Monday, August 24, 2026
উত্তেজনা প্রশমনে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মোসাদপ্রধানের বৈঠক
অ্যাক্সিওসের বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, রোববার (২৩ আগস্ট) এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি কোথায় হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার পর সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা কমাতেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে দামেস্ককে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সিরিয়া ওই সতর্কবার্তায় সাড়া না দেওয়ায় হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে জেরুজালেম।
এই হামলার পর সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে তুরস্ক এবং তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাকও ইসরায়েলের হামলার কঠোর সমালোচনা করেছেন।
বৈঠকের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় অ্যাক্সিওসের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্রের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-শাইবানি বলেন, আমরা বর্তমানে ইসরায়েলকে বিশ্বাস করি না।
ইসরায়েল গত সপ্তাহে সিরিয়ার আবু আল দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলেও জানান তিনি।
সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দামেস্ক আশা করছে শিগগিরই আলোচনা আবার শুরু হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে।
ইসরায়েল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে বলেও অভিযোগ করেন আল শাইবানি। তার দাবি, এ ধরনের শক্তি প্রয়োগে ইসরায়েল সফল হয়নি।
সূত্র : দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
![]() |
| আসাদ আল শাইবানি ও রোমান গোফম্যান। ছবি : গেটি ইমেজেস |
Sunday, August 23, 2026
তুরস্কের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতেই সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলা ইসরায়েলের
কাটজ বলেন, হামলার অনুমোদন দেওয়ার আগে সিরিয়া সরকারকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সতর্ক করেছিল ইসরায়েল। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন কর্মকর্তাদেরও দেওয়া হয়। তবে সিরিয়ার পক্ষ থেকে ইসরায়েলের দাবির বিষয়ে কোনো সাড়া না পাওয়ার পর হামলা চালানো হয়।
যদিও ইসরায়েলের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তুরস্ক। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলার আগে বা হামলার সময় আবু আল দুহুর ঘাঁটিতে কোনো তুর্কি সামরিক প্রতিনিধি দল ছিল না।
সিরিয়াও জানিয়েছে, আবু আল দুহুরে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তবে সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য তুরস্কের কর্মকর্তারা ওই স্থাপনা পরিদর্শন করেছিলেন।
গত ১৮ আগস্ট উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ওই বিমানঘাঁটিতে আট দফা বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলায় বিমানঘাঁটির রানওয়ে ও অস্ত্র-সরঞ্জাম সংরক্ষণের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইসরায়েলের এই হামলাকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তুরস্ক, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে সংঘাত এড়াতে একটি সমন্বয়ব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে কাজ করছে তারা।
তবে ব্যারাকের মন্তব্যেরও সমালোচনা করেছেন কাটজ। তার দাবি, ব্যারাকের প্রতিক্রিয়ায় অনেক ভুল তথ্য রয়েছে এবং গোলান মালভূমি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গেও তার কিছু বক্তব্য সাংঘর্ষিক।
সূত্র : আল জাজিরা
![]() |
| সিরিয়ার আবু আল দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে প্রহরারত একজন সিরীয় সৈন্য। ছবি: এএফপি |
Thursday, August 20, 2026
তুরস্কের ঘাঁটি নিয়ে ইসরায়েলের ভয়: সিরিয়ায় হামলার আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ করেন মোসাদপ্রধান
মোসাদপ্রধান রোমান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির মধ্যে ১৪ আগস্ট এ ফোনালাপ হয়। এটি সিরিয়ার ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রশাসনের সঙ্গে ইসরায়েলের এযাবৎকালের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। ফোনালাপের ঠিক চার দিন পর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সাধারণত মোসাদ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলার পর গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দামেস্ক প্রশাসন সিরিয়ায় তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। নেতানিয়াহুর দাবি, সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েন করা হলে তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে। এ বিষয়ে তারা সিরিয়াকে বারবার সতর্ক করলেও আল-শারা প্রশাসন তা আমলে নেয়নি।
দুটি সূত্র বলছে, হামলার চার দিন আগে মোসাদপ্রধান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মধ্যে এ ফোনালাপ হয়। এতে সিরিয়াকে দেওয়া তুরস্কের সামরিক সহায়তার বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। সূত্র আরও জানায়, ফোনালাপে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, অস্ত্র বিক্রি, ড্রোন সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েল নানা তথ্য জানতে চায়। সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে তুরস্ক অস্ত্র সরবরাহ করছে কি না, গফম্যান সেটিও জানতে চান।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় আরেকটি সূত্র ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়েই মূলত কথা হয়েছে।
এদিকে এ ফোনালাপের বিষয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তুরস্ক-সিরিয়া সম্পর্ক নিয়ে নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি
সিরিয়ায় ২০২৪ সালে ‘স্বৈরশাসক’ বাশার আল-আসাদ সরকারকে হটিয়ে দেন আল-শারার নেতৃত্বে দেশটির বিদ্রোহীরা। এর পর থেকে তুরস্ক শারা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। এর আগেও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্ক বাশার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়। সিরিয়ায় তুরস্কের এ ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইসরায়েলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিরিয়ার শাসক আল-শারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। গত জুলাই মাসে তিনি জানিয়েছিলেন, সিরিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তাচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ইসরায়েল যেন সিরিয়ার প্রতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে, সে জন্য অন্যান্য প্রভাবশালী দেশকে যুক্ত করে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টাও চালাচ্ছে দামেস্ক।
নেতানিয়াহু গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তায় সিরিয়াকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে পারে, সিরিয়ায় তুরস্কের এমন কোনো সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি ইসরায়েল সহ্য করবে না।’
সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলার দিকে ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমরা তুরস্ককে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, এমনটা করবেন না। তারা স্পষ্টত আমাদের বার্তা শোনেনি। তাই আমরা (সিরিয়ায় বিমান হামলা চালানোর মাধ্যমে) নিশ্চিত করেছি, যেন তারা (তুরস্ক) বার্তাটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে।’
তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় গত বুধবার ইসরায়েলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এগুলো ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তুর্কি প্রশাসনের মতে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর চালানো ‘অবৈধ বিমান হামলা’ বৈধতা দিতেই ইসরায়েল এ ধরনের অভিযোগ তুলছে।
তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বৈধ উপায়ে সিরিয়া সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। তবে নিজেদের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি।
তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক মঙ্গলবার বলেন, ইসরায়েলের এ বিমান হামলা ‘একটি অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে এ হামলা কোনো ভূমিকা রাখবে না’।
মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া আরেক বক্তব্যে টম বারাক বলেন, ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত না বাধে, সে জন্য ওয়াশিংটন একটি সমঝোতার উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। তিনি আরও জানান, এ তিন দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
![]() |
| হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে অপেক্ষা করছেন রোমান গফম্যান। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স |
Wednesday, August 19, 2026
সিরিয়ায় হামলাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনার শঙ্কা
এর আগে মঙ্গলবার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়। রানওয়ে সংস্কারের কাজ দেখতে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শনের পরই হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সুযোগ ভালোভাবে নিচ্ছে না তারা। এর প্রতিক্রিয়ায় হামলা হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরায়েল।
এ বিষয়ে মার্কিন বিশেষ দূত থমাস বারাক বলেন, হামলার আগে তুরস্ককে সতর্ক করা হয়নি। ফলে প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুরস্ক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সময়ে সিরিয়ার দারা অঞ্চলের একটি গ্রামের কাছে গোলাবর্ষণের খবরও পাওয়া গেছে।
মার্কিন এই দূত বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল, সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটি সমন্বয় বা ‘ডিকনফ্লিকশন’ ব্যবস্থা জরুরি। ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। তার মতে, এই মুহূর্তে উত্তেজনা কমানো এবং আরও সংযত পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি করাই অগ্রাধিকার।
এর আগে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বারাক এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে মন্তব্য করেন।
এরপর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি কার্যত নিশ্চিত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বিষয়ে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি বিদ্যমান অবস্থান বজায় রাখার সমঝোতা ছিল। কিন্তু সিরিয়া আলেপ্পোর কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সুযোগ দিয়ে সেই অবস্থান প্রায় লঙ্ঘন করেছে।
ইসরায়েলের দাবি, এ ধরনের তুর্কি মোতায়েন তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এবং সিরিয়াকে এ বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সিরিয়া সতর্কতা উপেক্ষা করায় ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে।
রাতে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি বিমান দিয়ে ঘাঁটির রানওয়ে ও সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সিরিয়া এ হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।
সিরিয়ার একটি সামরিক সূত্র ও স্থানীয় এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানওয়ে সংস্কারের কাজ দেখতে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শনের পরই হামলা চালানো হয়।
আবু আল-দুহুর ঘাঁটি সারাকিবের প্রায় ১৭ মাইল পূর্বে অবস্থিত। ইদলিব, হামা ও আলেপ্পো এই তিন অঞ্চলের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে থাকা ঘাঁটিটি উত্তর সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি।
তুরস্ককে ঘিরে ইসরায়েলের উদ্বেগ
তুরস্কের সহায়তায় বিমানঘাঁটিটির বড় ধরনের সংস্কার এবং সেখানে সম্ভাব্য তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ওই এলাকায় ইসরায়েলের আকাশ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই হামলাটি চালানো হয়ে থাকতে পারে।
তবে ইসরায়েল তুরস্ক বা সিরিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের আকাশসীমায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখাকে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
এ অবস্থায় সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা এবং তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
![]() |
| শারা, নেতানিয়াহু ও এরদোয়ান। ছবি: সংগৃহীত |
Sunday, July 12, 2026
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘হাত মিলাচ্ছে’ ইরাক-সিরিয়াঃ ইরানকে ঠেকাতে নতুন চাল
