Showing posts with label নারী অধিকার. Show all posts
Showing posts with label নারী অধিকার. Show all posts

Wednesday, October 2, 2024

আরজিকরের প্রতিবাদ মিছিলে ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’ স্লোগান! রিপোর্ট তলব by সেবন্তী ভট্টচার্য্য

আরজিকরে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রতিবাদ মিছিলে নেমেছিলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। যাদবপুরে সেই প্রতিবাদ মিছিল থেকে স্লোগান উঠল ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’। দায়ের হয়েছে এফআইআর। জানা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তরফে ইতিমধ্যেই ঘটনাটির প্রাথমিক রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে দিল্লিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, মিছিলের উদ্যোক্তাদের পরিচয়, স্লোগান দেওয়া ব্যক্তিরা কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না বিক্ষিপ্ত ভাবে ওই স্লোগান— এ রকম কয়েকটি বিষয় জানতে চাওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে যাবতীয় রিপোর্ট সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে দিল্লিতে। তবে এই বিষয়ে আরও তদন্ত করে দেখে ফের কিছু রিপোর্ট দিল্লিতে পাঠানো হতে পারে বলে সূত্রের খবর।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার শুনানির আগে রবিবার সন্ধেয় পাড়ায় পাড়ায় মশাল মিছিলের ডাক দিয়েছিল জুনিয়র ডাক্তাররা। কলকাতার মোট সাত জায়গায় হয় এই মিছিল। যেগুলি হল, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, এনআরএস, ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, সাগরদত্ত, আর জি কর এবং যাদবপুরের কেপিসি। এদিন যাদবপুরের এই মিছিলের ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে যেখানে দেখা গিয়েছে, কেউ মোমবাতি তো কেউ হাতে মশাল নিয়ে মিছিল করছেন। সামনের সারিতে যারা রয়েছেন তাঁদের হাতে রয়েছে ফ্লেক্স। যেখানে লেখা, ‘তিলোত্তমা ভেবো না, আগুন নিভতে দেবো না’। নীচে ডানদিকে ইংরেজিতে লেখা- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।

অভিযোগ, এই মিছিল থেকেই স্লোগান ওঠে ‘কলকাতা মাঙ্গে আজাদি’, ‘আর জি কর মাঙ্গে আজাদি’, ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, এই স্লোগানের নেপথ্যে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১৫-২০ জনকে চিহ্নিত করে ছবি সমেত বিস্তারিত তথ্য শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠিয়ে দিয়েছেন গোয়েন্দারা। তালিকায় রয়েছেন যাদবপুরের কয়েক জন প্রাক্তনীও, যাঁদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে পশ্চিমবঙ্গে দেশবিরোধী আন্দোলনে সরব হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মীরে তৃতীয় দফার ভোটগ্রহণের সময়েই কলকাতায় এমন স্লোগান ওঠায় কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্বেগ বেড়েছে। তদন্তকারীরা যাচাই করছেন, এই স্লোগানের পেছনে কোনও কাশ্মীরি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কি না। কারণ ৩৭০ এবং ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীরে প্রথমবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আর এই সময় পশ্চিমবঙ্গে এমন রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান কেন্দ্রকে ভাবিয়ে তুলেছে।

mzamin

Tuesday, September 17, 2024

বৃটেনের হোটেলে নারী আশ্রয়প্রার্থীদের যৌন হয়রানি বন্ধ করার আহ্বান ডব্লিউআরডব্লিউ'র by আরিফ মাহফুজ

বৃটেনে এসাইলাম প্রার্থীদের জন্য আবাসন ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরুষ আশ্রয়প্রার্থীদের যেমন হোটেলে বাসস্থান দিচ্ছে তেমনি নারী আশ্রয়প্রার্থীকেও হোটেলে রাখছে হোম অফিস কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা নানা ক্যাটাগরিতে এসাইলাম দাবি করছেন বৃটেনে। সম্প্রতি দেশটিতে এসাইলাম আবেদনকারীদের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে যাওয়াতে আবাসন ঘাটতি মেটাতে হোটেলে রাখার কারণে নারী আশ্রয়প্রার্থীরা অমানবিক আচরণ ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, এমনটি দাবি করেছে বৃটেন-ভিত্তিক সংগঠন উইমেন ফর রিফিউজি উইমেন (ডব্লিউআরডব্লিউ)।

