Monday, September 29, 2025

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে নতুন প্রশ্ন, নেতৃত্ব দেবে কে? by পল অ্যাডামস

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন ফিলিস্তিনি কূটনীতিক হুসাম জমলট। তখনই বৃটেন, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দেয় বেলজিয়াম। জমলট একে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আখ্যা দিয়ে বলেন, নিউইয়র্কে যা হতে যাচ্ছে, সেটিই হয়তো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কার্যকর করার শেষ চেষ্টা। সেটা ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না।

কয়েক সপ্তাহ পর বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও একই পদক্ষেপ নিল। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে আমরা শান্তির সম্ভাবনা ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান টিকিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। নিরাপদ ইসরাইলের পাশাপাশি টিকে থাকার মতো একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমরা কোনোটিই পাইনি।

এর আগে ১৫০টির বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বৃটেন ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বলে মনে করছেন অনেকেই। সাবেক কর্মকর্তা জাভিয়ের আবু ঈদ বলেন, ফিলিস্তিন এখন বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে আছে। বিশ্ব ফিলিস্তিনের পক্ষে সংগঠিত।

রাষ্ট্রস্বীকৃতির জটিল প্রশ্ন:
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- কোন ভূখণ্ডকে ফিলিস্তিন বলা হচ্ছে? রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির জন্য ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশন চারটি মানদণ্ড দিয়েছে। ফিলিস্তিনের আছে স্থায়ী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা। কিন্তু ‘সংজ্ঞায়িত ভূখণ্ড’ বা কার্যকর সরকার নেই। ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের রাষ্ট্র হলো তিন অংশে বিভক্ত। তাহলো পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা। এর সবই ইসরাইল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করে। পশ্চিম তীর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ইসরাইলি দখল ও বসতি স্থাপনের কারণে। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আর পূর্ব জেরুজালেম বসতি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে।

নেতৃত্ব সংকট: রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর সরকার প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে ফাতাহ ও হামাসের দ্বন্দ্বে গাজা ও পশ্চিম তীরে দুই ভিন্ন শাসনব্যবস্থা চলছে। মাহমুদ আব্বাস নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কার্যত অসহায়। সেখানে সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০০৬ সালে। এর মানে ৩৬ বছরের নিচে কেউ কখনো ভোট দেয়নি। আইনজীবী ডায়ানা বুত্তু বলেন, এত বছর নির্বাচন হয়নি- এটা অকল্পনীয়। নতুন নেতৃত্ব দরকার। এই নেতৃত্ব সংকটে বারবার উঠে আসে কারাগারে বন্দি মারওয়ান বারঘুতির নাম। জনসমর্থনে তিনি আব্বাসের চেয়ে অনেক এগিয়ে, যদিও ২০০২ সাল থেকে ইসরাইলি কারাগারে আছেন। জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ফিলিস্তিনি তাঁকেই ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে চান।

ইসরাইলের অবস্থান: বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহুবার স্পষ্ট করেছেন, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চান না। বরং নতুন বসতি অনুমোদন দিয়ে পূর্ব জেরুজালেমকে পশ্চিম তীর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করেছেন। ইসরাইলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বলেন, স্বীকৃতি দেয়ার মতো কোনো রাষ্ট্র নেই, আর স্বীকৃতি দেয়ার মতো কেউ নেই।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বাস্তবতা: ফ্রান্স-সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’-এ বলা হয়েছে, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করে গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের হাতে দিতে হবে। ১৪২টি দেশ এটি সমর্থন করেছে। হামাসও বলেছে, তারা টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে দায়িত্ব ছাড়তে প্রস্তুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন এবং তার ‘রিভেরা প্ল্যান’-এ গাজার দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কোনো উল্লেখ নেই।

প্রতীকী স্বীকৃতির সীমাবদ্ধতা: ডায়ানা বুত্তু মনে করেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মূল্যবান হতে পারে, তবে নির্ভর করছে দেশগুলোর উদ্দেশ্যের ওপর। লন্ডনের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল প্রতীকী স্বীকৃতিতে কাজ হবে না, বাস্তব অগ্রগতি দরকার। যেমন পশ্চিম তীর-গাজার একত্রীকরণ, নির্বাচন আয়োজন, পুনর্গঠন পরিকল্পনা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বড় বাধা ইসরাইলের কঠোর বিরোধিতা। ইসরাইল ইতিমধ্যে পশ্চিমতীর দখল করার হুমকি দিয়েছে।