সূত্রগুলো এমইই’কে বলেছে, উত্তর ইরাকের কিরকুক থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইন পুনরুজ্জীবনের চুক্তি আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। এ সময় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, তুরস্কে নিযুক্ত ট্রাম্প প্রশাসনের রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে চুক্তির বিভিন্ন দিক চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন। সফরকালে আল-জায়েদি জ্বালানি শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন অঙ্গরাজ্য টেক্সাসও যেতে পারেন।
ঊর্ধ্বতন এক ইরাকি কর্মকর্তা এমইই’কে বলেছেন, টম ব্যারাকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আল-জায়েদির ভালো কর্মসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ব্যারাক এই পাইপলাইন প্রকল্পকে লেভান্ট অঞ্চলে এমন একটি অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য সমানভাবে লাভজনক হবে।
পাইপলাইনটি ১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি নির্মাণ করে। এটির দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা ছিল।
তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সিরিয়া তেহরানের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ১৯৮০-এর দশকে বাগদাদ পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। পরে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনের সময় পাইপলাইনটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এরপর থেকে এটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
আঞ্চলিক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমইই’কে জানান, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করতে নতুন সংরক্ষণাগার, পাম্প, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
তার মতে, বাস্তবে পুরো পাইপলাইন নতুন করে নির্মাণ করতে হতে পারে, যা শেষ করতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই পুনর্র্নিমাণে ইতোমধ্যে কয়েকটি মার্কিন কোম্পানির সমন্বয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছে, যা প্রকল্পটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।
হরমুজ সংকটের পর গুরুত্ব বেড়েছে
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর সিরিয়া ও ইরাক পাইপলাইনটি পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছিল। তবে সেই উদ্যোগ তখন সফল হয়নি।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ জোরালো হওয়ায় পাইপলাইনটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরাক সীমিত পরিসরে সিরিয়ার মাধ্যমে ট্রাকে করে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করলেও তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সারহাং হামাসাঈদ বলেন, ইরাক এখন সিরিয়াকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছে। আগে তাদের মধ্যে সন্দেহ ছিল, কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরাকের সিরিয়াকে প্রয়োজন।
আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানিও যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন।
যদিও ইরাকের বর্তমান সরকারে ইরান ঘনিষ্ঠ শিয়া রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়াদের প্রভাব রয়েছে, তবু তারা এখন সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের সমর্থন পেয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে সিরিয়ার ওপর আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে এবং আল-শারার সাবেক সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
গত সপ্তাহে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প আল-শারাকে “অসাধারণ” এবং “অত্যন্ত সম্মানিত” নেতা বলে প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, ১৯৭৯ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় থাকা সিরিয়ার নামও সরিয়ে নেয়া হবে।
মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণ
চলতি মাসের শুরুতে ইরাক সরকার ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিরকুক ও হাদিথা থেকে বানিয়াস পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের একটি প্রাথমিক চুক্তি অনুমোদন করেছে।
ইরাক তার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে করে থাকে। ফলে প্রণালিটি বন্ধ বা অচল হয়ে গেলে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ইরাকের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি গত বছরের গড়ের মাত্র ৮ শতাংশে নেমে আসে।
উল্লেখ্য, ইরাকের রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিকল্প রপ্তানি পথ চালু করা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Saturday, July 4, 2026
‘গ্রেটার ইসরাইল’ গড়তে এবার সিরিয়ায় নজর
গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংগঠনটির কর্মীরা অধিকৃত গোলান মালভূমি ও দক্ষিণ সিরিয়ার মধ্যকার সীমান্তে জড়ো হন। কয়েকজন সীমান্তের বেড়ার সঙ্গে নিজেদের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলেন, আর অন্তত ১০ জন সীমান্ত অতিক্রম করে হারমন পর্বতের (জাবাল আল-শেখ) পাদদেশে মাজদাল শামসের কাছে সিরিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। পরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, সীমান্ত অতিক্রমকারী বেসামরিক ব্যক্তিদের ফিরিয়ে এনে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে সংগঠনটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের অংশ বলেই তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য, ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি রেখার ওপারেও ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
কী এই ‘পাইওনিয়ার্স অব বাশান’
২০২৫ সালের এপ্রিলে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। কয়েক মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ সিরিয়ার কিছু এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করে। সেই প্রেক্ষাপটেই সংগঠনটির উত্থান।
‘বাশান’ নামটি নেয়া হয়েছে বাইবেলে উল্লেখিত একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল থেকে, যা জর্ডান নদীর পূর্বে হারমন পর্বত থেকে গিলিয়াদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
‘গ্রেটার ইসরাইল’ মতবাদের অনুসারীদের বিশ্বাস, ইসরাইলের কোনো চূড়ান্ত সীমান্ত নেই। ধর্মীয় জায়নবাদীদের একটি অংশ মনে করে, বাইবেলে প্রতিশ্রুত ভূখণ্ড মিসরের নীল নদ থেকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত, উত্তরে তুরস্কের হাতায় এবং দক্ষিণে সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই মতাদর্শ অনুযায়ী, দক্ষিণ সিরিয়াকে তারা বিদেশি ভূখণ্ড নয়, বরং পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক আবাসভূমির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
বিতর্কিত বক্তব্য
ওপেন-সোর্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক মুরাদ মোহাম্মদ আল-হামউইর মতে, সংগঠনটির সদস্যরা নতুন হলেও অনভিজ্ঞ নন। তিনি বলেন, এরা অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমির অভিজ্ঞ সেটলার। তাদের লক্ষ্য দক্ষিণ সিরিয়ায় স্থায়ী ইহুদি বসতি গড়ে তোলা।
তিনি আরও বলেন, সংগঠনটির কিছু প্রকাশ্য বক্তব্য স্থানীয় জনগণের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের আহ্বানের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এপ্রিল মাসে সংগঠনটির ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, বাশান অঞ্চল থেকে সব সুন্নি ও শিয়া মুসলিমকে বহিষ্কার করতে হবে। পোস্টে বলা হয়, ইসরাইলি শাসনের অধীনেই কেবল বাশান অঞ্চল সমৃদ্ধ হতে পারে।
কারা দিচ্ছেন নেতৃত্ব?
সংগঠনটির প্রধান মুখ আমোস আজারিয়া। তিনি একজন ইসরাইলি শিক্ষাবিদ, ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী কর্মী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসরাইলি সীমান্তের বাইরে ইহুদি বসতি স্থাপনের দীর্ঘদিনের সমর্থক।
আজারিয়ার মতে, দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতির পর সেখানে স্থায়ী বেসামরিক ইহুদি বসতি গড়ে তোলা উচিত। তার ভাষায়, এটি যেমন নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন, তেমনি বাইবেলীয় উত্তরাধিকারের অংশ।
তিনি একই সঙ্গে উরি তজাফোন নামে আরেকটি উগ্র ডানপন্থী সংগঠনেরও অন্যতম নেতা। এই সংগঠনটি দক্ষিণ লেবাননে ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে প্রচার চালায়।
সংগঠনের মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারী জোনাথন লেভি দাবি করেন, সিরিয়ার বর্তমান সরকারের অধীনে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে স্থায়ী ইহুদি বসতি স্থাপন।
রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ছে
শুরুর দিকে প্রান্তিক সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন সংগঠনটি ইসরাইলের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের প্রকাশ্য সমর্থন পাচ্ছে।
২০২৬ সালের শুরুতে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে “ট্রিবিউট টু দ্য পাইওনিয়ার্স অব সেটেলমেন্ট” শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে হালুতজেই হাবাশান এবং এর প্রতিষ্ঠাতা আমোস আজারিয়াকে বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয়।
এই সম্মাননাপত্রে স্বাক্ষর করেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই সেটলার আন্দোলনের অন্যতম প্রবল সমর্থক।
এ ছাড়া প্রবাসবিষয়ক মন্ত্রী আমিখাই চিকলি প্রকাশ্যে বলেন, এটি আমাদের ভূমি। বাশানে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগমন্ত্রী শ্লোমো কারহির সঙ্গেও আজারিয়ার বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাশান অঞ্চলে ইসরায়েলি মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
লিকুদ দলের সংসদ সদস্য এরিয়েল কালনারও এই আন্দোলনের সমর্থনে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় বসতি স্থাপনের মাধ্যমে।
একাধিক সীমান্তে সমন্বিত বসতি আন্দোলন
হালুতজেই হাবাশানের সঙ্গে গাজায় পুনরায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে কাজ করা নাহালা এবং দক্ষিণ লেবাননে বসতি স্থাপনের পক্ষে থাকা উরি তজাফোন সংগঠনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দখল বা নিয়ন্ত্রণে আসা বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে এসব সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় ক্রমেই বাড়ছে।
ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ
সংগঠনটি ধাপে ধাপে সীমান্ত অতিক্রমের কৌশল অনুসরণ করছে। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো তারা সিরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করে “বাশান ওএসিস” নামে একটি বসতি স্থাপনের চেষ্টা করে। এরপর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরজুড়ে একাধিকবার সীমান্ত ভাঙার চেষ্টা চালানো হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার ভেতরে “বাশান নেচার রিজার্ভ” নামে একটি নতুন বসতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানও করে তারা।
এপ্রিল মাসে মাজদাল শামসের কাছে সীমান্তের বেড়া ভেঙে কয়েকশ মিটার ভেতরে প্রবেশ করে সংগঠনটির সদস্যরা। ১৭ মে তারা আবারও সীমান্তে বিক্ষোভ করে এবং বসতি স্থাপনের অনুমতি দাবি জানায়।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকার দক্ষিণাঞ্চলে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী ও সেটলার সংগঠনগুলো।
মুরাদ আল-হামউই বলেন, এখন পর্যন্ত সংগঠনটির সদস্যরা নিরস্ত্র অবস্থায় সীমান্ত অতিক্রম করছে, যাতে বিষয়টিকে সামরিক নয়, বেসামরিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তারা যখন সিরিয়ার জনবসতিপূর্ণ এলাকার আরও কাছে পৌঁছাবে, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠবে।
২৮ জুন দারা প্রদেশের আবদিন গ্রামে ইসরাইলি বাহিনীর হেলিকপ্টার ও গোলন্দাজ সহায়তায় অভিযানের পর স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন। তারা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ফেলে সড়ক অবরোধ করে ইসরাইলি সামরিক যানবাহনের অগ্রগতি ঠেকানোর চেষ্টা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ সিরিয়ায় বসতি স্থাপনের এই আন্দোলন কেবল সীমান্ত রাজনীতির বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতে অঞ্চলটির নিরাপত্তা, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং ইসরায়েল-সিরিয়া সম্পর্কের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

Sunday, June 21, 2026
‘সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে ইসরায়েল’, পরবর্তী নিশানা কে—তুরস্ক না পাকিস্তান
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি এ মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারগুলোয় মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘উগ্র সুন্নি অক্ষ’ গড়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সিরিয়ার বর্তমান ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে এ কট্টরপন্থী মন্ত্রী বলেন, ‘আইএস ও আল-কায়েদার আদর্শে বিশ্বাসী একটি “জিহাদি” শাসনব্যবস্থা, যাদের মূল লক্ষ্য জেরুজালেম দখল করা, তারা কখনো ইসরায়েল রাষ্ট্রের পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করতে পারে না।’
