Tuesday, December 3, 2024

মিয়ানমারে জাতিসংঘ-শাসিত নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশ: ড. ইউনূস

মিয়ানমারে জাতিসংঘ-শাসিত নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশ- এমনটা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নিক্কেই এশিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সোমবার প্রকাশিত জাপানের এই সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস  মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলেছেন । রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার। এক্ষেত্রে ড. ইউনূস তাদের (রোহিঙ্গাদের) নিজেদের দেশে ফিরিয়ে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই দায় বাংলাদেশ কতদিন বহন করবে? রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য আমাদের একটি সুস্পষ্ট গন্তব্য ঠিক করা দরকার। মিয়ানমারে জাতিসংঘ-শাসিত নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশ। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মিয়ানমার অনুমতি দিলে বিপুল পরিমাণ এই রোহিঙ্গা তাদের দেশেই থাকতে পারবে। সেখানকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তারা অন্য দেশে স্থানাস্তরিত না হয়েই তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারবে বলে উল্লেখ করেন মুহাম্মদ ইউনূস।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতি সংস্থা-আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার বিষয়ে জোর দিয়েছেন ড. ইউনূস। কেননা বাংলাদেশ আসিয়ানে যোগ দেয়াকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। বিশেষ করে ২০২৬ সালের মধ্যে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। আগামী জানুয়ারি থেকে আসিয়ানের সভাপতিত্ব করবে মালয়েশিয়া। ড. ইউনূস বলেছেন, তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বাংলাদেশকে আসিয়ানে যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে বেশ কিছু ধাপ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিন বলেন, আসিয়ানে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটি হবে একটি সর্বসম্মত রেজুলেশন নিশ্চিত করা। আমরা আসিয়ানের মধ্যে একটি সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের আশা করছি। আসিয়ানের সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ড. ইউনূস।

ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী সংশোধনীসহ সাংবিধানিক ও বিচার বিভাগীয় সংস্কারের পর সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ড. ইউনূস।  নির্বাচনের আগে দেশের অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র এবং বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ৮৪ বছর বয়সী নোবেলজয়ী ক্ষুদ্রঋণের এই অগ্রদূত।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান এবং বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করেছে। জানুয়ারির মধ্যে ওই কমিশনগুলোর সুপারিশ হাতে পাওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়ন করার কথা জানিয়েছে সরকার। তবে এই সংস্কার বাস্তবায়নে সময় লাগবে বলে জানান তিনি। বলেন, এই সংস্কার বাস্তবায়নে সময় লাগবে, কেননা ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে আমরা একদম গোড়া থেকে কাজ শুরু করেছি। তবে নির্বাচন ঠিক কখন হবে সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের সময় নির্ভর করছে সংস্কার কাজের ওপর। কাজের ফলাফলই সময় নির্ধারণ করে দেবে।

সাধারণ নির্বাচনে ড. ইউনূস প্রার্থী হবেন কি না তা জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়টি নাকচ করে দেন। বলেন, আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি সবসময়ই রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছি। রাষ্ট্রের যেসকল ব্যক্তিরা নীতিকে সমুন্নত রাখেন, নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেন এবং নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত রাখেন তাদের নির্বাচনে দাঁড়ানো উচিত বলে মনে করেন ড. ইউনূস।

তিনি বলেন, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের শাসনকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গছে, আমরা এখন তা পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের মুখোমুখি হয়েছি। গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা আমাদের কাজ।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, হাসিনার শাসনামলে গণতন্ত্রের মূলনীতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। টানা তিন মেয়াদে ভোটারবিহীন নির্বাচন করেছিলেন হাসিনা। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে এবং তার দলকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন। একজন ফ্যাসিবাদী শাসক হিসেবে এসব করেছিলেন হাসিনা। এ বছরের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন সরকারি চাকরিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কয়েকশ শিক্ষার্থী নিহত হন। এরপরই শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন হাসিনার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ৫ই আগস্ট  ছাত্র-নাগরিকের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তিনি হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে পালিয়ে যান। অক্টোবরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা এবং তার বেশ কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

এই বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় হলে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ভারতকে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, বিচার শেষে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় এলে আমরা ভারতের কাছে হাসিনার আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের অনুরোধ করব। এক্ষেত্রে উভয় দেশের স্বাক্ষরিত একটি আন্তর্জাতিক আইনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ আইন মানতে ভারত বাধ্য থাকবে।

কূটনৈতিক ফ্রন্টে বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে ড. ইউনূস দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব করেছেন। ভারত এবং পাকিস্তানের বৈরি সম্পর্কের ফলে সার্ক কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছে। সার্কের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মতো নিজেদের মধ্যে চলাফেরার স্বাধীনতা, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যকে উৎসাহিত করা। সার্কের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ভারতেকে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন ড. ইউনূস।

ওদিকে হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ভারত সরকার। তাদের দাবি বাংলাদেশে হিন্দুদের ঘরবাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং মন্দিরে ‘হামলা’  করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকাকে অবশ্যই হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলে জোর দিয়েছে দিল্লি। তবে ভারত সরকারের এসব ঢালাও বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু ইস্যুতে যা বলা হচ্ছে তার বেশির ভাগই প্রোপাগান্ডা। এগুলো সঠিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে বলা হচ্ছে না বলে পাল্টা অভিযোগ করেছেন ড. ইউনূস। তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের বাংলাদেশে এসে তদন্ত সাপেক্ষে সঠিক তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা এসব ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে ভারত সরকারকে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য কাজ করছি।

আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ড. ইউনূস চীনকে বন্ধু দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত চীন বিভিন্নভাবে আমাদের সহায়তা করেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক আগের মতোই অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

mzamin

পাগলা মসজিদে এ পর্যন্ত কত টাকা জমা হলো, কোথায় ও কীভাবে খরচ হয় by তাফসিলুল আজিজ

কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানের সিন্দুক তিন মাস পরপর খুলে পাওয়া যায় কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা। এখন পর্যন্ত কত টাকা পাওয়া গেল, এই টাকা কোথায় জমা রাখা হয় বা কীভাবে খরচ হয়—এ নিয়ে মানুষের মনে স্বভাবতই এসব প্রশ্ন জাগে। দানের সিন্দুক খোলার কয়েক দিন পর্যন্ত চলে এসব আলোচনা।

সর্বশেষ গত ৩০ নভেম্বর দানের ১১টি সিন্দুক খুলে পাওয়া যায় ৮ কোটি ২১ লাখ টাকার ওপরে। এখন পর্যন্ত মসজিদের কত টাকা জমা হয়েছে, সাংবাদিকেরা সেটা জানতে চেয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি ফৌজিয়া খানের কাছে। তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। আগের জেলা প্রশাসকদেরও এই প্রশ্ন করা হলে তাঁরা উত্তর দিতেন না। এ নিয়ে মসজিদ কমিটির লোকজনও কথা বলতে রাজি হন না।

সর্বশেষ যেদিন মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়, সেদিন জেলার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ইকরাম হোসেন মসজিদে এসে আয়-ব্যয়ের সব হিসাব জনসমক্ষে উত্থাপন করার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পাগলা মসজিদের টাকা জনসাধারণের দেওয়া টাকা। তাই জনগণ এ টাকার হিসাব জানার অধিকার রাখে। তবে এ ব্যাপারে মসজিদ কর্তৃপক্ষের যুক্তি, তিন থেকে চার মাস অন্তর অন্তর যখন দানের সিন্দুক খোলা হয়, তখন নগদ কত টাকা পাওয়া যায়, সেটা গণমাধ্যমের কল্যাণে মানুষ জানতে পারে। এ ছাড়া প্রতিদিন মসজিদে মানুষের দান করা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ নানা জিনিসের নিলাম থেকে হাজার হাজার টাকা পাওয়া যায়। দানের সিন্দুকে টাকার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আর স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়, সেটার হিসাবও কখনো কাউকে জানানো হয় না। ফলে মানুষের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে জানার আগ্রহ বাড়ছে।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে যখন থেকে টাকার পরিমাণ বেশি হচ্ছে ও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, সেই ৯ বছরে পাগলা মসজিদের সিন্দুকে টাকা জমা পড়েছে ৭৫ কোটি টাকার ওপরে। এই ৯ বছরে অন্তত ২৩ বার দানের সিন্দুক খোলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন মসজিদে দেওয়া প্রাণী, অন্যান্য জিনিস, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার নিলামে তুলে আরও ২৫ কোটি টাকার ওপরে পাওয়া গেছে। এভাবে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত পাগলা মসজিদে শতকোটি টাকার ওপরে জমা পড়েছে।

তবে এই টাকা থেকে মসজিদের ৩৭ কর্মীর বেতন ও মাদ্রাসার এতিম শিশুদের ভরণপোষণ বাবদ ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা প্রতি মাসে ব্যয় হয়। আবার ওয়াক্‌ফ স্টেটের হিসাব বাবদ ৫ শতাংশ হারে বছরে টাকা কাটা হয়। তবে কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে জমা রাখায় প্রতি মাসে লভ্যাংশও আসছে।

২০১৫ সালের শুরুর দিকে আটটি লোহার সিন্দুক খুলে একসঙ্গে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। তখন ছয় মাস পরপর সিন্দুক খোলা হতো। এর পরেরবার পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের শেষের দিকে দানসিন্দুকে সর্বোচ্চ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ওপরে মিলেছিল। দিন দিন টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা জমার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তিন মাস পরপর সিন্দুক খোলার প্রথা চালু হয়। এভাবে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে দানের সিন্দুক খুলে সর্বমোট ৭৫ কোটি ৪৭ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩৮ টাকা পাওয়া গেছে। আর যে বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়, তা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে গচ্ছিত রাখা হয়।

মসজিদ কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়ার ভাষ্য ও সরেজমিনে নিলামের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। নিলামে শুক্রবার বাদে প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার টাকার জিনিস বিক্রি হয়। আর প্রতি শুক্রবার দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকার জিনিস বিক্রি হয়। এ হিসাবে প্রতি মাসে নিলামের ডাক থেকে ২০ লাখ টাকার ওপরে পাওয়া যাচ্ছে। আর বছরে নিলামের এ হিসাব দাঁড়ায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার মতো। এভাবে গত ৯ বছরে নিলাম থেকে পাওয়ার কথা ২২ কোটি টাকার ওপরে।

শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, মসজিদের দানসিন্দুক থেকে যে স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়, তা সর্বশেষ ২০২০ সালে এসবের একবার নিলাম হয়েছিল। তখন এ থেকে আরও প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা পাওয়া যায়। তবে এর পর থেকে পাওয়া স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে জমা আছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত ১৫ বার সিন্দুক খোলা হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, ট্রেজারিতে জমা থাকা ১৫ বারের স্বর্ণালংকার আর বৈদেশিক মুদ্রা মিলে আরও সাত থেকে আট কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। দানসিন্দুকের ৭৫ কোটি টাকার ওপরে, নিলামের প্রায় ২২ কোটি টাকা, চার বছর আগের স্বর্ণালংকারের নিলাম থেকে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা, ট্রেজারিতে জমা থাকা গত চার বছরের স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে থাকা প্রায় সাত থেকে আট কোটি টাকা মিলিয়ে ১০০ কোটি টাকার বেশি হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৯ সাল থেকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পাগলা মসজিদের কার্যক্রম চলে আসছে। সেই থেকে পদাধিকার বলে কিশোরগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকেরা পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

মসজিদ কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে পাগলা মসজিদের আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। এ মসজিদের টাকা দুটি ব্যাংকে আছে। মসজিদের আয় দিয়ে এই কমপ্লেক্সে অবস্থিত নুরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসার ১৩০ এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীর বিনা মূল্যে পড়াশোনা ও ভরণপোষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এখানে দায়িত্বরত কর্মীদের বেতনও মসজিদের আয় থেকে দেওয়া হয়।

মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, দানের অর্থ দিয়ে মসজিদের পাঁচ একর জায়গায় একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এতে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। মূল মসজিদটি ছয়তলাবিশিষ্ট হবে। প্রতি তলায় একসঙ্গে পাঁচ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। পাশাপাশি আরও পাঁচ হাজার নারী মুসল্লির জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা থাকবে। সব মিলিয়ে ৪০ হাজার লোক যাতে একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া থাকবে একাডেমিক ভবন ও অতিথিশালা। অতিথিশালায় রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবস্থানের ব্যবস্থা থাকবে।

জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি ফৌজিয়া খান বলেন, পাগলা মসজিদ ও ইসলামি কমপ্লেক্সের খরচ চালিয়ে দানের বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। জমা টাকার লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তাও করা হয়ে থাকে।

কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মসজিদটি গড়ে ওঠে। কথিত আছে, খাস নিয়তে এ মসজিদে দান করলে মানুষের মনের আশা পূরণ হয়। সে জন্য দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে এসে দান করে থাকেন।

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ। ছবি: প্রথম আলো

রাশিয়ার কুরস্কে যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় সেনারা ক্লান্ত, ট্রাম্পের জন্য অপেক্ষায় তাঁরা

আবহটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, হতাশাজনক, এমনকি বিক্ষুব্ধও।

রাশিয়ার সীমান্তবর্তী কুরস্ক অঞ্চলে যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় এক সেনা বলেন, পরিস্থিতি প্রতিদিনই খারাপ হচ্ছে।

কুরস্কে অবস্থানরত আরেক ইউক্রেনীয় সেনা বলেন, এখানে লড়াইয়ের কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁরা যেখানে লড়ছেন, সেই ভূখণ্ড ইউক্রেনের নয়, রাশিয়ার।

প্রায় চার মাস আগে সীমান্তবর্তী রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে ইউক্রেন। তারা কুরস্কের একটা অংশ দখল করে নেয়।

