Sunday, July 3, 2016

ফ্রম ক্রসফায়ার টু লাঠি-বাঁশি!

‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে কথা উঠেছে। কথা আগেও ছিল। এখন একের পর এক যেভাবে ক্রসফায়ার চলছে, অনেকেই চিন্তিত। এটা ঠিক যে ক্রসফায়ারে মূলত দাগি কিছু আসামি, জঙ্গি সন্ত্রাসী বা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিই মারা যান। কিন্তু মারা যেতে হবে কেন? এখানেই প্রশ্ন। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কি তঁাদের অপরাধী হিসেবে সাজা দেওয়া যায়? তাই পুলিশের কাজ হলো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধরে বিচারের সম্মুখীন করা। তারপর আদালত জানেন কী করতে হবে। কিন্তু তার আগেই পুলিশ তঁাদের নিয়ে যাচ্ছে ‘স্বীকারোক্তি’ অনুযায়ী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বা অন্য অভিযুক্ত অপরাধীদের ধরতে এবং সেখানে চিরাচরিত প্রথায় ‘ওত পেতে থাকা কিছু অপরাধী পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ শুরু করে এবং আসামি মারা যায়’! এখন পুলিশ আরেক কৌশল নিয়েছে। জনপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে জড়ো করে তাঁদের হাতে লাঠি-বাঁশি তুলে দেওয়া হচ্ছে। ২৯ জুন জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে বাগেরহাটে সাধারণ মানুষের মধ্যে লাঠি বিতরণ করেছে জেলা পুলিশ। এর আগে আরও কয়েকটি জেলা-উপজেলায় জনতার হাতে লাঠি-বাঁশি তুলে দেওয়া হয়েছে। ক্রসফায়ারের চেয়ে লাঠি-বাঁশি যে ভালো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু তাতে কি বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ হচ্ছে? দুদিন আগেও তো বন্দুকযুদ্ধে একজন মারা গেছেন। তারপরও বলব, বন্দুকযুদ্ধের পরিবর্তে পুলিশ যদি লাঠি-বাঁশি অপারেশনের পরিকল্পনা করে থাকে, মন্দের ভালো। অন্তত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকবে। পুলিশ বলছে, ওই লাঠি আক্রমণের জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য। তাহলে তো ভালো, খুব ভালো। কিন্তু লাঠি যে কে কার মাথায় মারবে, সেটা কে পাহারা দেবে? পুলিশ তো লাঠি দিয়েই খালাস। তারপর কেউ ডাক দিল আর পিল পিল করে লোকজন লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, হুজুগের মাথায় নিরীহ কারও মাথা ফাটিয়ে দিল। এসব হাঙ্গামা সামলাবে কে? পুলিশ কি পূর্বাপর সব বিবেচনা করেই লাঠি-বাঁশির চাল দিচ্ছে? আরও প্রশ্ন হচ্ছে লাঠি-বাঁশি কি বিচার? না, বিচার না, কিন্তু জনপ্রতিরোধের একটা ব্যবস্থা। এটা সুশৃঙ্খলভাবে না চালানো হলে সমস্যা আছে। আত্মরক্ষার যে কথা পুলিশ বলছে, সেটা যদি ঠিক ঠিক পালন করা হয়, তাহলে অবশ্য দোষ নেই। কিন্তু এই সুযোগে গণ-অরাজকতা শুরু হবে কি না, সেটা দেখতে হবে। লাঠি-বাঁশির খবরে মনে পড়ল নাটোরে প্রায় দেড় যুগ আগে গড়ে ওঠা লাঠি-বাঁশি আন্দোলনের মূল নেতা আবদুস সালামের কথা। আমরা মনে করতে পারি যে তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে নাটোরে লাঠি-বাঁশি সমিতি সফল ভূমিকা পালন করেছিল। তখন সেখানে নির্বিচারে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি চলছিল।
নাটোরের ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লাঠি-বাঁশি আন্দোলন গড়ে তোলেন। কোথাও কেউ চাঁদাবাজি করতে গেলেই বাঁশিতে ফুঁ, আর সঙ্গে সঙ্গে দলে দলে লাঠি হাতে ব্যবসায়ীরা এসে হাজির। কাউকে মারধর না, কারও মাথা ফাটানোর ব্যাপার নেই। একজোট হয়ে রুখে দাঁড়ানোই যথেষ্ট। হাতের লাঠি শুধু মনের জোর আনার ব্যবস্থা মাত্র। সেই ১৯৯৯ সালে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় সরকার এবং বিরোধী দল, বিএনপির নেতারাও এই লাঠি-বাঁশি আন্দোলনকে সমর্থন করেন। কারণ, ব্যবস্থাটা সুফল দিচ্ছিল। প্রথম দিকে