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের আর্মি রেডিওর সঙ্গে আলাপকালে আমিচাই চিকলি তাঁর দৃষ্টিতে গড়ে ওঠা এক নতুন ইসরায়েলবিরোধী জোটের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতার মিলে এ নতুন জোট গঠন করেছে।’
এ জোট নিয়ে চিকলি এতটাই চিন্তিত যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক শান্তিচুক্তির চেয়েও এটি তাঁকে বেশি উদ্বিগ্ন করছে।
লিকুদ পার্টির এই মন্ত্রী অবশ্য স্বীকার করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ইরান বড় ধরনের কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। তবে তিনি বলেন, ‘এর চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা নতুন এ অক্ষ বা জোট।’
ইসরায়েলি এই মন্ত্রীর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ও সমঝোতায় পাকিস্তান ও তুরস্ক বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। আর এর মধ্য দিয়েই তারা এই নতুন জোটের অংশ হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার ‘কোল বারামা’রেডিওকে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে চিকলি এই নতুন জোটে কাতারের ভূমিকা কেমন, তা ব্যাখ্যা করেন। পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটিকে তিনি ‘জিহাদিদের জনসংযোগ শাখা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
‘উগ্র সুন্নি অক্ষ’
আমিচাই চিকলি বিশ্বজুড়ে কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ ও সরকারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার কাজ করছেন। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের কট্টরপন্থী উসকানিদাতা টমি রবিনসনের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। রবিনসনের আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলে-লেনন।
রাশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার পর ব্রিটিশ পুলিশ রবিনসনকে আটকে দেয় এবং তাঁর মুঠোফোনগুলো জব্দ করে।
এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী চিকলি বলেন, ‘প্রকৃত “ইসলামি সন্ত্রাসের” বিরুদ্ধে ব্রিটেনের অন্যতম স্পষ্ট এক কণ্ঠস্বরকে এখন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় হেনস্তা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্রিটেন খুব দ্রুতই ইউরোপের দ্বিতীয় ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে।’
‘কোল বারামা’রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি এই মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক হলো ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের শত্রু, যারা (এই তিন দেশ) আবার ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
বুধবার ‘১০৩এফএম’রেডিওকে চিকলি বলেন, ‘আমরা আমাদের চোখের সামনে একটি নতুন অক্ষ বা জোটের উত্থান প্রত্যক্ষ করছি।’ তুরস্ক, কাতার ও পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করে তিনি কথিত এ জোটকে ‘একটি উগ্র সুন্নি অক্ষ, যা তাঁর আগে দেখা যেকোনো কিছুর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক’ বলে বর্ণনা করেন।
সাক্ষাৎকারে চিকলি কাতার ও পাকিস্তান—উভয় দেশের কথা উল্লেখ করলেও মূল মনোযোগ ছিল তুরস্কের ওপর। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দূরদর্শিতা বা লক্ষ্যকে তিনি ‘আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংমিশ্রণ’ বলে আখ্যা দেন।
চিকলি বলেন, তুরস্ক মূলত সিরিয়ায় ‘একটি তুর্কি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘তুরস্ক ও সিরিয়া আমাদের জন্য ইরানের চেয়ে ১০ হাজার গুণ বেশি উদ্বেগের কারণ।’
লিকুদ দলীয় এই মন্ত্রীর মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। সম্প্রতি এরদোয়ান বলেছেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা তাঁর দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
চলতি মাসের শুরুর দিকে তুর্কি নেতা বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলকে অবশ্যই থামাতে হবে, এটি মানবতার দায়িত্ব।’
অন্যদিকে তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তফা চিফৎচি সম্প্রতি জেরুজালেম মুক্ত করার বিষয়ে কথা বলেছেন।
তুরস্কের কাছ থেকে হুমকি আসার কথা বলা প্রথম ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ নন চিকলি। গত সপ্তাহে লিকুদ পার্টিরই আরেক আইনপ্রণেতা আরিয়েল কেলনার তুরস্ককে একটি ‘শত্রু রাষ্ট্র’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়া গত মাসে ইসরায়েলি সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহর বলেছিলেন, ইসরায়েলের ‘অবশ্যই তুরস্ককে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।’ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে তুরস্ককে ভারী আঘাত সইতে হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি তুরস্ককে শত্রু হিসেবে দেখেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘তুরস্ক হলো নতুন ইরান।’
বৃহস্পতিবার চিকলিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, আড়াই বছরের যুদ্ধের পর ইসরায়েলিরা কি এখন একটু শান্তিময় সময়ের আশা করতে পারে? জবাবে বলেন, তিনি তেমনটাই আশা করেন, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
চিকলির মতে, তুরস্কের ‘খুব স্পষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে’ এবং তারা ইসরায়েলের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েলের আঙ্কারা জয়ের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই এবং সিরিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ না হলে তিনি খুবই খুশি হবেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার ঘটনা থেকে তিনি কী শিক্ষা পেয়েছেন, তা মনে করিয়ে দিয়ে চিকলি বলেন, ‘শত্রু যখন কিছু বলে, আমি তা মনোযোগ দিয়ে শুনি।’
![]() |
| জেরুজালেমে ইহুদিবিদ্বেষ–বিষয়ক এক সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি (ডানে)। তাঁর পাশে বসে আছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার। ২৭ মার্চ, ২০২৫ ছবি: এএফপি |
Monday, February 2, 2026
সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে মিশে যাচ্ছে কুর্দি-নেতৃত্বাধীন এসডিএফ
গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে এসডিএফ জানায়, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর এই সমঝোতা হয়েছে। পরে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হবে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের ঝটিকা হামলার ফলে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়। এরপর বিদ্রোহীদের নেতা আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়।
বাশারের পতনের কয়েক সপ্তাহ পর শারার সরকার উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় এসডিএফের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এ অভিযান ছিল পুরো দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি সরকারি বাহিনী ও এসডিএফের মধ্যে ব্যাপক সংঘাত হয়। তবে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বজায় আছে। এর ধারাবাহিকতায় এসডিএফকে কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় সিরিয়ার সেনাবাহিনী উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এসডিএফের কাছ থেকে দখলে নেয়। এই দ্রুত অগ্রগতির ফলে শারার নেতৃত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে। সংঘাতের আগে এসডিএফের যোদ্ধা ও কুর্দি রাজনৈতিক কাঠামোকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছিল; কিন্তু কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি।
চুক্তির মূল দিকগুলো
চুক্তি অনুযায়ী, উভয় পক্ষ সংঘাতের সম্মুখভাগ থেকে নিজ নিজ বাহিনী ও যোদ্ধাদের প্রত্যাহার করবে। হাসাকাহ ও কামিশলি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কেন্দ্রীয় সরকারের সেনা ও নিরাপত্তা ইউনিট মোতায়েন করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করা হবে।
এসডিএফ এক বিবৃতিতে জানায়, একটি নতুন সামরিক ডিভিশন গঠন করা হবে। এতে এসডিএফের তিনটি ব্রিগেড অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ছাড়া কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত শহর কোবানি (আইন আল-আরব) এলাকায় থাকা বাহিনী নিয়ে একটি আলাদা ব্রিগেড গঠন করা হবে, যা আলেপ্পো গভর্নরেটের অধীনে থাকবে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এসডিএফ পরিচালিত স্বশাসিত প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করা হবে। এতে বেসামরিক কর্মীদের চাকরি ও অবস্থান বহাল রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি মোটামুটি কার্যকর রয়েছে। তবে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। সরকার বাকি কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এসডিএফ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিজেদের শেষ কয়েকটি ঘাঁটি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আহমেদ আল-শারার সঙ্গে ফোনালাপের পর তিনি বলেন, সিরিয়ার সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে তিনি ‘খুব খুশি’।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, আল-শারা ট্রাম্পকে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সিরিয়ার পূর্ণ অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা ও নাগরিক শান্তি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
আইএসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফকে সমর্থন দিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র আল-শারাকেই সিরিয়ায় তাদের প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখছে।
গত বুধবার আল-শারা মস্কোতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সিরিয়ায় রাশিয়ার একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি রক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই ক্রেমলিন এই বৈঠকে আগ্রহী ছিল।
![]() |
| চলতি মাসের শুরুতে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনী এসডিএফের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। ফাইল ছবি: এএফপি |
Sunday, January 11, 2026
আরব বসন্তে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রনায়করা এখন কোথায়?
তিউনিসিয়ার জয়নাল আবিদিন বিন আলি
তার জন্ম ১৯৩৬ সালে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্বাসনে থেকেই ২০১৯ সালে তার মৃত্যু হয়। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেন আলি প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবাকে শারীরিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে কঠোর শাসন কায়েম করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও দুর্নীতি, বৈষম্য ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। টানা এক মাসের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি বেন আলি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। পরে তিউনিসিয়ার আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ২০১৯ সালে সৌদি আরবে নির্বাসনে তার মৃত্যু হয়।
মিশর: হোসনি মুবারক
১৯৮১ সালে আনোয়ার সাদাত হত্যার পর ক্ষমতায় আসেন মুবারক। জরুরি আইন ও সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেন। ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি গণবিক্ষোভ শুরু হয় এবং ১৮ দিনের মাথায় ১১ ফেব্রুয়ারি মুবারক পদত্যাগে বাধ্য হন। বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হলেও পরে তা বাতিল হয়। দুর্নীতির মামলায় কিছুদিন আটক থাকার পর ২০১৭ সালে মুক্তি পান। ২০২০ সালে কায়রোতে তার মৃত্যু হয়।
ইয়েমেন: আলি আবদুল্লাহ সালেহ
ইয়েমেনের রাজনীতিতে দক্ষ কৌশলী হিসেবে পরিচিত সালেহ ৩৩ বছর দেশ শাসন করেন। ২০১১ সালের আন্দোলনের পর ২০১২ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তিনি সাবেক শত্রু হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে জোট বেঁধে ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলে সহায়তা করেন। কিন্তু ২০১৭ সালে সেই জোট ভেঙে গেলে হুথি বাহিনীর হাতে তিনি নিহত হন।
লিবিয়া: মুয়াম্মার গাদ্দাফি
১৯৬৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসা গাদ্দাফি চার দশকের বেশি সময় লিবিয়া শাসন করেন। তেল সম্পদের ওপর ভর করে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। ২০১১ সালে বেনগাজিতে আন্দোলন শুরু হলে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ন্যাটোর বিমান হামলা ও বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় তার শাসনের অবসান ঘটে। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর সির্তে শহরে বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়ে তিনি নিহত হন।
সিরিয়া: বাশার আল-আসাদ
