Monday, July 11, 2016

কারফিউর মধ্যেই খণ্ডযুদ্ধ কাশ্মীরে

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন জেলায় গতকালও কারফিউ
ভেঙে বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় বিভিন্ন
স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ছবিটি
গতকাল রাজধানী শ্রীনগর থেকে তোলা। এএফপি
ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর উপত্যকা গতকাল রোববারও থমথমে ছিল। কারফিউ সত্ত্বেও সেখানকার বিভিন্ন জেলায় জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ অব্যাহত। নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা গতকাল বিকেল পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। তাঁদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মীও রয়েছেন। তাঁকে গাড়িসহ খরস্রোতা ঝিলম নদে ফেলে দেওয়া হয়। গত দুদিনের হিংসাত্মক ঘটনায় আহত ব্যক্তির সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে শতাধিক নিরাপত্তারক্ষী। তিনজন পুলিশ কর্মী তাঁদের অস্ত্রসহ নিখোঁজ হয়ে যান। গতকাল তাঁদের মধ্যে দুজন ফিরে এসেছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার বুরহান ওয়ানি গত শুক্রবার নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পর শনিবার থেকে উপত্যকার দক্ষিণের জেলাগুলোতে অশান্তি শুরু হয়। বুরহানের দাফনে হাজার হাজার মানুষ যোগ দেয়। বিভিন্ন স্থানে উত্তেজিত জনতার সঙ্গে শুরু হয় নিরাপত্তা বাহিনীর খণ্ডযুদ্ধ। সবচেয়ে বেশি উপদ্রুত অনন্তনাগ, পুলুয়ামা, সোপোর ও কুলগাম জেলা। এসব জেলায় কয়েকটি থানাও আক্রান্ত হয়। লুট হয় অস্ত্র। পুলিশের গুলিতে শনিবারই মারা যান ১১ জন।
অশান্ত অবস্থা থাকে গতকাল পর্যন্তও। শাসক দল পিডিপি ও বিজেপির কয়েকটি অফিস আক্রান্ত হয়। দেদার পাথর ছোড়া হয় পুলিশকে তাক করে। পুলিশের গাড়িতেও আগুন লাগানো হয়। গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং দিল্লিতে তাঁর বাসভবনে কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকেন। শনিবারই নিরাপত্তা বাহিনীর দেড় হাজার বাড়তি সদস্য উপত্যকায় পাঠানো হয়। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মনে করে, উপত্যকায় পাকিস্তানি এজেন্টরা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলতে যাবতীয় ইন্ধন জোগাচ্ছে। গতকালের বৈঠকে ঠিক হয়েছে, কোনোভাবেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার সব রকম চেষ্টা করা হবে। গুলি চালানো হবে একেবারে উপায় না থাকলে। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু গতকাল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, নিহত বুরহান সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের নেতা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে হা-হুতাশ করার কোনো কারণই নেই। সমবেদনাও নেই। নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবারই গোটা উপত্যকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল পর্যন্ত তা বন্ধই ছিল। বন্ধ ছিল জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় সড়ক ও উপত্যকার রেল,
উপত্যকার সব স্কুল-কলেজ। বিভিন্ন পরীক্ষাও স্থগিত রাখা হয়েছে। শ্রীনগরে তেমন কোনো হিংসাত্মক ঘটনা না ঘটলেও শহরের পুরোনো এলাকাগুলোতে উত্তেজনা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি সবাইকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। পর্যটকেরা আটকে পড়েছেন। আশা করা হচ্ছে, আজ সোমবার থেকে জাতীয় সড়ক খুলে দেওয়া হলে সড়ক পথেও পর্যটকেরা জম্মু ফিরে যেতে পারবেন। উপত্যকার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা হরতালের যে ডাক দিয়েছিলেন, তা সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে দোকানপাটসহ অফিস-আদালত ওই দিন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মীরওয়াইজ ওমর ফারুক ও ইয়াসিন মালিককে শনিবার থেকেই গৃহবন্দী রাখা হয়। রাজ্য প্রশাসন ঠিক করেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত তাঁদের নজরবন্দী রাখা হবে। এই সময়ে ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা অমরনাথ যাত্রা করে থাকেন। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে তীর্থযাত্রীদের নির্ভর করতে হয় কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর। শনিবার এই যাত্রা বন্ধ করে দেওয়া হয় নিরাপত্তার স্বার্থে। গতকাল অবশ্য যাত্রা ফের শুরু হয়েছে।

‘ইরাক যুদ্ধ অবৈধ ছিল’