শেষ কথা: অতএব, রাষ্ট্রস্বীকৃতি পেলেও ফিলিস্তিন এখনো কার্যকর নেতৃত্বহীন। আব্বাস প্রায় ৯০ বছরের, বারঘুতি কারাগারে, হামাস বিপর্যস্ত, আর পশ্চিম তীর খণ্ডিত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অবশ্যই প্রতীকী শক্তি দেয়, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি বিষয় হলো- গাজায় রক্তপাত বন্ধ করা। ডায়ানা বুত্তু বলেন, আমার কাছে রাষ্ট্রস্বীকৃতির চেয়ে জরুরি হলো হত্যাযজ্ঞ থামানো। দেশগুলোকে এখনই কিছু করতে হবে।
(অনলাইন বিবিসি থেকে অনুবাদ)

mzamin

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ায় নিউজিল্যান্ডে হতাশা

নিউজিল্যান্ড সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দেয়ার সিদ্ধান্তে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশটির বিরোধী দল, ফিলিস্তিনি সংগঠন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত নিউজিল্যান্ডকে ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড় করিয়েছে এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গেও বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।

এতে আরও বলা হয়, গত সপ্তাহে বৃটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বিশেষ সম্মেলনের আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ মাস পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৫৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল, নিউজিল্যান্ডের জোট সরকারও একই পদক্ষেপ নেবে, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন ও অন্যান্য মন্ত্রীর পূর্ববর্তী মন্তব্যের আলোকে।

কারণ তারা বলেছিলেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া হবে ‘কবে দেয়া হবে, সেটা প্রশ্ন, দেয়া হবে কি না- সেটা নয়।’ কিন্তু শনিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স জানান, যদিও নিউজিল্যান্ড দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে এখনই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না। তিনি বলেন, যুদ্ধ চলমান অবস্থায়, হামাস যখন গাজার কার্যত শাসক, আর ভবিষ্যতের কোনো ধাপ পরিষ্কার নয়- তখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

তাই এখনই নিউজিল্যান্ডের পক্ষে স্বীকৃতি ঘোষণা করা যুক্তিযুক্ত হবে না। পিটার্স আরও দাবি করেন, স্বীকৃতি দেয়ার ফলে যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত অনেক নিউজিল্যান্ডারের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছেন। সোমবার অকল্যান্ডে অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রীর অফিসের সামনে অ্যাংলিকান ও ক্যাথলিক ধর্মযাজকরা নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক বলেন, নিউজিল্যান্ড নিজেকে ‘ইতিহাসের ভুল পাশে’ দাঁড় করিয়েছে।

তিনি আরএনজেড’কে বলেন, যত বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে একটি সমাধানের পথে এগোনোর অংশ হিসেবে, নিউজিল্যান্ড ততটাই পিছিয়ে পড়ছে এবং এর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির ঘোষণাগুলো এসেছে এমন সময়ে, যখন ইসরাইল গাজা শহরে হামলা তীব্র করেছে এবং আশঙ্কা তৈরি হয়েছে স্বীকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে পশ্চিম তীর দখল করতে পারে তারা। এর আগে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কমিশন জানিয়েছে, ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে।

mzamin

খেলাধুলায় ‘চ্যাম্পিয়ন’ ফিলিস্তিনি কিশোরকে মরতে হলো খাবারের অভাবে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অনাহার ও অপুষ্টিতে ভুগে গতকাল শনিবার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর মারা গেছে। আগে তার কোনো অসুস্থতা ছিল না। কিন্তু খাবারের অভাবে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে সে মারা যায়। কিশোরের স্বজনেরা ও চিকিৎসাকর্মীরা এমনটাই বলেছেন।

ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজা উপত্যকার মানুষ তীব্র সংকটে আছে। সেখানকার মানুষ এখন খাবারের জন্য মরিয়া। ইসরায়েল সেখানে ত্রাণ পৌঁছাতে দিচ্ছে না।

শনিবার মারা যাওয়া ওই কিশোরের নাম আতেফ আবু খাতের। গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালের একটি সূত্র আল–জাজিরাকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