দাতব্য সংস্থাটির একটি দল সাত নারী আশ্রয়প্রার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা। ''জবরদস্তি এবং নিয়ন্ত্রণ: হোটেলগুলোতে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের প্রতি আচরণ'' শিরোনামের প্রতিবেদনে সংগঠনটি বলছে, হোটেলগুলোতে নারী আশ্রয়প্রার্থীরা হোটেল কর্মীদের মাধ্যমে যৌন হয়রানি ও বিভিন্ন অমানবিক আচরণের শিকার হয়ে থাকেন। দাতব্য সংস্থাটির একটি দল সাত নারী আশ্রয়প্রার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম, জবরদস্তি এবং নিয়ন্ত্রণ: হোটেলগুলোতে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের প্রতি আচরণ। নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে অনেক আশ্রয়প্রার্থী নিজ দেশ থেকে পালিয়ে এসেছেন। বৃটেনে তাদের যে হোটেলে রাখা হয়েছে সেখানেও তাদের সঙ্গে জবরদস্তিমূলক আচরণ ও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা দুঃখজনক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হোটেলগুলোর জীবনযাত্রার চাপ নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ‘অত্যন্ত ক্ষতিকর’ প্রভাব ফেলেছে। এ নিয়ে একটি জরিপ চালিয়েছে তারা। জরিপে অংশ নেওয়াদের ৯১ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগেন এবং ৭৫ শতাংশ হতাশাগ্রস্ত। সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থী নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য লেবার পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউআরডব্লিউ। বৃটিশ এই সংগঠন বলেছে, ‘‘হোটেলগুলোতে নারীদের প্রতি আচরণকে পাখির খাঁচার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। খাঁচার পাখি যেমন যেখানে ইচ্ছা সেখানে উড়তে পারে না তেমনভাবে এখানেও নারীরা নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন করতে পারেন না।’’

এসব বিষয় নারীদের আত্মসম্মান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। উইমেন ফর রিফিউজি উইমেন (ডব্লিউআরডব্লিউ) নেটওয়ার্কের সাতজন সদস্য এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারা ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বসবাসরত নারীদের অভিজ্ঞতার ওপর একটি অনলাইন সমীক্ষা চালিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহ করেন।

মোট ৬২ জন নারী শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী জরিপে অংশগ্রহণ করেন। এর বাইরে তারা জুলাই মাসে ১০ জনের সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ডব্লিউআরডব্লিউ’র প্রতিবেদন সম্পর্কে বৃটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, এগুলো গুরুতর অভিযোগ এবং আমরা জরুরি ভিত্তিতে এ ব্যাপারে তদন্ত করবো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশ্রয় ব্যবস্থায় কর্মীদের মাধ্যমে অন্যায় বা অপরাধের অভিযোগকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেয় ইনফোমাইগ্রেন্টস।

প্রতিবেদনে যেসব বিষয়গুলো উঠে এসেছে : নারীদের ওপর নিয়মিত নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ। হোটেল কর্মীদের অবমাননাকর আচরণ। যেমন: যৌন হয়রানি, কক্ষে অনুপ্রবেশ এবং কেন্দ্র থেকে বের হতে বাধা প্রদান, শাস্তিমূলক পদক্ষেপের হুমকি, সহায়তা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা।

‘ডব্লিউআরডব্লিউ’ সংগঠনটি বৃটেনের সরকারকে এই পদক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
mzamin

