Saturday, December 26, 2009

ইউরেনিয়াম চুক্তি নিয়ে বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ইরানের প্রত্যাখ্যান

ইরানকে বিদেশ থেকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে আনার চুক্তি এ বছরের মধ্যে মেনে নিতে পশ্চিমা বিশ্ব যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ গত মঙ্গলবার তা নাকচ করে দিয়েছেন।
ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে না—এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে দেশটির কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এলইইউ) বিদেশে পাঠিয়ে সমৃদ্ধ করার প্রস্তাব দেয় পশ্চিমা বিশ্ব, যা তেহরানের একটি গবেষণা চুল্লির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার কথা।
ইরান বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে ইউরেনিয়াম পাঠাতে ব্যর্থ হলে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য জাতিসংঘকে প্রস্তাব দেবে বলে হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের শহর শিরাজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘আমাদের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার তারা কে?’
ইরান পরমাণু বোমা তৈরির আকাঙ্ক্ষায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে বলে পশ্চিমা বিশ্ব সন্দেহ করে আসছে। তবে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ দাবি করে জানিয়েছে, বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়ানোর জন্যই তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যাতে ইরান আরও গ্যাস ও তেল রপ্তানি করতে পারে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে ভারত-ভুটান চুক্তি সই

বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পানিবিদ্যুত্, বেসামরিক বিমান চলাচল, স্বাস্থ্য ও মাদক চোরাচালান রোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মঙ্গলবার ছয়টি চুক্তি ও ছয়টি সমঝোতা স্মারক সই করেছে ভারত ও ভুটান।
ভুটানের ২৯ বছর বয়সী রাজা জিগমে খেসার নামগায়েল ওয়াংচুক সোমবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গিয়ে পৌঁছালে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।
নয়াদিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন রাজা খেসার। প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক ও দুই নেতার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর ছয়টি চুক্তি ও ছয়টি সমঝোতা স্মারকে সই করে দেশ দুটি।
প্রস্তাবিত তিনটি পানিবিদ্যুত্ প্রকল্প ও একটি পানি সংরক্ষণাগার প্রকল্পের ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে থিম্পুকে সহায়তা দেবে ভারত।
বর্তমানে ভুটান এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনে সক্ষম। উত্পাদিত বিদ্যুতের মধ্য থেকে ৪০০ মেগাওয়াট অভ্যন্তরীণ কাজে ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুত্ রপ্তানি করা হয় ভারতে। ইতিমধ্যে তিনটি বড় পানিবিদ্যুত্ প্রকল্প স্থাপনে ভুটানকে সহায়তা দিয়েছে ভারত।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভুটানের রাজার সফরকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেন। ভুটানকে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেও অভিহিত করেছেন তিনি। রাজা খেসার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে আশ্বস্ত করে বলেন, তাঁর দেশ ভারতের স্বার্থের ব্যাপারে সচেতন। ২০১০ সালে ভুটানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনকে স্মরণীয় ও সফল করতে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং।

ভারতের শতাধিক জেলেকে মুক্তি দেবে পাকিস্তান

পাকিস্তানে আটক ভারতীয় শতাধিক জেলেকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। বিশেষ মানবিক বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তান সরকারের একজন মুখপাত্র। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পরমাণু শক্তিধর বৈরী প্রতিবেশী দেশ প্রায়ই আরব সাগরের সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতিপক্ষ দেশের জেলেদের আটক করে নিয়ে যায়।
পাকিস্তান সরকারের মুখপাত্র আরও জানান, মানবিক কারণেই পাকিস্তানের বিভিন্ন কারাগারে আটক ভারতীয় শতাধিক জেলেকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে গেছে। এখন তারা এই জেলেদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে পাকিস্তান জানিয়েছে, এক হিসাবমতে, ভারতের কারাগারে প্রায় ২০০ পাকিস্তানি জেলে আটক রয়েছেন। অপরদিকে পাকিস্তানের কারাগারে পাঁচ শতাধিক ভারতীয় জেলে আটক থাকার অভিযোগ করেছে নয়াদিল্লি।
তবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি অভিযোগ করেছেন, ভারত ওই জেলেদের দেশে ফিরিয়ে নিতে সহযোগিতা করছে না। করাচি কারাগারের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট শাকির শাহ বলেন, ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই জেলেদের দেশে ফিরিয়ে নিতে ভারতকে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা পাকিস্তানকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে পারেনি। জেলেদের ফিরিয়ে নিতে নতুন একটি তারিখ ঠিক করতে হবে।
গত বছর মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ থাকার পর থেকেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ শীতল পর্যায়ে রয়েছে।

উত্তর কোরীয় বিমানটি শ্রীলঙ্কা যাচ্ছিল! -থাই কর্তৃপক্ষের দাবি

থাইল্যান্ডে আটক অস্ত্রবোঝাই উত্তর কোরীয় বিমানটি ইরান যাচ্ছিল—এমন খবর নাকচ করে দিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ। এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীর দাবি, বিমানটি শ্রীলঙ্কা যাচ্ছিল। খবর এপির।
থাইল্যান্ডের অপরাধ দমন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান কর্নেল সুপিসরন ভাদিনারিনাথ বলেন, অস্ত্রবাহী বিমানটি ইরান যাচ্ছিল—এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে তদন্ত অব্যাহত আছে।
বিমানটি জ্বালানি ভরার জন্য ১২ ডিসেম্বর ব্যাংককের ডন মুয়াং বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। ওই দিনই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানটিতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ৩৫ টন অস্ত্র উদ্ধার এবং বিমানচালক ও চার ক্রুকে গ্রেপ্তার করে থাই কর্তৃপক্ষ।

ইউরোস্টার ট্রেন চালু হয়েছে সচল হচ্ছে ইউরোপ

ইউরোপে প্রচণ্ড তুষারপাতের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘ইউরোস্টার’ রেল যোগাযোগ আবার চালু হয়েছে। হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে গত মঙ্গলবার লন্ডন থেকে ইউরোপের অন্যান্য স্থানে ইউরোস্টার ট্রেনের চলাচল শুরু হয়।
তবে তীব্র শীত, তুষার ও জমে থাকা বরফ রেলপথ ও সড়কপথে এখনো সমস্যা তৈরি করছে। এ ছাড়া ইতালি ও জার্মানির বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট দেরিতে ছেড়ে যায়, অনেক ফ্লাইট বাতিলও হয়।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও তুষারপাত্রের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষে খারাপ আবহাওয়ার ফলে ইউরোস্টারের কয়েকটি ট্রেন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে সংযোগকারী সাগরতলের সুড়ঙ্গপথে প্রায় ১৬ ঘণ্টা আটকা পড়ে। ফলে প্রায় আড়াই হাজার যাত্রী ট্রেনে বিদ্যুত্ সরবরাহ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, খাবার ও পানি ছাড়া তীব্র ভোগান্তির শিকার হয়। এরপর ইউরোস্টারের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার সীমিত আকারে আবার চালু হওয়ার পর সকাল সাতটা ৪১ মিনিটে লন্ডনের সেন্ট প্যানক্রাস ইন্টারন্যাশনাল স্টেশন থেকে প্যারিসের উদ্দেশে একটি ট্রেন ছেড়ে যায়। অন্যদিকে প্যারিসের গার দ্যু নর্দ স্টেশন থেকে ফিরতি পথে একটি ট্রেন ছাড়ে।
এ সময় স্টেশনে আরও হাজারখানেক যাত্রী পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় ছিল। পাঁচ শর মতো যাত্রী সঠিক তথ্য না দিতে পারায় ইউরোস্টারের কর্মচারীদের উদ্দেশে চেঁচামেচি করে অভিযোগ জানায়।
ইউরোস্টারের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড ব্রাউন জানান, ক্রিসমাসের আগে রেল যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। ক্রিসমাসের সময়টা বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ের একটি এবং এই সময় খারাপ আবহাওয়ার কারণে ইউরোপজুড়ে সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ব্রিটেনের বিমানবন্দরগুলো আগের দিনের আটকে থাকা ফ্লাইটগুলো চালু করছে এবং আরও অনেক ফ্লাইট ছাড়তে বিলম্ব হতে পারে বা বাতিলও হতে পারে বলে যাত্রীদের সতর্ক করেছে।
ইতালির আল ইতালিয়া এয়ারলাইনসও তাদের ফ্লাইটগুলো আবার চালু করেছে। তবে বার্লিনের টেগেল বিমানবন্দরে এক ঘণ্টা বিমান চলাচল বন্ধ থাকে এবং ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রায় ২০০ ফ্লাইট আটকা পড়ে।

লালনের ছায়া by আজাদুর রহমান

দৌলতপুরের হোসেনাবাদ গ্রামে জন্ম নেওয়া বাউল শফি মণ্ডলের কাছে লালনই সব কথা। তাঁর ভাষায়, ‘গুরুকেই আমি লালন ভাবি। গুরুভাবনায় থাকতে থাকতে কখনো আবার নিজের মধ্যেই লালন প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। তখন মন অন্য রকম হয়ে যায়। গানের সুর ভালো হয়। মনে হয়, যার গান সেই গাইছে, আমি খালি খালি মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।’ শ্যামলা রঙের মনোহরি এই বাউলের ভাবের অভাব হয় না। কথা বলতে বলতে তিনি গান ধরেন—
‘ভাবের ঘরে কী কুদরতি
ভাবের লণ্ঠন ভাবের বাতি
ভাবের অভাব হলে এক রতি
অমনি ওই রূপ যায় সরে...’
গান শেষ করে শফি পুনরায় কথায় ফেরেন, ‘যখন গান করি, তখন কিছুই দেখতে পাই না। শুধু আমার রূপে গুরুর রূপ বিলীন করে নিজের রূপটাই আমি দেখতে চেষ্টা করি। রূপের দিকে “ধিয়ান” না থাকলে সে রূপ থাকে না আর।’ গুরু ও লালন প্রসঙ্গে শফি জানান, ‘গুরু কিংবা লালন যা-ই বলুন, ওনারা তো ধিয়ানলোকে বিরাজ করেন। কাজিপুরের দবিরউদ্দিনকে দেখে আসুন, তিনি আমার গুরু, তাঁকে দেখলে লালনের ছোঁয়া পাবেন।’
দবিরউদ্দিন নিভৃত গ্রামে থাকেন। অনেকবার গাড়ি ও রাস্তা বদল করে তাঁর কাছে যেতে হয়। দৌলতপুর-মেহেরপুরের সীমানা বরাবর হওয়ায় কেউ বলেন দৌলতপুরে বাড়ি, কেউ বলেন মেহেরপুরে। যা হোক, কুষ্টিয়া শহর থেকে খলিষাকুণ্ডি হয়ে প্রথমে বাসে করে প্রায় ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরের মেহেরপুরের বামুন্দিতে নামতে হয়। সেখান থেকে ভ্যানের রাস্তায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার যাওয়ার পর নওদাপাড়া বাজার। এরপর হাতের বাঁয়ে নদী ধরে হাঁটাপথ প্রায় মাইলখানেক পেরোলে ঝুপড়িগ্রাম-কাজিপুরের মাঠপাড়া। মাঠপাড়ার মাঝামাঝি জায়গায় পিঁড়ালি দেওয়া খড়ের চৌচালা ঘরের আঙিনায় খেজুরের পাটিতে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন দবিরউদ্দিন। সালাম দেওয়ার পর মুখোমুখি হতেই একটা অন্য রকম ভাব নেমে এল—কল্পনার লালন বুঝি ছেঁউড়িয়া থেকে এখানে এসে বসতি গেড়েছে। লালনের মতোই নাক, কপাল, কান—যেন অদ্ভুত এক মুহূর্তে সাক্ষাত্ লালনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। গায়ের রংটা হালকা কালো হলেও তাতে তামাটে উজ্জ্বলতা। দাঁড়ালে দবির উদ্দিনের হাত দুটো লালনের মতো হাঁটুর নিচে পড়ে। আগ্রহ নিয়ে তাঁর দিকে চেয়ে থাকি।
দবিরউদ্দিনকে কী বলা যায়, সব গুলিয়ে গেছে। দবিরের সেবাদাসী আনজিরা বেগম চিঁড়া, গুড়, মুড়ি আনলেন। খেজুরপাটিতে বসে পরস্পর আলাপচারিতা। খেতে খেতে জানা গেল, প্রাগপুরের গরুড়া গ্রামের আনজিরা বেগম দবিরউদ্দিনের স্ত্রী বেঁচে থাকতেই সংসার থেকে সম্মতি নিয়ে তাঁর সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন। আনজিরার বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে। দবিরউদ্দিন স্ত্রী সারেজান বিবিকে খুব ভালোবাসতেন। প্রতিবছর স্ত্রীর প্রয়াণ দিনে সাধুসেবা করেন। স্ত্রী বছরখানেক আগে গত হয়েছেন। প্রয়াত স্ত্রীর কথা মনে করে দবির আফসোস করে ওঠেন, ‘সারেজানের মৃত্যুটা অন্য রকমভাবে হয়েছিল। সেদিন সকালে সাধুসংঘ ছিল। বাল্যসেবার পর দুপুরে সাধুসেবা। বাল্যসেবা নেওয়া হলে সারেজান সবাইকে বললেন, “আমি তো দুপুরের সাধুসংঘ শেষ করতে পারব না। আমাকে বিদায় দিতে হবে।” এ কথা শোনার পর সবাই ব্যথিত হলো। সারেজান প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিলেন, তারপর আমাকে শিষ্যদের হাতে সঁপে দিয়ে কথা বলতে বলতে তিনি মারা গেলেন।’ দবিরের গুরুমা অর্থাত্ গুরু মোফাজ্জল শাহের স্ত্রীও তাঁর জীবদ্দশায় অনুরূপ সাধুসংঘে একই প্রক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন। দবিরের গুরুর নাম মোফাজ্জল ফকির। মোফাজ্জল ফকিরের গুরুর নাম সাধনশাহ্। মোফাজ্জল ফকিরের বাড়ি ছিল খলিষাকুণ্ডিতে। দবিরের বাবা তৈয়ব আলী একসময় জোতদার ছিলেন। তখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে বাড়ি ছিল। দবির নিজে কোনো লেখাপড়া করেননি। সংসারে উদাসী দবির ফকির গান গেয়েই বেড়াতেন—পাল্লার গান। গানে গানেই একসময় জমিজমা শেষ হয়ে যায়। দবির এখন যে বাড়িতে আছেন, সেটা গুরু মোজাম্মেলের আখড়া ছিল। ঘরের পাশেই মোজাম্মেল ফকিরের কবর। মৃত্যুকালে তিনি দবিরকে এই বাড়ি দিয়ে যান। সেই থেকে দবির এখানেই থাকেন। একটা ঘর— খেজুরপাতার বেড়া দেওয়া—ওইটাই সব।
লালনের গান ছাড়া দবিরের তেমন কোনো নেশা নেই, তবে পান খান। গুরুর প্রতি তাঁর ভক্তি অপরিসীম। একসময় লালনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শিষ্য ইসমাইল ও কোকিল শাহের সঙ্গে তাঁর সঙ্গ ছিল। দবিরউদ্দিনের গুরুর গুরু সাধনশাহ্, সাধনের গুরু ছিলেন আবদুল্লাহ্। আবদুল্লাহ্ লালনের প্রাথমিক পর্যায়ের শিষ্য ছিলেন। তিনি তরিকা মেনে নামাজ পড়েন, রোজাও করেন। সর্বোপরি মানবতাই তাঁর কাছে বড় ধর্ম। সে কারণে সারা জীবনের অর্জিত অর্থ তিনি মানবসেবায় ব্যয় করেন। তাঁর মতে, মানবসেবা হলো সাধুসংঘ করে মানুষকে বোঝানো।
সাধনা বলতে দবির নিষ্কাম ভজনাকেই বোঝেন। ‘সোনার মানুষ ভাসছে রসে’—লালনের এই গান শোনার পর দবির মুগ্ধ হয়ে লালনপথে এসেছিলেন।
লালনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় কি না—এ রকম কথার জবাবে দবির বলেন, ‘স্বপ্নে তাঁর সঙ্গে আমার স্বরূপে দেখা হয়। লালন আমার মাথায়-মুখে ফুঁ দিয়ে দোয়া করেন। কথা বলেন না, তবে আকার-ইঙ্গিতে কথাবার্তা হয়। আমাকে কী দিয়েছেন, আলোচনা কী হয়—সেসব গুরুরহস্য এত অল্প সময়ে আপনাকে দেওয়া যাবে না।’
লোকে বলে, দবির এখন ১০৩ বছরের শক্তসমর্থ বৃদ্ধ বাউল। ৪৫ বছর ধরে নিরামিষভোজি দবির ফকিরের সুনির্দিষ্ট কোনো শিষ্য নেই। তাঁর ভক্ত-শিষ্যরা ছড়িয়ে থাকেন সারা দেশে। দবিরের ওখানে বছরে দুবার সাধুসংঘ হয়। সাধুসংঘের ধরন অন্য রকম। অগ্রহায়ণের ১৯ তারিখে পুরুষদের সাধুসংঘ, অন্যদিকে নারীদের সাধুসংঘ হয় আশ্বিনের ১৯ তারিখে।

কুষ্টিয়ায় বিআরবি পলিমারের ১২তম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন

পিভিসি পাইপ প্রস্তুতকারী কুষ্টিয়ার বিআরবি গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিআরবি পলিমার লিমিটেডের ১২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মঙ্গলবার স্থানীয় বিসিক শিল্পনগরীর কারখানা চত্বরে পালিত হয়েছে।
এ উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিআরবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মজিবর রহমান। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুর রহমান ও বিআরবি পলিমারের উপমহাব্যবস্থাপক রোকনুজ্জামান।
১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া বিসিক শিল্পনগরীতে বিআরবি পলিমার লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে পিভিসি পাইপ, পিভিসি ফিলটার ও ফিটিংস এবং আমদানি বিকল্প ওয়্যারস অ্যান্ড কেবলস উত্পাদনের কাঁচামাল পিভিসি কম্পাউন্ড।

দেশের বাজারে স্পাইস মোবাইল নিয়ে এল ট্রু ডিস্টিবিউশন

দেশের বাজারে ভারতীয় স্পাইস মোবাইল হ্যান্ডসেট নিয়ে এল ট্রু ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড। তারা স্পাইস এম-৫২৫২, স্পাইস এক্স-১, স্পাইস ডি-৮৮ গোল্ড ও স্পাইস এস-৯৪০ নামের চারটি হ্যান্ডসেট বাজারজাত করছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে এই মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেটের বাজারজাতকরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) সচিব মো. মাহবুব আহমেদ। এতে উপস্থিত ছিলেন স্পাইস মোবাইলস লিমিটেডের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কুনাল আহুজা, ট্রু ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব আহমেদ আনসারী এবং সাউথ এশিয়া মোবাইল ফোরামের চেয়ারম্যান মেহবুব চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, স্পাইস মোবাইল হচ্ছে ভারতের আন্তর্জাতিক মানের মোবাইল হ্যান্ডসেট, যা ইতিমধ্যে ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
এতে আরও বলা হয়, স্পাইস মোবাইলস লিমিটেড ভারতের মোবাইল ফোন জগতে সর্বপ্রথম ‘ডুয়াল মোড ফোন’ নিয়ে আসার মাধ্যমে এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। একইভাবে এ কোম্পানি বাজারে আনে ‘স্পাইস ডি-১১০০’ নামে ভারতের প্রথম ডুয়াল সিম পিডিএ।

তেজি হয়ে উঠছে বিশ্ব শেয়ারবাজার

যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খাতে বিক্রি বাড়ায় সে দেশের অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর গতি জোরালো হচ্ছে—এমন আশাবাদে গতকাল বুধবার এশিয়া ও ইউরোপের বড় বড় শেয়ারবাজারের মূল্যসূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। এ দিন বিশ্বের প্রধান অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের মূল্যসূচকও বাড়ে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে গতকাল চীনের সাংহাই, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল, অস্ট্রেলিয়ার সিডনির শেয়ারবাজারের মূল্যসূচক যেমন বেড়েছে, তেমনি ইউরোপে জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য প্রভৃতি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতেও শেয়ারের মূল্যসূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এর আগের দিন মঙ্গলবার প্রকাশিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বর মাসে আবাসন বিক্রির তথ্য। এতে বলা হয়, এ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন বিক্রি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যা ইতিপূর্বের প্রাক্কলনের চেয়ে আড়াই শতাংশ বেশি।
চীনের সাংহাইয়ে শেয়ারের সমন্বিত সূচক গতকাল ২৩ দশমিক ২৬ পয়েন্ট, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের কোসপি সূচক শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, সিঙ্গাপুর সূচক ও তাইওয়ানের তায়েক্স সূচক শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় সিডনির এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স সূচক শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
জাপানে টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জ গতকাল বুধবার অবশ্য ছুটির কারণে বন্ধ ছিল। এর আগের দিন টোকিওতে শেয়ার সূচক নিক্কি ২২৫ অর্থাত্ ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছিল।
হংকংয়ের হেংসেং সূচক বেড়েছে গতকাল ১ দশমিক ১ শতাংশ।
মঙ্গলবারে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিটের শেয়ারবাজারে ডাউ জোন্স শিল্পসূচক ৫০ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট, স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর (এসঅ্যান্ডপি) ৫০০ সূচক শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, নাসডাক সমন্বিত সূচক শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
আমেরিকায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমিয়ে প্রাক্কলন করা সত্ত্বেও আবাসন খাতে বিক্রি বাড়ায় দেশটির শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হবে বলে তাদের বাণিজ্য বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে। এর আগে এ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৮ শতাংশে প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
হংকংভিত্তিক নিউএজ গ্রুপের বিশ্লেষক কার্বি ডালি বলেন, চীনের অর্থনীতির শক্তিমত্তা বজায় থাকায় তা সার্বিকভাবে এশিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে এশিয়ার অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে।
এদিকে ৫৮ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের আর্থিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচির সুবাদে চীন ২০০৯ সালে মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) ৮ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করছে। তবে সমাজতান্ত্রিক দেশটির বেসরকারি খাতের অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য আশা করছেন, জিডিপিতে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে।

অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৩ শতাংশ -যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে বাস্তবায়ন সন্তোষজনক নয়

চলতি বছরের বাজেট বাস্তবায়নে সরকার নানা পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করলেও প্রথম পাঁচ মাসে দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ২৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একই সময়ে এডিপির মোট বরাদ্দের ৩৬ শতাংশ অর্থ ছাড় করা হয়েছে।
এডিপি বাস্তবায়নে শীর্ষ ১০টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, শিক্ষা, কৃষি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সন্তোষজনক অগ্রগতি করলেও অগ্রগতি নেই পানিসম্পদ এবং গৃহায়ণ ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের। দেশে যোগাযোগ ও বিদ্যুত্ খাত চরম নাজুক অবস্থায় থাকলেও এ দুটি মন্ত্রণালয়ও পরিস্থিতি উন্নয়নে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারছে না। দুটি মন্ত্রণালয় গত পাঁচ মাসে তাদের মোট বরাদ্দের ২০ শতাংশও খরচ করতে পারেনি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তাদের বরাদ্দের ১৩ শতাংশ এবং বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় লক্ষ্যমাত্রার ১৮ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়কালে এডিপি বাবদ ব্যয় করা হয়েছে ছয় হাজার ৯০১ কোটি টাকা। এটি এ বছরের মোট বরাদ্দ ৩০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ২৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাবদ ব্যয় হয়েছিল চার হাজার ৫৩১ কোটি টাকা, যা ছিল ওই অর্থবছরের মোট বরাদ্দের ১৮ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এডিপির বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
এডিপি বাস্তবায়নের বরাদ্দের শীর্ষে থাকা ১০ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তাদের বরাদ্দ করা ৬৮৩ কোটি টাকার মধ্যে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়টি ৪৫৪ কোটি টাকা খরচ করেছে, যার পরিমাণ মোট বরাদ্দের ৬৬ শতাংশ। এরপর আছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়টি তাদের বরাদ্দ করা দুই হাজার ৮২৮ কোটি টাকার মধ্যে ৩৭ শতাংশ খরচ করে ফেলেছে। এরপর আছে কৃষি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুটি মন্ত্রণালয়ই তাদের বরাদ্দ করা এডিপির ৩২ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিগত পাঁচ মাসে তাদের সারা বছরের বরাদ্দ ছয় হাজার ৫১৩ কোটি টাকার মধ্যে এরই মধ্যে এক হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা মোট বরাদ্দের ৩০ শতাংশ।
এডিপি বাস্তবায়নের দিকে সবচেয়ে নিচে আছে গৃহায়ণ ও পূর্ত মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়টি এ বছর এডিপি বাবদ বরাদ্দ পায় ৫৪৪ কোটি টাকা। পাঁচ মাসে তারা ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ২০ কোটি টাকা, যা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ৪ শতাংশ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় তাদের মোট বরাদ্দের মাত্র ১২ শতাংশ ব্যয় করেছে। যোগযোগ মন্ত্রণালয় এ বছরে বরাদ্দ পেয়েছে তিন হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। পাঁচ মাসে তারা ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ১৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান সরকার উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কারণ ৩০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিরাট এডিপির বিপরীতে পাঁচ মাসে মাত্র ২৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হওয়া তারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখ্ত প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি অর্থবছরই প্রথম ছয় মাসে এডিপির বাস্তবায়নের হার খুব অল্প ও গতি খুব শ্লথ থাকে। সেই অনুযায়ী এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কিন্তু অনেকে এটাও বলছেন, গতানুগতিক এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে বছরের শেষদিকে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অপচয় বাড়বে।
প্রসঙ্গত, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন সব সময়েই দুর্বল; এবারের বিশেষ ভয় হলো যে এইটি এতই উচ্চাভিলাষী যে ব্যর্থতার আশঙ্কা ব্যাপক। তাই শুরু থেকেই পরিবীক্ষণ, দেখাশোনা ও মূল্যায়নে জোর দিতে হবে।’
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বিশ্ব মন্দা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছিলেন। আর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি অনিবার্যভাবে চলে আসে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার ব্যয় বাড়ানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো অর্থ ব্যয় করতে পারছে না। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছর এডিপিতে মোট ৮৮৬টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ছিল ৯০৪টি। সংশোধিত এডিপির আয়তন গত অর্থবছরে ছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা গেছে ১৯ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, যা মোট বরাদ্দের ৮৬ শতাংশ। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গত অর্থবছরের জন্য ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার মূল এডিপি নির্ধারণ করে। পরে এই সরকার এসে তা কমিয়ে আনে।

উলফা ও বাংলাদেশ -বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় আর নয় by মতিউর রহমান

আসামের উলফা (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম) এবং বিভিন্ন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন বাংলাদেশে নানাভাবে সক্রিয় ছিল, তাদের আস্তানা ছিল—এ বিষয়টি এখন দেশের সংবাদমাধ্যমে বহুল আলোচিত। এটা যে আগে কেউ জানত না, ব্যাপারটা তা নয়। এসব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর এ দেশে অবস্থান বা তত্পরতার কথা অতীতের সব সরকার ও বিরোধী দল এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানত। দীর্ঘদিন তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতাও পেয়েছে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো, যদিও অতীতে আমাদের সরকারগুলো দেশে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করে এসেছে। আন্তদেশীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সরকারগুলো যেন সংকটে না পড়ে, সে বিবেচনা থেকে দেশের সংবাদমাধ্যমও এদের নিয়ে বড় কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন সময় এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরকারের কিছু তত্পরতা বা তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নানা ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে।
আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এ দেশে আস্তানার বা অবস্থানের সত্যতা বাংলাদেশের একাধিক সরকারের আমলে একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী আমাদের নিশ্চিত করেছিলেন। অন্তত তিনজন সাবেক সেনাপ্রধানের কাছ থেকেও এসব আমরা শুনে এসেছি। প্রভাবশালী একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতাও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পেয়েছে বলে জানা যায়। তারা অবশ্য এ সমালোচনা এখন মেনে নেয়। তারা এ-ও জানায়, আর এ রকম হবে না। ভারতের অভিযোগের জবাবে আমাদের সব সরকারই অবশ্য উলফাসহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশে অবস্থানের কথা অস্বীকার করে এসেছে। এখন তো বাংলাদেশের সরকার এদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তবে এটাও সত্য, অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় সরকারের আমলে এসব গোষ্ঠীর ওপর কখনো কখনো কিছু চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। উলফা বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর কিছু আস্তানা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময় কিছু ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহতও হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালের ২৭ মে ভোরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুরে র্যাব ও বিডিআর যৌথ অভিযান চালাতে গেলে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে ছয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়। পরে র্যাব ওই এলাকা থেকে আটজনকে গ্রেপ্তার এবং গ্রেনেডসহ বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে।
২০০৬ সালের ১২ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মাচালংয়ে সেনাবাহিনী ও র্যাবের যৌথ অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে ১০ জন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়। অভিযানকালে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলটির ঘাঁটি থেকে একটি সাব-মেশিনগান (এসএমজি), ৩০৩ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তলসহ আটটি অস্ত্র এবং গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ২০০৬ সালের ৩০ জুন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে একে-৪৭ রাইফেল, গ্রেনেড ও মর্টার শেলসহ উদ্ধার করা হয় বেশকিছু অস্ত্র।
২০০৭ সালের মার্চের শুরুতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বারোমারি ক্যাম্পের বিডিআরের সদস্যরা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি গোষ্ঠীর ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেন।
এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ১৯৯৭ সালে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন উলফার সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়া। আবার বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৬ সালে মৌলভীবাজারে গ্রেপ্তার হন ত্রিপুরার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এনএলএফটির (ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা) একাংশের প্রধান নয়নবাসী জামাতিয়া। দুজন এখনো বাংলাদেশের কারাগারে রয়েছেন।
শুধু তা-ই নয়, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল এ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার ঘটনা ঘটে। ওই দিন চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তীরে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) জেটিতে খালাস করার সময় ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক করে পুলিশ। এ অস্ত্রের চালান যে উলফার আমদানি করা ছিল, সেটা তখনই জানা গিয়েছিল। মামলার তদন্তে এখন এমন তথ্য বেরিয়ে আসছে যে, উলফাকে এ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করছিল একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এরই মধ্যে ওই গোয়েন্দা সংস্থার দুজন সাবেক মহাপরিচালককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন ওই সংস্থার একজন সাবেক পরিচালক। অস্ত্র চোরাচালানের পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশের কথাও শোনা যায়।
ওই অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার পর বিএনপির তত্কালীন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন, এই অস্ত্রের চালান এনেছে উলফা। ওই মন্ত্রী আরও বলেছিলেন, উলফা নিজ ব্যবস্থাপনায় এ রকম বড় ধরনের অস্ত্রের চালান নিয়ে আসতে পারে, তাদের সেই শক্তি-সামর্থ্য ও যোগাযোগ রয়েছে। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পুরো বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে রাখে।
এর আগে ২০০৩ সালের ২৭ জুন বগুড়ার কাহালুতে এক লাখ গুলি ও ১৭৪ কেজি উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক আরডিএক্স ধরা পড়ে। সে চালানও উলফার ছিল বলে এখন তদন্তে বেরিয়ে আসছে। এসব ঘটনা এটাই প্রমাণ করে, এ দেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা শুধু অবস্থানই করেনি, তারা বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুদও করেছে। আর এ সবই করতে পেরেছে দেশের অভ্যন্তরের কোনো না কোনো রাজনৈতিক শক্তি ও গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায়।
সম্প্রতি উলফার চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়াসহ সংগঠনটির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনায় বাংলাদেশে এসব গোষ্ঠী আবার আলোচনায় এসেছে। তারা কোথায় ও কীভাবে গ্রেপ্তার হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিতর্ক যা-ই হোক, দেশের ভেতরে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। সার্ক ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী সনদে স্বাক্ষরদানকারী দেশ বাংলাদেশ। তবে সে বিতর্কে না গিয়েও এখন এটা স্পষ্ট করে বলা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে থেকে তত্পরতা চালিয়ে ছিল। উলফার সামরিক বিভাগের প্রধান পরেশ বড়ুয়া একসময় এ দেশে অনেকটা প্রকাশ্যেই চলাফেরা করেছেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব গোষ্ঠীর তত্পরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ২০০৪ সালের শুরুতে পরেশ বড়ুয়া বিএনপি সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। ওই মন্ত্রী তখন অনেককেই এ কথা বলেছিলেন।
সম্প্রতি উলফার চেয়ারম্যানসহ একাধিক নেতার গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি আলোচনায় এলেও বিরোধী দল বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামী এখনো এ বিষয়ে কিছু বলেনি। তবে এ দলগুলোর সমর্থক-সংবাদমাধ্যমে তাদের পক্ষের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা তুলছেন। তাঁরা এমনও প্রচার করছেন, উলফা এ দেশে পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে। অবশ্য পরেশ বড়ুয়া বিবৃতি দিয়ে সে আশঙ্কা দূর করেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ তাদের লক্ষ্য নয়।
আমরা মনে করি, এ ধরনের ভারতীয় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো গোষ্ঠীকে কোনো প্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া আমাদের দেশের জন্য ঠিক নয়। কোনো গোয়েন্দা সংস্থারও উচিত নয় তাদের সহযোগিতা করা। বাংলাদেশের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে, অন্য দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ক্ষেত্রে আমরা কাউকে কোনো সহায়তা করব না। কিন্তু বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এ ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা করা হয়েছে। ফলে ওই সময় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এর আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও শুরুর দিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ ছিল, কিন্তু পরে সে উষ্ণতা আর বজায় থাকেনি। সে সময় অনুপ চেটিয়া গ্রেপ্তার এবং বিচারের সম্মুখীন হলেও উলফা বা অন্য কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শুধু ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, ভারত ও পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কথাও এ ক্ষেত্রে বলতে হয়। এসব জঙ্গিগোষ্ঠী এ দেশে শুধু আনাগোনাই করেনি, এখানে তাদের আস্তানা ছিল, এখানে তারা অত্যন্ত তত্পর ছিল। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এ-জাতীয় জঙ্গিদের আনাগোনা ছিল সবচেয়ে বেশি। তাদের তত্পরতার কথা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অজানা ছিল—এ কথা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আবার এ কথাও সত্য, এসব জঙ্গির প্রতি পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠতা এবং নানা রকম যোগাযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। জঙ্গিদের প্রতি উদাসীন থাকার পরিণতি বিগত জোট সরকারের আমলে আমরা দেখেছি। দেশব্যাপী ভয়ংকর বোমা-গ্রেনেড হামলা ও হতাহতের সেসব স্মৃতি সহজে ম্লান হওয়ার নয়। গত কয়েক মাসে ভারত ও পাকিস্তানের ১০ জন জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে।
আমরা মনে করি, ভারতের উলফা, পাকিস্তানের লস্কর-ই-তাইয়েবা কিংবা অন্য যেকোনো বিদেশি সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠীই হোক না কেন, কখনোই আমাদের ভূমি ব্যবহারের কোনো সুযোগ তাদের দেওয়া ঠিক নয়। এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে তা আন্তরাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ভূ-রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ হয়ে পড়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ; আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি হয়ে ওঠে বড় বাধা। পাশাপাশি আমাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
বর্তমান সরকার এরই মধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে এ ধরনের বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। আমরা এ ক্ষেত্রে সরকারি এসব ব্যবস্থাকে সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করি। বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিগোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে পাকিস্তান এখন যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী সামনের ভারত সফরে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করবেন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এসব অন্তরায় দূর করতে উদ্যোগ নেবেন। অন্য কোনো দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিদের এ দেশের ভূমি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না—এমন আশ্বাস নিশ্চয় তিনি ভারতকে দেবেন। পাশাপাশি ভারতের কাছ থেকেও নিশ্চয় আমরা এ প্রতিশ্রুতি ও নিশ্চয়তা আদায় করতে পারব যে, আমাদের দেশের কোনো সন্ত্রাসীও ভারতে আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে না। কারণ এটাও আমরা জানি, বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভারতে গিয়ে লুকিয়ে থাকে। সেখানে থেকেই এ দেশে নানা অপরাধ সংগঠিত করে। সে জন্য এই অপরাধীদের অপতত্পরতা বন্ধে অবশ্যই আমাদের ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও বর্তমান মহাজোটের শেখ হাসিনার সরকারকে আলোচনা করতে হবে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের সঙ্গে এই সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে যে, বাংলাদেশের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী পাকিস্তানে কোনো প্রশিক্ষণ বা অন্য কোনো ধরনের সহযোগিতা পাবে না। পাকিস্তানের জঙ্গিদেরও বাংলাদেশে প্রবেশে বা তত্পরতা চালানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হবে, এবং এ সংক্রান্ত সব বিষয়ে দুই দেশ পরস্পরকে সহযোগিতা করবে।
আমরা কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা চাই না। আমরা সমঝোতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ও আমাদের আঞ্চলিক ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা চাই, ভারত ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিদেশীয় এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে দক্ষিণ এশীয় পরিমণ্ডলের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার একটি উদ্যোগী ভূমিকা নেবে। আসন্ন নয়াদিল্লি সফরের মধ্য দিয়ে এর সূত্রপাত হতে পারে। অন্তত এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে, যাতে সে লক্ষ্যে একটি ইতিবাচক যাত্রার সূচনা হয়।
মতিউর রহমান: সম্পাদক, প্রথম আলো।

