Wednesday, March 27, 2019

জাপায় কেন এই অস্থিরতা? by হাফিজ মুহাম্মদ

অস্থিরতা, নয়া মেরুকরণ জাতীয় পার্টিতে নতুন কিছু নয়। এই অস্থিরতা আর মেরুকরণের চাবিও সব সময় একজনেরই হাতে। তিনি পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এরশাদ একাই  সিদ্ধান্ত দেন। একাই আবার প্রত্যাহার করেন। অন্য নেতারা হয় দর্শক আর না হয় সমর্থক। দলটির সিনিয়র নেতারা বলছেন, পার্টি চেয়ারম্যানের একক কর্তৃত্বের কারণেই নিয়মিত অস্থিরতা লেগে আছে জাতীয় পার্টিতে। আর এই অস্থিরতা ও মেরুকরণে ক্রমেই ম্রিয়মাণ হচ্ছে সাবেক স্বৈরশাসকের হাতে গড়া দলটি।
গুরুতর অসুস্থতার সময় নিজের ভাইকে উল্টরসূরি নিয়োগ ও পরে জাতীয় সংসদের উপনেতা করায় দলের অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন।
আবার কেউ কেউ ছিলেন ক্ষুব্ধ। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে এরশাদের নতুন সিদ্ধান্ত নতুন করে ক্ষোভ আর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে নেতাকর্মীদের মাঝে। তার সিদ্ধান্তে ফের স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পার্টিতে থাকা বিভক্তি। নেতারা বলছেন, এখন মূলত তিনটি ধারায় চলছে জাতীয় পার্টি, একটি পক্ষ অতিমাত্রায় সরকার ঘেঁষা। অন্য একটি পক্ষ সরকার বিরোধী। মধ্যপন্থা নিয়ে আছেন পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ। তিন পক্ষের নেতারাই সুযোগ-সুবিধার জন্য এরশাদকে সময় সময় ব্যবহার করছেন। সূত্র বলছে, পার্টির বাইরে থেকেও একটি পক্ষ পার্টির নিয়ন্ত্রণে ছড়ি ঘোরাচ্ছে।
কেউ কেউ বলছেন, পার্টির আসল নিয়ন্ত্রণ এখন বাইরে থেকেই হচ্ছে। এ কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে অবিশ্বাস ও হতাশা বাড়ছে। একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে প্রশ্ন সবারই একটা। কি হতে যাচ্ছে জাপায়? কেন এই অস্থিরতা। গত কয়েকদিন ধরে পার্টি অফিসেও সিনিয়র নেতারা আসছেন না। কর্মীদের আনাগোনাও কম। সর্বশেষ বুধবার এরশাদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে জাপার প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন। এর দু’দিন পরেই ছোট ভাই জিএম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ায় হতবাক অনেকে। আর শনিবার সংসদের বিরোধী দলের উপনেতা পদ থেকেও ছোট ভাইকে সরিয়ে দেন এরশাদ। তার স্থলে উপনেতা করা হয় স্ত্রী রওশনকে। একটি পক্ষ এতে খুশি হলেও অন্য পক্ষ ক্ষুব্ধ। খুশি হওয়া নেতাকর্মীরা রওশনের বাসায় ফুল নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেও ভিড় করছেন।
এছাড়া চলমান উপজেলা নির্বাচন নিয়েও পার্টিতে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। পার্টিতে অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে সিনিয়র নেতাদের সম্পর্কে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল উপজেলা নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারছে না। অনেক উপজেলায় তারা প্রার্থীও দিতে পারেনি। এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পর জাপার প্রার্থী সাফিন আহমেদ জাপা থেকে অসহযোগিতার অভিযোগ এনেছিলেন।
পার্টি সূত্র বলছে, জিএম কাদেরের অপসারণের পেছনে কয়েকজন সিনিয়র নেতার নেপথ্য ভূমিকা থাকতে পারে। সার্বিক বিষয়ে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আখতার মানবজমিনকে বলেন, আমার রাজনীতিতে আর হারানোর কিছু বাকি নেই। তাই ভয়ের কিছুও নেই। অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম কিন্তু সখ মিটে গেছে। বাংলাদেশে সুস্থ রাজনীতি বলতে কিছু চলছে না। আমরা তো স্বাধীনভাবে রাজনীতি করছি না। জিএম কাদেরের অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সহকারীর কারণে তার ক্ষতি হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে পার্টিতে যোগ দিয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়া লে. জে. অব. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে জাপার সিনিয়র থেকে জুনিয়র সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। তিনি ঠিক কি কারণে জাপায় এসেছেন তা বুঝে উঠছেন না নেতাকর্মীরা। সামনে তিনি আরো গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন বলে আলোচনা আছে। জিএম কাদেরের অপসারণের বিষয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, পুরো ঘটনাটা কীভাবে হয়েছে তা আমি কিছুই জানি না। কীভাবে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হলো তাও জানি না। জাপায় যোগ দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান আমাকে অনেক দিন ধরেই পার্টিতে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন তার কাছে সিনিয়র একজন জেনারেল থাকুক। এ ব্যাপারে কথা-বার্তা চলছিল। এরপরে আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ইতিবাচক ইঙ্গিত পেলাম তাই জাপায় যোগ দিয়েছি। সিনিয়রিটির অবস্থানের কারণেই আমাকে সম্মানজনকভাবে নিয়েছে এটাই স্বাভাবিক। তাই হয়তো অনেকে তা ভালোভাবে নিতে পারেননি।
পার্টি একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কো-চেয়ারম্যান ও সংসদ উপনেতার পদ থেকে জিএম কাদেরকে সরিয়ে দেয়ার পর এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নয়া মেরুকরণে নতুন কারা কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন এবং কারা বাদ পড়ছেন এ নিয়ে এক ধরনের কৌতূহল রয়েছে। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের অবস্থান নিয়েও নেতকর্মীদের মধ্যে আছে নানা প্রশ্ন। জাপার তৃণমলের নেতাকর্মীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এরশাদের অবর্তমানে দলের উত্তরসূরি হবে কে? এরশাদ ছাড়া অন্য কারও নেতৃত্বে ঠিকতে পারবে কি এক সময়ে দেশ শাসন করা দলটি।

নীরব মোদির সংগৃহীত চিত্রকর্ম নিলামে

গত সপ্তাহে বৃটেনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতের ডায়মন্ড ব্যবসায়ী, বিলিয়নিয়ার নীরব মোদিকে। তার স্বর্ণালঙ্কার উঠেছে প্রিয়াংকা চোপড়া, নিক জোনাসের মতো তারকাদের হাতেও। দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়ােিতর অভিযোগে তাকে ফেরত চাইছে ভারত। অভিযোগ আছে, নীরব মোদি ২০০ কোটি ডলারের জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত। এরপর তিনি নিরুদ্দেশ ছিলেন। পরে তাকে বৃটেনে দেখা যায়। সেখানেই গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাকে। এই নীরব মোদির দখলে আছে ৬৮টি বিরল আর্ট বা অঙ্কনচিত্র।
এগুলো মুম্বইতে নিলামে উঠার কথা মঙ্গলবার। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এই নিলামের মাধ্যমে তারা ৪৪ লাখ থেকে ৭৩ লাখ ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
নীরব মোদির সংগ্রহে রয়েছে ভারতের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রাজা রবি বর্মা, ভাসুদেও এস গাইতোনদের মতো শিল্পীর আঁকা বিরল সব শিল্পকর্ম। নিলামকারীরা আশা করছেন, ভাসুদেব এস গাইতোনদের আঁকা ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত বিমূর্ত চিত্র হবে এই নিলামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এর মধ্যে ‘আনটাইটেলড’ শিরোনামের একটি চিত্রকর্ম ২০১৫ সালে মুম্বইয়ে ৪৪ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। এর ফলে ওই চিত্রকর্মটি ভারতের সবচেয়ে দামী চিত্রকর্মে পরিণত হয়। এ ছাড়া নিলামকারীরা মনে করছেন রাজা রবি বর্মার একটি চিত্রকর্মের দাম উঠে যেতে পারে ২৫ লাখ ডলার।
উল্লেখ্য, ভারতের রাষ্ট্র পরিচালিত দ্বিতীয় বৃহৎ ব্যাংক পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (পিএনবি) অভিযোগ করেছে যে, ২০০ কোটি ডলার জালিয়াতিচক্রে জড়িতদের অন্যতম নীরব মোদি। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি ২০১৮ সালের শুরুতে ভারত থেকে পালিয়ে যান। তারপর আয়কর বিভাগ তার বেশ কিছু সম্পত্তি জব্দ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল কিছু সম্পত্তি এবং ১৭০টি দামী অঙ্কনশিল্প।
কোনো অন্যায় তিনি করেন নি বলে এর আগে দাবি করেন নীরব মোদি। লন্ডন পুলিশ বলেছে, গত সপ্তাহের মঙ্গলবারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার জামিন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ২৯ শে মার্চ পর্যন্ত তাকে রিমান্ডে দেয়া হয়েছে।
কে এই নীরব মোদি?
ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম নীরব মোদি। ফরবিস ম্যাগাজিনের হিসাবে, তার সম্পদের পরিমাণ ১৭৫ কোটি ডলার। ডায়মন্ড ব্যবসা করে এমন একটি বংশে তার জন্ম। তবে নিজের ব্যবসা শুরু করে সে ২০১০ সালে। খুব দ্রুততার সঙ্গে তার এই ব্যবসার ব্রান্ড বিস্তার লাভ করে। শিগগিরই তিনি ভারতজুড়ে তার দোকান ছড়িয়ে দেন। এমন কি নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও হংকংয়েও তিনি ব্যবসা শুরু করেন। তার ডিজাইনের ডায়মন্ড পরেছেন ‘টাইটানিক’ নায়িকা কেট উইন্সলেট, রোজি হান্টিংটন-হোয়াইটলি ও নাওমি ওয়াটসের মতো নায়িকারা।