Monday, February 1, 2010

একটি ভুল এবং জন্মের আগেই নারীর মৃত্যু প্রসঙ্গ by ফরিদা আখতার

কলকাতা থেকে প্রকাশিত ২৫ জানুয়ারি দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রথম পাতায় আট কলামজুড়ে শিরোনাম, ‘হোয়ার এ পাক পিকচার ক্যান প্রভোক শেইম...’ (যেখানে একটি ছবি লজ্জাকে উস্কে দেয়) আমার দৃষ্টি কেড়েছে। শিরোনামটি উপেক্ষা করার জো নেই। খবরের সঙ্গে একটি সরকারি বিজ্ঞাপনের ছবিও রয়েছে। সেই বিজ্ঞাপনের আংশিক ছবিতে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান তানভীর মাহমুদ আহমেদ ও ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের ছবি দেখা যাচ্ছে। ঘটনা কী, জানার জন্য দ্রুত পড়ে ফেললাম।
২৪ জানুয়ারি ছিল জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। এ উপলক্ষে ভারতে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পত্র-পত্রিকায় পুরো পাতাজুড়ে একটি বিজ্ঞাপন ছেপেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা-নেত্রী, সংগীতজ্ঞ, ক্রীড়াবিদের ছবি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আপনি কোথায় থাকতেন, যদি আপনার মাকে জন্মাতে না দেওয়া হতো?’ এ স্লোগানের ওপরের অংশে ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, সোনিয়া গান্ধী এবং নারী ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী কৃষ্ণা তিরাতের ছবি। নিচে ছিল, ক্রিকেট সুপারস্টার বিরেন্দর শেবাগ ও কপিল দেব, সরোদসম্রাট ওস্তাদ আমজাদ আলী খান এবং পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান তানভীর মাহমুদ আহমেদের ছবি। তানভীর মাহমুদ আহমেদ ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রধান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। নাশতার টেবিলে যাঁরা পত্রিকা পড়েন, তাঁদের জন্য একটা বোমা ফাটার মতো ঘটনাই ঘটে গেছে সাত-সকালে। হইচই পড়ে গেল চারদিকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ঘটনার তদন্ত ও মন্ত্রীকে ক্ষমা প্রার্থনা করার কথা বলা হলো। কন্যাশিশুকে বাঁচানোর জন্য যে বক্তব্য, তা ছাপিয়ে উঠে এল রাজনৈতিক বক্তব্য।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটেছে ইন্টারনেট থেকে গুগল ইমেজের ছবি ব্যবহার করতে গিয়ে। ভারত সরকারের ডিরেক্টরেট অব অ্যাডভার্টাইজিং অ্যান্ড ভিজুয়াল পাবলিসিটি (ডিএভিপি) ছবি সহকারে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য গুগল থেকে ছবি সংগ্রহ করতে গিয়েই এই গোলমাল বাধিয়েছে। তারা অবশ্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি করতে দিয়েছিল। তারা চেয়েছিল কন্যাশিশু দিবসে ভ্রূণ হত্যার (ফিমেল ফেটিসাইড) যে প্রবণতা ভারতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, এই দিনে বিভিন্ন পেশার মানুষের ছবি দিয়ে এই বক্তব্য তুলে ধরা যে এই কন্যাশিশুরাই তো এত গুরুত্বপূর্ণ মানুষের মা, ভবিষ্যতেও তারা এমন সন্তানই জন্ম দেবে। বিশেষ করে ক্রিকেট খেলোয়াড়, সংগীতশিল্পী, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তার ছবি বিজ্ঞাপনে থাকলে খুব ভালো হবে বলেই মনে করেছিল এই অধিদপ্তর। কিন্তু গুগল থেকে ছবি ডাউনলোড করার পর তারা লক্ষ্য করে দেখেনি যে বিমানবাহিনীর পোশাক পরা ব্যক্তি ভারতের নন, পাকিস্তানের। সর্বনাশ! ফলে সরকারি বিজ্ঞাপনে বিদেশি নাগরিকের (শুধু বিদেশি নয়, ‘শত্রু দেশের’ সামরিক বাহিনীর) ছবি প্রকাশিত হয়েছে। দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এ খবরের উপশিরোনাম ছিল অ্যাপোলজি আফটার অ্যাড শোয়িং ‘এনিমি’ (বিজ্ঞাপনে ‘শত্রু’কে দেখানোর জন্যক্ষমাপ্রার্থনা)। কাজেই ঘটনাটি খুব সহজে ফেলে দেওয়ার নয়। যদিও মন্ত্রী কৃষ্ণা তিরাত তাঁর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু তাঁর মতে যে বক্তব্য তিনি এই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নারীভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে দিতে চেয়েছেন, তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাত্ জন্মের আগে কন্যাশিশু হত্যা বা ভ্রূণ হত্যা রোধ করার জন্য সব ধরনের পেশার মানুষের জন্ম দেয় যে নারী, তাকে জন্মাতে দেওয়া হচ্ছে না, তাই এই বক্তব্য। যাক গে। গুগল ইমেজ নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের জন্য এ ঘটনা একটি সাবধান বাণী হয়ে থাকবে আশা করি। ছবি হলেই হবে না, ছবি চিনে তবে ছাপতে হবে।
রাজনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে বিদেশি নাগরিকের ছবি দিয়ে সরকারি বিজ্ঞাপন করা অবশ্যই সঠিক কাজ নয়। তবে যাঁকে নিয়ে এত হইচই তিনি এতে বিব্রত নন। বিবিসি নিউজ ওয়েবসাইটে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান তানভীর মাহমুদ আহমেদ বিষয়টি লক্ষ করেননি। কারণ, তিনি গলফ ম্যাচ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর মতে, এটা একটা ইনোসেন্ট (নিষ্পাপ) ভুল। পাঠকেরা এ বিষয় নিয়ে আরও জানতে চাইলে গুগলেই পাওয়া যাবে।
জাতিসংঘের হিসাব মতে, ভারতে প্রতিদিন অবৈধভাবে দুই হাজার কন্যাশিশুর ভ্রূণ গর্ভপাত ঘটছে। ফলে ভারতে সার্বিকভাবে নারীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ২০০১ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হাজার পুরুষের বিপরীতে ৯২৭ জন নারী। অথচ ১৯৬১ সালে তা ছিল, প্রতি হাজার পুরুষের তুলনায় ৯৭৬ জন নারী। প্রায় তিন থেকে চার কোটি কন্যাশিশু ভারতের জনসংখ্যা থেকে হারিয়ে গেছে। পাঞ্জাব, উড়িষ্যা, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এমনকি মুম্বাই এবং রাজধানী দিল্লির অবস্থা আরও খারাপ। সাম্প্রতিক হিসাবে দেখা গেছে, দক্ষিণ দিল্লিতে নারী-পুরুষ অনুপাত হচ্ছে প্রতি হাজারে ৭৬২ জন নারী এবং মুম্বাইতে প্রতি হাজারে ৭২৮ জন নারী। ধনী-গরিব সব ধরনের পরিবারেই কন্যাশিশুদের জন্মের আগেই হত্যা করা হচ্ছে।
এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে বাংলাদেশেও এ ঘটনা ঘটছে না। মোট জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণ জন্মের আগেই নারীর মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে চিকিত্সা বিজ্ঞানের তথাকথিত ‘উন্নত’ প্রযুক্তি বা সেক্স সিলেকশন টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে, যার মাধ্যমে গর্ভাবস্থায়সন্তানের লিঙ্গ চিহ্নিত করা যায়। বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে বন্ধ্যত্ব দূরীকরণের চিকিত্সা এবং গর্ভধারণের পর ভ্রূণটি ছেলে না মেয়ে জানার জন্য প্রিইমপ্লেনটেশন জেনেটিক ডায়াগনোসিস (পিজিডি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় শোনা যায়, আলট্রা সাউন্ড পরীক্ষা দিয়ে সন্তান ছেলে না মেয়ে জানা যাচ্ছে এবং প্রয়োজনে গর্ভপাতও ঘটানো হচ্ছে। গর্ভকালীন সময় মধ্যবিত্ত নারীরা এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছেন, চিকিত্সকেরাও তাঁদের সহায়তা করছেন। কিন্তু সরকারের এ বিষয়ে কোনো নীতি আছে কি-না, তা কারোই জানা নেই। পরিবারগুলো পুত্রসন্তান চায়। পরিবারে সব ছেলে থাকলে তখন মেয়ে হলে আদর লাগে, কিন্তু সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইনের কারণে মেয়েদের ভ্রূণেই মৃত্যু ঘটানো হচ্ছে। এটা একটা নীরব হত্যাকাণ্ড, যা ঘটে চলেছে আমাদের সবারই অজান্তে। অন্ধকার ও বর্বর যুগে যা ছিল, তা এখন আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে ঘটছে বলেই কি আমরা সবাই মেনে নিচ্ছি?
চীন দেশে এক সন্তান জনসংখ্যা নীতিগ্রহণের কারণে একটি সন্তান কন্যা হলে তাকে হত্যা করার ঘটনা জাতীয়পর্যায়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে গর্ভেই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে আর প্রযুক্তি যেখানে নেই, সেখানে মেয়েটি জন্মে পৃথিবীর আলো দেখতে না দেখতেই তাকে যে কোনোভাবে মেরে ফেলা হচ্ছে। কেউ কেউ এত নিষ্ঠুর হতে চাননি, তাই কন্যাকে এতিমখানায় পালতে দিয়ে কিংবা জন্মনিবন্ধন না করিয়ে আর একটি ছেলেসন্তানের চেষ্টা করার সুযোগ নিয়েছে। এটাও তো এক ধরনের মৃত্যু, কারণ এই মেয়েটি মা-বাবা থাকা সত্ত্বেও স্বীকৃতি পেল না। সে এতিম হলো কিংবা জন্মেছে এমন হিসাবের বাইরে চলে গেল। চীনে প্রতি ১১৬ জন ছেলের বিপরীতে মেয়ের সংখ্যা ১০০। কিন্তু এখন হয়েছে অন্য বিপদ। কন্যাশিশুকে নিয়ে এই ভয়ানক সমস্যা চিহ্নিত আবারও সেই পুরুষদেরই প্রয়োজনে। যেমন ভারতের কয়েকটি রাজ্যে পুরুষেরা বিবাহযোগ্য হয়ে উঠেছে কিন্তু তাদের বউ হবে এমন বয়সী মেয়ে সেখানে নেই। চীনেও একই সমস্যা। বউ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অন্য রাজ্য কিংবা দেশ থেকে পাচার করে মেয়েদের নিয়ে আসা হচ্ছে ছেলেদের বিয়ে করানোর জন্য এবং বংশ বৃদ্ধির জন্য।
আবারও ভারতের সেই বিজ্ঞাপনের কথায় ফিরে যাই। আসলে যদিও বলা হচ্ছে, ‘আপনি কেমন করে জন্মাতেন যদি আপনার মা না জন্মাতো’—সেটা বলা হচ্ছে, বিখ্যাত পুরুষদের জন্ম নিশ্চিত করার জন্য। এই নারীদের বেঁচে থাকা বা জন্মানোর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কি? নারীকে জন্মাতে হবে পুরুষ জন্ম দেওয়ার জন্য, আর কিছু নয়? বাহ্। এটাই কি কন্যাশিশু দিবসের মূল কথা?
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী।

Saturday, December 26, 2009

নারী উন্নয়ন নীতির ভবিষ্যৎ কী by ফিরোজ জামান চৌধুরী

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষিত হয়েছিল এক যুগ আগে, ১৯৯৭ সালে। এর পর অনেক চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে গেছে। নারী উন্নয়ন নীতির প্রশ্নে অনেক দেনদরবার হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে লাভ-লোকসানের নানা হিসাব-নিকাশ হয়েছে। কিন্তু সম-অধিকারের প্রশ্নে নারীর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি। সবচেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, ১২ বছরেও নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সরকারগুলো। আমাদের নারী উন্নয়ন নীতির অবস্থা হয়েছে সেই প্রবাদের মতো, ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’।
তবে নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে। রোকেয়া পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত নারী উন্নয়ন নীতিমালা চালু ও বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা সরকারের আছে।’ (প্রথম আলো, ১১ ডিসেম্বর ২০০৯)
১৯৯৭ সালে ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে তা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে আওয়ামী লীগের নারী উন্নয়ন নীতি ছিল অনেকটাই উদার ও নারীবান্ধব। কিন্তু যেকোনো নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের চেয়ে তার বাস্তব প্র্রয়োগই বড় কথা। ১৯৯৭ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রবর্তনের যোগ্য সম্মান পাওয়ার দাবিদার আওয়ামী লীগ। কিন্তু তারাই আবার একে হিমাগারে ফেলে রাখতেও কার্পণ্য করেনি। নানা অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করে পার করেছে তাদের শাসনামলের বাকি চার বছর। আর বিএনপি-জামায়াত সরকার ‘নারী উন্নয়ন নীতি’তে চাতুর্যপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের রক্ষণশীল অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছে। তারা গোপনে কাটাছেঁড়া করে ২০০৫ সালে ‘নারী উন্নয়ন নীতি ২০০৪’ সালের নামে যা প্রকাশ করে, তাকে আর নারী উন্নয়ন নীতি বলার জো নেই। বিএনপি-জামায়াত সরকারের ওই সংশোধিত নীতি কোনো মহলই সমর্থন করেনি। প্রগতিশীল নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একটা সুযোগ এসেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৪ সালের সংশোধনীগুলো বাতিল করে নারী উন্নয়ন নীতি-২০০৮ ঘোষণা করে। কিন্তু সময়স্বল্পতা আর সুযোগসন্ধানী একশ্রেণীর মৌলবাদীর আস্ফাালনের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ নীতি ছিল বহুলাংশে ১৯৯৭-এর নারী নীতির আলোকে প্রণীত। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতিতে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতি এবং বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতির মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং যেকোনো একটা বেছে নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা দরকার। তবে সর্বশেষ, অর্থাত্ ২০০৮ সালের নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে কাজে হাত দেওয়াই হবে বেশি যুক্তিযুক্ত।
২.
বেইজিং কর্মপরিকল্পনা (পিএফএ), আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও বাংলাদেশের সংবিধানের মূল ভিত্তিকে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ‘নারী উন্নয়ন নীতি’তে রাজনীতির মূল ধারায় নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি, নারীর সম-অধিকার, সম্পদে নারীর উত্তরাধিকার প্রভৃতি বিষয় অনেক ইতিবাচক ও স্পষ্ট ছিল। ২০০৪ সালে সংশোধিত (২০০৫-এ ঘোষিত) ‘নারী উন্নয়ন নীতি’র ৭.১ ধারায় বর্ণিত ‘অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা’ বাক্যটি সংশোধন করে ‘সমান অধিকার’ বাদ দিয়ে ‘সংবিধানসম্মত অধিকার’ শব্দ যোগ করা হয়েছে। সংবিধানসম্মত অধিকার শব্দযুগল নিয়ে আপত্তির কিছু না থাকলেও এর মাধ্যমে ‘সমান অধিকার’ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। একইভাবে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় ‘সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেওয়া’ শীর্ষক বাক্যে ‘সম্পদ’ ও ‘অংশীদারিত্ব’ শব্দ দুটো বাদ দেওয়া হয়েছে। ৭.২ ধারায় ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন’ অংশের সংশোধনীতে ‘উত্তরাধিকার’, ‘সম্পদ’ ও ‘ভূমির ওপর অধিকার’ শব্দগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ‘নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক ধারা ৯-এ উল্লিখিত ‘বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন, বিচার বিভাগের উচ্চপদে নারী নিয়োগ প্রদান করা’ অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। উপরিউক্ত সংশোধনীগুলো পর্যবেক্ষণ করলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া খুব কঠিন নয়, বিএনপি ও তার মিত্র রাজনৈতিক শক্তির হাতে নারী উন্নয়ন নীতির বাস্তবায়ন হবে না। ১৯৯৭-এর নারী উন্নয়ন নীতির মৌলিক ভিত্তিগুলোকে পরিবর্তন করে বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকার স্পষ্টতই নারী অধিকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
নারী উন্নয়ন নীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে, ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক ধারা ৮। ধারা ৮-এ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আগের বার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান প্রণয়নের নামে শুধুই কালক্ষেপণ করেছে। তাদের যুক্তি ছিল, সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, বিরোধী দলের সমর্থন ছাড়া এ বিল পাস করা সম্ভব নয়। ফলে সংসদীয় কমিটির আঁতুড়ঘরেই বিলটির মৃত্যু হয়েছে। আগের আওয়ামী লীগ সরকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোয় এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান করেছিল। স্থানীয় সরকারে নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচনের বিধান রাখা সম্ভব হলে জাতীয় সংসদের জন্য একই বিধান রাখতে বাধা কোথায়? এবার আমাদের সামনে ভিন্ন এক রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। জাতীয় সংসদে এখন আওয়ামী লীগের একারই রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন। সুতরাং এবার আর পুরোনো অজুহাত খাড়া করার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারের ১২.২ ধারায় উল্লেখ করেছে, ‘জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে।’ এ সংসদেই সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। সমাজের মূলধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করতে হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর সরাসরি নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
২০০৮ সালের নারী উন্নয়ন নীতিতে মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাসের বদলে পাঁচ মাস করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখনো কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। চাকরিজীবী নারীর জন্য এ ছুটি খুবই প্রয়োজনীয়। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের কালবিলম্ব করা ঠিক হবে না।
নারীর ক্ষমতায়নের স্বার্থে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন এবং অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন (ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড) করে তা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই জরুরি। আশা করা যায়, সরকার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে তা বাস্তবায়ন করবে।
বর্তমানে দাপ্তরিক সব কাজে সন্তানের পরিচয়ে বাবার সঙ্গে মায়ের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে—নারী অধিকারের প্রশ্নে ১৯৯৮ সালে গৃহীত তত্কালীন শেখ হাসিনার সরকারের এ পদক্ষেপটি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। এরই মধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এবারের সরকার নারী অধিকার বাস্তবায়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংসদ উপনেতা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর নিয়োগ নারীর ক্ষমতায়নের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেশ-বিদেশে আলোচিত হচ্ছে। তাই এ সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক।
সম্প্রতি মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শিরিন শারমীন চৌধুরীও ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার খুব শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করবে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন পরিষদের আগামী সভাতেই নারী উন্নয়ন নীতিসংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটবে। (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ নভেম্বর ২০০৯)। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ধারার বাইরে রেখে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। জাতীয় সংসদেও নারী উন্নয়ন নীতির বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। আশা করা যায়, মহাজোট সরকার নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন করে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। তবে শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আইন করে নারী উন্নয়ন নীতির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জীবনের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ ও অধিকারের সুযোগ সরকারকেই করে দিতে হবে।
ফিরোজ জামান চৌধুরী: সাংবাদিক
firoz.choudhury@yahoo.com

Tuesday, November 24, 2009

আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে -জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি

গত ১২ বছরেও নারী উন্নয়ন নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঘোষণা আর পুনর্ঘোষণাতেই আটকে আছে এর ভবিষ্যত্। বর্তমান মহাজোট সরকারের অঙ্গীকারের মধ্যে নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা রয়েছে। কার্যত এর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় কথা। নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া একটি সমাজ সমৃদ্ধ ও মানবিক হতে পারে না। আর এ কাজটি রাষ্ট্রীয় উত্সাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব নয়।
১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতিটি বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এ নীতিটি প্রণয়ন করা হয় বেইজিং সম্মেলন এবং জাতিসংঘ-ঘোষিত নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদের (সিডও) আলোকে। এই নীতি প্রণয়নের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন নারী অধিকার ও নারী আন্দোলনের কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে এ নীতির বাস্তবায়ন সম্পন্ন করতে পারেনি। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আরোহণের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। তারা কোনো রকম আলাপ-আলোচনা ছাড়াই নারী উন্নয়ন নীতিটি গোপনে সংশোধন করে ২০০৪ সালের মে মাসে প্রকাশ করে, যেখানে নারীর অধিকারের মৌলিক প্রশ্নগুলোই এড়িয়ে যাওয়া হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৪-এর পশ্চাত্পদ নারীনীতিটি বাতিল করে ‘নারী উন্নয়ন নীতি, ২০০৮’ ঘোষণা করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ওই নীতিটিও আর বাস্তবায়িত হয়নি।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ইতিমধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সংসদ উপনেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর নিয়োগ এ সরকারের নারীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। সরকার সম্প্রতি বাবার সমান্তরালে মায়ের একক অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করেছে। ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার ঘোষণার মাধ্যমেই সব দাপ্তরিক কাজে বাবার পাশাপাশি মায়ের নামের প্রচলন হয়েছে, যার সুফল আমরা এখন পাচ্ছি। নারী বিষয়ে শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, এ সরকারের পক্ষেই নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সরকার বলছে, ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতি পুনর্বহাল করবে। সরকারের সদিচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমরা বলতে চাই, আবার ১২ বছর পেছনে যাওয়ার দরকার কী? ২০০৮ সালের নীতি বাস্তবায়ন করতে অসুবিধা কোথায়? কারণ, ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতি ২০০৮-এর মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। শুধু কাজের আওতা না বাড়িয়ে নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের মনোযোগী হওয়া উচিত।
এ বছর সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরকার অঙ্গীকার করেছে, সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের জন্য আইন প্রণয়ন করবে। আশা করা যায়, সরকার তার অবস্থান থেকে পিছু হটবে না।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শিরিন শারমীন চৌধুরী বলেছেন, সরকার শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করবে। আমরা আশা করব, সরকার শুধু ঘোষণার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ রাখবে না, সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করে নারী উন্নয়ন নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।

Thursday, November 12, 2009

নারী আসনের সীমানা

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের ৪৫ নারী সাংসদের সংসদের আসা-যাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজকর্ম নেই। সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও এলাকার জন্য কিংবা জনগণের জন্য কিছু করতে পারছেন না। এক অর্থে তাঁরা সংসদীয় উদ্বাস্তু। একমাত্র কাজ হলো সংসদে এসে কোরাম পূর্ণ করা। এটিই যেন সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদদের একমাত্র রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংরক্ষিত মহিলা সাংসদেরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এ জন্য সারা দেশের নির্বাচনী এলাকাকে ৪৫ বা ৫০টি ভাগে ভাগ করে তাঁদের এলাকা নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু দীর্ঘদিন আটকে আছে সংরক্ষিত আসনের সীমানা নির্ধারণ বিষয়টি। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংসদ থেকেই নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বহাল ছিল। ১৯৭২ সালে সংবিধানে ১০ বছরের এ বিধান রাখা ছিল। পরবর্তী সময়ে নানা পরিবর্তনের ফলে এখন সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫টিতে। সংরক্ষিত নারী আসনকে মর্যাদাপূর্ণ করতে ভবিষ্যত্ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার ও তাঁদের জন্য সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আসকার ইবনে সাঈদ
ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ।