জন প্রেসকট
ইরাক যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে মন্তব্য করলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকট। ২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ওই যুদ্ধে ব্রিটিশরাও অংশ নেয়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ওই আগ্রাসনের দীর্ঘ ১৩ বছর পর এসে সানডে মিরর পত্রিকার একটি লেখায় প্রেসকট এই মন্তব্য করেন। এতে তিনি আরও লেখেন, তাঁকে বাকি জীবন ‘বিপর্যয়কর’ এ সিদ্ধান্ত মাথায় নিয়ে কাটাতে হবে। লর্ড প্রেসকট বলেন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের মতো গভীর দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে তিনি এখন একমত যে ওই যুদ্ধ ছিল অবৈধ। তা সত্ত্বেও ইরাক আগ্রাসনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। প্রেসকট বলেন, ২০০৩ সালের মার্চে ইরাক অভিযান শুরুর আগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে পাঠানো ব্লেয়ারের বার্তা, ‘যাই ঘটুক, আমি আপনার সঙ্গে আছি’—ছিল ‘বিধ্বংসী’। প্রেসকট বলেন, ‘এমন একটা দিনও কাটে না, যেদিন যুদ্ধে যাওয়ার ওই সিদ্ধান্তের কথা আমি ভাবি না।
যেসব ব্রিটিশ সেনা দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন দিয়েছেন বা আহত হয়েছেন; সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের মাধ্যমে আমাদের খোলা প্যান্ডোরার বাক্সের কারণে যে ১ লাখ ৭৫ হাজার বেসামরিক ইরাকি নিহত হয়েছে তাদের কথা না ভেবে এক দিনও পার হয় না।’ ওই যুদ্ধের জন্য দলের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের দুঃখপ্রকাশকে অভিনন্দন জানান প্রেসকট। প্রেসকটের ওই মন্তব্যের আগে গত বুধবার সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে ইরাকে হামলার যৌক্তিকতা ও ফলাফল নিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘চিলকট রিপোর্ট’ নামের ঐতিহাসিক এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনি ব্লেয়ারকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। ইরাক যুদ্ধে হতাহত ব্রিটিশ সৈন্যদের পরিবার ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মিলে যুক্তরাজ্য ইরাকে যে হামলা চালিয়েছে, সেটার কোনো যৌক্তিক বিবেচনার ভিত্তিতে ছিল না। দেশটিকে নিরস্ত্র করার শান্তিপূর্ণ উপায় পাশ কাটিয়ে ওই হামলা চালানো হয়। ভবিষ্যতে কোনো দেশে হস্তক্ষেপ বা হামলার আগে এই প্রতিবেদনের শিক্ষাগুলো বিবেচনায় রাখতে যুক্তরাজ্য সরকারকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ইরাকে হামলায় যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা অনুসন্ধান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সরকারের ভূমিকা তদন্তে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা স্যার জন চিলকটকে প্রধান করে ২০০৯ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটি দীর্ঘ সাত বছর পর তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ছেঁড়া তার, অপঘাত, দালান-রহস্য