কতটুকু ‘বিরোধী দল’ হতে পেরেছে জাতীয় পার্টি by আদিত্য রিমন

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই মেয়াদে সংসদে বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত আসনে বসছেন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা। তবে বিরোধী দল হিসেবে তারা কতটা ভূমিকা পালন করতে পারছেন তা নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে দলটির ভেতরে-বাইরে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত সংসদে একইসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ ও বিরোধী দলে থেকে জাতীয় পার্টি ছিল ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল। আর এবার মন্ত্রিপরিষদের বাইরে থেকে তারা পালন করছে ‘ফরমায়েশি’ বিরোধী দলের ভূমিকা।
জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, এবার মহাজোটের শরিক দল হিসেবে নির্বাচন করেও সরকারের ইচ্ছায় জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসেছে। শুধু তা-ই নয়, জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ অনেক সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে সরকারি দলের ইচ্ছায়। তাদের মতে, এর বড় উদাহরণ হলো সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত জিএম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যানের পদ ও সংসদে বিরোধী দলের উপনেতার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া। তার জায়গায় আনা হয়েছে সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত রওশন এরশাদকে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক-দুই মাসের কর্মকাণ্ড দিয়ে তো কাউকে মাপা যাবে না। তবে আমরা সংসদে সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে কথা বলা শুরু করেছি। মাঠে হয়তো সেভাবে কোনও কর্মসূচি ছিল না।’ এক প্রশ্নের জবাবে রাঙ্গা বলেন, ‘দলে কে সরকারপন্থী আর কে কোন নেতার অনুসারী এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। আমি জাতীয় পার্টির লোক এটাই সত্য।’
দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবারের সংসদে তো জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের আসনে বসার কথা ছিল না। সরকারের ইচ্ছায় সংসদীয় রাজনীতি ব্যালেন্স করার জন্য আমরা বিরোধী দল হয়েছি। এছাড়া বিরোধী নেতা ও পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দীর্ঘদিন অসুস্থ। যার ফলে বিরোধী দল হিসেবে আমরা কোন বিষয়ে কথা বলবো আর কোন বিষয়ে বলবো না সেটা নির্ধারিত নয়। কিন্তু এবার আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি বিরোধী দল হওয়ার।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি দলের চেয়েও বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি অনেক বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সরকারের ভুল-ক্রটি ধরিয়ে দিয়ে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সংসদীয় কমিটিগুলোকে সক্রিয় করে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, বিভিন্ন দুযোর্গ ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে কথা বলা বা মূলতবী প্রস্তাব এনে আলোচনা করা। কিন্তু তার কোনও কিছুই করতে পারেনি বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টি। বিরোধী দল বা মন্ত্রিপরিষদে তাদের থাকা না থাকা নির্ভর করে সরকারি দলের ইচ্ছার ওপর। ফলে জাতীয় পাটি হচ্ছে ফরমায়েশি বিরোধী দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি কোনোভাবেই বিরোধী দল নয়। তারা হচ্ছে গৃহপালিত বিরোধী দল। আর দলটির নেতৃত্বের ওপর আমাদের কোনও আস্থা নেই। কারণ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করলেন, তখন তার নিজের পদের নাম নিয়েছিলেন সিএমএলএ। অর্থাৎ চিফ মার্শাল ল’এডমিনিস্ট্রেটর। তো ’৮২ সাল থেকে তার যে স্বভাব ছিল তা বজায় রেখেছেন। কাজেই এই দলের কোনও ভবিষ্যত দেখছি না। তারা তো বর্তমানে বিরোধী দল নয়, ভবিষ্যতেও হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখছি না।’
নির্বাচন বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিরোধী দলের মূল কাজ হলো- সরকারের সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সংসদীয় কমিটিগুলোকে সক্রিয় করে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। কিন্তু তারা তো তার কিছুই করে নাই। যেমন চকবাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটা পাবলিক হেয়ারিং বা মূলতবী প্রস্তাব এনে সংসদে এটা নিয়ে একদিন আলোচনা করা দরকার ছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টি তো কিছুই করে নাই। আসলে তারা একটা ফরমায়েশি বিরোধী দল।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা তো বিরোধী দল হতে চায় না, তারা সরকারের মন্ত্রিত্ব চায়। তারা বিরোধী দল হিসেবে মনে করে সরকারের সঙ্গে মিলেমিশে শান্তির সঙ্গে থাকবেন। সরকার থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে খাবেন। এটা কীভাবে বিরোধী দল হয়?’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলটির নেতারা বলছেন, বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হলে আগে দলকে সুসংগঠিত করতে হবে। সকালে এক সিদ্ধান্ত, বিকালে আরেক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন তো দূরের কথা, দলও ঠিক রাখা যাবে না। দলের অভ্যন্তরে একাধিক গ্রুপ রয়েছে। কেউ এরশাদপন্থী, কেউ রওশনপন্থী, কেউ আবার সুযোগ সন্ধানী। আবার দলের মধ্যে কার কী রোল হবে সেটাও ঠিক নেই। ফলে ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে এরশাদকে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পার্টির চেয়ারম্যান বা সভাপতির একক ক্ষমতা দেওয়া আছে। তার মতামতের ওপর ভিত্তি করে দলের অন্য সবাইকে চলতে হয়, কথা বলতে হয় এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অর্থাৎ দলগুলোর মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলার অভাব থাকে। আমাদের দলের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের মতামতের বাইরে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ফলে দলের ভালমন্দ নির্ভর করে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের ওপর।’ 
এ ব্যাপারে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এরশাদের অবর্তমানে এই দলের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। কারণ বিভিন্ন দলছুট সুবিধাভোগী লোকদের নিয়ে এই দল তৈরি হয়েছে। যার ফলে সুবিধা পেয়ে সকালে এক সিদ্ধান্ত নেয়, আবার আরেক জনের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে বিকালে আরেক সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে এই দলের পক্ষ কোনোদিন বিরোধী দল হওয়া সম্ভব নয়।’

সন্ত্রাসী ব্রেনটনের আদ্যোপান্ত

সন্ত্রাসী ব্রেনটন হ্যারিসন টেরেন্ট (২৮)। অস্ট্রেলিয়ার সাউথ ওয়েলসে তার জন্ম। সংক্ষেপে তাকে ডাকা হয় ব্রেনটন টেরেন্ট নামে। তার জন্ম এক কর্মজীবী পরিবারে। তার ছিল সাধারণ জীবন। শ্বেতাঙ্গ যুবক সে। একাকী থাকতো। পড়াশোনা নেই। অশিক্ষিত।
নিউজিল্যান্ডে গিয়ে ডুনেদিনের পূর্বদিকে বসবাস করতো সমারভিলে স্ট্রিটের একটি বাড়িতে। কিন্তু এই বাড়ির আশপাশে যারা বসবাস করেন তারা কখনো ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলাকারী এই সন্ত্রাসীকে দেখেন নি। হয়তো প্রতিবেশীরা একে অন্যকে পথে অতিক্রম করে গেছেন কাজে যাওয়ার সময়। আবার সন্ধ্যায় ফিরেছেন বাসায়। কিন্তু ব্রেনটন টেরেন্টকে তারা দেখতে পান নি। কারণ, সে সব সময়ই থাকতো দৃষ্টির আড়ালে। নিজের মতো করে সময় কাটাতো। কোনো চাকরি বা কাজ ছিল না। তবে শহরের দক্ষিণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ‘গান ক্লাবে’ যেতো, জিমে যেতো। মাঝে মাঝেই বিদেশ সফরে যেতো। সে কিভাবে উগ্রপন্থি বা সন্ত্রাসী হয়ে উঠল তা নিয়ে এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে অনলাইন নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড।
এক বছরের বেশি সময় সমারভিলে স্ট্রিটের ডুপ্লেক্স বাড়িতে সে একাকী বসবাস করতো। ১৫ই মার্চ ক্রাইস্টচার্চে আল নূর ও উইনউড মসজিদে হামলা চালিয়ে সে কমপক্ষে ৫০ জন মুসল্লিকে হত্যা করে। নিউজিল্যান্ডে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক এই সন্ত্রাসী হামলা। তারপর থেকে তার জীবনকে দেখা হচ্ছে আলাদা করে। তদন্ত চলছে কিভাবে সে এমন উগ্রবাদী, সন্ত্রাসী হয়ে উঠলো।
তার বস্তাব জীবন ছিল ইন্টারনেটভিত্তিক। একজন প্রতিবেশী বলেছেন, আমাদের পাশেই সে ছিল-  এটা ভেবে বুক কাঁপে। এখন প্রতিবারই যখন রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তখন ভাবি, ওই বাড়িতে সে কতগুলো বন্দুক, কি পরিমাণ বোমা লুকিয়ে রেখেছিল? তার এমন কর্মকান্ডের জন্য আমরা নিজেদের অপরাধী মনে করি।
নিজের প্রকাশিত ‘ম্যানিফেস্টো’তে ব্রেনটন নিজেই বলেছে, নিউজিল্যান্ডে থাকার জন্য কেন সে ডুনেদিনকে বেছে নিয়েছে তার কোনো বিশেষ কারণ নেই। সে শুধু চেয়েছিল অস্থায়ীভাবে কোথাও থাকতে এবং নিজের প্রশিক্ষণ নিতে। তাই সে স্থানীয় একটি রাইফেল ক্লাবে যোগ দেয়। নিউজিল্যান্ডের অস্ত্র বিষয়ক আইন ব্যবহার করে অস্ত্র কিনেছে, এই অস্ত্র ব্যবহার করে সে হামলা চালায়। সে বলেছে, এমন হামলা পরিকল্পনা করেছে সে দু’বছর ধরে। বিশেষ করে শেষ তিন মাসে এসে তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত আকার ধারণ করে।
২০১০ সালে তার পিতা রোডনি মারা যান। তার পর থেকেই সে বিদেশ ভ্রমণ শুরু করে। এ সময় থেকেই তার মধ্যে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হয় বলে মনে করা হয়। দম্ভ করতে থাকে অনলাইনে। বলতে থাকে তার কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে ৫ লাখ ডলার আছে। বিনিয়োগ করেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রায়। এসব অর্থের কারণে সে কোনো কাজ না করেই দিন কাটাতে পারতো। সে বলেছে, যখন সে ইউরোপে তখনই রাজনৈতিক বিশ্বাসটা তার ভিতর ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করে।
সে ইঙ্গিত করেছে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত হয়েছে তিনটি সুনির্দিষ্ট ইভেন্ট থেকে। তার মধ্যে একটি হলো সুইডেনে সন্ত্রাসী হামলায় ১১ বছরের একটি মেয়েকে হত্যা। ২০১৭ সালে ফরাসি নির্বাচনের ফল এবং বিশ্বে যেসব দেশে যুদ্ধ হয়েছে সেখানকার সমাধিক্ষেত্রগুলো দেখে। সে যেসব দেশ ভ্রমণ করেছে তার মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক ও গ্রিস। সম্প্রতি সে সফর করেছে বুলগেরিয়া, রোমুানিয়া ও হাঙ্গেরি। প্রথম দিকে তার সফরের ছবি বলতে বানর বা কচ্ছপের ছবি থাকতো। অথবা কোনো ডুবুরির ছবি থাকতো। কিন্তু পরে সেই ধারা পাল্টে যায়। তার সফরে যেসব ছবি প্রাধান্য পায় তার মধ্যে রয়েছে খ্রিস্টান-মুসলিম যুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর ছবি।
রিপোর্ট অনুয়ায়ী সে যেসব স্থান সবশেষে সফর করেছে তার মধ্যে রয়েছে মন্টেনেগ্রো। সেখানে ১৮৬০ এর দশকে অটোম্যান সেনাবাহিনী যে আশ্রমে হামলা চালিয়েছিল সেখানে গিয়েছিল সে। ওই স্থানটি রক্ষার জন্য চেষ্টা করেছিলেন যে সার্বিয়ান নেতা, পরে তেমনই একটি অস্ত্র ব্যবহার করেছে সে ক্রাইস্টচার্চে হামলায়। অভিযুক্ত এই সন্ত্রাসী তার ম্যানিফেস্টো ও ফেসবুকে আগের ঘটে যাওয়া কিছু সন্ত্রাসী ঘটনার উল্লেখ করেছে। এতে সে উল্লেখ করেছে নরওয়ের উগ্র ডানপন্থি সন্ত্রাসী অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকের নাম। তুলে ধরেছে অসওয়াল্ড মোসলের মতো ঐতিহাসিক ফ্যাসিস্টদের নাম।
কোনোমতে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেছে সে। একজন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পা রাখে নি। এরপরই সে অনলাইনে বিভিন্ন জিনিস খোঁজা শুরু করে। সে লিখেছে, এর বাইরে আপনি অন্য কোথাও সত্য খুঁজে পাবেন না।
তার ম্যানিফেস্টো বিশ্লেষণ করেছেন নিউজিল্যান্ড ইন্সটিটিউট অব সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম সায়েন্সের জয়েন্ট ডিরেক্টর ডেভেন পোলাশচেক। তিনি বলেছেন, সমস্যা হলো টেরেন্ট স্বশিক্ষিত। নিজে নিজে তথ্য বাছাই করেছে। আর সেই তথ্যগুলো যাচাই বাছাই না করে সে ধারণ করেছে। সে দৃশ্যত নরডিক, আর্য্য আদর্শ ধারণ করতো বলে মনে হয়। তার পোস্টগুলোতে ভরা স্বর্ণালী চুলের নারী ও শিশুতে। আর থাকতো দেখতে শক্তিমান পুরুষ। তাকে দেখা যেতো কখনো ঘোড়ার পিছে। প্রথম দিকে তার এসব ম্যাসেজকে দেখে অনেকে কল্পনা করতেন কৌতুক হিসেবে।
পিএইচডি করছেন বেন এলি। তিনি বলেন, অনেক মানুষ এসবই সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করে। তাদের মধ্যে এমন আদর্শ কাজ করে যে নরডিক বিষয় হলো ইতিহাসের অংশ। যেমনটা প্রাচীনযুগে পূজা করা হতো। একই রকমভাবে কিছু মানুষ ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আদর্শ হিসেবে দেখতো। তারা ভাইকিংসকে পছন্দ করতো।
ক্রাইস্টচার্চে হামলার পর বিশেষজ্ঞরা ও সাংবাদিকরা সন্ত্রাসী ব্রেনটন টেরেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। তারা সেুলোকে ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন। টেরেন্ট বলেছে, সে একজন ‘ইকো-ফ্যাসিস্ট’। আল নূর মসজিদে হামলার কয়েক মিনিট আগে সে তার বন্ধুদের জন্য (8chan )-এ  পোস্ট দেয়া কিছু সময়ের জন্য স্থগিত করে। (8chan ) হলো একটি অনলাইন ম্যাসেজ বোর্ড। তার প্রোফাইল ছবিতে ছিল একটি কার্টুন। তাতে তার হ্যাটে ব্যবহার করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান কিছু বিষয়। হাতে ধরা ভিক্টোরিয়া বিটার বিয়ারের বোতল। কৌতুক করে সে লিখেছে, ওকে ল্যাডস, এখন পোস্টিং দেয়া বন্ধের সময়। এখন সময় বাস্তব জীবনধর্মী প্রচেষ্টার পোস্ট। এ সংক্রান্ত আরো কিছু পোস্ট দেয় সে ওই বোর্ডে।
তাৎক্ষণিকভাবে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় ওই (8chan ) বোর্ডে। বেশির ভাগ ব্যবহারকারী তার সফলতা কামনা করে। এখানেই ফেসবুক লাইভের লিঙ্ক দিয়েছিল সে। কিন্তু অনেকেই ওই লিঙ্কে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ, এতে ব্যবহার করা হচ্ছিল ফেসবুক। অনেকে ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা মডারেটরদের প্রতি ওই লিঙ্ক ডিলিট করতে অনুরোধ জানায়। তাদের মধ্যে ভয় কাজ করতে থাকে যে, এ কারণে তাদের ফোরামটি বাতিল হয়ে যেতে পারে।
এরপরই শুরু হয় হামলা। 8chan ও ফেসবুক ব্যবহারকারীরা সরাসরি সম্প্রচার করা ভিডিও সেভ করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্য স্থানে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। ইউটিউব ও ফেসবুক অনুযায়ী, মুহূর্তের মধ্যে ওই ভিডিও হাজার হাজার বার পোস্ট হয়ে যায়। যত তাড়াতাড়ি তা ডিলিট করা যায়, তার চেয়ে বেশি গতিতে এটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ইন্টারনেট সেবাদানকারীরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব ফুটেজ বাতিল করে দিতে বা ব্লক করে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে।
সন্ত্রাসী ব্রেনটন টেরেন্ট এখন বন্দি। তার বিচার চলছে। কিন্তু আদালতেও সে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রথম দফায়। সে চেয়েছে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দিতে। আদালতে তাকে দেখা গেছে ফিটফাট। মনোবল যেন ভাঙে নি। এমন কি এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের চিহ্ন ফুটিয়ে তোলে হাতে। তাকে গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় ব্লেম গেম। কেউ কেউ দায়ী করার চেষ্টা করে তার ‘গান ক্লাব’কে ও এর সদস্যদের। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় উগ্রবাদের বিস্তার ঘটানোর। এর জবাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট স্কট উইলয়ামস বলেছেন, সন্ত্রাসী ব্রেনটন যে ক্লাবে ওই অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতো, তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

কাশ্মীর স্থানীয়দের জন্য নিরাপদ নয়

কাশ্মীরের শ্রীনগরে তার বাড়ির ওপর দিয়ে প্রথম যখন জঙ্গি বিমান উড়ে যাচ্ছিল, তার কিছুক্ষণ পর ৫০ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইউসুফ জানতে পারেন, খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে ১০ কিলোমিটারের কম দূরত্বের একটি স্কুলে গণিত পড়ান মোহাম্মদ ইউসুফ। মাথার ওপরে জঙ্গি বিমানের গর্জন এর আগে কখনও তিনি শোনেননি বলে জানান। রাজধানী শ্রীনগরে গত সপ্তাহের আগে যুদ্ধবিমানের এমন গর্জন নিকটাতীতে শোনা যায়নি।
জঙ্গি বিমানের গর্জন যখন ইউসুফের কানে আসে, তখন রাত সোয়া ৩টার বেশি বাজে। তখনও কেউ জানতেন না যে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারত-পাকিস্তান পরস্পরের ভ‚মিতে বিমান হামলা চালাতে যাচ্ছে। ইউসুফ বলেন,জঙ্গি বিমানের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে আতঙ্কিত হয়ে সবাই ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসি।
এই-ই হচ্ছে শ্রীনগরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। পরমাণু শক্তিধর ভারত-পাকিস্তানের বৈরিতার মাঝখানে তাদের অবস্থান।
পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সেনা অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর একটি হচ্ছে কাশ্মীর। পাহাড়েঘেরা এই ছোট্ট উপত্যকাটিতে প্রায় সাত লাখ ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে।
সশস্ত্র পুলিশের বিপুল অবস্থান সত্তে¡ও বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য হচ্ছে কাশ্মীর। ডাল লেকের চোখ জুড়ানো দৃশ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে সেখানে। ৪০০ বছরের পুরনো মোগল আমলের পরীমহল দেখতে পর্যটকরা ছুটে যান কাশ্মীরে। কিন্তু পরীর নিবাসখ্যাত এই গার্ডেনেও ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর একটি ছোট্ট ক্যাম্প বসানো রয়েছে।
১৪ ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামায় হামলার পর কাশ্মীরে উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।
ঝিলাম নদে যাত্রী পারাপার করেন আবদুল কারিম কালু। সতিনি বলেন, বাস্তবিকভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সংঘাতের কারণে কাশ্মীরের লোকজনের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক কাজ করছে।
কালু সবসময় নিজের দুই নাতনির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। তিনি বলেন, যারা সকালে রুটি-রুজির সন্ধানে ঘর থেকে বের হন, সন্ধ্যায় তারা জীবিত ফিরতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কাশ্মীরের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে এক দোকানির সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি বিচলিত বোধ করেন। কীভাবে পাক-ভারত সংঘাত তার ব্যবসা ধ্বংস করে দিয়েছে, সে কথা জানান ২৫ বছর বয়সী যুবক আবিদ খাপড়া।
কথা বলার সময় তার ভেতর খুবই আবেগ দেখা গেছে। বেদনার সঙ্গে তিনি বলেন, দিনে দিনে আমরা হতাশ হয়ে পড়ছি। অর্থনৈতিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমাদের শিশুরা শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে। এভাবেই খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের।
শ্রীনগরে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে দাঙ্গা পুলিশ। ১৪ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় অভিযান চলছে। কাজেই পুলিশের বাধায় নিজের দোকানে যেতে পারেন না আবিদ খাপড়া। এতে তার আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, যখনই আমি বাইরে বের হই, দেখি দাঙ্গা পুলিশ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হয়রানির শিকার হই। দোকানে যেতে পারি না।
আবিদ বলেন, ভারতের কোথাও গেলে সেনাবাহিনী আপনাকে সহায়তা করবে। কিন্তু এখানে একজন সেনার কাছে অপরিচিত জায়গার ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পাবেন না। সেনাসদস্যরা যদি খারাপ কিছুও করে, তবে সে জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হয় না।
একটি ক্যাফেতে খেতে গিয়ে পছন্দের খাবার পাননি ২২ বছর বয়স্কা চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আবরু জান। তিনি বলেন, পুলওয়ামায় হামলার পর ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর আচরণে পরিবর্তন চলে এসেছে। সেনাসদস্যরা আমাদের তাদের শত্রু মনে করছে।
আবরু জান বলেন, একজন কাশ্মীরি হিসেবে স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যদের বেদনা আমি বুঝতে পারি। আমরা সবাই কাউকে না কাউকে হারিয়েছি। আমাদের গ্রামে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। বন্দুকের গুলিতে তরুণদের আহত হতে দেখেছি।
বাইরে বের হলেই সশস্ত্র পুলিশের মুখোমুখি হতে হয় বলেও জানান এ মেডিকেলছাত্রী। বললেন, এখানে অনেক বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। এখানে বহু সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতির এতই অবনতি ঘটেছে যে, কাশ্মীরিদের জন্য কাশ্মীর কোনো নিরাপদ বাসস্থান নয়।
‘পুলওয়ামার আগে মনে হয়েছিল, পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটছে। স্বাভাবিক না হলেও চলাফেরা করা যেত। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান ও ভারত সংঘাতের দিকে চলে গেছে। আর সেই সংঘাতের মাঝে রয়েছে কাশ্মীর।’
ঘাসে ঢাকা নদীর তীরে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিলেন ২১ বছর বয়সী কম্পিউটার প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবরার। তার একটি ভালো চাকরি আছে। কাজেই তিনি কিছুটা আশাবাদী মানুষ।
তার পরও তিনি বলেন, আতঙ্কে শহরে সপ্তাহখানেক রাতে ঘুমাতে পারিনি। শ্রীনগরের রাস্তায় এই প্রথমবারের মতো আমি উত্তেজনা টের পেলাম। আমরা খুবই হতাশ। বাড়িতে নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছি না।’
এই কম্পিউটার প্রকৌশলী বলেন, এখানে কারও ভবিষ্যৎ নেই। কোনো শিশু, নারী-পুরুষ কিংবা বৃদ্ধ। কেউ নিরাপদ নয়; এমনকি এখানকার কোনো বাড়িতেও কারও নিরাপত্তা নেই। সূত্র : ইন্ডিপেন্ডেন্ট অনলাইন।

