Saturday, July 26, 2014

ব্রিকস ব্যাংক কি বিশ্বব্যাংকের প্রভাব কমাতে পারবে? by ধীরাজ কুমার নাথ

ব্রাজিল, রশিয়া, ভারত, গণচীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃবৃন্দ ১৫ জুলাই ২০১৪ এক ঐতিহাসিক সভায় মিলিত হয়েছেন ব্রাজিলের ফোর্তালেজা শহরে। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত মনোরম এ শহরে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে আলোচনা শেষে অনেক প্রত্যাশা ও শুভেচ্ছা নিয়ে হাসিমুখে হাতে হাত রেখে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রৌসেফ, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা ব্রিকস ব্যাংক গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যাপক প্রতিশ্রুতি ও অপার সম্ভাবনার আশা ব্যক্ত করে পাঁচ দেশের নেতৃবৃন্দ ব্রিকস ব্যাংকের শুভযাত্রার সূচনা করলেন। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী শোরগোল শুরু হল বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবার সত্যিই কি প্রতিযোগিতার মুখে পড়ল? তাদের একছত্র আধিপত্য এবার বোধ হয় সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হল।

পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক ফাইল কার্টুন
সিদ্ধান্ত হয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো বিনির্মাণে চীনের বৃহৎ বাণিজ্য নগরী সাংহাইয়ে থাকবে এ ব্যাংকের সদর দফতর। ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট হবেন একজন ভারতীয়। বোর্ড অব গভর্নরের প্রথম চেয়ারপারসন আসবেন রাশিয়া থেকে এবং পরিচালনা পর্ষদের প্রথম প্রধান হবেন একজন ব্রাজিলিয়ান। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকবে এই ব্যাংকের আফ্রিকার আঞ্চলিক সদর দফতর। এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ব্রাজিলের অর্থমন্ত্রী গুইডো মনে করেন, ‘বিশ্বব্যাংকের কর্তৃত্ব বরাবরই ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকে। ব্রিকস ব্যাংক হবে গণতান্ত্রিক।’ সম্ভবত একটি ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাংক তার শুভ সূচনা করল।
ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ১০ হাজার কোটি ডলার, তবে প্রাথমিক মূলধন হবে ৫ হাজার কোটি ডলার। গণচীন দিবে ৪ হাজার ১শ’ কোটি এবং ব্রাজিল, ভারত ও রাশিয়া দিবে প্রত্যেকে ১ হাজার ৮শ’ কোটি ডলার করে। দক্ষিণ আফ্রিকা দিবে ৫শ’ কোটি ডলার। তবে পরিচালনা এবং ঋণদান বিষয়ক অনেক নিয়মাবলী পর্যায়ক্রমে আলোচিত হবে এবং সেভাবে সিদ্ধান্ত হবে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদির অভিমত হচ্ছে, শুরু থেকেই ‘একটি স্থিতিশীল, শন্তিপূর্ণ এবং ভারসাম্য অবস্থা বজায় রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে এবং সবার অভিমত গ্রহণ করে ব্রিকস ব্যাংক তার কাজ পরিচালনা করবে।’ ব্যাংকের সূচনালগ্নে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রৌসেফের বক্তব্য হচ্ছে- ‘ব্রিকস ব্যাংক এবং সঞ্চিত আমানতের চুক্তিতে আমরা যে স্বাক্ষর করেছি, তা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রশাসনের নতুন নকশা প্রদানে মূল্যবান অবদান রাখতে সক্ষম হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা চাই ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার। আইএমএফকে দ্রুত ভোটাধিকার কোটা পরিবর্তন করতে হবে। উদীয়মান দেশগুলোর গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে হবে।’
একটি গণতান্ত্রিক ধারার সূচনা করা এবং সবার অভিমত গ্রহণ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা ছাড়াও বিশ্বপরিমণ্ডলে নতুন অর্থনৈতিক প্রশাসনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে শতাব্দী ধরে আর্থিক বিশ্বে আধিপত্যবাদের অবসানের লক্ষ্যে ব্রিকস ব্যাংকের শুভযাত্রার মাধ্যমে উদীয়মান দেশসমূহ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের অঙ্গনে একটি অর্থবহ চ্যালেঞ্চ ছুঁড়ে দিল বলে অনেকেই মনে করেন।
ব্রিকস ব্যাংকভুক্ত ৫টি দেশের মোট জনসংখ্যা হচ্ছে বিশ্বের প্রায় ৪২ শতাংশ। বিশ্বের মোট পুঁজি বিনিয়োগে ১১ শতাংশ এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এই পাঁচটি দেশ থেকেই আসে। তাই বিশিষ্ট অর্থনৈতিক প্রজ্ঞাবান দার্শনিকদের ধারণা হচ্ছে, ব্রিকস ব্যাংকের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশাল এবং ব্যাপক। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মুন্সিয়ানা ও আধিপত্যবাদের সূর্য এবার অস্তমিত হবে। মাথানত করে প্রতিযোগিতার পরিমণ্ডলে তাদের টিকে থাকার লড়াই শুরু করতে হবে।
তবে কথা আছে। অর্থনীতির গতি প্রবাহ চলে নিজস্ব ধারায়। প্রশ্ন হচ্ছে, কী হারে এ ব্যাংক ঋণ দিবে। বিশ্বব্যাংক এখন তৃতীয় বিশ্বে বিশেষত বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ দেয়, যার সুদের হার হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ০.৭৫% অর্থাৎ ১% শতাংশেরও কম হারে। এ ছাড়াও বড় ধরনের সুবিধা হচ্ছে প্রায় ৪০ বছর পর এ ঋণ পরিশোধের তালিকায় আসে। বিশাল এক সুযোগ উন্মুক্ত করেছে বিশ্বব্যাংক। এ কারণেই বাংলাদেশের জনগণ পদ্মাসেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকে ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিনা সুদে জাইকার অর্থ গ্রহণে উৎসাহ পদর্শন করেছে। ব্রিকস ব্যাংক অবশ্য ঘোষণা করেনি কোন দেশ কোন ধরনের ক্ষেত্রে ঋণ সুবিধার আওতায় আসবে এবং অবকাঠামো নির্মাণে কেমন শর্তাবলী আরোপিত হবে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ যদি ব্রিকস ব্যাংকের সদস্য হয়, তবে বিনিয়োগের হার কী হবে এবং ভোটাধিকার থাকবে কিনা, সবই ভবিষ্যৎ বলে দিবে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের পরিচালনায় বিকল্প নির্বাহী পরিচালকের ভূমিকা পালন করে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের গভর্নিং বডির সদস্য।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকস গ্র“পের অর্থনীতিবিদ জিম ওনিল ৪টি দেশ নিয়ে ব্রিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ধারণার সূত্রপাত করেন। পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকা এতে সংযুক্ত হতে প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করায় এশীয়, আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার উদীয়মান দেশ হিসেবে ‘ব্রিকস ব্যাংকে’র ধারণা চূড়ান্ত করা হয়। লক্ষ্য করা যায়, ২০০৭ সালে এসব দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০.৭ শতাংশ যা বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। তবে বর্তমানে তা হ্রাস পেয়েছে সত্য; কিন্তু ব্যবসায়িক সাফল্য এবং রফতানির গতি-প্রকৃতিকে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে দেখে পশ্চিমা দেশসমূহ আতংকিত। তার উপর এমন একটি বিশাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা দেখে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনাবিদ এবং অর্থনীতিবিদগণ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন ।
আমরা তৃতীয় বিশ্বের আমজনতা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার এবং এসব ব্যাপারে আমাদের প্রতিবাদী কণ্ঠ তীব্র এবং কঠোর। আমরা পরিশ্রম করে আমাদের অগ্রগতি অর্জন করব, কারও অঙ্গুলির নির্দেশনা মানতে রাজী নই।
মূলত একটি ব্যাপক প্রতিযেগিতার সূত্রপাত করেছে ব্রিকস ব্যাংক। বিশ্ববাসী অবশ্যই অথনৈতিক সম্প্রসারণবাদের অবসান দেখতে পারে এবার। উদীয়মান অর্থনীতির দেশসমূহ বিশ্ব অর্থনৈতিক অঙ্গনে অবশ্যই প্রভাব বিস্তার করবে। তাই গোল্ডম্যান গ্র“পের জোহানসবার্গ শাখার প্রধান কলিন কোলম্যান মনে করেন, ‘কূটনৈতিকভাবে এবং আর্থিকভাবে আমরা এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উদীয়মান বাজারের অংশীদার।’
তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এ জাতীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগকে কিভাবে প্রভাবিত করে তা বুঝে ওঠা কঠিন। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে। ইউক্রেন প্রশ্নে ভারত বা গণচীন বা ব্রাজিল নীরব থাকলেও সবার ভাবনা এক নয়। মালয়েশিয়ার বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে ১৭ জুলাই বিকাল ৫টায় এবং ২৯৫ জন আরোহীর সবাই নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, সে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিনতাবাদীরা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বিমানটি ভূপাতিত করেছে। এভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন ভিন্নরূপ নিতে চলেছে। ব্রাজিলের নির্বাচন সামনে। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, এসব রাজনৈতিক ব্যতিক্রমধর্মী কর্মকাণ্ড ব্রিকস ব্যাংকের মহান উদ্যোগকে প্রভাবিত করে তার অভীষ্ট পূরণে সহায়তা করবে কি-না।
সবকিছুর মাঝে নতুন ব্যাংকের যাত্রা শুভ হোক, বিশ্ব পরিমণ্ডলে, অর্থনৈতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতা তীব্র হোক। অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদের অবসান হোক, এই আমাদের প্রত্যাশা।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা,সাবেক সচিব, কলাম লেখক
dknath888@gmail.com

কী ঘটবে ঈদের পর? by আহমেদ সুমন

এবার বৈশাখে ‘কালবৈশাখী’র তাণ্ডব তেমন লক্ষ করা যায়নি। বর্ষায় পাহাড় ধসের দুঃসংবাদও পাওয়া যায়নি। ঈশান কোণে কালো মেঘমালা ভেসে বেড়িয়েছে বটে, তবে তা জনমনে আতংক সৃষ্টি করেনি। এসবই আমাদের জন্য ভালো খবর। এ ভালো খবরের মধ্যেও আমরা পুরোপরি শংকামুক্ত নই। আবহাওয়া ও জলবায়ুর এ আচরণ মানুষের মনে আতংক সৃষ্টি না করলেও রাজনীতির ঈশান কোণে কালো মেঘমালা ভেসে বেড়াচ্ছে কি-না, তা নিয়ে ভাবনায় বুক ধড়ফড় করছে।
এ বুক ধড়ফড় করা নিয়ে যে সংবাদ সূচনা লেখা হয় তাকে স্ট্যাকাটো (Staccato) সংবাদ সূচনা বলা হয়। সাংবাদিকতার পরিভাষায় নানা ধরনের সংবাদ সূচনার মধ্যে ‘স্ট্যাকাটো’ সূচনা একটি। স্ট্যাকাটোর ইংরেজি আরও সমার্থক শব্দ হলshort, clipped, separate, characterized by short abrupt sounds, as in speech, a staccato from staccare to detach ইত্যাদি। সাংবাদিক আতাউস সামাদ স্ট্যাকাটো সংবাদ সূচনার উদাহরণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘ঈশান কোণে কালো মেঘ। হঠাৎ ঝড়ো বাতাস। একটা প্রচণ্ড ঢেউ। উল্টে গেল সাম্পান। যাত্রীরা সব নিখোঁজ।’ তাহলে দেখা যাচ্ছে, স্ট্যাকাটো সূচনার বাক্যগুলো ছোট ছোট কিন্তু কাটা কাটা। মনে ধাক্কা দেয়। ভয় তৈরি করে। রাজনীতির ময়দানে এখন সরকারি দল এবং বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে কাটা কাটা শব্দের ব্যবহারে আমরা শংকিত। রাজনীতির ঈশান কোণে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। ঈদের পর যদি এর বজ বর্ষণ হয়, তা থেকে আমরা কেউই রেহাই পাব না। ঈদের পর নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি আন্দোলনের যে মহাপরিকল্পনার কথা জানাচ্ছে, তাতে ‘না জানি কী হয়’, শংকা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।
ঈদের পর আন্দোলনের ভাবনা আমাদের শংকায় ফেলে দিলেও ঈদপূর্ব রোজার মাসে এক সম্প্রীতির পরিবেশ বিরাজমান। ইফতারকে কেন্দ্র করে এ সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। রোজার মাসে ইফতারের রাজনীতি বাংলাদেশের দীর্ঘকালের সংস্কৃতি। ছোট-বড় রাজনৈতিক দলগুলো এ মাসে ইফতারের আয়োজন করে। সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতারা থেকে শুরু করে ভিন্ন মত বা প্রতিপক্ষ দলের রাজনৈতিক নেতাদেরও ইফতার পার্টিতে দাওয়াত দেয়া হয়। বছরজুড়ে বৈরী সম্পর্ক ভুলে গিয়ে একে অপরের দাওয়াত কবুল করেন এবং সময়-সুযোগ পেলে ইফতার পার্টিতে অংশগ্রহণও করেন। রাজনীতির এ সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে সাম্প্রতিককালে এখানেও খানিকটা নেতিবাচক দিক যুক্ত হয়েছে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতারা পরস্পরকে ইফতারের দাওয়াত দেন বটে তবে তাতে কেউ অংশগ্রহণ করেন না। সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে সেনাকুঞ্জে এ দুই দলের সভানেত্রী ও চেয়ারপারসন আগে যেতেন এবং পাশাপাশি বসে সশস্ত্র বাহিনীর অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। তারও এখন মাঝে মধ্যে ব্যত্যয় ঘটছে। এ দুই দলের বৈরিতা এখন এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা সশস্ত্র বাহিনীর দিবসের অনুষ্ঠানেও যান না। এ কারণে পরস্পরের মধ্যে মুখ দেখাদেখির সুযোগও ঘটে না। এবারের রোজায়ও সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একে অপরকে ইফতারের দাওয়াত দিয়েছিল। কিন্তু কেউ কারও দাওয়াতে অংশগ্রহণ করে ন্যূনতম সৌজন্যবোধের স্বাক্ষর রাখেনি। রাজনীতির এ কদর্য রূপ আমরা বিগত দুই দশক ধরে লক্ষ করছি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এরশাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রূপরেখা অনুযায়ী তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও নির্বাচনে বিজিত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সরকারকে একদিনের জন্য হলেও শান্তিতে থাকতে দেবে না বলে জানায়। বাস্তবে হয়েছেও তাই। এখন বিএনপি রমজান মাসজুড়ে বিভিন্ন সভা, সমিতি ও ইফতার পার্টিতে ঈদের পর সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। ঈদের পর আন্দোলনের এ হুমকি-ধামকিতে চিন্তায় না পড়ে উপায় কী?
বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবিতে সরকারকে আলোচনা শুরুর করার দাবি জানিয়ে আসছে। সরকার এ দাবি বিবেচনায় না এনে সরকারের মেয়াদ ৫ বছর শেষ করার কথা ভাবছে। এ লক্ষ্যে ঈদের পরে বিএনপির আন্দোলনের হুমকি-ধমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না। সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিএনপিকে কাগুজে বাঘ বলে মনে করে। আগের দফাগুলোয় বিএনপি আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও ছাড়া কার্যত কিছু করতে পারেনি। বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে নামেনি। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপির ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পুরোপরি ফ্লপ হয়েছে। আলোচিত বালুর ট্রাক দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন ঘেরাও করে তাকে পল্টনের দলীয় কার্যালয়ে যেতে পুলিশ বাধা দিলে দলীয় নেতাকর্মীরা কেউ এসে পুলিশি বাধা ভাঙার চেষ্টা করেনি। দলের এ নাজুক অবস্থা অনুধাবন করে বিএনপি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের ক্ষেত্রে অনেকটা নমনীয় হয়ে সর্বশেষ হাসিনা বাদে অন্য কাউকে সর্বদলীয় সরকারের প্রধান করার আন্দোলনে এসে পৌঁছেছিল। বিএনপি ঈদের পর যদি নবউদ্যমে আবার আন্দোলন শুরু করে, সেক্ষেত্রে সরকারি দলও বসে থাকবে না বলে জানাচ্ছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তারা শোডাউন করবে এবং রাজপথ দখলে রাখবে। এমন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে মানুষ নির্ভাবনায় থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও একটি বড় রাজনৈতিক দল। সংসদ নির্বাচনে এ দুই দলের প্রাপ্ত ভোটের কাছাকাছি থাকে। বিএনপি ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহতের ডাক দিয়ে বর্জন করেছিল। প্রতিহত করতে না পারলেও বর্জনে অটল ছিল। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিএনপি যে সরকার গঠন করত না, তা কে বলতে পারে? নির্বাচনপূর্ব ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করেছিল। সুতরাং বিএনপির অংশগ্রহণবিহীন সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে এক প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যেসব রাষ্ট্র নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল, তারা মনোভাব যে খুব একটা বদলেছে তা মনে হয় না। আওয়ামী লীগ মার্কিন বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মনে করত। কারণ তার অভিমত বিএনপির পক্ষে যেত। তিনি বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছেন। মার্শিয়া স্টিফেন ব্লুম বার্নিকাট ঢাকায় ড্যান মজিনার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। তিনিও নির্বাচনের বিষয়ে অভিন্ন মত পোষণ করেছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে তিনিও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। মার্কিন নয়া রাষ্ট্রদূত সব দলের অংশগ্রহণে নতুন করে নির্বাচনের লক্ষ্যে সংলাপ শুরুর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। চীনও নির্বাচন প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। তবে সম্প্রতি শেখ হাসিনা চীন সফর করে এ বিষয়টি ঘষামাঝা করেছেন।
ঈদের পর রাজনীতিতে বিএনপির আন্দোলনের যে হুমকি, তার বাস্তবে প্রতিফলন যাই ঘটুক না কেন, জনসাধারণের মনে স্বস্তি এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশের স্বার্থে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংলাপ হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সফল সংলাপের মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এতে কোনো পক্ষেরই পরাজয়ের কোনো গ্লানি ধাকবে না। দেশের স্বার্থই সর্বাগ্রে বিবেচনার রাখা উচিত। এ বিবেচনাবোধ জাগ্রত হওয়ার মধ্যে দেশের মঙ্গল, অন্যথায় ঈদের পর তো বটেই, নিয়মিত বিরতিতে আগামীতে জনসাধারণকে দুঃখ-দুর্ভোগ পোহাতে হবে। বিএনপি নিয়মিত বিরতিতে দম নিয়ে মাঝে মধ্যেই আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। এর অবসান হওয়া জরুরি।
আহমেদ সুমন : গবেষক ও বিশ্লেষক
asumanarticle@gmail.com