ঈদের কয়েক দিন আগের ঘটনা। তখন ঈদ উপলক্ষে বাজার রমরমা। রংবেরঙের বাতি জ্বলছে। অসংখ্য যুবক-যুবতী, শিশু, বৃদ্ধ এস্কেলেটরে উঠছে-নামছে। এর মধ্যেই বিকট একটা শব্দ। সেই সঙ্গে আলো নিভে গেল, কাচগুলো ভেঙে পড়ছে। অন্ধকারে আত্মরক্ষার জন্য ছোটাছুটি, সুপারমার্কেট থেকে বেরোনোর জন্য আকুতি। মানুষের আর্তনাদ, চিৎকার। এস্কেলেটরগুলো বন্ধ। আলো নেই। কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পুরো মার্কেট। জানা গেল লিফট ছিঁড়ে ইতিমধ্যেই ছয়জন নিহত, আহত বেশুমার। এসব নতুন কিছু নয়। প্রতিনিয়তই চলছে আমাদের দেশে। প্রাণের মূল্য এ দেশে সবচেয়ে কম। বিদেশি লিফটে একটা সার্টিফিকেট টাঙানো থাকে: লিফটটিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন আছে অত তারিখ পর্যন্ত। বাড়ির মালিককে সেই তারিখের আগেই অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। এখানে সেসবের বালাই নেই। আগে লিফটগুলোতে একজন করে লিফটম্যান থাকত, এখন অধিকাংশ লিফট স্বয়ংক্রিয়।যেখানে বেশি লোক ওঠানামা করে সেখানকার লিফটের কর্মক্ষমতাও দেখা প্রয়োজন।
যেকোনো পশ্চিমা দেশে বা প্রাচ্যের উন্নত দেশগুলোতে দালান পরিদর্শকের একটি মূল্যবান পদ থাকে। এই পদে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা কাজ করেন। এই দালান পরিদর্শকের ক্ষমতা অনেক। পরীক্ষা করে যদি তিনি কোনো দালানে লিফট, পয়োনিষ্কাশন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা আপত্কালীন বেরোনোর পথে কোথাও কোনো ঝামেলা দেখেন, তাহলে অবিলম্বে দালানটি বাসের অযোগ্য বলে নোটিশ দিয়ে বসবাসকারীদের জানিয়ে দেবেন। তারপর দ্রুত দালানটিতে সিলগালা লাগিয়ে দেবেন। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা নিলে কত যে সিলগালা লাগত, তার হিসাব নেই। এ দায়িত্ব কি রাজউকের, সে সংস্থা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে? নাকি সিটি করপোরেশনের? জানি না এ কার দায়িত্বে পড়বে! এই যে কত মানবসন্তানের অপঘাতে মৃত্যু হচ্ছে শুধু কিছু মানুষের অবহেলায়, তার দায় কে নেবে? এই সংগত প্রশ্নের জবাবই বা কে দেবে? যে সুপারমার্কেটে লিফট ছেঁড়ার ঘটনা ঘটেছে সেখানে আগেও লিফটে ঝামেলা হয়েছে। কে মালিক এত বড় শপিং কমপ্লেক্সের?
তাঁর বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নিল, তাও আমরা জানি না। দালান-ঝুঁকিতে রয়েছে লাখ মানুষ। মাঝারি ভূকম্পনেই ঝুরঝুর করে পড়বে ওই সব স্থাপনা। সাম্প্রতিক এক ভূমিকম্পে বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান দালান সচিবালয়ের কর্মকর্তারা ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতার। কিন্তু ওই সব ক্ষমতাধর ব্যক্তি এসব অপঘাতে মৃত্যুর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? জবাব মেলে না। ফিরে আসি লিফট দুর্ঘটনার কথায়। লিফটের প্রযুক্তিগত দিকগুলো এখনো আমাদের প্রকৌশলীদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি? লিফটের সবকিছুই বিদেশ থেকে আনা। হাজার হাজার লিফট প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে। দুর্ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা লিফটে নিশ্চয়ই থাকে। সেই ব্যবস্থাটি কি লিফট রপ্তানিকারক কোম্পানির কাছ থেকে আমদানিকারক সঠিকভাবে বুঝে নেয়? লিফট ছেঁড়ার দৃশ্যত কোনো কারণ নেই। তবু ছিঁড়ে যায়, মানুষ মারা যায়। তবে কি গোড়ায় কোনো গলদ আছে? উন্নত দেশগুলোতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ লিফট লাগানোর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে এবং বছর বছর পরীক্ষা করে নিরীক্ষাপত্র দিয়ে থাকে। কোনো কোনো লিফট বিকল হয় এবং দুর্ঘটনার বড় কারণ অতি ব্যবহার ও অতিরিক্ত যাত্রীধারণ। বিদ্যুতের ঘাটতি থাকাতে প্রায়ই লিফট আটকে যায়।
আজকাল কিছু কিছু জায়গায় জেনারেটরের ব্যবস্থা আছে বটে। কখনো দেখেছি জেনারেটরে তেমন কেউ নেই অথবা জেনারেটর চালানোর লোকটি কোথাও গেছে। সেদিন একটি দালানের সাততলায় উঠেছি, বিদ্যুৎ চলে গেল। জেনারেটর নেই। কেউ কেউ হেঁটেই নিচে নামলাম, কিন্তু লিফটে আটকে থাকা লোকগুলোর কী হবে? অত্যন্ত আদিম উপায়ে তাদের নামানো হবে। অর্ধেক তলায় লিফট আটকে গেছে, দরজা খুলে লাফিয়ে নিচে নামবে যাত্রীরা। যদি তার মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা থাকেন তাহলে কী হবে? জেনারেটর ছাড়া যে লিফট ব্যবহার করা যাবে না, এই বিধান কি কোথাও আছে? যদি থাকে তাহলে তার প্রয়োগের প্রক্রিয়া কী? সেখানেও অদ্ভুত আঁধার! যেসব লিফটে একজন করে লিফটম্যান আছেন, তাঁরাও কতটা প্রশিক্ষিত? দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করার কৌশল কি তাঁদের জানা আছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রে আনকোরা অদক্ষ লোকেরাই এখানে কাজ করে থাকে। কিন্তু কন্ট্রোলে যাঁরা আছেন তাঁরাই–বা কতটা জানেন? এর আগেও শুনেছি লিফট কাত হয়ে গেছে, সবাই হয়তো মারা যাননি, যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা হয়তো জীবনে লিফট ব্যবহার করবেন না।
দিন দিন আকাশচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা বাড়ছে। আবাসিক দালানগুলোও তিরিশ-পঁয়ত্রিশ তলা হতে শুরু করেছে। সেখানে লিফট ব্যবহার অত্যাবশ্যক। এসব জায়গায় লিফট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে দালানটি কতটুকু বাসযোগ্য, কোথাও ফাটল ধরছে না, এসব দিকেও সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। কাত হওয়া দালানেও দেখা যায় মানুষ বসবাস করে চলেছে। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। আগামী এক যুগ পরে দিগন্তরেখায় নীল-সবুজ দেখা যাবে কি না সন্দেহ। হাট-বাজার, দালানকোঠায় ভরে যাচ্ছে শ্যামল বাংলাদেশ। ঢাকা শহরেও এখন দেশলাইয়ের বাক্সের মতো দালান। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটেও শুরু হয়েছে প্রবলভাবে। যা হচ্ছে তা অপ্রতিরোধ্য কিন্তু দালান নির্মাণের আইনকানুনের প্রয়োগ দেখা যায় না। দুর্নীতির সুযোগ থাকায় কোনো আইনি বাধ্যবাধকতাও কাজ করে না। শহরে উল্টো দিক থেকে গাড়ি চালালেও তার শাস্তি হয় না। নাগরিক সচেতনতা এ ক্ষেত্রে এত কম যে কেউ বাধাও দিচ্ছে না। উত্তরায় লিফটে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় সমাজে সর্বোচ্চ সচেতনতা সৃষ্টি করা, আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা।
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব।

