Sunday, February 22, 2015

ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট আছে, কেউ আসবে না -প্রধানমন্ত্রী

(আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্যে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রোববার বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা) সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতায় এলে সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট) ব্যবস্থা রয়েছে। তাই কেউ এভাবে ‘আগুনে পা দিতে আসবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেছেন, খালেদা জিয়া মনে করছেন, ‘উত্তরপাড়া’ থেকে এসে তাঁকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবেন। তিনি যাঁদের নিয়ে ভাবেন, তারাও জানে এভাবে ক্ষমতায় এলে কী পরিণতি হয়। সংবিধান লঙ্ঘন করে কেউ ক্ষমতায় এলে সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট) ব্যবস্থা রয়েছে। এভাবে কেউ আগুনে পা দিতে আসবে না।
প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপ ও সমঝোতার লক্ষ্যে নাগরিক সমাজের উদ্যোগের সমালোচনা করে বলেন, ‘সুশীল সমাজের ১৩ জনের একটি তালিকা দেখলাম। জানি না, এই সুশীলের সংজ্ঞা কী। আমরা আগেরবার (৯৬ সালে) যখন ক্ষমতায় ছিলাম, তখন এঁদের কেউ কেউ সচিব ছিলেন। অনেকে পদ-পদবির জন্য, পদোন্নতির জন্য তদবিরও করেছেন। কিছুদিনের জন্য হলেও কেবিনেট সেক্রেটারি হতে চেয়েছেন। সরকারি চাকরি শেষ হলেই তাঁরা সুশীল হয়ে যান। তাঁদের কাছ থেকে এখন আমাদের ছবক নিতে হবে। তবে মানুষ সচেতন। কেউ তাদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না।’ তিনি বলেন, ‘সুদখোর, ঘুষখোর ও চাটুকারদের দিয়ে এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে। কারণ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই আমরা করি মনের টানে।’
বিএনপি নেত্রী বিদেশি প্রভুর দিকে তাকিয়ে আছেন
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি নেত্রী নিজের দেশের জনগণের পরিবর্তে বিদেশি প্রভুদের দিকে তাকিয়ে আছেন। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর এত আশা, সেই দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তাঁকে নাশকতা-সহিংসতা ও মানুষ হত্যা বন্ধ করতে বলেছেন। যে প্রভুদের দিকে উনি তাকিয়ে আছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধেরও বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু আমরা যুদ্ধ করেই দেশকে স্বাধীন করেছি। পদ্মা সেতু নির্মাণের সময়ও অনেকে বাধা দিয়েছিল। এখন নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করে যাচ্ছি।’
গাড়িতে পতাকা ওড়ানোর আশা পূরণ হবে না
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি নেত্রী আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। একই সঙ্গে অবরোধ ও হরতাল। অবরোধ দিয়ে তিনি নিজেই অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। ওনার আশা ছিল তাঁকে কেউ এসে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। সুশীল বাবুদের কেউ কেউ উনাকে দেখতে গেছেন। আমার চাচাও (ড. কামাল হোসেন) গেলেন। ভেবেছিলাম কামাল হোসেন যেহেতু হরতাল-অবরোধের বিরুদ্ধে বলেন, খালেদা জিয়াকে তা বন্ধ করতে বলবেন। তাঁরা এত ন্যায়নীতির কথা বলেন, ছেলেমেয়েরা যে পরীক্ষা দিতে পারছে না, একটিবারও সে কথাটি বললেন না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হয়তো তাঁরা মনে করছেন, এভাবে খালেদা জিয়া ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলে দেশে কিছু একটা ঘটবে। অনেকের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়তে পারে। কিন্তু তাদের সেই আশা কোনো দিন পূরণ হবে না।’
জনগণ হত্যা করে আন্দোলন দেখিনি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা নেই। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছে, খালেদা জিয়া একইভাবে পেট্রলবোমা মেরে গণহত্যা চালাচ্ছে। মানুষ মারা, গাছ কাটা, রাস্তা কাটা এমন কী গরুর ট্রাকেও আগুন দিয়েছে। জনগণকে হত্যা করে আন্দোলন, এমনটা কখনো দেখিনি।’ তিনি বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের দেড়টা মাস নষ্ট হয়ে গেল। ওনার সেদিকে চিন্তা নেই। অথচ ওনার নাতনিদের বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন পড়াশোনার জন্য।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়া ভেবেছিলেন ভারতে মোদি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এবার একটা কিছু হবে। কিন্তু বিজেপি সভাপতির ফোন নিয়ে ধরা পড়ে গেলেন।’
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মতিয়া চৌধুরী, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কথাসাহিত্যিক রাহাত খান, এম এ আজিজ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কামরুল ইসলাম প্রমুখ।

জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খানের ছেলে রিমান্ডে

জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খানের ছেলে রিফাত আবদুল্লাহ খানকে জামিন না দিয়ে তিন দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার বিষয়ে করা বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে জামিন আবেদন নাকচ করেন আদালত।
রোববার পল্লবী থানায় দায়ের করা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এসআই মিজানুর রহমান তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম স্নিগ্ধা রাণী চক্রবর্তীর আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চান। আসামিপক্ষ রিমান্ড বাতিল করে জামিন চায়। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে উপরোক্ত মর্মে নির্দেশ দেন। আইনজীবী তার পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা চাইলে আদালত উপরোক্ত মর্মে নির্দেশ দেন।
আইনজীবীরা আদালতে বলেন, গত শুক্রবার রিফাত আবদুল্লাহ খানকে ঢাকার উত্তরা থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার সময় হল থেকে সাদা পোশাকধারীরা নিয়ে যায়। পরে বিভিন্ন পত্রিকায় তার মায়ের আকুতি-সংবলিত বক্তব্য প্রচার হলে রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। তিন দিন সাদা পোশাকধারীরা তাকে কোথায় নিয়ে রেখেছে এবং তাকে নিয়ে কেন নির্যাতন করেছে সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই পুলিশের। পুলিশ তাকে ধরে উত্তরা পরীক্ষার হল থেকে। আর মামলা করেছেন পল্লবী থানায়। এ ব্যাপারে এজাহারে কোনো বক্তব্য নেই। তবে আসামির বিরুদ্ধে কেবল বক্তব্য আছে।
আইনজীবীরা বলেন, তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছে। আদালতকে দেখতে হবে তার বয়স ১৬ বছর। সে এসএসসি পরীক্ষার্থী। সেদিকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার পিতা রাজনীতি করলেও সে কোনো রাজনীতি করেনি। সে নাবালক ছেলে। সেজন্য তার প্রতি মানবিক দৃষ্টি দেয়া উচিত। আদালত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে আদালতকে।
তারা বলেন, রিফাতকে ধরে নিয়ে কোনো মামলার প্রথমে না দিয়ে তার বাসা নিয়ে যায় সেখানে তার পড়ার রুমে যায় এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করে। অতপর কোনো কিছু না পেয়ে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে পুলিশ নিজেরা তৈরি করে এই মামলা দিয়েছে। সেজন্য তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তারা পায়নি। স্রেফ তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ না পেয়ে ও পুলিশ অতি উৎসাহিত হয়ে এই মিথ্যা মামলা দেয়ায় তাকে রিমান্ড না দিয়ে জামিন দেয়া প্রয়োজন এবং তার পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন মোঃ মশিউল আলম, মোঃ আঃ রাজ্জাক, এস এম কামালউদ্দিন, মোঃ দেলোয়ার হোসাইনসহ বেশকিছু আইনজীবী।
রাষ্ট্রপক্ষে বলা হয়েছে, আসামি তার ফেসবুকে উল্লেখ করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে সম্মানহানিকর বক্তব্য প্রদান করেন। উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের জীবননাশের হুমকি প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল। এতে লোক ছিল ১৫/২০ জন। আর মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব এর মৃত্যু নয়, মৃত্যুর একটি ঘোষণা হয়েছে মাত্র; সাথে সাথে সারা দেশে প্রায় ২০০ মানুষ জীবন দিল। ৫ হাজার লোক গুলিবিদ্ধ এবং লাখ লাখ লোক জীবন দিতে প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেন।
আসামি তার ফেসবুকে আরো উল্লেখ করেন, ‘শেখ হাসিনা শুধু নাস্তিক-ই না, শেখ হাসিনা একটা নব্য ফেরাউন মিশরের বাদশা ফেরাউন প্রকাশ্যে নিজেকে খোদা দাবি করতো; আর রাতের অন্ধকারে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতো যেন পৃথিবীতে আল্লাহ তাকে লজ্জা না দেন।’
শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে আল্লাহকে মানে (ভান করে) আর রাতের অন্ধকারে (অ-প্রকাশ্যে) মহান আল্লাহর দ্বীন ‘ইসলাম’কে ধ্বংস করার পায়তারা করে।
পার্থক্যটা শুধু এখানেই, একজন জনসম্মুখে খোদা দাবি করে আর অন্যজন জনতার আড়ালে খোদাই দাবি করে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, ‘মিসরের ফেরাউনের মতো শেখ হাসিনা নামক নব্য ফেরাউনকে যে ভবিষ্যতের জালিমদের জন্য হুশিয়ারির দৃষ্টান্ত রাখেন।
কেন আসামি এই মন্তব্য করেছে তার সাথে কারা জড়িত, সেজন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

আর কত সাত দিনে দেশ স্বাভাবিক হবে : এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশের চলমান সংকটের জন্য প্রধান দুই দলকেই দায়ী করে বলেছেন, দেশের চলমান সমস্যার সমাধান করতে না পারলে এই দুই দলই ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। সরকারকে বলবো, এখনো সময় আছে মানুষকে নিরাপত্তা দিন আর বিএনপিকে বলব সহিংসতা বন্ধ করুন। অন্যথায় কাউকে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। তাদের অবস্থান হবে মিউজিয়ামে।
মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, আপনারা বলেছিলেন, সাত দিনের মধ্যে দেশ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কত সাত দিন গেল, কবে সেই সাত দিন শেষ হবে। আর কত সাত দিনে দেশ স্বাভাবিক হবে।
রোববার ডিপ্লেমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতীয় পার্টি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপির সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এ হান্নান এমপি, সাইদুর রহমান টেপা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম ফয়শল চিশতী, হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব এ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভুঁইয়া, যুগ্ম-মহাসচিব জহিরুল ইসলাম জহির, অধ্যক্ষ ইকবাল হোসেন রাজু, নুরুল ইসলাম নুরু, দিদারুল আলম দিদার, ইসহাক ভূঁইয়া প্রমুখ বক্তৃতা করেনে।
বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পালন করার প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, এর পেছনে সব কৃতিত্ব জাতীয় পার্টির। আমরাই আইন করে সর্বস্তরে বাংলা চালুর নির্দেশ আমি দিয়েছিলাম। আমি ক্ষমতায় থাকার সময় সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার ব্যবহার নিশ্চিতে কাজ করেছি। বাংলাভাষার প্রচলন করেছি। এমনকি আইন অমান্য করায় ১৫ জন কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়েছিলাম। কারণ আমি বাংলাভাষাকে ভালোবাসি।
এরশাদ বলেন, জাতীয় পার্টির কর্মীরা বুক ফুলিয়ে বলবে, শহীদ মিনার আমরা করেছি। ২৮ বছর আগে শহীদ মিনার করে ২৬ বছর পর আমি শহীদ মিনারে গিয়েছি। দীর্ঘ ২৬ বছর পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পেরে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, ২৬ বছর আমি শহীদ মিনারে যেতে পারিনি। ইতিহাস বড়ই নির্মম। কাউকে ক্ষমা করে না। যারা আমাকে এতোদিন এখানে যেতে দেয়নি তারাই আজ শহীদ মিনারে যেতে পারেনি। আমার সঙ্গে যা যা করছে এখন তাদের সঙ্গে তাই করা হচ্ছে। আল্লাহর মাইর। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও আমরা মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাইছি। এর চেয়ে লজ্জার কী আছে। দেশ কি তাহলে অকার্যকর রাষ্ট্র হবে?
দেশে রাজনীতির নামে আগুনে পুড়ে মানুষ মারার মহোৎসব চলছে উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, আজ আমরা নিশ্চিত নই বাড়ি থেকে বের হয়ে আবার ফিরে আসতে পারব কী না। নিশ্চিত নই সন্তান স্কুল থেকে বাড়ি ফিরবে কী-না। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মানুষ হত্যার রাজনীতি বন্ধ করুন। পেট্রোল বোমা মেরে জ্যান্ত মানুষকে আর হত্যা করবেন না। বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষ ঘরে থাকলে ক্ষুধার আগুন, আর বাইরে পেট্রোল বোমার আগুনে জ্বলছে। এরশাদ বলেন, দুই দলকে নয় জনগণ এখন জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। সে অনুযায়ী জাতীয় পার্টিকে আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যে দিকে দৃষ্টি দেই সব দিকেই এখন জাতীয় পার্টির জয়জয়কার।
ডা. মিলন ও নূর হোসেন হত্যায় নিজের সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে সাবেক এই সেনারাষ্ট্রপতি বলেন, নূর হোসেনকে পেছন থেকে গুলি করা হয়েছে। আমি জেল থেকে বের হয়ে তার (নূর হোসেন) বাবাকে খুঁজে বের করে মাসিক পাঁচ হাজার টাকার ভাতার ব্যবস্থা করি। যদি হত্যা করতাম তাহলে কি আমি খুঁজে গিয়ে টাকা দিতাম? মিলনকে কারা হত্যা করেছে তা আমরা জানি না। তিনি ডা. মিলন হত্যার বিচার দাবি করেন।

তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও আলোচনা হতে পারে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: খন্দকার মাহবুব হোসেন by সোহরাব হাসান

