Thursday, February 13, 2025

‘ওর মৃত্যুতে দেশবাসী ছাড়া কাঁদার মতো কেউ নেই’ by মাসুদ রানা

পাঁচ বছর বয়সে বাবা পাড়ি দিয়েছেন পরপারে। তারও আগে মা চলে গেছেন অন্যের ঘরে। দেখভাল করতেন দাদি। দুই ভাই, এক বোনের সংসারে বড় ভাই আর দাদিও প্রয়াত হয়েছেন। একমাত্র বোন থাকে মায়ের সঙ্গে। এমন নিঃসঙ্গ ও অসহায় ছেলে আবুল কাশেমের পড়াশোনাও এগোয়নি খুব বেশি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ২০ বছর বয়সী ছেলেটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বুধবার বেলা তিনটার দিকে মারা গেলেন।

নিহত আবুল কাশেম গাজীপুর মহানগরের দক্ষিণ কলমেশ্বর এলাকার প্রয়াত হাজি জামালের ছেলে। শুক্রবার রাতে মহানগরীর ধীরাশ্রম দক্ষিণখান এলাকায় সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রদের ওপর হামলা এবং তাঁদের আটকে মারধরের যে ঘটনা ঘটেছিল, তাতে আবুল কাশেমসহ ১৭ জন আহত হন। পরে কাশেমসহ গুরুতর আহত ৭ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গাজীপুর শাখার সমন্বয়ক মো. আবদুল্লাহ বলেন, আবুল কাশেমকে হত্যার প্রতিবাদে আজ বুধবার রাতে গাজীপুরের শিববাড়ী মোড় থেকে ডিসি অফিস পর্যন্ত মশাল ও বিক্ষোভ মিছিল করা হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজবাড়ী মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহানগরীর বোর্ডবাজার–সংলগ্ন আল-হেরা সিএনজি পাম্প মাঠে আরেক দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় আজ আরও ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত এ ঘটনায় ১৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগের মামলার সঙ্গে এখন হত্যা মামলার ধারাও যুক্ত করা হবে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বোর্ডবাজার আল–হেরা সিএনজি পাম্প থেকে ৫-৬ কিলোমিটার পশ্চিমে আনাস মার্কেট। পাশেই আবুল কাশেমের বাড়ি। আজ বিকেল চারটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক নারী-পুরুষের ভিড়। সেখানে একটি দোকানের সামনে বসে নিহত আবুল কাশেমের ফুফু নাসিমা বেগম হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। অনেকে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজনও ছুটে এসেছেন। পুরো এলাকায় শোক নেমে এসেছে। ওই স্থান থেকে ৫ ফুট ভেতরে একটি ছোট তিনতলা ভবনের তৃতীয় তলায় একটি কক্ষে একাই বসবাস করতেন আবুল কাশেম। ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর থেকে ঘরটি তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। তবে ঘরের জানালাটা এখনো খোলা। সেই জানালার ফাঁকা দিয়ে দেখা যায় ঘরে খাট-পালং কিছুই নেই। ফ্লোরে একটি বিছানা পাতা আছে। ঘরের দেয়ালে টানানো একটি দড়িতে কাশেমের জামাকাপড় ঝুলে আছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, কাশেম নিজেই রান্না করে খেতেন। যার কারণে ঘরের মেঝের এক পাশে হাঁড়ি–পাতিল আর থালাবাসনও দেখা যায়। সেখানে কথা হয় কাশেমের দূরসম্পর্কের ভগ্নিপতি সজীব আহমেদের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আবুল কাশেমের বয়স যখন ৪-৫, তখন তাঁর মা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে অন্যত্র বিয়ে করেন। এরপর তাঁর বাবা মারা যান। তাঁর বড় ভাই গত বছরের জুলাই মাসে অজ্ঞাত কারণে আত্মহত্যা করেন। মূলত তাঁকে দেখার মতো কেউ ছিল না। বোনও তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকে। কাশেম স্থানীয় একটি স্কুলে লেখাপড়া করেছিলেন। তবে বেশি দূর পড়া হয়নি।

নিহতের চাচা আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাতিজা স্থানীয় ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যোগ দেয়। তাকে হামলা চালিয়ে মারধর করে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই, তাদের ফাঁসি চাই।’

নিহত কাশেমের চাচি সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘শুক্রবার বিকেলে বাসার সামনে বসে আছি। ও বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার সঙ্গে শেষ কথা হয়। বলে চাচি আমি জয়দেবপুর যাচ্ছি, আসতে রাত হবে। এই বলে সে চলে যায়। সন্ধ্যার পরে শুনলাম ছাত্রদের সাথে কোথায় যেন গেছে। এরপরে শুনি কারা যেন ওরে মারধর করেছে, আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছে। ওর মৃত্যুতে কাঁদার মতো কেউ নেই দেশবাসী ছাড়া। ওর মৃত্যুতে যারা দায়ী, তাদের বিচার চাই।’

আবুল কাশেম
আবুল কাশেম। ছবি: সংগৃহীত

‘বইগুলো ব্যাগের ভেতরেই আছে, আমি আবার আসব’

‘ম্যাডাম আমার বইগুলো ব্যাগের ভেতরেই আছে। একটু যত্ন করে রাখবেন। আমি তো আবার ক্লাসে আসব।’

কথাগুলো চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী মরিয়ম আক্তারের (১০)। কিছুদিন আগে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মরিয়মকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যান। তখন সে তার শিক্ষককে এসব কথা বলে। ২২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মরিয়মের মৃত্যু হয়।

গত ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয় মরিয়ম আক্তার ও রাফসি আহসান (১০)। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মরিয়মের শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল বলে জানান চিকিৎসকেরা। অপর আহত তৃতীয় শ্রেণির রাফসির এক হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। সে বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

ঘটনার পর প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস দাবি করেন, ‘ছাদে সব সময় তালা দেওয়া থাকে। কে বা কারা তালা খুলে দিয়েছে, তা দেখেননি তিনি। অসাবধানতাবশত পল্লি বিদ্যুতের খোলা লাইনে লেগে দুই শিক্ষার্থী বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়।

মরিয়ম আক্তার তার মামাবাড়িতে থাকত। তার মামা আবদুর রহমান জানান, ‘বিদ্যালয় ঘেঁষে ৪৪ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক তার রয়েছে। এ কারণে পুরো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিতে রয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে আমার ভাগনিকে জীবন দিতে হয়েছে।’

অপর শিক্ষার্থী রাফসি আহসানের অবস্থাও সংকটাপন্ন বলে তার বাবা মো. রনি জানান। তিনি বলেন, চিকিৎসক চেষ্টা করছেন তাকে সুস্থ করে তুলতে। রাফসির ডান হাত কেটে ফেলা হয়েছে। দুটি পা কেটে ফেলা হবে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

লক্ষ্মীপুর পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. শফিউল আলম বলেন, ‘দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ ঘটনায় ঢাকা থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত টিম এসেছে। বিষয়টি এখনো তদন্ত চলছে। অনেক বছর আগে বিদ্যালয়ের ভবনের পেছন দিয়ে বিদ্যুতের লাইনটি নির্মিত হয়েছে। এ কারণে এটি আমাদের নজর এড়িয়ে যায়।’

স্কুলের ছাদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মরিয়ম আক্তার ২২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানল
স্কুলের ছাদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মরিয়ম আক্তার ২২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানল। ছবি: সংগৃহীত

ডিস্ক প্রলাপস কেন হয়, সতর্কতা ও চিকিৎসা কী by এম ইয়াছিন আলী

মেরুদণ্ডের দুটি কশেরুকার মাঝখানের ফাঁকা স্থানটিতে নরম যে অংশ থাকে তার নাম ইন্টার ভার্টিব্রাল ডিস্ক। এ ডিস্ক যখন জায়গা থেকে সরে যায়, তখন তাকে ডিস্ক প্রলাপস বলে। এ অবস্থাকে অনেকেই বলেন যে মেরুদণ্ডের হাড় সরে গেছে। আসলে ডিসপ্লেসমেন্ট হয় ডিস্কের, হাড়ের নয়।

সাধারণত ঘাড় বা সারভাইক্যাল স্পাইন ও কোমর বা লাম্বার স্পাইনে ডিস্ক প্রলাপস বেশি হয়। নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে পুরুষের তুলনায় নারীরা এ রোগে বেশি ভোগেন।

ডিস্ক প্রলাপস কেন হয়

-মেরুদণ্ডের সঙ্গে যে স্পাইনাল লিগামেন্ট ও মাংসপেশি লাগানো থাকে, এগুলো দুর্বল হয়ে গেলে ডিস্ক সরে যেতে পারে।

-অসচেতনভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে ভারী কিছু ওঠাতে গেলে হঠাৎ এমন হতে পারে।

-আঘাত পেলে বা উঁচু স্থান থেকে পড়ে গেলে।

-দীর্ঘক্ষণ নিচে বসে কাজ করলে, এমনকি সামনের দিকে ঝুঁকে জুতার ফিতা বাঁধতে গেলে অথবা বেসিনে মুখ ধুতে গেলেও অসতর্কতায় ডিস্ক প্রলাপস হতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন

ঘাড় বা সারভাইক্যাল স্পাইনে প্রলাপস হলে ঘাড়ে ব্যথা, ব্যথা ঘাড় থেকে হাতের দিকে ছড়ায় এবং হাতে তীব্র ব্যথা হয়। হাত ঝিনঝিন করে বা অবশ অবশ মনে হয়। হাতের শক্তি কমে যায় বা হাত দুর্বল হয়ে আসে। তীব্রতা বেশি হলে অনেক ক্ষেত্রে হাতের মাংসপেশি শুকিয়ে আসে।

কোমর বা লাম্বার স্পাইনে হলে কোমরে ব্যথা, ব্যথা কোমর থেকে পায়ের দিকে ছড়ায়। পা ভারী বা অধিক ওজন মনে হয়। পায়ে জ্বালাপোড়া, পায়ের শক্তি কম অনুভব করা, অনেক ক্ষেত্রে পায়ে মাংসপেশি শুকিয়ে যায়। তীব্রতা বেশি হলে অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির মলমূত্রের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়।