‘বাংলাদেশি পন্থা’ বলে কিছু নেই

জুলাইয়ের ১ তারিখে ঢাকার আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক পাড়া গুলশানে সন্ত্রাসী হামলায় ২১ জনের (জঙ্গি ও পুলিশ ছাড়া) মৃত্যু বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি অভূতপূর্ব ও দুঃখজনক ঘটনা। আবারও ইসলামিক স্টেট হামলার দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার সেই পুরোনো বাগাড়ম্বর চালিয়েই যাচ্ছে, দেশে কোনো বিদেশি জঙ্গিগোষ্ঠী নেই। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষকই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আরও স্পষ্ট ও নতুন মনোভঙ্গি গ্রহণের ব্যাপারে জোর দিয়েছেন, যাতে দেশের মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো অনেক ধাঁধার উত্তর তো পাওয়াই যায়নি, উপরন্তু ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় আরেকটি হামলার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। এটা ঠিক যে সব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু দুটি ঘটনা আমলে নিয়ে আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু পর্যবেক্ষণ করতে পারি। প্রথমত, সন্ত্রাসী হামলার কৌশল ও ধরনে কোনো ‘বাংলাদেশি পন্থা’ নেই। একের পর এক ধর্মনিরপেক্ষ লেখক ও চিন্তকেরা খুন হওয়ার পর কিছু বিশ্লেষক এসবের মধ্যে ‘ব্যতিক্রম’ খুঁজে পেলেন। বড় হামলার মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি না হলেও এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মিল আছে, যাঁদের হত্যা করা হয়েছে তাঁদের ইসলামবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
ইসলামি চরমপন্থায় রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের ‘বিরোধিতাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার’ নীতিকে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসবাদের নতুন রূপ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। দৃশ্যত, এ ধরনের যুক্তি বাংলাদেশ সরকারের বাগাড়ম্বরের পক্ষেই যায়: আইএস ও আল-কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, দেশীয় গোষ্ঠীই এসব জিহাদি হামলা চালাচ্ছে। এ যুক্তির বিষয়টি মাথায় রেখেই এ দুটি হামলাকে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের হামলার সঙ্গে একই কাতারে ফেলতে হবে, যেগুলো করে হয় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন, না হয় তাদের অনুপ্রেরণাতেই তা সংঘটিত হয়। পরিণামে বাংলাদেশ সরকারকে শেষমেশ এটা স্বীকার করতে হবে যে আন্তর্জাতিক জিহাদি আন্দোলন দেশে এসে পৌঁছেছে।দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সরকার এখনো সময়মতো কাজ করার জন্য প্রস্তুত নয়। অপারেশন থান্ডারবোল্ট শুরু হয় আক্রমণের ১০ ঘণ্টা পর। এই বিলম্বিত (সফল) প্রতিক্রিয়ার কারণ নানাবিধ ও জটিল হতে পারে—দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, সামরিক-বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার ঘাটতি, রসদ ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি। শেষমেশ বলা যায়, সময় এসেছে, বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক জিহাদি আন্দোলনের হুমকি মোকাবিলা করতে হবে, আর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
সিগফ্রিড ও উলফ: জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক।