেশে পারিবারিক রাজনীতির ঐতিহ্য রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অবশ্য আন্তর্জাতিক একটা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে জায়মা রহমান রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন, এমনটা বলা যাবে না। হয়তো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যস্ততার কারণে তার প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে’ অংশ নিয়েছেন জায়মা রহমান। তবে বিএনপি যে জায়মাকে প্রতিনিধিত্ব করতে সুযোগ দিয়েছে, সেটা তার জন্য নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। দলে তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে উনি সেখানে যেতেই পারেন। তা ছাড়া বিএনপিতেও তরুণ নেতৃত্ব আসছে। সে দিক থেকে জায়মার অংশগ্রহণ একটা ভালো বিবেচনার বিষয় হয়েছে। কেননা, তরুণরা কীভাবে ভাবছে, কী ভাবছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আর বিএনপিও যে তরুণদের প্রাধান্য দিচ্ছে, জায়মার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সেটাও প্রমাণিত হয়েছে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় এটা ইঙ্গিত দেয়, জায়মা রহমান রাজনীতিতে আসছেন। কারণ, আমাদের দেশে পারিবারিক ধারায় রাজনীতিতে আসাটাই স্বাভাবিক। এটা বিএনপির জন্য এক ধরনের বার্তা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে’ জায়মা রহমানের অংশগ্রহণে উচ্ছ্বসিত বিএনপির তরুণ নেতারা বলছেন, এটা বাংলাদেশের জন্য গর্বের। জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে জায়মা রহমানের ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে’ যোগ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ এবং যুবসমাজ আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না। তিনি কালবেলাকে বলেন, ওই অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তার মেয়ে জায়মা রহমান। আন্তর্জাতিক ওই অনুষ্ঠানে তিনি শুধু বাবার প্রতিনিধিত্বই করেননি, দেশের সব তরুণ সমাজেরও প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এটা আমাদের জন্য গর্বের।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের আগামী দিনের কান্ডারি। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে’ সেই তারেক রহমানের কন্যা জায়মা রহমান তার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের ও সম্মানের। জায়মা রহমানের বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে রাজনীতিতে নতুন বার্তা বলে মনে করেন তিনি।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালে সপরিবারে লন্ডন যান তারেক রহমান। এর ফলে ছোটবেলা থেকে লন্ডনেই পড়াশোনা করেছেন জায়মা রহমান। বিশ্বখ্যাত লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন তিনি। পড়াশোনা করার সময় রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি তাকে। তবে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকার ছাত্র সমন্বয়কারীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যে বৈঠক করেন, সে সময় জায়মা রহমান তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা যায়।

জানা গেছে, লন্ডনে আইন পেশায় সম্পৃক্ত রয়েছেন জায়মা রহমান। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও এখন পর্যন্ত রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হননি। বিএনপি নেতারা বলছেন, জায়মা রহমান রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হোন বা না হোন, তিনি রাজনীতির জ্ঞান লাভ করতেই পারেন। তবে পুরোদস্তুর রাজনীতিতে আসবেন কি না, তা নির্ভর করবে তার বাবা-মার সিদ্ধান্তের ওপর।

মার্কিন নেত্রীর সঙ্গে জায়মা রহমানের বৈঠক : যুক্তরাষ্ট্রের উইমেন্স ফেলোশিপ ফাউন্ডেশনের নেত্রী রেবেকা ওয়াগনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ব্যারিস্টার জায়মা রহমান। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসিতে রেবেকা ওয়াগনার এবং সংগঠনটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রচেষ্টার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জায়মা জারনাজ রহমান। সৌজন্য ছবি
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জায়মা জারনাজ রহমান। সৌজন্য ছবি



ট্রাম্প গণতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করে যাবেন by ইয়ান বুরুমা

অন্যান্য পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ। প্রায় ২৪ শতাংশ আমেরিকান নিজেদের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান হিসেবে চিহ্নিত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচজন বিচারপতিই এখন রক্ষণশীল ক্যাথলিক (নীল গোরসাচ নামে বাকি যে একজন রক্ষণশীল বিচারপতি রয়েছেন, তিনি ক্যাথলিক হিসেবে বড় হলেও বর্তমানে একজন এপিসকোপেলিয়ান খ্রিষ্টান)।

আরেকটি ব্যাপার হলো, ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দিক থেকে যা-ই হোন না কেন, জনপরিসরে তাঁরা সব সময়ই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা মানুষ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকেও অনেকটা পবিত্র গ্রন্থের মতো মর্যাদা দেওয়া হয়। এমনকি যারা ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী, তাঁরাও সংবিধানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখে। ১৮৩০-এর দশকের শুরুর দিকে ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সিস দ্য তোকভিল যুক্তরাষ্ট্র সফর করে দেখেছিলেন, খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধ দেশটির গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি মনে করেছিলেন, এই ‘নাগরিক ধর্ম’ আমেরিকার অতিরিক্ত ভোগবাদী জীবনযাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করে। আইন ও স্বাধীনতাকে ভিত্তি ধরে তৈরি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এই আস্থাই বিভিন্ন জাতির অভিবাসীদের একত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছিল।

আমেরিকার গণতন্ত্র বা রাজনৈতিক বিশ্বাস সব সময় সবার জন্য সমান ছিল না। ১৯৬০-এর দশকের আগে কৃষ্ণাঙ্গরা পুরোপুরি এর অংশ হতে পারেনি। এখনো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব আমেরিকার রাজনীতিতে শক্তিশালী। গৃহযুদ্ধে দক্ষিণের পরাজয় হলেও এই সমস্যার সমাধান হয়নি। ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা কখনোই বিশ্বাস করেনি, ধর্ম ও রাষ্ট্র আলাদা থাকা উচিত। আর দরিদ্র মানুষের জন্য আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমেই আছে; কারণ তারা পর্যাপ্ত পয়সা খরচ করে ভালো আইনজীবী নিতে পারে না।

তবুও আমেরিকার গণতন্ত্র অনেক দিন ধরে এমনভাবে টিকে আছে যেন এটি এক ধরনের বিশ্বাসের (ধর্মের মতো) অংশ। খ্রিষ্টধর্মের অনেক ধারণা আমেরিকার রাজনীতিতে ঢুকে গেছে। যেমন, আমেরিকা মনে করে তাদের মূল্যবোধ (স্বাধীনতা, গণতন্ত্র) সব মানুষের জন্য এবং তারা সেসব মূল্যবোধ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চায়। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সও একই কাজ করেছে, কারণ ফ্রান্স ও আমেরিকার গণতন্ত্র দুই বিপ্লব (ফরাসি বিপ্লব ও আমেরিকান বিপ্লব) থেকে এসেছে। আর এই বিপ্লব আলোকিত যুগের (এনলাইটমেন্ট) ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়াটা আমেরিকার গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। এটি হয়তো মার্কিন গণতন্ত্রকে ধ্বংসও করতে পারে।

অনেকে ট্রাম্পকে ফ্যাসিবাদী (স্বৈরাচারী শাসকের মতো) বলে থাকেন। তবে ফ্যাসিবাদ সাধারণত একটি সুস্পষ্ট মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে চলে; যা ট্রাম্পের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। তাঁর আশপাশের লোকজন (যাঁরা তাঁর উগ্র সমর্থক, যাঁরা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ান এবং সুযোগসন্ধানী) তাঁরা আদর্শগত দিক থেকে ঐক্যবদ্ধ নয়।

মুসোলিনি বা অন্যান্য ফ্যাসিবাদী শাসকের মতো তাঁরা শক্তিশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থা চান না। বরং তাঁরা অনেক সরকারি কাঠামো ভেঙে ফেলতে চান।