২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় আসেন। ২০১১ সালে দারা শহরে শিক্ষার্থীদের গ্রাফিতি লেখাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত ও অর্ধেকের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তি এতে জড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর হায়াত তাহরির আল-শামের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের দ্রুত অভিযানে দামেস্কের পতন ঘটে। বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ মস্কোতে পালিয়ে যান এবং সেখানে আশ্রয় নেন।
আরব বসন্ত বহু স্বৈরশাসকের পতন ঘটালেও অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কারও পরিণতি হয়েছে মৃত্যু, কারও নির্বাসন, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ- আরব বসন্তের উত্তরাধিকার আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

Wednesday, December 31, 2025
ইসরায়েলের চোখে ‘নতুন সিরিয়া’ কেন বিপজ্জনক by আলী বাকির
গত এক বছরে সিরিয়া ধীরে ধীরে ধ্বংসের কিনারা থেকে সরে এলেও দেশটির অবস্থান এখনো নড়বড়ে। প্রেসিডেন্ট আহমদ আল শারার নেতৃত্বে সিরিয়া আর আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে থাকা রাষ্ট্র নেই। দেশটি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক পুনঃসংযোগ এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতির দিকে এগোচ্ছে। তবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। সিরিয়ার পক্ষে দাঁড়ানো আঞ্চলিক শক্তির সংখ্যা সীমিত এবং একাধিক শক্তি ওখানকার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এসবের মধ্যে ইসরায়েল একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
গত এক বছরে সিরিয়ায় বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। আসাদের শাসনের শেষ দিকের নিষ্ঠুর সময়ের তুলনায় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ সিরীয় নিজ দেশে ফিরে এসেছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী এবং ১৮ লাখ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে। এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের সতর্কতার সঙ্গে বাড়তে থাকা আস্থারই প্রতিফলন।
শারা সরকারের বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতিতে উত্তেজনা কমানো, স্থিতিশীলতা এবং পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। দেশের ভেতরে সরকার বিপ্লবী বৈধতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার দিকে অগ্রসর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আসাদের শাসনামলে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া সদস্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার চালু করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি সাংবিধানিক ঘোষণা এবং নতুন সংসদ গঠন।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার সবগুলো শক্তির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। কুখ্যাত মুখাবারাত গোয়েন্দা সংস্থাকে বিলুপ্ত করে তার জায়গায় জেনারেল সিকিউরিটি সার্ভিস গঠন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে একীভূত করে একটি জাতীয় সেনাবাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে সিরিয়া সফলভাবে আবার আরব বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাতার ও সৌদি আরব নতুন সরকারের মিত্র হিসেবে সামনে এসেছে। ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরেই প্রেসিডেন্ট শারা নজিরবিহীনভাবে কয়েকটি বিদেশ সফর করেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল ঐতিহাসিক। পাশাপাশি তিনি ফ্রান্স ও রাশিয়ার সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। এসব কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ সুগম হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার পুনঃঅন্তর্ভুক্তি আরও শক্তিশালী হয়।
নতুন ও স্থিতিশীল সিরিয়া গঠনে যেসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তাদের মধ্যে তুরস্ক অন্যতম। আসাদ সরকারের পতনের পর আঙ্কারার সঙ্গে দামেস্কের সম্পর্ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। এই সম্পর্কের ভিত্তি হলো সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং অভিন্ন হুমকির মোকাবিলা।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক নতুন সিরিয়াকে প্রভাবিতকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখে তুরস্ক সিরীয় রাষ্ট্রের বিপর্যয় ঠেকাতে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
এরপরেও সিরিয়ার নেতৃত্বকে কঠিন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দীর্ঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব অত্যন্ত বিশাল। পুনর্গঠনের ব্যয় এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং এখনো লাখ লাখ সিরীয় রয়েছে বাস্তুচ্যুত অবস্থায়। ফলে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ব্যাপকতা অত্যন্ত গভীর।
রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল। আসাদ সরকারের পতনের ফলে কিছু প্রভাবশালী সংখ্যালঘু গোষ্ঠী তাদের দীর্ঘদিনের বিশেষ সুবিধা হারিয়েছে। এর ফলে এমন একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা নানা অজুহাতে নতুন ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের মতো ধারণাকে সামনে রেখে তারা নিজেদের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বাহ্যিক দিক থেকে ইসরায়েল এখনো সবচেয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও বিপজ্জনক শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। তেল আবিব নতুন সিরিয়াকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার কৌশল অনুসরণ করছে, যাতে তারা আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে পারে এবং গোলান মালভূমির দখল স্থায়ী করতে পারে।
গত এক বছরে ইসরায়েল একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল নতুন সরকারকে দুর্বল করা এবং সিরিয়াকে স্থায়ীভাবে অক্ষম অবস্থায় রেখে দেওয়া। আসাদ সরকারের পতনের পর ইরানের প্রভাব কমে গেছে, তবে তারা আবার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।
২০২৬ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর টানাপোড়েনে। সম্পূর্ণ স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির দিকে হঠাৎ কোনো বড় অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা যেমন কম, তেমনি আবার সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলকভাবে কম। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো, নানা বাধা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা।
দামেস্ক ও আঙ্কারার সম্পর্ক সিরিয়ার ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি হয়ে থাকবে। তবে সিরীয় জনগণ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সবাইকে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখতে হবে। সামনে পথ হবে দীর্ঘ, কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এই যাত্রায় ধৈর্য ও দৃঢ় অঙ্গীকার যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন ভেতরের ও বাইরের সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে সতর্কতা, যারা সিরিয়াকে একটি নতুন যুগের দিকে এগিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।
• আলী বাকির, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| বাশার আল-আসাদের পতনের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বক্তব্য দেন। ৮ ডিসেম্বর, দামেস্ক। ছবি : রয়টার্স |
Monday, December 29, 2025
লাতাকিয়ায় বিক্ষোভে সহিংসতা, বহু হতাহত
সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বিক্ষোভের মধ্যে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ঢুকে পড়ে এবং গুলিবর্ষণ শুরু করলে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। এতে বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা হতাহত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাঁজোয়া যানসহ সেনাবাহিনীর ইউনিট লাতাকিয়া ও তারতুস শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হয়। কর্তৃপক্ষ বলেছে, সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আরও সহিংসতা ঠেকানো।
লাতাকিয়া প্রদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল আজিজ আল-আহমাদ জানান, বিক্ষোভস্থলের কাছে মোতায়েন নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অজ্ঞাত স্থান থেকে গুলি চালানো হয়। এতে নিরাপত্তাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হন এবং পুলিশের কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, বিক্ষোভকারীর ভিড়ে লুকিয়ে থাকা একটি সশস্ত্র দল নিরাপত্তা চৌকিতে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য আহত হন।
শাফাক নিউজের দামেস্ক প্রতিনিধি জানান, রোববার লাতাকিয়া, তারতুস ছাড়াও হোমস ও হামা শহরে আলাউইত সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তারা ফেডারেল ব্যবস্থা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করেন।

Friday, December 19, 2025
মস্কোয় কেমন আছেন বাশার আল আসাদ
লন্ডনে চক্ষু চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন আসাদ। এখন নিজের পুরোনো সেই শিক্ষার আলো আবারও জ্বালাতে চাইছেন তিনি। রাশিয়ায় বসে নতুন করে শুরু করেছেন চক্ষু চিকিৎসার পড়াশোনা। আসাদ পরিবারের একজন বন্ধুর বরাতে এমন খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হাত পাকিয়ে তিনি রাশিয়ার এলিটদের ক্লায়েন্ট বানাবেন। তবে টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে নয় বরং নিজের প্রবল আগ্রহ থেকেই এই পেশায় ফিরতে চান আসাদ। এমনকি সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর আগেও নাকি দামেস্কে নিয়মিত চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাকটিস চালিয়ে গেছেন তিনি।
সাবেক এই স্বৈরশাসকের স্ত্রী আসমা আল আসাদ লিউকেমিয়ার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। তবে মস্কোয় তিনি এক্সপেরিমেন্টাল চিকিৎসা নিয়েছেন। সুস্থ হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতেই নতুন প্লট নিয়ে হাজির হয়েছেন আসাদ। এখন নিজের সাইড স্টোরি দিয়ে গণমাধ্যমে শিরোনাম হতে চাইছেন তিনি। এমনকি তিনি এখন স্বেচ্ছায় মার্কিন ও রুশ মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। যদিও বিষয়টা এতটা সরল নয়। রুশ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের সাক্ষাৎকারই দিতে পারবেন না তিনি।
১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত হন আসাদ। দীর্ঘ আর রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। জানা গেছে, একেবারে শেষ মুহূর্তে রাশিয়া পালিয়ে যান আসাদ। কিন্তু তাকে নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে, যেসব নেতারা ক্ষমতা হারান, তাদের ব্যাপারে পুতিনের ধৈর্য নেই বললেই চলে। তাই আসাদকে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিত্ব কিংবা তাকে ডিনারে দাওয়াত দেওয়ার মতো অতিথিও মনে করেন না পুতিন।
ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক প্রভাবও কমে গেছে আসাদ পরিবারের। তাই মস্কো ও আমিরাতে নিরিবিলি ও একান্ত সময় কাটাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে আমিরাত তো আসাদের সন্তানদের দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে উঠেছে। তারা সেখানে প্রায়ই ঘুরতে যান। বহির্বিশ্বের সঙ্গে আসাদের খুব একটা যোগাযোগ নেই। বরং তার প্রাসাদে থাকা হাতেগোনা কয়েকজনের সঙ্গেই তার যোগাযোগ রয়েছে। একাকী সময় কাটালেও বিলাসিতায় কোনো কমতি নেই আসাদ কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের।

Monday, December 15, 2025
বাশারমুক্ত সিরিয়ায় বিদেশি শক্তির পাশাখেলা by আলতাফ পারভেজ
সিরিয়ায় আসাদ বংশকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু ২০১১ সালে এবং সফল হয় ২০২৪–এর ডিসেম্বরে। চলতি ডিসেম্বরে বাশার আল–আসাদহীন সিরিয়ার এক বছর হলো। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, বাথ পার্টিবিরোধী ‘বিপ্লবী’রা ক্ষমতায় এসে এক বছরে মানুষের জন্য কী করলেন, দেশটির কী অবস্থা?
বাশার এখন মস্কোতে
আসাদকে পালানোতে বাধ্য করে মুখ্যত হায়াত তাহরির আল-শামস (এইচটিএস)। এই নামের বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘সিরিয়ার মুক্তির জন্য গঠিত সংস্থা’। এটা ছিল হঠাৎ সৃষ্ট ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সশস্ত্র জোট। চূড়ান্ত যুদ্ধকালে তুরস্কের সহায়তাপুষ্ট সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মিও (এসএনএ) এইচটিএসের পাশে ছিল। এসএনএ গড়ে ওঠে বাশারের বাহিনী ছেড়ে আসা কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে। গৃহযুদ্ধের শুরুতে দেশটির বিভিন্ন দিকে অনেকগুলো সংগঠন বাশারবিরোধী যুদ্ধে নামে। ক্রমে তারা টেলিগ্রাম চ্যানেলকে ব্যবহার করে যত যূথবদ্ধ হয়েছে, তত প্রতিপক্ষকে কাবু করায় সফল হয়েছে।
সিরিয়ায় আসাদ বংশ ক্ষমতায় ছিল প্রায় ৫০ বছর। পরিবারের সর্বশেষ শাসক ক্ষমতাচ্যুত বাশার আল-আসাদ এখন মস্কোতে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি সেখানে পালান। বাশারের ক্ষমতাচ্যুতির ভেতর দিয়ে বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিকাশমান বাথ পার্টির শেষ দুর্গের পতন হয়।
