Thursday, May 23, 2019

মায়ের আশা চন্দন একদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন

সন্তানের ভালোবাসার কাছে সব কিছুই তুচ্ছ। সন্তান যতো বড়ই হোক মায়ের কাছে সব সময় ছোট্ট খোকাটিই হয়ে থাকে আজীবন। তাইতো ছেলে মার্কিন মুল্লুকের প্রভাবশালী সিনেটর হলেও তাকে কাছে পেয়ে কিছুতেই আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না মমতাময়ী মা সৈয়দা হাজেরা খাতুন (৯৩)। বয়স শতকের কোটা ছুঁই ছুঁই। তবে অনেকদিন পর সন্তানকে দেখে যেন সাধ মিটছিল না তাঁর। ছোট্ট খোকাটির মতো সিনেটর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বারবার কপালে চুমু খাচ্ছিলেন। আর মায়ের আদরভরা ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সিনেটর ছেলের দু’চোখ দিয়ে ঝরে পড়ছিল আনন্দের অশ্রু। গত বুধবার বিকালে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সরারচর গ্রামে বৃদ্ধ মা আর সিনেটর ছেলের এমন ভালোবাসাবাসির দৃশ্য দেখে সেখানে অবস্থিত সবার চোখই ছিল ছল ছল।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর শেখ মুজাহিদুর রহমান চন্দনের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার সরারচরে। গত নভেম্বরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেটর নির্বাচিত হন। সরারচরে গ্রামের বাড়িতে মা সৈয়দা হাজেরা খাতুন বসবাস করেন। মূলত তাকে দেখার জন্যই তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন। এ সময় অনেক দিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন হাজেরা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে একদিন দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়াবে- এমন স্বপ্ন ছিল অনেক আগেই। তাই ছেলে আজ সিনেটর হওয়ায় যেনো তার আনন্দের শেষ নেই।
হাজেরা খাতুন বলেন, ‘কতোদিন পর আমার ছেলেকে কাছে পেয়েছি। তাই এ আনন্দ কেমন করে ধরে রাখি! সন্তান জন্মের পরই আমার বিশ্বাস ছিলো- আমার ছেলে-মেয়েরা একদিন দেশ-বিদেশে সুনাম বয়ে আনবে।’ বড় ছেলে শেখ মুজাহিদুর রহমান চন্দন সিনেটর নির্বাচিত হওয়ায় তার চেয়ে বেশি আনন্দিত আর কেউ হয়নি জানিয়ে হাজিরা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আমি মনে করি, আমার ছেলে একদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। হয়তো সেদিন আমি থাকবো না।’ দীর্ঘদিন পর মাকে কাছে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি সিনেটর মুজাহিদুর রহমান চন্দনও। বলেন, মূলত মাকে দেখার জন্যই ছুটে আসা। ৬ বছর আগে একবার দেশে এসেছিলাম। তবে এবারের আসাটা একেবারেই ভিন্ন। দীর্ঘ প্রায় ৩৯ বছর পর এই প্রথম বারের মতো গ্রামের বাড়িতে সব ভাই-বোনদের এক সাথে দেখা ও তাদের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে।’
এ সময় তার বড় বোন তাহেরা হক, ছোট ভাই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, ছোট বোন মুক্তিযোদ্ধা ডা. তাহমিনা আক্তার সামিয়া, ছোট বোন আমেরিকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাদিরা রহমান ও নাহিদা আক্তার, ভাগ্নি জামাই মার্কিন নাগরিক ওয়েস্টিন সাসম্যান, ভাগ্নি মিশাসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক চন্দন দীর্ঘ দিন ধরে আমেরিকায় ডেমোক্রেডিট দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। ভাই-বোনদের বেশিরভাগই দেশের বাইরে থাকেন।
সিনেটর নির্বাচিত হওয়ায় বুধবার সন্ধ্যায় তাকে সংবর্ধনা দেয় এলাকাবাসী। সরারচরের নিজ বাড়িতে এ সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। সংবর্ধনার জবাবে সিনেটর শেখ মুজাহিদুর রহমান চন্দন বলেন, ‘এলাকাবাসীর এ ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবো না।’ বাংলাদেশ দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের প্রভূত উন্নতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আর আগের বাংলাদেশ নেই। মানুষের ভাগ্যের উন্নতি হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এ যেনো এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ।’

ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি: দ্বিতীয় জীবন পাওয়ার বর্ণনা ওদের মুখে by জিয়া চৌধুরী

ভয়ঙ্কর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে হবে ছোট্ট নৌকায়। একটি নৌকায় প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি ও সোমালিয়ান নাগরিক। এ যেন জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সাগর জয়ের চেষ্টা। সিলেটের ছায়েদুল ইসলামের বয়স সবে মাত্র ১৬। ভূমধ্যসাগরের বিশাল জলরাশি কিংবা দালাল চক্রের নির্যাতন এমন  অমানবিক গল্প ডিঙ্গিয়ে তৈরি করতে চেয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। সিলেট থেকে ইউরোপ এমন স্বপ্নে বিভোর ছায়েদুলকে দেখতে হয়েছে ভাগ্যের নির্মমতা।
পরিবার-পরিজন, কিংবা কিশোর বয়সের উচ্ছ্বলতা সবকিছু পেছনে ফেলে যার কাছে ইউরোপ পৌঁছানোই ছিল মূখ্য। ভাগ্যের তাড়নায় অগত্যা ঘর ছাড়ে ছায়েদুল, পাড়ি জমায় এক ভয়ঙ্কর যাত্রায়। সিলেট থেকে যাত্রা শুরু হয় ইউরোপের উদ্দেশ্যে। ভারত, দুবাই, জর্ডান হয়ে স্বপ্নের ইউরোপের একেবারে কাছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ের দেশ লিবিয়ায়। লিবিয়া থেকে ত্রিপোলি উপকূলে পৌঁছে সিলেটে থাকা পরিবারের সঙ্গে কথাও হয় ছায়েদুলের। আর মাত্র কয়েক দিন পর ইউরোপ পৌঁছে যাবার কথা জানায় মুঠোফোনে। এর মধ্যে দালাল চক্রকে বুঝিয়ে দেয়া হয় প্রায় নয় লাখ টাকাও। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরের ত্রিপোলি উপকূলে পৌঁছালে ছায়েদুলের ঠাঁই হয় ‘গেইম ট্র্যাপ’ নামে ঘরে। যেখানে আটকদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা বুঝে নিতে চলে নির্যাতন। তবুও হাল ছাড়েনি ছায়েদুল, সে তখন স্বপ্ন থেকে মাত্র কয়েক হাজার কিলোমিটার সমুদ্র পথ দূরে। গেইম ঘর থেকে মুক্তির পর ত্রিপোলি উপকূল থেকে দালালদের হাত বদলে ছায়েদুলের ঠাঁই হয় নৌকায়।
জাহাজে করে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রার কথা বললেও তাকে নৌকায় তুলে দেয় বাংলাদেশি দালাল চক্রের সদস্যরা। পঞ্চাশ জন করে তিনটি নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেবার ভয়ঙ্কর যাত্রা শুরু হয় তার। ত্রিপোলি উপকূল থেকে যাত্রা শুরু হওয়ার পর ছায়েদুল শুধু ক্ষণ গুনছিলেন কখন ইতালি পৌঁছাবেন। ত্রিপোলি থেকে ইতালি সাগরপথে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কিলোমিটার দুরত্ব। পাড়ি দিতে সময় লাগে সময়ভেদে ত্রিশ ঘণ্টারও বেশি। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, ছায়েদুলও পৌঁছে যাচ্ছিলেন তার স্বপ্নের কাছে। তবে, তিউনিসিয়া উপকূলে পৌঁছালে হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় নৌকার ইঞ্জিন। পাশে থাকা আরেকটি নৌকাও দেখা দেয় একই গোলযোগ। ভয়ে চিৎকার করে ওঠেন অনেকে। জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সাগরে ভাসতে হয় দু’দিন। তাদের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে তিনটি নৌকার দুটিতে জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এই দুই নৌকায় থাকা বাংলাদেশি ও সোমালিয়ান নাগরিকদের ১১ মে তিউনিসিয়ার উপকূল থেকে উদ্ধার করে দেশটির কোস্টগার্ড বাহিনী। অন্য একটি নৌকার তলা ফেটে গেলে তাদের সঙ্গে ছায়েদুলদের আর যোগাযোগ হয়নি।
গত মঙ্গলবার তিউনিসিয়ায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৫জনকে দেশে ফিরিয়ে আনে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন(আইএওএম)। তিউনিসিয়া উপকূলে জ্বালানি শেষ হয়ে গেলেও ভাসতে থাকায় এরা জীবিত ফিরতে পেরেছে বলে জানা গেছে। তিউনিসিয়া থেকে বেঁচে ফিরে আসা ১৫ জন হলো: মাদারীপুরের শাহীন বিজয়(২৬), সিলেটের ইকবাল হোসেন(২৩), সেন্টু চন্দ্র সাহা(৪৭), মো. ছায়েদুল ইসলাম(১৬), মো. সোহেল আহমেদ(১৮), শাহেদ আহমেদ(৪০), মো. রুবেল আহমেদ(৩১), মাসুম খান(৩২), সুনামগঞ্জের আনোয়ার হাসান(২৬) ও মোহাম্মদ আবদুল মতিন(৪১), ভৈরবের আমির হোসেন(৩৫), কিশোরগঞ্জের এরফান চৌধুরী(২৬), ) হবিগঞ্জের রাশেদ মিয়া(২৫), সজীব মিয়া(১৯) ও মো. সোহেল রানা(২৬)। আউটপাস নিয়ে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে মঙ্গলবার দুুপরে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় এই ১৫জন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে দালাল চক্রের বিষয়ে জানতে কথা বলে ইমিগ্রেশন পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব), পুলিশের বিশেষ শাখা ও অনান্য গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা। কথোপকথনে লিবিয়া ও বাংলাদেশে থাকা মানপাচারের চক্রটির বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে বলে কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে।
পরে মঙ্গলবার রাতে তাদের যার যার বাড়িতে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করা হয়। তিউনিসিয়া থেকে বেঁচে ফিরে আসা হবিগঞ্জের সোহেল রানার সঙ্গে রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় কথা হয় এই প্রতিবেদকের। সোহেল রানা জানান, গত ২৮ জানুয়ারি নিজ এলাকার এক দালাল বুলবুলের সহায়তায় লিবিয়ার উদ্দেশ্যে সিলেট ছাড়েন তিনি। ভারত, জর্ডান হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর বুলবুলকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। পরে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য আরেক দালালকে ব্যাংকের মাধ্যমে দিতে হয় আরও সাড়ে তিন লাখ টাকা। সোহেল রানা জানান, দালালদের সঙ্গে চুক্তি ছিল, লিবিয়া থেকে জাহাজে করে ইতালি নেয়া হবে এবং চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। তবে লিবিয়ায় নিয়ে প্রায় তিন মাস একটি ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। গত ৯ মে সন্ধ্যায় লিবিয়া থেকে মোট ৫৭ জনকে একটি নৌকায় তুলে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া হয়। নৌকাটিতে ৮ জন নারী ও তিন শিশুও ছিল। ১০ মে সারাদিন সাগরে ভাসার পর নৌকায় পানি উঠতে শুরু করে। ভাসতে ভাসতে এক সময় তিউনিসিয়া উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় জেলেরা তাদের উদ্ধার করে। পরে তিউনিশয়ার কোস্টগার্ডের সহায়তার তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিলেটের রুবেল আহম্মেদ জানান, তারা ১১ বন্ধু সিলেট থেকে উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমান।
পথে পথে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তারা। শেষমেষ ত্রিপোলি থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে আলাদা নৌকায় রওনা হন ১১ বন্ধু। তবে, নিজেদের মধ্যে মাত্র ৪ জন বেঁচে ফিরতে পেরেছেন। বাকি সাত বন্ধুর খবর এখনো জানেন না তারা। নৌকা ডুবে যাওয়ায় আর বাকি বন্ধুদের হদিস পায়নি তারা। এদিকে, আইওএমের বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অফিসার চৌধুরী আসিফ মহিউদ্দিন হারুন গতকাল মানবজমিনকে বলেন, বুধবার আরো একজন তিউনিসিয়া থেকে দেশে ফিরে আসার কথা রয়েছে। এছাড়া, তিউনিসিয়ায় থাকা ১৪ বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ ফিরতে আগ্রহী হলে তাদেরও ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ই মে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ৪০ বাংলাদেশী নিখোঁজ হন। একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ৪০ জনের সবাই পানিতে ডুবে মারা গেছেন।