Friday, September 4, 2009

নারীও বাংলাদেশ সালমা খান সিডওর ২৫ বছর ও নারীর মানবাধিকার

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর ৩ সেপ্টেম্বর সিডও দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ কর্তৃক পুরুষের সমান পর্যায়ে নারীর মানবাধিকারের আদর্শগত ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক সিডও সনদ বা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসন সনদ পরিগৃহীত হয়, যা বর্তমানে বিশ্বের ১৮৭টি রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ ডিসেম্বর কিছু ধারা সংরক্ষণ সাপেক্ষে সিডও সনদ অনুমোদন করে। সিডও সনদ পরিগৃহীত হওয়ার ২৭ বছর পর এবং বাংলাদেশের সিডও সনদে অনুমোদন দান করার প্রায় ২৫ বছর পর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নারীর মানবাধিকার বাস্তবায়ন ও অগ্রগমনে সরকারের ভূমিকা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সিডওর ২৫ বছরে বাংলাদেশের নারীর প্রাপ্যতার ঝুলি কতটুকু ভরেছে, ২৫ বছরের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় পারিবারিক, সামাজিক, সম্প্রদায়ভুক্ত ও গণজীবনে প্রকৃতপক্ষে নারীর প্রতি বৈষম্যের নিরসন হয়েছে কতখানি? বাংলাদেশের সংবিধান ২৮(১) অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিধানাবলির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব আইনকে বাতিল গণ্য করে [২৬ (১) অনুচ্ছেদ]। অন্যদিকে সিডও একটি মানবাধিকার সনদ, যা মূলত বৈষম্যহীনতা ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নারীর সব ধরনের মানবাধিকার ভোগের নৈতিক দর্শনের ওপর নির্ভরশীল এবং অনুমোদনকারী রাষ্ট্রের পক্ষে একটি আইনসম্মত আন্তর্জাতিক চুক্তি বলে বিবেচিত। তথাপি আমরা দেখি সংবিধান ও সিডও সনদের আলোকে নারীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো, যথা উত্তরাধিকার, বিবাহ এবং সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনের কোনো উদ্যোগই এ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের রয়েছে সুদীর্ঘ নারী আন্দোলনের ইতিহাস। উপরন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী কাল থেকে এনজিও এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের মধ্যে নারী সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। সার্বিক মূল্যায়নে বলা যায়, বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক নারী উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি এনজিওরা নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। নারী আন্দোলনও সোচ্চার থেকে সরকারের প্রতি চাপ অব্যাহত রেখেছে নারীর প্রতি বিরাজমান সব বৈষম্য নিরসন করতে। এ ক্ষেত্রে যা লক্ষণীয় তা হলো, আশির দশক পর্যন্ত নারীর ক্ষমতায়নের মূল কৌশল হিসেবে সামাজিক উন্নয়ন অর্থাত্ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমতার ভিত্তিতে নারীর মানবাধিকার ভোগে যে বিধিনিষেধ বা সীমাবদ্ধতা আরোপিত হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। এই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলেও মানবাধিকার ভোগে নারীর অগ্রগতি হয়েছে ন্যূনতম।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা রয়ে গেছে অদৃশ্য, অগোচরিত এবং অনালোচিত। বৈশ্বিক পর্যায়ে নারী আন্দোলন নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনকে মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে গণ্য করে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রথম ১৯৯২ সালে সিডও কমিটি কর্তৃক গৃহীত নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত ১৯ নম্বর সাধারণ সুপারিশের (জেনারেল রিকমেন্ডেশন) পরিপ্রেক্ষিতে। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে নারীর সমতার অধিকারকে মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং নারীর প্রতি সহিংসতাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন রূপে চিহ্নিত করা হয়। পরে ১৯৯৫ সালের বেইজিং সম্মেলনে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয় এবং নারীর প্রতি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে সর্বাত্মকভাবে নিরসনের লক্ষ্যে বেইজিং কর্মপরিকল্পনাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উন্নয়ন নীতিতে সম্পৃক্ততার পূর্বশর্ত হিসেবে সিডও সনদ বাস্তবায়নের গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়। কারণ, অনুমোদন চুক্তির শর্ত হিসেবে এই সনদ বাস্তবায়নের আইনগত দায়িত্ব বর্তায় শরিক রাষ্ট্রের ওপর, যা বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় প্রযোজ্য নয়। কিন্তু সিডও সনদ অনুমোদনের দীর্ঘ ২৫ বছর পরও আমরা দেখি, সনদের পূর্ণ কার্যকারিতাকে ক্ষুণ্ন করে সনদের মৌলিক ভিত্তি ২ নম্বর ধারায় সংরক্ষণ অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং সনদে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনগত সম-অধিকার নিশ্চিত করাকে লিঙ্গবৈষম্য নিরসনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবৃত করলেও সরকারি পর্যায়ে তা উপেক্ষিত হয়ে আসছে। ফলে স্বাধীনতার ৩৭ বছর পরও আইনের দৃষ্টিতে নারীর সমতা স্থাপিত হয়নি। নারীর শিক্ষা ও উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি হলেও পুরুষশাসিত সামাজিক অনুশাসনের মাধ্যমে নারীর অধস্তনতার বিষয়টি সামাজিক রীতি (নর্ম) হিসেবে অব্যাহত রয়েছে।
দেশে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করার পক্ষে জনগণের বিপুল সমর্থন গড়ে উঠলেও মৌলিক সব ইস্যু যথা লিঙ্গ-সমতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পক্ষে এখনো শক্তিশালী জনমত গড়ে ওঠেনি। উপরন্তু সমাজে নতুন ধারা ও প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে নারী-পুরুষের ক্ষমতার বিভাজন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার গণ্ডি বিনির্মাণে, যা সমাজপতিদের দ্বারা নিজস্ব সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে পরিচিত করানো হচ্ছে। তাই সমাজ-নির্ধারিত তথাকথিত গণ্ডির বাইরে নারীর পদচারণের শাস্তির ভয়াবহ স্বরূপ প্রকাশিত হচ্ছে ফতোয়া দিয়ে নারীকে দোররা মারা, একঘরে করা এবং হীনম্মন্যতার বশে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব হচ্ছে সমাজে নারী নির্যাতনের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হওয়া। প্রকাশ্যে শত শত লোকের নীরব সম্মতিতে নারীর মানবাধিকার হরণের ঘটনা ঘটে চলেছে, যার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো প্রতিবাদ হয়নি। এমনকি ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রশাসনিক স্পর্শকাতরতাকেও ভোঁতা করে দিচ্ছে বলে মনে হয়। যে কারণে সম্প্রতি পুলিশ প্রধান দাবি করেছেন, ‘দেশে আইন-শৃঙ্খলার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে, যদিও নারী নির্যাতন বেড়েছে’ (১ সেপ্টেম্বরে সংবাদপত্র ও টিভির সংবাদ)।
নারী নির্যাতন শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতির উল্লেখ্য সূচকই নয়, নারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং সিডও বাস্তবায়নের আন্তর্জাতিক দায়িত্বেরও অংশবিশেষ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশে আইনের দৃষ্টিতে এবং সামাজিক ধারণাগতভাবে নারীর ক্ষমতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে সংবিধান-প্রদত্ত অধিকার ও সিডও সনদে প্রতিফলিত মানবাধিকারের সমন্বয়ে একটি উইমেনস চার্টার বা সমন্বিত নারী মানবাধিকার নীতি প্রণয়ন করা যায়, যা রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল সিডও সনদের মৌলিক ধারাগুলোর সমন্বয়ে অনুরূপ উইমেনস চার্টার প্রণয়ন করেছে। বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ সরকার সিডওর ধারাগুলো যথাযথ আইনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে। কারণ, সিডও নারীর মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনসম্মত একটা আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা বাস্তবায়নের মুচলেকা সরকার দিয়েছে। অঙ্গীকারমাফিক তাই আর কালক্ষেপণ না করে বাংলাদেশ সরকারকে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনের যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার নিশ্চিত করার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।
সালমা খান: সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারপারসন ও উইমেন ফর উইমেনের সভাপতি।