এক ‘বুসবি বেবের’ চলে যাওয়া

১৯৫৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়াদের অন্যতম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড খেলোয়াড় অ্যালবার্ট স্ক্যানলন ৭৪ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন গতকাল।
১৯৫৪ সালে ১৯ বছর বয়সে প্রবাদপ্রতিম ম্যানেজার ম্যাট বুসবির তত্ত্বাবধানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে অভিষেক হয়েছিল স্ক্যানলনের। বুসবির যুব প্রকল্প থেকে মূল দলে এসেছিলেন বলে অন্যদের মতো তাঁকেও ডাকা হতো ‘বুসবি বেবস’ বলে। ১৯৫৮ সালে জার্মানি থেকে ইউরোপিয়ান কাপের ম্যাচ খেলে ফেরার সময় বিমান দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন স্ক্যানলন, যে দুর্ঘটনায় ৮ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে নিহত হন ৩ জন কর্মকর্তা। পা ভেঙে গিয়েছিল, আঘাত পেয়েছিলেন মাথায়ও। তবে সেরে উঠে পরের বছর আবার খেলেছেন ম্যানইউর হয়ে, মোট ম্যাচ খেলেছেন ১২৭টি, আর তাতে তাঁর গোল ছিল ৩৫টি।

বিজয় দিবস হকি

ফেডারেশন একাদশ নাম নিয়ে খেলা জাতীয় দল এরই মধ্যে বিজয় দিবস হকির ফাইনালে উঠেছে। ৩ ম্যাচে ৯ পয়েন্ট পাওয়া জাতীয় দলের বিপক্ষে আজ শেষ ম্যাচে জয় পেলে ২৬ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটায় অনুষ্ঠেয় ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হবে সেনাবাহিনী। সে ক্ষেত্রে ৪ ম্যাচে তাদের পয়েন্ট হবে ৮। সেনাবাহিনী আজ হারলে বা ড্র করলে ৪ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে বিকেএসপি চলে যাবে ফাইনালে। বাংলাদেশ পুলিশ দলকে কাল ৩-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করেছে বিকেএসপি।

জাতীয় ক্রিকেট লিগ ১ জানুয়ারি থেকে

নতুন ফরম্যাটে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের আসর ১১তম জাতীয় লিগ। এবারের চার দিনের ম্যাচের লিগ হবে দুই পর্বে, দ্বিতীয় পর্বের শীর্ষ দুদল খেলবে ফাইনাল। ফাইনাল হবে পাঁচ দিনের, ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি।
ছয়টি বিভাগীয় দল প্রথম পর্বে সিঙ্গেল লিগ পদ্ধতিতে খেলবে একে অপরের সঙ্গে। এই পর্বের সব খেলাই হবে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। প্রথম পর্বের পয়েন্ট নিয়েই শীর্ষ চার দল খেলবে দ্বিতীয় পর্বে। সিঙ্গেল লিগ পদ্ধতিকে সবার সঙ্গে সবার খেলা হবে এই পর্বেও। দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচগুলোর ভেন্যু এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
১ জানুয়ারি একসঙ্গে তিনটি ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে জাতীয় লিগ। রাজশাহী ও সিলেট খেলবে ফতুল্লা স্টেডিয়ামে। রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়ামে খেলবে খুলনা ও ঢাকা। আর বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগ মুখোমুখি হবে বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে।

ভুল বানান ও ভুলের সংস্কৃতি by শান্তনু কায়সার

গত ২৪ নভেম্বর আমন্ত্রিত সুধীজনদের সঙ্গে প্রথম আলো কার্যালয়ে এক অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভায় নানা কথা বলেন অক্সফোর্ডের সাবেক অধ্যাপক, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কিন্তু জন্মসূত্রে ‘বাঙাল’ ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী। এবার বাংলাদেশে আসার পর এক জায়গায় তাঁকে সস্ত্রীক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রসিকতার সঙ্গেই এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে ‘সস্ত্রীক’ বানানে ‘স’-এর সঙ্গে ‘ব’ যুক্ত হয়, যাতে মনে হয় তিনি নিজের স্ত্রীকে নিয়েই এসেছেন, অন্য কাউকে নয়।
কিন্তু এ ধরনের বানান ভুল বোধ হয় আমাদের জন্য স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। নিজের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তদানকারী আমরা বোধ হয় ভুল বানানেও অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি অথবা গেছি। তাই যদি না হবে, তাহলে ‘পথিকৃত্’ জেলা শহরের একেবারে কেন্দ্রে এ ধরনের লেখায় শোভিত হয়ে একটি ব্যানার কী করে দিনের পর দিন প্রদর্শিত হয়—‘পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মাসব্যাপী/তাঁত বস্ত্র ও হস্তশিল্প মেলা-০৯/উক্ত মেলায় আপনারা স্ব-পরিবারে আমন্ত্রীত?’ স্ব-র কথা আর না বলাই ভালো, দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে ‘আমন্ত্রীত’ লেখাও বোধ হয় আমাদের সয়ে গেছে।
কলকাতার দেশ পত্রিকার (বর্তমানে পাক্ষিক) পঁচাত্তর বছরে পদার্পণ উপলক্ষে ২০০৭-এর ২ নভেম্বর সংখ্যায় তপন রায়চৌধুরী ‘আমাদের উচ্চশিক্ষার নিম্ন-উচ্চ’ প্রবন্ধে ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রসঙ্গে যা বলেছেন, আমাদের উচ্চশিক্ষা বিষয়ে তা অধিকতর প্রযোজ্য। প্রবন্ধটির শুরুতেই তিনি বলেছেন, ‘এ দেশের উচ্চশিক্ষাকে একটি প্রাসাদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেই বহু-মহলা পুরীর ছাদ আকাশ ছুঁয়েছে। কিন্তু মেঝে বলে কিছু নেই। অর্থাত্ উচ্চশিক্ষার মান কী, আমাদের দেশে এ প্রশ্ন তুললে তার কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না।’ এই অনুচ্ছেদ তিনি শেষ করেছেন এই বলে, ‘আমাদের ডিগ্রিধারীদের এক বিরাট অংশ প্রায় অশিক্ষিত থেকে গেছেন।’
তাঁর প্রবন্ধের আরও কিছু অংশ উদ্ধার করলে বোঝা যাবে, আমাদের পরিস্থিতি তার চেয়েও কতটা খারাপ। ‘আমাদের শিক্ষা খাতে খরচের এক বিরাট অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য যেভাবে ব্যয়িত হয়, তার ফলে আমাদের উপকারের বদলে অপকারই হয়।’ ‘প্রতি পেপারের জন্য কুড়ি থেকে ত্রিশ পৃষ্ঠা গলাধঃকরণ করে এবং পরীক্ষার খাতায় চর্বিত বস্তু উগরে দিয়ে বিদ্যালাভ সম্পূর্ণ হয়। বাকি জীবন মা সরস্বতীর সঙ্গে মুখ দেখাদেখি না হলেও ক্ষতি নেই।’ ‘পৃথিবীর কোনো অঞ্চলেই এ ধরনের শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষা বলে না।’ এমনকি স্নাতকোত্তর শিক্ষকদের কোনো কোনো ডিগ্রির অভিসন্দর্ভ পড়ে তিনি হাসবেন না কাঁদবেন ভেবে পাননি। এ রকম একটি উদাহরণ দিয়ে তপন রায়চৌধুরী লিখেছেন, ‘এক ব্যক্তি তাঁর রাজ্যে হস্তশিল্পের ইতিহাস লিখতে গিয়ে হরপ্পা থেকে শুরু করেছেন এবং উপসংহারে ওই রাজ্য সরকারে যাঁরা হস্তশিল্প দপ্তরে চাকরি করেন, তাঁদের কাকে কোথায় বদলি করা উচিত, সে বিষয়ে বিশদ মন্তব্য করেন।’ এ বিষয়ে তাঁর শেষ দুটি মন্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য—‘তাঁর ডিগ্রি পেতে অসুবিধে হয়নি। মনে করবেন না এটি বিরল দৃষ্টান্ত।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘ব্রাহ্মণের পইতের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ভদ্রজনের জন্য আবশ্যিক।’ তিনি একে বলেছেন, ‘সোচ্চার শহুরে মানুষের দূরদৃষ্টিবর্জিত স্বার্থসন্ধান।’ বাংলাদেশে বানানের নৈরাজ্য এরই নিম্নতম ও নিকৃষ্ট পরিণতি।
‘নবান্ন উত্সব, ১৪১৬’-র একটি আমন্ত্রণপত্রেও ওই ধরনের ভুল ঘটে। বলা যায়, ভুল বানানের তাঁরা ‘পথিকৃত্’ হয়ে উঠেছেন। ‘সবান্ধবে’ এখানেও যথারীতি হয়েছে ‘স্ব-বান্ধবে’। আমন্ত্রণকারীদের একজন অ্যাডভোকেট ও অন্যজন দৈনিকের সম্পাদক হলেও ‘স’ ও ‘স্ব’-র পার্থক্য নিশ্চিতই তাঁদের অজানা। আমন্ত্রণের শুরুর বাক্যটিতেই ‘অপার্থিব’ বানান লেখা হয়েছে ‘অপ্রার্থিব’ হিসেবে। অর্থাত্ ভুল বানানের সংস্কৃতির ছড়াছড়ি। সে জন্য ‘ধান ভানে’ হয়েছে ‘ধান বানে’। তথ্যগত ভুল তো আছেই, তদুপরি উদ্বোধকের নামটি দৃষ্টিকটুভাবে বড় হরফে লেখা।
এবার অন্যরকম ভুলের কথা। ২৫ নভেম্বরের প্রথম আলোয় একটি প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করেছেন জাফর আহমদ রাশেদ। তাঁর বক্তব্যের শিরোনাম—‘টিভি উপস্থাপকের কাজ কী।’ ঘটনা ২০ নভেম্বর রাত ১২টার পর। বিটিভি ওয়ার্ল্ড প্রচারিত টক-শোতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেনকে স্বাধীনভাবে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। রাশেদের ভাষায়, ‘উপস্থাপক ড. সেনকে ঠিকমতো বলতে দেননি, আমাকে দেননি ঠিকমতো শুনতে।’ তিনি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন ভিডিওতে অনুষ্ঠানটি একবার দেখতে, যাতে তিনি বুঝতে পারেন ‘তাঁর কী করা উচিত নয়’।
এখানে আমি রাশেদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। এ দোষ তো বেচারা উপস্থাপক বা বিটিভির নয়। তাঁরা তো হিজ অথবা হার মাস্টার্স ভয়েস। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলে, ক্ষমতাসীনদের নির্জলা প্রশংসা অথবা স্তুতি করতে হবে। তার পরও ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য কখনো কখনো স্বাধীন অথবা অপেক্ষাকৃত স্বাধীন চিন্তকদের আমন্ত্রণ জানাতে হয়। কিন্তু পাছে তাঁরা যথার্থ, প্রকৃত অথবা সত্য কথা বলে ফেলেন, সে জন্য পাহারা বসাতে অথবা মুখের কথা কেড়ে নিতে হয়। ঝুঁকে থাকা উপস্থাপকেরা সে কাজটিই করে থাকেন। যেমনি নাচায় তেমনি নাচি—পুতুলের কী দোষ?
আমারও বিটিভির ওই রকম এক আলোচনা শোনা ও দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছিল। প্রতিপাদ্য ছিল, ধর্মীয় দৃষ্টিতে হরতাল জায়েজ কি না। একাধিক আলোচক কিছু কথা বলা শুরু করতে না করতেই উপস্থাপক তাঁদের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, অর্থাত্ আপনি বলতে চাচ্ছেন—। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, এই আচরণই বা আদৌ অথবা কতটা জায়েজ।
বিটিভি এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই লালন করে, না করে তার উপায় নেই। সুবচন সে অনেক শুনেছে, নিজেও তা কম প্রচার করেনি। কিন্তু নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানে, যখন যে বা যার আমল আসবে, তার প্রশস্তি করাই তার একমাত্র কর্তব্য। সে ক্ষেত্রে কেউ যাতে ভিন্ন কথা বলতে না পারে, তার পাহারা দেওয়াও তার সেই কর্তব্যেরই অংশ।
গণতন্ত্রের কথা বলা আর প্রকৃত গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। যিনি গণতন্ত্রের কথা বলবেন, তাঁরই প্রথমে সে কথা বলার আগে উচিত হবে নিজে তার অনুশীলন করা। আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও।
ভুল বানান ও ভুল রাজনীতির প্রাথমিক উত্স আত্মসন্তুষ্ট হওয়া, সেই ভ্রান্তির চারপাশে কেবলই ঘুরপাক খাওয়া এবং কোনো ধরনের শিক্ষা গ্রহণে সম্পূর্ণ অনীহ থাকা।
শান্তনু কায়সার: লেখক ও অধ্যাপক।

ফিরছেন শুমাখার

কিছুদিন ধরে চলে আসা গুঞ্জনটাই অবশেষে সত্যি হলো। আবার স্টিয়ারিং ধরছেন ফর্মুলা ওয়ানের কিংবদন্তি মাইকেল শুমাখার। তবে চিরপরিচিত সেই ফেরারির লাল পোশাকে নয়, ফিরবেন মার্সিডিজের হয়ে। ৩ জানুয়ারি ৪১ বছর পূর্ণ করতে যাওয়া শুমাখারের সঙ্গে মার্সিডিজের এক বছরের চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার খবর দিয়েছে জার্মান পত্রিকা বিল্ড। চুক্তির বিস্তারিত অবশ্য এখনো জানা যায়নি। ১৯৮২ সালে দুই বছরের অবসর ভেঙে অস্ট্রিয়ান নিকি লাউদার ফেরার পর এটাই হতে যাচ্ছে ফর্মুলা ওয়ানের সবচেয়ে আলোচিত প্রত্যাবর্তন।

ওয়ানডে ফিরল ‘স্বর্গোদ্যানে’

