Sunday, January 18, 2015

সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের উদ্যোগ নেবে ভারত

রাজ্যসভার আসন্ন অধিবেশনে ভারত-বাংলাদেশ স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনে ফের উদ্যোগ নেবে ভারত। গতকাল শনিবার নয়াদিলি্লতে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আশ্বাস দেন। তোফায়েল আহমেদ স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে বিরাজমান অসুবিধা দূর করার আহ্বান জানান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী দু'দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি কানেক্টিভিটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। গতকাল সকালে দিলি্লতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন,
'বাণিজ্য ও বিনিয়োগই হলো প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি।' অবিলম্বে বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রতিবন্ধকতা দূর করতে উদ্যোগী হতে তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। কিছুদিনের মধ্যেই দু'দেশের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক ডেকে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এ বৈঠকের পরেই তোফায়েল আহমেদ ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মার সঙ্গে 'ফলপ্রসূ' বৈঠক করেন বলে দিলি্লর হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ইনামুল হক চৌধুরী জানান।
তোফায়েল আরও বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। পরে বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মার সঙ্গে বৈঠকে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ২৫টি পণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্য ভারতে শুল্কমুক্ত রফতানির জন্য ভারত সরকার অনুমতি দিলেও তার সদ্ব্যবহার করতে পারছে না বাংলাদেশ। তার প্রধান কারণ অশুল্কজনিত বাধা। তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশি পণ্যের গুণমান ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা। এ বাধার কারণে তৈরি পোশাক ভারতের বাজারে পাঠানো যাচ্ছে না। তোফায়েল বলেন, বাংলাদেশের স্ট্যান্ডার্ড ও টেস্টিং সংস্থার (বিএসটিআই) মান ভারত স্বীকৃতি দিচ্ছে না। তবে বিএসটিআইকে আন্তর্জাতিক মানের সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে ভারত দ্রুত কারিগরি সাহায্য দেবে। তোফায়েল আহমেদ ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যে তৈরি পোশাক সরবরাহে শিলিগুড়ি ও গৌহাটিতে বাণিজ্যিক অফিস খোলার জন্য ভারতের মন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব দেন। বর্তমানে সীমান্তে দুটি সীমান্ত হাট চালু রয়েছে। ত্রিপুরা ও মিজোরাম-রাঙামাটিতে আরও দুটি সীমান্ত হাট খোলারও প্রস্তাব দেন তিনি। ভারতের মন্ত্রী বলেছেন, 'বাংলাদেশ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। তাদের সহযোগিতা করতে দ্রুত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।' আগরতলা, পেট্রাপোল, ডাওকি ও শ্রীমন্তপুরের অবকাঠামো দ্রুত উন্নত করা হবে বলে ভারতের মন্ত্রী আশ্বাস দেন। ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তারেক এ করিম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭৪ সালে তদানীন্তন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজ্যসভার গত অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও কানেক্টিভিটি বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
শেখ হাসিনার অধীনেই অন্তর্বর্তী নির্বাচন বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যতে নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা আছে কি-না_ এমন প্রশ্নের জবাবে তোফায়েল বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখনই নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে ভবিষ্যতে সংলাপের মাধ্যমে বিরোধীদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলে তবেই নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু সে নির্বাচন হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। সে নির্বাচনেও জামায়াত অংশ নিতে পারবে না। তিনি বলেন, কিছু কিছু পশ্চিমা দেশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তারা সহিংসতার নিন্দা করছে। এখন আমেরিকাও বুঝেছে, জামায়েত সহিংস সংগঠন। তিনি বলেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননের সঙ্গে আলোচনায় জঙ্গিবাদ গুরুত্ব পেয়েছে। এতে ভারত যে উদ্বিগ্ন, তা আলোচনায় বোঝা গেছে। তোফায়েল আহমেদ ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত দু'দিনব্যাপী সার্ক বিজনেস লিডার্স কনক্লেভে অংশগ্রহণ করার জন্য নয়াদিলি্ল আসেন। কনক্লেভে যোগদান ছাড়াও তিনি শুক্রবার ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি ভারতের প্রথিতযশা সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
(মনমোহন-তোফায়েল বৈঠক)

‘আমাগো ছেলেমেয়েরে মাইরা হেরা রাজনীতি করব?’ by মানসুরা হোসাইন

‘আমাগো ছেলেমেয়েরে মাইরা হেরা রাজনীতি করব? এইডা কোন দ্যাশে আইয়্যা পড়লাম।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ নাসির মিয়া এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। চোখের সামনে বিছানায় শুয়ে বড় ছেলে আরমান হোসেন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাসে ছুড়ে মারা পেট্রলবোমায় আরমান পুড়ে যান। বৃদ্ধ বাবা নাসির মিয়া বলেন, ‘নিজেগোর মারামারির জেরে তারা বোমা মারে। যে ফ্যামেলিরে মারতাছে সেই ফ্যামেলি তো শেষ। সরকার বিহিত না করলে মরণ ছাড়া তো আর পথ নাই।’ পাশে দাঁড়ানো আরমানের বৃদ্ধ মা কোনো কথাই বলতে চাইলেন না। শুধু বললেন, ‘আমি আর কী কইমু।’ ছেলে জানে বেঁচে গেছেন, এর জন্য শুকরিয়া জানালেন।
গতকাল রাতে আরমানের মতোই দুর্ভাগ্যের শিকার হন কনস্টেবল মোরশেদ আলম। মৎস্য ভবনের কাছে পুলিশের একটি বাস লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা পেট্রলবোমা ছোড়ে। বাসটি চালাচ্ছিলেন মোরশেদ। বাসটিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। আগুনে দগ্ধ মোরশেদ এখন বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। তাঁর মাথার চুল পুড়ে গেছে। বাঁ চোখ খুলতেই পারছেন না। বাঁ হাতও আগুনে পুড়ে গেছে।
মোরশেদ আলম বলেন, ‘সারা দিনের ডিউটি শেষ করে ফিরতেছিলাম। বাইকে করে এসে একটা বাচ্চা ছেলে বাসের সামনে কিছু ছুড়ে মারে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সারা গাড়ি অন্ধকার। আমি নিয়ন্ত্রণ হারাই। দরজা তো আর দেখা যায় না। লাফ দিছি, মাটিতে গড়াইছি। ফুটপাতের এক নারী টেনেটুনে আমার গায়ের জ্যাকেট খুলে দেন। চারপাশ থেকে সবাই বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করতাছে। কিন্তু কে কারে বাঁচাইব?’ মোরশেদের স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে ময়মনসিংহে বেড়াতে গেছেন। স্বামীর এই দুর্ভাগ্যের খবর পেয়েছেন তাঁরা। কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে ঢাকায় ফিরতে পারছেন না।
বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৮ নভেম্বর (হরতালের আগের দিন) থেকে আজ রোববার পর্যন্ত সহিংসতার শিকার মোট ৩২ জন ভর্তি হয়েছেন। আজ পর্যন্ত ভর্তি আছেন ১৭ জন। বার্ন ইউনিটে আনার পথে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনজন।
আজ রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বার্ন ইউনিটের বিভিন্ন ওয়ার্ডে থাকা চারজন রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা সবাই গতকাল অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। ফিরে যাই আরমানের কথায়। আরমান পেশায় ট্রাকচালক। সারা দিন চালানোর পর গতকাল রাতে ট্রাক আমিনবাজারে রাখেন। গাবতলী থেকে বাসায় ফেরার জন্য বাসে ওঠেন। মোহাম্মদপুরে পৌঁছানোর পর সেই বাসে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। তাঁর ১০ ও ৮ বছর বয়সী দুই ছেলে। সামনের মাসে আবার বাবা হবেন আরমান। সংসারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে প্রতিদিন কাজে বের হতেই হয় আরমানকে। তিনি বলেন, ‘অবরোধের কারণে মনে ভয় ছিল, কিন্তু না বাইর হইলে পেট তো চলে না।’ গতকাল রাতের কথা মনে করে বলেন, ‘আমার চেহারা তো ভালো আছে। আমার সঙ্গে সেদিন বয়স্ক এক লোকরে দেখি পুইড়া চেহারা ভচকাইয়্যা গেছে। কিন্তু তারে আর কী বাঁচাইমু, নিজেই তো বাঁচি না।’
৭০ বা তার বেশি বয়স হবে আবু তাহেরের। স্ত্রীর ভাঙা পায়ের চিকিৎসা করতে পাবনা থেকে অবরোধের মধ্যেই ঢাকায় রওনা হয়েছিলেন। মোহাম্মদপুরে বাস আসার পরেই আগুন লাগে। আবু তাহেরের মুখ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গা পুড়ে ফুলে গেছে। তিনি কথা বলতে পারছেন না। পাশ থেকে বড় ছেলের বউ রেহানা জানালেন, একই বাসে থাকা তাঁর দুই দেবরের একজনের হাত পুড়ে গেছে। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে আরেকজনের পা ভেঙে গেছে। শাশুড়ির তো আগে থেকেই পা ভাঙা। ছেলেরাই আবু তাহেরের সংসারে উপার্জনক্ষম। তাঁরা সবাই আহত হওয়ায় খরচ নিয়েও চিন্তিত রেহানা। আবু তাহেরের মেয়ে মর্জিনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চান, তাঁর বাবা ও ভাইদের কী অপরাধ ছিল। এখন তাঁরা কীভাবে চলবেন? এ ধরনের ঘটনার বিচার চান মর্জিনা।
কাপড় বিক্রি করে দিন চলত রায়েরবাজারের বাসিন্দা নূরজাহানের। গতকাল রাতে মোহাম্মদপুরে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারা ওই বাসের যাত্রী ছিলেন তিনিও। দশম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে ঋতু ও দেড় বছরের ছেলে রিফাতকে নিয়ে ওই বাসে যাচ্ছিলেন নূরজাহান। ছেলেমেয়েরা ভালো থাকলেও মা নূরজাহানের সারা মুখ পুড়ে গেছে।
মায়ের পাশে বসা কিশোরী ঋতুর চোখেমুখে আতঙ্ক। কাঁদতে কাঁদতে ক্ষুব্ধ ঋতু বলল, ‘তাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। তারা গন্ডগোল করে, আর আমরা পুইড়া মরি। সাধারণ মানুষ কেন ক্ষতিগ্রস্ত হইব।’
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, শীতের সময় এমনিতেই দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এখন হরতাল অবরোধে সেই চাপ আরও বেড়েছে। এখানে যারা আসছে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে খুব যে ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে তা-ও নয়। ১৮-১৯ দিনের মাথায় যে রোগীরা মারা যাচ্ছে, তারা সংক্রমণে মারা যাচ্ছে। রংপুরের অগ্নিদগ্ধ রোগীকে ঢাকায় আনতে হচ্ছে। সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে বার্ন ইউনিট খুলতে হবে।
সামন্ত লাল সেন আরও বলেন, ‘পাঁচজন পোড়া রোগীর জন্য একজন নার্স প্রয়োজন। আমাদের এখানে ৭০ জন রোগীকে দেখছেন একজন নার্স। বছরে প্রায় সাত লাখ মানুষ পুড়ছে, সেখানে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষ চিকিৎসক আছেন ৫০ জনের মতো। অথচ চিকিৎসক দরকার এক হাজার ৫৫১ জন।
৩০০ শয্যার বার্ন ইউনিটে আজ মোট রোগী ভর্তি আছেন ৪৯২ জন। হরতাল, অবরোধে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের দেখতে যাচ্ছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মী ও রোগীর সঙ্গে থাকা আত্মীয়স্বজনের ভর সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সেখানকার চিকিৎসক ও নার্সরা।

দগ্ধ কনস্টেবলকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী

পেট্রলবোমার আঘাতে গুরুতর আহত পুলিশ কনস্টেবল শামীম মিয়াকে আজ রোববার দেখতে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শামীম রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। গতকাল শনিবার রমনা পার্কের পাশের রাস্তায় মৎস্য ভবনের কাছে এ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের কাছে শামীম মিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন এবং তাঁর সুচিকিৎসার নির্দেশ দেন। এ সময় হাসপাতালে উপস্থিত আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারকে প্রধানমন্ত্রী বোমাবাজ ও অগ্নিসংযোগকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পরে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানের মেয়ে শাহানাজকে দেখতে যান।

‘হাত দুইটা ভালো হবে তো’ -রিক্সাচালক ফজলুর আকুতি by মহিউদ্দীন জুয়েল

হাসপাতালের বেডে শুয়ে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলেন ফজলুর রহমান (৫০)। বারবারই বলছিলেন, আমার হাত দুইটা ভালো হবে তো। আমি আবার আগের মতো রিক্সা চালাতে পারবো তো। মেয়েটার সামনে এসএসসি পরীক্ষা। কিভাবে টাকা জোগাড় হবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়ে শনিবার সকালে শোনা যায় এমনি সব আকুতি। শুক্রবার রাতে যাত্রী নিয়ে ফেরার পথে অবরোধকারীদের ছোড়া পেট্রল বোমায় ঝলসে গেছে ফজলুর দুই হাত। পুড়ে গেছে শরীরের ৩০ শতাংশ জায়গা।
মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ওইদিন রাতেই ভর্তি করা হয় বার্ন ইউনিটে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ফজলু। বলেন, জীবনে কোনদিন কারো ক্ষতি করি নাই। তাহলে আমার এই অবস্থা হলো কেনো। কোথা থেকে আগুন আইসা পড়লো বুঝতে পারি নাই। মুর্হতেই সব দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। তিনি জানান, দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে প্রতিনিয়ত বেঁচে রয়েছেন। নিজে পড়ালেখা করতে পারেননি। তাই আদরের মেয়েটিকে স্কুলে দিয়েছিলেন। তার পড়াশোনার খরচ যোগাতে রিক্সা চালাচ্ছেন। পরিবারে স্ত্রী ছাড়াও রয়েছে এক ছেলে-একমেয়ে। অভাবের সংসারে অল্প বয়সে তাই ছেলেটিকেও হাল ধরতে চালাতে হচ্ছে অটোরিক্সা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় দাড়িয়ে কাঁদছিলেন ছেলে আমিনুর রহমান।
মানবজমিনকে তিনি বলেন, আমরা বিএনপি-আওয়ামী লীগ করিনা। সহিংসতা আমাদের জীবন কেড়ে নিয়েছে। বাবার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। এখন এতো টাকা কোথা থেকে আনবো জানিনা।
তিনি আরো বলেন, গত ১৫ দিন আগে বাবা বোনের পড়াশোনার খরচ নিতে চট্টগ্রাম এসেছিলেন গ্রামের বাড়ি থেকে। ঘটনার দিন অতিরিক্ত আয়ের আশায় রিক্সা নিয়ে ভাড়ায় বেরিয়েছিলেন। কিন্তু পরে শুনি তাকে পেট্টোল বোমা মারা হয়েছে।
ফজলুর রহমানের ছেলে ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, শুক্রবার রাত ১০টায় নগরীর কর্ণেল হাট এলাকায় যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের দিকে ফিরছিলেন রিক্সাচালক ফজলু। এই সময় হঠাৎ উড়ে এসে তার গায়ে পুড়ে পেট্টোল বোমা।
মুর্হতেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আগুন। আল্লাগো বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। এরপর লোকজন তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। আহত ফজলু তার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে শহরের আকবর শাহ থানার কর্নেল হাট এলাকার বিশ্ব কলোনীতে উঠেছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি নওগার ধামইরহাট থানার ঈষৎপুর এলাকায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক মিশমা সুলতানা বলেন, তার দুই হাত ঝলসে গেছে। ক্ষত বেশি। শুকাতে সময় লাগবে। সুস্থ হতে কতোদিন লাগবে কিংবা আদৌ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারবে কিনা তা এখনি বলতে পারছি না। তার শরীরের ৩০ শতাংশ জায়গা পুড়ে গেছে।

বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ, সংঘর্ষে নিহত ৪

বিদ্রূপাত্মক সাময়িকী শার্লি এবদোয় মহানবী হজরত
মুহাম্মদ (সা.)-এর নতুন কার্টুন প্রকাশের প্রতিবাদে
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ফ্রান্স দূতাবাসের বাইরে
গতকাল বিক্ষোভ করা হয়। ছবি: এএফপি
ফ্রান্সের বিতর্কিত রম্য পত্রিকা শার্লি এবদোর নতুন সংখ্যায় মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর কার্টুন ছাপানোর প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ হয়েছে। শুক্রবার আফ্রিকার নাইজারে বিক্ষোভ চলার সময় সংঘর্ষে চারজন মারা যায়। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ নানা প্রতিষ্ঠান এবং কিছু গির্জায় হামলা করে। খবর এএফপির। নাইজারের দ্বিতীয় প্রধান শহর জিন্দারে শুক্রবারের বিক্ষোভ ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষে চারজন নিহত এবং ৪৫ জন আহত হয়। বিক্ষোভকারীরা তিনটি গির্জায় ভাঙচুর চালায়। তারা ফরাসি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আগুন দেয়। শহরের এক চিকিৎসক জানান, হতাহতরা গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এত বড় সংঘর্ষ এই শহরে দেখিনি। এটি এক কালো শুক্রবার।’ সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ায় বিক্ষোভকারীরা ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা পোড়ায়। মৌরিতানিয়ার প্রেসিডেন্ট ওলুদ আবদেল আজিজ বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিতর্কিত ওই কার্টুন শুধু আমাদের ধর্মের ওপর নয়, বিশ্বের সব ধর্মের প্রতিই অবজ্ঞাসূচক।’ শুক্রবার পাকিস্তানের করাচিতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
প্রায় সাড়ে তিন শ বিক্ষোভকারী সেখানকার ফরাসি কনস্যুলেটে হামলার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় বার্তা সংস্থা এএফপির চিত্র সাংবাদিক আসিফ হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। এক পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাম্যানও আহত হন। পেশোয়ার ও মুলতানে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় ফ্রান্সের পতাকা পোড়ায়। বিক্ষোভ সমাবেশ হয় ইসলামাবাদ ও লাহোরে। শার্লি এবদোতে নতুন করে মহানবী (সা.)-এর ছবি ছাপিয়ে ‘ঘৃণাকে উসকে দেওয়া’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে কাতার ও বাহরাইন। জর্ডানের আম্মানে প্রায় আড়াই হাজার বিক্ষোভকারী আল-হুসেইনি মসজিদ থেকে বেরিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। বিক্ষোভকারীরা ‘মহানবীকে (সা.) অপমানই বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করে। আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে তিন হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীর সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা কেউ কেউ প্যারিসে হামলাকারী কোশি ভাইদের প্রতি সমর্থন জানায়। ৭ জানুয়ারি শার্লি এবদো কার্যালয়ে উগ্রপন্থীদের রক্তক্ষয়ী হামলার পর প্রকাশিত নতুন সংখ্যার প্রচ্ছদে মহানবী (সা.)-এর কার্টুন ছাপানো হয়েছে। এতে তাঁর চোখে অশ্রু দেখানো হয়। আর শিরোনামে লেখা হয়েছে, ‘সবকিছু ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।’ শার্লি এবদোর বিপণন প্রতিষ্ঠান এমএলপি জানায়, নতুন প্রকাশিত সংখ্যাটির ইতিমধ্যে ১৯ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। পত্রিকাটি সাধারণত ৬০ হাজার কপি ছাপা হতো।

বেলজিয়ামে সেনা মোতায়েন

সন্দেহভাজন ইসলামি জঙ্গিদের গ্রেপ্তার এবং চলমান সন্ত্রাসবাদ–বিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটে উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে পুরো ইউরোপ। যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় পুলিশকে সতর্কতার চতুর্থ স্তরে রাখা হয়েছে, যা দেশটিতে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। এ ছাড়া ফ্রান্সের মতো প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও গতকাল শনিবার থেকে পুলিশের পাশাপাশি সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। ফ্রান্সে আরও সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। খবর বিবিসি ও এএফপির। গত সপ্তাহে প্যারিসে কয়েকটি ঘটনায় উগ্রপন্থী বন্দুকধারীদের হাতে ১৭ জন নিহত হওয়ার পর ইউরোপের কয়েকটি দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিদের হয়ে লড়াই করতে যাওয়া তরুণেরা অনেকে ফিরে আসায় উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বেলজিয়ামে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান শুরু হওয়ার পর শুক্রবার সে দেশে সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার খবর পেয়ে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ভের্ভিয়ে শহরে পুলিশ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে সন্দেহভাজন দুই জঙ্গি নিহত হয়। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী শার্ল মিশেলের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ৩০০ সেনা পর্যায়ক্রমে রাজধানী ব্রাসেলস ও উত্তরাঞ্চলীয় শহর অ্যানভার্সের সড়কে টহল দেওয়ার জন্য মোতায়েন করা হবে। এ দুটি শহরেই বিপুলসংখ্যক ইহুদি বাস করে। টহলরত সেনাসদস্যরা সশস্ত্র অবস্থায় থাকবেন। বিবৃতিতে বলা হয়, মোতায়েন করা সেনাসদস্যদের কাজ হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি এবং পুলিশকে সহায়তা করা। ভের্ভিয়ে শহরেও শেষ পর্যন্ত সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। বেলজিয়ামের সন্ত্রাসী হামলার কথিত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্যারিসের হামলার যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী মানুয়েল ভল গত শুক্রবার বলেছেন, ‘দুই দেশই একই হুমকি মোকাবিলা করছে।
দুটি ঘটনার মধ্যে যে যোগসূত্র রয়েছে তা হলো আমাদের মূল্যবোধকে আক্রমণের ইচ্ছা।’ ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের ঘটনার পর প্রতিবেশী দেশেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাজ্যে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। ইহুদি সম্প্রদায়-অধ্যুষিত এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হচ্ছে। দেশটির সন্ত্রাসবিরোধী এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, ইহুদি- অধ্যুষিত এলাকায় টহল বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের স্কুলগুলোতে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জার্মানিতে পুলিশ শুক্রবার অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে। ফ্রান্সের পুলিশ এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটি জুড়ে ১ লাখ ২০ হাজার পুলিশ ও সেনা টহল দিচ্ছে। বোমা হামলার আতঙ্কে শুক্রবার প্যারিসের একটি রেলস্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ক্যামেরন-ওবামা যৌথ পদক্ষেপ: সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় যৌথ প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করার পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দেশের ভেতরে এবং বাইরে ইসলামি উগ্রপন্থীদের মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গতকাল হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে তাঁরা দুই দেশে কট্টরপন্থী ভাবাদর্শের বিস্তার রোধ এবং ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করার বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করেন। তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সহিংস মতাদর্শের বিস্তার রোধ করতে দুই দেশের কর্মকর্তারা একসঙ্গে কাজ করে ছয় মাসের মধ্যে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। উগ্রপন্থী ভাবনা মোকাবিলা এবং মৌলবাদ বিরোধিতার নকশা প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে যুদ্ধ করে আসা জিহাদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী সম্মেলনে এ পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। বৈঠকে ওবামা প্যারিসের ঘটনার অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়ার বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক করে দেন।

পদ্মায় বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ শিকার- নেপথ্যে আ.লীগের স্থানীয় দুই নেতা

(ফরিদপুর সদরের কামারডাঙ্গি এলাকায় পদ্মা নদীতে আড়াআড়ি বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় জেলেরা। গত শুক্রবার তোলা ছবি l প্রথম আলো) ফরিদপুর-মানিকগঞ্জ সীমানায় পদ্মা নদীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় দুই নেতার সহায়তায় আড়াআড়ি বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় জেলেরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গত শুক্রবার সরেজমিনে দেখা গেছে, ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের শেষ অংশে কামারডাঙ্গি এলাকায় পদ্মায় আড়াআড়ি করে প্রায় সোয়া দুই কিলোমিটারজুড়ে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে। বেড়ার পশ্চিম প্রান্ত ফরিদপুরের কামারডাঙ্গিতে এবং পূর্ব প্রান্ত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার পূর্ব সিলিমপুরে গিয়ে ঠেকেছে। বেড়ার পানির নিচের অংশে কারেন্ট জাল দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, গত ১৫ ডিসেম্বর বেড়ার নির্মাণ শুরু হয়। শেষ হয়েছে ৪ জানুয়ারি। এর পর থেকে চলছে মাছ শিকার।
নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. মোস্তাকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কামারডাঙ্গি এলাকায় পদ্মা নদীতে আড়াআড়ি বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। তবে এ কাজে কারা জড়িত, তা আমার জানা নেই।’
পাবনার সুজানগর উপজেলার বাবুলপুর গ্রামের জেলে সজল হালদার ও তাঁর সহযোগীরা বাঁশের বেড়া নির্মাণ করেছেন বলে জানা গেছে। সজল হালদার বলেন, তিনিসহ পাবনা অঞ্চলের ৩০ জন জেলে বেড়া দিয়ে মাছ শিকার করছেন। সজল হালদার আরও বলেন, তাঁদের এ কাজে সহায়তা করছেন ফরিদপুরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সমন্বয়কারী মোফাজ্জেল হোসেন ও সদস্য হারুন ব্যাপারী।
বেড়া নির্মাণে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে হারুন ব্যাপারী বলেন, ওই বেড়া ফরিদপুরের সীমানার মধ্যে পড়েনি। এটি রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ জেলায় পড়েছে। তবে মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘বেড়ার কিছু অংশ ফরিদপুরের মধ্যে পড়লেও দলীয় নেতাদের বলেছি বিষয়টি ম্যানেজ করে নিতে।’
ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী হিরু মিয়া বলেন, ওই বেড়ার কারণে ফরিদপুরের জেলেরা নদীতে মাছ পাচ্ছেন না। এতে বাজারে ইলিশসহ সব মাছের দাম বেড়ে গেছে।
ফরিদপুর সদরের মমিনখাঁর হাটে মাছ বিক্রি করেন কবিরপুর এলাকার জেলে বাচ্চু শেখ। তিনি বলেন, ‘১২ দিন ধরে বেড়ার পাশে গিয়ে মাছ ধরতে পারছি না। আড়াআড়ি ফাঁদ দেওয়ায় বেড়ার ওপারেও যেতে পারি না। তাই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।’
বুধবার কবিরপুর মৎস্যজীবীদের পক্ষে হযরত শেখ ওই বাঁশের বেড়া অপসারণের দাবি জানিয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক সরদার সরাফত আলীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। এর অনুলিপি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল ইসলাম ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াহিয়া খানকে দেওয়া হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫০ সালের মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী মাছের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ করে নদীতে আড়াআড়ি ফাঁদ দিয়ে মাছ ধরা যাবে না।
ইউএনও মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি জেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রযোজনীয় উদ্যোগ নেব।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘জেলেদের লিখিত অভিযোগ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পেয়েছি। বিষয়টি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে বেড়া অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

লোকসংস্কৃতি- বনবিবি by আহাদ হায়দার

‘বনবিবি’। সুন্দরবনজীবীদের কাছে পূজিত এক নারীশক্তি। বনজীবী বিশ্বাসী জেলে, বাওয়ালি আর মৌয়ালদের তিনি সুরক্ষার দেবী। এই সুরক্ষা বনের বাঘ এবং বাঘরূপী অপশক্তি ‘দক্ষিণ রায়’ বা ‘রায়মণির’ হাত থেকে। যেমনটি পেয়েছিল সুন্দরবনের লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ শিশুচরিত্র দুঃখে, বহু শত বছর আগে। ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিবছরের মতো ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার বাংলা বছরের পয়লা মাঘ (পঞ্জিকামতে) সুন্দরবনের ভেতরে আর বনসংলগ্ন লোকালয়ে ‘মা বনবিবি’র পূজা হয়েছে। এই পূজা দক্ষিণ বাংলার আবহমান লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ এই অঞ্চলের যেসব স্থানে বনবিবির পূজা হয়, তার মধ্যে অন্যতম খুলনার দাকোপ উপজেলার বাণীশান্তা ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন ঢাংমারী গ্রাম। একটি খাল দিয়ে গ্রাম আর বনের সীমানা। এই গ্রামের পূর্ব ঢাংমারী সর্বজনীন বনবিবি মন্দিরের পুরোহিত মধুসূদন মণ্ডল (৬১)। শুক্রবার এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত বনবিবির পূজার পুরোহিত ছিলেন তিনি। এখানে খ্রিষ্টীয় ১৮৯৬ সাল থেকে বনবিবির পূজা হচ্ছে বলে মধুসূদন জানান।
‘আমি বনবিবির মন্দিরে উত্তরাধিকারসূত্রে পৌরোহিত্য করছি। বনসংলগ্ন লোকালয় এবং বনের ভেতরে প্রতিবছর দুই হাজারের বেশি স্থানে বনবিবির পূজা হয়। ঢাংমারীসহ শুধু পশুর নদের পশ্চিম পারে ভদ্রা নদী পর্যন্ত এলাকায় এ বছর বনবিবির তিন শতাধিক পূজা হয়েছে।’ বলেন মধুসূদন।
পূজামণ্ডপে বনবিবির প্রতিমার সঙ্গে থাকে বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলী, গাজী আউলিয়া, শিশু দুঃখে, তার দুই চাচা ধন আর মন-এর প্রতিমা এবং দক্ষিণ রায় তথা ব্যাঘ্রমূর্তি। মন্ত্রপাঠ, নৈবেদ্য ইত্যাদি ধর্মীয় আচারাদির পাশাপাশি প্রসাদ ও শিরনি বিতরণ করা হয়। হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে মানুষ মনস্কামনা পূর্ণ করতে মানত করেন। ইচ্ছা পূরণ হলে পরবর্তী বছর পূজার দিনে মানত পূরণ করা হয়। পূজাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ মেলা বসে অনেক স্থানে।
বনবিবির কাহিনি শুধুই গল্প, না সত্য, তা নিয়ে বিভেদ আছে। তবে এই কাহিনির কিছু চরিত্র ইতিহাসে বর্তমান। আর এই ইতিহাসের উপাত্ত বনবিবির অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসীদের আরও সংহত করেছে বলে মনে করেন ভক্তরা।
‘বনবিবির পাঁচালি’ বর্ণনা করতে গিয়ে মনোরঞ্জন মণ্ডল বলেন, অনেক বছর আগে সুন্দরবনের পাশের গ্রামের এক দরিদ্র মায়ের শিশু ছেলে দুঃখেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে নিয়ে যান ধনে আর মনে নামে দুই ব্যবসায়ী। দুঃখেকে মা বলেন, ‘বনে আমার মতো তোর আরেক মা আছেন। কোনো বিপদে পড়লে তাঁকে ডাকবি।’
তখন বনে গাজী নামে এক আউলিয়া থাকতেন। দক্ষিণ রায় বাঘবেশী অপশক্তি। গাজীর সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। এক রাতে রায়মণি বা দক্ষিণ রায় ধনে-মনেকে স্বপ্নে দেখা দেন। তিনি দুই ভাইকে প্রচুর মধু আর সম্পদ দেওয়ার লোভ দিয়ে দুঃখেকে উৎসর্গ করতে বলেন। অন্যথায় তাদের নৌকা ডুবে যাওয়ার এবং মধু না পাওয়ার ভয় দেখান। ধনে আর মনে ভয়ে দুঃখেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাকে পানি আনতে পাঠিয়ে নৌকা ছেড়ে চলে যান। দুঃখে মায়ের কথামতো সেই মাকে স্মরণ করে। বনবিবি এসে দুঃখেকে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের কবল থেকে উদ্ধার করেন এবং তাকে কুমিরের পিঠে ভাসিয়ে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। এদিকে বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গালী বাঘরূপী দক্ষিণ রায় ও গাজী আউলিয়াকে ধরে বনবিবির কাছে নিয়ে যান। গাজী দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির পক্ষ নেন। এভাবেই পরবর্তী সময়ে বনবিবি সুন্দরবনজীবী মানুষের কাছে দেবীর মর্যাদা পেয়ে পূজিত হতে শুরু করেন।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন এলাকায় দক্ষিণ রায়, বণিক ধোনাই ও মোনাই এবং গাজীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বনবিবির জহুরানামা নামে একটি বই উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, বনবিবি বেরাহিম নামে এক আরবদেশির কন্যা। বেরাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি সতিনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্ত হন। সেখানে তাঁর গর্ভে বনবিবি ও শাহ জাঙ্গুলী জন্ম নেন। দক্ষিণ রায় যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীন ভাটির দেশের রাজা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয়। দক্ষিণ রায় পরাজিত হয়ে সন্ধি করেন। ইতিহাসের সঙ্গে লোককথার যতই অসংগতি থাক, বনবিবি দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো সুন্দরবনজীবীর মনে এখনো ভক্তি, শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের স্তম্ভ হয়ে আছেন।