জায়নবাদ, আত্মপরিচয় ও ইতিহাস পাঠ by ফরহাদ মজহার

গাজার হত্যাযজ্ঞের পরিপ্রেক্ষিতে বেশকিছু বিষয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। খুবই গোড়ার প্রশ্ন যেমন জায়নবাদ (Zionism), জায়নবাদী (Zionist) ইত্যাদি ব্যাপারগুলো আসলে কী, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা বাংলাদেশে নেই। এ বিষয়ে খুব একটা আলোচনা কিংবা তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ চোখে পড়ে না। সে কারণে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, জায়নবাদের সঙ্গে ইহুদিদের সম্পর্ক কী, ইসরাইলের বিরোধিতা করার অর্থ আসলে ইহুদিদের বিরোধিতা কিনা- ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন অপরিচ্ছন্ন জায়গায় পড়ে রয়েছে।

জায়নবাদী বা জায়নিস্টের সঙ্গে হজরত মূসার (আ.) ধর্মানুসারী ইহুদির কোনো সম্পর্ক নাই- এটা বোঝা কঠিন কিছু নয়। অতএব জন্মসূত্রে কেউ ইহুদি হলেই তিনি জায়নবাদী হবেন এমন কোনো কথা নাই। বরং জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের তিনি ঘোরতর বিরোধী হতে পারেন। নরম্যান ফিঙ্কেলস্টাইন, নোয়াম চমস্কিসহ জন্মসূত্রে বিস্তর ইহুদি রয়েছেন যারা ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রাম শুধু নয়, দুনিয়ার সব মজলুমের পরীক্ষিত মিত্র। এমনকি গোঁড়া ইহুদিও অনেকে আছেন যারা ঘোরতরভাবে জায়নবাদবিরোধী। ফলে জায়নবাদ বা জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা ইহুদিবিরোধী হয়ে গেলাম কিনা খামাখা সেই ভদ্রলোকি দুশ্চিন্তায় পড়ার কোনো কারণ নেই। সেটা সামাল দিতে গিয়ে বিশ্বাস ও মতাদর্শের দিক থেকে যারা ইহুদি মতাবলম্বী, তারা কিভাবে তাদের মতকে একালে হাজির করছেন, তা বিচারের বাইরে রেখে দেয়া সমীচীন নয়। শুধু ইহুদি ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে নয়, যে কোনো ধর্মতত্ত্ব বা মতাদর্শ সম্পর্কেই এটি সত্য।
ইহুদি বিদ্বেষ বা ঘৃণাকে অ্যান্টি-সেমিটিজম বলে গণ্য করা হয়। কেউ যদি নিজের ইহুদি পরিচয় নির্মাণ করতে গিয়ে মনে করে, সেমিটিক ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাদেরই একমাত্র অধিকার, আরবের অন্য কোনো জাতি বা ভাষাগোষ্ঠী নয়, তাহলে সেটা নতুন জটিলতা তৈরি করে। একইভাবে আরবি ভাষা শুধু মুসলমানদের ভাষা এই দাবিও সমস্যার। কারণ ইহুদিরাই নৃতাত্ত্বিক ভাষাগতভাবে সেমিটিক জাতি নয়।
মুশকিল হচ্ছে, ইহুদি পরিচয় শুধু ধর্মীয় পরিচয় নয়, এর সঙ্গে জাতিগত পরিচয় বা বংশলতিকার দাবি নিহিত রয়েছে। আরব দেশে বংশ, গোত্র ও জাতির তর্ক ও রক্তাক্ত বিরোধের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, তিক্ত ও সহিংস। গোড়ায় কে রানীর আর কে বাঁদির গর্ভ থেকে জন্ম, সেই তর্কের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী যুক্ত। কারা হজরত ইব্রাহিমের (আ.) প্রথম স্ত্রী সারার বংশলতিকা বহন করছে আর কে সারার বাঁদি হাজেরার- এই তর্ক বাদ দিলে একেশ্বরবাদী ধর্মতত্ত্বের মধ্যে বিরোধের গোড়ার জায়গা আমরা ধরতে পারব না। অভিজাতদের বিরুদ্ধে বাঁদির বংশের দীর্ঘ লড়াইকে আমরা কোনো আধুনিক মানবতাবাদী বয়ান দিয়ে মুছে ফেলতে পারব না। এটা ইতিহাস। ধর্মতত্ত্ব নয়। এর সমাধানের হদিস সেই ইতিহাস জানা ও বোঝার ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসের এই অমীমাংসিত বিষয়টি এখনও অমীমাংসিতই রয়েছে। মীমাংসা হয়নি। কারণ জাত, পাত, উচ্চশ্রেণী ও অভিজাততন্ত্রের পক্ষপাতী রানীর বাচ্চাদের বিরুদ্ধে মজলুম বাঁদির বাচ্চাদের লড়াই একালেও পুরামাত্রায় বহাল আছে। শুধু ধর্মতত্ত্ব দিয়ে সেটা বোঝা যাবে না। আরব দেশে একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর মধ্যে সবার শেষে যার আবির্ভাব ঘটেছে, কেন সেটা সব ধরনের অভিজাততন্ত্র, গোত্রবাদ, রক্ত-বর্ণসহ সব ধরনের জাতিবাদ, গোষ্ঠীবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে জিহাদ হিসেবে উদিত হয়েছে তার মর্ম ঘূণাক্ষরেও আমরা ধরতে পারব না যদি এই ইতিহাসের মধ্যে আমরা প্রবেশ না করি। ইতিহাসের সেই মর্ম ভুলে গিয়ে মুসলমানরা যেভাবে মজলুমের লড়াইকে এখন নিছকই ইহুদি-নাসারার বিরুদ্ধে জিহাদে পর্যবসিত করেছে, সেই করুণ ও সাম্প্রদায়িক অধঃপতনের কিছুই আমরা ধরতে পারব না। এর অর্থ, জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগে ফিরে গিয়ে খোদ ইসলামকেই বিপন্ন করে তোলা।
ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন তত্ত্ব ও ধর্মীয় আত্মপরিচয় নতুন জটিলতা তৈরি করে। অথচ এই ইসলামই নিঃসংকোচে ও নিঃশর্তভাবে অন্যসব ধর্মের নবী-রসুল তো বটেই, এমনকি বিভিন্ন জাতির পথপ্রদর্শকদের মেনে নিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। কারণ প্রত্যেককেই আল্লাহর তরফেই মানুষকে সুপথে আনার জন্য পাঠানো হয়েছে। হজরত ঈসা (আ.) আর হজরত মুসা (আ.) উভয়েই আল্লাহর নবী। একজন কলিমুল্লাহ, অন্যজন রুহুল্লাহ। এঁদের নবী ও রসূল না মানলে মুসলমান হওয়া যায় না। ইসলাম সাক্ষী- একইভাবে নিপীড়িত, মজলুম ও বাঁদির বাচ্চা বলে ইতিহাসে যাদের সব সময় বর্জ্য হিসেবে সমাজের তলানি বা প্রান্তসীমায় নিক্ষেপ করা হয়, তাদের পক্ষে জিহাদ ছাড়া নিজেকে মোমিন দাবি করার কোনো হক কারও নাই।
এই উপমহাদেশেও আমরা দেখি, জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েই ইসলাম এসেছে, নিছক ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব আকারে আসেনি। এসেছে অজাতের কিংবা শূদ্রের মুক্তির বাণী হিসেবে। সেই ইতিহাস আমরা ভুলে গিয়েছি বলে এ উপমহাদেশ থেকে জাতপাতের বর্বর অত্যাচার উৎখাত করা যায়নি। মুসলমানরা তাদের ধর্মের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ভুলে গিয়ে একে নিছকই ধর্মতত্ত্বে পরিণত করেছে। ব্রাহ্মণ্যবাদ নতুন শক্তি হিসেবে উপমহাদেশে পুনর্গঠিত হতে পেরেছে। এখন পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে তাদের নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদকে মোকাবেলা করতে হবে। ইতিহাস বেমালুম ভুলে গিয়ে এক হাতে কোরআন আর এক হাতে তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে মোকাবেলা অসম্ভব- কামিয়াব তো দূরের কথা। সেটা আগাম বলে রাখা যায়।
তাহলে জন্মসূত্রে কেউ ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুসলমান দাবি করলেও সেটা বিস্তর জটিলতা তৈরি করে। সবাই থাকুক নিজ নিজ ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আর আমরা ধর্মীয় সম্প্রীতির সানাই বাজাই, ব্যাপারটা এত সরল বা সহজ নয়। আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রে নিজের ইতিহাস সে কিভাবে পড়েছে, জেনেছে ও আমলে নিয়েছে- তার হদিস নেয়ার প্রশ্ন থেকে যায়। এটা সেকুলারিজম বনাম রিলিজিয়নের তর্ক নয়; তর্ক নয় ধর্ম কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার। অনৈতিহাসিক জায়গা থেকে ধর্মকে নিছকই ধর্মতত্ত্ব হিসেবে মেনে নেয়ার অর্থ ইতিহাসের অভিমুখ অস্পষ্ট করে দেয়া। কী অর্থে নিজের পরিচয় প্রদান, ইতিহাসের কী পাঠ নিয়ে ধর্মের দাবি- তার হদিস নেয়া দরকার হয়ে পড়ে।
ইসলামে জন্মসূত্রে মুসলমান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুধু কলেমা পড়লেই চলে না, যিনি ইসলাম গ্রহণ করতে চান তাকে সাক্ষ্য দিতে হয়। অর্থাৎ তিনি কী গ্রহণ করলেন, কী বর্জন করলেন, তা তিনি ঠিক উপলব্ধি করেছেন সেই সাক্ষ্য। আখেরি নবীকে রসূল বলে মেনে নিলেই চলছে না, তাঁর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের যে বিশেষ মুহূর্ত হাজির হয়েছিল তার অর্থ উপলব্ধি করতে পারি কি-না সেই পরীক্ষা দেয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে- সাক্ষী দেয়ার অর্থ সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকা, তার ঐতিহাসিক অর্থ কবুল করা।
দুই
ইতিহাসের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছাড়া শুধু ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের মুশকিল আছে। তেমনি ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বকে ঐতিহাসিকভাবে পাঠ না করার চেয়ে আহাম্মকি আর কিছুই হতে পারে না। এই মুশকিলগুলো মেনেও বলা যায়, ইহুদি আর জায়নবাদী এক কথা নয়। ঠিক যেমন কেউ মুসলমান, হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করলেই তিনি সাম্প্রদায়িক হন না। তার পরিচয়ের ঐতিহাসিক পাঠ তার কাছে কেমন সেটা তার সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চায় ধরা পড়ে।
জায়নবাদীরা মনে করে, ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করে একটি সার্বভৌম ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করা একটি ভালো চিন্তা। এই রাষ্ট্র আইন করে ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানের চর্চার মাধ্যমে ইহুদিদের জন্যই একটি হোমল্যান্ড কায়েম করবে। পিতৃভূমি বা মাতৃভূমি- সেটা যাই হোক। এটাই ইউরোপে ইহুদিরা যে বিদ্বেষ, ঘৃণা ও নির্যাতন সহ্য করেছে তা মোচনের একমাত্র উপায়। একটি দেশের অধিবাসীদের বাড়িঘর থেকে উৎখাত করে তাদের ভূখণ্ড দখল করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় সেখানে জায়নবাদী রাষ্ট্র কায়েম করা, এটাই ইউরোপের ও ইহুদিদের সমস্যার সমাধান। সেই দেশে ইহুদিরা স্থানীয় অন্য ধর্মবিশ্বাসী অধিবাসীদের কাছ থেকে আলাদা থাকবে। এই চিন্তার ভিত্তিতেই আরবদের দেশ ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের ভূমি ও রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে- জায়নবাদের এটাই যুক্তি। এ যুক্তির পক্ষে ন্যায্যতা কী? আল্লাহর সঙ্গে ইহুদিদের চুক্তি হয়েছে, সেটা বাইবেলে ও ইহুদি ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে। জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ইহুদিদের, এটা এখন আমাদের সবাইকে মানতে হবে।
অথচ জায়নবাদী নেতাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সেকুলার, ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক। জায়নবাদের সঙ্গে এ দিক থেকে ধর্মবিশ্বাসী ইহুদির বড়সড় পার্থক্য আছে। এই সেকুলার বা নাস্তিক ইহুদিরা দাবি করে, ইহুদিরা একটি নির্যাতিত জাতি। অতএব, তাদের এই সংগ্রাম নির্যাতিত জাতির মুক্তি সংগ্রাম। কিন্তু এ যুক্তিও ধোপে টেকে না। কারণ জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ বা জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি ভূখণ্ডের নির্যাতিত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মুক্তি সংগ্রাম। পরাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
সেই যুদ্ধ দূরে থাকুক, জায়নবাদ তার ঠিক উল্টোটা করে। তারা সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় একটি ভূখণ্ডের স্থানীয় অধিবাসীদের উৎখাত, হত্যা কিংবা বসতবাটি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের দেশ দখল করে নেয়। সেখানে বসতি স্থাপন করে। বিতাড়িত স্থানীয় অধিবাসীদের স্থান হয় শরণার্থী শিবিরে। যে কারণে ইউরোপে ইহুদিদের নির্যাতনের বিরোধিতা আর নির্যাতনের সমাধান হিসেবে জায়নবাদ ও ইসরাইল রাষ্ট্র কায়েম এক কথা নয়। জায়নবাদ একটি সেটলার কলোনিয়াল রাষ্ট্রের মতাদর্শ। জায়নবাদীদের প্রথম সারির সংগঠন তাদের মেমোরেন্ডামে লিখছে :
জুয়িশ ন্যাশনাল ফান্ড (Jewish National Fund) গঠিত হয় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জমি দখল করার দরকারে। তারা তাদের প্রথম দিককার মেমোরেন্ডামে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলছে : 'to purchase, take on lease or in exchange, or otherwise acquire any lands, forests, rights of possession and other rights...for the purpose of settling Jews on such lands. জমি হোক, বনভূমি হোক ইহুদিদের জন্য তা কেনা হবে, লিজ বা অন্য যে কোনোভাবে জমির অধিকার কায়েম করা হবে। সেটা বিনিময় হতে পারে কিংবা অন্য কোনোভাবে, অর্থাৎ বল প্রয়োগের মাধ্যমে। ইসরাইল আসলে এ কারণেই একটি সেটলার কলোনিয়াল রাষ্ট্র। স্থানীয় অধিবাসীদের বিতাড়িত করে সেখানে বাইরে থেকে লোক এনে বসতি গেড়ে বসা।
জায়নবাদ ও সেটলার কলোনিয়াল রাষ্ট্রের মতাদর্শ যখন দানা বাঁধছে, তখন ইংল্যান্ড ও আমেরিকা নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন ঐক্য গঠন করতে গিয়ে চুক্তি করেছিল, কেউ আর অন্য দেশ দখল বা উপনিবেশ স্থাপন করবে না। সে প্রতিশ্র“তি রুজভেল্ট ও চার্চিল স্বাক্ষরিত আটলান্টিক চার্টার নামে পরিচিত। উপনিবেশ স্থাপনের যুগ অস্ত গেলেও সাম্রাজ্যবাদ নতুনভাবে সেটলার কলোনিয়াল রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে। ইসরাইলকে যে কারণে সাম্রাজ্যবাদ থেকে আলাদা করে বিচার করা যাবে না।
জায়নবাদ ও ইহুদি সমার্থক নয় এটা পরিষ্কার। জায়নবাদ বিরোধিতার অর্থ ইহুদি বিরোধিতা নয়। কিন্তু ইহুদি, মুসলমান, হিন্দু, জৈন কিংবা খ্রিস্টান- কেউই ইতিহাসের বাইরে নয়। এমনকি আল্লাহর কী কুদরত, নাস্তিক বা ধর্ম-বিরোধিরাও নয়!! প্রগতিশীল কী প্রতিক্রিয়াশীল, প্রত্যেকেই ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই নিজেদের স্বরূপ প্রদর্শন করে।
গাজায় জায়নবাদী রাষ্ট্র যখন মানুষ হত্যার উৎসবে মেতে উঠেছে, সেই রক্তের শামিয়ানার নিচে আমরা মজলুমের পক্ষে দাঁড়িয়ে কে কিভাবে ইতিহাস পাঠ করি, তার দ্বারাই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
এটা নিশ্চিত বলা যায়। অবশ্যই।
২৫ জুলাই ২০১৪, শ্যামলী, ঢাকা