কুরস্কের দখল করা এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইউক্রেনীয় সেনারা এখন লড়ছেন। যদিও সম্প্রতি তাঁরা কুরস্কের ৪০ শতাংশ এলাকার দখল হারিয়েছেন বলে খবর বের হয়েছে।

কুরস্কে যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় সেনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি। তাঁরা যে বার্তা বিবিসিকে দিয়েছেন, তাতে হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে।

ইউক্রেনীয় সেনারা জানান, তাঁরা ঠিক কী উদ্দেশ্যে কুরস্কে লড়ছেন, তা বুঝতে পারছেন না।

ইউক্রেনীয় সেনারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তাঁরা এই লড়াইয়ে হেরে যেতে পারেন।

কুরস্কে কর্মরত বেশ কয়েকজন ইউক্রেনীয় সেনার সঙ্গে টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় বিবিসির। তাঁদের একজন অবশ্য সম্প্রতি কুরস্ক থেকে দেশে চলে গেছেন।

ইউক্রেনীয় এই সেনারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাই প্রতিবেদনে তাঁদের ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে বিবিসি।

কুরস্কে যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় সেনারা অঞ্চলটিতে বিরাজমান ভয়ানক প্রতিকূল আবহাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন পরিস্থিতি তো আছেই, পাশাপাশি তাঁরা প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গেও লড়ছেন।

ইউক্রেনীয় সেনাদের হঠাতে রাশিয়া কুরস্কে ক্রমাগত বোমাবর্ষণ করে চলছে। ইউক্রেনীয় সেনারা বলেন, রাশিয়া ভয়ংকর তিন হাজার কেজির গ্লাইড বোমাও ব্যবহার করছে কুরস্কে।

রাশিয়ার ক্রমাগত বোমাবর্ষণের কারণে ইউক্রেনীয় সেনারা ঘুমাতে পর্যন্ত পারছেন না।

রাশিয়ার হামলার মুখে ইউক্রেনীয় সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁরা স্বীকার করেন, রুশ বাহিনী ধীরে ধীরে ইউক্রেনীয় সেনাদের দখল করা অঞ্চল পুনরুদ্ধার করছে।

গত ২৬ নভেম্বর পাভলো (ছদ্মনাম) নামের এক ইউক্রেনীয় সেনা বিবিসিকে বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলেই তাঁর ধারণা। শুধু তা-ই নয়, ইউক্রেনীয় সেনাদের কুরস্কের দখল করা এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারানোটা সময়ের ব্যাপারমাত্র।

পাভলো ইউক্রেনীয় সেনাদের ভীষণ ক্লান্তির কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউক্রেনীয় সেনাদের পালাবদল করে দায়িত্বপালনের সুযোগ কুরস্কে কম। এর ফলে বিরামহীন ক্লান্তি ইউক্রেনীয় সেনাদের চেপে ধরেছে।

পাভলো জানান, কুরস্কে নতুন যেসব সেনা ইউনিট ইউক্রেন মোতায়েন করছে, তা মূলত মাঝবয়সী পুরুষদের নিয়ে গঠিত। এই ইউনিটগুলো অন্য কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি কুরস্কে পাঠানো হয়েছে। কুরস্কে এসেই তাঁদের লড়তে হচ্ছে। এর ফলে ইউক্রেনীয় সেনাদের বিশ্রামের সুযোগ নেই।

কমান্ডিং অফিসার, তাঁদের আদেশ-নির্দেশ, যুদ্ধ সরঞ্জামসহ অন্যান্য বিষয়ের অভাব নিয়ে ইউক্রেনীয় সেনাদের নানা অভিযোগ আছে। কিন্তু এসব অভাব-অভিযোগের কথা শোনা হচ্ছে না বলে জানান ইউক্রেনীয় সেনারা।

কুরস্কে থাকা ইউক্রেনীয় সেনারা বিবিসিকে বলেন, তাঁরা খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের (রাশিয়া) দিক থেকে প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। অন্যদিকে সামনে যে কোনো আশা আছে, তেমনটাও দেখা যাচ্ছে না।

ইউক্রেনীয় সেনাদের কাছ থেকে বিবিসি যে বার্তা পেয়েছে, তাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন, হতাশার চিত্র মেলে। লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইউক্রেনীয় সেনাদের মধ্যে প্রেরণার অভাব থাকার বিষয়টি এসব বার্তায় ফুটে ওঠে।

কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, কুরস্কে কিয়েভের অভিযানের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ইউক্রেনের পূর্ব দিক থেকে রুশ সেনাদের সরে যেতে বাধ্য করা। কিন্তু এই পরিকল্পনা আদৌ কাজ করছে কি না, তা নিয়ে ইউক্রেনীয় সেনাদের মধ্যে সন্দেহ আছে।

ইউক্রেনীয় সেনারা বলেন, এখন কিয়েভের নির্দেশ হলো, রুশ ভূখণ্ডের এই ছোট অংশটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখা।

গত ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ট্রাম্প জয়ী হন। তিনি নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী বর্তমান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে হারান।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের নীতি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তিনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই যুদ্ধ থামাবেন তিনি।

আগামী ২০ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন ট্রাম্প। ইউক্রেনীয় সেনা পাভলো বলেন, এখন তাঁদের সামনে প্রধান কাজ হলো ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণ এবং নতুন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত কুরস্কের সর্বাধিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। পরে কিছুর বিনিময়ে তা ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু কেউ জানেন না, সেটা কী।

গত মাসের (নভেম্বর) শেষ দিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইঙ্গিত দেন, মার্কিন প্রশাসনে পরিবর্তনের বিষয়টি এখন যুদ্ধের উভয় পক্ষের (কিয়েভ ও মস্কো) মাথায় রয়েছে। তিনি নিশ্চিত যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে ইউক্রেনকে রাশিয়ার অঞ্চল (কুরস্ক) থেকে হটিয়ে দিতে চান।

কুরস্কে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পাল্টা আক্রমণ ব্যর্থ করে দিতে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সম্প্রতি একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পদক্ষেপ নিয়েছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে পশ্চিমাদের সরবরাহ করা দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাতে তারা কিয়েভকে অনুমতি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছ থেকে এই অনুমতি পেয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে হামলা শুরু করে ইউক্রেন।

কিন্তু কিয়েভের এমন হামলা যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় সেনাদের মনোবল বাড়াতে খুব বেশি কাজে দিচ্ছে বলে মনে হয় না।

কুরস্কে যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় সেনা পাভলো বলছিলেন, তাঁরা কেউ ঠান্ডা পরিখার মধ্যে বসে এই প্রার্থনা করছেন না যে ইউক্রেন থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে এসে যুদ্ধে তাঁদের সহায়তা করবে। কেননা, তাঁরা কুরস্কে অবস্থান করে লড়াই করছেন। আর ইউক্রেন থেকে ছোড়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে গিয়ে রাশিয়ার অন্যত্র পড়ে।

ইউক্রেনীয় সেনারা জানান, তাঁরা ঠিক কী উদ্দেশ্যে কুরস্কে লড়ছেন, তা বুঝতে পারছেন না
ইউক্রেনীয় সেনারা জানান, তাঁরা ঠিক কী উদ্দেশ্যে কুরস্কে লড়ছেন, তা বুঝতে পারছেন না। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইয়াজুজ–মাজুজের কাহিনি by ফেরদৌস ফয়সাল

মদিনার ইহুদিরা মক্কার কুরাইশদের নবীজি (সা.)-এর কাছে কিছু প্রশ্ন করার পরামর্শ দিয়েছিল। প্রশ্নগুলো ছিল আসহাবে কাহাফের পরিচয় ও ঘটনা, রুহের প্রকৃতি ও জুলকারনাইনের ঘটনা। সুরা কাহাফে এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইয়াজুজ-মাজুজ অর্থ দ্রুতগামী। ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে বের হয়ে অতি দ্রুত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। কারও কারও মতে, আরবি ‘মওজ’ শব্দ থেকে ‘ইয়াজুজ-মাজুজ’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ ‘তরঙ্গ’ বা ‘ঢেউ’। তাদের মতে, ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে বের হবে অজস্র সংখ্যায়, এরপর ঢেউয়ের মতো ছুটতে ছুটতে সারা পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করবে। এ জন্যই তাদের এই নামকরণ।

ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় আদম (আ.)-এর বংশধর। শাসক জুলকারনাইন ইয়াজুজ-মাজুজদের প্রাচীর দিয়ে আটকে রেখেছেন (সুরা কাহাফ, আয়াত ৯২-৯৭)। কিয়ামতের আগে হজরত ঈসা (আ.)-এর পৃথিবীতে পুনরাগমনের সময় তারা ওই প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং সামনে যা পাবে, সব ভক্ষণ করবে।

কোরআনে আছে, ‘সে (জুলকারনাইন) বলল, আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তা-ই যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে এক মজবুত প্রাচীর গড়ে দেব। তোমরা আমার কাছে লোহার তাল নিয়ে আসো। তারপর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা পূর্ণ হয়ে যখন লোহার ঢিবি দুটি পাহাড়ের সমান হলো, তখন জুলকারনাইন বলল, তোমরা হাপরে দম দিতে থাকো। যখন তা আগুনের মতো গরম হলো, তখন সে বলল, তোমরা গলানো তামা নিয়ে আসো, আমি তা ওর ওপর ঢেলে দেব। এরপর ইয়াজুজ-মাজুজ তা পার হতে পারল না বা ভেদ করতেও পারল না। জুলকারনাইন বলল, এ আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাদের চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবেন, আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য। সেদিন আমি (আল্লাহ) তাদের দলে দলে তরঙ্গের আকারে ছেড়ে দেব, আর শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে। তারপর আমি তাদের সবাইকে একত্র করব।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৯৩-৯৯)

ইয়াজুজ-মাজুজ নদীর পানি খেয়ে শেষ করে ফেলবে। তাদের সঙ্গে কেউ লড়াই করে পারবে না। একসময় তারা বায়তুল মুকাদ্দাসের এক পাহাড়ে গিয়ে বলবে, দুনিয়ায় যারা ছিল, তাদের হত্যা করেছি। এখন আকাশে যারা আছে, তাদের হত্যা করব।

তারা আকাশের দিকে তির নিক্ষেপ করবে। এ সময় ঈসা (আ.) তাদের জন্য দোয়া করবেন। এতে ইয়াজুজ-মাজুজের কাঁধের দিক থেকে একপ্রকার পোকা সৃষ্টি করে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন। পৃথিবীজুড়ে তাদের লাশ পড়ে থাকবে। আল্লাহ নখযুক্ত পাখি পাঠিয়ে লাশগুলোকে সরিয়ে নেবেন। (বুখারি ও মুসলিম)

কোরআনে ইয়াজুজ-মাজুজের বিস্তারিত পরিচয় দেওয়া হয়নি। বাইবেলের আদি পুস্তকে (১০ম অধ্যায়ে) তাদের হজরত নুহ (আ.)-এর বংশধর বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ অস্বাভাবিক বেঁটে, কেউ আবার অস্বাভাবিক লম্বা।

আল্লাহ বলেন, ‘চলতে চলতে সে যখন পাহাড়ের প্রাচীরের মাঝখানে পৌঁছাল, তখন সেখানে এক সম্প্রদায়কে পেল, যারা তার কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বলল, হে জুলকারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্য কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন।’

বাদশাহ জুলকারনাইনের যুগে তারা বিশৃঙ্খলা করেছিল। তাদের অনিষ্ট থেকে মানুষকে বাঁচাতে জুলকারনাইন তাদের যাতায়াতের পথে বৃহৎ প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। জুলকারনাইন সারা বিশ্ব ভ্রমণ ও শাসন করতেন। এ কারণে তিনি পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবে আলোচিত হয়েছিলেন। আরেকটি কারণ হলো, তিনি ইয়াজুজ-মাজুজের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন মানুষকে।

প্রতীকী ছবি

আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলা, ঢাকার কড়া প্রতিবাদ

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় গতকাল সোমবার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশন প্রাঙ্গণে ঢুকে হামলা চালানো হয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু সংঘর্ষ সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠনের সমর্থকেরা এ হামলা চালান। এদিন মুম্বাইয়ের বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কাছাকাছি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আয়োজনে কয়েক শ লোক বিক্ষোভ করেছেন। হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি হলো ভিএইচপির সহযোগী সংগঠন।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগরতলার ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছে। তারা বলেছে, কূটনৈতিক ও কনস্যুলার সম্পত্তি কোনো অবস্থাতেই লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং দেশের (ভারতের)

অন্যান্য স্থানে তাদের উপ ও সহকারী হাইকমিশনের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে।

তবে আগরতলার হামলার বিষয়টি পূর্বপরিকল্পিত উল্লেখ করে নিন্দা ও কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলার ঘটনা বাংলাদেশ সরকারকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। ঘটনাপ্রবাহ দেখে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত। এ ঘটনা কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের লঙ্ঘন। এ ছাড়া ওই হামলার ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল রাতে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

কয়েক দিন ধরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। গত রোববার ফেনীর সীমান্তবর্তী পরশুরামের বিলোনিয়া স্থলবন্দরের ভারত অংশে বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। সনাতনী হিন্দু সমাজের ব্যানারে কিছু ভারতীয় ওই বিক্ষোভ করেন। এ ঘটনায় গতকাল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এর আগে ২৮ নভেম্বর বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ নামের একটি সংগঠন কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সামনে সহিংস বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও প্রধান উপদেষ্টার কুশপুত্তলিকা পোড়ায়। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রতিবাদ জানিয়েছে। আর গতকাল পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বাংলাদেশে শান্তিসেনা পাঠাতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আরজি জানান।

৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ওই দিনই শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। ভারতের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চলছে। এরই মধ্যে গতকাল ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছে বাংলাদেশ। সেখানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি গোষ্ঠী।
আগরতলার সহকারী হাইকমিশনে হামলা

কলকাতা থেকে প্রথম আলোর সংবাদদাতা জানান, আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হিন্দু সংঘর্ষ সমিতিসহ কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হামলা চালায়। তারা সহকারী হাইকমিশনের প্রাঙ্গণে ঢুকে বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে তাতে আগুন দেয় এবং সেখানে ভাঙচুর করা হয়।

কয়েক দিন ধরে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন আগরতলা এবং সংলগ্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল করছে। গতকাল দুপুরে তারা হঠাৎ সহকারী হাইকমিশন প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে বলে ওই সাংবাদিক জানান।

ত্রিপুরার পর্যটনমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বর্ণনা করে বলেন, ‘এটাও মনে রাখতে হবে, এটা কিন্তু দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রকাশ।’

আগরতলা থেকে কূটনৈতিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে গতকাল বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। সংঘ পরিবারভুক্ত বিভিন্ন সংগঠন, ভিএইচপির হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি, বজরং দল ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল সকাল থেকে সহকারী হাইকমিশনের ৫০০ মিটার অদূরে এই বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করা হয়। বেলা একটার দিকে বিক্ষোভ সমাবেশের একাংশ হাইকমিশনের দিকে এগোতে থাকে। একপর্যায়ে তারা বাধা পেরিয়ে হাইকমিশনের মূল ফটকের সামনে পৌঁছে বিক্ষোভ করতে থাকে।

সূত্র জানায়, বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি দিতে মিশনে প্রবেশ করে। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে মিশনের মূল ফটকের বাইরে থাকা বিক্ষোভকারীরা জোর করে মিশন চত্বরে প্রবেশ করে। এরপর তারা ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড থেকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নামিয়ে পদদলিত করে এবং ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে পাশাপাশি ফুলের টব ভেঙে ফেলে। এ সময় সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য উপস্থিত থাকলেও তাদের কোনো সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়নি।

স্থানীয় পশ্চিম ত্রিপুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চিরঞ্জীব চক্রবর্তী ভারতের সংবাদমাধ্যম পিটিআইকে বলেন, হিন্দু সংঘর্ষ সমিতির ছয়জনের একটি প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি দিতে মিশনে প্রবেশ করে। আর কিছু বিক্ষোভকারী মিশনের ভেতরে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন।
আগরতলার হামলা পূর্বপরিকল্পিত: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের প্রাঙ্গণে গতকাল হিন্দু সংঘর্ষ সমিতির বিক্ষোভকারীদের একটি বড় দলের হিংসাত্মক বিক্ষোভ ও হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে ক্ষুব্ধ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রাপ্ত ঘটনাপ্রবাহ চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে, বিক্ষোভকারীদের পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের প্রধান ফটক ভেঙে প্রাঙ্গণে আগ্রাসনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতিতে তারা পতাকার খুঁটি ভাঙচুর করে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা করে এবং সহকারী হাইকমিশনের ভেতরে সম্পত্তির ক্ষতি করে। পরিতাপের বিষয়, প্রাঙ্গণ রক্ষার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা শুরু থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ছিলেন না।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সহকারী হাইকমিশনের সব সদস্য প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বাংলাদেশ সরকার জোর দিয়ে বলতে চায়, বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক মিশনের ওপর এই জঘন্য হামলা এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অপবিত্রতা একটি নৈমিত্তিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে। গত ২৮ নভেম্বর কলকাতায়ও একই ধরনের হিংসাত্মক বিক্ষোভ হয়েছে। আগরতলায় এই বিশেষ কাজটি কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের লঙ্ঘন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কূটনৈতিক মিশনগুলোকে যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করা স্বাগতিক দেশের সরকারের দায়িত্ব। তাই বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে এ ঘটনা মোকাবিলায় অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে এবং ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ, কূটনীতিক ও অকূটনৈতিক সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা জোরদার করতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
মুম্বাই মিশনের কাছে বিক্ষোভ

ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কাছে গতকাল বিকেলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কয়েক শ বিক্ষোভকারী বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে বাংলাদেশ মিশনের এক শ থেকে দেড় শ গজের মধ্যে এসে অবস্থান নেন। তাঁরা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং ইসকন সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিবাদ জানিয়ে নানা স্লোগান দেন।

মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের দূতাবাসপ্রধান মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, মুম্বাইয়ে এদিন শ তিনেক বিক্ষোভকারী আজাদ ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন। পরে তাঁরা সেখান থেকে সরে বাংলাদেশ মিশনের কাছে গিয়ে স্লোগান দেন ও পথসভা করেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আয়োজনে ওই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও বিশিষ্ট শিল্পপতি লোধা মঙ্গল প্রভাত।

জানা গেছে, সাধারণত বিদেশি কোনো মিশনের আশপাশে কোনো সমাবেশ হলে তা ওই দেশের মিশনকে স্বাগতিক দেশ জানিয়ে দেয়। কিন্তু মুম্বাইয়ের উপহাইকমিশন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ওই বিক্ষোভ সম্পর্কে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে প্রথম তথ্য পেয়েছিল। তবে স্থানীয় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের মিশনের কাছে পথ আটকে দেয়।

ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন প্রাঙ্গণে সোমবার বিক্ষোভ করেন হিন্দু সংঘর্ষ সমিতির সমর্থকেরা ছবি: সংগৃহীত
ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন প্রাঙ্গণে সোমবার বিক্ষোভ করেন হিন্দু সংঘর্ষ সমিতির সমর্থকেরা ছবি: সংগৃহীত

কিওদো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকার: যুদ্ধ জয়ের আশা ছেড়ে দেওয়ার কথা জানালেন জেলেনস্কি by মনজুরুল হক

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, তাঁর দেশ রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি চায়। জাপানের বার্তা সংস্থা কিওদো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হারানো ভূখণ্ড ফিরে পাওয়া তাঁর দেশের জন্য কঠিন হবে বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।

আজ সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় দুপুরের পর জেলেনস্কির সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়। সাক্ষাৎকার নিতে ইউক্রেনের রাজধানীতে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়েছিলেন বার্তা সংস্থা কিওদোর সাংবাদিক গেনইচিরো কোদামা। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্যপদ লাভ করার পর আলোচনার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে ভূখণ্ড ফিরে পেতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবেন তিনি।

পূর্বাঞ্চলে রুশ বাহিনীর দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য পর্যাপ্ত ছিল না। ইউক্রেন এখন ন্যাটোর সামরিক জোটে যোগ দিয়ে সেই চেষ্টা করে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীর সেই শক্তির ঘাটতি রয়েছে এবং সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের পথ আমাদের অবশ্যই খুঁজে দেখতে হবে।’

সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হওয়ার ঠিক পরপর অনেকেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সরাসরি স্বীকারোক্তিতে কিছুটা অবাক হয়েছেন। এ নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে, কেন তিনি জাপানের বার্তা সংস্থাকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদানের জন্য বেছে নিলেন? কেনই–বা কিওদো নিউজ জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার নিতে কিয়েভে নিজেদের সাংবাদিক দল পাঠাল।

ইউক্রেনের হঠাৎ করে এ অবস্থান বদল সম্পর্কে বলা যায়, সম্প্রতি বিশ্বরাজনীতির কিছু রদবদল ও যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে দেখা দেওয়া হতাশা জেলেনস্কিকে অবশ্যই প্রভাবিত করে থাকবে। এক মাস পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। তিনি ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি টানতে নিজের ইচ্ছার কথা শুরু থেকেই বলে আসছেন। ফলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট এখন জো বাইডেনের শেষ মুহূর্তে দিয়ে যাওয়া ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আসা সত্ত্বেও বুঝতে পারছেন তাঁর দেশের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অনেকটা আত্মঘাতী আকার নিতে পারে।

সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য জেলেনস্কি এমন একটি মাধ্যমের সন্ধান করছিলেন, যেটি পশ্চিমা আগ্রাসী সাংবাদিকদের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় অবস্থান থেকে তাঁর কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইবে। বলা যায়, কিওদো নিউজ জেলেনস্কির সামনে সেই সুযোগ খুলে দিয়েছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি যুদ্ধ নিয়ে ইউক্রেনে চালানো বেশ কয়েকটি জনমত জরিপের ফলাফলও রয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর প্রকাশিত গ্যালোপের জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনের জনমত এখন ক্রমেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে হেলে পড়ছে। নাগরিক জীবনে মৃত্যু আরও বেশি প্রকট আকার নিয়ে উপস্থিত হতে থাকায় যুদ্ধ ছাড়াও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রেসিডেন্ট নিজেই হয়তো শঙ্কা বোধ করছেন।

গ্যালোপের জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ইউক্রেনের ৫২ শতাংশ নাগরিক এখন যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের সমাপ্তি দেখতে চান; এমনকি রাশিয়ার দখল করে নেওয়া ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হলেও। অন্যদিকে মাত্র ৩৮ শতাংশ নাগরিক ভূখণ্ড ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। ২০২২ সালে চালানো জরিপে এই হার ছিল ৭৩ শতাংশ।

অন্য যে প্রশ্ন জাপানের কিছু কিছু সূত্র থেকে তুলে ধরা হচ্ছে, তা হলো, কিওদো নিউজ কেন এ সময়ে জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে এগিয়ে গিয়েছে। জাপানের বেলায় প্রশ্নের উত্তর অবশ্য অনেকটাই সহজ। উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাশিয়ার পক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা নিয়ে জাপান অনেকটাই উদ্বিগ্ন। ঘরের পাশের শত্রুদেশ সেখানে কতটা পারদর্শিতা দেখাচ্ছে এবং যুদ্ধের মোড় তা ঘুরিয়ে দিচ্ছে কি না, জাপান সেটা পরিষ্কারভাবে জানতে চায়।

পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম উত্তর কোরিয়ার সেনাদলের ব্যাপকভাবে হতাহত হওয়ার খবর প্রচার করে গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিক কী হচ্ছে, নিজের কৌশলগত অবস্থানের কারণেই জাপানের তা জানা দরকার।

কিওদোর প্রচারিত সাক্ষাৎকারের বর্ণনায় বড় এক অংশজুড়ে আছে উত্তর কোরিয়ার সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি। কিওদোর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জেলেনস্কি যেমন শুরুতেই বলেছেন, রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ করার জন্য উত্তর কোরিয়ার যে সৈন্যদের পাঠানো হয়েছে, তাদের মধ্যে হতাহতের হার অনেক বেশি।

উত্তর কোরিয়ার ঠিক কতজন সৈন্যকে যুদ্ধ করার জন্য রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা বলতে পারেননি জেলেনস্কি। তবে তিনি বলেছেন, সেখানে ১২ হাজারের মতো উত্তর কোরীয় সেনা থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে কতজন যুদ্ধে নিহত কিংবা আহত হয়েছে, সেই সংখ্যা তিনি প্রকাশ করেননি। ফলে ধরে নেওয়া যায় উত্তর কোরিয়ার সেনাদের যুদ্ধে জড়িত হওয়া নিয়ে খুব বেশি অবগত নয় ইউক্রেন।

তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া থেকে আরও বেশি সৈন্য নিয়ে আসার জন্য তাদের সঙ্গে রুশ বাহিনী ভালো আচরণ করছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনী যুদ্ধে জড়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ সম্পর্কে ভালো প্রশিক্ষণ হয়তো লাভ করতে পারবে। তবে তারা আগামীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তা হলো ড্রোন, অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধে ব্যবহারের অন্যান্য অস্ত্র সম্পর্কে এরা আরও বেশি অবগত হয়ে উঠলে কেবল এশিয়া নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউরোপ যাওয়ার পথে ১৪ দিন অনাহারে, মরদেহ সাগরে ফেলা

২৬ বছর বয়সী এক তরুণী হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই একদিন নিঃশব্দে বাড়ি ছাড়েন। স্বপ্নের ফ্রান্সের মায়োতি দ্বীপে পৌঁছানোর জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেন। তিনি স্থানীয়ভাবে একটি বিউটি পারলার চালাতেন এবং তার ব্যবসা ভালোই চলছিল। তবে, কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা বুঝে উঠতে পারছে না তার পরিবার।

একদিন ফাতি পরিবারের কাউকেই কিছু না জানিয়ে মায়োতি দ্বীপের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর তার পরিবারের কাছে মৃত্যুর খবর আসে সেই তরুণীর, যা পরিবারের জন্য এক তীব্র চাপা শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনাটি ঘটেছে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর উপকণ্ঠ ইয়াকশিদ এলাকার ফাতি হুসেইন নামে এক তরুণীর।

ফাতি ইউরোপ যাওয়ার জন্য এমন একটি বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়েছিলেন, যা জীবনহানির ঝুঁকি বহন করে। তিনি ভারতের মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মায়োতি দ্বীপে পৌঁছানোর জন্য একটি নৌকায় উঠেছিলেন। এই যাত্রায় তিনি অন্যান্য অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন আরও অনেকেই, যারা একই উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন।

কিন্তু বিপজ্জনক যাত্রায়, পাচারকারীরা একদিন নৌকা থেকে পালিয়ে যায় ফাতি এবং অন্যদের রেখে। তারপর তারা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সমুদ্রে ভাসতে থাকে। তাদের খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনাহারে পড়ে অনেকেই মারা যান, তাদের মধ্যে ছিল ফাতি।

ফাতির বোন সামিরা জানান, যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের কাছ থেকেই আমরা ফাতির মৃত্যুর খবর পাই। তারা জানান, ফাতি অনাহারে থাকতে থাকতে একটা সময় মারা যায়। মৃত্যুর আগে তার স্মৃতি বিভ্রম হয়েছিল এবং মৃত্যুর পর তার মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