কীভাবে শনাক্ত করা যায়

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরীক্ষার পাশাপাশি আক্রান্ত স্পাইনের এমআরআইয়ের মাধ্যমে কোন লেভেলে কতটুকু ডিস্ক প্রলাপস, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করেন।

চিকিৎসা

প্রয়োজনীয় ব্যথা উপশমকারী ওষুধের পাশাপাশি সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে, অর্থাৎ ব্যথা তীব্র থাকার সময় হাঁটাচলা করা যাবে না। এরপর সঠিক ফিজিওথেরাপি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী দুই থেকে চার সপ্তাহ ফিজিওথেরাপি দিতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি থেকে দিনে দু-তিনবার ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিলে ও চিকিৎসক নির্দেশিত থেরাপিউটিক ব্যায়াম করলে রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন।

জীবনযাপনে সতর্কতা

-সামনে ঝুঁকে ভারী কাজ করবেন না।

-শোবার জন্য মধ্যম সাইজের বালিশ ব্যবহার করবেন।

-ভারী ওজন তোলা নিষেধ।

-মাঝারি শক্ত বিছানায় শোবেন।

-ভ্রমণে সারভাইক্যাল কলার অথবা লাম্বার করসেট ব্যবহার করবেন।

-চিকিৎসকের নির্দেশিত ব্যায়াম করবেন।

এম ইয়াছিন আলী, চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা

সাধারণত ঘাড় বা সারভাইক্যাল স্পাইন ও কোমর বা লাম্বার স্পাইনে ডিস্ক প্রলাপস বেশি হয়
সাধারণত ঘাড় বা সারভাইক্যাল স্পাইন ও কোমর বা লাম্বার স্পাইনে ডিস্ক প্রলাপস বেশি হয়। ছবি: সংগৃহীত

কেনেডি হত্যায় জড়িত কয়েক হাজার নতুন নথির সন্ধান পেয়েছে এফবিআই

যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যার সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার নথির সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। ক্ষমতায় আসার আগেই কেনেডি হত্যার সকল নথি ফাঁস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০শে জানুয়ারি শপথ গ্রহণের পরই কেনেডি হত্যার নথি ফাঁসের বিষয়ে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন তিনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে কেনেডি হত্যার সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার নথির সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে এফবিআই। প্রসঙ্গত ১৯৬৩ সালে গুলি করে হত্যা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ওই প্রেসিডেন্টকে। তবে এখনো তাকে হত্যা করার বিষয়টি ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। যা উন্মোচনের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এফবিআই জানিয়েছে- জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম সপ্তাহে ট্রাম্প কেনেডি হত্যার বিষয়ে যে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন তার ধারাবাহিকতায় নতুন করে নথির সন্ধান পেয়েছে তারা। নতুন করে তারা প্রায় ২৪০০ নথির সন্ধান পেয়েছে। যা এর আগে কখনো প্রকাশ করা হয়নি। এফবিআইয়ের সন্ধানে নতুন করে যেসব নথি তাদের হাতে পৌঁছেছে এগুলো সবই কেনেডি হত্যার সঙ্গে জড়িত।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নতুন করে সন্ধান পাওয়া নথিগুলোর যথাযথ ডিক্লাসিফিকেশন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সেগুলো জাতীয় আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কাছে হস্তান্তরের কাজ চলছে। মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এখনো এসব নথি প্রকাশ করা হয়নি বা কখন প্রকাশ করা হবে সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তবে কেনেডি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কোন কোন নথি জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে তা জানতে চেয়ে ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের কাছে একটি সুপারিশ পাঠিয়েছে দেশটির জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের কার্যালয়।

কেনেডিকে টেক্সাসের ডালাসে হত্যা করা হয়। তার হত্যার সঙ্গে জড়িত হিসেবে একমাত্র বন্দুকধারী লি হার্ভে অসওয়াল্ডকে দায়ী করা হয়। বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য ফেডারেল সরকারি সংস্থাগুলো ওই বন্দুকধারীকেই কেনেডি হত্যার জন্য দায়ী করে আসছে। কিন্তু বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী আমেরিকানরা বিশ্বাস করেন যে, কেনেডির মৃত্যুর পেছনে বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেনেডিকে হত্যার ছয় দশক পার হলেও এ বিষয় জানতে আকর্ষণ অনুভব করছে সবাই। জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার আগেই কেনেডি হত্যাকাণ্ডের সকল নথি প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। পাশাপাশি তিনি নাগরিক অধিকারের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং সিনেটর রবার্ট কেনেডির হত্যাকাণ্ডের নথি প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেনেডিকে হত্যার পাঁচ বছর পর; অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে লুথার কিং এবং সিনেটর রবার্টকে হত্যা করা হয়। তবে এগুলো প্রকাশের জন্য এফবিআইকে আরও সময় দিয়েছেন ট্রাম্প।

জন এফ কেনেডির ভাতিজা রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র অভিযোগ করেছেন যে, তার চাচার মৃত্যুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বাহিনী সরাসরি জড়িত। যদিও এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করেছে তারা। কেনেডি জুনিয়র আরও বলেছেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন জন এফ কেনেডির হত্যার পেছনে একাধিক বন্দুকধারী জড়িত। তবে এতদিন ধরে যেসব নথি সম্পর্কে জানা গেছে তার সঙ্গে ওই দাবি সাংঘর্ষিক।

mzamin

গাজায় আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার শঙ্কা

ফিলিস্তিনের গাজায় আবার যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রিজার্ভ সেনা তলব করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস আগামী শনিবারের মধ্যে আরও ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি না দিলে গাজায় হামলা শুরু করতে পারে ইসরায়েল।

গত ১৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীন আগামী শনিবার আরও তিন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার কথা। তবে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে অভিযোগ এনে চলতি সপ্তাহে অনির্দিষ্টকালের জন্য জিম্মি মুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয় হামাস।

হামাসের এ ঘোষণা পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শনিবার দুপুরের মধ্যে হামাস সব জিম্মিকে মুক্তি না দিলে গাজায় ‘নরক নেমে আসবে’।

গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাস যদি জিম্মি মুক্তির সময়সীমা মেনে না চলে, ‘তীব্র লড়াই’ শুরু করবে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি গাজার ভেতরে ও আশপাশে ইসরায়েলি বাহিনীকে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পরই গাজা সীমান্তবর্তী ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা পাঠানো ও রিজার্ভ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেয় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী।

এ অচলাবস্থার কারণে গাজায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় ১৫ মাসের এ সংঘাতে গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাবার, সুপেয় পানি ও আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংঘাত ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।

ইসরায়েলের কর্মকর্তারা জানান, শনিবারের মধ্যে সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া না হলে যুদ্ধবিরতি বাতিলে ট্রাম্পের দেওয়া হুমকি ‘অনুমোদন করেছেন’ নেতানিয়াহু সরকারের মন্ত্রীরা।

এদিকেগতকাল মঙ্গলবার হামাসের এক নেতা বলেছেন, কেবল যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চললেই গাজা থেকে জিম্মিদের ফেরত নিতে পারবে ইসরায়েল। এ নিয়ে ট্রাম্পের দেওয়া হুমকিও নাকচ করে দিয়েছে সংগঠনটি।

হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সামি আবু জুহরি রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্পের অবশ্যই মনে রাখা উচিত, এ বিষয়ে একটি চুক্তি রয়েছে, যা উভয় পক্ষেরই মেনে চলা উচিত। ইসরায়েলি বন্দীদের মুক্ত করার এটাই একমাত্র উপায়। হুমকির সুরে কথা বলার কোনো মানে নেই এবং এটি বিষয়টিকে জটিল করবে।

এদিকে সম্ভাব্য সংকট এড়াতে চেষ্টা করছে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। এ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতির সংঘাতে মোড় নেওয়া ঠেকাতে নিজেদের ভূমিকা জোরদার করেছেন মধ্যস্থতাকারীরা।

যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন না সিসি

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন করার বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন না মিসরের প্রেসিডেন্ট আবেদল ফাত্তাহ আল-সিসি। মিসরের দুটি গোয়েন্দা সূত্র এ কথা জানিয়েছে।

১ ফেব্রুয়ারি টেলিফোনে কথা বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট সিসি। তখন সিসিকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এখনো এ সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অবশ্য এ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এদিকে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নিতে ওয়াশিংটন সফররত জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহকে চাপ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, কিন্তু বাদশাহ আবদুল্লাহ তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের না সরিয়েই গাজা পুনর্গঠন করা হবে। এ বিষয়ে আরব দেশগুলো একমত।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ওভাল অফিসে দুই নেতা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, গাজা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ও উপত্যকাটির বাসিন্দাদের স্থায়ীভাবে সরানোর পরিকল্পনা থেকে তিনি সরে আসবেন না।

জবাবে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে বাস্তুচ্যুত করার বিরুদ্ধে জর্ডানের ‘অবিচল অবস্থান’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাদশাহ আবদুল্লাহ। সংবাদ সম্মেলন শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এটাই আরবদের সম্মিলিত অবস্থান। ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত না করে গাজা পুনর্গঠন করা এবং ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সবার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’

ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে বিতাড়ন করার ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে চীনও। আজ বুধবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গো জিয়াকুন বলেন,‘গাজার মালিক ফিলিস্তিনিরা এবং এটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা গাজার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার বিরুদ্ধে।’

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন করার পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন আরব লিগের মহাসচিব আহমেদ গেইত। দুবাইয়ে ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্টস সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আজ গাজার কথা বলা হচ্ছে তো আগামীকাল পশ্চিম তীরে নিজেদের ইতিহাসিক আবাস থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হবে।’

শনিবারের মধ্যে জিম্মিদের মুক্তি না দিলে যুদ্ধবিরতি বাতিল, ইসরায়েলের হুঁশিয়ারি

আগামী শনিবার দুপুরের মধ্যে জিম্মিদের ফেরত দেওয়া না হলে গাজায় যুদ্ধবিরতি বাতিল এবং সেখানে আবার তীব্র লড়াই শুরু হবে বলে হামাসকে সতর্ক করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি গাজার ভেতরে এবং আশপাশে ইসরায়েলি বাহিনীকে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন করে কোনো জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া স্থগিত করেছে হামাস। সংগঠনটির এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু এই নির্দেশ দেন।