ধানের বাজার দরঃ না পেট ভরে না পিঠ ঘুরে by ইমাদ উদ দীন

এক মণ ধান বিক্রি করে মেলে না এক কেজি মাংস। সব খরচ ছাড়াও হয় না একজন শ্রমিকের মজুরিও। রোদ বৃষ্টিতে সারা বছর হাল চাষ করে না পাই পেট পুরে খেতে। আর না পারি ভালো পোশাক পরতে। ধান পাওয়ার পরও টানপড়েনের সংসার। কারণ যে খরচ করে ধান চাষ শেষে ফসল ঘরে তুলি, ধানের বাজার দর কম থাকায় তা বিক্রি করে সে ব্যয়টিও উঠাতে পারি না। প্রতিবছরই প্রতিজ্ঞা করি আর ধান চাষ করব না। জায়গা পতিত রাখব। কিন্তু ঐতিহ্য রক্ষায় মৌসুম এলেই পেছনের কথা ভুলে যাই। আবারো নব উদ্যমে স্বপ্ন প্রত্যাশায় শুরু করি নতুন মৌসুম। কিন্তু যেই সেই। ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষক হয় হতাশ। আর ব্যবসায়ীরা হয় আঙুল ফুলে কলাগাছ। এভাবে আর চলে না। এর দ্রুত সুষ্ঠু সমাধান না হলে কৃষক আর কৃষি কোনোটাই বাঁচবে না। গত ১৬ মে ২০১৯ বিকালে এমনি ভাবে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন হাকালুকি হাওরের তীরবর্তী ভূকশিমইল ইউনিয়নের মুক্তাজিপুর গ্রামের কৃষক ফয়ছল আহমদ, লীল মিয়া, হারিছ মিয়া, তোতা মিয়া, বরদল গ্রামের জসিম আহমদ, মহিষঘরি গ্রামের কৃষক আনফর আলী, আমিন মিয়া, কুটি মিয়া, আব্দুল খালিক, গৌড়করনের লেচু মিয়াসহ অনেকেই। তারা ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে বলেন, আমাদের নিয়ে ভাবলে আমাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতো সরকার। ধানের ন্যায্য মূল্যও দিতেন।
এমনটি হলে আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারতাম। আমরাতো হাওর পাড়ের মানুষ, আমাদের জীবন জীবিকা ওই বোরো ধানের ওপরই নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলে আমাদের কৃষি ক্ষেত। নাব্যহ্রাসে বন্যা ও খরা  মোকাবিলায় অতিষ্ঠ হয়েও কখনো কখনো ধানের বাম্পার ফলন হলেও মেলেনা দাম। এখন কেজি প্রতি ধানের দাম সাড়ে এগারো থেকে সাড়ে চৌদ্দ টাকা বিক্রি হলেও কেজি প্রতি চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৬ থেকে ৪৫ টাকা। কিন্তু আমরা ধানের দাম পাই না। তারা বলেন ফড়িয়া ব্যবসায়ী কিংবা মিল মালিকরা লাভবান হলেও আমরা হচ্ছি ক্ষতিগ্রস্ত। সরকার আমাদের দুঃখ দুর্দশা দেখেও দেখে না। সরকার শুধু মিল মালিকদের খুশি করতে ব্যস্ত। তা না হলে সরাসরি আমাদের কাছ থেকেই ধান ক্রয় করত। ২০১৭ সালে বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় সর্বস্ব খুইয়েছিল এ জেলার হাওর ও নদী তীরের বোরোচাষিরা।
তখন পাকা-আধাপাকা বোরো ধানের সঙ্গে বানের পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল তাদের মাথা গুজার একমাত্র ঠাঁই বসতভিটাও। তখন পচা ধানের বিষক্রিয়ায় মারা যায় মাছ, হাঁস জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদও। আর ২০১৮ সালে বোরো ধানের উৎপাদন ভালো হলেও হঠাৎ ব্লাস্ট ও নেক ব্লাস্টের আক্রমণে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন বোরোচাষিরা। তবে এ বছর ভিন্ন দৃশ্য হাওরজুড়ে। হাকালুকি, হাইলহাওর আর কাউয়াদিঘি হাওরসহ জেলার ছোট বড় হাওর ও নদী এলাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে বোরো ধানের। তবে তাদের এই খুশি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। কারণ তারা ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। তাই ধানের উৎপাদন ব্যয় কিভাবে পুষাবেন এ নিয়ে রয়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। জেলা কৃষি বিভাগ জানায় এবছর বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩ হাজার ১১৬ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ৫৩ হাজার ১৬২ হেক্টর। আর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৯ হাজার ১৯৯ টন। আর উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ৮৪৪ টন।
জানা যায় এ মৌসুমে সাড়ে এগারো লাখ টন চাল এবং দেড় লাখ টন ধান ক্রয় করবে সরকার। ২৫শে এপ্রিল থেকে সারা দেশে এই ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়ে ৩১শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। সরকার ৩৬ টাকা সিদ্ধ ও ৩৫ টাকা আতপ চাল কেজি দরে ক্রয় করবে। ধান প্রতি মণ ১০৪০ টাকা দরে ক্রয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারি ভাবে ধান ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ ও বরাদ্দ না থাকায় এ জেলার কৃষক মণ প্রতি ধান বিক্রি করছেন ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা। সরকারের এই ঘোষণায় স্থানীয় হাওর পাড়ের কৃষক তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এমন সিদ্ধান্তে মিল মালিকরা উপকৃত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন চাষিরা। কৃষক বাঁচাতে তারা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জোরালো দাবি জানান। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিনয় কুমার দেব গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানান এ জেলায় সরকারি ভাবে ১ হাজার ৪৫৫ টন ধান  ও ৭ হাজার ৭শ’ ৭ টন চাল ক্রয় করা হবে। জেলার ৭ উপজেলার ৮টি গুদাম এজন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান ক্রয় সংক্রান্ত এই বরাদ্দের নির্দেশনাটি ২৭শে এপ্রিলে তাদের হস্তগত হয়েছে। ২রা মে এ বিষয়ে জেলায় মিটিংও হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, এ জেলায় এখনো ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়নি।
শিগগিরই ধান চাল ক্রয় কার্যক্রম চলবে। হাওর বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন আহমেদ বাদশাহ মানবজমিনকে বলেন গেল কয়েক বছরের মধ্যে এবছর বোরো ধানের বাম্পার ফলনে কৃষক আনন্দিত। তবে ধানের মূল্য কম হওয়ায় তাদের সে আনন্দ অনেকটাই ম্লান হচ্ছে। সরকার মিল মালিকগণকে বাঁচাতে মরিয়া। অথচ ওই মিল মালিকরা ধান চাষ করেন না। তারা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান ক্রয় করে বেশি দামে সরকারের কাছে বিক্রি করেন। এতে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তিনি বলেন, সারা দেশে সরকারি ভাবে এখনো একটি ধানও ক্রয় করা হয়নি। সরকার কৌশলে ওই ধান চাল মূলত মিল মালিকের কাছ থেকে কিনতে চান। এই ঘোষণা শুধুমাত্র লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই না। তিনি কৃষক বাঁচাতে এ বিষয়ে সরকারকে সদয় হওয়ার আহ্বান জানান।