‘নব্বই হাজার-এক লাখ দর্শকে পরিপূর্ণ স্টেডিয়াম যেভাবে গর্জে ওঠে, যেকোনো ক্রিকেটারের জন্যই সেখানে খেলা বিশেষ কিছু’—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুই দশক পূর্তিতে কলকাতার এরিয়ান ক্লাবের দেওয়া সংবর্ধনায় বলছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না কোন মাঠ সম্পর্কে বলছিলেন টেন্ডুলকার। বলছিলেন কলকাতার ইডেনের কথাই, যে মাঠে খেলার জন্য শুধু টেন্ডুলকারই নন, ব্যাকুল থাকেন প্রায় সব ক্রিকেটারই। ওয়েবসাইট।
সেই ইডেনে ওয়ানডে ক্রিকেট ফিরছে প্রায় তিন বছর পর। ২০০৭ সালে ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ হওয়া ম্যাচটিও ছিল আজকের দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে। তবে ভারত-শ্রীলঙ্কা সে ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছিল বৃষ্টিতে। আজও তেমন কিছু ঘটুক—এমনটা চাইবে না কোনো দলই। ম্যাচটি যে শ্রীলঙ্কার সিরিজে ফেরার আর ভারতের সিরিজ জয় নিশ্চিত করার। সিরিজে পিছিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কাকে পুরো সফরটাই ভারতের পাশাপাশি লড়াই করতে হয়েছে ইনজুরির সঙ্গেও। এরই মধ্যে তারা হারিয়েছে মুত্তিয়া মুরালিধরন, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস, থিলান তুষারা ও দিলহারা ফার্নান্দোকে। তবে এই ম্যাচের আগে সাঙ্গাকারারা স্বস্তি পেতে পারেন প্রতিপক্ষকে দেখে।
আগের ম্যাচের মতো এ ম্যাচেও নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতে পারবেন না অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। ভারতের জন্য আরও দুঃসংবাদ, ইনজুরির কারণে পুরো সিরিজের জন্যই যুবরাজ সিংয়ের বাইরে চলে যাওয়া। ২০০৪ সালের পর এই প্রথম কোনো ম্যাচে একসঙ্গে ধোনি ও যুবরাজকে পাচ্ছে না ভারত। যুবরাজের জায়গা নেবেন আজ দ্বিতীয় ম্যাচে ৫৪ করার পরও বাদ পড়া বিরাট কোহলি। শ্রীলঙ্কায় পরিবর্তন হতে পারে একটিই। চামারা কাপুগেদেরার জায়গায় সনাত্ জয়াসুরিয়াকে বিবেচনা করা হতে পারে আরেকবার। ইডেনের সর্বশেষ ম্যাচটি পরিত্যক্ত হওয়ার আগে ১৮.২ ওভারে ৩ উইকেটে ১০২ রান তুলেছিল শ্রীলঙ্কা, ৬১ বলে ৬৩ করে অপরাজিত ছিলেন জয়াসুরিয়া।
তবে যতই যুবরাজ-ধোনিরা না থাকুক, আজকের ম্যাচে ফেবারিট হয়েই নামছে ভারত। শুধু এই সিরিজের গতিবিধির কারণেই নয়, মাঠের কারণেও। কদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে এই ম্যাচের সব টিকিট, অর্থাত্ বরাবরের মতোই আজ লাখখানেক দর্শক থাকছে ‘স্বর্গোদ্যানে।’ আর এই দর্শকদের ভূমিকাটা কী থাকে, এটা টেন্ডুলকারের কথা দিয়েই বলা যাক, ‘বলা হয়ে থাকে ইডেনে খেললে ফিল্ডিংয়ের সময় আমাদের স্রেফ দুটো উইকেট নিলেই চলবে, চিত্কার-চেঁচামেচি করে বাকি আট উইকেট দর্শকেরাই নিয়ে নেবে।’

নারী উন্নয়ন নীতির ভবিষ্যৎ কী by ফিরোজ জামান চৌধুরী

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষিত হয়েছিল এক যুগ আগে, ১৯৯৭ সালে। এর পর অনেক চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে গেছে। নারী উন্নয়ন নীতির প্রশ্নে অনেক দেনদরবার হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে লাভ-লোকসানের নানা হিসাব-নিকাশ হয়েছে। কিন্তু সম-অধিকারের প্রশ্নে নারীর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি। সবচেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, ১২ বছরেও নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সরকারগুলো। আমাদের নারী উন্নয়ন নীতির অবস্থা হয়েছে সেই প্রবাদের মতো, ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’।
তবে নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে। রোকেয়া পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত নারী উন্নয়ন নীতিমালা চালু ও বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা সরকারের আছে।’ (প্রথম আলো, ১১ ডিসেম্বর ২০০৯)
১৯৯৭ সালে ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে তা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে আওয়ামী লীগের নারী উন্নয়ন নীতি ছিল অনেকটাই উদার ও নারীবান্ধব। কিন্তু যেকোনো নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের চেয়ে তার বাস্তব প্র্রয়োগই বড় কথা। ১৯৯৭ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রবর্তনের যোগ্য সম্মান পাওয়ার দাবিদার আওয়ামী লীগ। কিন্তু তারাই আবার একে হিমাগারে ফেলে রাখতেও কার্পণ্য করেনি। নানা অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করে পার করেছে তাদের শাসনামলের বাকি চার বছর। আর বিএনপি-জামায়াত সরকার ‘নারী উন্নয়ন নীতি’তে চাতুর্যপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের রক্ষণশীল অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছে। তারা গোপনে কাটাছেঁড়া করে ২০০৫ সালে ‘নারী উন্নয়ন নীতি ২০০৪’ সালের নামে যা প্রকাশ করে, তাকে আর নারী উন্নয়ন নীতি বলার জো নেই। বিএনপি-জামায়াত সরকারের ওই সংশোধিত নীতি কোনো মহলই সমর্থন করেনি। প্রগতিশীল নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একটা সুযোগ এসেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৪ সালের সংশোধনীগুলো বাতিল করে নারী উন্নয়ন নীতি-২০০৮ ঘোষণা করে। কিন্তু সময়স্বল্পতা আর সুযোগসন্ধানী একশ্রেণীর মৌলবাদীর আস্ফাালনের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ নীতি ছিল বহুলাংশে ১৯৯৭-এর নারী নীতির আলোকে প্রণীত। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতিতে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতি এবং বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতির মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং যেকোনো একটা বেছে নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা দরকার। তবে সর্বশেষ, অর্থাত্ ২০০৮ সালের নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে কাজে হাত দেওয়াই হবে বেশি যুক্তিযুক্ত।
২.
বেইজিং কর্মপরিকল্পনা (পিএফএ), আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও বাংলাদেশের সংবিধানের মূল ভিত্তিকে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ‘নারী উন্নয়ন নীতি’তে রাজনীতির মূল ধারায় নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি, নারীর সম-অধিকার, সম্পদে নারীর উত্তরাধিকার প্রভৃতি বিষয় অনেক ইতিবাচক ও স্পষ্ট ছিল। ২০০৪ সালে সংশোধিত (২০০৫-এ ঘোষিত) ‘নারী উন্নয়ন নীতি’র ৭.১ ধারায় বর্ণিত ‘অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা’ বাক্যটি সংশোধন করে ‘সমান অধিকার’ বাদ দিয়ে ‘সংবিধানসম্মত অধিকার’ শব্দ যোগ করা হয়েছে। সংবিধানসম্মত অধিকার শব্দযুগল নিয়ে আপত্তির কিছু না থাকলেও এর মাধ্যমে ‘সমান অধিকার’ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। একইভাবে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় ‘সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেওয়া’ শীর্ষক বাক্যে ‘সম্পদ’ ও ‘অংশীদারিত্ব’ শব্দ দুটো বাদ দেওয়া হয়েছে। ৭.২ ধারায় ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন’ অংশের সংশোধনীতে ‘উত্তরাধিকার’, ‘সম্পদ’ ও ‘ভূমির ওপর অধিকার’ শব্দগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ‘নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক ধারা ৯-এ উল্লিখিত ‘বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন, বিচার বিভাগের উচ্চপদে নারী নিয়োগ প্রদান করা’ অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। উপরিউক্ত সংশোধনীগুলো পর্যবেক্ষণ করলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া খুব কঠিন নয়, বিএনপি ও তার মিত্র রাজনৈতিক শক্তির হাতে নারী উন্নয়ন নীতির বাস্তবায়ন হবে না। ১৯৯৭-এর নারী উন্নয়ন নীতির মৌলিক ভিত্তিগুলোকে পরিবর্তন করে বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকার স্পষ্টতই নারী অধিকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
নারী উন্নয়ন নীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে, ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক ধারা ৮। ধারা ৮-এ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আগের বার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান প্রণয়নের নামে শুধুই কালক্ষেপণ করেছে। তাদের যুক্তি ছিল, সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, বিরোধী দলের সমর্থন ছাড়া এ বিল পাস করা সম্ভব নয়। ফলে সংসদীয় কমিটির আঁতুড়ঘরেই বিলটির মৃত্যু হয়েছে। আগের আওয়ামী লীগ সরকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোয় এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান করেছিল। স্থানীয় সরকারে নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচনের বিধান রাখা সম্ভব হলে জাতীয় সংসদের জন্য একই বিধান রাখতে বাধা কোথায়? এবার আমাদের সামনে ভিন্ন এক রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। জাতীয় সংসদে এখন আওয়ামী লীগের একারই রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন। সুতরাং এবার আর পুরোনো অজুহাত খাড়া করার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারের ১২.২ ধারায় উল্লেখ করেছে, ‘জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে।’ এ সংসদেই সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। সমাজের মূলধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করতে হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর সরাসরি নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
২০০৮ সালের নারী উন্নয়ন নীতিতে মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাসের বদলে পাঁচ মাস করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখনো কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। চাকরিজীবী নারীর জন্য এ ছুটি খুবই প্রয়োজনীয়। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের কালবিলম্ব করা ঠিক হবে না।
নারীর ক্ষমতায়নের স্বার্থে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন এবং অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন (ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড) করে তা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই জরুরি। আশা করা যায়, সরকার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে তা বাস্তবায়ন করবে।
বর্তমানে দাপ্তরিক সব কাজে সন্তানের পরিচয়ে বাবার সঙ্গে মায়ের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে—নারী অধিকারের প্রশ্নে ১৯৯৮ সালে গৃহীত তত্কালীন শেখ হাসিনার সরকারের এ পদক্ষেপটি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। এরই মধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এবারের সরকার নারী অধিকার বাস্তবায়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংসদ উপনেতা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর নিয়োগ নারীর ক্ষমতায়নের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেশ-বিদেশে আলোচিত হচ্ছে। তাই এ সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক।
সম্প্রতি মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শিরিন শারমীন চৌধুরীও ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার খুব শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করবে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন পরিষদের আগামী সভাতেই নারী উন্নয়ন নীতিসংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটবে। (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ নভেম্বর ২০০৯)। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ধারার বাইরে রেখে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। জাতীয় সংসদেও নারী উন্নয়ন নীতির বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। আশা করা যায়, মহাজোট সরকার নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন করে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। তবে শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আইন করে নারী উন্নয়ন নীতির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জীবনের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ ও অধিকারের সুযোগ সরকারকেই করে দিতে হবে।
ফিরোজ জামান চৌধুরী: সাংবাদিক
firoz.choudhury@yahoo.com