বিরোধী দলের অবরোধ–হরতালের দেড় মাস পার হলো। জনজীবনে চরম উৎ​কণ্ঠা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের উপায় নিয়ে বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন
প্রথম আলো :দেড় মাস ধরে অবরোধ চলছে। সংকট সমাধানের পথ কী?
খন্দকার মাহবুব হোসেন :সংকটের শুরু ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন থেকে। সরকার ১৫৩ জন সাংসদকে বিনা ভোটে নির্বাচিত করিয়ে এনেছে। বাকি আসনে যে নির্বাচন হয়েছে, তাতেও মানুষ ভোট দেয়নি। নির্বাচন কমিশন অন্যায়ভাবে ক্ষমতাসীন জোটকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছে।
প্রথম আলো :তখন আপনারা এর আইনি প্রতিকার চাইলেন না কেন?
খন্দকার মাহবুব : সর্বক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও ভন্ডুল হয়ে গেছে। নিম্ন আদালত এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। নামমাত্র সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট বার থেকে বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে নীতিমালা করা হয়নি। এ ব্যাপারে আগের একটি রুল ছিল, তাও মুলতবি রয়েছে।এ অবস্থায় মামলা করে সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে বলে মনে হয় না। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।
প্রথম আলো :এক বছর তো আপনারা চুপচাপ ছিলেন। হঠাৎ​ লাগাতার কর্মসূচি কেন?
খন্দকার মাহবুব : বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। নির্বাচনের অব্যবহিত পর প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। সব দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একাদশ সংসদ নির্বাচন করা হবে। বিরোধী জোট প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে এক বছর অপেক্ষা করেছে। এরপর তারা আন্দোলনের প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন জেলায় জনসভা করলেও সরকার তাতে ভ্রূক্ষেপ করেনি। বরং বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে, গ্রেপ্তার করে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোট ৫ জানুয়ারি ঢাকায় জনসভার কর্মসূচি নিলেও তাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। অথচ পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় সরকারি দল মিছিল-সমাবেশ করেছে। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদারির বাইরে গিয়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখার প্রকাশ্য হুংকার দিতে থাকে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলে। অন্যদিকে সরকার রাজনৈতিক আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে প্রচার চালাতে থাকে।
প্রথম আলো : বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কি নাশকতার ঘটনা ঘটছে না?
খন্দকার মাহবুব :ঘটছে। এগুলো বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা করছেন না। করছে দুর্বৃত্তরা। সরকার তাদের ধরুক। তাই বলে গয়রহ গ্রেপ্তার বা পাইকারি মামলা তো কোনো সমাধান দেবে না। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে না পারার কারণেই দেশে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ-হরতাল হচ্ছে এবং অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সরকারকে স্বীকার করতে হবে আন্দোলনটি রাজনৈতিক। মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে লাভ নেই। এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি দেশের মানুষের সমর্থন আছে, তারা রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান দেখতে চায়। সরকার বৈধ বা অবেধ যাই-ই হোক না কেন, জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব তাদেরই। যেই মুহূর্তে সরকার জনগণের সম্মতিতে একটি সরকার গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসবে, সেই মুহূর্তে দেশে শান্তি ফিরে আসবে বলে মনে করি।
প্রথম আলো :৫ জানুয়ারি বিএনপির নেত্রী যে লাগাতার অবরোধের কর্মসূচি দিলেন, তা কি পরিকল্পিত ছিল? এ নিয়ে দলে বা জোটে আলাপ হয়েছিল?
খন্দকার মাহবুব :আমরা এক বছর ধরে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করেছিলাম, সরকার সংলাপের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করবে, কিন্তু তারা তা করেনি। কর্মসূচির বিষয়ে আগেই আমাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ছিল। প্রস্তুতি ছাড়া ঢাকা থেকে সারা বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হতো না; ৪৭ দিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যেত না।
প্রথম আলো :যেকো​েনা আন্দোলন ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হয়। কিন্তু এবার বিরোধী দলের কর্মসূচি হঠাৎ করেই কি দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি?
খন্দকার মাহবুব :সরকারের একগুঁয়েমির কারণেই এটি ঘটেছে। আমাদের দাবি ছিল, সংলাপে বসুন। সংলাপ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। অবরোধের পর হরতাল এল। কিন্তু সরকার অনমনীয়। তারা একটি ন্যায্য রাজনৈতিক আন্দোলনকে ধ্বংসাত্মক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে চিহ্নিত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রথম আলো :আপনারা এর দায় নিচ্ছেন না। কিন্তু যখন আপনাদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে, তখন কি সেটি প্রত্যাহার করা উচিত নয়?
খন্দকার মাহবুব :সরকার যে মুহূর্তে সংলাপে রাজি হবে, সেই মুহূর্তে এসব সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাবে। সরকার বলুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে। আপনারা আসুন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে কীভাবে নির্বাচন হবে, নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে, সেসব নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত আছি, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে।
প্রথম আলো :আপনারা চাইছেন সরকারের পক্ষ থেকে আগে ঘোষণাটি আসুক, কিন্তু আপনারাও তো কর্মসূচি স্থগিত করে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে পারেন।
খন্দকার মাহবুব :আমরা বারবার বলেছি, সাত দফা প্রস্তাবেও সংলাপে বসার কথা আছে। কিন্তু সরকার তো অনড় অবস্থানে। প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো আমাদের প্রস্তাব সুনির্দিষ্ট নয়। এরপর আমরা সাত দফা দিলাম। সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিলেই আমরা কর্মসূচি বন্ধ রাখতে প্রস্তুত আছি। তখন দুর্বৃত্তরাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে না।
প্রথম আলো :দুই পক্ষই যার যার জায়গায় অনড়। তাহলে সমাধানটি কীভাবে হবে? এই অবস্থা চলতে থাকবে?
খন্দকার মাহবুব :না, এভাবে চলতে পারবে না। এ জন্যই আমরা বলছি, সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার আমাদের অভিভাবক। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতি তথা জনগণের জানমাল রক্ষায় তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা বলছি, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন।
প্রথম আলো :বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে থাকা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা উঠেছে। কেবল দেশের ভেতরে নয়, বাইরেও। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট, নিউইয়র্ক টাইমসও বলেছে, বিএনপির উচিত জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
খন্দকার মাহবুব :এই দলটি নিয়েই কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৯৯৫-৯৬ সালে আন্দোলন করেছে। ১৯৮৬ সালে একসঙ্গে তারা নির্বাচন করেছে। আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? আমরা বলেছি, তাদের সঙ্গে আমাদের ঐক্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা যখন জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তখন এসব কথা ওঠেনি কেন। জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল বলা হয়। অথচ দলটির ৬৫ শতাংশ নেতা-কর্মী বাংলাদেশ প্রজন্মের।
প্রথম আলো :বর্তমান সংবিধানে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান নেই। আওয়ামী লীগ যদি সংবিধান পরিবর্তনে রাজি না হয়?
খন্দকার মাহবুব :সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। জনগণের কল্যাণের জন্যই সংবিধান। আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছিল, সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে দেশে দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে। তারা যেকোনো সময় সংবিধান পরিবর্তন করতে পারে। প্রয়োজনে গণভোটে দিতে পারে।
প্রথম আলো :বর্তমান সংবিধানের অধীনে কি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে?
খন্দকার মাহবুব :সেটি আলোচনায় বসলেই একটা পথ বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সরকার তো আলোচনায়ই বসতে চাইছে না।
প্রথম আলো :কিন্তু ৫ জানুয়ারির আগে তো তারা আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন বিএনপি সাড়া দেয়নি।
খন্দকার মাহবুব :আমরা বলতে চাই, অতীত ভুলে যান। আওয়ামী লীগও ভুল করেছে। বিএনপিও ভুল করেছে। সরকারের কতটা জনসমর্থন আছে, তা পরীক্ষা করে দেখা হোক। জাপানে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল অভিযোগ আনায় প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে ফের ক্ষমতায় আসেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ভয় পাচ্ছে কেন?
প্রথম আলো :দৃশ্যত আমরা দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার লক্ষণ দেখছি না। পর্দার আড়ালে কিছু হচ্ছে কি?
খন্দকার মাহবুব :আমি মনে করি জনস্বার্থে সরকারকে সংলাপে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি সরাসরি সংলাপে বসতে না চায়, তাহলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও আলোচনা হতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিব আলোচনার কথা বলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট বলেছেন, তাঁরা সহায়তা করতে রাজি আছেন। আমি আশাবাদী এ কারণে যে, জনমতকে উপেক্ষা করে কেউ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। বর্তমান সরকারও পারবে না।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
খন্দকার মাহবুব : ধন্যবাদ।

‘প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে মহাকর্ষ বল ও চাঁদে পানির অস্তিত্বের উল্লেখ ছিল’

স্যার আইজ্যাক নিউটনের ১৫০০ বছর পূর্বেই মহাকর্ষ বল স¤পর্কে জানতেন আর্যভট্টের মতো ভারতীয় প্রাচীন জ্যোতির্বিদরা। মহাকর্ষ বলের অস্তিত্ব ও চাঁদে পানি থাকার বিষয়ে ইঙ্গিত ছিল প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র বেদ-এর কিছু শ্লোকেও। এ দাবি করেছেন ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী ও ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা আইএসআরও-এর সাবেক চেয়ারম্যান জি মাধভন নায়ার। এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি। মর্যাদাবান পদ্মবিভ’ষণ খেতাব জয়ী ৭১ বছর বয়সী এ বিজ্ঞানী আরও বলেন, ধাতুবিদ্যা, বীজগণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, স্থাপত্যবিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্র স¤পর্কে পশ্চিমারা জানার বহু আগেই বেদ সহ অন্যান্য প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে উল্লেখ ছিল। বেদ স¤পর্কিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দেয়ার সময় মাধবন নায়ার বলেন, বেদে উল্লেখিত ওই তথ্যগুলো ছিল ‘সংক্ষিপ্ত বিন্যাসে’ সজ্জিত। তার মতে, এ কারণে আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য এসব গ্রহণ করা কঠিন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বেদের একটি শ্লোকে রয়েছে যে, চাঁদে পানির অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু কেউই এটি বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আমাদের চন্দ্রায়ণ  অভিযানে  (ভারতের চাঁদ অনুসন্ধান অভিযান) আমরা পানির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমরাই ছিলাম প্রথম, যারা এটি আবিষ্কার করতে পেরেছিল। তবে তার মতে, বেদের সবকিছু বোঝা সম্ভব নয়, কেননা এটি শুদ্ধ সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছিল। পঞ্চম শতাব্দীর ভারতীয় জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ আর্যভট্টের বিষয়েও অনেককিছু বলেছেন মাধভন নায়ার। তিনি বলেন, আমরা সত্যিই আর্যভট্ট ও ভাস্করকে নিয়ে গর্ববোধ করি। তারা গ্রহ স¤পর্কিত কাজে ও অন্যান্য গ্রহ আবিষ্কারে প্রচুর অবদান রেখেছিলেন। এটা ছিল চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। তিনি বলেন, চন্দ্রায়ণ অভিযানেও আর্যভট্টের সমীকরণ ব্যবহৃত হয়েছিল। এমনকি নিউটন জানতে পারার ১৫০০ বছর পূর্বেও আমাদের প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স¤পর্কে উল্লেখ ছিল। তার দাবি, হারাপ্পা সভ্যতার বিভিন্ন শহর নির্মানে হিসাব করতে জ্যামিতি ব্যাবহৃত হয়েছিল। এছাড়া বৈদিক সময়েও পিথাগোরিয়ান উপপাদ্যসমূহের উল্লেখ ছিল। উল্লেখ্য, এতদিন ধরে বহু বিজেপি নেতা দাবি করে আসছেন, প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র সমূহে প্লাস্টিক সার্জারি ও বায়ুগতিবিদ্যা সহ বহু বৈজ্ঞানিক তথ্যের উল্লেখ ছিল। এবার এ ধরণের নতুন দাবি করলেন নায়ার। তিনি আরও বলেন, মহাকাশবিদ্যা ও পারমাণবিক শক্তি স¤পর্কে বহু তথ্য রয়েছে বেদে। আমরা ৬০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ঠিক ছিলাম। তখন থেকে শুরু করে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি পর্যন্ত বহিরাক্রমণ চলে আমাদের উপর। তবে আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে আমরা সমৃদ্ধ হচ্ছি। আমরা শান্তিপূর্ন কাজে ব্যবহারের জন্য পরমাণু পাঠোদ্ধার করেছি। আরও অনেক প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকার কথা উল্লেখ করে নায়ার বলেন, এসব হচ্ছে সেসব মৌলিক বিষয়, যা স¤পর্কে পশ্চিমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তবে এ তথ্যগুলো সংক্ষিপ্ত হওয়ায় আধুনিক বিজ্ঞান এসব মেনে নিতে রাজী নয়। এছাড়া বেদ পড়তে হলে, একজনকে অবশ্যই সংস্কৃত ভাষা জানতে হবে।

জম্মু-কাশ্মীরে ঐক্যমতের সরকার গঠন করবে বিজেপি-পিডিপি

প্রায় এক সপ্তাহ খানেক ধরে অনেক আলোচনার পর ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে সরকার গঠনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও স্থানীয় আঞ্চলিক দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) মতৈক্যে পৌঁছেছে। এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি। খবরে বলা হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়াসংক্রান্ত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং বিতর্কিত আর্মড ফোর্সেস ¯েপশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট (আফসা) নিয়ে সমঝোতা হয়েছে দুই দলের। এই দু’ বিষয়ে দল দু’টির অবস্থান ছিল পর¯পরবিরোধী। মূলত, দু’ দলের সমঝোতার প্রশ্নে ৩৭০ অনুচ্ছেদ আর আফসা’ই ছিল মূল বাঁধা। পিডিপি’র একটি সূত্র জানিয়েছে, আফসা প্রশ্নে তারা তাদের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে। উল্লেখ্য, ওই আইনের বলে সেনাবাহিনী জম্মু-কাশ্মীরের মতো অস্থিতিশীল বা গোলযোগপূর্ণ এলাকায় পরোয়ানা ছাড়াই যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। সরকার গঠনে বিজেপি’কে সমর্থন দিতে মুফতি মোহাম্মদ সাইদের নেতৃত্বাধীন পিডিপি আফসা প্রত্যাহার করার বিষয়ে সময়সীমা সম্বলিত একটি লিখিত প্রতিশ্রুতি দাবি করেছিল। তবে বিজেপির সঙ্গে তাদের চূড়ান্ত চুক্তি অনুসারে, এটি বাতিলে কোনো সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করেই আইনটি প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচিত হবে বলে দুই দল একমত হয়েছে। এছাড়া ধীরে ধীরে ওই এলাকায় সেনা উপস্থিতি হ্রাস ও যেসব এলাকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, সেখানে সেনার পরিবর্তে পুলিশ মোতায়েনের বিষয়েও একমত হয়েছে দল দু’টি। তবে আদর্শিকভাবে স¤পূর্ন বিপরীতমুখী এ দল দু’টির ঐক্যমতের সরকার গঠনের বিষয়টিকে পিডিপি’র নেতা মুফতি সাইদ বলেছেন, ‘উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর এক হওয়া’। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ নিয়ে খুব বেশি কিছু উল্লেখ নেই চুক্তিতে। জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের বড় স্বীকৃতিদাতা এ অনুচ্ছেদটি যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে চায় পিডিপি। এ অনুচ্ছেদ অনুসারে, প্রতিরক্ষা বা জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ ব্যাতিত জম্মু-কাশ্মীর স¤পর্কিত কোনো আইন করতে গেলে রাজ্য সরকারের অনুমোদন নিতে হয় কেন্দ্রীয় সরকারকে। তবে  ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিভাজনকে উসকে দেয় - এমন অভিযোগ করে আগে অনেকবারই বিজেপি এটি নিয়ে তাদের আপত্তির কথা বলেছিল। পিডিপি’র আরও দাবি ছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে স¤পর্ক ঠিক করা ও কাশ্মীরের সকল দলের সংগঠন হুরিয়াত-এর সঙ্গে আলোচনায় বসা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিজেপির নেতা নরেন্দ্র মোদির কয়েকদিনের মধ্যেই মুফতি সাইদের সঙ্গে দেখা করার কথা রয়েছে। তাঁদের সাক্ষাতের পরই দুই জোটের সরকার গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। উল্লেখ্য, দুই মাস আগে অনুষ্ঠিত জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভা নির্বাচনে কোনো দলই সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট আসন পায়নি। তবে মোট ৮৭টি আসনের মধ্যে পিডিপি ২৮টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অপরদিকে বিজেপি পেয়েছিল ২৫টি আসন।

সুলেমান শাহ’র সমাধি তুলে নিতে সেনা অভিযান

সিরিয়ার একটি ওসমানিয় সমাধি’র পাহারায় নিযুক্ত তুর্কি সেনাদের সরিয়ে নিতে সেনা অভিযান চালিয়েছে তুরস্ক। সিরিয়ার আলেপ্পো প্রদেশে উগ্র
তাকফিরি গোষ্ঠী আইএসআইএলের নিয়ন্ত্রিত কারাকোজাক গ্রামে অবস্থিত সমাধিটি ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল এ গোষ্ঠী।
তুরস্কের টিআরটি টেলিভিশন আজ (রোববার) জানিয়েছে, গতরাতে জঙ্গিবিমানের ছত্রছায়ায় স্থলবাহিনী পাঠায় তুরস্ক। তুর্কি সেনারা তাদের সহকর্মীদের
সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি সমাধিটিও তুলে নিয়ে যায়।
ওসমানিয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম ওসমানের দাদা সুলেমান শাহ’র এই সমাধিসৌধ পাহারার জন্য এতদিন সেখানে ৪০ জন তুর্কি সৈন্য মোতায়েন
ছিল। তাদেরকে উদ্ধারের জন্য শনিবার রাতে তুর্কি বিশেষ বাহিনীর প্রায় ৭০০ সৈন্য অভিযান চালায়।
তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাউদওগলু ২০১৪ সালের মার্চ মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় বলেছিলেন, সমাধিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তার
দেশ সম্ভাব্য সবকিছু করবে। সমাধিটি সিরিয়ার ভেতরে অবস্থিত হলেও ১৯২১ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে তুরস্কের স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এটি তুরস্কের ভূখণ্ড
হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। দাউদওগলু আজ বলেছেন, সুলেমান শাহ’র সমাধি এখন সিরিয়ার ভেতরে অন্য কোথাও স্থাপন করা হবে। তুরস্ক তার ‘নিজ
ভূখণ্ডে’ এ অভিযান চালিয়েছে বলে ঘোষণা করলেও সিরিয়া একে ‘চরম আগ্রাসন’ বলে মন্তব্য করেছে।
সমাধিটি সিরিয়ার তুর্কি সীমান্তবর্তী কুর্দি অধ্যুষিত শহর কুবানির কাছে অবস্থিত। সম্প্রতি শহরটি আইএসআইএলের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত করেছে
কুর্দি যোদ্ধারা। সিরিয়ার অভ্যন্তরে তুর্কি সেনা অভিযানের সময় একজন সৈন্য নিহত হয়েছে। আঙ্কারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমাধিসৌধে যাওয়ার
পথে ‘দুর্ঘটনায়’ ওই সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে।
সূত্র : রেডিও তেহরান।

পদ্মায় লঞ্চডুবি, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ by আব্দুল মমিন

(পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া যাওয়ার পথে পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মোস্তফার কিছু অংশ পানির ওপর থেকে দেখা যায়। আজ রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে লঞ্চটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায়। ছবি: ফোকাস বাংলা) পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া যাওয়ার পথে পদ্মা নদীতে আজ রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এমভি মোস্তফা নামের যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ ডুবে গেছে। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ২২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করা এক শিশুকে হাসপাতালে নেওয়ার পর সে মারা যায়। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ জনের লাশ উদ্ধার করার খবর নিশ্চিত করেছে। এদিকে এ ঘটনায় ধাক্কা লাগা কার্গো জাহাজ নার্গিস-১-এর লস্কর শাহিনুর রহমান (২১), শহিদুল ইসলাম (২৪) ও জহিরুল ইসলামকে (১৬) আটক করেছে শিবালয় থানার পুলিশ।
পাটুরিয়া ঘাটের সুপারভাইজার জুয়েল রানা জানান, দেড় শতাধিক যাত্রী ছিল লঞ্চে। লঞ্চটি ১৪০ জন যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটে পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সহকারী পরিচালক ফজলুর রহমান খানসহ (৫৬) এ পর্যন্ত ১৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আরও চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন লাইলি বেগম (৬৫), মো. ইমরান (৮), মো .সেলিম (২২) ও নাসিরউদ্দিন (৪০)।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্ধারকারী জাহাজ আইটি ৩৮৯ ডুবে যাওয়া লঞ্চটিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে। ঢাকা থেকে যাওয়া ফায়ার সার্ভিসের ১৫-১৬ জন ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
উদ্ধারকারী জাহাজ থেকে মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঘটনার পরপরই নদীতে থাকা অন্যান্য লঞ্চ, নৌকা ও ট্রলার গিয়ে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের উদ্ধার করে। তবে কতজন এখনো নিখোঁজ, তা জানা যায়নি। এখন পর্যন্ত ২২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ছয়জন, নারী পাঁচজন ও পুরুষ ১২ জন।
ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুরুতর অবস্থায় এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর শিশুটি মারা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বিকাশ মণ্ডল শিশুটির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
গোয়ালন্দ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার কিয়াম শিকদার জানান, নিহত শিশুটির নাম স্মৃতি। তার বাবার নাম ফারুক শেখ। তাদের বাড়ি এই ওয়ার্ডেই। ফারুক তাঁর ছেলেমেয়ে, স্ত্রী ও শাশুড়িকে নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। এ দুর্ঘটনায় তিনি বেঁচে গেলেও তাঁর স্ত্রী ও শাশুড়ি এখনো নিখোঁজ। ছেলেকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে উদ্ধার পাওয়া যাত্রী হাফিজুর রহমান শেখের ভাষ্য, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাটুরিয়া ঘাট থেকে লঞ্চটি দৌলতদিয়ার উদ্দেশে ছাড়ে। রওনা হওয়ার ১৫ মিনিট পরে আড়াআড়িভাবে আসা একটি কার্গো জাহাজ লঞ্চটির মাঝখান বরাবর আঘাত করে। এতে লঞ্চটি উল্টে ডুবে যায়। তিনি লঞ্চের ডেকে ছিলেন। ধাক্কায় তিনি নদীতে পড়ে যান। তিনি আরও জানান, যাঁরা লঞ্চের ডেকে ছিলেন, তাঁরা বের হতে পেরেছেন। তবে ভেতরে থাকা যাত্রীরা কেউ বের হতে পারেননি। হাফিজুরের বাড়ি বাগেরহাটে।
তদন্ত কমিটি গঠন: লঞ্চডুবির ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে।
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন মো. শাজাহান। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নৌযান দুর্ঘটনা তদ‌ন্তের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এর আগে যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সেই কমিটিও আজকের দুর্ঘটনার তদন্ত করবে।
এদিকে, লঞ্চডুবির ঘটনার পরপরই নৌপরিবহমন্ত্রী শাজাহান খান সচিবালয় থেকে ঘটনাস্থলে যান এবং উদ্ধারকাজের তদারকি করেন। তিনি এক শোকবাণীতে লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।

সুলেমান শাহ’র সমাধি তুলে নিতে সেনা অভিযান

সিরিয়ার একটি ওসমানিয় সমাধি’র পাহারায় নিযুক্ত তুর্কি সেনাদের সরিয়ে নিতে সেনা অভিযান চালিয়েছে তুরস্ক। সিরিয়ার আলেপ্পো প্রদেশে উগ্র তাকফিরি গোষ্ঠী আইএসআইএলের নিয়ন্ত্রিত কারাকোজাক গ্রামে অবস্থিত সমাধিটি ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল এ গোষ্ঠী।
তুরস্কের টিআরটি টেলিভিশন আজ (রোববার) জানিয়েছে, গতরাতে জঙ্গিবিমানের ছত্রছায়ায় স্থলবাহিনী পাঠায় তুরস্ক। তুর্কি সেনারা তাদের সহকর্মীদের সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি সমাধিটিও তুলে নিয়ে যায়।
ওসমানিয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম ওসমানের দাদা সুলেমান শাহ’র এই সমাধিসৌধ পাহারার জন্য এতদিন সেখানে ৪০ জন তুর্কি সৈন্য মোতায়েন ছিল। তাদেরকে উদ্ধারের জন্য শনিবার রাতে তুর্কি বিশেষ বাহিনীর প্রায় ৭০০ সৈন্য অভিযান চালায়।
তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাউদওগলু ২০১৪ সালের মার্চ মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় বলেছিলেন, সমাধিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তার দেশ সম্ভাব্য সবকিছু করবে। সমাধিটি সিরিয়ার ভেতরে অবস্থিত হলেও ১৯২১ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে তুরস্কের স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এটি তুরস্কের ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। দাউদওগলু আজ বলেছেন, সুলেমান শাহ’র সমাধি এখন সিরিয়ার ভেতরে অন্য কোথাও স্থাপন করা হবে। তুরস্ক তার ‘নিজ ভূখণ্ডে’ এ অভিযান চালিয়েছে বলে ঘোষণা করলেও সিরিয়া একে ‘চরম আগ্রাসন’ বলে মন্তব্য করেছে।
সমাধিটি সিরিয়ার তুর্কি সীমান্তবর্তী কুর্দি অধ্যুষিত শহর কুবানির কাছে অবস্থিত। সম্প্রতি শহরটি আইএসআইএলের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত করেছে কুর্দি যোদ্ধারা। সিরিয়ার অভ্যন্তরে তুর্কি সেনা অভিযানের সময় একজন সৈন্য নিহত হয়েছে। আঙ্কারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমাধিসৌধে যাওয়ার
পথে ‘দুর্ঘটনায়’ ওই সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে।
সূত্র : রেডিও তেহরান।

সব মহলের ‘হ্যাঁ’ বনাম সরকারের ‘না’ by জি. মুনীর

গুণীজনদের বলতে শুনেছিÑ একটা মিথ্যা হাজারো মিথ্যার জন্ম দেয়। তেমনি একটা ভুল হাজারো ভুলের জন্ম দেয়। তবে কোনো ভুল হয়ে গেলে সে ভুল স্বীকার করে নিয়ে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পথ চললে নতুন করে ভুল সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই ধরনের কথা চালু আছে কোনো সঙ্কট বা সমস্যার ব্যাপারে। একটি সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ার প্রথম কাজ হচ্ছে সমস্যা আছে, এ কথা স্বীকার করা এবং এমনটি স্বীকার করে নিয়ে নির্মোহভাবে এ সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা। কোনো সমস্যার কারণ যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে পারলে, বলা হয় সমস্যাটির সমাধানের পথে অর্ধেক এগিয়ে যাওয়া সম্পন্ন হয়ে যায়। আর সমস্যার কারণ দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সমস্যার বাকি অর্ধেক সম্পন্ন হয়। তখন হাতের মুঠোয় আসে গোটা সমস্যা বা সঙ্কটের সমাধান। কথাগুলো বলা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে রেখে। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সময়ের সাথে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। কিন্তু এর সমাধানের কোনো উপায়ই দৃশ্যমান হচ্ছে না। মানুষ জানতে-বুঝতে পারছে নাÑ কবে হবে এর সমাধান কিংবা কী হবে এর পরিণতি। এর বড় কারণ দেশে চালকের আসনে থাকা সরকারপক্ষ দেশে কোনো সমস্যা আছে, এমনটিই স্বীকার করছে না। ফলে এ সমস্যা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে আরো নতুন নতুন সমস্যা। সমস্যা আরো জটিল হয়ে রূপ নিচ্ছে সঙ্কটে; অথচ দেশের ভেতর ও বাইরের সব মহল বলছে, দেশ আজ গভীর সঙ্কটে নিপতিত। গোটা দেশ আজ অচলপ্রায়। দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য, কৃষি-শিল্প, অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। দেশে বিরাজ করছে চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা। দেড় মাসাধিক সময় ধরে ভোটের অধিকার ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে সরকারবিরোধীদের অব্যাহত অবরোধ কর্মসূচি ও থেমে থেমে হরতাল চলছে। আন্দোলনকারী ২০ দলীয় জোট বলছে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবেই। প্রয়োজনে আসবে আরো কঠোর কর্মসূচি। এই আন্দোলনের শুরু থেকেই চলছে দৃশ্যমান সহিংসতা। পেট্রলবোমায় পুড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, কেউ কেউ পোড়া ক্ষত নিয়ে কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বেডে। তাদের পরিবারের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। কিন্তু এই মানুষ পোড়ানোর দায় আন্দোলনকারীরা নিচ্ছে না। তারা বলছে, আন্দোলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার জন্য সরকারের এজেন্টরাই যানবাহনে পেট্রলবোমা ছুড়ে মানুষ মারছে, আর দোষ চাপাচ্ছে ২০ দলের ওপর। কিন্তু সাধারণ মানুষ থাকছে এ ব্যাপারে পুরোপুরি অন্ধকারে। এরা শুধু এর সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। অপর দিকে সরকারপক্ষ বিরোধীদের চলমান এই সহিংসতার জন্য ২০ দলীয় জোটকে দায়ী করে তা কঠোর হাতে দমনের অবস্থান নিয়েছে। সারা দেশে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, গণগ্রেফতার চলছে। করা হচ্ছে মনগড়া নানা মামলা। আসামি করা হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। চলছে যৌথবাহিনীর অভিযান। একই সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে বিরোধী নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনাও চলছে সমান্তরাল। সরকারবিরোধী ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার গুলশানের কার্যালয়ে নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এমনকি তার কার্যালয়ে খাবার যেতেও বাধা দেয়ার অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রচার হতে দেখা যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে চলছে সরকারি দলের নেতাদের নানা অশোভন বিষোদগার। কিন্তু চলমান এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান হচ্ছে না। বন্ধ হচ্ছে না সহিংসতা। সরকার বারবার বলছে, এক সপ্তাহের মধ্যে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। বাস্তবে বেড়েই চলেছে জনদুর্ভোগ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ-জাতি। বিদেশী গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।
দেশের বিবেকবান মানুষ এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক মহল। তারা বলছে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে হবে। কিন্তু সরকার দেশে কোনো রাজনৈতিক সমস্যা বা সঙ্কট আছে, তা স্বীকারই করতে চাইছে না। বরং বলা হচ্ছে, এখন যা চলছে তা আইনশৃঙ্খলাজনিত একটি সমস্যা মাত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়ে তা অচিরেই সমাধান করবে। আর যারা আজ অবরোধ কর্মসূচির নামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলছে, তারা সন্ত্রাসী। তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, সরকারপক্ষ বলছে, বিএনপি নেত্রীর সাথে কোনো সংলাপ-সমঝোতা নয়। কারণ, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী জঙ্গি সংগঠন। আর বেগম খালেদা হচ্ছেন সন্ত্রাসের রানী, জঙ্গি নেত্রী। জানি না, দেশের ও দেশের বাইরের মানুষ এ সমালোচনা কতটুকু বিশ্বাস করছে কিংবা আমলে নিচ্ছে। তবে সরকারপক্ষ প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে দেশে ও দেশের বাইরেও বেগম খালেদা জিয়া ও তার দলকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার সর্বাত্মক প্রয়াস এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, বেগম জিয়ার কারণেই আজ দেশে নানা বিশৃঙ্খলা, এই সন্ত্রাস ও সহিংসতা। এদের নির্মূল করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দেশে আর কোনো সমস্যা নেই। সরকার দেশকে শুধু উন্নতির দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে।
সমস্যাটি এখানেই। আমরা স্বীকার করতে চাচ্ছি না, আজকের সমস্যার সূচনা কিন্তু বহুল আলোচিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। সারা দুনিয়া বলছে, এটি ছিল একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কেননা, এতে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বয়কট করেছে। এই তো দুয়েক দিন আগে একটি আন্তর্জাতিক জরিপে বলা হয়েছে, ওই নির্বাচন ছিল একটি ‘ব্যর্থ নির্বাচন’। খবরে প্রকাশ, নির্বাচনী শুদ্ধতা প্রকল্প (ইলেকটোরাল ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্টÑ ইআরপি) নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্প ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বাংলাদেশের নির্বাচনকে একটি ‘ব্যর্থ নির্বাচন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ প্রকল্প পরিচালিত হয়। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত বিশ্বের ১০৭টি দেশের ১২৭টি নির্বাচনের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এরা নির্বাচনী শুদ্ধতার ধারণাসূচক (পারসেপশন অব ইলেকটোরাল ইন্টেগ্রিটিÑ পিইআই) প্রকাশ করে। ওই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম।
জরিপ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়Ñ অনেক পর্যবেক্ষকই বলছেন, সমকালীন নির্বাচনগুলোতে আন্তর্জাতিক মান রক্ষায় ঘাটতি ছিল। তাদের মতে, সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা গেছে নির্বাচিত স্বৈরশাসনগুলোতে তথা ইলেকটেড অটোক্র্যাসিগুলোতে। দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার খোলস থাকলেও সেসব নির্বাচনে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যর্থ এসব নির্বাচনের ফলে নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসে ক্ষয় ধরে, ভোটার উপস্থিতি কমে যায় এবং সরকারের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সদ্যপ্রকাশিত এই জরিপের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অংশে অনেক ব্যর্থ নির্বাচন বড় ধরনের বিপদ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। যেসব দেশের ব্যর্থ নির্বাচন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সবার আগে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ‘ফল হিসেবে ১৫৩টি আসন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানত আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। এই নির্বাচনে কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু ও শতাধিক ভোটকেন্দ্র জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে বলে এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিএনপিসহ প্রধান দলগুলো নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবিতে ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল। সরকার সে দাবি না মেনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে এই বর্জনের মুখেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পন্ন করে। একই সাথে বলে, এ নির্বাচনের পর সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ এবং জাতিসঙ্ঘও নির্বাচনের আগে ও পরে বলে আসছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নয়। তাই যথাসম্ভব দ্রুত সব দলের অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। কিন্তু সরকার নির্বাচনের পরপরই সে অবস্থান থেকে সরে গিয়ে পুরো পাঁচ বছর মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কথা ঘোষণা করে। সেই সাথে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে সরকারবিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা-সমাবেশ করা ও অবাধে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটসহ সরকারের বাইরে থাকা দলগুলো দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তোলে। দাবি না মানলে এরা রাজপথের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে বলে বারবার সরকারকে জানিয়ে দেয়। এভাবে কাটে গোটা ২০১৪ সাল। কিংবা তা মোটেও আমলে না নেয়ার প্রেক্ষাপটে আজকের এই আন্দোলন, এই অবরোধ কর্মসূচি, বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কট।
সরকার এ সঙ্কটকে সঙ্কট মনে করছে না। এ সঙ্কটের পথ ধরে চলা আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বলতে নারাজ। এমনটি বলে সরকার রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছে। অথচ আমরা দেখছি, সবাই বলছে দেশে এক চরম রাজনৈতিক সঙ্কট বিরাজ করছে। এর একটি আশু সমাধান দরকার। আর এ জন্য দরকার সংলাপের। শুধু দেশের মানুষই নয়, বিদেশীরাও একযোগে সংলাপের কথাই বলছে। বলছে, সংলাপই এর একমাত্র শান্তিপূর্ণ সমাধান। এরই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই গত শনিবারের দৈনিক প্রথম আলোর শীর্ষ সংবাদের একটি যথার্থ শিরোনামে। ওই শিরোনামটি ছিল : ‘সমাধান সংলাপে বিদেশীরা সরব, আওয়ামী লীগের না, বিএনপি উন্মুখ’। চলমান সহিংসতার নিন্দা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে তা বন্ধের লক্ষ্যে সংলাপের উদ্যোগ নিতে গত কয়দিনে সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে। এ ব্যাপারে যারা কূটনৈতিক ভাষায় অনুরোধ বা আহ্বান জানিয়েছেন তাদের পুরোভাগে আছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপীয় পার্লােেন্টর সদস্যরা। সংলাপের ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘ যে উদ্যোগ নিয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়েছে ২০ দলীয় জোট। একইভাবে এই জোট নাগরিকদের পক্ষ থেকে নেয়া সংলাপ উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। কিন্তু সরকারপক্ষ সংলাপে অনীহ, বরং সরকারি দলের নেতারা সুশীলসমাজের উদ্দেশে বলছেন, যারা সংলাপের কথা বলে তারা দেশের শত্রু। এরা এক-এগারোর কুশীলব।
এমনি পেক্ষাপটে সরকারকে বলব, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তুলে পুরো পাঁচ বছর মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার অনড় অবস্থান হবে এ সরকারের জন্য একটি বড় মাপের ভুল। এ অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। কেউই বলছে না, এটি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল, দেশের কিংবা দেশের বাইরের যাকেই আনুন না কেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, সরকারের জন্য অপ্রিয় সত্য হচ্ছেÑ দ্রুত সব দলের অংশগ্রহণে সব মহলের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত আজকের সঙ্কটের সমাধান। ভিন্ন কিছু এর সমাধান এনে দেবে না। শুধু বাড়াবে জাতীয় দুর্ভোগ আর বিপর্যয়। অতএব, সে লক্ষ্য অর্জনে চাই দ্রুত একটি জাতীয় সংলাপ, যেমনটি দাবি দেশী-বিদেশী সবার, সব দলনিরপেক্ষ বিবেকবান সচেতন মানুষের।

নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়াল -এই রাজনীতি থামাও

‘হামরা গরিব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। আজনীতি (রাজনীতি) করি না। ওগলা বুঝবারও চাও না। হামরা ক্যানে মরিম। এই আজনীতি থামাও।’
আহাজারি আর আকুতি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সামিউল ইসলাম। তাঁর ভাই সৈয়দ আলী ৬ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি দিনমজুরি করতেন। গ্রামে কাজ না থাকলে ঢাকায় আসতেন। সেদিনও ঢাকায় আসছিলেন। কিন্তু পথেই সব শেষ।
শুধু কি দিনমজুর সৈয়দ আলী! দুই বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধা, ১৪ বছরের কিশোর থেকে শুরু করে ৩২ বছরের যুবক কেউ-ই যেন এখন নিরাপদ নন। এমন ১০১ জন গত ৪৮ দিনে সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে। গতকাল বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে দুজন নিহত হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা ১০০ ছাড়াল।
৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে চলছে বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি। সহিংসতার শুরু এর দুই দিন আগে থেকেই। গতকাল ছিল অবরোধ কর্মসূচির ৪৮তম দিন। এবারের কর্মসূচিতে রাজপথে নেতা-কর্মীদের দেখা না গেলেও প্রায়ই সাধারণ মানুষের ওপর হামলা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের নাম নাশকতা। ভয়ংকর পেট্রলবোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ৫৬ জন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ক্রসফায়ারের ঘটনাও বেড়েছে। গতকালও বরিশালে ক্রসফায়ারে নিহত হন দুজন। এই সময়ে এ নিয়ে ৩০ জন ক্রসফায়ারে নিহত হলো।
এঁদের মধ্যে সাতজন জামায়াত-শিবির আর ছয়জন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। বাকি ১৭ জনের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। ১৫ জন নিহত হয়েছেন সংঘর্ষ ও অন্যান্য ঘটনায়। এ ছাড়া আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। আগুন দেওয়া হয়েছে ৫৯৪টি যানবাহনে এবং ভাঙচুর করা হয়েছে ৫৭৯টি। গতকালও দেশের কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
অবরোধ চলাকালে প্রথম নির্মম ঘটনার সূত্রপাত হয় রংপুরের মিঠাপুকুরে। গত ১৩ জানুয়ারি ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের মিঠাপুকুরে একটি বাসে আগুন দিলে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন পুড়ে মারা যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান আরও দুজন। একইভাবে ৩ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা ছুড়লে আটজন মারা যান। একইভাবে ৬ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে মারা যান আটজন।
কুমিল্লায় বাসের আগুনে নিহত হন ঢাকার কাপ্তান বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ওয়াসিম। তাঁর স্ত্রী কোহিনুর আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বামীর তো কোনো দোষ ছিল না। কেন তাঁকে এভাবে মরতে হলো। আমার সন্তানেরা এখন কাকে বাবা বলে ডাকবে? কীভাবে আমাদের দিন কাটবে? কেউ কি আমাদের এসব প্রশ্নের জবাব দেবে? কে থামাবে এই রাজনীতি?’
৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা যান ট্রাকচালক নূর হোসেন। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় তাঁর বাড়ি। তাঁর স্ত্রী মেরিনা আখতার (২৭) অন্তঃসত্ত্বা। নিহত নূর হোসেনের চাচাতো ভাই বাবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই দলের গদির লোভে আমার ভাই নূর হোসেনকে প্রাণ দিতে হলো। নেতাগো কাছে অনুরোধ, আমাগো বাঁচান।’
অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা গেছেন ১১ জন। আর এ সময় সারা দেশে পেট্রলবোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ৫৬ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছেন অন্তত ৫০ জন। তাঁদের স্বজনেরাও সহিংস এই রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এঁদের একজন ট্রাকচালক টিটন মিয়া। ২৩ জানুয়ারি বগুড়া থেকে নড়াইল যাওয়ার পথে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় দিন কাটছে তাঁর। হাতের ঘা আর পায়ের ক্ষত নিয়ে কাতরাচ্ছেন তিনি। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘অবরোধ-হরতালে যারা মানুষ মারে, তারা লোভী। ক্ষমতার জন্য তারা সাধারণ মানুষ মারছে। ওরা এই দেশটারে আফগানিস্তান বানাইতে চায়। জনগণের জন্য যাদের ভালোবাসা নেই, তারা আবার কিসের রাজনীতি করে।’
চলমান অবরোধ-হরতালে আগুনে পুড়ে যে ৫৬ জন মারা গেছেন, তাঁরা সবাই সাধারণ মানুষ। এঁদের মধ্যে নয়টি শিশু ও সাতজন নারী। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই গাড়িচালক ও শ্রমজীবী মানুষ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চলন্ত অবস্থায় বাসে বা ট্রাকে পেট্রলবোমা বা ককটেল হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারান ৫০৭ জন। এর মধ্যে ১৯৬ জন সাধারণ মানুষ। ওই বছর ২২ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে মারা যান।
শুধু যে সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে তা-ই নয়, অবরোধের মধ্যে ক্রসফায়ারের ঘটনাও বেড়েছে। গত ৪৮ দিনে অন্তত ৩০টি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন মাদ্রাসাছাত্র, বিএনপি-ছাত্রদল-যুবদল ও জামায়াত-শিবিরের নেতা। ক্রসফায়ারের প্রতিটি গল্প একই ধরনের। বাড়ি থেকে তুলে নিয়েও অনেককে হত্যা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলো।
১০১ জনের এই মৃত্যু এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় অধিকার বেঁচে থাকার অধিকার। কিন্তু সেটাই তো এখন আর থাকছে না। এভাবে ১০১ জন মানুষের মরে যাওয়া একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এই সহিংসতার বিরুদ্ধে সবার যেভাবে সোচ্চার হওয়ার কথা, সেটা হচ্ছে না।