গাজায় মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে

যুদ্ধবিরতির পর গাজার ধ্বংসস্তুপ থেকে শত শত লাশ বেরিয়ে আসছে। উদ্ধারকর্মীরা ৬ ঘণ্টায় দেড় শতাধিক লাশ উদ্ধার করেছে। এ নিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরতায় গাজায় মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে
এর আগে ইসরাইল ও হামাস গাজায় ১২ ঘণ্টার এক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। মূলত মানবিক কারণে শনিবার সকাল থেকে এই বিরতি নেয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়। শনিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে জানা গেছে। খবর বিবিসি।
যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলছে, ইতোপূর্বে গাজা থেকে যাদের সড়ে যেতে বলা হয়েছে তাদের ফিরে আসা উচিত হবেনা। আর আঘাত করা হলেই পাল্টা আঘাত করা হবে।
মানবিক দিক বিবেচনায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি এক সপ্তাহের জন্য যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারো প্রস্তাবেই সাড়া দেননি নেতানিয়াহু। ইসলায়েলের প্রতিরক্ষা দফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইয়ালুন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ১২ ঘন্টার যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়েছেন। নেতানিয়াহু ১২ ঘন্টার যুদ্ধ বিরতির বিষয়টি শনিবার জন কেরিকে অবহিত করেছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এদিকে, গাজায় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে হামাস। আর ইসরায়েলের বিমান বাহিনী আক্রমন অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ)। তাদের দাবি, শুক্রবার তারা একজন ইসলামী জঙ্গীকে হত্যা করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন বলেছেন, আর সময় নেই। ৪৭ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ এবার চিরতরে বন্ধ করার সময় এসেছে। তিনি বলেন, আলোচনায় বসার জন্য একটি পথ খুঁজে বের করতেই হবে। আগে আরও দুইবার গাজা নিয়ে সংঘর্ষ চলার সময় যেভাবে শান্তি আলোচনা চলেছে এবারে আর সেরকম হলে চলবে না। চলমান এই যুদ্ধই আমাদের বলে দিচ্ছে যে, ৪৭ বছর ধরে চলা যুদ্ধ এবারে একেবারেই সমাপ্ত করে অবরুদ্ধ গাযাকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি দেবার সময় এসেছে। তিনি বলেন, চলমান লড়াইয়ে এটা স্পষ্ট যে এর কোন সামরিক সমাধান নেই। তবে গাযায় যা চলছে তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
ওদিকে গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণের প্রতিবাদে পশ্চিম তীরে যে বিক্ষোভ হয়েছে সে সময় ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মিদের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। বেইত ফাজর নামের এলাকায় এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পার্শ্ববর্তী বেথেলহোমে নিরাপত্তা রক্ষীদের লক্ষ্য করে পাথর ও পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করা হলে জবাবে রাবার বুলেট ছোড়ে ইসরায়েলি নিরাপত্তা রক্ষীরা। রামাল্লা, নাবলুস এবং হেবরণের কাছে গ্রামেও বিক্ষোভ হয়েছে।
উল্লেখ্য, গাজা থেকে ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপ বন্ধের ধুয়া তুলে গত ৮ জুলাই ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী (আইডিএফ)। এই অভিযান প্রথম দিকে আকাশ ও নৌপথ থেকে বোমা নিক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ১৭ জুলাই স্থল অভিযান শুরু হয়। সহস্রাধিক প্রাণহানি ছাড়াও অভিযানের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছে এক লাখের বেশি ফিলিস্তিনি।

হামাসের সামরিক শাখা ‘আল কাসসাম’ বিগ্রেড -একটি পিস্তল থেকে সুসজ্জিত সেনাবাহিনী

১৯৯০ সালের আগে হামাসের সামরিক শাখা সবার কাছে অপরিচিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সে বছরে এ সামরিক শাখার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৫ সালে ফিলিস্তিনের শহর ইয়া’বাদ এ ব্রিটিশ সৈন্যদের গুলিতে নিহত সিরিয়ান মুক্তি আন্দোলনের নেতা শহীদ ‘এজ্জেদিন-আল-কাসসাম’-এর নাম অনুসারে এ সামরিক শাখার নাম দেয়া হয় ‘আল কাসসাম’ বিগ্রেড।
১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি এই বিগ্রেড তাদের প্রথম অপারেশনের ঘোষণা দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এ ঘোষণায় বলা হয়, কফরদরম স্থাপনায় দরন সশান নামের একজন ইহুদি পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘোষণার মাধ্যমে আল-কাসসাম বিগ্রেডকে হামাস তাদের সামরিক শাখা হিসেবে ঘোষণা করে।
শুরুতে সীমিতসংখ্যক সৈন্য নিয়ে শুরু করা এ বিগ্রেড এখন গাজার একটা বড় অংশজুড়ে আছে। কিন্তু পশ্চিমতীরে তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

নিজেদের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রচারিত এক বুলেটিন অনুসারে কেবল গাজাতেই তাদের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। এটি একটি সত্যিকারের সেনাদল যেটিতে সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে কোম্পানি, ব্যাটালিয়ন এবং বিগ্রেড।
বুলেটিন এ ঘোষণা দেয়া হয়, নর্দার্ন গাজা বিগ্রেড, গাজা বিগ্রেড, সেন্ট্রাল গাজা বিগ্রেড এবং সাউর্দার্ন গাজা বিগ্রেড নামে আল-কাসসামের চারটি বিগ্রেড আছে। এ সামরিক শাখা প্রথমে একটি পিস্তল নিয়ে শুরু হয়, এরপর অস্ত্রাগারে যোগ হয় একটি রাইফেল এবং এরপরে নিজেদের তৈরি মেশিনগান। ধীরে ধীরে ‘হোয়াজ’ এর মতো বিস্ফোরক যন্ত্র, আÍঘাতী হামলার জন্য বেল্ট এবং দূর থেকে হামলার জন্য বিস্ফোরক যন্ত্র যোগ হয়।
আল-কাসসাম বিগ্রেড ২০০১ সালের ২৬ অক্টোবর স্থানীয়ভাবে তৈরি রকেট দিয়ে ইসরাইলের ‘স্টেরট’ স্থাপনায় হামলা চালায়। এই রকেটের নাম ছিল ‘কাসসাম-১’। এটিকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন ‘একটি পুরোনো রকেট যেটি মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিতে পারে’ শিরোনাম প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
দ্রুতই ‘কাসসাম-২’ উদ্ভাবিত হয় যেটি ২০০২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে ব্যবহার করা হয়। এই দলটি ৮০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম রকেট তৈরি করেছে। এর মধ্যে ২০১২ সালের গাজার সঙ্গে যুদ্ধে ‘কাসসাম’ এম-৭৫ ব্যবহার করে। এ মাসের যুদ্ধে তারা ইসরাইলের হাইফা শহরকে লক্ষ্য করে আর-১৬৯ রকেট ব্যবহার করেছে। একই বছরের ১৪ জুলাই ইসরাইলের ভেতরের বিশেষ অপারেশনে অংশ নিতে সক্ষম এরকম তিনটি ড্রোন নির্মাণের ঘোষণা দেয় হামাস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর মতো আল-কাসসাম ব্রিগেডের ইঞ্জিনিয়ারিং, এরিয়াল, আর্টিলারি এবং আÍঘাতী স্কোয়াড রয়েছে। চলমান যুদ্ধে তাদের নৌ সেনাদের একটি দল ইসরাইলের আস্কেলন শহরে অবস্থিত সুরক্ষিত জাকিম সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করে প্রথম অপারেশনের ঘোষণা দিয়েছে। ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের মোকাবেলার জন্য আল-কাসসাম বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধন করেছে।
মিলিটারি শাখা ‘আল-বাত্তার’, ‘আল-ইয়াসিন’ নামের কামান বিধ্বংসী গোলা তৈরি করেছে যেটি ইসরাইলের প্রবাদতুল্য মারকাভা কামান ধ্বংস করতে সক্ষম।
এছাড়াও তারা ইতিমধ্যে ইসরাইলের কিছু সেনাকে আটক করতে সক্ষম হয় যার মধ্যে একজন ছিল গিলাত শালিত। ২০০৫ সালে কর্তব্য পালনরত অবস্থায় তারা তাকে আটক করে। ২০১১ সালে ১০৫০ জন বন্দি ফিলিস্তিনির মুক্তির বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেয়। এই ব্রিগেড ২০০৮ এবং ২০১২ সালে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের হামলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসরাইলের প্রভূত ক্ষতি সাধন করেছে। কাসসাম ব্রিগেডের বর্তমান প্রধানের নাম মোহাম্মদ-আল-দেইফ। ইসরাইল তাকে হত্যা পরিকল্পনার তালিকার শীর্ষে রেখেছে এবং একাধিকবার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। মিডলইস্ট মনিটর

মেসি ছুটি কাটাচ্ছেন ইতালিতে

ফুটবল বিশ্বকাপটা স্বপ্ন-রাঙা হয়নি লিওনেল মেসির। প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিলে ফুটবলযজ্ঞের সোনালি ট্রফির একেবারে কাছে- হাত দূরত্বে গিয়েও শেষ ঝাঁপটা দিতে পারেননি আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর। কিন্তু তাই বলে মন খারাপ করে বসে নেই এমএলটেন। বরং জার্মানির কাছে বিশ্বকাপ হারানোর অবসাদ কাটাতে কিংবা ব্যস্ত মৌসুম শুরুর আগে ক্লান্তি ঝেরে ফেলতে স্ত্রীকে নিয়ে অখণ্ড অবসর কাটাচ্ছেন বার্সেলোনা প্রাণভোমরা। মেসি এখন তার ২০ মাস বয়সী ছেলে থিয়াগো সিলভা এবং ২৬ বছর বয়সী স্ত্রী আন্তোনেল্লা রোকুজ্জিকে নিয়ে ইতালির ক্যাপ্রি দ্বীপপুঞ্জে ইয়ট-বিলাসে আছেন। আগস্টে নতুন ফুটবল মৌসুম শুরুর আগে এখন অবসরে আছেন বিশ্ব ফুটবলের তারকারা। সেজন্য নিজেকে সতেজ করতে কেউ সমুদ্র সৈকতে ছুটছেন। কেউবা ব্যস্ত সময় পার করছেন মডেলিং ও বিভিন্ন প্রচারণায়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো যেমন এখন বিভিন্ন প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। ওয়েবসাইট।

‘নির্বাচন নাকচ করলেতো ক্যামেরন দাওয়াত দিতেন না’ -প্রধানমন্ত্রী

বৃটেন বাংলাদেশের নির্বাচনকে নাকচ করেনি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তারাতো নির্বাচন নাকচ করেনি। আমি প্রধানমন্ত্রী না এটি বলেনি। বললেতো আমাকে দাওয়াত দিতো না। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। দাওয়াত করে নিয়েছেন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। বৃটেন সফর নিয়ে দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন ছিল সরকারের তরফে বলা হচ্ছে বৃটেন সরকার বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা বলেছে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন এখন অতীত, এখন সামনে তাকানোর সময়। কিন্তু বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছে নির্বাচন নিয়ে ক্যামেরন অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কি?