বাশারের পর
বাশার আল-আসাদ ডিসেম্বরে পালিয়ে গেলেও আহমেদ আল-শারা দেশটির প্রেসিডেন্ট হন দু-তিন মাস পর। বাশারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শুরুতে তিনি ছিলেন আল-কায়েদার সিরিয়া শাখা আল-নুসরা ফ্রন্টের নেতা। এইচটিএস ওই আল-নুসরার পরিবর্তিত এক ধরনের নাম।
শারার সরকার এ মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। আরও চার বছর এই সংবিধানের অধীনে দেশ চলবে। এত দিনকার বাশারবিরোধী সশস্ত্র গ্রুপগুলো নতুন সরকারের প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
মানবাধিকার দলন উল্টো চেহারা নিয়েছে
বাশার বংশ দামেস্ক থেকে চলে গেছে—এটা প্রচারিত হওয়ামাত্র সিরিয়াজুড়ে ব্যাপক লুটপাট হয় বেশ কয়েক দিন। লুটের প্রধান শিকার হয় বাশারের সহযোগী, রাষ্ট্রীয় নানান প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষভাবে সংখ্যালঘু আলাউইত ও দ্রুজ পরিবাগুলো। কোথাও কোথাও কবরস্থানগুলোও ভাঙচুর হয়। এ রকম একটা স্থান হলো বাশার আল-আসাদের বাবা হাফেজ আল-আসাদের কবর। হাফেজ আসাদ ও সাদ্দাম হোসেন ছিলেন আরব জাতীয়তাবাদী বাথ পার্টির দুই বড় চরিত্র। আট দশক আগে সিরিয়াতেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ওই রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল।
বাশার পরিবারের পলায়নমাত্র দেশটির অনেক মানবাধিকারকর্মী ওই আমলের অন্যায়-অবিচারের ডকুমেন্টেশন শুরু করেন, যাতে বিচারের দাবি তোলা যায়। তাঁদের সমস্যা হলো, আসাদদের পরে অন্যায়-অবিচারের ভিন্ন আরেক সুনামি বইছে সিরিয়াজুড়ে এবং এর শিকার মুখ্যত অ-সুন্নি জনগোষ্ঠী। আলাউইত ও দ্রুজদের বাইরে খ্রিষ্টানরাও নিয়মিত আক্রান্ত ও অপহৃত হচ্ছে। কেউ কেউ মারা পড়ছে। বড় অংশ পালাচ্ছে। তবে আল-শারার মন্ত্রিপরিষদে দ্রুজ, খ্রিষ্টান, কুর্দি ও আলাউইত সম্প্রদায়ের একজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভার এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চেহারা দেশ-বিদেশে প্রশংসিতও হয়েছে।
নতুন সরকারের এক বছর পূর্তিকালে সবচেয়ে বড় চমক হলো, এইচটিএস বলছে, আইএস (ইসলামিক স্টেট) গেরিলাদের নির্মূলে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে সিরিয়া। শারা রীতিমতো ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে এই অঙ্গীকার করে এসেছেন গত নভেম্বরে। একদিকে সাবেক আইএস সহযোগীরা ক্ষমতায়, আবার তারাই অন্য আইএসদের ধরপাকড়ে সহযোগিতা করতে চায়—এ রকম সবই একধরনের ধাঁধার মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে নতুন সিরিয়ার কাছে আরেক নীরব চাওয়া, দামেস্ক যেন ক্রমে ইসরায়েলের বন্ধু হয়ে ওঠে। একে ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়ই বলতে হবে; কারণ, বহুকাল ধরে সিরিয়া প্যালেস্টাইন গেরিলাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের বড় কূটনৈতিক বন্ধু। এখন শারার কল্যাণে পুরোনো সিরিয়ার পুরোনো ইসরায়েল নীতি অনেকটা বদলে যাবে বলে মনে হচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক পাশাখেলা
সিরিয়ায় আসাদের পতনের পর সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে। ১৩ বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর যুক্তরাষ্ট্র দারুণ উৎসাহের সঙ্গে ‘নতুন সিরিয়া’র সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়েছে। অথচ আজকের সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক-সামরিক উত্থান সেই সংগঠনের সহযোগী হিসেবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিমান হামলার দায়ে অভিযুক্ত।
আল-শারা ও আল-নুসরা ফ্রন্ট ২০২৪ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কালোতালিকাভুক্ত থাকলেও এখন ওয়াশিংটনের শাসকেরা সিরিয়ার নতুন সরকারের বড় মিত্র। পূর্বের ‘সন্ত্রাসী’ মোহাম্মদ আল-জোলানিকেই এখন মার্কিন মিডিয়া ‘আল-শারা’ নামে ‘মডারেট লিডার’ বলছে! ট্রাম্প দেশটির ওপর থেকে এত দিনকার অর্থনৈতিক অবরোধও তুলে নিয়েছেন। এসব দেখে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র শারার মাধ্যমে সিরিয়ার ‘বিপ্লব’ ছিনতাই করেছে।
সময়টা এখন তুরস্কের
বাশার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কৃতিত্বের বড় অংশ বিদেশিদেরও প্রাপ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক এ বিষয়ে বড় দাবিদার। শেষ মুহূর্তের ঘটনাবলির প্রধান কৃতিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বদলে তুরস্কের প্রাপ্য। ইসরায়েলের মতো তুরস্কও চায় বাশার–উত্তর সিরিয়ার একাংশ তার প্রভাবে থাকুক। প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে সে চেষ্টাই করছে তারা, যে সীমান্তের দুই দিকে আছে কুর্দিরা। সিরিয়ায় আঙ্কারার প্রভাব বাড়ামাত্র কুর্দিরা এরদোয়ান সরকারের সঙ্গে আপস চুক্তির মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধে রাজি হয়েছে।
নতুন সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দিদের জন্য কোণঠাসা এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিরিয়াতেও কুর্দিদের সংগঠন এসডিএফ নতুন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছে। এ চুক্তির একটা অংশ হলো দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দিদের যে স্বঘোষিত স্বায়ত্তশাসিত এলাকা রয়েছে, তাকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আনার বিষয়।
এটা একটা স্পর্শকাতর অধ্যায়, যার বাস্তবায়ন কীভাবে হয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় আরও কিছুদিন থাকতে হবে। তুরস্ক তার দেশের কুর্দি তো বটেই, সিরিয়ার কুর্দিদেরও কোনো ধরনের স্বশাসনের বিপক্ষে। কুর্দিদের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাগত ভবিষ্যতরর প্রশ্নে তুরস্কের বিপরীত অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। শারার পক্ষে এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে না।
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পরপরই ২০-৩০ লাখ মানুষ তুরস্কের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে। এ ঘটনা এবং কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি মোকাবিলার অজুহাতে তুরস্ক সিরিয়ার ভেতরে বেশ বড় একটা এলাকায় নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে রেখেছে। নতুন সরকারের আমলে সিরিয়ায় সফরকারী প্রথম বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন। বাস্তব কারণেই আহমেদ আল-শারাকেও প্রথম বিদেশ সফরে তুরস্কে যেতে হয়।
এর মধ্যেই ২০১২ সাল থেকে বন্ধ তুরস্ক দূতাবাস খুলেছে দামেস্কে। সিরিয়ার বাজারব্যবস্থায় তুরস্কের কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে যুক্ত হবে বলে সবার ধারণা। আঙ্কারা শরণার্থীদেরও ফেরত পাঠাতে ইচ্ছুক। সিরিয়ায় এর প্রভাব থাকলে মিসর ও ইসরায়েলকে বাদ দিয়েই সন্নিহিত সাগরের খনিজ উত্তোলনের চেষ্টা চালাবে তারা। তবে তুরস্কের এ রকম সব পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের চাওয়ার ওপর।
ইসরায়েলের নির্বিঘ্ন উপস্থিতি
বাশারের সঙ্গে ইসরায়েলের বিবাদের মূলে ছিল সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি। যেহেতু তেহরান হামাস ও হিজবুল্লাহকে অস্ত্র জোগাত, সে কারণে ইসরায়েল সিরিয়ার মাটিতে ইরানিদের দেখতে অনিচ্ছুক ছিল। গৃহযুদ্ধে ইরান ও হিজবুল্লাহর সমর্থনে আসাদের বিজয় হতো ইসরায়েলের জন্য সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক বিপদ। এতে ইরান-ইরাক-সিরিয়া-লেবাননজুড়ে লম্বা এক সামরিক রুটে ইরানের সহজ চলাচল কায়েম হয়ে যেত।
সেই হিসাব থেকে ইসরায়েল শারাদের বিপ্লবী অভিযানের এক দূরবর্তী সহযোগী ছিল। গৃহযুদ্ধের মধ্যে তারা বারবার বাশারের সহযোগী ইরানের সামরিক স্থাপনা ও সরবরাহ লাইনে হামলা করে আগুয়ান গেরিলাদের জন্য বন্ধুসুলভ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-তুরস্ক মিলে বাশারকে সরাতে ইতিহাসের ওই সময় বাছাই করেছে এ কারণেও যে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এত বেশি যুক্ত হয়ে পড়েছিল, বাশারের সমর্থনে বাড়তি জনবল ও অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
সিরিয়ায় সশস্ত্র সুন্নি শক্তিকে ক্ষমতায় বসিয়ে সেখান থেকে শিয়া ইরানকে দূরে রাখাকে ইসরায়েল আপাতত বেশ সুবিধাজনক মনে করলেও নিজেদের তারা পুরো বিপদ–মুক্ত ভাবে না। সে জন্য গত এক বছর ইসরায়েলের বিমানগুলো সিরিয়াজুড়ে উন্নত অস্ত্রপাতির গুদামগুলো বেছে বেছে ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি তুরস্কের মতো সীমান্ত–সংলগ্ন সিরিয়ার একাংশজুড়ে বিশাল এক ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়ে তুলেছে। বাস্তবে এখন তুরস্ক ও ইসরায়েল সীমান্তে সিরিয়ার ভেতর ওই দুই দেশের দুটি বাফার জোন রয়েছে।
ইসরায়েল যেটা চাইছে, তা হলো সিরিয়া জাতিগত সংঘাতে কমবেশি ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে থাকুক আর তুরস্ক সিরিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকুক।
ইরান ও রাশিয়া এখন কী করবে
বাশারের পলায়নে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইরান। সিরিয়ায় ইরানের বিপুল সামরিক বিনিয়োগ ছিল। গৃহযুদ্ধে যুক্ত হয়ে তারা বহু সামরিক প্রতিভাও হারিয়েছে।
ইরানের আহ্বানে ও প্রভাবে বাশারকে রক্ষায় লেবাননের অনেক হিজবুল্লাহ সৈনিকও এসেছিলেন। এ রকম সবাইকে সিরিয়া ছাড়তে হয়েছে দ্রুত। বাশারের পলায়নে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের রাজনৈতিক-সামরিক প্রভাব কমে গেছে অনেকখানি। আশপাশে সব মৌসুমে ভরসা করার মতো বন্ধু নেই আর তাদের। সিরিয়ায় প্রভাব হারিয়ে হিজবুল্লাহকে সহায়তার সরবরাহ লাইনও বিপর্যস্ত। হামাসও অনেকখানি ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ছদ্মযুদ্ধে তেহরান এখন প্রায় কোণঠাসা।
সিরিয়ার মাটিতে ক্রমে ইসরায়েলের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য আমূল পাল্টে যাওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের জন্যও মোটাদাগের এক বিপর্যয়। ধর্মীয়ভাবে বেশ র্যাডিক্যালদের শাসনকালেই এই পালাবদল ঘটছে।
ইরানের জন্য দূরবর্তী একটা আশার আলো হলো সিরিয়ায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নীরব জনমত আছে। এই দুই বিষয়ে ইরানের অবস্থানের প্রতি সিরিয়ার মানুষের সহানুভূতি আছে, যদিও বাশারের প্রতি ইরানি নীতি এই মানুষেরা সমর্থন করত না।
নতুন সিরিয়ায় ইরানের পাশাপাশি রাশিয়ার ভূমিকাও বেশ নগণ্য হয়ে গেছে। তবে সেটা ইরানের মতো বিপর্যয়কর নয়। রাশিয়া পুরোনো সিরিয়ার প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল। শারা সিরিয়ায় রুশদের উপস্থিতি পুরো সরাতে বলছেন না। হয়তো সেটা ইসরায়েলের দিক থেকে ভবিষ্যৎ বিপদের শঙ্কায়। ইতিমধ্যে মস্কো সফর করেছেন তিনি এবং এর পর থেকে সিরিয়ায় রুশদের পুরোনো তিনটি সেনা স্থাপনায় বেশ স্বাভাবিক পরিবেশ দেখা যাচ্ছে।
পুনর্গঠনের অপেক্ষায় অর্থনীতি
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর স্বাভাবিকভাবে সিরিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা চলছে। প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে অবকাঠামোর অর্ধেকই ধ্বংসপ্রাপ্ত। এগুলোর পুনর্নির্মাণ এবং ত্রাণের জন্য বিশেষজ্ঞদের হিসাবে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার দরকার। তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলো এ বিষয়ে সহায়তা করতে ইচ্ছুক। অনেক বিনিয়োগ ঢুকছেও দেশটিতে। তবে এসবের সুফল পেতে সামাজিক পূর্বশর্ত হিসেবে শান্তি দরকার। সমস্যা হলো, শারার সরকারের পক্ষে সেসব উগ্র গ্রুপকে সংখ্যালঘুবিরোধী সহিংসতা থেকে টেনে ধরা কঠিন, যারা বাশারবিরোধী যুদ্ধে মিত্র ছিল।
যুদ্ধকালে দক্ষিণের কুইনেত্রা ও দাররা প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েল ১০-১৫টি সশস্ত্র গ্রুপকে লালন-পালন করত। দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকার এদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে কি না, সেটা এখনো অনিশ্চিত।
আরেক সমস্যা ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ। বাশার পালালেও গত ১২ মাসে ইসরায়েল বহুবার দেশটিতে হামলা চালিয়েছে। সিরিয়ার ভেতর বহু জায়গায় তাদের চেকপোস্ট। সন্দেহ হলে নানাজনকে ধরেও নিয়ে যাচ্ছে তারা। নতুন সরকার এসব বিষয়ে দায়সারা বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে।
সিরিয়া যা শেখাল
কীভাবে একটা কর্তৃত্ববাদী সরকার সমৃদ্ধ কোনো দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং সেই ঝুঁকিকে ব্যবহার করে আবার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তি কীভাবে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করে নেয়, আজকের সিরিয়া তার এক পাঠকক্ষ।
শারার সরকার যতই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করুক, এটা রূঢ় বাস্তবতা যে দেশটির ভাগ্য নির্ধারক এখন তুরস্ক, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ভূরাজনৈতিক ওই পাশাখেলায় শারা ও তাঁর সহযোগীরা ধর্মীয় আবরণে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে কেবল। কিন্তু বিশ্বের মানুষের কৌতূহল একটাই, দেশটিতে কথিত বিপ্লবের পর শান্তি আসবে কি না?