বিশ্ব আবহাওয়া বনাম বাংলাদেশ পরিবেশ by এবিএম মূসা

মালদ্বীপ সরকার গিয়েছিল ভারত মহাসাগরের তলদেশে, নেপাল সরকার উঠেছিল হিমালয়ের চূড়ায়। বিশ্বের ছোট-বড় বাকি প্রায় সব দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান গিয়েছিলেন কোপেনহেগেনে। মালদ্বীপের মন্ত্রিসভার সমুদ্র-তলদেশে ডুব দেওয়া আর নেপালের মন্ত্রীদের পর্বতারোহণ এবং কোপ মহাসম্মেলনের একটিই উদ্দেশ্য ছিল। বিশ্ব জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে জনজীবনের যে চরম ক্ষতি হবে, এ সম্পর্কে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ, অন্তত একটি হইচই সৃষ্টি করা। সামগ্রিক ক্ষতির সাধারণ বিশ্লেষণ হচ্ছে, মালদ্বীপ অচিরেই পানির নিচে তলিয়ে যাবে। নেপাল হিমালয়ের বরফ-গলা পানির নিচে ডুবে যাবে। অন্য অনেক দেশ জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাবে, অথবা বর্তমানে বিলীন আটলান্টা দেশটির অনুসরণে মহাবিশ্বকে একটি মহাসাগরে পরিণত করবে। মালদ্বীপ ও নেপালের অভূতপূর্ব কর্মসূচিতে বিশ্বে কতখানি সাড়া পড়েছিল বোঝা যায়নি। তবে কোপেনহেগেন সম্মেলনে সমবেত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা ‘শেষের সেদিন ভয়ংকর’ বলে অনেক দিকনির্দেশক না হলেও ‘মূল্যবান’ বক্তব্য দিয়েছেন। যেসব দেশকে পরিবেশ বিপণ্ন করে ভবিষ্যতে পৃথিবী ধ্বংসের জন্য দায়ী করা হচ্ছে, সেখান থেকেও লক্ষাধিক প্রতিবাদকারী তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে সম্মেলনের বাইরে জড়ো হয়েছিল।
কোপেনহেগেন সম্মেলন তথা জলবায়ু পরিবর্তন, উচ্চ পরিমণ্ডলে উষ্ণায়ন, কার্বন নামের একটি পদার্থের নিঃসরণ ইত্যাকার জটিল বিষয়াদি নিয়ে যে মহা হইচই হয়ে গেল, তা নিয়ে পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সেসবের গুরুত্ব কতখানি বুঝেছেন, তা বলতে পারব না। তবে আমি নিজে কোপেনহেগেন থেকে বিশেষ সংবাদদাতাদের প্রতিবেদন আর রাষ্ট্রপ্রধানদের শলাপরামর্শ ও গলাবাজির খবরগুলো পড়ে বিশ্ব সম্মেলনটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব স্বল্পমাত্রায় অনুধাবন করার কোশেশ করেছি। মূল উদ্দেশ্যটি পুরোপুরি বুঝিনি, তবে একটুখানি খটকা লেগেছে, এর মধ্যে টাকা-পয়সার বিষয়টি কেন উঁকি মেরেছে। উষ্ণায়ন আর হিমমণ্ডল সৃষ্টির জন্য ‘উন্নত’ দেশগুলোকে দু-চার পয়সা নয়, দুই হাজার কোটি টাকা জরিমানা করে তহবিল গঠন ও লেনদেনের বিষয়টিও বুঝতে চেয়েছি। কারণ, সম্মেলনের কার্যসূচিতে বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের কুফলের চেয়ে ক্ষতিপূরণ অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সম্মেলন শেষের সিদ্ধান্ত থেকে এমনটি মনে হয়েছে, কারণ ভাবছি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যা হারাবে, টাকা দিয়ে কি তার সব পাওয়া যাবে? রাজনৈতিক বক্তব্যও আমাকে বিভ্রান্ত করেছে।
আশির দশকে বিশ্বপরিবেশ নিয়ে সবার মনে প্রাথমিক দুশ্চিন্তা অথবা চিন্তাভাবনার সঞ্চার করেছিল ‘গ্রিনহাউস’ আন্দোলন। তাদের মূল বক্তব্য ছিল উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়ন, এমনকি সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় অথবা বিলাসসামগ্রী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের এয়ার কন্ডিশনার, ফ্রিজ-টেলিভিশন এমনকি যন্ত্রচালিত যানবাহনের গ্যাস নিঃসরণ বিশ্বপরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহজ কথায়, তারা বিশ্বকে জানাতে চেয়েছে, গ্যাস নিঃসরণ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে একটি প্রতিবন্ধকতার বলয় সৃষ্টি করছে। এ বলয়ের কারণে পৃথিবী বরফের নিচে চাপা পড়বে। কারণ, সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছানোর পথে একটি আস্তরণ পড়বে। এটি ছিল পরিবেশ ধ্বংস নিয়ে সাধারণ ধারণা। গ্রিনহাউস আন্দোলন পরে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। কালক্রমে গ্যাস নিঃসরণের বিরুদ্ধে তাদের জোরদার আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং কার্যক্রম পুরোপুরি না হলেও অনেকখানি বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য ইউরোপের কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণেই গ্রিন পার্টি এখনো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল।
গ্রিনহাউস আন্দোলনের এত বছর পর আচম্বিতে গ্যাস নিঃসরণের বৈশ্বিক উষ্ণতার দুশ্চিন্তাটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আবহাওয়া পরিবর্তনে ভয়ংকর পরিস্থিতি উদ্ভবের আশঙ্কা, ভীতি ও দুশ্চিন্তা সাম্প্রতিককালে পরিবেশ-সম্পর্কীয় বিচিত্র সব কারণে এত বিস্তৃতি লাভ করেছে। আমাদের পরিবেশজনিত বর্তমানের নিজস্ব দুর্ভাবনা ভিন্ন ধরনের সমস্যা, যা আমাদেরই সৃষ্ট। আমাদের নীতিনির্ধারক মহারথিরা কোপেনহেগেনে আসন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে মহা দুর্ভাবনা প্রকাশ করেছেন। নিজ দেশের পরিবেশ ধ্বংস নিয়ে তাঁরা কতখানি উদ্বিগ্ন, নিজ দেশের পরিবেশ সংরক্ষণে কতখানি আন্তরিক? এ কারণে বিশ্ব পরিমণ্ডলে ভয়ংকর পরিস্থিতি আর স্বদেশে পরিবেশ ধ্বংস, এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। আগেই বলেছি, বাংলাদেশে পরিবেশ ধ্বংসের আশঙ্কাটি দেশেরই স্বার্থান্বেষী ও তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের সৃষ্টি। বিশ্ব নিয়ে দুুশ্চিন্তার বৃহত্তর পরিধির তুলনায় আমাদের দেশের জনগণের কাছে নিজেদের সংকটের গুরুত্ব অধিকতর। তা কি কোপ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী আমাদের নেতারা বোঝেন? বুঝলেও কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছেন?
উল্লেখ্য, বিশ্বের সব বিজ্ঞ, স্বল্প বৃহত্ শক্তিমান ব্যক্তি কোপেনহেগেনে একত্র হয়ে দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। একটি হচ্ছে, বৃহত্ দেশের শিল্পায়নের পরিধি সংকুচিত করতে হবে। দুই. যেহেতু তাদের শিল্পায়ন দুনিয়ার বাকি সব, এমনকি তাদের নিজেদের দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও বিশ্ব ভূপরিমণ্ডলের অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ হয়েছে, সে জন্য তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এরই মধ্যে এ দুটি বিষয় বিশ্বগ্রাসী সমস্যাবলির রাজনৈতিক নাকি অর্থনৈতিক পরিধির অন্তর্ভুক্ত, তা নিয়েও কোপেনহেগেনে ধুমধাড়াক্কা আলোচনা হয়েছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার, বিশ্ববায়ুতে ক্ষতিকর প্রভাবটি প্রথম দিকে গণমানুষের অস্তিত্ব সংকটের প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় এসেছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখা গেল, এটি অর্থনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য আলোচ্য বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে, কী আর করা যাবে, এখন ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। সেই ভাবনাই হবে গরিব দেশগুলোর জন্য অধিকতর লাভজনক। সুতরাং ভবিষ্যতে ক্ষতির মাত্রা বাড়লে ক্ষতিপূরণের অঙ্কের পরিমাণ বাড়বে কি না, তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি কে কত পাবে, তা নিয়েই মজাদার দরকষাকষির শেষ খবর পড়ে বেশ মজাই পেয়েছি। তদুপরি আমরা, মানে বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সুতরাং সর্ববৃহত্ অঙ্কটি পেতে হবে, এই সত্যটি সম্মেলনে অনেকেই মোটামুটি মেনে নিয়েছেন। তাই পাওয়ার অঙ্কটি ৭০০ কোটি টাকা কিংবা অনেক বেশি বলে নির্ধারিত হতে পারে। বুঝতে পারছি, এখন থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি দেশগুলো কোপেনহেগেন থেকে এ প্রাপ্তি নিয়েই দিন গুনতে থাকবে। গোনা শেষ হওয়ার আগে পৃথিবী ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। যাক না, নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা দেখার কেউ থাকবে না।
এ তো গেল অর্থনৈতিক আর পরিবেশগত সমস্যা। সর্বশেষ খবরটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়, যা শনিবারের প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে। প্রথম পৃষ্ঠার খবরটি হচ্ছে, ‘কোনো চুক্তি নয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে শেষ হতে চলেছে কোপ-১৫, কোপেনহেগেন সম্মেলন।’ পড়ে মাথা চুলকাচ্ছিলাম, কথা হচ্ছিল আলো-বাতাস নিয়ে, মধ্যিখানে টাকা-পয়সার ফয়সালা নিয়ে দরকষাকষি চলেছে। তাতে বুঝলাম শেষ পর্যন্ত রাজনীতি এল কোত্থেকে! সম্মেলনে ১৯৩টি রাষ্ট্রের পরিবেশবিদ আর অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের আওতামুক্ত হয়ে বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদদের হাতে চলে গেল? তবে অবাক হইনি, আমরাও তো নিজের দেশের পরিবেশ সমস্যা শেষ পর্যন্ত দলীয়, স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার রাজনীতির পঙ্কিল পানিতে ডুবিয়েছি। এ জন্যই আমাদের বন-পাহাড়, জঙ্গল-জলাশয় আর নদী-নালা ধ্বংসের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন দেশীয় রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাধরেরা ও তাদের স্বার্থের ভাগিদারেরা। হয়তো এরই পাল্টা ব্যবস্থায়, আমাদের এখন জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বিশ্ব তহবিল নিয়ে ভাবতে হবে। দূষিত পদার্থ নির্গমন বন্ধ হবে, নাকি কমিয়ে আনা হবে, তা নির্ধারিত না হলেও জাতিসংঘ ঘোষিত জলবায়ু তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে বেশির ভাগ রাষ্ট্র একমত হয়েছে।’ পত্রিকার পাতায় শেষ খবরটি পড়ে আশ্বস্ত হয়েছি। কোপেনহেগেন থেকে আমরা আর কিছু না-ই পাই, হয়তো প্রচুর টাকা-পয়সা পাব। কত, ৭০০ কোটি নাকি আরও বেশি? তার পরের ভাবনা, (১) এই টাকা দিয়ে আমরা কী করব? (২) বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়, নিজ দেশের পরিবেশ রক্ষা নিয়ে তাদের যে দুর্দশা ভোগ করতে হয়, তা লাঘবে এই অর্থ ব্যবহূত হবে কি?
অভাজনের ওপরের প্রশ্নগুলোর মাজেজা হচ্ছে, কখন সারা বিশ্ব রসাতলে যাবে, তা নিয়ে কোপে যাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, নিজ দেশের তলিয়ে যাওয়ার, সিডরে উড়ে যাওয়ার, বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার ব্যাপারে উঁচুমহলে যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা কী ভাবছেন, তা জানতে ইচ্ছে করছে। ঢাকা শহর যে এখনি বছরের অর্ধেক সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকে, নদীমাতৃক বাংলাদেশ যে মরুভূমির দেশ হবে, তা কি শুধু বিশ্ব আবহাওয়া উষ্ণায়নের কারণে? এ প্রশ্নের জবাব কোপেনহেগেন সম্মেলনে যোগদানকারী আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে দাবি করা কি অন্যায় হবে? অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটি কৌতুককর বক্তব্যে রসবোদ্ধা পাঠকদের সমীপে পেশ করছি। বিশ্বনেতাদের দুশ্চিন্তা হলো, প্রথমত বরফ গলছে এবং এ কারণে সব মহাসমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাপক শিল্পায়নের কারণে কার্বন নামের একটি বায়বীয় পদার্থ আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধি করছে। রসালো বক্তব্য হচ্ছে, দ্বিতীয়টি নিয়ে আমাদের কোনো দায়দায়িত্ব বা দুশ্চিন্তা নেই। দেশের প্রায় সব শিল্প আমরা নিজেরাই এরই মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি, আমাদের অন্তত কার্বন নিয়ে দুুশ্চিন্তা নেই।
আবারও বলছি, উপরিউক্ত দুটি জটিল বিষয় নিয়ে পণ্ডিত ব্যক্তিরা যখন মাথায় মাথা ঠেকিয়ে নিষ্কৃতির উপায় খুঁজছেন, তখন আমরা বঙ্গোপসাগর-তীরের বেড়িবাঁধের গাছ কাটছি, উপকূল অঞ্চলের বন ধ্বংস করছি। এ কি বিশ্ব পরিবেশ সমস্যা, নাকি আমাদের নিজেদের দুশ্চিন্তা? বলাবাহুল্য, আমাদের বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীকে অবশ্য কোপেনহেগেনে এ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। নেপালের মন্ত্রীরা যখন হিমালয়ে উঠে বরফ-গলা বন্ধ করা নিয়ে নজিরবিহীন বৈঠক করছেন, আমরা তখন বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ আর বালু নদী ভরাট করছি। নদীর স্রোত বন্ধ করে, জলাশয় ভরাট করে জমি-বাড়ি, কল-কারখানা, ব্যবসা প্রসারিত করছি। মালদ্বীপের মতো ক্ষুদ্র দ্বীপগুলো পানিতে ডুবে যাবে—তা নিয়ে আলোচনা করতে যাঁরা কোপেনহেগেনে গেছেন, তাঁদের উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা নিজ দেশে হুমকিধমকিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যাঁরা বিশ্বপরিবেশ ধ্বংস বন্ধের উপায় নির্ধারণে সুদূর কোপেনহেগেনে গেছেন, তাঁরা কি ঘর হতে শুধু দু পা ফেলিয়া আশুলিয়া, বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে, সীতাকুণ্ডু অথবা হাতিয়া গিয়েছিলেন?
জানি, উপরিউক্ত ‘অবান্তর’ প্রশ্নগুলো ওপরের মহলের অনেককে ক্ষুব্ধ করবে। এমনিতেই তাঁরা কোপেনহেগেন থেকে এখনই কিছু না-পাওয়ায় মনঃক্ষুণ্ন। তার পরও আশা করব, শত-হাজার কোটি যদি বাংলাদেশ পায়ও, সেই টাকার একটি ক্ষুদ্রাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে আবার বনায়ন, বেড়িবাঁধগুলো পুনর্নির্মাণ, তুরাগ-বালু শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধারে, জলাশয় ও জমি দখলকারীদের উচ্ছেদে ব্যয় করা হবে। ভবিষ্যতে আমাদের গ্রহটির পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া নিয়ে হাজারো মাইল দূরের শহরে দুশ্চিন্তার অবসানের উপায় নির্ধারণে সুচিন্তিত ও বাস্তব প্রস্তাব দিয়ে তাঁরা বিশ্ববাসীর বাহবা ও হাততালি পেয়েছেন। এখন দেশের মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয়, বন রক্ষায় ও লবণাক্ততা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে অন্তত দেশবাসীর প্রশংসা পাবেন। সোমবারের প্রথম আলোর শিরোনাম ‘বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতি সফল, বাকি লড়াই ক্ষতিপূরণ আদায়ের’। তাই তো আমার জিজ্ঞাসা, সেই লড়াই সফল হলে কি ঢাকা শহরের পানি উদ্ধার করা খাল দিয়ে তরতর করে নেমে যাবে? বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ রক্ষা পাবে?
এবিএম মূসা: সাংবাদিক।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা -ঝরে পড়া ও অনুত্তীর্ণ শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে

প্রথমবারের মতো প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা যে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, ফলাফলেও তার প্রতিফলন লক্ষ করা গেছে। যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়, সে দেশে একসঙ্গে ২০ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া সহজ ছিল না। বলা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সে দায়িত্ব মোটামুটি ভালোভাবে পালন করেছে, যদিও পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকায় কিছু কিছু ত্রুটিও ছিল। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক হলে এসব ত্রুটিও এড়ানো সম্ভব হবে।
এবারের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ৮৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হওয়াকে অনেকে সাফল্য হিসেবে দেখতে চাইবেন। বিশেষ করে, প্রথম বিভাগ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিতীয় বিভাগ ও তৃতীয় বিভাগের চেয়ে বেশি হওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক। একই সঙ্গে ১১ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণ হওয়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতারই পরিচায়ক। তালিকাভুক্তির পরও পরীক্ষায় অবতীর্ণ না হওয়া আরও ৮ শতাংশ যোগ করলে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর হার দাঁড়ায় প্রায় ১৯ শতাংশ। এটি শুধু সংশ্লিষ্ট অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের নয়, দেশের জন্যও বড় ধরনের অপচয়।
পরীক্ষার ফলাফলে চমকপ্রদ কিছু বৈশিষ্ট্যও ফুটে উঠেছে। যেমন মেধা তালিকায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের এগিয়ে থাকা, শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোর ভালো ফল করা। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, ভালো ফল করার জন্য নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার প্রয়োজন হয় না। শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকা সত্ত্বেও ভালো ফল না করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ফলাফলের এই ধারা উচ্চশ্রেণীতেও ধরে রাখতে পারলে শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব।
পিটিআই-সংলগ্ন স্কুলগুলোতে শতভাগ উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টিও তাত্পর্যপূর্ণ। শিক্ষকেরা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে ভালো ফল করা অসম্ভব নয়। ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। ব্র্যাক স্কুলের সাফল্যের পেছনেও রয়েছে নিয়মিত তদারকি ও শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ। অন্যান্য স্কুলে সেই তদারকি নিশ্চিত করা হলে তারাও ভালো ফল করতে পারবে।
অন্যদিকে এক হাজার ৯৩৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারবে না—সে ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রেখে লাভ কী? এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি যে ‘সহানুভূতি’ জানিয়েছেন, এর সঙ্গে দ্বিমত না করেও বলা যায়, শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয়কে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। উল্লিখিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেন খারাপ ফল করল, তা তদন্তপূর্বক দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় যারা ভালো করেছে, আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই। একই সঙ্গে এ কথাও বলব, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে ৮৯ শতাংশ উত্তীর্ণ হওয়ায় উল্লসিত হলে চলবে না। ভবিষ্যতে সব পরীক্ষায় যাতে শতভাগ উত্তীর্ণ হয়, সে চেষ্টাই চালাতে হবে। বিশেষ করে, প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া এবং অনুত্তীর্ণের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং মেধা ও জনশক্তির অপচয় রোধে এর বিকল্প নেই।