স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে ৩১ বার তোপধ্বনি কেন? by এমরান হোসাইন শেখ

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বা বিশেষ দিবসকে তোপধ্বনির (কামান দাগা) মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়। ঐতিহাসিকভাবে সামরিক বাহিনীর এই তোপধ্বনির মাধ্যমে সম্মান জানানোর রেওয়াজ রয়েছে। তোপধ্বনির মাধ্যমে সামরিক অভিবাদনের প্রথাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত। তোপধ্বনির সংখ্যার বিষয়টিও এসেছে ঐতিহাসিকভাবে। এটি ব্যক্তি বা ক্ষেত্রবিশেষে কম-বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে তোপধ্বনির মাধ্যমে শ্রদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক অভিবাদন জানানো হয়। দু’টি দিনেই ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়। আবার বাংলাদেশে অন্য কোনও দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান বা আন্তর্জাতিক বিশিষ্ট কোনও ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানাতে ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাপী সামরিক সম্মান জানাতে ২১ বারই তোপধ্বনি করার বিষয়টি জানা যায়।
ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা গেছে, এই তোপধ্বনির দেওয়ার রীতিটা শুরুটা হয়েছিল চতুর্দশ শতকে। ওই সময় নৌবিদ্যায় পারদর্শীরাই পৃথিবীজুড়ে রাজত্ব করতো। ফলে অধিকাংশ যুদ্ধই হতো নৌ-পথে। কোনও যুদ্ধজাহাজে গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে রিলোর্ড করা পর্যন্ত সেটি অসহায় থাকতো। এ অবস্থায় জাহাজটি স্থলভাগের সৈনিকদের কামানের গোলার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দিতো। তাই বিদেশের বন্দরে যখন কোনও যুদ্ধজাহাজ প্রবেশ করে তখন এভাবে তোপধ্বনি দিয়ে তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেই সম্মান প্রদর্শন করে।
আবার ওই সময় কোনও জাহাজ যখন যুদ্ধের জন্য বন্দর ছেড়ে যেতো তখন স্থলভাগ ও জাহাজের ভেতর দুই স্থান মিলিয়ে মোট ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হতো। পরবর্তীতে এই ২১ বারের তোপধ্বনির বিষয়টি একটি চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। এটি বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রচলিত রয়েছে।
৩১ বারের তোপধ্বনির ব্যাখ্যায় জানা যায়, বিশ্বের অন্যান্য দেশে ২১ বার তোপধ্বনি প্রচলন থাকলেও ব্রিটিশ উপনিবেশিক দেশগুলো এই নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন এনে ৩১ বার নির্ধারণ করে। বিষয়টি এমন যে, যখন কোনও যুদ্ধজাহাজ বন্দর বা ঘাঁটি ছেড়ে বের হয় তখন সেই জাহাজ থেকে ৭ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়। ঘাঁটিতে বা বন্দরে অর্থাৎ মাটিতে সৈনিকদের যে দল বা ব্যাটারি থাকে তারাও সেই তোপধ্বনির জবাবে ২১ বার তোপধ্বনি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। জাহাজ থেকে ৭ বার, মাটি থেকে ২১ বার মোট ২৮ বার তোপধ্বনি করার পর জাহাজ থেকে আরও তিনবার তোপধ্বনি করা হয়। সেই অতিরিক্ত তিনটি তোপধ্বনির একটা করা হয় ব্রিটিশ রাজা বা রানির সম্মানে, অন্যটা জাহাজের ক্যাপ্টেনের জন্য এবং শেষটা হচ্ছে ব্রিটিশ বাহিনীর রাজকীয় প্রতিনিধির জন্য।
এদিকে জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপট ছাড়াও ব্রিটিশ ক্রাউন ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলের রাজা বা তার প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা জানাতে তোপধ্বনি প্রথা চালু হয়েছিল। ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা গেছে, রাজা, নবাব বা জমিদারদের গুরুত্বভেদে এই তোপধ্বনি নির্ধারণ হতো। কোনও কোনও নবাব বা জমিদারের জন্য কোনও তোপধ্বনি বরাদ্দ ছিল না। একমাত্র বড়লাট বাহাদুরই নির্বাচন করতেন কোন রাজার সম্মানে কতগুলো তোপ দাগা হবে। রাজ্যের সমৃদ্ধি, রাজরক্তের কৌলীন্য আর সর্বোপরি ব্রিটিশরাজের প্রতি তাদের আনুগত্যবোধ থেকে তোপধ্বনির সংখ্যা নির্ধারণ হতো। তিনিই তোপধ্বনির সংখ্যা বাড়াতে বা কমাতে পারতেন। যেমন, হায়দ্রাবাদ, কাশ্মির, গোয়ালিয়র, মহিশুর এবং বারোদার রাজার বরাদ্দ ছিল ২১ বার তোপধ্বনির সম্মান। এর ধারাবাহিকতায় কেউ পেত ১৯, কেউ ১৭, কেউ ১৫ কিংবা ৯টি তোপের আখ্যা। আবার কারও অনুকূলে কোন তোপধ্বনি বরাদ্দই ছিলো না।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক বলেন, তোপধ্বনি হচ্ছে প্রচলিত সামরিক সম্মান। এটা ঐতিহ্যগতভাবেই এসেছে। বাংলাদেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দেশের সূর্যসন্তানদের সম্মান জানানো হয়। তবে, এই সম্মানের সঙ্গে তোপধ্বনির সংখ্যার সেই অর্থে কোনও সম্পর্ক নেই। কোথাও ৭ বার, কোথাও ২১ বার আবার ৩১ বারও এই তোপধ্বনি হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)-এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ জানান, এটি সামরিক সম্মান। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ঘাঁটি ছেড়ে যাওয়ার সময় এই তোপধ্বনির রেওয়াজ শুরু হয়। এটি কখনও ২১ বার আবার কখনও ৩১ বার হয়ে থাকে। আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে সম্মান জানানো হয়। আর যতদূর জানি, ৩১ বার তোপধ্বনির বিষয়টি ‍ব্রিটিশ রেওয়াজ থেকে এসেছে।

মরুভূমিতে ৪৩ কোটি ডলারের গোলাপ জাদুঘর

গোলাপের আকারে তৈরি জাদুঘর। কাতারের মরুভূমির মধ্যে অবস্থান। প্রায় ১০ বছর ধরে জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়। খরচা হয়েছে ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ সপ্তাহেই খুলে দেওয়া হয়েছে জাদুঘরটি।
স্থানীয় সময় গত বুধবার জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে জাদুঘরটির উদ্বোধন করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার জনসমক্ষে এটি খুলে দেওয়া হয়। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি, কুয়েতি আমির শেখ সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ এবং ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড ফিলিপ ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন।
জাদুঘরের স্থপতি ফ্রান্সের জেন নওভেল। প্রখ্যাত এই স্থপতি টুইটে বলেন, এই স্থাপনা ঐতিহ্যকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
জাতীয় জাদুঘরের ভবনের নকশা চোখে পড়ার মতো। প্রবেশপথে ১১৪টি ভাস্কর্য রয়েছে। ৯০০ মিটার লম্বা হ্রদ রয়েছে। আঁকাবাঁকা ছাদ রয়েছে। আছে ৭৬ হাজার সুড়ঙ্গ। ৩ হাজার ৬০০ আলাদা আকার ও নকশার সুড়ঙ্গ এগুলো।
জাদুঘরের ভেতরে ১ হাজার ৫০০ মিটারেরও বেশি প্রশস্ত জায়গা রয়েছে। দর্শকদের জন্য রাখা আছে উনিশ শতকের কার্পেট। ওই কার্পেট ১৫ লাখ উপসাগরীয় মুক্তাখচিত। রয়েছে ১৮ শতকেরও আগের প্রাচীন কোরআন শরিফ।
জাদুঘরের পরিচালক শেখ আমনা বিনতে আব্দুলআজিজ বিন জসিম আল-থানি বিবৃতিতে বলেন, এটা এমন এক জাদুঘর, যা কাতারের জনসাধারণের কথা বলে। আধুনিক কাতারের প্রতিষ্ঠাতার ছেলে শেখ আবদুল্লাহ বিন জসিম আল-থানির পুরোনো রাজপ্রাসাদের পাশে জাতীয় জাদুঘরটি অবস্থিত। জাদুঘর প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রাসাদটি মেরামত করা হয়েছে।
কাতারের বেদুইনদের ইতিহাস এবং ধনীদের বর্তমান অবস্থার চিত্র জাদুঘরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির সম্পদ সম্পর্কে ধারণাও দেওয়া হয়েছে।
স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নতুন জাদুঘরটি কাতারের রাজনৈতিক পরিচয়ও বহন করে।
উপসাগরীয় এলাকায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেও কাতারের এই জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। আরবের উন্নয়নের নিদর্শন হিসেবে জাদুঘরটি নির্মিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাদুঘরটি ২০১৬ সালে উন্মুক্ত করার কথা ছিল। দেরিতে উদ্বোধন হওয়ায় স্বকীয়তা আরও ভালোভাবে প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে কাতার।
২০১৭ সালের জুন মাস থেকে প্রতিবেশী সাবেক মিত্রদেশগুলো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কাতারকে অবরুদ্ধ করে রাখে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সন্ত্রাসকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ আনে কাতারের বিরুদ্ধে। তবে কাতার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

স্কুলে যৌন শিক্ষা: বাংলাদেশে কি পড়ানো হচ্ছে শ্রেণীকক্ষে

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় মাসিক, স্বপ্নদোষ, কনডম ইত্যাদি শব্দকে নিষিদ্ধ জ্ঞান করা হয়। কিন্তু ঢাকার বিমানবন্দরের কাছে আশকোনা এলাকার একটি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমেই এসব শব্দ নিয়ে অবলীলায় আলোচনা করছে।
তারা বয়ঃসন্ধিকালীন এসব অবশ্যম্ভাবী ইস্যুগুলো সম্পর্কে জানছে। তারা শিখছে প্রজননস্বাস্থ্যের নানা দিক। যৌনবাহিত এবং যৌনাঙ্গবাহিত রোগ সম্পর্কে অবহিত হচ্ছে। শিখছে এসব রোগ থেকে দূরে থাকার উপায়।
এই প্রশিক্ষণের জন্য তারা সাহায্য নিচ্ছে নানা রকম কম্পিউটার গেম এবং লুডো ও মনোপলির মতো দুটি বোর্ড গেমের। সেই সঙ্গে ক্লাস লেকচার তো রয়েছেই।
আশকোনার এই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কিশোর কিশোরী কর্নারে আমি যেদিন যাই, সেদিন তাদের পড়ানো হচ্ছিল বাল্যবিবাহ নিয়ে। বাল্যবিবাহ নিরোধ নিয়ে শিশুরা একটি নাটিকার মহড়া করছে শিক্ষার্থীরা, আমাকে সেটিও তারা দেখালো।
এই বিদ্যালয়ের একটি বিশেষ শ্রেণীকক্ষে গত ৫ বছর ধরে এসব শিখছে বিদ্যালয়টি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা।
বাংলাদেশ সরকারের 'জেনারেশন ব্রেকথ্রু' নামের একটি প্রকল্পের আওতায় এই শ্রেণীকক্ষটি তৈরি হয়েছে। কক্ষটির নাম দেয়া হয়েছে 'কিশোর কিশোরী কর্নার'।
আর এখানে তারা পড়ছে 'জেমস' নামে একটি কোর্স যেটির পূর্ণরূপ দাঁড়ায় 'জেন্ডার ইকুয়িটি মুভমেন্ট ইন স্কুলস'।
কোর্সটি অনেকটা পশ্চিমা দেশগুলোর বিদ্যালয়ে পড়ানো সেক্স এডুকেশন বা যৌন শিক্ষার আদলে সাজানো।
যদিও সংশ্লিষ্টরা এই কোর্সকে যৌন শিক্ষা বলতে নারাজ। এই কোর্সটি সাজানো হয়েছে 'আমার জেমস ডায়েরি' নামের একটি বই, সাতটি কম্পিউটার গেমস, দুটি বোর্ড গেম, একটি এনিমেশন ভিডিও আর একশোটি পর্বের রেডিও ধারাবাহিক দিয়ে।
ক্লাসে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের দেয়া হয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ।
দুই বছরের এই কোর্সে যোগ দিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থী যেসব বিষয় সম্পর্কে জানছে:
*জেন্ডার সমতা:
*বাল্যবিবাহ:
*মাসিক রজঃস্রাব:
*স্বপ্নদোষ:
*বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন:
*শারীরিক ও যৌন সহিংসতা:
*যৌনবাহিত রোগ:
*জননাঙ্গবাহিত রোগ:
*জেনারেশন ব্রেকথ্রু:

কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে বিদ্যালয়গুলোতে যৌনশিক্ষা দেবার চেষ্টা বহু বছর থেকেই করা হচ্ছে, কিন্তু যৌন বিষয় নিয়ে সামাজিক ট্যাবুর কারণে এটা সফল করা যায়নি কখনো।
এমনকি পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা বিষয়ক অধ্যায় জুড়ে দেবার পরও দেখা গেছে শ্রেণীকক্ষে সেসব অধ্যায় শিক্ষকেরা পড়াচ্ছেন না। শিক্ষার্থীদেরকে বাড়িতে গিয়ে এসব অধ্যায় পড়বার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
আর অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে অভিভাবকেরা বইয়ের সেসব অধ্যায় স্টাপলিং করে আটকে দিচ্ছে, যাতে অধ্যায়গুলো শিক্ষার্থীদের নজরে না পড়ে।
ফলে বিদেশী দাতাদের অর্থায়নে ২০১৪ সালে যখন ৫ বছর মেয়াদী জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পটি শুরু হয় বাংলাদেশের চারটি জেলার তিনশো ৫০টি বিদ্যালয়ে, তখন তারা এই ট্যাবুর বিষয়টি মাথায় রেখেছিলেন।
এই প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলছেন, প্রকল্পটি শুরু করতে গিয়ে স্কুলগুলো থেকে বাধা আসবে বলে আশঙ্কা করেছিলেন তারা।
কিন্তু বাধা যতটুকু এসেছে তা ঢাকার বিদ্যালয়গুলো থেকে। মফস্বলের বিদ্যালয়গুলো থেকে কোন বাধা আসেনি। শিক্ষক শিক্ষার্থীরা কোর্সটিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছে। এমনকি প্রকল্পে যে ৫০টি মাদ্রাসাকে যুক্ত করা হয়েছিল, সেখান থেকে এসেছিল অভূতপূর্ব ইতিবাচক সাড়া।
ড. হোসেন বলছেন, 'বাস্তবে দেখা গেল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকেরা এ বিষয়ে অনেক অগ্রসর'।
সাফল্য এলো কি?
প্রকল্পের মেয়াদের পাঁচ বছর শেষে এসে দেখা যে বিদ্যালয়গুলোতে এই বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে যেসব বিদ্যালয়ে এই বিষয়টি পড়ানো হয়না, সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্র আমাকে বলছিল, 'আমার অন্যান্য স্কুলের যেসব বন্ধু আছে তারা এইসব শব্দ শুনলে অনেক লজ্জা পায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আর এসব হয় না'।
অষ্টম শ্রেণীর একজন ছাত্রী বলছিল, 'প্রথম প্রথম আমি নিজেও এইসব ব্যাপারে অনেক সংকীর্ণ ছিলাম। যেসব বিষয় আমি আমার মা কিংবা বন্ধুদেরকে বলতে পারতাম না, পরামর্শ চাইতে পারতাম না, এখন অবলীলায় তা পারি।'জেমস ক্লাস করবার পর আমরা অনেক বেশী ফ্রি হয়ে গেছি', বলছিল সপ্তম শ্রেণীর আরেক ছাত্রী।
যেসব শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই জেনারেশন ব্রেকথ্রুর ক্লাসরুমে পাঠানো হয়েছিল, তারাও শুরুর দিকে জড়সড় হয়ে থাকতেন।
"আমাদের নিজেদের ভেতরেই একটা জড়তা ছিল। সেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে আমাদের কিন্তু সময় লেগেছে। সেক্স বিষয়ক কোন শব্দ আলোচনায় এলে বাচ্চার লজ্জা পেত", বলছিলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মঞ্জুয়ারা খাতুন।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরো উলটে গেছে, অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমাকে বললেন তিনি। কোর্সটি পড়ানো কি বন্ধ হয়ে যাবে?
জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৮ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই। যদিও অনেক বিদ্যালয়ে কোর্সটি পড়ানো অব্যাহত আছে, বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে দাতা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের যোগাযোগও বন্ধ হয়নি, কিন্তু কাগজে কলমে প্রকল্পটি শেষ।
তাহলে কি বিদ্যালয়গুলোতে যৌন শিক্ষা প্রদানের নতুন এই পদ্ধতিটি বন্ধ হয়ে যাবে?
ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলছেন, তারা অচিরেই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। সেখানে বিদ্যমান সাড়ে তিনশো বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হবে আরো দুশোটি বিদ্যালয়।
আর পর্যায়ক্রমে এই কোর্সটিকে অবশ্যপাঠ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের সব বিদ্যালয়ে, অবশ্য এখন পর্যন্ত এর সবই রয়েছে আলোচনা পর্যায়ে।
সূত্রঃ বিবিসি