ট্রাম্পই প্রথম আমেরিকান রাজনীতিবিদ নন যিনি শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের মনের অভিবাসনভীতি ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অভিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এবং উদারপন্থী (লিবারেল) নেতাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছেন। তবে অন্যদের চেয়ে তাঁর সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো—তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকাশ্যেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র বিচার ব্যবস্থা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং আইনের শাসন—এসব গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলেও ট্রাম্প এগুলোকে পাত্তা দেন না।

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে প্রথম সপ্তাহেই তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ফেডারেল বাজেট আটকে দিয়েছেন। জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বাতিলের ঘোষণা দেন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধান বিশেষজ্ঞ লরেন্স ট্রাইব একে ‘আইন ও সংবিধানের ওপর সরাসরি আক্রমণ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ট্রাম্প এমন কাজ করছেন যা আমেরিকার দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করছে। এই শাসনব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ হলেও এত দিন তা দেশকে এক সঙ্গে ধরে রেখেছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেটি ধ্বংস করে এক নতুন বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন যেখানে একজন নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য থাকতে হবে। জার্মানিতে একসময় একে ‘ফ্যুরারপ্রিন্সিপ’ বলা হতো, যার অর্থ হলো, শাসকই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী এবং তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারবে না।

ট্রাম্পের কিছু সমর্থক মনে করেন, তিনি ঈশ্বরের মনোনীত একজন নেতা। এই ধরনের অন্ধ ভক্তি সাধারণত কঠোর একনায়কতন্ত্রে দেখা যায়, কিন্তু এর আগে কখনোই এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়নি।

১৯৩০-এর দশকে ‘নিউ ডিল’ কার্যকর করার সময় ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট পদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের ক্ষুব্ধ করেছিল। তবুও তার অনেক সমর্থকের মতে এটি দেশের সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ছিল। সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান তখন বলেছিলেন, ‘একটা হালকা ধরনের একনায়কত্ব আমাদের কঠিন সময় পার হতে সাহায্য করবে।’

কিন্তু রুজভেল্ট তখনো আইন অমান্য করেননি। তিনি সংবিধানকে আঘাত করেননি বা বিদ্রোহ উসকে দেননি। তিনি তাঁর দলকে অন্ধ সমর্থনের ভিত্তিতে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মতো গড়ে তোলেননি।

কিন্তু ট্রাম্প এসব করছেন। হুমকি দিয়ে, চাপে রেখে এবং ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে তিনি রিপাবলিকান দলটিকে নিজের হাতের মুঠোয় এনেছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব কী হবে, তা এখনই বলা কঠিন।

কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী বা মতবাদ তাদের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পরও টিকে থাকে। কিন্তু ‘ট্রাম্পবাদ’ খুব বেশি দিন টিকে নাও থাকতে পারে। এর কারণ হলো, ট্রাম্পের রাগী ও আত্মকেন্দ্রিক আচরণ কোনো শক্তিশালী আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি যা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাব রাখতে পারে।

ট্রাম্পের অনেক সমর্থকই হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হতাশ হবে, কারণ তাঁর অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়নি।

যদি শেয়ারবাজারে বড় ধস নামে, ডেমোক্রেটিক পার্টি শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে বা আদালত তাঁর স্বেচ্ছাচারিতার ওপর লাগাম দেয়, তাহলে তাঁর প্রভাব অনেকটাই কমে যেতে পারে।

তবে ট্রাম্পের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী না হলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে এমনভাবে ধ্বংস করে যেতে পারেন, যা হয়তো আর ঠিক করা যাবে না। যদি তা ঘটে, তাহলে তাঁর শাসনের ক্ষতিকর প্রভাব অনেক দিন ধরে রয়ে যাবে। ট্রাম্প নিজে হয়তো একসময় রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সরে যাবেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ হয়তো বহু বছর পর্যন্ত দৃশ্যমান থেকে যাবে।

ইয়ান বুরুমা প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

গাজায় ‘জাতিগত নির্মূল’ চালানোর ট্রাম্পের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন কি সম্ভব

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাজুড়ে কয়েক দিন আগে দেখা গেল, উদ্বাস্তু হওয়া ফিলিস্তিদের উচ্ছ্বাস, সেই সঙ্গে পরিবার ও স্বজনের সঙ্গে অশ্রুসিক্ত চোখে পুনর্মিলনের অভূতপূর্ব সব দৃশ্য। গাজায় টানা ১৫ মাস ইসরায়েলের তাণ্ডব চলার পর হামাসের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির সুফল হিসেবে উপত্যকার দক্ষিণ থেকে উত্তরে নিজেদের বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ফিরতে পেরেছেন তাঁরা।

ফিলিস্তিনিদের ইতিহাসে বাস্তুচ্যুত হয়ে আবার নিজ বাড়িঘরে তাঁদের ফিরতে পারার এমন বিরল ঘটনাকে অভিনন্দিত করেছেন অধিকারকর্মীরা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্টো অবস্থানে। তিনি গাজা খালি করে এখানকার সব বাসিন্দাকে প্রতিবেশী দেশ মিসর ও জর্ডানে পাঠাতে চান।

দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৫ জানুয়ারি ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি চাই মিসর (গাজা থেকে) আরও মানুষ (ফিলিস্তিনি) নিয়ে যাক। আপনারা সম্ভবত ১৫ লাখ মানুষের কথা বলছেন। তাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গাজা খালি করতে হবে আমাদের।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘গাজার বাসিন্দাদের সাময়িক সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে এসব দেশে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। সত্যিকার অর্থে এটা (গাজা) এখন একটি ধ্বংসযজ্ঞ। প্রায় সবই ধ্বংস হয়েছে। মানুষ মারা যাচ্ছে।’

বিশ্লেষকদের মত, ট্রাম্পের এমন প্রস্তাব জাতিগত নির্মূলের শামিল হতে পারে। কিন্তু এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এর বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা কম।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির ফিলিস্তিন/ইসরায়েল কর্মসূচির প্রধান ইউসুফ মুনায়ার বলেন, সব নীতিনৈতিকতা ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করায় ট্রাম্পের ‘ভয়ানক’ বিবৃতির নিন্দা জানানো উচিত।

ট্রাম্পের এ বিবৃতিকে একধরনের সংশয়ের সঙ্গেও গ্রহণ করা দরকার বলে মন্তব্য করেন এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নির্মূল চালানোর ধারণাটা নতুন নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এমন ধারণার প্রচার চালানো হচ্ছে।

তবে গাজার সঙ্গে সীমান্ত থাকা একমাত্র আরব দেশ মিসর উপত্যকাটি থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে দ্রুতই নাকচ করে দিয়েছে। আবার, একই রকমের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কাছের দেশ জর্ডানও। এতে ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে উভয় দেশের অবস্থান পরিষ্কার।

ইউসুফ মুনায়ার বলেন, দুই দেশের এ অবস্থান যে শুধু ফিলিস্তিন বিষয়ে তাদের অনুভূতি বা তারা ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকটকে যেভাবে দেখে থাকে, তার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট, তা নয়। তিনি বলেন, এটি দেশ দুটির জাতীয় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের সঙ্গেও যুক্ত। এ নিয়ে তারা কোনো ছাড় দেবে না।

মিসর ও জর্ডানের ‘না’

২৯ জানুয়ারি মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার কোনো প্রচারণায় তাঁর দেশ অংশ নেবে না। তাঁদের বাস্তুচ্যুতিকে অবিচার আখ্যা দিয়ে মিসরের নিরাপত্তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট সিসি বলেন, ‘মিসরের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে দেওয়া বা এ ব্যাপারে নমনীয়তা না দেখানোর বিষয়ে মিসরের জনগণকে আমি আশ্বস্ত করছি।’ সিসি আরও বলেন, যদি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের তিনি গ্রহণ করতে চান, তাহলে মিসরের জনগণ তাঁর এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবেন।

একই রকম বক্তব্য তুলে ধরে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেছেন, এ বিষয়ে তাঁর দেশের অবস্থান ‘অপরিবর্তনীয়’।