যেখানে নাটোর থানায় মাসে সোয়া দু শ-আড়াই শ মামলা হতো, ধীরে ধীরে তা কমে আসে। কয়েক বছরের মধ্যে থানায় অপরাধের মামলার সংখ্যা কোনো কোনো মাসে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এল। কিন্তু বিএনপির আমলে লাঠি-বাঁশির সাফল্য সরকারের চক্ষুশূল হয়ে উঠল। ২০০৫ সালে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সবাই বললেন, নাটোরে লাঠি-বাঁশির আর প্রয়োজন নেই। কারণ, তাঁদের কাজের ফলে নাটোরে সন্ত্রাস দূর হয়ে গেছে। আর তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা দেখার জন্য তো পুলিশই রয়েছে, তাহলে লাঠি-বাঁশির দরকার কী? এরপর লাঠি-বাঁশি সমিতির মূল নেতা আবদুস সালামসহ অন্য নেতাদের সরিয়ে দিয়ে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে ওই আন্দোলনের সমাধি রচনা করা হলো। আমি মোবাইলে কথা বললাম সালাম সাহেবের সঙ্গে। তিনি বললেন,
লাঠি-বাঁশি সত্যিই সফল হতে পারবে, যদি তা জনগণের নিজস্ব ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড় করানো যায়। সাধারণ মানুষ নিজস্ব মেধা, প্রজ্ঞা ও শক্তি দিয়ে নিজেদের সংগঠন হিসেবে দাঁড় করালে সেটা সফল হবে। এখন যেটা হচ্ছে, সেখানে লাঠি-বাঁশি আছে বটে, কিন্তু তাতে প্রাণ নেই। অর্থাৎ এটা আসছে পুলিশ, তথা প্রশাসনের উদ্যোগ হিসেবে; সাধারণ মানুষের উদ্যোগ হিসেবে এখনো আসেনি। পুলিশ কেন মানুষকে লাঠি দেবে? সাধারণ মানুষের কি একটা করে লাঠি সংগ্রহ করার সামর্থ্য নেই? আবদুস সালামের নাটোরের লাঠি-বাঁশি আন্দোলন দেশের জন্য একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করানো যায়। এর মূল কথা হলো, লাঠি-বাঁশির উৎস সাধারণ মানুষ। আর প্রশাসন সেখানে পাশে থাকবে। মানুষ যখন প্রাণশক্তিতে জেগে ওঠে, তখন বিশৃঙ্খলা দূরে চলে যায়। সুশৃঙ্খল আন্দোলন তখনই গড়ে ওঠে, যখন তার পেছনে তৃণমূলের উদ্যোগ থাকে। আমরা উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই রোধে পাড়ায় পাড়ায় আক্ষরিক অর্থেই লাঠি-বাঁশি কমিটি গঠন করেছিলাম। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে প্রতিটি পাড়ায় ছাত্রদের নেতৃত্বে আমরা গড়ে তুলি রাত জেগে পাহারার ব্যবস্থা। যেন কেউ খুনখারাবি বা চুরি-ডাকাতি করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন নস্যাৎ করতে না পারে। মানুষের অফুরন্ত সমর্থনই ছিল আমাদের লাঠি-বাঁশি ব্যবস্থার প্রাণ। সেটা ছিল অন্য মেজাজের আন্দোলন।
সাধারণ মানুষ ছিল ৬ দফা, ১১ দফার পক্ষে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশ (পূর্ব বাংলা)। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হলো স্বাধীনতার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। আমরা স্বাধীন হলাম। ৩০ লাখ বাঙালির রক্তে রঞ্জিত এই বাংলাদেশ কি জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসীদের হাতে পরাজিত হবে? আমরা কি তা মেনে নেব? না, আমরা কখনোই তা মেনে নিতে পারি না। প্রতিরোধ গড়ে তুলব। কিন্তু সেটা হতে হবে আইনের পথে। গণতন্ত্রের পথে। আমরা তো দেখেছি জনগণ এমনকি জীবন বাজি রেখেও হত্যাকারীদের ধরে ফেলছে। সম্প্রতি মাদারীপুরে একজন অভিযুক্ত জঙ্গি ঘাতক ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে জনতা হাতেনাতে ধরে পুলিশে দিল। এর আগেও ঢাকার বেগুনবাড়ীতে তৃতীয় লিঙ্গের একজন সাহসী ব্যক্তি ঘাতক জঙ্গিকে ধরে ফেলেন। তাঁর সাহসের তারিফ করি। কিন্তু পুলিশ কী করল? বেগুনবাড়ীতে জঙ্গি হামলায় নিহত ওয়াশিকুরের হত্যাকারীর বিচার কত দূর? পুলিশ কি তাঁর বিচারের অগ্রগতি সময়-সময় জনগণকে দয়া করে জানাবে? ফাহিমের কথা কী বলব। বিচারের আগেই তিনি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেন। কেউ জানতে পারল না কোথা থেকে কে বা কারা কলকাঠি নাড়ছে। কে কিশোর-তরুণদের মাথা খাচ্ছে, খুনোখুনির নেশার সর্বনাশা পথে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা বলি, ‘ক্রসফায়ার’ নিপাত যাক। সেখানে লাঠি-বাঁশি আন্দোলন জনতার সুশৃঙ্খল প্রতিরোধ হিসেবে গড়ে উঠুক। তবে সেটা পুলিশের প্রজেক্ট হলে সফল হবে না। একে হতে হবে জনতার আন্দোলনের একটি রূপ। আমাদের সামনে রয়েছে নাটোরের লাঠি-বাঁশি মডেল। সরকার তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