নেতানিয়াহু বাদবাকি ৭৬ জিম্মির মুক্তির দাবি করেছেন নাকি শনিবার যে তিনজনকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল, তাঁদের মুক্তির দাবি করেছেন, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। তবে এক মন্ত্রী বলেছেন, তিনি সবার মুক্তির কথা বোঝাতে চেয়েছেন।

গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সাহায্য আটকে দেওয়াসহ নানাভাবে ইসরায়েল তিন সপ্তাহের পুরোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছে হামাস। যদিও এ দাবি অস্বীকার করেছে ইসরায়েল।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর হামাস বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যেকোনো জটিলতা কিংবা বিলম্বের জন্য ইসরায়েল দায়ী।

হামাস এই সপ্তাহান্তে নির্ধারিত জিম্মিদের মুক্তি বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাব করেন, ইসরায়েল চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হবে এবং শনিবারের মধ্যে ‘সব জিম্মিকে’ ফিরিয়ে না দিলে গাজাকে নরকে পরিণত করা হবে।

গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভার চার ঘণ্টার বৈঠকের পর নেতানিয়াহু একটি ভিডিও বিবৃতিতে বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হামাসের চুক্তি লঙ্ঘন এবং আমাদের জিম্মিদের মুক্তি না দেওয়ার সিদ্ধান্তের আলোকে গত রাতে আমি আইডিএফকে (ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী) গাজা উপত্যকার ভেতরে এবং চারপাশে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’

নেতানিয়াহু বলেন, যদি হামাস শনিবার দুপুরের মধ্যে আমাদের জিম্মিদের ফিরিয়ে না দেয়, তাহলে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে যাবে। হামাসের চূড়ান্ত পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত আইডিএফ পুনরায় তীব্র লড়াই শুরু করবে। তাঁর এই আলটিমেটাম মন্ত্রিসভায় সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন পেয়েছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় গাজার প্রায় ১ হাজার ৯০০ ফিলিস্তিনি বন্দীর বিনিময়ে মোট ৩৩ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হবে।

গত ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। চুক্তির শর্তাবলির বাইরে হামাস পাঁচজন থাই জিম্মিকে হস্তান্তর করেছে।

বাকি ১৭ ইসরায়েলি জিম্মিকে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ শিশু, ১ নারী, ৫০ বছরের বেশি বয়সী ৫ পুরুষ এবং ৫০ বছরের কম বয়সী ৯ জন পুরুষ। উভয় পক্ষই জানিয়েছে, এই জিম্মিদের মধ্যে আটজন মারা গেছেন, তবে কেবল একজনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।

২০২৩ সালে ৭ অক্টোবর সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরায়েলে ভয়াবহ হামলা চালায়। এতে সেখানে ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়। জিম্মি করা হয় ২৫১ জনকে। এ হামলার জবাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হামাসকে ধ্বংস করতে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ৪৮ হাজার ২১০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

গাজার বেশির ভাগ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে পড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও আশ্রয় সংকটে আছে গাজার মানুষ।

হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নতুন করে সীমান্তে অবস্থান নিচ্ছে ইসরায়েলি ট্যাংক। আজ বুধবার উত্তর গাজার সীমান্তে
হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নতুন করে সীমান্তে অবস্থান নিচ্ছে ইসরায়েলি ট্যাংক। আজ বুধবার উত্তর গাজার সীমান্তে। ছবি: রয়টার্স

গোপন বন্দিশালায় খুপরি ঘর, নির্যাতনে ব্যবহার করা চেয়ার

ঢাকায় তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। তিনি দেখেছেন, কীভাবে সেখানে মানুষকে বন্দী করে রাখা হতো, করা হতো নির্যাতন। তাঁর সঙ্গে যাওয়া এসব বন্দিশালায় আটক কয়েকজন ভুক্তভোগীর বন্দিজীবনের কষ্টের কথাও শুনেছেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, এসব বন্দিশালায় রয়েছে খুপরি ঘর, যেখানে আলো-বাতাস পৌঁছাতে পারে না বললেই চলে। রয়েছে নির্যাতনের জন্য ব্যবহৃত চেয়ার। বন্দী থাকা মানুষেরা দেয়ালে যা লিখেছিলেন, তা-ও রয়েছে।

পরিদর্শন শেষে অধ্যাপক ইউনূস গোপন বন্দিশালাকে বীভৎসতা ও নৃশংসতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আইয়ামে জাহেলিয়া বলে একটা কথা আছে না, গত সরকার আইয়ামে জাহেলিয়া প্রতিষ্ঠা করে গেছে। এটা (গোপন বন্দিশালা) তার একটি নমুনা।’

ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোপন বন্দিশালায় বিনা বিচারে মানুষকে আটকে রাখা হতো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকে বন্দিশালা থেকে মুক্তি পান। গুমের ঘটনা তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার গত ২৭ আগস্ট গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, র‍্যাব, ডিজিএফআই, ডিবি, সিটিটিসি, সিআইডি, পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে কমিশনে ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগ জমা পড়ে। তার মধ্যে ৭৫৮ জনের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করেছে কমিশন। এতে দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ ভুক্তভোগী ফিরে এসেছেন। বাকি ২৭ শতাংশ (অন্তত ২০৪ জন ব্যক্তি) নিখোঁজ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আটটির বেশি গোপন বন্দিশালা শনাক্ত করেছে কমিশন। তাদের ভাষ্য, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), র‌্যাব ও পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের মতো সংস্থাগুলো এসব গোপন বন্দিশালা পরিচালনা করত।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, অধ্যাপক ইউনূস বুধবার ঢাকার তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন। এগুলো রাজধানীর আগারগাঁও, কচুক্ষেত ও উত্তরায় অবস্থিত। এর মধ্যে দুটি বন্দিশালা পরিচালনা করত র‍্যাব, একটি ডিজিএফআই।

সকালে অধ্যাপক ইউনূস আয়নাঘর পরিদর্শনে যান। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছয়জন উপদেষ্টা, গুম কমিশনের প্রধানসহ পাঁচজন ও গুমের শিকার আট ব্যক্তি। কয়েকজন সাংবাদিকও সঙ্গে ছিলেন। তবে দেশীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়নি (বিটিভি ছাড়া)। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ সমালোচনা করেন।

দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বন্দিশালায় কক্ষগুলো ছোট। যাতায়াতের পথ সরু। বেশিসংখ্যক মানুষ নেওয়া কঠিন ছিল। তিনি সব সাংবাদিককে নিতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন।

‘এর থেকে তো মুরগির খাঁচাও বড়’

বন্দিশালা ঘুরে দেখে অধ্যাপক ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, বীভৎস দৃশ্য। নৃশংস কর্মকাণ্ড হয়েছে এখানে। তিনি বলেন, ‘যতটাই শুনি মনে হয়, অবিশ্বাস্য, এটা কি আমাদেরই জগৎ, আমাদের সমাজ? যাঁরা নিগৃহীত হয়েছেন, তাঁরাও আমাদের সমাজেই আছেন। তাঁদের মুখ থেকে শুনলাম। কী হয়েছে, কোনো ব্যাখ্যা নেই।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ভুক্তভোগীদের বিনা কারণে, বিনা দোষে উঠিয়ে আনা হতো। সন্ত্রাসী, জঙ্গি বলে এখানে ঢুকিয়ে রাখা হতো। তিনি বলেন, ‘এই রকম টর্চার সেল (নির্যাতনকেন্দ্র) দেশজুড়ে আছে। ধারণা ছিল এখানে কয়েকটা আছে। এখন শুনছি বিভিন্ন ভার্সনে (সংস্করণে) দেশজুড়ে আছে। সংখ্যাও নিরূপণ করা যায়নি।’

মানুষকে সামান্যতম মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘একজন বলছিলেন খুপরির মধ্যে রাখা হয়েছে। এর থেকে তো মুরগির খাঁচাও বড় হয়। বছরের পর বছর এভাবে রাখা হয়েছে।’

সমাজকে এসব থেকে বের করে না আনা গেলে সমাজ টিকবে না বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি নতুন সমাজ গড়া, অপরাধীদের বিচার করা, প্রমাণ রক্ষার ওপর জোর দেন।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ন্যায়বিচার যেন পায়, সেটা এখন প্রাধান্য। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন বাংলাদেশ ও নতুন পরিবেশ গড়তে চাই। সরকার সে লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন করেছে। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সরকার সে লক্ষ্যে কাজ করবে।’

বন্দিশালায় একসময়ের বন্দীদের কথাও শোনেন অধ্যাপক ইউনূস। প্রেস উইং থেকে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাশরুর আনোয়ার চৌধুরী নামের একজন ভুক্তভোগী বলছেন, ২০২০ সালের মার্চে তাঁকে ১০ দিন বন্দী রাখা হয়েছিল। সে সময় তিনি আরও কয়েকজন বন্দীর কথা শুনেছেন।

মাশরুর আনোয়ার চৌধুরী বলছিলেন, ‘আমি শুধু আমার দুই সন্তানের কথা ভাবছিলাম। একটির বয়স ছিল ৭ মাস, আরেকটির দেড় বছর।’ তিনি বলেন, বন্দিশালায় তাঁদের কোনো বালিশ দেওয়া হতো না। মেঝেতে শোয়ার জন্য শুধু একটি কাপড় দেওয়া হয়েছিল।

বন্দিশালা পরিদর্শনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি রাতে ফেসবুকে ভিডিও এবং ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘নৃশংস! এটাই আমাদের দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর আয়নাঘর। তিন ফুট বাই এক ফুটের সেল। দুই বিঘত জায়গায় টয়লেট (শৌচাগার)। বাকি দুই ফুটে হাঁটু মুড়ে বসে থাকার জায়গা।’