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন নিয়েতো আলোচনা হবেই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন, অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন আলোচনায় আসতেই পারে। তবে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা বলেছেন, তা অত্যন্ত সত্য কথা বলেছেন।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, উনিতো বলেননি ইলেকশন নাকচ, বা আপনি প্রধানমন্ত্রী না। হলেতো আমাকে দাওয়াতই দিতেন না। যারা ঘরের বদনাম বাইরে করতে চায় তারা আসলে কি চায় সেটিই বড় কথা।
প্রধানমনন্ত্রী বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেশে শান্তি ফিরে এসেছে। একটি শ্রেণীর এটি ভাল লাগে না। দেশে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল আছে। বিদ্যুতের সমস্যা নেই। মানুষ স্বস্থিতে আছে। মানুষ খুশি। কিন্তু খুশি নন গোটা কয়েক মানুষ। তারা চেয়েছিলেন থাইল্যান্ডের মতো পরিস্থিতি হোক। অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় আসুক। এলে হয়তো তাদের গাড়িতে পতাকা উড়বে।
এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির সঙ্গে সংলাপ সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, কাদের সঙ্গে সংলাপ করবো। সংলাপের জন্য আমি আগেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। জবাবে তারা আমাকে অপমানিত করলো। আমি কার সঙ্গে সংলাপ করবো। যারা আমার পিতার হত্যাকারী। যারা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে। তারপরও আমি চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ না নেয়া বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তাদের ভুলের খেসারত দেশবাসি কেন দেবে? যে ভাবে হোক নির্বাচন হয়েছে। জনগন মেনে নিয়েছে। ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে। তাহলে এখন আবার সংলাপ কেন। যদি দেশ চালাতে ব্যার্থ হতাম তাহলে কথা ছিল। তারা ট্রেন মিস করেছে। এখন নতুন ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে।
তারেক রহমান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে মুচলেকা দিয়ে দেশ ছেড়েছিল। তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে, সেগুলো চলবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। বিচারপতিদের ইমপিচমেন্টের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে। এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল চলতে পারে না। তাই ৭২-এর সংবিধানে আমরা ফিরে যেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি মৃত্যুকে ভয় পাইনা, মরার আগে মরিনা।
বিরোধী দলের আন্দোলন হুমকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্বলের তর্জন গর্জন বেশি থাকে। তাই আমাকে বারবার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। উল্টো আমাকেই দোষারোপ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছি। আমাদের আমলে ৩২ টি টেলিভিশন, ২২ টি রেডিও অনুমোদন দিয়েছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো। যেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করে শাস্তি দেয়া হয়েছে, ঠিক সেভাবেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যুক্তরাজ্য সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি মনেকরি বাংলাদশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই সফর অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের দু’দেশের সুসম্পর্ক এক নতুন মাত্রায় উন্নীত হবে। সুখী সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
গার্ল সামিটে অংশগ্রহণ ও তিন দিনের যুক্তরাজ্য সফর শেষে গত বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সদ্যপ্রয়াত সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য বেবী মওদুদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।

ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা হলেও বাড়ির পথে নির্বিঘ্ন যাত্রা

বাড়ি যাওয়ার আনন্দ ছিল সবার চোখেমুখে। পথের শঙ্কা হয়তো ছিল মনের ভেতরে, কিন্তু চেহারায় তার ছাপ দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত স্বস্তিদায়কই ছিল গতকালের যাত্রা। বাসের যাত্রীদের যানজটে পড়তে হয়নি। বেশির ভাগ ট্রেনই সময়মতো ছেড়েছে। লঞ্চও ছেড়েছে ঠিকঠাক। তবে টিকিটের জন্য হাহাকার ছিল। বাড়তি ভাড়া আর কালোবাজারি কষ্ট ছিল যথারীতি।

>>ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা হলেও হাসিমুখেই তা মেনে নিয়েছেন ট্রেনের বগিতে জায়গা না পাওয়া এই যাত্রীরা। নিষেধ অমান্য করে ছাদে উঠেছেন তাঁরা। দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকলেও নিরাপদেই বাড়ি ফিরবেন—এমন আশা নিয়েই গতকাল রাজধানী ছেড়েছেন তাঁরা। ছবিটি টঙ্গী রেলস্টেশন থেকে তোলা: প্রথম আলো
এবারের ঈদযাত্রা শুরু হয়ে গেছে গত বৃহস্পতিবারই। সে অর্থে গতকাল ছিল ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিন। তবে জুমাতুল বিদা ও শবে কদরের কারণে গতকাল শুক্রবার অনেক যাত্রী হয়তো যাত্রা করেনি। তাই অস্বাভাবিক জনস্রোত ছিল না। বিপণিবিতানকেন্দ্রিক যান-জটলা বাদ দিলে রাজধানীর রাস্তাঘাট ছিল মোটামুটি ফাঁকা। ভিড় ছিল কেবল গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে।
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে উত্তরবঙ্গে চলা শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কর্মী নুরুল ইসলাম বলেন, শবে কদরের রাতের পরের দিন ভিড় বেশি থাকে। এ ছাড়া পোশাক কারখানার কর্মীরাও শনিবার (আজ) থেকে যাত্রা শুরু করবেন। সে হিসেবে শনিবার মানুষের চাপ বেড়ে যাবে।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, পুলিশ ও পরিবহনের মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হওয়ার কয়েকটি কারণের কথা জানা গেছে। এগুলো হচ্ছে: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশের বিশেষ দল টার্মিনালগুলোতে সক্রিয় ছিল। তৎপর ছিল হাইওয়ে পুলিশও। আর ছিল ঈদের আগে ও পরে পাঁচ দিন ট্রাক চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রভাব। সড়ক-মহাসড়কের খানাখন্দ মেরামতের কাজ গতকালও চলছিল।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে কল্যাণপুর থেকে বগুড়া যাওয়ার জন্য এসআর পরিবহনের একটি বাসে ওঠার সময় কথা হয় যাত্রী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, পথে টুকটাক যানজট বাদ দিলে নির্বিঘ্নেই বগুড়ায় পৌঁছান সাড়ে চারটার দিকে।
কমলাপুর স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেট পথের যেসব ট্রেন ছেড়ে গেছে সেগুলোতে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও তা উপচে পড়া ছিল না। তবে সকালে উত্তরবঙ্গের তিস্তা এক্সপ্রেসে যাত্রীদের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। রাতে উত্তরবঙ্গের দ্রুতযান ও লালমনি এক্সপ্রেসেও যাত্রীদের দাঁড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। এ দুটি ট্রেনে বিমানবন্দর থেকে অনেক যাত্রী ছাদেও চড়ে বসে।
রেলের মহাপরিচালক তাফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশন থেকে ৫৪টি ট্রেন ছেড়ে যায়। এর মধ্যে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও নোয়াখালীমুখী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি এক ঘণ্টা ২০ মিনিট করে দেরিতে যায়। বাকি সবগুলোই সময়মতো ছেড়েছে।
রাত-দিন মিলিয়ে কমলাপুর থেকে ৬৬টি ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা। এসব ট্রেনের আসনসংখ্যা আছে প্রায় ৬০ হাজার। ঈদে দাঁড়িয়েও প্রচুর যাত্রী ভ্রমণ করে।
রেলের মহাপরিচালক বলেন, শুক্রবার যাত্রীর চাপ তুলনামূলক কম ছিল। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের চাপ বেড়ে যাবে ঈদের আগের দুই দিন। আজ শনিবার থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ও খুলনাসহ কয়েকটি পথে বিশেষ ট্রেন চলানো হবে বলে জানান তিনি।
টিকিট না কাটার বিড়ম্বনা: ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন সেলিম, ওবায়দুল্লাহ, রাকিবসহ একই এলাকার আটজন। যাবেন নওগাঁর সাপাহার। কিন্তু আগে থেকে টিকিট কাটা নেই বলে পড়েন বিড়ম্বনায়।
এই আট রাজমিস্ত্রির সঙ্গে কল্যাণপুরে এই প্রতিবেদকের কথা হয় গতকাল বেলা তিনটার দিকে, হানিফ পরিবহনের কাউন্টারের সামনে। সবার বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে। হাতে ব্যাগ, আছে রাজমিস্ত্রির কাজের কিছু যন্ত্রপাতিও। সেলিম বলেন, পুরো কল্যাণপুর ঘুরে তিন-চারটার বেশি টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সবাই একসঙ্গে যাবেন বলে ঠিক করেছেন।
এরই মধ্যে রাকিব বলে ওঠেন, ‘চল, সবাই কমলাপুর স্টেশনে যাই। ট্রেনে বাড়ি যাব।’ কিন্তু এতে অন্যরা সায় দেননি। কারণ, ট্রেনের টিকিট পাওয়া আরও কঠিন। এর মধ্যে রাকিব প্রস্তাব করেন মহাখালী বাস টার্মিনালে যাবেন। সেখান থেকে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
এই প্রতিবেদক বিকেল পাঁচটার দিকে মহাখালী টার্মিনালে গেলে সেখানেও এই আট যুবকের সঙ্গে দেখা হয়। টিকিট জোগাড় হয়েছে কি না, জানতে চাইলে শুকনো মুখে সেলিম বলেন, ‘না, তবে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করব।’
কিছুক্ষণ আলাপ করার পর সেলিম জানান, রাজমিস্ত্রির কাজ করলেও তাঁদের আটজনই কিছুটা পড়ালেখা জানা। পরিবারও একেবারে অসচ্ছল নয়। তাই গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো মানসিকতা নেই। অপেক্ষা করে হলেও একটু ভালো আসন নিয়ে যেতে চান। কাজের চাপের কারণে আগে এসে টিকিট কাটতে পারেননি।
আগে থেকে টিকিট না কাটা এমন অনেককেই গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালীর বিভিন্ন বাস কোম্পানির কাউন্টারে ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে। আবার যানজটের আশঙ্কা নিয়ে অনেকে আগেভাগে বাসা থেকে বের হয়ে স্টেশনে এসে বিড়ম্বনায় পড়েন, বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
বিকেল চারটার দিকে গাবতলী টার্মিনালের উল্টো দিকে হানিফ পরিবহনের নিজস্ব টার্মিনালে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম। যাবেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে বেলা একটায় রওনা দিয়ে গাবতলী পৌঁছে যান সাড়ে তিনটায়। কিন্তু তাঁর বাস ছাড়ার কথা সন্ধ্যা সাতটায়। তাই পত্রিকা পড়ে সময় কাটাচ্ছেন। মুহিত বলেন, অন্যবার যানজটের কারণে সময়মতো টার্মিনালে পৌঁছাতে পারেননি। এ জন্যই আগেভাগে রওনা দিয়েছিলেন। মাহিদুল অভিযোগ করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য তাঁকে ৮৫০ টাকা ভাড়া গুনতে হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই পথে ভাড়া ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা।
মাছ ব্যবসায়ী ইয়াকুব আলী আকন্দ ও পোশাক কারখানার কর্মী রাজিয়া বেগম গাবতলী টার্মিনালে বসা দুপুর থেকে। তাঁরা জানান, দুই ছেলেকে বরগুনার বাসে তুলে দিতে এসেছেন। অগ্রিম টিকিট ছিল না। টার্মিনালে এসে সোনার তরী পরিবহনের রাত সাড়ে আটটার বাসে টিকিট পেয়েছেন। প্রতিটির দাম ৬০০ টাকা। অন্য সময় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় যাওয়া যেত। ইয়াকুব আলী ও রাজিয়া বলেন, তাঁরা সাভারের ফুলবাড়িয়ায় থাকেন। ছেলেদের বাসে তুলে দিয়েই বাসায় ফিরবেন।
কল্যাণপুরের শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার থেকে বিকেল সোয়া তিনটায় দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বাসে রংপুরের গাড়িতে চড়েন ফরিদুল হক। তিনি বলেন, অনেক শঙ্কা ছিল যানজটের। কিন্তু কাউন্টারে এসে জানতে পারেন সময়মতোই বাস ছেড়ে যাবে। রাত ১০টার দিকে মুঠোফোনে ফরিদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ততক্ষণে বাড়িতে পৌঁছে গেছেন। যাত্রাটি আনন্দেরই ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফেরিতে জট: প্রথম আলোর মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার রাত ও ভোরে ছেড়ে যাওয়া দক্ষিণবঙ্গের বাসের অনেকগুলোই মাওয়া ফেরিঘাটে আটকা পড়ে।

>>প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করতে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। গতকাল সকাল থেকে ঘরমুখী মানুষের স্রোত দেখা গেছে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে। লঞ্চে করে মানুষের রাজধানী ছেড়ে যাওয়ার এই দৃশ্য পোস্তগোলা ব্রিজের ওপর থেকে তোলা l ছবি: সাজিদ হোসেন
মাওয়া ঘাট সূত্রে জানা যায়, মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে উজানের তীব্র স্রোত ও ঘাট এলাকার উল্টো পানির স্রোতের কারণে কয়েক দিন ধরেই ফেরি চলাচল কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ব্যক্তিগত গাড়িসহ যাত্রীবাহী বাসের চাপ বেড়ে গেলে জট লেগে যায় ঘাটে। অবশ্য বেলা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জট কমতে থাকে। সন্ধ্যার দিকে আবারও যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়।
মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে লঞ্চেও যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। অনেক লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিতে দেখা যায়। এ পথের লঞ্চগুলোর ধারণক্ষমতা ৮৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৯৮ হলেও ২০০-৩০০ পর্যন্ত যাত্রী বহন করে। সিবোটে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘাটে পিরোজপুরের সোলেমান দেওয়ান বলেন, সরাসরি যাওয়ার বাসের টিকিট না পেয়ে ভেঙে ভেঙে মাওয়ায় এসেছেন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষের মাওয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক সিরাজুল হক বলেন, সোমবার আরও ভিড় বাড়তে পারে। এটা সামাল দেওয়ার জন্য তাঁদের প্রস্তুতি আছে।
লঞ্চযাত্রীদের ভিড়: দক্ষিণের জেলাগুলোর মানুষ রাতের লঞ্চে ওঠার জন্য গতকাল সকাল থেকেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে জড়ো হতে শুরু করে। সেখানে পটুয়াখালীর আমিন হোসেন বলেন, সকাল ১০টায় এসে ডেকের টিকিট পেয়েছেন। তবে বসার ভালো জায়গা হয়নি। ব্যাংক কর্মকর্তা জালাল মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করেন টার্মিনাল এলাকায় হকারদের উৎপাতের বিষয়ে। তিনি বলেন, অন্তত ঈদ মৌসুমে টার্মিনাল থেকে হকার উচ্ছেদ করার দরকার ছিল। নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম পরিচালক সাইফুল হক খান বলেন, যাত্রীদের হয়রানি ও লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী এবং মালামাল বহন রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন।

কেঁদেই দিলেন সানিয়া মির্জা

কান্নায় ভেঙে পড়লেন সানিয়া মির্জা। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাত্কারে এই টেনিস তারকার মন্তব্য, ‘আর কী করলে প্রমাণিত হবে যে আমি একজন ভারতীয়!’