৪৮ বছর পরও আমরা এমনটি আশা করিনি -ড. কামাল হোসেন

৩০শে ডিসেম্বর একটি ভুয়া ভোটের মাধ্যমে অবৈধ সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও আমরা এমনটি আশা করিনি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়  ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গতকাল স্বাধীনতা দিবসে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে এসে ড. কামাল হোসেন এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দেশের মালিক জনগণ। নির্ভেজাল গণতন্ত্র বাস্তবায়ন করে দেশের ক্ষমতা জনগণকে বুঝিয়ে দিতে হবে।
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও দেশের মানুষকে ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু এটা আমরা আশা করিনি। এবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায় করা হবে।
ড. কামাল বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে এনে ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হবে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে হবে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করে সব কিছু অর্জন করতে হবে। তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্রের জন্য দেশ স্বাধীন হয়েছে। অথচ সেই গণতন্ত্রই এ দেশে অনুপস্থিত। এমন অবস্থা চলতে দেয়া যাবে না।
এ সময় তিনি বলেন, সংবিধানের ১৬ আনা বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। ১৬ আনা মুক্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সংবিধানে ঘোষিত মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে একতাবদ্ধ হলে তবেই ১৬ আনা মুক্তি আসবে। তিনি বলেন, সংবিধানে স্বাধীনতার লক্ষ্য সম্পর্কে বলা আছে। জনগণ সব ক্ষমতার মালিক। এ মালিকানা থেকে যদি কেউ তাদের বঞ্চিত করে, তবে তারা সংবিধানবিরোধী কাজ করছে, স্বাধীনতাবিরোধী কাজ করছে। কেউ যেন তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।
ড. কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধু সবসময় বলতেন, ঐক্য ধরে রাখতে হবে। তার অসাধারণ নেতৃত্বেই জাতি একতা ধরে রাখতে পেরেছিল। আওয়ামী লীগ বর্তমানে বাকশাল ফিরিয়ে আনতে চাইছে বলে যে অভিযোগ বিএনপি নেতারা করেন- সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. কামাল বলেন,  একনায়কতন্ত্র যেন না আসে সেটাই ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা তো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংবিধানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা লিখেছিলাম। তিনি বলেন, ১৬ আনা মুক্তি পেতে গেলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা কার্যকর ও বাস্তবে রূপ দিতে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। ঐক্যফ্রন্টের এ শীর্ষ নেতা বলেন, জনগণের ঐক্য হলো সব শক্তির ভিত। সেই শক্তি থেকে যারা আমাদের বঞ্চিত করতে চায়, তারা জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। এই জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণকে সংগঠিত হয়ে সব কিছু অর্জন করতে হবে। গণতন্ত্র সুসংগঠিত করতে ইলেকশন হয়, কিন্তু আমরা নির্ভেজাল ইলেকশন পাচ্ছি না।

নির্বাচনে বড় জালিয়াতির অভিযোগ থাকসিন সিনাওয়াত্রার

রোববার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বড় আকারে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ এনেছেন থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। তিনি বলেছেন, এসব অনিয়মের প্রমাণ আছে। এমন বৈষম্যে তিনি উদ্বিগ্ন। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেছেন।
২০০৬ সালে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। তারপর দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ গঠন করা হয়। ফলে তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান।
পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে নির্বাচনে তার ছোটবোন ইংল্যাক সিনাওয়াত্রা দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাকেও ২০১৪ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর দীর্ঘ ৫ বছর পরে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন।
সেই নির্বাচনে থাকসিন সিনাওয়াত্রার প্রতি অনুগত পুয়ে থাই পার্টি বিজয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু না, পপুলার ভোটের বেশির ভাগ ভোট পায় সেনাপন্থি পালাং প্রচা রাথ পার্টি (পিপিআরপি)। পুয়ে থাই পার্টি পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়, এ দলটি মোটের ওপর বেশি ভোট পায় নি। ফলে এখন কোন দল যে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তা স্পষ্ট নয়।
এ অবস্থায় ভোটের ফল প্রকাশে বেশ বিলম্ব করা হয়। এতে অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকে। কর্মকর্তারা বলেন, কিছু ভুলের কারণে ডাটা প্রকাশ করতে সমস্যা হচ্ছে। সোমবার এই ফল ঘোষণার কথা থাকলেও এখন বলা হচ্ছে, সরকারি ফল  ঘোষণা হবে মে মাসে। এর ফলে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
ক্ষমতা হারিয়ে নির্বাসনে থাকলেও এখনও থাইল্যান্ডে ব্যাপক প্রভাবশালী রাজনীতিক থাকসিন সিনাওয়াত্রা। তিনি হংকং থেকে বিবিসি থাই সংস্করণকে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছেন নির্বাচন নিয়ে। তিনি বলেছেন, নির্বাচনে প্রচুর অনিয়ম হয়েছে। তার ভাষায়, এসব অনিয়মের মাধ্যমে দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পশ্চাতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এটা দেখে আমি উদ্বিগ্ন।
অনিয়মের বিষয়ে থাকসিন সিনাওয়াত্রা একটি উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পেটচাবুন প্রদেশের দৃশ্যটাই দেখুন। সেখানকার ব্যালটবাক্স নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাতে স্থানীয় একটি অফিসে ব্যালট পেপার ভরা হয়।
তিনি আরো বলেন, অনেক সংসদীয় আসনে মোট যে পরিমাণ মানুষ ভোট দিয়েছেন তার চেয়ে ব্যালট পেপার অনেক বেশি। পিপিআরপি’র ভোট লাফ দিয়ে বেড়ে গেছে। তারা তৃতীয় অবস্থান থেকে প্রথম অবস্থানে চলে এসেছে। থাকসিন বলেন, অনেক স্থানে পিপিআরপি পরাজিত হওয়ার অবস্থা থেকে বিজয়ী হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আমার দেশ তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করছে বলে আমি দেখতে পাচ্ছি।
ব্যাংকক থেকে বিবিসির সাংবাদিক জোনাথন হেড বলছেন, সামরিক অভ্যুত্থানের ৫ বছর পরও সামরিক সরকার ও তাদের রক্ষণশীল সমর্থকরা থাই রাজনীতি থেকে থাকসিনকে সরানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় তার নাম ও ছবির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। যদি তার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন তথ্য পাওয়া যায় তাহলে সেই দলকে বিলুপ্ত করার ঝুঁকি ছিল।
সবাই জানে যে, তার দল পুয়ে থাই এখনও সব রকম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাকেই অনুসরণ করে। থাকসিন সিনাওয়াত্রা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তার তখনকার সময়কার নষ্টালজিয়া ও প্রকাশ্যে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে পুয়ে থাই সমর্থকরা। তিনি এমন একজন, যাকে এ দলটি মুছে দিতে পারে না। এখনও দিচ্ছে না।
গত শুক্রবার তার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানের ফাঁকে তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে অনেক সাংবাদিক ছুটে গিয়েছিলেন হংকং। এখন থাকসিন সিনাওয়াত্রা প্রকাশ্যে ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাতকার দিয়ে চলেছেন। নির্বাচনে তার দল যেমনটা করবে বলে প্রত্যাশা ছিল তার চেয়ে অনেক খারাপ করেছে। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছিল তার মাত্র অর্ধেক ভোট পেয়েছে এবার। কিছু আসন কম পেয়েছে। তবে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে তারা বেশি আসন পেয়েছে।
থাকসিন সিনাওয়াত্রার অনেক সমর্থকের সন্দেহ নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে। এক্ষেত্রে থাকসিন যে অভিযোগ করেছেন তারা সে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে থাইল্যান্ডের নির্বাচনে সব সময়ই কিছু নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। তবে থাকসিন যে অভিযোগ এনেছেন তাতে নির্বাচনের সার্বিক ফল পাল্টে যাবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে দৃশ্যত তেমনটা মনে হয় না। এক্ষেত্রে হাত রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।