যৌথ বাহিনীর অভিযানে শিবগঞ্জে আতঙ্ক- চাঁপাইনবাবগঞ্জে আজ ও কাল হরতাল

(যৌথ বাহিনীর অভিযানের ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এলাকা ছাড়ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মহদিপুর গ্রামের মানুষ। গতকাল সন্ধ্যার কিছু আগে তোলা ছবি l প্রথম আলো) যৌথ বাহিনীর অভিযানের ভয়ে বাক্সপ্যাটরা নিয়ে গ্রাম ছাড়ছে লোকজন। গতকাল শনিবার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মহদিপুর গ্রামে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার যৌথ বাহিনীর সদস্যরা মহদিপুর ছাড়াও রসুলপুর ও চণ্ডীপুর গ্রামের ৩৫টি বাড়িতে অভিযান চালান। এ সময় বাড়িঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। অভিযানের সময় হেলমেট পরা আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী তৎপর ছিলেন। শিবগঞ্জ থানার পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার দিনভর এই অভিযান চলে। জেলা পুলিশ সুপার বশির আহমেদ ছাড়াও ৯ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবু জাফর শেখ মোহাম্মদ বজলুল হক ও র্যাব-৫-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর কামরুজ্জামান অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। অভিযানের সময় সাধারণ মানুষকে মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যৌথ বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে অভিযান হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেআইনি কাজের কোনো সুযোগ ছিল না। শুধু আসামি ধরার জন্য কয়েকটি বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙচুরের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি।’
গতকাল শনিবার সন্ধ্যার ঠিক আগে মহদিপুর থেকে ১৫-১৬ জন নারী-শিশুকে লেপ-কাঁথা ও বাক্সপ্যাটরা নিয়ে শিবগঞ্জের উজিরপুরের দিকে যেতে দেখা যায়। তাঁরা জানান, যৌথ বাহিনীর অভিযানের ভয়ে তাঁরা গ্রাম ছাড়ছেন। গতকাল বিকেলে শিবগঞ্জের মহদিপুর ও রসুলপুরের ১৬-১৭টি বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুরের আলামত দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় বাড়িতে টিভি, আসবাব, চিনামাটির থালাবাসন এবং কয়েকটি বাড়িতে ফ্রিজ ভাঙচুর ও মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। একটি বাড়ির খড়ির ঘর ও একটি বাড়ির রান্নাঘর এবং খড়ের গাদা পোড়ানো দেখা যায়।
নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও মহদিপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, এ বাড়ির ধান রাখার গোলা পোড়ানোসহ তিনটি ঘরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। নজরুল ইসলামের স্ত্রী সালেয়া বেগম অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে পেছনের দরজা ভেঙে র্যাব ও পুলিশ বাড়িতে ঢুকে তিনটি ঘরে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চালায় ও ধানের গোলায় (বাঁশ ও মাটি দিয়ে তৈরি ফসল রাখার বড় পাত্র) আগুন দেয়। এতে প্রায় ৩০ মণ ধান পুড়ে যায়।
রসুলপুর গ্রামের ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি ইয়াসিন আলীর স্ত্রী চম্পা বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী কোনো দল করেন না। অথচ তাঁর বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। নষ্ট করা হয়েছে টিভি, ফ্রিজ, রাইসকুকার, শোকেস ও থালাবাসন। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি মোটরসাইকেল। তাঁর তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া মেয়ে আতিফা জানায়, ২০ জনের মতো কালো পোশাকধারী লোক তাদের বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি করে।
এ গ্রামের বিএনপির কর্মী আবু বাক্কারের বাড়িতেও ভাঙচুরের আলামত দেখা যায়। একই গ্রামের প্রয়াত হযরতের বাড়িতেও ভাঙচুর হয়। তাঁর মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী জমিলা খাতুন বলে, ‘কেঁদে কেঁদে হাতজোড় করে র্যাবের লোকজনকে বলেছি, আমার বাবা-মা নেই, আমরা খুব গরিব, আমাদের বাড়িতে ভাঙচুর করিয়েন না। কিন্তু তারা শোনেনি। আমার বড় বোনকে মারধর করা হয়।’
এ গ্রামের বিএনপির কর্মী মনিমুলের বাড়িতে একটি মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজ, চারটি শোকেস, দুটি ড্রেসিং টেবিল, রাইসকুকার ও থালাবাসন ভাঙচুর করা হয়। তাঁর স্ত্রী হামিদা বেগম অভিযোগ করেন, ‘আমার শিশু ছেলে বাড়ির বাইরে বিজিবির সদস্যদের মোটরসাইকেল না পোড়ানোর কথা বলে গড়াগড়ি করে কাঁদছিল। কিন্তু ওরা শোনেনি। র্যাবের লোকজনকে অনুরোধ করে বলি, আমার শ্বশুর, স্বামী ও দেবর কোনো সক্রিয় রাজনীতি করেন না। তাঁরা বলেন, আমরা জেনেশুনেই এসেছি। এরপর যদি এ এলাকার সড়কে কোনো গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, তাহলে এ গ্রামের অস্তিত্বই রাখব না।’
এ গ্রামের আওয়ামী লীগ-সমর্থক মো. সোহুবুল ও তাঁর ছেলে ইসমাইলের বাড়িতেও যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় ভাঙচুর চালানো হয়। সোহুবুল অভিযোগ করেন, র্যাবের লোকজন তাঁর বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছে।
বিএনপির শিবগঞ্জ পৌর কমিটির সদস্য রসুলপুর গ্রামের মনিমুল হকের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে নষ্ট করা ছাড়াও চারটি শোকেস, দুটি টিভি, দুটি ড্রেসিং টেবিল ভেঙে ফেলা হয়েছে।
গ্রামের লোকজন জানান, মহদিপুর, রসুলপুর ও চণ্ডীপুরের কয়েক শ পরিবার দামি জিনিসপত্র নিয়ে অন্য গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আবারও অভিযানের ভয়ে গ্রামের সব মানুষই আতঙ্কের মধ্যে আছে। এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে র্যাব-৫-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর কামরুজ্জামান বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এসব অভিযোগও ঠিক নয়।
হরতাল: টানা অবরোধের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কানসাটে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রদলের একজন স্থানীয় নেতা নিহত হন। এর প্রতিবাদে আজ রোববার ও কাল সোমবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় হরতাল ডাকা হয়েছে।

ক্যাফেতে প্রাণের ফোয়ারা by শিহাব জিশান

(বিকেল হলেই নগরের বিভিন্ন ক্যাফেতে জমে ওঠে তরুণদের আড্ডা। ছবিটি সম্প্রতি নগরের একটি ক্যাফে থেকে তোলা l জুয়েল শীল) কথার তোড়ে ভেসে যাওয়া কিংবা গানে গানে আসর মাতানোই যেন তারুণ্যের ধর্ম। পাড়ার চায়ের দোকানে, সড়কের পাশে রেলিংেয়, এমনকি ফুটপাতেও চলে আড্ডা। আড্ডার নিত্যনতুন জায়গা খুঁজে নিতেও জুড়ি নেই তরুণদের। নগরের কফি হাউসগুলোও বাদ যাবে কেন? সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি সেখানেও এখন প্রাণের ফোয়ারা ছোটাচ্ছেন তরুণেরা। কফি আর স্ন্যাকস খাওয়ার পাশাপাশি আড্ডাও চলে সমান তালে। গত বৃহস্পতিবার প্রবর্তক মোড়ে মিলানো ক্যাফেতে ঢুকতেই দেখা গেল দেয়ালে ঝোলানো বড় টিভি পর্দায় খেলা চলছে। কেউ খেলা দেখছিলেন, কেউ–বা আড্ডায় মশগুল। টেবিলে টেবিলে ধূমায়িত কফির কাপ ঘিরে বসে থাকা বেশির ভাগ ক্রেতাই তরুণ–তরুণী। এখানে বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনিয়া আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে এখানে খেতে আসি। এখানকার ক্যাপ্পুচিনো কফিটা বেশ ভালো লাগে।’
গত শুক্রবার নগরের জিইসি এলাকার মিলাঞ্জ ক্যাফেতে গিয়ে দেখা গেল তরুণদের ভিড়। এখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছয় তরুণ মিহাদ করিম, জাওয়াদ মোহাম্মদ ইবতিসাম, তাইন উল হক, সাকিব মনজুর, তাওসিফুল হক ও শাহবাজ চৌধুরী। তাঁরা সবাই পরস্পরের স্কুলজীবনের বন্ধু। কেন ক্যাফেতে আড্ডা দিচ্ছেন—এমন প্রশ্ন করতেই মিহাদ করিমের উত্তর, ‘সপ্তাহের প্রতিদিনই ছোটাছুটি করতে হয়। বাইরে বের হলেই ট্রাফিকজ্যামে নাকাল হতে হয়। বন্ধের দিনগুলোতে তাই নির্ভেজাল আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে আসি এখানে।’ মিহাদ করিমের মতো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া তরুণ-তরুণীকে এখন সন্ধ্যার পর বিভিন্ন ক্যাফেতে জমিয়ে আড্ডা দিতে দেখা যায়। নগরের বিভিন্ন এলাকার ১২টি ক্যাফেতে ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী অধরা নীলিম দেওয়ানজী পড়াশোনায় বেশ সিরিয়াস। তবে লোখাপড়ার পাশাপাশি ভালোবাসেন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে। তাই সুযোগ পেলেই মন সতেজ করতে তিন বান্ধবী পূজা নন্দী, সংগীতা দাশ ও অধরা মাধুরীকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। চলে যান বিভিন্ন ক্যাফেতে। গত রোববার সন্ধ্যায় নগরের জিইসির মোড় এলাকার রিও ক্যাফেতে কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। বারকোড, ক্যাফে মিলানো, মুনো ক্যাফে, মাস্টার ক্যাফে, ক্লাব প্রো, ক্যাফে আড্ডা ও ক্যাফে এইটটি এইটের মতো চট্টগ্রামের সব নামী ক্যাফেতে খেয়েছেন বলে জানালেন তাঁরা। ধীরে–সুস্থে খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া যায় বলে ক্যাফেগুলো তাঁদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে জানান এ তরুণীরা। এ ছাড়া ক্যাফেগুলোতে ভালো পরিবেশ ও নিরাপত্তা থাকায় তারুণ্যের আড্ডা বেড়েছে মন্তব্য করেন তাঁরা।
চট্টেশ্বরী সড়কের মুনো ক্যাফেতে কথা হয় চট্টগ্রামের ইউএসটিসির ফার্মেসি বিভাগের একদল তরুণের সঙ্গে। তাঁরা বললেন, ‘খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমরা একটু শৌখিন, তাই খাবারে বৈচিত্র্য আনতে ক্যাফেতে যাওয়া হয় প্রায়। এই সুযোগে জমে উঠে আমাদের আড্ডাটাও।’
তারুণ্যের আড্ডা প্রসঙ্গে চট্টেশ্বরী এলাকার অ্যাভালন ক্যাফের স্বত্বাধিকারী সাগর মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ভালো পরিবেশে অনেকক্ষণ বসা যায় বলে তরুণেরা ছুটে আসেন ক্যাফেগুলোতে। খাবারের দাম হাতের নাগালে থাকায় তাঁরা আড্ডার জন্য এখন ক্যাফেনির্ভর হয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া অনেক ক্যাফের খেলা দেখা ও গান শোননোর ব্যবস্থাও তরুণদের আকৃষ্ট করে।

পুড়ছে স্বপ্ন আর সম্ভাবনা- হরতাল–অবরোধে ১৩ দিনে বার্ন ইউনিটে মোট ভর্তি ২৫ by শেখ সাবিহা আলম