কক্ষ শনাক্ত করলেন নাহিদ-আসিফ

প্রধান উপদেষ্টার সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি বুধবার ফেসবুকে দেওয়া দুটি পোস্টে জানিয়েছেন, বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে গত জুলাই মাসে সাদাপোশাকের লোকজন তুলে নিয়েছিল। তুলে নেওয়ার পর তাঁদের টর্চার সেলে (নির্যাতনকেন্দ্র) রাখা হয়। বুধবার সেই টর্চার সেল পরিদর্শনে গিয়ে কক্ষগুলো শনাক্ত করেন তাঁরা।

সুচিস্মিতা তিথি লিখেছেন, নাহিদ জানিয়েছেন, তাঁকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল, তার একপাশে টয়লেট (শৌচাগার) হিসেবে একটি বেসিনের মতো ছিল। ৫ আগস্টের পর এই সেলগুলোর মাঝের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়, দেয়াল রং করা হয়।

প্রেস উইংয়ে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নাহিদ ইসলামকে বলতে শোনা যায়, কক্ষে আনার পর তাঁর চোখ খুলে দেওয়া হতো। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিলে চোখ বেঁধে ফেলা হতো। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা কেন আন্দোলন করছেন, বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না, এসব জানতে চাওয়া হতো। মাঝে মাঝে মারধর করা হতো। হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

সুচিস্মিতা তিথি আরেকটি পোস্টে অপর একটি কক্ষের কয়েকটি ছবি দিয়েছেন। একটি ছবিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া রয়েছেন। সুচিস্মিতা লিখেছেন, গত জুলাইয়ে সাদাপোশাকে তুলে নেওয়ার পর ডিজিএফআইয়ের এই টর্চার সেলে রাখা হয়েছিল আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে। বুধবার সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে কক্ষটি চিনতে পেরেছেন তিনি।

বন্দিশালার সংখ্যা ৭০০-৮০০ হতে পারে

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বন্দিশালা পরিদর্শন নিয়ে জানায়। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, যত আয়নাঘর আছে, প্রতিটি খুঁজে বের করা হবে। গুম কমিশনের তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত অনুযায়ী এর সংখ্যা কয়েক শ; ৭০০ থেকে ৮০০-এর মতো হতে পারে। বোঝা যাচ্ছে, এটি শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এ রকম আয়নাঘর ছিল।

গোপন বন্দিশালা পরিদর্শনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান; গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান; গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত গোপন বন্দিশালার ছবি।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত গোপন বন্দিশালার ছবি।

গোপন বন্দিশালায় থাকা নির্যাতনে ব্যবহৃত চেয়ার দেখছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যরা
গোপন বন্দিশালায় থাকা নির্যাতনে ব্যবহৃত চেয়ার দেখছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যরা ছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

আয়নাঘর: আলামত ধ্বংস করলো কারা?

ছোট ছোট খুপরি। গা ছমছম পরিবেশ। আলোহীন এক একটি কামরা যেন গ্রামের মুরগির খাঁচা। বাইরের জগৎ থেকে পুরাই আলাদা। কোথায় আছেন, দিনের কোন সময় পার করছেন জানারও সুযোগ নেই। কোনো কোনো কক্ষ সাউন্ডপ্রুফ। যেসব কক্ষে থাকতো নির্যাতনের নানা সরঞ্জাম। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ভিন্নমত দমনে গড়ে ওঠে এসব সেল। যেটি আয়নাঘর বা গোপন বন্দিশালা নামে পরিচিত। বছরের পর বছর আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে অনেক নিরপরাধ মানুষ। এখান থেকে কেউ কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ ফেরেননি। মৃত্যুই যাদের শেষ ঠিকানা হয়েছে। সরকারের নির্দেশে গুম করা অনেক মানুষকে এখানে বন্দি রাখতো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। বন্দিজীবনের গল্প ফুটে উঠেছে আয়নাঘরের দেয়ালে দেয়ালে। কিন্তু সেই আয়নাঘরের অনেক আলামতই গায়েব হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল পরিদর্শন করেছেন রাজধানীতে থাকা তিন আয়নাঘর। যেগুলো বিগত সরকারের গোপন বন্দিশালা ও টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত ছিল। কচুক্ষেত, আগারগাঁও ও উত্তরায় অবস্থিত এসব আয়নাঘরের একটি ডিজিএফআই’র, বাকি দুটো র‌্যাবের। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তারা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন- গুমের শিকার হওয়া একাধিক ব্যক্তি ও গুম কমিশনের সদস্যরা। কিন্তু এ পরিদর্শনের সময় নিজেদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখেনি সরকার। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকে আয়নাঘর পরিদর্শনের সুযোগ দেয়ার কথা থাকলেও প্রধান উপদেষ্টার পরিদর্শনের সময় সেটি করা হয়নি। কেবল পছন্দমতো দুইটি গণমাধ্যমকে (আলজাজিরা ও নেত্র নিউজ) এ সুযোগ দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া একজন সংবাদকর্মী প্রধান উপদেষ্টার পরিদর্শনের সময় সঙ্গে ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো ভিডিও ও স্থির চিত্রে দেখা যায়, আয়নাঘরের অন্দরের চিত্র। এক একটি ফুটেজ যেন কালের সাক্ষী, বীভৎস ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। তবে আয়নাঘরের চিত্র সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে এর আলামত ধ্বংসের বিষয়টি। অসংখ্য গোপন কক্ষের দেয়াল ভেঙে কক্ষগুলোকে বড় করে দেখানো হয়েছে। পলেস্তারা ও রং করা হয়েছে একাধিক কক্ষের দেয়ালে। যার কারণে মুছে গেছে দেয়ালে খোদাই করা ও আঁকা বন্দিদের নানা কথা, গল্প। এ ছাড়াও টর্চার সেলের বিভিন্ন সরঞ্জামও গায়েব করা হয়েছে। যেগুলো আছে সেগুলোও অকেজো করে ফেলা হয়েছে। যেসব সরঞ্জামের মাধ্যমে বন্দিদের নির্যাতন করা হতো। আয়নাঘরে ছিল নির্যাতনের বিভিন্ন সরঞ্জাম। এরমধ্যে ইলেকট্রিক চেয়ার, উচ্চ শব্দ করার যন্ত্র ও বিভিন্ন ইলেকট্রিক সরঞ্জাম। কোনো কোনো কক্ষ ছিল সম্পূর্ণ সাউন্ডপ্রুফ। গোপন বন্দিশালার দেয়ালে বন্দিদের আঁকা বিভিন্ন লেখার মধ্যে ছিল- ‘আমি আমার পরিবারকে ভালোবাসি’, ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭ ) অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র মহান, আমি তো সীমালঙ্ঘনকারী।’ এদিকে বন্দিশালাগুলো সিসি ক্যামেরা দ্বারা নজরদারি করা হতো। আজ সেসব সিসি ক্যামেরার কিছু কিছু দেখা গেলেও এসব ক্যামেরার ফুটেজ গায়েব হয়ে গেছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে অসংখ্য কক্ষের দেয়াল। যেগুলোতে ফুটে উঠেছিল গুম হওয়া মানুষের নরকযন্ত্রণার দিনগুলোর গল্প। সেগুলোর বেশির ভাগই আজ পলেস্তার করা। যেগুলো হতো পারতো তদন্ত কমিটির কাছে এক একটি ডকুমেন্ট। প্রশ্ন উঠছে এসব আলামত ধ্বংস করা হলো কেন? কারা এসব ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছেন। আলামত ধ্বংসের জবাব কি পাওয়া যাবে? সরকারের গঠিত গুম কমিশনও বলছে অনেক আলামত ধ্বংস করা হয়েছে। কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী অক্টোবরে বলেছেন, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ এভিডেন্স তারা নষ্ট করে দিয়েছে ওয়ালে পেইন্ট করে। ভিক্টিমরা বলেছিল ওয়ালে তাদের অনেক কথা, নাম এগুলো লেখা ছিল। অনেকের ফোন নম্বর, অনেকের ঠিকানা লেখা ছিল। ওই জিনিসগুলো পেইন্ট হওয়ার কারণে সেটা আর আমরা ওখানে পাইনি। গত ৫ই আগস্ট যখন রেজিম চেইঞ্জ হলো, তার পরপরই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে আমাদের ধারণা।

গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে আলামত ধ্বংসের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, আলামত ধ্বংস হয়েছে কিনা সেটি গুম কমিশন বলতে পারবে। তারা দেখছেন বিষয়টি। সে অনুযায়ী যে মামলাগুলো হয়েছে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা দেখছেন। সরকার প্রত্যেক বিষয় দেখছে। আলামত হিসেবে সবগুলো আয়নাঘর সিলগালা থাকবে। যেটি আইনি প্রক্রিয়ায় আমাদের লাগবে। আলামত ধ্বংস করা হয়েছে- আপনারা মনে করেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, মনে হওয়াটা আইনি বিষয়। তারা বলবেন, আলামত ধ্বংস হয়েছে কিনা, বা কীভাবে হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় আমরা পলেস্তারা দেখেছি। কোনো কোনো জায়গায় কক্ষগুলো ছোট ছিল সেখানে দেয়াল ভেঙে বড় করা হয়েছে। যেটি ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত গুম কমিশন দেখবে। তিনি বলেন, দেশের কোথায় কোথায় আয়নাঘর ছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত- প্রত্যেককে খুঁজে বের করা হবে।