বিনম্র শ্রদ্ধায় বীর শহীদদের স্মরণ

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদদের। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বর্ণিল আয়োজনে সারা দেশে পালিত হয়েছে দিবসটি।
সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়েছে লাখো মানুষ। তাদের সবার কণ্ঠে ছিল সমৃদ্ধ দেশ গড়ার শপথ। ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির মধ্যে ছিল শ্রদ্ধা নিবেদন, শিশু-কিশোরদের কুচকাওয়াজ ও আলোচনা সভা। সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোরদের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান। বিকালে বঙ্গভবনে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং কূটনীতিকরা অংশ নেন।
সেখানে অতিথিদের নিয়ে ৪৯তম স্বাধীনতা দিবসের কেক কাটেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ।
স্বাধীনতা দিবসে সারা দেশে এক সঙ্গে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। দিবসটি উপলক্ষে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এদিকে গতকাল সকাল থেকে হাতে লাল সবুজের পতাকা আর রঙ-বেরঙের ফুল নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে আসেন সব বয়সের সাধারণ মানুষ। তাদের হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে স্মরণ করেন স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ সূর্য সন্তানদের। মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে গতকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল এ সময় শহীদদের প্রতি সালাম জানায়।
বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কিছুটা সময় নীরবে দাঁড়িয়ে জাতির বীর সন্তানদের স্মরণ করেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দলের পক্ষে নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আবারো স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এরপর বিচারপতিগণ, তিন বাহিনীর প্রধান ও কূটনীতিকরা শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। স্মৃতিসৌধে ভিআইপিদের শ্রদ্ধা জানানোর পর সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। এরপরই পতাকা আর ফুল হাতে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। তাদের শ্রদ্ধায় ফুলে ফুলে ভরে উঠতে থাকে স্মৃতিসৌধ। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্রের কারণে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্ভব হয়নি। বিএনপি-জামায়াত পরিকল্পিতভাবেই বিভিন্ন সময়ে ২৫শে মার্চ কালো রাতের গণহত্যা নিয়ে মিথ্যাচার করেছে।
সব মিলিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে এবং ’৭৫-পরবর্তী সময়ে যারা বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসেছে তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই আমরা এখনো পর্যন্ত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করতে পারি নি। সকাল সাড়ে ৮টায় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দেশনেত্রীর মুক্তি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, লাখো বীর শহীদদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে আদর্শ, চেতনা নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম আজকে সেই চেতনা এবং আদর্শ সম্পূর্ণভাবে ভূ-লুণ্ঠিত হয়েছে। এদিকে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, গণতন্ত্রকে শাসন ব্যবস্থা হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দিতে পেরেছি। সংবিধান অনুমোদনসহ অনেক কিছু অর্জন করলেও দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুরোপুরি গড়ে তোলা হয়নি বলে আমরা অনেকগুলো ঘাটতি লক্ষ্য করছি।
আজকে যে গণতন্ত্র, আমরা মনে করি সেখানে অনেক ঘাটতি আছে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বিরোধীদলীয় উপনেতা বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলটির নেতাকর্মীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম প্রমুখ। জাতীয় স্মৃতিসৌধে পর্যায়ক্রমে ফুল দিয়ে সম্মান জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গণবিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), সাভার প্রেস ক্লাব, আশুলিয়া প্রেস ক্লাব, জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, যুবলীগ, যুব ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, মহিলা পরিষদ, যুবদল, ছাত্রদল, মহিলা দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে স্মৃতিসৌধে ফুল দেয়া হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দলের সদস্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। নানা বয়সের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মহান স্বাধীনতা দিবসে বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে স্মৃতিসৌধে আসেন এবং শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
আজকের শিশু আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে-প্রধানমন্ত্রী: দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে শিশু-কিশোরদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। আজকের শিশুদের মধ্যেই কেউ প্রধানমন্ত্রী হবে, মন্ত্রী হবে, বড় বড় চাকরি করবে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।  দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে ভালোবেসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তুলবে। স্বাধীনতা এবং জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শিশু-কিশোর সমাবেশে দেশে এবং প্রবাসে অবস্থানকারী সকল শিশুর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে  তোমাদেরকেই। তোমরাই গড়ে তুলবে আগামী দিনের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
তিনি আরো বলেন, এই বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নত শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ একটি দেশ। আমরাই জাতির পিতার এই স্বপ্ন পূরণ করবো। তিনি শিশুদের দোয়া ও আশীর্বাদ জানিয়ে বলেন, তোমরা বাবা-মা’র কথা শুনবে, শিক্ষকদের কথা শুনবে, নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলবে, সুন্দরভাবে জীবনযাপন করবে- সেটাই আমরা কামনা করি।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয়  স্টেডিয়ামে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শিশু-কিশোর সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম  মোজাম্মেল হক এবং ঢাকা জেলা প্রশাসক  মো. আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, মাদক এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনরুল্লেখ করে বলেন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং মাদকের হাত থেকে আমরা দেশকে মুক্ত করতে চাই। আমি শিশু-কিশোর, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দসহ সকলকে আহ্বান জানাবো- মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের কুফল সম্পর্কে আমাদের শিশুদের জানাতে হবে এবং এর হাত থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে দেশব্যাপী স্কুল পর্যায়ে অনুষ্ঠিত শুদ্ধ সুরে জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক এই তিন ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ৯০ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোরদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে কাঁদলেন মাহবুব তালুকদার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কাঁদলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। নির্বাচন ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মাহবুব তালুকদার বক্তব্য দেয়ার সময় এমনই দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ সময় দর্শক সারিতে অনেককেই চোখ মুছতে দেখা যায়।
‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০১৯’ উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্যোগে এ আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বক্তব্যের একপর্যায়ে মাহবুব তালুকদার বলেন, আজ আমার কার কথা মনে পড়ছে আপনারা জানেন? আমার মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধুর কথা। আমার পরম সৌভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরকারিভাবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অনেক স্মৃতি। আজ মাত্র দুটি কথা বলবো।
১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই দিনই তিনি আমায় ডেকে বলেন- মাহবুব তুমি আমার সঙ্গে থাকবা।
আমাকে রাষ্ট্রপতির সহকারী প্রেস সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। পদবি বড় কথা নয়, দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার পর স্বভাবতই আমি খুব খুশি হই। আমার দায়িত্ব পড়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর ডিকটেশন নেয়ার। সিদ্ধান্ত হয়- দুপুরে খাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর বিশ্রামের সময়টুকুতে আমি তার রুমে ঢুকে যাবো। তিনি আমাকে বলেন যদি কোনো অজুহাতে ডিকটেশন দেয়ার জন্য তিনি সময় না দিতে পারেন, তাহলে আমি যেন জোর করে ডিকটেশন নিই। সেই মতে, আমি পরপর তিনদিন বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর ডিকটেশন নিই। তার ডিকটেশন রেকর্ডও করি। চতুর্থ দিন এসে তিনি বেঁকে বসেন। বলেন, তোমার জন্য তো আমি বিশ্রামটুকুও নিতে পারছি না। আমি তাকে বলি, আইয়ুবের শাসন, আপনার ছয় দফা, পাকিস্তানের জেলে বন্দির দিনগুলো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা- এরকম গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়ের বিষয়গুলো নিয়ে তো আপনাকে ডিকটেশন দিতে হবে। আপনার বিশ্রামের সময় আপনাকে বিরক্ত করা আমারও ভালো লাগে না। তাই আপনি আমাকে অন্য একটা সময় বের করে দিন। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন- আমি সমস্ত কাজ গুছিয়ে আনছি, পরিবারের (সদস্যদের) বিয়ে শাদি শেষ করছি। সামনেই ডিকটেশন নেয়ার সময় বের করে দেবো। কোনো কিছুই আটকে থাকবে না। এরপরই ঘটে সেই ঘৃণ্য আগস্টের ঘটনা।
মাহবুব তালুকদার বলেন, দ্বিতীয় ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান যেদিন মারা যান, সেদিন আমি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সারাদিন ছিলাম। চল্লিশার দিনে ঠিক হয়, বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন। সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ, তিন বাহিনীর প্রধান ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা থাকবেন। গাজী জাহাজে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়। আমার জাহাজ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা না থাকায়, কাপড়-চোপড় সঙ্গে নেয়ার কথা মনে হয়নি। রাতে জাহাজ ছাড়লে দেখি, আমার শোবার কোনো জায়গা নাই। একপাশে একটি খালি সোফা পেয়ে শুয়ে পড়ি। পাশেই তখনকার এডিসি রাব্বানী সাহেব ছিলেন। মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। দেখি, রাব্বানী জেগে আছেন। আমার মাথার নিচে বালিশ। আমি অবাক হয়ে রাব্বানীকে জিজ্ঞেস করি- এই বালিশ আমার মাথার নিচে কে দিলেন? রাব্বানী বলেন রাতে বঙ্গবন্ধু রাউন্ডে এসেছিলেন। তিনি দেখেন- আপনি মাথার নিচে হাত দিয়ে সোফায় শুয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধু তার রুমে গিয়ে বালিশ নিয়ে এসে আপনার মাথার নিচে রেখে গেছেন। এই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাহবুব তালুকদার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি জানতাম বঙ্গবন্ধুর দুটি বালিশ ছাড়া ঘুম হয় না। তখন আমি বালিশ ফিরিয়ে দিতে বঙ্গবন্ধুর রুমের দিকে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু রাব্বানী জানান, গিয়ে লাভ নেই। বঙ্গবন্ধু দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
ভোর পাঁচটা। জাহাজ চলছে। সুনসান নীরবতা চারদিকে। জাহাজের সামনের দিকে এগিয়ে দেখি, একটি ইজি চেয়ারে বসে বঙ্গবন্ধু কবিতা আবৃত্তি করছেন। ‘নমো নমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি/গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ-সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।’ আর কবিতা আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে তিনি পা দুলাচ্ছেন। আবৃত্তি শেষে বঙ্গবন্ধু আমাকে খেয়াল করেন। বলেন, মাহবুব, রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো? আমি বললাম না। কেন? আমি তো তোমার মাথার নিচে বালিশ দিয়ে আসলাম। উত্তরে বঙ্গবন্ধুকে বলি, আপনি আমার মাথার নিচে বালিশ দিয়ে এলেন। আপনিই বলুন, আপনি কারো মাথার নিচে বালিশ দিয়ে এলে তার পক্ষে কি আর ঘুমানো সম্ভব? মাঝে বক্তব্য দেয়ার সময় অশ্রুসজল চোখ মুছতেও দেখা যায় মাহবুব তালুকদারকে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদাসহ অন্য নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিবসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গোলান নিয়ে ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের

সিরিয়ার গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলি ভূখণ্ড হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে যে স্বীকৃতি দিয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ট্রাম্পের স্বীকৃতির পর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ইস্যুতে তাদের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কাতার, লেবাননও ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করেছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা বিষয়ক দূত মিখাইল বোগডানোভ বলেছেন, গোলান নিয়ে রাশিয়ার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এ ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে নিয়ে যাবে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব স্বীকার করে না। আমাদের এ সংক্রান্ত অবস্থান পরিবর্তনের কোনও পরিকল্পনা নেই।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের পক্ষে ট্রাম্প যে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফ্রান্স এই দখলদারিত্ব স্বীকার করে না।
জার্মানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের স্বীকৃতি না দেওয়ার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছে কানাডা।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলেছেন, ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও একবার আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করলো। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত কখনও ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে বৈধতা দেবে না।
কাতার সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গোলান মালভূমি থেকে ইসরায়েলকে অবশ্যই সরে যেতে হবে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন বলেছেন, অন্য দেশের ভূখণ্ডের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বিদেশি নেতাদের নেই।
এর আগে ২৫ মার্চ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে দখলকৃত গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডের স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এদিন এ সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সিরীয় ভূখণ্ড গোলান মালভূমি দখল করে নেয় ইসরায়েল। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কখনও ইসরায়েলের এই দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দেয়নি। তবে দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি থেকে সরে এসে ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলি দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দেন তিনি। হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা ইহুদি ধর্মাবলম্বী জ্যারেড কুশনারের উপস্থিতিতে এ সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প।
টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গোলান মালভূমির কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত গুরুত্ব রয়েছে। অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার এখনই সময়।
গোলান মালভূমি কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ:
দক্ষিণ পশ্চিম সিরিয়ার একটি পাথুরে মালভূমি হচ্ছে গোলান। জায়গাটা বেশি বড় নয়। কিন্তু এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। গোলান থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এবং দক্ষিণ সিরিয়ার একটি বড় অংশ স্পষ্ট দেখা যায়। সিরিয়ান সেনাবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এটি একটি আদর্শ জায়গা। তাছাড়া পার্বত্য এলাকা বলে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর যে কোনও হামলার পথে এটি একটি চমৎকার প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করবে।
এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক পানির একটি চমৎকার উৎস গোলান মালভূমি। এখান থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে জর্ডান নদীতে। জায়গাটি উর্বর এবং এখানে আঙুরসহ বিভিন্ন ফলের চাষ হয়, পশুপালন হয়।
১৯৬৭ সালে ইসরায়েল জায়গাটি দখল করার পর এখানকার সিরিয়ান আরব বাসিন্দারা অধিকাংশই পালিয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে সিরিয়া এটি পুনর্দখলের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ১৯৮১ সালে ইসরায়েল গোলানকে নিজের অংশ করে নেয় একতরফাভাবে। তবে ইসরায়েলের এই দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দেয়নি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
অঞ্চলটিতে ৩০টিরও বেশি ইসরায়েলি বসতি আছে, যাতে ২০ হাজার ইসরায়েলি বাস করে। এছাড়াও এখানে বাস করে প্রায় ২০ হাজার সিরিয়ান দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষ। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, বিবিসি, ফ্রান্স ২৪।

কুমিল্লায় সড়কে প্রাণ গেল ২ শিক্ষার্থীর: এমন মৃত্যু আর কত?