ইসরায়েলসহ কিছু মিত্রদেশের কাছ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যের জন্য প্রশংসা কুড়ালেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিসর ও জর্ডানের নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে, যা গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করার সম্ভাবনা দূর করবে।

উভয় দেশের আশঙ্কা, বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করলে নিজেদের জনগণের কাছ থেকেই প্রতিরোধের মুখে পড়বে সরকার। ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূলে যেকোনো ধরনের ভূমিকা রাখাকে দেশ দুটির জনগণ ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখবেন। আর ফিলিস্তিন সংকট হলো মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রীয় ইস্যু।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, উপরন্তু, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারাসহ বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ ফিলিস্তিনির ঢল মিসর ও জর্ডানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অবকাঠামো অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

ন্যান্সি ওকাইল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’র সভাপতি। তিনি বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য দৃশ্যত প্রকৃত কোনো কৌশলের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া নয়। তিনি বলেন, ‘মিসর সরকার, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট আল–সিসি এ বিষয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি মেনে না নেওয়ার ব্যাপারে অনড় তিনি। এটাই রেডলাইন (শেষ সীমা)। এটা গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই।’

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষণা ফেলো অ্যানেল শেলিন বলেছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবে জনগণ উদ্বিগ্ন হতে পারেন, কিন্তু তিনি তাঁর নীতির কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হবেন, সেটি হয়তো পুরোপুরি বিবেচনায় আনতে পারছেন না।

নিজেদের বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই তাঁবু টানিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন গাজার উত্তরাঞ্চলে ফিরে আসা ফিলিস্তিনিরা
নিজেদের বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই তাঁবু টানিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন গাজার উত্তরাঞ্চলে ফিরে আসা ফিলিস্তিনিরা। ফাইল ছবি: এএফপি

যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীন ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এভাবেই স্বজনদের জড়িয়ে ধরেন এক ফিলিস্তিনি। গতকাল শনিবার দখলকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায়
যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীন ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এভাবেই স্বজনদের জড়িয়ে ধরেন এক ফিলিস্তিনি। গতকাল শনিবার দখলকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায়। ছবি: রয়টার্স

অভ্যুত্থানের ৬ মাস: কী করা উচিত, কী করছি by মীর হুযাইফা আল মামদূহ

১.
কয় দিন আগেই লিখেছিলাম, এই সরকারকে ৫ তারিখের পর চূড়ান্ত একটা ক্ষমতা দিয়েছিল মানুষ, সেই ক্ষমতা দিয়ে চাইলেই তারা দেশের জন্য এমন অনেক কাজ করতে পারত, যা আমাদের জন্য জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক দিনের আশা। তারা সেই কাজ করেনি, বরং বিপরীতে গিয়ে এমন কিছু কাজ করেছে, যা পপুলিস্ট এবং মানুষের উপরি চেতনাকে তুষ্ট করে।

অনেক দিন পর পালিয়ে যাওয়া হাসিনার ভাষণের কথা শুনে মানুষ এক হয়ে গেল দেখলাম। কিন্তু সেই এক হওয়াটাও কি জলে যাবে? মানুষ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ভেঙে ফেলেছে। সারা রাত ধরে, এমনকি পরদিন দুপুর পর্যন্ত সেই বাড়ি ভাঙা হলো। এরপর কাজ কী এখন? কোনো কাজ নেই, সবাই যার যার মতে বাড়ি ফিরে, নিজের পুরোনো রাজনীতিতে ফিরবে। পুরোনো ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ে আরও একবার নিজেদের শেষ করে দেবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না।

যাঁরা এই ৩২ নম্বরের বাড়ির ভাঙার পক্ষে মত দিচ্ছেন, দেখলাম বলছেন, এই ৩২ শেখ হাসিনার আর তাঁর বাবার নিদর্শন, চিহ্ন; এই চিহ্নের বিনাশ না হলে আওয়ামী লীগের সত্যিকার বিনাশ হবে না।

২.
একই দিন খবরে প্রকাশ, সাংবাদিকসহ আয়নাঘর পরিদর্শনে যেতে পারছেন না প্রধান উপদেষ্টা। যদিও পরবর্তী সময় সিদ্ধান্ত হয় সংবাদমাধ্যমসহ শিগগিরই আয়নাঘর পরিদর্শনে যাবেন প্রধান উপদেষ্টা। এই আয়নাঘরে ১৫ বছর ধরে অনেক মানুষকে নির্যাতন–নিপীড়ন করা হয়েছে। অনেক মানুষ আয়নাঘর থেকে ফিরে আসেননি। এখনো আয়নাঘরে বন্দী থাকা ব্যক্তিদের আত্মীয়রা নানা জায়গায় সভা–সমাবেশ করেন, যাতে তাঁদের আত্মীয়কে ফিরে পান।

আয়নাঘর থেকে যাঁরা ফিরেছেন, ফিরতে পেরেছেন, তাঁরা বলেছেন, কী নির্মম নির্যাতন হয় সেখানে। কী অমানবিকভাবে মানুষকে রাখা হয় বছরের পর বছর ধরে। একজন র‍্যাবের সৈনিক বর্ণনা দিয়েছেন, কত বীভৎসভাবে সেখানে মানুষকে খুন করা হতো কেবলই মতাদর্শের বৈরিতার জন্য। হাসিনার পুরো সময়, বিশেষ করে শেষ দিকটায় মানুষ কথা বলতে, লিখতে ভয় পেত কেবল আয়নাঘরের জন্য। কেউ জানত না, কখন, কাকে, কীভাবে তুলে নেওয়া হবে, কেন তুলে নেওয়া হবে। হাসিনার ক্ষমতা সংহত করেছে এই নির্যাতন সেল। অথচ আমরা এই আয়নাঘরের বিস্তারিত এখনো জানতে পারিনি, হাসিনার বিদায়ের ছয় মাস পর এসেও।
৩.
পুরো সময়জুড়েই হাসিনাকে রক্ষা করে গেছে আমলাতন্ত্র আর পুলিশ বাহিনী। গদিতে টেকার জন্য হাসিনা একপাল আজ্ঞাবহ দাসানুদাস তৈরি করে গেছেন। যারা সরকার বোঝে না, বোঝে আওয়ামী লীগ। সেই দাসানুদাস পুলিশ বাহিনী জুলাইয়ে হত্যা করেছে হাজারো মানুষকে, আহত করেছে ১০–১২ হাজারেরও বেশি মানুষকে; তাঁদের মধ্যে হাজারো এমন মানুষ আছেন, যাঁরা চোখ হারিয়েছেন জীবনের জন্য, হারিয়েছেন হাত-পা।

দেশের আমলাতন্ত্রের জটিলতা তো সর্বজনজ্ঞাত একটা ব্যাপার, সেখানে কাজ হয় না। দীর্ঘসূত্রতা আছে। এসব আমলা মানুষকে মানুষ ভাবেন না, ভাবেন তাঁদের আজ্ঞাবহ। দুর্নীতিতে প্রায় ডুবে আছেন আমাদের অনেক আমলাই। সেখানে লালফিতার দৌরাত্ম্য যেমন আছে, আছে চূড়ান্ত অসহযোগিতা। গত সপ্তাহে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি জুলাইয়ে আহত দীপংকর বালার কথা আমরা অনেকেই জানি। তাঁর প্রতি কী আচরণ হয়েছে, তা ওঠে এসেছে পত্রপত্রিকায়। দীপংকরের পায়ে লোহা লাগানো, জুলাইয়ে গুলি খেয়ে পা এখন পচে যাওয়ার অবস্থা। তিন মাস আগে বিদেশ যাওয়ার কথা, সেটা পিছিয়ে গত সপ্তাহে হয়েছিল। বিমানবন্দরে গিয়ে দেখেন, তাঁর জন্য সাধারণ সিট। অথচ আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে, তিনি সাধারণ সিটে যেতে পারবেন না। তাঁর জন্য বিশেষব্যবস্থা লাগবে। সেই যাত্রায় তাঁর বিদেশযাত্রা হয়নি। দুই সপ্তাহ পর এখনো হয়তো হয়নি। অথচ পা পচে যাওয়ার দশা। জুলাইয়ের আহত ব্যক্তিদের সঙ্গেই এই আচরণ আমলাদের। সাধারণ মানুষের সঙ্গে না জানি কেমন এখনো!