আয়নাঘরে যা দেখা গেল
খুট খুটে অন্ধকার। খুপড়ি ঘর। দেখতে খুবই ছোট। অধিকাংশই তিন ফুট বাই চার ফুটের মধ্যে। যেখানে একজন বন্দির নিজের মতো করে করার কিছুই নেই। ওপরে এগজস্ট ফ্যান বা ভেন্টিলেটর জাতীয় ফ্যান লাগানো। কোনো কোনো কক্ষে দু’টি। যেখান থেকে শ্বাস নেয়ার মতো বাতাস, কিছুটা আলোও আসতো। কিন্তু এমন কক্ষের মধ্যেই বন্দির প্রস্রাব-পায়খানার জায়গা। এরমধ্যেই দিনের পর দিন আটক রাখা হতো আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধীদের। কোনো কোনো কক্ষে শুধু ছোট একটা হোলের (ছিদ্র) মতো। যেটা আবার বেশির ভাগ সময়েই লাগিয়ে রাখা হয়। বন্দি ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওখানেই বন্দিকে প্রস্রাব-পায়খানা, গোসল করতে হতো। জায়গাটা সর্বোচ্চ সাড়ে তিন ফুট বাই চার ফুট। বছরের পর বছর, মাসের পর মাস এভাবে রাখা হতো তাদের। সারাক্ষণ এগজস্ট ফ্যান চলতো খুপড়ি ঘরগুলোতে, ফ্যান বন্ধ হলেই কান্না আর গোঙানির শব্দ শুনতে পাওয়া যেতো। কেউ কাউকে দেখার বা কথা বলার সুযোগ নাই। হাতে হ্যান্ডকাপ ও চোখ মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। শুধু খাবার ও বাথরুমে যাওয়ার সময় এসব খুলে দেয়া হতো। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণমাধ্যমকে নিয়ে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা টর্চার সেল বা আয়নাঘর পরিদর্শনে গিয়ে এমন চিত্র দেখতে পেয়েছেন। আয়নাঘরের বীভৎস দৃশ্য দেখে প্রধান উপদেষ্টাও বিস্মিত হয়েছেন। বলেছেন, আইয়্যামে জাহেলিয়াত বলে একটা কথা আছে না, গত সরকার আইয়্যামে জাহেলিয়াত প্রতিষ্ঠা করে গেছে। এটা (গোপন কারাগার) তার একটি নমুনা। প্রধান উপদেষ্টার অনুভূতি ব্যক্তের চেয়েও যেন ভয়াবহ চিত্র গোপন কারাগারগুলোতে, যা অধিক পরিচিতি পেয়েছে আয়নাঘর নামেই। দিনের পর দিন একেকজন বন্দি গুম থাকা অবস্থায় কীভাবে রোজনামচা লেখে বা তার সংকেত লিখে যায়, কীভাবে দিন গণনা করে, তার ধারণা মেলে গোপন কারাগারগুলোতে। বুধবার র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-১, র‌্যাব-২ ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বাহিনী (ডিজিএফআই) এর প্রধান কার্যালয় কচুক্ষেতে গিয়ে তিনটি আয়নাঘর পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ভুক্তভোগীদের কথা শুনেন। পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও আয়নাঘর পরিদর্শনে ছিলেন বর্তমান তথ্য ও সমপ্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ ভুক্তভোগী ও সাংবাদিকরা।

আগারগাঁও র‌্যাব-২ এর আয়নাঘরের দায়িত্বে ছিল ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি)। সেখানে একটি চেয়ার দেখে যেন থমকে যান সবাই। সেই চেয়ারে বসিয়ে ‘হাই ভ্যালু’ বন্দিদের ইলেকট্রিক শক দেয়ার বর্ণনা শোনেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যান্য উপদেষ্টা, ভুক্তভোগী ও দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা। র‌্যাব-২ এর আয়নাঘর পরিদর্শনে দেখা যায়, একটি স্টিলের চেয়ার। যেখানে ইলেট্রিক শকের সব ধরনের ব্যবস্থা। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা মতে, নির্যাতনের জন্যেই এই চেয়ার ব্যবহার করা হতো। বেশির ভাগ সময়েই ‘হাই ভ্যালু’ বন্দিদের ইলেক্ট্রিক শক দিতে ব্যবহার হতো এই চেয়ার। ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) ছিল এই আয়নাঘরের দায়িত্বে।

পরিদর্শনে নিজেদের বন্দি জীবনের বীভৎসতার কথাও মনে পড়েছে দুই উপদেষ্টা নাহিদ ও আসিফের। তাদেরকেও ৫ই আগস্টের আগে ওই গোপন বন্দিশালায় বন্দি রাখা হয়েছিল। তারা গোপন বন্দিশালার কোনো কক্ষে ছিলেন, নিজেরাই শনাক্ত করেছেন। জুলাই মাসে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নিয়েছিল তাদের। এরপর টর্চার সেলে (নির্যাতন কেন্দ্র) রাখা হয়। প্রধান উপদেষ্টার সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি আজ তার ফেসবুকে দেওয়া পৃথক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল বুধবার রাজধানীর তিনটি এলাকায় গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেছেন, যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত। সুচিস্মিতা তিথি ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে একটি কক্ষের কয়েকটি ছবি দিয়েছেন। একটি ছবিতে নাহিদ ইসলাম রয়েছেন। সুচিস্মিতা তিথি লিখেছেন, গত জুলাইয়ে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার পর ডিজিএফআই’র এই টর্চার সেলে রাখা হয়েছিল নাহিদ ইসলামকে। সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে কক্ষটি শনাক্ত করেন নাহিদ। এই কক্ষের একপাশে টয়লেট হিসেবে একটি বেসিনের মতো ছিল বলে জানান তিনি। ৫ই আগস্টের পর এই সেলগুলোর মাঝের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়, দেয়াল রং করা হয়। সুচিস্মিতা তিথি ফেসবুকে আরেকটি পোস্টে অপর একটি কক্ষের কয়েকটি ছবি দিয়েছেন। একটি ছবিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া রয়েছেন। সুচিস্মিতা তিথি লিখেছেন, গত জুলাইয়ে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার পর ডিজিএফআই’র এই টর্চারসেলে রাখা হয়েছিল আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে। পরিদর্শনে গিয়ে কক্ষটি চিনতে পেরেছেন তিনি। দেয়ালের ওপরের অংশের খোপগুলোতে এগজস্ট ফ্যান ছিল বলে জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসে ইন্টারোগেশন করা হয়েছে অনেক। যখন চোখ খোলা হয়েছিল, তখন এ রকম একটা রুম দেখেছি। যতক্ষণ রুমে থাকতাম, ততক্ষণ চোখ খোলা থাকতো, হাতকড়া খুলে দিতো। রুম থেকে বের করার সময় চোখ বাঁধতো, হাতকড়া বাঁধতো। এখানে ছিল একটা কাঠের দরজা, তার সামনে একটা লোহার দরজা ছিল। দরজার নিচ দিয়ে খাবার দিত। রুমে গোল গোল হলুদ লাইট ছিল। প্রচুর সাউন্ড হতো বাইরে। একটা পটের মতো ছিল, প্রস্রাব করতে হলে এখানেই করতে হতো। আদার্স লাগলে তারা ওয়াশরুমে নিয়ে যেত। কাঠের দরজা এবং সামনে বা পেছনে লোহার দরজা ছিল। নাহিদ আরও জানান, ওই কক্ষের একপাশে টয়লেট হিসেবে একটি বেসিনের মতো ছিল। ৫ই আগস্টের পর এই সেলগুলোর মাঝের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়, দেয়াল রঙ করা হয়।

ভুক্তভোগী প্রকৌশলী মাশরুর আনোয়ার চৌধুরী প্রধান উপদেষ্টাকে বলেন, ২০২০ সালে আমি ইন্টারকন্টিনেন্টালের প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করি। আমার নিজের ফেসবুক আইডিতে লেখালেখি করতাম। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে আসার প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে দুই লাইন লিখেছিলাম। পরেরদিন হাতিরঝিল এলাকা থেকে অফিসে আসার সময় আমাকে মাইক্রোবাসে করে তুলে আনে। আমাকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব-১১ এর গুম সেলে নিয়ে রাখা হয়। পরদিন আমাকে ঢাকার এই জায়গায় আনা হয়। তারপর লুঙ্গি ও টি-শার্ট পরিয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকতে বলে। আমি তখন চেষ্টা করছিলাম বুঝার জন্য কোথায় আছি। আমার সাত মাস ও দেড় বছরের দু’টি বাচ্চার কথা চিন্তা করছিলাম। আমি শিওর ছিলাম আমাকে মেরে ফেলা হবে। তখন আমার আশপাশে যাদেরকে আগে এনে রাখা হয়েছিল তারা আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। চিন্তা যেন না করি। এখানে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে দেখবেন। তখন অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাদের কেউ এক বছর, দেড় বছর, দুই বছর ধরে আয়নাঘরে ছিল। কারও সঙ্গে কথা বলা যেত না। আমাদের যোগাযোগটা ইশারায় হতো। যারা গুম করেছিল তারা আমাদের বলেছিল কেউ যেন কারও সঙ্গে কথা না বলি। তারা যখন আসতো তখন আমরা চুপ করে শুয়ে পড়তাম। পাশের রুমে একজন ছিল তাকে খুব বেশি মারধর করা হতো। সে যতক্ষন না কান্না না থামাতো ততক্ষণ তাকে মারধর করা হতো। জানতে পারি তাকে মারতে মারতে পাগল বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। ন্যাংটা দাঁড়িয়ে থাকতো। এভাবেই ১০দিন আমাকে আটকে রাখা হয়। পরে একদিন আমাকে ডেকে নেয়া হয়। আমি সেদিন ধরেই নিয়েছিলাম আমাকে মেরে ফেলা হবে। আমি তখন কালেমা ও দোয়া পড়ি। আমাকে গুম করার সময় আরও দুইজন প্রকৌশলীকে গুম করা হয়। তারা দু’জন শুধুমাত্র আমার সঙ্গে চলতো, চা খেত এজন্য গুম করা হয়। আমাদের যেদিন মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মিডিয়ার সামনে নেয়া হবে তার আগেরদিন আমাদেরকে নারায়ণগঞ্জে একটি হোটেলের সামনে নেয়া হয়। আমাদের সঙ্গে একজন হুজুর ছিলেন। তাকেও দুই সপ্তাহ আগে গুম করে র‌্যাব-১১ এর গুম সেলে রাখা হয়। পরেরদিন আমাদেরকে মিডিয়ার সামনে হাজির করা হয়। আমাদের নাকি নাশকতার পরিকল্পনার সময় হাতেনাতে ধরা হয়। তখন আমরা ৬ ডিজিটের  বেতনের চাকরি চলে যায়। সেই থেকে আমি অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ি। এখনও আমাকে হাজিরা দিতে হয় আদালতে।