ম্যান্ডেলা ও পেট্রলবোমার রোডেশীয় অভিজ্ঞতা by মিজানুর রহমান খান

নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে সমাজের অনেকেই ‘কঠোর হাতে’ পেট্রলবোমা হামলার নাশকতা বন্ধে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন এবং সরকারও ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ দেওয়ার মনোভাব ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দলও তাদের সহিংস কর্মসূচিকে যথার্থতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দাবি আদায়ে সহিংস পথ অবলম্বন এবং সহিংসভাবে তা দমনের লক্ষণ রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিবদমান দুই পক্ষ গণতন্ত্রের ফয়সালায়—যে যেভাবেই দেখুক—হিংসাশ্রয়ী এমন পথ বেছে নিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এ থেকে উত্তরণে বিদেশি অভিজ্ঞতা হয়তো সামান্যই সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এর একটি বোধগম্য মূল্য অস্বীকার করা যাবে না।
শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসনের অধীনে রোডেশিয়া (বর্তমান জিম্বুাবয়ে) ১৯৬৫ সালে ব্রিটেন থেকে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ওই সময় শ্বেতাঙ্গ সরকার ব্যাপকভিত্তিক পেট্রলবোমা হামলার মুখে পড়েছিল। আর এখন ২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেট্রলবোমার মতো নাশকতা বন্ধে নতুন আইন তৈরি এবং এ প্রসঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধানসংবলিত ২০০৯ সালে প্রণীত সন্ত্রাসবিরোধী আইন কার্যকর করার কথা আলোচনায় আসে। পেট্রলবোমা হামলাকে রাজনৈতিক অপরাধ বিবেচনায় রোডেশিয়ার বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকার কী কী করেছিল, সেই গল্পে যাওয়ার আগে রাজনৈতিক দাবি আদায়ের কৌশল সম্পর্কে দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মনের খবর জেনে নেওয়া যাক।
বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিতে তরুণ ম্যান্ডেলাও স্বাধিকারের দাবি আদায়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কারণ, এএনসি ১৯৫২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছয়টি ‘অন্যায্য আইন’ বাতিল; নইলে অসাংবিধানিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ম্যান্ডেলার ২৭ বছরের কারাজীবনের শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালের আগস্টে। ম্যান্ডেলা তাঁর আত্মজীবনী লং ওয়াক টু ফ্রিডম বইয়ে লিখেছেন, ‘আমরা আলোচনা করলাম গান্ধীর অহিংস নীতি বা সত্যাগ্রহ (সংলাপে সমাধান) নীতি গ্রহণ করব কি না। কেউ বললেন, নীতি হিসেবে এটা অন্য যেকোনো পথের চেয়ে নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ। অন্যরা বললেন, ‘নীতিগত কোনো জায়গা থেকে নয়, এটা কৌশল হিসেবে নেওয়া যায়। আমাদের উচিত হবে বিরাজমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে কৌশল ঠিক করা। যদি আমরা কোনো একটি বিশেষ পদ্ধতি বা কৌশলে শত্রুকে পরাস্ত করতে পারি, তাহলে তা-ই করা উচিত। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আমাদের চেয়ে ঢের শক্তিশালী। আমরা যদি সহিংসতার আশ্রয় নিই, তাহলে তারা তা ভয়ংকরভাবে ধূলিসাৎ করে দেবে।’
ম্যান্ডেলা অহিংস নীতির পূজারি ছিলেন না। তিনি জনসভায় পুলিশ দেখিয়ে জনগণকে খেপিয়ে তুলেছিলেন এই বলে যে ‘ওরা আমাদের শত্রু। অস্ত্র হাতে নাও এবং আক্রমণ করো।’ এমন উক্তির জন্য দলের তিরস্কার তিনি কবুল করেছিলেন। তবে তাঁর সরল স্বীকারোক্তি: রাষ্ট্র যেহেতু নির্যাতন চালাবে, সেই ভয়ে তাঁরা লক্ষ্মী ছেলে হয়ে ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘এটাই অহিংস নীতি গ্রহণের অনিবার্যতা হিসেবে দেখা দিল, কোনো বিকল্প হিসেবে নয়। এটাই ছিল আমার অভিমত। গান্ধীর মডেলের অহিংস আন্দোলনকে আমি অলঙ্ঘনীয় নীতি হিসেবে দেখিনি, পরিস্থিতির নিরিখে কৌশল হিসেবে দেখেছি। নীতি হিসেবে তা অতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আত্মঘাতী হলেও কৌশল হিসেবে তা ব্যবহার করা উচিত, আর গান্ধী নিজেও তা বিশ্বাস করতেন।’ ম্যান্ডেলা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, ‘যদি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সহিংস পন্থায় দমন করা হয়, তাহলে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ার যবনিকা ঘটে।’
দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্তবর্তী ঔপনিবেশিক রোডেশিয়া রাজনৈতিক অপরাধ ও রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু করেছিল। সেখানে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র বর্তমানে পেট্রলবোমাকে স্রেফ সন্ত্রাসী তৎপরতা হিসেবে দেখতে চাইছে। রাজনৈতিক সহিংসতা বিষয়ের গবেষক অধ্যাপক অ্যান্ড্রু নোভাক লিখেছেন, রোডেশিয়া যুদ্ধের গোড়ার বছরগুলোতে যখন আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়ে গিয়েছিল, তখন পেট্রলবোমা নিক্ষেপের দায়ে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছিল। বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড মানে হলো, বিচারকের পক্ষে এই অপরাধে অভিযুক্ত কাউকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে—জেল-জরিমানার সুযোগ নেই। আমাদের ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক আইনে এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি দশ বছরের কারাদণ্ড। ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অর্থ জরিমানা ও চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়ারও সুযোগ আছে। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ রোডেশিয়া চরম আইন করেছিল। তবে তারা অন্তত ‘দেখামাত্র গুলি’ বা বন্দুকযুদ্ধের পথে যায়নি। কিছুটা সুযোগ রেখেছিল ন্যায়বিচারের।
১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত শ্বেতাঙ্গ উদারনৈতিক সাংসদেরা, কালো আফ্রিকান, এমনকি দক্ষিণ এশীয় সাংসদেরা ওই আইনের বিরোধিতা করেন। পেট্রলবোমা মারলেই বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের বিধান সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। কারণ রোডেশীয় সংবিধানে ‘নিষ্ঠুর অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড’ আমাদের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের মতোই নিষিদ্ধ ছিল। নোভাক লিখেছেন, ‘পেট্রলবোমা ছুড়লেই মৃত্যুদণ্ড, এমনকি কেউ তাতে ব্যক্তিগতভাবে আহত বা তার সম্পদের ক্ষতি না হলেও মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য ছিল। বিচার বিভাগের হাত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাঁরা পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারীকে মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কোনো কম শাস্তি না দিতে পারেন।’ এই আইনটি কঠোর এবং তা অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ এর চেয়েও ভয়ংকর।
এ রকমের কঠোরতম দণ্ড কী প্রেক্ষাপটে রোডেশীয় পার্লামেন্ট গ্রহণ করেছিল, সেটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। তখন ক্ষমতায় ছিল উইংসটন ফিল্ডের যুক্তফ্রন্ট সরকার। পেট্রলবোমা ছোড়ার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। আইনমন্ত্রী ক্লিফোর্ড ডুপন্ট সংসদে তথ্য দিয়েছিলেন, ১৯৬২ সালের শুরু থেকে ৭৩টি পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে ২২ জনকে গ্রেপ্তার ও তিনজনকে দণ্ড দেওয়া সম্ভব হয়। এতে নাগরিক আক্রান্ত হয় ৩৩টি ঘটনায়, বাকিগুলোয় ক্ষতি হয় সম্পদের। তাই তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান এনে সংসদে বলেন, ‘পেট্রলবোমা আজ খুব বেশি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।’ আমরাও একই সমস্যায়। দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। তাই ডুপন্ট যা বলেছিলেন, আমাদের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও হয়তো তা-ই বলবেন। ডুপন্ট পার্লামেন্টে বলেন, ‘পেট্রলবোমা নিক্ষেপ সর্বদাই পূর্বপরিকল্পিত এবং কখনো আত্মরক্ষার জন্য নয়।’ বিরোধী দল কেবল মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিধানের সমালোচনা করেছিল। তারা যুক্তি দিল: ‘আসল লোকেরা নেপথ্যে থেকে এ কাজে তরুণদের ব্যবহার করছে।’ সুতরাং কেন এই তরুণদের মৃত্যুদণ্ড হবে। গত শনিবার সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারী হিসেবে ১০ বছরের মানিকের ওপর গণনির্যাতনের একটি আলোকচিত্র ঢাকা ট্রিবিউন-এ ছাপা হয়েছে।
রোডেশীয় প্রধানমন্ত্রী হোয়াইটহেড একটি মানবিক যুক্তি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আদালত কোনো ভুল করলে তা শোধরাতে নির্বাহী বিভাগ ক্ষমার অধিকার ব্যবহার করবে। সেখানে পেট্রলবোমার টার্গেট ছিল ইউরোপীয়রা। আর বাংলাদেশে নিরীহ মানুষ। শ্বেতাঙ্গ সরকার যদিও অস্বীকার করেছিল, এই আইনটি নির্দিষ্টভাবে আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু আমরা এটাও দেখব যে কঠোর আইন করে রোডেশিয়া সুফল পেয়েছিল। পেট্রলবোমা হামলা কমে গিয়েছিল। তবে যেটা লক্ষণীয় তা হলো, ৪২ দিনে ৫২ জন মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো বর্বরতা সেখানে ঘটেনি। ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডুপন্ট পার্লামেন্টকে অভিহিত করেন যে ১৯৬৩ সালে ১৮টি ও ১৯৬৪ সালের প্রথম দুই মাসে চারটি পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। কেউ মারা যায়নি। ২২টি হামলার মধ্যে ১৬টি বাড়িঘর লক্ষ্য করে ছোড়া হয়। এর ১৫টিতে মানুষের বসবাস ছিল। আর বাদবাকি একটি বাসে এবং অন্যগুলো খালি বাড়িতে নিক্ষেপ করা হয়। ১৯৬৫ সালে দেখা যায়, নিরাপত্তা আইনের আওতায় ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, ৫১ জন দণ্ডিত হয়েছে, এর মধ্যে পেট্রলবোমার বিধানের আওতায় দণ্ডিত হয়েছিল ১৯ জন। দু-একটি চমকপ্রদ কাহিনিরও জন্ম নেয়।
তার একটি এমন: দিনটি ছিল ১৯৬৩ সালের ২ সেপ্টেম্বরের ভোরবেলা। শহরতলির হারারেতে একটি বাড়িতে ছোট্ট সলতে লাগানো একটি প্যারাফিনের বোতল নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং সেটি একটি শিশুর দোলনার ওপরে গিয়ে পড়ে। এই অপরাধে দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মানিকের মতো এক কিশোরকে সাত বছরের জেল দেওয়া হয়। নোভাক লিখেছেন, ওঁরা কেউ পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারী ছিলেন না। অথচ এই দণ্ড রোডেশীয় সুপ্রিম কোর্ট এবং পরে প্রিভি কাউন্সিলও বহাল রাখেন। কিন্তু রানইউওয়া নামের এক ব্যক্তির দণ্ড হয়। তাঁর অপরাধ, তিনি একটি বোতলের দরকার পড়ায় প্যারাফিন কিনেছিলেন। তবে তিনি ছিলেন জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়নের (জানু) সমর্থক। কে পেট্রলবোমা ছুড়েছিল, আদালতের রায়ে কোনো পর্যবেক্ষণ ছিল না। রিচার্ড মাপুলিসা দণ্ডিত হন; কারণ তাঁর নিক্ষিপ্ত পেট্রলবোমায় একটি কার্পেট পুড়ে সামান্য ছিদ্র হয়েছিল।
তবে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর আইন প্রবর্তন করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ থামানো সম্ভব হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। ৯২টি পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ১৯৬৭ সালে মাত্র দুটিতে এসে দাঁড়ায়। তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে এক বছরের কম সময়ের ব্যবধানে রোডেশীয় পার্লামেন্ট ‘বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য নয়’ বলে আইনটি বাতিল করেছিল। এ ধরনের কোনো আইন সেখানেও কাজে দেয়নি, বাংলাদেশেও দেবে না।
রাজনৈতিক সংকটকে আলোচনা করে আর অপরাধকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে প্রতিহত করুন। এখানে নতুন কোনো আইনের দরকার আছে বলে মনে হয় না। বিস্ফোরক আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট। বর্বরোচিত কোনো নাশকতাই রাষ্ট্রকে প্রতিশোধপরায়ণতার দিকে ঠেলতে পারে না। গ্রেপ্তার–বাণিজ্য, ক্রসফায়ার বা বন্ধুকযুদ্ধ আইনের পথ নয়, প্রতিশোধের পথ।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

রাশিয়ার বিমান হামলায় টিকতে পারবে না ব্রিটেন

ব্রিটেনের রাজকীয় বিমান বাহিনীর (আরএএফ) সাবেক প্রধান মাইকেল গ্রেডন বলেছেন, ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং রাশিয়ার বিমান হামলার কাছে তারা টিকতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় যুক্তরাজ্য সব আক্রমণের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না। এর আগে বুধবার রাশিয়ার দুই বোমারু বিমান আন্তর্জাতিক আকাশসীমা লংঘন করে দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের কর্নওয়াল উপকূলে ঢুকে পড়ে। পরে তাদের এ এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে ধাওয়া করে ব্রিটিশ এয়ার ফোর্সের টাইফুন যুদ্ধবিমান। এ ঘটনার পরই এমন মন্তব্য করলেন গ্রেডন। এদিকে ব্রিটেনের আকাশসীমায় প্রায়ই রুশ বিমান ঢুকে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ গবেষকরা বলছেন, সম্প্র্রতি ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সামরিক বিমানগুলো যখন তখন যুক্তরাজ্যের আকাশসীমায় প্রবেশ করছে। স্নায়ু যুদ্ধকালে ঠিক একইভাবে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা করে দেখতে তারা নিয়মিতই এটা করত। এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বাছাইয়ের চেষ্টা করছে মস্কো। ক্যামেরন বলেন, সামান্য এ ঘটনাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি না।
তবে আরএএফের সাবেক প্রধান মাইকেল গ্রেডন মনে করেন, রাশিয়ার হুমকি অধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। গ্রেডন ডেইলি মেইলকে বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের টেকা নিয়ে আমি খুবই সন্দিহান। কেননা আগের চেয়ে এখন আমাদের (যুক্তরাজ্যের) সক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে। ‘আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে তারা (রাশিয়া) এ অঞ্চলে উড়ছে এবং সম্ভবত তারা এটিও জেনেছে যে, আমরা আর আগের মতো শক্তিশালী নই।’ মাইকেল গ্রেডন উল্লেখ করেন, তারা (রাশিয়া) জানে বর্তমান সময়ে তারা যা করছে তা উসকানি। কেননা তাদের (রাশিয়া) তুলনায় পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন কৌশলপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়। ১৯৯৯ সালে উত্তর ইরাকে মিত্র বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী এয়ার কমোডর এন্ড্র– ল্যামবার্ট বলেন, যদি রাশিয়া হামলা চালায়, তাহলে আমরা খারাপভাবে তা প্রতিহত করব। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল ফ্যালন বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোকে অস্থিতিশীল করতে যে চোরাগোপ্তা হামলা শুরু করবে তা সত্যিই বিপজ্জনক। টেলিগ্রাফ।

নালন্দার চ্যান্সেলরে অমর্ত্যরে না

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর পদে পুনর্বহালের প্রস্তাব বাতিল করলেন অমর্ত্য সেন। তার অভিযোগ, বিজেপি সরকার তাকে ওই পদে বহাল রাখতে আগ্রহী নয়। চ্যান্সেলর হিসেবে দ্বিতীয় দফায় তার নিয়োগে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশাসনিক ঢিলেমিতে যথেষ্ট অপমানিত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ।
বৃহস্পতিবার নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বোর্ডকে লেখা চিঠিতে দ্বিতীয়বার চ্যান্সেলরের দায়িত্ব গ্রহণে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছেন অমর্ত্য সেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সদস্যদের উদ্দেশে লেখা ৫ পাতার চিঠিতে সম্প্রতি তিনি বিষয়টি জানিয়েছেন। শুক্রবার টাইমস অব ইন্ডিয়া বিষয়টি জানিয়েছে। টিঠিতে জুলাই মাসের পর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের পদ ছাড়তে চেয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন অমর্ত্য সেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে তার ওই পদে থাকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির প্রস্তাবের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