বিলাদ আল–শাম মধ্যপ্রাচ্যের এমন এক জায়গা, যেখানে শান্তি না আসা পর্যন্ত পুরো অঞ্চলে শান্তি আসবে না। শাম অঞ্চলে ফ্যাসাদ সৃষ্টির ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও মনে করিয়ে দেয় বর্তমান বাস্তবতা।
* আলতাফ পারভেজ, ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| (বাঁ থেকে ডানে) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ১৪ মে ২০২৫ ছবি: হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে |
Thursday, December 11, 2025
বাশারের পতনের এক বছরে কত মানুষ ঘরে ফিরলেন সিরিয়ায়
১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ দেশ ছাড়েন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ শরণার্থীদের অর্ধেকের বেশি, তথা প্রায় ৩৭ লাখ ৪ হাজার আশ্রয় নেন প্রতিবেশী দেশ তুরস্কে। লেবাননে আশ্রয় নেন প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার। জর্ডানে আশ্রয় নেন প্রায় ৬ লাখ ৭২ হাজার।
২০১২ থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন প্রায় ৭ লাখ ৫ হাজার সিরিয়ার শরণার্থী। তবে নিবন্ধনের বাইরেও ইউরোপের এসব দেশে সিরিয়ার অনেক শরণার্থী রয়েছেন। বাশারের পতনের পর এসব দেশ সিরিয়ার শরণার্থী নেওয়া একধরনের বন্ধ করে দিয়েছে।
সিরিয়ায় যেহেতু এখন একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তাই লাখ লাখ শরণার্থী এবং প্রবাসে চলে যাওয়া সিরিয়ার নাগরিক দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। চাইছেন নিজ দেশে নতুন করে জীবন শুরু করতে।
ফিরে আসা শরণার্থী
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, বাশারের পতনের পর এক বছরে প্রায় ৭ লাখ ৮২ হাজার সিরিয়ার নাগরিক বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে আলেপ্পোতে ১ লাখ ৭০ হাজার, হোমসে ১ লাখ ৩৪ হাজার এবং দামেস্কের গ্রামাঞ্চলে ১ লাখ ২৪ হাজার মানুষ বিদেশ থেকে স্বদেশে ফিরেছেন।
দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে আসা এসব ব্যক্তিদের অনেকে ব্যবসা শুরু করেছেন। তবে দেশটিতে উপযুক্ত বেতনে চাকরি খুঁজে পাওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি।
অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ
গত এক বছরে সিরিয়ার অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১৮ লাখ মানুষ নিজেদের গ্রাম বা শহরে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে আলেপ্পোতে ৪ লাখ ৭১ হাজার, ইদলিবে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার এবং হামায় ৩ লাখ ১৪ হাজার মানুষ নিজ বাড়িঘরে ফিরে এসেছেন।
তালাল নাদার আল-আব্দো নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি ও তাঁর পরিবার গৃহযুদ্ধ চলাকালে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বাশারের পতনের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়িতে ফিরে এসেছেন। তিনি বাড়িটির পুনর্নির্মাণ শুরু করেছেন।
গত এক বছরে শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মিলিয়ে সাকল্যে ২৬ লাখ সিরিয়ার নাগরিক নিজ বাড়িঘরে ফিরেছেন। কিন্তু এখনো দেশের ভেতরে ৬০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রয়ে গেছেন।
‘স্বদেশে ফেরার অনুভূতি’
দামেস্কের ব্যবস্থাপনা প্রশাসনের কর্মকর্তা খালিদ আল-শাত্তা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর সিরিয়া ছেড়ে গিয়েছিলেন। তিনি এখন দেশে ফিরে এসেছেন। খালিদ নিজের স্ত্রী ও এক বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে প্রথমে জর্ডানে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে গিয়েছিলেন তুরস্কে। সেখানেই তিনি একধরনের স্থায়ী হয়ে গিয়েছিলেন।
বাশারের পতনের সময়কার কথা স্মরণ করে খালিদ বলেন, ‘তখন দেশব্যাপী ব্যাপক উত্তেজনা চলছিল। সেই রাতে আমরা সবাই জেগে খবর দেখছিলাম।’
৪১ বছর বয়সী এ ব্যক্তি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সিরিয়া যে মুহূর্তে মুক্ত হলো, তখনই আমরা (ফিরে যাওয়ার) সিদ্ধান্ত নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার ও আমার মনে হয়েছিল, আমাদের সিরিয়ায় ফিরে গিয়ে দেশ গড়ায় অংশ নেওয়া উচিত।’
১৩ বছর পর সিরিয়ায় ফেরার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে খালিদ বলেন, ‘মনে হলো আমি যেন কখনো সিরিয়া ছেড়ে যাইনি। তবে এই দেশ, এই জাতি এবং এই ভূমির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকার অনুভূতি অন্য রকম।’
![]() |
| বাশার আল-আসাদের পতনের পর তুরস্কের রেহ্যানলি শহরের সিলভেগোজু সীমান্ত ক্রসিংয়ে নিজ দেশে প্রবেশের জন্য সিরিয়ার শরণার্থীদের অপেক্ষা। ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। ছবি: এএফপি |
Monday, December 8, 2025
ইসরায়েল অন্য দেশে সংকট ছড়িয়ে দিচ্ছে, ‘কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে’: সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট
শনিবার কাতারে অনুষ্ঠিত দোহা ফোরামের ফাঁকে সিএনএনের সাংবাদিক ক্রিস্টিয়েন আমানপুরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শারা এ কথা বলেন।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবারও দাবি করেন, ইসরায়েল যেন ১৯৭৪ সালের সংঘাত নিরসন চুক্তি মেনে চলতে রাজি হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী সিরিয়া ও ইসরায়েলের সেনাদের মুখোমুখি না হওয়ার কথা। এক বছর আগে বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ সিরিয়ায় ঢুকে পড়ে এবং এখনো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হেরমন পর্বতচূড়া দখল করে রেখেছে। এই পর্বতচূড়া থেকে ইসরায়েল, লেবানন ও সিরিয়া তিনটি দেশই দেখা যায়। এটি ৫০ বছর ধরে একটি ‘বাফার জোন’ ছিল।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, এক বছর আগে দখলে নেওয়া জায়গাগুলোতে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, সিরিয়া ১৯৭৪ সালের চুক্তি মেনে চলার বিষয়ে অনড় এবং কোনো বিকল্প বাফার জোন গ্রহণ করবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দাবি জানাচ্ছি, ইসরায়েলকে ৮ ডিসেম্বরের (২০২৪) আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে আল-শারার বিদ্রোহী বাহিনী সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ঢুকে পড়লে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘চুক্তিটি সংশোধন করার চেষ্টা করা হলে তা আমাদের একটি গুরুতর এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘যদি সিরীয় সেনা বা সিরীয় বাহিনী সেখানে না থাকে, তবে এই বাফার জোন বা অসামরিক অঞ্চলের সুরক্ষা কে দেবে?’
ইসরায়েলের প্রতি ইঙ্গিত করে শারা আরও বলেন, ‘এক বছর আগের বিপ্লবের পর থেকে সিরিয়ার আকাশসীমা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। আমাদের ওপর এক হাজারের বেশি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। চার শতাধিক বার অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।’
গত মাসের শেষের দিকে সিরিয়ায় ইসরায়েলের চালানো সামরিক অভিযানে কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া আল-শারা চলতি বছরের শুরুতে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে শত শত সংখ্যালঘু আলাউইতদের নিপীড়নের ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ওই ঘটনায় কয়েক আলাউইত নিহত হন। আলাউইতদের বেশির ভাগই আসাদ সরকারকে সমর্থন করত।
![]() |
| দোহা ফোরামে কথা বলছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। দোহা, কাতার; ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, November 18, 2025
হোয়াইট হাউসে সাবেক ‘জিহাদি কমান্ডার’, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নতুন বাজি by জাসিম আল-আজযাভি
মাত্র এক বছর আগেও আল-শারা ছিলেন এমন এক বিদ্রোহী, যাঁর মাথার দাম যুক্তরাষ্ট্রই ঘোষণা করেছিল এক কোটি ডলার। আর এখন তিনিই বসে আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে। ঘৃণিত শত্রু নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভাঙাচোরা রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর সম্ভাব্য সহযোগী হিসেবে।
একজন জিহাদি কমান্ডার থেকে আল-শারার রাষ্ট্রপ্রধানে রূপান্তর সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক পালাবদলগুলোর একটি। একসময় ‘আবু মুহাম্মদ আল-জোলানি’ নামে পরিচিত এই লোক যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরাকে যুদ্ধ করেছেন। পরে আল-কায়েদার শাখা সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শামের নেতৃত্বও দিয়েছেন। এমনকি একসময় তিনি মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দিও ছিলেন।
২০১৩ সালে তালিকাভুক্ত ছিলেন বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে। অথচ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাঁর বাহিনীই মাত্র ১১ দিনে বাশার আল-আসাদের শাসনকে শেষ করে দিল। শেষ করে দিল অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলা এক নিষ্ঠুর একনায়কতন্ত্র।
নানা প্রলোভন
আল-শারার এই পরিবর্তনের গতি ছিল চোখধাঁধানো। গত বছর ওয়াশিংটন নিঃশব্দে তাঁর ওপর থেকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা তুলে নেয়। এদিকে হোয়াইট হাউস সফরের ঠিক কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আল-শারা ও তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর থেকে বাতিল করে নিষেধাজ্ঞা।
ট্রাম্পও স্বভাবসুলভভাবে বরণ করে নিয়েছেন এই সিরীয় নেতাকে। ট্রাম্পের ভাষায় আল-শারা এখন ‘কঠিন এক অঞ্চলের কঠিন মানুষ।’ তাঁর দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেছেন ট্রাম্প।
মার্কিন প্রশাসন ইতিমধ্যে ‘সিজার আইন’-এর আওতায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছে। এখন কংগ্রেসে তা স্থায়ীভাবে বাতিলের উদ্যোগ নিচ্ছে। যা সিরিয়াকে পুনর্গঠনের জন্য শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের দরজা খুলে দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে সিরিয়ায় পুনর্গঠনের ব্যয় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। তাই আল-শারার সফরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে বিশাল।
তবে আল-শারার ওয়াশিংটন সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি অর্থনৈতিক নয়; বরং পুনর্মিলনের। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে। গোপন বৈঠকগুলোয় মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালাচ্ছেন ১৯৪৮ সাল থেকে একপ্রকার যুদ্ধাবস্থায় থাকা দামেস্ক ও তেল আবিবের মধ্যে এমন একটি নিরাপত্তা চুক্তির, যা আগে কখনো ঘটেনি।
এই চেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের পারস্পরিক সীমান্তে একটি যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে ইসরায়েল নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে গোলান মালভূমির একটি নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করেছে। দামেস্ক চায় সেই সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়া হোক। এদিকে ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিরস্ত্রীকরণ করা হোক এবং সেখানে ইরানি প্রভাব পুরোপুরি শেষ করার নিশ্চয়তা দেওয়া হোক।
প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে আলোচনা করবে না সিরিয়া। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়াকে আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে সেই আগ্রহকে আল-শারা উড়িয়ে দিয়েছেন ‘অবাস্তব’ বলে। এই জটিলতার মূল কারণও ধারণা করা যায়। তা হচ্ছে, গোলান মালভূমি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই মালভূমি ১৯৬৭ সালে সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে ইসরায়েল। ১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত করে নেয় নিজেদের মানচিত্রে। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া দেয়নি কেউই।
বৈধতার বিনিময়ে গোলান মালভূমি?