(৫ জানুয়ারির পর অবরোধ ও হরতাল চলাকালে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে দগ্ধ রোগীদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে l ছবি: প্রথম আলো) ওঁদের কেউ সংসারের বাড়তি খরচ জোগাতে নিজেই সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, কেউ কেউ গোটা পরিবারের আয়ের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু অবরোধের আগুনে পুড়ে তাঁদের ঠিকানা এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। গতকাল শনিবার বার্ন ইউনিটে দেখা যায়, কারও মুখে, কারও হাতে, কারও প্রায় সমস্ত শরীরে পোড়া ক্ষত। আগুনে কেবল তাঁদের শরীরই পোড়েনি, পুড়ছে স্বপ্ন আর সম্ভাবনা। বার্ন ইউনিটে ৫ জানুয়ারি থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত হরতাল-অবরোধে দেওয়া পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৫ জন। এর মধ্যে বর্তমানে ভর্তি আছেন ১০ জন, আর মারা গেছেন দুজন। তাঁরা হলেন আবুল কালাম হাওলাদার ও মো. সিদ্দিক।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেছেন, ভর্তি রোগীদের কেউ শঙ্কামুক্ত নন। তাঁদের বেশির ভাগ শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। শ্বাসনালি পুড়ে গেলে ফুলে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয়। কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হলেও অনেকে আর বাঁচে না। শরীরের অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও পুড়ে গেছে এঁদের।
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হরতাল-অবরোধের আগুনে পোড়া মানুষের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের আলাদা একটি দল গঠন করা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে পুড়ে যাওয়া মানুষকে ১০-১৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বজনেরা বলছেন, সরকার সাহায্য করছে বটে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।
গতকাল শনিবার বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, এখন সবচেয়ে সংকটময় অবস্থায় আছেন মো. সেলিম। তাঁর শরীরের ৩৬ শতাংশ পুড়ে গেছে। পেশায় হিউম্যান হলার (লেগুনা) চালক। ১৫ বছর ধরে লেগুনা চালান। ১১ জানুয়ারি মুগদা থেকে মতিঝিলে যাচ্ছিলেন। এ সময় পেট্রলবোমার আগুনে তাঁর মুখ, বুক, হাত-পা, পিঠ সব পুড়ে গেছে। সেলিমের ভাই মো. সবুজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অন্যের গাড়ি আর চালাইব না কইরা কিস্তিতে লেগুনাটা কিনছিল। সপ্তাহে কিস্তির টাকা দিতেই হইব। এ মাসে খরচা বাড়ছে ভাইস্তারে স্কুলে ভর্তির জন্য। টানাটানিতে পইড়া গেছিল। এখন জান যায়।’
ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের সামনে পুড়েছেন মো. সিদ্দিক। তাঁর তিন সন্তান। দুই ছেলে, এক মেয়ে। নতুন বছরের শুরুতে মেয়েকে ভর্তি করাতে হবে, স্কুলের পোশাক বানাতে হবে, ঋণ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনেছেন। এত চাপ সামলাতে সিদ্দিককে গাড়ি নিয়ে নামতে হয়েছিল। সিদ্দিকের স্ত্রী শরীফা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, গাড়ি পোড়া আর মানুষ পোড়া কি এক হইল? গাড়ির তো জান নাই, মানুষের তো জান আছে।’ তাঁর স্বামীর মাথা, গোটা মুখ, কান, গলা, দুই হাত পুড়ে গেছে। পুড়েছে শ্বাসতন্ত্রসহ শরীরের ১৭ শতাংশ। গাড়িতে যাত্রী ছিলেন না। দুর্বৃত্তরা ফাঁকা গাড়িতেই আগুন দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে ৫ জানুয়ারি।
শরীফা জানালেন, সমিতি থেকে টাকা উঠিয়ে অটোরিকশা কিনেছিলেন সিদ্দিক। মাত্র ৩০ হাজার টাকা শোধ হয়েছে।
সিদ্দিক পুড়েছেন, কবে সুস্থ হবেন জানা নেই। এ সংসারটা কীভাবে চলবে, তাও জানেন না তাঁর স্ত্রী।
পুড়ে যাওয়া ট্রাকচালক পিয়ার আহমেদের অবস্থা আরও করুণ। তাঁর স্ত্রী বলছিলেন, ‘মানুষটা তো বুড়া হই গ্যাছে। কিন্তু কী করব? হাওলাদ করি ছেলেরে দুবাই ফাটাইচিল। এক বছর পর ছেলে ফিরি আসছে। হাওলাদ ফুরা দিই দিতে ফারি নাই।’
১১ জানুয়ারি পিয়ার আহমেদ ট্রাক নিয়ে ঢাকার দিকে আসছিলেন। লাকসামে তাঁর চোখে টর্চ লাইটের আলো ফেলে ছেলের বয়সী ছেলেরা গাড়ি থামিয়ে আগুন দেয়। বিস্ময়ে হতবাক পিয়ার। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পান না। পিয়ারের পুড়েছে শরীরের ১৫ শতাংশ।
১০ জানুয়ারি পুড়েছেন রিকশাচালক অমূল্য চন্দ্র বর্মণ। এক মাস চার দিন আগে ঢাকায় এসেছিলেন পঞ্চগড় থেকে। বাড়িতে কাজ নেই। তিন ছেলে স্কুলে পড়ে। টাকা জমিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন। বাড়ি পৌঁছানোর আগেই লোকজন ধরাধরি করে পৌঁছে দিয়ে গেছেন বার্ন ইউনিটে।
১৩ জানুয়ারি কুড়িগ্রামে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে বগুড়ায় বাসে পেট্রলবোমা মারে দুর্বৃত্তরা। তখন রাত একটা। স্বপ্না বেগমের পুরো মুখ পুড়ে যায়। এখন একটু ভালোর দিকে। তিনি ঢাকায় একটি বাসায় কাজ করেন। স্বামী মো. বাদশাকে মুঠোফোনে ছবি তুলে দেখাতে বলেছিলেন। নিজের মুখচ্ছবি দেখে হা-হুতাশ করছেন।
স্বপ্নার পাশেই রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ মিনারা বেগম ভর্তি আছেন। মিনারার সঙ্গে বার্ন ইউনিটে আসার পথেই একজন মারা যান। সেই ঘটনা মনে করিয়ে স্বামী সান্ত্বনা দেন স্বপ্নাকে, ‘প্রাণে তো বেঁচে গেছ। কত লোকে তো মরে যায়। তোমার তো শুধু মুখটা।’
মো. বাদশা বলেন, ‘মানুষ পুড়লে কি সমস্যার সমাধান হবে? হলে কবে? শুধু একজন অন্যজনের ওপর দোষ চাপায়। আমরা তো আর পারতেছি না। শক্তি থাকতে হবে তো।’

নীল জলে ভাসমান ছেঁড়াদিয়া by আব্দুল কুদ্দুস

নীল সমুদ্রের মাঝখানে ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ
নির্জন সাদা বালিয়াড়ির ওপর আছড়ে পড়ছে নীল ঢেউ। আকাশে চক্কর দিচ্ছে গাঙচিলের ঝাঁক আর স্বচ্ছ অগভীর জলে হরেক রকমের প্রবাল ও শৈবালের মেলা। ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে পা রাখতেই মন আচ্ছন্ন হবে এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যে। টেকনাফ থেকে নৌপথে সেন্ট মার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। আবার সেন্ট মার্টিন থেকে ছেঁড়াদিয়া ১০ কিলোমিটার দূরে। ১০ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন থেকে ছেঁড়াদিয়ায় পৌঁছাতেই স্বাগত জানাল গাঙচিলের ঝাঁক। সাগরের নীল জলে চলছিল পাখিদের মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। যন্ত্রচালিত নৌকা ও স্পিডবোটে সেন্ট মার্টিন থেকে আসা বেশ কয়েকজন পর্যটকেরও দেখা মিলল। ছেঁড়াদিয়ার সৌন্দর্যে মুগ্ধ তাঁরাও। প্রবাল, শৈবাল আর নীল ঢেউয়ের দ্বীপটি এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। তবে পর্যটকদের ফেলা আবর্জনার কারণে দূষিত হচ্ছে এই দ্বীপ। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।
যেভাবে যেতে হয়: বাংলাদেশের মানচিত্রের সর্বদক্ষিণের শেষ বিন্দু এই দ্বীপ। এক বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটি ছেঁড়াদ্বীপ নামেও পরিচিত। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই দ্বীপে এখনো লোকবসতি গড়ে ওঠেনি। জোয়ারের সময় সেন্ট মার্টিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ছেঁড়াদিয়া। তবে ভাটার সময় কয়েক কিলোমিটার পাথুরে সৈকত পাড়ি দিয়েও সেন্ট মার্টিন থেকে ছেঁড়াদিয়ায় আসা যায়। জোয়ারের সময় যন্ত্রচালিত নৌকা কিংবা স্পিডবোটে আসতে হয় এই দ্বীপে।
জীববৈচিত্র্য: কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের ও মৎস অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই দ্বীপে রয়েছে ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৫৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ২৪০ প্রজাতির মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণী। দ্বীপটির কোমরসমান স্বচ্ছ পানিতে নামলে পাথরের স্তূপের ওপর নানা প্রজাতির প্রবাল, শৈবাল, শামুক-ঝিনুক ও অসংখ্য প্রজাতির মাছ দেখা যায়। ভাটার সময় দ্বীপের চারদিকে বিভিন্ন প্রজাতির প্রবাল দৃশ্যমান হয়। ভ্রমণে আসা অনেক পর্যটক এসব আহরণ করেন। কিন্তু বাংলাদেশ পরিবেশ আইনে এই দ্বীপের প্রবাল ও শামুক-ঝিনুক আহরণ নিষিদ্ধ করা আছে। শহর থেকে সব সময় আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌন্দর্য হারাচ্ছে ছেঁড়াদিয়া: শীত মৌসুমে ছোট্ট এই দ্বীপে পর্যটকের ভিড় বাড়ে। এ কারণে দ্বীপে অবৈধভাবে তৈরি হচ্ছে অস্থায়ী দোকান ও রেস্তোরাঁ। বিক্রি হচ্ছে ডাব, কাঁকড়া, লবস্টার ও মাছ ভাজা। পর্যটকেরা চড়া দামে এসব কিনে খাচ্ছেন।
বেশির ভাগ পর্যটক হাঁটুসমান নীল জলের স্বচ্ছ পানিতে নেমে প্রবাল ও শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া পর্যটকদের ফেলা পলিথিন, প্লাটিকের বোতল ও ডাবের খোসা দ্বীপের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। এসব নিয়ন্ত্রণে সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের কেউ নেই।
দ্বীপের অস্থায়ী রেস্তোরাঁর মালিক সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ডিসেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক আসা শুরু হয়। এই সময় অনেক পর্যটক ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে বেড়াতে আসেন। তাঁদের চাহিদার কথা ভেবে এই দোকান খুলেছি। সকাল ১০টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। মার্চ মাস পর্যন্ত এই ব্যবসা চলে। এরপর পর্যটক আসা বন্ধ হলে দোকানও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে।
ছেঁড়াদিয়া ভ্রমণে আসা কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, মানুষের অত্যাচারে দ্বীপটি সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে। একটি নীতিমালা তৈরি করে ছেঁড়াদিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
পরিত্যক্ত মেরিন পার্ক: সেন্ট মার্টিন ও ছেঁড়াদিয়ার প্রকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৭ সালে ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরিন পার্ক প্রতিষ্ঠা করলেও বর্তামান প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পের স্থাপনাও পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, মেরিন পার্ক স্থাপন করা হলেও এর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় সেখানে এখন কেউ নেই। গভীর সমুদ্রের মধ্যে দ্বীপের অবস্থান বলে কক্সবাজার শহর থেকে সব সময় আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেই স্থাপনা নির্মাণ- শেষ হলো তিন দিনের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলন

(সামরিক জাদুঘরে আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল বক্তব্য দেন স্থপতি কেন ইয়াংl ছবি: প্রথম আলো) আগের রাত ও সকালের বৃষ্টি উল্টেপাল্টে দিয়েছিল সময়সূচি। সকাল ১০টার অনুষ্ঠান শুরু হতে হতে বাজে বেলা তিনটা। তার পরও প্রাকৃতিক কারণে বিঘ্নিত আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলনের শেষ দিনের মূল কথা ছিল, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেই নিতে হবে সব স্থাপত্য পরিকল্পনা। নির্বিচারে সবুজ ধ্বংস করে আর কোনো নির্মাণযজ্ঞ নয়।
‘এনগেজ ঢাকা-২০১৫’ শীর্ষক তিন দিনের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল শনিবার দেশি-বিদেশি স্থপতি ও শিক্ষাবিদদের আলোচনায় এ কথাই ঘুরেফিরে এল। আর এ জন্য প্রত্যেকেই সময়োপযোগী পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিজয় সরণির সামরিক জাদুঘর মাঠে শুরু হওয়া এই স্থাপত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। এই আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। রেডিও পার্টনার এবিসি রেডিও এবং সম্প্রচার সহযোগী চ্যানেল আই। মিডিয়া পার্টনার আইস মিডিয়া।
বেলা তিনটায় সম্মেলনের তৃতীয় দিনের উপস্থাপনা ও আলোচনা পর্ব শুরু করেন মালয়েশিয়ান স্থপতি কেন ইয়াং। একই সঙ্গে তাত্ত্বিক ও নকশাকার কেন ইয়াং তাঁর উপস্থাপনায় তুলে ধরেন কীভাবে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে প্রতিবেশভিত্তিক স্থাপত্য নির্মাণ করা যায়। সিঙ্গাপুর জাতীয় গ্রন্থাগার, সোলারিস টাওয়ার প্রভৃতি পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য নির্মাণ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ইকো-আর্কিটেকচার।’ ইয়াং বলেন, আধুনিক বিশ্বের নগর পরিকল্পনা হবে ‘ঊর্ধ্বমুখী সবুজ নগরায়ণ’। এ জন্য সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করার জন্য কাচ, স্টিল ও মাঝে মাঝে খুব কম পরিমাণ কংক্রিটের ব্যবহার করেছেন তিনি। এসব ভবনে সূর্যের আলো সহজে ঢুকতে পারবে এবং একই সঙ্গে ভবনের ভেতর ও বাইরের তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে।
এরপর আলোচনা করেন বাংলাদেশের স্থপতি বশিরুল হক। বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার ময়নামতি, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ কিংবা ঢাকার লালবাগ দুর্গের স্থাপত্যকলাকে তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থাপত্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি। এই অঞ্চলের স্থাপত্যের জন্য পছন্দনীয় উপকরণ হচ্ছে ইট। বহু বছর আগে থেকে এই অঞ্চলের স্থাপত্যে ইটের ব্যবহার হয়ে আসছে। কারণ, ইট সহজলভ্য ও টেকসই। আর ভূমিরূপের সঙ্গে মিল রেখে স্থাপত্যের নির্মাণশৈলী ঠিক করতে হবে। এ সময় বশিরুল হক তাঁর নকশায় তৈরি হওয়া ধানসিঁড়ি ফ্ল্যাট প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ছোট্ট একটা চা-বিরতির পর কেন ইয়াং ও বশিরুল হককে নিয়ে আলোচনায় বসেন স্থপতি ফারুক আমিন। তিন স্থপতির আলোচনার মধ্যেও ঘুরেফিরে আসে সবুজকে রক্ষা করে টেকসই নির্মাণভাবনা এবং এ জন্য পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা।
শ্রীলঙ্কার স্থপতি পালিন্দা কানাঙ্গারা প্রাকৃতিক পরিবেশে তাঁর বাংলো ধরনের প্রকল্পগুলো উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় স্থাপনাগুলোই সেখানকার স্থাপত্যশৈলীর মূল অনুপ্রেরণা।
স্থপতি ফারুক আমিন বলেন, আধুনিক শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে প্রকৃতিকে রক্ষা করা। এ জন্য পরিকল্পনা গ্রহণের সময় ভৌগোলিক অবস্থা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বা ঘনত্ব, মানুষের চলাচলের সুবিধা প্রভৃতি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ঢাকাকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এসব বিষয় মাথায় রাখা বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক ও চীনা স্থপতি কংইয়ান ইউ তাঁর উপস্থাপনায় একটি শহরের পানিপ্রবাহ, জলমগ্নতা, বন্যানিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি চীনের বেইজিং শহরে যেসব পদ্ধতিতে জলমগ্নতার সমস্যা সমাধান করা হয়েছে, সেগুলো তিনি ব্যাখ্যা করেন। অল্প কয়েক দিন ঢাকায় থাকার অভিজ্ঞতায় ইউ বলেন, মহানগর ঢাকার সমস্যাগুলোও খুব সহজেই সমাধান করা সম্ভব। এ জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার।
ইউয়ের মতে, একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিকল্পনাই হচ্ছে মূল বিষয়। এ জন্য ‘চিন্তা করতে হবে রাজার মতো’। তাহলে ন্যূনতম হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ফল পাওয়া সম্ভব।
স্থপতি সাইফুল হক বলেন, স্থপতিদের দায়িত্ব হলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। তুরস্কভিত্তিক স্থপতি হান টুমারটেকিন বলেন, স্থাপত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাতা ও প্রকৌশলীকে মাথায় রাখতে হবে, যেন স্থানীয় ঐতিহ্য ও ভাবনাগুলোকে একত্র করা যায়।
রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিন দিনের সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরেকবার স্থাপত্যাচার্য মাজহারুল ইসলামকে স্মরণ করেন। দেশের কিংবদন্তি স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এই আয়োজন উৎসর্গ করা হয়েছিল। পুরো নতুন ধরনের চিন্তা থেকে আয়োজন করা হয়েছে ‘এনগেজ ঢাকা-২০১৫’ স্থাপত্য সম্মেলনের। আয়োজকদের মতে, শুধু নকশা প্রণয়ন, ত্রিমাত্রিক গঠন ও অট্টালিকা নির্মাণের সংকীর্ণতর গণ্ডির মধ্যে স্থাপত্যচর্চাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। স্থাপত্যচর্চাকে বিস্তৃত করতে হবে মানবকল্যাণে। স্থাপত্য, নকশা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে এবং গবেষণার মান বাড়াতে ইতিমধ্যেই বেঙ্গল আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন ইনস্টিটিউট চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে জানানো হয়, আগামী আগস্ট থেকে এই ইনস্টিটিউটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। এর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান স্থপতি, ইতিহাসবিদ, পেশাজীবী শিক্ষকেরা।