পৃথিবী নয় সূর্যই ঘোরে

পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে- বিশ্বের তাবড় সব বিজ্ঞানীর এ তত্ত্বকে সম্প্রতি ভুল বলে আখ্যা দিলেন এক সৌদি আলেম। ‘পৃথিবী একটি নিশ্চল বস্তু, এটি ঘোরা তো দূরের কথা, নড়তেও পারে না। বরং সূর্যই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে।’ গ্যালিলিও আর জিওর্দানো ব্রুনো থেকে শুরু করে আধুনিক টেলিস্কোপওয়ালা নাসার বিজ্ঞানীদের যাবতীয় তত্ত্বকে ভুল দাবি করে এমন কথা বলেছেন শেখ বান্দার আল-খাইবারি নামে এক সৌদি আলেম।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্যালিলিও গ্যালিলির জন্মদিবস (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৫৬৪) উপলক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের এই ‘গবেষণা’ তুলে ধরেন খাইবারি। ইতিমধ্যে খাইবারির এই বক্তৃতা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুলভাবে আলোচিত হচ্ছে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পরোয়া না করা খাইবারির দাবি, যদি পৃথিবী নিজের কক্ষপথে ঘুরত, তাহলে বিমান কখনওই তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারত না। পৃথিবী ঘুরলে বিমানের ওড়ার প্রয়োজন কী! চীন’ই তো ধীরে ধীরে বিমানটির কাছে এগিয়ে আসতো! নাসার চন্দ্রজয়ের বিষয়টি হলিউডের সৃষ্টি বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজের তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীদের প্রতি চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেন খাইবারি। দ্য টেলিগ্রাফ, ডেইলি মেইল, হাফিংটন পোস্ট।

জনসমুদ্র আছড়ে পড়েছিল বই মেলায় by মাসুম আলী

‘তিল ঠাঁই আর নাহি রে’—গতকাল একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেলে বইমেলা প্রাঙ্গণের ভিড় দেখে বারবার কবিগুরুর কবিতার চরণটি মনে পড়ছিল। একুশে ফেব্রুয়ারিতে অন্য রকম একটা দিন পার করল বইমেলা। আগের দিন শুক্রবার বইমেলায় ছিল মানুষের ঢল। গতকাল শুধু ঢল নয়, জনতার সাগরে যেন বিপুল জোয়ার। মানুষের এ ভিড় কেবল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিংবা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ নয়, টিএসসি থেকে নীলক্ষেত মোড়, দোয়েল চত্বর থেকে শিক্ষা ভবন মোড়, চানখাঁরপুলে ছড়িয়ে পড়েছিল। সকাল থেকেই মেলায় জনসমুদ্র যেন আছড়ে পড়েছিল।
বইমেলায় গতকাল শনিবার মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, দ্রোহ ও শোকের গাঢ় পঙ্ক্তিমালা। যেদিকে দুচোখ যায়—মানুষ আর মানুষ। মেলায় ঢোকার জন্য সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে দীর্ঘক্ষণ। উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরা চোখ, মাথায় বাংলাদেশের পতাকা, কেউ কেউ পরেছে ভাষাশহীদদের সম্মানে ‘অ আ ক খ’ বর্ণমালাখচিত পোশাক।
সরকারি ছুটির দিন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে গতকাল মেলার প্রবেশপথ সকাল আটটায় খুলে দেওয়া হয়। সকাল থেকেই ছিল ক্রেতাদের ভিড়। শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে অনেকেই সোজা চলে এসেছিল মেলায়। দুপুরে ভিড় একটু কমলেও বিকেলে আবার বেড়ে যায়। গতকাল বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মানুষের পদচারণে বইমেলা ছিল মুখর, প্রাণোচ্ছল।
‘এ তো মেলা নয়, যুদ্ধ!: অনীক, হাসিব, আশিক, তৌসিব ও জাওয়াদ এসেছেন পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকা থেকে। সবার গায়ে একই রকম পাঞ্জাবি, তাতে আঁকা বাংলা বর্ণমালা। দল বেঁধে তাঁরা বইমেলায় এসেছেন, আড্ডা দিয়েছেন, ঘুরেছেন নানা স্টলে। অনীক বললেন, ‘এলাকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত কিংবা আড্ডা ছেড়ে মেলায় না এসে পারলাম না!’
বই কিনলেন?: জবাবটা এল হাসিবের কাছ থেকে। জানালেন, ‘সবাই মিলে আটটি বই কিনেছি। আরও কিনব। আমরা পালাক্রমে বই পড়ব।’ ওয়ারী থেকে মাইশা এসেছিল বাবার কাঁধে চড়ে। ছোট্ট মাইশার গালের এক পাশে শহীদ মিনার, অন্য পাশে ‘অ আ ক খ’ এঁকে দিয়েছেন কেউ একজন। মাইশা জানাল, বাবার কাছে আবদার করে আখতার হুসেনের এক ঘর ছড়া বইটি সে কিনেছে। মায়ের জন্য কিনেছে একটি রান্নার বই।
ব্যাংক কর্মকতা শিপন হোসেন এসেছিলেন ভাগনেকে সঙ্গে নিয়ে। চোখেমুখে চরম বিরক্তি। জানালেন, বেলা ১১টা থেকে অন্তত দেড় ঘণ্টা চেষ্টা করেও মূল মেলায় ঢুকতে পারেননি ভাগনেকে নিয়ে। ভিড় ঠেলে বেরিয়েই বললেন, ‘এ তো মেলা নয়, যুদ্ধ! প্রবেশপথ আরও বেশি করা গেলে সময় অর্ধেক বেঁচে যেত।’
প্রথমা প্রকাশন এবারও পুরস্কার পাচ্ছে
এ বছর বিক্রি এবং মানসম্মত বই প্রকাশের কারণে প্রথম দিন থেকেই আলোচনায় ছিল প্রথমা প্রকাশন। প্রতিদিনই এই প্রতিষ্ঠানের সামনে অগ্রসর পাঠকদের ভিড় করতে দেখা যায়। গতকাল বাংলা একাডেমির ‘গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫ কমিটি’র আহ্বায়ক একাডেমির পরিচালক মো. মোবারক হোসেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের চারটি গুণীজন স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করেন। এর মধ্যে স্টল ক্যাটাগরিতে প্রথমা প্রকাশনকে ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সালে সর্বাধিকসংখ্যক মানসম্পন্ন গ্রন্থ প্রকাশের জন্য বাংলা একাডেমির শহীদ মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, ২০১২ ও ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি গুণগত মান বিচারে বছরের সেরা বই হিসেবে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’, ২০১৪ সালে ওই বছর সর্বাধিকসংখ্যক মানসম্পন্ন গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’সহ আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পায়।
এবার ২০১৪ সালে সর্বাধিকসংখ্যক গুণমানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশের জন্য মাওলা ব্রাদার্সকে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’, মুর্তজা বশীরের আমার জীবন ও অন্যান্য গ্রন্থ প্রকাশের জন্য বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে এবং রবীন্দ্রসমগ্র খণ্ড-২৩ প্রকাশের জন্য পাঠক সমাবেশকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে সর্বাধিকসংখ্যক গুণমানসম্পন্ন শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য সময় প্রকাশনকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হয়।
২০১৫ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় প্যাভিলিয়ন ক্যাটাগরিতে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডকে, স্টল ক্যাটাগরিতে প্রথমা প্রকাশন এবং জ্যার্নিম্যান বুকসকে ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ গ্রন্থমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে এই পুরস্কারগুলো দেওয়া হবে।
প্রথমা প্রকাশনের ব্যবস্থাপক জহিরউদ্দীন জানালেন, নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরোনো বইগুলোও পাঠক খুঁজেছেন গতকাল। প্রথমা প্রকাশনের বইমেলায় নতুন আসা সেলিনা হোসেনের দিনকালের কাঠখড়, হরিশংকর জলদাসের এখন তুমি কেমন আছ, আনিসুল হকের বিক্ষোভের দিনগুলিতে প্রেম, ভয়ংকর দ্বীপে বোকা গোয়েন্দা, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীর কর্নেলকে কেউ লেখে না, বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বাসন্তী, তোমার পুরুষ কোথায়, শাহনাজ মুন্নীর হৃদয় ঘরের বারান্দায়, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের তালপাতার সেপাই ও অন্যান্য গল্প, তাহমিমা আনামের দ্য গুড মুসলিম (অনুবাদ: মশিউল আলম) বইগুলো ভালো বিক্রি হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়েছে আরও একটি নতুন বই আলী রীয়াজের হাউ ডিড উই অ্যারাইভ হেয়ার। এ ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের অতীতে প্রকাশিত আনোয়ার উল আলমের রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা, আনিসুল হকের আমারও একটা প্রেমকাহিনি আছে, রায়হান রাইনের আগুন ও ছায়া ইত্যাদি বই ভালো বিক্রি হচ্ছে।
মেলায় গতকাল পাঠকের হাতে হাতে দেখা গেছে হুরমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন ও আনিসুল হকের লেখা গল্প-উপন্যাস; আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুযণ, মহাদেব সাহা, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর পুরোনো কবিতার বই।
একাডেমির তথ্যকেন্দ্র এবং সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে জানা গেছে, শনিবার মেলার ২১তম দিনে ২৪০টি নতুন বই এসেছে।
সকালে কবিতাপাঠ, বিকেলে আলোচনা, সন্ধ্যায় গান
একাডেমির গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে সকালে অনুষ্ঠিত হয় স্বরচিত কবিতাপাঠের আসর। এতে সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা। অনুষ্ঠানে শতাধিক কবি কবিতা পাঠ করেন। বিকেলে একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বক্তৃতানুষ্ঠান। ‘ভদ্রলোক-রাজনীতি ও শ্রেণিচেতনার আলোকে ভাষা-আন্দোলন’ শীর্ষক একুশে বক্তৃতা প্রদান করেন ভাষাসংগ্রামী ও রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিক। একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী’ এবং স্টেপ মিডিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা গান করেন।