এ ঘটনার সময় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ দুটি ছোট নৌকায় করে যাত্রা করছিলেন। কিন্তু, বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় ২৪ জনের মৃত্যু হয় এবং ৪৮ জনকে উদ্ধার করা হয়। এই সমস্ত মানুষ মায়োতি দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন, যা মাদাগাস্কারের উত্তর-পশ্চিমে ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ফাতি ১ নভেম্বর মোগাদিসু থেকে প্রথমে কেনিয়ার মোম্বাসা শহরে পৌঁছান এবং পরে সেখান থেকে নৌকায় মায়োতির দিকে রওনা হন। তার পরিবারের কেউ জানতেন না যে তিনি ইউরোপ যাওয়ার জন্য এমন পরিকল্পনা করছেন।

ছোট বোন সামিরা বলেন, ফাতি আমাদের কাছে বলেছিল যে সে ব্যবসা থেকে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ইউরোপ যাচ্ছিল, তবে সে সাগর পছন্দ করত না। তার এমন সিদ্ধান্ত মানতে পারছি না।

জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, যাত্রা শুরু করার সময় তারা বড় নৌকায় ছিলেন, তবে মাঝপথে পাচারকারীরা তাদের ছোট নৌকায় তোলেন এবং বলেছিলেন, ‘তিন ঘণ্টার মধ্যে মায়োতি পৌঁছাবেন।’ কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, পাচারকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের মাঝপথে ফেলে চলে গিয়েছিল, কারণ তাদের সবার কাছ থেকেই যাত্রার খরচ নেওয়া হয়েছিল।

সামিরা জানান, আটকে পড়ার পর একে একে ১৪ দিন সাগরে ভাসতে থাকা অবস্থায় কেউ তাদের উদ্ধার করেনি। অবশেষে ফাতির মৃত্যু হয়। তিনি আরও বলেন, তারা যে নৌকায় উঠেছিল, তা ছিল স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কাওসা’ নামে। নৌকা দুটি অত্যন্ত ছোট এবং দুর্গম ছিল।

এ ধরনের বিপজ্জনক পথ দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার প্রচেষ্টা দিন দিন বেড়ে চলেছে, বিশেষ করে মায়োতি দ্বীপে যাওয়ার চেষ্টা। এতে বছরে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন পথ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানায়, এই পথটি দিন দিন আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালের প্রথম দিক থেকে এই পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় আরও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে বিভিন্ন পাচারকারী চক্র ফেসবুক ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউরোপ যাওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। এসব বিজ্ঞাপনে নানা ধরনের প্রলুব্ধকর কথা বলে, যা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করে এবং তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ ধরনের বিপজ্জনক যাত্রায় সায় দেয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হলেও এর ফলস্বরূপ তারা শুধু হতাশ ও শোকসন্তপ্ত হয় না, বরং জীবনও হারায়। পরিবারগুলোর অভিযোগ, পাচারকারীরা বড় নৌকা দেখিয়ে তাদের ছোট নৌকায় উঠায়, যার ফলে এ ধরনের বিপদে পড়তে হচ্ছে।

ফাতির মতো অসংখ্য মানুষ অভিবাসনের এই বিপজ্জনক পথ বেছে নেয়। এ ঘটনা বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে জীবনহানির ঝুঁকি প্রচণ্ড।

সূত্র : বিবিসি

সঞ্চিত সব অর্থ দিয়েও ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি ফাতি হুসেইনের। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
সঞ্চিত সব অর্থ দিয়েও ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি ফাতি হুসেইনের। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে



যৌনকর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে আইন পাস বেলজিয়ামে

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বেলজিয়ামে যৌনকর্মীদের জন্য নতুন একটি আইন পাস করা হয়েছে।

এই আইনে তাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা, অবসরভাতা এবং অসুস্থতার জন্য ছুটি নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, যৌনকর্মীরাও এখন অন্যান্য চাকরির মতো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। খবর বিবিসি।

সোমবার (০২ ডিসেম্বর) বেলজিয়াম ভিত্তিক দ্য ব্রাসেল’স টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেশটির সরকার জানায়, এই আইনের মাধ্যমে যৌনকর্মীরা কর্মক্ষেত্রে আর বৈষম্যের শিকার হবেন না এবং তারা সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকবেন।

নতুন আইনে যৌনকর্মীদের দেওয়া হবে একটি কর্মসংস্থানের প্রশংসাপত্র, যার মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্যবিমা, নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা পাবে। এছাড়া, তারা কাজের সময় যে কোনো অস্বস্তি বা বিপদে পড়লে ‘প্যানিক বাটন’ ব্যবহার করে সহায়তা চাইতে পারবেন। যৌনকর্মীদেরও অধিকার থাকবে খদ্দেরকে ‘না’ বলার।

এই আইনের পেছনে অনেকটা ইতিহাসও রয়েছে। করোনা মহামারির সময় যৌনকর্মীরা তাদের জীবিকা নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছিলেন, যার ফলে তারা আন্দোলন শুরু করেন। যদিও আইনের প্রস্তাবের আগে কিছু সমালোচনা হয়েছিল, তবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এই আইনের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।

বিশ্বে অনেক দেশেই যৌনকর্মী কাজ করেন, তবে বেলজিয়াম প্রথম দেশ হিসেবে তাদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে যৌনকর্মীরা অবশেষে একটি সুরক্ষিত ও সম্মানজনক পরিবেশে কাজ করতে পারবেন।

বেলজিয়ামের যৌনকর্মীরাও এখন থেকে অন্যান্য চাকরির মতো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। ছবি : সংগৃহীত
বেলজিয়ামের যৌনকর্মীরাও এখন থেকে অন্যান্য চাকরির মতো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। ছবি : সংগৃহীত



বুদ্ধিমত্তায় আইনস্টাইন, হকিংকে টপকে গেল ১০ বছরের কৃষ অরোরা

বয়স মাত্র ১০ বছর। অথচ বুদ্ধিতে সে হারিয়ে দিয়েছে বিশ্বের তাবড় তাবড় লোকেদের। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই  বৃটিশ কিশোরের আইকিউ ১৬২, যা  আইনস্টাইন-হকিংয়ের থেকেও বেশি। আইনস্টাইন এবং স্টিফেন হকিংয়ের আইকিউ ১৬০। বিশ্বের সবথেকে বুদ্ধিমান ১ শতাংশ মানুষের মধ্যে উঠে এলো কৃষের নাম। এই বিস্ময় বালকের নাম কৃষ অরোরা। বর্তমানে সে বৃটেনের বাসিন্দা। মানব ক্যালকুলেটর বলা চলে তাকে। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই বিষয়টি নজরে আসে। টপাটপ অঙ্ক করতে পারে ওই খুদে। ওই বয়সেই দশমিকের অঙ্ক কষতে সময় লাগত মাত্র এক সেকেন্ড। বয়স যত বেড়েছে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বুদ্ধি।  কৃষ অঙ্কে ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। ১১টিরও বেশি পরীক্ষা দিয়েছে সে, সব পরীক্ষাই তার কাছে খুব সহজ বলে মনে হয়েছে। বয়স আন্দাজে প্রাথমিক স্কুলে পড়লেও, সেই পড়াশোনা খুবই ‘বোরিং’ লাগে তার কাছে। তাই সেপ্টেম্বর মাস থেকে সে কুইন এলিজাবেথ স্কুলে ভর্তি হতে চলেছে। পশ্চিম লন্ডনের বাসিন্দা কৃষ শুধু পড়াশোনার দিক থেকেই এগিয়ে নয়, দারুণ গানও গায় সে। পিয়ানো বাজানোতেও অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সে। ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকের ‘হল অব ফেমে’ও জায়গা পেয়েছে সে। আশ্চর্যের বিষয়, গান গাওয়া বা পিয়ানো বাজানোর জন্য ওর মিউজিক শিটের প্রয়োজন পড়ে না। একবার দেখলেই সবকিছু বইয়ের পাতার মতো মগজে গেঁথে যায়। কৃষের বাবা মা দুজনেই পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। অল্প বয়সেই ছেলের এমন প্রতিভা দেখে তারা দাবার প্রশিক্ষক রাখেন ছেলের জন্য। মাত্র চার মাস সময় লেগেছিল সেটা শিখতে। এরপর সেই দাবা প্রশিক্ষকই কৃষের কাছে আর জিততে পারেন না দাবা খেলায়। বাবা মায়ের আশা ছেলে বড় হয়ে একজন গণিতবিদ হবে । বর্তমানে কৃষ পড়ছে সেখানকার সেরা স্কুল কুইন এলিজাবেথে। কিন্তু তা নিয়ে তার বক্তব্য, এখন ক্লাসে শুধু যোগ আর গুণ শেখানো হয়।  তার চাই বড়দের অঙ্ক।

সূত্র : wionews

mzamin

আগরতলায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে হামলা: পতাকা ছিঁড়ে আগুন

ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা বাংলাদেশের পতাকা ছিঁড়ে অগ্নিসংযোগ করেছে। গতকাল দুপুরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া আরও কয়েকটি স্থানে ভারতীয়রা বিক্ষোভ করেছেন। তারা বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভ হয়েছে মুম্বই উপ-দূতাবাসের সামনেও। হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা সেখানে হামলা করছেন, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা স্ট্যান্ড থেকে নামিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি নামের একটি সংগঠনের সভা ছিল আগরতলার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের সামনে। সভা শেষে সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল হাইকমিশন কার্যালয়ের ভেতরে যায় স্মারকলিপি জমা দিতে। এসময় বাইরে থাকা কিছু হিন্দু যুবক হঠাৎ বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলে এবং আগুন দেন। পরে হাইকমিশন কার্যালয়ের কিছু সাইনবোর্ড ভাঙচুর করে তারা। ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে থাকলেও হামলা-ভাঙচুর ঠেকাতে পারেনি।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল গেরুয়া পতাকা, ইটপাটকেল ও লাঠিসোটা। তাদের জয়শ্রীরাম স্লোগান দিতে শোনা যায়। ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুঃখ প্রকাশ করেছে। তাদের এক্স হ্যান্ডেলে লেখা হয়, কোনো অবস্থাতেই কূটনৈতিক সম্পত্তিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা উচিত নয়।
এদিকে, ভারতের কোচবিহারেও বিক্ষোভ হয়েছে।  সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে বিক্ষোভ দেখায় সনাতনী হিন্দু মঞ্চ। সংগঠনটির সদস্যরা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া চ্যাংড়াবান্ধায় বিক্ষোভ মিছিলও করে। বিক্ষোভ হয়েছে ভারতের পেট্রাপোল সীমান্তেও। সেখানে সমাবেশ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে।

মুম্বইয়ে উপ-হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ: ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কাছে সোমবার বিকালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কয়েক শ’ বিক্ষোভকারী বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে বাংলাদেশ মিশনের প্রায় এক থেকে দেড় শ’ গজের মধ্যে অবস্থান নেন। তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং ইসকন সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিবাদ জানিয়ে নানা স্লোগান দেন। মুম্বইয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আয়োজনে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের রাজ্য সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও বিশিষ্ট শিল্পপতি লোধা মঙ্গল প্রভাত।

ফেনী সীমান্তে বিক্ষোভ: ওদিকে ফেনীর সীমান্তবর্তী পরশুরামের বিলোনিয়া স্থলবন্দরের ভারত অংশে বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। সনাতনী হিন্দু সমাজের ব্যানারে কিছু ভারতীয় নাগরিক রোববার বিকালে বিক্ষোভ করেন। সোমবার এ বিষয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবি-৪ ফেনী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রোববার রাত ১২টার দিকে বিলোনিয়া সীমান্তেও ওই বিক্ষোভের ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোববার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিলোনিয়া স্থলবন্দরের ওপারে ৫০ থেকে ৬০ জন ভারতীয় নাগরিক জড়ো হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। তারা ইসকনের পক্ষে এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য ও বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধের দাবিতে স্লোগান দেন। এ সময় ভারতের নো-ম্যানস ল্যান্ড অংশে ঢুকে বাংলাদেশের দিকে মাইক তাক করে উচ্চ শব্দে প্রায় আধা ঘণ্টা নানা স্লোগান দেন। পরে বিএসএফ সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেন।

বিজিবি’র মজুমদারহাট বিওপির কোম্পানি কমান্ডার সৈয়দ কামরুল আলম মজুমদার বলেন, ঘটনার পর বিলোনিয়া স্থলবন্দরে বিজিবি’র সদস্যরা অবস্থান নেন। বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডারকে ডেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

mzamin

দেশবাসী ড. ইউনূসকে আরও সক্রিয় দেখতে চায় by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

শেখ হাসিনাকে ফেলে দেয়ার জন্য জো বাইডেন নানা রকম নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছিলেন। এখন শুনছি নবনির্বাচিত ট্রাম্প শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাবেন। সেখানে ভারত সরকারেরও সহযোগিতা থাকবে। এসবের কোনো কিছুই ভালো না। আমাদের দেশ, আমাদের জনগণ কাকে ক্ষমতায় বসাবে আর কাকে বসাবে না সেটা ঠিক করবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি নয়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নয়। এসব খুবই বাজে কথা। পরাজিতরা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে- এটাই শাশ্বত সত্য। চাল ডাল লবণ তেল প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া...