বেসরকারি খাতকে চালিকাশক্তি করতে হবে -অর্থনীতি by মামুন রশীদ

স্বাধীনতা-পরবর্তী ৩৮ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক উদারীকরণ ও যথেষ্ট সংস্কার সাধিত হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার হার বাড়ানো ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোধের ক্ষেত্রে টেকসই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনায় গোল্ডম্যান অ্যান্ড স্যাক্স বাংলাদেশকে ‘পরবর্তী ১১ জাতির একটি’ এবং জেপি মরগ্যানও ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভ’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছে। আবার বিশ্বব্যাংক বলেছে, মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) বছরে সাড়ে সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০১৬ সাল নাগাদ একটি মধ্যম-আয়ের দেশে পরিণত হবে।
বিশ্ব-অর্থনীতিতে আমরা এরই মধ্যে অমিত সম্ভাবনার আশাবাদ নিয়ে পদচারণা শুরু করেছি। সে জন্য স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদায় থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনায় ‘বিকাশমান অর্থনীতি’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। দেশের এ সাফল্যের পেছনে বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ার একটি ভালো ভূমিকা রয়েছে। এখন আমাদের উন্নত অর্থনীতির মর্যাদা পাওয়ার লক্ষ্যে নতুন রোডম্যাপ নিয়ে এগোতে হবে। উন্নয়ন-সমৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে উন্নীত হতে হলে আমাদের বেসরকারি খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো উতরে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা, উত্পাদনশীলতা, মানবসম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দেখিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য অবশ্য সরকারকেও পর্যাপ্ত নীতি-সহায়তা ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বাণিজ্য উদারীকরণ: বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে বাজারমুখী অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে। বিগত শতকের আশির দশক থেকে কাঠামোগত সংস্কারও করে আসছে। এর ফলে দেশের বাণিজ্যনীতিও রক্ষণশীলতা ছেড়ে বহির্মুখী হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া আমদানি খাতে শুল্ক রেয়াত এবং রপ্তানিতে আর্থিক ও নীতি-সহায়তাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর সুফলও পাওয়া গেছে। উদারীকরণের সুবাদে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য-বৈষম্য নিয়ে দরকষাকষিতে আমাদের এগোনোর কৌশলগত অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে।
এফডিআই প্রবাহ: বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে বড় ও মাঝারি শিল্পের জাতীয়করণের নীতি গ্রহণ করে। ১৯৮০ সালের দিকে এসে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে থাকে। ১৯৮০ সালের দিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত দেশে আটটি ইপিজেড স্থাপিত হয়েছে। স্থানীয় বেসরকারি খাত ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উত্সাহিত করতে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বিনিয়োগ বোর্ড। বিশেষ করে ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোট এফডিআইয়ের প্রবাহ বাড়লেও ২০০৫ সাল থেকে তা কমতে থাকে। তবে ২০০৮-০৯ সালে এফডিআই বেড়ে ৯৪ কোটি ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে যায়।
পুঁজিবাজার: বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ারের মোট সংখ্যা ৪৪৪টি এবং বাজার মূলধনের আকার হলো দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা জিডিপির ৩২ শতাংশের সমান। তবে এই বাজার মূলধন উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় কম। গত দুই বছরে গ্রামীণফোন, ম্যারিকো বাংলাদেশ ও তিতাস গ্যাসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে শেয়ার ছেড়েছে, আরও কিছু আসছে। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারে যাতে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে, সেদিকে গভীর মনোযোগ দেওয়া দরকার।
কৃষি খাত: দেশের রপ্তানি আয়ে দিন দিন কৃষি খাতের অবদান বাড়ছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয় আসে কৃষির উপখাত চিংড়ি থেকে। এ ছাড়া মত্স্য রপ্তানিও বাড়ছে। কৃষি খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের সংস্কারের উল্লেখযোগ্য দিক হলো বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সার বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা। উদারীকরণের মাধ্যমে কৃষিকাজে ব্যবহূত যন্ত্রপাতির ব্যবসায়, বীজ আমদানি ও সরবরাহ এবং পণ্য উত্পাদন ও প্রক্রিয়াকরণে সুবিধা দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তিক কৃষকের হাতে সুফল পৌঁছানোর জন্য তাদের মুনাফা বাড়াতে কৃষি উপকরণের দাম কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে।
শিল্প খাত: বর্তমানে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উত্পাদন খাতের অবদানই হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। উত্পাদন খাতের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, ওষুধ ও কেমিক্যালস ইত্যাদি উপখাতেই বেসরকারি বিনিয়োগ বেশি হয়েছে।
বস্ত্র ও তৈরি পোশাক: দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে। তবে শ্রমের সহজলভ্যতা এবং দামের দিক থেকেও সুবিধাজনক অবস্থায় থাকায় ২৫ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানকারী ও ৭৯ শতাংশ রপ্তানি-আয়ের খাত তৈরি পোশাকশিল্পে এখনো বিনিয়োগের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বিশ্বের পোশাকশিল্পের ৪১ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনো মাত্র দুই শতাংশে সীমিত রয়ে গেছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে পোশাকশিল্প মালিকদের শ্রমিকদের উত্পাদন বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অস্থিরতা রোধ এবং সুপারভাইজার-শ্রমিক সম্পর্কোন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। এই শিল্পের বিকাশের জন্য সরকারি নীতি-সহায়তা এবং অর্থায়ন সুবিধার পাশাপাশি, ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং নিত্যনতুন রপ্তানিবাজার খুঁজে বের করতে হবে।
ওষুধশিল্প: গত দুই দশকে দেশে ওষুধশিল্পের সন্তোষজনক বিকাশ ঘটেছে। এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ২১ শতাংশের ওপর। যেটির আরও অনেক বিকাশের সুযোগ এবং প্রচুর পরিমাণে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ জন্য প্রয়োজন এফডিআই আকৃষ্ট করা। আরও বেশি দরকার অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্টস উত্পাদনকারী খাতকে সুবিধাদি দেওয়া।
বিদ্যুত্ খাত: দেশে বর্তমানে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিদ্যুতের চাহিদা বছরে প্রায় পাঁচ শতাংশ করে বাড়ছে। অন্যদিকে দেশে গ্যাসের প্রমাণিত মজুদের পরিমাণ ৮ দশমিক ৪ টিসিএফ। নতুন মজুদের সন্ধান না পেলে ২০১৫ সালের পর থেকে বর্ধিত চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসাধন এবং জ্বালানি সংকট লাঘব করা মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সরকার অবশ্য আগামী পাঁচ বছরে সাত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যে এক হাজার কোটি ডলারের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বেসরকারি বিদ্যুেকন্দ্র বা আইপিপি, ছোট বিদ্যুেকন্দ্র বা এসপিপি এবং পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনে স্থানীয় বেসরকারি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে হবে। নিতে হবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন এবং আঞ্চলিক বিদ্যুত্ গ্রিড স্থাপনের উদ্যোগ।
নির্মাণ খাত: বর্তমানে জিডিপিতে নির্মাণ খাতের অবদান ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। যেহেতু উন্নয়নের এক অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন, সেহেতু সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) এবং এফডিআই আকৃষ্ট করার মাধ্যমে এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সেবা খাত: আমাদের জিডিপিতে এখন সেবা খাতের অবদান ৪৯ শতাংশের মতো। এই খাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া উচিত। গত এক দশকে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগ এসেছে এবং যা অব্যাহত রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিগত বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ, সমাধান ও সম্ভাবনা: আমাদের দেশের বেসরকারি খাতের সামনে এখনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, করপোরেট সুশাসনে দুর্বলতা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা এবং মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা প্রভৃতি অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। এ ছাড়া দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখনো সরকারি খাতের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ এবং ‘মানসিকতা’য় পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি খাতও পুঁজিবাজারের মতো যুগোপযোগী উেসর পরিবর্তে সেকেলে পদ্ধতিতে মূলধন সংগ্রহ করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে বেসরকারি খাতকে চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা দিতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারকে নিতে হবে সার্বিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা দূরীকরণ এবং তথ্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদারের পদক্ষেপ। এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও পরিহার করতে হবে কারণে-অকারণে, কথায় কথায় সরকারি সমর্থন চাওয়ার মানসিকতা। তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়ে জোর দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের হিসাব সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে।
মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। নিবন্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্টোবরে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের আলোকে রচিত।

দেরাজের ভেতর কঙ্কাল -খোলা চোখে by হাসান ফেরদৌস

বলা হয়, সব মানুষেরই নাকি দেরাজের ভেতর দু-চারটে কঙ্কাল লুকানো থাকে। যতক্ষণ সে কঙ্কাল লুকিয়ে রাখা যায়, কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু একবার যদি কোনো কঙ্কালের কনে আঙুলটিও হঠাত্ বেরিয়ে পড়ে, তার বাকিটুকু টেনে না নামানো পর্যন্ত স্বস্তি নেই। ব্যাপারটি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন টাইগার উডস। কোনো এক আহাম্মকি মুহূর্তে ভদ্রলোক তাঁর দেরাজের একটা কপাট একটুমাত্র খুলেছিলেন, আর অমনি তা থেকে ঝমঝম করে একের পর এক কঙ্কাল পড়া শুরু হয়েছে। থামাথামির কোনো লক্ষণ নেই। কত বড় দেরাজ রে বাবা এই লোকের?
সত্যি বলতে কি, কঙ্কাল নয়, টাইগারের নেংটি ধরে টান পড়েছে। একদম বাজারের মধ্যখানে, ভর সন্ধ্যাবেলা, যখন চারদিকে লোকজন গমগম করছে, ঠিক তখন। তিনি এখন একজন পুরোপুরি উদোম মানুষ। যতই দুই হাত দিয়ে নিজের লজ্জা (নাকি গর্ব!) ঢাকতে চাইছেন, চারদিকে সবাই তাঁর লেংগুট ততই খামচে ধরছে। এতে কার কী লাভ হচ্ছে জানি না, কিন্তু আমার নিজের মস্ত ক্ষতি হয়ে গেছে। আমেরিকায় দীর্ঘদিন বসবাসের ফল হয়েছে এই যে গলফ নামক অতি বড়লোকি খেলার ব্যাপারে আমি অত্যুত্সাহী হয়ে পড়েছি। নিজে খেলি না, কারণ এ দেশে গলফ খেলা আর হাতি পালায় খুব তফাত নেই। অতএব, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো গলফের শখ মেটাতে টেলিভিশনের পর্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে এই খেলা দেখি। ১০ বছর ধরে এই একটা অভ্যাস আমার হয়েছে। ১০ বছর নয়, ঠিক ঠিক হিসাব করলে ১৩ বছর হবে। ১৯৯৫ সালে, যেবার টাইগার উডস পেশাদারি গলফার হিসেবে নাম লেখালেন এবং সে বছরই দু-দুটো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতলেন, সেই থেকে আমি গলফ দেখছি, তা-ও মূলত যে টুর্নামেন্টে টাইগার আছেন।
আমি একা নই, টাইগার যে টুর্নামেন্ট খেলেন, তা দেখার জন্য এ দেশে লাখ লাখ লোক টিভি খুলে বসে থাকে। গলফ উপলক্ষ মাত্র নয়, টাইগারের খেলা দেখাই তাদের আগ্রহের বিষয়। যে খেলায় টাইগার নেই, তার টিভি-দর্শকের সংখ্যা কম করে হলেও গড়ে ৪০ শতাংশ পড়ে যায়। দর্শক কমে যাওয়া মানে টিভির রেটিং কমে যাওয়া, বিজ্ঞাপন কমে যাওয়া, আয় কমে যাওয়া। লোকটা যেন একাই একটা ইন্ডাস্ট্রি। তাঁর নামে সুইস ঘড়ির বিজ্ঞাপন, দামি গাড়ির বিজ্ঞাপন, এমনকি ইন্স্যুরেন্সের বিজ্ঞাপন। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে টাইগারের নামে। সিবিএস ও এনবিসি টিভি কয়েক বছরের জন্য কোটি টাকার বায়না করে রেখেছে, আগামী কয়েক বছর যত গলফ টুর্নামেন্টে টাইগার খেলবেন, কেবল তারাই পালা করে সেসবের ধারাবিবরণী প্রচার করবে। কিন্তু নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে তার মুখে এখন এমন চুনকালি পড়েছে যে টাইগার মাস দুয়েক কোনো খেলায় অংশই নেবেন না বলে জানান দিয়েছেন। আগামী কয়েক মাস কেন, এরপর আদৌ নিজ ফর্মে ফিরে এসে তাঁর পক্ষে খেলা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ফলে বুঝতেই পারছেন, এ দেশে একেবারে হায় হায় রব শুরু হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে যাঁরা টাইগারের অন্তর্বাস টেনে ধরেছেন, তাঁর ভেতর কী আছে, তা পুরোপুরি না জানা পর্যন্ত তাঁরা এই কেচ্ছা টিভির পর্দা বা পত্রিকার পাতা থেকে সরাতে রাজি নন। টাইগারের সর্বনাশ হলে কী হবে, ‘গসিপ’ বিকিয়ে যাঁরা বিরিয়ানি-পোলাও খান, তাঁদের এখন মচ্ছব চলছে।
টাইগারকে আমরা বিশ্বের একজন সেরা খেলোয়াড় বলে জেনে এসেছি। চলতি সপ্তাহেই অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস টাইগার উডসকে গত এক দশকের সেরা অ্যাথলেট বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই লোকটার ভেতর যে এমন একটা বন্য ও কুিসত মানুষ বাস করে, তা আমাদের জানা ছিল না। না, মেয়েমানুষ নিয়ে ফষ্টিনষ্টি করেছে বলে এ কথা বলছি না। তাঁর বিরুদ্ধে আমার ক্রোধ এ কারণে যে আমি প্রতারিত বোধ করছি। উডস আমাদের সামনে একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও পিতা বলে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন। তাঁকে যে আমরা ‘হিরো’ বলে আলিঙ্গন করেছিলাম, এর কারণ তিনি শুধু বড় খেলোয়াড় বলেই নয়, তাঁর ভেতর একজন চমত্কার, সদাশয় ও দায়িত্ববান মানুষ রয়েছে, তাঁকে হিরো ভাবার সেটাও একটা কারণ। আমরা সবাই অসম্পন্ন মানুষ, কিন্তু একজন সম্পন্ন মানুষের খোঁজ আমাদের অহর্নিশ। টাইগারকে আমরা সে রকম একজন সম্পন্ন মানুষ ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, তিনি একটি মুখোশ পরে ছিলেন। সেই মুখোশের আড়ালে একজন নীচ ও কদাকার মানুষ তিনি।
যে প্রশ্নের জবাব না পেয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ মাথার চুল ছিঁড়ছি, তা হলো উডসের মতো মানুষ, যাঁর জীবনে কোনো কিছুর অভাব ছিল না, বিত্ত-যশ-প্রতিপত্তি যাঁর আঙুলের ডগায়, এমন চমত্কার সুন্দর স্ত্রী যাঁর ঘরে রয়েছে, তাঁকে কেন সস্তা দেহপসারিণীর কাছে যেতে হবে ফুর্তির খোঁজে? নানা ফ্রয়েড-বিশেষজ্ঞ নানাভাবে এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু এর কোনোটাই খুব সন্তোষজনক বলে মনে হয় না। এই বিশেষজ্ঞরা অধিকাংশই পুরুষের যৌন বাসনার কথা বলেছেন। সে বাসনা এমন তীব্র ও আত্মবিধ্বংসী যে সমাজ-সংসার কোনো কিছুই তার কাছে অলঙ্ঘনীয় মনে হয় না। মেয়েদের ভেতরও যে এমন আত্মঘাতকতার উদাহরণ নেই, তা নয়। কিন্তু সংখ্যা কম। কারণ, যৌন আগ্রাসনের সঙ্গে জড়িত ক্ষমতার প্রশ্ন। এই ক্ষমতা আসে অর্থ থেকে, খ্যাতি থেকে, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি থেকে। ক্ষমতার একটি নিজস্ব মোহ ও মাদকতা আছে, যার আস্ফাালনে মানুষ—সে পুরুষ হোক বা নারী, এমন এক বোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যে সে বিশ্বাস করা শুরু করে, এই স্খলন তার জন্য স্বাভাবিক।
রাজা-বাদশাহদের বেলায় আমরা যে স্খলন দেখেছি, ইতিহাস ঘাঁটতে হবে না, বর্তমান সময়েই এর এন্তার উদাহরণ রয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী বারলুসকোনির কথা ভাবুন। নাতনির বয়সী মেয়েদের বাগানবাড়িতে তুলে এনে একদঙ্গল বুড়ো কী সব কাণ্ড করছে, তার ভিডিও এখন আমাদের কাছে পৌঁছে গেছে। ধরা পড়ে যাওয়ার পরও লোকটার বিন্দুমাত্র লজ্জা নেই। একে তো তিনি প্রধানমন্ত্রী, তাই সে দেশের সবচেয়ে ধনী লোক তিনি। তাঁর ভয় নেই, চক্ষুলজ্জাও নেই। আমাদের দেশেও একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি আছেন, যিনি একসময় বলেছিলেন, তিনি মোটেই ছোক ছোক স্বভাবের নন। মেয়েরাই তাঁর কাছে ছুটে আসে। বাহাত্তরে বুড়ো হলে কী হবে, তাঁর ব্যক্তিত্বের এমনই আকর্ষণ! হাত কচলে ভদ্রলোক এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, আগুনে পুড়তে মেয়েরা যদি আমার কাছে নিজ থেকে ছুটে আসে, তাহলে বলুন, আমার কী করার আছে?
অন্য কথায়, ক্ষমতাবান পুরুষের জন্য স্খলন অপরাধ তো নয়ই, এ যেন তার অধিকার।
অন্য আরেকটা ব্যাখ্যাও বোধ হয় আছে। অধিকাংশ মানুষ—তা সে পুরুষ বা নারী যা-ই হোক, অন্তর্গতভাবে বহুগামী। সুযোগ পেলে, ধরা পড়ব না এই নিশ্চয়তা পেলে, পা হড়কে পড়ে, এমন লোকই হয়তো বেশি। নিষিদ্ধের প্রতি আকর্ষণ সব সময়, সব ধরনের মানুষের মধ্যেই ছিল। দ্য ওয়ার্ল্ড একরডিং টু গার্প যাঁদের পড়া আছে, তাঁদের সে বিষয়টি মনে থাকার কথা। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার একসময় বলেছিলেন, সরাসরি ফষ্টিনষ্টি তিনি করেননি, কিন্তু মনে মনে অন্য রমণীকে কামনা করেছেন। কার্টার সাত্ত্বিক মানুষ ছিলেন, কিছুটা মফস্বলীয়ও বটে। পরের স্ত্রীর শরীর স্পর্শ করতে ইচ্ছা হলেও তাঁর সাহসে কুলায়নি। আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঠিক তাঁর উল্টো। রমণী দেখলেই যত দ্রুত সম্ভব রমণীর শরীরে সে হাত চালান দেওয়া তাঁর প্রধান লক্ষ্য, সে কথা তিনি নিজেই কমবেশি স্বীকার করেছেন আত্মজীবনীতে। নিজের ঘরে সুন্দরী ও বিদুষী বউ থাকলে কী হবে, শুঁড়িখানার সুন্দরীদের দেখলে তাঁর মাথায় রক্ত চড়ে যায়। কিন্তু ‘রেড হ্যান্ড্রেড’ ধরা পড়বেন, এ কথা কখনোই ভাবেননি। এর পরও যখনই ধরা পড়ে গেছেন, মুখ কালো করে স্বীকার করেছেন, তিনি দেবতা নন, মানুষ মাত্র।
এই ঘরানারই একজন টাইগার উডস। আমাদের কাছে তিনি বীর ও মহানায়ক হয়ে উঠেছিলেন। অথচ রতি-পদানত একজন অতিসাধারণ মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নন তিনি। তাঁর এই ভিন্ন চিত্রটি এখন আমাদের সামনে উন্মোচিত হওয়ায় তিনি যে সবার ঘৃণার পাত্র হলেন, তা নয়। রতি-আসক্তির কারণে ঘেন্না করলে কম্বলে আর লোম থাকবে না। সরাসরি প্রতারিত হয়েছেন তাঁর স্ত্রী, ঘৃণা করলে তিনি করতে পারেন। খেলায় ফিরে এলে এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে পারলে, আমরা অধিকাংশই হয়তো তাঁর খেলা দেখব। কিন্তু তাঁকে যে নায়কোচিত সম্মান দিয়েছিলাম, তা তিনি আর কখনোই ফিরে পাবেন না।
টাইগার যে নষ্ট হয়ে গেলেন, এর পেছনে আমাদেরও কিছু অবদান আছে। ‘সেলিব্রেটি’দের প্রতি অযাচিত ও মাত্রাতিরিক্ত ভজনার অভ্যাস আমাদের। শুধু একঝলক দেখা পাওয়া যাবে ভেবে প্রিয় নায়ক বা নায়িকার জন্য আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করি। তাঁদের নামাঙ্কিত তুচ্ছাতিতুচ্ছ বাজারি জিনিস কিনে আমরা ঘর ভরে ফেলি। টিভির পর্দায়, পত্রিকার পাতায় তাঁদের খবর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। প্যারিস হিলটনের কথা ভাবুন, অথবা ভাবুন প্রিন্সেস ডায়ানার কথা। এসব সেলিব্রেটির অধিকাংশই মানুষ হিসেবে অতি ক্ষুদ্র ও ফাঁপা। তা জেনেও তাঁদের নিয়ে সত্য-মিথ্যা সব কেচ্ছা গোগ্রাসে আমরা গিলি। ব্রিটনি স্পিয়ার্স একবার অন্তর্বাস ছাড়া এক পার্টিতে এসেছিলেন। গাড়িতে উঠতে গিয়ে এক ‘পাপারাজ্জি’ ফটোগ্রাফারের ক্যামেরায় তা ধরা পড়ে যায়। আর কী, এরপর পুরো এক সপ্তাহ আমেরিকার হেন পত্রপত্রিকা নেই, টিভি অনুষ্ঠান নেই, যেখানে ব্রিটনির অন্তর্বাস সংবাদ শিরোনাম হয়নি। দিনের পর দিন আমরাই সে খবর গোগ্রাসে গিলেছি।
এই সেলিব্রেটি-আগ্রাসন থেকে মুক্তির কোনো সহজ উপায় আছে বলে মনে হয় না। আধুনিক নাগরিক জীবনের এ এক অনিবার্য উপদ্রব। যেমন, অনিবার্য উপদ্রব বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ। সে দূষণ থেকে মুক্তি অসম্ভব নয়। দূষণ আমরাই করি, চাইলে সে দূষণ আমরা ঠেকাতে পারি। সে জন্য দরকার সবার আগে নিজেদের ব্যবহার বদলানো। একই কথা সেলিব্রেটি-কালচার নিয়েও। আমাদের উত্সাহ ও সমর্থনেই তাঁরা সেলিব্রেটি হয়েছেন। তাঁদের দেখে নাচবে, এমন লোকের অভাব কখনোই হবে না। কিন্তু আমি যদি তাঁদের দলে নাম না লেখাতে চাই, তাহলে অনায়াসেই নিজের মনের জানালাটা এসব সেলিব্রেটির জন্য সপাটে বন্ধ করে রাখতে পারি। সে কাজে তো কেউ নিষেধ করছে না।
অতএব, টাইগার, বিদায়!
১৮ ডিসেম্বর ২০০৯, নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