জনগণের মুরোদ অপরিসীম by রেজোয়ান সিদ্দিকী

দ্রুত একটি অবাধ নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। সে অবরোধ চলছে। এর মধ্যে কয়েক দফা হরতালও পালিত হয়েছে। সরকারের মদদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে শুরু করেছে। কখনো এমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে যে সরকার পরিচালনা কে করছে, র‌্যাব পুলিশ বিজিবি, নাকি বেসামরিক কোনো প্রশাসন? ঢাকার সাথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সন্দেহ নেই, অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ করার সঠিক পথ গণতন্ত্রের চর্চা। সে পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। বিগত ৪৬ দিন ধরে যে অবরোধ চলছে তাতে ২০ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতাকে। বিভিন্ন মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। আর সরকারের বাগাড়ম্বরপ্রিয় নেতারা অবিরাম হুমকি দিচ্ছেন যে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবিকে নির্বিচারে হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। তার দায় নিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। ফলে ক্রসফায়ারের নামে প্রতিদিনই বিনাবিচারে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। অনেক তরুণ যুবককে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে পুলিশ অকারণেই পায়ে গুলি করে তাদের চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। নির্বিচারে চলছে গ্রেফতার বাণিজ্য। টাকা না দিলে ক্রসফায়ার। টাকা দিলে ৫৪ ধারা। জেলহাজতের সামনে প্রতিদিন শত শত উদ্বিগ্ন অভিভাবক ধরনা দিচ্ছেন। হয়তো তাদের নিখোঁজ সন্তানদের আদালতে হাজির করা হবে। মর্গে একটি লাশের খবর পাওয়া গেলে শত শত মানুষ ভিড় করছে। হয়তো তাদের কোনো স্বজনের লাশ। অর্থাৎ শত শত মানুষ গুম আছে।
খালেদা জিয়া কার্যত তার কার্যালয়ে স্টাফসহ বন্দী হয়ে আছেন। প্রায় ১০ দিন ধরে ওই কার্যালয়ে কোনো খাদ্য প্রবেশ করতে দিচ্ছে না সরকার। এর আগে বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, ডিস কানেকশন কেটে দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ পুনরায় চালু হলেও অন্যসব সেবা বন্ধই রয়েছে যেন সরকার বেগম খালেদা জিয়া ও তার স্টাফদের ভাতে পানিতে মারতে চাইছে।
দেশব্যাপী যে অবরোধ চলছে তাতে কার্যত কেউ নেতৃত্ব দিচ্ছে না। সে কর্মসূচি জনগণ নিজস্ব উদ্যোগের বাস্তবায়ন করছে। সরকারি দলের লোকদের টিটকারি দিতে শুনেছি যে, ২০ দলীয় জোট আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে ঘরে বসে থাকছে, রাস্তায় নামছে না। রাস্তায় নামবে কী, সবাই তো কারাগারে। আর রাস্তায় নামা তো দূরের কথা, কাউকে কোথায়ও দেখা গেলেই গ্রেফতার করে ফেলা হচ্ছে। তারপরও হরতাল-অবরোধ পালিত হচ্ছে। প্রথম দিকে সরকারের লোকদের হুমকি শুনছিলাম যে, বিএনপির আন্দোলনের কোনো মুরোদই নেই। তারপরও যখন কর্মসূচি চলতে থাকল তখন এলো, পেট্রলবোমা কালচার। পেট্রলবোমা ভয়াবহ নাশকতা, সন্দেহ নেই। তাতে সীমাহীন মানবিক বিপর্যয়ও ঘটেছে। পুড়ে মারা গেছে মানুষ। দগ্ধ হয়ে হাসপাতাল বেডে এখনো কাতরাচ্ছে মানুষ।
প্রথম দিন থেকেই সরকার হল্লাচিল্লা শুরু করে, এই পেট্রলবোমা মারছে আন্দোলনকারী ২০ দলীয় জোট। জোট ধারাবাহিকভাবেই তা অস্বীকার করে আসছে। পেট্রলবোমা হামলার দায় যদি ২০ দলীয় জোটের ওপর চাপানো যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবে মানুষ জোটের আন্দোলনের ওপর ভীত হয়ে উঠবে। অর্থাৎ পেট্রলবোমা মেরে আন্দোলনকারীদের কোনো লাভ নেই। লাভ সরকার দলেরই। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তা প্রমাণিত হলো। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী সব নেতা একসাথে বার্ন ইউনিট বার্ন ইউনিট বলে হল্লা করতে শুরু করলেন। প্রধানমন্ত্রী বার্ন ইউনিটে গিয়ে অঝোরে কাঁদলেনও। সে বড় প্যাথেটিক দৃশ্য!
কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যে প্রমাণিত হতে শুরু করল যে, পেট্রলবোমা তৈরির কারখানা বসেছে আওয়ামী লীগ অফিসে, আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতাকর্মীদের বাড়িতে। পেট্রলবোমা ছুড়তে গিয়ে আহত হতে থাকল আওয়ামী লীগের কর্মীরা। আটক হলো শত শত আওয়ামী লীগ কর্মী। আর তাদের ছাড়িয়ে নিতে আওয়ামী এমপি-নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ওই বোমাবাজদের ‘সৎ ও মেধাবী’ বলে সার্টিফিকেট দিতে থাকলেন, যাতে পুলিশ কিংবা আদালত তাদের ছেড়ে দেয়। এর মধ্যেই আওয়ামী চোঙ্গাবাজেরা সমস্বরে চেঁচিয়ে ‘ওরা পুড়িয়ে মানুষ মারে’ এমন একটা সেøাগান চালু করে ফেলল। আর আলোচনা বা সংলাপের প্রশ্ন উঠলেই প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে হাইব্রিড নেতারা পর্যন্ত বলতে থাকলেন, কাদের সাথে আলোচনা করব, খুনিদের সাথে? যারা পুড়িয়ে মানুষ মারে তাদের সাথে? ক্রমেই জনমনে বিভ্রান্তি দূর হতে থাকল। তারা প্রায় নিশ্চিত হলো যে, পেট্রলবোমা হামলার জন্যও সরকারই দায়ী।
বিরোধী দলের আন্দোলনকে সরকারের তরফ থেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হলেও দেখা গেল দেশব্যাপী তাদের আন্দোলন ক্রমেই আরো গতিময় হয়ে উঠছে। নেতা নেই। জনতাই সরকারকে রুখে দেয়। সংগ্রামে নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। এই সরকার প্রথম থেকেই জনগণকে ভয় পেয়ে আসছে। তাদের কুকীর্তি, তারা সরকারেই থাকুক বা বিরোধী দলেই থাকুক ত্রাস সৃষ্টি ও বলপ্রয়োগ তাদের বৈশিষ্ট্য। লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুুষ মারা, হরতাল-প্রতিরোধের নামে কুপিয়ে বিশ্বজিৎসহ আরো অনেক নিরপরাধ সাধারণ মানুষ হত্যা, মানুষকে প্রকাশ্যে দিগম্বর করা, এসবই আওয়ামী চরিত্র। সরকারের সব কর্মকাণ্ড ওই জনগণের বিরুদ্ধেই। ফলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনগণ।
জনগণকে ভয় পায় বলেই তারা করেছে একদলীয় নির্বাচনী প্রহসন। পৃথিবীর কোথায়ও সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। দেশের মানুষসহ সারা বিশ্ব দাবি করেছে অবিলম্বে আরো একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা হোক। এসব চাপের মুখে প্রথম দিকে সরকার অবশ্য বলেছিল, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নির্বাচন। শিগগিরই আরো একটি নির্বাচন দেয়া হবে। এখন বলছে, ২০১৯ সালের নির্ধারিত তারিখের এক দিন আগেও নির্বাচন হবে না। শুধু কি তাই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক প্রধানও বলে বসলেন যে, ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না। সরকার উপলব্ধি করতে পারছে না যে, কী দানবকে প্রশ্রয় দিয়ে কাঁধে তুলছে তারা। এসব বাহিনী যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে এখন গ্রামে গঞ্জে গভীর রাতে হানা দিয়ে গ্রামের বাড়িঘর তছনছ করছে। সাধারণ মানুষকে বেধড়ক পেটাচ্ছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ আইলাপুর ইউনিয়নের কয়েকটি বাড়িতে যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় পুরুষ না পেয়ে নারীদেরই ব্যাপক মারধর করেছে। যৌথবাহিনীর পিটুনিতে অন্তঃসত্ত্বা ও সত্তরোর্ধ্ব মহিলাদেরও বেধড়ক পিটিয়েছে। কিন্তু এ দানবদের দায়মুক্তি দিয়ে রাখা হয়েছে। সরকার উপলব্ধি করতে পারছে না যে, এ দানবই একদিন তাদের ঘাড় মটকাবে। অতএব সরকার নির্বাচিতও নয়, জনপ্রতিনিধিত্বশীলও নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘বড় দুই দলের ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে সব সময় সাধারণ মানুুষ বলি হয়েছে। এখনো হচ্ছে। পক্ষান্তরে পুলিশ অন্যায়ভাবে যাকে খুশি তাকে গ্রেফতার করে, গুলি করে মারছে। আমরা সব হত্যাকাণ্ডেরই তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা দেখেছি, বার্ন ইউনিটে মমতাময়ী মায়ের কান্না। আমার প্রশ্ন পুলিশ যখন সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে নির্বিচারে হত্যা করছে, তখন সেই মমতাময়ীর কান্না কোথায় থাকে?’
এই প্রশ্ন গোটা দেশবাসীর। এক দিকে সরকার বার্ন ইউনিটের কথা বললেও টুঁ শব্দটিও করছে না নির্বিচার খুন গুমের বিরুদ্ধে। ক্রসফায়ারের নামে যখন বিনাবিচারে খুন, গুম কি হত্যাকাণ্ড নয়? পেট্রলবোমা মেরে যারা মানুষ হত্যা করে তারাও খুনি। ক্রসফায়ারের নামে বিনাবিচারে যারা মানুষ খুন করে তারাও খুনি। সরকার যে ২০ দলীয় জোটকে খুনি অভিহিত করে তাদের সাথে আলোচনায় বসতে অস্বীকার করছে, আসলেই কি তাই? সরকারের পত্রপত্রিকাগুলোর রিপোর্ট তো বলছে অন্য কথা। উভয় পথেই হত্যা মানবাধিকারের চরম ব্যত্যয়। সব ক্ষেত্রেই আসল দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের এমন মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে সরেজমিন অবহিত হওয়ার জন্য, ক্রমবর্ধমান সহিংসতার অবসান এবং রাজনৈতিক সঙ্কটের সুরাহার পথ বের করতে ঢাকায় চার দিনের সফরে এসেছিল ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার উপকমিটির একটি প্রতিনিধি দল। তারা সঙ্কট নিরসনে সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিতে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি তাগিদ দিয়েছেন। একই সাথে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই দলটি ১৮ ফেব্রুয়ারি বৈঠক করেছিল পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী মো: শাহরিয়ার আলমের সাথে।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয়ে ইইউ প্রতিনিধি দল কিছু না বললেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মানবাধিকার নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ জানায়নি প্রতিনিধিদল। তার এই বক্তব্যে ১৯ তারিখেই ওই প্রতিনিধিদল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আর সে কারণেই আমরা এ দেশ সফরে এসেছি। বৈঠকে গণগ্রেফতার নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছাড়ার আগে তারা এক বিবৃতিতে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সুশীলসমাজের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অধিকারের বিনিময়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাদের এই উদ্বেগ ইইউর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। প্রতিমন্ত্রীর অসত্য বক্তব্য বাংলাদেশকেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
এ দিকে বাংলাদেশের চলমান সঙ্কট নিয়ে জাতিসঙ্ঘও তৎপর রয়েছে। জাতিসঙ্ঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পৃথক চিঠি দিয়েছেন। তা নিয়েও সরকারের তরফ থেকে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে।
মিথ্যা বলা ও বাগাড়ম্বর এ সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কে যে কখন কোন কথা বলবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। মাঝে মধ্যে শুনি দেশে কোনো হরতাল-অবরোধ কিছুই হচ্ছে না। গাড়ি-ঘোড়া চলছে। সারা দেশের দোকানপাট সব খোলা। সব কিছু স্বাভাবিক। সে পরিপ্রেক্ষিতে এক সহযোগী ‘সব যদি স্বাভাবিক হবে?’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। লেখাটি হুবহু তুলে দেয়া হলো।
“সময়ের ব্যবধান দু’ঘণ্টার মতো। দূরত্ব অবশ্য অনেক। ঢাকায় সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সিনিয়র মন্ত্রী আমির হোসেন আমু জানালেন, সব কিছুই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার অত্যন্ত সন্তুষ্ট। ঘণ্টা দুয়েক পর সিলেটে আরেক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানালেন, বুধবারের এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিরোধী জোটের হরতালের কারণেই এ পরীক্ষা পেছানো হয়। আমির হোসেন আমু ছাড়াও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও বলেছেন, দেশের সব কিছু স্বাভাবিক। কোথাও হরতাল হচ্ছে না।
কয় দিন ধরেই এ প্রচারণা চলছে, সব ঠিক আছে। কোথাও কোনো সঙ্কট নেই। কিন্তু এ নিয়ে অন্তত ১০টি প্রশ্ন উঠেছে
১. সব যদি স্বাভাবিক হবে তবে দফায় দফায় কেন এসএসসি পরীক্ষা পেছানো হচ্ছে? সর্বশেষ আজকের এসএসসি পরীক্ষা কেন পেছানো হলো। ‘কোনো কারণ’ ছাড়াই কেন শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন করা হচ্ছে? রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। রাজধানীর বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুক্র ও শনিবার ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। তা কেন?
২. বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় অভিমুখে প্রতিদিনই সরকারপন্থী বিভিন্ন সংগঠন যাত্রা করছে। খালেদা জিয়ার কাছে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন তারা। দেয়া হচ্ছে আলটিমেটাম। হরতাল-অবরোধ যদি না-ই হয় তবে তা প্রত্যাহারের দাবি উঠছে কেন?
৩. পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবিতে সব ব্যবসায়ী সংগঠনই রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে হিসাব দিচ্ছেন তাদের কত টাকা ক্ষতি হচ্ছে। ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’ সত্ত্বেও কেন তারা তা করছেন?
৪. অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সোমবারও বলেছেন, টানা অবরোধের কারণে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। তারা পথে বসে গেছেন। মফস্বল এলাকায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর আগেও তিনি বলেছিলেন, জেলা শহরগুলোর পরিস্থিতি মারাত্মক। কেন তিনি এসব কথা বলছেন?
৫. নিরপেক্ষ সূত্রগুলো দাবি করছে, মহাসড়কগুলোতে ২৫ ভাগের বেশি যানবাহন চলাচল করছে না। সরকারই রাত ৯টার পর গাড়ি না চালাতে পরিবহন মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সব কিছু যদি স্বাভাবিক হবে তবে মহাসড়কে কেন স্বাভাবিক যানবাহন চলছে না?
৬. বার্ন ইউনিটে মানুষের আর্তনাদ দেখে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষই স্থির থাকতে পারছে না। কেন এখনো বার্ন ইউনিটে মানুষ আসছে। কেন পঙ্গু হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ মানুষের ভিড় বাড়ছে? কেন পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হচ্ছে মানুষ? কেন মারা যাচ্ছে তারা। কেন আগুন জ্বলছে বাসে। কেন ককটেল বিস্ফোরণ হচ্ছে যত্রতত্র। কেন ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছে আদম সন্তান। কেন পায়ে গুলি করা হচ্ছে নিরীহ মানুষের।
৭. সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি কেন হরতাল-অবরোধে বিচারকার্যক্রমে অংশ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। কেন বিঘœ ঘটছে বিচারকার্যক্রমে। কেন প্রতিদিন মিছিল হচ্ছে উচ্চ আদালতে।
৮. সরকারপ্রধানের তাগাদা দেয়ার পরও বেশির ভাগ সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় যাননি। কেন কয়েকটি জায়গায় তাদের সমাবেশ হামলার শিকার হয়েছে।
৯. কারাগারগুলো কেন বন্দীদের ভিড়ে ঠাসা? কেন ৪০ দিনে ১৪ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কেন অভিযানের নামে মানুষের ঘরবাড়ি তছনছ করা হচ্ছে। কেন প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে মানুষ?
১০. কেন বহু মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছে? কেন তারা দেশত্যাগের চেষ্টা করছে?”
আওয়ামী মন্ত্রী-নেতাদের ভাষায় ২০ দলের হয়তো ‘মুরোদ’ নেই। কিন্তু এই শিক্ষা তাদের হওয়া উচিত যে জনগণের মুরোদ অপরিসীম।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

অবরোধের বিভীষিকা- 'আমি বাঁচতে চাই আমারে বাঁচান' by নাহিদ তন্ময়

রশিদ মোল্লা (৩৫)। পেশায় রিকশাচালক। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তার সময় কাটে যাত্রী বহন করে। ২০ বছর ধরে এভাবেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই টানা অবরোধ কর্মসূচি তার এ রুটিন পাল্টে দেয়। গ্যারেজ মালিক রিকশা বাইরে বের করতে দেন না_ কখন নাশকতাকারীরা রিকশা পুড়িয়ে দেয় এ শঙ্কায়। কয়েক দিন ধরে তার অলস সময় কাটছে। ছয়জনের সংসারের প্রতিদিনের খাবার খরচ জোগাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এখন আর টাকা ধার চেয়েও পান না। অসহায় রশিদ ছুটে যান তার ছোট বোন লুৎফার মানিকগঞ্জের বাসায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন বোনজামাই অসুস্থ। এ অবস্থায় টাকা চাইবেন কী করে? চক্ষুলজ্জা ফেলে বোনের কাছে নিজের অভাবের কথা জানান। অল্প কিছু টাকা নিয়েই গাজীপুরের কালিয়াকৈরে নিজের বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু তার বাসায় ফেরা হয় না। তার আগেই মাঝপথে পেট্রোল বোমার আগুনে ঝলসে যায় তার মুখমণ্ডল, দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ। তিনি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আর পাশে বসে চোখের পানি ফেলছেন স্ত্রী রাশেদা আক্তার। বলছেন, 'না খেয়ে থাকতাম সেই তো ভালো ছিল। এখন আমার সব গেল। এই লোকটার কিছু হয়ে গেলে বাকি জীবন কীভাবে কাটবে?'
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর গাজীপুরের বড়াইতলা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। ওই বাসের যাত্রী ছিলেন রশিদ মোল্লা। বাসটিতে আগুন ধরে যাওয়ার পর জানালা ভেঙে দ্রুত নামার চেষ্টা করেন। তার আগেই রশিদের শরীরে আগুন ধরে যায়। লাফিয়ে পড়ে ভাঙেন পায়ের গোড়ালি। বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল সমকালকে বলেন, 'রশিদের শরীরের ৩৯ ভাগ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি শঙ্কামুক্ত_ এমন কথা এখনই বলা যাচ্ছে না।'
গতকাল বিকেলে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে গিয়ে দেখা যায়, দগ্ধ শরীর নিয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন রশিদ। একটু পর পরই অস্পষ্ট স্বরে বলছেন_ 'আমি বাঁচতে চাই। আমারে বাঁচান...। শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে। একটু ঠাণ্ডা করেন। শরীরে একটু ঠাণ্ডা পানি দেন। আমি আর কষ্ট সইতে পারি না।' ডিউটি নার্স এগিয়ে গিয়ে সান্ত্বনা দেন_ 'বাবা একটু সহ্য করেন। ওষুধ লাগিয়েছি।' কিন্তু নার্সের এসব কথায় ভরসা পান না রশিদ। বলেন_ 'এই এক কথা তো কতবারই বলেছেন। কই আপনার ওষুধে তো কোন কাজ হয় না। আরও ভালো ডাক্তার ডাইকা আনেন...।'
নিজের ব্যান্ডেজ করা দুই হাত দেখিয়ে রশিদ মোল্লা বলেন, গত ২০ বছর ধরে এই দুই হাত দিয়া রিকশার হ্যান্ডেল ধরছি। পাও দিয়া প্যাডেল চাপছি। এই দুইডা হাত আমার পুইড়া গেছে। পায়ের গোড়ালিও ভাইঙা গেছে। গরুর মতো খাটতাম। সকাল থেকে রাইত পর্যন্ত রিকশা চালাইয়া সংসারের খরচ জোগাইতাম। এখন আমার এ সংসার কে দেখব? কে জোগাইব বউ-পোলাপানের খাওনের খরচ?'
রশিদ মোল্লার স্ত্রী রাশেদা আক্তার বলেন, 'নিজের এক টুকরো জমিও নেই। কালিয়াকৈরের চন্দা এলাকার নাজিমুদ্দিন মাস্টারের বাড়ির এক কোণায় বাঁশখড় দিয়া একটা ঘর তুইলা কোনো রকম বাঁইচা আছি। অন্যের জায়গায় থাকলেও স্বামী-পোলাপান নিয়া সুখেই ছিলাম। আমার এই সুখটাও কাইড়া নিল।'
সব স্বপ্ন পুইড়া ছাই হইয়া গেল :রশিদ মোল্লার সঙ্গে একই বাসের যাত্রী ছিলেন দুই কলেজ ছাত্র রাজীব কর্মকার এবং পৃথীরাজ চক্রবর্তী। রাজীব রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। পৃথীরাজ চলতি বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনার্সে ভর্তি হবেন। তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাসা হাজারীবাগ নিলাম্বর সাহা রোডে। আগামী ২৭ ডিসেম্বর অনার্সে ভর্তির শেষ সময়। তাই অবরোধের মধ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। রাতে বোনের বাসায় থেকে সকালে এইচএসসি সার্টিফিকেট নিয়ে আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। বন্ধু একা যেতে ভয় পাচ্ছে_ তাই সঙ্গে রওনা হন রাজীব। তারা দু'জনই এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পৃথীরাজের মা ঝর্ণা চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, 'দুই মেয়েকে কম বয়সে বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়েছি। একমাত্র ছেলেকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলের বাবা চন্দন চক্রবর্তী একটি কসমেটিকসের দোকানের কর্মচারী। অভাবের সংসারে তিন বেলা খাবার খেতে না পারলেও ছেলের পড়াশোনা চালিয়েছি। এখন ছেলের দুই হাত পুড়ে গেছে। ছেলের এই দুই হাতের সঙ্গে তো আমার সব স্বপ্ন পুইড়া গেল। আমি এখন কার কাছে যাব? কার কাছে গেলে এর বিচার পাব?'