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চলমান আলোচনায় সিরিয়া গোলান মালভূমি ফেরত চাওয়ার দাবি জোরালোভাবে তুলছে না। তাদের দাবি সীমিত রয়েছে ইসরায়েলের সম্প্রতি দখল করা বাফার জোনগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহারের মধ্যে। কিছু প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হচ্ছে, দামেস্ক শান্তিচুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে অন্তত গোলানের এক-তৃতীয়াংশ ফেরত চায়। আবার কেউ কেউ ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার বা লিজ চুক্তির মতো জটিল প্রস্তাবও দিয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, গোলানের ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি না দিলে কোনো ধরনের চুক্তিই সম্ভব নয়।
আল-শারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্র তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনিও সম্পূর্ণ কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতা করছেন। কারণ, এতে আঙ্কারার আঞ্চলিক প্রভাব কমে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের প্রভাব বাড়তে পারে।
এদিকে সিরিয়ার সাধারণ মানুষ বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। দামেস্ক ও আলেপ্পোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকের অভিযোগ, আল-শারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় সিরিয়ার জমি বিকিয়ে দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার—পশ্চিমা চাহিদার সিরিয়া মানে ইরান ও তার ‘প্রতিরোধ জোটের’ জন্য এক ভয়াবহ ধাক্কা। যদি দামেস্ক তেহরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে চলে যাবে ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্র ও তেল আবিবের পক্ষে। নেতানিয়াহু বিষয়টি একেবারে স্পষ্টই বলেছেন, ইরান ও হিজবুল্লাহর দুর্বলতাই সিরিয়ার সঙ্গে আলোচনাকে ‘সম্ভব’ করে তুলেছে।
মূল প্রশ্ন হচ্ছে, আল-শারার হাতে কি যথেষ্ট রাজনৈতিক পুঁজি আছে নিজের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য? তিনি এখনো একটি বিভক্ত দেশের শাসক, তাঁর নিরাপত্তা বাহিনীর আনুগত্যও প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর নিজের জোটের মধ্যেই তুরস্ক-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা রয়েছে। একসময় জিহাদি কমান্ডার হিসেবে তাঁর অতীত তাঁকে আসাদকে উৎখাত করার সক্ষমতা দিয়েছে বটে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ভিন্ন দক্ষতা।
বাজির মঞ্চে এক জিহাদি
আল-শারার হোয়াইট হাউস সফর খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এক বাজি। এই বাজির অংশীদার আরও অনেকে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বাজি হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রলোভন ও কূটনৈতিক স্বীকৃতির সমন্বয়ে তাঁরা এক সাবেক সন্ত্রাসী নেতাকে নির্ভরযোগ্য অংশীদারে রূপান্তর করতে পারবেন।
অন্যদিকে সদ্য ক্ষমতায় আসা সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাজি ধরেছেন যে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুনর্গঠনের অর্থায়ন পেতে পারেন। সেটি নিজের দেশের জনগণকে সম্পূর্ণভাবে দূরে সরিয়ে না দিয়েই কিংবা সিরিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ভূখণ্ডগত দাবি বিসর্জন না দিয়েই।
আল-শারা হয়তো মনে করছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক জাতির জন্য তিনি বাস্তববাদী পথই নিচ্ছেন; কিন্তু যে জনগণ এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, তাদের কাছে এই বাস্তববাদই আত্মসমর্পণের মতো।
সামনের মাসগুলোই নির্ধারণ করবে আল-শারা স্বীকৃতি অর্জন করতে পারবেন কি না, আত্মসমর্পণ ছাড়া পুনর্গঠন এগিয়ে নিতে পারবেন কি না, স্বাধীনতা হারানো ছাড়া এবং বৈধতা অর্জন করতে পারেন বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া।
আপাতত আহমেদ আল-শারা দাঁড়িয়ে আছেন এক বিশাল কূটনৈতিক পরীক্ষার কেন্দ্রে। যা হয়তো অস্থির এক অঞ্চলকে স্থিতিশীল করবে, নয়তো নতুন করে আগুন জ্বালিয়ে দেবে এমন এক ভূমিতে, যা ইতিমধ্যেই সহ্য করেছে অগণিত যন্ত্রণা।
* জাসিম আল-আজযাভি, মধ্যপ্রাচ্যের সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক। কাজ করেছেন এমবিসি, আবুধাবি টিভি ও আলজাজিরা ইংরেজিতে
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১০ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি |
Monday, November 10, 2025
সেই শারা ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন
সিরীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ইসলামিক স্টেটের সন্দেহভাজন ৭১ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে আহমেদ শারা সিরিয়াকে পুনরায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশটি আসাদ শাসনের অধীনে বহু বছর বিচ্ছিন্ন ছিল এবং ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে জর্জরিত। তিনি এ বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। সেখানে তিনি বলেন, সিরিয়া আবারও বিশ্বের জাতিগুলোর মধ্যে তার যথার্থ অবস্থান পুনরুদ্ধার করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। এ সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে সমর্থন জানায়। এটি ওয়াশিংটনের মাসব্যাপী ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। শুক্রবার আহমেদ শারা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনাস হাসান খাত্তাবের নাম যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ-অর্থায়নে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট জানায়, সিরীয় নেতৃত্ব যে অগ্রগতি প্রদর্শন করেছে তার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শারা’র নাম এর আগে ‘মুহাম্মদ আল-জাওলানি’ নামে তালিকাভুক্ত ছিল। এটি ছিল তার ছদ্মনাম। তখন তিনি হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর নেতা ছিলেন। এই গোষ্ঠী ২০১৬ সাল পর্যন্ত আল-কায়েদার সহযোগী ছিল। পরে শারা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এইচটিএস নেতৃত্বের আগে শারা ইরাকে আল-কায়েদার হয়ে যুদ্ধ করেন এবং একসময় মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দী ছিলেন। তার মাথার দাম ছিল এক কোটি ডলার। এ বছর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র এইচটিএস-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ট্রাম্প এর আগে মে মাসে রিয়াদ সফরের সময় শারা’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে বর্ণনা করেন একজন কঠিন মানুষ, অতীতে অনেক শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে। তার অতীত সত্ত্বেও, শারা এমন সব সরকারের সমর্থন পেয়েছেন যারা আসাদ শাসনের বিরোধিতা করেছিল। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন একটি মধ্যপন্থী সরকার গঠনের, যা সিরিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও গোষ্ঠীর সমর্থন পেতে সক্ষম হবে।
এ বছর তিনি ঘোষণা দেন, তার নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব সদস্য সিরিয়ার আলাওয়ি সংখ্যালঘুদের হত্যা করেছে বলে অভিযোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সুন্নি বেদুইন উপজাতি যোদ্ধা ও দ্রুজ মিলিশিয়াদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ দেখা দিয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- এইচটিএস-নেতৃত্বাধীন সরকার কি সত্যিই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবে?

Tuesday, October 7, 2025
যে মার্কিন জেনারেল একদিন গ্রেপ্তার করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এক মঞ্চে বসে সাক্ষাৎকার দিলেন আল-শারা
গত বছর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন আহমেদ আল-শারা। ডিসেম্বরের ওই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের ৫০ বছরের শাসনকালের অবসান হয়। এ বছর জানুয়ারিতে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বিদ্রোহী নেতা আল-শারা।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল পেট্রাউস। তাঁর ওই বাহিনীই আল-শারাকে ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার করে ২০১১ সাল পর্যন্ত কারাবন্দী করে রেখেছিল। আল-শারা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার কারণে সে সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
পরে পেট্রাউস যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আসাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে ২০১২ সালে আল-শারা আল-নুসরা ফ্রন্ট নামে একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। চার বছর পর আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন তিনি।
তার এক বছর পরে আল-নুসরা সিরিয়ায় আসাদ সরকারবিরোধী অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলিত হয়ে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামে একটি দল গঠন করেন। এ দলের নেতৃত্বও থাকে আহমেদ আল-শারার হাতে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার সঙ্গে অতীত সম্পর্কের কারণে হায়াত তাহরির আল-শামকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে ওয়াশিংটন আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার প্রতি নরম অবস্থান থেকে ওই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেয়।
যুক্তরাষ্ট্র আল-শারাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এক কোটি মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। গত বছর ডিসেম্বরের শেষের দিকে ওই ঘোষণাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
সময় ও স্থানের তাৎপর্য
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে রোববার নিউইয়র্কে পৌঁছান আহমেদ আল-শারা। প্রায় ছয় দশকের মধ্যে তিনিই প্রথম কোনো সিরীয় রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন।
সেখানে প্রেসিডেন্ট আল-শারা এবং তাঁর বিশাল প্রতিনিধিদল বিভিন্ন বৈঠক করছেন। তাঁরা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও বৈঠক করেন। সোমবার সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে একাধিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আল-শারা।
সেদিন আল–শারা সাবেক সেনা কর্মকর্তা পেট্রাউসের সঙ্গে ২০২৫ সালের ‘কনকর্ডিয়া অ্যানুয়াল সামিটে’ অংশ নেন। এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত একটি বৈশ্বিক ফোরাম।
এই সম্মেলনে বিশ্বনেতারা, ব্যবসায়িক নেতারা ও এনজিও প্রতিনিধিরা মিলিত হন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।
আল-শারার ‘ভক্ত’ পেট্রাউস
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল পেট্রাউস একই মঞ্চে আল-শারার সঙ্গে তাঁর জুটিকে খানিকটা অস্বাভাবিক বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে এই মঞ্চ ব্যবহার করে তিনি আহমেদ আল-শারার প্রশংসাও করেন।
দর্শকদের লক্ষ্য করে পেট্রাউস বলেন, ‘বিদ্রোহী নেতা থেকে তাঁর রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ওঠার এই যাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ঘটা অন্যতম নাটকীয় রাজনৈতিক রূপান্তর।’
বাশার আল-আসাদ পালিয়ে যাওয়ার পর সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময়ই দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটিতে গণতন্ত্র ফিরেয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন আল-শারা। নিজের প্রতিশ্রুতি রাখতে অক্টোবরে দেশটিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন তিনি।
গত সোমবার সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে আল-শারার শারীরিক অবস্থা নিয়ে পেট্রাউস উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আল-শারাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি পর্যাপ্ত ঘুমের সময় পান কি না।
মার্কিন এই অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বলেন, আল-শারার অনেক ভক্ত আছেন এবং তাদের মধ্যে তিনিও একজন।
পেট্রাউসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতিহাস জানতে চাওয়া হলে মুখে হাসি টেনে আল-শারা বলেন, ‘একসময় আমরা যুদ্ধ করতাম, আর এখন আমরা সংলাপে প্রবেশ করেছি।’
আল–শারা আরও বলেন, ‘যাঁরা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁরা শান্তির গুরুত্ব বোঝেন। আমরা যেমন অতীতকে আজকের নিয়ম অনুযায়ী বিচার করতে পারি না, তেমনি আজকের ঘটনাকেও অতীতের নিয়ম অনুযায়ী বিচার করতে পারি না।’
আল-কায়েদার একজন কমান্ডার হিসেবে তাঁর সময় কেমন ছিল, এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আল-শারা বলেন, ‘হয়তো আগে কিছু ভুল হয়েছিল।’
আল–শারা বলেন, তবে এখন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিরীয় জনগণ এবং এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করা।
আল–শারা বলেন, ‘সেই লক্ষ্যে করা অঙ্গীকারই আজ আমাদের এখানে (নিউইয়র্ক) নিয়ে এসেছে। আমরা সহকর্মী ও বন্ধুদের মধ্যে বসে আছি।’
![]() |
| সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস নিউইয়র্ক সিটির টাইমস স্কয়ারের শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত কনকর্ডিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চে উপস্থিত হন। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি |
Saturday, October 4, 2025
ইসরায়েলের আগ্রাসন কীভাবে মোকাবিলা করবে তুরস্ক by মুরাত ইয়েসিলতাস
তুরস্ক তাদের এই নতুন সিরিয়া নীতি ‘আঞ্চলিক মালিকানা’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করায়। তুরস্কের সিরিয়া নীতির কেন্দ্রে রয়েছে ইস্যু কুর্দি পিপলস প্রটেকশন ইউনিটস (ওয়াইপিজি)। এরপরও তুরস্ক ওয়াইপিজিকে নিয়ে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে দামেস্কের সঙ্গে সংগঠনটির সমঝোতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে।
তুরস্কের লক্ষ্য হলো একদিকে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা, অন্যদিকে ওয়াইপিজির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা ঠেকানো। এই ফাঁকে ওয়াইপিজি দামেস্কের সঙ্গে একটি চুক্তি করার জন্য সময় পায়। এতে তারা আঙ্কারা ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সামরিক চাপ এড়াতে সক্ষম হয়।
সিরিয়ায় ইসরায়েলের আগ্রাসী অবস্থানের ক্ষেত্রেও আঙ্কারা একই ধরনের আপসকামী নীতি নেয়। নতুন দামেস্ক প্রশাসনকে দুর্বল করা ও সিরিয়ার ভেতরে নিজেদের প্রভাববলয় বাড়ানোর ইসরায়েলি উদ্যোগের মুখে তুরস্ক কূটনৈতিক আলোচনা ও গোয়েন্দাপ্রক্রিয়া সক্রিয় করে। সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে কৌশলী আলোচনার পথ বেছে নেয়।
এই সময়ে ইসরায়েল সিরিয়ার নতুন সরকারের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে, গোলান মালভূমিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করে এবং দক্ষিণের দ্রুজ জনগোষ্ঠীকে ‘রক্ষা’র নামে দামেস্কে প্রতীকী বিমান হামলা চালায়।
কিন্তু এখন ইসরায়েল ও ওয়াইপিজির সঙ্গে তুরস্কের আপসের এই কৌশল আর কাজ করছে না।
সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে সরাসরি নিজেদের প্রভাববলয় গড়ে তুলতে চাইছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো তুরস্ককে অঞ্চলটি থেকে বের করে দেওয়া এবং দামেস্ক সরকারকে দুর্বল করে দিয়ে একটি অস্থিতিশীল সিরিয়া তৈরি করা। সুয়েইদাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সিরিয়ার ভেতরে গড়ে তোলা তুরস্কের নিরাপত্তাকাঠামোর প্রতি হুমকি তৈরি করছে।