আল–জাজিরার গাজা প্রতিনিধি হানি মাহমুদ বলেন, আতেফ স্থানীয়ভাবে খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন ছিল। কিন্তু খাবার খেতে না পারায় তার ওজন কমে যায়। প্রচণ্ড অপুষ্টিতে ভোগার পর অবশেষে সে মারা যায়। হানি আরও বলেন, আতেফ গাজায় তীব্র অপুষ্টির শিকার হাজার হাজার মানুষের একজন মাত্র।

আল–জাজিরার যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আতেফের পরিবার তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে। সেখানে তার শীর্ণকায় মরদেহ দেখা যাচ্ছে। তাঁর মুখ ক্যামেরা থেকে আড়াল রাখা হয়েছে।

আতেফ আবু খাতেরের পরিবার বলেছে, মৃত্যুর সময় তার ওজন কমে মাত্র ২৫ কেজি হয়েছিল। আগে তার ওজন ছিল ৭০ কেজি। ২৫ কেজি ওজন সাধারণত নয় বছর বয়সী শিশুদের হয়ে থাকে। আতেফের গালে একটুও চর্বি ছিল না। মুখমণ্ডলের হাড়গুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল।

ভিডিওতে দেখা যায়, আতেফের এক আত্মীয় তার পাঁজরের প্রতিটি হাড় আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখাচ্ছিলেন। তার পাঁজরের হাড়গুলো যেন গোনা যাচ্ছিল।

উইসাম শাবাত নামের এক সাংবাদিক ভিডিওটি নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন না খেতে পেরে এবং চিকিৎসার অভাবে আতেফের শরীরে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। আতেফ যখন হাসপাতালে আসে, তখন তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৯ জন ফিলিস্তিনি অনাহারে বা অপুষ্টিতে ভুগে মারা গেছে। এর মধ্যে ৯৩ জনই শিশু।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় গাজায় ত্রাণ সরবরাহের ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হলেও ফিলিস্তিনিরা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। তাদের পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক সমালোচনার মুখে ইসরায়েল বলেছে, তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণসহায়তা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে উড়োজাহাজ থেকে নিচে খাবার ফেলার মতো ব্যবস্থাও আছে।

তবে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, এ ধরনের সহায়তা ঝুঁকিপূর্ণ ও অকার্যকর। তাদের দাবি, গাজার সব সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়া হোক, যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা অবাধ প্রবেশ করতে পারে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি শনিবার বলেন, ‘গাজায় যে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চলছে, তা মূলত জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার ফল।’

গাজায় জিএইচএফ পরিচালিত ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে খাবার নিতে আসা ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে নিয়মিত গুলি চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। জাতিসংঘ চলতি সপ্তাহে বলেছে, মে মাসে এই সংস্থার কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে এক হাজার তিন শতাধিক ত্রাণপ্রত্যাশী নিহত হয়েছে।

লাজারিনির অভিযোগ, ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে জাতিসংঘ ও অন্য মানবিক সংস্থাগুলোকে ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। তিনি একে গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ প্রয়োগ ও তাদের শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা বলেছেন।

এক্সে দেওয়া পোস্টে লাজারিনি লিখেছেন, আর সময় নষ্ট করা যাবে না। সীমান্তগুলো নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার জন্য এখনই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।

শিশুরা ধুঁকে ধুঁকে মরছে

এদিকে গাজার হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পরিবার মরিয়া হয়ে খাবার ও অন্যান্য জরুরি জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছে। গতকাল গাজার মধ্যাঞ্চলীয় দেইর আল-বালাহ থেকে আল–জাজিরার সংবাদকর্মী হিন্দ খৌদারি বলেন, ইসরায়েল সৃষ্ট খাদ্যসংকটের কারণে শিশুসহ অনেক মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তেমনই একজন মিস্ক আল-মাধুন। অপুষ্টিতে ভোগা পাঁচ বছর বয়সী শিশুটিকে খাওয়ানোর মতো কোনো কিছুই তাঁদের কাছে নেই। তাঁরা বলছেন, প্রতিদিন চোখের সামনে তাঁরা তাঁদের মেয়েটিকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখছেন। মা-বাবারা তাঁদের সন্তানদের বাঁচাতে যা যা করা সম্ভব, সবই করছেন বলে উল্লেখ করেন খৌদারি।