মহররম মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা -ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খা

হিজরি সাল বা আরবি নববর্ষের প্রথম মাস মহররম অফুরন্ত বরকত ও তাত্পর্যমণ্ডিত। প্রতিবছর মহররম মাসটি পুরোনো বছরের জরাজীর্ণতাকে মুছে দিয়ে নতুনরূপে, কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ডানা মেলে, অনাবিল প্রত্যাশার ভেলায় চড়ে অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার ও দুরন্ত সাহসিকতার নির্ভীক পথচলার কল্যাণময় শুভবার্তা নিয়ে ফিরে আসে। ‘মহররম’ শব্দের অর্থ অলঙ্ঘনীয় পবিত্র। ইসলামে মহররম মাসটি অত্যন্ত ফজিলতময় ও মর্যাদাপূর্ণ। এ মাসেই বহু নবী-রাসুল ঈমানের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে মুক্তি ও নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন। অসংখ্য তথ্যবহুল ঐতিহাসিক ঘটনা এ মাসে সংঘটিত হয়েছিল। পবিত্র আশুরার সঙ্গে পুরো মহররম মাসের বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা চারটি মাসে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ হারাম ঘোষণা করেছেন; এগুলোকে অলঙ্ঘনীয় পবিত্র মাস বলা হয়। আল্লাহ তাআলার ঘোষণা অনুযায়ী যেসব মাসে ঝগড়া-বিবাদ, যুদ্ধবিগ্রহ একেবারে নিষিদ্ধ, সেই সম্মানিত চারটি মাসের অন্যতম এই মহররম মাস। অন্য তিনটি মাস হলো—রজব, জিলকদ ও জিলহজ। এ মাসগুলোতে যুদ্ধ করা মহাপাপ। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস ১২টি, তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩৬)
প্রাচীনকালে আরব দেশে চারটি মাস পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হতো। এ মাসগুলোতে আরবে যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, মারামারি, লুটতরাজ প্রভৃতি থেকে বিরত থাকার নিয়ম প্রচলিত ছিল। একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার তাত্পর্য বর্ণনাকালে সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, ‘তবে কি আল্লাহ তাআলা ওই দিনটিকে সব দিনের চেয়ে অধিক মর্যাদা দিয়েছেন? নবী করিম (সা.) জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ!’ এরপর তিনি ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তাআলা আসমান, জমিন, লওহ কলম, সাগর, পর্বত এই দিনে সৃষ্টি করেছেন।’
ইহজগতের সৃষ্টি, হজরত আদম (আ.)-এর খলিফা হিসেবে দুনিয়ায় আগমন এবং এ দিনেই তাঁর তওবা কবুল হওয়া, হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা ঝড়-তুফানের কবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়া, হজরত আইয়ুব (আ.) এর কঠিন পীড়া থেকে মুক্তি এবং হজরত ঈসা (আ.)-এর আকাশে জীবিতাবস্থায় উত্থিত হওয়াসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মহররমের ১০ তারিখ আশুরা একটি মর্যাদাপূর্ণ দিবস হিসেবে চিরস্মরণীয়। সর্বোপরি এ পৃথিবীর মহাপ্রলয় বা কিয়ামত মহররমের ১০ তারিখ ঘটবে বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার আগে পবিত্র আশুরার দিনে রোজা রাখা ফরজ ছিল। পরে তা রহিত করে মাহে রমজানের রোজা ফরজ করা হয়। এই মর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনে হজরত আদম (আ.)-এর ওপর ও অন্যান্য নবীর ওপর রোজা ফরজ ছিল। এ দিন দুই হাজার পয়গম্বর ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন এবং দুই হাজার পয়গম্বরের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছিল।’ (রযিন) নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখে, তার আমলনামায় সাত আসমান-জমিনের সব অধিবাসীর সওয়াব লেখা হয় এবং যে ব্যক্তি নিজের জন্য দোজখের আগুন হারাম করতে চায়, সে যেন মহররম মাসের নফল রোজা রাখে।’ অন্য এক হাদিস থেকে জানা যায়, ‘মহররম মাসে যদি কোনো ব্যক্তি রোজা রাখে, তবে প্রতিটি রোজার পরিবর্তে ৩০ রোজার পুণ্য লাভ করবে।’
ইসলাম-পূর্বকালে বিভিন্ন জাতি নানা কারণে পবিত্র আশুরার দিন রোজা রাখত। মহররমের ১০ তারিখ আশুরার ফজিলত সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে দেখতে পেলেন যে ইহুদিরা আশুরা দিবসে রোজা রাখছে। নবী করিম (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কোন্ দিন, যাতে তোমরা রোজা রেখেছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস, যেদিন আল্লাহ তাআলা হজরত মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন, ফিরআউনকে তাঁর সম্প্রদায়সহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই হজরত মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন রোজা রেখেছেন, এ জন্য আমরাও রোজা রাখি। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমাদের চেয়ে আমরা হজরত মূসা (আ.)-এর অধিকতর ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী।’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)
প্রাক-ইসলামি যুগে মক্কার কুরাইশরা আশুরার দিনে রোজা রাখত। নবী করিম (সা.) বাকি জীবনে এ দিন রোজা রাখতেন। মদিনায় আগমনের পর রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পর তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আমি আশুরার দিন রোজা রাখতে আদিষ্ট ছিলাম, অতএব এখন তোমাদের কারও যদি ওই দিন রোজা রাখতে ইচ্ছা হয়, তবে তা রাখতে পারো।’ আশুরার দিন রোজা রাখলে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যায় বিধায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তার আগের দিন বা পরের দিন আরেকটি রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুমিন মুসলমানেরা ১০ মহররম আশুরা দিবসের গুরুত্ব ও তাত্পর্য উপলব্ধি করে এদিন রোজাব্রত পালন করেন। আশুরার দিন রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘এ রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফ্ফারা হয়ে থাকে।’ (মুসলিম ও তিরমিজি) অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (আহমাদ)
প্রকৃতপক্ষে মহররম মাসটি ইবাদত-বন্দেগির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আশুরার দিনে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে জান্নাত লাভ থেকে শুরু করে সওয়াব হাসিলের আরও অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। এদিন যদি কোনো মুসলমানকে পেটপুরে আহার করান, তবে তিনি নবী করিম (সা.)-এর সব উম্মতকে পেটপুরে আহার করানোর সমান সওয়াব পাবেন। এ পবিত্র মাসের সম্মান প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মহররম মাসের সম্মান করবে, আল্লাহ তাকে বেহেশতে সন্মানিত করবেন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্ত রাখবেন।’
আসুন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে আকুল প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের সবাইকে পবিত্র মহররম মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুধাবন করে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অশেষ সওয়াব হাসিলের তাওফিক দান করেন এবং সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক কারবালার মর্মস্পর্শী কাহিনি স্মরণে প্রতিটি মুসলমানকে ঈমানি শক্তিতে আরও বেশি বলিয়ান ও তেজোদীপ্ত হওয়ার মানসিকতা দান করেন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

প্রতিক্রিয়া -আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই বিপরীত মেরুর দল by মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

৫ ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে এম এম আকাশ এক নিবন্ধে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্ব নিরসনের প্রসঙ্গে যা লিখেছেন, তার সূত্রে আমার এই লেখা।
অধ্যাপক এম এম আকাশ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ, একটি দ্বিদলীয় পদ্ধতির রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দল দুটোর চরিত্র, সেগুলোর ভবিষ্যত্ রূপান্তর নিয়ে যেসব কথা লিখেছেন, তা বাম রাজনৈতিক মহলে বহুল আলোচিত। তিনি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই লিখেছেন, ‘এই প্রধান দুই বুর্জোয়া শক্তির মধ্যে ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া মৌলিক কোনো দ্বন্দ্ব নেই। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে দ্বন্দ্বটুকু আছে, তাও ধীরে ধীরে কমে যাবে। অর্থাত্ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শেষাবধি উপরিকাঠামোর কিছু ইস্যু বাদ দিলে মৌলিক কোনো পার্থক্য থাকবে না।’
এম এম আকাশের এই দাবি ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। আওয়ামী লীগের আদর্শ নিয়মতান্ত্রিক উদার গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইত্যাদি প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শ। অপরদিকে বিএনপির জন্ম আওয়ামী-বিরোধী পরিকল্পনা থেকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ভূমিকা, অর্জন, আদর্শ ও নেতৃত্বকে অস্বীকার ও পর্যুদস্ত করার জন্য। জন্ম থেকে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের ধারা গ্রহণ করে ১৯৫২ থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সব গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ও ইতিবাচক অবদানে নেতৃত্ব দিয়েছে, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যেসব অগ্রসরমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার ছিল, তার প্রায় সব কয়টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ঘটেছিল। আর রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে জন্ম নেওয়া বিএনপি তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে ওই সব জাতীয় অর্জনকে বিসর্জন দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিল। বিএনপির দৃষ্টি ও চিন্তাধারা প্রতিক্রিয়াশীল, পাকিস্তানি ভাবধারার। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণেই আন্দোলন-সংগ্রামে সব গণতান্ত্রিক শক্তির সহযোগী হয়েছে, সব বাম গণতান্ত্রিক শক্তি আওয়ামী লীগের মিত্র থেকেছে, এখনো আছে। অন্যদিকে স্বভাবতই বিএনপির মিত্র হয়েছে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, ফ্রিডম পার্টি, মৌলবাদী তথা ডানপন্থী সব দল ও অপশক্তি। আওয়ামী লীগ বাম গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থী উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে অবস্থান নিয়েছে, বিএনপি ঠিক এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেছে। সুতরাং দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অংশ হলেও আওয়ামী লীগ-বিএনপি আদর্শ এবং চরিত্রগতভাবে আগাগোড়াই পরস্পর বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রেখেছে বা রাখছে।
এম এম আকাশ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ দক্ষিণপন্থী হয়ে গেল বলে মন্তব্য করেছেন। আওয়ামী লীগ কি বামপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ডানপন্থীদের নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, দেশ শাসন করেছে বা করছে? আমরা তো বরাবরই দেখে আসছি যে আওয়ামী লীগ বাম গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গেই ছিল বা এখনো আছে। ১৯৯১ সালেও নির্বাচনে সিপিবিসহ বামপন্থীদের নিয়েই আওয়ামী লীগ ঐক্যজোট করেছিল। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথাই বলেছিল। এর বিপরীতে বিএনপি প্রচারণায় প্রধান যে ইস্যুটি করেছিল, তা হলো, ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তন করা হলে দেশ থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ উঠে যাবে, দেশ ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত হবে ইত্যাদি। কিন্তু নির্বাচনে বিএনপিই বাজিমাত করেছিল। আওয়ামী লীগসহ আটদলীয় জোট অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে গেল। অধ্যাপক আকাশ এসব বাস্তবতার কী উত্তর দেবেন?
এম এম আকাশ লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ প্রথমে সমাজতন্ত্রে এসেছিল, সমাজতন্ত্রের সুবিধা বেশি হবে বলে, যখন অনুকূল হাওয়া তারা পেল না, তখন তারা মনে করল সমাজতন্ত্রে থাকার আর কোনো কারণ নেই।’ গত শতকের পঞ্চাশ থেকে আশির দশক পর্যন্ত সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর রাজনৈতিক দলের সমাজতন্ত্রের প্রতি আকর্ষণে কতগুলো ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল, প্রবণতাও ছিল, এমনকি ইসলাম নামধারী অনেক দলও ইসলামি সমাজতন্ত্রের কথা তখন উচ্চারণ করেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে সমাজতন্ত্র বিদায় নেওয়ার পর যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগের মতো দলগুলো বাস্তবতাবোধে পরিচালিত না হয়ে সিপিবি-বাসদের মতো সমাজতন্ত্রের ঝান্ডা নিয়ে পড়ে থাকলে রাজনীতির মাঠে আর কোনো উদার গণতান্ত্রিক দল থাকতে পারত কি না, সন্দেহ। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি দক্ষিণপন্থীদের নিয়ন্ত্রণেই চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকত কি?
অধ্যাপক আকাশ আরও লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা বেশি লাভবান হয়েছে, তারা তৈরি করল নতুন বিএনপি।... কিছু নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এবং স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করলেন বিএনপি।’ সেনাশাসক জিয়াউর রহমান কি আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন? খোন্দকার মোশতাকও তো বিএনপি গঠনের উদ্যোগের সঙ্গে ছিল না। বিএনপি গঠনের নেপথ্যে সামরিক, আমলা, বণিক, উগ্র ডান ও উগ্র বামের যেসব শক্তি জড়িত ছিল; তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা, দেশি-বিদেশি নানা শক্তির নীলনকশা বাস্তবায়ন করা, একটি পাকিস্তানি ভাবাদর্শের বাংলাদেশ সৃষ্টি করা। বিএনপির ক্ষমতা যত সংহত হয়েছে, তত বেশি দলটি আওয়ামী লীগকে এর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবস্থান থেকে উচ্ছেদে তত্পর হয়েছে, সেই জায়গাগুলো নিজেরা দখল করার চেষ্টা করেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল থেকে নির্দেশ পেয়েই পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব থেকে বঙ্গবন্ধুকে হটিয়ে বিদায় করা হয়, ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে একজন আপসকামী লোক হিসেবে দেখানো হয়, ২৫ মার্চে তাঁকে দেখানো হয় একজন আত্মসমর্পণকারী নেতা হিসেবে। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভারতে পলায়নকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেই সময় ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন মেজর জিয়া, তিনি ১৯৭৫ সালেও ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, একাত্তরের গোটা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন মেজর জিয়া এবং তাঁর জেড ফোর্স। বঙ্গবন্ধুকে পাঠ্যপুস্তকে একজন ব্যর্থ প্রশাসক ও স্বৈরশাসক হিসেবে উপস্থাপন করে ১৫ আগস্টকে ইতিহাসের এক প্রত্যাশিত, অনিবার্য ও অপরিহার্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে বিএনপি-জামায়াত আওয়ামী লীগ এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করার উন্মত্ততায় মেতে উঠেছিল। বিএনপি সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেনি, কিন্তু যারা তা করেছে তাদের সবাইকে পুরস্কৃত করেছে, তাদের বিচার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে, এবার যখন ওই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রায় হয়েছে বিএনপি তখন কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। বিএনপি বিশ্বাস করে, ১৫ আগস্ট না হলে বিএনপির জন্ম হতো না, তাই ১৫ আগস্টকে নানাভাবে চিত্রায়িত করা, ওই দিনের শোকাবহ অবস্থাকে ভুলিয়ে দিতে নানা উদ্যোগ, প্রচার-প্রচারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে বিএনপি।
অধ্যাপক আকাশ বিএনপিকে দক্ষিণপন্থী, আওয়ামী লীগকে ‘দক্ষিণপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের মিশ্র প্রতীক’ বলে অভিহিত করেছেন। এ দুই দলের মধ্যে যেটুকু পার্থক্য বা দ্বন্দ্ব, তা তাঁর কথায় ‘ক্ষমতার’ দ্বন্দ্বকেন্দ্রিক। তাঁর মতে, এই দ্বন্দ্ব মেটানোর সম্ভাব্য রাস্তা হচ্ছে দুটি—একটি হচ্ছে, দেশে একটি ভদ্র দ্বিদলীয় বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা; আর দ্বিতীয় রাস্তাটি হচ্ছে, জামায়াত ও স্বৈরাচারের বিচ্ছিন্নতা এবং পরাজয়ের কারণে বিএনপির শক্তিহানি, ক্রমবিলুপ্তি ও খণ্ডায়ন। যখন দেশে একমাত্র দক্ষিণপন্থী দল হবে আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোনো না কোনো অপেক্ষাকৃত র্যাডিকেল একটি রাজনৈতিক দল। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনানির্ভর অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-শিক্ষা-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছাড়া বাংলাদেশে ভদ্র বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মোটেও সম্ভব নয়। সেই আদর্শ রয়েছে একমাত্র উদার ও বাম গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোরই, দক্ষিণপন্থী কোনো সংগঠনেরই তা নেই। কেননা বিএনপিসহ সব ডান ও দক্ষিণপন্থী দল এবং শক্তির দৃষ্টি পেছনের সাম্প্রদায়িকতার দিকে। সব গণতান্ত্রিক শক্তি যত বেশি পশ্চাত্পদতা কাটিয়ে মানুষকে সামনের দিকে আর্থসামাজিক ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিকভাবে এগিয়ে নিতে পারবে, তত বেশি দক্ষিণপন্থীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ অতীত হয়ে যাবে। সেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নির্মাণে বাম রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিকেরা কবে সক্রিয় হবেন, সেটিই দেখার বিষয়।
ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।
patwari54@yahoo.com