সানিয়ার এই মন্তব্য ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির এক সাংসদের মন্তব্যের পরপরই। নবগঠিত তেলেঙ্গানা রাজ্যের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই সেই সাংসদ অভিযোগ করেন, ‘এই সানিয়া পাকিস্তানের গৃহবধূ। তাঁর তেলেঙ্গানার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। এই রাজ্য গঠনের আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই।’
এনডিটিভি অবশ্য বিজেপির নেতার এই মন্তব্যকে অভিহিত করেছে রাজনৈতিক ‘ফাউল প্লে’ হিসেবে। সানিয়াকে ভারতের ‘জাতীয় আইকন’ হিসেবে অভিহিত করে এনডিটিভি বলেছে, এর মাধ্যমে সানিয়াকে অপমান করা হয়েছে।
সাক্ষাত্কারের একপর্যায়ে সানিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, ‘সাংসদের এই মন্তব্য আমাকে নিদারুণ আহত করেছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে ভারতে জন্ম নিয়ে, ভারতে সারাটা জীবন কাটিয়েও আমাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে আমি আদৌ ভারতীয় কি না।’
পাকিস্তানি ক্রিকেটার শোয়েব মালিককে বিয়ে করেই মূলত ভারতীয়দের একাংশের কাছে সমালোচিত এই নারী টেনিস তারকা। রাজনৈতিক ‘চিরশত্রু’ পাকিস্তানের ‘বধূ’ হওয়ার ব্যাপারটি ভারতীয় কট্টরপন্থীরা কখনোই মেনে নিতে পারেনি, সে কারণে প্রায়ই সানিয়াকে উগ্র সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। এ ব্যাপারে এনডিটিভির কাছে তিনি প্রকাশ করেছেন চরম বিরক্তি ও হতাশা, ‘ছোটবেলা থেকেই
পারিবারিকভাবে আমি জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে শিখেছি। অন্য জাতি বা ধর্মের কারও সঙ্গে কথা বলা বা মেশার সময় এসব কখনোই আমার মাথায় থাকে না। শোয়েবের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সময়ও এসব নিয়ে আমি ভাবিনি। এসব নিয়ে কথা ওঠাটা খুবই দুঃখজনক।’
সানিয়া শ্লেষের সঙ্গে বলেন, ‘পৃথিবীতে এমন একটি দেশ হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কাউকে প্রতিনিয়ত তাঁর জাতীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।’
সানিয়া বলেন, ‘শোয়েবকে বিয়ে করার পরও আমি ভারতের হয়ে পদক জিতেছি। কেউ যদি আমার দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন সেটা আমাকে খুবই কষ্ট দেয়।’
বিজেপি সাংসদের ওই মন্তব্য অবশ্য ভারতজুড়ে যথেষ্ট সমালোচনা ও নিন্দার জন্ম দিয়েছে। সুশীল মহলের অনেকেই সানিয়াকে তেলেঙ্গানার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করা নিয়ে করা ওই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘নিচু মানসিকতা’ ও ‘পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এনডিটিভির সঙ্গে সাক্ষাত্কারে সানিয়া ধন্যবাদ দিয়েছেন সবাইকে তাঁর পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য। তিনি বলেন, ‘এই দেশের ৮০ শতাংশ মানুষই উদার। তারা এসব নিয়ে একেবারেই ভাবে না। তাদের ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত আমাকে মুগ্ধই করেছে। কিন্তু বিজেপির সাংসদের এই মন্তব্য সত্যিই আমাকে খুব আহত করেছে।’
সবশেষে সানিয়া জানিয়েছেন, ‘এই ভারতে রয়েছে আমার ও আমার পরিবারের শিকড়। আমি আমৃত্যু একজন ভারতীয় হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে অসম্ভব গর্ববোধ করব।’

সেই মন্ত্রী কবে হবে by কাজল ঘোষ

কুসুমকুমারী দাসের একটি কবিতার লাইন খুবই মনে পড়ছে। আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। মনে পড়ার সঙ্গত কারণ আমাদের মন্ত্রীদের অতিকথন। এটা যে এ সরকারের মন্ত্রীরা করছে আর অন্য সরকারের মন্ত্রীরা করেনি তা নয়। আমাদের এখানে কালে কালে মন্ত্রীদের সুবচন প্রশংসিত এবং আলোচিত। ঈদ এলেই অনেক পুরনো বিষয় ঘুরে-ফিরে আমাদের মধ্যে আলোচনায় আসে। এবারকার ঈদেও এসেছে। মন্ত্রীদের মধ্যে যোগাযোগমন্ত্রী বরাবরই ঈদ ঘিরে আলোচনায় থাকেন। এবারও এর ব্যতিক্রম নন। বলা যায়- অনেকটা রেকর্ডও করেছেন। তিনি অনেক রকমের আলটিমেটাম আমাদের উপহার দিয়েছেন। সবশেষে শুনিয়েছেন আগামী ঈদ নির্বিঘ্নে করার প্রতিশ্রুতি। আগামীতে সব ঠিক হয়ে যাবে। যদিও কোন ঈদে এটা স্পষ্ট নয়। এটা কি আরো দু’মাস পরই আসছে যে ঈদ। নাকি তারও পরের। যা হোক আমরা আশায় আবারও বুক বাঁধলাম। হয়তো সামনে সুদিন আসছে। তবে এটুকু বলতেই হবে, সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করতে না পারলেও তিনি পথে নেমেছেন। অন্তত হেঁটেছেন। তবে ঈদের আগে যোগাযোগমন্ত্রীর বাইরে এবার সরকারি দলের বর্তমান ও সাবেক আরও দু’জন আলোচনায় আছেন। একজন সাবেক মন্ত্রী খন্দকার হাসান মাহমুদ এবং অন্যজন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী। গাজায় লাশ পড়ছে ইসরাইলি হামলায়। বিশ্বমানবতা যেখানে গুমরে কাঁদছে সেখানে আমাদের সাবেক মন্ত্রী হাসান মাহমুদ এটাকে রাজনৈতিক রঙ লাগালেন। বলে বসলেন, গাজায় ইসরাইলি হামলায় যুক্ত ইহুদিদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক থাকতে পারে। রাজনীতিকরা ভালোরকমের কথাশিল্পী। কথার জোরেই এত অসঙ্গতি আর অভিযোগ নিয়েও আমাদের মন্ত্রীরা সফেদ হয়ে যান। তাদের পোস্টারে ছাপা অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। অমুক ভাইও যেখানেই যান মাইক পেলে অমায়িক হয়ে যান। আমজনতা বিভ্রান্ত হয়ে সেইসব নেতাদের বরণ করে নেন। ফিরে আসি মূল কথায়। গাজায় হামলার সঙ্গে বিএনপিকে সম্পৃক্ত কি ধরনের গাঁজাখুরি মাথায় ঢুকে না। যা হোক নেতা বলে কথা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রীতো হঠাৎ বোমা ফাটালেন। এমন আইনের দোহাই দিয়ে তিনি মিডিয়াকে চোখ রাঙালেন। ভাবার কারণ নেই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন করবেন আর গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমের কর্মীরা মন্ত্রী মহোদয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়বেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন তিনি জেগে ঘুমিয়েছেন। যা হোক গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আওয়াজ যেকোন দুর্বল শাসকের পুরনো কৌশল। যখন দেশে বিরোধী দল থাকে সরকারের অংশ তখন গণমাধ্যমকেই মূল বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। আর গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা কখনই সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ হতে পারে না। কালে-কালে আমাদের মন্ত্রীরা বহুবিধ প্রকৃতির সুবচন উগরে দিয়েছেন। তার কিছু উল্লেখ করে আজকের লেখার যবনিকাপাত টানতে চাই। বিএনপি জমানায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন দুর্ঘটনায় নিহত একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে বলেছিলেন, আল্লার মাল আল্লায় নিয়েছে। তাতে ওনার কি করার আছে। সেই কথা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তারপর সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের লুকিং ফর শত্রুজ এখনও লোকমুখে ফিরে। তারপর আওয়ামী লীগ জমানার মন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর রানাপ্লাজা ট্র্যাজেডির দিনই হাজির করলেন নড়াচড়া তত্ত্ব। দোষ চাপালেন বিরোধী দলের ঘাড়ে। হরতালের পিকেটাররা পিলার ধরে নড়াচড়া করার কারণেই নাকি এই ভবনে ধসের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। কতোটা হাস্যকর হতে পারে এমন দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে এধরনের বক্তব্য দেয়া তাতো আমরা পরবর্তীতে দেখতে পেয়েছি। আর সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার বিচার নিয়ে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের পালাক্রমে দেয়া বক্তব্য মিলালে মানুষের জীবন নিয়ে কি সীমাহীন খামখেয়ালি করা হয়েছে তার হিসাব মিলবে। ঘটনার দিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সবচে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এ ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেপ্তারে আলটিমেটাম ঘোষণা করলেন। এরপর থেকে কত দফায় এই আলটিমেটাম পার হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আর ঈদে বাড়ি ফেরা নিয়েতো বলে বসলেন, সবাই যেন ঘরে ঠিকমতো তালা মেরে যান। নিরাপত্তা মন্ত্রী হয়ে সবার নিরাপত্তা নিজেদের খুঁজতে বলে তিনি হাসির খোরাক যোগালেন। তারপর মহীউদ্দীন খান আলমগীর দায়িত্ব নিয়েও নানান চমক দেখালেন সাংবাদিক দম্পতি হত্যার বিচার নিয়ে। বাস্তবতা হচ্ছে মেঘ তার বাবা-মায়ের হত্যার বিচার এখনও পায়নি। আদৌ পাবে কিনা তাও সূদুরপরাহত। ফিরি কুসুমকুমারী দাসের কবিতাতেই। আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা কবি জীবনানন্দ দাসের মায়ের এই চরণগুলো চিরায়ত কালের যন্ত্রণা বয়ে ফিরছে। আমাদের সমাজে আমরা কেবলই কথার ফুলঝুরি নিয়ে ব্যস্ত। কথায় নয়, আমরা কবে দেখবো আমাদের সমাজে সেই মন্ত্রী কবে হবে- কথায় নয় কাজে বড় হবে।

নদী ও পানি আগ্রাসন by ড. মাহফুজ পারভেজ

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে গেলে এ অঞ্চলের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি ব্যবহার নিয়ে আঞ্চলিক সঙ্কট দেখা দেয়। তখন বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচিতে ভারত ও পাকিস্তানের সরকার প্রধানরা সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর পানি ব্যবহার নিয়ে ‘ইনডাস ওয়াটার ট্রিটি’ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী পাঞ্জাবের রাভি, সাটলেজ ও বিয়াস নদীর পুরো প্রবাহ ভারতকে এবং সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পুরো প্রবাহ পাকিস্তানকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ‘ইনডাস ওয়াটার ট্রিটি’ সম্পাদনের পর ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের সময়ও তারা কিন্তু পানি-চুক্তি ভঙ্গ করেনি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পর বাংলাদেশের ৫৪টি নদী ভারতের সঙ্গে অভিন্ন রূপে চিহ্নিত হয়। ভারত ষাটের দশকে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কার ওপর যে ব্যারেজ নির্মাণ শুরু করে, তা কিন্তু পাকিস্তান আমলে চালু করতে পারেনি; চালু করেছে বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৫ সালে। ভারত তখন একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে ৪০,০০০ কিউসেক পানি হুগলি নদীতে প্রত্যাহার করতে শুরু করে। এর ফলে হঠাৎ করে বাংলাদেশ অংশে গঙ্গার পানি প্রবাহ কমে যায় এবং গঙ্গার পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা ও সমস্যা সৃষ্টি হয়। ১৯৭৭ সালে ভারত ও বাংলাশে প্রথমবারের মতো গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তিতে যে কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ন্যূনতম ৩৪,৫০০ কিউসেক পানি দেওয়ার গ্যারান্টি ছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি ওই চুক্তির সময় উত্তীর্ণ হলে ভারত ইচ্ছামাফিক পানি আটকাতে থাকে। এর ফলে একসময় গঙ্গার পানিপ্রবাহ বাংলাদেশ অংশে ১০,০০০ কিউসেকে নেমে আসে। পরে ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি দ্বিতীয় গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হয়। এ চুক্তিতে ন্যূনতম ২৭,৬৩৩ কিউসেক পানি দেয়ার কথা থাকলেও এ ব্যাপারে কোন গ্যারান্টি নেই।
এদিকে, বাংলাদেশের ভেতরে ভারত থেকে আসা গঙ্গা, তিস্তাসহ ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর নায্য প্রবাহ অব্যাহত রাখার বিষয়টি বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ, ফসল ও অর্থনীতি এবং জীব ও জনজীবনের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করেছে চীন। সেই সঙ্গে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের জনগণ ও প্রকৃতি বহুবিধভাবে বিপর্যয় ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদী প্রসঙ্গে এ অঞ্চলের উজানের দেশগুলোর কর্মকাণ্ড ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য বিরাট বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ নতুন নয়। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ করেছিলেন। রংপুরে তিস্তা নদী অভিমুখেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক লংমার্চ হয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সব জায়গার সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে। বিভিন্ন নদীর মরণদশা দেখে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। শুধু গঙ্গা, তিস্তা বা টিপাইমুখ নয়, আগে-পরের আরও অনেক পানি আগ্রাসী ঘটনা এই ক্ষোভের বিস্তার ঘটাচ্ছে। সম্প্রতি ফেসবুকে এক তরুণের সংক্ষুব্ধ ভাষ্য এভাবেই প্রকাশিত হয়েছে: ‘ভারত উজানে স্থায়ীভাবে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তায় গজলডোবা বাঁধ, মনু নদীতে নলকাথা বাঁধ, যশোরের কোদলা নদীর ওপর বাঁধ, খোয়াই নদীর ওপর চাকমাঘাট বাঁধ, বাংলাবন্ধে মহানন্দা নদীর ওপর বাঁধ, গোমতি নদীর ওপর মহারানী বাঁধ এবং মুহুরি নদীর ওপর কলস বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করছে বছরের পর বছর। এছাড়াও আরও কমপক্ষে ১৫টি সীমান্ত নদীর ওপর অস্থায়ী ভিত্তিতে কাঁচা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বর্ষায় অস্থায়ী বাঁধ কেটে দেয়া হয়। ভারতের এরকম পানি আগ্রাসী নীতির কবলে পড়ে শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশের প্রায় সব নদ-নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ে। আর বর্ষায় বাংলাদেশকে ভাসানো হয় বন্যার পানি দিয়ে। এছাড়াও সীমান্ত নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভারত পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে বাংলাদেশ অংশে ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি করছে। ভারতের এমন নীতির কবলে পড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশের শ’ শ’ কোটি টাকার সম্পদ, ফসল নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে।’
এমনই আগ্রাসী পরিস্থিতিতে ভারত বা ভারতের তৎপরতা সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব কেমন হতে পারে- তা আঁচ করা কঠিন নয়। অতএব, রামপাল প্রকল্প, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট নিয়ে গোপন চুক্তি, টিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তাসহ যথাযথভাবে নদী চুক্তি নিয়ে টালবাহানা, অসম বাণিজ্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের মানুষের সামনে কার্যকরী প্রতিবাদ ছাড়া অন্য কোন পথ ও পন্থা খোলা নেই।