খৌদারি বলেন, ‘আমরা এমন অনেক মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁরা দুধ না পেয়ে বাধ্য হয়ে শিশুদের শুধু পানি খাওয়াচ্ছেন। কারণ, তাঁদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। আমরা আরও দেখছি, ফিলিস্তিনি মা-বাবারা প্রতিদিন প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ পথ হেঁটে রান্না করা খাবার বা ত্রাণ বিতরণকেন্দ্র খুঁজে ফিরছেন। এমনকি কেউ কেউ জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলোতেও যাচ্ছেন। সেখানে তাঁরা মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন, আহত হন কিংবা খালি হাতেই বাড়ি ফেরেন।

গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক ক্ষুাবিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) বলেছে, গাজায় দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হচ্ছে। সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার বেশির ভাগ এলাকায় মানুষ এত কম খাবার পাচ্ছে যে তা এখন দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, অবিরাম সংঘর্ষ, গণহারে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর বাধা, স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রয়োজনীয় সব পরিষেবায় ধস নামার কারণে এই সংকট এখন এক ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছেছে।

খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিরা গাজায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফ পরিচালিত বিতরণ কেন্দ্রগুলোয় ভিড় জমায়
খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিরা গাজায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফ পরিচালিত বিতরণ কেন্দ্রগুলোয় ভিড় জমায়। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

গণ–অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ–নেপালে যে ৫টি জায়গায় বিস্ময়কর মিল by সুশীম মুকুল

নেপালের সরকার পতনের সঙ্গে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের সরকার পতনের বিস্ময়কর মিল দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে যেমন ছোট্ট একটি ইস্যু থেকে তরুণদের আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু হয়েছিল এবং তার জের ধরে নির্বাচিত সরকারের পতন হয়েছিল; নেপালেও তা–ই ঘটল।

কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করার পর সেখানে সেনাপ্রধান কার্যত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। পুরো ঘটনাই যেন ঢাকার ঘটনা পুনরাবৃত্তি। বিশেষ করে পাঁচটি ক্ষেত্রে এই দুই দেশের ঘটনায় আশ্চর্য রকমের মিল পাওয়া যাচ্ছে।

১. তরুণদের নেতৃত্ব

বাংলাদেশের মতো নেপালেও আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি। কাঠমান্ডু থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এক দিনে ছড়িয়ে পড়ে পোখারা, বিরাটনগর, ভরতপুরসহ ৭৭ জেলার রাজধানীতে। নেপালের ৩ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ জেন–জি; আর ৯০ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। তাই আন্দোলন মুহূর্তেই ব্যাপক হয়ে ওঠে।

স্কুল-কলেজের পোশাক পরা হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছিল। ‘যুবসমাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে’ স্লোগান তুলেছিল, যেটি সংগঠিত করেছিল এনজিও ‘হামি নেপাল’। এর নেতৃত্বে ছিলেন ৩৬ বছর বয়সী কর্মী সুদান গুরুং।

এই তরুণেরা ‘নেপো বেবি’ আর ‘নেপো কিডস’-এর বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিজাত পরিবারের সন্তানদের চাকচিক্যময় জীবনযাত্রা নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কারণ, কোটা আওয়ামী লীগের অনুগতদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করছিল। এখানেও প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিলেও পরে আন্দোলনে মৌলবাদী গোষ্ঠী ঢুকে পড়ে।

দুই দেশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল তরুণদের মূল হাতিয়ার। বাংলাদেশে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ, আর নেপালে টিকটক (যেটি নিষিদ্ধ হয়নি) ও ভিপিএন আন্দোলন জমাতে ভূমিকা রেখেছিল।

২. ছোট্ট ট্রিগার থেকে বড় বিস্ফোরণ

বাংলাদেশে কোটা আন্দোলন আর নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ—দুটিই তুলনামূলক ছোট ইস্যু ছিল। কিন্তু এগুলো আড়ালে থাকা দুর্নীতি, বৈষম্য আর অকার্যকর শাসনের ওপর চাপা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে তোলে।

নেপালে ৪ সেপ্টেম্বর তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুং ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, স্থানীয়ভাবে নিবন্ধন না করা, ঘৃণা ছড়ানো ঠেকানো, প্রতারণা রোধ ইত্যাদি। কিন্তু জনগণের চোখে এটা ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের চেষ্টা।