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। মাসটি মুক্তিযুদ্ধের বড় বেশি স্মরণীয় মাস। ৩০শে নভেম্বর ’৭১ নাগরপুর থানা আক্রমণ করেছিলাম। সারা মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনী কখনো কোথাও অত শক্তি প্রয়োগ করেনি। প্রায় পাঁচ হাজার যোদ্ধার ১৫টা কোম্পানি নিয়ে নাগরপুর থানা আক্রমণ করা হয়েছিল। আমি ছিলাম পূর্বদিকে, উত্তরে ছিল হুমায়ুন বাঙ্গাল, আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি, রবিউল আলম গেরিলা, মোস্তফা, সবুর খান, মকবুল হোসেন খোকা, সাইদুর, ফজলু শামসুল হক দক্ষিণেও চেপে ধরেছিল। শুধু খোলা ছিল পশ্চিম দিক। নাগরপুর থানা মাটির নিচ দিয়ে সব জায়গায় সীমানা বাঙ্কার করা হয়েছিল। তাই আমাদের প্রথম আক্রমণে পাকিস্তান হানাদাররা থানা ছেড়ে সামান্য একটু পেছনে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হয়েছিল হনুমান কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুনকে নিয়ে। সে তার প্রায় ৪০০ যোদ্ধা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা কোনো দিশা না পেয়ে আবার এসে থানার বাঙ্কারে লুকায়। সারাদিন যুদ্ধ চলে। কমান্ডার আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি, বীরপ্রতীক, হনুমান কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বাঙ্গাল এবং একেবারে আমার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে চর পাকুল্লার শামসুল হক সারাদিন পড়ে থাকে। এ ছাড়া আরও ৬-৭ জন আহত হয়। সেই সময় কেবলই ভারত থেকে ফিরে আসা কাদেরিয়া বাহিনীর স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. শাহজাদা চৌধুরী কেদারপুরে অবস্থান করছিল। যার কারণে নাগরপুর যুদ্ধে আহত কেউ মারা যায়নি, শহীদ হয়নি। এপ্রিল থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা দখল পর্যন্ত একত্র কোথাও কাদেরিয়া বাহিনী অত শক্তি প্রয়োগ করেনি। অত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেও নাগরপুর থানার পতন ঘটানো যায়নি। নাগরপুরের যুদ্ধে আমি নিজেও সামান্য আহত হয়েছিলাম। গুলি লেগেছিল আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ আর পহেলা ডিসেম্বর ’৭১ নাগরপুর থানা দখলে। এইটটি থ্রি ব্লান্ডার সাইটের গোলা ছুড়তে গিয়ে সামান্য আঘাত লেগেছিল। সে যুদ্ধ ছিল এক মারাত্মক কঠিন ব্যাপার। সারাদিনে হানাদার ঘাঁটির পতন ঘটাতে না পেরে আমরা সবাই এক কিলোমিটারের মতো যার যার দিকে থানা থেকে সরে গিয়ে রাত কাটিয়ে ছিলাম। পরদিন বেলা ওঠার আগে থেকেই আবার যতদূর এগুনো যায়, যতদূর কেন আমরা থানা বাউন্ডারির কোন জায়গায় ১০০, কোন জায়গায় ৭০-৮০ গজের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের প্রচণ্ড গোলাগুলিতেও হানাদারদের ঘাঁটির পতন ঘটানো যায়নি। থানার একেবারে কাছে পৌঁছে যাওয়ায় থ্রি ইঞ্চ মর্টার ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। কারণ নিজেদের গোলা নিজেদের উপর পড়তে পারে। ৭২ আর আর ছিল, ৪-৫টা রকেট লাঞ্চার, ব্যালেন্ডার সাইট মিলে প্রায় ১৫টা, হেভি মেশিনগান ৫টা, মিডিয়াম মেশিনগান ৬টা, লাইট মেশিনগান মানে খগএ প্রায় ৩০টা আর সবই স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। কিন্তু এত প্রচণ্ড শক্তির পরও হানাদারদের জন্য অনুকূল, আমাদের জন্য প্রতিকূল হওয়ায় নাগরপুর ঘাঁটির পতন ঘটাতে পারিনি। ২ তারিখ দুইটা-আড়াইটার দিকে খবর আসে নাগরপুরের হানাদারদের উদ্ধার করতে টাঙ্গাইল থেকে এক ব্যাটালিয়ান সৈন্য আসছে। তাদেরকে এলাসিন ঘাটে বাধা দেয়া হয় এবং আমরা আক্রমণ প্রত্যাহার করে সবক’টি দল নিয়ে এলাসিন ঘাটে পৌঁছে যাই। আমরা এলাসিন নদীর দক্ষিণ পাড়ে, হানাদাররা উত্তর-পূর্ব পাড়ে। তখনো তারা নদী পেরুতে পারেনি। কিন্তু হানাদাররা অনেকটা উত্তর-পশ্চিমে সরে গিয়ে নদীর বিশাল চরের মধ্যদিয়ে প্রায় দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে চলে এসেছিল। আমরা ছিলাম ভাররা বাজারের পাশে। আমাদের হাতে ১৫-২০ জন হানাদার আহত ও নিহত হয়েছিল। সেখানে আমাদের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা কামুটিয়ার সানোয়ার মারাত্মকভাবে আহত হয়। আল্লাহ’র দয়ায় সাহসী যোদ্ধাটি এখনো বেঁচে আছে। যখনই ভগ্ন স্বাস্থ্য সানোয়ারকে দেখি তখনই সেই এলাসিনের যুদ্ধের কথা মনে হয়। আল্লাহ আয়ু দিয়েছেন; তাই এখনো সানোয়ার বেঁচে আছে। এমন আরও কতো যোদ্ধা বেঁচে আছে। কিন্তু তাদের স্বস্তি নেই, শান্তি নেই, সম্মান নেই।

এবার নতুন অবস্থা, নতুন আঙ্গিকে, নতুন প্রেক্ষাপট। কিন্তু কেন যেন ভালো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। অধ্যাপক ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের দুঃসময়ে প্রায় ২-৩ বছর তাকে ছায়ার মতো সাহস দিয়েছি। একজন রাজনৈতিক মানুষের যা কিছু করা সম্ভব করার চেষ্টা করেছি। এসবের মধ্যে ছিলেন ড. কামাল হোসেন। তার উৎসাহেই ওসব করেছি। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। সাধারণ মানুষ তার কাছ থেকে যতটা যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধের আশা করেছিল উপদেষ্টা পরিষদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের তেমন আশা পূরণ হয়নি। যে কারণে তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। ইদানীং সমন্বয়কদের কথা শুনছি। বিশেষ করে সারজিস, তার কথাবার্তা অনেকটাই শেখ হাসিনার মতো। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা যাদের পরাজিত করে মহা বিজয় অর্জন করেছেন, পরাজিতরা নাকে সরিষার তেল দিয়ে মোটেই ঘুমিয়ে থাকবে না- এটাই সত্য কথা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলতেন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সরকারকে অস্থিতিশীল করা, তাকে সরিয়ে অন্যেরা সরকারে আসা- এটাই শতসিদ্ধ সত্য। এর কোনো কোনো জায়গায় নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র হয়। কিন্তু সবটুকু নয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারিয়েছে। তার প্রধান কাজ ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করা। সেটা তিনি বা তারা সদা সর্বদা করবেন। এ সরকারকে অস্থিতিশীল করার যত রকমের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে তা করবেন। এতে ক্ষোভ প্রকাশের কোনো কারণ নেই। এ তো খুবই সত্য। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কয়েক হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আহত-নিহত হয়েছে। এটা তো বুকে হাত দিয়ে অবশ্যই বলা যায়- আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তরাও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতা পায়নি। এমনকি যথাযথ চিকিৎসা সেবাও পায়নি। তাই শুধু কথার ফুলঝুরি ঝরালেই চলবে না, বাস্তবের সঙ্গেও কিছু না কিছু মিল থাকতে হবে। পতিতদের কাজ কি? হারানো স্থান দখল করা বা ফিরে পাওয়া। সেক্ষেত্রে হাসিনা আর আওয়ামী লীগকে এক করে ফেললে নিশ্চয়ই তার শক্তি সামর্থ্য বাড়বে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর বঙ্গবন্ধু এক কথা নয়। শেখ হাসিনা প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধাও না। এ জিনিসগুলো আন্দোলনকারীদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

শেখ হাসিনাকে ফেলে দেয়ার জন্য জো বাইডেন নানা রকম নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছিলেন। এখন শুনছি নবনির্বাচিত ট্রাম্প শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাবেন। সেখানে ভারত সরকারেরও সহযোগিতা থাকবে। এসবের কোনো কিছুই ভালো না। আমাদের দেশ, আমাদের জনগণ কাকে ক্ষমতায় বসাবে আর কাকে বসাবে না সেটা ঠিক করবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি নয়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নয়। এসব খুবই বাজে কথা। পরাজিতরা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে- এটাই শাশ্বত সত্য। চাল ডাল লবণ তেল প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া। তাতে সত্যিই দেশবাসী বিরক্ত হতাশ। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বিবেচনার মধ্যেই নেই। অতি সম্প্রতি ইসকন থেকে বিতাড়িত চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের চট্টগ্রামের হুজ্জতি সারা দেশকে এক চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে। ৩-৪ ঘণ্টা আদালতে দাঙ্গা- হাঙ্গামা ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সেখানে ইসকনের বহিষ্কৃত নেতা চিন্ময়ের অনুসারীদের হাতে এড. সাইফুল ইসলাম আলিফের প্রাণনাশ এক মারাত্মক অশনিসংকেত। এটা সত্যিই আমাদের জন্য চরম উৎকণ্ঠার বিষয়। আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থে হিন্দু-মুসলমানের তেমন রেষারেষি নেই। আমরা পাশাপাশি জন্মেছি, পাশাপাশি মরি। আমাদের কবরস্থান আর শ্মশানঘাট অনেক সময় পাশাপাশি দেখা যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কতো শত হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান আলেম-ওলামা হিন্দুদের বাড়িঘর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরম যত্নে পাহারা দিয়েছে। তাই এসব দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। কেন যেন অধ্যাপক ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সে দক্ষতা খুঁজে পাচ্ছি না। যখন সবাইকে একযোগে কাজ করা উচিত সেখানে নিজেদের মধ্যেই অনেক বিভাজন, অনৈক্য দেখতে পাচ্ছি।

গ্রামীণ ব্যাংকের উপর শেখ হাসিনার সর্বগ্রাসী আক্রমণে সময় ড. কামাল হোসেনের অনুরোধে প্রায় ২-৩ বছর একনাগাড়ে অধ্যাপক ইউনূসকে যখন যেভাবে যতটা সহযোগিতা করা দরকার করার চেষ্টা করেছি। দলীয় এবং পারিবারিকভাবে অনেকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। তাকে যে উচ্চ মার্গের মানুষ হিসেবে মনে হয়েছে কেন যেন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর তাকে তেমন দেখছি না। কোথায় যেন তার দক্ষতা-যোগ্যতার অল্প বিস্তর খাদ দেখতে পাচ্ছি। এক’শ কয়েকদিন তিনি ক্ষমতায়, কতো দলের সঙ্গে একাধিকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, অনেক কথা হয়েছে। আমাদের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি নিবন্ধিত দল। আমাদের সঙ্গে কেন যে একবারও কথা বা আলাপ আলোচনার প্রয়োজন মনে করছেন না কেন বুঝতে পারছি না। এরমধ্যে কিছু লোকজনের সঙ্গে তো দেখা- সাক্ষাৎ, কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু তাদের খুব একটা সক্রিয় এবং যোগ্যও মনে হচ্ছে না। কেন যেন সবাই গা এলিয়ে আছেন। এখান থেকে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে দেশ ও জাতির মারাত্মক ক্ষতি হবে। একবার সে ক্ষতি হয়ে গেলে শত চেষ্টা করেও আমরা তা পূরণ করতে পারবো না।

সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ হবে কিনা জানতে চাইলেন এক কূটনীতিক by মিজানুর রহমান

ধর্মীয় সংখ্যালঘু ইস্যুতে সৃষ্ট ঘটনাবলির বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানাতে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ব্রিফিংয়ে সংস্কার হওয়া সংবিধান কেমন হবে? তা জানতে চাইলেন এক কূটনীতিক। বিশেষ করে বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে পুনঃলিখন হচ্ছে কিনা? এবং নতুন সংবিধান ধর্মের প্রশ্নে নিরপেক্ষ হবে কিনা? তা জানার আগ্রহ ছিল পূর্ব এশিয়ার ওই রাষ্ট্রদূতের। রমনার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ছিল সেই জনাকীর্ণ ব্রিফিং। যেখানে সুইডেন এবং সংযুক্ত আবর আমিরাত ছাড়া ঢাকাস্থ প্রায় সব কূটনৈতিক মিশনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। উপদেষ্টা সেই প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেননি, সময় নিয়েছেন। দূতদের তিনি জানিয়েছেন, বিদ্যমান সংবিধান এখনো বহাল। প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে সংবিধান বিষয়ে পড়াশোনা এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করে দিয়েছে সরকার। সেই কমিশন কাজ করছে, ডিসেম্বরের সমাপনীতে সুপারিশসহ তারা তাদের রিপোর্ট জমা দেবেন। সেই রিপোর্ট নিয়ে সরকার এবং স্টেক হোল্ডারদের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। তারপরই বলা যাবে সংবিধান কেমন হবে? ওই ব্রিফিংয়ে পশ্চিমা এক কূটনীতিক জানতে চান ইসকনসহ ধর্মীয় ইস্যুতে সৃষ্ট  উত্তেজক পরিস্থিতিতে সরকার হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কতটা যোগাযোগ রাখছে অর্থাৎ সংলাপ চলছে কিনা? উপদেষ্টা এ নিয়ে সরকারের সমুদয় উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন। ব্রিফিংয়ে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, ব্রিফিং শেষে উপস্থিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। সঙ্গে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। ব্রিফিংয়ে কারা কারা ছিলেন বিশেষ করে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ভারতসহ প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিই ছিলেন। এক’দুটি মিশনের প্রতিনিধি বাস্তব কারণে না-ও আসতে পারেন। এটা স্ক্রুটিনি করলে পুরো পিকচার পাওয়া যাবে। তবে উল্লেখযোগ্য সব মিশনের প্রতিনিধিই ছিলেন। তার বক্তব্যে কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, আমার মনে হয়েছে তারা আমাদের বক্তব্যে কনভিন্স।