শুভ লক্ষণ নয় by সাহস রতন

জন্মলগ্ন থেকেই রাজনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে লাগাতার আন্দোলনের ফলে প্রায়ই আমাদের অর্থনীতি খুব নাজুক হয়ে পড়ে। যদিও গত জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে বিরোধীদের তৎপরতা কিছুটা স্তিমিত হয়ে আছে। তবে ইদানীং নির্বাচনে অংশ না নেয়া দলটির নেতারা যেভাবে হম্বিতম্বি করছে, তাতে মনে হচ্ছে সামনে রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হওয়া মানেই তো আবারও হরতাল, আবারও অবরোধ। এর সঙ্গে গান পাউডার আর পেট্রল বোমার আগুনে ঝলসে যাওয়া মানুষের আহাজারিতে হাসপাতালের বাতাস ভারি হয়ে উঠবে। মানুষ হবে দিশাহারা। বিগত চল্লিশ বছরে অসংখ্যবার এই দৃশ্য দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতির প্রতি চরম ঘৃণা জন্মে গেছে। এটি কোন শুভ লক্ষণ নয়। আমরা চাই বা না চাই, পছন্দ করি বা না করি, রাজনীতিবিদরাই দেশ শাসন কিংবা শোষণ করবেন, গণতন্ত্রে এটাই চিরায়ত নিয়ম।
ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের শেষ ধাপ হচ্ছে অসহযোগ কিংবা চলতি ভাষায় হরতাল। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মই হয়েছে ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলন, হরতাল এবং সর্বশেষ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এরপর সব বড় বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে আমরা সহস্রবার হরতালের মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু এত হরতালের মধ্যে, তৎকালীন পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে এবং স্বৈরশাসক এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময়, মনে হয় এই দুই বারই সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ  স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল সমর্থন করেছিল। এছাড়া আর কোন হরতালেই সাধারণ মানুষের তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না, থাকেও না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে হরতাল বা অবরোধ সমর্থন করেন এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। এর প্রধান কারণ, একমাত্র হরতালই হচ্ছে সেই কর্মসূচি যেখানে পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে, আম কিংবা জাম, সব পাবলিকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি থাকে চরমে। বেশ ক’মাস আগে একটি টিভি চ্যানেলে ঢাকার বাইরে দেশের বড় বড় শীতের সবজি পাইকারি বাজারগুলোর সচিত্র প্রতিবেদন প্রচারিত হচ্ছিল। হরতালের আগে আর হরতালের দিন বাজারটির তুলনামূলক চিত্র দেখে বিবেকবান মানুষজন ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সবজি ব্যবসায়ীরা তাদের হতাশার কথা বলেছেন। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এটি কোন খণ্ডিত চিত্র নয়। সমগ্র বাংলাদেশেরই এই অবস্থা। হরতালে সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে। শাসক দল হরতালকে বর্ণনা করে ‘ভয়তাল’ হিসেবে। সত্যিই তো, সাধারণ মানুষ হরতাল অপছন্দ করলেও পিকেটারদের তৎপরতার ভয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয় না। যদিও ক্ষমতাসীন দল নানাভাবে হরতালের বিপক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করে, সরকারি গাড়িগুলো রাস্তায় চলে, তবুও হরতালের ক্ষতি তাতে মোটেও কমে না। গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার দোহাই দিয়ে এই সহিংসতা আর কতকাল দেখতে হবে আমাদের? অথচ হরতাল আহ্বানকারী দলের নেতারা হরতাল ডেকে দিয়ে তাদের নিজের কারখানা খোলা রাখেন। আবার অনেক নেতা হরতালে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে পিকেটিংয়ে যোগ দেন। বিগত বছরগুলোয় আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর চলমান কলহ আর হাজারো রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও আমাদের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কাছাকাছি। আমাদের ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রাখার কৌশল রপ্ত করে ফেলেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে একমাত্র হরতাল বা অবরোধই আমাদেরকে স্তব্ধ রাখতে পারে। আর কিছু নয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, হরতালের মতো ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করার জন্য তেমন কিছুই করতে হয় না। শুধু মিডিয়াকর্মীদের ডেকে এনে অফিসে বসে একটা ঘোষণা দিলেই হলো। জনবিচ্ছিন্ন সব রাজনৈতিক দল এটা করছে গত চার দশক ধরে। আমাদের প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াও এর দায় এড়াতে পারে না। চিহ্নিত কিছু লোক সারাদিন ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় এসে বলে দিলো আগামীকাল হরতাল। আর অমনি খবর বিক্রেতারা এই খবরটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার শুরু করে, কেন? তাই সময় এসেছে হরতাল নিয়ে বিকল্প কিছু করার। সময়োপযোগী বিধি বিধানের। তবে গণতন্ত্র আর ব্যক্তি স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে একমত হবেন না, এটা নিশ্চিত। ঈদের পর কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে আবারও আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার আগে, বেশ কিছুদিন থেকে রাস্তায় ব্যানার, বিলবোর্ডে একটা একটা স্লোগান নজর কাড়ছে- আওয়ামী লীগ পারে, আওয়ামী লীগই পারবে। এ স্লোগান যে স্রেফ স্লোগান নয় তা এ ক্ষেত্রে দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা বিপজ্জনক by আলী ইদ্‌রিস

অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক ব্যাংকিং খাত। রাজনৈতিক অস্থিরতা যেমন অর্থনীতিকে পিছিয়ে দেয় তেমনি রাজনৈতিক প্রভাবে বা বিবেচনায় ব্যাংকিং সেক্টরকে পরিচালনা করলে স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়। সরকারি, বেসরকারি তহবিলসহ সাধারণ জনগণের তথা সমগ্র জাতির এবং বিদেশী নাগরিক ও সংস্থার আমানতের রক্ষক ব্যাংক। তাই ব্যাংক পরিচালনায় আইন-কানুনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে বা ছাড় দিলে অথবা নীতিমালা শিথিল করলে সেখানে অস্থিতিশীলতা আক্রমণ করতে পারে। ব্যাংকের কুঋণ, খেলাপি ঋণ, অবলুপ্ত ঋণ, মওকুফকৃত সুদ, আর্থিক কেলেঙ্কারি, জালিয়াতি, সব মিলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার পর কৃত্রিমভাবে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবসা প্রতিষ্টানের আর্থিক ক্ষতি হযেছে এই অজুহাত দেখিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা শিথিল করা হয় এবং নতুন, পুরাতন খেলাপিরা দলে দলে কোন রকম ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ পুনঃতফসিল করার আবেদন করেন। এ সুযোগে ১৪,০০০ কোটি টাকার খেলাপি ও প্রায় খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ৭,৮৫৭ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকসমুহ ৬,০০০ কোটি টাকা টাকা পুনঃতফসিল করেছিল। এতে খেলাপি ঋণ পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় কমে গিয়েছিল। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৬,৭২০ কোটি টাকা থেকে ডিসেম্বরের প্রন্তিকে খেলাপি ঋণ কমে ৪০,৫৮৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল। অর্থাৎ তিন মাসে ১৬,১৩৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমে ব্যাংকের, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল।কিন্তু পুনঃতফসিলকৃত ঋণ খেলাপিরা ঋণ পরিশোধে অনিয়ম করাতে অবস্থা পুনরায় খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ব্যাংকসমুহের কৃত্রিমভাবে এই পুনঃতফসিল করার ফলে পুরাতন ঋণখেলাপিগণ সুবিধা পেয়েছেন কিন্তু নতুন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বঞ্চিত হয়েছেন। কুফলস্বরূপ সৎ ও নিষ্ঠাবান ঋণগ্রহণকারীদের মধ্যে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে কুঋণ, খেলাপি ঋণ আদায় করার তৎপরতায় ভাটা পড়েছে, কৃত্রিমভাবে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ২০১৩ সালে মুনাফা বেড়ে গিয়েছে ও নগদে ডিভিডেন্ড চলে গিয়েছে। আরও লক্ষণীয় যে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা ও কৃষি খাত ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার হলেও তাদের বিবেচনায় আনা হয়নি। অন্যদিকে যে সমস্ত ঋণ অতীতে একাধিকবার পুনঃতফসিল হয়েছে তা পুনরায় বিবেচনার অবকাশ নেই, কিন্তু সে সব বিষয় বিশ্লেষণ-বিবেচনা না করে ডাউন পেমেন্ট ছাড়া, হ্রাসকৃত সুদে কুঋণ পুনঃতফসিল করাতে সুবিচার করা হয়নি। নবম সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জানা যায় ৪৭টি ব্যাংকে মোট ঋণ-খেলাপির সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৪,৪০৩ কোটি টাকা। আরও আছে মূলধন এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি। সোনালী, জনতা, অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৯,৬৪৫ কোটি টাকা, প্রভিশন ঘাটতি ৭,৪৯৪ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক দু’দিকেই সবচেয়ে এগিয়ে আছে।। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ ইত্যাদি গ্রুপের কেলেঙ্কারির পর অবস্থা খারাপ হয়েছে। এদিকে বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতিতে স্বয়ং পর্ষদের চেয়ারম্যান ও পরিচালকগণ জড়িত থাকার এবং ৪,০০০ কোটি টাকার অধিক অর্থ লোপাট হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক দিন থেকেই বেসিক ব্যাংকের কেলেঙ্কারি সন্দেহ করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয় কোন কার্য়ক্রম নেয়নি, এখন চেয়ারম্যানকে সম্মানজনকভাবে পদত্যাগ করতে দেয়া হয়েছে। সুতরাং, যা হওয়ার তাই হয়েছে। ২০০৯ সালে ব্যাংটির খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ১৪১.২৩ কোটি টাকা, চার বছরে সে ঋণ ৪,১৫৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ২,১৭,৯৯২ কোটি ঋণের বিপরীতে ৪,৬৮০ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিপিডির প্রতিবেদন মোতাবেক গত সাড়ে চার বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার সুদ মওকুফ ও ১১,০০০ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। এর আগে ৭ বছরে সুদ মওকুফ করা হয়েছিল মাত্র ৩,৬৪৫ কোটি টাকা। এসব করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহ, কৃষিব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও শিল্পঋণ সংস্থায়। এ বিশাল অংকের সুদ মওকুফ ও ঋণ অবলোপনের ফলে ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণ কমে গিয়েছে এবং মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০১১ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ২,২২৫ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছিল, তার বিপরীতে ২০১২ সালে সেগুলো লোকসান গুনেছে। একই ভাবে রাষ্ট্রাত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ২০১১ সালে ১০.৯৬ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছিল, ২০১২ সালে মাত্র ১৫ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করায় ২০১৩ সালে ব্যাংকের কৃত্রিমভাবে হঠাৎ আর্থিক উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকসমূহে অলস পড়ে আছে প্রায় ১০০,০০০ কোটি টাকা (জানুয়ারিতে ছিল ৬০,০০০ কোটি টাকা) যা থেকে বোঝা যায় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ অচলাবস্থার অবসান না হলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে না, এমডিজি অর্জন করা কঠিন হবে, দেশকে মধ্য আয়ের দেশে রূপ দেয়ার লক্ষ পিছিয়ে যাবে। সুতরাং, ব্যাংকিং খাতে আরও দক্ষ, আরও বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একটি ব্যাংক দেউলিয়া হলে অর্থনীতি তথা দেশের ভাবমূর্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

গাজায় অস্ত্রবিরতির তোড়জোড়

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে
গতকালও বিক্ষোভ হয়েছে বিভিন্ন দেশে। চেক প্রজাতন্ত্রের
রাজধানী প্রাগে এমন একটি বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ
দেওয়া লোকজন নিয়ে আসেন ‘গাজাবাসীর প্রতীকী
লাশ’। ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে তা দেখছে
এক শিশু l ছবি: এএফপি
গাজা উপত্যকায় পড়ছে বোমার পর বোমা। ঝরছে একের পর এক প্রাণ। ১৮ দিন ধরে চলছে এই অবস্থা। এই মানবিক বিপর্যয়ের রাশ টেনে ধরতে এত দিন কার্যকর তেমন কোনো তৎপরতা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু গাজায় জাতিসংঘের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ইসরায়েলি গোলা আঘাত হানায় সবার কিছুটা হলেও হুঁশ ফিরেছে বলে মনে হচ্ছে; গতি পেয়েছে একটি কার্যকর অস্ত্রবিরতির প্রচেষ্টা। খবর এএফপির। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড এক সপ্তাহের একটি মানবিক অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন।
গতকালই বিষয়টি ইসরায়েলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত গোপন মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওঠানোর কথা ছিল। এদিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগলু পূর্বনির্ধারিত ফ্রান্স সফর বাতিল করে উড়ে গেছেন কাতারে। লক্ষ্য, ইসরায়েল ও গাজাশাসনকারী ইসলামপন্থী সংগঠন হামাসের মধ্যে একটি অস্ত্রবিরতির প্রচেষ্টায় সহায়তা করা। গাজা থেকে ইসরায়েলের ভেতরে রকেট নিক্ষেপ বন্ধ করার ধুয়া তুলে গত ৮ জুলাই ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী (আইডিএফ)। এই অভিযান প্রথম দিকে আকাশ ও নৌপথ থেকে বোমা নিক্ষেপ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ১৭ জুলাই স্থল অভিযান শুরু হয়। গত ১৮ দিনের টানা সংঘাতে গাজায় এরই মধ্যে প্রাণহানির সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে এক লাখের বেশি ফিলিস্তিনি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গাজায় জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে ইসরায়েলি গোলার আঘাতে অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি ও দেড় শতাধিক লোক আহত হয়। চলমান সংঘাতে বাড়িঘর ছাড়া হওয়া কিছু গাজাবাসী ওই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হতাহত ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিরা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন জাতিসংঘের একজন কর্মীও। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, তিনি এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ‘হতভম্ব’। এ ঘটনা সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে, ‘এখনই হত্যাকাণ্ড থামাতে হবে’। আরব ও পশ্চিমা কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, মিসরের কায়রোতে অবস্থানরত বান কি মুন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হ্যামন্ড গত বৃহস্পতিবার গাজায় অস্ত্রবিরতির প্রচেষ্টা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটান। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এক সপ্তাহের জন্য একটি মানবিক অস্ত্রবিরতি শুরু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই প্রস্তাব গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসকে মুখ রক্ষার একটা সুযোগ করে দেবে। এর আগে গাজায় ইসরায়েলি স্থল হামলা শুরুর আগে মিসরের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল তারা। পরে তারা জানিয়েছিল, ইসরায়েল গাজার অবরোধ তুলে নিলে তারা অস্ত্রবিরতির বিষয়টি বিবেচনা করবে। আপাতত একটি মানবিক অস্ত্রবিরতির ব্যাপারে হামাসকে রাজি করাতে কাজ করে যাচ্ছে তুরস্ক ও কাতার। এই দেশ দুটিই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে হামাসের বড় সমর্থক। তুরস্কের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাভুতোগলু বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলেন। পরে তিনি পৃথকভাবে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। পশ্চিমা ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানবিক অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব গৃহীত হলে তারপর ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিনিধিরা কায়রোতে যাবেন। এরপর শুরু হবে সরাসরি আলোচনা। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত যেভাবে কাজ চলছে, সে অনুযায়ী সাত দিনের জন্য একটি মানবিক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করা হতে পারে। আর অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে ইসরায়েলি বেতারকেন্দ্রের খবরে বলা হয়, ‘আমেরিকান প্রস্তাবটি হামাস মানলে, সেটাকে ইসরায়েলও মানতে পারে।’