টিকটক আগে থেকেই নিবন্ধন করায় নিষিদ্ধ হয়নি। আর সেটিই আন্দোলনকারীদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে যেমন কোটা নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়টা ছিল আসলে স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির প্রতীক, তেমনি নেপালে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করা ছিল তরুণদের কণ্ঠরোধের প্রতীক।

ফলাফল একই হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘ আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার পতন হযেছে। আর নেপালে মাত্র দুই দিনেই অলি সরকারের পতন হয়েছে।

৩. বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু

বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাজারো মানুষ মারা যায়। সরকারি হিসাবে ১ হাজার জন আর পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস জানান, প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন নিহত হয়েছিলেন।

নেপালে প্রথম দিনের সংঘর্ষেই ২০ জন নিহত হন। তাঁদের বেশির ভাগই তরুণ শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে যেমন বিক্ষোভকারীদের হত্যার পর আন্দোলন তীব্র হয়েছিল, নেপালেও প্রথম দিনের মৃত্যুগুলো দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

৪. মন্ত্রীদের বাড়ি ও সরকারি স্থাপনায় হামলা

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার গণভবন, সংসদ ভবন, মন্ত্রীদের বাড়ি, থানা—সব জায়গায় হামলা হয়েছিল।

নেপালেও একই দৃশ্য। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী অলির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। তাঁকে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক ও বিরোধী দলের নেতা পুষ্প কমল দহলের বাসায় হামলা হয়। অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাউডেলকে আন্দোলনকারীরা প্রকাশ্যে মারধর করেন।

দুই দেশেই মন্ত্রীর বাড়ি, সরকারি কার্যালয় ও সংসদে হামলা হয়েছিল। এই আক্রমণগুলো ছিল দুর্নীতি আর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ।

৫. প্রধানমন্ত্রীর পতন আর সেনাবাহিনীর ভূমিকা

বাংলাদেশে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে বলেন। সেনাবাহিনী জানায়, তারা জনগণের পাশে থাকবে, গুলি চালাবে না। ৫ আগস্ট হাসিনাকে হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়তে হয়।

নেপালেও একই ঘটনা। সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেল অলিকে বলেন, সেনাবাহিনী স্থিতিশীলতা আনতে পারবে, যদি তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে মঙ্গলবার অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আসরে বাংলাদেশের কোটাব্যবস্থা আর নেপালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ—দুটিই তরুণদের ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। দুই দেশেই আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা, পরে সাধারণ জনগণ তাতে যোগ দেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ দুটি দেশ ভারতের প্রতিবেশী ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই দুই সরকারের পতন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন নির্দেশ করছে।

* সুশীম মুকুল, ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক
- ইন্ডিয়া টুডে থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে নেওয়া

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2Fr9hnssbt%2Fsocial-media-ban.webp?rect=32%2C0%2C582%2C388&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভে উত্তাল রাজপথ। কাঠমান্ডু, নেপাল, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ দফা শান্তি প্রস্তাব

গাজায় যুদ্ধ বন্ধে এবং ভবিষ্যত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে ২১ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যার মধ্যে অবিলম্বে জিম্মি মুক্তি, ফিলিস্তিনিদের গাজায় অবস্থান এবং হামাসকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রস্তাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে টাইমস অব ইসরাইল। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে আরব নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।

খবরে বলা হয়েছে, গাজার বাসিন্দাদের উপত্যকাতেই থাকার প্রস্তাবটি মার্কিন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ এর গাজার দখল নিয়ে ২০ লাখ গাজাবাসীকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তাছাড়া ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাটিও ট্রাম্পের নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। কারণ প্রশাসন কখনোই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করেনি।

এই প্রস্তাবে ইসরাইলের পক্ষেও কিছু অনুকূল বিষয় রয়েছে। যেমন হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা এবং সেখানকার জনগণের উগ্রপন্থা দূর করার প্রক্রিয়া শুরু করা। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কখনোই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে প্রচার করেননি এবং তিনি শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বলেন, ৭ই অক্টোবরের পর জেরুজালেম থেকে এক মাইল দূরে ফিলিস্তিনিদের একটি রাষ্ট্র দেওয়াটা ১১ই সেপ্টেম্বরের পর আল-কায়েদাকে নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে এক মাইল দূরে একটি রাষ্ট্র দেওয়ার মতো। এটা চরম পাগলামি। এটা উন্মত্ততা এবং আমরা এটা হতে দেব না। ইসরাইল আমাদের গলায় সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র চাপিয়ে দিতে দেবে না।