আবারও বাজারে এল সোনিয়ার সেই বিতর্কিত আত্মজীবনী লাল শাড়ি

দীর্ঘ ১০ বছর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় থাকার পর ভারতে আবারও প্রকাশিত হল কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর জীবনী ভিত্তিক বিতর্কিত বই ‘দ্য রেড শাড়ি’ (লাল শাড়ি)। স্প্যানিশ লেখক জাভিয়্যের জোরোর লেখা এ বইটি সাত বছর আগে প্রথম প্রকাশ পায় স্পেনে। ‘দ্য রেড শাড়ি : হোয়েন লাইফ ইজ দ্য প্রাইস অব পাওয়ার’ শিরোনামের বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্কসহ কয়েকটি দেশে এ পর্যন্ত বইটির তিন লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়। ২০১০ সালে ভারতে বইটির ইংরেজি ভার্সান প্রকাশিত হয় রোলি বুকস প্রকাশনা থেকে। সেই সময় কংগ্রেসের বিরোধিতায় বাজার থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল বইটি। এর বিরুদ্ধে বইটির লেখক মোরো আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো হয়। আমি মনে করি বইটি প্রকাশ করতে কারও অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন নেই।’ ইন্টারন্যাশনাল বিজনেজ নিউজ, ডিএনএ,
এনডিটিভি। ২০১৪ সালে দিল্লিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ২০১৫ সালে ফের বইটি ভারতে প্রকাশের উদ্যোগ নেয় রোলি বুকস। যদিও বইটির লেখক মোরোর দাবি- ২০১০ সালেও বইটি নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং প্রকাশকদের ভয় দেখানো হয়েছিল। বইয়ে মিসেস গান্ধীর ইতালিতে থাকাকালীন জীবনযাপনের যে বর্ণনা রয়েছে সে বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তার আইনজীবী। মোরোর মতে, এই আপত্তি অবান্তর। তিনি বলেন, মিসেস গান্ধীর জীবনীতে তো এটা লেখা সম্ভব নয় যে তিনি ভারতে জন্মেছিলেন। কংগ্রেসের অভিযোগ, জ্যাভিয়ের মোরো তার বইয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর মৃত্যু- এই দুই বিশেষ মুহূর্তে সোনিয়া গান্ধীর অবস্থার বর্ণনা দিয়ে কল্পিত সংলাপ জুড়ে দিয়েছেন। বইয়ে লেখা হয়েছে, ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দিলে তা সোনিয়া গান্ধীর কাছে ‘ফাঁসির আদেশ’ বলে মনে হয়েছিল। সোনিয়া গান্ধী চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে, ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে!’

দেশ ছাড়লেন রাজাপাকসের দুই ভাই

নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর শ্রীলংকার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহেন্দ্র রাজাপাকসের দুই ভাই গোপনে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। শ্রীলংকার সংবাদ সংস্থা আদাদেরেনার প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজাপাকসের ছোট ভাই সাবেক অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাকসে গত সপ্তাহে শনিবার সকালে কাতুনায়েকের বন্দরনায়েকে থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। পত্রিকাটির প্রতিনিধি জানান, তিনি বাসিলকে তার স্ত্রী পুষ্প রাজাপাকসেকে সঙ্গে নিয়ে বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে ব্যবহার করেছেন।
এদিকে রাজাপাকসের আরেক ছোটভাই সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব গোতাবায়া রাজাপাকসে মালদ্বীপে পালিয়ে গেছেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পরই তিনি দেশ ছাড়েন। তবে মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ খবরের সত্যতা অস্বীকার করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টুইটার অ্যাকাউন্টে বলা হয়েছে শ্রীলংকার কেউ পালিয়ে মালদ্বীপে আসেননি। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহেন্দ্র রাজাপাকসে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে খুব শোকাহত। তবে তার সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, তিনি দেশেই থাকবেন এবং রাজনীতি চালিয়ে যাবেন। শ্রীলংকার আগের সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের ব্যাপক আধিপত্য ছিল। বলা হয়, রাজাপাকসে পরিবার দেশটির অর্থনীতির ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ
করে। সিলন টুডে

বেলজিয়ামে জঙ্গিবিরোধী অভিযান

বেলজিয়ামের কর্তৃপক্ষ সিরিয়া থেকে ফেরত আসা ইসলামী যোদ্ধাদের ধরতে বড় ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালিয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০টি ‘চিরুনি তল্লাশি’ চালানো হয়। পূর্বাঞ্চলীয় একটি শহরে অভিযানের সময় সন্দেহভাজন দু’জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। শহরের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে বলে শহরটির মেয়র জানিয়েছেন। সন্দেহভাজন এই যোদ্ধারা যে কোনো মুহূর্তে পুলিশ স্টেশনে কিংবা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে পারে এমন আশংকায় এই অভিযান চালানো হয়। পুলিশের দাবি, যে দু’জন নিহত হয়েছে তারা পুলিশের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করেছিল। তারপর পুলিশও শুরু করে পাল্টা গুলি। আরও ১৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, উভয়পক্ষে বেশ কয়েক মিনিট ধরে গুলি বিনিময়ের পর মারা যায় সিরিয়া ফেরত সেই দুই ব্যক্তি। প্রসিকিউটর এরিক ফন ডে সিপ্ট বলেছেন, ব্রাসেলসেও সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে এবং সেখানেও বেশ কিছু গ্রেফতারের ঘটনা ঘটতে পারে।
সন্ত্রাসী হামলার আশংকায় দেশটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়। গত সপ্তাহে প্যারিসে যে হামলা হয়েছিল সেখানে ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র ব্রাসেলস থেকে কেনা হয়েছে বলে খবরে জানাচ্ছিল বিভিন্ন গণমাধ্যম। কিন্তু প্রসিকিউটর ফন ডে সিপ্ট এই খবরকে নাকচ করে দিয়েছেন। জিহাদিদের বিরুদ্ধে কয়েক দফা অভিযানের পর নিরাপত্তা সতর্কতা ৩ মাত্রায় বাড়িয়েছে বেলজিয়াম। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নামানো হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী চার্লস মাইকেল। জিহাদি হুমকি বিশ্লেষণকারী বেলজিয়ান সরকারি সংস্থা ওসিএএম সতর্কতার এ মাত্রা নির্ধারণ করেছে। রাজধানী ব্রাসেলসসহ পূর্বাঞ্চলীয় দুটো শহরে বৃহস্পতিবার বেশ কয়েকটি অভিযানে দু’জন নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নিল দেশটি। সন্দেহভাজন একটি জিহাদি গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এ অভিযান চলে। রাস্তায় এবং পুলিশ স্টেশনে পুলিশ হত্যাই ওই জিহাদি গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল বলে জানিয়েছে বিবিসি। বেলজিয়ামের কৌঁসুলিরা বলছেন, এ হামলা খুবই আসন্ন ছিল। অভিযানে নিহত দু’জনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তারা। ব্রাসেলসে রাতভর তল্লাশি অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১৩ সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়াও, অভিযানে অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, পুলিশ ইউনিফর্ম, বিপুল অংকের অর্থও জব্দ করেছে পুলিশ।

ফ্রান্সে এবার বোমাতংক, জিম্মিভয়

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এবার বোমা হামলা আতংকে একটি রেলস্টেশন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রম্য ম্যাগাজিন শার্লি হেবদোর কার্যালয়ে হামলার জের কাটতে না কাটতেই শুক্রবার প্যারিসের গ্যারে ডি ইস্ট স্টেশনের এ হামলার হুমকি দেয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, পূর্ব সতর্কতা হিসেবে রেলস্টেশনটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গ্যারে ডি ইস্ট প্যারিসের অন্যতম প্রধান রেলস্টেশন। এটি পূর্ব প্যারিস ও ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের সেবা দিয়ে থাকে। এদিকে আবারও জিম্মির ঘটনা ঘটেছে ফ্রান্সে। শুক্রবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরে একটি শহরে দু’জনকে জিম্মি করার কিছুক্ষণ পরে পুলিশ তাদেরকে উদ্ধার করে। তারা দু’জনেই সুস্থ আছেন। অস্ত্রধারী ও জিম্মিকারীকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই শহরের একটি পোস্ট অফিসে এই ঘটনা ঘটে। জিম্মির ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে ওই পোস্ট অফিস ঘিরে ফেলে পুলিশ। পোস্ট অফিস ভবনের ওপর দিয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর হেলিকপ্টার মহড়া শুরু করে। ফরাসি গণমাধ্যমের বরাতে বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, শার্লি হেবদো ঘটনার পর থেকে বোমা, গুলি, চোরাগোপ্তা হামলা আর জিম্মি ভয়ে ভীত ফরাসিরা এখন একপ্রকার ঘরবন্দি জীবনযাপন করছে। এদিকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে প্যারিসে ১২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গত সপ্তাহে ব্যঙ্গ ম্যাগাজিন শার্লি হেবদো এবং একটি বিপণি কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলায় ১৭ জন নিহতের পর এ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল আইটেলি জানিয়েছে, মন্ট্র–গ, গ্রিগনি, চ্যাটিনেই-মালাব্রি,
ইপিনেই-সুর-সিনি ও ফ্লিউরি-মারওগিস শহরে বৃহস্পতিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাদের আটক করে। বুধবার শার্লি হেবদোর প্যারিস কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে সম্পাদক এবং চার কার্টুনিস্টসহ ১২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। মহানবীকে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন ছাপানোর দায়ে ওই হামলা চালানো হয়। এরপর বৃহস্পতিবার দক্ষিণ প্যারিসে অপর এক হামলায় এক নারী পুলিশ নিহত হন। পরদিন শুক্রবার শহরের একটি বিপণি কেন্দ্রে চার জিম্মিকে হত্যা করে জঙ্গি সন্ত্রাসীরা। গত তিন দিনের অব্যাহত সহিংসতায় সব মিলিয়ে ১৭ জন প্রাণ হারায়। ১৯ হাজার ফরাসি ওয়েবসাইট হ্যাক : শার্লি হেবদোর ঘটনার পর এবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে ফ্রান্সের ১৯ হাজার ওয়েবসাইট। হ্যাকাররা দেশটির সরকারি ও বেসরকারি অনেক ওয়েবসাইটকেই হ্যাক করছে বলে সম্প্রতি ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। ধনী ব্যবসায়ী, ধর্মীয় সংগঠন, নগরপাল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের ওয়েবসাইটই এই আক্রমণের শিকার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘দুঃখের ভাগীদার’ : ওঁলান্দকে কেরি : ফ্রান্সে গত সপ্তাহে ইসলামপন্থীদের ভয়াবহ হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক জন কেরি শুক্রবার বলেছেন, তার দেশ ফ্রান্সের দুঃখ- বেদনার ভাগীদার। এএফপি

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে- দিনে পুলিশ, সন্ধ্যায় ফাঁকা রাতে ভুতুড়ে অবস্থা by মহিউদ্দীন জুয়েল

দিনে পুলিশ। সন্ধ্যায় ফাঁকা রাস্তা। রাতে ভুতুড়ে পরিবেশ। সুনসান নীরবতা। একঘণ্টা পর দেখা মিলছে পণ্যবাহী লরির। সামনে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। পরিস্থিতি এমন যেন কোন অঘোষিত কারফিউ চলছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অলঙ্কার থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ১০০ পয়েন্টে এমন অবস্থা বিরাজ করছে প্রতিদিন। সরকার পুলিশ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে বড় বাস ও পণ্যবাহী কনটেইনার চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেও এখনও আতঙ্ক কাটছে না চালক, মালিক ও যাত্রীদের। তারা জানিয়েছেন, লাগাতার অবরোধ কর্মসূচিতে বাসে আগুন দেয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে তাদের মাঝে। তাই জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সবাই শঙ্কিত। চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার একাধিক বাসের মালিক ও চালকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গত ১০ দিনে তাদের হরতাল অবরোধে ক্ষতি হয়েছে ৩২ কোটি টাকা। এভাবে চলতে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ খুব অল্প সময়ে ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা সবার। প্রতিদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ন্যূনতম ৪০ সিটের একটি গাড়ি দিনে আসা-যাওয়া করে ঢাকা থেকে দুবার। ৪০০ বড় বাস স্বাভাবিক নিয়মে চলাচল করে শিডিউল অনুযায়ী। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এসব গাড়ির সংখ্যা তিন ভাগের এক ভাগের নিচে নেমে এসেছে।
সরজমিনে গতকাল শনিবার সকালে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন মহাসড়ক ও চট্টগ্রামের অলঙ্কার-বিআরটিসি বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গাড়ির কোন ভিড় নেই। অলস বসে আছেন চালকরা। গ্যারেজে পড়ে রয়েছে এসি, নন এসি, ভলবোসহ অন্তত ১০০০ গাড়ি। এই বিষয়ে জানতে চাইলে চালকরা সরকারের কাছে হরতাল-অবরোধ পরিস্থিতি দ্রত সমাধানের দাবি জানান। একইসঙ্গে জীবনের নিরাপত্তা দেয়ার কথা উল্লেখ করেন।
সিকান্দার আলী নামের হানিফ যশোর রোডের একটি গাড়ির চালকের সঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রামের স্টেশনরোডের বাসস্ট্যান্ডে। তিনি বলেন, আমি কিছুদিন আগে হানিফ পরিবহন চালাতাম। এখন ভাল উপার্জনের আশায় অন্য একটি বাস চালাচ্ছি। গত কয়েক দিন আগে দেখলাম এই বাসের অন্য একটি সার্ভিসে পেট্রোল দিয়েছে অবরোধকারীরা। খুবই শঙ্কায় আছি। গ্রাম থেকে পরিবারের লোকজন প্রতিদিন ফোন করে।
এস আলম পরিবহনের সুপারভাইজার সজল বলেন, পুলিশ দিয়ে কত দিন গাড়ি চালানো যাবে ভাই। একটা সমাধানেও তো আসতে হবে। গাড়ি চালাতে না পারলে খাব কি। আমাদের সব আয় বন্ধ হয়ে গেছে। মালিক রাস্তায় গাড়ি নামাচ্ছেন না। ভাঙচুর করলে, আগুন দিলে দায় নেবে কে?
যাত্রীরা জানান, চট্টগ্রামের গরীবুল্লাহ শাহ মাজার বাস কাউন্টারে গিয়ে প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে অনেককে। তবে দুয়েকটি বাস রাতের বেলায় ছেড়ে গেলেও তাতে কেউ যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চট্টগ্রামের বাস কাউন্টারগুলোতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন হাজার হাজার লোক। এই কাউন্টার থেকে দূর পাল্লার ৫০টি রুটের গাড়ি ছেড়ে যায় প্রতিদিন। এসি-ননএসি। সব ধরনের গাড়ি রয়েছে বড় এই কাউন্টারে। অন্যদিন এখানে লোকজনের টিকিট পাওয়া দুষ্কর হলেও গত কয়েক দিনের চিত্র ছিল ভিন্ন।
কথা হলে যাত্রীদের কয়েকজন জানান, বিএনপির ডাকা লাগাতার অবরোধের কারণে কোন গাড়ি চট্টগ্রাম ছেড়ে যেতে চাইছে না। বিশেষ করে নোয়াখালী, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, চাঁদপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, খুলনা, যশোরসহ একাধিক রুটের সব গাড়ি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কায় বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে যায়নি গত ১০ দিনেও।
যাত্রীদের বিশ্বাস, বিশ্ব ইজতেমার কারণে অবরোধ শিথিল হলে আবারও স্বাভাবিক হতে পারে পরিস্থিতি। কিন্তু নতুন করে সঙ্কট তৈরি হওয়ায় আশঙ্কা ভেতরেই থেকে গেছে। রাকিবুল মওলা নামের সিটি করপোরেশনের এক কলেজশিক্ষক বলেন, আমার বাড়ি টাঙ্গাইলে। শুনেছি রাতে সীতাকুণ্ডে আগুন দিচ্ছে কে বা কারা। এসব খবর উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বাড়ি যেতে গিয়ে লাশ হতে হবে শেষমেষ।
নগর পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামে এই মুহূর্তে পণ্যবাহী কন্টেইনারের দিকে বেশি নজর পুলিশ বিভাগের। বিজিবির প্রহরায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু গাড়ি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছেড়ে গেছে। এসব গাড়ি চট্টগ্রাম দিয়ে সীতাকুণ্ড হয়ে প্রথমে ফেনী চলে যাচ্ছে। এরপর সেখান থেকে পুলিশের আরেকটি দল তাদের ঢাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করছে।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এসএম তানভীর আরাফাত মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ প্রহরায় গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেখা যাক কি হয়। আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করবো যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
চট্টগ্রাম বাসমালিক সমিতির নেতারা জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন বিভিন্ন কাউন্টার থেকে ১১০০ গাড়ি ছাড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এবারের চিত্র ভিন্ন। পুলিশ প্রহরায় বন্দর থেকে প্রতিদিন রাতে ৫০-৬০টি পণ্যবাহী গাড়ি ছেড়ে যায়। যাত্রীবাহী বাসসহ মোট দূরপাল্লার ১০০টি গাড়ি ছাড়ছে চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন।
বর্তমানে বাস মালিক নেতারা গাড়ি পুড়ে ফেলার ভয়ে রাস্তায় পরিবহন নামাতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, কত দিন এভাবে পুলিশ দিয়ে গাড়ি চালানো যাবে। তবে গত কয়েক দিন ধরে দুয়েকটি বিআরটিসির গাড়ি চলাচল করতে শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায়।
চট্টগ্রামের আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, একদিনের হরতালে আমাদের বাস মালিকদের ক্ষতি হচ্ছে ৩ কোটি টাকার কাছাকাছি। সেই হিসেবে নথি অনুযায়ী আমাদের ১০ দিনে ৩২ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়ে গেছে। পুলিশ দিয়ে গাড়ি চালাতে রাজি নন আমাদের ড্রাইভাররা। বাস মালিকরা কোন দলের নয়। তারা রাজনীতি করে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে গাড়ি চালানো যাবে না। কিন্তু এভাবে কত দিন আমরা লস দেবো বলতে পারেন?

রাজধানীতে পুলিশের বাস লক্ষ্য করে পেট্রল বোমা, আহত ১৩

বিক্ষিপ্ত, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনার মধ্য দিয়ে বিরোধী জোটের ডাকা অবরোধের ১২তম দিন পার হয়েছে। অবরোধ চলাকালে বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাজধানীতে অন্তত ৮টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। রমনা এলাকায় পুলিশের গাড়িতে ককটেল ও পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৩ পুলিশ সদস্য। তাদের মধ্যে ৫ জনকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি ৮জনকে ভর্তি করা হয়েছে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে। বিভিন্ন জেলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২০ দলের বেশকিছু নেতাকর্মী। বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা এবং নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলার প্রতিবাদে দেশের কয়েকটি জেলায় হরতাল পালিত হয়েছে। আজ হরতাল ডাকা হয়েছে আরও কয়েকটি স্থানে। এদিকে টানা অবরোধে দেশের অনেক এলাকায় নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজধানীতে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল ও পেট্রলবোমা
রাজধানীর রমনা পার্কের গেটে পুলিশের একটি বাস লক্ষ্য করে ককটেল ও পেট্রলবোমা হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। এতে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকসহ ১৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশ জানায়, গতকাল রাত ৮টার দিকে পিজি হাসপাতাল ও বারডেম হাসপাতালে দায়িত্ব পালন শেষে নিজস্ব বাসে পুলিশ সদস্যরা রাজারবাগের পুলিশ লাইন্সে ফিরছিলেন। বাসটি রমনা পার্কের রমনা রেস্টুরেন্টের গেটের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ বাস লক্ষ্য করে একাধিক ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। এতে বাসচালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আইল্যান্ডের ওপর তুলে দেন। এ সময় আজাদ নামে এক উপ-পরিদর্শকসহ ১৩ পুলিশ সদস্য আহত হন। আহত অন্য পুলিশ সদস্যরা হলেন- কনস্টেবল লিখন, মোরশেদ, মতিয়ার ও শামীম। এদের মধ্যে শামীমের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। ঘটনার পর সহকর্মী ও পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে ভর্তি করে। বাকি ৮জনকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশের রমনা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শিবলী নোমান বলেন, দুর্বৃত্তদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
অপরদিকে অন্যান্য দিনের মতো গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে পল্টন মোড় এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়। বেলা আড়াইটার দিকে উত্তর বাড্ডার ফুজি টাওয়ারের সামনে একাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়। ফায়ার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় যাত্রাবাড়ী থানাধীন রায়েরবাগ পুনম সিনেমা হলের সামনে ঢাকা-কুমিল্লা রুটের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি)’র সুলতানা ইসলাম নামে এক ছাত্রী আহত হন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি অবনী শঙ্কর রায় জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। দৃর্বৃত্তদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. নূর মোহাম্মাদ বলেন, সুলতানার আঘাত তেমন গুরুতর নয়। বাসটিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় সে জানালা দিয়ে লাফ দেয়ায় তার পায়ে আঘাত লাগে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার পর প্রক্টরিয়াল বডির সহায়তায় তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
এদিকে সকাল ৭টায় কাফরুল বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এসময় ওই বাসের চালক ও হেলপার নিজেরাই বাসটির আগুন নিভিয়ে ফেলেন। বিকাল ৪টায় দারুস সালাম থানাধীন টেকনিক্যাল মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ২টি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৩ ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সন্ধ্যায় ওই এলাকায় আরও একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। এ সময় সন্দেহভাজন একজনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নিউ মার্কেট থানাধীন সিটি কলেজের সামনে একটি প্রাইভেটকারে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। তবে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ওই আগুনের ঘটনার সম্বন্ধে তারা অবগত নন বলে জানিয়েছেন। সন্ধ্যায় হাতিরপুল বাজারে একটি ট্রাকে আগুন দেয়া হয়। প্রায় একই সময়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি সড়কেও একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
চাঁপাই নবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত স্কুলছাত্র রাজন আলী রকি (১৫) মারা গেছে। শুক্রবার রাতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সে মারা যায়। নিহত স্কুলছাত্র শিবগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি ও শেখটোলা গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে। সে ৯ম শ্রেণীতে পড়তো। গত বৃহস্পতিবার রকি রসুলপুর এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান দেখা শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তার ওপর লোহার-রড ও লাঠিসোটা দিয়ে হামলা চালায়। এতে সে মাথাসহ দেহের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পায়। প্রথমে তাকে শিবগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ওই দিনই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। রকি ২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টায় মারা যায়। নিহত রকির ভাই রুবেল জানান, বাবা আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ার কারণে স্কুলপড়ুয়া ভাইকে জামায়াত-শিবির ও বিএনপি’র কর্মীরা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। নিহত রকি রাধাকান্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। রকির লাশের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল শনিবার দুপুর দেড়টায় তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি শেখটোলায় আসলে তার মা-বাবাসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
এদিকে শিবগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের অভিযানে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যৌথবাহিনীর অভিযানে অধিকাংশই শিকার হচ্ছেন উপজেলার সাধারণ মানুষ। বৃহস্পতিবারের মতো শনিবারও বিকাল ৫টা থেকে অভিযান চালায় পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি সমন্বিত  যৌথবাহিনীর সদস্য। বিকালে শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নের শিয়ালমারা-কামালপুর গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে এই বাহিনী।
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া থেকে জানান, বগুড়ায় শনিবার সকালে অবরোধকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। শহরের মাটিডালি এলাকায় অবরোধকারীরা মহাসড়কে বেরিকেড সৃষ্টির চেষ্টা করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এতে অবরোধকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ৪/৫টি ককটেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল এবং রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে অবরোধকারীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১৪ জনকে আটক করেছে। পরে দুপুর ১টার দিকে শহরের ঝোপগাড়ী এলাকায় অবরোধকারীরা একটি সুজি বোঝাই ট্রাকে আগুন দেয়। এদিকে বিকালে বগুড়ার সদর থানার সামনে অবরোধকারীরা ৩টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।
স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে জানান, শনিবারও খুলনা থেকে দূরপালার কোন যানবাহন ছেড়ে যায়নি। এদিকে ওই দিন রাতে খুলনা থানা পুলিশ বিএনপি নেতা  মেজবাউল হাসান ও ছাত্রশিবির নেতা ইব্রাহিম ও নূরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে। সকাল ১০টায় নগরীর কেডি ঘোষ রোডে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শিবিরের জেলা সভাপতি গ্রেপ্তার: ইসলামী ছাত্রশিবিরের খুলনা জেলা সভাপতি মু. আইয়ুব আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় আহসানুল কারীম ও রাজু আহমেদ মোড়ল নামের আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে খুলনার কয়রা উপজেলা সদরের ওয়াজেদ আলীর বাড়ি থেকে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পুলিশ তাদের কাছ থেকে একটি শাটারগান, তিনটি হাত বোমা ও দুটি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, ৯ম সমাবর্তনের একদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনে ও ছাত্রীদের আবাসিক হলের পেছনে এ ককটেল দুটি বিস্ফোরণ করে পালিয়ে যায় দুজন দুর্বৃত্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক তারিকুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, রাত পৌনে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনে বিকট একটি শুনতে পাওয়া যায়। পরে সেখান থেকে মোটরসাইকেল যোগে দুজনকে পালিয়ে যেতে দেখে এর কিছুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন। ওই দুজন মোটরসাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসিক হলের সামনে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আরও একটি শব্দ শোনা যায় বলেও জানান তিনি। এদিকে রাজশাহীর তানোরে জামায়াত নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে মু-ুমালা তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ। গতকাল শনিবার দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ব্যক্তির নাম মিজানুর রহমান মিজান (৪৫)। বাড়ি উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানা জামায়াতের আমীর আবদুল গফুর মোল্লাসহ বিএনপি-জামায়াতের ১০ নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এদিকে, অবরোধ চলাকালে শুক্রবার রাতে সদর উপজেলার শিয়ালকোল বাজারের কাছে পিকেটারদের ছোড়া ঢিলে ও মারপিটে ৩টি সিএনজি অটোরিকশার চালক গুরুতর আহত হন। এ সময় তারা ওই অটোরিকশাগুলোও ভাঙচুর করে।
স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম থেকে জানান, কুড়িগ্রামে পুলিশ পাহারায় জামায়ত-শিবির ও বিএনপি অবরোধের সমর্থনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। জেলা জামায়াত-শিবির শহরের সরদার পাড়াস্থ দলীয় কার্যালয় থেকে এবং বিএনপি পোস্ট অফিসপাড়াস্থ দলীয় কার্যালয় থেকে বের হয়। দুটি মিছিলে ছিল পুলিশের পাহারা।
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানা পুলিশ বিএনপির ৩ নেতাকর্মীকে আটক করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। শুক্রবার রাতে ভেড়ামারা উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ধরমপুর উত্তর ভবানীপুর এলাকার রাকিবুল ইসলাম জ্যোতি (২৪), রুহুল আমিন নিশান (২৫) ও রিন্টু (৩২)।
নাটোর প্রতিনিধি জানান, অবরোধের সমর্থনে নাটোরে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল পুলিশি বাধার মুখে পড়ে পরে মহাসড়কে বসে সমাবেশ করেছে। গতকাল দুপুর ১২টায় শহরের আলাইপুরস্থ জেলা বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে থেকে দলের নেতাকর্মীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি স্টেশন বাজারের দিকে এগোলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পুলিশি বাধায় নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ের সামনে ফিরে গিয়ে নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কে বসে সমাবেশ করে।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের সাদা মাছের বাজার ও সবজি বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সব থেকে বড় দু’টি পাইকারি সাদা মাছের আড়তে মাছের আমদানি অস্বাভাবিকহারে কমে যাওয়ায় বেচাকেনা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। প্রতিদিন এ দু’টি মৎস্য আড়তে অন্তত ২ শ’ টন মাছ কেনাবেচা হয়ে থাকে। আর এখান থেকে এ মাছ রাজধানী ঢাকার কাওরান বাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। টানা অবরোধের ফলে পরিবহন সঙ্কট ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক অজানা আতঙ্কে তা এখন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে এই মৎস্যশিল্পের সঙ্গে জড়িত শ’ শ’ প্রান্তিক চাষি ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, অটোরিকশা ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে গতকাল রংপুরে বিএনপির সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৫ বিএনপি ও ৩ জামায়াত-শিবির কর্মীসহ মোট ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সকালের দিকে দোকানপাট বন্ধ থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর দোকানপাট খুলতে শুরু করে।
ভোলা প্রতিনিধি জানান, ভোলা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বিকালে শহরের পিটিআই এলাকায় গোপন বৈঠককালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে, শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ২ বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সন্ধ্যার আগে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে জনমনে।
স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ থেকে জানান, অব্যাহত অবরোধের কারণে বাজারে ভোজ্য তেল, ডাল ও পিয়াজের সঙ্কট দেখা দিচ্ছে ময়মনসিংহে। মজুত কমে যাওয়ায় ভোজ্য তেল, মসুরের ডাল ও পিয়াজের দাম বেড়েছে। ভোজ্য তেল লিটারপ্রতি ১০ থেকে ১২, মসুরের ডাল প্রতি কেজি ৭ থেকে ৮, পিয়াজ ৫ থেকে ৬ টাকা দাম বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে দামও বেড়েছে চিনির। ব্যবসায়ীরা জানান ২-১ দিনের মধ্যে এসব পণ্যের মজুত শেষ হয়ে যাবে। অবরোধ অব্যাহত থাকলে বাজারে এসব পণ্যের সঙ্কট দেখা দেবে। ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক শংকর সাহা জানান, ময়মনসিংহের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার ছোটবাজার ও মেছুয়া বাজার প্রতি সপ্তাহে ৮ থেকে ১০ ট্রাক ভোজ্য তেল, ১০ থেকে ১২ ট্রাক ডাল আনা হয়। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে এক সপ্তাহের বেশি কোন চট্টগ্রাম থেকে এসব পণ্য পরিবহন করে ময়মনসিংহে নিয়ে আসার সাহস পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এদিকে ট্রাকের মালিক ও শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করতে রাজি হচ্ছে না। কেউ কেউ রাজি হলেও ১৭-১৮ হাজার টাকা থেকে ৩০-৩২ টাকা পর্যন্ত ট্রাক ভাড়া দিতে হয়।
আজ যেসব জেলায় হরতাল
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী থেকে জানান, সোনাইমুড়ী ছাত্রদলকর্মী মোরশেদ আলম পারভেজ হত্যার প্রতিবাদে আজ নোয়াখালীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে জেলা বিএনপি। গতকাল দুপুর ২টায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ আজাদ হরতালের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনগণকে নোয়াখালী জেলায় আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের আহ্বান জানান। এদিকে নোয়াখালী পৌর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ চৌধুরী চয়নসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে নোয়াখালীর মাইজদীর শান্তিনগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে সুধারাম থানা পুলিশ।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, রাজশাহী বিভাগে আজ থেকে ৩৬ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে বিএনপি। চাঁপাই নবাবগঞ্জে যৌথ অভিযানে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ছাত্রদল নেতা নিহতের প্রতিবাদে এ হরতাল আহ্বান করা হয়। রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল মনির স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৫ই জানুয়ারি চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ছাত্রদল সহসভাপতিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আরও দু’জন ছাত্রদলড়নেতা র‌্যাব কর্তৃক অপহৃত হওয়ার পর নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলার সভাপতিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের ও তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বেআইনিভাবে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে গুপ্ত ঘাতক দিয়ে গুলি করে হত্যা করার প্রচেষ্টা ও বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে বর্তমান সরকার একদলীয় সরকার কায়েম করেছে। এসবের প্রতিবাদে আজ সকাল ৬টা থেকে কাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগে ৩৬ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করা হয়েছে।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, সারা দেশে বিএনপির গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে সরকারের নির্দেশে পুলিশের অত্যাচার, গুলি করে মানুষ হত্যা, গুম, মিথ্যা মামলা ও নেতাকর্মীদের বিনা কারণে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজবাড়ীতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে রাজবাড়ী জেলা ২০ দলীয় ঐক্যজোট। বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্ত করার দাবিতে রাজবাড়ীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে জেলা বিএনপির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। গতকাল দুপুর ১২টায় জেলা বিএনপির কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শহরে এক বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলে নেতৃত্বে দেন জেলা বিএনপির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ ছাড়া গতকাল জেলা সদরে দুজন, পাংশা উপজেলায় দুজন, কালুখালী উপজেলায় একজন, বালিয়াকান্দি উপজেলায় দুজন এবং গোয়ালন্দ উপজেলায় একজনসহ ৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি জানান, আজ গাইবান্ধা জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি আনিসুজ্জামান খান বাবু স্বাক্ষরিত সন্ধ্যায় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ হরতাল আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করার প্রতিবাদ এবং দেশব্যাপী ২০ দলীয় জোটের গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি এবং নির্যাতনের প্রতিবাদে এ হরতাল আহ্বান করা হয়। এছাড়া খুলনা দক্ষিণ জেলা শিবিরের সভাপতি আয়ুব আলীকে আটকে আজ খুলনার ৩ উপজেলায় হরতাল আহ্বান করেছে দক্ষিণ জেলা ছাত্রশিবির। হরতাল সমর্থনে সংগঠনের পক্ষ থেকে গতকাল দুপুরে পাইকগাছা উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়েছে।