আয়নাঘর নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, এ রকমই কোনো একটা ঘরে হয়তো আমার বাল্যবন্ধু সাজেদুল ইসলাম সুমনকে আটকে রাখা হয়েছিল। এইরকমই কোনো একটা ঘরে অজানা আশঙ্কায় সে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এইরকম একটা ঘরে বসেই হয়তো সে আল্লাহ্‌র দরবারে হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল- ‘আল্লাহ্‌, তুমি আমারে এই বারের জন্য বাঁচাইয়া দাও। আমি আর রাজনীতি টাজনীতি করবো না। আমার সন্তানের জন্য আমারে বাঁচাইয়া দাও। আমার মায়ের জন্য আমারে বাঁচাইয়া দাও। ফারুকী লেখেন, এ রকমই একেকটা ঘরে আমরা ১৭ কোটি মানুষ আটকা ছিলাম ১৬ বছর। আর গোপনে বলতাম, আল্লাহ্‌ এই ডাইনির হাত থেকে আমাদের বাঁচাইয়া দাও। সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা লেখেন, সুমনের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় উত্তরার এক হাসপাতালে লুকাইয়া থাকা অবস্থায়। ওর ভাগনে আবরারের একটা শ্যুট ছিল আমার সঙ্গে। স্পষ্ট মনে আছে ওর শেষ কথা, ‘দোস্ত, আবরাররে তুই ইজি কইরা নিস। নাইলে অ্যাকটিং খারাপ করবো। তিনি আরও লেখেন, এমনই এক জালিমের শাসনে ছিলাম যে তোর জন্য, সুমন, একটা কথাও বলতে পারি নাই। পরে জানলাম মানুষরুপী জানোয়ার জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তোরে ইনজেকশন দিয়ে মেরে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়। যে বাবার ঘরে ফিরে সন্তানের সঙ্গে ভাত খাওয়ার কথা ছিল তাকে এই ডাইনির দল শীতলক্ষ্যার মাছের খাবারে পরিণত করে। এই হায়েনাদের হয়ে যখন কেউ কথা বলতে আসে, আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমি আমার কমপোজার লুজ করি।

আয়নাঘর পরিদর্শনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গী হন ভারতীয় সাংবাদিকরাও। সেখানে ছিলেন ‘ইনস্ক্রিপ্টিডটমি’-এর সম্পাদক অর্ক দেব। আয়নাঘর পরিদর্শন শেষে অর্ক দেব সেখানকার একটি ইলেকট্রিক চেয়ারের ছবি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, ‘এই চেয়ারটা দেখে রাখা জরুরি। ফ্যাসিবাদের জননী শেখ হাসিনার আয়নাঘরের একটি কক্ষে রাখা এই চেয়ার (আগারগাঁও অঞ্চলে)। ‘হাই ভ্যালু’ বন্দিদের ইলেকট্রিক শক দিতে ব্যবহার হতো এই চেয়ার। ডিজিএফআই’র কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) এই আয়নাঘরের দায়িত্বে ছিল। সারাক্ষণ একজস্ট ফ্যান চলতো এই ঘরগুলোতে, ফ্যান বন্ধ হলেই কান্না আর গোঙানির শব্দ শুনতে পাওয়া যেত। আর কিছুক্ষণ। আজ থেকে গোটা বিশ্ব আয়নাঘরের সব ছবি দেখবে। অন্য এক পোস্টে অর্ক বলেন, এখানে বন্দি ছিলেন মাইকেল চাকমা। তিনি মাইকেল চাকমার বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, ‘প্রথম যে দু’টো রুম দেখা যাচ্ছে ঠিক এই রুমগুলোর মধ্যে ১১৩ নম্বর সেল যেটি একেবারে বাথরুমের পাশে এবং সেলের ভেতর ঢোকার সময় বাঁ সাইডের কোণায় একটি সিসি ক্যামেরা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। এই সেলে আমি প্রায় দুই বছর বন্দি ছিলাম। একই লাইনের ১১৭ নম্বর রুমে ছিলাম প্রায় দেড় বছরের একটু বেশি। নিচের রুমগুলোর মধ্যে ১০৪ নম্বর রুমে ছিলাম এক বছরের কাছাকাছি। ১০৪-এর পরে ১০৫ নম্বর সেল। এরপরে টয়লেট, বাথরুম ও চুল কাটার সেল। চুল কাটার সেল নম্বর ১০৬। এ ছাড়া আরও অনেক রুমে আমাকে রাখা হয়।
উল্লেখ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে ‘বিশেষ’ স্থানে রাখা হতো। এ নিয়ে সুইডেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এসব স্থান ‘আয়নাঘর’ নামে প্রকাশ্যে আসে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেকে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর আয়নাঘর থেকে ফিরে আসেন পরিবারের কাছে। তাদের বয়ানে উঠে এসেছে আয়নাঘরের ভয়াবহতা। 

mzamin

ক্ষমতা ধরে রাখতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন চালিয়েছিল বাংলাদেশের সাবেক সরকার: ভলকার তুর্ক

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, জনগণের বিরোধিতার মুখেও ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে বিক্ষোভ দমন করার কৌশল নিয়েছিল বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকার। এরই অংশ হিসেবে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার-আটক ও নির্যাতন চালানো হয়েছে। বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।

তুর্কের বক্তব্য তুলে ধরা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় থাকার জন্য বাংলাদেশের সাবেক সরকার  গত বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের সময় ক্রমাগত সহিংস পথ ব্যবহার করে পদ্ধতিগতভাবে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেছিল। আওয়ামী লীগের সহিংস কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পদ্ধতিগতভাবে সেসময় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত ছিল। মূলত জনবিরোধিতার মুখে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতেই একটি পরিকল্পিত এবং সুসমন্বিত কৌশল হিসেবে এমন নৃশংস পদক্ষেপ নিয়েছিল তারা। বিক্ষোভ দমন করার কৌশলের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে, তাদের সমন্বয় ও নির্দেশনায় শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক এবং নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে।

ভলকার তুর্ক বলেন, আমরা যে সাক্ষ্য এবং প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, তা ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং নিশানা করে হত্যার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। যা সবচেয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে পড়ে এবং যা আন্তর্জাতিক অপরাধের শামিল বলেও বিবেচিত হতে পারে। তাই এই জাতীয় ক্ষত সারাতে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাণহানির ঘটনাগুলো নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুরোধে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় গত সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল পাঠায়। ওই প্রতিনিধিদলে ছিলেন মানবাধিকারবিষয়ক তদন্তকারী, একজন ফরেনসিক চিকিৎসক এবং একজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ। অন্তর্বর্তী সরকার তদন্তকাজে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। যেখানে যেখানে প্রবেশাধিকার চাওয়া হয়েছে, সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে এবং যথেষ্ট নথিপত্র সরবরাহ করেছে। সেসব তথ্যের ভিত্তিতে গত ১লা জুলাই থেকে ১৫ই আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। যাদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ ছিল শিশু। ৪৪ জন বাংলাদেশ পুলিশ কর্মকর্তা। এছাড়াও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া গুলিতে বিদ্ধ হয়েছেন।

আর যখন সাবেক সরকার দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছিল, তখন সংঘটিত প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড এবং আওয়ামী লীগ কর্মী ও সমর্থক, পুলিশ, গণমাধ্যম কর্মীদের লক্ষ্য করে অন্যান্য গুরুতর প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সেগুলোও এ প্রতিবেদনে নথিভুক্ত করা হয়েছে। হিন্দু, আহমদিয়া মুসলিম এবং চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর আদিবাসী জনগণও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। অনেক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা এবং এসব গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের পরও অপরাধীরা এখনো দায়মুক্তি উপভোগ করছে। 

mzamin

মিস্টার হোসেনের এ কেমন ডিপ্লোমেসি? by মিজানুর রহমান

প্রত্যাশার পারদ ছিল তুঙ্গে। ব্যাপক সংস্কারের অঙ্গীকার ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। বিশেষত বাংলাদেশের বিদেশনীতি বাস্তবায়নের ফোকাল পয়েন্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি ছিল রক্তস্নাত অভ্যুত্থানের ফসল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন আপৎকালীন সরকারের। কিন্তু ৬ মাসে সংস্কার-পরিবর্তন দূরে থাক বরং এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে  সেগুনবাগিচায়। জেঁকে বসা সেই স্থিতাবস্থায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের ডিপ্লোমেসি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফরেন পলিসির বড় অংশ জুড়ে থাকা বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন এবং কোথায় যাচ্ছে তার কোনো নির্দেশনা নেই। বন্ধুপ্রতিম যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। বহুপক্ষীয় ডিপ্লোমেসির আঁতুড়ঘর নিউ ইয়র্ক, জেনেভা, ব্রাসেলসে বাংলাদেশ আছে কি নেই তা টের পাচ্ছেন না খোদ পেশাদাররা। নিউ ইর্য়কস্থ বাংলাদেশ মিশন আলোচনায় আসে নতুন দূত নিয়োগের প্রক্রিয়ায়। বহুপক্ষীয় কূটনীতির অভিজ্ঞতা নেই এমন একজনকে স্থায়ী প্রতিনিধি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত ধোপে টিকেনি। জেনেভা হেডলাইন হয় আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে বিমানবন্দরে হেনস্তার ঘটনায়। স্থায়ী মিশনের দু’জনের ইন্ধনে সুইজারল্যান্ড আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ ড. আসিফ নজরুলকে ঘিরে ধরে। তাৎক্ষণিক তদন্তে ঘটনার সঙ্গে জড়িত মিশনের দু’জনের নাম আসার পর তাদের একজনকে দ্রুত ঢাকায় ফেরত এবং অন্যজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ব্রাসেলসের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রদূতের পদটি খালি। ছ’মাসে হেডকোয়ার্টার এবং মিশনগুলোতে পরিবর্তন আনতে গিয়ে লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি করেছে মিস্টার হোসেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন।  মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনেককে ফেরত আনা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র সচিবের ন্যূনতম কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। যদিও তিনি ছাত্র-জনতার ঝরানো রক্তের সিঁড়ি বেয়েই সচিব পদে আসীন হয়েছেন।