তা সত্ত্বেও আরব নেতাদের সঙ্গে গাজা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। তিনি মনে করেন এ নিয়ে একটি চুক্তি হতে পারে। এ বিষয়ে চার দিন ধরে তীব্র আলোচনা চলছে এবং একটি সফল সম্পন্ন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে বলে ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, অঞ্চলের সকল দেশ এতে জড়িত। পাশাপাশি হামাস ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীও এ আলোচনায় আছেন।

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আরব নেতাদের সাথে বৈঠকের পর বলেন, আমাদের একটি খুবই ফলপ্রসূ অধিবেশন হয়েছে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যে, গাজায় শান্তির জন্য ট্রাম্পের ২১-দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি। এ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। উইটকফ বলেন, আমি বলতে পারি এমনকি আত্মবিশ্বাসী যে আগামী দিনগুলোতে আমরা কোনো ধরনের অগ্রগতির ঘোষণা দিতে সক্ষম হব।

https://mzamin.com/uploads/news/main/182192_Kaium-3.webp

ট্রাম্প যেভাবে মিয়ানমারকে চীনের হাতে তুলে দিচ্ছেন by ডেভিড ব্রেনার

গত ২৫ জুলাই মিয়ানমারের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর। এ ঘটনা মিয়ানমার প্রশ্নে কয়েক দশক ধরে চলে আসা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পুরোপুরি বিপরীত অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের বার্ষিকীতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের নিষ্ঠুর সামরিক সরকারের অব্যাহত দমন-পীড়ন ও বিমান হামলার মুখে প্রতিরোধ করে যাওয়া দেশটির গণতন্ত্রপন্থীদের প্রতি সংহতি জানানো হয়েছিল।

এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে অনেকে ‘মিয়ানমারের ওপর ট্রাম্পের পিছু হটা যুদ্ধের’ সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরেকবার চীনের হাতে কৌশলগত বিজয় তুলে দেওয়া হলো। নৈতিকতার মানদণ্ডে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এ পদক্ষেপ মোটেও অবাক করার মতো বিষয় নয়।

ট্রাম্প এরই মধ্যে রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে ইউক্রেনকে একা ফেলে এসেছেন, গাজায় জাতিগত নিধনযজ্ঞের পক্ষে ওকালতি করেছেন এবং আমেরিকান গণতন্ত্রের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটি মুছে ফেলতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন; কিন্তু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ঘটনাটি শুধু নীতিগত ব্যর্থতা নয়, এটি চরম মাত্রার কৌশলগত ভুলও।

মিয়ানমার প্রশ্নে মার্কিন নীতি পরিবর্তনের পেছনে কী আছে, সেটি এখনো অস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি; কিন্তু সময়টা খুব কৌতূহলোদ্দীপক। কেননা, মাত্র কয়েক দিন আগে মার্কিন কংগ্রেসে দুই দলের (রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক) সমর্থনে তিনটি বিল পাস হয়েছে, যেখানে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয় এবং জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান জ্যেষ্ঠ জেনারেল মিন অং হ্লাইং সম্প্রতি শুল্ক নিয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্পের বাড়াবাড়ি রকম প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি যে পরিচালিত হচ্ছে ব্যক্তিগত চাটুকারিতা ও আত্মপ্রশংসার ওপর ভর করে, এটা তার আরেকটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পাল্টানোর পেছনে আরও হিসাবি উদ্দেশ্য আছে। ব্যবসায়ী লবিস্টরা ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে মিয়ানমারে মাটির নিচে যে বিরল খনিজ আছে, তা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত সম্পদ হতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে মিয়ানমার এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।  বিশেষ করে চীন যখন পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের কথা বিবেচনা করে নিজ দেশে বিরল খনিজের খনন কমিয়ে দিয়ে সেই শূন্যস্থান মিয়ানমারকে দিয়ে পূরণ করছে।

কিন্তু এখানে মূল বিষয়টি হলো মিয়ানমারের বিরল পদার্থের খনিগুলো জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। এই খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে চীনের সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্যগুলোর প্রভাবশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হাতে। বিশ্বের অন্যতম পুরোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন গত বছর বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