স্থবির আমদানি-রপ্তানি- স্থলবন্দরে আটকা শত শত ট্রাক

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধে ভেঙে পড়েছে অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা। এর প্রভাব পড়েছে দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে। নিরাপত্তার অভাবে সীমান্তের ওপারে থাকা পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে না। পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আটকে আছে শ’ শ’ ট্রাক। একই কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য নিয়ে ব্যবসায়ীরা সীমান্তের বন্দরগুলোতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তার আশ্বাস সত্ত্বেও পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ীরা বন্দরমুখী হচ্ছেন না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে গাড়িভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন কতিপয় পরিবহন ব্যবসায়ী। ফলে যারা পুলিশ ও বিজিবি পাহারায় পণ্য পরিবহন করছেন, তারা ভাড়া মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। যার প্রভাব পড়েছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে। স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দরগুলোর কার্যক্রম। পচন ধরেছে খালাসের অপেক্ষায় থাকা পণ্য। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কয়েকটি বন্দরে পুলিশ ও বিজিবি পাহারায় আমদানি-রপ্তানি শুরু হয়েছে।
চাঁপাই নবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধে ১১ দিন ধরে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ২২ কোটি টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। পণ্যবাহী ট্রাকে একের পর এক আগুন দেয়ায় বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রেখেছেন। এদিকে পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের ইয়ার্ডে আটকা পড়েছে দুই শতাধিক পণ্যবাহী ভারতীয় ট্রাক। বাংলাদেশী ট্রাকের অভাবে ভারতীয় এসব ট্রাক থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকৃত কাঁচা পণ্য পিয়াজ, আদাসহ বিভিন্ন ফলে পচন দেখা দিয়েছে। সোনামসজিদ সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব সোহেল আহমেদ পলাশ জানান, গত ৭ই জানুয়ারি থেকে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কাঁচা পণ্যবাহী বেশ কিছু ট্রাক গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আবার গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে বেশ কয়েকটি ট্রাকে আগুন দেয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশী ট্রাকের অভাবে ভারতীয় ট্রাক থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় পানামা ইয়ার্ডে দুই শতাধিক ভারতীয় ট্রাক আটকা পড়েছে। ভারতের ট্রাকচালক মাজহারুল হোসেন জানান, কলকাতা থেকে আমলকি নিয়ে ১০ দিন আগে তিনি সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আসেন। কিন্তু বাংলাদেশী ট্রাকের অভাবে তার ট্রাক থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় তিনি আটকা পড়েছেন। অন্ধ্রপ্রদেশের ট্রাকচালক অমর দাস জানান, তিনিও ৯ দিন আগে উত্তরপ্রদেশের ফতেপুর থেকে পিয়াজ নিয়ে এ বন্দরে আসেন। কিন্তু পণ্য এখনও খালাস করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, তিনি যা টাকা-পয়সা নিয়ে এসেছিলেন তাও প্রায় ফুরিয়ে যেতে বসেছে। সোনামসজিদ স্থলবন্দরের আমদানিকারক মনিরুল ইসলাম বলেন, এ বন্দরে পচনশীল পণ্য আটকা পড়ায় ইতিমধ্যে কিছু ফল, পিয়াজ ও আদায় পচন ধরতে শুরু করেছে। সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার নুরুল বাশির জানান, বর্তমানে বন্দরে দুই শতাধিক ভারতীয় ট্রাক আটকা পড়েছে। বাংলাদেশী ট্রাকের অভাবে ওই সব ট্রাক থেকে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পণ্যজটের কারণে বন্দরে কোন ভারতীয় ট্রাক ঢুকছে না। তিনি বলেন, প্রতিদিন এ বন্দর থেকে সরকার কমপক্ষে ২ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে। সে হিসাবে গত ১১ দিনে ২২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। চাঁপাই নবাবগঞ্জ চেম্বার সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ জানান, বন্দরে পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকারকরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, অবরোধের কারণে আখাউড়া স্থলবন্দরে রপ্তানি কার্যক্রম অর্ধেক কমে গেছে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রায় ২০০ ট্রাক এ বন্দর দিয়ে যাওয়া-আসা করতো। প্রায় এক কোটি টাকার ওপরে আমদানি-রপ্তানি হতো। অবরোধের কারণে এখন প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক যাতায়াত করছে। কমে এসেছে রপ্তানির পরিমাণ। এখন প্রতিদিন ৫০ কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে। আখাউড়া বন্দর দিয়ে মূলত পাথর, সিমেন্ট, শুঁটকি, মাছ, প্লাস্টিকদ্রব্য, পাটজাতদ্রব্য রপ্তানি। এসব দ্রব্য আসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর থেকে। অবরোধের কারণে এসব এলাকা থেকে ট্রাক নিয়ে আসতে ভয় পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ত্রিপুরার আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সেক্রেটারি হাবুল বিশ্বাস মোবাইল ফোনে জানান, বাংলাদেশে অবরোধের কারণে গাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী সেখান থেকে মাল কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। বিশেষ করে ছোট ছোট ব্যবসায়ী এ বাড়তি ভাড়া বহন করতে পারছেন না। সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত একটি ট্রাকের ভাড়া আগে ছিল ১৪ হাজার। এখন সেই ভাড়া প্রায় ২০ হাজার পার হয়ে গেছে। আখাউড়া বন্দরের রপ্তানিকারক সমিতির সেক্রেটারি ও প্রিয়াংকা এন্টারপ্রাইজের সেক্রেটারি হাজী তাজুল ইসলাম বলেন, আখাউড়ার বন্দরে মারাত্মকভাবে অবরোধের প্রভাব পড়েছে। রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ট্রাকমালিকরা ভয়ে গাড়ি বের করছেন না। ফলে গাড়িভাড়া বেড়ে গেছে। তবে বন্দরে রপ্তানি কার্যক্রম কমে যাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি স্বীকার করেননি আখাউড়া স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, রপ্তানি কার্যক্রম কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা মাল নিতে আসছেন না।
হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, টানা হরতাল, অবরোধ ও পণ্য পরিবহনের অভাবে স্থবিরতা বিরাজ করছে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে। অতিরিক্ত গাড়িভাড়ার কারণে পুলিশ ও বিজিবির পাহারায় পণ্য পরিবহনের আগ্রহ কম ব্যবসায়ীদের। পণ্য পরিবহন না হওয়ার কারণে বন্দরের অভ্যন্তরে ও ব্যবসায়ীদের পোডাউনে জট লেগে আছে। পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে বন্দর থেকে পণ্যও ছাড় হচ্ছে কম। প্রতিদিন বন্দরে কমবেশি এক থেকে দেড় শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক বন্দর অভ্যন্তরে থাকছে পণ্য খালাসের অপেক্ষায়। পুলিশ ও বিজিবি নিরাপত্তা দিলেও আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের তেমন কোন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত গাড়িভাড়া দিয়ে ও অজানা আতঙ্ক নিয়ে তারা পণ্য সরবরাহ করতে চাচ্ছেন না। এদিকে পুলিশ ও বিজিবির পাহারায় হিলি স্থলবন্দর থেকে প্রতিদিন পিয়াজ, চাল ও কয়লার মতো ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক পণ্য বগুড়া মোকামতলা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। হিলি স্থলবন্দরে ব্যবসায়ী আরকে ট্রেডিংয়ের মালিক রাজীব কুমার দত্ত জানান, হরতাল ও অবরোধের আগে তিনি বন্দর ও নিজস্ব গোডাউন থেকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ ট্রাক চাল বিক্রি করে থাকেন, কিন্তু বর্তমানে অবরোধের কারণে তার পাইকারের সংখ্যা কমেছে, যে দু-চারজন ব্যবসায়ী তার কাছে থেকে চাল কিনছেন তারা পরিবহনের ঝুঁকি নিতে চাইছে না, ফলে তাকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বিক্রির অভাবে প্রচুর পরিমাণে চাল পড়ে আছে তার গোডাউনে ও বন্দরে। ফলে তাকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তার মতো একই অবস্থা বন্দরের ছোট-বড় শতাধিক আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের। পানামা হিলি পোটের অপারেশন ম্যানেজার এস এম হায়দার আলী জানান, পণ্য ডেলিভারি কম হওয়ার কারণে, রাতে ভারতীয় গাড়ির অবস্থান বাড়ছে। গাড়িভাড়া বেশি হওয়ার কারণে অনেকে বন্দর থেকে পণ্য ছাড় করছেন না, ফলে পণ্যজট লেগে আছে। হিলি কাস্টমসের সহকারী কমিশনার মহিবুর রহমান জানান, হিলিবন্দর দিয়ে কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে হরতাল ও অবরোধের কারণে ব্যবসায়ীরা কিছুটা কম পণ্য খালাস করছেন বন্দর দিয়ে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গতকাল থেকে এ বন্দর দিয়ে আগের মতো বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে শুরু হয়েছে মালামাল আমদানি-রপ্তানি। অবরোধ ও হরতালের কারণে ভারত ও নেপাল থেকে আনা পাথর, কয়লা, চাল, গম, ডালসহ অন্যান্য পণ্য বন্দরের ওয়্যার হাউজে রাখা হয়। এসব পণ্য ইতিমধ্যে বিজিবি ও পুলিশ পাহারায় দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিনে ১ হাজার ১৪০টি পণ্যবাহী ট্রাক ও ৫৭টি জ্বালানি বহনকারী লরি বিজিবি’র পাহারায় নিরাপদে পঞ্চগড় জেলায় চলাচল করেছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানিকৃত সব ধরনের পণ্যের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে বিজিবি সদস্যরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে বন্দরের অচলাবস্থা কাটবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন।
পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি জানান, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও স্বাভাবিক হচ্ছে না বুড়িমারী স্থলবন্দরের কার্যক্রম। স্বাভাবিক অবস্থায় শতাধিক ট্রাক এ বন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেয়া করে। বর্তমানে প্রতিদিন ৫০-৬০টি ট্রাক বন্দর দিয়ে যাওয়া-আসা করছে। কয়লা রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। শুধু পচনশীল ফল হওয়ার কারণে লোকসানের আশঙ্কায় ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ীরা কমলা রপ্তানি করছেন।

টাকা কীভাবে শোধ দেবেন ফজলুর?- চট্টগ্রামে পেট্রলবোমায় দগ্ধ রিকশাচালক by প্রণব বল

ডিসেম্বর মাসে ছয় হাজার টাকা ধার করেছিলেন ফজলুর রহমান। তাঁর মেয়ে রুমি আক্তার এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষার ফি জমা দিতে এই টাকা ধার করতে হয়েছে তাঁকে। মেয়েকে নিয়ে বড় স্বপ্ন তাঁর। সংসার খরচ তো আছেই, ধার করা টাকা ফেরত দেওয়ার দুশ্চিন্তাও এক মাস ধরে পোড়াচ্ছে ফজলুর রহমানকে। পঞ্চাশ পেরোনো জীর্ণ শরীর নিয়ে তাই রাতেও রিকশা নিয়ে বের হতে হয় তাঁকে। হাড়ভাঙা খাটুনির পর গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এরপর আবারও রিকশা নিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু ঘরে ফেরার আগেই অন্ধকার ফুঁড়ে ছুটে আসা পেট্রলবোমায় ফজলুর রহমানের জীবন এখন সংকটাপন্ন। টানা অবরোধের মধ্যে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রামের কর্নেলহাট সিডিএ-১ নম্বর এলাকায় রিকশা চালানো অবস্থায় পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে গতকাল শনিবার কথা হয় ফজলুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একদিন রিকশা না চালালে আমার সংসার চলে না। তার ওপর ওই ঋণ। এখন কী হবে? আমার তো সব শেষ।’ নগরের বিশ্বকলোনি এলাকায় ছেলে আমিনুর রহমানকে নিয়ে থাকেন ফজলুর রহমান। আমিনও রিকশা চালান। তাঁদের বাড়ি নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায়। সাত মাস আগে ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি কর্নেলহাট থেকে দুই যাত্রী নিয়ে বিশ্বকলোনি যাচ্ছিলাম। সিডিএ-১ এলাকায় আসার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার পাশের অন্ধকার থেকে একজন পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। এসে পড়ে আমার হাতের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত ও লুঙ্গিতে আগুন লেগে যায়। দুই যাত্রী লাফ দিয়ে বেঁচে যান।’
আগুনে দুই হাত, কোমরসহ দুই পা দগ্ধ হয়েছে ফজলুর রহমানের। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক মিশমা ইসলাম জানিয়েছেন, ‘ফজলুর রহমানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। রোগী কথা বলছে, এটা দেখে ভালো মনে হতে পারে। কিন্তু ৩৫ শতাংশ পোড়া রোগীর অবস্থা যেকোনো মুহূর্তে খারাপ হয়ে যেতে পারে।’
বাবার চিকিৎসা, সংসার খরচ, বোনের পরীক্ষা— কীভাবে একা সব সামাল দেবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না আমিনুর রহমান। তিনি জানান, নওগাঁয় মায়ের সঙ্গে তাঁর বোন থাকে। মুঠোফোনে তাঁদের খবর জানিয়েছেন। সবাই কাঁদছে। তিনি বলেন, ‘আমার বোন এসএসসি পরীক্ষা দেবে, এ নিয়ে বেশি ভাবতেন বাবা। এখন সব শেষ হয়ে গেল।’
দগ্ধ ট্রাকচালক: প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের অন্য একটি শয্যায় কাতরাচ্ছেন ট্রাকচালক তাজুল ইসলাম। তাঁর তিন সন্তান। ১০ জানুয়ারি কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম আসার পথে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন। বুক, মুখ, হাতসহ তাঁর শরীরের ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁর অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানান চিকিৎসকেরা। তাজুল বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের ওপর কেন হামলা হয়?’