ধানের দামে কৃষকের কান্না by এম এম মাসুদ ঢাকা ও আশরাফুল ইসলাম

ক্ষেত ভরা পাকা ধান। কেউ কেউ তা কেটে তুলছেন গোলায়। আবার শ্রমিকের অভাবে কেউ কেউ আছেন কেটে তোলার অপেক্ষায়। কিন্তু কারও মুখে হাসি নেই। বরং চাপা কান্নায় বুক ভারী কৃষকের। কারণ ধানের দাম নেই। জমি চাষ করতে যে খরচ হয়েছে পুরো ফলন বিক্রি করেও তা উঠবে না। তাহলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমি চাষ করে কী লাভ? কষ্টের পুঁজি খাটানোরই বা দরকার কী? এমন প্রশ্নের কোন উত্তর পাচ্ছে না দেশের মেরুদণ্ড খ্যাত কোটি কৃষক। কৃষি অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষক পরিস্থিতির শিকার। সরকারি নীতিও কৃষকের এমন দুরবস্থার জন্য দায়ী। এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে সামনে ধান চাষই ছেড়ে দিতে পারেন অনেকে।
বোরো ধানের মণ বাজারে প্রকার ভেদে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি গুনতে হচ্ছে পাঁচশ থেকে নয়শ টাকা পর্যন্ত। অবস্থা এতোটাই ভয়াবহ যে, ক্ষোভে দুঃখে অভিনব এক প্রতিবাদ করেছেন টাঙ্গাইলের কৃষক আবদুল মালেক সিকদার। গত রোববার নিজের পাকা ধানের ক্ষেতে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষকদের এ দুর্দশা পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত বলে মনে করে সংশ্লিষ্টরা।
ধানের দাম না পাওয়ার কারণ হিসেবে কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে কাজ করা গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, সরকার ধানের দাম নির্ধারণ করতে দেরি করে। যেটা করা দরকার ছিল মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গে। দামটা নির্ধারণ করে বাজারে দেয়া হলে ফড়িয়ারা কৃষকের সঙ্গে কারসাজি করতে পারতো না। দাম নির্ধারণে দেরি করায় ফড়িয়ারা সুযোগ নেয়। এটা একটা বড় সমস্যা। তিনি বলেন, সরকার যে পরিমাণ ধান ক্রয় করে তা খবুই সীমিত। আবার যা ক্রয় করে তা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে নেয় না। ক্রয় করে চাতাল মলিক বা ধান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এটাও একটা অন্যতম বড় সমস্যা। সরকার যে পরিমাণ ধান ক্রয় করে তা কোনোভাবেই বাজারে প্রভাব ফেলে না বলে মনে করেন তিনি।
শাইখ সিরাজ বলেন, সরকারের নিজস্ব গুদামে ধান বা চালের ধারণ ক্ষমতা যদি ২০ লাখ টনের কাছাকাছি হয়। তা হলে এই পরিমাণ ধান-চাল দিয়ে বছরে ৩ কোটি টনের বাজারে ফড়িয়াদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকা সরকারের জন্য মুশকিল। সরকারের কাছে যদি ৫০ লাখ টন খাদ্য মজুদ থাকতো তা হলে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে পারতো। এতো স্বল্প পরিমাণ চাল নিয়ে সরকারের পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রয় অসম্ভব। তিনি বলেন, কৃষককে সবাই ঠকায়। কৃষকের কাছে কম দামে ধান কিনে বেশি দামে চাল বিক্রি করা হচ্ছে। ঠকছে কৃষক। কৃষক দাম পাচ্ছে না। কম দামে ধান বিক্রি করে ভোক্তা যদি কম দামে চাল কিনতে পারতো তা হলে কৃষক লাভবান হতো। যেমন; কৃষক ২০ টাকায় ধান বিক্রি করলো। এরপর ভোক্তা যদি চাল ৩০ টাকায় কিনতে পারতো তা হলে কৃষক লাভবান হতো। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। ৪০ টাকার নিচে কোনো চাল বাজারে পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, এর ফল দাঁড়াবে এক সময় কৃষক ধান চাষ বন্ধ করে দেবে। ইতিমধ্যেই অনেকেই চাষ বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানান তিনি।
বিভিন্ন কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ধান পেকে গেছে। অনেক জায়গায় রাতদিন পরিশ্রম করে ধানকাটা হচ্ছে। আবার কোথাও শ্রমিক সঙ্কটের কারণে থেমে আছে। কয়েক দিন আগের ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে কৃষিতে ক্ষতি হয়েছে। ফণীর প্রভাবে সারাদেশেই বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে অনেক এলাকায় ধান পড়ে গেছে জমিতে। এই পড়ে যাওয়া ধান দ্রুত কাটার হিড়িক পড়েছে। পড়ে যাওয়া সোনার ফসল কৃষক ঘরে উঠাতে ব্যস্ত থাকলেও শ্রমিক সঙ্কট একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরিও। এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা যাচ্ছে না। শুধু তাই নয় এক মণ ধান বিক্রি করে কৃষক বাজার থেকে এক কেজি গরুর মাংসও কিনতে পারছেন না। কেননা বাজারে এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা করে।
এদিকে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সারাদেশে ৪৯ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। ধান কাটায় এগিয়ে রয়েছে হাওর অঞ্চলের জেলাগুলো। হাওরের সাত জেলায় প্রায় শতভাগ জমির ধান ঘরে তোলা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে পিছিয়ে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা এবং রাজধানীর আশপাশ, বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা অঞ্চল। তথ্যমতে, এবার বোরো আবাদের জন্য জমির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪৮ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর। তবে নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে বেশি জমিতে প্রায় ৪৯ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে বোরো ধান।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বোরো মৌসুমে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ লাখ টন সেদ্ধ ও দেড় লাখ টন আতপ চাল। এছাড়া ধান সংগ্রহ করা হবে দেড় লাখ টন (এক লাখ টন চালের সমপরিমাণ)। প্রতিকেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ধরা হয়েছে ২৬ টাকা। কেজিপ্রতি সেদ্ধ চাল ৩৬ ও আতপ চালের সংগ্রহমূল্য ৩৫ টাকা ধরা হয়েছে। গত ২৫শে এপ্রিল শুরু হওয়া ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান চলবে আগামী ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত। অথচ এখন  পর্যন্ত কোনো ধানও ওঠেনি খাদ্য বিভাগের গুদামে। কারণ ক্রয়ের খাতা শূন্য।
এদিকে উৎপাদন খরচের চেয়ে দাম কম হওয়ায় প্রতিমণ ধানে দুই/তিন শ’ টাকা লোকসান হচ্ছে কৃষকের। প্রতিমণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হাজার টাকা ছাড়ালেও বিক্রি করতে হচ্ছে ৬৫০-৭০০ টাকায়। ধানের মোকামগুলোয় ক্রেতা না থাকায় ধানের দাম এখনও নিম্নমুখী। ব্যবসায়ীদের কাছে আমদানি চালের সরবরাহ থাকায় তারা বাজার থেকে ধান কেনায় কম গুরুত্ব দিচ্ছে। জানা গেছে, সরকার প্রতিমণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করছে ১ হাজার ৪০ টাকা। এর কোন প্রভাব নেই বাজারে, মাঠের চিত্র ভিন্ন।
আবার সরকারিভাবে ধান কেনায় এখনও গতি আসেনি। ফলে কৃষক ভাল দামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যদি ধান-চালের দাম বাড়ে, তাহলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের কষ্ট হয়। আবার ধানের দাম কমে গেলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাজেই দুইয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকা দরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, আমাদের কৃষকদের ভর্তুকি যদি একটু বাড়ানো যায় অর্থাৎ সার, বীজ, সেচের ক্ষেত্রে ভর্তুকি বাড়াতে পারলে উৎপাদন খরচ কমে আসবে।
হাওর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন ভেজা ধান প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০-৫৫০ টাকা। শুকনো ধান ৬০০-৬৫০ টাকা। মাস দুয়েক পর ধানের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। তাই যাদের সামর্থ্য আছে, তারা এমন পানির দরে ধান বিক্রি করছেন না।
বগুড়ায় বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুম চলছে। এক সপ্তাহ আগে থেকে ধান কাটা শুরু করে কৃষকরা। বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ মিলে এই কৃষি অঞ্চলের এখন পর্যন্ত ৩৯ ভাগ ধান কেটে ঘরে তুলতে পেরেছে কৃষক। ফলনও ভাল হয়েছে তবে কৃষকদের মুখে হাসি নেই। ধান কেটে ঘরে তোলার পর বিক্রির সময় দাম না পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হতাশার রেখা ফুটে উঠেছে। অনেকে ধানের বাজারদর শুনে ধান উৎপাদন খরচ তুলতে পারবেন কি না এমন দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে মাঠে ধান কাটছেন।
বর্তমানে এই অঞ্চলে ধান মাত্র ৫০০-৫৩০ টাকা মন। এই দামে ধান বিক্রি করে প্রতিবিঘা জমিতে মোটা অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। গত ২ সপ্তাহ ধরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে ধানের দাম ৭০০ টাকা ছিল।
এদিকে ধানের বাজার কমের কারণ হিসেবে কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধান চাল মজুদ থাকায় মিল মালিকরা ধান নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এছাড়া সরকারি ভাবে এখনো কৃষকদের থেকে ধান ক্রয় শুরু করেনি। এরপর বাজারে ভারতীয় চালের আমদানি পর্যাপ্ত থাকায় ভরা মৌসুমে কৃষকদের মাথায় হাত পড়েছে। ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে মণ প্রতি ৫০০-৫৩০ টাকা দরে ধান কিনছেন। এতে কৃষকদের লোকসান গুণতে হচ্ছে।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও কৃষক ১ লাখ ৮৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ধান রোপন করেছিল। জেলায় এবার ধানের ফলন ভাল হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদনও হবে। এখন পর্যন্ত ৩% জমির ধান কাটা হয়েছে। বগুড়া জেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৩ টন। এখন পর্যন্ত ২১ হাজার ৪৬৭ টন জমির ধান ঘরে তোলা হয়েছে।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল ইউনিয়নের শালিকা গ্রামের কৃষক লুৎফর, আব্দুর রহিম জানালেন, লাভের আশায় ধান চাষ করে এবার তাদের লোকসান গুনতে হবে। তাদের কেউ ১০ বিঘা, কেউ ১৭ বিঘা আবার কেউ ১৩ বিঘা জমিতে ধান রোপন করেছিলেন। সপ্তাহের শুরুতে ধানের দাম একটু থাকলেও ধীরে ধীরে বাজার কমতে শুরু করে। এখন বাজারে ধানের দাম মণ প্রতি ৬৭০ টাকা। ১ বিঘা জমিতে ধান রোপন থেকে শুরু করে কাটা মাড়াই পর্যন্ত কৃষকের খরচ পড়ে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে কৃষক ধান পায় ২০ থেকে ২২ মণ। সে তুলনায় কৃষক এবার বিঘা প্রতি পাবে সাড়ে ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। বিভিন্ন এনজিও এবং দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লোন নিয়ে জমিতে বিনিয়োগ করে এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রমে এত স্বল্প পরিমাণ টাকা শঙ্কিত এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে তাদের।
নন্দীগ্রাম উপজেলার ক্ষুদ্র ধান ব্যবসায়ী শাহ আলম জানালেন, তিনি কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান ক্রয় করে মহাজনদের দেন।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নিখিল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, যে কোন মুহুর্তে ঝড় বৃষ্টি হতে পারে। তাই আমাদের পক্ষ থেকে পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে মাইকিং করা হয়েছিল এবং কৃষকদের নিয়ে গ্রুপ মিটিং করা হয়েছিল।
হাওরে দশ বছর ধরে লোকসানে কৃষক
ধান উৎপাদনে ব্যয় বাড়লেও, মিলছে না ন্যায্য দাম। কৃষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় গত দশ বছর ধরে তারা বোরো আবাদে লোকসান দিয়ে যাচ্ছেন। এবার ভাল ফলন হলে সে ধকল কিছুটা কাটিয়ে ওঠার আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়েবালি। ঘটেছে ব্রিধান-২৮ এর ফলন বিপর্যয়। এছাড়া ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে এবারও লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। কেবল ন্যায্য দাম নয়, একের পর এক সংকটে কাবু হাওরের কৃষক। দ্বিগুণ-তিনগুণ পারিশ্রমিক দিয়েও মিলেনি ধান কাটা শ্রমিক। তাই এবারের ধান কাটা পর্ব ছিল একেবারেই ছন্দহীন। ব্যাপক দরপতন ও ফলন বিপর্যয়ের কারণে হাসি নেই কৃষকের মুখে।
দেশের অন্যতম প্রধান বোরো উৎপাদনকারী জেলা কিশোরগঞ্জ। কৃষি বিভাগ জানায়, এ বছর জেলায় প্রায় পৌনে ২ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর অধ্যুষিত ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী-এ চারটি উপজেলায় আবাদ হয়েছিল প্রায় এক লাখ হেক্টর।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, হাওরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক মূলত ধার দেনা ও মহাজনের কাছ থেকে সুদের ওপর ঋণ নিয়ে জমি চাষ করেন। ধান তোলার সাথে সাথেই তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু ধানের কম দাম তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই কারণে তারা মহাজনের ঋণ শোধ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। কৃষকেরা জানান, সারের চড়ামূল্য, সেচ খরচ, শ্রমিকের চড়া মজুরীতে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। কিন্তু ফসলের ন্যায্য দাম নেই। মূল্য কম-বেশি যাই হোক, মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতেই হয়।
সরজমিন হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, জেলার হাওরের অনেক কৃষক অন্যের জমি পত্তন নিয়ে বোরো আবাদ করেছেন। আবার অনেকে বিত্তশালীদের জমি বর্গা চাষ করেছেন। কৃষকেরা শ্রমিকের মজুরি আর মহাজনের ঋণ শোধ করতে গিয়ে ধান কাটা শুরু হওয়ার পর থেকেই নতুন ধান বিক্রি করছেন। প্রতি মণ ধানের সর্বোচ্চ মূল্য ৫৫০ টাকা। ১০০% ভাগ শুকনো ধানের দাম সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। অথচ উৎপাদন ব্যয় পড়েছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা। তাই বর্তমান বাজারে সর্বোচ্চ দামেও তাদের উৎপাদন ব্যয় উঠবে না বলে জানান কৃষক।
কৃষকেরা জানান, প্রতিটি কৃষক পরিবারের যেসব সদস্য চাষাবাদে শ্রম দেন, তারা নিজেদের মজুরিটা কখনোই টাকার মুল্যে হিসাব করতে শেখেননি। কেবল নগদ যে টাকাগুলো চাষাবাদে খরচ করেন, কেবল সেটাই হিসাবের মধ্যে ধরেন। তারপরও মৌসুমের শুরুর দিকে প্রতি মণ ধানে কম করে হলেও তাদের দু’শ টাকা ক্ষতি হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকরা বোরো আবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেন, এনজিও থেকেও ঋণ নেন। আবার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন চাতাল মালিক কৃষকদের মধ্যে আগাম লগ্নি করেন। ধানের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য নির্ধারণ করে এসব লগ্নির টাকা কৃষকদের হাতে তুলে দেন। আর নতুন ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এসব চাতাল মালিকের লোকদের হাতে কৃষকদের পরিশ্রমের ধান তুলে দিতে হয়।
এই সময় হাজার হাজার মণ ধান বড় বড় নৌকা বা কার্গোতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় হাওরাঞ্চলের ‘প্রবেশদ্বার’ বলে খ্যাত করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরে। সেখান থেকে ট্রাক এবং ট্রাক্টরে ভরে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলের চাতালে। আবার ধান কাটার মৌসুমে চামড়া নৌবন্দরে অস্থায়ী আড়ত খুলে বসেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা দালালের মাধ্যমে হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে সস্তায় ধান কিনে আড়তে গুদামজাত করেন। এখান থেকে সরবরাহ করেন বিভিন্ন বড় বড় চালকল বা চাতালে। চামড়া বন্দরের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখন সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকা মণ দরে ধান কিনছেন। নিকলী উপজেলার ভাটিবরাটিয়া গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান এবার ৯ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ব্রিধান ২৮ রোপন করেছিলেন ৭ একর জমিতে। এ ৭ একর জমিতে স্বাভাবিক ফলনে ধান হওয়ার কথা ৪০০ মণ। ফলন বিপর্যয়ের কারণে ধান হয়েছে ২২০ মণ। বাকি ২ একর জমিতে ব্রিধান ২৯ রোপণ করে স্বাভাবিক ফলন পেলেও  ঋণগ্রস্থ এই কৃষক  এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। আবদুল মান্নান মানবজমিনকে বলেন, ‘একদিকে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে, অন্যদিকে ধানের দাম কম থাকায় এবার আমি বড় ধরণের ধরা খেয়েছি। পাওনাদারদের তাগাদার কারণে সস্তায় সব ধান বিক্রি করে দিয়েছি।  ঘরে এক ছটাক ধানও রাখিনি। সামনের দিনগুলোতে কী খেয়ে বাঁচবো এই চিন্তায় আছি।’
গতকাল মঙ্গলবার সকালে করিমগঞ্জ উপজেলার বড় হাওরে সরেজমিন কথা হয় উপজেলার গুনধর গ্রামের কৃষক মো: আল আমিনের সঙ্গে। তিনি জানান, এবার সব মিলিয়ে  ৭ একর জমিতে বোরো ধান করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে ব্রিধান ২৮ করেছিলেন ৪ একর জমিতে।  ব্রি ধান ২৯ করেছিলেন ৩ একর জমিতে। সব মিলিয়ে ধান পেয়েছেন ৩২০ মন। আল আমিন জানান, স্বাভাবিক ফলনে তার জমিতে ধান হওয়ার কথা কমপক্ষে ৪০০ মণ। ৭ একর জমিতে ধান উৎপাদনে  তার খরচ হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ৩২০ মণ ধান ৫৫০ টাকা করে বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন মাত্র ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। প্রায় ছয় মাস রোদে পুড়ে কষ্ট করে বোরো ধান করে তাকে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে।
মিঠামইনের কাটখাল গ্রামের ষাটোর্ধ কৃষক হারিছ মিয়া এবার ১০ একর জমিতে  ব্রিধান ২৯  আবাদ করেছিলেন। ফলন মোটামুটি হয়েছে। তারপরও স্বস্তি নেই তার মনে। মহাজনের ঋণের বোঝা তার মাথার উপর ঝুলছে। ধানের কম দাম তার ফসল তোলার আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। ‘মহাজনের ঋণ শোধ করে যে সারাটা বছর কিভাবে চলবো তা একমাত্র আল্লাহই জানে!’ বলতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন হারিছ মিয়া। মিঠামইন উপজেলার ঢাকী গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া জানান, তিনি ৮ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ধানের দাম কম হলেও তাকে ঋণ পরিশোধ করতে খলাতে রেখেই ধান বিক্রি করতে হয়েছে। কৃষক মরম আলী জানান, প্রতি মণ ধান ফলাতে কৃষকের খরচ পড়েছে সাড়ে ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা। অথচ বর্তমানে এর কাছাকাছি দামও পাওয়া যাচ্ছে না।
এতে তাদের মণপ্রতি বড় অঙ্কের লোকসান গুণতে হচ্ছে। ইটনা সদরের কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, কৃষিকাজ না করে কৃষক বসে থাকতে পারে না। তাই লাভ-লোকসানের হিসাব না করে প্রতি বছরই তারা বোরো আবাদ করেন। তিনি বলেন, দিন দিন কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে চলেছে। তাই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কৃষিকাজ করলেও তারা লাভবান হতে পারেন না। তার দাবি, কৃষকদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকদের হাত থেকে মৌসুমের শুরু থেকেই ধান ক্রয় করতে হবে। মৃগা গ্রামের কৃষক শামীম মিয়া জানান, একটি মাত্র বোরো ফসলই হাওরের জীবন-জীবিকা। কৃষকের হাতে নগদ টাকা না থাকায় শ্রমিক খরচসহ নানা খরচের যোগান দিতে বাধ্য হয়ে কম মূল্যে তাদের ধান বিক্রি করতে হয়। এই কারণে ধানের ফলনে তারা কমবেশি খুশি হলেও দামে ধরা খাচ্ছেন। করনশী গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ধান কাটার জন্য তাদেরকে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয়েছে। ঘরে যে পরিমাণ ধান তারা তুলতে পারবেন বলে আশা করেছিলেন, তার এক চতুর্থাংশও তুলতে পারেননি।
এর উপর ধানের দাম কম হওয়ায় তারা দিশেহারা। তিনি বলেন, প্রতি বছর ভালো দাম পাওয়ার আশা করলেও আমরা বার বারই নিরাশ হচ্ছি। তবুও বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আমাদের বাধ্য হয়ে ধান চাষ করতে হচ্ছে। একই গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম জানান, উৎপাদিত ধানের বেশির ভাগই ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মজুরি মেটাতে চলে যায়। এছাড়া মৌসুমজুড়ে হালচাষ, আবাদ, সার ও কীটনাশকসহ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট নানা খরচ গুণতে হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কৃষকদেরকে চরমভাবে হতাশ করেছে। একই রকম কথা জানালেন মিঠামইনের মহিষারকান্দি গ্রামের কৃষক সাহিদ মিয়া, কালু মিয়া ও বাছির মিয়া, ঢাকী গ্রামের শফিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর মিয়া ও জিল্লুর রহমান, অষ্টগ্রামের সাপান্ত গ্রামের কৃষক বিষ্টু লাল দাস, চৌদন্ত বড়হাটির কৃষক আনন্দ দাস ও সুখময় দাস এবং ইটনার ধনপুর গ্রামের কৃষক ভজন দাস, সদরের আজাদ হোসেন ও আবদুর রউফসহ অনেকেই। তারা জানান, হাওরে এখন অধিকাংশ কৃষকের একই দশা। ধানের দাম না থাকায় তাদের মাথায় হাত পড়েছে। তারা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যখন কৃষকের হাতে ধান থাকে তখন দাম থাকে না। ধান কৃষকের হাত থেকে চলে গেলে দাম বাড়ে।

রাজনীতির ভবিষ্যৎ অচলাবস্থা!