তবু তাঁদের আশা মেয়ে বেঁচে আছে

ইউক্রেনে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজটি ২৯৮ জন আরোহী নিয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার পর এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। আরোহীদের কেউ বেঁচে নেই বলেই সবাই এখন নিশ্চিত। তবে তা মানতে নারাজ জারজি ও অ্যাঞ্জেলা ডিকজিনস্কি। অস্ট্রেলীয় এই দম্পতির বিশ্বাস, ওই উড়োজাহাজের যাত্রী তাঁদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে ফাতিমা এখনো বেঁচে আছেন। এই আশায় বুক বেঁধে ইউক্রেনের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তাঁরা। খবর এএফপির। ১৭ জুলাই মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এমএইচ-১৭ নেদারল্যান্ডস থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। দেশটির রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সেটিকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভূপাতিত করে বলে ধারণা করা হয়। ওই উড়োজাহাজটির যাত্রী ছিলেন মহাকাশ বিজ্ঞানী ফাতিমা।
বাবা-মাকে দেখতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে যাচ্ছিলেন। ফাতিমার বাবা চিকিৎসক জারজি নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে অবস্থানকালে অস্ট্রেলীয় সংবাদপত্র দি অস্ট্রেলিয়ানকে বলেন, ‘আমরা এখনো বিশ্বাস করি, সে বেঁচে আছে। তাই আজ আমরা তাকে খুঁজতে দোনেৎস্ক যাচ্ছি।’ জারজি মনে করেন, বিধ্বস্ত হওয়ার সময় ফাতিমা হয়তো উড়োজাহাজটি থেকে সজোরে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। আর তিনি যদি নিজের সিটের সঙ্গে সিটবেল্ট দিয়ে বাঁধা অবস্থায় থেকেই যান, তাহলে সেটা মাটিতে আছড়ে পড়ার সময় আঘাত পাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’ রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলে থাকা ইউক্রেনের দোনেৎস্ক এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তার পরও নিজেদের একমাত্র সন্তানকে খুঁজতে সেখানে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ওই দম্পতি।

একটি পিস্তল থেকে সুসজ্জিত সেনাবাহিনী

১৯৯০ সালের আগে হামাসের সামরিক শাখা সবার কাছে অপরিচিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সে বছরে এ সামরিক শাখার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৫ সালে ফিলিস্তিনের শহর ইয়া’বাদ এ ব্রিটিশ সৈন্যদের গুলিতে নিহত সিরিয়ান মুক্তি আন্দোলনের নেতা শহীদ ‘এজ্জেদিন-আল-কাসসাম’-এর নাম অনুসারে এ সামরিক শাখার নাম দেয়া হয় ‘আল কাসসাম’ বিগ্রেড। ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি এই বিগ্রেড তাদের প্রথম অপারেশনের ঘোষণা দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এ ঘোষণায় বলা হয়, কফরদরম স্থাপনায় দরন সশান নামের একজন ইহুদি পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘোষণার মাধ্যমে আল-কাসসাম বিগ্রেডকে হামাস তাদের সামরিক শাখা হিসেবে ঘোষণা করে। শুরুতে সীমিতসংখ্যক সৈন্য নিয়ে শুরু করা এ বিগ্রেড এখন গাজার একটা বড় অংশজুড়ে আছে। কিন্তু পশ্চিমতীরে তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। নিজেদের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রচারিত এক বুলেটিন অনুসারে কেবল গাজাতেই তাদের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি।
এটি একটি সত্যিকারের সেনাদল যেটিতে সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে কোম্পানি, ব্যাটালিয়ন এবং বিগ্রেড। বুলেটিন এ ঘোষণা দেয়া হয়, নর্দার্ন গাজা বিগ্রেড, গাজা বিগ্রেড, সেন্ট্রাল গাজা বিগ্রেড এবং সাউর্দার্ন গাজা বিগ্রেড নামে আল-কাসসামের চারটি বিগ্রেড আছে। এ সামরিক শাখা প্রথমে একটি পিস্তল নিয়ে শুরু হয়, এরপর অস্ত্রাগারে যোগ হয় একটি রাইফেল এবং এরপরে নিজেদের তৈরি মেশিনগান। ধীরে ধীরে ‘হোয়াজ’ এর মতো বিস্ফোরক যন্ত্র, আÍঘাতী হামলার জন্য বেল্ট এবং দূর থেকে হামলার জন্য বিস্ফোরক যন্ত্র যোগ হয়। আল-কাসসাম বিগ্রেড ২০০১ সালের ২৬ অক্টোবর স্থানীয়ভাবে তৈরি রকেট দিয়ে ইসরাইলের ‘স্টেরট’ স্থাপনায় হামলা চালায়। এই রকেটের নাম ছিল ‘কাসসাম-১’। এটিকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন ‘একটি পুরোনো রকেট যেটি মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিতে পারে’ শিরোনাম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দ্রুতই ‘কাসসাম-২’ উদ্ভাবিত হয় যেটি ২০০২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে ব্যবহার করা হয়। এই দলটি ৮০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম রকেট তৈরি করেছে। এর মধ্যে ২০১২ সালের গাজার সঙ্গে যুদ্ধে এম-৭৫ ব্যবহার করে। এ মাসের যুদ্ধে তারা ইসরাইলের হাইফা শহরকে লক্ষ্য করে আর-১৬৯ রকেট ব্যবহার করেছে।
একই বছরের ১৪ জুলাই ইসরাইলের ভেতরের বিশেষ অপারেশনে অংশ নিতে সক্ষম এরকম তিনটি ড্রোন নির্মাণের ঘোষণা দেয় হামাস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর মতো আল-কাসসাম ব্রিগেডের ইঞ্জিনিয়ারিং, এরিয়াল, আর্টিলারি এবং আÍঘাতী স্কোয়াড রয়েছে। চলমান যুদ্ধে তাদের নৌ সেনাদের একটি দল ইসরাইলের আস্কেলন শহরে অবস্থিত সুরক্ষিত জাকিম সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করে প্রথম অপারেশনের ঘোষণা দিয়েছে। ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের মোকাবেলার জন্য আল-কাসসাম বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধন করেছে। মিলিটারি শাখা ‘আল-বাত্তার’, ‘আল-ইয়াসিন’ নামের কামান বিধ্বংসী গোলা তৈরি করেছে যেটি ইসরাইলের প্রবাদতুল্য মারকাভা কামান ধ্বংস করতে সক্ষম। এছাড়াও তারা ইতিমধ্যে ইসরাইলের কিছু সেনাকে আটক করতে সক্ষম হয় যার মধ্যে একজন ছিল গিলাত শালিত। ২০০৫ সালে কর্তব্য পালনরত অবস্থায় তারা তাকে আটক করে। ২০১১ সালে ১০৫০ জন বন্দি ফিলিস্তিনির মুক্তির বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেয়। এই ব্রিগেড ২০০৮ এবং ২০১২ সালে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের হামলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসরাইলের প্রভূত ক্ষতি সাধন করেছে। কাসসাম ব্রিগেডের বর্তমান প্রধানের নাম মোহাম্মদ-আল-দেইফ। ইসরাইল তাকে হত্যা পরিকল্পনার তালিকার শীর্ষে রেখেছে এবং একাধিকবার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। মিডলইস্ট মনিটর

আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলের বিচার হবে

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গণহত্যা অব্যাহত রাখলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরাইলের বিচার করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তায়েপ এরদোগান। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইল যদি এ অপরাধযজ্ঞ অব্যাহত রাখে তাহলে নিশ্চিতভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে তার বিচার করা হবে।’ তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মেরসিনে দেয়া নির্বাচনী বক্তৃতায় এরদোগান আরও বলেন, ‘যদি আমরা দেখি যে, গণহত্যা চলছে তাহলে ইসরাইলের বিচারের জন্য তুরস্ক সংগ্রাম করবে।’
এর আগে, মার্কিন টিভি স্টেশন সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসরাইল যুদ্ধ বন্ধ করতে চায় না; তারা সেখানে হত্যা করছে, রক্তপাত ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, পশ্চিমারা ইসরাইলকে রক্ষা করে চলেছে এবং পুরো বিশ্ব এ বিষয়ে নীরব। এ অবস্থায় আমরা নীরব থাকতে পারি না; আমরা নীরব থাকবও না।’ ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য তুরস্ক এক সময় ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। তবে সম্প্রতি ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করছেন এরদোগান। ইসরাইল হিটলারের বর্বরতাকেও হার মানাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সিএনএনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এরদোগান আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে হামাস সবকিছুর জন্য প্রস্তুত, (ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ) আব্বাসও প্রস্তুত আছেন। কিন্তু ইসরাইল এমন কিছু চাচ্ছে না। সে চাচ্ছে মৃত্যু আর রক্তপাত।’ রয়টার্স, ওয়ার্ল্ড বুলেটিন।
ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন তুরস্কের : ইসরাইলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক শেষ করার ঘোষণা দিচ্ছে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গত তিনদিনেই তুরস্কের ১১১টি বিশ্ববিদ্যালয় ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার ঘোষণা দিয়েছে। এ সংখ্যা দিনদিনই বাড়ছে। প্রথমে তুরস্কের ৮৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টররা গত রোববার ঘোষণা করেন, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা না করলে তারা ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে একাডেমিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সম্পর্কে ছিন্ন করবেন। রেক্টরদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গাজায় মানবতার বড় ট্রাজেডি ঘটছে। পুরো বিশ্ব কানা ও বোবা হয়ে আছে, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ইসরাইলি সরকার শিশুদের নির্মমভাবে বন্দুকের সামনে নিক্ষেপ করছে।’ ‘পবিত্র রমজান মাসেও লোকজনকে বোমার আঘাতে অশ্র“, দুর্ভোগ ও কষ্ট নিয়ে ইফতার করতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সবাই এই নির্মমতার ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে আছে।’ এদিকে গাজায় আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইসরাইলি পণ্য ও রাষ্ট্রটির সঙ্গে যুক্ত দেশের পণ্য বর্জনের হিড়িক পড়েছে তুরস্কের শহরগুলোতে। সামাজিক গণমাধ্যমে ইসরাইলি পণ্য এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে। ইসরাইলকে সমর্থন করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোকাকোলার পানীয় বর্জনেরও আহ্বান জানানো হচ্ছে। ইস্তাম্বুলে গাঙ্গুরেন জেলার মেয়র সাকির ইয়াসেল কারামান বলেন, কোকাকোলা ও অন্যান্য যেসব কোম্পানি জায়নবাদী ইসরাইলের সম্প্রসারণে কাজ করে তাদের সহায়তা করা আমাদের ঠিক হবে না। জেরুজালেম পোস্ট।

আমাদের মেয়ে এখনও বেঁচে আছে

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ২৯৮ আরোহী নিয়ে বিধ্বস্ত হওয়া মালয়েশীয় বিমানের এক অস্ট্রেলীয় যাত্রীর বাবা-মা এখনও আশায় বুক বেঁধে আছেন যে, তাদের মেয়ে এখনও বেঁচে আছে। তাই মেয়েকে খুঁজতে ইউক্রেন যাচ্ছেন তারা দু’জন। শুক্রবার এক খবরে এ কথা বলা হয়। ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভূপাতিত মালয়েশীয় বিমানে জার্জি ও এঞ্জেলা দিকজিলাস্কির একমাত্র মেয়ে ফাতেমাও ছিলেন। তিনি পার্থে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসছিলেন। ফাতেমার বাবা জার্জি আমস্টার্ডমের শিফল বিমানবন্দরে অস্ট্রেলীয় সংবাদপত্রকে বলেন,
‘আমরা এখনও মনে করি সে বেঁচে আছে। তাই আমরা তাকে খুঁজতে আজ দোনেস্ক যাচ্ছি। ফাতেমার বাবা-মা এখনও আশা করছেন, তাদের ২৫ বছর বয়সী মহাকাশ বিজ্ঞানী মেয়ে কোনো না কোনোভাবে বেঁচে আছে। বাবা-মা ভাবছেন, তাদের মেয়েটি হয়তো কোনোভাবে বিধ্বস্ত বিমানটির বাইরে ছিটকে পড়ে সিট বেল্ট বাঁধা অবস্থায় কোথাও আটকা পড়ে আছে। তার বাবা দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের মেয়ে এখনও বেঁচে আছে।’ নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার স্থলে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মা এঞ্জেলা কিয়েভে অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েট প্রেসকে বলেন, ‘না, আমরা চিন্তিত নই।’ বাবা জার্জি বলেন, আমরা বিমানটিকে হামলা করার স্থানে যাব, আমরা তাকে খুঁজে দেখতে চাই।’ তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে আছে তাদের সম্পর্কে কেউ কিছু বলছে না, এর নিশ্চয় একটা কারণ আছে। এই দুর্ঘটনায় কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন এমন সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে।’ এএফপি।