ইসকন এবং চিন্ময় দাশ প্রসঙ্গ: বিফ্রিংয়ে ইসকন পুরোহিত চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে জানানো হবে বলে দাবি করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। সেই সঙ্গে ইসকনসহ সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নানা রকম খবর ছাপা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর বেশির ভাগই অসত্য। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে উপদেষ্টা বলেন, সব ধর্ম-বিশ্বাসের লোকজনের নিরাপত্তায় সরকার যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে তা বিশ্ব সমপ্রদায়ের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে হামলা করা হচ্ছে মর্মে ভারতীয় গণমাধ্যম অরকেস্ট্রেইটেড ওয়েতে যে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই বলে ফের দাবি করেন তিনি। তবে উপদেষ্টা বলেন- ঘটনা যে নাই বা সমস্যা নাই তা আমরা বলছি না। বরং যেসব ঘটনা ঘটেছে তা কো-ইনসিডেন্ট, ব্যক্তিস্বার্থ, পুরনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা প্রতিহিংসা থেকে। কূটনৈতিক ব্রিফিংটি পুরোপুরি ফ্লেক্সিবল ছিল জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এতে কেবল রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বা মিশনপ্রধানই নন, যেকোনো ডিপ্লোম্যাট ব্রিফিংয়ে অংশ নিয়েছেন। তারা খোলামেলা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। চা-খেতে খেতে অনেকে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নির্বিঘ্নে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, আমি তাকে সেই গল্পটা তার অন্য সহকর্মী এবং হেডকোয়ার্টারের রিপোর্টে লিখতে অনুরোধ করেছি।

মমতাকে চিনি, তার বাড়িতে যাতায়াত ছিল আমার, তিনি তার স্টাইলেই বক্তব্যটি রেখেছেন- পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

এদিকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের আহ্বান সংবলিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে ‘তার ধরনের একটি বক্তব্য’- হিসেবে দেখতে চান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিসেনা পাঠানোর আরজি জানাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তার ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। সোমবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যকে মমতা ব্যানার্জির ধরনের হিসেবে দেখতে চাই।’ মমতাকে চেনাজানা এবং তার বাড়িতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, মমতা ব্যানার্জি কেন এমন বক্তব্য দিলেন, আমরা জানি না। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তার রাজনীতির জন্য বিষয়টি ঠিক হয়নি। পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে আমরা স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে চাই।’ এ সময় চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের গ্রেপ্তার নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তাকে গ্রেপ্তার এবং আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সঙ্গে বলা হয়েছে, তার অনুসারীরা বিক্ষোভ করতে পেরেছেন। কারণ, এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী বৈশ্বিক প্রচারণা চালাচ্ছে উল্লেখ করে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং এক্ষেত্রে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। আমরা মেনে নিচ্ছি, তাদের এক্ষেত্রে শক্তি আমাদের চেয়ে বেশি। তবে আমরা সবাইকে বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করছি।’ ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধানত ভারতীয় গণমাধ্যমে অপপ্রচার চাালানো হচ্ছে। এর বাইরেও অনেক গণমাধ্যম ভারতীয় গণমাধ্যমকে উপজীব্য করে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তবে আমরা বলতে চাই, সব সরকারের আমলেই বছরে দু’-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তবে সরকারের কাজ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। আমরা সেটি করেছি। তবে দেশ ও দেশের বাইরে এ নিয়ে মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।’ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর জানিয়ে উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা বার্তা দিতে চাই, বর্তমান সরকার সামপ্রদায়িক কোনো অপতৎপরতা বরদাশ্‌ত করবে না। আমরা হিন্দু-মুসলিম কোনো ভেদ করতে চাই না। কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা গেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।’

অন্যান্য প্রসঙ্গ: এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘বৃটেনের অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের প্রতিবেদন একপেশে হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে সেখানে অবস্থানরত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষ প্রভাব রেখেছে। বৃটেনের আওয়ামীপন্থি সাংসদের সংখ্যাও বেশি। তারা প্রতিবেদনকে প্রভাবিত করেছে। তারা আমাদের দূতাবাসকে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, আসলেই ৫ই আগস্টের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে সমস্যা চলছে। এটা স্বীকার করতেই হবে।  তবে আমরা  স্বাভাবিক, ভালো সুসম্পর্ক চাই। এই সম্পর্ক  অন্তরের চেয়ে স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ক স্বার্থের মধ্যদিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, আমি কাল একটা হাসপাতালে গেলাম দেখি রোগী ভর্তি। আর কলকাতার দোকানপাট এখন খালি, যেহেতু ভিসা বন্ধ। এখন  ভারতের স্বার্থ তো  আমি বুঝতে পারবো না। তারা তাদের স্বার্থ বুঝবে। উপদেষ্টা বলেন, হিন্দু সমাজের পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের মনে হয়েছিল ভুল ধারণা যাতে সৃষ্টি না হয়, ভুল ধারণা সৃষ্টি করার সুযোগ আছে। বিশেষ করে মিডিয়া, কোন দেশের মিডিয়া বলছি না। তারা যতটুকু পারা যায় খারাপ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কাজেই আমাদের মনে হয়েছে যে কূটনীতিক যে প্রতিনিধিরা আছেন তাদের ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন যাতে তারা প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারে। তাদের কিছু ম্যাকানিজম আছে, কিন্তু আমরা আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি। তৌহিদ হোসেন বলেন, আমরা বলেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের সমাজের অংশ। সরকার এটি বজায় রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কোন মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিগৃহীত হবে না সেটা আমরা নিশ্চিত করবো। সরকার এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে গত চার মাসে। যদিও অনেক মাল-মসলা ছিল অনেক বেশি গণ্ডগোল হওয়ার মতো। সেটি আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি। দুর্গাপূজার মতো উৎসব শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এক-দুইটি ঘটনা যে ঘটেনি তেমনটা তো না। সেগুলো প্রতি বছরই দুই-একটা ঘটে। কোন দেশের মিডিয়ার অপপ্রচারের কথা বলছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি খুব স্পষ্ট। প্রধানত ভারতের মিডিয়া। কিন্তু এর বাইরেও অনেক মিডিয়া ভারতের মিডিয়ার বক্তব্য ধরে নিয়ে প্রচার করেছে। মিডিয়া ছাড়াও ভারতের সরকার বা রাজনীতিবিদদের কোনো কড়া বার্তা দিতে চান কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যে বার্তাটা দিতে চাই এই সরকার কোন ধরনের কোন সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ বরদাশত করবে না। সেটা হিন্দু বা মুসলিম বলে কথা নয়। আমরা সবাইকে সমান চোখে দেখবো। এই বার্তাটি আমরা সবাইকে দিতে চেয়েছি। এ ব্যাপারে আইন তার গতিতে চলবে। যদি কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে তাদের শক্ত হাতে দমন করা হবে। এই বার্তাটি সবার কাছে গেছে। সরকারিভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলে সেটি সরকারিভাবেই প্রতিবাদ জানাই। বাকিটুকু সাধারণভাবেই বলেছি। তিনি বলেন, আজকের ব্রিফিংয়ে ভারতকে নিয়ে সেভাবে কিছু বলিনি। আমি মিডিয়ার সম্পর্কে বলেছি। বৈঠকে ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা ভুলে গেলে চলবে না যে একটা গ্লোবাল ক্যাম্পেইন চলছে। সবাই পার্টিসিপেট করছে তা না। কিন্তু গ্লোবাল ক্যাম্পেইনটা চলছে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর কারণে। চেষ্টা করছে সব জায়গায় হিট করার। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটাও মেনে নিতে হবে তাদের রিচ আমাদের তুলনায় বেশি, আমাদের তাদের মোকাবিলা করতে হবে। বর্ডারে ভারতীয় প্রতিবাদকারীরা বাংলাদেশের বর্ডারে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, সেটিকে কীভাবে দেখেন- এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, এটাকে আমি একটা প্রভোকেশন হিসেবেই দেখি। প্রভোকেশন দেয়ার মতো লোকজন তো আছে, সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এটাকে প্রভোকেশন হিসেবে ততক্ষণ দেখবো যতক্ষণ না তারা বর্ডার অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। বিএসএফ তাদের সেখানে থামাতে সক্ষম হয়েছে। প্রোটেস্ট তারা করতেই পারেন, তাদের দেশের আইনও সেটাকে অ্যালাউ করে। তবে বর্ডার পার হওয়া মানে আইন ভঙ্গ করা। সেটা তারা ব্যবস্থা নিবেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক চায় জানিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখতে চায় বাংলাদেশ। চলতি মাসে নির্ধারিত ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) অনুষ্ঠিত হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটি অনুষ্ঠিত হবে।’

mzamin

সীমান্তে অচলাবস্থা বাণিজ্য ব্যাহত by পরিতোষ পাল ও ওয়েছ খছরু

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে এবং গ্রেপ্তার হওয়া সন্ন্যাসীদের মুক্তির দাবিতে গতকাল পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাংলাদেশ সীমান্তে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ওদিকে সিলেটের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার পেট্রাপোলে এদিন প্রায় হাজার খানেক সন্ন্যাসী ও বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের সমর্থকরা সীমান্ত অবরুদ্ধ করে রাখেন। সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ সীমান্তে সমবেত হয়েছিলেন। পুলিশ অবশ্য সতর্কতা হিসেবে তাদের সীমান্তের জিরো পয়েন্টের ৮০০ মিটার আগেই আটকে দিয়েছে। অবশ্য আন্দোলনকারীরা মানববন্ধন করে জিরো পয়েন্টে গিয়ে বাংলাদেশকে বার্তা দিতে চলেছেন। অখিল ভারতীয় সন্ত সমিতির আয়োজনে এই অবরোধ কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

সন্ত সমিতির বাংলা কমিটির সভাপতি স্বামী পরমাত্মানন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নির্যাতন বন্ধ এবং ধৃত  সন্ন্যাসীদের মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত সীমান্ত অবরোধ কর্মসূচি চলবে। তিনি বলেন, আমরা সব রকমের বাণিজ্য বন্ধ করে দেবো। কোচবিহারের চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্তেও এদিন কয়েক শ’ মানুষ প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। সীমান্তে এই অবরোধের ফলে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীদের আনাগোনা এক প্রকার ছিল না বললেই চলে।
বিজেপি’র নেতা ও রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী আগামী বুধবার পেট্রাপোল সীমান্ত অবরুদ্ধ করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে আসামের সীমান্তেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, সনাতনী ঐক্যমঞ্চ’র ডাকে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। শিবসাগর জেলার সুতারকান্দি সীমান্তে চলো বাংলাদেশ নামের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

এদিকে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এক বিবৃতিতে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশে হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং তাদের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, নারী ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর ইসলামী মৌলবাদীদের হামলা, হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও অমানবিক নৃশংসতার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হিন্দু মহাসভার পশ্চিমবঙ্গ কমিটির  সভাপতি ডক্টর চন্দ্রচূড় গোস্বামী  বলেছেন, আমরা প্রতিবাদ করছি। তবে প্রতিশোধ নেয়া প্রয়োজন।
ওদিকে সিলেট সীমান্তে ভারতের ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র বাংলাদেশ অভিমুখে মার্চের পর দুই পোর্টে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ কারণে গতকাল বিয়ানীবাজারের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে মালামাল আসা-যাওয়া করেনি। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন; ভারত অংশে উত্তেজনার কারণে আপাতত বন্ধ রয়েছে দুই পোর্ট। বাংলাদেশে কথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ এলাকায় বিক্ষোভ চলছে। ভারতের হিন্দু ঐক্যমঞ্চ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে রোববার কয়েকশ’ সনাতনী মানুষ ‘বাংলাদেশ চলো’ কর্মসূচি নিয়ে বিয়ানীবাজারের শ্যাওলা স্থলবন্দর অভিমুখে আসতে থাকে। বাংলাদেশ সীমান্তের অদূরে একটি স্থানে প্রথমে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। কিন্তু পুলিশের বাধা ডিঙিয়ে তারা এগুতে থাকলে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কাঁটা তার দিয়ে ব্যারিকেড দেয়। এই ব্যারিকেড ভাঙতে চাইলে ভারতের উগ্রপন্থি সনাতনীদের সঙ্গে বিএসএফ ও ওখানকার পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে- সংঘর্ষে  বেশ কয়েকজন আহত হন। তবে ব্যারিকেড ভেঙে শেষ পর্যন্ত আরএসএ’র নেতৃত্বে থাকা ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র নেতারা সীমান্ত এলাকায় আসতে পারেননি। তবে; তাদের এই মুভমেন্টের পর বাংলাদেশের শ্যাওলা সীমান্ত বন্দর দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। পোর্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- নিরাপত্তা বিবেচনায় কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গতকালও  পোর্টের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ‘বাংলাদেশ চলো’ মুভমেন্টে স্থানীয় ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র নেতারা বলছিলেন; ‘জীবন গেলে যাবে, তবুও তারা বাংলাদেশে যাবেন।’ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের প্রতিবাদে তারা এই মার্চ কর্মসূচি পালন করছেন বলে জানান। এদিকে- আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জের সুতারকান্দি সীমান্তে যখন মুভমেন্ট নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল তখন রোববার পার্শ্ববর্তী করিমগঞ্জ স্টিমারঘাটের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানি- রপ্তানি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। করিমগঞ্জের মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া খবরে জানা গেছে; ভারত অংশের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় বাংলাদেশে কঠিন পরিস্থিতি চলছে বলে ব্যবসায়ী নেতারা উল্লেখ করেন। তবে; ব্যবসায়ীদের এই সিদ্ধান্ত না মেনে গতকাল সকালে করিমগঞ্জ পোর্ট দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলে করিমগঞ্জ এলাকার স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে করিমগঞ্জের কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী পোর্টে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও গতকাল দুপুরের পর জকিগঞ্জে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে; বিধায়ক কমলাক্ষ চক্রবর্তী কিছু সংখ্যক কর্মী নিয়ে এসে নদী তীরবর্তী স্টিমারঘাটের পোর্টে আসেন। এ সময় ওই পোর্ট দিয়ে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কিছু মালামাল ঢুকছিল। তিনি মালামালের একটি চালান আটক করে প্রকাশ্যে আগুন ধরিয়ে দেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেই বাঁশ এনে পোর্ট এলাকায় ব্যারিকেড দেন। একই সঙ্গে ঘোষণা দেন; বাংলাদেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পোর্ট দিয়ে আমদানি- রপ্তানি বন্ধ থাকবে। তবে এই মুভমেন্টের আগে দু’দেশের মধ্যে কয়েক গাড়ি মালামাল আসা-যাওয়া করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের জকিগঞ্জ পোর্টের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- সকালে করিমগঞ্জ থেকে নদীপথে দুই ট্রাক পণ্য এসেছিল। ওই অংশে কিছু বিশৃঙ্খলার কারণে বিকাল পর্যন্ত মালামাল আসেনি ও বাংলাদেশ থেকে যায়নি। সিলেটের ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন; ভারত অংশের সমস্যার কারণে বিয়ানীবাজারের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে যখনই সম্মতি আসবে তখনই ফের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। সিলেট আমদানিকারক গ্রুপের যুগ্ম সম্পাদক ও শ্যাওলা বন্দরের ব্যবসায়ী জয়ন্ত চক্রবর্তী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- করিমগঞ্জের সুতারকান্দি স্থল বন্দরের ঝামেলার কারণে  রোববার থেকে সিলেটের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। করিমগঞ্জের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমদানি-রপ্তানি শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি। শ্যাওলা পোর্টের সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক নিয়াজ উদ্দিন জানিয়েছেন- ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র মুভমেন্টের আগে আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক ছিল। এজন্য  পোর্টে মালামাল লোড করা ট্রাক অপেক্ষমাণ ছিল। বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কারণে ওই ট্রাকগুলো আটকা পড়ে। আপাতত লোড করা ট্রাকগুলো খালাস করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে; বাংলাদেশ অংশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যেও এ নিয়ে কোনো উত্তেজনা নেই। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বিজিবি’র ১৯ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মেহেদী হাসান জানিয়েছেন- বাংলাদেশ অংশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সীমান্তে পূর্বের মতো বিজিবি’র পক্ষ থেকে টহল জোরদার রয়েছে। জকিগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আফসানা তাসনিম জানিয়েছেন- সীমান্তে নজরদারি চলছে। একই সঙ্গে বিজিবি’র পক্ষ থেকে অতিরিক্ত লোকবল নিয়ে টহল বাড়ানো হয়েছে।

mzamin

আওয়ামী লীগের শাসনামলে চোরতন্ত্র সৃষ্টি হয়েছিল

দেশের অর্থনীতির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি মনে করে, দেশে গত ১৫ বছরে ‘চামচা পুঁজিবাদ থেকেই চোরতন্ত্র’ তৈরি হয়েছিল, যাতে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিচার বিভাগসহ সবাই অংশ নিয়েছে। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা।

সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে শ্বেতপত্র কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ সময় কমিটির সব সদস্য সংক্ষেপে তাদের প্রতিক্রিয়া জানান।

কারা বেশি দুর্নীতিবাজ ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে শ্বেতপত্র কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় বলেছেন, কমিটি বিষয়টি নিয়ে যেসব শুনানি করেছে সেখানে এমন মত এসেছে যে ‘চোরতন্ত্রের মূল স্তম্ভ ছিল আমলারা, সামরিক-বেসামরিক-রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা। আইনসভা, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগসহ সবাই যখন গোষ্ঠীবদ্ধভাবে চুরির অংশ হয় সেটাই চোরতন্ত্র। মূলত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনই এই বিষবৃক্ষ তৈরি করেছে।

কারা এসব দুর্নীতি করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাজ চোর ধরা না, চুরির বর্ণনা দেয়া। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং চুরির প্রক্রিয়া খুঁজে বের করা। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কারও কিছু বলার থাকলে দুদক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে যাওয়াই শ্রেয়।
শ্বেতপত্রে গত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সীমাহীন দুর্নীতি, পাচার বা লুটপাটের তথ্য-উপাত্ত দেয়া হলেও কমিটি বলছে, তাদের হাতে এর কোনো প্রমাণ নেই। তবে তাদের ধারণা যেসব খাতে বেশি দুর্নীতি হয়েছে তার মধ্যে শীর্ষে থাকবে ব্যাংকিং, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং তথ্য প্রযুক্তি খাত।
এর আগে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি রোববার উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তখন তারা জানিয়েছিল যে, শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলের দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও আর্থিক কারচুপির যে তথ্য পাওয়া গেছে তা আতঙ্কিত হওয়ার মতো। এই কমিটি দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাটসহ অর্থনীতির নানা বিষয়ে তাদের প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র তৈরি করেছে। গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর ২৮শে আগস্ট দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র জানতে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়।

শ্বেতপত্র যা বলছে: শ্বেতপত্র কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবারিত দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে একটি ‘চোরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। প্রতিবছর পাচার করা অর্থের পরিমাণ ছিল গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার।
এতে আরও বলা হয়, বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে মেগা প্রকল্পগুলোতে। ১৫ বছরে প্রকল্পের খরচ গড়ে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রকল্পগুলো শেষ করতে গড়ে ৫ বছরের বেশি সময় লেগেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা ৬০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ১৪ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ৬১ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা) রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুষ এবং বাজেট বাড়ানোর মতো বিভিন্ন দুর্নীতির কারণে নষ্ট হয়েছে। এতে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাংকিং খাতের সংকটকে গভীর করেছে। বিগত ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাতে যে মন্দ ঋণ তৈরি হয়েছে, তা দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল বা ২৪টি পদ্মা সেতু করা যেতো। ধারাবাহিক ঋণ খেলাপির ঘটনা এবং বড় ধরনের কেলেঙ্কারিগুলো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করেছে এবং উৎপাদনশীল খাত থেকে পুঁজি অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে গেছে বলেও শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অভিবাসন খাতে গত এক দশকে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ কোটি টাকা সরানো হয়েছে হুন্ডিতে লেনদেনের মাধ্যমে। মূলত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ভিসা ক্রয়ের নামে এ টাকা বিদেশে গেছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়, এ টাকা মতিঝিল-উত্তরা রুটের মেট্রোরেল নির্মাণ খরচের চারগুণ। সিন্ডিকেট ও অনৈতিক রিক্রুটমেন্ট চর্চার কারণে সত্যিকার অভিবাসী কর্মীরা ক্ষতির শিকার হয়েছে এবং দেশ রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হয়েছে। শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ভুয়া বরাদ্দগুলোর কারণে লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে পড়েছে। জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতির অভিযোগও আনা হয়েছে শ্বেতপত্রে।
গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, গৃহস্থালির উৎপাদন, পরিসংখ্যান বিকৃত করা এবং চাহিদা কম দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে চাল, ভোজ্য তেল এবং গমের মতো প্রধান পণ্যের ক্ষেত্রে এমন চিত্র দেখা গেছে। যা বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। সাধারণ ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ অর্থ তছরুপ হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের ১০ শতাংশ মানুষ দেশের ৮৫ শতাংশ সম্পদ ভোগ করেছেন।

শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তারা ২৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৭টি বড় প্রকল্প পরীক্ষা করে দেখেছেন প্রতিটিতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। ২৯টি বড় প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৮৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরীক্ষা করা সাতটি প্রকল্পের আনুমানিক প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। অতিরিক্ত উপাদান যোগ করে, জমির দাম বেশি দেখিয়ে এবং ক্রয়ের ক্ষেত্রে হেরফের করে প্রকল্পের ব্যয় সংশোধিত করে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তিনি বলেন, ব্যয়ের সুবিধা বিশ্লেষণ না করেই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে যে টাকা পাচার হয়েছে সেটা দেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে থেকে যাবে। টাকা পাচার ধরা খুবই কঠিন। তবুও আমরা চেষ্টা করেছি।
কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক একে এনামুল হক বলেন, গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে এবং এর ৪০ শতাংশ অর্থ আমলারা লুটপাট করেছে।
কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, বিগত শাসনামলে কর অব্যাহতির পরিমাণ ছিল দেশের মোট জিডিপি’র ৬ শতাংশ। এটি অর্ধেকে নামিয়ে আনা গেলে শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ এবং স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করা যেতে পারতো বলে জানান তিনি।

কমিটির আরেক সদস্য ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং ১০ শতাংশ যদি অবৈধ লেনদেন ধরা হয়, তাহলে পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৩ বিলিয়ন ডলার। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তির বিধান করে দুর্নীতির রাজকপাট খুলে দেয়া হয়েছিল গত ১৫ বছরে এবং নীতি করেই দুর্নীতির পথ সুগম করে দেয়া হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এতদিন ভেবেছিলাম, আমরা মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ার শঙ্কায় আছি। এখন আমরা বলছি, আমরা সেই ফাঁদে পড়ে গেছি। পরিসংখ্যান দিয়ে এতদিন উন্নয়ন দেখানো হয়েছে। বাস্তবে তা হয়নি। হিসাব গরমিলের কারণে মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ে গেছি। তার মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি সংস্কার ও জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছাড়া এ থেকে উত্তরণের উপায় নেই।

এলডিসি থেকে উত্তরণ সম্পর্কে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সক্ষমতা ও আয়তন অনুসারে বাংলাদেশ এলডিসিতে থাকার মতো দেশ নয়। যদি কোনো কারণে ২০২৬ সালে উত্তরণ হতে না পারি, তাহলে আবার বলা হবে, “সোনার সংসার রেখে গিয়েছিলাম, এটা নষ্ট করে গেছে।” যারা (বাজার-সুবিধাপ্রাপ্ত রপ্তানিকারক) এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দিতে তদবির করেন, তাদের গোড়া কোথায়, তা দেখেন। তারা সংসদে প্রভাবশালী ছিলেন, রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিলেন। আমরা দেখেছি, একটি রপ্তানি খাতকে কীভাবে একচেটিয়া সুবিধা দেয়া হয়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, চরম ত্রুটিপূর্ণ তিনটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা না হলে পুরনো খেলোয়াড়েরা (যারা এসব খাত ধ্বংস করেছে) ফিরে আসতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য ৫টি পরামর্শ দেন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান। প্রথমত, গত পাঁচ মাসে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা। দ্বিতীয়ত, আগামী ছয় মাস যেহেতু দেশ ও জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাই এ সময়ে কী অর্থনৈতিক সংস্কার করা হবে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরা। যেমন- মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, টাকার মান কত হবে, তা জনগণকে জানানো। অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা উচিত। তৃতীয়ত, আগামী দিনের সীমারেখা কী, তা না বুঝে কেউ বিনিয়োগ করবে না। নিকট ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে বিনিয়োগকারীরা দ্বিধাগ্রস্ত হবেন। দুই বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেন তিনি। চতুর্থত, তিনি মনে করেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া স্থবির হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনটি মাপকাঠিতে বাংলাদেশ উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই ২০২৬ সালের আগে বড় ধরনের অর্থনৈতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। এখনো সেই সময় হয়নি। পঞ্চমত, উন্নয়ন সহযোগী; বাজার-সুবিধা দেয়ার দেশ; বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং শ্রমশক্তি নেয়, এমন দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে আগামী বছরের প্রথম দিকে একটি উন্নয়ন ফোরাম বৈঠক করা, যেখানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে হবে।

যেসব পদ্ধতিতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ শাসনামলে দুর্নীতি হয়েছে, তার একটি তালিকা দেয়া হয়েছে শ্বেতপত্র কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। এ পদ্ধতিগুলো হলো-

ব্যাংক খাতের ঋণ কেলেঙ্কারি: প্রতারণাপূর্ণ ব্যাংকঋণের ব্যাপক প্রসারের কথা উল্লেখ করেছে শ্বেতপত্র কমিটি। এর পাশাপাশি ছিল ঋণের অর্থ আত্মসাৎ করা।

ব্যাংক অধিগ্রহণ: আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে জোর করে ব্যাংকের মালিকানা অধিগ্রহণ বা দখল করা হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটি বলছে, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থার সহায়তা নেয়া হয়েছে।

অবৈধভাবে অর্থ পাচার: বেআইনিভাবে যে অর্থ নেয়া হয়েছে, তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচার করা অর্থের পরিমাণ ছিল বিপুল।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেয়া অলাভজনক প্রকল্প: লাভজনক হবে না, এমন প্রকল্পে সম্পদের অপচয় করা হয়েছে। সময়মতো এসব প্রকল্প শেষ করা হয়নি। বিপুল অর্থ খরচের কারণে তা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি: প্রকল্পের খরচ ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে টাকা চুরি করা যায়।

প্রকল্প অনুমোদনের পর ব্যয় বৃদ্ধি: বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের পর কৃত্রিমভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল তহবিলের অর্থ পকেটস্থ করা।