অথচ আমরা পারতাম, ৫ আগস্টের পর গোটা আমলাতন্ত্রকে আগাপাছতলা সাজানো, গোছানো এবং নতুন করে ঠিক করতে। সেই আমলাতন্ত্র যেন আক্ষরিক অর্থে মানুষের জন্যই হয়। তাঁদের কাছে গিয়ে যেন হয়রানির শিকার না হতে হয়। যেন আমরা না দেখি, পুকুর কাটা শেখার জন্য ৩২ আমলার আফ্রিকা সফরের মতো অযথা রাষ্ট্রের খরচ।
৪.
হাসপাতালে এখনো অনেক ব্যক্তি ভর্তি, যাঁরা জুলাইয়ে আহত হয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসা হয়তো হচ্ছে, কিন্তু তাঁরা পর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধা পাচ্ছেন না। একেকজন ঋণের দায়ে জর্জরিত। চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা খরচা জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ রাষ্ট্র কোনো দায় নিচ্ছে না। আহত ব্যক্তিদের মানসিক পুনর্বাসন প্রয়োজন, সেই বিষয়েও নেই কোনো উদ্যোগ। শহীদের আত্মীয়রা পাচ্ছেন না যোগ্যতম সম্মান।

যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের এই অবধি একটা স্বচ্ছ তালিকা হয়নি, ছয় মাস চলে যাওয়ার পরেও। অথচ জুলাই নিয়ে বলতে গেলে সবাই প্রায় জুলাইয়ের মালিক সেজে বসেন। যেন সেই তাঁরাই একমাত্র জুলাইয়ের রক্ষক। অথচ জুলাইয়ের সবচেয়ে অপমান হচ্ছে তাঁদের দিয়েই।

এই যে আওয়ামী লীগ তার ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে গিয়ে এত এত খুন, এত মানুষের অঙ্গহানি করল; তাদের বিচার পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়েছে কি? অনেক মানুষকে জেলে ভরা হয়েছে, মামলাও দেওয়া হয়েছে অনেক; তাঁদের অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হবে, সেই অনুসন্ধান-তদন্ত-বিচারপ্রক্রিয়া কতটা এগোলো আসলে? আমাদের বিচার বিভাগের সংস্কার ছাড়া আদৌ কি তাঁদের বিচার করা সম্ভব?
৫.
গত ছয় মাসে এই অন্তর্বর্তী সরকার অনেক কিছুই করতে চেয়েছে। অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। অনেক নিয়োগ দিয়েছে, যেসব নিয়োগের কারণ, ধর্ম কিছুই আমরা জানি না। অনেক কিছুই হয়তো বদলাতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি। না পারার কারণ হিসেবে দায় দিয়েছে সবার মধ্যে ঐক্য না থাকাকে। না হলে সবাই মিলে করে ফেলা যেত। আফসোস করছেন, নানা রাজনৈতিক দলকে দায় দিচ্ছেন উপদেষ্টা সমন্বয়কেরা।

অথচ হাসিনার ভাষণের ঘোষণা শুনেই পুরো দেশ এক হয়ে গেল, এই ঐক্যকে নিয়ে গেল একটা ভাঙচুরের দিকে। এই ভাঙচুর চলতে থাকলে কার কী লাভ হবে?

বিদ্যমান সংবিধান হাসিনাকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছিল। সেই সংবিধান সংস্কারের কী হবে, সংশোধন হবে নাকি, বাতিল হবে; হাসিনা সরকারের প্রেসিডেন্ট নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, এমন অনেক কিছু নিয়ে এখনো প্রশ্ন থেকে গেছে।

এই মাফিয়া আমলাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, মানুষের জন্য যাঁদের দায় ও দরদ আছে, এমন আমলাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়া যেত। শহীদের বিচার ও আহত ব্যক্তিদের যাতে পূর্ণ পুনর্বাসন হয়, সেই মর্মেও সরকারকে বাধ্য করা যেত। যেই আওয়ামী লীগের নিদর্শন ভাঙা হয়েছে, সেই আওয়ামী লীগই বিচার হলে শেষ হয়ে যেত। আলাদা করে নিদর্শন ভাঙতে হতো না।

কোন কাজ আমাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করা উচিত, সেটা বুঝতে পারাটাও আমাদের জন্য একটা বড় শিক্ষা। সেই শিক্ষা আমাদের হোক। এটাই মোনাজাত।

মীর হুযাইফা আল মামদূহ গবেষক

অভ্যুত্থানের ৬ মাস: কী করা উচিত, কী করছি

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীকে গুলি: কী ঘটেছে গাজীপুরে? by সুদীপ অধিকারী

শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। গাজীপুর চৌরাস্তা মোড়ের চান্দিনা টাওয়ারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের একটি অফিস উদ্বোধনের কাজ চলছিল। হঠাৎ একটি ফোন কল আসে। বলা হয়- গাজীপুরের ধীরাশ্রম মন্দিরবাড়ী এলাকায় সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজ্জামেল হকের বাড়িতে কিছু লোক ভাঙচুর-লুটপাট চালাচ্ছে। এই খবর পেয়ে আমরা ৪০ থেকে ৫০জন শিক্ষার্থী ৪টা ইজিবাইকে করে সেখানে যায়। তারা সেখানে গিয়ে দেখেন কয়েকজন মোজ্জামেল হকের বাড়ির ভেতরে ভাঙচুর করছে। শিক্ষার্থীদের একটি দল ভেতরে প্রবেশ করে। আরেক গ্রুপ বাইরে ছিল। এ সময় হঠাৎ বাড়ির সামনের মসজিদের মাইকে জয় বাংলা বলে ঘোষণা করা হয়- বলা হয় এলাকায় ডাকাত ঢুকেছে। সব লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আপনারা সবাই যার যা আছে নিয়ে বের হয়ে আসুন। এরপর এলাকাটির প্রায় সবক’টি মসজিদে একই ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণার পরপরই এলাকাটির প্রায় এক-দেড়শ’ মানুষ ধারালো অস্ত্র, লাঠি-সোটা নিয়ে বের হয়ে মোজাম্মেল হকের বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে। তারা এসেই প্রথমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের মারধর করে। পরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের আটকে রেখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। তখন তাদের কেউ কেউ দুইতলা থেকে নিচে লাফ দেন। ১০ থেকে ১৫ জন জীবন বাঁচাতে বাড়িটির ছাদে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেন। তারা ছাদের দরজা ভেঙে ছাদে গিয়েও হামলা করে। গাজীপুরের ধীরাশ্রমে শুক্রবার রাতে হামলার এমনই বর্ণনা দিয়েছেন আহতরা। সরজমিন ঘুরে স্থানীয়দের কাছ থেকেও এমন বর্ণনা মিলেছে। যদিও ঘটনার পর থেকে এলাকায় পুরুষদের খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও কেউ ঘটনার বিষয়ে কথা বলছেন না। হামলার শিকার হয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১২তলার কেবিনে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন চান্দিনা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের ওপর পরিকল্পনা করেই হামলা হয়। তারা মাথা লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। একটা কোপ এসে লাগে আমার বাম চোখের পাশে। আমি নিচে লুটিয়ে পড়লে তারা আমাকে মৃত ভেবে চলে যাচ্চিল। তখন একজন লাইট মেরে বলে- শালা মরেনি। ওদের ধরে নিয়ে চল। আজকে সবক’টাকে একদম শেষ করে দেবো। তখন আমাদেরকে ধরে বাড়ির সামনের মসজিদে নিয়ে গিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে আবারো মারধর করে। আমার সামনেই একজনের পায়ের রগ কেটে দেয়। আমাকেও বলা হয়- ভিডিওতে মাফ চা, বল কোনোদিন আর এসব করবি না। না হলে তোরও পায়ের রগ কেটে দেয়া হবে। পরে আমি তাদের কাছে মাফ চেয়ে জীবনটা রক্ষা করি।

শুক্রবার রাতে হামলার সময় মোজাম্মেল হকের বাড়ির ২য় তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়ে একই কেবিনে ভর্তি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের গাজীপুর শাখার সদস্য টঙ্গী চেরাগ আলী এলাকার বাসিন্দা মো. আকাশ (১৯) বলেন, যখন চারপাশ থেকে এসে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমাদেরকে কোপানো শুরু করে তখন জীবনের ভয়ে আমিসহ কয়েকজন ২য়তলা থেকে নিচে ঝাঁপ দিই। তিনি বলেন, এটা একটা ট্র্যাপ (চক্রান্ত) ছিল। চক্রান্ত করেই বাড়ি ভাঙচুরের খবর দিয়ে আমাদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ আমাদের ওপর যখন হামলা চলছিল তখন যারা আগেই ওই বাড়িতে ভাঙচুর চালাচ্ছিল তারাও স্থানীয়দের সঙ্গে যোগ দেয়। তারা ওদেরই লোক ছিল। আমরা যখন প্রথমে গিয়ে তাদের ফোন চেক করেছিলাম, তখন তাদের ফোনে আওয়ামী লীগ নেতাদের ছবি ও পোস্ট ছিল।  তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমাদের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে সরজমিন গাজীপুরের ধীরাশ্রম মন্দির বাড়ি এলাকায় সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক কারুকার্যের দুইতলা বিশিষ্ট বাড়িটির প্রতিটা রুমেই ভাঙচুর চালানো হয়েছে। চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে জানালার কাঁচ ভাঙচুর করা হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বাড়িটির মালামাল আসবাবপত্র। আলিশান বাড়িটির উঠানে রয়েছে সুইমিংপুল, পাকা বসার জায়গা। বাড়ির সামনে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, ফুলের বাগান। পাশেই মসজিদ। যেই মসজিদ থেকেই প্রথম ডাকাত পড়েছে বলে ঘোষণা দেন মোজাম্মেল হকের বাড়ি দেখাশোনা করা ও ওই মসজিদের ইমাম। মসজিদের দেওয়াল ও মেঝেতে রক্তের দাগ দেখা যায়। মসজিদের দেওয়ালে রক্তের দাগ দেখে বোঝা যায়- মসজিদের বারান্দায় আহত কাউকে বসিয়ে রাখায় তাদের মাথা থেকে দেওয়ালে লেগেছে এই রক্ত। পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শুক্রবার রাতে ও সকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নারী-পুরুষসহ কয়েকজনকে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ায় ভয়ে মুখ খুলছে না কেউ।

নাসিমা বেগম, ইয়াসিন সরকারসহ নাম না প্রকাশের শর্তে আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আমরা সবাই বাড়িতে ছিলাম। হঠাৎ মসজিদের মাইকে ডাকাতের হামলার ঘোষণা শুনে বাইরে এসে দেখি অনেক লোক। মন্ত্রীর বাড়ির মধ্যে ঢুকে ভাঙচুর করছে। এরমধ্যেই এলাকার লোকজনের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। কেউ কেউ দৌড়ে পালিয়ে যায়। কয়েকজনকে আটকে রাখা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা এসে তাদেরকে নিয়ে যায়। তারা বলেন, এটা সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের পৈতৃক নিবাস। তিনি এখানে সবসময় থাকতেন না। মাঝে মধ্যে সময় কাটাতে আসতেন। তার শহরের ওপর বাড়ি আছে। বেশির ভাগ সময়ই তিনি ঢাকায় থাকতেন। সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। এই বাড়িতে মসজিদের ইমাম তার বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকেন। এই বাড়ি দেখাশোনার জন্য তাকে ময়মনসিংহ থেকে এনে বেতনভুক্ত রাখা হয়েছে। তারা বলেন, ওই ঘটনার পর রাতে পুলিশ এসে বাড়িতে বাড়িতে গিয়েছেন। খোঁজ নিয়েছে- কোন বাড়িতে নারীরা আছে আর কোন বাড়িতে পুরুষ আছে। পুরুষ মানুষ পেলেই তাকে তুলে নিয়ে গেছে। শনিবার সকালেও অনেকজনকে থানায় নিয়ে গেছে। এই পাশের মার্কেট মসজিদের ইমামকে না পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। ভয়ে এখন পুরুষশূন্য পুরো এলাকা।

অপরদিকে সেদিন রাতে ওই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মোজাম্মেলের বাড়িতে বহন করে নিয়ে যাওয়া ৪ ইজিবাইকের মধ্যে থাকা এক চালক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, শুক্রবার রাতে আমি কাজ শেষে বাড়িতে যাবো। চৌরাস্তায় গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এর মাঝেই ছাত্ররা ডাক দিলো। আমরা একসঙ্গে ৪টা ইজিবাইকে তাদেরকে নিয়ে রওনা করি। তারা সবাই খালি হাতে ছিল। কোনো লাঠিসোটা ছিল না। তবে তারা খুব মারমুখী ছিল। গাড়ি থেকে নেমে তারা দুটো ইজিবাইকের ভাড়া ১৫০ করে মোট ৩০০ টাকা দিলেও আমাদের দুটোর ভাড়া বাকি ছিল। আমরা দু’জনেই তাই গাড়ি নিয়ে ভাড়ার অপেক্ষায় ছিলাম। দেখলাম ছাত্ররা গেটে লাথি মেরে চিল্লাচিল্লি করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। এরপরই এক হুজুর দৌড়ে গিয়ে মাইকে ডাকাত বলে ঘোষণা করলেন। এরপর আশপাশের মসজিদেও ডাকাতের ঘোষণা করা হয়। এলাকার সবাই তখন দা, সাবল নিয়ে দৌড়ে আশে। তখন আমি আর আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক ইজিবাইকচালক দু’জনে দুইদিকে গাড়ি চালিয়ে বের হয়ে যায়। ভাড়া না পাওয়ায় আমি জয়দেবপুর যাওয়ার মেইন রোডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরইমধ্যে দুইজন শিক্ষার্থী আমার কাছে এসে অনুরোধ করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আগে ভাড়ার টাকা না পাওয়ায় আমি তখন তাদেরকে বলি ভাড়া না দিলে আমি যাবো না। তখন একটি শিক্ষার্থী তার পকেটে হাত দিয়ে বলে- আমার সব নিয়ে গেছে। ফোন নিয়ে গেছে। তবে মানিব্যাগটা আছে। এই বলে সে ৫শ’ টাকার একটি নোট আমার হাতে তুলে দেয়। আমি তখন তাদেরকে নিয়ে তাজউদ্দীন মেডিকেলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমিই প্রথম আহত দু’জনকে আমার ইজিবাইকে করে হাসপাতালে পৌঁছে দিই। এরপর শুনি এত ঘটনা।     

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গাজীপুরের মুখ্য সংগঠক মো. রবিউল হাসান ও  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. নয়ন দেওয়ান বলেন, কিছু লোক গাজীপুর মহানগরের ধীরাশ্রম এলাকায় সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের গ্রামের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, এমন খবর পেয়ে আমাদের লোকজন ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই এলাকাবাসী আমাদের লোকজনের ওপর হামলা চালায়।

গাজীপুরে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীকে গুলি
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে জানান, গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সারাদিনের আন্দোলনের কর্মসূচি শেষে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কয়েকজন। এ সময় মোটরসাইকেলে এসে অতর্কিত গুলি ছোড়ে এক ব্যক্তি। এতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন মোবাশ্বের হোসেন নামের এক ছাত্র। তার হাতে গুলি লেগেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই গুলি ছুড়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. নয়ন দেওয়ান বলেন, সন্ধ্যায় শহরের জোড় পুকুরপাড়ের দিক থেকে মোটরসাইকেলে এসে এক ব্যক্তি গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। এতে ওই শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে তাকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।   

অন্যদিকে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে শুক্রবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)কে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার নাজমুল করিম খান।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনের সড়কে অবস্থান করে সমাবেশ চলাকালে সেখানে এসে পুলিশ কমিশনার বলেন, গতকাল রাতে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। আমি ব্যর্থতা স্বীকার করে নিচ্ছি। হামলাকারী কাউকে ছাড়া হবে না, প্রতিটি হামলার জবাব দেয়া হবে। যেসব পুলিশ রেসপন্স করতে দেরি করেছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুনেছি, আমার ওসি দুই ঘণ্টা পর আপনাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আমি এখানে দাঁড়িয়ে বললাম, তাকে সাসপেন্ড (বরখাস্ত) করবো। আমি বলতে চাই, যারা এই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আঁতাত করেছে, তাদের পুলিশে চাকরি করতে দেয়া যাবে না। পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, গত ১৭ বছর ধরে যারা অত্যাচার করেছে, দেশের ওপর জুলুম করেছে, তারা মাথাচাড়া দিচ্ছে। কিন্তু তাদের কোনো মাথাচাড়া বরদাশত করা হবে না। ইতিমধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাতে চিরুনি অভিযান চালানো হবে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দমন করার জন্য ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ পরিচালনা করা হবে।

হামলার প্রতিবাদে দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ
সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের গাজীপুরের বাড়িতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৮ জন আহত হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে গাজীপুর। হামলা চালিয়ে আহত করার প্রতিবাদে ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে দিনভর বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি এসব কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মসূচিকে ঘিরে জেলা শহরে ছিল থমথমে পরিস্থিতি। গত শুক্রবার রাতে হামলায় আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় ছয়জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আহত তিনজন ভর্তি আছেন শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গাজীপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর খুনি মোজাম্মেল ও জাহাঙ্গীর এবং আওয়ামী দোসরদের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করে অবস্থা কর্মসূচি, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। শনিবার সকাল ১১টা থেকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে শহরের রাজবাড়ী সড়কে ও ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ী ময়দানে এসব কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় হামলার প্রতিবাদে সড়কে অবস্থান নিয়ে গাজীপুরে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সারজিস আলম।

সমাবেশে সমন্বয়ক সারজিস আলম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আজকে রাতের মধ্যে গাজীপুরের ছাত্র-জনতার ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে আমরা সরকার ও পুলিশের বিপক্ষে অবস্থা নেবো। সারজিস আরও বলেন, আজকের পর থেকে যদি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কোনো ক্যাডার আমার ভাইকে হুমকি দেয় তারপরের দিন তার জায়গা হবে জেলখানায়। খুনি শেখ হাসিনা ও খুনি জাহাঙ্গীরের দোসররা যদি এই গাজীপুরে আবার উত্থান করতে চায়, তাহলে ছাত্র-জনতা তাদের ছাড় দিবে না।

দুপুরে জাতীয় নাগরিক কমিটির সমাবেশ শেষে  রাজবাড়ী মাঠ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এর আগে সেখানে জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সংগঠক ও ক্রাইসিস রেসপন্স সেল বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট আলী নাসের খান, কাউন্সিলর এসোসিয়েশন নেতা এডভোকেট নজরুল ইসলাম খান। জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সংগঠক এডভোকেট আলী নাসির খান  আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল, আওয়ামী দোসরদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, তাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা এবং হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার দাবি করেন।

স্থানীয়রা জানান, রাতের আঁধারে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩১নং ওয়ার্ডের দক্ষিণখান এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হকের দ্বিতল বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দাবি, ওই ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পেয়ে তারা তা প্রতিহত করতে সেখানে যান। এ সময় পরিকল্পিতভাবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ মাইকে ডাকাতের গুজব ছড়িয়ে জড়ো হয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়। এ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রদের মারধর করে আহত করা হয়। এ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্তত ১৫ জন আহত হয়। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রাতের ঘটনায় মোট ১৮ জন আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে ৬ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, শনিবার সকালে হাসপাতালে আহতদের খোঁজখবর নেন জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন। তিনি এ সময় চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন এবং সুচিকিৎসার জন্য নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোজাম্মেল হকের বাড়ি পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। এ ব্যাপারে শনিবার বিকাল পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়নি বলে জানিয়েছেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা  আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

ওদিকে শুক্রবার রাতের ঘটনায় সদর থানার ওসিকে প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন মহানগর পুলিশের কমিশনার নাজমুল করিম খান। এছাড়া ওই ঘটনার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে ক্ষমা চান। বলেন, হামলাকারীদের কাউকে ছাড়া হবে না।

mzamin

গাজায় যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য কী দখলদারিত্ব

গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য কৃতিত্ব দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তিনি ফিলিস্তিনের এই ভূখণ্ডকে জোরপূর্বক জনশূন্য করার আহ্বানও জানিয়েছেন গত সপ্তাহে। বলেছেন, গাজাবাসীকে মিশর, জর্ডান, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেখানে তারা বসতি গড়বেন। এটা হতে পারে অস্থায়ী সময়ের জন্য। হতে পারে দীর্ঘমেয়াদে। এর অর্থ গাজাবাসীকে গাজা থেকে উৎখাত করা হবে। কিন্তু গাজাবাসী এই প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এমন প্রস্তাবের কড়া নিন্দা করেছে হামাস, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ, আরব দেশগুলো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ অনেক দেশ। তারপরও একই কথা বলছেন ট্রাম্প। এতে গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অনলাইন আল-জাজিরায় এসব কথা লিখেছেন সাংবাদিক আলী হার্ব। তিনি লিখেছেন, বার বার গাজাকে জনমানবশূন্য করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো তার এ হুমকিকে এথনিক ক্লিনজিং বা জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ফিলিস্তিনের গাজাকে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নিতে পারে বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

এমন অবস্থায় সারা বিশ্বের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদেরকে জোরপূর্বক উৎখাত করা হলে তাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া ট্রাম্প যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির জাস্টিস অ্যান্ড পিস প্রোগ্রামের লেকচারার জোশ বুবেনার বলেন,  গাজায় বসবাসকারী কমপক্ষে ২০ লাখ ফিলিস্তিনির বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে আক্রোশপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন তা জাতি নিধনের সমতুল্য। এতে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে  হেয় করা হয়। অবশ্যই ফিলিস্তিনি জাতিনিধন যুদ্ধবিরতির কোনো অংশ নয়। কিন্তু ট্রাম্প সেই বিষয়টিই আলোচনায় আনছেন। তিনি অতি ভঙ্গুর এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ভেঙে দেয়ার পক্ষে। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় মেয়াদে ২০শে জানুয়ারি শপথ নেন ট্রাম্প। এর আগের দিন ১৯শে জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করেছেন তার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিফ উইটকফের নেতৃত্বে আলোচনার প্রস্তাব এগিয়ে গেছে। তার ফলেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে। ট্রাম্প তার উদ্বোধনী ভাষণে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন একজন পিসমেকার এবং একীভূতকরণ বিষয়ক একটি লিগেসি রেখে যাবেন। এর কয়েকদিন পরেই গাজাকে জনমানবশূন্য করে দেয়ার কথা বলেন। এটা একবার-দু’বার বললে তা উড়িয়ে দেয়া যেত। কিন্তু তিনি বার বার একই কথা বলতে থাকেন। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশে নিয়ে তিনি তার ওই প্রস্তাব আবার প্রকাশ করেন। ট্রাম্প এ সময় বলেন- আমরা গাজা উপত্যকা দখল করবো। তা নিয়ে কাজ করবো। এটা হবে আমাদের।