সরল গরল -নতুন প্রধান বিচারপতির ৪৭ দিন by মিজানুর রহমান খান

দেশের ১৭তম প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলাম শপথ নিলেন। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি অবসরে যাবেন। মাঝখানে হাতে গোনা ৪৭টি দিন। এর মধ্যে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন। কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণ করা কঠিন নয়। বিচার বিভাগ আজ এমন একটি অস্থির সময় অতিক্রম করছে যখন বিরাট কিছুর পরিকল্পনা এখনই নেওয়া দরকার।
১. ব্যতিক্রম বাদে আমাদের প্রধান বিচারপতিরা নিয়মিতভাবে এজলাসে বসেছেন। আগে আপিল বিভাগে বিচারক ছিলেন পাঁচজন। বর্তমান সরকার তা এগারোতে উন্নীত করেছে। প্রধান বিচারপতির ওপর জজিয়তির বোঝা তাই লাঘব হয়েছে। প্রধান বিচারপতি যে সমগ্র বিচার বিভাগের প্রধান নির্বাহী এবং প্রধান প্রশাসক, তা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের বিনীত প্রস্তাব হলো, শুধু আইনের উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যার প্রশ্ন ছাড়া প্রধান বিচারপতি আদালতে বসবেন না।
২. প্রধান বিচারপতি এককভাবে হাইকোর্ট বেঞ্চগুলোকে নির্দিষ্ট এখতিয়ার দেন। সে কারণে কোনো বেঞ্চ দেওয়ানি, কেউ ফৌজদারি, কেউ মূসক ও আবগারি, কেউ রিট মামলা শোনার অধিকার পান। এই এখতিয়ার সময়ে সময়ে বদলে যায়। কোন বিচারক কোন কাজ করবেন, তা নির্ধারণ করেন প্রধান বিচারপতি। এ জন্য তাঁর ওপর আলোচনার দায় নেই। অথচ এই কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে হলে একজন প্রধান বিচারপতিকে ৯০ জন বিচারকের কাজ নজরদারি করতে হয়। বেঞ্চগুলো দৈনিক তাঁদের কাজের একটি পরিসংখ্যান জমা দেন। সবাই দেনও না। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, অনেক হাইকোর্ট বেঞ্চ ক্রমশ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট এখতিয়ার-বহির্ভূত সিদ্ধান্তদানের প্রবণতা দেখাচ্ছেন। আপিল বিভাগের চূড়ান্ত ও মীমাংসিত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। এর দুটো দিক রয়েছে—একটি বিচারিক, অপরটি পুরোপুরি প্রশাসনিক। বিচারকেরা যে যা-ই করুন, তাকে প্রশাসনিক মানদণ্ডে যাচাই করতে দেখা যায় না। এই অবস্থার অবসান প্রয়োজন। যাঁকে যে এখতিয়ার দেওয়া হয়, তাঁকে তাঁর গণ্ডির মধ্যেই থাকতে হবে। কেউ তার বাইরে গেলে তা অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলাজনিত অবিচারিক বিষয় বলে গণ্য করতে হবে। বিচারিক এখতিয়ার বা কর্মসীমা বণ্টনের বিষয়টি একান্তভাবেই প্রশাসনিক। একটি উদাহরণ দিই: খুন, ধর্ষণ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক মামলায় ৩০ বছর করে সাজাপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক সাজা পাওয়া আসামিকে গণজামিন দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। এই বেঞ্চটিই র্যাবের হাতে নিহত দুই সহোদরের বিষয়ে একটি সুয়োমোটো রুল জারি করেন। এ রকম রুল জারির নির্দিষ্ট এখতিয়ার ওই বেঞ্চের ছিল না। এ ধরনের রুল দেওয়ার এখতিয়ার রিট বেঞ্চের। এ ধরনের অবিচারিক অনুশীলন বন্ধে প্রধান বিচারপতিকে প্রশাসনিক মানদণ্ডে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা অনেক তর্কের পরে মেনে নিয়েছেন যে, তাঁদের ও তাঁদের পোষ্যদের সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণ জনগণের জানার অধিকারের মধ্যে পড়ে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতি এটা সহজে মানতে চাননি। দিল্লি হাইকোর্টের রুলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট লড়াইয়েও নেমেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির রক্ষণশীলতার সঙ্গে আমাদের দারুণ মিল রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারতের প্রধান বিচারপতিসহ সবাই তাঁদের সম্পদের বিবরণ সম্প্রতি ওয়েবসাইটে দিয়েছেন। নতুন প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ, তিনি একই ধরনের উদ্যোগ নেবেন। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদমতে, বিদ্যমান আচরণবিধি বিচারকদের কাছ থেকে সম্পদের বিবরণ চাওয়ার এখতিয়ার প্রধান বিচারপতিকেই দিয়েছে। কেউ ঘণ্টা বাঁধতে রাজি নন। তিনি তা প্রয়োগ করলে একটি মাইলফলক দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। একান্ত না পারলে এই বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে একটি প্রকাশ্য অভিমত আশা করি।
৪. বিচারকদের নিয়ে কোনো কথা উঠলেই কারণে-অকারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কথা চলে আসে। দুই সামরিক শাসকের (আইয়ুব ও জিয়া) আরামপ্রিয় এই ব্যবস্থাটির বিকলাঙ্গ দিক আমাদের আইনবিদেরা আলোচনা না করতে সংকল্পবদ্ধ। পঞ্চম সংশোধনীর রায়েও জিয়ার এই অপকীর্তিটি অক্ষত। অনেকেই লক্ষ করছেন না যে, এই কাউন্সিল শুধু অপসারণের মতো একটি চরম শাস্তিই দিতে পারে। বিচারকদের জন্য যা মৃত্যুদণ্ডতুল্য। অথচ এমন অনেক লঘু পাপ ঘটতে পারে, যার জন্য লঘুদণ্ডই প্রাপ্য। সংসদে অভিশংসনযোগ্য বিষয় ছাড়াও একজন বিচারকের কর্মজীবনে অনিয়ম ঘটতে পারে। সে জন্য হয়তো কখনো তিরস্কার প্রাপ্য। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৯৫ সালে ‘সি. রবিচন্দ্র আয়ার বনাম বিচারপতি এ এম ভট্টাচার্য’ মামলায় এই বিষয়টি স্বীকার করেন। আদালত এ জন্য অভ্যন্তরীণভাবে ‘মাইনর মেজারস’ বা লঘু ব্যবস্থা গ্রহণে একটি অভ্যন্তরীণ কাঠামো গঠনের সুপারিশ করেন।
বাংলাদেশের নতুন প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ, তিনি যেন এ রকম একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনে কার্যকর উদ্যোগ নেন। এ ধরনের শৃঙ্খলা কমিটি যুক্তরাষ্ট্রের বহু রাজ্য ও অনেক দেশে রয়েছে। ভারতের বিখ্যাত আইনবিদ ভি আর কৃষ্ণা আয়ার, যিনি বাংলাদেশি আইনবিদদের কাছে খুবই শ্রদ্ধেয়, তিনি এই লক্ষ্যে একটি জুডিশিয়াল পারফরম্যান্স কমিশন গঠনে সরব রয়েছেন। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রশ্নে এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ব্রিটিশ আইনজ্ঞ লর্ড ডেভিড প্যানিক বলেন, ‘বিচারকদের এটা মানতে হবে যে, তাঁরা রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গে কর্মরত লোকদের মতোই ভুলভ্রান্তি করতে পারেন। সুতরাং তাঁদের মতোই তাঁদের আচার-আচরণও সমালোচনা ও প্রতিকারযোগ্য। বিচারকেরা এটা না মানলে তাঁরা সরকার ও সমাজের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন এক বিরাট ক্ষমতাধর পুরোহিতমণ্ডলী হয়ে থাকবেন। এর ফল দাঁড়াবে, তাঁরা কেউ কারও অসুবিধা বুঝবেন না। তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থাকবে।’ এখানে লক্ষণীয় যে, প্রস্তাবিত পারফরম্যান্স কমিশন গঠনের ধারণা ও তার বাস্তবায়ন একান্তভাবেই কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিষয়। এ জন্য রাষ্ট্রপতি বা সরকারের কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না।
৫. অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও কর্মস্থল নির্ধারণে একটি নীতিমালা করতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে ফুল কোর্টকে অনুমোদন দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে টানা ৭২ ঘণ্টা ফুল কোর্টের অধিবেশন চালানো দরকার। ফুল কোর্ট হলো সুপ্রিম কোর্টের পার্লামেন্ট। এর অবস্থা শেরেবাংলা নগরের হাউস অব দ্য নেশনের চেয়ে খুব কার্যকর বলা যায় না। আইনসচিব নিয়োগ বেআইনি ছিল। এখানে আইনের অতি নগণ্য প্রশ্ন ছিল। তদুপরি এতটা কাঠখড় পুড়ল, পোড়ানোর সুযোগ দেওয়া হলো। তবে নতুন প্রধান বিচারপতির জন্য কাকতালীয়ভাবে একটি বিশেষ দায় তৈরি হয়েছে। আইনসচিবকে বেআইনি বলে তাঁর রায় ঘোষণা এবং প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর শপথ নেওয়ার মধ্যে কয়েক প্রহরের তফাত। তিনি হাইকোর্ট বিভাগের যে রায় সমুন্নত করেছেন, সেখানে একটি তদন্তের নির্দেশনা রয়েছে। এই তদন্ত অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার দায় এখন তাঁর ওপরই বর্তেছে। যিনি বিচারিক আদেশদাতা, তিনিই এখন তা বাধ্যতামূলকভাবে পালনকারী। আর এই দায়িত্ব পালন না করা পর্যন্ত আইনসচিব নিয়োগ-নাটকের রহস্য কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে।
৬. সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট সম্পূর্ণ করা, প্রযুক্তিনির্ভর আদালত কক্ষ ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইনের আওতায় জনসংযোগ কর্মকর্তা নিয়োগের মতো প্রস্তাব নতুন প্রধান বিচারপতি তাঁর টেবিলেই পাবেন। যদি তাঁর সামনে নতুন বিচারক নিয়োগের প্রশ্ন আসে, তাহলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, প্রভু, ক্ষমা করো। গোপনীয়তার পিঞ্জর খোলো। গোপন বিচারের মতো গোপন নিয়োগও মহাপাপ।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে একটি অসাধারণ পরিবৃত্তিকাল (ট্রানজিনশন পিরিয়ড) দেখতে পাচ্ছি। নতুন প্রধান বিচারপতির ৪৭ দিন ফুরিয়ে যাবে দ্রুত। এরপর যদি জ্যেষ্ঠতাই মাপকাঠি হয়, তাহলে আমরা প্রধান বিচারপতিদের ঘন ঘন আগমন ও বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান দেখব। ২০১১ সালের ১৮ মে অর্থাত্ আগামী ১৯ মাসের মধ্যে চার-পাঁচজন প্রধান বিচারপতির আগমন ও প্রস্থান দেখা যাবে। সুপ্রিম কোর্টের দিনবদল যেন আগমন ও প্রস্থানের ঘূর্ণাবর্তে মূর্ছা না যায়। নতুন প্রধান বিচারপতি আগামী ৪৭ দিনে উল্লিখিত কাজগুলোর সূচনা ঘটাতে পারেন। এ ছাড়া আমাদের চলতে পারে না। কে কতটা করবেন বা উদ্যোগী হবেন, তা দেখার বিষয়। তবে এসব বিষয়ের জন্য আমরা সরকার বা অন্যদের দুষতে পারব না। যত দোষ নন্দ ঘোষ বলে সরকারকে নিন্দা করতে পারব না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট- দুর্দশা কাটিয়ে কার্যকর কল্যাণ সংস্থা হয়ে উঠুক

দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁদের পরিবারদের কল্যাণের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এখন যেন এক মূর্তিমান হতাশা। এ ট্রাস্টের দুর্দশার বিশদ চিত্র ফুটে উঠেছে ২০ ডিসেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
প্রতিষ্ঠার পরপরই মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে সরকার ৩২টি শিল্প-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা দিয়েছিল। অর্থাত্ ট্রাস্টের সম্পদের পরিমাণ ছিল বিরাট, আর্থিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ-সম্ভাবনাও ছিল বিশাল। শহীদ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অবদান রেখেছিলেন, তাঁদের সবার জন্য বিভিন্ন মাত্রার আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মৌলিক অর্থনৈতিক ভিত্তি ট্রাস্টের ছিল। সে অর্থে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টই হতে পারত মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণকারী মূল সংস্থা। বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে যে দাবিদাওয়া সরকারের দরবারে পেশ করা হয়, তার প্রয়োজন হতো না যদি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট তার মালিকানাধীন শিল্প-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সফলভাবে পরিচালনা করে প্রচুর আয় করতে পারত। শুধু তা-ই নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানসন্ততিদের শিক্ষাগত যোগ্যতাভেদে ওই সব প্রতিষ্ঠানে প্রচুরসংখ্যক কর্মসংস্থানও হতে পারত। ১৯৯১ সালে ঢাকার মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত ট্রাস্ট আধুনিক হাসপাতালটি হতে পারত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ হাসপাতাল, যেখানে স্বল্প খরচে তারা চিকিত্সাসেবা পেতে পারত।
দুঃখের বিষয়, এহেন সম্পদশালী সংস্থাটি এখন ঋণগ্রস্ত; বিভিন্ন ব্যাংকে এর মোট ঋণের পরিমাণ সোয়া শ কোটি টাকারও বেশি। কীভাবে এমন দুর্দশায় পৌঁছাল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, তারই বিবরণ রয়েছে প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন সরকারের, বিশেষত সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ট্রাস্টের বিরাট ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই এরশাদ সরকার ১৯৮৩ সালে ট্রাস্টের মালিকানাধীন সাতটি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকদের কাছে বিক্রি করে দেয়; বন্ধ করে দেয় আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৩ সালে বিএনপির সরকার মিরপুরে ট্রাস্ট আধুনিক হাসপাতালটি ইজারা দেয় ইসলামি উম্মাহ করপোরেশন নামের এক প্রতিষ্ঠানকে। ২০০১ সালে ট্রাস্টের মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠান ঢাকার গুলিস্তান প্রেক্ষাগৃহটি তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর যোগসাজশে বিক্রি করে দেওয়া হয় বিএনপির এক নেতার কাছে। তাবানী বেভারেজ নামে ট্রাস্টের সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি ২০০১ সালেও লাভ করেছিল ২৫ কোটি টাকা। স্বার্থান্বেষী মহলের চেষ্টা ছিল কারসাজি করে বেনামে সেটি কিনে নেওয়ার। তা ঘটেনি বটে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস করে, অবশেষে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বন্ধ করা হয়েছে ২০০৮ সালে।
ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতিপ্রবণতার পাশাপাশি ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, এর অধীনস্থ শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাব ইত্যাদিও ট্রাস্টের সার্বিক দুর্দশার পেছনে কাজ করেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে মনোযোগী, তাঁদের কল্যাণার্থে নানা উদ্যোগ নিয়েছে এই সরকার। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের দুর্দশা দূর করে একে আবারও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেছে, যার সভাপতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। আমরা আশা করব, এই ট্রাস্টি বোর্ড মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে একটি শক্তিশালী, দক্ষ, উপার্জনক্ষম ও কল্যাণকারী সংস্থা হিসেবে দাঁড় করানোর কার্যকর উদ্যোগ নেবে। ট্রাস্টের সম্পদ লুটপাটের ঘটনাগুলো তদন্ত করে আইনানুগ পন্থায় সেগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও করা উচিত।