গুলশান বিভীষিকা

অবশেষে বাংলাদেশকেও এক বিভীষিকাময় জঙ্গি হামলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। শুক্রবার রাত পৌনে নয়টা থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার অভিজাত ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানের কূটনীতিক পাড়ার এক রেস্তোরাঁয় যে সশস্ত্র হামলা হয়েছে, তা নৃশংস পৈশাচিকতার ভয়ংকর প্রদর্শনী। নিরীহ লোকজনকে যারা এভাবে হত্যা করেছে, তারা মানবতার শত্রু; তাদের প্রতি ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ হামলার ঘটনায় নিহত দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিক ও ২ পুলিশ কর্মকর্তার জন্য আমরা গভীরভাবে শোকাহত। স্বজনহারা পরিবারগুলোর প্রতি আমরা আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। পুলিশের ২০ সদস্যসহ যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত সম্মিলিত অভিযানের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা এবং ছয় হামলাকারীর মৃত্যু ও একজনকে জীবিত গ্রেপ্তার করার মধ্য দিয়ে ঘটনাটির পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু এই বিরাট বিয়োগান্ত ও বিভীষিকাময় ঘটনার প্রভাব ও পরিণতি সুদূরপ্রসারী। এটা বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চলমান জঙ্গি তৎপরতার মাত্রাগত উল্লম্ফনের ইঙ্গিতবাহী: বেছে বেছে একজন বা দুজন মানুষকে হত্যা করা থেকে গণহারে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার পর্যায়ে পদার্পণ। এটা বাড়তি শঙ্কা ও উদ্বেগ জাগায়; ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের ভয়াবহ গণহত্যাযজ্ঞগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমরা এতকাল এই ভেবে স্বস্তিতে ছিলাম যে ওই সব দেশের মতো নারকীয় হত্যাযজ্ঞ থেকে আমাদের দেশ মুক্ত রয়েছে। কিন্তু গুলশানের এই ঘটনার পর আমাদের আর সেই স্বস্তিতে থাকার উপায় রইল না। হামলাটি যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত ছিল তা নিয়ে সন্দেহ নেই। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই হামলাকারীরা ওই রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিল, এবং পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে তারা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা ও ২০ জনকে আহত করেছে। আর রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া নিরীহ-নিরপরাধ মানুষগুলোকে তারা হত্যা করেছে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। রোমহর্ষক নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনের এমন ঝোঁক লক্ষ করা গেছে ইরাক ও সিরিয়ায় তৎপর ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের মধ্যে। এর উদ্দেশ্য স্পষ্টতই সুস্থ-স্বাভাবিক মানবসমাজকে তীব্র মানসিক আঘাতে বিহ্বল করে দেওয়া, প্রচণ্ড ভীতি সঞ্চার করা। আরও একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো, হামলাকারীরা বেছে নিয়েছে দেশের এমন একটি রেস্তোরাঁ যেখানে প্রচুর বিদেশি নাগরিক নিয়মিত যান এবং সেটি কূটনীতিক পাড়ার ভেতরেই। অর্থাৎ তারা এই হামলার মাধ্যমে বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছে। মানুষকে