মিয়ানমারের এই পরিবর্তন ওয়াশিংটনের দৃষ্টি এড়ায়নি। এ কারণে কয়েকজন লবিস্ট দুটি প্রস্তাব সামনে এনেছেন। এক. যুক্তরাষ্ট্র কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশনের সঙ্গে বিরল সম্পদ উত্তোলনের জন্য সরাসরি কাজ করতে পারে। দুই. কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন ও সামরিক জান্তার মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় শান্তিচুক্তি করিয়ে যৌথভাবে এসব খনি ব্যবহার করার পথ তৈরি করতে পারে।

প্রথম প্রস্তাবটি যৌক্তিকতার বিচারে একেবারেই অবাস্তব। কাচিন রাজ্যটি ল্যান্ডলক বা স্থলবেষ্টিত। এই রাজ্যের চারপাশে যেমন জান্তানিয়ন্ত্রিত অঞ্চল আছে, তেমনি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা যুদ্ধ অঞ্চলও রয়েছে। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারত ও চীনের দুর্গম এলাকাও রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রস্তাবটি আরও বিভ্রান্তিকর। এটি ওয়াশিংটনের ব্যবসায়িক লবিস্টদের সেই বিশ্বদৃষ্টি প্রতিফলিত করে, যেখানে অনেক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক আন্দোলনকে শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। যদি কাচিনরা কেবল মুনাফার আশায় পরিচালিত হতো, তাহলে তারা বহু আগেই চীনের দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতির চাপে নতিস্বীকার করত। তারা তা করেনি। কারণ, তাদের লক্ষ্য বাণিজ্যিক নয়, রাজনৈতিক।

কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করছে এবং সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি মূল সহযোগী। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কিংবা আধুনিক অস্ত্র বিক্রি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়ার মতো এমন কিছু নেই, যা একটি চুক্তিকে মূল্যবান করে তুলতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি নেওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট নয়। কারণ, কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশনকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়।

এদিকে বিরল উপাদানের খনির সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে। এ গোষ্ঠী এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী। কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মা ভেঙে যাওয়ার পর এই গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিল, এখনো তারা চীনের অস্ত্র ও সমর্থন পাচ্ছে। মিয়ানমারের বিরল খনিজ খাতে যুক্তরাষ্ট্র অর্থপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে, এ ধারণা শুধু শিশুসুলভ নয়, বাস্তবতাবিবর্জিতও। এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হচ্ছে, এতে সরাসরি চীনের স্বার্থে কাজ করার ঝুঁকি তৈরি হবে।

মিয়ানমারের ওপর চীন এরই মধ্যে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে। এ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা সংস্থা ইউএসএআইডির বাজেট কাটছাঁট হওয়ার পর মিয়ানমারের রাজনীতিতে আরও শক্তভাবে প্রভাব তৈরির সুযোগ পায় চীন। এখন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় চীনের আধিপত্য আরও পাকাপোক্ত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হলো।

মিয়ানমারের জেনারেলরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাবেন। তাঁরা এটিকে ব্যবহার করবেন তাঁদের পরিকল্পিত প্রহসনের নির্বাচনের বৈধতা দিতে এবং দেশে-বিদেশে তাঁদের প্রচারণা জোরদার করার কাজে। তাঁরা কখনো চীনকে ত্যাগ করবেন না। কারণ, তাঁদের অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস এখনো চীন।

অন্যদিকে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলন (এখন দেশটির অর্ধেকের বেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে) যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে আরও হতাশ হবে। বাইডেন প্রশাসন বার্মা অ্যাক্ট (প্রাণঘাতী নয়, এমন সহায়তার প্রতিশ্রুতি) পাস করলেও সেটি কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পশ্চিমা সমর্থন বরাবরই ছিল প্রতীকী। এখন সেই প্রতীকী সমর্থনও প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে।

বছরের পর বছর ধরে ফাঁকা বুলি শুনে আসা মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের কাছে পশ্চিমা বিশ্বের ওপর আস্থা আর অবশেষ নেই; কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বাসঘাতকতা তাদের চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য করতে পারে।

* ডেভিড ব্রেনার, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ফাইল ছবি