প্রতিযোগিতাবিহীন দরপত্র প্রক্রিয়া: সরকারি কেনাকাটা করা হয়েছে, এমনভাবে যাতে স্বজনতোষী ও সুবিধাপ্রাপ্তরা লাভবান হয়। যোগ্য সরবরাহকারীদের এ প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রাখা হয়েছে।

অপ্রয়োজনীয় ও দুর্বল প্রকল্প: একটি প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সম্পদের অপচয় হয়েছে। প্রকল্প যথাসময়ে শেষ করা হয়নি, বেড়েছে খরচ।

নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি: প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, বিশেষ করে যাদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ করা হতো, তাদের নিয়োগের মাপকাঠি ছিল রাজনীতির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ। এক্ষেত্রে মেধা বিচার করা হতো না।

ভূমি ও সম্পদের অবৈধ অধিগ্রহণ: ভূমি ও সম্পদ জব্দ কিংবা অধিগ্রহণ করা হয়েছে বেআইনি পন্থায়।
ভূমি অধিগ্রহণের অর্থের অপব্যবহার: যেসব ভূমিমালিকের শক্ত রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল না, তাদেরকে অসম চুক্তিতে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য যে অর্থ দেয়া হয়েছে, তার অপব্যবহার করা হয়েছে।

চুক্তিমূল্য বাড়িয়ে কাজ দেয়া: রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের অনেক ক্ষেত্রে যেসব সরকারি কাজ দেয়া হয়েছে, তার মূল্য বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এসব কাজে দেয়া হয়েছে কোনোরকম প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই।

প্রকল্পের সম্পদের অপব্যবহার: ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুবিধার জন্য যানবাহন, ভ্রমণ বাজেট এবং প্রকল্পের অন্যান্য সম্পদের অপব্যবহার করা হয়েছে।

ঘুষকে ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার: কাজের প্রক্রিয়া জোরদার করা কিংবা বিশেষ সুবিধা নেয়ার জন্য নিয়মিতভাবে ঘুষের লেনদেন করা হতো।

রাষ্ট্রীয় তহবিলের ভুল বরাদ্দ: উন্নয়নকাজের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করা। এর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক নেতাদের রাজনৈতিক অথবা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য পূরণ।
অভিজাতদের কর অব্যাহতি: কর নীতি অসঙ্গতভাবে প্রভাবশালীদের সুবিধা দিয়েছে।

সরবরাহ চেইনের বিকৃতি: সরবরাহ ব্যবস্থাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা পণ্যমূল্য অন্যায্যভাবে বাড়িয়েছে এবং বাজারে অদক্ষতা সৃষ্টি করেছে।
ইনসাইডার ইনফরমেশন বা ভেতরের তথ্য আদান-প্রদান: নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর কাছে নীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ফাঁস করে দেয়া হতো, যাতে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে।

সংঘবদ্ধ দুর্নীতি: সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি ব্যক্তিরা আঁতাত করতেন, যাতে উভয়েই লাভবান হতে পারেন।

চাঁদাবাজিভিত্তিক দুর্নীতি: ঘুষ আদায় কিংবা অন্যায্য লেনদেনে যেতে চাপ প্রয়োগ করা হতো।
একচেটিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি: বাজার পরিস্থিতি এমনভাবে পরিচালনা করা হতো, যাতে বিশেষ ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান লাভবান হয়।
আগেই তথ্য লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতি: গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেই জানিয়ে দেয়া হতো, ফলে বিশেষ গোষ্ঠী সুবিধা পেতো।
তথ্য গোপন করার মাধ্যমে দুর্নীতি: অংশীজনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখা হতো, যাতে তারা বিভ্রান্ত হয়।

নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে দুর্নীতি: ঘুষ পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করা হতো।

কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির জন্য দুর্নীতি: ঘুষ ও যোগাযোগের ব্যবহার করা হতো, যাতে পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া যায়।

কমিশনের ভাগ-বাটোয়ারা: কোনো বিষয়ে অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কমিশনের ভাগ চাইতেন।

রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া: রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা সুবিধা পাওয়ার জন্য সম্পদের ব্যবহার ও সিদ্ধান্ত নেয়া হতো।

আইনের প্রণয়ন: আইন ও নীতি এমনভাবে প্রণয়ন করা হতো, যা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতো।

mzamin

থার্ড টার্মিনালে অস্বাভাবিক ব্যয়ের তদন্ত হবে

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিমান ও পর্যটন উপদেষ্টা হাসান আরিফ বলেছেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয় কেন হয়েছে তা তদন্ত করে দেখা হবে। এ ছাড়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ে বিমানের সক্ষমতার বিষয়টি আমরা দেখবো। দুই বছর যে আমরা হাত দিয়ে বসে থাকবো- বিষয়টা এমন নয়। যদি তার সক্ষমতার ঘাটতি হয় বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুপুরে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ে গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ (এটিজেএফবি)। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি তানজীম আনোয়ার। উপদেষ্টা বলেন, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা তদন্ত করা হবে। সেই সঙ্গে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে থার্ড টার্মিনাল চালু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন থেকে ৩৬৫ দিন সময় লাগবে। তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে যে বিনিয়োগ হয়েছে তা থেকে কেমন সেবা পাওয়া যাবে এবং দেশ ও জাতি লাভবান হবে- সেটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাসান আরিফ বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের পর প্রশ্ন আসছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়, এই টার্মিনাল নির্মাণের পর আমাদের রিটার্ন কি? অর্থের দিক দিয়ে নয়, সার্ভিসের দিক দিয়ে রিটার্ন কি? থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে ২৩ হাজার কোটি টাকা যে ব্যয় হয়েছে অবশ্যই দুর্নীতি হয়েছে বলে বেশি ব্যয় হয়েছে বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখবো।

গোলটেবিল বৈঠকে লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এভিয়েশন অপারেটর’স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি ও নভোএয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান। প্রবন্ধে মফিজুর রহমান বলেন, সমপ্রতি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বিমানের জিম্মায় তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা দুই বছরের জন্য প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জোর বিতর্ক চলমান এবং তা যৌক্তিক। তৃতীয় টার্মিনাল অপারেশনের ক্ষেত্রে যেন রাজনীতির উপর অপারেশনাল বিষয় প্রাধান্য পায় তার জোর দাবি রাখবো। তিনি বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা এবং টার্মিনাল অপারেশন উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বর্তমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং মনোপলি ভেঙে একাধিক কোম্পানিকে দেয়া হোক। এখানে বিমান প্রসঙ্গ নয়, গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবার মনোপলি ভাঙা সম্ভব হলে চূড়ান্ত বিচারে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। আর অন্য অপারেটরের সঙ্গে যোগ্য বিবেচনা হলে বিমানকেও জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। এতে দেশ এবং জনগণ একধারে আর্থিকভাবে লাভবান হবে এবং উন্নত সেবা পাবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিশ্বের কোথাও রাজধানীর ভেতর বিমানবন্দর নেই। সেখানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তথা তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের সময় তা বিবেচনা করা হয়নি। এমন অপরিকল্পিত কার্যক্রমের জন্য ৫৪ বছরেও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অর্জন শূন্য। তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও কোনো একটি সংস্থা একক ভাবে বিমানবন্দর গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করে না। সেখানে শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দর এককভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করছে বিমান। এ বিষয়ে সেবা দিতে গিয়ে বিমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। এখন তারা শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং নেয়ার জন্য চেষ্টা করছে। এটা তারা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবে তা বলা যায় না।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মনজুর কবির ভূঁইয়া বলেন, থার্ড টার্মিনালসহ দেশের সকল টার্মিনালগুলোকে উন্নত করার জন্য কাজ করছি। এক্সপোর্ট এবং ইমপোর্ট নিয়ে একটি টার্মিনাল হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এই টার্মিনালের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য উপদেষ্টার সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু জাতির কাছে স্বপ্ন। তবে এজন্য তারা বসে নেই। নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ যেটা ভালো হয় সেটাই করার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি। এয়ার এ্যাস্ট্রা’র সিইও ইমরান আসিফ বলেন, একটি ভবন থাকলে শুধু হবে না। আমাদের মাল্টিপল গ্রাউন্ড সার্ভিস প্রভাইডার লাগবে। এর পাশাপাশি আমাদের দক্ষ ভালো ম্যানেজমেন্ট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে পারে- এমন জনবলও লাগবে। আমাদের টার্মিনালগুলোতে যেসব লোক কাজ করে তাদের বেতন পর্যাপ্ত নয়। যারা গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা দেবেন তাদের সেবায় যেনো দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর যাত্রীরা সন্তুষ্ট থাকে। এসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় পরিবহন করে বিদেশে এয়ারলাইন্সগুলো সন্তুষ্ট না। তারা জানিয়েছে, বিশ্ব অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় শাহজালাল বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং চার্জ বেশি। তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে হলে শাহজালাল বিমানবন্দরকে এভিয়েশন হাব করতে হবে।

এয়ারলাইন্স অপারেটরস কমিটির ঢাকার (এওসি) চেয়ারপারসন দিলারা হোসেন বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে যেসব অভিযোগ শুনেছি- এখনো একই ধরনের অভিযোগ আসছে। এই বিমানবন্দরে ক্রমেই বিদেশি এয়ারলাইন্স বাড়ছে। কিন্তু গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের সেবার মান বাড়ছে না।

mzamin

বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় প্রেমিকাকে গুলি করে হত্যা

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় শাহিদা আক্তার (২২) নামে সেই তরুণীকে গুলি করে হত্যা করেছে প্রেমিক। গতকাল ভোরে ভোলার ইলিশা থেকে মনপুরা পালিয়ে যাওয়ার সময় প্রেমিক তৌহিদ শেখ তন্ময়কে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটিও উদ্ধার করা হয়। এর আগে শনিবার দুপুর ১২টায় উপজেলায় ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের সমসপুর এলাকার দোগাছী সার্ভিস সড়ক থেকে ওই তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

তন্ময় রাজধানীর ওয়ারীর বনগ্রাম এলাকার প্রয়াত শফিক শাহর ছেলে। শনিবার রাত ১২টার পর নিহতের মা জরিনা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাটি করেন। রোববার সকালে সে মামলায় একমাত্র নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়। নিহতের শরীরে আটটি গুলির ছিদ্র ছিল। সে সময় লাশের পাশে কয়েকটি গুলির খোসাও পড়ে ছিল। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মো. আজাদ বলেন, শাহিদাকে হত্যার পর থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে তৌহিদকে গ্রেপ্তারের জন্য আমাদের একাধিক দল কাজ করছিল। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি তৌহিদ ভোলা রয়েছে। রোববার রাতে আমাদের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। সেখান থেকে তৌহিদকে গ্রেপ্তার করে। পরে তৌহিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে যে অস্ত্র দিয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সেটি কেরানীগঞ্জের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

হত্যার ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, তৌহিদ আমাদের জানিয়েছে, শাহিদার সঙ্গে তৌহিদের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রেমের সম্পর্ক থেকে তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এর মধ্যে তৌহিদ অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিষয়টি শাহিদা জানতে পারে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার ঝগড়াঝাঁটি হয়। তাদের সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তবে গত শুক্রবার রাতে তৌহিদ শাহিদাকে মুঠোফোনের মাধ্যমে ওয়ারীর বাড়ি থেকে মাওয়ায় ইলিশ খাওয়ার কথা বলে ডেকে আনে। তারা সারারাত এক্সপ্রেসওয়েতে ঘোরাঘুরি করে। শনিবার ভোরে তারা শ্রীনগর দোগাছী এলাকায় হাঁটাহাঁটি করছিল। এ সময় শাহিদা বিয়ের জন্য চাপ দেন। তৌহিদ বিয়ে করতে অস্বীকার করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে তৌহিদের সঙ্গে থাকা পিস্তল দিয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যা করে। যে পিস্তলটি দিয়ে শাহিদাকে হত্যা করা হয়েছে এটি গত ৫ আগস্ট ওয়ারী থানা থেকে লুট করেছিল তৌহিদ।

নিহত শাহিদা ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার বেগুনবাড়ীর বরিবয়ান এলাকার প্রয়াত আবদুল মোতালেবের মেয়ে। তিনি ঢাকার ওয়ারী এলাকায় ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। গত শনিবার ভোরে শাহিদা ও তৌহিদকে সার্ভিস লেনে হাঁটতে দেখেছেন পথচারীরা। কিছুক্ষণ পর অন্য পথচারীরা শাহিদার রক্তাক্ত লাশ সড়কে পড়ে থাকতে দেখেন। তার পিঠে একাধিক গুলির চিহ্ন ছিল। পরে তারা বিষয়টি পুলিশকে জানান। শাহিদার মা জরিনা বেগম বলেন, ৬ বছর ধরে তার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছিল তৌহিদ। বিষয়টি তৌহিদের পরিবারের লোকজন জানত। তিন মাস আগে শহিদা ও তৌহিদা সবার অজান্তে চাঁদপুরে ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে তৌহিদ আমার মেয়েকে মারধর করে। পরে পুলিশ এসে দু’জনকে ধরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে তৌহিদের পরিবারের লোকজন। তখন থেকে প্রেমের বিষয়টি আমি জানতে পারি। এরপর তৌহিদের বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ-খবর নেই। জানতে পারি তৌহিদ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ছেলে হিসেবেও ভালো না। পরে আমরা মেয়েকে ওই ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করি। তৌহিদ বিভিন্ন সময় আমার মেয়েকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যেত। প্রেমের অপরাধে তৌহিদের মা আমার মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। আমি মেয়েকে বাড়ি থেকে বের হতে দিতাম না। শুক্রবার শাহিদাকে ফুসলিয়ে ফোনের মাধ্যমে বাড়ি থেকে বের করে নেয়। শেষপর্যন্ত আমার মেয়েটাকে গুলি করে হত্যা করেছে। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।

mzamin