জিম্মি করে তারা সরকারের কাছে কোনো বার্তা পৌঁছায়নি, তাদের কোনো দাবিদাওয়া ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের চরম নৃশংসতা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে চরম ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করা আর আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আইএসের পক্ষ থেকে এই হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্ত-অনুসন্ধান প্রয়োজন; যে একমাত্র হামলাকারীকে জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে, তার কাছে এ বিষয়ে নিশ্চয়ই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় দেশের ভেতরে ও বাইরে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে; উদ্বেগ ক্রমশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শুক্রবারে হামলার যেসব তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে, তাতে দেখা যায় যে বাংলাদেশে এ ধরনের বড় আকারের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা বিদেশি পর্যবেক্ষক মহলে ছিল। বলা হচ্ছে, এ রকম হামলা ছিল ‘প্রেডিক্টেবল’ বা পূর্বেই অনুমেয়। কিন্তু আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে এমন সব বার্তা দেওয়া হয়েছে যে জঙ্গি সমস্যা গুরুতর নয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে। এখন, গুলশানের এই গণহত্যাযজ্ঞ বলে দিচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে কিংবা যাচ্ছে। জঙ্গি তৎপরতা সম্পর্কে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জানা-বোঝা যথেষ্ট কি না, জঙ্গিদের কার্যকরভাবে দমন ও নিষ্ক্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ কতটুকু আছে—এসব প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। সন্ত্রাসবাদী সমস্যা আরও অনেক দেশকে আক্রান্ত করেছে, তারা তা মোকাবিলার চেষ্টা করছে। আমাদেরও তা করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সক্রিয় উদ্যোগ। সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে যে জঙ্গিবাদী সহিংসতা অত্যন্ত গুরুতর এক জাতীয় সমস্যা হিসেবে আমাদের সামনে এসেছে, পুরো জাতিই আজ জঙ্গিবাদী আক্রমণের মুখোমুখি। তাই একে রুখতে সরকারের জোরালো উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক পক্ষ-নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত সক্রিয়তা।

ড্রোন হামলায় নিহত ১১৬ বেসামরিক লোক

বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ও বিমান হামলায় রণাঙ্গনের বাইরে গত সাত বছরে ১১৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। হোয়াইট হাউস এ কথা জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি করা সংখ্যার চেয়ে এটি অনেক কম। বিশ্বজুড়ে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার এক নির্বাহী নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। মার্কিন সামরিক অভিযানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশে প্রতিবছর যুদ্ধে নিহত সাধারণ নাগরিকের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করতে বলা হয়। নির্দেশে বলা হয়, বেসরকারি সংস্থাগুলোর করা ‘নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন’ থেকে এতে তথ্য যুক্ত করা যেতে পারে। বেসামরিক নাগরিক নিহতের এই সংখ্যাটি ধরা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামার মেয়াদকাল ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করছে, ড্রোন ও বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে। কোনো কোনো সংগঠন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের হামলায় বেশ কয়েক