সিরিয়া এখন তুরস্ক ও ইসরায়েলের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মঞ্চ। এ অবস্থায় ইসরায়েলের আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আরও সুস্পষ্ট প্রতিরোধমূলক অবস্থান না নিলে তুরস্কেরর পক্ষে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কঠিন বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েল চায় সিরিয়ার আকাশসীমায় পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে।
অন্যদিকে তুরস্ক এ ব্যাপারে সজাগ যে ইসরায়েলের এই হস্তক্ষেপ ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো দামেস্ক প্রশাসনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। কিন্তু আঙ্কারা ও দামেস্কের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে এবং ‘ঘাঁটিসংক্রান্ত চুক্তি’ হলে সেটিকে ইসরায়েল ‘লাল রেখা’ বলে ঘোষণা করেছে। তবে এই তথাকথিত লাল রেখা প্রকৃতপক্ষে যতটা বাস্তব প্রতিরোধ, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত ভাঁওতাবাজি। এর কারণ হলো, ইসরায়েল যদি সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তবে সেটি আঙ্কারাকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে নেওয়ার সমান হবে। তুরস্ক যদি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তেল আবিব বা ওয়াশিংটন—কেউই ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
সিরিয়ায় ইসরায়েলের নীতি শুধু দক্ষিণ সিরিয়ায় দ্রুজ সম্প্রদায়কে হাতিয়ার বানিয়ে নতুন প্রভাববলয় তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ওয়াইপিজিও দেশটির এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসরায়েল চাইছে ওয়াইপিজি ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে সিরিয়ার মাটিতে তুরস্কের কৌশলগত অবস্থানকে সংকুচিত করে দিতে।
এই কৌশল এখন কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসরায়েল ব্যবহার করছে। ওয়াইপিজিকে পরোক্ষ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিয়ে তাদের তুরস্কের ‘লাল রেখা’ অতিক্রমের পথে নিয়ে যেতে চাইছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ওয়াইপিজি ও দামেস্কের মধ্যে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা ঠেকানো, তুরস্কের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা দুর্বল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া নীতি তুরস্কবিরোধী অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া। অভিযোগ আছে, ওয়াশিংটনে তুরস্কের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল কূটনীতিকদের সরিয়ে দিয়ে ইসরায়েল–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসাতে চাপ দিয়েছে তেল আবিব।
অন্যদিকে তুরস্ক ওয়াইপিজি ইস্যুতে স্পষ্ট একটি কৌশলগত সীমারেখার নীতি অনুসরণ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তুরস্ক ওয়াইপিজিকে নির্দিষ্ট সময় দিয়েছে এবং সে সময়ের মধ্যে সংগঠনটির দামেস্কের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছে।
যদি এই প্রত্যাশা পূরণ না হয়, তবে তুরস্ক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে সামরিক বিকল্পটি তারা আরও জোরদারভাবে ব্যবহার করবে। এর অর্থ হচ্ছে, ওয়াইপিজি যাতে শান্তিপূর্ণ পথে নিজেদের রূপান্তর করতে পারে, সেটাতেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে তুরস্ক, কিন্তু প্রয়োজনে ওয়াইপিজিকে সামরিকভাবে দুর্বল করার বিকল্পও ভেবে রেখেছে।
তুরস্কের জন্য ওয়াইপিজি ইস্যুটি এখন শুধুই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুও।
এখন ইসরায়েলের আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য তুরস্কের প্রয়োজন আরও সক্রিয় একটি কৌশল। দামেস্কের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা, আরব দেশগুলোর সঙ্গে কূটনীতি গভীর করা এবং ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই ওয়াইপিজিকে অন্তর্ভুক্ত বা নিষ্ক্রিয় করা—এই তিনটি কৌশলের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
* মুরাত ইয়েসিলতাস, তুরস্কের সিএটিএ ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা বিভাগের পরিচালক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
![]() |
| রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Thursday, October 2, 2025
সিরিয়ায় ‘ব্যর্থ’ আল-শারা, নির্বাচন কি শাপে বর হবে by জাসিম আল-আজ্জাওয়ি
মার্চ মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগত গোষ্ঠীগুলো লাতাকিয়া ও টারতুস উপকূলীয় অঞ্চলে সরকারি বাহিনী এবং মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ জন নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক; ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ জন বাস্তুচ্যুত হয়।
বারবার সংঘটিত এই সহিংসতা প্রকাশ করে দিচ্ছে সেই খোলামেলা সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে, যেটিকে একসময় আসাদ ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এখন তাঁর অনুপস্থিতিতে, সেই বিভাজনগুলো আরও বিস্তৃত হচ্ছে—দশকের পর দশক ধরে চলা অনিষ্পন্ন ক্ষোভ, জমি নিয়ে বিরোধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তারের কারণে।
আসাদকে অপসারণের পর ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট আহমাদ আল-শারা এখনো সব গোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, তাঁর প্রধান মনোযোগ ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে। তাঁর ইসলামপন্থী ঝোঁক সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। দ্রুজ, আলাউই, খ্রিষ্টান ও কুর্দিরা আশঙ্কা করছে যে তিনি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে আরও সহিংসতা ঘটতে পারে।
আগামী সেপ্টেম্বরের নির্বাচন শারা সরকারের জন্য আনুষ্ঠানিক বৈধতা বয়ে আনতে পারে। তবে প্রকৃত নিরাপত্তা ও পুনর্মিলন ছাড়া এই নির্বাচন বিদ্যমান বিভাজনকে আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করছে এবং এমন একটি ক্ষমতার কাঠামোকে শক্তিশালী করছে, যা প্রকৃতপক্ষে ঐক্যবদ্ধ জাতির বদলে কেবল কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করবে।
পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রেসিডেন্ট আল-শারা তাঁর জাতীয় কৌশলে মূলত পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখানেই প্রধানত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে।
মে মাসে আলেপ্পো শহরে (সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর) এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে আল-শারা সিরিয়ানদের পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়েছে আর এখন আমাদের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছে।’
দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে আল-শারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর সহায়তায় তিনি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন: যুক্তরাষ্ট্র সরকার আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়েছে এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শামকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এসডিএফকে নতুন নিরাপত্তাকাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাকেও সমর্থন জানায়।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, দামেস্কের নতুন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া ইরানের প্রভাব কমাতে এবং সিরিয়াকে হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের করিডর হওয়া থেকে বিরত রাখতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে আল-শারার কাছে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈধতা সুনিশ্চিত করার একটি সুযোগ।
সিরিয়ার প্রতিবেশী তুরস্কও আল-শারার জাতীয় কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটি যুদ্ধ ছাড়া সামরিক সহায়তা, যেমন প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে সিরিয়ার নিরাপত্তা অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য। পাশাপাশি তারা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা করছে। এ মাসে তুরস্ক সিরিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে, যা উত্তরের জ্বালানি–সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করছে।
এদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও সিরিয়ার অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জুলাইয়ে সৌদি আরব ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ঘোষণা করে।
এর দুই সপ্তাহ পর সিরিয়ান সরকার কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে গণপরিবহন ও রিয়েল এস্টেট খাতে ১৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে।
তবে অনেক সমালোচক যুক্তি দেন, অর্থনৈতিক সহায়তা একটি দেশের পুনর্গঠনের জন্য অপরিহার্য হলেও, এককভাবে এটি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। ঝুঁকি রয়েছে যে টাকা ও উন্নয়ন প্রকৃত ক্ষোভ ও বিভাজনগুলোকে ঢেকে রাখবে, যা ভবিষ্যতে আবারও সংঘাত উসকে দিতে পারে।
নতুন সিরিয়ান সরকারের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জরুরি প্রয়োজনের সঙ্গে জনগণের অভিযোগ-অভিমত ও ক্ষোভ নিরসনের সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করা।
আইনসভার নির্বাচন
অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা নিরসনের একটি উপায় হলো গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জন আস্থা অর্জন করা। আল-শারা সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন। তবে সাধারণ সিরিয়ানরা সেখানে ভোট দিতে পারবেন না। কারণ, ২১০ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন বেছে নেবে স্থানীয় নির্বাচনী কমিটি এবং বাকি ৭০টি আসন সরাসরি প্রেসিডেন্ট নিজে মনোনীত করবেন। কোনো আসনই সরাসরি জনগণের ভোটে পূরণ হবে না।
এই কাঠামো মূলত একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক হিসাব। এটি নতুন নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রিত ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয় এবং একই সঙ্গে সার্বিক জাতীয় ভোট আয়োজনের জটিলতা এড়ায়; বিশেষত তখন, যখন দামেস্ক এখনো দেশের সব ভূখণ্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত নয়।
তবে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অনেক সিরিয়ানই অবিশ্বাসের চোখে দেখবেন, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো। তাদের কাছে এটি সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠদের পক্ষে পক্ষপাতমূলক বলে মনে হবে।
কেউ কেউ হয়তো নির্বাচন বর্জনের পথ বেছে নেবেন, একে অবৈধ ঘোষণা করবেন কিংবা ভিন্ন উপায়ে তাঁদের গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করবেন। কারণ, এই ব্যবস্থায় তাঁদের অর্থবহ কণ্ঠস্বর থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিবিড়ভাবে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে এবং এটি যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়, তবে তারা সমালোচনামূলক অবস্থান নেবে।
এর ফলে নতুন সরকারের নবগঠিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সমর্থন পাওয়ার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দামেস্কের জন্য আরও জরুরি সমস্যা হলো—এই নির্বাচন দেশটির গভীর ক্ষত সারাতে কোনো ভূমিকা রাখবে না, বিশেষত চলমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে। তাই সিরিয়ার এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি সর্বজনীন জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া।
ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি
সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার এখনো ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করতে পারেনি। বাশার আল-আসাদের আমলে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, যার মধ্যে ছিল গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন ও রাসায়নিক হামলা—এগুলো আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞের জন্য দোষীদের জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
জবাবদিহির অনুপস্থিতি কেবল নৈতিক ব্যর্থতা নয়, কৌশলগত ব্যর্থতাও বটে। অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার মতো আইনগত কাঠামো না থাকলে সিরিয়ার ক্ষত আরও গভীর হবে।
সিরিয়ার প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি। জনগণ আর সেই পুরোনো দায়মুক্তির ভিত্তি মেনে নেবে না, যা অতীত শাসনকে টিকিয়ে রেখেছিল।
ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াটি অবশ্যই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হতে হবে। বাশার আল-আসাদের দীর্ঘকালীন এক পরিবারকেন্দ্রিক শাসন, যা আলাওয়ি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এর প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার এককভাবে বিচারক হতে পারে না।
রাষ্ট্র–নেতৃত্বাধীন কোনো প্রক্রিয়াকে সহজেই নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায় বা পুরোনো শাসনের অনুগতদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে দেখা হতে পারে। এই ধারণা দূর করতে এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে জাতিসংঘের, সহায়তা সিরিয়ার জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর মতো একটি কাঠামো শক্তিশালী কৌশল হতে পারে। এটি শুধু শাস্তির দিকে মনোযোগ না দিয়ে অতীতের অপরাধ—যেমন গণহত্যা, নির্যাতন ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাগুলো উন্মোচনের ওপর অগ্রাধিকার দেবে।
এ প্রক্রিয়া সিরিয়াকে শাস্তিমূলক বিচারব্যবস্থা থেকে দূরে সরাতে সাহায্য করতে পারে, যা সমাধান না দিয়ে কেবল শুদ্ধীকরণে মনোযোগ দেয়। এটি নতুন শাসনব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা তৈরি করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বয়ান নয় বরং একটি যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নতুন সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করতে পারে।
একই সঙ্গে এটি ফেডারেলিজমের দাবিকে প্রশমিত করতে পারে, যা দেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সিরিয়ার রূপান্তর কখনোই সহজ হতো না। কিন্তু বর্তমান সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সামরিকীকৃত রাজনীতির সিরিয়াকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আনুষ্ঠানিক অগ্রগতিকে অভিনন্দন জানানোর বাইরে যেতে হবে। তাদের অবশ্যই নাগরিক সমাজকে সহায়তা করতে হবে এবং অতীত ও বর্তমান অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলতে হবে।
অন্যথায় সিরিয়ার ভবিষ্যৎ ভয়ংকরভাবে অতীতের মতোই হয়ে উঠবে—নতুন নেতৃত্ব থাকবে। কিন্তু সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার পুরোনো চক্র একই রকম অব্যাহত থাকবে।
* জাসিম আল-আজ্জাওয়ি, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম প্রশিক্ষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম
| দামেস্কের সড়কে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য। সিরিয়া, ২৬ ডিসেম্বর। ছবি: রয়টার্স |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