প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন সফরের প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বিশ্বজুড়ে অশান্তির আগুন সামলাতে পাশ্চাত্যের কথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর শাসকেরা যখন হিমশিম খাচ্ছেন, তখনই যে তাঁদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়—এটুকু শিক্ষা দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর যে হয়েছে তার একটা নমুনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্রিটেন সফর। কূটনীতিকেরা সাধারণত কম কথা বলেন এবং এমনভাবে কথা বলেন, যা নানাজনের নানাভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক সম্পর্কে মাহমুদ আলী লন্ডন থেকে টেলিফোনে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন যে ব্রিটেন বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে চায়। তিনি বলেছেন যে নির্বাচন শেষ হয়েছে,
এটা অতীত। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই। আগামী দিনে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাই (প্রথম আলো, ২৩ জুলাই, ২০১৪)। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস সূত্রে জানা যায়, ওই একই বৈঠক সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্যসচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী লন্ডনে সাংবাদিকদের বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন অর্থনীতি এবং নারীর অধিকার ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন এবং এই অগ্রগতি দেখার জন্য দেশটি ভ্রমণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ মৌলবাদের সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করছে, তা দেখতেও ক্যামেরন আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাসসের ওই খবরে আরও বলা হয় যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে পরপর দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে ওই বৈঠকে উপস্থিত কার সূত্রে এই অভিনন্দনের কথা জানা গেল, বাসস তা জানায়নি। এত বড় একটা তথ্য জানাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্যসচিব দুজনেই কী করে ভুলে গেলেন, তা রীতিমতো বিস্ময়ের বিষয়। আবার বাংলাদেশে মৌলবাদের সমস্যা মোকাবিলায় ক্যামেরনের কথিত আগ্রহ এবং তা দেখতে আসার বাসনা প্রকাশের গুরুত্বই বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কীভাবে উপেক্ষা করলেন, তা বোধগম্য নয়।
ব্রিটেনের বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার অন্যতম প্রধান গন্তব্য যে দেশটি, সেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন আলোচনা করলেন, তার কিছুই তাঁর দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বাংলাদেশের সরকারি ভাষ্যই ভরসা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যসচিবের বয়ান এবং বাসসের খবরের মধ্যে ফারাকগুলো চোখে পড়ার মতো। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করার আগে অবশ্য যে কথাটুকু বলে নেওয়া দরকার তা হলো, আলোচনা যা-ই হোক, ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত ভোটারবিহীন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সঙ্গে বর্তমান সরকারের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তার পটভূমিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটিই কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের একটা বড় সাফল্য। গণতন্ত্রের মডেল হিসেবে বিবেচিত ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টের বিশেষ বিতর্কে দল–মতনির্বিশেষে যে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয় বলে সমালোচিত হয়েছে, সেই পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহিকারী ক্যামেরন সেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধানমন্ত্রীকে যে স্বাগত জানিয়েছেন, সেটাই তো এক বড় বিস্ময়। সফরটি যেহেতু দ্বিপক্ষীয় নয় এবং তার উপলক্ষও আলাদা, সেহেতু এই বৈঠক না–ও হতে পারত। সে রকমটি হলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য তা একটা বড় প্রচারণার বিষয় হয়ে উঠত। বিশেষ করে গার্ল সামিটে স্বাগতিক প্রধানমন্ত্রী ছাড়া একমাত্র সরকারপ্রধান যিনি অংশ নিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সামিটের মূল বিবেচ্য বিষয় দুটির একটি মেয়েদের খতনার কোনো চল বাংলাদেশে আছে বলে শোনা যায় না, আর অপরটি মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের সমস্যাও আগের মতো প্রকট নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভায় বলেছেন, বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে সন্তুষ্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তাঁর কথিত ‘নির্বাচনী সাফল্য’কে অভিনন্দিত করার কোনো কথা তিনি বলেননি। এই সফরের আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল কয়েকজন ব্রিটিশ এমপির তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সভায় ডজন খানেক ব্রিটিশ এমপি ও এমইপির (ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য) উপস্থিতি। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কথিত ভারতীয় খাবারের (ইন্ডিয়ান কারি) আকর্ষণ ক্ষমতার প্রভাবেই এটি সম্ভব হয়েছে (ব্রিটিশ রাজনীতিকেরা, যাকে বাংলাদেশিদের কারি পাওয়ার বলে অভিহিত করে থাকেন)। ওয়েস্টমিনস্টার পাড়ায় অতীব সমাদৃত এক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ এ ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে বলেও শোনা যায়। তবে বাংলাদেশের বিভাজনের রাজনীতিতে বিদ্যমান তিক্ততা সম্পর্কে সচেতন ব্রিটিশ এমপিদের মধ্যে যাঁদের এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি ভোটার রয়েছে, তাঁরা অনেকেই অবশ্য দূরত্বটা বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। এঁদের অনেকেই অতীতে তাঁদের দলে টানার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতি প্রকাশ্যে বিরক্তি ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বর্ণনা যেমন বাহুল্যবর্জিত, তেমনি প্রত্যাশিত। তাতে কোনো চমক নেই, যেটা বাসসের খবরে আছে। যেকোনো সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পর যদি ভবিষ্যতে সম্পর্ক নিবিড় করার আগ্রহটুকু প্রকাশিত না হয়, তাহলে সেই সম্পর্ক যে স্বাভাবিক নয়, সেটা বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়। একই সঙ্গে কোনো দেশের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোর মানে দাঁড়ায় সম্পর্কচ্ছেদ বা বয়কট। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ব্রিটেন কোনো দিন সে রকম কোনো ঘোষণাও দেয়নি। সুতরাং বৈঠকটি সম্পর্কে গতানুগতিক ভাষ্যই স্বাভাবিক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যামেরন বলেছেন যে নির্বাচন শেষ হয়েছে, এটা অতীত। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই। বৈঠকের সূত্র বলছে, এই কথাগুলো বলার আগে মি. ক্যামেরন বলেছেন যে ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের অবস্থানগত ভিন্নতা থাকলেও সেটা এখন অতীত।’ তাঁর বক্তব্যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের মূল্যায়নে কোনো পরিবর্তনের কথা ছিল না। নির্বাচনকে সংবিধানসম্মত স্বীকার করলেও অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকা এবং ভোটার উপস্থিতির দৈন্য যে জনমতের প্রতিফলন নয়, তাঁরা শুরু থেকে সে কথাটাই বলে এসেছেন।
একইভাবে ভবিষ্যতে ব্রিটেন যে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, সে কথা ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার এবং সদ্য সাবেক হওয়া প্রতিমন্ত্রী অ্যালান ডানকানও একাধিকবার জানিয়েছেন। সুতরাং, ক্যামেরনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠককে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সার্টিফিকেট হিসেবে প্রচার অথবা তা নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা হবে একেবারেই অর্থহীন। ডাউনিং স্ট্রিটে যেদিন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, সেই একই দিনে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর বিশ্বে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঝুঁকি মূল্যায়নের নতুন ভাষ্য প্রকাশ করেছে, যাতে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে বিএনপি বয়কট করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বধীন মহাজোট অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছে। ২০১১ সালের জুনে একটি বিতর্কিত সংশোধনীর মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি বাতিলের কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, বয়কটের ফলে জাতীয় পার্টি এখন সরকারিভাবে স্বীকৃত বিরোধী দল, যদিও তারা মন্ত্রিত্ব গ্রহণসহ সরকারে অংশ নিয়ে একটি অতুলনীয় অবস্থানে রয়েছে। এই বিবরণীতে দেশটিতে মানবাধিকার পরিস্থিতির দৈন্যদশা, আইনের শাসনের সংকট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দুর্নীতির যে সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হয়েছে তা যে দেশের জন্য মোটেও মর্যাদাকর নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অভ্যন্তরীণ যেকোনো বিষয়—তা সে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারী অধিকার কিংবা নির্বাচন—এগুলোতে বিদেশিদের প্রত্যয়ন বা সার্টিফিকেশনের বিপদটা আমাদের রাজনীতিকেরা যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন, তাঁদের জন্য সেটা ততটাই ভালো। কেননা, তাহলে তাঁদের বিড়ম্বনাও কিছুটা কমবে। পুনশ্চ, ডাউনিং স্ট্রিটে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সময় বাইরে বিরোধী দল বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিবাদ একটা স্বীকৃত অধিকার। সুতরাং, সেই প্রশ্নে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে ইউটিউবে প্রকাশ করা এক ভিডিওতে দেখা যায় যে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর সেখান থেকে বেরোনোর সময় এঁদের মধ্য থেকে কয়েকজন ঢিল ছুড়ছেন। এই আচরণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের লাঠিয়ালনির্ভর রাজনীতি আমদানির যেকোনো উদ্যোগ নিন্দনীয়, তার লক্ষ্য যিনিই হোন না কেন।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

জুমাতুল বিদা ও লাইলাতুল কদর

রমজান মাসের তৃতীয় দশকের বিদায়কালীন শুক্রবার তথা শেষ জুমার দিন মুসলিম বিশ্বে ‘জুমাতুল বিদা’ নামে পরিচিত। এবার জুমাতুল বিদার দিবাগত রজনীতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ‘লাইলাতুল কদর’ পালিত হওয়ায় এর গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। সাপ্তাহিক জুমার নামাজ মুসলমানদের বৃহত্তর জামাতে অনুষ্ঠিত হয়। রমজান মাসের জুমাবার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতময়। জুমাতুল বিদাসহ মাহে রমজানের প্রতি জুমাবারে ইবাদত-বন্দেগিতে অধিকতর সওয়াব লাভের সুবর্ণ সুযোগ থাকে। রমজান মাসের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা একটি মাস ত্যাগ-তিতিক্ষার সঙ্গে সিয়াম সাধনার পর এ দিনটিতে জুমার নামাজ আদায় করে মাহে রমজানকে বিদায় সম্ভাষণ জানান। পবিত্র কোরআনে শুক্রবারের নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে জোরালো দিকনির্দেশনা দিয়ে সব মুসলমানকে এই দিন মসজিদে একত্র হয়ে জুমার নামাজ আদায়ের তাগিদ প্রদান করা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।’ (সূরা আল-জুমুআ, আয়াত: ৯)
মাহে রমজানের সব শুক্রবারই অত্যন্ত পবিত্র ও বরকতময় দিবস। তন্মধ্যে বিদায়ী শুক্রবার জুমাতুল বিদা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এ দিন রমজান মাস শেষ হয়ে যাওয়ার সতর্কতামূলক দিবস। জুমাতুল বিদা রোজাদারদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মাহে রমজানের সমাপনান্তে এ বছর এর চেয়ে ভালো দিবস আর পাওয়া যাবে না। সুতরাং এ পুণ্যময় দিনটির যথাযথ সদ্ব্যবহার করা অবশ্যকর্তব্য। মাহে রমজানের শুরু থেকে যেসব ইবাদত ব্যস্ততাবশত ফেলে রাখা হয়েছে, যে গুনাহখাতা মাফের জন্য কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে ভুল হয়েছে, জুমাতুল বিদার দিনে দোয়া কবুল হওয়ার সময়ে তা-ই করা উচিত। যে মহিমাময় রজনীকে অনন্য মর্যাদা দিয়ে রাত্রিকালীন ইবাদত-বন্দেগিতে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, উম্মতে মুহাম্মদির পরম সৌভাগ্য যে কালপরিক্রমার ধারাবাহিকতায় মাহে রমজানের জুমাতুল বিদায় সেই মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর পুনরায় কল্যাণ, শান্তি ও মুক্তির সওগাত নিয়ে মুসলমানদের জীবনে ফিরে এসেছে। ‘লাইলাতুল কদর’ আরবি শব্দ। এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুন’ অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং ‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা। এ ছাড়া, এর অন্য অর্থ হলো ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা।
এ রাত্রিকে ‘লাইলাতুল কদর’ হিসেবে নামকরণ করার কারণ, এই রজনীর মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদির সম্মান বৃদ্ধি করা হয়েছে বা এ রাতে মানবজাতির তাকদির নির্ধারণ করা হয়। তাই এবারের জুমাতুল বিদার দিবাগত কদরের রাতটি অতিশয় পুণ্যময় ও মহাসম্মানিত। লাইলাতুল কদরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এ গৌরবময় রজনীতে মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মুক্তির সনদ ঐশীগ্রন্থ ‘আল-কোরআন’ অবতীর্ণ হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত (কদরের) রজনীতে। আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে তুমি কি জানো? মহিমান্বিত রজনী সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাত্রিতে ফেরেশতাগণ ও রুহ (জিব্রাইল) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’ (সূরা আল-কদর, আয়াত: ১-৫) লাইলাতুল কদরের মহিমা এমন যে হাজার মাস ইবাদতে যে সওয়াব হয়, কদরের এক রাতের ইবাদত এর চেয়ে উত্তম। কদরের ফজিলতময় রাতে মুমিন মুসলমানদের ওপর আল্লাহর অশেষ রহমত, বরকত ও নিয়ামত বর্ষিত হয়। লাইলাতুল কদরে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে মাগফিরাত, নাজাত ও ক্ষমা পাওয়ার পরম সুযোগ লাভ করা যায়।
কদরের রজনীতে যারা আল্লাহর আরাধনায় মুহ্যমান থাকবে, মহান স্রষ্টা তার ওপর থেকে দোজখের আগুন হারাম করে দেবেন। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও আত্মবিশ্লেষণের সঙ্গে সওয়াবপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে কদরের রাতে (ইবাদতের জন্য) দণ্ডায়মান হয়, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ও মুসলিম) রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন: ‘তোমরা রমজানের শেষ ১০ রাতে শবে কদর সন্ধান কর।’ (বুখারি ও মুসলিম) নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মাহে রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রজনীগুলোতে তোমরা শবে কদর অনুসন্ধান কর।’ (বুখারি) সুতরাং কদরের রাতে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি তথা কিয়াম করা, তারাবি-তাহাজ্জুদসহ অধিক নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, একাগ্রচিত্তে দোয়া-দরুদ, তাসবিহ-তাহলিল এবং অতীত পাপমোচনে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য পরিবার-পরিজনকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করা উচিত। এসব ইবাদতের মাধ্যমে কদরের রাত্রি জাগরণ করাই মুমিন মুসলমানের প্রধান কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 
সিজদায় বান্দা তার প্রভুর অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই তোমরা অধিক দোয়া করো।’ (মুসলিম) হজরত আয়েশা (রা.) একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কী করব? তিনি বললেন: তুমি বলবে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন, তুহিব্বুল আফ্ওয়া ফা’ ফু আন্নি’ অর্থাৎ হে আল্লাহ্! নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসো, অতএব আমাকে ক্ষমা করে দাও!’ (তিরমিজি) লাইলাতুল কদর জগৎবাসীর জন্য আল্লাহর অশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমা লাভের অপার সুযোগ এনে দেয়। এ রাত হচ্ছে আল্লাহর কাছে সুখ-শান্তি, ক্ষমা ও কল্যাণ প্রার্থনার এক অপূর্ব মুহূর্ত। কদরের রাতে অবতীর্ণ মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মুক্তির সনদ পবিত্র কোরআনের অনুপম শিক্ষাই ইসলামের অনুসারীদের সার্বিক কল্যাণ, উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তির পথ দেখায়। তাই আসুন, এবার মাহে রমজানে জুমাতুল বিদার দিবাগত মহিমাময় বিজোড় রজনীতে অফুরন্ত নিয়ামতের আধার ‘লাইলাতুল কদর’ তালাশ করতে সচেষ্ট হই এবং রাতব্যাপী সপরিবারে ইবাদত-বন্দেগিতে নির্ঘুম কাটিয়ে দিই!
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক।
dr.munimkhan@yahoo.com