বাজেট অধিবেশন ডাকা হয়েছে। এবারের অধিবেশনে  দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি থাকবে। অফিসিয়াল অপজিশন তো থাকবেই। বাজেট আলোচনায় সব দল অংশ নেবে। কিন্তু এতকিছুর পরেও সংসদ তার পুরনো চেনা চেহারা ফিরে পাবে না। সকল দল সংসদে থাকবে, আবার ঠিক থাকাও হবে না। রাজনীতিতে যে অস্বাভাবিকতা বিরাজমান, তার রেশ কাটবে না, চলমান থাকবে। এ সবই যেন বাংলাদেশি রাজনীতির নিয়তি। রাজনীতিবিদরা এসব নিয়ে ভাবেন না। তারা চান যেনতেনভাবে ক্ষমতায় থাকতে। এর ফলে জনগণ রাজনীতির প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। এর মধ্যেই বড় দুই দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে।
জাতীয় রাজনীতি আটকে গেছে। অনেকের মতে রাজনীতির ভবিষ্যৎই হলো একটা অচলাবস্থা। জোটগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনুরা মন্ত্রিসভায় না থাকায় মহাজোটের টেস্ট নষ্ট হয়ে  গেছে। আবার ১৪ দল কাগজে কলমে থাকলেও তাও গতিশীল নেই। মোহাম্মদ নাসিম মাঝে মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। হয়তো মনের কষ্টে।
অবশ্য রাজনীতি সম্পর্কে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি করেছেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা। তার কথায়, ?‘এগুলোকে প্রায় অকার্যকর করার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, এটা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অপরিহার্য। কিন্তু এটা বাস্তবে সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয় না। ফলে এই অবস্থা থেকে বেরুতে হলে কখন কীভাবে পরিবর্তন আসবে, সেটা  ভেবে আমি উদ্বিগ্ন।’ তিনি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন। বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের চরিত্র অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দলটি এখন ক্ষমতার অপব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা আত্মঘাতী, এখানে পরিবর্তন না এলে আমরা যে যেখান থেকে যত সংস্কারের কথাই বলি, কোনোদিন সংস্কার আনা যাবে না। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, প্রতিটি, বিশেষ করে দুই বড় দলে সংস্কার আনতে হবে।’ এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, এই অচলাবস্থার বৃত্ত কে ভাঙবে। ক্ষমতাসীন দলের সামনে বড় উৎসব উদ্‌যাপনের হাতছানি।
তারা এখন এমন কিছুতেই জড়াবে না, যাতে উৎসব উদ্‌যাপনের সম্ভাবনায় কোনো রকম চিড় ধরে। সুতরাং বড় কোনো সংস্কারে ক্ষমতাসীন দল যাবে না। সুশাসন ও আইনের শাসনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। কিন্তু তা শুরু করার কোনো রকম সম্ভাবনা  নেই। চার লাখ কোটি টাকা দেশ  থেকে পাচার হয়ে গেছে। জানা যায়,  কোনো টাকা ফেরত আনতে কোনো প্রক্রিয়া নেই দুদক, মহাহিসাব নিরীক্ষক কিংবা অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে। টিআইবি মুখপাত্র প্রশ্ন তুলেছেন, কোকোর টাকা ফেরত আনার উদাহরণ তৈরি থাকলে সেটা অন্যদের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না  কেন? অবশ্য তিনি অকপটে এমনটাও বলেছেন যে, টাকা পাচারে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের একাংশের জড়িত থাকার সম্ভাবনা প্রকট। সে কারণে দুদক ভাবে, এখানে ‘হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে’।
পর্যবেক্ষকরা একমত বিএনপির পক্ষে এই বৃত্ত ভাঙায় কার্যকর দূরে থাক আদৌ কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ কম। অতীতে দুর্নীতি বিষয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল একটা লিপ সার্ভিস দিতো। সেটা এখন হারিয়ে  গেছে। ৫ম সংসদে তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী মাজেদুল হকের  ছোটখাটো দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে সংসদীয় কমিটি হয়েছিল। দিনের পর দিন বিতর্ক হয়েছে। কয়েক শ’ পৃষ্ঠার সংসদীয় রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। আজ সেসব স্বপ্নের মতো। জাতীয় পার্টি বা বিএনপির কথায়  কোনো মন্ত্রীর দুর্নীতি বিষয়ে সংসদ দিনের পর দিন বিতর্ক করছে, সেটা আশা করা যায় না। 
সংবাদ মাধ্যমের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু  প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া যেন পাল্লা দিয়ে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাকি থাকে সিভিল  সোসাইটি। তবে সবাই একবাক্যে বলবেন, এই সোসাইটির সদস্য সংগ্রহ অভিযান বহুদিন ধরেই স্থগিত। অনেকে রসিকতা করে বলেন, সিভিল সোসাইটি অলৌকিক হয়ে যাচ্ছে। ডাকসু নির্বাচনে ভিপিসহ কিছু পদে বিরোধী দলীয়দের নাটকীয় বিজয়ের পরে রাজনীতিতে একটা নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। কিন্তু তা থমকে গেছে। দেশের বাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে, তা কারো জানা  নেই। এখানেও সেই অচলাবস্থা বিরাজ করছে। 
এরকম একটি অবস্থায় অচলাবস্থা ভঙ্গ করার একটা আশু সম্ভাবনা মনে করা হয়, কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি। তিনি দেশে থাকেন বা বিদেশে যান, অনেকের মতে, রাজনীতিতে একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতির অবসান হওয়া দরকার।
তবে তিনি প্যারোলে নাকি জামিনে  বেরুবেন- এখানেই অচলাবস্থা চলছে। ইতিমধ্যে তিনি পরিত্যক্ত কারাগারে দীর্ঘ সময় পার করে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আইনবেত্তাদের অনেকেই এমন পরিবেশে তাকে এভাবে রাখা কতোটা জেল কোডসম্মত সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে দ্বিধান্বিত। কারণ তুলনা করার মতো কোনো উদাহরণ জাতির ইতিহাসে নেই।
সর্বশেষ জানা গেছে, তাকে  কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হচ্ছে।  সেখানেই ৩৪ মামলায় তার বিচারে এজলাস বসবে।  আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এতদিনে  কেরানীগঞ্জে নারী কয়েদিদের রাখার জায়গার কাজ শেষ হয়েছে। তাই খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগার  থেকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করতে অসুবিধা নেই। আর নিরাপত্তার স্বার্থে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর বিচারকাজ নিষ্পত্তি করতে কেরানীগঞ্জ কারাগারে বিশেষ আদালত গঠন করা হচ্ছে। 
বিএনপি’র অনেকেই অবশ্য মনে করেন, দেশের সার্বিক যা পরিস্থিতি,  যেখানে রাজনীতি অনুপস্থিত, গণতন্ত্রের ঘাটতি গভীরতর, সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কীভাবে কারাগার  থেকে বের হবেন, সেই বিষয়ে প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন তোলা বৃথা।
বেগম খালেদা জিয়ার দরকার আশু  চিকিৎসা। মুক্ত পরিবেশে তার নিজের চিকিৎসক দিয়ে মনমতো চিকিৎসক বাছাই করে স্বাস্থ্যসেবা  নেয়া। এখন সেটা তিনি করবেন জামিনে না প্যারোলে, সেটা এখন একটা কূটতর্ক। অবশ্য দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, বেগম জিয়া প্যারোল না নিতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। তাকে অবশ্য স্মরণ করানো হয়েছে, এক এগারোতে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে প্যারোল নিতে চাননি। কিন্তু পরে রাজি হন।
ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো বলেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সবশেষে বৈঠকে বিএনপি আশাবাদী  হয়েছিল।  সেটা মিলিয়ে যায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লন্ডন সফরকালে বিএনপির অতি উৎসাহীদের অপ্রয়োজনীয় মনে করেন সিনিয়র নেতাদের একাংশ।
গত মার্চের গোড়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপির ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন যে, প্যারোলের দরখাস্ত পেলে তারা বিবেচনা করবেন। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে গত বছরের ২৭শে মার্চ, ২৩শে এপ্রিল ও ৯ই সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন বিএনপি নেতারা।
তার মুক্তির প্রশ্ন অমিমাংসিত রেখেই বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি লড়াইয়ে নামছে। সংরক্ষিত নারী আসনেও নাম পাঠাবে। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও রাজনীতির নিকটবর্তী অচলায়তন ভাঙার প্রশ্নটি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেটি বাস্তবে ঘটলেও বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব কাঠামো না বদলালে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া বিএনপি কি চায় এটা পরিষ্কার নয়। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে নির্বাচনের আগে এবং পরে বেশকিছু অফার এসেছিল। প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করেও দেখেননি। এক বাক্যে নো, নো বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি বেগম জিয়া কারাগারে যাবার আগেও প্রস্তাব পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ভুল কামাল হোসেনের মাধ্যমে শোধরানোর চেষ্টা কতটা সফল হয়েছে তা সময়ই বলবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিলে আওয়ামী লীগই শক্তিশালী হবে। বিএনপির নেতাকর্মীরা সরকারের প্রতি সন্তুষ্ট হবে। তিনি আরো বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরলেও তিনি ?‘আগের’ রাজনীতি করবেন না। সুতরাং প্রলম্বিত অচলাবস্থাই আপাতত নিয়তি।

অসন্তোষ কমিয়ে রফতানি মূল্যবৃদ্ধিই পোশাক খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ by জিয়াউল হক মিজান

দেশের রফতানি আয়ে ৮৪ শতাংশ অবদান বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প খাতের এই বিশাল অর্থনৈতিক সেক্টরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা শ্রমিক অসন্তোষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সমস্যাও ততটা জটিল হতো না, যদি শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে পানি ঘোলা করার মতো দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পক্ষ তৎপর না থাকত। দ্বিতীয় যে সমস্যার কারণে সম্ভাবনাময় এ শিল্প ধুঁকছে তা হলো পণ্যের উপযুক্ত দাম না পাওয়া।
শ্রমিকের মজুরি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি পাশাপাশি বিদেশীদের শর্ত পূরণে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করতে গিয়ে পণ্যের উৎপাদন খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও তৈরি পণ্যের দাম বাড়ছে না। পরিস্থিতির বাস্তবতায় আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন কারখানা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ানোর এই দুই প্রধান সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে উদ্যোক্তাদের বৃহত্তম সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম নারী সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন এই সংগঠনেরই সাবেক সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক। স্বামীর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তৈরী পোশাক শিল্প খাতে শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে সময়মতো মজুরি না পাওয়া। অধিকাংশ কারখানাই শ্রমিকদের সময়মতো মজুরি পরিশোধ করে না। অনেক প্রতিষ্ঠান মজুরি প্রদানে সামর্থ্য থাকার পরও প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক অন্যত্র চলে যাবে এই ভয়ে এক মাসের মজুরি পরিশোধ করা হয় পরের মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখে। চাকরি ছেড়ে যাওয়ার পর ভাঙ্গা মাসের বেতন পান না তারা।
আর যেসব কারখানার আর্থিক সঙ্কট থাকে সেগুলোয় মজুরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় মাসের পর মাস। কোনো কারণে স্টক লট কিংবা একটা শিপমেন্ট বাতিল হলে মালিকদের পাশাপাশি বিপর্যয় নেমে আসে সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিকদের ওপরও। এমন পরিস্থিতিতে সময়মতো মজুরি পেতে উদগ্রীব হয়ে থাকেন শ্রমিকরা। এতে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেই বেধে যায় লঙ্কাকাণ্ড। উসকানি দিয়ে হাজির হয় সুবিধাবাদি বিভিন্ন পক্ষ। আর এগুলো প্রচার করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে তৎপর হয়ে ওঠে প্রতিযোগী দেশগুলো।
এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের দায়ও কম নয়। কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই এবং মামলা দায়েরের প্রবণতায় মুহূর্তেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। উদ্যোক্তাদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে মজুরি নিয়ে আন্দোলনের জের ধরে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পাঁচ হাজার ৮৪৫ পোশাক শ্রমিককে আসামি করে ২৮টি মামলা হয়েছে।
এর মধ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও গাছা, সাভার, আশুলিয়া ও টঙ্গী পূর্ব থানায় ২৭টি কারখানার করা মামলায় চার হাজার ৩৪৫ শ্রমিককে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ৫১৫ শ্রমিকের নাম উল্লেখ আছে, বাকিরা অজ্ঞাতনামা। সাভার থানায় শিল্প পুলিশের করা এক মামলায় আসামি এক হাজার ৫০০ অজ্ঞাত শ্রমিক। পাশাপাশি চাকরি হারিয়েছেন বেশ কয়েক হাজার শ্রমিক।
শ্রমিকদের সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছে, ৯৯টি কারখানার ১১ হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই ও বরখাস্ত হয়েছেন। অনেক নিরীহ শ্রমিকের পাশাপাশি ইউনিয়নের সাথে যুক্ত শ্রমিকেরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বিজিএমইএ নেতাদের দাবি, পোশাক শিল্পের ক্ষতির জন্য শ্রমিক অসন্তোষ যতটা দায়ি তার চেয়ে বেশি দায়ী অসন্তোষের প্রচারকারীরা। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পক্ষ এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উদাহরণ হিসেবে শ্রমিক সংগঠনের আন্তর্জাতিক জোট ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন (সিসিসি) এবং গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন বিজিএমইএ সভাপতি মো: সিদ্দিকুর রহমান।
তিনি জানান, প্রতিযোগীদের উসকানিতে গত ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, জেনেভা, বার্লিন, ব্রাসেলস, মাদ্রিদ ও দ্য হেগে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে ‘হ্যাশট্যাগ উই স্ট্যান্ড উইথ গার্মেন্ট ওয়ার্কার’ শীর্ষক কর্মসূচি পালন করে সিসিসি। তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রকৃত ঘটনা না জেনে আন্দোলন করে।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ব্রিটেনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান কমিক রিলিফ বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানা থেকে টি-শার্ট তৈরি করিয়েছে, যেখানে শ্রমিককে ঘণ্টায় মাত্র ৩৫ পেনি বা ৩৮ টাকা মজুরি দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, এই শ্রমিকদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়, হেনস্তা করা হয়। তাদের দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব শ্রমিকের অনেকের মজুরি ৮ হাজার ৮০০ টাকা (৮২ পাউন্ড)। শ্রমিকেরা দীর্ঘ দিন ধরে ১৬ হাজার টাকা মজুরির দাবি করে এলেও তা মানা হয়নি। শ্রমিকদের প্রায়ই ‘অসম্ভব’ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অতিরিক্ত সময় কাজ বা ওভারটাইম করতে বাধ্য করা হয়। এমনকি দিনে ১৬ ঘণ্টাও কাজ করেন তারা। মধ্য রাত পর্যন্তও কাজ করতে হয় কখনো। শ্রমিকেরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে তাদের গালাগালি করা হয়। অনেকে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হন।
এ দিকে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে গত চার বছরে ১২০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন তৈরী পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো: সিদ্দিকুর রহমান। নিকট ভবিষ্যতে আরো অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে আশঙ্কা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, রফতানি বাণিজ্যের চাহিদা অনুযায়ী গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকা, দীর্ঘ লিড টাইম এবং শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কম থাকার কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় রফতানি প্রবৃদ্ধির দিক থেকে আমরা ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছি।
২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত পোশাক শিল্পে মজুরি ৩৮১.৩৫ শতাংশ বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ২০১৪-১৮ সময়ে আমাদের অন্যতম প্রধান বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পোশাকের দরপতন হয়েছে ১১.৭২ শতাংশ। অন্য দিকে এ সময়ে পোশাকের গড় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৯.৫৪ শতাংশ।
তিনি জানান, ২০১৪ সালে বিশ্বের পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ৪৮৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৭ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৪ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোতে ক্রেতাদের চাহিদা কমেছে, যা মূল্যভিত্তিক বাজার প্রতিযোগিতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় রফতানি প্রবৃদ্ধির দিক থেকে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।
এ দিকে বাড়তি খরচ মেটানোর জন্য পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই জানিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির সাবেক প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, উৎপাদিত পণ্যের দাম চাইলেই বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় নীতিনৈতিকতা ভুলে গিয়ে বায়াররা অস্বাভাবিক কম দাম অফার করে। কাজ না নিয়েও উপায় নেই।
চলমান খরচের কথা ভেবে অনেক সময় বাধ্য হয়েই কম দরে অর্ডার নিচ্ছি, কখনো ফিরিয়ে দিচ্ছি। তা ছাড়া আমি রিফিউজ করলে কী হবে? অর্ডার তো আর আমার জন্য অপেক্ষা করেনি, হয় আমার দেশেরই অন্য কোনো ফ্যাক্টরি নিয়েছে অথবা অন্য কোনো দেশে অর্ডার চলে গেছে। তিনি বলেন, কম দামে যারা অর্ডার নিচ্ছে তারা অর্ডার নিয়ে হয়তো লস করেছে ২৫ লাখ, না নিলে লস হতো এক কোটি টাকা।
এ দিকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বিজিএমইএ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মরহুম আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক। আনিসুল হক ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের প্রভাবশালী সংগঠন বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই ও সার্ক চেম্বারেরও সাবেক সভাপতি ছিলেন। রুবানা হকের স্বামী আনিসুল হক প্রতিষ্ঠিত মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে স্বামীর নেতৃত্ব থেকে অনেক কিছু শিখেছেন রুবানা হক। গত ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রুবানা হকের নেতৃত্বে সম্মিলিত পরিষদ-ফোরাম ঘোষিত পূর্ণ প্যানেলে ৩৫ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী, তাদের ভোটে রুবানা হকের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এখন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের বিদ্যমান সমস্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রুবানা হক সমস্যাগুলোকে নিয়েছেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে।
নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে রুবানা হক বলেন, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত পোশাক। দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ এ খাতের সাথে জড়িত। আমরাই মূলত দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছি। আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। দেশের পোশাক খাত নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ইমেজ সঙ্কট রয়েছে মন্তব্য করে রুবানা হক বলেন, সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব।
অনেকে মনে করেন, আমরা সবচেয়ে সস্তা। এই সস্তা কোনোভাবেই ভালো না বলে আমি মনে করি। প্রতিযোগিতা হলো সবচেয়ে ভালো। কিন্তু আমরা সম্মিলিতভাবে দরকষাকষির জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। সবাই এ বিষয়ে একমত হতে পারিনি। এখন সময় এসেছে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে একটা উদ্যোগ নেয়ার।
তিনি বলেন, আমাদের বেশ ভালো মানের ফ্যাক্টরি রয়েছে। আমরা মনে করি সেলফ মনিটরিংয়ের এখনই সময়। আমাদের চ্যালেঞ্জটা হবে, কী করে শ্রমিক-মালিক একসাথে কাজ করবে। আমার মরহুম স্বামী আনিসুল হক মেয়র হিসেবে দুই বছরে সেটা দেখিয়ে গেছেন; কিভাবে পরিবর্তন আনতে হয়। তার দেখানো পথেই পরিবর্তন সম্ভব বলে দাবি করেন রুবানা।

ওয়াসার লাইনে বিষ: পাতালের পানিই ভরসা জুরাইনে by শাহনেওয়াজ বাবলু

জুরাইনের মসজিদে মসজিদে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে লম্বা লাইন। কারো হাতে কলস। কারো হাতে বালতি। কেউ নিয়ে এসেছেন ড্রাম। মসজিদের ডিপ টিউবওয়েল থেকে পানি নেয়ার এ লাইন থাকে রাত দিন সবসময়। এ পানি নিতে মসজিদের ফাণ্ডে তারা দিচ্ছেন প্রতিবার দুই কিংবা পাঁচ টাকা করে। সারাবছরই পানি সংকট থাকে রাজধানীর জুরাইন এলাকায়। মাঝে মধ্যে যেটুকু পানি আসে, তাতেও দুর্গন্ধ। ভাসে ময়লা। এক সময় ফুটিয়ে খাওয়া গেলেও এখন ফুটানোর পর ফিটকিরি দিয়েও কাজ হয় না। চারদিকে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার। এ অবস্থায় এলাকাবাসীর উদ্যোগে বিভিন্ন মসজিদে ডিপ টিউবওয়েল বসানো হয়েছে।
এই পানি দিয়ে মসজিদের মুসল্লীরা ওজু করেন। আর এই টিউবওয়েল থেকে পাইপের মাধ্যমে জুরাইনের বিভিন্ন মোড়ে সংযোগ দিয়ে বসানো হয়েছে আলাদা পানির ট্যাপ। সেখান থেকে মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করে। প্রতিবার দুই টাকা করে মসজিদের ফান্ডে দেয়া হয়। আর এই পানি সংগ্রহের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে থাকে মানুষের ভিড়। তাদের কথা- পাতালের পানি আমাগ বাঁচাইয়া রাখছে। ওয়াসার পানি নয়, দিচ্ছে বিষ। 
এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে এই পানির সংকট চরমে পৌঁছেছে। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জুরাইনের বেশিরভাগ এলাকায় ওয়াসার পানি পাওয়াই যাচ্ছে না। কিছু জায়গায় পানি পাওয়া গেলেও তা ময়লা-দুর্গন্ধে ভরা, যা ফুটিয়েও ব্যবহারোপযোগী করা যাচ্ছে না।
সরেজমিন জুরাইনের মুরাদপুর, মাদরাসা রোড, মেডিকেল রোড, ইসলাসাবাদ, ঋষিপাড়া, কমিশনার রোডসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুরাইন এলাকার সব জায়গাতেই রয়েছে পানির হাহাকার। রমাজানে এ হাহাকার আরও বেড়েছে। তাদের পানি কিনতে হচ্ছে খাওয়া-রান্না ও গোসলের জন্য। যাদের বাসা স্থানীয় মসজিদের পাশে, তারা মসজিদের স্থায়ী পাম্প থেকে লিটার প্রতি দুই টাকার বিনিময়ে পানি কিনছেন।  কেউ কেউ বোতলজাত কিংবা জারের পানি কিনে ব্যবহার করছেন। এভাবেই কাটছে ওই এলাকার বাসিন্দাদের রমজান মাস। কোনো কোনো মসজিদে পর্যাপ্ত পরিমাণে অজুর পানিও মিলছে না।
ওই এলকার বাসিন্দা ও সুপেয় পানির জন্য অন্যতম আন্দোলনকারী মিজানুর রহমান বলেন, এতো আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এলাকার পানির সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কিছুদিন আগে একটি টকশোতে আমাদের এলাকায় ওয়াসার ময়লা পানির একটি ভিডিও দেখিয়েছিলাম। ওই টকশোতে ওয়াসার এমডিও ছিলেন। তখনই তিনি আমাকে বলেছেন, এই এলাকার পানির সমস্যা সমাধানের জন্য দ্রুত তিনি উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু ওই টকশোর পর দুই সপ্তাহ হয়ে গেলেও ওয়াসার কোন কর্মকর্তাকে এই এলাকায় দেখি নাই।
রাস্তার পাশের ট্যাপ থেকে পানি নিতে আসা কামরুন নাহার বলেন, ওয়াসার পানিতে গন্ধ আর ময়লা আসে। খাওয়ার জন্য মসজিদের ডিপের পানিই নেই প্রতিদিন। ২ টাকা, ৫ টাকা যখন যা পারি দেই। এক মাস হলো এই এলাকায় এসেছেন তিনি। এর মধ্যে বেশ কয়েক দিন ওয়াসার লাইনে হলুদ ও নীল কালারের ময়লা পানি আসার কথা জানালেন তিনি।
পূর্ব জুরাইনের আলম মার্কেট এলাকায় ছোট ছোট আধাপাকা ঘরে ভাড়া থাকে কয়েকটি পরিবার। এখানে ১৫ বছর ধরে থাকছেন রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, এই পানি খাওয়া যায় না। দুর্গন্ধ। ওই মসজিদ থেকে পাতালের পানি কিন্না আইনা খাই। ৫ টাকা দেই, ২ টাকাও দেই। এই মসজিদের পানি দিয়া পুরা মহল্লাডা চলতাছে। ওয়াসাকে অভিযোগ জানিয়েছেন কি না জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমরা ভাড়াটিয়া, আমরা কী অভিযোগ দিমু। আর বাড়িওলাও তো কিন্না খায়। তাদের কী কমু?
বাড়িওয়ালা হাজি ওসমান গণিকে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, জন্ম থেকে এখানে আছি। ২০-২৫ বছর ধরেই ওয়াসার লাইনে ময়লা পানি আসছে। মাঝে মধ্যে লাল পানি আসে। পোকা, কেঁচো পর্যন্ত আসে। মইরা গেলেও তো এই পানি খামু না। মানুষ দিয়া মসজিদ থেকে পানি আইনা খাই।
ওয়াসাকে অভিযোগ জানিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কী অভিযোগ জানামু, দেখেন না একজন অভিযোগ জানাইতে গিয়া এখন হুমকি-ধামকি খাইতাছে। কোন সময় গায়েব করে দেয় ঠিক আছে? এজন্য আমগো মতো সাধারণ মানুষ কেউই অভিযোগ জানাতে যাই না। যেমনে আছি, এমনেই ভালা আছি। পানি পচা আসুক আর যেমনই আসুক।
ওসমান গণির বড় ছেলে বলেন, ওরা তো কেউ আসে না। পানি ভালো না খারাপ দেখতেও তো আসে না একটা দিন। খালি বিলের কাগজটা দিয়া যায়। হেরা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের ধরতে হলে টেবিলে টেবিলে যেতে হবে। টাকা ছাড়া কোনো কাজই হয় না।
এ বিষয়ে জুরাইন এলাকার ব্যবসায়ী আমিনুদ্দীন বলেন, ভাগ্যিস এলাকার ১৫-২০টি মসজিদের পাশে গভীর নলকূপ বসানো আছে। এসব গভীর নলকূপের কারণে টাকা দিয়ে হলেও সুপেয় পানির দেখা মিলছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. নূর হোসেনও স্বীকার করে নিলেন পানি সংকটের কথা। তিনি মানবজমিনকে বলেন, দেড় বছর আগে ডিএসসিসিতে এক সভায় ওয়াসার এমডির সামনে জুরাইনের পানি সমস্যার চিত্র তুলে ধরা হয়। তখন তিনি সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু আজও সমাধান হয়নি। শুধু তাই নয়, গত চার বছর ধরে বহুবার ডিএসসিসির মেয়রের সমন্বয়ে ওয়াসাকে চিঠি দিয়েছি। একটারও কোনো উত্তর পাইনি। আমার নিজ উদ্যোগে সবুজবাগ ও কমিশনার রোডে দুটি পাম্প বসিয়েছি। এখন পানির সমস্যা কিছুটা লাগব হচ্ছে।
ওয়াসার মোডস জোন-৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবিদ হোসেন বলেন, জুরাইনে পানির সমস্যা চলছে, এটা ঠিক। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানে আমরাও কাজ করে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই ওই এলাকায় নতুন পাম্প বসানো হবে। তবে কবে নাগাদ এই পাম্প বসানো হবে, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি তিনি।

আমের মাস শুরু

বৈশাখ পেরিয়ে প্রকৃতি এখন জ্যৈষ্ঠ মাসে। শুরু হলো আমের মাস। এ মাসেই আম, লিচু, কাঁঠাল, জামসহ নানা জাতের ফল পাকতে শুরু করে। এসব পাকা ফলের মিষ্টি গন্ধ সহজেই সবার মন কাড়ে।
গ্রীষ্মকালের শেষ মাস জ্যৈষ্ঠ। ষড়ঋতুর এ দেশে প্রথম ঋতুটি প্রাণিকূলের জন্য প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে আসে। ফলদ গাছগুলো পূর্ণ হয়ে ওঠে ফলে ফলে। আমের শহর রাজশাহীতে শুরু হয় আম ‘ভাঙা’। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আমের গন্ধে ভরে ওঠে রাজশাহীর বাজার, ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাসহ সারাদেশে।
ফল ‘বিষমুক্ত’ রাখতে গত তিন বছর ধরে গাছ থেকে আম পাড়ার জন্য সময় বেঁধে দিচ্ছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছর গোপালভোগ ২০ মে, রাণীপছন্দ ও লক্ষ্মা বা লক্ষ্মণভোগ ২৫ মে, হিমসাগর ও ক্ষীরসাপাত ২৮ মে, ল্যাংড়া ৬ জুন; আম্রপালি, ফজলি ও সুরমা ফজলি ১৬ জুন এবং আশ্বিনা আম আগামী ১ জুলাই থেকে পাড়া যাবে।
আমের মুকুল থেকে শুরু করে আম পাড়া পর্যন্ত নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার আম বাগান আর বাজারে অনেকে ভ্রমণ করে থাকেন। তবে এবার রোজার মধ্যে হওয়ায় ঈদের পরপরই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকা কর্মব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী মহানগরীর আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুর পর ধীরে ধীরে আম পাকতে শুরু করে। বিভিন্ন জাতের আম পর্যায়ক্রমে বাজারে নামতে থাকে। মধ্য রমজানের পর বাজারে বিভিন্ন জাত ও স্বাদের আম নামতে শুরু করবে। অনেকেই আবার রমজানের কারণে আম ভাঙবেন না। সেই অর্থে ঈদের পরেই রাজশাহীতে আম ভাঙা পুরোদমে শুরু হবে। এছাড়া গাছে আম পাকিয়ে নামালে কেমিক্যাল দিতে হয় না। এ জন্য এখন সবাই গাছ থেকেই পাকা আম পাড়েন।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন বলেন, অন্যান্য আমের চেয়ে গুটি আম প্রতিবছরই আগে পাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অনেকে এখন গুটি আম নামাতে শুরু করবেন। এছাড়া জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়ার সময় অনুযায়ী সাত দফায় আম নামাতে পারবেন তারা।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকৃতিক কোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আম উৎপাদন হতে পারে।

বান্ধবীর বাসায় আশিকের মৃত্যু নানা রহস্য by পিয়াস সরকার

ফজরের আজান দিয়েছে সবে। সেহরির পর নামাজ শেষে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখন শেখ ফারিহা কলির দরজায় টোকা পড়ে। কলি রাজধানীর আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র পঞ্চম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। দরজায় টোকা দিচ্ছিলেন তার সহপাঠী আশিক এ এলাহী। এর পরের ঘটনা রহস্যঘেরা। কলির বাসা থেকেই সকালে উদ্ধার করা হয় আশিকের লাশ। ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কী ঘটেছিলো সেদিন, কিভাবে আশিকের মৃত্যু হয়েছে? এরকম নানা প্রশ্ন তার সহপাঠী, স্বজনদের মধ্যে। আশিকের বান্ধবীসহ বেশ কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
সূত্র জানায় ঘটনার আগের দিন রাত থেকে তাদের দু’জনের মধ্যে চলছিলো বাকবিতন্ডা। মোবাইলফোন বন্ধ করে রেখেছিলেন কলি। আশিক সারারাত যোগাযোগ করতে না পেরে ভোরে চলে আসেন কলির মেসে।
কলি ও আশিক সহপাঠী। অনেকে জানান, তাদের দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। তাদের এক বন্ধু বলেন, তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই। তারা একসঙ্গেই চলাফেরা করে প্রায় সময়। তবে তাদের আরেক বান্ধবী জানান, আশিক কলিকে পছন্দ করতো। কিছুদিন আগে কলির বিয়ের প্রস্তাব আসে। সেই থেকেই শুরু হয় মনোমালিন্য।
এদিকে, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কলি জানিয়েছেন, তারা বন্ধুর মতো চলাফেরা করতেন। আশিক তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও এড়িয়ে চলতেন তিনি। এরপর পারিবারিকভাবে বিয়ের সম্বন্ধ এলে তাদের বন্ধুত্ব রূপ নেয় শত্রুতায়। এমনকি বিরক্তের কারণ হয়ে দাঁড়ায় আশিক। কলি পুলিশকে জানিয়েছেন, আশিক আত্মহত্যা করেছেন। স্বজনদের অভিযোগ আশিককে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। আত্মহত্যার বিষয়টি মিথ্যা, সাজানো বলে মনে করেন তারা। আশিকের বড় ভাই আল আমিন পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ দায়ের করেছেন।
কলির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার দিন আশিক বাসায় গেলে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। আশিক তখন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। রাজি না হওয়ায় হুমকি দেন আত্মহত্যা করার। একপর্যায়ে কলি চলে যান পাশের ঘরে। কিছুক্ষণ পর ওই রুমে যান কলি। জানালার গ্রিলের সঙ্গে প্যান্টের বেল্ট পেঁচিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় আশিককে দেখতে পান তিনি। এই দৃশ্য দেখে চিৎকার করতে থাকেন কলি। বাসার মালিকসহ আশপাশের লোকজনের সামনে বেল্টটি বটি দিয়ে কেটে নামানো হয় হয় আশিককে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। দ্রুত তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর আশিকের বড়ভাইকে ফোন দেয়া হয় কুর্মিটোলা হাসপাতালে আসার জন্য। ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার ভোরে। পরে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে।
আশিকের বড় ভাই আল আমিন বলেন, আমার ভাই প্রায় ৬ ফিট লম্বা। ৬ ফিট একটা লম্বা ছেলে কি করে গ্রিলের সঙ্গে বেল্ট লাগিয়ে আত্মহত্যা করে? এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তিনি বলেন, কলির সঙ্গে আমার ভাইয়ের সম্পর্ক ছিলো। এছাড়াও তার আরও এক ডাক্তারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো। সেই ডাক্তার বেশ প্রভাবশালী। কলির সঙ্গে ঝামেলা হবার কারণে সেই ডাক্তার প্রতিশোধ নিবে বলেও জানায় কলি। এই কারণে তার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
ঘটনার পর থেকেই তদন্ত করছে পুলিশ ও ডিবি। গতকাল বুধবার জিঙ্গাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয় কলি, কলির বান্ধবী, গৃহপরিচারিকা  ও  কলির মাকে।
ভাটারা থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক বলেন, তাদের আটক করা হয়নি। জিঙ্গাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। তবে তাদের কথার মধ্যে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বাসায় ভোর বেলা কি করে আশিক প্রবেশ করল? এই প্রশ্নের জবাবে বাড়ির মালিকের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ভোর বেলা ফজরের নামাজের জন্য খোলা ছিলো বাড়ির গেট। ওই সময়ে হয়তো আশিক বাসায় ঢুকেছে। ভাটারা থানার ওসি বলেন, আশিকের গলা ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও আঘাতের কোন চিহ্ন মেলেনি। এদিকে, আশিকের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল তার গ্রামের বাড়িতে সকাল ১০টার দিকে দাফন করা হয়। আশিকের বাড়ি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দীনের দালালপুরে। আর কলির বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরে। কলি রাজধানীর ভাটারা থানার কুড়িল এলাকার কুড়াতলি বাজারের এক বাসায় ভাড়া থাকেন। তারা দুই বান্ধবী দ্বিতীয় তলার দুই রুমের ফ্লাটটি ভাড়া নিয়েছেন।

বিমান ছিনতাই চেষ্টা মামলা: সিমলায় আটকে আছে তদন্ত! by ইব্রাহিম খলিল

ঘটনার প্রায় তিন মাস হতে চলেছে। এরইমধ্যে পুলিশ পনের রকমের আলামত সংগ্রহ করেছে। ১৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নানা তথ্য-উপাত্তও সংগ্রহ করেছে। পুলিশ বলছে তদন্তে মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। কারণ ঘটনার পুরো রহস্যই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১৪৭ ময়ূরপঙ্খী বিমান ছিনতাই চেষ্টা মামলার মূল আসামি পলাশ আহমেদ ওরফে মাহাদির স্ত্রী চিত্রনায়িকা সামশুন নাহার সিমলার মধ্যে। আর সিমলাকে খুঁজে না পাওয়ায় মামলার পুরো তদন্তই আটকে আছে। 
এমন কথা বলছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া। তিনি বলেন, নিহত পলাশ আহমেদের স্ত্রী সিমলার হদিস মিলছে না। তার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশের তদন্ত টিম।
সিমলার পরিবার থেকে জানানো হচ্ছে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। কিন্তু ঘটনার পর এতদিনেও দেশে ফেরেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত সিমলাকে তদন্ত সংস্থার কাছে হাজির হতে দু-একদিনের মধ্যে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হচ্ছে বলে জানান পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া।
রাজেশ বড়ুয়া বলেন, মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়। এ সময় রানওয়ে থেকে দুটি গুলির খোসা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। এ ছাড়া বিমানটির ভেতরে বাথরুমের দেয়াল ও বাম পাশের দেয়ালে দুটি গুলির চিহ্ন আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিমানটির ইমারজেন্সি দরজা খোলাসহ বিমানের ভেতর থেকে আরো ৭ ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়।
অভিযানে বিমান ছিনতাই চেষ্টাকারী পলাশ আহমেদ ওরফে মাহাদির কাছ থেকে উদ্ধার করা খেলনা পিস্তল ও বিস্ফোরক দ্রব্যের মতো একটি বস্তু নগরীর পতেঙ্গা থানায় জমা দেন র‌্যাব ও সেনা কমান্ডোরা। যেগুলো আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মর্গ থেকে কমান্ডো অভিযানে নিহত পলাশ আহমেদের মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। এভাবে এই ঘটনার ১৫ রকমের আলামত এখন হাতে রয়েছে আমাদের।
এ ছাড়া কমান্ডো অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তার বক্তব্য, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে পলাশ আহমেদ কীভাবে বিমানে প্রবেশ করলো তার তদন্তে বিমান বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ছিনতাইকারীর কবলে পড়া বিমানের পাইলট, ক্রু ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদসহ সব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পলাশ আহমেদের মা-বাবার দেয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ঘটনার নেপথ্যে সিমলার সঙ্গে পলাশের বিচ্ছেদ, পলাশের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিষয়ও রয়েছে। যা ধারদেনা করে পলাশ এ অর্থ সিমলার হাতে তুলে দেন বলে তথ্য দেন।
এ অবস্থায় পলাশের সঙ্গে সিমলার কি হয়েছিল, অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টিও সঠিক কিনা, তার প্রকৃত সত্য জানতে সিমলার সঙ্গে কথা বলা দরকার। কিন্তু সিমলা একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন। তার এ আচরণ রহস্যজনক। এতে সিমলার প্রতি তদন্ত টিমের সন্দেহ বাড়ছে।  
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, মামলার স্বার্থে চিত্রনায়িকা সিমলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। কারণ বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার হেতু কি? পলাশ আহমেদ কেনই বা এতবড় ঝুঁকি নিলেন, পলাশ আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কেন কথা বলতে চাইলেন। স্ত্রীকে ফিরে পাওয়া নিয়ে পলাশ আহমেদের যে দাবি তার সত্যতা বা যৌক্তিকতা কি? নেপথ্যে এই কারণগুলো রয়ে গেছে। এসব জানা গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা এ মামলার চার্জশিট দিতে পারবো। এ নিয়ে তার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কথাও বলেছি। কিন্তু সিমলার হদিস মিলছে না।
প্রসঙ্গত, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টা ৫ মিনিটে ছেড়ে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। ঢাকা থেকে উড্ডয়নের পরই উড়োজাহাজটি ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর কমান্ডো অভিযানে উড়োজাহাজ ছিনতাই চেষ্টার অবসান ঘটে।
রাত ৮টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাত্র আট মিনিটের কমান্ডো অভিযানে উড়োজাহাজটির ছিনতাইকারী পলাশ আহমদ (২৫) নিহত হন। এ ঘটনায় ২৫শে ফেব্রুয়ারি নগরীর পতেঙ্গা থানায় মামলা করেন সিভিল এভিয়েশনের প্রযুক্তি সহকারী দেবব্রত সরকার। এতে কমান্ডো অভিযানে নিহত পলাশ ও অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

মাদক ও জঙ্গির খোঁজে যা হচ্ছে চট্টগ্রামে by ইব্রাহিম খলিল

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর সিএসসিআর হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সে কর্মরত শওকত হোসেন। নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে যাওয়ার পথে মুরাদপুর ফ্লাইওভারে উঠার মুখে পুলিশের সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পড়েন অটোরিকশা চালক। এরপর নেমপ্লেটে লেখা সুমন নামে এক পুলিশ সদস্য বলেন, গাড়ি থেকে নামেন। কেন জানতে চাইলে বলেন, এখানে পুলিশের চেকপোস্ট। অগত্যা অটোরিকশা থেকে নামেন শওকত হোসেন। দেখতে পান আরো দুই পুলিশ সদস্য। এদিক-ওদিক দেখে শওকত হোসেন বলেন, কোথায় চেকপোস্ট। এখানে তো সেরকম কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
পুলিশ সদস্য বলেন, দেখা লাগবে না। এই গাড়িতে ইয়াবা পাচার হচ্ছে এমন ইনফরমেশন আছে আমার কাছে। বলেন কি? বিস্মিত হয়ে শওকত হোসেন বলেন, ভাই আমি বাংলাদেশ বিমানে কর্মরত। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি। এই দেখুন ডাক্তারের কাগজপত্র।
এরপরও গাড়িতে তল্লাশি চালান তিনি। ইয়াবা না পেয়ে পুলিশ সদস্য বললেন, আপনারা যে, স্বামী-স্ত্রী তার কাবিননামা দেখান। আইএস জঙ্গিরা স্বামী-স্ত্রী সেজে বোমা মারে। তা নাহলে আপনাদের থানায় নিয়ে যাব। শওকত বললেন, ডাক্তারের কাছে রাত ৮টায় আমার শিডিউল আছে। ঠিকমতো পৌঁছাতে না পারলে স্ত্রীর চিকিৎসা হবে না। এ সময় পকেটে হাত দিয়ে ৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় পুলিশ সদস্য সুমন। এ সময় কোন থানার পুলিশ জানতে চাইলে সে উল্টো অশ্রাব্য গালিগালাজ করে বলে জানান শওকত হোসেন।
শনিবার দুপুর আড়াইটা। ফটিকছড়ি থেকে বাসে চড়ে নগরীর মুরাদপুর আসছিলেন মুদি দোকানদার ইলিয়াছ। বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন অক্সিজেন পুলিশ বক্সের সামনে ইশারা দিলে বাসটি থামে। তল্লাশি করতে বাসে উঠে পড়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য। মিনিট পাঁচেক পর বাসের চালকসহ তিন যুবককে নামিয়ে আনে পুলিশ।
ইয়াবা বহনের সন্দেহে পুলিশ বক্সের ভেতরে নিয়ে তাদের দেহ তল্লাশি করেন তারা। ওই তিন যুবক মাদক ব্যবসায় জড়িত নয় বলে জানানোর পরও তাদের শরীর এক্স-রে করাতে হবে ধমক দেন এক পুলিশ সদস্য। অক্সিজেন এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক্স-রে করে মাদকের অস্তিত্ব না পেয়ে ২০-২৫ মিনিট পর অবশেষে ওই তিন যুবককে ছেড়ে দেয় পুলিশ। ওইদিন বেলা দেড়টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা ওই পুলিশ বক্সের সামনে অবস্থান করে মাদক ও আইএস জঙ্গির খোঁজে তল্লাশির নামে নিরীহ যাত্রীদের পুলিশি হয়রানির এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অক্সিজেন পুলিশ বক্সে মাদক তল্লাশির নামে নিরীহদের হয়রানির চিত্র নিত্যদিনের। এ চেকপোস্টে মাদক তল্লাশির নামে বিভিন্ন মানুষের কাছে টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে রাজি না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বায়েজিদ থানার ওসি খোন্দকার আতাউর রহমান বলেন, মাদক কিংবা অবৈধ কিছু তল্লাশিকালে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে কিছু কষ্ট শিকার করতে হবে এমনটা স্বাভাবিক। তবে তল্লাশির নামে কাউকে হয়রানি করা যাবে না। শুধু অক্সিজেন নয় তল্লাশির নামে নগরজুড়ে পুলিশি হয়রানির এ চিত্র নিত্যদিনের। ভুক্তভোগী কলেজছাত্র আজম খান বলেন, দুর্বৃত্তদের দেখলে মানুষ যেমন ভয় পায়, তেমনি পুলিশ চেকপোস্ট দেখলেও মানুষের বুক কেঁপে ওঠে।
নাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা আবদুস সোবহান জানান, গত ১৬ মে সকালে সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে নগরের নিউমার্কেট যাচ্ছিলেন তিনি। অক্সিজেন মোড়ের চেকপোস্টে তাকে বহনকারী অটোরিকশাটি থামায় পুলিশ। এসময় তার পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার শঙ্কায় পড়ে যান আবদুস সোবহান।
তল্লাশিকারী পুলিশ সদস্যকে সোবহান বলেন, ভাই আমার কাছে ছেলেমেয়ের জন্য পোশাক কেনার টাকা আছে। আপনি পকেটে হাত দেবেন না।
নগরের কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার একাধিক দোকানদার জানান, চান্দগাঁও থানা পুলিশের চেকপোস্টে প্রতিদিন নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পথচারী, যাত্রী কিংবা শিক্ষার্থীদের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে পুলিশ। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চান্দগাঁও থানার ওসি আবুল বাশার। অভিযোগ আছে, নগরের গণি বেকারি, সার্সন রোড, পলিটেকনিক্যাল, আমবাগান ভাঙারপুল, জাকির হোসেন রোডের চক্ষু হাসপাতালের সামনে, একই সড়কের এমইএস কলেজ কবরস্থান, পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন, পাঁচলাইশ থানাধীন বনগবেষণা ইনস্টিটিউট, সিআরবি, আগ্রাবাদ, সল্টগোলা ক্রসিং, বিমানবন্দর সড়ক, টাইগার পাসসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশির নামে হয়রানি করা হচ্ছে।
হোসেন আহমেদ নামে এক ভুক্তভোগী জানান, এপ্রিল মাসে পাহাড়তলী থানা এলাকায় ছেলের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে হয়রানি করার অভিযোগে মেহেরুন্নিসা নামে এক নারী আদালতে পাহাড়তলী থানার তৎকালীন ওসি রফিকুল ইসলামসহ সাত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মেহেরুন্নিসার অভিযোগ, ২৫শে এপ্রিল রাতে টহল পুলিশ তার ছেলে মেহেদি হাসানকে রাস্তা থেকে ধরে থানায় নিয়ে গিয়ে তিন লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে তার ছেলের পকেটে ৪০টি ইয়াবা পাওয়ার অভিযোগে মামলা দেয় পুলিশ। পরদিন মেহেদীকে আদালতে চালান দেয়। আদালতের নির্দেশে পিবিআই এ ঘটনা তদন্ত করছে।
ওমেশ চন্দ্র নামে এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, চেকপোস্টে আতঙ্কজনক তল্লাশি চালায় পুলিশ। রিকশা কিংবা গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রথমেই কয়েকজন পুলিশ মিলে সংশ্লিষ্ট পুরুষকে ঘিরে ধরে। এরপর সারা শরীরে তল্লাশি চালায়। সঙ্গে থাকা মানিব্যাগ হাতড়েও দেখে পুলিশ। অনেক সময় মানিব্যাগ থেকে টাকাও রেখে দেয়।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম বলেন, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার কারণে পুলিশের তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের যাত্রীদের তল্লাশির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তবে তল্লাশির নামে হয়রানি কোনোভাবে মেনে নেয়া হবে না। এ বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ঢাকার গুলিস্তানে পুলিশের ওপর হাতবোমা বিস্ফোরণে আইএসর দায় স্বীকারের পর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে চট্টগ্রাম মহানগরীজুড়ে রেড এলার্ট জারি করে পুলিশ। এরপর থেকে নগরীর অতিগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি প্রতিটি মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

অজ্ঞান পার্টিতে ‘কিশোর চক্র’

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীতে আবারো সক্রিয় হয়েছে অজ্ঞান পার্টিসহ পকেটমার ও প্রতারক চক্র। রাজধানীর অভিজাত বিপনি বিতান ও বাণিজ্যিক এলাকা ঘিরে তৎপরতা বেড়েছে এসব চক্রের। তবে অজ্ঞান পার্টিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও কিশোরদের চাহিদা তুলনামূলক বেশি বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। গত শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অজ্ঞান পার্টির ৬২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এর মধ্যে, নিউমার্কেট এলাকা ও আশপাশ থেকে ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করে সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। আটক হওয়া অজ্ঞান পার্টির সকলে ঢাকায় ভাসমান অবস্থানে বসবাস করে।
এদের মধ্যে বেশির ভাগ মাদকাসক্ত হওয়ায় মাদকের টাকা ম্যানেজ করতে মানুষকে অজ্ঞান করে মূল্যবান জিনিসপত্র, নগদ টাকা হাতিয়ে নেয়। তবে এই চক্রে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও কিশোররা মূল ভূমিকা পালন করতো বলে জানিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। নিউমার্কেট এলাকা থেকে পুলিশের হাতে আটক হওয়া ৩৮ জনের মধ্যে অন্তত চারজন কিশোর। অজ্ঞান পার্টিতে এসব কিশোরদের কদর বয়স্কদের তুলনায় বেশি বলে দাবি করেছে পুলিশ। সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ সূত্র জানায়, নিউমার্কেট, নূরজাহান, গাউছিয়াসহ ওই এলাকার বিভিন্ন বিপনি বিতানে নারী ক্রেতাদের টার্গেট করে কিশোররা। বয়সে কম হওয়ায় অজ্ঞান পার্টির কিশোর গ্যাংয়ের দিকে মানুষের সন্দেহ কম থাকে। এই সুযোগ নিয়ে নিউমার্কেট এলাকার বিপনি বিতানগুলোতে আসা নারী ক্রেতাদের কাছাকাছি থেকে ছক কষে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। টার্গেট নারী ক্রেতা অজ্ঞান হয়ে গেলে ভিড়ের মধ্যে তার সাথে থাকা দামি মোবাইল, নগদ টাকা ও অনান্য জিনিসপত্র লুটে নেয় তারা।
পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হওয়া অজ্ঞান পার্টি চক্রটির নেতৃত্ব দেয় আবদুস সালাম মীর নামে একজন। এক পা অচল হলেও কিশোর ও মাঝ বয়সীদের নিয়ে গ্যাং চালাতো সালাম। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশকে জানায়, বয়স্কদের মানুষ তুলনামূলক সন্দেহের চোখে দেখে। তবে, কিশোর ও কম বয়স্করা সহজেই ক্রেতাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। এজন্য, কিশোরদের দিয়ে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতো এই অজ্ঞান পার্টি চক্রের হোতা। পুলিশকে সালাম আরো জানায়, কাজ শেষে ভিড়ের মধ্যে সুযোগ বুঝে মিশে যেত তার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এরাও মাদকাসক্ত ও ভাসমান হওয়ায় সহজেই তাদেরকে দলে ভেড়ায় সালাম। এদিকে অভিযানের নেতৃত্ব দেয়া ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. নাজমুল হক গতকাল মানবজমিনকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ৩৮ জনের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বয়স বিবেচনায় কিশোর সংশোধনাগারে দেয়া হয়েছে। অজ্ঞান পার্টির বিষয়ে গোয়েন্দারা তৎপর আছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

নিঃসঙ্গ এরশাদ দিন কাটছে যেভাবে by শফিকুল ইসলাম সোহাগ

৯ বছরের প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন অনেকটা নিঃসঙ্গ। পরিজন বলতে পাশে থাকার মতো কেউই নেই। পরিচর্চা করেন স্টাফরা। অধিকাংশ সময় কাটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। দলের নেতা-কর্মীরা এখন আর ভিড় করেন না বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে। দলের কোনো কর্মসূচিতে তিনি আর অংশ নেন না। ৯০ বছরের শরীর আর সায় দেয় না। সব মিলিয়ে জীবনসায়াহ্নে এসে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন সাবেক এই সেনাপ্রধান। দীর্ঘদিনের কর্মচারী আবদুল ওহাব, আবদুস সাত্তার, বাদশা, নিপা ও রুবির তত্ত্বাবধানে কাটছে এরশাদের দিনকাল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এইচ এম এরশাদের ছোট ভাই পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের প্রায় সারা দিনই বাসায় কাটে। শরীরটা খারাপ বোধ করলে ডাক্তারের কাছে যান। শারীরিক পরিচর্যা কারা করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজের লোক আছে। তারাই পরিচর্চা করেন। আমরা প্রায়ই দেখা করতে যাই।’
এইচ এম এরশাদ, যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পরও নব্বইয়ের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে চলেছেন, সেই প্রতাপশালী সাবেক সেনাশাসক এইচ এম এরশাদ আজ জীবনসায়াহ্নে একা। স্ত্রীসহ নিকটাত্মীয় কেউ থাকেন না পাশে। মৃত্যু ভয়ে প্রায়ই রাত-বিরাতে ছুটে যান সিএমএইচে। আধা কিলোমিটারের মধ্যে গুলশানে স্ত্রী ও পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ বসবাস করলেও তিনি বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে এইচ এম এরশাদের খোঁজ নিতে সশরীরে আসেন না। গত পাঁচ বছরে ১৭ বার এইচ এম এরশাদ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে গেলেও স্ত্রী রওশন এরশাদ একবারও সঙ্গে যাননি। এরশাদ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সর্বক্ষণ তার সঙ্গে ছিলেন আমেরিকা প্রবাসী এরশাদের আরেক ভাই মঞ্জুর মুর্শেদ ও তার সহধর্মিণী রোকসানা মুর্শেদ। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে এরশাদের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হলে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশে সুস্থতা কামনায় জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে একাধিক মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হলেও কোনো দোয়া মাহফিলে অংশ নেননি রওশন এরশাদ। ছোট ভাই জি এম কাদের প্রায়ই আসেন বারিধারার বাসায়। কথা বলেন, ভাইয়ের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন।  জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক বিষয় নিয়েও আলাপ করেন। রওশন এরশাদ জাপা চেয়ারম্যান এরশাদকে দেখতে প্রেসিডেন্ট পার্কে আসেন কি না জানতে চাইলে এরশাদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিগত সহকারী আবদুল ওহাব প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের পিতার মতো। অসুস্থ পিতাকে সন্তান যেমন সেবা-যত্ন করে, আমরা আমাদের পিতার সেবা করে যাচ্ছি।’ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ। মনোনয়নপত্র জমাদানের পরপরই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে তখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। সিঙ্গাপুর থেকে এসেই পুনরায় তিনি ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি হন। নির্বাচনের পর তিনি আবার সিঙ্গাপুরে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এরশাদের ব্যক্তিগত সচিব মেজর খালেদ আখতার বলেন, ‘চিকিৎসার বিষয়টি আমি নিজে দেখাশোনা করি। আর স্টাফরা তার পরিচর্যা ও দেখাশোনা করেন।’ সারা দিন শুয়ে-বসেই এরশাদের দিন কাটে বলে তিনি জানান।

কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব বোঝা হিসেবে দেখছে ব্যাংক: ২ লক্ষাধিক হিসাব অচল by প্রতীক ওমর

সরকার কৃষক থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুবিধা প্রদান করে। পরবর্তীতে কৃষকের ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন প্রকার প্রণোদনা ও ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয় কৃষকের ১০ টাকায় খোলা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে। দেশের সরকারি ৫টি ব্যাংক সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও জনতা ব্যাংকে এই সুবিধা প্রদান করা হয়। এসব ব্যাংকে বগুড়ায় কৃষকরা ৬ লক্ষাধিক হিসাব খোলে। এসব হিসাবে ভর্তুকির টাকা ছাড়া অন্য কোনো লেনদেন না হওয়ায় ব্যাংকগুলো বোঝা হিসেবে দেখছে। অনেক কৃষক তাদের ১০ টাকার হিসাবে লেনদেন করতে অনাগ্রহী। তারা এ হিসাবের মাধ্যমে শুধুমাত্র সরকারি ভর্তুকি নিতে আসে। অন্যকোনো লেনদেন করতে আসে না। ফলে ইতিমধ্যেই প্রায় ২ লাখ হিসাব অচল হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে শুধু জেলার অগ্রণী ব্যাংকে ৪২ হাজার ২০৮টি, রূপালী ব্যাংকে ২ হাজার ২০০টি, সোনালী ব্যাংকে ৪০ হাজার ১৬০টি, জনতা ব্যাংকে ১৮ হাজার ৮৯৮টি, রাকাব উত্তর ৭৬ হাজার ১৯টি ও রাকাব দক্ষিণ ব্যাংকে ৬১ হাজার ৭৮০টি কৃষকের ব্যাংক হিসাব চালু রয়েছে। এ ছাড়া সচল ও অচল মিলে বর্তমানে জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ৬ লাখ ৫ হাজার ২৬৪টি কৃষকের ব্যাংক হিসাব গড়াগড়ি খাচ্ছে। এরমধ্যে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩৯ জন কৃষকের এবং ৩১ হাজার ৬২৫টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে কৃষাণীর ব্যাংক হিসাবে। তবে এসব হিসাবে শুধু ভর্তুকির টাকা উত্তোলন করায় ২ লাখ ৩ হাজার ২৫৮টি ব্যাংক হিসাব অচল রয়েছে। জেলার উপজেলাভিত্তিক কৃষকের ব্যাংক     পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ৪
হিসাবের মধ্যে সচল রয়েছে বগুড়া সদরে ৫ হাজার ৩শ’, শাজাহানপুরে ২০ হাজার ৬৫২টি, শেরপুরে ৩১ হাজার ৫১টি, ধুনটে ৪০ হাজার ৬৫০টি, গাবতলীতে ৫৩ হাজার ৯২০টি, সারিয়াকান্দিতে ৪৮ হাজার ৫৮০টি, সোনাতলায় ৩৮ হাজার ৭৭৭টি, শিবগঞ্জে ২২ হাজার ২৮৫টি, কাহালুতে ৫ হাজার ৪৯৫টি, দুপচাঁচিয়ায় ২ হাজার ৮শ’, আদমদীঘিতে ৫ হাজার ও নন্দীগ্রাম উপজেলায় ২১ হাজার ৯৫৯টি ব্যাংক হিসাব।
বগুড়া সদরের পাটিতাপাড়া গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম, তবিবর রহমান, মোকাব্বর হোসেন, রেজাউল করিম বলেন, কৃষকের ভর্তুকির ব্যাংক হিসাবে সব ধরনের লেনদেন করা যায় তা তাদের জানা নেই। তা ছাড়া ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের বলেছেন, ভর্তুকির হিসাবে অন্যকোনো লেনদেন করা যাবে না। একই এলাকার কৃষক শফিকুল ইসলাম জানালেন, ১ বছর আগে তার ঐ হিসাবে সোনালী ব্যাংক বাজার শাখায় ১০ হাজার টাকার একটি চেক জমা দেন। পরে ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হয় ভর্তুকির টাকা ছাড়া তার হিসাবে অন্য কোনো টাকা লেনদেন করা যাবে না। বাধ্য হয়ে তিনি আবেদন করে সেই টাকা ব্যাংক থেকে উঠিয়ে নেন। সারিয়াকান্দি উপজেলার পারতিতপরল গ্রামের আব্দুল বাকী, আমিরুল ইসলাম, আচারের পাড়া গ্রামের আজিম উদ্দিন বলেন, ১০ টাকায় খোলা কৃষক হিসাবে অন্য কোনো লেনদেন করা যায় তা তাদের জানা নেই। শিবগঞ্জের মোকামতলার চলনাকাথী গ্রামের কৃষক মো. আইয়ুব আলী লস্করপুর পশ্চিমপাড়ার নাজিম উদ্দিন ও মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক থেকে বলা হয় কৃষকের ব্যাংক হিসাবে শুধু ভর্তুকির টাকা উত্তোলন করা যাবে। অন্য কোনো প্রকার টাকা জমা ও উত্তোলন করার বিধান নেই। এসব কারণে তারা ব্যাংকের ঐ হিসাবে লেনদেন করেন না।
সোনালী ব্যাংক বগুড়া বাজার শাখার ব্যবস্থাপক এবিএম জুলফিকার নাইম খান বলেন, সরকার কৃষকদের জন্য ১০ টাকার হিসাবে শুধুমাত্র সঞ্চয়ী লেনদেন করার অনুমতি দিয়েছেন। তবে যে কৃষক ১০ হাজার টাকার চেক তার ১০ টাকায় খোলা হিসেবে জমা দিয়েছিল সেটা ছিল তার ব্যবসার টাকা। ঐ চেক সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে জমা করার নিয়ম বিধায় তার জমা করা টাকা নিয়মমাফিক হয়নি।
অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড বগুড়া জোনাল কার্যালয়ের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. মাহফুজুর রহমান মিয়া বলেন, কৃষকের ১০ টাকায় খোলা হিসাবগুলোতে লেনদেন না হওয়ায় তার অনেকটাই অচল হিসেবে পরিণত হয়েছে। যা সংরক্ষণ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। হিসাবগুলো এক প্রকার ব্যাংকের কাছে বোঝা হয়ে রয়েছে।

আমেরিকা আয়োজিত বাহরাইন সম্মেলনে যোগ দেবে না ফিলিস্তিন

ফিলিস্তিনের সামাজিক উন্নয়নমন্ত্রী আহমাদ মাজদলানি
ফিলিস্তিনের সামাজিক উন্নয়নমন্ত্রী আহমাদ মাজদলানি বলেছেন, আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় বাহরাইনে যে অর্থনীতি বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে ফিলিস্তিনের কর্মকর্তারা যোগ দেবেন না। আগামী মাসে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কথিত ‘শতাব্দির সেরা চুক্তি’র প্রথম অংশ উন্মোচন করবেন। মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে, ইহুদিবাদী ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্য নিয়ে শতাব্দির সেরা চুক্তি তৈরি করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে মাজদালানি বলেন, মানামা ওয়ার্কশপে ফিলিস্তিনের কেউ যোগ দেবেন না। তিনি বলেন, ফিলিস্তিন থেকে যদি কেউ ওই সম্মেলনে যোগ দেন তাহলে তিনি বা তারা আমেরিকা ও ইসরাইলের সহযোগী ছাড়া আর কিছুই হবেন না।
এর আগে, ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মাদ শাত্তাইয়া বলেছেন, বাহরাইন সম্মেলন সম্পর্কে তার সরকারের সঙ্গে কোনো রকম পরামর্শ করা হয় নি।
ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মাদ শাত্তাইয়া

জাতিসংঘে ইরানের সংলাপ প্রস্তাব: বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ব্যাপারে তেহরানের হুঁশিয়ারি

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি মাজিদ তাখতে রাভানচি এই সংস্থার মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানের কাছে লেখা চিঠিতে মধ্যপ্রাচ্যে বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এ অঞ্চলের বাইরের বিভিন্ন দেশের প্রচেষ্টার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
চিঠিতে তিনি বলেছেন, "এমন কিছু প্রমাণ রয়েছে যাতে দেখা যায় এ অঞ্চলের বাইরের বিভিন্ন মহল আঞ্চলিক মিত্রদের সহযোগিতায় মিথ্যাচার করে, মিথ্যা তথ্য তুলে ধরে ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা পাঠিয়ে নিজেদের অবৈধ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে।" ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী কিছুদিন আগে এক সমাবেশে এ অঞ্চলে মার্কিন ভূমিকাকে তিনটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। এ তিনটি দিক হচ্ছে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আর্থ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা এরই আলোকে মূল্যায়ন করা যায়। বিরাজমান স্পর্শকাতর অবস্থা বিবেচনা করে জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি তার ওই চিঠিতে নানা সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হিসেবে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সংলাপের পদক্ষেপ নেয়ার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ইরান সবসময়ই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রীতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং যুদ্ধ ও সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এসেছে। ইরানের পররাষ্ট্র নীতিতে কখনোই যুদ্ধকে একমাত্র অপশন হিসেবে রাখা হয়নি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ ও সংলাপের ব্যাপারে মার্কিন কর্মকর্তাদের অসভ্যতা ও বেয়াদবিপূর্ণ কথাবার্তার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, "আমরা যুদ্ধও চাই না আর আমেরিকার বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে সংলাপও চাই না।"
তিনি আরো বলেন, "আদৌ কোনো যুদ্ধই হবে না। কারণ অতীতের মতোই আমরা কখনোই যুদ্ধ শুরু করব না। আবার মার্কিনীরাও হামলার সাহস দেখাবে না কারণ তারা জানে এর পরিণতি তাদের জন্য মোটেও শুভকর হবে না।" সর্বোচ্চ নেতা বলেন, "আমরা প্রমাণ করেছি যেকোনো আগ্রাসীকে আমরা শক্ত ও কঠিন জবাব দিতে পারি।"
ইরান মনে করে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। এ সংলাপ প্রক্রিয়া পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টি, নিরাপত্তা বিধান এবং সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ মোকাবেলায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। সেইসঙ্গে সমুদ্র পথে নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও নিশ্চিত করবে। এমনকি সংঘাতের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এ কারণে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ সম্প্রতি বিরাজমান উত্তেজনা ও সংকট নিরসনের জন্য এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ অবস্থায় এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি এ সংস্থায় নিযুক্ত ইরানের প্রতিনিধির আহ্বান জানানোর বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

রাজধানীতে ভয়ঙ্কর ‘গাড়ি পার্টি’ by শাহনেওয়াজ বাবলু

রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গাড়ি পার্টি।  ভাড়ায় যাত্রী নেয়ার কথা বলে লুটে নিচ্ছে সর্বস্ব। প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাস নিয়ে রাজপথে নেমে পড়ে তারা। চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই এরা ছিনতাইকারী। কখনো যাত্রী বহনের ছলে টার্গেট করা ব্যক্তিকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। আবার কখনো ফাঁকা রাস্তায় জোর করেই গাড়ির মধ্যে টেনে নেয়। গাড়িতে তুলেই শুরু হয় নির্যাতন। টাকা, মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন, ব্যাংকের ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড সবই তাদের চাই। মোটরসাইকেল আরোহীদেরও রেহাই নেই তাদের কবলে পড়লে। মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নেয়ার পাশাপাশি সবই লুটে নেয় এ চক্রটি। রাজধানীতে সক্রিয় হয়ে ওঠা এমন চক্রকে ‘গাড়ি পার্টি’ বলে অভিহিত করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
শাহবাগ এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাতে গাড়ি পার্টির কবলে পড়েন মোজাম্মেল হোসেন। রাত ৮টার দিকে তিনজন যাত্রী নিয়ে একটি সাদা মাইক্রোবাস থেকে একজন মতিঝিল যাবে বলে ডাকছিল। ভাড়া মাত্র ২০ টাকা দিতে হবে বলার পর রিপন গাড়িতে উঠেন। তারপরই তিন যাত্রীবেশী ছিনতাইকারী তাকে জিম্মি করে। একজন পকেট থেকে পিস্তল বের করে বলে, যা আছে দিয়ে নেমে যা। চিৎকার কিংবা কথা বললে সোজা গুলি হজম করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মানিব্যাগসহ যা ছিল দিয়ে দেন। এরপর রাজউক এভিনিউ এলাকায় মাইক্রোবাসের দরজা খুলে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দ্রুত চলে যায়। এ ঘটনায় তিনি মতিঝিল থানায় গেলে পুলিশ ঘটনাটি সাধারণ ডায়রি হিসেবে লিখে রাখে।
কয়েক দিন আগের ঘটনা। তখন রাত ৮টা। ধানমন্ডি এলাকার ১৫ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে গাড়ির অপেক্ষায় ছিলেন রায়হান চৌধুরী। তখন সাদা রঙের মাইক্রোবাস থেকে যাত্রী ডাকছিলেন, একজন দরকার, একজন। তিনি চালকের সঙ্গে ভাড়ার ব্যাপারে কথা বলেন। মাত্র ৩০ টাকা ভাড়ায় রাজি হন চালক। গাড়িতে ওঠার পরই যাত্রী বেশে থাকা তিন ছিনতাইকারী তাকে জিম্মি করে। একজন পকেট থেকে পিস্তল বের করে বলে, কথা বললেই গুলি করা হবে।
মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন নিয়ে পল্টন এলাকায় রায়হানকে নামিয়ে দিতে চান তারা। বিপত্তি বাধায় মানিব্যাগে থাকা একটি ক্রেডিট কার্ড। যানজটের মধ্যে গাড়ি ধীরে চলতে থাকে, আর ভিতরে চলে জিজ্ঞাসাবাদ। রায়হানের কার্ডের পিন নম্বর চান তারা। তিনি ভুলে গেছেন বলে দাবি করলে পিস্তলের বাঁট দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করেন একজন। এক পর্যায়ে পিন নম্বর বলে দেন মাসুদ। মতিঝিলে একটি ব্যাংকের এটিএম বুথের কাছে গিয়ে মাইক্রোবাসটি দাঁড়ায়। একজন নেমে যান। গাড়ি আবার চলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর একটি কল আসে একজনের ফোনে। তখন গাড়ি ঘুরে আবার দৈনিক বাংলা মোড়ে আসে।
হঠাৎ করেই গাড়ির দরজা খুলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয় রায়হানকে। ভুক্তভোগী রায়হান জানান, নগদ আট হাজার ও ক্রেডিট কার্ডের ২৮ হাজার টাকা খোয়ান তিনি। এখানেই থেমে থাকে না এ চক্র। কারও কাছে টাকা বা মূল্যবান কিছু না পেলে তাকে আটকে আদায় করছে মুক্তিপণ।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানী-বারিধারা ছাড়াও আবদুল্লাহপুর, উত্তরা, কাওলা, বিমানবন্দর সড়ক, মহাখালী, কুড়িল-বাড্ডা-রামপুরা, কাকরাইল, মতিঝিল, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ধানমন্ডি, মিরপুর রোড ও গাবতলী এলাকায় ছিনতাইকারী ১০টি চক্র রয়েছে। গাড়ি পার্টির সদস্যরা উঠতি বয়সের তরুণ থেকে যুবক। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, এরা ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত। রাজধানীতে পেশাদার ছিনতাইকারীদের তালিকা থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের দপ্তরে রয়েছে। তারপরেও অনেকেই রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এই অপরাধী চক্রটি তিনটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর রেল স্টেশনের সামনে যাত্রী বহনের জন্য বসে থাকে। টার্গেট করা লোককে গাড়িতে উঠিয়ে ফাঁকা জায়গায় নামিয়ে দিয়ে মালামাল কেড়ে নেয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেকর্ডপত্র বলছে, প্রতি রাতেই আহত লোক জরুরি বিভাগে আসে। এদের প্রায় সবাই প্রহারে আহত অবস্থায় এসে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যায়। ঘটনা সম্পর্কে আহতরা কর্তব্যতর চিকিৎসককে যে তথ্য দেয় তা হচ্ছে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে মারপিট করে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা থানা পর্যন্ত তেমন একটা গড়ায় না। আবার কেউ কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে থানায় মামলা করেন। তবে মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেটকারের নম্বর ও আরোহী সম্পর্কে ঘটনার শিকার লোক পুলিশকে কোন তথ্য দিতে পারেন না। আবার হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে যারা চলে যান তাদের অনেকের কথা, থানায় অভিযোগ করলেও প্রতিকার মিলে না।

ধানের মূল্য না পেয়ে দিশাহারা কৃষক

টাঙ্গাইলে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫শ’ টাকায়। অন্যদিকে একজন শ্রমিকের দিন মজুরি ৮৫০-৯০০ টাকা। এতে প্রতি মণ ধানে কৃষকের গুনতে হচ্ছে লোকসান। ফলে কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর আব্দুল মালেক সিকদার ও বাসাইল উপজেলার কাশিল গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম নিজের পাকা ধানে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মালেক সিকদার ও নজরুল ইসলামের এই প্রতিবাদে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এলাকার অধিকাংশ কৃষক। পাকা ধানে আগুন দেখে অনেকেই ছুটে আসেন।
এ বিষয়ে মালেক সিকদার ও নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিমণ ধানের দাম থেকে প্রতি শ্রমিকের মজুরির দাম দ্বিগুণ। এবার ধান আবাদ করে আমরা মাঠে মারা পড়েছি। তাই মনের দুঃখে পাকা ধানে আগুন দিয়েছি। আমরা দেশের প্রতিটি কৃষককে জানাতে চাই তারা যেন আমাদের এই প্রতিবাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আমাদের মৌলিক অধিকারটুকুও কেড়ে নিতে চায় সরকার। তাই দেশের সব কৃষককে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান।
এদিকে, কালিহাতীর আউলটিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান মজনু নামের আরেক কৃষক তার ক্ষেতের পাকা ধান এলাকাবাসীকে বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছেন। এলাকাবাসী ধান কেটে অর্ধেক অংশ নিজে এবং বাকি অর্ধেক অংশ ক্ষেত মালিককে দিয়ে দিচ্ছেন। যে ধান কৃষকের মুখে হাসি ফুটাবে সেই ধানই যেন বর্তমানে কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের মুখে হাসি নেই বাজারে গিয়ে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। চালকল মালিক ও সরকারি গুদামে ধান কেনার কারণে ধানে ভয়াবহ দরপতন চলছে। আমনের পর এবার বোরো ধানে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে চরম ক্ষুব্ধ কৃষক। কৃষকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে ব্যাপারি ও ফরিয়ারা। মৌসুমের শুরুতেই পড়তি দামে তেতো অভিজ্ঞতায় বিরক্ত কৃষক। লোকসানের গ্যাড়াকলে কৃষক উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামও পাচ্ছে না ধানে। এর আগে গত আমন মৌসুমেও কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পায়নি। ৪শ’ থেকে ৬শ’ টাকা মণে শুকনো আমন ধান বিক্রি হয়েছে। এ বছর এক বিঘা বোরো জমি চাষ করতে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা সে জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ১৫ মণের মতো। প্রতি মণ ধান ৫শ’ টাকা দরে বিক্রি করে কৃষক পেয়েছেন সাড়ে ৭ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় কৃষকের লোকসান ৬ হাজার টাকা। ফলে এ ধানই যেন কৃষকের গলার কাঁটা ও মাথা ব্যথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রকিবুল ইসলাম নামের এক চাষি বলেন, বীজতলা থেকে শুরু করে প্রতি মণ ধান ঘরে তুলতে হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়। কিন্তু ধান বিক্রি করছি অর্ধেক দামে। এবার আমরা পথে বসে গেছি। এ ছাড়া আরো কয়েকজন কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, কৃষককে ধানের ন্যায্য দাম দিয়ে বাঁচাতে হলে সরকারের সুদৃষ্টি প্রয়োজন। এদিকে, উত্তরবঙ্গেও প্রবেশদ্বার এলেঙ্গাতে শ্রমিকের হাটে রোববার সকালে গিয়ে দেখা যায় রংপুর থেকে আসা একজন শ্রমিক ৮শ’ থেকে ৯শ’ টাকায় প্রতিদিনের জন্য বিক্রি হচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের ধানের জমির মালিককে তিনবেলা খাবারও দিতে হচ্ছে। কৃষি নিয়ে কাজ করা এনজিও কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, বর্তমানে কৃষকদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। লাভ তো দূরের কথা ধান চাষ করে কৃষক আর্থিকভাবে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিষয়টি সরকারের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন পাকা ধানক্ষেত আগুন দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য দেয়া উচিত। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এএম শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন খরচ ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। আর ধানের বর্তমান বাজার মূল্যে প্রতি বিঘায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা কৃষকের লোকসান হচ্ছে। এমতাবস্থায় সরকারকে কৃষিকাজে যান্ত্রিকীকরণ ও ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবেই কৃষক উপকৃত হবে।