এটা সবার জানা, পতিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল। সেই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় সচিব উপদেষ্টার সঙ্গে ‘সহমত’কেই শ্রেয় মনে করছেন। এ বিষয়ে উভয়ের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন কবরের শান্তি বিরাজমান। বক্তৃতা-বিবৃতি তথা মিডিয়ায় উপদেষ্টা, সচিব আর মুখপাত্রের উপর্যুপরি ব্রিফিংয়ের বাইরে থেকে মনে হতে পারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন সক্রিয়।

বাস্তবে ঠিক উল্টো। কতিপয় ঘটনা, দুর্ঘটনা নিয়ে সরব থাকার চেষ্টা ছাড়া ফরেন পলিসিতে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ বা পরিকল্পনা নেই। অভ্যন্তরীণ বদলি-পদোন্নতি নিয়ে পেশাদারদের মাঝে অন্তহীন ক্ষোভ বিরাজমান। অভিযোগ উঠছে রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, মিশন প্রধান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে পতিত সরকারের পদাঙ্কই অনুসরণ করছে বর্তমান সরকার। ফলে হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগীরাই ঘুরে ফিরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাচ্ছেন কিংবা বহাল রয়েছেন। প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উপদেষ্টা আর নতুন পররাষ্ট্র সচিব নিয়োগ ছাড়া সেগুনবাগিচায় কার্যত কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, মিশন প্রধান বা উপ-প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ পদে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদের নিয়োগ অনুমোদন করে গেছেন অন্তর্বর্তী সরকারে তার সিকি পরিমাণ পরিবর্তন করেনি। এমনকি বিষয়টি রিভিউ করারও প্রয়োজন মনে করেনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, হাসিনা আমলে মিশনগুলোতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার চুরি হয়েছে। দুর্নীতি, নারী নির্যাতন আর বঞ্চনার কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। মোমেন-শাহরিয়ার জমানায় সাইবারের মতো স্পর্শকাতর কমিউনিকেশন লিক হয়েছে, যা দেশের জাতীয় নিরাপত্তায় দীর্ঘ মেয়াদে হুমকি তৈরি করেছে। কিন্তু ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন প্রভাবশালীরা এতে অনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। ফলে তদন্ত ফাইল পর্যন্ত গায়েব করে দেয়া হয়। উপদেষ্টা হওয়ার আগে থেকেই তৌহিদ হোসেন এসব ঘটনার বিষয়ে অবহিত। এক সময় তিনি নিজেও এসবের প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন। উপদেষ্টার চেয়ারে আসীন হওয়ার পর তিনি নতুন করে সব জেনেছেন। তাকে ব্রিফ করেছেন কর্মকর্তারা। মিশনগুলোতে চুরি, দুর্নীতি তথা পেশাদারদের অপেশাদারি আচরণের সবক’টি ঘটনা তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে অভ্যুত্থানে যুক্ত ছাত্র-জনতাকে ‘সন্ত্রাসী’ এবং ‘জঙ্গি’ বলে দুনিয়াতে প্রচার করা কূটনীতিকদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রতিশ্রুতি ছিল তার। কিন্তু না, ৬ মাসে তিনি হয় তার আগের অঙ্গীকার ভুলে গেছেন কিংবা অপরাধীদের নীরবে ‘ক্ষমা’ করে দেয়ার নীতি নিয়েছেন! হাসিনা আমলে সংঘটিত কোনো অপরাধের বিচার তো দূরের কথা, একটি ঘটনার তদন্ত ফাইলও খুলতে পারেননি তিনি। বরং ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে এবং শেখ হাসিনা সরকারকে রক্ষায় পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়ে ‘অ্যাক্টিভিস্ট’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া কিছু কর্মকর্তাকে নানাভাবে পুরস্কৃত করেছেন উপদেষ্টা মিস্টার হোসেন।

ছয় মাসের তৎপরতা এবং:
শুরুর দিনগুলোতে অনেকটা হানিমুন মুডেই কাটিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। একান্ত ব্যক্তিগত তথা পারিবারিক সফরে কিছু সময় কাটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহ গেছে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রস্তুতিতে। ওই অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রধান উপদেষ্টা। পররাষ্ট্র উপদেষ্টাও ব্যস্ত সময় কাটান নিউ ইয়র্কে। অধিবেশনের সাইড লাইনে একটি  বৈঠক ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। সেটি হলো ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক। খবরে প্রকাশ, ওই বৈঠকে মোটাদাগে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি আলোচনা এবং সম্পর্ক এগিয়ে নিতে উভয়ের মধ্যে ঐকমত্য হয়। উপদেষ্টার ৬ মাসে ৬টি সফর করেছেন। যার ৫টিই বহুপক্ষীয় কর্মসূচি উপলক্ষে। নিউ ইয়র্কের পর ক্যামেরুন, সামওয়া, কুয়েত, পর্তুগাল সফর করেন তিনি। অবশ্য গত ২০ থেকে ২৪শে জানুয়ারি  ছিল তার চীনে দ্বিপক্ষীয় সফর। সেই সফরে চিকিৎসার জন্য ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনকে গড়ে তোলার প্রস্তাব নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। দেশে চীনের হাসপাতাল নির্মাণে পূর্বাচলে জায়গা দিতে সম্মত হয় সরকার। কলকাতার বিপরীতে ‘কুনমিংকে বাংলাদেশিদের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা বিশেষত: ২/৩টি হাসপাতাল সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয় উভয় পক্ষ। সে ক্ষেত্রে ভিসাসহ অন্যান্য বিষয় সহজ করার তাগিদ দেয়া হয় ঢাকার তরফে।

সেই আলোচনায় তিস্তা এমওইউ নবায়নে আরও নতুন দু’টি পয়েন্ট যুক্ত করার বিষয়ে সম্মত হয় দুই পক্ষ। তাছাড়া চীনা ঋণের সুদহার ৩ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং পরিশোধের সময়সীমা ২০ থেকে ৩০ বছর করার বাংলাদেশি অনুরোধকে বেইজিং ইতিবাচকভাবে বিবেচনায় নিয়েছে। বৈঠকে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যবসা, বাণিজ্য ও অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা করেন উপদেষ্টা। তিনি ব্রহ্মপুত্রের উজানে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানান।

বারবার সিদ্ধান্ত বদল:  আগের সরকারের আমলে মনোনয়ন পাওয়া কোনো রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের মনোনয়ন পরিবর্তন করেননি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তবে তার আমলে যে ক’জন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ হয়েছে তার মধ্যে অন্তত দু’জনের মনোনয়ন পরিবর্তন হয়েছে। একটি মস্কো, অন্যটি বাগদাদ। এক মাসের ব্যবধানে দু’টি স্টেশনে ৪ জন রাষ্ট্রদূতের নাম প্রস্তাবে বাংলাদেশ সরকারের দুর্বলতা তথা ‘ইনকনসিসটেন্সি’ প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করেন পেশাদাররা। তবে ওয়ারশতে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রদূতের এগ্রিমো আসার পরও ছাত্র-আন্দোলনে বিরোধিতার অভিযোগে আচমকা নিয়োগটি বাতিল হওয়ার বিষয়টি সরকারকে বিপাকে ফেলে। এসব স্পর্শকাতর নিয়োগের বিষয়টি আরও যাচাই-বাছাইপূর্বক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ কেউ।

mzamin

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন হাজারো অভিবাসী বাবা-মা

নেহা সতপুতে এবং অক্ষয় পিসা তাদের প্রথম সন্তানকে স্বাগত জানানোর সব প্রস্তুতি সেরে রেখেছেন। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এই ভারতীয় দম্পতি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এইচ-১ বি ভিসাতে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। একটা বড় প্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করেন এই দম্পতি। নতুন অভিভাবকদের জন্য ছুটির নীতি রয়েছে ওই প্রযুক্তি সংস্থায়, সেই সমস্ত কিছুকে মাথায় রেখেই ধীরে ধীরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসেতে নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছিলেন তারা। আগামী ২৬শে ফেব্রুয়ারি তাদের আসন্ন পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার কথা। তাদের আশা ছিল মার্কিন নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করবে তাদের প্রথম সন্তান। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নির্বাহী আদেশ তাদের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের (যুক্তরাষ্ট্রে) জন্মানো সন্তানদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব না দেয়ার বিষয়ে তিনি আইন করতে চান।এতদিন বাবা-মায়ের অভিবাসন স্ট্যাটাস যাই থাকুক না কেন, তাদের সন্তানদের জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব দেয়া হতো। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প যে পরিবর্তন আনতে চান, সেই সংক্রান্ত মামলায় প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দিয়েছিল সিয়াটল আদালত।

সেই মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়ে  ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে আপাতত আটকে দিয়েছেন মেরিল্যান্ডের একজন ফেডারেল বিচারক। এর অর্থ হলো আদালতে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই বিধি কার্যকর করা যাবে না। যদিও উচ্চতর আদালত যে কোনও সিদ্ধান্তকে বদলে দিতে পারে এবং এক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। এই বিষয় সংক্রান্ত একাধিক মামলা এবং আইনি চ্যালেঞ্জ, অক্ষয় পিসা এবং তার স্ত্রী নেহার মতো হাজার হাজার মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে অক্ষয়  পিসা বলেন, এর সরাসরি প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছে। যদি এই বিধি কার্যকর হয়, তাহলে আমরা জানি না এর পরে কী হবে- এটা সম্পূর্ণ ধোঁয়াশার মতো একটা ব্যাপার।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসী যারা খুব শিগগিরই অভিভাবক হতে চলেছেন, তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন বিধি চালু হলে তাদের সন্তানের নাগরিকত্ব  কী হবে? তাদের উদ্বেগ বৈধ, নিউইয়র্ক-ভিত্তিক অভিবাসন অ্যাটর্নি সাইরাস মেহতা বলেছেন, ‘মার্কিন আইনে এখানে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিকে অ-অভিবাসী মর্যাদা দেওয়ার কোনও বিধান নেই।’