বিজিবিপ্রধানের বক্তব্য মানবাধিকার লংঘন নয়, দাবি মিজানের

বিজিবিপ্রধানের বক্তব্য মানবাধিকার লঙ্ঘন নয় বলে জানিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত ‘নারীর ক্ষমতায়নে সচেতনাতামূলক প্রচারাভিযান ও সিডো সনদের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক সেমিনারে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। বৃহস্পতিবার পিলখানায় বিজিবি সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেছেন, “জানমালের নিরাপত্তায় বিজিবি সদস্যরা অবশ্যই অস্ত্র ব্যবহার করবেন। কেউ পেট্রোল বোমা ব্যবহারের চেষ্টা করলে বিজিবি সদস্যরা বসে থাকবেন না। জানমালের নিরাপত্তায় তারা তখন অবশ্যই অস্ত্র ব্যবহার করবেন।” মিজানুর রহমান বলেন, “বিজিবি প্রধান মানুষ হত্যার ঘোষণা দেয়নি। তিনি বলেছেন, জ্বালাও–পোড়াও, সহিংসতার মধ্যে মানুষের জান-মাল রক্ষার্থে প্রয়োজনে গুলি চালানো হবে। আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনবোধে গুলি অবশ্যই মানবাধিকার লংঘন নয়।” ড. মিজান বলেন, “একজন গাড়িতে পেট্রোল বোমা মেরে জ্বালিয়ে দেবে আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চুপচাপ দেখবেন তা হতে পারে না। সেক্ষেত্রে আত্মরক্ষা যেকোনো আইনেই বৈধ।” সরকারের প্রতি বিএনপির সংলাপের আহ্বান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণতন্ত্রকে যারা ধারণ করে তাদের সঙ্গে সংলাপ হতে পারে কিন্তু গণতন্ত্রকে যারা ত্যাগ করে, নাশকতার পথ বেছে নেয় তাদের সঙ্গে আবার কিসের সংলাপ? সন্ত্রাস ও পাশবিকতার সঙ্গে কোনো সংলাপ হতে পারে না।” মিজানুর রহমান বলেন, “নারীর ক্ষমতায়ন মূল্যায়ন করতে হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে নারীদের মূল্যায়ন না করলে অর্থাৎ তাদের কাজের মূল্য না দিলে নারী ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। তাই নারী ক্ষমতায়নে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।” আমাদের দেশে নারীদের সকল ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণ বাড়লেও অংশিদারিত্বে বার বার হোঁচট খাচ্ছি বলে মন্তব্য করেন তিনি। কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, “নারীর অধিকারগুলোকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মূল কথাগুলোকে ধারণ করে সিডো সনদের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ২ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘বৈষম্য বিলোপ করে নারী পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপনের নীতিমালা ও উদ্যোগ গ্রহণ।’ তাই এই ধারার ওপর আরোপিত সংরক্ষন তুলে না নিলে সিডোর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।” অনুষ্ঠানে নারী অধিকার বিষয়ক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মাহফুজা খানমের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন- গণ স্বাক্ষরতার অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, সাংসদ শিরিন আক্তার।

রাজনৈতিক সহিংসতা: দগ্ধ মানুষের কথা

বাংলাদেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গেলে এখন চোখে পড়বে পায়ে, শরীরে, মুখমণ্ডলে সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া বহু রোগী। এক একটি মানুষ যেন এক একটি জীবন্ত মমি। গত ১২ দিনের রাজনৈতিক হানাহানির মধ্যে রাস্তায় বা গাড়িতে অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছেন তারা। গত ১২ দিনে প্রতিদিনই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের খবর এসেছে। আজও রাজধানী ঢাকার পুরনো অংশে দুটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দগ্ধ অনেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের অনেকের অবস্থাই গুরুতর। নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে যারা সজ্ঞানে আছেন মাঝে মধ্যেই তাদের যন্ত্রনাকাতর চীৎকার শোনা যায়ে। দগ্ধদের কজন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন রাজশাহীর আবু বক্কর সিদ্দিক। পেশায় ট্রাকচালক। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি খাদ্যপন্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় আসছিলেন তিনি। পথে সিরাজগঞ্জে হামলার শিকার হয় তার চলন্ত ট্রাকটি। “সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। আমার ট্রাক চলছে। হঠাৎ দেখলাম পাশে জঙ্গলের মধ্যে থেকে একদল ছেলে এসে একটি আগুন বোমা ছুড়ে মারল। সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকে এবং আমার গায়ে আগুন ধরে গেল। আমি ট্রাক নামিয়ে দিলাম পাশের রাস্তায়। ট্রাক উল্টে গেল। আমার গায়ে সব শীতের পোশাকে আগুন ধরে গেল। আমি উপরের জ্যাকেট খুলতে পারলাম। ততক্ষণে আমার মাথার মাফলারে আগুন ধরে গেছে।” সিদ্দিকের শরীরের শতকরা নব্বই ভাগই আগুনে পুড়ে গেছে। তিনি তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে পরিবার। সন্তানেরা স্কুলে পড়ে। তিনি যেদিন বার্ন ইউনিটে এসেছেন, সেদিনই তার পাশের বিছানার রোগী আবুল কালাম আজাদের মৃত্যু হয়েছে। পেশায় তিনি ছিলেন একজন ব্যক্তিগত গাড়িচালক। কয়েকদিন আগেই মগবাজার এলাকায় তার গাড়িটিতে অগ্নিসংযোগ করার পর তিনি দগ্ধ হয়েছিলেন। দুরপাল্লার বাসে পেট্রোল বোমায় পুড়ে গেছেন স্বপ্না বেগম (ডানে) এবং মিনারা নিবিড় পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের পাশেই পোস্ট অপারেটিভ বা অস্ত্রোপচার পরবর্তী কক্ষে রয়েছেন স্বপ্না বেগম। অস্ত্রোপচারের পড় তিনি আশঙ্কামুক্ত। মুখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে। দগদগে ঘা সেখানে। চোখ খুলতে পারছেন না। গাড়িচালক স্বামীর রোজগারে ঢাকায় সংসার চালানো কষ্ট, তাই বাসাবাড়িতে কাজ করতেন স্বপ্না। মেয়ে আর জামাইকে নিয়ে বাবার বাড়ী কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে বেড়িয়ে বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন তিনি। এ সময়ে চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে দুষ্কৃতিকারীরা। বার্ন ইউনিটে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে যে এগারোজন মানুষ এখন চিকিৎসাধীন আছেন তাদের সবারই কমবেশি একই রকম গল্প। 'সারা শরীরে মরিচের জ্বালা' ঢাকার কমলাপুরে একটি লেগুনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ মোহাম্মদ সেলিম বলছিলেন, "“সারা গায়ে মরিচের মত জ্বলে।এখন আর চিৎকার করার শক্তিও পাই না। আপনার সঙ্গে কথা বলছি, কিন্তু সারা শরীরে বেদনা’। দগ্ধ সেলিমের পাশে বসে ছিলেন উৎকণ্ঠিত তার মা রহিমা বেগম। এক মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে লেগুনাটি কিনে দিয়েছিলেন সেলিমকে। প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তি দিতে হয়। গত রবিবারের হামলায় তার লেগুনাটি ভস্মীভূত হয়ে গেছে। সেলিম যখন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন, তখন গত সপ্তাহেই কিস্তির জন্য তাদের বাড়িতে এসে কয়েকবার ঘুরে গেছেন মহাজন।

অবরোধের ১৩ দিন আজ- সহিংসতার শিকার সাধারণ মানুষ by শরিফুল হাসান

গাইবান্ধার আলতাফ হোসেন স্কুলশিক্ষক। নাটোরের ইমাদুর রহমান, সিরাজগঞ্জের ইসমাইল হোসেন, বরিশালের আবুল কালাম ও নোয়াখালীর জমির হোসেন পেশায় গাড়িচালক। আর চট্টগ্রামের এনাম হোসেন ও নোয়াখালীর মিজানুর রহমান দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁরা সবাই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার বলি। কিন্তু তাঁরা কেউই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কেবল এই সাতজনই নন, গত ১২ দিনের অবরোধে সারা দেশে এখন পর্যন্ত যে ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, তাঁদের ১৯ জনই সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়েই মারা গেছেন নারী-শিশুসহ পাঁচজন। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যে ১০ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁরা সবাই সাধারণ শ্রমজীবী। এ ছাড়া অবরোধ কর্মসূচিতে আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি। যাঁদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। এসব ঘটনার পর জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করছেন।
২০১৩ সালেও একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ চলাকালে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হন ৫০৭ জন। যাঁদের মধ্যে ১৯৬ জন সাধারণ মানুষ। তাঁদের বেশির ভাগই মারা গেছেন গাড়িতে আগুন, পেট্রলবোমা ও ককটেল হামলা কিংবা রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষে।
দশম সংসদ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে আবার রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়েছে বছরের শুরু থেকে। এ সহিংসতায় আবারও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। তিনি গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে জানান, ৫ জানুয়ারি বিএনপি সমাবেশ করতে চেয়েছিল। এটি তাদের রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু সরকার নাশকতার কথা বলে তাদের সমাবেশ করতে দিল না। নাশকতার আশঙ্কাটা আসলে কী, সেটা সরকার পরিষ্কার করলে ভালো হতো। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবরোধের নামে যে সন্ত্রাসবাদ চলছে, সেটি কখনোই মানা যায় না।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন কখনোই সহিংস হতে পারে না। আমরা এর আগেও এমন চিত্র দেখেছি। সব আন্দোলনের শিকার সাধারণ মানুষ। তাঁদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। যখন-তখন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। কিন্তু রাজনীতিবিদদের মনে রাখা উচিত রাজনীতির নামে মানুষ হত্যার অধিকার কারও নেই।’
গত বছর ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াতসহ ২০-দলীয় জোটের অবরোধ চলছে। তবে ৪ জানুয়ারি থেকেই সহিংসতার শুরু। ওই দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত নিহত হন ২৬ জন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন পেট্রলবোমা ও গাড়িতে আগুনে পুড়ে এবং ১০ জন সংঘর্ষে মারা গেছেন। পাঁচজন নিহত হন বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে। এই পাঁচজনসহ মোট সাতজন রাজনৈতিক কর্মী। এ সময় প্রায় আড়াই শ যানবাহনে আগুন ও তিন শরও বেশি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এসব যানবাহনের প্রায় সবগুলোর মালিকই সাধারণ মানুষ।
এবার সবচেয়ে নির্মম ঘটনা ঘটেছে ১৩ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুরে। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন: কুড়িগ্রামের রহিমা বেগম, তাঁর ছেলে রহিম বাদশা ও মেয়ে জেসমিন আক্তার এবং রংপুরের তছিরন বেগম ও দুই বছরের এক শিশু। নিহত রহিম বাদশার স্ত্রী নিলুফার বেগম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বামী ঢাকাত (ঢাকায়) বাদাম বিক্রি করত। তাই দিয়া হামার ছাওয়াগুলার পড়াশুনা এবং সংসার চলছে। মোর স্বামীর কী অপরাধ? হামরা তো আজনীতি (রাজনীতি) করি না। হামার স্বামীক কেনে পুড়ি মারিল? হামার শাশুড়ি, ননদোক (ননদ) ক্যান পুড়ি মারিল?’
৮ জানুয়ারি ঢাকার ইস্কাটনে অবরোধকারীদের পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন প্রাইভেট কারের চালক আবুল কালাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৫ জানুয়ারি মারা যান ২৬ বছরের এই তরুণ। ছেলে মারা যাওয়ার পর মা সাফিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোর ছেলে কোনো রাজনীতি করত না। হ্যার পরও ওরে এমনভাবে পোড়াইয়া মারল। ওর পাঠানো ছয় হাজার টাহা দিয়ে পরিবারের চারজন এত দিন বাঁইচ্যা ছিলাম। অ্যাহন মোরা কী খাইয়া বাঁচমু।’
১২ জানুয়ারি অবরোধের কারণে বাস না পেয়ে ট্রাকে করে ফেনী থেকে চট্টগ্রাম ফিরছিলেন রিয়াজউদ্দিন বাজারের দোকান কর্মচারী এনাম হোসেন। পথে জোরারগঞ্জে দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমা হামলায় নিহত হন তিনি। একই দিন অবরোধকারীদের ধাওয়ায় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারালে নোয়াখালী শহরের পৌরকল্যাণ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে নিহত হন চালক জমির হোসেন।
নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসে ঢাকায় আসার পথে পেট্রলবোমা হামলায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে এখন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছেন বেসরকারি একটি সংস্থার কর্মী আল মাসুদ। তাঁর বোন ফাতেমা জোহরা বলেন, ‘আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী অপরাধ? আমরা তো রাজনীতি করি না। আমরা কেন হামলার শিকার?’
যশোরের ট্রাকচালক মুরাদ হোসেন নিজের গাড়িতেই ঘুমিয়ে ছিলেন। ৭ জানুয়ারি ওই গাড়িতে আগুন দিলে গুরুতর দগ্ধ হন তিনি। ১১ জানুয়ারি সকালে মারা যান। একইভাবে ১৫ জানুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে বাসের ভেতর পুড়ে মারা যান চালকের সহযোগী তোফাজ্জল হোসেন।
১১ জানুয়ারি রাতে গাইবান্ধায় যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তরা পেট্রলবোমা ছুড়লে আসাদুল মিয়া নামে এক যাত্রীর শরীরে আগুন ধরে যায়। তা দেখে ভয়ে জানালা দিয়ে বাইরে লাফিয়ে পড়েন পারভেজ মিয়া নামের আরেক যাত্রী। আর তৎক্ষণাৎ ট্রাকের চাপায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।
২০১৩ সালে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চোরাগোপ্তা হামলা, পেট্রলবোমা ও গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
জানতে চাইলে আসকের পরিচালক (তদন্ত ও অনুসন্ধান) মো. নূর খান বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার বা টিকে থাকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ সব সময়ই মরেছে। দুই দশক ধরে তা বাড়তে বাড়তে এখন তা চরম উদ্বেগের জায়গায় পৌঁছেছে। তিনি বলেন, ‘দুঃখের বিষয়, কখনো এসব হত্যার বিচার হয় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে।’