আসুন শহীদ মিনারকে একটি মসজিদ অথবা মন্দিরে পরিণত করি! by ফরহাদ মজহার

শহীদ মিনার গড়ে উঠেছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক ও হাতিয়ার হিসাবে। প্রতীক, কারণ রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নিপীড়ন অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের লড়াই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটা বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল; শহীদ মিনার সেই মুহূর্তের প্রতীক। সমাজে যখনই ন্যায়সঙ্গত লড়াইয়ের দাবি ওঠে, আমরা বার বার শহীদ মিনারে গিয়ে দাঁড়াই। ফলে লড়াইয়ের সেই বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্ত সার্বজনীন তাৎপর্য লাভ করেছে।
অন্যদিকে, একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিগঠন ও রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সঙ্গে যে ভাষার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সেটাও শিখেছি। অতএবএই মুহূর্তটিকে শুধু ভাষা আন্দোলনের দিক থেকে বিচার করলে চলবে না। ঔপনিবেশিক ইতিহাসের মধ্যে আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। যেমন, কেন খেটে খাওয়া কৃষক ও শ্রমিকের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রশ্ন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর ভাষা ও সংস্কৃতির দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল? ভাষা আন্দোলনে? কী ঐতিহাসিক কারণ ছিল তার?
ইংরেজ ১৭৫৭ সালে এ দেশ দখল করে নেবার পর ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ অবধি এই দেশের মানুষ—বিশেষত মুসলমান সমাজ ইংরেজি শেখেনি। ততোদিনে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছে। বাংলাভাষী মুসলমান তখন অধিকাংশই কৃষক, জোলা, কারিগর ইত্যাদি। সমাজে নিগৃহীত। যখন তারা শিক্ষার দিকে ঝুঁকল তখন অনেক আশা বুকে বেঁধে পাট বেচে মরিচ বেচে ধান বিক্রি করে তারা তাদের সন্তানদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠাতে শুরু করল। তারা পাকিস্তান চেয়েছিল দেশ ভাগ করবার জন্য নয়, জমিদার মহাজনদের নির্যাতন থেকে রেহাই পাবার জন্য। ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল এমন যে জমিদার ও সুদখোরি মহাজনদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু। জমিদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকসহ নিপীড়িত জনগণের স্বার্থের বিরোধ সাতচল্লিশের দেশভাগের একটি প্রধান কারণ। এই দিকটি মনে না রাখলে আমরা যেমন আমাদের নিজেদের বুঝতে ভুল করব, তেমনি কেন বাংলার কৃষক ও খেটে খাওয়া শ্রেণীগুলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলনে শামিল হোল তার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভাষা আন্দোলনের পেছনে কেন কৃষক শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষ ঐক্যবদ্ধ হোল তার কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ধান বেচে পাট বেচে মরিচ বিক্রি করে যে-ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তুলবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল তাদের বুকে গুলি চালানো হয়েছে। সেই গুলির রক্তের ছিটা ও ক্ষত কৃষকের বুকে গিয়ে লেগেছে, জোলা, কারিগর মেহনতি মানুষের বুকে গিয়ে লেগেছে। পাঁজর ভেদ করে চলে গিয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মত সংখ্যা-গরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের কাছে এই আন্দোলন নিছকই ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার আন্দোলন ছিল না। ঔপনিবেশিক ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে জনগণ, কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ব্যর্থ হবার পর তারা বুঝতে পেরেছিল তাদেরকেও ইংরেজি শিখতে হবে, শিক্ষিত হতে হবে। ভবিষ্যতের আশায় তারা তাদের সন্তানদের স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে শুরু করল। সেই ছাত্রদের যখন খুন করা হোল সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে তখন আগুন জ্বলে উঠল।
শুধু প্রতীক নয়, শহীদ মিনার ছিল একই সঙ্গে রাজনৈতিক হাতিয়ার। সেটা আমরা সহজে বুঝতে পারি যখন কোন রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা ঘটে শহীদ মিনারকে আশ্রয় করে আন্দোলনের দাবিদাওয়া নিজের ন্যায্যতা প্রমাণ করবার চেষ্টা করে। শহীদ মিনার সরগরম হয়ে ওঠে। ঠিক যে শহীদ মিনার শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দাবিদাওয়ার পাটাতন হিসাবেই প্রধানত ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। শ্রমিক, কৃষক খেটে খাওয়া মানুষের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে নি। কিন্তু রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে শহীদ মিনারের এই ভূমিকা ছিল অনন্য। শহীদ মিনারের এই রাজনৈতিক তাৎপর্য ক্ষুণ্ণ হয়েছে যখন এর অধঃপতন ঘটেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাংস্কৃতিক মঞ্চে। এই সাংস্কৃতিকতা আবার অধিকাংশ সময় ছিল দলীয়, বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন প্রদর্শন। পতনের ধারাবাহিকতাই চলছিল এতদিন। ফলে শহীদ মিনারের বিরাজনীতিকরণ ঘটেছে দ্রুত। রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের প্রতীক বা হাতিয়ার হয়ে থাকার অবক্ষয় ঘটেছে মারাত্মকভাবে।
যখন একে তথাকথিত সেক্যুলার মধ্যবিত্ত শ্রেণী মসজিদ বা মন্দিরের বিকল্প হিসাবে ভাবতে ও গণ্য করতে শুরু করেছে তখনএই পতন পচনের রূপ ধরেছে। শহীদ মিনার হয়ে উঠেছে 'পাকপবিত্র' স্থান, তার আবার একটি মূলবেদীও আছে। ‘পবিত্র’, ‘বেদী’ ইত্যাদি ধর্মতাত্ত্বিক চিহ্নে শহীদ মিনারকে ভূষিত করা হয়। দারুণ ইন্টারেস্টিং!
এই পচন কতো গভীর রূপ নিয়েছে সেটা মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের দায়ের করা জনস্বার্থ রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে শহীদ মিনারের ‘মর্যাদা ও পবিত্রতা’ এবং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষায় ২৫ আগস্ট ২০১০ তারিখে বুধবার বিচারপতি মোঃ মমতাজ উদ্দিন আহমদ ও বিচারপতি নাঈমা হায়দারের বেঞ্চের দেয়া রায়ের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে। রায়ে প্রতিষ্ঠিত হোল শহীদ মিনারের তাৎপর্য রাজনৈতিক তো নয়ই এমনকি সাংস্কৃতিকও নয়; শহীদ মিনারকে এখন আমাদের মন্দির বা মসজিদের মত ‘পবিত্র’ গণ্য করতে হবে। এটাও আমাদের জানিয়ে দেওয়া হোল শহীদ মিনারে মন্দিরের মতো একটি ‘মূল বেদী’ (!) আছে। শহীদ মিনারের মূল বেদীতে কোন সভা সমাবেশ করা যাবে না। তবে ‘বেদীর পাদদেশে’ সভা সমাবেশ করা যাবে।
শহীদ মিনারে ‘বেদী’ আছে এবং বেদীর পাদদেশও আছে। বেশ। অথচ বাংলাদেশের কোন্ স্থান 'পাকপবিত্র' আর কোথায় 'বেদী' স্থাপিত হয়েছে বা আগামিতে হবে সেই সিদ্ধান্ত নেবার এখতিয়ার আদালতের নয়। বাংলাদেশের সংবিধান আইন প্রণয়নের দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করে নি। শহীদ মিনারে সভা সমাবেশ করা যাবে কি যাবে না সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার এখতিয়ার আদালতের নাই। এই এখতিয়ার জাতীয় সংসদের। ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’ বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা করা ও শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র অবস্থায় ‘সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ (দেখুন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৩৬ ও ৩৭।)।
রায়ে আদালত নিজের এখতিয়ারের বাইরে আরো নির্দেশ দিয়েছে। যেমন, “বিশ্ববিদ্যালয় ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।” আরো আছে, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের মরণোত্তর পদক ও জীবিতদের জাতীয় পদক দেয়ার নির্দেশ; জীবিত ভাষা সৈনিকদের কেউ সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্য চাইলে তা দেয়ার নির্দেশ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি লাইব্রেরিসহ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ; সেখানে পর্যটকদের জন্য ভাষা আন্দোলনের তথ্য সংক্রান্ত পুস্তিকা রাখার নির্দেশ; ভাষা সৈনিকদের প্রকৃত তালিকা তৈরির জন্য সরকারকে একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ; এমনকি এ বিষয়ে ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে গেজেট প্রকাশ করার নির্দেশও দেয়া হয়। অন্যান্য নির্দেশের মধ্যে আছে ভাষা সৈনিকদের সব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাদের জন্য সাধ্যমতো সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করা, ইত্যাদি।
এই সকল নির্দেশের মধ্যে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, জাতীয় সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ একাকার হয়ে গিয়েছে। এই বিষয়গুলো কেন জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেই দিকও স্পষ্ট নয়। বিচার বিভাগের সীমা কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ আদালতের রায় দেখে আর বোঝার উপায় নাই। জনগণের লড়াই ও সংগ্রামের প্রতীক ও হাতিয়ার শহীদ মিনারের এই দুর্দশা দেখে সত্যই করুণা হয়।
রায়ে শহীদ মিনার এলাকায় ভবঘুরেরা যেন ঘোরাফেরা করতে না পারে বা ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ চালাতে না পারে সে জন্য তিন জন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ দেওয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষের কী কার্য সামাজিক আর কোনটাই বা 'অসামাজিক' তার নৈতিক মানদণ্ড ঠিক করে দেবার দায়িত্ব আদালতের নয়। ‘অসামাজিকতা’-র আইনী সংজ্ঞা কী? নৈতিক পরিমণ্ডলের সীমা আইন করে নির্ধারণ করা যায় না। শহীদ মিনারের নির্বাহী ব্যবস্থাপনার সমস্যা রায় দিয়ে সমাধানের চেষ্টাও বিস্ময়কর বটে। শহীদ মিনারের দারোয়ানের সমস্যাকেই আদালত আইন করে নিষ্পত্তি করতে চাইছেন। এতে আদালত কোথায় নেমে আসে সেটা আমরা আদালতকে বিবেচনা করে দেখতে অনুরোধ করব।
ভবঘুরেরা বাংলাদেশের নাগরিক, কিন্তু তাদের হাত থেকে শহীদ মিনার রক্ষা করতে হবে, এই যদি আদালতের রায় হয় তাহলে আদালত নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করবে কীভাবে? ঠিক যে শহীদ মিনার এমনভাবে ব্যবহার করা দরকার যাতে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য ক্ষুণ্ণ না হয়। যদি রায়ের বাস্তবোচিত মানে করি, তার মানে দাঁড়ায় বাংলাদেশের অবহেলিত, নির্যাতিত সাধারণ যেসব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ—যেসব ঘরহারা গরিব মানুষ মাঝেমধ্যে শহীদ মিনারে এসে বিশ্রাম নিত, যাদের মাথার ওপর ছাদ নাই, কিচ্ছু নাই, তাদের জন্য শহীদ মিনার নিষিদ্ধ হোল। এই রায় গণমানুষের পক্ষে গেল না। দুর্ভাগ্য আমাদের।
আসুন রায়ের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আমরা শহীদ মিনারকে একটি মসজিদ অথবা মন্দিরে পরিণত করি। বাংলাদেশে লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস চুলায় যাক। কী এসে যায় শহীদ মিনার আমাদের বেড়ে ওঠার কোন প্রতীক বা হাতিয়ার কিনা। এই যুগ মসজিদের যুগ, এই যুগ মন্দিরের যুগ। আসুন আমরা আমাদের গোপনে লুকিয়ে রাখা ধর্মান্ধ অনুভূতিগুলোকে শহীদ মিনারে মনের মাধুরি মিশিয়ে সাজাই। তারপর প্রশংসা করি আমাদের সেক্যুলারিজমের। আসুন পাকপবিত্র স্থানগুলোকে আরো পাকপবিত্র করে তুলি, বেদীগুলোকে আরো পূজার ফুল দিয়ে সাজাই!!!
এই তো চাই!