নজিরবিহীন আন্দোলন। নানা প্রতিশ্রুতি। চোখ খুলে দেয়া। কিন্তু কোনো কিছুতেই বদলাচ্ছে না পরিস্থিতি। প্রতিদিনই সড়ক-মহাসড়কে ঝরছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তাজা প্রাণ। অঙ্কুরেই মরে যাচ্ছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। গতকালও কুমিল্লায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঝরেছে দুই শিক্ষার্থীর প্রাণ। নিহতরা হলো- চান্দিনার কুটুম্বপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী মাহমুদা আক্তার ইয়াসমিন (১৫) ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণের বিজয়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া সাহা (১৬)।
নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনেই ট্রাক্টর চাপায় নিহত হয় ইয়াসমিন আর লেগুনা থেকে পড়ে নিহত হয় রিয়া। এই ঘটনার প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এ সময় ট্রাক্টরচালক মনোয়ার হোসেন (১৮)কে আটক করে স্থানীয়রা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনির হোসেন জানান, আমাদের বিদ্যালয়ের সামনের কাঁচা সড়ক দিয়ে গ্যাস লাইন নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর চলাচল করে। ২৬শে মার্চ উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসে। সকাল ৯টার দিকে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আমি দাঁড়ানো ছিলাম আর ছাত্রীরা বিদ্যালয়ের দিকে আসছিল। ১৭-১৮ বছরের এক ট্রাক্টরচালক মেয়েগুলোকে দেখে জোরে হর্ন চেপে ট্রাক্টরটি রাস্তায় এদিক-সেদিক ঘুরাচ্ছিল। এ সময় ট্রাক্টরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে একজন পানিতে পড়ে যায় আরেকজন চাকায় পিষ্ট হয়।
এদিকে, ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা স্কুলের পাশের মহাসড়ক অবরোধ করে। পরে হাইওয়ে পুলিশ এসে শিক্ষার্থীদের প্রহার করে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশের লাঠির আঘাতে ইয়াছিন (১৬) নামে এক শিক্ষার্থী আহত হয়। তার মাথায় পেছনে অংশ ফেটে গেলে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দাউকান্দি সার্কেল) মহিদুল ইসলাম জানান, আমরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছি। নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্য, স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। গাড়ি ও চালক আটক করা হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, দুপুর সোয়া ১২টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর, জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম, চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এসএম জাকারিয়া।
এ সময় গ্যাস লাইন নির্মাণ কোম্পানি চিটাগং-ফেনী-বাখরাবাদ গ্যাস লাইন প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল যোবায়ের জানান, জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে আমরা নিহতের পরিবারকে ৬ লাখ টাকার চেক দিয়েছি। ভবিষ্যতে আমরা দক্ষ ও লাইসেন্স প্রাপ্ত চালক নিয়োগ দেব। এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের তহবিল থেকে নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
এদিকে, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার মোস্তফাপুর মাদরাসার সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গতকাল সকাল ৭টায় লেগুনা খাদে পড়ে ঘটনাস্থলেই স্কুলছাত্রী রিয়া নিহত হয়। এতে আহত হয়েছে আরো পাঁচ শিক্ষার্থী। রিয়া বিজয়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আহত ওই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী মনিকা (১৪), সাবেকুন্নাহার (১৪), অংকন সাহা (১৪), রুমি আক্তার (১৪) ও সালমা আক্তারসহ ১৩ জনকে স্থানীয় সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা  দেয়া হয়। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জসিম উদ্দিন মজুমদার জানান, সকালে বিদ্যালয় থেকে তিনটি লেগুনায় করে শিক্ষার্থীরা উপজেলায় স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিল। পথে শিক্ষার্থীরা এ দুর্ঘটনার শিকার হয়। এক শিক্ষার্থী জানান, সকাল ৬টার দিকে স্কুল থেকে প্রায় ১৮ জন শিক্ষার্থী একটি লেগুনায় করে রওনা হয়। মোস্তফাপুর মাদরাসার সামনে এসে লেগুনাটি কাঁপতে থাকে এবং কিছুক্ষণ পর রাস্তার পাশে একটি খাদে পড়ে যায়।
এনায়েতপুরে ট্রাক চাপায় বৃদ্ধ নিহত
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার বেতিলে অবৈধ বালুর ট্রাক চাপায় বৃদ্ধ এক পথচারী নিহত হয়েছেন। নিহত আবদুস সোবহান সরকার (৬৮) গোপালপুর গ্রামের মৃত হাজী জয়নাল আবেদিন সরকারের ছেলে। এছাড়া তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা এম এম সরকারের ভাই।
এনায়েতপুর থানার এসআই মামুন হোসেন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকালে যমুনা নদীর তীর হতে বালু নিয়ে একটি ট্রাক গোপালপুরের দিকে যাবার পথে বেতিল মোড় অতিক্রম করছিল। তখন পাশের ভ্যানের সঙ্গে হালকা ধাক্কা লাগলে চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে চালক ঐ ভ্যানের চালককে ধরতে যায়। সে সময় ট্রাকটি নিচের দিকে নেমে এসে পথচারী সোবহান সরকারকে চাপা দেয়। তৎক্ষণাত উদ্ধার করে স্থানীয়রা খাজা ইউনুছ আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে। এ ঘটনায় পুলিশ ঘাতক ট্রাকটি আটক করেছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
রাজাপুরে বাস চাপায় মোটরসাইকেল চালক নিহত, আহত ২
ঝালকাঠির রাজাপুরে যাত্রীবাহী বাস চাপায় তৌহিদুল ইসলাম (২১) নামে এক মোটরসাইকেল চালক নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় মোটরসাইকেলের দু’জন আরোহী আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে ভাণ্ডারিয়া-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের রাজাপুর উপজেলার বাইপাস এলাকার টিঅ্যান্ডটি সড়কের মুখে এ ঘটনা ঘটে। নিহত তৌহিদ উপজেলার পশ্চিম চারাখালি গ্রামের শাহ আলমের ছেলে। রাজাপুর থানার এসআই ফিরোজ আলম জানায়, বাইপাস এলাকার টিঅ্যান্ডটি সড়কের সামনের সড়ক থেকে ৩ আরোহী বহনকারী মোটরসাইকেলটি আঞ্চলিক মহাসড়কের উঠার সময় ভাণ্ডারিয়া থেকে ছেড়ে আসা বরিশালগামী শতাব্দী পরিবহনের একটি বাস তাদের চাপা দেয়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে রাজাপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে আসার পরে চালক তৌহিদুলকে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে, শাকিল ও হাবিুবর রহমানকে বরিশাল শেবাচিমে প্রেরণ করে। পুলিশ বাসটি আটক করলেও চালক পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানায় পুলিশ।

যত দ্রুত সম্ভব ইয়েমেনে যুদ্ধ অবসানের জন্য ইরানের আহ্বান

গত চার বছর ধরে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে নিষ্ফল যুদ্ধ ও ভয়াবহ আগ্রাসন চলে আসছে। এমন সময় এ যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়াল যখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, দুই কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। এ ছাড়া, দেড় কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে এবং লাখ লাখ শিশু ক্ষুধার্ত। কোনো প্রাকৃতিক সংকট নয় বরং চার বছর ধরে চলা অব্যাহত যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সমাজের নীরবতা এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন শুরুর চার বছর পূর্তি উপলক্ষে ইয়েমেনে আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে যত দ্রুত সম্ভব এ যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। আমেরিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরো কয়েকটি দেশের সমর্থন নিয়ে সৌদি আরব ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক আগ্রাসন শুরু করে এবং সেই সঙ্গে দেশটির স্থল, নৌ ও আকাশ পথ অবরুদ্ধ করে রাখে। ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরব ও তার ত্রিদের আগ্রাসন শুরুর পর এ পর্যন্ত ১২ হাজার ইয়েমেনি নিহত এবং প্রায় ২৬ হাজার আহত হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে ছয় হাজার নারী ও শিশুও রয়েছে।
সৌদি আরব ইয়েমেন দখল এবং এই দেশটিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার জন্য অসম যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু তারা যা আশা করেছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি বরং ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও গণকমিটির প্রতিরোধের মুখে তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মার্কিন সাময়িকী 'হিল'-এ ইয়েমেন সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে। সৌদি আরব ইয়েমেনে এমন এক চোরাবালিতে আটকা পড়েছে যা থেকে উদ্ধার পেতে হলে তাকে অবশ্যই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।"
ইয়েমেন সংকট সমাধানের জন্য ২০১৫ সালের এপ্রিলে ইরান চার দফা প্রস্তাব পেশ করে। এ প্রস্তাবে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক ত্রাণ পৌঁছে দেয়া, ইয়েমেনের সব পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু এবং জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে।
ইয়েমেনে যুদ্ধ অবসানের জন্য এ পর্যন্ত বেশ ক'বার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সুইডেনের স্টকহোমে ইয়েমেনের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের কথা উল্লেখ করা যায়। ওই সংলাপে সব পক্ষ হুদাইদা বন্দরে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা, বন্দি বিনিময়, খাদ্য ও ওষুধসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের জন্য আকাশ পথ খুলে দেয়ার ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু সৌদি আরব বারবার এই সমঝোতা লঙ্ঘন করছে।
যাইহোক, ইয়েমেন সংকট নিরসন ও সৌদি আগ্রাসন বন্ধের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সমাজ বিশেষ করে আরব দেশগুলোর স্বদিচ্ছা। ইরান মনে করে, একমাত্র রাজনৈতিক উপায়ে ইয়েমেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো যাবে। এ কারণে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আবারো স্টকহোম সমঝোতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।