শ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে এসব অভিযান পরিচালনা করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। তাদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা তুলে ধরতেই হতাহত ব্যক্তিদের সংখ্যা প্রকাশ করেছে ওবামা প্রশাসন। লন্ডনভিত্তিক ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে ২০০২ সাল থেকে পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় অন্তত ১ হাজার ১০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তারা বলছে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক, এনজিওর কর্মকর্তা, ফাঁস হওয়া সরকারি নথি, আদালতের কাগজপত্র এবং মাঠপর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নিহত ব্যক্তিদের এই সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওবামা প্রশাসন সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কিছু ভুল তথ্যের কারণে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দেওয়া নিহত ব্যক্তিদের তালিকাটি সঠিক নাও হতে পারে। হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বারাক ওবামার শাসনামলে ৪৭৩টি অভিযানে ২ হাজার ৩৭২ থেকে ২ হাজার ৫৮১ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর পরিসংখ্যানে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার মতো কিছু রাষ্ট্রের তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন বাহিনীর হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

করবিনের পদত্যাগ চান ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা

জেরেমি করবিন
যুক্তরাজ্যের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা দলীয় নেতা জেরেমি করবিনকে পদত্যাগের তাগিদ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তাঁরা করবিনের সঙ্গে এক ধরনের আপস চান, যাতে পদ ছাড়লেও নেতা হিসেবে তাঁর প্রধান ইচ্ছাগুলোর বাস্তবায়ন হয়। করবিন ‘মর্যাদার সঙ্গে পদত্যাগ’ করবেন—এমনটাই চাইছেন লেবার পার্টির এমপিরা। কিন্তু দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা জেমস স্নেইডার বলেন, এই পরিকল্পনায় কাজ হবে না। কারণ, করবিনের পক্ষে বিপুল সমর্থন রয়েছে। তাঁর নেতৃত্ব বা নীতি নিয়ে এমপিরা যদি অসন্তুষ্ট হন, সে বিষয়ে তাঁদের ৫১টি স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হবে। এ ছাড়া নেতার পদের জন্য একজন প্রার্থী খুঁজে বের করতে হবে এবং একটি অভিন্ন অবস্থান ধরে অগ্রসর হতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, করবিনকে হারানোর মতো কোনো প্রার্থী এ মুহূর্তে তাঁদের নেই।
স্নেইডার আরও বলেন, লেবার পার্টিতে যোগদানকারী অনেকেই করবিনের প্রতি সমর্থন জানাতে এসেছেন। এ বিষয়ে ‘পর্যাপ্ত প্রমাণ’ আছে। ২৩ জুনের গণভোটে ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচার অভিযানে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে এমপিদের অনেকে অনাস্থা জানানোয় লেবার পার্টিতে জেরেমি করবিনের নেতৃত্ব হুমকির মধ্যে পড়ে। তবে গত বছর ৬০ শতাংশ ভোট পেয়ে নেতা নির্বাচিত হওয়া করবিন বলেন, দলীয় প্রধানের পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁকে ভোট দেওয়া সদস্যদের ‘বিশ্বাস’ ভাঙবেন না। ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা গত বৃহস্পতিবার জেরেমি করবিনের সঙ্গে বৈঠকে বসার চেষ্টা করেও সফল হননি। তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, লেবার নেতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাস্তবায়নের বিষয়ে সমঝোতা হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে বৈষম্য নিরসন এবং দলে অধিকতর গণতন্ত্রায়ণ।