তার এমন মন্তব্যের মধ্যেও যুদ্ধবিরতি চুক্তি অব্যাহত আছে। তবে বন্দুকের ট্রিগার নীরব আছে। একে-একে হাতে থাকা ইসরাইলি জিম্মিকে মুক্তি দিচ্ছে হামাস। গতকালও তারা তিন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শেষ পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আলোচনা হচ্ছে- গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রথম দফায় মোট ৩৩ জন ইসরাইলি জিম্মিকে মুক্তি দেয়ার কথা। এ সময়ে গাজায় ব্যাপক হারে মানবিক সহায়তা দেয়ার কথা। সেখানে মোতায়েন ইসরাইলি সেনাদের আংশিক প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা। এর মধ্য দিয়ে চুক্তির প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ১লা মার্চ। দ্বিতীয় দফায় গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা। এর ফলে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হওয়ার কথা। হামাসের হাতে বাকি সব জিম্মিকে মুক্তি দেয়ার কথা। তৃতীয় দফায় গাজাকে ৫ বছরের মধ্যে পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন প্রস্তাব রয়েছে।

কিন্তু গাজার মানুষকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়ার যে কথা বলছেন ট্রাম্প- তা চুক্তিতে যে আগ্রহের কথা বলা হয়েছে, তার বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই চুক্তির কোনো অংশ মানতে দৃশ্যত এখন অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে।

ট্রাম্পের দূত উইটকফ মঙ্গলবার বলেন, ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্ত করতে প্রথম দু’টি দফা পূরণে সচেষ্ট থাকবে ওয়াশিংটন। কিন্তু গাজা পুনর্গঠন নিয়ে বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেছেন, চুক্তির আলোচনায় যেভাবে বলা হয়েছে এটা যেভাবে এগুবে না। চুক্তি করার সময় তিনি ট্রাম্প টিম থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। বলেছেন, শুরু থেকেই বিষয়টি সুন্দর ছিল না। এরপর কী হবে আমরা জানি না। ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে কথা বলা থেকে সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিত বলেছেন, গাজার মানুষকে অস্থায়ীভিত্তিকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়া হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, গাজাবাসীকে বাস্তুচ্যুত করার প্রক্রিয়া হবে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য। গাজা পুনর্গঠনের পর তারা আবার ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি তা-ই বলেছেন! তিনি গত সপ্তাহে প্রায়দিনই তার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন।

তিনি বলেছেন, গাজাবাসীকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা আছে তার এবং গাজার মালিকানা এরই মধ্যে দাবি করে বসেছেন তিনি। আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসি’র নির্বাহী পরিচালক খলিল জাহশান বলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য সর্বনাশা। হোয়াইট হাউস থেকে যেসব কথা আমরা শুনেছি, আমার সাধারণ বিচারে, তা হবে পুরোপুরিভাবে যুদ্ধবিরতিকে হত্যা করা। গাজা এবং গাজাবাসীর জন্য দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ছিল এ সমস্যার সমাধান। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।  যদি গাজাবাসীকে জাতিগতভাবে ইন্দোনেশিয়া থেকে আলবেনিয়া বা অন্য কোথাও স্থানান্তরিত করা হয়, তাহলে এসব প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য কি? এমনকি ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এই যুদ্ধ শিগগিরই শুরু হয়ে যেতে পারে।
মঙ্গলবার তিনি বলেন, হামলা পরের দিনই শুরু হয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক খালেদ এলগিনডি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের মঙ্গলের জন্য যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের আগ্রহ নেই। তিনি শুধু যুদ্ধবিরতিতে সংবাদ শিরোনাম হতে চান। তিনি কৃতীত্ব দাবি করেন। তিনি বলতে চান- আমি জিতেছি। আমিই সেই ব্যক্তি, যে এটা করতে পেরেছে।

mzamin

ভারত, চলুন একসঙ্গে কাজ করি by মো. তৌহিদ হোসেন

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শাসনের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক একটি জটিল  মোড়ে পৌঁছেছে। আমার  মনে হয়  ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পূর্বাভাস  পেতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন স্বার্থ এবং সহযোগিতামূলক সম্ভাবনার কথা ভুলে গেলে চলবে না।  অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং আমি ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সামনে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। ইতিবাচক দিকগুলোকে মাথায় রেখে ভুল বোঝাবুঝি ও সমস্যাগুলো নিরসনের মাধ্যমে আমরা যথাযথ গুরুত্ব সহকারে কাজ করতে ইচ্ছুক। আমাদের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট: আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি ভালো কাজের সম্পর্ক চাই। আমরা আশা করি ভারতও বাংলাদেশের এই ইচ্ছায় সম্মতি জানাবে।

ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সফর একটি  ‘ইতিবাচক উদ্যোগ’ ছিল। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার যে ধারা শুরু হয়েছে,  সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে  উভয় দেশের মানুষই উপকৃত হবে। ২০ শতকের শেষ দশক থেকে শুরু করে, ভারত উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব অর্জন করেছে। তা বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এর প্রাণবন্ত প্রযুক্তি খাত  হোক বা এর অর্থনীতি, যা এখন বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম। বাংলাদেশেরও উল্লেখযোগ্য অর্জনের ক্ষেত্র রয়েছে। আমাদের পোশাক রপ্তানি ক্ষেত্রটি চীনের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের অবদান অন্য যেকোনো  দেশের চেয়ে বেশি, সারা বিশ্বের হটস্পটগুলোতে  প্রয়োজনীয় পরিষেবা প্রদান করে। নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূস প্রবর্তিত এখানকার ক্ষুদ্রঋণ মডেলগুলো বিশ্বব্যাপী শিল্পের সৃষ্টি ও বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে। ভারতেও এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
বাংলাদেশি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে অনেক শোরগোল তৈরি হয়েছে ভারতে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পূর্ববর্তী শাসনের পতন এবং অন্তর্র্বর্তী সরকার নিয়োগের মধ্যে বিদ্যমান শূন্যতার সময় বাংলাদেশের  আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না এবং অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। এগুলো বিশেষ করে পূর্ববর্তী শাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রভাবিত করেছে। তাদের অধিকাংশই মুসলমান। কিছু হিন্দুও রয়েছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্র্বর্তী সরকার এসব অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। এমনকি সারা দেশের জনগণও সাহসিকতার সঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাদের পরিবার ও মন্দিরের সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসে। তা সত্ত্বেও ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে’ ভারতের গণমাধ্যম ও সাইবারস্পেস  অতিরঞ্জিত ও প্রায়শই পুরোপুরি ভুয়া তথ্য প্রকাশ করে নেতিবাচক পরিবেশ  সৃষ্টি করতে চাইছে।

বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তী সরকার তাদের ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বাংলাদেশের হিন্দুরাও  সমানভাবে দেশের নাগরিক। ভয়েস অফ আমেরিকা পরিচালিত একটি স্বাধীন সমীক্ষা  দেখে আমরা খুশি হয়েছিলাম।  যেখানে দেখা গেছে, আমাদের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিশ্বাস করে যে, অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধীনে সংখ্যালঘুদের চিকিৎসার উন্নতি হয়েছে। আমরা দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মডেল হতে চাই। কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই যা ঘটছে তা রিপোর্ট করার জন্য, আমরা ভারতীয় সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাই। ভারতীয় জনগণ তাদের নিরপেক্ষ তদন্ত রিপোর্ট থেকে সঠিক তথ্য জানতে পারবেন।

অন্তর্র্বর্তী সরকার সার্ক জোটকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সংস্থার কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। তবে এ বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে এখনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।  আমরা জানি, দক্ষিণ এশিয়ার  দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তবে হাজারো মাইলের যাত্রা ছোট একটি পদক্ষেপের মাধ্যমেই শুরু হয়। প্রথম ধাপ হিসেবে আমরা কি পারি না এ অঞ্চলের সব নেতার পরবর্তী কোনো  বৈশ্বিক সম্মেলনে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে একটি ছবি তুলতে, যা আমাদের আঞ্চলিক সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের সদিচ্ছা প্রকাশ করবে?’

চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেছে।  যেমন- সাম্প্রতিককালে মৎস্যজীবীদের বিনিময় এবং নেপাল  থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির ত্রিপক্ষীয় চুক্তি। এই ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর ওপর ভিত্তি করে এমন একটি অংশীদারিত্ব তৈরি করতে হবে, যা দুই দেশের মানুষ, এই অঞ্চল ও  বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এক্ষেত্রে একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে সীমান্তে নিরস্ত্র  বেসামরিকদের হত্যার অনুশীলন বন্ধ করা। এই  ইতিবাচক এবং বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উভয়দেশের জনগণেরই অনেক কিছু অর্জন করার আছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।

(লেখক: মো. তৌহিদ হোসেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত তার কলামের অনুবাদ)

mzamin

মেধা পাচাররোধে ইউজিসি’র নতুন পরিকল্পনা by পিয়াস সরকার

দেশের বাইরে থাকা মেধাবী শিক্ষক-গবেষকদের ফেরাতে চায় সরকার। এই উদ্যোগের পাশাপাশি দেশে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এই পরিকল্পনার আওতায় শিক্ষার্থীরা দেশে থেকেই বিদেশি কারিকুলামে অধ্যয়নের সুযোগ পাবেন। চাকরির ক্ষেত্রে মিলবে অগ্রাধিকার। যার ফলে দেশেই থেকে যাবেন মেধাবীরা। এই প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণে এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন (টিএনই)। এই শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে একটি মডেল তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

টিএনই হচ্ছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি রূপান্তরমূলক পদ্ধতি। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিদেশি কারিকুলামে দেশেই অধ্যয়ন করবেন। দেশের মেধা দেশেই থাকবে সেইসঙ্গে কাজে লাগবে উন্নত দেশের গুণগত মানের শিক্ষা। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষায় দেশের বাইরে যাওয়ার খরচ কমবে। বর্তমানে দেশে চলমান ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই)’র মাধ্যমে দেশে-বিদেশে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার এবং ইন্সটিটিউটগুলোর সঙ্গে পার্টনারশিপে গিয়েছে। কিন্তু যথাযোগ্য সফলতা না আসায় টিএনই বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়ায় পরিকল্পনা চলছে।

টিএনই মূলত চারভাবে করা যেতে পারে বলে বলা হয়। প্রথমত, বিদেশের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেশে নির্মাণ করা, বিদেশি ইন্সটিটিউশনের মাধ্যমে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা, দেশে থেকেই বিদেশের কোর্স নিয়ে পড়ানো হবে যা পরিচালিত হবে দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে, যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ডেলিভারি এবং স্বীকৃতি প্রদান।
টিএনই বাস্তবায়ন হলে যেসব সুবিধা মিলবে। এরমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিলেবাস ও টিচিং মেথড। বিদেশে থাকার খরচ, যাতায়াত ও জীবনযাত্রার খরচ কমবে। ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশেষায়িত খাত যেমন হসপিটালিটি এবং ফ্যাশন ডিজাইনের মতো বিষয়ে উচ্চমানের শিক্ষা মিলবে। দেশেই চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য লোক পাবে।
ইউজিসি প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় একটা ফারাক রয়েছে। ২০২২ সালের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে ৫৩টি পাবলিক ও ১০৮টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এরপরও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ভালো প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকার ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই) পলিসি চালু করে ২০১৪ সালে। এই পলিসির মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশে ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে টিএনই পরিচালনা করছে কিন্তু তা দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থায়। উত্তীর্ণ হবার পরও বিপুল পরিমাণ শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। এসব কারণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে যেতে পারছে না। আবার বিপুল পরিমাণ উচ্চ শিক্ষিত দেশে থাকলেও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো দেশের বাইরে থেকে লোক আনছে। এসব কারণে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে ৫.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পায়। ২০১২ সালে দেশ থেকে ২১ হাজার ৯২৭ শিক্ষার্থী দেশের বাইরে যায়।

দেশে বর্তমানে দুটি টিএনই পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এগুলো হলো ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং দ্য এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর ওমেন। লোকাল সেন্টারগুলো এসিসিএ, সিআইএমএ এবং পিয়ারসন এডেক্সসেল পরিচালনা করছে। এই দূরবর্তী শিক্ষাকার্যক্রমগুলো মূলত ইউকে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ইউকে, ইউএসএ, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়ন করছে। বাংলাদেশে পড়তে আসছে নেপাল, মায়ানমার, ইন্ডিয়া এবং ভুটান থেকে। ২০১২ সালে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১,৫৮৯ জন যা ২০২৩ সালে এসে দাঁড়ায় ২৬০০ জনে।
এসব বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলা হচ্ছে। টিএনই প্রোগ্রামের যে খরচ অনেক শিক্ষার্থীই বহন করতে সক্ষম হবেন না। টিএনই অগ্রগতি ধরে রাখার জন্য গুণমান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিএনই দক্ষ আন্তর্জাতিক মানের লোক প্রস্তুতে কাজ করে। এরমাধ্যমে বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি হয়। টিএনই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে সাউথ এশিয়ার মধ্যে একটি এডুকেশন হাব হিসেবে নাম কুঁড়াতে পারে।

কোভিড ১৯ পরবর্তী সময়ে বিদেশে শিক্ষার জন্য বাংলাদেশের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ৫৩টি হলেও যথাযোগ্য শিক্ষাদানে ব্যহত হচ্ছে। একই সময়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে (১১০টি)। এরমধ্যে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কোলাবরেশন, ডুয়েল ডিগ্রির ব্যবস্থা, ফ্রাঞ্জাইজড প্রোগ্রাম চালু করেছে। তবে টিএনই দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি খরচ বহন করতে হবে। টিএনই অনেক সময় তার মূল প্রতিষ্ঠানের মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না। টিএনই শিক্ষায় স্থানীয় সংস্কৃতি ধারণ করতে পারে না সেইসঙ্গে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের যোগসূত্র স্থাপনে ব্যর্থ হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ জনসংখ্যার বয়স ৩০ এর নিচে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা উচ্চমানের শিক্ষার সুযোগ পাবে। চাকরির বাজারে এই শিক্ষার্থীরা ভালো সুযোগ পাবে, তারা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দেশে বসেই অর্জন করতে পারবে। টিএনই বাস্তবায়নে ভর্তি সংক্রান্ত সময়ে গ্যাপটা পূরণ করতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিক পরিমাণ বৃত্তি ও আঞ্চলিকতা বিবেচনায় শিক্ষাব্যয় কমাতে হবে।

টিএনই নিয়ে একটি পরিকল্পনা এনেছে ইউজিসি। এটি করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ, সহযোগিতায় ছিলেন ইউজিসি পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভুঁইয়া। এটি প্রস্তুত করেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাব্বির হোসাইন। তারা সম্প্রতি এই মডেলটির উল্লেখ শ্রীলঙ্কায় হয়ে যাওয়া একটি শিক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে।  
এবিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে টিএনই গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। যার ফলে মেধাবীদের প্রাপ্ত শিক্ষা দেশের উন্নয়নে কাজে আসবে। তিনি আরও বলেন, এর নানান ধরণের চ্যালেঞ্জ আছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের উচ্চ শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। উপকৃত হবে দেশ।

mzamin