সন্তান জন্মের নির্ধারিত তারিখ যতই এগিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগ বাড়ছে নেতা -অক্ষয়ের মতো হবু বাবা -মায়েদের । আসন্ন সন্তানকে নির্ধারিত সময়ের আগেই সি-সেকশনের মাধ্যমে প্রসবের বিষয়ে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শও করেছেন নেহা এবং অক্ষয়ের মতো অনেকেই। চিকিৎসকদের মতে, যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে তবে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা ৪০ তম সপ্তাহে সন্তান জন্ম দিতে পারেন। যদিও অক্ষয় বলেছেন, ‘আমার অগ্রাধিকার সন্তান যাতে নিরাপদে ভূমিষ্ট হতে পারে এবং আমার স্ত্রীর স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। নাগরিকত্ব দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।’ হবু মা নেহা সতপুতে বলেছেন, ‘আমি চাই প্রাকৃতিক নিয়মেই সমস্ত কিছু চলুক।’

আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অফ ফিজিশিয়ানস অফ ইন্ডিয়ান অরিজিন (এএপিআই) এর সভাপতি ডাঃ সতীশ কাথুলা, প্রাথমিকভাবে সি-সেকশন চাইছে এমন পরিবারগুলোর প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি জানিয়েছেন, নিউ জার্সিতে কয়েকটা ঘটনা ছাড়া বেশিরভাগ চিকিৎসকই এ জাতীয় কোনও বিষয়ের কথা তাকে জানাননি। ওহাইও-ভিত্তিক ডা. সতীশ কাঠুলা বলেছেন, ‘এমন এক দেশে যেখানে কঠোর চিকিৎসা আইন রয়েছে, সেখানে শুধু নাগরিকত্বের জন্য নির্ধারিত সময়ের আগে সি-সেকশন করার বিরুদ্ধে আমি। আমাদের চিকিৎসকরা নীতিবান। চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজন না হলে, তারা কোনোভাবেই তা (সন্তান প্রসবের জন্য অস্ত্রোপচার) করবেন না।’

মার্কিন নাগরিকত্ব অত্যন্ত লোভনীয়, বিশেষ করে দক্ষ H-1B ভিসাধারীদের কাছে। ভারতীয়রা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় বৃহত্তম অভিবাসী গোষ্ঠী। একটি জন্মগত নাগরিকত্ব আদেশ ভারতীয়দের কঠোরভাবে আঘাত করবে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫ মিলিয়নেরও বেশি ভারতীয়দের অ-অভিবাসী ভিসা রয়েছে।

দক্ষিণ এশীয় অভিভাবকরা ট্রাম্পের অর্ডারের প্রভাব এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে উদ্বেগ নিয়ে অনলাইন গোষ্ঠীগুলির কাছে নিরন্তর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে যে, এটি বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাদের সন্তানদের মার্কিন নাগরিকত্বের ডকুমেন্টেশন পাওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে  না। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়রা বৈধভাবে স্থায়ী বসবাসের জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন দীর্ঘদিন ধরে। অভিবাসন নীতি বিশ্লেষক স্নেহা পুরী এই বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, জন্মগত নাগরিকত্বের বিরুদ্ধে বিধি নিষেধ ভারতীয়দের জন্য বেশ সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ লক্ষেরও বেশি ভারতীয়ের নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাতে (অ-অভিবাসী ভিসায়) রয়েছেন। প্রতি বছর, এইচ-১বি ভিসার ৭২ শতাংশ পেয়ে থাকেন ভারতীয়রা। কেটো ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে গ্রিন কার্ডের জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ৬২ শতাংশই ভারতীয়। বর্তমানে যারা কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড পেয়েছেন, সেই ভারতীয়রা ২০১২ সালে এর জন্য আবেদন করেছিলেন। কেটোর ইমিগ্রেশন স্টাডিজের পরিচালক ডেভিড বিয়ারওয়ার্ন জানাচ্ছেন, নতুন ভারতীয় আবেদনকারীদের আজীবন অপেক্ষা করতে হবে। গ্রিন কার্ড পাওয়ার আগেই চার লক্ষ আবেদনকারীর মৃত্যু হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।  

প্রসঙ্গত, পিউ রিসার্চ এর তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭২৫,০০০ কাগজপত্র ছাড়া ভারতীয় অভিবাসী রয়েছে, যা তাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নথিপত্রহীন অভিবাসী গোষ্ঠীর তালিকায় তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠীতে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে, মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের হিসাব আবার ভিন্ন। এই প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, এই সংখ্যা তিন লাখ ৭৫ হাজার এবং কাগজ ছাড়া অভিবাসী গোষ্ঠীর তালিকায় ভারতের স্থান পঞ্চম। মার্কিন জনসংখ্যার তিন শতাংশ নথিপত্রহীন অভিবাসী মানুষ। তারাই ভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন এমন জনসংখ্যার ২২ শতাংশ।

এইচ-১বি বা 'ও' ভিসায় থাকা ভারতীয়দের প্রধান উদ্বেগের বিষয় তাদের সন্তানদের জীবনযাত্রার মান। বিদেশে মার্কিন দূতাবাসে ভিসা স্ট্যাম্প লাগানোর জন্য পর্যায়ক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হয় এই ক্যাটাগরির ভিসায় থাকা ব্যক্তিদের। ভিসা স্ট্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাদের নির্দিষ্ট সময়ে ভারতে আসতে হয়, তাদের প্রায়শই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে দেরি হয়। যারা এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, সেই অভিবাসীরা চান না যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মানো তাদের সন্তানদেরও একই আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতির সম্মুখীন হতে হোক। বেশ কয়েক বছর ধরে গ্রিন কার্ডের আবেদনকারী হিসাবে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে অক্ষয় পিসাকে। তিনি জানেন মার্কিন নাগরিকত্ব জীবনকে কতটা সহজ করে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক চিকিৎসক ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জানিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দক্ষ বিদেশি কর্মীরা কী ভূমিকা পালন করেন। ডা. কাঠুলা বলেছেন, ‘উত্তর ও দক্ষিণ ডাকোটার মতো গ্রামীণ অঞ্চলে ভারতীয় চিকিৎসকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা না থাকলে স্বাস্থ্যসেবায় এর প্রভাব পড়বে । এখন তারাই নিজেদের সংসার নিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন।’

সান জোসের বাসিন্দা প্রিয়ংশি জাজুর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার কথা এপ্রিলে। সম্ভাব্য পরিবর্তন  নিয়ে তিনিও দ্বিধায় রয়েছেন । তিনি বলছেন, পাসপোর্টের জন্য আমাদের কি ভারতীয় কনস্যুলেটের সাথে যোগাযোগ করতে হবে? কোন ভিসা প্রযোজ্য? অনলাইনে কোনও তথ্য নেই।'

নেহার কথায় ‘গর্ভাবস্থা এমনিতেই যথেষ্ট স্ট্রেসের। আমরা ভেবেছিলাম, এক দশক পর বিষয়টা হয়তো সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন তা আরো জটিল আকার ধারণ করেছে।’

তার স্বামী অক্ষয় যোগ করেছেন, ‘ট্যাক্স প্রদানকারী অভিবাসী হিসাবে, আমাদের শিশু  মার্কিন নাগরিকত্ব পাবার  যোগ্য - এটিই ছিল  আইন তাই না?’

সূত্র : বিবিসি

mzamin

ভারতে গরুকে ‘রাষ্ট্রমাতা’ ঘোষণার দাবি, সরকারকে ৩৩ দিনের আলটিমেটাম

গরুকে ‘রাষ্ট্রমাতা’ ঘোষণা করা হোক। এমনই দাবি জানিয়ে এবার ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়ে দিলেন উত্তরাখণ্ডের শঙ্করাচার্য স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী। ৩৩ দিনের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ১৭ মার্চের মধ্যে সরকার যদি এই ঘোষণা না করে, তাহলে বড়সড় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। হিন্দু সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি গরুকে ‘রাষ্ট্রমাতা’ ঘোষণা করা হোক।

তবে এতদিন এই দাবিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। যার জেরে রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলন করেন শঙ্করাচার্য। বলেন, ‘আগামী ১৭ মার্চ পর্যন্ত কেন্দ্রকে সময় দিলাম। এর মধ্যে গোমাতাকে রাষ্ট্রমাতা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। তা যদি না করা হয়, তাহলে দিল্লির রামলীলা ময়দানে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গো প্রতিষ্ঠা নির্ণায়ক দিবস আয়োজন করা হবে। সেখান থেকেই এই দাবিতে আমরা আন্দোলনে নামব। পরবর্তী রণকৌশল এখান থেকেই ঠিক করা হবে।’

শঙ্করাচার্যর কথায়, শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে একটি গরুর শরীরে ৩৩ কোটি দেব-দেবী বাস করেন। আমরা গত দেড় বছর ধরে গরুকে 'রাষ্ট্রমাতা' হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আন্দোলন চালিয়ে আসছি। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারের উচিত গরুকে পশু হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ না করে ‘রাষ্ট্রমাতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর গোপাল মণির নামক ধর্মীয় সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল ‘গো-ক্রান্তি মঞ্চ’। সেখানে চার শঙ্করাচার্য পীঠের সমর্থনে শুরু হয় এই আন্দোলন। ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে তিনটি গো সংসদ আয়োজিত হয়েছে। ২০২৪ সালে গোবর্ধন থেকে দিল্লি পর্যন্ত এই ইস্যুতে পদযাত্রাও করেন একাধিক হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা। যদিও সরকারের তরফে এই বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি। এবার আদাজল খেয়ে, ময়দানে নেমেছেন শঙ্করাচার্য স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী।  

তিনি বলেছেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের দাবি হলো গরুকে পশুর শ্রেণী থেকে বাদ দিয়ে 'রাষ্ট্রমাতা' ঘোষণা করা উচিত এবং গোহত্যাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত। রাজ্য সরকার স্কুল পাঠ্যক্রমে গরুকে অন্তর্ভুক্ত করতে চলেছে। কিন্তু সেখানেও যদি গরুকে পশু বলা হয়, তাহলে  লাভ কী?'

সূত্র : ইকোনোমিক টাইমস

mzamin